শিক্ষকের ভুল ধরা কি ভুল

ছাত্র হয়ে শিক্ষকের ভুল ধরা যাবে না,সেটা করলে পাপ হবে এবং শিক্ষাজীবন ববার্দ হয়ে যাবে।শিক্ষাজীবন ববার্দ যেন না হয় তাই দিনের পর দিন আমরা শিক্ষকের ভুল দেখেও মুখ খুলিনি পাপ হবে বুঝলেন পাপ।পাপের ভয়ে আমরা আজীবন ভুল শিখেছি, ভুল জেনেছি, ভুল ভাবে বড় হয়েছি।আমাদের জন্মটাই যেন ভুল সময়ে হয়েছে।রসিকতা নয় বরং আক্ষেপ করে বলতেই পারি জন্মটা একাত্তুরের আগে হলে হয়তো এ জীবন টেনে নিতে হত না।স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়ে শহীদ হয়ে যেতাম। তাহলে আর শিক্ষকদের ভুল দেখে মেজাজ খারাপ হতনা,শিক্ষকদের ভুল ধরার দরকার পড়তো না এবং পাপও হতনা।

দেশ এখন রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে চিন্তিত তার মাঝে আমি ভুল নিয়ে তবেকি ভুলভাল বকছি?ইদানিং ফেসবুকের কল্যাণে কিছু কিছু কথা কিছু কিছু ছবি কিছু কিছু ভিডিও ভাইরাল হয়।ভাইরাল শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ কি তা এখনো আবিস্কার হয়েছে কিনা কারো জানা থাকুক বা না থাকুক এই শব্দটির সাথে প্রায় সবাই পরিচিত হয়ে গেছে।এমনও হতে পারে সেলফীর মত এই ভাইরাল শব্দটিও আসলে যে কোন ভাষার ক্ষেত্রে নতুন সংযোজোন হয়েছে।তো কাজের কথায় আসা যাক।কিছুদিন আগে কোন একটি টিভি চ্যানেলের করা একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল যেখানে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কিছু সাধারণ প্রশ্ন করা হয়েছিল কিন্তু কেউ সঠিক উত্তর দিতে পারেনি।আর এতেই সারা দেশ ফুসে উঠলো,শিক্ষা ব্যবস্থাকে গালিগালাজ করলো শিক্ষামন্ত্রীকে ধুয়ে দিল যেন সব দোষ শিক্ষামন্ত্রীর আর সরকারের।

আমরা সেই টেলিভিশন চ্যানেলের পেজে,সাইটে গিয়ে একটু খোঁজ নিতেই দেখতে পেলাম দুই লাইন লেখায় তিনটা বানান ভুল।যেহেতু তারাই নেমেছে ভুল ধরতে সেহেতু তাদের ভুলগুলো কে ধরবে তার দায়িত্ব সম্ভবত তারা বন্টন করেনি তখনো।অগত্য সেটা নিয়েও খুব হুলুস্থুল কান্ড ঘটে গেল এবং তারা তখন শুধরে নিল।এর পর জানা গেল সেই নিউজটাও নাকি ভুয়া ছিল।এটার সত্যতা যাচাই করার চিন্তা আপাতত মাথা থেকে সরিয়ে ফেলছি।কেউ যদি প্রমান চায় তবে সেই প্রমান দেবার মত সময় এবং ইচ্ছে কোনটাই আমার নেই।আমাদের প্রশ্নপত্রে ভুল,স্কুল কলেজের বইয়ে ভুল,রাস্তায় রাস্তায় অলিতে গলিতে পোষ্টার ব্যানারে ভুল।বুকের উপর সেপটি পিন দিয়ে আটকে রাখা নেমপ্লেটে ভুল।চলনে বলনে ভুল আচার আচরণে ভুল।আমাদের জীবনটাই যেন ভুলের রাজ্য হয়ে উঠেছে।আচ্ছা আমাদের কি দোষ বলুন।যে বই পড়ে আমরা জ্ঞানী হব বলে ভেবেছি সেই বইয়ে ভুল থাকলে আমরাতো ভুলই শিখবো।যে প্রশ্নে ভুল থাকে সেই প্রশ্নের উত্তর দিলে আমরাতো ভুল উত্তরই দেব।আর যে শিক্ষক আমাদের পড়ান তিনি ভুল করলে কি হবে? অবশ্যই আমরা ভুল শিখবো কিন্তু তার ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়া যাবেনা।কারণ শিক্ষকের ভুল ধরাও ভুল।এটা মস্তবড় পাপ।

এই ভুলের রাজ্যে কারো কারো হয়তো সেই ছাত্রটির মত মতিগতি বিগড়ে যেতে পারে।আচ্ছা জানা গল্পটা না হয় আরো একবার জেনে নেওয়া যেতেই পারে এতে দোষেরতো কিছু নেই।ন্যাড়া না হয় বেলতলায় একবারই যায় কিন্তু আমরাতো ন্যাড়া নই তাই একবারের যায়গায় দশবার গেলেওবা ক্ষতি কি।যদিও আমরা বেল তলা যাচ্ছিনা বরং জানা গল্প আরেকবার জানতে চেষ্টা করছি।

স্কুল থেকে ফিরে সেই ছাত্রটি তার বাবাকে বললো বাবা কাল থেকে আর স্কুলে যাবনা।যাচ্ছেতাই ব্যাপার খুবই বিরক্তিকর।কারো মধ্যে কোন কান্ডজ্ঞান নেই কেউ দায়িত্ববান নয় সব একটা মিথ্যাবাদি।ছেলের কথা শুনে বাবাতো ভীষণ অবাক।জানতে চাইলেন কি হয়েছে সেটা আগে খুলে বলো তার পর ভেবে দেখা যাবে তুমি স্কুলে যাবে কি যাবেনা।ছেলেটি বললো স্কুলে যাব কি করে। যে স্কুলের শিক্ষকেরা সামান্য একটি বিষয়ে একমত হতে পারেনা সেই স্কুলে গিয়ে আমি কি শিখবো তাইতো বুঝতে পারছিনা।ক্লাসে আইসিটি স্যার বললেন সেল মানে হলো মোবাইল ফোন।পরের পিরিয়ডে বিজ্ঞান স্যার বললেন সেল মানে হলো কোষ।গণিত স্যার বললেন সেল মানে হলো বিক্রয়।সমাজ বিজ্ঞাস স্যার বললেন সেল মানে হলো জেলখানা।যেখানে এক সেল কথাটাকেই স্যারেরা সবাই মিলে এক অর্থে মেনে নিতে পারছেনা সেখানে গিয়ে আমি কি শিখবো?

গল্পটি পড়ে কারো হয়তো হাসি পাবার কথা নয় কিংবা এই গল্পটি কেন বললাম সেটার কারণ খুঁজতে শুরু করে দিতে পারেন।আসলে অনেকটা ধান ভানতে শিবের গীতের মত ব্যাপার।বলছিলাম শিক্ষকদের ভুলের কথা।ছোটবেলায় ছোট খাট ভুলের কারণে কতবার যে দুই হাতে বেতের বাড়ি পড়ে লাল হয়ে গেছে তার হিসেব নেই।সেই সব বেতের বাড়ির দাগ কবেই মুছে গেছে কিন্তু স্মৃতিগুলো রয়ে গেছে।তখন না হয় ছোট ছিলাম এবং সেই সব শিক্ষকেরাও সবাই অল্প শিক্ষিত ছিল তাই ভুলগুলো মেনে নেওয়াই যেতে পারে কিন্তু এখনকার আধুনিক শিক্ষকেরাতো উচ্চ শিক্ষিত।তারা প্রথম শ্রেনীতে প্রথম তারা সেরাদের সেরা।তারা কি করে ভুল করে?ভুল করলে অবশ্য দোষ নেই কিন্তু তারা সেটা দিনের পর দিন কি করে চালিয়ে যায়?শুধরে নিতে পারেনা?তার মানে হলো তিনি বা তারা যে ভুল করছেন সেটাই তারা বুঝতে পারছেন না।এই যে বুঝতে না পারাটা কি অন্যায়  হবে?নাহ তা হবে কেন?কিন্তু আমি যে তাদের ভুলের কথা বলছি এটা খুবই অন্যায় হচ্ছে,আমার শিক্ষাজীবন ববার্দ হয়ে যাবে।

ছোটবেলায় শিক্ষকের ভুল ধরতাম না কারণ বাবা মা বড়রা বলতেন শিক্ষকের ভুল ধরাও ভুল এতে পাপ হয়,পড়ালেখা ববার্দ হয়ে যায়।এখনতো বড় হয়েছি তাই ভুল ধরলে পড়ালেখা ববার্দ হওয়ার ভয় পাওয়ারতো কোন কারণ নেই তাইনা? আছে আছে অবশ্যই বরবাদ হওয়ার কারণ আছে।শিক্ষকের ভুল ধরিয়ে দিলে তিনি তখনকার মত কিছু নাও বলতে পারেন কিন্তু মনে মনে তার একটা গান ঠিকই মুখস্ত আছে তিনি সেটা বেশ সুর করে গাইতে থাকবেন।“তুমি আমার ঘুড়ি আমি তোমার লাটাই,যেদিকেই উড়ে বেড়াও,আমার আকাশ পুরোটাই”। তার মানে হলো তুমি যত খুশি আমার ভুল ধরো পরীক্ষার খাতাতো আমার হাতেই আসবে।কী করে কত নাম্বার পাও সেটা দেখিয়ে দেব।সুতরাং বড় হয়েও শিক্ষকের ভুল ধরতে যাওয়ার সুযোগ নেই তাতে পাপ হবে পাপ।তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে ভবিষ্যতে ধরা খাবে পাবেনাকো মাপ তখন যতই করো বাপ বাপ।

এইতো গত বছর যারা এইচএসসি পাশ করলো তাদের পরীক্ষার খাতা দেখেছে তাদেরই মত ছাত্র ছাত্রীরা।এ খবর পত্রপত্রিকার মাধ্যমে আমাদের সবারই জানা।শিক্ষক নিজে না দেখে অন্যকে দিয়ে দেখাচ্ছেন এটাতো ভারি অন্যায় কিন্তু এই অন্যায় ধরা যাবেনা তাহলে পাপ হবে,পড়াশোনাও ববার্দ হয়ে যাবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে যাদের কাছে পিএইচডি থিসিস জমা দিলাম তারা সবাই বিজ্ঞজন এটা মানতেই হবে।থিসিস পেপার উপস্থাপনের সময় দাড়ি কমা সেমিকোলন কোথাও ছুটে গেলেই থামিয়ে দিচ্ছেন কথা শোনাতে পিছপা হচ্ছেন না।ঠিক সেই গুণীজনদের তত্ত্বাবধানে যখন একটা সংকলন বের হচ্ছে সেখানে কোন দাড়ি কমা সেমিকোলনের ভুল নয়,কোন শব্দ গঠনের ভুল নয় সরাসরি একটি মিথ্যাকে সত্য বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে কেউ কিছু মনেই করছেনা।যারা থিসিস পেপারের দাড়ি কমা সেমিকোলনের ভুল ধরে নাজেহাল করে ছাড়ছে তারাই একটি সংকলনের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে বার কয়েক প্রুফ দেখে ছাপিয়ে দিচ্ছেন সম্পুর্ন মিথ্যে কথা তাতে তাদের কোন দোষ দেওয়া যাবেনা কারণ তারা শিক্ষক এবং শিক্ষকের ভুল ধরা পাপ।দাড়ি কমা সেমিকোলন ভুল হতে পারে কিন্তু পুরো একটা তথ্যই কি করে উল্টে যেতে পারে তা জানা নেই।

একটা চার চাকার গাড়ি চলতে চলতে একটা চাকা খুলে পড়ে যেতে পারে তখন গাড়িতে তিনটা চাকা থাকবে।কিন্তু একটা গাড়ি চলতে চলতে হাওয়া থেকে আরো একটা চাকা এসে সেই গাড়িতে লেগে যেতে পারেনা নিশ্চই।ঠিক একই ভাবে একটা শব্দ ভুল হতে পারে তা বলে একটা পুরো তথ্য কি করে ভুল হয় সেটা ধরা যাবেনা কারণ তাদের ভুল ধরাওতো পাপ।যদি মনে করি তাদের অজ্ঞাতে ওটা হয়েছিল তাহলে সেই সব শিক্ষার্থীদের দোষ দিয়ে লাভ কি যারা জাতীয় স্মৃতি সৌধ কোথায় অবস্থিত তা বলতে পারেনি।এটা বেশ পুরোনো ঘটনা বলছিলাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া স্বরণিকার কথা।পুরোনো কাসুন্দি ঘেটে লাভ নেই বরং নতুন কিছু বলা যেতে পারে।সুকান্ত যেমন লিখে গেছেন “এসেছে নতুন শিশু তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান”। ঠিক তেমনি ভাবে নতুন ঘটনার জন্ম হয়েছে তাই পুরোনো গুলোর লেজ ধরে পড়ে থেকে কোন লাভ নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবন মানেই অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ন একটি স্থান।ওখানে যারা বসেন,কথা বলেন তাদের শিক্ষা দীক্ষা জ্ঞান গরিমা কোন কিছুই কম নয় এবং এ নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।কিন্তু যখন দেখা যায় সেই সিনেট ভবনের দেয়ালে ঝুলে থাকা জাতীয় প্রতীক আসলে ভুল তখনোকি তাদের ভুল ধরা যাবেনা? না যাবেনা কারণ তাদের ভুল ধরাওতো একপ্রকার ভুল।এতে পাপ হবে পাপ।আর পাপের কারণে লেখাপড়া ববার্দ হয়ে যাবে।রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে যে জাতীয় প্রতীক স্থাপন করা হয়েছিল তাতে শুধুমাত্র শাপলা আছে দুই পাশে নেই ধানের শীষ উপরে নেই তিনটি পাটপাতা আর চারটি তারকাও নেই।দেখে মনে হয় তারকারা আলো দিতে দিতে নিভে গেছে।পাটপাতা গুলোকে ভর্তা করে খেয়ে ফেলা হয়েছে আর যেহেতু পাটপাতার ভর্তা খেতে হবে তাহলেতো ভাত দরকার আর ভাত হয় চাল থেকে এবং চাল হয় ধান থেকে।সুতরাং ধানের শীষ নিয়ে নেওয়া হয়েছে।তাই সেখানে শুধুমাত্র শাপলাটাই আছে।কোন গ্রাম্য বালিকার নজরে পড়েনি নইলে খোপায় পরবে বলে শাপলাটাকেও হয়তো তুলে নিত।কর্তৃপক্ষ বলছেন তারা নাকি জানেন না বিষয়টি।তারা খোজ নিয়ে দেখবেন বিষয়টি সত্যি কিনা যদি সত্যি হয় তাহলে ব্যবস্থা নিবেন।এই যে তারা বললেন জানেন না বিষয়টি কিংবা এই যে বড় একটা ভুল এই ভুল ধরিয়ে দেওয়া যাবেনা কারণ ধরিয়ে দিলে পাপ হবে পাপ। আর এতে করে শিক্ষা জীবন ববার্দ হয়ে যাবে।তাদের এই না জানাটা কোন দোষের নয়।তার জন্য আমি একটা খুবই শক্ত যুক্তি দাড় করিয়েছি।মায়ানমারের আরাকান অঞ্চলে বেশ কিছুদিন ধরে সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা মুসলিমদের হত্যা করছে বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে ফলে প্রান নিয়ে কোন মত পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে লাখ লাখ মানুষ।এই কথাটি শান্তিতে নোবেল বিজয়ী শান্তির দূত অং সান সুচিকে বলা হলে তিনি বললেন তিনি নাকি বিষয়টি জানেনই না!এতো বড় একজন মানুষ এতো বড় একটি বিষয়ের কথাই যেখানে জানেন না সেখানে সিনেট ভবনে জাতীয় প্রতীক ভুল হয়েছে এটা না জানা কোন বিষয়ই না।আর আমাদেরকেও চুপ থাকতে হবে ওসব ভুল ধরিয়ে দেওয়া যাবেনা কারণ গুরুজনদের ভুল ধরাও ভুল তাতে পাপ হয় পাপ।আর পাপ হলে লেখাপড়া ববার্দ হয়ে যায়।

ভুল ধরো না পাপ হবে

—জাজাফী

২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭

দৈনিক ইত্তেফাকে ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ তে প্রকাশিত। প্রকাশের সময় বেশ কিছু অংশ সংযোজন বিয়োজন করা হয়েছে এবং শিরোনামও চেঞ্জ করা হয়েছে।