Sunday, May 19, 2024
Homeনিবন্ধনিরাপদ পৃথিবীর জন্য যে কিশোরীরা লড়াই করছে

নিরাপদ পৃথিবীর জন্য যে কিশোরীরা লড়াই করছে

আজকের শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যত। আর সেই ভবিষ্যত প্রজন্ম যেন নিরাপদে বেড়ে  ওঠে তার জন্য চাই একটি নিরাপদ পৃথিবী। যে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল থাকবে শিসামুক্ত,ওজনস্তর থাকবে ফাটলমুক্ত। যে পৃথিবী থাকবে সবুজ শ্যামলিমায় ঘেরা। তারুণ্যের কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন 

এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান

জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপপিঠে

চলে যেতে হবে আমাদের

চলে যাবতবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ

প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,

বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি

নবজাতকের কাছে আমার দৃঢ় অঙ্গীকার

কবি আগামী দিনের শিশুদের জন্য যেমন পৃথিবী রেখে যেতে চেয়েছিলেন আমরা তেমন পৃথিবী পাইনি। দিন যাচ্ছে আর পৃথিবী তার রূপ হারাচ্ছে। ক্রমাগত ভাবে পৃথিবী ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌছে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে একদিন এ পৃথিবীতে মানুষ বসবাস করতে পারবে না। একদিন এ পৃথিবী হয়ে উঠবে মৃত্যুপুরী। পৃথিবীর জলবায়ু বদলে যাচ্ছে। পানি ও বাতাস দুষিত হচ্ছে। শহর থেকে গ্রাম বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। নগরায়নের এই যুগে পৃথিবী তার স্বরুপ হারাচ্ছে। এ নিয়ে আমাদের মত বড়রা চিন্তা না করলেও পৃথিবীতে কিছু শিশু কিশোর কিশোরী পৃথিবী বাঁচানোর জন্য সংগ্রাম করছে তাদের মধ্যে গ্রেটা থুনবার্গ,ফাতিহা আয়াত, সুবহা সাফায়েত সিজদা এবং রেবেকা শবনম অন্যতম। তাদের সম্পর্কে আজ আমরা আলোচনা করবো। 

গ্রেটা থুনবার্গ:

পরিবেশ আন্দোলনের সাথে যুক্ত কিশোর কিশোরীদের মধ্যে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে আলোচিত নাম গ্রেটা থুনবার্গ। ফিনিক্স পাখির মত তার গল্প আজ বিশ্বব্যাপী আলোচিত। ছোট্ট মানুষটি যখন কন্ঠ উচিয়ে বলে “ হাউ ডেয়ার ইউ” তখন বিশ্ব নেতারা নড়ে চড়ে বসে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে সফল হয়েছেন গ্রেটা। বিষয়টিকে বৈশ্বিক আন্দোলনে রূপান্তরিত করেছেন। বলা যায়, এই আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন কৈশোরেই। গ্রেটার জন্ম ২০০৩ সালের ৩ জানুয়ারি সুইডেনের স্টকহোমে।তার মা ম্যালেনা আর্নম্যান একজন অপেরা গায়িকা এবং বাবা স্ভান্তে থুনবার্গ একজন অভিনেতা এবং রসায়নে নোবেল পুরস্কার জয়ী বিজ্ঞানী স্ভান্তে আরহেনিয়াসের উত্তরসূরি।

৮ বছর বয়সে তাঁর ‘অ্যাসপারজার সিনড্রোম’ ধরা পড়ে, যা একধরনের বিকাশগত ব্যাধি। এই ব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষেরা একটা ধারণা বা আগ্রহের ওপর গভীরভাবে মনোনিবেশ করে। গ্রেটার ক্ষেত্রে এই বিষয় ছিল জলবায়ু পরিবর্তন। গ্রেটা বলেন, ‘আমার অনেকটা এমন মনে হচ্ছিল যে আমি যদি জলবায়ুর পরিবর্তন সম্পর্কে প্রতিবাদ না করি, তাহলে ভেতরে ভেতরে আমি যেন মারা যাচ্ছিলাম।’

এর কয়েক বছরের মধ্যে গ্রেটা নিজেকে পরিবর্তন করে। হয়ে যায় নিরামিষাশী এবং বিমান ভ্রমণ থেকে বিরত থাকে। মা–বাবাকেও নিরামিষাশী হতে এবং বিমানে ওঠা এড়াতে রাজি করায়। গ্রেটা ২০১৮ সালে স্থানীয় এক পত্রিকায় জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে রচনা প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পায়। একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে সুইডেনের জাতীয় নির্বাচনের তিন সপ্তাহ আগে পার্লামেন্টের সামনে বসে পড়ে গ্রেটা। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আইনপ্রণেতাদের উদ্বুদ্ধ করতে ‘স্কুল স্ট্রাইক ফর ক্লাইমেট’ লেখা একটা ব্যানার নিয়ে শুরু করে অবস্থান কর্মসূচি। এই আন্দোলন গ্রেটা একাই শুরু করেছিল। পরদিন থেকে অনেকেই তাঁর পাশে দাঁড়াতে শুরু করে। তাঁর এই আন্দোলন প্রচারমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এরপর ‘ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার’ নামে একটা আন্দোলন শুরু করে। প্রতিবাদ স্বরুপ প্রতি শুক্রবার স্কুলে অনুপস্থিত থাকে গ্রেটা। তাঁর এই অভিনব প্রতিবাদও অল্প দিনের মধ্যে সুইডেন এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশে ছড়িয়ে পড়ে। গ্রেটা ইউরোপজুড়ে ট্রেন ভ্রমণ শুরু করে এবং বিভিন্ন স্থানে বক্তৃতা দিতে থাকে।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ব্যর্থতার জন্য বিশ্ব নেতাদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে নিন্দা করে আবেগপূর্ণ বক্তৃতা করেছেন সুইডেনের কিশোরী জলবায়ু আন্দোলনকারী গ্রেটা থানবার্গ। নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘের সদর দফতরে সংস্থাটির সেই জলবায়ু সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন অর্ধশতাধিক বিশ্বনেতা। গ্রেটা তার কন্ঠকে যথাসম্ভব উচু করে দৃঢ় কন্ঠে ঘোষণা করেছে ‘বাস্তুসংস্থান ধ্বসে পড়ছে, গোটা বিশ্ব আজ গণবিলুপ্তির (মানুষসহ সকল প্রাণী) হুমকির মুখে অথচ আপনারা সবাই টাকার কথা বলছেন, আপনারা যার যার দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে ভাবছেন। এই সাহস আপনাদের হয় কীভাবে?’বক্তৃতার শুরুতেই প্রচন্ড আক্রমণাত্মকভাবে কথা বলা শুরু করেন গ্রেটা থুনবার্গ। বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে গোটা বিশ্বের তরুণ ও যুব সমাজের হয়ে সে কী বার্তা দিতে চায় এমন প্রশ্ন করা হলে গ্রেটা থুনবার্গ বলে, ‘আমাদের বার্তা হলো, আমরা আপনাদের ওপর নজর রাখছি।’ 

গ্রেটা থুনবার্গ তার বক্তব্যে গোটা বিশ্বের তরুণ সমাজের সঙ্গে বিশ্বনেতারা প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে বলে অভিযোগ করে। সরকারপ্রধানদের উদ্দেশে সে বলে, ‘আপনারা আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করছেন, আমাদের ব্যর্থ করে দিচ্ছেন। আপনাদের বিশ্বাসঘাতকতা বুঝতে পারছে যুবসমাজ।’ গ্রেটা থুনবার্গের আশঙ্কা, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গোটা পৃথিবী কী মারাত্মক ঝুঁকির মুখে আছে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই তা বলে আসলেও এবারের সম্মেলনেও বৈশ্বিক এই ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন কোনো পরিকল্পনা বিশ্ববাসীর সামনে হাজির করতে পারবেন না বিশ্বনেতারা। বিশ্ব নেতাদের চোখে চোখ রেখে এই কিশোরী বলেছে ‘আপনারা আপনাদের ফাঁকা বুলি দিয়ে আমার স্বপ্ন এবং আমার শৈশব চুরি করেছেন। ভবিষ্যত প্রজন্মের চোখ আপনাদের এখন আপনাদের ওপর। যদি আপনারা আমাদের ব্যর্থ করতে চান তাহলে আমি বলছি, আপনাদের আমরা কখনোই ক্ষমা করবো না।’ গ্রেটা আরও বলেছে “এই সবকিছুই ভুল। আমার এখানে থাকা উচিত নয়। মহাসাগরের ওপারের স্কুলে আমার থাকার কথা। আমরা এভাবে চলতে দেব না।’ রাষ্ট্র প্রধানদের উদ্দেশে সে বলে, ‘তারা শিশুদের অধিকার রক্ষায় কাজ করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিলেও আদৌ তারা কিছুই করছে না।

জার্মানিতে একটি কয়লা খনি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে আটক হয়েছিল প্রখ্যাত সুইডিশ পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ। অবশ্য আটকের কয়েক ঘন্টা পরই তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। মুক্তির পর সে বলেছিল ‘জলবায়ু রক্ষার আন্দোলন কোনো অপরাধ নয়।’

ওয়াঙ্গারি মাথাইয়ের মৃত্যুদিবস ছিল ২৫ সেপ্টেম্বর। খুব নীরবে দিনটি চলে গেল। ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন’ সপ্তায় বিশ্ব সংবাদমাধ্যম গ্রেটা থুনবার্গকে নিয়ে এতই ব্যস্ত থাকল যে মাথাইয়ের নামও শোনা গেল না কোথাও! পরিবেশসচেতনতা আন্দোলনে নতুন ঢেউ আনতে পারায় গ্রেটা ধন্যবাদার্হ নিঃসন্দেহে! গ্রেটা কিশোরী হওয়ায় তার প্রতি দুনিয়াও সহানুভূতিশীল। এ বছর বিবিসির জরিপেও গ্রেটা বিশ্বের ১০০ জন অনুপ্রেরণাদায়ী নারীর মধ্যে অন্যতম একজনের স্বীকৃতি পেয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় ভূমিকা রাখার জন্য গ্রেটা অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছে। ২০১৯ সালে মনোনীত হয়েছিল শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য। ২০১৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর মাত্র ১৭ বছর বয়সী গ্রেটা টাইম ম্যাগাজিনের বর্ষসেরা ব্যক্তিত্ব নির্বাচিত হয়। ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে এই গৌরব অর্জন করে গ্রেটা থুনবার্গ। টাইম ম্যাগাজিন তাঁকে ‘দ্য পাওয়ার অব ইয়ুথ’ উপাধিতে ভূষিত করে। স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো গ্রেটার প্রশংসা করেছেন এই বলে যে সে যা অর্জন করেছে তা আর কেউ করতে পারেনি। গ্রেটাকে তিনি বলেছেন, “তুমি পৃথিবীকে জাগিয়ে তুলেছ। আমি তোমার কাজে গর্বিত।”

ফাতিহা আয়াত:

ফাতিহা আয়াত যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বসবাসকারী বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত লেখক, শিশু অধিকার কর্মী ও একজন জলবায়ু পরিবর্তন সংস্কারক। সে CHIL&D নামের একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা যেখানে জলবায়ু, স্বাস্থ্য, তথ্য, শিক্ষা ও উন্নয়ন নিয়ে কাজ করে। ফাতিহা আয়াত ২০১১ সালের ১৩ অক্টোবর বাংলােদেশে জন্মগ্রহণ করে।আমেরিকার বুকে নিজেকে একটুকরো বাংলাদেশ করে রেখেছে।তার বর্তমান বয়স ১৩ বছর। ফাতিহার বয়স যখন সাত বছর সেই বয়স থেকে ফাতিহা নিজে শেখে আর অন্যদের শেখায়। যে বয়সে আমরা বাসায় মেহমান আসলে লজ্জা আর ভয়ে লুকিয়ে থাকি সেই বয়সে সে জাতিসংঘের সদরদপ্তরে বিখ্যাত সব মানুষের সামনে বক্তব্য দিয়েছে।ওর বক্তব্য শুনে অন্যরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছে। 

শুধুমাত্র ২০২৩ সালেই ফাতিহা আয়াত এখন পর্যন্ত তিন বার জাতিসঙ্ঘ সদর দপ্তরে বক্তব্য রেখেছে। এগুলো ছিল বিশ্ব পানি সম্মেলন, ইকোসক ইয়ুথ ফোরাম, ১৭তম আন্তর্জাতিক মানবাধিকার যুব সম্মেলন।বিশ্বের নানা প্রান্তে ফাতিহা আমন্ত্রিত হয়ে শিশু অধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন রোধ সহ নানা বিষয়ে বক্তব্য দিয়ে থাকে। অধিকার প্রতিষ্ঠায় কথা বলে।কিছুদিন আগেই সে “চেঞ্জ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ” শীর্ষক তার প্রথম টেডএক্স বক্তব্য রেখেছে নিউইয়র্কের ইরভিংটনে। এছাড়াো এস্টনিয়ার রাজধানী ট্যালিনে আয়োজিত “লেটস ডু ইট” কনফারেন্সে সে বক্তব্য । তার অন্যান্য বক্তব্যের মধ্যে রয়েছে ইউএন গ্লোবাল কম্প্যাক্ট ও প্যাসিফিক ইন্সটিটিউট আয়োজিত “ওয়াটার ম্যান্ডেট” সেমিনার,কার্বন ডিস্ক্লোজার প্রজেক্ট আয়োজিত “ওয়াটার সিকিউরিটি” কনফসারেন্সে বক্তব্য এবং সাস্টেইনেবল ডেভেলপ্নেন্ট সলিউশন্স নেটওয়ার্ক আয়োজিত “হিউম্যান প্ল্যানেট ফোরাম” অনুষ্ঠানে রাখা বক্তব্য অন্যতম।

গত বছর ২৬ সেপ্টেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য পুত্র সজিব ওয়াজেদ জয়ের উপস্থিতিতে ফাতিহা জাতিসংঘে বক্তব্য দিয়েছে। আর এ বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে একই দিন একই বিষয়ে জাতিসংঘে বক্তব্য রেখেছে। নানা বিষয় নিয়ে ফাতিহা সচেতনতা গড়ে তুলতে কাজ করছে। আমরা যখন গাছ কাটি,আইসক্রিম খেয়ে যেখানে সেখানে খোসা ফেলে পরিবেশ নষ্ট করি, ছোট্ট ফাতিহা তখন পৃথিবীকে বাঁচানোর জন্য প্রতিবাদ করে। এরই প্রেক্ষিতে গত ১২ আগস্ট বিশ্ব যুব দিবসের অনুষ্ঠানে সে জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছে। সেখানে সে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা যুবকদের দ্বারা বনাঞ্চল ধ্বংস ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে এর ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরেছে। এছাড়াও ১৬তম আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সম্মেলন, ইউএন ডে এবং উইমেন পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাজেন্ডাতে অংশ নিয়ে শিশু নির্যাতন, লিঙ্গ বৈষম্য, পারিবারিক সহিংসতায় শিশুদের সমস্যা, শরণার্থী শিশুদের অমানবিক জীবন নিয়ে বক্তব্য তুলে ধরেছে।ওর বয়সীরা যখন কথা বলতেই ভয় পায় ফাতিহা তখন শিশুদের আনন্দময় শিক্ষার অধিকার নিয়ে কথা বলে।

বিশ্বব্যাপী শিশুদের দুঃখ-দুর্দশার কথা শুনে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বড় হয়ে সে এমন কিছু করবে যেন আর কোনো শিশু ক্ষুধা বা তৃষ্ণায় একটি দিনও না কাটায়। ফাতিহার মতে ‘সন্তানকে মুখস্থ করাবেন নাকি আবিষ্কারের নেশা ধরিয়ে দেবেন সেই সিদ্ধান্ত আপনার’ । ছোট্ট ফাতিহা ক্ষুধা,দারিদ্র ও শিশু কিশোর কিশোরীদের জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়ার জন্য সবাইকে আহ্বান জানিয়েছে। এই পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হলে ফাতিহার সাথে কন্ঠ মেলাতে হবে।

রেবেকা শবনম:

গ্রেটা থুনবার্গ আর ফাতিহা আয়াতের সাথে কন্ঠ মিলিয়ে রেবেকা শবনম বিশ্বকে বাঁচানোর জন্য আওয়াজ তুলে বিশ্বব্যাপী আলোচিত হচ্ছে। ফাতিহার মতই সেও বিশ্বের প্রবল প্রতাপশালী দেশ আমেরিকার মাটিতে দাঁড়িয়ে যখন বলছে আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি, তখন লাল সবুজের পতাকাটি আরো খানিকটা সম্মানিত হচ্ছে।

মাত্র ছয় বছর বয়সে মা-বাবার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমায় রেবেকা শবনম। গত ১০ বছরে দেশের স্মৃতি তার অন্তর থেকে ম্লান তো হয়ইনি বরং দেশের কল্যাণের ভাবনায় তার পরিকল্পনা দৃঢ়তর হয়েছে। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অত্যন্ত সপ্রতিভ ষোড়শী রেবেকা। আর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সে জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের ঝুঁকি ও তা মোকাবেলার প্রয়োজনীয়তা বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার জন্য নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছে।

এইতো সেদিনের কথা। স্পেনের মাদ্রিদে চলছিল বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের অধিকার আদায়ে ওই সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একদিকে বাংলাদেশ সরকারের হয়ে প্রধানমন্ত্রী যেমন চেষ্টা করে যাচ্ছেন, অন্যদিকে তেমনি আন্দোলনকারীদের কাতারে থেকে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে রেবেকা। সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সে ম্যানহাটানে প্রায় দুই লাখ মানুষের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল। জলবায়ু পরিবর্তনরোধে সোচ্চার সুইডিশ কিশোরী গ্রেটা তুনবার্গের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ম্যানহাটানে জড়ো হওয়া আন্দোলনকারীদের সামনের সারিতে ছিল রেবেকা শবনম। তাকে নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা।তারপরই সে রাতারাতি পরিচত হয়ে ওঠে বিশ্বের কাছে।

বর্তমানে নিউ ইয়র্কে বসবাসরত শবনমের চেষ্টা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশ কতটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, সে বিষয়ে সবাইকে জানানো। নিউ ইয়র্কে হাজারো মানুষের সামনে সে বলেছে, ‘আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি, যা জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম।’ বক্তৃতায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরে সে।

আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রেবেকা বলে, ‘ভেবেছিলাম, যখন বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হবে তখন সবাই চুপ থাকবে। তবে সবার সাড়া দেখে আমি নিজেই অবাক। এটা শুধু পরিবেশগত সংকট না, এটা মানবাধিকার সংকটও। বাংলাদেশের নারীরা পাচারের শিকার হয়। আর এটা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আরো বেড়েছে। আমরা বাংলাদেশে থাকা নারী ও রোহিঙ্গাদের জানাতে চাই, তাদের জীবনের জন্য বিশ্বজুড়ে আন্দোলন করছি আমরা। এখনও স্কুলজীবন শেষ হয়নি রেবেকা শবনমের। সে মনে করে, সামনে হাঁটতে হবে আরও অনেক পথ। ভয়াবহ ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের নারী, শিশু ও রোহিঙ্গাদের জন্য বিশ্বের দরবারে কীভাবে সুবিচার প্রত্যাশা করা যায়, সেটাই তার চিন্তার মূল বিষয়। রেবেকা বলেছে, জলবায়ু আন্দোলনে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ কেউ যেন ভুলে না যান, তা নিশ্চিত করতে লড়াই চালিয়ে যাবে সে।আমাদের দেশে এমন রেবেকার সংখ্যা নেহায়েত কম নয়,যারা পৃথিবীকে বাঁচাতে চায়।শুধু জ্বলে ওঠার অপেক্ষায়।

এভাবেই দুনিয়া জুড়ে তিন কিশোরী নিজ নিজ অবস্থান থেকে সুন্দর ও নিরাপদ পৃথিবীর দাবিতে কাজ করে যাচ্ছে। তারা হয়তো সুকান্তর সেই কবিতা কখনো পড়েনি কিন্তু এই বয়সেই হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছে যে এ পৃথিবীকে বাস যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। এবং আশা করা হলো তারা অনেকটা সফলও হয়েছে। নাসার তথ্য মতে গত কয়েক বছরে বিশ্বব্যাপী যে পরিবেশ আন্দোলন গড়ে উঠেছে গ্রেটা থুনবার্গের উদ্যোগে তার কারণে আগের চেয়েও পৃথিবী অনেক বেশি সবুজ হয়েছে। সুতরাং আমরা সুন্দর একটি পৃথিবী গড়ে উঠবে সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করতেই পারি এবং সেই সাথে আমরা চাই পৃথিবীর ঘরে ঘরে এমন আলোকিত শিশু কিশোর কিশোরীর জন্ম হোক। যারা নিজেরাই নিজেদের জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তুলবে এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্যও একটি নিরাপদ, সবুজ পৃথিবী রেখে যাবে।

১৫ অক্টোবর ২০২৩

লেখাটির অংশবিশেষ প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক খবরের কাগজ পত্রিকায় ২৪ অক্টোবর ২০২৩ এ। প্রকাশিত লেখার লিংক

Most Popular