জাজাফী রিভিউ আপনি কোন ধরনের পাঠক?

আপনি কোন ধরনের পাঠক?

আপনি কোন ধরনের পাঠক আমি তা জানি না, তবে আমি নিজে মধ্য মানের পাঠক। আমি বই কিনলে বেছে বেছে কিনি তারও আগে দাড়িয়ে দাড়িয়ে ফ্ল্যাপের লেখাটা মন দিয়ে পড়ি,বইটা উল্টোপাল্টে দেখি এবং পারলে দু এক পৃষ্ঠা পড়ে বুঝতে চেষ্টা করি। এর পর যদি মনে হয় বইটা পড়া উচিত তখন সেটা কিনি। বইটা উপন্যাস বা গল্পই হবে তা কিন্তু নয়। ইতিহাসও হতে পারে বিজ্ঞানও হতে পারে।

দিব্য প্রকাশের স্টলে গিয়ে দেখুন “তাজমহলের গল্প” শিরোনামে “মো: আদনান আরিফ সালিম ( Salim Aurnab ) এর লেখা একটি বই পাবেন দাম ৬০০ টাকা মত। কমিশনে কিছু কমে কিনতে পারবেন। এই বইটি আপনাকে এই বইমেলার অনেক উপন্যাস,কবিতা,গল্পের বই থেকেও বেশি আনন্দ দেবে বলে আমি মনে করি।

একটু আগেই আমি বলেছি দ্বিতীয় সৈয়দ হকের (Ditio Syed-Haq) লেখা বই : মেঘ ও বাবার কিছু কথা” শিরোনামের বইটি অসাধারণ। সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে ঢুকতেই কথা প্রকাশের স্টল। আপনাকে কিছু করতে হবেনা শুধু গিয়ে কিছুক্ষন দাড়িয়ে দেখবেন পাঠক এসে আপনাআপনি বলছে দ্বিতীয় সৈয়দ হকের বইটা দিনতো। আপনি ঘুরে দেখতে পারেন তার ফেসবুক ওয়াল।তিনি বলা চলে কোথাও এই বইয়ের প্রচার প্রচারণা করেন নি। তার পরও বইটা বিক্রি হচ্ছে দেদারছে। সিয়ামের সাথে গিয়ে আমি গত দিন একবার বইটা কিনেছি কিন্তু সংগ্রহে রাখতে পারিনি হাতছাড়া হয়ে গেছে। আবার কিনেছি সেটাও হাতছাড়া হয়ে গেছে এবং আজ আবার কিনেছি।

দেখুন একটা বই মানুষকে জোর করে পড়ানো যায়না অথচ আরেকটা বই মানুষ আপনাআপনি কিনছে কথা বলছে। কেন কিনছে? খ্যাতিমান সব্যসাচী লেখকের পুত্রের লেখা বলে? নাকি তাকে নিয়ে লিখেছে সে জন্য? এর কোনটাই হয়তো নয় আবার দুটোই হতে পারে। কিন্তু একটা কথা মনে রাখতে হবে আমাদের জনপ্রিয়তম লেখক হুমায়ূন আহমেদকে নিয়েও অনেকেই বই লিখেছেন কিন্তু লেখার মান ভাল নয় বলে সেগুলো হারিয়ে গেছে কিংবা আমরা গ্রহণ করিনি। শুধু গ্রহণ করেছি শাকুর মজিদের (Shakoor Majid ) লেখা দুটি অসাধারণ বই “হুমায়ূন আহমেদ: যে ছিল এক মুগ্ধকর এবং নুহাশপল্লীর এই সব দিনরাত্রি” সেই সাথে সালেহ চৌধুরীর লেখা ” সৌখিনদার এবং আমি এবং হুমায়ুন আহমেদ বইটি। এবার দেখলাম আরো অনেকেই হুমায়ুন আহমেদকে নিয়ে লিখেছেন।

বিখ্যাত মানুষকে নিয়ে লিখলেই পাঠক সেই বই গ্রহণ করবে এটা ভাবার কোন কারণ নেই।এখানে লেখক নিজে যদি মুন্সিয়ানা দেখাতে পারেন তবেই পাঠক সেটা মনে রাখবে এবং লুফে নেবে।আমি যদি স্বয়ং গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ কিংবা ফিদেল ক্যাস্ট্রো কিংবা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখি মানুষ সেটা গ্রহণ করবেনা কারণ আমি লেখক নই। অথচ কোন একজন গুনী লেখক যদি আমাকে নিয়েও বই লেখে সেটাও পাঠক লুফে নেবে। আদনান আরিফ সালিমের লেখা “তাজমহলের গল্প” কিংবা দ্বিতীয় সৈয়দ হকের লেখা “মেঘ ও বাবার কিছু কথা” কিংবা শাকুর মজিদের “লেস ওয়ালেসার দেশে” পাঠক লুফে নেয় এবং মনে রাখে।

আনিসুল হক (Anisul Hoque) অনেক বই লিখেছেন। তার অগণিত পাঠক। তার পাঠকের শ্রেনী বিভাগও আলাদা। পিচ্চিদের জন্য তিনি গুড্ডু বুড়া লিখেছেন সেটা আপনি পড়লে ভাল লাগবেনা এবং ওটা পড়ে আপনি হয়তো আনিসুল হকের সমালোচনা করে ধুয়ে দিবেন অথচ ওটা ছোটদের জন্য চমৎকার একটি বই যা পড়ে ছোটরা খুবই মজা পায়। কিশোরদের জন্য তিনি লিখেছেন “একাত্তুরের একদল দুষ্টু ছেলের দল” সেটা পড়লেও আপনার ভাল নাও লাগতে পারে এটাই স্বাভাবিক।আগে নিজেকে কোন স্তরের পাঠক মনে করেন সেটা নির্ধারণ করে লেখকের লেখা পড়ুন তাহলে সমালোচনা করলেও লেখকের কাছে সেটা ভাল লাগবে এবং লেখক আপনার থেকে কিছু শিখবে এবং পরবর্তীতে আপনার উপযোগি আরো বই লিখতে পারবে। আপনি উচ্চমানের পাঠক হলে এই বই মেলায় আনিসুল হকের যে দুটো নতুন বই এসেছে তা আপনাকে হয়তো মুগ্ধ করবে না।যেমন তরুনদের কাছে “এক লক্ষ লাইক” বইটা ভাল লাগতে পারে কারণ তরুণদের অনেকেই ফেসবুকে মেতে থাকে। আবার কিছুটা রহস্যপ্রিয় যারা তাদের কাছে “প্রিয় এই পৃথিবী ছেড়ে” বইটাও ভাল লাগবে। তবে আমি যেহেতু নিজেকে মধ্যমানের পাঠক বলে মনে করি তাই এ দুটো বই আমাকে খুব বেশি টানবে না। আমি বরং এই নতুন দুটো বই থেকে অনেক বেশি এগিয়ে রাখবো গত মেলায় আসা “জেনারেল ও নারীরা” বইটিকে। আইয়ুব খান,ইয়াহিয়া খানদের কাহিনী আমাকে মুগ্ধ করে রেখেছে এখনো।ঠিক একই বই হয়তো আপনাকে মুগ্ধ নাও করতে পারে।

সে জন্যই আমাদের আগে উচিত নিজেকে পাঠক স্তরে বিন্যস্ত করা তার পর বই পড়া।স্বকৃত নোমানের (Swakrito Noman) একটা বই বের হয়েছে “শেষ জাহাজের আদমেরা” এই লেখকের নাম আপনি নাও শুনে থাকতে পারেন আবার শুনে থাকলেও থাকতে পারেন। অথচ সে অলরেডি বেশ অনেক গুলো নামী দামী সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছে। আপনি যদি ভুল করেও তার লেখা “বাক বদলের কালে” বইটা পড়তে বসেন তাহলে শুরুতেই বলে বসবেন এ আবার কোন লেখক হলো? তার চেয়ে বরং আপনি তার লেখা “কালকেউটের সুখ” উপন্যাসটি আগে হাতে নিন।

আমরা অনেক সময় ভুল সময়ে ভুল বই হাতে নিই এবং সেটাকেই সব মনে করে লেখক কবিদের বিচার করি।একজন আনিসুল হকের “এক লক্ষ লাইক” বইটার সমালোচনা না করে বরং আপনি মধ্য মানের বা উচু মানের পাঠক হলে ওসব লেখা পাশ কাটিয়ে “জেনারেল ও নারীরা” কিংবা “মা” কিংবা আরো কয়েকটি বই আছে সে গুলো পড়েন।

এবার বাংলাএকাডেমী পদক যাদের দেওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে একজন আমার ফ্রেন্ডলিস্টে ছিলেন।তার লেখা আমার মোটেও ভাল লাগতো না।আমি ভাল না লাগলে সেটাতে লাইক দেইনা কমেন্ট করে বলি আমার ভাল লাগেনি।একদিন সমালোচনা সহ্য করতে না পেরে তিনি আমাকে আনফ্রেন্ড করলেন।তাতে আমার কি কোন ক্ষতি হলো? বরং তিনি একজন পাঠক কিংবা ছোটখাট সমালোচক হারালেন।হয়তো বলতে গেলে তারও কোন ক্ষতি হয়নি।তাকে আজই প্রথম কাছ থেকে দেখলাম এবং আমি যেভাবে তাকে কল্পনা করতাম তিনি আসলে তাই।তা বলেতো আমি তাকে অপমান করতে পারিনা।এই দেশের অগণিত পাঠক বা অন্যরা শাহাদুজ্জামানের সমালোচক।আমি সেগুলো পড়ে আনন্দ পাই কিন্তু বিশ্বাস করিনা।কারণ আমি নিজে তার কিছু লেখা পড়েছি মুগ্ধ হয়েছি।

এই দেশে ভ্রমন কাহিনী যারা লেখেন তাদের মধ্যে মঈনুস সুলতান (Mainus Sultan) কিংবা শাকুর মজিদের নাম অনায়াসে বলা যায়।কিন্তু এবার যিনি পুরস্কারে ভূষিত হলেন তার নাকি এটাই প্রথম বই।নানা কথা উঠেছে সেটা নিয়ে।আমি তার সমালোচনা করতে যাচ্ছিনা কারণ তার লেখা আমি পড়িনি।

এই লেখাটা বেশি বড় হয়ে যাচ্ছে।যারা এতোটুকু সহনশীলতা নিয়ে পড়েছেন তাদেরকে ধন্যবাদ। বই মেলা শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই আমরা প্রচার প্রচারণা করি।আমি এটাকে কিছুটা সমর্থনও করি।একজন লেখক বই লিখেন অনেক সাধনা করে।সেটা সবাইকে জানানো কোন অপরাধ নয়।তবে পাঠকদের উচিত ভাল লেখার প্রচার করা।লেখক তার দিক থেকে সব বইয়েরই প্রচার করবেন এটাই স্বাভাবিক কিন্তু পাঠকের উচিত তার পড়া সেরা বইটার কথা অন্যদের জানানো।

প্রীতির এবারও দুটো বই বের হচ্ছে।তার ফেসবুক ফলোয়ার ৪৫ হাজারের বেশি।তার একটা বইয়ের নাম “নারীর নাড়ী” আরেকটি “প্রেমিক”। এর আগেও তার দু একটা বই বের হয়েছে।আপনি যদি তরুন হন এবং নারী ভক্ত হন তাহলে তার লেখা “উনিশ বসন্ত” বইটাকে সেইরকম বই বলে চালিয়ে দিবেন। আর আপনি যদি একটু শক্তপোক্ত পাঠক হন তাহলে বলবেন এটা কোন লেখা হলো? তার প্রচুর প্রচার প্রচারণা আছে। তার বইয়ে ভূমিকা লিখে দেন মুহাম্মদ জাফর ইকবাল। তার বই কত গুলো বিক্রি হয়? আমি জানিনা।আমাকে বিচারের ভার দেওয়া হয়নি যে আমি বিচার করবো। কিন্তু পাঠক হিসেবে আমি বলতে পারি প্রীতির এই জনপ্রিয়তা থাকা সত্তেও এমন অনেক কিশোর কিশোরী লেখক আছে যাদের লেখা আরো বেশি মানসম্মত। আমি দেখলাম একই প্রশ্নের উত্তর স্বকৃত নোমান যেভাবে দিলেন প্রীতি দিলেন উল্টো।

মীম নোশিন নাওয়াল খানের (Meem Noshin Nawal Khan) নাম শুনেছেন কিনা জানিনা।ব্যক্তিগত ভাবে কিভাবে কিভাবে যেন সবার সাথেই আমার ভাল রিলেশান আছে যদিও কারো সাথেই আমার কোন দিন দেখা হয়নি। এই মীমের অনেক প্রতিভা।কেউ কেউ আবার সমালোচনার ঝড়ও বইয়ে দেয় কিন্তু মীম সেগুলো গায়ে মাখে না।বিদ্যা প্রকাশ থেকে এবার ওর “পড়শি” নামে একটা বই বের হয়েছে।গত বছর বের হয়েছিল “দূর্বা” নামে একটা উপন্যাস।এক বছর পর যে বইটি বের হলো স্বাভাবিক ভাবে মনে হওয়া উচিত আগের বইটা থেকে এই বইটা বেশি মানসম্মত হবে কিন্তু আমার মতে এই বইটার চেয়ে আগের বইটা বেশি ভাল ছিল।আপনি চাইলে মিলিয়ে নিতে পারেন।মেয়েটি এবার ভিকারুননিসা নুন স্কুল থেকে এসএসসি দিচ্ছে।সে নিজেকে প্রচার করেনা ঠিকই কিন্তু তার বই অনায়াসে ৫০০ কপি বিক্রি হয়।তার কারণ ছোট মানুষ হিসেবে সে যথেষ্ট ভাল লেখে। কার কার চেয়ে ভাল লেখে সেটা বলতে গেলে আমি যদি বলি প্রখ্যাত লেখক মোশতাক আহমেদের চেয়ে ভাল লেখে তাহলে আমাকে সবাই তুলোধুনো করে ছাড়বে।

১৬০ পৃষ্ঠার একটা বই কমিশনের পর ২২৫ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে দেখে আমারও মনে হয়েছে বইয়ের দাম একটু বেশিই।শাহাদুজ্জামানের “কাগজের নৌকা” বইটা কিনতে গিয়ে দেখি ৪০০ পৃষ্ঠার বইয়ের গায়ের দাম ৮০০ টাকা। কেনা হয়নি।

আজকের রাতের ঘটনা বলে ইতি টানি। হাসান আজিজুল হক স্যারের রিডিং রুমে বসে আছে এইসএসসি পরীক্ষার্থী এক মেয়ে।কেন বসে আছে? কারণ হাসান আজিজুল হক স্যার বসে বসে খুব মন দিয়ে ওই মেয়েটির লেখা গল্প পড়ছেন।তার কারণ গল্পগুলো পড়ে স্যার ওকে একটা ভূমিকা লিখে দেবেন।স্যার ওর অনেক গুলো ভুল ধরিয়ে দিয়েছেন অনেক কিছু দেখিয়ে দিয়েছেন আর ওর লেখা এই প্রথম বইটাতে একটা বিজ্ঞান কল্পকাহিনী আছে সেটা সম্পর্কে বলতে গিয়ে বলেছেন “তুমি এটা জাফর ইকবাল সাহেবকে পাঠাও”!! কেন বলেছেন সেটা আমি অনুভব করেছি।কারণ ওই মেয়েটির লেখা ওই বিজ্ঞান কল্পকাহিনীটা আমিও পড়েছি। সুতরাং লেখা যেটা ভাল সেটার প্রশংসা যদি না করি তাহলে অন্যায় হবে। হাসান আজিজুল হক স্যার যে বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর প্রশংসা করেছেন সেটির লেখক “মোসাররত মেহজাবীন মীম” (Mosarrat Meem) বন্ধুরা যাকে আদর করে ডাকে মীম্মা।স্মৃজনশীল মেধা অন্বেষনে যে দেশ সেরা হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে এক লাখ টাকার চেক গ্রহণ করেছিল এবং ঐতিহ্য প্রথম আলো গোল্লাছুট গল্প লেখা প্রতিযোগিতায় গল্প লিখে বিজয়ী হয়েছিল।

বই মেলাতে গিয়ে হুজুগের বসে একটা দুটো বই কিনে ফিরে আসবেন না।বই দেখুন বুঝুন এবং কিনুন। হ্যারিপটার রাতারাতি বিলিয়ন বিলিয়ন কপি বিক্রি হয়েছে তাই বলে সেটি কিন্তু লিও টলস্টয়ের বইয়ের চেয়ে সেরা নয়।তাই ভাল বই পড়ুন এবং যে বই পড়ে আপনার ভাল লেগেছে তা অন্যকে জানান।

যে ফুল সুগন্ধ ছড়ায় তা ঝোপের আড়ালে ফুটলেও মানুষ তাকে খুজেঁ নেয়।ভাল বইয়ের ক্ষেত্রেও তাই হয়। বই হোক আমাদের পরম বন্ধু।

—জাজাফী
৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭
বাংলা একাডেমী

Zazafee