Home Blog Page 21

অগ্নিকান্ডঃ কারণ,প্রতিকার এবং কিছু দাবী

 

আমাদের জীবন আজ আনন্দ বেদনার মহাকাব্য হয়ে গেছে।আমরা প্রতিনিয়ত খুশির সওদা করতে গিয়ে এক সমুদ্র দুঃখ নিয়ে ফিরে আসছি। সেই দুঃখ আজীবন বয়ে বেড়াচ্ছে আমাদের স্বজন।২১ আগষ্ট হঠাৎ করে আবারও বসুন্ধরা সিটিতে আগুন লাগলো। এ নিয়ে মোট তিনবার আগুন লেগেছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই শপিংমলে।

আমরা শপিং করতে যাই খুশি নিয়ে আর ফিরে আসি স্বজন হারানো ব্যাথায় বুক চাপড়াতে চাপড়াতে।এর আগে দুইবার যখন আগুন লেগেছে তখন এই শপিংমলের সংশ্লিষ্টদের আরো সচেতন হওয়া উচিত ছিল।আমার জানতে পেরেছি বিগত দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও তার কোন রিপোর্ট কোথাও জমা পড়েনি।

এরকম একটা স্বনামধন্য শপিংমলে অনাহুত ভাবে অগ্নিকান্ডের ঘটনা তাই জন মনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি করে।ফায়ার সার্ভিসের ২৯টা ইউনিট একাধারে অগ্নিনির্বাপন কাজে নিয়োজিত থেকে ঘন্টার পর ঘন্টা চেষ্টা করে আগুন নিয়ন্ত্রনে আনলেও ততোক্ষণে বেশ কয়েকজন হতাহত হয়েছে।

শুধু বসুন্ধরা সিটির ঘটনাই নয় বরং দেশে প্রতিনিয়ত অসংখ্য অগ্নিকান্ডের ঘটনা আমরা দেখছি।তাজরিন ফ্যাশনের অগ্নিকান্ডের ভয়াবহতা আজও আমাদের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়। কিন্তু তার পরও আমাদের মধ্যে সচেতনতার বড়ই অভাব।

একের পর এক দেশের আনাচে কানাচে শপিংমল, শিল্পকারখানায় আগুন লেগে রক্তমাংসের শরীর পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।এভাবে আর কত দিন? কেন আগুন লাগছে শপিংমল কিংবা শিল্প কারখানায়? কী এর রহস্য? এর থেকে কি কোনই প্রতিকার নেই? কোন ভাবেই কি আগুন লাগা থামানো যায়না? আগুন লাগার কিছু সাম্ভাব্য কারণ আমরা চিহ্নিত করতে পারি।

বৈদ্যুতিক সংযোগ দেয়ার ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় তাড়াহুড়ো করেই হোক আর খরচ বাচাতে গিয়েই হোক নিম্ন মানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে সহজেই তা থেকে শর্টসার্কিট হয়ে আগুন লাগছে।

পোষাক শিল্পে আগুন লাগার ক্ষেত্রে বিশেষত যে কারণটি লক্ষ্য করা যেতে পারে তা হলো কর্মরত অধিকাংশ শ্রমিক কর্মচারি ধুমপান করে। যখন বিরতী দেয়া হয় তখন অনেকেই এখানে সেখানে দাড়িয়ে ধুমপান করে।

এরপর যখন ঘন্টা বা সাইরেন বাজে কাজে ফিরে যাওয়ার তখন অনেকেই হাতের সিগারেট বা বিড়ির অবশিষ্টাংশটুকু যত্রতত্র ফেলে দেয়। সেই রেখে যাওয়া সিগারেটের অল্প একটু আগুন ভেতরের তাপে আরো বেশি উত্তপ্ত হয় এবং একসময় ভয়াবহ আগুন হিসেবে সব জ্বালিয়ে দেয়। মশার কয়েল থেকেও অগ্নিকান্ডের সুত্রপাত হতে পারে।

বিগত বছর গুলোতে দেখা গেছে দেশের আনাচে কানাচে শপিংমল সহ শিল্প প্রতিষ্ঠানে বেশ অনেক বার আগুন লেগেছে এবং প্রতিবারই বেশ কিছু মানুষ মারা যাচ্ছে। যার সবচেয়ে ভয়াবহতা দেখেছি তাজরিন ফ্যাশনের অগ্নিকান্ডে। শত শত মানুষ লাশ হয়ে আজীবনের মত হারিয়ে গেছে।

যাদের অনেককেই কেউ চিনতেই পারেনি। কোন কোন মা তার ছেলেকে শেষ বারের জন্যও দেখতে পায়নি। কোন কোন শিশু তার বাবা মাকে শেষ বারের জন্য বাবা-মা বলে ডাকতে পারেনি। গবেষণায় দেখা গেছে আগুন লাগার সাথে সাথে তা চারদিকে ছড়িয়ে পড়েনা।

চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে এবং ভয়াবহ রুপ নিতে যতটুকু সময় লাগে তার অনেক আগেই ভবন থেকে সব মানুষ নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে পারে। তাহলে কেন সেটা হচ্ছেনা? তার কারণ হতে পারে এরকম যে গার্মেন্টস গুলোতে ঘুরে দেখা গেছে প্রায় সবগুলোতেই একটাই মাত্র পবেশপথ এবং সেই প্রবেশ পথটাও খুব বেশি প্রশস্থ নয়। এ ছাড়া সেটা সব সময় বন্ধ রাখা হয়। ফলে আগুন লাগার পর ভয়ে আতংকে সবাই যখন ছোটাছুটি করে গেটের কাছে আসে এবং দেখে গেট বন্ধ তখন তারা দিশাহারা হয়ে পড়ে। সেই হুড়োহুড়িতেই অনেকে চাপা পড়ে আবার অনেকে জ্ঞান হারায়। এর ফলে হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যায়।

শপিংমল কিংবা কারখানা গুলোতে অগ্নি নিবার্পক ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে সহজে আগুন নিয়ন্ত্রনে আনা সম্ভব হয়না।

কোন এক ফ্লোরে আগুন লাগলে সাথে সাথে যদি অটো অ্যালার্মিং সিস্টেম চালু থাকে  তবে অন্য ফ্লোরে অবস্থানরতরা আগেই স্থান ত্যাগ করতে পারে। এ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে অন্তিম মুহুর্তে সবাই বুঝতে পারে আগুন লেগেছে। ফলে তারা দিশা হারা হয়ে পড়ে। হতাহতের সংখ্যাও বাড়ে।  শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে শপিংমল গুলোতেও সব সময় ভবনের ছাদ বন্ধ থাকে। ফলে দুর্ঘটনার পর ছাদ দিয়ে সহজেই কেউ বেরিয়ে আসতে পারেনা । দেশে শপিং মল,আবাসিক হাউজিং কিংবা শিল্প কারখানা নির্মানের পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা জোরালো তা নিশ্চিত না হয়েই ব্যবহারের জন্য খুলে দেওয়া হয়। ফলে দুঘর্টনার সময় হতাহতের পরিমান বাড়ে।

কোথাও কোন অবস্থাতেই আগুন লাগুক এটা কারো কাম্য হতে পারেনা। সচেতনতাই পারে এর থেকে আমাদের রক্ষা করতে।

প্রথমত ভবন নির্মামের সময় সচেতন ভাবে মানসম্মদ বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে যেন বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের আশংকা শুন্যের কোটায় নেমে আসে। একই সাথে বিপদ কালীন দ্রুত বাহির হওয়ার মত বিকল্প ব্যবস্থাও রাখতে হবে। ভবনের ছাদ সবর্দা খোলা রাখতে হবে এবং ভবনের ছাদের থেকে অস্থায়ী প্রস্থান ব্যবস্থা রাখতে হবে। ভবন ব্যবহারের জন্য চালু করার আগেই নিম্চিত হতে হবে যে সেখানে পযার্প্ত অগ্নিনিবার্পক ব্যবস্থা আছে। ফায়ার স্টিংগুইশার বা ফায়ার এলার্ম বা ওয়াটার হোস পযার্প্ত না থাকা পযর্ন্ত ভবন ব্যবহারের জন্য খুলে দেওয়া যাবেনা। ভবনে নিয়োজিত কর্মচারিদের নিয়োগের আগেই ভালভাবে বিপদ কালীন করনীয় বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। কেননা এতে করে সবাই ধীর স্থির ভাবে কিভাবে বিপদ থেকে বাঁচা যায় তা বুঝতে পারবে। এলার্মিং সিস্টেম নাজুক থাকায় এক ফ্লোরে আগুন লাগলে অন্য ফ্লোরের মানুষ তা জানতেই পারেনা। তাই এলার্মিং সিস্টেমের দুর্বলতা দুর করতে হবে যেন আগুন লাগার সাথে সাথে সবাই সেটা বুঝতে পারে। পযাপ্ত সিসিটিভির ব্যবস্থা রাখতে হবে যেন কোথায় কি হচ্ছে তা সহজেই মনিটর করা যায়। এতে করে বিপদের আশংকা কমে যাবে। শপিংমল এবং শিল্প কারখানার জন্য প্রতি ফ্লোরে অন্তত একজন করে মনিটরিং অফিসার নিয়োগ দিতে হবে। তাদের দায়িত্ব প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা ঘুরে ঘুরে শপিংমল বা কারখানার সব কিছু দেখাশোনা করা। কোথাও কোন সমস্যা থাকলে তার সমাধানের ব্যবস্থা নেওয়া। এমনকি প্রতি সপ্তাহে বা মাসে বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক সব সংযোগ ও অন্যান্য ব্যবস্থা পরীক্ষা করে দেখতে হবে ঠিক আছে কিনা।

আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে অগ্নিকান্ডের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে। আমরা কেউ চাইনা আর কোন ভাইবোন বন্ধু আগুনে পুড়ে বা অন্য কোন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাক। সবাই সচেতন হলেই কেবল আশা করা যাবে যে আর কোন পুড়ে যাওয়া লাশর ছবি কোন পত্রিকার পাতায় আমাদের দেখতে হবেনা।

২৩ আগষ্ট ২০১৬,দৈনিক ইত্তেফাক।

 

অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়। যে স্বপ্ন দেখতে জানে এবং সেই স্বপ্নটাকে সত্যি করতে আপ্রাণ চেষ্টা করে সে সফল হয়। তার স্বপ্নটা সত্যি হয়ে নীল আকাশে ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়। মাতৃভাষা বাংলা করার স্বপ্নে বিভোর আবদুল মতিনেরা কিংবা স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর বঙ্গবন্ধুর সেই দৃপ্ত আহ্বানে সাড়া দিয়ে স্বপ্ন সত্যি করার মিছিলে শামিল হওয়া কোটি বাঙ্গালীর দৃপ্ত শপথই প্রমান করে স্বপ্ন যদি দেখার মত দেখা যায় তবে সেই স্বপ্ন সত্যি হয়।

অথচ আমাদের স্বপ্ন গুলো একটু একটু করে মরে যায়। বুকের মধ্যে তিল তিল করে বেড়ে ওঠা স্বপ্নটা ভেঙ্গে যেতে সময় লাগেনা। কেবল মাত্র পরিসংখ্যনের দিকে তাকালেই আমাদের দুই তৃতীয়াংশর স্বপ্ন ভঙ্গ হয় বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতই। কিছুদিন আগে এসএসসি পরীক্ষা শেষ করেছে যে ছেলে মেয়েগুলো তাদের এখন অখন্ড অবসর থাকার কথা ছিল।কথা ছিল তারা এই সময়টিতে পছন্দ মত জায়গায় ঘুরতে যাবে,আড্ডা দেবে,সিনেমা দেখবে,গল্পের বই পড়বে এবং শান্তিমত ঘুম দেবে। কিন্তু তাদের অধিকাংশের ভাগ্যে ওগুলোর কোনটাই জুটছে না।

এসএসসি পরীক্ষা এবং এর রেজাল্টের জন্য তারা যতটা না চিন্তিত, তার থেকে কয়েক গুন বেশি চিন্তিত কলেজে ভর্তি নিয়ে।আশা নিরাশার দোলাচালে বোর্ড পরীক্ষার চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিয়ে তাদের পড়তে হচ্ছে কলেজ ভর্তি পরীক্ষার পড়া।আমরা কখন যেন নিরবে খুন করেছি তাদের কিশোর মনের অবসর সময়টাকে শিক্ষাব্যবস্থার জাতা কলে পিষে মেরেছি।পাশ করা ছাত্র ছাত্রীদের তুলনায় কলেজ সংখ্যা, বিশেষ করে মানের দিক থেকে এগিয়ে থাকা কলেজ সংখ্যা সীমিত হওয়ায় পরীক্ষার পর অবসরে সময় কাটানোর বিপরীতে তাদেরকে ভর্তি যুদ্ধে নামতে হচ্ছে।কিন্তু তারা জানেই না সেই যুদ্ধে তাদের কোন কোন ভাগ্যবান ভাগ্যবতী জয়ী হবে, আর কাদের আশা ভঙ্গ হবে।

অধিকাংশর আশা ভঙ্গ হবে এটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, কারণ পছন্দসই কলেজ সংখ্যা সীমিত।ফলে কাউকে না কাউকেতো সুযোগ বঞ্চিত হতেই হবে।

সারা দেশে আবারও যখন এক যোগে শেষ হতে চলেছে এইচ এস সি পরীক্ষা তখন তাই সেই স্বপ্ন ভঙ্গের ভয় মনের মধ্যে হানা দিতে শুরু করেছে।যারা পরীক্ষা দিচ্ছে তাদের মনে কত স্বপ্ন বাসা বেঁধেছে।তাদের সেই স্বপ্নের পালে হাওয়া লাগিয়ে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে তাদের বাবা, মা, পরিবার পরিজন।ছেলেটি বা মেয়েটি ডাক্তার হবে, নয়তো ইঞ্জিনিয়ার হবে, নয়তো ভাল কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাল কোন বিষয়ে পড়াশোনা করবে এমন স্বপ্নই দেখেন সবাই।কিন্তু পরীক্ষার রেজাল্ট বের হবার পর যখন ভর্তি পরীক্ষার সময় আসে তখন একে একে ক্রমাগত ভাবে স্বপ্ন ভঙ্গ হয়।স্বপ্নরাও মরে যায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ে সীট সংখ্যা অপ্রতুল এবং পাশ করা ছাত্র ছাত্রীদের তুলনায় বিশ্ববিদ্যালয় সংখ্যাও হাতে গোনা হওয়ার ফলে স্বপ্ন ভঙ্গ হয়।এখন গোল্ডেন জিপিএধারী ছাত্র ছাত্রীই বিশ,ত্রিশ হাজার ছাড়িয়ে যায়, যা আপাত দৃষ্টিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মোট সীট সংখ্যার থেকেও বেশি।

শিক্ষা ব্যবস্থার কতটা উন্নতি হয়েছে সেটা হয়তো পরীক্ষায় বিগত বছর গুলোতে ভাল রেজাল্টের এই পরিসংখ্যন দিয়ে প্রমান করে দেবে কেউ কেউ। কিন্তু বাস্তবতা কতটা নিমর্ম তা কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ না পাওয়া ওই সব মেধাবী ও তাদের পরিবারের মানুষই বুঝতে পারে।

ছাত্রছাত্রীরা এইচ এস সি পরীক্ষা শুরু হওয়ার এক মাস আগে থেকেই ভর্তি যুদ্ধে টিকে থাকার লড়াইয়ে অংশ নিতে ভর্তি হয়ে গেছে কোচিং গুলোতে।প্রতি বছর আমাদের কোন কোন শিক্ষাবিদ কোচিং বানিজ্য বন্ধের কথা বললেও খোদ সেই সব শিক্ষাবিদদের ভর্তি পরীক্ষার্থী সন্তানেরাই সবার আগে ভর্তি হচ্ছে কোচিং সেন্টার গুলোতে।

পথে কুড়িয়ে পাওয়া দুই টাকার একটা নোট হারিয়ে গেলে যতটা না কষ্ট হয় তার থেকে বেশি কষ্ট হয় যদি সেই দুই টাকার নোটটি কষ্টার্জিত হয়।বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স না পেলে বা ভাল কলেজে ভর্তির সুযোগ না পেলে কষ্টটা যতটা হওয়ার কথা তার চাইতে কয়েক গুন বেশি কষ্ট হয় ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে গিয়ে যে ভোগান্তির শিকার হতে হয় তার জন্য।নীলফামারী,কুড়িগ্রাম বা সুদুর বাগেরহাটের অজপাড়া গায়ের দিনমজুরের ছেলে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির স্বপ্ন বুকে নিয়ে সারা বছরের ধান গম বিক্রি করে কিছু টাকা পকেটে নিয়ে ঢাকা শহরে আসে তখন সে প্রথমেই চমকে ওঠে।

এ শহর,এ শহরের লাল নীল বাতি আর ব্যস্ততার ভীড়ে তার স্থান কোথায়।অনেক কষ্টেও সে যদি কোন একটা মেসে ওঠে তবে খরচ চালানো এবং পড়াশোনা চালানোর ধাক্কায় সে হাপিয়ে ওঠে। তার স্বপ্নটাতো তখনই অর্ধেক মরে যায়।

অন্যদিকে কেউ কেউ তাদের সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ঢাকাতে ওই অল্প কয়েক মাসের জন্য শত ত্যাগ স্বীকার করে হলেও বাসা ভাড়া নিতে বাধ্য হয়।সন্তানের ভবিষ্যত নিশ্চিত করতে চায় সব বাবা মা ই।তাইতো যাদের ন্যুনতম সামর্থ আছে তারা চড়া মুল্যের এই বাজারে ফ্ল্যাট ভাড়া নিতেও পিছপা হয়না।

সেই বাবা মা এবং সেই সন্তান যখন চেষ্টা করে স্বপ্নটাকে সত্যি করতে তখন তার থেকেও হয়তো বেশি মেধাবীরা তাকে পিছনে ফেলে ভর্তি যুদ্ধে এগিয়ে গিয়ে সেই স্বল্প সংখ্যক আসন জিতে নেয়।তখন ওই সব পরিবার এবং যাকে নিয়ে স্বপ্ন বোনা সেই শিক্ষার্থীর কি পরিণতি হয় ভেবে দেখার কেউ নেই।হয়তো কেউ কেউ বলবেন সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পারলে কারো জীবন বৃথা হয়ে যায় না। তা হয়তো ঠিক কিন্তু যে হত দরিদ্র কৃষকের ছেলেটি সরকারী মেডিকেলে ভর্তি হয়ে ডাক্তার হতে চেয়েছিল সে নিশ্চই ক্ষমতা রাখেনা বেসরকারীতে পড়ার। কিংবা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ও তাকে ডাক্তার হওয়ার সুযোগ দেওয়ার  ক্ষমতা রাখেনা।

আর্থিক ভাবে স্বচ্ছল পরিবার হয়তো তাদের সন্তানদের ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বানাতে দেশে বিদেশের বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর নির্ভর করতে পারে কিন্তু আমাদের দেশের অগণিত হতদরিদ্র চাষাভোসা দিনমজুরের ছেলে মেয়েদের কি হবে।তাদের স্বপ্ন কি এভাবেই অঙ্কুরেই শেষ হয়ে যাবে।আগামীর বিশ্বকে মেধার বিশ্ব বলা হচ্ছে। সেই বিশ্বে টিকে থাকতে হলে মেধার অবমূল্যায়ন রোধ করতেই হবে।আর সে জন্য দরকার শিক্ষা খাতে আরো বেশি বিনিয়োগ এবং আরো বেশি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন।পদ্মাসেতুর মত বড় প্রকল্পের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আসন বৃদ্ধির দিকেও তাই নজর দেওয়া উচিত।সেটা না করতে পারলে সবার অগোচরে ফুটে ঝরে যাওয়া কোন সুগন্ধী ফুলে মতই হয়তো ঝরে যাবে হাজার হাজার অমিত সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থী। সেই সাথে ক্রমাগত ভাবে স্বপ্ন ভাঙ্গার মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকবে।

……………………………………………………

২০ মে ২০১৬,দৈনিক ইত্তেফাক।

কেউ কথা রাখেনি

বাঙালীর মূখে বুলি ফুটেছে।এখন সে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে।তবে সেই সব কথা প্রগল্ভতায় ভরা।বাঙ্গালীর নতুন নাম দেওয়া যেতে পারে কথা বলার বাঙ্গালী। তবে কথারও লিমিট থাকা উচিত।রাজনৈতিক নেতাদের সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আমাদের কথা বলার প্রতিযোগিতা। কে কত কথা বলতে পারে সেটাই যেন মুখ্য বিষয়। স্বাধীনতার পর এ দেশটা ক্ষুধা দারিদ্র্যের চরম পর্যায়ে ছিল।ধীরে ধীরে একটু একটু করে দেশটা অনেকটাই এগিয়েছে। আরো অনেক বেশি এগিয়ে যেতে পারতো যদি আমাদের লাগামহীন কথা বলা বন্ধ করা যেত। চারদিকে আজ কথা কিংবা অকথার ফুলঝুরি। রাস্তার মোড়ে মোড়ে সত্তুর পার্সেন্ট ডিসকাউন্টে এনার্জি লাইটের বিজ্ঞাপনের শব্দ শোনেনি ঢাকাতে এমন একটা মানুষও পাওয়া যাবে বলে মনে পড়েনা। লাগামহীন ভাবে বলে চলছে দোকানে কিনতে গেলে বেশি লাগবে আমাদের থেকে নিয়ে অতো পার্সেন্ট ডিসকাউন্ট। দোকানে যদি বেশি দামেই বিক্রি করা যায় তবে কোম্পানী কেন কম দামে বিক্রির জন্য রাস্তার মোড়ে মোড়ে শব্দদুষণ করছে। এগুলো আমাদের গা সওয়া হয়ে গেছে।

ক্লাসে শিক্ষকদের কথা বলা কমেছে।তারা বরং ছাত্রদের বলে অমুক চ্যাপ্টার বাসা থেকে পড়ে এসো।অথচ তাদের ক্লাসে কথা বলার কথা ছিল। তাই বলে মাঠে ময়দানে কথা বলা কিন্ত কমেনি। রাজনৈতিক নেতারা গলা ফাটিয়ে কথার ফুলঝুরি আর মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে,টিভিতে টকশোতে কতিপয় জ্ঞানীজন জ্ঞান বিলিয়ে যাচ্ছে। যিনি ওপার বাংলার সিরিয়ালের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বক্তব্য দিয়ে বাহবা পাচ্ছেন তার ঘরেই হরহামেশা চলছে জিবাংলা, স্টার জলসা কিংবা ডোরেমন নবিতাদের নিয়ে মাতামাতি। আজ থেকে অনেক বছর আগে সুনীল গঙ্গোপাধ্যয় একটা কবিতা লিখেছিলেন ‘কেউ কথা রাখেনি’। তিনি তার কবিতায় তেত্রিশ বছর অপেক্ষার কথা বলেছেন। আমরা অপেক্ষায় আছি তার থেকেও বেশি। আসলে কেউ কথা রাখেনি,কেউ কথা রাখেনা।

হাটি  হাটি পা পা করে উন্নয়নের পথে একটু একটু করে এগিয়ে যাওয়া আজকের বাংলাদেশেও অনেক দৃশ্য আমাদেরকে খুব কষ্ট দেয়, তার একটি হল রাস্তায় ঘুমন্ত মানুষ। এখানে সেখানে ওভার ব্রিজে প্রায়ই দেখা যায় অর্ধেক শরীর রেলিঙের বাইরে রেখে ঘুমিয়ে আছে। একটা বাতাস এলেই ধুপ করে নিচে পড়বে। শহরের রাস্তার যেখানটায় আমরা থুতু ফেলি রাত হলে সেখানটাতেই কোন কোমল শরীর আলতো করে শুয়ে থাকে; এর চেয়ে স্পর্শকাতর ব্যাপার আমাদের জন্য আর কী হতে পারে?

কেন এত মানুষ রাস্তায় ঘুমায়?এই প্রশ্নটির উত্তর আমি আপনি সবাই কম বেশি জানি। প্রতিনিয়ত কর্মব্যস্ত এই শহরে গ্রাম থেকে ছুটে আসছে হাজার হাজার মানুষ। ভাগ্য বদলের আশায় ঢাকায় আসা মানুষের অধিকাংশই দিশেহারা হয়ে পড়ছে এ শহরের নির্মমতা দেখে। রাস্তায় রাত কাটানো মানুষ গুলির প্রতি আমাদের যে আবেগ তার প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলা যেতে পারে যে, তাদের অধিকাংশ স্বভাবের কারণে তারা রাস্তায় থাকে। চোখ কান খোলা রেখে যারা রাস্তায় চলাচল করে তারা দেখেছেন যে কত মানুষ কতরকম ব্যবসা করেইনা দিনযাপন করছে। অনেকেই এক গ্লাস পানিতে একটু লেবু চিবিয়ে চিনি নাড়িয়ে  পাঁচ টাকা দিয়ে বিক্রি করছে। প্রতিদিন দুশো গ্লাস বিক্রি হলেও তার আয় হচ্ছে এক হাজার টাকা। কিংবা খুব সামান্য টাকা দিয়ে কেউ কেউ একটা ওজন মাপার মেশিন কিনে পার্কের সামনে কিংবা অন্য কোথাও বসে যাচ্ছে। স্টেশনে শুয়ে না থেকে একটা ফ্লাক্স কিনে অনেকেই রাস্তায় চা বিক্রি করছে।

এক হাজার টাকা দিয়ে যে কোন একটা বস্তিতে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকা যায়। অর্থাৎ কেউ ইচ্ছে করলেই তার দু দিনের পারিশ্রমিক দিয়ে ফুটপাতে না থেকে একটা বাসা ভাড়া নিয়ে সুন্দর করে থাকতে পারে। তবু এই কাজটি করবে না ওই সব রাস্তায় শুয়ে থাকা মানুষ গুলো। কেননা তারা অলস কিংবা তাদের অধিকাংশই দিনে রাতে নানা অকাজে লিপ্ত থাকে। একদল মানুষ নির্মাণাধীন ভবনে ইট ভাঙ্গবে, রোদে পুড়ে উদাম গায়ে ঠেলাগাড়ি ঠেলবে এবং আরেক দল মানুষ এই কাজটি না করে রাস্তার মাঝখানের আইলেনে শুয়ে থাকবে। আমরা কোন কোন সাংবাদিকেরা সেই ঘুমন্ত মানুষ গুলোর করুণ ছবি তুলে করুণার ক্যাপশন দিবো!

নামাজ পড়ার পর দেখবেন বাইরে অনেকে ভিক্ষা করছে। তাদের দিকে তাকিয়ে দেখবেন অধিকাংশই কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করার ক্ষমতা থাকার পরও ভিক্ষা করছে। শরীর না খাটিয়ে যদি দুই চার পয়সা কামাই করা যায় তাহলে কাজ করে লাভ কি এই চিন্তাই তাদের মাথায় কাজ করে। মুখটাকে এমন করুন করে আর এমন সারল্য ফুটিয়ে তোলে যে আপনার আমার মনে আপনা আপনি দয়া উথলে ওঠে। ব্রিজে অর্ধেক শরীর রেলিঙের বাইরে রেখে যে যুবক ঘুমিয়ে আছে সে ইচ্ছে করলেই একটা টিনের বাসায় ফ্যান ছেড়ে ঘুমাতে পারতো। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে যে ছেলেটি চাকরী না পেয়ে হীনমন্যতায় ভুগছে; ইচ্ছে করলেই সে পানিতে লেবু চিবিয়ে রাস্তায় দাড়িয়ে যেতে পারে না। আমাদের এই নিষ্ঠুর সমাজ ব্যবস্থাই তার জন্য এ কাজটাকে কঠিন করে দিয়েছে। কি পরিমান মানসিক কষ্টে তারা আছে সেটা আমি আপনি জানার পরও অনুভব করতে চেষ্টা করিনা। তাদের পরিপাটি শার্ট প্যান্ট আপনাকে আমাকে তাদের অর্থ কষ্টের কথা বুঝতে দেবে না। অথচ আমরাই ক্ষমতায় যাবার জন্য প্রতিশ্রুতির বন্যা বইয়ে দিতে দ্বিধা করিনা। ঘরে ঘরে চাকরি দেবার নামে যে মিথ্যে প্রতিশ্রুতি আমরা দিয়েছি তার কিছুই হয়নি। আগামীতেও আমাদের কথা বলা বন্ধ হবেনা।

বেকারত্ব শীতের দিনে কম্বল কালেকশনের কোন ইভেন্ট না যে একদিন পর সেটা নিয়ে আর ভাবা লাগবেনা। লক্ষ লক্ষ বেকার যুবকের বছরের পর বছর খালি পকেটের দায়িত্বটা যাদের তারা কেউ কথা রাখেনি। কথা রাখেনি সরকার,বিরোধীদল,হিউম্যান রাইটস, শিল্পতি, এনজিও… কেউ কথা রাখেনি। কিন্তু তারা কথা বলছে অবিরাম।যাদের কাছ থেকে আমরা কিছু আশা করি… যাদের জন্য বেঁচে থাকতে ইচ্ছে জাগে,সেই সব বুদ্ধিজীবীরাও কথা রাখে নি। বড় বড় গায়ক, ক্রিকেটার, লেখক,অভিনয় শিল্পী কেউ কথা রাখেনি। অথচ তাদের মুখে টিভিতে হরহামেশাই দিনবদলের কথা শুনতে পাই।কেউ কেউ বলে ‘ এবার নতুন কিছু কর’ কিন্তু তারা নিজেরাই নতুন কিছু করেনা। কেউ কেউ বলে , ‘ জেগে ওঠো আপন শক্তিতে ‘ কিন্তু তারাই জেগে ওঠা মানুষদের ঘুম পাড়িয়ে দেয়। কেউ কেউ শ্লোগান দেয় “যতদিন আমাদের হাতে থাকবে দেশ,পথ হারাবেনা বাংলাদেশ” কিন্তু বেকারত্বের বোঝা মাথায় নিয়ে ক্রমাগত নষ্ট পথে পা বাড়াতে বাধ্য হওয়া যুবকটির হাতে দেশ থাকার সুযোগ কোথায়,দেশটাইবা তাহলে পথহারাবেনা কেন? তাহলে  এই সব স্লোগান দিয়ে কী হবে ? সব ভাওতাবাজি। মধ্যবিত্তরা তাদের কষ্ট বুকের ভেতরে রেখে শার্টের বোতাম লাগিয়ে রাখে।

ফিদেল ক্যাস্ট্রোকে বলা হয়েছিল আপনি যদি জনগনকে তামাকের ক্ষতিকর দিকটার কথা বলতেন তবে জনগন সেটা শুনতো এবং ক্ষতির হাত থেকে বাঁচতে পারতো। ক্যাস্ট্রো দেখলেন তিনি নিজেই যেখানে চুরুট খান সেখানে কোন মূখে জনগনকে তামাক বর্জনের উপদেশ দিবেন। তিনি আস্তে আস্তে নিজেই চুরুট ছেড়ে দিয়ে একদিন দেশবাসীকে তামাক ছাড়ার আহ্বান করলেন। কিন্তু আমরা শহর পরিস্কার রাখো বলে লম্বা বক্তৃতা দিয়ে নিজের খাওয়া কলার খোসাটা রাস্তার মাঝখানে ফেলে দেই।গ্যাসের  অপচয় বন্ধ করতে বলি আর  ম্যাচের কাঠি বাঁচানোর জন্য ঘরের চুলাটা জ্বালিয়ে রাখি।আমরা কথা বলি কিন্তু কথা রাখিনা।

………………………………………..

২৮ এপ্রিল ২০১৬,দৈনিক ইত্তেফাক।

সাহিত্যের হারিয়ে যাওয়া এক রাজপুত্রঃ শহীদুল জহির

খুব অল্প জীবন নিয়ে কারো কারো আগমন ঘটে অনেকটা ধুমকেতুর মত।ধুমকেতু ক্ষণস্থায়ী হয় অনেকটা রংধনুর মত কিন্তু সেই সব অল্প জীবন নিয়ে আসা মানুষগুলো যে দীপ্তি ছড়িয়ে যায় তার রেশ যুগের পর যুগ থেকে যায়। সেই যাদুবাস্তবতায় মুগ্ধ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায় সাহিত্য প্রেমী অগণিত পাঠক।২৩ মার্চ তাই বাংলা সাহিত্যের জন্য হয়ে ওঠে এক বেদনার রঙে রাঙ্গা দিন।

“হিয়ার মাঝে লুকিয়ে ছিলে দেখতে আমি পাইনি” কবিগুরুর এই গানের কথাকে সত্য প্রমান করতেই কিনা জানিনা যুগে যুগে অনেক ক্ষণজন্মা মনীষীকে দেখেছি নিভৃতে জীবন কাটিয়েছেন,সবার অলক্ষ্যে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। সেই ধারায় প্রথম যে নামটি আমরা দেখতে পাই তিনি জীবনানন্দ দাশ।তার চলে যাবার পর ধীরে ধীরে তিনি ক্রমাগত ভাবে নতুন রুপে আবিস্কৃত হয়েছেন এবং হচ্ছেন। তার ফেলে যাওয়া জংধরা ট্রাংকটি তাই হয়ে ওঠে সাহিত্য প্রেমীদের কাছে আলাউদ্দিনের আশ্চর্য প্রদীপের মতই। সেখান থেকে বেরিয়ে আসে অমূল্য সব সাহিত্য।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পর সম্ভবত জীবনানন্দ দাশের কবিতাই সর্বাধিক পঠিত এবং কোন কোন ক্ষেত্রে রবী ঠাকুরের কবিতার চেয়েও তার কবিতা হয়ে উঠেছে জনপ্রিয়তম।

জীবনানন্দ দাশের মতই নিভৃত জীবন,অলক্ষ্যে মৃত্যু অতঃপর ধীরে ধীরে আবিস্কৃত হচ্ছেন যে মানুষটি তিনি কেবলই একজন সাহিত্যিক নন বরং সাহিত্যের বোদ্ধা পাঠকদের চোখে তিনি যাদু বাস্তবতার কারিগর।তিনি শহীদুল জহির।১১ সেপ্টেম্বর ১৯৫৩ তে যার জন্ম হয়েছিল।

শহীদুল জহিরকে প্রথম চিনেছিলাম শ্রদ্ধাভাজন লেখক “শাহাদুজ্জামান”র লেখা “লেখালেখি” বইটি পড়তে গিয়ে। সেই প্রথম শহীদুল জহির সম্পর্কে জানতে পারি। শাহাদুজ্জামান একজন শক্তিমান লেখক হিসেবে শহীদুল জহিরকে তার ছোট্ট প্রবন্ধটিতে সুন্দর ভাবে তুলে ধরতে চেষ্টা করেছেন। “ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প” এর এই লেখক মাত্র ৫৫ বছরের এক ছোট্ট জীবন নিয়ে আমাদের মাঝে এসেছিলেন। ২০০৮ সালের ২৩ মার্চ যখন তিনি সবার অলক্ষ্যে চিরদিনের মত চলে গেলেন অন্য ভূবনে, তখনো তাকে খুব একটা মানুষ চিনতো না। যদিও তার লেখক জীবনের বিস্তৃতি ছিল প্রায় ত্রিশ বছরের কিছু অধিক।

লেখালেখিতে ছিল তার প্রচন্ড ভালবাসা।একটা লেখা লিখতে তিনি নিয়েছেন ব্যপক প্রস্তুতি। তাইতো আমার দেখতে পাই তার প্রথম বই প্রকাশ পায় ১৯৮৫ সালে। এক বই মেলাতে “দীপু মাহমুদ” “তৌহিদুর রহামন” “মোশতাক আহমেদ” “ইমদাদুল হক মিলন” যেখানে আট দশটি বই বের করছেন সেখানে ত্রিশ বছরের লেখক জীবনে শহীদুল জহিরের মোট বই সংখ্যা মাত্র ৭টি। হালের নাম ধারী প্রচার সর্বস্ব লেখকরা যেখানে বছরে দশ বারোটা বই লিখেছেন সেখানে শহীদুল জহিরের সারা জীবনের রচনাও সেই এক বছরের লেখার সংখ্যাকে ছাড়াতে পারেনি।

কিন্তু সংখ্যাধিক্য নয় বরং সাহিত্য মান বিচারে হালের অধিকাংশ সাহিত্যিককে যোজন যোজন পিছনে ফেলে হিমালয় সমান উচ্চতায় নিয়ে গেছেন তার যাদুবাস্তবতার মিশেলে অনন্য সব সাহিত্যকে।আমার দেখতে পাই তার জীবদ্দশায় ৬টি গ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছিল। তার রচিত সাতটি গন্থের মধ্যে চারটি উপন্যাস আর তিনটি গল্প সংকলন।

মাত্র ৭টি গ্রন্থ দিয়েই বাংলা সাহিত্যের ভূবনে তার স্বতন্ত্র স্থান নিশ্চিত করে গিয়েছেন শহীদুল জহির। অন্য অনেক লেখক একশোর অধিক বই লিখেও শহীদুল জহিরের সাহিত্য মানের এক ছিটেফোটা অংশও অর্জন করতে পারেনি।এখানেই শহীদুল জহির অনন্য।

শহীদুল জহির অনন্য তার ভাষা ও বর্ননাভঙ্গীর সাবলিলতা ও মায়াবি ব্যবহারে। সম্পূর্ন অভিনব ও ভিন্নধর্মী তার ভাষার ব্যবহার ও কাহিনীর বর্ননাভঙ্গী। শহীদুল জহির ও তার সাহিত্যকে তাই মেলানো যাবে না বাংলা সাহিত্যের আর কোন লেখকের সাথে। তার কোন পূর্বসূরীকেই তিনি প্রতক্ষ্যভাবে এমনকি অবচেতন ভাবেও অনুসরণ করেননি। সম্পূর্ন নতুন পথে হেটেছেন তিনি। পুরনো সব প্রথা ডিঙিয়ে বাংলা ভাষাকে ব্যবহার করেছেন সম্পূর্ণ নিজের মত করে।

শহীদুল জহিরের ছিল গল্প বলার নতুন ভঙ্গি। পাঠক যখন তার কোন গল্প নিয়ে বসে তখন অবাক হয়ে দেখে তার গল্পের ভিতরে অসাধারণ কোন কাহিনী নেই। কিন্তু তার ভিন্নধর্মী দৃষ্টিভঙ্গি ও উপস্থাপন সাধারন একটা কাহিনীর মাঝ থেকে বের করে আনে অসাধারণ কিছু। তিনি যেভাবে দেখেছেন সেভাবে পাঠক না দেখেছে তার নিজের অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে, না দেখেছে অন্য কোন লেখকের চোখে।

শহীদুল জহিরকে বলা হয় উত্তর-আধুনিক বাংলা সাহিত্যের রুপকার। বাংলা সাহিত্যে যাদু-বাস্তবতার প্রথম সার্থক প্রয়োগ হয় তার হাত ধরেই। অনেকের মতে তার শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘সে রাতে পূর্ণিমা ছিল’র কথা। অদ্ভুত ভাললাগার এক কুহকী জগৎ তিনি চিত্রায়ন করেছেন উপন্যাসটিতে। যে জগতের মায়াময় গোলকধাঁধায় পাঠক ঘুরপাক খেতে থাকে একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে।

শহীদুল জহিরের প্রথম উপন্যাস ‘জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা’। আপাত দৃষ্টিতে হয়তো খুবই সাদামাটা একটা নাম। এই সাদামাটা নামের ভিতরে আছে মুক্তিযুদ্ধের উপরে লেখা অন্যতম শ্রেষ্ঠ একটি উপন্যাস। এখানেও আছে শহীদুল জহিরের পরশপাথর ‘অভিনব দৃষ্টিভঙ্গি’। মুক্তিযুদ্ধকেও তিনি তুলে ধরেছেন ভিন্ন আঙ্গিকে। আবেগের বিন্দুমাত্র আতিশয্যে না যেয়ে সম্পূর্ন নির্মোহভাবে একত্তরের ভয়াবহতাকে তার মত কেউ প্রকাশ করতে পেরেছেন বলে মনে হয় না।

তিনি পুরান ঢাকার ভাষাকে এমন সাবলিল ভাবে ব্যবহার করেছেন যা পড়লে মুগ্ধতার রেশ আর কাটেনা।
‘‘আমাদের মহল্লা, দক্ষিণ মৈশুন্দির শিল্পায়নের ইতিহাস আমাদের মনে পড়ে; মহল্লায় গরম পড়তে শুরু করলে চৈত্র, বৈশাখ অথবা জ্যৈষ্ঠ মাসে তরমুজওয়ালা তরমুজ নিয়ে আসে এবং আমরা তরমুজ খেতে শুরু করি,’’
এখানের এই আখ্যানকারি ‘আমরা’ কখনো বা একদল স্কুল পড়ুয়া কিশোর, কখনোবা একদল কারখানার শ্রমিক। একই সাথে অতীতের, বর্তমানের ও ভবিষ্যতের পথে বিচরন করছে। ব্যক্তি ও কালের এই আন্তর্পরিভ্রমণ তার অনেক লেখাতেই পাওয়া যায়।

কারো কারো মতে শহীদুল জহিরের লেখায় বাংলা সাহিত্যের  কোন পূর্বসূরীদের প্রভাব তেমন একটা না থাকলেও মার্কেজের প্রভাব আছে। কিন্তু সেই প্রভাব অনুকরণের পর্যায় যায় নি কখনো, অনুপ্রেরণার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। যাদু-বাস্তবতার ভাবনাটাই শুধু নিয়েছেন। ভাষা থেকে শুরু করে কাহিনী, চরিত্র সবকিছুই তার নিজস্ব উদ্ভাবনী ক্ষমতায় উদ্ভাসিত।

শহীদুল জহির জীবদ্দশায় জনপ্রিয় ছিলেন না। নিভৃতচারী এই মানুষটি খুব একটা পরিচিতও ছিলেন না। কখনো জনপ্রিয় হওয়ার জন্য চেষ্টাও নি। হয়ত বুঝতে পেরেছিলেন তাকে গ্রহণ করার জন্য এখনো রূচিগতভাবে প্রস্তুত নয় বাংলাদেশি পাঠকেরা। আজকের এই আধুনিক যুগে এখনো যে তিনি খুব পরিচিত হয়েছেন বলা যায় না। কিন্তু নিশ্চিতভাবেই তার পরিচিতি দিনদিন বাড়ছে। তিনি আবিষ্কৃত হচ্ছেন প্রতিনিয়ত, মূল্যায়ন পাচ্ছেন। অথবা বলা চলে স্বর্ণকে কেউ স্বর্ণ বলে মেনে না নিলে যেমন স্বর্ণের স্বর্ণত্ব বিলোপ হয়না তেমনি শহীদুল জহিরও হারিয়ে যেতে পারেন না।

তার রয়েছে নিজস্ব পাঠক গোষ্ঠী। নতুন কোন পাঠকের হাতে যখন তার বই উঠছে ক্রমাগত ভাবে সেও হয়ে উঠছে শহীদুল জহিরের একান্ত পাঠক।

বাজারের লেখক বলে প্রচলিত কথাটি কখনোই শহীদুল জহিরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ছিলনা। তিনি লিখতেন আপন মনে আপন ভঙ্গিমায়। তাইতো তার লেখার সংখ্যাও সর্বসাকুল্যে মাত্র ৭টি বইয়ে সীমাবদ্ধ থেকে গেছে। প্রচলিত ধারার বাইরে আমাদের বাংলা সাহিত্যে যারা একটু অভিনবত্ব এনেছেন, দুঃখজনকভাবে তাদের লেখার সংখ্যা বেশ কম। সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, শহীদুল জহির সবাই লিখেছেন কম কিন্তু উপহার দিয়েছেন নতুন কিছু। হায় আফসোস তাদের জীবনকালও তাদের লেখার সংখ্যার মতই ছিল।

আমরা যখন তার “ডলু নদীর হাওয়া ও অন্যান্য গল্প” বইটি হাতে নেই দেখতে পাই সাদামাটা রোজকার কিছু কথাবার্তা তিনি এমন ভাবে তুলে ধরেছেন যে পাঠক মাত্রই মুগ্ধ হয়ে আছেন।যেতে নাহি দিব হায় তবু যেতে দিতে হয়,তবু চলে যায়।

শহীদুল জহিরও চলে গেলেন। সমকালীন জনপ্রিয় লেখক আনিসুল হক তার “লেখা নিয়ে লেখা” বইটিতেও শহীদুল জহিরকে নিয়ে লিখেছেন।অন্য আরো অনেকেই শহীদুল জহির ও তার সাহিত্য কর্ম নিয়ে লিখছেন। সময় এসেছে এই ক্ষণজন্মা সাহিত্যিককে লাইম লাইটে নিয়ে আসার। তার রেখে যাওয়া অসাধারণ সাহিত্যকর্মকে সাধারণ মানুষের হাতে তুলে দেওয়া। সাহিত্য প্রেমীরা দেখুক বাংলা সাহিত্য কোন মানের একজন লেখককে হারিয়েছে।

আরো বছর বিশেক বাঁচলে কি হতো, কম করে হলেও আরো গোটা পাঁচেক বই আমাদের উপহার দিয়ে গেলে কি হত! কিন্তু ওপারের ডাক সম্ভবত তিনি আগেই শুনতে পেয়েছিলেন কিংবা শুনতে চেয়েছিলেন।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের পর তিনিই সম্ভবত বাংলা সাহিত্যে ভিন্ন ধারার একটি স্রোত তৈরি করেছিলেন।

আট বছর আগে আজকের এই দিনে তিনি চলে গিয়েছিলেন। কী আশ্চর্য তখনোতো আমি টিএসসি,শাহবাগ দিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি,তখনোতো আমি বারডেমে ঘুরেছি। কিন্তু এই যাদুবাস্তবতার কারিগর এতো কাছে থাকার পরও তাকে ধরতে পারিনি, তিনি থেকেছেন তার নিজস্ব যাদুবলয়ে। তারাশঙ্করের কবি উপন্যাসের সেই কথাটি বার বার মনে পড়ছে “জীবন এতো ছোট কেনে”

শহীদুল জহির চলে গেছেন না ফেরার দেশে কিন্তু রেখে গেছেন এমন কিছু যা সাহিত্য মান বিচারে বাংলা সাহিত্যের ভান্ডারে যোগ করেছে কোহীনুরের মত এক অমূল্য রতন।শহীদুল জহিরেরা তাই মরে গিয়েও বার বার ফিরে আসে পাঠকের হৃদয়ে ভালবাসা হয়ে।

…………………………………………

২৫ মার্চ ২০১৬,গ্লোবালপোষ্ট।

 

পৃথিবীতে শান্তি বিরাজ করুক

সম্প্রতি ফ্রান্সে যে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড ঘটেছে তা নিয়ে সারা বিশ্বে নিন্দা ক্ষোভ প্রকাশের মহড়া দেখা গেছে।সেই ধারা অব্যাহত ছিল বাংলাদেশীদের মধ্যেও। এটা অবশ্যই স্বাভাবিক যে,যে কোন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে আমরা অবস্থান করবো এবং ওগুলোকে ঘৃণা করবো।

এই ঘৃণা প্রকাশের রীতি বহুপুরাতন হলেও এখন নতুন ভাবে সেটা প্রকাশ হচ্ছে। এবং সব কিছুকে ছাড়িয়ে গেছে ফেসবুক নামক আজব দুনিয়ার আগমনের মাধ্যমে।ফ্রান্সে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় যখন গোটা বিশ্ব ক্ষোভে ফেটে পড়ছে তখন ফেসবুক একটা অ্যাপস বানিয়েছে যার মাধ্যমে ফ্রান্সকে সাপোর্ট করার জন্য নিজের ফেসবুক প্রোফাইলের ছবিটি ফ্রান্সের পতাকার আদলে রাঙিয়ে নেওয়া যাবে। আর এটা ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে যে কোন মহামারির থেকেও দ্রুত গতিতে।

যদি ১৪৯ কোটি ফেসবুক ব্যবহারকারীর মধ্যে কমপক্ষে ৮০ কোটি ব্যবহারকারী এটা করেছে।কিন্তু আমাদের কাছে মোটেও বোধগম্য হয়নি যে ফ্রান্সে সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদ স্বরুপ ফ্রান্সের পতাকায় নিজের ফেসবুক প্রোফাইল রাঙিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে কিভাবে প্রতিবাদ করা হলো বা ফ্রান্সকে কিসের ব্যাপারে সাপোর্ট করা হলো।

ধরে নেওয়া যাক যে এটা একটা অভিনব পন্থা এবং সত্যি সত্যি কেউ যদি তার ফেসবুক প্রোফাইল ফ্রান্সের পতাকার রঙে রাঙিয়ে নেয় তবে সে ফ্রান্সে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া ঘটনার নিন্দা জানাতেই এই পদক্ষেপ নিয়েছে।

এখানেই অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন এই বলে যে গোটা বিশ্বে, বিশেষ করে সিরিয়া,আফগানস্থান আর ফিলিস্তিনে দীর্ঘদিন ধরে মুসলিম নিধন চলছে,কিংবা মুসলিম নিধনের সাথে সাথে সেই সব হামলায় অন্যান্য ধর্মাবলম্বীরাও মারা যাচ্ছে আর তা হিসাব করলে ফ্রান্সের হামলায় যতজন মারা গেছে তার থেকে কয়েক হাজার গুন বেশি। সেই সব হামলার প্রতিবাদেতো কেউ কোন দিন সেই সব দেশের পতাকার রঙে নিজেদের ফেসবুক প্রোফাইল পরিবর্তন করেনি।

রানা প্লাজা ধ্বসে অনেক মানুষ মারা গেছে যদিও সেটা দুর্ঘটনা ছিল তার পরও সেটার সমব্যাথী হয়ে কেউতো ওভাবে বাংলাদেশের পতাকায় নিজেদের প্রোফাইল রাঙায়নি।

নাকি তখন ফেসবুক ছিলনা?পিনাক নামক লঞ্চ ডুবে যখন অনেক মানুষের প্রাণহানি ঘটলো তখনো বাঙ্গালীরা নিশ্চুপ ছিল অন্তত ফেসবুকীয় আঙ্গিনায়।একেই বলে হুজুগে বাঙ্গালী।

ফেসবুক প্রোফাইলে পতাকার রঙে রাঙ্গালেই যদি প্রতিবাদ করা হয় কিংবা সাপোর্ট করা হয় তবে আমরা অবশ্যই সেটাকে সমর্থন করি।

কিন্তু কেন সেটা সব দেশ ও জাতির জন্য প্রযোজ্য নয় সেটাই আমাদের প্রশ্ন।সিরিয়া,আফগানস্তান বা ফিলিস্তিনে ইসরাইলকর্তৃক হামলায় হাজার হাজার নারী পুরুষ ও শিশু মারা গেলে আমরা প্রতিবাদ করতে পারিনা কিন্তু ফ্রান্সের ঘটনায় প্রতিবাদের নামে নাটক করি।

আজব এক যুগে এসে পড়েছি আমরা যেখানকার মানুষগুলো আজব এবং তাদের কর্মকান্ডও অদ্ভুত।ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন যে কোন মূল্যে তারা আইএস নিধন করবে।

অথচ আইএস এর উত্থান কিন্তু অনেক আগেই হয়েছে এবং তারা সারাবিশ্বে আরো অনেক দেশে তাদের নির্মম হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে তখন ফ্রান্স ছিল নিষ্কৃয় দর্শক ।

এই ধরনের মানুষ বাংলাদেশেও অহরহ দেখা যায়। যাদেরকে আমরা হুজুগে বাঙ্গালী বলে থাকি।

একদল মানুষ যারা ফ্রান্সের সন্ত্রাসী হামলার পর ফ্রান্সের পতাকায় নিজেদের ফেসবুক প্রোফাইল রাঙিয়েছে তাদেরই মত একদল একসময় চাঁদের বুকে সাইদীর ছবি দেখে নিজেদের ফেসবুক প্রোফাইল রাঙিয়েছিল।

পৃথিবীর আনাচে কানাচে প্রতিনিয়ত কোন না কোন সন্ত্রাসী হামলা হচ্ছে। মালয়েশিয়ার বোয়িং বিমান যখন দুইশোর অধিক যাত্রী নিয়ে আজীবনের মত হারিয়ে গেল তখন কিন্তু আমরা সমব্যাথী হয়ে আমাদের ফেসবুক প্রোফাইল মালয়েশিয়া বা অন্য কোন দেশের পতাকার রঙে রাঙাইনি।

এখন যুগটাই চলছে এরকম। হঠাৎ কেউ কোন একটা কিছুর প্রচলন শুরু করে দিলেই সেটা নিয়ে আমরা মাতোয়ারা হয়ে যাই। এই যেমন হঠাৎ করে সেলফী ভাইরাসের আক্রান্ত হয়ে পড়লে সারা বিশ্ব। অথচ সেলফীর প্রচলনের অনেক আগেও মানুষ সেফলী তুলতো। তখন হয়তো ওটার নাম সেলফী হয়ে ওঠেনি।

আমরা অবশ্যই ফ্রান্সে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সন্ত্রাসী হামলার তীব্র নিন্দা জানাই। সেই সাথে আমাদের উচিত পৃথিবীর যে কোন দেশের যে কোন সন্ত্রাসী কর্মকান্ডকে ঘৃণা করা।আমাদের সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনতে হবে।আমাদের একটাই কাম্য “পৃথিবীতে শান্তি বিরাজ করুক”।

……………………………………………………………………………………………

২১ নভেম্বর ২০১৫,দৈনিক ইত্তেফাক।

দূরের সৌন্দর্য

একটু ভেবে দেখুন হয়তো আপনার ঘরের পুব দিকের জানালাটা খুললেই ফুরফুরে বাতাস আপনাকে মুহুর্তেই শীতল করে দেয়।বাইরে তাকাতেই আদিগন্ত খোলা মাঠ,নীল আকাশ।রোজ সকালে একবার করে আপনার ঘুম ভাঙ্গে জানালা দিয়ে আসা সুযের্রর মিষ্টি আলোয়।

কিন্তু সেই ভোরের সুর্যটা যখন মিষ্টি আলো ছড়াতে ছড়াতে পুব আকাশে উকি মারে তখন কখনো কি আয়োজন করে সেটার দিকে তাকিয়েছেন? কিংবা হতেও পারে আপনার রুমটি পশ্চিম দিকে খোলা জানালা ধরে তাকালেই রোজ একটু একটু করে সুযের্র তলিয়ে যাওয়া দেখতে পান। পুরো পৃথিবীকে অন্ধকার করে দিয়ে সে হারিয়ে যায়।

তখন নিশ্চই আপনি আয়োজন করে সুর্যর হারিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখেন নি। কিন্তু সেই আপনিই কত আয়োজন করে কুয়াকাটাতে যাচ্ছেন সুয উদয় অস্ত দেখতে কিংবা কক্সবাজার যাচ্ছেন সুযের ডুবে যাওয়া দেখতে।

আকাশেতো একটাই সুয, সেই সুযটাইতো আপনার ঘরের জানালা বরাবর উদয় হয়ে দিন শেষে অস্ত যায়। আবার সেই সুযটাইতো কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের ওপাশে উদয় হয়ে অস্ত যায়। কিন্তু আপনার জানালায় উকি দেয়া সুর্যটা আপনাকে টানেনা, কিন্তু কুয়াকাটার সুয আপনাকে টানে।

না পাওয়ার পিছনে ছুটতেই আমরা ভালবাসি।যেটা আপনা আপনি পদতলে লুটিয়ে পড়ে থাকে আমরা সেটাকে অবহেলা করি, কখনোই তুলে নেই না।

ওপারেতে যত সুখ আমার বিশ্বাসকে পুজি করেই আমাদের বেঁচে থাকা।সুদুর ইতালির ভেনিস নগরীর কংক্রিটের সৌন্দয আমাদের মোহাচ্ছন্ন করে কিন্তু গাজিপুরের শালবাগান আমাদের টানেনা।ভোলার মনপুরা দ্বীপ আমাদের টানেনা।

আপনার খুব বিপদের সময় হয়তো কাউকে ফোন করেছেন একবার দুবার বার বার। কিন্তু ওপাশের ব্যক্তিটি ফোন রিসিভ করছেনা। এমনকি কেটেও দিচ্ছেনা।আপনার খুব বিরক্ত লাগছে। মনে মনে ভাবছেন সে আপনাকে তাচ্ছিল্যের চোখে দেখছে, অবহেলা করছে।   ভাবছেন তার সাথে সম্পর্কই ছিন্ন করবেন।

প্রকৃত পক্ষে সেটা নাওতো হতে পারে।আধুনিক এই যুগে মানুষ বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করছে। কেউ কোন মত খেয়ে পরে বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রাম করছে, আবার কেউবা পাহাড় সমান সম্পদ থাকার পরও হিমালয়ের মত উচু হওয়ার জন্য সংগ্রাম করছে।

ব্যাস্ততাই আজ আমাদের অনেক কিছু থেকে বিমুখ করে রেখেছে। সে জন্যই হয়তো আপনি আমি যাকে ফোন করছি তার নজরেই আসছেনা যে কেউ একজন তাকে ফোন করেই যাচ্ছে।

ব্যস্ততা যে মানুষকে কতটা বেখেয়াল করে দেয় তার অনেক উদাহরণ দেয়া যায়।ওয়াশিংটন মেট্রো রেল স্ট্রেশান।সকাল থেকেই হাজার হাজার কর্মব্যস্ত মানুষের ভীড়। রেল ক্রসিংএর জন্য যে ওভার ব্রিজটা আছে তার সিড়ির পাশেই দাড়িয়ে ছিলাম।অপেক্ষা ট্রেন আসার জন্য।

একজন বয়স্ক লোক একটা হুইল চেয়ার ঠেলে নিয়ে এসে থামলো সিড়ির পাশে। হুইল চেয়ার থেকে একজনকে ধরে ধরে সিড়ির পাশে বসিয়ে দিল।লোকটার মাথায় একটা সাদামাটা ক্যাপ।হাতে একটা বেহালা।চোখে একটা সাদামাটা চশমা। হতেও পারে লোকটা অন্ধ। যে তাকে নামিয়ে দিতে এসেছিল সে হুইল চেয়ারটা ঠেলে ঠেলে চলে গেল।

বেহালা হাতে লোকটি একে একে সুর তুলতে লাগলো। মাথার ক্যাপটি সামনে মেলে ধরলো।বুঝলাম নেহায়েত কোন ভিখারী। ওই দেশে ভিক্ষুকও কোন না কোন সৃজনশীলতা দেখিয়ে তবেই ভিক্ষা করে।হাজার হাজার মানুষ ব্যস্ত হয়ে ছুটে চলেছে নিজ নিজ গন্তব্যে। বেহালা বাদক একের পর এক সুর তুলছে।কখনো বেদনার, কখনো আনন্দের।কারো সেদিকে তাকাবার সময়ই যেন নেই।

একজন মধ্য বয়সী মহিলা যেতে যেতে তার ক্যাপের দিকে এক ডলার ছুড়ে দিল।তার পর আরো অনেক ক্ষন।আমার ট্রেনে ওঠা হলোনা। তার সুর আমাকে মুগ্ধ করলো, তার চেয়েও আমি বেশি কৌতুহলী ছিলাম তার ক্যাপে কত ডলার পড়ে সেটা দেখার জন্য।

একটা ছোট্ট বাচ্চা অনেক ক্ষণ তার দিকে অপলোক দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল।কত মানুষ গেল কত মানুষ আসলো কিন্তু তার সেই সুর কারো আমলেই আসলোনা। কেউ তার দিকে গুরুত্ব দিয়ে তাকালানা পযর্ন্ত। সবার কাছে তার বেহালার সুর যেন কোন ট্রামের সাইরেনের মতই যে বাজছে বাজুক কানে এসে লাগুক তাতে কার কি আসে যায়।

দিন শেষে সেই বেহালাবাদকের ক্যাপে ৩২ ডলার জমা হলো।কিছুক্ষণ পর যে তাকে নামিয়ে দিয়ে গেছিল সে আবার ফিরে আসলো।

নাহ তার সাথে কোন হুইল চেয়ার নেই। বেহালা বাদক এবার নিজেই উঠে দাড়ালেন।তার হাত থেকে বেহালাটিও লোকটি নিজে নিয়ে নিল।চোখ থেকে চশমাটা খুলে ফেলার পর আমি অবাক চোখে তাকিয়ে দেখলাম একটু আগেই বেহালা বাজিয়ে ভিক্ষা করা লোকটিকে।

ঘন্টার পর ঘন্টা দাড়িয়ে থেকেও যাকে আমি চিনতে পারিনি এবং আমার মত হাজার হাজার মানুষ চিনতে পারেনি সেই তাকেই মাত্র এক মিনিটেই চিনতে পারলাম। তিনি আর কেউ নন, তিনি বিশ্বের সবর্কালের শ্রেষ্ঠ বেহালা বাদকদের একজন, জোসুয়া বেল!!!

যার এক একটা কনসার্টে যেতে হলে সবর্নিম্ন টিকেটের দাম থাকে ১০০ ডলার! সেই জোসুয়া বেল যখন একটা ব্যস্ত মেট্রো স্টেশানের ওভার ব্রিজের নিচেয় বসে ভিক্ষুকের মত ভিক্ষার জন্য একই সুর বাজিয়ে ছিলেন তখন মানুষের তার দিকে নজর দেবার সময় ছিলনা।সারা দিনে যার আয় হয়েছে মাত্র ৩২ ডলার।

আমরা আসলে এরকমই ব্যস্ত হয়ে পড়েছি যে ব্যস্ততার কারণে জীবনের অনেক কিছু আমাদের চোখের আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।

সাধারণ সময়,অনুপোযোগি স্থান আর অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিই জোসুয়া বেলকে সবার নজরে উপেক্ষিত থাকতে হয়েছিল। তিনি সেদিন ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের একদল গবেষকের গবেষণার জন্য মেট্রো স্টেশানে ভিখারির মত ভিক্ষা করছিলেন!

পত্রিকার পাতায় পাতায় যখন খবরটি ছাপা হলো তখন কতজনেই না আফসোস করলো।যাকে টাকা দিয়েও কাছে পাওয়া যায়না সেই জোসুয়া বেল নিজে এসে ভিক্ষুকের বেসে  দুয়ারে দাড়িয়েছে অথচ তাকে কেউ চেনেনি।আমার বন্ধু ডকোটা গয়ো নিজেও আফসোস করেছিল পরের প্রায় তিন মাস ধরে।সেও নাকি সেদিন পাশ কাটিয়ে চলে এসেছিল!

এভাবেই হয়তো আমাদের প্রত্যেকের জীবন থেকেই কত গুরুত্বপুর্ন সময় হারিয়ে যায়,কত গুরুত্বপুর্ন মানুষ হারিয়ে যায় আমরা খোঁজও পাইনা।তাই জীবনের সব থেকে গুরুত্ব পুর্ন সময় হচ্ছে এখন এই সময়টা। সব চেয়ে গুরুত্বপুর্ন মানুষ হচ্ছে এই মুহুর্তে সামনে যে আছে তিনি। এবং সব থেকে গুরুত্বপুর্ন কাজ হচ্ছে যে কাজটি শুরু করেছি সেটা।

না পাওয়ার পিছনেই আমরা অবিরাম ছুটে চলেছি।মরিচিকা জেনেও সেটাকে অনুসরণ করছি। অথচ যা আমার পায়ে এসে গড়াগড়ি খাচ্ছে সেটাকে গুরুত্বই দিচ্ছিনা।

বাংলাদেশে হাতে গুনে হলেও অন্তত দশজন বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ আছেন তাদের পাশ কাটিয়ে আমরা তাই অন্য কাউকে বড় কোন পদে বসিয়ে দিচ্ছি আবার যখন জল ঘোলা হচ্ছে তাকে সরিয়ে দিতেও দ্বিধা করছিনা।

জানালা খুললে যে সুযকে উদিত এবং অস্ত যেতে দেখি সেটার দিকে আমরা ফিরেও তাকাইনা অথচ ঠিকই সেই একই সুযকে উদয় অস্ত দেখতে হাজার থেকে শুরু করে কয়েক লাখ টাকা  খরচ করে কুয়াকাটা থেকে  পাতায়া বীচে যেতেও আমাদের সময় লাগেনা।

দূরের সৌন্দর্য আমাদের মোহাচ্ছন্ন করে রাখে কাছের সৌন্দযকে নেহায়েত ধুসর মনে হয়।যে পান্ডুলিপিকে জীবনানন্দ “ধূসর পান্ডুলিপি” আখ্যা দিয়েছিলেন সেটি যে আসলে ধুসর নয় বরং হীরের মত উজ্জল ঠিক তারই মত আমরাও অহেতুক মোড়ক লাগানো সৌন্দর্যের পিছনে ছুটতে ছুটতে প্রকৃত সৌন্দযকে দেখার সুযোগ পাচ্ছিনা।চোখের আড়ালেই থেকে যাচ্ছে প্রিয় কোন স্থান,প্রিয় কোন মানুষ,প্রিয় কোন স্মৃতি।

………………

৩১ মার্চ ২০১৬,দৈনিক ইত্তেফাক।

 

বাঙ্গালীর ধৈর্য

হতাশাবাদীরা উদয়মান  সূর্যকে মনে করে অস্তগামী।হাতাশার চাদরে তারা এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে সেখান থেকে আর বেরিয়ে আসতে পারছেনা। তাদের সামনে একটা গ্লাসের অর্ধেক পানি পূর্ণ করে উপস্থাপন করলে তারা বলে অর্ধেক গ্লাস খালি।

কখনো ভেবে দেখেনা ক্লাসটা অর্ধেক পূর্ন। চারদিকে আজ হতাশাবাদীদের ভীড়। কিন্তু তার পরও আশাবাদীদের সংখ্যাও কোন অংশে কম নয়। এখনো এদেশে অনেক মানুষ আছে যারা সুন্দর আগামীর স্বপ্নে বিভোর।

যারা মনে মনে বিশ্বাস করে আগামীর বাংলাদেশ হবে শিক্ষা শান্তি প্রগতিতে বিস্ময়জাগানিয়া দেশ। মানুষ তার স্বপ্নের সমান বড়।যে যত বড় স্বপ্নই দেখুকনা কেন সে যদি সেই স্বপ্নটা বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টা করে তবে সে তা পারে।

একজন বিলগেটস একদিনে তৈরি হয়না,একজন ড.মুহম্মদ ইউনুস রাতা রাতি জন্ম নেয়না। তার জন্য দরকার দৃঢ়প্রত্যয়, দরকার অকৃত্রিম ভালবাসা এবং ধৈর্য্য। বাঙ্গালীদের আর যাই হোক ধৈর্য্যের অভাব নেই এবং কোন কালেও অভাব ছিলনা। বাঙ্গালীদের ধৈর্য্যের বর্ণনা দেওয়ার মত যথাযথ শব্দও খুজে পাওয়া কঠিন।

হয়তো বলতে পারি পাহাড় সমান ধৈর্য্য আছে বাঙ্গালীদের কিন্তু তাতেও কমই বলা চলে। আমরা যে কত বড় ধৈর্য্যশীল তার প্রমান আমাদের চোখের সামনেই ভূরিভূরি পাওয়া যাবে।

দায়িত্বশীল মন্ত্রী যখন কোন একটা ঘটনার তদন্তের ব্যাপারে ৪৮ ঘন্টা সময় নেয় আমরা তখন আশাবাদী হই এবং সেই আটচল্লিশ ঘন্টা আর শেষ হয়না।

যদিও ৪৮ দিন যায় ৪৮ মাস যায় কিংবা হয়তো ৪৮ বছরও যাবে। তার পরও বাঙ্গালীদের ধৈর্য্যর বাঁধ ভাঙ্গেনা। তারা ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করে কবে সেই আটচল্লিশ ঘন্টা শেষ হবে। বাঙ্গালীরা বরাবরই ক্রিকেট পাগল।

খেলা দেখার টিকেটের জন্য ঘন্টারপর ঘন্টা লাইনে দাড়িয়ে থাকে,ঈদ কিংবা পূজাপার্বনে পরিবারের সাথে সময় কাটানোর জন্য ট্রেনের টিকেটের লাইনে ঘন্টারপর ঘন্টা দাড়িয়ে থেকে অনেকেই টিকেট না পেয়ে খালি হাতে ফিরে যায় তার পরও ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙ্গেনা।

আমাদের ধৈর্য্যের নিত্যদিনের উদাহরণ ঢাকা শহরের অবিরাম যানজট। সকাল সাতটায় উত্তরা থেকে মতিঝিলের উদ্দেশ্যে রওনা হলে দুপুর গড়িয়ে যায় আর আমরা ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করি।

রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দের দোলাচালে শুরু হয়েছিল এসএসসি পরীক্ষা। ধৈর্য্য যেন বাঙ্গালীদের জন্মগত বৈশিষ্ট্য।

তাই আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীরাও দেখিয়েছে তাদের সীমাহীন ধৈর্য্য। দিন যায় মাস যায় কিন্তু তাদের পরীক্ষা যেন শেষই হতে চায়না। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি তাদের অভিভাবকেরাও ধৈর্য্যের পরীক্ষা দিয়েছেন।

কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য আমাদের পিছু ছাড়েনি। এতো ধৈর্য্যের পরীক্ষা দিয়েও আমাদের রেহাই নেই।

আমাদের জন্মই যেন হয়েছে আজন্ম ধৈর্য্যের পরীক্ষা দেওয়ার জন্য। যে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ দিন ধরে এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার ধকল সহ্য করার পর আশার জাল বুনেছিল ফলাফলের পর কলেজে ভর্তি হবে, তাদের সে স্বপ্নটা ক্ষীণ হয়ে যায় যখন ভর্তিপরীক্ষার ফলাফল বার বার পেছানো হয়।

তারপরও তারা ধৈর্য্য ধরেছে। এ যেন ধৈর্য্যধারনের কোন প্রতিযোগিতা। নীতিনির্ধারকদের চরম অবহেলা আর অদূরদর্শীতাই এসবের মূল কারণ।

মেয়েদের কলেজে ছেলেরা চান্স পাচ্ছে তারপরও আমরা বিকার হয়ে বসে আছি। কলেজে ভর্তি হবার অধিকার যেন রিলিফের চাল পাওয়ার মত। লাইন ধরে দাড়িয়ে থাক,অপেক্ষা করো তবেই তাদের মর্জিমত তোমাকে দেওয়া হবে। অদক্ষদের হাতে যখন কোন একটা দায়িত্ব দেওয়া হয় তখন আমাদের কেবল ধৈর্য্য ধারণ করে দিনের পর দিন মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই থাকেনা।

শিক্ষা ব্যবস্থা দিনের পর দিন হুমকির মূখে পড়ছে।দাবী করা হচ্ছে বছরের প্রথম দিন কোটি কোটি শিশু শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়ার কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলছে। বছরের এক তৃতীয়াংশ চলে যাওয়ার পরও কোথাও কোথাও শিক্ষার্থীদের হাতে বই পৌছাচ্ছেনা। সেই সব বইই বিক্রি হচ্ছে কোন কোন লাইব্রেরীতে।সৃজনশীলতার নামে চলছে মেধা ধ্বংসের পায়তারা। বাজারে অহরহ বিক্রি হচ্ছে সৃজনশীল গাইড। তারা হাতে ধরে শেখাচ্ছে সৃজনশীলতা।

সৃজনশীলতা কি মোটর ড্রাইভিং শেখার মত যে হাতে ধরে শেখানো যাবে। যে শিক্ষার্থীরা আমাদের আগামী দিনের চালিকা শক্তি আজ আমরা তাদের শিক্ষাজীবনকে হুমকির মূখে ফেলে উপরন্ত আমাদের স্বপ্নময় আগামীকেই হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছি। মাসেরও অধিক সময় ব্যায় করে এসএসসি পরীক্ষা শেষ করার পর ফলাফল হলো এবং শিক্ষার্থীরা আশায় বুক বাঁধলো কলেজে ভর্তির।

এবার অনলাইনে ভর্তি ব্যবস্থা চালু হওয়ায় আমরা বেশ আশায় বুক বেঁধেছিলাম কিন্তু আমাদের সব আশা তাসের ঘরের মত ভেঙ্গে যায় যখন দেখি ফলাফল বের হওয়া নিয়ে নাটকের নিত্যনতুন মহড়া।

আরো হতাশ হতে হয় যখন সেই ফলাফলে মেয়েদের কলেজে ছেলেদের নাম উঠে আসে। আমাদের দেশে দক্ষ নাবিকের অভাব কোন কালেও ছিলনা কিন্তু তার পরও আমরা বার বার অদক্ষদের হাতে হাল ধরিয়ে দিয়ে মাঝ দরিয়ায় খাবি খাচ্ছি। শিক্ষা ব্যবস্থায় আমুল পরিবর্তন আনা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা যেন সময় মত পরীক্ষা দিয়ে পাশ করে বের হয়ে আসতে পারে সে ব্যবস্থা নীতিনির্ধারকদের নিশ্চিত করতে হবে।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার দূর্বলতা গুলো দূর করা না গেলে আগামী প্রজন্ম ক্ষতিগ্রস্থ হবে যা অন্য অর্থে আমাদের দেশের ভবিষ্যতকেই হুমকিতে ফেলে দেবে। যখন নির্ধারিত সময়ে একজন শিক্ষার্থী তার শিক্ষাজীবন শেষ করতে না পারে তখন স্বাভাবিক ভাবেই তার মধ্যে হতাশা কাজ করে,বেকারত্বের হার বাড়ে।

আজকে যে শিক্ষার্থীরা সবে মাত্র কলেজে ভর্তি হবে বলে আশায় বুক বেঁধেছিল তাদের ভর্তি নিয়ে যে অনাহুত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তা সত্যিই উদ্বেগজনক।তার পরও আমরা ধৈর্য্য ধরে আছি,হয়তো ধৈর্য্যের সীমানা প্রাচীর দিয়ে কোন একদিন উকি দেবে সুদিনের সুর্য।

১২ জুলাই ২০১৫, দৈনিক ইত্তেফাক।

 

বাংলা প্রীতি

সুদূর অতীতে এই দেশে এসে মুগ্ধতা নিয়ে ফিরে গিয়েছিলেন চৈনিক পরিব্রাজক ফা হিয়েন। মরোক্কো থেকে নানা দেশ ঘুরে বাংলাদেশে এসে মুগ্ধ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন ইবনে বতুতা। কী আছে এই বাংলাদেশে? কী দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন তিনি?এখনকার অনেক বাঙ্গালীইতো আজকের বাংলাদেশে কোন সুখ খুঁজে পান না,এ দেশের কোন সৌন্দর্যই নাকি তাদেরকে আর টানেনা।

তারা ছুটে যায় ইতালীর ভেনিস নগরীতে, যে নগরী আজন্মকাল অবগাহন করছে গলাঅব্দি পানিতে।তারা ছুটে যায় সিডনিতে যেখানে কংক্রিটের দেয়াল চারদিকে প্রাণহীন তামাটে সৌন্দর্য বিলিয়ে চলেছে।

তারা ওখানে সুখ খুঁজে পায় কিন্তু সুখ খুঁজে পায়না বাংলার সবুজে ঘেরা প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে। তাহলে ইবনে বতুতা কী পেয়েছিলেন এই সবুজ জমিনে। “কিতাবুর রেহালা” নামে তার সেই বিখ্যাত ভ্রমন কাহিনীতে তিনি বাংলাকে ধনসম্পদে পরিপুর্ণ এক বেহেস্তের সাথে তুলনা করে গেছেন। কবি গুরু লিখেছিলেন “ সাতকোটি সন্তানেরে হে বঙ্গ জননী/রেখেছ বাঙ্গালী করে মানুষ করোনি”।

কিন্তু কবি গুরু বেঁচে থাকলে হয়তো এই কথাটিও লিখতেন না। আমরাতো ক্রমে ক্রমে আমাদের বাঙ্গালীত্বও হারিয়ে ফেলতে বসেছি।আমাদের বাঙ্গালীত্ব ফুটে ওঠে কেবল ফেব্রুয়ারিতে,বইমেলায় আর পহেলা বৈশাখে।আমরা তখন একুশ ফেব্রুয়ারিকে আট ফাল্গুন বলতে ভালবাসি। কিন্তু তার পর আমাদের বাঙ্গালীত্বকে আমরা বিসর্জন দিই।

আমরা বাবাকে ড্যাডি বলতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি। আমরা মাতৃভাষাকে যে যেভাবে পারছি বিকৃত করছি। তবে এখনো মাতৃভাষা প্রীতি আছে এমন মানুষের সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়।স্কুলের শিক্ষকের প্রশ্নের উত্তরে স্বর্গর মত ছোট্ট ছেলেটিও দেশ প্রেমের অতুলনীয় সংজ্ঞা দিতে পারে।

একজন কম বয়সী ছেলে যখন বলে “ যখন দেশের কোন ভাল সংবাদে মনের মধ্যে আনন্দ হয় আর খারাপ সংবাদে ব্যাথা লাগে তখন বুঝতে হবে ঐ ব্যক্তির মধ্যে দেশ প্রেম আছে। দেশ প্রেম  রাজনৈতিক নেতাদের মত মাইকে গলা ফাটিয়ে বলার মত কিছু নয় যে আমি দেশ প্রেমিক।

দেশ প্রেম হলো নিজ নিজ দায়িত্ব সঠিক ভাবে পালন করা”। যে মানুষ এরকম ভাবতে পারে তারাই আমাদের ভবিষ্যত এবং উজ্জল ভবিষ্যৎ।ওদের দিকে তাকালে আমাদের আশার প্রদীপ আবার জ্বলে ওঠে।

প্রতি নিয়ত যারা দেশ নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করে আর বলে বেড়ায় এ দেশে কিছুই নেই,এ দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকার, তাদের জন্যতো বহুকাল আগে  আবদুল হাকিম লিখেছিলেন “যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি”।   বিদেশী ভাষা শিক্ষার ব্যাপারে আমরা বরাবরই জোর দিয়ে থাকি কিন্তু সে ক্ষেত্রে অবশ্যই মাতৃভাষাকে প্রাধান্য দিতে হবে।ড.মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছিলেন একাধিক ভাষায় পন্ডিত তাই বলে তিনি মাতৃভাষা পরিত্যাগ করেন নি।

প্রয়োজনের বাইরে কেন বিদেশী ভাষা ব্যবহার করতে হবে। এর যৌক্তিকতাইবা কতটুকু। ইংরেজী মাধ্যমে পড়ুয়া ছেলে মেয়েরা স্কুলে যথেষ্ট ইংরেজীর চর্চার সুযোগ পায় তাহলে বাসায় বা বন্ধুদের আড্ডায় কেন ইংরেজীতেই কথা বলতে হবে তা আমাদের বোধগম্য নয়।

আর তাই অনেক ইংরেজী মাধ্যমের ছেলে মেয়েদের বাংলা বলা শুনলে মনে হয় বাংলা তাদের দ্বিতীয় ভাষা। আজকে আমাদের স্বদেশ প্রীতি নিয়েও কথা উঠছে। দেশে এখন দুই ধরনের মানুষের বসবাস ধনী এবং গরীব।

যারা এক সময় মধ্যবিত্ত শ্রেনীতে ছিল তারা ক্রম ব্যায়বর্ধমান সময়ের সাথে সাথে গরীব শ্রেণীতে নেমে গেছে। আর ধনীরা ক্রমান্বয়ে আরো ধনিতে পরিণত হচ্ছে। আর সেই শ্রেনীভুক্তদের মধ্যেই দেশ প্রেম এবং বাংলা প্রীতির অভাব প্রবল ভাবে লক্ষ্যনীয়। তারাই সব থেকে বেশি হতাশ এ দেশ নিয়ে। আমাদের খুব জানতে ইচ্ছে করে যে দেশটাকে আপনাদের ভবিষ্যৎহীন মনে হয় সে দেশে কেন থাকেন আপনারা। আবদুল হাকিমের ভাষায় “ স্বদেশের প্রেম যার মনে ন জোয়ায়/নিজ দেশ ছাড়ি কেন বিদেশে ন যায়”।

আমরা হয়তো সৌন্দর্যের লীলাভূমি এই বাংলার সৌন্দর্য খুঁজে পাইনি। কিংবা সেই সৌন্দর্য দেখার মত চোখ আমাদের নেই। আমরা হয়তো আমাদের মাতৃভাষাতে সুখ পাইনা, কারণ আমাদের মন থেকে মাতৃভাষা প্রীতি উঠে গেছে। কিন্তু সুদুর চীন থেকে এসে সেই অপার সৌন্দর্য অবলোকন করে মুগ্ধতা নিয়ে ফিরে যায় ফা হিয়েন।

ইবনে বতুতা বিশ্বের অন্য সব দেশ ফেলে রেখে বাংলা মুলুককেই বেছে নেয় স্বর্গ রাজ্য হিসেবে। হালের মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান ডাব্লিউ মাজেনাও সেই বাংলার সৌন্দর্যতে মুগ্ধ হয়ে এদেশেই থেকেছেন অনেক দিন। তার বাংলাদেশ প্রীতির কথা আমরা প্রায় সকলেই জানি।

তিনি কি পেয়েছিলেন এই দেশে, এই সবুজ জমিনে? যা আমাদের দেশে জন্ম নেওয়া অনেকেই দেখতে পাননা। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকি ভ্যালেরি টেইলরের দিকে। দূর বিদেশীনী এই খ্যাতিমান চিকিৎসক বাংলাদেশকে ভালবেসে সারাটা জীবন কাটিয়ে দিলেন এই দেশে এই ভাষায় কথা বলে।

এখনো প্রতি বছর বিদেশ থেকে এ দেশে যারা ঘুরতে আসে তারা মুগ্ধ হয়। এ দেশেই আছে বিশ্বের সব থেকে বৃহত্তম সমুদ্র সৈকত,বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন থেকে শুরু করে হৃদয়ের ভাজে ভাজে ভালবাসার স্পন্দন সৃষ্টিকারী অনেক কিছু।

শুধু দেখার মত চোখের অভাবেই বাঙ্গালীরা সেটা দেখতে পায়না। সেই সৌন্দর্যে অবিরাম তাকিয়ে মন্ত্রমুগ্ধতা নিয়ে ফিরে যায় হাজারো ইবনে বতুতা। এদেশেরই কেউ ক্রিকেটে বিশ্ব সেরা হয়,সাহিত্যে জিতে আনে নোবেল পুরস্কার। অথচ পাশ্ববর্তী শতকোটি মানুষের দেশের ভাষার সাহিত্যিকেরা সে ভাষার সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী হতে পারেনি। আমরা তবে কেন এই দেশ এই ভাষা নিয়ে গর্ব করবোনা।

আমরা তবে কেন এই ভাষাকে ভাল না বেসে এই দেশের সৌন্দর্যকে উপক্ষো করে কংক্রিটে মোড়া সৌন্দর্যের পিছনে ছুটে চলেছি অবিরাম? কবি তাই আক্ষেপ করে লিখেছেন “নিজ সুখ লুটে নিল দূর বিদেশীনি/দেখলিনা সেই সুখ খুঁজে কোন দিনই।

………………….

২১ জুলাই ২০১৫,দৈনিক ইত্তেফাক।

 

একটি স্বপ্নের মৃত্যু

 

মানুষের স্বপ্ন বার বার বদলায়। যেমন বদলেছিল বাঙ্গালীদের স্বপ্ন। শুরুটা কত আগে হয়েছিল তা হয়তো আমাদের জানা নেই। তবে সাধারণ ভাবে বলতে গেলে ১৭৫৭ সালটাই ধরা যেতে পারে। মূলত সেদিনইতো বাংলার স্বাধীনতার সুর্য় দীর্ঘ দিনের জন্য ডুবেছিল। যে স্বাধীনতার আলো জ্বালতে বাঙ্গালীদের লেগেছে যুগের পর যুগ। দেশ ভাগ হলো। বাঙ্গালীরা মনে করলো এবার নিশ্চই তাদের ভাগ্য বদলাবে।

নতুন একটা দেশ হলো। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস তাই আবারও তাদের আশা ভঙ্গ হলো। শাষক গোষ্ঠি তাদের ওপর চাপিয়ে দিল নানা অত্যাচার। দেশকে ভালবাসার মানুষের অভাব ছিলনা। বর্তমানে যারা দেশকে ভালবাসে বলে বড় বড় কথা বলে তারা আসলে কতটা দেশকে ভালবাসে তা চোখ কান খোলা রাখলেই উপলব্ধি করা যায়।

মাতৃভাষায় কথা বলার অধিকারটুকু যখন শাষক গোষ্ঠি কেড়ে নিতে চাইলো তখন বাঙ্গালীরা রুখে দাড়ালো। রাজ পথ বুকের রক্ত দিয়ে ধুয়ে দিল। যার স্মৃতি ধরে রাখতে আজ আমরা শহীদ মিনার বানিয়েছি। কালের পরিক্রমায় সাহসী বাঙ্গালীরা যে সুখের আর সমৃদ্ধির স্বপ্ন নিয়ে দেশ গড়ার কাজে মনোযোগি হয়েছিল তারা হারিয়ে যেতে লাগলো। হারিয়ে যাওয়ার আগে ১৯৭১ সালে ৯ মাস যুদ্ধ করে আমাদের হাতে তুলে দিয়ে গেল একটা স্বাধীন বাংলাদেশ।

তাদের স্বপ্ন ছিল বুকের রক্ত দিয়ে জীবন দিয়ে তারা যে স্বাধীন দেশটা আমাদের হাতে তুলে দিয়ে যাচ্ছে তা আমরা রক্ষা করবো এবং আরো বেশি সমৃদ্ধ করে তুলবো। কিন্তু তাদের সে স্বপ্ন আমরা সত্যি হতে দেইনি। তাদের সে স্বপ্নকে আমরা মিথ্যে করে দিতে প্রতিনিয়ত ব্যাস্ত ছিলাম।

সেই সব মানুষ যারা ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ অবধী জীবনের সব সুখ বিসর্জন দিয়ে আমাদের জন্য একটা লাল সবুজের পতাকা এনে দিয়ে গেল এবং আমাদের হাতে সেই সোনার বাংলার দায়িত্ব দিয়ে গেল তাদের এই দিয়ে যাওয়াটা অনেকটা শেয়ালের কাছে মুরগী বরগা দেয়ার মত। যে শেয়াল প্রতিনিয়ত তার কাছে রেখে যাওয়া মুরগীর ছানাকে খেয়ে ফেলতে লাগলো। আমাদের হয়েছে তাই। যে মানুষগুলো জীবনের সব সুখ বির্সজন দিয়ে আমাদের হাতে তুলে দিয়ে গেল একটা স্বাধীন পতাকা আজ আমরা সেই পতাকা খামচে ছিড়ে নষ্ট করছি।

দেশ এই স্বাধীনতা পরবর্তী বছর গুলোতে কতটা উন্নত হয়েছে সেটাতো আমরা দেখতেই পাচ্ছি কিন্তু কতটা হারিয়েছে সেটাও নিশ্চই আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানোর প্রয়োজন নেই। আমাদের চেয়ে সব দিক থেকে পিছিয়ে থাকা দেশও এখন আমাদের থেকে অনেক উন্নত। তাইতো আমাদের দেশের সম্পদশালীরা সেই সব দেশে ছুটি কাটাতে যায়। অথচ এমনটা হওয়ার কথা ছিলনা। বরং অন্য দেশের মানুষদেরই আমাদের দেশের সৌন্দর্য দেখতে আসার কথা ছিল।

পাওয়া না পাওয়ার হিসাব কসতে গেলে অনেক কিছু বেরিয়ে আসবে। এখন আমরা দেখি স্বাধীনতা যুদ্ধ নিয়ে বাজে কথা বলা হচ্ছে এবং সেটা যে কেউ বলছেনা, বলছেন তারাই যারা স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় খুব কাছে ছিলেন এবং স্বাধীনতা যুদ্ধে যাদের অবদান কোন অংশেই কম নয়। এখন স্বাধীনতার ঘোষক নিয়েও তর্ক বিতর্ক হতে দেখা যাচ্ছে। এটাতো ন্যুনতম জ্ঞান সম্পন্ন ব্যক্তিরও জানা থাকার কথা যে স্বাধীনতা লাভের পরও চার বছর জীবিত ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি কি কখনো বলেছেন যে তিনি স্বাধীনতার ঘোষক। জিয়াউর রহমান বেঁচে ছিলেন আরো অনেক দিন। তিনিকি কখনো বলেছিলেন যে তিনিই স্বাধীনতার ঘোষক? আমরা নিজেরাই আসলে কুলাঙ্গার।

তাই যারা আমাদের জন্য এরকম সুন্দর একটা দেশ সুন্দর একটা পতাকা এনে দিয়েছিলেন তাদের আমরা সকাল সন্ধ্যা পদদলিত করছি অপমান করছি। স্বাধীনতার ঘোষনা দেয়া না দেওয়া যদি বড় কিছু হতো তবে বঙ্গবন্ধু কিংবা জিয়াউর রহমান দুজনেই জীবিত থাকা কালিন এমন কিছু করে যেতেন যে সেটা নিয়ে কারো কিছু বলার থাকতোনা। আমরা কেন তাহলে এতো কথা বলছি। আজকে আওয়ামীলীগ বা বিএনপি কেউ কাউকে সম্মান করতে চায়না।

              আজকে বিএনপি এবং তার সমর্থিতরা যে তারেক রহমানকে নিয়ে অহংকার করে তিনি এতোটাই নাদান যে তিনিও অস্বীকার করেন বঙ্গবন্ধুর অবদানের কথা। এমনকি যে মানুষটা না হলে বাংলার স্বাধীনতার সুত্রপাতই হতনা তাকেও স্বাধীনতার বিপক্ষের মানুষ বলে আখ্যায়িত করতে দ্বিধা করেন না। রাতের আকাশের চাঁদ ভাবে সেই সব কিছু,তাকে কেউ সরাতে পারবেনা কিন্তু দিনের সূয ঠিকই তাকে আড়ালে নিয়ে যায়। সূযটাও ঠিক একই ভাবে মনে করে সেই অবিচল কিন্তু রাতের অন্ধকার তাকেও দূরে ঠেলে দেয়।

আমরা এই স্বাভাবিক বিষয়টা থেকেও শিক্ষা লাভ করতে শিখিনি যে ক্ষমতা কোন কালে কোন দেশেই স্থায়ী নয়। মূখে লাগামহীনভাবে যা ইচ্ছে বলে যাচ্ছি।যাকে ইচ্ছে বানিয়ে ফেলছি মুক্তিযোদ্ধা আবার মুক্তিযোদ্ধাকেও সার্থের খাতিরে দেশদ্রোহী বানাতে কুন্ঠাবোধ করছিনা। একদেশে জাহাজ ডুবি হলে মন্ত্রী স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে আর এক দেশে হাজার হাজার মানুষ মারা গেলেও বলা হয় তুচ্ছ ঘটনা। যে দেশে গুণীর কদর নেই সে দেশ কতটা উন্নতি করবে তা কেবল ভবিষ্যতই বলে দিবে।

৫ ডিসেম্বর ১৯৬৯ সালে একটা মানুষ যে দেশটার নাম দিয়েছিলেন বাংলাদেশ সেই বঙ্গবন্ধুকেও যদি এ দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর ছেলে দেশদ্রোহী বলতে পারে এবং নিজের দলের কাছে আদর্শের মানদন্ড হতে পারে সে দেশে আমাদের মত সাধারণ মানুষের সম্মানের কথা চিন্তাও করা যায়না। এখন আমাদের বিবেক বলতে কিছু নেই।আমরা যেন বেঁচে থেকেও মৃত।

২ জুলাই ২০১৫,দৈনিক ইত্তেফাক।

মায়ের ছায়াতে মাকে খুঁজি।

বাড়ির নাম “মায়ের ছায়া” আহ দেখলেই মনটা জুড়িয়ে যায়। রোজ যাওয়া আসার সময় বাড়িটির নাম ফলকে চোখ আটকে যায় আর ভাবি এই বাড়ির মালিক তার মাকে কতইনা ভালবাসে।

একদিন বাড়ির গেটটা খোলা ছিল আর বাইরে খেলা করছিল বার তের বছরের এক ছেলে। মনে হলো ও বাড়িরই ছেলে। এখনকার সময়ে হুট করে কারো সাথে কথা বলা বিপদজনক। বিশেষ করে ছোটদের সাথে কথা বলা আরো রিস্ক। বাপ মা এবং অন্যরা ধরেই নেয় ছোটদের সাথে বড়রা কথা বলা মানেই হয় সে ছেলে ধরা নয়তো……!!!!

ছেলেটা তার এক বন্ধু কিংবা প্রতিবেশী ছেলের সাথে ক্রিকেট খেলছিল। কিছুক্ষণ দাড়িয়ে খেলা দেখলাম। ওদের খেলা দেখলে নিশ্চই কেউ কিছু মনে করবেনা বরং ওরাই বেশি খুশি হবে। হুট করে একবার বলটা আমার কাছে চলে আসলো। কুড়িয়ে সোজা বলটা না দিয়ে আমি বললাম বল করি তুমি মারো?

ছেলেটা রাজি হলো।এমন ভাবে বল করলাম যেন ছেলেটি বল মারতে পারে। সত্যিই ও বল মারলো এবং খুশি হলো। পরের বলটাও আমাকেই করতে দিল এবং তার পরেরটাও। ক্রিকেট বল দিয়ে তার সাথে বলা চলে ক্ষণিকের বন্ধুত্ব হয়ে গেল।

এক জীবনে আর কখনো দেখা হবে কিনা তার কোন ঠিক নেই। উদ্দেশ্য ছিল ওর সাথে কথা বলা। এক সময় জিজ্ঞেস করলাম এই বাড়িটি কি তোমাদের? সে হ্যা বললো। আমি বললাম তোমার বাবা কি তোমার দাদিকে খুব ভালবাসে? কে কে থাকে তোমাদের বাসায়? দাদিও নিশ্চই তোমাদের খুব ভালবাসে।

প্রশ্ন শুনে খেলা ছেড়ে ছেলেটা কথা বলতেই আগ্রহী হয়ে উঠলো। বললো: না না বাসায়তো দাদি থাকেইনা! জানেন দাদি আমাদের খুব আদর করতো….আমি বললাম করতো বলছো কেন? এখন করেনা? ছেলেটি বললো দাদি থাকলেতো আদর করবে।

মনটা খারাপ হয়ে গেল। ভাবলাম দাদি মনে হয় মারা গেছেন। বার তের বছরের ছেলেটি কি আমার মনের কথা পড়ে ফেলেছিল? নাকি অনেক মানুষের একই প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে মনের ভাব বুঝতে পারছিল? সে বললো, না না দাদিতো বেঁচেই আছেন তবে আমাদের সাথে থাকেন না। একদিন স্কুল থেকে ফিরে দেখি দাদি আর নেই। বাবা কিছু বলেন না মাও বলেন না। পরে ফুলি খালা মানে আমাদের কাজের মহিলার কাছে জানতে পারলাম দাদিকে নাকি বৃদ্ধাশ্রম নামক একটা জায়গায় রেখে এসেছেন।

দাদিকে আমার খুব মনে পড়ে। কিন্তু দাদির সাথে দেখা হয়না কথাও হয়না। আমি বললাম তুমি জানো বৃদ্ধাশ্রম কি জিনিস? ছেলেটি বললো: ফুলি খালার কাছে জিজ্ঞেস করেছিলাম তিনি বললেন বৃদ্ধাশ্রম হলো বয়স্ক মানুষদের থাকার জায়গা। সেখানে নাকি বয়স্করা খুব আরামে থাকে।
সরল মনের ছেলেটির কথা শুনে ভেতরে ভেতরে কেপে উঠলাম। জিজ্ঞেস করলাম তুমি কি বৃদ্ধাশ্রম নিয়ে কিছু চিন্তা করেছ?

ছেলেটি কিছুক্ষন চুপ করে থাকলো। বললো আমি পড়াশোনায় খুব একটা ভাল না। তাই বেশি ভাল চাকরি পাবনা হয়তো। তাই বাবা মা যখন বৃদ্ধ হবে তখন তাদের যত্ন যদি না করতে পারি? তাই তাদেরকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসবো। কারণ ফুলি খালা বলেছেন বৃদ্ধাশ্রমে নাকি বৃদ্ধরা রাজার হালে থাকে।

একবার আমি ছেলটির সরল মুখের দিকে তাকাই আরেকবার তাকাই বাসার নেম প্লেটের দিকে। যেখানে খুব যত্ন করে পাথর খোদাই করে লেখা আছে “মায়ের ছায়া”

আর ভাবি সেই হতভাগা বাবার কথা যে তার বাড়ির নাম রেখেছে “মায়ের ছায়া” অথচ সেই মায়ের ছায়াঘেরা বাড়িতে মায়েরই ঠাই হয়নি। মাকে রেখে এসেছে বৃদ্ধাশ্রমে। যার ছোট্ট ছেলেটিও তাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসার কথা ভেবেই রেখেছে যদিও সে জানেনা বৃদ্ধাশ্রম কি যদিও তার বয়স কেবল মাত্র তের বছর।

…………………….
১২ মার্চ ২০১৬
উত্তরা,ঢাকা-১২৩০