স্বরলিপির টানে

তালপুকুরে বাগিচাগাঁও নামে একটি গ্রাম আছে কুমিল্লাতে।তালপুকুর নামটা যেমন সুন্দর তেমনি সুন্দর বাগিচাগাঁও নামটি।নাম শুনেই মনে হয় সারা গ্রাম জুড়ে বিছিয়ে রাখা হয়েছে তালসুপারি নারকেল বাগান।তালপুকুরের বাগিচাগাও গ্রামে নিশিকান্ত দাশের বাড়ি।সংসারে মানুষের অভাব নেই।তিন মেয়ে আর ছয় ছেলে মিলে তার বিশাল পরিবার।লোকে হাসতে হাসতে বলে মেয়ে তিনটে না হয়ে ওগুলো যদি ছেলে হতো তাহলে একটা পুরো ফুটবল টিম হয়েও একজন অতিরিক্ত হিসেবে সাইড লাইনে বসে থাকতে পারতো।নিশিকান্ত দাশ ওসব কথা কানেও তুলতেন না।তিনি তার মত করে চলতেন।কেউ কেউ রসিকতা করে বলতো নিশি আরেকটা ছেলে নিলেতো ভালই হতো। শুনেছি সাত হলো লাকী নাম্বার।তবে সব থেকে বেশি যে কথাটি শুনতে হত তা হলো এতো সন্তান কেন নিলে নিশিদা?

এর উত্তরে নিশিকান্ত দাশ একটা হাই তুলে বলতেন সব তার ইচ্ছা।আর তাছাড়া খাবার পরবারেরতো আর অভাব নেই আমার সুতরাং দু দশটা ছেলেপুলে মানুষ করা আমার জন্যতো কঠিন কিছু না।তা বাপু তোমাদের এতো বাধছে কেন?নিশিকান্ত দাশের কথা শুনে সবাই অবশ্য চুপ করে যেত।সেতো ঠিকই বলেছে।তার একটা ছেলে থাকুক না দশটা থাকুক তাতে অন্যদের কী? কেউকি ওদের খাবার পরবার দিচ্ছে যে এতো কথা উঠছে।খেয়ে থাকুক না খেয়ে থাকুক সবতো নিশিকান্ত নিজেই সামলাচ্ছে।নিশিকান্ত দাশ ভাবতেন তার সন্তানেরাই তার ভবিষ্যত।এক রাতে বিছানায় পাশ ফিরতে ফিরতে তার স্ত্রী হেমপ্রভা দাশ বললেন শুনছেন আপনি আবার চাঁদমুখ দেখতে চলেছেন।প্রথম বার বাবা হওয়ার সংবাদ শুনে নিশিকান্ত দাশ স্ত্রীকে একটি সোনার হার উপহার দিয়েছিলেন কিন্তু তার পর ওই সংবাদটি নিয়মিত সংবাদ বুলেটিনের মত প্রতি এক দু বছর পর পর প্রচার হতে থাকায় সেই আগের খুশি ফিরে আসেনি।

সংবাদটি দেওয়ার পর কোন প্রতিকৃয়ার আশাও করেনি হেমপ্রভা দাশ।কিন্তু তিনি অবাক হয়ে দেখলেন বহু বছর পর তার স্বামী এই সংবাদ শুনে বেশ খুশি হয়েছেন। নিশিকান্ত দাশ স্ত্রীকে অবাক করে দিয়ে বললেন এই সংবাদ শোনার পর আমি খুবই খুশি।এবারও আশাকরি একটি ছেলেই হবে।সাতভাই মিলে গোটা এলাকা মাতিয়ে রাখবে।হেমপ্রভা দাশ স্বামীর কথা শুনে খুশি হলেন।ঠিক আট মাস সাতাশ দিন পর জন্মনিল যে শিশুটি তাকে কোলে তুলে নিতে নিতে নিশিকান্ত দাশ বড় ছেলে সুরেনকে ডেকে বললেন বাবা সুরেন তোর এই ভাইয়ের নাম কি রাখবো বলতো।সুরেন ছোট মানুষ সে কি করে নাম ঠিক করবে তাই বাবার মূখের দিকে তাকিয়ে থাকলো।

বাবা তখন ছোট্ট শিশুটিকে চুমু খেতে খেতে বললেন সুরেনের ভাই তাই ওর নাম হবে সুধীন।নিশিকান্ত দাশের ছেলে সুধীন দাশ।বদ হয়ে বংশের নাম উজ্জল করবে সে।সুরেন বললো বাবা আমি যখন ওর মত ছিলাম তখন আপনি কি আমাকে কোলে নিয়ে এভাবেই নাম দিয়েছিলেন?বাবা বললেন সে কথাতো এখন আর মনে নেই।

মায়ের কোলপোছা ধন ছিল সুধীন।আর কোন সন্তান নিবেন না বলে সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সুধীন তাদের শেষ সন্তান হয়ে থাকলো।সুধীনকে সবাই বেশ ভালবাসতো।গ্রামের ছেলেদের সাথে মিশে খুব বাউন্ডুলেপনা করে বেড়ালেও তার ছিল প্রখর মেধাশক্তি। সে পড়াশোনায় খুবই ভাল ছিল।বামচন্দ্র পাঠশালায় তার হাতে খড়ি হওয়ার পর বিদ্যালয় পরিবর্তন করে ঈশ্বর পাঠশালায় ভর্তি হয়।পড়াশোনায় সে কখনো ফাঁকি দিতনা। কিন্তু এর মাঝেই শুরু হয়ে গেল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।সেই যুদ্ধের ডামাডোলে যখন স্কুল বন্ধ হয়ে গেল তখন তার বাউন্ডুলেপনা মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো।কিভাবে কিভাবে যেন দাবা খেলাও শিখে গেল।প্রখর বুদ্ধি থাকায় দাবাতে বরাবরই সে বড়দেরও হারিয়ে দিত।

সুরেন তখন বড় হয়ে সঙ্গীত বিষয়ে শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছে।দাদার কাছে সঙ্গীত নিয়ে অনেক কিছু শুনে শুনে সুধীনের মনেও সঙ্গীতের প্রতি ভালবাসা জন্মে গেল।কিন্তু মা চাইতেন সে সঙ্গীত বাদ দিয়ে পড়াশোনা করুক,বড় হোক।সুরেন একটা গানের স্কুল চালাত সেখানে অনেক ছাত্র ছাত্রী ছিল কিন্তু মায়ের নিষেধাজ্ঞার কারণে সুধীন সেখানে বসতে পারতো না যদিও গানের প্রতি তার ছিল প্রবল টান।পাটকাঠির বেড়া দেওয়া ঘরে দাদা যখন তার ছাত্র ছাত্রীদের গানের তালিম দিতেন সুধীন তখন বেড়ার বাইরে পিছনে ঘাপটি মেরে বসে বসে সেই সব গান শুনতো তালিম নিত।তার পর দুরে কোন মাঠে,কোন নদীর কিনারে কিংবা কোন বটগাছের নিচেয় বসে আপন মনে গলা সাধতো।একটু একটু করে কথাটা চাউর হয়ে গেল যে সুধীন বেশ ভাল গান শিখেছে।সবাই খুব অবাক হত বিশেষ করে মা বাবা অন্য ভাই বোনেরা।সুধীনতো কখনো গানের তালিম নেয়নি তাহলে কি করে শিখলো?তাদের বিশ্বাস হতনা।তবে সুরেন ঠিকই বুঝতো।সে জানতো তার ছোট ভাই তার ছাত্র ছাত্রীদের তালিম দেওয়ার সময়টিতে ঘরের পিছনে ঘাপটি মেরে বসে বসে সব শোনে।

একদিন দাদার মুখের একটি কথাই সুধীনের জীবনটাকে বদলে দিল।দাদা তার ছাত্র ছাত্রীদের গানের পরীক্ষা নিলেন কিন্তু দেখা গেল কেউ কিচ্ছুটি শিখতে পারেনি।সুরেন তখন বললো তোরা সব এক একটা গাধা গাধি।এতো করে শেখালাম তার পরও কিছু শিখলিনা কিচ্ছু শেখাতে পারলাম না।অথচ ঘরের কোনা দিয়ে যারা ঘুরঘুর করে তারাতো ঠিকই শিখে নিয়েছে।দাদার বলা এই কথাটি সুধীনের জীবনটাকেই বদলে দিল।সে বুঝতে পারলো সে গান রপ্ত করতে পেরেছে এবং বেশ ভালভাবেই পেরেছে।

কুমিল্লা জিলাস্কুল তখনও শহরের সেরা স্কুল।সুধীন জিলা স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করে যখন ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হল তখন দেশে রাজনৈতিক ডামাডোল শুরু হয়ে গেছে।সব দিকে সজাগ দৃষ্টি রেখেও গানের প্রতি সুধীনের ভালবাসা ক্রমান্বয়ে বাড়তেই থাকলো।১৯৪৮ সালে বেতারে গান গাওয়ার সুযোগ এলে সে সেটা লুফে নিল।সেই যে তার পদচারণা শুরু তাকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি।দূর থেকে নিশিকান্ত দাশ আর হেমপ্রভা দাশ দেখলেন তাদের ছেলেটা গানের পাখির মত ডানা মেলে দিয়েছে।সেই সুরের ডানায় মাতাল সারা দেশ।এর অনেক আগেই সুধীনের জীবনে প্রেম এলো।দাদা সুরেন যে সঙ্গীতের স্কুলটি চালাতেন সেখানে এক সুন্দরী ছাত্রী ছিল নীলিমা।যেমন তার নামের সৌন্দর্য তেমনি তার রুপ।সুধীন পাগল হয়ে যেতেন।পরস্পরের সাথে ভাবের বিনিময় হয়ে যেতে বেশি দেরি হয়নি।গানের গলা এতোই সুন্দর ছিল যে নীলিমার নীল রঙ সেই কন্ঠের যাদুতে মুগ্ধ হয়ে মিশে গেল একাকার হয়ে।

বাংলা একাডেমী প্রতিষ্ঠিত হল ১৯৫৫ সালে।সেই বছরই বিয়ের সানাই বাজলো সুধীন দাশ আর নীলিমার বাড়িতে।ধুমধাম করে বিয়ে হলো তাদের।কুমিল্লা ছেড়ে তারা তখন ঢাকার মিরপুরে এসে উঠলেন।তাদের ঘর আলো করে জন্ম নিল নিলয় আর সুপর্না নামে আরো দুই গানের পাখি।সুধীন দাশের পুরো ঘর তখন সঙ্গীতময়।ততোদিনে গানের পাখিটির পরিবারের অনেক পুরোনো নতুন সদস্য না ফেরার দেশে চলে গেছে।সেই তালিকায় যোগ হল তার একমাত্র ছেলে নিলয়।ছেলে হারিয়ে সুধীন দাশের মনটা ব্যাথায় ভার হয়ে গেল।

কত সুর্য উঠলো আর ডুবলো।কত প্রান অকালে ঝরে গেল।ভাষা আন্দোলন হলো,রাষ্ট্রভাষা বাংলা হল,যুদ্ধ হল,দেশ স্বাধীন হল সব কিছু দেখলেন কাছ থেকে।নিজেই একটু একটু করে হয়ে উঠলেন ইতিহাসের জীবন্ত স্বাক্ষী।বাগিচাগাওয়ের সেই ছোট্ট সুধীন দাশ আর সেদিনের সুধীন নেই।সে তখন এমন বড় হয়ে গেল যে তাকে তাঁর বলে সম্বোধন করতে গিয়ে চন্দ্রবিন্দু ব্যবহার করতে হয়।নজরুল সঙ্গীতে তাঁর ভালবাসা ছিল চোখে পড়ার মত।নজরুল সঙ্গীতের জন্য তিনি একটু একটু করে চিরস্মরণীয় হয়ে ওঠার পথে এগিয়ে গেলেন।এতো কিছু দেখতে দেখতে তিনি বোধহয় অনেক ক্লান্ত হয়ে পড়লেন।কৈশরে দুরন্তপনা বাউন্ডুলেপনায় যার খ্যাতি ছিল তিনি বড় হয়ে সঙ্গীতে খ্যাতি অর্জন করলেন।

বয়সের ভারে তিনি নুইয়ে পড়েছিলেন।ডায়াবেটিস শরীরে বাসা বেঁধেছিল।যে হৃদয়ে সঙ্গীতের জন্য একটি রাজপ্রাসাদ তিনি তৈরি করেছিলেন সেই হৃদয়ে কোন এক ফাঁকে বাসা বেঁধেছিল হৃদরোগ।এক রাতে সারা আকাশ যখন তারায় তারায় ভরে আছে,মানুষ যখন ঘুমোতে যাবে তখন শরীর কাঁপিয়ে জ্বর এলো।স্থানীয় ডাক্তারের পরামর্শে নাপা প্যারাসিটামল খাওয়ানো হলো কিন্তু জ্বর কমল না।দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলো।যে বৃদ্ধটিকে হাসপাতালে নেওয়া হলো তিনি ততোদিনে সাধারণ কোন বৃদ্ধ নন,তাঁর ছিল দেশ বিদেশ জোড়া খ্যাতি।সরকারী হাসপাতালে রোগিদের ঠিক কতটা সেবা দেওয়া হয় তাতো সবাই জানে।সুধীন দাশকে জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালে নেওয়া হলে তারা জানালো সেখানে আইসিইউ ফাঁকা নেই।এবার তাহলে বসুন্ধরাতে এপোলো হাসপাতালে নেওয়া যাক।সেখানকার ডাক্তারদের কোন ত্রুটি না থাকলেও রাত আটটার দিকে সবাইকে কাঁদিয়ে গানের পাখি আজীবনের মত উড়ে গেল খাঁচা ভেঙ্গে।তাঁর কাছে ডাক এসেছিল, তিনি সে ডাকে সাড়া দিতে কাপর্ন্য করেন নি।তিনি ছুটে গেলেন স্বরলিপির টানে।

১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭