১.
ভোরে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস নেই রাফিনের। একদমই নেই বলা যায়। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ যেখানে সূর্যের আলোয় দিন শুরু করে, রাফিনের দিন শুরু হয় সূর্য ওঠার অনেক পর। ছাত্রজীবন থেকেই তার এই রাতজাগা স্বভাব। পরীক্ষার সময় জেগে পড়া, বন্ধুরা চলে যাওয়ার পর একা বসে গান শোনা, মুভি দেখা কিংবা নিরব রাতের জানালার পাশে বসে ভাবনায় হারিয়ে যাওয়া—সব মিলেই তার রাতগুলো ধীরে ধীরে দীর্ঘ হতে হতে একসময় অভ্যেসে পরিণত হয়েছে। সেই অভ্যেসটিই এখন তার দেহঘড়ির অংশ হয়ে গেছে।
পরিচিতজনরা প্রায়ই মজা করে বলত,
— “এখন তো চাকরি করো না, তাই রাত জেগে নিজের রাজত্ব চালাও। কিন্তু একবার কর্মজীবনে ঢুকলে বুঝবা, ঘুম নামের জিনিসটার দাম কী!”
শুনে রাফিন শুধু হেসে দিত। তার মনে হতো, জীবনযাপন বদলালেই অভ্যেস বদলায় না। রাত তাকে এতটাই টানে যে মনে হয় অন্ধকার নামলেই তার মস্তিষ্ক জেগে ওঠে, চিন্তা করতে শুরু করে, নতুন কিছু ভাবতে চায়।
চাকরি পাওয়ার পর অনেকেই ভাবে, মানুষ বদলে যায়। কিন্তু রাফিনের ক্ষেত্রে তা হয়নি। একটু পরিবর্তন এসেছে, একেবারে উল্টে যাওয়া নয়। আগের মতো সারা রাত জেগে সিনেমা দেখা বা হুট করে সকালে ঘুমিয়ে থাকা আর সম্ভব নয়—অফিস আছে, দায়িত্ব আছে। তবু সে রাত বারোটা পেরিয়ে যায়েই জেগে থাকে। কোনো কাজ থাকুক বা না থাকুক, তার ঘুম আসে না। রাত দুইটা, কখনও আড়াইটা—তবু ঘুম তার চোখে ধরা দেয় না। যেন মস্তিষ্কের ভেতরে কেউ এক অদৃশ্য সুইচ টিপে দিয়েছে, যা কেবল গভীর রাতেই চালু হয়।
রাফিন কখনও কখনও ভাবে, হয়তো এই রাতজাগা তার নিজের ইচ্ছায় নয়, শরীরের ভেতরের কোনো প্রাকৃতিক যন্ত্রের কারণে। সার্কাডিয়ান রিদম বলে একটা বিষয় আছে—মানব শরীরের নিজস্ব দেহঘড়ি, যা নির্দিষ্ট এক ছন্দে ঘুম ও জাগরণ নিয়ন্ত্রণ করে। একবার যদি সেই ছন্দ পাল্টে যায়, তখন সেটাকে ফেরানো মানে পাহাড় সরানোর মতো কঠিন কাজ। তার দেহও যেন সেই রিদমে আটকে গেছে। রাতের অন্ধকার তার কাছে শান্তির, সৃষ্টির আর ভাবনার সময়। আর ভোর—ভোর যেন কেবল অন্যদের জন্য।
প্রতিদিন ঘুমানোর আগে রাফিন চেষ্টা করে সময়মতো বিছানায় যেতে। চোখ বন্ধ করে অন্ধকারে শুয়ে থাকে, কিন্তু মাথার ভেতর চিন্তার স্রোত থামে না। অফিসের কাজ, অসমাপ্ত লেখা, পুরনো স্মৃতি—সব একসঙ্গে ঘুরে ফিরে আসে। ঘুম আসে না, বরং সময় গড়িয়ে যায় আরও গভীর রাতে। সে জানে, এই অভ্যাস ভালো নয়। কিন্তু শরীরের এই দেহঘড়ি সে একা পাল্টাতে পারে না। মানুষ যতটা নিজেকে বোঝে, তার ভেতরের ছন্দকে ততটা বোঝে না।
রাফিনের জীবনটা এখন যেন সার্কাডিয়ান রিদমের হাতেই বন্দী। তার দিন-রাতের হিসাব অন্য সবার চেয়ে আলাদা—একটা উল্টো ঘড়ি। রোজ রাত দুইটার পর ঘুমাতে যায়, আর সকালে নয়টার আগে চোখ খোলে না কখনো। অফিসের সময় মতো জেগে ওঠা তার কাছে কোনো চ্যালেঞ্জ নয়, বরং একটা যান্ত্রিক অভ্যাস মাত্র।
রাতের খাবার শেষ করে কখনো বই খুলে বসে। পড়তে পড়তে সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলে। গল্পের ভেতর ডুবে যেতে যেতে হঠাৎ মনে হয়, বাইরে রাত আরও গভীর হয়েছে। কখনো আবার টেবিল ল্যাম্প নিভিয়ে দেয়, ল্যাপটপ অন করে প্রিয় কোনো সিনেমা চালিয়ে বসে থাকে। তার কাছে রাত মানে একা সময়—যেখানে কেউ বাধা দেয় না, কেউ ডাকে না, কেবল সে আর তার ভাবনা। এই ভাবনাগুলিই যেন তার ঘুম চুরি করে নেয়, তবুও সে এগুলিকে হারাতে চায় না।
বছরের পর বছর এভাবেই চলছে তার জীবন। সকাল নামের জগৎ থেকে ধীরে ধীরে সে দূরে সরে গেছে। সূর্য ওঠা সে কবে দেখেছে তা তার নিজেরও মনে পড়ে না। খুব ছোটবেলায়, বাবার সঙ্গে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে গিয়েছিল একবার—ভোরের আলোয় সমুদ্রের বুক ফুঁড়ে সূর্যের ওঠা দেখেছিল সেদিন। রাফিনের মনে হয়, সেটাই ছিল তার জীবনের শেষ সূর্যদয় দেখা। তারপর থেকে তার জীবনের সকাল শুরু হয় যখন সূর্য আকাশে অনেকটা উঁচুতে উঠে গেছে।
রোজ সকাল নয়টায় ঘুম থেকে ওঠে রাফিন। চোখ খোলার পর কিছুক্ষণ বিছানায় বসে থাকে, শরীরটাকে সময় দেয় জেগে উঠতে। মাথার মধ্যে একটা ভারী ঝিমঝিম ভাব থাকে, যা সে এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছে সহ্য করতে। তারপর ধীরে ধীরে আড়মোড়া ভেঙে, পাশে রাখা ব্রাশ তুলে নেয়, টুথপেস্ট লাগিয়ে বাথরুমের দিকে হাঁটে।
তবে প্রতিদিনই সব একই ছকে চলে না। মাঝে মাঝে দেখা যায় বাথরুমটা ব্যস্ত—ভেতরে কেউ আছে। রাফিনের ভেতর তখন এক ধরনের ছোট্ট বিরক্তি কাজ করে, কিন্তু মুখে কিছু বলে না। দুই রুমের ছোট্ট ফ্ল্যাটে তিনজন মানুষ, তিনজনের একই সময়ে অফিস। একটা মাত্র বাথরুম—তাই এ অপেক্ষা তার জীবনের অঙ্গ হয়ে গেছে। ভাগ্য ভালো থাকলে ওয়াশরুম ফাঁকা পায়, না হলে দশ-পনের মিনিট চুপচাপ বসে অপেক্ষা করে। অপেক্ষার সময়টা সে সাধারণত ফোনে খবর দেখে বা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে—রাস্তায় ছুটে যাওয়া মানুষের ভিড় দেখে ভাবে, তার জীবনও যেন এমনই এক অদৃশ্য গতিতে ঘুরে চলেছে।
গোসল শেষ করে দ্রুত কাপড় পরে রেডি হয়ে নেয়। অফিসে দেরি হওয়ার ভয় নেই, কারণ অফিসটা একদম কাছেই—দু’টো বিল্ডিং পেরোলেই অফিসের গেট। এখন রাফিন বুঝতে পারে, অফিসের এত কাছে থাকা মানে এক ধরনের মুক্তি। যানজটের চিন্তা নেই, রাস্তায় ভিড় নেই, সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয় না। তবু, এই সুবিধার মাঝেও সে মাঝে মাঝে ভাবে—জীবনের কতটুকু যেন হারিয়ে ফেলেছে এই নিয়মিত ছকে বন্দী থেকে।
অফিসে পৌঁছাতে রাফিনের সময় লাগে পাঁচ মিনিটও না। হালকা ব্যাকপ্যাকটা এক কাঁধে ঝুলিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটে। পথে দু’টো বিল্ডিং পেরোলেই অফিস। হাঁটার সময় চারপাশের রোদ তার চোখে লাগে, কিন্তু সে চশমা পরে না—বরং একটু চোখ কুঁচকে হাঁটে। রাস্তায় তখন মানুষজন ব্যস্ত, সবাই যেন কোথাও ছুটছে। রাফিনের গতি ধীর, কিন্তু নিয়মিত। এই ছোট্ট হাঁটাটুকু তার কাছে যেন দিনের একমাত্র শান্ত মুহূর্ত।
অফিসে ঢুকেই পরিচিত হাসি, শুভ সকাল—সবই নিয়মের অংশ। ডেস্কে গিয়ে বসে, কম্পিউটার অন করে। কফির কাপে ধোঁয়া উঠতে থাকে। আশেপাশে সহকর্মীদের কথাবার্তা, ফোনের রিংটোন, কিবোর্ডের ক্লিক—সব মিলিয়ে একটা চেনা শব্দের ভেতর ডুবে যায় অফিস। রাফিনও সেই ভেতরে হারিয়ে যায়, নিজের মতো কাজ করে যায় নিঃশব্দে।
তার সহকর্মী রিয়াদ, হাসিখুশি মানুষ। অফিসে ঢুকেই সবার সঙ্গে মজা করে, মাঝেমধ্যে রাফিনকেও জড়িয়ে নেয় আলাপে।
— “কালও নাকি রাত দুইটা পর্যন্ত জেগেছ?”
— “হুম,” রাফিন হেসে বলে, “রিদমটা এমন হয়ে গেছে। ঘুম আসে না।”
রিয়াদ মাথা নাড়ে, “এই রিদমটা একদিন ঘুম খেয়ে দেবে।”
তারা দুজনেই হেসে নেয়, কিন্তু হাসির ভেতরে লুকানো থাকে একটা নিঃশব্দ ক্লান্তি।
রাফিনের ডেস্ক জানালার পাশে। বাইরে তাকালে পাশের বিল্ডিংয়ের কাচে নিজের প্রতিফলন দেখা যায়। কখনো কখনো কাজের ফাঁকে সেই প্রতিফলনের দিকে তাকিয়ে থাকে সে—চেনা মুখ, কিন্তু যেন অপরিচিত লাগে। ভাবে, এটাই কি তার চাওয়া জীবন? সকাল নয়টায় ঘুম থেকে উঠে অফিসে আসা, রাত জেগে থাকা, আবার পরদিন একই ছকে ফিরে যাওয়া—এই নিয়মের ভেতরে কি কোথাও কিছু বদলানোর সুযোগ আছে?
দুপুরের সময়টা আসে নীরবে। সবাই মিলে ক্যান্টিনে যায়, রাফিনও যায় কিন্তু খুব বেশি কথা বলে না। খাওয়া শেষ করে ছাদে উঠে যায় একা। ছাদে রোদ পড়ে, বাতাস একটু নরম। দূরের আকাশে ভাসে কিছু মেঘ। রাফিন হাতের মোবাইলটা পকেটে রাখে, চোখ বন্ধ করে বাতাসে মুখ দেয়। তার মনে হয়, এই নীরব সময়টাই তার জীবনের সবচেয়ে সত্যিকারের সময়—যেখানে কোনো শব্দ নেই, কেবল নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যায়।
কখনো কখনো সে ভাবে, যদি আবার কুয়াকাটা যাওয়া যেত, যদি আবার একবার সূর্যদয় দেখা যেত—হয়তো দেহের এই ঘড়িটা নতুন করে সেট হয়ে যেত। কিন্তু জীবন তো এমনই—একবার ছন্দ হারালে সেটাই হয়ে যায় জীবনের ছন্দ।
রাফিন যখন ঢাকায় ছিল, তখন তার জীবন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ছকে বাঁধা। অফিস থেকে বাসার দূরত্ব ছিল এতটাই বেশি যে প্রতিদিনই যেন সে এক যুদ্ধ লড়ত। সকালে বেরিয়ে সন্ধ্যা গড়িয়ে যেত ফিরতে ফিরতে। দিনে চার ঘণ্টা, কখনো কখনো আরও বেশি সময় কেটে যেত রাস্তায়। সিগনালে দাঁড়িয়ে থাকা, ধীরে ধীরে গলে যাওয়া গাড়ির লাইন, গরমে হাঁসফাঁস করা ভিড়—সব মিলিয়ে জীবন যেন এক স্থবির গতির প্রতিযোগিতা।
সবচেয়ে বিরক্তিকর বিষয় ছিল জ্যাম। স্থির রাস্তার ভেতরে বসে থাকা গাড়ির ভেতর মানুষগুলোও ধীরে ধীরে যেন স্থির হয়ে যেত। কোনো গন্তব্যে পৌঁছানো মানে ছিল ধৈর্যের পরীক্ষা পাস করা। জানালার বাইরে তাকালে শুধু হর্ণের শব্দ, ধুলো আর মানুষের ক্লান্ত মুখ দেখা যেত। ঢাকার রাস্তায় তখন তার মনে হতো, শহরটা যেন জীবন্ত—কিন্তু অসুস্থ এক দেহের মতো, হাঁপাচ্ছে, ছটফট করছে, কিন্তু থামতে জানে না।
এখন সেই দিনগুলো অতীত। ঢাকার জ্যাম, ধুলো, ট্রাফিক—সবই যেন এক অন্য জীবনের স্মৃতি। মাঝে মাঝে মনে হয়, সেই জীবনে ফিরে যাওয়া মানে দুঃস্বপ্নে ঢোকা। অথচ একটা সময় ছিল, যখন রাফিন ভাবত—ঢাকা তার প্রাণের শহর। এই শহরই তার শেকড়, তার সম্ভাবনা, তার বন্ধুদের হাসি, তার যৌবনের গল্প। মনে হতো, এই শহর ছেড়ে সে কোথাও গিয়ে থাকতে পারবে না।
কিন্তু সময়ের নিজের নিয়ম আছে। ধীরে ধীরে পরিবেশ আর পরিস্থিতি মানুষকে এমনভাবে বদলে দেয় যে, একসময় যা ছাড়া বাঁচা অসম্ভব মনে হতো, সেটাই হয়ে যায় ক্লান্তির প্রতীক। এখন ঢাকার নাম শুনলে রাফিনের মনে হয়—ফিরে যাওয়া মানে আবার সেই ধুলো, সেই গুমোট বাতাস, সেই যানজট, সেই বিরক্তিকর গাড়ির হর্ণের তীব্র শব্দে নিজেকে হারিয়ে ফেলা।
সে ভাবে, পৃথিবীতে যত শহর আছে, তার মধ্যে বসবাসের অযোগ্য কয়েকটির তালিকায় প্রায় প্রতি বছরই ঢাকার নাম থাকে। কখনো এক নম্বরে, কখনো তার কাছাকাছি। সংবাদমাধ্যমে এই খবর সে আগেও দেখেছে। তখন বিষয়টা তেমন গুরুত্ব পেত না—হাস্যরসেই উড়িয়ে দিত। কিন্তু এখন মনে হয়, এর ভেতরে সত্যিটা কত ভয়ংকরভাবে লুকিয়ে আছে।
তার মনে পড়ে, নোবেল পুরস্কার আছে মানবজাতির উন্নতির স্বীকৃতিতে, আবার “ইগ নোবেল” আছে হাস্যকর সব আবিষ্কারের জন্য। যদি বসবাস অযোগ্য শহরের জন্যও কেউ পুরস্কার দিত, তবে ঢাকা নিশ্চয়ই প্রতি বছর সেই ট্রফিটা ঘরে তুলত। সে একরকম হেসে ভাবতে থাকে—“তাকে যদি কেউ সেই পুরস্কার গ্রহণ করতে পাঠাত, হয়তো সেখানেই ঢাকার প্রতি তার শেষ দায়িত্বটা শেষ হতো।”
রাফিন জানে, শহরটা হয়তো এখনো জীবন্ত, এখনো মানুষ সেখানে বেঁচে আছে, ভালোও বাসে। কিন্তু তার নিজের ভেতর থেকে শহরটা হারিয়ে গেছে। এখন ঢাকাকে মনে পড়ে শুধু দূরের কোনো দৃশ্যের মতো—চেনা, অথচ আর নিজের নয়।
ঘুম থেকে উঠে তাড়াহুড়ো করে রেডি হতে হয় রাফিনকে। সকালটা যেন সব সময় এক দৌড়ের ভিতর শুরু হয়—ফ্রেশ হওয়া, কাপড় গুছানো, নাশতা গলায় ঢোকানো আর অফিসের জন্য বেরিয়ে পড়া। তাই যেদিন কোনো পরিকল্পনা থাকে, সেদিনের প্রস্তুতি আগের রাতেই নিতে হয়। রাফিনের জীবনে ‘আগের রাতের প্রস্তুতি’ এখন একরকম নিয়মে পরিণত হয়েছে—ব্যাগের চেন টেনে দেখা, ফোন চার্জে দেওয়া, আর মনে মনে হিসেব কষা—কীভাবে সকালটা সামলাবে।
গত মাসেই সে রাজশাহীতে গিয়েছিল। ফেরার সময় সবাইকে কথা দিয়েছিল, ১৯ সেপ্টেম্বর আবার যাবে। কথাটা হয়তো স্রেফ একটা প্রতিশ্রুতি ছিল, কিন্তু রাফিনের কাছে সেটা অনেক বেশি। এবার তাকে যাওয়া নিয়ে কেউ অনুরোধ করেছিল, কেউ বা একটু অভিমান মেশানো কণ্ঠে বলেছিল—“যেতে তো পারো।” রাফিন হাসিমুখে বলেছিল, “যাবো।”
সে জানে, প্রতিশ্রুতি দেওয়া যত সহজ, রাখা ততটা নয়। তবু সে চেষ্টা করে—প্রতিবার, প্রতিশ্রুতির মান রাখার জন্য। যেন নিজের অজান্তেই সে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার বিপরীতে হাঁটছে। “কেউ কথা রাখেনি”—এই পঙক্তিটা তার কাছে অনেকটা চ্যালেঞ্জের মতো। সে প্রমাণ করতে চায়, “কেউ কেউ কথা রাখে।”
গত বছর একা একা বেনাপোলের ছোট্ট ঘরে বসে সে পড়েছিল নাজিম উদ্দীনের থ্রিলার “কেউ কেউ কথা রাখে”। বইটা শেষ করার পর রাফিনের মনে হয়েছিল, নামটাই যেন তার জীবনের সঙ্গে মিলে যায়। তখন থেকেই সে ঠিক করেছিল—যা-ই হোক, নিজের কথার মূল্য সে রাখবেই।
কাজের সুবাদে রাফিন এখন বেনাপোল বন্দরের কাছাকাছি থাকে। সীমান্ত শহর, চারপাশে ট্রাকের গর্জন, মালামাল ওঠানামার শব্দ, পুলিশের বাঁশির আওয়াজ—সব মিলিয়ে জায়গাটা যেন কখনো ঘুমোয় না। কিন্তু এই কোলাহলের মধ্যেই রাফিনের দিন কেটে যায় এক অদ্ভুত স্থিরতায়। অফিস থেকে ফিরে সন্ধ্যাগুলো তার নিজের মতো—এক কাপ চা, টেবিলের পাশে রাখা বই, আর জানালার ওপারে কোলাহলমিশ্রিত নিরবতা।
ওখান থেকে সরাসরি রাজশাহী যাওয়ার কোনো বাস বা ট্রেন কিছুই নেই। বেনাপোল যেন দেশের এক প্রান্ত, আর রাজশাহী অন্য প্রান্তে। ফলে রাফিনের যাত্রাপথ সব সময়ই একটু জটিল হয়ে পড়ে। তাকে প্রথমে যশোর আসতে হয়, তারপর সেখান থেকে রাজশাহীর ট্রেন ধরতে হয়।
যাতায়াতের জন্য ট্রেনই আসলে সবচেয়ে ভালো। তাড়াহুড়ো নেই, বসার আরাম আছে, চাইলে পা ছড়িয়ে বসা যায়, নামাজ পড়া যায়, চাইলে এক কাপ চা নিয়েও বসা যায় জানালার পাশে। ট্রেনে কোনো রকম অস্থিরতা নেই—একটা ছন্দ আছে, একধরনের নির্ভরতা। সে ছন্দে রাফিনের মনের ভেতরও একটা শান্তি নেমে আসে। ট্রেন চলে নিজের মতো, আর যাত্রীরাও তাদের মতো। সময় ঠিক থাকে, পথে ঠেলাঠেলি নেই, আর সবচেয়ে বড় কথা—ভাড়া কম, সময়ও বাঁচে।
কিন্তু সমস্যা একটা, এবং সেটাই আসল।
রাজশাহীগামী ট্রেন ছাড়ে ঠিক বিকেল পাঁচটা আট মিনিটে। সেই ট্রেন ধরতে হলে বেনাপোল থেকে অন্তত দেড়-দুই ঘণ্টা আগে যশোর পৌঁছাতে হয়। মানে অফিস থেকে যদি পাঁচটার ট্রেন ধরতে চায়, তাহলে তিনটার আগেই বের হতে হবে। আর এখানেই রাফিনের সব হিসাব গুলিয়ে যায়।
অফিসে স্যারকে যদি বলে—“স্যার, আজ একটু আগে যেতে চাই,”—তখনই স্যারের মুখের ভাব বদলে যায়। কখনো ঠোঁট চেপে, কখনো ভ্রু কুঁচকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন—“আচ্ছা, হঠাৎ কোথায় যাচ্ছো?”, “আগে জানাতে পারতে না?”, “অফিসের কাজের কী হবে?” এসব প্রশ্ন শুনে রাফিনের ভিতরটা কেমন করে ওঠে। সে জানে, প্রতিবারই এমন হবে, তবু মুখ বুজে সহ্য করে। মাঝে মাঝে ভীষণ বিরক্ত লাগে, কিন্তু বিরক্ত হয়ে লাভ কী! ছুটি তো যেকোনোভাবে নিতে হবেই।
গত কয়েক মাসে অন্তত একবার হলেও রাফিনকে রাজশাহী যেতেই হয়েছে। হয়তো কারো দেখা, কোনো প্রতিশ্রুতি, বা কেবল কিছুক্ষণের মুক্ত বাতাসের প্রয়োজন—যাই হোক না কেন, তাকে যেতেই হয়। কিন্তু অফিস যেন এসব বোঝে না। উল্টো তারা তাকে জিজ্ঞেস করে—
“এতো ঘনঘন রাজশাহী যান কেন?”
“ওখানে কে থাকে?”
“কোনো বিশেষ কাজ আছে?”
প্রশ্নগুলোর সুরে কৌতূহল কম, সন্দেহ বেশি। এসব শুনলে রাফিনের মেজাজ গরম হয়ে যায়, কিন্তু মুখে কিছু বলে না। মনে মনে ভাবে—ছুটি তো আমার পাওনা, আমি কোথায় যাব, কী করবো সেটা জানার অধিকার কারো নেই। কিন্তু অফিসে এসব বললে সেটা ‘অসভ্যতা’ হিসেবে গন্য হয়। তাই সে চুপ থাকে।
এমনকি বৃহস্পতিবার বিকেলে একটু আগে বাসায় ফিরতে চাইলে স্যারদের মুখের অভিব্যক্তি বদলে যায়। কেউ কেউ আবার মজা করে বলে—“আবার রাজশাহী যাচ্ছো নাকি?”
সবাই হাসে, কিন্তু সেই হাসিতে রাফিন নিজের প্রতি একধরনের কটাক্ষ খুঁজে পায়।
বিষয়টা তার মোটেই ভালো লাগে না। তবু সে কিছু বলে না। নিজের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভটা চুপচাপ গিলে ফেলে। মনে মনে শুধু ভাবে—
“এই অফিস থেকে যেদিন বদলি হয়ে চলে যাব, সেদিন যদি ফেয়ারওয়েল দেয় আর কিছু বলতে বলে, তখন বলবো—‘বলার কিছু নেই। শুধু চাই, জীবনের বাকি সময় আপনাদের কারো সঙ্গে যেন আর কাজ করতে না হয়।’”
ভাবনাটা মনে হয় তৃপ্তি দেয়, একরকম মানসিক প্রতিশোধের মতো। কিন্তু বাস্তবে সে জানে, এই কথাগুলো সে কোনোদিন বলবে না। হয়তো তখনও সে এক চিলতে হাসি মুখে নিয়ে শুধু বলবে—
“সবাই ভালো থাকবেন।”
এক সপ্তাহ আগেই পাশের সহকর্মীকে রাফিন জানিয়ে রেখেছিল,
“দাদা, আগামী বৃহস্পতিবার, মানে ১৮ সেপ্টেম্বর আমি হয়তো দুই ঘণ্টা আগে বের হবো। সেদিন বিকেলের কয়েকটা কাজ যদি আপনি সামলে নিতে পারেন, আমি আগেই সেগুলো গুছিয়ে রেখে যাব।”
সহকর্মী হালকা হাসলেন, বললেন—
“আচ্ছা, আপনি চিন্তা করবেন না। আমি দেখে নেব।”
রাফিন জানে, কথাটা নিছক ভদ্রতা নয়। এই সহকর্মীর সঙ্গে তার সম্পর্কটা বন্ধুত্বের চেয়ে বেশি পরিণত, কিন্তু অফিসের আনুষ্ঠানিকতা ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগেই। দুজনেই একই ডিপার্টমেন্টে কাজ করেন, আবার কাকতালীয়ভাবে একই বাসায়ও থাকেন। তাই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একে অপরের দেখা হয়; কখনও চায়ের কাপে গল্প, কখনও আবার অফিসের টেনশন ভাগাভাগি করা—সব মিলিয়ে একধরনের সহজ সখ্য গড়ে উঠেছে।
তবুও রাফিন কাজের ব্যাপারে খুব সতর্ক।
সে চায়, নিজের দায়িত্ব অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে না দিয়ে যতটা সম্ভব আগেই শেষ করে রাখতে। তাই পুরো সপ্তাহ জুড়ে সে ফাইল গুছিয়েছে, রিপোর্ট সাজিয়েছে, অসমাপ্ত কাজের তালিকা লিখে রেখেছে নোটবুকে। তার ডেস্কটা এখন এমনভাবে গোছানো যে কেউ এলেও সহজেই বুঝতে পারবে কোন কাজ কোথায় থেমে আছে।
কয়েকদিন আগেই অবশ্য স্যারের কাছ থেকে অনুমতিটাও নিয়ে রেখেছে।
স্যার প্রথমে মুখে কিছু বলেননি, কিন্তু রাফিন টের পেয়েছিল—তার চোখে একধরনের অস্বস্তি ঘুরছে।
কিছু না বললেও সেই দৃষ্টিটা যেন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, “আবার রাজশাহী যাচ্ছেন?”
রাফিন মৃদু হেসে বলেছিল, “জী, একটু ব্যক্তিগত কাজে যেতে হবে।”
স্যার মাথা নেড়ে বলেছিলেন, “ঠিক আছে, তবে কাজ যেন ঠিকমতো ম্যানেজ হয়।”
“জী স্যার,” সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়েছিল রাফিন।
আজ রাতে ঘুমানোর আগে তাই সে শেষবারের মতো নিজের ব্যাগটা খুলে দেখল।
সব ঠিকঠাক আছে কি না—চার্জার, পাওয়ার ব্যাংক, ফাইলের কপি, একটা ছোট নোটবুক, আর প্রিয় কলমটা।
ব্যাগের এক পাশে কাপড়চোপড়, অপর পাশে বই।
যদিও এবার মাত্র দুই রাত আর একদিনের সফর, তবুও রাফিন ব্যাগ ভর্তি করে ফেলেছে।
টিশার্ট, জিন্স আর স্নিকার্স—এগুলো তো আছেই, সঙ্গে এবার রাখল একটা পাঞ্জাবি, পায়জামা আর নতুন সেন্ডেল।
ভাবল, একদিন অন্তত একটু আলাদা পোশাক পরবে; শহর বদলালে মানুষও যেন অল্প কিছুটা বদলায়।
সব গুছিয়ে নিয়ে রাফিন জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
বাইরে রাত নেমেছে, দূরে বন্দরের আলো চিকচিক করছে।
হঠাৎ মনে হলো—এই শহর, এই ছোট্ট ঘর, এই একঘেয়ে জীবন থেকে বেরিয়ে রাজশাহীর পথে যাত্রাটা যেন কেবল দূরত্ব নয়, বরং একধরনের মুক্তি।
বিছানায় শুয়ে মোবাইলে অ্যালার্ম সেট করল সকাল ছয়টার।
চোখ বন্ধ করার আগে মনে হলো, জীবনে কত ব্যস্ততা, দায়িত্ব, নিয়ম—সবকিছুর ভেতরেও মানুষ একটা যাত্রার জন্যই বাঁচে।
রাফিনও তাই।
কোথাও যাওয়ার জন্য রাফিন সব সময় স্কুল ব্যাগের মত একটা কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ ব্যবহার করে। ব্যাগটিকে অবশ্য স্কুল ব্যাগ না বলে ল্যাপটপ ক্যারি করার ব্যাগ বলা যেতে পারে। গতবছর অক্টোবরে রাফিন যখন তার বন্ধু মুবাশশিরকে সাথে নিয়ে ঢাকায় গিয়েছিল তখন ব্যাগটি কিনেছিল। রাফিনের সেদিনের কথা বেশ মনে আছে। সেদিন সে মুবাশশিরকে সাথে নিয়ে গিয়েছিল রাদিদের বাসায়। রাফিনের আরেক বন্ধু। ওরা থাকে বনশ্রীতে। রাদির বাবা একজন ম্যাজিশিয়ান। মুবাশশিরের ম্যাজিকের প্রতি প্রবল আগ্রহ থাকায় সেখানেই নিয়ে গিয়েছিল। রাদি আর মুবাশশিরের মধ্যেও দারুণ বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। তিনজন মিলে বসুন্ধরা সিটিতে গিয়ে সিনেমা দেখেছিল। সিনেমার নাম আজ আর রাফিনের মনে নেই। সেদিন বসুন্ধরা সিটি থেকে নেমে ফুটপাথ ধরে হাটতে হাটতে একটি ব্যাগের দোকানে ঝুলানো ব্যাগগুলো দেখে ওর খুব পছন্দ হলো। দেখলো অন্যান্য যায়গার তুলনায় এখানে দাম কিছুটা কমই মনে হচ্ছে। তাই সুযোগ বুঝে একটা ব্যাগ নিয়ে নিলো। আসার সময় যে পুরোনো ব্যাগটা সে নিয়ে এসেছিল ঢাকা থেকে ফেরার পথে সেটা আর টেনে নিলো না। মুবাশশিরকে সাথে নিয়ে কেনা সেই ব্যাগটাই এখন রাফিনের ভ্রমণ সঙ্গী। একবার রাফিনের এক বন্ধু ব্যাগটা বদল করতে চেয়েছিল। কিন্তু কোনো কারণে তা বদল করা হয়নি।
রাতে ঘুমানোর আগে আগে সেই ব্যাগে টিশার্ট,প্যান্ট,বেল্ট,সেন্ডেল সহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলো। শুধু বাকি থাকলো মোবাইলের চার্জার আর ব্রাশ। যেহেতু পরদিন সকালে উঠে ব্রাশ করতে হবে তাই ব্রাশ আগেই ব্যাগে ঢোকাতে পারলো না। যথারীতি পরদিন সকালে অফিসে গেল। এই ট্যুর প্ল্যান আগেই করা ছিল বলে এগারদিন আগেই ট্রেনের যাওয়া এবং ফেরার টিকেট করে রেখেছিল। দেরি করলে মূলত টিকেট পাওয়া যায় না। এই দীর্ঘ পথ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করা কিছুটা কষ্টসাধ্য হলেও অসম্ভব না। কিন্তু দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করতে গেলে কিছু অসুবিধায় পড়তে হয় বলেই অগ্রিম টিকেট করে রাখা। রাফিন সব সময় একটি থিওরি ফলো করে আর তা হলো সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। যাওয়া হোক চাই না হোক অগ্রিম টিকেট করে রাখে। যদি যেতে না পারে তবে কিছুক্ষণ আগে টিকেট ক্যান্সেল করলেও টিকেটের টাকার সিংহভাগ ফেরত পাওয়া যায়। কিন্তু যদি টিকেট না করে তাহলেতো সেদিন যাওয়ার সুযোগ হলেও সিট পাওয়ার চান্স থাকে না। রাফিনের জীবনে এরকম অনেক ঘটনাই ঘটেছে। মুবাশশিরকে নিয়ে গত বছর অক্টোবরে যখন ঢাকায় যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তখনো এভাবেই টিকেট করেছিল। কিন্তু হঠাৎ জানতে পারলো ছুটি বাড়ানো হয়েছে। ফলে সেই টিকেট ক্যান্সেল করে ভ্রমণের ডেট এগিয়ে এনে নতুন করে টিকেট করেছিল। এ কারণেই রাফিন অগ্রিম টিকেট করে রাখে। এখন রেল ভ্রমণ অনেক সহজ ও আরামদায়ক হওয়ার পাশাপাশি সাশ্রয়ী হয়েছে। টিকেটের দামও বাসের তুলনায় কম। ভ্রমনের সময় টিকেট দেখানোও লাগে না। তারপরও রাফিন টিকেটের একটা কপি প্রিন্ট করে ব্যাগে ঢুকিয়ে রেখেছে।
ট্রেনে রাফিন আর আমার সিট পড়েছিল মুখোমুখি। মাঝখানে ছোট্ট একটা টেবিল—তার উপর রাখা দুটো চায়ের কাপ, একটায় এখনো ধোঁয়া উঠছে। জানালা দিয়ে ঢুকছে বিকেলের ম্লান আলো, কখনো আলো, কখনো ছায়া এসে পড়ছে রাফিনের মুখে।
কীভাবে রাফিনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল—সেটা পরে বলব।
ও গল্পটা একটু আলাদা, সময় নিয়ে বলতে হবে।
আজ বলি, সেই দিনটার কথা—যেদিন আমরা প্রথম একসাথে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিচ্ছিলাম, আর আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলাম ওর জীবনের গল্প।
ট্রেনটা এগোচ্ছিল ছন্দে ছন্দে, একটার পর একটা স্টেশন পেরিয়ে যাচ্ছিল।
কখনো দূরে দেখা যাচ্ছিল গাছের সারি, কখনো জনমানবহীন ফাঁকা মাঠ।
বাতাসে মিশে ছিল শীতলতার সাথে একধরনের মেঘলা গন্ধ।
কিন্তু কামরার ভেতর অন্যরকম আবহ—একজন মানুষ নিজের জীবনের গল্প খুলে দিচ্ছে, আর একজন শুনছে অজানা এক মুগ্ধতায়।
রাফিনের জীবনের গল্প যেন নদীর মতো—একবারও সোজা চলে না, কোথাও বাঁক নেয়, কোথাও গাঢ় হয়, কোথাও হারিয়ে যায় কুয়াশায়।
আমি বারবার ওকে থামিয়ে প্রশ্ন করছিলাম, “তারপর কী হলো?”, “আপনি তখন কেমন অনুভব করেছিলেন?”, “ওই মানুষটার সঙ্গে যোগাযোগ আছে এখনো?”
রাফিন শান্তভাবে উত্তর দিচ্ছিল, কখনো মুচকি হাসছিল, আবার হঠাৎ থেমে যাচ্ছিল।
তার দুই চোখে তখন জল টলমল করছিল।
এক ফোঁটা গড়িয়ে পড়ল গালে, আলোয় চিকচিক করল এক মুহূর্ত, তারপর মিলিয়ে গেল।
সে রাজশাহী থেকে ফিরে আসছিল নিজের জগতে, কিন্তু মনে হচ্ছিল কিছু একটা রেখে এসেছে পেছনে—হয়তো কোনো মানুষ, হয়তো কিছু না-বলা কথা, হয়তো শুধু একটুখানি ভালোবাসা।
ওর মুখে তখন এমন এক প্রশান্তি আর বিষণ্ণতা একসাথে মিশে ছিল যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
রাফিন বুকের সাথে একটা ব্যাগ জাপটে ধরে রেখেছিল।
আরেকটা ব্যাগ উপরে, বাঙ্কারে রাখা।
যেভাবে কোনো শিশু তার প্রিয় খেলনাটা আগলে রাখে, ঠিক সেভাবেই ও ব্যাগটা আঁকড়ে ছিল।
আমার কৌতূহল হচ্ছিল—ওই ব্যাগে কী আছে? কাপড়, বই, না হয়তো কিছু ব্যক্তিগত জিনিস?
কিন্তু আমি প্রশ্ন করিনি।
মনে হচ্ছিল, ওই ব্যাগটা হয়তো শুধু জিনিসপত্র নয়, বরং কোনো স্মৃতি, কোনো গোপন অধ্যায়ের রক্ষক।
ট্রেনের ঝাঁকুনি আর ছন্দ মিলেমিশে এক অদ্ভুত সুর তৈরি করছিল।
আমার মনে হচ্ছিল—এই গল্পগুলো হারিয়ে যাওয়া উচিত নয়।
রাফিনের জীবনের প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি অনুভব যেন কোনোভাবে ধরে রাখতে পারি, লিখে ফেলতে পারি, যাতে অন্যরা জানে এমন মানুষ, এমন গল্প এখনো আছে এই পৃথিবীতে।
তখনই মনে হলো, এই গল্পটা আমারই লেখা উচিত।
রাফিনের গল্প—যার শুরু হয় রাত জাগা এক মানুষ থেকে, আর শেষ কোথায় হবে এখনো জানা নেই।
যাই হোক, ফিরে যাই আগের দিনের গল্পে।
যেদিন রাফিন অফিসে বসে ক্ষণ গুনছিল,
ঘড়ির কাঁটা চারটার দিকে এগোচ্ছে ধীরে ধীরে।
তার চোখে তখন সময়ের হিসেব, মনে কেবল একটাই ভাবনা—
কখন এই অফিস ছুটবে,
কখন বাসায় পৌঁছে আগেই গুছিয়ে রাখা ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে
রাজশাহীর ট্রেন ধরতে ছুটে যাবে স্টেশনের পথে।
ছিমছাম, ছোট্ট, নিরিবিলি একটি অফিসে কাজ করে রাফিন। অফিসের ঘরটা বড় নয়, কিন্তু সবসময়ই পরিচ্ছন্ন থাকে। টেবিলের ওপর সাজানো কিছু ফাইল, পাশে ধোঁয়া উঠা চায়ের কাপ, আর দেয়ালে ঝুলানো ঘড়ির টিকটিক শব্দ—এই নিয়েই দিন চলে যায়। সেখানে রাফিনসহ আরও ছয়জন কর্মকর্তা কাজ করেন। সবাই বেশ ভদ্র, নিজের মতো কাজ নিয়ে ব্যস্ত। তবে অফিসে তেমন কথাবার্তা বা হাসিঠাট্টা হয় না। সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্কও মেপে মেপে—‘তুই’ নয়, বরং ‘আপনি’। সেই ‘আপনি’ সম্বোধনের ভদ্র দূরত্বটুকু অফিসের পরিবেশে এক ধরনের শৃঙ্খলা এনে দিয়েছে, যদিও কখনো কখনো রাফিনের মনে হয় একটু প্রাণচাঞ্চল্য থাকলে খারাপ হতো না।
অফিসের পাশেই একটি আবাসিক ভবনের চারতলায় দুই রুমের একটি ছোট বাসায় থাকে রাফিন। একই অফিসের আরও দুজন সহকর্মী তার রুমমেট। তারা সকালে একসাথে বেরোয়, আবার রাতে প্রায় একই সময়ে ফিরে আসে। রান্নার ব্যবস্থা থাকলেও তিন বেলাতেই তারা বাইরে খায়—সম্ভবত সময়ের অভাব আর একটু অলসতাই এর কারণ।
সেদিন বিকেলে রাফিন অফিসের কাজ সেরে স্যারের রুমে গিয়ে বিনয়ের সঙ্গে জানাল—
“স্যার, আজ একটু আগে যেতে হবে।”
স্যার মাথা নেড়ে অনুমতি দিলেন, “ঠিক আছে, তবে বেরোনোর আগে থাম্বসটা দিয়ে যেও।”
অফিসে ডিজিটাল অ্যাটেন্ডেন্স সিস্টেম চালু হয়েছে কিছুদিন হলো। সকালে একবার আর বিকেলে একবার—দুইবারই আঙুলের ছাপ দিতে হয়। এতে বোঝা যায় কর্মীরা সত্যিই কত ঘণ্টা অফিসে ছিলেন। আগের হাজিরা খাতার মতো নয় যে কেউ সাইন করে বেরিয়ে গেলেও সারাদিনের উপস্থিতি দেখায়। তাই রাফিন বিকেল চারটার আগেই একবার থাম্বস দিয়ে বেরিয়ে গেল। জানতো, রাজশাহীর ট্রেন ধরতে এখন আর দেরি করা চলবে না।
বাইরে তখন বেশ রোদ, বাতাসে আর্দ্রতার ছোঁয়া। গরমের সঙ্গে মিশে আছে বৃষ্টির গন্ধ। আকাশের একপাশে মেঘ জমেছে, যেন একটু পরেই নামবে ঝুমবৃষ্টি। রাফিনের ব্যাগে ছাতা ছিল, তবু সে আকাশের দিকে একবার তাকাল—মেঘের ভাঁজে সূর্যের আলো মিশে একটা অদ্ভুত সোনালি রঙ তৈরি হয়েছে। তার ভেতরে হালকা উত্তেজনা কাজ করছে, যেন দীর্ঘ প্রতীক্ষিত কোনো যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে।
অফিস থেকে কয়েক মিনিট হাঁটলেই বাসস্ট্যান্ড। সে পৌঁছে দেখলো আগেই একটি বাস দাঁড়িয়ে আছে। গন্তব্য যশোর শহরের উপকণ্ঠ—চাচড়া। সেখান থেকে অটোরিকশায় করে স্টেশন পৌঁছানো যাবে। বাসে উঠেই বুঝল, আজও সিট নেই। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ বলল, “এই রুটে সিট পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার বাবা!”
রাফিন হেসে বলল, “ঠিকই বলেছেন চাচা, এই রাস্তায় সবারই যেন কোথাও না কোথাও যাবার তাড়া।”
বাসের ইঞ্জিন গর্জে উঠলো। ঠাসাঠাসি ভিড়, জানালার ধারে গরম বাতাস ঢুকছে, মাঝে মাঝে মেঘে ঢেকে যাচ্ছে সূর্য। তবু রাফিনের মনে আজ কোনো বিরক্তি নেই—তার চোখে এখন রাজশাহীর ট্রেন, স্টেশনের হুইসেল, আর এক প্রতিশ্রুত যাত্রার দৃশ্য ভেসে উঠছে।
একসময় বাস চাচড়া চেকপোস্টে গিয়ে থামলো। গরম বাতাসে ধুলোর হালকা ঘূর্ণি উঠছে, হকাররা ঠেলাগাড়িতে কলা আর চানাচুর বিক্রি করছে। রাফিন ব্যাগটা কাঁধে তুলে নামল। সময় তখন বিকেল সাড়ে চারটা। তার ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে নিল—রাজশাহীগামী ট্রেন ছাড়বে ৫টা ৮ মিনিটে। হাতে খুব বেশি সময় নেই, তবু তার মনে হলো একটা কাজ আগে করতেই হবে।
ও আগেই দেখে রেখেছিল, আজ আছরের ওয়াক্ত শুরু হবে সাড়ে চারটায়। ট্রেন মিস করার ভয় থাকলেও নামাজ মিস করতে চায়নি সে। স্টেশনে না গিয়ে সোজা পাশে থাকা নতুন মডেল মসজিদে ঢুকে পড়ল। মসজিদের ভেতর হালকা ঠান্ডা বাতাস, জানালার ফাঁক দিয়ে পড়ছে ম্লান বিকেলের আলো। ওজু শেষে নামাজে দাঁড়াতেই মনে হলো যেন দিনের সব অস্থিরতা গলে যাচ্ছে। রুকু-সিজদার ফাঁকে রাজশাহীর ট্রেন, প্রতিশ্রুতি, আর এক মুখ যেন চোখের সামনে ভেসে উঠছে।
নামাজ শেষ করে রাফিন আস্তে আস্তে বেরিয়ে এল। বাইরে এখন হালকা বাতাস বইছে, আকাশে কিছুটা কালো মেঘ জমেছে। হাতে সময় আর খুব বেশি নেই। হালকা দৌড়ে রাস্তা পার হয়ে সে রিকশা ধরে স্টেশনের দিকে রওনা দিল। রিকশার চাকাগুলো যখন রেলস্টেশনের দিকে ঘুরছে, রাফিনের মনেও তখন একরকম ভারী নীরবতা ঘুরছে।
সে জানে—রাজশাহীতে তার এই যাওয়া একরকম কথা রাখার যাত্রা। কেউ একজনকে সে কথা দিয়েছিল, তাইই আজকের এ ছুটে চলা। কিন্তু অন্যবারের মতো এবার তার যাত্রাটা আনন্দমুখর নয়। আগে যে মানুষটা মিনিটে মিনিটে খোঁজ নিতো—“পৌছালে?”, “কোথায় আছো এখন?”, “চা খাওনি কেন?”—এবার সে যেন পুরোপুরি নীরব। ফোনের স্ক্রিনে কোনো মেসেজ নেই, কোনো কল নেই।
রাফিন জানে, তাকে এই নীরবতাই মেনে নিতে হবে। তবুও মনটা কেমন যেন হালকা শূন্যতায় ভরে ওঠে। কল্পনাও করেনি এতটা নির্লিপ্ততা তাকে এভাবে ছুঁয়ে যাবে। পরে অবশ্য জানতে পেরেছিল, ওই মানুষটি খুব অসুস্থ ছিল—তাই তেমন খোঁজ নিতে পারেনি। তবু সেই ব্যাখ্যা রাফিনের বুকের ভেতরের শূন্যতাটা পুরোপুরি ভরাতে পারেনি।
রাফিনের গল্পে একটু বিরতি দিই। কারণ জীবনের গল্পগুলোও মাঝেমাঝে থেমে গিয়ে আমাদের ভাবতে শেখায়।
ওপাশের মানুষটির থেকে সেভাবে সাড়া না পেয়ে রাফিন হয়তো ভেবেছিল—সময় হয়তো সবকিছু বদলে দিয়েছে, হয়তো মানুষটিও বদলে গেছে। আমরা আমাদের জীবনে অনেক সময় এমনটা ভাবি। একতরফা বিচার করি, মুদ্রার শুধু এক পিঠটিই দেখি। অপর পিঠে যে কেমন অন্ধকার, কেমন অসহায়তা বা ব্যস্ততার ভার লুকিয়ে থাকে, সেটা ভাবি না।
আসলে ভাবলেই দেখতাম, আমাদের মনে যে সন্দেহ, কষ্ট আর দ্বিধাদ্বন্দ্ব জমে থাকে, তার অর্ধেকটাই হয় অজানার কারণে। অনেক সম্পর্ক নষ্ট হয় এই ভুল বোঝাবুঝির বীজ থেকেই।
রাফিনও শুরুতে ভেবেছিল, মানুষটি ইচ্ছে করেই তাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু পরে যখন জানতে পারলো সে ভীষণ অসুস্থ, তখন তার ভেতরের সব ক্ষোভ গলে গিয়ে একরকম মায়ায় পরিণত হলো। জীবনকে তখন একটু নতুন চোখে দেখা শুরু করল সে।
এই পর্যন্ত এসে মনে হয় গল্পের শুরুর অংশটাই বলা দরকার।
না হলে পাঠকের মনে প্রশ্ন থেকেই যাবে—রাফিন আসলে কার জন্য এতটা পথ পাড়ি দিচ্ছিল? কে সেই মানুষটি, যে নীরব থেকেও রাফিনের জীবনে এত প্রভাব ফেলতে পারে?
আমার সাথে রাফিনের পরিচয় হয়েছিল রাজশাহী থেকে ফেরার পথে, ট্রেনে একই কামরায়, মুখোমুখি সিটে বসে। তখনও জানতাম না, এই অপরিচিত তরুণের গল্প আমাকে এমনভাবে ছুঁয়ে যাবে। আমি সেদিন রাজশাহীতে গিয়েছিলাম বোন আর ভাগ্নেকে দেখতে। ব্যস্ত জীবনে ছুটি মেলে না, তাই দুই দিনের ছোট্ট সফরেই মনটা একটু হালকা করতে চেয়েছিলাম।
আমার ট্রেন ছিল দুপুর আড়াইটায়। ফলে সকালে ঘুম থেকে উঠেই তাড়াহুড়ো লেগে গেল। ব্যাগ গোছানো, নাস্তা, পোশাক বদল—সব মিলিয়ে সময়ের পেছনে ছুটছি যেন। বোনের বাসা শালবাগান পাওয়ারহাউস মোড়ের কাছে, আসাম কলোনীতে।
যখন বের হতে যাবো, দেখি বোনটা নামাজে দাঁড়িয়েছে। ভাগ্নেটাকেও দেখলাম না, হয়তো ঘরের ভেতরে খেলছিল। আম্মুকে বলেই বেরিয়ে গেলাম। মনে হচ্ছিল, দশ মিনিট দাঁড়ালে হয়তো ওদেরকেও বলে যেতে পারতাম—“চল ফিরে এলেই দেখা হবে।”
কিন্তু তাতে ভয় ছিল—ট্রেনটা মিস হয়ে যাবে না তো?
ট্রেন মিস করার ভয়টাই আমাদের জীবনে অনেক সময় মানুষ মিস করার কারণ হয়ে যায়—এ কথাটা তখন ভাবিনি।
কাঁধে তখন দুটো ব্যাগ। একটা কাঁধে ঝুলছে, অন্যটা হাতে। ভেতরে দু’দিনের সফরের জামাকাপড়, এক জোড়া স্যান্ডেল আর কিছু ছোটখাটো জিনিস। ব্যাগের ভারে শরীরটা যেন খানিকটা হেলে যাচ্ছে, তবু তাড়াহুড়ো থামছে না। রেলস্টেশনের দিকে যেন নিজের সাথেই এক দৌড় প্রতিযোগিতা চলছে।
রিকশা নিলাম, আর রিকশাও যেন বুঝে ফেললো যাত্রীটা তাড়ায় আছে—একটা টানটান ছোটা শুরু করল। রাস্তার বাতাসে তখন একটা অদ্ভুত ঘ্রাণ—ভেজা মাটির গন্ধ, ধুলো, আর গরম লোহা-পিচের গন্ধ মিলেমিশে একটা ভারী গন্ধে পরিণত হয়েছে। আকাশে কালো মেঘ জমে আছে, মাঝে মাঝে বিদ্যুতের আলোয় এক মুহূর্তের জন্য চারপাশ উজ্জ্বল হয়ে উঠছে।
ট্রেন মিস করার ভয়টা তখনও ছিল, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ভয় ছিল হঠাৎ বৃষ্টি এসে সবকিছু ভিজিয়ে দেবে। দীর্ঘ পথ ভেজা শরীরে গেলে ঠান্ডা লেগে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে—আর রাজশাহীর সফরটা তখনই নষ্ট হয়ে যাবে।
রিকশা যখন রেলগেটের কাছে পৌঁছালো, তখন হঠাৎ করেই থেমে গেল। সামনে রেলগেট বন্ধ, আর রাস্তার দুই পাশ জ্যামে একাকার। যতদূর চোখ যায়, শুধু রিকশা আর মোটরসাইকেলের লাইন। কাদা জমে রাস্তা এমন নরম হয়ে গেছে যে পা রাখলে জুতা আটকে যায়। মনে হলো এই জ্যাম বুঝি কখনোই ছাড়বে না।
আমি যে রিকশায় বসে ছিলাম তার চারপাশে আরও কয়েকটা রিকশা এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে যে, নামার উপায় নেই। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম, কিন্তু সময় থেমে থাকেনি। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলছে নিজের মত করে।
শেষ পর্যন্ত গেট খুলে গেলে রিকশাগুলো একসাথে ছুটে চললো—হঠাৎ যেন শহরটা আবার শ্বাস নিতে শুরু করল। রিকশা সামান্য এগোতেই দেখি আবারও থেমে গেছে। এবার আর অপেক্ষা করিনি। ব্যাগ কাঁধে নিয়ে নেমে পড়লাম, আর যতটা পারি হাঁটতে শুরু করলাম।
পথের কাদা, ঠান্ডা বাতাস, মানুষের ভিড়—সবকিছুকে অগ্রাহ্য করে দৌড়াচ্ছি। মাথায় তখন একটাই চিন্তা, “ট্রেনটা যেন মিস না হয়।”
রেলস্টেশনের দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িতে সময় তখন ৫টা বেজে ১ মিনিট। হাতে মাত্র কয়েক মিনিট। সৌভাগ্যক্রমে টিকিট আগে কাটা ছিল, তাই লাইনে দাঁড়ানোর ঝামেলা নেই। ভেতরে ঢুকেই দেখি চার নাম্বার প্ল্যাটফর্মে ট্রেনটা দাঁড়িয়ে আছে—গাঢ় লাল আর নীল বগির শরীরে সূর্যের শেষ আলোটা লেগে একরকম ধাতব আভা তৈরি করেছে।
প্ল্যাটফর্মে ভিড়, চা-ওয়ালার হাঁক, ট্রেনের ইঞ্জিনের শিস—সব মিলিয়ে একটা চিরচেনা কোলাহল। প্ল্যাটফর্মের শুরুতেই বড় একটা প্ল্যাকার্ডে লেখা,
“বেনাপোল এক্সপ্রেস — রাজশাহী।”
মনে হলো এই নামটাই যেন এক টান দেয় বুকের ভেতর।
হেঁটে হেঁটে নিজের বগি খুঁজে বের করলাম। দরজার ধাতব হাতলটা ধরতেই হাতটা ঠান্ডা হয়ে গেল। ভেতরে ঢুকে দেখি যাত্রীরা প্রায় সবাই বসে গেছে। সিট নম্বর খুঁজে বসে পড়লাম। নিঃশ্বাসটা যেন গলার ভেতর থেকে ধপ করে নেমে এলো—সময় মতো পৌঁছেছি।
বাইরে তখন ট্রেন ছাড়ার সিগন্যাল বাজছে, আর আমি জানালার ধারে বসে ভাবছি—এই সফরটা অন্যরকম হবে।
কাপড় ভর্তি ব্যাগটা ট্রেনের লাগেজ বাঙ্কারে রেখে দিলাম। অন্য ব্যাগটা বুকের কাছে জাপটে ধরলাম, যেন সবকিছু নিজের হাতের নাগালে থাকে। কপোতাক্ষ এক্সপ্রেসের গন্তব্য খুলনা।
আমার সামনের সিটে জানালার ধারে বসে ছিল এক তরুণ। চোখ-মুখ অন্ধকারমাখা, চেহারায় যেন দীর্ঘ সময়ের দুঃখের ছাপ। বারবার সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছিল—কেউ আছে কি না, কাউকে খুঁজছে কি না, মনে হচ্ছিল যেন।
নির্ধারিত সময়ে ট্রেন ছুটতে শুরু করল। তখনই দেখলাম, তরুণ জানালায় মুখ ঠেকিয়ে হুহু করে কেঁদে উঠল। চোখের জল অবিরাম ঝরছে, গাল ভিজে গেছে। তার সেই জলভরা চোখ যেন কাউকে খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে গেছে। প্রিয় কাউকে হয়তো ছেড়ে চলে যাচ্ছে—অথবা খুঁজে পাচ্ছে না—তাই এমন করুণ চুপচাপ কান্না।
আমি আগ্রহী হয়ে জানালার বাইরে তাকালাম, তার উদ্দেশ্যে কেউ হাত নেড়েছে কি না দেখতে। কিন্তু দেখা গেল, পাশে কেউ নেই।
ট্রেনের অন্যান্য যাত্রীরাও লক্ষ্য করেছে। কেউ ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে, কেউ হয়তো ভাবছে—“প্রিয়জন হারিয়ে গেছে, তাই এমন কান্না।” কেউ হয়তো মনে করছে, হয়তো আজকার পরীক্ষার ফল ভালো যায়নি, তাই মন ভেঙেছে।
আমার মনটা অন্য দিকে গিয়ে আটকাল। মনে হচ্ছিল, তরুণটির কান্নার কারণ প্রেম-বিরহ। হয়তো প্রিয়জন দূরে চলে গেছে, হয়তো আর দেখা হবে না—এই ভাবনায় চোখ ভিজেছে। আর আমি চুপচাপ বসে সেই কান্নার মুহূর্তটা দেখছিলাম, যেন তার ব্যথা আমার চোখে ও মনে একসাথে প্রতিফলিত হচ্ছে।
চলন্ত ট্রেনের জানালায় মুখ ঠেকিয়ে হুহু করে কাঁদছে এক তরুণ। বয়স আনুমানিক আটাশের মতো, কিন্তু তার কান্নার ভেতর যেন অন্তহীন দুঃখ লুকিয়ে আছে। মুখ থেকে বেরোয়া শব্দ ট্রেনের ঝিকঝিক আওয়াজে হারিয়ে গেলেও চোখ থেকে ঝরে পড়া অশ্রু অদৃশ্য হলেও স্পষ্ট। ছোট ছোট জলবিন্দু জানালার কাচে লেগে ভেসে যাচ্ছে, আর ধীরে ধীরে একাকার হয়ে যাচ্ছে ট্রেনের ধূসর আলোতে।
তরুণের চোখে এখন শুধু কাঁদার একমাত্র উদ্দেশ্য—মনকে হালকা করা। সে জানে, এই মুহূর্তে কোনো মানুষের দৃষ্টি তার কান্নাকে বিচার করবে না। কাঁদতে কাঁদতে সে যেন নিজেকে, অতীতের ভাঙা স্মৃতি আর হারানো মুহূর্তগুলোর সঙ্গে একত্রিত করছে। চোখের জল ভেসে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে গোটা ট্রেনটা তার সঙ্গে কেঁদে যাচ্ছে। বাইরের মানুষের কৌতূহল, ব্যস্ততা বা উদাসীনতা—কোনোটিই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।
সে বারবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছে। হয়তো খুঁজছে কাউকে, হয়তো নিজের কষ্টের কারন খুঁজছে। চোখ ভেজা, গাল অশ্রুসজল, কিন্তু মুখে কোনো অসহায়তার ছাপ নেই—শুধু গভীর ব্যথা ও নীরব বেদনা। তার কান্নার ভেতর শুধু দুঃখ নয়, এক ধরনের মুক্তি আছে। এই অশ্রুর মধ্যে সে নিজের সমস্ত চাপ, ক্লান্তি ও বেদনা ঢেলে দিচ্ছে।
আমি তখনও তাকিয়ে আছি। তাকে চিনি না, আগে কখনো দেখিনি। আজই প্রথম দেখলাম। আমার সিট আর তার সিট মুখোমুখি—একের পর এক মুহূর্তে যেন আমরা একে অপরের উপস্থিতি অনুভব করছি।
কিছুক্ষণ চুপচাপ দেখার পর আমি বুঝতে পারি, চোখের জল ভেসে গেলেও তার মনটা কেবল ভেঙে পড়ছে না—বেদনার সঙ্গে প্রশান্তির এক ধরনের মিল তৈরি হচ্ছে। ট্রেনের ঝিকঝিক আওয়াজ, প্ল্যাটফর্মের ভিড়, চা-ওয়ালাদের ডাক—সব মিলেমিশে তার কাঁদার মুহূর্তকে আরও গভীর করছে। বুকের কাছে ব্যাগ জাপটে ধরে রাখা, চোখের জল ভেসে যাওয়া, সব মিলিয়ে একটি নিঃশব্দ একাকিত্ব তৈরি করছে।
শেষে বুঝতে পারি, এই ছেলেটিই—রাফিন।
আসাম কলোনীর ছোট্ট, নিরিবিলি গলির মধ্যে রাফিন বেরিয়ে তাকাল—কিন্তু আদিবার কোথাও দেখা মিলল না। আশেপাশের প্রতিটি কোণশ্রেণী যেন নিরব, যেন হঠাৎ সব শব্দ থেমে গেছে। রিকশা থেকে নেমে মাত্র কয়েক মিনিট হয়েছে, আর এখন সেই নীরবতা তার মনে হালকা উদ্বেগ জাগাচ্ছে। আদিবার কাছে এই এলাকা একেবারেই অচেনা। যদিও সে কয়েক বছর ধরে রাজশাহীতে আছে, কিন্তু কখনো এই গলির ভিতরে হাঁটেনি। আসার প্রয়োজনও পড়েনি। আজ সে এসেছে রাফিনের সঙ্গে।
আদিবা রিকশায় বসে থাকতে চেয়েছিল, কিন্তু রাফিন বলল—“এখানেই দাঁড়াও।” সে বাধ্য হয়ে দাঁড়িয়ে রাফিনের পিছুটান করল। হালকা হাওয়া বইছে, আকাশে সন্ধ্যার নীলাভ ছায়া আর কিছু মেঘ ভেসে চলেছে। বাতাসে বৃষ্টির আগের আর্দ্রতা আছে, আর কাদামাখা রাস্তার গন্ধ দূরে পর্যন্ত ভেসে যাচ্ছে।
গলির ভিতরে রাফিনের বাসা। দরজা বন্ধ, জানালা থেকে হালকা আলো বের হচ্ছে। বাসার ভিতরে আম্মু, ছোট বোন রুহামা এবং ভাগ্নে জিসান আছে। রেস্টুরেন্ট থেকে আনা প্যাকেট—পিৎজা, বার্গার আর ফ্রাইড চিকেন—রাফিন হাতে ধরে কলিংবেল বাজাল।
মাত্ৰ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই জিসান দৌড়ে এল। চার বছরের ছোট্ট ছেলেটি, মামাকে দেখে উত্তেজনায় লাফাচ্ছে। মুখে হাসি, চোখে কৌতূহল, কিন্তু একই সঙ্গে তার ছোট্ট মনে কিছু অভিযোগও—মামা সব সময় যথাযথ মনোযোগ দেয় না, এই অভিযোগের শেষ নেই। রাফিন তাকে শান্ত করার জন্য হালকা করে হাসল এবং হাতে থাকা খাবারগুলো টেবিলে সাজাতে লাগল।
রাস্তার দিকে তাকিয়ে রাফিন অনুভব করল—সন্ধ্যার হালকা নীলাভ আলো, বাতাসের আর্দ্রতা, শিশুর খেলা এবং বাসার উষ্ণ আলো—সব মিলিয়ে এক শান্তি আর উষ্ণতার অনুভূতি তৈরি করছে। হঠাৎ মনে হলো, এই ছোট্ট মুহূর্তগুলোই জীবনের সব আনন্দ।
রাফিনের ছোট বোনের নাম রুহামা। এ বছর রুহামা এসএসসি পাশ করলো। পরীক্ষা শেষে সে গিয়েছিল ছোট চাচ্চুর বাসায়।
ঢাকার বনশ্রীতে ছোট চাচ্চুর বাসা। ঢাকায় গিয়ে সে কোথাও ঘুরতে পারছে না। আব্বু তার কলিগদের নিয়ে পিকনিকে কুয়াকাটা চলে গেছে। আম্মুও জরুরী ভিত্তিতে রাজশাহীতে ফিরে যাচ্ছে। রুহামার ছুটিটাই যেন মাটি হয়ে গেল। এমন সময় রাফিন ওকে ফোন করে জানতে চাইলো এখন যদি আমি ঢাকাতে থাকতাম তাহলে কেমন হতো? রুহামা তখন আহ্লাদি গলায় বললো ভাইয়া তাহলেতো খুবই ভালো হতো। তোমার সাথে সারা ঢাকা ঘুরে বেড়াতাম। রুহামা জানে এখন ভাইয়ার ছুটি নেই। সুতরাং চাইলেও সে রুহামাকে সারা ঢাকা ঘুরিয়ে দেখাতে পারবে না। তাছাড়া ভাইয়ার পোস্টিং ও ঢাকার বাইরে। কিন্তু ছোট বোনের মনের কথাটা জানতে পেরে আগেই রাফিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বোনকে সারপ্রাইজ দিবে। তো সত্যি সত্যিই অফিস থেকে ছুটি নিয়ে সে ঢাকায় গিয়ে হাজির। আম্মু তখন রাজশাহীতে আর আব্বু তখন কুয়াকাটায়। রাফিন ছোট চাচ্চুর বাসা থেকে রুহামাকে নিয়ে ঢাকার কিছু জায়গাতে ঘুরিয়ে দেখালো। শুরুতে সে গেলো বাংলামোটর। ওখানে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সপ্তম তলাতে বাতিঘর নামে খুব সুন্দর একটা লাইব্রেরী আছে। রুহামাকে সেখানে নিয়ে গেলো। ঘুরে ঘুরে বই দেখলো, ছবি তুললো তারপর রুহামার পছন্দ মত কিছু বই কিনে বেরিয়ে আসলো। এবার গন্তব্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন জায়গা ঘোরার পর রাফিন ওর ছোট বোনের কাছে জানতে চাইলো সিনেমা দেখবে কি না? রুহামাতো এক বাক্যে রাজি। এই সুযোগ কি আর সে হাতছাড়া করে? কখনোই সে সিনেপ্লেক্সে মুভি দেখেনি। ফলে আর সব বাদ দিয়ে সে সিনেমা দেখাকেই প্রাধান্য দিলো। ভাই বোন মিলে রিকশা নিয়ে চলে গেলো বসুন্ধরা সিটিতে। রুহামার ইচ্ছে ছিল বাংলা সিনেমা দেখার। বিশেষ করে ওই সময়ে শাকিব খানের কোনো একটি সিনেমা চলছিল যা দেশ ব্যাপী বেশ আলোচিত ছিল। কিন্তু গিয়ে দেখা গেলো টিকেট নেই। ফলে উপায় না থাকায় ফাইনাল ডেস্টিনেশন নামে হলিউডের একটি সিনেমা দেখলো। সেবার রুহামাকে নিয়ে ঢাকায় ঘুরে ঘুরে ছবি তুলে বড় আপার হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়েছিল রাফিন। রাফিনের ব বোনের নাম রোমানা। রোমানা আপার ছেলেই জিসান। মায়ের ফোন সারাক্ষণ বলতে গেলে তার হাতেই থাকে। সে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো মামা আর ছোট খালামনির ঘুরে বেড়ানোর ছবি দেখে মামার উপর ব্যাপক ক্ষ্যাপা। মামার সাথে কথাই বলবে না। সে কেন শুধু রুহামাকে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে। তাকে কেন ঘুরতে নিয়ে যায়নি এই নিয়ে তার অভিযোগের শেষ নেই। রাফিনকে কথা দিতে হয়েছে এবার ছুটিতে আসলেই জিসানকে ঘুরতে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু রাফিনতো জানে জিসানকে সে আসলে ঘুরতে নিয়ে যেতে পারবে না। তার সেই পরিমান সময় হবে না। এক দুদিনের ছুটিতে হুটহাট করে বাসায় আসে। তখন জরুরী কাজগুলোই ঠিকমত করার সময় মেলে না। ফলে জিসানকে ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার সুযোগও তার হয় না। ভাগ্নেকে খুশি রাখার জন্যই তাই রেস্টুরেন্ট থেকে ওর পছন্দের খাবার নিয়ে আসা।
আদিবার সাথে সব সময় ভিন্ন ভিন্ন রেস্টুরেন্টে বসতে পছন্দ করে রাফিন। এবার সে বসেছিল ক্যালিস্ট্রোতে। সম্ভবত এই প্রথম রাফিন অবাক হয়ে দেখলো ক্যালিস্ট্রোতে গিয়ে সাথে সাথে বসার মত টেবিল ফাকা পেলো। প্রতিবারই বোনদেরকে নিয়ে যখনই ওখানে যায় দেখা যায় কোনো টেবিল ফাঁকা নেই। এবার অবশ্য ভাগ্য সুপ্রসন্ন বলা চলে। গিয়েই টেবিল ফাঁকা পেয়েছিল। দুদিন হলো আদিবার শরীর খারাপ । রাফিন কিংবা আদিবা দিনের শুরুতেও আশা করেনি ওদের দেখা হবে। আদিবার শরীর তখন এতোটাই খারাপ ছিল। কিন্তু কথা দিয়েছিল বলে বিকেলের দিকে শরীর খারাপ থাকা সত্তেও আদিবা বের হয়েছিল। এখানে সেখানে ঘোরার পর ক্যালিস্ট্রোতে গিয়ে বসেছিল। আদিবা কিছু খেতে চায়নি। রাফিনের ঘ্যানঘ্যান করার কারণে শেষে খেতে রাজি হলো। পরদিন দুপুরের ট্রেনে রাফিনের ফিরে যাওয়ার কথা। কদিন আগেই ছোট বোন রুহামার জন্মদিন গেল। জন্মদিনে বোনকে কিছু উপহারও দেওয়া হয়নি। জন্মদিনে উইশ করতেও দেরি করে ফেলেছিল। তাতেই বোন মুখ গোমরা করে রেখেছিল। বলেছিল ভাইয়া তোমার সাথে আড়ি। তুমি আমার জন্মদিনে উইশ করতে এতো দেরি করলে কেন? তখনই রাফিন ওকে কথা দিয়েছিল ১৯ তারিখ রাতে তোকে জন্মদিনের ট্রিট দেবো। বিষয়টা মাথায় রেখেই রাফিন আদিবাকে বললো রুহামাকে ডাকবে কি না? সেদিন আদিবার কী হয়েছিল তা রাফিন জানে না। বলার সাথে সাথে আদিবা রাজি হয়ে গেল। অথচ আর আগে কতবার বলেছে বোনদের ডাকি? একসাথে খাই? কিন্তু আদিবা কখনোই রাজি হয়নি। এবার আর সে না করলো না। রুহামাকে ফোন করলো রাফিন। ফোন ধরলো বড় আপা। কিন্তু ওকে আসতে দিতে রাজি হলো না। রাফিন গিয়ে নিয়ে আসতে পারলে কোনো অসুবিধা হতো না। কিন্তু সন্ধ্যার পর একা একা আসতে দিতে রাজি হলো না আপা। শেষে রুহামা আর জিসানের সাথে কথা বলে ওদের পছন্দের খাবার নিয়ে যাওয়ার কথা দিতে হলো।
ক্যালিস্ট্রেতে বসে গল্প করতে করতে অনেক সময় পেরিয়ে গেলে তারপর অর্ডারকৃত খাবার এলো। রাফিন নিজ হাতে আদিবার প্লেটে খাবার তুলে দিল। ফ্রাইড রাইস, চিকেন,ভেজিটেবল আর কী কী যেন। দুজন খাওয়া শেষ করতে করতেই রুহামাদের জন্য পার্সেল রেডি করে টেবিলে রেখে গেলো বেয়ারা। খাবারের ফাঁকেই আদিবা জানতে চাইলো এখান থেকে রাফিন সোজা বাসায় চলে যাবে কি না? আদিবার মনের কথাটা বুঝতে পারলো রাফিন। আদিবা চাইছিল আরও কিছু সময় রাফিনের সাথে কাটাতে। যদি খাওয়া শেষে সোজা বাসায় চলে যায় তাহলেতো আর সময় কাটানো হবে না। আদিবার শরীর খারাপ না থাকলে হয়তো সকালেই বের হতে পারতো। তাহলে সারাদিন ঘুরতে পারতো, গল্প করতে পারতো। সেটাতো সম্ভব হয়নি। আদিবার মনের ভাব বুঝতে পেরে রাফিন বললো এক কাজ করলে কেমন হয়? তুমি আর আমি রিকশা করে বাসায় গিয়ে খাবারগুলো দিয়ে তারপর আবার বেরিয়ে পড়বো। এতে করে খাবার গুলোও ঠান্ডা হয়ে যাবে না আবার দুজনের আরও কিছু সময় ঘোরাও হবে।প্রস্তাবটা আদিবার মনের মত ছিল। ফলে সে সম্মতি দিলো। ক্যালিস্ট্রো থেকে বেরিয়ে রিকশা নিয়ে ওরা রওনা হলো শালবাগান পাওয়ার হাউস মোড় আসাম কলোনিতে। ওখানেই রাফিনদের বাসা। রাফিন জানতো আদিবা এখন বাসায় যাবে না। তাছাড়া আম্মু বা বড় আপা কাউকে ও আসবে এটা বলাও হয়নি। অবশ্য বললেও আদিবা যেতো না। ওর এভাবে যেতে বিব্রত লাগতো। তারপরও রাফিন একবার রিকশা থেকে নেমে আদিবাকে বললো চলো বাসায়? কয়েক মিনিট বসে না হয় বের হইও? কিন্তু আদিবা রাজি হলো না। ওকে দাঁড় করিয়ে রেখে দ্রুত পায়ে বাসার গেটে গিয়ে কলিংবেল চাপলো। জিসান গেট খুলে দিতেই রাফিন ভিতরে ঢুকে ডাইনিং টেবিলের উপর খাবারের প্যাকেটগুলো রাখলো। আম্মু তখন ডাইনিংএ বসে ছিলেন। কয়েকদিন হলো বড় খালা এসেছেন। দুই বোন মিলে গল্প করছিল। খাবার আনতে দেখে আম্মু বললো এতো সব আনছো কেন? রাফিন মুখে হাসি টেনে বললো রুহামা আর জিসানকে এবার বাইরে নিতে পারেনি তাই এনেছে। তারপর বললো আম্মু আমি আবার একটু বাইরে যাচ্ছি। পরে ফিরবো। আম্মু হয়তো যা বুঝার বুঝলো।
রাফিন বেরিয়েই অন্ধকার গলি দিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ালো। আদিবাকে যেখানে দাঁড় করিয়ে রেখে গিয়েছিল সেখানে কেউ নেই। চারদিকে কোথাও কেউ নেই। মোবাইল হাতে নিয়ে কয়েকবার কল করলো। কল ঢুকছে কিন্তু রিসিভ করছে না দেখে রাফিনের চিন্তা বেড়ে গেল। সে দ্রুত পায়ে পাওয়ার হাউস মোড়ের দিকে গিয়ে ভালোভাবে দেখলো। না কোথাও আদিবার দেখা পেলো না। এমন সময় আবার সে কল করলো এবং আদিবাকে ফোনে পেলো। আদিবা রহস্য করে বললো আমিতো হারায় গেছি। পথ খুঁজে পাচ্ছি না। রাফিন উদ্বেগের সাথে জানতে চাইলো তুমি কোথায়। কথা বলতে বলতে আবার সে বাসার দিকে হাটতে শুরু করলো। ঠিক যেখানে আদিবাকে রিকশা থেকে নেমে দাড়াতে বলেছিল সেখানে আসার পর দেখা গেল আদিবা বাসার পূর্ব দিকে একটু দূরে থাকা গলি থেকে বের হচ্ছে। সে মূলত রাফিনকে ঘাবড়ে দেওয়ার জন্য এমনটা করেছিল। রাফিন কপট অভিমান করে বললো এরকম করা ঠিক হয়নি আদিবা। তারপর দুজন হাটতে হাটতে পাওয়ার হাউস মোড়ের কাছে আসলো। এবার একটা রিকশা নেওয়ার পালা। এমন সময় রাফিনের মনে পড়লো আদিবা তার কাছে কিছু একটা আব্দার করেছিল। এখন সেটা পূরণ করার সময়। রাফিন আরেকবার আদিবার কাছ থেকে ডিটেল জেনে নিয়ে পাশের দোকানে গিয়ে দাঁড়ালো। জীবনে এই অভিজ্ঞতা আগে কখনো হয়নি। রাফিন দোকানদারকে বললো দুটো ব্যাঞ্চন লাইট আর দুটো গোল্ডলিফ সিগারেট দিন! রাফিন কখনোই সিগারেট খেতো না। তার জীবনে সিগারেট খাওয়ার দুটো গল্প অবশ্য আছে। স্কুলে পড়া অবস্থায় ওদের স্কুল কমিটির নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিল ওর বন্ধুর বাবা। ওর আর ওর বন্ধুদের দায়িত্ব পড়েছিল সিগারেট পান এগুলো বিতরণ করা। বিতরণ করতে করতে অনেক গুলো বেচে গিয়েছিল। সেবার বন্ধুরা মিলে একসাথে একবারে কে কতগুলো সিগারেট খেতে পারে তার প্রতিযোগিতা করেছিল। সেটা অবশ্য সিগারেট খাওয়া বলা চলে না। এক মুঠো সিগারেট একসাথে আগুন দিয়ে নষ্ট করা। আর আরেকটা স্মৃতি অবশ্য আরও আগের। রাফিনের বাবা সিগারেট খেতেন। সে অন্যদের কাছ থেকে ঘটনাটা শুনেছে। একবার রাফিনের বাবা তার এক কলিগের সাথে উঠোনে বসে সিগারেট খাচ্ছিল। রাফিন তখন তিন চার বছর বয়সী। সে গিয়ে বাবার বন্ধু বা কলিগকে গিয়ে বলেছিল আংকেল আমাকেও একটা সিগারেট দিন। আমিও খেতে চাই। এই ঘটনার পর থেকে নাকি রাফিনের বাবা আর কখনো সিগারেট খাননি। সেই দিনের পর এই প্রথম সে সিগারেট হাতে নিল। আর জীবনে প্রথম সিগারেট কিনলো। তাও নিজের জন্য না বরং আদিবার ইচ্ছে পূরণের জন্য।
লেখা চলমান——–

