Saturday, March 14, 2026
Homeগল্পগৃহবন্দী ইমাম

গৃহবন্দী ইমাম

ইরাকের বাগদাদ নগরী। পৃথিবী বিখ্যাত এক শহর। জ্ঞানের শহর। দূর দূরান্ত থেকে মানুষ আসে জ্ঞানার্জন করার জন্য। অন্যান্য নানা কারণেই তখন বাগদাদ ছিল বিখ্যাত এক শহর। ব্যবসার কেন্দ্র। বাগদাদের আকাশে সেদিন গুচ্ছ গুচ্ছ মেঘ সূর্যটাকে আড়াল করে রাখতে ব্যস্ত। সকালে সূর্যের আলো যখন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে বাগদাদ শহরের উপর, তখন প্রথম যে জিনিসটি চোখে পড়ে তা হলো বিশাল টাইগ্রিস নদী। নদীটি শহরের বুক চিরে বয়ে গেছে, ঠিক যেমন মানুষের শরীরের মাঝখান দিয়ে মেরুদন্ড গিয়েছে। টাইগ্রিস নদীটিও যেন তেমনি বাগদাদ শহরের মেরুদন্ড। এই নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে বাগদাদ নগরী।

টাইগ্রিসের পানি কখনো গভীর নীল, কখনো রোদে সোনালি হয়ে ওঠে। ভোরবেলায় নদীর উপর হালকা কুয়াশা ভেসে থাকে। দূরে ছোট ছোট নৌকা ধীরে ধীরে ভেসে চলে। কোথাও জেলেরা জাল ফেলছে, কোথাও বণিকদের মাল বোঝাই নৌকা শহরের দিকে এগিয়ে আসছে।

নদীর দুই তীরে ছড়িয়ে আছে বাগদাদের জীবন। পূর্ব তীরে জনবহুল বাজার, মসজিদ আর মাদ্রাসা। পশ্চিম তীরে খলিফার প্রশাসনিক কেন্দ্র, প্রাসাদ ও দপ্তর। দুই তীরকে যুক্ত করেছে কাঠের সেতু আর নৌকা।

দিনের বেলায় বাগদাদ যেন এক চলমান পৃথিবী। সরু গলিতে মানুষের ভিড়, বাজারে মসলা ও কাপড়ের গন্ধ। নামাজের সময় হলে চারদিক থেকে ভেসে আসে আজানের ধ্বনি, যা নদীর জলের উপর দিয়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়ে।

কিন্তু সন্ধ্যা নামলে শহরের রূপ বদলে যায়। সূর্য যখন টাইগ্রিসের জলে ডুবে যেতে থাকে, তখন নদীর উপর পড়ে লালচে আলো। সেই আলোয় শহরের মিনারগুলো দীর্ঘ ছায়া ফেলে। নৌকার দাঁড় টানার শব্দ আর নদীর ঢেউয়ের মৃদু ছলাৎছল শব্দ মিলিয়ে এক অদ্ভুত শান্তি তৈরি করে।

খলিফার প্রাসাদসমূহ দূর থেকে দেখলে মনে হতো যেন একটি ছোট শহর। উঁচু প্রাচীর, বিশাল ফটক, আর ভেতরে অসংখ্য প্রাঙ্গণ। প্রাসাদের প্রধান ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে সশস্ত্র প্রহরীরা। তাদের হাতে বর্শা, কোমরে তলোয়ার। ফটকের ওপরে খোদাই করা জ্যামিতিক নকশা ও আরবি ক্যালিগ্রাফি। ভেতরে ঢুকলেই দেখা যায় প্রশস্ত উঠান, মাঝখানে ফোয়ারা, চারপাশে খেজুর ও কমলালেবুর গাছ। প্রাসাদের করিডোরগুলো দীর্ঘ। দেয়ালে দেয়ালে ঝোলানো আরবী ক্যালিগ্রাফি। দরবারের মাঝখানে পারস্যের কারুকাজ করা কার্পেট।

সেই শহরেই বাস করতেন এক বিজ্ঞ আলেম,এক খোদাভীরু ইমাম। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষ তার কাছে ছুটে আসতো হাদীসের দারস নিতে। বিভিন্ন মাসয়ালা জানতে। তিনিও খুব মনোযোগ দিয়ে সবার কথা শুনতেন এবং কুরআন ও হাদীসের আলোকে সমাধান দিতেন। সেই সময়ে আব্বাসি খলিফা ছিলেন ওয়াসেক বিল্লাহ। তিনি ছিলেন মুতাজিলা মতবাদে বিশ্বাসী। মুতাজিলারা মনে করতো মহা গ্রন্থ আলকুরআন আল্লাহর সৃষ্টি। কিন্তু যারা মুতাজিলা মতবাদে বিশ্বাসী ছিল না তারা মনে করতো আল কুরআন আল্লাহর সৃষ্টি নয় বরং আল্লাহর বাণী। সেই বৃদ্ধ আলেম ছিলেন মুতাজিলা মতবাদের বিরোধী। এ কান ও কান হতে হতে একদিন বিষয়টি খলিফা ওয়াসেক বিল্লাহর কানে পৌছে গেলো। 

আব্বাসি খলিফা ওয়াসেক বিল্লাহ ইমাম সাহেবের উপর প্রচন্ড ক্ষিপ্ত হলেন। বিভিন্ন জনের কাছ থেকে তার কাছে যে অভিযোগ উপস্থাপন করা হয়েছে সেটা শুনেই তিনি ইমামের উপর ক্ষিপ্ত। এমনিতে যদিও তিনি ইমামকে খুবই পছন্দ করেন তবে জনগন তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এনেছে তা শোনার পর তিনি ক্ষিপ্ত না হয়ে পারলেন না। যেহেতু তিনিও মুতাজিলা মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন তাই বিষয়টি তিনি কোনো ভাবেই মানতে পারলেন না। খলিফার দরবারে ডেকে আনা হলো যুগের শ্রেষ্ঠ আলেম, বৃদ্ধ ইমামকে। 

খলিফা যে ইমামকে ডেকে পাঠাবেন সেটা তিনি আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন। আগের দিন সন্ধ্যার পর তিনি যখন মসজিদে বসে শিষ্যদের হাদিসের তালিম দিচ্ছিলেন তখনই এক শিষ্য তাকে  প্রশ্ন করেছিল হুজুর মহাগ্রন্থ আলকুরআন কি আল্লাহর সৃষ্টি নাকি আল্লাহর কালাম? ইমাম সাহেব দৃঢ়কন্ঠে বলেছিলেন আল কুরআন আল্লাহর সৃষ্টি নয় বরং আল্লাহর কালাম। ইমামের মুখ থেকে এটা শোনার পর সেই শিষ্য বলেছিল হুজুর আপনি নিশ্চই জানেন আমাদের খলিফা মুতাজিলা মতবাদে বিশ্বাসী। শুনেছি খলিফা সব আলেমকে দরবারে ডেকে নিয়ে তাদের মূখ দিয়ে এই কথা বলাবেন যে আল কুরআন আল্লাহর সৃষ্টি সমূহের একটি। সেই সময় আপনারও উপস্থিত থাকা লাগবে এবং আপনার মুখ দিয়েও খলিফা এই কথা বলিয়ে নিবেন। শিষ্যের মুখ থেকে এমন কথা শোনার পর যুগ শ্রেষ্ঠ ইমাম মুচকি হাসলেন। বললেন খলিফা যদি সত্যি সত্যি ডেকে পাঠান এবং এমন বয়ান চান তবে আমার কাছ থেকে তাকে হতাশ হয়ে ফিরতে হবে। আমিতো খলিফার কথা মত আল্লাহর কালামকে সৃষ্টি বলে প্রচার করতে পারবো না। তারপর সত্যি সত্যিই খলিফার দরবার থেকে ডাক আসলো। ইমাম সাহেব তার ঘরেই ছিলেন। তাকে বলা হলো খলিফা আপনাকে তলব করেছেন। আমাদের সাথেই আপনাকে যেতে হবে। তিনি কিছুটা সময় নিয়ে প্রায় সাথে সাথেই সৈন্যদের সাথে রওনা হলেন।

পথে যেতে যেতে অনেক মানুষের সাথে দেখা হলো। লোকে ভীষণ অবাক হলো আর ভীত হয়ে উঠলো। সাথে সৈন্য থাকায় সবাই ধরে নিলো ইমাম সাহেবকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কী অপরাধে গ্রেফতার করা হয়েছে তা অবশ্য তারা অনুমান করতে পারলো না।

আব্বাসী খলিফা ওয়াসেক বিল্লাহ তার দরবারে ইমামকে ডেকে পাঠিয়েছেন শুনে ইমাম বিচলিত নন। কারণ তিনি জানেন তিনি সত্য ও ন্যায়ের পথে আছে। ফলে খলিফার দরবারে উপস্থিত হয়ে তিনি জবাব দিতে পারবেন এই বিশ্বাস তার আছে। তিনি খলিফার প্রতিনিধিদের সাথে দরবারে উপস্থিত হলেন। দরবারে তখন ফিসফাস শব্দ হচ্ছে। তিনি দেখলেন আরও অনেক আলেম সেখানে উপস্থিত। যাদের অনেকেই তার শিষ্য। দরবার শুরু হওয়ার পর খলিফা তার মূল কথা শুরু করলেন। তিনি জানতে চাইলেন বিজ্ঞ আলেমগণ আপনাদের কাছে আমার একটি প্রশ্ন আছে। আমি জানতে চাই পবিত্র কুরআনকে আপনারা কিভাবে দেখেন? এটি কি আল্লাহর সৃষ্টি নাকি অন্য কিছু? তখন এক এক করে সবাই বলতে লাগলো এটি আল্লাহর সৃষ্টি। শুধু চুপ করে থাকলেন বৃদ্ধ ইমাম। এবার খলিফা তার কাছে জানতে চাইলেন আপনি বলুন। তিনি বললেন পবিত্র কুরআন আল্লাহর সৃষ্টি নয় বরং আল্লাহর কালাম। এগুলো আল্লাহর বলা কথা। আল্লাহর বাণী। ইমামের কথা শুনে প্রচন্ড ক্ষিপ্ত হলেন খলিফা ওয়াসেক বিল্লাহ। যেহেতু তিনি মুতাজিলা মতবাদে বিশ্বাসী আর মুতাজিলারা মনে করে আল কুরআন আল্লাহর সৃষ্টি তাই ইমামের কথাটা তার মতের বিপরীতে চলে যাওয়ায় তিনি ক্ষিপ্ত হলেন। অন্যরা যখন খলিফার শাস্তির ভয়ে খলিফার পছন্দমত কথা বলেছে তখন বৃদ্ধ ইমাম সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থেকেছে। শাস্তিকে পরোয়া করেনি।

দরবারের সিদ্ধান্ত হলো ইমামকে তার বক্তব্য ফিরিয়ে নিতে হবে এবং আল কুরআন আল্লাহর সৃষ্টি এটা স্বীকার করতে হবে। নতুবা তাকে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। কিন্তু ইমাম তার কথায় অটল থাকলেন। তিনি জানালেন শুরুতে তিনি যা বলেছেন সেটাই তার চূড়ান্ত বক্তব্য। কোনো শাস্তির ভয়ে তিনি সত্যকে অস্বীকার করতে পারেন না। ফলে খলিফা তাকে সভাসদের পরামর্শ মত শাস্তি দিলেন। ইমাম এখন থেকে নিজের ঘরেই থাকবেন। মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তে পারবেন না এবং কাউকে শিক্ষা দিতে পারবেন না। যদি এর হেরফের হয় তবে শারীরিক শাস্তি দেওয়া হবে। তারা এই সিদ্ধান্ত নিল এ জন্য যে যদি তাকে মসজিদে নামাজ পড়তে দেওয়া হয় তবে তার কাছে মানুষ আসবে আর শিক্ষা লাভ করবে। মুতাজিলাদের মতবাদের বিরোধীতা আরও প্রবল হবে। তাই তাকে একঘরে করে রাখা হলো। ইমাম সাহেব সিদ্ধান্ত মেনে নিলেন।

চারদিকে এই ঘটনা ছড়িয়ে পড়লো। মানুষের মধ্যে অনেক রকম প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলো। যারা ইমামকে ভালোবাসতেন তারা খুব দুঃখ পেলেন আর যারা মুতাজিলা মতবাদে বিশ্বাসী তাদের কেউ কেউ ভাবলো শাস্তির পরিমান কম হয়ে গেছে। এভাবে বেশ কিছুদিন কেটে গেলো। ইমাম সাহেব একাকী নিজের ঘরে অবস্থান করতে লাগলেন। তবে তিনি থাকলেন নজরদারীতে। কেউ তার কাছে শিক্ষা লাভ করতে যায় কি না সেটা খেয়াল রাখতে বলা হলো।

এক রাতে ইমাম সাহেব নিজের ঘরের কবাট আটকে হাদিস নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন। এমন সময় দরজায় করাঘাতের শব্দ পেলেন। তিনি ভাবলেন নিশ্চই রাজ দরবার থেকে কেউ এসেছে। কোনো সৈন্য এসেছে। আবার হয়তো কোনো তলব আছে। সাধারণ কারো আসার কথা নয়। কেননা রাজ্যের সবার কাছে ঘোষণা করা হয়েছে ইমাম সাহেব গৃহবন্দী। তার মসজিদ সহ সব জায়গায় যাওয়া নিষেধ। তেমনি তার কাছেও কেউ দরস নিতে যাওয়া নিষেধ। ফলে সাধারণ কারো আসার কথা নয়। আসলে রাজ দরবার থেকেই কেউ আসবে। হয়তো কোনো তলব নিয়ে নয়তো বাজার সদাই নিয়ে। যেহেতু তার কোথাও যাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা আছে তাই তার বাজার রাজ কর্মচারিরাই সর্বরাহ করবে এই আদেশ দেওয়া ছিল। ইমাম সাহেব স্বাভাবিক ভাবে গিয়ে দরজা খুলে দিলেন। দরজা খুলতেই তিনি অবাক হলেন সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন মানুষকে দেখে। লোকটি ইমাম সাহেবকে দেখে সালাম দিলেন। ইমাম সাহেব সালামের জবাব দিলেন।

লোকটির পরণে ছিল ছেড়া জামা,কাঁধে একটা ঝোলা বস্তা। পায়ে পুরোনো সেন্ডেল। যে কেউ দেখলেই বুঝতে পারবে সে একজন ভিখারী। রাত তখন বেশ হয়েছে। এশার নামাজ শেষ করেই তিনি হাদিস নিয়ে বসেছিলেন। তারপর কত সময় পার হয়েছে তিনি মনে করতে পারেন না। ফলে ধরে নেওয়া যায় বেশ রাত হয়েছিল। এই সময় এমন একজন ভিখারীকে দেখে তিনি অবাক হয়ে জানতে চাইলেন তুমি কে? এখানে কেন এসেছো? ভিক্ষা দেবার মত অবস্থা এই মুহূর্তে আমার নেই। লোকটি বললেন হুজার আমি ভিখারী নই। ভিখারীর ছদ্মবেশে এসেছি। আমার নাম বাকি ইবনে মুখাল্লাদ। আপনি আমাকে চিনবেন না। আমি অনেক দূর থেকে এসেছি আপনার কাছে হাদীস শেখার উদ্দেশ্যে। ইমাম সাহেব অবাক হলেন এবং বুঝলেন লোকটি আসলেই দূর থেকে এসেছে। তার চেহারায় ক্লান্তির ছাপ আছে। তাছাড়া আসেপাশের কেউ হলে তার জানা থাকার কথা যে ইমামের সাথে কারো দেখা করা নিষেধ এবং তার কাছ থেকে জ্ঞানার্জন করাও নিষেধ। তিনি জানতে চাইলেন তুমি কোথা থেকে এসেছো? বাকি ইবনে মুখাল্লাদ নামে সেই জ্ঞান পিপাসু জানালেন তিনি মরক্কো থেকে এসেছেন।

তার কথা শুনে ইমাম সাহেব খুবই অবাক হলেন। মরক্কো থেকে বাগদাদের দূরত্ব কমপক্ষে সাড়ে চার হাজার মাইল। পায়ে হেটে সেই পথ অতিক্রম করতে এক বছর সময় লেগে যাওয়ার কথা। এক বছর ধরে হাটতে হাটতে আলজেরিয়া,লিবিয়া,তিউনিশিয়া,মিশর,সিরিয়া পার হয়ে তারপর ইরাকের বাগদাদ নগরীতে পৌঁছেছেন শুধুমাত্র তার কাছ থেকে হাদীসের দরস নেওয়ার জন্য। ইমাম সাহেব বললেন মরক্কো তো অনেক দূর। তাছাড়া তুমি কিভাবে আমার বাড়ি চিনলে? আগে তো কখনো আমার বাড়িতে আসোনি। আর তুমি কি জানো না আমার সাথে কারো সাক্ষাৎ করা ও কথা বলা রাষ্ট্রীয় ভাবে নিষিদ্ধ? ইবনে মুখাল্লাদ বললেন আমি বাগদাদে আসার আগে রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞার কথা জানতাম না। তারপর যখন বাগদাদ নগরীতে নেমে আপনার বাড়ির সন্ধান চাইলাম তখন লোকে বললো হে পথিক তুমি ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহঃ) এর সাথে দেখা করতে আসছো, তুমি কি জানো না তার সাথে দেখা করা রাষ্ট্রীয় ভাবে নিষেধ। খলিফা জানতে পারলে তোমার গর্দান যাবে। এ কথা শোনার পর আমি ভীষণ অবাক হয়েছি এবং তাদের কাছে জানতে চেয়েছি যুগ শ্রেষ্ঠ ইমামকে এমন শাস্তি দেওয়ার কারণ কী? তারা তখন বিস্তারিত বলেছে। আর যখন জানতে পেরেছে আমি সুদুর মরক্কো থেকে এসেছি তখন তারা আপনার বাড়ির পথ চিনিয়ে দিয়েছে। সেই সাথে সতর্ক করে দিয়েছে যেন কারো চোখে না পড়ি। তাদের সতর্ক বাণী শুনে আমি ভিখারীর ছদ্মবেশ নিয়ে তারপর আপনার এখানে এসেছি। আপনার অনুমতি পেলে প্রতিদিন আমি ভিখারীর ছদ্মবেশে আপনার কাছে আসবো এবং অল্প সময় হাদিস শিখে চলে যাবো।

ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল তার কথায় মুগ্ধ হলেন এবং বললেন ঠিক আছে তুমি আসো তবে খুব সাবধান। কারো চোখে যেন ধরা না পড়ে যে তুমি আসলে ভিক্ষুক নও। সেদিনের পর থেকে বাকি ইবনে মুখাল্লাদ প্রতিদিন ছেঁড়া পোশাক পরে পুটলি হাতে ভিক্ষুকের বেশে ইমাম সাহেবের বাড়িতে উপস্থিত হতেন। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল দরজা খুলতেই তিনি বলতেন, আমি ক্ষুধার্ত, আমাকে কিছু খাবার দিন। তখন ইমাম সাহেব তাকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে কিছু সময় হাদিস শোনাতেন। তিনি কি আসলে ক্ষুধার্ত ছিলেন? ইমাম সাহেব কি তাকে খাবার দিতেন? এই প্রশ্ন করা হলে কেউ কেউ ভাবতে পারে হাদিস শেখার জন্য তিনি মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন। মূলত তিনি কখনোই মিথ্যার আশ্রয় নেননি। তিনি ছিলেন জ্ঞানের ক্ষুধায় ক্ষুধার্ত। আর ইমাম সাহেব তাকে খাবার হিসেবে জ্ঞানের ক্ষুধা নিবারণ উপযোগি খাবারই দিয়েছেন। ফলে তারা সত্য ও ন্যায়ের পথেই ছিল।

এভাবেই বাকি ইবনে মুখাল্লাদ দিনের পর দিন ভিক্ষুকের বেশে ইমামের বাড়িতে উপস্থিত হয়ে হাদিসের দরস নিয়ে মুসনাদে আহমাদের সম্পূর্ণটা তাঁর থেকে শুনে হাদিস শেখা শেষ করে মরক্কো ফিরে গিয়েছিলেন। কোনোদিন কেউ বুঝতে পারেনি ভিক্ষুকের বেশে রোজ এক লোকট ইমামের বাড়িতে আসতো আর হাদিস শিখতো। 

এর কয়েক বছর পর আব্বাসি খলিফা ওয়াসেক বিল্লাহর মৃত্যুর পর নতুন খলিফা নির্বাচিত হলেন আল মুতাওয়াক্কিল। ততোদিন পযর্ন্ত ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল গৃহবন্দী অবস্থায় ছিলেন। রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা মেনে চলতে হয়েছিল। তারও বয়স হয়ে গিয়েছিল। নতুন খলিফা আল মুতাওয়াক্কিল ওয়াসেক বিল্লাহর মত মুতাজিলা মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন না। ফলে তিনি খলিফা নির্বাচিত হওয়ার পরই আগের খলিফার নির্দেশ তুলে নিলেন এবং সম্মানের সাথে ইমাম আমদ ইবনে হাম্বলকে স্বাধীন ভাবে মসজিদে নামাজ পড়া ও দরস দেওয়ার অনুমতি দিলেন। 

আসরের আজান হয়ে গেছে। এমন সময় তার কাছে রাজ দরবার থেকে খবর আসলো তিনি আগের খলিফা কর্তৃক যে আদেশ প্রাপ্ত হয়েছিলেন তা থেকে মুক্ত। তিনি চাইলে এই মুহুর্ত থেকেই বাইরে চলাফেরা করতে পারবেন। মসজিদে যেতে পারবেন। এই সংবাদ শোনার পর তিনি আর দেরি করলেন না। দ্রুত ওজু করে মসজিদের পথে বেরিয়ে পড়লেন। তার বাড়ি থেকে জামে রুসাফা খুব বেশি দুরে না। পথে যেতে যেতে ব্যস্ত মানুষকে লক্ষ্য করলেন। আর মানুষগুলোও অবাক হয়ে দেখলো তাদের মাঝ দিয়ে হেটে চলেছেন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহঃ। যে মানুষটিকে বহু বছর এই পথে যেতে দেখা যায়নি। যতটা পথ তিনি হাটলেন মানুষ তাকে সালাম বিনিময় করতে লাগলো। সবার মনে আনন্দ। অবশ্য তাদের মধ্যেও যে মুতাজিলা মতবাদের অনুসারী ছিল না তা নয়। যারা ওই মতবাদে বিশ্বাসী ছিল তারা অবশ্য ততোটা খুশি হতে পারলো না।

মুসল্লিরা ব্যস্ত হয়ে মসজিদে ঢুকছে। ইকামত হয়ে গেছে। ইমাম সাহেব আল্লাহু আকবর বলে জামাত শুরু করলেন। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহঃ জামাতে শরিক হলেন। নামাজ শেষ হলে সালাম ফেরানোর পর মুসল্লিরা যখন বের হবে বলে উঠে দাঁড়ালো তখন অবাক হয়ে দেখলো তাদের সাথেই নামাজ আদায় করেছেন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহঃ। যারা উঠে চলে যাচ্ছিল তারা সাথে সাথে বসে পড়লো। যিনি নামাজের ইমামতি করেছিলেন তিনি সহ অন্য শিষ্যরা প্রিয় শিক্ষক, প্রিয় ইমামকে দীর্ঘদিন পর কাছে পেয়ে আপ্লুত হয়ে পড়লো। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহঃ মসজিদের মিম্বরে গিয়ে বসলেন। তারপর সবার উদ্দেশ্যে বক্তব্য দিলেন। নসিহত করলেন। তখন এক শিষ্য জানতে চাইলেন হুজুর আপনার থেকে অনেক কিছু শেখার ছিল কিন্তু দীর্ঘ সময় নিষেধাজ্ঞার কারণে আমরা আপনার সাথে সাক্ষাত করতে পারিনি। আমাদের শিক্ষা অসমাপ্ত রয়ে গেছে। যদি আমাদের শিক্ষা সমাপ্ত হওয়ার আগেই আপনি আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যান তাহলে আমাদের হাদিসের দারস কে দেবে? কে হবে আপনার উত্তরসূরী? 

ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহঃ শিষ্যের কথা শুনে একটু মুচকি হাসলেন। তারপর তিনি বললেন আমার অবর্তমানে তোমরা হাদিসের দরস নিতে পারবে বাকি ইবনে মুখাল্লাদের কাছ থেকে। সেই আমার অন্যতম সেরা ছাত্র। উপস্থিত কেউ এই নামে কাউকে চিনতে পারলো না। সবাই  একে অন্যের দিকে তাকালো। তখন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল জানতে চাইলেন তোমরা কি বাগদাদ শহরে ছেড়া কাপড় পরা, কাঁধে ঝোলা টুপলা সহ কোনো ফকিরকে দেখেছ? সবাই এক বাক্যে বললো হ্যা এমন একজনকে তারা দেখেছে। তখন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহঃ জানালেন তার নামই বাকি ইবনে মুখাল্লাদ। সে এসেছিল সাড়ে চার হাজার মাইল দূরের শহর মরক্কোর কুরতুবা নগরী থেকে কেবল মাত্র হাদিস শেখার জন্য। খলিফার নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে সে সতর্কতা অবলম্বন করে ফকিরের বেশে নিয়মিত আমার বাড়িতে এসে কিছুসময় হাদিস শিখে বেরিয়ে যেতো। এভাবেই কয়েক বছর ধরে সে হাদিসের দরস নিয়েছে। উপস্থিত সবাই এই ঘটনা শুনে বিস্মিত হলো। রাস্তায় ফকিরের বেশে ঘুরে বেড়ানো যে মানুষটিকে তারা কখনো গুরুত্বই দেয়নি তিনিই যে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহঃ এর অন্যতম শিষ্য তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।

Most Popular