Home Blog Page 23

ভ্যাকেশানের ভেলকি

একবার বর্ষাকালে কলেজের ভ্যাকেশান শুরু হলো।বর্ষা কাল আমাদের ভাল লাগতো না।শরিয়তুল্লাহ হাউজের ক্যাডেট সিজানের বাসা ঝিনাইদাহ।ওর সাথে আমার বেশ ভাল বন্ধুত্ব ছিল। যদিও আমি সোহরাওয়ার্দি হাউসের তার পরও বন্ধু বলতে আমরা মোট চারজন ছিলাম খুবই ক্লোজ।শের ই বাংলা হাউসের ক্যাডেট জাহিদ,সোহরাওয়ার্দী হাউসের ক্যাডেট সাব্বির আমি আর শরিয়তুল্লাহ হাউসের ক্যাডেট সিজান।

আমার বাসা কুষ্টিয়াতে হওয়ায় ভ্যাকেশানেও সিজানের সাথে আমার দেখা হওয়া খুবই সহজ।সিজান যাওয়ার সময় সাব্বির আর জাহিদকে ঝিনাইদাহ যাওয়ার আমন্ত্রন জানালো।আমিও বললাম তোরা যদি আসিস তবে আমিও কুষ্টিয়া থেকে সিজানদের ওখানে যেতে পারি।তাহলে ভ্যাকেশানটা জোস হবে।সাব্বির আর জাহিদ বললো ঠিক আছে আগে বাসায় যাই তার পর জানাবো।ভ্যাকেশানে বাসায় ফিরে একদিন সাব্বির আর জাহিদ ফোন করে জানালো ওরা সিজানদের ওখানে আসবে।

এক বিকেলে সাব্বির আর জাহিদ সিজানদের ওখানে চলে আসলো।আমিও তখন বড় ভাইয়ার সাথে সিজানদের বাড়িতে গেলাম।ভাইয়া আমাকে রেখে ফিরে গেল।কথা ছিল আমরা দুইদিন একসাথে থাকবো।সিজানদের বাড়ি ছিল একদম গ্রাম্য এলাকায়।রাস্তায় হাটুসমান কাদা থাকে।তবে রাস্তার মাঝামাঝি দিয়ে কিছুটা অংশ শুকনো থাকায় একজন করে সেই পথ দিয়ে হাটা যায়।আমি আমার বাকি তিন ক্যাডেট বন্ধুর সাথে সেদিন বিকেলে হাটতে বেরিয়েছি।

এই কাদার রাস্তা দিয়ে যখন হাটছি তখন সামনে থেকে দুটো মোটাগোটা আমাদের বয়সী ছেলে আসছিল।এখন কাউকে না কাউকেতো কাদায় নামতেই হবে।কারণ যে রাস্তাটুকু ভাল ছিল সেটা দিয়ে শুধু একজনই হেটে যাওয়া সম্ভব।আমাদের সবার সামনে ছিল শের ই বাংলা হাউসের ক্যাডেট জাহিদ।আমরা সবাই ক্লাস সেভেনে পড়ি।জাহিদ আবার খুবই চালাক।

সে গলা খাকারি দিয়ে উল্টো পাশ থেকে আশা মোটাগোটা ছেলে দুটোকে বললো ভাই সাইড দাও আমরা যাব।তারা তখন উল্টো ঝাড়ি দিয়ে বললো তোমরা আমাদের সাইড দাও আমরা যাব।দেখা গেল কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছেনা।ঠিক তখন ক্যাডেট জাহিদ তার ক্যাডেটীয় ভেলকী দেখালো।সে বললো দেখ মানে মানে সাইড দাও নইলে কিন্তু গতবার যা করেছিলাম এবারও তাই করবো। তখন কিন্তু কিছু বলতে পারবা না।

জাহিদের কথার আগা মাথা কিছুই বুঝলাম না।তার পরও কি হয় এটা দেখার জন্য অপেক্ষায় থাকলাম।ঠিক তখন দেখি মোটাগোটা ছেলে দুটো দেখি কোন কথা না বলে কাদায় নেমে পড়েছে।আমরা তখন শুকনো পথ দিয়ে হেটে এগিয়ে যেতেথাকি। আমরা যখন জাহিদের কাছে জানতে চাইবো গতবারকি করেছিলি তার আগেই ছেলে দুটো প্রশ্ন করলো “আমরাতো কাদায় নেমে তোমাদেরকে সাইড দিলাম, এখন বলে যাও গতবার তোমরা কি করেছিলে?

জাহিদ তখন বললো তোমরা এবার যা করেছ গতবার আমি তাই করেছিলাম!ছেলে দুটো বোকা হয়ে গেল আর আমরা হাসতে হাসতে শুকনো পথে হেটে হেটে সিজানদের বাড়িতে ফিরে গেলাম।সিনিয়র হওয়ার পর জুনিয়রদেরকে মাঝে মাঝে ভয় দেখিয়ে বলতাম এটা করো নইলে গতবার যা করেছিলাম এবারও কিন্তু তাই করবো। জুনিয়রেরা তখন ভাবতো গতবার না জানি কি ভয়ংকর কোন শাস্তি দিয়েছিলাম তাই তারা ভয়ে ভয়ে হুকুম তামিল করতো।।

৭ জানুয়ারি ২০১৭

ভ্যাকেশানের প্রথম রাত

ভোর হতে তখনো বেশ দেরি।চারদিকে শুনশান নিরব। মিসেস রাবেয়া ছোটাছুটির শব্দ শুনে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লেন।বাইরে দুবার বাশির শব্দ শুনেছিলেন। যে শব্দটা রোজই শোনেন। নাইটগার্ড পাহারা দেয় বাইরে।নিজের সাহস ধরে রাখার জন্য সে হুইসেল বাজায়। কিন্তু মিসেস রাবেয়া ধঢ়ফড়িয়ে বিছানা থেকে নেমে পড়লেন অন্য একটা শব্দ শুনে। শব্দটা আসছে তার ছেলে মাহিনের ঘর থেকে।

মাহিন ক্যাডেট কলেজে পড়ে। সকালেই সে ভ্যাকেশানে বাড়িতে এসেছে। মিসেস রাবেয়া ছেলের রুমের দরজায় নক করলেন।ভিতরের ছোটাছুটি যেন আরো বেশি বেড়ে গেল।মিসেস রাবেয়া বিচলিত হয়ে পড়লেন। তিনি মাহিনের নাম ধরে ডেকে বললেন কি হয়েছে মাহিন।

ছুটোছুটির শব্দটা থেমে গেল। বিমর্ষ মুখে দরজা খুললো মাহিন। তার পর বিছানায় গিয়ে বসলো। মিসেস রাবেয়া ছেলের পাশে বসে আদর করে জানতে চাইলেন ছোটাছুটির শব্দ শুনলাম কেন?

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাহিন বললো বাশির শব্দ শুনে ঘুম ভেঙ্গে গেল। ভাবলাম ফলইন করতে হবে এখনি। তাই ছুটোছুটি করে পিটি সু খুজছিলাম। দরজায় নক করতেই মনে হলো হাউজ বেয়ারা বোধহয় নক করছে তাই ছুটোছুটি আরো বাড়লো। এর পর তুমি নাম ধরে ডাকার পর মনে পড়লো আমিতো ভ্যাকেশানে বাসায় এসেছি।

ছেলের ঘুমের কথা চিন্তা করে পরদিন থেকে নাইটগার্ডকে ওই সময়ে বাশি বাজাতে নিষেধ করলেন মিসেস রাবেয়া।

=============================

জাজাফী

দৈনিক প্রথম আলোতে প্রকাশিত

চাঁদাবাজ ক্যাডেট

ভ্যাকেশানে বাড়িতে এসেছি।বন্ধুদের নিয়ে মাস্তি করে বেড়াচ্ছি।এক দিন আমার পিচ্চি বোনটা বললো ভাইয়া কালকে আমার ম্যাথ এক্সাম কিন্তু জ্যামিতি বক্সে সব ঠিক থাকলেও চাঁদাটা পাচ্ছিনা। তুই হারু কাকার দোকান থেকে আমার জন্য একটা চাঁদা এনে দিবি।আমি আবার আমার পিচ্চি বোনের মহা ভক্ত।তাকে বললাম তুইতো সামান্য একটা চাঁদা চেয়েছিস এ আর এমন কি, এক্ষুনি এনে দিচ্ছি।তুই যদি চাঁদার বদলে চাঁদ আনতে বলতি হয়তো পারলে তাও এনে দিতাম।আমার বোনটা জানে যে ভাইয়া একটুও বাড়িয়ে বলছেনা।

আমি সজলকে সাথে নিয়ে প্রথমে গেলাম আনাসদের বাড়িতে।একই এলাকায় সবার বাসা আবার একই সাথে পড়ি।ভ্যাকেশানে তাই আড্ডাও হয় চরম।ওদের দুজনকে সাথে নিয়ে সোজা চলে গেলাম হারু কাকার দোকানে।আসে পাশে আর কোন দোকান না থাকায় হারু কাকা বেশ জমিয়ে ব্যবসা করছে।হারু কাকা আমাকে আবার একটু অপছন্দ করে।এর কারণ কি হতে পারে তা আমি অনুমান করেছি।তার ছেলেটা আমার সাথে একই স্কুলে পড়তো।ছাত্র হিসেবেও বেশ ভাল ছিল এবং আমার সাথে সেও ক্যাডেট কলেজে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছিল।কিন্তু ভাগ্যের ফেরে সে চান্স পায়নি আর আমি পেয়েছি।এতেই হারুকাকার পিত্তি জ্বলে যাওয়ার মত অবস্থা।সেই থেকেই সম্ভবত হারু কাকা আমাকে দেখতেই পারেনা।

ভ্যাকেশানে এসে হারুকাকার মুখোমুখি হতে আমার বেশ ভালই লাগে।মনে হয় আমি কলেজেই আছি কারণ হারুকাকা যেন সিনিয়র ক্যাডেটর মত আমাকে ধরাশায়ী করতে চেষ্টা করছে আর আমি নানা ভাবে তাকে বোকা বানাচ্ছি কিংবা উল্টো ফাদে ফেলছি।সাপে নেউলে ব্যাপার বলে যদি কিছু থেকে থাকে তবে আমি আর হারু কাকার একই অবস্থা।অথচ আনাস বা সজলকে নিয়ে তার কোন মাথা ব্যথা নেই।

ছোট বোনের জন্য চাদা কেনার জন্য তার দোকানে গিয়ে দাড়ালাম।সে এমন ভাবে আমার দিকে তাকাল যেমন করে জুনিয়র ভয়ে ভয়ে সিনিয়রের দিকে তাকায়।আমি বললাম হারু কাকা চাদা দেন।আমার কথা শুনে হারু কাকার মুখ হা হয়ে গেল।কিছুটা সময় নিয়ে তিনি বললেন কিসের চাদা?তোকে চাদা দেব কেন?আমিও দিকবিদিক জ্ঞান শুন্য হয়ে গেলাম।বললাম আমার বোনের জন্য চাদা দিবেন।হারু কাকা বললেন কারো জন্যই কোন চাদা দেব না। এটা কি মগের মুল্লুক পাইছিস যে চাইবি আর চাদা দেব?কত্ত বড় সাহস তোর।

আমার রাগ চরমে উঠে গেছে।কলেজে থাকতে সিনিয়রদের যন্ত্রনায় অস্থির ছিলাম।ভ্যাকেশানে বাড়ি এসেও শান্তি নেই।ছোট বোনের জন্য আমি জান কোরবান করতে পারি আর এতো কোন হারু কাকা।আমি রেগে মেগে বললাম চাদা দিবেন না মানে?চাদা যদি নাই দিবেন তাহলে দোকান খুলে বসে আছেন কেন?আমি যখন হারু কাকার সাথে কথা বলছি আনাস আর সজল তখন দূরে দাড়িয়ে গল্প করছে।এদিকে কি হচ্ছে না হচ্ছে তাদের জানা নেই।আমি আরো হুমকি ধামকি দিলাম হারু কাকাও দমবার পাত্র নয়।সে কোন ভাবেই আমাকে চাদা দিল না।রাগে ফুলতে ফুলতে বললো এই টুকু দুই আঙ্গুলের ছেলে সে এসেছে আমার কাছে চাদা চাইতে। তাও আবার তার পুচকে বোনের জন্য।ক্লাস সেভেনে পড়া একটা ছেলে হারু কাকার মত একজনের সাথে পেরে উঠবে না এটাই স্বাভাবিক।আমি হার মেনে ফিরে গেলাম।কিন্তু আনাস বা সজলের কাছে নিজের হারের কথা কোন ভাবেই স্বীকারকরা যাবেনা।

কাছে যেতেই ওরা বললো কিরে এক চাদা আনতে এতো দেরি হয়?আমি বানিয়ে বললাম বলিসনা দোস্ত হারু কাকা আমাকে অনেক ভালবাসেতো তাই অনেক গল্প করলাম।তবে চাদা পাইনি।ওনার কাছেনেই। কি আর করা আনাস আর সজল বললো চল তাহলে কোথাও ঘুরতে যাই।এর পরতিন বন্ধু ঘুরতে বেরিয়ে পড়লাম।সারা বিকেল ঘুরে যখন সন্ধ্যা নামলো তখন বাড়ির উঠোনে পা দিতেই আৎকে উঠলাম।দেখি উঠোন ভর্তি মানুষ।মাতবর কাকা মেম্বার কাকা সবাই আছেন।কি হয়েছে বিষয়টা বুঝতে পারিনি।ভাল করে তাকিয়ে দেখি এক পাশে হারু কাকাও আছে আর অন্য পাশে বাবা বসে আছেন।বাবার মূখটা ভারভার। আমি কাছে গিয়ে বুঝতে চেষ্টা করলাম বিষয়টা কি।সবার আগে চোখ পড়লো হারু কাকার।সে বললো ওইতো গুণধর ক্যাডেট ফিরে এসেছেন।এবার বিচার করেন। এইটুকু একটা পোলা তাও ক্লাস সেভেনে পড়ে।সে কিনা চাদাবাজ হচ্ছে। ক্যাডেট কলেজে পড়ে এই বয়সেই চাদাবাজি শুরুকরেছে বড় হলে না জানি ব্যাংক ডাকাতিও করবে।

আমার বোনটা তখন আসে পাশে ছিলনা।কেউ বোধহয় আমার কোনকথা শুনবে না বলে পণ করেছে।আমি বিষয়টা বলতে চাইলেও কেউ বলার সুযোগ দিলনা। বাবা আমাকে কাছে ডেকে পিঠে দু ঘা বসিয়ে দিলেন।দেখি হারু কাকার মুখে বিটকেলে হাসি ফুটেছে। সিনিয়রদের হাতে অপদস্থ হতে দেখলে আমার কোনকোন ক্লাসমেট যেমন আনন্দ পেতো ঠিকই একই ভাবে আমাকে মার খাওয়াতে পারলে হারু কাকারও আনন্দের সীমাথাকেনা।বাবা দু ঘা মারার পর মেম্বার কাকাকে বললেন এই ছেলের বিচার তুমিই করো মেম্বার।নিজের ছেলের বিচার নিজে করতে গেলে অন্যরা মনে করবে আমি শিথিলতা দেখিয়েছি।

মেম্বার কাকাও দেখি আমাকে কিছুই প্রশ্ন না করে শুধু হারু কাকাকে প্রশ্ন করলেন।হারু কাকা একটা কথাও বানিয়ে বলেনি।তিনি বললেন ও দুই বন্ধুকে দূরে দাড় করিয়ে রেখে সোজাআমার দোকানে এসে আমার কাছে চাদা চেয়েছে।তার পর আমি চাদা দেবনা বলেছি আর সে রেগে অনেক তর্ক করেছে। ক্যাডেট কলেজে গিয়ে এই ছেলে পুরোপুরি গোল্লায় গেছে। না হলে কেউ বাপের বয়সীর কাছে চাদা চায়?আর চাদার জন্য ওভাবে ঝগড়া করে?

সবশুনে মেম্বার কাকা যখন আমার শাস্তি দিবেন বলে ঠিক করেছেন ঠিক তখন আমার পিচ্চি বোন এসে হাজির।সে এতো মানুষ দেখেও ঘাবড়ে না গিয়ে সোজা আমার কাছে এসে বললো ভাইয়া আমার কালকে ম্যাথ এক্সাম। তোকে না বললাম হারু কাকার দোকান থেকে একটা চাদা কিনে আনতে।তুই যাস নি?দে আমার চাদাটা দে।ওর কথা শোনার পর উপস্থিত সবাই থ হয়ে গেল।আমাকে আর কিছু বলতে হলো না।তখন উল্টো সবাই হারু কাকাকেই কথা শোনাতে লাগলো।এই ঘটনাটা এলাকায় জানাজানি হলো।তবে সবাই হেসে হেসে সেদিন থেকে আমাকে চাদাবাজ ক্যাডেট নাম দিয়ে দিল। ঘটনাটা আনাস আর সজলও জানতে পেরেছিল।ওরা শেষে পিসিসিতে গিয়ে রটিয়ে দিল এমসিসিতে ক্লাস সেভেনে এক চাদাবাজ ক্যাডেট আছে।অবশ্য ওরা না বললেও হত।আমি নিজেই কলেজে গিয়ে এটা সবাইকে বলেছি।এমনকি এ কান ও কান করতে করতে আমাদের এডজুটেন্ট স্যারের কানেও চলে গিয়েছিল।অ্যাডজুটেন্ট স্যারে মুখে কোন দিন হাসি দেখা যায়নি।কিন্তু রফিক কায়সার স্যারের মুখে পরে শুনেছি সেদিন নাকি অ্যাডজুটেন্ট স্যারও এটা শুনে হেসে ছিলেন।তার হাসির কারণ কলেজে ক্লাস সেভেনে অনেক প্রতিভাধর ক্যাডেটের উত্থান পতন হয়েছে কিন্তু চাদাবাজ ক্যাডেট এবারই প্রথম পয়দা হলো।খাকি চত্ত্বরে আজীবনের মত আমার পরিচয় অমোচনীয় কালিতে লেখা হয়ে গেল “চাদাবাজ ক্যাডেট” বলে।

জাজাফী

৯ জানুয়ারি ২০১৭

 

বিখ্যাত ক্যাডেট

বিখ্যাত ক্যাডেট সে

নাম তার অলীন

রোজ রোজ দেরি করে

সে হয় ফল ইন।

 

ইভিনিং প্রেপটাতে

দেয় রোজ ঘুম

পরীক্ষা এলে তার

পড়ার কি ধুম।

 

মিনিটে মিনিটে সে

ইডি খেতে রাজি

ক্যাডেট কলেজে নেই

তার মত পাজি।

 

আজ তবে হোকনা

অলীনের গল্প

প্রথম দিনেই ছিল

তার সংকল্প।

 

যে হবে গাইড তার

সে নাকি বুঝবে

দিন রাত সে নাকি

তার নাম পুছবে।

 

আমি বলি হাদারাম

তুইকি জানিস না

সিনিয়র ভাইকে কি

সিনিয়র মানিস না?

 

মাথাটা দুলায় সে

মুখে বাকা হাসি

হাটতেছি অলীন আর

আমি পাশাপাশি।

 

নভিসেসে যদি থাকে

অলীনের সামনে

লাথি খেয়ে পড়ে যাবে

বাপ মার নাম নে।

ক্যাডেট নিরা ও হলুদ খামের চিঠি

নিরার কথা মনে আছে?

যে নিরার একটি চিঠি এসেছিল ডাক যোগে। হলুদ খামে। খামের উপর খুব যত্ন করে কেউ একজন লিখেছিল নিরার নামটি। সে ভুল করে হোক আর ইচ্ছে করেই হোক নিরার নামটি দীর্ঘ ইকার যোগে লিখেছিল নীরা।

সেটাই ছিল নিরার জীবনের একমাত্র চিঠি। নিরা চলে যাবার আগে যে নোট রেখে গিয়েছিল সেই নোটে প্রথম চিঠির কথা উল্লেখ ছিল। ফুটফুটে সুন্দর ছিমছাম গড়নের নিরা সদাচারিয়ান ছিল। বিশাল বাউন্ডারী ঘেরা সবুজ চত্ত্বরে প্রথম যেদিন নিরার সাথে দেখা হয়েছিল সেদিন নিরা ছিল নির্বাক।কিন্তু কদিন যেতে না যেতেই তার মূখে যেন কথার ফুলঝুরি ছুটতে শুরু করলো। আমি সদাচারিয়ান নই ফলে নিরার সব কথা আমার শোনা হতনা।

নিরাকে নিয়ে সবাই কথা বলতো। নভিসেস ড্রিলের সময় নিরার দাপুটে পারফরমেন্স যেমন সবার নজরে এসেছিল তেমনি গেমস গুলোতেও সে ছিল অগ্রবর্তী। নিরাকে আমরা ভালবাসতাম খুব,মনে মনে হিংসাও করতাম। নিরার সুন্দর দুটি চোখ ছিল বাদামী। চোখের দিকে তাকালে অদ্ভুত রকম মায়া হত। ওর চুলগুলো যদি সোনালী হতো তবে ওকে অনায়াসে বিদেশীনি বলে চালিয়ে দেওয়া যেত। নিরাকে আমরা খুব হিংসেও করতাম ওর ঐ অদ্ভুত সুন্দর চোখ আর মিষ্টি হাসির জন্য। রুপন্তী বলতো নিরা না হাসা পযর্ন্ত নাকি বৃষ্টি আসেনা। কিন্তু সে হাসতো খুবই কম।

নাহ আমরা কখনোই নিরার কোন দুঃখ ছিল বলে জানতাম না।কিন্তু তার পরও নিরা চলে গেল। যাবার সময় সবার জন্য একটা নোট রেখে গেল। নোটের ভাজে সেই চিঠিটাও ছিল। হলুদ খামের চিঠি। যে খামের উপর খুব যত্ন করে দীর্ঘ ইকার যোগে নিরার নামটি লেখা ছিল।

শান্তি হাউজের থার্ড ডর্মে থাকতাম আমি। চত্ত্বরের সব থেকে সিনিয়র হওয়ায় বেশ কিছু সুবিধা ছিল আমাদের। তার পর ভাগ্য গুনে কিংবা প্রীতির মতে ভাগ্য দোষে আমি ছিলাম হাউজ প্রিফেক্ট। কাঁধে বিশাল দায়িত্ব নিয়ে সব সময় তটস্থ থাকতাম কিন্তু নিরার সাথে দেখা হলে মনটা শান্ত হয়ে যেত।

কি ছিল যেন ওর চোখে মুখে। আমার ফটো এলবামের প্রথম ছবিটা নিরার। হলুদ খামের চিঠিটা যখন এসেছিল আমরা তখন কলেজের শেষ কয়েকটা দিনের জন্য অপেক্ষা করছি। বাউন্ডারী ঘেরা এই চত্ত্বটির প্রতি মায়া জন্মে গেছে। প্রথম যেদিন এসেছিলাম কিংবা বলা চলে বাবা মা যেদিন সম্পুর্ন অপরিচিত এই ভূবনে আমাকে রেখে গিয়েছিল তখন আমার খুব কান্না পাচ্ছিল। দেখতে দেখতে ছয়টি বছর কেটে গেল। এখন আবার কান্না পাচ্ছে। কলেজ ছেড়ে যাওয়ার কষ্টের সাথে নিরার হলুদ খামের চিঠিতে বয়ে নিয়ে আসা কষ্ট। পুর্বসুরীদের মত এ চত্ত্বর ছেড়ে চলে গেলেও প্রতিবছর একবার করে হলেও ফিরে আসা যাবে। কিন্তু নিরা? নাহ সে চলে গেছে বুকের মধ্যে চাপা কষ্ট নিয়ে। যে কষ্ট তার কাছে এসেছিল ডাক যোগে হলুদ খামে বন্দি হয়ে।

এক সপ্তাহ পর আমি যখন শেষ পরীক্ষার হলে বসবো আমার পিছনের সিটটা তখন ফাঁকা থাকবে।আমি জানি ফিরে তাকালেই দেখবো সেখানে নিরা নেই।বুকের মধ্যে ব্যথা হুহু করে ওঠে। নিরা কেন থাকবেনা?  এর পর পরীক্ষার ফলাফল হবে। সাংবাদিক আসবে আমাদের খাকি পোষাকে ভি চিহ্ন দেখানো ছবি তুলতে। সামনের সারিতে এডজুটেন্ট আরও দু চারজন স্যার থাকবেন সেই সারিতে আমাদের সহপাঠিনীদের দুএকজনও থাকবে। শুধু যার থাকার কথা ছিল অাতিউতি করেও তাকে কোথাও পাওয়া যাবেনা। সে নিরা। ঐ ছবিতে খাকি পোষাকে দাড়িয়ে পোজ দেওয়ার ভাগ্য সম্ভবত তার ছিলনা। কদিন আগেই সে চলে গেছে।

উচ্চতর ডিগ্রি নিতে সুইডেন যাওয়ার স্বপ্ন ছিল নিরার কিন্তু সে সুইডেন না গিয়ে আরো দূরের দেশে গেল। সে দেশের টেলিফোনের কান্ট্রিকোড আমাদের কারো জানা ছিলনা।

কেমন আছে এখন সদাচারিয়ান নিরা?অন্য সদাচারিয়ানরা কি নিরাকে মনে রেখেছে? নিরা যে নোটটা রেখে গিয়েছিল তার শেষ দুটি লাইন কারো ভুলে যাবার কথা নয়। সে লিখেছিল “তুমি রাতের আকাশে জ্বলজ্বল করে জ্বলে থাকা থালার মত বিশাল চাঁদ হতে পারো কিন্তু ঐ দূর দিগন্তে ক্ষীনভাবে জ্বলতে থাকা নক্ষত্রের দিকে তাকিয়ে তোামর আফসোস হবেই”। কি বলতে চেয়েছিল নিরা?

আমরা যখন ইভিনিং প্রেপের জন্য তৈরি হচ্ছি নিরাও নিশ্চই তৈরি হচ্ছিল। কিন্তু তার ডাক পড়লো এডজুটেন্টের রুমে। সেই প্রথম তার সাথে ডাক পড়লো আমাদেরও। ইভিনিং প্রেপ বাতিল করা হলো সেদিনের মত। ক্যাম্পাসে সম্ভবত জীবনে প্রথম এবং শেষবার ওটা ঘটেছিল। এডজুটেন্টের রুমে সারিবদ্ধ ভাবে দাড়ানো আমরা।আমাদের চোখের পলক পড়ছেনা।স্থির হয়ে আছে এডজুটেন্টের হাতে ধরে থাকা হলুদ খামের দিকে। সেই খামে কি আছে আমাদের জানা নেই। কোথাও কোন শব্দ নেই। আমরা সবাই যেন কারো জন্য শোক প্রকাশ করতে নিরবতা পালন করছি। সেই একজনকি নিরা ছিল?নিজের জন্য নিজেই যে দাড়িয়েছে শোক প্রকাশ করতে। হতেও পারে।

…………..চলমান।

 

ক্যাডেটের নাশতার রুটি

ডাইনিংএ দুটো চেয়ার ফাঁকা ছিল।খোঁজ নিয়ে দেখা গেল ও দুটোতে ক্লাস সেভেনের জনি আর বনির বসার কথা।ডিনার টাইম হয়ে যাওয়ার পরও ওরা আসেনি কেন?দুজনইকি মেডিকেলে ভর্তি?ক্যাডেট তাইমুরকে পাঠানো হলো হাউসে খোঁজ নিতে।সে রকেটের গতিতে ছুটে গিয়ে আবার সাথে সাথে ফিরে এসে জানালো হাউসের কোথাও ওরা নেই।কোন বাথরুমে নেই,মসজিদে নেই,কোথাও নেই।দ্রুত ডিনার শেষ হলো।সবাই বুঝতে পারলো ওরা কলেজ থেকে পালিয়েছে।

     অ্যাডজুটেন্ট স্যারের নির্দেশে সাথে সাথে শহরে তল্লাশী চালানো হলো।বাস স্ট্যান্ডে ফোন করে জানানো হলো রেল স্টেশানেও জানিয়ে দেওয়া হলো দুজন ক্যাডেট কোন বাসে বা ট্রেনে উঠতে চাইলে তাদেরকে যেন উঠতে দেওয়া না হয়। ক্যাডেট মানেই যে খাকি পোশাকে থাকতে হবে তা নয়।বিশেষত খাকি দেখলে অনেকেই চিনে ফেলে তাই লুকোচুরির কিছু থাকলে সাধারণ কিছু পরতে হয়।জনি আর বনিও দুটো টিশার্ট পরে বেরিয়েছিল।তবে পোষাক বদলালেও চালচলন,চুলের বাটি ছাটতো আর বদলে ফেলা যায়না।ফলে বাসে ওঠার আগেই ওদেরকে ধরে নিয়ে আসা হলো।

     অ্যাডজুটেন্ট স্যারের সামনে দুজন দাড়িয়ে আছে।তারা মনে মনে খুশি যে এই অপরাধে হলেও তাদেরকে কলেজ থেকে বের করে দেওয়া হবে যেটা তারা মনে মনে চাচ্ছিল।কিন্তু তাদের সে আশা পুরণ হলোনা।অ্যাডজুটেন্ট স্যার জানতে চাইলেন তোমরা কলেজ থেকে পালিয়েছিলে কেন?জনি বললো স্যার কলেজের খাবার খুবই জঘন্য খাওয়াই যায়না।কখনো নরম ভ্যাড়ভেড়ে আবার কখনো লোহার মত শক্ত। অ্যাডজুটেন্ট স্যার কিছু একটা ভাবলেন তার পর আবার প্রশ্ন করলেন,আচ্ছা বুঝলাম খাবার খুব জঘন্য কিন্তু তোমরা কলেজের গেটের তালা ভাংলে কি করে? অ্যাডজুটেন্ট স্যারের প্রশ্ন শুনে বনি উত্তর দিল।স্যার সকালের নাস্তার রুটিটা এতো শক্ত ছিল যে ওটা দিয়ে বাড়ি দিতেই গেটের তালা ভেঙ্গে গেল।

     ওদের কথা শুনে অ্যাডজুটেন্ট স্যার থ হয়ে গেলেন।বাইরে কলেজ বেয়ারা দাড়িয়ে ছিল।তাকে ডাক দিতেই সে ভিতরে গিয়ে দাড়ালো।বাচ্চা দুটোর জন্য তার খুব মায়া হলো।ওদেরকে না আবার সত্যি সত্যিই বের করে দেওয়া হয় তাই সে বললো স্যার সত্যি সত্যিই রুটি অনেক শক্ত হয়।এই দেখুন আমার একটা দাত ভেঙ্গে গেছে রুটি ছিড়তে গিয়ে।সে মুখ হা করে দেখাল তার একটা দাত ভাঙ্গা।(যদিও ক্যাডেটদের খাবার তার ভাগ্যে জোটেনা কখনো)

     অ্যাডজুটেন্ট স্যার আর কথা না বাড়িয়ে জনি আর বনিকে বললেন এবারের মত ছেড়ে দিলাম।ভবিষ্যতে কলেজ পালাতে চেষ্টা করলে কঠিন শাস্তি পেতে হবে বলে দিলাম।ক্যাডেটের কাছে কলেজ আউটের চেয়ে কঠিন শাস্তি আর কিছু হতে পারেনা।সেটা দিলেও জনি বনি মাথা পেতে নিত।কিন্তু অ্যাডজুটেন্ট স্যার যেভাবে বললেন তাতে নিশ্চই রেড বুকে আরো ভয়ংকর কিছুর কথা লেখা আছে।পরবর্তীতে আর কোন দিন তারা ভুলেও কলেজ পালানোর কথা মাথায় আনলো না। রুটি যত শক্তই হোকনা কেন তা তাদের হজম করতেই হলো।

১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

ক্যাডেট কলেজের দারোয়ান

সীমান্ত রক্ষীরা যেমন অতন্দ্র প্রহরীর মত সীমান্ত পাহারা দেয় তেমনি ক্যাডেট কলেজের দারোয়ানদেরও অতন্দ্র প্রহরী হতে হয়।ক্যাডেট কলেজে বাইরে থেকে কোন চোর এসে চুরি করে যাবে এমন সাহস পৃথিবীর কোন চোরের হয়নি।এমনকি ক্যাডেট কলেজ গ্রাউন্ডের ভিতর চুরি করার সাহস নেই স্বয়ং থিপ অব বাগদাদের।প্রিন্সিপাল স্যার এটুকু বলে থামলেন। তার পর বললেন ও তুমি হয়তো থিপ অব বাগদাদের নাম জানোই না।প্রিন্সিপাল স্যার যাকে এটা বলেছেন সে স্যারকে আশ্চর্য করে দিয়ে বললো না স্যার শুনেছি।টিভিতে দেখেছি।সে এসেছে ক্যাডেট কলেজের দারোয়ান পদের জন্য সাক্ষাতকার দিতে।তার নাম জমির শেখ। প্রিন্সিপ্যাল স্যার বললেন শুনে থাকলে শুনেছ দেখে থাকলে দেখেছ। এবার আসল কথায় আসি।

     প্রিন্সিপাল স্যার আবার বলতে শুরু করলেন।কলেজ ক্যাম্পাসে বাইরের কোন লোক এসে কিছু চুরি করবে এমনটি কোন দিনই হবেনা।তার পরও কলেজের কোন কোন গাছের কাঠাল,কোন কোন গাছের ডাব,আম কিংবা পেয়ারা রাতের অন্ধকারে হারিয়ে যাবে।কোন ভূত নয় কোন জীন নয় মানুষই সেগুলো চুরি করে খাচ্ছে। সেই চোরদের হাত থেকে কলেজকে দেখে রাখতে হবে তুমি কি পারবে?জমির শেখ বললো অবশ্যই পারবো।যদি দেখি কোন ক্যাডেট ডাব চুরি করতে চেষ্টা করছে কিংবা কাঠাল চুরি করতে চেষ্টা করছে তবে আমি তাদের পাকড়াও করবো।যদি বেশি বাড়াবাড়ি করে তাহলে ওদের থেকে ডাব এবং কাঠালের ভাগ নেব!

     নতুন গার্ড নিয়োগের উদ্দেশ্যে প্রিন্সিপাল স্যার জমির শেখের ভাইভা নিচ্ছিলেন।ভাইভার এই পযার্য়ে প্রিন্সিপাল স্যার হতভম্ব হয়ে যান।ক্যাডেটরা চুরি করে ডাব কিংবা কাঠাল খেতে চাইলে গার্ডের দায়িত্ব সেটা যেন না ঘটে আর জমির শেখ নাকি গার্ড হলে চুরি করা ডাব এবং কাঠালের ভাগ চাইবে।

     প্রিন্সিপাল স্যার বললেন, এবার পরের অংশে আসি।ক্যাডেট কলেজে বাইরে থেকে কেউ সদর দরজা দিয়েও ঢোকার সাহস করবেনা আবার দেয়াল টপকেও ভিতরে আসার চেষ্টা করবেনা। তবে হা কোন কোন দুষ্টু ক্যাডেট কারণে কিংবা অকারণে দেয়াল টপকে কলেজের বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করবে। কেউ কেউ পালিয়ে একবারে বাড়ি চলে যাওয়ার চেষ্টা করবে। তোমার দায়িত্ব হবে কেউ যেন কোন ভাবেই কলেজ থেকে পালিয়ে যেতে না পারে সেটা দেখে রাখা।তুমি কি পারবে?

     জমির শেখ মুখে বিশাল হাসি এনে বললো অবশ্যই পারবো স্যার।কাউকে দেয়াল টপকে পালিয়ে যেতে দেবনা।আর কোন ক্যাডেট যদি বেশি বাড়াবাড়ি করে তবে তাকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে কলেজ থেকে বের করে দেব।

     প্রিন্সিপাল স্যার একবার জমির শেখের মুখের দিকে তাকালেন আরেকবার আমার দিকে।আমি ভাইস প্রিন্সিপাল।তিনি আমার মতামত চাচ্ছেন যে জমির শেখকে গার্ড হিসেবে কি নিয়োগ দেওয়া যায়?আমি কোন ভাবেই ঠিক করতে পারিনা। আপনারাই বলুন যে গার্ড ক্যাডেটের পালিয়ে যাওয়া ঠেকানোর পরিবর্তে তাকে ঘাড় ধরে বের করে দেওয়ার কথা চিন্তা করতে পারে এবং ক্যাডেটদের চুরি করা ঠেকানোর বদলে তাদের চুরির কাঠাল আর ডাবের ভাগ চাইবে বলে সিদ্ধান্ত নিতে পারে তাকে কি ক্যাডেট কলেজের গার্ডের চাকরি দেওয়া যায়? নাহ যায় না।আমি সোজা না করে দিলাম। আমি জানি যে আমি হ্যা বললেও কিছু হবেনা না বললেও কিছু হবেনা। প্রিন্সিপাল স্যার সব সময় অন্যদের মতামত নেন কিন্তু যা করার সেটা তিনি নিজেই আগে থেকে সিদ্ধান্ত নিয়ে রাখেন। এবং জমির শেখের কপালে আর ক্যাডেট কলেজের গার্ড হওয়ার ভাগ্য হলোনা।ক্যাডেটদের কারো কারো কপাল পুড়লো অন্তত যারা পালিয়ে যেতে চেয়েছিল।জমির শেখ গার্ড হলেতো সেই পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিত। একটু রাগিয়ে দিলেই ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দিত।

১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

ক্যাডেটের বাড়ি ফেরা

ট্রেনে ওঠার পর থেকে প্রান্তর যেন হাসি আর থামেইনা। যখন বাসায় ঢুকেছি তখনো সে হো হো করে হাসছে।আম্মু ওর হাসি দেখে অবাক হয়ে জানতে চাইলেন কি হয়েছে এতো হাসছিস কেন?কিন্তু প্রান্ত হাসবে, না ঘটনা বলবে?প্রান্ত আমার ছোট ভাই।আমরা একই কলেজে পড়ি।কলেজে সিনিয়র জুনিয়রের মতই আচরণ করলেও বাইরে বন্ধুর মত।একসাথে কলেজ থেকে বাসায় আসি আবার ভ্যাকেশান শেষে একসাথেই ফিরে যাই। বাবা মায়ের অনেক স্বপ্ন ছিল ছেলেরা  ক্যাডেট কলেজে পড়বে।বাবা মায়ের স্বপ্ন পুরণ করতে গিয়ে সেটা কখন যেন নিজেদেরও স্বপ্ন হয়ে উঠেছিল।কিন্তু বাবা মা কিংবা আমরা কি আর জানতাম যে স্বপ্ন গুলো উল্টো হয়ে বুম্যেরাং এর মত ফিরে আসবে।

বাবা মা ভাবতো ছেলেরা ক্যাডেট কলেজে পড়ছে বিশাল কিছু হচ্ছে কিন্তু বাইরের লোক কি ভাবতো সেটা কিন্তু বাবা মা জানে না। ভ্যাকেশানে বাড়ি ফিরছি।টাঙ্গাইল রেল স্টেশান থেকে ট্রেনে উঠেছি।যে কামরায় উঠেছি সেখানে একটা ছোট্ট বাচ্চা তার আম্মুকে বলছে আম্মু দেখ কত ছোট বাচ্চা পুলিশ!ক্যাডেট কলেজ থেকে খাকি পোষাকে বাড়ি যাচ্ছি।আমি কিছু বলার আগেই আমার আদরের ভাইটা হো হো করে হেসে  উঠলো। ট্রেনটা যখন পোড়াদাহ স্টেশানে থেমেছে তখন দুই ভাই নেমে গেলাম।একটু হাটাহাটি করছি এমন সময় এক লোক এসে আমার ভাইয়ের কাধে হাত রেখে বললো এই ছোকড়া আমার ব্যাগটা স্টেশানের বাইরে নিয়ে চল পাঁচ টাকা দিবো।

আগের বার প্রান্ত হো হো করে হাসলেও এবার রেগে গেল।বললো দেখেতো শিক্ষিতই মনে হচ্ছে কিন্তু কোট টাইয়ের ভিতরে যে আস্ত একটা গন্ডমুর্খ ঢুকে বসে আছে বুঝিনি।ওর কথায় লোকটা থতমত হয়ে গেল।আমতা আমতা করে বললো বুঝিনি বিষয়টা। তখন আমি বললাম, যে বোঝেনা তাকে বুঝাতে চাইনা।আমার হেটে বেরিয়ে গেলাম।শুনলাম কেউ একজন বলছে আরে ভাই ওরাতো ক্যাডেট কলেজে পড়ে।বাসে উঠে বসেছি, এমন সময় শুনি পিছনের সিটের এক মহিলা বলছেন এতো ছোট বয়সের কাউকে দারোয়ানের চাকরি দেওয়া ঠিক নয়!এবার প্রান্ত আবার হো হো করে হেসে উঠলো।সে দাড়িয়ে মজা করার জন্য বললো ইয়েস আন্টি! ইউ আর রাইট।বাট উই হ্যাভ নাথিং টু ডু। ইউ ক্যান নট চেঞ্জ দ্যা রুলস অব সোসাইটি।

ওর পটরপটর ইংরেজী শুনে ভদ্রমহিলার মুখটা হা হয়ে গেল। সেই মুখ দিয়ে আস্ত একটা হাতিও ঢুকিয়ে দেওয়া যেত।বাস থেকে নেমে দুই ভাই হাটছি আর কথা বলছি। কথায় কথায় প্রান্ত হো হো করে হাসছে।যাওয়ার পথে একজন বললো তোমরা কি আনসারের চাকরি করো? তা বেতন কত দেয়!এবার আমারও হাসি এসে গেল।প্রান্তর সাথে সাথে আমিও একচোট হেসে নিলাম।আমাদের হাসা দেখে লোকটা ভেংচি কেটে বললো আনসারের চাকরি করো আর বেতন বলতে লজ্জা পাও? এতে হাসার কি আছে। তোমাদের সাত পুরুষের ভাগ্য যে তোমাদেরকে দারোয়ান না বানিয়ে আনসার বানিয়েছে।

বাসায় ফেরার পর প্রান্তর হাসি যখন থামছেই না আম্মু তখন আমাকে ধরলেন। আমি ঘটনাটা বলতেই আম্মুও হাসতে শুরু করলো।হাসি আসলে সংক্রামক। খুব সহজেই অন্যের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। আর আমাদের কলেজ জীবনটাও হাসি আনন্দে ভরপুর। এর পর ভাবতে থাকি ভ্যাকেশান শেষ করে ফিরে যাওয়ার সময় লোকে আর কি কি বলতে পারে।

৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬

রঙ্গীন ফানুস-শেষ চ্যাপ্টার

(মাঝের চ্যাপ্টার গুলো এখনো কম্পোজ শেষ হয়নি)

মিনহাজ ফিরে এসে দেখলো সারা বাড়ি লোকারণ্য।আজতো কোন উৎসব নেই এ বাড়িতে।তাহলে এতো মানুষ জড় হয়েছে কেন?দূর থেকে ভেসে আসছে কারো না কারো কান্নার শব্দ।প্রতিটি কান্নার শব্দই শেল হয়ে বুকে বেঁধে।চারদিকে তাকায় মিনহাজ।উঠোনের এক কোণায় একটা খালি খাট।কয়েকজন মিলে তার উপরে একটা মশাড়ি টাঙ্গিয়ে দিয়েছে।একজন ঘর থেকে কারো একটা চাদর নয়তো কারো একটা শাড়ি এনে সেই মশাড়ি ঘেরা খাটটার চারদিকে ঘিরে দিতে ব্যস্ত।রান্নাঘরের ওখানে একটা বড় হাড়িতে কিছু একটা রান্নার চেষ্টা চলছে।নাকি পানি গরম করছে তা তার জানা নেই।দক্ষিণের বারান্দায় ঠেস দিয়ে বসে আছে বাবা।বাবার মুখে কোন হাসিনেই।মা কোথায় তাও জানা নেই মিনহাজের।হয়তো ভিতরে নিজের রুমে আছেন।

গোয়াল ঘরের দিকে চোখ পড়তেই দেখতে পেলো গরু গুলো হাম্বা হাম্বা করে ডাকছে।এতো বেলা হয়েছে তার পরও কেউ গরু গুলো কেন গোয়াল থেকে বের করেনি তা সে বুঝতে পারছেনা।দুটো মটর সাইকেল এসে থামলো উঠোনে।মোটর সাইকেল থেকে নামলেন ছোট ফুপা আর তার তিন ছেলে।তাদের চোখ ছলছল করছে।সব কিছু পিছনে ফেলে সে একটা একটা সিড়ি মাড়িয়ে দাদার রুমের দিকে এগোতে থাকে।

মিনহাজের মনে আজ অনেক আনন্দ।দাদার স্বপ্ন পুরনের আনন্দ।এই মুহুর্তে মিনহাজের হাতে যে খামটি আছে সেটা হাতে পেলে দাদার চোখ নিশ্চিত অশ্রুতে ভিজে উঠবে।খামের মাঝে যে চিঠিটি আছে সেটি দাদা নিশ্চই পরম মমতায় বুকের সাথে চেপে ধরবে।সেটা দেখার চেয়ে আনন্দের কোন দৃশ্য এই পৃথিবীতে আছে বলে মনে করেনা মিনহাজ।এই দিনটির জন্য সে কত দিন অপেক্ষা করেছে।সেই অপেক্ষাটা শুরু হয়েছিল ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় থেকে।নাহ ভুল বলেছি এটা শুরু হয়েছিল মিনহাজের জন্মের অনেক আগে থেকে এমনকি মিনহাজের বাবার জন্মেরও অনেক আগে থেকে।

একটা স্বপ্নের অনেক বয়স।যে স্বপ্নটার জন্ম হয়েছিল তার এবং তার বাবার জন্মের অনেক বছর আগে।স্বপ্নটা একদিন দাদার একার ছিল।তার পর যেন পৈত্রিক সুত্রে সেই স্বপ্নটা বাবার মধ্যে বেড়ে উঠতে শুরু করলো।দিনে দিনে এক সময় সেটা মিনহাজের মধ্যে ভর করলো।স্বপ্নটা তাকে তাড়া করে ফিরতো।মনে পড়তো এ পি জে আবদুল কালাম আজাদের কথা।তিনি বলেছিলেন “স্বপ্ন তাই যা তোমাকে ঘুমাতে দেয়না”। সত্যি সত্যিই স্বপ্নটা মিনহাজকে ঘুমাতে দেয়নি।কত যে বিনিদ্র রজনী কেটেছে তার কোন হিসেব নেই।

পা বাড়ালেই দাদার রুমের দরজা পেরিয়ে সে দাদার খাটের কাছে চলে আসবে।দাদার রুমের দরজাটা খোলা।মনে হচ্ছে ভিতরে অনেক মানুষের উপস্থিতি।আলো জ্বলছে আর কেউ একজন সুর করে আল কুরআন তিলাওয়াত করছে।তিলাওয়াত খুব সুরেলা হচ্ছে।দূর থেকে যে কান্নার শব্দ ভেসে আসছিল সেটার সাথে আল কুরআনের তিলাওয়াতের সুর মিলিয়ে মিনহাজের কানে অন্যরকম শোনাচ্ছে।কে কাদছে কিংবা কে তিলাওয়াত করছে সেসব দেখার সময় মিনহাজের নেই।তার প্রথম কাজ হলো দাদার হাতে খামটি ধরিয়ে দেওয়া।দাদাকে বলা এই দেখো দাদা তোমার জন্য আমি স্বপ্ন সত্যি করে নিয়ে এসেছি।

মিনহাজ যখন দাদার রুমের দরজায় পা রেখেছে তখন মসজিদের মাইকের শব্দ ওর কানে ভেসে আসলো।মিনহাজ সেই শব্দে স্থির হয়ে গেল।ওর চলার শক্তি যেন মুহুর্তে হারিয়ে গেছে।ঘোষক ঘোষনা করে চলেছেন ‘একটি শোক সংবাদ,একটি শোক সংবাদ,অত্র গ্রামের সবর্জন শ্রদ্ধেয় মুক্তিযোদ্ধা জনাব শফিউল আলম আর নেই’।

ঘোষকের আর কোন কথা মিনহাজের কানে ঢুকলো না।তার চোখে শ্রাবণ ধারা নেমে এলো।সে যেন মুহুর্তেই শরীরের সব শক্তি হারিয়ে ফেললো।ছোট ফুপা এসে তাকে ধরে ধরে দাদার বিছানার পাশে নিয়ে বসালেন।দাদা শুয়ে আছেন।দাদার খাটটা আজ ঘুরিয়ে নেওয়া হয়েছে।আগে দাদার খাট ছিল পুর্ব পশ্চিম বরাবর।আজ সেটা উত্তর দক্ষিণমূখী।এখন শীত কাল নয় কিন্তু দাদাকে চাদর দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে।মুখের উপর থেকে চাদরটি সরাতেই দাদার মুখটি ভেসে ওঠে মিনহাজের চোখে।সেই চোখ বন্ধ,সেই ঠোটে এখনো হাসি লেগে আছে।চলে যাবার আগে দাদা কি কোন ভাবে অনুভব করতে পেরেছিল তার নাতি ছেলে মিনহাজ তার দেখা স্বপ্ন পুরণ করে তার কাছে ছুটে আসবে।

দাদার বিছানার পাশে একটা ডায়েরি।চুরানব্বই বছর বয়স হয়েছিল দাদার।যে বয়সে মানুষ বিছানা ছেড়ে উঠতেই পারেনা কিংবা যে বয়সে মানুষ বেচেই থাকেনা সেই বয়সেও দাদা ঠিকই হেটে বেড়াতেন।চোখে বেশ ভালই দেখতেন আর নিয়ম করে ডায়েরি লিখতেন।মিনহাজ ভার্সিটি থেকে গ্রামে ফিরলে পাশে বসেয়ে দাদা তার ডায়েরি পড়ে শোনাতেন। সেই ডায়েরি শোনা শুরু হয়েছিল মিনহাজ যখন খুব ছোট তখন থেকে।ডায়েরির সেই কথাগুলো ক্রমে ক্রমে মিনহাজের বুকের মধ্যে একটা স্বপ্নের জন্ম দিয়েছিল।সেই স্বপ্নটা পুরণ করতে মিনহাজের অনেক বছর লেগে গিয়েছে ঠিকই কিন্তু স্বপ্নটা পুরণ হয়েছে।শেষ দিন গুলিতে দাদা কি লিখেছেন তা মিনহাজ জানেনা।

ভেজা চোখে ডায়েরিটা হাতে নেয় মিনহাজ।ডায়েরিটা খোলার আগে বুকের সাথে একবার চেপে ধরে সে।এই ডায়েরিতেই যে জড়িয়ে আছে তার দাদার স্বপ্নের কথা,জড়িয়ে আছে তার বাবা এবং তার নিজেরও স্বপ্নের কথা।বুকের সাথে এমন ভাবে জড়িয়ে ধরে যেমন করে এক বাবা তার ছেলেকে জড়িয়ে ধরে,এক প্রেমিক তার প্রেমিকাকে জড়িয়ে ধরে কিংবা তার চেয়েও বেশি মমতায়।সেই সাথে অবিরাম ঝরতে থাকে তার দুচোখের জল।

ডায়েরির ভাজে একটা কলম রাখা।ওখানেই হয়তো দাদার লেখা শেষ কথা গুলো শোভা পাচ্ছে।ভেজা চোখে ঝাপসা হয়ে আসা ডায়েরির পাতায় আটকে আছে মিনহাজের দৃষ্টি।ফুপা সহ আরো কতগুলো চোখ সেখানে অপলোক তাকিয়ে আছে।চোখের অশ্রুত মুছতে মুছতে সেদিকে তাকিয়ে থাকে মিনহাজ।

“চুরানব্বইটা বছর পার হয়ে গেল।যে বয়সে আমার বন্ধুরা,খেলার সাথীরা কিংবা পরিচিতজনেরা আকাশের ওপারে চলে গেছে কিংবা কেউ কেউ বিছানায় শুয়ে শেষ বিদায়ের অপেক্ষা করছে আমি সে বয়সে স্বপ্নের কথা লিখছি।রাবার টেনে লম্বা করা যায় কিন্তু তারওতো একটা সীমা আছে।স্বপ্ন দেখা যায় এবং সেই স্বপ্নটাকেও টেনে নেওয়া যায় কিন্তু আমার জানা নেই সেই স্বপ্নটা ঠিক কতদূর টেনে নেওয়া যায়।আমার স্বপ্নটা আমি বুকে ধরে রেখেছিলাম।এখন মনে হচ্ছে স্বপ্নটাকে বাচিয়ে রাখার সময় বুঝি শেষ।যে স্বপ্নটা আমি বাচাতে পারিনি আমার কৈশরে,যৌবনে এবং যে একই স্বপ্ন বাচিয়ে রাখতে পারেনি আমার সন্তান তার কৈশর,যৌবনে সেটা একই ভাবে পারেনি মিনহাজ ওর শৈশবে।তবে কি একই ভাবে ওর যৌবনেও ও স্বপ্নটাকে বাচিয়ে রাখতে পারবেনা?

মিছেই স্বপ্নের পিছে ছুটে বেড়িয়েছি।আর নিজের স্বপ্নটাকে মিছেই সন্তান এবং তার সন্তানের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছি।চুরানব্বইটা বছর যে স্বপ্নটাকে বুকে আগলে রেখেছিলাম সেই স্বপ্নটাকে আর বয়ে নিতে ইচ্ছে হচ্ছেনা।বয়ে নিয়ে লাভইবা কি।স্বপ্নরাতো মরে যায় অল্পতেই কিন্তু আমার স্বপ্নটাতো বেচে ছিল অনেক দিন,অনেক মাস এবং অনেক বছর।এখন সময় হলো স্বপ্নটাকে মুক্তি দেয়ার।সময় হলো সন্তান এবং তার সন্তানকে স্বপ্ন বয়ে বেড়ানোর বোঝা থেকে মুক্তি দেয়ার।মানুষের সব স্বপ্ন পুরণ হয়না তাই আমিও না হয় ভেবে নেব এই স্বপ্নটা অপুরনীয় থাকুক।মিনহাজকে যখন এই লেখাটুকু শোনাবো তখন ও নিশ্চই বলবে দাদা আরো কিছুদিনতো বাকি আছে।আরো কিছুটা পথ যেতে দাও তোমার স্বপ্নটাকে।দেখবে নিশ্চই আমি স্বপ্নের পায়ে রশি বেধে তোমার সামনে নিয়ে আসবো।মিনহাজের কথা শুনে আমার ভাল লাগবে কিন্তু আমি ওকে বলবো, না দাদু ভাই জীবন কোন ছোট খাট বিষয় নয় যে সারাজীবন শুধু একটা ঠুনকো স্বপ্নের পিছনে কাটিয়ে দেবে।এই জীবনে আরো কত কিছু করার আছে।শুধু একটি স্বপ্নকে নিয়ে পড়ে থাকলে জীবনের ষোল আনাই বাকি রয়ে যাবে।যেমন আমার জীবনের ষোলআনাই মিছে হয়ে গেছে একটা স্বপ্নের পিছে ছুটে।

মরুভূমিতে পিপাসিত পথিকের বার বার মনে হয় ওইতো দূরে সীমাহীন সমুদ্রে জল থৈথৈ করছে।পিপাসিত পথিক জানেনা সে যে সমুদ্র দেখছে সেটা আসলে মরিচিকা।জীবনের চুরানব্বইটা বছর পার করার পর আমি উপলব্ধি করছি আমার স্বপ্নটাও মরুভূমিতে দেখা মরিচিকার মত।মরিচিকার পিছনে ছুটে কেবল ক্লান্ত হওয়া ছাড়া আর কিছুই পাওয়া যায়না।

তবে যে স্বপ্নটা আমি দেখেছিলাম তার মধ্যে ভালবাসা ছিল।সেই ভালবাসাই আমাকে দীর্ঘদিন বাচিয়ে রেখেছে,বাচতে সাহায্য করেছে।মানুষের বুকের মধ্যে স্বপ্ন না থাকলে সে বেচে থাকেনা।স্বপ্নহীন জীবন কোন জীবন নয়।যেদিন কারো জীবনের স্বপ্ন গুলো শেষ হয়ে যায় মূলত সেদিন সেও আর থাকেনা। আমার একটা স্বপ্নই আমাকে প্রেরণা দিয়েছে বাচিয়ে রেখেছে।সেই স্বপ্ন এখন ছুটে যেতে চায় সুদুরে।যে যেতে চায় তাকে বেধে রাখার সাধ্য আমার নেই।তাই ছুটি দিয়ে দিয়েছি স্বপ্নটাকে।যেহেতু এখন আর কোন স্বপ্ন বেচে নেই।যেহেতু আমার রঙ্গীন ফানুস আজ আকাশে উড়ে গেছে সেহেতু আমি আজ সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুর মত।যার নিজের বলতে কিছু নেই।কিন্তু শিশুটির অপেক্ষার সাথে সাথে সে অনেক কিছু পায় আর আমার অপেক্ষাতো কেবল একটা আহ্বানের জন্য। সেই আহ্বান এলে স্বপ্নের রঙ্গীন ফানুসের মত আমিও উড়ে যাবো।আসার সময় একটা ফিরে যাওয়ার টিকেট সাথে করে নিয়ে এসেছিলাম।শুধু জানা হয়নি ফিরতি ট্রেন কবে কোন স্টেশান থেকে ছাড়বে”।

মিনহাজের চোখের জলে ভিজে গেছে দাদার হাতের ছোয়া লাগা ডায়েরির পাতা গুলো।ভিজে আছে বাকিদের চোখ।দাদা তার রঙ্গীন ফানুস উড়িয়ে দিয়ে নিজেও রিটার্ন টিকেটের ট্রেনে চেপে বসেছে।বাম হাতে ধরে রাখা খামের ভিতর থেকে মিনহাজ একটি চিঠি বের করে।গোটাগোটা অক্ষরে তার নাম লেখা।একদম নিচেয় লেখা ক্যাডেট কলেজ পরিচালনা পর্ষদ।মিনহাজ মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক পদে নিয়োগ পেয়েছে।এমন একটা সময়ে সে চিঠিটা হাতে পেয়েছে যখন তার দাদার রঙ্গীন ফানুস উড়তে উড়তে অনেক দূরে চলে গেছে।কৈশরে দাদা ক্যাডেট কলেজে পড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন কিন্তু স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে গেছে।যৌবনে ক্যাডেট কলেজের শিক্ষক হয়ে সেই স্বপ্নটা পুরণ করতে চেয়েছিলেন তাও হয়নি।একটু একটু করে স্বপ্নটা মরে যেতে চাইলেও তিনি মরতে দেন নি।তার সন্তান ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হবে আর তিনি প্যারেন্টস ডেতে এবং অন্যান্য সময়ে সেখানে যাবেন সেই স্বপ্নও দেখেছেন।মিনহাজের বাবাও সেই স্বপ্ন পুরণ করতে পারেন নি।একই ভাবে পারেনি মিনহাজ নিজেও।কিন্তু দাদার স্বপ্নটা মিনহাজকে প্রতিনিয়ত মনে করিয়ে দিত।নিজ থেকে সেই স্বপ্নটা আকড়ে ধরেছিল।যখন সে মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজের শিক্ষক পদে নিয়োগের চিঠিটা হাতে পেলো তার কতইনা আনন্দ হলো।দাদাকে চিঠিটা দিয়ে বলবে দাদা তোমার স্বপ্ন আমি সত্যি করেছি।তুমি এবার ক্যাডেট কলেজে যাবে,ঘুরে দেখবে,যে সবুজ চত্ত্বর ঘিরে তোমার অবিরাম ভালবাসা মিশে আছে।কিন্তু নিয়তি তা হতে দেয়নি।মিনহাজ তার দাদাকে চিঠিটা দিতে পারেনি,দাদাকে তার স্বপ্নের সবুজ চত্ত্বরে নিয়ে যেতে পারেনি।যদি রঙ্গীন ফানুসই উড়ে যায়,যদি ঘুড়ি সুতো ছিড়ে আকাশে উড়ে যায় তবে শুধু লাটাই ধরে রেখে লাভ কি।

মিনহাজের হাতে ধরে রাখা ক্যাডেট কলেজ থেকে আসা চিঠিটি সে ছিড়ে ফেলে।যে সবুজ চত্বরে সে তার দাদাকে নিয়ে যেতে পারবেনা সে চত্ত্বরে যাওয়ার কোন ইচ্ছেই তার নেই।তার শুধু মনে পড়ে দাদার লেখা কবিতার সেই কথা গুলো—

“তোমার জন্য সব ভালবাসা সবটুকু প্রেম জমা

ভুলকরে যদি ভুলকরি কভু নিজগুনে দিও ক্ষমা ।

মির্জাপুরিয়ান নাম দিয়ে তুমি আমাকে করেছ ঋণী

যেখানেই থাকি তোমাকে আমরা ভুলবোনা কোন দিনই।

তোমার জন্য তাই আমাদের এতো মায়া এতো টান

মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ চেতনার আরেক নাম।।

আওয়াজ শুনি প্যারেড গ্রাউন্ডে লেফট রাইট ডান বাম”।

৬ ডিসেম্বর ২০১৬

রঙ্গীন ফানুস, পর্ব-৩

জাকির বেশ ভাল মাবের্ল খেলতে পারতো।শুনেছি জাকির এখন বাইরে থাকে।ও যখনি খেলতে চাইতো আমরা তখন চুপসে যেতাম।কারণ ওর হাতের টিপ বা নিশানা চমৎকার।একবার বেশ মনে পড়ে আমি বাবার এক বন্ধুর বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলাম।কথা ছিল বিকেলের আগেই আবার বাড়িতে ফিরে আসবো কিন্তু বাবার বন্ধুর একটা ছেলে ছিল আমার চেয়ে একটু কম বয়সী সে কোন ভাবেই আমাকে আসতে দেবেনা বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।তাই সে আমার জামা জুতো সব লুকিয়ে রেখেছিল।কিন্তু আমার মনের মধ্যে মাবের্ল খেলার যে নেশা জন্মেছিল তার টান আমি উপেক্ষা করতে পারিনি তাই স্যান্ডোগেঞ্জি গায়ে হাফ প্যান্ট পরেই চলে আসি গ্রামে।এরকম একটা পরিবেশ থেকে কোন দিন ক্যাডেট কলেজের সবুজ চত্ত্বরে পা রাখবো সেটা আমি যেমন ভাবিনি তেমনি স্বপ্নও দেখিনি। স্বপ্নটা তৈরি হয় হঠাৎ করে।স্বপ্নরা এমনই হয়। হঠাৎ জন্মনিয়ে তরতর করে ডালপালা গজিয়ে ফেলে।এক সময় দেখা যায় সেই স্বপ্নটাই মহীরুহ হয়ে উঠেছে।ওয়াসফিয়া নাজরিন কিংবা মুসা ইব্রাহীমও একদিন কি জানতো যে তারা পৃথিবীর সবোর্চ্চ বিন্দুতে পা রাখবে আর লাল সবুজের পতাকা উড়িয়ে আসবে?তাদের স্বপ্নটাও ধীরে ধীরে বাস্তবে রুপান্তরিত হয়েছে।যে গ্রামের মানুষের অধিকাংশই মফস্বল শহরে যাওয়ার মত ভাগ্য নিয়েই জন্মেনি তাদের কারো কারো সন্তান ক্যাডেট কলেজে পড়বে এটা কল্পনাতীত।কিন্তু মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়।তাই স্বপ্ন দেখলে হয়তো চেষ্টাতে সেই সব স্বপ্ন সত্যিও হয়।সব স্বপ্নতো আর অলীক নয়।

বাবার বদলী হওয়া এবং কোয়াটার পাওয়া আমার জন্য শাপেবর হলো।যে আমি মাবের্ল খেলাকে জীবনের সব থেকে আনন্দের এবং সব থেকে সেরা বলে জেনে এসেছি সেই আমার মধ্যে তৈরি হতে লাগলো নতুন নতুন স্বপ্ন। সে স্বপ্ন ক্রমে ক্রমে তার শাখা প্রশাখা বাড়িয়ে দিতে লাগলো।…….. লেখা চলছে

পর্ব-১

পর্ব-২