Thursday, September 24, 2020
Home গল্প সুদিনের অপেক্ষায়

সুদিনের অপেক্ষায়

বইটা হাতে নিয়ে পাতা উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ হেসে উঠলো নিরব।ও সাধারণত হাসে না।যে বইটা হাতে নিয়েছে সেটা আলমারি থেকে আমিই বের করে দিয়েছি।কোন রম্য গল্পের বই নয় যে ওটা পড়ে হাসতে হবে।ওটা একটা কবিতার বই।কবিতা পড়েও হাসা যায় তবে সেটাতো সুকুমার রায়ের লেখা কবিতা নয়।সুনীলগঙ্গোপাধ্যয়ের লেখা কবিতার বইয়ে নিশ্চই এমন কোন কবিতা নেই যেটা পড়ে নিরবের মত নিরস কোন মানুষ হাসতে পারে।

    আমাদের বন্ধুদের মধ্যে একমাত্র নিরবই কম হাসতো।কম বলতে বলা যায় একেবারেই হাসতো না।প্যারেডের কঠিন সময় গুলোতেও টার্ন নেওয়ার সময় যখন অন্যের পিছনে লাথি লাগতো তখন সেটা দেখেও আমরা যখন হাসি খুব কষ্টে চেপে রাখতাম নিরব ছিল তার উল্টো।হাসির জোক্স বলেও তাকে হাসানো যেত না।সেই নিরব সুনীলের কবিতার বই হাতে হেসে ওঠায় অবাক না হয়ে উপায় কি।

    আমার মনে হলো কবিতা পড়ে হাসেনি বরং অন্য কোন ঘটনা মনে পড়ায় হেসেছে।কলেজের ছয়টা বছরে যাকে কোন দিন কোন ঘটনায় হাসতে দেখিনি তার মনের মধ্যে হঠাৎ কি এমন ঘটনা জন্মালো যা তার মূখে হাসি এনে দিল।আমি নিজের বইটা বন্ধ করে ওর পাশে এসে দাড়ালাম।ওদের বাড়িতে যে লাইব্রেরীটা আছে ওখানেই দিন কাটে নিরবের।যেন নিরবে নিভৃতে সে একাকী কাটাতে চায় প্রতিটি মুহুর্ত।সেই লাইব্রেরীতেই দুই বন্ধু গল্প পড়ে সময় কাটাবো বলে ভেবেছিলাম আর তখনই ওর হাসি আমাকে এলোমেলো করে দিল।

    কাধের উপর হাত রেখে জানতে চাইলাম আজ হঠাৎ কি এমন হলো যে তুই এমন করে হাসছিস?নিরব হাতে ধরে রাখা কবিতার বইটির একটি পৃষ্ঠা খুলে দেখাল।সেখানে দেখতে পেলাম সুনীলের শ্রেষ্ঠতম কবিতা “কেউ কথা রাখেনি”।কবিতাটা খুবই মায়া ভরা,বেদনা ভরা।এই কবিতা পড়ে কেউ হাসবেনা,চাই সে যত রসিক লোকই হোকনা কেন।অথচ আমার বন্ধু নিরব হেসেছে।আমি বললাম তুই এই কবিতা পড়ে হেসেছিস?নিরব মাথা নাড়িয়ে সায় দিল।আমি বললাম এখানে এই কবিতাতে হাসির কি আছে?

    নিরব কোন কথা না বলে আমার হাত ধরে টেনে পাশের চেয়ারে বসালো।তার পর কিছুটা সময় নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো আমি এই কবিতাটি দেখেই হেসেছি তার অনেক কারণ আছে।বহু কাল আগে ক্লাস নাইনে থাকতে প্রথম এই কবিতাটি পড়েছিলাম আর তাচ্ছিল্য করে মনে মনে বলেছিলাম মিথ্যে বলেছে সুনীল।কেউ কথা রাখেনি এই কথাটি সত্যি না।অনেক মানুষ কথা রাখে।অন্তত আমার জন্যতো এটা মোটেই ঠিক নয়।আমার কথা অনেকেই রাখে।আমি যখন যা বলি তাই সবাই মেনে নেয়।তুই নিজেও আমার কথা শুনেছিস অনেকবার।আমি তাই সুনীলের কবিতার কথাগুলিকে মেনে নিতে পারিনি।নিজেই বলেছি সুনীল মিথ্যা কথা লিখেছে।

    নিরব কিছুটা থামলে আমি বললাম ঠিকইতো আছে। তাহলে তুই আজকে কেন হাসলি।নিরব বললো সেদিন আমি শুধু শুধুই সুনীল গঙ্গোপাধ্যয়কে দোষারোপ করেছি।সুনীল আসলে মিথ্যে বলেনি।সুনীলের কবিতাটাই সত্যি।কেউ কথা রাখেনি।আদতেই কেউ কথা রাখেনা।

    নিরবের কন্ঠ ধরে আসে।নিরব না বললেও আমার বুঝতে বাকি থাকেনা।আমারও তখন মনে হয় কেউ কথা রাখেনি,কেউ কথা রাখেনা।

নিরবের স্বপ্ন গুলো হঠাৎ ভেঙ্গে গেল এক অজানা ঝড়ে। যে নিরব ক্যাডেট কলেজ থেকে পাশ করে সেনাবাহিনীতে অফিসার হয়ে দেশের সেবা করবে বলে ভেবেছিল সেই নিরবের সেনাবাহিনীতে যাওয়া হয়নি।ভেবেছিল কদিন পর না হয় বিমান বাহিনীর হয়ে আকাশে ডানা মেলবে সেই স্বপ্নটাও পুরণ হয়নি।নিরবের সব কিছু পাওয়ার অধিকার ছিল,সব কিছু পাওয়ার যোগ্যতাও ছিল।শুধু নিরবের ভাগ্যে সেসব লেখা ছিলনা।হঠাৎ নিবর অসুস্থ্য হয়ে পড়ায় আকাশে ওড়ার স্বপ্নটাও পুরণ হয়নি।

    এখন নিরব সারাদিন বাড়িতে থাকে।হুইল চেয়ারে করে বাড়িতে গড়ে তোলা লাইব্রেরীতে ঢুকে বই পড়ে দিন কাটায়।ঠিকমত পড়তেও পারেনা।একটা পড়লেই মাথা ব্যাথা হয় আর চোখে অন্ধকার দেখে।আকাশে ওড়ার স্বপ্ন যেমন সত্যি হয়নি তেমনি সত্যি হয়নি ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্নও।ঠিক মত পড়তে পারেনা অসুস্থ্যতার কারণে।ফলে ভর্তি হওয়া হয়নি কোথাও।

    যে নিরব ক্যাডেট কলেজের সেরা ছাত্রদের একজন ছিল এবং বন্ধুরা যার থেকে হেল্প নেওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকতো আজ সেই নিরব একাকী নিভৃতে দিনকাটায়।সেই সব বন্ধুরা কেউ ওর খোঁজ নেয়না।কেউ আর্মিতে কেউ বিমান বাহিনীতে আবার কেউ ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার পথে।আর নিরব যেন আজীবনের জন্য পণ করেছে নিরবতা পালনের।বন্ধুরা ওর খোজ নেয়না বলে ওর মনে হয়তো কিছুটা কষ্ট ছিল।তবে সেটা সে মেনে নিয়েছিল এটা ভেবে যে ওই বন্ধুদেরকে সে নিজেওতো খুব বেশি সময় দেয়নি।আজকে ওর এই অসময়ে তাই সেইসব বন্ধুরা না এলেও কিছু বলার থাকেনা।তাহলে নিরবের দুঃখটা কোথায়? আসলে নিরবের দুঃখ অন্য খানে।

    যে বন্ধুদের সে সময় দিতে পারেনি তারা এখন ওকে ভুলে গেলেও কিছু করার নেই।কিন্তু নিরব যার জন্য সময় দিয়েছে সে যদি ওকে ভুলে যায় তাহলে দুঃখ না হয়ে উপায় কি? সুনীলের কবিতাটা পড়ে নিরব ভেবেছিল সুনীল মিথ্যা কথা বলেছে।কেউ কথা রাখেনা এটা নিরব মানতে পারেনি।অন্তত দৃষ্টি নামের মেয়েটি নিশ্চই কোন দিন কথা না রাখার দলে যেতে পারবেনা।কিন্তু আজ কবিতাটি আবার পড়তে গিয়ে নিরব বুঝেছে সুনীল মিথ্যা বলেনি।যার উপর আস্থা রেখে সুনীলকে মিথ্যা বলতেই দ্বিধা করেনি নিরব,সেই দৃষ্টিও কথা না রাখাদের দলে মিশে গেছে।এখন সে হয়েছে বরুনা।তার বুকে কেবলই মাংসের গন্ধ।এখনো সে যে কোন নারী।

    ক্লাস সিক্সে ক্যাডেট কোচিংএ পরিচয় হয়েছিল নিরব আর দৃষ্টির।রংপুর শহরের নিরিবিলিতে সেই ক্যাডেট কোচিংএ ছোট্ট দুটি মানুষ রোজ ক্লাসে যেত।চোখাচোখি হত কিন্তু সেই বয়সে ভাললাগার বিষয়টি তাদের মনে গড়ে ওঠেনি।তার পর কিভাবে কিভাবে যেন দুজনই চান্স পেলো ক্যাডেট কলেজে।ক্লাস নাইনের ভ্যাকেশানে ওদের দেখা হলো।নতুন করে পরিচয় হলো।সেই পরিচয়ের গন্ডি বহু দূর এগোলো।

    নিরবের মনে হতো সুর্য পুব থেকে পশ্চিমে উঠতে পারে কিন্তু দৃষ্টি কখনো তাকে একা করে দিয়ে চলে যেতে পারেনা।কিন্তু নিরব ভুল ছিল।নিরবের হিসাবেও ভুল ছিল।নিরব এখন দৃষ্টিহীন।চোখের আলো আছে,গোটা পৃথিবীকে সে আমাদের মতই দেখতে পায় শুধু সে দেখতে পায়না দৃষ্টিকে।সে দৃষ্টিহীন।

    নিরব অসুস্থ্য হয়ে পড়ায় তার ক্যারিয়ারের সব স্বপ্ন মুছে গেল।নিরব তখন নিরবে নিভৃতে একাকী জীবন কাটাতে শুরু করলো।অন্য সবার সাথে সাথে কোন কিছু না জানিয়ে দৃষ্টিও চলে গেল দৃষ্টি সীমার বাইরে।এক বিকেলে খালার বাসা থেকে খালাতো ভাইয়ের সাথে ঘুরতে বেরিয়েছিল নিরব।ও হাটতে পারেনা বলে সারাক্ষণ হুইল চেয়ারই ওর সঙ্গী।তবে এটা অটো হুইলার হওয়ায় কাউকে কষ্ট করে ওর চেয়ার ঠেলতে হয়না।আইবিএর সামনে গিয়ে নিরব যখন চারদিকটা ভাল করে দেখছিল তখন আইবিএ ভবনের সিড়ি বেয়ে নেমে এলো এক অপ্সরা।নিরব তাকে চেনে।তার হাটা,তার চুল থেকে ভেসে আসা ঘ্রান,তার চাহুনী,তার প্রতিটি নিঃশ্বাস নিরবের চেনা।সে তার হারিয়ে যাওয়া দৃষ্টি।

    দৃষ্টিহীন নিরবকেও নিশ্চই দৃষ্টির চিনতে না পারার কোন কারণ নেই।কিন্তু পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার সময়ও একটি বারের জন্যও কথা বলেনি নিরবের সাথে।নিরবের দু চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়েছে অব্যক্ত বেদনার অশ্রু।সেই থেকে নিরবের বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা আরো প্রবল হয়েছে।তার মনোবল ক্রমাগত ভাবে বাড়ছে।সে স্বপ্ন দেখে একটা উজ্জল দিনের।যেদিন তার আকাশ থেকে সব কালো মেঘ সরেগিয়ে সাদা মেঘের ভেলা উড়বে।যেদিন নিরবের আর কোন দৃষ্টির দরকার পড়বেনা।নিরব বিশ্বাস করে সে সফল হবেই।এখন তার এক একটা দিন কাটে সুদিনের অপেক্ষায়।

২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

Most Popular

জমজ সন্তানের মায়েরা

সন্তান জন্মদানের মাধ্যমে একজন মা পরিপুর্নতা লাভ করেন। তার জীবনের সব থেকে বড় পাওয়া হলো নিজ গর্ভে জন্মনেওয়া সন্তান। সন্তান যেমনই হোক...

শোল মাছের মাথা

আরিফের জীবনে হঠাৎ করে প্রেম আসলো। আরিফ নিজেও কখনো ভাবেনি এমন কারো প্রতি তার মুগ্ধতা তৈরি হবে। স্কুল জীবনে রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজে...

করোনায় বিপযস্থ কর্মজীবী মায়েরা

করোনা ভাইরাস পৃথিবীতে এমন ভাবে বিস্তার করেছে যে নিজ ঘরেও কেউ আজ আর নিরাপদ নয়। নানা ভাবে দিন দিন সংক্রমন বেড়েই চলেছে।এর...

ব্যাংক,জালনোট,এটিএম এবং সাধারনের ভুল ধারণা

আজকের এই লেখাটি সেই সব মানুষের জন্য যারা কোন না কোন সময় ব্যাংক অথবা এটিএম থেকে টাকা উত্তোলন করতে গিয়ে এক বা...

Recent Comments