বোকা ক্যাডেটের গল্প

কলেজ ছুটি হয়ে গেছে।বরাবরের মতই ভ্যাকেশানের দিনগুলো কাজে লাগাতে চায় ক্যাডেট সজল ।সজল আমার খুব ভাল বন্ধু।হাওড় অঞ্চলে বাড়ি হওয়ায় জেলে না হয়েও ওরা জন্ম থেকেই জেলেদের মত জীবনযাপন করে অভ্যস্ত।পরিবারে বাবা মা এক বোন রিফা ছাড়া আর কেউ নেই।বোনটাও কলেজে পড়ে তবে সে খুবই বুদ্ধিমতী আর আমার বন্ধুটা খুবই সাদাসিধে এবং বোকা। ওর বোকামীর গল্প বলে শেষ করা যাবেনা।এ নিয়ে ওর বোন রিফার অভিযোগের শেষ নেই।ভাইয়ার জন্য নাকি ওর প্রেসটিজ পাংচার হওয়ার দশা।সে নিজে প্রতিবার ভ্যাকেশানে এসে ভাইয়াকে একটু স্মার্ট একটু চালাক বানাতে চেষ্টা করছে কিন্তু সজল কিছুতেই স্মার্ট হচ্ছেনা চালাক হচ্ছেনা।রিফা মনে করে ওর ভাইয়া ইচ্ছে করেই বোকা সেজে থাকে যেন লোকে ওকে নিয়ে হাস্যকর কান্ড করতে পারে।

পারিবারিক অবস্থা বেশি ভাল না হওয়ায় ভ্যাকেশানে এসে সজল অনেক কাজ করে।বাবার সাথে মাঝে মাঝে হাওড়ে গিয়ে মাছও ধরে।ভ্যাকেশানে একদিন বাবা মাছ ধরে বাড়ি আসার পর কিছুটা জ্বর জ্বর বোধ করায় সজলকে বললো তুই গিয়ে মাছগুলো বাজারে বিক্রি করে আয়তো। সজল এক কথায় রাজি হয়ে গেল। তার পর ঘর থেকে একটা আর্টপেপার নিয়ে তা দিয়ে একটা সাইনবোর্ডমত বানালো।

হাটের একটা নিরিবিলি স্থানে বসে সামনে সেই সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিল তাতে লেখা ছিল এখানে মাছ বিক্রি করা হয়।সে অপেক্ষায় থাকলো লোকজন আসবে আর মাছ কিনবে।এক দুষ্টু লোক আসলো।সে এসে মাছ টিপেটুপে দেখে বললো আরে মিয়া তুমি সাইনবোর্ডে “এখানে” মাছ বিক্রি করা হয় লিখেছ কেন? এখানে যে মাছ বিক্রি করা হয় সেটাতো লোকে এমনিতেই বুঝবে তাই এখানে কথাটা মুছে ফেলো।সজল তার কথা মত এখানে শব্দটা মুছে ফেললো। লোকটা কিন্তু মাছ না কিনেই আলগা জ্ঞান দিয়ে চলে গেল।

সজল অপেক্ষা করতে লাগলো অন্য ক্রেতাদের।এর মাঝে আরো একজন আসলো এবং মাছ টিপেটুপে দাম জিজ্ঞেস করে সাইনবোর্ডের দিকে তাকাল। তার পর কি যেন ভেবে বললো আরে ভাই আপনি মাছ নিয়ে বসেছেন এটাতো সবাই দেখতেই পাচ্ছে। তাহলে মাছ কথাটা লেখার দরকার কি? আপনিতো আর মাংস বিক্রি করতেছেন না।মাছ কথাটা তাই মুছে দেওয়া উচিত। সজল বললো আচ্ছা মুছে দিচ্ছি।তার পর সে মাছ কথাটাও মুছে দিলে সাইনবোর্ডে থাকলো শুধু বিক্রি করা হয়।ওই লোকটাও আগের লোকটার মত মাছ না কিনে ফিরে গেল।সজলের কিন্তু মোটেই মনখারাপ হলনা।

কিছুক্ষণ পর আরো এক খরিদ্দার আসলো এবং একই ভাবে মাছ টিপেটুপে দেখে দাম জিজ্ঞেস করলো কিন্তু সজল যে দাম চাইলো তা তার পছন্দ হয়নি অন্যদিকে সে যে দাম বলেছে সজলও সে দামে বিক্রি করবেনা।লোকটা উঠে যেতে যেতে সাইনবোর্ড দেখলো এবং বললো ভাই তুমি এখানে লিখছো বিক্রি করা হয়।এটাতো বাহুল্য।তুমি যে মাছ বিক্রি করার জন্য বসেছ এটাতো সবাই বুঝতেই পারছে। তুমি নিশ্চই মাছ ফ্রিতে বা মাংনা দিবানা। তাই এই বিক্রি করা হয় কথাটা লেখারতো কোন মানে হয়না।লোকটার কথা শুনে সজল বললো আপনি ঠিকই বলেছেন। ওটা মুছে দিচ্ছি।সাথে সাথে সে সাইনবোর্ড থেকে সেটা মুছে দিল এবং সাইনবোর্ডটাই সরিয়ে ফেললো।

এর পর অনেক ক্ষণ সে অপেক্ষা করলো কিন্তু কেউ তার মাছ কিনতে আসলোনা দামও জিজ্ঞেস করতে আসলোনা।হাট যখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে তখন সে মাছগুলো ব্যাগে ঢুকিয়ে বাড়ির পথে রওনা হলো।বাড়িতে গিয়ে মাছের ব্যাগটা মায়ের হাতে দিয়ে বললো মা মাছতো বিক্রি করতে পারিনি। লোকজন মাছ কিনতেই চায়না।কথাটা বাবাও শুনলেন।তবে কিছু বললেন না।তিনি শুধু আক্ষেপ করে বললেন আজ কাল মানুষ মাছ শাক খাওয়াও কি বন্ধ করে দিচ্ছেনাকি।সবারই কি আমাদের মত আকাল পড়েছে।

সেই মাছ গুলো রাতে রান্না হলো বাবা খুব তৃপ্তি করে খেলেন আর খেতে খেতে বললেন এক বছর ধরে বলা চলে এমন স্বাদ করে খাওয়া হয়নি।গরীব মানুষ যা মাছ ধরি সবতো বিক্রি করে দেই।নিজেরা খেলে ছেলে মেয়ের পড়ার খরচ জোগাবো কি করে তাই কখনো খাওয়া হয়না।

রাতে খাবার শেষ করে সজল আমাদের বাড়িতে এসেছিল।সে সব ঘটনা খুলে বলেছিল।বুঝলাম সজল ইচ্ছে করেই মাছের দাম দ্বিগুন চেয়েছে যেন কেউ কিনতে না পারে।কতদিন সে বাবা মাকে ভাল কিছু খেতে দেখেনি ভেবেই এটা করা।ও চাইলে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে মাছগুলো নিয়ে ফিরে যেতে পারতো কিন্তু তাতে মিথ্যে বলা হত।আর ও যেটা বলেছে এবং করেছে তাতে মিথ্যে কিছু নেই। সত্যিইতো লোকে দাম বলেছে কিন্তু কিনতে চায়নি।রিফা যে ওকে খুব বোকা মনে করে আসলেতো এই ক্যাডেট বোকা না। সজল ভেবেছে একদিনের জন্য এই মাছগুলো বিক্রি না করলে কতইবা ক্ষতি হবে তার চেয়ে বাবা মা যদি একদিনও একটু ভাল খাবার খেতে পায় তাইতো অনেক কিছু।বাবা মা নিজে কখনোই এটা করতেন না।তারা চাইতেন তাদের সন্তানেরা ভাল থাকুক বড় হোক। এটা করতে গিয়ে নিজেদের সব সুখ আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে চলেছেন ভেবে সজলের খুব মন খারাপ হয়।

কিন্তু মনে মনে সে ছিল দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।বাবা মাকে সে খুশি করার জন্য যা কিছু করা দরকার করতে চেষ্টা করবে।একদিন আকাশের সব মেঘ কেটে গিয়ে আলোর রেখা দেখা দিল।আইএসএসবিতে দাপুটে পারফরমেন্স দেখিয়ে ৭৯ তম বিএমএতে গ্রীনকার্ড নিয়ে ফিরে এলো বাড়িতে। বাবার হাতে কার্ডটা ধরিয়ে দিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললো বাবা অনেকতো কষ্ট করেছ এবার আর তোমাদের কষ্ট করতে হবেনা।আমি তোমাদের জন্য সুখের সংবাদ নিয়ে এসেছি।বাবা খুব ভাল করে দেখলেন কার্ডটা।তিনি একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেন।নিজের পরিবারের দুঃখ ঘুচেযাওয়ার দিন এসেছে বলে নয় বরং সন্তানের ভবিষ্যৎ উজ্জল হয়ে ধরা দিয়েছে এটা ভেবে।তিনি নিজে হয়তো সন্তানের জন্য সুখের ঠিকানা দিয়ে যেতে পারতেন না তাই এই সাফল্য তাকে খুবই খুশি করেছে।

বাবার হাত থেকে ভাইয়ার গ্রীন কার্ডটা নিয়ে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে ভাইয়াকে অভিনন্দন জানাল।রাতে খাওয়াদাওয়ার পর সজল যখন বিছানায় গেল তখন রিফা গুটিগুটি পায়ে ওর রুমে ঢুকে থমকে দাড়াল।সজল জানতে চাইলো কিরে কিছু বলবি? রিফা কাদো কাদো হয়ে বললো ভাইয়া আমি খুবই স্যরি।আমি তোমাকে সারা জীবন বোকা বলে খোটা দিয়েছি আনস্মার্ট বলেছি সে জন্য তুমি আমাকে ক্ষমা করো।সজল বিছানা থেকে নেমে আদরের বোনটার চুলে বিলি কেটে বললো আমি তোর উপর মোটেই রাগ করিনি।যে ভাইয়ের তোর মত একটা বোন আছে সে কি কখনো বোকা আর আনস্মার্ট হতে পারে?

বিএমএর দীর্ঘ প্রশিক্ষণ শেষে সোর্ড অব অনার নিয়ে ফিরে আসছে আমাদের সজল।সেই দিনটার স্বপ্ন দেখি।

Zazafee

৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭