Home Blog Page 4

ফিলিস্তিনের অকুতোভয় কিশোর কিশোরী

পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে জন্ম নেওয়া শিশুরা একদিন কিশোর হয়,তরুণ হয়, যুবক হয়। তারপর ডাক্তার,ইঞ্জিনিয়ার,পাইলট হয়। কিন্তু ফিলিস্তিন এমন একটি দেশ, যেখানে সেই সুযোগ মেলে না। ওখানে যুগে যুগে যে শিশু জন্ম নিয়েছে তাদের অনেকেই শৈশব পার করতে পারে না,অনেকেই কৈশোরে পা রাখতে পারে না। অনেকেই যৌবনের আগেই ঝরে পড়ে। তারা বীর কিশোর হয়,বীর তরুণ হয়, বীর যুবক হয়। বেঁচে থাকলে তাদের কেউ কেউ বীরপুরুষ হয়। এই পথপরিক্রমায় তাদের অনেকে শহীদ হয়। ফিলিস্তিনের শিশু কিশোর কিশোরীদের কথা ভাবলেই মনে পড়ে উর্দু ভাষার কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজের লেখা সেই কবিতা।ফিলিস্তিন নামক মৃত্যু উপত্যকায় বেঁচে থাকা শিশুদের সান্ত্বনা দিতে তিনি লিখেছিলেন- 

‘না বাছা, কেঁদো না!

তোমার বাসভূমে মৃতদের গোসল দিয়েছে সূর্য,

চাঁদ দিয়েছে কবর।’

দিন নয়, মাস নয় গত সত্তর বছর ধরে দখলদার ইসরায়েলিদের বন্দুক-বোমার প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়ে আছে ফিলিস্তিনে শিশুরা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এমন হাজারো শিশু ঝরে গেছে। কিন্তু ওরা জানে তারা নিজে মরলেও জাতিকে টিকিয়ে রাখতে হবে। তাই ধ্বংসপ্রায় ফিলিস্তিনি জাতিকে টেকাতে, অজস্র মৃত্যুর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শহীদদের শূন্যস্থান ভরাটের জন্য আরও আরও ফিলিস্তিনি শিশু জন্ম নিয়েছে। তারা যেন হৃদয়ে ধারণ করেছে মাহমুদ দারবিশের লেখা “পরিচয় পত্র” কবিতার সেই লাইন-

‘লিখে রাখো! আমি একজন আরব 

এবং আমার পরিচয়পত্রের নম্বর পঞ্চাশ হাজার!

আমার আটটি সন্তান আর নবমটি 

পৃথিবীতে আসবে গ্রীষ্মকালের পর

তোমরা কি ক্ষুব্ধ হবে তাতে?’

ফিলিস্তিনের এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মাঝেও বোমা-বারুদে মাটিতে মিশে যেতে থাকা এই উপত্যকায় প্রতিবছর অন্তত ৫০ হাজার নারী সন্তান জন্ম দেয়।এখন গাজায় প্রতিদিন অন্তত ১৬০ জন নারী সন্তান প্রসব করছেন।কী নির্মমতার শিকার ফিলিস্তিনের শিশু কিশোর কিশোরী যে, তাদের বয়স পরিমাপ করা হয় তারা কতগুলো ইসরায়েলি হামলার শিকার হয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে। গাজার ২৩ লাখ জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই শিশু কিশোর কিশোরী। 

এই লেখাটি যখন লিখছি তখন টিভিতে বিশ্বকাপ ক্রিকেট ম্যাচ চলছে। গ্যালারিতে উপচে পড়া ভীড়। সেই ভীড়ের মধ্যে অগনিত কিশোর কিশোরী নানা রকম প্ল্যাকার্ড হাতে বসে আছে। নিজ দলের সাফল্য দেখলেই প্লাকার্ড উঁচিয়ে উল্লাসে মেতে উঠছে।আবার নিজ দলের ব্যর্থতায় গালে,কপালে হাত রেখে হতাশা প্রকাশ করছে।পাশেই ভাই, বোন কিংবা প্রিয়জন আছে।খেলা শেষ হলে হয়তো পাশের কোনো রেস্টুরেন্টে বসে রাতের খাবার খাবে।কেউ বাসায় বসে নেটফ্লিক্সে পছন্দের কোনো মুভি বা সিরিজ দেখছে। আবার কেউ বন্ধুদের সাথে চ্যাট করছে,গেমস খেলছে। ঠিক সেই সময়ে চোখের সামনে ভেসে আসলো ফিলিস্তিনি শিশুদের মুখ। পৃথিবীর সবুজ জমিন নিজেদের রক্তে রঞ্জিত করে যারা স্বাধীনতা চেয়েছে। মনে পড়ছে ফিলিস্তিনের মানুষের দুঃখ নিয়ে মাহমুদ দারবিশের লেখা কবিতার লাইন-

‘আজকের দিনটি আগামী দিনের থেকে হয়তো ভালো,

কেবল মৃত্যুগুলোই আজ নতুন

প্রতিদিনই জন্ম নেয় যে নতুন শিশুরা

তারা ঘুমোতে যাওয়ার আগেই ঘুমিয়ে পড়ে, মৃত্যুতে

তাদের গণনা করা মূল্যহীন।’

একই পৃথিবীতে জন্ম নেওয়া কোটি কোটি শিশু কিশোর কিশোরীদের সাথে ফিলিস্তিনে জন্ম নেওয়া শিশু কিশোর কিশোরীদের জীবন ধারা আকাশ পাতাল ব্যবধান। ফিলিস্তিন হয়ে উঠেছে খোলা আকাশের নিচে পৃথিবীর বৃহত্তম জেলখানা। একদিকে পৃথিবীর অন্য দেশের কিশোর কিশোরীরা যখন প্রিয়জনের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিচ্ছে, তখন ফিলিস্তিনের কিশোর কিশোরীদের চোখে ঘুম নেই,পেটে খাবার নেই,ঘুমানোর জায়গা নেই,পড়াশোনা করার মত  স্কুল নেই,মাথাগোজার মত ঠাই নেই। মনে পড়ছে ১৪ বছর বয়সী স্কুল পড়ুয়া কিশোরী মালাক আল খতিবের কথা। গত বছর ৩১ ডিসেম্বর বেতিনে বিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফেরার পথে তাকে ইসরায়েলি বাহিনী ধরে নিয়ে গেছে। দিনের পর দিন অত্যাচার দেখে সে ফুসে উঠেছিল। ইসরায়েলের সশস্ত্র সেনাদের ওপর বাধ্য হয়ে সে পাথর ছুঁড়ে হামলা করেছিল। তারপর তাকে গ্রেফতার করে ২ বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়।সেই সাথে জরিমানা করা হয় দেড় হাজার ডলার।কারাবন্দী থাকা এই কিশোরী ফিলিস্তিনের বর্তমান পরিস্থিতির প্রতীক হয়ে উঠেছে।

রামাল্লার কাছে বেইতিন শহরে কিশোরী মালাকের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। মালাকের মা খাওলা আল-খতিবদুঃখ জড়ানো কন্ঠে বলেছেন, ‘ প্রচন্ড শীতের মাঝেও গরম কাপড় ছাড়াই  কিশোরী মেয়েটিকে ডাণ্ডাবেরি পরিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। এ অবস্থা দেখে মা হিসেবে আমার হৃদয় ভেঙে গেছে। আমি তার জন্য বাড়ি থেকে শীতের কাপড় নিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু বিচারকের বাঁধার কারণে আমি পোশাকটি আমার মেয়েকে দিতে পারিনি।’ 

শুধু মালাক একা নয়! তার মত কিশোর কিশোরীর সংখ্যা অগণিত। মানবাধিকার সংগঠন ডিফেন্স ফর চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল প্যালেস্টাইনের (ডিসিআই প্যালেস্টাইন) হিসাব মতে, পাথর নিক্ষেপের অভিযোগে দখলকৃত পশ্চিম তীর থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রতিবছর গড়ে হাজার খানেক শিশুকে আটক করে।ইসরায়েলের কারাগারে এখনো ২০০ এর অধিক ফিলিস্তিনি শিশু-কিশোর কিশোরী বন্দী আছে। ইসরায়েলে ১২ বছরের কম বয়সীদের শিশু বলা হয়। ফলে বিচার করার সময় মালাক শিশু হিসেবে বিবেচিত হয়নি। যদিও ইউনিসেফের হিসাবে, ১৮ বছর পর্যন্ত ছেলে বা মেয়ে শিশুর মর্যাদা পায়। ইসরায়েল এর তোয়াক্কা না করেই ফিলিস্তিনের শিশুদের আটক, গ্রেপ্তার ও শাস্তি দিয়ে থাকে। 

জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনের শিশুদের প্রতি অমানবিক আচরণের জন্য ইসরায়েলের সমালোচনা করা হয়েছে। সেভ দ্য চিলড্রেনের ২০২২ সালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, গাজায় প্রতি পাঁচ শিশুর মধ্যে চারজনই বিষণ্নতা ও ভয়ের মধ্যে বাস করছে। এখানকার অর্ধেকেরও বেশি শিশু আত্মহত্যার কথা ভাবে এবং অন্য শিশুদের মৃত্যুর সাক্ষী হওয়ার ট্রমা নিয়ে বেঁচে থাকে।আর এই বেঁচে থাকার সংগ্রাম দেখে দেখে তারাও হয়ে ওঠে বোমার মত শক্তিশালী। মাহমুদ দারবিশ তাই লিখেছিলেন –

‘মৃত্যু অবধারিত, কিন্তু তাই বলে

জীবনকে তো থামিয়ে রাখা যায় না।’

আর সে কারণেই বোধহয় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ছাদখোলা কারাগারে জীবন-মৃত্যুর অঙ্ক কষতে থাকা ফিলিস্তিনি কিশোর কিশোরী মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় মরণ অবধারিত জেনেও গুলতি কিংবা পাথর হাতে ছিনা টানকরে দাঁড়িয়ে যায় ট্যাঙ্কের সামনে।

মালাকের কথা লিখতে লিখতেই চোখের সামনে ভেসে উঠছে আহেদ তামিমির মুখ। ১৬ বছরের এক অকুতোভয় কিশোরী। যে বয়সে হেসে খেলে পার করার কথা সেই বয়সে সে বন্দী জীবনের স্বাদ নিয়েছে। কোকড়া চুলের এই কিশোরী  মালাকের মতই হয়ে উঠেছে  ফিলিস্তিনি জনগণের মুক্তি আন্দোলন ও তৃতীয় ইন্তিফাদার প্রতীকী চরিত্র।তার একটি ভিডিও পৃথিবীর মানুষ দেখেছে। ভয়ংকর ক্রোধ নিয়ে সে তাকিয়ে আছে দখলদার ইসরায়েলি সেনাদের দিকে। হুংকার দিয়ে চলে যেতে বলার পরও সেনারা যখন যায়নি তখন সে দুই সেনাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এতো কিছু করেও যখন সেনাদের সরাতে পারেনি তখন তাদের দুই গালে সজোরে থাপ্পড় মারতে শুরু করে।কী দুঃসাহসী অকুতোভয় এই কিশোরী যে অস্ত্রধারী ইসরায়েলি সেনার গালে থাপ্পড় মারে।কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।তাকে ও তার মাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, রিমান্ডে নিয়ে অত্যাচার করা হয়েছে। তবুও সে মাথায় নোয়ায়নি। সে বোধহয় হৃদয়ে সেই কথাটি ধারণ করেছিল “ মৃত্যু একবারই হয়, ভীতুরা মৃত্যর আগে বহুবার মনে”। কিন্তু সে তো ভীতু নয়। তাই সে প্রতিবাদ করেছে। তার মুক্তির জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে আওয়াজ উঠেছে। কিশোরী মালাকার মতই তামিমির বাড়িও রামাল্লাতে। ছোট বেলা থেকেই প্রতিবাদে অংশ নেওয়া তামিমি সাহসিকতার জন্য এর আগেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রশংসা কুড়িয়েছে। অনেক বছর ধরে তার গ্রামে প্রতি শুক্রবারেই প্রতিবাদ মিছিল বের হয়। মাত্র ৯ বছর বয়সে তামিমি প্রথম মিছিলে অংশ নিয়েছিল। বিভিন্ন তথ্যউপাত্ত থেকে জানা যায় ২০১৫ সালে ১১ বছর বয়সে ইসরায়েলি সেনার হাত থেকে তার চাচাত ভাই মোহাম্মদকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল তামিমি।এমনকি সে তার ভাইকে বাঁচাতে এক ইসরায়েলি সেনার হাতে কামড় দিয়েছিল। ওই ছবি প্রকাশের দুই বছর পর তামিমিকে তুরস্কে “হানদালা সাহসিকতা পুরস্কার” দেওয়া হয়। একই সাথে তুরস্কের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তায়েফ এরদোয়ান তাকে সাক্ষাতের জন্য আমন্ত্রণ জানান। গত বছর শিশু অধিকারের উপর একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার জন্য খোদ যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংগঠন তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তবে দুঃখজনকভাবে মার্কিন প্রশাসন তাকে ভিসা দেয়নি।

মালাক আল খতিব কিংবা আহেদ তামিমির মত আরও এক কিশোরীর মথা মনে পড়লো। তার নাম উইসেল শেখ খালিল। গাজার রাস্তায় এক্কাদোক্কা খেলে বেড়ানো ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরী সে । বয়সকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে সে এখন ফিলিস্তিনের মানুষের মনে বীর হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।যতদিন পৃথিবী থাকবে নিশ্চই তার নাম উচ্চারিত হবে শ্রদ্ধার সাথে। অঙ্ক আর নাচে যার বেশ দখল ছিল।রঙ তুলি হাতে ধরিয়ে দিলে মনোমুগ্ধকর ছবি আঁকতো। খুবই সাধারণ, শান্ত কিশোরীটি হঠাৎ করে ক্ষোভে ফেটে পড়ল। পরিবারের সদস্যরা অনেক বোঝাল। বলল সীমান্তে গেলে ইসরাইলি সেনারা গুলি করে মেরে ফেলবে।যার রক্তে বারুদের গন্ধ, সে কি আর কারো বারণ শোনে? জানি  এই কিশোরী কখনো বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা পড়েনি “ বল বীর! বল উন্নত মম শির! শির নেহারি আমারই নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির” । কবিতা না পড়লেও কিশোরী মেয়েটিও তার শির নত করেনি। সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে ১১ বছরের ছোট ভাইকে নিয়ে বিক্ষোভ করতে ইসরাইলি সেনাদের গুলি ও কাঁদানে গ্যাস উপেক্ষা করেই একেবারে সীমান্তে পৌঁছে গিয়েছিল সে।  প্রথম দিকে সে বিক্ষোভকারীদের পানির বোতল এগিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু ইসরাইলি সেনারা দমন-পীড়ন বাড়ালে তার মনের মধ্যে আগুন জ্বলে ওঠে।মাতৃভূমি ফিলিস্তিনকে দখল করে গড়ে তোলা ইসরাইলের কাঁটাতারের বেড়া কেটে ফেলতে চেষ্টা করে।একপর্যায়ে ইসরাইলি সেনাদের স্নাইপারের গুলিতে শহীদ হয় অকুতোভয় কিশোরী উইসেল।তার মত অগনিত কিশোর কিশোরী চায় নিজের রক্তের বিনিময়ে হলেও যদি ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা আসে।

ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ পৃথিবী সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান ছিল না যাদের, সেই সব অসম সাহসী কিশোর কিশোরীই জীবনের পরোয়া না করে প্রতিনিয়ত ইসরাইলের নিপীড়নবিরোধী মিছিলে শামিল হয়েছে। উইসেল তার বাবা মাকে বলেছিল, “এভাবে মুখ বুঝে আর ইসরাইলি বর্বরতা মেনে নেবো না। অবশ্যই অন্যদের সঙ্গে সীমান্তে গিয়ে বিক্ষোভ করবো”।সেই সাথে আরও বলেছিল “মা, আমি যদি মারা যাই, তবে আমাদের ছোট্ট কক্ষটিতে আমার ভাইবোনরা একটু আরামে থাকতে পারবে। তারা থাকতে একটু বেশি জায়গা পাবে”। এইটুকু কিশোরী মেয়ে কত কিছু ভেবেছে। পরিস্থিতিই তাকে এভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে।

পরিসংখ্যন বলছে এ বছরের শুধু মে মাসে ১৮ বছরের কম বয়সী ৩৩১ জন ফিলিস্তিনিকে আটক করা হয়েছে। ২০১৬ সালে প্রতি মাসে গড়ে ৩৭৫ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক ফিলিস্তিনিকে আটক করেছিল ইসরায়েল। এরপরও হামাসের ডাকে তৃতীয় ইন্তিফাদা শুরুর পর অসংকোচে রাস্তায় নেমে এসেছে ফিলিস্তিনি কিশোর-কিশোরীরা। আর আহেদ তামিমি, মালাক আল খতিব কিংবা উইসেল শেখ খলিল তাদের অনুকরণীয় নেতা হয়ে ওঠেছে।ফিলিস্তিন ও দেশটির মুক্তি আন্দোলনের সমর্থক হাজার হাজার কিশোর কিশোরী আশায় বুক বেঁধেছে, একদিন তামিমি,মালাক আর উইসেলের আত্মত্যাগের প্রতিদান তারা পাবে। স্বাধীন ফিলিস্তিন প্রতিষ্ঠিত হবে। হয়তো এই পথ পাড়ি দিতে তাদেরও হয়ে উঠতে হবে একজন মালাক, একজন তামিমি একজন উইসেল। সেদিন পৃথিবীর অন্যসব শিশু কিশোর কিশোরীর মত তারাও হাসি আনন্দে নিরাপদে বেড়ে উঠবে। ফিলিস্তিন হয়ে উঠবে নিরাপদ শহর। সেই দিনের অপেক্ষায়।

– জাজাফী

২১ অক্টোবর ২০২৩

লেখাটি দৈনিক খবরের কাগজ পত্রিকায় ২৭ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে প্রকাশিত। লিংক

জেরুজালেম!

তপ্ত বালুর উপর রক্তের ছোপ ছোপ দাগ লাগা

পূণ্যভুমি জেরুজালেম!

সে যেন স্বামী পরিত্যাক্তা নারীর মতন, কিংবা

ভগ্নহৃদয়ের রাজকুমারীর মতন

যার স্বামী নেই অথবা প্রেমিক তাকে ফেলে গেছে

যার উপর কারো অধিকার নেই কিন্তু সবাই তাকে চায়।

এই নগরীর ধুলোর উপর দিয়ে হেঁটে গেছেন অজস্র মহামানব

পাথরের উপর খুঁজলে আজও তাঁদের পদচিহ্ন পাওয়া যাবে

গ্রীস্মের দাবাদাহে এ ভূমিতে যেমন প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়

শীত এলেই কাঁপুনি ধরায় হিমেল হাওয়া

জেরুজালেম ছাড়া যেন পৃথিবীর ইতিহাস অসম্পূর্ণ।

শহরের অলিতে গলিতে খাঁজকাটা পাথর গুলোর বুকে

রক্তের ছোপ ছোপ দাগ লেগে আছে

প্রতিটি বালুকণা চিৎকার করে যুগের পর যুগ প্রতিবাদ করছে

জেরুজালেম!

যে শহরে জন্মের আগেই শিশুর মৃত্যুর কথা ভাবে মা

বিয়ের আগেই বিধবা হওয়ার চিন্তা থাকে তরুণীর

কৈশোর পেরোনো হয়না এক তৃতীয়াংশ শিশুর।

জেরুজালেম!

এমন এক পূণ্যভূমি, স্রষ্ঠা ও সৃষ্টির মিলনস্থল

যার পাথরের ‍বুকে রয়েছে বহু অমিমাংসিত প্রশ্নের উত্তর

মহাপ্রলয়ের আগে মক্কা থেকে কাবাঘর চলে আসবে এখানে

ইস্রাফিলের সিঙার ফুৎকারে মৃতরা জেগে উঠবে

পুনরুত্থিত হয়ে এখানেই জড় হবে বিচারের আশায়।

জেরুজালেম!

অসংখ্য মৃত্যুর সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক নগর

বার বার বিধ্বস্ত হতে হতেও যে আবার মাথা তুলে দাঁড়ায়

যে শহরে বাতাসের মাঝে কানপাতলে শোনা যায়

মৃত আর নিপীড়িতের আর্তনাদ।

#জাজাফী

৬ নভেম্বর ২০২৩

অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি রোহিঙ্গা কিশোর কিশোরী।

মানুষের জীবনে কৈশোরকাল অনেকটা বসন্তের মত। এই সময়েই অনেক কিছু পরিবর্তন হয়। বসন্তে যেমন গাছে গাছে নতুন জীবন ফিরে আসে, তেমনি মানুষ কৈশোর থেকে যৌবনে পদার্পন করে। এই সময়ে জীবনের একটি ভীত তৈরি হয়। কিন্তু সবার ভাগ্যে এই সময়টা ভালোভাবে পার করা সম্ভব হয় না। যেমন রোহিঙ্গা কিশোর কিশোরী। এদের শৈশব সংকীর্ণ গলিতে এবং স্যাঁতস্যাঁতে ও অন্ধকারাচ্ছন্ন তাঁবুতেই কেটে যাচ্ছে। তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমারে চলা সহিংসতা ও নির্যাতন থেকে পালিয়ে এসে রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে থাকতে বাধ্য হয়েছে। যার অর্ধেকেরও বেশি শিশু এবং কিশোর-কিশোরী। এসব শরণার্থীদের কেউ কেউ আশ্রয়শিবিরে বাস করছে। আবার অনেকে স্বাগতিক বাংলাদেশী কমিউনিটির আশ্রয়ে রয়েছে। সেই সব কিশোর কিশোরীদের কয়েকজনের জীবনের গল্প সবার সাথে তুলে ধরতে চাই।

কিশোর কিশোরীদের নিয়ে লিখতে গেলে সঙ্গত কারণেই তাদের আসল নাম পরিচয় প্রকাশ করা ঠিক নয় বলেই ছদ্মনাম ব্যবহার করতে হয়। আজ থেকে চার বছর আগে মিয়ানমার থেকে অসংখ্য মানুষ জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল বাংলাদেশে। যাদের সিংহভাগ ছিলো কিশোর কিশোরী। তাদেরই একজন জোবায়ের (ছদ্মনাম)। সে যখন বাংলাদেশে আসে, তখন সে শরণার্থী শিবিরের বাইরে যেতে ভয় পেতো। তার মন থেকে সহিংসতার স্মৃতি মুছে যায়নি। বাংলাদেশে নিরাপদ আশ্রয়ে থেকেও সবসময় তার মধ্যে আতংক কাজ করতো। ১৪ বছর বয়সী জোবায়েরের বেশিরভাগ দিন কাটতো খুপরি ঘরের ভেতরে নির্জনে। পরিবারে তার কাছাকাছি বয়সী আরও ছয়টি ভাই বোন আছে। সবাই মিলে একটি খুপরি ঘরে গাদাগাদি করে থাকতে হয়। অথচ কদিন আগেও যার জীবন ছিলো হাসি আনন্দে পরিপূর্ণ। স্কুলে যেতো,বন্ধুদের সাথে খেলতো। নদীর পানিতে নেমে সাঁতার কাটতো। এখানে আসার পর তার আর কিছুই করার সুযোগ নেই। শিক্ষার সুযোগও ছিলো না।

তার বয়সী ৮০ শতাংশ রোহিঙ্গা কিশোর-কিশোরী আশ্রয়শিবিরে আসার পর শিক্ষার সুযোগ পায়নি। পরবর্তী সময়ে আশ্রয়কেন্দ্রে নানাবিধ শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর তাদের অনেকেই কিছু কিছু শিখতে শুরু করেছে। গত কয়েক বছরে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ থিয়েটার আর্টস দ্বারা পরিচালিত ইউনিসেফ সমর্থিত সামাজিক কেন্দ্রে যুব নেতৃত্ব এবং পিয়ার-টু-পিয়ার বিভিন্ন কর্যক্রমে তার মত কিশোর কিশোরীরা অংশ নিয়েছে। জীবনে নানা ক্ষেত্রে কাজে লাগবে এমন দক্ষতা অর্জন এবং সমমনা বন্ধুদের সাথে দেখা করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে ক্যাম্পে থাকা সামাজিক কেন্দ্রগুলো। ক্যাম্পে থাকা কিশোরদের মধ্যে যারা সামাজিক কেন্দ্রের সুবিধা নিচ্ছে তাদের দিন একরকম কাটছে কিন্তু যারা এর বাইরে তাদের দিন সম্পূর্ন আলাদা। খোলা আকাশের নিচে থাকলেও রোহিঙ্গা কিশোর কিশোরীদের ক্যাম্পের বাইরে যাওয়া নিষেধ। যদিও অনেকেই নানা ভাবে বাইরে গিয়ে কাজ করছে। কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন হোটেল রেস্তোরায় তারা পরিচয় লুকিয়ে কাজ করছে। মেয়েদের সেই সুযোগ কম থাকায় তারা খুব একটা বাইরে যাচ্ছে না। কিন্তু কিশোরদের এই সুযোগ রয়েছে। আর যারা ক্যাম্পেই অবস্থান করছে তারা সাধারণত বন্ধুদের নিয়ে ক্যারাম খেলে,তাস খেলে বা আড্ডা দিয়ে সময় পার করে। দেশী বিদেশী নানা সংস্থার মাধ্যমে পরিবার প্রতি সহযোগিতা করা হয় ফলে অনেকের মধ্যেই একরকম গা ছাড়া ভাব দেখা যায়। কিন্তু অনেক কিশোর কিশোরী আছে যারা বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখে। তারা তাদের আয়ের পরিমান বৃদ্ধির জন্য লুকিয়ে বাইরে গিয়ে পরিচয় গোপন করে বিভিন্ন কাজের সাথে যুক্ত হয় বলেও দেখা যায়।

শরণার্থী কিশোর-কিশোরিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ নিরসনের লক্ষে ইউনিসেফ রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় কমিউনিটির কিশোর-কিশোরী৬দের বয়ঃসন্ধিকালীন বিকাশ এবং দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বেশ কয়েকটি সামাজিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছে। রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় কমিউনিটির মধ্যে সামাজিক সংহতি উৎসাহিত করাও সামাজিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্য। এই সব সামাজিক কেন্দ্রে অনেক বাংলাদেশী কিশোর কিশোরীও সদস্য হিসেবে যুক্ত হয়েছে। যেন দেশ থেকে বিতাড়িত শরণার্থী হিসেবে থাকা রোহিঙ্গা কিশোর কিশোরীরা মানসিক ভাবে শক্তিশালী হতে পারে। তেমনই এক বাংলাদেশী কিশোরী সদস্য মানসুরা (ছদ্মনাম)। বয়স ১৫ বছর। গত দুই বছরে রোহিঙ্গা কমিউনিটির মেয়েদের সাথে তার মত বাংলাদেশী কিশোরী সদস্যরা দ্রুত বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছে। তারা প্রায়শই তাদের জীবন নিয়ে একে অন্যের সাথে গল্প করে। মানসুরার মতো সহজে বিশ্বাস করা যায় এমন অনেক কিশোরীকে পেয়ে রোহিঙ্গা কিশোরীরা তাদের লড়াই এবং প্রতিদিন কীভাবে তারা তাদের দেশকে মিস করছে সেই কষ্টের গল্প বলে।মানসুরা বলে, “একদিনের জন্যও বাংলাদেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হতে পারি আমি এটা কল্পনাও করতে পারিনা। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে তারা তাদের ঘরবাড়ি থেকে দূরে রয়েছে। এটা ভাবতেও খুব কষ্ট হয়”।

মানুষ যখন অসহায় হয়ে পড়ে, বিপর্যয়ের মুখে পড়ে, তখনই সবচেয়ে নিগ্রহীত হয়, নির্যাতনের শিকার হয়। ইউনিসেফ বাংলাদেশের ইমার্জেন্সি ম্যানেজার মাইকেল জুমা বলেন, “কিশোর কিশোরীরা যখন তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন তারা যৌন নির্যাতন, পাচার ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা সহ বিশেষ করে শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। তাদের স্কুল থেকে ঝরে পড়ার আশঙ্কাও বেড়ে যায়।এটি মানসিকভাবে অত্যন্ত বিপর্যয়কর একটি অভিজ্ঞতা, যা তাদের সুরক্ষা ও বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে”। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ১৫ বছরের কম বয়সী অসংখ্য রোহিঙ্গা মেয়ে শিশুরা ধর্ষণের শিকার হয়েছে বলে নানা সময়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। 

বাল্যবিবাহ একটি সামাজিক ব্যাধি। বাল্যবিবাহের ফলে নানা রকম সমস্যা তৈরি হয়। বাল্যবিবাহ রোধে বিশ্বব্যাপী জোর প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। আইন তৈরি করা হয়েছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু এতো কিছুর পরও বাল্যবিবাহ বন্ধ হচ্ছে না। এর পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। বাল্যবিবাহ রোধে সামাজিক আন্দোলন চলমান থাকলেও ফাঁকফোকর দিয়ে প্রতিদিনই দেশের নানা প্রান্তে বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটছে। আশঙ্কাজনক বিষয় হলো বাল্যবিবাহের এই হার রোহিঙ্গাদের মধ্যে অনেক বেশি। কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে তার পরিধি ব্যাপকহারে বেড়েছে ৷ অন্তত ৯০ শতাংশ বিয়ে শুধু অভাবের তাড়নায় হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট গবেষক ও সমাজকর্মীরা। একবার ভেবে দেখুন একটি কিশোরীকে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে শুধুমাত্র তার প্রতিদিনের খাবারের জোগাড় হবে এই আশায়। বাবা মা কতটা অসহায় হলে কেবল মাত্র খাবারের জোগাড় হবে,পেটে ভাতে বেঁচে থাকবে এই চিন্তা থেকে মেয়েকে বিয়ে দিতে পারে।

কক্সবাজারে অবস্থিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঘুরলে যে দৃশ্যটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়বে তা হলো বাচ্চা কোলে অসংখ্য কিশোরী। এ বিষয়ে যাদের পূর্ব ধারণা নেই তারা মনে করবে হয়তো বোনের কোলো তার ছোট ভাই বা বোন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। কিশোরীদের কোলে থাকা শিশুটি তার নিজের সন্তান! যে নিজেই কৈশোর পেরোয়নি সে এখন আরেক শিশুর মা! মোহাম্মদ সেলিম নামে একজনের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি মিয়ানমারের কারারুপাং এলাকা থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসে কুতুপালং ক্যাম্পে ঠাঁই নিয়েছেন। তারা যখন মিয়ানমার বসবাস করতেন তখন থেকেই রোহিঙ্গাদের মধ্যে মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেয়ার প্রচলন ছিল। যার মুল কারণই হল নিরাপত্তা। বাংলাদেশে আসার পরও সেটিই বড় কারণ হিসেবে রয়ে গেছে। তার মতে, “যদি আমার বোনটাকে আমি বিয়ে না দেই, তাহলে সে এদিক ওদিক চলাফেরা করবে আর ওরা ওর গায়ে হাত বাড়াবে। তাই আমরা তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দেই। তাতে করে সে তার শ্বশুর বাড়িতে থাকবে। বাজারে যাবে না, এদিক ওদিক যাবে না। অধিকাংশ সময় সম্মান বাঁচাতে এটা করতে বাধ্য হতে হয়”।

তেমনই এক কিশোরীর ছদ্মনাম আকলিমা। বয়স ১৩ বছর। চোখের সামনে বাবা মাকে নৃশংস ভাবে খুন হতে দেখেছে সে। তারপর কিছুদিন জীবন নিয়ে পালিয়ে থেকে একসময় দাদির সাথে তিন দিন অবিরাম হেটে বাংলাদেশ সীমান্ত পার হয়ে এই দেশে আশ্রয় নিয়েছে। বাবা মা ছাড়া আকলিমাকে দেখার মত কেউ ছিলো না। সেই বাবা মা নৃশংসভাবে খুন হওয়ার পর দাদিই ছিলো একমাত্র আপনজন। কিন্তু শরাণার্থী শিবিরে থাকা দাদির পক্ষেও তার খরচ বহন করা সম্ভব ছিলো না। ফলে কয়েক মাস আগে তাকে বিয়ে দেওয়া হয়েছে! ১৩ বছর বয়সে যে কিশোরীর প্রজাপতির মত ডানা মেলে পৃথিবী দেখার কথা,স্কুলে যাওয়ার কথা,ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে বিভোর থাকার কথা, সেই কিশোরী এখন কারো স্ত্রী হিসেবে সংসার শুরু করেছে। হয়তো কদিন বাদেই সন্তানের মা হবে। ডয়েচেভেলের সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে মেয়েটি আক্ষেপ নিয়ে বলেছিল শুধুমাত্র পেটে ভাতে বেঁচে থাকার জন্য দাদি বাধ্য হয়ে তাকে বিয়ে দিয়েছেন! বিয়ে হয়েছে ফলে তার কাপড়,খাবার সব কিছুর দায়িত্ব স্বামী ও শ্বশুরবাড়ীর লোকদের। যদি এসবের চিন্তা না থাকতো তবে সে এই বয়সে বিয়ে করতো না। সুযোগ পেলে সে লেখাপড়া করতো।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এমন আকলিমার সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। হয়তো তাদের কারো নাম জরিনা, কারো নাম মর্জিনা বা নাফিসা হতে পারে। কিন্তু তাদের সবার ভাগ্য একই রকম। আকলিমার মতই আরেক কিশোরীর নাম জোবেদা। তারও বিয়ে হয়েছে কিছুদিন আগে। বয়স এখন ১৬ বছর। যখন বিয়ে হয়েছিল তখন আরো কম ছিল। তাছাড়াও আইনগত ঝামেলা এড়াতে অধিকাংশ বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে মেয়ের বয়স দুই থেকে তিন বছর বাড়িয়ে দেখানো হয়। হয়তো সে ক্ষেত্রে বিয়ের সময় আকলিমা বা জোবেদাদের প্রকৃত বয়স ১০ থেকে ১২ বছরও হয়ে থাকতে পারে।

ওরা জানে না ওদের অনাগত সন্তানের ভবিষ্যত কেমন হবে। শুধু জানে বিয়ে করার কারণে খাবারের সংকট কাটাতে পেরেছে। শরণার্থী শিবিরে পরিবার হিসেব করে ত্রাণ দেয়া হয় ৷ তাই নিজের সংসার হওয়ায় ত্রাণ এখন বেশি পাওয়া যাচ্ছে ৷ মেয়েদের জন্য খাদ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার তাদের বিয়ে দেওয়াই একমাত্র সমাধানের পথ হিসেবে মনে করে। এতে কিশোরীর শারীরিক ও মানসিক অনেক ক্ষতি হতে পারে জেনেও তারা তা আমলে নেয় না। এমনও পরিবার আছে, যাদের সদস্য সংখ্যা দশ এগারো জন। ছোট বাসায় দেখা যায় দুইজন যুবক ছেলে আর দুইজন যুবক মেয়ে। তখন তাদের দুইটা আলাদা রুম দিতে হয় যা তাদের পক্ষে সম্ভব না। ফলে তারা মনে করে ওদের যদি বিয়ে দিতে পারি তাহলে কিছুটা সুবিধা হবে।

রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে বিভিন্ন দেশী এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ৷ এসব প্রতিষ্ঠানের গড়া স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে প্রসুতি মায়েদের এবং শিশুদের জন্য চিকিৎসা সেবার বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে৷ কুতুপালং ক্যাম্পে দু’বছর ধরে কাজ করছেন ড. রোমানা ইসলাম৷ অল্পবয়সি মেয়েদের গর্ভধারণ নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন তিনি ৷ কখনো কখনো দিনে ২৫ থেকে ৩০ জন কিশোরী অন্তঃসত্ত্বার চিকিৎসা করেন তিনি ৷ তার মতে, ‘‘বাল্যবিবাহের শিকার মেয়েরা প্রথমত অপুষ্টিতে ভোগে৷ যেহেতু তারা নিজেরাই ছোট এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক, তাদের বাচ্চাগুলোও ছোট এবং অপরিনত হয়৷ অনেকসময় তাদের ডেলিভালির সময় অনেক বেশি রক্তক্ষরণ হয়৷ তারা নিজেরা নিজেদের যত্নতো নিতেই পারে না, সন্তানের যে পরিমাণ যত্ন নেয়া দরকার, সেটাও নিতে পারে না”। অন্যদিকে এদের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্মহারও বাড়ছে, জনসংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে যা ভবিষ্যতের জন্য আরও বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন অনেকেই। 

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে থাকা কিশোর কিশোরীদের শিক্ষা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে দেখা যায়। নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে অন্য একটি দেশে সহায় সম্বলহীন জীবনে অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত বাবা মায়ের সাথে কিংবা বাবা মা ছাড়া এতিম হিসেবে ঝুপড়িতে থেকে একটি কিশোর বা কিশোরীর পক্ষে পড়াশোনা করা কি সম্ভব? ক্যাম্পে থাকা কিশোর কিশোরীদের অবর্ননীয় সেই বেদনার কথা লিখে শেষ হবে না। জাতিসংঘের শিশু অধিকার বিষয়ক প্রতিষ্ঠান  ইউনিসেফ এবং তাদের অংশীদার বেসরকারি সংস্থাগুলো ২ হাজার ৮০০ শিক্ষা কেন্দ্রের মাধ্যমে কক্সবাজার ক্যাম্পে সাড়ে ৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী কিশোর কিশোরীদের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিল। করোনার ভয়াবহতার কারণে ২০২০ সালের মার্চে দেশব্যাপী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। একই সাথে বন্ধ হয়ে যায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পরিচালিত স্কুলগুলোও। ফলশ্রুতিতে রোহিঙ্গা কিশোর কিশোরীরা দীর্ঘ সময় শিক্ষার কোনোও সুযোগই পায়নি। আর ওই সময়ে বাল্য বিবাহের হার বেড়েছে, অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও বেশি ঘটেছে। যদিও পরবর্তীতে শিক্ষা কার্যক্রম আবার চালু হয়েছে।

ইউনিসেফ ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী ৭৪,০০০-এর অধিক রোহিঙ্গা কিশোর-কিশোরীদের সাক্ষরতা, সংখ্যাগণনা, জীবন দক্ষতা এবং বৃত্তিমূলক দক্ষতা প্রশিক্ষণসহ শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। নূর নামে ষোল বছর বয়সী এক রোহিঙ্গা কিশোর ইউনিসেফ সমর্থিত বহুমূখী শিশু ও কিশোর-কিশোরী কেন্দ্রে দক্ষতা বিকাশের কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিল। শরণার্থী শিবিরগুলোর সর্বত্র যেসব সৌর প্যানেল রয়েছে সেগুলো স্থাপন ও মেরামত করতে শিখছে নূর। ফলে সে এখন তার বাড়ির সৌর প্যানেল নিজে নিজেই মেরামত করতে পারে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে থাকা ১২ বছরের মেয়ে রাজিয়া। তার এবং তার ছোট বোন ফেরদৌস ও সাদেকার ইউনিসেফের ওয়ার্ল্ড ভিশন সেন্টারে অবস্থিত রোহিঙ্গা শিবিরে সবচেয়ে সেরা সময় কাটে। সেখানে তারা সেলাই, হস্তশিল্পের কাজের পাশাপাশি ইংরেজি ও বার্মিজ ভাষা এবং গণিতসহ জীবন ধারণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও শেখে। শরণার্থী হিসেবে থাকা রোহিঙ্গা কিশোর কিশোরীরা নানা কারণে মাদক পাচার থেকে শুরু করে অন্যান্য সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সাথেও জড়িয়ে পড়ছে।অনেক সময় তাদেরকে জোর করে এসব কাজে বাধ্য করা হচ্ছে। পাশাপাশি পাচারের শিকারও হতে হচ্ছে। 

জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মতে, শরণার্থীদের অন্তত ৬০ ভাগই ১৬ বছরের কম বয়সী কিশোর কিশোরী। উখিয়া,কুতুপালং সহ অন্যান্য শরণার্থী শিবিরে প্রায় সাড়ে তিন লাখ কিশোর কিশোরী রয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার কিশোর কিশোরী সহিংসতায় তাদের বাবা, মা অথবা দু’জনকেই হারিয়েছে। অন্তত ২০ হাজার রোহিঙ্গা কিশোর কিশোরী বিভিন্নভাবে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ভয় ও আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করার জন্য গত কয়েক বছরে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে কয়েক শত শিশু কিশোর কিশোরী সহায়তা কেন্দ্র চালু করা হয়েছে, যেখানে নাচ, গান এবং অংশগ্রহণমূলক বিভিন্ন খেলার মাধ্যমে তাদের মন থেকে ভয়াবহ স্মৃতিগুলো মুছে দিতে চেষ্টা করা হয়। কিন্তু চাইলেই কি আর এমন বেদনার স্মৃতি মন থেকে মুছে ফেলা যায়? তেমনই এক কিশোরীর ছদ্মনাম জামিলা। তার বয়স এখন ১৫ বছর। যখন শরণার্থী হয়ে এসেছিল তখন বয়স ছিলো ১২ বছর। আপনজন বলতে কেউ নেই তার। অভিভাবক হিসেবে সে রাশিদা বেগম নামে একজনকে পেয়েছে। যিনি মায়ানমারে জামিলাদের প্রতিবেশী ছিল।

কিশোর কিশোরীর বিকাশে পরিবার এবং শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।কিন্তু একজন শরাণার্থী কিশোর বা কিশোরীর ক্ষেত্রে এ দুইটিরই কমতি দেখা যায়। রোহিঙ্গা কিশোর কিশোরীরা একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। এটি তাদেরকে হতাশার দিকে নিয়ে যেতে পারে। শিক্ষণের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকলে, পাচার, বাল্য বিবাহ, শোষণ ও নির্যাতনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ কম থাকা এবং বড় হওয়ার সাথে সাথে নিজেদের পরিচয় প্রকাশের যথাযথ জায়গা এবং সুযোগ না থাকায় এসব শরণার্থী কিশোর কিশোরীদের অনেকেই একটি হারানো প্রজন্মের অংশ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। নিজেদের পড়াশুনা, লেখালেখি, খেলাধুলা এবং সৃজনশীল দিকগুলো বিকশিত করার স্বাধীনতা রয়েছে তাদের জন্য এমন নিরাপদ জায়গা করে দেওয়া এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর সেটা হতে পারে যদি তাদেরকে নিরাপদে তাদের মাতৃভূমিতে ফিরিয়ে নেওয়া যায়। এ জন্য শুধু বাংলাদেশ সরকারের ইচ্ছে বা প্রচেষ্টাই যথেষ্ট নয় পাশাপাশি মায়ানমারকেও সদিচ্ছা প্রকাশ করতে হবে এবং পৃথিবীর ক্ষমতাধর রাষ্ট্রকে জাতিগত এই সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। আমরা শুধু তাদের দিকে তাকিয়ে বলতে পারি “ পৃথিবীতে শান্তি বিরাজ করুক”।

৩০ অক্টোবর ২০২৩

ইমেইল: [email protected]

লেখাটি দৈনিক খবরের কাগজ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে ১০ নভেম্বর ২০২৩ । প্রকাশিত লেখার লিংক ইপেপারের লিংক

কক্সবাজারগামী ট্রেন: পর্যটন খাতে সম্ভাবনা ও আশঙ্কা

দেশের প্রধানতম পর্যটন নগরী কক্সবাজার। ছুটির অবসরে ঘুরতে যাওয়ার জন্য দেশের ভ্রমণপিয়াসী মানুষ স্বভাবতই কক্সবাজারকে প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নেয়। তবে দীর্ঘদিন এখানে কাজের সুবাদে থাকার কারণে আমি দেখেছি এখানকার খরচ তুলনামূলক ভাবে অনেক বেশি। এমনকি ভালোভাবে হিসেব করলে দেখা যায় কক্সবাজারে আসলে একটি পরিবারের যে পরিমান খরচ হয় সেই একই পরিমান অর্থ ব্যয় করে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ঘুরে আসা যায়। অন্যদিকে দূরত্বের কারণে অনেকেই ছুটি পেলেও খরচ ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে কক্সবাজারে যেতে পারে না। অনেকেই মনে করতো যদি কক্সবাজারে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকতো তাহলে কক্সবাজার যাওয়ার ইচ্ছেটা পূরণ হতো। কারণ তুলনামূলক ভাবে ট্রেনের ভাড়া কম থাকে। পাশাপাশি ট্রেনে ভ্রমন নানা কারণে আমারদায়ক বিধায় অনেকেই ট্রেনকেই যাতায়াতের জন্য সেরা মাধ্যম মনে করে।কিন্তু এতোদিন কক্সবাজারের সাথে রেল যোগাযোগ ছিল না। সম্প্রতি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো। কক্সবাজার রেল যোগাযোগ চালু হলো। এতে করে কক্সবাজারের সাথে সারা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন অধ্যায় সূচিত হবে বলে মনে করি। পর্যটনখাতে আয়ও বাড়বে। সেই সাথে এদিকে আরও বেশি কর্মসংস্থান হবে।

অর্থনীতির পরিভাষায় যোগান বৃদ্ধি পেলে দাম কমার কথা। যেহেতু ট্রেন যোগাযোগের একটি বড় মাধ্যম, তাই এটা স্বাভাবিক ভাবে ধরে নেওয়া যায় পযর্টকদের একটি বিরাট অংশ কক্সবাজার যাওয়া আসার ক্ষেত্রে রেলপথ বেছে নিবে। আর এটা হলে বাস এবং বিমানের যাত্রী সংখ্যা অনেকটাই কমে যাবে। ফলশ্রুতিতে বাস এবং বিমান উভয়েই যাত্রী ধরে রাখতে হলে ভাড়ার পরিমান কমানো ছাড়া কোনো পথ থাকবে না। সেই কমানোর পরিমান ঠিক কত হবে সেটা এখনি বলা যাচ্ছে না। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বিভিন্ন অফার দেওয়া,দাম কমানো সহ নানা সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করা ছাড়া গ্রাহক ধরে রাখা সম্ভব নয়। যেহেতু যোগাযোগের তিনটি ভিন্ন মাধ্যমই এখন কার্যক্রম শুরু করেছে, তাই স্বভাবতই অপেক্ষাকৃত কম খরচে যে মাধ্যমে মানুষ যাতায়াত করতে পারবে সেটাই বেছে নিবে।

অনেক বয়স্ক মানুষ আছেন, এমনকি অনেক অল্প বয়সী মানুষও আছে যারা দীর্ঘ পথ বাসে ভ্রমন করতে পারে না। অসুস্থবোধ করা,বমি হওয়া থেকে শুরু করে নানা সমস্যায় ভুগতে হয়। তাছাড়াও দীর্ঘ ক্লান্তিকর ভ্রমনেও অনেকের মধ্যে অনীহা দেখা দেয়। ট্রেন সেটাকে অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে। ট্রেনের মধ্যে হেটে বেড়ানো যায়। চা কফি খাওয়া যায়। টয়লেটের ব্যবস্থা থাকে, বাইরের দৃশ্য দেখতে দেখতে পিকনিকের আমেজে যাওয়া যায়। অন্যদিকে অল্প সময়ে ভ্রমনের জন্য বিমান প্রধান মাধ্যম হলেও ঢাকা সহ অন্যান্য এয়ারপোর্ট থেকে কক্সবাজারের বিমান ভাড়া অনেক বেশি। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য সেটা বহন করা সম্ভব হয় না। এ ক্ষেত্রে ট্রেন হয়ে উঠবে তাদের প্রথম পছন্দ কারণ কর্তৃপক্ষের দেওয়া হিসেব মতে ট্রেনের ভাড়া হবে বাসের প্রায় অর্ধেক বা তারও কিছু কম। ফলে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দেশের অন্যান্য রুটের তুলনায় এই রুটে সারা বছরই যাত্রী পাবে এবং সঠিক ভাবে সেবা দিতে পারলে রেলওয়ের ভালো আয় হবে। কিন্তু সেবার মান অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।

এটাতো গেলো সম্ভাবনার কথা। কিন্তু এই ট্রেন যোগাযোগ চালুর পর আমি কিছু আশঙ্কাও করছি। পযর্টকের পরিমান বেড়ে যাওয়ায় হোটেল মোটেলে যায়গার সংকুলান হবে না। এক শ্রেণীর মানুষ এটাকে পুজি করে হোটেল মোটেলের ভাড়া বাড়িয়ে দিতে পারে। একই সাথে অন্যান্য সেবা খাত যেমন, খাবারের হোটেল,প্রয়োজনীয় পণ্য,লোকাল গাড়ি ভাড়া সব বাড়িয়ে দিতে পারে। প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। পরিবেশ দূষণের হার বাড়তে পারে। সেই সাথে সমুদ্র সৈকত এলাকায় অপরাধ প্রবণতাও বাড়তে পারে এবং সৈকতের পরিবেশও নষ্ট হতে পারে। যে পরিমান ধারণ ক্ষমতা আছে তার অধিক পযর্টকের আগমনে সৈকতের সৌন্দর্য নষ্ট হতে পারে। আর দেশের অন্যতম আকর্ষনীয় স্থান সেন্টমার্টিন যেহেতু কক্সবাজারেই তাই সেখানেও যেতে চাইবে অনেকে। ফলে সেন্টমার্টিনের জন্যও তা হবে ভয়াবহ।

অন্যদিকে ট্রেন চালুর পর গণপরিবহনের ভাড়া কমানো বা যাত্রী কমে যাওয়ার বিষয়টি আমলে নিয়ে একটি চক্র ভয়বহ সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আর সেটা হতে পারে মানুষকে ট্রেন থেকে বিমুখ করা। এটা করার জন্য তারা চক্রান্ত করে ট্রেনে পাথর ছুঁড়ে মারতে পারে। সারা দেশের বিভিন্ন রুটে নানা সময়ে পাথর মারার ঘটনা আমরা দেখে থাকি। এটা কেউ পাগলামী করার জন্য মারে না বরং এর পেছনে নিশ্চই গোপন অভিসন্ধি থাকে। এখানেও তেমনটি ঘটার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। সব জায়গায় ভালো এবং খারাপ মানুষ থাকে। নিজেদের ব্যবসা ধরে রাখার জন্য, যাত্রী যেন কমে না যায় সেটা মাথায় রেখে কোনো দুষ্কৃতিকারী যদি ট্রেনের জানালায় পাথর ছুঁড়ে মারে,কাউকে হতাহত করে, ভয় দেখায়, তবে তারা অনেকটাই সফল হবে। ট্রেন থেকে হতাহতের ভয়ে যাত্রীরা মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। এতে করে এক শ্রেণীর মানুষ নিশ্চই লাভবান হবে যারা যাত্রী সেবা দিয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে আগে থেকেই ঘোষণা দেওয়া উচিত এই ধরনের কোনো ঘটনা ঘটলে প্রথমেই একই ধরনের সেবাদানকারীদের উপর পরোক্ষ ভাবে হলেও দোষ যাবে। এটা করতে পারলে শুরুতেই তারা সচেতন হবে এবং ভুলেও যদি কারো মনে এই ধরণের অভিসন্ধি থেকে থাকে তো তারা সেই পথ থেকে ফিরে আসবে। অন্যদিকে দালাল চক্র সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে যারা টিকেট নিয়ে দালালি করবে।

পৃথিবীর অনেক দেশ আছে যাদের অর্থনীতি একটি বড় অংশ পযর্টন নির্ভর। মরিশাচ,থাইল্যান্ড,ইন্দোনেশিয়া,ভূটান,মালদ্বীপ তার মধ্যে অন্যতম।তারা পযর্টনকে সত্যিকার অর্থে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছে বলেই আজ ওই সব দেশে পযর্টকদের আনাগোনা অনেক বেশি। বাংলাদেশ থেকেও প্রতিবছর ওই সব দেশে হাজার হাজার পযর্টক ভ্রমন করতে যাচ্ছে। তাদের মতামত আমরা নানা সময়ে দেখতে পাই। ওই সব দেশে গিয়ে তারা যেমন হসপিটালিটি পেয়ে থাকে,যেমন পরিবেশ পেয়ে থাকে তার ছিটেফোটাও আমরা আমাদের পযর্টনকেন্দ্রগুলোতে দিতে পারি না। ফলে বিদেশী পযর্টকরা যেমন আমাদের এখানে আসতে আগ্রহ হারায় তেমনি দেশীয় পযর্টকদের এক বিরাট অংশই বিদেশমুখী হয় বিশেষ করে যাদের আর্থিক সংগতি আছে।

সুতরাং পযর্টন শিল্প বলে আমরা যেটাকে আখ্যায়িত করি সেখানে পযর্টন শব্দটি থাকলেও শিল্প খুব একটা নেই বলাই চলে। শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারলেই কেবল এ খাত হয়ে উঠতে পারে অত্যন্ত লাভজনক এবং দেশ এই খাত থেকে অনেক বেশি লাভবান হতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রায় আয় হতে পারে ঈর্ষনীয়। সে ক্ষেত্রে যাতায়াত ভাড়া,হোটেল ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পযর্টক বৃদ্ধিপেলেই একশ্রেণীর মানুষ সেটাকে পুজি করে হোটেল,মোটেল ভাড়া বাড়িয়ে দেয়, গাড়ি ভাড়া বাড়ায়, খাবারের দামও বাড়ায়। এসব নিয়ে নানা সময়ে আমরা নিউজ হতে দেখি কিন্তু আশানুরুপ পদক্ষেপ নিতে দেখি না। যদি এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যায়,নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা যায় তবে এ খাত হয়ে উঠতে পারে অপার সম্ভাবনাময়। একই সাথে কক্সবাজারে সমুদ্র সৈকত ছাড়া আর কোনো বিনোদন মাধ্যম নেই। নেই কোনো সিনেপ্লেক্স,নেই কোনো মাল্টিপ্লেক্স,নেই কোনো বলার মত শিশুপার্ক বা অন্যান্য বিনোদন কেন্দ্র। ফলে দেশী বিদেশী পযর্টকরা এখানে এসে খুব সহজেই হতাশ হয়ে পড়ে, আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এই বিষয়গুলো কঠোর নজরদারীতে আনা জরুরী।

কক্সবাজারে বর্তমান যে পরিস্থিতি আছে তাতেও বলা যেতে পারে সরকার এখান থেকে মাসে শত কোটি টাকা রাজস্ব পাচ্ছে। কিন্তু সেই তুলনায় সরকারী ভাবে তেমন কোনো সুযোগ সুবিধাই এখানে দেওয়া হচ্ছে না বলে পযর্টকরা মনে করে। বীচ এরিয়াতে নেটওয়ার্কের অবস্থাও খুবই দুর্বল। তারা চাইলেও ঘরে রেখে আসা প্রিয়জনদেরকে ভিডিও কলে বা লাইভের মাধ্যমে সমুদ্র দেখাতে পারে না। অথচ চাইলেই পুরো জোনটাকে ফ্রি ওয়াইফাই জোন করে দেওয়া যায়। আর সরকারি ভাবে এটা করতে পারলে দারুণ প্রসংশাও পাবে বলে আমি মনে করি। লাবণী পয়েন্ট থেকে কলাতলী পয়েন্ট পযর্ন্ত এই তিন চার কিলোমিটার এরিয়ায় ১০০০ টি রাউটার লাগালে এবং প্রতিটির জন্য মাসে ১ হাজার টাকাও যদি খরচ হয় তবে মাসে ইন্টারনেট বাবদ খরচ হতো ১০ লাখ টাকা। যেখানে সরকার শত কোটি টাকা মাসে রাজস্ব পাচ্ছে সেখানে পযর্টকদের জন্য এক দুই কোটি টাকা তারা খরচ করতে পারবে না এটা অন্তত কল্পনাও করা যায় না। এর বাইরে বীচ এরিয়াতে যে লাইটগুলো আছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম আলো দেয়। যে আলোতে বীচের সৌন্দর্য দেখা যায় না। এখানে স্টেডিয়ামের মত তিন পয়েন্টে তিনটি ফ্ল্যাড লাইট স্থাপন করতে পারলে পুরো এরিয়া আলোকোজ্জল হয়ে উঠতো এবং বীচ হয়ে উঠতো নিরাপদ এবং আকর্শনীয়। এমনকি এই সব ক্ষেত্রে যা খরচ হতো সেটাও সরকার চাইলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মাধ্যমেই পূরণ করতে পারতো।

এই শহরে যাতায়াতের জন্য ব্যাটারিচালিত রিকশা বা টমটমই একমাত্র বাহন কিন্তু সেটার ভাড়ার কোনো বিধিনিষেধ নেই। যার কাছ থেকে যত হাকিয়ে নিতে পারে। পুরো জিম্যি করে রাখা হয় পযর্টকদের। ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার পথ ব্যাটারি চালিত টমটমে যাওয়া আসার জন্য ভাড়া নেওয়া হয় ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা! পাঁচ কিলোমিটার পথ যেতেও তারা ভাড়া দেড়শো থেকে দুইশো টাকা দাবী করে। যেখানে যেতে তাদের মাত্র দশ থেকে বার মিনিট সময় লাগে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে পযর্টন এই দেশে কখনোই শিল্পের পর্যায়ে পৌছাতে পারবে না। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সকলের উচিত বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নেওয়া।

#জাজাফী

৮ নভেম্বর ২০২৩

লেখাটি দৈনিক খবরের কাগজে প্রকাশিত হয়েছে ১৭ নভেম্বর ২০২৩ তারিখে। প্রকাশিত লেখাটির লিংক (ইপেপার) ওয়েবসাইটের লিংক

আমি যেভাবে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করি

সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে আমি মোটামুটি সচেতনতা অবলম্বন করতে চেষ্টা করি। কখনো কখনো পোস্ট দেওয়ার পর ভুল হয়েছে বুঝতে পারলে সেটা সরিয়ে নিই। নানা কারণে অন্যদের তুলনায় আমি সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকটা সময় ব্যয় করি।তবে এডিক্টেড বলা যাবে না। কারণ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করতে গিয়ে আমি অন্যান্য কাজ ফেলে রাখ না। সোশ্যাল মিডিয়ায় যে কাজগুলো আমি সাধারণত করি না তার একটি তালিকা নিম্নরুপ। 

১। ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করি না।

বিভিন্ন দিক বিবেচনা করেই মূলত আমি সোশ্যাল মিডিয়ায় আমার ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করি না।প্রতিনিয়ত নিজের জীবনকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরলে মানুষ আমার ব্যক্তিগত জীবনে মতামত দেওয়ার সুযোগ পাবে এবং যেহেতু আমি নিজেই আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার জনসম্মুখে তুলে ধরছি, তাই সবাই আমার জীবনে নাক গলানোকে নিজেদের অধিকার হিসেবে মেনে নেবে। গোপনে আমাকে নিয়ে চায়ের কাপে চর্চাও হবে প্রতিনিয়ত। তাই নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে যতটা সম্ভব ব্যক্তিগত রাখাটাই আমি শ্রেয় মনে করি।  এ কারণে আপনারা আমার বন্ধু তালিকায় থাকার পরও,ভালো সম্পর্ক হওয়ার পরও আমার পড়াশোনা,কর্মজীবন,জীবনধারা সম্পর্কে আমি আপনাদের সাথে খুব কমই শেয়ার করি। বছরের পর বছর সুসম্পর্ক থাকার পরও আমার ছবি,বয়স,গ্রামের বাড়ি কোনো কিছুই আপনাদের সাথে আমি শেয়ার করিনি। দুএকজন যাদের সাথে আমার সরাসরি পরিচয় আছে তারাই শুধু খুব সীমিত পরিমান তথ্য জানেন। এতে আমি অনেক নিরাপদ বোধ করি। নির্ভার বোধ করি।

২। নেতিবাচক কথা বলি না

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা কত কথাইতো বলি। কত ঘটনার মুখোমুখি হই। প্রতিটি বিষয়েই দুটি দিক থাকতে পারে যার একটি ইতিবাচক আরেকটি নেতিবাচক। আমি চেষ্টা করি নেতিবাচক বিষয়টি এড়িয়ে যেতে। এমন কোনো কথা বলি না যা নেতিবাচক। যার মাধ্যমে কারো উৎসাহে ভাটা পড়বে, কারো ক্ষতি হবে, কারো আত্মবিশ্বাস কমে যাবে। একজন কম নাম্বার পেয়েছে বলে তাকে বলি না তুমি এতো কম পেয়েছ! তারচেয়ে বরং ইতিবাচক ভাবে তাকে বলি তোমার নাম্বারতো বেশ। তবে তোমার মধ্যে যে সক্ষমতা আছে তুমি চেষ্টা করলে পরবর্তীবার আরও বেশি ভালো করবে। প্রতিনিয়ত তুমি নিজেই নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে পারবে। আমি কারো সাথে কারো তুলনা করে তার মনোবল ভেঙ্গে দিতে ইচ্ছুক নই। সব সময় তাই ইতিবাচক কথা বলাকে আমি প্রাধান্য দিই।

৩। বিতর্কিত পোস্ট করি না

নানা সময়ে আমাদের সমাজে অনেক ঘটনাই ঘটে যা নিয়ে তর্ক বিতর্ক হয়ে থাকে। আমি সাধারণত এমন কোনো পোস্ট করি না যা বিতর্কের জন্ম দেয়। কিছু পোস্ট করি যা হয়তো  আলোচনার বিষয় হতে পারে কিন্তু সেটা সেই অর্থে বিতর্ক তৈরি করে না। বিতর্ক বলতে সেই যে ডিম আগে না মুরগি আগে টাইপ বিষয়কে আমি এড়িয়ে চলি। তবে বিতর্কিত বিষয়ে আমি আমার মতামত তুলে ধরি যেন অপেক্ষাকৃত ভুল ধারণা নিয়ে থাকা মানুষ তা বুঝতে পারে। যেমন ক্রিকেটার তানজিম সাকিবের পুরোনো স্ট্যাটাস নিয়ে যে তর্ক বিতর্ক শুরু হয়েছে তা নিয়ে আমি কোনো পোস্ট করিনি। এর মানে আবার এই নয় যে আমি বিতর্ক এড়িয়ে যাচ্ছি।  আমার কিছু শুভাকাঙ্খী আছেন যারা নানা সময়ে এই ধরনের কোনো বিষয় নিয়ে আমার মতামত জানতে চান। তখন আমি সেসব নিয়ে লিখি বা মতামত দিই। নিজ থেকে বিতর্ক জন্মদিতে আমি পছন্দ করি না।

৪। সার্বক্ষণিক সেলফী/নিজের ছবি পোস্ট করি না

ফেসবুকে সিংহভাগ মানুষই ছবি শেয়ার করেন। এতে দোষের কিছু নেই। তবে কেউ কেউ প্রচুর সেলফী এবং নিজের অন্যান্য ছবি শেয়ার করেন। আমি খুবই কম শেয়ার করি। করলেও অনলি মি করে রাখি কিংবা কিছু নির্দিষ্ট মানুষ দেখতে পাবে সেভাবে অডিয়েন্স সেট করে তারপর পোস্ট করি। আমার এটা ভালো লাগে। 

৫। ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে অভিযোগ করি না

একটা সময় ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে আমিও অভিযোগ করতাম। পরে যখন একটু পরিণত হয়েছি তখন বুঝেছি এটা ঠিক না। অভিযোগ করতে হলে যার বিষয়ে অভিযোগ তাকেই সরাসরি অভিযোগ করার পক্ষে আমি। আমি চেষ্টাও করি ইনবক্সে তাদেরকে তাদের বিষয়ে জানাতে। সোশ্যাল মিডিয়াতে কারো বিষয়ে সরাসরি অভিযোগ করা থেকে যথাসম্ভব বিরত থাকি।

৬। অতিরিক্ত দেখনিপনা টাইপ পোস্ট করি না

নানা সময়ে রেস্টুরেন্টে খেতে দিয়ে বা কোথাও ঘুরতে গিয়ে বা কিছু কেনাকাটা করে তার ছবি তুলে শেয়ার করার একটা রীতি বা প্রবণতা আমাদের সমাজে দেখা যায়। আমিও ঘুরতে যাই,খেতে যাই, ছবি তুলি। তবে সেগুলো অন্যদের মত সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করি না। স্মৃতি হিসেবে শুধু রেখে দিই। তবে কেউ আমাকে যখন উপহার দেয় তখন মাঝে মাঝে খুশি ধরে রাখতে না পেরে সেটা নিয়ে স্ট্যাটাস দিই।

৭। বিভ্রান্তিকর তথ্য পোস্ট করি না

অনেক সময় আমরা দেখতে পাই ভুল ও চটকদার তথ্য দিয়ে অনেক পোস্ট শেয়ার হয়। ওই সব পোস্ট প্রচুর ভিউ হয়,লাইক কমেন্ট পায় এবং ভালো লাগার কারণে অনেক মানুষ শেয়ারও করে। ক্ষেত্র বিশেষে আমারও ভালো লাগে। তবে যদি দেখি তথ্য বিভ্রান্তিমূলক এবং সত্যতা যাচাই করার সুযোগ নেই। কিংবা সত্যটা আমি জানতে পেরেছি যে পোস্টের তথ্য ভুল তখন আমি তা শেয়ার করা বা পোস্ট করা থেকে বিরত থাকি। বরং আমি অন্যরা যে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে তা সবাইকে জানাতে চেষ্টা করি। আপনারা জানেন রিউমার স্ক্যানার পেজের মাধ্যমে এই ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য যাচাই করে সবাইকে সচেতন করা হয়ে থাকে।

৮। হ্যাশট্যাগের অতিরিক্ত ব্যবহার করি না

আজকাল অনেকেই কথায় কথায় হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে থাকে। কিছু একটা হলেই হ্যাশট্যাগ দেয়। আমি খুব কম দেই। আমি হ্যাশট্যাগ দিলে শুধু নিজের নামে হ্যাশট্যাগ দিই যেন সহজে কখনো প্রয়োজন পড়লে আমার ওই লেখাটি খুঁজে পাই। তবে সব পোস্টে না বরং যদি কোনো কবিতা,গল্প বা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কিছু লিখি শুধু তখন এটা করি। অর্থাৎ আমার ওই হ্যাশট্যাগ অন্য কারো কাজে আসে না বা অন্য কাউকে প্রভাবিত করে না।

৯। কারো মন্তব্য ও মেসেজ উপেক্ষা করি না

নানা সময়ে আমরা অনেকের পোস্টে মন্তব্য করি বা মেসেজও দিয়ে থাকি। তবে সবাই সব সময় রিপ্লাই দেয় না। আমাকে যারা মেসেজ দেয় আমি প্রায় শতভাগ মানুষকে রিপ্লাই দিই। কাউকে উপেক্ষা করি না। পাশাপাশি যারা মন্তব্য করে তাদের মন্তব্যের রিপ্লাই দিতে চেষ্টা করি। আর যে সব মন্তব্যে রিপ্লাই দেওয়ার সুযোগ নেই সেগুলোতে লাইক দিই।

সোশ্যাল মিডিয়াকে ভালো কাজের জন্য ব্যবহার করতে পারলে অবশ্যই এটি থেকে অনেক উপকৃত হওয়া সম্ভব। আমি এর বহু প্রমাণ পেয়েছি। আবার অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে নিজেদের বিকৃত মানসিকতা জেনে না জেনে প্রকাশ করে থাকে। এটা আমি ঘুরতে ঘুরতে বিভিন্ন মানুষের পোস্টে করা কমেন্ট দেখে যেমন জেনেছি তেমনি বেশ কিছু জনপ্রিয় কিশোর কিশোরীর পেজের এডমিন হিসেবে শত শত বিকৃতমনা মানুষের পাঠানো মেসেজ দেখেও জেনেছি। সবার সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার হোক ইতিবাচক এবং নিরাপদ। শুভেচ্ছা সবাইকে।

১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩

নিশ্চল নিশ্চুপ! আপনার মনে পুড়িব একাকী গন্ধ বিঁধুর ধুপ

আমরা যে সমাজে বাস করি সেখানে প্রতিনিয়ত নানা রকম ঘটনা ঘটে। অনেক অন্যায়,অবিচার,অনিয়ম ঘটে। আবার ভালো কাজও হয়ে থাকে। উভয় ক্ষেত্রেই আমাদের সমাজের মানুষ প্রতিক্রিয়া দেখায়। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এই ধারাটা খুবই চোখে পড়ে। তবে যে কথা যাদের বলা উচিৎ তারা সাধারণত বলে না। যে লেখা যাদের লেখা উচিৎ তারা তা লেখে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা দেখি যোগ্যতম মানুষটি ক্ষেত্রবিশেষে নিরব ভূমিকা পালন করে। যোগ্য মানুষটি যখন নিরব ভূমিকা পালন করে,নিশ্চুপ থাকে, তখন আমার মত সাধারণ মানুষ সেই ঘটনা বা বিষয়  নিয়ে কথা বলে,লেখে,বিবৃতি দেয়। ফলে দেখা যায় কথাগুলো যেমন হওয়ার কথা থাকে তা হয় না। লেখাগুলো যেমন হওয়ার কথা তা হয় না। এবং আমাদের লেখা বা বলার মাধ্যমে আদতে ওই ঘটনাগুলোতে তেমন কোনো ফল দেয় না, কোনো প্রভাব বিস্তার করে না। হয়তো বন্ধু তালিকায় থাকা দু’চারজন সেটা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা করে এর বেশি কিছু না। কিন্তু আমরা যাদের বিষয়ে আশা করি যে তারা যদি ওই একই বিষয় নিয়ে তাদের মতামত ব্যক্ত করতেন তবে কতইনা ভালো হতো। তাহলে আর আমাদের মত সাধারণ মানুষ নিজের মত করে মনগড়া উক্তি বা মতবাদ প্রচার করতো না বা করার প্রয়োজন হতো না। কোনো একটি অন্যায় সংগঠিত হলে তার সমাধানকল্পে সমাজে যারা বুদ্ধিজীবী,জ্ঞানী,বিশেষজ্ঞ তাদের যথেষ্ট ভূমিকা থাকা দরকার বলে আমি মনে করি।

আমাদেরও একটা সময় ছিলো যখন পত্রিকার সম্পাদকীয় পাতায় যা লেখা হতো তা সংশ্লিষ্ট মহল গুরুত্বের সাথে দেখতো এবং সেগুলো আমলে নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিতো। টেলিভিশন টকশোতে বা কোথাও প্রতিবাদ মিছিল হলে তা যথেষ্ট গুরুত্বের সাথে দেখা হতো। যৌক্তিক দাবীদাওয়ায় যখন সুশীল সমাজ একাত্ত্বতা ঘোষণা করতো তখন সংশ্লিষ্ট মহল তা নিয়ে ভাবতে বাধ্য হতো। কিন্তু সেই যুগ অতীত হয়ে গেছে। এখন আমরা দেখি সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা একাধিক দলে ভাগ হয়ে গেছে। ফলে ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপটে একদল যে পক্ষ নেয় অন্য দল বিরোধীতা করে, বিরোধী যুক্তি দেয়। ফলশ্রুতিতে কাজের কাজ কিছুই হয় না। আবার অনেক সময় আমরা দেখি একই রকম দুটি ঘটনার একটিতে যে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে অন্যটিতে তা দেখাচ্ছে না। অথচ দুটোই অন্যায় এবং প্রতিবাদ করতে হলে দুটোর বিষয়েই করতে হবে। আজ আমাদের বুদ্ধিজীবী সমাজ দ্বিধাবিভক্ত। সাদা দল, নীল দল সহ আজ কত রকম দল। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকরা দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে সব সময় কাজ করে। দলীয় এজেন্ডার বাইরে কেউ যৌক্তিক কথা বললেও তার বিরোধীতা করে,অসহযোগ মনোভাব দেখায়। এতে হয়তো তারা দলীয় নেতাদের কাছে বা হাইকমান্ডের কাছে বাহবা পায় কিন্তু আমাদের জাতীয় জীবনে তা অনেক বাজে প্রভাব ফেলে। সেই একই মানুষ যখন ক্ষমতার বাইরে চলে যায় তখন তাদের ন্যায্য দাবিও একই ভাবে সেই সময়ে যারা ক্ষমতায় থাকে তারা অবজ্ঞা করে বা দমিয়ে রাখে। এর ফলে দেখা যায় যখন যেই দায়িত্বে থাকুক না কেন ক্ষতিটা পুরো জাতির হয়।

শুধু সুশীল সমাজই নয় একই সাথে রাষ্ট্রের শক্তিশালী স্তম্ভ তথা সংবাদমাধ্যম বা মিডিয়ার ভূমিকাও এখন শতভাগ প্রশ্নবিদ্ধ। অনলাইনে প্রকাশিত বিভিন্ন পত্রিকা,টিভি চ্যানেলের সংবাদ শিরোনাম দেখলে ন্যুনতম জ্ঞান আছে এমন সবাই বুঝবে হলুদ সাংবাদিকতা কাকে বলে। গত কয়েক বছর এর হার বেড়েছে অনেক বেশি। আমরা যদি প্রতিদিনের মিডিয়ার সংবাদ শিরোনামগুলো দেখি এবং তাদের কার্যকলাপ দেখি তবে এটা স্পষ্ট হয়ে যাবে। এখনতো অনেকে তাদের কার্যক্রম দেখে হাসাহাসি করে তাদেরকে ইমেরিটাস সম্পাদক বলে আখ্যায়িত করে থাকে। তারা যদি একটি নির্দিষ্ট দলের তাবেদার হয়ে কাজ করে, একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হয়ে কাজ করে তবে সেই গোষ্ঠী বা দল যখন ক্ষমতার বাইরে থাকবে তখন তাদের অবস্থা কেমন হবে তা কিন্তু এখনকার সময়েই দেখা যায়। এক সময় অন্য দলের হয়ে কাজ করা মিডিয়াগুলোর বর্তমান হাল নিশ্চই কারো অজানা নয়। তাহলে আমরা সাধারণ মানুষ ঠিক কী আশা করতাম? আমরা চাইতাম রাষ্ট্রের এই শক্তিশালী স্তম্ভটি সব সময় নিরপেক্ষ থাকুক। লেখকের কলমের ধার অক্ষুন্ন থাকুক। সাংবাদিকের কলম আর মুখ নিরন্তর ভাবে যেন কারো গোলামী না করে  একনিষ্ঠ থাকে ন্যায়ের পথে। তবেইতো কেউ ক্ষমতার মসনদে বসে অন্যায় করতে গেলে কেপে উঠবে, ভয় পাবে, ভেবে চিন্তে পদক্ষেপ ফেলবে। আর যখন তারা জানবে ” আমার বাড়ি আমি মেম্বর আমার বউ চেয়ারম্যান” তথা আমরা যা কিছু করবো তার জন্য কেউ আঙ্গুল তুলবে না, কলম ধরবে না,প্রশ্ন করবে না। ফলে আমাদের ভয়ের কিছু নেই। তখন তারা যা খুশি তাই করবে এটাই স্বাভাবিক। আমি আমাদের সমাজে এমনটি হতে দেখছি প্রতিনিয়ত। 

অন্যায় জেনেও চুপ থাকছে অনেকে যাদের কথার ওজন ছিল অনেক বেশি। যাদের কথার এবং লেখার ওজন অনেক বেশি ছিল তারা সবাই কিন্তু এমনি এমনি চুপ হয়নি। একটু একটু করে সেই শ্রেণীর অনেক মানুষ যখন বিভিন্ন দলের তাবেদারি করতে শুরু করে তখন অল্প সংখ্যক নিরপেক্ষ ওজনদার মানুষ আর একা কিছু বলার সাহস পায় না। কারণ কিছু বললে তাদের অস্তিত্বই থাকবে না। ফলে বাধ্য হয়ে তারা চুপ থাকে। এর মাঝেও অবশ্য দুই চারজন কথা বলে। কিন্তু যখন অসংখ্য গাড়ির হর্ণের শব্দের মাঝে কেউ একা বাঁশি বাজায় তখন সেই বাঁশির সুর আর সুমধুর হয় না এবং আলাদা করে কারো কানে বাজে না। এর বাইরে ন্যায্য কথা বলতে গিয়ে নিজের অস্তিত্ব হারানো,প্রিয়জনকে তাদের প্রিয়জনের বিয়োগ ব্যথা দেওয়ার ভয় থেকেও চুপ থাকে। আমি বলি মাথা বিক্রি করে দেওয়া। সাস্টের সম্মানিত শিক্ষক আব্দুল হামিদ স্যারের একটা বই আছে “ মস্তিস্কের মালিকানা”। আমি বলি আমাদের দেশের অনেকেরই মস্তিস্কের মালিকানা আর তার নিজের হাতে নেই!

সাম্প্রতিক সময়ে যে ঘটনাগুলো ঘটেছে তা নিয়ে আমরা অর্বাচীনরা কথা বলেছি। প্রতিবাদ করেছি। আমাদের মত করে বুঝে বা না বুঝে আলোচনা সমালোচনা করেছি। আমাদের সেই বলায়,সেই প্রতিবাদে তেমন কিছু হয়নি কারণ আমরা প্রভাববিস্তার করার মত কেউ নই। ফলে অনেক গুলো শক্তিশালী হাত যখন এক হয়ে কোনো একটি ন্যায়কে অন্যায় বলে চেপে ধরে তখন ন্যায়ও তাদের সামনে থমকে দাঁড়ায়। আমরা আসলে সত্যের পক্ষে নেই। আমরা আজ দলীয়করণে এতোটাই লিপ্ত হয়ে পড়েছি যে নিজ মতাদর্শী হলে সে অন্যায় করলেও তাকে সমর্থন যোগাই,বাহবা দেই। আর ভিন্নমতাবলম্বী হলে সে ন্যায় সংগত হলেও আমরা তার বিরোধীতা করি। এভাবেই আমাদের সমাজের অবক্ষয় চলছে। এভাবেই আমাদের সমাজকে আমরা ক্রমাগতভাবে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিচ্ছি। কবে আমরা সেই সব মানুষের কলম থেকে ন্যায়ের পক্ষে শব্দের পর শব্দ সাজাতে দেখবো। কবে আমরা সেই সব ওজনদার মানুষের পক্ষ থেকে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে প্রতিবাদী কন্ঠ শুনবো? আমার আশা করতে ইচ্ছে করে কিন্তু আজ আর আশা করার সাহস দেখি না। ওজনদার মানুষদের নিরবতা পালন করা দেখে,চুপ থাকতে দেখে অভিমান হয়। নিজেকেই তাই যতটা পারি ওজনদার মনে করে কথা বলি,লিখি,প্রতিবাদ করি। কিন্তু সেই কথায়,সেই প্রতিবাদে তেমন কোনো ফল হয় না। কোনো পরিবর্তন আনতে পারি না। কারণ আমার চারপাশে যারা আমার চেয়ে ওজনদার তারা সত্যকে মিথ্যা  দিয়ে চাপা দেয়। তাই আমাদের মত অভাজনদের দুঃখ করা ছাড়া কিছুই থাকে না। আক্ষেপ নিয়ে কবি শামসুর রাহমানের ভাষায় বলতে হয় “ অদ্ভুত উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ” সেই সাথে মনে মনে কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার লাইন বলে নিজেকে সান্তনা দিতে হবে “নিশ্চল নিশ্চুপ! আপনার মনে পুড়িব একাকী গন্ধ বিঁধুর ধু “

  • জাজাফীর দিনলিপি 

২১ সেপ্টেম্বর ২০২৩

কেউ কেউ কথা রাখে

ঈদের পর দুটো বই পড়েছি। দুটোই একই লেখকের লেখা। তৃতীয় আরেকটি বই পড়তে শুরু করেছি মাত্র । সেই বইটির নাম “বিএনপির সময় অসময়” লেখক মহিউদ্দিন আহমদ। ঈদের পরের সপ্তাহে যে দুটি বই পড়েছি তার মধ্যে প্রথম বইটা অবশ্য পড়তে শুরু করেছিলাম ঈদের ঠিক আগে আগে। তবে তখন পুরোটা পড়ে শেষ করতে পারিনি। পড়ার ক্ষেত্রে আমি খুবই ধীরগতি সম্পন্ন।প্রতিটি শব্দ মনে মনে হলেও উচ্চারণ না করে আমি পড়তে পারি না। ফলে একটি বই শেষ করতে অনেক সময় লেগে যায়। আবার অনেক সময় একই সময়ে একাধিক বইও পড়তে শুরু করি। একটা বিশ পৃষ্ঠা পড়লাম তো আরেকটার দশ পৃষ্ঠা পড়লাম এমনও হয়। কারো কারো হয়তো মনে আছে আমি ঈদের আগে একদিন স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম “এই মুহূর্তে আমি যে বইটি পড়ছি তার নাম কেউ বলতে পারলে তাকে সেই বইটি উপহার দেবো। এমনকি যতজন বলতে পারবে সবাইকে উপহার দেবো”। আমি সত্যি সত্যিই উপহার দিতে বদ্ধপরিকর ছিলাম। আমি খুবই খুশি হয়েছি যে আমার সেই পোস্টে অনেক অনেক বন্ধু মন্তব্য করে বইয়ের নাম বলেছে। তবে কেউ সঠিক নামটি অনুমান করতে পারেনি। আসলে অনুমান করা সম্ভবও না। এটি কাকতালীয় ভাবে হয়তো মিলে যেতে পারে। লক্ষ কোটি বইয়ের মধ্যে আমি কোনটা পড়ছি সেটা কারো পক্ষে অনুমান করা সম্ভব নয়। বিশেষ করে যখন বই সম্পর্কে কোনো রকম হিন্টস দেওয়া হয়নি। মজার বিষয় হলো সঠিক নামটি উদ্ধার করতে কেউ কেউ আমার ইনবক্সে প্রাসঙ্গিক নানা বিষয়ে প্রশ্ন করেছে। সেগুলোর মাধ্যমে উত্তর খুঁজতে চেষ্টা করেছে। যেমন এক বন্ধু জানতে চাইলেন আমার প্রিয় লেখক কে, প্রিয় বই কী? এরকম নানা বিষয়ে। তো আমি যে বইটি পড়ছিলাম সেটির সাথে আমার প্রিয় লেখকের কোনো সম্পর্ক নেই। পরে বাধ্যহয়ে দু একটা হিন্টস দিয়েছিলাম। যেমন বইটির লেখক জীবিত এবং আমার ফেসবুক বন্ধু তালিকায় থাকা মানুষ।

সেই স্ট্যাটাসের নিচে মন্তব্যের ঘরে যারা মন্তব্য করেছিলেন তাদের বলা অধিকাংশ বই আমি অনেক আগেই পড়েছি আর দু একটা বই এখনো পড়া হয়নি। তবে কয়েকজন বন্ধু খুব কাছাকাছি উত্তর দিয়েছিলেন। মানে আমি যে লেখকের বই পড়ছিলাম সেই লেখকেরই একই ঘরানার বইয়ের নাম বলেছিলেন। আরেকটু হলেই মিলে যেতে পারতো। আজ ভাবলাম সে বিষয়ে সবাইকে জানিয়ে দিই। আমি যখন ওই স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম তখন পড়ছিলাম ‍দুই বাংলার জনপ্রিয়তম থ্রিলার লেখক মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের লেখা “ কেউ কেউ কথা রাখে” বইটি। তাঁর লেখা অন্য যে বইটি দুদিন আগেই পড়েছি সেটির নাম “জাল”। প্রথমে জাল বইটি পড়ে শেষ করেছি তারপর ”কেউ কেউ কথা রাখে” বইটি ধরেছি। আর তখনই ওই স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম।

জাল নামক বইটিতে লেখক একজন তরুণ জনপ্রিয় ব্যারিস্টার আর একজন অবসরপ্রাপ্ত গোয়েন্দাকে উপজীব্য করে দারুন এক গল্প ফেঁদেছেন। মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের শব্দচয়ন,সহজবোধ্য ভাষার ব্যবহার আর গল্পের ধারাবাহিকতা সমানভাবে রক্ষার যে দক্ষতা তিনি তাঁর বইগুলোতে দেখিয়েছেন সেটাই পাঠককে তাঁর গল্পের প্রতি আকৃষ্ট করেছে। জাল নামক রহস্য উপন্যাসটিতে আমি দেখতে পেলাম তরুণ ব্যরিস্টার তাঁর এক ক্লায়েন্টের সাথে একটি রেস্টুরেন্টে দেখা করতে যান।তারপর একটা খুনের ঘটনায় জড়িয়ে পড়েন। জনপ্রিয় ব্যরিস্টার নিজেই হয়ে ওঠেন আসামী বা সন্দেহভাজন। আবার যে খুন হয় তিনি তাঁর পরিচিতজন এবং খুন হয় ব্যরিস্টারের লাইসেন্স করা পিস্তলের গুলিতে। কিন্তু ব্যরিস্টার জানান তিনি খুন করেননি বরং খুন করেছে অন্য একজন। এ নিয়ে রহস্য দানাবাঁধতে থাকে। চমৎকার ভাবে গল্প এগোতে থাকে। ডিবির অবসরপ্রাপ্ত এক তুখোড় গোয়েন্দা এই ইনভেস্টিগেশনে তাকে সহায়তা করে। জাল গল্পটিতে সবচেয়ে বেমানান লেগেছে ওই গোয়েন্দাকে। তাকে যেভাবে দেখানো হয়েছে তাতে তাঁর বয়স অন্তত ৬৫ থেকে ৭০ বছরের মধ্যে হলে ভালো হতো বলে আমার মনে হয়েছে। তাঁর কথা,আচরণ,হাবভাব কোনো ভাবেই তাঁর বয়সের সাথে মানানসই মনে হয়নি। সবচেয়ে মজার ছিল এই তুখোড় গোয়েন্দার মোবাইল চুরি যাওয়ার রহস্য উন্মোচন করতে না পারার বিষয়টি। লেখক ওই অংশটিকে চমৎকার ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। গল্প শেষ করার আগেই অবশ্য সেই রহস্যের সমাধানও করে দিয়েছেন। পাঠক হিসেবে সমাধানটি আমার পছন্দ হয়েছে। তবে অন্য অনেক লেখক আছেন যারা ওরকম পরিস্থিতিতে ওটুকুর সমাধান না করে বরং দ্বিতীয় কিস্তি লেখার জন্য রেখে দিতেন এবং গোয়েন্দা চরিত্রটিকে প্রাধান্য দিয়ে নতুন গল্প লিখতেন। জাল নামক থ্রিলার বইটি আমাকে মুগ্ধ করেছে।

লেখকের অন্য যে বইটি পড়লাম সেটির নাম “ কেউ কেউ কথা রাখে”। এই বইটি নিয়েই আমি সেই স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম। বইয়ের নাম শুনলে প্রথমেই মনে পড়ে সুনীলের বিখ্যাত কবিতা “ কেউ কথা রাখেনি”। এই বইটি পড়ার শুরুতে চোখে পড়বে ভূমিকা। ভূমিকা পড়লেই পাঠকের মনের মধ্যে দারুণ আগ্রহ জন্মাবে বইটি পড়ার জন্য। জাল বইটির তুলনায় এই বইটি অনেক বেশি ভালো লেগেছে কারণ বইটিতে নানা ভাবে এদেশের রাজনৈতিক নানা প্রেক্ষাপট স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন। মুক্তিযুদ্ধকালিন সময়ের নানা বিষয় উঠে এসেছে বইটিতে। খুনের রহস্য উন্মোচন করতে গিয়ে দুজন পুলিশ অফিসার যারা কর্মসূত্রে সিনিয়র জুনিয়র হলেও তাদের মধ্যে ছিল দারুণ বন্ধুত্ব এবং তাদের মধ্যে রাজনৈতিক চিন্তা চেতনা ছিল ভিন্নরকম। তাদের আলাপচারিতার মাধ্যমে বাকশাল,বঙ্গবন্ধু সহ সেই সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি,অস্থিরতা সব ফুটে উঠেছে। “কেউ কেউ কথা রাখে” বইটির ভূমিকা পড়ে আমার মনে হয়েছে সত্য কোনো ঘটনাকে অবলম্বন করে লেখা একটি চমৎকার গল্প। পুরো গল্প পড়তে গিয়েও সেটা মনে হয়েছে। মনে হয়েছে লেখকের জীবনে ,লেখকের চোখের সামনে ঘটা কোনো দৃশ্যকে পুজি করে গল্প লিখেছেন তিনি। তবে সে ক্ষেত্রে নিজেকে নিয়ে গেছে পুরোনো সময়ে। নিজের সময়ের চেয়ে অনেক আগের সময়কে ব্যাকগ্রাউন্ড করে গল্প ফেঁদেছেন।

বইটিতে  দেখা যায় এক ব্যাংকারের বিয়ের কয়েক মাসের ব্যবধানে তার স্ত্রী নিজ বাসায় খুন হয়। তিনি অফিস থেকে বাসায় ফিরে স্ত্রীকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখতে পান। রহস্য দানা বাঁধে। যার স্ত্রী খুন হয়েছে তিনি নিজেই সাসপেক্ট হিসেবে পুলিশের চোখে চোখে থাকেন। তদন্তকারী কর্মকর্তা ও তার সহযোগী রহস্য সমাধানকল্পে ইনভেস্টিগেশন জারি রাখেন। যে মেয়েটি খুন হয় তার গ্রুপ ছবি দেখতে গিয়ে একাধিক ছবিতে সন্দেহজনক একজনকে দেখা যায়। খোঁজ নিয়ে জানা যায় সে বখাটে আর রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পালিত একজন মানুষ। তদন্ত কাজে পুলিশের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয় মেয়েটির এক বান্ধবী যার সাথে আবার তদন্তসুত্রে বন্ধুত্ব তৈরি হয় পুলিশ অফিসারের সহযোগির। যার মুখ দিয়ে লেখক গল্পটি বলেছেন। এই উপন্যাস যে পুলিশ অফিসারের মুখ দিয়ে বলা হয়েছে গল্পেও তিনি একজন লেখক। আর এ কারণে গল্পটি আরও আকৃষ্ট করেছে আমাকে। উপন্যাসে সেই সময়ের যে চিত্রটি ফুটে উঠেছে তা আসলে আজও বদলায়নি। আজও যারা ক্ষমতাবান তারা তাদের ক্ষমতাবলে দুর্বলদের পিষে মারছে। উপন্যাসে আমরা দেখতে পাই নানা প্রমান সহ সৎ পুলিশ অফিসার আসামীকে গ্রেফতার করলেও সে জামিন পেয়ে যায় এবং আরও বেপরোয়া আচরণ করতে থাকে।হুমকি দিতে থাকে। এমনকি এক পর্যায়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা খুন হয়ে যায়।

রহস্য রোমাঞ্চকর বর্ননার পাশাপাশি লেখক গল্পের পরতে পরতে প্রেম,বিরহ,মান অভিমান পর্ব দারুন ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। পড়তে গিয়ে বার বার মনে হয়েছে যাকে পুলিশ প্রাইম সাসপেক্ট হিসেবে গ্রেফতার করেছে সেই রাজনৈতিক ক্ষমতার ছাঁয়ায় থাকা ছেলেটি হয়তো নির্দোষ। উল্টো খুন হওয়া মেয়েটির স্বামীই খুনী। কিন্তু যখন সেই মানুষটিকে প্রতিদিন অফিস থেকে ফেরার পথে কবরস্থানে গিয়ে স্ত্রীর কবরের পাশে বসে কাঁদতে দেখা যায় তখন আর সেই সন্দেহ চলে না। গল্প নানা দিয়ে নানা সময়ে নানা ভাবে বাঁক নিয়েছে।রহস্যের সামাধান হয়েগেছে মনে হলেও আবার তা ভিন্ন ভাবে মোড় নিয়েছে। এভাবে একের পর এক বাঁক তৈরি করে লেখক তার মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। এই ঘটনার বহু বছর পর লেখক যখন অবসরে তখন তিনি পুরো ঘটনা নিয়ে একটি বই লিখতে শুরু করেন। যেহেতু খুনের মামলায় আসামীর কোনো সাজা হয়নি ফলে খুন হয়ে যাওয়া মেয়েটির কথা কেউ আর মনেও রাখবে না। নানা বিষয় ভেবেচিন্তে লেখক একটি বই লিখতে চেয়েছেন। এমনকি আবার নতুন করে কেসটি রিওপেন করা যায় কি না তা নিয়ে কথাও বলেছেন। লেখকের মনের মধ্যে পুরোনো দিনের প্রেম জমে উঠেছে। উকি দিয়েছে। কিন্তু সর্বপরি তিনি তার লেখাটাকে শেষ করতে চেয়েছেন। আর সেই সময়ে দেখা গেছে খুনের আসামী হিসেবে যাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল,যাকে আদালত জামিন দিয়ে দিয়েছে সেই লোকটির কোনো খবর কেউ জানে না। তাকে খুঁজে বের করতে পারলে অনেক কিছু জানা যেতো। অন্যদিকে খুন হওয়া মেয়েটির ব্যাংকার স্বামীর খোঁজও তেমন কেউ জানে না। রহস্য ক্রমাগত  ঘণীভূত হতে থাকে। কিন্তু গল্পের মাঝে আরেক গল্প থাকায় সেই গল্পের নায়ক তথা লেখক দমবার পাত্র নয়। নানা ভাবে খোঁজ নিয়ে জানতে পারে ব্যাংকার ভদ্রলোক দূরবর্তী এক অঞ্চলে থাকে। সেখানকার এক ব্র্যাঞ্চে কাজ করছে।

যে মানুষটি স্ত্রীর শোকে কাতর। রোজ তার কবরের পাশে গিয়ে স্মৃতিচারণ করতেন সেই মানুষটি প্রিয় স্ত্রীর কথা ভুলে গিয়ে তবেকি নতুন সংসার পেতেছেন এবং অতীত ভুলে থাকতে দূরে গিয়ে নিজেকে সরিয়ে রাখছেন। লেখকের মনে আগ্রহ তৈরি হয়। আর সেই আগ্রহ থেকে তিনি যখন লোকটির কাছে পৌছান তখন দেখতে পান নির্জন এক গ্রামে নির্জন এক বাড়িতে তার বসবাস। আসেপাশে ঝোপ জঙ্গল। এবং পুরো বাড়িতে তিনি একা। দ্বিতীয়বার আর বিয়ে করেননি। তার কাছে খুনির বিষয়ে জানতে চাইলে সে জানায় তাকে আর খুঁজে লাভ নেই। তাকে আর পাওয়া যাবে না। তিনি নিজেও আর ওসব নিয়ে ভাবতে চান না। এমনকি তিনি চান না তার মৃত স্ত্রীর জীবনের গল্প বই আকারে প্রকাশ হোক। কিন্তু লেখক নাছোড়বান্দা। তিনি চেয়েছেন বইটি প্রকাশ করতে। প্রয়োজন হলে নাম চরিত্র বদলে হলেও প্রকাশ করবেন।

এভাবেই গল্প এগোতে থাকে এবং এক সময় লেখক বুঝতে পারেন কেন খুন হওয়া মেয়েটির স্বামী চান না বইটি প্রকাশ হোক। আর কেনইবা খুনীকে আর খুঁজে লাভ হবে না। শেষ অংশটি পুরো গল্পকে আরও রোমাঞ্চকর করে  তুলেছে। বইটি পাঠকমাত্রই আকৃষ্ট করার ক্ষমতা রাখে বলে মনে হয়েছে। আমার মত যারা খুব অল্পতেই খুশি হয়,মুগ্ধহওয়ার অশেষ ক্ষমতা নিয়ে জন্মেছে তাদের কাছে “ কেউ কেউ কথা রাখে” বইটি সুপাঠ্য হবে বলে আমি মনে করি। আর বইটি পড়লেই জানতে পারবেন কেন বইটির নাম “ কেউ কেউ কথা রাখে” রাখা হয়েছে।

১১ জুলাই ২০২৩

খাবার নিয়ে আমি কোনোদিন আপত্তি করিনি

খাবার নিয়ে আমি কোনোদিন আপত্তি করিনি। ছোট বলা থেকেই আমার যতদূর মনে পড়ে যখন যা জুটেছে তাই খেয়েছি এবং তৃপ্তির সাথে খেয়েছি। আর এখনতো বুঝতে শিখেছি তাই আমি শুধু হালাল হারাম বাছাই করা ছাড়া খেতে কেমন হলো না হলো কিংবা কি খেলাম না খেলাম, কতটুকু খেলাম তা নিয়ে খুব একটা ভাবি না। খাবার হালাল হলেই আমি খুশি। যতটুকু জুটেছে তাই নিয়েই সন্তুষ্ট থাকি। এই কথাটিতে বিন্দুমাত্র বাড়িয়ে বলিনি আমি। আমিতো জানি আল্লাহ আমাকে কিছু না কিছু খাওয়ার তৌফিক দিয়েছেন। আর এই ঢাকা শহরে,এই দেশে এই পৃথিবীতে প্রতিদিন অগণিত মানুষ অভুক্ত থাকে। এক বেলা খাবারও জোটে না ঠিকমত। সেসব ভাবলেই আমার মধ্যে কখনো কোনো হতাশা কাজ করে না।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি বিষয়ক সংস্থা এফএও এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সারা বিশ্বে অন্তত ৮২ কোটি মানুষ রাতে না খেয়েই ঘুমাতে যায়। এমন নয় যে তারা ডাক্তারের পরামর্শমত না খেয়ে ঘুমায়। আসলে তারা খাবার জুটাতে পারে না বলেই না খেয়ে ঘুমায়।

বিশ্বের প্রায় ২০০ কোটি মানুষ অতিরিক্ত খাবার খেয়ে খুব মোটা হয়ে গেছে।

যেখানে ৮২ কোটি মানুষ একবেলা কোনো খাবার পায় না, সেখানে সারা বিশ্বে প্রতি বছর অন্তত ২২ কোটি ২০ লাখ টন খাবার নষ্ট বা অপচয় করা হয়।

ইউরোপ এবং পূর্ব আমেরিকার মানুষ গড়ে প্রতি বছর ৯৫ থেকে ১১৫ কিলোগ্রাম খাবার না খেয়ে ফেলে দেয়। সাব সাহারান আফ্রিকা এবং এশিয়া অঞ্চলে খাবার ফেলে দেয়ার প্রবণতা সেই তুলনায় অনেক কম। এই দুই অঞ্চলের মানুষ গড়ে প্রতি বছর ছয় থেকে ১১ কেজি খাবার ফেলে দেয়।

আপনি যখন কোনো একটি খাবার স্বাদ হয়নি বলে অবজ্ঞা করছেন,কটুক্তি করছেন ঠিক সেই সময়ে এই ঢাকা শহরে,এই দেশে,এই পৃথিবীতে ৮২ কোটি মানুষ না খেয়ে থাকছে। খাবারই জুটছে না। যদি এই তথ্যটি মাথায় রাখেন এবং নিজেকে সেই মানুষদের কাতারে রেখে বিচার করেন তাহলে দেখবেন যে কোনো খাবারই আপনার কাছে অমৃত লাগবে। আপনিকি জানেন পৃথিবীতে এমনও দেশ আছে যেখানে কাদা দিয়ে বিস্কুট তৈরি করে সেটাই খায়! বলছিলাম হাইতির কথা।

ক্ষুধার জ্বালা কতটুকু হলে মাটি খাওয়া যায়?

আমরা যারা এই মুহূর্তে কম্পিউটার, মোবাইল বা যে কোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইসের স্ক্রিনে চোখ রেখে এই লেখা পড়ছি তাদের কারোরই সম্ভবত বিষয়টি নিয়ে ধারণা নেই।

এমনই এক পৃথিবী আমরা তৈরি করেছি যেখানে পৃথিবীর এক প্রান্তের মানুষ যখন শত শত খাবার নষ্ট করছে, তখন আরেক প্রান্তের মানুষ ক্ষুধা নিবারনের জন্য আয়োজন করে মাটির সঙ্গে লবন মিশিয়ে তা রোদে শুকিয়ে বিস্কিট বানিয়ে সংরক্ষণ করছে। প্রচণ্ড ক্ষুধায় সেই মাটির তৈরি অস্বাস্থ্যকর বিস্কুটই তাদের পেট ভরাচ্ছে।যে দেশটির বেশিরভাগ মানুষের দৈনিক মাথাপিছু আয় দুই ডলারেরও কম। সেই দেশের মানুষের কাছে ফল-মূলসহ যে কোনো পুষ্টিকর খাবার স্রেফ স্বপ্ন। পেট ভরানোই যেখানে কষ্টকর সেখানে পুষ্টির জোগান আসবে কোথা থেকে?

সেই দেশের একটা শ্রেণির মানুষ তাই পেট ভরাতে খান মাটির বিস্কুট। শিশু থেকে বৃদ্ধ সবারই পেট ভরাচ্ছে বিশেষভাবে তৈরি এই বিস্কুট। হাইতিতে বেশ সহজলভ্যও এটি। বাজারের অন্য সব সামগ্রীর মতো এই বিস্কুটও বিক্রি হয় ঝুড়িভরে।

এখন একবার ভেবে দেখুন আপনি যা খেতে গিয়ে থুথু করে ফেলে দিচ্ছেন আর বলছেন স্বাদ হয়নি, এই খাবার কি খাওয়া যায়? তাহলে একবার ভাবুন ওদের মত হলে আপনি কী করতেন?

খাবার নিয়ে যখনই আপনার মনের মধ্যে খুতখুতানি জমবে তখনই এই ছবিটির কথা মনে করবেন। মনে করতে চেষ্টা করবেন জাজাফী নামে এক লোক কথা প্রসঙ্গে হাইতির লোকদের কথা তুলেছিল। রাস্তায় ঘুমানো মানুষের কথা বলেছিল। আর ইন্টারনেট থাকায় আপনি অনায়াসে নিজেই খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন কত মানুষ না খেয়ে থাকে। খাবারই জোটাতে পারে না। আসুন সন্তুষ্টচিত্তে খাদ্য গ্রহণ করি।

#জাজাফী

২৮ মার্চ ২০২৩

মঙ্গল শোভাযাত্রা একটি কৃত্রিম বাঙালি সংস্কৃতি

রাত পোহালেই পহেলা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষ। প্রতি বছরের মত এ বছরও পহেলা বৈশাখ তথা বাংলা নববর্ষ ঘিরে অনেক আলোচনা সমালোচনা চলছে। এ বছর একটু বেশিই হচ্ছে কারণ, মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে হাইকোর্টে রীট করা হয়েছে।মঙ্গল শোভাযাত্রা বন্ধে ০৯ এপ্রিল ২০২৩ তারিখে আইনি নোটিশ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী। তিনি উল্লেখ করেছেন যে, পহেলা বৈশাখ বাঙালি সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হাজার বছর ধরে, বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী বাঙালি জনগণ একে অপরের ধর্মকে সম্মান করে এই পহেলা বৈশাখ উদযাপন করে আসছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় এই যে, ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে একটি কৃত্রিম কার্যকলাপ বাঙালি সংস্কৃতি পহেলা বৈশাখের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে। মূলত এই কৃত্রিম উদ্ভাবিত মঙ্গল শোভাযাত্রার সঙ্গে পহেলা বৈশাখের কোনও সম্পর্ক নেই।

নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘মঙ্গল’ শব্দটি একটি ধর্মীয় সংশ্লিষ্ট শব্দ। সব ধর্মের লোকজন তাদের সৃষ্টিকর্তার কাছে ‘মঙ্গল’ প্রার্থনা করে থাকেন। এখন এই মঙ্গল শোভাযাত্রার সঙ্গে বিভিন্ন ধরনের দৈত্য আকৃতির পাখি, মাছ ও বিভিন্ন প্রাণীর ভাস্কর্য প্রদর্শনের মাধ্যমে মুসলিম জনগণের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা হচ্ছে যা বাংলাদেশ সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২-ক এর সরাসরি লঙ্ঘন। এটা দণ্ডবিধির (Penal Code) ২৯৫-ক ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধও।

তাই নোটিশ পাওয়ার পর ‘অসাংবিধানিক, বেআইনি ও কৃত্রিম উদ্ভাবিত’ মঙ্গল শোভাযাত্রা বন্ধে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়েছে। অন্যথায় এই বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হবে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়েছে।

যারা মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বাঙ্গালীর ঐতিহ্য বলছেন,হাজার বছরের সংস্কৃতি বলছেন তাদেরকে দুই চার কথা বলতে চাই এবং প্রশ্ন রেখে যেতে চাই। আমি আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান থেকে যতটুকু বুঝেছি পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ আমাদের বাঙ্গালীর হাজার বছরের সংস্কৃতি হলেও তথাকথিত মঙ্গল শোভাযাত্রা  কোনো ভাবেই আমাদের সংস্কৃতির অংশ নয় এবং এর হাজার বছরের ইতিহাসও নেই।

বৈশাখী উদযাপনের ইতিহাস কয়েকশ বছরের পুরনো হলেও মঙ্গল শোভাযাত্রার ইতিহাস খুব বেশি পুরনো নয়। মঙ্গল শোভাযাত্রা প্রথম শুরু হয়েছিল ১৯৮৫ সালের পহেলা বৈশাখে যশোরে। তখন দেশে ছিল সামরিক শাসন। উদ্দেশ্য ছিল দেশের লোকজ সংস্কৃতি উপস্থাপনের মাধ্যমে সব মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করা। আর সেই শোভাযাত্রায় অশুভের বিনাশ কামনা করে শুভশক্তির আগমনের প্রার্থনা করা হয়। এর উদ্যোগ নিয়েছিলেন চারুশিল্পী মাহবুব জামাল শামিম।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনষ্টিটিউট থেকে পড়াশোনা শেষ করে যশোরে চলে যান তিনি। যশোরে গিয়ে চারুপিঠ নামে একটি প্রতিষ্ঠান শুরু করেছিলেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত যশোরে সীমাবদ্ধ থাকেনি মঙ্গল শোভাযাত্রা।

১৯৮৯ সালে পহেলা বৈশাখে ঢাকার চারুকলা থেকেও শুরু হয় এই মঙ্গল শোভাযাত্রা। শুরুতে এর নাম ‘আনন্দ শোভাযাত্রা’ ছিল। তৎকালীন রাজনৈতিক অবস্থাকে মাথায় রেখেই এমনটা করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে এটি ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ হিসেবেই পরিচিত হয়।

সেই শোভাযাত্রার মূলভাব ছিল অগণতান্ত্রিক শক্তির বিনাশ। ওই সময় এরশাদবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। সে সময় সবাইকে এক প্ল্যাটফর্মে আনার চেষ্টা করেছিল সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। সবার প্রচেষ্টায় তখন এটি বৃহত্তর প্রচেষ্টা হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করা হলো। ১৯৮৫-৮৬ সালের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রার উদ্যোক্তা। শিক্ষকরা পেছনে ছিলেন, কিন্তু সব কাজ হয়েছে শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে। এখন পহেলা বৈশাখ বাংলা নববর্ষে মঙ্গল শোভাযাত্রা সব ধরনের মানুষের অংশগ্রহণে একটি প্রধান অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।

ষাটের দশক থেকে রমনা বটমূলে গানের মাধ্যমে বৈশাখী উদ্যাপন শুরু করে। ১৯৮৯ সাল থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট (বর্তমান চারুকলা অনুষদ) ঢাকায় প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা শুরু করে। যার উদ্যোক্তা ছিল চারুকলার ১৯৮৬ ব্যাচ।

আশির দশকে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন যখন তুঙ্গে, মানুষ যখন তার খর্বিত মৌলিক, মানবিক অধিকার আর বাকস্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার জন্য সোচ্চার, ঠিক এই সময় হতাশা-যন্ত্রণার মাঝে আনন্দের দীপশিখা জ্বালিয়ে আশার বাণী শোনাবার জন্য চারুকলার ১৯৮৬ শিক্ষাবর্ষের কিছু তরুণশিল্পী বৈশাখী উৎসবের মধ্য দিয়ে একটি আনন্দ-উদ্দীপনা আনতে প্রয়াসী হয়। ১৯৮৯ সালের ১ বৈশাখে ঢাকা শহরে প্রথম আনন্দ শোভাযাত্রার সূচনা হয়। তার আগে ১৯৮৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর এই গ্রুপের নেতৃত্বেই জয়নুল জন্ম উৎসব ৮৮-এর আনন্দ শোভাযাত্রার সূত্রপাত ঘটে। তবে বাংলাদেশে প্রথম ১৯৮৬ সালে ১ বৈশাখে  শোভাযাত্রার সূত্রপাত ঘটায় যশোরের চারুপীঠের শিল্পী এবং শিক্ষার্থীরা। চারুকলা ইনস্টিটিউটের (বর্তমানে চারুকলা অনুষদ) মঙ্গল শোভাযাত্রা এবং বর্ষবরণের উৎসব সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং জাতীয় পর্যায়ে রূপলাভ করেছে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয় ২০০৮ সালে উপাচার্য অধ্যাপক আবু ইউসুফ স্যারের সময়। একটি বড় বাঘ ও বক, অনেক ঘোড়া এবং মুখোশ বানানোর দায়িত্ব ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগের শিক্ষক আলপ্তগীন তুষারের ওপর, যা ছিল তার ঢাকা চারুকলার অভিজ্ঞতার ফসল।

ঢাকায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে একটি সংস্কৃতিক বলয় তৈরির জন্য শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান স্যার অত্যন্ত গুরুত্বসহকারে কাজ করেছিলেন। সেই লক্ষ্যে শিল্পী নাজমা আক্তারের পরিকল্পনা এবং ভিসি স্যারের বলিষ্ঠ পদক্ষেপে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে চারুকলা বিভাগ খুলে আলপ্তগীন তুষারকে চট্টগ্রাম থেকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ দিয়ে বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব সিনিয়রিটির নিয়ম মেনে অর্পণ করেন। ২০১৪ সালে একটি বাঘ এবং বক তৈরি করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা বিভাগ। সেটা নিয়ে প্রথম মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। ২০১৫ সালে পরাক্রমশালিতার প্রতীক হিসেবে বড় একটি হাতি বানানো হয়েছিল। এসব তৈরির মূল দায়িত্ব পালন করেন আলপ্তগীন তুষার। সঙ্গে সহযোগিতা করেন সহকর্মী শিল্পী রশিদ আমিন, রেজাউল সাদাত, ইমাম হোসেন সুমন এবং চারুকলার ছাত্রছাত্রী।

১৩ এপ্রিল ২০২৩

আমার আনন্দ বেদনার ঈদ

বয়ে চলা নদীর মত জীবনটাও নানা অলিগলি পেরিয়ে কবে কোথায় কোন মোহনায় গিয়ে মেশে তা কেউ জানে না।তাইতো কথায় বলে নিঃশ্বাসের বিশ্বাস নেই। যদিও এটি কথার কথা কিন্তু কথাটি পুরোপুরি সত্য। একটি মাটির পাতিল যত্ন করে রেখে দিলে তা যুগের পর যুগ সেভাবেই থেকে যাবে। কিন্তু রক্ত মাংসের শরীরে গড়া মানুষকে যতই যত্ন করে রাখি না কেন,যতই ভালোবেসে আগলে রাখি না কেন তার মধ্যে রয়েছে প্রাণ পাখি। কখন সে ফুড়ুৎ করে উড়াল দেবে কেউ আমরা জানি না।প্রতিনিয়ত চোখের সামনে যাদের দেখি তারাই একদিন হুট করে চিরকালের মত হারিয়ে যায়। আমরা কখনো কল্পনাও করতে পারি না আজ যার সাথে গল্প করেছি কাল হয়তো সে থাকবে না নয়তো আমি থাকবো না, নয়তো আমরা কেউ থাকবো না।
এবারের ঈদ ছিল আমার জন্য আনন্দ বেদনার। বেদনা বলতে যা বুঝায় যদিও এটা সেরকম কিছু না। এবারের ঈদে বাড়িতে গিয়ে কয়েকজন স্বজনকে দেখতে পাইনি। তারা পৃথিবীর আলোবাতাসে আর নিঃশ্বাস নেয় না। তাদের শরীরের ঘ্রাণ এখন আর পাওয়া যায় না। যে জমিন থেকে তাদেরকে সৃষ্টি করা হয়েছিল আজ তারা সেই জমিনের নিচে শুয়ে আছে। মিশে গেছে তাদের শরীরের মাংস হাড় অস্তিমজ্জা সব। এই তালিকায় ছিলেন আমার মেজ চাচি,দুই চাচা আর এক বন্ধু এবং এক বন্ধুর বাবা। তাদের সাথে ছিল আমার আত্মার সম্পর্ক। আমার দুই চাচার মধ্যে একজনের কথা রাস্তায় যেতে যেতে মনে পড়লো। তার বাড়ির সামনে রাস্তার পাশে বেশ কিছু দইয়ের পাতিল পড়ে আছে। আমার সাথে তার শেষ স্মৃতি দই নিয়ে। ভীষণ অসুস্থ ছিলেন। ডাক্তার বলেছিলেন সময় ফুরিয়ে গেছে। শেষ বার যখন ছুটিতে বাড়িতে গিয়েছিলাম তখন জানতে চেয়েছিলাম তিনি কী খেতে পছন্দ করেন। চাচা বলেছিলেন তিনি তেমন কিছুই খেতে পারেন না। শুধু দুই আর চিড়া খেতে পারেন। আমি তার জন্য শহর থেকে দই কিনে এনে দিয়েছিলাম। তিনি তৃপ্তি সহকারে খেয়েছিলেন।
তারপর আবার আমি ফিরে আসি সমুদ্র সৈকতের শহরে। একদিন খবর পাই সেই চাচা আর নেই। ইচ্ছে থাকলেও তাই তার শেষ যাত্রায় শরীক হতে পারিনি। আমার যে চাচি মারা গিয়েছেন এইতো কিছুদিন আগে। তার মৃত্যুর সময়ও যেতে পারিনি। আমি এই চাচির মৃত্যু নিয়ে খুব ভয় পেতাম। কারণ অনেক আগে থেকেই তিনি চাইতেন তিনি মারা গেলে আমি যেন তার জানাজা নামাজের ইমাম হই! আমি নিজেকে অতটা যোগ্য মনে করতাম না কখনোই। তাই প্রতিনিয়ত প্রার্থনা করতাম চাচি যেন অনেক অনেক অনেক বছর বেঁচে থাকেন। আমি যদি আরও মুত্তাকি হতে পারি এবং তখন যদি চাচি ইন্তেকাল করেন তবে হয়তো আমি তার জানাজায় ইমামতি করতে পারবো। আল্লাহ তার জন্য যে সময় নির্ধারণ করেছিলেন তিনি সেই সময়েই তার ডাকে সাড়া দিয়ে চলে গেছেন। তার ছোট সন্তান আরও কয়েক বছর আগে ইন্তেকাল করেছিলেন। এখন নিশ্চই আল্লাহ চাইলে মা ছেলের সাক্ষাত ঘটেছে। আমি চাচির জানাজাতে উপস্থিত হতে পারিনি।দূরত্ব  আমাকে আরও বেশি অপারগ করে দিয়েছে।
আমার যে বন্ধু  আমার চেয়ে বয়সে ছোট ছিল। গ্রামের বাড়িতে দুই তলা বিল্ডিং করেছে। একটি প্রিমিও গাড়ি কিনেছে। ঢাকা শহরে ফ্ল্যাট কিনেছে। সেই হাসিখুশি মানুষটিও কয়েক মাস আগে বিদায় নিয়েছে। বেশ কয়েক বছর আগে তার হার্টের অপারেশন করা হয়েছিল।এবার ঈদে গিয়ে তাকেও মিস করেছি। মিস করেছি আমার বন্ধু আওরঙ্গজেবের বাবাকে। যিনি ফরিদপুর মেডিকেলের ডক্টর ছিলেন। আমাকে খুবই স্নেহ করতেন।ব্যক্তিজীবনে তিনি অত্যন্ত পরহেজগার মানুষ ছিলেন। আমার বাবার অসুস্থতার সময়ে তিনি অনেক সহযোগিতা করেছেন। সবকিছু ছেড়ে তিনি বাবার পাশে থেকেছেন। তার সাথে শেষ কবে দেখা হয়েছিল সেই স্মৃতিও আর মনে নেই।
এবারের ঈদ ছিল আমার জন্য আনন্দ বেদনার এক মহাকাব্য। শুরুটা হয়েছিল অবশ্য আনন্দের সাথে এবং শেষটাও মোটামুটি আনন্দের সাথেই হয়েছে। আমি সব সময় ভালো কাজের সাথে যুক্ত থাকতে চেষ্টা করি। সব সময় পারি না। এবার কিছু মহৎপ্রাণ মানুষের সংস্পর্শে এসে ভালোকাজের পরিমান বেড়েছে। এবারের ঈদ তাই আমার জীবনের সবচেয়ে সেরা ঈদও বলা যেতে পারে। ঈদের আগে পবিত্র রমজান মাসে অসহায়দের মাঝে খাবার বিতরণ কিংবা ৭০ জনেরও অধিক শিশু কিশোর কিশোরীর হাতে ঈদের জামা তুলে দেওয়া আর ৪২টি পরিবারকে ঈদের বাজার করে দেওয়ার যে সুযোগ আমি পেয়েছিলাম তা আমার ঈদকে সত্যিকারের আনন্দে রুপ দিয়েছে।
এই ঈদে আমি তিনজনের কাছ থেকে মোট ১১ হাজার টাকা ঈদ সালামী পেয়েছিলাম। সেটাও আমার আনন্দকে বহুগুন বাড়িয়ে দিয়েছে। আবার একই সাথে আমি আমার ভাই বোন বন্ধুদেরকে ঈদ সালামী দিতে পেরেছি সেটাও কম আনন্দের নয়।এর বাইরে ১১ জনের হাতে যাকাতের ১ লাখ ২০ হাজার টাকা তুলে দিতে পেরেও ভালো লাগছে।আমার হারানো মোবাইলটা ফেরত পাওয়ার জন্য থানায় জিডি করেছিলাম। তখনই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম ফোনটা ফিরে পেলে এক বন্ধুকে উপহার দেবো। আমি কথা রেখেছি। ফোন ফিরে পেয়ে সেই বন্ধুকে উপহার দিয়েছি। সে খুবই খুশি হয়েছে।
ঈদ যাত্রার শুরুতেই ভালোলাগা তৈরি হয়েছিল। এবার ১১ দিনের ছুটি ছিল আমার। অনেক কিছু করবো বলে ভেবেছিলাম। তবে প্রচন্ড গরমের কারণে তেমন কিছুই করতে পারিনি। গ্রামের বাড়িতে একটা কম্পিউটার থাকার পরও সাথে করে ল্যাপটপটা নিয়ে গিয়েছিলাম। ইচ্ছে ছিল ১০/১২ বছর আগে যে লেখাগুলো ২৫/৩০ হাজার শব্দ লিখে ফেলে রেখেছিলাম তার দু একটা নিয়ে বসবো। কিন্তু তা আর সম্ভব নয়নি। যদিও আমি সব সময় গুগল ডকে লিখি। ফলে ইন্টারনেট কানেকশন থাকলে যে কোনো কম্পিউটার থেকেই লেখা সম্ভব হয়। কষ্ট করে ল্যাপটপ নিয়ে যাওয়াই বৃথা হয়েছে।
যখন কক্সবাজার থেকে ডাইরেক্ট ফ্লাইট  ছিল তখন আমার জন্য সুবিধা ছিল। এখন আবার তা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কানেক্টিং ফ্লাইট ধরলে সময়ও লাগে অনেক আবার টাকাও খরচ হয় দ্বিগুন। তাই সময় বেশি লাগার পাশাপাশি টাকাও বেশি খরচ হবে ভেবে বাসেই যাত্রা করি। কিন্তু এবার ডাইরেক্ট বাসও পাইনি। প্রথমে ঢাকা পযর্ন্ত গিয়ে পরে আবার বাস বদল করেছি। আমি সাধারণত কক্সবাজার থেকে ঢাকা পযর্ন্ত এনা পরিবহনের বাসে যাওয়া আসা করি। এবারও বাসা থেকে একটা অটোতে করে এনা পরিবহনের ঝাউতলা কাউন্টারে গিয়ে বসি। আধা ঘন্টা অপেক্ষা করার পর নির্ধারিত সময় বাস আসলে উঠে বসি। বাস ছড়ে দেয়। কলাতলিতে গিয়ে আবার অপেক্ষা। সেই সময়ে আইসক্রিম খাবো বলে নিচে নামি। আইসক্রিম না পেয়ে কোক কিনি। বাসে ফিরতে গিয়ে পকেটে হাত দিয়ে দেখি ট্রাউজারের পকেটে মোবাইলটা নেই!
আমার মনে হলো হয়তো বাসের সিটে পড়েছে। কিন্তু গিয়ে পেলাম না। ফোন করলে এক লোক রিসিভ করলো। সে তখন কালুরদোকান! আমার ওই মোবাইলের চেয়ে সিমটা সাথে থাকা জরুরী। কিন্তু ভাগ্যের লিখন খন্ডানোর উপায় নেই। ভেবেছিলাম ঢাকায় পৌছেই সিম তুলে নেবো কিন্তু সেই সুযোগ পাইনি। পরদিন সন্ধ্যা নাগাদ বাড়িতে পৌছালাম। মাগরিবের নামাজ পড়ে তারপর সিম তুলে নিলাম।

ঈদে কোথাও ঘুরতে যাইনি। আমাদের বাড়ি  একদম গ্রামে। খুব একটা উন্নতির ছোঁয়া পায়নি এমন গ্রাম।একদিন শহরে গেলাম। গিয়ে মনে হলো পুরো শহর মৃত। দোকানপাট বন্ধ। লোকজন নেই। মনে হয় সবাই এ শহর ছেড়ে কোথাও পালিয়ে গেছে। শহরে গিয়ে যাদের সাথে আমি ঘুরতাম তারাও কেউ নেই। তারা কে কোথায় কী নিয়ে ব্যস্ত আছে জানি না।এবার ঈদে আমাদের বাড়িতে প্রচুর গ্যাঞ্জাম হয়েছে। ভাইয়ে ভাইয়ে মারামারিলেগেছে। অশান্তি ছিল চরমে। আমি মাঝখানে পড়ে গিয়ে আমার অবস্থাও কাহিল। ভিলেজ পলিটিক্স দেখে আমি প্রচন্ড বিরক্ত। দুইদিনের জীবনে মানুষের এতো লোভ এতো ক্ষোভ এতো চাহিদা কেন আমি জানি না। এতো রেশারেশি।

এগারদিনের ছুটির মধ্যে ১৯ তারিখ সারাদিন বাড়িতে যাওয়ার জন্য পথে পথে কেটেছে!  তারপর ঈদ শেষে ঢাকায় ফেরার পথে ২৭ তারিখ পুরোটা দিন গেছে! তারপর কক্সবাজার ফেরার জন্য ২৮ তারিখটা গেছে। ছুটির তিন চারদিন এভাবেই পথে পথে কাটে।

আমার এবার নাটোর যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল। বিভাদের বাসায়। ভেবেছিলাম ওদের বাসায় যাবো। আমাকে দাওয়াত করেছিল। আগে কখনো যাইনি। কিন্তু প্রচন্ড গরমের কারণে আর বাড়িতে গ্যাঞ্জামের কারণে মনটাই বিষিয়ে উঠেছিল। ফলে কোথাও আর যাওয়া হয়নি। বিভাদের বাড়িতেও না।

দীর্ঘ ভ্রমণ আমাকে কখনো ক্লান্ত করে না। এবারও ক্লান্ত করেনি। কিন্তু ঢাকায় ফেরার পর বন্ধুর সাথে রেস্টুরেন্টে খেয়ে পেটের বারটা বেজেছে।প্রচন্ড বমি আর ডিসেন্ট্রি! যদিও শরীর ক্লান্ত ছিল না। কিন্তু খুব বিরক্ত হয়েছি। ঈদের আগে রোহানকে বলেছিলাম ঢাকায় ফিরলে তোমার সাথে দেখা করবো বা তোমাদের বাসায় আসবো। একদিন তোমার সাথে থাকবো। কিন্তু শরীরটা খারাপ হয়ে সব বিগড়ে গেছে। পরে ধানমিন্ডতে আমার বন্ধু শাহীনের বাসায় উঠেছিলাম। রাতে ফেসবুকে ঢুকে দেখি রোহানের নানা মারা গেছেন! ওইদিন আমার ওর সাথেই থাকার কথা ছিল। বিকেলে টিকেট কাটতে কলাবাগান গেলাম। যাওয়ার পথে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম  আমি ধানমন্ডিতে আছি। এটা চোখে পড়ায় উত্তরা থেকে এক ভাই ফোন দিয়ে বললেন তিনি আসতে চান দেখা করতে। আমি বললাম সময়তো কম। তিনি জানালেন বাইকে আসবেন। বেশি সময় লাগবে না।

সীমান্ত স্কয়ারে তার সাথে দেখা করলাম। এতো কষ্ট করে এতো দূর থেকে এসেছেন। এক ঘন্টা মত আড্ডা দিয়ে বন্ধুর বাসায় ফিরে গেলাম। এশার নামাজ পড়ে খাবার খেয়ে রিকশা নিয়ে বাস কাউন্টারে গেলাম। শরীর ভালো থাকলে আজ সারাদিন ঢাকায় থাকতে পারতাম। তবে সেটা আর হয়নি।

এবার ঈদে বাড়িতে গিয়ে শুধুমাত্র একটি বইয়ের কয়েক পৃষ্ঠা পড়া ছাড়া কোনো মুভি দেখিনি,নাটক দেখিনি, কোথাও ঘুরতে যাইনি। সারাদিন ঘরের মধ্যেই শুয়ে বসে কাটিয়েছি। এবার ঈদে কেউ আমাকে মোবাইলে ঈদ মুবারক লিখে মেসেজ দেয়নি। আমিও দেইনি। আমি দেইনি বলেইকি কেউ দেয়নি কি না জানি না। তবে ফেসবুকে কয়েকজনের সাথে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় হয়েছে। যদিও অন্যান্য বছরের তুলনায় তা খুবই সীমিত।

সবচেয়ে খারাপ লেগেছে গত ১৬ এপ্রিল কক্সবাজার থেকে কন্টিনেন্টাল কুরিয়ারে আরুশী আর ইররামের জন্য ছোট্ট একটি ঈদ উপহার পাঠিয়েছিলাম।আজও তা ওদের কাছে পৌছেনি। ওরা থাকে ঢাকার লালবাগে! ভাবছি আজ একবার আরুশীদের কাছে খোঁজ নিয়ে জানতে চেষ্টা করবো ওরা পেলো কি না। না পেলে ভোক্তা অধিকারে কুরিয়ারের নামে মামলা করবো। এই মামলা কি আমলযোগ্য হবে কি না আমার জানা নেই।

#জাজাফী

২৯ এপ্রিল ২০২৩