নিশিকান্তর বাবা মারা গেছেন তিন বছর আগে। মারা যাবার সময় নিশিকান্ত কিংবা তার মায়ের জন্য বাবা কিছুই রেখে যাননি। ওর একজন দিদি আছেন। দুই ভাই বোনের মধ্যে দিদি বড়। দিদি থাকে গৌরীপুরে। বনেদী ঘরের ভাল একটা ছেলের সাথে তার বিয়ে দেয়া হয়েছে। ছেলেটির নাম রামকৃষ্ণ। রেলওয়েতে চাকরির সুবাদে নিশিকান্তর বড় দিদি বিভিন্ন যায়গা ঘুরতে পেরেছে। নিশিকান্ত নিজেও দিদির সাথে অনেক জায়গা গিয়েছে। একবারতো দিদির সাথে কক্সবাজার গিয়েছিল। কী বিশাল সমুদ্র সৈকত। ও শুনেছে এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সমুদ্র সৈকত। ছোট্ট নিশিকান্ত সেবার সমুদ্র সৈকতে দাড়িয়ে দিদির কাছে প্রশ্ন করেছিল আচ্ছা দিদিভাই যতদূর চোখ যায় শুধু জল আর জল। জলের ওপারে আসলে কী আছে? কিছু কি আছে? দিদি ভাই তখন হেসে উত্তর দেয় নিশ্চই কিছু আছে। তুই বড় হয়ে কলম্বাসের মত গিয়ে আবিস্কার করিস ওপাশে কী আছে। দিদির কথা শুনে নিশিকান্তও হেসে ওঠে। সে স্কুলে দীপেন স্যারে মুখে শুনেছে কলম্বাস আমেরিকা আবিস্কার করেছিল। কলম্বাসের আগে কেউ জানতোই না সমুদ্রের ওপাশে আমেরিকা নামে একটা দেশ আছে। সেই সব কথা নিশিকান্তর বেশ মনে পড়ে।
বাবা দেহ ত্যাগের সময় নিশিকান্তের বয়স ছিল নয় বছর। বাবার সাথেও নিশিকান্তর ছিল দারুণ সব স্মৃতি। সে কখনো ভাবেনি এতো দ্রুত এতো অল্প বয়সে এভাবে বাবাকে হারাতে হবে। বাবার ভালোবাসা পুরোপুরি উপভোগ করার আগেই তিনি পরলোকগত হলেন। তারপর চোখের নিমিশে দিনগুলো যে কিভাবে কাটতে লাগলো তা ওর ধারণারও বাইরে। বাবা গত হয়েছেন তিন বছর সেই দিক থেকে নিশিকান্তর বর্তমান বয়স বার বছর। ময়মনসিংহের মুকুল নিকেতন স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেনীর ছাত্র সে। বাবা গত হওয়ার পর সম্বলহীন নিশিকান্ত আর তার মা মুশড়ে পড়ে। দিদি মাঝে মাঝে সামান্য কিছু টাকা পাঠায় তা দিয়ে সংসার চলে না। অবশ্য দিদিকেও দোষ দেওয়ার উপায় নেই। পরের সংসারে থাকে সে। সেখান থেকে মা আর ছোট ভাইয়ের জন্য যে কিছু টাকা পাঠাতে পারছে এটাইতো বিরাট ব্যাপার। ওইটুকুও যদি সে না দিতো তাহলে নিশিকান্তদের কিছু বলার থাকতো না।
ছোট্ট নিশিকান্ত সিদ্ধান্ত নেয় আর পড়ালেখা করবে না। পড়ালেখা ছেড়ে দিয়ে ছোট খাট কিছু একটা করবে যা দিয়ে তাদের সংসারটা বেচে যায়। বাবা বেচে থাকলে ওর জীবনটা নিশ্চই অন্যরকম হতে পারতো। যে স্বপ্ন সে দেখতো সেই স্বপ্ন সত্যি করতে পারতো। পড়াশোনা করে কত কিছু হতে পারতো। কিন্তু এখন আর সেটা ভেবে লাভ কী? যে নেই তাকে ঘিরে তো আর স্বপ্ন দেখা যাবে না। এখন যে কোনো ভাবেই হোক সংসারটা টিকিয়ে রাখতে হবে। সে যদি স্কুলে যায়,পড়াশোনা করে তাহলে একদিন নিশ্চই বড় কিছু হয়ে সংসারের হাল ধরতে পারবে। মাকে সুখী করতে পারবে। কিন্তু সেটাতো দীর্ঘ এক যাত্রা। সেই যাত্রাপথ পাড়ি দেওয়ার জন্য যে রসদ দরকার তা কোথা থেকে আসবে? ফলে তাকে কিছু না কিছু করতেই হবে। একেতো সে ছোট মানুষ তাই পড়াশোনা করার ফাঁকে ফাঁকে কিছু আয় রোজগার করার মত কোনো উপায় তার জানা নেই। আয় করতে হলে তাকে পড়াশোনা ছাড়তেই হবে। কিন্ত তার মা ভারতী দেবী কোনো ভাবেই ছেলের লেখাপড়া বন্ধ হোক এটা চান না।
সংসারে অভাব আর মায়ের হাড় খাটুনি দেখে বার বছরের ছেলেটার খুব খারাপ লাগে। মনমরা করে নদীর ধারে বসে থাকে। কে জানতো একদিন তার মাকেও অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাতে হবে। অথচ বাবা বেঁচে থাকতে কত সম্মান ছিল তাদের। নিজেদের জন্য ভাত তরকারি রান্না করা আর উঠোন ঝাড়ু দেওয়ার বাইরে নিজেদের কাপড় ধোয়া ছাড়া তেমন কোনো কাজই করা লাগতো না। যদিও বাবা ছোট্ট একটা চাকরি করতেন কিন্তু তিনজনের সংসার সেই টাকায় চলে যেতো। বাবার সাথে কাটানো সেই সব দিনের কথা মনে হলেই নিশিকান্তর মন খারাপ হয়ে যায়। তখন সে নদীর ধারে গিয়ে বসে থাকে। আকাশপাতাল ভাবে। পৌষের এক বিকেলে নিশিকান্ত হাটতে হাটতে ব্রহ্মপুত্র নদের ধারে শান বাঁধানো ঘাটে গিয়ে বসলো। তার দৃষ্টি অনেক দূরের নীল আকাশের দিকে। আকাশে তখন একঝাক বুনো পাখি উড়ে যাচ্ছে। কয়েকটা কবুতরও দেখা যাচ্ছে। হয়তো আশেপাশে কারো পোষা কবুতর হবে। কিছু খন্ড খন্ড মেঘ ভেসে ভেবে কোথাও চলে যাচ্ছে। দিনের বেলায় আকাশে কোনো তারা দেখা যায় না। যদি দেখা যেতো তবে সে হয়তো সেই তারার মাঝে তার বাবাকে খুজতো। মায়ের মুখ থেকে শুনেছে যারা পরলোকগত হয় তারা আকাশের তারা হয়ে যায়। ছোট বেলায় সে যখন মায়ের মুখে এরকম কথা শুনতো তখন প্রশ্ন করতো আচ্ছা মা সুকুমার জেঠুও কি তারা হয়ে গেছে? আমিও কি একদিন তারা হয়ে যাবো? মা তখন ওর মাথার চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলতেন একদিন সবাই আকাশের তারা হয়ে যাবে।
নদীর পাড়ে বসে বসে বাবা থাকতে তার সুন্দর সময়ের কথা ভাবতে থাকে। সকাল থেকে কেবল একটা শুকনো রুটি খেয়ে সে সারাটা দিন কাটিয়ে দিয়েছে। মনটা তার ভাল নেই। মায়ের শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না। থেকে থেকে জ্বর আসছে কাপুনি দিয়ে। যে ঘরে ওরা থাকে সেটাতে টিনের ছাউনি দেওয়া। বহুবছরের পুরোনো সে ঘর। জায়গায় জায়গায় টিন ছিদ্র হয়ে গেছে। সেই ছিদ্র দিয়ে সুর্যের আলো ঢুকে পড়ে। রাতে চন্দ্রের আলোয় দেখা যায়। আর বৃষ্টির দিনে সেটা দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। সেই ঘরেই নিশিকান্ত আর তার মা থাকে। মায়ের অসুখ। মাকে ডাক্তার দেখানোর মত কোনো টাকা তার নেই। সেই সব চিন্তায় মনটা বিষিয়ে উঠেছে নিশিকান্ত নামের বার বছরের ছেলেটার।
রোজ বিকেলে নিশিকান্ত এই জায়গাটাতে বসে থাকে। এলোমেলো চিন্তা তার মাথায় সারাক্ষণ ঘুরপাক খেতে থাকে। এটা সেটা ভাবতে ভাবতে এক সময় সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। প্রতিদিনের মতো নিশিকান্ত সেদিনও বাড়ির পথে রওনা হয়। বাড়ি বলতে যা বুঝায় এটা তা নয়। জিলাস্কুলের পশ্চিম পার্শ্বের যে একতলা ছিমছাম বাড়িটা আছে ওদিকে তাকালেই ওর ভীষণ কষ্ট হয়। ঐ বাড়িটা ওর ভীষণ চেনা। বড় মায়া লাগে বাড়িটার দিকে তাকালেই। ঐ পথ দিয়ে যাওয়ার সময় নিশিকান্তের চোখ ছলছল করে ওঠে। বিশেষ করে ওর বন্ধু নাফিস তিহামী যখন দরজায় দাঁড়িয়ে ওকে ভেতরে আসতে বলে তখন। একদিন ওই বাড়িতে নিশিকান্ত ওর বাবা মাকে নিয়ে কতইনা আনন্দে থাকতো। বাড়িটা নিশিকান্তর বাবার তৈরি। হঠাৎ একটা ঝড়ে সব কেমন এলোমেলো হয়ে গেল। নিশিকান্তর বাবার ভীষণ অসুখ করলো। প্রথমে ময়মনসিংহ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। কিন্তু চিকিৎসার পরও কোনো উন্নতি না হলে ডাক্তাররা বলেন ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যেতে। ঢাকায় তখন নিশিকান্তদের পরিচিত কেউ নেই। কিছুদিন হলো দিদির বিয়ে হয়েছে। সেখানেও অনেক খরচ হয়ে গিয়েছে। জমানো টাকা বলতে এখন আর কিছুই নেই। ঢাকা মেডিকেলে ভর্তির পর প্রায় এক সপ্তাহ কেটে গেলো। ডাক্তাররা তেমন কোনো আশা দেখালেন না। তারা বললেন আপনারা একবার চাইলে ইন্ডিয়াতে নিয়ে যেতে পারেন। দেশেই চিকিৎসা করানোর মত সামর্থ্য ছিল না তাদের সেখানে বিদেশে নেওয়া,ভিসা পাসপোর্ট করা কত ঝক্কি ঝামেলার কাজ। কিন্তু যে করোই হোক লোকটাকে বাঁচানো দরকার। কোলকাতাতে তার এক জেঠু থাকতো। তার সাথে টেলিফোনে কথা বললো। তিনি জানালেন মাদ্রাজে ভালো চিকিৎসা হয়। গেলে তিনি সময় দিতে পারবেন। এরপর সিদ্ধান্ত হলো মাদ্রাজে নিয়ে যাবেন। চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে একে একে সব বিক্রি করতে হলো। শেষ সম্বল মাথা গোজার ঠাই বাড়িটাও বিক্রি করে দিতে হলো। তবে নিশিকান্তদের ভাগ্য সহায় হলো না। মাদ্রাজে প্রায় এক মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর বাবা পরলোক গমন করলেন। আর্থিক অবস্থা এতোটাই করুণ ছিল যে বাবার মরদেহ দেশে এনে দাহ করার সুযোগ হলো না। জেঠুদের ওখানেই একটা শ্মশানে নিয়ে দাহ করা হলো। নিশিকান্তর দিদি শেষ বারের মত বাবার মুখদর্শন থেকে বঞ্চিত হলো। কেননা সেবার মা আর নিশিকান্তই গিয়েছিল বাবার সাথে। এছাড়াও বিদেশে একজন বড় মানুষ দরকার ছিল বলে জামাইবাবুও সাথে গিয়েছিলেন। বাবার চিকিৎসা করতে গিয়ে নিজেদের বাড়িটাও বিক্রি করতে হয়েছিল।
সেই বাড়িটা এখন নাফিস তিহামীদের। পররাষ্ট্রমন্ত্রনালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা তিহামীর বাবা। সাড়ে আট লাখ টাকার বিনিময়ে তিনি বাড়িটা কিনে নিয়েছিলেন। এখন তিহামীরা ঐ বাড়িতে থাকে। ছোট্ট তিহামী ওর এই বন্ধু নিশিকান্তর দুঃখ বোঝে। অগচোরে চোখের দু ফোটা জলও ফেলে। কিন্তু ওর জন্য সে কিছুই করতে পারে না । একদিন কত আনন্দ ছিল নিশিকান্ত নামের বার বছরের এই দুঃখি ছেলেটার মনে। তিহামীর সাথে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াতো। আনন্দ করতো। আর আজ সে একা ঘরহীন, চাল চুলাহীন পথের মানুষ। তিহামী যদিও তাকে সেই আগের মতই বন্ধু মনে করে কিন্তু নিশিকান্ত নিজে ওর কাছ থেকে সব সময় দূরে দূরে থাকার চেষ্টা করে। নিজেকে আর অন্যের দয়ার পাত্র হিসেবে দেখতে তার ভালো লাগে না। যদিও তিহামী কখনো তাকে দয়ার পাত্র মনে করে না। কিন্তু নিশিকান্ত নিজ থেকেই আত্মমর্যাদা ঠিক রাখতে এটা করে।
সন্ধ্যার অন্ধকার ক্রমেই ঘনিয়ে আসছে দেখে নিশিকান্ত দ্রুত পা চালায় বাড়ির দিকে। রোগাগ্রস্থ মা একা বাড়িতে পড়ে আছে। ওর ইচ্ছে হয় মায়ের জন্য কিছু একটা করতে কিন্তু কিছুই করতে পারে না। অন্ধকারে হাটতে হাটতে নিশিকান্ত অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কিন্তু পুরোনো বাড়িটার কাছে আসলেই তার পা আর চলতে চায় না। তার পরও আজ সে সব চিন্তা ভুলে গিয়ে দ্রুত পা চালাতে থাকে। পাকা রাস্তার মোড়েই ওদের পুরোনো সেই বাড়িটা। অবশ্য এখন আর ওদরে বাড়ি বলার সুযোগ নেই। বাড়িটাতো আর এখন ওদের নেই। রাস্তাটা ব্রহ্মপুত্র নদের তীর ঘেষে জামালপুর চলে গেছে। নিশিকান্ত সেই অন্ধকারে ঐ পথে একা একা হাটছিল। দূরপাল্লার গাড়ি গুলি তখন মাঝে মাঝেই ভেপু বাজিয়ে চোখের সামনে হাজির হয়ে আবার মুহুর্তেই মিলিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ নিশিকান্ত লক্ষ্য করলো একজন বৃদ্ধা মহিলা রাস্তা পার হচ্ছেন। কিন্তু তিনি রাস্তা পার হচ্ছেন খুব ধীর গতিতে। দেখে মনে হচ্ছিল বৃদ্ধা লোকটি দৃষ্টিহীন।
নিশিকান্ত দাড়িয়ে দাড়িয়ে কিছুক্ষণ লক্ষ্য করলো। ঠিক তাই। বৃদ্ধার হাতে একটা সাদা রঙের লাঠি এবং সে সেই লাঠি মাটিতে ছুইয়ে ছুইয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন। নিশিকান্ত জানতো সাদা ছড়ি অন্ধদের প্রতীক। তাই বৃদ্ধার হাতের লাঠি দেখে সে নিশ্চিত হলো বৃ্দ্ধা লোকটি চোখে দেখে না। ঠিক এমন সময় একটা ট্রাক পিছন দিক থেকে ছুটে আসলো । কিছু বুঝে ওঠার আগেই ট্রাকটি বৃদ্ধা মহিলাকে চাপা দিয়ে চোখের সামনে দূরে মিলিয়ে গেল।নিশিকান্তর চোখের সামনে দুর্ঘটনাটা ঘটলো এবং সে প্রায় বাকরুদ্ধ হয়ে দেখলো মর্মান্তিক ঘটনাটা। ঐ মুহুর্তে তার কি করা উচিৎ তা সে বুঝতে পারছিননা। বার বছর বয়স্ক একটা বাচ্চা ছেলে সন্ধ্যার অন্ধকারে প্রায় জনহীন এই রাস্তায় চোখের সামনে একটা বিভৎস দৃশ্য দেখার পর স্বভাবতই জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাবার কথা কিন্তু নিশিকান্তের বেলায় তা ঘটলো না। জীবনের রুঢ় বাস্তবতার সাথে সংগ্রাম করতে করতে সে ভীষণ সাহসী হয়ে উঠেছে। এই সব দুর্ঘটনা তাই তার কাছে এখ তুচ্ছ বলেই মনে হয়। বার বছরের নিশিকান্ত পুর্নবয়স্ক মানুষের মত এই মাত্র দুর্ঘটনায় পতিত বৃদ্ধা মহিলার ক্ষতবিক্ষত দেহের পাশে গিয়ে দাড়ায়। সারা রাস্তা বৃদ্ধার রক্তে ভেবে গেছে।
বৃদ্ধা তখনো মারা যায়নি| বিড়বিড় করে মুখে কি যেন বলছিল| নিশিকান্ত কান পেতে কথা গুলো শোনার চেষ্টা করলো এবং বুঝতে চেষ্টা করলো বৃদ্ধা মহিলা মুখে কি বলছে কিন্তু লাভ হলনা একটুও| বৃদ্ধার কথাগুলো ছিল জড়ানো জড়ানো| শুধু মাত্র তিনটি শব্দ নিশিকান্ত বুঝতে পেরেছিল যেগুলি ছিল জামি জিমি জুনা| কথাগুলোর আগা মাথা কিছুই নিশিকান্তের মাথায় ঢুকছিলনা| নিশিকান্ত যা ভেবেছিল ঠিক তাই| সে দেখলো মহিলাটি ঠিকই অন্ধ কিন্তু হঠাৎ সে লক্ষ্য করলো যে বৃদ্ধা মহিলার কপালের ঠিক মাঝখানে গোল একটা ছিদ্র| সাধারণত গুলি লেগে যেভাবে ছিদ্র ˆতরী হয় অনেকটা সেরকম| কিন্তু নিশিকান্ত বুঝতে পারেনা মহিলার কপালে এরকম ছিদ্র কোথা থেকে আসলো| একটা ট্রাকে মহিলাটিকে চাপা দিয়েছে সেখানে ছিদ্র হওয়ারতো কোন কথাই নয়| নিশিকান্ত ততক্ষণে ভুলে গেল বাড়ী যাওয়ার কথা| ভুলে গেল যে তার মা অসুস্থ হয়ে বিছানাতে কাতরাচ্ছে| তার মনের মধ্যে কেবল ঘুরপাক খাচ্ছে ঐ একটি ব্যাপার ,কেন মহিলার কপালের মাঝখানে অমন একটা ছিদ্র| ইচ্ছে হচ্ছে এখনই তিহামীকে ডেকে এনে ব্যাপারটা দেখাতে কিন্তু এখনতো সেটাও সম্ভব নয়| নিশিকান্ত ক্ষত বিক্ষত মহিলাটির উপর অনেকটা জুকে পড়লো| মাথাটা নিচু করে বৃদ্ধা মহিলার কপালের ছিদ্রটির দিকে তাকালো এবং সাথে সাথে তার মাথার ভিতর ঘুরপাক খেতে শুরু করলো| বৃদ্ধার কপালের ছিদ্র থেকে হালকা সোনালী আলো বেরিয়ে আসছে| কেন আসছে কোথা থেকে আসছে তার কিছুই জানেনা নিশিকান্ত| তার মাথা কেবল ঘুরছে আর ঘুরছে| সারা পৃথিবীটাই তার কাছে কেমন ঘুরপাক খাচ্ছে| চারিদিকে ভীষণ নিস্তব্ধ| হঠাৎ নিশিকান্ত স¤ি^ত ফিরে পেল এবং খেয়াল করলো চারিদিকে কোথাও কোন আলো নেই| রাস্তায় যে ট্রাকগুলো হেডলাইট জ্বালিয়ে ছুটে যাচ্ছিল এখন সেগুলোরও দেকা নেই| তাহলেকি অনেক রাত পর্যন্ত সে এখানে বসে আছে নাকি অন্য কোন কারণ? অন্ধকারে কোথাও কিছু দেখা যাচ্ছেনা| কেমন যেন একটা ভূতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করছে| গভীর অন্ধকারে বার বছরের একটা বালক ক্ষত বিক্ষত একটা লাশ সামনে করে বসে আছে এটা ভয়ংকর একটা দৃশ্য|হিসাব কষে দেখা যায় আজ পূর্ণিমা তিথী| কিন্তু আকাশের কোথাও চাঁদের ছিটে ফোটাও নেই| একটা তারা নেই,কোথাও কোন পাখিদের ডাক নেই এমনকি ঝিঝিরা পর্যন্ত আজ কেন যেন ডাকতে ভুলে গিয়ে নিশ্চুপ হয়ে আছে| এটা মনে হচ্ছে পাতালপুরী| নিশিকান্ত কিছুই বুঝে উঠতে পারেনা কি এর রহস্য| কোন দিক থেকে কোন দিকে সময় গড়িয়ে যাচ্ছে তা তার ধারনার বাইরে| চারিদিকে কোন আলো না থাকলেও ক্ষত বিক্ষত বৃদ্ধার কপালের ছিদ্র দিয়ে সোনালী আলোটা ঠিকই বেরিয়ে এসে আশপাশ আলোকিত করে রেখেছে| সেই আলো অদ্ভুত রকমের ,মায়াবী জগতের মতথমথমে ভাব বিরাজ করছে| অন্য সময় হলে নিশিকান্ত ভয়ে চিৎকার করে উঠতো কিন্তু আজ তার মধ্যে কোন ভয়ই কাজ করছেনা| ভয় বলতে যে কোন শব্দ আছে তা আজ তার কাছে অপরিচিত মনে হচ্ছে| বিজ্ঞান বলে অধিক ভয়ের কোন কারণ ঘটলে মানুষ ভীষণ সাহসী হয়ে ওঠে| কারণ প্রচুর পরিমান ভয়ের কোন কারন ঘটলে মানুষের রক্তে এন্ড্রোলিন নামক এক প্রকার এনজাইম প্রচুর পরিমানে বৃদ্ধি পায় এবং যার ফলে সমস্ত ভয় কেটে যায়| নিশিকান্তের বেলায়ও আজ তাই ঘটেছে| বৃদ্ধার কপালের ছিদ্র দিয়ে আরেকবার তাকালো নিশিকান্ত এবং আবারও তার মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠলো| কিন্তু এবার সে একটু হলেও কিছু একটা দৃশ্য দেখতে পেল| ছিদ্রটা যেন সীমাহীন অতল গভীর| সেই গভীরে গোটা পৃথিবীটাই হারিয়ে যেতে পারে এবং কৃষ্ণগহ্বর বলতে যে জিনিসটির কথা শোনা যায় এটা অনেকটা তারই মতো| সেই ছিদ্রটার ভিতরে যা কিছু দেখলো তা অবাস্তব| ভিতরে সুন্দর একটা বাগান,যেখানে অনেক ছেলে মেয়ে খেলা করছে,গাছে গাছে ফুল পাখিদের কলরব| একটা অর্ধ্ব মৃত মানুষের মাথায় একটা ছিদ্র সেই ছিদ্র দিয়ে এসব দেখা যাচ্ছে সেটা কাউকে বললে নিশ্চই সবাই তাকে পাগল বলে অভিহিত করবে| সেটা নিশিকান্তের নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিলনা| নাহ সে নিশ্চই ভুল দেখেছে এবং হাত দিয়ে চোখটা মুছে নিয়ে আবার সে বৃদ্ধার কপালের সেই অদ্ভুত ছিদ্র দিয়ে ভিতের তাকালো| এবার দৃশ্যটা পাল্টে গেছে| এবার সে দেখলো অন্য চিত্র একটা বড় রুমের মধ্যে অনেক গুলো মানুষকে হাত পা বেধে ফেলে রাখা হয়েছে| হাতপা বাধা লোকগুলো হাত পা ছুড়ে পালাবার অহেতূক চেষ্টা করছে কিন্ত কোন কাছ হচ্ছেনা| দু’জন লোক হাতে জ্বলন্ত আগুনের মশাল নিয়ে মাঝে মাঝেই হাত পা বাধা লোকগুলোর গায়ে স্পর্শ করছে আর সাথে সাথে লোকগুলি বেদনায় গগন বিদারী চিৎকার করে উঠছে| দৃশ্যটা দেখে নিশিকান্ত দুই হাতে চোখ বন্ধ করে ফেললো| সে অমন ভয়ানক দৃশ্য দেখতে রাজি নয়| কিছুক্ষণ পর সে চোখের উপর থেকে হাতটা সরিয়ে নিলো এবং অবাক হয়ে দেখলো কিছুক্ষণ আগের সেই ভয়াল দৃশ্য পরিবর্তন হয়ে ভিন্ন একটা দশ্য এসে হাজির হয়েছে| একটা মানুষ তার সমস্ত শক্তি দিয়ে রাস্তার উপর পড়ে থাকা একটা গাছের গুড়িকে সরাতে চেষ্টা করছে কিন্তু পারছেনা| লোকটা ঘেমে সারা শরীর ভিজে গেছে| একেক সময় একেক দৃশ্য নিশিকান্তের চোখের সামনে ভসে উঠছে| হঠাৎ সে হালকা আলোর ভিতরে দেখতে পেল বৃদ্ধা মহিলার সমস্ত শরীর কেপে উঠছে| হয়তো মুহূর্তের মধ্যেই বৃদ্ধা মহিলা মারা যাবে| তার খুব মায়া হলো যদি মহিলাকে সে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারতো কিন্তু তার মতো ছোট্ট ছেলের পক্ষে এমন একজন মহিলাকে বয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়| এসব চিন্তা করতে করতে নিশিকান্ত মহিলার মুখের দিকে তাকালো টআর সবেচেয়ে ভয়ানক দৃশ্য দেখলো তখন| বৃদ্ধা মহিলার মুখটা ক্রমে ক্রমে খুলে যাচ্ছে ,হা হয়ে যাচ্ছে আর ভিতর থেকে হালকা নীল আলো বেরিয়ে আসছে বাইরে| নিশিকান্ত কোন দিন এমন দৃশ্য দেখেনি| রক্তমাংসে গড়া একটা মানুষের মুখের ভিতর থেকে কখনো আলোকরশ্মি বেরিয়ে আসার কথা নয়| সে যতদূর জানে তাতে এটা অসম্ভব| এই মুহূর্তে তার স্নিগ্ধ-মুগ্ধর কথা মনে পড়ছে| স্নিগ্ধ-মুগ্ধ জমজ দুই ভাই জিলাস্কুলের ভীষণ ভাল ছাত্র| ওদের কাছে মানুষের দেহতত্ত্ব নিয়ে অনেক আলোচনা শুনেছে নিশিকান্ত| রফিকুল ইসলাম স্যার নিজেও ওদের ক্লাসে এ নিয়ে অনেক কথা বলেছেন কিন্তু কখনো এমন অদ্ভুত কথা শোনেনি যা আজ সে নিজ চোখে দেখছে| মুখে শুনলে হয়তো বিশ্বাস হতোনা কিন্তু নিজ চোখে দেখার পর সেটাকে অবিশ্বাসের উপায় নেই| মাঝেমাঝে মনে হচ্ছিল সব বুঝি মনের কল্পনা কিন্তু গায়ে চিমটি কেটে দেখেছে যে সে ¯^প্ন দেখছেনা| নিশিকান্ত যখন এসব কথা ভাবছিল ঠিক তখনই শরীরে গরম বাতাসের একটা চাপ অনুভব করলো| হঠাৎ করে গরম বাতাস বইছে কেন সেটাও এক প্রকারের রহস্য| শীত কাল তার পরও এমন গরম বাতাস আসার কোন কথাই নয়| প্রচন্ড শীতের মাঝেও সে ঘেমে নেয়ে যাচ্ছে| ইচ্ছে হচ্ছে গায়ের জামাটা খুলে বাতাস করতে| ওদিকে বৃদ্ধা মহিলা তখনো অস্ফুট ¯^রে বিভিন্ন কথা বলছিল| যার মধ্যে মাত্র ঐ তিনটা শব্দই নিশিকান্ত বুঝতে পারছিল| কিন্তু কথাগুলোর অর্থ কি তা সে মিলাতে পারছিলনা| নিশিকান্ত আবার মহিলার মুখের দিকে তাকালো| এতক্ষণ মুখ থেকে হালকা নীল আলো বের হচ্ছিল এখন সেটা হলুদ হয়ে গেছে এবং সেই হা করা মুখ থেকে বেরিয়ে আসা হলুদ আলোর ভিতর থেকে নিশিকান্ত দেখলো একটা লিকলিকে সাপ একে বেকে বেরিয়ে আসছে| নিশিকান্ত এবার ভড়কে গিয়ে লাফিয়ে দু হাত পিছিয়ে গেল| সাপটার গায়ের রং সোনালী তার ওপর বাদামী রঙের ডোরাকাটা| হাতের কাছে এই মুহূর্তে নিশিকান্ত কিছু একটা খুজছিল যা দিয়ে সাপটাকে সে আক্রমন করতে পারবে কিন্তু হাতড়িয়ে হাতড়িয়ে তেমন কিছুই পেলনা| তার হাতটা অন্ধকারের মাঝেই পিছনদিকে ঘুরিয়ে একটা লাঠি খুজলো এবং শক্তমতো কিছু একটা তার হাতে বাধলো| সে সেটাকে আকড়ে ধরে সামনে আনলো| মুখ থেকে বেরিয়ে আসা সাপটা তখন বালক নিশিকান্তের সামনে দু হাত দূরে গিয়ে ফনা তুলে দাড়ালো| নিশিকান্ত অবাক হয়ে দেখলো সাপটার বুকে ঠিক যেখানে ফনা তুলেছে সেখানটাতে ঐ তিনটি শব্দ লেখা | এসবের কিছুই নিশিকান্তের মাথায় ঢুকছিলনা| সে শক্ত মত যে জিনিষটা কুড়িয়ে নিয়েছিল সেটা উচু করে তুলে ধরলো যেন সাপটা আক্রমন করতে আসলে সেও আক্রমন করতে পারে| ফনাতুলে দাড়িয়ে থাকা সাপটার ভিতরে আক্রমন করার কোন লক্ষণ দেখা গেলনা| নিশিকান্ত একটু ভাল করে লক্ষ্য করে দেখলো ফনাতুলে তারসামনে যে সাপটা দাড়িয়ে আছে তার মুখটা অবিকল মানুষের মত| নিশিকান্ত অবাক হয়ে একপলকে তাকিয়ে থাকলো| ঠিক সেই সময়ে সাপের চোখের সাথে নিশিকান্তের চোখাচোখি হল| একটা মায়াবি আলোকরশ্মি নিশিকান্তের চোখে এসে লাগলো| নিশিকান্তের চোখটা ঘুমে বন্ধ হয়ে আসতে চাইলো| কিন্তু জোর করে সে চোখটা খুলে রাখলো| কিছুক্ষণের মধ্যেই তার সারা শরীরে প্রশান্তি নেমে আসলো এবং সামনে থেকে সাপটা একে বেকে অন্ধকারে হারিয়ে গেল| সাপটা যেহেতু চলে গেছে তাই হাতে ধরে রাখা শক্ত জিনিষটার আর কোন দরকার নেই ভেবে ওটা ফেলে দিতে যাবে এমন সময় সে লক্ষ্য করলো যে তার হাতে ধরে রাখা জিনিষটা আসলে শক্ত নয় বরং ঠান্ডা এবং ভীষন নরম| নিশিকান্ত ভাবলো শীতেরকারণে হয়তো ঠান্ডা হয়ে গেছে| কিন্তু নরম হওয়ারতো কোন কারণ নেই| ধরে রাখা জিনিষটি এবার সে চোখের সামনে এনে মেলে ধরলো| ভয়ে এই প্রথম নিশিকান্ত কুকড়ে গেল| সে শক্ত লাঠি মনে করে এতক্ষন যা ধরে রেখেছিল সেটাআসলে আরেকটি সাপ| সে দ্রুত হাত থেকে সাপটিকে দূরে ছুড়ে ফেলে দিল| এতক্ষণ কোন ভয় না লাগলেও এখন তার একটু একটু ভয় লাগছে| সব চিন্তা বাদ দিয়ে সে আবার মহিলাটির দিকে ফিরে তাকালো| আহত মহিলাটি নড়াচড়া করছে| নিশিকান্ত মহিলাটির আরো নিকটে গিয়ে বসলো| তার মনে হল মহিলাটিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত| কিন্তু কিভাবে নেবে সে সেটা ভাবতে পারছিলনা| ঠিক এমন সময় ঘোড়ার পায়ের আওয়াজ তার কানে ভেসে আসলো| হ্যা একটি নয় পর পর চারটি ঘোড়ার পায়ের আওয়াজ| এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই তার সামনে চারটি ঘোড়ার একটি টমটম গাড়ি এসে থামলো| সব কিছু ভুলে গিয়ে নিশিকা&ত টমটম ওয়ালার কাছে গিয়ে সাহায্য প্রার্থনা করলো যেন সে মহিলাটিকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে সাহায্য করে| টমটম ওয়ালা তাকে সাহায্য করতে রাজি হল কিন্তু সে ছিল দুই পাহীন এক টমটম চালক| কোন একদিন রেললাইন ধরে হাটার সময় রেলে তার দুই পা কাটা পড়েছিল| তাই সে গাড়ি থেকে নেমে হতাহত মহিলাটিকে টেনে তুলতে পারবেনা| এখন নিশিকান্তকেই টেনে টেনে তুলতে হবে| ছোট্ট নিশিকান্ত উপায়হীন হয়ে ভাবনাহীনভাবে বৃদ্ধা মহিলার হাত ধরে আস্তে করে টান দিল| সাথে সাথে সে অবাক হয়ে দেখলো বৃদ্ধা মহিলাটিকে তার ভীষন হালকা মনে হচ্ছে| সে অনায়াসেই বৃদ্ধা মহিলাকে উচু করে টমটম গাড়িতে নিয়ে বসলো| টমটম ওয়ালা হইহই করে ঘোড়া চালিয়ে দিলেন | আর ঠকঠক ঠক ঠক শব্দ করে চার ঘোড়ার টমটম এগিয়ে চললো| কিছুক্ষণের ভিতরেই তারা সদর হাসপাতালের গেটে হাজির হলো| নিশিকান্ত আগের মতোই বৃদ্ধা মহিলাকে দুই হাতে উচু করে গাড়ি থেকে নামিয়ে নিল এবং তার কাছে যে কোন ভাড়া নেই সেটাও সে টমটম ওয়ালাকে জানালো| টমটম ওয়ালা কিছুই বললোনা শুধু মঙ্গল কামনা করে চলে গেল| নিশিকান্ত ক্ষতবিক্ষত মহিলাকে নিয়েসদর হাসপাতালের দরজার সামনে দাড়ালো| আস্তে করে সিড়ির ওপরে বৃদ্ধা মহিলাকে শুইয়ে দিয়ে দরজায় নক করলো| ভিতরে কোন সাড়াশব্দ নেই| কিন্তু এমনতো হবার কথা নয়| রাত যতই হোকনা কেন হাসপাতালে নার্স,ডাক্তারেরা জেগে থাকারকথা| এর আগেও বাবা মারসাথে দিদিকে নিয়ে সে অনেক রাতেও হাসপাতালে এসেছে তখনতো দরজায় নক করতেও হয়নি| আবার নক করলো নিশিকান্ত কিন্তু এভাবে অনেক বার নক করেও কোন ফল হলনা| বেদনায় মুশড়ে পড়লো নিশিকান্ত নামের বার বছরের ছেলেটা| তার ধারনা ছিল এখনো যদি ডাক্তার দেখানো যেত তাহলে এই মহিলা বেচে যেতে পারতো| কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও কোন লাভ হলনা| রাজ্যের ঘুম নিশিকান্তের চোখে নেমে আসলো| বৃদ্ধা মহিলার পাশেই ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেল নিশিকান্ত|
অনেক বেলা অব্দি নিশিকান্ত ঘুমে বিভোর থাকলো| ঘুমের মাঝে বার বার তার মায়ের মুখটা ভেসে উঠছিল| সকালে কিছু মানুষের কোলাহলে নিশিকান্তের ঘুম ভাংলো| নিশিকান্ত দেখলো অনেক মানুষের ভীড়| কিন্তু সে কিছুতেই বুঝতে পারলোনা যে ঠিক এই স্থানে সে কেমন করে কখন আসলো| সে রাতে একজন বৃদ্ধা হতাহত ক্ষত বিক্ষত মহিলাকে টমটম গাড়িতে করে সদর হাসপাতালে এসছিল| হাসপাতালের সিড়িতে বৃদ্ধা মহিলাকে রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল আর এখন ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখচে সে অচেনা একটা জায়গাতে শুয়ে আছে| সেই বৃদ্ধা মহিলাটির নাম গন্ধটিও নেই| অনেক মানুষের ভীড়ে সে কোন পরিচিত মুখ খুজে পাচ্ছিলনা যাকে সে জিজ্ঞেস করবে সে আসলে এখানে আসলো কিভাবে? হঠাৎ অনেক মানুষের ভীড়ে সে একজন চেনা মানুষ দেখতে পেল| তার সমবয়সী একটা ছেলে পরনে থ্রিকোয়ার্টার প্যান্ট গায়ে নীল রঙের শার্ট| যে ছেলেটি তার খুব কাছের খুব প্রিয় বন্ধু নাফিস তিহামী তিহাম| তিহামকে দেখে সে দৌড়ে মানুষের ভীড়ে ঢুকে গেল| পিছন থেকে তিহা,ের কাধে হাত রাখতেই তিহাম চমকে ফিরে তাকালো| নিশিকান্তকে দেখে সে হাউমাউ করে কেদে উঠলো| ওর কান্না দেখে জনসমুদ্র নিশ্চল হয়ে দাড়িয়ে গেল| নিশিকান্ত বুঝতে পারলনা এতে কাদার কি আছে| সে ওকে শান্তনা দিয়ে কি হয়েছে জানতে চাইলো| ততক্ষণে নিমিকান্ত আর তিহামীর পাশে অনেকেই এসে দাড়িয়েছে যারা নিশিকান্তের ভীষন পরিচিত| বড় জেঠু,দিদি,দিদা,কাকিমা,ঠাকুরমা সবাই এসেছে| তাদের দেখে নিশিকান্ত চমকে গেল| তিহামীর কান্না ততক্ষণে থেমে গেছে| নিশিকান্ত ঠাকুর মাকে জিজ্ঞেস করলো ঠাকুর মা কি হয়েছে তোমরা সবাই এখানে কেন? ঠাকুরমা ওকে জড়িয়ে ধরে কেদে ফেলে বললো ওরে হতভাগা তুই আজ তিনদিন কোথায় ছিলি? ঠাকুর মার মুখে তিনদিন শব্দটি শুনে চমকে উঠলো নিশিকান্ত| তার কাছে সব কিছু ঘোরের মতো লাগছিল| সেতো গতকাল বিকেলে নদীর ধারে এসে বসেছিল | আসার সময়ও ঠাকুর মার সাথে দেখা হয়েছিল আর সেই ঠাকুরমাই কিনা এখন বলছে তিনদিন কোথায় ছিলি| নিশিকান্ত গলার ¯^র নামিয়ে বললো নাতো ঠাকুরমা আমিতো গতকাল…………………বলতে গিয়ে থেমে গেল| তার চোখটা তখন দূরে একটা খাটিয়ার ওপর নিবদ্ধ হল| সাদা কাপড়ে জাড়ানো কোন একজন শুয়ে আছে| সেখান থেকে ভেসে আসছে কর্পুরের গন্ধ| বুকের ওপর কয়েক গোছা গাদা ফুলের সদ্য গাথা মালা| উপস্থিত সবার চোখে বাধ ভাঙ্গা জল| দিদিটা একটু দূরে বুক চাপড়ে কাঁদছে| এমন কান্না শুধু একবারই দিদিকে কাঁদতে দেখেছিল নিশিকান্ত তার বাবা মারা যাবার সময়| আবার আজকে সেই একই রকম বুক ফাটানো কান্নায় দিদি হাহুতাশ করছে| নিশিকান্ত বুকের মাঝে শুন্যতা অনুভব করলো| তারও চোখ বেয়ে অশ্রু গাড়তে শুরু করলো| কোথায় যেন কিছু একটা অতি আপন কিছু হারিয়ে ফেলার তীব্র বেদনা মনের অজান্তেই ভর করলো ছোট্ট নিশিকান্তের বুকে| চার পাশে দাড়ানো ছোট বড় সবার চোখে জল মুখে মৃত্যুপুরীর নিরবতা বিরাজ করছিল| কারো মুখে কোন কথা নেই দেখে নিশিকান্ত উঠে দাড়ায়| দিকবিদিক জ্ঞানশুন্য হয়ে ছুটে যায় খাটিয়াতে শোয়ানো সাদা কাপড়ে ঢাকা মানুষটার কাছে| সেই মায়া ভরা হাসি এখনো মুখে লেগে আছে| যে মুখে সে হাজার বার চুমু খেয়েছে| যে দুটি হাত দেহের দুই পাশে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে আছে এই হাত দুটি কত বার নিশিকান্তের মাথায় বুলিয়ে দিয়েছে,আদর করে এই দুটি হাত দিয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছে আজ চোখের সামনে সেই হাত দেহের পাশে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে আছে| কিছুক্ষণ পর যে মানুষটাকে চিতার আগুনে পোড়ানো হবে সেই মানুষটি নিশিকান্তের মা| নিশিকান্তের বুক ফেটে কান্না আসছে কিন্তু সেই কান্নার শব্দ মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছেনা| জ্বর অবস্থায় সে তার মাকে একলা ফেলে রেখে চলে এসেছিল আর সেই মা অসহায় ভাবে যন্ত্রনায় কাতরাতে কাতরাতে চলে গেল| যাবার আগে হয়তো তার খুব ইচ্ছে ছিল নিশিকান্তের হাতেএকটু জল খাবে ,ওর সাথে দুচারটে কথা বলবে কিন্তু নিশিকান্তকে সে কাছে পায়নি| নিশিকান্তের বুকটা ক্রমশ ফেটে যেতে চাচ্ছে| তার মা আর নেই একথা সে আর ভাবতে পারছেনা| নিশিকান্ত তার কোমল দুটি হাত তার মায়ের মুখে ছোয়াল| কী কোমল সেই অনুভূতি| ওর মনে হচ্ছিল মা চলে যায়নি শুধু কিছুটা ক্লান্ত হয়ে ঘুমচ্ছে| আর ও ডাকারসাথেই ওর মা উঠে বসবে| পুরোহিত ওকে বার বার তাগাদা দিচ্ছে মায়ের সৎকার এবং মুখাগ্নি করার জন্য কিন্তু নিশিকান্ত উঠছেনা| সে বাধভাঙ্গা আবেগে মায়ের চোখের পাতাদুটো সরিয়ে দিলো|এইতো তার মা তার দিকে ঠিকই তাকিয়ে আছে| মায়ের লাশের সামনে বারবছরের নিশিকান্তের বাধ ভাঙ্গা আকুলি বিকুলি দেখে পুরো এলাকা নিস্তব্ধ হয়ে গেল| সবাই চোখের জলে ভাসতে লাগলো| সেই চোখে সবকিছু ঝাপসা মনের হল| ঠিক এরই মাঝে দৃশ্যপট পরিবর্তন হতে শুরু করলো তা অন্য কেউ খেয়াল করেনি কেবল তিহামী ছাড়া| কিন্তু কেন এমন হচ্ছে তা তিহামীও বুঝতে পারলোনা| মায়ের বন্ধ চোখের পাতা সরাতেই চোখে চোখে কথা হল নিশিকান্তের | নিজের অজান্তেই নিশিকান্তের চোখ থেকে হালকা একটা সোনালী আলোকরশ্মি মায়ের চোখে গিয়ে মিশলো| ব্যাপারটা না দেখলো নিশিকান্ত না দেখলো তিহামী বা অন্য কেউ| নিশিকান্ত কেদে কেদে চোখ ফুলিয়ে উঠে দাড়ালো| পুরোহিতকে বললো চলুন ঠাকুর| ওর কথাটা ঠাকুরের কান পর্যন্ত পৌছালনা এমনকি অন্য কারো কানেও নয়| সবাই তখন নিস্পলক চেয়ে আছে এক অতি আশ্চর্য ঘটনার দিকে| নিশিকান্ত শুধু অন্যদের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে| পিছনে আস্তে করে নড়ে চড়ে উঠে বসেছে তার প্রানাধিক প্রিয় মা| সবাই তখন বিস্ময়ে হতবাক| ডাক্তার বলেছে নিশিকান্তের মায়ের দেহত্যাগ হয়েছে| সেখানে নাড়ির কোন স্পন্দন নেই| ডাক্তারদের কথা সাধারণ দৃষ্টিতে সবাই মেনে নিয়ে নিশিকন্তের মায়ের সৎকারের ব্যবস্থা করেছে| যদিও চিতার আগুনে তখনও উঠানো হয়নি| সবার আশ্চর্যšি^ত চোখ দেখে নিশিকান্ত অবাক হল| ঠিক তখনই কে যেন তাকে ডাকলো নিশি| বড় চেনা সেই ডাক | বড় মধুর সেই কন্ঠ, যে কন্ঠ সে বারটা বছর ধরে শুনেছে আর বুকের মধ্যে অন্যরকম সুখ অনুভব করেছে| এমন করে কে তাকে ডাকছে? তার মা ছাড়াতো কেউ তাকে কখনো অমন করে নিশি বলে ডাকেনা| কিন্তু মাতো আজ অন্য ভূবনের পথযাত্রী হাতলে কে তাকে ডাকবে? এমন চিন্তার মাঝে ডুবতে গিয়ে নিশিকান্ত আবার শুনতে পেল কেউ একজন খুব কোমল ¯^রে তাকে ডাকছে বাবা নিশি আমার কাছে আয় তিন দিন তোকে দেখিনি| একথা শোনার সাথে সাথে নিশিকান্ত পিছন ফিরে তাকালো| সে অবাক বিস্ময়ে দেখলো দুই হাত বাড়িয়ে তার মা তাকে ডাকছে| যে মাকে সে কিছুক্ষণের মধ্যে মুখাগ্নি করতে যাচ্ছিল সেই মা আসলে মরেনি| সুখ নিদ্রায় এতই নিমগ্ন ছিল যে ডাক্তারেরা পর্যন্ত তার নাড়িরস্পন্দন ধরতে পারেনি| দৌড়ে গিয়ে নিশিকান্ত তার মায়ের কোলে ঝাপিয়ে পড়লো| চারিদিকে তখন অন্যরকম অনুভূতি অন্যরকম আনন্দ এবং শীতল বাতাস বয়ে গেল| কেউ জানলোনা বুঝলোনা কিভাবে একটা শীতল ঘুমন্ত মানুষ জেগে আবার উঠলো| পুরোহিত নিজে হতবাক হয়ে ঠায় দাড়িয়ে থাকলো| যারা এসেছিল শবদেহ নিয়ে তারাই ফিরে গেল আনন্দ মিছিল নিয়ে| সমস্ত এলাকাতে ঘটনাটা ছড়িয়ে পড়লো আর পাড়া প্রতিবেশি সবাই জড় হতে লাগলো নিশিকান্তদের বাসায়| এরপর মাত্র তিনদিন পর নিশিকান্তদের স্কুল থেকে চিঠি আসলো পরীক্ষার ফি আদায়ের জন্য| সংসারের দূরাবস্থা পেটে খাবার জোটেনা সেখানে পরীক্ষার ফি বাবদ পাঁচশো টাকা কিভাবে দেবে ওরা তাই জানেনা নিশিকান্ত| আগামী পরশু দিনের মধ্যে ফি দিতে না পারলে নিশিকান্তের পরীক্ষা দেয়া হবেনা| নিশিকান্ত তার মাকে জানালো যে তার পরীক্ষা দেয়ার দরকার নেই| কিন্তু তার মা বলেছে যে করেই হোক তিনি টাকার জোগাড় করবেন| মুখে ছেলেকে আশ্বাস দিলেও ভিতরে ভিতরে সে ভীষন হতাশা বোধ করছিল| মাত্র একদিনের ভিতরে এত গুলো টাকা সে কোথায় পাবে| চিন্তায় চিন্তায় ঐ দিন সারা রাত ভারতী দেবীর ঘুম আসলোনা| নিশিকান্ত অবশ্য তিহামীকে বললে ওর পরীক্ষার ফিটা তিহামী দিয়ে দিত| কিন্তু নিশিকান্ত এটা চায়না| কারো সাহায্য তার দরকার নেই| পরদিন সকাল গড়িয়ে দুপুর এলো এবং একসময় দুপুর পেরিয়ে বিকেল পেরিয়ে সন্ধ্যা নেমে আসলো কিন্তু ভারতী দেবী ছেলের পরীক্ষার ফি জোগাড় করতে পারলেন না| রাত পোহালেই পরীক্ষার ফি দিতে হবে অন্যথায় তার ছেলের পরীক্ষা দেয়া হবেনা| নিশিকান্ত ওসব চিন্তা বাদ দিলেও ওর মা চিন্তায় চিন্তায় কাহিল হয়ে পড়লো| বিরস মুৃখে সে ভেঙ্গে পড়া অবস্থায় অসহায়ের মতো করুণ দৃষ্টিতে নিশিকান্তের দিকে তাকালো| মায়ের কষ্টটা নিশিকান্ত খুব বুঝতো তাই সে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বললো তুমি অত ভেঙ্গে পড়ছো কেন মা? এবার না হোক আগামী বার পরীক্ষাতো দেবই তাহলেইতো হবে| ছেলের মুখের কথা শুনে ভারতী দেবী কিছুটা খুশি হলেন| সকাল নয়টা পেরিয়ে গেছে | মুকুল নিকেতন স্কুল মাঠে লাইন দিয়ে দাড়িয়ে আছে ছাত্র ছাত্রীরা| সবাই পরীক্ষার ফি দেবে বলে লাইন দিয়ে দাড়িয়েছে| বাড়ির উঠোনে বসেই সেই কঠিন দৃশ্যটা দেখছিলেন ভারতী দেবী আর তার কষ্টের ধন বুকের মানিক নিশিকান্ত কিন্তু করার ছিলনা কিছুই| মায়ের চোখে জল ছল ছল করে উঠছিল| অথচ দৃশ্যটা অন্যরকম হওয়ার কথা ছিল| ঐ ছেলে মেয়েদের সারিতে তারপ্রুত্র নিশিকান্তরও থাকার কথা ছিল কিন্তু আজ সে সেই সারিতে নেই| নিশিকান্ত মায়ের চোখের জল মুছে দিল| বাইরে তখন শো শো করে বাতাস বইছে| সেই বাতাসের শব্দকে ছাপিয়ে নিশিকান্ত আর তার মায়ের কানে মটর সাইকেলের তীব্র ভেপু বাজানোর শব্দ এসে আঘাত করলো| সচকিত চোখে ফিরে তাকালো নিশিকান্ত এবং তার মা ভারতী দেবী| তাদের জীর্ণ কুটিরের ছোট্ট উঠোনে এসে থেমেছে লাল রঙের একটা মোটর সাইকেল| পাশে দাড়িয়ে আছেন মধ্য বয়স্ক একজন ভদ্রলোক| ভদ্রলোকের চোখে তখন রোদ চশমা হাতে দামী ঘড়ি| দেখে মনে হয় বড় কোন চাকরী করে কিংবা লোকটা অনেক টাকাওয়ালা| নিশিকান্তের মাকে প্রনাম করে কাছে এসে দাড়ালো লোকটি| অচেনা এই লোকটিকে বসতে দেবার মতোও কিছু নিশিকান্তদের ঘরে নেই| নিজেই ¯^বিস্তারে নিজের পরিচয় দিলেন ভদ্রলোক| তার কথা থেকে বোঝা গেল ভদ্রলোকের নাম বলাই কুমার| থাকেন আসামের লুসাই পাহাড়ের সন্নিকটে| তিনি ওখানে একটা টি এস্টেটের মালিক এবং যেখানে প্রতিদিন দেড়শো শ্রমিক কাজ করে| জন্ম সুত্রে তিনি বাংলাদেশী এবং সব পরিচয় দেবার পর ভারতী দেবী জানতে পারলেন বলাই কুমার নামের এই ভদ্রলোক তার ¯^ামীর ছাত্র| টাকার অভাবে বিলেতে লেখাপড়া করতে যেতে পারছিলনা এই ছেলেটি| সেই বিপদের সময়ে নিশিকান্তের বাবা তাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়েছিলেন| সেই টাকায় বিলেত গিয়ে পড়ালেখা করে এখন সে মস্ত বড়লোক| বাড়ী গাড়ি সব কিছুই আছে তার| নিশিকান্তের বাবা মারা যাবার ঘটনাটা সে শুনেছে কিন্তু কোন ভাবেই সে ছুটে আসতে পারেনি| আজ এসেছে সেই টাকাগুলো ফেরৎ দিতে| এই কথাগুলো বলেই পকেট থেকে এক বান্ডিল নোট বের করে ভারতী দেবীর হাতে ধরিয়ে দিলেন| ভারতী দেবী তখন বাক রুদ্ধ হয়ে দাড়ানো| এই টাকাটা পেয়ে সে পুরো দুনিয়াটা হাতে পেয়েছে| সে বার কয়েক বলাই কুমার নামক ভদ্রলোককে ধন্যবাদ জানিয়ে ভিতরে গিয়ে দুটো নাড়ু আর এক গ্লাস জল এনে লোকটিকে সামান্য আতিথেয়তা গ্রহণ করতে বললেন| বলাই কুমার মেধাবী মানুষ ভারতী দেবীর বর্তমান করুণ অবস্থা বুঝতে পেরেই এই সামান্য আতিথেয়তাকে অনেক বড় মনে করে গ্রহণ করলেন| শেসে অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নেবার আগে বলে গেলেন কখনো কোন সমস্যা হলে তারা যেন তারসাথে কোন রুপ সংকোচ না করে যোগাযোগ করেন| বলাই কুমার ভদ্রলোক যেভাবে ভেপু বাজিয়ে এসেছিলেন আবার সেভাবেই চলে গেলেন| ভারতী দেবীর মুখে তখন অন্যরকম আনন্দ খেলা করছিল| মুকুল নিকেতনের মাঠে তার নিশিকান্তের পদচারণা দেখতে পাচ্ছিল| সে নিশিকান্তকে শিঘ্রই কাপড় পরে স্কুলে রওনা হতে বললেন| নিশিকান্তও খুশি মনে টাকা নিয়ে স্কুলে গেল| তার মা তাকে বহুদিন পর ঝালমুড়ি আর ফুচকা খাওয়ার জন্য অতিরিক্ত টাকা দিয়েছে| কত দিন সে ওসবের মুখ চোখে দেখেনি| যদিও তার ভীষণ প্রিয় বন্ধু তিহামী বার বার ওকে খেতে বলতো কিন্তু নিশিকান্ত কখনো খেতনা| সেই থেকে তিহামী নিজেও আর কোন দিন ঝালমুড়ি কিংবা ফুচকা খায়নি| যখনই খেতে ইচ্ছে হয় ঠিক তখনই নিশিকা&েতর কথা মনে পড়ে আর ভীষণ ভাবে মন খারাপ হয়ে যায়| এ নিয়ে ওর বাবা ওকে অনেক বার প্রশ্ন করেও কোন উত্তর পায়নি| নিশিকান্ত মায়ের কাছে পাওয়া টাকা দিয়ে আজ নিজেই তিহামীকে খাওয়াবে বলে ঠিক করলো| শেষে লাইনে দাড়িয়ে একসময় পরীক্ষার ফিস জমা দিয়ে প্রবেশ পত্র নিল| মাত্র তিনদিন পর পরীক্ষা শুরু হবে অথচ ওর তেমন কিছুই পড়া হয়নি| ছাত্র হিসেবে মধ্যম শ্রেণীর নিশিাকান্ত পড়ালেখায় ভাল মন দিতো কিন্তু দারিদ্রতারকাছে সব কিছু তুচ্ছ হয়ে গেল| স্কুল থেকে দেয়া বইগুলো ছাড়া কোন নোট খাতা কিছুই ছিলনা ওর| তিহামীর কাছ থেকে মাঝে মাঝে পড়া বুঝে নিত এই যা| সামনে পরীক্ষা কী করবে ও ভেবে পাচ্ছিল না| মন মরা করে বাড়ী ফিরতেই মা জিজ্ঞেস করলেন পরীক্ষার ফিস জমা দিয়েছে কিনা| ও জানালো যে পরীক্ষার ফিস জমা দেয়া হয়েছে| কিন্তু তারপরও ওর মন খারাপ কেন জানতে চাইলে সে তার মাকে তার প্রস্তুতির কথা খুলে বললো| মা ওকে শান্তনা দিয়ে বললেন এবারের মত কোন একভাবে পরীক্ষাটা শেষ কর কয়েক দিনের মধ্যেই নোট গাইড কিনে দেব| নিশিকান্ত মায়ের কথা শোনার পর পূর্ণদ্যোমে লেখাপড়া শুরু করলো| এর মাঝেই সে ভুলে গেল সে রাতের ঘটে যাওয়া নানা কাহিনী| তিহামীর কাছে গিয়ে সে পড়াগুলো একবার করে দেখে নিল| যদিও তিহামীদের বাসায় যেতে ওর একদমই ভাললাগেনা তারপরও লেখাপড়ার তাগিদে যেতেই হয়| তিহামী ওকে কথা দিয়েছে ও বড় হলে বাড়িটা নিশিকান্তকে ফেরৎ দেবে কিন্তু নিশিকান্ত ওসব কথায় কান দেয়না| তিন দিন পর নিশিকান্তর পরীক্ষা শুরু হল| মায়ের আশির্বাদ নিয়ে নিশিকান্ত পরীক্ষা দিতে গেল| যুগে যুগে দেশে দেশে প্রতি ক্লাসেই কিছু দুষ্টু ছেলে মেয়ে থাকে যারা অন্যদের শুধু জ্বালাতন করে| নিশিকান্তদের ক্লাসেও তেমন ক’জন দুষ্টু ছেলে ছিল যাদের মধ্যে শ্রীকান্ত,অমল,বাদল আর রাতুল অন্যতম| সব সময় অন্যকে কিভাবে ডোবানো যায় শাস্তি দেয়া যায় এই চিন্তা ওদের মাথায় ঘুরপাক খেত| ক্লাসে কম বেশি সবাই কোন না কোন ভাবে ওদের ফাদে পা দিয়ে শাস্তি পেয়েছে| ওদের দ্বারা অপমানিত হয়েছে| এটা ওদের চিরদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েগেছে| এর মধ্যে নিশিকান্তও কয়েকবার ওদের দ্বারা অপমানিত হয়েছে কিন্তু কখনো কিছু বলেনি| ওরা সবাই ক্ষমতাবান ঘরের ছেলে তাই ওদের সাথে লাগা ঠিক হবেনা বলেই নিশিকান্তকে বুঝিয়েছে তিহামী| তাই নিশিকান্তও ওদের আর ঘাটতে যায়নি| আজ পরীক্ষার হলে ঢুকার সাথে সাথে পাজি ছেলে গুলো একসাথে বলে উঠলো “বিদ্যাসাগর আসিয়াছেন তিন না¤^ার বেঞ্চে বসিয়াছেন,কি লিখিবেন? লিখিবেন ঘোড়ার ডিম পাইবেন বড় বড় রসগোল্লা,হা হা হা|” ওদের মুখ ভেংচানো দেখে নিশিকান্তর মাথায় রাগ উঠে যাচ্ছিল| কিন্তু পরীক্ষার কথা চিন্তা করে ও চুপকরে থাকলো| এর পনের মিনিট পর খাতা দেয়া হল| নিশিকান্ত শান্ত মনে খাতার ওপর নাম রোল না¤^ার শ্রেণী ,বিষয় যা লেখার সব লিখে নিল| আজ নিজের কাছেই নিজেকে অচেনা মনে হচ্ছে| হাতের লেখাটা নিজেই চিনতে পারছেনা| সুন্দর সে লেখা ভীষণ পরিচ্ছন্ন এবং সাজানো গোছানো| যে কেউ দেখলেই চক্ষু ছানাবড়া হয়ে যাবে| এরপর যখন প্রশ্ন দেয়া হল তখন সবগুলো প্রশ্ন পড়ে নিশিকান্ত ভীষন অবাক হলো| সে যে সব প্রশ্ন পড়েছে ঠিক সেগুলোই এসেছে| তার চোখের সামনে উত্তর গুলো বইয়ের পাতার মতো ভেসে উঠছে| সে কোন দিকে না তাকিয়ে আপন মনে লিখতে লাগলো| মূল খাতা শেষ হলে অতিরিক্তি পাতা নিল এবং তিন ঘন্টা হতে যখন আরও পৌনে এক ঘন্টা বাকি তখনই সে খাতা বন্ধ করে জমা দিয়ে দিল| পরীক্ষার হলে ছোট খাট ফিসফিসানির শব্দ কানে ভেসে আসছিল| পাশের জনের কাছ থেকে একটু সাহায্য পাবার আশায় অনেকেই এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল| ক্লাসের ভাল ছাত্রগুলি তখনও লেখা শেষ করতে পারেনি অথচ নিশিকান্ত লেখা শেষ করে খাতা জমা দিয়ে বেরিয়ে গেছে| ওর খাতা জমা নেবার সময় অধিক্রম দত্ত্ব স্যারও ভ্রু কুঞ্চন করলেন| তার মুখে তখন অনেকটাই তাচ্ছিল্যের ভাব বিরাজ করছিল| সাধারণত এমনটাই হবার কথা | কারণ সেরা ছাত্ররা যেখানে উত্তর দিতে হিমশিম খাচ্ছে সেখানে অতি নগণ্য একজন ছাত্র সবগুলো উত্তর নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই লিখে শেষ করেছে বললে তাচ্ছিল্য আসাই ¯^াভাবিক| কিন্তু অধিক্রম দত্ত স্যার যদি খাতাটার দিকে অন্তত একবার তাকাতেন তবে ‘থ’ হয়ে যেতেন এমনকি তারমুখে কোন কথা বের হতোনা|
নিশিকান্তের মনটা বেশ ফুরফুরে| প্রথম দিনের পরীক্ষাটা সে বেশ ভালই দিয়েছে| বিগত বছর গুলোতে কখনোই এতো ভাল পরীক্ষা সে দিতে পারেনি| বরাবরই সে দুই তিন বিষয়ে ফেল করি করি করে কোন মতে পাশ করে গিয়েছে আর এবার প্রথম পরীক্ষাটাই এতো ভাল হয়েছে যে খুশিতে ধেই ধেই করে নাচতে ইচ্ছে করছে| ভারতীদেবী ছেলের পরীক্ষা ভাল হয়েছে শুনে ভীষণ খুশি| মনে মনে এই ছেলেকে নিে য়তার অনেক ¯^প্ন অনেক আশা| বিকেলে হাটতে হাটতে নিশিকান্ত তিহামীদের বাসায় গেল| তিহামী তখন পরদিনের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত| নিশিকান্ত জানে তিহামীর পরীক্ষা অনেক ভাল হয়েছে কারণ তিহামী ওদের ক্লাসের ফাষ্ট বয় তাই ইচ্ছে করেই জিজ্ঞেস করেনি পরীক্ষা কেমন হয়েছে| কিন্তু ওর পরীক্ষাযে ভাল হয়েছে এটা তিহামী জানতোনা| নিশিকান্ত নিজেই বললো আজ আমার পরীক্ষা ভীষণ ভাল হয়েছে| সবগুলোর সঠিক উত্তর দিয়েছি এবং খুব সুন্দর করে সাজিয়ে লিখেছি| ওর কথা শুনে তিহামী তেমন কিছু মন্তব্য করলোনা| তিহামী জানে ওর কথা পুরোপুরি ঠিক নয় কারণ ইংরেজিতে কোন দিন নিশিকান্ত চল্লিশের ঘরে পৌছায়নি আর সেই যদি বলে খুব ভাল পরীক্ষা দিয়েছে তা কি করে বিশ্বাস করে? সে ক্লাসের ফাষ্ট বয় হয়েও এবার সবগুলোর উত্তর দিতে পারেনি সেখানে একশো তেইশ রোল না¤^ারের একটা ছাত্র সবগুলোর উত্তর দেবে এটা অকল্পনীয়| তিহামী কথা না বাড়িয়ে শুধু এতটুকু বললো যে আমার পরীক্ষা খুব বেশি ভাল হয়নি| সবগুলোর উত্তর দিতে পারিনি| ওর কথা শুনে নিশিকান্ত অবাক হলো| এত সহজ প্রশ্ন আর তিহামী উত্তর দিতে পারেনি এটা কী করে হয়ে? মুখের ওপর কথাটা বলেই ফেলল কিন্তু তিহামী প্রিয় বন্ধটাকে এ ব্যাপারে কিছু বললনা| রাত পেরুলেই ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষা তাই নিয়ে সে ব্যস্ত হয়ে পড়লো| নিশিকান্তকে বুঝিয়ে দিল কোনগুলো পড়তে হবে| কিন্তু নিশিকান্তের মনে হচ্ছিল তিহামীর দেখানো প্রশ্নগুলো আসবেনা| তাই সে নিজের মতো করে পড়লো এবং ওর মনের সাম্ভাব্যতার কথা তিহামীকেও জানালো| এরপরও তিহামী ওকে কিছু বললোনা| পরদিন পরীক্ষার হলে প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে তিহামীর চক্ষু চড়কগাছ| তার পড়া প্রশ্ন গুলো থেকে খুব সামান্যই কমন পড়েছে অথচ গতকাল নিশিকান্ত যা বলেছিল হুবহু ঠিক সেরকমই প্রশ্ন এসেছে| ঘাড় ফিরিয়ে দেখলো তার মতো প্রায় সকলেই কলম কামড়াচ্ছে| কিন্তু একজন ছাত্র খুব মনোযোগ দিয়ে কারো দিকে না তাকিয়ে এক মনে লিখছে| সেই একজন ছাত্রই বলতে গেলে সবার গনার বাইরে আর সে হলো নিশিকান্ত| তিহামীর কাছে সব কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে| গত দিনের মতো ঐ দিনও নিশিকান্ত ঘন্টা পড়ার আগেই খাতা জমা দিয়ে চলে গেল| গতদিন অধিক্রম দত্ত স্যার ওর খাতা নিয়েছিলেন আর আজ নিলেন মনিরা ম্যাডাম| অধিক্রম স্যারের মতো মনিরা ম্যাডামও অনেকটা তাচ্ছিল্যের সাথে ওর খাতা জমা রাখলেন| তিহামী উঠে এসে মনিরা ম্যাডামকে বললেন গত কাল এবং আজ যে প্রশ্ন এসেছে তা আমাদের আয়ত্তের বাইরে| এমনকি এই প্রশ্নগুলো আমাদেরকে পড়ানোও হয়নি খুব একটা| তাহলে টিচারেরা কেন এমন প্রশ্ন করলেন? মনিরা ম্যাডাম বললেন নাতে াএমন কোন প্রশ্নই করা হয়নি যা তোমাদের পড়ানো হয়নি| তিহামী প্রশ্নটা মনিরা ম্যাডামের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো একবার চোখ বুলিয়ে নিন| মনিরা ম্যাডাম নিজেও শক খেলেন| এই বিষয়টা তিনি পড়ান এবং প্রশ্নগুলোও তিনিই করেছেন| তাহলে এই প্রশ্নগুলো আসলো কোথাথেকে| এই প্রশ্নগুলোতো তিনি দেননি| তাহলেকি প্রেসের লোকেরা ভুল প্রশ্ন ছাপিয়েছে? ঐ দিনের মতো পরীক্ষা শেষ হলো| শিক্ষকেরা অবাক হয়ে দেখলেন সব গুলো প্রশ্নই তাদের করা প্রশ্নথেকে ভিন্ন| প্রেসে গিয়ে খবর নেয়া হলো তারা তাদেরকে ভুল প্রশ্ন দিয়েছে কিনা দেখা গেল মুকুল নিকেতন থেকে যে প্রশ্ন হাতে লিখে জমা দেয়া হয়েছে ঠিক সে প্রশ্নই ছাপানো হয়েছে| স্যারেরা এটা দেখেও অবাক হলেন| তাদেরই হাতে লেখা প্রশ্নগুলো এরা ছাপিয়েছে| অথচ স্পষ্ট মনে আছে এই ধরণের কোন প্রশ্ন তারা লেখেনি| ঐ দিন পরীক্ষা শেষে ফুরফুরে মনে বাড়ীর পথে হেটে চলেছে নিশিকান্ত| ঠিক সেই সময়ে তার অন্য সহপাঠীরা পরীক্ষা দিচ্ছে| সেদিনও তিহামীর পরীক্ষা ভাল হলনা| ভাল ছাত্র বলে যা নিজ থেকে লিখতে পেরেছে কিন্তু এটা আহামরি কোন ভাল পরীক্ষা নয়| যথারীতি আবার বিকেলে নিশিকান্তের সাথে দেখা| পড়ালেখার কথা বাদ দিয়ে আজ তিহামী শুধু আবিষ্ট মনে ওর দিকে তাকিয়ে থাকলো| হঠাৎ করে কিভাবে একটা মানুষ এমন হয়ে উঠতে পারে তা সে কিছুতেই ধরতে পারছিলনা| এভাবেই একে একে সবগুলো পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল| আবার আগেরমতো ক্লাস আরম্ভ হলো| নিশিকান্তের মা তাকে নতুন স্কুল ড্রেস,জুতা,মোজা এবং ব্যাগ কিনে দিয়েছে| নতুন সব কিছুই নিশিকান্তকে নতুন রুপে বলিয়ান করে তুলেছে| সে ফুরফুরে মন নিয়ে স্কুলে পৌছাল| তিহামী ওকে নতুন পোষাকে দেখে ভীষণ খুশি হল| আজ ওকে ভীষণ সুন্দর লাগছে| কিন্তু তিহামীর কাছে ওকে সুন্দর লাগলে কি হবে কুৎসিত মনের মানুষগুলির কাছে ওর এই সুন্দর পোষাক পছন্দ হলনা| আচ¤ি^তে শ্রীকান্ত,অমল,বাদল আর রাতুল এসে মুঠি ভরে ধুলো কাদা এনে ওরগায়ের সুন্দর জামায় লাগিয়ে দিল| তিহামী তখন ওদের বললো তোমরা ওর নতুন জামায় কাদা লাগিয়ে দিলে কেন? শ্রীকান্ত অমল বাদল আর রাতুল ছেলে গুলো ছিল অসম্ভব বেয়াদব| তারা তিহামীকে বললো ওরটাতে ধুলো দিয়েছি তাতে তোর কী ? তোরটাতে দিইনি এইতো তোর ভাগ্য| যা ভাগ এখান থেকে নইলে তোরটাতেও লাগিয়ে দেব| তিহামী তখন বললো তোমরা এটা ভাল করছোনা| আমি কিন্তু হেড স্যারের কাছে বিচার দেব| একথা বলার সাথে সাথে পাজি ছেলেগুলো নিশিকান্তর মতো ওর জামায়ও কাদা লাগিয়ে হা হা করে হাসতে লাগলো| তিহামী তখন ওদের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো| নিশিকান্ত এতো দিন ছেলেগুলোকে কিছুই বলেনি আজ ওর নতুন জামায় কাদা লাগিয়ে দিয়েছে তাতেও কিছু বলেনি কিন্তু যখন দেখলো তিহামীর জামায় কাদা লাগিয়ে দিয়েছে তখন সে হাত গুটিয়ে বসে থাকলোনা| রাগে ফুলতে ফুলতে শ্রীকান্তের কলার ধরে ধাক্কা মারলো| সাথে সাথে শ্রীকান্ত মাটিতে পড়ে ধুলোয় গড়াগড়ি খেল| অমল বাদল আর রাতুল তখন এক যোগে নিশিকান্তকে জাপটে ধরলো| নিশিকান্ত আজ ভেতর থেকে শক্তি অনুভব করছে| পাশাপাশি বিগত দিনের অপমানের যন্ত্রনা আজ চাগিয়ে উঠেছে| সে ঝাকুনি দিয়ে ওদের তিনজনের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাকে সামনে পেল কিলিয়ে আলুভর্তা বানিয়ে ফেললো| দূরে দাড়িয়ে তিহামী ওর শক্তি আর সাহস দেখছিল| আর আশ্চর্য হচ্ছিল এই ভেবে যে এই ছেলেটিই এতোদিন ওদের সব অপমান মুখ বুজে সহ্য করে এসেছে| নিশিকান্তের হাতে বেদম ধোলাই খেয়ে শ্রীকান্ত,অমল,বাদল আর রাতুল খোড়াতে খোড়াতে পালিয়ে গেল| তিহামী বা নিশিকান্ত কারো আর ঐ দিন ক্লাস করা হলোনা| বাড়ি ফিরতে ফিরতে তিহামী নিশিকান্তকে অনেক কথা বললো ওরা চারজন ক্ষমতাবান লোকের ছেলে | স্কুল কমিটির প্রধান মীর্জা আজিমুদ্দিনের ছেলে রাতুল| অন্য তিনজনের একজন চেয়ারম্যান বিমল মিত্রের ছেলে অমল,একজন স্কুলের দাতা সদস্য রহমতউল্যার ছেলে বাদল এবং অন্যজন স্কুলের শিক্ষক অধিক্রম দত্তের ছেলে শ্রীকান্ত| ওদের চারজনকে মারার জন্য কালকেই হয়তো শাস্তি পেতে হবে নিশিকান্তকে আর সেই শাস্তি হবে ভয়ংকর| তিহামীর কথায় কোন ভাবান্তরই হলোনা নিশিকান্তের মনে| সে এক মনে হাটছেতো হাটছেই| আর কেবল একটা কথাই ভাবছে সে ওদের চারজনকে একা ধরাশায়ী করলো কিভাবে? এত সাহসইবা ও পেল কোথায়? বাড়িতে ফিরলে মা ওকে ধুলো কাদা মাখা কেন জানতে চাইলে সহজ ভাবেই নিশিকান্ত মাকে সব খুলে বললো| তিহামীর মতোই মা ভারতী দেবীও চিন্তিত হয়ে পড়লেন| তিনি তার এক মাত্র ছেলেকে অনেক করে বুঝালেন | পরদিন সত্যি সত্যি নিশিকান্তের মা ভারতী দেবীকে স্কুলে ডেকে পাঠানো হল| বিচারের আসন বসানো হলো যেখানে শ্রীকান্ত,অমল,বাদল আর রাতুলের বাবাও উপস্থিত ছিলেন| প্রধান শিক্ষক ভারতী দেবীকে সব খুলে বললেন এবং ছেলে গুলোকে যে ভীষণ আকারে মেরেছে তাও বললেন| ভারতী দেবী ছেলের নির্দোষীতার কথা হেড স্যারকে বলার পরও তিনি সেটা মানতে রাজি হলেন না| নিজের ছেলের কথা যদি তার মা বলে তাহলে তা গ্রহণ যোগ্য নয় বলে জানালেন| তিহামী তখন সাক্ষী হয়ে হেডস্যারকে সব খুলে বললো| সব শুনে নিশিকান্তকে ক্ষমা করে দেয়া হলো| আসলে সবাই যেরকম ভাবতো শ্রীকান্ত,অমল ,বাদল আর রাতুলের বাবা সেরকম খারাপ মানুষ নয়| তারা সত্যি সত্যিই অন্যায়ের আপোষ করেন না এটা প্রমানিত হলো| যদি তাই না হতো তবে হেড স্যারকে চাপ দিয়ে ঠিকই তারা নিশিকান্তকে শাস্তি দিত| তিহামী এবং নিশিকান্ত সহ সকলের এত দিনের ভুল ধারণা ভেঙ্গে গেল| এরপর থেকে আবার তারা নিয়মিত স্কুলে আসতে শুরু করলো| এর মাঝেই পরীক্ষার রেজাল্ট ঘোষণার দিন আসলো| স্যারদের মাঝে কানাঘুসা হতে লাগলো| তারা ক্লাস সিক্সের একটা খাতা দেখে ভীষণ অবাক হয়েছে| খাতাটা নিশিকান্তের| প্রতিটি পরীক্ষাতে ঝকঝকে পরিস্কার হাতের লেখায় সুন্দর উপস্থাপনায় সব গুলোর সঠিক উত্তর সে ক্রমাš^য়ে লিখে দিয়েছে| এমনকি নাফিস তিহামী তিহাম যেখানে সবগুলোর উত্তর দিতে পারেনি সেখানেও সে সঠিক ভাবে উত্তর দিয়েছে| কোথাও কোন কাটা ছেড়া নেই| ফলাফল ঘোষনার পর দেখা গেল সবার চেয়ে একশো বত্রিশ না¤^ার বেশি পেয়েছে নিশিকান্ত| ফলাফল দেখে অন্যরা যেমন বাকহীন হয়ে পড়েছে তেমনি নিশিকান্ত আরও বেশি| সে নিজে জানো কখনো কোন বিষয়ে ষাট না¤^ার সে তুলতে পারেনি আর এবার সে সব পরীক্ষাতেই আশি না¤^ারের ওপরে পেয়েছে| রেজাল্টের পর থেকে সবাই ওকে আপন ভাবতে লাগলো| ভারতী দেবী তার ছেলের ফলাফলে ভীষন খুশি| তার ¯^প্ন পূরন করতে তার ছেলে ভাল ফলাফল করা শুরু করেছে| সবাই খুশি হলেও কেবল খুশি নয় নিশিকান্ত নিজে| সে কখনোই তিহামীকে টপকে যেতে চায়না| দুই বা তিন হোক তাতে কোন আপত্তি নেই কিন্তু সে মনে প্রাণে চায় যেন তিহামীই ক্লাসে প্রথম হয়| কিন্তু তা কোন ভাবেই হচ্ছেনা| আগে ক্লাসের পড়াও নিশিকান্ত ভালমতো পারতোনা এখন স্যারেরা যা পড়া দেয় সব পারে| শত চেষ্টা করেও সে পরীক্ষা বা ক্লাস কোথাও খারাপ করতে পারেনা| পড়াগুলো যেন আপনা আপনিই ওর মাথার ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে| তিহামীকে সে বলেছে আরো বেশি করে গুরুত্ব দিয়ে পড়তে যেন সে ওকে টপকে যেতে পারে আর নিজে পড়া কমিয়ে দিয়েছে কিন্তু তারপরও কিছুই হচ্ছেনা| বইয়ের পাতা তার চোখের সামনে আপনাআপনিই ভেসে উঠছে| মনের অজা&েত কখনো কখনো ও দেখেছে ওর মাথার ভিতরে কে যেন ফিস ফিসিয়ে কথা বলে|
স্কুল থেকে একসাথে বাসায় ফিরছিল নিশিকান্ত আর তিহামী দুই বন্ধু| বিদ্যাময়ী স্কুলের সামনে অনেক মানুষের উপচেপড়া ভীড় দেখে তিহামী এবং নিশিকান্তর মনে কৌতূহল জাগলো| ভীড় ঠেলে ভিতরে গিয়ে দেখলো একজন সাপুড়ে সাপখেলা দেখাচ্ছে| কয়েক প্রকারের সাপের ভিতরে একটা বড় গোখরা সাপও ছিল| সেটা নিয়েই খেলা দেখাচ্ছিল সাপুড়ে| বাঁশির তালে তালে অনেক উচুতে ফনা তুলে দাড়াচ্ছিল সাপটি| তিহামী মুগ্ধ বিস্ময়ে ফনাতোলা সাপটির দিকে তাকিয়ে ছিল| একফাকে নিশিকান্ত তিহামীকে বললো একটা মজা দেখবি? রহস্যের গন্ধ পেয়ে তিহামী মাথা নাড়িয়ে সায় দিলো| নিশিকান্ত তখন চুপি চুপি ওকে বললো আয় এখনি সাপটা ফণা তোলা বন্ধ করবে| কিন্তু কিভাবে করবে,কেন করবে,কী রহস্য এর ভিতরে কিছুই জানতোনা তিহামী| সে শুধু নিশিকান্তকে অনুসরণ করলো| নিশিকান্ত ওকে নিয়ে সাপটি যেদিকে মুখ করে ফণা তুলেছিল ঠিক সেই পাশে গিয়ে দাড়ালো| ফণা তোলা সাপটির চোখে চোখ পড়লো নিশিকান্তর এবং যাদুর কাঠির ছোয়ার মত সাথে সাথে সাপটি ফণা নামিয়ে একদম মাটির সাথে শুয়ে পড়লো| সাপুড়ে অনেক চেষ্টা করেও সাপটিকে আর ফণা তুলাতে পারলোনা| এটা কিভাবে করা হলো তিহামী জানতে চাইলেও নিশিকান্ত কিছু বললোনা| ওদিকে সাপুড়ে জানালো অনেক বার খেলা দেখিয়ে সাপটি ক্লান্ত হয়ে পড়েছে তাই সে আর ফণা তুলবেনা| তিহামী চুপি চুপি নিশিকান্তকে জিজ্ঞেস করলো সাপুড়ে যা বলেছে তাকি সত্যি? নিশিকান্ত মাথা দুলিয়ে জানালো সত্যি নয়| এবার তিহামী ওকে অনুরোধ করলো তুই তাহলে সাপটাকে আবার ফণা তোলা| নিশিকান্ত ওকে একটু অপেক্ষা করতে বললো| সাপুড়ে সাপটাকে যখন ঝুড়িতে রাখলো ঠিক তখনই আবার নিশিকান্তের চোখে চোখ পড়লো সাপটির এবং সাথে সাথে ফুপিয়ে ফণা তুলে দাড়ালো সাপটি| এবার আগের চেয়ে দ্বিগুন| দর্শকরা হাতে তালি বাজাতে লাগলো আর সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হলো তিহামী| সাপুড়ে নিজেই হতবাক হয়ে গেল এসব কান্ড কারখানা দেখে| ঠিক এমন সময় সাপটি তাকে ছোবল মারলো| আগেই বিষদাত ভাঙ্গা ছিল বলে সাপুড়ের কিছু হলনা| এভাবে ঐ দিনকার মতো সাপুড়ের খেলার সর্বনাশ হল কিন্তু সাপুড়ে এর কোন কারণ বা কুল কিনারা খুঁেজ পেল না| পথে যেতে যেতে তিহামী এর ভেতরের রহস্য জানতে চাইলো| কৌতুহলের সাথে জানতে চাইলো তুইকি কোন মন্ত্র জানিস যে সাপ তোর কথায় ওঠে বসে| নিশিকান্ত মাথা দুলিয়ে অ¯^ীকার করে বলে আরে না তেমন কিছু না তবে কেন যেন এটা হয় আমিও ঠিক বুঝতে পারিনা| নিশিকান্ত কথাটি মিথ্যে বলেনি| সে সেই রাতে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা পুরোপুরি ভুলে গেছে ফলে এসব কেন হচ্ছে তা সে ধরতে পারছেনা| এরপর নিশিকান্ত তিহামীকে আরো একটি ঘটনার কথা জানালো| হেড স্যারকে দিয়ে শাস্তি দিতে পারেনি বলে শ্রীকান্ত ,অমল,বাদল আর রাতুল নিজেরা পরিকল্পনা করে আমাকে অন্য ভাবে শাস্তি দিতে চেয়েছিল| আজ থেকে মাত্র পনের দিন আগের ঘটনা যা তোকে বলতে ভুলেই গিয়েছিলাম| আমি আমার ঠাকুমার সাথে শুয়ে ছিলাম| হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল এবং ঘরের পাশে ফিসফিস করে কথা বলার আওয়াজ শুনতে পেলাম| আমি টু শব্দটি না করে চুপটি করে বসে থাকলাম| এর কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্ধকারেই দেখতে পেলাম শ্রীকান্ত.অমল,বাদল আর রাতুল একজন মধ্য বয়স্ক মানুষকে সাথে নিয়ে আমার রুমের জানালার পাশে এসে দাড়িয়েছে| আমি সেই ঘুটঘুটে অন্ধকারেও স্পষ্ট দেখতে পেলাম মধ্য বয়স্ক লোকটার হাতে একটা ল¤^া গোকরা সাপ| এবং সে সেটা আমার রুমের জানালা দিয়ে ভিতরে ছেড়ে দিল| চট করে আমি ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম| কিন্তু সাপটা সোজা আমার পা বরাবর দুই হাত দূরে থেমে গেল| সাপকে আমার খুব একটা ভয় কখনোই লাগতোনা| তাই আমি সরাসরি সাপটির চোখের দিকে তাকালাম এবং হঠাৎ করে আমার সারা শরীর শীতল হয়ে গেল | তারপর চোখের সামনে দেখলাম সাপটা আমার সামনে মাথা নিচু করে প্রণাম করার ভঙ্গি করলো| আমি ব্যাপারটা কিভাবে কি ঘটলো কিছুই বুঝতে পারলামনা| মনে মনে শুধু বললাম যারা আমাদের ক্ষতি করার জন্য তোকে এখানে ছেড়ে দিয়েছে তুই তাদেরকে পাকড়াও করতে পারিসনা? মনে মনে যখন এ কথা ভেবেছি সাপটিও সাথে সাথে ফণা তুলে ফিরে গেল শ্রীকান্তদের দিকে| নিজেদের পাঠানো সাপ তাদের দিকেই তেড়ে আসছে দেখে সাপুড়ে সহ চারজনই পড়ি মরি করে পালালো| তখন থেকেই বুঝেছি কোন একটা অজ্ঞাত কারণে সাপ আমাকে কিছু বলেনা এবং আমার কথা শোনে| তিহামী ওর কথা শুনে ভীষণ ভাবে আশ্চর্য হলো| কিন্তু এমনটি কেন হচ্ছে তা তারা দুজনের কেউই বুঝে উঠতে পারলোনা| পরদিন সকালেই স্কুলে গিয়ে জানতে পারলো ঐ চারজন ছাত্র ভীষণ অসুস্থ| তাদের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় হঠাৎ করে ঘা হতে শুরু করেছে| ওদেরকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং চিকিৎসা চলছে| তবে ডাক্তারেরা এই রোগের কারণ খুজে পাচ্ছেনা| প্রতিটি ক্ষত স্থানেই পরীক্ষা করে সাপ বা ঐ জাতীয় কোন প্রাণীর বিষের উপস্থিতি দেখা গেছে | অথচ ওদের কাউকেই কখনো সাপে কাটেনি| তিহামী আর নিশিকান্তও ওদেরকে দেখতে হাসপাতালে গেল| ওদের দেখে তিহামী বিচলিত না হলেও নিশিকান্ত ঘাবড়ে গেল| ওদের শরীরের যেখানে যেখানে ও আঘাত করেছিল ঠিক সেখানে সেখানেই ঘা হয়েছে| তাহলেকি ওর হাতই বিষাক্ত ? ভাবনায় পড়ে গেল নিশিকান্ত| ওর এই হঠাৎ চিন্তিত মুখের দিকে তাকিয়ে তিহামী কিছুটা বেদনা অনুভব করলো| এই ছেলেগুলোই দীর্ঘদিন ওকে জ্বালাতন করেছে অথচ সহজ সরল অসম্ভব মেধাবী এবং সাহসী নিশিকান্ত তাদেরই বিপদের দিনে পাশে বসে চোখের জল ফেলছে| ও আমার বন্ধু এ কথা ভাবতেই তিহামীর ভীষণ গর্ব অনুভূত হচ্ছে| নিশিকান্তের আরো একটু গা ঘেষে বসলো তিহামী| ওরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে যে নিশিকান্ত সব ভুলে গিয়ে ওদেরমতো খারাপ ছেলে গুলোকে দেখতে এসেছে পাশে বসেছে| বাড়ি ফিরে নিশিকান্ত তার মা ভারতী দেবীকে ওদের করুণ অবস্থার কথা জানিয়েছে| শুনে ভারতী দেবীরও খুব খারাপ লেগেছে| কোন বাবা মার কোল যে খালি হতে চলেছে তা তার জানা নেই| ভয়ে নিশিকান্তকে সে বুকে জড়িয়ে নেয়| নিশিকান্ত সারা দিনই মন খারাপ করে থাকে| বিকেলে রেল লাইনের ওপর একা একা নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকে| তিহামী বুঝতে পারেনা নিশিকান্তর হঠাৎ কী হলো যে সে তাকে এড়িয়ে চলছে| কোন ভাবেই নিশিকান্ত বুঝে উঠতে পারছেনা যে ছেলেগুলোর শরীরে তার হাতের আঘাতের চিহ্ণ আসলো কী করে| এর মাত্র তিনদিন পর ডাক্তারেরা জানালো যে শ্রীকান্ত ,অমল,বাদল এবং রাতুলের অবস্থা ভাল নয়| তাদেরকেবিদেশেনিয়ে গেলে ভালহতেপারে| ওরা প্রত্যেকেই ছিল নিজ নিজ পিতার একমাত্র সন্তান| আদরের মানিককে বাঁচাতে তারা শেষ স¤^ল বিক্রি করে হলেও বিদেশেযাওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলো| শুধু শ্রীকান্তের জন্য কোন ব্যবস্থা করতে পারলেন না তার দরিদ্র স্কুল মাষ্টার পিতা অধিক্রমদত্ত| ছেলেকে মৃত্যু সজ্জ্যায় দেখে তিনি দিনদিন ভেঙ্গে পড়তে লাগলেন| শ্রীকান্তের মা ভবানী দত্ত প্রায় উন্মাদিণীরন্যায় বিলাপ করতে লাগলেন| অমল বাদল আর রাতুলের বাবা ওদেরকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে গেলেন| উন্নত চিকিৎসা দিয়ে কলিজার টুকরা ছেলেকে সুস্থ করে তুলতেই হবে| পরিবার পরিজন আত্মিয় ¯^জন স্কুলের শিক্ষক এবং সহপাঠীরা সবাই অপেক্ষায় থাকলো কী হয় তা দেখার জন্য| প্রার্থনা করতে লাগলো ছেলেগুলো যেন সুস্থ হয়ে ফিরে আসে| মাত্র পনের দিন পর বাদল রাতুল আর অমলকে চিকিৎসা শেষে সিঙ্গাপুর থেকে দেশে ফিরিয়েআনা হলো| কিন্তও এতে কেউ আনন্দিত হতে পারলোনা| ততক্ষণে পরিবার পরিজনের ভেতরে চাপা গুঞ্জন শুরু হলো| রাতুল আর বাদলের পরিবার ব্যস্ত হয়ে পড়লো সাদা কাপড়.আগরবোতি, সুরমা,কর্পুর কেনার জন্য| আলাদা আলাদা ছোট্ট দুটি মাটির ঘর বানানোর জন্য| আর অমলের দাদা কাকা জেঠুরা ব্যস্ত হয়ে পড়লো চন্দন কাঠ জোগাড় করে চিতার আগুন জ্বালাবার ব্যবস্থা করতে লাগলো| পিতা মাতা শেষ স¤^লটুকু বিকিয়ে দিয়েও আদরের সন্তানকে বাঁচাতে পারেনি| শ্রীকান্তের বাবা অধিক্রম দত্ত এবং মা ভবানী দত্ত রাতুল অমল আর বাদলের মৃত্যু খবর শুনে গগণ বিদারী আর্তনাদ করতে লাগলো| চোখের সামনে প্রিয় বন্ধুদের মৃত্যু দেখে নির্বাক হয়ে গেল সজ্জ্যাশায়ী শ্রীকান্ত| বাঁচার সব আশা সে পুরো পুরি ছেড়ে দিয়েছে| বিদেশেচিকিৎসা করাতে নিয়ে গিয়েও একই রোগে তার বন্ধুরা বেঁেচ ফিরে আসেনি সেখানে তার বাঁচার আশা করা বোকামী| কিন্তু প্রতিটা মানুষ বাঁচতে চায়,বাঁচার জন শ্রীকান্তেও মনটাও আকুলী বিকুলী কওে ওঠে| বিগত দিনের স্মৃতিগুলি বার বার তার চোখে ভেসে ওঠে| মনের অজান্তেই শ্রীকান্তেও চোখ ছলছল করে ওঠে| চিরকালের মতো হারিয়ে যাওয়া তিন বন্ধুর মরদেহ সমাধস্থ এবং দাহ করার পর সবাই শোক সইতে না পেরে সদর হাসপাতালে ভীড় জমালো| সবাই এসেছে শ্রীকান্তকে দেখতে | সেই আগত জচনসমুদ্েরর ভীড়ে বাদ পড়েনি অমল বাদল আর রাতুলের বাবা মাও| বিশ্বের বড় বড় ডাক্তারেরা কোন রোগই ধরতে পারেনি| সন্তান হারিয়ে ওদের বাবা মা একদম নিঃ¯^ হয়ে পড়েছে| সকলের উপস্থিতিতে গোটা হাসপাতালে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে| শ্রীকান্তের মনে হল একসাথে শেষ বারের মতো সবাই তাকে বিদায় জানাতে এসেছে| সবার উপস্থিতিতে হাসপাতালের পরিবেশ ভারি হয়ে উঠেছে| একসাথে এতোগুলো মানুষ দেখে কড়া মেজাজী অধিক্রম দত্ত স্যারও থেকে থেকে কেঁদে উঠলেন| তিনি স্পষ্ট দেখতে পারছেন তার ছেলের বিদায়ী যাত্রায় এরা সবাই জড় হয়েছে| বিকেলের দিকে হাসপাতালে ভীড় কমে গেল এবং বিকেল পাঁচটা নাগাদ একেবারেই ফাকা হয়ে গেল| বিছানায় ফ্যাকাশে মুখেশুয়ে আছে শ্রীকান্ত ,চোখ দুটো ফোলাফোলা,সারা শরীরের বিভিন্ন স্থানে খাবলা খাবলা মাংসে দগদগে ঘা ,সেই দগদগে থেতলে যাওয়া মাংসের ওপর মাছিরা আয়েশ করে বসছে কিন্তু শ্রীকান্তের সেদিকে কোন মন নেই| ওর দৃষ্টিটা কেবলই শূণ্যতায় ঘুরপাক খেতে থাকে| মাত্র বার বছর বয়স ওর ,চরে যাবার সময় এটা নয় কিন্তু ঐ ডাকটা এমন কঠিন যে একবার ডাকলে না শুনে উপায় নেই| এতদিনের প্রিয় বন্ধুরা সে ডাকে সাড়া দিয়ে সুদুর নীলিমায় হারিয়ে গেছে| এবার সামান্য ব্যবধানে তাকেও যেতেহবে| থাকবেনা বাবা মার আদর মাখা শাসন,মুকুল নিকেতনের ছোট্ট খেলার মাঠে দাপিয়ে বেড়ানো কিংবা মনিরা ম্যাডামের ছেলে উৎসর হাত ধরে বন্ধুত্ব বন্ধুত্ব খেলা| ধীরে ধীরে চোখের পর্দা নেমে আসছে| ঐ যে দূরে তিন বন্ধু অমল বাদল আর রাতুল ওকে ডাকছে| সন্ধ্যায় ডাক্তার এসে ওর বাবা মাকে বলেছে ওকে বাড়ি নিয়ে যেতে| এখানে রেখে টাকা খরচ করে কোন লাভ নেই| সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা না করে অধিক্রম দত্ত স্যার তার আদরের সন্তান শ্রীকান্তকে রাত দশটার আগেই বাড়ি নিয়ে গেলেন| ব্রক্ষ্মপুত্র নদের তীর ঘেসে ইস্কান্দার মিজার সুবিশাল বাংলো বাড়ী| সেই বাড়ীর পাশেই অধিক্রম দত্তের ছোট্ট একটা বাড়ী| মুকুল নিকেতনে শিক্ষকতা করে পাশাপাশি টিউশনী করে এক সন্তান আর স্ত্রীকে নিয়ে সুখে দুঃখে সংসার ভালই চলে যায়| আর পাশে ইস্কান্দার মির্জা শান শওকাতের সাথে জীবণ কাটাতে থাকে| সন্তান টাকা কড়িতে তিনি যেমন সমৃদ্ধশালী তেমনি জ্ঞানে গুণেও তার চেয়ে কোন অংশে কমতি নেই| কলেজের গণিত বিভাগের অধ্যাপক,তিন সন্তানের জনক তিনি| যে সন্তানগুলো এক একটা কোহীনুর সম| বড় ছেলে অভি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে আর ছোট& দুই ছেলে স্নিগ্ধ এবং মুগ্ধ জিলা স্কুল থেকে এবার এস এস সি পরীক্ষা দিচ্ছে| অধিক্রম দত্ত কখনোই নিজেকে ওদের সাথে তুলনা করেনা কিন্তু ইস্কান্দার মির্জা ছিলেন অসম্ভব ভালো মানুষ| তাই তিনি সব সময় অধিক্রম দত্তকে সমাদর করতেন| তার এই বিপদের দিনে ইস্কান্দার মির্জা চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা দিতে চেয়েছিলেন যা দিয়ে অধিক্রম দত্ত ছেলেকে চিকিৎসা করাতে বিদেশে নিয়ে যেতে পারতেন| কিন্তু যখন দেখলেন অমল বাদল আর রাতুলকে বিদেশে নিয়েও কোন লাভ হয়নি তখন ইস্কান্দার মির্জার টাকা তিনি গ্রহণ করলেন না| তার দুঃখ ইস্কান্দার মির্জা বুঝতে পারেন| স্নিগ্ধ মুগ্ধ ওরাও শ্রীকান্তের জন্য ব্যথিত হয়ে ওঠে| সময়ে অসময়ে গণিতের সমস্যাগুলি সমাধানের জন্য শ্রীকান্ত ওদের কাছে ছুটে আসতো| আর সেই ছোট্ট ছেলেটা যে কোন সময় তাদের চোখের সামনে থেকে হারিয়ে যাবে এটা ভাবতেই স্নিগ্ধ মুগ্ধর চোখ ছলছল করে ওঠে| বিকেলের দিকে শ্রীকান্তের শরীর একটু ভাল লাগতে থাকলো| কিন্তু এটা ভাল লক্ষণ নয় বলেই সে মনে করে| হয়তো একটা ভাল হয়েই আবার সে ঢলে পড়বে মৃত্যুর কোলে| এরই মাঝে আত্মীয় ¯^জন পাড়া প্রতিবেশী কম বেশি সবাই এসে ওকে দেখে গেছে কথা বলে গেছে| শুধু নিশিকান্ত ঐ দিনের পর আর আসেনি| সবার থেকে সে এখন আলাদা| কারো সাথে সে এখন মেশেনা| কারো কাধে সে এখন আর হাত রাখেনা| শ্রীকান্তের খুব ইচ্ছে করে নিশিকান্তকে দেখতে কিন্তু নিশিকান্ত আসেনা| শ্রীকান্ত তিহামীকে অনুরোধ করে যেন নিশিকান্তকে অন্তত একবার আসতে বলে| তিহামী ওকে কথা দেয় যে সে যে করেই হোক নিশিকান্তকে নিয়ে আসবে| শ্রীকান্তকে কথা দিলেও মনে মনে সে ভীষণ দুর্বলতা অনুভব করে| সত্যিইকি সে নিশিকান্তকে ওর কাছে নিয়ে আসতে পারবে?
রেল লাইনটা একদম ফাকা| অনেকক্ষণ পর যখন একটা রেল গাড়ি আসে কেবল তখনই রেল লাইনের পাতগুলো সুখ পায়| স্টেশান থেকে অনেকটা দূরে নিশিকান্তদের বাড়ী| বাড়ীর পাশ দিয়ে চলে গেছে রেল লাইন | ও যেখানে বসে আছে এখানে চারপাশে সারি সারি দেবদারু গাছ| আগে ও ব্রক্ষ্মপুত্র নদের ধারে বসে থাকতো এখন আর সেখানে বসতে নিশিকান্তর ভাল লাগেনা| একাকী তাই রেল লাইনের এই স্থানটাতে বসে থাকে| খুব ভাল লাগে রেল লাইনের এই নিরবতা| চারদিকে কোথাও কেউ নেই, মাথার ওপর আদিগন্ত নীল আকাশ| সেই আকাশে একখন্ড মেঘ নেই ,চারদিকে সোনালী রোদের ঝিলমিল জ্যোৎস্না| বার বছরের একটা ছোট্ট ছেলে একাকী নিরবে রেললাইনে বসে থাকাটা শোভনীয় নয়| এই বয়সে তার থাকার কথা খেলার মাঠে| বন্ধুদের সাথে নদীর পানিতে ঝাপিয়ে বেড়ানোই ছিল ¯^াভাবিক| নিশিকান্ত তার ঠিক বিপরীত| একাকী নিঃসঙ্গতায় সারাক্ষণ কাটাতে ভালবাসে| মনে তার পড়ার সাথীদের হঠাৎ হারিয়ে যাওয়ার দুঃখ| অনেকক্ষণ হল তিহামী ওর পিছনে এসে দাড়িয়েছে কিন্তু ও টের পায়নি| তিহামী প্রথম ওদের বাড়ীতে গিয়ে ওকে পায়নি| নিশিকান্তের মাকে ডেকে জিজ্ঞেস করেছে মাষিমা নিশি কোথায়? ভারতী দেবীই বলে দিয়েছে নিশিকান্ত এখানে| ওদের বাড়ী থেকে তাই সোজা সে এখানে চলে এসেছে| তিহামী ওকে ডাক দিল নিশি! হঠাৎ ওর নাম ধরে কে ডাকছে শুনেই সে ফিরে তাকাল| আচ¤ি^তে সে চমকে উঠলো| ওখানে যে তিহামী দাড়িয়ে আছে তা তার মনে হলনা| মনে হল যেন রাতুল দাড়িয়ে আছে| সে অস্ফুট ¯^রে বলেই উঠলৈা রাতুল তুমি? তিহামী বুঝতে পারলো যে ও ভুল দেখছে তাই বলল রাতুলকে কোথায় দেখলি আমিতো তিহামী| রাতুলরা যে আর কোন দিন ফিরে আসবেনা আর কোন দিন তোকে বা আমাকে জ্বালাতন করবেনা| কথাগুলো নিশিকান্তের বুকের মধ্যে শেল হয়ে বিধলো| শ্রীকান্ত ওকে দেখতে চেয়েছে এই কথাটা সে নিশিকান্তকে জানালো| অনেক অনুরোধ করেও নিশিকান্তকে রাজি করাতে পারলোনা| সন্ধ্যা তখনো হয়নি তার আগেই তিহামী ফিরে গিয়ে শ্রীকান্তকে দুঃখের এই সংবাদটি জানালো| যার জীবনটাই আর সামান্য সময় মাত্র তার কাছে এটা কোন দুঃখই নয়| ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে| তিহামী শ্রীকান্তকে বিদায় জানিয়ে বাড়ীতে ফিরে গেল| সে নিজেও জানেনা যে এটাই শ্রীকান্তের সাথে তার শেষ দেখা কি না| মসজিদের মিনারে মিনারে মাগরিবের আজানের ধ্বণি আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হতে লাগলো| আর শ্রীকান্ত ক্রমে ক্রমে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে লাগলো| আজান শেষ হলে চারদিকে নিরবতা নেমে আসলো| সেই নিরবতা শশ্মানের নিরবতাকে হার মানায়| শ্রীকান্তের শরীর ক্রমশ খারাপ হতে লাগলো| একটু একটু করে কেপে উঠলো সারা শরীর| ওদিকে নিশিকান্তের মনটাও আনচান করতে লাগলো| মৃত্যু পথযাত্রী তার এক বন্ধু তাকে দেখতে চাচ্ছে অথচ সে যাচ্ছেনা এই ব্যাথায় অনুশোচনায় সে ছটফট করতে করতে অবশেষে রেললাইন ধরে দক্ষিণ দিকে হাটতে শুরু করলো| দক্ষিণ দিকে আধাঘন্টা হাটলে শ্রীকান্তদের বাড়ী| হাটি হাটি পা পা করে একসময় নিশিকান্ত ওদের বাড়ীতে পৌছে গেল| অধিক্রম দত্তের একমাত্র ছেলে তখন মৃত্যু যন্ত্রনায় ছটফট করছে| কাঠের দুই কপাট ওয়ালা দরজা তখন খোলাই ছিল| আস্তে কওে দরজা সরিয়ে ভিতওে ঢুকলো নিশিকান্ত| ঘরের উত্তর কোণায় একটা বিছানাতে শ্রীকান্ত মৃত্যু যন্ত্রনায় ছটফট করছে| নির্বিকার চোখে ধীর পায়ে সে বিছানার কাছে এসে দাড়ালো| ওকে দেখে শ্রীকান্তেও শরীরটা কাপা বন্ধ হয়ে গেল| শত কষ্টের মাঝেও ঠোটের কোণায় এক চিলতে হাসির রেখা দেখা দিল| শ্রীকান্ত ওকে অস্ফুট ¯^রে পাশে বসতে বললো| শ্রীকান্তের পাশে বসতে বসতে তার চোখে জল ছলছল করে উঠলো| শ্রীকান্ত ওর হাতটা ধরতে চাইলো কিন্তু সে তাকে ওর হাতটা ধরতে দিল না| এই হাতের আঘাতের চিন&হ শ্রীকান্তের শরীরে ক্ষত সৃষ্টি করেছে| সুতরাং এই হাত সে আর কাউকে ছুতে দেবেনা| নিশিকান্ত হাতটা সরিয়ে নিল| শ্রীকান্ত ওকে অনুনয় করে বললো শেষ বারের মতো তোর হাতটা আমার হাতে রাখ একটু ছুয়ে দেখি| আর কোন দিনতো তোকে অমন করে কষ্ট দিতে পারবোনা| ওর কথা শুনে নিশিকান্তের বুকের মধ্যে ঝড় উঠলো কাপা কাপা ভাবে হাতটা এগিয়ে দিল শ্রীকান্তের দিকে| সেই হাতটা পরম মমতায় ভালবাসায় বুকের সাথে জড়িয়ে নিল মৃত্যু পথযাত্রী শ্রীকান্ত| ঐ হাতটা বুকের সাথে জাপটে ধরতেই সব কিছু পরিবর্তন শুরু হলো| একপ্রকার শীতল অনুভুতি জাগলো শ্রীকান্ত এবং নিশিকান্তের সমস্ত শরীরে| মনে হলো দুজন যেন একই মানুষ| মনে হলো একের রক্ত যেন অন্যের শরীরে শির শির করে মিশে যাচ্ছে| ওর হাতটা ধরে শ্রীকান্ত খুব আরাম বোধ করলো| মাথার ভিতরে একবার ঝিমঝিম করে উঠে সব থেমে গেল| সমস্ত শরীরে কোন যন্ত্রণা নেই চোখের সামনে যে শূণ্যতা বিরাজ করছিল সেটিও এখন আর নেই| কেন কিভাবে এমন অনুভূতির জন্ম হলো শ্রীকান্ত তা জানেনা| হয়তো মৃত্যুর ঠিক আগ মুর্হূতে এমনটিই অনুভূত হয়| এভাবে প্রায় দশ মিনিট সে নিশিকান্তর হাতটা বুকের সাথে চেপে ধরে রাখলো| নিশিকান্ত বা শ্রীকান্ত কেউ তখনো লক্ষ্য করেনি যে এরই মাঝে অনেক কিছু ঘটে গেছে|হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বাড়ি ফিরে গেল নিশিকান্ত| অধিক্রম দত্ত এবং তার স্ত্রী ভবানী দত্ত সারা দিন কান্নাকাটির ধকল সইতে না পেরে ঘুমিয়ে পড়লো| চারদিকে কেবল বিদঘুটে অন্ধকার,কোথাও কোন সাড়া নেই|সেই অন্ধকারে শ্রীকান্ত নিজের শরীর পর্যন্ত দেখতে পেলনা| একটু দূরে মা তার জন্য একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে রেখেছিল| দমকা বাতাসে সেই মোমবাতিটিও নিভে গেছে| দূর থেকে ভেসে আসছে ডাহুকের করুণ সুরে ডাক| সেই করুণ সুরের ডা&কও শ্রীকান্তর এখন আর খারাপ লাগছেনা| তার মনের মধ্যে একপ্রকার আনন্দই খেলা করছে| জানালার ফাক গলে আরো বেশি অন্ধকার ঘরের মধ্যে প্রবেশ করছে| এভাবে একসময় শ্রীকান্ত গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লো| সকালে অধিক্রম দত্ত এবং তার স্ত্রী ভবানী দত্ত ধড়ফড় করে বিছিানায় উঠে বসলেন| পাশের কক্ষে তাদের রুগ্ন মৃতপ্রায় ছেলে শ্রীকান্তের কোন সাড়াশব্দ নেই|ভয়ে কুকড়ে গেলেন শ্রীকান্তের বাবা মা| দৌড়ে ঢুকেগেলেন শ্রীকান্তের কক্ষে| তাদের ছেলে তখন ঘুমিয়ে আছে আপন মনে| ছেলের কাছে গিয়ে গায়ের ওপর হাত রাখলেন অধিক্রম দত্ত| ছেলের শরীরটা ভীষন ঠান্ডা| মৃত মানুষের শরীরই এমন ঠান্ডা হয়| তাহলেকি তাদের ছেলে আর নেই| তারা গগণ বিদারী আর্তনাদ করে ওঠে| তাদের কান্নার শব্দে শ্রীকান্ত জেগে উঠে বলে বাবা মা তোমরা কাঁদছো কেন? ছেলের কথায় স¤ি^ত ফিরে পায় তারা| ছেলে বেঁেচ আছে দেখে তারা খুশি হয়| হঠাৎ ভবানী দত্ত লক্ষ্য করলেন তার ছেলের শরীরের কোথাও সেই দগদগে ঘা নেই| এমনকি গতকালও যে থেতলে যাওয়া মাংস দেখেছেন যেখানে মাছি বসতো তার কোন চিহ্নই নেই| সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছে শ্রীকান্ত| এটা ঘটেছে অন্ধকারে একদম ভোজ বাজীর মতো| কোন কথা না বলে সেই সকালেই তারা মন্দিরে পূজো দিতে গেল| তাদের একমাত্র সস্তান মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে এতেই তারা খুশি| তাদের আর কোন কিছুই চাওয়ার নেই| গোটা শহর নগর গোটা ময়মনসিংহের আর কেউ জানতে পারেনি ওখানে কী ঘটেছে | সবাই মেনে নিয়েছে শ্রীকান্ত নামের ছেলেটাও মারা যাবে| কোন একটা অজ্ঞাত কারণে সে সুস্থ হয়ে উঠেছে| ঘটনাটা তিহামী বা নিশিকান্তও জানেনা| ঘুম থেকে তখনও নিশিকান্ত জেগে ওঠেনি| দরজায় কেউ একজন আঘাত করছে আর নিশিকান্ত নিশিকান্ত বলে ডাকছে| সাতসকালে হাকডাক শুনে নিশিকান্তর মা বেরিয়ে এলেন| চোখের সামনে অক্ষত শ্রীকান্তকে দেখে তিনি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন| খানিকটা সময় নিরবতার মাঝে কেটে গেল| শ্রীকান্ত বা নিশিকান্তর মা কেউ কোন কথা বলতে পারলোনা| মাকে চুপ করে থাকতে দেখে নিশিকান্তও বিছানা ছেড়ে বেরিয়ে আসলো| তার সামনে দাড়ানো শ্রীকান্ত যার সারা শরীরে মাংস খাবলে খাবলে পড়ছিল| সে এখন তার সামনে দাড়ানো পুরোপুরি সুস্থ একজন মানুষ| নিশিকান্ত কিছুই বুঝে উঠতে পারলোনা| তার এসব মতি ভ্রম মনে হলো| গায়ে চিমটি কেটে গেখলো সে ঘুমিয়ে আছে না কি জেগে আছে| কিন্তু না তার কোন ভুল হচ্ছেনা| মাকে সাথে করে সে যা দেখছে তা বাস্তব| এর মাঝেই শ্রীকান্ত এসে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরেছে| শ্রীকান্ত বিশ্বাস করে য নিশিকান্তর হাতটা বুকে চেপে ধরার পরই সে ভাল হয়ে গেছে| সে সারা শহর ঘুরলো এবং তাকে দেখে সবাই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল| সদর হাসপাতালের ডাক্তারেরা পর্যন্ত বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকলেন| যে মানুষটির মারা যাবার কথা ,বেঁেচ থাকার কোন সম্ভাবনাই তারা দেখেনি সেই মানুষটিই এখন দিব্যি সুস্থ হয়ে হেসে খেলে বেড়াচ্ছে| শ্রীকান্ত তার ছোট্ট গলার ¯^র আরো উচু করে চিৎকার করে বলতে লাগলো যে তাকে সুস্থ করেছে নিশিকান্ত| সে এও বললো যে নিশিকান্তর হাতে যাদুর ছোয়া আছে| ওর হাতটা বুকে রাখতেই সে সুস্থ হয়ে উঠেছে| খবর পেয়ে রাতুল বাদল আর অমলের বাবা মাও ছুটে এসেছে| তারা সবাই পুরোনো ব্যাথাটা আবার বুকের মধ্যে নতুন করে অনুভব করতে লাগলেন| অমলের বাবা মা কিছু ভাবলেন না কিন্তু রাতুল আর বাদলের মা বার বার বলতে লাগলেন ওদের কবর খুড়ে বের করে নিশিকান্তর হাত ছোয়াতে হবে| বড় মসজিদের ইমাম সাহেব সব শুনে বলেছেন এটা গোনাহের কাজ আর তাছাড়া মৃত মানুষকে কোন মানুষ জীবিত করতে পারেনা| যদি জীবিত হয় তবে কেয়ামত হয়ে যাবে| কিন্তু সন্তান হারা মায়ের বাধ ভাঙ্গা আকুতি এবং সেই সাথে সবাই ইমাম সাহেবকে অনুরোধ করলেন অনুমতি দেয়ার জন্য| উপায়ান্ত না দেখে তিনি এ কাজের অনুমতি দিলেন তবে এও বলে রাখলেন যে কোন উপকার হবেনা| শেষে অনেক মানুষের উপস্থিতিতে ওদের লাশ ওপরে তোলা হল| অনিচ্ছা সত্তেও নিশিকান্ত সেই মৃত লাশের বুকের ওপর হাত রাখলো| সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলো কী ঘটতে যাচ্ছে তা দেখার জন্য| কিন্তু তেমন কিছুই ঘটলোনা| ইমাম সাহেবের কথাই যে ঠিক সেটা নিশিকান্তও জানতো তারপরও তাকে সেটা করতে হলো| সবার চক্ষু ছানাবড়া করে দিয়ে তাই রাতুল বা বাদলের মৃত দেহ জীবিত হয়ে উঠে বসলোনা| শেষে হতাশায় ডুবে যাওয়া মানুষ গুলি আবার মৃত দেহ দুটি মাটিচাপা দিল| ওপর ওপর রাতুল আর বাদলের মা পূণরায় ছেলের লাশ দেখে আরো বেশি শোকাহত হয়ে পড়লেন| একদিন দুদিন করে করে সবার মধ্যেই শোক কাটিয়ে ওঠার শক্তি সঞ্চারিত হল| ওরাও আবার স্কুলে যাওয়া শুরু করলো| শ্রীকান্ত এখন নিশিকান্তকে ভীষণ পছন্দ করে| যদিও নিশিকান্ত ওকে দূরে দূরে রাখে| এমনকি নিশিকান্ত তিহামীর সাথেও মেশেনা| এর মাঝেই ওর মা ওকে গাইড বই গুলি কিনে দিয়েছেন| তাই সে তিহামীর কাছে আগের মত বইও আনতে যায়না| দেখতে দেখতে দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষার সময় এসে গেল| পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে সবাই তখন ব্যস্ত হয়ে পড়লো| ব্যস্ত নিশিকান্ত নিজেও| তার কেন যেন মনে হচ্ছে পরীক্ষাটা খুব ভাল হবে| যখন বই খুলে পড়তে বসে তখন মনে হয় পড়াগুলি আপনাআপনিই তার মাথার ভিতরে ঢুকে পড়ছে| নিশিকান্ত তাই পড়ালেখা বা পরীক্ষা নিয়ে কুব একটা ভাবছেনা| তার মন বার বার ফিরে যাচেছ সে রাতে একজন বৃদ্ধা মহিলাকে সে সে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল| যদিও বাস্তবে তা ঘটেনি| সেই রাতে সেই সাপের চোখ থেকে যে আলোক রশ্মি বেরিয়ে নিশিকান্তর চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিল তার পর থেকেই নিশিকান্তর মাঝে এমন পরিবর্তন| সব কিছুই ঠিক আছে কেবল ঠিক নেই একটি বিষয় আর তা হলো নিশিকান্ত কাউকে আঘাত করলেই সেখানে ঘা হয়ে যাচ্ছে| এজন্য নিজেকে বড় নিষ্ঠুর ও খারাপ মনে হচ্ছে| এসব ভেবে ভেবে নিশিকান্তর মনটা বিষিয়ে উঠছে|
গত পরীক্ষায় ভাল করতে পারেনি বলে তিহামী এবার আরো বেশি গুরুত্ব দিয়ে পড়াশোনা করছে| তিহামীর বাবা ছেলের এই অতিরিক্ত পড়াশোনা দেখে খুব বেশি অবাক হলেন| তিনি জানেন তার চেলে ক্লাসের ফাস্ট বয়| এমনকি সে প্রতিদিন দুই ঘন্টা করে পড়লেও তার চেয়ে বেশি ন¤^র কেউ পাবেনা | তিহামীর বাবা এটা নিয়ে শুধু নিজেই গর্ব করেন না বরং স্কুলের শিক্ষকেরাও তিহামীকে নিয়ে গর্ব করে| সেই তিহামী কিনা খেলার মাঠে যাওয়া বন্ধ করে লেখাপড়ায় অত্যাধিক মনোযোগ দিয়েছে এটা অবাক হবার মতই বিষয়| এমনকি সে কম্পিউটারের সামনেও আর আগের মত বসেনা| বাসার ছাদে উঠে আর আগের মতো ঘুড়ি উড়ায় না| তিহামীর ছোট ভাই ওকে আদুরে গলায় বলে চলনা ভাইয়া ঘুড়ি উড়াই কিন্তু তিহামী ওঠেনা| তিহামীর একটাই ভাবনা সাধারণ একটা ছেলে যে কিনা কোন পরীক্ষায় চল্লিশের বেশি ন¤^র পায়না সেই ছেলেটা সব বিষয়ে সবাইকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে কিভাবে? তাই তাকে ঠিক থাকতে হলে আরো বেশি মনোযোগি হতে হবে| তিহামীর বাবা অবশ্য এসব জানে না| জানলে হয়তো তিনিও অবাক হতেন যে তার ছেলেকেও কেউ একজন টপকে যাচ্ছে| তিহামী নিজেই ব্যাপারটা বাবার কাছে চেপে গেছে| মনে করেছে কোন একটা কারণে নিশিকা&ত ওর েেয় ভাল করলেও এবার নিশ্চই ও নিশিকান্তকে পিছনে ফেলবে| সেই আশা বুকে নিয়ে তিহামী কঠোর পরিশ্রম করতে লাগলো| শিক্ষকদের সবার নজর তিহামীর ওপর| পাশাপাশি হঠাৎ ঝলসে ওঠা নিশিকান্তর ওপরও শিক্ষকদের খানিকটা নজর পড়েছে| জুলাইয়ের ২২ তারিখে পরীক্ষা শুরু হলো| তিহামী অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো পরীক্ষার আগে নিশি ওরকাছে নোট নিতে কিংবা কোন প্রশ্নগুলো কমন আসতে পারে তা জানতে আসেনি| মনেমনে তিহামী ওকে দেমাগী সাব্যস্ত করেছে| পরীক্ষায় ভাল করে ও ওকে দেখিয়ে দেবে| প্রথম পরীক্ষার দিন দেখাগেল তিহামীর পড়ে আসা প্রশ্নই এসেছে তবে একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে| মোটামুটি সুন্দর করে সাজিয়ে গুছিয়েই সবগুলোর সে উত্তর দিয়েছে| পরীক্ষা শেষে তিহামী নিশিকান্তর কাছে ওর পরীক্ষা কেমন হয়েছে জানতে চাইলে সে জানালো পরীক্ষা ভাল হয়নি| এমনটি হবে তা আগেই ভেবেছিল তিহামী| আগ বাড়িয়ে তাই বলেই ফেললো কালকে আমার বাসায় আসলেই পারতি আমি তোকে বলে দিতাম কোন প্রশ্নগুলো আসতে পারে| তাহলেই পরীক্ষা ভাল দিতে পারতি| ঠিক আছে আজ আসিস আমি তোকেবুঝিয়ে দেব আগামী কালের পরীক্ষায় কোনগুলো আসার সম্ভাবনা বেশি| নিশিকান্ত ওর কথায় হ্যা বা না কোন কিছুই বললোনা| তিহামী ওর কাধে হাত রেখে বললো অত ভেঙ্গে পড়ছিস কেন? আমিতো আছি| নিশি কে জানালো বিশেষ কারণে ও যেতে পারবেনা| প্রতিযোগিতা করার ইচ্ছে থাকলেও নিশিকান্তকে মনে মনে তিহামী অনেক ভালবাসে| বিকেলে তাই নিজেই সে নিশিদের বাড়িতে আসলো| ওকে দেখে নিশিকান্তর মা ভীষণ খুশি| এমন একটা মেধাবী ভদ্র ছেলে তার ছেলের সাথে মেশে ,বাসায় আসে সেটা খুশির কথা| যে কোন বাবা মাই চায় তার ছেলের মেয়ের বন্ধুরা হোক মেধাবী ভদ্র এবং মানবীয় গুনাবলীর অধিকারী| কিছু বাবা মা আছে ভিন্ন| তারা তাদের স্ট্যাটাস নিয়ে ভীষণ চিন্তিত থাকে| ছেলেকে তাই গরীব বন্ধুদের সাথে মিশতে দিতে চায়না| যার ফলশ্রুতিতে বড়লোক বখাটে ছেলেদের সাথে মিশে সুন্দর ছেলেটাই হয়ে ওঠে অমানুষ| বন্ধু নির্বাচনে আভিজাত্যকে প্রাধান্য দিতে হয়না| প্রাধান্য দিতে হয় মানুষের মেধা,চরিত্র এবং মানষিকতাকে| বন্ধু কখনো অন্য বন্ধুর বাসায় এসে চিরকাল পড়ে থাকেনা| কিংবা সাহায্যের জন্যও হাত পেতে থাকেনা| পরস্পরের মধ্যে সুখদুঃখ ভাগাভাগি করে নেয়ার নামই প্রকৃত বন্ধুত্ব| বয়সের ফ্রেমে বন্ধুত্বকে বেধে রাখা ঠিক নয়| একজন এগার বছরের ছোট্ট ছেলের সাথে পচিশ বছর বয়সের এক যুবকের বন্ধুত্ব হতেই পারে এতে দোষের কিছু নেই| এতে করে পরস্পর পরস্পরের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারে| নিশিকান্তর মা তাই তিহামী দেখে বেশি খুশি| নিশি তখন পড়ার টেবিলে বই খুলে নিয়ে বসে আছে| চোখ ড়ুটো বইয়ের পাতায় না রেখে খোলা জানালা দিয়ে সুদুর আকাশের সীমাহীন নীলিমায় তাকিয়ে আছে| নিশি ইদানিং দার্শনিকের মতো তাকিয়ে থাকে এটা শ্রীকান্তের অভিব্যক্তি| তাকে দেখলে সব সময় ভাবুক মনে হয়| তিহামী ওর পাশেগিয়ে বসেছে অথচ ও টেরও পায়নি| ওর কাধে একটা হাত রাখতেই নিশি ফিরে তাকালো| ওর চোখের নিচে কালো দাগ পড়েছে| অনেক দিন না ঘুমোলে যেমনটি হয় ঠিক সেরকম| তিহামী ভেবেছে ও পড়ালেখা নিয়ে এত চিন্তিত| তিহামী ওকে আবার শান্তনার সুরে বললো আমি যেগুলো বলছি এগুলো পড় তাহলেই সব কমন পড়বে| নিশিকান্ত মাথা নাড়লো| এটা সম্মতি জ্ঞাপন নয় সে বরং মুখ দিয়ে বললো তার মনে হয় ঐ প্রশ্নগুলোর সবগুলো আসবেনা| সে নিজেই তিহামীকে কিছু প্রশ্ন দেখিয়ে বললো আমার মনে হয় এগুলো আসবে| নিশির দেকানো প্রশ্নগুলো মনে রাখলো তিহামী| বাসায় ফিরে এসে নিজের পছন্দ মতো প্রশ্নগুলো পড়ার পর চিন্তায় ডুব দিল| নিশির কথা ফেলে দেয়ার মত নয়| গত পরীক্ষাতেও সে যা বলেছিল সেগুলোই এসেছিল| তিহামী তাই অতিরিক্ত হিসেবে ঐ প্রশ্নগুলোও পড়ে রাখলো| পরদিন পরীক্ষা দিতে গিয়ে তিহামী নিশিকান্তর অনুমানযে একশ ভাগ সত্য তার প্রমান পেল| এরপরদিন থেকে প্রতি পরীক্ষায় নিশিদের বাড়ীতে গিয়ে ওর কাছ থেকে সাজেশান্স নিয়ে তিহামী সে অনুযায়ী পরীক্ষা দিতে লাগলো| ফলাফল সেই আগের মতই| তিহামীকে ছাড়িয়ে নিশি অনেক বেশি ন¤^র পেল| ক্লাসে ওর মর্যাদা বৃদ্ধি পেল| যারা ওকে দূরে দূরে রাখতো তারাও ক্রমে ক্রমে ওর বন্ধু হতে শুরু করলো| তিহামীতো ওকে আরো বেশি পছন্দ করতে শুরু করলো| নিশিকান্তদের ঘরের সাথে লাগোয়া কোন বাথরুম নেই| ভদ্র সমাজে যেটাকে এটাচ বাথরুম বলে| বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে বাঁশ ঝাড়ের পাশে টিনের বেড়া দেয়া টয়লেট| নিশিকান্তদের বাসা শহরে হলেও ওদের বাড়ীটা যে জায়গাতে সেটা অনেকটাই গ্রাম্য পরিবেশ| এক অন্ধকার রাতে নিশি বের হলো বাথরুমে যাওয়ার জন্য| চারদিকে তখন কোথাও কোন আলো নেই| কোথাও কোন পাখিদের ডাক নেই| সারা শহরে একটা জনমানুষ জেগে নেই| কেবল কিছু রাতপ্রহরা ঝিঁঝিপোকা অবিরাম ডেকে চলেছে| নিশিকান্ত ঘর থেকে বেরিয়ে একাকী হাটছে আর এই বিচিত্র প্রাণী ঁিঝি পোকার কথা ভাবছে| নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলো আচ্ছা ঝিঁঝি পোকার ইংরেজি কী? নিজেই আবার উত্তর দিল জানিনাতো| ঠিক তখনই ও শুনতে পেল কেউ একজন ওর কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলছে ঘরে ডিকশনারী আছে দেখেনাও| নিশিকান্ত চারদিকে খুজেও কাউকে না পেয়ে বাবলো নিজের মনই হয়তো কথাটা বলেছে| সে তখনই ঘরে গিয়ে অভিধানটা খুলে দেখলো ঝিঁঝিপোকার ইংরেজি হচ্ছে ক্রিকেট| এটা দেখে ওর খুব আন্দ হলো| যে খেলাটা সবার প্রিয় সেটার অর্থই ঝিঁঝিপোকা! স্কুলে বন্ধুদেরকে জিজ্ঞেস করে তাক লাগিয়ে দেয়া যাবে| ভাবতে ভাবতে সেআবার ঘর থেকে বের হয়ে বাথরুমের দিকে যেতে লাগলো| হঠাৎ একটা আলোর ঝলকানি চারদিকে মুহূর্তের জন্য আলোকময় করে সা করে চলে গেল| ও জানতো এটা একটা উল্কাপিন্ড তাই ওকে এটা বেশি ভাবান্তর করলোনা| নিশিকান্ত বাথরুমের কাজ শেষ করে পানির বদনাটা খুজতে গিয়েই পড়লো বিপত্তিতে| মনে পড়লো পানির বদনাটা উঠোনেই ফেলে রেখে চলে এসেছে| এখন কী করা যায় ভাবতেই ওর হাসি পাচ্ছিল| ঠিক এমন সময় ও দেকলো টয়লেটের দরজাটা আপনা আপনি খুলে যাচ্ছে এবং শূণ্যে বাসতে ভাসতে পানির বদনাটা ওর সামনে এসে নিচে মাটিতে নেমে গেল| টয়লেটের দরজাটা তখন ভেতর থেকে বন্ধ ছিল | কিন্তু কিভাবে খুলে গেল ,কে খুললো তা ভেবে ও ভয় পেয়ে গেল| শেষে তাড়াহুড়ো কওে পানি খরচ কওে হাত ধুয়ে দ্রুত ভয়ে ভয়ে বেরিয়ে আসলো| কিছুক্ষণ পরেই ও লক্ষ্য করলো ওর জড়তা ভয় সব কেটে গেছে| সব কেমন ভূতুতে কান্ড বলে ওর মনে হলো| দ্রুত বিছানায় গিয়ে কাথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকে| সকালে ঘুম থেকে উঠেও মাকে কিছু বলেনা| ঐ দিনের পর থেকে নিশিকান্ত অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো সে যখন যেখানেই যায় মনে হয় কেউ একজন তার পিছনে পিছনে হাটছে| পিছন ফিওে তাকাতেই সে কাউকে দেখতে পায়না| এভাবেই সুখে দুখে কাটতে থাকে মা ছেলের ছোট্ট সংসার| এর কিছুদিন পর মুকুল নিকেতন স্কুলের উত্তর পার্শ্বে যে চারতলা বিল্ডিংটি দেখা যায় ঐ বিল্ডিং এর ছাদে উঠেছিল তিহামী নিশিকান্ত এবং ওদেও বন্ধুরা| হঠাৎ ধাক্কা ধাক্কি করতে গিয়ে অনিক নামের ছেলেটা পা পিছলে ছাদ থেকে পড়ে যাচ্ছিল| নিশিকান্ত সেটা দেখেই দ্রুত ওর হাত টেনে ধরলো| শেষে বিপদ যা ঘটার ঘটে গেল| অনিকের মোটা শরীরের ভার সইতে না পেরে টান লেগে অনিকেরসাথে সাথে চারতলা থেকে নিশিকান্তও পড়ে গেল| ওদের দুজনের পড়ে যাওয়ার শব্দে চারদিক থেকে ছাত্র ছাত্রী ও শিক্ষকেরা ছুটে আসলেন| নিশিকান্ত ততক্ষণে শোয়া থেকে উঠে বসেছে| পাশে নিশ্চুপ অবস্থায় অষাড় হয়ে পড়ে আছে অনিক| অনিকের কোন সাড়া শব্দ নেই| নিশিকান্ত অবাক বিস্ময়ে নিজের শরীর দেখতে লাগলো| চারতলা থেকে পড়ে গিয়েও ওর হাড়গোড় একটুও ভাঙ্গেনি,মচকায়নি এমনকি একটু আচড়ও লাগেনি| ওদিকে একই সাথে অনিকও ছাদ থেকে পড়ে গিয়েছে কিন্তু তার কোন সাড়াশব্দ নেই| নিরবতা ভেঙ্গে বিজ্ঞানের স্যার দীনেষ কান্তি নাথ অনিকের লুটিয়ে পড়া দেহের কাছে এসে বসলেন| গায়ে হাত দিয়ে ধাক্কা দিলেন| অনিক অনিক বলে বার কয়েক ডাকও দিলেন | কিন্তু অনিকের কোন সাড়া নেই| নিজে যতটুকু বোঝেন তাতেই হাত ধরে নাড়ির স্পন্দন দেখলেন| মনে হল সেখানে সব গুলো ধমনী নিস্তেজ হয়ে গেছে| শেষে তাড়াহুড়ো করে অনীককে সদর হাসপাতালে নেয়া হলো| ডাক্তারেরা অনিক নামের ফুটফুটে ছেলেটাকে মৃত ঘোষনা করলেন| আবার একটা লাশ কাধে করে সবাই ছুটলো কালী তলা শশ্মানে| চোখ বেয়ে বেরিয়ে আসলো ব্যাথার অশ্রু| সবাই আরো বেশি অবাক হলো নিশিকান্তকে দেখে| একই সাথে সেও ছাদ থেকে নিচে পড়ে গিয়েছিল অথচ তার কিছুই হলোনা! চারদিকে গুঞ্জন উঠলো এই ছেলে নিশ্চই যাদু জানে| আবার কেউ কেউ বলতে লাগলো এ আসলে মানুষ না মানুষের ছদ্মবেশে প্রেতাত্মা| কেউ কেউ বললো ওর সাথে জ্বীন ভূত আছে| নইলে এত্তো সব কান্ড ঘটে| কোন কোন গার্ডিয়ান জোর আওয়াজ তুললো এই অভিশপ্ত অপায়া ছেলেটাকে স্কুল থেকে বের করে দিতে হবে নইলে আমাদের বাচ্চাদের এই স্কুলে আর রাখবোনা| ঐ ছেলের সাথে মারামারি করে তিন তিনটে ছেলে অকালে প্রাণ দিয়েছে| ঐ ছেলের সাথে থেকে আজ আবার আরেকটা ছেলে প্রান দিল| সব ওর দোষ ওকে স্কুল থেকে বের করে দিন| গার্ডিয়ানদের কেউ কেউ নিরব থাকলো আবার কিছু সংখ্যক গার্ডিয়ান নিশিকান্তর পক্ষ নিয়ে বললো শুধু শুধু আপনারা ছেলেটার ওপর দোষ চাপাচ্ছেন কেন? তিনটা ছেলে মারা গেলেও শ্রীকান্ততো বেঁেচ গেছে| তাহলে ছেলেটার দোষ কোথায়? এমনকি ছাদ থেকে পড়ে যাওয়ার সময় নিশিকান্ত নিজেওতো ওকে বাঁচাবার জন্য চেষ্টা করেছে| কিন্তু অধিকাংশ গার্ডিয়ান এসব কথা গায়ে মাখলোনা| শেষে সবাইকে বুঝিয়ে সুজিয়ে প্রধান শিক্ষক সিদ্ধান্ত নিলেন ফাইাল পরীক্ষা শেষ হলে তার পর না হয় নিশিকে টিসি দিয়ে দেয়া যাবে| সকলের সব কথা শুনে নিশিকান্তর মনটা বিষিয়ে উঠলো| ইচ্ছে হলো বই খাতা সবার মুখে ছুড়ে মেরে মুখে থুথু ছিটিয়ে স্কুল থেকে বেরিয়ে যায়| আর স্কুল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় মুখে বলতে বলতে যাবে এই স্কুলের নিকুচি করি| মনে মনে জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে গেলেও নিশিকান্ত মুখে কিছু বললোনা| সে তার মাকে অনেক ভালবাসে| মা যা বলে ও শুধু তাই করে| এখন ওকে নিয়ে যত কথাই হোকনা কেন মায়ের কথা ছাড়া আর কারো কোন কথাই ও কানে তুলবেনা| নিশিকান্তর মা চিন্তায় পড়ে গেলেন| চিন্তায় পড়ে গেল তিহামী এবং শ্রীকান্ত| নিশিকে ছাড়া ওদের একদিনও চলবেনা| শিক্ষকদের চিন্তা আরো বেশি| ছাত্র হিসেবে নিশিকান্ত এখন সবার চেয়ে ভাল| তাকে স্কুল থেকে বের করে দেয়া ঠিক হবেনা| আর তাছাড়া শিক্ষকদের কারো কাছেই মনে হয়না যে সব ঘটনা ঘটেছে তার জন্য আসলেই নিশিকান্ত দায়ি| আবার ওকে স্কুলে রাখলেও বিপদ| অন্য অভিভাবকেরা হুমকি দিয়েছে তাদের বাচ্চাকে নিয়ে যাবে| এক নিশিকান্তর কথা চিন্তা করেতো আর স্কুলের অনেক বাচ্চা হারাতে চাবেনা| শিক্ষকেরা কেবল ভাবতে লাগলেন আসলে কি করা উচিৎ| নিশিকান্ত ওসব নিয়ে মাথা ঘামালোনা| সে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী বালক| চিন্তা শুধু কেবল মাকে নিয়ে| মা ওর চিন্তায় চিন্তায় পাগল হয়ে যাবে| মা ওকে ঘিরে কত শত ছবি আকে ¯^প্ন দেখে | সেই ¯^প্নকে যেকরেই হোক বাস্তবায়িত করবে বলেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বালক নিশিকান্ত| খেয়ে না খেয়েও স্কুলে যেতে তাই নিশিকান্তর কোন আপত্তি ছিলনা| ও নিজে একা হলে কোন কথাই ছিলনা| কোন না কোন স্কুলেতো ওকে অবশ্যই ভর্তি করে নেবে| ঐদিন বিকেলে আগের মতই একাকী বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে রেল লাইনের ওপর বসে থাকলো নিশিকান্ত| খুজতে খুজতে তিহামী আর শ্রীকান্তও ওর কাছে চলে আসলো| সত্যিকারের বন্ধুর মতো ওর পাশে বসে ওর কাধে হাত রাখলো| অনেক কিছু নিয়ে কথা হল| ওরা দুজনে ওকে শান্তনা দিয়ে ওকে বললো দেখিস কিছুই হবেনা| তোর কোন দোষ নেই| এসব কথায় নিশিকান্তর মনের কোন পরিবর্তন হলনা| তারমন না দুঃখ বারাক্রান্ত আর না আনন্দে উদ্বেলিত| সে সরল মনেই বললো ওসব নিয়ে আমি কিছু ভাবছিনা| আমি ভাবছি আমাদের স্কুলে এমন একটা সংগঠন খুলবো যারা ব্যাথিত মানুষের পাশে গিয়ে দাড়াবে| যেসব ছাত্র ছাত্রী গরীব তাদেরকে সাহায্য করবে| ওর কথা শুনে তিহামী এবং শ্রীকান্ত বেশ পুলকিত হলো| কী কী পরিকল্পনা করেছে তা জানতে চাইলো| শেষে নিশি ওদেরকে সব খুলে বললো| প্রথমে আমাদের ক্লাস থেকে কাজ মুরু করবো| আমরা যারা মোটামুটি সচ্চল পরিবার থেকে এসেছি অর্থাৎ যাদের বাবা মা প্রতিদিন আমাদের টিফিনের জন্য কিছু কিছু টাকা দেয় সেই সব ছাত্র ছাত্রীরা প্রতি মাসে টিফিন থেকে অন্তত পাঁচ টাকা বাচিয়ে একজনের কাছে জমা রাখবো| আমাদের ক্লাসে যেহেতু আড়াইশো ছাত্র ছাত্রী তাহলে তাদের ভিতর থেকে প্রায় দুইশো জন আছে যারা টিফিন থেকে এভাবে টাকা জমাতে পারি| দুইশো জন পাঁচ টাকা করে দিলে প্রতি মাসে এক হাজার টাকা জমা হবে| সেই টাকা আমরা আমাদের গরীব বন্ধুদের দেব যাতে করে তা দিয়ে তারা খাতা কলম কিনতে পারে| আমরা এর পর অন্য ক্লাস গুলোতে যাব এবং তাদেরকে বুঝাবো| এভাবে সবাই যদি এগিয়ে আসে তবে সবার মধ্যে বন্ধুত্ব সৃষ্টি হবে| আমাদের ছোট ছোট দুঃখ গুলো দূর হয়ে যাবে| ওর কথা শুনে আনন্দে একেবারে হাত তালি দিয়ে উঠলো তিহামী এবং শ্রীকান্ত| পরিকল্পনা করতে করতে ওদের অজান্তেই অনেক রাত হয়ে গেল ওরা তা টেরই পেল না| একসময় খেয়াল হল চারদিক অন্ধকার হয়ে গেছে বাড়ি ফিরতে হবে| তিন জনই উঠে পড়লো এবং রেললাইন ধরে হাটতে লাগলো| পথে যেতে যেতে তিহামী মনের অজান্তেই বলে ফেললো ঐ গার্ডিয়ানগুলো কিরকম দেখলি! নিশি ফাষ্ট হচ্ছে দেখে সব দোষ ওর ঘাড়ে চাপিয়ে ওকে তাড়ানোর ফন্দি আটছে| ওদের মুখ যদি বন্ধ হয়ে যেত তাহলে কেমন হতো? নিশিকান্ত কোন উত্তর দিলনা| শ্রীকান্ত বললো খুব ভাল হত| ওনারা মজা টের পেতেন| এবার দুজন মিলে নিশিকান্তর মতামত জানতে চাইলো| দুজনের ভীষন রকম চাপাচাপিতে শেষে বাধ্য হয়েই নিশিকান্ত বলে ফেললো ঠিক আছে বন্ধ হয়ে যাক| বন্ধ হলেই যদি ভাল মনে হয়| শ্রীকান্ত বা তিহামী কিছুই টের পেলনা কিন্তু নিশি ঠিকই শুনতে পেল তার কানের কাছে কেউ একজন ফিসফিস করে বলছে তুমি যখন বলছো তখনতো বন্ধ হতেই হবে| নিশিকান্ত চমকে উঠলো| সর্বনাশ ! একথাটা কেন সে মুখে উচ্চারণ করলো| সত্যি সত্যি যদি ওনাদের কথা বন্ধ হয়ে যায় তাহলে আর উপায় থাকবেনা| কিন্তু কানের কাছে কে ফিসফিস করে কথা বললো? প্রথমে ভাবলো তিহামী বা শ্রীকান্ত ফিসফিসিয়ে কথা বলেছে পরক্ষনেই ওর মনে হলো ওরা কেউ বলেনি| ওরা বললে ফিসফিসিয়ে বলতো না| এদিক ওদিক ফিরে দেখলো কাউকে দেখা যায় কিনা কিন্তু কাউকে পেলনা| নিশিকান্তর এহেন আচরণ দেখে ওরা দুজনও অবাক হলো| জিজ্ঞেসকরলো ওভাবে কী দেখছিস? নিশিকান্ত বললো কে যেন কানের কাছে ফিসফিসকরে কথা বলছে| তোরা কি কেউ শুনতে পাচ্ছিস? ওরাও তাকিয়ে দেখলো কেউ নেই তখন ওরা বললো না আমরাতো কিছু শুনতে পাচ্ছিনা| শেষে নিশি ভাবলো ও নিজেই মনের ভুলে এসব চিন্তা করছে| সব মনের ভুল ভেবে তিনজনই নিজ নিজ বাসায় ফিরে গেল|
আগষ্টের দ্বিতীয় রবিবার মুকুল নিকেতন স্কুলটা এগারটারমধ্যেই ছুটি হয়ে গেল এবং নোটিশ আসলো স্কুল আগামী তিনদিন বন্ধ থাকবে| কেন বন্ধ থাকবে কিসের বন্ধ তা ছাত্র ছাত্রীরা কেউ বুঝে উঠতে পারলোনা| রাস্তায় যেতে যেতে ছাত্র ছাত্রীরা খুব আলোচনা করতে লাগলো| দু চারজন ছাত্র ছাত্রীকে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে দেখা গেল| শ্রীকান্ত ভাবলো আহা বেচারীরা স্কুলটাকে কতইনা ভালবাসে যে স্কুল বন্ধ হয়েছে বলে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে| তিহামী ওর কথা মানলোনা বললো এরাতো দুষ্টুর শিরোমনি,একদিন স্কুল বন্ধ হলে এদের ভীষণ আনন্দ হয়| নিশ্চই ওরা অন্য কোন কারণে কাঁদছে| ওরা তখন একজনের কাছে গিয়ে তার কাধে শান্তনার হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো কাদিস না মাত্র তিনদিন পরইতো স্কুল আবার খুলবে তখন আবার মজা করবি| ছেলেটা ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছিল এবং সেই অবস্থাতেই জানালো যে সে স্কুলের জন্য কাঁদছেনা | রহস্যের গন্ধ পেয়ে তিহামী ছেলেটার গা ঘেসে দাড়িয়ে সুর নরম করে ওর কান্নার কারন জানতে চাইলো| ছেলেটা ওদের যা জানালো তাতে ওদের ভীমরতি খাবার উপক্রম| ছেলেটার বাবা তাদেরই একজন যারা স্কুলে এসে উচ্চবাচ্য করেছিল এবং নিশিকান্তকে স্কুল থেকে তাড়িয়ে দেবার দাবী তুলেছিল| সেই লোকটি ঐ দিনের পর থেকে এই এক সপ্তাহ কোন কথা বলতে পারছেনা শুধু আ আ শব্দ করছে| এটা শুনে নিশিকান্তদের চোখ কপালে| কোন মতে শান্তনা দিয়ে কান্না রত আরেকটি ছেলের কাছে গিয়ে একই ভাবে তার কান্নার কারণ জানতে চাইলে সেও জানালো তার বাবা কথা বলতে পারছেনা| নিশিকান্তর কাছে ব্যাপারটা পুরোপুরি পরিস্কার হয়ে গেল| তার মুখের কথাই ফলে গেছে| এটা নিশ্চই যে ফিসফিস করে কথা বলেছিল তার কারসাজি| এটাও পরিস্কার হয়ে গেল যে স্কুল কেন তিনদিন ছুটি ঘোষনা করা হয়েছে| শুধু পুরোপুরি পরিষ্কার নয় তিহামী বা শ্রীকান্তর কাছে| অবশেষে ওরা একে একে সবার কাছেই জানতে পারলো যে সবার বাবার ক্ষেত্রেই একই ঘটনা ঘটেছে| সারা পথ হাটতে হাটতে তিহামী এবং শ্রীকান্তকে অনেকটা উৎফুল্লই মনে হল| বার কয়েক বলেই ফেললো যে আমাদের প্রার্থনা কাজে লেগেছে,ব্যাটারা শাস্তি পেয়েছে| ওদের কথায় নিশিকান্তর মনে তেমন কোন ভাবান্তর হলোনা| সে নিরবে নিজের মত করে চিন্তা করতে করতে হাটতে থাকলো| ওর এখন অনেক ভাবনা| সেই ভয়াল রাতের পর থেকে সে মুখে যা উচ্চারন করছে তাই ফলে যাচ্ছে| এখন থেকে সব কিছু ভেবে চিন্তে বলতে হবে| বাসায় ফিরতে ফিরতে ওদের দুপুর গড়িয়ে গেল| কথা ছিল স্কুল থেকে ফিরে নদীতে যাবে গোসল করতে| কিন্তু বাড়ি ফিরে নিশিকান্তর একটুও ইচ্ছে হলনা নদীতে যেতে| সে দুপুরে কোন মত খেয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল এবং গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল| ঘুমের মাঝে সে নানা রকম ¯^প্ন দেখতে লাগলো| ওদিকে বন্ধুরা সবাই নদীর ঘাটে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে করে শেষে নিজেরা গোসল করে ফিরে গেল| খোঁজ নিয়ে দেখা গেল সত্যি সত্যি ঐ দিন যে সব গার্ডিয়ান নিশিকান্তকে স্কুল থেকে বের করে দেয়ার দাবী জানিয়েছিল তারা কেউই কথা বলতে পারছেনা| স্কুল বন্ধ তাই তিহামীর ইচ্ছে হল ঐ লোকগুলিকে একটু দেখতে যাবে| সে শ্রীকান্তকে রাজি করিয়ে নিশিকান্তদের বাড়ীতে গেল| নিশিকান্ত কিছুতেই যেতে রাজি নয়| তার পরও ওরা নাছোড়বান্দা| শেষে তিনজন মিলে লোকদের দেখতে বের হলো| প্রথমে ওরা সানীর বাবাকে দেখতে গেল| দেখা গেল তিনি নির্বাক বসে আছেন| ওদের দেখে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলেন কিন্তু কিছুই বলতে পারলেন না| সানী বারান্দার একপার্শ্বে মুখ গোমরা করে বসে আছে| সানীর মা ¯^ামীর পাশে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে| ওদের দেখেও তার মধ্যে তেমন কোন পরিবর্তন দেখা গেল না| এরপর ওরা গেল নিতাইদের বাসায়| নিতাইয়ের বাবা শ্যামল দত্ত এমনিতে ভীষণ রাগী মানুষ কিন্তু গিয়ে দেখা গেল একদম শক্তিহীন রোগা মানুষের মত তিনিও নিশ্চুপ হয়ে গেছেন| ওদের দেখে তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো| নিতাই ওর মাকে ওদের তিনজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল| নিশিকান্তর নাম শুনতেই নিতাইয়ের মা রেগেমেগে আগুন| পারলে তখনই নিশিকান্তকে প্রায় মেরেই বসে| নিশিকান্তর বিরুদ্ধে তার হাজারটা অভিযোগ| তার ধারনা নিশিকান্তর জন্যই তার ¯^ামী আজ কথা বলতে পারছেনা| সে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করলো| অন্তরের বিষ ঢেলে দিল নিশিকান্তর ওপর| একজন মানুষ কতক্ষণ মুখ বুজে গালিগালাজ সহ্য করতে পারে? নিশিকান্তর মাথায় রাগ উঠে গেল| সেও বড় মানুষের মত রাগে ফুলতে লাগলো| ওর চেহারা অগ্নিমুর্তি ধারন করলো| শরীর থেকে গরম হাওয়া বেরতে লাগলো| চিৎকার করে বললো চুপ করুন আপনি| আমার জন্য আপনার ¯^ামীর কথা বলা বন্ধ হয়েছে তাইনা? আপনার ¯^ামীতো ভান ধরেছে কথা না বলার| আমি তার ভান এক্ষুনি ছুটিয়ে দি&িচ্ছ বলেই কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই বারান্দার কোনায় পড়ে থাকা ফুল ঝাড়ুটি তুলে নিয়ে নিতাইয়ের বাবার পিঠে সপাং সপাং দুবার মেরে বসলো এবং বললো কথা বল শালা হারামি| মুখ বন্ধ করে ভান ধরেছিস? ওর আচরণে নিতাই সহ উপস্থিত সবাই হতভ¤^ হয়ে গেল| এরপরই হঠাৎ থেমে গেল নিশিকান্ত| রাগের মাথায় কী অন্যায়টাই না করে ফেলেছে সে| এমন সময় সত্যি সত্যিই কথা বলে উঠলো নিতাইয়ের বাবা| সবাই ভীষণ খুশি হল| নিশিকান্ত কী করেছে তাও সবাই ভুলে গেল| কোন কিছু ঘটার আগেই নিশিকান্ত নিতাইদের বাসা থেকে হন হন করে বেরিয়ে গেল| ওর দেখাদেখি তিহামী এবং শ্রীকান্তও বেরিয়ে পড়লো| এরপর ওরা আর অন্যদের বাসায় যাওয়ার সাহস করলোনা| আবারও চারদিকে সাড়া পড়লো নিশিকান্তকে নিয়ে| অন্য যারা কথা বলতে পারছিলনা তারাও নিশিকান্তদের বাড়ীতে হাজির হল| সকলের অনুরোধে নিশিকান্ত সবকটাকে ঝাড়ুপেটা করলো কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলোনা| লোকগুলো নিতাইয়ের বাবার মত কথা বলা শুরু করলোনা| হতাশ হয়ে সবাই ফিরে গেল| কেবল কিছু দুষ্টু ছেলে মেয়ে হেসে গড়াগড়ি যেতে লাগলো এই ভেবে যে বড় বড় মানুষগুলি নিশির হাতে কিভাবেইনা ঝাড়ুপেটা খেল| ডাক্তারেরা কোন রকম অসংগতি খুজে পাননি যার কারণে লোকগুলোর কথা বলার শক্তি হারিয়ে যাবে| ওদিকে তিনদিন পর স্কুল আবার খুলে দেয়া হলো| আবার নিশিকান্তরা স্কুলে যাওয়া শুরু করলো| মাত্র পনের দিনের ব্যাবধানে ওদের ক্লাসে দেড়শো ছাত্র ছাত্রী ওদের সংগঠনে যোগ দিল| প্রথমে সিদ্ধান্ত নিল মাসে প্রতি ছাত্র পাঁচ টাকা জমা দেবে| পরে দেখা গেল সবাই দশ টাকা দিতে রাজি হয়েছে| সংগঠনের কমিটি গঠন করা হলো| অধিক্রম দত্ত স্যারকে প্রধান উপদেষ্টা এবং মনিরা মিসকে নারী উপদেষ্টা করে ষোল সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষিত হল| ঐ দিনই কম বেশি সবাই টাকা জমা দিয়ে দিল| এক মাস যেতে না যেতেই দেখা গেল ওদের সহায়তায় অন্য ক্লাসগুলোও উদ্যোগ নিয়ে কমিটি গঠন করে টাকা জমা করতে শুরু করেছে| স্থানীয় এবং জাতীয় পত্রিকায় ওদের এই সুন্দর উদ্যোগের সংবাদ ছাপা হল এবং এর একটি সুন্দর নাম আহ্বান করা হল| বিভিন্ন মহল থেকে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেল| শেষে অনেক গুলি নামের মধ্য থেকে “আলোর মেলা” নামটা সবার পছন্দ হলো| এই সংগঠনে যারা কাজ করছে তারাতো সবাই সত্যি সত্যি এক একজন আলোকিত মানুষ যারা অন্যদেরকেও আলোকিত করার চেষ্টা করছে| সেদিন থেকেই আলোর মেলার যাত্রা শুরু হলো| কিশোরগঞ্জ থেকে এ্যাডভোকেট হাসান ইমাম এই নামটি পাঠিয়েছেন| সাথে পাঠিয়েছেন দুই হাজার টাকা এবং কিছু দিক নির্দেশনা| ভদ্রলোকের প্রতি অনেকটা চির কৃতজ্ঞই থেকে গেল নিশিকান্তর দল| দুই মাস পর দেখা গেল শুধু মুকুল নিকেতন স্কুলেই জমা পড়েছে একত্রিশ হাজার টাকা| শিক্ষকেরাও কিছু কিছু টাকা দিতে লাগলেন| সেই টাকায় দরিদ্র ছেলে মেয়েরা ভাল ভাবে পড়া লেখা করার সুযোগ পেতে থাকলো| ওদের এই উদ্যোগের কথা পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর জিলা স্কুল ,বিদ্যাময়ী স্কুল সহ অন্যরাও অণুপ্রানিত হয়ে এই মহান কাজটা শুরু করলো| আলোর মেলা দিন দিন আরো সম্প্রসারিত হতে লাগলো এবং আলোর মেলাতে আরো বেশি আলোকিত মানুষের ভীড় বাড়তে লাগলো| সংগঠন বাদ দিলে পড়ালেখা সবারই আগের চেয়ে ভাল চলছে| একে অন্যকে পড়া বুঝিয়ে দিচ্ছে| এতে করে স্কুলে সত্যিকারের পড়ালেখার পরিবেশ ফিরে এসেছে| নভে¤^রের প্রথম সপ্তাহে ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হল| রাতের আকাশে পূর্ণ চন্দ্র আর তারার মেলা| দিনে পরীক্ষার চিন্তা| প্রথম দিন পরীক্ষা দিয়ে এসে নিশিকান্ত দ্বিতীয় দিনের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে লাগলো| কিন্তু পড়া কিছুতেই তার মাথায় ঢুকলোনা| কোন পড়াই সে আর মুখস্ত করতে পারছেনা| পরীক্ষার ফলাফল বেরনোর পর তাই সবার চক্ষু ছানাবড়া| নিশিকান্ত গণিত ইংরেজি,বিজ্ঞান সহ ধর্ম বিষয়েও ফেল করেছে| যে নিশিকান্ত গত দুই পরীক্ষায় সবাইকে ছাড়িয়ে সর্বোচ্চ ন¤^র পেয়েছিল সে কিনা শেষ পরীক্ষায় কোন বিষয়েই পাশ করতে পারেনি| সবার ধারণা সংগঠনে সময় দিতে গিয়ে তার পড়ালেখার এই করুণ পরিনতি| কিন্তু ভালভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায় নিশিকান্ত সংগঠনের জন্য তেমন সময় দেয়নি বরং পড়ালেখায় তার মন ছিল বেশি| এছাড়া পরীক্ষার আগে সেইতো ক্লাসের অন্যদের বুঝিয়েছে | সেই সব প্রশ্ন লিখেই অন্যরা ভাল রেজাল্ট করেছে অথচ নিশিকান্ত পাশ করতে পারেনি| নিয়ম অনুযায়ী কোন ছাত্র ছাত্রী পাঁচ বিষয়ের ওপরে ফেল করলে তাকে স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয়| তাই আরেকবার সুযোগ চেয়েও নিশিকান্ত পার পেলনা| তাকে টিসি দিয়ে বের করে দেয়া হলো| ছেলের এই দুসংবাদে মা ভারতী দেবী পাগলের মতো হয়ে গেলেন| সামনে যাকে পান খামচি মারেন,কামড়াতে আসেন| এ অবস্থায় অন্য কোন স্কুলই নিশিকান্তকে ভর্তি করতে রাজি হলনা| এমনকি নিজের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত “আলোর মেলা” নামক সংগঠনও তার পাশে এসে দাড়াতে পারলোনা স্কুল কমিটির চোখ রাঙ্গানীর ভয়ে| গোটা ময়মনসিংহে নিশিকান্তদের আত্মীয় বলতে আর কেউ নেই| এখানে থাকলে নিশ্চিত ওর মা এবং ও না খেয়ে মারা যাবে| ভেবে চিন্তে কোন উপায় বের করতে পারলোনা| যাওবা দিদি ছিল সেও গত বছর সিলেটে চলে গেছে| অনেক ভেবে চিন্তে শেষে সিদ্ধান্ত নিল জামালপুর যাবে| ওখানে মায়ের এক পিসতুতো ভাই আছে,এক সময় মা তাকে অনেক সাহায্য করেছে| এই বিপদের সময় সে নিশ্চই সাহায্য করবে ভেবে নিশিকান্ত মাকে নিয়ে জামালপুরের ট্রেনে চেপে বসলো| যাওয়ার সময় তিহামী বা শ্রীকান্ত কাউকে কিছু বললোনা| যে ট্রেনে ওরা জামালপুর যাচ্ছিল ঐ ট্রেনের টিটি ছিল একটু বেয়াদব ও গন্ডার টাইপের| টিকেট চাইতে আসলে নিশিকান্ত টিকেট দেখাতে না পারায় সে অনেক গালিগালাজ করলো| আসে পাশের কিছু যাত্রী বসে বসে তামাশা দেখলো আর কিছু যাত্রী প্রতিবাদ করলো| টিটি উল্টো তাদেরকেও একহাত দেখে নিল| “বলি ভাড়াটাকি আপনারা দিবেন যে এই নবাব জাদাকে জামালপুর নিয়ে যাব| দিন ওর আর ওর মার টিকেটের দাম দিন|” এ কথা শুনে যারা প্রতিবাদ করছিল তারাও চুপ হয়ে গেল| নিশিকান্ত রাগে দুখে কেঁদেই ফেললো| ওর চোখের পানি দেখেও টিটির মন গললোনা| ট্রেন যখন পিয়ারপুর ষ্টেশানে এসে থামলো ঠিক তখনই টিটি নিশিকান্ত এবং ওর অসুস্থ মাকে ট্রেন থেকে নামিয়ে দিল| নিশিকান্তর ভীষণ রাগ হচ্ছিল| ভরা ট্রেনে ওদের দুঃখে দুঃখী হওয়ার মতো একজনওকি লোক ছিলনা? পিয়ারপুর ষ্টেশানে ট্রেনটা দশ মিনিট থামে| এই সময়ে যাত্রীদের অনেকেই নিচে নেমে এটা সেটা কিনে খায়| সেই সব মানুষের খাওয়া দেখে নিশিকান্তর পেটের ক্ষুধা আরো বেড়ে যায়| দুঃখে অনেকটা ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে শুরু করে নিশিকান্ত| ওর কান্না দেখে হয়তো অনেকেই থমকে দাড়ায় কিন্তু পাশে এসে কাধের ওপর স্নেহের হাত কেউ বুলিয়ে দেয়না| ট্রেন ছাড়তে আজকে একটু বেশিই দেরী হচ্ছে| অন্য একটা ট্রেন ক্রস করবে বলে এই ট্রেনটা অপেক্ষা করছে| নিশিকান্ত দেখলো ট্রেনের সেই টিটি নিচে নেমে এক কোণায় দাড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে| নিশিকান্ত হঠাৎ মনের মধ্যে শক্তি খুজে পেল| হঠাৎ তার মনে হল তারতো অজানা এক ধরনের ক্ষমতা ছিল সেটা এখনো আছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখা যায়| নিশিকান্ত এক মনে টিটির দিকে তাকালো| মনে মনে বললো সিগারেটে হঠাৎ আগুন ধরে যাক এবং টিটির মুখ পুড়ে যাক| বলতে না বলতেই টিটির আত্মচিৎকার নিশিকান্তর কানে ভেসে আসলো| তাকে ঘিরে লোকজন জড় হল| সত্যি সত্যি সিগারেটের আগুনে তার মুখ অনেক খানিই পুড়ে গেছে| কেউ বুঝে উঠতে পারলোনা কেন এমনটি ঘটলো| কেউ কেউ সিগারেটের ফেলে দেওয়া অংশের দিকে মুখ নিচু করে বুঝতে চেষ্টা করলো আসলে ব্যপারটা কী| অনেকের ধারনা ˆতরীর সময় ভুল করে খানিকটা বারুদ ওর ভিতরে ঢুকে গিয়েছিল আর তাই সেই অংশে আগুন লাগতেই ফস করে জ্বলে ওঠে| আসল ঘটনাটা জানে কেবল নিশিকান্ত| ট্রেনটা কিছুক্ষনের মাঝেই ছেড়ে যাবে| ওদিকে ক্ষুধায় নিশিকান্তর পেট জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে| নিজের অজানা সেই শক্তির প্রয়োগ করে সে এবার খাবার খাওয়ার চিন্তা করলো| কিন্তু ওর সব চেষ্টাই বৃথা হয়ে গেল| ও মনে মনে ইচ্ছে করেছিল বলেই ট্রেনের টিটির মুখ পুড়ে গিয়েছিল কিন্তু হাজার বার ইচ্ছে প্রকাশ করার পরও কোন খাবার তার সামনে এসে ধরা দিল না| এভাবে আর বেশিক্ষণ থাকতে পারবেনা| হঠাৎ একটা কোমল হাত পিছন থেকে ওর কাধে এসে ঠেকলো| ফিরে তাকাতেই দেখলো ওর বয়সী একটি ছেলে দাড়িয়ে আছে| তার পাশে মাঝ বয়সি একজন লোক| লোকটি হয়তো ছেলেটির বাবা বা মামা এই ধরনের কেউ হবে| নিশিকান্ত কাধ থেকে ছেলেটির হাত নামিয়ে দিল| ছেলেটা সুন্দর পোশাক পরে আছে| আর ওর সারা শরীর ময়লায় ভরপুর| পেটে ক্ষুধার যন্ত্রনা| ছেলেটা ওর দুঃখ বুঝতে পেরেছে তাই ওকে বললো আমি তোমার একজন বন্ধুর মত| আমাদের বাসা জামালপুরে| তোমার সমস্যা আমি বুঝি তাইতো বন্ধুর মত তোমার পাশে দাড়াতে চাই| নিশিকান্ত ওর কথা শুনে একটু আশ্বস্ত হলো| ছেলেটি ওকে এবং ওর মাকে নিয়ে আবার ট্রেনে উঠে বসলো| ব্যাগে টিফিন বক্সে খাবার ছিল তা থেকে ওদেরকে খেতে দিল| কোথায় যাবে কোথায় থাক ইত্যাদি জানতে চাইলে নিশিকান্ত সব একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বললো| ছেলেটার নাম সায়ন| এক ভাই এক বোনের মধ্যে ও বড়| জামালপুর জিলা স্কুলে নিশিকান্তর মত একই ক্লাসে পড়ে| ছাত্র হিসেবে আর দশজন ছাত্রের চেয়ে অনেক ভাল| তুলনা করলে অনেকটা তিহামীর সাথে তুলনা করা যায়| সায়নের বাবা অগ্রনী ব্যাংকে চাকরী করেন| কাজের ব্যস্ততার ভিড়েও বাবা ঠিকই সায়নকে সময় দেন| এরকম বাবা খুব একটা দেখা যায়না| নিশিকান্তর সাথে ওর বাবাও অনেক কথা বলে| শেষে ট্রেন থেকে নামার সময় একটা ঠিকানা লিখে দেয়| যদি কখনো সময় হয় ও যেন সায়নদের বাসায় আসে| ওদের বাসা চামড়াগুদাম মোড়ের ওখানে| কোন রকম মাথা নেড়ে সায় দেয় নিশিকান্ত| ও আর ওর মায়ের ট্রেনের ভাড়াটা সায়নের বাবাই দিয়ে দেয়| নিশিকান্তর এতে করে ওদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে| ট্রেন থেকে নেমে সায়ন নামের ছেলেটা ওর বাবার সাথে বাসায় চলে যায়| স্টেশনে পড়ে থাকে নিশিকান্ত আর তার রোগাক্রান্ত মা| নিশিকান্ত কিভাবে ওর মায়ের সেই পিসতুতো ভাইয়ের বাসায় যাবে তা বুঝে উঠতে পারেনা| ওর কাছে কানা কড়িও নেই যা দিয়ে রিক্সা করে বাসায় পৌছাবে| আর তাছাড়া ও জানেনা তার বাসাটা ঠিক কোথায়| কোন কিছু বুঝে উঠতে না পেরে ও অনেকক্ষন মাকে নিয়ে রেল ষ্টেশনের এক পাশে বসে থাকলো| সন্ধ্যা তখন প্রায় হয় হয় এমন সময় একটা ট্রেন আসলো| ট্রেন থেকে যাত্রীরা যে যার মতো নেমে বাড়ির দিকে যেতে লাগলো| সেই ট্রেনে ঢাকা থেকে আসলো এক বিদেশী ভদ্রলোক| রেল ষ্টেশনে নেমে সে আশপাশের লোকদের কাছে সরকারী বাংলোতে যাওয়ার রাস্তা জানতে চাইলো| বিদেশী লোকটার কথা কেউ বুঝতে পারলোনা| লোকটা যদি ইংরেজিতেও কথা বলতো তাহলেও কেউ না কেউ তাকে রাস্তাটা বলে দিত| কিন্তু এই ভদ্রলোক খাটি স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলছে| আমাদের দেশের খুব কম মানুষই স্প্যানিশ ভাষা জানে| মফ¯^ল শহরের একটা রেলওয়ে ষ্টেশনে স্প্যানিশ ভাষা জানে এমন কাউকে খুজে পাওয়াও সম্ভব নয়| আবার এই ভদ্রলোক ইংরেজি একটুও বোঝেন না| কিছুক্ষনের মধেই লোকটিকে ঘিরে একটি জটলা ˆতরি হল| এতক্ষণ এসবের কিছুই খেয়াল হয়নি নিশিকান্তর| হঠাৎ কি মনে করে প্লাটফর্মের দিকে তাকাতেই দৃশ্যটা ওর চোখে পড়লো| সে কৌতুহলী হয়ে ভীড়ের কাছে এগিয়ে আসলো| এসে দেখলো একজন বিদেশিকে নিয়ে মানুষ কৌতুহলী হয়ে উঠেছে| বিদেশী ভদ্রলোকও এত মানুষ দেখে একেবারে ঘাবড়ে গেছেন| তার কন্ঠ¯^র একেবারে খাদে নেমে গেছে| নিশিকান্ত পাশের লোকটিকে জিজ্ঞেস করলো বিদেশী লোকটাকে নিয়ে কি সমস্য? নিশিকান্ত ছোট বলে লোকটা ওর কথার কোন উত্তর দিলনা| নিশিকান্ত তাই আরেকজনের কাছে জানতে চাইলো| সে জানালো লোকটি কি যেন বলছে কিন্তু কেউ বুঝতে পারছেনা| এবার নিশিকান্ত নিজেই লোকটির সামনে এসে দাড়ালো| সে লোকটিকে প্রথমে ইংরেজীতে জিজ্ঞেস করলো আপনিকি কোন সমস্যায় পড়েছেন? লোকটি কিছুই বুঝলোনা| এবার নিশিকান্ত লোকটিকে স্প্যানিশ ভাষায় বললো বিয়েনবেনিভো,যার অর্থ ¯^াগতম| কারণ নিশিকান্ত বাংলার পাশাপাশি এ দুটিভাষা ছাড়া আর কোনটিই জানেনা| স্প্যানিশ ভাষার শব্দ শোনার সাথে সাথেই বিদেশী ভদ্রলোক নড়ে উঠলো| তার মুখে মৃদু হাসির রেখা দেখা দিল| সে নিশিকান্তর কাছে এসে ওর কাধে হাত রেখে বললো এস্তয় বুসকান্দো,মানে তোমাকেই খুজছি| জানতে চাইলো রেষ্ট হাউসে যাওয়ার পথ কি| নিশিকান্ত যেহেতু জামালপুরে আজই নতুন তাই পথটা তারও জানা নেই| কিন্তু তাতে কোন সমস্যা হলনা| কারণ সে লোকটির কথা বুঝতে পরছে যা সে অন্যদের কাছ থেকে বাংলায় প্রশ্ন করে জেনে নিতে পারবে| নিশিকান্ত স্থানীয়দের কাছ থেকে রেষ্ট হাউসের ঠিকানা নিয়ে লোকটিকে স্প্যানিশ ভাষায় বুঝিয়ে দিল| লোকটি খুশি হয়ে ওকে একশো টাকার একটা নোট ধরিয়ে দিল| অন্য সময় হলে নিশিকান্ত এ টাকা নিতনা| কিন্তু অসুস্থ মাকে নিয়ে খালি হাতে রেল ষ্টেশানে বসে থাকা সম্ভব নয় বলে সে টাকাটা নিল| এরপর সে একটা রিক্সা ডেকে লোকটিকে উঠিয়ে রিক্সাওয়ালাকে বুঝিয়ে দিল যে ওনাকে ঠিক রেষ্ট হাউসের গেটে নামিয়ে দেবেন| আর তার কাছ থেকে ভাড়া এক টাকাও বেশি নেবেন না| রিক্সা ওয়ালা মাথা নেড়ে সায় দিল| উপস্থিত সবাই এবার নিশিকান্তকে ঘিরে ধরলো| অবাক বিস্ময়ে তারা নিশিকান্তকে দেখতে লাগলো| এতটুকুন একটা ছেলে কিভাবে লোকটির সাথে কথা বললো| আর সে লোকটি কি বলছে তা এ বুঝলো কিভাবে? উপস্থিত কয়েকজন ওর কাছে জানতে চাইলো লোকটি আসলো কোন ভাষায় কথা বলছিল| ও জানালো লোকটি স্পেন থেকে এসেছে এবং তার ভাষাও স্প্যানিশ| স্কুলে পড়া কালিন সময়ে ওরা ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব থেকে স্প্যানিশ ভাষাটা মোটামুটি রপ্ত করে নিয়েছিল বলেই আজ একজন বিদেশীকে উপকারের পাশাপাশি নিজেও উপকৃত হল| আস্তে আস্তে লোক কমে গেল এবং নিশিকান্ত ওর মায়ের কাছে ফিরে আসলো| ভিড় দেখে সে যদি এগিয়ে না যেত তাহলে আজ তাকে এবং তার মাকে উপস হয়েই থাকতে হত| এমনকি ঐ বিদেশী লোকটিকেও হয়তো ওখানেই পড়ে থাকতে হত| ভাগ্যে যা লেখা থাকে তা হবেই| এবার কোথাও গিয়ে মাথা গুজতে হবে| সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়ে গেছে| ময়মনসিংহ হলেও না হয় কোথাও জায়গা করে নিতে পারতো কিন্তু এখানেতো ও কোন জায়গাই চেনেনা| তাহলে মাকে নিয়ে সে কোথায় যাবে| উপায়ান্ত না দেখে রাতটা পার হোক এই ভেবে রেল ষ্টেশানের যাত্রী ছাউনির নিচেয়ই বসে থাকলো| পাশের দোকান থেকে পাউ রুটি আর কলা কিনে এনে মাকে নিয়ে খেল| রাতে প্রচন্ড আকারে বৃষ্টি হল| সেই বৃষ্টির ঝাপটা এসে লাগলো যাত্রী ছাউনির নিচেয় বসে থাকা নিশিকান্ত এবং তার মায়ের শরীরে| নিশিকান্তর কিছু না হলেও সেই বৃষ্টির পানি গায়ে লেগে অসুস্থ মায়ের শরীর আরো অসুস্থ হয়ে পড়লো| কোন মত রাত গড়িয়ে সকাল হলেই নিশিকান্ত দেখলো তার মায়ের অবস্থা খুব একটা ভালনা| রেল ষ্টেশনে কুলির কাজ করে ওর বয়সী একটা ছেলে রমিজ| রমিজ ওর এই কষ্ট দেখে সেদিনকার মত কাজ বাদ দিয়ে নিশিকান্তর পাশে এসে দাড়ায়| সে নিশিকান্তর সাথে ওর মাকে সদর হাসপাতালে নিয়ে গেল| এর তিনদিন পর নিশিকান্তর মা মারা গেল| নিশিকান্ত এখন এক দম একা| আপন বলতে আর তেমন কেউ রইলোনা| একমাত্র দিদি সেও অনেক দূরে থাকে| নিশিকান্তর মাকে কালীঘাটে নিয়ে দাহ করা হয়| হিন্দুদের নিয়ম অনুযায়ী নিশিকান্তর মাথা মুন্ডন করার কথা থাকলেও নিশিকান্ত সেটা করলনা| বাবা মারা যাবার পর নিশিকান্ত আস্তে আস্তে ধর্মের থেকে অনেক দূরে সরে যেতে থাকে| তার চূড়ান্ত পর্যায় আসে মায়ের দেহ ত্যাগের পর| জামালপুর এসে নিশিকান্তর থাকার কথা ছিল ওর মায়ের এক পিসতুতো ভাইয়ের বাসায় কিন্তু সে বাসায় আর যাওয়া হলোনা তার| সে এখন রমিজের সাথে বস্তিতে থাকে| ওর মা মারা গেছে তিনদিন হলো| আর ও জামালপুর এসেছে ছয়দিন| এক সময় ঘুরতে ঘুরতে সে রেষ্ট হাউসের কাছে চলে আসলো| হঠাৎ তার সেই স্প্যানিশের কথা মনে পড়লো| ভাবলো যাই একবার দেখেই যাইনা লোকটা কেমন আছে| পোষাকে নোংরা হলেও চাল চলনে নিশিকান্তর ভিতরে ছিল শিক্ষিত মানুষের ছাপ| রেষ্ট হাউসের গেটের কাছে আসতেই নিশিকান্তর চোখ পড়লো পুকুর পাড়ে বেঞ্চির ওপর| সেই স্প্যানিশ ভদ্রলোক বসে আছে| সে গেট দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতেই দারোয়ান ওকে আটকালো| চোর বলে সাব্যস্ত করে ওকে রেষ্ট হাউসের পরিচালকের সামনে হাজির করলো| নিশিকান্ত তাকে বললো যে সে আসলে চোর নয়| সে এদিক দিয়ে যাচ্ছিল তাই ভাবলো স্প্যানিশ ভদ্রলোকের সাথে একটু দেখা করে যাই| ওর মুখে স্প্যানিশ লোকটার কথা শুনে তিনি বিস্মিত হয়ে জানতে চাইলেন “তুমি কিভাবে জান যে এখানে একজন স্প্যানিশ থাকেন? নিশিকান্ত তখন তাকে সেদিনকার সব ঘটনা খুলে বললো| ওর কথা শুনে পরিচালক একটুও দেরি না করে সত্যতা যাচাই করার জন্য ওকে লোকটির সামনে নিয়ে গেলেন| লোকটি ওদের উপস্থিতি টের পেয়ে মাথা ঘুরিয়ে তাকালেন এবং সাথে সাথে নিশিকান্তকে দেখে আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন| তিনি নিশিকান্তর হাতে হাত মেলালেন| এ দেখে পরিচালক ভদ্রলোক আশ্চর্য হয়ে গেলেন| পাশাপাশি নিশিকান্তর প্রতি কৃতজ্ঞতাও অনুভব করলেন| এই বিদেশী ভদ্রলোক আসার পর তাকে নিয়ে নানা ঝামেলায় পড়তে হয়েছে| বিশেষ করে তিনি ইংরেজি জানেন না বলে তার সাথে কোন কথাই বলা সম্ভব হচ্ছিলনা| এটা দেখে ঢাকায় টেলিফোন করা হয়েছিল যেন একজন দোভাষী পাঠানো হয় কিন্তু ঢাকা থেকে জানানো হয়েছে যে দোভাষী আসতে আরও সপ্তাহ খানেক লাগবে| কেননা সব দোভাষীরাই অন্য কোন পর্যটকের সাথে আছে| নিশিকান্তকে পেয়ে তাই রেষ্ট হাউসের পরিচালকের ভাল লাগলো| সে সাথে সাথে ঢাকায় টেলিফোন করে জানিয়ে দিল যে আর কোন দোভাষী পাঠাতে হবেনা| এখানেই একজন দোভাষী পাওয়া গেছে| তিনি নিশিকান্তর কাছ থেকে তার সব কিছু জেনে তাকে আপাতত এখানেই থাকতে অনুরোধ করলেন| এক দিক থেকে নিশিকান্তর ভালই হল| বস্তিতে থাকতে তার মোটেও ভাল লাগছিলনা তাছাড়া সেখানে খাওয়া দাওয়াও খুব একটা ভাল নয়| সে বিনা বাক্য ব্যয়ে রাজি হয়ে গেল| রেষ্ট হাউজের পরিচালক ওর জন্য নতুন জামা জুতো কিনে এনে দিলেন এবং নিশিকান্ত আবার আগের মত পুরোদস্তুর ভদ্র বনে গেল| রোজ সকাল বিকেল স্প্যানিশ ভদ্রলোককে নিয়ে নানা যায়গা ঘুরতে বের হয় এবং সন্ধ্যায় ফিরে আসে| এভাবেই কেটে যায় প্রায় পনের দিন| স্প্যানিশ ভদ্রলোক জামালপুরে এসেছেন এক মাসের জন্য| সেই দিক থেকে আগামী কয়েকদিন নিশিকান্তর আর কোন চিন্তা করতে হবেনা| সে এই ভদ্রলোকের সাথে আরামেই কাটাতে পারবে| আর এই কয়দিনে যা ইনকাম হবে তা দিয়ে সে বাকি কিছুদিন চালিয়ে নিতে পারবে| মার্চের সতের তারিখ নিশিকান্ত স্প্যানিশ ভদ্রলোককে নিয়ে ঘুরতে বের হল| স্প্যানিশ ভদ্রলোকের নাম আন্দ্রে নেল| নেল ওকে বলেছে সে যে কয়দিন এখানে থাকবে নিশি যেন তার সাথেই থাকে| নিশিকান্ত বিদেশী সংস্কৃতির অনেক কিছুই জানে তাই সে আন্দ্রে নেল কে শুধু নেল বলে ডাকে| বাংলাদেশের কেউ হলে কী রাগটাইনা করতো যে বড় দের নাম ধরে ডাকছো কেন? বিদেশীদের কাছে বড় আর ছোট নেই সবাই সবার নাম ধরে ডাকে| ঘুরতে বেরিয়ে একসময় নিশি এবং নেল জিলাস্কুলের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল| নেল ওর কাছে জানতে চাইলো এটা কি? নিশিকান্ত জানাল এটা জামালপুর জিলাস্কুল| এটা একটা স্কুল জানতে পেরে নেল আগ্রহ প্রকাশ করলো স্কুলটা ঘুরে দেখবে| স্কুল খোলা এবং পুরোদমে ক্লাস চলছে এই মুহুর্তে কিভাবে নেলকে ভিতরে নেওয়া যায় তা ভেবে পাচ্ছেনা নিশিকান্ত| এর মাঝেই ওর মনে পড়লো ট্রেনে পরিচিত হওয়া ছেলেটার কথা | সায়ন নামের সেই একই বয়সের ছেলেটাও এই স্কুলে পড়ে| ওকে বলে হেড স্যারের সাথে কথা বলে নেলকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া যাবে| দারোয়ান চাচাকে দিয়ে সায়নকে ডেকে আনা হল| সায়ন ওকে দেখে অবাক হলো এবং খুশি হল| চলে আসার পর সায়ন ওর কথা ভেবেছে কিন্তু ও কোথায় থাকে সেটা জানেনা বলে যোগাযোগ করা হয়নি| শেষে সায়ন হেড স্যারের সাথে কথা বলে ওদেরকে ভেতরে নিয়ে গেল| একজন বিদেশীকে স্কুলে আসতে দেখে অনেকেই ক্লাস ছেড়ে বেরিয়ে আসলো | যেন একটা আনন্দ মেলা কিংবা অনুষ্ঠান| বাচ্চারা নেলকে ছুয়ে দেখতে লাগলো| নেলেরও ভাল লাগলো| সে নিশিকান্তকে জানাল এখানে এসে তার অনেক ভাল লাগছে| নিশিকান্ত সেটা স্কুলের সবাইকে জানালে তারা আনন্দে জয়োল্লাস ধ্বনি করলো| শিক্ষকেরাও নেলএর কাছে এসে দাড়িয়েছে| নিশিকান্ত নেলকে এবং স্যারদেরকে পরস্পরের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল| এতটুকু একটা বাচ্চা এই বিদেশীর সাথে স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলছে দেখে সবাই ভীষণ অবাক হল| কেউ কেউ সুযোগ পেলে জিজ্ঞেসই করতো যে তুমি এই বিদেশী ভাষা শিখলে কিভাবে কিন্তু তা আর হয়ে উঠলোনা| তার আগেই ওরা বেরিয়ে আসলো| সায়ন সবাইকে জানালো নিশির সাথে ওর কিভাবে পরিচয় হয়েছিল| সবাই ছেলেটার দুঃখ ব্যথা শুনে মর্মাহত হয়ে সমবেদনা জানাল| তবে সায়নের কাছে ভাল লাগলো এই দেখে যে আগের দিনে দেখা নিশি আর আজকের দেখা নিশির মধ্যে অনেক ব্যবধান| সেদিন ওর পরনে ছিল ময়লা কাপড় আর আজ পরিপাটি কাপড়ে এক বিদেশী ভদ্রলোকের পাশে ওকেও একজন ভদ্রলোক মনে হচ্ছে| নিশিকান্ত নেল নামের ভদ্রলোকের সাথে থেকে থেকে অনেক কিছুই শিখে ফেলেছে| সে স্প্যানিশ ভাষাটাও বেশ ভালই রপ্ত করে ফেলেছে| পেশায় বিদেশী লোকটা প্রানী বিজ্ঞানী| লোকটা এদেশের বিভিন্ন স্থান ঘুরে ঘুরে নানা প্রজাতির প্রাণিদের নিয়ে গবেষণা করছেন| এরই মধ্যে তিনি নিশিকান্তকে তার সাথে অন্যান্য জায়গাতে যেতে প্রস্তাব করেছে| নিশিকান্তর যেহেতু কোন স্কুল নেই থাকার জায়গা নেই সেহেতু সে এক কথায় রাজি হয়ে গেল| নিশিকান্তর কাছে জীবন মানেই কোন মত বেঁেচ থাকা| সংগ্রামের এই জীবনে তাই একটু সুখ আসলে সেটাকে পায়ে ঠেলে দেওয়া ঠিক হবেনা ভেবে নিশিকান্ত রাজি হয়ে গেছে| নেল ঠিক করেছে আগামী এপ্রিলের তিন তারিখেই কিশোরগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা হবে| সাথে যাবে তার অনেক অনেক কাজের সহযোগী গাইড বালক নিশিকান্ত| নিশিকান্তও মনে মনে কিশোরগঞ্জে যাওয়ার জন্য ভীষণ ভাবে মুখিয়ে আছে| কেননা নিশিকান্তরা যখন একটা ভালকাজের সংগঠন খুলেছিল সেটার নাম দিয়েছিলেন কিশোরগঞ্জের এক ভদ্রলোক যার নাম হাসান ইমাম| লোকটার রুচিবোধ অনেক ভাল এবং ভালকাজে সহযোগিতা করার মনোভাব রয়েছে দারুন ভাবে| তাই তাকেও দেখার ইচ্ছে আছে| এক সাথে নতুন একটা জেলা ভ্রমন পাশাপাশি একটা কাঙ্খিত লোকের সাথে দেখা হওয়া | কিন্তু বাধ সাধলো এক মহা ঝামেলা| নেল নামের বিদেশীর সাথে থেকে থেকে নিশিকান্ত ওর অতীত দিনের কথা ,দুঃখ ব্যথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল| ঠিক এমন একটা সময়ে মার্চের ২৭ তারিখে দুপুরে সারা শহর রটে গেল স্প্যানিশ ভদ্রলোক খুন হয়েছেন| সত্যি সত্যি খোজ নিয়ে দেখা গেল নেল নামের লোকটি খুন হয়েছে| রেষ্ট হাউজের বাথরুমে তার লাশ পাওয়া গেছে| রেষ্ট হাউজের দারোয়ান এবং ঝাড়ুদারকে পুলিশ গ্রেফতার করেনিয়ে গেছে| ধারনা করা হচ্ছে লোকটাকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়েছে| রেষ্ট হাউজের সামনে পুলিশ পাহারা বসানো হয়েছে| নিশিকান্ত এসবের কিছুই জানেনা| সে একটা কাজে সকালেই বেরিয়েছিল তাই তার অনুপস্থিতিতে এত বড় ঘটনা ঘটেছে সে তার কিছুই জানতে পারেনি| পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের পর রেষ্ট হাউসের দায়িত্বরত ম্যানেজার নিশিকান্তর কথাও বলেছে| ফলে পুলিশ আদেশ দিয়েছে নিশিকান্তকে কোথাও দেখলেই গ্রেফতার করতে| নিশিকান্ত এটাও জানেনা| সারা শহরের মানুষ ঘটনাটা জেনে গেলেও নিশিকান্তর কানে খবরটা পৌছেনি কেননা সে তার সেই বস্তির বন্ধুর সাথে ঘুরতে ঘুরতে শহরের বাইরে চলে গিয়েছিল| বিকেলে নিত্যদিনের মতই নিশিকান্ত রেষ্ট হাউজে ফিরছিল| প্রধান ফটকে তালা লাগান এবং পাশে পুলিশ দাড়িয়ে আছে দেখে ও একটু আশ্চর্য হল| প্রথমে ভাবলো হয়তো ভিআইপি কেউ এসেছে তাই অতিরিক্ত পুলিশ পাহারা| আবার ভাবলো যদি ভি আইপি কেউ এসেই থাকে তবে আগের সিকিউরিটি গার্ড কোথায়? তাছাড়া গেটে তালা ঝুলছে কেন? সে কাছে যেতেই একজন কনস্টেবল ওকে বাধা দিয়ে বললো এই ছোকরা কি চাই এখানে? নিশিকান্ত জানাল সে রেস্ট হাউসের ভেতরে যেতে চায়| ওখানে যে স্প্যানিশ ভদ্রলোক আছেন তিনি ওর পরিচিত| স্প্যানিশ ভদ্রলোকের কথা শুনে কনস্টেবল জানতে চাইলেন তোমারনাম কি? নিশিকান্ত ওর নাম বলতেই পাশের গার্ড রুমে বসেথাকা হাবিলদার বেরিয়ে আসলেন এবং ওয়াকি টকিতে থানায় কথা বললেন| “স্যার নিশিকান্ত নামে যাকে আপনি গ্রেফতার করতে বলেছিলেন সেএসেছে তাকেকি নিয়ে আসবো? ওপাশ থেকে কি বলা হল তা নিশিকান্ত জানতে পারলোনা | শুধু দেখলো দুজন কনস্টেবল ওর দুই পাশে এসে দুই হাত শক্তকরে ধরে জিপে তুলল| নিশিকান্ত কিছুই বুঝতে পারলোনা কেন পুলিশ ওকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে| ওর অপরাধটা কী তা ও জানতে চাইলে হাবিলদার ওর কথার কোন জবাব দিলেন না| থানায় গিয়ে দেখা গেল অনেক মানুষের ভিড়| নিশিকান্তকে জেলার প্রধান পুলিশ কর্মকর্তা এসপি সাহেবের সামনে হাজির করা হলো| এসপি সাদিকুর রহমান সাহেব নিশিকান্তর দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন তুমিনিশিকান্ত? নিশিকান্ত মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিল ইয়েস স্যার| এসপি সাদিকুর রহমান বললেন আমি ভেবেছিলাম নিশিকান্ত নামের লোকটা হয়তো বয়স্ক হবে কিন্তু এখন দেখছি তুমি একদম ছোট ঠিক আমার ছেলের বয়সী| নিশিকান্ত যখন এসপি সাহেবের মুখে শুনলেন যে ওর বয়সী এসপি সাহেবের একটা ছেলে আছে তখন ওর মাঝে একটু সাহস সঞ্চার হল| যদিও নিশিকান্তকে পুলিশে ধরেছে বলে ওর খুব একটা ভয় হচ্ছেনা| ও সাহস করে জিজ্ঞেস করলো কিন্তু স্যার আমাকে ধরে আনা হয়েছে কেন? এসপি সাহেব নিজেই অবাক হয়ে জানতে চাইলেন কেন সারা শহরের মানুষ জানে আর তুমি জাননা? নিশিকান্ত যে কিছুই জানেনা সেটা সে জানাল| এসপি সাহেব বললেন নেল নামের স্প্যানিশ ভদ্রলোক খুন হয়েছেন| খুনের কথা শুনেই কেপে উঠলো নিশিকান্ত| যে সে লোকনয় একেবারে সে যার পাশে পাশে ঘুরে বেড়িয়েছে সেই নেল| নিশিকান্তর চোখ ছলছল করে উঠলো| এ কয়দিনেই বিদেশী লোকটরি ওপর ওর মায়া জন্মে গেছে| রাতে একসাথে থাকা খাওয়া সারাদিন ঘুরে বেড়ানো সব সময় নিশিকান্ত লোকটির পাশে থাকতো আর সেই লোকটি খুন হয়েছে তা শুনে নিশিকান্ত কাঁদবেনা তো কে কাদবে? পাশে দাড়িয়ে থাকা ওসি ইকরামুল ওকে মৃদু ধমক দিয়ে বললেন এখন কেদে কেদে ভান করার দরকার নেই| তুমি জাননা বললেতো হবেনা ! কিভাবে কেন খুন করেছ সেটা বল| ওসি সাহেবের কথা শুনে নিশিকান্তর রাগ আরো বেড়ে গেল| সে বলল আমি খুন করিনি| আমি শুধু তার সাথে থাকতাম এবং আমি স্প্যানিশ ভাষা জানি বলেই লোকটি সব সময় আমাকে সাথে রাখতো| এই এতটুকু একটা বাচ্চা স্প্যানিশ ভাষা জানে দেখে এসপি সাহেব খুব অবাক হলেন| ওর কোন কথাই কেউ আমলে আনলোনা| পরদিন খবরের কাগজে ছাপা হল নিশিকান্ত নামের বালক ছেলেটাকে খুনের দায়ে জেল হাজতে পাঠান হয়েছে| এসপি সাহেব বাসায় ফিরে রাতে খাবার টেবিলে নিশিকান্তর কথা বলছিলেন যে অতটুকু একটা ছেলে সে কিনা এমন একটা খুন করতে পারলো| এসপি সাহেবের স্ত্রী বললেন টাকার লোভে মানুষ কত কিছুইনাকরে| কিন্তু তাদের কথার প্রতিবাদ করলো তাদের এক মাত্র ছেলে শিশির| শিশির জানাল ও ওদের স্কুলে একবার নিশিকান্তকে দেখেছে বিদেশী ভদ্রলোককে নিয়ে আসতে| নিশিকান্ত কিছুতেই খুন করতে পারেনা আর তাছাড়া পুলিশ নিশিকান্ত খুন করেছে এমন কোন যুক্তি দেখাতে পারবেনা| কেননা খুন করা হয়েছে যে চুরি দিয়ে তার হাতলের ছাপ এখনো পরীক্ষা করে দেখা হয়নি| যদি সেই হাতলের হাতের ছাপের সাথে ওর ছাপ বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট মিলে যায় তবেই তাকে দোষি বলা যাবে| শিশিরের কথা শুনে ওর বাবা মা কথাটা আমলে নিলেন| পরদিন ফিঙ্গার প্রিন্ট করা হলে দেখা গেল নিশিকান্তর সাথে তার কোন মিল নেই তখন ¯^ভাবতই নিশিকান্ত নির্দোষ প্রমানিত হওয়ার কথা থাকলেও সরকার পক্ষের উকিল দাবি করলেন নিশিকান্ত অন্য কারো মাধ্যমে এই খুনটা করিয়েছে তাই প্রকৃত দোষি সেই| মামলাটা এভাবেই ঝুলতে থাকলো| পরপর অন্য আসামী যাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল তাদের ফিঙ্গার প্রিন্ট করা হলো কিন্তু তাদের সাথেও মিললনা| কোন ভাবেই নিশিকান্ত বা অন্য আটক আসামীরা মুক্তি পেলনা| এভাবে এক সপ্তাহ যাবার পর জিলাস্কুল মাঠে মিলিত হল শিশির,সায়ন,রাকিন,সাগর ওরা সবাই | ওরা সিদ্ধান্ত নিল যে কোন ভাবেই হোক একদিনের পরিচিত বন্ধুটাকে ওরা বাঁচাবে| শেষে শিশিরের বাবার কাছে অনুনয় বিনয় করে ওরা নিশিকান্তর সাথে দেখা করতে গলে| ওদের দেখেই নিশিকান্ত চিনতে পারলো এবং মনে মনে খুশি হল| নিশিকান্ত ওদেরকে সব খুলে বল| ঘটনার দিন ও রেষ্ট হাউজ থেকে সকালেই বেরিয়ে গেছে এবং ফিরেছে সন্ধ্যায়| নেল খুন হয়েছে এটা ও জানতোই না| শিশির ওর কাছে জানতে চাইলো আর কোন কথা মনে আছে কিনা,কে কে নেল এর সাথে দেখা করতে আসতো,নেল কি কি করতো বা অন্য কোন গোপন তথ্য| অনেকক্ষণ চিন্তা করার পর নিশিকান্ত জানাল আমি পুলিশকে অনেক কথাবলার চেষ্টা করেছি কিন্তু তারা আমার কোন কথাই শোনেনি| আমাকে যদি রেষ্ট হাউসে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে আমি হয়তো কোন তথ্য বের করতে পারবো| ওরা নিশিকান্তর সাথে কথা শেষ করে জেলার সাহেবের সাথে দেখা করে এ কথা বললো | জেলার সাহেব শিশিরকে চেনে কেননা শিশিরের বাবা জেলার এসপি| কিন্তু নিয়মের বাইরে কিছুই তিনি করতে পারবেন না| এসপি সাহেব এবং কোর্টের আদেশ ছাড়া নিশিকান্তকে রেষ্ট হাউজে নেয়া যাবেনা বলে তিনি জানালেন| ওরা ফিরে এসে শিশিরের বাবাকে সব জানালো এবং তিনি আশ্বাস দিলেন এ ব্যাপারে ভেবে দেখার| পরদিন ওদের সাথে করে নিশিকান্তকে রেষ্ট হাউজে নিয়ে যাওয়া হলো| অনেক ঘুরে ঘুরেও তেমন কোন তথ্য নিশিকান্ত সংগ্রহ করতে পারলোনা| শেষে হতাশায় নুইয়ে পড়ার মত ওরা বেরিয়ে আসলো| নিশিকান্ত যেমন আশায় বুক বেধেছিল তেমনি শিশির,সাগর,সায়ন বা রাকিনরাও ওর মুক্তি হবে এই কামনা করছিল কিন্তু তা আর হলনা| ওরা রেষ্ট হাউজের গেট পার হয়ে কেবল পুলিশের ভ্যানে উঠেছে এমন সময় নিশিকান্ত জানাল ওর মনে পড়েছে এবং ও নিশ্চিত খুনীদের ধরা যাবে| ওর কথা মত আবার রেষ্ট হাউজে ঢোকা হল এবং নিশিকান্ত সবাইকে নিয়ে সোজা রেস্ট হাউজের লাইব্রেরিতে গেল| সেখানে একটা বইয়ের আলমারির পিছনে উকি দিতেই ওর মুখ উজ্জল হয়ে উঠলো| হাত বাড়িয়ে একটা ল্যাপটপ বের করে আনলো| সেই ল্যাপটপের সাথে ল¤^ার তার| সেটা দেখে এসপি সাহেব জিজ্ঞেস করলেন ল্যাপটপ এখানে কেন এবং তার কিসের? নিশিকান্ত জানাল ল্যাপটপ নেল নামের বিদেশীর| উনি এটিকে এখানে সেট করে বিভিন্ন জয়গায় ছোট ছোট সিসি ক্যামেরা লাগিয়েছিলেন| নেল ছিলেন প্রানী বিজ্ঞানী এবং তার ধারনা ছিল এই রেষ্ট হাউজে কিছু অপরিচিত পাখি এবং ভিন্ন প্রজাতির এক ধরনের সরীসৃপ তথা টিকটিকি জাতীয় প্রাণী আছে| সেটার অবস্থান এবং তথ্য ও ছবি নেয়ার জন্যই এই সিসি ক্যামেরা স্থাপন করেছিলেন| খুন যেখানেই করা হোক হয়তো সিসি ক্যামেরায় সেই দৃশ্য ধরা পড়েছে| ওর কথা মত চিকন তার ধরে ধরে এগিয়ে যাওয়ার পর দেখা গেল বিভিন্ন রুমে সত্যি সত্যি সিসি ক্যামেরা লাগান যেটা সাধারন ভাবে চোখে পড়েনা| ল্যাপটপটা রাকিন হাতে নিয়ে অন করলো এবং আরকাইভ থেকে বিভিন্ন রেকড ফাইল প্লে করতে করতে একটা ফাইলের এসে ওদের চোখ স্থির হয়ে গেল| বিডিওতে দেখা গেল নেল বাথ রুমে যাচ্ছে এমন সময় তিনজন লোক বাথ রুমে ঢুকেই ওর গলায় ছুরি ধরে ওর কাছ থেকে চাবি নিয়ে নিল এবং যাওয়ার সময় ল¤^া মত লোকটা বলল এ শালাকে বাচিয়ে রেখে কি হবে যদি পুলিশকে বলে দেয় তাই ওকে শেষ করে ফেলি| মোটা মত লোকটা বললো ঠিক আছে | এই বলেই নির্দয়ের মত নেলের বুকে ছুরিকাঘাত করলো| মুখ দিয়ে যাতে শব্দ করতে না পারে তাই মুখ চেপে ধরলো| সব দৃশ্য সিসি ক্যামেরায় রেকর্ড হচ্ছে এটা জানলে নিশ্চই ঘাতকেরা তাকে খুন করার সাহস পেতনা| এরপর খুনিরা নেলের ব্যাগ লাগেজ এবং আলমারি থেকে গুরুত্বপূর্ন সব কিছু নিয়ে নিল| সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে যাওয়ার সময় গেটের দারোয়ানের সাথে হেসে হেসে কথা বলছিল এবং তার হাতে কিছু একটা ধরিয়ে দিয়েছিল যা স্পষ্ট নয়| এসব দেখে স্পষ্টই প্রমান হল নিশিকান্ত এর সাথে জড়িত নয়| নিশিকান্তর মুখে হাসি ফুটলো সেই সাথে হাসি ফুটলো রাকিন,সায়ন বা শিশিরদের মুখে| কোর্টে আবেদন করা হলো| আবেদন করলেন সাগরের বাবা| সাগরের বাবা একজন নাম করা উকিল| জ সাহেব সব শুনে এবং দেখে নিশিকান্তকে মুক্তি দিলেন| এবার পালা দারোয়ানের| সে প্রথম থেকেই অ¯^ীকার করেছে যে সে এর কিছুই জানেনা অথচ সে যে জানে তা এখন প্রমানিত| এখন আর কিছুতেই অ¯^ীকার করার উপায় নেই| তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর সে মারের চোটে সব গড় গড় করে ¯^ীকার করলো| নেল নামের ভদ্রলোক অনেক দিনের জন্য বাংলাদেশে এসেছে তাই তার কাছে নিশ্চই অনেক টাকা আছে| সেই টাকার লোভেই রেষ্ট হাউসের ম্যানেজার বুদ্ধি করে নিশিকান্তকে সকালেই সরিয়ে দিয়ে নিজের লোকদের দিয়ে খুন করিয়েছে নেলকে| সব শোনার পর ম্যানেজারকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞেস করতেই খুনিদের আসল পরিচয় পাওয়া গেল| খুনি তিনজনের পরিচয় পাওয়ার পর পুলিশ তাদের ধরতে অভিযান চালাল এবং তিন দিনের মাথায় তারা ধরা পড়লো| এরা স্থানীয় এমপির দলের লোক | এমপি চৌধুরি জয়েন উদ্দিন অবশ্য অ¯^ীকার করলেন যে তিনি এদের কাউকেই চেনেন না| অবশেষে বিচার বিভাগীয় তদন্ত শেষে দেশের সর্বচ্চো আইনে কোন বিদেশীকে হত্যা করার অপরাধে ম্যানেজার এবং তিন খুনিকে ফাসি দেয়া হল| আর গেটের দারোয়ানকে পাঁচ বছরের জেল দেয়া হল| কেননা সেও পরিস্থিতির ¯^ীকার ছিল| তাকে হুমকি দেয়া হয়েছিল যে সে এ কাজে রাজি না থাকলে তাকে চাকরী চ্যুত করা হবে আর এর চেয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করলে তাকেও খুন করা হবে| সেই ভয়েই সে এ কাজ করতে রাজি হয়েছিল|
নিশিকান্তর জিলাস্কুলে ভর্তি
নেল খুন হওয়ার পর নিশিকান্তর জীবনে আবার অন্ধকার নেমে আসলো| তারতো কোন থাকার জায়গা নেই,খাবার কেনার মত কোন টাকা নেই এসব ভেবে সে আবার সেই পুরোনো বন্ধুর বস্তিতে গিয়ে উঠলো| নিশিকান্তকে এখন অনেকেই চেনে| পত্রিকায় ওর ছবি উঠেছিল,খবর হয়েছিল কিংবা সায়ন রাকিন ওরা সবাইও ওকে চেনে| সেই সাথে জিলা স্কুলের অনেকেই চেনে| একদিন বিকেলে নিশিকান্ত বসে ছিল জিলাস্কুলের পাশে নদীর কিনারে| ওর মনটা খুব খারাপ| স্কুলে অনেক অনেক ছাত্র হেসে খেলে আনন্দ করছে অথচ ও সেখানে যেতে পারছেনা| ওরও ইচ্ছে হয় আবার স্কুলে ভর্তি হতে কিন্তু তার আর উপায় নেই| বাবা নেই মা নেই এমনকি বোনও নেই বললেই চলে| মা মারা যাওয়ার খবরটা পর্যন্ত বোন জানলোনা| বোন কোথায় আছে তাও ওর জানা নেই| কেবল শুনেছে সিলেটে থাকে| কিন্তু সিলেট কোন ছোট খাট জায়গা নয় যে গেলেই পাওয়া যাবে| আবার সেখানে যেতে হলেও কিছু টাকার প্রয়োজন সেই টাকাটাও ওর হাতে নেই|
অবশেষে নিশিকান্ত সায়ন রাকিন আর সাগরের প্রচেষ্টায় জামালপুর জিলাস্কুলে ভর্তি হলো| জিলাস্কুল কর্তৃপক্ষ যেহেতু নিশিকান্তর আসল ব্যপার জানেনা তাই তাকে ভর্তি করে নিতে তাদের তেমন কোন অনিহা বা সমস্যা দেখা গেল না| প্রথমে তারা টিসি চেয়েছিল কিন্তু রাকিনদের কথার জোরে স্যারেরা সেটা বেমালুম ভুলে গেল| রাকিনদেরকে নিশিকান্ত কোন কিছুই গোপন না করে খোলাখুলি বলে দিয়েছে| সাগর আর জাহিদ ওর কথাকে স্রেফ গাজাখুরি হিসেবে ভেবে নিলেও রাকিন বা সায়ন ওকে গুরুত্বর সাথেই দেখেছে| যে কোন মানুষের ভিতরেই কোন না কোন সুপার ন্যাচারাল পাওয়ার থাকে| কারো কারো সেই শক্তিটা তুলনামুলক ভাবে অনেক বেশি বলে সেটাকে আজগুবী বা অমুলক মনে হয়| কেউ আছে বড় বড় গুন অংক মুহূর্তের মধ্যেই করে ফেলতে পারে| আবার কারো কারো এমন আছে যে সে কারো মুখ দেখলেই তার মনের অবস্থা বলে দিতে পারে| শুধু তাই নয় এমনও দেখা গেছে কারো কারো মুখস্থ করার এমন প্রতিভা থাকে তা না দেখলে বিশ্বাস হয়না|তেমনি নিশিকান্তরও হয়তো তেমন এক ধরনের সুপার ন্যাচারাল পাওয়ার থেকে থাকতে পারে| আর সেটা বুঝতে তো বেশি দিন দেরি করতে হবেনা| দু চারদিন গেলেইতো জানা যাবে আসলেই ওর মধ্যে কোন শক্তি আছে নাকি ও সব বানিয়ে বলেছে| এরপর আসলো চমক দেখানোর পালা| অংকে নিশিকান্ত প্রথম ক্লাসেই ফাটাফাটি সাফল্য দেখাল| দেখা গেল স্যার সেদিন অংকের ক্লাসে একটি ধারা লিখে তার যোগফল নির্ণয় করতে দিলেন ধারাটি ছিল এরকম ১+২+৩+……………..+১০০| অন্যরা যখন কিভাবে সমাধান করবে তা ভাবছে এবং এটা যোগ করতে হলে আগে সংখ্যা গুলি লিখতে হবে ভাবছে নিশিকান্ত ততক্ষনে সমাধান করে স্যারের সামনে খাতা মেলে ধরেছে| স্যার নিজেও এটা দেশে বিস্মিত| কেননা এটা করতে খানিকটা সময় লাগার কথা| কিন্তু দেখা গেল নিশিকান্তর উত্তর দেখে স্যার আরো তাজ্জব হয়ে গেলেন| তিনি অনেকক্ষন নিশিকান্তর দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলেন| নিশিকান্ত আসলে কার্ল ফ্রেডারিক গাউসের জীবনী পড়েছিল| তিনিই প্রথম এই ধারার সহজ এই সমাধান বের করেছিলেন| বলা হয়ে থাকে গাউস কথা বলা শিখার আগেই গণিত শিখেছিলেন| রাকিন জিজ্ঞেস করলো স্যার ওর উত্তরটাকি ঠিক হয়েছে ? স্যার যখন বললেন ঠিক হয়েছে তখন স্যারের মত ক্লাসের সবাই ওর দিকে হা হয়ে তাকিয়ে থাকলো| ওরা তখনই বুঝতে পারলো নিশিকান্ত যা বলেছিল তা ঠিক| ওর ভেতরে সত্যি সত্যিই অন্যরকম একটা শক্তি আছে যা আর কারো নেই| তার পরও ওরা কিছুদিন দেখতে চাইলো যে আর কোন কিছু দেখাতে পারে কি না|
নিশিকান্তর ধর্মান্তর
নিশিকান্তের আর কোন ভাবেই চলছেনা। তার এই মুহুর্তে টাকা পয়সার প্রয়োজন। ওদিকে ওর খ্রিষ্টান বন্ধু যোসেফ ওকে বার বার লোভ দেখাচ্ছে যে তুই যদি আমাদের ধর্মে চলে আসিস তবে আমরা তোকে অনেক টাকা সম্পদ লিখে দেব। ফলে তোর আর কোন সমস্যা থাকবেনা। টাকার লোভ কম বেশি সবারই আছে। তার ওপর অভাব থাকলেতো কোন কথাই নেই। নিশিকান্ত বার বার নিজেকে প্রশ্ন করে কোন পথটা তোর জন্য ভাল আর কোন পথটা তোরজন্য খারাপ তা ভেবে চিন্তে বের রে নে।নিশিকান্তর ভিতরের সত্তাটা ওকে বার বার বুঝাতে চেষ্টা করে যে নিজের ধর্ম ত্যাগ করলে তুই বড় পাপী হয়ে যাবি তাউ এ কাজ করিসনা। আবার ভিতরেরআরেকটা সত্তা ওকে আরো বেশি প্রবোধ দেয় এই বলে যে না খেয়ে মরে যাওয়ার চেয়ে তুই তোর ধর্ম পরিবর্তন কর।
এসব যখন হচ্ছিল তখন নিশিকান্তর পাশে দাড়ানোর মত নিকটজন কেউ ছিলনা। কেবল ওর বয়সী ছোট ছোট বন্ধুরা ছাড়া আর কেউ ওর পাশে এসে ওর কাধে হাত রেখে বললোনা যে নিশিকান্ত ঘাবড়ে যাচ্ছ কেন আমরাতো আছি। এই এতটুকু একটা বাচ্চা ছেলে কতটুকুই বা সে খায়। যেখানে ঘুমোতে দেয়া যায় শান্ত ছেলের মত সেখানেই সে ঘুমো।এতদিন সে তার এক বন্ধুর সাথে বস্তিতে থাকতো। এখন বিপদের ওপর বিপদ। সেই বন্ধু ঢাকায় চলে গেছে হকারী করতে। সে এখন থেকে ঢাকাতেই থাকবে। কোন আয় নেই তার ওপর স্কুলে ভর্তি হয়েছে তাই নিশিকান্তর থাকার যায়গাটাও চলে গেল।অল্প বয়সে বাবা হারালো কিছুদিন যেতে না যেতেই মাকেও হারালো আর এক মাত্র দিদি তারও তেমন কোন খবর নেই। মা মারা গেছে এই খবরটা পযর্ন্ত দিদিকে সে জানাতে পারেনি। কেমন করে জানাবে। কোন যোগাযোগের নাম্বারওতো তার কাছে নেই।নিশিকান্ত নিজেই সিদ্ধান্ত নিল সে ধর্মান্তরীত হবে। সে যোসেফকে বললো ধর্মান্তরীত হওয়ারআয়োজন করতে।ওর কথা শুনে যোসেফ মহা খুশি। সে তার বাবাকে নিয়ে ফাদারের সাথে কথা বলে পরবর্তী রবিবার গীর্জায় নিশিকান্তের ধর্মান্তরীত হওয়ার সব আয়োজন করে রাখলো। নিশিকান্ত দেখলো রবিবার আসতে ঢের বাকি। এর মাঝে ওকে অনেক কিছু করতে হবে।এই কদিনে জামালপুরে অনেকেই নিশিকান্তকে মোটামুটি চিনে ফেলেছে। বিশেষ করে বিদেশী ভদ্রলোকেরসাথে তার চলাফেরা এবং সেই বিদেশী খুন হওয়াকে কেন্দ্র করে তার ছবিও পত্রিকাতে ছাপা হয়েছিল। চায়ের দোকানে রাস্তা ঘাটে মানুষ ওর কথা আলোচনা করতো।ওদিকে পত্রিকায় নেলের খুন হওয়ার ঘটনার সাথে যখন নিশিকান্তর ছবিও ছাপা হলো এবং বলা হলো এই খুনেরসাথে নিশিকান্ত নামের বার বছরের ছেলের সম্পর্ক আছে তখন ওর জন্মভূমি ময়মনসিংহের মানুষ হায় হায় করে উঠলো। ওর পুরোনো সব বন্ধুদের অনেকেই আফসোস করে বললো কী সর্বনাশ! নিশিকান্ত খুন করেছে? আর সেই সব পরিবারের সদস্যরা হাফ ছেড়ে বাচলো এই বলে যে ভাগ্যিস এই খুনিটাকে এখান থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল তা না হলে কিযে হতো! অথচ পত্রিকায় যখন প্রকাশ হলো নিশিকান্ত বিদেশী ভদ্রলোক নেল খুনের সাথে কোন যোগসাজ ছিলনা তখন কিন্তু কেউ বলেনি বাহ নিশিকান্ততো খুব ভালো ছেলে। ও এরকম একটা কাজ করতে পারে তা আমাদের কল্পনাতেও ছিলনা। শুধু শুধু নিরাপরাধ ছেলেটার নামে কলংক লাগানো।নিশিকান্ত ওসব নিয়ে কিছুই ভাবেনি। এই অল্প বয়সেই সে বুঝে গেছে এই পৃথিবীটা কতটা নিষ্ঠুর। তাই কে কাকে কি বললো আর কি ভাবলো তা সে পাত্তা দেয়না। যেখানে পেটই চলেনা সেখানে অতসব ভেবে কি হবে। অথচ একটা সময় ছিল নিশিকান্ত মনে মনে যা বলতো তাই ফলে যেত।এখনআর সেই আশ্চর্য বিষয়টা ঘটনা।কেন ঘটেনা এটা নিয়েও নিশিকান্ত কখনো চিন্তা করেনি।যেহেতু কদিন বাদেই সে ধর্মান্তরিত হবে এবং তাখন তার কোন অভাব থাকবেনা সেহেতো এই কদিন সে পড়াশোনার কোন বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে চায়না। জামালপুর আসার পর প্রথম দিকে তার খুব একা একা লাগতো। কেননা আগে ময়মনসিংহ থাকতে তার একাকী নিরবে বসে থাকার যায়গা ছিল এখানে তেমন কোন নিজর্ন জায়গা নেই যেখানে নিশিকান্ত কিছুক্ষণ বসে থাকবে। কথায় কথায় ও সায়নকে এটা বলতেই সায়নওকে জানালো দারুন একটা নিরিবিলি জায়গা এখানে আছে। তবে ভয়ের ব্যাপার হলো সেখানে দিনের বেলাও কেউ যেতে সাহস করেনা।যেখানে দিনের বেলাও কেউ যেতে সাহস করেনা সেরকম জায়গা যে সত্যিই নিরিবিলি হবে এতে নিশিকান্তর কোন সন্দেহ থাকলোনা। সে সায়নের কাছ থেকে জায়গাটার লোকেশান জেনে নিয়ে ওইদিন বিকেলেই সেখানে রওনা হলো। শহর থেকে খুব একটা দূরে নয়। তবে লোকালয় নেই সেখানে। সেটা একটা চর এলাকা।নদীর ধারে দাড়ালেই দেখা যায় ঘন জঙ্গলে পরিপূর্ন এক বিশাল দ্বীপ এলাকা। হয়তো কেউ কখনো ওখানে যায়না। আর গেলেও নদীর ধার থেকেই আবারফিরে আসে। এক মাঝিকে বলতেই সে তেড়ে আসলো। এইটুকুন পুলা তুমি এইডা কি কও। জানোনা ওহানে কেউ দিনের বেলা বড় মানুষও যায়না তুমি যাইবা কিবা?নিশিকান্ত তাকে কিছু একটা বলতে চাইলো কিন্ত সে বলার সুযোগ দিলোনা। তার আগেই ঘাটে নৌকা বেধে কোথায় যেন চলে গেল। নিশিকান্ত এদিক সেদিক দেখে যখন নিশ্চিত হলো আশে পাশে আর কেউ নেই তখন সে নিজেই নৌকার রশি খুলে তাতে উঠে বসলো। এর আগে ময়মনসিংহ থাকতে এক মাঝির সাথে ওর বেশ খাতির ছিল। সেই শিখিয়ে দিয়েছিল কিভাবে নৌকার বৈঠা বাইতে হয়। নিশিকান্তর তাই তেমন কোন বেগ পেতে হলোনা।ওপারে গিয়ে ঝোপের আড়ালে নৌকাটাকে লুকিয়ে রেখে সে ঘন জঙ্গলের ভিতর ঢুকে গেল।লোকজনের চলাফেরা নেই বলেই হয়তো নাম নাজানা কত কত রকম গাছ ও ঘাস এখানেজন্মেছে। কিছুদূর এগোতেই নিশিকান্তের ভুল ভেঙ্গে গেল। সবাই বলেছে বা বলে যে এখানে দিনের বেলাও কেউ আসেনা ও এখানে না আসলে হয়তো তাইই বিশ্বাস করতো। আর এখানে এসে সে যা দেখলো তাতে তার চোখ কপালেউঠে গেল। এখানে কেউ আসেনা নয় বলতে গেলে নিয়মিতই আসে। আর তা না হলে জঙ্গলের একটু গভীরে যেতেই সে স্পষ্ট রাস্তা দেখতে পেতনা। ঘন জঙ্গলে মানুষ না আসলে সেখানে ঘাস জন্মে থাকতো যেটা সে নদীর কিনার থেকে জঙ্গলের কিছুদূর পর্যন্ত দেখেছে।অথচ এখানে তার ব্যতিক্রম তার সামনে ঘাসহীন চলার পথ। সেই অন্ধকার আর আধো আলো ছায়ারমাঝে নিশিকান্ত সেই পথ ধরে এগিয়ে যেতে লাগলো। বেশ অনেকক্ষণ হাটার পর তার সামনের পথ থেমে গেল। থেমে গেল বলতে তিনটা পথ এক স্থানে এসে মিলেছে বলে ওকে থামতে হলো।কোন পথ দিয়ে গেলে কোথায় গিয়ে পৌছাবে তা তার জানানেই।তারপর নিশিকান্ত চোখ বন্ধ করলো। সে চোখ বন্ধ করার সাথে সাথে একটা আলোর ঝিলিক চোখের মাঝে খেলে গেল। সেই আলোর ঝলকানিতে সে দেখতে পেলো তিনটা রাস্তার একদম শেষ রাস্তাটার মাথায় একটা বাড়ি আছে। সে কল্পনাতে হোক আর যেভাবেই হোক সে যা দেখতে পেলো সেই রাস্তায়ই যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিল। সেই অনুযায়ি সে হাটতে শুরু করলো। হাটতে হাটতে কখন যে সন্ধ্যা হয়ে গেছে তা সে টেরও পায়নি। টের পাবে কি করে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে সে যখন হাটছিলো তখন তার চারপাশ আলোকিত ছিল। সে ভাবলো এখনো সন্ধ্যা হতে ঢের বাকি।অথচ সন্ধ্যা হয়েছে অনেক আগেই। এই আলোর উৎস কি তা নিশিকান্তর জানা ছিলনা। আদৌ সেখানে সে অন্য কোন আলোতে পথ চলছিল কিনা তাও সে কল্পনা করেনি। একসময় সে একটা বাড়ি দেখতে পেলো। সেই বাড়ির দরজা জানালা সব বন্ধ। কোথাও কেউ আছে কিনা তা জানার জন্য বাড়িটার চারদিকে সে একটা চক্কর দিলো। এরপর দরজায় ধাক্কা দিলো।এইরকম সময়ে সে শুনতে পেলো কারা যেন কথা বলতে বলতে এদিকে আসছে। সে একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়লো। নিশিকান্ত দেখলো দুটো অদ্ভত রকম প্রাণীতে চড়ে দুজন মানুষ ঘরটার সামনে এসে দাড়ালো আর সাথে সাথে দরজা খুলে গেল। নিশিকান্ত বুঝতে পারলোনা দরজা এমনি এমনি খুলে গেল নাকি ওরা কোন মন্ত্র পড়ে দরজা খুললো। ও সব চেয়ে বেশি অবাক হলো যে লোক দুটো আসলো তাদের প্রত্যেকেরই তিনটা করে চোখ। দুটো ঠিক মানুষেরমত আর একটা ঠিক কপালের মাঝখানে। নিশিকান্তর হঠাৎ সেই বুড়ির কথা মনে হলো। সেই বুড়ির ছিল দুটো চোখ আর কপালের মাঝখানেএকটা বিশাল ফুটো। সেই ফুটো দিয়ে আলো বের হচ্ছিল আর সে যখন সেটা দিয়ে ভিতরে তাকালো আজব আজব অনেক কিছু সে দেখতে পেল। এই লোকদুটোর কি আসলেই তিনটে চোখ নাকি কপালেরমাঝখানের ওটা সেই বুড়ির মতই একটা ফুটো।সে আর কিছুই ভাবতে পারলোনা। আর যে প্রানী দুটোতে চড়ে লোকটা আসলো সেই প্রানীও অদ্ভুত। না ইউনিকর্ণ না ঘোড়া না মানুষ। এই সব কিছুরসাথে মিলিয়ে তার পেছনে দুটো ডানাও আছে। নিশিকান্ত অনেক বই পড়েছে। সে থেকে ও জানে এই অঞ্চলে ইউনিকর্ণ বা এ জাতীয় কোন প্রাণী থাকার কথা নয়। গোটা বাংলাদেশ এমনকি এশিয়াতে কোন আজব প্রাণী নেই। থাকলে বিজ্ঞানীরা অনেক আগেই খুজে পেত।তাহলে কিএরা ভীন গ্রহের বাসিন্দা? এখানে নিরিবিলি থাকার চেষ্টা করছে।তাও হতে পারেনা। পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে প্রবেশের আগেই বিজ্ঞানীরা নিশ্চই তাদের অস্তিত্ব টের পেতো। তাহলে কারা এরা? নাকি মনের ভুল। সে সাহস করেউঠে দাড়ালো। দরজার সামনে গিয়ে করাঘাত করলো কিন্তু সেই আগের মতই ভিতর বা বাইরে থেকে কোন সাড়া পাওয়া গেলনা।শেষে নিশিকান্ত ফিরে আসলো।নিশিকান্তর সামনে সময় যেনো থেমে গিয়েছিল। তাই সে যখন সেই ঘন জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসলো তখন সে দেখলো সূর্য উঠছে। সে অবাক হয়ে গেল। সে তাহলে একটা রাত এখানে কাটিয়েছে? ঝোপের ভিতর থেকে নৌকাটা খুজে পেতেই সে সেটাতে চেপে এ পাশে ফিরে আসলো। এসে দেখলো একটা লোক মাথা নিচু করে বসে আছে। সে নৌকা থেকে নেমে কাছে আসতেই চিনতে পারলো লোকটাকে। নৌকার সেই মাঝি। নিশিকান্ত ভাবলো এবার হয়েছে লোকটা নিশ্চই তেড়ে আসবে। তাই সে আগেই স্বীকার করে বললো চাচা আমার ভুল হয়ে গেছে আপনাকে না জানিয়ে আপনার নৌকাটা নিয়ে গিয়েছিলাম। নৌকার মাঝি ওকেতো কিছু বললেনই না বরং হা করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন তার পর ভুত ভূত বলে চেচিয়ে নৌকা ফেলে রেখে পালিয়ে গেলেন। নিশিকান্ত ভাবলো লোকটা বোধহয় পাগল হয়ে গেছে। তাই ওকে দেখে ভূত ভূত বলে পালিয়ে গেল এমনকি নিজের নৌকাটাও ফেলে গেল। শেষে নিশিকান্ত নৌকাটা ঘাটে বেধে রেখে বস্তির সেই ছোট্ট ঘরে ফিরতে লাগলো। পথেই যোসেফের বাসা। ভাবলো একবার কথা বলেই যাই ওরা কতদূর কি আয়োজন করেছে তা জেনে যাই। সেই ভাবনা থেকে নিশিকান্ত যখন ওদেরবাসায় গেল তখন যোসেফ সেকি রাগ। নিশিকান্ত ওর রাগের কারণ জানতে চাইলে যোসেফ বললো এভাবে আমাকে অপমান না করলেও পারতি। আমি না হয় তোকে ধর্ম ত্যাগ করে আমার ধর্মে আসতে বলেছি তাই বলে এভাবে অপমান করবি? আমি কি তোকে জোর করেছি? নিশিকান্ত ভেবে পেলোনা এর মাঝে সে যোসেফকে কখন অপমান করলো। সে বললো কি হয়েছে খুলে বল। আমি কখন তোকে অপমান করলাম? যোসেফ একটু শান্ত হয়ে বললো তোর ধর্মান্তরীত হওয়ার কথা ছিল আর আমি সব আয়োজন করে রেখেছিলাম অথচ সময় মত তুই আসলিনা! ।ওর কথা শুনে নিশিকান্ত থ হয়ে গেল। বলেকি এই ছেলে। ধর্মান্তরীত হওয়ার কথা সেই রবিবারে তা আসতে এখনো চারদিন বাকি অথচ ও এসব কি বলছে। নিশিকান্ত বললো ধর্মান্তরীত হওয়ার কথাতো সেই রবিবারে এখনোতো ঢের বাকি! যোসেফ এবার রেগে মেগে আগুন। রবিবার চলে গেছে গতকাল আর আজ সোমবার। ওর কথার আগা মাথা নিশিকান্ত কিছুই বুঝতে পারছিলনা। সেদিনের পত্রিকাটা হাতে নিতেই সত্যিটা অনুভব করতে পারলো। সত্যিই আজ সোমবার আর গতকালই রবিবার চলে গেছে। অথচ গতকাল বিকেলেইনা ও বেরিয়েছিল রাত পেরোতেই সে চলে এসেছে এর মাঝেই পাচ দিন পার হয়ে গেল কিভাবে? কোন কথা না বাড়িয়ে নিশিকান্ত বস্তিতে ও যেখানে থাকতো সেখানে চলে আসলো। হাতমুখ ধুয়ে সোজা চলে গেল স্কুলের বিজ্ঞান স্যারের কাছে। নিশিকান্তকে দেখে স্যার অবাক হলেন। তুমি কোথায় পালিয়ে গিয়েছিলে নিশিকান্ত। তোমারতো ধর্মান্তরীত হওয়ার কথা ছিল। তার পরতো তোমাকে কোথাও খুজেই পাওয়া যাচ্ছিলনা। কোথায় ছিলে এই কয়দিন । নিশিকান্ত পরিস্কার বুঝতে পারলো ওর মা অসুস্থ হওয়ারসময় যা ঘটেছিল এবারও তাই ঘটেছে তবে একটু বেশি সময় নিয়ে। সে বললো স্যার একটু সমস্যায় পড়েছিলাম তাই কোথাও কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি। নিশিকান্ত পাশ কাটিয়ে গেল আসল ঘটনা। তারপর একটু সময় নিয়ে সে জানালো যে সে এসেছে বিজ্ঞানের কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে। বয়স তের আর এই বয়সে স্যারের সাথে বিজ্ঞানের কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনায় এসেছে শুনে স্যারেরও ভালো লাগলো। যিনি বিজ্ঞান পড়ান তার কাছেতো বিজ্ঞান বিষয়ক সবই ভালো লাগবেই। নিশিকান্তকে তিনি বললেন বলো কি জানতে চাও। এই স্যারকে নিশিকান্ত বেশ পছন্দ করে। সে শিক্ষক হিসেবে সত্যিই দারুন। যেমন অনেক বিষয়ে জানাশোনা আছে তেমনি ছাত্রদেরসাথে বন্ধুর মত সম্পর্ক। নিশিকান্ত জানতে চাইলো স্যার সময়কে কি কোন ভাবে বেধে রাখা যায় বা থামিয়ে রাখা যায়? বা এমনকি হতে পারে পাশাপাশি দুটো স্থান এক স্থানে সময় চলমান আর এক স্থানে সময় স্থীর। ওর প্রশ্ন শুনে স্যার আশ্চর্য হয়ে গেলেন। এরকম প্রশ্ন সাধারণত এই বয়সী ছেলে মেয়েরা করতে পারেনা বা এরকম প্রশ্ন এদের মাথাতে আসারই কথা নয়। স্যার মন্ত্রমুগ্ধের মত ওর কথা শুনলেন এবং তার পর তিনি যতটুকু জানতেন তা জানালেন। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ দিন ধরে সময়কে কিভাবে স্থীর করা যায় তা নিয়ে গবেষণা করছেন। এমনকি নিশিকান্ত যে প্রশ্ন করেছে বিজ্ঞানীদেরমনেও একই প্রশ্ন। মহাবিশ্বে ওয়ার্ম হোল তৈরি থেকে শুরু করে আরো কত কিছুর কল্পনা করা হচ্ছে। তাতে দেখা গেছে যে পাশাপাশি দুটো স্থানের সময় দুই রকম হতেই পারে। কোন এক স্থানে সময় দ্রুত চলে আবার কোন কোন স্থানে ধীরে চলে। নিশিকান্ত আর কোন প্রশ্ন করলোনা। সে স্যারকে বিদায় জানিয়ে চলে আসলো। তার এখন স্পষ্ট মনে পড়ছে সেই বৃদ্ধা বুড়ির কথা। যারসাথে তার এক অন্ধকার রাতে রাস্তার মাঝে দেখা হয়েছি। বৃদ্ধা তখন এক্সিডেন্ট করে রাস্তায় গড়াগড়ি খাচ্ছিল। সে রাতে নিশিকান্তের আর ঘুম এলোনা। ওদিকে সেই নৌকার মাঝি চারদিকে ছড়িয়ে দিল এক পুচকে ছেলে তার নৌকা নিয়ে নদীর ওপাশে গিয়ে পাচ দিন থেকে এসেছে। সে মানুষ না ভূত। নিশিকান্ত দেখলো এতো মহা বিপদ। অথচ যে কোন ভাবেই হোক তাকে ওখানে যেতেই হবে। যেতে গেলে কেউ না কেউ দেখে ফেলবে। হাটতে হাটতে সেই নদীর ঘাটে গেল। গিয়ে অবাক হয়ে দেখলো সেখানে অনেক মানুষের ভীড়। ভীড় ঠেলে ভেতরে গিয়ে দেখলো ভীড়ের মধ্যমনি সেই নৌকার মাঝি। কথা বলছে মূলত নিশিকান্তকে নিয়েই। সেই সব গল্প শুনে নিশিকান্তরই অবাক হওয়ার পালা। সবাইতো জানতো এই নির্জন দ্বীপের মত ঘন জঙ্গলে দিনের বেলাও কেউ একা প্রবেশ করেনা সেখানে একা একটা তের বছরের ছেলে সেই ভয়ংকর জঙ্গলে পাচ দিন কাটিয়ে এসেছে শুনে যে কারো ভয়ে শিউরে ওঠারকথা। নিশিকান্ত ভাবলো অন্য কেউকি জানে যে ওই জঙ্গলে সময় থেমে যায়। নাকি অন্য কোন কারনে সবাই মনে করে যে জঙ্গলটা ভয়ংকর।কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থেকে নৌকার মাঝি কি কি গল্প বলে তা শুনতে ইচ্ছে হলো। এক সময় মাঝিকে একটা লোক প্রশ্ন করলো আচ্ছা যে বাচ্চা ছেলেটা তোমার নৌকা নিয়ে ওপারে গিয়ে পাচদিন থেকে এসেছে তাকে দেখলেকি চিনতে পারবে? মাঝি বললো অবশ্যই চিনতে পারমু।আরেকজন বললো আচ্ছা ছেলেটা যখন তোমার সামনেআসলো তখন কি ওর বড় বড় দাত ছিল? পাশ থেকে একজন বলে উঠলো কোন শিং ছিল? সেই সাথে আরো একজন বললো আচ্ছা ওর চোখ দিয়েকি তখন ধোয়া বের হচ্ছিল? লোকগুলোর প্রশ্ন শুনে নিশিকান্তর নিজের কাছেই নিজেকে ভয়ংকর মনে হচ্ছিল। আয়না থাকলে তখনই একবার সে নিজের চেহারাটা দেখেনিত। এবার সবার প্রশ্নের জবাবে নৌকার মাঝি বলতে শুরু করলো ুছেলেটা যখন আমার সামনে এসে দাড়ালো আমি তখন অনুভব করলাম চারদিক গরম হয়ে উঠেছে। একটা কড়া গন্ধ এসে নাকে লাগলো। আমি মাথা উচু করে তাকাতেই দেখতে পেলাম সেই ছোট্ট ছেলেটার লম্বা লম্বা দাত আর লম্বা লম্বা হাত পায়ের নখ। এ কথা শোনার সাথে সাথেই নিশিকান্ত নিজেরহাতে পায়ের নখের দিকে তাকালো। নাহ সব ঠিক আছে। লোকটা মিথ্যা বলছে। আবার মনে হলো সে যা বলছে তা সত্যিওতো হতে পারে। হয়তো সেই সময়ে সেরকমই ছিল এখন আর নেই। নিশিকান্ত আবারও শোনারচেষ্টা করলো লোকটা কি বলে।এবার লোকটা এমন কথা বললো যে নিশিকান্তর বমি আসতে লাগলো আর রাগে পেশি শক্ত হয়ে গেল। নৌকার মাঝি জানালো এর পর নাকি সেই ছেলেটা হঠাৎ তাকে কামড় দিতে ইয়া বড় বড় দাত বের করে তেড়ে আসছিল। সে কোন মতে দৌড়ে পালিয়ে বেচে গেছে। নির্ঘাত ছেলেটা ভূত বা এধরনের কিছু। নিশিকান্ত এবার নিজেকে ধরে রাখতে পারলোনা। ভীড় ঠেলে এগিয়ে গিয়ে বললো আপনারা এই পাগলের কথা শুনছেন কেন। ইনি যা বলছে তার কিছুই সত্যি নয়। দেখেন ইনি আরো কত মিথ্যা বলে। একজনে বলতে যাচ্ছিল খোকা তুমি কিভাবে শিওর হলে যে উনি মিথ্যা বলছেন তা আর প্রশ্ন করার দরকার হলোনা। মাঝি যে মিথ্যা বলছে তা মাঝি নিজেই প্রমাণ দিলো। নিশিকান্তকে দেখে বলে উঠলো আরে এইতো সেই ছেলে যে আমার নৌকা নিয়ে পাচদিন ওই জঙ্গলে থেকে এসেছে। এইতো আমাকে খাওয়ার জন্য তাড়া করেছিল। সবাই তখন নিশিকান্তর দিকে তাকালো। নাহ কোন অসঙ্গতি তারা খুজে পেলোনো। কেউ কেউ নিশিকান্তর হাত ছুয়ে দেখলো আর যারাঅতি ভীতু প্রকৃতির তারা নিশিকান্ত থেকে একটু দূরে সরে গেল।যখন দেখা গেল আসলে সেরকম কিছুই না তখন সবাই যে যার মত চলে গেল। সেখানে থেকে গেল শুধু নিশিকান্ত আর নৌকার মাঝি।মাঝি ওকে দেখে ভীত থাকলো। সেই ফাকে নিশিকান্ত আবার নৌকায় উঠে নৌকার বৈঠা বাইতে শুরু করলো। নদীর কুলে দাড়িয়ে মাঝি চিৎকার করে বলতে শুরু করলো যে ভয়ংকর ছেলেটা আবার জঙ্গলে ঢুকছে। কিন্ত তার কথায় কেউ কান দিলনা। সেরাতে নিশিকান্ত সাহস হারালোনা। সে মনে মনে ভাবলো আজ যে কোন ভাবেই হোক যা হয় হোক তবুও ওই অদ্ভুত লোকদের দেখা পেলে তাদের সামনে দাড়াবে। অপেক্ষায় থাকতে লাগলো কখন তাদের দেখা মেলে। ওর অপেক্ষার পালা যেন শেষই হতে চায়না।
(এই চ্যাপ্টার শেষ করে আগের চ্যাপ্টারের শেষে কি ঘটেছিল তা লিখতে হবে)
বিশ্বের নানা প্রান্তে একটা ভয়ংকর সংবাদ প্রচারিত হলো। ভীন গ্রহবাসী পৃথিবীতে এসেছে। তারা পৃথিবীরএখন চরম বিপদ। বিজ্ঞানীরা জানেনা কোথায় সেই ভয়ংকর প্রাণীগুলি অবতরণ করেছে। তারা শুধু এতটুকু জানতে পেরেছে যে এই বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে হলে এমন একটা ছেলে দরকার যার বয়স তের বছর। যার অন্যরকম শক্তি আছে। যার শরীরের ভিতর দিয়ে গামা রশ্মি প্রবাহিত হতে পারে। যার হৃৎপিন্ডের সিস্টোলিক চাপ ডায়াস্টোলিক চাপের তিন গুন। সেই ছেলেটি এমন যে একহাজার পাওয়ারের লাইটের দিকে টানা দশ মিনিট তাকিয়ে থাকতে পারবে তার কিছুই হবেনা। বিজ্ঞানীরা একটা আল্ট্রা সাউন্ড ব্যবহার করে সেই ভয়ংকর প্রাণীদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করছে কিন্ত কোন ভাবেই সেই তরঙ্গ তারা ধরতে পারছেনা। পৃথিবী ব্যাপী এই সব কথা প্রচার করা হচ্ছে ঘন্টায় ঘন্টায়। যে যতটুকু পারছে চেষ্টা করছে এরকম একটা ছেলে খুজে বের করতে। নিজ বাসায় যে সমস্ত ছেলে সন্তানআছে এবং যাদের বয়স তের বছর তাদের ক্লিনিক্যাল টেষ্ট করা হচ্ছে। কিন্ত তিন চার দিন কেটে যাওয়ার পরও এমন কোন ছেলে সন্তানের খোজ মেলেনি।

