জাজাফী গল্প তিন শহরের টান

তিন শহরের টান




ক্লাসে মন বসছিলো না।শেষে দুপুরের আগেই বাসায় ফিরে এলাম।গত বছর ৯ মার্চের কথা।আমাদের বাসা মহম্মদপুরের নুরজাহান রোডে।বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরে সাধারণত বিকেল থেকে সন্ধ্যা পযর্ন্ত বন্ধুরা মিলে টোকিও স্কয়ারের ওদিকটাতে আড্ডা দেই।সেদিন কিছুই ভালো লাগছিলো না।ক্লাস শেষ না করে বাসায় ফিরে এলাম।খানিকটা ঘুমিয়ে যখন উঠলাম তখন মোবাইলে অনেক গুলো মিসড কল দেখতে পেলাম।বন্ধুরা ফোন দিয়েছিল।কি মনে করে ওদেরকে আর ব্যাক করলাম না।চোখে মুখে পানির ছিটা দিয়ে কম্পিউটারের সামনে বসলাম।মেইল ওপেন করতেই চোখে পড়লো I will lift up my eyes। কথাটি দেখার সাথে সাথে বুঝলাম মেইল এসেছে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগেরি থেকে।কানাডার আলবার্টাতে অবস্থিত বেশ নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়।তিন মাস আগে ওরা একটা প্রোগ্রামে অংশ নেওয়ার জন্য সারা বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র ছাত্রীদের কাছ থেকে আবেদন আহ্বান করেছিল।কি মনে করে আমিও দিয়েছিলাম।কখনো ভাবিনি ওরা আমাকে সেই প্রোগ্রামে ডাকবে।

আমি স্বপ্নকে তাড়া করে ফিরি।পৃথিবীর বন্দরে বন্দরে আমার নৌকা ভিড়াই স্বপ্ন খুঁজবো বলে।কিন্তু স্বপ্নগুলো ছায়ার মত সরে যায়।আমি যখন এক পা এগিয়ে যাই তখন সেও এগিয়ে যায়।আকাশের চাঁদটাও ঠিক তাই।যেন আমার সাথে সেও প্রতিযোগিতায় নেমেছে।আমি ভাবি যে স্বপ্নকে ছুবো বলে দিনাতিপাত করছি সে কবে আসবে?কবে তাকে ছুয়ে দেখতে পাবো।কিন্তু পাইনা, সেই সুযোগও আসে না।আমিও হাল ছাড়ি না।মনের মধ্যে বুনে রেখেছি সেই স্বপ্ন যা দেখার মধ্যেও আনন্দ আছে।

স্কুল লাইফ থেকেই পরিবেশ নিয়ে তুমুল আগ্রহ আমার।আমি যখন ম্যানহাটন জুনিয়ার হাইস্কুলে পড়তাম তখনই বন্ধুদের সাথে পরিবেশ নিয়ে কাজ করেছি।স্কুল থেকে আমরা মাঝে মাঝেই চলে যেতাম রকফেলার পার্কে।বন্ধুরা মিলে সারা বিকেল কাটিয়ে আসতাম প্রাকৃতিক পরিবেশে।রকফেলার পার্কের গাছগুলো খুব সুন্দর।মনে হতো আমাদের আগমনে ওরা বেশ খুশি।মাঝে মাঝে আমার বন্ধু গ্রেগর গাছের সাথে কথাও বলতো।যদিও সেসব ছেলেমানুষী ছিলো তবে ভালোবাসাও ছিলো খুব।তারই ধারাবাহিকতায় আমরা ইউনেস্কোর বেশ কিছু প্রোগ্রামে অংশ নিয়েছিলাম।স্কুলে আমাদের ছিলো এনভায়রনমেন্ট ক্লাব।সেই ক্লাবে আমি ছিলাম।তার পর আমি যখন চলে এলাম তখন কিছুদিন সেসবে ভাটা পড়ে গেলো।এর প্রধান কারণ রকফেলার পার্কে সামান্য কটা গাছ দেখে যে আমি অভিভূত ছিলাম সেই আমি যখন বাংলাদেশের সবুজ বেলাভূমিতে এসে পৌছালাম তখন আমি বাকরুদ্ধ।এতো সবুজ এখানে! আমার বন্ধুরা আসলে নির্ঘাৎ পাগল হয়ে যাবে এই সৌন্দর্য দেখে।এনভায়রনমেন্ট ক্লাবের চিন্তা তখন আর মাথায় আসেনি।তবে মনে যে বিষয়টি গেথে ছিলো তার প্রতি এতো সহজেতো ভালোবাসা উবে যাওয়ার কথা নয়।আমার মনের মধ্যেও ছিলো।

স্কুল কলেজ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় আঙিনায় পা রাখার পরও প্রকৃতির প্রতি আমার অবিরাম ভালোবাসা ছিলো।সুন্দর পৃথিবীটা দিনদিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে দেখে মনখারাপ হতো।তাই পরিবেশ নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে ছিলো সব সময় এবং সুযোগ পেলেই আমি তা করতাম।আমার জিওগ্রাফীতে পড়ুয়া বন্ধুরাও বেশ অবাক হতো।বলতো একাউন্টিং ম্যানেজমেন্ট পড়ুয়া ছাত্রের পরিবেশ নিয়ে এতো জানাশোনার আগ্রহ দেখে অবাক হই।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগেরি পঞ্চাশতম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে তারা এ আয়োজন করলো।সমস্ত ব্যয়ভার তাদের।এমন সুযোগ আমি তাই হাতছাড়া করতে চাইনি।আর বিষয়টি যেহেতু পরিবেশ নিয়ে এবং আমার পছন্দের তাই আমাকে আরো টেনেছে।সারাদিনের ক্লান্তি ভাব মুহুর্তেই উবে গেলো যখন মেইলের শুরুতেই ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগেরির মটো চোখে পড়লো।মিস্টার ডেবোরাহ ইয়েডলিনের সাইন করা স্ক্যান কপি এটাচ করে পাঠিয়েছে।সেখানে আমাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন তোমার অতীত অভিজ্ঞতা এবং পরিবেশের প্রতি ভালোবাসার গল্পগুলো আমাদের মুগ্ধ করেছে।আমরা চাই তুমি আমাদের এ আয়োজনে যুক্ত হয়ে তোমার ভালোবাসার গল্পগুলো শেয়ার করো এবং পরিবেশ সুন্দর করা বিষয়ে তোমার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরো।

আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত পড়ছি মিস্টার ডেবোরাহ ইয়েডলিনের আমন্ত্রনপত্র।তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির চ্যান্সেলর।দিনতারিখ দেখতে গিয়ে বুঝলাম সময় খুব বেশি নেই।সাথে সাথে মেইলের প্রিন্ট কপি নিয়ে ছুটলাম মাম্মামের কাছে।বললাম আমাকে কানাডা যেতে হবে।মাম্মাম মেইলের কপি হাতে নিয়ে মনোযোগ দিয়ে দেখে অভিনন্দন জানালেন আর বললেন ওখান থেকে মাত্র চল্লিশ কিলোমিটার দূরেই আমেরিকা সীমান্ত।আর বড়জোর ২৪০ কিলোমিটার গেলেই ম্যানহাটন।তুমি চাইলে ঘুরে আসতে পারো!মাম্মামের কথাটা মনে ধরলো।ভাবলাম ভালোই হবে যদি শৈশবের স্কুলটাতে ঢু মেরে আসি।অ্যাম্বাসিতে গিয়ে সব পেপার রেডি করি এবং বেশ সহজেই সব কিছু হয়ে যায়।তার পর নির্ধারিত দিনে আকাশে উড়াল দেই।প্রথমবারের মত কানাডা যাচ্ছি।হাতে বেশ সময় নিয়েছি।ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগেরির আয়োজিত “দ্য আর্থ সামিট ২০১৮” এ অংশ নেওয়ার পর ঘুরবো বেশ কিছু যায়গা।বিশেষ করে ভ্যাঙ্কুভার,টরেন্টোর বেশ কিছু যায়গা।নায়াগ্রা জলপ্রপাতের ওদিকটাতেও যাবো।

কোন রকম ঝামেলা ছাড়াই ক্যালগেরি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে গিয়ে নামলাম।বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আরো অনেকেই এসে পৌছেছে।বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি টীম আমাদের রিসিভ করার জন্য অপেক্ষা করছে।আমার ডেলিগেট ছিলো ওকিনাওয়া নামে এক জাপানিজ মেয়ে।জাপানিজ হলেও সে বেশ ইংরেজী জানে।তার সাথে কথা চালিয়ে যাওয়ায় আমার কোন অসুবিধা হলো না।পথে যেতে যেতে অনেক কথা হলো।আমি তাকে জানালাম দুজন মানুষের সাথে দেখা করার খুব ইচ্ছে আমার।ওকিনাওয়া তাদের পরিচয় জানতে চাইলে আমি বললাম তারা হলেন ওয়েন অ্যাডামস আর ক্যাথিরিন কিং। আমার কথা শুনে সুন্দর একটা হাসি দিলো ওকিনাওয়া।তার হাসির কারণ আমার জানা ছিলো না। আমি জানতে চাইলাম হাসলে কেন? সে তখন বললো তোমার ইচ্ছে দেখছি এমনিতেই পুরণ হতে চলেছে।ওয়েন অ্যাডামস আর ক্যাথিরিন উপস্থিত থাকবেন এই প্রোগ্রামে।শুধু তাই নয় ঘুরতে নিয়ে যাবেন তাদের গড়ে তোলা “ফ্রিডম কৌভ” বা স্বাধীন দ্বীপে।শুনে আমার খুব ভালো লাগলো। ফ্রিডম কৌভ খুবই সুন্দর একটি জায়গা।ওখানে না গেলে কানাডা আসার আনন্দ ফিকেঁ হয়ে যাবে।এক সপ্তাহ ব্যাপী “দ্য আর্থ সামিট ২০১৮” এর কার্যক্রম বেশ সুন্দর ভাবে চলতে থাকলো।সেটি নিয়ে পরে বিস্তারিত লিখবো বলে ভাবছি।

আর্থ সামিট শেষ হওয়ার পর মাম্মামের কথা মনে পড়লো।ভাবলাম এবার পাড়ি জমাবো আমেরিকায়।কতদিন যাওয়া হয়নি।আলবার্টা থেকে আমি গিয়ে উঠেছিলাম ভ্যাঙ্কুভারে।ওখানে আমার ছোট চাচ্চুর বাসা।পরিবার সহ স্থায়ীভাবে বাস করছে।ভ্যাঙ্কুভার পৃথিবীর সব থেকে সুন্দর শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম।কুইক শাটল নামক বিলাসবহুল বাসে রওনা হলাম ম্যানহাটনের উদ্দেশ্যে। সরাসরি ম্যানহাটন যেতে পারবো না। আমাকে প্রথমে যেতে হবে সিয়াটল তার পর সেখান থেকে ম্যানহাটন।ভ্যাঙ্কুভার থেকে ৯৯ নং সড়ক ধরে আমাদের কুইক শাটল চলতে শুরু করলো।এতো দ্রুতগামী যে মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যেই আমরা সীমান্তে পৌছে গেলাম।সীমান্তের এ অংশের দুটো নাম আছে। কানাডা অংশের নাম সারি আর আমেরিকা অংশের নাম ব্লেইন।খুব দ্রুততার সাথে ইমিগ্রেশান চেকিং চলতে থাকলো।

একসময় আমার পালা চলে আসলো।পাসপোর্ট হাতে নিয়ে অফিসার আমার মূখের দিকে তাকালেন।এমন ভাবে তাকালেন যেন আমার মধ্যে রহস্যজনক কিছু একটা পেয়েছেন।আমি বললাম কি দেখো অমন করে?অফিসারের নাম ফিলিপ কার্ট।সে মুচকি হাসি দিয়ে বললো তোমার গল্প আমরা জানি।তুমি যে চোখ ভিজিয়ে একদিন চলে গিয়েছিলে সেই খবরতো সবাই জানে।তোমাকে স্বাগতম!

ছোটবেলার কথা খুব মনে পড়ে গেলো।সেই ঘটনাটা যে পত্রিকায় ঢলাওকরে ছাপা হয়েছিল তা আমার জানাই ছিলো না।বিষয়টি ভাবতেই আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম।মনে মনে তখন অনেক কল্পনা।ম্যানহাটন জুনিয়র হাইস্কুলে পৌছে না জানি আমি কি কি দেখবো।তারা কি আমাকে মনে রেখেছে? আমার শৈশবের স্কুল! ভাবতেই ভালো লাগছে।মনে মনে ভাবলাম অবশ্যই আমাকে মনে রেখেছে।আমি যেহেতু মনে রেখেছি সে কেন মনে রাখবে না।জানালার কাচের ভিতর দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি।দ্রুত গতিতে চলছে আমাদের বাস।মন পড়ে আছে তিন জায়গায়।ভ্যাঙ্কুভার,ম্যানহাটন আর ঢাকা।অন্য দুটি শহর যত সুন্দরই হোক না কেন আমি অবশ্যই ঢাকায় ফিরে যাবো।বাংলায় কথা বলার জন্য,বাংলায় লেখার জন্য।

গল্পঃ তিন শহরের টান

লেখাঃ জাজাফী

২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯