ন্যু ক্যাম্পের অচেনা আগন্তুক

একটা ট্রেন মিস হয়ে গেলেও চান্স থাকে পরের ট্রেনটা পাবো,কিন্তু জীবনে এমনও সুযোগ আসে যা একবার মিস হয়ে গেলে আর কোন দিন দ্বিতীয়বার সুযোগ আসবে কি আসবেনা সেটা কেউ জানেনা।ন্যু ক্যাম্প থেকে আধা কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে অবস্থিত লা নুয়েভা মার্কুয়েসা রেস্তোরায় একাকী একটা টেবিলে বসে আছি।স্পেন,ইতালী থেকে শুরু করে ইন্ডিয়ান খাবারও পাওয়া যায় এই হোটেলে।ওসব জিবে জল আনা খাবারের কোনটার প্রতিই আমার মন নেই।এমনকি মন নেই চোখ ধাধানো ডেকোরেশান আর নানা দেশ থেকে আগত পযর্টকদের দিকেও।দক্ষিনের দেয়াল ঘেসে বসে থাকা অস্ট্রেলিয়া থেকে আগত সুন্দরী এলসার দিকেও তাকাতে ইচ্ছে হচ্ছেনা।সুদুর বাংলাদেশ থেকে বয়ে আনা মনটা পড়ে আছে আধা কিলোমিটার দূরত্বে থাকা ন্যু ক্যাম্পে।যে মনটা একই সাথে ব্যাথিত না পাওয়ার যন্ত্রনায়।বার বার মনে হয় যদি মনের সাথে সাথে পুরো মানুষটিকেই ন্যু ক্যাম্পের কোন একটা চেয়ারে হেলান দেওয়া অবস্থায় দেখতে পেতাম তবে ভাল হত।কিন্তু সে কপাল নিয়ে হয়তো আসিনি আমি।

বিষয়টি খোলাশা করে বলা দরকার।বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিবেশ বিষয়ক আন্তর্জাতিক এক সম্মেলনে যোগ দিতে এসেছি ফুটবলের স্বর্গরাজ্য বার্সেলোনায়।লা নুয়েভা মার্কুয়েসার দক্ষিনের দেয়াল ঘেসে বসে থাকা অস্ট্রেলিয় সুন্দরী তরুনী এলসাও একই সম্মেলনে যোগ দিতে এসেছে। সাত দিনের জন্য এসেছি এখানে।বার্সেলোনায় এসে ন্যু ক্যাম্পে খেলা না দেখে যাওয়া মানে অমূল্য কোহিনুর হাতে পেয়ে অবহেলায় ছুয়ে না দেখার মত।সম্মেলন গত কালই শেষ হয়েছে, হাতে আছে আজ এবং আগামী কাল।বাংলাদেশের আকাশ অতিক্রমের আগেই খোঁজ নিয়ে জেনেছি সম্মেলন শেষ হওয়ার পরেরদিনই ভাগ্য ক্রমে ন্যু ক্যাম্পেই এল ক্লাসিকো আছে।মনে মনে পণ করেছিলাম সম্মেলন শেষ করে হাতে যে দুদিন সময় থাকবে তার একদিন ন্যু ক্যাম্পে এল ক্লাসিকো দেখে কাটাবো।কিন্তু সবার স্বপ্ন সত্যি হয়না।

খেলা চলাকালিন তোলা ছবি

ঢাকার ফুটপাতের পাশে গড়ে ওঠা হোটেলে আলমারির কাঁচের ফাক দিয়ে নানা রকম মিষ্টি দেখার পরও সেসব যেমন পথ শিশুদের ভাগ্যে জোটেনা বরং স্বপ্নই থেকে যায়, ঠিক একই ভাবে আমার স্বপ্নও নিরবে খুন হয়।ক্রিড়া সাংবাদিক উৎপল শুভ্রর কাছ থেকে অনেক বার শুনেছি ন্যু ক্যাম্পের টিকেট পাওয়া আর হাতে আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপ পাওয়া একই কথা।সে সব কথা মাথায় রেখে বার্সেলোনার মাটিতে পা রেখে সম্মেলনে যোগ দেবার আগেই ন্যু ক্যাম্পের একটা টিকেট হাতে পাওয়ার জন্য বার কয়েক ঢু মেরেছি।অনলাইনেও অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু সব টিকেট আগেই বিক্রি হয়ে গেছে।

কোন টিকেট নেই জানার পর মনটা বিষিয়ে উঠেছে।আহ কী শান্তি ঢাকাতে। মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে খেলা চলাকালিন সময়েও দু একটা টিকেট পাওয়া যায়।কিছু না হোক ব্লাকেও টিকেট পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর এখানে? ভেবেছিলাম উন্নত দেশ হলে কি হবে, হয়তো দু একটা টিকেট এখানেও ব্লাকে পাওয়া যাবে।নাহ পাওয়া যায়নি এমনটি বলতে চাইছিনা।পাওয়া গিয়েছিল, কিন্তু সেই টিকেটের যে দাম তা দিয়ে হয়তো ঢাকা থেকে বার্সেলোনা দুবার যাওয়া আসার প্লেন ভাড়া হয়ে যাবে।বাড়িয়ে বলছি হয়তো কিন্তু নিদেন পক্ষে সে টাকা দিয়ে অন্তত একটা পালসার মটর সাইকেল কেনাই যাবে বলে মনে হয়েছে।ওই পরিমান অর্থ আমার নেই।ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাওয়া আসার ভাড়াই কখনো ছিল কিনা সন্দেহ আছে, সেখানে অতগুলো টাকা আমি কোথায় পাবো।বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচে এসেছি সম্মেলনে অংশ নিতে।সাথে খরচ বাবদ যা বাজেট ছিল তা থেকে হয়তো একটু কৃপণতা করতে পারলে ন্যু ক্যাম্পে এল ক্ল্যাসিকোটা দেখাই যেত। কিন্তু টিকেটের দুর্ভিক্ষ আমার ভাগ্যকে সুপ্রন্ন হতে দেয়নি।

বিয়ের আসর থেকে বর পক্ষ উঠে চলে গেলে কনের বাবার যে অবস্থা হয় আমার অবস্থা হয়েছে সেরকম।ন্যু ক্যাম্পের এতো কাছে এসেও খেলা দেখা হচ্ছেনা ভেবে মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেছে।আসলে যেখানে এক মাস আগে থেকেই টিকেট বিক্রি হয়ে যায় সেখানে আমি খেলার মাত্র চার পাঁচদিন আগে টিকেটের আশা করে বরং বোকামীই করেছি বলে মন্তব্য করলেন এক স্প্যানিশ ভদ্রলোক।ন্যু ক্যাম্পের গ্যালারিতে বসে খেলা দেখার স্বপ্নটা স্বপ্ন হয়েই থেকে যাবে বাকি জীবন।এতো কাছে এসে যে স্বপ্নটা ধরা দেয়নি সেটা বাকি জীবনে ধরা দেবে বলে মনে হয়না।মনের অবস্থা তখন এমন হয়েছে যেন মনে হচ্ছে প্রিয়জন ছেড়ে গেছে আমাকে।ফুটবল পাগল এই আমার কাছে ন্যু ক্যাম্পের আকাশের নিচেয় এসেও ন্যু ক্যাম্পের গ্যালারিতে না বসতে পারাটা নিশ্চই তার থেকে কোন অংশেই কম বেদনার নয়।তখন আমার কাছে ন্যু ক্যাম্পই আমার প্রেমিকা।যে কাছে থেকেও অনেক দূরে।যার ছোয়া পাওয়ার আশা বুকে নিয়ে পৃথিবীর সব থেকে সুন্দর দেশ আমার সোনার বাংলার আকাশ পাড়ি দিয়ে সাত সমুদ্র তের নদীর এপারের এই দেশটিতে এসেছিলাম সে আমাকে ছুতে দেয়নি।ন্যু ক্যাম্প আমাকে বঞ্চিত করেছে ভালবাসা থেকে।

লা নুয়েভা মার্কুয়েসায় বসে আমার মনের মধ্যে শুধু ন্যু ক্যাম্পে যেতে না পারার ব্যাথা বার বার মনকে উতলা করে তুলছে।টেবিলে রাখা প্রন স্যুপ থেকে সুবাশিত ধোয়া ওঠা থেমে গেছে সেই কখন তা বুঝতেই পারিনি।আমি যখন চিন্তার সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছি আর প্রেমিকা হারা প্রেমিকের মত হৃদয়ের ক্ষত নিয়ে বসে আছি লা নুয়েভা মার্কুয়েসার টেবিলে একাকী তখন সামনের চেয়ারটা টানতে টানতে বসার অনুমতি চাইলেন এক বৃদ্ধ লোক।তার কথাতে সম্বিত ফিরে পেয়ে তাকে বসার অনুমতি দিলাম।দেখে মনে হতে পারে যেন আমি মাস্টার মশাই আর আমার সামনে বসতে চাওয়া লোকটা আমার ছাত্র এবং সে বসার অনুমতি চাইছে।এই দেশটা বড়ই সুন্দর।এখানকার মানুষের আতিথেয়তার কথা নাইবা বললাম কিন্তু এদের ভদ্রতা সত্যিই মুগ্ধকর।হোটলের চেয়ারগুলো সবার জন্যই সমান অথচ সেখানে বসার জন্যও এরা কী সুন্দর ভদ্রতা করে অনুমতি চাইছে অপর প্রান্তে বসে থাকা সুদুর বাংলাদেশ থেকে আসা ন্যু ক্যাম্পে যেতে না পারার দুঃখে জর্জরিত এক তরুনের কাছে।

হোটেল লা নুয়েভা মার্কুয়েসা থেকে দেখা ন্যু ক্যাম্প

তার কথাতেই বুঝলাম তিনি স্প্যানিশ।আমার প্রনস্যুপের বাটিটার দিকে তাকিয়ে তিনি ইংরেজীতেই বললেন স্যুপতো ঠান্ডা হয়ে গেছে খাওনি কেন? তোমাকে বিষন্ন লাগছে কেন?তার কথাতে মনে পড়লো স্যুপের অর্ডার দেওয়ার পর সেই কখন স্যুপ দিয়ে গেছে তা খেয়ালই করিনি।

আমি স্যুপের চামচ নিয়ে খেতে যাবো তখন ভদ্রলোক খেতে নিষেধ করলেন।ওয়েটারকে ডাকলেন।স্প্যানিশে ওয়েটারকে কামারেরো বলা হয়।ওয়েটার এসেই তাকে সালাম দিল।ওদের কায়দায় এবং তিনি তখন ওয়েটারকে বললেন আমার স্যুপটা পাল্টে গরম স্যুপ পরিবেশণ করতে।ওয়েটার তার কথা মত সত্যি সত্যি মুহুর্তেই আমার স্যুপটা বদলে গরম স্যুপ দিয়ে গেল।আমি খেতে খেতে বৃদ্ধকে দেখতে লাগলাম।তিনি সম্ভবত প্রভাবশালী কেউ নয়তো এই রেস্তোরার নিয়মিত কাষ্টমার। তা না হলে পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় অধিকাংশ ওয়েটারই তাকে সম্মান দেখাতো না।এসবের পরও আমার মনটা ঠিকই পড়ে ছিল ন্যু ক্যাম্পে।মাত্র ঘন্টা খানেক পরই খেলা শুরু হবে।ন্যু ক্যাম্পের আকাশের নিচেয় থেকেও সেখানে যাওয়া হচ্ছেনা আমার এর থেকে বড় ব্যথার আর কি থাকতে পারে।এসব ভাবছি আর আনমনে স্যুপের চামচে চুমুক দিচ্ছি।হঠাৎ খেয়াল করলাম সামনে বসা বৃদ্ধ ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।তিনি সম্ভবত বেশ খানিকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। চোখে চোখ পড়তেই সেটা সরিয়ে না নিয়ে জানতে চাইলেন আমি কি কোন বিষয়ে খুব চিন্তিত কিনা।

মনে মনে ভাবলাম ন্যু ক্যাম্পে খেলা দেখার স্বপ্ন মরে গেছে এটা তাকে জানাই আবার মনে হলো তাকে জানিয়ে লাভ কি? তাতে বরং দুঃখটা আরো বাড়বে বই কমবেনা।দুঃখের সময় কেউ যখন শান্তনা দেয় তখন বরং দুঃখ কমে না গিয়ে আরো বেড়ে যায়।আমি কিছু বলছিনা দেখে তিনি আবারও জানতে চাইলেন। পরে ভাবলাম এতো করে যখন বলছে তাকে বলাই যেতে পারে।আমি বিষয়টা জানালাম।তিনি তেমন কিছু বললেন না।আপন মনে ধোয়া ওঠা কফিতে চুমুক দিলেন।মনে মনে রাগ হলো।এই দেশের মানুষ দেখছি বেশ কৃপন।

বিনা পয়সায় একটু সহানুভুতি দেখাবে,টিকেট পাইনি বলে যে কষ্ট পাচ্ছি তার জন্য একটু শান্তনা দেবে তার কোন নাম গন্ধ নেই?আমাদের দেশ হলে কেউ কি এরকম করতো?চারদিকে যতজনকে দেখা যেত সবাই শান্তনা দিত।বলতো এবার পাওনি তো কি হয়েছে পরে নিশ্চই পাবা।সুযোগতো বলে কয়ে আসেনা। দেখবা হুটকরে একদিন সুযোগ চলে এসেছে।আর এই স্পেনের এই বুড়ো মানুষটা মুখে টু শব্দটিও করলো না?মনে মনে ভাবলাম লোকটার সাথে আর কোন কথাই বলবো না। আমি আপন মনে স্যুপ খেতে লাগলাম।একটিবার শুধু তার দিকে তাকালাম।সে আগেই কফি শেষ করেছে।কি কারণে যেন কফি শেষ হওয়ার পরও তিনি টেবিল ছেড়ে চলে না গিয়ে বসে থাকলেন।

আমি স্যুপ খাওয়া শেষ করে টেবিল ছেড়ে উঠলাম।আশ্চর্য আমার সাথে সাথে বৃদ্ধ লোকটাও উঠলেন।আমি কাউন্টারে গিয়ে বিল পরিশোধের জন্য মানিব্যাগ বের করতেই কাউন্টার থেকে ইংরেজীতে জানানো হলো বিল দিতে হবেনা।কেন দিতে হবেনা জানতে চাইলে তিনি পাশের বৃদ্ধকে দেখিয়ে বললেন আপনি ওনার অতিথি তাই আপনার থেকে কোন বিল নেওয়া হবেনা।আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম।একটু আগেই সমবেদনা কিংবা শান্তনা দেয়নি বলে মনে মনে যাকে আমি কৃপণ বলেছি সে আমার স্যুপের বিল দিয়ে দিচ্ছে।তখন তার প্রতি আমার মুগ্ধতার সীমা নেই।তিনি আমাকে নিয়ে লা নুয়েভা মার্কুয়েসা থেকে বেরিয়ে এলেন।

ঠিক তখন খেয়াল হলো আমাকে যেমন তিনি বিল দিতে দেন নি তেমন তিনি নিজেওতো কোন বিল দিলেন না।তিনিকি সেটা ভুলে গেছেন?আর ভুলে গেলেওতো রেস্তোরার ম্যানেজার ভুলে যাবার কথা নয়।তখন মনে পড়লো সব ওয়েটার তাকে যে সম্মান দেখাচ্ছিল তার রহস্য হতে পারে তিনিই লা নুয়েভা মার্কুয়েসার মালিক।বার্সেলোনার সব থেকে সুন্দর হোটেলের একটি হলো এটি আর সেটির মালিক নিজের অতিথি হিসেবে আমাকে স্যুপ খাইয়েছেন ভাবতেই আনন্দে প্রায় আত্মহারা হয়ে উঠলাম।

জানার লোভ সামলাতে না পেরে আমি বলেই ফেললাম যে আপনিতো রেস্তোরার বিল দিতে ভুলে গিয়েছেন।তিনি তখন বললেন না ভুলিনি আসলে ওরা খাতায় লিখে রাখবে। মাস শেষে বিল নিয়ে নেবে।আমি একটা আগ বাড়িয়ে বললাম যে আমার মনে হচ্ছিল আপনিই এই জনপ্রিয় রেস্তোরাটির মালিক।বৃদ্ধ তখন আমার অনুমানকে নাকোচ করে দিয়ে জানালেন যে তিনি ওই রেস্তোরার মালিক নন বরং নিয়মিত কাস্টমারদের একজন।তখন মনে হলো তার কথাটাই যুক্তিযুক্ত এবং যেহেতু নিয়মিত কাষ্টমার তাই সব ওয়েটারই তাকে চেনে এবং সম্মান করে।লা নুয়েভা মার্কুয়েসা থেকে বেরিয়ে আমি আমার হোটেল ক্যাটালোনিয়া অ্যাটিনাসে যাবো বলে সিদ্ধান্ত নিলাম।ওই হোটেলেই আমি উঠেছি।যেহেতু ন্যু ক্যাম্পে যাওয়া হলোনা সেহেতু হোটেলে ফিরে যাওয়াই সমুচিত হবে বলে মনে করলাম।বৃদ্ধকে বিদায় জানিয়ে হোটেলে ফিরবো বলতেই তিনি বললেন তার সাথে যেতে,তাকে একটু সময় দিতে।

কেন তাকে সময় দিতে হবে কিংবা কোথায় সময় দিতে হবে তা জানার দরকার হলোনা।অপরিচিত একটা তরুণকে যিনি নিজের টাকায় স্যুপ খাওয়াতে পারেন এবং যিনি বয়সে বাবার সমান কিংবা তার চেয়ে বড় তাকে একটু সময় দিলে আমারতো কোন সমস্যা নেই। তাছাড়া হোটেলে ফিরে গিয়েওতো অলস বসে থাকতে হবে। আবার মনে হলো এই বিদেশ বিভূইয়ে অপরিচিত লোকটাকে সময় দেওয়াকি ঠিক হবে?হোক সে যতই বৃদ্ধ কিংবা যতই সে আমাকে স্যুপ খাওয়াক।কি মনে করে তার গাড়িতে উঠে বসলাম।একটা বক্সস্টার এস ৭১৮ মডেলের পোর্শে কার দেখেই মনে হলো লোকটা বেশ টাকাওয়ালা।আমার মত এক শুটকো তরুনকে কিডন্যাপ করেও তার কোন লাভ নেই।সুতরাং বিনা দ্বিধায় গাড়িতে উঠে বসলাম।তিনিই ড্রাইভ করছেন আর আমি পাশে বসে আছি।এই ধরনের গাড়ি আমি শুধু হলিউডের সিনেমাতেই দেখেছি।ঢাকাতে এসব গাড়ি কল্পনাও করা যায়না।

দশমিনিটের ব্যবধানে গাড়িটা থেমে গেল।তিনি আমাকে গাড়ি থেকে নামতে বলে নিজেও নামলেন।আমি গাড়ি থেকে নেমেই স্তব্ধ হয়ে গেলাম।গাড়ি থেমেছে ন্যু ক্যাম্পের সামনে।তিনিকি তবে আমার কাটা ঘায়ে আরো একটু নুনের ছিটা লাগানোর জন্য সোজা ন্যু ক্যাম্পেই নিয়ে আসলেন।পরক্ষণেই হোটেলের কথা মনে করে চিন্তাটা মাথা থেকে সরিয়ে নিলাম।দেখিইনা বৃদ্ধ স্প্যানিশ কি করেন। গাড়িটা পার্ক করে আমাকে নিয়ে ন্যু ক্যাম্পের গেট দিয়ে ঢুকে গেলেন।অন্যরা যখন লাইন ধরে এগোচ্ছিল ভদ্রলোক তখন লাইন ছাড়াই এগিয়ে গেলেন।গার্ড এবং সংশ্লিষ্টরা কেউ কেউ তার সাথে হ্যান্ডশেক করলো।আমি এই বৃদ্ধ কে এবং তার ক্ষমতা আসলে কতটুকু তা বুঝতে চেষ্টা করে খেই হারিয়ে ফেলছিলাম।একবার মনে হলো তিনি সম্ভবত ন্যু ক্যাম্পের বড় কোন কর্মকর্তা আবার মনে হলো সম্ভবত স্পেনের সব থেকে ধনীদের একজন তিনি তাই সবাই তাকে ওরকম সমীহ করছেন।তিনি হাটতে হাটতে বললেন আমার কাছে দুটো টিকেট আছে আজকের এল ক্ল্যাসিকোর।সাথে আমার ওয়াইফ আসার কথা ছিল কিন্তু সে অন্য একটা কাজে আটকে পড়ায় আমি একাই আসলাম।হোটেলে যখন তোমার খেলা দেখার ইচ্ছের কথা জানতে পারলাম তখন ভাবলাম তোমাকেই সাথে নিই।আমি অবাক হয়ে বললাম আপনিতো চাইলে এই টিকেটটা পাঁচশো ইউরোতেও বিক্রি করতে পারতেন, তাহলে আমাকে ফ্রি নিচ্ছেন কেন?

আমার কথা শুনে বৃদ্ধ একটু হাসলেন। তার পর বললেন তোমার ফুটবলের প্রতি যে ভালবাসা দেখেছি তাতে তোমাকে দেওয়াই শ্রেয় মনে হয়েছে।আর তা ছাড়া টিকেটতো আমার কেনা লাগেনি। ফ্রি পেয়েছি।তবে হ্যা সাধারণ ভাবে এই টিকেটের দাম কিন্তু ৫০০ ইউরো না! আমি জানতে চাইলাম তাহলে এটার দাম কত?তিনি আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে দিয়ে জানালেন এই টিকেটের দাম ৪ হাজার ডলার।আর ব্লাকে বিক্রি করলে এটা সাড়ে চার হাজার থেকে ছয় হাজার ডলারে বিক্রি হবে।

সামান্য সময়ের পরিচয়ে একজন আরেকজনের জন্য এতো ডলারের টিকেট ফ্রিতে দিতে পারে তা কল্পনায়ও সম্ভব না আর আমি বাস্তবে দেখছি।তবে মনে হলো তিনি যেহেতু ফ্রি পেয়েছেন তাই অন্য কাউকে সেটা দিয়ে দিতেও ওনার গায়ে লাগছেনা।তবে চিন্তা একটা থেকেই গেল।কে এই ভদ্রলোক যে তাকে এরকম দুটো ভিআইপি টিকেট ফ্রিতে দিয়েছে।আবারও মনে হলো তিনি নিশ্চই প্রভাবশালী কেউ নয়তো স্পেনের সেরা ধনীদের একজন।এর মাঝেই বেশ কয়েকজন এসে তার সাথে দেখা করে গেল।স্প্যানিশে কি সব বললো তার মাথা মুন্ডু কিছুই বুঝতে পারিনি।

খেলা দেখলাম খুব আয়েশ করে।ন্যু ক্যাম্পের কথা উৎপল শুভ্রর মুখে যেরকম শুনেছি ঠিক তাই।অনেক উচুতে বসে যারা খেলা দেখছে আমি নিশ্চিত তারা কার পায়ে বল কিংবা কে কোথায় দৌড়াচ্ছে তা বুঝতে পারছেনা।অত উচু থেকে দেখতে পাওয়ার কথাও নয়।জায়ান্ট স্ক্রিন থাকায় কেউ কেউ সেটা দেখে খেলোয়াড় চিনছে নতুবা কেউ কেউ সাথে করে দুবীর্ন নিয়ে এসেছে।আমরা ভিআইপি টিকেটধারী হওয়ায় জায়ান্ট স্ক্রিন কিংবা দুবীর্ন কোনটারই দরকার পড়েনি।খেলার উত্তেজনায় আমি তখন কম্পমান।যেন মেসি রোনালদো নয় আমি নিজেই খেলছি।বৃদ্ধ লোকটাও মাঝে মাঝে উত্তেজিত হচ্ছেন এবং আশ্চর্য ভাবে তিনিও আমার মতই বার্সেলোনার সমর্থক।তবে ভাগ্য সুপ্রসন্ন না হওয়ায় খেলা ড্র হলো।বেরিয়ে যাওয়ার জন্য উঠতেই বৃদ্ধ আমাকে থামালেন।তিনি বললেন আরেকটু সময় অপেক্ষা করতে।বৃদ্ধর ছেলে আসবেন তার সাথে দেখা করে তার পর ন্যু ক্যাম্প ত্যাগ করবেন।আমি বিনা বাক্য ব্যায়ে মেনে নিলাম।যার কল্যাণে আমার আজীবনের অধরা স্বপ্ন সত্যি হলো এই ন্যু ক্যাম্পে বসে এল ক্ল্যাসিকো দেখলাম তার জন্য একটু কেন এক বছরও অপেক্ষা করা যায়।

কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধর ছেলে আসলেন।বৃদ্ধ পরিচয় করিয়ে দিলেন এটা আমার ছেলে।আমার মুখে তখন কোন কথা নেই।আকাশের ওপরে আকাশ তারও ওপরে আরেকটা আকাশ যেন আমার মাথার উপর এক সাথে ভেঙ্গে পড়েছে।বৃদ্ধ তার যে ছেলেকে আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন তাকে যে আমি আগে থেকেই চিনি।আমার সামনে দাড়ানো বৃদ্ধর সেই ছেলেটির নাম জর্ডি আলবা।বার্সেলোনা ফুটবল দলের বিখ্যাত খেলোয়াড় তিনি।

জাজাফী

ফেসবুকঃ www.facebook.com/zazafee1

ওয়েবসাইটঃ www.zazafee.com

২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

 

7 thoughts on “ন্যু ক্যাম্পের অচেনা আগন্তুক

  1. It is appropriate time to make some plans for the future and it is time to be happy. I’ve read this post and if I could I desire to suggest you few interesting things or advice. Perhaps you could write next articles referring to this article. I wish to read more things about it!

  2. I’m not sure where you are getting your info, but good topic. I needs to spend some time learning much more or understanding more. Thanks for excellent information I was looking for this info for my mission.

  3. I was suggested this web site by my cousin. I am not sure whether this post is written by him as nobody else know such detailed about my trouble. You are wonderful! Thanks!

  4. I¡¦ve been exploring for a little for any high quality articles or weblog posts in this kind of space . Exploring in Yahoo I at last stumbled upon this site. Reading this information So i am satisfied to exhibit that I’ve an incredibly excellent uncanny feeling I found out just what I needed. I so much undoubtedly will make certain to don¡¦t put out of your mind this website and give it a look on a constant basis.

  5. Hello, you used to write wonderful, but the last several posts have been kinda boring¡K I miss your tremendous writings. Past several posts are just a little out of track! come on!

  6. Thanks , I have recently been searching for info about this topic for a while and yours is the greatest I have discovered so far. But, what about the bottom line? Are you positive in regards to the source?

Leave a Reply

Your email address will not be published.