নিজেকে লিখি খোলা চিঠি

0
20

সারাজীবন কত মানুষকে চিঠি লিখেছি এবার নিজেকে লিখলাম। নিজের কাছে নিজের চিঠি।

প্রিয় জাজাফী

তোমাকে আমি খুব গুরুত্বপুর্ন কিছু কথা বলার জন্য এই চিঠি লিখছি।আমি জানি এই কথাগুলির অধিকাংশই তোমার জন্য প্রযোজ্য নয় তার পরও তোমাকে লিখছি কারণ তুমি আমার কথাগুলোকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিবে এবং তোমার মাধ্যমে অনেকেই কথাগুলো জানতে পারবে যাদেরকে আমি নিজে সরাসরি বললে এসব থোড়াই কেয়ার করতো। এগুলো কোন উপদেশ নয়, ধরে নিতে পারো এগুলো আমার নিজের অভিমত যা আমি কখনো কারো উপর চাপিয়ে দেইনি, তবে আমি সব সময় আশায় বুক বাঁধি অন্যরাও এটি অনুসরণ করবে।

প্রিয় জাজাফী

বিপদ কখনো বলে আসেনা। তাই যে কোন বিপদের সময় আশাহত হবে না,ঘাবড়ে যাবে না।মাথা ঠান্ডা রেখে সিদ্ধান্ত নিবে।কোথাও আগুন লাগলে সাহায্য করবে এবং সাহায্য করতে না পারলে অন্তত ভীড় বাড়িয়ে দমকল বাহিনীর কাজে বিঘ্ন ঘটাবে না।বিপদগ্রস্থ মানুষের ছবি তুলে ফেসবুকে দিয়ে লাইক শেয়ার পাওয়ার চেয়ে তার সাহায্যে যতটা পারো হাত বাড়িয়ে দিও।কেউ যখন রক্ত চেয়ে তোমাকে মেসেজ দিবে তখন চেষ্টা করো সাহায্য করতে। রক্ত দিতে ভয় পেয়ো না।মনে রেখো একের রক্ত অন্যের জীবন।পারত পক্ষে বিপদাপন্ন মানুষের পাশে দাড়াবে।সাহায্য করতে না পারলেও অন্তত তাকে অভয় দেবে,সাহস দেবে। কাউকে এমন কোন পরামর্শ দেবে না যা তার জন্য সামান্য তম হলেও ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়ায়।

প্রিয় জাজাফী

কেউ যখন তোমাকে কিছু বলতে চায় তুমি মন দিয়ে শোনো। ব্যস্ত থাকলে তাকে তোমার ব্যস্ততার কথা বলে কথা সংক্ষিপ্ত করতে বলো অথবা সময় নাও পরে শুনবে বলে।তা বলে এড়িয়ে যেও না।হতে পারে কথাগুলো সে তোমাকে বলতে পারলে তার অনেক প্রশান্তি আসবে,উপকার হবে।কারো কথার মাঝে তাকে থামিয়ে দিওনা বরং পুরোটা বলতে দাও।আগে ভালো শ্রোতা হও তার পর বক্তা।কোন একটি বিষয় সম্পর্কে তোমার জানা না থাকলে তুমি তা অকপটে স্বীকার করো এবং জেনে নাও। নিজের অজ্ঞতা ঢাকার জন্য বানোয়াটি কোন কথা বলা থেকে নিজেকে বিরত রাখো।

প্রিয় জাজাফী

অন্যের সমালোচনা করা খুব সহজ,এটি সবাই করে থাকে কিন্তু নিজের সমালোচনা কেউ নিজে করে না এবং অন্যে যখন সমালোচনা করে তখন তা খুব কম সংখ্যক মানুষ মেনে নিতে পারে।তুমি অন্যের সমালোচনা করার আগে নিজের সমালোচনা করো,নিজের দোষগুলো খুজে বের করে তা থেকে বেরিয়ে আসো।তোমাকে নিয়ে কেউ সমালোচনা করলে সেগুলোকে যথেষ্ট গুরুত্ব দাও এবং তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করো।সমালোচনা করার চেয়ে গ্রহণ করাই শ্রেয় বলে মনে করো।

প্রিয় জাজাফী

তোমাকে যদি কখনো কেউ ফোন করে বা শুভেচ্ছা জানিয়ে মেসেজ দেয় তবে তুমি চেষ্টা করো সেটা রিসিভ করতে এবং উত্তর দিতে।যদি তুমি খুব ব্যস্ত থাকো তবে পরে সময় করে মেসেজের উত্তর দিও,ফোন ব্যাক করো। এটা তোমার দায়িত্ব।যার ফোন তুমি রিসিভ করতে পারোনি তাকে ফোন ব্যাক করার নাম সৌজন্যতা। তোমার উচিৎ সৌজন্যতা শেখা।

প্রিয় জাজাফী

ভালো কাজের জন্য মানুষকে ধন্যবাদ দিও।এমনকি সেই ভালো কাজটি যদি তোমার জন্য নাও হয়ে থাকে। তুমি যদি দেখো কেউ একজন আইসক্রিম খেয়ে প্যাকেট বা কাঠি যেখানে সেখানে না ফেলে ময়লা রাখার নির্দিষ্ট স্থানে ফেলেছে তবে তুমি তাকেও ধন্যবাদ দিও।কারণ সে জায়গা নোংরা না করে একটি ভালো কাজ করেছে।তুমিও চেষ্টা করো যেখানে সেখানে ময়লা না ফেলতে।আমরা প্রত্যেকে যদি নিজের ব্যবহৃত ময়লা নির্দিষ্ট স্থানে ফেলি তবে পরিবেশ এমনিতেই পরিচ্ছন্ন হবে।

প্রিয় জাজাফী

রাস্তা ঘাটে চলতে গেলে তুমি দেখবে অনেক ধুলাবালি।কখনো কখনো থুথু ফেলতে হবে।তুমি অবশ্যই চেষ্টা করো যেখানে সেখানে থুথু না ফেলতে। তুমি হয়তো ভাবছো এখানে থুথু ফেললে কিছু হবে না আসলে তা নয়। অন্যের ফেলা থুথু তোমার চোখে পড়লে পায়ের নিচে পড়লে বা হাতে লাগলে তোমার কেমন লাগবে? নিশ্চই খারাপ লাগবে। ঠিক একই ভাবে তোমার ফেলা থুথু অন্যের ক্ষেত্রে এমর পরিস্থিতির জন্ম দিবে।

প্রিয় জাজাফী

পরিচিত কেউ অসুস্থ হলে খোঁজ নিও।সহমর্মিতা জানাও।এতে করে তার হয়তো কোন উপকার হবে না তবে সে সাহস পাবে এবং খুশি হবে। তুমিও যদি কখনো অসুস্থ্য হও তবে দেখবে তোমার পাশে কত প্রিয় মুখ। তোমার তখন ভালো লাগবে। পাশাপাশি তোমার অসুখের কথা শুনে যদি খুব কাছের কেউ না আসে তবে তুমি মন খারাপ করবে না।হতে পারে তার আসার ইচ্ছে ছিলো কিন্তু আসতে পারেনি।

প্রিয় জাজাফী

রাস্তা পারাপারে সব সময় ওভারব্রীজ ব্যবহার করবে।যদি কোথাও ওভারব্রীজ না থাকে তবে খুব সাবধানে পার হবে।আর হাটার সময় ফুটপাত ব্যবহার করবে।তুমি নিজে সচেতন হলে তোমাকে দেখে হয়তো কেউ না কেউ অনুপ্রাণিত হবে।দুর্ঘটনা রোধ হবে।

প্রিয় জাজাফী

ধুমপান করো না এটি ক্ষতিকারক। আর একান্তই যদি ধুমপানে আসক্ত হও তবে এমন ভাবে করো যেন তোমার ধুমপান অন্যের বিরক্তির কারণ হয়ে না দাড়ায়।রাস্তাঘাটে অহরহ দেখা যায় ধুমপানকারীদের জন্য অধুমপায়ীরা কষ্ট পায়।তারাতো তোমার কোন ক্ষতি করেনি তাহলে তুমি কেন তাদের বিরক্তির কারণ হবে?ক্ষতির কারণ হবে? একই ভাবে পান খেলে যেখানে সেখানে থুথু ফেলো না।যদিও জানি তুমি এসবের কোনটিতেই আসক্ত নও এবং তুমি যথেষ্ট সচেতন।

প্রিয় জাজাফী

বেসিনে হাতমুখ ধুতে গিয়ে অযথাই ট্যাপ খুলে রাখবে না।পানির অপচয় করবে না।ফ্রি হোক আর নিজের কেনা হোক তুমি কখনো টিস্যুপেপারও অপচয় করবে না। গ্যাসের চুলা অযথাই জ্বালিয়ে রাখবে না।এমনকি তোমার আম্মু বা বোন যদি জ্বালিয়ে রাখে তবে তুমি বন্ধ করে দিবে।অযথা অতিরিক্ত লাইট জ্বালিয়ে রাখবে না। যতটুকু খাবার তুমি খেতে পারো তার বেশি নিয়ে নষ্ট করবে না।

প্রিয় জাজাফী

টয়লেট ব্যবহারের ক্ষেত্রে সব সময় খেয়াল করবে তোমার ব্যবহারের পর যেন তা অন্যের ব্যবহার উপযোগি থাকে। অন্যের ব্যবহার উপযোগি রাখার মাধ্যমেই সবাই নিজে ব্যবহারের সময় পরিচ্ছন্ন পরিবেশ পেতে পারে।ব্যবহৃত টিস্যু যেখানে সেখানে ফেলবে না। কখনো টয়লেটে ফ্ল্যাশের ব্যবস্থা থাকলে অবশ্যই ফ্ল্যাশ করবে এবং হাই কমোডের সিট উঠিয়ে রাখবে যেন ভিজে গিয়ে অন্যের ব্যবহারের অনুপোযোগি না হয়।

প্রিয় জাজাফী

কখনো কোন কিছুতে নিজের সামান্য ক্ষতি হবে ভেবে নিজের দোষ অন্যের উপর চাপিয়ে দেবে না। মনে রাখবে দোষ স্বীকার করার মধ্যেই মহত্ব লুকিয়ে আছে। দুদিনের এই ক্ষণিকের জীবনে দাপট দেখানোর কিছু নেই। সবাইকে নিয়ে মিলে মিশে থাকার মধ্যেই জীবনের সার্থকতা নিহীত।

প্রিয় জাজাফী

তুমি যদি পাবলিক বাসে ওঠো এবং বসার সিট না পাও তবে খালি থাকা সাপেক্ষে মহিলা সিটে বসতে পারো।তবে যখনই কোন নারী,প্রতিবন্ধী বা বয়স্ক কেউ উঠবে তাকে সিট দিও।তবে পারত পক্ষে সিট না থাকলেও মহিলা সিটে বসো না।বরং অন্যান্য সিটে বসা অবস্থায় কোন নারী,শিশু,বয়স্ক সিট না পেলে সাধ্য মত তাকে বসতে দাও।তোমার সামর্থ আছে দাড়িয়ে থাকার,তাদের হয়তো নেই। সামান্য পথ দাড়িয়ে থাকলে তোমার নিশ্চই ক্ষতি হবে না ঠিক যেমন তুমি সামান্য পথ বসে গেলে তেমন কোন উপকার হবে না।

প্রিয় জাজাফী

তোমাকে যারা ভালোবাসে,স্নেহ করে তাদের তুমি অতি অবশ্যই ভালোবাসবে। আর যারা তোমাকে ঘৃণা করে বা অবহেলা করে তাদেরকে তুমি কখনোই ঘৃণা করবে না বা অবহেলা করবে না।তুমি তাদেরকে গুরুত্বের সাথে দেখবে ঠিক যেমন তুমি যাদের ভালোবাসো তাদেরকে যেমন গুরুত্ব দাও তেমন। কখনো কাউকে ছোট করো না। তুমি তাদের মত হইও না কখনো।

প্রিয় জাজাফী

মানুষ চারদিকে অনেক কথা বলে।সেসব কথার সবটা গ্রহণ করো না।তোমার নিশ্চই বিচারবুদ্ধির ক্ষমতা আছে।তুমি সেগুলো প্রয়োগ করো তার পর ভালোটাই গ্রহণ করো।যদি কখনো দ্বিধায় পড়ো তবে তুমি এমন কারো সাথে সে বিষয়ে পরামর্শ করো যাকে তুমি ভরসা করো তার পর তার মতামত নাও। সব ধরনের রিহিউমার থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখো।

প্রিয় জাজাফী

সন্তানকে তার পিতার দোষে দোষী ভেবো না এবং পিতাকেও তার সন্তানের দোষে দোষী ভেবো না। তবে সন্তানের সেই দোষ সংগঠনে পিতার অবাদন থাকলে সেটি ভিন্ন কথা ঠিক একই ভাবে পিতার দোষ সংগঠনে পুত্রের হাত থাকলে তাকে অবশ্যই দোষী ভাববে। যে দোষ একজন করেনি সে দোষে তাকে দোষী করা যায় না। তাহলে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাফল্যে তার সন্তানকেও নোবেল সাহিত্য পুরস্কার দেওয়া উচিত। এটি আমাদের দেশের রাজনীতির মত নয় যে উত্তরাধিকার সুত্রে কারো উপর ক্ষমতা বর্তাবে।

প্রিয় জাজাফী

ছোটরা তোমায় ভালোবাসে,সম্মান করে।তুমি অবশ্যই ছোটদের ভালোবাসবে এবং স্নেহ করবে।তাদেরকে কখনো নিরাশ করবে না।তারা কখনো ভুল করলে বকা না দিয়ে এমন ভাবে বলবে যেন সেটি থেকে তারা আরো ভালো করার উঁৎসাহ পায়।একই ভাবে বড়দের সম্মান করবে এবং কোন ভাবেই কষ্ট দেবে না। মিথ্যার সাথে কখনো আপোস করবে না।যদি মিথ্যার বিরুদ্ধে রুখে দাড়াতে না পারো তবে অন্তত তাকে প্রশ্রয় দিও না।

প্রিয় জাজাফী

একটি স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক তুমি।কখনো এমন কোন কাজ করবে না যা তোমার নিজের জন্য ভালো হলেও দেশ ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর। নিজের খাবার জোগাড় করতে গিয়ে অন্যের খাবার কেড়ে নিবে না।অন্যের অধিকার সমুন্নত রাখবে এবং কাউকে তার ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করবে না।তোমার কাছে কেউ কোন বিষেয়ে পরামর্শ চাইলে যদি তুমি মনে করো সে বিষয়ে তোমার জ্ঞান আছে তবে অবশ্যই পরামর্শ দিবে আর জ্ঞান না থাকলে তুমি তাকে বিনীত ভাবে তোমার অজ্ঞতার কথা জানাবে। অজ্ঞতার কথা জানানোর মধ্যে লজ্জার কিছু নেই বরং অজ্ঞতাকে লুকিয়ে রাখাই বড় রকম অজ্ঞতা এবং লজ্জার।

প্রিয় জাজাফী

এমন কোন কথা বলবে না যা অন্যায় ভাবে কারো সার্থে আঘাত হানে। এমন কোন কথা বলবে না যা শুনে বাদানুবাদ তৈরি হয়,হানাহানি হয়। ধর্মীয় বিষয় গুলোতে সহনশীল হবে। এক স্থানে সংগঠিত অন্যায়ের জন্য অন্য স্থানের একই মতবাদের অনুসারীরা দোষী হতে পারে না। এটা পৈত্রিক সম্পত্তি নয় যে বাবার সব পুত্র সমান ভাগ পাবে।এটি হলো জ্ঞানের মত যা পিতার এক সন্তান অর্জন করলে অন্য সন্তান সেটির সুফল পেতে পারে না।

আমি আশা করি এই বিষয়গুলি তোমার জীবনকে আরো সুন্দর করে তুলবে। তোমার জন্য অনেক ভালোবাসা ও শুভকামনা।

আমি অন্য কেউ নই বরং আমি আসলে তোমার ভিতরের তুমি,তোমার প্রকৃত বন্ধু

–জাজাফী—

৯ মার্চ ২০২০