জাজাফী গল্প আমি কিছু লিখিনি

আমি কিছু লিখিনি



নভেম্বরের ২৭ তারিখ বিকেলে হঠাৎ বদরুলের ফোন।ও সাধারণত আমাকে খুব একটা ফোন করেনা।সারাক্ষণই নিজেকে নিয়ে তামাশা করে,ছোট বলে খোটা দেয়।অথচ বন্ধুদের মধ্যে সেই সব থেকে সফল।

বিশাল একটা ব্যবসা তার।হাজার খানেক কর্মী অনবরত কাজ করে চলেছে।প্রতিদিন অনেক লাভ করছে।আর আমরাতো সবাই লবডঙ্কা। তার পরও তার একই কথা তোদের মত আইবিএ থেকে পড়িনি বলে জীবনে কিছুই হইতে পারলাম না।সেই বদরুল যখন ফোন করে বললো দোস্ত দারুণ একটা ব্যপারে তোর সাথে কথা বলতে চাই। আমি বললাম কি কথা বলে ফেল। সে বললো আরে ফোনে বলা যাবে না।এটা একটা এক্সাইটিং ব্যাপার।তোর সাথে দেখা করেই বলতে চাই।যেহেতু দেখা করতে চায় তাই বদরুলকে বললাম এক কাজ কর আমার বাসায় চলে আয়।বাসায় আসতে বললাম এ জন্য যে আগেরবারের মত রাস্তায় দাড়িয়ে সিঙ্গাড়া সমুচা যেন খেতে না হয়।

বদরুল কিছুক্ষণ ভাবলো।তার পর বললো নারে দোস্ত বাসায় আসা যাবে না।তারচেয়ে বরং তুই ধানমন্ডি লেকে চলে আয় আমরা ওখানে হাটতে হাটতে কথা বলি।আমি সুযোগ বুঝে খোচা মেরে বললাম তোর মত কোটিপতি ধানমন্ডি লেকের রাস্তায় হাটবে দেখতে কেমন লাগবে না? সে হো হো করে হেসে উঠে বললো ইয়ার্কি করিস না।ওকে বললাম ঠিক আছে আসতেছি।তারপর যথারীতি গিয়ে হাজির হলাম।হাটতে হাটতে ওর সাথে নানা বিষয়ে কথা বললাম কিন্তু ও আসল কথা বলেই না।আমি বললাম দোস্ত এবারতো আসল কাহিনী বল।যে কারণে তুই আমাকে ডেকেছিস।সে বললো দোস্ত ভালো খবর বলার আগে আয় তোরে কিছু খাওয়াই।ও যখন বললো আয় তোরে কিছু খাওয়াই তখনই সব গুবলেট হয়ে গেলো।এখানেতো খাওয়ার তেমন কিছু নেই।

একটু দূরেই একটা ছেলে সিঙ্গাড়া সমুচা বিক্রি করছে তাকে ডাকলো!আমি বললাম শালা তুইতো মহা ধান্দাবাজ।এখানেও ব্যবসা করতেছিস?বন্ধুকে খাওয়াবি সেখানেও ব্যবসা। এই সিঙ্গাড়া সমুচাও নিশ্চই তোর কোম্পানী ডেলিভারি দিছে?সে মুচকি হেসে বললো কী জানি।ছেলেটা কাছে আসতেই ও সিঙ্গাড়া সমুচা দিতে বললো।আমি জানতে চাইলাম এই সিঙ্গাড়া সমুচা কি তুমি বাসায় বানিয়েছ না কিনেছ? ছেলেটা এক গাল হেসে দিয়ে বললো সার কি যে কন। বানামু ক্যান। এইডা অইলো গিয়া টিসির বিখ্যাত সিঙ্গাড়া সমুচা। নামতো সুনাই হোগা?

ছেলেটার বাংলা হিন্দি মিলিয়ে কথা বলা বেশ মজাই লাগলো।টিএসসি বলতে না পেরে সে টিসি বলেছে।হাসি পাচ্ছিল খুব।আমি সিঙ্গাড়া খেতে খেতে বদরুলকে বললাম তোর ব্যবসাতো ভালো চলছে।তাহলে তুই অন্য কিছু না খাইয়ে এটাই কেন খাওয়াচ্ছিস?সে বললো আরে দোস্ত যারা আমার জন্য লাভের বন্দোবস্ত করেছে তাদেরকে হেল্প করা আমার দায়িত্ব। নিজের পণ্য যদি নিজেই না কিনি তবে কে কিনবে?আর কথা বাড়ালাম না। বললাম এবার আসল কথা বল যেটা বলার জন্য ডেকেছিস। বদরুল একটু থামলো তার পর বললো দোস্ত বই লিখেছি! এবারের বই মেলায় বই বের হচ্ছে।

বদরুলের বই বের হচ্ছে শুনে আমি আরো অবাক হলাম।সে কবে বই লিখতে শুরু করলো বুঝলাম না।বললাম কি বই?সিঙ্গাড়া বিক্রি করে কোটিপতি কিভাবে হলাম টাইপের বই না অন্য কিছু?বদরুল বললো শোন টিটকারী মারিস না।আইবিএতে পড়িনি বলে কি আমরা বই লিখতে পারি না?আমি রাগ দেখিয়ে বললাম বদরুল ভালো হবেনা বললাম।বার বার আইবিএ আইবিএ করে খোটা দিবি না। আইবিএতে পড়লে মানুষ মহাজ্ঞানী হয়ে যায় না।কি বই লিখেছিস সেটা বল।তাছাড়া হঠাৎ বই লিখতে গেলি কেন?বদরুল বললো এটা এমন একটা বই যাকে তুই কোন বিশেষণে বিশেষিত করতে পারবি না।মানুষ কবিতা লেখে বই হয় কবিতার,গল্প লেখে বই হয় গল্পের,উপন্যাস লেখে বই হয় উপন্যাসের,ভ্রমনকাহিনী লেখে বই হয় ভ্রমনকাহিনীর,উপদেশমূলক বই লেখে বই হয় উপদেশবাণী কিন্তু আমার এই বইয়েতো এসবের সবই আছে এবং আরো নানা বিষয় আছে।তাই বিশেষণে বিশেষায়িত করার উপায় নেই।এই দায়িত্ব বাংলা ভাষার পন্ডিতদের কিংবা তোদের মত আইবিএর ছাত্র ছাত্রীদের।

আমি বললাম বদরুল তোর যে মারাত্মক একটা রোগ হয়েছে তুই জানিস?বদরুল রেগে গিয়ে বললো কি বলিস এসব? আমার রোগ হলে আমি জানবো না?মারাত্মক রোগ মানে তো এইডস।আমিতো এমন কিছু করিনি যার জন্য এটা হবে!আমি বললাম গাধা সে বললো হতেও পারে!আমি বললাম তুই খাজ কাটার গল্পটা জানিস? বদরুল কিছুটা ভাবলো তার পর বললো হ্যা ওই যে এক ছাত্রকে যে রচনাই লিখতে দিক না কেন সে সেটাতে কুমির টেনে আনতো এবং কুমিরের লেজে খাজ কাটা খাজকাটা এটা লিখে পৃষ্ঠা ভরাতো।তার পর তাকে পলাশীর যুদ্ধের রচনা লিখতে বলা হলো সে সেখানেও কুমির নিয়ে আসলো আর খাজকাটা খাজকাটা ব্যবহার করলো।আমি বললাম হ্যা ঠিক এরকমই হয়েছে তোর দশা।তুইও কথায় কথায় আইবিএ আইবিএ টেনে আনছিস।বদরুল আমার কথায় মর্মাহত হলো বলে মনে হলো।বললো দোস্ত স্যরি।তোদের মত আইবিএতে পড়িনি বলে কোন কিছুই মনে থাকে না।আমি বললাম এই যে আবার তুই আইবিএ নিয়ে টানাটানি করতেছিস।

যাই হোক বদরুলের সাথে কথা হলো ওর বই নিয়ে।বইয়ের কন্টেন্ট নিয়ে।আমি বললাম বদরুলরে তোর ভবিষ্যত উজ্জল।তোকে মানুষ চিনবে।যদিও অলরেডি তোর কোটিপতি হওয়ার গল্প সবাই জানে এবং তোকে চেনে কিন্তু এবার তোকে আরো চিনবে।আমি বললাম বলতো বাংলাদেশের বড় কিছু সেলিব্রেটির নাম। ও বললো সাকিব আল হাসান,আনিসুল হক,মাশরাফী, শাকিব খান।আমি মাথা নেড়ে বললাম আরে ওনারাও সেলিব্রেটি তবে তুই ওনাদের চেয়েও বড় সেলিব্রেটি হবি যাদের কথা মানুষ রোজ বলবে আলোচনা হবে।ও আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলো এমন দু চারজন সেলিব্রেটির নাম বল শুনি যাদের নিয়ে রোজ আলোচনা হয়। আমি বললাম এই ধর গিয়া সেফু দা,হিরো আলম,এটিএন বাংলার মাহফুজুর রহমান কিংবা প্রখ্যাত ভার্স্কযশিল্পী মৃনাল হক।তুই হবি এই তালিকার নতুন সদস্য।

আমার কথা শুনে বদরুল ভীষণ রেগে গেলো।বললো তোদের মত আইবিএতে পড়িনি বলে এভাবে আমাকে ছোট করবি? আমি বললাম শোন তোকে ছোট করিনি।যাদের কথা বললাম তারা প্রত্যেকেই নিজেদের গুনে বিখ্যাত।আরেকটা কথা তালিকায় একটা নাম বলতে ভুলে গেছি তিনি কেকা ফেরদৌস।আচ্ছা শোন তোর ওই সিঙ্গাড়া সমুচায় কিন্তু কেকা ফেরদৌসীর ভার্সন আনতে পারিস। মানে নুডুলসের পুর ভরে দিতে পারিস।সেটাও চমৎকার হবে।আর যদি তুই কখনো কোন রেস্টুরেন্ট টাইপের কিছু দিস তবে সেটাতে মিউজিক সিস্টেম রাখবি। আগত ভোজনরসিকেরা নুডুলসের পুর ভর্তি সিঙ্গাড়া সমুচা খেতে খেতে মাহফুজুর রহমানের গান শুনবে।আর হ্যা রেস্টুরেন্টের ডিজাইনের ক্ষেত্রে তুই যাকেই পছন্দ করিস না কেন গেটের বাইরে অবশ্যই তোর একটা ভাস্কর্য স্থাপন করবি।দায়িত্ব কাকে দিতে হবে আশা করি তোকে বলে দিতে হবে না।

আমার কথা শুনে বদরুল যেন থ হয়ে গেলো এবং কিছুসময় কথা বলতেই ভুলে গেলো।ভুলে গেলো বলেই ওর কাছ থেকে বার কয়েক একটি কথা শোনা হলো না।আবার যখন কথা শুরু করবে সেই কথাটা নিশ্চই বলবে।বুঝতে পারছেন কোন কথা?বদরুলকে বললাম দোস্ত আরেকটা কথা।তোর এই সব সাফল্যে সাংবাদিকেরা তোকে প্রশ্ন করবে কেন এটা করছেন তখন তুই অবশ্যই বলবি এই মনে করেন খুশিতে ভাল্লাগে ঠেলায় ঘোরতে!আর কেউ কেউতো তোকে দেখে হিংসে করবে তখন তুই ফেসবুক লাইভে এসে বলবি কি আমার মত হতে চাও? তবে সিঙ্গাড়া সমুচা বিক্রি করো,কি হিংসে হয়? এবার বদরুল আমাকে থামিয়ে দিলো।বললো দোস্ত তুই তখন থেকে যা খুশি বলে যাচ্ছিস আর নয়।আমি আইবিএতে পড়িনি বলে এমন করে খোচা দিবি না।ওর কথা শুনে আমিও একবার স্যরি বললাম।আমি জানি বদরুলের এই অভ্যাস যাবে না।ও বললো দোস্ত কাজের কথায় আসি বইতো প্রকাশ পাচ্ছে এখন বিক্রি বাড়াবো কি করে বুদ্ধি দে!আমি বললাম বদরুল তুই এটা কি বলিস?তুই নিজের বুদ্ধিতেই আজ এতো বড় হয়েছিস,মার্কেটিং বিষয়ে আমার চেয়ে অবশ্যই তোর জ্ঞান অনেক বেশি এটা তুই মানিস বা না মানিস।

সেদিনের মত আর কোন কথা হলো না।বদরুলের সাথে পরে কথাও হলো কয়েকদিন। কি চিন্তা করেছে জানতে চাইলে সে বললো না। শুধু বললো নিজের টাকা খরচ করে বই বের করেছি ১০ হাজার কপি।আমার চিন্তা হলো একদিনেই বিক্রি করে ফেলবো।তুই শুধু ২১ ফেব্রুয়ারিতে মেলায় আসিস দেখবি।আমি বললাম একুশে ফেব্রুয়ারিতেই কেন? ও বললো সেদিনই সব থেকে বেশি ভীড় থাকবে।বই বিক্রিও বাড়বে।আমি অপেক্ষায় থাকলাম বদরুলের টেকনিক কি হবে জানার জন্য। অবশেষে আসলো সেই একুশে ফেব্রুয়ারি।

কোথাও বদরুলের টিকিটির দেখা নেই।স্টলে গিয়ে ওর লেখা বইটি দেখেছি তেমন কেউ আগ্রহ দেখাচ্ছে না।প্রকাশকও বেশ বিরক্ত।এমন সময় মাইকে একটি কন্ঠস্বর ভেসে আসলো।কন্ঠ শুনেই চিনলাম এটা বদরুল।ও বলছে আমি বদরুল বলছি।কোটিপতি বদরুল।নামতো সুনাই হোগা।সারা ঢাকা শহরের অলিতে গলিতে আপনারা যে সিঙ্গাড়া সমুচা খাচ্ছেন সব আমার কোম্পানীর। এবার মেলার প্যাভিলিয়ন ২৭ এ আমার লেখা বই “আমি কিছু লিখিনি” পাওয়া যাচ্ছে।আধাঘন্টার মধ্যে আপনারা যদি আমার বই না কেনেন তবে বাংলা একাডেমীর ছাদ থেকে লাফিয়ে আমি আত্মহত্যা করবো।

বদরুলের এই ঘোষণা শুনে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম।কী টেকনিকরে বাবা। কিন্তু কতটা কাজ করবে তাতো জানি না।দেখলাম সমবেদনা জানিয়ে হোক আর অন্য যে কোন কারণে হোক প্যাভিলিয়ন ২৭ এ ভীড় বাড়তে লাগলো এবং বিক্রি হতে শুরু করলো।যে বইটা কেউ ছুয়ে দেখছিলো না সেই “আমি কিছু লিখিনি” দেদারছে বিক্রি হতে লাগলো।ওদিকে পুলিশ আইনশৃঙ্খলাবাহিনীও বসে নেই।ফায়ারসার্ভিসের তিনটা ইউনিট চলে এসেছে।টিভি চ্যানেলের লোকেরা লাইভ দেখাতে শুরু করেছে কিন্তু বদরুলকে ফুটেজে আনা যাচ্ছে না।বাংলা একাডেমী ভবনের ছাদের দরজা বন্ধ।বদরুল নিশ্চই ভিতর থেকে বন্ধ করে দিয়েছে।ফায়ার সার্ভিসের লোকেরা বিল্ডিং এর চারদিকে জাল পেতে দিয়েছে যেন লাফ দিয়ে নিচে পড়লেও বদরুল বেঁচে যায়।এবার দরজা ভেঙ্গে ছাদে গিয়ে দেখা গেলো সেখানে বদরুলতো দূরের কথা কোন মানুষই নেই।একটা টেপ রেকর্ডার বাজছে যার সাথে একটি শক্তিশালী মাইকের কানেকশান লাগানো।

সবাই হতাশ হয়ে নিচে নেমে আসলো এবং বদরুলকে গালি দিতে লাগলো।আমি ভাবলাম বন্ধুর লেখা বই এক কপি না কিনলে কেমন দেখায়।প্যাভিলিয়ন ২৭ এ গিয়ে হাজির হলাম। তখনো অনেক ভীড়।ভীড় ঠেলে সামনে গিয়ে সেলস ম্যানকে বললাম ভাই “আমি কিছু লিখিনি” বইটির একটি কপি দিন। তিনি জানালেন বইটা আগেই শেষ হয়ে গেছে। আমরা মাত্র ১০ হাজার কপি প্রিন্ট করেছিলাম সব শেষ।কাল আসেন পাবেন।

বদরুলের নামে ওয়ারেন্ট জারি হলো কেননা একুশে বইমেলার মত যায়গায় সে এমন একটা বাজে নাটক করেছে সবাইকে ভয় পাইয়ে দিয়েছে,শান্তি বিনষ্ঠ করেছে।কিন্তু বদরুলের কিছুই হলো না।আদালতে প্রমান হলো বদরুল সেদিন বাংলাদেশেই ছিলো না।সে একটি বিজনেস সামিটে যোগ দিতে কুয়ালালামপুরে ছিলো।বদরুলের সাথে দেখা হলে জানা যাবে কিভাবে কি ঘটেছিল।

গল্পঃ কোটিপতির লেখা বই “আমি কিছু লিখিনি”
লেখাঃ জাজাফী
৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

Tags: