জাজাফী গল্প মমতার বন্ধন

মমতার বন্ধন



শীতের বিকেল।আকাশের সুর্য যে রোদ ছড়াচ্ছে তা উষ্ণতার জন্য যথেষ্ট নয়।বিশেষ করে কক্সবাজারের আবহাওয়াটাও অন্যরকম।আমার বন্ধু উইলহেমের আমন্ত্রনে ঢাকা থেকে আরও তিনজন বন্ধুকে সাথে নিয়ে পৌছেছি কক্সবাজারে।অন্য তিন বন্ধুর একজন কানাডিয়ান,একজন ইন্ডিয়ান এবং একজন রাশিয়ান।স্কুল লেভেলে আমরা ফিফথ গ্রেড পযর্ন্ত একসাথে পড়েছি ম্যানহাটন জুনিয়র হাইস্কুলে।তার পর আমি ফিরে এলাম মাতৃভূমিতে আর ওরা থেকে গেলো।তবে পরবর্তীতে ওদের অনেকেই নিজ নিজ দেশে ফিরে গেলো।কিন্তু বিধিলিপিতে যা লেখা আছে তা খন্ডাবার সাধ্য মানুষের নেই।গ্রহ নক্ষত্রের মত আবর্তিত হতে হতে আমরা আবার মিলিত হয়েছি।উইলহেম ম্যানহাটনে থেকে গেলেও আমি,গ্রেগর,রুদ্রনীল আর মায়োকভস্কি পরিবারের সাথে পাড়ি জমিয়েছি মাতৃভূমিতে।আমাদের মধ্যে তবুও যোগাযোগ ছিলো সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যানে।আমরা কথা দিয়েছিলাম আজীবন বন্ধু থাকবো যেখানেই থাকি না কেন।সেই কথা আজও অব্দি রাখতে চেষ্টা করেছি।

ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে আমি মেইল করেছিলাম গ্রেগর,রুদ্রনীল আর মায়োকভস্কিকে।সেই সাথে মেইল করেছিলাম উইলহেমকেও।সেই মেইলে ওদের আমন্ত্রন জানিয়েছিলাম ফেব্রুয়ারি জুড়ে বাংলা একাডেমীতে হওয়া বইমেলার সৌন্দর্য দেখার জন্য।বলেছিলাম প্রতি বছর একুশ ফেব্রুয়ারিতে যে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয় সেটির সুতিকাগার এই সোনার বাংলাদেশের জাতীয় শহিদ মিনারে খালি পায়ে শ্রদ্ধা জানানো লাখো জনতার ভীড় দেখতে,প্রভাত ফেরী দেখতে। আমি ভেবেছিলাম ওরা তেমন আগ্রহ দেখাবে না।কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে এক এক করে সবাই মেইলের উত্তর দিয়েছিল এবং জানিয়েছিল ওরা আসবে।শুধু উইলহেম লিখেছিল পরে জানাবে।উইলহেমের বিষয়টা আলাদা।সে আসবে কি আসবে না সেটা আমি ধরে রাখিনি।ষোল বছর বয়স থেকেই সে জাতিসংঘের নানা কার্যক্রমে যুক্ত থাকায় সারা বছরই কোন না কোন কাজে ব্যস্ত থাকে।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার কাজও নিশ্চই অনেক বেড়েছে। সে সেই সব ব্যস্ততা কাটিয়ে একুশে বইমেলা দেখতে আসবে আর একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরীতে যোগ দিবে আমি সেটা আশাও করিনি।তবে অন্যরা যখন মেইল পেয়ে উচ্ছাস প্রকাশ করে বলেছে আসবে তখন আমি নিশ্চিত তারা আসবেই।রুদ্রনীলতো আমাদের পাশের দেশেই থাকে।ইন্ডিয়া থেকে আসতে তার খুব একটা বেগ পেতে হবে না।ভাবছিলাম গ্রেগর আর মায়োকোভস্কির কথা।বিশেষ করে মায়োকোভস্কি আসবে রাশিয়ার উইলিয়ানোভস্ক শহর থেকে।উইলিয়ানোভস্ক শহরটি রাশিয়ার রাজধানী মস্কো থেকেও ৮৯৩ কিলোমিটার পুর্বে ভলগা নদীর তীরে।এই শহরেই জন্ম নিয়েছিলেন ভ্লাদিমির লেনিন।এতোটা দূর থেকে জার্নি করে আসতে ওর নিশ্চই কষ্ট হবে।আমি এসব কথা ওদের জানাতেই ওরা আমাকে নিশ্চিত করে জানালো এই উইন্টারে বাংলাদেশ ভ্রমনের এই সুযোগের মত আনন্দের আর কিছু থাকতে পারেনা।একই সাথে অনেক কিছু হবে।বন্ধুরা মিলে দীর্ঘ চৌদ্দ বছর পর আড্ডা হবে সেই সাথে বইমেলা এবং প্রভাতফেরী দেখা হবে।

আমি আমার বাল্যবন্ধুদের উৎসাহে ভীষণ পুলকিত হলাম।আমার কাঁধে তখন অনেক গুলো দায়িত্ব।ভাবছি ওদেরকে কি আমার বাসায় রাখবো নাকি হোটেলে?এটি নিয়ে আমরা গ্রুপে আলোচনা করলাম।ওরা জানালো ওরা আমার বাসাতে থাকতেই বেশি আগ্রহী।মাম্মামকে কথাটা বলতেই সেও বললো বেশতো বন্ধুরা আসুক।ওদের সাথে আমারওতো চৌদ্দ বছর দেখা হয়নি।দারুন হবে।সেদিন থেকেই দিনক্ষণ গুনতে লাগলাম।বার বার শুধু উইলহেমের কথা মনে পড়ছিল।সত্যিই ও যদি আসতো আরো ভালো হতো।ম্যানহাটন জুনিয়র হাইস্কুলে পড়াকালীন সময়ে আমরা সব থেকে বেশি আড্ডা দিতাম উইলহেমের বাসায়।ওর বাবা মা আমাদের দারুণ পছন্দ করতো।আর আমরা পছন্দ করতাম ওর বোন রসি উইলহেমকে।তখন সে নাইনথ গ্রেডে পড়তো আর আমরা ফিফথ গ্রেডে।কিন্তু বাবা মা না থাকলে সে আমাদের বেবীসিটার হতো।তবে খুব আদর করতো।

দিনক্ষণ ঠিক হলো।উইলহেম কিছুই জানায়নি তবে অন্যরা জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে ঢাকায় পৌছাবে।থাকবে পুরো ফেব্রুয়ারি জুড়ে।আমাকে বলে দিলো এই এক মাস কি কি করা হবে তার একটি তালিকা তৈরি করতে।আমি পরিকল্পনা করতে শুরু করলাম।বইমেলায় ঘুরতে যাওয়া,শহিদ মিনার,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ অন্যান্য যায়গায় ঘুরতে যাওয়া।মাম্মাম বললো ওদেরকে বিশ্বের সব থেকে বড় সমুদ্রসৈকতটাও দেখিয়ে নিয়ে আয়।সুতরাং আমি তালিকাতে যুক্ত করলাম কক্সবাজারের নাম।২৯ জানুয়ারি ঢাকায় এসে পৌছালো গ্রেগর আর রুদ্রনীল।ওদেরকে এয়ারপোর্টে গিয়ে রিসিভ করে সোজা বাসায় নিয়ে এলাম।উত্তরার তিন নাম্বার সেক্টরের বার নাম্বার রোডে আমাদের বাসা।

নিরিবিলি সিমসাম বাসা।৩৪০০ স্কয়ারফিট বাসায় আমরা চারজন মাত্র মানুষ থাকি।একমাত্র বোন থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে।ছোট ভাই তার বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে।থাকার ভিতরে আমি মাম্মাম,বাপী আর আমাদের আব্দুল চাচা।আব্দুল চাচাই বাসার সব বাজার সদাই করে।অনেকটা কেয়ারটেকারের মত।রুদ্রনীল আর গ্রেগর দুজনই আমাদের বাসাটা খুব পছন্দ করলো।আমি জানতাম ওদের পছন্দ হবে। বাংলাদেশে ওরা এবারই প্রথম এসেছে।বিমানবন্দরে নেমে ওরা যতটানা আমার দিকে তাকিয়েছে তার চেয়ে বেশি বাইরের চারপাশটা দেখায় ব্যস্ত।দুজন প্রায় কাছাকাছি সময়ে আসায় একসাথে বাসায় নিয়ে আসতে পেরেছি।মায়োকভস্কির সাথে ফেসবুকে যোগাযোগ হয়েছে ওর আসতে আরো সাড়ে সাত ঘন্টা মত লাগবে।

বিকেলে আমি,রুদ্রনীল আর গ্রেগর বের হলাম।উদ্দেশ্য ওদেরকে উত্তরা ঘুরিয়ে দেখাবো।বিশেষ করে দিয়াবাড়ি এলাকাটা।যদিও গ্রেগরের দেশ অনেক উন্নত তার পরও এমন গ্রামীন পরিবেশ ওর ভালো লাগবে বলেই মনে করেছি।তিন বন্ধু রিকশায় চড়ে ঘুরতে গেলাম দিয়াবাড়ী।ভোর রাতে এসে পৌছালো মায়োকভস্কি।বেশ ভালোই চলছিল আমাদের আড্ডা।মন খারাপ হচ্ছিল উইলহেমের জন্য।ইস সেও যদি আসতো।প্রধানমন্ত্রী বই মেলা উদ্বোধন করে যাওয়ার পর আমার প্রথমদিনেই মেলা ঘুরে দেখলাম।যদিও মেলা ততোটা গোছানো হয়নি, আরো সপ্তাহ খানেক লাগবে তার পরও গ্রেগর,রুদ্রনীল আর মায়োকভস্কি তিনজনই ভীষণ মুগ্ধ। এতো বড় বই মেলা তারা জীবনে কল্পনাও করেনি।ফেব্রুয়ারির দুই তারিখ সকালে উইলহেমের ফোন!বললো বাংলাদেশে এসেছি!!এখন আছি কক্সবাজারে!আমরাও যেন চলে যাই।আমরা ওর কথা শুনে অবিশ্বাস করলাম,বললাম বিশ্বাস হচ্ছেনা,ছবি দে।তখন সে বেশ কিছু ছবি পাঠালে বুঝলাম সত্যিই ও এসেছে।আমাদের সব থেকে প্রিয় বন্ধু উইলহেম এসেছে আমরাকি আর ঢাকায় বসে থাকতে পারি? ছুটে গেলাম কক্সবাজারে।গিয়ে বুঝতে পারলাম ও এসেছে জাতিসংঘের ইউএনএইচসিআর এর হয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শনে।

আমারও খুব ইচ্ছে ছিলো রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবেতর জীবন কাছ থেকে উপলব্ধি করার কিন্তু যাওয়ার সুযোগ হচ্ছিল না।৩ ফেব্রয়ারি বিকেলে পৌছে গেলাম রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যেখানে আগে থেকেই আমাদের বন্ধু উইলহেম উপস্থিত ছিলো।ইউএনএইচসিআর এর প্রতিনিধিদের একটি দল এসেছে পরিদর্শন করতে সেই দলে উইলহেমও আছে।বন্ধুকে কাছে পেয়ে কত গল্প হলো।আমরা ঘুরে ঘুরে ক্যাম্প দেখতে লাগলাম।ও আমাদেরকে বললো তোদের জন্য দারুন একটি সারপ্রাইজ আছে।আমরা ভাবতে লাগলাম কী হতে পারে সেই সারপ্রাইজ কিন্তু কুলকিনারা করতে পারলাম না।ও খোলাসা করে কিছু বললো না।সুতরাং অপেক্ষায় রইলাম।ক্যাম্পের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত দেখতে লাগলাম।ওদের করুণ অবস্থা আমাকে ব্যথিত করলো।

একটা খোলামেলা যায়গাতে অনেক মানুষের ভীড় দেখে এগিয়ে গেলাম।উইলহেম জানালো ওখানেই তোদের জন্য সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে।ওর কথা শুনে আমাদের আগ্রহ আরো বহুগুন বেড়ে গেলো।দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলাম।ভীড় ঠেলে যতটা সম্ভব সামনে গিয়ে দেখতে পেলাম ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি দলের অনেক সদস্য সেখানে উপস্থিত।মাঝখানে একটি চেয়ারে কালো গাউন পরা মধ্যমনি।তিনি সবার উদ্দেশ্য কথা বলছেন।তার কথা গুলো শুনতে ভালো লাগলো।তার চেহারায় বিষণ্নতা লক্ষ্যনীয়।তিনি যেন রোহিঙ্গাদের দুঃখে ভীষণরকম দুঃখী।যদিও স্বাভাবিক ভাবে দুঃখীই বলা যায় তা না হলে কি আর এতো দূরে ছুটে আসতেন।এই মানুষটি অসম্ভব প্রিয় হয়ে উঠেছে সবার কাছে।আমরা চার বন্ধুই তাকে অনেক আগে থেকেই চিনি।বিশেষকরে টিভিতে দেখেছি।

অসহায় এতিমদের জন্য তার মনে অনেক ভালোবাসা।জানতে চাইলে তিনি বললেন সম্ভব হলে পৃথিবীর সব এতিম শিশুকিশোর কিশোরীকে নিজের সন্তান হিসেবে লালনপালন করতাম।মায়ের নামের জায়গায় নিজের নাম লিখে দিতাম।তার কথা শুনে মনে পড়লো বঙ্গবন্ধুর সেই অমর বাণী।তিনি বলেছিলেন একাত্তুরে জন্ম নেওয়া পিতাহীন প্রতিটি শিশুর পিতার নামের জায়গায় আমার নামটি লিখে দাও।এই মানুষটি কি বঙ্গবন্ধুকে চেনে? কিংবা বঙ্গবন্ধুর সেই অমর বাণী শুনেছে।গল্পে গল্পে তিনি জানালেন এক করুন গল্প। ২০১৫ সালে সিরিয়ার তত্কালীন সহিংসতায় উদ্বিগ্ন হয়ে তিনি তুরস্কের একটি শরণার্থী শিবিরে গিয়েছিলেন। সেখানকার অমানবিক পরিস্থিতি দেখে দীর্ঘসময় ধরে সিরিয়ায় চলা এই নির্মম সহিংসতার সমাধানে নিরাপত্তা পরিষদের ব্যর্থতার কড়া সমালোচনাও করেছিলেন। শরণার্থী শিবিরে পিতৃহীন তিন সিরীয় শিশুকে দেখে এবং তাদের বাবা-মায়ের করুণ মৃত্যুর বিষয়টি জেনে তিনি তৎক্ষণাৎ তিন শিশুকেই দত্তক নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেন। এই শিশুদের বাবাকে সৈন্যরা ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছিল, আর তাদের মা বোমার আঘাতে মারা যান। ছয় সন্তান থাকার পরও তার এই দত্তক নেওয়ার সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে প্রশংসা অর্জন করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন জটিলতার কারণে আর সেই শিশুদের দত্তক নেওয়া সম্ভব হয়নি। এই তিনজনকে দত্তক না নেওয়ার দুঃখটি এখনো তিনি ভুলতে পারেননি।

একনাগাড়ে সেই সব গল্প বলে যাচ্ছিলেন আর আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনছিলাম।সুদুর আমেরিকা থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অগণিত দুঃখী মানুষদের খোঁজ নেওয়া মানুষটিকে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা অ্যাঞ্জেল মনে করলো আর আমরা দেখলাম সত্যিকারের মানুষটি হলিউডের বিখ্যাত অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলি।

গল্পঃ মমতার বন্ধন
লেখাঃ জাজাফী
১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

Tags: