Home Blog Page 2

আমি যদি দুটো লাইক আশা করি তবে প্লিজ গোস্বা করবেন না

ফেসবুকে কিছু পোস্ট করে আমি যদি দুটো লাইক,কমেন্ট,শেয়ার আশা করি তবে প্লিজ গোস্বা করবেন না। আপাতদৃষ্টিতে প্রতিভাহীন মানুষ যদি হাবিজাবি পোস্ট করে লাইক,কমেন্ট,শেয়ার আশা করে তবে তা হয়তো দৃষ্টিকটু লাগতেই পারে। ভাবতে পারেন এ কেমন মামাবাড়ির আব্দার যে হাবিজাবি পোস্ট করে লাইক কমেন্ট আশা করছেন?

না প্লিজ এমন করে বলবেন না। আমাকে একটু সুযোগ দিলে আমি অবশ্যই প্রমাণ করতে পারবো যে আমি হাবিজাবি পোস্ট করলেও আপনাদের কাছ থেকে লাইক কমেন্ট শেয়ার আশা করতে পারি। সেই অধিকার আমার আছে এবং এর পেছনে শক্ত যুক্তিও দিতে পারবো। যেহেতু আপাতদৃষ্টিতে প্রতিভাহীন মানুষ তাই হাবিজাবি পোস্ট করা ছাড়া আর কিইবা করতে পারি।

এখন আসি অন্য প্রসঙ্গে। যাদের প্রতিভা নেই তারাতো হাবিজাবিই পোস্ট করবে। কিন্তু যারা প্রতিভাবান তাদের কাছ থেকে আমরা কী আশা করি? নিশ্চই তারা যে বিষয়ে প্রতিভাবান সেই বিষয়ের কিছু পোস্ট আশা করি। তাছাড়া তারাতো সেলিব্রেটি। তাই তাদের প্রতি আমরা ভক্তকূল অনেকটা চাতকের মত চেয়ে থাকি। শুরুটা কাকে দিয়ে করবো বুঝতে পারছি না। যেহেতু আমি এক উপখ্যান লিখতেছি তাই শুরুটা বোধহয় লেখকদের নিয়েই করা যেতে পারে।

আলোচিত সমালোচিত লেখক আনিসুল হক। যেহেতু টুকটাক বই পড়ার অভ্যাস আছে তাই সব ঘরানার লেখক কবিদের বইই পড়তে চেষ্টা করি। আনিসুল হকেরও বেশ কিছু বই পড়েছি। কোনো বই ছোটদের জন্য লেখা আর কোনোটা বড়দের জন্য। তবে আর যাই হোক আমি কিন্তু তার লেখ “ আপা তোমার আব্বাকে একটু আব্বা বলে ডাকি ও অন্যান্য” বইটি কিন্তু আমি পড়িনি। সে যাই হোক মাঝে মাঝে তার পোস্ট আমার সামনে চলে আসে। তিনি খ্যাতিমান লেখক। বেশ কিছুদিন ধরে দেখছি তিনিও হাবিজাবি পোস্ট করতেছেন। যেহেতু ফেসবুক নিয়ে ঘাটাঘাটি করি আর কিছু মানুষের ফেসবুক পেজ পরিচালনা করি। তাই আমার মনে হয়েছে লেখক আনিসুল হক মূলত ফেসবুকের রিচ,এঙ্গেজমেন্ট ধরে রাখার জন্য রোজ কিছু না কিছু পোস্ট করতে হয় তাই করতেছেন। একটা উদাহরণ দিই। না স্যরি একটা না দুটো উদাহরণ দিই। তিনি একটা পোস্টে পাটকাঠির ছবি শেয়ার করে লিখেছেন আমাদের এলাকায় এটাকে এই নামে ডাকে। আপনাদের এলাকায় এটাকে কী বলে? আরেকটা পোস্টে কয়েকজন মেয়ে সেলিব্রেটির ছবি দিয়ে জানতে চেয়েছেন এনাদের মধ্যে কাকে কাকে চিনতে পারলেন? আমি পোস্ট দেখার পাশাপাশি পোস্টের মন্তব্যগুলো খুব আগ্রহ নিয়ে পড়ি।

আপনারা নিশ্চই জানেন এই সব পোস্টের চেয়ে এর কমেন্ট সেকশন বেশি মজার হয়ে থাকে। আমি ঠিক জানি না লেখক অথবা লেখকের পেজের যদি একাধিক এডমিন থাকেন তারা সেই সব কমেন্ট পড়েন কি না। পড়লেতো মাথা ঠিক থাকার কথা না। কমেন্ট সেকশন বন্ধ করে রাখার কথা। কারণ অধিকাংশ কমেন্টই বাজে এবং ইঙ্গিতপূর্ণ। যেমন একজন লিখেছেন এনাদের সম্পর্কেতো আপনারই ভালো জানার কথা। আপনি লেখক ও সাংবাদিক। এনাদের সাথেই ওঠাবসা। আমরা নাটক সিনেমা দেখে আর তাদের কতটুকু্ইবা চিনতে পারি? লোকটা কী মিন করেছে তা নিশ্চই খুলে বলা লাগবে না। তো এর চেয়ে ভয়াবহ সব মন্তব্য আছে সেই সব পোস্টে। যেহেতু যে কেউ মন্তব্য করতে পারছে তার মানে তিন ঘটনা ঘটতে পারে। এক. লেখক বা তার এডমিন এসব পড়ে না। দুই. তাদের চামড়া মোটা। তাই অপমান গায়ে লাগে না। তিন. তারা মূলত পজিটিভ হোক বা নেগেটিভ হোক আলোচনা হচ্ছে,পেজের রিচ এবং এঙ্গেজমেন্ট বাড়ছে এটাতেই খুশি।

তো লেখক আনিসুল হকের মত বিখ্যাত মানুষ লেখালেখি বিষয়ে বা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বাদ দিয়ে তার পেজে হাবিজাবি পোস্ট করে লাইক কমেন্ট পেতে চাইলে আমাকে প্লিজ দোষ দিতে পারবেন না। আমি ভাই সাধারণ মানুষ। প্রতিভার অভাবে কিছু করতে পারি না। হাবিজাবি পোস্ট করে দুটো লাইক চাইলে প্লিজ দয়া করে লাইক দিয়েন। শেয়ারও দিয়েন। পারলে কমেন্টও করেন। এর বিনিময়ে যদি একটু সেলিব্রেটি হয়ে যাই।

লেখকের উদাহরণতো দিলাম। এবার একটু গান হয়ে যাক। কী বলেন? না ভাই আমি গান শোনাতে পারবো না। মাহফুজুর রহমানই যেখানে গান শোনানো ছেড়ে দিয়েছেন সেখানে আমিতো আমিই। ইয়ে মাহফুজুর রহমান গান ছেড়ে দেওয়ার আগে তাকে কিন্তু ইভা রহমানই ছেড়ে গেছে। যদিও গান বাংলার তাপসকে তার প্রিয়তমা ছেড়ে গেছে কি না বলতে পারছি না। অন্যদিকে হিরো আলমকেও বহুদিন কোনো নতুন গান করতে দেখি না। প্রতিভার ছড়াছড়ি মানুষগুলোর এ কী হাল হয়েছে? তারা কেন আমাদের মত সাধারণ মানুষের কাতারে নেমে আসছে? যাই হোক আমাদের প্রিয় থেকে প্রিয় শিল্পী হলেন কনকচাপা। তার কন্ঠে যাদু আছে এটা অস্বীকার করার মত কেউ আছে কি না জানি না। আমি তার পোস্ট মাঝে মাঝে দেখি। মুগ্ধ হই। জানেন এ জন্য কনকচাপাকে আমি আন্তরিক ভাবে ধন্যবাদ দিতে চাই কারণ তার ফেসবুক পোস্ট দেখে দেখে আমরা অনেকেই শাক সবজি চাষ করা শিখতে পারছি,রান্না করা শিখতে পারছি। তিনি গানের মানুষ। তার পোস্টে গান রিলেটেড কিছু তেমন দেখা যায় না। তার যে গানের ভূবনে পথচলা সেই স্মৃতি কথা যদি তিনি মুখে ভিডিওর মাধ্যমে শেয়ার করতেন কিংবা লিখে পোস্ট করতেন তবে সেটাও শেষ হতে এক দশক পেরিয়ে যেতো। কিন্তু না না না এসব কেন আমি বোকার মত আশা করতেছি? তিনি বরং আমাদেরকে নতুন কিছুর সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছেন এটাই বা কম কিসে?

যাই হোক লেখক আর শিল্পীদের কথা বলার পর নায়িকারা যদি আবার মন খারাপ করে তাই তাদের প্রতিনিধির কথাতো বলতেই হবে তাই না? হুম শাবনুর। জনপ্রিয়তায় যিনি এই দেশের সর্বকালের সেরা নায়িকাদের অন্যতম সেই শাবনুর অভিনয় থেকে হারিয়ে গেছেন বহু আগে। এখন তিনি দেশের বাইরে থাকছেন। মাঝে মাঝে ছবি শেয়ার করেন আর তিনিও কনকচাপার মতই রান্না বাগান করা এসব বেশ এনজয় করেন আর আমাদের সাথে শেয়ার করেন। আহ প্রতিভাবান প্রতিভাবতীরা যখন তাদের প্রতিভার বিষয় বাদ দিয়ে হাবিজাবি (দুঃখিত এগুলো তাদের নিজের পছন্দের বিষয়, আমি কেন নাক গলাচ্ছি?) বিষয় শেয়ার করলে আমার মত অতি সাধারণদের অবস্থা একবার ভাবুন।

ভাই এই লেখাটা যারা পড়তেছেন তারাই বলুন আপনারা কোন আক্কেলে আমার কাছ থেকে বিরাট কিছু আশা করেন? আমিতো প্রতিভাবান কেউ না।

মানুষের মন বদলাতে সময় লাগে না। কেন্দে দিয়েছি বলা সিমরিন লুবাবাকে নিয়ে রোজ মানুষ ট্রল করতো এখন তার পরিবর্তন দেখে মাথার তাজ করে রাখার মানুষ অনেক। আবার হুট করে সব প্রেমিকের হৃদয় ভেঙ্গে খানখান করে দিয়ে সিমরিন যখন বিয়ে করেছে ঘোষণা দিলো তখন পুরো রাষ্ট্র দুই পক্ষ হয়ে গেলো। কেউ বাল্যবিবাহ হয়েছে বলে সমালোচনা করলো আর কেউ এপ্রিশিয়েট করলো। গুড গুড।

পলাতক আওয়ামীলীগ নেতা হাসান মাহমুদের কথা দিয়ে শেষ করি। তিনি বলেছেন শেখ হাসিনা পালায়নি (যেমনটা আগে শেখ হাসিনা বলেছিলেন শেখ হাসিনা পালায় না) তো তিনি দেশের বাইরে কেন? হাসান মাহমুদ বলেছেন শেখ হাসিনা রাষ্ট্রীয় প্রটোকলে রাষ্ট্রীয় হেলিকপ্টারে স্বদেশ ত্যাগ করেছেন ।

আমিও এখন লেখা থেকে পলায়ন থুক্ক প্রটোকল সহ সরে পড়ি। আপনি যদি সময় নিয়ে পুরো লেখাটা পড়ে থাকেন তাহলে অনেক ধন্যবাদ। জানি আপনি লাইক দিতে ভুলে গেছেন,কমেন্ট করতেও ভুলে গেছেন। আমার এক ছোট্ট বন্ধু ইররামের কথা মনে পড়লো। সে তার এক ভিডিওতে বলেছিল “ আমার আত্মীয় স্বজনরা কেউ আমার পোস্টে লাইক দেয় না। তারা ভাবে,তারা মনে করে, তাদের একটা লাইকে আমি সেলিব্রেটি হয়ে যাবো”। কথাটা বার বার মনে পড়তেছে। হায় একটা লাইকের জন্য হাজার হাজার শব্দ লিখলাম কিন্তু লাইক জুটলো না,কমেন্ট জুটলো না।

অন্যদিকে অমুক ভাই তমুক আপা সকাল সন্ধ্যা গুডমর্নিং গুড ইভিনিং লিখে হাত উচু করে একটা ছবি পোস্ট করলে দেখা যায় তিন হাজার লাইক দেড় হাজার শেয়ার আর হাজার খানেক কমেন্ট পড়ে গেছে। ইয়ে ভাই ধার চাচ্ছি না চেয়েচিন্তে দুটো লাইক চাইতেছি। দিবেন প্লিজ? দিন না প্লিজ। একটা দুটো লাইক দিলেতো আপনাদের কমবে না।

পাত্রী পক্ষ এখনো বলেনি ছেলের ফেসবুক পোস্টে কয়েক হাজার লাইক কমেন্ট না পড়লে কন্যাদান করবো না। এমনিতেই সব ক্রাইটেরিয়াতেই ফেইল করেছি। এটাকেও তারা যদি ক্রাইটেরিয়া ধরে তবে হাতে হারিকেন থুক্কু কবি বদরুল চৌধুরীর ভাষায়তো আর বলতে পারছি না যে হাতে মিসাইল ধরে থাকা লাগবে।

আচ্ছা একটা আন্দাজ করি দেখি মেলে কি না। এই পোস্টে যদি ১০০ এর বেশি লাইক আর ১০০ এর বেশি কমেন্ট পড়ে তবে আমি একজনকে একটা বউ উপহার দেবো। বই বানান ভুল করে বউ লিখেছি জানি কিন্তু ঠিক করতে ইচ্ছে করছে না। যেখানে বড় বড় লেখক “ কাপড় পড়ে” আর ” বই পরে” সেখানে আমার মত সাধারণ মানুষের বানান ভুল হলে কী বা যায় আসে। ইয়ে মানে দুটো বই পড়ে দেখতে পারেন “ ইন্টারের মাইয়ার লগে প্রেম” আর “ দুধ চা খেয়ে তোকে গুলি করে দেবে”।

অবশ্য ইচ্ছে হলে আনিসুল হকের বিখ্যাত বই “ আপা তোমার আব্বাকে একটু আব্বা বলে ডাকি” বইটাও পড়ে দেখতে পারেন। শেখ রাসেল শেখ হাসিনাকে এই কথা বলেছিল বলে শুনেছি।

আর হ্যা বনলতা এক্সপ্রেস সিনেমা দেখার আগে সিনেমার মূল গল্প লেখক হুমায়ূন আহমেদের লেখা “কিছুক্ষণ” উপন্যাসটা পড়ে দেখবেন। ভালো লাগবে গ্যারান্টি দিতে পারি। হুমায়ূন আহমেদের মত লেখক গোটা পৃথিবীতে আর একটাও নেই।

১৩ এপ্রিল ২০২৬

কালকে পহেলা বৈশাখ। পান্তা ইলিশ খেতে চাইলে আজকেই এই পোস্ট পড়ার পর ভাতে পানি দিয়ে রাখেন। ইলিশ ফ্রিজে না থাকলে গিয়ে দুই হাজার টাকা কেজিতে কিনে আনেন।

ও হ্যা কয়েক মাসেই প্রিয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার ৪১ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ নিয়ে ফেলেছেন এবং ইউনুস সরকারকে গালি দেওয়া লোকজনের জানা উচিত এস আলম গ্রুপের মত যারা ছিল তারা যেন আবার তাদের অবস্থানে ফিরে আসতে পারে সেই ব্যবস্থাও শুনলাম পাকা হয়ে গেছে। গুড। চারদিকে ফেসবুকে ভিডিওতে সাধারণ মানুষকে যেভাবে বলতে শুনতেছি শেখ হাসিনাই ভালো ছিল। তাতে কিন্তু ডাল মে কুচ কালা হে না কী যেন কয় সেইডা লাগতেছে।

গৃহবন্দী ইমাম

ইরাকের বাগদাদ নগরী। পৃথিবী বিখ্যাত এক শহর। জ্ঞানের শহর। দূর দূরান্ত থেকে মানুষ আসে জ্ঞানার্জন করার জন্য। অন্যান্য নানা কারণেই তখন বাগদাদ ছিল বিখ্যাত এক শহর। ব্যবসার কেন্দ্র। বাগদাদের আকাশে সেদিন গুচ্ছ গুচ্ছ মেঘ সূর্যটাকে আড়াল করে রাখতে ব্যস্ত। সকালে সূর্যের আলো যখন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ে বাগদাদ শহরের উপর, তখন প্রথম যে জিনিসটি চোখে পড়ে তা হলো বিশাল টাইগ্রিস নদী। নদীটি শহরের বুক চিরে বয়ে গেছে, ঠিক যেমন মানুষের শরীরের মাঝখান দিয়ে মেরুদন্ড গিয়েছে। টাইগ্রিস নদীটিও যেন তেমনি বাগদাদ শহরের মেরুদন্ড। এই নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে বাগদাদ নগরী।

টাইগ্রিসের পানি কখনো গভীর নীল, কখনো রোদে সোনালি হয়ে ওঠে। ভোরবেলায় নদীর উপর হালকা কুয়াশা ভেসে থাকে। দূরে ছোট ছোট নৌকা ধীরে ধীরে ভেসে চলে। কোথাও জেলেরা জাল ফেলছে, কোথাও বণিকদের মাল বোঝাই নৌকা শহরের দিকে এগিয়ে আসছে।

নদীর দুই তীরে ছড়িয়ে আছে বাগদাদের জীবন। পূর্ব তীরে জনবহুল বাজার, মসজিদ আর মাদ্রাসা। পশ্চিম তীরে খলিফার প্রশাসনিক কেন্দ্র, প্রাসাদ ও দপ্তর। দুই তীরকে যুক্ত করেছে কাঠের সেতু আর নৌকা।

দিনের বেলায় বাগদাদ যেন এক চলমান পৃথিবী। সরু গলিতে মানুষের ভিড়, বাজারে মসলা ও কাপড়ের গন্ধ। নামাজের সময় হলে চারদিক থেকে ভেসে আসে আজানের ধ্বনি, যা নদীর জলের উপর দিয়ে প্রতিধ্বনিত হয়ে পুরো শহরে ছড়িয়ে পড়ে।

কিন্তু সন্ধ্যা নামলে শহরের রূপ বদলে যায়। সূর্য যখন টাইগ্রিসের জলে ডুবে যেতে থাকে, তখন নদীর উপর পড়ে লালচে আলো। সেই আলোয় শহরের মিনারগুলো দীর্ঘ ছায়া ফেলে। নৌকার দাঁড় টানার শব্দ আর নদীর ঢেউয়ের মৃদু ছলাৎছল শব্দ মিলিয়ে এক অদ্ভুত শান্তি তৈরি করে।

খলিফার প্রাসাদসমূহ দূর থেকে দেখলে মনে হতো যেন একটি ছোট শহর। উঁচু প্রাচীর, বিশাল ফটক, আর ভেতরে অসংখ্য প্রাঙ্গণ। প্রাসাদের প্রধান ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে সশস্ত্র প্রহরীরা। তাদের হাতে বর্শা, কোমরে তলোয়ার। ফটকের ওপরে খোদাই করা জ্যামিতিক নকশা ও আরবি ক্যালিগ্রাফি। ভেতরে ঢুকলেই দেখা যায় প্রশস্ত উঠান, মাঝখানে ফোয়ারা, চারপাশে খেজুর ও কমলালেবুর গাছ। প্রাসাদের করিডোরগুলো দীর্ঘ। দেয়ালে দেয়ালে ঝোলানো আরবী ক্যালিগ্রাফি। দরবারের মাঝখানে পারস্যের কারুকাজ করা কার্পেট।

সেই শহরেই বাস করতেন এক বিজ্ঞ আলেম,এক খোদাভীরু ইমাম। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে মানুষ তার কাছে ছুটে আসতো হাদীসের দারস নিতে। বিভিন্ন মাসয়ালা জানতে। তিনিও খুব মনোযোগ দিয়ে সবার কথা শুনতেন এবং কুরআন ও হাদীসের আলোকে সমাধান দিতেন। সেই সময়ে আব্বাসি খলিফা ছিলেন ওয়াসেক বিল্লাহ। তিনি ছিলেন মুতাজিলা মতবাদে বিশ্বাসী। মুতাজিলারা মনে করতো মহা গ্রন্থ আলকুরআন আল্লাহর সৃষ্টি। কিন্তু যারা মুতাজিলা মতবাদে বিশ্বাসী ছিল না তারা মনে করতো আল কুরআন আল্লাহর সৃষ্টি নয় বরং আল্লাহর বাণী। সেই বৃদ্ধ আলেম ছিলেন মুতাজিলা মতবাদের বিরোধী। এ কান ও কান হতে হতে একদিন বিষয়টি খলিফা ওয়াসেক বিল্লাহর কানে পৌছে গেলো। 

আব্বাসি খলিফা ওয়াসেক বিল্লাহ ইমাম সাহেবের উপর প্রচন্ড ক্ষিপ্ত হলেন। বিভিন্ন জনের কাছ থেকে তার কাছে যে অভিযোগ উপস্থাপন করা হয়েছে সেটা শুনেই তিনি ইমামের উপর ক্ষিপ্ত। এমনিতে যদিও তিনি ইমামকে খুবই পছন্দ করেন তবে জনগন তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ এনেছে তা শোনার পর তিনি ক্ষিপ্ত না হয়ে পারলেন না। যেহেতু তিনিও মুতাজিলা মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন তাই বিষয়টি তিনি কোনো ভাবেই মানতে পারলেন না। খলিফার দরবারে ডেকে আনা হলো যুগের শ্রেষ্ঠ আলেম, বৃদ্ধ ইমামকে। 

খলিফা যে ইমামকে ডেকে পাঠাবেন সেটা তিনি আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিলেন। আগের দিন সন্ধ্যার পর তিনি যখন মসজিদে বসে শিষ্যদের হাদিসের তালিম দিচ্ছিলেন তখনই এক শিষ্য তাকে  প্রশ্ন করেছিল হুজুর মহাগ্রন্থ আলকুরআন কি আল্লাহর সৃষ্টি নাকি আল্লাহর কালাম? ইমাম সাহেব দৃঢ়কন্ঠে বলেছিলেন আল কুরআন আল্লাহর সৃষ্টি নয় বরং আল্লাহর কালাম। ইমামের মুখ থেকে এটা শোনার পর সেই শিষ্য বলেছিল হুজুর আপনি নিশ্চই জানেন আমাদের খলিফা মুতাজিলা মতবাদে বিশ্বাসী। শুনেছি খলিফা সব আলেমকে দরবারে ডেকে নিয়ে তাদের মূখ দিয়ে এই কথা বলাবেন যে আল কুরআন আল্লাহর সৃষ্টি সমূহের একটি। সেই সময় আপনারও উপস্থিত থাকা লাগবে এবং আপনার মুখ দিয়েও খলিফা এই কথা বলিয়ে নিবেন। শিষ্যের মুখ থেকে এমন কথা শোনার পর যুগ শ্রেষ্ঠ ইমাম মুচকি হাসলেন। বললেন খলিফা যদি সত্যি সত্যি ডেকে পাঠান এবং এমন বয়ান চান তবে আমার কাছ থেকে তাকে হতাশ হয়ে ফিরতে হবে। আমিতো খলিফার কথা মত আল্লাহর কালামকে সৃষ্টি বলে প্রচার করতে পারবো না। তারপর সত্যি সত্যিই খলিফার দরবার থেকে ডাক আসলো। ইমাম সাহেব তার ঘরেই ছিলেন। তাকে বলা হলো খলিফা আপনাকে তলব করেছেন। আমাদের সাথেই আপনাকে যেতে হবে। তিনি কিছুটা সময় নিয়ে প্রায় সাথে সাথেই সৈন্যদের সাথে রওনা হলেন।

পথে যেতে যেতে অনেক মানুষের সাথে দেখা হলো। লোকে ভীষণ অবাক হলো আর ভীত হয়ে উঠলো। সাথে সৈন্য থাকায় সবাই ধরে নিলো ইমাম সাহেবকে গ্রেফতার করা হয়েছে। কী অপরাধে গ্রেফতার করা হয়েছে তা অবশ্য তারা অনুমান করতে পারলো না।

আব্বাসী খলিফা ওয়াসেক বিল্লাহ তার দরবারে ইমামকে ডেকে পাঠিয়েছেন শুনে ইমাম বিচলিত নন। কারণ তিনি জানেন তিনি সত্য ও ন্যায়ের পথে আছে। ফলে খলিফার দরবারে উপস্থিত হয়ে তিনি জবাব দিতে পারবেন এই বিশ্বাস তার আছে। তিনি খলিফার প্রতিনিধিদের সাথে দরবারে উপস্থিত হলেন। দরবারে তখন ফিসফাস শব্দ হচ্ছে। তিনি দেখলেন আরও অনেক আলেম সেখানে উপস্থিত। যাদের অনেকেই তার শিষ্য। দরবার শুরু হওয়ার পর খলিফা তার মূল কথা শুরু করলেন। তিনি জানতে চাইলেন বিজ্ঞ আলেমগণ আপনাদের কাছে আমার একটি প্রশ্ন আছে। আমি জানতে চাই পবিত্র কুরআনকে আপনারা কিভাবে দেখেন? এটি কি আল্লাহর সৃষ্টি নাকি অন্য কিছু? তখন এক এক করে সবাই বলতে লাগলো এটি আল্লাহর সৃষ্টি। শুধু চুপ করে থাকলেন বৃদ্ধ ইমাম। এবার খলিফা তার কাছে জানতে চাইলেন আপনি বলুন। তিনি বললেন পবিত্র কুরআন আল্লাহর সৃষ্টি নয় বরং আল্লাহর কালাম। এগুলো আল্লাহর বলা কথা। আল্লাহর বাণী। ইমামের কথা শুনে প্রচন্ড ক্ষিপ্ত হলেন খলিফা ওয়াসেক বিল্লাহ। যেহেতু তিনি মুতাজিলা মতবাদে বিশ্বাসী আর মুতাজিলারা মনে করে আল কুরআন আল্লাহর সৃষ্টি তাই ইমামের কথাটা তার মতের বিপরীতে চলে যাওয়ায় তিনি ক্ষিপ্ত হলেন। অন্যরা যখন খলিফার শাস্তির ভয়ে খলিফার পছন্দমত কথা বলেছে তখন বৃদ্ধ ইমাম সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থেকেছে। শাস্তিকে পরোয়া করেনি।

দরবারের সিদ্ধান্ত হলো ইমামকে তার বক্তব্য ফিরিয়ে নিতে হবে এবং আল কুরআন আল্লাহর সৃষ্টি এটা স্বীকার করতে হবে। নতুবা তাকে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। কিন্তু ইমাম তার কথায় অটল থাকলেন। তিনি জানালেন শুরুতে তিনি যা বলেছেন সেটাই তার চূড়ান্ত বক্তব্য। কোনো শাস্তির ভয়ে তিনি সত্যকে অস্বীকার করতে পারেন না। ফলে খলিফা তাকে সভাসদের পরামর্শ মত শাস্তি দিলেন। ইমাম এখন থেকে নিজের ঘরেই থাকবেন। মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়তে পারবেন না এবং কাউকে শিক্ষা দিতে পারবেন না। যদি এর হেরফের হয় তবে শারীরিক শাস্তি দেওয়া হবে। তারা এই সিদ্ধান্ত নিল এ জন্য যে যদি তাকে মসজিদে নামাজ পড়তে দেওয়া হয় তবে তার কাছে মানুষ আসবে আর শিক্ষা লাভ করবে। মুতাজিলাদের মতবাদের বিরোধীতা আরও প্রবল হবে। তাই তাকে একঘরে করে রাখা হলো। ইমাম সাহেব সিদ্ধান্ত মেনে নিলেন।

চারদিকে এই ঘটনা ছড়িয়ে পড়লো। মানুষের মধ্যে অনেক রকম প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হলো। যারা ইমামকে ভালোবাসতেন তারা খুব দুঃখ পেলেন আর যারা মুতাজিলা মতবাদে বিশ্বাসী তাদের কেউ কেউ ভাবলো শাস্তির পরিমান কম হয়ে গেছে। এভাবে বেশ কিছুদিন কেটে গেলো। ইমাম সাহেব একাকী নিজের ঘরে অবস্থান করতে লাগলেন। তবে তিনি থাকলেন নজরদারীতে। কেউ তার কাছে শিক্ষা লাভ করতে যায় কি না সেটা খেয়াল রাখতে বলা হলো।

এক রাতে ইমাম সাহেব নিজের ঘরের কবাট আটকে হাদিস নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন। এমন সময় দরজায় করাঘাতের শব্দ পেলেন। তিনি ভাবলেন নিশ্চই রাজ দরবার থেকে কেউ এসেছে। কোনো সৈন্য এসেছে। আবার হয়তো কোনো তলব আছে। সাধারণ কারো আসার কথা নয়। কেননা রাজ্যের সবার কাছে ঘোষণা করা হয়েছে ইমাম সাহেব গৃহবন্দী। তার মসজিদ সহ সব জায়গায় যাওয়া নিষেধ। তেমনি তার কাছেও কেউ দরস নিতে যাওয়া নিষেধ। ফলে সাধারণ কারো আসার কথা নয়। আসলে রাজ দরবার থেকেই কেউ আসবে। হয়তো কোনো তলব নিয়ে নয়তো বাজার সদাই নিয়ে। যেহেতু তার কোথাও যাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা আছে তাই তার বাজার রাজ কর্মচারিরাই সর্বরাহ করবে এই আদেশ দেওয়া ছিল। ইমাম সাহেব স্বাভাবিক ভাবে গিয়ে দরজা খুলে দিলেন। দরজা খুলতেই তিনি অবাক হলেন সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন মানুষকে দেখে। লোকটি ইমাম সাহেবকে দেখে সালাম দিলেন। ইমাম সাহেব সালামের জবাব দিলেন।

লোকটির পরণে ছিল ছেড়া জামা,কাঁধে একটা ঝোলা বস্তা। পায়ে পুরোনো সেন্ডেল। যে কেউ দেখলেই বুঝতে পারবে সে একজন ভিখারী। রাত তখন বেশ হয়েছে। এশার নামাজ শেষ করেই তিনি হাদিস নিয়ে বসেছিলেন। তারপর কত সময় পার হয়েছে তিনি মনে করতে পারেন না। ফলে ধরে নেওয়া যায় বেশ রাত হয়েছিল। এই সময় এমন একজন ভিখারীকে দেখে তিনি অবাক হয়ে জানতে চাইলেন তুমি কে? এখানে কেন এসেছো? ভিক্ষা দেবার মত অবস্থা এই মুহূর্তে আমার নেই। লোকটি বললেন হুজার আমি ভিখারী নই। ভিখারীর ছদ্মবেশে এসেছি। আমার নাম বাকি ইবনে মুখাল্লাদ। আপনি আমাকে চিনবেন না। আমি অনেক দূর থেকে এসেছি আপনার কাছে হাদীস শেখার উদ্দেশ্যে। ইমাম সাহেব অবাক হলেন এবং বুঝলেন লোকটি আসলেই দূর থেকে এসেছে। তার চেহারায় ক্লান্তির ছাপ আছে। তাছাড়া আসেপাশের কেউ হলে তার জানা থাকার কথা যে ইমামের সাথে কারো দেখা করা নিষেধ এবং তার কাছ থেকে জ্ঞানার্জন করাও নিষেধ। তিনি জানতে চাইলেন তুমি কোথা থেকে এসেছো? বাকি ইবনে মুখাল্লাদ নামে সেই জ্ঞান পিপাসু জানালেন তিনি মরক্কো থেকে এসেছেন।

তার কথা শুনে ইমাম সাহেব খুবই অবাক হলেন। মরক্কো থেকে বাগদাদের দূরত্ব কমপক্ষে সাড়ে চার হাজার মাইল। পায়ে হেটে সেই পথ অতিক্রম করতে এক বছর সময় লেগে যাওয়ার কথা। এক বছর ধরে হাটতে হাটতে আলজেরিয়া,লিবিয়া,তিউনিশিয়া,মিশর,সিরিয়া পার হয়ে তারপর ইরাকের বাগদাদ নগরীতে পৌঁছেছেন শুধুমাত্র তার কাছ থেকে হাদীসের দরস নেওয়ার জন্য। ইমাম সাহেব বললেন মরক্কো তো অনেক দূর। তাছাড়া তুমি কিভাবে আমার বাড়ি চিনলে? আগে তো কখনো আমার বাড়িতে আসোনি। আর তুমি কি জানো না আমার সাথে কারো সাক্ষাৎ করা ও কথা বলা রাষ্ট্রীয় ভাবে নিষিদ্ধ? ইবনে মুখাল্লাদ বললেন আমি বাগদাদে আসার আগে রাষ্ট্রীয় নিষেধাজ্ঞার কথা জানতাম না। তারপর যখন বাগদাদ নগরীতে নেমে আপনার বাড়ির সন্ধান চাইলাম তখন লোকে বললো হে পথিক তুমি ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (রহঃ) এর সাথে দেখা করতে আসছো, তুমি কি জানো না তার সাথে দেখা করা রাষ্ট্রীয় ভাবে নিষেধ। খলিফা জানতে পারলে তোমার গর্দান যাবে। এ কথা শোনার পর আমি ভীষণ অবাক হয়েছি এবং তাদের কাছে জানতে চেয়েছি যুগ শ্রেষ্ঠ ইমামকে এমন শাস্তি দেওয়ার কারণ কী? তারা তখন বিস্তারিত বলেছে। আর যখন জানতে পেরেছে আমি সুদুর মরক্কো থেকে এসেছি তখন তারা আপনার বাড়ির পথ চিনিয়ে দিয়েছে। সেই সাথে সতর্ক করে দিয়েছে যেন কারো চোখে না পড়ি। তাদের সতর্ক বাণী শুনে আমি ভিখারীর ছদ্মবেশ নিয়ে তারপর আপনার এখানে এসেছি। আপনার অনুমতি পেলে প্রতিদিন আমি ভিখারীর ছদ্মবেশে আপনার কাছে আসবো এবং অল্প সময় হাদিস শিখে চলে যাবো।

ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল তার কথায় মুগ্ধ হলেন এবং বললেন ঠিক আছে তুমি আসো তবে খুব সাবধান। কারো চোখে যেন ধরা না পড়ে যে তুমি আসলে ভিক্ষুক নও। সেদিনের পর থেকে বাকি ইবনে মুখাল্লাদ প্রতিদিন ছেঁড়া পোশাক পরে পুটলি হাতে ভিক্ষুকের বেশে ইমাম সাহেবের বাড়িতে উপস্থিত হতেন। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল দরজা খুলতেই তিনি বলতেন, আমি ক্ষুধার্ত, আমাকে কিছু খাবার দিন। তখন ইমাম সাহেব তাকে ভেতরে নিয়ে গিয়ে কিছু সময় হাদিস শোনাতেন। তিনি কি আসলে ক্ষুধার্ত ছিলেন? ইমাম সাহেব কি তাকে খাবার দিতেন? এই প্রশ্ন করা হলে কেউ কেউ ভাবতে পারে হাদিস শেখার জন্য তিনি মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছেন। মূলত তিনি কখনোই মিথ্যার আশ্রয় নেননি। তিনি ছিলেন জ্ঞানের ক্ষুধায় ক্ষুধার্ত। আর ইমাম সাহেব তাকে খাবার হিসেবে জ্ঞানের ক্ষুধা নিবারণ উপযোগি খাবারই দিয়েছেন। ফলে তারা সত্য ও ন্যায়ের পথেই ছিল।

এভাবেই বাকি ইবনে মুখাল্লাদ দিনের পর দিন ভিক্ষুকের বেশে ইমামের বাড়িতে উপস্থিত হয়ে হাদিসের দরস নিয়ে মুসনাদে আহমাদের সম্পূর্ণটা তাঁর থেকে শুনে হাদিস শেখা শেষ করে মরক্কো ফিরে গিয়েছিলেন। কোনোদিন কেউ বুঝতে পারেনি ভিক্ষুকের বেশে রোজ এক লোকট ইমামের বাড়িতে আসতো আর হাদিস শিখতো। 

এর কয়েক বছর পর আব্বাসি খলিফা ওয়াসেক বিল্লাহর মৃত্যুর পর নতুন খলিফা নির্বাচিত হলেন আল মুতাওয়াক্কিল। ততোদিন পযর্ন্ত ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল গৃহবন্দী অবস্থায় ছিলেন। রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা মেনে চলতে হয়েছিল। তারও বয়স হয়ে গিয়েছিল। নতুন খলিফা আল মুতাওয়াক্কিল ওয়াসেক বিল্লাহর মত মুতাজিলা মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন না। ফলে তিনি খলিফা নির্বাচিত হওয়ার পরই আগের খলিফার নির্দেশ তুলে নিলেন এবং সম্মানের সাথে ইমাম আমদ ইবনে হাম্বলকে স্বাধীন ভাবে মসজিদে নামাজ পড়া ও দরস দেওয়ার অনুমতি দিলেন। 

আসরের আজান হয়ে গেছে। এমন সময় তার কাছে রাজ দরবার থেকে খবর আসলো তিনি আগের খলিফা কর্তৃক যে আদেশ প্রাপ্ত হয়েছিলেন তা থেকে মুক্ত। তিনি চাইলে এই মুহুর্ত থেকেই বাইরে চলাফেরা করতে পারবেন। মসজিদে যেতে পারবেন। এই সংবাদ শোনার পর তিনি আর দেরি করলেন না। দ্রুত ওজু করে মসজিদের পথে বেরিয়ে পড়লেন। তার বাড়ি থেকে জামে রুসাফা খুব বেশি দুরে না। পথে যেতে যেতে ব্যস্ত মানুষকে লক্ষ্য করলেন। আর মানুষগুলোও অবাক হয়ে দেখলো তাদের মাঝ দিয়ে হেটে চলেছেন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহঃ। যে মানুষটিকে বহু বছর এই পথে যেতে দেখা যায়নি। যতটা পথ তিনি হাটলেন মানুষ তাকে সালাম বিনিময় করতে লাগলো। সবার মনে আনন্দ। অবশ্য তাদের মধ্যেও যে মুতাজিলা মতবাদের অনুসারী ছিল না তা নয়। যারা ওই মতবাদে বিশ্বাসী ছিল তারা অবশ্য ততোটা খুশি হতে পারলো না।

মুসল্লিরা ব্যস্ত হয়ে মসজিদে ঢুকছে। ইকামত হয়ে গেছে। ইমাম সাহেব আল্লাহু আকবর বলে জামাত শুরু করলেন। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহঃ জামাতে শরিক হলেন। নামাজ শেষ হলে সালাম ফেরানোর পর মুসল্লিরা যখন বের হবে বলে উঠে দাঁড়ালো তখন অবাক হয়ে দেখলো তাদের সাথেই নামাজ আদায় করেছেন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহঃ। যারা উঠে চলে যাচ্ছিল তারা সাথে সাথে বসে পড়লো। যিনি নামাজের ইমামতি করেছিলেন তিনি সহ অন্য শিষ্যরা প্রিয় শিক্ষক, প্রিয় ইমামকে দীর্ঘদিন পর কাছে পেয়ে আপ্লুত হয়ে পড়লো। ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহঃ মসজিদের মিম্বরে গিয়ে বসলেন। তারপর সবার উদ্দেশ্যে বক্তব্য দিলেন। নসিহত করলেন। তখন এক শিষ্য জানতে চাইলেন হুজুর আপনার থেকে অনেক কিছু শেখার ছিল কিন্তু দীর্ঘ সময় নিষেধাজ্ঞার কারণে আমরা আপনার সাথে সাক্ষাত করতে পারিনি। আমাদের শিক্ষা অসমাপ্ত রয়ে গেছে। যদি আমাদের শিক্ষা সমাপ্ত হওয়ার আগেই আপনি আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে চলে যান তাহলে আমাদের হাদিসের দারস কে দেবে? কে হবে আপনার উত্তরসূরী? 

ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহঃ শিষ্যের কথা শুনে একটু মুচকি হাসলেন। তারপর তিনি বললেন আমার অবর্তমানে তোমরা হাদিসের দরস নিতে পারবে বাকি ইবনে মুখাল্লাদের কাছ থেকে। সেই আমার অন্যতম সেরা ছাত্র। উপস্থিত কেউ এই নামে কাউকে চিনতে পারলো না। সবাই  একে অন্যের দিকে তাকালো। তখন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল জানতে চাইলেন তোমরা কি বাগদাদ শহরে ছেড়া কাপড় পরা, কাঁধে ঝোলা টুপলা সহ কোনো ফকিরকে দেখেছ? সবাই এক বাক্যে বললো হ্যা এমন একজনকে তারা দেখেছে। তখন ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহঃ জানালেন তার নামই বাকি ইবনে মুখাল্লাদ। সে এসেছিল সাড়ে চার হাজার মাইল দূরের শহর মরক্কোর কুরতুবা নগরী থেকে কেবল মাত্র হাদিস শেখার জন্য। খলিফার নিষেধাজ্ঞা থাকার কারণে সে সতর্কতা অবলম্বন করে ফকিরের বেশে নিয়মিত আমার বাড়িতে এসে কিছুসময় হাদিস শিখে বেরিয়ে যেতো। এভাবেই কয়েক বছর ধরে সে হাদিসের দরস নিয়েছে। উপস্থিত সবাই এই ঘটনা শুনে বিস্মিত হলো। রাস্তায় ফকিরের বেশে ঘুরে বেড়ানো যে মানুষটিকে তারা কখনো গুরুত্বই দেয়নি তিনিই যে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহঃ এর অন্যতম শিষ্য তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।

আগন্তুক পর্ব-২

0

আমি যেন স্বপ্ন দেখছিলাম,যেন কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে গিয়েছিলাম।সত্যিইকি আমি স্পেনে এসেছি? সত্যিইকি আমি ন্যু ক্যাম্পের ভিআইপি গ্যালারিতে দাড়িয়ে আছি? সত্যিই কি আমার সামনে জর্ডি আলবা?আমি তাকে বললাম আমিকি আপনাকে ছুয়ে দেখতে পারি?আমাকে অবাক করে দিয়ে তিনি নিজেই আমাকে ছুয়ে দিয়ে বললেন তুমি স্বপ্ন দেখছো না!এটা সত্যি!

কিছু স্মৃতি আজীবন আনন্দের সাথে বুকের মধ্যে বয়ে বেড়ানোর মত।এটিও তেমনই স্মৃতি।একটা অটোগ্রাফ নিতে পারলে দারুণ হতো।সবাইকে দেখানো যেতো।পকেট হাতড়েও কোন কাগজ পাইনি।হায় আফসোস বৃদ্ধর সাথে যখন গাড়িতে বসে ছিলাম ভুল করে মোবাইলটাও সীটের উপর ফেলে এসেছি।ছবি তোলার সুযোগটাও হাতছাড়া হয়ে গেলো।এতো আনন্দের ভীড়ে একঝাক দুঃখ জমা হয়ে থাকলো।রাত দশটার দিকে হোটেলে ফিরে এলাম।বার্সেলোনা শহরের হোটেল গুলোর মধ্যে ক্যাটালোনিয়া অ্যাটিনাস বেশ নামকরা।এতো সুন্দর হোটেল যে চোখ জুড়িয়ে যায়।হোটেলে ফিরে পুরো ঘটনাটা যখন সবাইকে বললাম তখন কেউ বিশ্বাস করেনি।তারাধরেই নিয়েছে আমি কোন গল্প ফেঁদেছি।গল্প লেখকদের এই একটা সমস্যা।তাদের পরিচিতজনেরা দ্বিধায় পড়ে যায়।তারা বুঝতে পারেনা কোনটা গল্প আর কোনটা সত্যি।আমিও যে গল্প লিখছি না তা ওরা শিওর না।ওরা বলে এটা তোর অন্য গল্পগুলোর মতই দারুন একটা প্লট।আমি বলি এটা গল্প না,সত্যি! ওরা আরো বেশি করে অবিশ্বাস করে।

ফাইরুজ আমাকে প্রশ্ন করলো যদি এটা সত্যি হয় তবে মেসি বা অন্যদের সাথেও কেন দেখা করলি না?আমি ওদের বললাম কি করে দেখা করবো বল? আমি তখন পুরো ঘোরের মধ্যে ছিলাম।এতোটা বিস্মিত জীবনে আগে কখনো হইনি।ওরা পিট চাপড়ে বললো গল্প হোক আর সত্যি হোক বিষয়টি সত্যিই রোমাঞ্চকর।আমি কিছু বললাম না।আমার বলার ছিলো বলেছি।কারো সত্যি মনে হলে সত্যি কারো গল্প মনে হলে গল্প।

ঢাকার মতই বার্সেলোনা শহরও যেন সারা রাত জেগে থাকে।সেদিন আমার ঘুমই আসছিলো না।বার বার চোখের সামনে পুরো দিনের চিত্র ভেসে উঠছিলো।লা নুয়েভা মার্কুয়েসার সেই স্যুপ খাওয়ার দৃশ্য,বৃদ্ধর সাথে কথোপকথন এবং শেষে খেলা দেখার পর জর্ডি আলবার সাথে দেখা হওয়া।জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আলোঝলমলে শহরটা দেখি।শহরের প্রতিটি আলোকবাতিতে যেন ভেসে ওঠে এক একটি দৃশ্যকল্প।সেরাতে মনে হয় ঘুমের মধ্যেও একই দৃশ্য স্বপ্ন হয়ে আবার আমার কাছে ফিরে আসে।

পরদিন সকালে দেরিতে ঘুম ভাঙে।উঠে দেখতে পাই আমার দলের অন্যরা ঘুরতে বেরিয়েছে।ওরা হয়তো আমাকেও ডেকেছিল কিন্তু আমি ঘুমে বিভোর ছিলাম তাই টের পাইনি।বিছানা ছেড়ে উঠে গোসল সেরে বেরিয়ে পড়লাম।একাকী ঘুরে বেড়ানোর আনন্দই আলাদা।পুরোপুরি স্বাধীনতা ভোগ করা যায়।অন্যদের সাথে ঘুরতে বের হলে তাদের মতামত,ভালো লাগা মন্দ লাগাও গুরুত্ব দিতে হয়।হয়তো একটা জিনিষ আমার ভালো লেগেছে একটু দেখবো বলে দাড়িয়েছি অন্যদের সেটা ভালো লাগেনি বলে তারা চলে যেতে চায়।সে কারনেই একাকী ঘুরতে বেশি ভালো লাগে।ব্রেকফাষ্ট করতে করতেই পরিকল্পনা করলাম আজ মাদ্রিদ যাবো।যে ভাবনা সেই কাজ।দ্রুত পৌছে গেলাম প্লাসা ডেলপিসো ক্যাটালোনিয়াতে।বার্সেলোনার রেলওয়ে স্টেশান।প্রতিদিন এই স্টেশান থেকে ১৮টি ট্রেন মাদ্রিদের পথে ছেড়ে যায়।দ্রুতগামী সেই ট্রেনে আড়াই ঘন্টার মধ্যেই মাদ্রিতে পৌছে গেলাম।৩২ ইউরো খরচ করতে খুব বেশি কষ্ট হয়নি।বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটের বাইরে নিজেও কিছু অর্থ নিয়ে এসেছিলাম।ট্রেন যে স্টেশানে গিয়ে আমাকে নামিয়ে দিলো সেটার নাম অ্যাভেনিডা ডি মাদ্রিদ।মাদ্রিদের এই স্টেশানে পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আগত পযর্টকে মুখরিত থাকে।প্রতিনিয়ত কেউ আসছে নয়তো চলে যাচ্ছে।

শহর দেখতে বেরিয়ে পড়লাম।এই শহরে মানুষ খুব হাটতে ভালোবাসে।আমিও মনের আনন্দে হেটে বেড়াচ্ছি।রোদের প্রখরতা নেই।শীতের দেশে রোদটাও উপভোগ্য হয়।আমি যখন সেগোভিয়া স্ট্রিট দিয়ে হেটে চলছি তখন অবাক হয়ে দেখলাম লম্বা চুল দাড়িওয়ালা একটা লোক একটা ফুটবল নিয়ে কারিকুরি করছে।পথচারিদের দু একজন একনজর দেখেই যে যার কাজে চলে যাচ্ছে।ফুটবলের প্রিয়ভূমি স্পেনের অলিতে গলিতে ফুটবল নিয়ে মেতে থাকবে এটাই স্বাভাবিক।কিন্তু আমার মনে হলো বাংলাদেশের অলিতে গলিতে যে হারে ফুটবল নিয়ে মাতোয়ারা হতে দেখা যায় এই দেশে সেরকম নেই।আর তাইতো একাকী সেই বয়স্ক মানুষটির ফুটবল খেলার প্রতি কারো কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।

পাশেই একটা চেয়ারের উপর সেই মধ্যবয়স্ক লোকটির কাপড় রাখা।একটা বোতলে পানিও রেখেছেন।সেই সাথে আছে একটা কুকুর।এই সব দেশের মানুষেরা কুকুর খুব পছন্দ করে।কাছাকাছি গিয়ে দেখলাম একটা বড় ম্যাজিশিয়ান টুপির মত টুপি রাখা।আমার মনে হলো লোকটা আসলে ফুটবলের কারিকুরি দেখিয়ে ভিক্ষা করছে।আমি আগেও দেখেছি এই সব উন্নত দেশের ভিক্ষুকেরা কখনো কোন কিছু না করে ভিক্ষা নেয় না।তারা হয় ম্যাজিক দেখাবে নয়তো গান শোনাবে নয়তো অভিনয় করে দেখাবে।কিছুনা কিছু প্রতিভা দেখিয়ে তবেই ভিক্ষা নিবে।লোকটিকে ফুটবল নিয়ে খেলা দেখানো দেখে সেটাই মনে হলো।দু একজন পথচারি অবশ্য কিছু দিতে চেষ্টা করলো।লোকটার জন্য আমার খুব মায়া হচ্ছিল।বাংলাদেশে ফার্মগেট ওভার ব্রিজের উপর থালা হাতে নিয়ে দাড়ালে সে নিশ্চিত হাজারখানেক না হোক দুই চারশো টাকা পেয়ে যেতো।

আমার খুব ইচ্ছে হচ্ছিল তার সাথে গিয়ে ফুটবল খেলার আনন্দটুকু উপভোগ করি।শুধু তাই নয় ইচ্ছে হচ্ছিল তাকে গিয়ে বলবো জানো গতকাল ন্যু ক্যাম্পে খেলা দেখেছি আর হ্যান্ডশেক করেছি জর্ডি আলবার সাথে।মনে মনে এসব ভাবলেও কিছুই বলা হয়নি।আমাদের দেশে হলো এতোক্ষণে তার সাথে ফুটবল খেলার জন্য অনেক ছেলেপুলে বুড়ো মানুষও জুটে যেতো।আমাদের দেশে কারো কাছে বল দেখলেই সবাই নিমিষেই খেলোয়াড় হয়ে যায়।মনে পড়ে গ্রামে ছেলেরা চাঁদা তুলে ফুটবল কিনতো।তার পর খেলতে গিয়ে যদি মনোমালিন্য হতো তবে সবাই সেই নতুন বলটা কেটে ভাগ করে নিতো! আমি আরো খানিকক্ষণ দাড়িয়ে লোকটির নিঃসঙ্গতা অনুভব করতে চেষ্টা করলাম।যেহেতু গল্প লিখি তাই মনে মনে তাকে নিয়েও কোন গল্প লেখা যায় কিনা ভাবতে থাকি।পাশেই একটা পপকর্নশপ ছিলো।এক ইউরো খরচ করে একপ্যাকেট পপকর্ন কিনি।তখন দেখতে পাই একটা বার বছরের ছেলে জুটে গেছে।সে লোকটার দিকে বল মারছে আবার কখনো কখনো লোকটাও তার সাথে বল নিয়ে কাড়াকাড়ি করছে।দেখতে খুব ভালো লাগছে।

এই দেশটা খুব সহনশীলতার দেশ।খেলতে খেলতে লোকটা এমন সব কান্ড করেছে যে আমাদের দেশ হলে তুলকালাম লেগে যেতো।পাশ দিয়ে হেটে যাওয়া এক তরুনীর কাছে সে তার মোবাইল নাম্বার চাইলো আর তরুণী তখন একটা মুচকি হাসি দিয়ে দুঃখিত দেওয়া যাবেনা বলে চলে গেলো।আশে পাশে যারা ছিলো কেউ কিছু মনেই করলো না।আমি ভাবলাম এই ঘটনাটা যদি ঢাকায় হতো তাহলে কি হতো?এতোক্ষণে লোকটাকে ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি করতে হতো।তার চুলগুলো ছিলো বেশ লম্বা,ব্রাউনী।দাড়ি গোফ দেখলে মনে হয় জঙ্গল থেকে উঠে এসেছে।ঢাকার রাস্তায় হাটলে নিশ্চিত টোকাই শ্রেনীর ছেলেপুলে তার দিকে পাগল পাগল বলে ঢিল ছুড়তো।এখানে তার কিছুই হলো না।কেউ যখন তাকে কোন পাত্তাই দিচ্ছিলো না তখন একটা বার তের বছরের ছেলে এগিয়ে আসলো।তার সাথে ফুটবল খেলায় মেতে উঠলো।লোকটা তখন খুব খূশি।এতো সময় এখানে ফুটবল নিয়ে কারিকুরি করেও কারো নজর কাড়তে পারলো না।দু একজন হয়তো অল্প কিছু কয়েন ছুড়ে দিলো টুপিতে।

বার তের বছর বয়সী ছেলেটা দেখতে খুব সুন্দর আর মিষ্টি চেহারার অধিকারী।ছোটরা স্বভাবতই খেলাধুলা পছন্দ করে।নিঃসঙ্গ মানুষটিকে যখন একাকী ফুটবল নিয়ে মেতে থাকতে দেখলো সেও এগিয়ে আসলো।ছেলেটির সঙ্গ নিশ্চই লোকটি উপভোগ করলো।তার সাথে বেশ কিছুক্ষণ ফুটবল খেললো।পথচারিরা এসব দৃশ্য দেখে হয়তো অভ্যস্ততাই কেউ কৌতুহলী নয়।আমাদের দেশে রাস্তার মাঝে খেলাতো দূরের কথা দাড়ানোই যায় না।আর এখানে দিব্ব্যি ফুটবল খেলছে।অনেক ক্ষণ খেলে সম্ভবত লোকটা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল।আমার কাছে অন্তত তাই মনে হলো যখন দেখলাম লোকটা ফুটবল হাতে তুলে নিলো।তার পর ছেলেটিকে প্রশ্ন করলো তোমার নাম কি? ছেলেটি বললো তার নাম নিকোলাস।লোকটি পকেট থেকে একটা মার্কার বের করে ফুটবলের গায়ে লিখে দিলেন নিকোলাসকে ধন্যবাদ আমার সাথে ফুটবল খেলার জন্য।এর পর নিচে তার নিজের নাম সই করে দিলেন।

নিকোলাস ফুটবলটি পেয়ে যতটানা আনন্দিত হলো তার চেয়েও তার বিস্ময়ের সীমা থাকলো না যখন নিজের নামের নিচে সেইমানুষটির সিগনেচার দেখলো। এই সিগনেচার সে অনেক আগেই ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করেছে।ছেলেটি লম্বা চুল দাড়িগোফ ওয়ালা লোকটার মূখের দিকে তাকালো। নাহ তাকে সে চেনে না।অথচ তার করা সিগনেচারটা সে চেনে। পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ চেনে।লোকটা হয়তো নিকোলাসের মনের ভাষা বুঝতে পারলেন।তিনি এক টান দিয়ে দাড়ি গোফ খুলে ফেললেন!তার পর চুলও খুলে ফেললেন।তারমানে তিনি ছদ্মবেশে ছিলেন।কিছুক্ষণ আগেও যারা মোটেই আমলে দেয়নি তারাও তখন তাকে দেখে মোবাইল,ক্যামেরা যে যেভাবে পারে স্মৃতি ধরে রাখার জন্য উল্লাস করতে করতে তার পাশে ঘিরে ধরে।নিকোলাস নামের ছোট্ট ছেলেটি ফুটবল হাতে তার মুখের দিকে তাকায়।দেখতে পায় একটু আগে সে যার সাথে ফুটবল নিয়ে মেতে উঠেছিল তিনি এই গ্রহের অন্যতম সেরা ফুটবলার ক্রিষ্টিয়ানো রোনালদো।

হঠাৎ করে লোকটিকে ঘিরে এতো ভীড় কেন বেড়ে গেলো প্রথমে বুঝতে পারিনি।ভীড় ঠেলে সামনে যাবো তারও সুযোগ পাইনি।একজনের কাছে জানতে চাইলাম হঠাৎ এতো মানুষের ভীড় কেন লোকটাকে ঘিরে?একটু আগেওতো কেউ তাকে পাত্তা দিচ্ছিলো না।সে কি তবে ছেলে ধরা?ওই ছেলেটাকে কি সে ধরে নিয়ে যেতে চেয়েছিল?আমার এক নাগাড়ে এতো গুলো প্রশ্ন শুনে লোকটা চোখ কপালে তুললো।বললো তুমি এসব কি বলছো! চুল দাড়িওয়ালা ওই লোকটা আর কেউ নয় স্বয়ং ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো!! এটা শুনে আমি হুড়মুড় করে এগিয়ে গেলাম।দেখতে পেলামনা ভীড়ের কারণে তবে চারপাশে যারা তাকে ঘিরে এগোচ্ছিল তারা চিৎকার করে বলছিলো ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো!আমি তখন পুরোপুরি ঘোরের মধ্যে।ইস তিনি যখন ছদ্মবেশে একাকী ফুটবল নিয়ে কারিকুরি করছিলেন তখন কেন আমি তাকে চিনতে পারিনি? কেন কাছে গিয়ে তার সাথে ফুটবল খেলিনি!!

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে।হোটেলে ফিরতে হবে।ঘোরের মধ্যে আছি।গতকালকের চেয়েও বেশি বিস্মিত আমি।স্পেনে এসে পরিবেশ বিষয়ক সম্মেলনের আয়োজকদের কাছে কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।তারা সুযোগ দিয়েছিল বলেই এমনদুটি অসাধারণ ঘটনার সাক্ষী হলাম।মনে মনে ভাবলাম হোটেলে ফিরে গিয়ে এ ঘটনাটা সবাইকে জানাবো।পরে মনে হলো ওরা এটাকেও গল্প হিসেবে ধরে নেবে।সবর্শেষ ট্রেন ছিলো রাত আটটায়।সেই ট্রেনে হোটেলে ফিরলাম।তখনো সবাই জেগে আছে।আমি উত্তেজনা দমিয়ে রাখতে পারছি না।পুরো ঘটনাটা ওদেরকে খুলে বললাম।ওরা হাত তালি দিলো।বললো আমার গতকালকের গল্পটার চেয়েও এটা বেশি ভালো হয়েছে।আমি ওদের কি করে বুঝাই যে এটা গল্প না সত্যি।বিশ্বাস না করলেও আমার কিছু যায় আসে না।আমি ফ্রেশ হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম।তন্দ্রা মত এসেছে এমন সময় রাহবার আমাকে জাগিয়ে তুললো।সে ভীষণ উত্তেজিত।দেখলাম ওর হাতে মোবাইল।ইউটিউবের একটা ভিডিও দেখে সে উত্তেজিত।চোখ কচলে ভিডিওটির দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলাম।এটাতো সেই জায়গা যেখানে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো ছদ্মবেশ নিয়ে এসেছিলেন।তার পর পুরো ভিডিওটা দেখলাম কয়েকবার।তিনি যে ওখানে আসবেন এটা আগে থেকেই ঠিক করে ওনাকে প্রস্তুত করা হয়েছিল।কিন্তু কেউ বুঝতেই পারেনি পৃথিবী বিখ্যাত মানুষটি তাদের মাঝেই বিচরণ করছেন।আমার টিমের জুনিয়র ছেলে জিদান বললো ভাই আপনার কথাতো সত্যি! আমরা আরো ভেবেছিলাম আপনি লেখক মানুষ তাই গল্প লিখেছেন।এবারতো প্রমান মিললো।তার মানে জর্ডি আলবার সাথে দেখা হওয়াটাও গল্প নয় সত্য!!

জিদানের কথার কোন জবাব দিলাম না।শুধু মিষ্টি করে একটা হাসি দিলাম।এখানে আমার বলার কিছু নেই।আমিতো আগন্তুক মাত্র।

জাজাফী

৬ মার্চ ২০১৯

আগের পর্ব এখানে পড়ুন

সার্কাডিয়ান রিদম

১.

ভোরে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাস নেই রাফিনের। একদমই নেই বলা যায়। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ যেখানে সূর্যের আলোয় দিন শুরু করে, রাফিনের দিন শুরু হয় সূর্য ওঠার অনেক পর। ছাত্রজীবন থেকেই তার এই রাতজাগা স্বভাব। পরীক্ষার সময় জেগে পড়া, বন্ধুরা চলে যাওয়ার পর একা বসে গান শোনা, মুভি দেখা কিংবা নিরব রাতের জানালার পাশে বসে ভাবনায় হারিয়ে যাওয়া—সব মিলেই তার রাতগুলো ধীরে ধীরে দীর্ঘ হতে হতে একসময় অভ্যেসে পরিণত হয়েছে। সেই অভ্যেসটিই এখন তার দেহঘড়ির অংশ হয়ে গেছে।

পরিচিতজনরা প্রায়ই মজা করে বলত,
— “এখন তো চাকরি করো না, তাই রাত জেগে নিজের রাজত্ব চালাও। কিন্তু একবার কর্মজীবনে ঢুকলে বুঝবা, ঘুম নামের জিনিসটার দাম কী!”
শুনে রাফিন শুধু হেসে দিত। তার মনে হতো, জীবনযাপন বদলালেই অভ্যেস বদলায় না। রাত তাকে এতটাই টানে যে মনে হয় অন্ধকার নামলেই তার মস্তিষ্ক জেগে ওঠে, চিন্তা করতে শুরু করে, নতুন কিছু ভাবতে চায়।

চাকরি পাওয়ার পর অনেকেই ভাবে, মানুষ বদলে যায়। কিন্তু রাফিনের ক্ষেত্রে তা হয়নি। একটু পরিবর্তন এসেছে, একেবারে উল্টে যাওয়া নয়। আগের মতো সারা রাত জেগে সিনেমা দেখা বা হুট করে সকালে ঘুমিয়ে থাকা আর সম্ভব নয়—অফিস আছে, দায়িত্ব আছে। তবু সে রাত বারোটা পেরিয়ে যায়েই জেগে থাকে। কোনো কাজ থাকুক বা না থাকুক, তার ঘুম আসে না। রাত দুইটা, কখনও আড়াইটা—তবু ঘুম তার চোখে ধরা দেয় না। যেন মস্তিষ্কের ভেতরে কেউ এক অদৃশ্য সুইচ টিপে দিয়েছে, যা কেবল গভীর রাতেই চালু হয়।

রাফিন কখনও কখনও ভাবে, হয়তো এই রাতজাগা তার নিজের ইচ্ছায় নয়, শরীরের ভেতরের কোনো প্রাকৃতিক যন্ত্রের কারণে। সার্কাডিয়ান রিদম বলে একটা বিষয় আছে—মানব শরীরের নিজস্ব দেহঘড়ি, যা নির্দিষ্ট এক ছন্দে ঘুম ও জাগরণ নিয়ন্ত্রণ করে। একবার যদি সেই ছন্দ পাল্টে যায়, তখন সেটাকে ফেরানো মানে পাহাড় সরানোর মতো কঠিন কাজ। তার দেহও যেন সেই রিদমে আটকে গেছে। রাতের অন্ধকার তার কাছে শান্তির, সৃষ্টির আর ভাবনার সময়। আর ভোর—ভোর যেন কেবল অন্যদের জন্য।

প্রতিদিন ঘুমানোর আগে রাফিন চেষ্টা করে সময়মতো বিছানায় যেতে। চোখ বন্ধ করে অন্ধকারে শুয়ে থাকে, কিন্তু মাথার ভেতর চিন্তার স্রোত থামে না। অফিসের কাজ, অসমাপ্ত লেখা, পুরনো স্মৃতি—সব একসঙ্গে ঘুরে ফিরে আসে। ঘুম আসে না, বরং সময় গড়িয়ে যায় আরও গভীর রাতে। সে জানে, এই অভ্যাস ভালো নয়। কিন্তু শরীরের এই দেহঘড়ি সে একা পাল্টাতে পারে না। মানুষ যতটা নিজেকে বোঝে, তার ভেতরের ছন্দকে ততটা বোঝে না।

রাফিনের জীবনটা এখন যেন সার্কাডিয়ান রিদমের হাতেই বন্দী। তার দিন-রাতের হিসাব অন্য সবার চেয়ে আলাদা—একটা উল্টো ঘড়ি। রোজ রাত দুইটার পর ঘুমাতে যায়, আর সকালে নয়টার আগে চোখ খোলে না কখনো। অফিসের সময় মতো জেগে ওঠা তার কাছে কোনো চ্যালেঞ্জ নয়, বরং একটা যান্ত্রিক অভ্যাস মাত্র।

রাতের খাবার শেষ করে কখনো বই খুলে বসে। পড়তে পড়তে সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলে। গল্পের ভেতর ডুবে যেতে যেতে হঠাৎ মনে হয়, বাইরে রাত আরও গভীর হয়েছে। কখনো আবার টেবিল ল্যাম্প নিভিয়ে দেয়, ল্যাপটপ অন করে প্রিয় কোনো সিনেমা চালিয়ে বসে থাকে। তার কাছে রাত মানে একা সময়—যেখানে কেউ বাধা দেয় না, কেউ ডাকে না, কেবল সে আর তার ভাবনা। এই ভাবনাগুলিই যেন তার ঘুম চুরি করে নেয়, তবুও সে এগুলিকে হারাতে চায় না।

বছরের পর বছর এভাবেই চলছে তার জীবন। সকাল নামের জগৎ থেকে ধীরে ধীরে সে দূরে সরে গেছে। সূর্য ওঠা সে কবে দেখেছে তা তার নিজেরও মনে পড়ে না। খুব ছোটবেলায়, বাবার সঙ্গে কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে গিয়েছিল একবার—ভোরের আলোয় সমুদ্রের বুক ফুঁড়ে সূর্যের ওঠা দেখেছিল সেদিন। রাফিনের মনে হয়, সেটাই ছিল তার জীবনের শেষ সূর্যদয় দেখা। তারপর থেকে তার জীবনের সকাল শুরু হয় যখন সূর্য আকাশে অনেকটা উঁচুতে উঠে গেছে।

রোজ সকাল নয়টায় ঘুম থেকে ওঠে রাফিন। চোখ খোলার পর কিছুক্ষণ বিছানায় বসে থাকে, শরীরটাকে সময় দেয় জেগে উঠতে। মাথার মধ্যে একটা ভারী ঝিমঝিম ভাব থাকে, যা সে এখন অভ্যস্ত হয়ে গেছে সহ্য করতে। তারপর ধীরে ধীরে আড়মোড়া ভেঙে, পাশে রাখা ব্রাশ তুলে নেয়, টুথপেস্ট লাগিয়ে বাথরুমের দিকে হাঁটে।

তবে প্রতিদিনই সব একই ছকে চলে না। মাঝে মাঝে দেখা যায় বাথরুমটা ব্যস্ত—ভেতরে কেউ আছে। রাফিনের ভেতর তখন এক ধরনের ছোট্ট বিরক্তি কাজ করে, কিন্তু মুখে কিছু বলে না। দুই রুমের ছোট্ট ফ্ল্যাটে তিনজন মানুষ, তিনজনের একই সময়ে অফিস। একটা মাত্র বাথরুম—তাই এ অপেক্ষা তার জীবনের অঙ্গ হয়ে গেছে। ভাগ্য ভালো থাকলে ওয়াশরুম ফাঁকা পায়, না হলে দশ-পনের মিনিট চুপচাপ বসে অপেক্ষা করে। অপেক্ষার সময়টা সে সাধারণত ফোনে খবর দেখে বা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে—রাস্তায় ছুটে যাওয়া মানুষের ভিড় দেখে ভাবে, তার জীবনও যেন এমনই এক অদৃশ্য গতিতে ঘুরে চলেছে।

গোসল শেষ করে দ্রুত কাপড় পরে রেডি হয়ে নেয়। অফিসে দেরি হওয়ার ভয় নেই, কারণ অফিসটা একদম কাছেই—দু’টো বিল্ডিং পেরোলেই অফিসের গেট। এখন রাফিন বুঝতে পারে, অফিসের এত কাছে থাকা মানে এক ধরনের মুক্তি। যানজটের চিন্তা নেই, রাস্তায় ভিড় নেই, সময়ের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয় না। তবু, এই সুবিধার মাঝেও সে মাঝে মাঝে ভাবে—জীবনের কতটুকু যেন হারিয়ে ফেলেছে এই নিয়মিত ছকে বন্দী থেকে।

অফিসে পৌঁছাতে রাফিনের সময় লাগে পাঁচ মিনিটও না। হালকা ব্যাকপ্যাকটা এক কাঁধে ঝুলিয়ে ধীরে ধীরে হাঁটে। পথে দু’টো বিল্ডিং পেরোলেই অফিস। হাঁটার সময় চারপাশের রোদ তার চোখে লাগে, কিন্তু সে চশমা পরে না—বরং একটু চোখ কুঁচকে হাঁটে। রাস্তায় তখন মানুষজন ব্যস্ত, সবাই যেন কোথাও ছুটছে। রাফিনের গতি ধীর, কিন্তু নিয়মিত। এই ছোট্ট হাঁটাটুকু তার কাছে যেন দিনের একমাত্র শান্ত মুহূর্ত।

অফিসে ঢুকেই পরিচিত হাসি, শুভ সকাল—সবই নিয়মের অংশ। ডেস্কে গিয়ে বসে, কম্পিউটার অন করে। কফির কাপে ধোঁয়া উঠতে থাকে। আশেপাশে সহকর্মীদের কথাবার্তা, ফোনের রিংটোন, কিবোর্ডের ক্লিক—সব মিলিয়ে একটা চেনা শব্দের ভেতর ডুবে যায় অফিস। রাফিনও সেই ভেতরে হারিয়ে যায়, নিজের মতো কাজ করে যায় নিঃশব্দে।

তার সহকর্মী রিয়াদ, হাসিখুশি মানুষ। অফিসে ঢুকেই সবার সঙ্গে মজা করে, মাঝেমধ্যে রাফিনকেও জড়িয়ে নেয় আলাপে।
— “কালও নাকি রাত দুইটা পর্যন্ত জেগেছ?”
— “হুম,” রাফিন হেসে বলে, “রিদমটা এমন হয়ে গেছে। ঘুম আসে না।”
রিয়াদ মাথা নাড়ে, “এই রিদমটা একদিন ঘুম খেয়ে দেবে।”
তারা দুজনেই হেসে নেয়, কিন্তু হাসির ভেতরে লুকানো থাকে একটা নিঃশব্দ ক্লান্তি।

রাফিনের ডেস্ক জানালার পাশে। বাইরে তাকালে পাশের বিল্ডিংয়ের কাচে নিজের প্রতিফলন দেখা যায়। কখনো কখনো কাজের ফাঁকে সেই প্রতিফলনের দিকে তাকিয়ে থাকে সে—চেনা মুখ, কিন্তু যেন অপরিচিত লাগে। ভাবে, এটাই কি তার চাওয়া জীবন? সকাল নয়টায় ঘুম থেকে উঠে অফিসে আসা, রাত জেগে থাকা, আবার পরদিন একই ছকে ফিরে যাওয়া—এই নিয়মের ভেতরে কি কোথাও কিছু বদলানোর সুযোগ আছে?

দুপুরের সময়টা আসে নীরবে। সবাই মিলে ক্যান্টিনে যায়, রাফিনও যায় কিন্তু খুব বেশি কথা বলে না। খাওয়া শেষ করে ছাদে উঠে যায় একা। ছাদে রোদ পড়ে, বাতাস একটু নরম। দূরের আকাশে ভাসে কিছু মেঘ। রাফিন হাতের মোবাইলটা পকেটে রাখে, চোখ বন্ধ করে বাতাসে মুখ দেয়। তার মনে হয়, এই নীরব সময়টাই তার জীবনের সবচেয়ে সত্যিকারের সময়—যেখানে কোনো শব্দ নেই, কেবল নিজের নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যায়।

কখনো কখনো সে ভাবে, যদি আবার কুয়াকাটা যাওয়া যেত, যদি আবার একবার সূর্যদয় দেখা যেত—হয়তো দেহের এই ঘড়িটা নতুন করে সেট হয়ে যেত। কিন্তু জীবন তো এমনই—একবার ছন্দ হারালে সেটাই হয়ে যায় জীবনের ছন্দ।


রাফিন যখন ঢাকায় ছিল, তখন তার জীবন ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন ছকে বাঁধা। অফিস থেকে বাসার দূরত্ব ছিল এতটাই বেশি যে প্রতিদিনই যেন সে এক যুদ্ধ লড়ত। সকালে বেরিয়ে সন্ধ্যা গড়িয়ে যেত ফিরতে ফিরতে। দিনে চার ঘণ্টা, কখনো কখনো আরও বেশি সময় কেটে যেত রাস্তায়। সিগনালে দাঁড়িয়ে থাকা, ধীরে ধীরে গলে যাওয়া গাড়ির লাইন, গরমে হাঁসফাঁস করা ভিড়—সব মিলিয়ে জীবন যেন এক স্থবির গতির প্রতিযোগিতা।

সবচেয়ে বিরক্তিকর বিষয় ছিল জ্যাম। স্থির রাস্তার ভেতরে বসে থাকা গাড়ির ভেতর মানুষগুলোও ধীরে ধীরে যেন স্থির হয়ে যেত। কোনো গন্তব্যে পৌঁছানো মানে ছিল ধৈর্যের পরীক্ষা পাস করা। জানালার বাইরে তাকালে শুধু হর্ণের শব্দ, ধুলো আর মানুষের ক্লান্ত মুখ দেখা যেত। ঢাকার রাস্তায় তখন তার মনে হতো, শহরটা যেন জীবন্ত—কিন্তু অসুস্থ এক দেহের মতো, হাঁপাচ্ছে, ছটফট করছে, কিন্তু থামতে জানে না।

এখন সেই দিনগুলো অতীত। ঢাকার জ্যাম, ধুলো, ট্রাফিক—সবই যেন এক অন্য জীবনের স্মৃতি। মাঝে মাঝে মনে হয়, সেই জীবনে ফিরে যাওয়া মানে দুঃস্বপ্নে ঢোকা। অথচ একটা সময় ছিল, যখন রাফিন ভাবত—ঢাকা তার প্রাণের শহর। এই শহরই তার শেকড়, তার সম্ভাবনা, তার বন্ধুদের হাসি, তার যৌবনের গল্প। মনে হতো, এই শহর ছেড়ে সে কোথাও গিয়ে থাকতে পারবে না।

কিন্তু সময়ের নিজের নিয়ম আছে। ধীরে ধীরে পরিবেশ আর পরিস্থিতি মানুষকে এমনভাবে বদলে দেয় যে, একসময় যা ছাড়া বাঁচা অসম্ভব মনে হতো, সেটাই হয়ে যায় ক্লান্তির প্রতীক। এখন ঢাকার নাম শুনলে রাফিনের মনে হয়—ফিরে যাওয়া মানে আবার সেই ধুলো, সেই গুমোট বাতাস, সেই যানজট, সেই বিরক্তিকর গাড়ির হর্ণের তীব্র শব্দে নিজেকে হারিয়ে ফেলা।

সে ভাবে, পৃথিবীতে যত শহর আছে, তার মধ্যে বসবাসের অযোগ্য কয়েকটির তালিকায় প্রায় প্রতি বছরই ঢাকার নাম থাকে। কখনো এক নম্বরে, কখনো তার কাছাকাছি। সংবাদমাধ্যমে এই খবর সে আগেও দেখেছে। তখন বিষয়টা তেমন গুরুত্ব পেত না—হাস্যরসেই উড়িয়ে দিত। কিন্তু এখন মনে হয়, এর ভেতরে সত্যিটা কত ভয়ংকরভাবে লুকিয়ে আছে।

তার মনে পড়ে, নোবেল পুরস্কার আছে মানবজাতির উন্নতির স্বীকৃতিতে, আবার “ইগ নোবেল” আছে হাস্যকর সব আবিষ্কারের জন্য। যদি বসবাস অযোগ্য শহরের জন্যও কেউ পুরস্কার দিত, তবে ঢাকা নিশ্চয়ই প্রতি বছর সেই ট্রফিটা ঘরে তুলত। সে একরকম হেসে ভাবতে থাকে—“তাকে যদি কেউ সেই পুরস্কার গ্রহণ করতে পাঠাত, হয়তো সেখানেই ঢাকার প্রতি তার শেষ দায়িত্বটা শেষ হতো।”

রাফিন জানে, শহরটা হয়তো এখনো জীবন্ত, এখনো মানুষ সেখানে বেঁচে আছে, ভালোও বাসে। কিন্তু তার নিজের ভেতর থেকে শহরটা হারিয়ে গেছে। এখন ঢাকাকে মনে পড়ে শুধু দূরের কোনো দৃশ্যের মতো—চেনা, অথচ আর নিজের নয়।

ঘুম থেকে উঠে তাড়াহুড়ো করে রেডি হতে হয় রাফিনকে। সকালটা যেন সব সময় এক দৌড়ের ভিতর শুরু হয়—ফ্রেশ হওয়া, কাপড় গুছানো, নাশতা গলায় ঢোকানো আর অফিসের জন্য বেরিয়ে পড়া। তাই যেদিন কোনো পরিকল্পনা থাকে, সেদিনের প্রস্তুতি আগের রাতেই নিতে হয়। রাফিনের জীবনে ‘আগের রাতের প্রস্তুতি’ এখন একরকম নিয়মে পরিণত হয়েছে—ব্যাগের চেন টেনে দেখা, ফোন চার্জে দেওয়া, আর মনে মনে হিসেব কষা—কীভাবে সকালটা সামলাবে।

গত মাসেই সে রাজশাহীতে গিয়েছিল। ফেরার সময় সবাইকে কথা দিয়েছিল, ১৯ সেপ্টেম্বর আবার যাবে। কথাটা হয়তো স্রেফ একটা প্রতিশ্রুতি ছিল, কিন্তু রাফিনের কাছে সেটা অনেক বেশি। এবার তাকে যাওয়া নিয়ে কেউ অনুরোধ করেছিল, কেউ বা একটু অভিমান মেশানো কণ্ঠে বলেছিল—“যেতে তো পারো।” রাফিন হাসিমুখে বলেছিল, “যাবো।”
সে জানে, প্রতিশ্রুতি দেওয়া যত সহজ, রাখা ততটা নয়। তবু সে চেষ্টা করে—প্রতিবার, প্রতিশ্রুতির মান রাখার জন্য। যেন নিজের অজান্তেই সে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কবিতার বিপরীতে হাঁটছে। “কেউ কথা রাখেনি”—এই পঙক্তিটা তার কাছে অনেকটা চ্যালেঞ্জের মতো। সে প্রমাণ করতে চায়, “কেউ কেউ কথা রাখে।”

গত বছর একা একা বেনাপোলের ছোট্ট ঘরে বসে সে পড়েছিল নাজিম উদ্দীনের থ্রিলার কেউ কেউ কথা রাখে”। বইটা শেষ করার পর রাফিনের মনে হয়েছিল, নামটাই যেন তার জীবনের সঙ্গে মিলে যায়। তখন থেকেই সে ঠিক করেছিল—যা-ই হোক, নিজের কথার মূল্য সে রাখবেই।

কাজের সুবাদে রাফিন এখন বেনাপোল বন্দরের কাছাকাছি থাকে। সীমান্ত শহর, চারপাশে ট্রাকের গর্জন, মালামাল ওঠানামার শব্দ, পুলিশের বাঁশির আওয়াজ—সব মিলিয়ে জায়গাটা যেন কখনো ঘুমোয় না। কিন্তু এই কোলাহলের মধ্যেই রাফিনের দিন কেটে যায় এক অদ্ভুত স্থিরতায়। অফিস থেকে ফিরে সন্ধ্যাগুলো তার নিজের মতো—এক কাপ চা, টেবিলের পাশে রাখা বই, আর জানালার ওপারে কোলাহলমিশ্রিত নিরবতা।

ওখান থেকে সরাসরি রাজশাহী যাওয়ার কোনো বাস বা ট্রেন কিছুই নেই। বেনাপোল যেন দেশের এক প্রান্ত, আর রাজশাহী অন্য প্রান্তে। ফলে রাফিনের যাত্রাপথ সব সময়ই একটু জটিল হয়ে পড়ে। তাকে প্রথমে যশোর আসতে হয়, তারপর সেখান থেকে রাজশাহীর ট্রেন ধরতে হয়।
যাতায়াতের জন্য ট্রেনই আসলে সবচেয়ে ভালো। তাড়াহুড়ো নেই, বসার আরাম আছে, চাইলে পা ছড়িয়ে বসা যায়, নামাজ পড়া যায়, চাইলে এক কাপ চা নিয়েও বসা যায় জানালার পাশে। ট্রেনে কোনো রকম অস্থিরতা নেই—একটা ছন্দ আছে, একধরনের নির্ভরতা। সে ছন্দে রাফিনের মনের ভেতরও একটা শান্তি নেমে আসে। ট্রেন চলে নিজের মতো, আর যাত্রীরাও তাদের মতো। সময় ঠিক থাকে, পথে ঠেলাঠেলি নেই, আর সবচেয়ে বড় কথা—ভাড়া কম, সময়ও বাঁচে।

কিন্তু সমস্যা একটা, এবং সেটাই আসল।
রাজশাহীগামী ট্রেন ছাড়ে ঠিক বিকেল পাঁচটা আট মিনিটে। সেই ট্রেন ধরতে হলে বেনাপোল থেকে অন্তত দেড়-দুই ঘণ্টা আগে যশোর পৌঁছাতে হয়। মানে অফিস থেকে যদি পাঁচটার ট্রেন ধরতে চায়, তাহলে তিনটার আগেই বের হতে হবে। আর এখানেই রাফিনের সব হিসাব গুলিয়ে যায়।

অফিসে স্যারকে যদি বলে—“স্যার, আজ একটু আগে যেতে চাই,”—তখনই স্যারের মুখের ভাব বদলে যায়। কখনো ঠোঁট চেপে, কখনো ভ্রু কুঁচকে প্রশ্নের পর প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন—“আচ্ছা, হঠাৎ কোথায় যাচ্ছো?”, “আগে জানাতে পারতে না?”, “অফিসের কাজের কী হবে?” এসব প্রশ্ন শুনে রাফিনের ভিতরটা কেমন করে ওঠে। সে জানে, প্রতিবারই এমন হবে, তবু মুখ বুজে সহ্য করে। মাঝে মাঝে ভীষণ বিরক্ত লাগে, কিন্তু বিরক্ত হয়ে লাভ কী! ছুটি তো যেকোনোভাবে নিতে হবেই।

গত কয়েক মাসে অন্তত একবার হলেও রাফিনকে রাজশাহী যেতেই হয়েছে। হয়তো কারো দেখা, কোনো প্রতিশ্রুতি, বা কেবল কিছুক্ষণের মুক্ত বাতাসের প্রয়োজন—যাই হোক না কেন, তাকে যেতেই হয়। কিন্তু অফিস যেন এসব বোঝে না। উল্টো তারা তাকে জিজ্ঞেস করে—
“এতো ঘনঘন রাজশাহী যান কেন?”
“ওখানে কে থাকে?”
“কোনো বিশেষ কাজ আছে?”
প্রশ্নগুলোর সুরে কৌতূহল কম, সন্দেহ বেশি। এসব শুনলে রাফিনের মেজাজ গরম হয়ে যায়, কিন্তু মুখে কিছু বলে না। মনে মনে ভাবে—ছুটি তো আমার পাওনা, আমি কোথায় যাব, কী করবো সেটা জানার অধিকার কারো নেই। কিন্তু অফিসে এসব বললে সেটা ‘অসভ্যতা’ হিসেবে গন্য হয়। তাই সে চুপ থাকে।

এমনকি বৃহস্পতিবার বিকেলে একটু আগে বাসায় ফিরতে চাইলে স্যারদের মুখের অভিব্যক্তি বদলে যায়। কেউ কেউ আবার মজা করে বলে—“আবার রাজশাহী যাচ্ছো নাকি?”
সবাই হাসে, কিন্তু সেই হাসিতে রাফিন নিজের প্রতি একধরনের কটাক্ষ খুঁজে পায়।

বিষয়টা তার মোটেই ভালো লাগে না। তবু সে কিছু বলে না। নিজের ভেতর জমে থাকা ক্ষোভটা চুপচাপ গিলে ফেলে। মনে মনে শুধু ভাবে—
“এই অফিস থেকে যেদিন বদলি হয়ে চলে যাব, সেদিন যদি ফেয়ারওয়েল দেয় আর কিছু বলতে বলে, তখন বলবো—‘বলার কিছু নেই। শুধু চাই, জীবনের বাকি সময় আপনাদের কারো সঙ্গে যেন আর কাজ করতে না হয়।’”
ভাবনাটা মনে হয় তৃপ্তি দেয়, একরকম মানসিক প্রতিশোধের মতো। কিন্তু বাস্তবে সে জানে, এই কথাগুলো সে কোনোদিন বলবে না। হয়তো তখনও সে এক চিলতে হাসি মুখে নিয়ে শুধু বলবে—
“সবাই ভালো থাকবেন।”

এক সপ্তাহ আগেই পাশের সহকর্মীকে রাফিন জানিয়ে রেখেছিল,
“দাদা, আগামী বৃহস্পতিবার, মানে ১৮ সেপ্টেম্বর আমি হয়তো দুই ঘণ্টা আগে বের হবো। সেদিন বিকেলের কয়েকটা কাজ যদি আপনি সামলে নিতে পারেন, আমি আগেই সেগুলো গুছিয়ে রেখে যাব।”

সহকর্মী হালকা হাসলেন, বললেন—
“আচ্ছা, আপনি চিন্তা করবেন না। আমি দেখে নেব।”

রাফিন জানে, কথাটা নিছক ভদ্রতা নয়। এই সহকর্মীর সঙ্গে তার সম্পর্কটা বন্ধুত্বের চেয়ে বেশি পরিণত, কিন্তু অফিসের আনুষ্ঠানিকতা ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগেই। দুজনেই একই ডিপার্টমেন্টে কাজ করেন, আবার কাকতালীয়ভাবে একই বাসায়ও থাকেন। তাই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একে অপরের দেখা হয়; কখনও চায়ের কাপে গল্প, কখনও আবার অফিসের টেনশন ভাগাভাগি করা—সব মিলিয়ে একধরনের সহজ সখ্য গড়ে উঠেছে।

তবুও রাফিন কাজের ব্যাপারে খুব সতর্ক।
সে চায়, নিজের দায়িত্ব অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে না দিয়ে যতটা সম্ভব আগেই শেষ করে রাখতে। তাই পুরো সপ্তাহ জুড়ে সে ফাইল গুছিয়েছে, রিপোর্ট সাজিয়েছে, অসমাপ্ত কাজের তালিকা লিখে রেখেছে নোটবুকে। তার ডেস্কটা এখন এমনভাবে গোছানো যে কেউ এলেও সহজেই বুঝতে পারবে কোন কাজ কোথায় থেমে আছে।

কয়েকদিন আগেই অবশ্য স্যারের কাছ থেকে অনুমতিটাও নিয়ে রেখেছে।
স্যার প্রথমে মুখে কিছু বলেননি, কিন্তু রাফিন টের পেয়েছিল—তার চোখে একধরনের অস্বস্তি ঘুরছে।
কিছু না বললেও সেই দৃষ্টিটা যেন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়, “আবার রাজশাহী যাচ্ছেন?”
রাফিন মৃদু হেসে বলেছিল, “জী, একটু ব্যক্তিগত কাজে যেতে হবে।”
স্যার মাথা নেড়ে বলেছিলেন, “ঠিক আছে, তবে কাজ যেন ঠিকমতো ম্যানেজ হয়।”
“জী স্যার,” সংক্ষিপ্ত উত্তর দিয়েছিল রাফিন।

আজ রাতে ঘুমানোর আগে তাই সে শেষবারের মতো নিজের ব্যাগটা খুলে দেখল।
সব ঠিকঠাক আছে কি না—চার্জার, পাওয়ার ব্যাংক, ফাইলের কপি, একটা ছোট নোটবুক, আর প্রিয় কলমটা।
ব্যাগের এক পাশে কাপড়চোপড়, অপর পাশে বই।
যদিও এবার মাত্র দুই রাত আর একদিনের সফর, তবুও রাফিন ব্যাগ ভর্তি করে ফেলেছে।
টিশার্ট, জিন্স আর স্নিকার্স—এগুলো তো আছেই, সঙ্গে এবার রাখল একটা পাঞ্জাবি, পায়জামা আর নতুন সেন্ডেল।
ভাবল, একদিন অন্তত একটু আলাদা পোশাক পরবে; শহর বদলালে মানুষও যেন অল্প কিছুটা বদলায়।

সব গুছিয়ে নিয়ে রাফিন জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
বাইরে রাত নেমেছে, দূরে বন্দরের আলো চিকচিক করছে।
হঠাৎ মনে হলো—এই শহর, এই ছোট্ট ঘর, এই একঘেয়ে জীবন থেকে বেরিয়ে রাজশাহীর পথে যাত্রাটা যেন কেবল দূরত্ব নয়, বরং একধরনের মুক্তি।

বিছানায় শুয়ে মোবাইলে অ্যালার্ম সেট করল সকাল ছয়টার।
চোখ বন্ধ করার আগে মনে হলো, জীবনে কত ব্যস্ততা, দায়িত্ব, নিয়ম—সবকিছুর ভেতরেও মানুষ একটা যাত্রার জন্যই বাঁচে।
রাফিনও তাই।

কোথাও যাওয়ার জন্য রাফিন সব সময় স্কুল ব্যাগের মত একটা কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ ব্যবহার করে। ব্যাগটিকে অবশ্য স্কুল ব্যাগ না বলে ল্যাপটপ ক্যারি করার ব্যাগ বলা যেতে পারে। গতবছর অক্টোবরে রাফিন যখন তার বন্ধু মুবাশশিরকে সাথে নিয়ে ঢাকায় গিয়েছিল তখন ব্যাগটি কিনেছিল। রাফিনের সেদিনের কথা বেশ মনে আছে। সেদিন সে মুবাশশিরকে সাথে নিয়ে গিয়েছিল রাদিদের বাসায়। রাফিনের আরেক বন্ধু। ওরা থাকে বনশ্রীতে। রাদির বাবা একজন ম্যাজিশিয়ান। মুবাশশিরের ম্যাজিকের প্রতি প্রবল আগ্রহ থাকায় সেখানেই নিয়ে গিয়েছিল। রাদি আর মুবাশশিরের মধ্যেও দারুণ বন্ধুত্ব হয়ে গিয়েছিল। তিনজন মিলে বসুন্ধরা সিটিতে গিয়ে সিনেমা দেখেছিল। সিনেমার নাম আজ আর রাফিনের মনে নেই। সেদিন বসুন্ধরা সিটি থেকে নেমে ফুটপাথ ধরে হাটতে হাটতে একটি ব্যাগের দোকানে ঝুলানো ব্যাগগুলো দেখে ওর খুব পছন্দ হলো। দেখলো অন্যান্য যায়গার তুলনায় এখানে দাম কিছুটা কমই মনে হচ্ছে। তাই সুযোগ বুঝে একটা ব্যাগ নিয়ে নিলো। আসার সময় যে পুরোনো ব্যাগটা সে নিয়ে এসেছিল ঢাকা থেকে ফেরার পথে সেটা আর টেনে নিলো না। মুবাশশিরকে সাথে নিয়ে কেনা সেই ব্যাগটাই এখন রাফিনের ভ্রমণ সঙ্গী। একবার রাফিনের এক বন্ধু ব্যাগটা বদল করতে চেয়েছিল। কিন্তু কোনো কারণে তা বদল করা হয়নি।

রাতে ঘুমানোর আগে আগে সেই ব্যাগে টিশার্ট,প্যান্ট,বেল্ট,সেন্ডেল সহ প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে নিলো। শুধু বাকি থাকলো মোবাইলের চার্জার আর ব্রাশ। যেহেতু পরদিন সকালে উঠে ব্রাশ করতে হবে তাই ব্রাশ আগেই ব্যাগে ঢোকাতে পারলো না। যথারীতি পরদিন সকালে অফিসে গেল। এই ট্যুর প্ল্যান আগেই করা ছিল বলে এগারদিন আগেই ট্রেনের যাওয়া এবং ফেরার টিকেট করে রেখেছিল। দেরি করলে মূলত টিকেট পাওয়া যায় না। এই দীর্ঘ পথ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করা কিছুটা কষ্টসাধ্য হলেও অসম্ভব না। কিন্তু দাঁড়িয়ে ভ্রমণ করতে গেলে কিছু অসুবিধায় পড়তে হয় বলেই অগ্রিম টিকেট করে রাখা। রাফিন সব সময় একটি থিওরি ফলো করে আর তা হলো সুযোগ হাতছাড়া করা যাবে না। যাওয়া হোক চাই না হোক অগ্রিম টিকেট করে রাখে। যদি যেতে না পারে তবে কিছুক্ষণ আগে টিকেট ক্যান্সেল করলেও টিকেটের টাকার সিংহভাগ ফেরত পাওয়া যায়। কিন্তু যদি টিকেট না  করে তাহলেতো সেদিন যাওয়ার সুযোগ হলেও সিট পাওয়ার চান্স থাকে না। রাফিনের জীবনে এরকম অনেক ঘটনাই ঘটেছে। মুবাশশিরকে নিয়ে গত বছর অক্টোবরে যখন ঢাকায় যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তখনো এভাবেই টিকেট করেছিল। কিন্তু হঠাৎ জানতে পারলো ছুটি বাড়ানো হয়েছে। ফলে সেই টিকেট ক্যান্সেল করে ভ্রমণের ডেট এগিয়ে এনে নতুন করে টিকেট করেছিল। এ কারণেই রাফিন অগ্রিম টিকেট করে রাখে। এখন রেল ভ্রমণ অনেক সহজ ও আরামদায়ক হওয়ার পাশাপাশি সাশ্রয়ী হয়েছে। টিকেটের দামও বাসের তুলনায় কম। ভ্রমনের সময় টিকেট দেখানোও লাগে না। তারপরও রাফিন টিকেটের একটা কপি প্রিন্ট করে ব্যাগে ঢুকিয়ে রেখেছে।

ট্রেনে রাফিন আর আমার সিট পড়েছিল মুখোমুখি। মাঝখানে ছোট্ট একটা টেবিল—তার উপর রাখা দুটো চায়ের কাপ, একটায় এখনো ধোঁয়া উঠছে। জানালা দিয়ে ঢুকছে বিকেলের ম্লান আলো, কখনো আলো, কখনো ছায়া এসে পড়ছে রাফিনের মুখে।

কীভাবে রাফিনের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল—সেটা পরে বলব।
ও গল্পটা একটু আলাদা, সময় নিয়ে বলতে হবে।
আজ বলি, সেই দিনটার কথা—যেদিন আমরা প্রথম একসাথে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিচ্ছিলাম, আর আমি মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলাম ওর জীবনের গল্প।

ট্রেনটা এগোচ্ছিল ছন্দে ছন্দে, একটার পর একটা স্টেশন পেরিয়ে যাচ্ছিল।
কখনো দূরে দেখা যাচ্ছিল গাছের সারি, কখনো জনমানবহীন ফাঁকা মাঠ।
বাতাসে মিশে ছিল শীতলতার সাথে একধরনের মেঘলা গন্ধ।
কিন্তু কামরার ভেতর অন্যরকম আবহ—একজন মানুষ নিজের জীবনের গল্প খুলে দিচ্ছে, আর একজন শুনছে অজানা এক মুগ্ধতায়।

রাফিনের জীবনের গল্প যেন নদীর মতো—একবারও সোজা চলে না, কোথাও বাঁক নেয়, কোথাও গাঢ় হয়, কোথাও হারিয়ে যায় কুয়াশায়।
আমি বারবার ওকে থামিয়ে প্রশ্ন করছিলাম, “তারপর কী হলো?”, “আপনি তখন কেমন অনুভব করেছিলেন?”, “ওই মানুষটার সঙ্গে যোগাযোগ আছে এখনো?”
রাফিন শান্তভাবে উত্তর দিচ্ছিল, কখনো মুচকি হাসছিল, আবার হঠাৎ থেমে যাচ্ছিল।

তার দুই চোখে তখন জল টলমল করছিল।
এক ফোঁটা গড়িয়ে পড়ল গালে, আলোয় চিকচিক করল এক মুহূর্ত, তারপর মিলিয়ে গেল।
সে রাজশাহী থেকে ফিরে আসছিল নিজের জগতে, কিন্তু মনে হচ্ছিল কিছু একটা রেখে এসেছে পেছনে—হয়তো কোনো মানুষ, হয়তো কিছু না-বলা কথা, হয়তো শুধু একটুখানি ভালোবাসা।
ওর মুখে তখন এমন এক প্রশান্তি আর বিষণ্ণতা একসাথে মিশে ছিল যা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।

রাফিন বুকের সাথে একটা ব্যাগ জাপটে ধরে রেখেছিল।
আরেকটা ব্যাগ উপরে, বাঙ্কারে রাখা।
যেভাবে কোনো শিশু তার প্রিয় খেলনাটা আগলে রাখে, ঠিক সেভাবেই ও ব্যাগটা আঁকড়ে ছিল।
আমার কৌতূহল হচ্ছিল—ওই ব্যাগে কী আছে? কাপড়, বই, না হয়তো কিছু ব্যক্তিগত জিনিস?
কিন্তু আমি প্রশ্ন করিনি।
মনে হচ্ছিল, ওই ব্যাগটা হয়তো শুধু জিনিসপত্র নয়, বরং কোনো স্মৃতি, কোনো গোপন অধ্যায়ের রক্ষক।

ট্রেনের ঝাঁকুনি আর ছন্দ মিলেমিশে এক অদ্ভুত সুর তৈরি করছিল।
আমার মনে হচ্ছিল—এই গল্পগুলো হারিয়ে যাওয়া উচিত নয়।
রাফিনের জীবনের প্রতিটি বাঁক, প্রতিটি অনুভব যেন কোনোভাবে ধরে রাখতে পারি, লিখে ফেলতে পারি, যাতে অন্যরা জানে এমন মানুষ, এমন গল্প এখনো আছে এই পৃথিবীতে।

তখনই মনে হলো, এই গল্পটা আমারই লেখা উচিত।
রাফিনের গল্প—যার শুরু হয় রাত জাগা এক মানুষ থেকে, আর শেষ কোথায় হবে এখনো জানা নেই।

যাই হোক, ফিরে যাই আগের দিনের গল্পে।
যেদিন রাফিন অফিসে বসে ক্ষণ গুনছিল,
ঘড়ির কাঁটা চারটার দিকে এগোচ্ছে ধীরে ধীরে।
তার চোখে তখন সময়ের হিসেব, মনে কেবল একটাই ভাবনা—
কখন এই অফিস ছুটবে,
কখন বাসায় পৌঁছে আগেই গুছিয়ে রাখা ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে
রাজশাহীর ট্রেন ধরতে ছুটে যাবে স্টেশনের পথে।

ছিমছাম, ছোট্ট, নিরিবিলি একটি অফিসে কাজ করে রাফিন। অফিসের ঘরটা বড় নয়, কিন্তু সবসময়ই পরিচ্ছন্ন থাকে। টেবিলের ওপর সাজানো কিছু ফাইল, পাশে ধোঁয়া উঠা চায়ের কাপ, আর দেয়ালে ঝুলানো ঘড়ির টিকটিক শব্দ—এই নিয়েই দিন চলে যায়। সেখানে রাফিনসহ আরও ছয়জন কর্মকর্তা কাজ করেন। সবাই বেশ ভদ্র, নিজের মতো কাজ নিয়ে ব্যস্ত। তবে অফিসে তেমন কথাবার্তা বা হাসিঠাট্টা হয় না। সহকর্মীদের সঙ্গে সম্পর্কও মেপে মেপে—‘তুই’ নয়, বরং ‘আপনি’। সেই ‘আপনি’ সম্বোধনের ভদ্র দূরত্বটুকু অফিসের পরিবেশে এক ধরনের শৃঙ্খলা এনে দিয়েছে, যদিও কখনো কখনো রাফিনের মনে হয় একটু প্রাণচাঞ্চল্য থাকলে খারাপ হতো না।

অফিসের পাশেই একটি আবাসিক ভবনের চারতলায় দুই রুমের একটি ছোট বাসায় থাকে রাফিন। একই অফিসের আরও দুজন সহকর্মী তার রুমমেট। তারা সকালে একসাথে বেরোয়, আবার রাতে প্রায় একই সময়ে ফিরে আসে। রান্নার ব্যবস্থা থাকলেও তিন বেলাতেই তারা বাইরে খায়—সম্ভবত সময়ের অভাব আর একটু অলসতাই এর কারণ।

সেদিন বিকেলে রাফিন অফিসের কাজ সেরে স্যারের রুমে গিয়ে বিনয়ের সঙ্গে জানাল—
“স্যার, আজ একটু আগে যেতে হবে।”
স্যার মাথা নেড়ে অনুমতি দিলেন, “ঠিক আছে, তবে বেরোনোর আগে থাম্বসটা দিয়ে যেও।”

অফিসে ডিজিটাল অ্যাটেন্ডেন্স সিস্টেম চালু হয়েছে কিছুদিন হলো। সকালে একবার আর বিকেলে একবার—দুইবারই আঙুলের ছাপ দিতে হয়। এতে বোঝা যায় কর্মীরা সত্যিই কত ঘণ্টা অফিসে ছিলেন। আগের হাজিরা খাতার মতো নয় যে কেউ সাইন করে বেরিয়ে গেলেও সারাদিনের উপস্থিতি দেখায়। তাই রাফিন বিকেল চারটার আগেই একবার থাম্বস দিয়ে বেরিয়ে গেল। জানতো, রাজশাহীর ট্রেন ধরতে এখন আর দেরি করা চলবে না।

বাইরে তখন বেশ রোদ, বাতাসে আর্দ্রতার ছোঁয়া। গরমের সঙ্গে মিশে আছে বৃষ্টির গন্ধ। আকাশের একপাশে মেঘ জমেছে, যেন একটু পরেই নামবে ঝুমবৃষ্টি। রাফিনের ব্যাগে ছাতা ছিল, তবু সে আকাশের দিকে একবার তাকাল—মেঘের ভাঁজে সূর্যের আলো মিশে একটা অদ্ভুত সোনালি রঙ তৈরি হয়েছে। তার ভেতরে হালকা উত্তেজনা কাজ করছে, যেন দীর্ঘ প্রতীক্ষিত কোনো যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে।

অফিস থেকে কয়েক মিনিট হাঁটলেই বাসস্ট্যান্ড। সে পৌঁছে দেখলো আগেই একটি বাস দাঁড়িয়ে আছে। গন্তব্য যশোর শহরের উপকণ্ঠ—চাচড়া। সেখান থেকে অটোরিকশায় করে স্টেশন পৌঁছানো যাবে। বাসে উঠেই বুঝল, আজও সিট নেই। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা এক বৃদ্ধ বলল, “এই রুটে সিট পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার বাবা!”
রাফিন হেসে বলল, “ঠিকই বলেছেন চাচা, এই রাস্তায় সবারই যেন কোথাও না কোথাও যাবার তাড়া।”

বাসের ইঞ্জিন গর্জে উঠলো। ঠাসাঠাসি ভিড়, জানালার ধারে গরম বাতাস ঢুকছে, মাঝে মাঝে মেঘে ঢেকে যাচ্ছে সূর্য। তবু রাফিনের মনে আজ কোনো বিরক্তি নেই—তার চোখে এখন রাজশাহীর ট্রেন, স্টেশনের হুইসেল, আর এক প্রতিশ্রুত যাত্রার দৃশ্য ভেসে উঠছে।

একসময় বাস চাচড়া চেকপোস্টে গিয়ে থামলো। গরম বাতাসে ধুলোর হালকা ঘূর্ণি উঠছে, হকাররা ঠেলাগাড়িতে কলা আর চানাচুর বিক্রি করছে। রাফিন ব্যাগটা কাঁধে তুলে নামল। সময় তখন বিকেল সাড়ে চারটা। তার ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে নিল—রাজশাহীগামী ট্রেন ছাড়বে ৫টা ৮ মিনিটে। হাতে খুব বেশি সময় নেই, তবু তার মনে হলো একটা কাজ আগে করতেই হবে।

ও আগেই দেখে রেখেছিল, আজ আছরের ওয়াক্ত শুরু হবে সাড়ে চারটায়। ট্রেন মিস করার ভয় থাকলেও নামাজ মিস করতে চায়নি সে। স্টেশনে না গিয়ে সোজা পাশে থাকা নতুন মডেল মসজিদে ঢুকে পড়ল। মসজিদের ভেতর হালকা ঠান্ডা বাতাস, জানালার ফাঁক দিয়ে পড়ছে ম্লান বিকেলের আলো। ওজু শেষে নামাজে দাঁড়াতেই মনে হলো যেন দিনের সব অস্থিরতা গলে যাচ্ছে। রুকু-সিজদার ফাঁকে রাজশাহীর ট্রেন, প্রতিশ্রুতি, আর এক মুখ যেন চোখের সামনে ভেসে উঠছে।

নামাজ শেষ করে রাফিন আস্তে আস্তে বেরিয়ে এল। বাইরে এখন হালকা বাতাস বইছে, আকাশে কিছুটা কালো মেঘ জমেছে। হাতে সময় আর খুব বেশি নেই। হালকা দৌড়ে রাস্তা পার হয়ে সে রিকশা ধরে স্টেশনের দিকে রওনা দিল। রিকশার চাকাগুলো যখন রেলস্টেশনের দিকে ঘুরছে, রাফিনের মনেও তখন একরকম ভারী নীরবতা ঘুরছে।

সে জানে—রাজশাহীতে তার এই যাওয়া একরকম কথা রাখার যাত্রা। কেউ একজনকে সে কথা দিয়েছিল, তাইই আজকের এ ছুটে চলা। কিন্তু অন্যবারের মতো এবার তার যাত্রাটা আনন্দমুখর নয়। আগে যে মানুষটা মিনিটে মিনিটে খোঁজ নিতো—“পৌছালে?”, “কোথায় আছো এখন?”, “চা খাওনি কেন?”—এবার সে যেন পুরোপুরি নীরব। ফোনের স্ক্রিনে কোনো মেসেজ নেই, কোনো কল নেই।

রাফিন জানে, তাকে এই নীরবতাই মেনে নিতে হবে। তবুও মনটা কেমন যেন হালকা শূন্যতায় ভরে ওঠে। কল্পনাও করেনি এতটা নির্লিপ্ততা তাকে এভাবে ছুঁয়ে যাবে। পরে অবশ্য জানতে পেরেছিল, ওই মানুষটি খুব অসুস্থ ছিল—তাই তেমন খোঁজ নিতে পারেনি। তবু সেই ব্যাখ্যা রাফিনের বুকের ভেতরের শূন্যতাটা পুরোপুরি ভরাতে পারেনি।

রাফিনের গল্পে একটু বিরতি দিই। কারণ জীবনের গল্পগুলোও মাঝেমাঝে থেমে গিয়ে আমাদের ভাবতে শেখায়।
ওপাশের মানুষটির থেকে সেভাবে সাড়া না পেয়ে রাফিন হয়তো ভেবেছিল—সময় হয়তো সবকিছু বদলে দিয়েছে, হয়তো মানুষটিও বদলে গেছে। আমরা আমাদের জীবনে অনেক সময় এমনটা ভাবি। একতরফা বিচার করি, মুদ্রার শুধু এক পিঠটিই দেখি। অপর পিঠে যে কেমন অন্ধকার, কেমন অসহায়তা বা ব্যস্ততার ভার লুকিয়ে থাকে, সেটা ভাবি না।

আসলে ভাবলেই দেখতাম, আমাদের মনে যে সন্দেহ, কষ্ট আর দ্বিধাদ্বন্দ্ব জমে থাকে, তার অর্ধেকটাই হয় অজানার কারণে। অনেক সম্পর্ক নষ্ট হয় এই ভুল বোঝাবুঝির বীজ থেকেই।
রাফিনও শুরুতে ভেবেছিল, মানুষটি ইচ্ছে করেই তাকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু পরে যখন জানতে পারলো সে ভীষণ অসুস্থ, তখন তার ভেতরের সব ক্ষোভ গলে গিয়ে একরকম মায়ায় পরিণত হলো। জীবনকে তখন একটু নতুন চোখে দেখা শুরু করল সে।

এই পর্যন্ত এসে মনে হয় গল্পের শুরুর অংশটাই বলা দরকার।
না হলে পাঠকের মনে প্রশ্ন থেকেই যাবে—রাফিন আসলে কার জন্য এতটা পথ পাড়ি দিচ্ছিল? কে সেই মানুষটি, যে নীরব থেকেও রাফিনের জীবনে এত প্রভাব ফেলতে পারে?

আমার সাথে রাফিনের পরিচয় হয়েছিল রাজশাহী থেকে ফেরার পথে, ট্রেনে একই কামরায়, মুখোমুখি সিটে বসে। তখনও জানতাম না, এই অপরিচিত তরুণের গল্প আমাকে এমনভাবে ছুঁয়ে যাবে। আমি সেদিন রাজশাহীতে গিয়েছিলাম বোন আর ভাগ্নেকে দেখতে। ব্যস্ত জীবনে ছুটি মেলে না, তাই দুই দিনের ছোট্ট সফরেই মনটা একটু হালকা করতে চেয়েছিলাম।

আমার ট্রেন ছিল দুপুর আড়াইটায়। ফলে সকালে ঘুম থেকে উঠেই তাড়াহুড়ো লেগে গেল। ব্যাগ গোছানো, নাস্তা, পোশাক বদল—সব মিলিয়ে সময়ের পেছনে ছুটছি যেন। বোনের বাসা শালবাগান পাওয়ারহাউস মোড়ের কাছে, আসাম কলোনীতে।
যখন বের হতে যাবো, দেখি বোনটা নামাজে দাঁড়িয়েছে। ভাগ্নেটাকেও দেখলাম না, হয়তো ঘরের ভেতরে খেলছিল। আম্মুকে বলেই বেরিয়ে গেলাম। মনে হচ্ছিল, দশ মিনিট দাঁড়ালে হয়তো ওদেরকেও বলে যেতে পারতাম—“চল ফিরে এলেই দেখা হবে।”
কিন্তু তাতে ভয় ছিল—ট্রেনটা মিস হয়ে যাবে না তো?

ট্রেন মিস করার ভয়টাই আমাদের জীবনে অনেক সময় মানুষ মিস করার কারণ হয়ে যায়—এ কথাটা তখন ভাবিনি।

কাঁধে তখন দুটো ব্যাগ। একটা কাঁধে ঝুলছে, অন্যটা হাতে। ভেতরে দু’দিনের সফরের জামাকাপড়, এক জোড়া স্যান্ডেল আর কিছু ছোটখাটো জিনিস। ব্যাগের ভারে শরীরটা যেন খানিকটা হেলে যাচ্ছে, তবু তাড়াহুড়ো থামছে না। রেলস্টেশনের দিকে যেন নিজের সাথেই এক দৌড় প্রতিযোগিতা চলছে।

রিকশা নিলাম, আর রিকশাও যেন বুঝে ফেললো যাত্রীটা তাড়ায় আছে—একটা টানটান ছোটা শুরু করল। রাস্তার বাতাসে তখন একটা অদ্ভুত ঘ্রাণ—ভেজা মাটির গন্ধ, ধুলো, আর গরম লোহা-পিচের গন্ধ মিলেমিশে একটা ভারী গন্ধে পরিণত হয়েছে। আকাশে কালো মেঘ জমে আছে, মাঝে মাঝে বিদ্যুতের আলোয় এক মুহূর্তের জন্য চারপাশ উজ্জ্বল হয়ে উঠছে।

ট্রেন মিস করার ভয়টা তখনও ছিল, কিন্তু তার চেয়েও বেশি ভয় ছিল হঠাৎ বৃষ্টি এসে সবকিছু ভিজিয়ে দেবে। দীর্ঘ পথ ভেজা শরীরে গেলে ঠান্ডা লেগে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে—আর রাজশাহীর সফরটা তখনই নষ্ট হয়ে যাবে।

রিকশা যখন রেলগেটের কাছে পৌঁছালো, তখন হঠাৎ করেই থেমে গেল। সামনে রেলগেট বন্ধ, আর রাস্তার দুই পাশ জ্যামে একাকার। যতদূর চোখ যায়, শুধু রিকশা আর মোটরসাইকেলের লাইন। কাদা জমে রাস্তা এমন নরম হয়ে গেছে যে পা রাখলে জুতা আটকে যায়। মনে হলো এই জ্যাম বুঝি কখনোই ছাড়বে না।

আমি যে রিকশায় বসে ছিলাম তার চারপাশে আরও কয়েকটা রিকশা এমনভাবে দাঁড়িয়ে আছে যে, নামার উপায় নেই। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম, কিন্তু সময় থেমে থাকেনি। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলছে নিজের মত করে।

শেষ পর্যন্ত গেট খুলে গেলে রিকশাগুলো একসাথে ছুটে চললো—হঠাৎ যেন শহরটা আবার শ্বাস নিতে শুরু করল। রিকশা সামান্য এগোতেই দেখি আবারও থেমে গেছে। এবার আর অপেক্ষা করিনি। ব্যাগ কাঁধে নিয়ে নেমে পড়লাম, আর যতটা পারি হাঁটতে শুরু করলাম।

পথের কাদা, ঠান্ডা বাতাস, মানুষের ভিড়—সবকিছুকে অগ্রাহ্য করে দৌড়াচ্ছি। মাথায় তখন একটাই চিন্তা, “ট্রেনটা যেন মিস না হয়।”

রেলস্টেশনের দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িতে সময় তখন ৫টা বেজে ১ মিনিট। হাতে মাত্র কয়েক মিনিট। সৌভাগ্যক্রমে টিকিট আগে কাটা ছিল, তাই লাইনে দাঁড়ানোর ঝামেলা নেই। ভেতরে ঢুকেই দেখি চার নাম্বার প্ল্যাটফর্মে ট্রেনটা দাঁড়িয়ে আছে—গাঢ় লাল আর নীল বগির শরীরে সূর্যের শেষ আলোটা লেগে একরকম ধাতব আভা তৈরি করেছে।

প্ল্যাটফর্মে ভিড়, চা-ওয়ালার হাঁক, ট্রেনের ইঞ্জিনের শিস—সব মিলিয়ে একটা চিরচেনা কোলাহল। প্ল্যাটফর্মের শুরুতেই বড় একটা প্ল্যাকার্ডে লেখা,
বেনাপোল এক্সপ্রেস — রাজশাহী।”

মনে হলো এই নামটাই যেন এক টান দেয় বুকের ভেতর।

হেঁটে হেঁটে নিজের বগি খুঁজে বের করলাম। দরজার ধাতব হাতলটা ধরতেই হাতটা ঠান্ডা হয়ে গেল। ভেতরে ঢুকে দেখি যাত্রীরা প্রায় সবাই বসে গেছে। সিট নম্বর খুঁজে বসে পড়লাম। নিঃশ্বাসটা যেন গলার ভেতর থেকে ধপ করে নেমে এলো—সময় মতো পৌঁছেছি।

বাইরে তখন ট্রেন ছাড়ার সিগন্যাল বাজছে, আর আমি জানালার ধারে বসে ভাবছি—এই সফরটা অন্যরকম হবে।

কাপড় ভর্তি ব্যাগটা ট্রেনের লাগেজ বাঙ্কারে রেখে দিলাম। অন্য ব্যাগটা বুকের কাছে জাপটে ধরলাম, যেন সবকিছু নিজের হাতের নাগালে থাকে। কপোতাক্ষ এক্সপ্রেসের গন্তব্য খুলনা।

আমার সামনের সিটে জানালার ধারে বসে ছিল এক তরুণ। চোখ-মুখ অন্ধকারমাখা, চেহারায় যেন দীর্ঘ সময়ের দুঃখের ছাপ। বারবার সে জানালা দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছিল—কেউ আছে কি না, কাউকে খুঁজছে কি না, মনে হচ্ছিল যেন।

নির্ধারিত সময়ে ট্রেন ছুটতে শুরু করল। তখনই দেখলাম, তরুণ জানালায় মুখ ঠেকিয়ে হুহু করে কেঁদে উঠল। চোখের জল অবিরাম ঝরছে, গাল ভিজে গেছে। তার সেই জলভরা চোখ যেন কাউকে খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত হয়ে গেছে। প্রিয় কাউকে হয়তো ছেড়ে চলে যাচ্ছে—অথবা খুঁজে পাচ্ছে না—তাই এমন করুণ চুপচাপ কান্না।

আমি আগ্রহী হয়ে জানালার বাইরে তাকালাম, তার উদ্দেশ্যে কেউ হাত নেড়েছে কি না দেখতে। কিন্তু দেখা গেল, পাশে কেউ নেই।

ট্রেনের অন্যান্য যাত্রীরাও লক্ষ্য করেছে। কেউ ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে, কেউ হয়তো ভাবছে—“প্রিয়জন হারিয়ে গেছে, তাই এমন কান্না।” কেউ হয়তো মনে করছে, হয়তো আজকার পরীক্ষার ফল ভালো যায়নি, তাই মন ভেঙেছে।

আমার মনটা অন্য দিকে গিয়ে আটকাল। মনে হচ্ছিল, তরুণটির কান্নার কারণ প্রেম-বিরহ। হয়তো প্রিয়জন দূরে চলে গেছে, হয়তো আর দেখা হবে না—এই ভাবনায় চোখ ভিজেছে। আর আমি চুপচাপ বসে সেই কান্নার মুহূর্তটা দেখছিলাম, যেন তার ব্যথা আমার চোখে ও মনে একসাথে প্রতিফলিত হচ্ছে।

চলন্ত ট্রেনের জানালায় মুখ ঠেকিয়ে হুহু করে কাঁদছে এক তরুণ। বয়স আনুমানিক আটাশের মতো, কিন্তু তার কান্নার ভেতর যেন অন্তহীন দুঃখ লুকিয়ে আছে। মুখ থেকে বেরোয়া শব্দ ট্রেনের ঝিকঝিক আওয়াজে হারিয়ে গেলেও চোখ থেকে ঝরে পড়া অশ্রু অদৃশ্য হলেও স্পষ্ট। ছোট ছোট জলবিন্দু জানালার কাচে লেগে ভেসে যাচ্ছে, আর ধীরে ধীরে একাকার হয়ে যাচ্ছে ট্রেনের ধূসর আলোতে।

তরুণের চোখে এখন শুধু কাঁদার একমাত্র উদ্দেশ্য—মনকে হালকা করা। সে জানে, এই মুহূর্তে কোনো মানুষের দৃষ্টি তার কান্নাকে বিচার করবে না। কাঁদতে কাঁদতে সে যেন নিজেকে, অতীতের ভাঙা স্মৃতি আর হারানো মুহূর্তগুলোর সঙ্গে একত্রিত করছে। চোখের জল ভেসে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে গোটা ট্রেনটা তার সঙ্গে কেঁদে যাচ্ছে। বাইরের মানুষের কৌতূহল, ব্যস্ততা বা উদাসীনতা—কোনোটিই তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।

সে বারবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছে। হয়তো খুঁজছে কাউকে, হয়তো নিজের কষ্টের কারন খুঁজছে। চোখ ভেজা, গাল অশ্রুসজল, কিন্তু মুখে কোনো অসহায়তার ছাপ নেই—শুধু গভীর ব্যথা ও নীরব বেদনা। তার কান্নার ভেতর শুধু দুঃখ নয়, এক ধরনের মুক্তি আছে। এই অশ্রুর মধ্যে সে নিজের সমস্ত চাপ, ক্লান্তি ও বেদনা ঢেলে দিচ্ছে।

আমি তখনও তাকিয়ে আছি। তাকে চিনি না, আগে কখনো দেখিনি। আজই প্রথম দেখলাম। আমার সিট আর তার সিট মুখোমুখি—একের পর এক মুহূর্তে যেন আমরা একে অপরের উপস্থিতি অনুভব করছি।

কিছুক্ষণ চুপচাপ দেখার পর আমি বুঝতে পারি, চোখের জল ভেসে গেলেও তার মনটা কেবল ভেঙে পড়ছে না—বেদনার সঙ্গে প্রশান্তির এক ধরনের মিল তৈরি হচ্ছে। ট্রেনের ঝিকঝিক আওয়াজ, প্ল্যাটফর্মের ভিড়, চা-ওয়ালাদের ডাক—সব মিলেমিশে তার কাঁদার মুহূর্তকে আরও গভীর করছে। বুকের কাছে ব্যাগ জাপটে ধরে রাখা, চোখের জল ভেসে যাওয়া, সব মিলিয়ে একটি নিঃশব্দ একাকিত্ব তৈরি করছে।

শেষে বুঝতে পারি, এই ছেলেটিই—রাফিন।

আসাম কলোনীর ছোট্ট, নিরিবিলি গলির মধ্যে রাফিন বেরিয়ে তাকাল—কিন্তু আদিবার কোথাও দেখা মিলল না। আশেপাশের প্রতিটি কোণশ্রেণী যেন নিরব, যেন হঠাৎ সব শব্দ থেমে গেছে। রিকশা থেকে নেমে মাত্র কয়েক মিনিট হয়েছে, আর এখন সেই নীরবতা তার মনে হালকা উদ্বেগ জাগাচ্ছে। আদিবার কাছে এই এলাকা একেবারেই অচেনা। যদিও সে কয়েক বছর ধরে রাজশাহীতে আছে, কিন্তু কখনো এই গলির ভিতরে হাঁটেনি। আসার প্রয়োজনও পড়েনি। আজ সে এসেছে রাফিনের সঙ্গে।

আদিবা রিকশায় বসে থাকতে চেয়েছিল, কিন্তু রাফিন বলল—“এখানেই দাঁড়াও।” সে বাধ্য হয়ে দাঁড়িয়ে রাফিনের পিছুটান করল। হালকা হাওয়া বইছে, আকাশে সন্ধ্যার নীলাভ ছায়া আর কিছু মেঘ ভেসে চলেছে। বাতাসে বৃষ্টির আগের আর্দ্রতা আছে, আর কাদামাখা রাস্তার গন্ধ দূরে পর্যন্ত ভেসে যাচ্ছে।

গলির ভিতরে রাফিনের বাসা। দরজা বন্ধ, জানালা থেকে হালকা আলো বের হচ্ছে। বাসার ভিতরে আম্মু, ছোট বোন রুহামা এবং ভাগ্নে জিসান আছে। রেস্টুরেন্ট থেকে আনা প্যাকেট—পিৎজা, বার্গার আর ফ্রাইড চিকেন—রাফিন হাতে ধরে কলিংবেল বাজাল।

মাত্ৰ কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই জিসান দৌড়ে এল। চার বছরের ছোট্ট ছেলেটি, মামাকে দেখে উত্তেজনায় লাফাচ্ছে। মুখে হাসি, চোখে কৌতূহল, কিন্তু একই সঙ্গে তার ছোট্ট মনে কিছু অভিযোগও—মামা সব সময় যথাযথ মনোযোগ দেয় না, এই অভিযোগের শেষ নেই। রাফিন তাকে শান্ত করার জন্য হালকা করে হাসল এবং হাতে থাকা খাবারগুলো টেবিলে সাজাতে লাগল।

রাস্তার দিকে তাকিয়ে রাফিন অনুভব করল—সন্ধ্যার হালকা নীলাভ আলো, বাতাসের আর্দ্রতা, শিশুর খেলা এবং বাসার উষ্ণ আলো—সব মিলিয়ে এক শান্তি আর উষ্ণতার অনুভূতি তৈরি করছে। হঠাৎ মনে হলো, এই ছোট্ট মুহূর্তগুলোই জীবনের সব আনন্দ।

রাফিনের ছোট বোনের নাম রুহামা। এ বছর রুহামা এসএসসি পাশ করলো। পরীক্ষা শেষে সে গিয়েছিল ছোট চাচ্চুর বাসায়।

ঢাকার বনশ্রীতে ছোট চাচ্চুর বাসা। ঢাকায় গিয়ে সে কোথাও ঘুরতে পারছে না। আব্বু তার কলিগদের নিয়ে পিকনিকে কুয়াকাটা চলে গেছে। আম্মুও জরুরী ভিত্তিতে রাজশাহীতে ফিরে যাচ্ছে। রুহামার ছুটিটাই যেন মাটি হয়ে গেল। এমন সময় রাফিন ওকে ফোন করে জানতে চাইলো এখন যদি আমি ঢাকাতে থাকতাম তাহলে কেমন হতো? রুহামা তখন আহ্লাদি গলায় বললো ভাইয়া তাহলেতো খুবই ভালো হতো। তোমার সাথে সারা ঢাকা ঘুরে বেড়াতাম। রুহামা জানে এখন ভাইয়ার ছুটি নেই। সুতরাং চাইলেও সে রুহামাকে সারা ঢাকা ঘুরিয়ে দেখাতে পারবে না। তাছাড়া ভাইয়ার পোস্টিং ও ঢাকার বাইরে। কিন্তু ছোট বোনের মনের কথাটা জানতে পেরে আগেই রাফিন সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বোনকে সারপ্রাইজ দিবে। তো সত্যি সত্যিই অফিস থেকে ছুটি নিয়ে সে ঢাকায় গিয়ে হাজির। আম্মু তখন রাজশাহীতে আর আব্বু তখন কুয়াকাটায়। রাফিন ছোট চাচ্চুর বাসা থেকে রুহামাকে নিয়ে ঢাকার কিছু জায়গাতে ঘুরিয়ে দেখালো। শুরুতে সে গেলো বাংলামোটর। ওখানে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সপ্তম তলাতে বাতিঘর নামে খুব সুন্দর একটা লাইব্রেরী আছে। রুহামাকে সেখানে নিয়ে গেলো। ঘুরে ঘুরে বই দেখলো, ছবি তুললো তারপর রুহামার পছন্দ মত কিছু বই কিনে বেরিয়ে আসলো। এবার গন্তব্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন জায়গা ঘোরার পর রাফিন ওর ছোট বোনের কাছে জানতে চাইলো সিনেমা দেখবে কি না? রুহামাতো এক বাক্যে রাজি। এই সুযোগ কি আর সে হাতছাড়া করে? কখনোই সে সিনেপ্লেক্সে মুভি দেখেনি। ফলে আর সব বাদ দিয়ে সে সিনেমা দেখাকেই প্রাধান্য দিলো। ভাই বোন মিলে রিকশা নিয়ে চলে গেলো বসুন্ধরা সিটিতে। রুহামার ইচ্ছে ছিল বাংলা সিনেমা দেখার। বিশেষ করে ওই সময়ে শাকিব খানের কোনো একটি সিনেমা চলছিল যা দেশ ব্যাপী বেশ আলোচিত ছিল। কিন্তু গিয়ে দেখা গেলো টিকেট নেই। ফলে উপায় না থাকায় ফাইনাল ডেস্টিনেশন নামে হলিউডের একটি সিনেমা দেখলো। সেবার রুহামাকে নিয়ে ঢাকায় ঘুরে ঘুরে ছবি তুলে বড় আপার হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়েছিল রাফিন। রাফিনের ব বোনের নাম রোমানা। রোমানা আপার ছেলেই জিসান। মায়ের ফোন সারাক্ষণ বলতে গেলে তার হাতেই থাকে। সে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো মামা আর ছোট খালামনির ঘুরে বেড়ানোর ছবি দেখে মামার উপর ব্যাপক ক্ষ্যাপা। মামার সাথে কথাই বলবে না। সে কেন শুধু রুহামাকে নিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছে। তাকে কেন ঘুরতে নিয়ে যায়নি এই নিয়ে তার অভিযোগের শেষ নেই।  রাফিনকে কথা দিতে হয়েছে এবার ছুটিতে আসলেই জিসানকে ঘুরতে নিয়ে যেতে হবে। কিন্তু রাফিনতো জানে জিসানকে সে আসলে ঘুরতে নিয়ে যেতে পারবে না। তার সেই পরিমান সময় হবে না। এক দুদিনের ছুটিতে হুটহাট করে বাসায় আসে। তখন জরুরী কাজগুলোই ঠিকমত করার সময় মেলে না। ফলে জিসানকে ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার সুযোগও তার হয় না। ভাগ্নেকে খুশি রাখার জন্যই তাই রেস্টুরেন্ট থেকে ওর পছন্দের খাবার নিয়ে আসা।

আদিবার সাথে সব সময় ভিন্ন ভিন্ন রেস্টুরেন্টে বসতে পছন্দ করে রাফিন। এবার সে বসেছিল ক্যালিস্ট্রোতে। সম্ভবত এই প্রথম রাফিন অবাক হয়ে দেখলো ক্যালিস্ট্রোতে গিয়ে সাথে সাথে বসার মত টেবিল ফাকা পেলো। প্রতিবারই বোনদেরকে নিয়ে যখনই ওখানে যায় দেখা যায় কোনো টেবিল ফাঁকা নেই। এবার অবশ্য ভাগ্য সুপ্রসন্ন বলা চলে। গিয়েই টেবিল ফাঁকা পেয়েছিল। দুদিন হলো আদিবার শরীর খারাপ । রাফিন কিংবা আদিবা দিনের শুরুতেও আশা করেনি ওদের দেখা হবে। আদিবার শরীর তখন এতোটাই খারাপ ছিল। কিন্তু কথা দিয়েছিল বলে বিকেলের দিকে শরীর খারাপ থাকা সত্তেও আদিবা বের হয়েছিল। এখানে সেখানে ঘোরার পর ক্যালিস্ট্রোতে গিয়ে বসেছিল। আদিবা কিছু খেতে চায়নি। রাফিনের ঘ্যানঘ্যান করার কারণে শেষে খেতে রাজি হলো। পরদিন দুপুরের ট্রেনে রাফিনের ফিরে যাওয়ার কথা। কদিন আগেই ছোট বোন রুহামার জন্মদিন গেল। জন্মদিনে বোনকে কিছু উপহারও দেওয়া হয়নি। জন্মদিনে উইশ করতেও দেরি করে ফেলেছিল। তাতেই বোন মুখ গোমরা করে রেখেছিল। বলেছিল ভাইয়া তোমার সাথে আড়ি। তুমি আমার জন্মদিনে উইশ করতে এতো দেরি করলে কেন? তখনই রাফিন ওকে কথা দিয়েছিল ১৯ তারিখ রাতে তোকে জন্মদিনের ট্রিট দেবো। বিষয়টা মাথায় রেখেই রাফিন আদিবাকে বললো রুহামাকে ডাকবে কি না? সেদিন আদিবার কী হয়েছিল তা রাফিন জানে না। বলার সাথে সাথে আদিবা রাজি হয়ে গেল। অথচ আর আগে কতবার বলেছে বোনদের ডাকি? একসাথে খাই? কিন্তু আদিবা কখনোই রাজি হয়নি। এবার আর সে না করলো না। রুহামাকে ফোন করলো রাফিন। ফোন ধরলো বড় আপা। কিন্তু ওকে আসতে দিতে রাজি হলো না। রাফিন গিয়ে নিয়ে আসতে পারলে কোনো অসুবিধা হতো না। কিন্তু সন্ধ্যার পর একা একা আসতে দিতে রাজি হলো না আপা। শেষে রুহামা আর জিসানের সাথে কথা বলে ওদের পছন্দের খাবার নিয়ে যাওয়ার কথা দিতে হলো।

ক্যালিস্ট্রেতে বসে গল্প করতে করতে অনেক সময় পেরিয়ে গেলে তারপর অর্ডারকৃত খাবার এলো। রাফিন নিজ হাতে আদিবার প্লেটে খাবার তুলে দিল। ফ্রাইড রাইস, চিকেন,ভেজিটেবল আর কী কী যেন। দুজন খাওয়া শেষ করতে করতেই রুহামাদের জন্য পার্সেল রেডি করে টেবিলে রেখে গেলো বেয়ারা। খাবারের ফাঁকেই আদিবা জানতে চাইলো এখান থেকে রাফিন সোজা বাসায় চলে যাবে কি না? আদিবার মনের কথাটা বুঝতে পারলো রাফিন। আদিবা চাইছিল আরও কিছু সময় রাফিনের সাথে কাটাতে। যদি খাওয়া শেষে সোজা বাসায় চলে যায় তাহলেতো আর সময় কাটানো হবে না। আদিবার শরীর খারাপ না থাকলে হয়তো সকালেই বের হতে পারতো। তাহলে সারাদিন ঘুরতে পারতো, গল্প করতে পারতো। সেটাতো সম্ভব হয়নি। আদিবার মনের ভাব বুঝতে পেরে রাফিন বললো এক কাজ করলে কেমন হয়? তুমি আর আমি রিকশা করে বাসায় গিয়ে খাবারগুলো দিয়ে তারপর আবার বেরিয়ে পড়বো। এতে করে খাবার গুলোও ঠান্ডা হয়ে যাবে না আবার দুজনের আরও কিছু সময় ঘোরাও হবে।প্রস্তাবটা আদিবার মনের মত ছিল। ফলে সে সম্মতি দিলো। ক্যালিস্ট্রো থেকে বেরিয়ে রিকশা নিয়ে ওরা রওনা হলো শালবাগান পাওয়ার হাউস মোড় আসাম কলোনিতে। ওখানেই রাফিনদের বাসা। রাফিন জানতো আদিবা এখন বাসায় যাবে না। তাছাড়া আম্মু বা বড় আপা কাউকে ও আসবে এটা বলাও হয়নি। অবশ্য বললেও আদিবা যেতো না। ওর এভাবে যেতে বিব্রত লাগতো। তারপরও রাফিন একবার রিকশা থেকে নেমে আদিবাকে বললো চলো বাসায়? কয়েক মিনিট বসে না হয় বের হইও? কিন্তু আদিবা রাজি হলো না। ওকে দাঁড় করিয়ে রেখে দ্রুত পায়ে বাসার গেটে গিয়ে কলিংবেল চাপলো। জিসান গেট খুলে দিতেই রাফিন ভিতরে ঢুকে ডাইনিং টেবিলের উপর খাবারের প্যাকেটগুলো রাখলো। আম্মু তখন ডাইনিংএ বসে ছিলেন। কয়েকদিন হলো বড় খালা এসেছেন। দুই বোন মিলে গল্প করছিল। খাবার আনতে দেখে আম্মু বললো এতো সব আনছো কেন? রাফিন মুখে হাসি টেনে বললো রুহামা আর জিসানকে এবার বাইরে নিতে পারেনি তাই এনেছে। তারপর বললো আম্মু আমি আবার একটু বাইরে যাচ্ছি। পরে ফিরবো। আম্মু হয়তো যা বুঝার বুঝলো।

রাফিন বেরিয়েই অন্ধকার গলি দিয়ে রাস্তায় এসে দাঁড়ালো। আদিবাকে যেখানে দাঁড় করিয়ে রেখে গিয়েছিল সেখানে কেউ নেই। চারদিকে কোথাও কেউ  নেই। মোবাইল হাতে নিয়ে কয়েকবার কল করলো। কল ঢুকছে কিন্তু রিসিভ করছে না দেখে রাফিনের চিন্তা বেড়ে গেল। সে দ্রুত পায়ে পাওয়ার হাউস মোড়ের দিকে গিয়ে ভালোভাবে দেখলো। না কোথাও আদিবার দেখা পেলো না। এমন সময় আবার সে কল করলো এবং আদিবাকে ফোনে পেলো। আদিবা রহস্য করে বললো আমিতো হারায় গেছি। পথ খুঁজে পাচ্ছি না। রাফিন উদ্বেগের সাথে জানতে চাইলো তুমি কোথায়। কথা বলতে বলতে আবার সে বাসার দিকে হাটতে শুরু করলো। ঠিক যেখানে আদিবাকে রিকশা থেকে নেমে দাড়াতে বলেছিল সেখানে আসার পর দেখা গেল আদিবা বাসার পূর্ব দিকে একটু দূরে থাকা গলি থেকে বের হচ্ছে। সে মূলত রাফিনকে ঘাবড়ে দেওয়ার জন্য এমনটা করেছিল। রাফিন কপট অভিমান করে বললো এরকম করা ঠিক হয়নি আদিবা। তারপর দুজন হাটতে হাটতে পাওয়ার হাউস মোড়ের কাছে আসলো। এবার একটা রিকশা নেওয়ার পালা। এমন সময় রাফিনের মনে পড়লো আদিবা তার কাছে কিছু একটা আব্দার করেছিল। এখন সেটা পূরণ করার সময়। রাফিন আরেকবার আদিবার কাছ থেকে ডিটেল জেনে নিয়ে পাশের দোকানে গিয়ে দাঁড়ালো। জীবনে এই অভিজ্ঞতা আগে কখনো হয়নি। রাফিন দোকানদারকে বললো দুটো ব্যাঞ্চন লাইট আর দুটো গোল্ডলিফ সিগারেট দিন! রাফিন কখনোই সিগারেট খেতো না। তার জীবনে সিগারেট খাওয়ার দুটো গল্প অবশ্য আছে। স্কুলে পড়া অবস্থায় ওদের স্কুল কমিটির নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিল ওর বন্ধুর বাবা। ওর আর ওর বন্ধুদের দায়িত্ব পড়েছিল সিগারেট পান এগুলো বিতরণ করা। বিতরণ করতে করতে অনেক গুলো বেচে গিয়েছিল। সেবার বন্ধুরা মিলে একসাথে একবারে কে কতগুলো সিগারেট খেতে পারে তার প্রতিযোগিতা করেছিল। সেটা অবশ্য সিগারেট খাওয়া বলা চলে না। এক মুঠো সিগারেট একসাথে আগুন দিয়ে নষ্ট করা। আর আরেকটা স্মৃতি অবশ্য আরও আগের। রাফিনের বাবা সিগারেট খেতেন। সে অন্যদের কাছ থেকে ঘটনাটা শুনেছে। একবার রাফিনের বাবা তার এক কলিগের সাথে উঠোনে বসে সিগারেট খাচ্ছিল। রাফিন তখন তিন চার বছর বয়সী। সে গিয়ে বাবার বন্ধু বা কলিগকে গিয়ে বলেছিল আংকেল আমাকেও একটা সিগারেট দিন। আমিও খেতে চাই। এই ঘটনার পর থেকে নাকি রাফিনের বাবা আর কখনো সিগারেট খাননি। সেই দিনের পর এই প্রথম সে সিগারেট হাতে নিল। আর জীবনে প্রথম সিগারেট কিনলো। তাও নিজের জন্য না বরং আদিবার ইচ্ছে পূরণের জন্য।

লেখা চলমান——–

অসহায় এক রাজার গল্প

ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশানের এভিনিউ ফোরে একটি চারতলা ভবনের পুরোটা জুড়ে রফিক সাহেবের অফিস দ্য আর এস গ্রুপ। সুন্দর সাজানো গোছানো। প্রথম দেখাতেই রুচিশীল মনের পরিচয় মেলে। অফিসের পরিবেশটা এতোই সুন্দর যে কর্মচারিরা বাড়িতে থাকার চেয়ে অফিসে থাকতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করে। রফিক সাহেব বসেন তৃতীয় তলায়। তিনি তার ডেস্কে বসেই বাইরের দৃশ্য দেখতে পান। পুরো অফিস কাঁচ দিয়ে ঘেরা। পাশেই গুলশান লেক। লেকের পাড় ঘেসে পথচারিদের জন্য সুন্দর বাঁধানো রাস্তা। সারাদিন ওই পথে অসংখ্য পথচারি চলাফেরা করে। কেউ কেউ শরীর ঠিক রাখতে হাটাহাটি করে আর কেউ অফিসে যাওয়া আসার পথ হিসেবে ব্যবহার করে। রাস্তার দুই ধারে নানা ধরনের গাছ। লেকের পানিতে ছোট ছোট নৌকা চলাচল করে। কিছুদিন হলো স্পিডবোর্ড চলাচল করছে। রফিক সাহেব আকাশ দেখতে পছন্দ করেন। এই অভ্যাসটা তার কখনোই ছিল না। কিন্তু তিনি সেটা এখন অভ্যাসে পরিণত করেছেন একজনের ভালোবাসা থেকে। সেই একজন হলো তার মেয়ে। দুই ছেলে মেয়ে নিয়ে রফিক সাহেবের সুখের সংসার। বড় ছেলে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ক্যাপ্টেন হিসেবে চাকরি করছেন। পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য তার মেয়ে। পড়ছে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে। মেয়েটি তার খুব আদুরে। মেয়ে না যেন তার নিজের মা সে। আদুরে গলায় বাবাকে সে মায়ের মতই শাসন করে। বাবাকে আদর করে বলে ব্যাটা রফিক। সে যখন বাবাকে এভাবে ডাকে তখন রফিক সাহেবের মনে হয় তার মা  বুঝি তার সামনেই আছে। অথচ তিনি তার মাকে হারিয়েছেন বহু বছর আগে। মেয়েটি তার মায়ের স্বভাব না পেলেও তার মধ্যে তিনি মাকে খুঁজে পেয়েছেন।

রফিক সাহেবের মাকে খুব মনে পড়ে। যখনই মায়ের কথা মনে পড়ে তখনই তিনি মেয়ের সাথে গল্প করেন। মেয়েটি যে তার মায়ের স্থান দখল করে আছে। কী সুন্দর করে তাকে ব্যাটা রফিক বলে ডাকে। আদর করে, শাসন করে। মেয়েটি ছোটবেলা থেকেই আকাশ দেখতে পছন্দ করে। কে জানে হয়তো মনের মধ্যে ওই আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন ছিল তার। আকাশে উড়ে যাওয়া ডানা মেলা পাখির মত সেও মুক্ত আকাশে উড়তে চায়। মেয়ের সাথে সাথে তিনিও আকাশ দেখতে দেখতে আকাশের প্রতি মুগ্ধতা জন্মেছে। আর তাই তিনি গুলশান লেকের ধারে অফিস নিয়েছেন যেন পাশে কোনা আকাশ ছোঁয়া অট্টালিকা এসে তার আকাশ দেখায় ব্যাঘাত ঘটাতে না পারে। রফিক সাহেবের অফিসে একজন এইচআর ম্যানেজার নিয়োগ দিবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। সেই মোতাবেক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেওয়া হলো। পদ সংখ্যা মাত্র এক কিন্তু আবেদন জমা পড়লো কয়েক হাজার। সেই সব আবেদনপত্র থেকে বাছাই করে সেরা ও যোগ্য মানুষটিকে বেছে নেওয়া দূরুহ কাজ ছিল। এ কাজে তিনি তার অফিস টিমের বাইরে তার মেয়েকেও ইনভলভ করলেন। মেয়েটির তখন ভ্যাকেশন চলছিল। রফিক সাহেব বললেন আমার অফিসে একজন এইচআর ম্যানেজার নিয়োগ দিতে চাই। এপ্লিকেশন জমা পড়েছে কয়েক হাজার। তুমি কি সেখান থেকে শর্ট লিস্ট করতে আমাকে হেল্প করতে পারবে?

বাবার কথা শুনে রিফাহ বেশ আগ্রহী হলো। তবে সে শুরুতেই বলে নিল বাবা আমি কিন্তু এ বিষয়ে অনভিজ্ঞ। তবে আমি তোমাকে অবশ্যই হেল্প করতে পারবো। তার আগে আমাকে কিছু প্রশ্নের জবাব দিতে হবে। আমি সেই আলোকে তোমার জন্য শর্ট লিস্ট তৈরি করবো। রিফাহ বাবার কাছে জানতে চাইলেন পড়াশোনা,অভিজ্ঞতা,ছেলে বা মেয়ে, সাবজেক্ট এই সব ক্রাইটেরিয়া সম্পর্কে বলো। রফিক সাহেব মেয়ের সব প্রশ্নের উত্তর দিলেন। তিনি বললেন ছেলে বা মেয়ে যে যোগ্য হবে তাকেই নেওয়া হবে। এই দিক থেকে তার কোনো আপত্তি নেই। অন্যান্য ক্রাইটেরিয়ার মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস ফ্যাকাল্টির ভালো সিজিপিএধারী তরুণ কাউকে পেলে ভালো। এছাড়া যদি এই ক্রাইটেরিয়ার পাশাপাশি তরুন না হয়ে মধ্য বয়সীও হয় এবং অন্য কোথাও জবের এক্সপেরিয়েন্স থাকে তাহলে আরও ভালো। তাছাড়া শুধু অফিসের কাজ নয় বরং দেখতে চাই প্রার্থীর এক্সট্রা কারিকুলার এক্টিভিটিস কেমন ছিল। সারাজীবন পড়াশোনাই করেছে নাকি আরও কিছু করেছে। বাবার কথা মত অসংখ্য সিভি থেকে বাছাই করে রিফাহ তার বাবাকে ৫০ জনের সিভি আলাদা করে দিল এবং বললো বাবা এই সিভিগুলো তোমার টিমকে দিতে পারো এবং তারা চাইলে এখান থেকে আরও শর্টলিস্ট তৈরি করতে পারবে। তাহলে ইন্টারভিউ নিতে সুবিধা হবে।

মেয়ের কথা মত বাছাইকৃত সিভিগুলো তিনি তার টিমকে দিলেন এবং যদি আরও শর্ট করা প্রয়োজন হয় তবে তা করতে বললেন। টিম সেগুলো থেকে বাছাই করে ১৫ জনকে রাখলেন। এই ১৫ জন সব দিক থেকে এগিয়ে। নির্ধারিত প্রার্থীদেরকে ফোনে ইন্টারভিউয়ের ডেট জানিয়ে দেওয়া হলো। রফিক সাহেব তার মেয়েকে বললেন সে চাইলে ইন্টারভিউ বোর্ডে থাকতে পারে। তাহলে সে যে সব সিভি বাছাই করেছিল সেই সব প্রার্থীরা আসলে কতটা যোগ্য তা বুঝতে পারবে। ভবিষ্যতের জন্য একটা অভিজ্ঞতা অর্জন হবে। কিন্তু রিফাহ তাতে রাজি হয়নি। তাছাড়া তার ক্লাসও শুরু হয়ে যাবে। অন্যদিকে রফিক সাহেব জানেন তার ছেলেকে বলে কোনো লাভ নেই। কেননা ছেলেটার ছুটি নেই।

মার্চের ২১ তারিখে ইন্টারভিউ ডেট। সেদিন সকাল সকাল অফিসে চলে আসলেন। প্রার্থীদের কেউ কেউ তারও আসার আগেই উপস্থিত হয়ে গেছে। এটি তাকে বেশ মুগ্ধ করলো। সময়জ্ঞান থাকাটা খুবই জরুরী। আজকালকার ছেলে মেয়েদের সময়জ্ঞান খুবই কম। ১০টায় আসতে বললে তারা আসে বারটায়। একে একে ১৪ জন প্রার্থীর ইন্টারভিউ নিলেন। চমৎকার সব প্রার্থী বাছাই করেছে তার মেয়ে। মেয়েটি যদি এই বোর্ডে উপস্থিত থাকতো তবে খুশি হতো। যখনই যার ইন্টারভিউ নিয়েছেন মনে হয়েছে একেই নেওয়া যেতে পারে। যেহেতু লোক লাগবে মাত্র একজন তাই পছন্দ হলেও সবাইকে নেওয়ার সুযোগ নেই। প্রার্থীরাও অবাক হয়ে দেখেছে অন্য সব অফিসের ইন্টারভিউয়ের সাথে দ্য আর এস গ্রুপের ইন্টারভিউ সম্পূর্ণ আলাদা। রফিক সাহেব গতানুগতিক ধারার বাইরে গিয়ে প্রার্থীদের প্রশ্ন করেছেন। তাদের ভিতরটা দেখতে চেয়েছেন। যেমন একজনকে প্রশ্ন করলেন আপনি কি সুখী? আরেকজনকে প্রশ্ন করলেন আপনি কি সফল? অন্যান্য প্রশ্নে যাওয়ার আগে প্রত্যেক প্রার্থীকে এই ধরনের কিছু প্রশ্ন করে তার মনের মধ্যে ঢুকতে চেষ্টা করলেন।

একে একে ১৪ জনের ইন্টারভিউ শেষ হলে শেষ প্রার্থীর ডাক পড়লো। প্রার্থী যখন রুমে ঢুকলেন তখন রফিক সাহেব কফির পেয়ালাতে চুমুক দিচ্ছেন। তার কফি খেতে ভালো লাগে। তারই মত তার কন্যাও কফি পছন্দ করেন। টেবিলে একটা ফটো ফ্রেমে পরিবারের সবার ছবি আছে। মেয়েটি যখন ক্যাডেট কলেজ পড়তো তখনকার এক প্যারেন্টস ডেতে এই ছবিটা তোলা। ছবিটা তার খুবই পছন্দ। সে কারণেই অফিসের টেবিলের এক দিকে রেখে দিয়েছেন। ছবির দিকে তাকালেই তার মনে হয় এইতো ওরা আমার সাথেই আছে। শেষ প্রার্থী একজন মেয়ে। বয়স ৩৮ বা ৩৯ হবে। কালো বোরখা পরা তবে মুখ খোলা। ভেতরে আসার অনুমতি চেয়ে সালাম দিতেই রফিক সাহেব তাকে আসতে বললেন এবং সামনে রাখা চেয়ার দেখিয়ে বসতে বললেন। অন্যান্য প্রার্থীদের মতই তাকেও চা বা কফি কি খাবে জানতে চাইলেন। ভদ্রমহিলা বললেন এখন চা বা কফি খেতে চান না। ইন্টারভিউ বোর্ডে আরও চারজন কর্মকর্তা ছিলেন যাদের একজন মেয়ে। তবে প্রশ্ন যা করার প্রায় সবটাই রফিক সাহেবই করলেন। শেষ প্রার্থীর নাম সাদিয়া আক্তার। পড়াশোনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগে। সিজিপিএ ৩.৮ । এমবিএতে মেজর ছিল এইচআরএম। এর আগে নেসলে বাংলাদেশ এবং বেঙ্গল গ্রুপে এইচআরে কাজ করেছেন। বিয়ের পর সংসার ও সন্তান সন্ততি নিয়ে ব্যস্ত হওয়ায় চাকরি আর কন্টিনিউ করা হয়নি। স্বামী সরকারি চাকরিজীবী বিধায় দেশের নানা প্রান্তে পোস্টিং নিয়ে যেতে হয়। রফিক সাহেবের হাতে তার সিভি ও কভার লেটার। সেখানেই টুকিটাকি নানা তথ্য মেয়েটি দিয়ে রেখেছে। অন্য প্রার্থীদের সিভির সাথে কভার লেটার ছিল না। নিঃশব্দে চেয়ার টেনে বসলেন সাদিয়া আক্তার। সাথে করে আনা সার্টিফিকেট ও অভিজ্ঞতার অন্যান্য ডকুমেন্ট সহ ফাইলটি এগিয়ে দিলেন। রফিক সাহেব তাকে প্রথম যে প্রশ্নটি করলেন সেটা সাদিয়া আশাও করেনি। রফিক সাহেব জানতে চাইলেন আপনি এই চাকরিতে বেতন কত টাকা আশা করছেন? সাদিয়া আক্তার একটু সময় নিলেন। ভাবলেন তিনিতো দীর্ঘদিন সার্ভিস গ্যাপে আছেন। এই সময়ে টানা চাকরি করলে তার বেতন হয়তো লাখ টাকা ছাড়িয়ে যেত। কিন্তু যেহেতু দীর্ঘদিন চাকরি করেননি তাই অতো বেশি চাওয়া ঠিক হবে না। তিনি কয়েক মুহুর্ত ভেবে নিয়ে বললেন আমি মূলত আপনার প্রতিষ্ঠানের বেতন স্কেল অনুযায়ি পেলেই খুশি। তবে আপনি যেহেতু আমার মতামত জানতে চেয়েছেন তাই আমার চাওয়া ৭৫ হাজার টাকা।

রফিক সাহেব অবশ্য চমকালেন না। কারণ মেয়েটি যা বেতন আশা করছে তার প্রতিষ্ঠানে এইচআর ম্যানেজারের বেতন অনেকটা সেরকমই। তিনি বুঝলেন মেয়েটি এখানে আসার আগেই বেশ স্টাডি করে নিয়েছে দ্য আর এস গ্রুপ সম্পর্কে। ফলে শুরুতেই সে প্রতিষ্ঠানের বেতন কাঠামো অনুযায়ি বেতন পেলেই খুশি হবে জানিয়ে তারপর নিজের চাহিদার কথা বলেছে। দুটোর মধ্যে বেশ ব্যালেন্স রেখেছে। স্কুল কলেজ জীবনের গল্প করার পর রফিক সাহেব জানতে চাইলেন বই পড়া ঘুরে বেড়ানো ছাড়াও মেয়েরা নানা বিষয়ে খেলাধুলাও করে থাকে। যেমন জোবেরা রহমান লিনু টেবিলটেনিস খেলে গিনেস বুকে নাম লিখিয়েছে। আপনি কি কোনো খেলাধুলা পছন্দ করেন? মেয়েটি বললো স্যর আমি দাবা খেলা খুব পছন্দ করি। আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় দাবা চ্যাম্পিয়নশীপে অংশ নিয়েছি। যদিও বিজয়ী হতে পারিনি কখনো। মেয়েটির সরল জবাব বোর্ডের সবাইকে মুগ্ধ করলো। ইন্টারভিউতে মূলত প্রার্থীরা চাকরি পাওয়ার জন্য অনেক মিথ্যা কথাও বলে। মেয়েটি চাইলে বলতেই পারতো সে আন্তঃ বিশ্ববিদ্যালয় চ্যাম্পিয়নশীপে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।

রফিক সাহেব মেয়েটির সত্যবাদীতায় মুগ্ধ হলেন। তিনি বললেন দাবা একটি বুদ্ধির খেলা। যার বুদ্ধি ও চিন্তার ব্যাপ্তি বেশি সে ততো সুবিধা করতে পারে। যেহেতু আপনি দাবা খেলতে পছন্দ করেন তাই এখন বলুন দাবার কোন গুটিটি আপনার কাছে সবচেয়ে প্রিয়। সাদিয়া এই প্রশ্নটি শুনেও একটু অবাক হলো। নিজে দীর্ঘদিন দাবা খেললেও কখনো এভাবে ভেবে দেখেনি যে কোনো একটি নির্দিষ্ট গুটি প্রিয় হতে পারে। সাদিয়া আক্তার নামের শেষ প্রার্থী কয়েক সেকেন্ড ভেবে উত্তর দিলেন  আমার মন্ত্রী পছন্দ। রফিক সাহেবও জানেন দাবার কোর্টে মন্ত্রীর পাওয়ার সবচেয়ে বেশি। কিন্তু তিনি প্রার্থীর যুক্তি বুঝার জন্য বললেন আমারতো মনে হয় ঘোড়ার চাল সবচেয়ে অনন্য। রফিক সাহেবের সাথে প্রার্থীও একমত হয়ে বললেন হ্যাঁ ঘোড়ার চাল অনন্য কিন্তু মন্ত্রীর মধ্যে সব গুনাগুণ আছে এবং সে সবচেয়ে ক্ষমতাশালী। সে তীর্যক ভাবে যেমন চলতে পারে তেমনি সরাসরিও চলতে পারে। যখন প্রয়োজন হয় সে রাজার ঢাল হয়ে দাড়ায়। তাছাড়াও বলা চলে সেই সেনা প্রধান। সাদিয়া আক্তারের কথা শুনে রফিক সাহেব আরও একবার মুগ্ধ হলেন। তিনি জানতে চাইলেন সাদিয়া আপনি তাহলে রাজাকে কিভাবে দেখছেন? যেহেতু মন্ত্রীকে অনেক ক্ষমতাশালী বললেন।

এই প্রশ্নে অবশ্য সাদিয়া আক্তারকে ভাবতে হলো না। তিনি বললেন দাবা খেলায় আমার কাছে রাজাই সবচেয় দুর্বল মনে হয়। সে নিজেকেও রক্ষা করতে পারে না। কারণ সে মাত্র একঘর পযর্ন্ত সরতে পারে। ফলে তাকে মন্ত্রী ও অন্যান্যদের উপর নির্ভর করতে হয়। রফিক সাহেব এবার মোক্ষম একটি প্রশ্ন করার সুযোগ পেয়ে গেলেন। তিনি জানতে চাইলেন মনে করুন আমাদের জীবনটা একটা দাবার কোর্ট। এই কোর্টে অনেক গুলো গুটি আছে যাদের শক্তি ও ক্ষমতা আলাদা। আপনি নিজে যদি এই কোর্টের একটি গুটি হয়ে থাকেন তবে নিজেকে কোন গুটি হিসেবে দেখেন? রফিক সাহেব লক্ষ্য করলেন এই প্রশ্ন শুনে সাদিয়া নামের প্রার্থীর চোখটা ছলছল করে উঠলো। কন্ঠটা কিছুটা কেঁপে উঠলো। তারপর বললো আমি নিজেকে রাজা হিসেবে দেখি।

রফিক সাহেব অবাক হলেন। যে মানুষ রাজাকে কোর্টের সবচেয়ে দুর্বল মনে করে সেই মানুষ কিভাবে নিজেকে রাজা দাবী করে? তিনি আগ্রহ নিয়ে এর কারণ জানতে চাইলে  মেয়েটি তার জীবনের গল্প বলতে শুরু করলো। বাস্তব জীবনে তিনি একজন রাজার মতই ছিলেন। দুর্বল,এবং নিজেকে রক্ষা করার জন্য তার পাশে সব সময় একজন শক্তিশালী মন্ত্রী ছিল। সেই মন্ত্রী আর কেউ না তার স্বামী। যে তাকে সব সময় রক্ষা করতেন। কিন্তু এক রোড এক্সিডেন্টে তার জীবনটাই ওলটপালট হয়ে গেছে। তার স্বামী মারা গেছে। আর সে কারণেই এই চাকরিটা তার দরকার। তাকে যে রক্ষা করার মত আর কেউ নেই। বরং রাজা হয়েও তাকেই এখন সন্তান পরিবারের দায়িত্ব নিতে হবে। ভয় পেলেতো চলবে না। যখন আপনি একটি নৌকার যাত্রী হিসেবে নদী পার হবেন তখন আপনার কোনো চিন্তা থাকবে না কারণ নৌকাটিতে একজন মাঝি আছে যে আপনাকে নিরাপদে অন্যপারে নিয়ে যাবে। কিন্তু কোনো কারণে যদি সেই নাবিক পড়ে যায় বা না থাকে তখন আপনাকে বাঁচতে হলে নিজেই হাল ধরতে হবে। যদিও আপনি আগে কখনো হাল ধরেননি। সাদিয়া বলতেই থাকে আর বোর্ডের সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনতে থাকে। তারপর আরও কিছু বিষয়ে আলাপ হওয়ার পর ইন্টারভিউ পর্ব শেষ হয়। প্রার্থীদের জানিয়ে দেওয়া হয় ফলাফল হলে সবাইকে জানানো হবে।

ইন্টারভিউ শেষ হতে হতে দুপুর পেরিয়ে যায়। রফিক সাহেব নামাজ ও দুপুরের খাবার খাওয়ার আগেই মেয়েকে ফোন করেন। ওপাশ থেকে রিফাহ ফোন রিসিভ করে বাবার কন্ঠ শুনেই কিছুটা অনুমান করতে পারে। সে বাবা কিছু বলার আগেই বলে ওঠে বাবা আমি বোধহয় অনুমান করতে পারছি তুমি ইন্টারভিউ থেকে কাকে সিলেক্ট করেছ বা করতে চাইছো। মেয়ের এমন কথা শুনে রফিক সাহেব বেশ অবাক হয়ে জানতে চাইলেন ঠিক আছে বল দেখি কাকে নিতে চাইছি। আর তুই এতোটা  নিশ্চিত কিভাবে যে তোর প্রেডিকশন ঠিক হবে? তাছাড়া তোর বাছাই করা ৫০ জনের তালিকা ছোট করে ১৫ জন করা হয়েছিল। এমনওতো হতে পারে যে তোর অনুমান করা প্রার্থী আগেই বাদ হয়ে গেছে।

বাবার কথায় যুক্তি আছে। রিফাহ তাই বললো বাবা তোমার কথায় যুক্তি আছে। তবে যদি সেই বাছাই করা তালিকার মধ্যে আমার অনুমান করা প্রার্থীর সিভি থেকে যায় তাহলে তারই চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। রফিক সাহেব বললেন তাহলে বলতো তার নাম কী? রিফাহ বললো সাদিয়া আক্তার! বাড়ি রাজশাহীর জেলার পবা উপজেলাতে। তবে স্বামী সন্তান সহ সে রাজশাহী শহরের শ্রীরামপুর রাজপাড়া রেলওয়ে কলোনীতে। রফিক সাহেব তার হাতে থাকা সাদিয়া আক্তারের সিভি চেক করে দেখলো বর্তমান ঠিকানা এবং স্থায়ী ঠিকানা সবটাই মেয়ের কথার সাথে মিলে যাচ্ছে। রফিক সাহেব জানতে চাইলেন কিভাবে তুই এটা বুঝলি? বাবার এই কথার উত্তর দেওয়ার আগে রিফাহ বললো বাবা তুমি ওনার সিভিটা হাতে নিয়ে দেখো পেছনে আমি আমার সিগনেচার দিয়ে কিছু লিখেছি। মেয়ের কথা মত রফিক সাহেব পাতা উল্টে দেখলেন সত্যি সত্যিই সেখানে রিফাহ সিগনেচার সহ একটি নোট দিয়েছে। প্রিয় বাবা যদি কোনো ভাবে আমার এই লেখাটা তোমার চোখে পড়ে তবে তুমি অবশ্যই তাকে নিয়োগ দিতে চেষ্টা করো। যদি সে অন্য প্রার্থীদের চেয়ে একটু কম যোগ্য হয় তবুও। কী আশ্চর্য এই লেখাটা তার চোখে পড়েনি। অবশ্য সিভির উল্টো পিঠতো তার দেখার কথা না। সুতরাং চোখেও পড়ার কথা না। এবার রফিক সাহেব জানতে চাইলেন তুই কেন এবং কি কারণে তার সিভিতেই এরকম একটা কথা লিখে রেখেছিলি? যদিও তুই না বললে ওটা আমার চোখেও পড়তো না।

রিফাহ তখন বললো বাবা ওনার সিভি দেখার সাথে সাথেই আমি ওনাকে চিনতে পেরেছিলাম। আমার রুম মেট জুই আলিয়ানা নামে একটি ছোট্ট মেয়েকে প্রাইভেট পড়াতো। একদিন জুঁই আর আমি নভো থিয়েটার দেখতে গিয়েছিলাম। দেখার পর জুঁই বললো এখানেই রেলওয়ে কলোনীতে আমি প্রাইভেট পড়াই। চল আজ আমার সাথে। আমি বললাম আমি গিয়ে কি করবো? সে নাছোড় বান্দা। আমাকে সাথে যেতেই হলো। আলিয়ানাই মূলত সাদিয়া আক্তারের মেয়ে। সেদিন গিয়ে পুরো এক ঘন্টা ওনাদের সাথে গল্প করে এসেছিলাম। তারপর মাঝে মাঝেই আমাকে যেতে বলতো যদিও আর যাওয়া হয়নি। ওনার স্বামী যেদিন একসিডেন্ট করে মারা যান সেদিন  আমরা ক্লাস শেষ করে হোস্টেলে ফিরছিলাম। আমার সাথে জুঁইও ছিল। হঠাৎ ওর ফোন এলো। ফোন রিসিভ করতেই জুঁইয়ের চোখে পানি চলে আসলো। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। বাড়িতে কারো কোনো সমস্যা কি না। পরে জানতে পারলাম আলিয়ানার বাবা এক্সিডেন্ট করে মারাগেছে। আমাদের হাসপাতালেই নিয়ে আসা হয়েছিল।আমি আর জুঁই সংবাদ পেয়ে হোস্টেলে না গিয়ে সোজা হাসপাতালে গিয়েছিলাম । সারাটা সময় ওনাকে দেখেছি এবং চেহারা মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল।

তারপর যখন সিভি বাছাই করার জন্য আমাকে প্রস্তাব দিলে তখন সিভি দেখতে দেখতে ওনার সিভিতে চোখ আটকে গেলো। সিভিতে যেহেতু ছবি ছিল তাই চিনতে অসুবিধা হয়নি। ওনার অবস্থা দেখে আমার মনে হয়েছিল চাকরিটা ওনারই বেশি দরকার। ওনার সিভির পিছনে রেকমেন্ড করার পর ভেবেছিলাম তোমাকে ফোনে বলবো কিন্তু রুটিন ক্লাসের চাপে সব ভুলে গেছি।

রফিক সাহেব মেয়ের কাছ থেকে সব শুনে তাকে বললেন তোর রেকমেন্ড ছাড়াই সে তার নিজ যোগ্যতায় ইন্টারভিউ বোর্ডকে সন্তুষ্ট করেই চাকরিটা পাচ্ছে। যদিও অফিসিয়ালি জানানো হয়নি কিন্তু তোর সাথে কথা বলে বিষয়টা একেবারে ফাইনাল করে নিলাম। ক্লাসের সময় হয়ে যাচ্ছিল দেখে রিফাহ তখনই বাবার সাথে কথা শেষ করলো। মেয়ের সাথে কথা বলে রফিক সাহেবও নিশ্চিন্ত হলেন। বাবা মেয়ের ভাবনার কত মিল। অবশ্য বাবা মেয়ে না বলে উল্টো  মা ছেলেও বলা যেতে পারে। রিফাহতো বাবাকে ব্যাটা রফিক বলেই ডাকে মাঝে মাঝে। মনে হয় যেন নিজের মা তার ছেলেকে ডাকছে।

সেদিন ক্লাস শেষ করে জুঁই আর রিফাহ হোস্টেলে ফিরছিল। রিফাহ জুঁইকে বললো জানিস আমি সুপার ন্যাচারাল পাওয়ার পেয়েছি। তোকে আমি এখন একটা ভবিষ্যৎবাণী করবো দেখবি সেটা সত্যি হবে। তবে সমস্যা হলো আমার বলা কথাটাতে একটা গুড নিউজ থাকবে আর একটা ব্যাড নিউজ থাকবে। আর ব্যাড নিউজটা তোর জন্য। তাই তোর কথা ভেবে খানিকটা খারাপও লাগছে। জুঁই আবার প্রেম করে জিসান নামে একটা ছেলের সাথে।বুয়েটে পড়ে ছেলেটা। ব্যাড নিউজের কথা শুনে জুইয়ের মনে প্রথমেই জিসানের ভাবনা আসলো। তার মুখটা চুপসে গেল। তারপরও সেটা আড়াল করে জুঁই হেসে হেসে বললো তুই ডাক্তারী পড়া বাদ দিয়ে কবে থেকে অ্যাস্ট্রোলজি চর্চা শুরু করলি? তাহলে কি ফোনে ইদানিং যে অদৃশ্য ভূতের সাথে চ্যাট করিস এগুলো তার আছর নাকিরে? জুঁইয়ের কথায় রিফাহ নিজেও হেসে উঠলো। তারপর বললো এই সপ্তাহের মধ্যেই তোর টিউশন চলে যাবে। জুইয়ের ওই একটাই টিউশনী । সেটা চলে গেলে ওর বেশ কষ্টই হবে। অবশ্য কয়েকটা পরিবার ওকে বলে রেখেছে ফ্রি হলে যেন তাদের বাচ্চাকে পড়ায়। মেডিকেলে এতো পড়ার চাপে একটার বেশি দুটো পড়ানো সম্ভব হয় না বলে সে কখনো কাউকে কথা দেয়নি। আলিয়ানার টিউশনীটা চলে গেলে তার টিউশনী পেতে বেশি বেগ পেতে হবে না। কিন্তু কথা হলো আলিয়ানার টিউশনীটা যাওয়ার মত তো কোনো ঘটনা ঘটেনি। তখন সে রিফার কাছে জানতে চাইলো কিভাবে টিউশনী যাবে শুনি? তখন রিফাহ বললো কারণ এক সপ্তাহের মধ্যেই আলিয়ানার আম্মুর চাকরি হবে আর তার পোস্টিং হবে গুলশান। জুই ভাবলো রিফাহ ইয়ার্কি করতেছে। কিন্তু রুমে ফেরার পর সত্যি সত্যিই জুইয়ের কাছে ফোন আসলো। আলিয়ানার আম্মু জানালো তার নতুন চাকরি হয়েছে। আগামী সপ্তাহেই পরিবার সহ তাকে ঢাকায় শিফট করতে হবে। শুনে একই সাথে জুই বেশ চমকে উঠলো। রিফাহ তখন ফোনের দিকে তাকিয়ে কোনো এক ভূতের সাথে চ্যাট করছে আর মিটমিট করে হাসছে। নিজের বিছানায় বসে জুই তার বন্ধু ও রুমমেট রিফাহর দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে ভাবছে রিফাহ কিভাবে জানলো আলিয়ানার আম্মুর চাকরি হবে? কিছুক্ষণের মধ্যেই রিফাহ টের পেলো তার কাঁধে জুই হাত দিয়ে তাকে ধাক্কাচ্ছে। ওর দিকে মুখ ফেরাতেই জুই তার হাতটা রিফার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো দেখতো জিসানের সাথে আমার বিয়েটা হবে কি না? রিফাহ তখন দুষ্টুমীর ছলে ওর হাতটা ভালোভাবে দেখে বললো নারে তোর জিসানের সাথে বিয়ে হবে না। সেদিন সারা রাত জুইয়ের ঘুম হলো না। কতবার জিসান ওকে ফোন করলো কিন্তু ও ফোন রিসিভই করলো না। মেসেজের উত্তরও দিলো না। জুইয়ের বিশ্বাস রিফাহ যেহেতু বলেছে ঠিকই বলেছে। কারণ রিফাহ সব সময়ই সঠিক।

৮ জুলাই ২০২৫

রিফাহদের গল্প

ট্রেনের জানালার ধারে বসে আনমনে বাইরে তাকিয়ে আছে রিফাহ। ট্রেনটা ধীরে ধীরে গতি নিচ্ছিল। ক্রমাগত ভাবে পেছনে সরে যাচ্ছিল দৃশ্যগুলো। আর সামনে হাজির হচ্ছিল নতুন নতুন দৃশ্য। ধুপধাপ শব্দ তুলে একটার পর একটা কামরা স্টেশনের বুক চিরে ছুটে চলছিলো উত্তরবঙ্গের দিকে। প্ল্যাটফর্ম পেরিয়ে গাছপালা, দোকানপাট, কাঁচাবাজার—সব পেছনে পড়ে যাচ্ছিল, ঠিক যেভাবে রিফাহর কৈশোরও পেছনে পড়ে আছে। আজ সে ট্রেনে বসে; পাশে তার বাবা—চোখেমুখে চিন্তা আর বুকভরা প্রত্যাশা। গন্তব্য রাজশাহী। উদ্দেশ্য—মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা।

“আর একটু পরেই সিরাজগঞ্জের রেলব্রিজ,” বাবা হালকা করে বললেন।

রিফাহ জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। চেনা শ্যাওলা পড়া পিলারগুলো দূর থেকে দৃষ্টিসীমায় এল। সেতুর নিচে পদ্মা—আধা শুকনো, আধা চলমান। স্রোতের গর্জন নেই, কিন্তু তার মধ্যে একটা অব্যক্ত আকর্ষণ আছে। ঠিক যেন নিজের ভেতরের ভয় আর কল্পনার মতো—চুপচাপ, গভীর।

এই ট্রেন যাত্রা যেন একটা অন্যরকম উপলব্ধি নিয়ে এসেছে। কেবল একটি গন্তব্য নয়—একটা অধ্যায়ের শুরু। কাঁধে বইয়ের ব্যাগ, একজোড়া চশমা আর হৃদয়ের গভীরে হাজারো আশঙ্কা আর স্বপ্ন নিয়ে রিফাহ পা রেখেছে এক অচেনা ভবিষ্যতের দিকে।

পাশের সিটে বসে থাকা বাবা মাঝে মাঝে প্রশ্ন করছিলেন—
“পর্যাপ্ত ঘুম হয়েছে তো?”
“আবেদনপত্রে ঠিক মতো ছবি দিয়েছিলে তো?”
“কলেজ কোডগুলো মনে আছে?”

রিফাহ কেবল মাথা নাড়ছিল, কিন্তু মন ছিল না কথাগুলোতে।
তার চোখে তখন ভাসছিল জয়পুরহাট ক্যাডেট কলেজের সেই শেষ ফেয়ারওয়েল রাত। ব্যাগ গুছাতে গুছাতে জুই এসে বলেছিল,
“মেডিকেলেই যাচ্ছ রিফু? আকাশের বদলে হাসপাতাল?”

রিফাহ মুচকি হেসেছিল, বলেছিল,
“চিকিৎসকও তো একধরনের জ্যোতির্বিদ, জীবন নামক গ্রহের চারপাশ ঘিরে মৃত্যুর কক্ষপথ শনাক্ত করে।”

ট্রেন হঠাৎ গতি কমালো। রাজশাহী স্টেশনের কাছে চলে এসেছে। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেমেয়েগুলো—প্রায় সবই ভর্তি পরীক্ষার্থী, কাঁধে ব্যাগ, চোখে তীব্র চাপা টেনশন। কেউ কেউ চোখ বন্ধ করে দোয়া পড়ছে, কেউ আবার বুকের ভেতরে অস্ফুটে ছড়া আওড়াচ্ছে আগে পড়া কোনো বিষয়।

পরীক্ষার আগের রাত তারা থাকবে রাজশাহীতে। একটা ছোট্ট হোটেলে বুকিং দেওয়া হয়েছে আগেই। সেই হোটেলেই বাবা-মেয়ে রাত কাটাবে—রিফাহ পড়ার ভান করবে, কিন্তু তার চোখ ঘুরে ফিরে যাবে সেই পদ্মার দিকে, অথবা জুইয়ের কণ্ঠে আটকে থাকবে।

পরদিন সকালে ভর্তি পরীক্ষা।
সকাল সাতটার ভেতর পৌঁছাতে হবে পরীক্ষাকেন্দ্রে। কলেজ চত্বরে ঢুকতেই লাগলো একটা অন্যরকম শীতলতা। চিরচেনা নয়, কিন্তু খুব চেনা যেন। ভবনের ভেতর নানা ব্যাচের ছাত্রছাত্রীদের ভিড়। দেয়ালে দেয়ালে “সাইলেন্স প্লিজ”, “মোবাইল নিষিদ্ধ”—তবে কারও চোখেই নিষেধের ভয় নেই, সবার ভেতর ভয়টা আলাদা—ভবিষ্যৎ নামক অনিশ্চয়তার।

হলরুমের বেঞ্চিতে বসে রিফাহ বুঝতে পারছিল—এই একটা ঘণ্টা তার বাকি জীবনের প্রবেশপথ। যেটুকু মুখস্থ, সেটুকুই অস্ত্র। আর যেটুকু অনিশ্চয়তা, সেটুকুই সময়ের উপর ছেড়ে দেওয়া।

ঘণ্টা বাজল।
প্রথম প্রশ্নে চোখ রাখতেই চেনা একটা ইকুয়েশন। মাথা ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করে সে পেন চালালো।

পরীক্ষা শেষে বাইরে বেরিয়ে এসে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকল রিফাহ। কলেজের গেটের দুপাশে অভিভাবকদের মুখে একধরনের অস্থির কৌতূহল—কারও চোখে জিজ্ঞাসা, কারও ঠোঁটে খুশির আগাম ছায়া, আর কারও মুখে নিঃশব্দ চিন্তার রেখা। রিফাহর বাবা সামনের গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছিলেন, মুখে পানি ছিটিয়ে নিচ্ছিলেন।

“কেমন হইছে?”
বাবা জিজ্ঞেস করলেন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে, যেন জেনে গেছেন কোনো উত্তরই এখন চূড়ান্ত কিছু বলে না।

“ভালোই… যেটুকু পারি দিয়েছি,”
একটা নিঃসাড় উত্তর দিল রিফাহ।

রিকশা ডেকে হোটেলের দিকে রওনা হল তারা। রাস্তার পাশ দিয়ে ছুটে চলছিল মানুষ, গাড়ি আর হকারদের চিৎকার। কিন্তু এই মুহূর্তে রিফাহর মনে হচ্ছিল যেন তার চারপাশে সবকিছু ম্লান, সাদাটে হয়ে গেছে। তার কানে বাবার কথাও যেন ঠিকমতো ঢুকছিল না।

হোটেলে ফিরে একটু বিশ্রাম নিয়েই বাবার সঙ্গে দুপুরের খাবার খেল সে। খাবার যেন কেমন কৃত্রিম লাগছিল। লবণ মেপে দেওয়া, ডাল কেবল গরম, কিন্তু তাতে মা’র হাতের মতো কোনো নির্ভরতা নেই।

রুমে ফিরে বিছানায় গা এলিয়ে দিল সে। জানালার ফাঁক গলে একটু রোদ ঢুকছে। একটা কবিতা মনে পড়ল—
সূর্যের আলো মানেই সব উজ্জ্বল নয়, কিছু আলো ছায়া ডেকে আনে।

বুকের ভেতর একটা অদ্ভুত ফাঁকা লাগছিল। পরীক্ষার চাপ না, না কোনো অনিশ্চয়তা—একটা শূন্যতা, যেন কোনো কিছু শেষ হয়ে গেল হঠাৎ। অনেকদিন ধরে যে প্রস্তুতি, যে ভয়, যে রুটিনমাফিক চিন্তা—সব এখন থেমে গেছে। এখন কিছুই করার নেই, শুধু অপেক্ষা।

হঠাৎ মা’র কথা মনে পড়ল তার। ভাবল, বাসায় একটা কল দিয়ে জানিয়ে রাখে। ফোন করতেই ওপাশ থেকে মা’র কণ্ঠ,
“কি রে মা, পরীক্ষা শেষ? খালি পেটে আছিস না তো?”
এই কণ্ঠেই এত ভালোবাসা লুকানো, এত উদ্বেগ। রিফাহ হেসে বলল,
“না মা, ভালোই গেছে। তুমি চিন্তা কইরো না।”

কথা শেষ করে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল সে। রাজশাহীর আকাশ তখন ধীরে ধীরে সন্ধ্যায় গড়িয়ে যাচ্ছে।
একটা চড়ুই পাখি বারান্দার রেলিংয়ে এসে বসে আছে। ছোট ছোট চোখে চারদিক দেখে নিচ্ছে—ঠিক রিফাহর মতো, একা, নতুন শহরে, এক নতুন জীবনের অপেক্ষায়।

কোথা থেকে যেন হঠাৎ জুইয়ের কণ্ঠস্বর মনে পড়ে গেল,
“তুই যদি মেডিকেলে চান্স পাস, আমায় ভুলে যাবি না তো?”
রিফাহ হেসে ফেলে মনে মনে—এমন প্রশ্ন কেউ করে? যাকে মনে রাখার জন্য কোনো চেষ্টাই করতে হয় না, তাকে ভোলা কি এতই সহজ? অবশ্য জুই নিজেও মেডিকেলেই ভর্তি পরীক্ষা দিচ্ছে। যদিও ওর পরীক্ষা কেন্দ্র রাজশাহীতে না। রাজশাহীতে হলে অবশ্য দেখা হতো। পরীক্ষার পর দুই   বান্ধবী মিলে রাজশাহী শহরটা ঘুরে দেখা যেতো। চান্স হবে কি হবে না তাতো নিশ্চিত না। ফলে আর কবে রাজশাহী আসা হবে তাও অনিশ্চিত।

রাতে খাবার খেতে গিয়ে বাবা বললেন,
“রেজাল্ট যা-ই হোক, আমি জানি তুই নিজের জায়গায় ঠিক আছিস। মানুষ হিসেবেই তোকে আমি সবসময় ভালোবাসি।”

এই কথা শুনে অনেকক্ষণ কিছু বলতে পারল না রিফাহ। চোখের পেছনে হালকা জ্বলুনি—কিন্তু সে কেঁদে উঠল না। বুকের ভিতর কেবল একটা শব্দ হচ্ছিল:
আশা। শুধু একটা শব্দ। বাকিটা সময় বলবে।

সিদ্দিকার পর্ব:

মেয়েটির নাম সিদ্দিকা। মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই নতুন জীবন শুরু হয়েছিল তার। ঘর থেকে দূরে হোস্টেল, অচেনা মুখ, আর ভরা ক্লাসের প্রতিদিন নতুন নতুন চমক।

প্রথম দিন অ্যানাটমি ল্যাবেই যে কী হলো!

মৃতদেহ রাখা ছিল টেবিলের ওপরে সাদা চাদরে ঢাকা। শিক্ষক বললেন,

— “এই হচ্ছে তোমাদের প্রথম শিক্ষক। ক্যাডাভার।”

চোখের পাতা কাঁপছিল সবার। সিদ্দিকা একটু সাহস নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল, কিন্তু সাদা চাদর সরিয়ে যখন মৃতদেহের মুখ দেখা গেল, তখন পাশের বান্ধবী চিৎকার দিয়ে কাঁদতে শুরু করল। কেউ কেউ সরে গিয়ে দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়েছিল — যেন চাদরের নিচে এখনও প্রাণ আছে।

এর কিছুদিন পর ফিজিওলজি ল্যাবে “ব্লাড গ্রুপিং” চলছিল। সিদ্দিকার এক বন্ধু, রাজীব, রক্ত নিতে গিয়ে নিজের আঙুলে সূঁচ ঢুকিয়ে ফেলল। তখন সে একদম গুরুগম্ভীরভাবে বলে উঠল,

— “দোস্ত, আমি তো নিজের রক্তই নিতে পারি না! আমি রোগীর কী করব?”

ওয়ার্ড ক্লাসে রোগী দেখা শুরু হতেই জীবনটা আরও মজার হয়ে উঠল। একজন রোগীর কাছে গিয়ে ছাত্ররা তার রোগের ইতিহাস নিচ্ছিল। তখন রোগী বলল,

— “তোরা কি সত্যি ডাক্তার? তোদের দাড়িগোঁফই তো উঠছে না!”

আরেকদিন সিদ্দিকা ওয়ার্ডে গেল ডিউটিতে। এক রোগী হঠাৎ বলে উঠল,

— “আপা, একটু চা এনে দিবেন?”

সিদ্দিকা হেসে বলল,

— “আমি স্টুডেন্ট। চা এনে দিলে স্যার রাউন্ডে আমাকেই খেয়ে ফেলবে।”

আর অপারেশন থিয়েটার — সেখানে ঢুকে যেন সবাই স্তব্ধ। পেট কাটা দেখেই জুই জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। তখন অপারেশন চালু রেখেই নার্স বললেন,

— “এই যে মেয়েটা পড়ে গেছে, কেউ পানি এনে দাও। কিন্তু রোগী আগে!”

মেডিকেল লাইফে এমন হাজারো গল্প আছে। কখনও গভীর রাত অবধি পড়ে থাকত, আবার কখনও সকালে উঠে দেখে — পরীক্ষার ডেট ভুলে গেছে! কখনও রোগী ভালো হলে চোখে পানি এসে যেত, আবার কখনও খুব চেষ্টা করেও হারিয়ে যাওয়া রোগী মনে করিয়ে দিত — এই পেশা শুধু চাকরি না, এটা একধরনের যুদ্ধ।

হোস্টেল মানেই স্বাধীনতা, আবার হোস্টেল মানেই অনিয়মিত ঘুম, পোকা, পানি না থাকা, আর কারেন্ট গেলে ভৌতিক পরিবেশ।

সিদ্দিকার রুম ছিল ৩য় তলার এক কোনার ঘরে — জানালায় বাতাস ঢুকত ঠিকই, কিন্তু পাশে ড্রেন থাকায় ঘ্রাণে সবসময় ক্লোরোফর্মের আবেশ। রিফাহ আর জুই ছিল এক রুমে — চিরকালের বন্ধু রুমমেট, বাইরে গেলে দুইজনেই একে অপরের সাথেই থাকে।

একদিন সন্ধ্যায় বৃষ্টির মধ্যে হোস্টেলের কারেন্ট চলে গেল। তখন সময় রাত ৯টা, সিদ্দিকা হোস্টেলের লাইব্রেরিতে বসে পড়ছিল। রিফাহ তখন ভেবে বসেছিল, মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে চুল শুকানো যাবে — ফলাফল: মোবাইল অতিরিক্ত গরম হয়ে বন্ধ হয়ে গেল।

জুই তখন কেবল মগভর্তি পানি নিয়ে বাথরুমে ঢুকেছে, হঠাৎ আলো নিভে গেলে সে এক ঝাঁকায় বলে উঠল,

— “এই হোস্টেলেই একদিন ভূত চড়াবে, আমি জানি!”

ঠিক তখন বাইরে হঠাৎ প্রথম বর্ষের এক ছাত্রী কাঁদতে কাঁদতে দৌঁড়ে এসে বলল,

— “আমার তোয়ালে উড়ে গেছে ছাদে… আমি তোয়ালে ছাড়া উঠতে পারি না!”

এমন সময় মাহির ছেলেদের হোস্টেল থেকে ফোন করল সিদ্দিকাকে,

— “তোমাদের হোস্টেলে এত চিৎকার কেন? ভূত নামছে নাকি?”

সিদ্দিকা শান্ত স্বরে বলল,

— “না রে ভাই, ভূতেরও তো ফাইনাল প্রফ দিতে হয়, এত ফুরসত নেই ওদের।”

কারেন্ট ফিরল রাত ১১টায়। তখন সবাই বই রেখে খোলা ছাদে গেল — বৃষ্টি থেমে গেছে, চারদিক ঠাণ্ডা, আকাশে তারা।

সেখানে দাঁড়িয়ে রিফাহ বলল,

— “জানিস, এখানে দাঁড়িয়ে মনে হয় ডাক্তার হওয়ার চেয়ে পিচ্চিকালে গৃহশিক্ষক হওয়াই ভালো ছিল।”

জুই বলল,

— “তাও তো ছাত্র পালাত না! এখন তো রোগীও পালিয়ে যায়!”

হাসির দমকে ভেসে গেল হোস্টেলের ছাদ। রাত বাড়ল, পড়া জমল, কিন্তু এই একটা রাতের কথা কেউ আর ভুলল না।

কারণ মেডিকেল হোস্টেলে একটা “নরমাল” রাত বলতে কিছু নেই।

কলেজ হোস্টেলে রাত তখন ১১টা। বৃষ্টি থেমেছে কিছুক্ষণ আগে। ছাদের এক কোণে বসে আছে রিফাহ আর জুই — একজনের হাতে চায়ের মগ, অন্যজনের হাতে কাঁথা। চারপাশে ভেজা গন্ধ, দূরের আকাশে তারা দেখা যাচ্ছে না, তবুও দুজনেই তাকিয়ে আছে ওপরে।

রিফাহ আসলে চা খেতে জানে না — চা অনুভব করে।

সে বলে,

— “চা হচ্ছে একধরনের মাইন্ড ম্যাপিং। এই যে এখন, ক্লাসটেস্ট শেষ, মাথা ভারী… একটা কাপ চা মানেই ক্যানভাসে একটু রোদ।”

জুই হেসে বলল,

— “তুই কি চায়ের প্যাকেট থেকেও কবিতা লিখে ফেলবি?”

তারপর গম্ভীর হয়ে বলল,

— “রিফাহ, তুই কথা বললেই মন ভালো লাগে।”

এই দুই বান্ধবীর আড্ডার মাঝে মাঝেই এসে বসে সিদ্দিকা। সাদামাটা মেয়েটা, মুখে চুপচাপ হাসি থাকে, চোখে থাকে সাহস। প্রেমে না জড়ানোটা তার কোনো সংকল্প নয়, বরং স্বাভাবিক এক সহজ জীবনযাপন।

সে এসে বলল,

— “তোদের একেকটা কথা শুনলে মনে হয় আমি কোনো সিরিয়াস সিরিজের সাইড ক্যারেক্টার।”

তখনই হোস্টেলজুড়ে হইচই শুরু হলো। নিচের ওয়ার্ড থেকে খবর এসেছে — ইন্টার্নদের একজন প্রথমবার সিপিআর দিতে গিয়ে কেঁদে ফেলেছে। সবাই ছুটে গেল নিচে, হোস্টেল প্রায় ফাঁকা।

রিফাহ নিচে না গিয়ে বলল,

— “জীবনে প্রথম মৃত্যুর মুখোমুখি হওয়া আসলেই শক্ত। আমি ক্যাডেট কলেজে ছিলাম, সেখানে ডিসিপ্লিনের ছাপ ছিল, কিন্তু এখানে… প্রতিটা মৃত্যু এত কাছ থেকে লাগে।”

সিদ্দিকা এক গাল হেসে বলল,

— “তুই পারবি। এই তুই-ই একদিন মানুষের জীবন বাঁচাবি। আমার বিশ্বাস আছে।”

জুই বলল,

— “আর আমি তোকে চা খাইয়ে যাবো সব সার্জারি রোটেশন জুড়ে।”

তিন বান্ধবী ছাদের রেলিং ধরে দাঁড়াল। আকাশ তখন পরিষ্কার হচ্ছে ধীরে ধীরে। একটা তারা হঠাৎ জ্বলে উঠল।

সিদ্দিকা ফিসফিস করে বলল,

— “এই মেডিকেল লাইফ — চায়ের কাপ, দৌড়ের ওয়ার্ড, চোখের জল, বন্ধুত্ব, আর ছাদের আকাশ… সবকিছু মিলিয়ে জীবনটা আসলে খুবই মানবিক।”

রিফাহ মাথা নি

চু করে চায়ের কাপের দিকে তাকাল।

সেই কাপটা শুধু কাঁচের ছিল না — ভেতরে ছিল গল্প, ক্লান্তি, স্বপ্ন, সাহস।

রাজশাহীতে সেপ্টেম্বরের বিকেলটা একটু অন্যরকম। বাতাসে ধুলো কম, রোদটা মোলায়েম, আর পদ্মার পাড়ে হালকা একটা কুয়াশা যেন আগেই এসে দাঁড়িয়েছে।

রিফাহ, জুই আর সিদ্দিকা — এই তিনজনের আজ ‘অফ-ডে’। মানে, টিউশনি শেষে কলেজ নেই, ওয়ার্ড নেই, ক্লাসটেস্ট নেই।

টিউশন করে তিনজনই কিছু টাকা জমায়। কেউ ভবিষ্যতের সার্জিকাল ইনস্ট্রুমেন্ট কিনবে বলে, কেউ বই, আর কেউ… কফি।

সেদিন বিকেলেই তিনজন হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছায়  ক্যালিস্ট্রোতে। রাজশাহীর প্রাণকেন্দ্রে এক কোণার ভেতরে গরম কফি আর ঠাণ্ডা বাতাসের সেই ছোট্ট দুনিয়ায়।

রিফাহ প্রথম ঢুকে বলল,

— “তিনটা ল্যাতে — একটা হট কফি আমার, বাকিটা তোদের।”

জুই চোখ টিপ দিয়ে বলল,

— “টিউশন থেকে পেমেন্ট পেলে তুই যেন গার্ডিয়ান অফ দ্য গ্যালাক্সি!”

চায়ের বদলে আজ কফি — রিফাহর মুখে গম্ভীর ভাবটা থাকলেও, এই মুহূর্তে তার চোখে একটু ছুটির হাসি। আর সিদ্দিকা? সে চুপচাপ কফি চুমুক দিয়ে জানালার দিকে তাকিয়ে বলল,

— “আমরা কি একটু পরে টি বাধ যাবো?”

ঘণ্টাখানেক পর তিনজন পৌঁছায় টি বাধে — পদ্মার পাড়।

পানি তখন অনেক নিচে, বাতাসে সোঁদা গন্ধ। হিজলগাছের পাশে বসে রিফাহ বলল,

— “পদ্মার পানি অনেক কিছু গিলে ফেলেছে জানিস? আমার ছোটমামার শৈশবের ভিটেও এখন নদীর তলায়।”

জুই পাশ থেকে গম্ভীর হয়ে বলে,

— “আমাদের শৈশবও এই মেডিকেল লাইফ গিলে ফেলছে রে।”

তখনই সিদ্দিকা পেছন থেকে দুজনকে মাথায় ঠোকা মেরে বলল,

— “নেতিবাচক ভাব বাদ দাও। আমরা চা-কফি খেতে পারি, আকাশ দেখতে পারি, মানুষ বাঁচাতে শিখছি — এর চেয়ে বেশি সৌভাগ্য ক’জনের হয়?”

এরপর তারা হাঁটতে হাঁটতে কামরুজ্জামান পার্কে যায়। এক কোণায় বসে বাদাম খায়। পেছনে বাচ্চারা খেলছে, সামনে সেদ্ধ ডিমওয়ালার ডাক।

জুই বলল,

— “তুই যদি প্রেম করতি রে সিদ্দিকা, তাহলে এত ভালো কথা তোর মুখে মানাতো না।”

সিদ্দিকা হেসে বলে,

— “আমি তোদের প্রেমে পড়েই আছি। আলাদা করে কার দরকার?”

রিফাহ নিচু গলায় বলল,

— “আমাদের বন্ধুত্বটাই মনে হয় সবচেয়ে বড় রিলেশনশিপ।”

আকাশে তখন লাল রঙ ছড়াচ্ছে। ওরা তিনজন চুপ করে বসে থাকে কিছুক্ষণ। কেউ কিছু বলে না। কিন্তু একটা অদ্ভুত শান্তি চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে।

হয়তো এটাই ছিল তাদের সবচেয়ে দরকারি মেডিসিন —

এক কাপ কফি, কিছু পদ্মা হাওয়া, আর কাছের মানুষের নিঃশব্দ উপস্থিতি।

রাজশাহী মেডিকেলের হোস্টেলে তখন রাত ১টা। চারপাশে অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা। ছাদে হালকা বাতাস বইছে, তবু যেন শব্দ শুনতে পাওয়া যায়: বই উল্টানোর আওয়াজ, হালকা কফির কাপে চুমুক, আর গভীর নিঃশ্বাস।

পরদিন প্রথম প্রফ। মানে— মেডিকেল লাইফের প্রথম বড় ধাক্কা।

সিদ্দিকা, রিফাহ, জুই—তিনজনই তিন রকম মানসিকতায়।

সিদ্দিকা একটা ছোট খাতা নিয়ে একটার পর একটা চেকলিস্ট টিক দিচ্ছে। তার চোখে কোনো ভয় নেই, কিন্তু জুইর দিকে তাকিয়ে সে বুঝতে পারছে — কারো না কারো ভেঙে পড়া এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।

রিফাহ কাঁথা গায়ে দিয়ে ছাদে বসে আছে, আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে চুপচাপ। হাতে চায়ের মগ, কিন্তু তাতে আজ তেমন স্বাদ নেই।

জুই পাশে এসে বসে বলল,

— “তুই একটুও ভয় পাচ্ছিস না?”

রিফাহ মৃদু হেসে বলল,

— “আমি ক্যাডেট কলেজের প্রথম দিনেও কাঁপছিলাম না, এখানে তো তুই আছিস।”

জুই চুপ করে গেল। ভেতরে কোথাও শব্দ হল, শব্দটা এক ধরনের নির্ভরতার।

তাদের নিচে হোস্টেলের রুমে সিদ্দিকা তখন হঠাৎ বই বন্ধ করে উঠে দাঁড়াল। গলায় পানির বোতল ঝুলিয়ে ছাদের দিকে উঠল।

উপরে এসে দুই বন্ধুকে দেখে বলল,

— “তোমরা এত চুপ কেন? ভয় পেলে কথা বলতে হয়। শরীর নয়, ভয়টাই হলো মেডিকেলের সবচেয়ে বড় রোগ।”

তিনজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ। চাঁদের আলো গায়ে পড়ছে, চারপাশ ঘুটঘুটে। পাশের ছাদে কে যেন হালকা সুরে গাইছে,

“ভয় পেও না, পেছনে আমি আছি…”

সিদ্দিকা বলল,

— “চলো, সবাই একসাথে পড়ি আরেকবার। তিনজনের মধ্যে একটা না একটা মাথায় ঢুকবেই — পরীক্ষা হলে মিলিয়ে নেব।”

ওরা তিনজন মিলে নিচে নেমে এল। খোলা নোট, কফির কাপ, লাল চোখ, মাথায় চাপ — সবকিছু নিয়েও হাসতে হাসতে পড়তে থাকল।

জুই মাঝেমাঝে বলে,

— “আমার মনে হয় রেফারেন্স দিয়ে ফেলব।”

রিফাহ বলল,

— “তাতে কি? স্ট্যাম্পড কফির দোকানে চাকরি করব, তবুও হার মানব না।”

সিদ্দিকা চুপচাপ তাদের পাশে বসে চোখ বন্ধ করল। তারপর বলল,

— “কাল যখন প্রশ্ন হাতে পাবে, মনে রেখো— আমরা শুধু পড়িনি, লড়েছি।”

সকাল ৬টা। পরীক্ষার দিন।

তিনজন হাতে গ্লাভস পরে হলে ঢুকছে। কেউ চোখে আঙুল বুলিয়ে নিচ্ছে, কেউ আয়নায় নিজেকে দেখে নিচ্ছে, কেউ চুপচাপ দোয়া পড়ছে।

তিনজনের চোখে ভয় নেই, আছে একধরনের শান্তি। কারণ আগের রাতটাতে তারা শুধু পড়েনি— তারা একে অপরকে আগলে রেখেছে।

শনিবারের দুপুর। ক্লাস নেই, টিউশনটাও আজ ক্যানসেল হয়েছে। রিফাহ হঠাৎ করে প্রস্তাব দিল—”চলো না টি বাধে যাই। পদ্মার পাড়ে একটু হাওয়া খাওয়া হবে, মাথা ঠাণ্ডা হবে।”

জুই এক পায়ে রাজি। এমন প্রস্তাবে সে কখনও না করে না। আর সিদ্দিকা? একটু ভেবে নিল, তারপর বলল, “চলো। কিন্তু ফিরতে হবে সন্ধ্যার আগেই।”

রিকশা চেপে তিনজন রওনা দিলো। শহরের কোলাহল পেরিয়ে পদ্মার পাড়ের নিরিবিলি জায়গা, যেটাকে ওরা বলে “টি বাধ”—সেই জায়গাটা যেন অদ্ভুত এক প্রশান্তি ছড়িয়ে রাখে। বাতাসে কেমন একটা কাঁচা গন্ধ, আর দূরের কাশফুলগুলো নদীর দিকে হেলে পড়ে আছে।

রিফাহ এক কোণে বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। ওর হাতে এক কাপ চা—একেবারে কড়া লাল চা। জুই মাঝেমাঝে রিফাহর দিকে তাকায়। সে জানে, এই আকাশ দেখতে দেখতেই মেয়েটার অনেক চিন্তা তৈরি হয়। কিন্তু রিফাহ কখনও তা খোলসা করে না।

“তুই আবার কি ভাবছিস?”—জুই জিজ্ঞেস করল।

“আকাশের মতো মানুষ হওয়া যায় না?”—রিফাহ হেসে উত্তর দেয়। “যার নিজের কিছু নেই, কিন্তু সবকিছুকে ঢেকে রাখে।”

সিদ্দিকা তখন পাশের এক বাচ্চার হাতে বাদাম দেখে হেসে উঠে বলল, “চলো, আমরাও বাদাম খাই। মনে হয় ভালো গল্প হবে এর সাথে।”

ওরা তিনজন বসে পড়ল পাটের তৈরি একটা ছায়াঘেরা বেঞ্চিতে। বাদাম খেতে খেতে গল্প চলতে থাকল ছেলেবেলার, কাঁঠালচোরা প্রেমের, একাডেমিক ব্যর্থতার, আবার হঠাৎ হঠাৎ গম্ভীর হয়ে যাওয়া ক্যাডেট কলেজের স্মৃতির।

জুই বলল, “রিফাহ, তুই তো অনেক কিছুই বলিস না। জয়পুরহাটের দিনগুলো মনে পড়ে?”

“মনে পড়ে, কিন্তু সেসব কথা শুধু চায়ের সাথে যায়। আর আজকে তো কফি খাওয়া হয়নি!”—রিফাহ মুচকি হাসে।

সিদ্দিকা চোখ ঘুরিয়ে বলল, “তোর চা আর আকাশ—এই দুইটা ছাড়া কিছু পছন্দই আছে তোর?”

“আছে। তোর মতো বন্ধু।”

এক মুহূর্তের জন্য সবাই চুপ। নদীর ঢেউয়ের শব্দে চারপাশ ভরে যায়। এই নীরবতাই ওদের সবচেয়ে প্রিয় হয়তো।

ফেরার পথে কামরুজ্জামান পার্কের পাশ দিয়ে হেঁটে চলল ওরা। এক দোকান থেকে আবার বাদাম কেনা হলো। বসে গল্প, হালকা ঝগড়া আর একে-অপরের দিকে তাকিয়ে থাকা—সবই চলল নিঃশব্দ বোঝাপড়ায়।

শহরের মধ্যে থেকেও যেন একটা আলাদা পৃথিবী গড়ে তুলেছে ওরা তিনজন।

হালকা বাতাস বইছে। মৃদু রোদের পর, শহরটা যেন একটু শান্ত হয়ে এসেছে। মেডিকেলের ক্লাস, ওয়ার্ড, টিউশন—সব মিলিয়ে ক্লান্ত তিনজন মানুষ, রিফাহ, জুই আর সিদ্দিকা, হঠাৎ করেই ঠিক করল—আজ আর কোনো প্ল্যান নয়, হুট করে বেরিয়ে পড়া যাক।

জুইয়ের প্রস্তাব, “চলো কামরুজ্জামান পার্কে যাই। বাদাম খাবো, হাঁটবো। বেশি কিছু না—শুধু বসে থাকবো, মনটা হালকা হবে।”

তিনজনই রাজি হয়ে গেল।

পার্কে পৌঁছেই ওরা একটা নিরিবিলি বেঞ্চ খুঁজে নিল। রিফাহের হাতে এক বাটি ভাজা বাদাম। সেই কাগজে মোড়ানো গরমগরম বাদামের ভেতর একধরনের ঘরোয়া গন্ধ—নুন, মরিচ, আর সরিষার তেলের হালকা ছোঁয়া।

সিদ্দিকা নীরবে বসে থাকে, পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষদের দেখে। ওর চোখে সহজ সরলতা, কথাবার্তায় গভীরতা। জুই একটু ফুরফুরে মেজাজে, সবকিছুর মধ্যে গল্প খুঁজে নেয়।

রিফাহ বাদামের বাটি এগিয়ে দেয় সিদ্দিকার দিকে। “নে, বাদাম খা। তোর মুখে কিছু না দিলে পার্কও বোবা লাগে।”

সিদ্দিকা হেসে বলে, “তোর এই নাটকীয় সংলাপগুলা শুনলে মনে হয় মেডিকেল ছাড়ছিস, সিনেমার চিত্রনাট্যকার হবি।”

জুই হালকা হেসে বলে, “হয়তো হবে, কিন্তু সিনেমার মূল চরিত্র আমি। মনে রাখিস।”

মাঝে মাঝে রিফাহ আকাশের দিকে তাকায়—নীল থেকে ধূসর হচ্ছে একটু একটু করে। সে হঠাৎ বলে ওঠে, “জানো, আকাশ এমন সময়টায় সবচেয়ে বেশি কথা বলে। সূর্য ডোবার ঠিক আগের মুহূর্তে…”

জুই জিজ্ঞেস করে, “তুই আকাশের সাথে কথা বলিস নাকি?”

“হ্যাঁ,” বলে রিফাহ, “তুই শুনিস না বলেই তো বুঝিস না।”

এই কথা শুনে সিদ্দিকা আর জুই হেসে ওঠে। সিদ্দিকা বলে, “আকাশের মতো করে মানুষের মন বোঝা যদি এতো সহজ হতো!”

একটু পরে ওরা উঠে দাঁড়ায়। বাদামের শেষ খোসাগুলো মুঠোয় নিয়ে ডাস্টবিনে ফেলে আসে। ওরা জানে—এ জীবনে এমন অনেক সন্ধ্যা আসবে, আবার চলে যাবে। কিন্তু এই একটা সন্ধ্যা, এই কথা, এই হালকা হাসিগুলো—সব তারা মনে রাখবে।

কারণ মেডিকেল জীবনে কিছু দিন থাকে—যা শুধু পড়া বা রোগী নয়, গল্প হয়ে থাকে।

সকাল ৭টা। রাজশাহী মেডিকেল কলেজের ক্যাম্পাসে একটু ভোরের আলো ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে ক্লাসরুমের ভেতর কাঁপতে থাকে নতুন দিনের উত্তেজনা।

সিদ্দিকা, রিফাহ আর জুই একসাথে ভর্তি হয়েছে তৃতীয় বর্ষে। ক্লাস শুরু হওয়ার আগেই ওরা টিউশনে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

রিফাহ একটু নার্ভাস — আজ ফার্মাকোলজি টিউশনের প্রথম দিন।

সিদ্দিকা ধীরে ধীরে বই গুছিয়ে বলল,

— “একটু মন দিয়ে শুনিস, ডাক্তার হওয়ার যাত্রাটা কঠিন, কিন্তু ধৈর্য ধরলেই হবে।”

ক্লাসরুমে শিক্ষক স্পষ্ট আর গম্ভীর। অজানা অনেক নাম, জটিল রসায়ন, ওষুধের ডোজ আর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া — সব কিছু মাথায় আটকে রাখতে হবে।

জুই মাঝে মাঝে চোখ মুছে, চেষ্টা করে ফোকাস বাড়ানোর।

ক্লাস শেষে সরাসরি ওয়ার্ডে যায় তারা। এখানে মেডিকেল লাইফের অন্য রকম চ্যালেঞ্জ শুরু হয়। রোগীর সঙ্গে কথা বলা, পরীক্ষা নেওয়া, নোট নেয়া—সব কিছুই নতুন।

রিফাহ যখন প্রথমবার কোনো রোগীর হার্টসাউন্ড শুনল, সে একসময় ভয় পেলেও এখন একটু একটু করে আত্মবিশ্বাস বাড়ছে।

সিদ্দিকা রোগীর পাশে দাঁড়িয়ে বলে,

— “দেখিস, আমাদের কাজ শুধু বই পড়া নয়, মানুষের সাথে বিশ্বাস গড়া।”

দিন শেষে টিউশনে আবার তাদের দেখা হয়। আর এখানে শুরু হয় ক্লাসের পরের লড়াই—পাঠ শেষ না হওয়া পর্যন্ত মনোযোগ ধরে রাখা।

জুই হাসতে হাসতে বলল,

— “আমি মনে করি, যদি টিউশন না থাকতো, আমাদের মাথা আর একটু বেশি বাঁচতো।”

তারা সবাই জানে মেডিকেল পড়াশোনা সহজ নয়, তবে একে অপরের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে চলতে পারলে পথটা অনেকটা সুন্দর হয়ে ওঠে।

সকাল ৮টা। রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ার্ডে উত্তেজনা কাঁপছে। নতুন শিক্ষার্থীদের জন্য আজ প্রথম রাউন্ড।

সিদ্দিকা, রিফাহ আর জুই—তিনজনই একটু নার্ভাস, কিন্তু মনে করেই সেজেগুজে এসে দাঁড়িয়েছে ওয়ার্ডের দরজার সামনে। সেদিনের টপিক: সাধারণ শ্বাসতন্ত্রের রোগ।

রাউন্ডের শুরুতে সিনিয়র ডাক্তার কড়া কন্ঠে বলে উঠলেন,

— “রোগী দেখার সময় মনোযোগ দিন, শুধু বইয়ের কথা নয়, রোগীর অবস্থা বুঝতে হবে।”

রিফাহ প্রথম রোগীর সামনে দাঁড়িয়ে হাত ঝাঁকিয়ে বলে,

— “স্যার, রোগীর শ্বাসপ্রশ্বাস অস্বাভাবিক, হাঁচি-কাশির ইতিহাস আছে…”

জুই পাশ থেকে অতি সতর্ক চোখে রোগীর লক্ষণ খেয়াল করতে থাকে।

সিদ্দিকা একটু চুপচাপ হলেও রোগীর সঙ্গে আলাপ করে সাহস যোগায়।

রাউন্ড শেষে তারা একসাথে বসে আলোচনা করতে থাকে—কী ভুল হলো, কী ভালো হলো, কোথায় বেশি মনোযোগ দেওয়া দরকার।

সিদ্দিকা বলে,

— “বই থেকে শেখা আর বাস্তব জীবনের মাঝে পার্থক্য অনেক। এখানে রোগীর কথাও বোঝা জরুরি।”

রিফাহ যোগ করে,

— “ওয়ার্ডে আসল ক্লাস শুরু হয়। সেখানেই বুঝি ডাক্তার হওয়ার দায়বোধ কী।”

জুই মুচকি হেসে বলে,

— “ভয়ের কিছু নেই, পরেরবার আমরা আরও ভালো করব।”

দিনশেষে তিন বন্ধু ক্লাসের টেনশন ভুলে একটু হাসির খোরাক নিয়ে একে অপরকে সাহস দেয়। সবাই জানে, ওয়ার্ডের এই প্রথম অভিজ্ঞতা যতই কঠিন হোক, এগুলো তাদের ভবিষ্যতের অনন্য ধন।

সকালের ক্লাস শুরু হয়েছে অ্যানাটমি ল্যাবে। চারদিকে টেবিলভর্তি মৃতদেহের অংশবিশেষ, কাচের জারে সংরক্ষিত অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আর পচা ফর্মালিনের গন্ধে নতুনদের মাথা ঝিমঝিম করে। সিদ্দিকা, রিফাহ আর জুই তাদের সাদা অ্যাপ্রোন গায়ে, মাথায় স্কার্ফ শক্ত করে বাঁধা। তাদের হাতে হাতে বই, নোট আর গ্লাভস।

“এই ডেড বডিটা আগেরবারও দেখছিলাম মনে হয়,” মুখে মাস্ক পরে একটু নিচু স্বরে বলল রিফাহ।

“আচ্ছা, হিউম্যান হার্টটা আলাদা করে রাখা হয়েছে কোন জারে?” জুই খুঁজছিল।

সিদ্দিকা এগিয়ে গিয়ে একটা কাচের বয়াম তুলে ধরল, “এইটাই মনে হয়। তবে এটা পুরো হার্ট না। থোরাসিক কাট সেকশন।”

এই সবকিছু সয়ে নেয়ার অভ্যাস হচ্ছে ধীরে ধীরে। রিফাহ মাঝে মাঝে কানে হেডফোন দিয়ে অ্যানাটমির টার্মস মুখস্থ করে। জুই আবার নিজের চিরচেনা অভিব্যক্তি নিয়ে সবকিছু লিখে রাখে – তার রঙিন নোট খাতায় “হার্ট অফ মেডিসিন” বলে একটা শিরোনামও আছে।

আজ তাদের টিউটরিয়াল ক্লাসে একজন সিনিয়র ডাক্তার এলেন, যিনি খুবই কড়া বলে খ্যাত। সবাই একটু গুছিয়ে বসে। সিদ্দিকা আগেভাগেই রিফাহ ও জুইয়ের জন্য জায়গা রেখে দিয়েছিল।

“Tell me the branches of the arch of aorta,” প্রশ্ন করলেন ডাক্তার।

একটু থেমে সিদ্দিকা জবাব দিল, “Brachiocephalic trunk, left common carotid artery and left subclavian artery.”

ডাক্তার একটু হাসলেন। “Good. Anyone can tell me why it’s clinically important?”

রিফাহ এবার হাত তুলল। “Sir, in coarctation of aorta, the narrowing often occurs after the origin of the left subclavian artery, which affects the lower body’s blood flow…”

ডাক্তার এবার সিরিয়াসভাবে মাথা নাড়লেন, “Well done.”

জুই একটু হালকা করে ফিসফিস করল, “তোর আকাশ দেখার মতো উত্তর!”

রিফাহ হেসে বলল, “তোরা মাথা ঘামানো বাদ দে। ব্রেইন ডিসেকশন আসতেছে আগামী সপ্তাহে।”

সিদ্দিকা একটু গম্ভীর গলায় বলল, “একটা সময় ভাবতাম আমি হয়তো পারব না। কিন্তু আসলে – আমাদের সবকিছু অভ্যাস হয়ে যাচ্ছে। আমরা বদলে যাচ্ছি। বড় হয়ে যাচ্ছি।”

ওদের চারপাশের মেডিকেল লাইফের প্রতিটি ক্লাস, টেস্ট, টার্ম – একেকটা যুদ্ধ। একেকটা স্লাইডে চোখ রেখে একেকটা জীবনের ছোঁয়া। ক্লাস শেষে রিফাহ একটু আনমনা হয়ে বলল, “চল, আজকে ক্যাফেতে না গিয়ে একটু ক্যান্টিনে বসি। দই আছে নাকি চেক করিস তো!”

সিদ্দিকা হেসে বলল, “দই খেতে গিয়ে আবার হৃদপিন্ডের ডায়াগ্রাম দেখে বসিস না যেন!”

জুই হাসে। “তুমি আবার দই খেলে মন ভালো হয়ে যায় নাকি?”

সিদ্দিকা মাথা নেড়ে বলে, “না না, ওর মন ভালো হয় ক্যালসিয়াম ইনটেকে! মেডিকেল লজিক।”

রিফাহ কপট রাগে বলে, “তোমরা দুজন মিলে আমাকে শুধু প্যারা দাও। আর কেউ হলে এমন মন খারাপ শুনে আইসক্রিম কিনে দিত!”

জুই একটু মায়া করে বলে, “দেই? আইসক্রিমই দেই না হয়! চলো।”

তিনজনই হাঁটতে হাঁটতে রাজশাহী মেডিকেলের পুরাতন ক্যান্টিনের দিকে রওনা হলো। চারপাশে ছাত্রছাত্রীদের ভিড়, হাসাহাসি, চায়ের কাপের শব্দ, পেছনের টিনের চাল থেকে ঝরে পড়া ছায়া—সবকিছুতেই একধরনের বন্ধুত্বপূর্ণ বিশৃঙ্খলা।

ক্যান্টিনে ঢুকে তারা কোণের এক টেবিলে বসলো। কাঠের বেঞ্চে বসতেই রিফাহ বললো, “আমার জন্য একটা মিষ্টি দই। আর সাথে একটা গরম চা। আর হ্যাঁ, ছাঁকা চা, প্লিজ।”

জুই বলে, “তোমার চায়ের প্রেম নিয়ে একদিন একটা গবেষণা হবে, দেখো।”

সিদ্দিকা ক্যান্টিনের দাদাকে বলে দিলো অর্ডার। ততক্ষণে পাশে থাকা টেবিলগুলোতে চেনা-অচেনা মুখ, কেউ এমবিবিএস ফাইনাল প্রপ, কেউ ইন্টার্নশিপ নিয়ে আলোচনা করছে।

রিফাহ হঠাৎ করেই চুপচাপ হয়ে যায়। জুই তাকিয়ে বলে, “কি রে?”

রিফাহ মাথা নিচু করে বলে, “মনে হচ্ছে সব কিছু খুব দ্রুত পাল্টে যাচ্ছে। আজকে হোস্টেলে একা ঘুমাতে ইচ্ছে করছে না… মা-কে খুব মনে পড়ছে।”

এক মুহূর্তে ক্যান্টিনের কোলাহল যেন ফিকে হয়ে আসে তাদের জন্য। সিদ্দিকা হাতটা রাখে রিফাহর কাঁধে, শক্ত করে।

জুই ধীরে বলে, “আজ না হয় তোর সাথে থাকি হোস্টেলে? কথা বলি অনেকক্ষণ?”

রিফাহ চোখ তুলে তাকায়। সেই চেনা মায়াভরা চোখে একচিলতে হাসি। “আরে, এমন করে বলিস না। কান্না চলে আসছে।”

চা আর দই এসে যায় টেবিলে। তিনজনের চোখেমুখে ক্লান্তি, কিন্তু বন্ধুত্বের উষ্ণতা কাপে কাপে বয়ে চলে।

রিফাহর হাতে বইয়ের ভারী ব্যাগটা। ক্লাস শেষে ওয়ার্ড ক্লিয়ার করে এখন সিঁড়ি বেয়ে নামছে নিচে। সিদ্দিকা আগেই নিচে চলে এসেছে, ওর চেহারায় চিন্তার ছাপ। জুই পাশেই দাঁড়িয়ে। আজ অ্যানাটমি দ্বিতীয় পত্রের ভাইভা ছিল। সবাই একটু থমথমে।

সিঁড়ির কোণে এসে রিফাহ থেমে গেল। পেছন থেকে সিদ্দিকার গলা,

— “চল না, নিচে যাই। ক্যান্টিনে একটু বসি, মাথা ভার লাগছে।”

রিফাহ মাথা নেড়ে বলল,

— “তুই কেমন করলি?”

সিদ্দিকা হালকা হাসল,

— “আমার তো একটুও ভয় করে না ভাইভা। আমি যা জানি, সেটাই বলি। ভুল হলে ওরাই ঠিক করে দিক। তুই কেমন করলি?”

রিফাহ মুখে কিছু বলল না। চুপচাপ ব্যাগটা টেবিলে রাখল। ওর চোখে একরাশ ক্লান্তি।

জুই ধীরে ধীরে কাছে এল,

— “তুই কাঁদিসনি তো, রিফাহ?”

— “না… কিন্তু গলাটা আটকে গেছিল…”

সিদ্দিকা একটু পর পর বোঝার চেষ্টা করে,

— “তুই না পড়েছিলি? অ্যানাটমি তো তোর ভালোই ছিল!”

রিফাহ হালকা হেসে বলল,

— “কখনো কখনো মনে হয় আমি কেন এখানে আছি… কেন এই লাশের ওপর পিন দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকি, কেন এই স্প্ল্যাঙ্কনিক নার্ভ নিয়ে ঘাম ঝরাই…”

জুই বলল,

— “তুই খুব ক্লান্ত রে… তোকে একটু চা খাওয়াতে হবে।”

সিদ্দিকা ঝট করে বলল,

— “ক্যালিস্ট্রো যাই?”

রিফাহ একটু চমকে উঠল, তারপর হেসে ফেলল।

— “চা দিলে সব ঠিক হয়ে যায় না রে… কিন্তু হ্যাঁ, চল, চল ক্যালিস্ট্রো।”

ক্যাফের কর্নারে বসে তিনজন। এক কাপ করে কড়া লাল চা। চারপাশে মেডিকেলের কিছু চেনা মুখ। কারও বইয়ের নোট, কারও ফোনে কুইজ অ্যাপ।

রিফাহ চা হাতে জানালার বাইরে তাকায়। সন্ধ্যা নামছে ধীরে। আকাশের গায়ে সূর্যের হালকা ছোপ।

— “আকাশটা খুব শান্ত আজ,” ও বলল নিজে নিজে।

সিদ্দিকা বলল,

— “তোর যখন মুড খারাপ থাকে তখনই তুই আকাশের কথা বলিস।”

জুই একটু হেসে বলল,

— “আকাশকে কেউ বুঝতে পারে না… যেমন রিফাহকে।”

চায়ের কাপে টুং শব্দ হয়। রিফাহ একটু নরম গলায় বলে,

— “ভাইভা খারাপ গেলেও আমরা তো খারাপ না। বুঝলি? আমি, তুই, সিদ্দিকা — আমরা ঠিক আছি।”

সিদ্দিকা মাথা নেড়ে বলে,

— “সব সময় ঠিক থাকা যায় না, রিফাহ। কখনো কখনো কান্না চেপে রাখাটাও একধরনের শক্তি।”

তিনজনের চোখে এক ধরনের বোঝাপড়া। মেডিকেল কলেজ মানে শুধু হাড়, রক্ত আর কেস স্টাডি না — এখানে ভাঙা ভাঙা সময়ের মধ্যে গড়ে ওঠে গভীর বন্ধন, অসমাপ্ত ইমোশন, আর মাথা উঁচু করে বাঁচার এক অদ্ভুত প্রতিজ্ঞা।

রেডিওলজির ক্লাসটা শেষ হতে না হতেই রিফাহ ফিসফিস করে বলল,
— “চল ক্যান্টিনে যাই, দই খাবো।”
জুই সঙ্গে সঙ্গে সায় দিলো,
— “ওমা ঠিক ঠিক বলেছিস! আজকে দইটা একটু বাড়তি লাগে!”

সিদ্দিকা একটু হাসল। সে কিছু বললো না। চোখে তার শান্ত চাহনি, মুখে হালকা হাসি। চশমার কাচের পেছনে তার ক্লান্ত চোখ আজ একটু বেশি শান্ত।
— “তুই তো তেমন কিছু খাস না, সিদ্দিকা। একটু খাবি না?” — রিফাহ জিজ্ঞেস করল।
— “না রে, এখন চুপচাপ বসে থাকলেই ভালো লাগে।” — মৃদু হেসে উত্তর দিল সিদ্দিকা।

ওরা তিনজন ক্যান্টিনের কোনার টেবিলটা বেছে নিল। জানালার পাশে বসে থাকা যায় এমন একটা টেবিল। বাইরের আলো ছড়িয়ে আসছিল সাদামাটা ঘরের ভেতরে। রিফাহ আর জুই দই নিয়ে এল, মাটির বাটিতে ঢেলে খেতে খেতে তারা গল্প শুরু করল ক্লাসের কাহিনি নিয়ে।

সিদ্দিকা শুধু বসে ছিল। হঠাৎ পিঠে হাত রেখে বলল,
— “এই পিএলআইডি না কি যেন হয়েছে, ব্যথাটা আজ একটু বেশি লাগছে।”

রিফাহ আর জুই থেমে গেল।
— “তুই বলিসনি তো! ডাক্তার কিছু বলেছে?” — জুই একটু দুশ্চিন্তায় বলল।
সিদ্দিকা মাথা নেড়ে বলল,
— “রেস্ট নিতে বলেছে, বেশি ওঠাবসা করা যাবে না। প্ল্যানটা বাদ দে, রে। ঘোরাঘুরি আর হবে না কিছুদিন।”

রিফাহ যেন একটু থমকে গেল।
চঞ্চল মুখে একটা ছায়া নেমে এল।
জুইও চুপ। তাদের দুই বন্ধুর প্রাণটা আজ একটু স্তব্ধ।
একটু পর রিফাহ বলল,
— “তোর কিছু হলে তো আমরাও ভালো থাকি না, বুঝিস তো?”

সেদিনের দইটা হঠাৎ যেন পানসে লাগে।

পর্ব:

বৃহস্পতিবার দুপুর। রাজশাহী মেডিকেলের ক্লাস শেষে রিফাহ নিজের ব্যাগটা কাঁধে তুলে হোস্টেলের দিকে হাঁটা ধরলো। একাডেমিক ব্লক থেকে বেরিয়ে পশ্চিম দিকে ছোট্ট একটা গলি বাক নিয়েছে। ওই পথে কয়েক মিনিট হাটলেই রিফাহদের হোস্টেল। চারদিক থমথমে রোদ, বাতাসে কাঁপছে কড়ই গাছের পাতারা। দূরে রাধাচূড়ার ডালে ডালে শোভা পাচ্ছে রঙ্গীন ফুল। রিফাহর মাথার মধ্যে কী এক ক্লান্তিময় চাপা ভাব। হোস্টেলের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করেই চুপচাপ বিছানায় বসে পড়ে রিফাহ। হঠাৎ মায়ের মুখটা মনে পড়ে গেলো। মুখে নিজের অজান্তেই একটা হাসি ফুটে উঠলো। “চলেই যাই না আজই,” ভাবলো সে।
ব্যাগটা গুছিয়ে, কিছু জামাকাপড় আর একটা ছোট বাক্সে উপহার রাখা শাড়িটা নিয়ে রওনা হয়ে গেলো রাজশাহী রেলস্টেশনের দিকে। টিউশনীর টাকা জমিয়ে সে মায়ের জন্য একটা শাড়ি কিনেছে। সারা জীবন মা তাকে তার পছন্দের সব কাপড় কিনে দিয়েছে। রিফাহরও খুব ইচ্ছে করতো মায়ের জন্য সে নিজের টাকায় কিছু কিনবে। কিন্তু সে তো আগে ছোট ছিল। সেই সময়ে সে কোনো টাকা আয় করতো না। ঈদে বা বিভিন্ন সময়ে তাকে অনেকেই সালামি দিতো। সেই সব টাকা থেকে সে কিছু টাকা জমাতো এবং টাকাগুলোও তারই। তারপরও রিফাহ মনে করতো এগুলোতো আমি নিজে ইনকাম করিনি। মাকে আমি নিজের ইনকামের টাকা থেকে কিছু উপহার দেবো। ফলে টিউশন পাওয়ার পর থেকেই সে কিছু কিছু টাকা জমাতে শুরু করেছিল। সেই টাকা দিয়ে অবশেষে মায়ের জন্য শাড়িটা কিনতে পেরেছে। রাজশাহীর সিল্ক। মা নিশ্চই পছন্দ করবে। ছোট বেলায় কতবার মায়ের মুখে রাজশাহীর সিল্কের কথা শুনেছে রিফাহ। ভাবতে ভাবতে রিফাহ কাউন্টারের কাছে চলে যায়।

টিকিট কাউন্টারে ভিড়। সব সিট বুকড।
– “স্ট্যান্ডিং টিকেট আছে, নিবেন?”
– “দিইন, তাড়াতাড়ি।”
হাতের মুঠোয় টিকেটটা নিয়ে দাঁড়াল সে প্ল্যাটফর্মে। ট্রেন এসে থামে। ধোঁয়ার কুয়াশার মধ্যে উঠে পড়ে রিফাহ।

ট্রেন চলা শুরু করে। পাশে বসে থাকা এক মধ্যবয়স্ক ভদ্রলোক একটু পরপরই গল্প জুড়ে দেন।
– “তুমি মেডিকেলে পড়ো? আমার ছোট ভাইয়ের মেয়েও পড়ে, কুমিল্লায়।”
রিফাহ মুচকি হেসে গল্প শুনতে থাকে। একবার এক সিট ফাঁকা হলো, ভদ্রলোক বললেন,
– “বসে যাও মা, দাঁড়িয়ে কষ্ট হচ্ছে।”
রিফাহ মাথা নাড়ে, “আমি দাঁড়ানোর টিকেট কেটেছি। অন্যের সিটে বসা ঠিক না।”

ট্রেন ছুটে চলে। জানালার বাইরে গাঢ় সবুজ মাঠ, মাঝে মাঝে খয়েরি পাথরের উঁচু ঢিবি, পানির খাল আর ছোট ছোট সেতু – সব মিলিয়ে যেন বাংলাদেশ তার প্রকৃত সৌন্দর্য দিয়ে অভ্যর্থনা জানাচ্ছে। বড়াল ব্রীজের কাছাকাছি এসে ট্রেনের গতি কমে যায়। একটা হালকা কুয়াশা, নদীর উপর সূর্য হেলে পড়েছে – যেন স্বপ্নের মধ্যে ঢুকে পড়েছে রিফাহ।

রেলস্টেশন থেকে রিকশায় করে বাড়ি। বাড়ি পৌঁছেই মায়ের মুখে হাসি।
– “ওমা রিফু! হঠাৎ?”
– “ভাবছিলাম একটু গিয়ে দেখা করি তোমার সাথে।”

মা জড়িয়ে ধরে। রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে শীতল ভাতের ঘ্রাণ, পাকা টমেটো আর বেগুন ভাজার গন্ধ।
– “চা করবো না?”
– “তুমি থাকো মা, আমি করি।”
– “ধুর পাগল! তুই এলি আর আমি চা করতে দেবো?”

বাবা স্কুল থেকে ফিরেন, অবাক হন মেয়েকে দেখে। ডাইনিং টেবিলে তিনজন একসাথে বসে খায় অনেক দিন পর।
– “তোর ভাই ফোন করেছিলো, ছুটি পাচ্ছে না। অনেক কষ্ট হয় ওর,” মা বলেন।
রিফাহ তাকিয়ে থাকে মায়ের মুখে। অনুভব করে, এই ভালোবাসা, এই সংসারের গন্ধ কোথাও নেই।

শুক্রবার সকাল। চায়ের কাপ হাতে বারান্দায় বসে রিফাহ। আকাশে সাদা মেঘ ভাসছে। একটা শালিক এসে বারান্দার রেলিংয়ে বসে। মা বারান্দায় এসে বলেন,
– “চলে যাবি এখন?”
– “হ্যাঁ মা, ট্রেন ধরতে হবে। এইবার সিট কনফার্মড।”

বিদায়ের সময় মা একগাল আদর করে বলে,
– “আরেকটু থাক না!”
রিফাহ হাসে, “থাকবো মা, একদিন অনেকদিনের জন্য আসবো।”

বড়াল ব্রীজ আবার দেখা দেয় জানালার বাইরে। এবার সে বসে আছে জানালার ধারে। হালকা বাতাসে ওড়ানো চুলে আঙুল চালিয়ে রিফাহ ভাবে,
এই যাওয়া আর আসার মাঝেই হয়তো জীবন…
এই হঠাৎ দেখা, হঠাৎ ফেরা – এটাই কি মায়ের ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ?

Part-0000

তৃতীয় বর্ষের শুরুতেই গাইনি ওয়ার্ডে ক্লিনিক্যাল পোস্টিং। রাজশাহী মেডিকেল কলেজের তিন বন্ধুর—রিফাহ, জুই আর সিদ্দিকার প্রথম দিন।

রিফাহ একটু নার্ভাস। গাইনি ওয়ার্ড বলতেই তার মনে পড়ে যায় সিনেমার ভয়ানক সিজার সীন। আর জুই? সে বরং উৎসাহে টগবগ করছে।

— “রিফু! আজ না হয়তো বাচ্চা কাড়াকাড়ি দেখতে পাবো!”

সিদ্দিকা মুখে মৃদু হাসি টেনে বলল,

— “তুমি সবকিছু নিয়েই এত এক্সাইটেড হও কিভাবে?”

ওয়ার্ডে ঢুকেই দেখা গেল হট্টগোল। বেড নম্বর ১৩-এর পাশে ভিড়। একদল আত্মীয়, কেউ চুপচাপ, কেউ চোখে পানি, আবার কেউ ফোনে ভিডিও কলে বলছে—”দোয়া কইরেন, নাতি হইছে… মানে নাতনি হইছে বোধহয়… ওই দেখেন, আমিও কনফিউজ!”

রিফাহ, জুই আর সিদ্দিকা এগিয়ে গেল।

বাচ্চার মায়ের নাম রহিমা। সিজার হয়েছে গতরাতে। বাচ্চা সুস্থ, তবে শরীরের গঠন একটু বিভ্রান্তিকর। ডাক্তারদের প্রাথমিক ধারণা—জেনিটাল এনোমালি। আত্মীয়রা কেউ বুঝতেই পারছে না—ছেলে না মেয়ে?

একজন চাচা হঠাৎ রিফাহকে ডেকে বলল,

— “ডাক্তার সাব, আল্লাহর কসম, কন এইডা বেটা না বেটি? কোরবানির জন্য গরু কিনা কিনা করতেছি!”

জুই হেসে পড়ে, গালে হাত চাপা দিয়ে ফিসফিস করে বলে,

— “এখনই যদি গরু কিনতে হয়, তাহলে হুজুর ডাকেন আগে, ডাক্তার না।”

সিদ্দিকা রিফাহর কানে কানে বলল,

— “তুই হাসিস না, কিচ্ছু বলিস না। এটা সিরিয়াস, বুঝলি?”

রিফাহ একটু গম্ভীর হয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে বুঝিয়ে দিল—সে দায়িত্ব নিচ্ছে।

তখনই একজন বয়স্ক মহিলা বলে উঠলেন,

— “আমাগো বাড়ির সব বাচ্চা জন্মাইলে কান্নায় ঘর ভইরা যায়। এইডা তো চুপচাপ… হেই জন্যই সন্দেহ হইতেছে!”

রিফাহ আর থাকতে পারল না। হালকা হাসি চেপে রেখে বলল,

— “চাচী, কেউ চুপ থাকলেই মেয়ে হয় না। আর বেশি চিল্লাইলে ছেলে না। একটু সময় দেন। চিকিৎসা দরকার হতে পারে।”

জুই তখন বাচ্চার ফাইলটা ধরেছে, সেখানেই লেখা:

    Ambiguous genitalia — further evaluation required.

সিদ্দিকা ইতোমধ্যে সিনিয়র ডাক্তারকে ফোন করেছে। তিনি এসে পরিষ্কারভাবে বুঝিয়ে দিলেন—এই ধরনের কন্ডিশনে হরমোনাল ও জিনগত পরীক্ষা করতে হবে। তখনই বোঝা যাবে শিশুর প্রকৃত লিঙ্গ কী।

সবাই একরকম স্তব্ধ হয়ে গেল। তখনই এক আত্মীয়, বাচ্চার বড় চাচা, বললেন,

— “তা তো ঠিক আছে। কিন্তু নাম কি রাখবো? রাফি রাখি, না রাফিয়া?”

এইবার পুরো ওয়ার্ডে হেসে উঠলো সবাই।

রিফাহ, জুই আর সিদ্দিকা একটু দূরে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। রিফাহ বলল,

— “মানুষ আসলে কতো সহজে একজন মানুষকে শুধু লিঙ্গ দিয়েই সংজ্ঞায়িত করে!”

জুই মাথা নাড়িয়ে বলল,

— “আর আমরা ডাক্তার হয়ে শুধু রোগ দেখি, মানুষ দেখি না—এইটা হলে সবচেয়ে বড় সমস্যা।”

সিদ্দিকা এক কোণে বসে শান্ত গলায় বলল,

— “তবে এই শিশুটাই একদিন হয়তো কারও ভাবনায় পরিবর্তন আনবে। কে জানে!”

দিনের শেষে ওরা তিনজন কফি খেতে গেল “ক্যালিস্ট্রো”-তে। মিষ্টির বক্স হাতে বাচ্চার আত্মীয়দের একজন এসে বলল,

— “ডাক্তার আপারা, আপনাদের জন্যও একটা মিষ্টি। আমরা ঠিক করলাম, এখন নাম রাখছি ‘রাহী’। ছেলে হোক বা মেয়ে—আমাদের পথের সাথী হবে।”

রিফাহ হালকা হেসে জবাব দিল,

— “ঠিকই বলেছেন চাচা, রাহীর জন্য দোয়া করি—সে যেন নিজের পরিচয় নিজেই গড়ে নিতে পারে।”

পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ডে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে একটা বিশেষ গন্ধ লাগে—ডেটলের মতো কিছু, ভেজা স্যাঁতসেঁতে বিছানার চাদর, আর তার মধ্যেও লুকিয়ে থাকা চকলেট আর কল্পনার গন্ধ।

রিফাহ একটু থমকে গেল, জুই দৌড়ে বাচ্চাদের দিকে এগিয়ে গেল আর সিদ্দিকা চারপাশটা নিরীক্ষা করে নিল ঠান্ডা চোখে।

পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ডে আজ রিফাহদের প্রথম পোস্টিং। ঢুকতেই চারপাশে বাচ্চাদের কান্না আর মায়ের দুশ্চিন্তাময় মুখ। গাইনি ওয়ার্ডের তুলনায় এখানে পরিবেশটা অন্যরকম—একটা মায়া, একটা কোমলতা যেন বাতাসে ভাসছে।

রিফাহ, জুই আর সিদ্দিকা ঢুকে বাচ্চাদের নাম, রোগ, ওষুধ সব লিখে নিচ্ছিল।

এমন সময় ৭ নম্বর বেড থেকে একদমই অপ্রত্যাশিত এক কান্নার শব্দ আসলো।

রিফাহ এগিয়ে গিয়ে দেখে—একটা পাঁচ-ছয় বছরের ছেলে, নাম ‘রাফিন’। সে বিছানার নিচে লুকিয়ে কাঁদছে। পাশে তার মা বিব্রত মুখে দাঁড়িয়ে। স্যালাইন লাগানো হাতটা এক হাতে ধরে রেখেছে বাচ্চা, অন্য হাতে আঁচল কামড়ে চুপচাপ কাঁদছে।

রিফাহ নিচু হয়ে জিজ্ঞেস করল,
— “কী হয়েছে রাফিন? কাঁদছো কেন?”

রাফিন মুখ ফিরিয়ে বলল,
— “আমি কাঁচা আম খাইছি, কেউ দেখেনি। এখন আমার পেট ব্যথা করছে। কিন্তু আমি ডাক্তার দেখাবো না। ডাক্তার মানে ইনজেকশন!”

জুই ফিসফিস করে বলে উঠল,
— “ডাক্তার মানেই ইনজেকশন—এই ইমেজটা আমরা কি সত্যিই পাল্টাতে পারি?”

সিদ্দিকা কোমর বাঁকিয়ে বাচ্চার চোখে চোখ রেখে বলল,
— “আচ্ছা, যদি বলি ইনজেকশনের বদলে চকলেট দেব, তাহলে হবে?”

রাফিন একটু থেমে বলল,
— “চকলেট দিবা? ইনজেকশন না দিলে?”

— “না দিলে না,” জবাব দিল সিদ্দিকা।

তখনই পাশ থেকে সিনিয়র ডাক্তার এসে রসিকতা করে বললেন,
— “তাহলে তো ওষুধ দিতেই হবে, ইনজেকশন ছাড়াও যে ভালো হওয়া যায়, এটা তো ডাক্তাররাই প্রমাণ করতে চায়!”

রাফিন আস্তে করে বিছানায় উঠে বসল। কিন্তু তার চোখে পানি।

জুই তার ব্যাগ থেকে একটা লজেন্স বের করে বলল,
— “এই যে, আমের মতো টক লজেন্স। নাম – ‘ডক্টর চকলেট’। খাও আর ভালো হয়ে যাও।”

রাফিন মুখে পুরে দিল।

রাফিনকে দেখে জুইর মনে পড়ে গেল তার ছোট ভাই “রায়ান”-কে। জন্মের সময় থেকেই হাঁটতে পারত না। সারাজীবন বিছানায় থেকেও সবসময় বলত,
— “আপুর মতো ডাক্তার হব।”

কিন্তু হয়নি।

রায়ান চলে গেছে জুই যখন ফার্স্ট ইয়ারে। তখন থেকে ও ছোট বাচ্চা দেখলেই কোমল হয়ে যায়। বাচ্চার চোখের পানি, গাল ফুলিয়ে রাখা অভিমান, কিংবা অদ্ভুত যুক্তি—সব জিনিসে সে তার ভাইকে খুঁজে ফেরে।

তাই সে বলে,
— “ডাক্তার মানেই ইনজেকশন—এই ইমেজটা ভাঙতে হবে, রিফু। ছোটরা ভয় না পেয়ে যদি আমাদের কাছে আসে, তবেই তো আমরা সত্যিকারের ডাক্তার হব।”

সিদ্দিকার PLID-এর কারণে তার নিজের চলাফেরায় সীমাবদ্ধতা আছে। তবু আজ রাফিনের বিছানার পাশে সে চুপ করে বসে রাফিনের হাতটা ধরে রেখেছিল। একটু কষ্ট হচ্ছিল বসে থাকতে, কিন্তু মুখে আঁচও পড়েনি।

সে ভাবে—“আমি তো বাচ্চাদের মতো ছুটতে পারি না, খেলতে পারি না, ঘুরতে পারি না। কিন্তু যদি তাদের পাশে বসে থাকতে পারি, এটাও তো একরকম ভালোবাসা।”

ওর নীরব ভালোবাসার ভাষাটা বাচ্চারাও বুঝে ফেলে।

রিফাহ আস্তে করে মায়ের কাছ থেকে ইতিহাস নিল—জানতে পারল, ছেলেটার বাবা কয়েকদিন আগেই রোড অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেছে। ওর জেদ বেড়ে গেছে, খেতে চায় না, চিকিৎসা ভয় পায়।

রিফাহ সাধারণত কঠিন, বাস্তববাদী। সে আবেগে তেমন ভেসে না। কিন্তু এই ওয়ার্ডটা যেন তাকে কেঁপে কেঁপে ভেতর থেকে নরম করে ফেলছে।
রাফিনের বাবা মারা গেছে… সে নিজের বাবার মুখ মনে করতে চেষ্টা করল। কোনোদিন তো সে বাবার চোখে কাঁদতে দেখেনি।

কিন্তু এই বাচ্চারা কাঁদে, ভয় পায়, আবার এক মিনিটেই হাসেও।

এই সহজেই গলে যাওয়া মনই ওকে বুঝিয়ে দেয়—চিকিৎসা মানে শুধু রিপোর্ট না, প্রেসক্রিপশন না,
চিকিৎসা মানে কোনো শিশুর চোখে সাহস ফিরিয়ে দেওয়া।

সিদ্দিকা শিশুর চোখে তাকিয়ে বলল,
— “তোমার বাবার মতই তুমিও কি সাহসী হবে না, রাফিন?”

বাচ্চাটা আস্তে করে মাথা নাড়ল।

পরদিন যখন ওরা আবার ওয়ার্ডে গেল, রাফিন একটা ছবি আঁকছিল। ছবিতে একজন মেয়ে ডাক্তার, হাতে চকলেট, আর নিচে লেখা:
এই আপু ইনজেকশন দেয় না। শুধু হাসি দেয়।

তিন বান্ধবী চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিল কিছুক্ষণ।
রিফাহ মৃদু হেসে বলল,
— “পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ডে শুধু ওষুধ না, ভালোবাসাটাও ডোজ হয়ে ওঠে।”

ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে ওরা তিনজন “ক্যালিস্ট্রো”তে কফি খেতে বসে।

জুই বলল,
— “আজ যদি রায়ান থাকতো, জানি ও খুশি হতো।”

সিদ্দিকা বলে,
— “তুমি ওকে ভুলে যাওনি বলেই সে এখনও পাশে।”

রিফাহ এক গ্লাস পানি খেয়ে বলল,
— “আজ প্রথমবার মনে হচ্ছে, ডাক্তারি পেশাটা শুধু রক্ত-মাংসের না। এটা আত্মার চিকিৎসা।”

ওরা একে একে চুপ করে যায়।

হঠাৎ রিফাহ ব্যাগ থেকে একটা আমসত্ত্ব বের করে টেবিলে রাখে।

— “রাফিনের কাঁচা আমের গল্পটা অসমাপ্ত না থাকুক।”

জুই আর সিদ্দিকা হেসে ওঠে।

পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ডের একটা দিন—তাদের শিখিয়ে দেয়, কিভাবে কাঁদতে হয়, কিভাবে ভালোবাসতে হয়, আর কিভাবে একটা কাঁচা আমও কারও জীবনের গল্প হয়ে যেতে পারে।

পর্ব : শ্বাস নিতে কষ্ট হয়

মেডিসিন ওয়ার্ডে ঢুকতেই একটা কষ্টের গন্ধ লাগে। এই গন্ধের কোনো রাসায়নিক ব্যাখ্যা নেই। এখানে দীর্ঘ সময় ধরে অসুস্থ মানুষ পড়ে থাকে, বেঁচে থাকার লড়াই চলে, আর মাঝে মাঝে হাল ছেড়ে দেওয়া একেকটা চোখ তাকিয়ে থাকে সিলিংয়ের দিকে।

রিফাহ একটু থমকে গেল।
আজকে ওদের তিনজনের ওয়ার্ড ক্লাস। রোগী নিতে হবে। টিচার এসে বললেন,
— “৫ মিনিটের মধ্যে একজন রোগী ঠিক করে তার হিস্ট্রি নিয়ে আসবে। শ্বাসকষ্টের কোনো কেস পেলে ভালো হয়।”

রিফাহ সোজা এগিয়ে গেল ২১ নম্বর বেডের দিকে। সেখানে শুয়ে আছে এক বৃদ্ধ লোক, মুখে অক্সিজেন মাস্ক, বুকে হালকা নিঃশ্বাসের ঝাঁকুনি। পাশে বসে একটা কিশোর ছেলে—চোখ লাল, কিন্তু শক্ত হয়ে আছে।

— “চাচা, কেমন আছেন?”
রিফাহ ধীরে জিজ্ঞেস করে।

বৃদ্ধ লোক মাস্ক খুলে কষ্ট করে বলে,
— “আল্লাহর রহমতে শ্বাস টানতেছি, কিন্তু ফুসফুস আর বইতেছে না… আমার কপালেই কাহিনি।”

ছেলের নাম সাব্বির। সে বলে,
— “আমার আব্বু অনেক দিন ধরে ধুমপান করে। এখন বুড়ো বয়সে ফুসফুস দুইটাই শেষ। ডাক্তার বলছে সিওপিডি।”

রিফাহ বুঝে যায়—এটা একটা ক্লাসিক কেস। COPD – Chronic Obstructive Pulmonary Disease।

ও হিস্ট্রি নিতে নিতে দেখে, বৃদ্ধ লোকটা হঠাৎ বলছে,
— “ডাক্তার সাব, শুইতে গেলে মনে হয় বুকের ওপর কেউ পাথর চাপ দিছে।”

এই বাক্যটা রিফাহর মনে গেঁথে যায়।

ও ভাবে—প্যাথোলোজি বইয়ে লিখা কেস না, এটা জীবনের কেস। একেকটা রোগ শুধু শরীরে নয়, মনেমগজে কতখানি দাগ কাটে, তা কি বইয়ে পাওয়া যায়?”

পাশ থেকে সিদ্দিকা আস্তে করে বলে,
— “রিফু, একটা আশ্চর্য কথা বলি?”
— “বল।”
— “তুই তো সবসময় বলিস, আমি খুব শান্ত। কিন্তু জানিস, এই রোগীদের দেখে আমার কেমন জানি একটা রাগ হয়। নিজের ওপর, সমাজের ওপর, জীবনদর্শনের ওপর।”

জুই এসে যোগ দেয়,
— “আচ্ছা, আমরা কি সত্যিই রোগ সারাতে পারি? নাকি শুধু সময়টুকু বাড়াই?”

ওয়ার্ড ক্লাস শেষে টিচারদের প্রশ্ন, উত্তর, টেনশন—সব কিছুর মাঝে একটা কথা রিফাহ মনে মনে লেখে:

এই প্রথম মনে হলো, ডাক্তার হবার মানে রোগ সারানো নয়রোগীর পাশে থাকা। শ্বাস না নিতে পারা মানুষটার পাশে দাঁড়িয়ে শ্বাস নেওয়া।

সন্ধ্যায়

তিনজন আবার দেখা করে কফিশপ ‘ক্যালিস্ট্রো’-তে।

আজ আর কেউ হাসছে না। চুপচাপ বসে আছে।

জুই প্রথম বলল,
— “আজ আর কিছু খেতে ইচ্ছে করছে না। সেই ছেলেটার চোখে কেমন ভয় ছিল জানিস? যদি আব্বুকে হারিয়ে ফেলে…”

সিদ্দিকা মৃদু স্বরে বলে,
— “হারানোর ভেতর দিয়েই তো আমরা ডাক্তার হয়ে উঠি, জুই।”

রিফাহ ওদের দিকে তাকায়।
— “তোমরা জানো? আমি ওই বৃদ্ধ লোকের বুকের ‘পাথর’ শব্দটা ভুলতে পারছি না।”

হঠাৎ এক কাপ কফি ঠাণ্ডা হয়ে পড়ে থাকে টেবিলের ওপরে। তার পাশে রিফাহ নিজের ডায়েরিতে লেখে:

“আজ শিখলাম—
রোগ শরীরে শুরু হয়, মনের গহীনে বাসা বাঁধে,
আর একজন ডাক্তার হতে হলে কেবল রোগ নয়, ভয়টাও বুঝতে হয়।”

পর্ব : ছুরি, রক্ত, জীবন

সকালের আলো তখনো হাসপাতালের জানালায় এসে পড়েনি ঠিকভাবে।
সার্জারি ওয়ার্ডের সেই পুরোনো জানালাগুলোর গায়ে মরিচা ধরেছে, কিন্তু ঘরের ভেতরে নিঃশব্দ আতঙ্ক জেগে থাকে সদাই।

রিফাহদের আজ প্রথম অপারেশন থিয়েটারে ঢোকার সুযোগ।
ওয়ার্ডে ঢোকার মুখে লেখা—
“Clean mind, clean hands. Leave ego outside.”

রিফাহ এই লেখাটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে।
পেছন থেকে জুই বলে,
— “আমার কিন্তু হাত ঠান্ডা হয়ে গেছে। যেই ছুরি দেখে ফেললাম, মনে হচ্ছে আমি ব্ল্যাকআউট করব।”

সিদ্দিকা তার চিরচেনা ভঙ্গিতে বলে,
— “তুমি যে এখনও দাঁড়িয়ে আছো, এটাই যথেষ্ট। একদিন এসবই আমাদের হাতের খেলনা হয়ে যাবে। কিন্তু যতদিন না হচ্ছে, ভয়টাও উপভোগ করা যাক।”


অপারেশন থিয়েটার: প্রথম দেখা

ভেতরে ঢুকেই গন্ধটা নাকে লাগে—সেলাইন, বিটাডিন, রক্ত আর ভয়ের গন্ধ।

আজকের কেস: একজন ২৬ বছর বয়সী ছেলের অ্যাপেনডিসাইটিস।
ইমারজেন্সি অপারেশন।

অ্যাসিস্টেন্ট সার্জন রিয়াজ স্যার বললেন,
— “যারা দাঁড়িয়ে আছো, মনোযোগ দিয়ে দেখো। অপারেশন কোনো জাদু না, এটা প্র্যাকটিস। কিন্তু রোগীর বিশ্বাস, সেটা যেন না ভেঙে।”

ছুরি চালানো হলো।
পেটের চামড়া কাটা, তারপর মাংসপেশি, তারপর লিগামেন্ট… তারপর?

রক্ত।

গাঢ় লাল রক্ত।

রিফাহর মনে হলো, সময় থেমে গেছে। এমনকি হার্টবিটও যেন এক সেকেন্ড থেমে ছিল।

জুই মুখ ফিরিয়ে ফেলল। সিদ্দিকা চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্ত।
কিন্তু ঠিক তখনই, রিয়াজ স্যার বললেন,
— “Appendix found. Inflamed. Ready to remove.”

সেই মুহূর্তে রিফাহের মনে হয়,
এটাই জীবনফাঁপা একটা অঙ্গ, যা ব্যথা দেয়, ফেটে গেলে মরে যেতে হয়। অথচ অপারেশনের পর মানুষ হেঁটে বাড়ি যায়।

জীবন কতোটা সহজ হতে পারে!

অপারেশন শেষ। বাইরে বেরিয়ে রিফাহ দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে।

জুই ধপ করে পাশেই বসে পড়ল।
— “আমার মনে হচ্ছে আমি একটা যুদ্ধ দেখে ফিরলাম। আমাদের হাতে ছুরি থাকবে, রক্ত থাকবে, কিন্তু মানুষ বাঁচবে—এই ভাবনাটা অবিশ্বাস্য।”

সিদ্দিকা বোঝে, জুই কাঁদছে না, কিন্তু চোখে জল জমানো।

ও ধীরে বলল,
— “এই প্রথম আমি রক্ত দেখে ভয় পেলাম না। মনে হলো, সেই রক্তটা কেবল শরীরের না—ভালোবাসারও। মানুষ তার প্রিয়জনকে ফিরে পায় এই রক্তের বদৌলতে।”

আজ তেমন কথা নেই।

রিফাহ কফিতে চুমুক দিয়ে বলল,
— “একটা ছুরি দিয়ে জীবন বাঁচানো যায়। আর একটা ছুরি দিয়ে সম্পর্ক কাটা যায়। পার্থক্য জানার জন্য তো ডাক্তারি পড়া জরুরি না, তাই না?”

সিদ্দিকা উত্তর দেয়,
— “কিন্তু ওই পার্থক্য যদি ভালোভাবে না বুঝি, তাহলে একদিন নিজের ছুরিই আমাদের কেটে ফেলবে।”

জুই গলার কাছে গামছার মতো ওড়নাটা টেনে বলে,
— “আজ মনে হচ্ছে, আমাদের হাতে কেবল ছুরি নয়, সময়ও আছে। সময় দিয়ে জীবনের সেলাইটা করে যেতে হবে।”

 “আজ প্রথমবার মানুষের শরীরের ভেতর ঢুকেছি।
পেশি, রক্ত, নাড়ি—সবই ছিল। কিন্তু কোথাও খুঁজে পাইনি ‘ভালোবাসা’, ‘ভয়’, বা ‘বিশ্বাস’-কে।
অথচ অপারেশনের পরে ওই তিনটা জিনিসই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে।”

রিফাহদের আজ তৃতীয় দিন পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ডে। শিশুগুলোর কান্না, মায়েদের মুখে উদ্বেগ আর ডাক্তারদের ব্যস্ততা— সব মিলিয়ে ওয়ার্ডটা যেন একেকটা গল্পের খনি। আজ তারা টিউশন সেরে একটু দেরিতে এসেছে। ক্যালিস্ট্রোর কফির ঘ্রাণ এখনও জামার ভাঁজে লেগে আছে।

“এই বাচ্চাটার চেহারাটা কেমন যেন পরিচিত মনে হচ্ছে,” জুই হঠাৎ করে বলল।

“কোনটা?” রিফাহ এগিয়ে গিয়ে দেখল। ছোট্ট একটা ছেলেশিশু, বয়স বড়জোর দেড় বছর। মুখটা ফ্যাকাশে। চোখে-মুখে দারিদ্র্যের ছাপ। পায়ের পাতায় ব্যান্ডেজ। পাশে বসে থাকা মহিলা— একরাশ ক্লান্তি আর ভাঙা শাড়িতে ঢাকা কষ্টের প্রতিচ্ছবি।

“আপনার ছেলের কী হয়েছে?” সিদ্দিকা কোমল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল।

মহিলা মাথা নিচু করে বলল, “গরম পানিতে পা পুড়ে গেছে। গরম চায়ের কেটলি উল্টে পড়েছিল।”

জুইয়ের চোখ ছলছল করে উঠল। শিশুটার মাংসপেশিতে টান পড়েছে, ব্যথায় মাঝে মাঝে হঠাৎ কেঁদে ওঠে।

রিফাহ পকেট থেকে একটা ছোট্ট গাড়ির খেলনা বের করল। সে জানে, এই বয়সী শিশুরা খেলনা দেখলে এক মুহূর্তের জন্য হলেও ব্যথা ভুলে যেতে পারে।

“এইটা ওকে দিন,” সে বলল।

“রিফাহ, তোমার মা তো খোঁজ করছিল,” সিদ্দিকা বলল।

“হুম, আমি পরে ফোন দেব। এখন এই বাচ্চাটার জন্য মন খারাপ লাগছে,” সে পায়ের পাতা ধরে মৃদু গলায় শিশুটার সঙ্গে কথা বলছিল।

একটু দূরে, হঠাৎ একটা কান্নার শব্দ শুনে জুই ফিরে তাকাল। এক নার্সের হাত ধরে একটা ছোট মেয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলছে, “আম্মু কই? আম্মু কই?”

“এই শিশুটার মা বাইরে গেছেন প্রেসক্রিপশন আনতে,” নার্স জানাল।

জুই মেয়েটাকে কোলে নিল। মেয়েটা চুপ হয়ে গেল, তার গলা জড়ায়ে ধরল। সেই মুহূর্তে জুইয়ের মনেও অদ্ভুত এক টান অনুভব হল— একরকম মাতৃত্বের ছোঁয়া।

“তুমি নাম কী?” জুই ফিসফিসিয়ে জিজ্ঞেস করল।

“আরিবা,” মেয়েটি বলল।

“আচ্ছা আরিবা, আমি তোকে একটা গান শোনাব, চল?”

সিদ্দিকা ফোনে টুকটাক কিছু বাজিয়ে দিল। তারা তিনজন হাসিমুখে শিশুগুলোর মাঝে বসে সময় কাটাল। তাদের চোখে ক্লান্তি, ব্যথা, কিন্তু মন ভরে উঠেছিল একটা অন্যরকম শান্তিতে।

দিন শেষে তারা বেরিয়ে এলো ওয়ার্ড থেকে। পদ্মার বাতাস যেন আরও নরম লাগছিল আজ। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে রিফাহ বলল,
“তোর মনে হয় না, আমরা একটু একটু করে বদলে যাচ্ছি?”

জুই হাসল, “হয়তো আমরা বড় হচ্ছি— হৃদয়ে।”

সিদ্দিকা কিছু না বলে, শুধু হেঁটে গেল সামনের দিকে। তার পিঠে ব্যথা, তবুও আজকের বিকেলটা তার বুকেও খানিকটা উষ্ণতা ছড়িয়ে দিয়েছিল।

পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ড থেকে ফিরে আসার পর রাতে রিফাহ, জুই আর সিদ্দিকা তিন বন্ধু ‘ক্যালিস্ট্রো’ ক্যাফেতে মিলে বসেছিল।
দিনভর যত ক্লান্তি, ব্যথা, কষ্ট সব যেন ক্যাফের আলোর নরম আবহাওয়ায় কিছুটা ফুরিয়ে আসছে।

জুই প্রথম বলল,
— “আজ আরিবা, রাফিন, ওই ছোট্ট ছেলেটা… ওদের কথা ভাবতেই আমার মন খারাপ হয়।”

সিদ্দিকা মুখে হালকা হাসি ফোটালো,
— “তবে এতক্ষণ বাচ্চাদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে মনে হয়েছে, এরা আমাদের থেকেও অনেক সাহসী।”

রিফাহ একটু থামল, তারপর বলল,
— “আমরা কি কখনো বুঝব তাদের ভয়টা? যে কান্নাটা ওরা লুকিয়ে রাখে?”

জুই মাথা নাড়িয়ে,
— “আমাদের তো অনেক সময় তাদের চোখের কাছে নিজের চোখ ঢাকতে হয়।”

সেদিন সন্ধ্যায় তারা দীর্ঘক্ষণ চুপচাপ ছিল,
কিন্তু তার মধ্যে ছিল এক অদ্ভুত বোঝাপড়া।

হঠাৎ রিফাহর ফোন বেজে উঠল। কল আসছিল তার মায়ের থেকে।
ফোন ধরে রিফাহ বলল,
— “মা, আজকাল তোমার কথা ভাবি বেশি। তুমি কেমন আছো?”

মা বলল,
— “বেটা, তোর কথা ভাবি আমি বেশি। একদিন তুই ডাক্তার হয়ে ফিরে আসবি তো? ঘরে ফিরে এসে সবাইকে ভালোবাসা দেবে।”

রিফাহর চোখে জল এসে গেল। সে জানত, ঘরের দরজার ওপাশেও অনেক যুদ্ধ লড়াই চলছে, যেটা কেউ জানে না।

জুই বলল,
— “আমরা শুধু ডাক্তার নই, আমরা হয়ে উঠছি ভালোবাসার সেতুবন্ধন।”

সিদ্দিকা মৃদু হাসল,
— “তাই না, আমাদের হাতের প্রতিটি ছুরি, প্রতিটি ইনজেকশন, প্রতিটি কথাই যেন একেকটা জীবনের অঙ্গ।”

রিফাহ ডায়েরি খুলে লিখতে শুরু করল—

“আজও শিখেছি—
মানুষের দেহ যতই অসুস্থ হোক,
ভালোবাসা না থাকলে সুস্থ হওয়া অসম্ভব।”

তিনজন বন্ধু হাতে হাত দিয়ে কফির শেষ এক কাপ ভাগ করে নিলো,
আর ভাবলো—আগামী কাল তাদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে আসবে।

জুইয়ের একটি অংশ

রাজশাহীর কাঁকনহাটে কোচিং শুরু করে জুই। ওর চোখে সবকিছুই নতুন—নতুন শহর, নতুন মানুষ, নতুন রুটিন। প্রথম কয়েকদিন কিছুটা অস্বস্তি লাগলেও দ্রুত মানিয়ে নেয়, কারণ জুই জানে, এই যুদ্ধে জিততেই হবে। কোচিংয়ের ব্যস্ততা তার কাছে খুব অচেনা নয়।

কোচিং সেন্টারে একটা ছেলে ছিল—নাম রাশেদ। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা, হালকা পাতলা গড়ন, সবসময় চুপচাপ থাকে। কেউ ভাবে ও অহংকারী, কেউ ভাবে ও খুব পড়ুয়া। কিন্তু জুই ভাবে, ছেলেটা “আদ্ভুত রকমের সুন্দর”—চেহারায় নয়, আচরণে।

একদিন হঠাৎ লিফটে আটকা পড়ে যায় তারা দুজন। সেদিন প্রথম কথা হয়—স্রেফ দু-তিন বাক্য। তবু জুইয়ের মনে হয়, এই অল্প কথার ভেতরেই অনেক কিছু লুকানো ছিল। এরপর চোখাচোখি হতে থাকে, সামান্য হাসি বিনিময়, একসাথে ক্লাসে বসা—আরো কাছাকাছি আসা।

জুই রাশেদকে ভালোবেসে ফেলে। একদিন সাহস করে বলে ফেলে:

– “তোমার সাথে কিছু একটা অনুভব করি রাশেদ। ঠিক প্রেম না, আবার তা-ও। তুমি কি কিছু অনুভব করো?”

রাশেদ নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে,
– “জুই, তুমি অনেক ভালো। কিন্তু এই সময়ে এসব না ভাবাই ভালো। আমার ফোকাস মেডিকেল। আর এসব বিষয় নিয়ে আমি কখনোই সিরিয়াস না।”

জুই মাটির সাথে মিশে যায়। কান্না পায়, কিন্তু কাঁদে না, মুচকি হাসে।

এরপর দিনগুলো চলে যায়। পরীক্ষা এসে যায়। সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে। জুই মন ভেঙে যাওয়ার যন্ত্রণাকে শক্তি বানিয়ে ফেলে। ঘুমহীন রাত, ব্যথাভরা বুক আর জেদের আগুন নিয়ে ও লড়তে থাকে।

শেষমেশ রেজাল্ট বের হয়।

কয়েকদিন পর বাসস্ট্যান্ডে দেখা হয়ে যায় রাশেদের সাথে। ছেলেটা চোখ নামিয়ে রাখে। কিছুটা কুণ্ঠিত ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করে,
– “তুমি তো রাজশাহী মেডিকেলেই পড়বে, তাই না?”
জুই কেবল মাথা নাড়ে।
– “ভালো লাগছে জানো? আমি আগেই বলেছিলাম, তুমি অনেক ভালো করবে।”

জুই হাসে। ঠোঁটে সেই মুচকি, কিন্তু চোখে তীব্র দৃঢ়তা।

– “রাশেদ, তুমি ঠিক বলেছিলে। এই সময়ে এসব না ভাবাই ভালো। এখন আমার ফোকাস মেডিকেল।”

ছেলেটা স্তব্ধ হয়ে যায়। কিছু বলতে চায়, পারে না।

জুই ঘুরে চলে আসে। জানে, কিছু কিছু গল্প অসমাপ্ত থাকাই ভালো। আর কিছু কিছু ভালোবাসা… শুধু একতরফা হলেই শ্রেষ্ঠ।

রেলওয়ে কলোনি, বিকেল পাঁচটা।

জুই একটা পুরনো ভাঙাচোরা গেট ঠেলে ঢুকল লাল ইটের বাড়িটার ভেতর। কলোনির পুরোনো ধাঁচের ঘর, ছাদের খড়খড়ে ফাঁকফোকর দিয়ে আলো পড়ে আছে পড়ার টেবিলের ওপর।

“আসেন আপু,” ছোট মেয়েটি বলল। পিএন স্কুলে পড়ে, নাম অর্ণা। ক্লাস সেভেন।

জুই টেবিলের ওপর বই রাখল। “আজকে কিসে পড়ব, অর্ণা?”

মেয়েটি বাংলা বইটা এগিয়ে দিল।

জুই বইটা খুলতেই, পৃষ্ঠা ফাঁকে একটা ভাঁজ করা কাগজ পড়ল। তার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। কাগজ খুলতেই একটা ছেলেমানুষী হাতের লেখা—

তুমি যখন হাসো, মনে হয় সারা ঘর আলোয় ভরে যায়। জানি, তুমি আমায় ভালোবাসবে না। কিন্তু তবুওআমি চাই তুমি জানো।রাফি

জুই থমকে গেল।

ঠিক তখন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক কিশোর ছেলের চোখে চোখ পড়ল তার। গায়ের রঙ শ্যামলা, চুল এলোমেলো, হাতে একটা ব্যাট। কিছু বলতে যাবে, এমন মুখ করে তাকিয়ে আছে।

“তোমার ভাইয়ের নাম রাফি?” জুই জিজ্ঞেস করল ঠাণ্ডা গলায়।

অর্ণা গা চুলকাতে চুলকাতে বলল, “হ্যাঁ… মানে… ও তো আপনার ভীষণ ফ্যান।”

জুই কাগজটা আবার ভাঁজ করে বইয়ের পাতার মধ্যে রেখে দিল। মুখে কোনো হাসি নেই, চোখে একধরনের ধোঁয়া জমে গেছে। ধোঁয়ার ভেতরেও একটা মৃদু লজ্জা, একটা না-বলা চমক, আর হয়তো একচিলতে দয়ার ছায়া।

একজন স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসেন

চলুন গল্পে গল্পে ফিরে যাই পুরোনো দিনে। ১৯৯০ সালের জানুয়ারির আকাশে কুয়াশার ঘন আবরণ। শীতের এক সন্ধ্যা। নটিংহ্যাম ফরেস্টের স্টেডিয়াম সেদিন উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল। গ্যালারি জ্বলে উঠেছিল আশঙ্কা আর অপেক্ষায়। যেন হাজার হাজার চোখের সামনে লেখা হতে চলেছে একটি রক্তাক্ত রায়। অ্যালেক্স ফার্গুসেন তখনো স্যার উপাধী পাননি। সেটি পেতে তাকে অপেক্ষা করতে হবে আরও অনেক বছর। সেই সময়ে তিনি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কোচ। সাইড লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। মাথার ভেতর ঝড় বয়ে যাচ্ছে। তিনি জানেন, আজ হারলে সব শেষ। শুধু একটি ম্যাচ নয়, তার স্বপ্ন, তার যুদ্ধ, তার আত্মার লড়াই  সব শেষ। কেননা বার বার পরাজিত হতে হতে এমন হয়ে গিয়েছিল যে তাকে ছাটাই করার আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছিল। পেছনের গ্যালারিতে ইউনাইটেড সমর্থকরা গলা ফাটিয়ে চিৎকার করছিল। কিন্তু তাদের চিৎকারে ভেসে আসে এক অদৃশ্য আতঙ্ক। “Fergie Out! Fergie Out!”

এই আওয়াজ যেন পেরেক ঠুকে দিচ্ছিল তার সাহসে। মাঠের মধ্যে নটিংহ্যাম ফরেস্ট আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে তীব্র বেগে। ফার্গুসেনের ইউনাইটেড কোনো ভাবে দাঁতে দাঁত চেপে প্রতিরোধ করছে। মাঠের বাতাস ভারী, যেন শ্বাস নেওয়াও কঠিন। প্রতিটি পাসে, প্রতিটি দৌঁড়ে, সময় যেন তামার মত ভারী হয়ে পড়ে। তারপর… এক মুহূর্তের বিদ্যুৎঝলক। একটি স্মরণীয় পাস… একটি নিঃশ্বাস আটকে রাখা দৌড়…। মার্ক রবিন্স — তরুণ, অনেকটাই অচেনা। বল পেয়ে ছুটলেন। সমস্ত গ্যালারি দাঁড়িয়ে পড়লো, সময় থমকে গেল। তার পায়ের স্পর্শে বলটি নটিংহ্যামের গোলরক্ষককে ফাঁকি দিয়ে জালে ঢুকে গেল। গোল! একটি নিস্তব্ধ বিস্ফোরণ। গ্যালারিতে যেন একসঙ্গে বয়ে গেলো বিস্ময়ের ঢেউ। কিছু সমর্থক চিৎকার করে কাঁদছিল, কিছু নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ফার্গুসেনের ঠোঁট নড়লো না, হাত তুললেন না। শুধু চোখের কোণে একটা অদৃশ্য অশ্রুবিন্দু চকচক করে উঠলো। ভেতরে ভেতরে তিনি যেন নিজেই নিজেকে বললেন, “আমি বেঁচে গেছি।”

কিন্তু যুদ্ধ তখনও শেষ হয়নি। বল নিয়ন্ত্রণে রাখতে, প্রতিটি মিনিটে প্রতিপক্ষের ধাক্কা সামলাতে
দলকে মরিয়া হয়ে লড়তে হলো। সময়ের প্রতিটি কাটা যেন বুকে ছুরি চালাচ্ছিলো। শেষ বাঁশি বাজলো। ১-০ গোলের জয়। ছোট্ট এক সংখ্যা, কিন্তু ফার্গুসেনের জীবনে একটি মহাকাব্য। সেই রাতে, নটিংহ্যামের ঠান্ডা বাতাসে অদেখা অশ্রু ঝরেছিল, আকাশের তারাগুলো ফিসফিস করে বলেছিল, “ইতিহাস বেঁচে গেছে।” সেই গোল, সেই রাত আজও ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের প্রতিটি হৃদয়ে রক্তের মতো বয়ে চলে। আজও ফুটবল জানে,কখনো কখনো, একটি মাত্র মুহূর্তই বদলে দিতে পারে কোটি কোটি মানুষের ভবিষ্যত।

জীবন যখন মৃত্যুর কিনারে দাঁড়িয়ে, তখনই সে সবচেয়ে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। নটিংহ্যামে সেই অলৌকিক রাত্রির পরও যুদ্ধ শেষ হয়নি। কেবলতো শুরু। ম্যাচের পরের দিনগুলোয় ফার্গুসেনের চেহারায় ছিল এক অদ্ভুত পরিবর্তন। চোখ দুটোয় জ্বলে উঠেছিল বাঁচার এক অদম্য আগুন। দলকে তিনি চুপিসারে নতুন করে গড়তে শুরু করলেন, মনের ভেতর প্রতিটি খেলোয়াড়ের ওপর আঁকা হলো অদৃশ্য এক যুদ্ধচিত্র।

তারপর এলো সেই দিন । ১৯৯০ সালের FA Cup ফাইনাল। ওয়েম্বলির ঐতিহাসিক ময়দান। আকাশ ধূসর। মৃদু বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে টানটান এক অজানা স্নায়ুযুদ্ধ। গ্যালারির সাদা-লাল পতাকাগুলো বাতাসে লাফাচ্ছে,হাজার হাজার কণ্ঠস্বর মিশছে এক বিশাল সমুদ্রে। কখনো আনন্দের ফোয়ারা, কখনো আশঙ্কার নিঃশ্বাস। তাদের প্রতিপক্ষ সেদিন  ক্রিস্টাল প্যালেস। অবজ্ঞা করা সহজ, কিন্তু আজ তারা এসেছে খুনের নেশায়। প্রথম সাইরেন বাজলো। খেলা শুরু। ক্রিস্টাল প্যালেস যেন ঝাঁপিয়ে পড়ল ইউনাইটেডের ওপর। গোলের পর গোল। প্রত্যাঘাতের পর প্রত্যাঘাত। ফার্গুসেন দাঁড়িয়ে, চোখ দুটো তীক্ষ্ণ, এক মুহূর্তের জন্যও না কাঁপা। তার মন যেন প্রতিটি পাস, প্রতিটি ফাউল, প্রতিটি দৌড়ে মিশে গেছে।

প্রথমার্ধ শেষ। স্কোর সমান। গ্যালারির ভেতর চাপা উত্তেজনা। সমর্থকদের মুখে চুপচাপ প্রার্থনা। ওয়েম্বলির বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে। সময় গড়িয়ে দ্বিতীয়ার্ধ চলে এলো। হঠাৎ করেই ক্রিস্টাল প্যালেস এগিয়ে যায়। হাজার হাজার গলা থেকে বেরিয়ে আসে বিষণ্ণ দীর্ঘশ্বাস। ফার্গুসেনের মনে আবারো বেজে ওঠে সেই পুরোনো ভয়।”সব হারিয়ে যাবে?” কিন্তু ভয়ই যদি হয় শেষ কথা, তবে বীরত্বের দাম কোথায়? তিনি বেঞ্চ থেকে ডেকে আনলেন মার্ক হিউজেস, ব্রায়ান রবসনকে। তার দুই সৈনিক ঝাঁপিয়ে পড়ল যুদ্ধক্ষেত্রে। সেই উত্তাল সময়ে ইউনাইটেডও ফিরিয়ে দিল এক সমান শক্তির আঘাত। স্কোর সমান হলো। সময় শেষ। ম্যাচ গেল রিপ্লেতে। ফার্গুসেন এবার তার হৃদয়ের মাটি কেটে তৈরি করলেন নতুন রণকৌশল। দলে আনলেন এক সাহসী পরিবর্তন। লেস সিলি গোলরক্ষক হিসেবে বদলি নামালেন।ডিফেন্সের প্রাণপণে লড়াই। ওয়েম্বলির আকাশ সেদিন একেবারে উজ্জ্বল নীল। সূর্যের সোনালি আলো যেন ঘোষণা দিচ্ছিল নতুন আশার।

মাঠে তখন কেবল একটি কথা লেখা”জয় চাই”। লি মার্টিন। যিনি সচরাচর গোলের ধারেকাছেও আসেন না। তিনি এগিয়ে গেলেন, পায়ের ছোঁয়ায় বলকে উড়িয়ে দিলেন আকাশে। নিমেষে বল ঢুকে গেল প্রতিপক্ষের জালে! ১-০। সমস্ত গ্যালারি কেঁপে উঠলো। আনন্দে, চোখে জল, মুখে উল্লাস। ফার্গুসেন দাঁড়িয়ে, দু’হাত মুষ্টিবদ্ধ করে আকাশের দিকে তাকালেন। এ যেন শুধু একটি গোল নয়, এটি তার নিজের পুনর্জন্মের ডাক। শেষ বাঁশি বাজল। ইউনাইটেডের ছেলেরা ছোটে, লাফায়, কান্না করে। কেউ মাঠে পড়ে থাকে, কেউ গ্যালারির দিকে হাত তোলে। স্যার অ্যালেক্স ধীরে ধীরে মাঠের কেন্দ্রে আসেন। মাথা নিচু, ঠোঁটের কোণে এক ধীর অম্লান হাসি। যেন বলছেন: “আমি পড়ে যাইনি। আমি রক্ত দিয়ে আমার গল্প লিখেছি।”

যারা শেষ পর্যন্ত লড়াই করে, ভাগ্য তাদের জন্য দ্বার খুলে দেয়। আর ইউনাইটেডের ইতিহাসে অমর হয়ে যান একজন স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসেন। যিনি পরাজয়ের কিনার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে গড়েছিলেন ফুটবলের সবচেয়ে মহাকাব্যিক সাম্রাজ্য। ওয়েম্বলির সেই রাতে যখন শেষ বাঁশি বেজে উঠেছিল, স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসেন একা দাঁড়িয়ে ছিলেন। সব উল্লাসের মাঝখানে তার চোখের মধ্যে তখনো চলছিল এক নীরব ঝড়। অনেকের জন্য হয়তো সেই জয় ছিল এক ট্রফি। কিন্তু ফার্গুসেনের জন্য? এ ছিল কেবল শুরু। এক বিশাল যুদ্ধের প্রতিশ্রুতি।

সময়ের ধুলো ঝেড়ে নতুন ইতিহাস রচনার অভিযান শুরু হলো। ওল্ড ট্রাফোর্ডের করিডোরগুলোয় সেই সময় এক অদৃশ্য উত্তেজনা ভাসছিল। চেয়ারম্যানের রুম থেকে ড্রেসিং রুম পর্যন্ত,সবার মনে এক প্রশ্ন:”এই মানুষটা কি আমাদের আবার গৌরবের দিন ফিরিয়ে আনতে পারবে?” ফার্গুসেন জানতেন, মেরামত নয়, দরকার পুরোপুরি নতুন করে নির্মাণ।


তিনি একে একে সাবধানী কৌশলে পুরনো, ক্লান্ত সৈনিকদের বিদায় দিলেন। যারা আর যুদ্ধের ডাকে সাড়া দিতে পারতো না, তাদের চোখে সম্মান রেখেই মুক্তি দিলেন। গোটা ইউনাইটেডের শরীরে তখন নতুন শিরা-উপশিরা জোড়া লাগানো হচ্ছিল। আলো-আঁধারির মধ্য দিয়ে এগিয়ে চলছিল এক বিপ্লবের পদধ্বনি।

তারপর শুরু হলো স্বর্ণযুগের ছেলে খোঁজার যাত্রা। নরম সকালবেলায়, ভিজে ঘাসের মধ্যে, কুয়াশার চাদরে মোড়া প্রশিক্ষণ মাঠে এক ঝাঁক তরুণ ছেলেরা দৌড়াচ্ছিল প্রাণপণে। তাদের চোখে ছিল স্বপ্নের দীপ্তি, পায়ে ছিল বিদ্যুৎ। সেই দলে ছিল রায়ান গিগস। যেন বাতাসের সন্তান, ডানায় ভর করে উড়ে যান মাঠের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। ডেভিড বেকহাম যার ডান পায়ে ছিল যাদুর ছোঁয়া, নিখুঁত ক্রস, অব্যর্থ ফ্রি-কিক। পল স্কোলস মাঠের নিরব জাদুকর, যিনি নিঃশব্দে বদলে দিতেন খেলার গতিপথ। গ্যারি ও ফিল নেভিল দুই ভাই, যেন রক্তের সম্পর্ক দিয়ে বাঁধা দুটো নির্ভরতার দুর্গ। নিকি বাট পাথরের মত কঠিন, যুদ্ধক্ষেত্রের এক অমোঘ সৈনিক। ফার্গুসেন তাদের গড়ছিলেন নিজের হাতের ছাঁচে। প্রতিদিন, প্রতিটি অনুশীলনে, তিনি তাদের মধ্যে ঢেলে দিচ্ছিলেন লড়াইয়ের নেশা, পরাজয়ের ঘৃণা, আর জয়ের ক্ষুধা।

ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের যুবকরা একে একে ঘোষণা দিলো নিজেদের আগমন। তারা কোনো সাধারণ প্রজন্ম ছিল না। তারা ছিল “Class of ’92″। ইতিহাসের পাতায় জ্বলন্ত সোনালী অক্ষরে লেখা এক নাম। পেছনে ফার্গুসেন দাঁড়িয়ে দেখছিলেন। গভীর চোখে, নীরব ঠোঁটে  যেন একজন কৃষক দেখছে কীভাবে তার হাতে বোনা বীজ ফুঁড়ে বেড়িয়ে আসছে রাজকীয় ফসল।

রাজত্ব শুরু হলো। ১৯৯৩ সালে অপেক্ষার অবসান হলো। ২৬ বছরের খরা ভেঙে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ইংলিশ লিগে চ্যাম্পিয়ন হলো। ওল্ড ট্রাফোর্ডের আকাশ ফেটে গেল উল্লাসে। লাল পতাকাগুলো সেদিন কেবল কাপড়ে নয়, প্রতিটি হৃদয়ের ভেতরেও উড়ছিল। ফার্গুসেন দাঁড়িয়ে ছিলেন দলবল নিয়ে, কিন্তু তার চোখে ছিল এক মৃদু, অদৃশ্য বিষণ্ণতা
কারণ তিনি জানতেন, এটি শেষ নয়; এটি কেবল শুরু। পরের বছরগুলোয় তিনি একের পর এক শিরোপা জিতলেন  প্রিমিয়ার লিগ, FA Cup, লিগ কাপ, এবং অবশেষে ১৯৯৯ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগ জিতে গড়লেন “ট্রেবল” এক সাথে তিনটি বড় ট্রফি। এমন কীর্তি যা তখন পর্যন্ত ইংলিশ ফুটবলে ছিল স্বপ্নেরও অতীত। এবং এভাবেই একজন স্কটিশ যুবক, যিনি চাকরি হারানোর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েছিলেন,যিনি এক রাতে তার ক্যারিয়ার বাঁচিয়েছিলেন এক তরুণের পায়ে ভর করে,তিনি গড়ে তুললেন এক কিংবদন্তী সাম্রাজ্য। যার শীর্ষে দাঁড়িয়ে তিনি পরিণত হলেন ফুটবল ইতিহাসের সর্বকালের শ্রেষ্ঠ কোচ। ওল্ড ট্রাফোর্ডের দেয়ালগুলো আজও রাতে ফিসফিস করে বলে  এখানে একসময় রাজত্ব করতেন স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসেন। রক্ত দিয়ে লেখা এক কিংবদন্তি।

লেখা: জাজাফী (গল্পকার)

www.zazafee.com

কর্ণফুলী টানেল: বোঝা নাকি সম্ভাবনার দ্বার?

বাংলাদেশের প্রথম নদীর নিচ দিয়ে নির্মিত কর্ণফুলী টানেল প্রকল্পটি দেশের অবকাঠামো উন্নয়নের একটি মাইলফলক। তবে সম্প্রতি এর রক্ষণাবেক্ষণ খরচ মেটানোর অক্ষমতা এবং প্রকল্পের জন্য নেওয়া ঋণের চাপ নিয়ে আলোচনা বৃদ্ধি পেয়েছে। এই প্রবন্ধে কর্ণফুলী টানেলের বর্তমান পরিস্থিতি, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, এবং এটি বাংলাদেশের জন্য বোঝা না সম্ভাবনা—এই প্রশ্নগুলো বিশ্লেষণ করা হবে।

টানেলের বর্তমান অবস্থা

কর্ণফুলী টানেল, যা “বঙ্গবন্ধু টানেল” নামেও পরিচিত, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর নিচ দিয়ে নির্মিত। এটি দেশের প্রথম টানেল এবং একটি উচ্চ প্রযুক্তি নির্ভর প্রকল্প। কিন্তু এর নির্মাণ খরচ এবং রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।

  1. রক্ষণাবেক্ষণ খরচ: টানেলটি চালু হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে, টোল আদায় থেকে পাওয়া রাজস্ব এর রক্ষণাবেক্ষণ খরচও পূরণ করতে পারছে না। বর্তমানে প্রতিদিনকার গড় টোল আদায় টানেলের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ের তুলনায় কম।
  2. ঋণ পরিশোধের চাপ: টানেলটি নির্মাণে বিশাল পরিমাণ অর্থ বিদেশি ঋণ হিসেবে নেওয়া হয়েছিল। এই ঋণের সুদসহ পরিশোধের বোঝা দেশের অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য বোঝা নাকি সম্ভাবনা?

বোঝার দিকগুলো:
  1. অর্থনৈতিক চাপ: কর্ণফুলী টানেলের নির্মাণ ব্যয় ছিল ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি, যার একটি বড় অংশ ঋণ হিসেবে নেওয়া। রক্ষণাবেক্ষণ খরচ না উঠলে ঋণ পরিশোধে বাড়তি রাজস্ব বরাদ্দ করতে হবে। এটি সরকারের অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পকে প্রভাবিত করতে পারে।
  2. পর্যাপ্ত যানবাহনের অভাব: টানেলের টোল আদায়ের প্রধান উৎস যানবাহন। কিন্তু টানেল দিয়ে প্রত্যাশিত সংখ্যক যানবাহন চলাচল না করায় রাজস্ব কম হচ্ছে।
  3. পরিকল্পনার ঘাটতি: চট্টগ্রামে বিদ্যমান সড়ক অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার কারণে টানেলের পুরো সক্ষমতা ব্যবহার করা যাচ্ছে না।
সম্ভাবনার দিকগুলো:
  1. অঞ্চলীয় সংযোগ উন্নয়ন: টানেলটি চট্টগ্রাম শহরের যানজট কমানোর পাশাপাশি চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মধ্যে সংযোগ বৃদ্ধি করেছে। এটি ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে সহায়ক।
  2. পর্যটন উন্নয়ন: টানেলের মাধ্যমে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের পর্যটন শিল্পে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এতে ভবিষ্যতে পর্যটক বৃদ্ধি রাজস্ব আয় বাড়াবে।
  3. বহুমুখী ব্যবহার: ভবিষ্যতে টানেলটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, কর্ণফুলী নদীর উভয় তীরের উন্নয়ন, এবং চট্টগ্রাম বন্দরকে আরও কার্যকর করতে সহায়ক হতে পারে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

কর্ণফুলী টানেলের সফলতা অনেকটাই নির্ভর করছে এর যথাযথ ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনার ওপর। কিছু প্রস্তাবনা নিম্নরূপ:

  1. টোল ব্যবস্থাপনা উন্নত করা: টোল আদায়ের প্রক্রিয়া আরও ডিজিটাল এবং স্বচ্ছ করতে হবে। এছাড়া টোল হার পুনর্বিবেচনা করে যানবাহন মালিকদের আকর্ষণ করা যেতে পারে।
  2. যোগাযোগ উন্নয়ন: টানেলের উভয় প্রান্তে সড়ক অবকাঠামো উন্নত করা জরুরি। এই যোগাযোগ উন্নয়ন টানেলের ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়াতে সহায়ক হবে।
  3. বিনিয়োগ আকর্ষণ: টানেলকেন্দ্রিক শিল্প এবং বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হলে এটি দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক হতে পারে।
  4. পর্যটন প্রচারণা: চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের পর্যটন স্থাপনার সঙ্গে টানেলকে একীভূত করে প্রচারণা চালানো হলে পর্যটক সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।

উপসংহার

কর্ণফুলী টানেল বর্তমানে একটি আর্থিক চাপ সৃষ্টি করলেও এটি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার মাধ্যমে এটি দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। যদিও এখন এটি বোঝা মনে হচ্ছে, তবে সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে টানেলটি ভবিষ্যতে লাভজনক প্রমাণিত হতে পারে। সরকারের উচিত পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণের মাধ্যমে টানেলটিকে একটি সফল প্রকল্পে পরিণত করা।

লুই আলথুসেরের রাষ্ট্র ও ভাবাদর্শ পাঠপ্রতিক্রিয়া

লুই আলথুসের (Louis Althusser) মার্কসবাদী তত্ত্বের একটি বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, যার লেখা “Ideology and Ideological State Apparatuses” প্রবন্ধটি মার্কসবাদী রাষ্ট্রতত্ত্বে একটি অনন্য মাত্রা যোগ করে। এটি তার গ্রন্থ “On the Reproduction of Capitalism”–এর অংশ। এই লেখায় আলথুসার বিশ্লেষণ করেন রাষ্ট্র কীভাবে তার শাসনক্ষমতা বজায় রাখতে জনগণকে ভাবাদর্শের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করে এবং কীভাবে শ্রেণিসংগ্রামের ভিত্তিতে সমাজের প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে ওঠে।


মূল তত্ত্ব ও ধারণা

১. আইডিওলজি (ভাবাদর্শ):

আলথুসেরের মতে, আইডিওলজি এমন একটি ব্যবস্থা যা ব্যক্তির চিন্তা ও চেতনার গঠন করে। এটি সমাজের মধ্যে ব্যক্তি এবং তাদের স্থান সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি করে। তবে আইডিওলজি শুধু প্রতারণামূলক নয়; এটি ব্যক্তি ও সমাজের সম্পর্কের মধ্যে অর্থও তৈরি করে।

২. রাষ্ট্রযন্ত্র (State Apparatus):

আলথুসের রাষ্ট্রকে দুটি যন্ত্রের মাধ্যমে বিশ্লেষণ করেন:

  • দমনমূলক রাষ্ট্রযন্ত্র (Repressive State Apparatuses, RSA): পুলিশের শক্তি, সামরিক বাহিনী, আদালত, এবং কারাগারের মতো যন্ত্র, যেগুলো সরাসরি বলপ্রয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রের শাসন ক্ষমতা বজায় রাখে।
  • ভাবাদর্শিক রাষ্ট্রযন্ত্র (Ideological State Apparatuses, ISA): শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, পরিবার, সংস্কৃতি ইত্যাদি, যেগুলো মানুষকে “স্বাভাবিক” আচরণের মধ্যে রাখতে চিন্তা ও চেতনাকে প্রভাবিত করে।

৩. আইডিওলজির ইন্টারপেলেশন:

আলথুসার বলেন, আইডিওলজি মানুষের চিন্তাকে এমনভাবে “ইন্টারপেলেট” (ডাকে) বা সম্বোধন করে যে, তারা নিজেকে স্বাধীন ব্যক্তি মনে করলেও আসলে তারা শাসকশ্রেণির সেবায় নিয়োজিত।

৪. শ্রেণিসংগ্রাম:

আলথুসারের দৃষ্টিতে রাষ্ট্র হলো শ্রেণি সংগ্রামের ক্ষেত্র। শাসকশ্রেণি তাদের শাসন ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখার জন্য আইডিওলজি ও বলপ্রয়োগ উভয়েরই ব্যবহার করে।


আলথুসারের বইয়ের প্রভাব ও গুরুত্ব

১. মার্কসবাদী রাষ্ট্রতত্ত্বে নতুন মাত্রা:
আলথুসার মার্কসের তত্ত্বকে সম্প্রসারিত করে রাষ্ট্র ও আইডিওলজির সম্পর্ককে ব্যাখ্যা করেছেন। পূর্বের মার্কসবাদীরা রাষ্ট্রকে শুধু দমনমূলক হিসেবে দেখলেও আলথুসার দেখিয়েছেন যে, রাষ্ট্র “ভাবাদর্শিক” মাধ্যমেও শাসন করে।

২. শিক্ষা ও সংস্কৃতির ভূমিকা:
আলথুসার দেখান যে, শিক্ষা একটি প্রধান আইডিওলজিক্যাল যন্ত্র, যা শাসকশ্রেণির মূল্যবোধ এবং চিন্তাকে সমাজের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়। এটি আমাদের ভাবতে বাধ্য করে, “যা আছে, তাই স্বাভাবিক।”

৩. স্বাধীনতার প্রশ্ন:
আলথুসারের তত্ত্ব চ্যালেঞ্জ করে যে, মানুষ আসলে কতটা স্বাধীন। তার মতে, আমাদের চিন্তা ও সিদ্ধান্ত মূলত আইডিওলজির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।


পাঠ প্রতিক্রিয়া:

১. তত্ত্বের গভীরতা ও জটিলতা:

আলথুসারের লেখার ভাষা জটিল এবং বোঝা কিছুটা কঠিন, তবে এটি গভীরভাবে সমাজের কাঠামো এবং ব্যক্তির অবস্থান সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দেয়।

২. সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা:

আলথুসারের তত্ত্ব এখনো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আধুনিক রাষ্ট্রে গণমাধ্যম, শিক্ষা এবং বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে কিভাবে জনগণকে প্রভাবিত করা হয়, তা আলথুসারের আইডিওলজির বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে পরিষ্কার হয়।

৩. সমালোচনা:

  • আলথুসারের তত্ত্বে মানুষের চেতনার স্বাধীনতার ব্যাপারে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে, যা কিছু সমালোচকের মতে অতিরিক্ত নির্ধারণবাদী (deterministic)।
  • তিনি শ্রেণিসংগ্রামের গুরুত্বের কথা বললেও, এতে ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সক্রিয় ভূমিকার বিষয়ে স্পষ্ট আলোচনা নেই।

“রাষ্ট্র ও ভাবাদর্শ” সমাজের গভীর কাঠামো বোঝার একটি চমৎকার তাত্ত্বিক গ্রন্থ। এটি দেখায় কিভাবে রাষ্ট্র শুধুমাত্র শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নয়, বরং ভাবাদর্শের মাধ্যমে তার শাসনক্ষমতা টিকিয়ে রাখে। বইটি পড়ার পর রাষ্ট্র, সমাজ, এবং আমাদের চেতনার নির্মাণ সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।

তবে, এটি বুঝতে সময় ও মনোযোগ প্রয়োজন। যারা সমাজতত্ত্ব, রাষ্ট্রতত্ত্ব, এবং মার্কসবাদী চিন্তার গভীরে যেতে চান, তাদের জন্য এটি একটি অবশ্যপাঠ্য।

রাফায়েল নাদাল: তার ক্যারিয়ার এবং অবসর – শ্রেষ্ঠত্বের অমলিন গল্প

টেনিসের ইতিহাসে কিছু নাম অমর হয়ে থাকে, যাদের খেলা শুধু খেলা নয়, এক বিস্ময়কর যাত্রা—রাফায়েল নাদাল তাদের মধ্যে অন্যতম। এই স্প্যানিশ কিংবদন্তির ক্যারিয়ার কেবল তার সাফল্যের গল্প নয়, বরং প্রতিটি পদক্ষেপে চ্যালেঞ্জের সঙ্গে লড়াই এবং নিজেকে অতিক্রম করার এক প্রেরণাদায়ী কাহিনি। নাদালের অবসর ঘোষণা কেবল একটি যুগের সমাপ্তি নয়, বরং এটি এক গৌরবময় অধ্যায়ের শেষ, যেখানে প্রশ্ন উঠতেই পারে—“কীভাবে একজন খেলোয়াড় শুধুমাত্র ট্রফির সংখ্যা দিয়ে সেরা হিসেবে বিবেচিত হয়?” রজার ফেদেরার ও নোভাক জোকোভিচের মতো কিংবদন্তিদের সঙ্গে তুলনা করে, আমরা কি বলতে পারি যে নাদাল আসলেই শ্রেষ্ঠ? তার ক্যারিয়ার এবং অবসর নিয়ে আলোচনা করতে গেলে, হয়তো সঠিক উত্তর আমরা পাই তাঁর নিজের কথাতেই।

নাদালের যাত্রা: “আমি হার না মানা মানুষ”

রাফায়েল নাদাল কখনোই সহজ পথে হাঁটেননি। তার ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল ২০০৫ সালে, যখন ফরাসি ওপেনে তার প্রথম গ্র্যান্ড স্লাম জয় তাকে দ্রুত বিশ্ব মানচিত্রে পরিচিত করে তোলে। এরপর থেকে একের পর এক সাফল্যের পালক—বিশ্বের টেনিসপ্রেমী মানুষদের কাছে তিনি হয়ে ওঠেন ‘রেড সান’ (লাল সূর্য)। তার শক্তি, দৃঢ়তা এবং প্রতিপক্ষের প্রতি অপ্রতিরোধ্য মনোভাব টেনিস কোর্টে তাকে এনে দিয়েছিল এক অসাধারণ স্থান। ২০০৮ সালে উইম্বলডন ফাইনালে রজার ফেদেরারকে হারিয়ে কিংবদন্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয় তার নাম। তাঁর নিজস্ব অঙ্গীকার ছিলো—“আমি হার না মানা মানুষ। যখন আমি কোর্টে থাকি, আমি জানি, আমাকে সবটুকু দিতে হবে।”

ফরাসি ওপেন তার কাছে ছিলো এক রহস্যময় জায়গা। সেখানে তিনি ১৪ বার চ্যাম্পিয়ন হন, যা একটি অসাধারণ রেকর্ড। এটি প্রমাণ করে যে, তার শক্তি শুধুমাত্র কৌশলে নয়, বরং তার প্রতিরোধ ক্ষমতায় নিহিত। “ফরাসি ওপেনের মাটির কোর্টে রাফা অনন্য,” একবার রজার ফেদেরার বলেছিলেন, “যে কোর্টে অন্যান্য খেলোয়াড়রা ঝরেপড়া মনে করেন, সেখানে সে যেন এক রাজা।”

ফেদেরার ও জোকোভিচের তুলনায় নাদাল: “আমরা তিনজনই আলাদা, কিন্তু একে অপরকে সম্মান করি”

যদিও রজার ফেদেরার এবং নোভাক জোকোভিচ তার প্রতিযোগী, তাদের প্রতি নাদালের শ্রদ্ধা ছিল সীমাহীন। এক সাক্ষাৎকারে ফেদেরার বলেছিলেন, “নাদাল হল এক যোদ্ধা। তার শারীরিক কসরত, তার খেলার প্রতি নিষ্ঠা এবং পরিশ্রম তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।” ফেদেরার আরও বলেন, “তাকে পরাজিত করতে গেলে আপনাকে শুধু তার কৌশলেই নয়, বরং তার মনোবলকে পরাস্ত করতে হবে। তিনি কোনও মুহূর্তে ছাড় দেন না।”

অন্যদিকে, জোকোভিচও নাদালের ব্যাপারে কিছুটা ভিন্ন ভাষায় বলেছিলেন: “নাদাল কোর্টে যেভাবে খেলেন, তাতে তার প্রতি পূর্ণ সম্মান জানানো ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। তার শক্তি এবং জয়ের জন্য তার পিপাসা অসাধারণ।” জোকোভিচের মতে, “আমরা তিনজনই আলাদা, কিন্তু একে অপরকে সম্মান করি।”

তবে, নাদালের ক্যারিয়ারে গ্র্যান্ড স্লামের সংখ্যা জোকোভিচ বা ফেদেরারের থেকে কম হলেও, তার প্রভাব তাতে কমেনি। নাদালের প্রতিটি ম্যাচ ছিলো তার আত্মবিশ্বাস এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির প্রতিফলন। এমনকি যখন অনেকেই ভেবেছিলো, তার শারীরিক অবস্থা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে, তখনও তিনি উজ্জ্বলভাবে ফিরে এসেছেন। ২০১৮ সালে তার ক্যারিয়ার উচ্চতায় পৌঁছানোর সময়, নাদাল বলেছিলেন, “আমার কাছে প্রতিটি দিনই একটি নতুন যুদ্ধ। তবে, আমি জানি, যতদিন আমি মাঠে থাকতে পারব, আমি লড়াই চালিয়ে যাব।”

নাদালের অবসর: “সব কিছুই একদিন শেষ হয়”

২০২৪ সালে যখন রাফায়েল নাদাল অবসর নেওয়ার ঘোষণা দেন, তখন পুরো টেনিস দুনিয়া শোকস্তব্ধ। দীর্ঘ সময় ধরে যে কোর্টগুলো তাকে স্বাগত জানিয়েছিল, সেগুলো এখন শুনশান। তবে, তার ক্যারিয়ার ছিলো শুধুমাত্র জয়-পরাজয়ের গল্প নয়, বরং এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়ের উজ্জ্বল প্রস্থান। তার অবসর নিয়ে জোকোভিচ বলেছিলেন, “রাফার অবসর আমাদের সকলকে গভীরভাবে ভাবতে বাধ্য করবে। আমরা তার মতো একজন প্রতিপক্ষ আর পাবো না।”

ফেদেরারও তার অবসর সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন, “রাফা আমাদের জীবনে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। তার লড়াই, তার আত্মবিশ্বাস, তার কঠোর পরিশ্রম—এগুলি আমাদের সকলের জন্য পাঠ। আমি তার অবসর গ্রহণের সময়, তাঁকে ধন্যবাদ জানাই, কারণ তার খেলা আমাদের এক নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিয়েছে।”

নাদাল: কেন তিনি শ্রেষ্ঠ?

নাদালের শ্রেষ্ঠত্ব শুধুমাত্র ট্রফি বা সাফল্যের পরিসর দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় দিক ছিলো—“কিভাবে সে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছে।” জোকোভিচ এবং ফেদেরারের মতো খেলোয়াড়রা যে তীব্র প্রতিযোগিতায় ছিলেন, নাদাল তার মানসিক দৃঢ়তার জন্য বরাবরই অন্যদের থেকে এক ধাপ এগিয়ে ছিলেন। “কখনও কখনও, শারীরিক শক্তি যতটা গুরুত্বপূর্ণ, মানসিক শক্তি তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ,” নাদাল বলেছিলেন একসময়।

রাফায়েল নাদাল কেবল টেনিসের কিংবদন্তি নয়, তিনি সবার জন্য এক অনুপ্রেরণা। তার ক্যারিয়ার, তার সংগ্রাম, এবং তার অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্স কেবল খেলাধুলার অঙ্গনে নয়, প্রতিটি মানুষের জীবনে সফলতা ও কঠোর পরিশ্রমের একটি আদর্শ হয়ে থাকবে।

নাদালের এই দীর্ঘ, গৌরবময় যাত্রা শেষ হলেও, তার প্রভাব চিরকালীন।