Home Blog Page 22

সেরের উপর সোয়া সের

রাসেলের বাবা এক্স ক্যাডেট। এক প্যারেন্টস ডেতে তিনি আসলেন আমাদের কলেজে।এর আগে কোন প্যারেন্টস ডে তে তিনি আসতে পারেননি। দেশের বাইরে থাকার কারণে সব সময় রাসেলের আম্মুই প্যারেন্টস ডে গুলোতে কলেজে আসতেন ছেলের সাথে সময় কাটাতে। সেবার ছুটিতে দেশে থাকায় রাসেলের বাবা এলেন।রাসেল আগেই আমাকে বলেছিল ওর বাবা এক্স ক্যাডেট। আমাদের অন্য বন্ধুদের অনেকেই এই তথ্যটা জানতো না।একসময় রাসেল অন্য এক আংকেলের সাথে কথা বলছিলেন আর আমি ওর বাবার সাথে গল্প করছিলাম। এমন সময় কোথা থেকে যেন মাহবুব ছুটে আসলো।আমার পাশে রাসেলের বাবাকে দেখে মনে করলো তিনি সম্ভবত আমার বাবা। সে বললো কিরে তোর বাবা নাকি? কথাটা রাসেলের বাবা শুনলো কিনা জানিনা। আমি বললাম না উনি রাসেলের বাবা। আর জানিস উনি এক্স ক্যাডেট।

মাহবুব হাত এগিয়ে দিয়ে সালাম জানিয়ে বললো ভাই শুনলাম আপনি এক্স ক্যাডেট। তা কোন কলেজ ছিল আপনার? তিনি কিছু একটা বলতে গেলেন আমি মাহবুবের হাত ধরে টানতে টানতে দূরে সরিয়ে নিয়ে বললাম গাধা তোর ক্লাসমেট রাসেল ও তোর ভাই আবার তার বাপও তোর ভাই হয় কি করে? মাহবুব বললো তুই আকাশের দিকে তাকিয়েছিস কখনো? আমি বললাম তাকাবো না কেন? প্রতি পুর্নিমাতেইতো আমি হাউসের ছাদে গিয়ে ভরা জোছনায় ভেসে যাই,চাঁদ দেখি,সেটাতো তুইও জানিস। মাহবুব বললো চাঁদকে তুই ছোট বেলা কি ডাকতি? আমি মনে করে বললাম চাঁদকে আমি মামা ডাকতাম। সে বললো তোর আম্মু চাঁদকে কি ডাকে?ভেবে দেখলাম আম্মুও চাঁদকে মামা ডাকে। সে বললো তোর ভাই কিংবা কাকা কিংবা দাদা তারা চাঁদকে কি বলে ডাকে? আমি বললাম গাধা সবাইতো কমন ভাবে চাঁদকে চাঁদমামা বলেই ডাকে।

মাহবুব একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো আমিতো তোকে এটাই বুঝাতে চাইছিলাম যে চাঁদ যেমন কমনলি সবার মামা তেমনি যে কোন এক্স ক্যাডেটই কমনলি অন্য ক্যাডেটদের ভাই।এমনকি সে যদি নিজের বাপও হয় তবে তাকেও ভাই বলা যায়।আমি আর কি বলবো। এতো বড় যুক্তিবাদির সাথেতো যুক্তিতে পারা যাবেনা তাই বললাম ঠিক আছে তোর ছেলে মেয়ে যখন ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হবে তখন তাদেরকে বলবো তোকে এক্স ক্যাডেট হিসেবে ভাই বলে ডাকতে।এটা শুনে মাহবুবের মুখটা চুপসে গেল। বললো কিসের মধ্যে কি টেনে আনছিস। আমি আর কোন কথা না বাড়িয়ে রাসেলের বাবার দিকে হাটতে লাগলাম। ততোক্ষণে রাসেল চলে এসেছে। এবার রাসেল মাহবুবের সাথে তার বাবাকে পরিচয় করিয়ে দিলো এবং বললো আমার বাবা কিন্তু এক্স ক্যাডেট। আমি ভেবেছিলাম মাহবুব না আবার ভাই বলে ডাকে। এবার দেখি সে সালাম দিয়ে বললো তা আংকেল আপনি কোন কলেজে ছিলেন? আমার খুব হাসি পাচ্ছিল।

রাতে ঘুমানোর আগে রাসেলকে ঘটনাটা বলতেই সে মাহবুবের উপর চড়াও হলো। বললো শালা তুই আজকে থেকে আমার কাকা।আমার বাপ তোর কোন জন্মের ভাই সেটা দেখিয়ে দেব।পরীক্ষার আগে ফিজিক্স আর ম্যাথে এক কানাকড়িও দেখাবো না।এই শুনে মাহবুবের মুখের যে অবস্থা হলো তা দেখার মত। মাহবুব ওই দুটো বিষয়ে খুবই দুবর্ল ছিল এবং বরাবরই রাসেলের কাছে হেল্প নিত। এবার সে বিছানা ছেড়ে উঠে বললো দোস্ত মাফ চাইছি। তোর বাপ কোন জন্মেও আমার ভাই ছিলনা। দরকার হলে আজ থেকে তোর বাপ আমারও বাপ তার পরও তুই তোর সিদ্ধান্ত ফিরিয়ে নে।আমার সবর্নাশ করিস না।ওর এহেন অবস্থা দেখে আমি হেসে উঠলাম আর রাসেল বললো ভাতিজা তাহলে বুঝেছ সেরের উপরেও সোয়া সের আছে।

জাজাফী

১২ মার্চ ২০১৭

নামে কি আসে যায়,কর্মই নামকে বড় করে

ধরুন শখ করে আমার ছেলেটির নাম রাখা হল আইনস্টাইন কিংবা মুশফিকুর রহিম! তাই বলে আমার ছেলেটাও ওই নাম পেয়ে তর তর করে বেড়ে উঠবে আর হয়ে যাবে আইনস্টাইন কিংবা মুশফিকুর রহিম এটা ভাবার কোন কারণ নেই। তবে হ্যা তার যদি চেষ্টা থাকে এবং ভাগ্য থাকে তবে সে হয়তো তার নামটাকে বড় করতে পারবে,মানুষের মনে স্থান করে নিতে পারবে।

অতীতে এবং বর্তমানে একই নাম নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন প্রজন্মে জন্ম নিয়ে কিংবা একই প্রজন্মে জন্মনিয়ে কেউ কেউ একে অন্যকে খ্যাতির দিক থেকে পেরিয়ে গেছে। কখনো কখনো বা তাদের একজনকে অন্যজনের সাথে তুলনা করা বোকামী বলে মনে হবে কারণ এক একজনের ক্ষেত্র এক এক রকম। কিন্তু জগতে কাউকে না কাউকেতো বড় করে দেখতেই হয়।

একদিন যেমন শাহীদ আফ্রিদির রেকর্ডকে মনে হত কেউ ভাংগেই পারবেনা কিন্তু সেটাও ভুল প্রমান করে দিয়ে আরো অনেকেই সেই রেকর্ড ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়েছে। ঠিক একই ভাবে কারো কারো খ্যাতিকে ছাড়িয়ে গেছে তারই নামে নামধারি অন্য কেউ।

বাংলাদেশে এমন অন্তত বেশ কয়েকটি নাম আছে যে নাম নিয়ে একই সাথে বেশ কয়েকজন খ্যাতির শীর্ষে আরহোন করেছেন।

প্রথমে আসি হুমায়ুন নামটা নিয়ে। না তাই বলে আমি ইতিহাসের পাতা থেকে সম্রাট হুমায়ুনকে আমার এই ক্ষুদ্র লেখাতে টেনে আনতে চাইছিনা। তিনি বরং ইতিহাসের পাতাতে বসেই আমাদের দিকে তাকিয়ে দেখুন যে তাকে রেখেও আমরা অন্য হুমায়ুনদের নিয়ে আলোচনা করতে পারি।

বাংলার আকাশে সম্রাট হুমায়ুন নয় আরো কয়েকজন হুমায়ুন চিরস্থায়ী আসন করে নিয়েছিলেন তারা হলেন ১। হুমায়ুন আহমেদ ২। হুমায়ুন ফরিদী ৩। হুমায়ুন আজাদ ৪। হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী।

সিরিয়াল অনুযায়ি হুমায়ুন আহমেদকে এক নাম্বার স্থান দিয়েছি এটা একান্তই আমার মতামত। চাইলে আপনি তাকে দুই নাম্বার বা চার নাম্বারেও নিয়ে যেতে পারেন। কারণ জানেনতো আকাশে চাদ একটাই। সেই চাদকেই হুমায়ুন আহমেদ দেখলেন অসম্ভব সুন্দর রুপে আবার সুকান্ত দেখলেন ঝলসানো রুটি রুপে আবার প্রেমিক তার প্রেমিকাকে চাদের সাথে তুলনা করতে চায়না কারণ চাদের কলঙ্ক আছে।

তাই প্রত্যেকেরই নিজের চিন্তাকে প্রকাশ করার স্বাধীনতা আছে।

আমি হুমায়ুন আহমেদকে এক নাম্বারে রেখেছি কারণ তিনি কেবল মাত্র একজন সাহিত্যিক ছিলেন না। তিনি প্রথমে বিজ্ঞানে পিএইচডি ধারি ছাত্র তার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সেখান থেকে সাহিত্যিক,নাট্যকার,এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা রুপে আবির্ভূত হলেন। বাকিদের মধ্যে এক সাথে এতো গুলো প্রতিভা আমি দেখিনি। ও হ্যা তিনি অসাধারণ ম্যাজিক পারতেন এবং আমাদের প্রিয় জুয়েল আইচকে আমি নিজে বলতে শুনেছি “হুমায়ুন আহমেদ পামিং এ আমার থেকেও ভাল এবং বাংলাদেশে এক নাম্বার!}–(জুয়েল আইচ)।

পামিং হচ্ছে কয়েন হাতে নিয়ে পুর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই দেখানো যায় এমন এক ম্যাজিক যা দিয়ে চোখের নিমিষে কয়েন অদৃশ্য করে ফেলা হয়।
হুমায়ুন আহমেদের ম্যাজিক মুনশি এবং কালো যাদুকর বই দুটিতে ম্যাজিকের অনেক কিছু বলা হয়েছে আর হ্যা তিনি আর্ন্তজাতিক ম্যাজিশিয়ান সোসাইটির সদস্য ছিলেন।
একই সাথে তিনি বেশ ভাল ছবিও আকতেন। এই হুমায়ুন আহমেদকে তাই এক নাম্বার হুমায়ুন বলেই চিনতে চেয়েছি।
* হুমায়ুন ফরিদী একজন কোন মানের অভিনেতা ছিলেন সেটা আমি না লিখলেও অন্যরা নিশ্চই সেটা জানেন। তার অভিনয় শৈলি তার ব্যক্তিত্ব এবং তার আবৃত্তি নিয়ে কারো কোন দ্বিমত আমি কখনোই দেখিনি। ব্যক্তি হুমায়ুন ফরিদিও ছিলেন অসম্ভব সদালাপি।

* হুমায়ুন আজাদকে অনেকেই পছন্দ করেন না। আবার অনেকে শুদ্ধপুরুষ রুপে তাকে দেখেন।
আমি হুমায়ুন আজাদকে দুই তিনটা বই দিয়েই বিবেচনা করতে চাই। “আব্বুকে মনে পড়ে” বইটা পড়ে দেখুন। আমার মনে হয় আপনি না খেয়ে মরে গেলেও কোন দিন বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসার কথা চিন্তাও করতে পারবেন না। এবং যারা বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে এসেছেন তাদেরকে ওই বইটা জোর করে পড়িয়ে দিন। দেখবেন কাদতে কাদতে গিয়ে সেই দিনই বাবাকে বৃদ্ধাশ্রম থেকে বাসায় নিয়ে আসবে। তার স্ত্রী পুত্র যদি সেটা পছন্দ না করেন তবে হয়তো তাদেরকে এক হাত দেখে নিতেও দ্বিধা করবেনা। আর হ্যা “লাল নীল দিপাবলী” পড়ুন। বাংলা সাহিত্যের জন্মকথা এমন ভাবে লিখেছেন যে আপনি মুগ্ধ না হয়ে যাবেন না। অথচ আপনি কেবল পড়ে আছেন তার “পাক সার জমিন সাদ বাদ” নিয়ে।

* হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী জাতীয় সংসদের স্পিকার ছিলেন। ব্যক্তি জীবনে তিনিও সফল একজন মানুষ।

এই চার হুমায়ুন বাংলার আকাশে উজ্জল করে রেখে গেছেন তাদের নাম।

বর্তমানে আর একটি নাম অত্যন্ত জনপ্রিয় সেটি আনিসুল হক। হুমায়ুন নামধারীদের নামের শেষ অংশ মিল ছিলনা কিন্তু আনিসুল হক নামে যে তিনজন আছেন তাদের নামের কোথাও কোন বেমিল নেই।

১। আনিসুল হক (সাহিত্যিক)। (Anisul Hoque) । আজ যাকে আমরা সাহিত্যিক হিসেবে দেখছি তিনিও হুমায়ুন আহমেদের মতই অনেক গুলো প্রতিভার অধিকারী। বুয়েট থেকে পাশ করা এই অসাধারণ মানুষটি ইঞ্জিনিয়ারতো বটেই তার সাথে সাংবাদিক,সাহিত্যিক,নাট্যকার এবং বেশ ভাল মানের আর্টিস্টও বটে।
মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বদেশ প্রেম নিয়ে লেখা তার রচনা গুলো আমাদেরকে দেশ প্রেম শেখায় নিয়ে যায় উত্তাল সেই দিনগুলোতে। মনের মধ্যে বীরত্ব জন্ম দেয়।
প্রেমের উপন্যাস গুলোতে আমাদের জীবনের চতুর্থপর্বে এসেও প্রেম জাগায়,মনে হয় যেন এই বৃদ্ধ বয়সেও আমি এক তরুন কলেজ স্টুডেন্ট।

নিছক ছোটদের আনন্দ দেয়ার জন্য তিনি যখন গুড্ডু বুড়োকে নিয়ে নানা কান্ড ঘটাতে লাগলেন আমরা অবাক হয়ে দেখলাম সেটা কেবল ছোটরাই নয় সেই সাথে বড়রাও গো গ্রাসে গিলছে।

তার লেখা গদ্য কার্টুন কার না ভাল লাগে।

আচ্ছা ধরুন সব কিছু বাদ। এই আনিসুল হক বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের যে মানের ভক্ত তার বিনিময়ে তার স্থান আমার দৃষ্টিতে এক নাম্বার হবে এটাইতো স্বাভাবিক। তিনি বাংলাদেশকে এবং বাংলাদেশ দলকে যেভাবে সাপোর্ট করেন তার মুগ্ধকর।

২। আনিসুল হক (মেয়র)। এই আনিসুল হক সাহিত্যিক আনিসুল হকের থেকে বয়সে প্রবীন।তিনি আগে লাইম লাইটে ছিলেন না। ব্যক্তিগত ভাবে আমি তাকে চিনতাম এবং তার সাথে কয়েকবার আমার দেখাও হয়েছে। তখন তাকে আমার ঠিক সেরকম লাগেনি। বরং তিনি যখন মেয়র পদে দাড়ালেন আমার মনে হলো এই লোকটা নির্বাচিত হলে কিছুই করবেন না।

আহ আমার ধারণা ভুল প্রমান করে দিয়ে তিনি নির্বাচিত হওয়ার সামান্য এ কয়দিনের ব্যবধানে যা করেছেন আমার ক্ষুদ্র জ্ঞান বলে যে প্রয়াত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ থেকে সাদেক হোসেন খোকাও তা করেন নি। হ্যা আমি দেখেছি একই সাথে এলাকার সব রাস্তা খুড়ে কাজ শুরু করেছেন। ভোগান্তি হচ্ছে কিন্তু তিনি কোন কাজ ফেলে রাখেন নি। তর তর করে এগিয়ে যাচ্ছে। নির্বাচিত হওয়ার পর তার সাথে দেখা হলো। আমার মত সাধারণ মানুষকে হতবাক করে দিয়ে তিনি হাসিমুখে কথা বললেন। এবং আমার মনে হলো নির্বাচিত হওয়ার আগে তিনি যতটা বন্ধুভাবাপন্ন ছিলেন নির্বাচিত হওয়ার পর তা বেড়ে গিয়েছে কয়েক গুন। এবং দেখবেন অবধারিত ভাবেই তিনি আপনার মনেও জায়গা দখল করে নেবে। যদিনা আপনি ঘোর বিরোধী না হন।

৩। আনিসুল হক (আইন মন্ত্রী)। তিন আনিসুল হকের মধ্যে শেষ জন হলেন বয়সে সব থেকে প্রবীন আইন মন্ত্রী আনিসুল হক। তিনি আইনমন্ত্রী হওয়ার পর অনেক কিছু হয়েছে। অনেকের চোখ ভিজে উঠেছে আনন্দ অশ্রুতে এবং কারো কারো হয়তো বেদনায়।

তাই দেখা যাচ্ছে বাংলার আকাশে হুমায়ুন আর আনিসুল হক নাম দুটোতে একাধিক ব্যক্তি খ্যাতিমান হয়েছেন মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছেন।

তাহলে আসুন আমি আপনি আমাদের সন্তানদের নামও ওরকম কারো সাথে মিলিয়ে রাখলে সন্তান তার মত হবে এই ধারনা থেকে বেরিয়ে আসি এবং তাদের মেধা বিকাশে আন্তরিক সহযোগিতা দেখাই। হয়তো সহযোগিতা পেলে সেই ছেলেটিই একদিন নাম কামাবে।
কুসুম কুমারী দাশের সেই কবিতার মত
“আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে?
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।”

হ্যা হুমায়ুন আর আনিসুল হক নামধারী মানুষ গুলো শুধু কথায় নয় কাজে বড় হয়েছেন। তাদের জন্য স্যালুট।
………………………..
#জাজাফী
১১ মার্চ ২০১৬
উত্তরা,ঢাকা-১২৩০

ক্যাডেট মাহবুব ও চাটনির গল্প

ক্লাস সেভেনের মাহবুবকে বললাম যাতো নাজিরকে ডেকে নিয়ে আয়।ওরে দুটো চটকানি দেই।আমি বলার সাথে সাথে জো হুকুম জাহাপনা টাইপের একটা বাউ করে ছুট দিলো মাহবুব।আমার হাউসের জুনিয়র মোষ্ট ক্যাডেট সে।আর নাজিরও আমার হাউজের।ছোট খাট একটা অপরাধ করেছে তাই ডেকে এনে চটকানি দেব বলে ভাবছি।মানুষ যেমন কোন কাজ না থাকলে হুদাই বিড়ি সিগারেটে টান দিয়ে ধোয়া ছাড়ে আমিও তেমনি কোন কাজ কাম না থাকলে কোন জুনিয়রকে ডেকে এনে শালটিং দেই।

নজরুল হাউসে নিজের রুমে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে অপেক্ষা করছি নাজিরের আসার জন্য।সাথে মাহবুব ফিরে আসলে ওকে রুমে চলে যেতে বলে তার পর চটকানি দেব।আমার আবার একটু মায়া বেশি।মাহবুবের সামনে তার ক্লাসমেট কাম রুমমেট নাজিরকে চটকানি দেওয়া ঠিক হবেনা।অতোটা লজ্জা দিতে চাইনা আমি। কিছুক্ষণের মধ্যেই মাহবুব ফিরে আসলো সাথে আসলো নাজির।আমি হাতের ইশারায় মাহবুবকে চলে যেতে বললেও সে গেলো না।আমি ওর সাহস দেখে চমকে উঠলাম।পুরো হাউস যেখানে থরথর করে কাপে সেখানে পুচকে মাহবুব দাড়িয়েই আছে।আমি বললাম কিরে যাচ্ছিসনা কেন?সে বললো ভাই শুধু নাজিরকে দিবেন আমারে দিবেন না? আমি এতো কষ্ট করে ওকে ডেকে আনলাম আর শুধু ওকেই দিবেন।

আমি ওর কথা শুনে পুরো থ হয়ে গেলাম।বলে কি এই ছেলে?আমি রাগ দমিয়ে রেখে বললাম ঠিক আছে তুইও থাক তোরেও দেব।এতোই যেহেতু শখ তোর তাহলে দেবনা কেন?আমারতো কিনতে হচ্ছেনা যে দিতে অসুবিধা।শুধু তুই কেন তোর ব্যাচের সবগুলোকে দিতেও আমার অসুবিধা নেই।এবার আমি নাজিরকে কাছে ডাকলাম।নাজির হাসি মুখে কাছে এসে দাড়িয়ে বললো ভাই চাটনি দিবেন শুনলাম।তা হঠাৎ কি মনে করে চাটনি দিবেন। নাজিরের কথা শুনে আমি আরো অবাক হলাম।গাধাটাকে নাকি আমি চাটনি খাওয়াবো বলে ডেকেছি। আমি বললাম তোকে চাটনি দেব কে বলেছে? নাজির বললো ভাই মাহবুবতো আমাকে বললো ভাই তোরে ডাকছে চাটনি দেবে বলে।

আমি সাথে সাথে বুঝলাম গাধাটা কানে কম শোনে বলে আমি চটকানি বলেছি সেটাকে সে চাটনি শুনেছে। আমি বললাম আমি তোকে চাটনি খাওয়ানোর জন্য ডাকিনি,তোকে চটকানি খাওয়ার জন্য ডেকেছি। এটা বলেই ধমক দিয়ে বিশবার কান ধরে উঠবস করাতে শুরু করে দিলাম।এটা দেখে কানে কম শোনা মাহবুব থতমত খেয়ে গেল।সে একটু একটু করে দরজার দিকে সরছিল।আমি হাক দিলাম এই তুই এদিকে আয়।তুই না একটু আগে বললি কষ্ট করে নাজিরকে ডেকে এনেছিস শুধু ওকে দেব কেন তোকেও দেওয়া লাগবে। আয় তোকেও দিচ্ছি। নে তোকে একটু বেশি দিচ্ছি।তুই পঞ্চাশবার পুশ আপ দে।

হাকিম নড়ে তো হুকুম নড়েনা।সাথে সাথে চাটনি খাওয়ার মজা টের পেতে শুরু করলো মাহবুব।কানে কম শোনার পুরস্কার হিসেবে যা সে ফ্রিতে পেলো তার কোন তুলনাই হয়না।ওকে দেখে নিশ্চই নাজিরের মনটা আনন্দে ভরে গেল।ডেকে এনে যে শুধু ওকেই শাস্তি খাইয়েছে তাতো নয় বরং গায়ে পড়ে নিজেই ফেসে গেছে মাহবুব। শাস্তি শেষ হলে দুজন বেরিয়ে গেল।আমি কান পেতে শুনলাম করিডোর দিয়ে হাটার সময় নাজির বলছে কিরে চাটনি কেমন লাগলো।তুইতো আমার সত্যিকারের দোস্ত যে কিনা বন্ধুকে ছেড়ে একা একা চাটনি খেতে রাজি নয়।মনে মনে হাসি দিলাম।একটু পরেই আবার ইভিনিং প্রেপ।আজকের কোটা পুর্ন করে ফেললাম।প্রেপটাইমে ভাবতে হবে কালকে কাকে কি অছিলায় চটকানি দেওয়া যায়।

৪ মার্চ ২০১৭

শিয়ালদহর পথে

শিয়ালদহ ইস্টিশানে নেমেছি।চারদিকে এতো মানুষের ভীড় আমি জীবনেও দেখিনি।আমার কাছে ভীড় মানেই গুলিস্থান,শাখারি বাজার নয়তো বড়জোর ফার্মগেট।কিন্তু শিয়ালদহ ইস্টিশানের ভিড় দেখে মনে হলো বাংলাদেশের ওই সব ভীড় এর কাছে নগন্য।আমার অবস্থা তখন আসিফের সেই কুয়োর ব্যাঙের মত।আচ্ছা কুয়োর ব্যাঙের ঘটনাটা আরেকবার বলে রাখা ভাল।কারণ সবাইতো আর কুয়োর ব্যাঙের গল্পটা জানেনা।যারা জানে তাদের কথা আলাদা কিন্তু যারা জানেনা তারা অন্তত নতুন করে জেনে নিতে পারবে।

আমার মামাতো ভাই আসিফের একটা বড় গুন ছিল আর তা হলো সে মানুষ ছাড়াও অন্যান্য প্রাণীর সাথে কথা বলতে পারতো। এই কুয়োর ব্যাঙের বিষয়টাও ওর মূখ থেকেই শোনা।ওদের একটা কুয়ো ছিল যেটাকে অনেকে ইদারা বলে।সেই কুয়োয় ছিল একটা ব্যাঙ।যে মনে করতো ওই কুয়োটাই হলো পৃথিবীর সব থেকে বড় জলাশয়।কিন্তু কালক্রমে প্রচুর বৃষ্টি হলো আর কুয়োটা ভরে ব্যাঙটা ভাসতে ভাসতে ওদের পুকুরে গিয়ে পড়লো। তখন সে নিজেই নিজেকে বললো আমি এতোদিন ভুল ভেবেছি।ওই কুয়োটা পৃথিবীর সব থেকে বড় জলাশয় নয়। সব থেকে বড় জলাশয় হলো এটা।ওই পুকুরে গোসল করার সময় আসিফের সাথে কথা হয়েছিল ব্যাঙটার।আসিফ ওকে বলেছিল তুমি চাইলে এর চেয়েও বড় জলাশয়ে তোমাকে নিয়ে যেতে পারি।ব্যাঙটা রাজি হলে একদিন আসিফ ব্যাঙটাকে নবগঙ্গা নদীতে নিয়ে ছেড়ে দিল।তখন ব্যাঙটা আসিফকে বললো আমি এতোদিন ভুল ভেবেছিল। আসলে পৃথিবীর সব থেকে বড় জলাশয় হলো এই নদীটা। বলেই সে ডুব দিল আর ফিরলো না। আসিফও বাড়িতে ফিরে গেল।ওই ব্যাঙটা জানতেও পারলো না যে এর পর আছে সাগর তার পর আছে মহাসাগর।

ওই ব্যাঙের মতই আমিও ভাবতাম ফার্মগেট কিংবা গুলিস্থানের ভীড়ই পৃথিবীর সব থেকে বেশি।কিন্তু শিয়ালদহ ইষ্টিশানে নেমে আমার ধারনা ভুল প্রমানিত হলো।আমি যেহেতু ব্যাঙ নই (কেউ কেউ ভাবতে পারেন তুমি ব্যাঙ নওতো হাতি ঘোড়া?) তাই তার মত আর ভুল করতে চাইনা। আমি বিশ্বাস করি এই শিয়ালদহর চেয়েও ভীড় ওয়ালা যায়গা হয়তো আছে যা আমার জানা নেই। যাই হোক আসল কথায় আসি। শিয়ালদহ ইষ্টিশানে নেমেছি কারণ ওখান থেকে পনের কিলোমিটার উত্তরে নাগপুরে অসীম পোদ্দারের বাড়ি।আমার বন্ধু সে।স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বাংলাদেশ ছেড়ে ইন্ডিয়াতে চলে এসেছিল এবং এখানেই স্থায়ী হয়েছে। আমরা একই স্কুলে পড়তাম এবং স্বাধীনতার সময়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও পরে আবার যোগাযোগ হয়েছে। সে আমার খুব ভাল বন্ধু।তার মেয়ে বিমলার বিয়ের জন্যই আমার এবার ইন্ডিয়াতে আসা।সে তো আর যে সে বন্ধু না যে তার মেয়ের বিয়েতে না গেলেও চলবে। সে আমার বাল্য বন্ধু।তাই না যেয়ে উপায় ছিলনা।তাছাড়া বিমলাও ফোন করে বললো আমি যদি না যাই তবে সে নাকি আর কোন দিন আমাকে বাবাই বলে ডাকবেনা।

আজীবন অকৃতদার আমি।পরিবার বলে কিছু নেই আমার।অসীমের মেয়েটা ছোটবেলা থেকেই আমাকে বাবাই বলে ডাকতো।যদিও ওর সাথে আমার কোন দিন দেখা হয়নি।এতো করে যখন মেয়েটা বলছে তাই না এসে থাকতে পারিনি।

শিয়ালদহ ইস্টিশানে নামতেই এক ভিক্ষুক এসে ভিক্ষা চাইলো।আমি পকেট থেকে একটা দশ রুপির নোট তার হাতে দিলাম।সে নোটটা হাতে নিয়ে বললো আমার কাছে ভাংতি নেই।ভাংতি দেন।আমি বললাম ভাংতি লাগবে কেন? আমি তোমাকে পুরো দশ রুপিই দিয়েছি।সে এবার নোটটা ভাল করে উল্টেপাল্টে দেখলো।তার পর বললো এটা কি আসল নোট নাকি নকল?আমি বললাম এটা অবশ্যই আসল নোট।এটা নকল হতে যাবে কেন?সে তখন বললো না কেউতো কখনো এক রুপির বেশি দিতেই চায়না সেখানে আপনি দশরুপি দিচ্ছেন তাই।ছেলেটার বয়স ১২ বা তার একটু কম হবে।ওকে কি করে বলি আমাদের দেশে ফার্মগেটের ওভারব্রিজের উপরে বসে যারা ভিক্ষা করে তাদেরকে কেউ কেউ কখনো কখনো পাঁচশো টাকাও দিয়ে থাকে এবং সেই সব ভিক্ষুকেরা মোটেও তাতে অবাক হয়না।ছেলেটা দশরুপির নোটটা হাতে নিয়ে দেখতে দেখতে চলে গেল।আমার মনে হলো সে জীবনে এর থেকে বেশি খুশি কোন দিন হয়নি।

আমার সাথে এসেছে আমাদের আরেক বন্ধু অজিত গাঙ্গুলি।ওকে একপাশে বসিয়ে রেখে আমি দোকানে গেলাম।অজিত একটা দুর্ঘটনায় পা হারিয়ে ফেলায় হাটতে পারেনা।হুইল চেয়ারই ওর একমাত্র ভরসা।কিন্তু দোকানে যাওয়ার সময় ওকে আর সাথে নিলাম না।দোকানে গেলাম সিগারেট কিনবো বলে।আমার সিগারেটের অভ্যাস নেই।আমি গেলাম অজিতের জন্য সিগারেট কিনতে।ওর আবার সিগারেট ছাড়া চলেই না।যেন সিগারেট নয় ওটা অক্সিজেন তৈরির মেশিন।

দোকানটা সাদামাটা,চারপাশে বেশ কজন লোক বসে আছে। কেউ চা খাচ্ছে কেউ সিগারেট খাচ্ছে।দোকানের টিভিতে তখন আইপিএল খেলা চলছে।কোন কোন দল খেলছে তা দেখার সময় ছিলনা আমার। আমি দোকানদারকে বললাম দাদা ব্যানসন লাইট দিনতো।তিনি আমাকে একটা সিগারেট এগিয়ে দিলেন।আমি বললাম পুরো এক প্যাকেট দিন।তিনি মনে হয় আমার কথা শুনতেই পেলেন না।থ মেরে থাকলেন।তার হাতে তখনো সেই একটা সিগারেট ধরা।আমি আবার বললাম দাদা পুরো এক প্যাকেট দিন।আমার কথা শুনে আসেপাশে যারা বসে ছিল তারাও আমার মূখের দিকে তাকিয়ে থাকলো।যেন আমি কোন দেখার বস্তু যাকে খুটিয়ে খুটিয়ে মুগ্ধ হয়ে দেখতে হবে। আমি বিষয়টা বুঝতে পারিনি।তৃতীয়বার বলার পর দোকানদার এক প্যাকেট সিগারেট দিলে আমি দাম মিটালাম।দোকানদার বললেন দাদা আপনিকি বাংলাদেশ থেকে আসছেন? আমি বললাম জ্বি! কিন্তু কেন বলুনতো?

তিনি বললেন কারণ বাংলাদেশীরা টাকাকে টাকাই মনে করেনা।কথাটার মানে বুঝতে না পেরে বললাম এ কথা বলছেন কেন?দোকানদার তখন বললেন আমাদের এখানে কেউ একটা সিগারেটই কেনেনা সেখানে আপনি এক প্যাকেট কিনছেন।বাংলাদেশীরাই শুধু এরকম করে।আমাদের এখানেতো একটা সিগারেট কিনে দুজন কি তিনজন ভাগাভাগি করে খায়।তার কথা শুনে ভীষণ রকম অবাক হলাম।আমাদের দেশেতো অনেকের দিনে দেড় থেকে দুই প্যাকেট সিগারেট লাগে! আমি আর কথা না বাড়িয়ে অজিতের কাছে ফিরে গিয়ে ঘটনাটা বলতেই সে হেসে উঠলো। তার পর বললো চল সামনে গেলে আরো অনেক কিছু জানতে পারবি।

প্রথম বার ইন্ডিয়াতে এসেছি এবং যাচ্ছি বাল্য বন্ধু অসীমের একমাত্র মেয়ের বিয়েতে যেকিনা আমাকে কথা বলা শেখার পর থেকে বাবাই বলে ডাকে।সেই বাড়িতে নিশ্চই খালি হাতে যাওয়া যায়না।একটা বড় সড় মিষ্টির দোকান দেখে অজিতকে বাইরে রেখেই ঢুকে পড়লাম।দোকানীকে বললাম পাঁচ কেজি চমচম দিন।আমি আগেই একটা ধারণা পেয়েছিলাম তাই আশা করেছিলাম এই দোকানীও নিশ্চই চমকাবেন।এবং আমার অনুমান সত্যি করে দিয়ে তিনিও একই প্রশ্ন করলেন আমি বাংলাদেশী কিনা।আমারও একই উত্তর।তবে তিনি আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে দিয়ে বললেন দাদা পাঁচ কেজি মিষ্টি যে কিনবেন তা এতো মিষ্টি নিয়ে যাবেন কিভাবে? কোন ভাড়া করা গাড়ি আছে সাথে?

আমি অবাক হয়ে বললাম পাঁচ কেজি মিষ্টি নিতে ভাড়া করা গাড়ি লাগবে কেন?ইন্ডিয়াতেকি এক কেজি সমান অন্য দেশের এক মনের সমান নাকি?আমরাতো আত্মীয় বাড়িতে চার পাঁচ কেজি মিষ্টি হাতে করেই নিয়ে যাই।আমি কথাগুলো নিজেই নিজেকে বললাম। তার পর দোকানদারকে বললাম দাদা আপনি প্যাকেট করেন। কিভাবে নিয়ে যাবো সেটা আমি বুঝবো। আমার কথা মত দোকানী প্যাকেট করতে শুরু করলেন আর আমি কাউন্টারে দাম মিটিয়ে বাইরে অজিতের পাশে এসে দাড়ালাম।এই ঘটনাটাও অজিতকে বললাম।সে আগের চেয়েও বেশি হাসলো।তার পর বললো তোর পাঁচ কেজি মিষ্টি নিয়ে যাওয়ার জন্য সত্যি সত্যিই কিন্তু গাড়ি ভাড়া করতে হবে।অজিতের কাঁধে একটু আলতো ধাক্কা দিয়ে বললাম ইয়ারকি করবিনা।বেশি তেড়িবেড়ি করলে এখানে বসেই পাঁচকেজি মিষ্টি পেটের মধ্যে চালান করে দেব।তার পর বডি সহ সেই পেটটাকে টেনে নিয়ে যাবো অসীমের বাড়িতে।যদি কোন সিস্টেম থাকে তাহলে ওখানে গিয়ে একটা একটা করে মিষ্টি পেট থেকে বের করবো।

অজিত আমার কথাকে স্বাভাবিক ভাবে নিয়েই বললো দোস্তু সত্যি সত্যিই আমি ইয়ারকি করছিনা।দোকানদার মিষ্টি প্যাকেট করার পর বুঝবি আসল কাহিনী।আমি কিছুই বুঝে উঠতে পারলাম না।এরই মধ্যে দোকানদার ডাকলো দাদা গাড়ি ঠিক করছেন? আপনার মিষ্টি কিন্তু রেডি।দোকানদারকি আমার সাথে মশকরা করছে নাকি বুঝলাম না।আবার অজিতও একই রকম কথা বলছে।বিষয়টা কি সেটা বুঝে ওঠার জন্য দোকানের ভিতরে গিয়ে আমার চোখ কপালে।মোট ২৫ প্যাকেট হয়েছে সেই মিষ্টি।মানে প্রতি কেজির জন্য ৫টা প্যাকেট।আমি বললাম কি করেছেন এটা।এতো প্যাকেট কেন?পাঁচ কেজি মিষ্টি নিতেতো দুটো প্যাকেটই যথেষ্ট।দোকানদার তখন বললেন আমাদের এখানে ওভাবে কেউ মিষ্টি কেনেনা।এখানকার প্যাকেটে একসারি মিষ্টি ধরে আর তার ওজন হয় ২০০ গ্রাম।

২৫ প্যাকেট মিষ্টি একসাথে করলে সেটার জন্য আসলেই একটা গাড়ি দরকার।সেই প্রথম একটা প্রবাদের সত্যতা পেলাম। খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি কিংবা ঘোড়ার চেয়ে চাবুকের দাম বেশি।পাঁচকেজি মিষ্টি বয়ে নেওয়ার জন্য এখন আমাকে ১২০ রুপি দিয়ে একটা গাড়ি ভাড়া করতে হচ্ছে এর চেয়ে আজগুবি ব্যাপার আর কি থাকতে পারে।শেষে বাধ্য হয়েই আমি একটা গাড়ি ঠিক করলাম।মিষ্টি দেখে গাড়িওয়ালাও জানতে চাইলেন।না তিনি কিন্তু অন্যদের মত জানতে চান নি যে আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি কিনা।তাহলে তিনি কি জানতে চাইলেন? তিনি বললেন দাদা কারো শ্রাদ্ধ নাকি যে এতো মিষ্টি কিনেছেন।

আমি তাকে কি করে বলি ওরে পুটিমাছের প্রানের দেশের লোক আমাদের দেশে পিএসসির মত একটা পরীক্ষাতে কারো ছেলে মেয়ে বি গ্রেড পেয়ে পাশ করলেও অন্তত সাত আট কেজি মিষ্টি কেনে আর তোরা মাত্র পাঁচ কেজি মিষ্টি দেখেই খেই হারিয়ে ফেলেছিস।আর যদি আমাদের এসএসসিতে এ প্লাস পাওয়ার সময় ঢাকাতে থাকতি তবেতো হার্টফেল করেই মরতি। আমি আর কথা না বাড়িয়ে তার সাথে মিলে মিষ্টির প্যাকেটগুলো গাড়িতে তুললাম। তার পর একপাশে অজিতকে বসিয়ে সামনের সিটে আমি বসলাম ড্রাইভারের পাশে।গাড়ি চলছে।এর আগে ইষ্টিশানে নেমে একটা এয়ারটেল সিম কিনেছি।ইন্ডিয়াতে তুলনামূলক ভাবে এয়ারটেলই ভাল সার্ভিস দেয়।বাংলাদেশে কিন্তু এই কোম্পানীর সার্ভিস সব থেকে নিম্নমানের।

ফোন করে অসীমকে জানালাম যে আমরা আর ঘন্টাখানেকের মধ্যেই চলে আসবো।সে বললো ঠিক আছে সাবধানে চলে আয়।আমি বাড়ির সামনে দাড়িয়ে থাকবো তোদের জন্য।আমরা সময়মত পৌছে দেখি সত্যি সত্যিই অসীম দাড়িয়ে আছে।অসীমের গা ঘেষে এক আঠারো বছরের সুকন্যা দাড়ানো।আমার বুঝতে বাকি নেই যে ওটাই অসীমের কন্যা।ফেসবুকে ওর অনেক ছবি দেখেছি তাই না চেনার কোন কারণ নেই।সেও যে আমাকে চেনে সেটা বলাই বাহুল্য কারণ আমার ছবিও সে দেখেছে।আর প্রতি সপ্তাহেতো কথা হতোই।আমাকে দেখে দৌড়ে এসে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বাবাই বাবাই বলে ডাকতে লাগলো।অসীমের অনেক সৌভাগ্য যে ওর মত একটা লক্ষ্মী মেয়ে ওর ঘরে জন্ম নিয়েছে।

গাড়ি থেকে মিষ্টির প্যাকেট নামানোর সময় বিয়ে বাড়িতে যত লোক এসেছিল সবাই এসে জড় হলো।যেন আমি সাথে করে মিষ্টি নিয়ে আসিনি বরং তাজমহলটাই তুলে নিয়ে এসেছি।ইর্ন্ডিয়ার মানুষের এতটুকুতেই বিস্মিত হওয়া দেখে আমি নিজেই অবাক হয়েছি।অসীম কিংবা ওর মেয়েটা কিন্তু বিস্মিত হয়নি।অসীমতো বাংলাদেশীই। সে জানে আমাদের মন কত বড়।আর অসীমের রক্ত বয়ে বেড়ানো মেয়েটিও হয়তো সেই সংস্কৃতি নিয়েই বেড়ে উঠেছে।

বিয়ের যাবতীয় অনুষ্ঠানাদি শেষ হওয়ার পর যখন বাংলাদেশের পথে পা বাড়িয়েছি তখন বার বার ওই সব দৃশ্য ভেসে উঠছে আর অবাক হয়ে ওদের কথা ভেবে ভাল লাগছে।

এয়ারপোর্ট ইস্টিশানে ট্রেন থেকে নামতেই শিয়ালদহ ইষ্টিশানের মতই একটা ভিক্ষুক বয়সে বৃদ্ধ এসে দাড়ালো আমাদের সামনে। তার মুখে অনেক কাকুতি মিনতি।মায়া হলো লোকটার জন্য।পকেট থেকে একটা দশ টাকার নোট বের করে দিলাম তার হাতে।সে বিস্মিত হলনা বরং নোটটা একটু  উল্টেপাল্টে দেখে বললো স্যার এটা একটু বদলে দেন।এটাতে টেপ মারা।আমি কোন কথা না বাড়িয়ে নোটটা বদলে দিয়ে অজিতের দিকে হাটতে লাগলাম। অজিত তখন প্ল্যাটফর্মের কিনারায় গিয়ে অপেক্ষা করছে।তার মুখে চওড়া হাসি।সে ভিক্ষুকের নোট বদলের দৃশ্যটা দেখেই হাসছে।


জাজাফী

২৭ ফ্রেব্রুয়ারি ২০১৭

 

ন্যু ক্যাম্পের অচেনা আগন্তুক

একটা ট্রেন মিস হয়ে গেলেও চান্স থাকে পরের ট্রেনটা পাবো,কিন্তু জীবনে এমনও সুযোগ আসে যা একবার মিস হয়ে গেলে আর কোন দিন দ্বিতীয়বার সুযোগ আসবে কি আসবেনা সেটা কেউ জানেনা।ন্যু ক্যাম্প থেকে আধা কিলোমিটারেরও কম দূরত্বে অবস্থিত লা নুয়েভা মার্কুয়েসা রেস্তোরায় একাকী একটা টেবিলে বসে আছি।স্পেন,ইতালী থেকে শুরু করে ইন্ডিয়ান খাবারও পাওয়া যায় এই হোটেলে।ওসব জিবে জল আনা খাবারের কোনটার প্রতিই আমার মন নেই।এমনকি মন নেই চোখ ধাধানো ডেকোরেশান আর নানা দেশ থেকে আগত পযর্টকদের দিকেও।দক্ষিনের দেয়াল ঘেসে বসে থাকা অস্ট্রেলিয়া থেকে আগত সুন্দরী এলসার দিকেও তাকাতে ইচ্ছে হচ্ছেনা।সুদুর বাংলাদেশ থেকে বয়ে আনা মনটা পড়ে আছে আধা কিলোমিটার দূরত্বে থাকা ন্যু ক্যাম্পে।যে মনটা একই সাথে ব্যাথিত না পাওয়ার যন্ত্রনায়।বার বার মনে হয় যদি মনের সাথে সাথে পুরো মানুষটিকেই ন্যু ক্যাম্পের কোন একটা চেয়ারে হেলান দেওয়া অবস্থায় দেখতে পেতাম তবে ভাল হত।কিন্তু সে কপাল নিয়ে হয়তো আসিনি আমি।

বিষয়টি খোলাশা করে বলা দরকার।বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পরিবেশ বিষয়ক আন্তর্জাতিক এক সম্মেলনে যোগ দিতে এসেছি ফুটবলের স্বর্গরাজ্য বার্সেলোনায়।লা নুয়েভা মার্কুয়েসার দক্ষিনের দেয়াল ঘেসে বসে থাকা অস্ট্রেলিয় সুন্দরী তরুনী এলসাও একই সম্মেলনে যোগ দিতে এসেছে। সাত দিনের জন্য এসেছি এখানে।বার্সেলোনায় এসে ন্যু ক্যাম্পে খেলা না দেখে যাওয়া মানে অমূল্য কোহিনুর হাতে পেয়ে অবহেলায় ছুয়ে না দেখার মত।সম্মেলন গত কালই শেষ হয়েছে, হাতে আছে আজ এবং আগামী কাল।বাংলাদেশের আকাশ অতিক্রমের আগেই খোঁজ নিয়ে জেনেছি সম্মেলন শেষ হওয়ার পরেরদিনই ভাগ্য ক্রমে ন্যু ক্যাম্পেই এল ক্লাসিকো আছে।মনে মনে পণ করেছিলাম সম্মেলন শেষ করে হাতে যে দুদিন সময় থাকবে তার একদিন ন্যু ক্যাম্পে এল ক্লাসিকো দেখে কাটাবো।কিন্তু সবার স্বপ্ন সত্যি হয়না।

খেলা চলাকালিন তোলা ছবি

ঢাকার ফুটপাতের পাশে গড়ে ওঠা হোটেলে আলমারির কাঁচের ফাক দিয়ে নানা রকম মিষ্টি দেখার পরও সেসব যেমন পথ শিশুদের ভাগ্যে জোটেনা বরং স্বপ্নই থেকে যায়, ঠিক একই ভাবে আমার স্বপ্নও নিরবে খুন হয়।ক্রিড়া সাংবাদিক উৎপল শুভ্রর কাছ থেকে অনেক বার শুনেছি ন্যু ক্যাম্পের টিকেট পাওয়া আর হাতে আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপ পাওয়া একই কথা।সে সব কথা মাথায় রেখে বার্সেলোনার মাটিতে পা রেখে সম্মেলনে যোগ দেবার আগেই ন্যু ক্যাম্পের একটা টিকেট হাতে পাওয়ার জন্য বার কয়েক ঢু মেরেছি।অনলাইনেও অনেক চেষ্টা করেছি কিন্তু সব টিকেট আগেই বিক্রি হয়ে গেছে।

কোন টিকেট নেই জানার পর মনটা বিষিয়ে উঠেছে।আহ কী শান্তি ঢাকাতে। মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় স্টেডিয়ামে খেলা চলাকালিন সময়েও দু একটা টিকেট পাওয়া যায়।কিছু না হোক ব্লাকেও টিকেট পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর এখানে? ভেবেছিলাম উন্নত দেশ হলে কি হবে, হয়তো দু একটা টিকেট এখানেও ব্লাকে পাওয়া যাবে।নাহ পাওয়া যায়নি এমনটি বলতে চাইছিনা।পাওয়া গিয়েছিল, কিন্তু সেই টিকেটের যে দাম তা দিয়ে হয়তো ঢাকা থেকে বার্সেলোনা দুবার যাওয়া আসার প্লেন ভাড়া হয়ে যাবে।বাড়িয়ে বলছি হয়তো কিন্তু নিদেন পক্ষে সে টাকা দিয়ে অন্তত একটা পালসার মটর সাইকেল কেনাই যাবে বলে মনে হয়েছে।ওই পরিমান অর্থ আমার নেই।ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাওয়া আসার ভাড়াই কখনো ছিল কিনা সন্দেহ আছে, সেখানে অতগুলো টাকা আমি কোথায় পাবো।বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচে এসেছি সম্মেলনে অংশ নিতে।সাথে খরচ বাবদ যা বাজেট ছিল তা থেকে হয়তো একটু কৃপণতা করতে পারলে ন্যু ক্যাম্পে এল ক্ল্যাসিকোটা দেখাই যেত। কিন্তু টিকেটের দুর্ভিক্ষ আমার ভাগ্যকে সুপ্রন্ন হতে দেয়নি।

বিয়ের আসর থেকে বর পক্ষ উঠে চলে গেলে কনের বাবার যে অবস্থা হয় আমার অবস্থা হয়েছে সেরকম।ন্যু ক্যাম্পের এতো কাছে এসেও খেলা দেখা হচ্ছেনা ভেবে মনটা খুবই খারাপ হয়ে গেছে।আসলে যেখানে এক মাস আগে থেকেই টিকেট বিক্রি হয়ে যায় সেখানে আমি খেলার মাত্র চার পাঁচদিন আগে টিকেটের আশা করে বরং বোকামীই করেছি বলে মন্তব্য করলেন এক স্প্যানিশ ভদ্রলোক।ন্যু ক্যাম্পের গ্যালারিতে বসে খেলা দেখার স্বপ্নটা স্বপ্ন হয়েই থেকে যাবে বাকি জীবন।এতো কাছে এসে যে স্বপ্নটা ধরা দেয়নি সেটা বাকি জীবনে ধরা দেবে বলে মনে হয়না।মনের অবস্থা তখন এমন হয়েছে যেন মনে হচ্ছে প্রিয়জন ছেড়ে গেছে আমাকে।ফুটবল পাগল এই আমার কাছে ন্যু ক্যাম্পের আকাশের নিচেয় এসেও ন্যু ক্যাম্পের গ্যালারিতে না বসতে পারাটা নিশ্চই তার থেকে কোন অংশেই কম বেদনার নয়।তখন আমার কাছে ন্যু ক্যাম্পই আমার প্রেমিকা।যে কাছে থেকেও অনেক দূরে।যার ছোয়া পাওয়ার আশা বুকে নিয়ে পৃথিবীর সব থেকে সুন্দর দেশ আমার সোনার বাংলার আকাশ পাড়ি দিয়ে সাত সমুদ্র তের নদীর এপারের এই দেশটিতে এসেছিলাম সে আমাকে ছুতে দেয়নি।ন্যু ক্যাম্প আমাকে বঞ্চিত করেছে ভালবাসা থেকে।

লা নুয়েভা মার্কুয়েসায় বসে আমার মনের মধ্যে শুধু ন্যু ক্যাম্পে যেতে না পারার ব্যাথা বার বার মনকে উতলা করে তুলছে।টেবিলে রাখা প্রন স্যুপ থেকে সুবাশিত ধোয়া ওঠা থেমে গেছে সেই কখন তা বুঝতেই পারিনি।আমি যখন চিন্তার সাগরে হাবুডুবু খাচ্ছি আর প্রেমিকা হারা প্রেমিকের মত হৃদয়ের ক্ষত নিয়ে বসে আছি লা নুয়েভা মার্কুয়েসার টেবিলে একাকী তখন সামনের চেয়ারটা টানতে টানতে বসার অনুমতি চাইলেন এক বৃদ্ধ লোক।তার কথাতে সম্বিত ফিরে পেয়ে তাকে বসার অনুমতি দিলাম।দেখে মনে হতে পারে যেন আমি মাস্টার মশাই আর আমার সামনে বসতে চাওয়া লোকটা আমার ছাত্র এবং সে বসার অনুমতি চাইছে।এই দেশটা বড়ই সুন্দর।এখানকার মানুষের আতিথেয়তার কথা নাইবা বললাম কিন্তু এদের ভদ্রতা সত্যিই মুগ্ধকর।হোটলের চেয়ারগুলো সবার জন্যই সমান অথচ সেখানে বসার জন্যও এরা কী সুন্দর ভদ্রতা করে অনুমতি চাইছে অপর প্রান্তে বসে থাকা সুদুর বাংলাদেশ থেকে আসা ন্যু ক্যাম্পে যেতে না পারার দুঃখে জর্জরিত এক তরুনের কাছে।

হোটেল লা নুয়েভা মার্কুয়েসা থেকে দেখা ন্যু ক্যাম্প

তার কথাতেই বুঝলাম তিনি স্প্যানিশ।আমার প্রনস্যুপের বাটিটার দিকে তাকিয়ে তিনি ইংরেজীতেই বললেন স্যুপতো ঠান্ডা হয়ে গেছে খাওনি কেন? তোমাকে বিষন্ন লাগছে কেন?তার কথাতে মনে পড়লো স্যুপের অর্ডার দেওয়ার পর সেই কখন স্যুপ দিয়ে গেছে তা খেয়ালই করিনি।

আমি স্যুপের চামচ নিয়ে খেতে যাবো তখন ভদ্রলোক খেতে নিষেধ করলেন।ওয়েটারকে ডাকলেন।স্প্যানিশে ওয়েটারকে কামারেরো বলা হয়।ওয়েটার এসেই তাকে সালাম দিল।ওদের কায়দায় এবং তিনি তখন ওয়েটারকে বললেন আমার স্যুপটা পাল্টে গরম স্যুপ পরিবেশণ করতে।ওয়েটার তার কথা মত সত্যি সত্যি মুহুর্তেই আমার স্যুপটা বদলে গরম স্যুপ দিয়ে গেল।আমি খেতে খেতে বৃদ্ধকে দেখতে লাগলাম।তিনি সম্ভবত প্রভাবশালী কেউ নয়তো এই রেস্তোরার নিয়মিত কাষ্টমার। তা না হলে পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় অধিকাংশ ওয়েটারই তাকে সম্মান দেখাতো না।এসবের পরও আমার মনটা ঠিকই পড়ে ছিল ন্যু ক্যাম্পে।মাত্র ঘন্টা খানেক পরই খেলা শুরু হবে।ন্যু ক্যাম্পের আকাশের নিচেয় থেকেও সেখানে যাওয়া হচ্ছেনা আমার এর থেকে বড় ব্যথার আর কি থাকতে পারে।এসব ভাবছি আর আনমনে স্যুপের চামচে চুমুক দিচ্ছি।হঠাৎ খেয়াল করলাম সামনে বসা বৃদ্ধ ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে আছেন।তিনি সম্ভবত বেশ খানিকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে ছিলেন। চোখে চোখ পড়তেই সেটা সরিয়ে না নিয়ে জানতে চাইলেন আমি কি কোন বিষয়ে খুব চিন্তিত কিনা।

মনে মনে ভাবলাম ন্যু ক্যাম্পে খেলা দেখার স্বপ্ন মরে গেছে এটা তাকে জানাই আবার মনে হলো তাকে জানিয়ে লাভ কি? তাতে বরং দুঃখটা আরো বাড়বে বই কমবেনা।দুঃখের সময় কেউ যখন শান্তনা দেয় তখন বরং দুঃখ কমে না গিয়ে আরো বেড়ে যায়।আমি কিছু বলছিনা দেখে তিনি আবারও জানতে চাইলেন। পরে ভাবলাম এতো করে যখন বলছে তাকে বলাই যেতে পারে।আমি বিষয়টা জানালাম।তিনি তেমন কিছু বললেন না।আপন মনে ধোয়া ওঠা কফিতে চুমুক দিলেন।মনে মনে রাগ হলো।এই দেশের মানুষ দেখছি বেশ কৃপন।

বিনা পয়সায় একটু সহানুভুতি দেখাবে,টিকেট পাইনি বলে যে কষ্ট পাচ্ছি তার জন্য একটু শান্তনা দেবে তার কোন নাম গন্ধ নেই?আমাদের দেশ হলে কেউ কি এরকম করতো?চারদিকে যতজনকে দেখা যেত সবাই শান্তনা দিত।বলতো এবার পাওনি তো কি হয়েছে পরে নিশ্চই পাবা।সুযোগতো বলে কয়ে আসেনা। দেখবা হুটকরে একদিন সুযোগ চলে এসেছে।আর এই স্পেনের এই বুড়ো মানুষটা মুখে টু শব্দটিও করলো না?মনে মনে ভাবলাম লোকটার সাথে আর কোন কথাই বলবো না। আমি আপন মনে স্যুপ খেতে লাগলাম।একটিবার শুধু তার দিকে তাকালাম।সে আগেই কফি শেষ করেছে।কি কারণে যেন কফি শেষ হওয়ার পরও তিনি টেবিল ছেড়ে চলে না গিয়ে বসে থাকলেন।

আমি স্যুপ খাওয়া শেষ করে টেবিল ছেড়ে উঠলাম।আশ্চর্য আমার সাথে সাথে বৃদ্ধ লোকটাও উঠলেন।আমি কাউন্টারে গিয়ে বিল পরিশোধের জন্য মানিব্যাগ বের করতেই কাউন্টার থেকে ইংরেজীতে জানানো হলো বিল দিতে হবেনা।কেন দিতে হবেনা জানতে চাইলে তিনি পাশের বৃদ্ধকে দেখিয়ে বললেন আপনি ওনার অতিথি তাই আপনার থেকে কোন বিল নেওয়া হবেনা।আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলাম।একটু আগেই সমবেদনা কিংবা শান্তনা দেয়নি বলে মনে মনে যাকে আমি কৃপণ বলেছি সে আমার স্যুপের বিল দিয়ে দিচ্ছে।তখন তার প্রতি আমার মুগ্ধতার সীমা নেই।তিনি আমাকে নিয়ে লা নুয়েভা মার্কুয়েসা থেকে বেরিয়ে এলেন।

ঠিক তখন খেয়াল হলো আমাকে যেমন তিনি বিল দিতে দেন নি তেমন তিনি নিজেওতো কোন বিল দিলেন না।তিনিকি সেটা ভুলে গেছেন?আর ভুলে গেলেওতো রেস্তোরার ম্যানেজার ভুলে যাবার কথা নয়।তখন মনে পড়লো সব ওয়েটার তাকে যে সম্মান দেখাচ্ছিল তার রহস্য হতে পারে তিনিই লা নুয়েভা মার্কুয়েসার মালিক।বার্সেলোনার সব থেকে সুন্দর হোটেলের একটি হলো এটি আর সেটির মালিক নিজের অতিথি হিসেবে আমাকে স্যুপ খাইয়েছেন ভাবতেই আনন্দে প্রায় আত্মহারা হয়ে উঠলাম।

জানার লোভ সামলাতে না পেরে আমি বলেই ফেললাম যে আপনিতো রেস্তোরার বিল দিতে ভুলে গিয়েছেন।তিনি তখন বললেন না ভুলিনি আসলে ওরা খাতায় লিখে রাখবে। মাস শেষে বিল নিয়ে নেবে।আমি একটা আগ বাড়িয়ে বললাম যে আমার মনে হচ্ছিল আপনিই এই জনপ্রিয় রেস্তোরাটির মালিক।বৃদ্ধ তখন আমার অনুমানকে নাকোচ করে দিয়ে জানালেন যে তিনি ওই রেস্তোরার মালিক নন বরং নিয়মিত কাস্টমারদের একজন।তখন মনে হলো তার কথাটাই যুক্তিযুক্ত এবং যেহেতু নিয়মিত কাষ্টমার তাই সব ওয়েটারই তাকে চেনে এবং সম্মান করে।লা নুয়েভা মার্কুয়েসা থেকে বেরিয়ে আমি আমার হোটেল ক্যাটালোনিয়া অ্যাটিনাসে যাবো বলে সিদ্ধান্ত নিলাম।ওই হোটেলেই আমি উঠেছি।যেহেতু ন্যু ক্যাম্পে যাওয়া হলোনা সেহেতু হোটেলে ফিরে যাওয়াই সমুচিত হবে বলে মনে করলাম।বৃদ্ধকে বিদায় জানিয়ে হোটেলে ফিরবো বলতেই তিনি বললেন তার সাথে যেতে,তাকে একটু সময় দিতে।

কেন তাকে সময় দিতে হবে কিংবা কোথায় সময় দিতে হবে তা জানার দরকার হলোনা।অপরিচিত একটা তরুণকে যিনি নিজের টাকায় স্যুপ খাওয়াতে পারেন এবং যিনি বয়সে বাবার সমান কিংবা তার চেয়ে বড় তাকে একটু সময় দিলে আমারতো কোন সমস্যা নেই। তাছাড়া হোটেলে ফিরে গিয়েওতো অলস বসে থাকতে হবে। আবার মনে হলো এই বিদেশ বিভূইয়ে অপরিচিত লোকটাকে সময় দেওয়াকি ঠিক হবে?হোক সে যতই বৃদ্ধ কিংবা যতই সে আমাকে স্যুপ খাওয়াক।কি মনে করে তার গাড়িতে উঠে বসলাম।একটা বক্সস্টার এস ৭১৮ মডেলের পোর্শে কার দেখেই মনে হলো লোকটা বেশ টাকাওয়ালা।আমার মত এক শুটকো তরুনকে কিডন্যাপ করেও তার কোন লাভ নেই।সুতরাং বিনা দ্বিধায় গাড়িতে উঠে বসলাম।তিনিই ড্রাইভ করছেন আর আমি পাশে বসে আছি।এই ধরনের গাড়ি আমি শুধু হলিউডের সিনেমাতেই দেখেছি।ঢাকাতে এসব গাড়ি কল্পনাও করা যায়না।

দশমিনিটের ব্যবধানে গাড়িটা থেমে গেল।তিনি আমাকে গাড়ি থেকে নামতে বলে নিজেও নামলেন।আমি গাড়ি থেকে নেমেই স্তব্ধ হয়ে গেলাম।গাড়ি থেমেছে ন্যু ক্যাম্পের সামনে।তিনিকি তবে আমার কাটা ঘায়ে আরো একটু নুনের ছিটা লাগানোর জন্য সোজা ন্যু ক্যাম্পেই নিয়ে আসলেন।পরক্ষণেই হোটেলের কথা মনে করে চিন্তাটা মাথা থেকে সরিয়ে নিলাম।দেখিইনা বৃদ্ধ স্প্যানিশ কি করেন। গাড়িটা পার্ক করে আমাকে নিয়ে ন্যু ক্যাম্পের গেট দিয়ে ঢুকে গেলেন।অন্যরা যখন লাইন ধরে এগোচ্ছিল ভদ্রলোক তখন লাইন ছাড়াই এগিয়ে গেলেন।গার্ড এবং সংশ্লিষ্টরা কেউ কেউ তার সাথে হ্যান্ডশেক করলো।আমি এই বৃদ্ধ কে এবং তার ক্ষমতা আসলে কতটুকু তা বুঝতে চেষ্টা করে খেই হারিয়ে ফেলছিলাম।একবার মনে হলো তিনি সম্ভবত ন্যু ক্যাম্পের বড় কোন কর্মকর্তা আবার মনে হলো সম্ভবত স্পেনের সব থেকে ধনীদের একজন তিনি তাই সবাই তাকে ওরকম সমীহ করছেন।তিনি হাটতে হাটতে বললেন আমার কাছে দুটো টিকেট আছে আজকের এল ক্ল্যাসিকোর।সাথে আমার ওয়াইফ আসার কথা ছিল কিন্তু সে অন্য একটা কাজে আটকে পড়ায় আমি একাই আসলাম।হোটেলে যখন তোমার খেলা দেখার ইচ্ছের কথা জানতে পারলাম তখন ভাবলাম তোমাকেই সাথে নিই।আমি অবাক হয়ে বললাম আপনিতো চাইলে এই টিকেটটা পাঁচশো ইউরোতেও বিক্রি করতে পারতেন, তাহলে আমাকে ফ্রি নিচ্ছেন কেন?

আমার কথা শুনে বৃদ্ধ একটু হাসলেন। তার পর বললেন তোমার ফুটবলের প্রতি যে ভালবাসা দেখেছি তাতে তোমাকে দেওয়াই শ্রেয় মনে হয়েছে।আর তা ছাড়া টিকেটতো আমার কেনা লাগেনি। ফ্রি পেয়েছি।তবে হ্যা সাধারণ ভাবে এই টিকেটের দাম কিন্তু ৫০০ ইউরো না! আমি জানতে চাইলাম তাহলে এটার দাম কত?তিনি আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে দিয়ে জানালেন এই টিকেটের দাম ৪ হাজার ডলার।আর ব্লাকে বিক্রি করলে এটা সাড়ে চার হাজার থেকে ছয় হাজার ডলারে বিক্রি হবে।

সামান্য সময়ের পরিচয়ে একজন আরেকজনের জন্য এতো ডলারের টিকেট ফ্রিতে দিতে পারে তা কল্পনায়ও সম্ভব না আর আমি বাস্তবে দেখছি।তবে মনে হলো তিনি যেহেতু ফ্রি পেয়েছেন তাই অন্য কাউকে সেটা দিয়ে দিতেও ওনার গায়ে লাগছেনা।তবে চিন্তা একটা থেকেই গেল।কে এই ভদ্রলোক যে তাকে এরকম দুটো ভিআইপি টিকেট ফ্রিতে দিয়েছে।আবারও মনে হলো তিনি নিশ্চই প্রভাবশালী কেউ নয়তো স্পেনের সেরা ধনীদের একজন।এর মাঝেই বেশ কয়েকজন এসে তার সাথে দেখা করে গেল।স্প্যানিশে কি সব বললো তার মাথা মুন্ডু কিছুই বুঝতে পারিনি।

খেলা দেখলাম খুব আয়েশ করে।ন্যু ক্যাম্পের কথা উৎপল শুভ্রর মুখে যেরকম শুনেছি ঠিক তাই।অনেক উচুতে বসে যারা খেলা দেখছে আমি নিশ্চিত তারা কার পায়ে বল কিংবা কে কোথায় দৌড়াচ্ছে তা বুঝতে পারছেনা।অত উচু থেকে দেখতে পাওয়ার কথাও নয়।জায়ান্ট স্ক্রিন থাকায় কেউ কেউ সেটা দেখে খেলোয়াড় চিনছে নতুবা কেউ কেউ সাথে করে দুবীর্ন নিয়ে এসেছে।আমরা ভিআইপি টিকেটধারী হওয়ায় জায়ান্ট স্ক্রিন কিংবা দুবীর্ন কোনটারই দরকার পড়েনি।খেলার উত্তেজনায় আমি তখন কম্পমান।যেন মেসি রোনালদো নয় আমি নিজেই খেলছি।বৃদ্ধ লোকটাও মাঝে মাঝে উত্তেজিত হচ্ছেন এবং আশ্চর্য ভাবে তিনিও আমার মতই বার্সেলোনার সমর্থক।তবে ভাগ্য সুপ্রসন্ন না হওয়ায় খেলা ড্র হলো।বেরিয়ে যাওয়ার জন্য উঠতেই বৃদ্ধ আমাকে থামালেন।তিনি বললেন আরেকটু সময় অপেক্ষা করতে।বৃদ্ধর ছেলে আসবেন তার সাথে দেখা করে তার পর ন্যু ক্যাম্প ত্যাগ করবেন।আমি বিনা বাক্য ব্যায়ে মেনে নিলাম।যার কল্যাণে আমার আজীবনের অধরা স্বপ্ন সত্যি হলো এই ন্যু ক্যাম্পে বসে এল ক্ল্যাসিকো দেখলাম তার জন্য একটু কেন এক বছরও অপেক্ষা করা যায়।

কিছুক্ষণ পর বৃদ্ধর ছেলে আসলেন।বৃদ্ধ পরিচয় করিয়ে দিলেন এটা আমার ছেলে।আমার মুখে তখন কোন কথা নেই।আকাশের ওপরে আকাশ তারও ওপরে আরেকটা আকাশ যেন আমার মাথার উপর এক সাথে ভেঙ্গে পড়েছে।বৃদ্ধ তার যে ছেলেকে আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন তাকে যে আমি আগে থেকেই চিনি।আমার সামনে দাড়ানো বৃদ্ধর সেই ছেলেটির নাম জর্ডি আলবা।বার্সেলোনা ফুটবল দলের বিখ্যাত খেলোয়াড় তিনি।

জাজাফী

ফেসবুকঃ www.facebook.com/zazafee1

ওয়েবসাইটঃ www.zazafee.com

২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭

 

ক্যাডেট মহিবুল স্যরি বললেও দোষ না বললেও দোষ

সিনিয়রের সাথে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় টাচ লাগলে তাকে স্যরি বলতে হবে।গাইড হায়দার ভাই এটা শিখিয়ে দেওয়ার পর ক্লাস সেভেনের মহিবুলের মাথায় সেটা সারক্ষণ ঘুরপাক খেতে থাকলো।এটা নিয়ে সে সহপাঠী জাবেরের সাথে কথাও বলেছে। তার নাকি স্যরি বলতে ভাল লাগে কিন্তু কোন ভাবেই স্যরি বলার সুযোগ সে পেতোনা।

একদিন মোক্ষম সুযোগ আসলো। খাবার টেবিলে টি ব্রেকের সময় হঠাৎ মহিবুল স্যরি বলে উঠলো। টেবিলে সিনিয়র ছিল অনেকে। তারা হঠাৎ কোন কারণ ছাড়াই স্যরি বলা দেখে জানতে চাইলো স্যরি বললে কেন? মহিবুল তখন মুখ কাচুমাচু করে বললো, ভাই আপনার কলার সাথে আমার কাপের টাচ লেগে গেছে, তাই স্যরি বলেছি। মহিবুলের কথা শুনে সবার মুখেই চাপা হাসি দেখা গেল। তবে সিনিয়রদের ভয়ে কেউ হাসতে সাহস পাচ্ছিল না।

কিন্তু হাসি কি আর দমিয়ে রাখা যায়? কবি বলেছেন “হাসতে নাকি জানেনা কেউ কে বলেছে ভাই,এই শোন না কত হাসির খবর বলে যাই”। ক্লাস নাইন হাসি সামলাতে না পেরে হো হো করে হেসে ফেললো। অতঃপর সিনিয়রেরা ক্লাস নাইনকে ব্রেকের পর দেখা করতে বললো। কারো বুঝতে বাকি থাকলোনা কি শাস্তি হতে চলেছে। এর পর শাস্তি খেয়ে ক্লাস নাইন মহিবুলকে তলব করলো। তাকে শাসানো হলো আর যদি বে জায়গাতে স্যরি বলে তবে তার কপালে দুঃখ আছে।

এক সকালে ফলইনের সময় মহিবুল দেরি হবে ভেবে উসাইন বোল্ট গতিতে দৌড় দিল। যেন কারো দিকে তার কোন নজর নেই। সেই সময় সরাসরি ধাক্কা লাগলো হাউজ লিডার তারেক ভাইয়ের সাথে।এতো জোরে ধাক্কা লাগলো যে তাল সামলাতে হিমশিম খেতে হলো তারেক ভাইকে। নিয়ম অনুযায়ি মহিবুলের তখন স্যরি বলার কথা কিন্তু সে স্যরি না বলে দৌড়ে ফলইন হলো।

এর পর যথারীতি মহিবুলকে তলব করা হলো সে কেন স্যরি বলেনি? মহিবুল সরল মনে বললো, ক্লাস নাইনের ভাইয়েরা বে যায়গায় স্যরি বলতে নিষেধ করেছে। ওটাতো বে যায়গা ছিল! অতঃপর আবার ক্লাস নাইনের ডাক পড়লো এবং দেখা গেল এক সাথে অনেকেই ফ্রন্ড রোল দিতে দিতে এগিয়ে যাচ্ছে। ক্লাস নাইন শেষে বুঝতে পারলো মহিবুল হলো একটা কুফা,সে স্যরি বললেও দোষ না বললেও দোষ।

সাহসী ক্যাডেট

একাডেমিক ব্লকের নিচেয় দাড়িয়ে আছি আমি ওয়ালিউর আর অপার। ক্যাডেট ওয়ালিউর শের ই বাংলা হাউসের আর ক্যাডেট অপার সোহরাওয়ার্দী হাউজের।আমাদের মধ্যে দারুন বন্ধুত্ব।প্রায় কোন কথাতেই আমাদের মধ্যে কোন দ্বিমত হয়না।কথা হচ্ছিল সাহস নিয়ে।মুসা ইব্রাহীম কিংবা নিশাত মজুমদার অনেক সাহসী বলেইনা তারা এভারেষ্ট বিজয় করেছে।পৃথিবীর সব থেকে সাহসীদের কথা বলতে গিয়ে আমি বললাম বেয়ার গ্রিলসের কথা।ওরা দুজনও মেনে নিল যে বেয়ার গ্রিলস অনেক সাহসী।

হঠাৎ ওয়ালিউর বললো জানিস বিসিসিতে আমার হাউসের জুনিয়রেরা সব থেকে সাহসী ক্যাডেট।ওয়ালিউরের কথা শেষ হতে না হতেই দেখি অপার জীবনে প্রথম বারের মত ওর মতের সাথে এক মত হতে পারলো না।সে বললো নাহ মোটেই তোর হাউজের জুনিয়র বেশি সাহসী নয় বরং আমার হাউসের জুনিয়রেরা বেশি সাহসী।ওরা দুজন যখন এটা নিয়ে কথা আর থামাতেই চাইছেনা তখন দেখি এদিকেই আসছে শের ই বাংলা হাউসের জুনিয়র মোষ্ট ক্যাডেট জাহিদ আর সোহরাওয়ার্দী হাউসের জুনিয়র মোষ্ট ক্যাডেট মুহতাসিম।

অপার আর ওয়ালিউরকে থামিয়ে বললাম তোরা থামবি একটু।কথা বাড়িয়ে লাভ কি?প্রমান হয়ে যাক কার হাউসের জুনিয়র বেশি সাহসী।কিভাবে প্রমান হবে ওরা জানতে চাইলে বললাম ওই দেখ দুইটা আসতেছে।কাছে এসে ওরা যখন সালাম দিল তখন আমি বললাম ওয়ালিউর তুই তোর জুনিয়র যে সাহসী তা প্রমান করে দেখা।ওয়ালিউর তার হাউজের জুনিয়র ক্যাডেট জাহিদকে বললো এই যাও এখনি ওই নারকেল গাছটাতে উঠে দেখাও।ক্যাডেট জাহিদ সাথে সাথে গাছে উঠে দেখাতেই ওয়ালিউরের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। সে অপারকে বললো দেখলি আমার জুনিয়র কত সাহসী।

এবার অপারকে বললাম তুই তোর জুনিয়র যে সাহসী সেটা প্রমান করে দেখা।অপার তখন তার হাউজের জুনিয়রকে নিদের্শ দিলো যা ওই নারকেল গাছ থেকে একটা ডাব পেড়ে নিয়ে আয়।সাথে সাথে তার হাউসের জুনিয়র মুহতাসিম একটা ডাব পেড়ে আনলো।সেও ওয়ালিউরের মতই বললো দেখলি আমার হাউসের জুনিয়র কত সাহসী।আমি দুজনকেই থামিয়ে বললাম ঠিক আছে এ নিয়ে কথা বাড়িয়ে আর লাভ নেই।তোদের দুই হাউজের জুনিয়রই বেশ সাহসী।আমরা জুনিয়র দুইটাকে ছেড়ে দিলাম।

এবার ওয়ালিউর বললো তা দোস্ত তুইতো তোর হাউসের কথা কিছু বললি না।নিশ্চই তোর হাউসের জুনিয়রেরা খুব ভীতু।আমি বললাম না রে।তারা ভীতু হবে কেন?তারা মহা সাহসী।এবার অপার আর ওয়ালিউর প্রমান চাইলো।মোক্ষম সুযোগ এসে গেল সাথে সাথে।আমি শরিয়তুল্লাহ হাউসের।তাকিয়ে দেখি বেশ জোর কদমে এগিয়ে আসছে ক্যাডেট ইলহাম।সে আমার হাউজের।ইলহামকে আমি হাড়ে হাড়ে চিনি।ও যে আমার সম্মান ডুবাবে না সেটা আমি বিশ্বাস করি।ওকে দিয়েই প্রমান করবো যে আমার হাউজের জুনিয়র বেশি সাহসী।

কাছে এসে সালাম দিতেই ওকে থামালাম। বললাম ইলহাম কথা হলো আমরা বাজি ধরেছি কার হাউজের জুনিয়রেরা বেশি সাহসী।সোহরাওয়ার্দী আর শের ই বাংলা হাউজের জুনিয়রদের সাহসের প্রমান নিয়েছি।এবার আমাদের হাউজের পালা।তুমি কি সাহসের প্রমান দেখাতে প্রস্তুত?ইলহাম সাথে সাথে বললো জ্বি ভাই প্রস্তুত।আমি বললাম যাও ওই নারকেল গাছ থেকে একটা ডাব পেড়ে এনে দাও।আমার কথা শুনে অপার আর ওয়ালিউর বললো আগের দুজনতো ওই একই কাজ করছে তাতে কিভাবে প্রমান হবে যে তোর হাউজের জুনিয়র বেশি সাহসী?

ওদের প্রশ্নের উত্তর আমাকে দিতে হলো না।ওরা এমনিতেই পেয়ে গেল।আমার হাউজের জুনিয়র ইলহাম একটুও নড়েনি। আমি আবার বললাম যাও ডাব পেড়ে নিয়ে আসো।এবার ইলহাম বললো ভাই ডাব পাড়তে পারবো না।দরকার হয় আপনি নিজে পেড়ে খান বলে সে হনহন করে হাটা শুরু করলো।আমি তখন বিজয়ীর হাসি হেসে বললাম দেখলি আমার হাউজের জুনিয়রেরা কত বেশি সাহসী? তারা এমনকি সিনিয়রের মুখের উপরও কথা বলার মত সাহস রাখে।এবার সত্যি সত্যি অপার আর ওয়ালিউর মেনে নিল যে শরিয়তুল্লাহ হাউসের জুনিয়রেরাই বেশি সাহসী।

কিন্তু অপার বা ওয়ালিউর জানেনা যে ওদের অগচরেই আমি ইলহামকে চোখের ইশারায় সব বুঝিয়ে দিয়েছিলাম কি করতে হবে।অপার এবারও আইসিসিএলএলএম এ ফাস্ট হয়েছে।ওকে হারানোর এই একটা পথই আমার জানা ছিল।যদিও পথটা একটু বাকা।ইলহাম ঠিকঠাক অভিনয়টা করতে না পারলে বিসিসিতে শরিয়তুল্লাহ হাউজের জুনিয়রদেরকে সব থেকে সাহসী প্রমান করা হত কিনা সন্দেহ।

৫ জানুয়ারি ২০১৬

সুখে থাকতে ভুতে কিলানোর গল্প

ভ্যাকেশানে বাড়ি ফেরার পর ক্যাডেট সজলকে তার বড় ভাই আনাস জিজ্ঞেস করলেন কিরে সজল এবার কলেজে কয়টা ইডি খেয়েছিস?ইডির কথা শুনলেই সজলের যেন কেমন লাগে।ও তবুও মুখটা হাসিহাসি রেখে বললো ভাইয়া এবার বেশি ইডি খাইনি মাত্র দুইটা খাইছি।ড্রয়িং রুমে তখন ওর ছোট ভাই মেসবাহ ছিল।মেসবাহ আবার বায়না ধরার ওস্তাদ।ভাইয়া যা কিছু কিনবে, যা কিছু পরবে, যা কিছু খাবে তা তার চাইই চাই।মেসবাহ ক্লাস ফোরে পড়ে।সে বায়না ধরলো ভাইয়া একা একা কেন ইডি খেলো? আমিও খাবো।আমাকে ইডি খাওয়াতেই হবে।

ওর কথা শুনে ভাইয়া এবং সজল দুজনেই হো হো করে হেসে উঠলো।কিন্তু কোন কিছুতেই সে দমলো না।তার একটাই কথা আমাকে ইডি দাও, আমি ইডি খাবো।ও ভেবেছে ইডি হয়তো কোন দারুন মজাদার খাবারের নাম।বড় ভাইয়া বললেন, মেসবাহ তোমাকে ইডি খাওয়ানো যাবেনা।ইডি খেতে হয়না।পিচ্চিটা তখন উল্টো যুক্তি দিল।আমি কেন ইডি খেতে পারবো না?ভাইয়া কেন খেলো?যেটা ভাইয়া খেতে পারে সেটা আমিও খেতে পারবো।বড় ভাইয়া দুষ্টুমী করে বললেন ইডি খেলে তোমার হজম হবেনা।এই যুক্তিতেও কাজ হলোনা।সে একটা পাকনা ছেলে।

সে বললো কি বলো ভাইয়া আমার স্টমাক অনেক স্ট্রং।লোহা খেলেও হজম হয়ে যাবে আরতো কোথাকার কোন ইডি।আমি এক সাথে দশটা ইডি খেলেও কিচ্ছু হবেনা।ওর কথা শুনে আবার হাসির রোল পড়ে গেল কিন্তু ও এবার ক্ষেপে উঠে বললো আমাকে ইডি খাওয়াবা কিনা বলো।নইলে আম্মুকে বলে দেব,আর আম্মু তোমাদেরকে বকবে।সজল তখন বললো যা তুই আম্মুকে বল।সে গাল ফুলিয়ে গিয়ে আম্মুকে বললো আম্মু তোমার ছেলে সজল কলেজে একা একা ইডি খেয়ে এসেছে আমার জন্য নিয়ে আসেনি।এখন আমি ইডি খেতে চাইছি আর সে আমাকে ইডি খেতে দিচ্ছেনা।

ইডি বিষয়ে আম্মুর ব্যাপক ধারনা আছে।আম্মু নিজে ময়মনসিংহ গার্লস ক্যাডেট কলেজে পড়াশোনা করেছে।আম্মু বললেন বাবা ইডিতো কোন খাওয়ার জিনিস নয়।মেসবাহ তখন বললো আমি কোন কথাই শুনবো না।ভাইয়া খেয়েছে আমাকেও দিতে হবে, আমি খাবোই খাবো।আম্মু তখন সজলকে বললেন, দে ওকে একটা ইডি খাওয়া।ড্রয়িং রুমের সোফা গুলো সরিয়ে অবশেষে মেসহাবকে ইডি দেওয়া হলো।সে আর কোন কথা বললো না।বড় ভাইয়া শুধু বললেন একেই বলে সুখে থাকতে ভুতে কিলায়।

ইচ্ছে করে ইডি খাওয়ার মজা টের পেয়েছিসতো?।সেদিন বিকেলে বন্ধুদের সাথে আড্ডা শেষে ফেরার পথে সজল তার ছোট ভাই মেসবাহের জন্য গ্রিল আর নান নিয়ে আসলো।ক্লাস ফোরে পড়া মেসবাহকে ডেকে বললো রাতে তোর জন্য গ্রিল আর নান খাওয়ার ব্যবস্থা করেছি।মেসবাহ বললো আমি জীবনেও গ্রিল কিংবা নান কোনটাই খাবো না।একবার ইডি খেয়েই আমার শিক্ষা হয়েছে।গ্রিল আর নান তুমি একাই খাও, আমার খাওয়া লাগবেনা।পিচ্চিটা ভেবেছে গ্রিল বা নান ও ইডির মত ক্যাডেটীয় কোন পানিশমেন্টের নাম!

৬ ডিসেম্বর ২০১৬

রেজওয়ানের জেপিশীপ/সোজা আঙ্গুলে ঘি ওঠেনা

প্রিন্সিপাল স্যার ক্রিয়েটিভিটির খুব ভক্ত।ডিসিপ্লিন আর ক্রিয়েটিভিটি যদিও এক নয় তার পরও তিনি সব সময় এ দুটোকে বেশি পছন্দ করেন।আর কোন ক্যাডেটের মধ্যে যদি ক্রিয়েটিভিটি থাকে তবেতো কোন কথাই নেই।নিজের ক্রিয়েটিভিটির গুণে আমার বন্ধু ক্যাডেট কাইয়ুম জেপিশীপ পেয়ে গেল।

আমরা অভিবাদন জানালাম।প্রিন্সিপাল স্যার সবাইকে শুনিয়ে বললেন আজ তোমাদেরকে এমন একজন জেপি উপহার দিলাম যার মধ্যে ক্রিয়েটিভিটি আছে।প্রিন্সিপাল স্যারের মুখে ক্রিয়েটিভিটির প্রশংসা শুনে ক্যাডেট কাইয়ুম সিদ্ধান্ত নিবে সে নিত্যনতুন ক্রিয়েটিভিটি দেখাবে। সে সিদ্ধান্ত নিল জুনিয়রেরা কেউ ভুল করলে ইডির ক্ষেত্রেও সে ক্রিয়েটিভিটি আনবে।অভিনবত্ব আনবে এবং নিজের স্টাইলে শাস্তী দেবে।

শেখ সাদীর একটা কথা ক্যাডেট কাইয়ুমের খুব পছন্দ।শেখ সাদী বলেছিলেন “মানুষের মুখের কিছু কিছু কথা বিষাক্ত তীরের আঘাতের চেয়েও বেদনা দায়ক”। সুতরাং কথার মাধ্যমে ঘায়েল করতে পারলেই সব থেকে আনন্দ।কারণ শরীরের শাস্তী একটু পর হারিয়ে যায় কিন্তু মনের শাস্তী দীর্ঘদিন মনে থাকে।

জেপিশীপ পাওয়ার মাত্র একদিন পরই সে ক্রিয়েটিভিটি দেখানোর মোক্ষম সুযোগ পেয়ে গেল।ক্যাডেট জারিফ একাডেমিক ব্লক থেকে হাউসে ফিরছিল।তার দুই পকেটে দুই হাত আর উদাস উদাস ভাব।সে খেয়ালই করেনি সামনে কাইয়ুম দাড়িয়ে আছে।সে ফুটবল গ্রাউন্ডের দিকে তাকিয়ে হাটছিল বলেই হয়তো দেখতে পায়নি।কাইয়ুমকে যখন পেরিয়ে গেছে তখন মনে হলো কে যেন পাশ কাটিয়ে গেছে।সাথে সাথে ফিরে দেখলো জেপি কাইয়ুম ভাই।এটেনশান পজিশনে দাড়িয়ে জারিফ সাথে সাথে ওকে সালাম দিল।এবার তবে আসো ইদুড় বিড়াল খেলি বলে ক্যাডেট কাইয়ুম তার সামনে সিংহমুর্তি ধারণ করলো। ক্লাস সেভেনের জারিফের অবস্থা তখন যায় যায়।

সে নিশ্চিত আজ তার কপালে দুঃখ আছে। ক্যাডেটদের যত রকম পানিশমেন্ট আছে সব তাকে ভোগ করতে হবে। কিন্তু জেপি তাকে বললো নে আজ তোকে শাস্তি দেবার আগে একটু জ্ঞান বিতরণ করি। বলতো রবি ঠাকুরের আগের নাম কি? জারিফ কিছু না ভেবেই বললো ভাই রবী ঠাকুরের আগের নাম একটেল ঠাকুর। জেপির সামনে মশকরা হচ্ছে? বলে রুদ্র মুর্তি ধারণ করলো ক্যাডেট কাইয়ুম।জারিফ তখন আমতা আমতা করে বললো ভাই সত্যি বলছি আগে রবির নাম একটেল ছিল।কিন্তু সে ভুলে গেল জেপি তাকে রবীঠাকুরের নাম জিজ্ঞেস করেছে কোন ফোন কোম্পানীর নাম নয়।শেষে গতানুগতিক ধারায় শাস্তির ব্যবস্থা করা হলো।ফ্রগ জাম্প,সাইড রোল,ফ্রন্ড রোল কোন কিছুই বাদ রাখলো না।

ওইদিন বিকেলেই তাফসীর আর আলমকেও পাকড়াও হতে হলো জেপি ক্যাডেট কাইয়ুমের হাতে।তাফসিরকে প্রশ্ন করা হলো বলতো ফুটবল কোন লিঙ্গ? ক্যাডেট তাফসির ভয়েই উত্তর দিতে পারলো না।ক্যাডেট কাইয়ুম চোখ লাল করে আলমের দিকে তাকিয়ে বললো তুমি বলো উত্তর কি হবে?উত্তর দিতে পারলেই ছেড়ে দিব।নয়তো সারা মাঠে তোমাদের ক্রলিং করিয়ে ছাড়বো। আলম একটু কম ঘাবড়ালো এবং আমতা আমতা করে বললো ভাই ফুটবল স্ত্রী লিঙ্গ। ক্যাডেট কাইয়ুমের রাগ মাথায় উঠে গেল।ঠিক তখন আলমকে সাপোর্ট দিয়ে তাফসির বললো ভাই আলম ঠিকই বলছে ফুটবল স্ত্রী লিঙ্গ।দেখেন না কিভাবে ২২ জন প্লেয়ার ওটার পিছনে দৌড়াতে থাকে। মেয়ে না হলে কি আর দৌড়াতো?

একটু পরেই দেখা গেল একাডেমীক ব্লকের নিচেয় তাফসীর আর আলম একে অন্যের কান ধরে উঠবস করছে। জেপিশীপ পাওয়ার পর ক্যাডেট কাইয়ুম ভেবেছিলম ক্রিয়েটিভিটির শাস্তি দিবে কিন্তু তার আর হলো না।সে বুঝলো সোজা আঙ্গুলে যেমন ঘি ওঠেনা তেমনি ক্রিয়েটিভিটি দিয়ে জুনিয়রদের শায়েস্ত করা যায়না।তাদের জন্য স্বয়ং শায়েস্তখানের মত শাস্তির ব্যবস্থা করতে হয়।

শুধু শেখ সাদীর কথাই নয় ক্যাডেট কাইয়ুমের আরো একজনের কথা মনে পড়ে সে তার এক বড় ভাই।তিনি বলতেন মানুষকে বলে মারার চেয়ে কলে মারা ভাল।মানে বুদ্ধিতে ঘায়েল করলে সব থেকে ভাল হয়। ক্যাডেট কাইয়ুম তাই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কখনো জেপি হলে জুনিয়রদের ইডির ক্ষেত্রে একটু অভিনবত্ব আনবে।

রাজপুত্রর জন্মদিনের একাল সেকাল

সাত খুন মাফ বলে একটা কথা প্রচলিত আছে। কিন্তু বাস্তবে কেউ কোন দিন দেখেছেন এটা? হু এটা আমি দেখেছি।আমার সাথে আরো অনেকে দেখেছে। মানে যারা ক্যাডেট কলেজে পড়ে তারা অন্তত দেখেছে। আজ সেরকমই একটা গল্প শোনাতে এলাম।

রাজপুত্রের মন খারাপ। মন খারাপ তার কারণ এবারই সে বেশ কিছু সুযোগ সুবিধা বঞ্চিত হয়েছে। চাইলে এটা নিয়ে সে প্লাকার্ড হাতে ফেস্টুন মাথায় বেঁধে পদযাত্রা করতে পারে। কিন্তু এমন একটা সময় চলছে যে রাজপুত্রর সেটা করা সম্ভব হচ্ছেনা। গত বছর এই দিনটার কথা তাই বার বার রাজপুত্রর চোখে ভাসছে। এটা একটা বিশেষ দিন। এই দিনেই সে ভুবন আলো করে তার মায়ের কোলে ঠাই নিয়েছিল। আজ রাজপুত্রর জন্মদিন। জন্মদিনটা এবার বোধ হয় খুব সাদামাটাই হয়ে যাচ্ছে।

অথচ এইতো গত বছর জন্মদিনে কলেজে কত কিছুইনা হলো। তার একটা ফিরিস্তি দেওয়াই যেতে পারে।

আমি আর আমাদের রাজপুত্র একসাথেই পড়ি।মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ। বিদ্যাই বল কথাটিকে বুকে ধরে এক একটা দিন পার করছি। রাতে লাইটস অফের ঘন্টা বাজার পর সবাই যখন একটু একটু করে ঘুমের দেশে তলিয়ে যাচ্ছে আমি দেখলাম রাজপুত্র তখনো জেগে আছে। আমি জিজ্ঞেস করতেই সে বললো নারে একটু পরে ঘুমাবো। কি কারণে যেন আমারও ঘুম আসছিলনা। আমাদের এই রাজপুত্রর নাম প্রান্ত। প্রন্ত নামটা ঘরে বাইরের কিন্তু বনেদি নাম শাশ্বত। ক্যাডেট শাশ্বত।

আমি দেখলাম ও ডায়েরি নিয়ে কি যেন লিখছে। ডায়েরি লেখার মধ্যে আমি নেই। ঘুমাতে চেষ্টা করতেই ঘুম নেমে আসলো চোখে। কিন্তু বারটার কিছু আগেই কেন জানিনা ঘুমটা ভেঙ্গে গেল। আমি দেখলাম ও তখনো জেগেই আছে। আমি অবাক হলাম। ভোর হতে না হতেই যেখানে ব্যস্ততম দিন শুরু হবে সেখানে না ঘুমিয়ে জেগে থাকার সুযোগ কোথায়। আমি যে জেগেছি তা ওকে বুঝতে দেইনি।

ঠিক বারটা বাজার এক দু মিনিট আগে ডায়েরিটা বন্ধ করে ও উঠে দাড়ালো।কাবার্ড(আলমারী) থেকে খুজে পেতে একটা ছোট্ট আয়না বের করলো। আয়নাটা নিজের সামনে ধরে রেখে শোনা যায়না এমন আস্তে করে বললো হ্যাপি বার্থডে টু মি!! আমি ভীষণ চমকে উঠলাম। আরে তাইতো আজতো শাশ্বতর জন্মদিন আর শালা আমি ভুলেই গেছি। অন্যরাও ভুলে বসে আছে! বিছানা ছেড়ে উঠলাম। ও হকচকিয়ে গেল।আমি ওকে জড়িয়ে ধরে বললাম হ্যাপি বার্থডে শাশ্বত। সে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়লো। সম্ভবত আমি একটু শব্দ করেই বলে ফেলেছিলাম। আরো একজন দুজন জেগে উঠলো। তবে তারা কিছু বুঝতে পারেনি কি ঘটছে।

সকালে ড্রেস ইন্সপেকশানের ফল ইন।আমরা সবাই সারিবদ্ধ ভাবে দাড়িয়ে আছি।আগের রাতেই ঘুমানোর আগে আমি সব ঠিকঠাক করে রেখেছি।জুতা মেটাল পলিশ করে রেখেছি। হঠাৎ শাশ্বতকে হাক ছাড়লেন স্টাফ। এই আপনার জুতা পলিশ নেই কেন?শেভ করেন নাই,মেটাল পলিশ নাই,ভেস্ট পরেন নাই। ফ্রন্টরোল,শুরু করেন ফ্রন্ট রোল। ওদেখি বিপদে পড়ে গেছে। আমার হঠাৎ মনে পড়লো আরে আজতো ওর বার্থ ডে। আমি হাত উচিয়ে বললাম স্টাফ,বাদ দেন আজকে। আজকে ছেলেটার বার্থ ডে! স্টাফের মনটা মোমের মত গলে গেল। আরেকটু হলে পানি হয়ে গড়িয়ে যেত। তিনি বললেন আচ্ছা যান আজকের মত মাফ করলাম। তবে কাল থেকে কিন্তু এ গুলো চলবেনা বলে দিলাম।

আমি সময় মত পিটিতে অংশ নিলাম। কিন্তু শাশ্বত সেদিন কিভাবে কিভাবে যেন পিটিতে লেট করলো। সারা বছর ও কিন্তু পিটিতে লেট করেনা কখনো। স্টাফ পিটিতে লেট করে আসার জন্য ওর নাম নোট করতে গেল। আমি বললাম না না স্টাফ ওর নাম আজকে নোট করেন না। আজ ওর বার্থ ডে! স্টাফ বললেন ঠিক আছে যান বার্থ ডে বলে নাম নোট করলাম না।

ক্লাস রুমে বসে আছি।শাশ্বত আমার পাশের রোতে বসা।ফিজিক্স স্যার ক্লাস নিচ্ছেন।শাশ্বত বললো স্যার টয়লেটে যাব। ফিজিক্স স্যার আবার ইংরেজী ছাড়া কথাই বলেন না।তিনি বললেন নো ভিজিটিং টয়লেট ইন মাই ক্লাস! ইংরেজী শুদ্ধ অশুদ্ধ নিয়ে তিনি কখনো মাথা ঘামান না।এখানেও আমার বাম হাত ঢুকাতে হলো।বললাম স্যার যেতে দিন। আজকে ওর বার্থ ডে। স্যারের মুখটা থমথমে ছিল কিভাবে কিভাবে যেন সেটা হাওয়াই মিঠাইয়ের মত নরম হয়ে গেল। তিনি বললেন যাও। মনে করো আমার পক্ষ থেকে এটা তোমার জন্য বার্থডে ট্রিট।মনে মনে হাসবো না কাদবো বুঝলাম না।টয়লেটে যেতে দেওয়াও যদি বার্থ ডে ট্রিট হয় তাহলে আর বাকি থাকলো কি!

গেমস টাইমটা অসাধারণ কাটে আমার। অন্যদেরটা জানিনা।সকাল থেকে শাশ্বতর বার্থডে উপলক্ষে আমার বার বার বামহাত ঢুকাতে হচ্ছে।আমি মনে মনে প্রস্তুত হলাম গেমস টাইমেও নিশ্চই কিছু না কিছু ঘটবে। এবার মড়ার উপর খাড়ার ঘা। গেমসের সময় অ্যাডজুটেন্ট হাক ছাড়লেন শাশ্বতকে দেখে। ইউ ব্লাডি  ইডিয়ট। হোয়াট ইজ দ্যা কন্ডিশান অফ ইওর পিটি স্যু? গো গেট আ শেল। আমি ভাবছিলাম আর একটুর জন্য ওকে না দুটো ইডি দিয়ে দেয়। অ্যাডজুটেন্টের সামনে কথা বলার মত সাহস কজনের আছে?কি জানি কি হলো হাত উচু করলাম।

বললাম স্যার আজকে ওর বার্থ ডে.. ভেবেছিলাম এবার নির্ঘাত আমাকেই এক্সট্রা ড্রিল দিবে। স্যার বললেন সো…..? গো ব্লাডি হারিআপ। এবার আর বাম হাত ঢুকিয়েও শাশ্বতকে বাচাতে পারলাম না। পানিশমেন্ট খাওয়ার পর অ্যাডজুটেন্টের মুখের দিকে তাকানোর সাহস ওর ছিলনা। কিন্তু আমি খেয়াল করে দেখলাম অ্যাডজুটেন্টের মূখে হাসি ফুটে উঠেছে। তিনি বললোন ইউ বার্থডে বয় কাম হেয়ার এবং গো টু ক্যাফেটেরিয়া এন্ড এনজয় হোয়াট ইউ ওয়ান্ট।ট্রিট ইজ অন মি। অ্যাডজুটেন্টের কথা শুনে তিন কোটি ওয়াটের বাল্বের মত শাশ্বতর মুখটা উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। যদিও তিনকোটি ওয়াটের বাল্ব টমাস আলভা এডিসন কেন তার চৌদ্দপুরুষও কল্পনাও করতে পারবেনা।

আহা কলেজে বার্থডে হওয়ার কত সুবিধা। সাত খুন মাফ বলে যে কথা আছে এটা তার থেকে কম কিসে?

রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে শাশ্বত বিড়বিড় করে বললো জীবনের সেরা জন্মদিন ছিল এটা।কিন্তু সকাল থেকে রাত অবধী আমি যে তার জন্য এতো কিছু করলাম সে একটুও সেটার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলো না।আমরা শুধু মনে মনে ভাবি ইস কেন যে কলেজে বার্থডেটা পড়েনা।

সেই রাজপুত্রটার আজকে জন্মদিন। সে এখন কলেজে নেই তাই জানিনা তার গত বছরের জন্মদিনের কথা মনে আছে কিনা।শুনেছি আজ সন্ধ্যায় ওয়েস্টিনে এক জমকালো জন্মদিনের পার্টি হচ্ছে রাজপুত্রর।আমাকে জানায়নি সে। জানানোর প্রয়োজনও নেই বোধ করি।কারণ আজকের পার্টিতেতো কেউ মেটাল পলিশ নিয়ে কথা তুলবেনা কেউ টয়লেটে যেতে নিষেধ করবেনা,কোন স্টাফ ফল ইনে দেরি করার ওযুহাতে নাম লিখে নেবেনা।তাই সেখানে আমার থাকা আর না থাকা সমান।

আমাকে দাওয়াত দেয়নি বলে আমার মনখারাপ তা কিন্তু নয়।আমি আমার মত আছি। সে যদি যেতে বলে আমি যে কোন সময় যেতে প্রস্তুতি আছি। সন্ধ্যার কিছুক্ষন পর আমার ফোনটা বেজে উঠলো।স্ক্রিনে ওর নামটাই দেখতে পেলাম।রিসিভ করে শুভজন্মদিন বলতেই আহ্লাদে গদগদ হয়ে ও বললো শোন তেমন কিছু করা হচ্ছেনা ছোটখাট একটা পার্টি দিচ্ছি।আমি গাড়ি পাঠাচ্ছি তুই চলে আয়।মনে মনে এতো বেশি খুশি হলাম যে ওর বিগত দিনের সব ভুল এবং আগামীতেও যত ভুল করবে তা অগ্রিম মাফ করে দিলাম।আহ দোস্তর জন্মদিন বলে কথা।

আমি আম্মুর কাছ থেকে এক হাজার টাকা নিয়ে একটা ভাল ব্রান্ডের পারফিউম কিনলাম।অপেক্ষায় আছি ওর গাড়ির জন্য।বাইরে থেকে উচু গলায় কেউ একজন ডাকলো নাম ধরে।গলার স্বর শুনেই বুঝতে পারলাম এটা সাদমান ছাড়া কেউ নয়।শাশ্বত তাহলে সাদমানকে দিয়ে গাড়ি পাঠিয়েছে আমাকে নিয়ে যেতে! নিজেকে ভিআইপি ভাবতে ইচ্ছে হলো। গায়ে তিন পদের সেন্ট মেখে ওর জন্য কেনা গিফটা নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে দেখি সাদমানই দাড়িয়ে আছে।

কাছে যেতেই বললো বাড্ডি দারুন পার্টি হবে আজকে।আসে পাশে তাকিয়ে কোথাও কোন গাড়ি পেলাম না।সাদমানের সাথে একটা ফনিক্স সাইকেল। সেই সাইকেলের ক্যারিয়ারে বসে চলেছি শাশ্বতর জন্মদিনের পার্টিতে। যে পার্টিটা সে আয়োজন করেছে ওয়েস্টিনে।কিন্তু ভেবে পাচ্ছিনা উত্তরা থেকে এই লক্কড়ঝক্কড় সাইকেলে করে কতক্ষণে ওয়েস্টিনের পার্টিতে যেতে পারবো।

আমাকে অবাক করে দিয়ে একটা বাসার সামনে থামলো সাদমানের সাইকেল।দেখি গেটে দাড়িয়ে আছে তুর্য।আমি বুঝে উঠতেই পারিনি সাদমান কেন আমাকে এখানে নিয়ে আসলো আর তুর্যইবা এখনো এখানে দাড়িয়ে আছে কেন। পরে ভাবলাম মনে হয় এখান থেকে সবাই মিলে কোন পাজেরো মার্সিডিজ বা অন্য যে কোন গাড়িতে করে আমরা পার্টিতে যাব।তুর্য আমার কাধে হাত রেখে বললো দোস্ত আজকে সেই মজা হবে।আমি মনে মনে খুশিই হলাম।রুমে ঢুকতেই দেখি শাশ্বতর আম্মু।

আন্টিকে আমি আগে থেকেই চিনি।তার মানে এটা শাশ্বতদের বাসা!তাহলে যে সবাই বললো ওয়েস্টিনে পার্টি হবে।আমি কিছু বললাম না। রাত সাড়ে দশটার দিকে আমরা বাসার ছাড়ে উঠলাম।মনে পড়ে ফজলুল হক হাউজের ছাদে উঠে আমরা কত কি করতাম। ছাদে বিশাল একটা পাটি পেতে দেওয়া আছে সেখানেই বসে আছে শাশ্বত।যার জন্মদিন সে।ওকে শুভেচ্ছা জানিয়ে ওর জন্য আনা গিফটটা ওকে দিলাম। খুশি হয়ে ধন্যবাদ দিল।একটু পরেই আন্টি একটা কেক নিয়ে উপরে আসলেন।আমরা কেক কাটলাম জন্মদিনের।এর পর একটা টিনের জারে মুড়ি আর চানাচুর দিয়ে গেলেন।সেই টিনের জারটা ছিল খুবই পুরোনো এবং জং ধরা।

আমি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললাম বাহ শাশ্বত এই তাহলে তোর ওয়েস্ট টিনের পার্টি!!!!!!!তুর্য সাদমান সহ বাকিরা হেসে উঠলো। আকাশে তখন জোছনারা খেলা করছে। আমার কেন যেন মনে হলো আমরা শাশ্বতদের বাসার ছাদে নই আমরা ফজলুল হক হাউজের ছাদে ক্যাডেটদের প্রিয় থেকে প্রিয়তর মুড়ি চানাচুর পার্টি করছি।কলেজে কারো জন্মদিন মানেই যেটা ছিল অবধারিত।পার্টি শেষে সেদিনও শাশ্বত বললো জীবনের সেরা পার্টি ছিল এটা।আমি জানি বাকি জীবনে যতবার ওর জন্মদিন আসবে সে সেই জন্মদিনটাকেই আগের জন্মদিনের চেয়ে সেরা বলবে।

বলুকনা বলতে তো দোষ নেই। কদিন পর ক্লাস ইলেভেনে কলেজে গিয়ে এবারের জন্মদিন নিয়ে গল্পের ঝুলি খুলে বসবে তুর্য আর সাদমান।আমি তখন ভাব করবো যে আমি কিছু জানিইনা।আর চমকে উঠে বলবো ওর জন্মদিন ছিল?ওহহোরে দেখ আমি কত্ত বড় ইডিয়েট যে ওকে শুভেচ্ছা জানাতেই ভুলে গেছি। এই শাশ্বত এই প্রান্ত এই রাজপুত্র শুভজন্মদিন!