ট্রেনের জানালার ধারে বসে আনমনে বাইরে তাকিয়ে আছে রিফাহ। ট্রেনটা ধীরে ধীরে গতি নিচ্ছিল। ক্রমাগত ভাবে পেছনে সরে যাচ্ছিল দৃশ্যগুলো। আর সামনে হাজির হচ্ছিল নতুন নতুন দৃশ্য। ধুপধাপ শব্দ তুলে একটার পর একটা কামরা স্টেশনের বুক চিরে ছুটে চলছিলো উত্তরবঙ্গের দিকে। প্ল্যাটফর্ম পেরিয়ে গাছপালা, দোকানপাট, কাঁচাবাজার—সব পেছনে পড়ে যাচ্ছিল, ঠিক যেভাবে রিফাহর কৈশোরও পেছনে পড়ে আছে। আজ সে ট্রেনে বসে; পাশে তার বাবা—চোখেমুখে চিন্তা আর বুকভরা প্রত্যাশা। গন্তব্য রাজশাহী। উদ্দেশ্য—মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা।
“আর একটু পরেই সিরাজগঞ্জের রেলব্রিজ,” বাবা হালকা করে বললেন।
রিফাহ জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। চেনা শ্যাওলা পড়া পিলারগুলো দূর থেকে দৃষ্টিসীমায় এল। সেতুর নিচে পদ্মা—আধা শুকনো, আধা চলমান। স্রোতের গর্জন নেই, কিন্তু তার মধ্যে একটা অব্যক্ত আকর্ষণ আছে। ঠিক যেন নিজের ভেতরের ভয় আর কল্পনার মতো—চুপচাপ, গভীর।
এই ট্রেন যাত্রা যেন একটা অন্যরকম উপলব্ধি নিয়ে এসেছে। কেবল একটি গন্তব্য নয়—একটা অধ্যায়ের শুরু। কাঁধে বইয়ের ব্যাগ, একজোড়া চশমা আর হৃদয়ের গভীরে হাজারো আশঙ্কা আর স্বপ্ন নিয়ে রিফাহ পা রেখেছে এক অচেনা ভবিষ্যতের দিকে।
পাশের সিটে বসে থাকা বাবা মাঝে মাঝে প্রশ্ন করছিলেন—
“পর্যাপ্ত ঘুম হয়েছে তো?”
“আবেদনপত্রে ঠিক মতো ছবি দিয়েছিলে তো?”
“কলেজ কোডগুলো মনে আছে?”
রিফাহ কেবল মাথা নাড়ছিল, কিন্তু মন ছিল না কথাগুলোতে।
তার চোখে তখন ভাসছিল জয়পুরহাট ক্যাডেট কলেজের সেই শেষ ফেয়ারওয়েল রাত। ব্যাগ গুছাতে গুছাতে জুই এসে বলেছিল,
“মেডিকেলেই যাচ্ছ রিফু? আকাশের বদলে হাসপাতাল?”
রিফাহ মুচকি হেসেছিল, বলেছিল,
“চিকিৎসকও তো একধরনের জ্যোতির্বিদ, জীবন নামক গ্রহের চারপাশ ঘিরে মৃত্যুর কক্ষপথ শনাক্ত করে।”
ট্রেন হঠাৎ গতি কমালো। রাজশাহী স্টেশনের কাছে চলে এসেছে। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেমেয়েগুলো—প্রায় সবই ভর্তি পরীক্ষার্থী, কাঁধে ব্যাগ, চোখে তীব্র চাপা টেনশন। কেউ কেউ চোখ বন্ধ করে দোয়া পড়ছে, কেউ আবার বুকের ভেতরে অস্ফুটে ছড়া আওড়াচ্ছে আগে পড়া কোনো বিষয়।
পরীক্ষার আগের রাত তারা থাকবে রাজশাহীতে। একটা ছোট্ট হোটেলে বুকিং দেওয়া হয়েছে আগেই। সেই হোটেলেই বাবা-মেয়ে রাত কাটাবে—রিফাহ পড়ার ভান করবে, কিন্তু তার চোখ ঘুরে ফিরে যাবে সেই পদ্মার দিকে, অথবা জুইয়ের কণ্ঠে আটকে থাকবে।
পরদিন সকালে ভর্তি পরীক্ষা।
সকাল সাতটার ভেতর পৌঁছাতে হবে পরীক্ষাকেন্দ্রে। কলেজ চত্বরে ঢুকতেই লাগলো একটা অন্যরকম শীতলতা। চিরচেনা নয়, কিন্তু খুব চেনা যেন। ভবনের ভেতর নানা ব্যাচের ছাত্রছাত্রীদের ভিড়। দেয়ালে দেয়ালে “সাইলেন্স প্লিজ”, “মোবাইল নিষিদ্ধ”—তবে কারও চোখেই নিষেধের ভয় নেই, সবার ভেতর ভয়টা আলাদা—ভবিষ্যৎ নামক অনিশ্চয়তার।
হলরুমের বেঞ্চিতে বসে রিফাহ বুঝতে পারছিল—এই একটা ঘণ্টা তার বাকি জীবনের প্রবেশপথ। যেটুকু মুখস্থ, সেটুকুই অস্ত্র। আর যেটুকু অনিশ্চয়তা, সেটুকুই সময়ের উপর ছেড়ে দেওয়া।
ঘণ্টা বাজল।
প্রথম প্রশ্নে চোখ রাখতেই চেনা একটা ইকুয়েশন। মাথা ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করে সে পেন চালালো।
পরীক্ষা শেষে বাইরে বেরিয়ে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল রিফাহ। কলেজের গেটের দুপাশে অভিভাবকদের মুখে একধরনের অস্থির কৌতূহল—কারও চোখে জিজ্ঞাসা, কারও ঠোঁটে খুশির আগাম ছায়া, আর কারও মুখে নিঃশব্দ চিন্তার রেখা। রিফাহর বাবা সামনের গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন, মুখে পানি ছিটিয়ে নিচ্ছিলেন।
“কেমন হইছে?”
বাবা জিজ্ঞেস করলেন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, যেন জেনে গেছেন কোনো উত্তরই এখন চূড়ান্ত কিছু বলে না।
“ভালোই… যেটুকু পারি দিয়েছি,”
একটা নিঃসাড় উত্তর দিল রিফাহ।
রিকশা ডেকে হোটেলের দিকে রওনা হল তারা। রাস্তার পাশ দিয়ে ছুটে চলছিল মানুষ, গাড়ি আর হকারদের চিৎকার। কিন্তু এই মুহূর্তে রিফাহর মনে হচ্ছিল যেন তার চারপাশে সবকিছু ম্লান, সাদাটে হয়ে গেছে। তার কানে বাবার কথাও যেন ঠিকমতো ঢুকছিল না।
হোটেলে ফিরে একটু বিশ্রাম নিয়েই বাবার সঙ্গে দুপুরের খাবার খেল সে। খাবার যেন কেমন কৃত্রিম লাগছিল। লবণ মেপে দেওয়া, ডাল কেবল গরম, কিন্তু তাতে মা’র হাতের মতো কোনো নির্ভরতা নেই।
রুমে ফিরে বিছানায় গা এলিয়ে দিল সে। জানালার ফাঁক গলে একটু রোদ ঢুকছে। একটা কবিতা মনে পড়ল—
“সূর্যের আলো মানেই সব উজ্জ্বল নয়, কিছু আলো ছায়া ডেকে আনে।”
বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত ফাঁকা লাগছিল। পরীক্ষার চাপ না, না কোনো অনিশ্চয়তা—একটা শূন্যতা, যেন কোনো কিছু শেষ হয়ে গেল হঠাৎ। অনেকদিন ধরে যে প্রস্তুতি, যে ভয়, যে রুটিনমাফিক চিন্তা—সব এখন থেমে গেছে। এখন কিছুই করার নেই, শুধু অপেক্ষা।
হঠাৎ মা’র কথা মনে পড়ল তার। ভাবল, বাসায় একটা কল দিয়ে জানিয়ে রাখে। ফোন করতেই ওপাশ থেকে মা’র কণ্ঠ,
“কি রে মা, পরীক্ষা শেষ? খালি পেটে আছিস না তো?”
এই কণ্ঠেই এত ভালোবাসা লুকানো, এত উদ্বেগ। রিফাহ হেসে বলল,
“না মা, ভালোই গেছে। তুমি চিন্তা কইরো না।”
কথা শেষ করে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল সে। রাজশাহীর আকাশ তখন ধীরে ধীরে সন্ধ্যায় গড়িয়ে যাচ্ছে।
একটা চড়ুই পাখি বারান্দার রেলিংয়ে এসে বসে আছে। ছোট ছোট চোখে চারদিক দেখে নিচ্ছে—ঠিক রিফাহর মতো, একা, নতুন শহরে, এক নতুন জীবনের অপেক্ষায়।
কোথা থেকে যেন হঠাৎ জুইয়ের কণ্ঠস্বর মনে পড়ে গেল,
“তুই যদি মেডিকেলে চান্স পাস, আমায় ভুলে যাবি না তো?”
রিফাহ হেসে ফেলে মনে মনে—এমন প্রশ্ন কেউ করে? যাকে মনে রাখার জন্য কোনো চেষ্টাই করতে হয় না, তাকে ভোলা কি এতই সহজ? অবশ্য জুই নিজেও মেডিকেলেই ভর্তি পরীক্ষা দিচ্ছে। যদিও ওর পরীক্ষা কেন্দ্র রাজশাহীতে না। রাজশাহীতে হলে অবশ্য দেখা হতো। পরীক্ষার পর দুই বান্ধবী মিলে রাজশাহী শহরটা ঘুরে দেখা যেতো। চান্স হবে কি হবে না তাতো নিশ্চিত না। ফলে আর কবে রাজশাহী আসা হবে তাও অনিশ্চিত।
রাতে খাবার খেতে গিয়ে বাবা বললেন,
“রেজাল্ট যা-ই হোক, আমি জানি তুই নিজের জায়গায় ঠিক আছিস। মানুষ হিসেবেই তোকে আমি সবসময় ভালোবাসি।”
এই কথা শুনে অনেকক্ষণ কিছু বলতে পারল না রিফাহ। চোখের পেছনে হালকা জ্বলুনি—কিন্তু সে কেঁদে উঠল না। বুকের ভিতর কেবল একটা শব্দ হচ্ছিল:
“আশা। শুধু একটা শব্দ। বাকিটা সময় বলবে।“
সিদ্দিকার পর্ব:
মেয়েটির নাম সিদ্দিকা। মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই নতুন জীবন শুরু হয়েছিল তার। ঘর থেকে দূরে হোস্টেল, অচেনা মুখ, আর ভরা ক্লাসের প্রতিদিন নতুন নতুন চমক।
প্রথম দিন অ্যানাটমি ল্যাবেই যে কী হলো!
মৃতদেহ রাখা ছিল টেবিলের ওপরে সাদা চাদরে ঢাকা। শিক্ষক বললেন,
— “এই হচ্ছে তোমাদের প্রথম শিক্ষক। ক্যাডাভার।”
চোখের পাতা কাঁপছিল সবার। সিদ্দিকা একটু সাহস নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল, কিন্তু সাদা চাদর সরিয়ে যখন মৃতদেহের মুখ দেখা গেল, তখন পাশের বান্ধবী চিৎকার দিয়ে কাঁদতে শুরু করল। কেউ কেউ সরে গিয়ে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছিল — যেন চাদরের নিচে এখনও প্রাণ আছে।
এর কিছুদিন পর ফিজিওলজি ল্যাবে “ব্লাড গ্রুপিং” চলছিল। সিদ্দিকার এক বন্ধু, রাজীব, রক্ত নিতে গিয়ে নিজের আঙুলে সূঁচ ঢুকিয়ে ফেলল। তখন সে একদম গুরুগম্ভীরভাবে বলে উঠল,
— “দোস্ত, আমি তো নিজের রক্তই নিতে পারি না! আমি রোগীর কী করব?”
ওয়ার্ড ক্লাসে রোগী দেখা শুরু হতেই জীবনটা আরও মজার হয়ে উঠল। একজন রোগীর কাছে গিয়ে ছাত্ররা তার রোগের ইতিহাস নিচ্ছিল। তখন রোগী বলল,
— “তোরা কি সত্যি ডাক্তার? তোদের দাড়িগোঁফই তো উঠছে না!”
আরেকদিন সিদ্দিকা ওয়ার্ডে গেল ডিউটিতে। এক রোগী হঠাৎ বলে উঠল,
— “আপা, একটু চা এনে দিবেন?”
সিদ্দিকা হেসে বলল,
— “আমি স্টুডেন্ট। চা এনে দিলে স্যার রাউন্ডে আমাকেই খেয়ে ফেলবে।”
আর অপারেশন থিয়েটার — সেখানে ঢুকে যেন সবাই স্তব্ধ। পেট কাটা দেখেই জুই জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তখন অপারেশন চালু রেখেই নার্স বললেন,
— “এই যে মেয়েটা পড়ে গেছে, কেউ পানি এনে দাও। কিন্তু রোগী আগে!”
মেডিকেল লাইফে এমন হাজারো গল্প আছে। কখনও গভীর রাত অবধি পড়ে থাকত, আবার কখনও সকালে উঠে দেখে — পরীক্ষার ডেট ভুলে গেছে! কখনও রোগী ভালো হলে চোখে পানি এসে যেত, আবার কখনও খুব চেষ্টা করেও হারিয়ে যাওয়া রোগী মনে করিয়ে দিত — এই পেশা শুধু চাকরি না, এটা একধরনের যুদ্ধ।
হোস্টেল মানেই স্বাধীনতা, আবার হোস্টেল মানেই অনিয়মিত ঘুম, পোকা, পানি না থাকা, আর কারেন্ট গেলে ভৌতিক পরিবেশ।
সিদ্দিকার রুম ছিল ৩য় তলার এক কোনার ঘরে — জানালায় বাতাস ঢুকত ঠিকই, কিন্তু পাশে ড্রেন থাকায় ঘ্রাণে সবসময় ক্লোরোফর্মের আবেশ। রিফাহ আর জুই ছিল এক রুমে — চিরকালের বন্ধু রুমমেট, বাইরে গেলে দুইজনেই একে অপরের সাথেই থাকে।
একদিন সন্ধ্যায় বৃষ্টির মধ্যে হোস্টেলের কারেন্ট চলে গেল। তখন সময় রাত ৯টা, সিদ্দিকা হোস্টেলের লাইব্রেরিতে বসে পড়ছিল। রিফাহ তখন ভেবে বসেছিল, মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে চুল শুকানো যাবে — ফলাফল: মোবাইল অতিরিক্ত গরম হয়ে বন্ধ হয়ে গেল।
জুই তখন কেবল মগভর্তি পানি নিয়ে বাথরুমে ঢুকেছে, হঠাৎ আলো নিভে গেলে সে এক ঝাঁকায় বলে উঠল,
— “এই হোস্টেলেই একদিন ভূত চড়াবে, আমি জানি!”
ঠিক তখন বাইরে হঠাৎ প্রথম বর্ষের এক ছাত্রী কাঁদতে কাঁদতে দৌঁড়ে এসে বলল,
— “আমার তোয়ালে উড়ে গেছে ছাদে… আমি তোয়ালে ছাড়া উঠতে পারি না!”
এমন সময় মাহির ছেলেদের হোস্টেল থেকে ফোন করল সিদ্দিকাকে,
— “তোমাদের হোস্টেলে এত চিৎকার কেন? ভূত নামছে নাকি?”
সিদ্দিকা শান্ত স্বরে বলল,
— “না রে ভাই, ভূতেরও তো ফাইনাল প্রফ দিতে হয়, এত ফুরসত নেই ওদের।”
কারেন্ট ফিরল রাত ১১টায়। তখন সবাই বই রেখে খোলা ছাদে গেল — বৃষ্টি থেমে গেছে, চারদিক ঠাণ্ডা, আকাশে তারা।
সেখানে দাঁড়িয়ে রিফাহ বলল,
— “জানিস, এখানে দাঁড়িয়ে মনে হয় ডাক্তার হওয়ার চেয়ে পিচ্চিকালে গৃহশিক্ষক হওয়াই ভালো ছিল।”
জুই বলল,
— “তাও তো ছাত্র পালাত না! এখন তো রোগীও পালিয়ে যায়!”
হাসির দমকে ভেসে গেল হোস্টেলের ছাদ। রাত বাড়ল, পড়া জমল, কিন্তু এই একটা রাতের কথা কেউ আর ভুলল না।
কারণ মেডিকেল হোস্টেলে একটা “নরমাল” রাত বলতে কিছু নেই।
কলেজ হোস্টেলে রাত তখন ১১টা। বৃষ্টি থেমেছে কিছুক্ষণ আগে। ছাদের এক কোণে বসে আছে রিফাহ আর জুই — একজনের হাতে চায়ের মগ, অন্যজনের হাতে কাঁথা। চারপাশে ভেজা গন্ধ, দূরের আকাশে তারা দেখা যাচ্ছে না, তবুও দুজনেই তাকিয়ে আছে ওপরে।
রিফাহ আসলে চা খেতে জানে না — চা অনুভব করে।
সে বলে,
— “চা হচ্ছে একধরনের মাইন্ড ম্যাপিং। এই যে এখন, ক্লাসটেস্ট শেষ, মাথা ভারী… একটা কাপ চা মানেই ক্যানভাসে একটু রোদ।”
জুই হেসে বলল,
— “তুই কি চায়ের প্যাকেট থেকেও কবিতা লিখে ফেলবি?”
তারপর গম্ভীর হয়ে বলল,
— “রিফাহ, তুই কথা বললেই মন ভালো লাগে।”
এই দুই বান্ধবীর আড্ডার মাঝে মাঝেই এসে বসে সিদ্দিকা। সাদামাটা মেয়েটা, মুখে চুপচাপ হাসি থাকে, চোখে থাকে সাহস। প্রেমে না জড়ানোটা তার কোনো সংকল্প নয়, বরং স্বাভাবিক এক সহজ জীবনযাপন।
সে এসে বলল,
— “তোদের একেকটা কথা শুনলে মনে হয় আমি কোনো সিরিয়াস সিরিজের সাইড ক্যারেক্টার।”
তখনই হোস্টেলজুড়ে হইচই শুরু হলো। নিচের ওয়ার্ড থেকে খবর এসেছে — ইন্টার্নদের একজন প্রথমবার সিপিআর দিতে গিয়ে কেঁদে ফেলেছে। সবাই ছুটে গেল নিচে, হোস্টেল প্রায় ফাঁকা।
রিফাহ নিচে না গিয়ে বলল,
— “জীবনে প্রথম মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া আসলেই শক্ত। আমি ক্যাডেট কলেজে ছিলাম, সেখানে ডিসিপ্লিনের ছাপ ছিল, কিন্তু এখানে… প্রতিটা মৃত্যু এত কাছ থেকে লাগে।”
সিদ্দিকা এক গাল হেসে বলল,
— “তুই পারবি। এই তুই-ই একদিন মানুষের জীবন বাঁচাবি। আমার বিশ্বাস আছে।”
জুই বলল,
— “আর আমি তোকে চা খাইয়ে যাবো সব সার্জারি রোটেশন জুড়ে।”
তিন বান্ধবী ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়াল। আকাশ তখন পরিষ্কার হচ্ছে ধীরে ধীরে। একটা তারা হঠাৎ জ্বলে উঠল।
সিদ্দিকা ফিসফিস করে বলল,
— “এই মেডিকেল লাইফ — চায়ের কাপ, দৌড়ের ওয়ার্ড, চোখের জল, বন্ধুত্ব, আর ছাদের আকাশ… সবকিছু মিলিয়ে জীবনটা আসলে খুবই মানবিক।”
রিফাহ মাথা নি
চু করে চায়ের কাপের দিকে তাকাল।
সেই কাপটা শুধু কাঁচের ছিল না — ভেতরে ছিল গল্প, ক্লান্তি, স্বপ্ন, সাহস।
রাজশাহীতে সেপ্টেম্বরের বিকেলটা একটু অন্যরকম। বাতাসে ধুলো কম, রোদটা মোলায়েম, আর পদ্মার পাড়ে হালকা একটা কুয়াশা যেন আগেই এসে দাঁড়িয়েছে।
রিফাহ, জুই আর সিদ্দিকা — এই তিনজনের আজ ‘অফ-ডে’। মানে, টিউশনি শেষে কলেজ নেই, ওয়ার্ড নেই, ক্লাসটেস্ট নেই।
টিউশন করে তিনজনই কিছু টাকা জমায়। কেউ ভবিষ্যতের সার্জিকাল ইনস্ট্রুমেন্ট কিনবে বলে, কেউ বই, আর কেউ… কফি।
সেদিন বিকেলেই তিনজন হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছায় ক্যালিস্ট্রোতে। রাজশাহীর প্রাণকেন্দ্রে এক কোণার ভেতরে গরম কফি আর ঠাণ্ডা বাতাসের সেই ছোট্ট দুনিয়ায়।
রিফাহ প্রথম ঢুকে বলল,
— “তিনটা ল্যাতে — একটা হট কফি আমার, বাকিটা তোদের।”
জুই চোখ টিপ দিয়ে বলল,
— “টিউশন থেকে পেমেন্ট পেলে তুই যেন গার্ডিয়ান অফ দ্য গ্যালাক্সি!”
চায়ের বদলে আজ কফি — রিফাহর মুখে গম্ভীর ভাবটা থাকলেও, এই মুহূর্তে তার চোখে একটু ছুটির হাসি। আর সিদ্দিকা? সে চুপচাপ কফি চুমুক দিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,
— “আমরা কি একটু পরে টি বাধ যাবো?”
ঘণ্টাখানেক পর তিনজন পৌঁছায় টি বাধে — পদ্মার পাড়।
পানি তখন অনেক নিচে, বাতাসে সোঁদা গন্ধ। হিজলগাছের পাশে বসে রিফাহ বলল,
— “পদ্মার পানি অনেক কিছু গিলে ফেলেছে জানিস? আমার ছোটমামার শৈশবের ভিটেও এখন নদীর তলায়।”
জুই পাশ থেকে গম্ভীর হয়ে বলে,
— “আমাদের শৈশবও এই মেডিকেল লাইফ গিলে ফেলছে রে।”
তখনই সিদ্দিকা পেছন থেকে দুজনকে মাথায় ঠোকা মেরে বলল,
— “নেতিবাচক ভাব বাদ দাও। আমরা চা-কফি খেতে পারি, আকাশ দেখতে পারি, মানুষ বাঁচাতে শিখছি — এর চেয়ে বেশি সৌভাগ্য ক’জনের হয়?”
এরপর তারা হাঁটতে হাঁটতে কামরুজ্জামান পার্কে যায়। এক কোণায় বসে বাদাম খায়। পেছনে বাচ্চারা খেলছে, সামনে সেদ্ধ ডিমওয়ালার ডাক।
জুই বলল,
— “তুই যদি প্রেম করতি রে সিদ্দিকা, তাহলে এত ভালো কথা তোর মুখে মানাতো না।”
সিদ্দিকা হেসে বলে,
— “আমি তোদের প্রেমে পড়েই আছি। আলাদা করে কার দরকার?”
রিফাহ নিচু গলায় বলল,
— “আমাদের বন্ধুত্বটাই মনে হয় সবচেয়ে বড় রিলেশনশিপ।”
আকাশে তখন লাল রঙ ছড়াচ্ছে। ওরা তিনজন চুপ করে বসে থাকে কিছুক্ষণ। কেউ কিছু বলে না। কিন্তু একটা অদ্ভুত শান্তি চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।
হয়তো এটাই ছিল তাদের সবচেয়ে দরকারি মেডিসিন —
এক কাপ কফি, কিছু পদ্মা হাওয়া, আর কাছের মানুষের নিঃশব্দ উপস্থিতি।
রাজশাহী মেডিকেলের হোস্টেলে তখন রাত ১টা। চারপাশে অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা। ছাদে হালকা বাতাস বইছে, তবু যেন শব্দ শুনতে পাওয়া যায়: বই উল্টানোর আওয়াজ, হালকা কফির কাপে চুমুক, আর গভীর নিঃশ্বাস।
পরদিন প্রথম প্রফ। মানে— মেডিকেল লাইফের প্রথম বড় ধাক্কা।
সিদ্দিকা, রিফাহ, জুই—তিনজনই তিন রকম মানসিকতায়।
সিদ্দিকা একটা ছোট খাতা নিয়ে একটার পর একটা চেকলিস্ট টিক দিচ্ছে। তার চোখে কোনো ভয় নেই, কিন্তু জুইর দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারছে — কারো না কারো ভেঙে পড়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
রিফাহ কাঁথা গায়ে দিয়ে ছাদে বসে আছে, আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে চুপচাপ। হাতে চায়ের মগ, কিন্তু তাতে আজ তেমন স্বাদ নেই।
জুই পাশে এসে বসে বলল,
— “তুই একটুও ভয় পাচ্ছিস না?”
রিফাহ মৃদু হেসে বলল,
— “আমি ক্যাডেট কলেজের প্রথম দিনেও কাঁপছিলাম না, এখানে তো তুই আছিস।”
জুই চুপ করে গেল। ভেতরে কোথাও শব্দ হল, শব্দটা এক ধরনের নির্ভরতার।
তাদের নিচে হোস্টেলের রুমে সিদ্দিকা তখন হঠাৎ বই বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল। গলায় পানির বোতল ঝুলিয়ে ছাদের দিকে উঠল।
উপরে এসে দুই বন্ধুকে দেখে বলল,
— “তোমরা এত চুপ কেন? ভয় পেলে কথা বলতে হয়। শরীর নয়, ভয়টাই হলো মেডিকেলের সবচেয়ে বড় রোগ।”
তিনজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ। চাঁদের আলো গায়ে পড়ছে, চারপাশ ঘুটঘুটে। পাশের ছাদে কে যেন হালকা সুরে গাইছে,
“ভয় পেও না, পেছনে আমি আছি…”
সিদ্দিকা বলল,
— “চলো, সবাই একসাথে পড়ি আরেকবার। তিনজনের মধ্যে একটা না একটা মাথায় ঢুকবেই — পরীক্ষা হলে মিলিয়ে নেব।”
ওরা তিনজন মিলে নিচে নেমে এল। খোলা নোট, কফির কাপ, লাল চোখ, মাথায় চাপ — সবকিছু নিয়েও হাসতে হাসতে পড়তে থাকল।
জুই মাঝেমাঝে বলে,
— “আমার মনে হয় রেফারেন্স দিয়ে ফেলব।”
রিফাহ বলল,
— “তাতে কি? স্ট্যাম্পড কফির দোকানে চাকরি করব, তবুও হার মানব না।”
সিদ্দিকা চুপচাপ তাদের পাশে বসে চোখ বন্ধ করল। তারপর বলল,
— “কাল যখন প্রশ্ন হাতে পাবে, মনে রেখো— আমরা শুধু পড়িনি, লড়েছি।”
সকাল ৬টা। পরীক্ষার দিন।
তিনজন হাতে গ্লাভস পরে হলে ঢুকছে। কেউ চোখে আঙুল বুলিয়ে নিচ্ছে, কেউ আয়নায় নিজেকে দেখে নিচ্ছে, কেউ চুপচাপ দোয়া পড়ছে।
তিনজনের চোখে ভয় নেই, আছে একধরনের শান্তি। কারণ আগের রাতটাতে তারা শুধু পড়েনি— তারা একে অপরকে আগলে রেখেছে।
শনিবারের দুপুর। ক্লাস নেই, টিউশনটাও আজ ক্যানসেল হয়েছে। রিফাহ হঠাৎ করে প্রস্তাব দিল—”চলো না টি বাধে যাই। পদ্মার পাড়ে একটু হাওয়া খাওয়া হবে, মাথা ঠাণ্ডা হবে।”
জুই এক পায়ে রাজি। এমন প্রস্তাবে সে কখনও না করে না। আর সিদ্দিকা? একটু ভেবে নিল, তারপর বলল, “চলো। কিন্তু ফিরতে হবে সন্ধ্যার আগেই।”
রিকশা চেপে তিনজন রওনা দিলো। শহরের কোলাহল পেরিয়ে পদ্মার পাড়ের নিরিবিলি জায়গা, যেটাকে ওরা বলে “টি বাধ”—সেই জায়গাটা যেন অদ্ভুত এক প্রশান্তি ছড়িয়ে রাখে। বাতাসে কেমন একটা কাঁচা গন্ধ, আর দূরের কাশফুলগুলো নদীর দিকে হেলে পড়ে আছে।
রিফাহ এক কোণে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। ওর হাতে এক কাপ চা—একেবারে কড়া লাল চা। জুই মাঝেমাঝে রিফাহর দিকে তাকায়। সে জানে, এই আকাশ দেখতে দেখতেই মেয়েটার অনেক চিন্তা তৈরি হয়। কিন্তু রিফাহ কখনও তা খোলসা করে না।
“তুই আবার কি ভাবছিস?”—জুই জিজ্ঞেস করল।
“আকাশের মতো মানুষ হওয়া যায় না?”—রিফাহ হেসে উত্তর দেয়। “যার নিজের কিছু নেই, কিন্তু সবকিছুকে ঢেকে রাখে।”
সিদ্দিকা তখন পাশের এক বাচ্চার হাতে বাদাম দেখে হেসে উঠে বলল, “চলো, আমরাও বাদাম খাই। মনে হয় ভালো গল্প হবে এর সাথে।”
ওরা তিনজন বসে পড়ল পাটের তৈরি একটা ছায়াঘেরা বেঞ্চিতে। বাদাম খেতে খেতে গল্প চলতে থাকল ছেলেবেলার, কাঁঠালচোরা প্রেমের, একাডেমিক ব্যর্থতার, আবার হঠাৎ হঠাৎ গম্ভীর হয়ে যাওয়া ক্যাডেট কলেজের স্মৃতির।
জুই বলল, “রিফাহ, তুই তো অনেক কিছুই বলিস না। জয়পুরহাটের দিনগুলো মনে পড়ে?”
“মনে পড়ে, কিন্তু সেসব কথা শুধু চায়ের সাথে যায়। আর আজকে তো কফি খাওয়া হয়নি!”—রিফাহ মুচকি হাসে।
সিদ্দিকা চোখ ঘুরিয়ে বলল, “তোর চা আর আকাশ—এই দুইটা ছাড়া কিছু পছন্দই আছে তোর?”
“আছে। তোর মতো বন্ধু।”
এক মুহূর্তের জন্য সবাই চুপ। নদীর ঢেউয়ের শব্দে চারপাশ ভরে যায়। এই নীরবতাই ওদের সবচেয়ে প্রিয় হয়তো।
ফেরার পথে কামরুজ্জামান পার্কের পাশ দিয়ে হেঁটে চলল ওরা। এক দোকান থেকে আবার বাদাম কেনা হলো। বসে গল্প, হালকা ঝগড়া আর একে-অপরের দিকে তাকিয়ে থাকা—সবই চলল নিঃশব্দ বোঝাপড়ায়।
শহরের মধ্যে থেকেও যেন একটা আলাদা পৃথিবী গড়ে তুলেছে ওরা তিনজন।
হালকা বাতাস বইছে। মৃদু রোদের পর, শহরটা যেন একটু শান্ত হয়ে এসেছে। মেডিকেলের ক্লাস, ওয়ার্ড, টিউশন—সব মিলিয়ে ক্লান্ত তিনজন মানুষ, রিফাহ, জুই আর সিদ্দিকা, হঠাৎ করেই ঠিক করল—আজ আর কোনো প্ল্যান নয়, হুট করে বেরিয়ে পড়া যাক।
জুইয়ের প্রস্তাব, “চলো কামরুজ্জামান পার্কে যাই। বাদাম খাবো, হাঁটবো। বেশি কিছু না—শুধু বসে থাকবো, মনটা হালকা হবে।”
তিনজনই রাজি হয়ে গেল।
পার্কে পৌঁছেই ওরা একটা নিরিবিলি বেঞ্চ খুঁজে নিল। রিফাহের হাতে এক বাটি ভাজা বাদাম। সেই কাগজে মোড়ানো গরমগরম বাদামের ভেতর একধরনের ঘরোয়া গন্ধ—নুন, মরিচ, আর সরিষার তেলের হালকা ছোঁয়া।
সিদ্দিকা নীরবে বসে থাকে, পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষদের দেখে। ওর চোখে সহজ সরলতা, কথাবার্তায় গভীরতা। জুই একটু ফুরফুরে মেজাজে, সবকিছুর মধ্যে গল্প খুঁজে নেয়।
রিফাহ বাদামের বাটি এগিয়ে দেয় সিদ্দিকার দিকে। “নে, বাদাম খা। তোর মুখে কিছু না দিলে পার্কও বোবা লাগে।”
সিদ্দিকা হেসে বলে, “তোর এই নাটকীয় সংলাপগুলা শুনলে মনে হয় মেডিকেল ছাড়ছিস, সিনেমার চিত্রনাট্যকার হবি।”
জুই হালকা হেসে বলে, “হয়তো হবে, কিন্তু সিনেমার মূল চরিত্র আমি। মনে রাখিস।”
মাঝে মাঝে রিফাহ আকাশের দিকে তাকায়—নীল থেকে ধূসর হচ্ছে একটু একটু করে। সে হঠাৎ বলে ওঠে, “জানো, আকাশ এমন সময়টায় সবচেয়ে বেশি কথা বলে। সূর্য ডোবার ঠিক আগের মুহূর্তে…”
জুই জিজ্ঞেস করে, “তুই আকাশের সাথে কথা বলিস নাকি?”
“হ্যাঁ,” বলে রিফাহ, “তুই শুনিস না বলেই তো বুঝিস না।”
এই কথা শুনে সিদ্দিকা আর জুই হেসে ওঠে। সিদ্দিকা বলে, “আকাশের মতো করে মানুষের মন বোঝা যদি এতো সহজ হতো!”
একটু পরে ওরা উঠে দাঁড়ায়। বাদামের শেষ খোসাগুলো মুঠোয় নিয়ে ডাস্টবিনে ফেলে আসে। ওরা জানে—এ জীবনে এমন অনেক সন্ধ্যা আসবে, আবার চলে যাবে। কিন্তু এই একটা সন্ধ্যা, এই কথা, এই হালকা হাসিগুলো—সব তারা মনে রাখবে।
কারণ মেডিকেল জীবনে কিছু দিন থাকে—যা শুধু পড়া বা রোগী নয়, গল্প হয়ে থাকে।
সকাল ৭টা। রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ক্যাম্পাসে একটু ভোরের আলো ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে ক্লাসরুমের ভেতর কাঁপতে থাকে নতুন দিনের উত্তেজনা।
সিদ্দিকা, রিফাহ আর জুই একসাথে ভর্তি হয়েছে তৃতীয় বর্ষে। ক্লাস শুরু হওয়ার আগেই ওরা টিউশনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
রিফাহ একটু নার্ভাস — আজ ফার্মাকোলজি টিউশনের প্রথম দিন।
সিদ্দিকা ধীরে ধীরে বই গুছিয়ে বলল,
— “একটু মন দিয়ে শুনিস, ডাক্তার হওয়ার যাত্রাটা কঠিন, কিন্তু ধৈর্য ধরলেই হবে।”
ক্লাসরুমে শিক্ষক স্পষ্ট আর গম্ভীর। অজানা অনেক নাম, জটিল রসায়ন, ওষুধের ডোজ আর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া — সব কিছু মাথায় আটকে রাখতে হবে।
জুই মাঝে মাঝে চোখ মুছে, চেষ্টা করে ফোকাস বাড়ানোর।
ক্লাস শেষে সরাসরি ওয়ার্ডে যায় তারা। এখানে মেডিকেল লাইফের অন্য রকম চ্যালেঞ্জ শুরু হয়। রোগীর সঙ্গে কথা বলা, পরীক্ষা নেওয়া, নোট নেয়া—সব কিছুই নতুন।
রিফাহ যখন প্রথমবার কোনো রোগীর হার্টসাউন্ড শুনল, সে একসময় ভয় পেলেও এখন একটু একটু করে আত্মবিশ্বাস বাড়ছে।
সিদ্দিকা রোগীর পাশে দাঁড়িয়ে বলে,
— “দেখিস, আমাদের কাজ শুধু বই পড়া নয়, মানুষের সাথে বিশ্বাস গড়া।”
দিন শেষে টিউশনে আবার তাদের দেখা হয়। আর এখানে শুরু হয় ক্লাসের পরের লড়াই—পাঠ শেষ না হওয়া পর্যন্ত মনোযোগ ধরে রাখা।
জুই হাসতে হাসতে বলল,
— “আমি মনে করি, যদি টিউশন না থাকতো, আমাদের মাথা আর একটু বেশি বাঁচতো।”
তারা সবাই জানে মেডিকেল পড়াশোনা সহজ নয়, তবে একে অপরের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে চলতে পারলে পথটা অনেকটা সুন্দর হয়ে ওঠে।
সকাল ৮টা। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ার্ডে উত্তেজনা কাঁপছে। নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য আজ প্রথম রাউন্ড।
সিদ্দিকা, রিফাহ আর জুই—তিনজনই একটু নার্ভাস, কিন্তু মনে করেই সেজেগুজে এসে দাঁড়িয়েছে ওয়ার্ডের দরজার সামনে। সেদিনের টপিক: সাধারণ শ্বাসতন্ত্রের রোগ।
রাউন্ডের শুরুতে সিনিয়র ডাক্তার কড়া কন্ঠে বলে উঠলেন,
— “রোগী দেখার সময় মনোযোগ দিন, শুধু বইয়ের কথা নয়, রোগীর অবস্থা বুঝতে হবে।”
রিফাহ প্রথম রোগীর সামনে দাঁড়িয়ে হাত ঝাঁকিয়ে বলে,
— “স্যার, রোগীর শ্বাসপ্রশ্বাস অস্বাভাবিক, হাঁচি-কাশির ইতিহাস আছে…”
জুই পাশ থেকে অতি সতর্ক চোখে রোগীর লক্ষণ খেয়াল করতে থাকে।
সিদ্দিকা একটু চুপচাপ হলেও রোগীর সঙ্গে আলাপ করে সাহস যোগায়।
রাউন্ড শেষে তারা একসাথে বসে আলোচনা করতে থাকে—কী ভুল হলো, কী ভালো হলো, কোথায় বেশি মনোযোগ দেওয়া দরকার।
সিদ্দিকা বলে,
— “বই থেকে শেখা আর বাস্তব জীবনের মাঝে পার্থক্য অনেক। এখানে রোগীর কথাও বোঝা জরুরি।”
রিফাহ যোগ করে,
— “ওয়ার্ডে আসল ক্লাস শুরু হয়। সেখানেই বুঝি ডাক্তার হওয়ার দায়বোধ কী।”
জুই মুচকি হেসে বলে,
— “ভয়ের কিছু নেই, পরেরবার আমরা আরও ভালো করব।”
দিনশেষে তিন বন্ধু ক্লাসের টেনশন ভুলে একটু হাসির খোরাক নিয়ে একে অপরকে সাহস দেয়। সবাই জানে, ওয়ার্ডের এই প্রথম অভিজ্ঞতা যতই কঠিন হোক, এগুলো তাদের ভবিষ্যতের অনন্য ধন।
সকালের ক্লাস শুরু হয়েছে অ্যানাটমি ল্যাবে। চারদিকে টেবিলভর্তি মৃতদেহের অংশবিশেষ, কাচের জারে সংরক্ষিত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আর পচা ফর্মালিনের গন্ধে নতুনদের মাথা ঝিমঝিম করে। সিদ্দিকা, রিফাহ আর জুই তাদের সাদা অ্যাপ্রোন গায়ে, মাথায় স্কার্ফ শক্ত করে বাঁধা। তাদের হাতে হাতে বই, নোট আর গ্লাভস।
“এই ডেড বডিটা আগেরবারও দেখছিলাম মনে হয়,” মুখে মাস্ক পরে একটু নিচু স্বরে বলল রিফাহ।
“আচ্ছা, হিউম্যান হার্টটা আলাদা করে রাখা হয়েছে কোন জারে?” জুই খুঁজছিল।
সিদ্দিকা এগিয়ে গিয়ে একটা কাচের বয়াম তুলে ধরল, “এইটাই মনে হয়। তবে এটা পুরো হার্ট না। থোরাসিক কাট সেকশন।”
এই সবকিছু সয়ে নেয়ার অভ্যাস হচ্ছে ধীরে ধীরে। রিফাহ মাঝে মাঝে কানে হেডফোন দিয়ে অ্যানাটমির টার্মস মুখস্থ করে। জুই আবার নিজের চিরচেনা অভিব্যক্তি নিয়ে সবকিছু লিখে রাখে – তার রঙিন নোট খাতায় “হার্ট অফ মেডিসিন” বলে একটা শিরোনামও আছে।
আজ তাদের টিউটরিয়াল ক্লাসে একজন সিনিয়র ডাক্তার এলেন, যিনি খুবই কড়া বলে খ্যাত। সবাই একটু গুছিয়ে বসে। সিদ্দিকা আগেভাগেই রিফাহ ও জুইয়ের জন্য জায়গা রেখে দিয়েছিল।
“Tell me the branches of the arch of aorta,” প্রশ্ন করলেন ডাক্তার।
একটু থেমে সিদ্দিকা জবাব দিল, “Brachiocephalic trunk, left common carotid artery and left subclavian artery.”
ডাক্তার একটু হাসলেন। “Good. Anyone can tell me why it’s clinically important?”
রিফাহ এবার হাত তুলল। “Sir, in coarctation of aorta, the narrowing often occurs after the origin of the left subclavian artery, which affects the lower body’s blood flow…”
ডাক্তার এবার সিরিয়াসভাবে মাথা নাড়লেন, “Well done.”
জুই একটু হালকা করে ফিসফিস করল, “তোর আকাশ দেখার মতো উত্তর!”
রিফাহ হেসে বলল, “তোরা মাথা ঘামানো বাদ দে। ব্রেইন ডিসেকশন আসতেছে আগামী সপ্তাহে।”
সিদ্দিকা একটু গম্ভীর গলায় বলল, “একটা সময় ভাবতাম আমি হয়তো পারব না। কিন্তু আসলে – আমাদের সবকিছু অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে। আমরা বদলে যাচ্ছি। বড় হয়ে যাচ্ছি।”
ওদের চারপাশের মেডিকেল লাইফের প্রতিটি ক্লাস, টেস্ট, টার্ম – একেকটা যুদ্ধ। একেকটা স্লাইডে চোখ রেখে একেকটা জীবনের ছোঁয়া। ক্লাস শেষে রিফাহ একটু আনমনা হয়ে বলল, “চল, আজকে ক্যাফেতে না গিয়ে একটু ক্যান্টিনে বসি। দই আছে নাকি চেক করিস তো!”
সিদ্দিকা হেসে বলল, “দই খেতে গিয়ে আবার হৃদপিন্ডের ডায়াগ্রাম দেখে বসিস না যেন!”
জুই হাসে। “তুমি আবার দই খেলে মন ভালো হয়ে যায় নাকি?”
সিদ্দিকা মাথা নেড়ে বলে, “না না, ওর মন ভালো হয় ক্যালসিয়াম ইনটেকে! মেডিকেল লজিক।”
রিফাহ কপট রাগে বলে, “তোমরা দুজন মিলে আমাকে শুধু প্যারা দাও। আর কেউ হলে এমন মন খারাপ শুনে আইসক্রিম কিনে দিত!”
জুই একটু মায়া করে বলে, “দেই? আইসক্রিমই দেই না হয়! চলো।”
তিনজনই হাঁটতে হাঁটতে রাজশাহী মেডিকেলের পুরাতন ক্যান্টিনের দিকে রওনা হলো। চারপাশে ছাত্রছাত্রীদের ভিড়, হাসাহাসি, চায়ের কাপের শব্দ, পেছনের টিনের চাল থেকে ঝরে পড়া ছায়া—সবকিছুতেই একধরনের বন্ধুত্বপূর্ণ বিশৃঙ্খলা।
ক্যান্টিনে ঢুকে তারা কোণের এক টেবিলে বসলো। কাঠের বেঞ্চে বসতেই রিফাহ বললো, “আমার জন্য একটা মিষ্টি দই। আর সাথে একটা গরম চা। আর হ্যাঁ, ছাঁকা চা, প্লিজ।”
জুই বলে, “তোমার চায়ের প্রেম নিয়ে একদিন একটা গবেষণা হবে, দেখো।”
সিদ্দিকা ক্যান্টিনের দাদাকে বলে দিলো অর্ডার। ততক্ষণে পাশে থাকা টেবিলগুলোতে চেনা-অচেনা মুখ, কেউ এমবিবিএস ফাইনাল প্রপ, কেউ ইন্টার্নশিপ নিয়ে আলোচনা করছে।
রিফাহ হঠাৎ করেই চুপচাপ হয়ে যায়। জুই তাকিয়ে বলে, “কি রে?”
রিফাহ মাথা নিচু করে বলে, “মনে হচ্ছে সব কিছু খুব দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। আজকে হোস্টেলে একা ঘুমাতে ইচ্ছে করছে না… মা-কে খুব মনে পড়ছে।”
এক মুহূর্তে ক্যান্টিনের কোলাহল যেন ফিকে হয়ে আসে তাদের জন্য। সিদ্দিকা হাতটা রাখে রিফাহর কাঁধে, শক্ত করে।
জুই ধীরে বলে, “আজ না হয় তোর সাথে থাকি হোস্টেলে? কথা বলি অনেকক্ষণ?”
রিফাহ চোখ তুলে তাকায়। সেই চেনা মায়াভরা চোখে একচিলতে হাসি। “আরে, এমন করে বলিস না। কান্না চলে আসছে।”
চা আর দই এসে যায় টেবিলে। তিনজনের চোখেমুখে ক্লান্তি, কিন্তু বন্ধুত্বের উষ্ণতা কাপে কাপে বয়ে চলে।
রিফাহর হাতে বইয়ের ভারী ব্যাগটা। ক্লাস শেষে ওয়ার্ড ক্লিয়ার করে এখন সিঁড়ি বেয়ে নামছে নিচে। সিদ্দিকা আগেই নিচে চলে এসেছে, ওর চেহারায় চিন্তার ছাপ। জুই পাশেই দাঁড়িয়ে। আজ অ্যানাটমি দ্বিতীয় পত্রের ভাইভা ছিল। সবাই একটু থমথমে।
সিঁড়ির কোণে এসে রিফাহ থেমে গেল। পেছন থেকে সিদ্দিকার গলা,
— “চল না, নিচে যাই। ক্যান্টিনে একটু বসি, মাথা ভার লাগছে।”
রিফাহ মাথা নেড়ে বলল,
— “তুই কেমন করলি?”
সিদ্দিকা হালকা হাসল,
— “আমার তো একটুও ভয় করে না ভাইভা। আমি যা জানি, সেটাই বলি। ভুল হলে ওরাই ঠিক করে দিক। তুই কেমন করলি?”
রিফাহ মুখে কিছু বলল না। চুপচাপ ব্যাগটা টেবিলে রাখল। ওর চোখে একরাশ ক্লান্তি।
জুই ধীরে ধীরে কাছে এল,
— “তুই কাঁদিসনি তো, রিফাহ?”
— “না… কিন্তু গলাটা আটকে গেছিল…”
সিদ্দিকা একটু পর পর বোঝার চেষ্টা করে,
— “তুই না পড়েছিলি? অ্যানাটমি তো তোর ভালোই ছিল!”
রিফাহ হালকা হেসে বলল,
— “কখনো কখনো মনে হয় আমি কেন এখানে আছি… কেন এই লাশের ওপর পিন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি, কেন এই স্প্ল্যাঙ্কনিক নার্ভ নিয়ে ঘাম ঝরাই…”
জুই বলল,
— “তুই খুব ক্লান্ত রে… তোকে একটু চা খাওয়াতে হবে।”
সিদ্দিকা ঝট করে বলল,
— “ক্যালিস্ট্রো যাই?”
রিফাহ একটু চমকে উঠল, তারপর হেসে ফেলল।
— “চা দিলে সব ঠিক হয়ে যায় না রে… কিন্তু হ্যাঁ, চল, চল ক্যালিস্ট্রো।”
ক্যাফের কর্নারে বসে তিনজন। এক কাপ করে কড়া লাল চা। চারপাশে মেডিকেলের কিছু চেনা মুখ। কারও বইয়ের নোট, কারও ফোনে কুইজ অ্যাপ।
রিফাহ চা হাতে জানালার বাইরে তাকায়। সন্ধ্যা নামছে ধীরে। আকাশের গায়ে সূর্যের হালকা ছোপ।
— “আকাশটা খুব শান্ত আজ,” ও বলল নিজে নিজে।
সিদ্দিকা বলল,
— “তোর যখন মুড খারাপ থাকে তখনই তুই আকাশের কথা বলিস।”
জুই একটু হেসে বলল,
— “আকাশকে কেউ বুঝতে পারে না… যেমন রিফাহকে।”
চায়ের কাপে টুং শব্দ হয়। রিফাহ একটু নরম গলায় বলে,
— “ভাইভা খারাপ গেলেও আমরা তো খারাপ না। বুঝলি? আমি, তুই, সিদ্দিকা — আমরা ঠিক আছি।”
সিদ্দিকা মাথা নেড়ে বলে,
— “সব সময় ঠিক থাকা যায় না, রিফাহ। কখনো কখনো কান্না চেপে রাখাটাও একধরনের শক্তি।”
তিনজনের চোখে এক ধরনের বোঝাপড়া। মেডিকেল কলেজ মানে শুধু হাড়, রক্ত আর কেস স্টাডি না — এখানে ভাঙা ভাঙা সময়ের মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর বন্ধন, অসমাপ্ত ইমোশন, আর মাথা উঁচু করে বাঁচার এক অদ্ভুত প্রতিজ্ঞা।
রেডিওলজির ক্লাসটা শেষ হতে না হতেই রিফাহ ফিসফিস করে বলল,
— “চল ক্যান্টিনে যাই, দই খাবো।”
জুই সঙ্গে সঙ্গে সায় দিলো,
— “ওমা ঠিক ঠিক বলেছিস! আজকে দইটা একটু বাড়তি লাগে!”
সিদ্দিকা একটু হাসল। সে কিছু বললো না। চোখে তার শান্ত চাহনি, মুখে হালকা হাসি। চশমার কাচের পেছনে তার ক্লান্ত চোখ আজ একটু বেশি শান্ত।
— “তুই তো তেমন কিছু খাস না, সিদ্দিকা। একটু খাবি না?” — রিফাহ জিজ্ঞেস করল।
— “না রে, এখন চুপচাপ বসে থাকলেই ভালো লাগে।” — মৃদু হেসে উত্তর দিল সিদ্দিকা।
ওরা তিনজন ক্যান্টিনের কোনার টেবিলটা বেছে নিল। জানালার পাশে বসে থাকা যায় এমন একটা টেবিল। বাইরের আলো ছড়িয়ে আসছিল সাদামাটা ঘরের ভেতরে। রিফাহ আর জুই দই নিয়ে এল, মাটির বাটিতে ঢেলে খেতে খেতে তারা গল্প শুরু করল ক্লাসের কাহিনি নিয়ে।
সিদ্দিকা শুধু বসে ছিল। হঠাৎ পিঠে হাত রেখে বলল,
— “এই পিএলআইডি না কি যেন হয়েছে, ব্যথাটা আজ একটু বেশি লাগছে।”
রিফাহ আর জুই থেমে গেল।
— “তুই বলিসনি তো! ডাক্তার কিছু বলেছে?” — জুই একটু দুশ্চিন্তায় বলল।
সিদ্দিকা মাথা নেড়ে বলল,
— “রেস্ট নিতে বলেছে, বেশি ওঠাবসা করা যাবে না। প্ল্যানটা বাদ দে, রে। ঘোরাঘুরি আর হবে না কিছুদিন।”
রিফাহ যেন একটু থমকে গেল।
চঞ্চল মুখে একটা ছায়া নেমে এল।
জুইও চুপ। তাদের দুই বন্ধুর প্রাণটা আজ একটু স্তব্ধ।
একটু পর রিফাহ বলল,
— “তোর কিছু হলে তো আমরাও ভালো থাকি না, বুঝিস তো?”
সেদিনের দইটা হঠাৎ যেন পানসে লাগে।
পর্ব:
বৃহস্পতিবার দুপুর। রাজশাহী মেডিকেলের ক্লাস শেষে রিফাহ নিজের ব্যাগটা কাঁধে তুলে হোস্টেলের দিকে হাঁটা ধরলো। একাডেমিক ব্লক থেকে বেরিয়ে পশ্চিম দিকে ছোট্ট একটা গলি বাক নিয়েছে। ওই পথে কয়েক মিনিট হাটলেই রিফাহদের হোস্টেল। চারদিক থমথমে রোদ, বাতাসে কাঁপছে কড়ই গাছের পাতারা। দূরে রাধাচূড়ার ডালে ডালে শোভা পাচ্ছে রঙ্গীন ফুল। রিফাহর মাথার মধ্যে কী এক ক্লান্তিময় চাপা ভাব। হোস্টেলের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করেই চুপচাপ বিছানায় বসে পড়ে রিফাহ। হঠাৎ মায়ের মুখটা মনে পড়ে গেলো। মুখে নিজের অজান্তেই একটা হাসি ফুটে উঠলো। “চলেই যাই না আজই,” ভাবলো সে।
ব্যাগটা গুছিয়ে, কিছু জামাকাপড় আর একটা ছোট বাক্সে উপহার রাখা শাড়িটা নিয়ে রওনা হয়ে গেলো রাজশাহী রেলস্টেশনের দিকে। টিউশনীর টাকা জমিয়ে সে মায়ের জন্য একটা শাড়ি কিনেছে। সারা জীবন মা তাকে তার পছন্দের সব কাপড় কিনে দিয়েছে। রিফাহরও খুব ইচ্ছে করতো মায়ের জন্য সে নিজের টাকায় কিছু কিনবে। কিন্তু সে তো আগে ছোট ছিল। সেই সময়ে সে কোনো টাকা আয় করতো না। ঈদে বা বিভিন্ন সময়ে তাকে অনেকেই সালামি দিতো। সেই সব টাকা থেকে সে কিছু টাকা জমাতো এবং টাকাগুলোও তারই। তারপরও রিফাহ মনে করতো এগুলোতো আমি নিজে ইনকাম করিনি। মাকে আমি নিজের ইনকামের টাকা থেকে কিছু উপহার দেবো। ফলে টিউশন পাওয়ার পর থেকেই সে কিছু কিছু টাকা জমাতে শুরু করেছিল। সেই টাকা দিয়ে অবশেষে মায়ের জন্য শাড়িটা কিনতে পেরেছে। রাজশাহীর সিল্ক। মা নিশ্চই পছন্দ করবে। ছোট বেলায় কতবার মায়ের মুখে রাজশাহীর সিল্কের কথা শুনেছে রিফাহ। ভাবতে ভাবতে রিফাহ কাউন্টারের কাছে চলে যায়।
টিকিট কাউন্টারে ভিড়। সব সিট বুকড।
– “স্ট্যান্ডিং টিকেট আছে, নিবেন?”
– “দিইন, তাড়াতাড়ি।”
হাতের মুঠোয় টিকেটটা নিয়ে দাঁড়াল সে প্ল্যাটফর্মে। ট্রেন এসে থামে। ধোঁয়ার কুয়াশার মধ্যে উঠে পড়ে রিফাহ।
ট্রেন চলা শুরু করে। পাশে বসে থাকা এক মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক একটু পরপরই গল্প জুড়ে দেন।
– “তুমি মেডিকেলে পড়ো? আমার ছোট ভাইয়ের মেয়েও পড়ে, কুমিল্লায়।”
রিফাহ মুচকি হেসে গল্প শুনতে থাকে। একবার এক সিট ফাঁকা হলো, ভদ্রলোক বললেন,
– “বসে যাও মা, দাঁড়িয়ে কষ্ট হচ্ছে।”
রিফাহ মাথা নাড়ে, “আমি দাঁড়ানোর টিকেট কেটেছি। অন্যের সিটে বসা ঠিক না।”
ট্রেন ছুটে চলে। জানালার বাইরে গাঢ় সবুজ মাঠ, মাঝে মাঝে খয়েরি পাথরের উঁচু ঢিবি, পানির খাল আর ছোট ছোট সেতু – সব মিলিয়ে যেন বাংলাদেশ তার প্রকৃত সৌন্দর্য দিয়ে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। বড়াল ব্রীজের কাছাকাছি এসে ট্রেনের গতি কমে যায়। একটা হালকা কুয়াশা, নদীর উপর সূর্য হেলে পড়েছে – যেন স্বপ্নের মধ্যে ঢুকে পড়েছে রিফাহ।
রেলস্টেশন থেকে রিকশায় করে বাড়ি। বাড়ি পৌঁছেই মায়ের মুখে হাসি।
– “ওমা রিফু! হঠাৎ?”
– “ভাবছিলাম একটু গিয়ে দেখা করি তোমার সাথে।”
মা জড়িয়ে ধরে। রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে শীতল ভাতের ঘ্রাণ, পাকা টমেটো আর বেগুন ভাজার গন্ধ।
– “চা করবো না?”
– “তুমি থাকো মা, আমি করি।”
– “ধুর পাগল! তুই এলি আর আমি চা করতে দেবো?”
বাবা স্কুল থেকে ফিরেন, অবাক হন মেয়েকে দেখে। ডাইনিং টেবিলে তিনজন একসাথে বসে খায় অনেক দিন পর।
– “তোর ভাই ফোন করেছিলো, ছুটি পাচ্ছে না। অনেক কষ্ট হয় ওর,” মা বলেন।
রিফাহ তাকিয়ে থাকে মায়ের মুখে। অনুভব করে, এই ভালোবাসা, এই সংসারের গন্ধ কোথাও নেই।
শুক্রবার সকাল। চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় বসে রিফাহ। আকাশে সাদা মেঘ ভাসছে। একটা শালিক এসে বারান্দার রেলিংয়ে বসে। মা বারান্দায় এসে বলেন,
– “চলে যাবি এখন?”
– “হ্যাঁ মা, ট্রেন ধরতে হবে। এইবার সিট কনফার্মড।”
বিদায়ের সময় মা একগাল আদর করে বলে,
– “আরেকটু থাক না!”
রিফাহ হাসে, “থাকবো মা, একদিন অনেকদিনের জন্য আসবো।”
বড়াল ব্রীজ আবার দেখা দেয় জানালার বাইরে। এবার সে বসে আছে জানালার ধারে। হালকা বাতাসে ওড়ানো চুলে আঙুল চালিয়ে রিফাহ ভাবে,
এই যাওয়া আর আসার মাঝেই হয়তো জীবন…
এই হঠাৎ দেখা, হঠাৎ ফেরা – এটাই কি মায়ের ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ?
Part-0000
তৃতীয় বর্ষের শুরুতেই গাইনি ওয়ার্ডে ক্লিনিক্যাল পোস্টিং। রাজশাহী মেডিকেল কলেজের তিন বন্ধুর—রিফাহ, জুই আর সিদ্দিকার প্রথম দিন।
রিফাহ একটু নার্ভাস। গাইনি ওয়ার্ড বলতেই তার মনে পড়ে যায় সিনেমার ভয়ানক সিজার সীন। আর জুই? সে বরং উৎসাহে টগবগ করছে।
— “রিফু! আজ না হয়তো বাচ্চা কাড়াকাড়ি দেখতে পাবো!”
সিদ্দিকা মুখে মৃদু হাসি টেনে বলল,
— “তুমি সবকিছু নিয়েই এত এক্সাইটেড হও কিভাবে?”
ওয়ার্ডে ঢুকেই দেখা গেল হট্টগোল। বেড নম্বর ১৩-এর পাশে ভিড়। একদল আত্মীয়, কেউ চুপচাপ, কেউ চোখে পানি, আবার কেউ ফোনে ভিডিও কলে বলছে—”দোয়া কইরেন, নাতি হইছে… মানে নাতনি হইছে বোধহয়… ওই দেখেন, আমিও কনফিউজ!”
রিফাহ, জুই আর সিদ্দিকা এগিয়ে গেল।
বাচ্চার মায়ের নাম রহিমা। সিজার হয়েছে গতরাতে। বাচ্চা সুস্থ, তবে শরীরের গঠন একটু বিভ্রান্তিকর। ডাক্তারদের প্রাথমিক ধারণা—জেনিটাল এনোমালি। আত্মীয়রা কেউ বুঝতেই পারছে না—ছেলে না মেয়ে?
একজন চাচা হঠাৎ রিফাহকে ডেকে বলল,
— “ডাক্তার সাব, আল্লাহর কসম, কন এইডা বেটা না বেটি? কোরবানির জন্য গরু কিনা কিনা করতেছি!”
জুই হেসে পড়ে, গালে হাত চাপা দিয়ে ফিসফিস করে বলে,
— “এখনই যদি গরু কিনতে হয়, তাহলে হুজুর ডাকেন আগে, ডাক্তার না।”
সিদ্দিকা রিফাহর কানে কানে বলল,
— “তুই হাসিস না, কিচ্ছু বলিস না। এটা সিরিয়াস, বুঝলি?”
রিফাহ একটু গম্ভীর হয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে বুঝিয়ে দিল—সে দায়িত্ব নিচ্ছে।
তখনই একজন বয়স্ক মহিলা বলে উঠলেন,
— “আমাগো বাড়ির সব বাচ্চা জন্মাইলে কান্নায় ঘর ভইরা যায়। এইডা তো চুপচাপ… হেই জন্যই সন্দেহ হইতেছে!”
রিফাহ আর থাকতে পারল না। হালকা হাসি চেপে রেখে বলল,
— “চাচী, কেউ চুপ থাকলেই মেয়ে হয় না। আর বেশি চিল্লাইলে ছেলে না। একটু সময় দেন। চিকিৎসা দরকার হতে পারে।”
জুই তখন বাচ্চার ফাইলটা ধরেছে, সেখানেই লেখা:
Ambiguous genitalia — further evaluation required.
সিদ্দিকা ইতোমধ্যে সিনিয়র ডাক্তারকে ফোন করেছে। তিনি এসে পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিলেন—এই ধরনের কন্ডিশনে হরমোনাল ও জিনগত পরীক্ষা করতে হবে। তখনই বোঝা যাবে শিশুর প্রকৃত লিঙ্গ কী।
সবাই একরকম স্তব্ধ হয়ে গেল। তখনই এক আত্মীয়, বাচ্চার বড় চাচা, বললেন,
— “তা তো ঠিক আছে। কিন্তু নাম কি রাখবো? রাফি রাখি, না রাফিয়া?”
এইবার পুরো ওয়ার্ডে হেসে উঠলো সবাই।
রিফাহ, জুই আর সিদ্দিকা একটু দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। রিফাহ বলল,
— “মানুষ আসলে কতো সহজে একজন মানুষকে শুধু লিঙ্গ দিয়েই সংজ্ঞায়িত করে!”
জুই মাথা নাড়িয়ে বলল,
— “আর আমরা ডাক্তার হয়ে শুধু রোগ দেখি, মানুষ দেখি না—এইটা হলে সবচেয়ে বড় সমস্যা।”
সিদ্দিকা এক কোণে বসে শান্ত গলায় বলল,
— “তবে এই শিশুটাই একদিন হয়তো কারও ভাবনায় পরিবর্তন আনবে। কে জানে!”
দিনের শেষে ওরা তিনজন কফি খেতে গেল “ক্যালিস্ট্রো”-তে। মিষ্টির বক্স হাতে বাচ্চার আত্মীয়দের একজন এসে বলল,
— “ডাক্তার আপারা, আপনাদের জন্যও একটা মিষ্টি। আমরা ঠিক করলাম, এখন নাম রাখছি ‘রাহী’। ছেলে হোক বা মেয়ে—আমাদের পথের সাথী হবে।”
রিফাহ হালকা হেসে জবাব দিল,
— “ঠিকই বলেছেন চাচা, রাহীর জন্য দোয়া করি—সে যেন নিজের পরিচয় নিজেই গড়ে নিতে পারে।”
পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ডে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে একটা বিশেষ গন্ধ লাগে—ডেটলের মতো কিছু, ভেজা স্যাঁতসেঁতে বিছানার চাদর, আর তার মধ্যেও লুকিয়ে থাকা চকলেট আর কল্পনার গন্ধ।
রিফাহ একটু থমকে গেল, জুই দৌড়ে বাচ্চাদের দিকে এগিয়ে গেল আর সিদ্দিকা চারপাশটা নিরীক্ষা করে নিল ঠান্ডা চোখে।
পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ডে আজ রিফাহদের প্রথম পোস্টিং। ঢুকতেই চারপাশে বাচ্চাদের কান্না আর মায়ের দুশ্চিন্তাময় মুখ। গাইনি ওয়ার্ডের তুলনায় এখানে পরিবেশটা অন্যরকম—একটা মায়া, একটা কোমলতা যেন বাতাসে ভাসছে।
রিফাহ, জুই আর সিদ্দিকা ঢুকে বাচ্চাদের নাম, রোগ, ওষুধ সব লিখে নিচ্ছিল।
এমন সময় ৭ নম্বর বেড থেকে একদমই অপ্রত্যাশিত এক কান্নার শব্দ আসলো।
রিফাহ এগিয়ে গিয়ে দেখে—একটা পাঁচ-ছয় বছরের ছেলে, নাম ‘রাফিন’। সে বিছানার নিচে লুকিয়ে কাঁদছে। পাশে তার মা বিব্রত মুখে দাঁড়িয়ে। স্যালাইন লাগানো হাতটা এক হাতে ধরে রেখেছে বাচ্চা, অন্য হাতে আঁচল কামড়ে চুপচাপ কাঁদছে।
রিফাহ নিচু হয়ে জিজ্ঞেস করল,
— “কী হয়েছে রাফিন? কাঁদছো কেন?”
রাফিন মুখ ফিরিয়ে বলল,
— “আমি কাঁচা আম খাইছি, কেউ দেখেনি। এখন আমার পেট ব্যথা করছে। কিন্তু আমি ডাক্তার দেখাবো না। ডাক্তার মানে ইনজেকশন!”
জুই ফিসফিস করে বলে উঠল,
— “ডাক্তার মানেই ইনজেকশন—এই ইমেজটা আমরা কি সত্যিই পাল্টাতে পারি?”
সিদ্দিকা কোমর বাঁকিয়ে বাচ্চার চোখে চোখ রেখে বলল,
— “আচ্ছা, যদি বলি ইনজেকশনের বদলে চকলেট দেব, তাহলে হবে?”
রাফিন একটু থেমে বলল,
— “চকলেট দিবা? ইনজেকশন না দিলে?”
— “না দিলে না,” জবাব দিল সিদ্দিকা।
তখনই পাশ থেকে সিনিয়র ডাক্তার এসে রসিকতা করে বললেন,
— “তাহলে তো ওষুধ দিতেই হবে, ইনজেকশন ছাড়াও যে ভালো হওয়া যায়, এটা তো ডাক্তাররাই প্রমাণ করতে চায়!”
রাফিন আস্তে করে বিছানায় উঠে বসল। কিন্তু তার চোখে পানি।
জুই তার ব্যাগ থেকে একটা লজেন্স বের করে বলল,
— “এই যে, আমের মতো টক লজেন্স। নাম – ‘ডক্টর চকলেট’। খাও আর ভালো হয়ে যাও।”
রাফিন মুখে পুরে দিল।
রাফিনকে দেখে জুইর মনে পড়ে গেল তার ছোট ভাই “রায়ান”-কে। জন্মের সময় থেকেই হাঁটতে পারত না। সারাজীবন বিছানায় থেকেও সবসময় বলত,
— “আপুর মতো ডাক্তার হব।”
কিন্তু হয়নি।
রায়ান চলে গেছে জুই যখন ফার্স্ট ইয়ারে। তখন থেকে ও ছোট বাচ্চা দেখলেই কোমল হয়ে যায়। বাচ্চার চোখের পানি, গাল ফুলিয়ে রাখা অভিমান, কিংবা অদ্ভুত যুক্তি—সব জিনিসে সে তার ভাইকে খুঁজে ফেরে।
তাই সে বলে,
— “ডাক্তার মানেই ইনজেকশন—এই ইমেজটা ভাঙতে হবে, রিফু। ছোটরা ভয় না পেয়ে যদি আমাদের কাছে আসে, তবেই তো আমরা সত্যিকারের ডাক্তার হব।”
সিদ্দিকার PLID-এর কারণে তার নিজের চলাফেরায় সীমাবদ্ধতা আছে। তবু আজ রাফিনের বিছানার পাশে সে চুপ করে বসে রাফিনের হাতটা ধরে রেখেছিল। একটু কষ্ট হচ্ছিল বসে থাকতে, কিন্তু মুখে আঁচও পড়েনি।
সে ভাবে—“আমি তো বাচ্চাদের মতো ছুটতে পারি না, খেলতে পারি না, ঘুরতে পারি না। কিন্তু যদি তাদের পাশে বসে থাকতে পারি, এটাও তো একরকম ভালোবাসা।”
ওর নীরব ভালোবাসার ভাষাটা বাচ্চারাও বুঝে ফেলে।
রিফাহ আস্তে করে মায়ের কাছ থেকে ইতিহাস নিল—জানতে পারল, ছেলেটার বাবা কয়েকদিন আগেই রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে। ওর জেদ বেড়ে গেছে, খেতে চায় না, চিকিৎসা ভয় পায়।
রিফাহ সাধারণত কঠিন, বাস্তববাদী। সে আবেগে তেমন ভেসে না। কিন্তু এই ওয়ার্ডটা যেন তাকে কেঁপে কেঁপে ভেতর থেকে নরম করে ফেলছে।
রাফিনের বাবা মারা গেছে… সে নিজের বাবার মুখ মনে করতে চেষ্টা করল। কোনোদিন তো সে বাবার চোখে কাঁদতে দেখেনি।
কিন্তু এই বাচ্চারা কাঁদে, ভয় পায়, আবার এক মিনিটেই হাসেও।
এই সহজেই গলে যাওয়া মনই ওকে বুঝিয়ে দেয়—চিকিৎসা মানে শুধু রিপোর্ট না, প্রেসক্রিপশন না,
চিকিৎসা মানে কোনো শিশুর চোখে সাহস ফিরিয়ে দেওয়া।
সিদ্দিকা শিশুর চোখে তাকিয়ে বলল,
— “তোমার বাবার মতই তুমিও কি সাহসী হবে না, রাফিন?”
বাচ্চাটা আস্তে করে মাথা নাড়ল।
পরদিন যখন ওরা আবার ওয়ার্ডে গেল, রাফিন একটা ছবি আঁকছিল। ছবিতে একজন মেয়ে ডাক্তার, হাতে চকলেট, আর নিচে লেখা:
“এই আপু ইনজেকশন দেয় না। শুধু হাসি দেয়।”
তিন বান্ধবী চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল কিছুক্ষণ।
রিফাহ মৃদু হেসে বলল,
— “পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ডে শুধু ওষুধ না, ভালোবাসাটাও ডোজ হয়ে ওঠে।”
ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে ওরা তিনজন “ক্যালিস্ট্রো”তে কফি খেতে বসে।
জুই বলল,
— “আজ যদি রায়ান থাকতো, জানি ও খুশি হতো।”
সিদ্দিকা বলে,
— “তুমি ওকে ভুলে যাওনি বলেই সে এখনও পাশে।”
রিফাহ এক গ্লাস পানি খেয়ে বলল,
— “আজ প্রথমবার মনে হচ্ছে, ডাক্তারি পেশাটা শুধু রক্ত-মাংসের না। এটা আত্মার চিকিৎসা।”
ওরা একে একে চুপ করে যায়।
হঠাৎ রিফাহ ব্যাগ থেকে একটা আমসত্ত্ব বের করে টেবিলে রাখে।
— “রাফিনের কাঁচা আমের গল্পটা অসমাপ্ত না থাকুক।”
জুই আর সিদ্দিকা হেসে ওঠে।
পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ডের একটা দিন—তাদের শিখিয়ে দেয়, কিভাবে কাঁদতে হয়, কিভাবে ভালোবাসতে হয়, আর কিভাবে একটা কাঁচা আমও কারও জীবনের গল্প হয়ে যেতে পারে।
পর্ব ৩: শ্বাস নিতে কষ্ট হয়
মেডিসিন ওয়ার্ডে ঢুকতেই একটা কষ্টের গন্ধ লাগে। এই গন্ধের কোনো রাসায়নিক ব্যাখ্যা নেই। এখানে দীর্ঘ সময় ধরে অসুস্থ মানুষ পড়ে থাকে, বেঁচে থাকার লড়াই চলে, আর মাঝে মাঝে হাল ছেড়ে দেওয়া একেকটা চোখ তাকিয়ে থাকে সিলিংয়ের দিকে।
রিফাহ একটু থমকে গেল।
আজকে ওদের তিনজনের ওয়ার্ড ক্লাস। রোগী নিতে হবে। টিচার এসে বললেন,
— “৫ মিনিটের মধ্যে একজন রোগী ঠিক করে তার হিস্ট্রি নিয়ে আসবে। শ্বাসকষ্টের কোনো কেস পেলে ভালো হয়।”
রিফাহ সোজা এগিয়ে গেল ২১ নম্বর বেডের দিকে। সেখানে শুয়ে আছে এক বৃদ্ধ লোক, মুখে অক্সিজেন মাস্ক, বুকে হালকা নিঃশ্বাসের ঝাঁকুনি। পাশে বসে একটা কিশোর ছেলে—চোখ লাল, কিন্তু শক্ত হয়ে আছে।
— “চাচা, কেমন আছেন?”
রিফাহ ধীরে জিজ্ঞেস করে।
বৃদ্ধ লোক মাস্ক খুলে কষ্ট করে বলে,
— “আল্লাহর রহমতে শ্বাস টানতেছি, কিন্তু ফুসফুস আর বইতেছে না… আমার কপালেই কাহিনি।”
ছেলের নাম সাব্বির। সে বলে,
— “আমার আব্বু অনেক দিন ধরে ধুমপান করে। এখন বুড়ো বয়সে ফুসফুস দুইটাই শেষ। ডাক্তার বলছে সিওপিডি।”
রিফাহ বুঝে যায়—এটা একটা ক্লাসিক কেস। COPD – Chronic Obstructive Pulmonary Disease।
ও হিস্ট্রি নিতে নিতে দেখে, বৃদ্ধ লোকটা হঠাৎ বলছে,
— “ডাক্তার সাব, শুইতে গেলে মনে হয় বুকের ওপর কেউ পাথর চাপ দিছে।”
এই বাক্যটা রিফাহর মনে গেঁথে যায়।
ও ভাবে—“প্যাথোলোজি বইয়ে লিখা কেস না, এটা জীবনের কেস। একেকটা রোগ শুধু শরীরে নয়, মনে–মগজে কতখানি দাগ কাটে, তা কি বইয়ে পাওয়া যায়?”
পাশ থেকে সিদ্দিকা আস্তে করে বলে,
— “রিফু, একটা আশ্চর্য কথা বলি?”
— “বল।”
— “তুই তো সবসময় বলিস, আমি খুব শান্ত। কিন্তু জানিস, এই রোগীদের দেখে আমার কেমন জানি একটা রাগ হয়। নিজের ওপর, সমাজের ওপর, জীবনদর্শনের ওপর।”
জুই এসে যোগ দেয়,
— “আচ্ছা, আমরা কি সত্যিই রোগ সারাতে পারি? নাকি শুধু সময়টুকু বাড়াই?”
ওয়ার্ড ক্লাস শেষে টিচারদের প্রশ্ন, উত্তর, টেনশন—সব কিছুর মাঝে একটা কথা রিফাহ মনে মনে লেখে:
“এই প্রথম মনে হলো, ডাক্তার হবার মানে রোগ সারানো নয়—রোগীর পাশে থাকা। শ্বাস না নিতে পারা মানুষটার পাশে দাঁড়িয়ে শ্বাস নেওয়া।“
সন্ধ্যায়
তিনজন আবার দেখা করে কফিশপ ‘ক্যালিস্ট্রো’-তে।
আজ আর কেউ হাসছে না। চুপচাপ বসে আছে।
জুই প্রথম বলল,
— “আজ আর কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না। সেই ছেলেটার চোখে কেমন ভয় ছিল জানিস? যদি আব্বুকে হারিয়ে ফেলে…”
সিদ্দিকা মৃদু স্বরে বলে,
— “হারানোর ভেতর দিয়েই তো আমরা ডাক্তার হয়ে উঠি, জুই।”
রিফাহ ওদের দিকে তাকায়।
— “তোমরা জানো? আমি ওই বৃদ্ধ লোকের বুকের ‘পাথর’ শব্দটা ভুলতে পারছি না।”
হঠাৎ এক কাপ কফি ঠাণ্ডা হয়ে পড়ে থাকে টেবিলের ওপরে। তার পাশে রিফাহ নিজের ডায়েরিতে লেখে:
“আজ শিখলাম—
রোগ শরীরে শুরু হয়, মনের গহীনে বাসা বাঁধে,
আর একজন ডাক্তার হতে হলে কেবল রোগ নয়, ভয়টাও বুঝতে হয়।”
পর্ব ৪: ছুরি, রক্ত, জীবন
সকালের আলো তখনো হাসপাতালের জানালায় এসে পড়েনি ঠিকভাবে।
সার্জারি ওয়ার্ডের সেই পুরোনো জানালাগুলোর গায়ে মরিচা ধরেছে, কিন্তু ঘরের ভেতরে নিঃশব্দ আতঙ্ক জেগে থাকে সদাই।
রিফাহদের আজ প্রথম অপারেশন থিয়েটারে ঢোকার সুযোগ।
ওয়ার্ডে ঢোকার মুখে লেখা—
“Clean mind, clean hands. Leave ego outside.”
রিফাহ এই লেখাটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে।
পেছন থেকে জুই বলে,
— “আমার কিন্তু হাত ঠান্ডা হয়ে গেছে। যেই ছুরি দেখে ফেললাম, মনে হচ্ছে আমি ব্ল্যাকআউট করব।”
সিদ্দিকা তার চিরচেনা ভঙ্গিতে বলে,
— “তুমি যে এখনও দাঁড়িয়ে আছো, এটাই যথেষ্ট। একদিন এসবই আমাদের হাতের খেলনা হয়ে যাবে। কিন্তু যতদিন না হচ্ছে, ভয়টাও উপভোগ করা যাক।”
অপারেশন থিয়েটার: প্রথম দেখা
ভেতরে ঢুকেই গন্ধটা নাকে লাগে—সেলাইন, বিটাডিন, রক্ত আর ভয়ের গন্ধ।
আজকের কেস: একজন ২৬ বছর বয়সী ছেলের অ্যাপেনডিসাইটিস।
ইমারজেন্সি অপারেশন।
অ্যাসিস্টেন্ট সার্জন রিয়াজ স্যার বললেন,
— “যারা দাঁড়িয়ে আছো, মনোযোগ দিয়ে দেখো। অপারেশন কোনো জাদু না, এটা প্র্যাকটিস। কিন্তু রোগীর বিশ্বাস, সেটা যেন না ভেঙে।”
ছুরি চালানো হলো।
পেটের চামড়া কাটা, তারপর মাংসপেশি, তারপর লিগামেন্ট… তারপর?
রক্ত।
গাঢ় লাল রক্ত।
রিফাহর মনে হলো, সময় থেমে গেছে। এমনকি হার্টবিটও যেন এক সেকেন্ড থেমে ছিল।
জুই মুখ ফিরিয়ে ফেলল। সিদ্দিকা চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্ত।
কিন্তু ঠিক তখনই, রিয়াজ স্যার বললেন,
— “Appendix found. Inflamed. Ready to remove.”
সেই মুহূর্তে রিফাহের মনে হয়,
“এটাই জীবন—ফাঁপা একটা অঙ্গ, যা ব্যথা দেয়, ফেটে গেলে মরে যেতে হয়। অথচ অপারেশনের পর মানুষ হেঁটে বাড়ি যায়।”
জীবন কতোটা সহজ হতে পারে!
অপারেশন শেষ। বাইরে বেরিয়ে রিফাহ দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।
জুই ধপ করে পাশেই বসে পড়ল।
— “আমার মনে হচ্ছে আমি একটা যুদ্ধ দেখে ফিরলাম। আমাদের হাতে ছুরি থাকবে, রক্ত থাকবে, কিন্তু মানুষ বাঁচবে—এই ভাবনাটা অবিশ্বাস্য।”
সিদ্দিকা বোঝে, জুই কাঁদছে না, কিন্তু চোখে জল জমানো।
ও ধীরে বলল,
— “এই প্রথম আমি রক্ত দেখে ভয় পেলাম না। মনে হলো, সেই রক্তটা কেবল শরীরের না—ভালোবাসারও। মানুষ তার প্রিয়জনকে ফিরে পায় এই রক্তের বদৌলতে।”
আজ তেমন কথা নেই।
রিফাহ কফিতে চুমুক দিয়ে বলল,
— “একটা ছুরি দিয়ে জীবন বাঁচানো যায়। আর একটা ছুরি দিয়ে সম্পর্ক কাটা যায়। পার্থক্য জানার জন্য তো ডাক্তারি পড়া জরুরি না, তাই না?”
সিদ্দিকা উত্তর দেয়,
— “কিন্তু ওই পার্থক্য যদি ভালোভাবে না বুঝি, তাহলে একদিন নিজের ছুরিই আমাদের কেটে ফেলবে।”
জুই গলার কাছে গামছার মতো ওড়নাটা টেনে বলে,
— “আজ মনে হচ্ছে, আমাদের হাতে কেবল ছুরি নয়, সময়ও আছে। সময় দিয়ে জীবনের সেলাইটা করে যেতে হবে।”
“আজ প্রথমবার মানুষের শরীরের ভেতর ঢুকেছি।
পেশি, রক্ত, নাড়ি—সবই ছিল। কিন্তু কোথাও খুঁজে পাইনি ‘ভালোবাসা’, ‘ভয়’, বা ‘বিশ্বাস’-কে।
অথচ অপারেশনের পরে ওই তিনটা জিনিসই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে।”
রিফাহদের আজ তৃতীয় দিন পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ডে। শিশুগুলোর কান্না, মায়েদের মুখে উদ্বেগ আর ডাক্তারদের ব্যস্ততা— সব মিলিয়ে ওয়ার্ডটা যেন একেকটা গল্পের খনি। আজ তারা টিউশন সেরে একটু দেরিতে এসেছে। ক্যালিস্ট্রোর কফির ঘ্রাণ এখনও জামার ভাঁজে লেগে আছে।
“এই বাচ্চাটার চেহারাটা কেমন যেন পরিচিত মনে হচ্ছে,” জুই হঠাৎ করে বলল।
“কোনটা?” রিফাহ এগিয়ে গিয়ে দেখল। ছোট্ট একটা ছেলেশিশু, বয়স বড়জোর দেড় বছর। মুখটা ফ্যাকাশে। চোখে-মুখে দারিদ্র্যের ছাপ। পায়ের পাতায় ব্যান্ডেজ। পাশে বসে থাকা মহিলা— একরাশ ক্লান্তি আর ভাঙা শাড়িতে ঢাকা কষ্টের প্রতিচ্ছবি।
“আপনার ছেলের কী হয়েছে?” সিদ্দিকা কোমল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল।
মহিলা মাথা নিচু করে বলল, “গরম পানিতে পা পুড়ে গেছে। গরম চায়ের কেটলি উল্টে পড়েছিল।”
জুইয়ের চোখ ছলছল করে উঠল। শিশুটার মাংসপেশিতে টান পড়েছে, ব্যথায় মাঝে মাঝে হঠাৎ কেঁদে ওঠে।
রিফাহ পকেট থেকে একটা ছোট্ট গাড়ির খেলনা বের করল। সে জানে, এই বয়সী শিশুরা খেলনা দেখলে এক মুহূর্তের জন্য হলেও ব্যথা ভুলে যেতে পারে।
“এইটা ওকে দিন,” সে বলল।
“রিফাহ, তোমার মা তো খোঁজ করছিল,” সিদ্দিকা বলল।
“হুম, আমি পরে ফোন দেব। এখন এই বাচ্চাটার জন্য মন খারাপ লাগছে,” সে পায়ের পাতা ধরে মৃদু গলায় শিশুটার সঙ্গে কথা বলছিল।
একটু দূরে, হঠাৎ একটা কান্নার শব্দ শুনে জুই ফিরে তাকাল। এক নার্সের হাত ধরে একটা ছোট মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলছে, “আম্মু কই? আম্মু কই?”
“এই শিশুটার মা বাইরে গেছেন প্রেসক্রিপশন আনতে,” নার্স জানাল।
জুই মেয়েটাকে কোলে নিল। মেয়েটা চুপ হয়ে গেল, তার গলা জড়ায়ে ধরল। সেই মুহূর্তে জুইয়ের মনেও অদ্ভুত এক টান অনুভব হল— একরকম মাতৃত্বের ছোঁয়া।
“তুমি নাম কী?” জুই ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল।
“আরিবা,” মেয়েটি বলল।
“আচ্ছা আরিবা, আমি তোকে একটা গান শোনাব, চল?”
সিদ্দিকা ফোনে টুকটাক কিছু বাজিয়ে দিল। তারা তিনজন হাসিমুখে শিশুগুলোর মাঝে বসে সময় কাটাল। তাদের চোখে ক্লান্তি, ব্যথা, কিন্তু মন ভরে উঠেছিল একটা অন্যরকম শান্তিতে।
দিন শেষে তারা বেরিয়ে এলো ওয়ার্ড থেকে। পদ্মার বাতাস যেন আরও নরম লাগছিল আজ। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে রিফাহ বলল,
“তোর মনে হয় না, আমরা একটু একটু করে বদলে যাচ্ছি?”
জুই হাসল, “হয়তো আমরা বড় হচ্ছি— হৃদয়ে।”
সিদ্দিকা কিছু না বলে, শুধু হেঁটে গেল সামনের দিকে। তার পিঠে ব্যথা, তবুও আজকের বিকেলটা তার বুকেও খানিকটা উষ্ণতা ছড়িয়ে দিয়েছিল।
পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ড থেকে ফিরে আসার পর রাতে রিফাহ, জুই আর সিদ্দিকা তিন বন্ধু ‘ক্যালিস্ট্রো’ ক্যাফেতে মিলে বসেছিল।
দিনভর যত ক্লান্তি, ব্যথা, কষ্ট সব যেন ক্যাফের আলোর নরম আবহাওয়ায় কিছুটা ফুরিয়ে আসছে।
জুই প্রথম বলল,
— “আজ আরিবা, রাফিন, ওই ছোট্ট ছেলেটা… ওদের কথা ভাবতেই আমার মন খারাপ হয়।”
সিদ্দিকা মুখে হালকা হাসি ফোটালো,
— “তবে এতক্ষণ বাচ্চাদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে মনে হয়েছে, এরা আমাদের থেকেও অনেক সাহসী।”
রিফাহ একটু থামল, তারপর বলল,
— “আমরা কি কখনো বুঝব তাদের ভয়টা? যে কান্নাটা ওরা লুকিয়ে রাখে?”
জুই মাথা নাড়িয়ে,
— “আমাদের তো অনেক সময় তাদের চোখের কাছে নিজের চোখ ঢাকতে হয়।”
সেদিন সন্ধ্যায় তারা দীর্ঘক্ষণ চুপচাপ ছিল,
কিন্তু তার মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত বোঝাপড়া।
হঠাৎ রিফাহর ফোন বেজে উঠল। কল আসছিল তার মায়ের থেকে।
ফোন ধরে রিফাহ বলল,
— “মা, আজকাল তোমার কথা ভাবি বেশি। তুমি কেমন আছো?”
মা বলল,
— “বেটা, তোর কথা ভাবি আমি বেশি। একদিন তুই ডাক্তার হয়ে ফিরে আসবি তো? ঘরে ফিরে এসে সবাইকে ভালোবাসা দেবে।”
রিফাহর চোখে জল এসে গেল। সে জানত, ঘরের দরজার ওপাশেও অনেক যুদ্ধ লড়াই চলছে, যেটা কেউ জানে না।
জুই বলল,
— “আমরা শুধু ডাক্তার নই, আমরা হয়ে উঠছি ভালোবাসার সেতুবন্ধন।”
সিদ্দিকা মৃদু হাসল,
— “তাই না, আমাদের হাতের প্রতিটি ছুরি, প্রতিটি ইনজেকশন, প্রতিটি কথাই যেন একেকটা জীবনের অঙ্গ।”
রিফাহ ডায়েরি খুলে লিখতে শুরু করল—
“আজও শিখেছি—
মানুষের দেহ যতই অসুস্থ হোক,
ভালোবাসা না থাকলে সুস্থ হওয়া অসম্ভব।”
তিনজন বন্ধু হাতে হাত দিয়ে কফির শেষ এক কাপ ভাগ করে নিলো,
আর ভাবলো—আগামী কাল তাদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসবে।
জুইয়ের একটি অংশ
রাজশাহীর কাঁকনহাটে কোচিং শুরু করে জুই। ওর চোখে সবকিছুই নতুন—নতুন শহর, নতুন মানুষ, নতুন রুটিন। প্রথম কয়েকদিন কিছুটা অস্বস্তি লাগলেও দ্রুত মানিয়ে নেয়, কারণ জুই জানে, এই যুদ্ধে জিততেই হবে। কোচিংয়ের ব্যস্ততা তার কাছে খুব অচেনা নয়।
কোচিং সেন্টারে একটা ছেলে ছিল—নাম রাশেদ। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, হালকা পাতলা গড়ন, সবসময় চুপচাপ থাকে। কেউ ভাবে ও অহংকারী, কেউ ভাবে ও খুব পড়ুয়া। কিন্তু জুই ভাবে, ছেলেটা “আদ্ভুত রকমের সুন্দর”—চেহারায় নয়, আচরণে।
একদিন হঠাৎ লিফটে আটকা পড়ে যায় তারা দুজন। সেদিন প্রথম কথা হয়—স্রেফ দু-তিন বাক্য। তবু জুইয়ের মনে হয়, এই অল্প কথার ভেতরেই অনেক কিছু লুকানো ছিল। এরপর চোখাচোখি হতে থাকে, সামান্য হাসি বিনিময়, একসাথে ক্লাসে বসা—আরো কাছাকাছি আসা।
জুই রাশেদকে ভালোবেসে ফেলে। একদিন সাহস করে বলে ফেলে:
– “তোমার সাথে কিছু একটা অনুভব করি রাশেদ। ঠিক প্রেম না, আবার তা-ও। তুমি কি কিছু অনুভব করো?”
রাশেদ নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে,
– “জুই, তুমি অনেক ভালো। কিন্তু এই সময়ে এসব না ভাবাই ভালো। আমার ফোকাস মেডিকেল। আর এসব বিষয় নিয়ে আমি কখনোই সিরিয়াস না।”
জুই মাটির সাথে মিশে যায়। কান্না পায়, কিন্তু কাঁদে না, মুচকি হাসে।
এরপর দিনগুলো চলে যায়। পরীক্ষা এসে যায়। সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। জুই মন ভেঙে যাওয়ার যন্ত্রণাকে শক্তি বানিয়ে ফেলে। ঘুমহীন রাত, ব্যথাভরা বুক আর জেদের আগুন নিয়ে ও লড়তে থাকে।
শেষমেশ রেজাল্ট বের হয়।
কয়েকদিন পর বাসস্ট্যান্ডে দেখা হয়ে যায় রাশেদের সাথে। ছেলেটা চোখ নামিয়ে রাখে। কিছুটা কুণ্ঠিত ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করে,
– “তুমি তো রাজশাহী মেডিকেলেই পড়বে, তাই না?”
জুই কেবল মাথা নাড়ে।
– “ভালো লাগছে জানো? আমি আগেই বলেছিলাম, তুমি অনেক ভালো করবে।”
জুই হাসে। ঠোঁটে সেই মুচকি, কিন্তু চোখে তীব্র দৃঢ়তা।
– “রাশেদ, তুমি ঠিক বলেছিলে। এই সময়ে এসব না ভাবাই ভালো। এখন আমার ফোকাস মেডিকেল।”
ছেলেটা স্তব্ধ হয়ে যায়। কিছু বলতে চায়, পারে না।
জুই ঘুরে চলে আসে। জানে, কিছু কিছু গল্প অসমাপ্ত থাকাই ভালো। আর কিছু কিছু ভালোবাসা… শুধু একতরফা হলেই শ্রেষ্ঠ।
রেলওয়ে কলোনি, বিকেল পাঁচটা।
জুই একটা পুরনো ভাঙাচোরা গেট ঠেলে ঢুকল লাল ইটের বাড়িটার ভেতর। কলোনির পুরোনো ধাঁচের ঘর, ছাদের খড়খড়ে ফাঁকফোকর দিয়ে আলো পড়ে আছে পড়ার টেবিলের ওপর।
“আসেন আপু,” ছোট মেয়েটি বলল। পিএন স্কুলে পড়ে, নাম অর্ণা। ক্লাস সেভেন।
জুই টেবিলের ওপর বই রাখল। “আজকে কিসে পড়ব, অর্ণা?”
মেয়েটি বাংলা বইটা এগিয়ে দিল।
জুই বইটা খুলতেই, পৃষ্ঠা ফাঁকে একটা ভাঁজ করা কাগজ পড়ল। তার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। কাগজ খুলতেই একটা ছেলেমানুষী হাতের লেখা—
“তুমি যখন হাসো, মনে হয় সারা ঘর আলোয় ভরে যায়। জানি, তুমি আমায় ভালোবাসবে না। কিন্তু তবুও… আমি চাই তুমি জানো। —রাফি“
জুই থমকে গেল।
ঠিক তখন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক কিশোর ছেলের চোখে চোখ পড়ল তার। গায়ের রঙ শ্যামলা, চুল এলোমেলো, হাতে একটা ব্যাট। কিছু বলতে যাবে, এমন মুখ করে তাকিয়ে আছে।
“তোমার ভাইয়ের নাম রাফি?” জুই জিজ্ঞেস করল ঠাণ্ডা গলায়।
অর্ণা গা চুলকাতে চুলকাতে বলল, “হ্যাঁ… মানে… ও তো আপনার ভীষণ ফ্যান।”
জুই কাগজটা আবার ভাঁজ করে বইয়ের পাতার মধ্যে রেখে দিল। মুখে কোনো হাসি নেই, চোখে একধরনের ধোঁয়া জমে গেছে। ধোঁয়ার ভেতরেও একটা মৃদু লজ্জা, একটা না-বলা চমক, আর হয়তো একচিলতে দয়ার ছায়া।

