Homeস্মৃতিকথাঅনুভার গল্প

অনুভার গল্প

২৮ এপ্রিল

বিশেষ কারণে বিকেল চারটার মধ্যেই অফিস ছুটি হয়ে গেছে মাহিবের। আগে আগে ছুটি হলে সবারই ভালো লাগে। আর সবার মতই মাহিবেরও খুব ভালো লাগছে। বিশেষ করে এপ্রিলের ২৭ তারিখে চারটার মধ্যে অফিস ছুটি হওয়া ওর জন্য খুবই জরুরী ছিল। ছুটি না হলেও বসকে বলে ছুটি নিয়ে সে বেরিয়ে যেতো। তাকে ক্যাম্পাসে যেতে হবে। সাথে করে নিয়ে যেতে হবে একটা তিনতলা কেক। কেকের উপর সুন্দর করে লেখা থাকবে শুভ জন্মদিন অনুভা। মাহিবের অফিস উত্তরাতে। ছাত্রজীবন থেকেই সে উত্তরায় থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি উত্তরা হয়ে সেই কোনাবাড়ি পযর্ন্ত যায়। সেই গাড়িতেই ছাত্রজীবনে চলাফেরা করতো মাহিব। গাড়িটার নামটাও সুন্দর। ক্ষণিকা। ঢাকা ও আশেপাশের ছাত্র ছাত্রীদের জন্য বিভিন্ন রুটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি চলাচল করে। গাড়িগুলোর কোনোটার নাম চৈতালি,কোনোটার নাম ক্ষণিকা,কোনোটার নাম শ্রাবণ। আগে যখন মাহিব কল্যাণপুরে থাকতো তখন সে চৈতালি বাসে নিয়মিত যাওয়া আসা করতো। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে উঠেছিল। অবশ্য তারপর অনেক গুলো টিউশন উত্তরাতে হওয়ায় সে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ছেড়ে দিয়ে উত্তরাতে থিতু হয়েছিল। সেই থেকে ছাত্রজীবন শেষ করে কর্মজীবন শুরু করেছে উত্তরাতেই। উত্তরা তার নিজের বাড়ির মত হয়ে উঠেছে। যেন প্রতিটি ইঞ্চি ইঞ্চি মাহিবের চেনা। অফিস শেষে বন্ধু ও কলিগদের সাথে রোজ ঘুরে বেড়ানো ছিল ওর নিয়মিত অভ্যাস। যখন আগে আগেই ছুটি হয়ে গেল তখন মাহিব হাফছেড়ে বাচলো। অন্তত ছুটির জন্য বসের সামনে গিয়ে দাড়াতে হবে না। এক দুই ঘন্টা আগে বের হতে চাইলেও বস যেভাবে তাকায় তাতে ছুটি নেওয়ার চেয়ে না নেওয়াই বেশি ভালো মনে হয়।

অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা বাসায় গিয়ে পোষাক বদলে নেয় মাহিব। অফিসে স্যুট টাই পরে থাকলেও সাধারণত এমনিতে সে জিন্স আর টিশার্ট বেশি পছন্দ করে। মাহিব দেরি না করে বেরিয়ে পড়ে। রাজলক্ষ্মী আর আজমপুরের মাঝামাঝি পেস্ট্রি শপ থেকে একটি তিন পাউন্ডের কেক কেনে। কেকের উপর সুন্দর করে লিখে নেয় শুভ জন্মদিন অনুভা। যার জন্য কেক কেনা হয়েছে সে কিন্তু জানে না। আগামী কাল ২৮ এপ্রিল অনুভার জন্মদিন। অনুভা থাকে নেত্রকোনাতে। ওখানেই বাসা। পড়াশোনাও করেছে ওখানে। স্কুল ছুটির অবসরে সে এসেছে খালার কাছে। এখানে কয়েকদিন থাকবে। মাহিব অনুভার খালামনির কাছ থেকে জেনে নিয়েছিল যে অনুভা ওর জন্মদিনে ঢাকাতেই থাকবে। তখন থেকেই মাহিব ভেবে রেখেছিল ওর জন্য কেক নিয়ে যাবে। অবশ্য  অনুভা যখন নেত্রকোনাতে থাকতো তখনও কোনো না কোনো ভাবে মাহিব ওর জন্য কেক পাঠাতো। জন্মদিনে অন্যান্য উপহারও পাঠাতো। এবার যেহেতু সে ঢাকাতেই আছে তাই মাহিবের মনে হলো ওকে সারপ্রাইজ দেওয়া যাবে। যেই ভাবা সেই কাজ। একটি কেক নিয়ে সে সিএনজিতে ক্যাম্পাসের দিকে রওনা দিলো। অনুভার খালামনি ক্যাম্পাসের পাশেই থাকে।  

যখনই অনুভা ঢাকায় আসতো সে মাহিবের সাথে ঘুরে বেড়াতো। ভাইয়া বলতে পাগল। তার যত আব্দার সব মাহিবের কাছে। মাহিবও তাকে খুব স্নেহ করে। উত্তরা থেকে ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে মাহিব দেখলো সেদিন মারাত্মক জ্যাম। তিন ঘন্টা লেগে গেলো ওইটুকু পথ যেতে। তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। চারদিকে অন্ধকার নেমে এসেছে। অবশ্য শহরে রাতও দিনের মতই আলোকিত থাকে। অনুভার খালামনির বাসার সামনে গিয়ে খালামনিকে ফোন করলো। তার সাথে আগেও কথা হয়েছিল। অবশ্য মাহিব বলেনি যে সে কেক নিয়ে আসবে। মাহিবের ফোন রিসিভ করার পর সে বললো অনুভাকে গেটে পাঠাতে। অবশ্য তাকে বলতে নিষেধ করলো কে এসেছে। শুধু বলা হলো একটা পার্সেল এসেছে যাও নিয়ে আসো। অনুভা তার খালামনির কথামত গেটে আসলো। মাহিবকে দেখে সে বিস্মিত হয়ে গেল। সে কল্পনাও করেনি মাহিব ভাইয়া আসবে। তারপর দাড়িয়ে দাড়িয়ে কিছুক্ষণ কথা বলে জন্মদিনের জন্য আনা কেকটা দিয়ে মাহিব বিদায় নিলো। যদিও জন্মদিন আগামী কাল ২৮ এপ্রিল। কিন্তু কালকে মাহিবের অফিস থাকবে সকাল থেকে বিকেল পযর্ন্ত। সেই সময়ে আসতে পারবে না। তাই আগে থেকেই কেক দিয়ে গেলো। তাছাড়া জন্মদিন রাত বারটার পর থেকে নাকি শুরু হয়। সেই রীতিও সে ফলো করলো। ভাইয়ের কাছ থেকে এমন সুন্দর একটা কেক পেয়ে অনুভা ভীষণ খুশি। মাহিব এবার বাস ধরে উত্তরাতে ফিরে গেলো। যেতে যেতে বেশ রাত হলো। বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে এশার নামাজ পড়ে রাতের খাবার খেলো। অনুভাকে জন্মদিনের কেক দিতে পেরে তার খুব ভালো লাগছে। শান্তি শান্তি লাগছে।

রাত বারটা বাজার পর অনুভাকে ফোন করে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালো। অনুভা কেক পেয়ে এমনিতেই খুশি। জন্মদিনের উইশ পেয়ে আরও খুশি হলো। পরদিন সকালে যথারীতি অফিসে ঢুকলো মাহিব। সারাদিন অফিস করলো। ওর অফিস টাইম বিকেল চারটা পযর্ন্ত। ছুটি হওয়ার পর অফিস থেকে বেরিয়ে হাটাহাটি করলো। অন্য এক বন্ধুর সাথে ঘুরে বেড়ালো এবং রাতে বাসায় ফিরলো। সারাদিন আর ফেসবুকে ঢোকা হয়নি। মাহিব ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার খেয়ে যখন ফেসবুকে ঢুকলো তখন দেখতে পেলো অনুভার খালামনির আইডি থেকে একটা নোটিফিকেশন এসেছে। বন্ধু তালিকায় থাকা কেউ পোস্ট দিলে সাধারণত নোটিফিকেশন আসে। সেই নোটিফিকেশন অনুসরণ করে টাইমলাইনে যেতেই মাহিব দেখতে পেলো রীবন্দ্রচত্ত্বরে অনুভা তার জন্মদিনের কেক কেটে জন্মদিন উদযাপন করেছে। মাহিবের দেওয়া সেই কেকটাই কাটা হয়েছে। অবশ্য আরও একটা ছোট কেকও ছিল। আর ওর পাশে ছিল অনুভার দুই খালামনি এবং অন্য আরও অনেকে। তাদের কাউকে অবশ্য মাহিব চেনে না। জন্মদিনে তাহলে বেশ ভালোই এনজয় করেছে অনুভা। মাহিব অনুভাকে মেসেজ দিল তোর জন্মদিনে কী দারুণ সেলিব্রেট করলি। আমাকে বললে আমিওতো চলে আসতাম।

মাহিব ভাবতেও পারেনি অনুভা তাকে এমন কিছু বলবে। অনুভারা চার বোন। কোনো ভাই নেই। অনুভা যখন ক্লাস থ্রিতে পড়তো তখন থেকে মাহিবের সাথে পরিচয়। মাহিব তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে পড়তো। সেই থেকে মাহিব হয়ে উঠেছিল অনুভার একমাত্র ভাই। সব কিছুতে সে ভাই হিসেবে তার সর্বচ্চটা দিয়ে বোনকে ভালোবাসতো। তার জন্য সব কিছু সাধ্যমত চেষ্টা করতো। তার সব ইচ্ছে পূরণ করতে চেষ্টা করতো।

যে সব মানুষের কথা আমি কখনো ভুলে যেতে পারিনি তাদের মধ্যে অনুভা একজন।

বার্লে গ্রিফিন লেকের পানির দিকে তাকালে আকাশের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। যেন পানির নিচে আরেকটা আকাশ। লেকের ইন্টারলকিং পেভার ব্লক দিয়ে বাঁধানো পথ ধরে জগিং করতে করতে ক্লান্ত হয়ে কোনো একটি বেঞ্চিতে বসে সেদিকে তাকিয়ে হয়তো অনুভার অনেক কিছুই মনে পড়ে। অনেক মানুষের ছবি ভেসে ওঠে। দেশের মাটিতে বাবা মা বোন আত্মীয় পরিজন,সহপাঠীরা রয়ে গেছে। সেই সব প্রিয়জনকে নিশ্চই সে মিস করে। কিন্তু আমি জানি না আমার কথা কখনো তার মনে পড়ে কি না। আমার ছবি তার মন থেকে পুরোপুরি মুছে গিয়েছে কি না। মানুষ সুখে দুঃখে দুই ধরনের মানুষকে মনে করে। যারা তাদের প্রিয়জন আর যারা তাদের শত্রু। আমি অবশ্য এই দুই ক্যাটাগরিতে পড়ি বলে মনে হয় না। কিন্তু আমার জীবনে প্রিয়জন হিসেবে অনুভা ছিল,আছে এবং হয়তো ভবিষ্যতেও থাকবে। আমিও একদিন অনুভার জীবনে প্রিয়জন হিসেবেই ছিলাম। অন্তত সেই সময়ে আমার তাই মনে হতো। সময়ের সাথে সাথে সূর্য যেমন তার তেজ হারায়। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলে সূর্য চোখের আড়ালে চলে যায় তেমনি আমাদের জীবন থেকেও অনেক মানুষ ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। এই হারানো আবার দুই রকম হতে পারে। যারা দুনিয়া থেকেই চিরতরে হারিয়ে যায় আর যারা দুনিয়াতে থেকেও হারিয়ে যায়।

অনুভার কথা মনে পড়লে আমার বার বার মনে পড়ে আটাশ এপ্রিলের কথা। এই দিন অনুভার জন্মদিন। একটা দীর্ঘ সময় এই দিনটি ছিল আমার জীবনের অন্যতম সুন্দর দিন। এক মাস আগে থেকে অনুভার জন্য নানা রকম উপহার কেনায় ব্যস্ত হয়ে উঠতাম। উপহারগুলো হয়তো সামান্যই ছিল কিন্তু তাতে ভালোবাসার কোনো কমতি ছিল না। অনুভাও সেটা খুব উপভোগ করতো। এখনও প্রতি বছর অনুভার জন্মদিন আসে আবার চলেও যায়। কিন্তু জানা হয় না আগের মত ওর জন্মদিন উদযাপন হয় কি না। অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরাতে থাকে অনুভা। পিএইচডি করতে গিয়েছে ওখানে। আমি অবশ্য ভাবতাম সে ইঞ্জিনিয়ারিং করবে অথবা চিকিৎসা বিদ্যায় উচ্চশিক্ষা নিবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় দেখলাম সে পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন নিয়ে পড়তে বেশি আগ্রহী।

  • মুকুল নিকেতন/পরিচয়
  • ভিকারুননিসা নুন স্কুল দ্বিতীয় দেখা
  • ঢাকায় ঘুরতে আসা ও অপেক্ষা
  • বিশ্বকাপ ক্রিকেটের টিকেট
  • জন্মদিনের কেক দেওয়া ও জন্মদিন পালন
  •  

Most Popular