অরবিটাল— সামান্থা হার্ভের লেখা একটি যুগান্তকারী উপন্যাস, যা ২০২৪ সালে বুকার পুরস্কার জয় করেছে। এই বইটি তার পূর্ববর্তী কাজের তুলনায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে এবং সাহিত্যের দুনিয়ায় একটি নতুন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। উপন্যাসটি অদ্ভুতভাবে একদিক থেকে বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির মতো, আবার অন্যদিক থেকে এটি একটি গভীর মানবিক কাহিনী, যা পাঠককে জীবনের সংকট, সম্পর্কের জটিলতা, এবং আত্মপরিচয়ের সন্ধানে নিয়ে যায়। অরবিটাল হার্ভের সাহিত্যিক যাত্রায় এক মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।
অরবিটাল মূলত একজন বিজ্ঞানী, এলা, এর জীবনযাত্রার কাহিনী। এলা, যিনি একটি মহাকাশ গবেষণা সংস্থায় কাজ করেন, তাঁর জীবন অনির্দেশ্যতার মধ্যে বন্দী। মহাকাশের জন্য তার প্রচণ্ড আগ্রহের পাশাপাশি, পৃথিবী ও মহাকাশের মধ্যে সম্পর্ক এবং জীবনযাত্রার অর্থ অনুসন্ধান তার মনোজগতের গভীরে চলে যায়। এলার জীবনটি একটি একক, নিজস্ব মহাকাশে পরিণত হয়েছে, যেখানে তিনি পারিবারিক সম্পর্ক, প্রেম এবং ব্যক্তিগত অসুখী স্মৃতির বিরুদ্ধে একটি দীর্ঘ সংগ্রামে রয়েছেন। উপন্যাসের কেন্দ্রে রয়েছে এলার এই জটিল মানসিক যাত্রা, যেখানে তিনি পৃথিবী ও মহাকাশের মধ্যে তার অবস্থান খুঁজে পেতে চেষ্টারত।
একদিকে যেমন অরবিটাল মহাকাশ সংক্রান্ত বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব ও প্রযুক্তির ব্যাপারে গভীর জ্ঞান প্রদান করে, তেমনি এটি মানুষের আত্মপরিচয়, সম্পর্ক, এবং অস্তিত্বের সংকট নিয়ে একটি মৌলিক এবং মারাত্মক মানবিক বিশ্লেষণও প্রদান করে। হার্ভে তাঁর পরিচিত শৈলীতে চরিত্রগুলির মনের গভীরে প্রবেশ করে তাদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং সংকটগুলো তুলে ধরেছেন।
হার্ভে তাঁর লেখায় যে ভিন্ন ধরনের মানবিক বিশ্লেষণ করেন, তা এই উপন্যাসেও পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। তিনি তাঁর চরিত্রের অভ্যন্তরীণ অনুভূতি ও সংকটকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে চিত্রিত করেছেন। এলার জীবন একটি ক্রমাগত ঘূর্ণায়মান অভ্যন্তরীণ পৃথিবী, যেখানে মহাকাশের বিশালতা এবং পৃথিবীর ক্ষুদ্রতা একে অপরের সাথে সম্পর্কিত। হার্ভে যে মানবিক সম্পর্ক এবং আত্মবিশ্বাসের সংকট নিয়ে লেখেন, তা এই উপন্যাসের মূল উপজীব্য। তার লেখার ধরন এমন যে, পাঠক বারবার চরিত্রের মানসিক যাত্রায় প্রবাহিত হন, যেন তারা সেই অনুভূতির সঙ্গী হয়ে ওঠেন।
এলার চরিত্রের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ, তার সম্পর্কের জটিলতা এবং তার আত্মবিশ্বাসের সংকট এই উপন্যাসের শক্তিশালী দিক। বইটি সাধারণত ধীর গতির, এবং প্রতিটি চরিত্রের মনের গতিবিধি বিশ্লেষণ করে, যা পাঠকের জন্য এক অনন্য অভিজ্ঞতা সৃষ্টি করে। এলার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পৃথিবী এবং মহাকাশের মধ্যে এক অদৃশ্য সেতু তৈরি হয়, যা হার্ভের লেখাকে আরও গভীর এবং ভাবনার খোরাক করে তোলে।
হার্ভে এই উপন্যাসে বৈজ্ঞানিক কল্পনার একটি নতুন দৃষ্টিকোণ উপস্থাপন করেছেন। মহাকাশ গবেষণা এবং বিজ্ঞান এর মধ্যে হার্ভে মানবিক গল্পটি এমনভাবে রেখেছেন, যা বৈজ্ঞানিক কল্পনার মতোই অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে, কিন্তু এটি গভীরভাবে মানবিক সম্পর্ক এবং অস্তিত্বের সংকটের সাথে জড়িত। যেমন মার্কেজের One Hundred Years of Solitude বা চীনা আচেবের Things Fall Apart বইগুলির মধ্যে বিশেষত রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল, তেমনি অরবিটাল মানুষের মানসিক যাত্রা এবং মহাকাশের বিশালতার মধ্যে সম্পর্ক খুঁজে পেতে চায়।
মহাকাশ এবং পৃথিবীকে যুক্ত করে হার্ভে একটি মেটাফোরিক্যাল ডেলিমা তৈরি করেছেন, যেখানে চরিত্রের শূন্যতা এবং সম্পর্কের ক্ষুদ্রতা একটি বৃহত্তর মহাজাগতিক তত্ত্বের মধ্যে আলোচিত হচ্ছে। যদিও এটি বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনির মত মনে হতে পারে, তবে আসলে এটি একটি গভীর মানবিক গবেষণা, যা আধুনিক জীবনের সংকট এবং জটিলতার প্রতিফলন।
অরবিটাল বইটি পড়তে গিয়ে পাঠককে ধৈর্য্য ধরে চরিত্রের মানসিক অবস্থা এবং তার যাত্রা অনুসরণ করতে হয়। প্রথমদিকে এটি ধীর গতির হতে পারে, কিন্তু হার্ভের লেখা আস্তে আস্তে পাঠককে তার পৃথিবী এবং মহাকাশের সম্পর্কের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়। এই উপন্যাসের এক বড় শক্তি হলো এর গতি এবং বিশ্লেষণাত্মক গভীরতা। পাঠক যেন চরিত্রের সঙ্গে একাত্ম হয়ে ওঠেন, এবং তাকে তার সংকটের মধ্যে দিয়ে পথ চলতে সহায়তা করেন।
এই বইটি একদিকে যেমন মহাকাশ বিজ্ঞান নিয়ে একটি গভীর ধারণা দেয়, তেমনি অন্যদিকে এটি আমাদের মানবিক সম্পর্ক এবং ব্যক্তিগত সংকটের দিকেও আলোকপাত করে। এই দুইটি উপাদান একত্রিত হয়ে একটি শক্তিশালী ও চিন্তা-provoking অভিজ্ঞতা তৈরি করেছে।
অরবিটাল হল এক অত্যাধুনিক সাহিত্যকর্ম, যেখানে বৈজ্ঞানিক কল্পনা, মানবিক সম্পর্ক এবং আত্মপরিচয়ের সংকট একত্রিত হয়েছে। সামান্থা হার্ভে তার অসাধারণ সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে পাঠককে এমন এক মানসিক যাত্রায় নিয়ে যান, যা একদিকে যেমন বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রদান করে, তেমনি মানবিক এবং অন্তর্দ্বন্দ্বপূর্ণ বিশ্লেষণের মাধ্যমে পাঠককে ভাবতে বাধ্য করে। বুকার পুরস্কারের জন্য এর নির্বাচিত হওয়া একেবারে সঙ্গত, কারণ এটি আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম মাইলফলক।
বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় সব ধরনের পণ্যের দাম আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে বাসাভাড়া, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎ বিল—সব কিছুতেই মূল্যবৃদ্ধি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো এবং এর সমাধান কী হতে পারে?
১. আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাব
বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের পর, বিভিন্ন পণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ হওয়ায়, বেশিরভাগ উপকরণ আমদানি করতে হয়। অপরিশোধিত তেল, গ্যাস, খাদ্যপণ্যসহ বহু উপকরণ বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়, যার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামা সরাসরি বাংলাদেশের বাজারে প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশকে শক্তিশালী করার জন্য স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, কৃষির আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করে খাদ্যপণ্যের স্বয়ংসম্পূর্ণতা নিশ্চিত করা এবং বিকল্প জ্বালানির উৎস তৈরি করা। এছাড়া, আন্তর্জাতিক বাজারে খোলা চুক্তির পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে সরকার, যাতে কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা কমানো যায়।
২. অভ্যন্তরীণ চাহিদার অস্বাভাবিক বৃদ্ধি
বাংলাদেশে বর্তমানে একটি দ্রুত বর্ধনশীল মধ্যবিত্ত শ্রেণি রয়েছে, যার কারণে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বেড়ে গেছে। মানুষের আয় বাড়ছে, কিন্তু সেই তুলনায় সাপ্লাই চেইন সঠিকভাবে কাজ করছে না। এ কারণে বাজারে চাহিদা মেটানোর জন্য পণ্যের দাম বাড়ছে।
সরকারকে শিপিং ও পরিবহন খাতের উন্নতির দিকে নজর দিতে হবে। পাশাপাশি, উৎপাদন বাড়ানোর জন্য স্থানীয় উদ্যোগ এবং উদ্যোক্তা তৈরি করা উচিত, যেন চাহিদার তুলনায় সাপ্লাই সচল থাকে। এছাড়া, অধিক পরিমাণে সরকারি নিয়ন্ত্রণে আসা দরকার, যাতে বাজারের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য বজায় থাকে।
৩. ডলারের বিপরীতে টাকার মান হ্রাস
বর্তমানে ডলারের বিপরীতে টাকার মানে অনেক বেশি হ্রাস পাওয়া গেছে, যা আমদানি খরচ বাড়িয়েছে। বিশেষ করে ইম্পোর্টেড পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে দেশীয় বাজারে দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, টেলিভিশন, মোবাইল ফোন, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, নির্মাণ সামগ্রী—এসবের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এই সমস্যার সমাধান করতে হলে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে হবে এবং রপ্তানি বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। এছাড়া, বাংলাদেশে তৈরি পণ্যের আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি বাড়ানো এবং বৈদেশিক ঋণকে সঠিকভাবে ব্যবহার করার মাধ্যমে ডলারের চাপ কমানো যেতে পারে।
৪. আমদানি নির্ভরতা ও সরকারি প্রশাসনিক সমস্যা
বাংলাদেশে বেশ কিছু পণ্যের উৎপাদন কম, যার কারণে আমদানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা রয়েছে। এসব পণ্য-সামগ্রী আমদানির জন্য সরকারকে অনেক টাকা খরচ করতে হয়, যা মুদ্রাস্ফীতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেই সঙ্গে দেশের প্রশাসনিক জটিলতা এবং দুর্নীতির কারণে বিভিন্ন পণ্য বাজারে ঠিকভাবে সরবরাহ করা সম্ভব হয় না।
সরকারি নীতিতে পরিবর্তন আনা এবং প্রশাসনিক দুর্নীতি কমানো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর পাশাপাশি, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করা যেতে পারে, যা সামগ্রিক বাজার পরিস্থিতি উন্নত করবে। সরকারি তরফ থেকে স্থানীয় উৎপাদনশীলতাকে উৎসাহিত করতে আরও বেশি ইনসেনটিভ দেওয়া প্রয়োজন।
৫. অস্থিরতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা
রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা দিশেহারা হয়ে পড়েন। এর ফলে বিনিয়োগ কমে যায় এবং ব্যবসা পরিচালনায় সমস্যা দেখা দেয়, যা সরবরাহের ওপর প্রভাব ফেলে। এই পরিস্থিতি মানুষের জীবনে মূল্যবৃদ্ধি ঘটানোর অন্যতম কারণ।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা জরুরি। সরকারের উচিত ব্যবসা পরিবেশ উন্নত করা, বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি ব্যবসার জন্য। পাশাপাশি, বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য একটি সমৃদ্ধ ও স্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করা।
বাংলাদেশে দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি একটি জটিল সমস্যা, যা বহু কারণে সংঘটিত হচ্ছে। তবে সঠিক নীতি গ্রহণ এবং কার্যকর পদক্ষেপের মাধ্যমে এই সংকট কাটিয়ে উঠা সম্ভব। উন্নত প্রযুক্তি, স্থানীয় উৎপাদন বাড়ানো, প্রশাসনিক সংস্কার এবং বৈদেশিক মুদ্রার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করার মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উন্নত করা সম্ভব। এসব উদ্যোগ কার্যকরী হলে মানুষের জীবনযাত্রার মানও উন্নত হবে, এবং মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো সম্ভব হবে।
যা বলতে চাই সেটা বলার আগে একটা গল্প বলি। এই গল্পটা হয়তো আগেই বলেছি বা আপনারা আগেও শুনেছেন। এক সরকারি কর্মকর্তার ইচ্ছে হলো একটা ইউটিউব চ্যানেল খুলবেন। সে জন্য তিনি যোগাযোগ করলেন এক কোম্পানীর সাথে। তারা তাকে জানালো ইউটিউব চ্যানেল খুলতে মোট ৫ লাখ টাকা লাগবে। তিনি ভাবলেন এতো টাকা! তার কাছে তখন অতো টাকা ছিলো না। তিনি সময় নিলেন। অল্প অল্প করে টাকা জমালেন। চার লাখ টাকা জমানোর পর একদিন অফিস শেষে ফেরার পথে চায়ের দোকানে বসে তার ইচ্ছের কথা তার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছোট ভাইকে বললেন। ছোট ভাইটা সব শুনে অবাক হলো। তার হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে একটু টেপাটিপি করে তার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন ভাই এই নিন আপনার ইউটিউব চ্যানেল খোলা হয়ে গেছে। লোকটি মোবাইল হাতে নিয়ে দেখলেন সত্যি সত্যিই তার নামে একটা ইউটিউব চ্যানেল খোলা হয়ে গেছে। তিনি অবাক হয়ে বললেন কিভাবে করলে? চ্যানেল খুলতে না ৫ লাখ টাকা লাগবে ওরা বললো? তখন ছেলেটি হেসে উঠলো। বললো ভাই এগুলো হলো মেরে খাওয়ার ধান্দা। এই গল্পের সারকথা হলো আমরা যে সব প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করি তা ওরকম বিভিন্ন মাধ্যমে করি বলি আমাদের খরচ হয় আকাশ ছোঁয়া। নিজেরাই যদি এগুলো বাস্তবায়ন করতে পারতাম তবে খরচের পরিমান অনেক কমে যেতো। আমরা যে মুখে মুখে বলি মানব সম্পদ আসলে কি আমরা সেটা অন্তর দিয়ে বিশ্বাস করি? আমরা কি কখনো সত্যি সত্যিই মানব সম্পদকে সম্পদে পরিনত করতে চেষ্টা করেছি? তাহলে আজকে আমাদের দেশের বিভিন্ন প্রজেক্ট করার জন্য বিদেশীদের ভাড়া করা লাগতো না। আমাদের সম্পদ অন্য দেশে চলে যেতো না।
যে দেশে এতো বেকার, বেকারত্বের অভিশাপ দূর করতে অন্যান্য দেশে গিয়ে আমরা শ্রম দিচ্ছি সেই দেশে বাইরের দেশের মানুষ এসে কিভাবে চাকরি করে? পুলিশ বাহিনীতেও নাকি ভারতীয় অনেক নাগরিক আছে এবং সেই সংখ্যাটাও চোখ কপালে ওঠার মত। অন্যদিকে শুনি বড় বড় প্রজেক্টে দক্ষ লোক পাওয়া যায় না বলে বিদেশ থেকে লোক ভাড়া করা লাগে। এই যে দক্ষ লোক পাওয়া যায় না এর জন্য দায়ী কে? আমরা নিজেরাই। আমাদের স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় তাহলে আমাদের ছেলে মেয়েদের কী শেখায় যে তাদের মধ্যে চাহিদা মত দক্ষতা গড়ে ওঠে না? আমরা যেহেতু জানি যে আমাদের কোন ধরনের দক্ষতা সম্পন্ন মানুষ দরকার আমরা তাহলে কেন সেগুলোকে আমলে নিয়ে আমাদের শিক্ষার্থীদের সেই সব বিষয়ে দক্ষ করে তুলি না? তাহলেইতো এই বিরাট সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। দেশের টাকা দেশেই থাকে এবং একই সাথে প্রজেক্ট বাস্তবায়ন খরচ চার ভাগের তিন ভাগ কমে যায়। পাশাপাশি দেশের বেকারত্ব শুণ্যের কোটায় নেমে আসে।
সারা পৃথিবী যেখানে শিক্ষা ক্ষেত্রকে প্রাধান্য দিয়ে মানবকে সম্পদে পরিনত করায় ব্যস্ত আমরা তখন কোন পথে হাটছি? আমরা বছরের পর বছর দলীয় লেজুড়ভিত্তিক অপশাসনের মাধ্যমে প্রতিটি সেক্টরকে সীমাহীন দুর্নীতির কারখানা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে চলেছি। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় সব জায়গায় সিন্ডিকেট সব জায়গায় লুটেরা সব জায়গায় দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়ন চলছে। এগুলোর অবসান হওয়া জরুরী। দেশকে সত্যিকার অর্থে উন্নত করতে চাইলে এর বিকল্প কিছু হতে পারে না। আমাদেরকে সত্যি সত্যিই টেকসই উন্নয়নের চিন্তা করতে হবে।
বাংলাদেশের একজন নাগরিক হিসেবে আমার সব সময়ই কিছু চাওয়া ছিলো, দাবী ছিলো এবং অধিকার ছিলো। সেই চাওয়া আমি চাইতে পারিনি, সেই দাবী আমি করতে পারিনি, সেই অধিকার আমি পাইনি। বুঝতে শেখার পর থেকে আমি কখনো আমার স্টেটমেন্ট বদলাইনি। বয়স বেড়েছে, সরকার বদল হয়েছে, হাওয়া বদলে যেতে দেখেছি কিন্তু আমার স্টেটমেন্ট বদলায়নি।
আমাদের দেশের সীমিত সম্পদ এবং সীমিত ভূখন্ডকে যথাযথ ভাবে কাজে লাগাতে হবে। মানব সম্পদকে সত্যিকার অর্থে সম্পদ রুপে গড়ে তুলতে হবে। দেশেই দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে যেন দেশের যে কোনো প্রজেক্ট দেশের মানুষের মাধ্যমেই সম্পন্ন করা সম্ভব। এতে করে খরচ অর্ধেকের চেয়েও কমে আসবে।
আমাদের দেশ কৃষিপ্রধান দেশ। কিন্তু এখন এই দেশে কৃষকের সংখ্যাই সবচেয়ে কম। কৃষিখাতে প্রচুর ভর্তুকি দিলেও সেই সুবিধা আসলে প্রান্তিক কৃষকেরা ভোগ করতে পারে না। এই দেশে কৃষকদের মূল্যায়ণ জরুরী। আমাদের কৃষি খাতকে গুরুত্ব দিতে হবে। সার ওষুধ কীটনাশকের দাম সীমিত রাখতে হবে। খাদ্যপণ্যের দাম তাহলে অটোম্যাটিক কম থাকবে। যদি সিন্ডিকেট না থাকে। কৃষিতে ব্যবহৃত পণ্যের দাম যদি কম থাকে তাহলে উৎপাদন খরচ কমে যাবে ফলে উৎপাদিত পণ্যের দামও ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই থাকবে।
ধান,গম, শাক সজবির বাইরে পাট,তুলা সহ অন্যান্য পণ্যের দাম বেশি হতে হবে কারণ ওগুলো দিয়ে সাধারণ মানুষের তেমন কোনো কাজ নেই। ওগুলো শিল্প মালিকেরা নিয়ে কাপড়,সুতা,কার্পেট অনেক কিছু বানিয়ে কোটি কোটি টাকা আয় করে। সেই তুলনায় কৃষকেরা দাম পায় না। চামড়া শিল্পে সিন্ডিকেট দূর করতে হবে। আমরা সবাই জানি চামড়াযাত পণ্যের দাম আকাশ ছোয়া। কিন্তু চামড়া বিক্রির সময় আমরা দেখি দামই পাই না। একটা গরুর চামড়া থেকে ১০/২০ জোড়া জুতা হয়। যার দাম দাড়ায় লাখ টাকা। কিন্তু সেই চামড়া বিক্রি হয় ২০০ টাকা থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে। এই সব অরাজকতা দূর করতে হবে।
রাস্তায় ট্রাফিক আইন একেবারেই বলবৎ না। সে ক্ষেত্রে জরিমানার পরিমান বাড়ানো উচিত। একবার জরিমানা দিলে ওই লোক সারা জীবন মনে রাখবে এবং ভবিষ্যতে আর কখনো আইন ভাংবে না। ঘুষ নিয়েছে এমন প্রমাণ হলে শুধু চাকরি থেকে বহিস্কারই নয় পাশাপাশি জেল জরিমানার ব্যবস্থা থাকতে হবে। একজন অফিসার নিজ থেকে জীবনের শুরুতেই ঘুষ চায় না বরং সেবাগ্রহীতা দ্রুত সেবা পাওয়ার জন্য নিজ থেকেই ঘুষ দিতে উদ্যোগি হয়। তারপর এটা এক সময় সেবা দাতার অভ্যাসে পরিণত হয়। তখন সেবা গ্রহীতার আর ঘুষ দেওয়ার কথা বলা লাগে না বরং তার থেকে ঘুষ জোর করে নেওয়া হয়।
সরকারি চাকরি বিশেষ করে বিসিএস কেন্দ্রীক যে ঝুকে পড়ার বিষয় এটা দূর করতে হবে। তাহলে দেশের বেকারত্ব কমবে। তাছাড়া একাডেমিতে পড়াশোনার সময় শিক্ষকদের ভূমিকা পালন করতে হবে। ছাত্রদের মধ্যে স্বপ্ন তৈরি করতে হবে, স্কিল ডেভেলপ করতে হবে, আত্মবিশ্বাসের বুনিয়াদ গড়ে দিতে হবে।
টাকা থাকলেই তাকে দলীয় নমিনেশন দেওয়া যাবে না বরং এলাকাভিত্তিক জনপ্রিয়তা যাচাই করতে হবে একই সাথে মানুষটি সৎ কি না সেটাও যাচাই করতে হবে। এলাকার মানুষ বলবে অমুককে প্রার্থী হিসেবে চাই। এভাবে নানা এলাকার মানুষ বলবে। সেইসব প্রার্থীদের মধ্যে আবার কে সেরা তা যাচাই করে তারপর নেতা নির্বাচন করতে হবে। সারা দেশের মানুষ চায় কি না সেটা যাচাই না করে কোনো আইন বা বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। প্রথমে জনসাধারণের সামনে বিষয়টি উত্থাপন করতে হবে যে আমরা অমুক কাজটি করতে চাই। ধরে নিচ্ছি একটা বিশ্ববিদ্যালয় বা একটা টিভি চ্যানেল চালু করতে চাই। তো আগেই ঘোষণা দিয়ে জনমত যাচাই করে পক্ষে গেলে তা অনুমোদন পাবে আর বিপক্ষে গেলে তা বাতিল হবে।
সর্বস্তরের শিক্ষকদের বেতন ও সম্মান বাড়াতে হবে। বিশেষ করে যারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। আর সবচেয়ে মেধাবীদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক লেভেলে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। সেটা বিসিএস ক্যাডারের মাধ্যমেই হোক বা অন্য কোনো উপায়ে।
জিনিসপত্রের দাম বহির্বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে। আগে কেনা পণ্যের মজুদ দাম বাড়ার সাথে বাড়তি দামে বিক্রির প্রবণতা ঠেকাতে হবে। ইলিশ মাছতো চাষ করতে হয় না বা ইলিশ উৎপাদনে কোনো খরচও নেই। তাহলে ইলিশের এতো দাম কেন? কারণ যে জেলে মাছ ধরে জালও তার না নৌকাও তার না। ফলে সিন্ডিকেট বা মহাজনি কারবারের মাধ্যমে এর দাম বাড়ে। সরকারি ভাবে জেলেদের নৌকা ও জালের ব্যবস্থা করে দিতে হবে যেন ইলিশের দাম আগের মত হয়। সবাই মাছে ভাতে বাঙ্গালী এটা আবার বিশ্বাস করতে পারে।
দেশের নদীগুলো খনন করতে হবে। নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে। নৌ যোগাযোগ উন্নত করতে হবে।
পোস্ট অফিসগুলোকে সচল করতে হবে। দেশের আনাচে কানাচে পোস্ট অফিস থাকায় মানুষের ঘরে ঘরেসেবা পৌছে দেওয়া সম্ভব। সেটা কেন হচ্ছে না? কুরিয়ার সার্ভিসগুলো হাজার হাজার কোটি টাকা আয় করছে যা পোস্ট অফিসের মাধ্যমে আরও সুন্দর সেবার মাধ্যমে সরকার নিজের ঘরে তুলতে পারতো। কুরিয়ারে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ডেলিভারির সুযোগ না থাকলেও পোস্ট অফিসে সেটা ছিলো।
মোবাইল কোম্পানীগুলোর মাধ্যমে দেশের টাকা বিদেশী কোম্পানী নিয়ে যাচ্ছে। অথচ টেলিটক বলে যে দেশী প্রতিষ্ঠান আছে সে অর্থবর মত বসে আছে। তাদের সেবার মান জঘন্য। এটা বাড়িয়ে গ্রাহকবান্ধব করতে হবে যেন দেশের টাকা দেশেই থাকে।
তেলবাজ,চাটুকারদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স হতে হবে। সীমান্তে হত্যাকান্ড বন্ধ করতে হবে। সব রকম চাঁদাবাজি বন্ধ করতে হবে। আরও কত শত চাওয়া আছে, দাবী আছে। প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু চাওয়া আছে। আমরা সেই সব চাওয়াগুলো একত্র করে কমনগুলো বাছাই করতে পারি। এরকম ১০০ টি বিষয়কে যদি আমরা বেছে নিয়ে সেগুলো সফল করতে চেষ্টা করি তবে সেই বাংলাদেশ হবে সত্যিকারের সোনার বাংলাদেশ।
গত কালকের সড়ক দূর্ঘটনার ঘটনা জানি না কত জনের চোখে পড়েছে। আমি ঘটনাটি জেনে মর্মাহত হয়েছি। এই দূর্ঘটনা ঘটেছে ফরিদপুরে। ইউনিক পরিবহনের একটি বাস ঢাকা থেকে মাগুরার দিকে আসছিলো আর ফরিদপুর থেকে একটি পিকাপ ঢাকার দিকে যাচ্ছিল। মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৪ জন মারা গেছে। যার মধ্যে একই পরিবারের ৫ জন সদস্য ছিলো। এই পাঁচজন সদস্যের একমাত্র উপার্জনকারী মানুষটি ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানে লিফটম্যান হিসেবে চাকরি করতেন। স্বল্প আয়ের মানুষ। ঈদ শেষে পরিবার সহ পিকাপে করে ঢাকায় ফিরছিলেন। সাথে ছিলো তার স্ত্রী,পুত্র,কন্যা এবং মা। ৫জন মানুষ নিয়ে বাসে যাওয়ার মত আর্থিক সংগতি তার ছিলো না বলেই তাকে বাধ্য হয়ে পিকাপে উঠতে হয়েছিল। নিম্ন আয়ের মানুষদের আসলে এ ছাড়া করার কিছু থাকেও না। কিন্তু সে কি আর জানতো আর কোনো দিন লিফটম্যান হিসেবে কাজ করা হবে না। আর কখনো ঢাকায় ফেরা হবে না। কোটি কোটি বছর পৃথিবী থাকবে। প্রতি বছর ঈদ আসবে। অনেকেই প্রিয়জনের টানে গ্রামে ছুটে যাবে। আনন্দের সাথে ঈদ করবে। আবার ঈদ শেষে কর্মস্থলে ফিরে যাবে। কিন্তু তার কখনো যাওয়া হবে না। তাকে যে পরিবার সহ পৃথিবী থেকেই ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়েছে।
এই দূর্ঘটনার জন্য প্রধানত দায়ী কে? ওই বাস বা ওই পিকাপ যে কোনোটিই হতে পারে। কিন্তু আমরা যদি তথ্যউপাত্ত বিশ্লেষণ করি তাহলে বাসকেই দায়ী করতে হবে। নিয়ম অনুযায়ী ২০ বছরের পুরোনো কোনো বাস রাস্তায় চলাচল করতে পারবে না। আর ২৫ বছরের পুরো কোনো ট্রাক বা লরি রাস্তায় চলাচল করতে পারবে না। এই যে ইউনিক পরিবহনের যে বাসটি মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত হলো সেই বাসটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে অনেক আগেই। ২০০২ সালে নিবন্ধিত বাসটি ২০২২ সালেই বিশ বছর পূর্ণ করেছে। তারপরও বহালতবিয়তে সেটা বুক উচু করে চলছে। সরকার কোনো ভাবেই বাস মালিকদের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি।
শকিং নিউজ হলো দূর্ঘটনা কবলিত ইউনিক পরিবহনের এই বাসটিই যে মেয়াদোত্তীর্ণ তা কিন্তু নয় বরং বিআরটিএর তথ্য মতে ঢাকায় চলাচলকারী এবং ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা ২০ বছরের বেশী বয়সী অর্থাৎ মেয়াদোত্তীর্ণ বাস সংখ্যা ৩৫ হাজার ৭৮২ টি। এবং ট্রাক ও লরি সংখ্যা ৩৭ হাজার ২৭৫ টি যা ২৫ বছরের বেশী বয়সী। আমার ধারণা এই সংখ্যা আরও বেশি। আশ্চর্যজনক বিষয় হলো উত্তরা ইউনিক পরিবহনের ওই বাস সহ দেশে ৬ লাখ নিবন্ধিত গাড়ি বাৎসরিক যে ফিটনেস টেস্ট করা বাধ্যতামূলক তা করে না। ফলশ্রুতিতে খোদ বিআরটিএর তথ্যই বলছে প্রতি বছর আগের বছরের তুলনায় দূর্ঘটনার হার বেড়েই চলেছে। বছর শুরু হতে পারেনি এর মাঝে হতাহতের যে ঘটনা ঘটেছে তা আশেপাশে অনেক দেশের বিশ বছরের সংখ্যার চেয়েও বেশি। জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের শেষ দিন পযর্ন্ত দেশে ১৪৭৭ জন মানুষ সড়ক দূর্ঘটনায় মারা গিয়েছে, ১৯২০ জন হতাহত হয়েছে। আর এই সংখ্যক হতাহত ও মৃত্যুর ঘটনার পিছনে ১৬৩০ টি দূর্ঘটনা দায়ী।
আমরা যদি আগের বছরের দিকে ফিরে তাকাই তবে দেখতে পাই ২০২৩ সালে ঠিক একই সময়ে অর্থাৎ প্রথম তিন মাসে মোট ১ হাজার ১৭টি দূর্ঘটনা ঘটেছিল। যার মাধ্যমে ১ হাজার ৫১ জন মৃত্যুবরণ করেছিল এবং ১৪৪০ জন আহত হয়েছিল।
মূলত গাড়ি যত পুরোনো হয় তা দেখভাল করতে ততো বেশি খরচ হয়। ফলে দেখা যায় গাড়ির মালিকেরা পুরোনো গাড়ির প্রতি সেভাবে নজর দেয় না। কারণ পুরোনো গাড়ি ঠিকঠাক মেইনটেন করতে গেলে মালিকের খরচ বাড়ে। আয়ের সাথে ব্যায়ের পার্থক্য বেড়ে গিয়ে তার লাভের পরিমান কমে যায়। এই কারণে তারা এটিকে এড়িয়ে চলে। ব্যক্তিগত সার্থের বলি হয় তখন সাধারণ মানুষ। দূর্ঘটনায় জীবন চলে যায়। সরকার কিছুই করতে পারছে না কারণ পরিবহন এসোসিয়েশন থেকে তাদের উপর চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে। সরকার যদি কারো মুখাপেক্ষি না হতো, নিজের অবস্থানে অটুট থাকতে পারতো তাহলে পরিবাহন মালিক সমিতির যে কোনো চাপ তারা উপেক্ষা করে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে পারতো। আর সেটা করতে পারলে সড়ক দূর্ঘটনার পরিমান কমিয়ে প্রায় শুণ্যের কোটায় নামিয়ে আনা সম্ভব হতো। এমনকি সরকারের এ বিষয়ে কোনো রোড ম্যাপ আছে বলেও আমার মনে হয় না। এই যে হাজার হাজার মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি রিপ্লেস করে নতুন গাড়ি নামানো দরকার এ নিয়ে তারা কখনো দৃঢ় কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেনি।
যখন সরকারদলীয় কোনো নেতা বা আমলা বা সংশ্লিষ্ট কেউ সরকারের কোনো কাজে হস্তক্ষেপ করে তখন সেই কাজটি করে ওঠা খুবই কঠিন। পরিবাহন খাত কারা নিয়ন্ত্রণ করে সেটা দেখলেই বিষয়টি আরও পরিস্কার হয়ে যাবে। এই যে প্রতিনিয়ত দূর্ঘটনায় অগণিত প্রাণ যাচ্ছে তার দায়ভার সরকার এড়িয়ে যেতে পারে না। মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ি এবং প্রশিক্ষিত চালকের অভাব যেমন আছে তেমনি নিয়মিত মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা না থাকায় গাড়িগুলো বহালতবিয়তে চলাফেরা করছে।মানুষ মরছে এই সব দায়িত্বজ্ঞানহীন কাজ করার জন্য। আমার বেশ মনে আছে সর্বশেষ ২০১০ সালে বিআরটিএ ২০ বছর বা তার চেয়ে পুরোনো বাস এবং ২৫ বছর বা তার চেয়ে পুরোনো ট্রাক ও লরি ব্যান করেছিল। গত ৩১ মার্চ মন্ত্রীপর্যায়ের মিটিংয়ে যখন বিআরটিএর কাছে পুরোনো গাড়ির তথ্য চাওয়া হয়েছিল তখন তারা যে তথ্য দিয়েছিল তা থেকে আমরা দেখতে পাই মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়ির সংখ্যা ৭৩ হাজার ৫৭ টি! শুধু তাই নয় তাদের তথ্য বলছে প্রায় ৪ লাখ ৭৯ হাজার গাড়ি ২০১৯ সালের পর আর কোনো ফিটনেস সার্টিফিকেট নবায়ন করেনি! এখানেই যদি শেষ হতো তাও কথা ছিলো। কিন্তু ২০২২ সালের জানুয়ারিতে এই সংখ্যাটি ৫ লাখ ৮ হাজারে গিয়ে ঠেকেছিল এবং গত সোমবার পযর্ন্ত যার সংখ্যা ৬ লাখ ১৭ হাজার!
আর কত প্রাণ সড়কে লেপটে গেলে আমাদের হুশ ফিরবে? আমরা কার সার্থ রক্ষা করে চলেছি এই সব মেয়াদোত্তীর্ণ গাড়িকে বহালতবিয়তে রাস্তায় চলতে দিয়ে?
আমি ছাত্র রাজনীতির পক্ষে নাকি বিপক্ষে? এই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দিতে গেলে আমি হয়তো বলবো আমি ছাত্র রাজনীতির পক্ষে। তবে মনে রাখতে হবে এই রাজনীতি কিন্তু ছাত্রলীগ,ছাত্রদল,ছাত্রশিবির,ছাত্র মৈত্রী সহ রাজনৈতিক প্রপাগান্ডায় গড়ে ওঠা ছাত্র রাজনীতি নয়। ছাত্ররাজনীতির পক্ষে শুনেই অনেকে আমার উপর রাগ করবেন এবং আমাকে মনে মনে বা সদরে গালমন্দও করতে পারেন। যেখানে অসংখ্য মানুষ ছাত্র রাজনীতির বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে সেখানে আমি কেন এমন কথা বলছি? বুয়েটের সাম্প্রতিক ঘটনার প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে। বুয়েটের যে সব শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতি বন্ধে সব রকম ক্লাস পরীক্ষা বর্জন করেছে এবং নিজ নিজ ফেসবুক টাইমলাইনে স্ট্যাটাস দিয়েছে ”আমি অমুক, বুয়েটে লেভেল-৩,টার্ম-১ এর একজন শিক্ষার্থী, আমি বুয়েট ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে কোনো প্রকার সাংগঠনিক ছাত্র রাজনীতি পুনরায় প্রতিষ্ঠা হোক চাই না”। তাদের এই মতামতকে আমি সম্মান করি এবং আমি তাদের দাবীর সাথে একমত পোষণ করছি।
আমি তাদের সাথে একমত পোষণ করছি এ কারণে যে আমি দেখেছি বুয়েটে রাজনীতির কারণে বছরের পর বছর ধরে অসংখ্য ন্যাক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। শুধু আবরার ফাহাদ নয় আরও প্রাণ ঝরেছে। মনে পড়ে সাবেকুন্নাহার সনির কথা? সেও কিন্তু বুয়েটের তথাকথিত ছাত্র রাজনীতির বলি হয়েছিল।২০০২ সালের ৮ জুন বুয়েটের কেমিকৌশল বিভাগের (৯৯ ব্যাচ) লেভেল ২, টার্ম ২–এর মেধাবী ছাত্রী সাবেকুন নাহার সনি টেন্ডারবাজিকে কেন্দ্র করে ছাত্রদলের দুই গ্রুপের গোলাগুলির মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। শোকে, বেদনায় স্তব্ধ হয়ে যায় সমগ্র বাংলাদেশ। এ দেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটিতে এমন কলঙ্কজনক ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি।২০০২ সালের ৮ জুন থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত বুয়েট ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়বিচারের দাবিতে শান্তিপূর্ণ লড়াইয়ের এক ময়দান। সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা হয়ে উঠেছিল পরস্পরের অতি আপনজন, সহযোদ্ধা। এই আন্দোলন আমাদের শিখিয়েছিল সংগ্রামের পথেই প্রকৃত বন্ধুত্ব রচিত হয়। আবার এই আন্দোলনে দেখেছিলাম, একটা নৈতিক আন্দোলন দমনে রাষ্ট্র কত নির্মম হতে পারে! এ প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের পক্ষে সেই দিনগুলো কল্পনা করাও কঠিন।
মনে পড়ে, ২০০২ সালের মিড-টার্মের পরে প্রথম দিনটি ছিল ৮ জুন। চলছে বিশ্বকাপের খেলা। খেলা দেখার জন্য স্বেচ্ছায় ছুটি নিয়েছিল শিক্ষার্থীরা। বেলা পৌনে একটার দিকে বুয়েটের বিশাল অঙ্কের টেন্ডারকে কেন্দ্র করে মোকাম্মেল হায়াত খান মুকির নেতৃত্বে ছাত্রদল বুয়েটের একটা সন্ত্রাসী গ্রুপের সঙ্গে গোলাগুলি শুরু হয় ঢাবির এসএম হলের আরেক সন্ত্রাসী টগর গ্রুপের সঙ্গে। অবিরাম গুলিবর্ষণের মধ্যে পড়ে আহসান উল্লাহ হলের সামনে সাবেকুন্নাহার সনি গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।
ওই দিন রাতেও খুনিরা অবস্থান করছিল বুয়েটের রশীদ হলে। রাতে হাজার হাজার শিক্ষার্থী মিছিল করে গিয়ে রশীদ হল ঘেরাও করে ফেলে। প্রশাসনকে জানানো হয় খুনিদের গ্রেপ্তারের জন্য। বেশ কিছুক্ষণ পরে পুলিশসহ প্রশাসন আসে রশীদ হলে। আশ্বস্ত হয় শিক্ষার্থীরা। কিন্তু সেখানে মঞ্চস্থ হয় আরেক নাটকের। পুলিশ এসে আন্দোলনকারীদের লাঠিপেটা করে ছত্রভঙ্গ করে খুনিদের পালিয়ে যেতে সহায়তা করে। আন্দোলন দমনের কৌশল হিসেবে পরদিন ৯ জুন বুয়েট অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়। এই বন্ধের মধ্যেও সারা দেশে আন্দোলন অব্যাহত থাকে।
বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে নতুন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। খুনিদের বিষয়ে প্রশাসন নমনীয় থাকলেও আন্দোলনকারীদের বিষয়ে বেশ সোচ্চার হয়ে ওঠে তারা। বোনের হত্যার বিচারের দাবিতে আন্দোলন করার অপরাধে (!) বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দেওয়া হয় আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের। আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়ায় স্থাপত্য বিভাগের বিজয় শংকর তালুকদার বিশু, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টের সহসভাপতি সুব্রত সরকারকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়। এ ছাড়া অনেক শিক্ষার্থীকে হল থেকে বহিষ্কারসহ বিভিন্ন ধরনের শাস্তি দেওয়া হয়। প্রশাসন ভেবেছিল, এভাবে শাস্তি দিয়ে ছাত্রদের মধ্যে ভীতি তৈরি করতে হবে, যেন পরে আর আন্দোলন সংগঠিত না হয়।
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো
এই রাজনীতি বুয়েটের ছাত্র ছাত্রীদের জীবনে দুর্বিষহ যন্ত্রণা ছাড়া আর কিছু দিতে পারেনি। কেড়ে নিয়েছে জীবন, কেড়ে নিয়েছে সুন্দর সময়,উজ্জল ভবিষ্যত। তাহলে তারা কেন সেই রাজনীতিকে সমর্থন করবে? আর আমিইবা কেন এই নষ্ট রাজনীতিকে সমর্থন করবো। যদি এই রাজনীতি তাদের জীবনে ভালো কিছু বয়ে আনতে পারতো তাহলে আমি অবশ্যই তা সমর্থন করতাম।
আমি যেহেতু তাদের দাবীর সাথে একমত পোষণ করছি তাহলে দেখা যাচ্ছে আমি আমার নিজের কথাতেই আটকে যাচ্ছি। কারণ শুরুতে আমি বলেছি আমি ছাত্র রাজনীতির পক্ষে! তাহলে বিষয়টা কেমন দাঁড়াচ্ছে? আমি ছাত্র রাজনীতি চাই আবার চাই না এটাতো বুমেরাং হয়ে গেলো। নিজের স্টেটমেন্টই নিজের বিপক্ষে চলে গেলো। বিষয়টা একটু অন্যরকম। এখন আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে যে ছাত্ররাজনীতি আছে আমি পুরোপুরি তার বিপক্ষে। ছাত্রলীগ,ছাত্রদল,ছাত্রশিবির,ছাত্রমৈত্রী সহ নানা নামে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে যে সবা ছাত্র (অছাত্র বলাই ভালো) সংগঠন তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এর পুরোপুরি বিরেধী আমি। দলীয় সার্থ ছাড়া এই সব ছাত্র সংগঠন কিছুই করে না। আর এটা করতে গিয়ে তারা দমন,নিপীড়ন,হল দখল থেকে শুরু করে এমন কোনো কাজ নেই যা তারা করে না। যখন যে দল ক্ষমতায় আসে তখন সেই দলের ছাত্র সংগঠন রাজত্ব করে। অন্য ছাত্রসংগঠন তখন কোণঠাসা হয়ে থাকে। আর এর মাঝে পড়ে সাধারণ ছাত্র ছাত্রীরা বিপাকে পড়ে। তারা এসেছিল পড়াশোনা করতে,হতে চেয়েছিল দেশের জন্য অমূল্য সম্পদ। কিন্তু ছাত্র রাজনীতির যাতাকলে পড়ে তাদের সব স্বপ্ন বিনষ্ট হয়ে যায়। সুতরাং এই সব অপরাজনীতি বন্ধ হোক এটা আমি চাই।
তাহলে আমি যে বললাম ছাত্র রাজনীতি চাই সেটা কিভাবে? আসলে আমি চাই বিশ্ববিদ্যালয়ের সব ছাত্র থাকবে রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ার বাইরে শুধুমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীক। তারা কাজ করবে ছাত্রদের কল্যাণে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কল্যাণে। বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোথাও কোনো সমস্যা থাকলে তারা সেটা সম্মিলিত ভাবে মোকাবেলা করবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশের উন্নয়ন,শিক্ষার মানোন্নয়ন,খাবারের মানোন্নয়ন থেকে শুরু করে যাবতীয় বিষয়ে তারা থাকবে ঐক্যবদ্ধ। তারা কারো তাবেদারী করবে না। বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীর দাবী দাওয়া তারা সম্মিলিত ভাবে আদায় করে নিবে। এর বাইরে তারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানা বিষয়ে কল্যাণকর হয় এমন বিষয়ে সোচ্চার থাকবে। অন্যায় দেখলে সম্মিলিত ভাবে প্রতিবাদ করবে। যে কোনো অনিয়ম তারা রুখে দিতে পারে সম্মিলিত প্রচেষ্টায়। তার বদলে এখন যে ছাত্র রাজনীতি চলছে তা কেবল দলের প্রভাব বিস্তার ছাড়া তাদের আর কোনো লক্ষ্য নেই। তারা ছাত্রদের কল্যাণ হয় এমন কিছুই করে না। বরং উল্টো হলের খাবার থেকে শুরু করে সিট অব্দি খেয়ে ফেলে। এই সব দলীয় অপছাত্র রাজনীতির কবলে পড়ে কত মেধাবী প্রাণ দিয়েছে তা কারো অজানা নয়। সুতরাং কোনো ক্যাম্পাসেই এই ধরনের অপরাজনীতি থাকতে পারে না। এটা সমর্থনও করতে পারি না।
হ্যা এটা আমি অস্বীকার করবো না যে আমাদের ভাষা আন্দোলন,মুক্তিযুদ্ধ সহ অন্যান্য বড় বড় আন্দোলনে এদেশের ছাত্রদের ভূমিকা ছিলো অনেক বেশি। কিন্তু সেই সময়ের ছাত্র রাজনীতির সাথে এখনকার ছাত্র রাজনীতি কোনো ভাবেই মেলানোর সুযোগ নেই। ছাত্র নেতাতো তার হওয়ার কথা যে ছাত্র হিসেবে সেরা, মানুষ হিসেবে সেরা। এই যে সাত বার ফেল করা একজন যখন ছাত্র নেতা হয়,ছাত্রদের অভিভাবক হয় তখন এর চেয়ে হাস্যকর আর কিছু থাকতে পারে না। যে নিজে সাত বার ফেল করে আদু ভাই হয়ে ছাত্রনেতা হয়ে ছড়ি ঘোরায় সে কোন মুখে বলে বুয়েটে ছাত্র রাজনীতি নেই বলে শিক্ষার পরিবেশ নেই! এর চেয়ে হাস্যকর কোনো কথা আমার জানা নেই। সে যদি নিজে সময় মত পাশ করতো, বিভাগের সবচেয়ে সেরা ছাত্র হতো, তবে তার কথা কিছুটা হলেও মানা যেত যে ছাত্র রাজনীতি তাকে সেরা ছাত্র বানিয়ে দিয়েছে। কিন্তু যে নিজেই ফেল করতে করতে রবার্ট ব্রুসকেও হার মানিয়ে দিয়েছে সে কোন মুখে এরকম কথা বলে? তারতো লজ্জা নেই। নির্লজ্জ বেহায়া না হলে এমন কথা কেউ বলতে পারে না। আমি আমার এই জীবনে ছাত্র রাজনীতি করে ভালো ফলাফল করেছে,দেশের কল্যাণে কাজ করেছে এমন কাউকে দেখিনি। তাহলে আমি সেই রাজনীতি কিভাবে সাপোর্ট করতে পারি যা ছাত্রদের কল্যাণের বদলে অকল্যাণ নিয়ে আসে।
আমি বরং দেখেছি কৃষকের ঘরে জন্ম নিয়ে ছাত্ররাজনীতিতে নাম লিখিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছে। এই সব লুটেরাদের কোনো ক্যাম্পাসেই ঢুকতে দেওয়া উচিত নয়। সে কারণে আমি দেশের সব ক্যাম্পাসে দলীয় লেজুড়ভিত্তিক ছাত্র রাজনীতি বন্ধ হোক এটা চাই। বিশ্ববিদ্যাল পড়াশোনার জায়গা। এখানে রাজনীতি করতে কেউ আসে না। যাদের শখ রাজনীতি করা তাদের জন্য আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় করা হোক যেখানে তারা সারাদিন শুধু রাজনীতি করবে। সেই ক্যাম্পাসে তারা মিছিল মিটিং যা খুশি করুক। সেখানে তারা শিখুক কিভাবে হল দখল করতে হয়, কিভাবে টেন্ডারবাজি করতে হয়। আমাদের সব বিশ্ববিদ্যালয়ে আমরা পড়তে চাই। সেখানে অপড়ুয়াদের কোনো জায়গা নেই। বুয়েট থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস হোক এই সব তথাকথিত লেজুড়ভিত্তিক ছাত্র রাজনীতি মুক্ত। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হয়ে উঠুক শুধু মাত্র পড়াশোনা,গবেষণা ও জ্ঞান বিজ্ঞানের আবাসভূমি।
কিশোরী একটি মেয়ে। নাম মিয়া মনজিডেলিস। এখন যার বয়স মাত্র ১২ বছর। স্কুলের বন্ধুদের সাথে খেলা করে,টিভি দেখে আর রেস্টুরেন্টে গিয়ে মজার মজার খাবার খেয়ে দিন পার করা আর দশজন কিশোর কিশোরীর মত নয় সে। ফেসবুক,ইউটিউব,টিকটক বা ইন্সটাগ্রামে ছবি আর ভিডিও পোস্ট করা মিলিয়ন ভিউ পাওয়া তথাকথিত সেলিব্রেটিও সে নয়। তবুও সে সেলিব্রেটি। তবুও সে বিশ্বব্যাপী আলোচিত এবং প্রশংসিত! সে সবার থেকে বেশ আলাদা। কারণ এই বয়সেই সে প্রতিষ্ঠিত উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী। মনজিডেলিস মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই পাওয়ারপনি আবিস্কার করেছিল। এখন আমাদের জানা দরকার এই পাওয়ার পনি জিনিসটা আসলে কী? পনি শব্দের অর্থ টাট্টু আর টাট্টু কথাটা বলার সাথে সাথে যে বিষয়টা মাথায় আসে সেটা হলো ঘোড়া। যে ঘোড়া খুবই ছোট তাকে আমরা টাট্টুঘোড়া বলি। তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে মনজিডেলিস কিভাবে টাট্টুঘোড়া আবিস্কার করলো? এখানে একটি ছোট্ট তথ্য দিতে হচ্ছে। পনি শব্দের আগে সে পাওয়ার শব্দটি ব্যবহার করেছে। তার মানে দাঁড়াচ্ছে পাওয়ারপনি হলো ব্যাটারি চালিত টাট্টুঘোড়া! হ্যাঁ ঠিকই পড়েছেন। মিয়া মনজিডেলিস যেটা আবিস্কার করেছে সেটি হলো ব্যাটারি চালিত ঘোড়া। আর এই ঘোড়ায় চড়লে সত্যিকার ঘোড়ায় চড়ার মতই অনুভূত হয়। মিয়া মনজিডেলিস একই সাথে নিউইয়র্কে অবস্থিত “দ্য ফ্যামিলি এন্ড চিলড্রেন এসোসিয়েশন” এর মেম্বার। এটি একটি দাতব্য সংস্থা, যারা অসহায় শিশু কিশোর ও বয়স্কদের সহযোগিতা করে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো মিয়া গত বছর এই সংস্থাকে ৫ হাজার ডলার সাহায্য দিয়েছে এবং বাংলাদেশী টাকায় যার পরিমান সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা! দ্য হেরাল্ড ট্রিবিউনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সে বলেছিলো ” আমি সব সময় অসহায় শিশু ও তাদের পরিবারকে সাহায্য করতে ভালোবাসি”। আর আশ্চর্য বিষয় হলো তার এই সাহায্য দেওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়েছিল যখন তার বয়স ছিলো মাত্র ৩ বছর!
মনজিডেলিস ছোটবেলা থেকেই ঘোড়ায় চড়তে পছন্দ করতো। তার ছিলো ঘোড়ার প্রতি দূরন্ত ভালোবাসা। কিন্তু মন চাইলেইতো আর ঘোড়ায় চড়া যায় না। বিশেষ করে ছোটরা ঘোড়ায় চড়তে গেলে কতরকম বিপদ হতে পারে। আর সে জন্য ছোটরা যখন ঘোড়ায় চড়ে তখন বড় কেউ না কেউ সাথে থাকতে হয়। কিন্তু দেখা গেলো বাবা অফিসে, মা রান্নার কাজে কিংবা বাজারে গিয়েছে এমন সময় ঘোড়ায় চড়তে ইচ্ছে করছে। তখন উপায় কি? একা একাতো ঘোড়ায় চড়তে পারবে না। ঘোড়ার পিঠেইতো উঠতে পারবে না। সুতরাং এমন একটা ঘোড়া দরকার যেটা হবে তার মত ছোটদের জন্য। যার পিঠে সে একা একাই উঠতে পারবে এবং যখন খুশি সে সেই ঘোড়ায় চড়তে পারবে। এমনকি মাঝ রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে তার যদি ইচ্ছে করে একটু ঘোড়ায় চড়বো তো কারো সাহায্য ছাড়াই সে একা একা সেই ঘোড়ায় চড়তে পারবে। কিন্তু এমন আজব ঘোড়া কি দুনিয়ার কোথাও একটাও আছে? ধরে নিলাম একটা আছে আর সেই ঘোড়াটা কোনো ভাবে মনজিডেলিসের জন্য সংগ্রহ করা হলো। সেটা দেখে যদি তার বন্ধুরা বলে তাদেরও অমন একটি ঘোড়া চাই। তখন কোথায় পাবে সেই ঘোড়া? বাবা মা তখন কষ্ট পাবে। মনজিডেলিসের উপর রাগ করবে। সুতরাং সে সিদ্ধান্ত নিলো এমন একটি ঘোড়া সে নিজেই তৈরি করবে! মাত্র পাচ বছর বয়সে সে এমন কিছু ভাবতে পারে কেউ কি কল্পনা করতে পারে? রুপকথার গল্পে হলে না হয় মানা যেত। বাস্তবে এমন ঘোড়া! কিন্তু সে যেহেতু সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাই সে এমন একটি ঘোড়া তৈরি করেই ছাড়বে এবং শুধু একটি নয় পরবর্তীতে দুনিয়ার সব শিশু কিশোর কিশোরীদের জন্য এমন টাট্টুঘোড়া তৈরি করবে বলে সে সিদ্ধান্ত নিলো। নাম দিলো পাওয়ারপনি।
মনজিডেলিস আবিস্কৃত সেই পাওয়ারপনিতে আইওএস সাপোর্ট করে! আছে একটি জুমি ইঞ্জিন! আর এটা আবিস্কারের পর তার নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো। শিশু কিশোর কিশোরীদের মধ্যে তার আবিস্কৃত পাওয়ারপনি দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠলো। সে নিশ্চয়তা দিয়েছে এই টাট্টুঘোড়ায় যারা চড়বে তারা প্রত্যেকেই অনেক আনন্দ পাবে।
নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ডে থাকে মনজিডেলিস। সে পাওয়ারপনির আবিস্কারক এবং প্রতিষ্ঠাতা। বর্তমানে শোর রোড এলিমেন্ট্রি স্কুলে সিক্সথ গ্রেডে পড়াশোনা করছে। ছোটবেলা থেকেই ঘোড়া পছন্দ করতো এবং স্বপ্ন দেখতো একদিন সে একটি ঘোড়ার মালিক হবে। কিন্তু সে যেখানে থাকতো সেখানে ঘোড়া রাখার মত জায়গা ছিলো না। সুতরাং বাবা মা তাকে ঘোড়া কিনে দিতে পারেনি। কিন্তু সে কখনো হাল ছাড়েনি। সে তার স্বপ্ন পূরণে সব সময় ছিল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এক ক্রিসমাসে সে একটি খেলনা ঘোড়া এবং একটি হভারবোর্ড উপহার পেয়েছিল। সে ভাবলো আচ্ছা যদি ঘোড়াটাকে হভারবোর্ডের উপর বসিয়ে দেই তাহলে কেমন হয়? তাহলেইতো একই সাথে দুটোতেই চড়া হবে আর তার ইচ্ছেও পূরণ হবে। আর সেই সময়েই তার মাথায় আইডিয়া আসলো ব্যাটারি চালিত ঘোড়া তৈরি করবে যেন যখন খুশি, যেখানে খুশি সে চড়তে পারবে। আর এ কাজে তাকে তার বাবা খুবই সহযোগিতা করেছে। যখন সে তার আইডিয়া বাবার সাথে শেয়ার করলো বাবা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলো।তারপর তিনি তাকে সবরকম সহযোগিতা করলেন। একসময় বাবা কঠোর পরিশ্রম করতেন। কিন্তু মনজিডেলিসের আইডিয়াটা শেয়ার করার পর দুজনে মিলে যখন সত্যি সত্যিই পাওয়ারপনি তৈরি করে ট্রায়াল দিয়ে সফল হলেন এবং বাজারে বিক্রি করে দারুণ সাড়া পেলেন তখন থেকে তাদের ভাগ্যই বদলে গেলো। মনজিডেলিস তাই নিজেকে খুবই সৌভাগ্যবতী মেয়ে মনে করে।
মনজিডেলিস নিজে যেহেতু ছোট তাই সে ছোটদের বিষয়টা মাথায় রেখেই তার ব্রান্ডের একটি সুন্দর নাম খুঁজতে শুরু করলো। অনেক নামের ভীড়ে শেষে পাওয়ারপনি নামটা তার বেশি পছন্দ হলো।তার বন্ধুরা তার এই আবিস্কারে ভীষণ এক্সাইটেড ছিলো। যখনই সে নতুন একটি পাওয়ারপনি তৈরি করে তার ট্রায়াল দিয়েছে তখনই বন্ধুরা উৎসাহ নিয়ে সেটা দেখেছে। উপভোগ করেছে। একবার এক সাক্ষাৎকারে মনজিডেলিসকে প্রশ্ন করা হয়েছিল তুমি এই পাওয়ারপনি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন জিনিসটি শিখেছ? সে তখন বলেছিল ”ছোট বলে কাউকে অবজ্ঞা করা যাবে না। এবং ছোটদের কল্পনায় যা আসে সেটিকেও উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। সেই আইডিয়াও বাস্তব জীবনে নিয়ে আসা সম্ভব যা আমি করে দেখিয়েছি। বিশ্বাস,আস্থা,সহযোগিতা আর গ্রুপওয়ার্ক করতে পারলে অনেক কিছুই করা সম্ভব যা প্রাথমিক ভাবে অসম্ভব মনে হতে পারে।”
তার প্রতিষ্ঠানে রয়েছে স্পেশাল ডিজাইনার,ইঞ্জিনিয়ার,ইলেক্ট্রিশিয়ান। আর প্রতিটি কাজই সে নিজে তদারকি করে থাকে। ডিজাইনার যখন ডিজাইন করে তখন সে নিজে সেটা দেখে এবং জাস্টিফাই করে যে সেই ডিজাইনটি তার গ্রাহকশ্রেণীর পছন্দ হবে কি না। যদি কিছু মডিফাই করার দরকার হয় তাহলে সে সেভাবেই ইন্সট্রাকশন দেয়। মনজিডেলিসের মতে নিজের মত করে একটি ব্যবসা দাড় করানো খুবই কঠিন বিষয়। তবে যদি নিজের আইডিয়ার উপর নিজের প্রবল বিশ্বাস থাকে,যথাযথ পরিকল্পনা থাকে আর লেগে থাকার মত মানসিকতা থাকে তাহলে যে কেউ সেই প্রজেক্ট সফল করার পথ নিজেই খুঁজে নিতে পারবে। আর এই পথপরিক্রমায় যতই বাঁধা আসুকনা কেন, সেগুলো অনায়াসেই পার করা সম্ভব হবে।
ক্রিসমাসে পাওয়া দুটো উপহার আর নিজের একটি স্বপ্ন থেকে কিশোরী মনজিডেলিস সফল উদ্যোক্তা হিসেবে খ্যাতি পেয়েছে। সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করে উদ্যোক্তা হবো বা কিছু করবো এমন ধারণা নিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই। মিয়া মনজিডেলিসের উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প থেকে আমরা এই শিক্ষাই পেতে পারি যে শুরু করার কোনো বয়স সীমা থাকে না আর শুরু করার পর লেগে থাকলে একদিন না একদিন সফলতা আসবেই। হাল ছাড়া যাবে না।
বইয়ের মত অকৃত্রিম বন্ধু আর হয় না। বই পড়ায় যে আনন্দ তার একটি ধারণা পাওয়া যায় বিশ্ববিখ্যাত শিশুতোষ লেখক রোয়াল্ড ডালের লেখা “মাতিলদা” বই থেকে। যেখানে মাতিলদা নামের ছোট্ট মেয়েটি বই পড়ায় এতো বেশি আগ্রহী যে পড়তে শেখার পর পরই সে লাইব্রেরীতে গিয়ে অসংখ্য বই পড়ে ফেলে। হলিউডে এটা নিয়ে দুটো সিনেমাও হয়েছে। বই পড়ে আমরা হাসি,কাদি,আনন্দপাই আবার অনেক জ্ঞানার্জনও করি। তবে অনেকেই বই পড়তে খুব একটা পছন্দ করে না। কিন্তু পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছে যারা বইপড়তে খুবই ভালোবাসে। আর আমরা তাদের বলি বইয়ের পোকা। ছোটবেলা থেকে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে জীবনে নানা সুবিধা পাওয়া যায়। কখনো নিজেকে একা লাগে না। মনে হয় সবচেয়ে সেরা বন্ধুতো আমার সাথেই আছে। আর সেই সেরা বন্ধু হলো বই। বই আমাদের নতুন এক জগতের সন্ধান দেয়। আমরা যত বেশি বই পড়ি আমাদের মনের চোখ খুলে যায়। আমরা কল্পনা করতে পারি নতুন নতুন ভূবনের। আমাদের চিন্তার প্রসার ঘটে। জ্ঞানের বিকাশ ঘটে।
কর্মব্যস্ত জীবনে অনেকেই বই পড়ার সুযোগ মেলে না বলে অভিযোগ করে। আবার উল্টোটাও দেখা মেলে। বিশ্ববিখ্যাত মানুষ বিলগেটস বা মার্ক জুকারবার্গও প্রচুর ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু তাদের বই পড়ার যে নিয়মিত অভ্যাস তাতে কোনো অসুবিধা হয় না। তারা সময় বের করে প্রতিদিনই বই পড়েন। একজন মানুষ তার সারা জীবনে ঠিক কতগুলো বই পড়তে পারে? কেউ কেউ বলেন ৫ হাজার আবার কেউ কেউ বলেন ১০ হাজার। বইয়ের সাইজ,ধরণ এসবের উপর সব কিছু নির্ভর করে। কেউ যদি রাত দিন পড়তেই থাকে তবে সে হয়তো অনেকগুলো বই পড়তে পারবে। আর যারা সবে মাত্র কিন্ডারগার্টেন শুরু করেছে এবং যাদের বয়স ১২ বছর বা তার কম তাদের পক্ষে ওই বয়সে ঠিক কতগুলো বই পড়া সম্ভব? স্কুলের পড়া,খেলাধুলা,টিভি দেখা সব কিছু বাদ দিয়ে যে সময় মেলে তাতে হয়তো ১০ থেকে ২০ টা বই পড়তে পারে। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো পৃথিবীতে এমন অনেক শিশু কিশোর কিশোরী আছে যারা কিন্ডারগার্টেন পার হওয়ার আগেই ৩০০ থেকে ১০০০ বই পড়ে ফেলেছে! অনেকের কাছেই এই তথ্যটি অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। তারা চাইলে ইন্টারনেটে সার্চ দিলেই এর সত্যতা খুঁজে পাবে। তেমনই কিছু শিশু কিশোর কিশোরীর গল্প শোনাতে চাই।
লানা রেনল্ড ও জুদাহ রেনল্ড
আমেরিকার পেনসিলভেনিয়ার অন্তর্গত ব্রুকভিল নামক স্থানে একটি লাইব্রেরি আছে যার নাম রেবেকা এম আর্থার্স লাইব্রেরী। স্থানীয় মানুষ এই লাইব্রেরীর সদস্য। সদস্যদের মধ্যে রয়েছে শত শত শিশু কিশোর কিশোরী। সেই সব শিশু কিশোর কিশোরীদের অনেকেই এক হাজার বই পড়ে ফেলেছে আবার কারো কারো সংখ্যা এক হাজারের কাছাকাছি চলে গেছে। তারা এই লাইব্রেরীতে এসেই পড়ছে এবং তারা পড়াটাকে খুব উপভোগ করছে। তাদেরই একজন লানা রেইনল্ড। সে কিছুদিন আগেই এক হাজার বই পড়ে শেষ করেছে। লানা যখন খুব ছোট ছিলো তখন সে দেখতো মা তার পাশে বসে বই পড়ছে। কখনো কখনো মা তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বই পড়তেন। সেই থেকে বইয়ের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয় লানার মনের মধ্যে। সে হয়তো তখনই মনে মনে ভেবে রেখেছিল মায়ের মতই সেও অনেক বই পড়বে। রোজ রাতে ঘুমানোর আগেও মা তাকে বই থেকে গল্প শোনাতো। সেই সব গল্পে রাজপুত্র,রাজকন্যা যেমন থাকতো তেমনি অনেক সুন্দর সুন্দর শিক্ষনীয় ঘটনাও থাকতো। তারপর সে যখন স্কুলে গিয়ে দেখে দেখে পড়া শিখলো তখন সে মায়ের পাশে বসে তার উপযোগী বই পড়তো।
লানা যতগুলো বই পড়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় বই “দ্য নেস্টিং বার্ড”। কারণ সে পাখির ছানা খুব ভালোবাসতো। লানার ছোট্ট একটা ভাই আছে। মা যেমন ছোট বেলায় তাকে গল্প পড়ে শোনাতো লানা নিজেও পড়তে শেখার পর তার ছোট ভাই জুদাহ রেনল্ডকে পাশে বসিয়ে বই পড়ে শোনাতো। এভাবে তার ভাইও বইয়ের প্রতি ভালোবাসায় আটকা পড়লো। ছোটবেলা থেকে লানা যে সব বই পড়েছিল সেগুলোই এখন জুদাহ নিজে পড়ছে। আর সে এরই মধ্যে ২০০ বই পড়ে ফেলেছে। বয়স যদিও মাত্র ৭ বছর! আর তার প্রিয় বই “পিটি দ্য ক্যাট”।
লানার বই পড়ার শুরুটা তার মায়ের হাতে হলেও সেটা গতি পেয়েছিল রেবেকা এম আর্থার্স লাইব্রেরীর বই পড়া কর্মসূচীর মাধ্যমে। বাংলাদেশে যেমন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়ার কর্মসূচী আছে অনেকটা সেরকম। লানার মায়ের নাম মাইলিয়া রেনল্ড তার এক বান্ধবীর মাধ্যমে বইপড়া কর্মসূচীর বিষয়ে জানতে পেরেছিলেন। সেই বান্ধবী তার বেবীদেরকে খুব ছোট বেলা থেকেই ওই লাইব্রেরীতে নিয়ে যেতেন এবং নিজেও বই পড়তেন। এটা শুনে মাইলিয়ার মনে হলো তিনি লানাকেও ওই লাইব্রেরীর সদস্য করবেন। বাড়িতে বসে অনেক বই পড়া হয়েছে। আরও কত শত বই আছে যার সব কিনে পড়া যেমন সম্ভব নয় তেমনি অনেক বইয়ের সন্ধানও অনেক সময় পাওয়া হয়না। কিন্তু লাইব্রেরীতে গেলে যেমন অসংখ্য বই পাওয়া যাবে তেমনি পড়ার পরিবেশও ভালো থাকায় পড়ায় গতি আসবে। তাছাড়া মাইলিয়া মনে করতেন এই পড়ার অভ্যাস তার ছোট্ট ছেলে মেয়েকে ভবিষ্যতে সফল হতে সহযোগিতা করবে। সেই থেকে লানা আর তার ভাই জুদাহ বাড়িতে পড়ার পাশাপাশি লাইব্রেরীতে গিয়েও পড়তে শুরু করলো। উল্লেখ্য লানা ও তার ভাই মূলত হোমস্কুল করতো বলে তাদের হাতে ছিলো পড়ার মত অনেক বেশি সময় ও সুযোগ।
বেথেনি ফ্রিটজ
লানা রেনল্ডের মতই বেথেনি ফ্রিটজ নামের মেয়েটিও বইয়ের পোকা। সেও এরই মধ্যে ১ হাজার বই পড়ে শেষ করেছে। বেথেনির দাদি আন ফ্রিটজ বলেছেন বেথেনির বয়স যখন মাত্র তিন বছর তখন থেকে সে লাইব্রেরীর গ্রীষ্মকালীন বইপড়া কর্মসূচীতে নাম দিয়েছিলো। বেথেনিদের বাসায় যে রেফ্রিজারেটর আছে সেটার দরজায় সে একটা চার্ট লাগিয়ে রেখেছিল কবে কখন কোন বই পড়বে। রোজ সে সকালে এবং রাতে ঘুমানোর আগে নিয়ম করে বই পড়তে শুরু করেছিল। বেথেনিও লাইব্রেরী খুব ভালোবাসতো। বইয়ের রাজ্যে সে আনন্দের সাথে বিচরণ করতো। লাইব্রেরী থেকে যখনই যে অফার দিতো সে ও তার পরিবার তা লুফে নিতো। জুদাহের মত বেথেনির প্রিয় বইয়ের নামও “পিটি দ্য ক্যাট”। বেথেনি বলেছে এই বইটি তার বেশি ভালো লেগেছে কারণ যে বিড়ালটিকে নিয়ে এই বইটি লেখা হয়েছে সে খুব মজার মজার ঘটনা ঘটায়। সেগুলো পড়লে খুব আনন্দ হয়, হাসি পায়।
লাইব্রেরীতে বসে পড়ার পাশাপাশি লাইব্রেরী থেকে পছন্দের বই বাড়িতে নিয়ে যাওয়ারও সুযোগ আছে। একবার তাকে যখন প্রশ্ন করা হলো কোন বইটি তুমি বাড়িতে নিয়ে পড়তে চাও? সে বলেছিল পারলে সবগুলোই সে বাড়ি নিয়ে পড়তে চায়! বইগুলো কিন্তু খুব বেশি বড় না। ছবিযুক্ত দারুণ সব ফিচার বুক। যেখানে ছবির সাথে সাথে কয়েক লাইন করে গল্পবলা হয়। ফলে খুব দ্রুতই পড়া হয়। বেথেনি ঘুম থেকে উঠে বই পড়ে, নাস্তার টেবিলে নাস্তা করতে করতে বই পড়ে। নাস্তা শেষ হলে বই পড়ে। দুপুরে ঘুমোতে যাবার আগে বই পড়ে আবার ঘুম থেকে উঠেও বই পড়ে। রাতে খাবারের আগে বই পড়ে আবার খাবার শেষেও বই পড়ে। আর ঘুমোতে যাবার আগেও বই পড়ে! বই বই আর বই। মুনির হাসানের একটা বইয়ের কথা মনে পড়লো। যে বইটির নামই “ পড়ো পড়ো পড়ো”। বেথেনি বা লানারা যদিও মুনির হাসানের বইটির কথা জানে না কিন্তু তারা যেন পণ করেছে শুধু পড়বে আর পড়বে।
অ্যাবি হলিস:
আরেক পড়ুয়ার নাম অ্যাবি হলিস। বয়স এখন মাত্র ৬ বছর। এ বছর সে কিন্ডারগার্টেন পার করবে। এরই মধ্যে সে রেবেকা এম আর্থার্স লাইব্রেরীর গ্রীষ্মকালীন বই পড়া কর্মসূচীতে অংশ নিয়ে ৯০০ বই পড়ে ফেলেছে। অ্যাবি খরগশের গল্প পড়তে বেশি ভালোবাসে। তার ইচ্ছে ১০০০ বই পড়া শেষ করে সে লাইব্রেরী থেকে পুরস্কার নিবে। এই প্রোগ্রামে যারাই ১০০০ বই পড়া শেষ করেছে তাদেরকে লাইব্রেরী থেকে পুরস্কৃত করা হচ্ছে। এই এক হাজার বই পড়ার জন্য সময় পাওয়া যায় পুরো এক বছর। অনেকে ভাবতে পারে এই বয়সে এক বছরে ১ হাজার বই পড়া কিভাবে সম্ভব? তাদের জন্য একটি তথ্য যুক্ত করেছেন রেবেকা এম আর্থার্স লাইব্রেরীর লাইব্রেরিয়ান। বাচ্চাদের বই পড়ায় উৎসাহ যোগাতে তারা একটি ব্যতিক্রম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। বাচ্চাদের বইগুলো সাধারণত খুব ছোট হয়। ২০ থেকে ৩০ পৃষ্ঠায় সীমাবদ্ধ হয়। ছবি আর লেখায় বইটি পরিপূর্ণ থাকে। ফলে দেখা যায় একটি বইয়ের শব্দ সংখ্যা ৫০০ থেকে ১০০০ এর কম হয়। ফলে এক বসাতেই পুরো বই পড়া হয়ে যায়। অন্যদিকে কোনো বাচ্চার যদি কোনো বই খুব ভালো লাগে এবং সে যদি সেই বইটি বারবার পড়ে তবে প্রতিবার পড়া হিসেবে একটি সংখ্যা কাউন্ট করা হয়। মানে অ্যাবি হলিস তার পছন্দের বইটি যদি ১০০ বার পড়ে থাকে তবে সে একশোটি বই পড়েছে বলে ধরে নেওয়া হবে। লাইব্রেরিয়াম স্ট্রম মনে করেন রিপিটেশনের মাধ্যমে বাচ্চারা যেন বইয়ের বিষয়বস্তু আরও ভালোভাবে জানতে ও শিখতে পারে তাই এই ব্যবস্থা রাখা।
বই আমাদের মনের চোখ বাড়ায়। আমাদের জ্ঞানভান্ডার সমৃদ্ধ করে। বই পড়ে আমরা যেমন আনন্দ পাই তেমনি শিখতে পারি অনেক কিছু। আমাদের জাতীয় গ্রন্থাগারের গেটের বাইরে এক সময় বড় একটি পাথরের বই তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে বড় করে লেখা ছিলো “ পড়িলে বই আলোকিত হই, না পড়িলে বই অন্ধকারে রই”। আর এ কারণেই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তাদের কর্মসূচীর নাম দিয়েছিল ”আলোকিত মানুষ চাই”।
পৃথিবী বদলে দিতে চায় তাদের জন্য বয়স কখনো বাঁধা হতে পারে না।তারা হয় অদম্য সাহসী, অকুতোভয় যোদ্ধা। হার না মানা প্রত্যয় থাকে তাদের হৃদয়ের গভীরে। ফলে কোনো কিছুই তাদেরকে দমিয়ে রাখতে পারে না।তারা তাদের চারপাশ ভালোভাবে দেখে।তারপর সিদ্ধান্ত নেয় যেমন পৃথিবী সে আশা করে, যেমন পরিবেশ সে আশা করে এই পৃথিবী তেমন নেই।তার জন্য নতুন একটি পৃথিবী চাই। আর সেই নতুন পৃথিবী কেউ তাকে গড়ে দিবেনা। সেই পৃথিবী সে নিজেই গড়ে নিবে।আর পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে যাবে সুন্দর স্বপ্নময় একটি পৃথিবী।যুগে যুগে এমন মানুষ জন্ম নিয়েছে। তাদের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়।যারা শৈশব থেকে কৈশোরে পা রাখতে রাখতেই এমন কিছু করেছে যার জন্য গোটা পৃথিবী তাদেরকে চিনেছে, তাদেরকে মনে রেখেছে। তেমনই এক কিশোরীর গল্প এটা।তার নাম এলিয়ান ওয়ানজিকু ক্লিস্টন।
কেনিয়ার নাইরোবির হিলভিউ স্টেটের চারপাশে যে সাইকেল চালাতে ভালোবাসে। যে পৃথিবীকে সবুজে ভরে দিতে চায়।হতে চায় ওয়েনগেরি মাথাইয়ের যোগ্য উত্তরসূরী।যদিও সে এরই মধ্যে ওয়েনগেরি মাথাইয়ের উত্তরসূরী হিসেবে নিজেকে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করে তুলতে সক্ষম হয়েছে। ওয়ানজিকুর বয়স ১৩ বছর।জন্ম ও বেড়ে ওঠা কেনিয়ায়। ৮ বছর বয়সেই সে কেনিয়া সরকার কর্তৃক “ইকো ওয়ারিয়র” পুরস্কার পেয়ে কেনিয়ার সর্বকনিষ্ঠ মাশুজা বা জাতীয় হিরো হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।মাত্র ৪ বছর বয়স থেকে গাছ লাগানো শুরু করে ১৩ বছর বয়সে তার লাগানো গাছের সংখ্যা ১৩ লাখ!২০২১ সালে মাত্র দশ বছর বয়সে সে পল হ্যারিস ফেলোশীপ পুরস্কারে ভূষিত হয়।এলিয়ান ওয়ানজিকু বৃক্ষরোপন এবং প্লাস্টিক দুষণ বন্ধের জন্য নিরলস ভাবে কাজ করছে।সে মনে করে ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীর ৭০% মানুষ শহরে বাস করবে।সুতরাং যদি আমরা সুস্থ্য সুন্দর জীবনযাপন করতে চাই তবে আমাদেরকে অবশ্যই আমাদের শহরগুলিকে সবুজ ও স্বাস্থ্যকর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
এলিয়ান ওয়ানজিকুর বয়স যখন মাত্র চার বছর এবং সে কিন্ডারগার্টেনে পড়তো তখন তাদেরকে একটি প্রজেক্ট করতে দেওয়া হয়েছিল হিরোদের উপর।সেই প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করতে গিয়ে সে প্রথম জানতে পারে আফ্রিকার প্রথম নারী নোবেল বিজয়ী এবং কেনিয়ার পরিবেশবাদী বিশ্ববিখ্যাত নারী ওয়েনগেরি মাথাই সম্পর্কে।ছোট্ট এলিয়ান ওয়েনগেরির কাজ সম্পর্কে যতই জানছিলো ততোই মুগ্ধ হচ্ছিল।তার ছোট্ট মনে মাথাইয়ের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা তৈরি হয়েছিল।তার বার বার মনে হচ্ছিল ইস আমিও যদি তার মত হতে পারতাম। এবং তাকে সে আইডল মেনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আমিও তারমতই হবো। কিন্তু সে আরো বেশি পড়াশোনা করতে গিয়ে জানতে পারে তার এই আইডল মানুষটি আজ আর পৃথিবীতে নেই।তখন ছোট্ট এলিয়ানের মনে একটি ভাবনার উদয় হয়। সে সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে আমিই হবো এই কাজের অগ্রগামী নেতা।মাথাইয়ের কাজ সম্পর্কে জানতে গিয়েই গাছের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়েছিল এবং বৃক্ষরোপনে আগ্রহী হয়ে উঠেছিল ছোট্ট এলিয়ান।বহু গল্পে সে শুনেছিল ওয়েনগেরি মাথাই বহু আম গাছ লাগিয়েছেন। আর এলিয়ান নিজেও আম খুব পছন্দ করে।তার মনে হতো সে জন্মেছে আম খাওয়ার জন্য!সে যখন ওয়েনগেরি মাথাইকে নিয়ে বিস্তারিত পড়াশোনা শুরু করলো তখন তার বার বার মনে হতো আমিও এটা করতে পারবো।আর সেদিনই সে ওই প্রজেক্ট শেষ করে কিন্ডারগার্টেন থেকে বাড়ি ফিরে প্রথমেই একটি কমলালেবু গাছ লাগালো।আর রাতে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বললো মা তুমিকি আমাকে প্লিজ কারুরা বনে নিয়ে যেতে পারবে। এই বনটি নাইরোবির অসাধারণ একটি বনাঞ্চল। এভাবে বার বার আব্দার করার কারণে একসময় বিরক্ত হয়ে হলেও তার মা রাজি হলেন এবং বললেন ঠিক আছে নিয়ে যাবো। তারপর মায়ের সাথে সেখানে গিয়ে আমি মুগ্ধ ও বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাই।যতদূর চোখ যায় ছোট বড় নানা ধরনের বৃক্ষ। চোখ জুড়িয়ে যায়। এমন সুন্দর সবুজ পৃথিবীইতো গড়তে হবে।সেখানে কাছেই একটি দোকান ছিলো। যেখানে গাছের খুব ছোট ছোট চারা বিক্রি করা হয়। এলিয়ান তার মাকে অনুরোধ করলো মা এখান থেকে কয়েকটা চারা কিনে নিয়ে যাই।মা তার কথায়রাজি হলেন এবং কয়েকটি চারা কিনে বাড়ি নিয়ে গেলেন।সেদিনই সেগুলো লাগানো হলো।আর সেখান থেকেই তার মধ্যে বৃক্ষরোপনের প্রতি আগ্রহ বেড়ে গেলো, ভালোবাসা বেড়ে গেলো। কাছাকাছি থাকা স্কুলগুলোতে সে গাছ লাগাতে শুরু করলো।এটা তার কাছে খুবই আনন্দের বিষয় হয়ে উঠলো। তার মনে হতো গাছেরা যেন তার সাথে কথা বলছে চুপিচুপি।
এর কয়েক বছর পর এলিয়ান তরুণদের সাথে নিয়ে মায়ের সহযোগিতায় একটি সংগঠন দাড়করালো। নাম রাখলো “চিলড্রেন্স উইথ নেচার”।এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান কাজ ছিলো তার মতই যে সব শিশু কিশোর কিশোরী সবজু পৃথিবী গড়তে চায়,গাছ ভালোবাসে তাদেরকে সংযুক্ত করতে।যেন দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ এমনটি হয়ে ওঠে।তারা সিদ্ধান্ত নিলো জলবায়ু নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। বৈশ্বিক উষ্ণতা কমাবে।একই সাথে তাদের এই কার্যক্রম সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গল বা এসডিজির সাথে যুক্ত হলো।পাশাপাশি তাদের এই কার্যক্রম কেনিয়ার ভিশন ২০৩০ এর সাথেও যুক্ত হলো।তাদের এই সংগঠনটি মূলথ সেই সব শিশুদের অর্ন্তভূক্ত করে যারা তাদের মতই গাছ লাগাতে ভালোবাসে এবং যারা নিজেদের জীবনকে সুন্দর ও নিরাপদ করার পাশাপাশি তাদের সন্তানদের জন্য একটি সুন্দর পৃথিবী রেখে যেতে চায়।
এলিয়ান তার দলবল নিয়ে স্কুলে স্কুলে গিয়ে শিশু কিশোর কিশোরীদের সাথে এসব নিয়ে কথা বলতে শুরু করে। সে বুঝাতে চায় কেন গাছ লাগানো প্রয়োজন এবং কিভাবে প্লাস্টিক আমাদের পরিবেশকে নষ্ট করছে । কিভাবে এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব।আর এভাবেই সে ও তার দল ৭৯টি স্কুলে গিয়েছে এবং রোপন করার জন্য তাদেরকে গাছের বীজ দিয়েছে।এছাড়াও বিভিন্ন হোটেল ও পার্কেও তারা বীজ উপহার দিয়েছে শুধুমাত্র পরিবেশগত পরিবর্তন আনার জন্য।এতো এতো বীজ এবং চারা কেনার জন্য প্রয়োজন হয়েছে অনেক অনেক টাকা। ছোট্ট এই কিশোরী মেয়েটির অর্থের যোগান হয়েছে বিভিন্ন ভাবে। শুরু করলে সফলতা আসেই। আমাদের দেশে যেমন একটি কথা প্রচলিত আছে টাকা ভূতে যোগাবে। এলিয়ানের টাকা যদিও কোনো ভূতে যোগায়নি তবে মাধ্যম তৈরি হয়েছে। সে শুরু করেছিলো নিজের টিফিনের টাকা দিয়ে, নিজের জমানো টাকা দিয়ে এবং মায়ের কিছু জমানো টাকার মাধ্যমে।পরবর্তীতে তার এই কাজ দেখে অনেকেই টাকা দিয়ে, বীজ দিয়ে, চারা দিয়ে তাকে সহযোগিতা শুরু করায় তার বৃক্ষরোপন কর্মসূচি আরও বেগবান হয়।
কেনিয়ার নাইরোবিতে জন্ম নেওয়া এলিয়ান নিজেও কি কখনো ভেবেছিল তার এই কার্যক্রম এভাবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে। শুধু কেনিয়া নয় পুরো আফ্রিকা মহাদেশের সব দেশ ছাড়িয়ে এখন এই বৃক্ষরোপন কর্মসূচি তারা আমেরিকাতেও চালু করেছে। সব দেশেইতো মানুষ কম বেশি গাছ লাগায়। কিন্তু কিশোরী এলিয়ান তার সংগঠনের মাধ্যমে পুরো আফ্রিকাকে সবুজায়নের পাশাপাশি আমেরিকাতেও কার্যক্রম বেগবান করেছে।৪ বছর বয়সে যে শিশুটি গাছ লাগানো শুরু করেছিল তার বয়স এখন ১৩। সে এখন কিশোরী। এই নয় বছরে সে তার সংগঠনের মাধ্যমে তের লাখ গাছ লাগিয়েছে।এলিয়ান পৃথিবীর সব কিশোর কিশোরীর উদ্দেশ্যে বলেছে “তোমরা যে যেখানেই থাকো না কেন, তোমরাও চাইলে আমাদের সাথে যুক্ত হতে পারো একটি সুন্দর নির্মল সবুজ পৃথিবী গড়ার এই আন্দোলনে”আর এটা করতে হলে তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে ভিজিট করে নিজের সম্পর্কে বলতে হবে,তুমি কি করতে চাও এবং কিভাবে করতে চাও সেটা জানাতে হবে এবং কিভাবে তুমি সহযোগিতা করতে চাও সেটাও বলতে হবে।
শুধু কেনিয়ার নাইরোবিতে গাছ লাগিয়েই থেমে যায়নি এলিয়ান। ওয়েনগেরি মাথাইকে আদর্শ মেনে সে সবুজায়নের এই চেষ্টাকে সারা বিশ্বেই ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করছে। এখন তার লক্ষ্য সাহেল মরুভূমির বুকে ৮ হাজার কিলোমিটার জুড়ে বনায়ন করার।যা কিনা পুরো আফ্রিকা মহাদেশব্যাপী প্রশস্থ। তার লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ মিলিয়ন অবক্ষয়িত জমি পুনরোদ্ধার করা এবং ২৫০ মিলিয়ন টন কার্বন রিসাইক্লিং করা।সে একই সাথে প্রচুর বাঁশ লাগাতে চায় যা দিয়ে নদী পরিস্কার করা যাবে এবং সেগুলো বিক্রির মাধ্যমে তার কার্যক্রম চালিয়ে নিতে পারবে এবং প্রচুর বাবলা গাছ লাগাতে চায় যেটা পর্যাপ্ত ছায়া দিবে।আর এই বছরে সে সাহিল মরুভূমিতে ১ মিলিয়ন গাছ লাগানোর টার্গেট নিয়েছে।সম্প্রতি কেনিয়ার পরিবেশ ও বন মন্ত্রনালয়ের কেবিনেট সেক্রেটারি কেরিয়াকো টোবিকো তাকে “মিচুকি পার্ক আরবান গ্রীন স্পেচ” প্রকল্পের কো চেয়ার নির্বাচন করেছে।যেদিন এই পার্ক উদ্ভোধন করা হয়েছিল সেদিন এলিয়ান কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উহুরু মুইগাই কেনিয়াত্তাকে পার্কের সব দিকে ঘুরিয়ে দেখিয়েছিল।আর এই প্রজেক্টে এলিয়ানের দায়িত্ব হলো সবুজায়ন ঠিক রেখে শিশুদের খেলার সুযোগ তৈরি করা এবং খেলতে খেলতে শেখার ব্যবস্থা করা।
মানুষ বাসস্থান তৈরির জন্য এখন প্রতিনিয়ত গাছ কাটছে। এতে করে পরিবেশের উপর বিরুপ প্রভাব পড়ছে।এলিয়ান চায় অতি প্রয়োজন ছাড়া যেন গাছ কাটা না হয় এবং কাটলেও অধিক পরিমান গাছের চারা লাগাতে হবে।সে যখন আরও ছোট ছিল তখন একবার তার স্কুলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় খুব মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। স্কুলের পাশে সবচেয়ে বড় যে গাছটি ছিলো সেদিন সেটা কেটে ফেলা হয়েছিল। এই গাছের সাথে তাদের ছিল কত স্মৃতি। এখানে বসে বন্ধুরা মিলে বই পড়তো, গল্প করতো। গাছটি কেটে ফেলায় তার হৃদয়ে আঘাত লেগেছিল।সেই বয়সেই সে জানতো যে গাছটি কেন তারা কাটছে। গাছটি না কাটলে স্কুলের জন্য ভবন নির্মানের মত যথেষ্ট জায়গা পাওয়া যেতো না।তবে সে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত মানুষ কেন এখনো পরিবেশ যে ভয়াবহ ঝুকিতে আছে সেটা বুঝতে পারছে না। কেন মানুষ অধিক হারে গাছ লাগাচ্ছে না।কিশোরী এলিয়ান মনে করে বড়রা পরিবেশ নিয়ে মোটেও চিন্তিত না।সে মনে করে বড়দেরই সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা উচিত। তারাই সবচেয়ে ভালো জানে যে পৃথিবী থেকে গাছের সংখ্যা কমে গেলে পরিবেশের উপর কেমন প্রভাব পড়বে। কতটা ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। ছোটদের মত এই পৃথিবীটাতো বড়দেরও। এই দিক থেকে তার মা খুবই ভালো। যদিও তিনি একটু লাজুক। নিজেকে প্রকাশ করতে চান না। তবে এলিয়ানের এই বৃক্ষরোপন কর্মসূচির অর্থের যোগান তার মাধ্যমেই হয়ে থাকে।
গাছ লাগানোর প্রতি এমন ভালোবাসার জন্য অনেক সময় তাকে বিরুপ পরিবেশের সাথে মোকাবেলা করতে হয়েছে। নতুন স্কুলে গিয়ে অনেক কটুকথাও শুনতে হয়েছে। কিন্তু সে দমে যায়নি।সে তার লক্ষ্যে অবিচল ছিলো।এলিয়ানের মতে শুধু সুন্দর সু্ন্দর রাস্তা,উচু উচু ভবন, দামি দামি কার থাকাটাই উন্নয়ন নয়। পাশাপাশি বায়ূ দূষণ কমাতে হবে, পানি দূষণ কমাতে হবে,অপুষ্টিতে ভুগে শিশু মৃত্যুর হার কমাতে হবে। এই যে বৃক্ষনিধনের ফলে যে বিরুপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিবে তা হয়তো আজ দেখা যাচ্ছে না কিন্তু এর ভয়াবহ রূপ আরও অনেক বছর পর উপলব্ধি করা যাবে যখন প্রতিহত করার সুযোগ থাকবে না। তাই এখন থেকেই সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরী।এলিয়ানের আফসোস দেশে দেশে এতো তরুন, যুবক আছে যারা নিজেদের ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবলেও সুন্দর নির্মল পৃথিবী কিভাবে গড়ে তোলা যায় তা নিয়ে ভাবে না। কিভাবে শিশুদের জন্য সুন্দর একটি পৃথিবী নির্মাণ করা যায় সেই চিন্তা কারো মাথায় নেই।
যারা গাছ লাগায় এলিয়ান তাদেরকে ভালোবাসে। তবে সে মনে করে আমাদের বুঝতে হবে কোন গাছ কোন জায়গায় লাগানো উচিত যেন ইকোসিস্টেমে কোনো বাধা তৈরি না হয়।এলিয়ান তার বয়সী কিশোর কিশোরীদের উদ্দেশ্যে বলেছে তোমাদের জন্য আমার উপদেশ হলো শুরু করো।মনে করো তুমি কিছু খাওয়া শুরু করেছ যার মধ্যে বীজ আছে। তুমি খাওয়ার পর সাথে সাথেই সেই বীজটি মাটিতে পুতে দাও। যেন একদিন তা থেকে চারা জন্মাতে পারে। শুরুটাতো এভাবেই হতে হয়।ঠিক শিশুদের হাটতে শেখার মত ছোট ছোট পদক্ষেপ দিয়েই শুরু করো। পরিবর্তন আনতে হলে তুমি যতটুকু পারো সেটাই শুরু করো।শুরুতেই বিরাট কিছু করতে না পেরে হতাশ হওয়া যাবে না। এছাড়াও তুমি যা করতে চাও সেটায় তোমার বাবা মাকেও রাজি করাতে চেষ্টা করতে হবে। যতক্ষণ তারা রাজি হবে না ততক্ষণ তাদের রাজি করাতে চেষ্টা অব্যাহত রাখো। কারণ তারা রাজি হয়ে গেলে তুমি তোমার কাজে নানা ভাবে সহযোগিতা পাবে।তারপর এক সময় নিজ দেশের সরকারকেও প্রভাবিত করতে হবে। কারণ তাদের হাতে অনেক জমি আছে, অনেক ক্ষমতা আছে। তারা একটু চেষ্টা করলেই খুব সহজেই বনায়নে সফল হতে পারে।কখনোই হতাশ হওয়া যাবে না, হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না।সম্প্রতি এলিয়ান বিখ্যাত ফুটবলার ডেভিড ব্যাকহামের সাথে সম্মিলিত ভাবে কলেরা নিমূল বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধির কাজে যুক্ত হয়েছে।এলিয়ান কেনিয়ার সর্বকনিষ্ট পরিবেশবিদ হিসেবে শিশু কিশোর কিশোরীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে। সম্প্রতি বিশ্ব বিখ্যাত ব্লগার “নাস ডেইলি” তাকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।এলিয়ান এখন পযর্ন্ত তিনটি বই লিখেছে।
কর্মব্যস্ত জীবনে নিজেকে একটু স্বস্তি দিতে অনেকেই ছুটি পেলেই ঘুরতে বেরিয়ে পড়েন।ভ্রমণপিয়াসী মানুষের কাছে একটি কমন প্রশ্ন হলো পাহাড় না সাগর? মানে পাহাড়ে ঘুরতে ভালোবাসেন নাকি সাগরে। কারো কাছে পাহাড় ভালো লাগে, আবার কারো কাছে সমুদ্র। কিন্তু এমনওতো মানুষ আছে যাদের একই সাথে পাহাড় এবং সাগর দুটোই ভালো লাগে।সেই সব মানুষের জন্য দুটি আলাদা এলাকায় গিয়ে আলাদা ভাবে পাহাড় আর সাগর দেখার সময় করে ওঠা যেমন কঠিন, তেমনি খরচও যোগান দেওয়া অনেক সময় কঠিন হয়। কিন্তু কেমন হতো যদি একই জায়গায় পাহাড়ের সাথে সাথে সাগরের দেখা মিলতো। হ্যা কক্সবাজার এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। মেরিন ড্রাইভ ধরে সামনে প্রায় নব্বই কিলোমিটার জুড়ে একদিকে পাহাড় আরেকদিকে সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ আছে। তবে এই পাহাড়গুলোতে চড়ার খুব একটা সুযোগ নেই। শুধুমাত্র হিমছড়িতে থাকা পাহাড়ে পযর্টকরা উঠতে পারেন। যদি কারো এর চেয়েই উঁচু পাহাড়ে উঠতে ইচ্ছে করে এবং পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে সাগর দেখতে ইচ্ছে করে, তাহলে তাদের জন্য আকর্ষণীয় পযর্টন কেন্দ্র হতে পারে মহেশখালী ও কুতুবদিয়া। বিশাল সাগরের জলরাশির মাঝে দুটি দ্বীপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি কক্সবাজার শহরের উত্তর- পশ্চিম কোণায় স্ব-মহিমায় দণ্ডায়মান এ দ্বীপাঞ্চল। বাঁকখালী নদীর কিছু অংশ এবং বঙ্গোপসাগরের মহেশখালী চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যেতে হয় মহেশখালী। আবার চকরিয়া উপজেলার বদরখালী-মহেশখালী সংযোগ ব্রিজ হয়ে সড়ক পথেও যাওয়া যায় মহেশখালী।
মহেশখালী কক্সবাজার জেলার একটি দ্বীপ উপজেলা। কক্সবাজার থেকে এটি মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। প্রায় ৩৬২ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের মহেশখালী উপজেলায় সোনাদিয়া, মাতারবাড়ি, ধলঘাটা নামে তিনটি দ্বীপ রয়েছে। ১৮৫৪ সালে গড়ে ওঠে এই দ্বীপটি। তবে জনশ্রুতি আছে ১৫৫৯ সালের প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে মূল ভূ-খন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই দ্বীপের সৃষ্টি হয়। বৌদ্ধ সেন মহেশ্বর থেকেই প্রায় ২০০ বছর আগে এই জায়গায়র নামকরণ হয়। যা মহেশখালী দ্বীপ নামেও পরিচিত। পান, মাছ, শুঁটকী, চিংড়ি, লবণ এবং মুক্তার উৎপাদনে সমগ্র বাংলাদেশে এই উপজেলার সুনাম রয়েছে। কক্সবাজার থেকে ৪-৫ ঘন্টা সময় ব্যায় করলেই মহেশখালী দ্বীপ থেকে ঘুরে আসা যায়।
মহেশখালীর দক্ষিণ প্রান্তের নয়ন জুড়ানো জেটিদ্বয় পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। গ্রাম বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য সারিসারি পানের বরজ আর সুপারি বাগান, পাহাড়ি কাঠ, ফল-ফলাদির বাগান, লবণের মাঠ, মাছের ঘেরের নয়নাভিরাম দৃশ্য, ফসলের সবুজ-শ্যামল মাঠ ও প্রাকৃতিক অপরূপ সৌন্দর্য সবাইকে আনমনা করে। সোনাদিয়ার শুঁটকি উৎপাদন ক্ষেত্র ও গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা জেলেদের হৈ-হুল্লোড়, সৈকতে ঝুড়ি হাতে শামুক কুড়ানো বালক-বালিকাদের চপলতা, ধান ও লবণ চাষিদের হাড়ভাঙ্গা খাটুনির ফাঁকে-ফাঁকে ক্লান্তি নাশী ভাটিয়ালী এবং আঞ্চলিক গান আর ভরা জোয়ারে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ মনকে আন্দোলিত করে। মহেশখালী জাতীয় অর্থনীতিতে রাখছে অনেক বড় মাপের অবদান। দেশের অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী সম্পদ চিংড়ি উৎপাদিত হয় মহেশখালীতে। পোশাক শিল্পের পরেই চিংড়ি দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক খাত। মহেশখালীতে উৎপাদিত বাগদা, লইল্যা চিংড়ি ও কাঁকড়া এবং অন্যান্য সামুদ্রিক সু-স্বাদু মাছ রফতানি করে সরকার বার্ষিক কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আয় করছে।
মহেশখালি বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়িয়া দ্বীপ। এ দ্বীপের মৈনাক পর্বতের উপরে রয়েছে আদিনাথ মন্দির। এ দ্বীপের কারুকার্য এখানে আসা দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে। এছাড়াও বছরের ফাল্গুন মাসে এখানে আদিনাথ মেলা অনুষ্টিত হয়। এখানে রয়েছে বেশ কিছু বৌদ্ধ বিহার, জলাবন ও নানা প্রজাতির পশুপাখি। এছাড়াও আছে রাখাইন পাড়া ও স্বর্ণ মন্দির। চাইলে ঝাউবাগান ও চরপাড়া বীচ থেকে ঘুরে আসতে পারবে যে কোনো পযর্টক। চলতি পথেই দেখতে পাবে পান গাছের বাগান আর লবণের মাঠ। মহেশখালীর পানের সুনাম সারা বাংলাদেশ ব্যাপী। তাই যারা কখনো পান খায়নি তারাও এখানে এসে মিষ্টি পান খেতে ভোলে না। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপূর্ব লীলাভূমি যেন সোনাদিয়া-মহেশখালী দ্বীপ। মূল ভুখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও এ দ্বীপ সাধারণ মানুষ ও পর্যটকদের কাছে সব সময় আকর্ষণীয় বিষয়। সারি সারি নয়নাভিরাম প্যারাবন আর এর পাশ ঘিরে অসংখ্য ছোট বড় খাল জালের মতো বিছিয়ে রয়েছে। সোনাদিয়া দ্বীপে সমুদ্রের পাশ ঘেঁষে গড়ে ওঠা সুউচ্চ বালিয়ারীর তুলনা দেশে দ্বিতীয়টি নেই। দ্বীপের সমুদ্র সৈকতের বেলাভূমিতে পানির কিনার ঘেঁষে লাল কাঁকড়া, সবুজ বনানী ও জীববৈচিত্র্যে ভরা এ দ্বীপটি যেন দেশী-বিদেশী পর্যটকদের কাছে টানে। এছাড়াও সুবিশাল প্যারাবন ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ পাহাড়ী বনাঞ্চল পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত করেছে। তবে সোনাদিয়া দ্বীপকে পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষার জন্য ইতোমধ্যে ১৯৯৯ সালে ইকোলজিক্যাল ক্রিটিক্র্যাল এরিয়া হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এ দ্বীপের পরিবেশের মান উন্নয়নে ইতোমধ্যে পরিবেশ অধিদফতরের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে বনায়ন কার্যক্রম।
সনাতন ধর্মীয় পুরোহিতদের মতে মহাদেব মহেশের নামানুসারে মহেশখালীর নামকরণ। ভূ-তাত্ত্বিকদের মতে মহেশখালী মূলত: কোন দ্বীপ ছিল না, কোন মহা প্রাকৃতিক পরিবর্তন বা দুর্যোগের কারণে মূল ভূখ- হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে এ দ্বীপের সৃষ্টি। টেকনাফ হতে সিলেট পর্যন্ত দেশের পূর্বাঞ্চলে টারশিয়ারি যুগের পাহাড়সমূহের অবিচ্ছেদ্য অংশই দ্বীপ মহেশখালীর দক্ষিণ থেকে উত্তর জুড়ে অবস্থিত। যেখানে রয়েছে মুসলিম, হিন্দু ও রাখাইন সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সংমিশ্রণে বাঙ্গালী জাতিসত্তার এক অপূর্ব সম্মিলন।দেশের মূল ভূখ- থেকে বিছিন্ন জনপদ মহেশখালী শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়ে যাচ্ছে ধীর পায়ে। স্কুল-কলেজ, কাওমী ও আধা-সরকারি মাদ্রাসাসমূহের পাশাপাশি অবরোধবাসিনী নারী সমাজকে যুগোপযোগী শিক্ষায় শিক্ষিতকরণের লক্ষ্যে গড়ে উঠেছে বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বালিকা মাদ্রাসা ও মহিলা কলেজ।
রয়েছে প্রাচীন ও আধুনিক স্থাপত্য শৈলীর অসংখ্য মসজিদ, মন্দির ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের দৃষ্টি নন্দন ক্যাং। মহেশখালী প্রাকৃতিকভাবে চমৎকার ভৌগোলিক সৌন্দর্য নিয়ে গঠিত ও অবস্থিত। বলতে গেলে এমন দ্বীপমালা পৃথিবীতে বিরল। আয়তনের দিক থেকে মালদ্বীপ, সিঙ্গাপুর এবং হংকং এর প্রায় কাছাকাছি। মহেশখালীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো চারপাশে সমুদ্র ও জলরাশি, যেন ভাসমান বিশাল এক জাহাজ বহর আর উত্তর-দক্ষিণ লম্বা ও উঁচু পর্বতমালা, মনে হয় যেন জাহাজ বহরের সু-উচ্চ পাল। কাছ থেকে আর দূর থেকে যেখান থেকে দেখুন না কেন সমুদ্র ঘেঁষে উঁচু পাহাড় যে কোনো প্রকৃতিপ্রেমী ও নান্দনিক দৃষ্টি সম্পন্ন মানুষকে অনায়াসেই আকৃষ্ট করবে।
মহেশখালীর সোনাদিয়া বিখ্যাত শুঁটকি উৎপাদন কেন্দ্রের জন্য। তদুপরি সোনাদিয়া আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট হিসেবেও ভ্রমণ বিলাসী মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয়। অর্থনীতির আর একটা বড় খাত হলো লবণ। এ দ্বীপে উৎপাদিত লবণ দেশের সিংহভাগ জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম। বলা যায়, প্রায় এককভাবে বাংলাদেশের সমস্ত লবণ কক্সবাজার জেলায় উৎপাদিত হয়।যাঁরা সাগরপথে ট্রলার বা স্পিডবোটে চড়ে কোথাও যাননি, তাঁদের জন্য মহেশখালী ভ্রমন হবে সবচেয়ে বেশি উপভোগ্য। স্পিডবোটে বা ট্রলারে চড়ে বাঁকখালী চ্যানেল পার হওয়ার সময়টা দারুণ। সকালবেলা দূরে রোদ আর নদীর অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে দেখতেই পৌঁছে যাবেন গন্তব্যে। সুবিশাল পাহাড় আর অপরূপ দৃশ্যের এই দ্বীপ।
পযর্টন ও অর্থনৈতিক ভাবে অপার সম্ভাবনাময় মহেশখালী দ্বীপের রয়েছে অনেক সীমাবদ্ধতা। শিক্ষা ক্ষেত্রে অনগ্রসরতা, যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহালদশা, স্বাস্থ্য খাতে অরাজকতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এ অঞ্চলের মানুষকে ব্যথিত করে।ফলে পযর্টন শিল্পের প্রসারও সেভাবে ঘটছে না। শহরের সাথে এই দ্বীপের মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম নৌকা বা স্পিড বোট। প্রসব বেদনায় কাতর মহিলারা ছটফট করতে থাকে নৌকা কিংবা স্পিড বোটে। অনেক সময় বাচ্চা প্রসব হয়ে যায় নৌকা কিংবা স্পিড বোটে।অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলা ভূমি মহেশখালীর যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি করতে না পারলে পযর্টন শিল্পের এই অপার সম্ভাবনাময় দ্বীপটি থেকে আমরা সেভাবে সুফল ভোগ করতে পারবো না।আজকে যারা কক্সবাজারকে সত্যিকারের আকর্ষণীয় পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার গালভরা বুলি আওড়ান, তাদের ভেবে দেখা উচিত শুধুমাত্র একটি সৈকত, হিমছড়ির একটি মরা ঝর্ণা ও ডুলাহাজারার একটি নাম মাত্র সাফারী পার্ক দিয়ে তারা দেশ-বিদেশের পর্যটকদের মন জয় করা সম্ভব নয়।
এই শহরে নেই কোন আনন্দ-বিনোদনের সু-ব্যবস্থা। এমতাবস্থায় কক্সবাজারকে সত্যিকারের পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে কক্সবাজার শহরের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহে নতুন নতুন পর্যটন স্পট সৃষ্টি করতে হবে। বিশেষত: প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সাগর তনয়া মহেশখালীকে অপরূপ সাজে সজ্জিত করতে হবে এবং মহেশখালীর পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। দ্বীপ অঞ্চলটিকে একটি আকর্ষণীয় পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত করা যেতে পারে। মহেশখালীর রাখাইন পল্লী ও ক্যাং সমূহের প্রয়োজনীয় সংস্কার, রাখাইনদের হস্তশিল্প ও সংস্কৃতি ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে একটি স্বতন্ত্র রাখাইন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে তাকে একটি পর্যটন স্পটে পরিণত করা যেতে পারে।
মহেশখালীর পর্যটন সম্ভাবনার অন্যতম প্রতিবন্ধক হলো দুর্গম যোগাযোগ ও অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। উল্লেখ্য যে, আদিনাথ স্পটে প্রতিবছর লাখ লাখ পর্যটক আগমন করে থাকে। আসা-যাওয়ার পথে তাদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের সম্মুখীন হতে হয়। মহেশখালীর প্রতি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে কক্সবাজার-মহেশখালী চ্যানেলে পর্যাপ্ত স্পিডবোট, নৌকা, লঞ্চ ও সী-ট্রাক চালু পূর্বক অস্বাভাবিক ভাড়া বৃদ্ধি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য মহেশখালী থানা প্রশাসনকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে আদিনাথ অঞ্চলে একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করা যেতে পারে। অবিলম্বে বাঁকখালী ও মহেশখালী চ্যানেলের ভরাট হওয়া নদী ড্রেজিং এর জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
মহেশখালীতে স্থলপথে যাতায়াতের প্রধান সড়ক গোরকঘাটা-জনতাবাজার সড়কের ২৭ কি. মি. রাস্তা পূর্ণাঙ্গরূপে পাকা করার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।মহেশখালীতে বাস্তবায়নাধীন কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প ও প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্র বন্দর পর্যটন সম্ভাবনার এক নবদ্বার উন্মুক্ত করবে। অভাগা দ্বীপাঞ্চলবাসীর সুবিধার্থে না হলেও মহাভাগ্যবতী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কোম্পানীগুলোর ব্যবসায়িক সুবিধার্থে মহেশখালীর সাথে কক্সবাজার শহরের সরাসরি স্থল যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে যমুনা কিংবা পদ্মাসেতুর ন্যায় একটি সেতু নির্মাণ করা যেতে পারে।কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার আরেকটি পযর্টন স্পট হলো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ সোনাদিয়া দ্বীপ। দ্বীপের মোট আয়তন ৭ বর্গকিলোমিটার। জেলা সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে কুতুবজোম ইউনিয়নে এর অবস্থান। এ দ্বীপের দুটি গ্রামে বর্তমানে প্রায় ১৭শ’ লোকের বসবাস। বাঁকখালী নদীর মোহনায় মহেশখালী পয়েন্ট থেকে স্পিডবোটে মাত্র ১৫ মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত সোনাদিয়া দ্বীপ। বর্তমানে ক্লাইমেট রিজিলিয়েন্ট পার্টিসিপেটরি এফরেস্টেশন এ্যান্ড রিফরেস্টশন প্রকল্পের মাধ্যমে সোনাদিয়া দ্বীপের বনায়ন কার্যক্রম চালু আছে। এছাড়াও জলপাই রঙের সামুদ্রিক কাছিম ও পরিযায়ী পাখি সংরক্ষণের জন্য প্রকল্প নেয়া হয়েছে। অসংখ্য খাল ও প্যারাবনের সারি গিয়ে মিলেছে দ্বীপের মূল ভূখন্ডে। যাওয়ার পথে নদী ঢেউ আর প্যারাবনের বাতাসের দোল খাওয়ার দৃশ্য যে কারও মন কেড়ে নেবে। একবার গেলে বারবার যেতে ইচ্ছে হবে এ দ্বীপে। দেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় প্যারাবনের একটি বিরাট অংশ সোনাদিয়া দ্বীপে দেখা যায়। সোনাদিয়ার প্যারাবন বাইন বৃক্ষসমৃদ্ধ। দেশে বিদ্যমান ৩ প্রজাতির বাইন গাছই এখানে পাওয়া যায়। এছাড়া প্যারাবনে গেওয়া হরিগোজা, নুনিয়া, ঝাউ ইত্যাদি ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদও রয়েছে। প্যারাবনের ভেতরে সুন্দরবনের মতো ছোট ছোট নদীর দু’পাশে নয়নাভিরাম দৃশ্যও চোখে পড়ে।
সোনাদিয়ার প্যারাবন চর, খাল ও মোহনা নানা প্রজাতির মাছ ও অমেরুদন্ডী প্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। দ্বীপটির প্যারাবনসংলগ্ন খালে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ যেমন- বাটা, কোরাল, তাইল্যা, দাতিনা, কাউন ও পোয়া পাওয়া যায়। সোনাদিয়া দ্বীপ ভ্রমণে প্রায় ১৪ কিলোমিটার প্রশস্ত সৈকত, সৈকত ঘেঁষে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা সুবিশাল ঝাউবন, সুউচ্চ বালিয়ারী, জালের মতো ছোট-বড় অসংখ্য খালবেষ্টিত ম্যানগ্রোভ বন, বিস্তীর্ণ ল্যাগুন্যাল ম্যাডফ্লাট, কেয়া নিসিন্দার ঝোপ, বিচিত্র প্রজাতির জলচর পাখি চোখে পড়বে। সমুদ্রের পাশ ঘেঁষে অবস্থিত সুউচ্চ বালিয়ারীর তুলনা যেন দেশে দ্বিতীয়টি নেই। সমুদ্র ও সৈকত থেকে ঝাউবনের দৃশ্য অপূর্ব শোভাবর্ধন করে। সৈকত এবং বালিয়ারীর বিপন্ন জলপাই বর্ণের সামুদ্রিক কাছিমের ডিম পাড়ারও উপযোগী স্থান এটি। স্থানীয়রা জানান, এখানে সামুদ্রিক সবুজ কাছিমও ডিম পাড়তে আসে। সমুদ্র সৈকতের বেলাভূমিতে পানির কিনার ঘেঁষে বিচরণ করতে দেখা যায় লাল কাঁকড়া।
শীতকালে সোনাদিয়া দ্বীপে নানা ধরনের স্থানীয় ও জলচর পাখির আগমন ঘটে। চর এবং খালের ধারে জলচর পাখির বেশি সমাগম ঘটে। এখানে ৭০ প্রজাতির জলচর পাখির দেখা মেলে। ডিসেম্বর থেকে ফেরুয়ারি পর্যন্ত সময়ে সোনাদিয়ায় জলচর পাখি বিশেষত দেশী-বিদেশী কাদাখোচা পাখির মেলা বসে এখানে। এই দ্বীপটিকে আকর্ষনীয় পযর্টনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি রাত্রী যাপনের সুন্দর ব্যবস্থা করতে হবে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। কক্সবাজার সদর থেকে মহেশখালী পযর্ন্ত কেবল কারের ব্যবস্থা করলে পযর্টকদের আগ্রহ বাড়বে। ফলে এখান থেকে সরকারের বড় অংকের আয় হবে যা পযর্টন শিল্পকে আরো এগিয়ে যেতে সহযোগিতা করবে। তবে দ্বীপের অনন্য বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে অবশ্যই এখানে বড় বড় হোটেল মোটেল করা যাবে না। তার বদলে কটেজ তৈরি করা যেতে পারে এবং সেটা অবশ্যই সরকারি ভাবে। যেহেতু কক্সবাজার শহর থেকে খুব বেশি দূরে নয় তাই পযর্টকরা অনায়াসেই মহেশখালী ঘুরে শহরে ফিরে আসতে পারবে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করলে এবং যাতায়াত ব্যবস্থা ঠিক করতে পারলে সারা বছরই এই অঞ্চলটি হতে পারে পযর্টকদের জন্য শীর্ষ পছন্দের যায়গা।
আজকের শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যত। আর সেই ভবিষ্যত প্রজন্ম যেন নিরাপদে বেড়ে ওঠে তার জন্য চাই একটি নিরাপদ পৃথিবী। যে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল থাকবে শিসামুক্ত,ওজনস্তর থাকবে ফাটলমুক্ত। যে পৃথিবী থাকবে সবুজ শ্যামলিমায় ঘেরা। তারুণ্যের কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন
এসেছেনতুনশিশু, তাকেছেড়েদিতেহবেস্থান
জীর্ণপৃথিবীতেব্যর্থ, মৃতআরধ্বংসস্তূপ–পিঠে
চলেযেতেহবেআমাদের।
চলেযাব–তবুআজযতক্ষণদেহেআছেপ্রাণ।
প্রাণপণেপৃথিবীরসরাবজঞ্জাল,
এবিশ্বকেএশিশুরবাসযোগ্যকরেযাবআমি
নবজাতকেরকাছেএআমারদৃঢ়অঙ্গীকার।
কবি আগামী দিনের শিশুদের জন্য যেমন পৃথিবী রেখে যেতে চেয়েছিলেন আমরা তেমন পৃথিবী পাইনি। দিন যাচ্ছে আর পৃথিবী তার রূপ হারাচ্ছে। ক্রমাগত ভাবে পৃথিবী ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌছে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে একদিন এ পৃথিবীতে মানুষ বসবাস করতে পারবে না। একদিন এ পৃথিবী হয়ে উঠবে মৃত্যুপুরী। পৃথিবীর জলবায়ু বদলে যাচ্ছে। পানি ও বাতাস দুষিত হচ্ছে। শহর থেকে গ্রাম বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। নগরায়নের এই যুগে পৃথিবী তার স্বরুপ হারাচ্ছে। এ নিয়ে আমাদের মত বড়রা চিন্তা না করলেও পৃথিবীতে কিছু শিশু কিশোর কিশোরী পৃথিবী বাঁচানোর জন্য সংগ্রাম করছে তাদের মধ্যে গ্রেটা থুনবার্গ,ফাতিহা আয়াত, সুবহা সাফায়েত সিজদা এবং রেবেকা শবনম অন্যতম। তাদের সম্পর্কে আজ আমরা আলোচনা করবো।
গ্রেটাথুনবার্গ:
পরিবেশ আন্দোলনের সাথে যুক্ত কিশোর কিশোরীদের মধ্যে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে আলোচিত নাম গ্রেটা থুনবার্গ। ফিনিক্স পাখির মত তার গল্প আজ বিশ্বব্যাপী আলোচিত। ছোট্ট মানুষটি যখন কন্ঠ উচিয়ে বলে “ হাউ ডেয়ার ইউ” তখন বিশ্ব নেতারা নড়ে চড়ে বসে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে সফল হয়েছেন গ্রেটা। বিষয়টিকে বৈশ্বিক আন্দোলনে রূপান্তরিত করেছেন। বলা যায়, এই আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন কৈশোরেই। গ্রেটার জন্ম ২০০৩ সালের ৩ জানুয়ারি সুইডেনের স্টকহোমে।তার মা ম্যালেনা আর্নম্যান একজন অপেরা গায়িকা এবং বাবা স্ভান্তে থুনবার্গ একজন অভিনেতা এবং রসায়নে নোবেল পুরস্কার জয়ী বিজ্ঞানী স্ভান্তে আরহেনিয়াসের উত্তরসূরি।
৮ বছর বয়সে তাঁর ‘অ্যাসপারজার সিনড্রোম’ ধরা পড়ে, যা একধরনের বিকাশগত ব্যাধি। এই ব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষেরা একটা ধারণা বা আগ্রহের ওপর গভীরভাবে মনোনিবেশ করে। গ্রেটার ক্ষেত্রে এই বিষয় ছিল জলবায়ু পরিবর্তন। গ্রেটা বলেন, ‘আমার অনেকটা এমন মনে হচ্ছিল যে আমি যদি জলবায়ুর পরিবর্তন সম্পর্কে প্রতিবাদ না করি, তাহলে ভেতরে ভেতরে আমি যেন মারা যাচ্ছিলাম।’
এর কয়েক বছরের মধ্যে গ্রেটা নিজেকে পরিবর্তন করে। হয়ে যায় নিরামিষাশী এবং বিমান ভ্রমণ থেকে বিরত থাকে। মা–বাবাকেও নিরামিষাশী হতে এবং বিমানে ওঠা এড়াতে রাজি করায়। গ্রেটা ২০১৮ সালে স্থানীয় এক পত্রিকায় জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে রচনা প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পায়। একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে সুইডেনের জাতীয় নির্বাচনের তিন সপ্তাহ আগে পার্লামেন্টের সামনে বসে পড়ে গ্রেটা। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আইনপ্রণেতাদের উদ্বুদ্ধ করতে ‘স্কুল স্ট্রাইক ফর ক্লাইমেট’ লেখা একটা ব্যানার নিয়ে শুরু করে অবস্থান কর্মসূচি। এই আন্দোলন গ্রেটা একাই শুরু করেছিল। পরদিন থেকে অনেকেই তাঁর পাশে দাঁড়াতে শুরু করে। তাঁর এই আন্দোলন প্রচারমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এরপর ‘ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার’ নামে একটা আন্দোলন শুরু করে। প্রতিবাদ স্বরুপ প্রতি শুক্রবার স্কুলে অনুপস্থিত থাকে গ্রেটা। তাঁর এই অভিনব প্রতিবাদও অল্প দিনের মধ্যে সুইডেন এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশে ছড়িয়ে পড়ে। গ্রেটা ইউরোপজুড়ে ট্রেন ভ্রমণ শুরু করে এবং বিভিন্ন স্থানে বক্তৃতা দিতে থাকে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ব্যর্থতার জন্য বিশ্ব নেতাদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে নিন্দা করে আবেগপূর্ণ বক্তৃতা করেছেন সুইডেনের কিশোরী জলবায়ু আন্দোলনকারী গ্রেটা থানবার্গ। নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘের সদর দফতরে সংস্থাটির সেই জলবায়ু সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন অর্ধশতাধিক বিশ্বনেতা। গ্রেটা তার কন্ঠকে যথাসম্ভব উচু করে দৃঢ় কন্ঠে ঘোষণা করেছে ‘বাস্তুসংস্থান ধ্বসে পড়ছে, গোটা বিশ্ব আজ গণবিলুপ্তির (মানুষসহ সকল প্রাণী) হুমকির মুখে অথচ আপনারা সবাই টাকার কথা বলছেন, আপনারা যার যার দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে ভাবছেন। এই সাহস আপনাদের হয় কীভাবে?’বক্তৃতার শুরুতেই প্রচন্ড আক্রমণাত্মকভাবে কথা বলা শুরু করেন গ্রেটা থুনবার্গ। বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে গোটা বিশ্বের তরুণ ও যুব সমাজের হয়ে সে কী বার্তা দিতে চায় এমন প্রশ্ন করা হলে গ্রেটা থুনবার্গ বলে, ‘আমাদের বার্তা হলো, আমরা আপনাদের ওপর নজর রাখছি।’
গ্রেটা থুনবার্গ তার বক্তব্যে গোটা বিশ্বের তরুণ সমাজের সঙ্গে বিশ্বনেতারা প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে বলে অভিযোগ করে। সরকারপ্রধানদের উদ্দেশে সে বলে, ‘আপনারা আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করছেন, আমাদের ব্যর্থ করে দিচ্ছেন। আপনাদের বিশ্বাসঘাতকতা বুঝতে পারছে যুবসমাজ।’ গ্রেটা থুনবার্গের আশঙ্কা, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গোটা পৃথিবী কী মারাত্মক ঝুঁকির মুখে আছে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই তা বলে আসলেও এবারের সম্মেলনেও বৈশ্বিক এই ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন কোনো পরিকল্পনা বিশ্ববাসীর সামনে হাজির করতে পারবেন না বিশ্বনেতারা। বিশ্ব নেতাদের চোখে চোখ রেখে এই কিশোরী বলেছে ‘আপনারা আপনাদের ফাঁকা বুলি দিয়ে আমার স্বপ্ন এবং আমার শৈশব চুরি করেছেন। ভবিষ্যত প্রজন্মের চোখ আপনাদের এখন আপনাদের ওপর। যদি আপনারা আমাদের ব্যর্থ করতে চান তাহলে আমি বলছি, আপনাদের আমরা কখনোই ক্ষমা করবো না।’ গ্রেটা আরও বলেছে “এই সবকিছুই ভুল। আমার এখানে থাকা উচিত নয়। মহাসাগরের ওপারের স্কুলে আমার থাকার কথা। আমরা এভাবে চলতে দেব না।’ রাষ্ট্র প্রধানদের উদ্দেশে সে বলে, ‘তারা শিশুদের অধিকার রক্ষায় কাজ করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিলেও আদৌ তারা কিছুই করছে না।
জার্মানিতে একটি কয়লা খনি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে আটক হয়েছিল প্রখ্যাত সুইডিশ পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ। অবশ্য আটকের কয়েক ঘন্টা পরই তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। মুক্তির পর সে বলেছিল ‘জলবায়ু রক্ষার আন্দোলন কোনো অপরাধ নয়।’
ওয়াঙ্গারি মাথাইয়ের মৃত্যুদিবস ছিল ২৫ সেপ্টেম্বর। খুব নীরবে দিনটি চলে গেল। ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন’ সপ্তায় বিশ্ব সংবাদমাধ্যম গ্রেটা থুনবার্গকে নিয়ে এতই ব্যস্ত থাকল যে মাথাইয়ের নামও শোনা গেল না কোথাও! পরিবেশসচেতনতা আন্দোলনে নতুন ঢেউ আনতে পারায় গ্রেটা ধন্যবাদার্হ নিঃসন্দেহে! গ্রেটা কিশোরী হওয়ায় তার প্রতি দুনিয়াও সহানুভূতিশীল। এ বছর বিবিসির জরিপেও গ্রেটা বিশ্বের ১০০ জন অনুপ্রেরণাদায়ী নারীর মধ্যে অন্যতম একজনের স্বীকৃতি পেয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় ভূমিকা রাখার জন্য গ্রেটা অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছে। ২০১৯ সালে মনোনীত হয়েছিল শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য। ২০১৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর মাত্র ১৭ বছর বয়সী গ্রেটা টাইম ম্যাগাজিনের বর্ষসেরা ব্যক্তিত্ব নির্বাচিত হয়। ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে এই গৌরব অর্জন করে গ্রেটা থুনবার্গ। টাইম ম্যাগাজিন তাঁকে ‘দ্য পাওয়ার অব ইয়ুথ’ উপাধিতে ভূষিত করে। স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো গ্রেটার প্রশংসা করেছেন এই বলে যে সে যা অর্জন করেছে তা আর কেউ করতে পারেনি। গ্রেটাকে তিনি বলেছেন, “তুমি পৃথিবীকে জাগিয়ে তুলেছ। আমি তোমার কাজে গর্বিত।”
ফাতিহাআয়াত:
ফাতিহা আয়াত যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বসবাসকারী বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত লেখক, শিশু অধিকার কর্মী ও একজন জলবায়ু পরিবর্তন সংস্কারক। সে CHIL&D নামের একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা যেখানে জলবায়ু, স্বাস্থ্য, তথ্য, শিক্ষা ও উন্নয়ন নিয়ে কাজ করে। ফাতিহা আয়াত ২০১১ সালের ১৩ অক্টোবর বাংলােদেশে জন্মগ্রহণ করে।আমেরিকার বুকে নিজেকে একটুকরো বাংলাদেশ করে রেখেছে।তার বর্তমান বয়স ১৩ বছর। ফাতিহার বয়স যখন সাত বছর সেই বয়স থেকে ফাতিহা নিজে শেখে আর অন্যদের শেখায়। যে বয়সে আমরা বাসায় মেহমান আসলে লজ্জা আর ভয়ে লুকিয়ে থাকি সেই বয়সে সে জাতিসংঘের সদরদপ্তরে বিখ্যাত সব মানুষের সামনে বক্তব্য দিয়েছে।ওর বক্তব্য শুনে অন্যরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছে।
শুধুমাত্র ২০২৩ সালেই ফাতিহা আয়াত এখন পর্যন্ত তিন বার জাতিসঙ্ঘ সদর দপ্তরে বক্তব্য রেখেছে। এগুলো ছিল বিশ্ব পানি সম্মেলন, ইকোসক ইয়ুথ ফোরাম, ১৭তম আন্তর্জাতিক মানবাধিকার যুব সম্মেলন।বিশ্বের নানা প্রান্তে ফাতিহা আমন্ত্রিত হয়ে শিশু অধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন রোধ সহ নানা বিষয়ে বক্তব্য দিয়ে থাকে। অধিকার প্রতিষ্ঠায় কথা বলে।কিছুদিন আগেই সে “চেঞ্জ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ” শীর্ষক তার প্রথম টেডএক্স বক্তব্য রেখেছে নিউইয়র্কের ইরভিংটনে। এছাড়াো এস্টনিয়ার রাজধানী ট্যালিনে আয়োজিত “লেটস ডু ইট” কনফারেন্সে সে বক্তব্য । তার অন্যান্য বক্তব্যের মধ্যে রয়েছে ইউএন গ্লোবাল কম্প্যাক্ট ও প্যাসিফিক ইন্সটিটিউট আয়োজিত “ওয়াটার ম্যান্ডেট” সেমিনার,কার্বন ডিস্ক্লোজার প্রজেক্ট আয়োজিত “ওয়াটার সিকিউরিটি” কনফসারেন্সে বক্তব্য এবং সাস্টেইনেবল ডেভেলপ্নেন্ট সলিউশন্স নেটওয়ার্ক আয়োজিত “হিউম্যান প্ল্যানেট ফোরাম” অনুষ্ঠানে রাখা বক্তব্য অন্যতম।
গত বছর ২৬ সেপ্টেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য পুত্র সজিব ওয়াজেদ জয়ের উপস্থিতিতে ফাতিহা জাতিসংঘে বক্তব্য দিয়েছে। আর এ বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে একই দিন একই বিষয়ে জাতিসংঘে বক্তব্য রেখেছে। নানা বিষয় নিয়ে ফাতিহা সচেতনতা গড়ে তুলতে কাজ করছে। আমরা যখন গাছ কাটি,আইসক্রিম খেয়ে যেখানে সেখানে খোসা ফেলে পরিবেশ নষ্ট করি, ছোট্ট ফাতিহা তখন পৃথিবীকে বাঁচানোর জন্য প্রতিবাদ করে। এরই প্রেক্ষিতে গত ১২ আগস্ট বিশ্ব যুব দিবসের অনুষ্ঠানে সে জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছে। সেখানে সে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা যুবকদের দ্বারা বনাঞ্চল ধ্বংস ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে এর ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরেছে। এছাড়াও ১৬তম আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সম্মেলন, ইউএন ডে এবং উইমেন পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাজেন্ডাতে অংশ নিয়ে শিশু নির্যাতন, লিঙ্গ বৈষম্য, পারিবারিক সহিংসতায় শিশুদের সমস্যা, শরণার্থী শিশুদের অমানবিক জীবন নিয়ে বক্তব্য তুলে ধরেছে।ওর বয়সীরা যখন কথা বলতেই ভয় পায় ফাতিহা তখন শিশুদের আনন্দময় শিক্ষার অধিকার নিয়ে কথা বলে।
বিশ্বব্যাপী শিশুদের দুঃখ-দুর্দশার কথা শুনে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বড় হয়ে সে এমন কিছু করবে যেন আর কোনো শিশু ক্ষুধা বা তৃষ্ণায় একটি দিনও না কাটায়। ফাতিহার মতে ‘সন্তানকে মুখস্থ করাবেন নাকি আবিষ্কারের নেশা ধরিয়ে দেবেন সেই সিদ্ধান্ত আপনার’ । ছোট্ট ফাতিহা ক্ষুধা,দারিদ্র ও শিশু কিশোর কিশোরীদের জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়ার জন্য সবাইকে আহ্বান জানিয়েছে। এই পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হলে ফাতিহার সাথে কন্ঠ মেলাতে হবে।
রেবেকাশবনম:
গ্রেটা থুনবার্গ আর ফাতিহা আয়াতের সাথে কন্ঠ মিলিয়ে রেবেকা শবনম বিশ্বকে বাঁচানোর জন্য আওয়াজ তুলে বিশ্বব্যাপী আলোচিত হচ্ছে। ফাতিহার মতই সেও বিশ্বের প্রবল প্রতাপশালী দেশ আমেরিকার মাটিতে দাঁড়িয়ে যখন বলছে আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি, তখন লাল সবুজের পতাকাটি আরো খানিকটা সম্মানিত হচ্ছে।
মাত্র ছয় বছর বয়সে মা-বাবার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমায় রেবেকা শবনম। গত ১০ বছরে দেশের স্মৃতি তার অন্তর থেকে ম্লান তো হয়ইনি বরং দেশের কল্যাণের ভাবনায় তার পরিকল্পনা দৃঢ়তর হয়েছে। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অত্যন্ত সপ্রতিভ ষোড়শী রেবেকা। আর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সে জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের ঝুঁকি ও তা মোকাবেলার প্রয়োজনীয়তা বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার জন্য নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছে।
এইতো সেদিনের কথা। স্পেনের মাদ্রিদে চলছিল বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের অধিকার আদায়ে ওই সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একদিকে বাংলাদেশ সরকারের হয়ে প্রধানমন্ত্রী যেমন চেষ্টা করে যাচ্ছেন, অন্যদিকে তেমনি আন্দোলনকারীদের কাতারে থেকে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে রেবেকা। সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সে ম্যানহাটানে প্রায় দুই লাখ মানুষের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল। জলবায়ু পরিবর্তনরোধে সোচ্চার সুইডিশ কিশোরী গ্রেটা তুনবার্গের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ম্যানহাটানে জড়ো হওয়া আন্দোলনকারীদের সামনের সারিতে ছিল রেবেকা শবনম। তাকে নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা।তারপরই সে রাতারাতি পরিচত হয়ে ওঠে বিশ্বের কাছে।
বর্তমানে নিউ ইয়র্কে বসবাসরত শবনমের চেষ্টা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশ কতটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, সে বিষয়ে সবাইকে জানানো। নিউ ইয়র্কে হাজারো মানুষের সামনে সে বলেছে, ‘আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি, যা জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম।’ বক্তৃতায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরে সে।
আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রেবেকা বলে, ‘ভেবেছিলাম, যখন বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হবে তখন সবাই চুপ থাকবে। তবে সবার সাড়া দেখে আমি নিজেই অবাক। এটা শুধু পরিবেশগত সংকট না, এটা মানবাধিকার সংকটও। বাংলাদেশের নারীরা পাচারের শিকার হয়। আর এটা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আরো বেড়েছে। আমরা বাংলাদেশে থাকা নারী ও রোহিঙ্গাদের জানাতে চাই, তাদের জীবনের জন্য বিশ্বজুড়ে আন্দোলন করছি আমরা। এখনও স্কুলজীবন শেষ হয়নি রেবেকা শবনমের। সে মনে করে, সামনে হাঁটতে হবে আরও অনেক পথ। ভয়াবহ ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের নারী, শিশু ও রোহিঙ্গাদের জন্য বিশ্বের দরবারে কীভাবে সুবিচার প্রত্যাশা করা যায়, সেটাই তার চিন্তার মূল বিষয়। রেবেকা বলেছে, জলবায়ু আন্দোলনে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ কেউ যেন ভুলে না যান, তা নিশ্চিত করতে লড়াই চালিয়ে যাবে সে।আমাদের দেশে এমন রেবেকার সংখ্যা নেহায়েত কম নয়,যারা পৃথিবীকে বাঁচাতে চায়।শুধু জ্বলে ওঠার অপেক্ষায়।
এভাবেই দুনিয়া জুড়ে তিন কিশোরী নিজ নিজ অবস্থান থেকে সুন্দর ও নিরাপদ পৃথিবীর দাবিতে কাজ করে যাচ্ছে। তারা হয়তো সুকান্তর সেই কবিতা কখনো পড়েনি কিন্তু এই বয়সেই হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছে যে এ পৃথিবীকে বাস যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। এবং আশা করা হলো তারা অনেকটা সফলও হয়েছে। নাসার তথ্য মতে গত কয়েক বছরে বিশ্বব্যাপী যে পরিবেশ আন্দোলন গড়ে উঠেছে গ্রেটা থুনবার্গের উদ্যোগে তার কারণে আগের চেয়েও পৃথিবী অনেক বেশি সবুজ হয়েছে। সুতরাং আমরা সুন্দর একটি পৃথিবী গড়ে উঠবে সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করতেই পারি এবং সেই সাথে আমরা চাই পৃথিবীর ঘরে ঘরে এমন আলোকিত শিশু কিশোর কিশোরীর জন্ম হোক। যারা নিজেরাই নিজেদের জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তুলবে এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্যও একটি নিরাপদ, সবুজ পৃথিবী রেখে যাবে।
১৫ অক্টোবর ২০২৩
লেখাটির অংশবিশেষ প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক খবরের কাগজ পত্রিকায় ২৪ অক্টোবর ২০২৩ এ। প্রকাশিত লেখার লিংক