সমান অধিকার নয় আগে চাই প্রাপ্য সম্মান

অধিকার কথাটির মধ্যে এক রকম জোর খাটানোর বিষয় থাকে।অধিকার আদায় করে নিতে হয় কিন্তু কিছু অধিকার আছে যা অধিকার শব্দকে ছাপিয়ে যায় এবং সেগুলো আদায় করে নেওয়ার কিছু নয় বরং স্বেচ্ছায় দিয়ে দিতে হয়।সেটাকে আমরা বলতে পারি যথাযথ প্রাপ্য সম্মান।ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা আমাদের থেকে কেড়ে নেওয়া ন্যায্য অধিকার আদায় করে নিয়েছিলাম।

মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা আমাদের জাতিগত স্বাধীন ভুখন্ড আদায় করে নিয়েছিলাম। কিন্তু এমন কিছু অধিকার আছে যা এভাবে আদায় করে নেওয়া যায় না বরং অন্য সবার দায়িত্ব থাকে নিজ উদ্যোগে সেই অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। যেমন নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন। এটি কোন অধিকার নয় বরং আমাদের দায়িত্ব। অনেক নারী দীর্ঘদিন থেকে সংগ্রাম করে যাচ্ছে সমান অধিকারের দাবীতে।এই সমান অধিকার কথাটি নিয়ে অনেক মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।

আমাদের অভ্যাস হয়ে গেছে সবকিছুতেই খুৎ ধরা,সবকিছুতেই কথার পিঠে কথা জুড়ে দেওয়া।এমন কিছু অহেতুক বিষয় আমরা টেনে আনি যা দিয়ে খোঁচা দিতে পিছপা হইনা।আমরা বলি সমান অধিকারের কথা যখন উঠছে তবে আসুন এখানে ছেলেরা যেমন রোল প্লে করে নারীরাও তেমন করুক!

এখন পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে নারীরা আর সমান অধিকার নিয়ে মাথা ঘামায় না বরং তারা চায় তাদের প্রাপ্য সম্মানটুকু যেন তাদের দেওয়া হয়।আর নিশ্চই সবাই জানে প্রাপ্য সম্মান বাজার থেকে কিনে নেওয়ার মত কোন দ্রব্য নয় যে কিনে নিবে এটা বরং নিজ উদ্যোগে দিয়ে দিতে হয়।

নারীর প্রতি সহিংসতা ক্রমাগত ভাবে বেড়েই চলেছে।অধিকারতো পরের কথা তারা পদেপদে হয়রানির শিকার হচ্ছে।আমরা কখনো দেখিনি বাসে,ট্রেনে,রাস্তায়,শপিংমলে,ওভারব্রীজে বা অফিসে কোন নারী ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় কোন পুরুষের গা ঘেষে দাড়িয়েছে বা স্পর্শ করেছে বা কোন পুরুষকে হয়রানি করেছে।কিন্তু পুরুষের বেলায় সেই চিত্রটা সম্পুর্ন উল্টো।

আমাদের সমাজে এমন কোন নারী নেই যে একাধিক বার কোন না কোন স্থানে কোন না কোন পুরুষ দ্বারা নিগ্রহের শিকার হয়নি।অসংখ্য পুরুষ আছে যারা বাসে,ট্রেনে,অফিসে,শপিংমলে,ওভারব্রীজে,মেলায়, যেখানে যে অবস্থায় পারছে নারীকে নানা ভাবে অপদস্থ করছে।

ইচ্ছে করে নারীর শরীরের সাথে গা ঘেষে দাড়াচ্ছে,স্পর্শ করছে এবং নারী কথাটি বলতে গেলে মেয়ে শিশুদের কথাও বলতে হচ্ছে।এসব ঘৃণ্য কাজ থেকে রেহাই পাচ্ছেনা আমাদের মেয়ে শিশুরাও।সুতরাং এই সব নারীদের সমান অধিকার চাওয়ার কোন ইচ্ছেই নেই বরং তারা এখন চায় প্রাপ্য সম্মানটুকু,নিরাপদ একটি পরিবেশ।

অফিসে,বাসে,ট্রেনে,শপিংমলে,মেলায়,ক্লাসে কোথাও যেন তাকে নিগৃহীত হতে না হয় নারীরা এখন সেটাই চায়।সমান অধিকার এমনিতেই প্রতিষ্ঠিত হবে যদি নারীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়।যখন একজন নারী নির্বিঘ্নে নিরাপদে কাজ করার সুযোগ পাবে তখন সে তার স্বীয় কাজে আরো মনোযোগী হতে পারবে যা তার কাজকে আরও সুন্দর ও পরিপাটি করবে।

প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী নারী দিবস পালিত হয়।প্রতি বছর এই দিবসে র‌্যালী হয়,সভা-সমাবেশ হয়,সিম্পোজিয়াম হয়,ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হয় এবং আমরা অনেক বড় বড় কথা বলি,আশার বাণী শোনাই।তার পর একদিন পেরোতে না পেরোতেই সব বেমালুম ভুলে যাই।এমনকি খোঁজ নিলে দেখা যাবে খোদ নারী দিবসেই অসংখ্য নারী নিগৃহীত হচ্ছে। আমরা অনেকেই বলে থাকি নিজের ঘরে কি মা বোন মেয়ে নেই? তাদের কথা ভেবে অন্য নারীকে সম্মান দিন।এই কথাটির কোন মানে হয় না।

নিজের ঘরে মা বোন মেয়ে থাকলে নারীকে সম্মান দিতে হবে আর না থাকলে কি দিতে হবে না? নারীকে সম্মান দিতে হবে তার নিজের জন্য।কারো কথা মনে করে তাকে সম্মান করতে হবে কেন? এখনকার দিনে নারীর সমান অধিকারের চেয়েও জরুরী নারীর যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা।প্রতিটি নারীকে তার প্রাপ্য সম্মানটুকু দিন।

আমাদের এই বিশ্বে নারীর প্রতি দোষারোপের হার দিন দিন বেড়েই চলেছে।কোথাও কোন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলে বা ভিডিও কিংবা ছবি প্রকাশ হলে নারীকেই হেনস্তার শিকার হতে হয়,পুরুষ দিব্যি ঘুরে বেড়ায়।নির্যাতকের শিকার নারীকে যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হয় তা নির্যাতনের শিকার হওয়ার চেয়ে কম কষ্টদায়ক নয়।অথচ যারা নির্যাতন করছে তারা সমাজের বুকে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আইনকে আরও কঠোর করা উচিত যেন কঠোর শাস্তির ভয়ে মানুষ শুধরে যায়।

নারীর সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার আগে নারীকে তার প্রাপ্য সম্মানটুকু দিন,তাকে নির্বিঘ্নে চলতে দিন,কাজ করতে দিন এবং আপনাদের চোখ,মুখ,হাত এবং অন্যান্য অংশ থেকে নারীকে নিরাপদ করুন। পোষাক এবং চলাফেরার দোহাই দিয়ে নারীর প্রতি অপবাদ দেওয়া বন্ধ করতে হবে।আমরা পরিসংখ্যন থেকে দেখতে পাই যে সব নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে তাদের কেউ বোরখা পরা,কেউ দুই বছরের শিশু,কেউ জিন্স পরা,কেউ হিজাব পরা। পোষাকের দোষে কেউ নির্যাতনের শিকার হয় না বরং নির্যাতনকারী পুরুষের স্বভাব বদলাতে হবে।

নিকৃষ্ট কিছু বিকৃতমনা পুরুষ নারী ও শিশু নির্যাতনের মধ্যে বিকৃত আনন্দ খুঁজে পায়।আমরা মনে করি নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধ করতে হলে পুরুষকেই এগিয়ে আসতে হবে। আরও একটি নারী দিবস চলে যাবে কিন্তু আমরা জানি না আমাদের সামাজে নারীদের প্রতি নিগ্রহের হার কমবে কি না।আমাদের এখন একটাই দাবী সমান অধিকার নয় সবার আগে নারীকে তার প্রাপ্য সম্মানটুকু দিন,নিরাপদ একটি পরিবেশ দিন যেখানে সে নিবিঘ্নে নিজের সম্মান নিয়ে বাঁচতে পারবে।

  • লেখকঃ জাজাফী

নিবন্ধকার,সমাজকর্মী
ওয়েবসাইটঃ www.zazafee.com

02-03-2020