Home Blog Page 24

রঙ্গীন ফানুস, পর্ব-২

     কবির স্যারের মুখে সেই প্রথম ক্যাডেট কলেজের নাম শুনি আমি।কিন্তু সে সম্পর্কে আমার কোন ধারনাই ছিলনা।কোন দিন ভুল করেও কবির স্যারকে জিজ্ঞেস করা হয়নি ক্যাডেট কলেজ আসলে কি?যতদুর মনে পড়ে এর পর তিনি কোন দিন ক্যাডেট কলেজের নামটাও নিয়েছেন কিনা সন্দেহ আছে।আর আমার মনে হয় তাকে যদি ওটা নিয়ে প্রশ্ন করতাম তবে দেখা যেত তিনি ওই ক্যাডেট কলেজ শব্দটা ছাড়া আর কিছুই জানেন না।ভুগোল আর ইতিহাসের ওপর স্যারের অন্যরকম দখল ছিল।সেই বয়সেই তিনি আহ্নিক গতি বার্ষিক গতির কথা বলতেন।আমার মাথাতে সেসব ঢুকতো না।আমি যেসব পরীক্ষায় আসবেনা সেসবে কান দিতাম না।এখন বুঝি সেই সব বিষয়গুলি যদি মনোযোগ দিয়ে শুনতাম তবে কতইনা ভাল হতো।কবির স্যারের সাথে আমার দেখা হয়নি অনেক অনেক বছর।বছরের পর বছর পেরিয়ে যায় কিন্তু আমরা ব্যক্তি জীবনে এতোই ব্যস্ত হয়ে পড়ি যে অনেক কাছের মানুষেরও খোঁজ রাখতে পারিনা।বাবার মুখে একটা কথা শুনেছিলাম ‘চোখের আড়াল না মনের আড়াল’। সত্যিই এক জীবনে কেউ যখন চোখের আড়াল হয়ে যায় সে যেন মনের আড়ালেই হারিয়ে যায়। কালেভদ্রে হয়তো কারো সাথে দেখা হয়।বাকিরা অজ্ঞাতেই আজীবনের মত হারিয়ে যায়।একদিন হয়তো খবর পাই অমুক নেই।একদিন হয়তো তারাও শুনবে আমি নেই।

২.

সারা বছরে হয়তো একবার আমাদের জন্য নতুন কাপড় কেনা হতো।সেই নতুন কাপড় কেনার জন্যও কখনো শহরে যেতে হতো না।গ্রাম থেকে বের হলেই বিনোদপুর বাজার।কিংবা রাড়িখালি বাজার পার হলেই নবগঙ্গা নদী পেরিয়ে শত্রুজিৎপুর বাজার।আমাদের কাপড় যা কেনা হতো কিংবা বানানো হতো তার সবই ওখান থেকে।কথায় বলে মোল্লার দৌড় মসজিদ পযর্ন্ত আমাদের অবস্থা অনেকটা তাই।আমাদের দৌড় ছিল ওই বিনোদপুর বাজার নয়তো সবোর্চ্চ শত্রুজিৎপুর বাজার।এমনকি কেউ অসুস্থ্য হলে যখন শহরের সদর হাসপাতালে ভর্তি হতো তখনো আমাদের মত ছোটদের সেখানে যাওয়া হতো না।ছোটরা হলো নানা অকাজের কাজী।

ছোটদের নিলেই নানা তালবাহানা শুরু করবে ভেবেই বড়রা আমাদেরকে সব সময় বাড়িতেই রেখে যেত।আর তাদের হাতে ছিল আমাদেরকে বশ করার কঠিন এক অস্ত্র আর তা হলো চানাচুর।পাঁচ টাকা দিলেই এক প্যাকেট বড় সাইজের চানাচুরের প্যাকেট পাওয়া যেত।আমাদের সবারই প্রিয় ছিল এই চানাচুর।

বড়রা বলতো বাড়িতে থাকো তাহলে আসার সময় তোমাদের জন্য চানাচুর নিয়ে আসবো। আমরা সেই চানাচুরের লোভে বাড়িতেই থেকে যেতাম। কখনো আর শহরে যাওয়া হতনা।আবার দেখা যেত কখনো কখনো বাড়িতে রেখে যাওয়ার শর্তে চানাচুরের পরিবর্তে পুরো পাচ টাকাই হাতে ধরিয়ে দিত। যেদিন টাকা ধরিয়ে দিত সেদিন মনে হতো দুনিয়াতে সব থেকে বড়লোক হলাম আমি।আমাদের কাছে তখন পাচ টাকা মানে বিলগেটসের সমান টাকা।যদিও বিলগেটসের নাম গ্রামের একজনও জানতো না।এখন সেই সব কথা মনে পড়লে নষ্টালজিয়ায় আক্রান্ত হই।

যখন সেই পাচ টাকা হাতে দিয়ে দেওয়া হতো তখন আমাদের মনের মধ্যে যে পাখিটা বাস করতো সে তার রঙীন ডানা মেলে আকাশে উড়াল দিত।সেদিন আর পড়ালেখা হতো না। বড়রা সেটা জানতো তার পরও সাথে করে শহরে নিয়ে যাওয়ার ঝামেলা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য তারা এটা করতো।তারা মনে করতো ছেলে পেলেকে শহরে নিয়ে যাওয়ার যে ঝামেলা তার চেয়ে একদিন পড়ালেখা না করে যদি হইহই করে ঘুরে বেড়ায় তবুও শান্তি।গ্রামে শিক্ষিত মানুষের হার খুবই কম ছিল।পুরো গ্রামে দ্বিতীয় ব্যক্তি হিসেবে আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছিলাম  এ তথ্যটিই বলে দেয় গ্রামের অবস্থা কি ছিল।আর আমার স্কুল লাইফের সময়টা তাহলে কিরকম ছিল সেটা সহজেই অনুমান করে নেওয়া যেতেই পারে।এখন গ্রামে প্রতি ঘরে ঘরেই কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলে মেয়ে পাওয়া যাবে কিন্তু তখনকার কথা ছিল সম্পুর্ন আলাদা।

     হাতে পাওয়া পাঁচটাকা নিয়ে আমাদের আনন্দের সীমা ছিলনা।পরিকল্পনা করতাম এই টাকা দিয়ে কি কি করবো।কখনোই মনে হতো না যে এখান থেকে একটাকা দুই টাকা জমিয়ে রাখবো।সবার আগে অবধারিত ভাবেই মার্বেল কেনার জন্য বাজেট করতাম দুই টাকা। তখন দুই টাকায় ৩০টার বেশি মার্বেল পাওয়া যেত।আমার বেশ মনে পড়ে মার্বেল ছিল আমাদের সব থেকে প্রিয় বিষয়।

      বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াকালিন সময়ে একদিন বিকেলে এক পিচ্চির সাথে বসে আছি তাদের ঘরে।সেদিন তার মা তাকে এবং আমাকে কিছু পিঠা খেতে দিলেন।পিচ্চিটার বয়স তখন পাঁচ কিংবা ছয় বছর।সে প্লেট থেকে একটা পিঠা হাতে নিয়ে আমাকে বললো জানো এই পিঠাটা না আমার প্রিয় পিঠা। আমি বললাম কতটা প্রিয়? সে বললো অনেক প্রিয়।তার পর পিঠা নিয়ে তার সাথে অর্ধেক এমফিল আর অর্ধেক পিএইচডি থিসিস করে ফেললাম।সে আমাকে জানালো সেই পিঠাটা নাকি তার কাছে তার বাবা মায়ের চেয়েও প্রিয়! আমি বললাম কি বলছো তুমি? তোমার বাবা মার চেয়েও তুমি এই পিঠাকে বেশি ভালবাসো? সে বললো অবশ্যই ভালবাসি। আমার বেশ অবাক লাগলো। সামান্য পিঠা কারো কাছে এতো প্রিয় হতে পারে? আমি বললাম আচ্ছা মনে করো তোমাকে এক প্লেট পিঠা দিয়ে বলা হলো এই পিঠা নিয়ে তুমি বাসা থেকে বেরিয়ে যাও তাহলে কি করবা? সে আগের মতই উত্তর দিলো: এই পিঠা আমাকে এক প্লেট দিয়ে যদি বলে এই বাসা থেকে চলে যেতে তাও আমি যেতে রাজি আছি কিন্তু এই পিঠাই আমার সব থেকে প্রিয়!

সেই পিচ্চিটার মতই আমাদের কাছে মনে হতো মাবের্ল খেলতে দেওয়ার অনুমতির বিনীময়ে এক ওয়াক্ত না খেয়ে থাকতে বললে তাও আমার রাজি হয়ে যেতাম।এই খেলাটা এতো জনপ্রিয় ছিল যে মনে হতো এটাই বাংলাদেশের জাতীয় খেলা।নাহ তখন কিন্তু জাতীয় খেলা বিষয়ে কোন ধারনা ছিলনা কিন্তু মনে হতো সব থেকে বেশি জনপ্রিয় খেলাই হলো মাবের্ল খেলা।জাতীয় বিষয়গুলোর মধ্যে আমরা শুধু জানতাম জাতীয় পাখির নাম, ফুলের নাম, মাছের নাম এবং জাতীয় কবির নামটা জানতাম। এর বাইরে আর যত জাতীয় বিষয় আছে তার কিছুই আমাদের জানা ছিলনা।শুধু আমাদের কেন, পুরো এলাকার কারো জানা ছিল বলে মনে হয়না।মাঝে মাঝে মনে হয় আমাদের স্কুলেরই কারো ওসব জানা ছিলনা তখন।একবিংশ শতাব্দীতে এসে যে স্কুলে এখনো পত্রিকা পৌছায়না সেই স্কুলে এতো বছর আগে কেউ ওই সব বিষয় জানবে তা প্রায় ভাবাই যায় না।ঠিক এই কারনের ক্যাডেট কলেজ বিষয়েও কারো কোন ধারণা ছিলনা। কবির স্যার ওই শব্দটা উচ্চারণ না করলে হয়তো কোন দিন ওই বয়সে ওরকম একটা অজপাড়াগায়ে বসে ক্যাডেট কলেজ বলে যে কিছু একটা আছে তাই জানা হতো না।আমাদের সবার মাঝে মাবের্ল খেলা নিয়ে যে উন্মাদনা ছিল তা বোধহয় বর্তমানে উসাইন বোল্টের একশো মিটার দৌড়ের সময় যেমন উত্তেজনা হয় তার চেয়ে কোন অংশে কম ছিলনা।আমরা মাবের্ল খেলার জন্য এহেন কাজ নেই যা করিনি।স্কুল ছুটি হওয়ার পর অধিকাংশ দিন আমরা বাড়ি না ফিরে কোথায় কোথায় চলে যেতাম মাবের্ল খেলতে।ফিরতাম রাত হলে। তবে বড়দের চোখের পড়লেই দাবড়ানি খেতে হতো। কেউ এই খেলাটা পছন্দ করতো না।শেষে উপায় না দেখে আমরা অপকর্মে লিপ্ত হতাম। দেখিয়ে দিতাম আমাদের দস্যিপনা।আর আমাদের সেই দস্যিপনা টের পাওয়া যেত যখন লোকেরা পাট কাটতে যেত। দেখা যেত কোন কোন জমির ভিতরে একটা বিশাল এলাকা জুড়ে একটাও পাটগাছ নেই।সেখানকার মাটিও বেশ পরিপাটি করা যেন প্রতিদিন কেউ সেখানে লেপন দিয়েছে।গ্রামের কাচা ঘরগুলোতে মহিলারা লেপন দিয়ে পরিপাটি করে রাখে।আমরা যখন কোথাও মাবের্ল খেলার যায়গা পেতাম না তখন একবার ইকবাল এই বিটকেলে বুদ্ধি বের করলো।পাটক্ষেতের চারপাশে অগণিত পাট থাকায় ভিতরে কোন একটা অংশ যদি ওভাবে কেটে সেখানে খেলার ব্যবস্থা হয় তাহলে কারো সাধ্যি নেই আমাদেরকে ধরার।সে কারণেই বিভিন্ন পাটক্ষেতের মাঝে আমরা মাবের্ল খেলার কোট তৈরি করতাম। যখন সেখানে সুবিধা হতো সেখানেই খেলতাম।

পর্ব-১ এখানে

পর্ব-৩ এখানে

রঙ্গীন ফানুস, পর্ব-১

(ক্যাডেট কলেজ লাইফ নিয়ে নতুন উপন্যাস)

১.

রাজশাহী যাচ্ছি।ঝিনাইদাহ মোড় পেরিয়ে গাড়িটা সবেগে ছুটে চলেছে রাজশাহীর পথে।এই প্রথম রাজশাহী যাচ্ছি।কিছু দূর যেতেই হাতের ডান পাশে চির সবুজ এক চত্বর আমার চোখ জুড়িয়ে দেয়।সবেগে ছুটে চলা বাসের জানালা দিয়ে কতটুকুইবা দেখা যায় সেই চত্বর।রাস্তার ধারে গেটের উপরে নাম লেখা ছিল।চলন্ত বাস থেকে সেই নামটাও পড়তে পারিনি।যতটা দেখেছি ভিতরে অবিরাম সবুজের লীলাভূমি।শান বাধা গ্রাউন্ডে দাগ টানা।দূরে একটা কি দুটো বড় মাঠ,ফুটবল গ্রাউন্ড এবং আরো কিছু কিছু।সেই সময়ে ওসবই আমার জীবনে প্রথম দেখা। ফলে চোখে সেই সবুজ মায়াবী প্রান্তরটির ছবি আজীবনের মত ফ্রেম বন্দী হয়ে গেল।বাউন্ডারি ঘেরা সেই প্রান্তরে সেই আঙিনায় না জানি কতই রহস্য লুকিয়ে আছে ভেবে ভেবে শিহরিত হই।মনে হয় বাস থামিয়ে ছুটে যাই সেই প্রান্তরে।

     আমার কেবলই মনে হয় মাটির পৃথিবীতে এতো সুন্দর কোন জায়গা হতে পারে?এটা কি কোন স্বপ্নলোক।পাশে বসা বাবাকে জিজ্ঞেস করি, বাবা ওই বাউন্ডারি ঘেরা সবুজ প্রান্তরটাতে কি আছে?বাবা হয়তো আগেই খেয়াল করেছিলেন আমি অপলোক দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে ছিলাম।তাই বাবাও হয়তো দেখেছিলেন ওই স্বপ্নভূবনটিকে।তিনি আমার কাধে হাত রেখে বললেন ওটা ক্যাডেট কলেজ।বাবার মুখে ক্যাডেট কলেজ শব্দটা শুনে মনে পড়ে গেল অনেক দিন আগে কবির স্যারের মুখে প্রথম এই শব্দটা শুনেছিলাম।যতক্ষণ বাসটা ছুটে আঙিনার সীমানা পার না হলো ততোক্ষণ আমার ছোট্ট স্বপ্নাতুর চোখ দুটো সেদিকেই তাকিয়ে থাকলো। বাবা বোধ হয় সেদিনই টের পেয়েছিলেন। আমার চোখের স্বপ্নটা তিনি হয়তো উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন।

যখন বাসটা সেই সবুজ সোনালী ভুবন পেরিয়ে গেছে তখন আমার চোখ ভেজা।বেদনা নয় বরং ওরকম সুন্দর একটা দৃশ্য দেখতে পেরে আনন্দে চোখ ভিজে গেছে।বাবা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে আৎকে উঠেছিলেন।ভেবেছিলেন আমি বোধহয় বাড়ির জন্য, গ্রামের জন্য মন খারাপ করছি।বাবা জানতে চাইলেন আমার চাখে পানি কেন? জানতে চাইলেন গ্রামের জন্য, গ্রামের বন্ধুদের জন্য মন খারাপ করছি কিনা।

আমি মাথা নেড়ে জানালাম যে, গ্রামের কথা এবং গ্রামের বন্ধুদের কথা মনে পড়ছে।বাবা আমার চোখের জল মুছে দিলেন।আমি বাবার বুকে মাথা রেখে বললাম বাবা আমার চোখের এই জল গ্রামের বন্ধুদের জন্য নয়, গ্রামের স্কুলের জন্য নয়, এমনকি গ্রামের জন্যও নয়। বাবা তখন সপ্রসন্ন দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন।এতো ছোট বয়সে আমার আরো কিছুর জন্য দরদ থাকতে পারে বাবা তা কল্পনা করতে পারছিলেন না।

তিনি সস্নেহে জানতে চাইলেন কেন তবে আমার চোখে জল। কিছুক্ষণ আগে অপলোক চোখে তাকিয়ে দেখা সবুজ চত্বরের কথা বাবাকে বললাম। বললাম বাবা ওরকম স্বপ্নময় একটা ভুবন দেখতে পেয়ে আনন্দে আমার চোখে জল এসে গেছে।বাবা ওখানে কি আমি কখনো যেতে পারবো? ওখানে কারা থাকে বাবা? তারাকি দেশের রাজা? রাজা না হলে ওই যায়গাটা ওতো সুন্দর কেন? বাবা আমাকে আরো জোরে বুকে জড়িয়ে নিলেন।আমার স্বপ্নটা সম্ভবত তখন বাবার বুকে লেপটে গেল।আমি বাবার কাছে আরো কতকি প্রশ্ন করলাম কিন্তু বাবা কিছুই বলতে পারলেন না।বাবার আসলে ওই সবুজ চির স্বপ্নময় ভুবনের কিছুই জানা ছিলনা তেমন।

বাবার ছিল পুলিশের চাকরি।বড় কোন পোষ্ট ছিলনা সেটা।সাধারণ কনস্টেবল ছিল আমার বাবা।দেশের নানা প্রান্তে বাবার বদলী হলেও কখনো কোন দিন সেসব জায়গায় যাওয়া হয়নি আমাদের।সামান্য বেতনের চাকরি ছিল বলে আমাদের নিয়ে যাওয়া হয়নি কখনো।এই যে রাজশাহী যাচ্ছি সেটা বড় ভাগ্যের ব্যাপার।বাবা কনস্টেবল থেকে হাবিলদার হয়েছেন।নতুন করে বদলী হয়েছেন রাজশাহীতে।সেখানে বাবা সরকারী কোয়াটার নামে একটা জিনিস পেয়েছেন।

কোয়াটার কি তা জানা ছিলনা আমার কিংবা আমার মা ও ভাইবোনদের।বাবার মুখে জানতে পারি কোয়াটার হলো বাড়ি।মানে একটু ভদ্রতা করে বাড়িকে কোয়াটার বলা হয়।আমাদের রাজশাহী যাওয়া উদ্দেশ্য হলো সেই সরকারী বাড়িতে থাকা।জানি আমার মধ্যে এক রকম স্বপ্ন তৈরি হতে শুরু করে। সেই স্বপ্নের পালে হাওয়া লাগে ঝিনাইদাহ মোড় থেকে একটু এগিয়ে হাতের ডান পাশে দেখা চির সবুজ সোনালী প্রান্তর।যে প্রান্তরের খোঁজ এর আগে কখনো পাইনি,কোন দিন স্বপ্নেও দেখিনি সেটা। শুধু একবার নামটা শুনেছিলাম কবির স্যারের মুখে।আমি তখন ক্লাস ফোরে পড়ি।তিনি শুধু মুখে বলেছিলেন ক্যাডেট কলেজ শব্দটি।

গ্রাম্য পরিবেশে বেড়ে ওঠা এই আমি শহর সম্পর্কে কোন ধারনাই রাখিনা।গ্রাম্য না বলে সরাসরি গেয়ো বলা যেতে পারে। কারণ আমি যে গ্রামে জন্ম নিয়েছি সেই গ্রাম আসলে গ্রাম নয় যেন তার থেকেও অনুন্নত কিছু। যেটাকে এক কথায় গেয়ো বলা যেতে পারে।অনেকটা পিছিয়ে পড়া মানুষকে যেমন অন্যরা অবহেলা করে ক্ষ্যাত বলে ডাকে ঠিক সেভাবে আমার গ্রামকে এবং গ্রামের মানুষকে গেয়ো বললে খুব বেশি গায়ে লাগবে বলে মনে হয় না।বিশ্ব তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে উন্নতির পথে আর আমার গ্রাম সেই উন্নয়নের ধারার বিপরীতে অবস্থান করছে।

অনেকটা স্রোতের বিপরীতে নৌকা চালানো মাঝির সেই অংকের মত।বিপরীতে গেলে একই সাথে স্রোত এবং নৌকার গতিবেগের তারতম্য লক্ষ্যনীয়।পঞ্চাশ বছর আগেও আমাদের গ্রামে বিদ্যুৎ ছিলনা,রাস্তা পাকা ছিলনা এই পঞ্চাশ বছর পরও বিদ্যুৎ আসেনি,রাস্তা পাকা হয়নি। সুতরাং সেরকম একটা গ্রামকে এবং গ্রামের মানুষকে গেয়ো বললে খুব বেশি গায়ে লাগার প্রশ্নই ওঠেনা।

     সেরকম একটা অজপাড়া গায়ে বেড়ে ওঠায় শহর সম্পর্কে ধারনা না থাকাটাই স্বাভাবিক।আনোয়ার ভাই লটারীতে একটা টেলিভিশন জিতেছিলেন।সেটাই ছিল গ্রামের প্রথম টেলিভিশন। গ্রামের ছেলে বুড়ো সবাই মিলে সেই টেলিভিশন দেখতাম। টেলিভিশনে তখন সব থেকে বেশি জনপ্রিয় ছিল আলিফ লায়লা নামে একটা সিরিজ।সেই টেলিভিশনে যা দেখা হতো সেটাই আমাদের জন্য সব।বাড়ির পাশেই ছিল আমাদের স্কুল।ঘন্টা বাজতেই হাতে বই খাতা নিয়ে ভো দৌড় দিতাম আমরা।

হয়তো অধিকাংশ দিন গায়ে শার্টও থাকতো না। শার্ট হাতে নিয়েই দৌড়াতাম।পথে যেতে যেতে কখনো পরা হতো শার্টটা আবার কখনো স্কুলে গিয়ে গায়ে দিতাম।শিক্ষকেরা সবাই ছিল পরিচিত,এলাকার মানুষ বলে কেউ কাউকে কিছু বলতো না।আমরা যে স্কুলে যাচ্ছি এতেই যেন তাদের আত্মতুষ্টি।আবার এমনও দিন যেত যে ভো দৌড় দিয়েছি, বই খাতা ঠিকই নিয়েছি কিন্তু শার্ট নিতে ভুলে গেছি। গায়ে যে স্যান্ডো গোঞ্জি পরা ছিল হয়তো সেটা পরেই চলে গেছি স্কুলে।

কোন কোন দিন মা পিছন থেকে ডেকে শার্ট ধরিয়ে দিতেন। আর যেদিন মা আশেপাশে থাকতোনা সেদিন হয়তো ভুল হয়েই যেত।স্কুলে গিয়ে দেখা যেত আহহারে শার্টটাইতো আনা হয়নি।ফিরে গিয়ে শার্ট আনতে হবে ভেবে স্কুল থেকে বের হতে চাইলে কবির স্যার কোন ভাবেই বের হতে দিতেন না।তার মতে আমরা যদি একবার স্কুল থেকে বেরিয়ে যাই তবে সেদিনের মত আমরা আর স্কুলে ফিরবো কিনা সন্দেহ আছে।তাই তিনি আমাদের বের হতে দিতেন না। সত্যি বলতে স্কুলে যেতে আমাদের খুব ভাল লাগতো কিন্তু কোন ভাবে যদি স্কুল থেকে বের হওয়ার সুযোগ পেতাম তাহলে আর ফিরে যেতেও ইচ্ছে করতো না।

আমাদের কবির স্যার খুবই ভাল মানুষ ছিলেন।আমাদের মতে তার ছিল অনেক জ্ঞান।ফিলোসফি দেখাতে ওস্তাদ ছিলেন তিনি। তার ভাষ্য ছিল এটাতো শহরের নামিদামি স্কুল নয় কিংবা ক্যাডেট কলেজও নয় যে পোষাক বড় বিষয় হয়ে দাড়াবে।এখানে এই পাড়াগায়ের অখ্যাত এই স্কুলে পড়ালেখার জন্য বই, খাতা, কলমই যথেষ্ট। সাথে ছাত্র ছাত্রী আর শিক্ষক থাকলেই হলো। ছাত্রদের গায়ে শার্ট থাকলো না  স্যান্ডোগেঞ্জি থাকলো সেটা দেখার কিছু নেই।তোমাদের কে কতটা পড়ালেখা শিখে কি হবে সেটাতো আমরা আগে থেকেই অনুমান করতে পারি।

তাই অত কিছু নিয়ে ভাবাভাবি লাগবেনা। কবির স্যারের কথাটা খুব মনে পড়ে।এখণ মনে হয় গ্রামের সেই সময়ে স্কুলের স্যারেরা তাদের ছাত্র ছাত্রীদের নিয়ে খুব বেশি স্বপ্ন দেখতেন না। তারা মনে করতেন কোন মত পাশ করে তাদেরই মত কোথাও কোন স্কুলে দপ্তরি নয়তো কেরানী নয়তো সবোর্চ্চ তাদের মত মাষ্টারী করবো আমরা।ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার কবি সাহিত্যিক আর্মি অফিসার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বিজ্ঞানী বা দার্শনিক সহ আরো যে হাজার রকমের পেশায় যাওয়ার হাতছানী থাকে তা যেন কারো স্বপ্নতেও ছিলনা। …চলছে…

পর্ব-২ পড়ুন এখানে

ক্যাডেট জুনায়েদ এবং চাকমা সমাচার

ক্যাডেট জুনায়েদকে প্রথম দিন দেখেই মনে হয়েছিল সে আসলে চাকমা।কিন্তু আমি কথাটা জিজ্ঞেস করতে পারিনি। ভেবেছি পরে সুযোগ পেলে জিজ্ঞেস করবো যে দোস্ত তুইকি চাকমা?কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো আরে আমিতো গাধার চেয়েও বড় গাধা।ওর নামতো জুনায়েদ।চাকমারাতো মুসলমান নয়।একমাত্র উপজাতি পাঙন হলো মুসলমান।তাই মাথা থেকে চিন্তাটা সরিয়ে নিলাম।তবে আমি সরিয়ে নিলে কি হবে বদের হাড্ডি গুলো মানে আমার অন্য বন্ধুরা ঠিকই মনে রেখেছে।

নতুন পরিচয়েতো কাউকে কিছু বলা যায় না। সবে মাত্র পিসিসিতে ক্লাস সেভেনে ভর্তি হয়েছি।আগে সবার সাথে পরিচয় হোক।আমরা যখন ক্লাস সেভেনে ভর্তি হই তখন কলেজের সিপি ছিলেন আতিক ভাই।আতিক ভাই সম্পর্কেতো দূরে থাকুক আমার যে গাইড ভাই তার সম্পর্কেও কিছু জানিনা। আমাদের প্রথম কাজ হবে সব কিছু মনে রাখা,সবাইকে চেনা।মনে রাখতে হবে কলেজে আমাদের চেয়ে জুনিয়র কেউ নেই এমনকি একটা থালা বাসনও আমাদের চেয়ে জুনিয়র নেই।

কদিন যেতে না যেতেই প্রায় অনেক কিছু আয়ত্বে চলে আসলো।তবে একই ভাবে ক্লাসে বন্ধু আর শত্রুও তৈরি হয়ে গেল।টুগেদার উই স্ট্যান্ড যেমন বলি তেমনি এলোন এন্ড এপার্টও বলি। যে কথাটা আমি জুনায়েদকে বলবো বলবো করে বলা হয়নি সেই কথাটাই একদিন ইভিনিং প্রেপ শেষে বলে ফেললো সজল।কি নিয়ে যেন কথা কাটাকাটি হলো জুনায়েদের সাথে এবং তখনি মুখ ফসকে বলে ফেললো তুইতো একটা চাকমা।

সজলের মুখে চাকমা শব্দটা শুনে ক্ষেপে গেল জুনায়েদ।সে বললো আমি চাকমা হলে তুইও চাকমা,তোর চৌদ্দগোষ্টি চাকমা,তোর দাদা নানা মামা সবাই চাকমা। এই ক্লাসের সবাই চাকমা,এই কলেজের সবাই চাকমা এমনকি সিপি আতিক ভাইও চাকমা।সজল সম্ভবত এরকম একটা সুযোগই খুজতেছিল।সে কথা না বাড়িয়ে আতিক ভাইয়ের কাছে নালিশ দিল ক্যাডেট জুনায়েদ আপনাকে চাকমা বলেছে।আতিক ভাই ভাল ছিল কিন্তু তা বলে ক্লাস সেভেনের কেউ তাকে চাকমা বলবে তা তো তিনি মেনে নিতে পারেন না।তিনি ডেকে পাঠালেন জুনায়েদকে।সেই সন্ধ্যায় বাস্কেটবল গ্রাউন্ডে দাড়াতে হলো পুরো ক্লাস সেভেনকে।এক জুনায়েদেরে জন্য এবার সবাইকে শাস্তি পেতে হবে।কিন্তু কেউ জানেনা কথাটা সিপির কানে দিল কে?কে সেই বিশ্বাস ঘাতক। (পরে জানলাম ওটা ছিল সজল)।

আতিক ভাই ডেকেছে মানেই সর্বনাশ।তার ব্যাচের অন্যরাও তখন চলে এসেছে।তারা যখন জানতে পারলো কলেজের সবাইকে জুনায়েদ চাকমা বলেছে তখন তারাও ক্ষেপে গেল।তবে আতিক ভাই খুবই ভাল মানুষ। তিনি শান্ত অথচ গম্ভীর ভাবে জুনায়েদকে প্রশ্ন করলেন তুমি আমাকে চাকমা বলেছ?জুনায়েদ ভয়ে কোন উত্তর দিলনা।তিনি তখন ধমকে উঠলেন।সত্যি বলো নইলো সোজা প্রিন্সিপালের কাছে পাঠিয়ে দেব এবং কালকেই তোমাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।

জুনায়েদ ছিল খুবই জেদী এবং মেধাবীও বটে।সে যে কত কিছু জানে তা না দেখলে বোঝা যাবেনা।সে শান্ত ভাবে বললো জ্বি ভাই আমি চাকমা বলেছি।সবাইকে চাকমা বলেছি।আতিক ভাই ভাবতেই পারেনি তার মুখের উপর আবার ও চাকমা বলবে।বাকিরা তখন আরো ক্ষেপে উঠেছে।আতিক ভাই জানতে চাইলেন তুমি কেন সবাইকে চাকমা বললে?আমরাতো কেউ চাকমা নই।এই কলেজেরই কেউ চাকমা নয়।আমরা ভাবলাম জুনায়েদ হয়তো সজলের নাম বলবে যে সেই প্রথম তাকে চাকমা বলেছে তাই রাগের মাথায় সেও বলেছে।কিন্তু জুনায়েদ সব চেপে গেল আর সজলও বেচে গেল শাস্তির হাত থেকে। জুনায়েদ বললো ভাই চাকমা শব্দের অর্থ মানুষ।সুতরাং এই কলেজের সবাই যদি মানুষ না হয় তবে কেউ চাকমা নয় এবং আমাকে শাস্তি দিন।

আমরা কেউ জানতাম না যে সত্যি সত্যিই চাকমা মানে মানুষ।এমনকি আতিক ভাইও জানতেন না।আতিক ভাই তখন মেসবাহকে বললেন বাংলা অভিধানটা নিয়ে আসতে।মেসবাহ ছুটে গিয়ে বাংলা অভিধান নিয়ে আসার পর দেখা গেল সত্যি সত্যিই চাকমা মানে মানুষ।তার মানে কলেজের সবাইকে চাকমা বললেও তেমন কোন ভুল কিছু বলেনি জুনায়েদ।

আতিক ভাই ওকে কোন শাস্তি দিলেন না।বরং বললেন তোমার থেকে গোটা কলেজ নতুন একটা শব্দ শিখলো।আশা করি তুমি কলেজকে অনেক কিছু দিতে পারবে। এর পর থেকে আমরা ওকে চাকমা বলে ডাকলেও সে কিছু মনে করতো না।মানুষকে তো মানুষ বলে ডাকাই যায়। প্রিয়তমাকে যদি জান বলে ডাকা যায় তবে মানুষকে চাকমা বলা যেতেই পারে।

ফেয়ারওয়েলের দিন তাই আতিক ভাই জুনায়েদকে ডেকে বলেছিলেন “তোমার কি মনে হয় আমিকি ঠিকমত চাকমা হতে পেরেছি? বলেই তিনি মুচকি হাসি দিলেন। তার মন থেকেও নিশ্চই জুনায়েদ বা চাকমার আবিস্কারক হারিয়ে যায়নি।

#জাজাফী

১৪ জানুয়ারি ২০১৭

 

অবহেলিত রশ্মি

ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হওয়ার পর অনেকেই বছরের পর বছর পার করেও খুব বশি পরিচিতি পায়না কিন্তু আমাদের ক্যাডেট জাহিদ ভর্তির কয়েক মাসের মধ্যেই গোটা কলেজে পরিচিত হয়ে গেল।বাছাই করে দেশ সেরা পঞ্চাশজনকে ভর্তির সুযোগ দেওয়ার পর কিছুটা সময় লাগে ক্যাডেট হয়ে উঠতে।সিনিয়রদের নাম মুখস্ত করতে করতেই কেটে যায় কত প্রহর সেখানে নিজেকে চেনানোর সুযোগ কতইবা আসে।কিন্তু হাবাগোবা টাইপের হওয়ার পরও ক্যাডেট জাহিদ পরিচিত হয়ে গেল গোটা কলেজের সব ক্যাডেট এমনকি টিচার এবং স্টাফদের কাছেও।

এক দিনের ঘটনা, বিজ্ঞান স্যার ক্লাস নিচ্ছেন।তিনি আলোর গতি প্রকৃতি ও ধরণ নিয়ে পড়াচ্ছিলেন।এক পযার্য়ে বললেন ক্যাডেট জাহিদ বলোতো সুযর্থেকে যে আলো আসে তা কোন ধরনের রশ্মি? আমাদের ক্যাডেট জাহিদ উঠে দাড়িয়ে সশব্দে বললো স্যার ওটা অবহেলিত রশ্মি।ওর কথা শুনে ক্লাসের বাকি ক্যাডেটতো দুরের কথা স্যারই হেসে উঠলেন। সবাই যে হাসছে ও বুঝতে পারেনি কেন হাসছে।ও যে অবলোহিত রশ্মি বলতে গিয়ে অবহেলিত রশ্মি বলেছে এটা পাশ থেকে মুকাব্বির বলে দেওয়ার পর খেয়াল হলো।শেষে বললো স্যরি স্যার ওটা হবে অবহেলিত রশ্মি। আবার হাসির রোল পড়ে গেল।

এভাবে তিনবার ও নিজেকে শুধরাতে গিয়েও একই ভুল করে চিরদিনের জন্য নিজের নামটা পরিচিত করে ফেললো। সেই থেকে তাকে সবাই অবহেলিত রশ্মি বলেই চিনতাম।এটা চলেছিল ফেয়ারওয়েল ডিনার পযর্ন্ত।কিন্তু সবই হতো টিচার এডজুটেন্ট, প্রিন্সিপালের অগচরে।কিন্তু আমাদের সেই অবহেলিত রশ্মির জনকই সবাইকে তাক লাগিয়ে বিজ্ঞানে প্রতিবার সব থেকে বেশি নম্বর পেতো।আমরা বলতাম সবই তোর অবহেলিত রশ্মির ছোয়ার কারিশমা। আমাদের সেই অবহেলিত রশ্মির জনক এখন জ্ঞানের রাজ্যে গামা রশ্মি ছড়িয়ে চলেছে অবিরাম।

১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬

 

কাইয়ুম ও টিকটিকির গল্প

ক্যাডেট কাইয়ুম আমার ভাল বন্ধু।তবে দুষ্টুর শিরোমনি সে।আমরা যখন পিসিসিতে ভর্তি হলাম তখন সবার আগে আমার কাইয়ুমের সাথে পরিচয়।দেখে মনে হয়েছিল খুব সাদাসিধে কিন্তু আদতে পাজির পা ঝাড়া সে।এক সপ্তাহ যেতে না যেতেই টের পেয়েছিলাম এই কাইয়ুম আসলে পিসিসিতে স্মরণীয় হয়ে থাকার জন্যই এসেছে।কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি গ্রাম থেকে আসা একটা ছেলে এতোটা দুষ্টু হয় কি করে।তাপস স্যার আমাদের বিজ্ঞান ক্লাস নিতে আসলেন।এটা সেটা পড়ানোর পর তাপস স্যার খেয়াল করলেন সজল দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আছে।

আমি সজলের পিছনে বসা আর আমার পাশে কাইয়ুম।কাইয়ুমের ঠিক সামনে মেসবাহ।আমরা তখনো পযর্ন্ত জানতাম না যে কাইয়ুম কতটা দুষ্টু।ক্যাডেট সজল দেয়ালের দিকে তাকিয়ে আছে দেখে তাপস স্যার বললেন ক্যাডেট সজল হোয়াট আর ইউ লুকিং? সজল ইংরেজীতে তখন খুবই কাঁচা ছিল। সে বললো স্যার বাংলায় বলি?আমাদের মধ্যে মৃদু গুঞ্জন শোনা গেল।স্যার বললেন বলো।সজল বললো স্যার টিকটিকি দেখি।তাপস স্যার বুঝলেন না একটা টিকিটিকির দেখার কি আছে।

তবে তিনি যে বিজ্ঞান ভাল বুঝেন এবং বিজ্ঞানে খুবই পন্ডিত সেটা বুঝাতেই কিনা জানিনা তিনি উল্টো প্রশ্ন করলেন নাউ টেল মি হোয়াট ইজ লিজার্ড(টিকটিকি)।আমরা সাথে সাথে শিখে গেলাম লিজার্ড মানে টিকটিকি।কিন্তু টিকটিকি যে কি সেটা সজল বলতে পারলোনা।আমারও আসলে জানা নেই।সজল চুপ করে থাকলো।তাপস স্যার জানতে চাইলেন এনিবডি নো? এবার কাইয়ুম উঠে দাড়াল।স্যার আমি জানি।স্যারতো খুবই খুশি।সম্ভবত স্যার নিজেও জানতেন না তাই কাইয়ুমের উত্তর থেকে তিনিও জেনে নিতে চাইছিলেন।তিনি উৎসাহের সাথে বললেন ভেরি গুড কাইয়ুম। বলো টিকটিকি কি?

আমাদের মাথায় সাতটা আসমান ভেঙে দিয়ে কাইয়ুম বললো স্যার টিকটিকি আসলে এক ধরনের ছোট জাতের কুমির।যে ছোট বেলায় কমপ্লান খায়নি।ওর উত্তর শুনে তাপস স্যার ধপ করে বসে পড়লেন।ওদিকে বেল পড়ে গেল তাই তার আর কিছুই করার থাকলো না।

১৩ জানুয়ারি ২০১৭

ক্যাডেট নাইমের ভাইভার গল্প

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ থেকে এক আলাভোলা ছেলে নাইম কিভাবে কিভাবে যেন ক্যাডেট কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় টিকে গেল।ছাত্র হিসেবে ভাল ছিল বলেই হয়তো টিকেছিল কারণ পরবর্তীতে সে যা করেছে তা আগে থেকে জানা থাকলে তাকে ক্যাডেট কলেজ থেকে দশ মাইল দূরে থাকতে বলা হলো।সে গল্প না হয় অন্যদিন করা যাবে আজকে আমরা ওর ভর্তি পরীক্ষার গল্প শুনি। ভর্তি পরীক্ষার লিখিত অংশে সে ভালভাবেই টিকে গেল।এবার নিয়ম মাফিক ভাইভা দেবার পালা।ভাইভা সম্পর্কে ওর তেমন কোন ধারনা ছিলনা তবে বিভিন্নজনের থেকে কিছু টিপস নিয়ে সে মনের জোর নিয়ে ভাইভা বোর্ডে প্রবেশ করলো।বোর্ড থেকে যে প্রশ্নই করা হচ্ছে সে সব গুলোরই উত্তর দিচ্ছে।সঠিক হচ্ছে না ভুল হচ্ছে তা দেখার দরকার নেই।উত্তর দিতে পারলেই যেন বাঁচে।

ভাইভা বোর্ডে এক ব্রিগেডিয়ার ছিলেন।তিনি প্রশ্ন করলেন বলোতো নাইম বিবিসিতে কি হয়? নাইম ঝটপট উত্তর দিল,ব্রিটিশ ব্রডকাষ্টিং করপোরেশান।স্যার খুশি হয়ে ওকে বললেন ভেরি গুড।তুমিতো বেশ অনেক কিছু জানো। এবার বলোতো ইএসপিএন এ কি হয়।নাইম কোন ভাবনা চিন্তা না করেই গড় গড় করে বলেদিল ইএসপিএন এ সারাদিন খেলা হয় স্যার।

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

তোফায়েলের প্যারেন্টস ডে

রাতে কারো ঘুম আসছিলনা। লাইটস অফের ঘন্টা বাজলেই বা কার কি। চিন্তা একটাই কালতো প্যারেন্টস ডে।ক্যাডেট লাইফে প্যারেন্টস ডে মানেই ক্যাডেটদের ঈদের দিন।হয়তো আমারও। কিন্তু কালকের প্যারেন্টস ডেটাকে কেন যেন ঈদের দিন ভাবতে পারছিনা। রাত পেরিয়ে সকাল হলে যে প্যারেন্টস ডেটা আসবে সেটি যে আর কোন দিন ফিরে আসবেনা। এক জীবনে আর কোন দিন প্যারেন্টস ডে আসবেনা আমাদের জীবনে। যদিও সারা জীবন বাবা মায়ের সাথে থাকলে প্রতিদিনই প্যারেন্টস ডে হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে কিন্তু কলেজ লাইফের শেষ প্যারেন্টস ডে হওয়ায় এই অনুভূতিটা অন্যরকম। ভাবতেই পারছিনা এই প্রিয় আঙিনা ছেড়ে চলে যেতে হবে।আর কোন দিন আমাদের জীবনে এই আঙিনায় প্যারেন্টস ডে নামের আড়ালে ঈদের আনন্দ ফিরে আসবে।

সবাই কম বেশি নির্ঘম কাটাচ্ছে।মনের মধ্যে প্যারেন্টস ডের আনন্দের চেয়ে ফুরিয়ে যাওয়া বেদনাটাই বেশি।মনের অজান্তেই যেন চোখে পানি চলে আসছে।একদিন এই চত্ত্বরে বাবা মা যখন রেখে গিয়েছিল সেদিনো আমরা কেঁদেছিলাম। সেদিনও কেদেছিলাম কষ্টে। কিন্তু এখন যে কাদছি সেটাও কষ্টের কিন্তু এই কষ্টটা এই আঙিনা ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট।

আমার পাশের বেডে তোফায়েল।তোফায়েল ঘুমায়নি। সে ডায়রি নিয়ে বসেছে।কি কি সব লিখছে।তার মনে কোন বেদনার ছায়াও দেখতে পাচ্ছিনা।প্রতিবার প্যারেন্টস ডেতে ওকে আর সবার মতই আনন্দিত দেখায়। তার মানে এবারও সবার মত তাকে বিষন্ন দেখানোর কথা ছিল কিন্তু হয়েছে তার উল্টোে। সেই একমাত্র খুশিতে আটখানা হয়ে আছে। ব্যাপারটা বুঝতেই পারিনি। বার কয়েক জিজ্ঞেস করলেও সে কিছু বলেনি। শুধু মুচকি মুচকি হেসেছে।

এর আগে যত বার প্যারেন্টস ডে এসেছে ততোবারই দেখেছি তোফায়েলের বাবাই শুধু এসেছেন।কোন দিন ওর আম্মুকে আসতে দেখিনি। ভাই বোনও কখনো আসেনি। আমি আর কোন কিছু না ভেবে ঘুমাতে চেষ্টা করলাম।

লাস্ট প্যারেন্টস ডেতে আমাদের প্রায় সবারই বাবা মা ভাই বোনেরা এসেছে। কারণ এবার না আসলে পরেতো আর কোন প্যারেন্টস ডে পাবেনা।আমরা একই সাথে আনন্দিত এবং আর কোন প্যারেন্টস ডে পাবোনা ভেবে বিষন্নও কিছুটা। সবাই সবার সাথে গল্প করছি।একজন আারেকজনকে তার মা বাবা ও পরিবারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে।

হঠাৎ চোখ গেল তোফায়েলের দিকে।সে দেখি এক ভদ্রমহিলা আর একটা সমবয়সী কিংবা অপেক্ষাকৃত কম বয়সী মেয়ের সাথে হেসে হেসে কথা বলছে। আমি আর মুকাব্বির এগিয়ে গিয়ে ওর পিঠ চাপড়ে দিলাম।সে আমাদেরকে ভদ্রমহিলার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো এই আমার আম্মু আর আমার ছোট বোন লামিয়া। আমি আর মুকাব্বির ওর আম্মুকে সালাম দিলাম। এর আগে কোন প্যারেন্টস ডেতেই তারা আসেনি। আমি আন্টিকে বললাম আগে কেন আসেননি প্যারেন্টস ডেতে। শুধু আংকেলই আসতেন। তিনি জানালেন তার কাজ থাকে তাছাড়া সময়ও খুব একটা হয়ে ওঠেনা। এটা যেহেতু শেষ প্যারেন্টস ডে আর ওর বাবা যেহেতু আসতে পারতেছেনা তাই আমি আর লামিয়া আসলাম।

আর কথা না বাড়িয়ে ওদেরকে রেখে আমি আর মুকাব্বির নিজেদের বাবামাকে নিয়ে মেতে উঠলাম। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সব দেখাচ্ছি এমন সময় এক ভদ্রলোক আমাকে নাম ধরে ডাকদিলেন। আমি ফিরে তাকিয়েই চিনতে পারলাম। তোফায়েলের বাবা! আমি সালাম দিয়ে আংকেলকে বললাম আংকেল তাহলে আপনিও এসেছেন। আন্টিতো বললো যে আপনি কাজের চাপে আসতে পারছেন না তাই তিনি একাই এসেছেন। তিনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। হঠাৎ খেয়াল করলাম তার পাশে আরেকজন ভদ্রমহিলা আর ছোট্ট আট নয় বছরের একটা মেয়ে। তিনি কিছুটা সময় নিয়ে জানতে চাইলেন আন্টি মানে?তোফায়েলের আম্মুতো আমার সাথেই আছে।

আমি তখন খেয়াল করে দেখলাম সত্যি সত্যিই আংকেলের পাশে আন্টি আর তোফায়েলে বোন। আমি পিচ্চিটার মাথার চুলে বিলি কেটে বললাম কেমন আছ লামিয়া?সে হেসে দিয়ে বললো ভাল আছি ভাইয়া। আমি বুঝলাম এলাহী কান্ড ঘটতে চলেছে।কিন্তু যেন ঝামেলা না হয় তাই আংকেলকে আগেই বললাম যে কোন সিনক্রিয়েট না করতে। কারণ সিনক্রিয়েট করলে কলেজ কর্তৃপক্ষ না জানি কি করে বসে।

আমি মুকাব্বিরকে ডাক দিলাম।সে দৌড়ে আসলো।আমি পরিচয় করিয়ে দেওয়ার আগেই মুকাব্বির তোফায়েলের বাবাকে চিনতে পারলো এবং সালাম দিল।আমি ইশারা করতেই ও বুঝে গেল কি ঘটেছে। আমি আর মুকাব্বির যেন বীর দর্পে আংকেল আর আন্টিকে নিয়ে তোফায়েলের দিকে রওনা হলাম। দুর থেকেই দেখলাম তোফায়েল তার বোন মানে লামিয়াকে মুখে তুলে খাইয়ে দিচ্ছে। লামিয়াও মাঝে মাঝে তোফায়েলকে খাইয়ে দিচ্ছে। আহ কি প্রশান্তি। কি ভালবাসা ভাই বোনের মধ্যে।ওদিকে লামিয়া কিন্তু আমার পাশে পাশে হাটছে!

আমি তোফায়েলের সামনে গিয়ে দাড়ালাম। তার পর সেই আন্টিকে বললাম আন্টি আংকেলতো এসেছেন।তিনি মনে করেছেন আপনি একা একা প্যারেন্টস ডেতে কিভাবে না জানি সময় কাটাবেন তাই তিনিও ছুটে এসেছেন। সাথে সাথে তার মুখটা কালো হয়ে গেল।আমি আর মুকাব্বির ছাড়া কেউ কিছু জানতে পারলোনা।মুকাব্বির অবশ্য তোফায়েলকে বাগে পেয়ে ছেড়ে দেয়নি খালিহাতে। সে সাজানো লামিয়া মানে তোফায়েলের গার্লফ্রেন্ডকে বললো বাবা এসেছেন পা ছুয়ে সালাম করো।আর সাজানো লামিয়ার মাকে বললেন আন্টি আপনি চুপ করে বসে আছেন কেন। আংকেল এসেছেন আংকেলের সাথে ঘুরে ঘুরে দেখুন সব।

দিন শেষে বাবা মা ফিরে গেছেন।গত রাতে যে তোফায়েলের মুখটা হাজার ওয়াট বাল্বের মত উজ্জ্বল ছিল সেই তোফায়েল গোমরা মুখে বসে আছে।আমাদের উপর তার রাগ হয়নি মোটেও। এমন পরিস্থিতি ঘটবে তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি। বন্ধুদের বলে রাখা ছিল প্যারেন্টস ডের সময় খোজ নিয়ে জানতে যে বাবা মা আসবে কিনা। যদি কোন প্যারেন্টস ডেতে বাবা মা না আসেন তবে যেন গার্লফ্রেন্ডকে বোন সাজিয়ে লিপি আপাকে মা সাজিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। লাষ্ট প্যারেন্টস ডের আগে তোফায়েলের গ্রামের বন্ধু নাজির গিয়ে ওর বাবার কাছে জানতে চাইলো কাকা প্যারেন্টস ডেতো এসে গেল তা কে কে যাবেন এবার। তোফায়েলের বাবা বললেন এবার কেউ যেতে পারছিনা বাবা। নানা ঝামেলার মধ্যে আছি।বন্ধু উপস্থিত থাকতেই বাবা তোফায়েলকে ফোন করে সেটা জানিয়েও দিল।তোফায়েলের সুযোগ হয়েছিল নাজিরের সাথে এক মিনিট কথা বলার।

যেহেতু অনেক আগে থেকেই ওসব শিখিয়ে দেওয়া আছে তাই তোফায়েল নাজিরকে বলেছিল দান দান তিন দান শেষ দান আমাদের। এতেই সে যা বুঝার বুঝে গিয়েছিল। ওদিকে প্যারেন্টস ডে নিয়ে তাই তোফায়েলের ছিল সেইরকম আনন্দস্বপ্ন। গার্লফ্রেন্ড আসতেছে।কেউ তাকে চেনেনা। বোন বলে পরিচয় করিয়ে দিবে।মুখে তুলে খাইয়ে দেবে আর কাধের উপর হাত রেখে পাশাপাশি হাটবে এর থেকে রাজ কপাল আর কি হতে পারে।

অপর দিকে তোফায়েলের বাবা আগের রাতে চিন্তা করলেন ছেলেতো কদিন বাদেই চলে আসবে কলেজ থেকে। এটাই জীবনের শেষ প্যারেন্টস ডে।তাছাড়া ওর মা আর লামিয়াকেও কোন দিন কলেজে নেওয়া হয়ে ওঠেনি কেবল মাত্র ভর্তির দিন ছাড়া। তাই তিনি মত পাল্টে লাস্ট প্যারেন্টস ডেতে উপস্থিত হবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি ভেবেছিলেন ছেলেকে চমকে দেবেন।তিনি যতটা ভেবেছিলেন তার থেকে শত গুন বেশি চমকেছে তোফায়েল।সেই সাথে তোফায়েলের বাবা মাও চমকেছে। শেষ প্যারেন্টস ডের কথা তাই তোফায়েলের মনে থাকবে সারাজীবন। এমনকি আমাদের চেয়েও বেশি।

১৫ মে ২০১৬

সুদিনের অপেক্ষায়

বইটা হাতে নিয়ে পাতা উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ হেসে উঠলো নিরব।ও সাধারণত হাসে না।যে বইটা হাতে নিয়েছে সেটা আলমারি থেকে আমিই বের করে দিয়েছি।কোন রম্য গল্পের বই নয় যে ওটা পড়ে হাসতে হবে।ওটা একটা কবিতার বই।কবিতা পড়েও হাসা যায় তবে সেটাতো সুকুমার রায়ের লেখা কবিতা নয়।সুনীলগঙ্গোপাধ্যয়ের লেখা কবিতার বইয়ে নিশ্চই এমন কোন কবিতা নেই যেটা পড়ে নিরবের মত নিরস কোন মানুষ হাসতে পারে।

    আমাদের বন্ধুদের মধ্যে একমাত্র নিরবই কম হাসতো।কম বলতে বলা যায় একেবারেই হাসতো না।প্যারেডের কঠিন সময় গুলোতেও টার্ন নেওয়ার সময় যখন অন্যের পিছনে লাথি লাগতো তখন সেটা দেখেও আমরা যখন হাসি খুব কষ্টে চেপে রাখতাম নিরব ছিল তার উল্টো।হাসির জোক্স বলেও তাকে হাসানো যেত না।সেই নিরব সুনীলের কবিতার বই হাতে হেসে ওঠায় অবাক না হয়ে উপায় কি।

    আমার মনে হলো কবিতা পড়ে হাসেনি বরং অন্য কোন ঘটনা মনে পড়ায় হেসেছে।কলেজের ছয়টা বছরে যাকে কোন দিন কোন ঘটনায় হাসতে দেখিনি তার মনের মধ্যে হঠাৎ কি এমন ঘটনা জন্মালো যা তার মূখে হাসি এনে দিল।আমি নিজের বইটা বন্ধ করে ওর পাশে এসে দাড়ালাম।ওদের বাড়িতে যে লাইব্রেরীটা আছে ওখানেই দিন কাটে নিরবের।যেন নিরবে নিভৃতে সে একাকী কাটাতে চায় প্রতিটি মুহুর্ত।সেই লাইব্রেরীতেই দুই বন্ধু গল্প পড়ে সময় কাটাবো বলে ভেবেছিলাম আর তখনই ওর হাসি আমাকে এলোমেলো করে দিল।

    কাধের উপর হাত রেখে জানতে চাইলাম আজ হঠাৎ কি এমন হলো যে তুই এমন করে হাসছিস?নিরব হাতে ধরে রাখা কবিতার বইটির একটি পৃষ্ঠা খুলে দেখাল।সেখানে দেখতে পেলাম সুনীলের শ্রেষ্ঠতম কবিতা “কেউ কথা রাখেনি”।কবিতাটা খুবই মায়া ভরা,বেদনা ভরা।এই কবিতা পড়ে কেউ হাসবেনা,চাই সে যত রসিক লোকই হোকনা কেন।অথচ আমার বন্ধু নিরব হেসেছে।আমি বললাম তুই এই কবিতা পড়ে হেসেছিস?নিরব মাথা নাড়িয়ে সায় দিল।আমি বললাম এখানে এই কবিতাতে হাসির কি আছে?

    নিরব কোন কথা না বলে আমার হাত ধরে টেনে পাশের চেয়ারে বসালো।তার পর কিছুটা সময় নিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো আমি এই কবিতাটি দেখেই হেসেছি তার অনেক কারণ আছে।বহু কাল আগে ক্লাস নাইনে থাকতে প্রথম এই কবিতাটি পড়েছিলাম আর তাচ্ছিল্য করে মনে মনে বলেছিলাম মিথ্যে বলেছে সুনীল।কেউ কথা রাখেনি এই কথাটি সত্যি না।অনেক মানুষ কথা রাখে।অন্তত আমার জন্যতো এটা মোটেই ঠিক নয়।আমার কথা অনেকেই রাখে।আমি যখন যা বলি তাই সবাই মেনে নেয়।তুই নিজেও আমার কথা শুনেছিস অনেকবার।আমি তাই সুনীলের কবিতার কথাগুলিকে মেনে নিতে পারিনি।নিজেই বলেছি সুনীল মিথ্যা কথা লিখেছে।

    নিরব কিছুটা থামলে আমি বললাম ঠিকইতো আছে। তাহলে তুই আজকে কেন হাসলি।নিরব বললো সেদিন আমি শুধু শুধুই সুনীল গঙ্গোপাধ্যয়কে দোষারোপ করেছি।সুনীল আসলে মিথ্যে বলেনি।সুনীলের কবিতাটাই সত্যি।কেউ কথা রাখেনি।আদতেই কেউ কথা রাখেনা।

    নিরবের কন্ঠ ধরে আসে।নিরব না বললেও আমার বুঝতে বাকি থাকেনা।আমারও তখন মনে হয় কেউ কথা রাখেনি,কেউ কথা রাখেনা।

নিরবের স্বপ্ন গুলো হঠাৎ ভেঙ্গে গেল এক অজানা ঝড়ে। যে নিরব ক্যাডেট কলেজ থেকে পাশ করে সেনাবাহিনীতে অফিসার হয়ে দেশের সেবা করবে বলে ভেবেছিল সেই নিরবের সেনাবাহিনীতে যাওয়া হয়নি।ভেবেছিল কদিন পর না হয় বিমান বাহিনীর হয়ে আকাশে ডানা মেলবে সেই স্বপ্নটাও পুরণ হয়নি।নিরবের সব কিছু পাওয়ার অধিকার ছিল,সব কিছু পাওয়ার যোগ্যতাও ছিল।শুধু নিরবের ভাগ্যে সেসব লেখা ছিলনা।হঠাৎ নিবর অসুস্থ্য হয়ে পড়ায় আকাশে ওড়ার স্বপ্নটাও পুরণ হয়নি।

    এখন নিরব সারাদিন বাড়িতে থাকে।হুইল চেয়ারে করে বাড়িতে গড়ে তোলা লাইব্রেরীতে ঢুকে বই পড়ে দিন কাটায়।ঠিকমত পড়তেও পারেনা।একটা পড়লেই মাথা ব্যাথা হয় আর চোখে অন্ধকার দেখে।আকাশে ওড়ার স্বপ্ন যেমন সত্যি হয়নি তেমনি সত্যি হয়নি ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্নও।ঠিক মত পড়তে পারেনা অসুস্থ্যতার কারণে।ফলে ভর্তি হওয়া হয়নি কোথাও।

    যে নিরব ক্যাডেট কলেজের সেরা ছাত্রদের একজন ছিল এবং বন্ধুরা যার থেকে হেল্প নেওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকতো আজ সেই নিরব একাকী নিভৃতে দিনকাটায়।সেই সব বন্ধুরা কেউ ওর খোঁজ নেয়না।কেউ আর্মিতে কেউ বিমান বাহিনীতে আবার কেউ ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার পথে।আর নিরব যেন আজীবনের জন্য পণ করেছে নিরবতা পালনের।বন্ধুরা ওর খোজ নেয়না বলে ওর মনে হয়তো কিছুটা কষ্ট ছিল।তবে সেটা সে মেনে নিয়েছিল এটা ভেবে যে ওই বন্ধুদেরকে সে নিজেওতো খুব বেশি সময় দেয়নি।আজকে ওর এই অসময়ে তাই সেইসব বন্ধুরা না এলেও কিছু বলার থাকেনা।তাহলে নিরবের দুঃখটা কোথায়? আসলে নিরবের দুঃখ অন্য খানে।

    যে বন্ধুদের সে সময় দিতে পারেনি তারা এখন ওকে ভুলে গেলেও কিছু করার নেই।কিন্তু নিরব যার জন্য সময় দিয়েছে সে যদি ওকে ভুলে যায় তাহলে দুঃখ না হয়ে উপায় কি? সুনীলের কবিতাটা পড়ে নিরব ভেবেছিল সুনীল মিথ্যা কথা বলেছে।কেউ কথা রাখেনা এটা নিরব মানতে পারেনি।অন্তত দৃষ্টি নামের মেয়েটি নিশ্চই কোন দিন কথা না রাখার দলে যেতে পারবেনা।কিন্তু আজ কবিতাটি আবার পড়তে গিয়ে নিরব বুঝেছে সুনীল মিথ্যা বলেনি।যার উপর আস্থা রেখে সুনীলকে মিথ্যা বলতেই দ্বিধা করেনি নিরব,সেই দৃষ্টিও কথা না রাখাদের দলে মিশে গেছে।এখন সে হয়েছে বরুনা।তার বুকে কেবলই মাংসের গন্ধ।এখনো সে যে কোন নারী।

    ক্লাস সিক্সে ক্যাডেট কোচিংএ পরিচয় হয়েছিল নিরব আর দৃষ্টির।রংপুর শহরের নিরিবিলিতে সেই ক্যাডেট কোচিংএ ছোট্ট দুটি মানুষ রোজ ক্লাসে যেত।চোখাচোখি হত কিন্তু সেই বয়সে ভাললাগার বিষয়টি তাদের মনে গড়ে ওঠেনি।তার পর কিভাবে কিভাবে যেন দুজনই চান্স পেলো ক্যাডেট কলেজে।ক্লাস নাইনের ভ্যাকেশানে ওদের দেখা হলো।নতুন করে পরিচয় হলো।সেই পরিচয়ের গন্ডি বহু দূর এগোলো।

    নিরবের মনে হতো সুর্য পুব থেকে পশ্চিমে উঠতে পারে কিন্তু দৃষ্টি কখনো তাকে একা করে দিয়ে চলে যেতে পারেনা।কিন্তু নিরব ভুল ছিল।নিরবের হিসাবেও ভুল ছিল।নিরব এখন দৃষ্টিহীন।চোখের আলো আছে,গোটা পৃথিবীকে সে আমাদের মতই দেখতে পায় শুধু সে দেখতে পায়না দৃষ্টিকে।সে দৃষ্টিহীন।

    নিরব অসুস্থ্য হয়ে পড়ায় তার ক্যারিয়ারের সব স্বপ্ন মুছে গেল।নিরব তখন নিরবে নিভৃতে একাকী জীবন কাটাতে শুরু করলো।অন্য সবার সাথে সাথে কোন কিছু না জানিয়ে দৃষ্টিও চলে গেল দৃষ্টি সীমার বাইরে।এক বিকেলে খালার বাসা থেকে খালাতো ভাইয়ের সাথে ঘুরতে বেরিয়েছিল নিরব।ও হাটতে পারেনা বলে সারাক্ষণ হুইল চেয়ারই ওর সঙ্গী।তবে এটা অটো হুইলার হওয়ায় কাউকে কষ্ট করে ওর চেয়ার ঠেলতে হয়না।আইবিএর সামনে গিয়ে নিরব যখন চারদিকটা ভাল করে দেখছিল তখন আইবিএ ভবনের সিড়ি বেয়ে নেমে এলো এক অপ্সরা।নিরব তাকে চেনে।তার হাটা,তার চুল থেকে ভেসে আসা ঘ্রান,তার চাহুনী,তার প্রতিটি নিঃশ্বাস নিরবের চেনা।সে তার হারিয়ে যাওয়া দৃষ্টি।

    দৃষ্টিহীন নিরবকেও নিশ্চই দৃষ্টির চিনতে না পারার কোন কারণ নেই।কিন্তু পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার সময়ও একটি বারের জন্যও কথা বলেনি নিরবের সাথে।নিরবের দু চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়েছে অব্যক্ত বেদনার অশ্রু।সেই থেকে নিরবের বেঁচে থাকার ইচ্ছেটা আরো প্রবল হয়েছে।তার মনোবল ক্রমাগত ভাবে বাড়ছে।সে স্বপ্ন দেখে একটা উজ্জল দিনের।যেদিন তার আকাশ থেকে সব কালো মেঘ সরেগিয়ে সাদা মেঘের ভেলা উড়বে।যেদিন নিরবের আর কোন দৃষ্টির দরকার পড়বেনা।নিরব বিশ্বাস করে সে সফল হবেই।এখন তার এক একটা দিন কাটে সুদিনের অপেক্ষায়।

২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

সত্যিকারের বন্ধু

ছোট্ট আলীমের মন খারাপ।তার কোন বন্ধু নেই।যাওবা একটা বন্ধু ছিল সেও তার বাবা মায়ের সাথে অন্য কোথাও চলে গেল।অবশ্য আলীমের ক্লাসে কিছু বন্ধু আছে কিন্তু ক্লাস শেষ হলেইতো তারা যার যার বাড়িতে চলে যায়।শুধু মাত্র নিরব নামের বন্ধুটি ওর সাথে সাথে বাড়ি ফেরে।নিরবের বাসা ছিল ওদের বাসার পাশেই।দুজনের মধ্যে দারুন বন্ধুত্ব ছিল।কিন্তু বাবা বন বিভাগের কর্মকর্তা হওয়ায় হুট করে নিরবকে অন্য যায়গায় চলে যেতে হলো।আলীমের বাবাও বন বিভাগের কর্মকর্তা।হয়তো একদিন তাকেও আবার বদলী হয়ে চলে যেতে হবে।কিন্তু আলীম এখন যেখানে আছে সেখানে আশেপাশে ওর বয়সী আর কেউ নেই।যারা আছে তারা সবাই অনেক বড় নয়তো খুবই ছোট।আলীমের এক মাত্র বন্ধু ছিল নিরব।এখন সে চলে যাওয়ার পর আর কোন বন্ধু নেই যার সাথে সে স্কুল থেকে ফিরবে,বিকেলে খেলবে,পরদিন একসাথে আবার স্কুলে যাবে।

     আলীম এখন আকাশ দেখে মজা পায়না,টিভিতে কার্টুন দেখেও মজা পায়না।বন্ধুহীন জীবন ছোট্ট আলীমের অসহ্য লাগে।ওর মন খারাপ দেখে বাবা মা চিন্তা করে কি করে ওর জন্য একটা বন্ধু এনে দেওয়া যায়।নতুন যে অফিসার আসবেন তিনি কিছুদিন হলো বিয়ে করেছেন,তার কোন ছেলে মেয়ে নেই।আলীমের জন্য তাদেরও মন খারাপ হয়ে যায়।প্রতিদিন যখন মন মরা করে স্কুলে যায় আবার মন মরা করে স্কুল থেকে ফেরে তখন বাবা মায়েরও খুব খারাপ লাগে।

     আলীমের ছোট মামা ফোন করে একটা বুদ্ধি দেয়।খেলার সাথী হিসেবে ওর জন্য একটা ছোট্ট তুলতুলে খরগোশ কিনলে কেমন হয়? যে বুদ্ধি সেই কাজ।বাবা একটা সুন্দর তুলতুলে খরচগোশ কিনে আনে।আলীম খুব খুশি হয় আর স্কুল শেষে সেই খরগোশের সাথে খেলা করে।বন্ধুর অভাব অনেকটাই পুরণ হয়ে যায়।কিন্ত এক বিকেলে বাসায় ফিরে দেখে তার আদরের খরগোশটা নেই।খরগোশটা বাগানে খেলছিল কোন ফাকে শেয়ালে ধরে নিয়ে গেছে।আবার আলীমের মন খারাপ হয়।সে মনে করে যারা তাকে ছেড়ে চলে যায় তারা কোন ভাবেই তার বন্ধু নয়।

     আলীমের ছোট মামা আবার একটা বুদ্ধি দেয়।ওর জন্য একটা কাকাতুয়া পাখি কেনার কথা বলে।পাখিটাকে কথা শেখালে আলীমের সাথে গল্প করতে পারবে।কাকাতুয়া পাখি মানুষের ভাল বন্ধু হয়।সত্যি সত্যি পরদিন ছোট্ট আলীমের জন্য বাবা একটা কথা বলা কাকাতুয়া কিনে আনে।সেটা আলীমের ঘরের দরজায় ঝুলিয়ে রাখা হয়।পাখিটা আলীমকে ডাকে আলীম আলীম কেমন আছ তুমি।পাখির মিষ্টি কথা শুনে আলীমের খুব ভাল লাগে।সে আবার একটা বন্ধু পেয়ে আগের দুঃখ ভুলে যায়।

     কিন্তু আগের মতই একদিন আলীম স্কুলে যাওয়ার সময় পাখিটাকে খাবার দিয়ে খাচার দরজা বন্ধ করতে ভুলে যায়। ফলে খোলা দরজা দিয়ে পাখিটা উড়ে চলে যায়।ফিরে এসে ছোট্ট আলীম দেখে খাচাটা শুন্য,সেখানে কাকাতুয়াটা নেই।তার মনটা আবার দুঃখে ভরে ওঠে।সে তার বাবাকে বলে যারা ওকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে তারা কোন ভাবেই ওর বন্ধু নয়।নিরব চলে গেল,খরগোশটা চলে গেল এবার কাকাতুয়াটাও চলে গেল।ওরা কেউ আমার বন্ধু নয়।আমি এমন এক বন্ধু চাই যে কোন দিন ছেড়ে যাবেনা আমাকে।আমি ছেড়ে যেতে চাইলেও সে আমাকে ছেড়ে যাবেনা।

     বাবা তখন ছোটমামাকে ফোনে কথা গুলো বললো।ছোটমামার অনেক বুদ্ধি কিন্তু এমন বন্ধু সে কোথায় পাবে যে কোন দিন ছেড়ে যাবেনা।সে ভাবতে থাকে কিন্তু কোন ভাবেই বুঝে উঠতে পারেনা।এক সপ্তাহ কেটে যায় কিন্তু সেরকম বন্ধু আর খুজে পাওয়া যায়না।ছোট্ট আলীমও খুব মন খারাপ করে থাকে।একদিন সে বাগানের বেঞ্চিতে বসে ছিল।এমন সময় সাদা পোশাকের একজন বৃদ্ধ মানুষ তার সামনে এসে দাড়াল।তার গায়ে ছিল সাদা পাঞ্জাবী,পরনে ছিল লুঙ্গী।তাকে দেখে ছোট্ট আলীমের একটুও ভয় লাগলোনা।লোকটা আলীমের পাশে বসলো তার পর বললো দাদু ভাই তোমার কি মন খারাপ? ছোট্ট আলীম তখন সব খুলে বললো এবং এমন একজন বন্ধু চাইলো যে কোন দিন তাকে ছেড়ে যাবেনা।

     সেই বুড়ো দাদুটি হেসে দিয়ে বললেন ও এই কথা?আমার কাছেইতো আছে সেইবন্ধু।যে কোন দিন তোমাকে ছেড়ে যাবেনা।তুমি নিজে ছেড়ে যেতে চাইলেও সে তোমাকে ছেড়ে যাবেনা।দাদুর কথা শুনে ছোট্ট আলীমের মুখে হাসি ফুটে উঠলো।সে বললো আমাকে দাওনা সেই বন্ধু এনে।বুড়ো দাদু তার কাধে ঝোলানো ব্যাগে হাত ঢুকিয়ে কি যেন খুজলো।আলীম বললো দাদু ওই ছোট্ট ব্যাগেইকি সেই বন্ধুকে লুকিয়ে রেখেছ?বুড়ো দাদু বললেন হ্যা এই ব্যাগেই আছে সেই বন্ধু।আলীম খুব অবাক হয়ে বললো এতোটুকু ছোট্ট ব্যাগে অমন সুন্দর বন্ধু থাকে?যে কোন দিন আমাকে ছেড়ে যাবেনা?

     সাদা পাঞ্জাবী পরা সেই দাদু আস্তে আস্তে ব্যাগ থেকে আলীমের জন্য অকৃত্রিম এক বন্ধুকে বের করে ওর হাতে দিলেন।আলীম ভাল করে নেড়ে চেড়ে দেখলো তার পর বললো তুমি কি সত্যি বলছো এই বন্ধু কোন দিন আমাকে ছেড়ে যাবেনা? দাদু তখন ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন সত্যি বলছি সে কোন দিন তোমাকে ছেড়ে যাবেনা।আলীম তার বন্ধুকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে ঘরে চলে গেল।ছোট্ট আলীমের সেই বন্ধুটি ছিল একটি সুন্দর বই।একটা একটা করে বইয়ের পাতা উল্টে পড়তে পড়তে আলীম মুগ্ধ হয়ে যাচ্ছিল।বাবা অফিস থেকে ফিরে দেখলেন আলীম হাসিখূশি মনে বই পড়ছে।কাছে গিয়ে জানতে চাইলেন আমাদের রাজপুত্রটাকে আজকে খুব খুশি দেখাচ্ছে যে।

     আলীম বাবার গলা জড়িয়ে ধরে বললো জানো বাবা আমি আজকে আমার সত্যিকারের বন্ধু খূজে পেয়েছি। যে কোন দিন আমাকে ছেড়ে যাবেনা,একটা দাদু বলেছে এটা।বাবা সেই বন্ধুকে দেখতে চাইলে ছোট্ট আলীম হাতে ধরে রাখা সুন্দর বইটি দেখালো।বইটা হাতে নিয়ে বাবা দেখতে পেলেন সত্যিকারের বন্ধুর খোজ দেওয়া সেই দাদুটি পলান সরকার।

     ছোট্ট আলীম একটু একটু করে বড় হলো।ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হলো এবং অবাক হয়ে দেখলো তার সেই বন্ধু তাকে ছেড়ে যায়নি।অন্যদের যখন আপনজনের জন্য বন্ধুদের জন্য মনখারাপ হতো তখনো আলীম তার বন্ধুকে পাশে পেতো।এর পর ভার্সিটি শেষ করে একদিন আলীম মনে করলো তার বন্ধুর কথা সবাইকে জানানো দরকার।সে তখন বড় হয়ে নিজেই একটা বই লিখলো নাম দিলো রক ক্যাডেট।সেটি হয়ে উঠলো আরো অনেকের আজীবনের বন্ধু।ছোট্ট আলীম বুঝেছিল বইয়ের চেয়ে ভাল বন্ধু আর কেউ হতে পারেনা।বই কখনো ছেড়ে যায়না।

২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

ক্যাডেট কলেজের দারোয়ান

সীমান্ত রক্ষীরা যেমন অতন্দ্র প্রহরীর মত সীমান্ত পাহারা দেয় তেমনি ক্যাডেট কলেজের দারোয়ানদেরও অতন্দ্র প্রহরী হতে হয়।ক্যাডেট কলেজে বাইরে থেকে কোন চোর এসে চুরি করে যাবে এমন সাহস পৃথিবীর কোন চোরের হয়নি।এমনকি ক্যাডেট কলেজ গ্রাউন্ডের ভিতর চুরি করার সাহস নেই স্বয়ং থিপ অব বাগদাদের।প্রিন্সিপাল স্যার এটুকু বলে থামলেন। তার পর বললেন ও তুমি হয়তো থিপ অব বাগদাদের নাম জানোই না।প্রিন্সিপাল স্যার যাকে এটা বলেছেন সে স্যারকে আশ্চর্য করে দিয়ে বললো না স্যার শুনেছি।টিভিতে দেখেছি।সে এসেছে ক্যাডেট কলেজের দারোয়ান পদের জন্য সাক্ষাতকার দিতে।তার নাম জমির শেখ। প্রিন্সিপ্যাল স্যার বললেন শুনে থাকলে শুনেছ দেখে থাকলে দেখেছ। এবার আসল কথায় আসি।


প্রিন্সিপাল স্যার আবার বলতে শুরু করলেন।কলেজ ক্যাম্পাসে বাইরের কোন লোক এসে কিছু চুরি করবে এমনটি কোন দিনই হবেনা।তার পরও কলেজের কোন কোন গাছের কাঠাল,কোন কোন গাছের ডাব,আম কিংবা পেয়ারা রাতের অন্ধকারে হারিয়ে যাবে।কোন ভূত নয় কোন জীন নয় মানুষই সেগুলো চুরি করে খাচ্ছে। সেই চোরদের হাত থেকে কলেজকে দেখে রাখতে হবে তুমি কি পারবে?জমির শেখ বললো অবশ্যই পারবো।যদি দেখি কোন ক্যাডেট ডাব চুরি করতে চেষ্টা করছে কিংবা কাঠাল চুরি করতে চেষ্টা করছে তবে আমি তাদের পাকড়াও করবো।যদি বেশি বাড়াবাড়ি করে তাহলে ওদের থেকে ডাব এবং কাঠালের ভাগ নেব!


নতুন গার্ড নিয়োগের উদ্দেশ্যে প্রিন্সিপাল স্যার জমির শেখের ভাইভা নিচ্ছিলেন।ভাইভার এই পযার্য়ে প্রিন্সিপাল স্যার হতভম্ব হয়ে যান।ক্যাডেটরা চুরি করে ডাব কিংবা কাঠাল খেতে চাইলে গার্ডের দায়িত্ব সেটা যেন না ঘটে আর জমির শেখ নাকি গার্ড হলে চুরি করা ডাব এবং কাঠালের ভাগ চাইবে।


প্রিন্সিপাল স্যার বললেন, এবার পরের অংশে আসি।ক্যাডেট কলেজে বাইরে থেকে কেউ সদর দরজা দিয়েও ঢোকার সাহস করবেনা আবার দেয়াল টপকেও ভিতরে আসার চেষ্টা করবেনা। তবে হা কোন কোন দুষ্টু ক্যাডেট কারণে কিংবা অকারণে দেয়াল টপকে কলেজের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করবে। কেউ কেউ পালিয়ে একবারে বাড়ি চলে যাওয়ার চেষ্টা করবে। তোমার দায়িত্ব হবে কেউ যেন কোন ভাবেই কলেজ থেকে পালিয়ে যেতে না পারে সেটা দেখে রাখা।তুমি কি পারবে?


জমির শেখ মুখে বিশাল হাসি এনে বললো অবশ্যই পারবো স্যার।কাউকে দেয়াল টপকে পালিয়ে যেতে দেবনা।আর কোন ক্যাডেট যদি বেশি বাড়াবাড়ি করে তবে তাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে কলেজ থেকে বের করে দেব।


প্রিন্সিপাল স্যার একবার জমির শেখের মুখের দিকে তাকালেন আরেকবার আমার দিকে।আমি ভাইস প্রিন্সিপাল।তিনি আমার মতামত চাচ্ছেন যে জমির শেখকে গার্ড হিসেবে কি নিয়োগ দেওয়া যায়?আমি কোন ভাবেই ঠিক করতে পারিনা। আপনারাই বলুন যে গার্ড ক্যাডেটের পালিয়ে যাওয়া ঠেকানোর পরিবর্তে তাকে ঘাড় ধরে বের করে দেওয়ার কথা চিন্তা করতে পারে এবং ক্যাডেটদের চুরি করা ঠেকানোর বদলে তাদের চুরির কাঠাল আর ডাবের ভাগ চাইবে বলে সিদ্ধান্ত নিতে পারে তাকে কি ক্যাডেট কলেজের গার্ডের চাকরি দেওয়া যায়? নাহ যায় না।

আমি সোজা না করে দিলাম। আমি জানি যে আমি হ্যা বললেও কিছু হবেনা না বললেও কিছু হবেনা। প্রিন্সিপাল স্যার সব সময় অন্যদের মতামত নেন কিন্তু যা করার সেটা তিনি নিজেই আগে থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখেন। এবং জমির শেখের কপালে আর ক্যাডেট কলেজের গার্ড হওয়ার ভাগ্য হলোনা।ক্যাডেটদের কারো কারো কপাল পুড়লো অন্তত যারা পালিয়ে যেতে চেয়েছিল।জমির শেখ গার্ড হলেতো সেই পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিত। একটু রাগিয়ে দিলেই ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিত।

#জাজাফী
#ক্যাডেট
#Cadet
Zazafee
#MCC
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭