Home Blog Page 18

যাদুকরের প্রথম দিন গুলি

ছয় বছর বয়সী ছেলেটা বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হতো।বাবা তখন ছয় বছর বয়সী ছেলেকে খুশি করার জন্য যাদুর কাঠি হাতে সামনে এসে দাড়াতো।যাদুর কাঠি বলতে বাবা তিনটা সাধারণ ম্যাজিক ট্রিক দেখাতো। সেই সাধারণ ট্রিক তিনটাই ছয় বছর বয়সী ছেলেটার চোখে মায়া এনে দিত। তার পর একটু একটু করে সেই ট্রিকগুলো শিখে নিয়ে বন্ধুদের দেখিয়ে তাদেরকে হতবাক করে দিত ছেলেটি। একদিন স্কুলের এক শিক্ষক জানতে পারলো তার এক ছয় বছর বয়সী ছেলে যাদু দেখাতে পারে এটা শুনে তিনি ক্লাসের সবাইকে জড় করে তাকে বললেন ম্যাজিক দেখাতে।ছেলেটি উৎসাহ পেয়ে তার দেখানো যাদু তিনটা দেখিয়ে সেদিন সবাইকে মুগ্ধ করে দিল।একটু একটু করে ম্যাজিকের প্রতি নেশা ধরে গেল।ভালবাসা হয়ে গেল ম্যাজিক। এভাবেই ম্যাজিকের সাথে সখ্যতা গড়ে উঠলো ছেলেটির।বড় হয়ে সেই ছেলেটি হয়ে গেল খ্যাতিমান যাদুকর প্রিন্স হারুন।

বই নিয়ে “আমার কিছু বলার ছিল”

আজই শেষ করলাম আনিসুল হকের লেখা “সেলাই” উপন্যাসটি। পড়ে কেমন লেগেছে তা জানানোর জন্যই মুলত আজকের এই লেখাটি। হতে পারে এই লেখা পড়ে কারো কারো উপন্যাসটি পড়তে ইচ্ছে করবে। আবার এও হতে পারে আমার উপস্থাপনার দুর্বলতার কারণে অনেকেই বইটি পড়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। কিন্তু এই বইটির পটভূমিই হয়তো আমার রিভিউয়ের দুর্বলতা থাকার পরও পাঠককে পড়তে আকৃষ্ট করবে।

সেলাই শব্দটি যখন শিরোনাম হিসেবে দেখি তখন মনে হতেই পারে এটি একটি ছোট গল্প।ছোট গল্প না হলেও হতে পারে একটি বড় গল্প।কিন্তু সেলাই আনিসুল হকের একটি উপন্যাস। তবে ভিন্ন ভাবে দেখলে এটিকে বড় গল্প বললেও ভুল হবেনা।যেমন সাহিত্য সমালোচকদের অনেকেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কোন কোন উপন্যাসকে বড় গল্প বলে উল্লেখ করেছেন।কিন্তু গল্প বা উপন্যাসকে ছাপিয়ে গেছে এই লেখাটি। এটি একটি গল্প হয়েও গল্প নয়, আবার একটি উপন্যাস হয়েও উপন্যাস নয়।সেলাই শিরোনামের আড়ালে পরতে পরতে লুকিয়ে আছে কষ্টের কথা।যা কেবল মাত্র গল্প উপন্যাসের মত ক্রমাগত ভাবে বলে যাওয়া কোন দুঃখের কল্পিত কাহিনীই নয় এটি সত্য ঘটনা।

স্বজন হারানোর ইতিহাস বাংলাদেশে বহুকালের পুরোনো রীতিই হয়ে গিয়েছিল।কিন্তু বিগত সময়ে স্বজন হারানোর ব্যথার সাথে এবারেরটার আকাশ পাতাল ব্যবধান।বিগত সময়ে আমরা হয় ভাষার জন্য স্বজন হারিয়েছি নয়তো একটি স্বাধীন দেশের জন্য স্বজন হারিয়েছি। কিন্তু আনিসুল হকের লেখা সেলাই উপন্যাসটির পটভূমিও স্বজন হারানো বিয়োগ ব্যথার সমন্বয়।রানা প্লাজা নামটি বললেই এ দেশের মানুষের মনে ভেসে ওঠে সেই হঠাৎ নেমে আসা বিপদের স্মৃতি।

সাধারণত সবাই জানে রানা প্লাজা শুধু শুধু ভেঙ্গে পড়ে অনেক মানুষ মারা যায়নি বরং এক ভাবে বলা চলে মানুষ গুলোকে মেরে ফেলা হয়েছে। কারণ ভবনে ফাটল ধরার পর পুরো ভবনটি অনিরাপদ ঘোষণা করার পরও পোষাক শিল্পমালিকেরা জোর করে শ্রমিকদের কাজে যেতে বাধ্য করেছিল এবং নিজেদের সংসার নিজেদের চাকরি বাঁচাতে বাধ্য হয়ে সেদিন তারা কাজে গিয়েছিল। সেই যে বাড়িতে বলে গিয়েছিল ফিরে আসবে কিন্তু আসতে পারেনি।ঢুকবো কি ঢুকবোনা এই দ্বিধা মনে নিয়ে কাজে ঢুকে না ফেরার দেশে চলে গেল কত জন। কতজন বেচে থেকেও মরার মত বেচে আছে আজও সেই ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে।

সময়ের আলোচিত লেখক আনিসুল হক রানা প্লাজার সেই মর্মান্তিক ঘটনাকে পুজি করে লিখেছেন তার সেলাই উপন্যাসটি।সেলাই উপন্যাসটিতে একক ভাবে কোন কেন্দ্রিয় চরিত্র নেই। আবার নেই বললেও ভুল হবে কেন্দ্রিয় চরিত্রতো স্বয়ং রানা প্লাজা।তৎতালিন সময়ে দেশে বিদেশে সব থেকে আলোচিত ছিল এই রানা প্লাজা। দশতলা ভবন ধ্বসে যে পরিমান মানুষ মারা গিয়েছিল তা ইতিহাসে দ্বিতীয়টি নেই।মানুষের বেচে থাকার যে আকুতি সেদিন বেরিয়ে এসেছিল ধ্বসে পড়া ভবনের ভিতর থেকে তা শুনলে যে কোন পাষাণ হৃদয়ও কেদে উঠতো।

উপন্যাসে দেখতে পাই এমন একজনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে যার ব্যাগে একটা ভাজ করা চিঠি ছিল যে তার মাকে লিখেছে সে যে মাসে ৬০০ টাকা বাড়িতে পাঠায় তা থেকে কিছু কিছু বাচিয়ে যেন ডাক্তার দেখায়।আর বেতন বাড়লে সে আরো বেশি করে টাকা পাঠাবে বাড়িতে।চিঠিটা তার মায়ের হাতে পৌছার আগেই সে না ফেরার দেশে চলে গেল।যার উপর নির্ভর করে বেঁচে ছিল পুরো পরিবার।বিঁজলী নামে যে চরিত্রটিকে আমরা দেখতে পাই সে সন্তান সম্ভাবা। তার স্বামী নজিবর রানা প্লাজাতেই একটা গার্মেন্টসে চাকরি করে।সেদিনও কাজে যাবার আগে দুজনের মধ্যে কথা হয় ছেলে হলে নাম রাখবে শাকিব কারণ নায়ক শাকিব খানকে তাদের ভাল লাগে। আর মেয়ে হলে রাখবে মৌসুমী।নজিবর আর ফিরে আসেনা।বিজলী ঠিকই একদিন শাকিবের মা হয় কিন্তু নজিবর আর বাবা ডাক শুনতে পারেনা।

রানা প্লাজায় সেদিন যারা উদ্ধার কাজে যুক্ত ছিল তাদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে দাউদ নামে একজন ছিল যে রানা প্লাজার একটা প্রতিষ্ঠানের মাইক্রো চালাত আর তার স্ত্রী ওখানে কাজ করতো।সে স্ত্রীকে খুজছে কিন্তু পাচ্ছেনা।তা বলে সে থেমে নেই। যাকে জীবিত পাচ্ছে উদ্ধার করছে যার লাশ পাচ্ছে সেটাও সে উদ্ধার করছে।এভাবে সে প্রায় ভুলেই যায় তার স্ত্রীও চাপা পড়েছে। সে যখন আশা ছেড়েই দিয়েছিল তখন দেখা গেল তার স্ত্রী বেঁচে আছে।বেঁচে থাকার যে কী আনন্দ তা কেবল তখনই বুঝতে পারে।

রাশেদা নামে যে চরিত্রটিকে দেখতে পাই সে বাচার আকুতি জানায় আর সবার মত। সে বলে তার দুই পা চাপা পড়েছে। দরকার হলে পা দুটো কেটে হলেও তাকে বাচানো হোক।লোকাল এনেসথেসিয়া দিয়ে সাবের নামের উদ্ধার কর্মীটি লোহা কাটার করাত দিয়ে তার দুই পা কেটে শরীর থেকে আলাদা করে।দুজনকে যখন বের করে আনা হয় তখন সাবের জ্ঞান হারায়।

পুরো উপন্যাস জুড়ে রানা প্লাজার ভয়াবহতা ফুটে উঠেছে। কোথাওবা আনন্দও আছে। যখন একজন জীবিত উদ্ধার হচ্ছে তখন যেন চারদিকে লটারি জেতার মত আনন্দ।আবার কিছুক্ষনের মধ্যেই শোকের ছায়া নেমে আসছে।যখন একটা লাশ বের করে আনা হচ্ছে।

ঘটনাচক্রে দেখা যায় এক সালামের লাশ নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে বিরোধ লেগে যায়। শেষ পযর্ন্ত যে পরিবার সালামের লাশ নিয়ে গিয়ে কবর দেয় তারা সরকারী ভাবে কিছু অনুদানও পাচ্ছে। এমন এক রাতে সালাম ফিরে আসে বাড়িতে।তার স্ত্রী দরজা খুলে দেখে তার স্বামী জীবিত ফিরে এসেছে। এটা তার কাছে বিস্ময়কর। সে তবে কার লাশ নিয়ে এসে কবর দিয়েছে?সালাম ভাগ্য গুনে বেঁচে গিয়েছিল।তাকে রানা প্লাজাতেই যেতে হয়নি। সে মলম পার্টির কবলে পড়ে একদিন অচেতন হয়ে ছিল ফলে সে ধ্বংসজজ্ঞ থেকে বেচে গেছে। কিন্তু লোক জানাজানি হলে পাওনা টাকাটা পাবেনা ভেবে সে রাতের আধারেই সীমান্তের কাছে বোনের বাসায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। যেন তিন চার মাস পর টাকাটা হাতে আসলে ফিরে যেতে পারে। অন্যদিকে দেখতে পাই সত্যিকারের যে সালাম মারা গিয়েছিল তার পরিবার হাহুতাশ করে।তারা কি এক জীবনে কোন দিন তাদের সালামের লাশটাও পাবেনা!

রানা প্লাজায় যত বেওয়ারেশ লাশ ছিল তাদের শেষ পযর্ন্ত স্থান হয়েছিল জুরাইন কবরস্থানে।হয়তো অন্যান্য কবরস্থানেও ঠাই হয়েছিল।যে ছোট্ট শিশু শাকিবের জন্ম হলো সে আজীবন অপেক্ষা করেও তার বাবাকে ফিরে পাবেনা।

আনিসুল হক তার সেলাই উপন্যাসটি লিখতে গিয়ে তৎকালিন সময়ে প্রকাশিত প্রথম আলোর সংসাদ হুবহু ব্যবহার করেছেন আবার কোথাও অনুলিখন করেছেন যা তিনি শুরুতেই পাঠককে বলে রেখেছিলেন।

সেলাই উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে বার বার ভেসে উঠছিল রান্না প্লাজার রক্তাক্ত ক্ষতবিক্ষত সেই সব হতভাগা মানুষের মুখ।এটি তাই একটি উপন্যাসের আড়ালে হয়ে উঠেছে একটি বেদনার কাব্য। এটি হয়ে উঠেছে স্বজন হারানো মানুষের স্মৃতি হাতড়ে বেঁচে থাকার মত একটি বই। তবে আনিসুল হক রংপুর ও তার আশেপাশের আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমার মনে হয়েছে কোথাও কোথাও আপনি তুমিতে কিছুটা সমস্যা করে ফেলেছেন।যদিও আমি ঠিক এ ব্যপারে সঠিক কিছু বলতে পারছিনা।

যেমন এক স্থানে তিনি লিখেছেন “তাকে শ্বাস নিতে হয় জোর করে।তার কষ্ট হয়।তার উপরে যদিল এই ভাবে কাউয়ায় ডাকপাড়ে,বুকটা ধরাস করি উঠে কিনা কন”।এখানে কিন্তু বিজলী নিজে কথা গুলো বলছেনা যে সে কাউকে প্রশ্ন করবে “বুকটা ধরাস করে উঠে কিনা কন”। কারণ তখন বিজলীর সামনে কেউ বসা ছিলনা এবং সে কারো সাথে কথাও বলছিলনা। দেখা যাচ্ছে লেখক বা বর্ননাকারী নিজে বলছেন।ওখানে শুরুতে তিনি স্বাভাবিক ভাষায় বলে শেষে এসে আবার আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করেছেন যা সংগত হয়নি।

সেলাই উপন্যাসে আরো যে অংশটি যুক্ত হতে পারতো তা হলো উদ্ধার কাজ শেষ হওয়ার পরও অগণিত মানুষ আজীবনের জন্য নিখোজই থেকে গেল সেটার বিস্তারিত বনর্না।থাকতে পারতো জুরাইনে পরিচয়হীন যে সব লাশ দাফন করা হয়েছিল তার বর্ননা। থাকতে পারতো কোন ধরনের সন্ধানই পাওয়া যায়নি এমন পরিবারের আরো কিছু কথা।কিন্তু সেসব কথা না থাকার পরও এটিকে ছোট চোখে দেখার উপায় নেই।রানা প্লাজা বাংলাদেশের মানুষের কাছে একটি অভিশপ্ত নাম। সেই অভিশপ্ত নামটি যেন কোন দিন হারিয়ে না যায় তার একটি ব্যবস্থা করে দিয়েছেন আনিসুল হক।সেই সব অগণিত স্বজন হারানোমানুষ গুলি ‘সেলাই’ উপন্যাসটি হাতে নিয়ে স্মৃতিকাতর হতে পারবেন। ফিরে যেতে পারবেন তাদের হারিয়ে যাওয়া প্রিয়জনের কাছে যাদেরকে তারা রানা প্লাজার মাটির নিচেয় আজীবনের জন্য মিশিয়ে দিয়ে এসেছেন।
————————————————————-

#জাজাফী
২৩ এপ্রিল ২০১৭
—————————————————–
উপন্যাসঃ সেলাই ।
লেখকঃ আনিসুল হক (Anisul Hoque)।
পটভূমিঃ রানা প্লাজা।

আনিসুল হকের মা উপন্যাস

 

এই মাত্র পড়ে শেষ করলাম মা উপন্যাসটি।বহু বছর আগে ম্যাক্সিমগোর্কির লেখা বিশ্ববিখ্যাত উপন্যাস “মা” পড়েছিলাম।তখন আমার বয়স অনেক কম ছিল এবং সাহিত্য তখন এখনকার চেয়েও অনেক কম বুঝতাম।যদিও এখনো বলার মত তেমন কিছু বুঝিনা তার পরও পড়াশোনার পরিধি বাড়ার পাশাপাশি বয়সের ছুটেচলায় কিছুটা বুঝতে শিখেছি।আনিসুল হকের লেখা মা উপন্যাসটিকে তাই বিশ্বসাহিত্যের অংশ বলে মনে করতে আমার দ্বিধা হয়না।শুনেছি অলরেডি অনেক গুলো ভাষায় উপন্যাসটি অনুদিত হয়েছে।বিশ্বের অগণিত ভাষার অগণিত সাহিত্য প্রেমিদের হাতে এই বইটি তুলে দেওয়া উচিত।

এতো বিখ্যাত উপন্যাস হওয়ার পরও কিভাবে কিভাবে যেন আমিও প্রায় চৌদ্দ বছর পার করে দিয়েছি এটা পড়তে। এটাওকি কোন কাকতালীয় ব্যপার কিনা জানিনা।মা উপন্যাসের গল্প আমি অনেক আগেই শুনেছি।এবং অনেকবার শুনেছি স্বয়ং লেখকের মুখে।ভাষা প্রতিযোগ কিংবা গণিত উৎসবে আনিসুল হক যখন বলতেন আজাদের মায়ের ভাত না খাওয়ার গল্প তখন চোখ দিয়ে পানি চলে আসতো।শুধু ওইটুকু কথা শুনেই এতো ভালবাসা জমে গিয়েছিল তা বলার নয়।কত মানুষের কাছে কথা গুলো বলেছি তার হিসেব নেই।কোন এক অজ্ঞাত কারণে এই লেখাটি পড়তে এতো দেরি হলো।দেরি হলেও যে পড়তে পেরেছি এখন ভাল লাগছে।

প্রথম দিকে লেখকের বর্ননা থেকে আজাদের মাকে আমার কেন যেন ভাল লাগছিলনা। বার বার মনে হচ্ছিল তিনি ততোটা দেশ প্রেমী নন যতটা হওয়ার আশা করেছিলাম। কারণ তিনি কেবল ছেলের কথা ভাবতেন,ছেলেকে আগলে রাখতে চাইতেন এবং ছেলে যেন বাইরের সব কিছু থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখে সেই চেষ্টা করতেন।উপন্যাসের ওই সব অংশ পড়তে গিয়ে বার বার রাগ হয়েছে।অবশ্য রাগ হওয়াটাই স্বাভাবিক।আমিওতো চাই মা বলুক যা দেশের জন্য যুদ্ধ কর,ঠিক যেমন আজাদ করেছিল।কিন্তু মা তাকে কিছুতেই মিছিল মিটিংএ যেতে দিতে আগ্রহী ছিলেন না।

যে মা একমাত্র ছেলেকে নিয়ে এক কাপড়ে বড়লোক স্বামীর ঘর ছেড়ে চলে আসতে পারেন তিনি অত্যন্ত কঠোর এবং একরোখা এটা ভাবাই যায়।আজাদের বাবা আজাদের মাকে ফিরিয়ে নেওয়ার অনেক চেষ্টা করেছেন।কুটবুদ্ধিতে কান দিয়ে তিনি প্রথমে আজাদকে মায়ের কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দিতে চেয়েছেন এবং তিনি আজাদকে করাচিতে পাঠিয়ে আজাদের মাকে একাকী করে দিয়ে বিষন্ন করতে চেয়েছেন। ভেবেছিলেন এতে তিনি হয়তো ফিরে যাবেন কিন্তু আজাদের মা সাফিয়া বেগম হার মানেন নি।তার পর আজাদের বাবা কুটবুদ্ধি শুনে তাকে তার বাড়ি ছাড়াও করেছেন কিন্তু কিছুতেই তাকে টলানো যায়নি। আলিশান বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসার সময় তিনি বলেছিলেন বেচে থাকতে আজাদের বাবা তার মুখ দেখতে পারবে না সত্যি সত্যিই তিনি সেটাই দেখিয়েছেন।

যুদ্ধ শুরু হলে আজাদের মাকে আমি অন্যরুপে দেখতে পেলাম।অনায়াসেই তিনি আজাদকে যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি দিলেন।তবে তিনি পীর সাহেবকে খুব মান্য করতেন।পীর সাহেব বলেছিলেন বলেই তিনি আজাদকে যুদ্ধে যেতে দিয়েছিলেন।সম্মুখ সমরে আজাদ খুব বেশি অংশ নেওয়ার সুযোগ না পেলেও মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে আজাদ অনেক স্মরণীয় একটি নাম। এক মা যে তার ছেলেকে বলে বাবা শক্ত হয়ে থাকিস।কোন কিছু স্বীকার করিস না সেই মা কে সালাম জানাই।

আনিসুল হকের লেখা সব থেকে নামকরা বই এটা।সবাই এটিকে উপন্যাস বলে পরিচয় করিয়ে দিতে চাইলেও আমি এটাকে কেবল মাত্র উপন্যাসের তকমায় আটকে রাখতে চাইনা।আমার মতে এটি ইতিহাসের একটা আকর।মুক্তিযুদ্ধের অনেক কথা এই বইয়ে আমি জানতে পেরেছি। লেখক সব শেষে গ্রন্থপুঞ্জি দিয়ে আরো উপকৃত করেছেন।ফলে মুক্তিযুদ্ধকে জানতে আগ্রহীরা ওই রেফারেন্স বই গুলোও পড়ে দেখতে পারবে।

পৃথিবীর প্রতিটি মাই অসাধারণ।তবে আজাদের মা একটু বেশিই অসাধারণ ছিলেন।সবাই জানতো তার একটি মাত্র সন্তান আজাদ কিন্তু আদতে তার ছিল অনেক সন্তান। যেন পুরো মুক্তিবাহিনীই ছিল তার সন্তানে ভরপুর।আজাদের বন্ধুদের কেউ কেউ যেমন তাকে আম্মা বলে ডাকতো তেমনি আজাদের কাজিনদের অনেকেই তাকে আম্মা বলেই ডাকতো। সব মিলিয়ে তিনি ছিলেন সবার মা।বঙ্গ মাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিবকে কেন বঙ্গমাতা বলা হয় জানিনা তবে শহীদ আজাদের মাকে বঙ্গমাতা বললে এতটুকুও ভুল হবেনা।

আনিসুল হকের অনেক বই আমি পড়েছি এবং এখনো পড়ছি। সেই সব বইয়ের মধ্যে অসাধারণ অনেক বই আছে।মা বইটি তার লেখা হাতে গোনা কয়েকটি সেরা বইয়ের একটি।মুক্তিযুদ্ধ এবং এক অসাধারণ মায়ের গল্প তিনি তুলে ধরেছেন সুনিপুন ভাবে। লেখক আনিসুল হক তার লেখা মা বইটার মাধ্যমে মূলত আজাদ হয়েই ফিরে এসেছেন আমাদের মাঝে। আজাদ বলেছিল যদি সে বিখ্যাত হয় তাহলে তার মাকে নিয়ে লিখবে এবং সেটা বিশ্ববাসী জানবে। আজাদ নেই,আজাদের মায়ের অগণিত সন্তানের মধ্য থেকে একজন আনিসুল হক আজাদের হয়ে কিংবা আজাদ রূপে আবির্ভূত হয়ে সেই মায়ের কথা লিখেছেন আন্তরিকতার এতটুকুও কমতি না রেখে।

পাঠক মাত্রই তাই মা উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে চোখে জল ফেলবে।আমি এখনো জাহানারা ইমামের লেখা “একাত্তুরের দিনগুলি” পড়িনি।হয়তো কাল পরশু থেকেই পড়তে শুরু করবো।মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলির কথা জানতে মনটা অস্থির থাকে। আজাদদের কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার সীমা নেই। তাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে একটা স্বাধীন দেশ পেয়েছি সে জন্য আমরা তাদের কোন দিন ভুলবো না।


মা

আনিসুল হক

২২ এপ্রিল ২০১৭ রাত ৩.২৭


 

আজ সন্ধ্যায় সেখানেই যাব

আজ সন্ধ্যায় সেখানেই যাব,স্মৃতিতে বুলাবো হাত
যেখানে তোমারে ফেলে এসে রোজ করেছি অশ্রুপাত।

যে নদীর জলে তোমার দু’পা খুঁজে পেতো কত সুখ
আজ সন্ধ্যায় সেখানেই যাব,যেতে আমি উন্মুখ।

আকাশে আজকে তারা জ্বলবেনা,থাকবেনা কোন চাঁদ
যতক্ষণ খুশি বসে রবো একা,কারো নেই প্রতিবাদ।

আজ সন্ধ্যায় সেই আঙ্গিনাতে কেবলই থাকবো একা
একাকী কাটাবো এই কথাটাতো বহুকাল আগে লেখা।

যখন ভোরে পুবের আকাশে উঠবে আলোর রবী
সেই আলোতে মুছে যাবে জানি কল্পনা রং ছবি।

আজ সন্ধ্যায় সেখানেই যাব,যেখানে তুমিও যেতে
একদিন যেথা সারাটা গোধুলী উঠেছি দুজনে মেতে।
——
২১-০৪-২০১৭
#জাজাফী

শুরু করুন,সফলতা আসবেই।

চারদিকে হতাশার গ্লানি নিয়ে কোন মতে বেঁচে আছে অনেকেই।যাদের অধিকাংশই মনে করে জীবন বুঝি শেষ হয়ে গেল।কিংবা যারা এখনো মনে করছে তারা হয়তো জীবনে কিছুই করতে পারবে না তাদের জন্য ছোট্ট একটা গল্প বলতে চাই। গল্প হলেও সত্য। আমাদের এক বড় ভাই তার নাম রাকিন।রাকিন ভাই শাহজালাল ইউনিভার্সিটিতে কোন একটা বিষয়ে পড়াশোনা করতো।বিষয়টা ছিল অপেক্ষাকৃত কম মুল্যের।তিনি কোন টিউশনীও করতেন না।সারাদিন কম্পিউটার নিয়ে পড়ে থাকতেন।

পাশাপাশি রাকিন ভাইয়ের এক বন্ধু ছিল সে বুয়েটে ভর্তি হয়েছিল ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এ। পাশাপশি সে দেশ সেরা কোচিং সেন্টারে ক্লাস নেওয়া এবং টিউশনীর মাধ্যমে প্রতি মাসে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা আয় করতো।রাকিন ভাইয়ের বুয়েট পড়ুয়া ওই বন্ধুর নাম ছিল মুহিন। তো মুহিন ভাইয়ার আয় দেখে সবার খুবই ঈর্ষা হতো। ছাত্র জীবনে মুহিন ভাই এতো এতো আয় করছে সেখানে অন্যরা বাবার কাছ থেকে টাকা এনে পড়াশোনা করছে। কিন্তু ঈর্ষা করতো না শুধু রাকিন ভাই। সে মুচকি হাসি দিত।তবে রাকিন ভাই যেহেতু কম্পিউটার নিয়ে পড়ে থাকতো তাই তার সামান্য কিছু আয় হতো।

এর পর বছর গড়িয়ে গড়িয়ে একদিন রাকিন ভাই বিএসসি শেষ করলেন। তার আর এমএসসি করা হলোনা। অন্যদিকে রাকিন ভাইয়ের বুয়েট পড়ুয়া বন্ধু মুহিন ভাই এমএসসি শেষ করে চাকরির আবেদন করতেই দেশের বড় একটা কোম্পানীতে চাকরি পেয়ে গেলেন। মাসিক বেতন ৩৫ হাজার টাকা। তিনি যদিও তার ছাত্র জীবনের চেয়ে কম বেতনে চাকরি শুরু করছেন তার পরও সবাই খুবই জেলাস। দেশ সেরা প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাচ্ছে বেতনও একেবারে কম নয়। আড্ডায় মুহিন ভাই তার চাকরি ও বেতনের কথা বলতেই কেউ কেউ ঈর্ষান্বিত হলো।শুধু ঈর্ষান্বিত হলোনা রাকিন ভাই। এটা দেখে মুহিন ভাই বললেন কিরে তুই কিছু বলছিস না যে।

শুনলাম এমএসসিটাও করতে পারিসনি। রাকিন ভাই বললেন আসলে একটা বিষয় নিয়ে ভাবছি আর তা হলো তুই ছাত্র থাকতে ৫০ হাজার টাকা আয় করতি আর এখন মাত্র ৩৫ হাজার। তোর স্ট্যাটাসতো কিছুটা কমে গেল। তুই এক কাজ কর তুই ওই কোম্পানীতে জয়েন করিস না। এটা শুনে সবাইতো থ হয়ে গেল। চাকরিতে জয়েন না করে তবেকি রাকিনের মত বেকার হয়ে ঘুরে বেড়াবে? কথাটা মুহিন ভাই নিজেই বললেন যে চাকরিতে জয়েন না করে তবেকি তোর মত ভবঘুরে বেকার হয়ে ঘুরে বেড়াব? রাকিন ভাই এবার আরো একটা প্রশস্ত হাসি দিয়ে বললেন দোস্ত তুই তাহলে এক কাজ কর আমি তোকে প্রতি মাসে পঞ্চাশ হাজার টাকা বেতন দেব,তুই আমার কোম্পানীতে জয়েন কর। ওনার কথা শুনে সবাই থ হয়ে গেল। সবাই ভাবলো রাকিন ভাই মজা করছে এবং তার যদি কোন কোম্পানী থাকে তবে সেটা হবে টোটো কোম্পানী।

রাকিন ভাই আর কিছু বললেন না অন্যদিকে মুহিন ভাই সেই বিখ্যাত কোম্পানীতে জয়েন করলেন। কোম্পানীর এমডির সাথে তখনো তার দেখা হয়নি কথাও হয়নি। ঠিক একমাস পর মুহিন ভাই কোম্পানীর এমডির সাথে দেখা করতে গেলেন জরুরী কাজে। তিনি বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সিরিয়াল নিয়ে এমডির রুমে ঢুকলেন। এমডি স্যার তখন অন্যদিকে মুখ করে ছিলেন। মুহিন ভাইকে বসতে বলে তার দিকে ঘুরে তাকালেন। মুহিন ভাই থ হয়ে গেল। যে কোম্পানীতে সে চাকরি করে এবং যে এমডির সাথে দেখা করতে এসেছেন তিনি তারই সেই ভবঘুরে বন্ধু রাকিন ভাই।

রাকিন ভাইকে কোম্পানীর এমডি দেখে বুয়েট থেকে পাশ করা মুহিন ভাই থ হয়ে গেলেন। তখন রাকিন ভাই বললেন আমার কথা তোরা কেউ বিশ্বাস করিসনি।আমি যখন শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বিতীয় বর্ষে ছিলাম তখনই ছোট্ট করে কোম্পানীটা শুরু করেছিলাম। তখন আমার হয়ে কাজ করতো মাত্র পাঁচজন মানুষ। তাদেরকে আমি ছয় থেকে আট হাজার টাকা করে বেতন দিতাম। আর এখন আমার কোম্পানীতে কাজ করে সাড়ে তিনশোজন মানুষ। যাদের মধ্যে তোর আমার মত অনেক ইঞ্জিনিয়ার আছে যাদের আমি বেতন দেই ৫০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পযর্ন্ত।

তোরা যখন টিউশনী থেকে অনেক টাকা আয় করতি আমি তখন অল্প আয় করেও এমন একটা কিছুর স্বপ্ন দেখতাম যেটা ভবিষ্যতের পাথেয় হবে। টিউশনী থেকে সাময়িক অনেক টাকা পেলেও সেটা ভবিষ্যত নয় ভেবেই আমি ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট নিয়ে কাজ করেছি। দেশের বাইরের মানুষের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলে তাদেরকে সার্ভিস দিয়েছি।মুহিন ভাই আর কোন কথা বলতে পারলেন না। তার কেবলই মনে হতে লাগলো সে বুঝি থ্রি ইডিয়টস সিনেমার একজন কুশীলব।

উদ্যোক্তা হতে টাকা লাগে এমন কথা মনে করে কেউ উদ্যোক্তা হওয়ার পথে থমকে দাড়লে সে এগোতে পারবেনা এটাই স্বাভাবিক। আপনি খোজ নিয়ে দেখুন বাজারে কোন কোন পন্য কোথায় কোথায় পাইকারি রেটে পাওয়া যায়। সেগুলো কোন কোন এরিয়াতে সহজলভ্য নয় সেটা জেনে সাপ্লাই দিন। এ জন্য আপনাকে টাকাপয়সার মালিক হতে হবে এমন কোন কথা নেই। ভাল সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারলে পাইকারী বিক্রেতা আপনাকে এমনিতেই পন্য দিবে। তার সাথে চুক্তি করবেন পন্য বিক্রির পর টাকা দিবেন। সে ক্ষেত্রে তাকে কিছু টাকা বেশি দিতে হলে তাও দেওয়া যাবে।

আজকে ইন্টারনেটের এই যুগে ইউটিউব থেকে অনেক কিছুই শেখা যায়। শিখে ফেলুন দুই চারটা ভাষা। তার পর লেগে পড়ুন প্রফেশনাল ট্যুরগাইডের কাজে। কোন কোম্পানীর হয়ে কাজ করতে হবে এমন নয়। আপনি এয়ারপোর্টে গেলেই বিদেশী ট্যুরিষ্ট পেতে পারেন। পাশাপাশি ফেসবুক ইন্টারনেটে বাইরের দেশ থেকে আগত ট্যুরিষ্টদের সাথে কথা বলুন। যোগাযোগ করুন। দেখবেন তারা যখন দেশে আসবে নিজেরাই আপনাকে খুঁজে নেবে। তখন তাদের সাথে ঘন্টা কিংবা দিন হিসেবে পারিশ্রমিক ধার্য করুন।

বিখ্যাত ডাক্তার এম আর খান যখন বিদেশে এমআরসিপি ডিগ্রি নেওয়ার জন্য গিয়েছিলেন তখন রেল স্টেশানে একজন তার লাগেজ ট্রেনে উঠিয়ে দিয়েছিল।তাকে দেখে শিক্ষিত মনে হওয়ায় এম আর খান জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন তিনি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডির ছাত্র। কাজকে কখনো ছোট মনে করা যাবেনা। পাছে লোকে কিছু বলে এটা ভেবে থমকে দাড়ালে লসটাতো আপনারই হবে। শুরু করুন। শুরু করলে তবেইনা কোন না কোন ফল পাবেন। গাছ না লাগিয়েতো ফলের আশা করা যায়না। আগে গাছ লাগান তার পর অপেক্ষা করে দেখুন,ফল না পেলেও সেই গাছ বিক্রি করেই আপনি লাভবান হবেন।

—-#জাজাফী
৯ এপ্রিল ২০১৭

আপনি কি সেই হাতি হবেন?নাকি মানুষ! সিদ্ধান্ত আপনার

সমাজ আপনাকে হাতি বানাতে চায়! আপনিকি সেই হাতি হবেন নাকি মানুষ হবেন সেটা একটু ভাবুন। আমার কথায় ঘাবড়ে যাওয়ার কোন কারণ নেই। আসুন হাতির গল্পটি শুনি তার পর নিজেদের সাথে মিলিয়ে দেখি সত্যিই আমরা সেই হাতি হচ্ছি নাকি মানুষ হচ্ছি।

পাবত্য চট্টগ্রামের রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে এক লোক দেখলেন রাস্তায় বিশাল একটা হাতি একটা ছাগল বাধা রশি দিয়ে গাছের সাথে বেঁধে রেখেছে।লোকটি অবাক হয়ে হাতির মালিককে বললেন আপনিতো মহা বোকার বোকা। এতো বিশাল একটা হাতিকে এই ছাগল বাধা রশি দিয়ে বেধেছেন কেন? ওতো ছিড়ে চলে যাবে। মালিক একটু হাসি দিয়ে বললেন ওই বিশাল হাতিটা এই সামান্য রশিটাও ছিড়তে পারবেনা। লোকটা অবাক হয়ে জানতে চাইলো কেন ছিড়তে পারবেনা। হাতির গায়েতো বিশাল শক্তি। সে এর চেয়ে দশগুন মোটা রশিও অনায়াসে ছিড়ে ফেলতে পারে। বিশাল বিশাল গাছ শুড় দিয়ে টেনে উপড়ে ফেলতে পারে। আর এ তো সামান্য ছাগল বাধা রশি।

তার কথা শুনে হাতির মালিক বললেন আপনার কথা ঠিক আছে তবে এই বিশাল হাতিটি এই সামান্য রশিটিও ছেড়ার ক্ষমতা রাখেনা। ও যখন খুব ছোট ছিল তখনও এই রশিটা দিয়েই ওকে বেধে রাখতাম আর ও তখন অনেক চেষ্টা করতো এটা ছিড়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু সেই সময়ে ও এতোটাই ছোট ছিল যে এই রশিটাও ছেড়া ওর পক্ষে অসম্ভব ছিল। ফলে দিনের পর দিন চেষ্টা করেও সে ছিড়তে পারেনি। এটা ওর অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেছে। ওর মনের মধ্যে গেথে গেছে যে রশিটা আমি ছোটবেলায় ছিড়তে পারিনি সেটা আর কোন দিনই ছিড়তে পারবো না।

ও ভেবেছে রশিটা ছেড়া ওর জন্য অসম্ভব ব্যাপার আর সেই বিশ্বাসের কারণে ও আর এখন চেষ্টাও করেনা। ওর মনোবল সেই ছোটবেলায় ভেঙ্গে গেছে। ও যদি জানতো যে ওকে যে রশি দিয়ে বাধা হয়েছিল সেটা ছোট বেলার জন্য যথেষ্ট শক্ত ছিল কিন্তু বড় বেলার জন্য তা নগন্য তুচ্ছ তাহলে ও ছিড়ে বেরিয়ে যেতে পারতো। লোকটা বুঝলো হাতির মনোবল সেই ছোটবেলায় এমন ভাবে ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে যে সে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে। তাই তার বাল্যকালে বেধে রাখা রশিটিও ছিড়তে পারবেনা বলে মনে করে চেষ্টাও করছেনা। অথচ যুগ বদলে গেছে,সে চেষ্টা করলেই কিন্তু রশিটা ছিড়ে মুক্ত হতে পারে।

এখন মিলিয়ে দেখুন এই গল্পটার সাথে আপনার জীবনের মিল আছে কিনা। প্রতিনিয়ত আপনি কিছু করতে চাইতেন আর আপনার আশেপাশের সবাই আপনাকে বলতো তুমি পারবেনা,এটা তোমার জন্য অসম্ভব কাজ,তুমি শুধু শুধু সময় নষ্ট করছো। যা পারবেনা তার পিছনে সময় দিয়ে লাভ কি। নানা জন এভাবে প্রতিনিয়ত আপনার উদ্যোগকে কটাখ্য করেছে,আপনার মনোবল ভেঙ্গে দিয়েছে,আপনাকে বুঝিয়েছে যে আপনি অক্ষম।

আপনাকে দিয়ে ওই কাজটা হবেনা।আর আপনি তাদের কথাকেই প্রাধান্য দিয়েছেন নিজে একটিবারও চেষ্টা করে দেখেন নি।আপনার নিজের উপর কোন বিশ্বাস নেই আস্থা নেই কিন্তু ওই সব পাছে লোকে কিছু বলের উপর বিশ্বাস আছে।আপনি কি পারেন বা না পারেন সেটা আপনি ছাড়া পৃথিবীর আর কারোতো জানার কথা নয়। কি করে জানবে বলুন? নিজেকে একবার প্রশ্ন করে দেখুন।

যদি কোন কিছু আপনি পেরে থাকেন সেটাও সবার আগে আপনারই জানার কথা আর যদি কোন কিছু না পেরে থাকেন সেটাও সবার আগে আপনারই জানার কথা। কিন্তু আপনি নিজে সেসব জানেন না বরং জানে অন্য কেউ।এই অন্য কেউরাই আপনাকে সেই হাতি বানিয়ে রেখেছে যে হাতি ছোটবেলার সেই বিশ্বাসটাতেই অটুট থেকেছে। আপনি কি হাতি? আপনি কি মানুষ নন? তাহলে হাতিটার মত সেই বিশ্বাসে অটুট থাকবেন কেন? অন্য লোকে বলবে আপনি পারবেন না আপনাকে দিয়ে এটা হবেনা আপনি শুধু শুধু সময় নষ্ট করছেন এই সব কথা কেন আপনি বিশ্বাস করে বসে থাকবেন?আপনার ক্ষমতা আছে কিছু করে দেখানোর কেবল মাত্র সাহস নিয়ে শুরু করুন। তার পর দেখিয়ে দিন আপনার শক্তি।

আপনি হয়তো চল্লিশ কেজি ওজনের একটা পাথর ওঠাতে পারবেন না তার মানেতো এই নয় যে আপনি পাথরই ওঠাতে পারেন না। আপনি দুই কেজি ওজনের একটা পাথরতো ওঠাতে পারেন।

আমি বলেছি সমাজ আপনাকে আমাকে সেই হাতি বানাতে চায় আর আমরা সেই বোকা হাতির মত সমাজের কথা শুনে বোকা হয়ে বসে থাকি।কান নিয়েছে চিলে শুনে চিলের পিছনে ছুটি কানে হাত দিয়ে দেখিনা। আইকারুস আর দাইদালুস নামের দুই ভাই আকাশে ওড়ার স্বপ্ন নিয়ে কতবার যে গাছের উপর থেকে ঝাপিয়ে পড়েছিল তার হিসেব নেই। তার পরই না তারা আকাশে উড়েছিল।পাখির মত ডানা মেলেছিল। আর একবার চিন্তা করে দেখুন এ কালের সেরা বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং এর কথা। ডাক্তার যাকে বলে দিয়েছিল তিন থেকে পাচ বছরের মধ্যে মারা যাবে তিনি কিন্তু চল্লিশ বছরের অধিক সময় ধরে সেই সব বিশ্ব বিখ্যাত ডাক্তারদের কথাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে বেচে আছেন এবং সারা বিশ্ব যার দিকে তাকিয়ে আছে।

আপনার আমার ঘাড়ের উপরে কি একটা মাথা নেই? সেই মাথায় কি চিন্তা করার কোনই ক্ষমতা নেই? যদি থেকে থাকে তাহলে অন্যের কথা শুনে বসে থাকবেন কেন? নিজে চিন্তা করে দেখুন। তার পর শুরু করুন।অন্ধকার সরে গিয়ে ঠিকই আলো আসে। লোডশেডিং বেশিক্ষণ থাকেনা। আলো আসবেই। শুধু সময়ের ব্যবধান মাত্র। বঙ্গবন্ধু তার সাত মার্চের ভাষণে বলেছিলেন তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। আমরা যে স্বাধীন একটা পতাকা পেয়েছি,দেশ পেয়েছি তা কিন্তু ওই যা কিছু নিয়ে প্রস্তুত থাকার কারণে। সুতরাং অন্যে আপনাকে হাতি বানিয়ে রাখতে চাইলে আপনি থাকবেন কেন? আপনিও আপনার যা কিছু আছে তাই নিয়েই ঝাপিয়ে পড়ুন। সাফল্য একদিনে আসেনা।বিশ্ব বিখ্যাত কেএফসির প্রতিষ্ঠাতা স্যান্ডার্সের কথা চিন্তা করে দেখুন। তিনি হতাশ হতে হতে ৬০ বছর বয়স পার হওয়ার পর সফল হলেন। আপনার বয়সতো এখনো ষাট হয়নি তাহলে আপনার ভেঙে পড়ারতো কিছু নেই।

শুরু করুন এবং দেখুন ফলাফল পাবেনই। একটা গর্ত খুড়ে একটা আমের আটি সেখানে রেখে দিলে একদিন না একদিন সেটা থেকে চারা গাছ বের হবেই। হয়তো সেই আটিটা নষ্ট হলে চারাগাছ বের হবেনা তাহলে আপনি আরো কয়েকটা গর্ত খুড়ে সেখানেও কয়েকটা আটি রাখুন।মনে রাখবেন সব গুলো আটি কিন্তু নষ্ট নয়। আপনি একবার কোন কিছুতে ফেইলিওর হয়েছেন মানে এই নয় সারা জীবনে আর কোন দিন বিজয়ী হবেন না।সুতরাং সমাজ আপনাকে সেই হাতি হতে বললে আপনি চাইলে হাতি হয়ে থাকতে পারেন নতুবা আজই এখনি শুরু করুন। খাতা কলম নিয়ে বসে যান এবং পরিকল্পনা করুন আপনি ঠিক কোন কাজটি নিয়ে এগোতে চান।সফলতা আসবেই। ঠিক যেমন মেঘ কেটে গেলে সুর্য উকি দেয়।

—– #জাজাফী

৯ এপ্রিল ২০১৭

স্বপ্ন আরও

আমার সাথে কোন দিনও
হয়তো তোমার হয়নি দেখা
তাই বলে কি নিষেধ আছে
তোমায় নিয়ে গল্প লেখা।

হয়তো কভু এক জীবনে
চোখ রাখিনি তোমার চোখে
তাই বলেকি স্বপ্ন দেখা
বন্ধ রবে ইহলোকে।

আকাশ যখন আঁধার করে
হয়তো তখন চাঁদ দেখিনা
তোমার প্রতি যে টান আছে
জেনে রেখো সব মেকি না।

আমারও এক আকাশ আছে
সেই আকাশের চাঁদ যে তুমি
সেই আলোতেই রঙ্গীন থাকে
হয়তো কোন মরুভূমি।

হয়তো কভু তোমার সাথে
হাতটা ধরে হয়নি হাটা
তুমি বিনে জানো কি এই
জীবনটা খুব সাদামাটা।

সাদামাটা জীবনটাকে
রাঙিয়ে দিতে আসতে পার
এসেই না হয় জেনে নিও
আছে কতই স্বপ্ন আরো।

——-

………………….#জাজাফী
আলোরমেলা,কিশোরগঞ্জ-২৩০০

গ্রামের টানে

চারপাশে ধান ক্ষেত সবুজের মেলা
সবুজের সাথে মিশে কাটাবো এ বেলা।

ওই দূর দেখা যায় আমাদের বাড়ি
একা আমি মেঠো পথ দেব আজ পাড়ি।

উঠোন ভরা রবে সোনা রং ধানে
সেটা দেখে খুশি রবে কৃষকের প্রাণে।

বাংলার নদী মাঠ প্রকৃতির রুপ
মনে হয় সেখানেই রোজ দেই ডুব।

হারাই একাকী আমি পাশে কেউ নেই
গ্রামে ফিরে যেতে হবে এই আমাকেই।

গ্রামইতো জীবন আমার সব ভালবাসা
আমার বাবার মত আমিও যে চাষা।

চাষা হয়ে এ শহরে থাকা কিগো সাজে
অনেকেই বলেনা তা হয়তোবা লাজে।

আমার সে লাজ নেই চাষা আমি মানি
আমি যে চাষার ছেলে হোক জানাজানি।

এই ধান ক্ষেতটাতে কত ভালবাসা
কেবল সেটা জানি আমি আর চাষা।

আমিওতো চাষাভোষা গ্রামের মানুষ
সাধ নেই ওড়াবার রঙ্গীন ফানুস।

——
#জাজাফী
৮ এপ্রিল ২০১৭
আলোরমেলা,কিশোরগঞ্জ-২৩০০

শেষের কবিতাঃ যে ভালবাসায় সমাপ্তি ছিলনা

নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি নিঃসন্দেহে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অনেক বড় করে তুলেছে। তবে নোবেল পুরস্কারকে এক পাশে সরিয়ে রাখলেও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের সবর্কালের সেরা লেখক কবিদের মধ্যেই শ্রেষ্ঠতম। একমাত্র মহাকাব্য ছাড়া সাহিত্যের প্রায় সব শাখায় তাঁর ছিল অবাধ বিচরণ। এবং সাহিত্যের যে শাখাতেই তিনি হেটেছেন সেখানেই রেখে গেছেন তার পায়ের স্থায়ী ছাপ। সেই ছাপ কোন কালেও মুছে যাবেনা এটা সাহিত্যের পাঠক মাত্রই বিশ্বাস করে।

Shesher-Kobita-Pandulipi

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এমন একজন বিশ্বমানের কবি যার প্রতিটি লেখা নিয়েই বিস্ময় প্রকাশ করা যায়। তার লেখা গানও তাই সেই অর্থে সাহিত্যের অন্যতম একটি পার্ট। লেখা ও প্রকাশের দিক থেকে শেষের কবিতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দশম উপন্যাস। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে সুস্থ্যতার লক্ষ্যে ব্যাঙ্গালোরে অবস্থান করছিলেন। সময়টা ছিল ১৯২৮ সাল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অমর গ্রন্থ শেষের কবিতা সেখানেই লেখা। শেষের কবিতা প্রথম প্রকাশিত হয় প্রবাসী’তে, ধারাবাহিকভাবে ভাদ্র থেকে চৈত্র পর্যন্ত।শেষের কবিতা নামটার মধ্যেই রয়েছে এক কাব্যময়তা ফলে অনেকে একে কবিতার বই ভেবে ভুল করে। আদতে এটি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্যতম রোমান্টিক উপন্যাস । রোমান্টিকতার দিক থেকে বাংলা সাহিত্যে শেষের কবিতা বরাবরই প্রথম কাতারে অবস্থান করছে। কপালকুন্ডলাতে যেরকম কোথাও কোথাও রোমান্টিকতার বিচ্ছুরণ দেখা গেছে শেষের কবিতার পুরোটাই রোমান্টিকতায় ভরপুর।

শেষের কবিতার প্রধান চরিত্র অমিত রায় ব্যারিস্টার। ইংরেজি ধাঁচে রায় পদবীকে “রয়” ও “রে”তে রূপান্তর যে কিনা নিজের নামের মূল বক্তব্যটাই বদলে ফেলেছে। নামের অসামন্যতা কামনা করে অমিত এমন একটি বানান বানিয়ে ফেলেছে যাতে ইংরেজ বন্ধু ও বন্ধুনীদের মুখে নামটার উচ্চারণ দাঁড়িয়ে গেছে-অমিট রায়ে। লাবণ্যের বাবা অবনীশ দত্ত এক পশ্চিমি কলেজের অধ্যক্ষ। মাতৃহীন মেয়েকে এমন করে মানুষ করেছেন যে, বহু পরীক্ষা পাসের ঘষাঘষিতেও তার বিদ্যাবুদ্ধিতে লোকসান ঘটাতে পারে নি। এমন কি, এখনো তার পাঠানুরাগ রয়েছে প্রবল। লাবন্যর বাবার একমাত্র শখ ছিল বিদ্যায়। মেয়েটির মধ্যে তাঁর সেই শখটির সম্পূর্ণ পরিতৃপ্তি হয়েছিল। তাঁর আর একটি স্নেহের পাত্র ছিল। নাম শোভনলাল। অল্প বয়সে পড়ার প্রতি এত মনোযোগ আর কারো দেখা যায় না। প্রশস্ত কপালে, চোখের ভাবের স্বচ্ছতায়, ঠোঁটের ভাবের সৌজন্যে, হাসির ভাবের সরলতায়, মুখের ভাবের সৌকুমার্যে শোভন লালের চেহারাটি দেখবামাত্র মনকে টানে। মানুষটি নেহাত মুখচোরা, তার প্রতি একটু মনোযোগ দিলে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

 

দুই দিক থেকে আসা দুটো গাড়ি মুখোমুখি সংঘর্ষে পতিত হয়। গাড়ি দুটির একটিতে ছিল বিলেত ফেরত ব্যারিষ্টার অমিত রায় আর অন্যটিতে ছিল লাবণ্য নামের লাস্যময়ী নারীটি। শিলং পাহাড়ের পথে সেই আকস্মিক দুর্ঘটনাই শেষের কবিতার সুচনা  করে। অমিত আর লবণ্য পরস্পরের সাথে পরিচিত হয়। নির্জন পাহাড়ের সবুজ অরণ্য ঘেরা দুর্লভ অবসরে দু’জন দু’জনকে দেখে মুগ্ধ হয়। যার পরিণতি দাঁড়ায় শেষ পর্যন্ত ভালোবাসায়। লাবণ্য পণ করেছিল নির্জন ওই প্রান্তরে সে একাকী বই পড়বে আর পাশ করবে, এমনি করেই তাঁর জীবন কাটবে। সে হঠাৎ দেখতে পেল সে-ও ভালোবাসতে পারে। আর অমিত যেখানে মেয়েদের কাছে সোনার রঙের দিগন্ত রেখা- ধরা দিয়েই আছে, তবু ধরা দেয় না। রুচির তৃঞ্চা মিটিয়ে কত সুন্দরী মেয়েদের পাশ কাটিয়ে এসেছে এতকাল। সেই বন্দি হলো লাবণ্য প্রেমে।

নব্য প্রেমিক প্রেমিকা শিলংয়ের পাহাড়ি পথে ঘুরে ঘুরে সময় কাটায় গান গেয়ে, আবৃত্তি শুনে, পাখি দেখে আর স্বপ্ন বোনে আগামী দিনের। প্রকৃতি যেন ওদের ভালোবাসার ক্ষেত্র তৈরি করে দিয়েছিল। এমন সময় অমিত লাবণ্যকে বিয়ে করতে অস্থির হয়ে উঠে। কিন্তু লাবণ্যর মন তাতে সায় দেয় না। লাবণ্য ও অমিতের মধ্যে তখন শুরু হয় ব্যক্তিত্বের সংঘাত। অনেক তর্ক-বিতর্ক, মান-অভিমানের পর অমিত লাবণ্যর ভালোবাসা যখন অনিশ্চয়তার দোলাচলে দুলছে হঠাৎ করেই তখন ওদের বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। এবং সেই সময় অমিতের বোন সিসি ও তাঁর বন্ধু কেতকী শিলং এসে উপস্থিত হয়।

কেতকীর সঙ্গে বিলেতে থাকার সময় অমিতের একটা গভীর মুগ্ধতার সম্পর্ক ছিল। এবং সে সময়টাতে অমিত কেতকীকে ভালোবেসে যে আংটি পরিয়েছিল, লাবণ্যর সঙ্গে অমিতের বিয়ের খবর শুনে কেতকী সে আংটি খুলে অশ্রুসিক্ত নয়নে শিলং ছেড়ে চেরাপুঞ্জি চলে যায়। অমিত যে আংটিটি লাবণ্যকে পরিয়ে ছিল সেটিও সে খুলে দেয় অমিতের হাতে। অমিত কি করবে ভেবে পায় না। লাবণ্যর পরামর্শে অমিত চেরাপুঞ্জি যায় কেতকীদের ওখানে। কদিন পর ফিরে এসে দেখে লাবণ্য চলে গেছে শিলং ছেড়ে। কোনো ঠিকানা রেখে যায়নি। এক সময় অমিত ফিরে যায় কলকাতায়। তারও কিছুকাল পরে অমিতের সঙ্গে বিয়ে হয় কেতকীর। এর মধ্যে লাবণ্যর একটি চিঠি আসে অমিতের কাছে। সে চিঠিতে লেখা- ছয়মাস পর রামগড় পর্বতের শিখরে শোভনলালের সঙ্গে লাবণ্যর বিয়ে। প্রথম যৌবনে শোভনলাল লাবণ্যকে ভালোবেসে ছিল; কিন্তু লাবণ্যর অবজ্ঞা ও অপমানে শোভন দূরে চলে যায়। এক সময় শোভনলালকে বরদান করবে বলেই লাবণ্য নিজের অগোচরে অপেক্ষা করে বসে ছিল এতকাল, আর এখন সেই শোভনলালই শেষ পর্যন্ত এলো তাঁর জীবনে।

বাংলা সাহিত্যে রোমান্সে রবীন্দ্রনাথের প্রভাব সবচাইতে বেশি।আর তার রোমান্টিক উপন্যাসের মধ্যে সবচাইতে জনপ্রিয় আর পাঠক-নন্দিত হলো ‘শেষের কবিতা’।শেষের কবিতার কিছু লাইন আপনাকে দিবে দর্শনের পূর্ন প্রান,আর কিছু লাইন আপনাকে ভাসাবে রোমান্সের সাগরে।

আপাত দৃষ্টিতে মনে হতে পারে অমিত কিংবা লাবণ্য দুজনেই তাদের ভালবাসা নিয়ে নাটক করেছে। কারণ অমিত কেতকিকে আগেই ভালবাসার পরও লাবণ্যর রুপ দেখে পাগল হয়ে গেছে যেটা তার ভালবাসায় খুত বলে ধরে নেওয়াই যায়। কারণ খাটি প্রেমিক জীবনে একবারই প্রেম করে। সেই প্রেম নিয়েই সে বেচে থাকে। পক্ষান্তরে অমিত প্রথম প্রেমের কথা ভুলে গিয়ে দ্বিতীয়বারের মত লাবণ্যকে পেতে চায়। ঠিক একই ভাবে লাবণ্যও শোভনলালকে মনে মনে ভালবাসা এবং তাকে বরমাল্য পরানোর স্বপ্ন দেখার পরও অমিতকে ভালবাসার কারণে তার ভালবাসাও প্রশ্ন বিদ্ধ। সব শেষে দুজন আগের পছন্দের মানুষকে বিয়ে করার ফলে একই সাথে প্রেমের সফলতা ও ব্যর্থতা প্রমানিত হয়। অমিত যেমন পুর্ববর্তী প্রেম কেতকীকে পেয়েছে আর হারিয়েছে প্রিয় প্রেম লাবণ্যকে তেমনি লাবণ্য পেয়েছে পুববর্তী প্রেম শোভনলালকে আর হারিয়েছে স্বপ্নাতুর সময়ের স্বপ্নের মানুষ অমিতকে। শেষের কবিতার অমিত আর লাবণ্যর প্রেমকে তাই এক অর্থে বলা যেতে পারে যে ভালবাসার সমাপ্তি ছিল কিন্তু মিলন ছিলনা।

ইবনের বাবা

প্যারেন্টস ডে তে সবাই বাবা মাকে নিয়ে আসলেও ইবন বাবা মাকে প্যারেন্টস ডের কথা বলেইনি।ইবন ক্লাস ফোরে পড়ে।সবাই যখন অডিটোরিয়ামে বাবা মায়ের সাথে আড্ডায় মেতে আছে ইবন তখন স্টেজের পিছনে মুখ গোমরা করে বসে আছে।একটু পরে তাকে মঞ্চে উঠে কিছু বলতে হবে।ক্লাসে এতো ছাত্র ছাত্রী থাকতে তাকেই সিলেক্ট করায় খুব রাগও হচ্ছে।বাবা মার উপর তার ভীষণ রাগ।মনে মনে ভেবেছে আজ ইচ্ছে মত বলবে।একসময় তার ডাক পড়তেই মঞ্চে উঠলো ইবন।সবাই হাততালি দিয়ে ওকে অভিনন্দিত করলো। কিন্তু সবাইকে হতভম্ব করে দিয়ে ইবন প্রথমেই যে কথাটা বলে উঠলো তা হলো “প্যারেন্টস ডে নিয়ে আমার কিছু বলার নেই।আমাকেতো বাবা মা ভালই বাসে না, তাহলে আমি বাবা মাকে নিয়ে কিইবা বলতে পারি।“

ওর কথা শুনে পুরো স্কুল অডিটোরিয়ামে শোরগোল পড়ে গেল।ইবন তখন বলতে শুরু করলো।আমার বাবা মা যে আমাকে ভালবাসে না তার প্রমান দেই।আমি যখন খুব ছোট তখন বাবা একদিন আমাকে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে পুকুরের মাঝে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল।আমি একটু একটু করে পানিতে ডুবে যাচ্ছিলাম। অনেক পানি খেয়েছি।তার পর বাবা আমাকে উঠিয়েছে। এভাবে আমাকে অনেক দিন বাবা ভরা পুকুরে ছুড়ে মেরেছে।বাবা যদি ভালবাসতো তবে নিশ্চই আমাকে পুকুরে ছুড়ে মারতো না। এর পর ভাইয়ার একটা সাইকেল ছিল।বাবা আমাকে সেই সাইকেলে উঠিয়ে ধরে না থেকে জোরে ধাক্কা দিয়ে ছেড়ে দিত।

আমি কতবার যে পড়ে গিয়ে ব্যাথা পেয়েছি তার কোন ঠিক নেই। বাবা আমাকে ভালবাসলে নিশ্চই ওভাবে ধাক্কা দিত না।বাবা আমাকে কাধে করে নারকেল গাছের অনেক উপরে নিয়ে ছেড়ে দিত। আমি শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আস্তে আস্তে নেমে আসতাম। বাবা আমাকে ভালবাসলে ওরকম করতে পারতো না।মাও আমাকে ভালবাসে না।মাকে যদি বলতাম আম্মু দুধ দাওতো সে আমার সামনে গুড়ো দুধের কৌটা,চিনি আর গ্লাস এনে রেখে দিত।ভালই যদি বাসবে তবে সে দুধ গুলিয়ে দিত।আমি স্কুলে যাওয়ার সময় সে আমার জুতার ফিতা বেধে দিত না,পাশে দাড়িয়ে শুধু বলে দিত। আম্মু যদি আমাকে ভালই বাসবে তবে সে জুতার ফিতা বেধে দিত।

আমার বন্ধুদের সবার আম্মু আব্বু তাদেরকে ভালবাসে,সব করে দেয় কিন্তু আমার আব্বু আম্মু আমাকে ভালবাসে না। সব আমাকেই করতে হয়।আমি আমার আব্বু আম্মুর সাথে তাই কথাই বলি না। সে জন্যই প্যারেন্টস ডের কথাও তাদের বলিনি।“এটুকু বলে ইবন মঞ্চ থেকে নেমে চলে গেল। সেদিন আর সে অনুষ্ঠানে থাকেনি।সবাই ছোট্ট ইবনের কথা গুলো শুনে চোখ দিয়ে পানি ছেড়ে দিল।শুধু বাংলা মিস ছাড়া।ইবনের বলা কথা গুলো ইবনের বাবা মার কানেও চলে গেল কিন্তু তারা কিছু বললো না।

তারা জানে ইবন তাদের উপর অনেক রেগে আছে কিন্তু কোন ভাবেই তারা তার রাগ ভাঙ্গাতে পারেনি।পরদিন ক্লাসে যাওয়ার পর বাংলা মিস বললেন আজ আর তোমাদেরকে আমি কিছু পড়াবো না। আমি কিছু প্রশ্ন করবো তোমরা হ্যা অথবা না বলবা কিংবা হাত উচু করবা।সবাই খুশিতে চিৎকার করে উঠলো।এমনকি ইবনও খুশি হলো।বাংলা মিস বললেন তোমাদের মধ্যে কে কে সাতার কাটতে পারো হাত উচু করো।দেখা গেল ইবন ছাড়া আর কেউ সাতার কাটতে পারে না।এর পর বাংলা মিস জানতে চাইলেন তোমাদের মধ্যে কে কে সাইকেল চালাতে পারো হাত উচু করো।

এবারও ইবন হাত উচু করে চারদিকে তাকিয়ে দেখলো সে ছাড়া আর কেউ সাইকেল চালাতে পারেনা।বাংলা মিস একে একে প্রশ্ন করতেই থাকলেন। কে কে গাছে উঠতে পারো হাত উচু করো,কে কে জুতার ফিতা বাধতে পারো হাত উচু করো,কে কে গুড়ো দুধ গুলিয়ে খেতে পারো হাত উচু করো। দেখা গেল প্রত্যেকটা ক্ষেত্রেই কেবল মাত্র ইবন ছাড়া আর কেউ কিছু পারে না।বাংলা মিসের মুখটা হাসিতে ভরে উঠলো।তিনি ইবনের কাছে এসে কাধের উপর হাত রাখলেন। ওর চুলে বিলি কেটে দিয়ে বললেন ইবন তুমি কি কিছু বুঝেছ?ইবন অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র।

সে মাথা দুলিয়ে বললো হ্যা সে বুঝেছে এবং সে বাংলা মিসকে বললো মিস আমি কি বাসায় যেতে পারি?বাংলা মিস তাকে ছুটি দিয়ে দিলেন।ইবনের গাড়িটা গেটের বাইরেই পার্ক করা ছিল।ড্রাইভার আংকেলকে বলে সে সোজা বাসায় চলে গেল।আব্বু আম্মু দুজনেই বাসায় ছিলেন।ইবন দৌড়ে গিয়ে আম্মুকে জড়িয়ে ধরে বললো আই লাভ ইউ আম্মু। তুমিই পৃথিবীর সেরা আম্মু।তার পর মাকে ছেড়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে বললো আব্বু আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি। তুমিই পৃথিবীর সেরা বাবা।তুমি আমাকে যত ভালবাসো পৃথিবীর কোন বাবাই তার সন্তানদের অতোটা ভালবাসে না।ইবনের কথা শুনে বাবা মার চোখে অবিরাম আনন্দ অশ্রু ঝরতে লাগলো।বিগত তিন বছর ইবন বাবা মার সাথে কথা বলে নি।স্কুল থেকে ফেরার পর ইবন সেই যে বাবাকে জড়িয়ে ধরেছে বাবা তাকে আর ছাড়েইনি।সেদিন সে বাবাকে জড়িয়ে ধরেই ঘুমিয়েছে।

জাজাফী

১৫ জুন ২০১৬