আকাশের রঙ বদলায়,রঙ বদলায় গিরগিটি আর সাগরের তলদেশে থাকা কাটল ফিশ। মানুষের জীবনের রঙও বদলে যায় ক্ষণে ক্ষণে। এ জীবনের রঙটাও হঠাৎই বদলে গেল। অমাবশ্যার ঘুটঘুটে অন্ধকারে নয়,পুর্নিমা চাঁদের আলোয় ভেসে যাওয়া রাতে নয়,সূর্য ডুবতে থাকা শেষ গোধুলীতে নয়,জীবনের রঙ বদলাতে শুরু করলো অনেকটা বলে কয়ে। কখনো ভাবিনি এমনটি হবে। বসন্ত আসে বসন্ত যায়। গাছে গাছে পুরোনো পল্লব ঝরে গিয়ে ফিরে আসে নতুন পাতা। সবুজে সবুজে ভরে যায় সারা পৃথিবী। তেমনি জীবন থেকে নিজের অজান্তেই পেরিয়ে যায় কত বছর। হঠাৎ একদিন অনুভব করি জীবনের অনেক পরিবর্তন এসেছে। আমিও তা অনুভব করতে পেরেছি।
যে আমি মায়ের আচঁলের তলে থেকে জীবনের আঠারটি বছর পার করেছি সেই আমিই আজ অন্যরকম এক পরিস্থিতির সম্মুখীন। আমি তাই এখন আর মায়ের আঁচলের নিচে লুকিয়ে থাকা ভীতু বালকটি নই। আমার মনের মধ্যেও এখন অন্যরকম অনুভূতি জাগে। সেই অনুভূতির কথা আমি নিজেই নিজেকে বুঝাতে পারিনা। কখনো মনে হয় আমি বুঝি ডানা মেলা পাখি, ইচ্ছেমত উড়ে চলেছি তেপান্তরে। আবার কখনো মনে হয় আমি সাধক, যে জন্মেছে কেবল সন্যাসব্রত গ্রহণের জন্য। পরক্ষণেই হয়তো মনে হয়, না এসব কিছুই না, আমি মানুষ। সমাজ সংসারে আমার কত কাজ, কত দায়িত্ব। ক্ষণে ক্ষণে আমার মনের ভেতরে সব কিছু ওলট পালট হয়ে যায়। রঙ্গিন স্বপ্ন আমার বুকের মধ্যে বাসা বাঁধে। আবার হঠাৎই কোন কিছু জানান না দিয়েই উধাও হয়ে যায়। বয়সের অবিরাম ছুটে চলার মধ্য দিয়ে আমি পৌছে গেছি ভয়াবহ এক মুহুর্তে। চারদিকে কেবল মানুষের মনের মধ্যে নানা রকম আশঙ্কা দানা বেঁধে আছে। কখন কি হয় বলা যায়না। কিন্তু তাই বলে থেমে নেই প্রতিদিনকার জীবন প্রনালী। যে যার কাজে ব্যস্ত আছে ঠিকই। রিক্সা চালক রোজ রিক্সা নিয়ে বেরিয়ে পড়ছে পেড়ের টানে। নৌকার মাঝি দুটো মাছ ধরার আশায় পাল তুলে জাল ফেলছে পদ্মার ঘোলা জলে। বৃদ্ধ ছোমেদ মিয়ার মত মানুষেরা জীবিকার তাগিদে মাথায় তুলে নিচ্ছে ইটের ঝাকা। আর একদল মানুষ দিন রাত আর সব মানুষের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে দিনাতিপাত করছে রাস্তায়-রাস্তায়, অলিতে-গলিতে মিছিল, মিটিং আর সমাবেশে উচ্চস্বরে গলা ফাটিয়ে বক্তৃতা দিয়ে। সেই বক্তৃতা শোনার জন্য সবাই কান উচু করে থাকে। রেডিওতে কখন এই সব বক্তৃতা প্রচার করা হবে তা নিয়ে থাকে সবার মধ্যে অপেক্ষায় থাকার প্রতিযোগিতা।
আমি এসব কিছুই ভাবতামনা । গ্রামে অনেকেইতো আমাকে খোকা বলে ডাকতো। যাকে মানুষ খোকা বলে ডাকে সে কি এতসব বুঝার মত বড় হয়েছে। আমিও তাই নিজেকে ছোট ভেবেই বসে ছিলাম। অথচ আমি যে আগেই বড় হয়ে গেছি সেটা একটি বারের জন্যও কেউ আমাকে বলে দেয়নি। আমার চাচার ছেলে রাসেল ভাই ঢাকায় থাকতেন। তিনিই প্রথম আমাকে কথায় কথায় অনেক কিছু বললেন। আমি দেখলাম সেসবের কিছুই আমি জানিনা। নিজেকে খুব হীন মনে হচ্ছিল। কিন্তু রাসেল ভাই আমার কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন ধুর বোকা এ আর এমন কি। তোর বয়সকি পেরিয়ে গেছে। সব জানতে পারবি। তার পর থেকে যে কয়দিন তিনি গ্রামে ছিলেন সে কয়দিন ওনার সাথেই ঘুরতাম। রেডিওতে খবর শুনতাম। ভাষণ ব্যাপারটা তখনই রাসেল ভাই আমাকে বুঝতে শিখিয়েছেন। এখন যে ভাষণ প্রচারিত হলে মানুষ কান খাড়া করে খুব অধীর আগ্রহ নিয়ে শুনতে থাকে আমিও নিজেকে তাদের দলে ভিড়িয়ে নিই। আমিও সেই সব কথা শোনার জন্য প্রতিক্ষীত মানুষের দলে মিশে থাকি। একদল মানুষ তাদের সমস্ত সুখ বিসর্জন দিয়ে রাজ পথে নেমে পড়েছে অধিকার আদায়ের মিছিল নিয়ে। আমারও খুব ইচ্ছে করে ঐ সব লোকদের পাশে গিয়ে দাড়াতে। আমারও ইচ্ছে এক সুরে সুর মিলিয়ে এক কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গাই আমার প্রিয় মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা। কিন্তু আমি পারিনা। আমি পারিনা আমার বিভিন্ন অপারগতার কারণে। কোনটা মায়াজাল আবার কোনটা পিছন থেকে আমাকে টেনে ধরে রাখার কারণে।
গ্রামের পাশ দিয়ে নদী। নদীর দুই ধারে সারি সারি আম কাঠাল আর সুপারি গাছ ঠায় দাড়ানো। বৈশাখ মাসে নদীর তীর ঘেসে বসে বৈশাখী মেলা। ঈদের মাঠে সবাই আনন্দ সহকারে কোলাকুলি করি। হিন্দুদের পূজোর সময় তার্ওা ঢোল বাজিয়ে আনন্দে মেতে ওঠে। অতি সাদামাটা একটা গ্রাম। সেই সাদামাটা গ্রামের একটা সাধারণ পরিবারে আমার জন্ম। সেই সাধারণ পরিবারের সুখ দুঃখ ভাগাভাগি করে আমার বসবাস। গ্রামের আর দশটা সাধারণ ছেলে মেয়েদের মতই জন্মের পর থেকে সেখানেই বেড়ে উঠেছি। আমার জীবনটাই তাই এক প্রকার সাদাসিঁেধ। ঈদ এলে নতুন জামা কেনার জন্য বায়না ধরার সাহস হতোনা কখনো। সংসারে বাবা, মা আর ছোট্ট একটা ভাইকে নিয়ে আমার দিন চলে নড়বড়ো আকারে। তবে যেভাবেই দিন চলুকনা কেন সুখ বলতে যা বুঝায় তার সবটাই আমি ভীষণ রকম উপলব্ধি করি। বাবা মায়ের স্নেহের আঁচল তলে আমি আর আমার ভাই দুজন আনন্দের সাথেই বেড়ে উঠেছি। আমার ভাই আমার পিঠেপিঠি নয় তবে ও আমার খুব ভাল বন্ধু। একসময়তো এমন ছিল দুজনে একসাথে একই প্লেটে ভাত না খেতে পারলে আমাদের দিনটাই খারাপ যেত। বাবা যদি আমাকে দুটো টাকা দিত আমি তা নিজের জন্য খরচ করতাম না। আমার ছোট ভাইয়ের জন্যও কিছু না কিছু কিনতাম। আমার ছোট ভাইও সেই শিক্ষাটা আপনা আপনি পেয়ে গেছে। আমাকে না দিয়ে সে বোধ হয় কোন দিন একটা পেয়ারাও খায়নি।
সময়টা বদলে গেছে ভীষণ রকম। চারদিকে বিপদের আবহ তৈরি। সম্মুখ সমরের প্রস্তুতি এখন আবালবৃদ্ধাবণিতা সকলের মাঝে। এই বিপদের দিনে আমার মনের ভিতরে জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির লাভার উদ্গিরণ চলতেই থাকে। সেই লাভায় ইচ্ছে হয় সবাইকে জ্বালিয়ে দিই। ইচ্ছে হয় আরও অনেক কিছু কিন্তু সেগুলোর কোনটিই হয়ে ওঠেনা। রাত হলে আগে হুতোম পেচারা ডেকে উঠতো। সেই ডাক শুনে কতবার যে ভয়ে আমার ছোট ভাই আমাকে জড়িয়ে ধরেছে। এখন আর সেই সব হুতোম পেচা ডাকেনা। কোথায় যেন হারিয়ে গেছে সেই সব রাত জাগা হুতোম পেচা। যেন হঠাৎই ওজের যাদুকর এসে সবগুলোকে বন্দী করে নিয়ে গেছে। কিংবা হ্যামিলনের বাশিওয়ালার বাশি শুনে তার পিছু পিছু চলে গেছে হুতোম পেচারা। রুমাদের দীঘিতে যে সব পানকৌড়ি ভেসে বেড়াতো তারাও কোথায় যেন হারিয়ে গেল। যেন সমাজ সংসার ছেড়ে আমাদের ছেড়ে ওরা সবাই বৈরাগী হয়ে এ গ্রাম এ শহর ছেড়ে দূরে হিমালয়ের কোন এক অজানা অঞ্চলে হারিয়ে যাচ্ছে।
শহরের রাজপথ এখন অনেক মানুষের ভারি পদক্ষেপে প্রকম্পিত হচ্ছে। কেবল মাত্র একটা ডাকের অপেক্ষা। হয়তো তার পরই সবাই ঝাঁপিয়ে পড়বে সেই মহারণে। মিষ্টির টুকরাকে ঘিরে যেমন পিপড়ার সারি ঘুরতে থাকে শহর নগরে আজ সেইরকম সারি সারি মানুষ। তারাও যেন কি এক অমৃতের সন্ধান পেয়েছে। আমি তরতাজা তরুণ। আমার বয়স যখন মাঠে মাঠে ফুটবল কিংবা অন্যসব খেলাধুলার সামগ্রি নিয়ে দাপিয়ে বেড়ানোর। আমার এই বয়সটা যখন কোন কিছুকে পরোয়া না করার। ইচ্ছে হতো আমিও রুষে উঠি, আমিও ঐ সোনার ছেলেদের সাথে মিশে আমাকে ধন্য করে ফেলি। আবার আমার বাবা মা আর ছোট্ট ভাইটার কথা মনে পড়ে। আমার বুকের ভিতরে মোচড় মেরে ওঠে। আমি আর তেমন কিছুই ভাবতে পারিনা। আমি যতই ভাবতে যাই ততোই কেউ একজন আমাকে পিছনে টেনে নিয়ে যায়। কেউ একজন আমার কানের কাছে ফিস ফিস করে বলে, কী দরকার ওসবের মধ্যে জড়ানোর। আছোতো ভালোই, তাহলে বাপু ইচ্ছে করে কপাল এগিয়ে সিদুঁর নেওয়ার দরকার কি? কিন্তু আমার মনের মধ্যে যে একজন বসবাস করে সে বলে, দরকার আছে বৈকি। তোমাকেইতো যেতে হবে। দেখছনা তোমাদের মত আরও কত জন এগিয়ে যাচ্ছে নির্ভীক ভাবে। বলিষ্ঠ কন্ঠ তাদের আকাশ বাতাসকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। সেই সারিতে তুমি না থাকলে তুমিতো পিছিয়ে পড়বে।
আমি আমার অন্তরের ডাক শুনতে পাই। যে কাঠ পুড়ে পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে তাকে আর কতটুকুই বা পোড়ানো যায়। আমিও পুড়েছি আমার মাঝে বেঁচে থাকা সুপ্ত আগ্নেয়গিরীর ঘুমন্ত আগুনে। তাইতো অন্তরের ডাকে সাথে সাথে আমিও বুঝতে পারি সত্যিই আমাকে যেতে হবে। সত্যিই আমার যাওয়া দরকার। কিন্তু তবুও যেতে পারিনা। প্রতিটা মানুষের মস্তিস্কে দুটি বিষয় সব সময় থাকে তার একটি হল লজিক বা যুক্তি অপরটি হল আবেগ বা মায়া। লজিক যেটাকে বলে যাও এটা কর এবং এটা করাই যুক্তি যুক্ত, ঠিক সেই বিষয়টাই আবেগ বা মায়া নামের অংশটা বলে এটা করার কোন দরকার নেই। আমার এখন নিজেকেই ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে, আমি আবেগে গা ভাসিয়ে দেব, নাকি লজিকের পথটা বেছে নেব। একজন সচেতন মানুষ হিসেবে আমার লজিকের অংশটাই বেশি পছন্দ।
সেই সময়টাতে গ্রামাঞ্চলে শহরের মত অতটা প্রভাব না পড়লেও রেডিও টিভিতে শুনে শুনে মানুষের মনে ভয় জমে গিয়েছিলো। এই বুঝি আসছে, এই বুঝি হঠাৎ ঝড়ো হাওয়ার মত সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর চারদিকে উঠছে কান্নার রোল। গরীব চাষার দুয়ারে রাজার সৈন্যরা কর নিতে আসলে যেমন তার বুকের খাঁচা ভয়ে থর থর করে কেঁপে ওঠে ঠিক তেমনি সবাই ভয়ে তটস্থ। কিংবা তাদের কাছে মনে হতো এই বুঝি আর কেউ থাকলোনা প্রিয়জন হারানোর শোকে কাঁদার মত। টগবগে এক যুবক আমি। উনিশ কি বিশ বছর বয়স আমার। শরীরের শক্তি আমার মনের অজান্তেই বলে দেয় যা এখনো বসে আছিস কেন? কিন্তু তবুও আমি যেতে পারি না। এর মাঝেই এসে গেল উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের সময়। বাবা মায়ের ইচ্ছে আমি যেন বড় কোন প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পাই। আমাদের দেশে বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেই বুঝায়। আমারও আজন্ম কালের লালিত স্বপ্ন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বো। সেই আশা বুকে নিয়েই অতিবাহিত করেছি বারো বছরের দীর্ঘ স্কুল এবং কলেজ জীবন। আমি যতই এসব কথা ভাবি ততই মনের মধ্যে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়। আবার সাথে সাথেই সেটা বেদনার ছায়াতে কালো হয়ে ওঠে। কিছু প্রিয় মানুষকে ছেড়ে দূরে কোন একটা জায়গাতে একা একা থাকতে হবে ভেবে আমার ভেতরে কেমন যেন করে ওঠে। তার পর আসে সেই কাংক্ষিত দিনটি। আমার যাবার কথা ভেবে বাবা মা আগেই সব কিছু রেডি করে রেখেছেন। তাদের মনের মধ্যে আমাকে নিয়ে অনেক আশা, অনেক স্বপ্ন প্রতিনিয়ত দোলা দিয়ে যায়।
মা আমার জন্য নাড়– তৈরী করে রেখেছে। বাবা বাজার থেকে এক কেজি চিড়া কিনে এনে রেখেছে। আমার মা জানতো আমি খুব বেশি চিড়া আর নাড়– পছন্দ করি। এক প্রকার মন চাইছিলো, আবার মনটাকে শান্তনা দিতে পারছিলাম না যে, এই সব প্রিয় মানুষেরা পড়ে থাকবে এই গ্রামে, যেখানে আমি মাঠে, ঘাটে, প্রান্তরে হেসে খেলে বড় হয়েছি । আর আমি থাকবো দূরে অচেনা একটা শহরে। যেখানে আমার থাকার কোন পরিচিত জায়গা নেই। স্নিগ্ধ বাতাস নেই, যে বাতাসে শ্বাস নিয়ে বেড়ে উঠেছি মুক্ত বিহঙ্গের মত। শান বাঁধানো পুকুর নেই, যে পুকুরে ডুব সাতার খেলেছি চাচাতো ভাইবোনদের সাথে। নেই মহিতোষ জেঠুর মিষ্টির দোকান, যেখান থেকে প্রতি হাটে বাবা আমাদের দুই ভাইয়ের জন্য গজা কিনে আনতেন। আমি এমন এক শহরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি যেখানে আমি এর আগে কোন দিন যাইনি। এমনকি রাসেল ভাই ছাড়া আমার পরিচিত এমন কেউ নেই যে সেই শহরে থাকে। যার কাছে গিয়ে আমি উঠতে পারবো, নিজেকে মানিয়ে নেওয়া পর্যন্ত তার কাছে থাকবো। অথচ এই আমার ছোট্ট গ্রামটিতে বাতাস বয়ে আনে আমার বন্ধুদের শরীরের ঘ্রান। মনে হয় বন্ধুরা আমার সাথেই আছে। রাতের অন্ধকারে নদীর ধারে হাটলে মনে হয় এই নদী আমার ব›ধু এই গাছ এই পাখি সব আমার আপনজন। অথচ এসব আর আমার সঙ্গী হবেনা।
ছোট্ট একটা চিরকূটের মত কাগজে বাবা তার এক বন্ধুর ছেলের ঠিকানা লিখে দিয়েছেন। আমাকে আজ সেখানে গিয়ে থাকতে হবে। আমি তাকে কোন দিন দেখিনি পযর্ন্ত। সেখানে সবাই আমার অচেনা, সবাই আমার অজানা। যেন দূর বিদেশ থেকে আগত কোন অবাঙ্গালী যে কারো সাথে কথা বলে বুঝাতে পারছেনা যে সে কি চায়। আমি সেই অজানা আঙ্গিনাতে একাকী কেমন করে থাকবো সে কথা আমি কোন ভাবেই ভাবতে পারিনা। আমি আমার ছোট্ট ব্যাগটিতে আমার প্রয়োজনীয় কাপড় এবং টুকিটাকি জিনিস ভরে নিয়ে বাবা মায়ের দোয়া নিয়ে বেরিয়ে যাই। মায়ের চোখে তখন জল ছিল আমি তা দেখার সাহস পাইনি। বাবার বুকে তখন ভালবাসা ছিল সে বুকে নিজেকে জড়িয়ে নিতে পারিনি। ছোট্ট ভাইটি স্কুলে থাকায় শেষ বারের মত তার সাথে দেখাও হয়নি। স্কুল থেকে ফিরে আমাকে না পেয়ে সে দিশে হারা হয়ে এ ঘর ও ঘর করবে আর তার বুকে শুন্যতা এসে ভর করবে। বাবা মাকে ফেলে রেখে আমি যখন বাড়ী ছেড়ে অনেকটাই দুরে এসে পৌছেছি, ঠিক তখন পিছন থেকে আমার কানে ভেসে আসে একটা নারী কন্ঠ। সেই নারী কন্ঠের ডাকে আমি আমার মনের অজোন্তেই থমকে দাড়াই। এই কন্ঠটা আমার অনেক দিনের চেনা। অনেক আগের থেকে আমার অন্তর আত্মার সাথে সেই কন্ঠটি মিশে আছে। আমার স্বপ্ন এবং জাগরণে তার ছবি আমি দেখেছি। একাকী এবং আধো আলো ছায়ার রাতে আমি যখন নির্ঘুম কাটিয়েছি তখন সে ছিলো আমার স্বপন সঙ্গী।
এক গ্রাম্য বালিকার ডাকে আমি যখন থমকে দাড়াই, তখনই টের পাই আমি এক প্রকার মায়ার বন্ধনে বাঁধা পড়ে গেছি। আমার বাবা বলতেন ‘‘জানিস মায়া বড় কঠিন জিনিস ,একবার মায়াতে পড়ে গেলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে সময় লাগে। অনেকেই বেরিয়ে আসতে পারেনা, সেই অনেকের মধ্যে মহাপুরুষরাও থাকে। সুতরাং সব সময় চেষ্টা করবি যেন কোন মায়া তোর পথের সাথী না হয়।’’ বাবার কথা এখন বার বার মনে পড়ছে। হয়তো আগেও পড়তো, যদি না বাবা মায়ের কাছ থেকে এভাবে কোথাও পাড়ি জমাতাম। এর আগে কোন দিন এমনটি হয়নি। আমি আগে কখনোই এমন ভাবে কোথাও অনেক দিনের জন্য পাড়ি জমাইনি বলেই হয়তো ব্যাথাটা অনুভব করতে পারিনি। আমাদের গ্রামের সেই মেঘ বালিকাটি, যার সাথে আমার কেটেছে অনেকটা বছর। যে ছিলো সেই ছোট বেলা থেকেই আমার খেলার সাথী। তাকে না দেখলে আমার কোন কিছুই ভালো লাগতোনা। সেই প্রিয় মানুষটিকে ফেলে রেখে আমি যখন একাকী শহরে পাড়ি জমাচ্ছি তখন সেই মানুষটি আমার পথ রোধ করে দাড়ালো। বললো, আমাকে না বলেই চলে যাচ্ছ? আমি তখনও বুঝতে পারিনি এতে বলে যাওয়ার কী আছে? তার সাথে আমার সর্ম্পকটা ছিলো বন্ধুত্ব বন্ধুৃত্ব। এক সাথে স্কুলে পড়েছি, এক সাথে কলেজও পার করে এসেছি। আমি তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করলাম কিন্তু পারলামনা। বার বার আমার মনের মধ্যে কেউ একজন আমাকে পিছনে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলো। আমার মন বলছিল অনেক কথা। আমি তাকে কোন রুপ সুযোগ না দিয়েই বললাম, আমি তাহলে আসি। সে তখন আমার দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকলো। যেন তার মুখের ভাষা মুর্হুতেই উবে গেছে। আমি দেখলাম তার চোখে পানি । আমি বুঝতে পারিনি সে কেন কাদঁছে। আমি সেই ছোট বেলার মতই তার চোখের পানিটুকু হাতের তালু দিয়ে মুছে দিয়ে বললাম, দুর পাগলী কাঁদতে হয় নাকি। কিন্তু এই কথা বলার সাথে সাথে সে আরও জোরে কেঁদে উঠলো। সেই সাথে সে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। এই প্রথম কোন মেয়ে আমাকে এভাবে জড়িয়ে ধরলো। গ্রাম্য সমাজের চোখে এটা খুবই খারাপ কাজ। আমি ওকে হাত দিয়ে সরিয়ে নিয়ে আশে পাশে লক্ষ্য করলাম কেউ বিষয়টা দেখলো কিনা। আমি যখন নিশ্চিত হলাম যে কেউ দেখেনি, তখন তাকে প্রশ্ন করলাম, আজ তোমার কী হয়েছে যে তুমি ওভাবে কাঁদছো ? সে তখন অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বললো, ‘না কিছুই হয়নি কাঁদছি আমি আমার মনের সুখে।’ আমি অবাক হলাম এই ভেবে যে, মনের সুখেও মানুষ কাঁদেনাকি। আমি কোন কিছু বলছিনা দেখে সে বললো, আমি কেন কাঁদছি তা তুমি এখনো বুঝতে পারলেনা? আমি সেই ছেলেবেলার বন্ধুত্বের মত তাকে বললাম, ঠিক আছে আমাকে না হয় বলে দাও। কিন্তু সে কোন কথা বললো না। বরং আরও জোরে জোরে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলো। এর পর আমাকে কোন কথা না বলে ওড়নার আঁচলে চোখ মুছে পালিয়ে গেল।
সে চলে যাওয়ার পর আমিও আবার চলতে শুরু করলাম। সেদিন তার পায়ে নুপুর ছিল যা সে বাউলাখালির মেলা থেকে কিনেছিল। সেই নুপুর তার পায়ে মানিয়েছিল বেশ। চলে যাবার সময় তার নুপুরের ধ্বনি আমার কানে ভেসে আসছিল। যে ধ্বনি শরীর ছোয়া দূরত্ব থেকে বেজে উঠেছিল তা ক্রমে ক্রমে দূরে মিলিয়ে গেল। শুধু নুপুরের অস্পষ্ট ধ্বনি আমার হৃদয়ের কোন এক আঙ্গিনায় বাজতে থাকলো একই তালে। এর কিছুক্ষণ পরই আমি অনুভব করলাম তাকে ছেড়ে আসতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। যে কষ্টটি এর আগে কোন দিন আমার হয়নি। ভালবাসার কোন দেশ নেই,ভাল লাগার কোন সংজ্ঞা নেই। আমি মনে মনে ভাবলাম, আমি কি তাহলে তাকে ভালোবেসে ফেলেছি ? আবার ভাবলাম, তাওবা কি করে হয়? আমিতো তাকে শুধু বন্ধুই ভেবেছি। আর সেওতো আমাকে বন্ধুই ভাবতো। এখন যদি তাকে ভালোবাসার কথা বলি তাহলে সে যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়। তাই এ কথা মন থেকে মুছে ফেলে হাটতে শুরু করি। সারি সারি তাল সুপারি গাছ। গ্রামের রাস্তার এই অপার সৌন্দর্যকি আমি শহরে দেখতে পাব?
মাইল তিনেক পথ আমাকে হাটতে হবে, তবেই একটা ইটের রাস্তা পাওয়া যাবে। সেখান থেকে একটা ভ্যান গাড়ি করে আরও মাইল পাঁচেক যাওয়ার পর বড় রাস্তার মোড়। সেখানেই ঢাকা যাওয়ার গাড়ি থামে। এতটা পথ চলার পর ঢাকা যাবার গাড়ি হয়তো আমাদের ধরতে হতোনা। কিন্তু সব আমাদের ভাগ্যের লেখনী। ব্রিটিশরা এদেশ ছেড়ে চলে গেছে বহুবছর আগে। কিন্তু আমাদের ভাগ্যের সিঁকে ছেড়েনি। বাবা মায়ের মুখে শুনেছি, একসময় এদেশে জোর আন্দোলন শুরু হলো। ভারত পাকিস্তান আলাদা হয়ে গেল। সেই আন্দোলনের সময়ও বঙ্গবন্ধু নামের এই মানুষটি ছিলেন। তিনি নিজেই নাকি মানুষকে স্বপ্ন দেখাতেন, পাকিস্তান হলে আমাদের ঘরে শান্তি আসবে, দেশের সব কিছুতেই উন্নতি হবে। কিন্তু আমাদের ভাগ্য ফেরেনি। সেই আগে যেমন রাস্তা ছিল এখনো তেমনই আছে। কাদায় ডুবে থাকে প্রায় সমস্ত রাস্তা। ঘোড়া আর গরুর গাড়ি চলা ছাড়া এসব রাস্তায় অন্য কিছু চলতে পারেনা। এখন বৃষ্টি নেই, তাই দু’একটা ভ্যান চলে। আমাদের যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিলো সেই স্বপ্ন ছিল এরকম যে, রাস্তাঘাট পাঁকা হবে,ট্রেন চলবে,বাস চলবে,কলকারখানার চাঁকা ঘুরবে। সেই সাথে বাঙ্গালীদের ভাগ্যের চাঁকাও ঘুরবে। পাকিস্তান হলো, কিন্তু বাঙ্গালীদের ভাগ্যের চাঁকা আর ঘুরলোনা। শেখ মুজিব নামে যাকে আজ সবাই বঙ্গবন্ধু বলে চিনি, সেই তিনিই একদিন স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন স্বাধীন পাকিস্তানের। সেই স্বাধীন পাকিস্তান হয়েও যখন বাঙ্গালীদের সুখ আসলোনা, তখন তিনি সত্যটা অনুধাবন করতে পারলেন। আজ সারা দেশে মানুষ সেই সত্য উপলব্ধি করেই স্বাীন বাংলাদেশ গড়ার মিছিলে শামিল হচ্ছে।
পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখানো সেই মানুষটিই এখন স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে তিনি নির্বাচনে জয়ী হয়ে বাঙ্গালীদের স্বপ্ন সত্য করার পথে দুই তৃতীয়াংশ এগিয়ে গেলেও পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী তাকে ক্ষমতায় বসতে দেয়নি। ঠিক এরকম একটা পরিস্থিতিতে গোটা দেশ উত্তপ্ত। সেই সময়ে বাবা মায়ের কথা মত আমি উচ্চ শিক্ষা নিতে ঢাকার পথে রওনা হয়েছি। যেখানে দেশের ভাগ্য নিয়েই দোটানার মধ্যে বসবাস, সেখানে ক্ষুদ্র এই আমি আমার ভাগ্যের কথা চিন্তা করছিনা। নানা চিন্তা আমার মাথায় এসে ভর করছে। যতদিন গ্রামে ছিলাম, এসব চিন্তার কোনটিই আমার মাথায় আসেনি। আজ হাটছি আর মাথার মধ্যে নানা চিন্তা গিজ গিজ করে উঠছে।। ঘন্টা খানেক হাঁটার পর আমি সেই ইটের রাস্তায় পৌছে আলীমুদ্দি নামে এক ভ্যান চালকের ভ্যানে চেপে বসলাম। তাকে আমি চিনি না, কিন্তু অন্যদের ডাকাডাকির কারণে নামটা জানতে পেরেছি। আমার মত কিংবা আমার চেয়ে কিছুটা বয়সে ছোটই হবে সে। কিন্তু তার কর্ম জীবন শুরু হয়েছে আরও দশ বছর আগে। এর মাঝে সে বিয়ে করেছে, আবার দুটো বাচ্চার বাপও হতে পেরেছে। এতো অল্প বয়সে বাপ হওয়া কোন কৃতীত্বের বিষয় নয় বরং সেটা একটা ভীতির কারণ। সন্তাানকে লালন পালন করানো ছাড়াও আরও অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। আমি কারো বাবা নই তারপরও আমি আমার বাবার কথা চিন্তা করেই এটা বুঝতে শিখেছি যে, বাবা হওয়া অনেক কষ্টের ব্যাপার। আমি বাবাকে যখন যা কিনে দিতে বলি বাবা তাই এনে দেয়, অথচ সন্তান হয়ে বুঝতে চেষ্টা করিনা বাবা জিনিসটা কিভাবে এনে দিলেন। তার কাছে কি যথেষ্ট পরিমান টাকা ছিল? তিনি কি খেয়েছেন, নাকি না খেয়ে আছেন। বাবার সুখ দুঃখ আমাদের মত ছেলে মেয়েদের চিন্তাতেও আসেনা। আমি অবশ্য বিভিন্ন বই পড়ে পড়ে বাবা মায়ের কষ্ট অনুভব করতে শিখেছি অনেক আগেই। আমাদের সমাজের অনেকেই সেটা শেখেনা। তারা বরং বাবাকে, মাকে নানা বিষয়ে চাপ দিতে থাকে। সমাজের এই অবক্ষয় শুধু শহরের নামি দামি স্কুলে পড়–য়া ছেলে মেয়েদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এখন তা ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে মহামারি আকারে।
কত বাবা সন্তানের চাহিদা পুরণ করতে না পেরে আত্মগ্লানীতে ভুগে মারা গেছে তা এখন রীতিমত ইতিহাস। আলীমুদ্দি নামের যে ছেলেটির ভ্যানে আমি চেপে বসেছি সে নিশ্চই ইতিমধ্যে বাবা হওয়ার যন্ত্রনা বুঝতে শুরু করেছে। কিন্তু বাবা মা এমনই যে শত কষ্ট হলেও তারা সেটা সন্তানকে বুঝতে দিতে চাননা। আলীমুদ্দিও হয়তো তার গোপন কষ্ট আর ব্যাথা লুকিয়ে রেখেছে। আমাদের হৃদয়টাও এক অচেনা ভুবন। একটাই ঘর অথচ হৃদয় নামের সেই অদ্ভুত ঘরেই বাস করে সুখ দুঃখ হাসি কান্না হতাশা সব। কারো সাথে যেন কারো বিরোধ নেই। যখন যার ইচ্ছে বেরিয়ে আসে। এই হাসায় তো এই কাদিয়ে একাকার করে দিয়ে যায়। আলীমুদ্দির ভ্যানে চেপে বসার সাথে সাথেই আমার গ্রামটাকে আমার কাছে অচেনা মনে হতে লাগলো। আমার চারদিকের সব দৃশ্য আস্তে আস্তে অচেনা হতে শুরু করলো। আর বুকের মধ্যে অজানা ব্যাথা হুহু করে কেঁদে উঠলো। সেই ব্যাথা কি আমার বাবা মায়ের জন্য? আমার গ্রামের জন্য? নাকি আমার খেলার সাথীদের জন্য তা আমি বুঝতে পারলাম না। কিন্তু আমার মনের মধ্যে কেউ একজন বাস করে, যে আমাকে বার বার বলে দিচ্ছিলো যে, এই ব্যাথাটা আমার বাবা মার জন্য এবং সেই সাথে আমার সেই ছোট বেলার সাথী মেঘবালিকাটির জন্য। যার সাথে আসার সময়ও দেখা হয়েছিলো এবং সে অনেক কিছু হয়তো বলতে ইচ্ছে করেছিলো। যে কথা বলা হয়নি সে কথার কোন দাম নেই, যে কথা শোনা হয়নি সে কথাই অমুল্য। আমার ফেলে আসা মেঘবালিকা যে কথা বলতে চেয়েছিল অথচ আমি শুনতে চাইনি তা এখন আমাকে পুড়াচ্ছে। তার অভাব আমি অনুভব করছি। সে চলে যাবার পর থেকে একটু একটু করে আমি অনুভব করতে পারছিলাম যে, আমি ঐ মেয়েটিকে ভালোবেসে ফেলেছি। কিন্তু সেই ভালোবাসার কথা এখন আর তাকে জানাতে পারছিনা। এ আকাশ আমার কথা শুনবে না যে আমি তাকে খবর পাঠাবো। এ বাতাস আমার অচেনা যাকে দিয়ে আমার মনের কথা পাঠিয়ে দেব গ্রামে ফেলে আসা বালিকা বন্ধুর কাছে। এই এতটুকু সময়ের ব্যবধানে আমার স্বপ্ন ডানায় ভর করে উড়ে চলা মন পাখির ডানার রঙ ফিকে হয়ে গেছে। আমি ভাবলাম শহরে পৌছে বাবা মাকে যখন চিঠি লিখবো তখন না হয় তাকেও একখানা লিখবো। সেই চিঠিতে থাকবে অনেক আবেগ, অনেক না বলা কথা। যা আজ একা একাই মনের গহীনে জন্ম নিয়েছে। সেই কথা গুলোও কেবল তাকে নিয়েই গড়ে উঠেছে। ঝাউ বনে দোলা দিয়ে যাওয়া বাতাসের মত আমার মনের আঙ্গিনায় কোন এক রঙ্গিলা বাতাস আমাকে উদাস করে দিচ্ছে। দূর পাহাড়ের সুউচ্চ চূড়া থেকে নিয়ে আসছে স্মৃতির রাশিমালা। একথা ভাবতে ভাবতেই আলীমুদ্দির ভ্যানটি বাস ছাড়ার স্থানে চলে আসে। আর সাথে সাথেই কিছু সময়ের জন্য ক্ষান্ত দিতে হয় আমার প্রিয় ভাবনা গুলিকে।
ভাড়া মিটিয়ে আমি একটা টিকেট কিনে নিজের সিটে গিয়ে বসি। এমন একটা ভাল গাড়িতে এর আগে আমি কখনোই চড়িনি। আমি নীলগঞ্জের মোড়ে দাড়িয়ে ছোট ছোট বাস, টেম্পু এসবই দেখেছি, সাথে কলেজে যাবার সময় এরকম দু’চারটে গাড়িও দেখেছি, কিন্তু এই প্রথম আমি এমন একটা গাড়িতে চড়ে বসলাম। গাড়ির সিটটা সুন্দর। আমার অজানা এই পৃথিবীর নিরানব্বই ভাগ। আস্তে আস্তে আমার সামনে নব দিগন্তের সুচনা হচ্ছে, আর আমি সেটা আমার দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছি। এসব ভাবতে ভাবতেই এক সময় আমার যাবার গাড়িটি ছেড়ে দেয়, আর পিছনে পড়ে থাকে আমার সব পরিচিত মুখ, সব চেনা জানা দৃশ্য। কিন্তু মনটাকেতো আর বেঁেধ রাখা যায়না। আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল, তাহলে মনের গতি কত? মনতো আলোর চেয়ে দ্রুত চলতে পারে। আচ্ছা এই বিষয়টা নিউটন বা আইনস্টাইনের মাথায় আসেনি কেন। অবশ্য এসেছিল কিনা সেটাইবা কে জানে। কোন বিজ্ঞানী কখন কি ভেবে গেছেন তা হয়তো আমাদের কাছে সঠিক ভাবে পৌছেনি, তাই আমরাও জানতে পারিনি সত্যিই তারা মনের এই গতিবেগ নিয়ে আদৌ চিন্তা করেছিল কিনা। মন এমন একটা আশ্চর্য জিনিস ইচ্ছে করলেই যে কোন সময়ে চলে যেতে পারে। মন যেমন অতীতে ফিরে যেতে পারে, আলো সেটা পারেনা। মন হচ্ছে কবিদের ভাষায় অচিন পাখি, যা ধরতে গেলে যায়না ধরা। তাই সে তার নিজের মত করে অনেক কিছু ভাবতে থাকে। ভাবতে থাকে শহরে গিয়ে কিভাবে কি করবে, কোথায় কিভাবে চলবে । সেই সাথে ভাবতে থাকে চলে আসার সময়ে তার সেই প্রিয় বালিকা বন্ধুর মুখটি।
আমার সেই বালিকা বন্ধুটি সামান্য সময়ের ব্যাবধানে আমার মনের মধ্যে ভালোবাসার মানুষে পরিণত হয়েছে। আমি তাকে মনে মনে নাম দিলাম তমালিকা। কারণ সে ছিলো ফুলের মত নরম এবং কোমল। তার হাতের ছোয়া ছিলো প্রজাপতির পাখার মত কোমল। একবার যদি সে চোখ তুলে তাকাতো; তবে তার সেই চাহনীর অপূর্ব সৌন্দর্য পৃথিবীর সব সৌন্দর্য্য বিমলিন করে দিত। যদি একবার সে হাসতো তবে পৃথিবীর সব আলো তার হাসির নিচে চাঁপা পড়ে যেত। তমালিকা আর তরুলতা যাই বলিনা কেন, তাতে তার সৌন্দর্যের তুলনা হয়না। তমালিকা! যদিও এটি তার আসল নাম নয়। বাবা মা তাকে নাম দিয়েছিলো আলেয়া। আলেয়া মানে ভ্রম কিন্তু আমি বলি আলেয়া মানে আলোর প্রদীপ।সে একটি আলোর প্রদীপের মতই। সে তার বাবা মায়ের মনকে আলোকিত করেছে। আবার কেউ কেউ তাই সারা জীবন আলেয়ার বা ভ্রমের পিছনে ছুটে ছুটে ক্লান্ত হয়ে যায়। আমার কাছে অবশ্য এই আলেয়াকে কখনোই ভ্রম মনে হয়নি। গ্রামের সবুজের সাথে মিশে তার রুপ দিন দিন আরো আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। আমরা যখন একসাথে স্কুলে যেতাম তখনই দেখেছি অন্য সব ছেলেরা মেয়েরা ওর দিকে তাকিয়ে থাকতো। যেন মানুষ নয়, কোন হুরপরী দেখছে। তার এই সুন্দর রুপ এতোদিন আমার চোখে ধরা পড়েনি। আমি কেবল তার কন্ঠ শুনেছি। আমি কেবল তার চলার সময় নুপুরের শব্দ শুনেছি। তার কন্ঠ, তার নুপুরের ধ্বনি শুনেই আমি যেখানে মন্ত্রমুগ্ধ, সেখানে তার রুপ দেখার কথা আমার মনে থাকার কথাই নয়।আমি একটা কবিতা পড়েছিলাম ”পা দুখানি দেখতে দেখতে মূখ দেখতে ভুলে গেছি।” কবির নাম মনে নেই। সেই কবির মত স্বভাবতই তাই তার রুপ দেখার কথা আমার মনেই ছিলনা। আর আজ, এই প্রথম আমি তার সত্যিকার সৌন্দর্য্য দেখতে পেলাম। যাও ছিলো ক্ষণিকের জন্য। আমি সেই ক্ষনিকের স্মৃতিকে বুকের মধ্যে ছবির মত এঁেক নিয়েছি। সেই ছবিটি আমি রোজ সকাল সন্ধ্যায় দেখবো। ছবি জিনিসটা খুব অবাক করে দেয়ার মত। কেউ ইচ্ছে করলেই তার জীবনটাকে বেঁধে রাখতে পারে ছবির মাধ্যমে। ছোট বেলা একটা মানুষ দেখতে কেমন ছিল তা সে বড় হলেও দেখতে পারে ছবির মাধ্যমে। ছবি তার বয়সকে বেঁধে রাখে ফ্রেমের মাধ্যমে। আমার মনে এখন নানা ধরনের চিন্তা দেখা দিতে শুরু করেছে। দূর পাল্লার বাসে এর আগে কখনো চড়িনি। আমার পরিধি ছিল দিনাজপুরের ভেতরে সীমাবদ্ধ। মনেও পড়েনা যে, নানা বাড়ি ছাড়া আমি কখনো কোথাও গিয়েছি কিনা। অনেকটা নিজেকে কুপমন্ডুক বলে মনে হয়। যার সীমানা কেবল ছোট্ট কুয়োর জল টুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আর সেই জলাশয়কেই তার মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জলাশয়। বাবা, মা, ভাই, পরিচিত জনকে ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট আমার বুকের এক কোনায় গেঁথে গেছে। বুকের মাঝখানটা আমার প্রিয় গ্রাম আর মেঘবালিকাকে ছেড়ে যাওয়ার কষ্টে নীল হয়ে আছে। আর বাকি পাশটাতে আস্তে আস্তে ভীড় করছে নতুন কিছু জানা ও দেখা অদেখা সুখ। সেই অদেখা সুখ যদি আমার প্রান প্রিয় মা বাবা, গ্রাম কিংবা মেঘবালিকাকে ছেড়ে আসা দুঃখকে ভুলিয়ে দেয়, আমি তখন আর কোন সাধারন মানুষ থাকবোনা।
আমার মমত্ববোধ,ভালবাসা সব একীভূত হয়ে আমি মানুষ থেকে ভিন্ন কিছু হয়ে যাবো। হতে পারে রক্তমাংশের আদলে গড়া কোন মুর্তি কিংবা ভালবাসা, ঘৃণা, ভয়ের উর্ধে থাকা কোন মহাপুরুষ। অথচ আমি এ দ’ুটোর কোনটিই হতে চাইনা। আমি না হতে চাই মহাপুরুষ, না ভীরু কাপুরুষ। স্বাভাবিক যে জীবনে ছন্দ আছে,সুখ আছে,বেদনা আছে, আমি সে জীবনই প্রত্যাশা করি। রবীন্দ্রনাথের নির্ঝরের স্বপ্ন ভঙ্গ যেমন ভালো লাগে তেমনি ভালবাসি নজরুলের বিদ্রোহী।
বাসের জানালা দিয়ে হুহু করে বাতাস আসছে। সেই বাতাসে সামনের সিটে বসা তরুনী বা কুমারী যাই বলিনা কেন তার ঘন কালো চুল উড়ছে। দু’একটা চুল সিটের বাঁধা পেরিয়ে আমার মুখে এসে লাগছেনা তা নয়। মিষ্টি সুবাশ মনকে স্বাভাবিক ভাবেই উতলা করে তোলে। দু একবার সে চুল সরিয়ে দিয়েছি কিন্তু সেই চুলের গোছা বাতাসের সঙ্গী হয়ে বার বার ফিরে আসছে। আমি কোন মহাপুরুষ নই, তাই চুল গুলোকে আর ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছিনা। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই, বাস ছুটে চলেছে দূরন্ত গতিতে। সেই সাথে সদ্য দেখা দৃশ্য পিছনে চলে যাচ্ছে। অদ্ভুত এক দৃশ্য। মনে হচ্ছে আমাদের বাস নয় পাশ থেকে দৃশ্য গুলোই সরে যাচ্ছে। আকাশে যেমন মেঘ ভেসে চলে, মনে হচ্ছে আজ আমিই ভেসে যাচ্ছি। কিছুক্ষণ পর পর আমার মন সত্যি সত্যি খারাপ হয়ে যাচ্ছে ফেলে আসা কিছু মুখ মনে করে। আমি জানি মুখগুলো সব সময়ই আমার চোখের পর্দায় ভেসে থাকবে। আমি কল্পনাতে ফিরে যাই ফেলে আসা সবুজে ছাওয়া গ্রামে। যেখানে আমার মা, বাবা, ভাই,পাড়া প্রতিজন আছে,চির চেনা স্কুল আছে,নদী আছে,আম বাগান,লিচু বাগান আছে, আর আছে আমার শিশুকাল থেকে শুরু করে শৈশবের প্রতিটি দিন একসাথে কাটানো খেলার সাথী, পড়ার সাথী, মেঘবালিকা।
কতক্ষণ এভাবে চলেছে তা আমার জানা নেই। হয়তো ভাবতে ভাবতেই আমি এক সময় ঘুমিয়ে পড়েছি। বাসের হেলপারের হাক ডাকে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। আমি শুনতে পেলাম যে ইতিমধ্যেই আমি ঢাকায় পৌছে গেছি। তাড়াতাড়ি তল্পিতল্পা গুটিয়ে নিয়ে বাস থেকে খোলা আকাশের নিচেয় রাজ পথে নেমে আসি। ভাবতে ভালো লাগে আমি সেই আকাংখিত ঢাকা শহরে চলে এসেছি। শুনেছি যেখানে রাতের আকাশে তারা ঝকমক করুক বা না করুক পুরো শহর থাকে আলো ঝলমলে নানা রঙ্গের আলোক বাতি। আজ আমি এই মুর্হুতে সেই স্বপ্নের শহরে এসে পৌছেছি। স্বপ্নের শহর আমাকে যতই কাছে টানুক তার মোহজালে, তার পরও মনটাতে ভীড় করে আছে সেই সব পুরোনো স্মৃতি। শহরে পৌছানোর পর চারদিক আমার অন্ধকার মনে হতে শুরু করলো। আমার পৌছার খবরটাও ইচ্ছে করলে এখন আমি আমার বাবা মাকে কিংবা প্রিয় সেই মানুষটিকে জানাতে পারছিনা। নতুন এসেছি বলে ঢাকা শহরের কোন কিছুই আমার চেনা জানা নেই। এখানে সেখানে নানা আকারের দোকান-পাট, বাড়ী-ঘর, মস্ত বড় দালান কোটা। একটু পর পরই ছোট বড় নানা আকারের অলি গলি। কোন গলিতে ঢুকলে কোথায় যাওয়া যাবে তার কোন হিসাব নেই। বাবার লেখা চিঠিটার কথা মনে পড়তেই আমি পকেটে হাত দিই। কিন্তু আমার কপালে যে এমন কিছু লেখা আছে আমি তা কোন দিন ভাবতেও পারিনি। আমার কপালে নেমে আসছে চরম দুর্ভোগ, সেটা আমি বুঝতে পারলাম আমার জামার পকেটে হাতটা ঢুকিয়েই। সেখানে বাবার লেখা চিরকুটটির টিকিটিও নেই। আমি মনের ভুলে সেটা পড়ার টেবিলে ফেলে রেখে চলে এসেছি। মা যখন ঘর গুছাতে যাবে তখন ওটা চোখে পড়বে এবং আমার পরিণতির কথা ভেবে আকাশ ফাটানো বিলাপ করতে থাকবে। বাবা হয়তো মাকে শান্তনা দেবার জন্য বলবে কাঁদছো কেন সালেহা! তোমার ছেলেকি আর সেই আগের মত ছোট আছে যে সে হারিয়ে যাবে? কিন্তু আমিতো জানি আমার মা বিনা কারণে কাঁদছে না। তার মনের মধ্যে যে ভয় ঢুকেছে তার কোনটিই মিথ্যা নয়। আমি যে, যে কোন সময় হারিয়ে যেতে পারি তা বলাই বাহুল্য। শুধু এতটুকু ভরসা যে আমি লেখাপড়া জানা তরতাজা তরুন। ফলে যে কারো কাছে জেনে নিতে পারবো কোথাও যাওয়ার আসল রাস্তা কোনটি। কিন্তু আসল সমস্যা হলো এই ঢাকা শহরে আমি এক অচেনা যুবক, যাব কোথায়? থাকবইবা কোথায়?
বাস ঢাকাতে পৌছে যে জায়গাতে থেমেছে, একজনকে জিজ্ঞেস করে জেনেছি জায়গাটার নাম গাবতলী। গন্তব্যহীন ভাবে আমি হাটতে শুরু করলাম। হাটতে হাটতে এক সময় আমি অনেকটা দূরে চলে আসলাম এবং একটি খোলা মাঠের পাশে গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিতে ইচ্ছে পোষন করলাম। শহরে এই জায়গাতে এতো বড় মাঠ কিভাবে থাকে তা আমি ভাবতে পালছিলামনা। পরে জানলাম ওটা একটা কলেজ মাঠ আর কলেজটির নাম বাংলা কলেজ। যে ভাষার জন্য বায়ান্নতে রাজপথ কাপিয়ে মিছিল উঠেছিল। আমাদের পূর্বসুরীরা বিলিয়েছিল বুকের তাজা রক্ত। সেই বাঙলাকে মিশিয়ে একটি কলেজ থাকতে পারে তা ছিল আমার কল্পনাতীত। কলেজের নাম শুনে আমার মনে হলো এই কলেজে শুধু মাত্র বাংলাই পড়ানো হয়। মনে মনে খুশিই হলাম যে, আমাদের দেশে একটা বাংলা শেখার মত কলেজও আছে। কিন্তু ভাবনাটা আবার সরিয়ে নিলাম। বাংলাতো আমাদের মাতৃভাষা, তাহলে সেটা শিখার জন্য কলেজ লাগবে কেন? প্রথমবার ঢাকায় আসা বলেই আমার মধ্যে এতো কৌতুহল আর এতো ভ্রান্ত ধারনা বিরাজ করছিলো। একসময় প্রায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলো। কিন্তু আমি আমার কোন গন্তব্য নির্ধারণ করতে পারলাম না। শেষে সিদ্ধান্ত নিলাম কোন একটা মসজিদে গিয়ে রাত কাটাবো। ধর্মীয় উপাসনালয়গুলো মানুষের নিরাপদতম স্থান। সৃষ্টি কর্তাকে ডাকার জন্য কোন স্থান কাল প্রয়োজন হয়না কিন্তু একনিষ্ঠ ভাবে ডাকতে হলে ধর্মীয় উপাসনালয় দরকার। আমি যদি সেই শান্তিময় স্থানে আশ্রয় নিই তাহলে আমার মনের ভয়গুলো দূর হয়ে যাবে। এই ভাবনাকে মনে প্রশ্রয় দিয়ে আমি আশেপাশে একটা মসজিদ খুঁজতে লাগলাম এবং কিছুক্ষণ খোঁজা খুঁিজর পর একটা মানান সই মসজিদ পেয়েও গেলাম। অন্তত আজকের রাতটাতো কাটানো যাবে ভেবে মনের মধ্যে একটু শান্তি অনুভব করলাম।
মাগরিবের নামাজ পড়ে অপেক্ষায় থাকলাম কখন এশার নামাজের সময় হয়। কেননা এশার নামাজ শেষ হলেই কেবল মসজিদ ফাঁকা হবে। আর তখন মসজিদে আমি ঘুমতে পারবো। আমার অপেক্ষার পালা যেন আর ফুরোতেই চায়না। ওদিকে আজ কেন যেন আকাশে মেঘ জমেছে। থেকে থেকে ডেকে উঠছে অজানা অক্রোশে। আকাশে চাঁদ নেই ,তারা নেই। প্রগাড় অন্ধকারে তলিয়ে গেছে সমস্ত পৃথিবী। আমি অপেক্ষা করতে থাকি মুছল্লিদের ফিরে যাওয়া পর্যন্ত। শেষে সেই কাংক্ষিত সময়টি আসলো এবং আস্তে আস্তে মসজিদ ফাঁকা হতে লাগলো। নানা চিন্তায় আমার ক্ষুধা মরে গেছে। মনেই হয়নি আমি সারাদিন প্রায় অভুক্ত ছিলাম। এরপর একটু একটু করে ক্ষুধা অনুভব করতে শুরু করলাম। বাড়ি থেকে আসার সময় মা যতœ করে ব্যাগের মধ্যে চিড়ে নাড়– ভরে দিয়েছেন। আমি মনে মনে ভাবলাম আজকের রাতটা চিড়ে আর নাড়– খেয়েই কাটিয়ে দেব। সবাই যখন মসজিদ ছেড়ে চলে গেলো, আমি তখন ব্যাগ থেকে একটা কাথা বের করে সেটাকে পেচিয়ে বালিশ বানিয়ে মাথার নিচেয় দিয়ে শুয়ে পড়লাম। আমি এখন অনেক নিরাপদ। রাত পার হলেই ঝকঝকা সকাল। তখন কিছু একটা করতে পারবো ভেবেই আনন্দ হচ্ছিল। যদিও বাবা মায়ের কথা খুব মনে পড়ছিল। কিন্তু বিপদ যার পিছু নেয় তার সামনে পিছনে কোথাও কোন আলো থাকেনা। কিছুক্ষণ পরই আমি আবিষ্কার করলাম একটা লোক আমার মাথার কাছে এসে দাড়িয়ে রাগী রাগী কন্ঠে বলছে এই তুমি কে? এখানে ঘুমচ্ছো কেন? আমি বললাম, আমি গ্রাম থেকে এসেছি, আমার কোন থাকার যায়গা নেই বলে আজ রাতটা আমি এখানেই কাটাতে চাই। আমার কথা শুনে লোকটি আরও রেগে উঠলো
‘বলি এটাকি তোমার বাপের তালুক নাকি যে তুমি এখানে রাত কাটাতে চাও’ বলেই লোকটি হেকে উঠলো। আমি ব্যাপারটা বুঝতে পারলামনা। এতে সমস্যা কোথায়? একটা বিপদাপন্ন মানুষ মসজিদে একটা রাত কাটাতে চায় তাতে তো কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু এ লোকটা কী অসভ্যের মত কথা বলছে! আমি বললাম আপনি আমার সাথে এতো খারাপ ব্যাবহার করছেন কেন? মসজিদতো আল্লাহর ঘর, এখানে তার বান্দারা রাত কাটাতেই পারে। লোকটা তখন অগ্নি মুর্তি ধারণ করলো এবং আমাকে প্রায় জোর করেই বসা থেকে উঠতে বাধ্য করলো। শেষে নিজ হাতে আমার ব্যাগটা নিয়ে মসজিদ থেকে ছুড়ে ফেললো। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সম্ভবত এসব কারণেই বিদ্রোহী হতে বাধ্য হয়েছিলেন। তার কলমে এমনি এমনি লেখা হয়নি
“তব মসজিদ মন্দিরে খোদা
নাই মানুষের দাবি
মোল্লা পুরুত লাগিয়েছে তার
সকল দুয়ারে চাবি।”
আমার জায়গায় নজরুল থাকলে জানিনা এই লোকটার নাকটা জায়গামত থাকতো কিনা। লোকটা কেবল আমার সাথে রাগত স্বরে কথা বলেই ক্ষান্ত হয়নি সে বরং আমার ব্যাগটাও ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। আমি গ্রাম থেকে এসেছি বলেই নয়, আমি বাবা মায়ের বাধ্য সন্তান, তাই লোকটাকে তেমন কিছু বলিনি। কিন্তু এতেই ঘটনা থেমে থাকলোনা। সে আমার বুকেও কয়েকবার ধাক্কা দিলো। আমার ইচ্ছে হচ্ছিলো লোকটাকে আচ্ছা রাম ধোলাই দিই কিন্তু ইচ্ছেটাকে দমিয়ে রেখেই আমি আবার আমার যুক্তি দাড় করানোর বৃথা চেষ্টা করতে লাগলাম। লোকটার চিৎকার চেচামেচিতে আশ পাশের আরও অনেক লোক এসে হাজির হলো। তারা আমার কাছে অনেক কিছু জানতে চাইলে আমি তাদেরকে আমার সব কথা খুলে বললাম। কিন্তু কেউ আমার প্রতি সমবেদনা জানানোর কোন ইচ্ছেই প্রকাশ করলোনা। তারা কেবল আহ বেচারা! বলেই ক্ষান্ত দিলো। ঢাকায় নেমে ঠিকানা হারিয়ে আমি যতটানা আহত হয়েছিলাম তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যথিত মর্মাহত হলাম যখন দেখলাম আমার কথা শোনার পরও কেউ আমার প্রতি সমবেদনা দেখাতে এগিয়ে আসলোনা। গ্রাম আর শহরের মধ্যে যে আকাশ পাতাল পার্থক্য তা আমি বুঝতে শুরু করলাম। গ্রামে কেউ কাউকে চিনুক বা না চিনুক একের বিপদে অন্যে ঠিকই এগিয়ে আসে। আর শহরে কেউ বিপদে পড়লে অন্যরা তা দেখতে আনন্দ পায়। আমি হতাশায় নুইয়ে পড়িনি। ভেবেছি দেখি কি করা যায়। কেউ যখন আমার পক্ষে কথা বললো না তখন কেবল একটি অর্ধ বয়স্ক ছেলে আমার কথা শুনে আমার কাছে এগিয়ে এসে বললো তুমি দিনাজপুর থেকে এসেছো? তোমার বাবার নাম অমুক এবং তুমি অমুক গ্রামের বাসিন্দা? আমি তার কথার ঠিক ঠিক জবাব দিলাম এবং অবাক হলাম যে, এই লোকটাকে আমি চিনিনা কিন্তু সে আমার অনেক কিছুই জানে। লোকটি আমার কাঁেধ হাত রেখে বললো, আমি তোমার বাবার বন্ধুর ছেলে। তোমার বাবা আমাকে অনেক দিন আগেই চিঠিতে জানিয়েছিলো যে, তুমি সেপ্টেম্বর মাসের সতের তারিখে ঢাকায় আসবে। আমার বাবা তোমার বাবার খুব ভালো বন্ধু। আমার বাবাও আমাকে চিঠিতে তোমার কথা জানিয়েছিলো। আজ আমি সকাল থেকেই গাবতলী বাস স্ট্যান্ডে তোমার অপেক্ষায় বসে ছিলাম কিন্তু তোমার কোন খোঁজ না পেয়ে ফিরে এসেছি। আসলে পথওতো কম নয়। দিনাজপুর থেকে সোজা আসার কোন পথও নেই। রাজশাহী নাটোর হয়ে সিরাজগঞ্জ এসে থেমে যেতে হয়েছে। তার পর নদী পার হয়ে আসতে আসতে হয়তো তোমার দেরি হয়েগেছে। আর আমিও তোমাকে না পেয়ে ফিরে চলে এসেছি। আমি তার কথা শুনে লজ্জা পেলাম। স্থানীয় সবাইকে বলে আমার হয়ে ক্ষমা চেয়ে সে আমাকে তার বাসায় নিয়ে গেলো। সে যে আমার হয়ে এতো গুলো লোকের সামনে ক্ষমা চাইলো বিষয়টি আমাকে আরও লজ্জায় ফেলে দিলো। অথচ আমি মোটেই তার এই ক্ষমা চাওয়াটাকে পছন্দ করলামনা। আমিতো কোন অন্যায় করিনি। আমি সত্য কথাটাই কেবল বলেছি। আমার বাবার বন্ধুর ছেলে আমাকে বুঝিয়েছেন যে, এখানে সত্য কথাটা বলে কোন লাভ নেই। যা আমি কয়েকটা দিন যেতে না যেতেই টের পেয়েছি।
বাবার বন্ধুর এই ছেলেটির নাম রাসেল। আমার একটা কাজিনের নামও রাসেল। রাসেল ভাই বাঙলা কলেজে অনার্স পড়ছেন। তার পঠিত বিষয় অর্থনীতি। আর এক বছর হলেই তার পড়ালেখা শেষ হবে। তখন হয়তো কোন একটা চাকরীতে ঢুকবেন। কিন্তু আমি শুনেছি তিনি রাজনীতিতে জড়িত। দেশের পরিস্থিতি এখন ভালোনা বলে বাবা মা আমাকে বার বার বলেছে “সাবধান বাবা! তুমি ওসবের ভিতরে জড়াবেনা কিন্তু।” ওসব বলতে বাবা মা আমাকে কি বলতে চেয়েছেন তা আমি বুঝতে পারিনি। সময়টা এখন ১৯৭০ সালের শেষের দিকে। মাত্র এক বছরও হয়নি আসাদ নামে এক বাঙ্গালী অধিকারের কথা বলতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে মারা গেছেন। যে জীবন দিয়ে গেছে তার পরিবার কতইনা কষ্টে আছে। আর যারা জীবন কেড়ে নেয় তারা মানুষ না অমানুষ তা বুঝে উঠতে পারিনি। আসাদের মৃত্যুতে এদেশের মানুষ অনেক কিছু বুঝতে শিখে গেছে। আসাদের মৃত্যুর সেই ঘটনা সবাই কম বেশি জানে। দেশটাতে তাই এখনও চলছে বিভিন্ন রকম মিছিল মিটিং সমাবেশ। সবার মুখে মুখে একটাই কথা আর তা হলো স্বাধীনতা। আমাদের এই সুন্দর দেশটাকে পাকিস্তানীরা দীর্ঘ দিন ধরে শাসন করে আসছে। আর আজ তা হয়ে উঠেছে চরম শোষন নির্যাতনের ভিন্ন এক রুপ। বাঙ্গালীরা তাই অকপটে ঘোষণা করেছে আমরা স্বাধীনতা চাই। সেই দলে মিশে যেতে আমারও ইচ্ছে করছে।
ঢাকায় পৌছার পর প্রথম দিনেই ঠিকানা বিহীন হয়ে পড়তে হলো এক চরম বিপদে। কোন রুপ চিন্তা ভাবনা না করেই মসজিদে থাকার চিন্তা করে আরেক বিপদ এসে মাথায় চাপতে বসেছিলো। রাতের খাবার খেতে খেতে রাসেল ভাইকে আমার ঢাকা আসার ঘটনাটা বললাম এবং ঠিকানা ফেলে রেখে আসার কারণে তিনি আমাকে ভর্ৎসনা করলেন। অবশ্য আমি এই ভর্ৎসনাটা পাবার যোগ্য কাজই করে এসেছি। উচ্চ শিক্ষার জন্য যে ছেলে শহরের এসেছে তার আরও বেশি সচেতন হওয়া উচিত ছিল। যেন তেন ভাবে ঠিকানা লেখা চিঠিটা ফেলে আসা তার জন্য মুর্খতার পরিচয় দেয়ার নামান্তর। আমিও তাই করেছি এবং নিজেকে অযোগ্য মুর্খ বলে পরিচয় দিয়েছি। আল্লাহর অশেষ রহমত তাই তিনি আমার সাথে রাসেল ভাইয়ের সাক্ষাত ঘটিয়েছেন। প্রথম দেখাতেই আমি বুঝতে পেরেছি এই রাসেল ভাই নামের মানুষটা সত্যিকার অর্থে অসাধারণ। তিনি আমার সব কথা শুনে আমাকে শান্তনা দিয়ে বললেন ক’টা দিন গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। আমিও মনে মনে তাই চাইলাম। এই অচেনা অজানা শহর মায়া ভরা আর এখানে চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানা রকম বিপদ। এই সব অনাহুত বিপদ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে চাই আরো বেশি সচেতনতা, আরও বেশি বুদ্ধি।
রাতে খাবার খেয়ে ঘুমোতে যাবার আগেই বাবা মাকে একটা চিঠি লিখলাম। সাথে আমার খেলার সাথী সেই বালিকা বন্ধুটি যে আজ আমার ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে তাকেও একটা চিঠি লিখলাম। বাড়ী থেকে সাথে করে নিয়ে আসা ডায়রীতে প্রতিদিনের কথামালা লিখে রাখতে শুরু করলাম। পরদিন সকালে রাশেদ ভাই বাসার সবার সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন।
অন্ধকারের পিছনেই আলো থাকে। এই কথাটা আমি বইয়ে পড়েছি। বাবা, মা, শিক্ষক, গুরুজন সবার মুখেই শুনে এসেছি। আমার নিজের জীবনটাও এখন এক আলো আধারির খেলা। উচ্চশিক্ষার আশায় বাবা, মা, ভাই সবাইকে ফেলে রেখে চলে এসেছি ঢাকাতে। এই ঢাকা আজ উত্তাল মিছিলের নগরী। এখানে থেকে থেকে মিছিলের আওয়াজে পুরো এলাকা প্রকম্পিত হচ্ছে। রাস্তা ঘাট, চায়ের দোকানের আড্ডায়,রাস্তার মোড়ে মোড়ে সবার মুখেই একটি কথা,বেঁেচ থাকার আনন্দ ফিরে পাওয়া। আর সেই আনন্দ ফিরে পাওয়ার জন্য যে কোন ত্যাগের নিমিত্তে প্রস্তুত হওয়া। একটা কিছু পেতে হলে একটা কিছুর মায়া ত্যাগ করতেই হয়। এটা এতদিন আমি বুঝতে পারতাম না। আজ আমি হাড়ে হাড়ে সেটা টের পাচ্ছি। আমার এবং বাবা মায়ের স্বপ্নটাকে পূরণ করতে এসে আমাকেও ত্যাগ স্বীকার করতে হচ্ছে। দূরে থাকার কষ্টটা বুকে চেপে রাখতে হচ্ছে। সেই সাথে একটা চির চেনা হাসি মুখ। যার সাথে রোজ আমার দেখা হতো, কথা হতো, সেই ছোট বেলা থেকে মাত্র কিছুদিন আগ পর্যন্তও। এখন সে সম্পূর্ণ একাকী। নাকি তাকে ছেড়ে আসার পর সেও আমাকে ভুলে গিয়ে অন্য কাউকে খেলার সাথী,খুনসুটির সাথী করে নিয়েছে তা আমি কল্পনা করতে পারিনা। আমার চারদিকে কেবল হতাশা এসে ভর করছে। একবার ইচ্ছে হচ্ছে সব ছেড়ে ছুড়ে গ্রামের সেই মেঠো পথে বেনী দুলিয়ে হেসে খেলে বেড়ানো বালিকার সান্নিধ্যে চলে যাই। যেখানে আমার প্রানাধিক প্রিয় মা আছে, আরো আছে আমার বাবা সহ অতি আপন পরিচিত জন। এই চিন্তাটা করার সাথে সাথেই আমার মনটা ভাল হয়ে যায়। আবার জানালা দিয়ে যখন দেখি একটা মিছিল যাচ্ছে, মুখে অধিকারের ঝাঝালো শ্লোগান। তখন ইচ্ছে করে, না আর বাড়ী গিয়ে কি হবে তার চেয়ে বরং এই দলে মিশে যাই। কোনটা যে আমার করা উচিত তা আমি বুঝে উঠতে পারিনা।
প্রতিদিন এমন করেই কাটতে থাকে আমার। সেই সাথে ফুরাতে থাকে আমার ডায়রীর পাতা। আমি লিখছিতো লিখছিই। এই লেখা কবে শেষ হবে তা আমি জানিনা। লিখতে আমার মোটেও ভাল লাগতো না। কিন্তু এখানে এসে নেই কোন খেলার সাথী,পাড়ার সাথী, কিংবা না কোন ভালো বই, যা পড়ে সময় কাটিয়ে দেয়া যাবে। তাই ডায়েরী লেখাটাকেই আপন ভাবতে বাধ্য হয়েছি এক প্রকার নিজের ইচ্ছের বাইরেই। আর সেই যে লিখতে শুরু করেছি, এখন আর ভাবতে হয়না কি নিয়ে লিখবো। এই হয়তো লিখছি আমার গ্রামের কথা, পরক্ষণেই মিছিলের আওয়াজ কানে ভেসে আসায় লেখা বাঁক নিয়ে ঘুরে যাচ্ছে অন্য দিকে। যখন রাত অনেক হয় তখনও আমার লিখতে অসুবিধা হয়না। গ্রামে থাকতে এশার নামাজ শেষে খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়া ছাড়া আর কোন কাজ থাকতোনা। সন্ধ্যা হতে না হতেই আমরা নিশ্চুপ হয়ে ঘুমের দেশে হারিয়ে যেতাম। প্রথম প্রথম এখানে এসে বিদ্যুতের আলোতে খুব সমস্যা হচ্ছিল। সব কিছু কেমন অন্যরকম লাগছিল। এখন সব কিছু চোখে সয়ে গেছে। মাও এই কথাটা বলতেন যে, দেখিস শহরে গেলে তোর গ্রামের কথা একদমই মনে থাকবেনা। আমি বলতাম কি যে বলোনা মা। আমি কোন দিনও গ্রামের কথা ভুলবোনা। সত্যিই আমি ভুলিনি। আর ভুলে যাওয়ার কোন সম্ভাবনাও নেই।
২.
মিছিলে মিছিলে প্রকম্পিত গোটা নগরী। ১৬১০ সালে যে ঢাকা রাজধানী হিসেবে গোড়াপত্তন হয়েছিল সেই ঢাকা আজ থেকে থেকে কেঁপে উঠছে। ঢাকা শহরের প্রাণ কেন্দ্রে অবস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আমার স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান। হয়তো পরিস্থিতিগত কারণেই অনেকে এখানে ভর্তির সুযোগ থাকার পরও ভর্তি না হয়ে গ্রামের কোন কলেজে ভর্তি হয়েছে। আবার যাদের টাকার কোন অভাব নেই তারা বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। আমার এ দুটোর কোনটিই ভাগ্যে লেখা নেই। সাধারন একটা ঘরের ছেলে হওয়ায় আমার পরিবারের পক্ষে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশ পাঠানোর কোন সামর্থই আমার বাবার নেই। আর এলাকার কলেজে পড়াও বাবা বা আমার কারোই পছন্দ নয়। দেশে থেকে পড়তে হলে সেরা বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়া উচিত। আর তাই সেই সুযোগটা আমি নিমিষেই পেয়ে গিয়েছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে নিজেকে এই উত্তাল শহরের সাথে দিন দিন মানিয়ে নিতে শুরু করলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি খুব একটা ভাল নয়। ছাত্ররা প্রতিদিনই মাথায় ফেস্টুন বেঁধে বিভিন্ন দাবিতে মিছিল করছে। বাড়ী থেকে আসার সময় বাবা মা আমাকে অনেক করে বুঝিয়ে বলেছেন “সাবধান বাবা তুই কিন্তু কোন মিছিল মিটিংএর মধ্যে যাবিনা। ওসব করার আরো অনেক মানুষ আছে । তোর কাজ শুধু লেখা পড়া করা।” আমিও আমার বাবা মায়ের কথা মেনে চলার চেষ্টা করতে থাকি। কিন্তু একটা চিন্তা আমার মাথায় সারাক্ষণই ঘুরপাক খেতে থাকে, আর তা হলো, আমার বাবা মা আমাকে যেমন বলেছেন যে, মিছিল মিটিংএ যাবিনা ও সব করার জন্য আরো লোক আছে । সেই লোক গুলো কারা? তারা যখন আমার মতো বাড়ী থেকে এসেছে, তাদের বাবা মা কি আমার বাবা মায়ের মতো করে মিছিল মিটিং থেকে দূরে থাকতে বলেন নি? নাকি বলেছেন লেখা পড়া তোর জন্য নয় শুধু মিছিল মিটিং করে বেড়াবি। লেখা পড়া করার জন্য আরো মানুষ আছে। প্রশ্ন গুলো আমি আমার মতো করে আমাকেই করি। আবার আমিই এর কোন না কোন উত্তর বের করে ফেলি। হয়তো কোনটা নিজের কাছে মনঃপুত হয় আবার কোনটা মনঃপুত হয়না। আমি খুব চেষ্টা করছি হলে একটা সিট পেতে। যদি কোন ভাবে একটা সিটের ব্যবস্থা হয় তাহলে আর রাসেল ভাইয়ের ঘাড়ের ওপর বসে তাকে এমন করে জ্বালাতন করতে হবেনা। দরখাস্তু করেছি হলে সিটের জন্য কিন্তু সেখান থেকে বলা হয়েছে সিট পেতে একটু দেরি হবে। আমি সেই দেরিটা কত দিনের তা অনুমান করতে থাকি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্তরের স্বাদ এখনো নিতে পারিনি। ক্লাস মোটামুটি অনিয়মিত বললেই বলা চলে। তার পরও আমি চেষ্টা করি ক্যাম্পাসে নিয়মিত হাজির হতে। বলতে দ্বিধা নেই যে, বাবা, মা বলার পরও মিছিল মিটিং আমার মোটামুটি ভালই লাগে। আমি অবশ্য এখনও কোন মিছিলে যাইনি। এরই মাঝে আমি অনেকগুলো বন্ধুও বানিয়ে ফেলেছি। তাদের অনেকেই আবার এই মিছিল মিটিং এর সাথে সরাসরি জড়িত। তাদের দিকে তাকালে আমার বুকটা আনন্দে ভরে ওঠে। এই ছেলেগুলো শুধু নিজেদের কথা ভাবেনা। এরা ভাবে আমাদের কথা, আমাদের এই দেশের কথা। এরা আমার বন্ধু ভাবতেই নিজের মনে খুব ভাল লাগে। এরাই বোধহয় সোনার ছেলে। এখনও আমরা একটা স্বাধীন দেশ আলাদা করে কাছে পাইনি। এখনও আমাদের ভালবাসার ভূবনে পতপত করে ওড়ে চাঁদ তারা খচিত পতাকা। পতাকার আর কি দোষ! দোষতো সেই পতাকার ধারক ও বাহকদের। তাদের কারণেই পতাকা হয়ে ওঠে আমাদের চোখের বিষ। ১৯৪৫ সালে যে পতাকাটা আমাদেরই পূর্বপুরুষেরা ছিনিয়ে এনেছিল, সেই পতাকাই আজ আমাদের চোখের বিষ হয়ে উঠেছে। আসলে পতাকা কারো চোখের বিষ হয়না বরং চোখের বিষ হয় সেই পতাকার ধারক ও বাহকেরা। তারা অন্যায় অত্যাচারে চারদিক বিভিষিকাময় করে তুলেছে। নিরিহ বাঙ্গালীদেরকে ইতিপূর্বে জোর করে মাতৃভাষা বাংলা বলা থেকে দুরে রাখতে চেয়েছিল কিন্তু তা তারা পারেনি। বাঙ্গালীরা জানতো মাতৃভাষায় কথা না বলা মানে আপন মাকেই ভুলে যাওয়া। তারা তা মেনে নেয়নি। বুকের রক্ত দিয়ে তাই প্রতিষ্ঠিত করেছে মাতৃভাষার দাবী। বাধ্য হয়ে দুরাচারীরা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করে নিয়েছে। সেই শুরু, এখনো থামেনি শয়তানদের অত্যাচার। তারা এখন পুরো বাঙ্গালীদের দাবিয়ে রাখতে চায়। গোলাম বানিয়ে কাজ হাসিল করতে চায়। আমি খুব কাছ থেকে দেখছি বাঙ্গালীরা অত বোকা নয়। তারা আবারও মাথা উচু করে বাঁচার স্বপ্ন নিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আমি জানি তাদের বিজয় আসবেই। হয়তো সে জন্য দিতে হতে পারে অনেক রক্ত অনেক আত্মহুতি।
মনে মনে আমিও নিজেকে প্রস্তুত করে নিচ্ছি। প্রয়োজনে আমাকেও যে যেতে হবে। কোন একটা কাজে আমি বাইরে গিয়েছিলাম। এখানে সেখানে শুধু মানুষ আর মানুষ। যে যেমন করে পারছে ইয়াহিয়ার মুন্ডুপাত করছে। করবেনা! সেইতো সব ঘটনার হোতা। আমারও ইচ্ছে হয় সামনে পেলে বেটাকে জুতাপেটা করি। সেই সৌভাগ্য আমার কোন দিন হবেওনা । সারাদিন এখানে ওখানে ঘুরে সন্ধ্যায় যখন বাসায় ফিরেছি তখন দেখি রাসেল ভাই আমার ডায়রিটা খুব মন দিয়ে পড়ছেন। আমি এতে একটুও অবাক হইনি। এটা সেরকম কোন ডায়রি নয় যে, যে কেউ এটা পড়তে পারবেনা। এটা আমার একান্ত গোপনীয় ডায়রি হলেও এতে আমার দেশ প্রেম এবং মমত্ববোধের সবকিছুই জাগরুক আছে। আমার ডায়রিটা পড়ে রাশেদ ভাইয়ের চোখ আরও জ্বলজ্বল করে উঠলো। তিনি আনন্দে আত্মহারা হবার মতই বলে উঠলেন আমরা স্বাধীনতা পাবই। আমি জিজ্ঞেস করলাম আমরা স্বাধীনতা পাব এ কথা ঠিক, কিন্তু আপনি সেটা আগেভাগেই বলছেন কিভাবে? তিনি তেমন কিছুই বললেন না। শুধু ডায়রিটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, এতে সব লেখা আছে। সে কথা যে বিফলে যাবার নয়। আমি তখন আমার ডায়রিটা নিয়েই মনে মনে নিজের কাছে গর্ব বোধ করলাম। রাসেল ভাই আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, তুমি অবশ্যই আমাদের সারির সামনে থাকবে। এমন একটা মহৎ কাজের সামনের সারিতে জায়গা পাওয়াও ভাগ্যের ব্যাপার। আমি মনে মনে একপ্রকার রাজি হয়েই থাকলাম। এর ঠিক পনের দিনের মাথায় হলে আমার সিট পাকা হয়ে গেল।
মানুষের এক জীবনে কত দৃঃখ কত আনন্দ পাশাপাশি বসবাস করে। এই সুখ তো এই দুঃখ। আমার জীবনটাও তেমন। গত দিনও যেখানে আমার থাকার যায়গা ছিলনা আর এখন আমি দিব্যি হলে সিট পেয়ে গেলাম। আমি সেই অবস্থাতেই হলে উঠে পড়লাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলে আমার সিট হল। নীল ক্ষেতের মোড়েই ইকবাল হল। হল জীবন আমার ভালই কাটছিল।হলে উঠেই বাবাকে চিটি লিখলাম যে, আমি হলে সিট পেয়েছি। কয়দিন যেতে না যেতেই বাবার চিঠি আসলো এবং তিনি লিখেছেন যে, রাসেল ভাই তাকে আগেই চিঠিতে জানিয়েছে যে, আমি হলে উঠে গেছি। হলে উঠে বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের অনেকের সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেল। হল জীবন নানা বৈচিত্রে পরিপূর্ন থাকে। সেই বৈচিত্রের মাঝে আরো বেশি রং ঢেলে দিয়েছে দেশের এই পরিস্থিতি। আমি আমার ডায়রিতে যা লিখে রাখছি তা আমার নিজের মত করে লিখছি। বাবা মায়ের স্বপ্ন আর নিজের স্বপ্ন এক করে এখানে এসেছি উচ্চ শিক্ষা নিতে। উচ্চ শিক্ষা নেওয়ার তাগিদের চেয়ে এখন বরং ঐ সব মানুষের কাতারে মিশে যেতে বেশি ইচ্ছে করছে, যারা বুক চিতিয়ে ঝাঝালো শ্লোগানে শ্লোগানে বাংলার রাজপথ উত্তাল করে তুলেছে। সেই মানুষের সারিতে আমি আছি কি নেই সেটাই এখন আমার মাথায় বার বার ঘুরপাক খাচ্ছে। আমার পাশে এখন কেউ নেই। হলের ১১ নাম্বার রুমে একটা বড় ভাইকে ধরে জায়গা করে নিয়েছি। তবে ঘুমোনোর সময় অবশ্যই আমাকে তার মশাড়ী টাঙ্গিয়ে দিতে হবে। গোসলের সময় তার কাপড় ধুয়ে দিতে হবে। মনকে শান্তনা দিয়েছি, একটু মাথা গোজার ঠাই পাওয়ার বিনীময়ে এই সামান্য কাজ করে দেয়া কোন কষ্টেরই না। নিজের কাপড় ধুতে পারলে তার সাথে অতিরিক্ত একটা কাপড় ধোয়া কষ্টের কিছু নয়। রাতে নিজে ঘুমোতে গেলে মশাড়ি টাঙ্গাতে পারলে অন্যের সাথে সেটা টাঙ্গানো কোন কষ্টের কাজ নয়। আমার রাতটা কাটে কোন মত কিন্তু দিন আসলেই শুরু হয় যন্ত্রনা। আমি আমার মনকে প্রবোধ দিতে পারিনা।
সময়টা বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন সময়। বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন স্বাধীনতা। সেই স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে পাকিস্তানীরা। বাঙ্গালীরা মাথা উচু করে কাঁধে কাঁধ রেখে দাড়িয়েছে। স্বাধীনতা আসবেই। আমি বরাবরই ইতিহাসের পোঁকা ছিলাম। ইতিহাস আমার ভাল লাগতো। সেটা যদি হয় নিজের দেশের ইতিহাস, নিজের সমসাময়িক ইতিহাস, তবে আমারও ইচ্ছে হয় সেই ইতিহাসে ঢুকে পড়ি। দেশের এই পরিস্থিতিতে আমাদের ক্লাস শুরু হচ্ছেনা। যেখানে গোটা বাঙ্গালী জাতির অস্বিত্ত্বের প্রশ্ন সেখানে সামান্য ক্লাস নিয়ে আমার মাথা ঘামানো উচিত হয়নি। কেবল মাত্র পরিচিতি ক্লাসটা হয়েছিল। সেদিন সেই ক্লাসে যে স্যার বক্তব্য দিয়েছিলেন তার নামটাও জানা হয়নি। তবে তার বক্তব্যের পুরোটাই অন্তরে গেথে গিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, সামান্য ক্লাস নিয়ে চিন্তা করে কি লাভ! যদি পুরো দেশটাই না থাকে। এখন আমাদের চিন্তা চেতনা হওয়া উচিত কেবল মাত্র প্রিয় দেশকে নিয়ে। এই দেশটা স্বাধীন হলে আমাদের ক্লাস হবে আনন্দপুর্ন।” আমিও তাই স্বাধীনতার কথাই মনে প্রানে আওড়াতে থাকি। প্রতিদিন সকাল বিকাল মিছিল মিটিং চলছেই। এর মাঝে ইকবাল হলের কয়েকজনের সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেল। আজমল, কবির,জুবায়ের ,আরিফ এবং বিশেষ করে আশরাফের কথা লিখতেই হচ্ছে। ওরা আমাকে আপন করে নিয়েছে। ওরা আমাকে দেশের কথা বলেছে, দেশের মানুষের সুখ দুঃখের কথা বলেছে। বলেছে ওরা কী করতে চায় তার সবটাই। বিনিময়ে চেয়েছে আমার সহযোগিতা এবং পাশে থাকার অঙ্গীকার। কথা গুলো আমার মনের মতই ছিল। আমি ওদের সাথে একমত হলাম। পড়ালেখার কথা একদম ভুলে গেলাম।
বাবা মা ভাই বা আমার নিজের স্বপ্ন কি তা নিয়ে আর ভাবার সময় নেই। এখন সবাইকে নিয়েই ভাবতে হবে। সবাই বলা বলি করছিল দেশে ভয়াবহ আকারে যুদ্ধ বাধঁতে পারে। অনেকেই ভীতু লোকদের মত বাড়িতে ফিরে গেল। আমাদেরকেও বাড়ী থেকে বলা হল ফিরে যেতে। কিন্তু আমি এবং আমার বন্ধুরা তা মেনে নিলাম না। মার্চের ৭ তারিখে রেসকোর্সের ময়দানে বিরাট সমাবেশ হবে। সেখানে দেশের কথা বলা হবে এবং অধিকারের কথা বলা হবে। আমাদের দেশে আমাদের মানুষকে আমরা ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেও আমাদের নেতাদের ক্ষমতায় বসাতে পারিনি। ওরা আমাদের হাতে শাসন ভার দিতে চায় না। পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী নানা ভাবে ষড়যন্ত্র করছে। বাঙ্গালীদের পায়ে ওরা শিকল পরিয়ে রাখতে চায়। বাঙ্গালী এখন আর সেই আগের মত নেই। এখন তারা স্বাধীনতা চায়। এ জন্য যে কোন ত্যাগ স্বীকার করতে সবাই প্রস্তুত। অপেক্ষায় থাকলাম ৭ মার্চ আসার। অবশেষে আসলো সেই আকাংখিত ৭ মার্চ। সলিমুল্লাহ হল থেকে আমি রাকিব,বিল্লাল ,রেজা সহ প্রায় বিশ জন বন্ধুকে নিয়ে ইকবাল হলের বন্ধুরা একত্রে বেরিয়ে শহীদ মিনারের সামনে গিয়ে দাড়ালাম। অপেক্ষা করতে থাকলাম ইকবাল হল থেকে অন্য সব বন্ধুদের আসার। এই সেই শহীদ মিনার! যা গড়ে উঠেছিল আমাদের পূর্বসুরীদের রক্তের বেদীতে। চারপাশে যে সব কৃষ্ণচূড়া শাখা প্রশাখায় ফুল ফুটিয়েছে তা আমাদের পূর্বসুরীদের আত্মদানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এখনো প্রতি ফেব্রুয়ারীতে আমরা শহীদ স্মরণে ফুল দেই। প্রভাত ফেরী আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় বায়ান্নর রাজপথে। শহীদ মিনারের পাশে দাড়িয়ে আমরা অন্যদের জন্য অপেক্ষা করছি আর মনে মনে ভীষণ সাহস খুঁজে পাচ্ছি। এই মিনার আমাদের শক্তি যোগাচ্ছে। আমাদের সামনে আরো বড় ইতিহাস হয়তো অপেক্ষা করছে। অন্যদের কথা জানিনা আমি আমার কথা বলতে পারি যে আমি আজ ভীষণ ভাবে উত্তেজিত। আসলে আমি ভীষণ আগ্রহ নিয়ে প্রতিক্ষায় আছি বঙ্গবন্ধুকে এক নজর দেখবো বলে। বাবা মায়ের কাছে তার কথা শুনেছি। যা শুনেছি তাতে মনে হয়েছে লোকটা সম্পর্কে অতিরঞ্জিত করে বলা হচ্ছে। আমার মতের সাথে একমত হতে পারেনি আমাদের হলের রাশেদ। সে মনে করে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে আমি যা শুনেছি তা আসলে মোটেও অতিরঞ্জিত কিছু নয় বরং বলতে গেলে কমই শুনেছি। রাশেদের বদলে অন্য কেউ হলে হয়তো কথাটা মেনে নিতাম না। কিন্তু রাশেদ হলে ভিন্ন কথা। বিখ্যাত ব্যক্তিদের সম্পর্কে রাশেদের বিস্তর জ্ঞান আছে। সারাদিন কত রকম বই যে ও পড়ে তা হিসাবের বাইরে। আমি তাই রাশেদের কথাই মেনে নিয়ে অপেক্ষায় আছি বঙ্গবন্ধুকে একনজর দেখার জন্য, তার মুখ থেকে দুটো কথা শোনার জন্য। চারদিক থেকে ভেসে আসছে মিছিলের ধ্বনি। সেই মিছিলে ছিল নানা মত নানা পেশার মানুষ। কিন্তু সবাই এক সারিতে মিলেছে একই দাবী আদায়ের মিছিলে। তাদের মুখ থেকে ভেসে আসছে কত রকম শ্লোগান। তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা। আরো কত কত শ্লোগান এই আকাশ এই বাতাসকে করে তুলছে প্রকম্পিত।
শহীদ মিনারে আমাদের বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলোনা। অবশেষে সবাই আসলো এবং একসাথে আমরা সারি বেঁধে মিছিল করতে করতে রেসকোর্সের ময়দানে হাজির হলাম। আমাদের মিছিলের ভাষা ছিল জোরালো। কোনদিন যে আমি মিছিল করিনি, সেই আমার মুখেই মিছিলের ঝাঁঝালো ধ্বনি। আমাদের চেয়েও অনেকেই দেশকে এবং দেশের মানুষকে বেশি ভালবাসে তার প্রমান পেলাম রেসকোর্সের ময়দানে গিয়ে। আমাদের আগেই লাখ লাখ মানুষ ওখানে হাজির হয়েছে। সবাই দেশকে ভালবাসে, দেশের মানুষের জন্য সব কিছু করতে পারে। একজন তার পাঁচ বছরের ছেলেকে সাথে করে নিয়ে এসেছে আর তাকে বিড় বিড় করে বলছে, ‘বাজান ঐ দেহ উনি হইলেন গিয়া বঙ্গবন্ধু,উনার কথা হুনার লাইগা আমরা এহানে আইছি,উনি যুদ্ধ করবার কইলে আমি যুদ্ধে যাইমু তহন তুমি কি করবা?’ সেই অল্প বয়সি ছেলে যার এ অবস্থায় কথা বলারই কথা না সে বলে উঠলো, ‘আমিও যুদ্ধে যামু বাজান’। বাশের খুটিতে বঙ্গবন্ধুর ছবি দেখে সে আর তার ছোট্ট ছেলেটি কথা বলছিল। বিশাল জনতার মাঝখানে একটা সাদাসিধে মঞ্চ। সেই মঞ্চে উঠবেন আপামর বাঙ্গালীর প্রিয় মানুষটি যাকে নির্বাচিত করেও ক্ষমতার গদিতে বসাতে পারিনি। আমরা জনতার ভীড় ঠেলে এগিয়ে গেলাম। অনেকেই আমাদেরকে আগে যেতে দিতে চাচ্ছিলনা কিন্তু আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জেনে জায়গা করে দিল। আমরা তখন এগোতে এগোতে প্রায় মঞ্চের কাছাকাছি। এমন সময় সোল্লাসে চিৎকার করে উঠলো লাখ লাখ বাঙ্গালী কণ্ঠ। জনতার মঞ্চে এসে দাড়ালেন শেখ মুজিবুর রহমান। আপামর বাঙ্গালী এই লোকটাকে বঙ্গবন্ধু বলে ডাকে। মানুষটিকে অনেক দিন থেকেই দেখার ইচ্ছে ছিল। আর সেই মানুষটিকে আজ কাছ থেকে দেখছি। বুকের সাহস আরো বেড়ে গেল। মনে হচ্ছিল এখনই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি। যখন তেমন কিছু জানতাম না, যখন শেখ মুজিবকে দেখিনি, তখন ভাবতাম এই লোকটাকে নিয়ে এত মাতামাতির কি আছে! অবশেষে বুঝলাম আসলে এই লোকটাকে নিয়েই মাতামাতি করা দরকার। বুকে যার অসম সাহস তিনিইতো বীর। আর ভাবতে লাগলাম আসলেই এই লোকটাকে নিয়ে খুব একটা মাতামাতি হয়না। দেশের প্রতি তার অসাধারন ভালবাসা দেখলে মনে হয় তার জন্য আমাদের অনেক কিছু করা দরকার। তার নামে আমরা যে চিৎকার দিচ্ছি সেটা আরও জোরে দেয়া উচিৎ যেন পাকিস্তান শাসক গোষ্ঠী আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশে নটিলাস ডুবো জাহাজে চড়ে থাকলেও আওয়াজ শুনে ভয়ে থর থর কেঁেপ ওঠে। এসব ভাবছি আর উত্তেজনায় ফুলছি। রাশেদ আমার পাশে ছিল। সে আমাকে আলতো খোঁচা দিয়ে বললো তোকে বলেছিনা বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। দেখ মানুষের ভালবাসা কাকে বলে। আমি ওর কথায় একমত হলাম। হঠাৎ সব চিৎকার থেমে গেল। তিনি মাইকে বক্তৃতা শুরু করলেন। আমি যদি পাশে না থাকতাম, আমি যদি উপস্থিত না থাকতাম, তবে বাঙ্গালী হয়ে জন্ম নেওয়াই আমার জন্য বৃথা হয়ে যেত। তিনি কথা বলতে শুরু করলেন, আর আমার শরীরের শিরায় শিরায় রক্তের শীতল স্রোত বয়ে যেতে লাগলো। একটা মানুষ এমন করে বলতে পারে কিভাবে। তিনি বললেন এবং থেকে থেকে মানুষের চিৎকার ধ্বনি মুখরিত হল। সম্বলহীন প্রায় যে মানুষগুলি তারাও হাতে লাঠি, বাঁশ যা পেল তাই তুলে নিল। আমার হাতের কাছে কিছু ছিল না। তাই আমি খালি হাতটাই তুলে ধরলাম। চিৎকার করতে করতে গলার স্বর ভঙ্গ হল। এবং একসময় দেখা গেল যে আমি যা কথা বলছি তা আমি নিজেই শুনতে পারছিনা। রাতে হলে এক মিটিং বসলো। সেখানেও এ বিষয়ে কথা হল। দিন যাচ্ছে আর পরিস্থিতি ঘোলাটে হচ্ছে। তবে বঙ্গবন্ধু যেভাবে সবাইকে প্রস্তুত থাকতে বলেছেন সবাই সেভাবেই প্রস্তুত। যে স্বপ্নটা কোটি কোটি বাঙ্গালী দেখছে এখন মনে হচ্ছে সেই স্বপ্নটা আমাদের দূয়ারে চলে এসেছে। একটা পতাকা এই আকাশে পতপত করে উড়বে কোন বাধাহীন ভয়হীন ক্লান্তিহীন ভাবে সেই আশায় বুক বেধে আছি। তার জন্য যা কিছু করা দরকার সব করতে আমরা প্রস্তুত।
৩.
লালবাগ কেল্লার পশ্চিম পার্শ্বের গলিতে রিমুদের বাসা। রিমু এবার ক্লাস থ্রিতে পড়ে। আমি রিমুর গৃহ শিক্ষক। আমার হলের এক বড় ভাই আমাকে টিউশনীটা জোগাড় করে দিয়েছিলেন যা দিয়ে আমি মোটামুটি নিজের খরচ চালিয়ে নিতে পারি। মাসে পচাত্তর টাকা এই সময়ে অনেক বলেই বিবেচিত। আর তাছাড়া টিউশনী হলেও রিমুর বাবা মা আমাকে অনেক আপন করে নিয়েছেন। তাদের নিজেদের কোন ছেলে নেই বলেই আমাকে এতটা স্নেহ করেন। কিছুক্ষণ আগে আমি টিউশনী থেকে ফিরেছি। ফেরার পথে আমার স্টুডেন্ট আমার হাতে একটা খাম ধরিয়ে দিয়েছিল, যদিও সেটা খুলে দেখা হয়নি। রিমুদের বাসায় আমি প্রথম যেদিন যাই সেদিনই বুঝতে পারি তার বাবা দেশকে অনেক ভালবাসেন। রিমু আমাকে স্যার বলে ডেকেছিল মাত্র একদিন। যেদিন আমি প্রথম ওদের বাসায় ওকে পড়াতে যাই সেদিন। তারপর আমারও ওকে খুব ভাল লাগলো। এর আগে গ্রামে দু একটা ছেলে মেয়েকে বিনা পারিশ্রমিকে পড়াতাম। তখন থেকেই ছোটদের ভাল লাগতো। রিমুকে পড়াতে যাওয়ার দ্বিতীয় দিনেই রিমু একটা বায়না ধরলো। আমি কিন্তু আজ থেকে আর স্যার ট্যার বলতে পারবোনা। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম স্যার বলবেনা তো কি বলবে? তুমি কি তাহলে আমার নাম ধরে ডাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছ নাকি? রিমুর সরল জবাব আরে তাই হয় নাকি। নাম ধরে ডাকা যায়না কি! আমি আরেকটু বেশি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম তো তাহলে তুমি আমাকে কি বলে ডাকবে? রিমু একগাল হেসে দিয়ে বললো ভাইয়া বলে ডাকবো। ওর কথা শুনে আমার খুব আনন্দ হল। বাড়িতে থাকতে ছোট ভাইটা আমাকে কত আদর করে ভাইয়া ডাকতো সেই ডাকটা আবার শুনতে পাব ভেবেই ভাল লাগছিল। রিমু আরও বললো আমি কিন্তু তুমি তুমি করে কথা বলবো। আমি আর না করলাম না। কিন্তু ওকে বলে দিলাম তোমার বাবা মা রাগ করলে তখন কে ম্যানেজ করবে? ও দিকটা দেখবে বলে সে আমাকে আশ্বাস দিল। সত্যি সত্যিই রিমু ওর বাবা মাকে পটিয়ে ফেললো আমাকে ভাইয়া ডাকবে এ ব্যাপারে। তার্ওা কোন কিছু বললেন না। ছোট্ট একটা মেয়ে একজনকে ভাইয়া ডেকে আনন্দ পাবে এতে রাগ করার কি আছে। এরপর থেকে রোজ ওদের বাসায় পৌছার সাথে সাথে রিমু দৌড়ে আসতো ভাইয়া কেমন আছ বলে এমন আদুরে গলায় আমাকে ডাকতো যেন মনে হত সত্যিই আমি আরেক জন্মে ওর মায়ের পেটের ভাই ছিলাম।
মার্চের ২৫ তারিখ সন্ধ্যায় রিমুদের বাসায় গেলাম ওকে পড়াতে। পরিস্থিতি এখন ঘোলাটে। যুদ্ধ হবে এটা অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে গেছে। পাকিস্তান আরমির গাড়ি রাস্তায় রাস্তাায় টহল দিচ্ছে। ওদের টহলে কিছু কিছু মানুষ ভীত সন্ত্রস্থ হয়ে পথ থেকে সরে যাচ্ছে। আর কেউ কেউ কোন ভ্রুক্ষেপই করছে না। আমাদের মনের মধ্যে জ্বলতে শুরু করেছে। ২৫ মার্চ রিমুকে পড়াতে গেলেও আর পড়ানো হয়ে ওঠেনি। যাবার পথে ইকবাল হলের গেটে পাকিস্তান আরমির কয়েকজন সৈন্যকে টহল দিতে দেখে এসেছি। ঠিক জানিনা ওদের মনের মধ্যে কি শয়তানি জমা হয়ে আছে। কোন একটা বড় অঘটন ঘটতে যাচ্ছে এটা মন বলছিল। সব কিছু বিবেচনা করে মনটা বিষন্ন হয়ে উঠেছিল। মন বলছিল আজ আর রিমুকে পড়াতে যাবনা। কিন্তু মাসের শেষ পর্যায়ে পড়ানো গ্যাপ দেয়া ঠিক হবেনা ভেবেই ওদের বাসায় গেলাম। আমি চিন্তিত এটা ওদের বুঝতে দিতে না চাইলেও চেহারাতে কোন একটা কিছু ছিল যা দেখে রিমুও বুঝতে পারলো আমার মন খারাপ। ও কাছে এসে বললো ভাইয়া আজ আমি পড়বোনা। কেন পড়বেনা তা জিজ্ঞেস করার আগেই রিমুর আম্মু বললো কাল ২৬ মার্চ রিমুর জন্মদিন। ও তাই তোমাকে নিয়ে পরিকল্পনা করতে চায় জন্মদিনে কি কি করবে। আমি সব চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু চাইলেইতো আর যোদ্ধার মন থেকে যুদ্ধের চিত্র মুছে ফেলা যায়না। বার বার যেটাকে দূরে রাখতে চায় সেটাই মনের মধ্যে বেশি করে দানা বাঁধে। ৭ মার্চের জনসভায় বঙ্গবন্ধুর কথা গুলো ধ্বমনিতে রক্তের সাথে মিশে গেছে। প্রতিক্ষনে তা কানে বাঁজে। রিমু আমার হাত ধরে ওর রুমে নিয়ে গেল। অবশেষে ছাত্রী এবং শিক্ষক কিংবা ভাই এবং বোন মিলে ২৬ মার্চ রিমুর জন্মদিনের পরিকল্পনা করতে লাগলাম। সেদিন রাতে রিমুর বাবার সাথে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে বেশ কথা হলো। তিনি আশংকা প্রকাশ করে বললেন এ মাসে বা এর পরের মাসেই হয়তো পাকিস্তান আরমি কোন অঘটন ঘটাবে। এ কথা শোনার সাথে সাথে আমার মনের মধ্যে যে আশঙ্কা আর ভয় ছিল তা জেগে উঠলো। আমার বুকটা অজান্তেই কেঁপে উঠলো। পাকিস্তান আরমি যদি সর্বনাশ করতে চায় তবে হয়তো প্রথম আঘাত হানবে বঙ্গবন্ধুর ওপর। কেননা ওরা জানে এবং বিশ্বাস করে গোটা বাঙ্গালী জাতির চেয়ে এক বঙ্গবন্ধু ওদের পথের বড় কাঁটা। ওরা বঙ্গবন্ধুকে প্রচন্ড ভয় করতো। ভয় করতো বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে, ভয় করতো বঙ্গবন্ধুর দৃঢ়তাকে।
আমি রিমুর বাবাকে সরাসরি প্রশ্ন করলাম তহলেকি ওরা বঙ্গবন্ধুর কোন ক্ষতি করবে? তিনি বললেন, পাকিস্তান বাহিনী এতটা দুঃসাহস দেখাতে পারবেনা। কেননা বঙ্গবন্ধুর কিছু হলে বাঙ্গালীকে কোন ভাবেই দমিয়ে রাখা যাবেনা। জেনে শুনে পাকিস্তানীরা এই ভুলটা অন্তত করবেনা। বঙ্গবন্ধু যেখানে বলেই দিয়েছেন, “আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি তোমরা প্রস্তুত থেকো।” এরপর বাঙ্গালী যদি দেখে তাদের প্রিয় মানুষটি নেই, তখন যে আগুন জ্বলে উঠবে তা দমিয়ে রাখার মত ক্ষমতা পাকিস্তানের নেই। কথাগুলো শুনে আমার রক্তে উষ্ণ স্রোত বয়ে গেল। আমার পেশি শক্ত হয়ে উঠলো। আমার মনে হলো আমার শরীরের রক্ত প্রবাহ দ্বিগুন হয়েছে। তিনি আশংকা করছেন পাকিস্তানীরা অন্য কোন ভাবে আমাদের ক্ষতি করবে। হয়তো আমাদের পুর্ব পাকিস্তানের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করবে। অর্থনৈতিক ভাবে আমাদের দুর্বল করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে পর্যাপ্ত অর্থ যোগান বন্ধ করা হবে। হতে পারে অন্য যে কোন কিছু। সমস্যার দোলাচালে থাকলে মানুষের মনে নানা আশংকাই জাগে। আমাদের অবস্থা এখন সেই সংকটাপন্ন অবস্থা। এখন আমাদের সামনে কি ঘটতে যাচ্ছে তা আমাদের অনুমান করাও কল্পনাতীত। দেশের পরিস্থিতি নিয়ে এবং আমার পড়ালেখা নিয়ে রিমুর বাবার সাথে অনেক কথাই বলা হলো এবং দেখা গেল রাত গভীর হয়েছে। সুতরাং আমার আর হলে ফেরা হলোনা। রাতে রিমুদের বাসাতেই থেকে গেলাম। সবে মাত্র চোখে রাজ্যের ঘুম নেমে আসছে এমন সময় বিকট শব্দে চোখ থেকে সেই ঝড়ের মত ধেয়ে আসা ঘুম পালিয়ে গেল। ঘড়িতে সময় তখন রাত পৌনে দুইটা। ২৬ মার্চ চলে এসেছে আজ রিমুর জন্মদিন। ঘুমোতে যাবার আগেও কি আমি ভাবতে পেরেছি যে সকালে রিমুর জন্মদিন আর পালন করা হবেনা। না এমন নয় যে রিমু অসুস্থ হয়ে পড়েছে কিংবা হারিয়ে গেছে। রিমু ঠিক রিমুর মতই সুস্থ স্বাভাবিক আছে অথচ তার পরও ওর জন্মদিনটা পালন করা হচ্ছেনা। এমনকি রিমু নিজেওকি জানতো তার এবারের জন্মদিনে একটা বেলুনও ফুটানো হবেনা। হয়তোবা ২৫ মার্চের এই রাত্রি দ্বিপ্রহরের বিকট শব্দ রিমুর জন্মদিনের কোন এক আতশ বাজি ফোটানোর শব্দের মত। কাছে কিংবা দূরে শব্দ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। মানুষের চিৎকার, কান্নার আওয়াজ, আকাশ বাতাস ভারি করে তুলেছে। কিসের আওয়াজ তা বুঝতে আমাদের বাকি থাকলোনা। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী রাতের অন্ধকারে নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছে নিরিহ বাঙ্গালীর ওপর।
রিমুর বাবা ঘুমোতে যাবার আগেও যে আশঙ্কার কথা বলেছিলেন তা এতো অল্প সময়েই পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী করে বসতে পারে আমাদের কল্পনাতেও ছিলনা। গুলির বিকট শব্দে সবারই ঘুম ভেঙ্গে গেছে। সবাই ভীত সন্ত্রস্ত্র। বিদ্যুৎ আছে, লাইট গুলোও ঠিক আছে কিন্তু কারো আলো জ্বালাবার সাহস হলোনা। আমি সেই ঘুটঘুটে অন্ধকারেই রুম থেকে বেরিয়ে ড্রয়িং রুমে আসি। আগে থেকেই সেখানে জড় হয়েছিল রিমুর বাবা মা কাজের লোক আর ছোট্ট রিমু। ওদের বাসার কাজের লোকগুলোও ভয়ে জড়সড় হয়ে আছে। ড্রয়িং রুমে টিমটিম করে মোমবাতির আলো জ্বলছে। সেই আলোতে এক একটা মানুষকে আরো বেশি ভীত হতাশাগ্রস্থ মনে হচ্ছে। মৃত্যু ভয়ে মানুষ কতটা ভীত হতে পারে আর কতটা জড়সড় হতে পারে তা সেই দৃশ্যটা দেখলে এমনিতেই বোঝা যায়। আমি আসতেই রিমু আমার গা ঘেসে বসলো। মোমবাতির মৃদু আলোয় স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল রিমুর চোখে মুখে ভয়ানক ভয়ের ছাপ। সেই সাথে ভয়ে ওর শরীর কাঁপছিল। এমন পরিস্থিতিতে কারো মুখ দিয়েই কথা বের হবার কথা নয়। আমাদের কারো মুখ থেকেই কোন কথা বের হচ্ছিলনা। আমরা অনেকটা বাকরুদ্ধ মানুষের মত বসে থাকলাম কিছুক্ষন আর শুনতে থাকলাম থেকে থেকে ভেসে আসা গুলির আওয়াজ আর চিৎকার রত মানুষের হাহাকার আর গগণ বিদারী কান্নার আওয়াজ। কিছুক্ষণ পর আমাদের মধ্যে ফিসফিসানি শুরু হলো। রিমু আমার গা ঘেসে বসতেই আমি ওর মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিতে দিতে গলার স্বর নিচু ও কিছুটা স্বাভাবিক করে ওকে শান্তনা দিলাম যে সকাল হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমার জন্মদিনে আমরা কেক আনবো বেলুন ফোটাবো। কিন্তু আমি জানি আমি রিমুর সাথে মিথ্যা কথা বলছি। সকাল হলে কোন কিছুই ঠিক হবেনা এবং দেখা যাবে সব বেঠিক। আমার কোলে মাথা রেখে ভীত সন্ত্রস্ত রিমু আবার ঘুমিয়ে পড়লো। চারিদিকে কোথাও তখন গুলির আওয়াজ নেই। আছে কেবল মানুষের কান্না আর আর্তনাদের বিষাদময় সুর। আমার তখনই ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে ইচ্ছে হচ্ছিল। কোথায় কি হচ্ছে দেখতে ইচ্ছে হচ্ছিল। কিন্তু সেই সময় তা সম্ভব নয় বলে ভোর হবার অপেক্ষায় থাকলাম। কখনো কখনো সময় শেষ হতে চায়না। অপেক্ষার সময় খুবই যন্ত্রনাদায়ক। কোন ভাবেই সে শেষ হতে চায়না। মনে হচ্ছিল এই রাত কোন দিন শেষ হবেনা। এই সময়ে আমার মাথা তেমন কাজ করছিলনা। একটি বারের জন্যও চিন্তা হয়নি হলের কথা,চিন্তা হয়নি বঙ্গবন্ধুর কথা। কেবল মাত্র আর্ত চিৎকার রত মানুষের ছবি কল্পনার চোখে ভেসে উঠছিল।
সে রাতে আর ঘুম এলোনা। অপেক্ষার সময় অবশেষে শেষ হলো। অবশেষে এলো ভোর। ২৬ মার্চের এই ভোর যে কোন দিনের ভোর থেকে ভিন্ন। অন্য যে কোন দিন ভোরে যেভাবে পুব আকাশে সুর্য ওঠে আজও হয়তো একই ভাবে সুর্য উঠেছে, তার পরও আজকের এই ভোর অন্য রকম। চারদিকে থমথমে ভাব। বাতাস ভারি হয়ে গেছে। রিমুদের বাসা থেকে বেরিয়ে আজিমপুর হয়ে হলে ফিরছি। রাস্তায় কেবল মানুষ আর মানুষ। গত রাতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর তান্ডবের কথাই তাদের মুখে মুখে। নীলক্ষেত মোড়ে আসতেই মানুষের জটলা দেখতে পেলাম। ভিড় ঠেলে এগিয়ে দেখি পাশাপাশি তিনটে লাশ। দু’জনের মুখ চোখ বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে বিকৃত করা। বাকি জনকে চিনতে পারলাম। সলিমুল্লাহ হলের রাসেল ভাই। রাসেল ভাইকে আমি একটু একটু চিনতাম। ওনার লাশ আমার হৃদয় ভেঙ্গে দিল। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে আমরা ইকবাল হল ও সলিমুল্লাহ হল থেকে যে ছোট্ট দল মিছিল করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম তার অগ্রভাগে ছিলেন রাসেল ভাই। তার গলায় ছিল অসম্ভব জোর। বুকে ছিল অসম সাহস আর ক্ষিপ্রতা ও আত্মপ্রত্যয়। তার এক একটা স্লোাগান এখনও আমার কানে বাজছে। আমার সাথে প্রথম যেদিন কথা হলো সেদিন তিনি শুরুতে আপনি করে কথা বলতে শুরু করলেন। আমি বললাম রাসেল ভাই আমি আপনার কত জুনিয়র। আমার সাথে আপনি আপনি করে কথা বললে আমার খারাপ লাগে। আপনি আমাকে লজ্জায় ফেলে দেবেন না। আমার সাথে তুমি করে বলবেন। রাসেল ভাই একগাল হেসে দিয়ে বলেছিলেন কি করে বলি? বলাতো যায়না আজ আমি যার সাথে তুমি বা তুই করে কথা বলবো কাল সেতো বিখ্যাত কেউ হয়ে যেতে পারে। তাই সম্মান দিয়ে আপনি করে বলার চেষ্টা করছি। আমি বললাম ভাই কোন দিন বিখ্যাত হবোনা আর যদি হয়েই যাই তো সেদিনও আমি আজকের আমিই থাকবো। তখনও আপনি আমাকে তুমি করেই বলবেন। আমার সরল জবাবে সেদিন রাসেল ভাই আমাকে বলেছিলেন সত্যিই তুই খুব ভাল। দেখবি তুই অনেক বড় হতে পারবি। তোকে দিয়ে অনেক কিছু হবে। আমার আশা গুলো আমাকে সে যে দোয়া করেছিল তা প্রতিফলিত হওয়ার আগেই সেই মানুষটি আমার চোখের সামনে নিরব নিথর হয়ে পড়ে আছে। অথচ সামনে আরও কত মিছিল হবে, তিনি সেখানে থাকতে পারবেন না। তার থাকাটা জরুরী ছিল। তিনি সেটা বুঝেও আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তিনি যেহেতু আমার পরিচিত তার লাশটা এখান থেকে নিয়ে যাওয়াটা আমার কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। কিন্তু একাতো তা সম্ভব নয়। তাই প্রথমে হলে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম।
হলের গেটে আসতেই বর্বরতা কাকে বলে তার চাক্ষুস সাক্ষ্যি হলাম। রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে পরিচিত অপরিচিত কত মুখ। নিমিষেই আমি নীলক্ষেত মোড়ে পড়ে থাকা রাসেল ভাইয়ের কথা ভুলে গেলাম। একটু আগেও যে মানুষটার জন্য আমার খুব দুঃখ হচ্ছিল এখন তা ছাপিয়ে গেছে। আমার সাথে ভীষন অন্তরঙ্গ ছিল এমন অনেকেই লাশ হয়ে পড়ে আছে, আমার করার কিছু নেই। সেখানে সামান্য পরিচিত রাসেল ভাইকে নিয়ে চিন্তা আমার মাথাতে আসার কথাই নয়। রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা অসংখ্য মুখের কোনটিতেই হাসি নেই। কারো দেহেই প্রান নেই। গত রাতে হানাদার বাহিনী গোটা ইউনিভার্সিটি এলাকায় যে তান্ডব চালিয়েছে তা পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম অধ্যায়। সৃষ্টিকর্তা করুণা করে আমাকে এই রাতের জন্য হল থেকে দূরে রেখেছিলেন। তা না হলে আমি যে বিভিষিকাময় দৃশ্যের কথা লিখছি তা আর লেখা হতোনা। আমি নিজেই তখন লাশ হয়ে গন্ধ ছড়াতাম। এ জন্য সৃষ্টিকর্তাকে প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা জানালাম। হলে ঢুকতেই ঢুকতেই বর্বরতার তীব্রতা চোখে জ্বালাপোড়া শুরু হলো। গোটা হল ধ্বংসস্তুপে পরিনত হয়েছে। সেখানে কেবল জানালার ভাঙ্গা কাচ আর মেধাবীদের রক্তমাখা নিথর দেহ। যারা বেঁচে গিয়েছিল তাদের মুখে ভাষা নেই। বিভিষিকাময় এই দৃশ্য দেখে আমরা কাদঁতে ভুলে গেলাম। হলের বড় একটা রুমে জরুরী সভা বসলো। সেখানে বলা হলো পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী আবার হানা দেয়ার আগে, আবার সর্বনাশ করার আগেই এখান থেকে আমাদের বেরিয়ে যেতে হবে। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এ যুদ্ধে আমাদের জয়ী হতেই হবে। ছাত্র নেতারা আমাদের বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে দিলেন। আমরা কলম ধরা ছাড়া কোন দিন অস্ত্র ধরার কথা চিন্তাও করিনি, সেই আমরাই কলমের কথা ভুলে গিয়ে অস্ত্র ধরতে প্রস্তুত হলাম। আমরা দেশের নামে শপথ নিলাম। এ দেশটা আমাদের এবং এর স্বাধীনতা আমরা ছিনিয়ে আনবোই। এ জন্য দরকার অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষন এবং রণাঙ্গনের রণকৌশল আয়ত্ব করা। একাত্তর এখন কোন সাধারন দশটা পাঁচটা বছরের মত নয়। একাত্তর আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য রক্তাক্ত ইতিহাস হয়ে থাকবে। আমার এই লেখাটা কারো হাতে পড়লে যেন জানতে পারে আমরা কত কষ্ট আর যন্ত্রনার মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছি। আমরা জানিনা স্বাধীনতার স্বাদ কিরূপ, কিন্তু আমরা জানি পরাধীনতার তিক্ত স্বাদের অসহ্য যন্ত্রনা। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তথা কথিত শ্রেষ্ঠ সৈনিক বলে যারা পরিচিত ছিল তারাই কাপুরুষের মত এদেশের নিরীহ মানুষদের হত্যা করেছে। পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠি ৭ মার্চের ভাষন শুনে ভয়ে শিউরে উঠেছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল বাংলার স্বাধীনতার এই আন্দোলন কোন ক্রমেই দমিয়ে রাখা যাবেনা। একমাত্র পথ কোন ভাবে বাঙ্গালীদের মনের মধ্যে ভয় ঢুকিয়ে দেয়া। ভয় ঢুকিয়ে দিতে পারলেই বাঙ্গালী থেমে যাবে। সেই ভয় ঢুকিয়ে দিতেই তারা গত রাতে বিভিষিকাময় ঘটনার জন্ম দিয়েছে। পাকিস্তানী কাপুরুষেরা ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যায় লিপ্ত হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক,ছাত্র,কুলি দিন মজুর তাদের হিংস্র থাবা থেকে বাঁচতে পারেনি। রিমুকে পড়াতে যাওয়ার সময় নীলক্ষেত মোড়ে নিঃস্ব ঘরহীন জরিনা আর তার ছয় বছরের ছেলেটাকে দেখেছিলাম। তারাও রক্ষা পায়নি। আমি নিজ চোখে বর্বরতার শেষ চিহ্নটুকু দেখে এসেছি নীলক্ষেত মোড়ে। জরিনার পরনের শাড়ী ছিল শত ছিন্ন। তার এক মাত্র সন্তানেরও তাই। গত রাতে এক মুঠো ভাত খেয়েছিল কিনা তা আমি জানিনা। হয়তো খেয়েছিল, হয়তো জীবনের শেষ খাওয়াটাও খাওয়া হয়নি অভাবে। ফুটপাতে যাদের বসবাস তাদের আবার সুখ আর সুখের নিদ্রা কি! জরিনাও তার সন্তানকে আকড়ে ধরে ফুটপাতেই বেঁচে থাকতে চেয়েছিল। স্বামী একটা সন্তান জন্মদিয়ে জরিনাকে ফেলে গেছে। খেয়ে না খেয়ে সে তার ছেলেকে বড় করে তুলছিল। ছেলেটা তার নীলক্ষেত স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেনীতে পড়তো। তারও স্বপ্ন ছিল সন্তান বড় হবে মানুষের মত মানুষ হবে। অথচ তার স্বপ্নটাও অংকুরেই শেষ হয়ে গেল।
ইকবাল হল সহ অন্যান্য হলের চারদিকে লাশের সারি। তার ভিতর আমি এক অভাগা মনের আনন্দে ডায়রি লিখছি। লিখছি ফুটপাতে পড়ে থাকা জরিনা নামের এক নিঃস্ব মা ও তার ছেলের লাশ হওয়ার কথা। আমি কথাগুলো এমনি এমনি লিখছিনা। আর মনের আনন্দে লেখার তো কোন অবকাশই নেই। আজ যে সবুজ জমিন জানা অজানা হাজারো মানুষের বুকের রক্তে লাল হয়েছে, সেই জমিনের ওপর বসে আমি কিভাবে মনের আনন্দে ডায়রি লিখি। কারো মনেই যে শান্তি নেই, আনন্দ নেই, এটা কারো অজানা নয়। বিগত দিনে বাঙ্গালীদের কম কষ্ট ভোগ করতে হয়নি। কম আন্দোলন হয়নি এদেশে। কত নারী তার সন্তানকে স্বামীকে হারিয়েছে তার হিসাব নেই। তাদের কথা কেউ লিখে রাখেনাই বলে তারা ইতিহাস থেকেই হারিয়ে গেছে। অথচ তাদের অবদান কোন অংশে কম ছিলনা। শুধু এসব কারণেই আমি জরিনা বা তার মত হতদরিদ্র ফুটপাতের মানুষের কথা লিখছিনা। ওর ছেলেটাকে আমি চিনতাম। আমাদের বন্ধু হাসনাত আরো কয়েক জনকে সাথে নিয়ে বিকেলে ফুটপাতে যে সব ছেলে মেয়ে বেড়ে উঠেছে তাদের বিনিপয়সায় পড়ায়। জরিনার ছেলেটাও স্কুল শেষে ওখানে আসতো। কয়েকদিন আমিও ক্লাস নিয়েছি। তখন থেকেই জরিনা ও তার ছেলেকে চিনি। গরিব হোক,সে তো আমাদেরই প্রতিবেশী। চেনা জানা মানুষ। এক মা, যে তার সন্তানকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতো। সেই মা তো দেশের জন্যই প্রাণ দিল। তার কথা আমি যদি নাই লিখি তবে কি লাভ এই অথর্ব ডায়রি লিখে। ডায়রি লেখার চেয়ে এখন বরং যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া বেশি প্রয়োজন। গত রাতে আগুনের ফুলকির মত সহস্র গোলাবর্ষন,মেশিনগানের গুলিবর্ষনের একটানা শব্দে সমস্ত ঢাকা নগরী ভুতুড়ে,মৃতের লাশের শহরে পরিণত হয়েছে। উত্তরে দক্ষিণে পুবে পশ্চিমে সব দিকেই আগুনের লেলিহান শিখা গগন চুম্বি হয়ে পড়েছিল। বেলুচিস্থানের কসাই কুখ্যাত টিক্কাখান,আব্দুল্লাহ খান নিয়াজি,ফরমান আলী,ইয়াহিয়া খান বাঙ্গালীর রক্ত দেখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। আমরা বন্ধুরা মিলে আশেপাশের খোঁজ জানার চেষ্টা করলাম। পিলখানা থেকে শুরু করে রাজারবাগ পুলিশ লাইন এমনকি ধানমন্ডি পর্যন্ত।
জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেই একটা আকাশ চোখে পড়ে। সেই আকাশটা সীমাহীন । কখনো সেই আকাশ নীলের ছড়াছড়ি আবার কখনো কালবোশেখী মেঘে ঢেকে থাকে। রাতে সেই আকাশটাই তারায় তারায় ঝিলমিল করে আর তার মাঝে জোছনার রানী চাঁদ মিটমিট করে হাসে। সেই আকাশে এখন কোন তারা নেই,এখন কোন চাঁদ নেই। গুমোট মেঘেমেঘে গোটা আকাশ ছেয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে আকাশের সেই তুলনাহীন নীল। চোখ তুটো কি যেন খুঁজছে। বাইরে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি আর আনমনাই কত কিছু ভাবছি। একটা পাখি হয়তো গাঙচিল নয়তো ভূবন চিল নয়তো অন্য কোন নাম নাজানা পাখি ডানা ঝাপটে উড়ে গেল। তার উড়ে যাওয়ার শব্দ পেলাম কিন্তু তাকে দেখতে ইচ্ছে হলোন। মনটা খারাপ হয়ে আছে। ঘরের দরজাটা খোলা আছে। ইচ্ছে হলেই বাইরে যেতে পারি। তারপরও মনে হচ্ছে আমি বন্দী। আমার পায়ে শিকল পরিয়ে রেখেছে। আমার কোন স্বাধীনতা নেই। যে স্বাধীনতা পেলে একটা পাখি আকাশে ইচ্ছা মত ডানা মেলতে পারে। যে স্বাধীনতা পেলে বনের হরিণ ইচ্ছে মত ঘুরতে পারে। সেই স্বাধীনতা আমার নেই। সেই স্বাধীনতা নেই কোটি কোটি বাঙ্গালীর। বর্বর পাকিস্তানীরা দিয়ে গেছে সীমাহীন যন্ত্রনা। যে ক্ষত বাঙ্গালীর হৃদয়ে দাগ কেটেছে তা মুছে ফেলার নয়। এর মাঝেই আরো ভয়াবহ সংবাদ আসতে থাকলো। সেই সব ভয়ংকর সংবাদের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর সংবাদ হলো বঙ্গবন্ধু নেই। আমি খুব সাবলিল ভাষায় কথাটি লিখলেও আমার হাত কাঁপছে,আমি বিচলিত এবং অনেকটা হিস্ট্রিয়া গ্রস্থ রোগীর মত। বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ কন্ঠ আমাকে এবং গোটা বাঙ্গালী জাতিকে জাগ্রত করেছে। বঙ্গবন্ধু নেই এ কথা শোনা মানে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হওয়া। গত রাতে বর্বর হামলা চালিয়ে গোটা এলাকা লাশের স্তুপ বানিয়ে ওরা সবচেয়ে ভয়ংকর কাজটি করেছে। আর তা হলো বঙ্গবন্ধুকে গায়েব করে দেয়া। কেউ জানেনা বঙ্গবন্ধু কোথায় আছেন। তিনি বেঁচে আছেন না তাকেও শেষ করে দিয়েছে তার কিছুই জানিনা। পথে পথে মানুষের মাঝে মিশ্র প্রতিকৃয়া। সবাই একই কথা বলছে ওরা নাকি বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলেছে। আমার সাথে রাশেদ,নজিব সহ আরো কয়েকজন ছিল। রাশেদ সবসময় জ্ঞানী মানুষের মত কথা বলে। ও জোর দিয়ে বলেছে পাকিস্তানীরা বঙ্গবন্ধুকে ধরে নিয়ে গেলেও হত্যা করার সাহস রাখেনা। ওর কথায় বুকে সাহস আসে। আমরাওতো চাই বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকুন, ভালো থাকুন। ওর কথায় যুক্তি আছে। যে মানুষের কথায় কোটি কোটি বাঙ্গালী রুখে দাড়ায় কামানের সামনে, তাকে হত্যা করলে কি ভয়ানক কান্ড ঘটবে তা বোকা হলেও পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী অনুধাবন করতে পারে বলে আমাদের বিশ্বাস।
হলে ফিরে আশেপাশের সংবাদ সবাইকে দিতেই সবাই আবার এক রুমে জড় হলো। এর মাঝে অনেকে মিলে মৃত ছাত্রদের লাশ সরিয়ে ফেলেছে। যা করেছে তা অতি দ্রুততার সাথেই করেছে। হলে এখন থমথমে পরিবেশ। সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে রাত হবার আগেই সবাই হল ছেড়ে বেরিয়ে যাবে। এর কিছুক্ষণের মাঝে খবর আসলো বঙ্গবন্ধু ভাল আছেন এবং তাকে পাকিস্তানীরা বন্দী করে রেখেছে। অনেক কষ্টে একটা রেডিও জোগাড় করা গেল। সেই রেডিওতে অস্পষ্ট ভাবে বিভিন্ন কথা ভেসে আসছে। আমরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কথা শুনে রেডিওর নব ঘুরাতে লাগলাম। অনেক চেষ্টার পর অস্পষ্ট শব্দ ভেসে আসতে লাগলো। কখনো সংগ্রামী গান আবার কখনো কথা ভেসে আসছিল। কিন্তু তা এতটাই অস্পষ্ট যে, কিছুই বোঝা গেলনা। এটা যে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র তা বুঝতে বাকি থাকলোনা। এরপর বেতারে ভেসে আসলো স্বাধীনতার ঘোষনা। সে ঘোষণা শুনে আমরা স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম। আমরা যুদ্ধে অংশ নেব এবং তার জন্য প্রয়োজন অস্ত্র এবং প্রশিক্ষণ। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে রওনা হলাম রিমুদের বাসায়। মাথার ওপর যে আকাশটা নীল ছিল, সে আজ আশা নিরাশার দোলাচালে কালো মেঘে ঢাকা পড়ে গেছে। রিমুদের বাসায় কলিংবেল নেই। হয়তো আগে ছিল কোন কারণে এখন নেই। আবার এমনও হতে পারে এ বাসায় কলিংবেল কোন কালেই ছিলনা। দরজায় টোকা দিলাম, কোন সাড়া শব্দ পেলামনা। আবার টোকা দিলাম, কিন্তু এবারও কোন সাড়া শব্দ নেই। ওরাকি তাহলে বাসায় নেই নাকি! ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতেই পারছিলাম না। আরো জোরে ধাক্কা দিতেই ওপাশ থেকে ভীত কন্ঠে কাজের ছেলেটা জানতে চাইলো কে? আমি নাম বলতেই দরজা খুলে দিল এবং ভেতরে ঢুকতেই দরজা আবার বন্ধ করে দিল। ঘরে বৈদ্যুতিক বাতি থাকলেও কেউ তা জ্বালাচ্ছেনা । ভয়ে সবাই স্থবির। সোফায় বসতে বসতে বললাম একগ্লাস পানি হবে। আমার বলা শেষ হতে না হতেই নিজাম ভাই গ্লাসে পানি নিয়ে আসলো। গ্লাসটা চকচক করছে। মনে হয় বেলজিয়াম গ্লাস। তা না হলে এতো চকচকে হতোনা। রিমুর বাবা মা এমনিতেই খুব সৌখিন। তাদের পানি পানের গ্লাস বেলজিয়াম হবে এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। নিজাম ভাইয়ের কাছ থেকে পানির গ্লাসটা নিয়ে ঢকঢক করে সবটুকু পানি শেষ করলাম। নিজাম ভাই আমার পানি পান এক নজরে দেখলেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে হয়তো বলতেন এত দ্রুত পানি খাওয়ার কি দরকার ধীরে ধীরে খেলেই হয়। কিন্তু এখন যেহেতু সময় বদলে গেছে তাই তা বলার অবকাশ নেই। পিপাসা পেয়েছে পানিটাই মুখ্য। সেটা বেলজিয়াম গ্লাসেই হোক কিংবা মাটির বদনায় হোক। তবে রুচি বলে একটা কথা আছে। কোন কোন সময় ওসব রুচি নিয়ে বসে থাকলে চলেনা। আমিতো এখন সেরকম একটা সময়েই আছি। নিজ হাতে পরিচিত জনদের লাশ সরিয়েছি। পথে বেওয়ারিশ ভাবে পড়ে থাকতে দেখেছি ইউনিভার্সিটির খুব কাছ থেকে দেখা বড় ভাইদের। সারাদেশে এখন যুদ্ধের থমথমে পরিবেশ। এই পরিবেশে মুখে একটু পানি দিতে পারাটাই যথেষ্ট। পানিটুকু পান করে নিজাম ভাইয়ের হাতে খালি গ্লাসটা ফিরিয়ে দিলাম।
নিজাম ভাই রিমুদের বাসায় টুকটাক কাজ করে দেন এবং তিনিই সব বাজার সদাই করেন। তার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ। বহুদিন হলো তিনি রিমুদের বাসায় আছেন। সেটি রিমুর জন্মেরও কয়েক বছর আগে থেকেই। রিমুর নানা বাড়িও কিশোরগঞ্জ। পাগলার মসজিদ থেকে সামান্য দক্ষিণে এগোলেই ওর নানাবাড়ি। নিজাম ভাই রিমুর নানাদের আত্মীয় এবং বিশ্বস্ত হওয়ায় রিমুর আম্মু ওনাকে সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন। নিজাম ভাই আমার থেকে দু এক বছরের বড় হবে। লেখাপড়া না শিখলেও বেশ গুছিয়ে কথা বলতে পারেন। তার সাথে কথা বললে সহজে কেউ বুঝতে পারবেনা যে আসলে তিনি নিরক্ষর। পানিটুকু শেষ করে ওনার হাতে গ্লাসটা দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। নিজাম ভাই একটু কাছে এসে গলা খাদে নামিয়ে বললেন শুনলাম ভার্সিটির অবস্থা ভাল না এর মাঝে ওখানে থাকা আপনার জন্য নিরাপদ নয়। এখন কি করবেন? কোথায় থাকবেন? ঢাকায় থাকা যায় এমন কোন আত্মীয় স্বজন আছে? নিজাম ভাই একসাথে অনেকগুলো প্রশ্ন করলেন। আবারও একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বললাম হলে ফিরছিনা। ওখানে থাকা মানে নিশ্চিত মৃত্যুর ফাঁদে পা রাখা। আবার চিন্তাও হয়, হলে থাকবোনা তো থাকবো কোথায়? ঢাকায় থাকার মত এমন কোন আত্মীয় নেই। যদি থেকেও থাকে তাদের সাথে আমার পরিচয় নেই। এখন বড় মুশকিলই হলো। নিজাম ভাইয়ের গলায় দরদ নেমে এলো। তিনি আমাকে গ্রামে চলে যেতে বললেন। আমি নিজাম ভাইয়ের হাত ধরলাম,বললাম নিজাম ভাই গ্রামে যাওয়া যাবেনা। গ্রামে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। চারদিকে যে পরিস্থিতি তাতে গ্রামও যে শান্ত আছে তা বলা যাবেনা। আমার কথায় নিজাম ভাই কোন উত্তর দিলেন না। শুধু মাথা নাড়ালেন। এর কিছুক্ষণ পর রিমুর বাবা মায়ের সাথে দেখা হলো। তারা বাসাতেই ছিলেন কিন্তু কেউ কোন কথা বলেননি। নিজাম ভাই তাদেরকে আমার কথা বললে তবেই তারা আমার সামনে আসলেন। রিমু জেগে নেই। জেগে থাকলে দৌড়ে আমার কাছে আসতো। গত কালকের রাতের গোলাগুলি আর দিনে মানুষের আহাজারি ওর ছোট্ট মনকে বিষিয়ে তুলেছে। হয়তোবা সে কারনেই স›ধ্যা নামতে না নামতেই ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেছে। ঘুমই ভাল। অন্তত একটু শান্তি পাওয়া যায়। জেগে থাকা মানেই কোন দুর্ঘটনা, কোন কুৎসিৎ বিভৎস দৃশ্য। ভাঙ্গা আয়নায় মুখ দেখার চেয়ে মুখ না দেখাই ভাল। তেমনি হানাদারদের নৃশংসতা দেখার চেয়ে ঘুমিয়ে থাকাই ভাল। রিমুর বাবা সরাসরি কথা বলা শুরু করলেন। রিমুর আম্মু তার পাশে বসা। রিমুর বাবার গলার স্বরও খাদে নেমে এলো। হলের সব খবর জানতে চাইলেন এবং আমি এখন কি করবো সেটাও জানতে চাইলেন। আমি তাকে জানালাম এ অবস্থায় হলে থাকতে চাইনা, আবার গ্রামেও ফিরে যেতে চাইনা। আবার যখন জানালাম ঢাকায় আমার কোন আত্মীয় স্বজন নেই যার বাসায় ক’দিন থাকতে পারি, তিনি খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তিনি কোন রুপ আড়ষ্ঠতা না দেখিয়ে আমাকে সরাসরি বললেন তুমি বরং পরিস্থিতি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত আমার বাসাতেই থাক। আমিও ভাবান্তরহীন তাকে প্রশ্নটা করলাম সত্যিইকি পরিস্থিতি আদৌ শান্ত হবে? এবার তার মুখে চিন্তার রেখা দেখা দিল। আমি তাকে বিগত দিনের কথা বললাম। তাকে জানালাম যখন গ্রামে ছিলাম তখন বঙ্গবন্ধুর নাম শুনেছি অল্পবিস্তর কিন্তু দেখা হয়নি কখনো। এরপর যখন ঢাকায় আসলাম এবং পরিস্থিতি আস্তে আস্তে বদলাতে শুরু করলো, আমিও তখন বদলে গেলাম। রাস্তায় মিছিল; আমি ঘরে বসে একা একা বই পড়ছি। মিছিলের এক একটি ধ্বনি কানে ঢুকছে আর আমি ক্রমান্বয়ে বইয়ের পাতা থেকে হারিয়ে যাচ্ছি মিছিলের সাথে। একদিন দু’দিন করে করে যখন বন্ধুদের সাথে রেসকোর্সের ময়দানে গেলাম সেদিন ছিল ৭ মার্চ। মাত্র কদিন আগের কথা আপনার ভুলার কথাও নয়। পুরো ময়দান লাখ লাখ মানুষে ভরপুর। ময়দান কেঁপে কেঁপে উঠছিল মিছিলে মিছিলে। বক্তা মাত্র একজন। যার অপেক্ষায় আর সবাই নিশ্চুপ শ্রোতা হতে অপেক্ষার প্রহর গুনছিল। একটা সাদামাটা মঞ্চ,ছড়ানো ছিটানো বাঁশের মাথায় গুটিকয়েক মাইক আর অজস্র মানুষের হাতে ছোট বড় লাঠি। ভীড় ঠেলে এগিয়ে গেলাম মঞ্চের খুব কাছে। সেখানে সেই মঞ্চে দাড়ালেন বীর,দাড়ালেন আপামর বাঙ্গালীর প্রানের মানুষ বঙ্গবন্ধু। তার কথা শুনে তখনই আমি আমাকে দেশের নামে উৎসর্গ করে এসেছি। আমিতো এখন পালিয়ে থাকতে পারিনা! আমিতো এখন গ্রামে ফিরে যেতে পারিনা। যে শপথ আমি সেদিন নিয়েছিলাম সে শপথ পুরণের সময় এসে গেছে। তাই আমার পথ আমি স্থির করে নিয়েছি।
আমার কথা বলা শেষ হলে আমি অনুভব করলাম কেউ একজন আমাকে জড়িয়ে ধরেছে। পরক্ষণেই বুঝলাম তিনি রিমুর বাবা। তার চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে। তিনি বললেন আমি যেদিন প্রথম তোমার সাথে দেশ নিয়ে কথা বলেছিলাম সেদিনই বুঝতে পেরেছিলাম দেশের প্রতি তোমার কতটা টান। তুমি যুদ্ধে যাচ্ছ এটা গৌরবের কথা। এ দেশ স্বাধীন হবেই। যে দেশের তরুণেরা কলম ফেলে অস্ত্র হাতে নেয় মাতৃভূমিকে রক্ষার তাগিদে, সে দেশ স্বাধীন হবে না তো কোন দেশ স্বাধীন হবে। হানাদারেরা রাতের অন্ধকারে যে নৃশংস ঘটনার জন্ম দিয়েছে একদিন তার ফল তারা ভোগ করবেই। কিন্তু বাবা যুদ্ধ কোন সাধারণ বিষয় নয়। আবেগ দিয়ে যেমন জীবন চলেনা তেমনি মুখে বললেই যুদ্ধে যাওয়া যায়না। সে জন্য দরকার প্রস্তুতি এবং প্রশিক্ষণ। তার কথাগুলো ছিল আমার জন্য অত্যন্ত উপকারী। তিনি অনেক রাত পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান দিলেন। জানিনা তিনিও আমার মত যুদ্ধে যাবেন কিনা। কিংবা আমার মত তার মনেও যুদ্ধে যাবার দৃঢ় সংকল্প আছে কিনা। তিনি একসময় সামরিক বাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি তাৎক্ষণাৎ বিভিন্ন অস্ত্র সম্পর্কে আমাকে প্রাথমিক ধারণা দিলেন। কোন অস্ত্র কিভাবে চালাতে হয়,কোনটির রেঞ্জ কত সব জানালেন। বলতে গেলে ঘরের মধ্যে একরাতেই তিনি আমাকে সামরিক মহড়া করিয়ে নিলেন। পরদিন সকালেই আমি রিমুদের বাসা থেকে বেরিয়ে পড়লাম। আসার সময় রিমুর বাবা আমার হাতে পাচশত টাকা ধরিয়ে দিলেন। আমিও নিতে সংকোচ বোধ করলাম না। যুদ্ধের এই সময়ে টাকা এবং খাবার খুবই জরুরী। অন্য সময় হলে কোন ভাবেই আমি টাকাটা নিতাম না। সেটা রিমুর বাবাও জানেন। কিন্তু এখন সময় ভিন্ন স্রোতে বয়ে চলেছে। তিনি বললেন এই টাকাগুলো তোমার বিভিন্ন সময় কাজে লাগবে। দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে আমি কতটা অবদান রাখতে পারবো জানিনা, তবে রিমুর বাবা ইতমধ্যে দেশের স্বাধীনতার জন্য তার গুরুত্বপুর্ণ অবদান রাখতে শুরু করেছেন। তিনি সদ্য মুক্তি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে যাওয়া একজন তরুণকে বুকে নিয়েছেন, বিভিন্ন পরামর্শ দেয়ার পাশাপাশি অনেকগুলো টাকা দিয়েছেন। তার চেয়ে বড় কথা আমাকে প্রথম কোথায় যেতে হবে তাও তিনি ঠিক করে দিয়েছেন। বগুড়ার শেরপুরে আতাহার সাহেবের বাড়িতে গিয়ে আমাকে উঠতে হবে। তিনি টেলিগ্রাম করে তাকে জানিয়ে দিয়েছেন। এখন যোগাযোগ ব্যবস্থা যেরকম আছে দুদিন বাদে তা হয়তো থাকবেনা। তখন হয়তো কেউ কারো সাথে খবর আদান প্রদান করতে পারবেনা। আতাহার সাহেব ওখানকার স্থানীয় লোক। ১৯৪৮ সালে তিনি সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়েছেন। তিনি সেনাবাহিনীতে একজন সাধারণ সৈনিক ছিলেন। রিমুর বাবা ছিলেন আতাহার সাহেবের অফিসার। সেই সুত্রেই তিনি আতাহার সাহেবকে আমার কথা জানিয়েছেন। আমি যখন কথাগুলো লিখছি তখন আমি আতাহার সাহেবের বাড়িতে। বাড়িতে তিনি , তার স্ত্রী ছাড়াও রয়েছে তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে আমার বয়সী,স্থানীয় এক কলেজে বিএ পড়ছে আর ছোট ছেলে পড়ে মাদ্রাসায়। একমাত্র মেয়ের নাম ফিরোজা। ফিরোজাও মাদ্রাসায় ক্লাস টেনে পড়ে। রিমুদের বাসা থেকে বেরিয়ে প্রথমে গাবতলী এসেছি। উদ্দেশ্য একটাই যদি রাসেল ভাইয়ের সাথে দেখা হয় তাকে অন্তত এতটুকু বলে যাব যে আমি যুদ্ধে যাচ্ছি। কখনো আমার বাবা মায়ের সাথে দেখা হলে যেন সংবাদটা দিতে পারেন। মনে মনে ভেবেছিলাম রাসেল ভাই হয়তো আমাকে আবার অপমান করে তাড়িয়ে দেবেন। কিন্তু গিয়ে দেখলাম রাসেল ভাই নেই। নজরুল ভাই ছিলেন তিনি আমাকে কাছে ডেকে বললেন রাসেল ভাই যুদ্ধে গেছে। একথা শোনার পর আমার বুকটা আনন্দে ভরে উঠলো। কিছুক্ষণ পর নজরুল ভাই জানালেন তিনিও যুদ্ধে যাবেন। তবে সপ্তাহ খানেক পর কিছু জরুরী কাজ সেরে তবেই যুদ্ধে যাবেন। আমি তাকে আমার কথাও জানালাম। তিনি আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন দেশটা যখন আমাদের এ দেশটাকেতো আমরাই রক্ষা করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বো। সেদিনের ঘটনার জন্য যে রাগ নজরুল ভাইয়ের ওপর জমেছিল তা হারিয়ে গেল। রাসেল ভাইয়ের সেই অপমানের কথা আমি বেমালুম ভুলে গেলাম। আর ফিরে আসার আগে নজরুল ভাইও আমার হাত ধরে বললেন আমি এখন বুঝতে পেরেছি যে সেদিন তোমার ওপর অন্যায় করা হয়েছে। আমি এর জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আমি নজরুল ভাইয়ের হাত ধরে বললাম ভাই ছোটদের কাছে বড়দের ক্ষমা চাইতে হয়না এমনিতেই ক্ষমা হয়ে যায়।
যারা দেশের জন্য যুদ্ধে যেতে প্রস্তুত হচ্ছে তাদের একে অন্যের কাছে কোন অপরাধ থাকতে পারেনা। আমি নজরুল ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফিরে এলাম। ইতিউতি করেও আর কাউকে দেখলাম না। এমনকি সেই কাজের মহিলাকেও না। যার কারণে রাসেল ভাই আমাকে যাচ্ছেতাই বলে দুর দুর করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। মহিলার ওপর এখন আমার আর কোন ক্ষোভ নেই। এখন আমার সব ক্ষোভ পাকিস্তান বাহিনীর ওপর। যারা আমাদের শান্তি কেড়ে নিয়ে রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছে তাদের জন্য সব ক্ষোভ ঢেলে দিতে চাই। যে আগুন জ্বলে উঠেছে বুকের গভীরে সে আগুনে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে চাই পাকিস্তানী হানাদারদের। গাবতলী রাসেল ভাইয়ের মেসে গিয়ে তাকে না পেয়ে সোজা টঙ্গীতে চলে আসলাম। আসার সময় চোখে পড়লো অসংখ্য ছুটন্ত মানুষ। গাট্টি বোচকা বেঁধে সবাই নিরুদ্দেশ হচ্ছে। আমার ইচ্ছে হচ্ছিল ওদের বলি তোমরা কোথায় নিরুদ্দেশ হচ্ছো? নিজের দেশ ছেড়ে তোমরা এভাবে চলে যেতে পারনা। কিন্তু আমি তা বলতে পারিনি। আসার পথেই খুব মায়া হলো একটা ছেলের জন্য। সে তার খেলার সাথীদের রেখে কিছুতেই গ্রামে যেতে রাজি নয়। সে বায়না ধরেছে আমি এখানে থেকে যাবো। রাকিন,ত্বকি ওদের ফেলে আমি অন্য কোথাও যাবোনা। আমি বুঝলাম রাকিন,ত্বকি ওর বন্ধুদের নাম। মা তাকে তাড়া দিলো বক বক করিসনা,এখানে থাকবো থাকবো করলেইতো হবেনা মিলিটারী এসেছে সবাইকে মেরে ফেলবে। পাশ থেকে ছোট্ট মেয়েটা মাকে প্রশ্ন করলো মা মিলিটারী শুধু শুধু আমাদের মারবে কেন? মা যেন রাগে ফেটে পড়তে চাইলেন। রাগত স্বরে মেয়েকে ধমক দিয়ে বললেন ওদের ইচ্ছা হয়েছে তাই মারবে। মেয়ে মায়ের ধমকানিতে ভয় পেলোনা। সে তার মাকে দার্শনিকের মত বললো ওদের ইচ্ছে হবে আর মারবে ? এটাকি মগের মুল্লুক? ওরা মারতে আসলে আমরাও মারবো। খালেক স্যারকে বলবো আমরা পড়া না পারলে স্যার যে বেত দিয়ে আমাদের মারেন সেটা দিয়ে মিলিটারিদের এমন মার মারবে যে ওরা বাবার নাম ভুলে যাবে। মেয়েটার কথা শুনে আমার খুব ভাল লাগলো। কোন না কোন ভাবে সেওতো মুক্তিযোদ্ধা! মা তাকে এবার ভীষণ জোরে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিলেন। ধমকের চোটে মেয়ে যেন কেদেই ফেলে। ওর বাবা শান্তনা দিলেন আর স্ত্রীকে বললেন আহ ছাড়োতো এত ধমকাচ্ছ কেন? এতে কাজ হলো। মহিলা আর কোন কথা বললোনা। বোনকে শান্তনা দিতে এগিয়ে এলো ভাইটি। বয়স দশ এগার হবে। আর বোনটার বয়স ছয় সাত। বোনের কাধে হাত রেখে বললো মন খারাপ করিসনা। পাকিস্তানিরা মারতে আসলে আমরাও ছেড়ে দেবনা। এবার দুই ভাই বোনের মধ্যে গল্প জমে উঠলো।
আচ্ছা ভাইয়া পাকিস্তানীরা মারতে আসলে তুইওকি ওদের মারবি?
হ্যা অবশ্যই মারবো। মারবোনা কেন? ওরা যদি তোকে মারতে আসে ভাই হয়ে আমি কি বসে থাকবো? আচ্ছা ভাইয়া পাকিস্তানীদের সাথে কি দিয়ে যুদ্ধ করবি? বোনের প্রশ্ন শুনে ভাই পকেটে হাত দেয়। বের করে আনে একটা গুলতি। অন্য পকেট থেকে বের করে কিছু মারবেল। বোনকে দেখিয়ে দেখিয়ে বলে এই গুলতি আর মারবেল দিয়ে ওদের সব কটার কপাল ফাটিয়ে দেব। বোন তার ভাইয়ের কথা শুনে সাহস পায় আর আনন্দে হাত তালি দিয়ে ওঠে। হাত তালি দিতে আমারও ইচ্ছে হয় কিন্তু দিইনা। আবার ্িদইনা বললেও ভুল হবে। ওদের কথা শুনে হাত তালি দিই মনে মনে। আচমকা হাত তালি দেয়া দেখে ওদের মা অবাক হয় কিন্তু কিছু বলেনা। মনের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ক্রমাগত ভাবে জেগে ওঠে। দুই ভাই বোনের কথাগুলো মনে দাগ কেটে যায়। যে দেশের ছোট্ট বাচ্চারা তাদের স্কুল মাস্টারকে দিয়ে বেত পিটা করে পাকিস্তানীদের তাড়াতে চায় সে দেশের স্বাধীনতা রুখে এমন সাধ্য কার।
রাস্তায় কোন গাড়ি নেই। দু একটা রিক্সা চলছে তার আপন গতিতে। রাস্তায় মানুষ আর মানুষ। সবাই ছুটছে নিরাপদ গন্তব্যের দিকে। আমি ছুটছি টঙ্গী হয়ে আমার গন্তব্যে পৌছার পথে। টঙ্গীতে এসে একটা দোকান থেকে রুটি আর কলা কিনে খেলাম। অধিকাংশ দোকানপাটই বন্ধ। দু’একটা দোকান খোলা আছে কিন্তু লোকজন নেই বললেই চলে। দোকানের ঝাপটা অর্ধেক নামানো। ভিতরে একটা বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে বসে আছে মধ্য বয়ষ্ক দোকানদার। দোকানদারের মুখে দাড়ি মাথায় টুপি। কলা আর পাউরুটি খেতে খেতেই দেখলাম আরো দু একজন লোক দোকানে এটা সেটা কিনতে আসছে। তাদের মাঝে ছোটখাট কথাও হচ্ছে। একজন বললো কি জীবন মিয়া পাকিস্তানীগো দলে ঢুকবা নাকি সারাক্ষণ টুপি পরে আছ। পাশ থেকে আরেকজন বলে উঠলো কি ভাই এলো মেলো কথা বলেন। টুপি পরলেই কি পাকিস্তানী হয়নাকি। টুপি দাড়ি ইসলামী লেবাস,নবীর সুন্নত এটা নিয়ে মশকরা করবেন না। কোন মুসলমান কি পাকিস্তানী হতে পারে! ওনার এই কথা শুনে আমি তাজ্জব বনে গেলাম। বলে কি এই লোকটা। গোটা পাকিস্তানতো মুসলমান সংখ্যা গরিষ্ঠ তাহলে এ কথা বলার মানে কি। পরক্ষণেই সব পরিস্কার হলো। পাকিস্তানী হানাদারেরা যা করেছে তাতে তারা মুসলমান কিনা তা কি জানি। ইসলাম মানে শান্তি আর ইসলাম এভাবে অন্যায় ভাবে কাউকে মারতে বলেনি। এর পর তিনি ছোটখাট একটা বক্তৃতা দিলেন। কথা গুলো ছিল খুব জোরালো এবং যুক্তিপূর্ণ তাই যাকে উদ্দেশ্য করে বললেন তিনি আর কোন উত্তর দিলেননা। তাদের কথাবার্তা থেকে জানলাম দোকানদারের নাম জীবন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন সেই অনেক আগে থেকে। লোক দুটো চলে যাবার পর আমি তার সাথে একটু কথা বলার চেষ্টা করতেই জানতে পারলাম মনের মধ্যে দেশের জন্য তার কত টান। তিনি দোকান খোলা রেখেছেন যদি কোন মুক্তিকামী মানুষ তার দোকান থেকে কিছু কেনে তাতে তার ভাল লাগবে এটা ভেবে। মনে মনে বললাম আপনিতো ইতমধ্যে কত মুক্তিকামী মানুষকেই আপনার দোকানের খাবার খ্ওায়ালেন। জীবন ভাইয়ের দোকান থেকে পাউরুটি কলা খেয়ে কোন মত পেটটাকে শান্ত করেই ট্রেনে উঠে বসলাম।
লক্কড়ঝক্কড় সেই ট্রেনে করে আমি পৌছালাম বগুড়ার সান্তাহারে। এর বেশি ট্রেন লাইন নেই। ট্রেন থেকে নেমে তিন মাইল পায়ে হাটা পথ। এরপর একটা বড় রাস্তয় উঠলাম। সেই বড় রাস্তায় গরু আর ঘোড়ার গাড়ী চলে। একটাকা ভাড়া দিয়ে উঠে বসলাম একটা ঘোড়ার গাড়িতে। গাড়ী চলছে আকাবাঁকা পথ বেয়ে। একসময় সে পথটুকুও ফুরালো। এর আগে আমি কখনো বগুড়াতে আসিনি। তার পরও সব কেমন চেনা চেনা মনে হচ্ছিল। ঘোড়ার গাড়ী থেকে নেমে আবার সেই পায়ে হাটা পথ। এদিকটাতে তেমন কোন রাস্তা নেই যা দিয়ে গাড়ী চলবে। অনেক মানুষকেই দেখা যাচ্ছে ঐ পথ দিয়ে হেটে যেতে। কিছুদুর হাটার পর একটা বাড়ীর সামনে আসলাম। সেখানে একজনকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি আতাহার সাহেবের বাড়ী দেখিয়ে দিলেন। তারপর আমি এখানে পৌছালাম। এ বাড়ীতে এসে প্রথমে একে একে সবার সাথে পরিচিত হলাম। তিন দিন হলো আমি এ বাড়ীতে আছি। সবাই মনে করছে যুদ্ধের সময়টা আমি এ বাড়ীতে নিরাপদে থাকার জন্য এসেছি। এটা বুঝলাম এ কারণে যে গত রাতে খাবার সময় আতাহার সাহেবের স্ত্রী তার মেয়েকে বললেন , তোর জন্য সুবিধা হলো, অতদূর যেয়ে আর পড়তে হবেনা। এখন থেকে ওর কাছেই পড়তে পারবি। আমি মাথা তুলে মেয়েটির দিকে তাকালাম। অসম্ভব সুন্দরী মেয়েটা। মায়ের কথা শুনে তার মুখে হাসির খৈ ফুটলো। সে হয়তো মনে মনে এটাই চাচ্ছিল। হয়তো সে অত দূরে গিয়ে পড়তে হবেনা ভেবে আনন্দ পাচ্ছিল নতুবা আমাকে দেখে তার ভেতরে একটু একটু অন্যরকম অনুভূতি জেগেছিল। রাতেই সে একবার আমার কাছে অংক করে গেছে।
সকাল হতে না হতেই সে আবার হাজির। সে অংকে ভালো বলেই মনে হলো। কেননা আমি তাকে কোন অংক একবার বুঝিয়ে দিলেই সে ওরকম বাকি অংক গুলো করতে পারে। তবে এ বয়সে যা হয় আরকি! সে কেমন অন্যরকম ভাবে আমার দিকে তাকায়। আমি বুঝতে পারি তার মনের ভাষা। কারণ এখন আমার মনের ভাষা বোঝার মত ছোট খাট জ্ঞান হয়েছে। হয়তো আলেয়া যখন চলে আসার সময় কিছু কথা ইঙ্গিতে বলেছিল তখন তা বুঝে উঠতে পারিনি তবে এখন বুঝি সে আসলে কি বুঝাতে চেয়েছিল। দুপুরে খাবার সময় ওর আম্মা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন বাড়ীতে আমার কে কে আছেন। এখানে থাকতে কোন অসুবিধা হচ্ছে কিনা। আমি আগেই ভেবে রেখেছিলাম আমার কী বলা উচিৎ। আমি ভেবেছিলাম আতাহার চাচা মনে হয় সবাইকে আগে থেকে সব বলে রেখেছেন । আমি কেন এসেছি কতদিনের জন্য এসেছি এসব আরকি। কিন্তু দেখলাম কোন এক অজানা কারণে তিনি তার বাড়ীর কাউকে আমার আসার উদ্দেশ্য বলেননি। বাধ্য হয়ে আমাকেই সব বলতে হলো। আমি এখানে নিরাপদে থাকতে আসিনি এবং যুদ্ধে যাবার জন্য এসেছি শুনে আতাহার চাচার স্ত্রী নির্বাক হয়ে গেলেন, আর মেয়েটাকে দেখলাম গাল ফুলিয়ে চোখ দিয়ে পানি ঝরাচ্ছে। মেয়েরা বোধ হয় একটুতেই হাসতে কাদঁতে পারে। মেয়েরা অল্পতেই ভাল কাঁদতে পারে এটা তার প্রমান। কেবল আতাহার চাচার বড় ছেলের মধ্যে খুশির আভা ফুটে উঠলো। খাবার শেষ করে আমি যখন বিছানায় শুয়ে আছি তখন সে আসলো। ওর নাম জামান। ও জানালো যে ওরা সব বন্ধুরাও যুদ্ধে যাচ্ছে। কথাটা শোনার সাথে সাথে একটা প্রশান্তি আমার মনের মধ্যে ভরে গেল। এরপর ওর সাথে আমার অনেক কথা হলো। ওর জীবনের অনেক হাসি কান্নার গল্প ও আমাকে শোনালো। যুদ্ধ শেষে ফিরে আসবে কিনা কেউ জানেনা। যেমন আমি জানিনা যুদ্ধ শেষে আবার সেই চিরচেনা গ্রামের মেঠো পথে হাটতে হাটতে বাবা মায়ের কাছে পৌছাবো কিনা। সে এক অদূর ভবিষ্যৎ হলেও সে সত্যিকার এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। হয়তো এ জন্যই সে আমাকে তার অন্তরে জমে থাকা সব কথা থেকে কিছু কিছু জানালো। বলার মত আমার থলিতে কিছু ছিলনা বলে আমি সংক্ষেপে ইতি টেনেছি। হ্যা! বলতে পারতাম আলেয়াকে নিয়ে কত শত কথা। তাকে নিয়ে বলতে গেলে আজীবন বলেও আমি শেষ করতে পারবো কিনা জানিনা। অথচ আমি নিদ্বির্ধায় জামানের কাছে সব লুকিয়ে কথা সংক্ষেপ করেছি। এরপর আমি সোজা ইন্ডিয়াতে আসলাম। বগুড়াতে আমি শুধু কয়েকদিন থাকার জন্য এবং সেখান থেকে প্রশিক্ষণ নেয়ার তাগিদে এখানে আসা। দিনাজপুর সীমান্ত দিয়ে আমি ইন্ডিয়াতে ঢুকেছি। বগুড়া আতাহার চাচার বাড়ী থেকে গাইবান্ধার সাঘাটা হয়ে আস্তে আস্তে আমি দিনাজপুরে পৌছাই। এখানেই আমার বাড়ী অথচ আমি একটি বারের জন্যও বাড়ী যাওয়ার কথা মনে করিনি। যে বাবা মা বার বার আমাকে বলেছেন ওসবের ভিতর যাসনা, ওসব করার জন্য আরো লোক আছে, সেই বাবা মা আমাকে যুদ্ধে যেতে দিতেন কিনা জানিনা। হয়তো পরিস্থিতি বুঝে আমাকে যাওয়ার অনুমতি দিতেন। কাহারোলে আমার সাথে যোগ দিল আরো কয়েকজন যুবক। ওরা সবাই মুক্তি যুদ্ধে অংশ নেবে বলে ট্রেনিং নিতে ইন্ডিয়া এসেছে। আমরা খুব সাবধানে বর্ডার পার হলাম।
এখানে যে ক্যাম্পে এসে উঠেছি সেখানে আমার অনেক পরিচিত মুখ আছে যেমন
নাজমুল,মান্নান,জসীম,বাকি,রাকিবুল সহ অনেকে। ওরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিভাগের ছাত্র। ওদের কাছে পেয়ে আমার ভাল লাগছে। যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে এসে বন্ধুত্বের বেড়াজালে বাঁধা পড়ছিনা। তবে চেনা মুখ বীরের বীরত্বকে বাড়তে সাহায্য করে। ”মুক্তিযুদ্ধ কোন ছেলে খেলা নয়, কিংবা তুচ্ছ কোন বিষয় নয়। মুক্তিযুদ্ধ মানে অবধারিত মৃত্যু হাতে বয়ে বেড়ানো। মুক্তিযুদ্ধ মানে মৃত্যুর বিনিময়ে জীবন ফেরী করা। যেখানে ভয়কে তুচ্ছজ্ঞান করে শত্রুর বুকে মরণ কামড় দেয়াই যোদ্ধার একমাত্র দায়িত্ব। শত্রুকে ছিন্ন ভিন্ন করা যেমন যোদ্ধার দায়িত্ব তেমনি সহযোদ্ধাদের রক্ষা করাও এরই মত একটা দায়িত্ব। সাধনা,ধৈর্য্য আর অত্যন্ত কঠোর অনুশীলন একজন মুক্তিযোদ্ধার আগামী দিনের পথ চলা সহজ করতে পারে। সেই সাথে দেশের স্বাধীনতা অর্জনে সহায়ক হতে পারে।” এগুলো ছিল ট্রেনিং এর আগে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে দেয়া উপদেশ। যে যুদ্ধের জন্য নাম লিখিয়েছি মুক্তিযুদ্ধে জানি সে যুদ্ধে প্রাণ দেয়ার মানসিকতা থাকা দরকার। নিজেকে শক্ত করি এবং প্রস্তুতি নিয়ে ফেলি মৃত্যুকে যে কোন মুহুর্তে আলিঙ্গন করার। এভাবেই শুরু মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি। এক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন কসরত শেখার পর হাতে এলো অস্ত্র। প্রথম দিন থ্রি নট থ্রি রাইফেল,দুদিন পর স্টেনগান এবং এভাবে একে একে হালকা মেশিনগান থেকে শুরু করে মর্টার ও একে ফর্টিসেভেন চালানো। এক ফাঁকে শিখে নিয়েছি হ্যান্ড গ্রেনেড কিভাবে ছুড়তে হয় তার কলাকৌশল।
যুদ্ধ শুরু হবার আগেই পেয়েছি সহযোদ্ধাকে হারানোর কষ্ট। যেদিন প্রথম গ্রেনেড ছোড়ার কলা কৌশল শেখানো হলো সেদিনই হারালাম দুজন সহযোদ্ধাকে। গ্রেনেডের পিন দাত দিয়ে খুলে দূরে লক্ষ্যবস্তুর দিকে ছুড়ে মারতে হয়। আমাদের মারজান নারে সহপ্রশিক্ষণরত যোদ্ধা পিন খুলে ছুড়ে দিতে দেরি করে ফেলে এবং ওর হাতেই গ্রেনেড ফেটে যায়। এতে ও মারাত্মক ভাবে আহত হয়। কিন্তু চিকিৎসা দিতে দিতে সে নিথর হয়ে পড়ে। ঠিক একই ভাবে জরিপ তার গ্রেনেডের পিন খুলে একটা ঝোপের দিকে ছুড়ে মারে। আমাদের কারো জানা ছিলনা যে তারেক নামে আমার এক প্রশিক্ষণরত যোদ্ধা সেই ঝোপের আড়ালে প্রসাব করতে বসেছিল। গ্রেনেড সেখানে পড়তেই তার গগণ বিদাবী চিৎকারে আমরা ছুটে যাই। এবং তার ছিন্ন ভিন্ন দেহ প্রাণহীন ভাবে পড়ে থাকতে দেখি। যুদ্ধ শুরু করার আগেই আমরা কষ্টের সাগরে ভাসতে থাকি। সব কিছু মেনে নিয়ে প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাই। যুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ এ কথাটা বার বার করে বলে দেয়া হয়েছে। ছোট খাট যে কোন জ্ঞানই কাজে লাগতে পারে বলে যারা শিক্ষিত ছিল তাদেরকে অস্ত্র চালনার পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে অল্প বিস্তর শেখানো হলো। প্রাথমিক চিকিৎসা থেকে শুরু করে প্রতিকুল আবহাওয়ায় টিকে থাকার কৌশল। মানুষ যে মৃত্যুকে এতটা ভালবাসতে পারে তা এখন অনুভব করতে পারি। যুদ্ধ মানেই মৃত্যু একথা জেনেও লাখ লাখ তরুণ,যুবা,বৃদ্ধ অস্ত্র হাতে নিচ্ছে মানে মৃত্যুকেই আলিঙ্গন করছে। এ জন্যই বোধহয় বায়ান্নতে আমরা ভাষা পেয়েছিলাম। এমন দৃশ্য অন্তরকে আনন্দ দেয়। যে যুদ্ধ একটা স্বাধীন পতাকার জন্য,একটা স্বাধীন ভূখন্ডের জন্য ,সে যুদ্ধে প্রাণ দিতে প্রস্তুত আমরা। ট্রেনিং শেষে দিনাজপুর সীমান্ত দিয়ে রাতের অন্ধকারে ফিরে এলাম। ততদিনে দেশের নানা প্রান্তে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। অস্ত্র গোলাবারুদ,চিকিৎসা সব কিছুর প্রশিক্ষণ নিয়েছি। যুদ্ধের ময়দানে যে কোন ভাবে সাহায্য করতে পারাটাই হবে গুরুত্বপুর্ন। ততদিনে আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগের বাছাই করা তরুণ ও শিক্ষিত কর্মীদের নিয়ে গড়ে উঠেছে মুজিব বাহিনী। তারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে শুরু করেছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন প্রান্তে আলাদা আলাদা ভাবে গড়ে উঠেছে মুক্তিযোদ্ধাদের দল। আমি সোজা ভৈরব চলে গেলাম।
দেখতে দেখতে বৈশাখ চলে আসলো। নামে হলেও বৈশাখ আসলেই আমাদের মনটা আনন্দে ভরে ওঠে। বাঙলা নববর্ষ বলে কথা। পৃথিবীতে কত কত ভাষা আছে কিন্তু তাদের কোন নববর্ষ নেই। আছে খ্রিষ্ঠীয় নব বর্ষ যা অনেকে ইংরেজী নববর্ষ বলে থাকে। আর আছে হিজরী সন বা আরবী নববর্ষ। এর বাইরে কেবল বাঙলা নববর্ষ আছে। প্রতিবছর কম বেশি আনন্দ হতো। গ্রামে দু এক স্থানে মেলাও বসতো। আর এবার দেখতে দেখতে বৈশাক এলো চলে গেল টেরই পেলাম না। বৈশাখ যেন নিরুত্তাপ হয়ে এসেছিল গোপনে আবার গোপনেই চলে যেতে চাচ্ছে। বৈশাখ মানেই এপ্রিলের ভ্যাপসা গরম। আকাশে মাঝে মাঝে মেঘের আনাগোনা। মাঝে মাঝেই বৃষ্টির শীতল পরশ বুলিয়ে যাওয়া। যুদ্ধর ডামাডোলে সব বিমলিন হয়ে গেছে। সব রঙ ফিকে হয়ে গেছে। বৈশাখের সেই উত্তপ্ত গরমের দিনে আকাশ যখন মেঘে মেঘে ঢেকে গেল গোটা ভূমিকে বৃষ্টির শীতল পরশ দিতে এরকম সময়ে ১৪ ও ১৫ এপ্রিল ভৈরবে ভয়াবহ রকম যুদ্ধ হলো। পাকিস্তান হানাদার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে মুখ থুবড়ে পড়লো। সেই যুদ্ধে সরাসরি থাকার সৌভাগ্য আমার হলোনা। যুদ্ধ শেষে আমি মুক্তিবাহিনীর সাথে যোগাযোগ করলাম এবং তাদের সাথে যোগ দিলাম। শুরু হলো গ্রাম থেকে শহরে এসে শিক্ষা জীবন শুরু করা এক তরুণের যোদ্ধা জীবন। আমার প্রশিক্ষণ সম্পর্কে সব জেনে নিয়ে আমাকে দায়িত্ব দেয়া হলো মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে শত্রু সৈন্যের অবস্থান ও খবর পৌছে দেয়া। আমি জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও দায়িত্ব পালন করবো বলে সিদ্ধান্ত নিলাম।
৪.
জুনের শেষ দিকে প্রচুর বৃষ্টি শুরু হলো। এমন বৃষ্টি বিগত সময়ে খুব একটা দেখা যায়নি। সকালে মানুষ ঘুম থেকে উঠে বৃষ্টি দেখছি এবং সারাদিন চলছে তুমুল বর্ষণ। গত এক মাসেরও বেশি সময়ে ডায়রীতে কলম ছোয়াতে পারিনি। এখন আমাদের প্রচুর ব্যস্ততা। এই বৃষ্টি আমাদের জন্য রহমত স্বরূপ। কখনো কখনো বৃষ্টি যেমন কষ্ট দেয় তেমনি কখনো কখনো বৃষ্টি আমাদের অনেক আনন্দের কারণ হয়ে দাড়ায়। বিগত সপ্তাহ খানেকের বৃষ্টি আমাদের জন্য অনেক উপকারে এসেছে। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাড়িয়ে আমরা কেবল দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়ছি। এ লড়াইয়ের শেষ অবধী আমরা সাহস হারাবোনা বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। মৃত্যুই যেখানে আমাদের সামনে তুচ্ছ সেখানে বৃষ্টি কোন ব্যাপারই না। একজন মুক্তিযোদ্ধা কোন কিছুতেই ভীত নয়। সৃষ্টিকর্তার ওপর পূর্ন আস্থা রেখে সে কেবল সামনে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ঝড় ঝঞ্জা সেখানে তুচ্ছ নগণ্য। সারাদিনের বৃষ্টিপাতে আমাদের যুদ্ধের উত্তেজনায় এতটুকু ভাটা পড়েনি বরং আমাদের কাজের গতি বেড়েছে। আমরা চাই স্বাধীনতা, তাই ঐ একটি শব্দকে পাওয়ার জন্য আমাদের অন্তহীন প্রচেষ্টা। অপরদিকে হানাদার পাকিস্তাানীরা জোর করে সেটা রুখতে চায়। তাদের কাছে বিষয়টা এমন যে বাঙ্গালীকে রুখতে পারলে অখন্ড পাকিস্তান থাকবে না রুখতে পারলেও সমস্যা নেই। আর তাই বৃষ্টির প্রকপতায় পাকিস্তানীরা মুশড়ে পড়েছে। এ কথা জোর দিয়ে আমি লিখতে পারছি কারন বিগত সময়ের চেয়ে বৃষ্টির এ সময়ে আমাদের পথচলা আরো গতিময় হয়েছে। আমরা অনেকগুলো পাকিস্তানী ক্যাম্প অ্যাম্বুশ করে উড়িয়ে দিয়েছি। ওরা এখন ভীত সন্ত্রস্ত। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের খুব বেশিদিন স্বাধীনতার সুখের জন্য অপেক্ষা করতে হবেনা। মুক্তিযুদ্ধে আমার দায়িত্ব সংবাদ আদান প্রদান করা। এ জন্য আমাকে বিভিন্ন সময়ে ছদ্মবেশ নিতে হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও নিতে হবে। প্রথম প্রথম আমার খুব ভয় হতো। এখন আর ভয় করেনা। এখন কোথাও কোন সংবাদ পৌছে দিতে গেলে খুব আনন্দ হয়। আর সবচেয়ে বেশি আনন্দ হয় যখন দেখি আমার দেয়া সংবাদকে ভিত্তি করে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানীদের ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। তখন মনে হয় আমার যদি ডানা থাকতো কিংবা আমি যদি আরও দ্রুতগতি সম্পন্ন হতে পারতাম তাহলে যেখানে মুক্তিযোদ্ধারা আছে তাদের কানে শত্রুর অবস্থান নিশ্চিত করতে পারতাম। গত দুইদিন ঘর থেকে বের হইনি। এক সপ্তাহ হলো জ্বরে ভুগছি। এই সময় জ্বরের কথা মাথায় রাখার সময়ও আমাদের নেই। জ্বরের মধ্যেই এখানে সেখানে ছোটাছুটি করেছি। কিন্তু শরীরতো যোদ্ধার হাতের একে ফর্টিসেভেন নয় যে তাকে যেভাবে চালাবো সেভাবেই চলবে। সে চলে তার নিজস্ব নিয়মে। গতকাল শরীর কাপুনি দিয়ে জ্বর আসলো। আমি চোখে অন্ধকার দেখতে শুরু করলাম। আমার পকেটে গুরুত্বপুর্ন সংবাদ সম্বলিত একটা চিঠি। চিঠিটা যে কোন মুল্যেই হোক কাহারোলে মুক্তি বাহিনীর হাতে পৌছাতে হবে। আমার শরীরের যে অবস্থা তাতে আমি উঠেই বসতে পারছিলাম না সেখানে সংবাদ নিয়ে অতদূরে যাব কি করে তা ভেবে কুল কিনারা পাচ্ছিলাম না। আমাকে অসুস্থ শরীরে ভীষণ চিন্তিত দেখে আমি যে বাড়িতে আছি সে বাড়ির কাকি আমার কাছে সব শুনে বললেন চিন্তা নেই বাবা আমি আমার ছেলেকে পাঠাচ্ছি। শুনে আমি বড়ই আস্বস্থ হলাম। কিন্তু যখন ওনার ছেলেকে দেখলাম তখন আমার আশার আলো ক্ষীণ হয়ে গেল। আমি ভেবেছিলাম ওনার ছেলে বোধ হয় বেশ বড়সড় হবে। হয়তো মুক্তিযোদ্ধাও হতে পারে। কিন্তু যখন দেখলাম বার বছরের একটা ছোট্ট ছেলে তখন আমি আবার চিন্তায় পড়ে গেলাম। এতটুকু একটা ছেলেকে যুদ্ধের ময়দানে ঠেলে দেয়া ঠিক হবেনা। কিন্তু আমি যাই ভাবিনা কেন শেষে আমার সব চিন্তা দূর হয়ে গেল ছেলেটার কিছু কথা শুনে। ছেলেটা নিজের অসম্ভব সাহসের পরিচয় দিতেই আমার কাছে এসে বললো “ ভাইজান আমি ছোট বইলা আমারে পাঠাইতে ভয় পাইতাছেন যে যদি আমি ধরা পড়ি,যদি আমি মইরা যাই। আপনেওতো ধরা পড়বার পারেন,আপনেওতো মারা পড়বার পারেন। এই দ্যাশটা যেমন আপনের এই দ্যাশটা আমার,আমগো সবার। আমারেও এটটু সুযোগ দ্যান।” ওর কথাগুলো শুনে আমার চোখ ভিজে উঠলো। আমি যদি ঠিক ওর বয়সী থাকতাম তাহলে আমিওকি এরকম করে কথা বলতাম? নাকি ভয়ে মুখ ফিরিয়ে নিতাম। তা আমি জানিনা। শেষে ওকে আর না করতে পারলাম না। সব বুঝিয়ে বিদায় জানালাম।
সকালে আমাকে ভীষণ অবাক করে দিয়ে ও ফিরে আসলো নতুন সংবাদ নিয়ে। অসুস্থ শরীরেও আমি ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে কপালে মুখে চুমু দিলাম। ওর নাম জহির। আমি ওদের বাড়িতে গত চারদিন ধরে আছি। মৃত্যুর ভয়ে বা ধরা পড়ার ভয়ে ভীতুদের মত আমি পালিয়ে নেই। আমি অসুস্থ শরীরেই রাতের অন্ধকারে আমার কর্তব্য পালনের জন্য এ বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। কোন এক সময়ে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গিয়েছিলাম জানিনা। জ্ঞান ফিরলে জানতে পারলাম এরা আমাকে তুলে এনে সেবা করে সুস্থ করার চেষ্টা করছে। ওরা যখন জানতে পারলো আমি মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করছি তখন ওরা আমার প্রতি আরো বেশি মমতা দেখালো। এখন আমি অনেকটাই সুস্থ। হয়তো দু একদিনের মধ্যেই আমি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবো। তারপর হয়তো এদের সাথে আমার আর দেখা হবেনা। এই ক’দিনে এরা আমার অতি আপন হয়ে উঠছে। কোন কাজ নেই এবং শরীর একটু সুস্থ বোধ করায় আজ অনেক কিছু লিখতে পারছি। কোন কাজ নেই বললে ভুল হবে। আসলে কাজ আছে অফুরন্ত। এখনো আমাদের কাঙ্খিত স্বাধীনতা আমরা অর্জন করতে পারিনি। আমরা কেবল আমাদের সফলতার পথে কয়েক ধাপ এগিয়েছি মাত্র। এখনও আমাদের পাড়ি দিতে হবে অনেক পথ। যে পথে আছে মৃত্যুর ভয়, আছে রক্ত নদীর উষ্ণ স্রোত। তা বলে আমরা থেমে যাবনা। এই সময়ে আমি চেষ্টা করছি জমানো কথাগুলো লিখে ফেলতে। হতেও পারে এটাই আমার শেষ লেখা। আর তাই যতটুকু সম্ভব লিখে ফেলাই ভাল মনে করছি। স্বাধীনতার এই পথ বড় জরাজীর্ণ,কন্টকময় আর রক্তে রক্তে অতি পিচ্ছিল। সুতরাং যে কোন সময় মৃত্যু আমাকে গ্রাস করবেনা তা বলা যাবেনা। আমি তাই লিখছি যতটুকু লেখা সম্ভব। এ সময় আমি কয়েকদিন পর বা সপ্তাহ খানেক পর ডায়েরি লিখতে বসি। কদিন পরে হয়তো একেবারেই বসার সময় হবেনা। এ বাড়িতে দুটো শোলার বেড়া দেয়া ছনের ঘর ছাড়া তেমন কিছু নেই। অত্যন্ত গরীব হওয়ায় ছেলে মেয়েরা স্কুলে পর্যন্ত যেতে পারেনা। দিন আনে দিন খায় এই যাদের অবস্থা। এমনকি যুদ্ধের এই সময়ে হয়তো তাও ঠিকমত রোজগার হয়না। তার মাঝে আমি বিগত কয়েকদিন কাঁধে চেপে বসে আছি। আমি জানি এবং বিশ্বাস করি তারা শত কষ্টের মাঝেও কিছু মনে করছেনা। কারণ তারাও দেশকে ভালবাসে। যে পরিবারের ছোট্ট একটা ছেলে মুক্তি যুদ্ধে অবদান রাখতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করে সেই পরিবার একজন মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যকারীকে অপছন্দ করতে পারেনা। তারপরও নিজের কাছে খুব খারাপ লাগছে। এ বাড়ির চাচার নাম আজহার ফকির। সেই সুত্রে ছেলের নাম রেখেছে জহির ফকির। ফকির কথাটার মধ্যে একরকম গরীবি ভাব ফুটে ওঠে যা এ পরিবারকে দেখলেই সহজে বুঝা যায়।
আজহার চাচার এক ছেলে দুই মেয়ে। বড় মেয়ে জরিনাকে বিয়ে দিয়েছে দু’বছর হলো। আর ছোট মেয়ের বয়স ষোলতে পড়েছে। ওনার মাথায় এখন ভীষণ চিন্তা। দেশে যুদ্ধ মেয়ে বাড়ন্ত চিন্তা হওয়াই স্বাভাবিক। মানুষ বলে গোবরে পদ্মফুল ফোটে। আসলেই কোন দিন গোবরে পদ্মফুল ফুটেছে কিনা জানিনা, তবে এই গরিবের ঘরে আকাশের চাঁদ যে কোন এক ফাঁকে নেমে এসেছে তা আমি টের পেলাম গতকাল সকালে। আজহার চাচার এক মাত্র ছেলে জহির বাড়ি ছিলনা,আজহার চাচাও কোথায় যেন গিয়েছিল সেই ফজরের আজান হলে। চাচি পঙ্গু , কারো সাহায্য ছাড়া চলাফেরা করতে পারেন না। সুতরাং যখন আমার খাবারের সময় হলো তখন ষোল বছরের মেয়েটাই আমার জন্য খাবার নিয়ে আসলো। হয়তো এর আগেও আমার কাছে এসেছিল কিন্তু আমি জ্বরে এতটাই বেহুশ ছিলাম যে বুঝতে পারিনি। আমি যেন কোন মানবী নয় হুর পরী দেখলাম। কিছুক্ষণ আমি কোন কথা বলতে পারলাম না। আমি অপলোক তাকিয়ে ছিলাম আর মেয়েটা লজ্জায় লাল হয়ে উঠছিল। হয়তো আমার মত করে কোন দিন কেউ তার দিকে তাকিয়ে থাকেনি। নির্জন এই এলাকায় আসে পাশে তেমন বাড়ি ঘর নেই। যেহেতু স্কুলে বা কলেজে যায়নি তাই খুব একটা বাড়ির বাইরে তাকে যেতে হয়নি। এ ফুল নির্জনে ফুটেছে নির্জনে নিজেই নিজের সুবাশ ছড়িয়েছে। সে সুবাশ আর কেউ পায়নি আর কেউ দেখেনি নির্জন এই প্রান্তে ফুটে থাকা গোলাপের অপার সৌন্দর্য। হঠাৎ আমার আলেয়ার কথা মনে হলো। চোখের পলকে মেয়েটার চেহারা আমার কাছে আলেয়ার মত মনে হতে লাগলো। আমি ভুলে গেলাম আমি মুক্তিযোদ্ধা। আমি অসুস্থ হয়ে আজহার নামে এক চাচার বাসায় আছি। আমি ভুলে গেলাম আমার সামনে দাড়িয়ে থাকা অপরূপ সৌন্দর্যে ভরা ষোল বছরের কুমারী কন্যা আজহার চাচার মেয়ে। আমার কেবল মনে হলো না এ আর কেউ নয় এ আমার আলেয়া। আগে কখনো এরকম করে ভাবিনি। এখন আমি ভাবতে শুরু করেছি আলেয়া নামে যাকে ফেলে এসেছি সে আমার। আর তাই ডায়েরিতে নির্লজ্জের মত লিখছি আমার আলেয়া। আলেয়া এই ডায়রিটা পড়লে কি ভাববে? তার অজান্তে তাকে নিয়ে কেউ একজন ডায়েরি লিখছে এটা সে কিভাবে গ্রহন করবে? এর একটাই উত্তর আমি জানিনা।
আমার মনে হচ্ছিল আলেয়াই বুঝি আমার সামনে এসে দাড়িয়ে তার আলোয় আমার চারদিক আলোকিত করে রেখেছে। “ আপনের শরীল এহন কেমুন লাগতাছে? মায় জিগায়।” মেয়েটার এই কথায় আমি সম্বিত ফিরে পাই। একটু সুস্থ লাগছে বলতেই মেয়েটা আবার ফিরে গেল। আমার সাথে একবার তার চোখাচোখি হলো। কি ছিল সেই চোখের ভাষায়? মুহুর্তেই সব কেমন এলোমেলো হয়ে গেল। কি ছিল সেই চোখের চাহুনীতে? কোন মায়া,কোন কুহক। কিন্তু আমি কোন মায়া বা কুহকে জড়াতে চাইনা। গত কাল সকালে মেয়েটার সাথে চোখাচোখি হবার পর আজ এই সন্ধ্যা পর্যন্ত কতবার যে সে আমার সামনে এসেছে তা আমার হিসাবের বাইরে। কারণে অকারণে সে আমার সামনে এসেছে। কিছুক্ষণ আগেও দেখেছি সে লুকিয়ে আমার ডায়েরি লেখা দেখছে। আমি বুঝতে পারছি আমার প্রতি তার টান আর মায়া পড়ে গেছে।
যে চোখ কখনো কুমড়ো ফুলই দেখেনি সে যদি রাতারাতি গোলাপ ফুল দেখে তাহলে সে তার পলক ফেলতে পারেনা এটাই স্বাভাবিক। এই মেয়েটাও তাই। কোন দিন হয়তো কোন যুবককে দেখেনি, যে তার এত কাছে এসেছে তার সাথে কথা বলেছে। জহির আমাকে বলেছে ওর ছোট বু গত কয়েকদিন আমার মাথায় পানি ঢেলেছে,মাথা মুছিয়ে দিয়েছে। সেই সেবাই হয়তো একটু একটু করে মায়ার জন্ম দিয়েছে। মায়া বড় অদ্ভুত জিনিস। এর কুহক থেকে বেরিয়ে আসা অত্যন্ত কঠিন। কত মনীষী, কত সাধক এই মায়ার টানে সব ছেড়েছে তা অজানা। কিন্তু একজন যোদ্ধা এরকম কুহক এরকম মায়ায় বাঁধা পড়তে পারেনা। আমিও তাই তার চোখের ভাষা বুঝেও কিছু বুঝিনি বলে মনকে সায় দিচ্ছি। কেবল মাত্র আলেয়ার আলোকে ঢেকে রাখা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। বীর সে রণাঙ্গনে শত্রুকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারলেও আলেয়ার আলোর কাছে সে মোমের মত। আলেয়ার আলোর ছোয়ায় তাকে যে গলতেই হবে। আমিও তাই গলে গেছি। মিশে গেছি সেই আলোর বর্ণিল শোভার অমিয় সুধা ভরা কোন এক রঙ্গিন ভুবনে। মনটা একটা দিনের জন্য উতলা হয়ে উঠেছে। আজ কেবলই ফেলে আসা দিনের কথা মনে পড়ছে। ইচ্ছে হচ্ছে বিগত দিনের কথা লিখে লিখে ডায়েরির পাতা ফুরিয়ে ফেলি। ভালবাসার মায়া বুঝতে পারার আগেই আমি যে ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ ছিলাম তা এখন অনুভব করি। তার সাথে আমার যে চলাফেরা আর মধুর সময় কাটিয়েছি তা এখন ক্ষণে ক্ষণে আমার অন্তরে দোলা দেয়। তখন আমি সপ্তম শ্রেণীতে পড়ি। ক্লাসে দু’একটা পড়া বাদে বাকিগুলো করতে পারি। ভালো ছাত্র নই, আবার খারাপও বলা চলেনা। পাশাপাশি মাঠে ফুটবল নিয়ে দাপিয়ে বেড়াই। একদিন অষ্টম শ্রেণীর সাথে আমাদের খেলা হচ্ছিল। আমি ছিলাম সেন্টার ফরোয়ার্ডের খেলোয়াড়। বল নিয়ে ছুটে যাচ্ছিলাম আর আমাকে প্রতিরোধ করতে অষ্টম শ্রেণীর তিনজন খেলোয়াড় বাঁধা হয়ে দাড়ালো। তাদের সেই প্রতিরোধের মুখে আমি সশব্দে মাটিতে পড়ে গেলাম। আমার মনে হচ্ছিল আমার একটা পা ভেঙ্গে গেছে। দু’জন খেলোয়াড়ের কাঁধে ভর করে আমি মাঠের বাইরে ফিরে আসলাম। ব্যাথায় আমার পা টনটন করছিল। হাটুর কাছে ছিলে রক্ত বেরিয়ে তা জমাট বেঁধে গিয়েছিল। ভীড় ঠেলে সেদিন কোথা থেকে যে আলেয়া ছুটে আসলো। ইস! কেটে রক্ত বেরিয়ে গেছে! এখনই ব্যান্ডেজ করা দরকার। তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে ইত্যাদি বলে আলেয়া আকাশ মাথায় তুললো। আমি এতে এতটুকু অবাক হইনি কেননা সে এরকমই। খুব ছোটবেলা থেকে একসাথে বেড়ে উঠেছি। একসাথে নদীতে সাঁতার কেঁেটছি,বিলের পানি থেকে শাপলা তুলেছি কিংবা কখনো কখনো সুর্য ওঠার আগেই বকুল কুড়িয়েছি। সে আমার ব্যাথায় ব্যথিত হতেই পারে। কিন্তু সেই ছুটোছুটি দেখে ক্লাসের অন্যরা সে কী টিটকারী মারতে শুরু করলো। এক একজন খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ওকে জ্বালিয়ে মারতে লাগলো। কিন্তু সে দমবার পাত্রী নয়। অন্যরা যখন বললো ও ব্যাথা পেয়েছে তাতে তোর এত মাথা ঘামানো কেন? ব্যাথা যেন ওর না তোর নিজের। ও তখন ছাফ ছাফ জানিয়েছে ও আমাদের ক্লাসমেট ও ব্যাথা পেলে মাথা ঘামাবো নাতো কার জন্য মাথা ঘামাবো। আবার যখন অন্যরা ওকে বলেছে আমরাতো এতো চিন্তা করছিনা তুই চিন্তা করছিস কেন? ও সেদিন কাউকে তোয়াক্কা করেনি,বলেছে তোরা সব হৃদয়হীন পাষন্ড তাই অন্যের দুঃখে দুঃখ অনুভব করিসনা। সেই তখনও আমি ওর কথা শুনে মুগ্ধ হয়ে যেতাম। আমিও যে ওর প্রতি দরদ দেখাইনি তা নয়।
একবার যখন শাপলা তুলতে গিয়ে কিছু একটা লেগে ওর পা কেটে রক্ত বেরোলো সেদিনতো আমিই ছুটে গিয়ে জারমনি লতা এটা সেটা এনে ওর ক্ষতস্থানে লাগিয়ে রক্ত পড়া বন্ধ করলাম। আজ বুঝি সেসব নিছক কোন ব্যাপার ছিলনা। সেসব ছিল একটু একটু করে জন্ম নেয়া মনের গভীরের ভালবাসা। আমি নিশ্চিত জানি ঐ সময় ভালবাসা কি জিনিস তা বোঝার মত বয়স আমার ছিলনা। আলেয়া সেটা বুঝতো কিনা জানিনা। আমি তখন না বুঝলেও এখন বুঝি সেটা ছিল ওর প্রতি আমার অন্তরের টান। অসংখ্য স্মৃতি আজ আমাকে আনন্দ বেদনায় ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ওদের বাড়ীতে কোন পিঠা বানালে সদরে ও অগচোরে আমার জন্য পিঠা নিয়ে আসতো। আমিও আমাদের গাছের পেয়ারা,লিচু কিংবা আতা ওকে চুপিসারে দিইনি তা নয়। কোনদিন কেউ সে সব একা খাইনি। হয়তো ও কিছু একটা আমার জন্য নিয়ে এসেছে কিন্তু খেয়েছি দুজনে ভাগ করে। আবার আমিও যখন কিছু ওকে খেতে দিয়েছি ও তা আমাকেও খেতে দিয়েছে। এখন সে সব কেবল স্মৃতি। যে মানুষটা বাস্তবে আমার পাশে নেই সেই মানুষের স্মৃতিই আমার আনন্দের বাহন। আমি নিজেকে সেই আনন্দ থেকে বঞ্চিত করতে চাইনি। গত কয়েকদিন আজহার চাচার বাড়ীতে থেকে ওনার পরিবারের সাথে মিশে গেছি। জানিনা আমার ভাগ্যটাই এমন কিনা অথবা বার বার কেবল আমার সাথেই এমন হচ্ছে কেন আমি বুঝে উঠতে পারিনা। যখন যেখানে যে পরিবারের সাথে মিশেছি দেখেছি সেই সব পরিবার দুঃখের সাগরে ডুবে আছে। বাইরে থেকে হয়তোবা সেই দুঃখ বুঝার উপায় নেই। কিন্তু ছাই চাপা আগুনের মত সেই দুঃখ গুলো মানুষ গুলোকে পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে। একটু সুস্থ হওয়ার পরই আমি আজহার চাচার বাড়ী থেকে বেরিয়ে পড়লাম। চাচা চাচিকে বিদায় জানিয়ে তাদের ছোট্ট ছেলেটার মাথায় হাত রেখে যখন ফিরে যাচ্ছি তখন কি এক শুন্যতা আমার বুকের মধ্যে হুহু করে উঠলো। বার বার আমি মায়ার টানে বাঁধা পড়তে পড়তে কোন একদিন হয়তো সেই মায়ার আঁধারে হারিয়ে যাব।
আমি ঘর থেকে উঠোনে নামলাম এবং দেখলাম রান্নাঘরের খুটি ধরে ঠায় দাড়ানো আজহার চাচার ছোট মেয়ে। তার চোখ ছলছল করছে,হাতটা কাঁপা কাঁপা। যে মানুষটি আমাকে সেবা করে সুস্থ করে তুলেছিল আমি তাকে না বলেই চলে যেতে চেয়েছিলাম। আমার মন আমাকে বাঁধা দিল, তাই তার দিকে একটু এগিয়ে গিয়ে তাকে বিদায় জানালাম। আমি আর অপেক্ষা করিনি। সন্ধ্যার অন্ধকারে যেমন এসেছিলাম ঠিক তেমনি আজহার চাচার বাড়ী থেকে বেরিয়ে গেলাম। পিছনে পড়ে থাকলো আজহার চাচা,তার স্ত্রী আর কন্যা। শুনতে পেলাম কুমারী কন্ঠের অস্ফুট স্বরের কান্না। আজহার চাচা হয়তো কিছু বুঝে উঠতে পারেননি তার মেয়ে কেন কাঁদছে কিন্তু আজহার চাচার স্ত্রী বুঝতে পেরেছিলেন। এমনকি তার ছোট্ট ছেলেটিও বুঝতে পেরেছিল বোনের এই গুমরে কেঁদে ওঠার কারণ। আর আমারতো না বুঝার কথাই নয়। সে মনে মনে আমাকে ভালবেসেছিল অথচ আমি বাঁধা পড়েছি আরও আগে অন্য কোন একজনের পৃথিবীতে। আজহার চাচার ছেলেটি আমাকে কিছুদূর পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেল। ফিরে যাওয়ার সময় সে শুধু বললো “বুবুরে আমি বুঝাইছি মুক্তিযোদ্ধাদের মনে দেশের জন্য সব ভালোবাসা জমা করা আছে। সেই ভালোবাসা থাইকা তোরে দেওনের মত এতটুকুও খালি নাই। বুবু শোনেনাই তাই আইজ এমন বাধভাঙ্গা কান্দন। আমি বুবুরে আবার বুঝামু। কিন্তু ভাইজান যুদ্ধ শ্যাষ অইলে আপনি যদি বাইচা থাহেন তাইলে কি বুবুর কাছে ফিরে আসন যায়না?” আমি ওর কথার কোন উত্তর দিতে পারিনি। নিঃশব্দে আমার গন্তব্যের পথে হেটে চলেছি। আমার মুখ কথা না বললেও হৃদয়তো ঠিকই কথা বলেছে। আমি ওকে কিভাবে বলি চাইলেও আমি ফিরে আসতে পারছিনা। আমিতো আলেয়ার আলোর নিচ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবোনা। আলেয়ার আলোটুকুই আমার সম্বল। ওখান থেকে বেরিয়ে আসলে যে অন্ধকার আমাকে গ্রাস করবে তা দূর হবার নয়।
৫.
জীবনটা অদ্ভুত রহস্যে ঘেরা। আকাশ যেমন কখনো রৌদ্রজ্জল কখনো মেঘাচ্ছন্ন থাকে, মানুষের গোটা জীবনে অসংখ্য বার রোদ মেঘের লুকোচুরি খেলা থাকে। একটা দিন চলে যায় আর তা স্মৃতি হয়ে জমা থাকে। জীবন মানেই সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, উচ্ছাস-হতাশা, রাগ ক্ষোভের মিলন মেলা। এমন কি একজন মানুষকেও খুঁজে পাওয়া যাবে যার কোন কালে কোন দুঃখ ছিলনা কিংবা এমন কাউকে কি আদৌ খুঁজে পাওয়া যাবে যার কোন কালেও সুখ ছিলনা। সুখ এবং দুঃখ পাশাপাশি অবস্থান করে যেমন রাত আর দিন। একটা মুহুর্তের সুখ ও কখনো কখনো আজীবন আনন্দের খোরাক জন্মাতে পারে। তেমনি একটা মুহুর্তের কোন বেদনা দায়ক স্মৃতি আজীবন যন্ত্রণা দিতে পারে। কী ছিলাম আর এখন আমার জীবনটা কোন দিকে মোড় নিল এটা আমি কোন দিন ভাবিনি। সামনের দিনগুলোতে আমার জন্য কি অপেক্ষা করছে তাও আমার অজানা। এই মেঘ রৌদ্র ছায়ার খেলায় নিজেকে প্রথম আবিস্কার করেছিলাম গ্রাম থেকে বাবা মা ভাই পরিবার পরিজন সর্বপরি আলেয়ার আলো ছেড়ে শহরের কোলাহলে পাড়ি জমানোর দিন থেকে। আমার গাড়ি চলছিল আর ক্রমান্বয়ে পিছে পড়ে ছিল আমার শৈশব কৈশর আর শিশুকালের স্মৃতি জড়ানো সোনালী সবুজ আমার চিরচেনা গ্রাম। যা কিছু নতুন ক’দিন বাদে তাই পুরাতন হয়ে যায়। এই যেমন শহরের জীবন যা অচেনা ছিল এখন তা নিছকই পুরাতন মনে হয়। অবশ্য এটাও ঠিক শহরের জীবনের স্বাদ পুরোপুরি বুঝে ওঠার আগেই দেশের পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে গেল। যে নদীতে পানি ছিলনা সে নদী হয়ে উঠলো খরস্রোতা। যে বাঙ্গালী বায়ান্নতে ফুসে উঠেছিল সেই বাঙ্গালী উনসত্তুরের পর একাত্তুরে আবার দাউদাউ করে জ্বলে উঠলো।
পাকিস্তানীরা উনুনের আগুন দেখেছে কিন্তু ছাইচাপা আগুনের তেজ দেখেনি। সাপের লেজে পা দিলে সাপ যেমন ছোবল দেবেই তেমনি বাঙ্গালী জ্বলে উঠলো। সেই জ্বলে ওঠার মিছিলে আমি যখন আমাকেই সাদরে স্বগতম জানালাম আমার মনে হলো আমার জীবন ধন্য হলো। ভাষা আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত আব্দুল মতিনের সাথে একবার দেখা হয়েছিল। সেই সময়ে তার কথা থেকেই অনুভব করেছিলাম শুধু ভাষার মুক্তিই বাঙ্গালীর জন্য যথেষ্ট নয় এ জন্য দরকার পূর্ন স্বাধীনতা। অবশেষে আজ সত্যিই আমরা স্বাধীনতার পথে। স্বাধীনতা কথাটা যতটা সহজে বলা যায় স্বাধীনতা অতটা সহজ নয়। আমি এক ক্ষুদ্র প্রান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেয়া লাখ লাখ বাঙ্গালীর মত আমিও দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়ছি । এরই মাঝে দেখেছি বিভিষিকাময় মৃত্যু যার কোন কোনটা আমার একান্ত কাছের। কোন কোন মৃত্যু ছিল আমার হৃদয় ছোয়া। আমার হাতের ওপর মাথা রেখে চির নিদ্রায় ঘুমিয়ে গেছে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। এভাবে দেশের আনাচে কানাচে কতজন মুক্তিযোদ্ধা দেশের জন্য বুকের রক্ত দিয়ে চিরতরে ঘুমিয়ে গেছে তা হয়তো কোন দিন জানা হবেনা। সুতরাং স্বাধীনতা মানেই যেমন সুখ তেমনি স্বাধীনতা মানেই এক বুক কষ্ট। যুদ্ধের ময়দানে শত্রুকে ছিন্ন ভিন্ন করতে ভয় পাইনা। ভয় পাইনা শত্রুর ছুড়ে মারা বুলেট বিদ্ধ হয়ে চিরতরে নিস্তব্ধ হয়ে যাবার। কেবল ভয় পাই সহযোদ্ধা কেউ যখন ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে। মৃত্যু এমনই যে তাকে ঠেকানোর ক্ষমতা কারো নেই। প্লাটুনের পর প্লাটুন পাকিস্তানী সৈন্যকে নিস্তব্ধ করে দিতে যে যোদ্ধার বেগ পেতে হয়নি সেই বীর যোদ্ধা মৃত্যুর কাছে স্রোতের তোড়ে ভেসে যাওয়া নিছক কোন খড় কুটোর মত।
স্মৃতি মানুষকে আনন্দ দেয় কিন্তু কিছু কিছু স্মৃতি মানুষকে যন্ত্রণা দিতে দিতে নিঃশেষ করে ফেলে। সেই সব স্মৃতি ইচ্ছে হলেও ভুলে থাকা যায়না। মনে হয় শরীরের কোন একটা ব্যাথার মত সে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে আছে। ঢাকায় এসে প্রথম যে দুঃসহ স্মৃতির ছোবলে আমি ক্লান্ত সেই স্মৃতি এখনো আমাকে কাঁদায়। আলো আধারির এই জীবন সত্যিই বিচিত্র। একরাতে মুক্তিযোদ্ধারা খুব খাবারের কষ্টে পড়লো। সাথে যে খাবার ছিল তা ফুরিয়ে গেল। গ্রামের পর গ্রাম জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে। কোন কোন এলাকা প্রায় জনশুন্য। সেই রাতে পাশের গ্রাম থেকে এক মহিলা তার ছোট ভাইকে সাথে করে প্রাণের মায়া ত্যাগ করে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাবার নিয়ে এলো। সেই খাবার খেয়ে আমরা পরিতৃপ্ত হলাম। কে সেই মহিলা তা আমি জানতামনা। একজন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রাণের মায়া ত্যাগ করে পাশের গ্রাম থেকে খাবার নিয়ে এসেছে সে সাধারণ কোন মহিলা হতে পারেনা। দেশ প্রেমের জ্বলন্ত উদাহরণ সে। তাকে না দেখেও মনের মধ্যে শ্রদ্ধা জাগে। যুদ্ধের ময়দানে মুক্তিয্দ্ধোারা যুদ্ধ করে শত্রুকে ছিন্ন ভিন্ন করে দেয় আর সেই সব মুক্তিযোদ্ধাদের নানা ভাবে সাহায্য করে আরো অনেক কিশোর যুবা বৃদ্ধ এবং নারী। তাদের অবদান কোন অংশেই কম নয়। একদিন দু’দিন করে করে পাঁচদিনের মাথায় খাবার দিয়ে যাওয়া নারীকে দেখলাম। তার চেহারা আমার চেনা। এমনকি আমি আমার নিজের চেহারা ভুলে গেলেও তার চেহারা ভুলবোনা বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম। একরাতে আমি যখন অন্য যোদ্ধাদের পাশে বসে খাচ্ছিলাম সেই মহিলা তখন পাতে খাবার তুলে দিচ্ছিল। হঠাৎ তার মুখের দিকে আমার চোখ পড়লো। এ কয়দিনে সে খাবার তুলে দিয়েছে কিনা তা জানিনা। আমার মুখের ভেতরে যে কয়টা ভাত ছিল তা আর পেটের ভিতরে ঢুকলোনা। আমি অর্ধভুক্ত অবস্থায় উঠে গেলাম। কেন জানিনা হড়হড় করে বমি হয়ে পেটে যতটুকু খাবার ঢুকেছিল তাও বেরিয়ে গেল। ঐ মহিলা আর কেউ নয়, যার কারণে চোর সাবস্ত হয়ে রাসেল ভাইয়ের মেস ছেড়েছিলাম এ সেই মহিলা। রাগে ঘৃণায় আমার মাথা খারাপ হয়ে উঠছিলো। আমার এহেন অবস্থা দেখে কমান্ডার আমার কাছে এসে জানতে চাইলেন হঠাৎ আমার কী হলো। নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া করুণ ইতিহাস,লজ্জার ইতিহাস আমি অন্যকে বলি কি করে। আমি কমান্ডারের কাছে সব চেপে গেলাম।
কী আশ্চর্য আমি অবলিলাক্রমে একটা কঠিন সত্যকে চেপে গেলাম। অথচ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার সময় শপথ নিয়েছিলাম যে কমান্ডারের অধীনে যুদ্ধ করবো তার কাছে কোন কিছু লুকাবোনা। অথচ আমি কথা রাখিনি। নিজের আক্রোশ মেটানোর জন্য চেপে গেছি সব কিছু। মহিলা আমাকে চিনতে ভুল করেনি। আমার এহেন অবস্থা যে তাকে দেখার কারনেই হয়েছে তা সে নিশ্চিত ছিল। পরদিন সে আর খাবার নিয়ে আসলো না। তার বদলে তার ছোট ভাই আর অন্য একজন মধ্যবয়সী মহিলা খাবার নিয়ে আসলেন। আমার সেই খাবার খেতে ঘৃণা হচ্ছিল। যুদ্ধের এই ভয়াবহ সময়ে খাবারের যখন প্রকট সমস্যা তখন সেই আমাদের খাবার নিয়ে এসেছে। না জেনে কয়েক দিন তার হাতের রান্না খেয়েছি বলে নিজের ওপর নিজেরই ঘৃনা হচ্ছিল। সিদ্ধান্ত নিলাম ঐ মহিলার রান্না আর খাবনা। সেটাও আর সম্ভব হলোনা। তার ছোট ভাই আমার ছোট ভাইয়ের বয়সী। আগের কয়দিন সে তার বোনের সাথে এসেছিল আর সেদিন আসলো মাকে সাথে নিয়ে। আমি তাকে কিছু বলিনি। বলার প্রয়োজনও মনে করিনি। সে নিজে আমার তাবুতে এসে ঢুকেছে। আমার পাশে বসে কয়েকটা কথা বলেছে। এই অল্প বয়সেও সে কথা বলেছে পরিনত বয়সের মানুষের মত করেই। আমি বিশ্বাস করেছি সে কারো শিখিয়ে দেয়া কথা বলেনি। পরিস্থিতিই হয়তো তাকে পরিণত করেছে। সে বলেছে মানুষকে ঘৃনা করতে নেই। ঘৃনা করতে হয় মানুষের ভেতরের পশুত্বকে। একজনের কোন এক সময়ের দেয়া কষ্ট মনে রেখে খাবারের সাথে রাগ দেখানো ঠিক নয়। যে যোদ্ধা নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে পরিবার পরিজন,বন্ধু স্বজন,আত্মীয় সব ফেলে দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবনদানের মহোৎসবে রক্ত দেয়া নেয়ার প্রতিযোগিতায় নামতে পারে তার কোন ব্যাক্তিগত আক্রোশ থাকা সাজেনা। যে দেশ প্রেমের মহান ব্রত নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধ করছে তার জীবনে ঐ সব দুঃখ ভুলে যাওয়া উচিৎ।
ওর কথা শুনে আমি আশ্চর্য হয়েছি। হয়তো ওর বোন কোন না কোন ভাবে বলেছে অতীতে কোন একদিন সে আমার সাথে খারাপ ব্যাবহার করেছিল তাই আমি অমন করছি। বোনের হয়ে তাই ছেলেটি আমাকে ওসব শুনিয়েছে। ওর কথায় যুক্তি আছে কিন্তু ওর কথা আমাকে সেই দুঃসহ স্মৃতি থেকে বের করে আনতে পারলোনা। তবে আমি তার রান্না করা খাবার ঠিকই খেলাম। তার ওপর আমার যে ক্ষোভ ছিল তা এতটুকু পরিমান কমেছিল কিনা জানিনা তবে ভেতরে এমন কিছু পরিবর্তন এসেছিল যা বুঝতে পারিনি। দেশ প্রেম আর একজন মানুষের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা সুন্দর মন বাহ্যিক দৃষ্টিতে কেউ দেখতে পায়না। কিছুদিন পর আমরা পাকিস্তানীদের একটা ক্যাম্প উড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করলাম। আমাদের মধ্য থেকে কঠিন পরিকল্পনা মাফিক আমরা এগিয়ে চললাম। রংপুর দিনাজপুরের মাঝামাঝি ছিল শত্রু ঘাটি। আমরা তিন দিক থেকে শত্রু ব্যারাক ঘিরে আক্রমন শুরু করলাম। আমাদের হাতে পর্যাপ্ত অস্ত্র ছিল তা সত্তেও আমরা প্রায় পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছিলাম পাকিস্তানী সৈন্যদের ভারি গোলাবর্ষনের কারণে। ওরা সৈন্য সংখ্যায় আমাদের দ্বিগুণ ছিল এবং ওদের অস্ত্র ছিল আধুনিক ও শক্তিশালী। আমরা যখন একটু একটু করে পিছু হটতে শুরু করেছি ঠিক তখন দেখলাম পাকিস্তান শিবিরে আগুন জ্বলে উঠলো। প্রথমটা বুঝতে পারিনি,দু’মিনিটের মাথায় বুঝতে পারলাম ক্যাম্পের অপর প্রান্ত থেকে হ্যান্ড গ্রেনেড ছুড়ে মারা হচ্ছে। আমরা পূর্ণ শক্তিতে আবার কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তুললাম। এর আধ ঘন্টা খানেকের মধ্যে শত্রুদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে সক্ষম হলাম। আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম ঐ যোদ্ধাদের যারা পিছন থেকে গ্রেনেড মেরে আমাদের জয় নিশ্চিত করেছে। যুদ্ধ থেমে গেলে আমরা দ্রুত ওদিকটাতে এগিয়ে গেলাম। চারদিকে শত্রু সৈন্যের মৃতদেহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে তার মাঝে মৃত্যুর নিরবতা থাকলেও ভেসে আসছিল কান্নার আওয়াজ। আওয়াজ শুনে মনে হচ্ছিল অল্প বয়স্ক কোন ছেলে কাঁদছে। কাছে গিয়ে বাকহারা হয়ে গেলাম। মানুষ তার শত্রুর ব্যাথায় কাঁদতে পারে এই প্রথম অনুভব করলাম। আমার চোখ জলে ভিজে গেল। যে ছেলেটা কাঁদছে সে আমার পরিচিত। এগার বছরের এই ছেলেটার পাশে এক বাক্স হ্যান্ড গ্রেনেড যার দুই তৃতীয়াংশ কিছুক্ষণ আগে মিনিটে মিনিটে বিস্ফোরিত হয়েছে। তার পাশে একটা রক্তাক্ত মৃতদেহ। মৃত দেহটাকে ঘিরে যে ছেলেটি কাঁদছিল বিগত ক’দিন সেই তার মাকে সাথে করে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাবার সরবরাহ করেছে। আর যে এখন চির নিদ্রায় তলিয়ে গেছে সে তার একমাত্র বোন। সেই মানুষটি যাকে আমি রাসেল ভাইয়ের মেসে থাকতেই ঘৃণা করতে শিখেছি। সেই মহিলা যার রান্না খেয়ে একদিন বমি করেছি। যার জন্য একদিন আমি চোর সাবস্ত হয়ে রাসেল ভাইয়ের মেস থেকে গলা ধাক্কা খেয়ে বিতাড়িত হয়েছিলাম।
কী আশ্চর্য ! সে এখন আর নেই! যাকে আমি ঘৃণা করেছি সেই আমাদের যুদ্ধকে সহজ করেছে। নিজ হাতে গ্রেনেডের পিন খুলে ছুড়ে মেরেছে শত্রু শিবিরে। তার সেই ছুড়ে দেয়া গ্রেনেডের আঘাতে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেছে শত্রু সৈন্য। একজন সামান্য কাজের বুয়া থেকে সে এখন এই মুহুর্তে একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। যাকে এতদিন আমি ঘৃণা করেছি এবং ভেবেছি আজীবন ঘৃণা করে যাব মুহুর্তের ব্যবধানে সব পাল্টে গেছে। শ্রদ্ধায় আমি কাতর হয়ে পড়ি। ওর ছোট্ট ভাইটার কথাই ঠিক। মানুষের একদিনের ব্যবহার দিয়ে তাকে চেনা যায়না। কে জানতো এই মানুষটি এমন অসাধারণ দেশ প্রেম দেখিয়ে যাবে। তাকে দাফন করে ফিরে আসার পর থেকে তার একমাত্র ভাই আমাদের সাথে থেকে গেল। কিশোর মুক্তিযোদ্ধা নুরু আমাদের কমান্ডারের সহযোগী হিসেবে কাজে লেগে গেল। যে কথা সেদিন মকান্ডারের কাছে গোপন করেছিলাম অবলিলা ক্রমে সবাইকে তা বলে দিলাম। সব শুনে শত্রুর বুক ঝাঝরা করতে একট্ওু শঙ্কিত না হওয়া মুক্তিযোদ্ধারা চোখের জলে ভেসে গেল। আমার সব ঘৃনা আক্রোশ শেষ হয়ে গেল। এই দেশ যখন স্বাধীন হবে তখন এই মানুষটির কথা হয়তো কোন ইতিহাসের পাতায় থাকবেনা। কিন্তু অন্তত যে কয়জন মুক্তিযোদ্ধা তার বীরত্ব দেখেছে তার সম্পর্কে জেনেছে তারা তাকে শ্রদ্ধাভারে স্মরণ করবে। এর নাম দেশ প্রেম, এর নাম ভালবাসা। শহীদ এই রমনীর ছোট ভাই তার জীবনের কত কথাইনা আমাদের শোনালো। আমরা অপারেশানে যাচ্ছি একথা শুনে মেয়েটি কমান্ডারকে অনুরোধ করেছিল তাকে সাথে নিতে। প্রশিক্ষণহীন একটা মেয়েকে যুদ্ধে নেয়া বোকামী হবে ভেবেই কমান্ডার না করেছিলেন। মেয়েটি ঠিকই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যুদ্ধে সে যাবেই তাই যেখানে আমরা গোলাবারুদ রেখেছিলাম সেখান থেকে কোন এক ফাকে এক বাক্স হ্যান্ড গ্রেনেড সরিয়ে রেখেছিল। খাবার দিয়ে যাওয়ার সময় ওর ছোট ভাই কমান্ডার থেকে কথার ছলে জেনে গিয়েছিল কিভাবে হ্যান্ড গ্রেনেড ছুড়তে হয়। সামান্য একটা ছেলের মুখে শোনা থেকেই অসাধারন দক্ষতায় সে ছুড়ে মেরেছে একের পর এক গ্রেনেড। সেই গ্রেনেডের আঘাতে তছনছ করে ভেঙ্গে গেছে শত্রু শিবির। তারই এক ফাঁকে শত্রুর ছোড়া বুলেট এসে তাকে আজীবনের মত নিরব করে দিয়ে গেছে। একমাত্র বোনের মৃত্যু নিজ চোখে দেখেছে এগার বার বছরের ছেলেটি। যে বোন রান্না করে তাকে নিজ হাতে খাইয়ে দিত, নতুন জামাকাপড় কিনে দিত, সেই বোনকে হারিয়ে দুদিন নির্বাক ছিল তার ছোট মন ছোট চোখ।
ডায়রি লেখার কোন এক ফাঁকে ভেবেছিলাম রাসেল ভাইয়ের মেসে থাকতে যে ঘটনা ঘটেছিল সেই বর্ণনাটুকু কেটে দেব কিন্তু তার আর হয়ে ওঠেনি। তবে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছি দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যদি বেঁচে থাকি তবে কোন একদিন আলেয়াকে নিয়ে এখানে আসবো ঠিক এই মাটির খুব কাঝে যেখানে এক বীর মুক্তিযোদ্ধা রমনী দেশের শত্রকে বিনাশ করতে করতে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়ে গেছে।
বহুদিন পর রাসেল ভাইয়ের সাথে যখন দেখা হলো তিনি তখন পুরোদস্তুর মুক্তিযোদ্ধা। আখাউড়া অঞ্চলে তিনি দেশের জন্য যুদ্ধ করছেন। কোন এক দৈব বলে তার সাথে আমার দেখা হয়ে গেলে আমি ভেবেছিলাম তিনি হয়তো আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা সত্যিই মানুষকে ঘৃণা করতে জানেনা। তিনি কবেই সে কথা সেসব ঘটনা ভুলে গেছেন। আমি মুক্তি যুদ্ধে অংশ নিয়েছি দেখে তিনি ভীষন খুশি। আমাকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। আমি সেই অবস্থাতেই তাকে জানালাম সেই সব দিনের কথা। তিনি নিজেও বিশ্বাস করতেন আমি নির্দোশ ছিলাম কিন্ত তার আত্মসম্মানের কাছে সেই বিশ্বাস প্রশ্রয় পায়নি। কিন্তু তিনি যখন শুনলেন সেই ফরিদা নামের কাজের বুয়া মুক্তিযুদ্ধে বিরাট অবদান রেখে দেশ মাতৃকার জন্য জীবন দিয়েছে তখন রাসেল ভাইয়ের চোখও ক্ষনিকের জন্য ছলছল করে উঠেছিল। শুধু যোদ্ধা বলেই নয় একজন দেশ প্রেমী মানুষ দেশের জন্য আত্মত্যাগ করেছে তা জেনেই তার মনে এত ভালবাসা এত শ্রদ্ধা। রাসেল ভাই একদিন আমার ডায়রি পড়ে যে কথাটি বলেছিলেন আবার তিনি সেই কথাটিই জানালেন। দেশ স্বাধীনতার খুব কাছে চলে এসেছে। প্রথম দিকে মুক্তিযোদ্ধারা ছোট ছোট ছাড়া ছাড়া ভাবে আক্রমন করে যুদ্ধটাকে এগিয়ে নিয়েছে। এখন মুক্তিযুদ্ধ পুরোপুরি বাঙ্গালীদের দিকে বললে ভুল হবেনা। ইতমধ্যে অনেক এলাকা থেকে খবর এসেছে পাকিস্তানীরা পলায়ন করতে বাধ্য হচ্ছে। স্বাধীন সুর্য উঠবে তার জন্য একটা একটা করে দিন পার করছি, একটা একটা করে রাত পার করছি। এরই মধ্যে হয়তো কত মা কত বোন স্বাধীন পতাকা বানাতে শুরু করেছে তার হিসাব নেই। স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষ হলে আবার কবে চির চেনা সেই গ্রামে ফিরে যাব তার দিন গুনি,দিন গুনি সেই স্মৃতি হাতড়ে হাতড়ে যখন নদীর জলে অবাধ সাতারে মেতেছি কিংবা নৌকায় বিলের জলে ভেসে ছোট ভাইকে সাথে নিয়ে বড়শী ফেলেছি। অথবা কখনো কখনো শাপলা তুলেছি কেবল মাত্র আলেয়ার হাতে তুলে দেব বলে। যদিও তখন সেটা ভালবাসা ছিলনা অথচ এখন ঠিকই অনুভব করি আজ যে ভালবাসার চারাগাছ আমার ভেতরে বেড়ে উঠছে তা রোপিত হয়েছিল সেই শাপলা তোলা কিংবা বকুল কুড়ানোর বয়স থেকেই।
৬.
ব্রহ্মপুত্র নদ কুড়িগ্রামকে অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ন করে তুলেছে। ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিম তীরে কুড়িগ্রাম চিলমারি বন্দর। নৌপথে সারা দেশের সাথে এর যোগাযোগ। এর বিপরীত দিকে ব্রহ্মপুত্র নদের পুর্বতীরে অবস্থিত রৌমারি। এই রৌমারিতে শত্রুসেনাদের একটা শক্তঘাটি। সেখানে অত্যন্ত দামী এবং কার্যকরী অস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুদ আছে বলে খবর পায় মুক্তিযোদ্ধারা। রৌমারিকে মুক্ত করতে হবে এই পণ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল ব্রহ্মপুত্র নদী সাতরে পার হলো। সে যে সে ধরনের সাতার নয়! মাথায় কচুরিপানা তার ওপর একহাতে স্টেনগান, একে ফোর্টিসেভেন এবং হ্যান্ড গ্রেনেড নিয়ে শুধু মাথাটুকু পানির উপর ভাসিয়ে সীমাহীন কষ্ট করে ব্রহ্মপুত্রের খরস্রোতা হিংস্রতাকে উপেক্ষা করে মুক্তিযোদ্ধারা পৌছালো রৌমারিতে। সেই দলে আমিও ছিলাম একজন সাধারন সহযোগী হিসেবে। রৌমারিকে নিরাপদ ও মুক্ত করার পাশাপাশি উদ্দেশ্য ছিল শত্রু শক্তি খর্ব করা ও তাদের মনোবল নষ্ট করে অস্ত্র ও গোলাবারুদ দখল করা। যে পোশাকটা হল থেকে বেরুনোর সময় গায়ে জড়িয়েছিলাম সেই পোষাকটাই শত ছিন্ন হয়েও শরীরের সাথে লেগে আছে। আকাশে কখনো মেঘ, কখনো রোদ, কখনোবা হাড় কাপানো শীত কিংবা রৌদ্র দগ্ধ দুপুর গড়িয়ে গেছে কিন্তু আমাদের পোষাক ঐ একটাই। বৃষ্টি কাদায় যে পোষাক ভিজেছে রোদে তাই শুকিয়েছে শরীরের সাথে লেগে থেকে। এই সময়টা আমাদের গ্রামে ফসল তোলার ধুম পড়ে যেত। আমিও কত বার বাবার সাথে ফসলের মাঠে ঘুরেছি, সে কথা মনে হতেই একটু অন্যরকম লাগে। খেজুর গাছে রস হলেও যেমন এখন আমাদের কিছু করার নেই, তেমনি কদম গাছে ফুল হলেও আমাদের দেখার সময় নেই। বৈশাখ গেল,চৈত্র গেল ,অগ্রহায়ণ কিংবা পৌষ ও যাবে, কিন্তু আমাদের এই পথ চলা, এই জীবনের বিনিময়ে দেশকে স্বাধীন করার অভিযান থামবে কবে তা আমরা কেউ জানিনা। চিলমারীতে যুদ্ধ হবে এটা অবধারিত ছিল। আমরা কয়েক সপ্তাহ ধরে পরামর্শ করেছি, পরিকল্পনা করেছি চিলমারী আক্রমন করবো বলে। ইংরেজদের নিয়মে রাত বারটা পার হলেই নতুন দিন ও তারিখ শুরু হয়। সেই হিসেবে ১৭ অক্টোবর ভোর হতে তখনো ঘন্টা তিনেক বাকি, আমরা বেরিয়ে পড়লাম। বিশ্বাস ছিল এই রাতের তৃতীয় প্রহরে শত্রু সেনারা নিশ্চই গভীর ঘুমে ডুবে থাকবে। আমরা অতর্কিত হামলা চালিয়ে ওদের বিনাশ করে ফেলবো। আমরা প্রতিবার যা করি এবারও সেই শপথ নিয়ে একসাথে বেরিয়ে পড়লাম অভিযানে। গোটা কুড়িগ্রাম নিস্তব্ধ। মিলিটারীরা কয়েক দিনে এখানে নৃশংসতা দেখিয়েছে। নিরীহ মানুষের বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে,বিবাহিত অবিবাহিত নারীকে তুলে নিয়ে গেছে ক্যাম্পে। চিলমারী মিলিটারী ক্যাম্পের একটা সাম্ভাব্য নকশা আমরা করেছিলাম। সে মোতাবেক রাতের শেষ ভাগে গোটা ক্যাম্পকে ঘিরে ফেললাম। অতর্কিতে গর্জে উঠলো ৩৭ টি স্টেনগান ২১ টি একে ফর্টিসেভেন আর দমাদম ছুড়ে মারা হলো কয়েক ডজন হ্যান্ড গ্রেনেড। গোটা এলাকা আগুনের লেলিহান শিখায় আলোকিত হয়ে উঠলো। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে শত্রু বাহিনী আমাদের প্রতিরোধ করতে মরিয়া হয়ে উঠলো। ওদের কাছে ছিল অত্যাধুনিক সব অস্ত্র। কিন্তু আমাদের ছিল সাধারন অস্ত্র আর অসাধারন কিছু মৃত্যু নিয়ে খেলা করা মুক্তিযোদ্ধা। মাত্র দেড় ঘন্টা গোলা বর্ষণ শেষে শত্রু সৈন্যরা কুপোকাত হলো। যারা পিছু হটতে গেল তারা ছুটে আসা গুলিতে ভূপাত হলো। তারপরও কয়েকজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হলো। আমরা হঠাৎ নিজেদের সবার কথা ভাবতে শুরু করলাম।
যুদ্ধের ময়দানে যে বীর শত্রুকে ছিন্ন ভিন্ন করে পরবর্তী ও বর্তমান প্রজন্মকে একটা স্বাধীন পতাকা, একটি স্বাধীন দেশ এনে দিতে মরনপণ লড়ছে তাদের মধ্য থেকে কত জন শহীদ হচ্ছে, কতজন আগামী দিনে শহীদ হবে, তা আমাদের জানা নেই। আমরা যুদ্ধ থেমে গেলে অস্ত্রাগারের পাশে মিলিত হলাম। দেখা গেল আমাদের ৬৮ জন মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে ৮ জন উপস্থিত নেই। আমরা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে আশ পাশে খুঁজতে শুরু করলাম। সেনা ব্যারাকের পশ্চিম গেটের পাশে সারি সারি শত্রুর লাশের মধ্যে আমাদের দুজন সহযোদ্ধাকে পেলাম। তারা সম্মুখ সমরেই শহীদ হয়েছে। তাদের মৃত দেহ কাঁেধ করে অস্ত্রাগারের কাছে এনে রাখলাম। কাঁধ ভেসে যাচ্ছে রক্তে আর সারা মুখ এবং বুক ভেসে যাচ্ছে চোখের পানিতে। একটু একটু করে স্বাধীনতা পাচ্ছি আর একটু একটু করে স্বজন,সহযোদ্ধা হারানো ব্যাথা আমাদের অন্তরকে পুড়িয়ে তামা বানিয়ে ফেলছে। এভাবে পূর্বপাশের জংলামত জায়গা গিয়ে দেখতে পেলাম আরেকজন সহযোদ্ধাকে। তিনি পায়ে গুলি খেয়ে আহত হয়ে পড়ে আছেন। তাকে এবং তার অস্ত্রটাকে কাঁেধ করে ফিরে এলাম অস্ত্রাগারের সামনে। একে একে সবাই সেখানে উপস্থিত হলাম। চিলমারি মুক্ত করতে আসার সময় সাথে নিয়ে এসেছিলাম ৬৮ টি তরতাজা প্রাণ। ফিরে যাচ্ছি সেই ৬৮ জনই কেবল তাদের মধ্যে ৫ জন আর কোন দিনই কোন যুদ্ধ জয়ের পর বুকে বুক মিলাবেনা। আর কোন দিন তারা মুখে চিৎকার দিয়ে জয় বাংলা বলবেনা। কোন দিন আর একসাথে বসে খাবেনা। তারা যুদ্ধের ময়দানেই শহীদ হয়েছেন। যে কাঁধে শত্রুর বুক ঝাঝরা করা মেশিনগান নিয়ে ঘুরেছি, সেই কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে বন্ধু ও সহযোদ্ধা শহীদ মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ। তিনজন ভীষণ ভাবে আহত, তাদেরকেও কাঁেধ করে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছি।
ছোট খাট চিকিৎসা বিদ্যা শিখেছিলাম ক্যাম্প চলাকালীন সময়ে। এখন সেটা কাজে লাগলো। হতাহত তিন যোদ্ধা বন্ধুকে সেবা করার জন্য পরবর্তী পাঁচদিন আমি আর কোন অভিযানে যেতে পারলামনা। শত্রুর সাথে যখন যুদ্ধ হয় তখন আমার ভয় করেনা। কিন্তু আমি ভয়ে কুকড়ে থাকি আহত মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুর পাশে। চিলমারি যুদ্ধে আহত তিন সহযোদ্ধাকে সেবা করার সময় আমি কেঁদেছি এতটাই যে একজন মানুষ এর বেশি কাঁদতে পারেনা। আগে যখন যুদ্ধে আমার দায়িত্ব ছিল খবর পৌছে দেয়া, তখন আমার কোন চিন্তা ছিলনা। শত্রু ছিনিয়ে নিলে কেবল আমার জীবনটাই নেবে। আর এখন এই যুদ্ধের ময়দানে আমি একই সাথে যেমন বীর তেমনি শঙ্কায় জর্জরিত এক তরুণ। এখানে এই যুদ্ধের ময়দানে বাবাকে,মাকে কিংবা ভাইকে হারানোর কোন ভয় আমার নেই। তাদেরকে হারাবো বা হারাতে পারি সে কথা জেনেইতো এখানে নাম লিখিয়ে ছিলাম। তারা যদি হারিয়ে যায় তবেতো তারা হারিয়ে যাবে আমার অগচরে। এখানে এই যুদ্ধের ময়দানে আমি ভয় পাচ্ছিনা আমার শৈশবে একসাথে বেড়ে ওঠা বালিকা বন্ধুকে হারিয়ে ফেলার। আমার ভয়টা তার চেয়ে বড়। একসাথে যে সহযোদ্ধা মেশিনগানের গর্জন তুলেছে, তাকে যখন গড়িয়ে পড়তে দেখি তা এবুককে শত মর্টারের আঘাতে জর্জরিত হওয়ার চেয়ে কষ্ট দেয়। তিনজন আহত যোদ্ধাকে সেবা করার সময় তাদের জীবন কাহিনী শুনেছি। একজন চট্টগ্রাম থেকে এসেছে যার বাবা বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে শহীদ হয়েছিলেন। সে আমাকে তার বাবার নাম বলেনি। সে বলে, শহীদ বাবা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে এটাই গর্ব। কিন্তু মানুষ তার নাম করে নানা রঙতামাশা করবে তা তারা চায়না। আমি এতে কোন প্রতিবাদ করিনি। যে বাবা ভাষার জন্য শহীদ হয়েছেন সে বাবাকে সবাই শ্রদ্ধা করি। ওর একমাত্র বোনের বিয়ে ঠিক হয়েছিল। বনেদি ঘরের ছেলে,এপ্রিলের তিন তারিখে বিয়ের দিন ধার্য হয়েছিল। একমাত্র বোনের বিয়ের যাবতীয় কেনাকাটা ও নিজ হাতে করেছিল। যার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছিল সে ছিল ওর বন্ধু। এর ফলে বোনের বিয়েটা সে নিজে বেশ জাকজমক ভাবেই দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তা আর হয়ে উঠলোনা। বিয়ের শানাই বেঁজে ওঠার আগেই হানাদার বাহিনীর মর্টার আর কামানের ঝাঝালো শব্দে সব শেষ হয়ে গেল। রিমুর জন্মদিন যেমন পালন করা হয়নি, তেমনি বোনের বিয়ের সানাইও বেঁজে ওঠেনি। যার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছিল সে একসময় ওদের বাড়িতে এসে সবার কাছে ক্ষমা চেয়েছে। সে বলেছে এখন এই পরিস্থিতিতে বিয়ে করা কোন ভাবেই সম্ভব নয়। তাকে যেন সবাই ক্ষমা করে কারণ সে যুদ্ধে যাবে। তার কথা শুনে কেউ হাহুতাশ করেনি। সবাই জানে যদি দেশটাই না থাকে তবে সামান্য বিয়ের আয়োজন করে লাভ কী। অবশেষে সে যুদ্ধে গেল। যাবার আগে কথা দিয়ে গিয়েছিল সে যদি যুদ্ধ জয় করে ফিরে আসে তবে বিয়েটা হবে। বলতে বলতে আমার সহযোদ্ধা আহত মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুর চোখ ভিজে ওঠে। তার মুখের ভাষা অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিছুক্ষণ ফুপিয়ে কেঁদে কেঁদে নিশ্চুপ হয়ে যায় মাত্র কয়েকটি কথা বলে। তার ঐ বন্ধু যার সাথে তার বোনের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল এবং সে কথা দিয়েছিল যুদ্ধ শেষে ফিরে আসলে বিয়ে হবে। সেই বন্ধুটি সত্যিই আর কোন দিন ফিরে আসবেনা। মাত্র ক’দিন আগে ৩ অক্টোবর সে দেশের জন্য যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছে। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের একটি গ্রাম তেলিখালী। পাকবাহিনী এটাকে একটা দুর্ভেদ্য ঘাটি হিসেবে গড়ে তুলেছিল। মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনী মিলে সেই দুর্ভেদ্য ঘাটিকে গুড়িয়ে দিয়ে বাংলার স্বাধীনতাকে আরো কাছে নিয়ে এসেছে। সেই যুদ্ধে পাক হানাদারদের ২৩৭ জন নিহত হয় এবং একজন বন্দি হয়। তেলিখালীর যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের ১৯ জন শহীদ হয়েছে ওর সেই বন্ধুও তাদের মধ্যে একজন। যে বন্ধুর সাথে এক মাত্র বোনের বিয়ের সব আয়োজন শেষ করেছিল, সেই বন্ধু আর নেই। আর কোন দিন তার সাথে দেখা হবেনা,কথা হবেনা। যে স্বাধীনতার জন্য সে প্রাণ দিয়েছে, সেই দেশ স্বাধীনতার দ্বার প্রান্তে দাড়িয়ে আছে। সেই দেশের মুক্ত বাতাসে মাত্র একটি বারের জন্যও তার আর নিঃশ্বাস নেয়া হলোনা। যে বোনকে বুকে আগলে স্নেহ দিয়ে বড় করেছে, সেই বোনের মেহেদী রাঙা হাত যার হাতে তুলে দেবে বলে স্বপ্ন লালন করেছিল, সে স্বপ্নটা বিলীন হয়ে গেল। এসব বলতে বলতে আমার আহত সহযোদ্ধা বন্ধু বেলায়েত ক্রমান্বয়ে ঢলে পড়লো। ওর শরীরের কয়েক যায়গা গুলি লেগেছিল। কাঁধের কাছের গুলিটা বের করা সম্ভব হয়নি। কে জানতো মাত্র ১৪ দিনের ব্যবধানে বন্ধুর পথ ধরে সেও হারিয়ে যাবে।
আহত যোদ্ধার সেবা করে আমি কখনো ক্লান্তি অনুভব করিনি। অথচ তার প্রতিটি কথা আমাকে ক্লান্তিতে অবশ করে দিয়েছে। আমি তার পাশে হাত ধরে বসা, মাত্র সকালেও যাকে নিজ হাতে ভাত তুলে খাইয়ে দিয়েছি সে আর নেই। সেই বেলায়েত চলে গেছে না ফেরার দেশে। এর চেয়ে নির্মম আর কী হতে পারে। আরও একজন মুক্তিযোদ্ধা বন্ধু শহীদ হলো। মৃত্যুর সময় তার মুখ নড়ছিল। কি বলতে চাচ্ছিল সে? কী বলতে চাচ্ছিল আমার সহযোদ্ধা বন্ধু বেলায়েত? বলতে বলতে সেতো অনেক কিছু বলেছিল। তার স্বপ্নের কথা,বোনের কথা,বন্ধুর কথা সব তো সে বলেছে। তার পরও হয়তো তার অনেক কিছু বলা হয়ে ওঠেনি। আসলেই কি তার বলা শেষ হয়েছিল? বলতে বলতে শেষ সময়ে সে তো শ্বাস নিতে পারছিলানা। তার গলার স্বর তখন খাদে নেমে গিয়েছিল। তার মুখ নড়া দেখে মনে হচ্ছিল সে অনেক কিছু বলতে চায়। চোখ ঘুরিয়ে হয়তো শেষ বারের মত স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে দাড়ানো মাতৃভূমিটাকে দেখে নিয়েছে। সে হয়তো তার একমাত্র বোন আর মায়ের কথা বলতে চেয়েছিল। বলতে চেয়েছিল তার অবর্তমানে ভাই হয়ে যেন বোনকে বিয়ে দিই, আর মাকে দেখে রাখি। যে মা তার স্বামীকে বায়ান্নতে রক্ত দিতে দেখেছে , যে মা কদিন আগে এক মাত্র মেয়ের জন্য দেখে রাখা জামাইকে হারিয়েছে, সেই মা একমাত্র ছেলেকে হারানোর শোক সইবে কি করে? তাকেতো আমাদের দেখে রাখতেই হবে। আমি পাগলের মত হাহাকার করে উঠি। কিন্তু আমি কি সত্যিই তার বোনের জন্য ভাই হয়ে পাশে দাড়াতে পারবো? আমি কি সত্যিই স্বামী হারা, সন্তান হারা মায়ের ছেলে হয়ে তার শুন্য বুকটা কিছুটা হলেও ভরিয়ে দিতে পারবো। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের এক পথিক আমি। দেশের জন্য যে বেলায়েত জীবন দিল, সেই বেলায়েতের মরদেহ পাশে রেখে আমি নির্বিকার। তাকে বা তার মৃত দেহকে কথা দেয়ার মত সাহস আমার নেই। এ বড় ভার মনে হয় আমার কাছে। আমার কেবলই মনে হয় বেলায়েত বেঁচে থেকে যদি আমার কিছু হত তবে ভাল হতো। আমরা ওর শহীদ মরদেহ ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে সমাহিত করলাম। জানি স্বাধীন দেশ ও দেখে যেতে পারেনি কিন্তু ক’দিন বাদেই ও যে মাটিতে ঘুমিয়ে থাকবে সে মাটি মুক্ত স্বাধীন হবেই হবে।
যে জীবন সুখ ও দুঃখের ,যে জীবন হাসি এবং কান্নার, সে জীবন আমরা ভুলে গেছি। সুখ এবং দুঃখ ভুলে কেবল শান্তি কেনার জন্য আমরা যুদ্ধের ময়দানে মৃত্যু ও জীবন বেঁচাকেনা করছি। আমার কষ্টটা এত বেশি হতনা, যদি আমি আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করার সাথে জড়িয়ে না থাকতাম। সেবা করে করে দু’জনকে সারিয়ে তুললাম। কিন্তু কেবল বাঁধন কেটে চলে গেল বেলায়েত। নাসির ওর সাথে অনেকগুলো অপারেশানে গায়ে গা ঘেসে অংশ নিয়েছে। বেলায়েতের চলে যাওয়া ও কোন ভাবেই মেনে নিতে পারছেনা। আমাদের কমান্ডার যখন ওকে শান্তনা দিয়ে বললেন, নাসির আমরাতো মৃত্যু ফেরী করতে এসেছি, সেখানে ভয় বা ভেঙ্গে পড়ার কিছু নেই। নাসির সে কথা শুনবে কেন। কোন কোন সময় আবেগের কাছে যুক্তি সত্যিকার অর্থে যুক্তিহীন হয়ে পড়ে। ওর ভাষায় বেলায়েত এখনই কেন চলে যাবে। স্বাধীনতা আসবে,সেই স্বাধীনতার সুখ কেমন তা অনুভব করবে,স্বাধীন পতাকা কপালে বেঁধে নিজ গ্রামে ফিরে যাবে। যে বোনকে মেহেদী রাঙ্গা হাতে বিয়ের পালকীতে শশুরবাড়ীতে পাঠাবে, সেই সব মুহুর্তকে পিছনে ফেলে বেলায়েতের এই চলে যাওয়া অবর্ননীয় দুঃখ আমাদের হৃদয় ছেপে হাহাকার তুলেছে। পদ্মা,মেঘনা,যমুনা,ব্রহ্মপুত্র উত্তাল ঢেউয়ে ভেঙ্গে যায়। সেই উত্তাল ব্রহ্মপুত্রের তীরে শহীদ বেলায়েতের কবর। সেই কবরে শুনশান নিরবতা। সব ভেঙ্গে গেলেও ব্রহ্মপুত্র নিশ্চই ওর কবরকে ভেঙ্গে দেবেনা। যে তার জীবনটা দিয়ে গেছে একটা স্বাধীন দেশের জন্য, একটা স্বাধীন পতাকার জন্য, তাকে ব্রহ্মপুত্র কেন কষ্ট দেবে। ব্রহ্মপুত্রকি জানেনা যে এ দেশটা পরাধীন থাকা মানে ব্রহ্মপুত্রের নিজেও পরাধীন থাকা। দেশ স্বাধীন হলে সে নিজেওতো স্বাধীনতার সুখ পাবে। দেশের সুর্যসন্তানকে সে নিশ্চই তার গর্ভে বিলীন করে দেবেনা। বেলায়েতের দাফন শেষ করতে করতে বেলা ডুবে আসে। ব্রহ্মপুত্রের অথৈ জলের নিজে হারিয়ে যায় সেদিনের সুর্য। আমরা ফিরে আসি মুক্তি ক্যাম্পে। যারা যুদ্ধের ময়দানেই শহীদ হয়েছিল তাদের জন্য যতটানা কষ্ট অনুভব করেছি, তার চেয়ে শতগুন বেশি কষ্ট পেয়েছি বেলায়েতের বেলায়। একটা অভিযান সফলভাবে শেষ করে চলে আসার পর আস্তে আস্তে সে যখন চলে গেল, তখন তা আমাদের বুকে কামানের ছুড়ে দেয়া গোলার মত আঘাত হানলো। শহীদ বেলায়েতের পরনের কাপড় একটা পলিথিনে ভরে কমান্ডার নিজের কাছে রেখে দিলেন। যুদ্ধ শেষে স্বাধীন দেশে যদি আমরা বেঁচে থাকি তবে বেলায়েতের শেষ চিহ্ন তার পরিবারকে তুলে দেয়া যাবে।
পাক বাহিনীর নিষ্ঠুরতম আক্রমনে বাংলার গ্রাম-গঞ্জ, নগর-বন্দর ছারখার হয়ে গেছে। শিক্ষক, ছাত্র, চাকরিজীবী, ব্যাবসায়ী, কৃষক সবাই নিজ নিজ পেশা ফেলে অস্ত্র হাতে তুলে নিতে বাধ্য হয়েছে। দেশের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনলে সব ফিরে আসবে। অনেক রক্ত, অশ্রু, মা বোনদের লাঞ্ছনা, পিতার লাশ, দগ্ধ শস্যক্ষেত্র, ভগ্ন ভিটা, বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি, এত সব কিছুর বিনিময়ে আমরা মরণপণ যুদ্ধ করে ছিনিয়ে এনেছি স্বাধীনতার লাল সূর্য। মুক্তি যুদ্ধে শত্রুর বর্বর হামলা থেকে প্রাণ বাঁচানোর জন্য যে বালক তার পিতার হাত ধরে বেরিয়ে পড়েছিল অনিশ্চিত যাত্রা পথে, সে হয়তো বেঁেচ নেই, কিংবা হয়তো একসময় আমারই মত সেও যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। হতে পারে সে বেঁেচ আছে, হতে পারে সে দেশের জন্য জীবন দিয়েছে। যে বালিকা তার পিতাকে রাতের অন্ধকারে অস্ত্র হাতে বিদায় নিতে দেখেছিল, হয়তো তার পিতা আর কখনো ফিরে এসে স্বস্নেহে কপালে হাত রাখতে পারবেনা। হয়তো বা সেই পিতা ফিরে আসবে কিন্তু ফেলে যাওয়া স্নেহের দুলালী মেয়েটাকে দেখতে পাবেনা। যে মা তার পুত্রকে নিজ হাতে সাজিয়ে যুদ্ধে পাঠিয়েছে, যুদ্ধ শেষে সেই মার কোল খালি হয়েছে অথবা এমনও হতে পারে সে দেখে যেতে পারেনি তার সেই বীর সন্তান তার জন্য লাল সবুজের একটা পতাকা ছিনিয়ে এনেছে, ছিনিয়ে এনেছে সবুজ ভূমি আর রক্তিম সূর্য। দেশ প্রেমের বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারেই শুধু আমরা ভেসে পড়িনি, অত্যাচারে আমরা বিদগ্ধ হতে হতে জ্বলে উঠেছি। আমরা জ্বলে উঠেছি সীমাহীন অত্যাচারের আগুনে পুড়ে। সেই জ্বলে ওঠা থেকেই আমাদের এই স্বাধীনতা। এই যেমন আমি বিশ্ববিদ্যালয় জীবন এখনো শুরুই করতে পারলাম না তার আগেই আমাকে কলম ফেলে অস্ত্র ধরতে হলো। এখনও জানিনা আমার বাবা, মা, ছোট ভাই এবং আমার সেই মেঘ বালিকা বেঁচে আছে না হানাদারদের হিংস্র থাবায় স্বাধীনতার সূর্য ওঠার আগেই বিদায় নিয়েছে। মাত্র গত কাল রেসকোর্সের ময়দানে হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হলো। আমাদের মা বোনের সম্ভ্রম হারানো বৃথা যায়নি। আমাদের পিতা, পিতামহ, ভাই বা সন্তানদের রক্ত দেয়া বৃথা যায়নি। নয় মাস একটা দু’টো দিন নয়। এই নয় মাসে আমরা দেখেছি নয়টা যুগের কষ্ট আর সাধনা। দেখেছি শত্রুর বুকে নিশানা করে ছুড়ে মারা কামানের গুলি। দেখেছি মিছিলে মিছিলে যারা রাজপথ উত্তাল করে স্বাধীনতার ঝড় তুলেছিল তাদের হাতের গর্জে ওঠা এক একটা স্টেনগান। এই সব স্মৃতি আমি কোন দিন ভুলবোনা। আমার এই ডায়রি লেখা শুধু মাত্র এই কারনে। আমি যদি যুুদ্ধের ময়দানে শত্রুর গুলির নিচেয় পড়ে যেতাম তবে আমি হারিয়ে যেতাম। এই যে এখন আমি নিঃশ্বাস নিচ্ছি, এটা স্বাধীন দেশের স্বচ্ছ বাতাস। স্বাধীনতার মানেই হলো এই সুখটুকু একান্তে নিজের মত করে কাছে পাওয়া। গত কাল রেসকোর্সের ময়দানে পাক হানাদার বাহিনী দলবল নিয়ে আত্মসমর্পন করেছে। সাধারন অর্থে এটা বললেও আমি বলবো আমরা আমাদের শত্রু পাক হানাদার বাহিনীকে আত্মসমর্পন করতে বাধ্য করেছি। আমরা তখনও ময়মনসিংহে ছিলাম যখন পাকবাহিনী আত্মসমর্পন করছে। আমাদের কাছে খবর আসলো আর সাথে সাথে আমরা আমাদের অস্ত্র উচিয়ে চিৎকার করে আকাশ বাতাস কাপিয়ে প্রতিধ্বনি তুললাম। মুক্তিযোদ্ধারা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে আনন্দ প্রকাশ করতে লাগলো। ভেবেছিলাম প্রথমে ঢাকা যাব তার পর বাড়ি ফিরে যাব। কিন্তু মন সায় দেয়নি। স্বাধীনতার এই নয় মাস প্রিয়জনকে ছেড়ে থেকেছি, তাই এখন প্রথম তাদের খোঁজ নেয়া দরকার ভেবেই সোজা বাড়ির দিকে রওনা হলাম। সহযোদ্ধা বন্ধুদের বিদায় জানালাম। পিছনে ফেলে গেলাম কষ্টের কত স্মৃতি। কত সহযোদ্ধা মুক্তিযেদ্ধাকে চিরদিনের জন্য এখানে সেখানে এ মাটির নিচেয় ঘুম পাড়িয়ে রেখে এসেছি।
৭.
যুদ্ধ জয় করে বাড়িতে ফিরে গিয়ে দেখি সব আমার অচেনা। সেই সুন্দর সাজানো গোছানো গ্রামখানা পাকিস্তানী হানাদারেরা ধুলোয় ধুসরিত করেছে। এখানে মুক্তি যোদ্ধাদের দু’টি দল দুই দিক থেকে আক্রমন করে পাকিস্তানী হানাদারদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়নি। আত্রাই নদীর তীর ঘেসে আমাদের সবুজে শ্যামলে ছাওয়া ছোট্ট গ্রামখানি অনেকটাই ফাঁকা। ফাঁকা হওয়ার কারণ নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছেনা। হতে পারে মিলিটারিরা মানুষদের ধরে ধরে নির্বিচারে হত্যা করেছে, আবার অনেকেই পালিয়ে গেছে প্রানের ভয়ে। আমি মুক্তি যুদ্ধে অংশ গ্রহণের পর একবার একটা মিশনে বোচাগঞ্জ এসেছিলাম। বোচা গঞ্জ আমার নানা বাড়ি। আমার নানা তখন বেঁেচ ছিলেন। অনুমতি ছিলনা তারপরও আমার পরিবার, আমার গ্রামের খবর নেয়ার জন্য অপারেশানের এক ফাঁকে বোচাগঞ্জে নানার বাড়িতে গিয়েছিলাম। আমার পরনে একটা কাদা মাখা প্যান্ট, গায়ে ফুলহাতা শার্ট। পিছনে বাজারের ব্যাগের ভেতর একটা এলএমজি। নানা আমাকে দেখে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। আমাদের অগ্রগতির কথা জানতে চাইলেন। আমি তার কাছে খবর পেলাম মা বাবা ওরা সবাই ভাল আছেন। আমাদের গ্রাম থেকে অনেকেই মুক্তি যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। আমাদের গ্রামে কয়েক ঘর হিন্দুও ছিল। কানাই লাল স্যার এবং তার পরিবার ইন্ডিয়া পালাতে গিয়ে রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে এবং তাদেরকে যমুনেশ্বরী নদীর তীরে দাড় করিয়ে হত্যা করা হয়। তাদের লাশ ভাসতে ভাসতে কোথায় গিয়ে পতিত হয় তা কারোর জানা নেই। আমার একজন বন্ধু ছিল রাম কৃষ্ণ। রাম কৃষ্ণ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হয়েছিল। ওর বাবা রাজ শেখর বসু ছিলেন একজন হোমিও প্যাথিক ডাক্তার। রাম কৃষ্ণ শুধু মাত্র টাকার অভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারেনি। রাম কৃষ্ণও মুক্তি যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। রাম কৃষ্ণের বাবা ওকে বলেছিলেন এ দেশটা আমাদের। এ দেশ ছেড়ে চলে যাব কেন? মরতে হলে লড়াই করে এদেশেই মরবো। কাপুরুষের মত পালিয়ে যাবনা। রাম কৃষ্ণ বাবার আশির্বাদ নিয়ে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়লো। এরকম আরো অনেকেই যুদ্ধে সক্রিয় এবং পরক্ষ ভাবে অংশ নিয়েছিল। এসব তথ্য আমি আমার নানার কাছ থেকে নিয়েছি। আমাদের পারিবারিক অবস্থা খুব একটা ভাল ছিলনা তবে আমার নানার ছিল অগাধ সম্পত্তি। আমার নানা ছিলেন পেশায় ডাক্তার। সবাই আমার নানাকে ডাক্তার ছমির উদ্দিন আহমেদ বলেই চিনতো।
পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বর্বরতার দিনেও নানা মুষড়ে পড়েননি। তিনি আমার মাথায় হাত রেখে দোয়া করেছিলেন। বলেছিলেন তোদের মত ছেলে মেয়েরা থাকতে এদেশের কোন ভয় নেই। দেখিস দেশ স্বাধীন হবেই। আমি নানার কাছ থেকে বিদায় নিতে গিয়ে রান্না ঘরের দরজার দিকে চোখ পড়তেই থমকে গেলাম। নানা আমাকে তথ্যটা আগে দেননি। কেন দেননি তা আমি অনুমান করতে পারছি। রান্না ঘরের দরজায় আমার মা দাড়িয়ে আছেন। কতদিন পর মাকে দেখছি, আমার প্রাণটা জুড়িয়ে গেল। দশ বছরের বাচ্চা ছেলের মত দৌড়ে গিয়ে মায়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। মা আমার কপালে চুমু একে দিয়ে বললেন তোকে আমি দূর থেকেই দেখছিলাম। আমাকে দেখে তোর যদি ফিরে যেতে ইচ্ছে না করে তাই শত ব্যাথা বুকে চাঁপা দিয়ে দূরে দাড়িয়ে ছিলাম। আমি মাকে অভয় দিলাম। মা আমরা জিতবই। মা নিজেও সেটা মনে করতেন। সে রাতেই আমাকে পঞ্চগড় চলে যেতে হল। যাবার সময় অতি সাবধানে দিনাজপুর জেলার কাহারোলে একটা বাড়িতে যেতে হলো। কাহারোলে যে বাড়িতে গেলাম সে বাড়িটা আমার বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া বন্ধু রাশেদের। ও একটা চিঠি দিয়ে বলেছিল বাড়িতে পৌছে দিস। আমি চিঠি পৌছে দিতে গিয়ে দেখি বাড়ির প্রায় চিহ্নই নেই। একজনের কাছে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম মিলিটারিরা এ বাড়ির সবাইকে মেরে ফেলেছে এবং বাড়িটা জ্বালিয়ে দিয়েছে। আমি আর কিছু ভাবতে পারিনা। রাশেদের পরিবারের অনেক খবর আমি সংগ্রহ করেছিলাম এবং রাশেদের সাথে ফিরে গিয়ে আমার সেসব কথা বলার কথা ছিল। মুক্তি যুদ্ধ শেষে বাড়ি ফিরছি। কত কিছু ভাবতে ভাবতে অনেক দূর পথ চলে গেলাম। সব মায়া ,সব স্মৃতি। কোনটা আনন্দের কোনটা বিস্বাদের।
আত্রাই নদীতে একটা ব্রিজ ছিল সেটাও গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। একটা নৌকাতে করে পার হয়েছি। এখন আমার মনের মধ্যে কোন ভয় নেই, কোন হতাশা নেই। একদিন বাড়ি থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে আমার মনে যেরকম অবস্থা হয়েছিল, আজ তার ছিটে ফোটাও আমার মধ্যে দেখা যাচ্ছেনা। আমি এখন একটা মুক্ত স্বাধীন দেশ পেয়েছি। এখানে ভয় থাকার কোন কারন নেই। যুদ্ধের ভয়াবহ দিনগুলিতেও আমি এভাবেই ডায়েরি লিখে রেখেছি। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করেছি আমার সহজ সরল মেঘবালিকা সেই বন্ধুটির কথা খুব একটা লেখা হয়নি। এখন আবার মনে পড়ছে। সব স্মৃতি হাতড়ে হাতড়ে বেরিয়ে আসছে। সেই সব স্মৃতি ফিরে গিয়ে আলেয়াকে বলবো, আর ও শুনে হাসতে হাসতে পেটে খিল লাগিয়ে দেবে এবং তারই এক ফাঁকে আমি তাকে বলবো, তোমার হাসিটা আগের চেয়ে সুন্দর হয়েছে, সেই সাথে তুমিও। আমি কি তোমাকে একটু ভালবাসতে পারি। ও এ কথা শুনে হয়তো দৌড়ে পালিয়ে যাবে, নয়তো ওর হাসিটা আরো বেশি উজ্জ্বল হবে। গ্রামের পথে হাটতে হাটতে আমার মনে হচ্ছে এদেশে কোন যুদ্ধ হয়নি। যদিও চারদিকে ধ্বংসস্তুপ। আমার মনে হচ্ছিল আমি বুঝি প্রিয় মানুষ গুলিকে ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাচ্ছি। যুদ্ধে যাওয়ার আগে কয়েকটা চিঠি আমি আমার মাকে লিখেছিলাম। সেই সাথে আমি আমার বালিকা বন্ধুকেও চিঠি লিখতে ভুল করিনি। দু একটার উত্তরও পেয়েছিলাম। একটা চিঠি এখনো আমার বুক পকেটে আছে। আমার ঠিক মনে নেই তবে এটাই ছিল ওর লেখা শেষ চিঠি যা আমার হাতে এসেছিল মুক্তি যুদ্ধ চলাকালিন সময়ে। হয়তো পরেও অনেক চিঠি পাঠিয়েছে কিন্তু ওগুলো আর আমার হাতে এসে পৌছেনি। দেশের পরিস্থিতি পুরোপুরি ঘোলাটে হয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যাবস্থাও অচল হয়ে পড়ে। আর তাছাড়া আমি কখন কোথায় থেকেছি হয়তো চিঠি আসলেও আমার হাতে পৌছেনি। ওর যে লেখাটা আমার হাতে সব শেষে এসেছিল সেটা আমার চোখের সামনে। চিঠিটা লিখতে গিয়ে ওর নিশ্চই হাত কাঁপছিল। হাতের লেখাটাও খুব একটা সুন্দর হয়নি। অবশ্য এমন পরিস্থিতিতে হাতের লেখা কোন মুখ্য বিষয় হতে পারেনা। বার বছর ওর সাথে পড়ালেখা করেছি । ওর হাতের লেখাও আমার খুব পরিস্কার মনে আছে। ও আমাকে এই চিঠিটা লিখেছিল আমি যুদ্ধে যাবার পরে, তবে তাতে কোন তারিখ ছিলনা,কোন শিরোনামও ছিলনা।
“ এখন আর পড়ালেখা করতে ইচ্ছে করেনা। ইচ্ছে করে মুক্তি যুদ্ধে যাই। কিন্তু কোথায় গেলে মেয়ে হয়েও মুক্তি যুদ্ধে অংশ নেয়া যাবে তা জানিনা বলে যেতে পারছিনা। আমি এখন ঘরের মধ্যে বন্দী প্রায়। বাবা মা সবাই ভয়ে ভয়ে দিনাতিপাত করছে ,কখন না জানি মিলিটারি চলে আসে। তুমি যদি মাত্র একটি বার আসতে আমি তোমার সাথে চলে যেতাম। বাবা মায়ের পর আমি কেবল তোমাকেই বেশি বিশ্বাস করি। আমি তোমার সাথে যুদ্ধে যেতেও ভয় পাবনা। যদি এই চিঠি তোমার হাতে পৌছে তুৃমিকি আমাকে নিতে আসবে? তুমি নিজেও কি যুদ্ধে যাবে? আমার মনে হয় তুমি যুদ্ধে যেতে পারবেনা। তোমার মত একটা ভীতু যুদ্ধে যেতে পারেনা। চলে যাবার সময় আমার কোন কথাই তুমি বুঝতে পারনি, সেখানে গ্রেনেড কিভাবে ছুড়তে হয় সেটা বুঝবে কিভাবে? আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করবো। শুধু মাত্র তোমাকে একটা কথা বলার জন্য। তার আগেই তুমি যদি বুঝতে পার আমি কি বলতে চাই তাহলে দেরি করোনা শুধু তোমার উত্তরটা জানাইও।
“ আলেয়া ”
এই চিঠিটা পেয়েছিলাম তানিমের কাছে। ওর সাথে আমার দেখা হয়েছিল পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে। ও ঢাকা থেকে আসার সময় চিঠিটা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল। কারণ ও জানতো আমি এ অঞ্চলে কোন না কোন খবর নিয়ে আসবোই।
আমি যুদ্ধ জয়ী বীর। ফিরে এসেছি নিজ গ্রামে। বিধ্বস্থ একটা দেশে কেনার মত কিছুই নেই। যাও কেনার মত আছে তা কেনার ক্ষমতা আমার নেই। যৎসামান্য উপহার কিনে ব্যাগে ভরে হাটছি বাড়ির পথে। ভেসে উঠছে বহুদিন আগে হেসে খেলে বেড়ানো সেই সব স্মৃতি। বুক পকেট থেকে চিঠিটা বের করে এরই মাঝে কয়েকবার পড়েছি। তাতে কি ! যত বার পড়ছি ততবারই মনে হচ্ছিল নতুন কিছু পড়ছি। দেখতে দেখতে আমার চির চেনা উঠোনে চলে এসেছি। এই বাড়িতে আঠার বছর জীবন যাপন করেছি। আমি মা বলে ডাক দিতেই ঘর থেকে মা ছুটে বেরিয়ে আসলেন। তার ছোখ ছলছল করছে। পানিতে ভিজে উঠেছে। আমি মায়ের বুকে ঝাপিয়ে পড়ি। মনে হতে থাকে আমি বুঝি এগার বছরের ছেলেটা। মা আমার কপালে মুখে চুমু দিতে থাকে। আমি আবেগ ধরে রাখতে পারিনা। কাঁদতে থাকি, সে কান্না আনন্দের। মা ছেলের মিলনের দৃশ্য দেখতে ততক্ষনে অনেকেই ভীড় করেছে। বাবা বাড়িতে ছিলেননা। কিছুক্ষনের মধ্যে বাবাও ফিরে এলেন। অনেকক্ষণ চলে যাবার পরও আমি আমার পনের বছরের ভাই জাহিনকে খুঁজে পেলাম না। মাকে ওর কথা জিজ্ঞেস করতেই মায়ের চোখ আবার ভিজে উঠলো। মায়ের কন্ঠ আবার জড়িয়ে আসলো। যুদ্ধ শুরু হবার পর ও খুব জোরাজুরি করছিল যুদ্ধে যাবার জন্য। আমি নিষেধ করেছিলাম বলে ও একদিন এক রাত আমার সাথে কথা বলেনি। হয়তো আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল। এক সকালে উঠে দেখি ও ঘরে নেই। টেবিলের ওপর একটা চিঠি।
“ মা তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি কিন্তু তার পরও থাকতে পারলামনা,আমরা মুক্তি যুদ্ধে না গেলে আর কারা যাবে বলো? তুমিকি চাওনা দেশটা স্বাধীন হোক? আমরা যাচ্ছি মা ,আমরা তোমার সোনার ছেলে। পতাকা নিয়ে ফিরে আসবো আর পতাকা আনতে না পারলে কোন দিন ফিরবোনা
“ জাহিন”
আমি আমার এমন ভাইয়ের জন্য গর্ব বোধ করি। ও এখনো ফিরে আসেনি। ও বেঁচে আছে না মারা গেছে তা আমার জানা নেই। আমি মাকে শান্তনা দিলাম। দেখো মা একদিন নিশ্চই ও ফিরে আসবে। মায়ের মন সহজে শান্ত হয়না। অনেক দিন পর বাড়িতে এসেছি। মাঝে কেটে গেছে প্রায় একটা বছর। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর আর বাড়িতে ফিরে আসা হয়নি। এর মাঝেই যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। আমিও যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। অনেক দিন বাদে গ্রামে এসে তাই সারা গ্রাম ঘুরে ঘুরে দেখলাম। যেখানে যেখানে শৈশবে আমার পদচারণা ছিল সেখানে আমার হারানো স্মৃতি খুঁজে বেড়ালাম। অনেক বাড়ি ঘরই জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল। আমাদের স্কুলে যাওয়ার পথে রাস্তার মোড়ে একটা বড় বট গাছ ছিল। সেখানে গিয়ে দেখি একটা কংকাল ঝুলছে। একজন বললো “হারামজাদাটা রাজাকার ছিল,সবাই মিলে গাছে ঝুলাইয়া দিছে। ভাইজান ওর কংকালে থুথু মারেন,আমরা রোজ থুথু মারি।” লোকটার কথা শুনে আমি সত্যি সত্যিই থুথু মারলাম। যদিও আমি জানি ওকে থুথু না মারলেও কিছু যায় আসেনা। ওর শাস্তি ও ঠিকমতই পেয়েছে। দেশের শত্রু যারা বেঁেচ আছে তাদের মুখে এমন করে থুথু মারতে পারলে মনে শান্তি পেতাম।
আমি হাটছি আমার বালিকা বন্ধুর খোঁজে, যার লেখা একটা চিঠি এখনো আমার বুক পকেটে আছে। মাঝখানে আমি মাকে একটা চিঠি লিখে ওর কথা বলেছিলাম, যদিও মাকে ওর নাম বলিনি। মাকে জানিয়েছিলাম যুদ্ধ শেষে যখন ফিরে আসবো তখন ওকে তোমার কাছে নিয়ে আসবো। আমি হাটছি আর পিছনের স্মৃতি আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। স্কুলে পড়ার সময় আমি ছিলাম সত্যিকারের হাবাগোবা, তবে মোটামুটি ধনের মেধাবী । কম বেশি সবাই আমাকে আরো বেশি বোকা বানানোর চেষ্টা করতো । সেই সব দিনগুলিতে কী এক মায়ার টানে আলেয়া আমাকে ঢাল হয়ে ঘিরে রাখতো। আমি তখন বুঝতে পারতাম না আমার জন্য তার মনে কিসের এতো দরদ। জ্বর হয়ে বিছানায় পড়ে থাকলে কেউ আমার খোঁজ নিতনা, কিন্তু ও ঠিকই আসতো। আমার কপালে হাত রেখে বলতো “ইস গরমে গা পুড়ে যাচ্ছে“। আমি অনেক দিন বাদে ফিরে এসেছি। ওদের বাড়ির উঠোনে পা রাখতেই কেমন যেন বুকের মধ্যে ধড়ফড় করতে লাগলো। আমি ওর নাম ধরে ডাকার শক্তি পেলাম না। কিছুটা লজ্জা কিছুটা ভয়। যে নামটা বছরের পর বছর ক্ষণে ক্ষণে উচ্চারণ করেছি, সেই নামটা আজ মুখে আনতে পারছিনা। মুক্তিযুদ্ধে হেরে গিয়ে হানাদার বাহিনী যখন আত্ম সমর্পন করতে বাধ্য হলো তখন যতটা উত্তেজনা অনুভব করেছি এখন তার চেয়ে বেশি অনুভব করছি। কি পেয়েছি কি পাইনি মনের ভেতর তার হিসার নিকাশ চলছে। বাবা মা চেয়েছিল আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই, সে স্বপ্ন পুরন হয়েছে। কোটি কোটি বাঙ্গালীর সাথে নিজে যখন স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম একটি স্বাধীন দেশ এবং আকাশে ওড়ানোর মত স্বাধীন একটা পতাকার। সেই স্বপ্নটাও নিজে স্বাক্ষী হয়ে পূরন করতে পেরেছি। না পাওয়ার খাতা প্রায় শুন্য। যুদ্ধ জয় করে ফিরে আসা বীরের সামনে অপূর্নতা বলে কিছু থাকার কথা নয়। কিন্তু আমার জন্য খানিকটা অপূর্ণতা রয়ে গেছে। চারদিকে এত আলো তার মাঝেও আমি আলোর খোঁজে আলেয়ার কাছে ছুটে এসেছি। জানি অন্য সব আলো আমার চারপাশে আলোকিত করবে ঠিকই কিন্তু আমার মনের ঘর আলোকিত করতে পারে শুধু আলেয়ার আলো। স্বাধীন একটা দেশ এবং স্বাধীন একটা পতাকা নিয়ে আসতে পেরেছি এর চেয়ে বড় উপহার আলেয়াকে আর দিতে পারবোনা জেনেও সাধ্য মত লাল শাড়ী এনেছি। শাড়ীটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলবো বর্ষার প্রথম কদমফুল নয়,বাগানের হাসনা হেনা নয়, তোমার জন্য যুদ্ধ করে এনেছি স্বাধীন সূর্য,স্বাধীন দেশ এবং আকাশে ওড়ানোর মত স্বাধীন একটা পতাকা। সেই সাথে এনেছি শহীদের রক্তের সাথে মিল রেখে লাল কাপড়। আমার কথা শুনে আলেয়ার কী অনুভূতি হবে তা ভাবতে থাকি।
খানিকক্ষন দাড়িয়ে থেকে ওর মাকে ডাকলাম, কাকি বাড়িতে আছেন? একবার দু বার তৃতীয়বার ডাকার পর ওর মা বেরিয়ে আসলেন। আমাকে দেখে চিৎকার করে কেঁদে আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। হতে পারে যুদ্ধ শেষে জীবিত ফিরে এসেছি সেই আনন্দে কাঁদছেন, কারণ অনেকের ছেলে মেয়েই জীবিত ফিরে আসতে পারেনি। আবার এমনও হতে পারে আলেয়া আমাকে নিয়ে তার স্বপ্নের কথা তার মাকে বলেছে এবং আমি ফিরে এসেছি দেখে তার এমন বাঁধ ভাঙ্গা কান্না। আমি কাকিকে শান্তনা দিয়ে বললাম এখন কাঁদার সময় শেষ। দেখবেন দেখতে দেখতে সব ঠিক হয়ে যাবে। তিনি কোন কথা বললেন না। হয়তো কিছু কিছু ব্যাথা কোন দিন শেষ হবার নয়। তিনি আমাকে হাত ধরে বাড়ির পাশে বকুল তলায় নিয়ে গেলেন। এই বকুল তলা আমি অনেক বার এসেছি। প্রতিবারই আমার ভাল লেগেছে। কেবল এবারই বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠলো। আলেয়া আমার পাশে নেই সে জন্যই কি এমনটি হচ্ছে, নাকি অন্য কিছু তা আমি বুঝে উঠতে পারছিনা। আগের সেই বকুল গাছ আর আজকের এই বকুল গাছের মধ্যে যুগ যুগান্তের পার্থক্য। যে বকুল গাছের নিচে কেবল ঝরা বকুলের সমাহার থাকতো আজ সেই বকুল গাছের তলে নতুন একটা কবর। কার কবর সেটা জিজ্ঞেস করার সাহস আমার হলনা। হতে পারে আলেয়ার ছোট ভাই মারা গেছে কিংবা আলেয়ার বাবা মারা গেছে। আলেয়াও যে মারা যেতে পারে সে কথাটা আমার মাথায় একবারও আসেনি। আমি কবরের মানুষটার জন্য দু হাত তুলে প্রার্থনা করলাম। কাকি আমার হাত ধরে ঘরে নিয়ে আসলেন। কোথা থেকে খুঁজে খুঁজে একটা রক্ত মাখা চিঠি আমার হাতে ধরিয়ে দিয়েই জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেলেন। কার চিঠি, কাকে লিখেছে, এসব তখন মামুলি ব্যাপার। জ্ঞান হারা মানুষটির সেবা করাই তখন একমাত্র কাজ ছিল। আমি সাহায্যের হাত বাড়ানোর জন্য কেউ একজনকে খুঁজছিলাম। আমার সামনে এসে দাড়াল আলেয়ার বাবা এবং ছোট ভাই আলাদীন। আমার বুকটা কেঁপে উঠলো। কোন পূর্বাভাস ছাড়াই চোখ বেয়ে অশ্রু নামতে লাগলো। বকুল গাছের নিচেয় যে কবরটা দেখেছি, বার বার সেটাও চোখের সামনে ভেসে উঠলো। আলেয়ার বাবা বা ভাই কেউ মারা যায়নি, তাহলে কবরটা কার? কোন অজ্ঞাত নামা মুক্তিযোদ্ধার? আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। আমি সব কিছু ভুলে হাতের রক্ত মাখা চিঠিটি চোখের সামনে মেলে ধরলাম। বাড়ি আসার সময় আলেয়ার জন্য একটা লাল টুকটুকে অল্প দামি শাড়ি কিনেছিলাম, সেটা তখন আমার পাশে। চিঠিটি চোখের সামনে মেলে ধরতেই আরেকটি যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। হানাদারদের ধুলোয় মিশিয়ে দেয়া বীর যোদ্ধা এই যুদ্ধে নিজেকে জয়ী করতে পারলোনা। জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেলাম। জ্ঞান হারানোর আগে হাতে ধরে রাখা চিঠির প্রতিটি অক্ষর আমার বুকের মধ্যে এক একবার বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে আমাকে ক্ষত বিক্ষত করে যাচ্ছিল। চিঠিটি ছিল আমাকে লেখা আলেয়ার শেষ চিঠি। চিঠিতে যা লেখা ছিল সেটা ছবি হয়ে আমার চোখে ভাসছিল।
৮.
আলেয়ার কবরে এখন প্রতিদিন বকুল ফুল ঝরে পড়ে। সকালের সুর্য আলেয়াকে আলো দেয়। ওর কবরেই বকুল ফুল ঝরে পড়া উচিৎ। মৃত্যুর আগে ও আমাকে ওর ভাল লাগা ভালবাসার কথা লিখে গেছে। শুধু জেনে যেতে পারেনি আমিও ওকে ভালবাসি এবং এখনো ওকে ভালবাসি। আলেয়ার লেখা শেষ চিঠি পড়ে আমি যখন জ্ঞান হারাচ্ছিলাম, তখন সেকেন্ডের ভিতরে বিগত সময়ের সব স্মৃতি আমার চোখের সামনে ভেসে উঠেই একবারে সব অন্ধকার হয়ে গেল। তার পর আমার আর কিছুই মনে নেই। আমি জ্ঞান হারানোর পর সবাই ধরাধরি করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে তিনি চিকিৎসা করেন এবং আমার জ্ঞান ফিরে আসে। মা এবং অন্যদের মুখে শুনেছি জ্ঞান ফেরার পর আমি কোন কিছুই মনে করতে পারিনি। শুধু মা বাবার চেহারাটা মনে ছিল। প্রায় দেড় বছর চিকিৎসার পর আমি সুস্থ হয়ে উঠি। একরাতে আলেয়া তার মায়ের সাথে ঘুমাচ্ছিল হঠাৎ দুড়–ম দাড়াম শব্দ। ভয়ে ওরা কেঁপে উঠলো এবং সাথে সাথে ওদের দরজায় লাথির আঘাত লাগলো। ওরা তখনই বুঝতে পারলো মিলিটারি এসেছে। আলেয়ার মা অনেক চেষ্টা করেও ওকে বাচাঁতে পারেনি। চোখের সামনে রাজাকার এবং পাকিস্তানী মিলিটারিদের বর্বরতা দেখেছে আলেয়ার ছয় বছরের ভাই আলাদীন। রক্তাক্ত ক্ষত বিক্ষত আলেয়া সেই অবস্থাতেই তার প্রিয় মানুষটিকে চিঠি লিখে তার মায়ের হাতে দিয়ে বলেছে “ ও যদি ফিরে আসে এই চিঠি যেন ওকে দেওয়া হয়”। এই টুকু ছিল আলেয়ার শেষ কথা।
রাস্তার মোড়ে বড় বটগাছে যে কংকালটা ঝুলছে সেটা আর কারো নয়, রাজাকার শরাফত আলীর। যে বদমাইশটার কারনে আমার জীবন থেকে আলেয়ার আলো নিভে গেছে চির তরে। এর মাঝে আমার ছোট ভাইও ফিরে এসেছে। মা ভীষণ আনন্দিত। বলতে গেলে দেশের এই বিরাট অর্জনে যত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে এবং যত ক্ষতি হয়েছে, আমার মায়ের তেমন একটা ক্ষতি হয়নি। প্রতি রাতে আলেয়ার লেখা চিঠিগুলি একবার করে পড়ি, শুধু রক্তমাখা চিঠিটা পড়ি প্রতি চাদনী রাতে, যখন চাঁদ তার সমস্ত জোছনা ঢেলে দেয়। তখন আমি আলেয়াকে ভাবি এবং তার জন্য চোখের জল বিসর্জন দেই। সুস্থ হবার পর আমি আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যাই। রাশেদের মা বাবাকে লেখা চিঠিটাও আমার পকেটে। ওর দেখা পেলে ওর চিঠিটা ওকে ফেরৎ দেব। রাশেদের বাড়িতে গিয়ে কাউকে না পেয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি মিলিটারিরা ওদের বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ছিল এবং ওর বাবা মা এবং ছোট ভাইকে গুলি করে হত্যা করেছিল। ওর অতি আদরের বোনকে ক্যাম্পে ধরে নিয়ে গিয়ে পাশবিক অত্যাচার করে বেয়নেট চার্জ করে খুচিয়ে খুচিয়ে মেরে ফেলেছিল। আমি কিভাবে রাশেদকে এসব কথা বলবো ভেবে পাইনি। আমি অনেকটা পালিয়ে থাকতাম, যেন রাশেদের সাথে আমার দেখা না হয়। আমার আর পালিয়ে থাকতে হলনা। সত্যি এক জীবনে আর কোন দিন রাশেদ আমার সামনে এসে দাড়াবেনা। আমাকে জিজ্ঞেস করবেনা আমার বাবা মাকে চিঠিটা দিয়েছিলি কিনা। একদিন এস এম হলের বারান্দায় বসে আছি। হঠাৎ দেখি মাহমুদ আমার পাশে দাড়ানো। প্রথমটাতে আমি চমকে উঠেছিলাম। আমার অবচেতন মন আমাকে বলছিল হয়তোবা রাশেদ এসে দাড়িয়েছে। পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি মাহমুদ। রাশেদ আর মাহমুদ দুজনেই আট নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেছিল। মাহমুদকে দেখে আমি কিছুটা শান্ত হলাম। আমার পাশে বসে মাহমুদ আমার কাধে হাত রাখলো। আমার অসুস্থতার দিনগুলোতেও ও সারাক্ষণ আমার পাশে ছিল। আমার এবং আলেয়ার সব বিষয় ও জানতো বলেই হয়তো আমাকে নানা ভাবে ভুলিয়ে ভালিয়ে রাখার চেষ্টা করতো। কিন্তু বিষয়টা হয়ে গিয়েছিল শরীরের একটা ব্যাথা স্বরুপ। ভুলতে চাইলেও ভুলতে পারিনি। আসলে আমি স্মৃতিগুলো কোনদিন ভুলতে চাইনা। পাশে বসে মাহমুদ পকেট থেকে একটা চিঠি বের করলো। এই চিঠিটাও রক্ত মাখা। বুকের মধ্যে আবার প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব করলাম। চিঠিটা খুলে পড়লাম এবং সাথে সাথে আমার চোখ অশ্রুতে ভিজে ঝাপসা হয়ে উঠলো। রাশেদের লেখা চিঠি। রাশেদ যখন চিঠিটি লিখছিল মাহমুদ তখন ওর পাশে বসা। মাহমুদ নিজ চোখে দেখেছে রাশেদের মৃত্যু দৃশ্য। রাশেদ ছিল আমার ভীষণ ভালো বন্ধু। সারাক্ষন আমরা একসাথে থাকতাম। কথা ছিল একই সেক্টরে যুদ্ধ করবো, তা আর হয়ে ওঠেনি। রাশেদ আমাকে অনুরোধ করেছে আমি যেন ওর বাবা মাকে দেখে রাখি। এবং ও যে মারা গেছে এটা যেন তাদের বুঝতে না দেই। রাশেদ আরো অনুরোধ করেছে ওর বোন নিতুকে আমি যেন ভালো ঘরে বিয়ে দেই। আমি যে রাশেদকে তার বাবা মায়ের এবং অতি আদরের বোনের সংবাদ দিতে পারবোনা বলে পালিয়ে বেড়াচ্ছি সেই রাশেদ আমাকে মুক্তি দিয়ে গেছে। মুক্তির নামে দিয়ে গেছে আজীবনের মত শিকল পরা ব্যাথা। রাশেদের লেখা চিঠি পড়ে ভাজ করে পকেটে রেখেছি। যেখানে আগে থেকেই আরেকটা রক্ত মাখা চিঠি ছিল,চিঠিটা আলেয়ার।
সন্ধ্যা হয়ে আসছে। স্বাধীন দেশে সুর্য ডুবছে । এস এম হলের বারান্দায় মাহমুদের পাশে বসে আমি শুন্য দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি। সে আকাশে কোন মেঘ নেই ,এক ঝাঁক পাখি ডানা ঝাপটে নীড়ে ফিরছে। তারাও আজ স্বাধীন। হল মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে ,হাতের তালু দিয়ে চোখ মুছে আমরা দু’জন উঠে দাড়িয়েছি। মাহমুদ নির্বিকার,যতই মুছছি চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছেই। এখন আর অশ্রু মুছতে ইচ্ছে করছেনা। ও ওর মত করে ঝরতে থাক। এখন আমার পকেটে রক্ত মাখা দুটো চিঠি, একটি মুক্তি যোদ্ধার, অন্যটি মুক্তিযোদ্ধাকে ভালবাসা এক বীরাঙ্গনার। চিঠি দুটোয় হাত বুলিয়ে বাকি জীবন কাটিয়ে দেব। মসজিদের দিকে হাটছি আর মুখ দিয়ে বিড় বিড় করে বেরিয়ে আসছে একটি কথা ,এখন আমার কাছে দুটো চিঠি, রক্ত মাখা দুটো চিঠি।
———————–সমাপ্ত——————————

