Homeস্মৃতিকথাবৃষ্টি, স্মৃতি ও বিশ্বকাপের দিনগুলো

বৃষ্টি, স্মৃতি ও বিশ্বকাপের দিনগুলো

বাইরে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। জানালার কাঁচের ভেতর দিয়ে সেই দৃশ্য চোখে এসে লাগছে। জানালার কাঁচটা সরিয়ে রাখতে পারলে বেশি ভালো হতো। আরও স্পষ্ট করে দেখতে পেতাম বৃষ্টির সৌন্দর্য। বৃষ্টি আমি পছন্দ করি আবার অপছন্দও করি। একই মানুষ একই বৃষ্টিকে পছন্দ করা আর অপছন্দ করা দুটো কথা একসাথে বলতে গেলে অনেকেই হাসবে। ভাববে পাগল হয়ে গেলাম কি না। আসলেও বিষয়টা সত্যি। এই যেমন এখন রুমের মধ্যে বসে লিখছি আর বাইরে জানালার ফাঁক দিয়ে অবিরাম ঝরতে থাকা বৃষ্টি দেখছি। এই দৃশ্য দেখতে আমার ভালো লাগে। বৃষ্টিকে এভাবে আমার ভালো লাগে।

কিন্তু বৃষ্টিকে তখনই আমার চরম বিরক্তিকর মনে হয় যখন আমি বাইরে থাকি। কোথাও ঘুরতে যাই আর হঠাৎ করে সে আমার সাথে শত্রুতা করে আমাকে ভিজিয়ে দেওয়ার প্রতিযোগিতায় নামে। বৃষ্টিতে ভিজতে আমার একই সাথে ভালো লাগে আবার বিরক্তও লাগে। যখন বাইরে ঘুরতে বের হই কিংবা সাথে ছাতা কিংবা রেইনকোট থাকে না তখন হুট করে আসা অনাহুত বৃষ্টিতে ভিজতে আমার খারাপ লাগে। কিন্তু কখনো কখনো এই আমিই নিজ থেকে উৎসবের মত করে বৃষ্টিতে ভিজি আর মেতে উঠি আনন্দে। যেমন ছোটবেলায় ফুটবল খেলতে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ভালো লাগতো। আবার একই সময়ে রোদ আর বৃষ্টির মিলনমেলায় ভিজতে ভালো লাগতো। ছোটবেলায় অনেক কিছু বুঝতাম না ফলে প্রথম বৃষ্টি এলেই নেমে পড়তাম। কিন্তু এখন জানি বছরের প্রথম বৃষ্টিতে ভিজতে নেই। সেই বৃষ্টির পানিতে অনেক কিছু থাকে যা ক্ষতির কারণ হতে পারে। তবে হ্যা প্রথম বৃষ্টি হলেও যদি তুমুল বৃষ্টি হয়ে দশ বা বিশ মিনিট পার হয় তখন ভিজলে অসুবিধা নেই।

আমার খারাপ লাগে শিলা বৃষ্টি আর খারাপ লাগে বৃষ্টির সময় যদি বিজলী চমকায়। বিজলী চমকানো ছাড়া বৃষ্টি হলে ভালো লাগে। আর সবচেয়ে ভালো লাগে যখন আমি গ্রামের বাড়িতে টিনের ঘরে থাকি এবং বৃষ্টি নামে। বৃষ্টির দিনে ঝাল মুড়ি খেতে মজা লাগে। পিঠা পুলিও খেতে মজা লাগে। জমিয়ে আড্ডা দেওয়া কিংবা মুভি দেখাও ভালো লাগে। অবশ্য বই পড়তেও খুব ভালো লাগে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে বোধহয় কাথা মুড়িয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে থাকা। এই মুহুর্তে আমি আমার ডেস্কে বসে কম্পিউটারে আজকের দিনের কথা লিখছি আর বাইরে বৃষ্টি দেখছি। সামনে একটা টিনের ঘরের চাল। সেটাতেই বৃষ্টি ঝরে পড়ছে। ওই ঘরটা না থাকলে রাস্তার দৃশ্যটাও দেখতে পেতাম। হয়তো দেখতাম কেউ কাক ভেজা ভিজে কোথাও চলে যাচ্ছে। বৃষ্টির মধ্যেই সাই করে কোনো বাস বা ট্রাক বা অন্য কোনো গাড়ি ছুটে যাচ্ছে। টায়ারের আঘাতে রাস্তার উপর পড়া বৃষ্টির পানি দুই দিকে ছুটে যাচ্ছে।

আমি যখন ছোট ছিলাম তখন দেখেছি আমাদের ঘরের টিনের চালে অনেক ছিদ্র ছিল। আম্মা সেই সব ছিদ্র বরাবর মেঝেতে ছোট ছোট হাড়ি পাতিল বা গামলা বসিয়ে দিতেন যেন বৃষ্টির পানি নিচে পড়ে মাটিতে কাদা তৈরি না হয়। আমিও মাঝে মাঝে মায়ের ব্যস্ততা থাকলে ওই কাজ করতাম। সময় গড়িয়ে গেছে। এখনো বৃষ্টি হয় তবে আগের মত ছুটে যেতে হয় না টিনের ছিদ্রর নিচে বাটি বা পাতিল পেতে রাখার জন্য। এখন আর টিনে ছিদ্র নেই। আল্লাহর রহমতে ও বরকতে এখন আমাদের অবস্থাও বদলেছে। বাড়িতে টিনের ঘর আছে,ছাদ করা বিল্ডিংও আছে। পাশেই পুকুর আছে। সেই পুকুরে অনেক রকম ছোট বড় মাছও আছে। আমি যখন ছোট ছিলাম তখন আমাদের কোনো পুকুর ছিল না,টিউবওয়েল ছিল না,টেলিভিশন ছিল না। আম্মা মসজিদের টিউবওয়েল থেকে পানি নিয়ে আসতেন। কত যে কষ্ট করতে হতো। গোসল করার জন্য বড় চাচাদের বাড়ির পিছনে থাকা গ্রামের সবচেয়ে বড় পুকুরই ছিল পুরো গ্রামের মানুষের একমাত্র ভরসা। কিন্তু সেই পুকুর আজও আছে। তার চেয়ে বড় কোনো পুকুর আজও গ্রামে কাটতে পারেনি কেউ। অথচ সেই পুকুরে কেউ আর গোসল করে না। কতকাল সেটা পরিত্যাক্ত হয়ে পড়ে আছে তা কেউ ঠিক বলতে পারবে না।

বড় চাচাও না ফেরার দেশে চলে গেছেন বহু বছর আগে। আমার বেশ মনে আছে আমি যখন গোসল করতে যেতাম তখন দেখতাম বড় চাচা বারান্দার খাটের উপর বসে আছেন। পান খাচ্ছেন। আমাকে দেখলেই ডাক দিতেন। গল্প করতেন। মাঝে মাঝে তাকে ফাঁকি দিয়ে অন্য পথ ধরে যাওয়া আসা করতাম। আজকে তাকে খুব মিস করি। কেন যে আরও অনেক বছর তিনি আমাদের মাঝে থাকলেন না। আল্লাহর ডাকে তাকে সাড়া দিয়ে চলে যেতে হলো। আমার বড় চাচা ছিলেন স্কুল শিক্ষক। হেড মাস্টার। আমি তার স্কুলে পড়বো বলে একবার ভর্তি হয়েছিলাম। সম্ভবত ওয়ান বা টুতে ভর্তি হয়েছিলাম। গ্রাম থেকে বেশ দূরেই ছিল সেই স্কুল। চাচা এলাকার বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন তবে সেই স্কুলটাই সবচেয়ে কাছে ছিল বলে সেখানে ভর্তি হয়েছিলাম। ভর্তির পর নতুন বইও পেয়েছিলাম। কিন্তু আজ আর মনে নেই কেন সেই স্কুলে এক মাসও পড়া হয়নি। বড় চাচা অনেক গল্প জানতেন। তিনি যখন অবসর নিলেন এবং পেনশনের টাকা পেলেন তখন আমাদের মধ্যে একটা উৎসব উৎসব ভাব বিরাজ করছিল। যদিও চাচা আর আমরা আলাদা সংসারে ছিলাম।

বড় চাচার অনেক গুলো ছেলে মেয়ে। সেই সময়ে মনে হয় ওভাবে গুনতেও পারতাম না। বড় চাচার ছেলে মেয়েদের মধ্যে শুধু একজন আমার চেয়ে ছোট। বাকি সবাই আমার চেয়ে বড়। সেবার পেনশনের টাকা পাওয়ার পর মোট তিনটা ঘর দিলেন যার মধ্যে পাশাপাশি দুটো ঘর। ঘরগুলো ছিল টিনের। উপরে এবং চারপাশে বেড়ার সবটাই ছিল টিনের। নতুন টিনের সেই ঘর দেখতেও কেমন যেন ভালো লাগতো। সেই সময়ে এলাকায় ওরকম নতুন ঘরতো আর কারো ছিল না। অবশ্য আমাদের বাড়িতে তখনো পাকা ঘর ছিল। উপরে শুধু টিন ছিল। বড় চাচা তার মেজ ছেলের জন্য একটা পাওয়ার টিলারও কিনেছিলেন। সেটাই ছিল গ্রামের প্রথম ও একমাত্র পাওয়ার টিলার। সেই টিলার দেখতেও আমরা ভীষণ আগ্রহী ছিলাম। সব কিছু আমাদের চোখে বিস্ময়কর ছিল। এখন বুঝি বড় চাচা পেনশনে খুব বেশি টাকা পাননি। হয়তো তিন বা চার লাখ টাকা পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই সময়ে ওই পরিমান টাকাও ছিল অনেক। তখনতো স্বর্ণের ভরি ছিল ছয় সাত হাজার টাকা।

আমার বেশ মনে আছে বাড়িতে নতুন ঘর দেওয়ার পর আমি অনেকের ছবি তুলেছিলাম। আমার দাদিকে দুই ঘরের মাঝে থাকা গোট বরাবর চেয়ারে বসিয়ে একটা ছবি তুলেছিলাম। আমার দাদির ওই একটা ছবিই আমার কাছে আছে। হয়তো আমিই না আমাদের পুরো গোষ্ঠীর কাছে দাদির ওই একটা ছবিই অবশিষ্ট আছে। কম্পিউটারের হার্ড ডিস্কে খুজলে পাওয়া যাবে। সেই সময়ে অবশ্য কম্পিউটার ছিল না। কম্পিউটার বলে যে কিছু পৃথিবীতে আছে তাও আমার জানা ছিল না। আমাদের পাশের গ্রামে রুহুল নামে এক ভাই আছেন। ওনার বাবা সৌদি আরব থাকতেন। একবার দেশে আসার সময় তার জন্য একটা ক্যামেরা এনেছিলেন। সেই ক্যামেরাটাই ছিল আমার ছবি তোলার মাধ্যম। রুহল ভাইকে কিছু টাকা দিয়ে ক্যামেরাটা আমি ইচ্ছে মত ব্যবহার করতাম। তারপর নেগেটিভ ওয়াশ করিয়ে ছবি প্রিন্ট করে এলবামে রেখে দিতাম। সেই এলবামে থাকতে থাকতে অনেক ছবি নষ্ট হয়ে গেছে। পরে যখন আমি ঢাকাতে শিফট হলাম তখন ছবিগুলো স্ক্যান করে ডিস্কে ভরে রেখেছিলাম। এখনতো হার্ড ডিস্কেই রাখতে পারি। তবে সব ছবি রাখা হয়নি। নেগেটিভ ছিল অবশ্য অনেক দিন। কিন্তু কোথাও আর সেই আগের মেশিনারিজ অবশিষ্ট পাইনি যা দিয়ে ছবি প্রিন্ট করবো।

আজকে রাতে ১১টায় ফুটবল বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার খেলা আছে। এক সময় আমিও আর্জেন্টিনার তুমুল ফ্যান ছিলাম। ছোট বেলায় বিশ্বকাপ খেলা দেখেছি। কাজিনদের প্রথম পছন্দ ছিল আর্জেন্টিনা। তখন আমি আর কিইবা বুঝি। ফলে তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আমিও আর্জেন্টিনা সমর্থন শুরু করি। তারপর কেটে গেছে অনেক বছর। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জেতা পযর্ন্ত আমি আর্জেন্টিনার ফ্যান ছিলাম। তারপর বৈশ্বিক নানা কারণে সেই সমর্থন তুলে নিয়েছি। মুসলিম নিধনকারী ইসরায়েল এবং আমেরিকার ঘনিষ্ট বন্ধু আর্জেন্টিনা সরকার। তারা মুসলিম নিধনকে সমর্থন করে। তারচেয়ে বড় কথা হলো খোদ লিওনেল মেসি এটাকে সমর্থন করে। কিছুদিন আগে যখন আমেরিকা-ইসারেয়ল ইরান আক্রমন করলো সেটা শুনে মেসি হাত তালিও দিয়েছে। সেই দলকে আমি কিভাবে সমর্থন করতে পারি? যদিও জানি আমার মত একজনের সমর্থন করা না করায় কিছুই যায় আসে না। তবুও আমি আমার জায়গায় ঠিক থাকতে চাই।

ফুটবল বিশ্বকাপ দেখার স্মৃতি আগের গুলো তেমন মনে নেই। শুধু মনে আছে মিরোস্লেভ কোলেসা নামে জার্মানির যে খেলায়াড় এই বিশ্বকাপের আগ পযর্ন্ত সর্বাাধিক গোলদাতা ছিলেন তার সেই গোল দেওয়ার দৃশ্যগুলো আমার মনে আছে। তার আগে রোনালদোর গোল সংখ্যা বেশি ছিল। আমি তার খেলা দেখেই তখন বুঝেছিলাম এই খেলোয়াড় সর্বাধিক গোলদাতা হবেন। পরে তাই হয়েছিলেন। যদিও এই লেখা যখন লিখছি তখন তার সেই রেকর্ডে ভাগ বসিয়েছেন লিওনেল মেসি। আমি সেই কিশোর বয়সে খেলা দেখার সময় নোটখাতা রাখতাম। রেকর্ডগুলো লিখে রাখতাম। কে কত মিনিট সময়ে গোল দিলো সেটাও লিখে রাখতাম। তখন কি আর জানতাম এগুলো সব এমনিতেই রেকর্ড বই সংরক্ষণ করা হয়। আমার সবচেয়ে ভালো লাগতো গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার খেলা আর তেভেজের খেলা। এর বাইরে রোনালদিনহো,ডেভিড ব্যাকহাম,ওয়েন রুনি,ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এমনকি মেসির খেলাও ভালো লাগতো। জ্লানাতান ইব্রাহিমোভিসের খেলাও ভালো লাগতো। আজও মনে আছে বহু আগে শোনা ফুটবলের এক বিখ্যাত বাণী যেটা বলেছিলেন গ্যারি লিনেকার। তিনি বলেছিলেন “ফুটবল হলো এমন একটি খেলা, যেখানে ২২ জন মানুষ ৯০ মিনিট বলের পেছনে দৌড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত জার্মানিই জেতে”।

এবার বিশ্বকাপ কে জিতবে জানি না। তবে এই বিশ্বকাপটা পর্তুগাল জিতলে পৃথিবীর শত কোটি লোক খুশি হতো। ক্রিষ্টিয়ানো রোনালদো নামে এক ফুটবল যাদুকর কতশত ট্রফি জিতেছে শুধু বিশ্বকাপ জেতা হয়নি। পর্তুগালের ইতিহাসেই শুধু নয় ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় বিশ্বকাপ ছাড়াই খেলা থেকে অবসরে যাক এটা কল্পনাও করতে খারাপ লাগে। যদিও তাদের প্রথম ম্যাচ তারা ড্র করেছে এবং রোনালদো পুরো খেলা জুড়েই ম্লান ছিলেন।

২২ জুন ২০২৬

Most Popular