কচুরিপানার খাল



বিকেলে ফুটবল খেলতে গিয়ে রোজ একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতো কলেজে।এ ফর্মের কারো পা থেকে বল গিয়ে যদি কোন ভাবে ইকরামের পায়ে ঠেকতো তাহলে সেই চিরচেনা ঘটনা।বলকে কিছুক্ষন এ পা ও পা করে গোলপোষ্টের দিকে সজোরে লাথি মারতো।বল কোন কালেও গোলপোস্টে যেতো না বরং সেটা গোলবারের উপর দিয়ে উড়ে গিয়ে পড়তো পাশের খালের মাঝখানে।বিরক্ত লাগতো সবার।কচুরিপানায় ভর্তি খালে অসংখ্য জোঁক কিলবিল করতো।বল একবার সখানে পড়লে কে তুলে আনবে?দুমিনিটের জন্য খালে নামলে অন্তত দশটা জোঁক আটকে যেতো পায়ে।কেউ যখন যেতে রাজি নয় তখন দেখা যেতো ইকরাম স্বেচ্ছায় গিয়ে সেই কোমর সমান পানি থেকে গিয়ে বল কুড়িয়ে নিয়ে আসতো।অতটুকু সময়েই তার পায়ে চার পাঁচটা জোঁক লেগে যেতো।সে তখন খেলা থামিয়ে খালপাড়ে বসে বসে জোঁক ছড়াতো।ওপারে দেখা যেতো দুটো ছোট্ট মেয়ে আর একজন মা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে।তারা যেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে একটা ছেলে পা থেকে জোঁক ছড়াচ্ছে।

প্রথম প্রথম কয়েকদিন মনে হয়েছে ইকরাম বোধহয় গোল করার জন্যই সজোরে গোলপোষ্টে বল মারতো কিন্তু কোন কারণে গোল হতো না।কিন্তু ঘটনাটা ছিল ভিন্ন কিছু সেটা টের পাওয়া গেলো এক বুধবার বিকেলে। এ ফর্ম বিফর্ম করে খেলা হতো।সেদিন এ ফর্ম পড়লো খালের সাইডে আর বি ফর্ম অন্য সাইডে।ইকরাম ছিলো এ ফর্মে কিন্তু সে খেলতে রাজি হলো না।সে চায় খালের বিপরীত সাইডে খেলতে।এর পর নিয়মে পরিণত হয়ে গেলো যেন।তখনো সেভাবে কিছু বুঝা যায়নি কিন্তু রোজই যখন খেলতে গিয়ে ইকরাম গোলপোষ্টের কাছে গিয়ে সজোরে বলে লাথি মারতো আর সেটা গিয়ে বরাবরের মতই পড়তো কচুরিপানার খালে তখন সবাই খুব বিরক্ত হতো।অথচ রোজকার মতই সে স্বেচ্ছায় জোকের কামড় সহ্য করে খাল থেকে বল কুড়িয়ে নিয়ে আসতো।ক্লাসের অন্যরা সবাই আশ্চর্য হয়ে দেখলো প্রতিদিনই ইকরাম একই কাজ করছে এবং সেই সময়ে খালপাড়ে সেই দুটো ছোট্ট মেয়ে আর তাদের মা দাড়িয়ে ওর দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছে।সেই হাত নাড়ানো দেখে ইকরামের মুখে হাসি ফুটে উঠতো।জোকের কামড়ের যায়গা থেকে তখন রক্ত বের হলেও সে সেসবে গুরুত্ব দিতো না।

ছেলেটা বোধহয় কুমিরের রচনার গল্পটি জানতো।আর তাই রচনার সেই গল্পের মতই ঘটতো ওর ক্ষেত্রে।সেই যে একটা ছেলেকে টিচার যে রচনাই লিখতে দিতো সে সেটাতে কুমির টেনে আনতো অনেকটা সেরকম।তাকে যখন পলাশীর যুদ্ধের রচনা লিখতে দেওয়া হয়েছিল এই ভেবে যে অন্তত এই রচনাতে সে কুমির আনতে পারবে না তখন দেখা গেলো ছেলেটা ঠিকই লিখলো নবার সিরাজউদ্দৌলা মিরজাফরকে আশ্রয় দিয়ে খাল কেটে কুমির এনেছে।ইকরামও ঠিক সেরকমই করলো।যেখানে যে পজিশনেই তাকে খেলতে দেওয়া হোকনা কেন সে ঠিকই বলটাকে কচুরিপানার খালে পাঠাবেই।একসময় জানা গেলো মুলরহস্য।ওপারে দাড়িয়ে থাকা বাচ্চা মেয়েদুটি ছিলো ইকরামের বোন।আর তাদের সাথে দাড়িয়ে হাত নাড়া মহিলা ছিলেন ইকরামের মা।অন্যরা এটা জানার পর খুব আফসোস করতো।ইস ইকরাম কত সৌভাগ্যবান।রোজ বিকেলে মাকে বোনদেরকে দেখতে পায়।এ খাল ভরা বর্ষায় উপচে পড়তো; আর হিম শীতে তার পানি হতো কোমর পর্যন্ত। প্রিন্সিপাল স্যারের বাড়ির পিছের অংশের পানি বেশ গভীর ছিল। এই খালের শীতল পানিতে নেমে ইকরামদের সাতার চলতো অবিরাম।দুইধারের দুই বাসিন্দাদের মধ্যে চোখাচোখি হতো কথা হতো ইশারায়।এতো কাছে থেকেও এতো দূরে।কচুরিপানারা তখন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখতো।পুবোন বাতাসে কচুরিপাতা নড়তো সেই সাথে নড়ে উঠতো মায়ের মন।ব্যাকুল হয়ে তাকিয়ে থাকতো ছেলের দিকে।ছেলে তখন আচল ছোয়া দূরত্বে থেকেও অধরা।পিটির আগে দৌড়ে চলে যেতো খালপাড়ে যদি মায়ের সাথে দেখা হয়।

এর পর কেটে গেছে অনেক বছর।পুরোনো সেই খাল এখনো আছে আগের চেয়ে বদলে গেছে ঢের।পুরোনো সেই মানুষগুলো নেই।খালের একপাশে এখন মা তার সন্তানকে দেখবে বলে দাড়িয়ে থাকে না।তিনি থাকেন আরো দূরে নক্ষত্র ভরা আকাশে।তাকিয়ে থাকেন সন্তানের দিকে। ইকরামও এখন আর সেই খালপাড়ে বসে পায়ে লেগে থাকা জোক ছড়াতে ছড়াতে মা বোনকে দেখতে পায়না।সে বরং ভরা পুর্নিমার রাতে আকাশের পানে তাকিয়ে দেখে ওইতো দূর নক্ষত্র মাঝে জ্বলজ্বল করে জ্বলে থাকা তারাটিই বুঝি মা।ইকরামের তখন মনে হয় দূর আকাশে তারা হয়ে জ্বলে থাকা মা আর মাটির পৃথিবীতে বসে থাকা ছেলের মাঝে যে দুরত্ব তা বুঝি সেই কচুরিপানার খালের মতই।দূরত্ব যতটুকুই হোক সেটা অধরাই রয়ে গেছে।যেমন অধরা ছিলো খাকিচত্বরের সেই কচুরিপানার খাল পাড়ে দাড়ানো প্রিয়জন।ইকরামের মনেও পড়েনা কেউ কোন দিন ওই খালটির কোন নাম দিয়েছিলো।ইকরামের খুব ইচ্ছে করে মায়ের স্মৃতিকে স্মরণ করে ওই খালের একটা নাম দিবে।কি নাম দিবে সে ভাবতে থাকে।তার মন বলে খালটির নাম হতে পারে মাতৃস্নেহ।কেননা নিয়মের বেড়াজালে আটকা পড়লেও সে ওই খালপাড়ে গেলে মাতৃস্নেহ খুঁজে পেতো।আকাশের দিকে তাকিয়ে ইকরাম একথা যখন ভাবছিল তখন একটা তারা তার সমস্ত আলো নিয়ে একবার জ্বলে উঠলো।ইকরামের মনে হলো মা বুঝি এ কথায় সম্মতি দিচ্ছে।

১৮ নভেম্বর ২০১৮

Tags: ,