জাজাফী বিবিধ নামে কি আসে যায়,কর্মই নামকে বড় করে

নামে কি আসে যায়,কর্মই নামকে বড় করে



ধরুন শখ করে আমার ছেলেটির নাম রাখা হল আইনস্টাইন কিংবা মুশফিকুর রহিম! তাই বলে আমার ছেলেটাও ওই নাম পেয়ে তর তর করে বেড়ে উঠবে আর হয়ে যাবে আইনস্টাইন কিংবা মুশফিকুর রহিম এটা ভাবার কোন কারণ নেই। তবে হ্যা তার যদি চেষ্টা থাকে এবং ভাগ্য থাকে তবে সে হয়তো তার নামটাকে বড় করতে পারবে,মানুষের মনে স্থান করে নিতে পারবে।

অতীতে এবং বর্তমানে একই নাম নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রজন্মে জন্ম নিয়ে কিংবা একই প্রজন্মে জন্মনিয়ে কেউ কেউ একে অন্যকে খ্যাতির দিক থেকে পেরিয়ে গেছে। কখনো কখনো বা তাদের একজনকে অন্যজনের সাথে তুলনা করা বোকামী বলে মনে হবে কারণ এক একজনের ক্ষেত্র এক এক রকম। কিন্তু জগতে কাউকে না কাউকেতো বড় করে দেখতেই হয়।

একদিন যেমন শাহীদ আফ্রিদির রেকর্ডকে মনে হত কেউ ভাংগেই পারবেনা কিন্তু সেটাও ভুল প্রমান করে দিয়ে আরো অনেকেই সেই রেকর্ড ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়েছে। ঠিক একই ভাবে কারো কারো খ্যাতিকে ছাড়িয়ে গেছে তারই নামে নামধারি অন্য কেউ।

বাংলাদেশে এমন অন্তত বেশ কয়েকটি নাম আছে যে নাম নিয়ে একই সাথে বেশ কয়েকজন খ্যাতির শীর্ষে আরহোন করেছেন।

প্রথমে আসি হুমায়ুন নামটা নিয়ে। না তাই বলে আমি ইতিহাসের পাতা থেকে সম্রাট হুমায়ুনকে আমার এই ক্ষুদ্র লেখাতে টেনে আনতে চাইছিনা। তিনি বরং ইতিহাসের পাতাতে বসেই আমাদের দিকে তাকিয়ে দেখুন যে তাকে রেখেও আমরা অন্য হুমায়ুনদের নিয়ে আলোচনা করতে পারি।

বাংলার আকাশে সম্রাট হুমায়ুন নয় আরো কয়েকজন হুমায়ুন চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছিলেন তারা হলেন ১। হুমায়ুন আহমেদ ২। হুমায়ুন ফরিদী ৩। হুমায়ুন আজাদ ৪। হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী।

সিরিয়াল অনুযায়ি হুমায়ুন আহমেদকে এক নাম্বার স্থান দিয়েছি এটা একান্তই আমার মতামত। চাইলে আপনি তাকে দুই নাম্বার বা চার নাম্বারেও নিয়ে যেতে পারেন। কারণ জানেনতো আকাশে চাদ একটাই। সেই চাদকেই হুমায়ুন আহমেদ দেখলেন অসম্ভব সুন্দর রুপে আবার সুকান্ত দেখলেন ঝলসানো রুটি রুপে আবার প্রেমিক তার প্রেমিকাকে চাদের সাথে তুলনা করতে চায়না কারণ চাদের কলঙ্ক আছে।

তাই প্রত্যেকেরই নিজের চিন্তাকে প্রকাশ করার স্বাধীনতা আছে।

আমি হুমায়ুন আহমেদকে এক নাম্বারে রেখেছি কারণ তিনি কেবল মাত্র একজন সাহিত্যিক ছিলেন না। তিনি প্রথমে বিজ্ঞানে পিএইচডি ধারি ছাত্র তার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সেখান থেকে সাহিত্যিক,নাট্যকার,এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা রুপে আবির্ভূত হলেন। বাকিদের মধ্যে এক সাথে এতো গুলো প্রতিভা আমি দেখিনি। ও হ্যা তিনি অসাধারণ ম্যাজিক পারতেন এবং আমাদের প্রিয় জুয়েল আইচকে আমি নিজে বলতে শুনেছি “হুমায়ুন আহমেদ পামিং এ আমার থেকেও ভাল এবং বাংলাদেশে এক নাম্বার!}–(জুয়েল আইচ)।

পামিং হচ্ছে কয়েন হাতে নিয়ে পুর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই দেখানো যায় এমন এক ম্যাজিক যা দিয়ে চোখের নিমিষে কয়েন অদৃশ্য করে ফেলা হয়।
হুমায়ুন আহমেদের ম্যাজিক মুনশি এবং কালো যাদুকর বই দুটিতে ম্যাজিকের অনেক কিছু বলা হয়েছে আর হ্যা তিনি আর্ন্তজাতিক ম্যাজিশিয়ান সোসাইটির সদস্য ছিলেন।
একই সাথে তিনি বেশ ভাল ছবিও আকতেন। এই হুমায়ুন আহমেদকে তাই এক নাম্বার হুমায়ুন বলেই চিনতে চেয়েছি।
* হুমায়ুন ফরিদী একজন কোন মানের অভিনেতা ছিলেন সেটা আমি না লিখলেও অন্যরা নিশ্চই সেটা জানেন। তার অভিনয় শৈলি তার ব্যক্তিত্ব এবং তার আবৃত্তি নিয়ে কারো কোন দ্বিমত আমি কখনোই দেখিনি। ব্যক্তি হুমায়ুন ফরিদিও ছিলেন অসম্ভব সদালাপি।

* হুমায়ুন আজাদকে অনেকেই পছন্দ করেন না। আবার অনেকে শুদ্ধপুরুষ রুপে তাকে দেখেন।
আমি হুমায়ুন আজাদকে দুই তিনটা বই দিয়েই বিবেচনা করতে চাই। “আব্বুকে মনে পড়ে” বইটা পড়ে দেখুন। আমার মনে হয় আপনি না খেয়ে মরে গেলেও কোন দিন বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসার কথা চিন্তাও করতে পারবেন না। এবং যারা বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে এসেছেন তাদেরকে ওই বইটা জোর করে পড়িয়ে দিন। দেখবেন কাদতে কাদতে গিয়ে সেই দিনই বাবাকে বৃদ্ধাশ্রম থেকে বাসায় নিয়ে আসবে। তার স্ত্রী পুত্র যদি সেটা পছন্দ না করেন তবে হয়তো তাদেরকে এক হাত দেখে নিতেও দ্বিধা করবেনা। আর হ্যা “লাল নীল দিপাবলী” পড়ুন। বাংলা সাহিত্যের জন্মকথা এমন ভাবে লিখেছেন যে আপনি মুগ্ধ না হয়ে যাবেন না। অথচ আপনি কেবল পড়ে আছেন তার “পাক সার জমিন সাদ বাদ” নিয়ে।

* হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী জাতীয় সংসদের স্পিকার ছিলেন। ব্যক্তি জীবনে তিনিও সফল একজন মানুষ।

এই চার হুমায়ুন বাংলার আকাশে উজ্জল করে রেখে গেছেন তাদের নাম।

বর্তমানে আর একটি নাম অত্যন্ত জনপ্রিয় সেটি আনিসুল হক। হুমায়ুন নামধারীদের নামের শেষ অংশ মিল ছিলনা কিন্তু আনিসুল হক নামে যে তিনজন আছেন তাদের নামের কোথাও কোন বেমিল নেই।

১। আনিসুল হক (সাহিত্যিক)। (Anisul Hoque) । আজ যাকে আমরা সাহিত্যিক হিসেবে দেখছি তিনিও হুমায়ুন আহমেদের মতই অনেক গুলো প্রতিভার অধিকারী। বুয়েট থেকে পাশ করা এই অসাধারণ মানুষটি ইঞ্জিনিয়ারতো বটেই তার সাথে সাংবাদিক,সাহিত্যিক,নাট্যকার এবং বেশ ভাল মানের আর্টিস্টও বটে।
মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বদেশ প্রেম নিয়ে লেখা তার রচনা গুলো আমাদেরকে দেশ প্রেম শেখায় নিয়ে যায় উত্তাল সেই দিনগুলোতে। মনের মধ্যে বীরত্ব জন্ম দেয়।
প্রেমের উপন্যাস গুলোতে আমাদের জীবনের চতুর্থপর্বে এসেও প্রেম জাগায়,মনে হয় যেন এই বৃদ্ধ বয়সেও আমি এক তরুন কলেজ স্টুডেন্ট।

নিছক ছোটদের আনন্দ দেয়ার জন্য তিনি যখন গুড্ডু বুড়োকে নিয়ে নানা কান্ড ঘটাতে লাগলেন আমরা অবাক হয়ে দেখলাম সেটা কেবল ছোটরাই নয় সেই সাথে বড়রাও গো গ্রাসে গিলছে।

তার লেখা গদ্য কার্টুন কার না ভাল লাগে।

আচ্ছা ধরুন সব কিছু বাদ। এই আনিসুল হক বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের যে মানের ভক্ত তার বিনিময়ে তার স্থান আমার দৃষ্টিতে এক নাম্বার হবে এটাইতো স্বাভাবিক। তিনি বাংলাদেশকে এবং বাংলাদেশ দলকে যেভাবে সাপোর্ট করেন তার মুগ্ধকর।

২। আনিসুল হক (মেয়র)। এই আনিসুল হক সাহিত্যিক আনিসুল হকের থেকে বয়সে প্রবীন।তিনি আগে লাইম লাইটে ছিলেন না। ব্যক্তিগত ভাবে আমি তাকে চিনতাম এবং তার সাথে কয়েকবার আমার দেখাও হয়েছে। তখন তাকে আমার ঠিক সেরকম লাগেনি। বরং তিনি যখন মেয়র পদে দাড়ালেন আমার মনে হলো এই লোকটা নির্বাচিত হলে কিছুই করবেন না।

আহ আমার ধারণা ভুল প্রমান করে দিয়ে তিনি নির্বাচিত হওয়ার সামান্য এ কয়দিনের ব্যবধানে যা করেছেন আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান বলে যে প্রয়াত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ থেকে সাদেক হোসেন খোকাও তা করেন নি। হ্যা আমি দেখেছি একই সাথে এলাকার সব রাস্তা খুড়ে কাজ শুরু করেছেন। ভোগান্তি হচ্ছে কিন্তু তিনি কোন কাজ ফেলে রাখেন নি। তর তর করে এগিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচিত হওয়ার পর তার সাথে দেখা হলো। আমার মত সাধারণ মানুষকে হতবাক করে দিয়ে তিনি হাসিমুখে কথা বললেন। এবং আমার মনে হলো নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি যতটা বন্ধুভাবাপন্ন ছিলেন নির্বাচিত হওয়ার পর তা বেড়ে গিয়েছে কয়েক গুন। এবং দেখবেন অবধারিত ভাবেই তিনি আপনার মনেও জায়গা দখল করে নেবে। যদিনা আপনি ঘোর বিরোধী না হন।

৩। আনিসুল হক (আইন মন্ত্রী)। তিন আনিসুল হকের মধ্যে শেষ জন হলেন বয়সে সব থেকে প্রবীন আইন মন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি আইনমন্ত্রী হওয়ার পর অনেক কিছু হয়েছে। অনেকের চোখ ভিজে উঠেছে আনন্দ অশ্রুতে এবং কারো কারো হয়তো বেদনায়।

তাই দেখা যাচ্ছে বাংলার আকাশে হুমায়ুন আর আনিসুল হক নাম দুটোতে একাধিক ব্যক্তি খ্যাতিমান হয়েছেন মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন।

তাহলে আসুন আমি আপনি আমাদের সন্তানদের নামও ওরকম কারো সাথে মিলিয়ে রাখলে সন্তান তার মত হবে এই ধারনা থেকে বেরিয়ে আসি এবং তাদের মেধা বিকাশে আন্তরিক সহযোগিতা দেখাই। হয়তো সহযোগিতা পেলে সেই ছেলেটিই একদিন নাম কামাবে।
কুসুম কুমারী দাশের সেই কবিতার মত
“আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে?
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।”

হ্যা হুমায়ুন আর আনিসুল হক নামধারী মানুষ গুলো শুধু কথায় নয় কাজে বড় হয়েছেন। তাদের জন্য স্যালুট।
………………………..
#জাজাফী
১১ মার্চ ২০১৬
উত্তরা,ঢাকা-১২৩০