Home Blog Page 17

ফারহানা আপুকে দেখতে এসেছিল

#এক্স_ক্যাডেট ফারহানা আপুকে দেখার জন্য ছেলেপক্ষ এলো বাড়িতে।ছেলের ভাই বোন ভাবি দাদা এসেছিল,সাথে ছেলেও ছিল। ফারহানা আপুকে দেখে তাদের পছন্দ হলো।গতানুগতিক ভাবে ওকে প্রশ্নও করা হলো তোমার নাম কি, কয় ভাই বোন, তুমি কত তম, পড়াশোনা কতটুকু করেছ,নামাজ পড়ো কিনা,কালেমা শাহাদাত বলো ইত্যাদি ইত্যাদি।

ফারহানা আপু বেশ সুন্দর ভাবে সবগুলো প্রশ্নের উত্তর দিল, এতে করে ছেলেপক্ষের সবাই ভীষণ খুশি।ছেলেও দু’একটা প্রশ্ন করেছিল। এবার ছেলের দাদা ফারহানা আপুকে বললেন ফারহানা তুমি কি কিছু বলবে আর? এই সুযোগটাই চাইছিল আপু। সে বললো আপনারা দশজন মিলেতো আমাকে নানা প্রশ্ন করলেন আমি সবগুলোর সঠিক জবাবও দিলাম।আমার খুব ইচ্ছা আপনাদের দশজনকে আমি একটা একটা করে প্রশ্ন করি।

ছেলেপক্ষের লোকেরা মোটামুটি আধুনিক ঘরানার ফলে ফারহানা আপুর প্রস্তাবে তারা রাজি হয়ে গেল।ফারহানা আপু তখন ছেলের দাদুকে দিয়েই শুরু করলো।সে বললো আচ্ছা দাদু বলুনতো #ক্রসকান্ট্রি_রেস কি জিনিষ? দাদু মাথা চুলকাতে লাগলেন বাকিরাও একই অবস্থা।দাদু তখন বললেন ও ক্রসকান্ট্রি রেস? এটাতো খুবই সোজা।একটা দেশের সীমানার মধ্যে অন্য একটা দেশের সীমানা ঢুকে গেলে সেটা নিয়ে অফিসে ফাইল চালাচালির সময় যে দৌড়াদৌড়ি করতে হয় সেটাই ক্রসকান্ট্রি রেস।সবাই তখন দাদুকে সাবাশি দিল।ফারহানা আপুর দিকে তাকিয়ে সম্মতি চাইল আপু কিছু বললো না।

ছেলের বড় বোন ছিল, যে ফারহানা আপুকে প্রশ্ন করেছিল বলোতো মালাইকারি বানানোর সময় কি কি করতে হয়।সেই বড়বোনকে ফারহানা আপু প্রশ্ন করলো আচ্ছা আপু বলুনতো #প্রেপের সময় কি কি করতে হয়? বড় বোন দাদুটার মত মাথা না চুলকে পন্ডিতি করে বললো প্রেপের সময় প্রার্থনা করতে হয়,দোয়া করতে হয়,সে জন্যইতো এর নাম প্রেপ।ফারহানা কিছু বললো না।

ছেলের আরেক বড় ভাই ছিল,আপু তাকে প্রশ্ন করলো আপনি বলুনতো #নভিসেস_ড্রিল কি? সে উত্তর দিল মাটির দেওয়ালে ফুটো করতে যে ড্রিল ব্যবহার করা হয় সেটা নভিসেস ড্রিল।

ছেলের ছোট ভাই ফারহানা আপুকে প্রশ্ন করেছিল বিপি কি?বিপি মানে যে ব্লাড প্রেসার এটাতো সবাই জানে ফারহানা আপুরতো না জানার কথা নয়। সেই ছোটভাইকে আপু প্রশ্ন করলো বলুনতো #সিপি কি? ছোট ভাই ঝটপট উত্তর দিল সিপি হলো একটা ফাস্টফুডের দোকান।যেখানে ফ্রাইড চিকেন,চিকেন উইংস,চিকেন বল,চিকেন নাগেট,চিকেন সসেজ বিক্রি হয়।

সবার শেষে ছেলের পালা। ছেলে ফারহানা আপুকে প্রশ্ন করেছিল উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে আপনি কি দিতে বেশি ভালবাসেন? তখন ফারহানা আপু অন্য একটা উত্তর দিয়েছিল।এবার ছেলেকে আপু প্রশ্ন করলো আপনি কখনো #ইডি খেয়েছেন? ছেলে বললো না খাইনি।তখন ফারহানা আপু বললো আমি অন্যদেরকে যে উপহারই দেইনা কেন যদি আপনাদের সবাইকে উপহার দিতে বলতেন তাহলে সবাইকে ইডি খাওয়াতাম উপহার হিসেবে। মেহমানরা সবাই মুখ চাওয়া চাউয়ি করতে লাগলেন কারণ তারাতো জানেইনা ইডি আসলে কোন ধরনের খাবার জিনিষ।

ফারহানা আপু প্রশ্ন শেষ করে বললো প্রশ্ন করা খুবই সহজ কিন্তু উত্তর দেওয়া অনেক কঠিন। আপনারা দশজন আমাকে দশটা প্রশ্ন করেছেন আমি সবগুলোর সঠিক জবাব দিয়েছি। যদি দিতে না পারতাম তাহলে বলতেন মেয়েতো অযোগ্য অপদার্থ,কিছুই জানেনা। পক্ষান্তরে আপনাদের প্রত্যেককে আমি একটা করে প্রশ্ন করেছি কেউ সঠিক উত্তর দিতে পারেন নি। কিন্তু আমাদের কারো পক্ষেই আপনাদেরকে অযোগ্য বলার সুযোগ নেই।

আপনারা আমাকে দেখে পছন্দ করেছেন,ছেলের যোগ্য মনে করেছেন, এখন ভেবে দেখুনতো আপনাদের ছেলে আমার যোগ্য কিনা। দেখুন! মাফ করবেন, আমি আপনাদের আঘাত দিতে চাইনি। মেয়েদেরকে গরুছাগলের মত বাজারে উঠিয়ে দাত ধরে দেখে খুঁত আছে কিনা পরখ করে, তার পর বিয়ের পিড়িতে বসানোর নীতি বন্ধ হওয়া উচিত। মেয়েরা কোন পন্য নয় যে, লাউ কেনার সময় যেমন চিমটি কেটে লাউ কেনে সেভাবে হাটিয়ে, বসিয়ে, প্রশ্ন করে তার পর বউ বাছাই করবেন।

ফারহানা আপুর কথা শুনে সবার মুখ কালো হয়ে গেল। আমাদের পরিবারের সবাইও বেশ লজ্জায় পড়ে গেল।মেহমানদের খাওয়াদাওয়া ভাগ্যিস আগেই হয়ে গিয়েছিল নইলে তারা না খেয়েই বিদায় নিত। সেই ছেলে পক্ষ পরে একদিন চিঠি লিখে ক্ষমা চেয়েছিল।

তিন বছর পর ফারহানা আপুর সাথে সেই ছেলেটির দেখা হয়েছিল এক পার্টিতে।ততোদিনে আপুর বিয়ে হয়ে গেছে আপুর পছন্দের ছেলের সাথে। যার সাথে দুবছর আগে রিলেশান হয়েছিল। কথায় কথায় সেই ছেলেটি বলেছিল আর যাই হোক ঘরে একজন এক্স ক্যাডেট স্ত্রী থাকলে স্বামীর অবস্থা কাহিল। তার পর ফারহানা আপুর হাজবেন্ডকে বললো ভাই আপনি কিভাবে কোন মন্ত্রবলে টিকে আছেন শুনি।

ফারহানা আপুর হাজবেন্ড তখন হেসে দিয়ে বললো ভাই আপনারা যেটা খাওয়ার সাহস পাননি আমি সেটা ক্লাস সেভেন থেকে খাওয়ার অভ্যাস করেছি ফলে ইডি আমার সহজেই হজম হয়ে যায়। সিপিতে গিয়ে চিকেন বল চিকেন সসেজ খাওয়ার দরকার পড়েনা কারণ কলেজে নিজেইতো সিপি ছিলাম। আমাদের মাটির দেওয়াল নেই তাই নভিসেস ড্রিল নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিনা। আর ক্রসকান্ট্রি রেস? সেটাও সমানে চলছে।

ছেলেটা শুধু বোকার মত ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে হাসতে লাগলো। বুঝে হাসলো এটা আপনি বলতে পারবেন না,সে কোন কিছু না বুঝেই হেসেছে আর সেটা দেখে ফারহানা আপু আর তার হাজবেন্ডও হেসেছে।

—– #জাজাফী
১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭

এক্স ক্যাডেটের ফুলসজ্জ্যা

বিভা আপুর বিয়ে হয়েছে ক’দিন আগে।বাসর রাতে খুব আগ্রহ নিয়ে বসে আছে,মাথায় ঘোমটা। কখন ভাইয়া আসবে সেই অপেক্ষায় আছে। রাত তখন সাড়ে দশটা এমন সময় বিভা আপুকে যারা ঘিরে বসে ছিল তারা বেরিয়ে গেল আর ভাইয়া ভিতরে ঢুকলো। এক গ্লাস পানি খেয়ে দরজাটা লাগিয়ে বিছানায় গেল। তখন রাত ১০ টা ৪৫ বাজে। আপু অপেক্ষা করলো ভাইয়া কখন কথা বলবে,মূখের উপর থেকে ঘোমটা সরাবে।

কিন্তু আপু অবাক হয়ে দেখতে পেল ভাইয়া সটাং করে শুয়ে চোখ বন্ধ করে ফেললো। বলুনতো কেন? ভাইয়াকি ভুলে গিয়েছিল যে সে সেদিনই বিয়ে করেছে? ভাইয়াকি খুব ক্লান্ত ছিল যে দ্রুত বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছে? ভাইয়াকি মনে মনে বুদ্ধি করেছিল যে তিনি আগে কথা বলবেন না বরং বিভাআপুকে দিয়ে কথা বলাবেন? অনেক ক্ষণ অপেক্ষা করার পরও যখন ভাইয়ার কোন সাড়া মিললো না বরং নাক ডাকার শব্দ শোনা গেল তখন বিভা আপু ভাইয়াকে ডেকে তুললো।

আচ্ছা বার বার ভাইয়া বলছি বলে খারাপ লাগলে ভিন্ন ভাবে বলি। আমাদের দুলাভাইকে আপু যখন ঘুম থেকে ডেকে তুললো তখন কি হলো? ও হা দুলাভাইয়ের নাম আহসান। তো আহসান ভাইকে ডেকে তোলার পর সে সেই ঘুম ঘুম চোখে বিভাপুকে দেখে কি বলো? সে কি বললো আরে আরে আপনি কে? এতো রাতে আমার ঘরে আমার বিছানায় কি করেন? নাকি বললো ওহ জানটুস ভুলেই গেছিলাম আজ আমি তোমাকে বিয়ে করে এনেছি। নাকি বললো স্যরি ভুলেই গিয়েছিলাম।

কাহিনী কি বলুনতো?

বিভা আপুই প্রথম কথা বললো। তুমি কোন কথা না বলেই ঘুমায় গেলে কেন?
আহসান ভাই এর উত্তেরে কি বলেছিলেন জানেন?

— কি বলো দেখনি ঘড়িতে ১০ টা ৪৫ বেজে গিয়েছিল।
এ কথা শুনে বিভাপু বললো ঘড়িতে দশটা পয়তাল্লিশ বাজলেই বা কি আর দুইটা বাজলেই বা কি। এর সাথে আমাদের কিসের সম্পর্ক?
আহসান ভাই হাই তুলতে তুলতে বললেন ওহ তোমাকেতো বলাই হয়নি, আমিতো ক্যাডেট কলেজের ছাত্র। জানো না রাত ১০ টা পয়তাল্লিশের পরে জেগে থাকা নিষেধ!

আপু তখন ভাইয়ার পাঞ্জাবীর কলার ধরে বুকের কাছে টেনে নিয়ে বললো ওরে আমার চান্দুরে উনি ক্যাডেটগিরি দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে দুনিয়াতে আর কোন ক্যাডেট নেই। চান্দু তুমিকি জানো না যে আমিও ক্যাডেট কলেজেই পড়েছি আর ওসব জানি আমি। তুমি এখন আর ক্যাডেট নও তুমি হইলা এক্স ক্যাডেট আর এক্স ক্যাডেটদের কাছে কলেজের সেই সব নিয়মও এক্স হয়ে গেছে। এক্স বয় ফ্রেন্ডকে যেমন মনে রাখতে নেই তেমনি এক্স ক্যাডেটদেরও কলেজের রুলস মনে রাখতে নেই।

আহসান ভাইয়া বললেন এই কি বললে তুমি? এক্স বয়ফ্রেন্ডদের মনে রাখতে নেই? তার মানে তোমার কি বয় ফ্রেন্ড থুক্কু এক্স বয়ফ্রেন্ড ছিল?
বিভাপু আহসান ভাইকে আরেকটু বুকের সাথে চেপে ধরে বললো থাকবে না কেন? আলবাত ছিল।আমার মত সুন্দরী পাশাপাশি এক্স ক্যাডেটের বয় ফ্রেন্ড থাকবেনা এটা কোন কথা হলো?তবে সেতো আমার এক্স বয় ফ্রেন্ড তাই তার কথা ভুলে গেছি।
আহসান ভাই বললেন তা কি মনে করে তুমি এক্স বয়ফ্রেন্ডকে ভুলে গেলে? তুমি যে একটু আগে যুক্তি দিলে সেটার জন্যইকি এক্স বয়ফ্রেন্ডকে ভুলে গেলে?
বিভাপু বললেন চান্দু বয়ফ্রেন্ড যখন স্বামী হয়ে যায় তখনতো বয়ফ্রেন্ড এক্সই হয়ে যায় তাই তাকে মনে রেখে লাভ কি? আমি বরং স্বামীকেই মনে রাখি।

তার পর শুরু হলো সেই প্রথম ভ্যাকেশানে এসে মিরপুর-১০ নাম্বারে কোচিং করার সময় পরিচয় থেকে বুয়েট পাশ করে বের হওয়ার সময়কার কত কত স্মৃতি। ওরা সারা রাত শুধু স্মৃতিই আওড়ায়,ওদের স্মৃতি বেশি বলেই আমি এখনো চাচ্চু মামা ডাক শুনতে পাইনি।

#এক্স_ক্যাডেটের_ফুলসজ্জ্যা
#জাজাফী
১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭

কাগজের উড়োজাহাজ

আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদক অনেকক্ষণ হলো আমার বৈঠকখানায় বসে আছেন। পুজো সংখ্যার জন্য আমার একটা গল্প দেওয়ার কথা ছিল। তিনি ঐ গল্পটার জন্য জায়গাও খালি রেখেছেন।আমি তাঁকে কথা দিয়েছিলাম একটা গল্প অবশ্যই দেব। তিনি সম্ভবত ভরসা পাননি তাই তাঁর এক সহসম্পাদকের হাতে একটি খাম ধরিয়ে দিয়েছিলেন আমাকে দেবার জন্য। খাম দেখলেই এখন বুঝতে পারি টাকা পয়সা নয়তো চেক। খুলে দেখি চেক পাঠিয়েছেন।আমার একটি গল্পের জন্য যতটা সম্মানী আমি আশা করি তিনি ঠিক সেরকমটাই পাঠিয়েছেন। উপন্যাস ছাড়া অন্য কোন লেখার জন্য আমি সাধারণত অগ্রিম টাকা নেইনা। আনন্দবাজারের জন্য একটি গল্প লিখে দেব বলে যখন কথা দিয়েছি তখন অবশ্যই দেব। কিন্তু সম্পাদক সাহেব সম্ভবত ঠিক ভরসা না পেয়ে অগ্রিম চেক পাঠিয়েছেন যেন গুরুত্বটা একটু বেশি হয়।

আমি সহসম্পাদকের হাত থেকে খামটি নিয়ে তাঁকে বলেছিলাম সম্পাদক সাহেবকে বলবেন আগামী রবিবার কাউকে পাঠিয়ে গল্পটি নিয়ে যেতে।যে কাউকে পাঠিয়ে দিলেই গল্পটি নিয়ে যেতে পারবে।দুদিন পর গল্পটা লিখে ফেললাম। রবিবার আসতে বেশি দেরি নেই। লেখার খাতাটা টেবিলের উপর রাখাই ছিল। আজ যে সেই রবিবার তা একদম ভুলেই গিয়েছিলাম। কবি জয়গোস্বামীর বাসায় মধ্যাহ্নভোজের নিমন্ত্রন ছিল। সেখানে আরো দু চারজনের সাথে দেখা হওয়ায় আড্ডাটা বেশ জমে উঠেছিল। বাসায় ফিরে দেখি বৈঠকখানায় আনন্দবাজার পত্রিকার সম্পাদক স্বয়ং উপস্থিত।ওঁকে দেখে মনে পড়লো আজতো লেখাটা দেওয়ার কথা ছিল।

বৈঠকখানার সোফাতে বসে কুশল বিনিময় শেষে সম্পাদক সাহেবকে আস্বস্ত করলাম আপনার দুঃশ্চিন্তার কোন কারণ নেই,আমি আপনার জন্য গল্প লিখে রেখেছি।আপনি নিজে না এসে কাউকে পাঠিয়ে দিলেও গল্পটি নিয়ে যেতে পারতো। তিনি মুচকি হেসে বললেন আপনার লেখা বলে কথা। নিজ হাতে নিয়ে যেতে পারার আনন্দই আলাদা। আর তা ছাড়া দেখা হলে দু’চারমিনিট আলাপও করা যাবে। আমি বললাম তা বেশ বলেছেন। এবার কার কার লেখা যাচ্ছে বলুনতো। বাংলাদেশের কারো লেখা কি নিচ্ছেন। সম্পাদক সাহেব আক্ষেপ করে বললেন এ ক’বছরে বাংলাদেশের লেখকেরা খুব এগিয়েছে। তাঁদের লেখার মানও বেড়েছে। এপার বাংলায় সমরেশ মজুমদার,শীর্ষেন্দু আর আপনি ছাড়া গল্পকারতো তেমন নেই।আপনি মৃন্ময় আচার্য একাইতো গল্পের ঝুলিটাকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন। কবিদের মধ্যে জয়গোস্বামীতো সবার উপরে। কিন্তু বাংলাদেশে আপনি নাম বলে শেষ করতে পারবেন না। বাংলা সাহিত্য এখন বাংলাদেশী লেখক কবিদের সম্পদে পরিণত হচ্ছে। তাঁরা আমাদের লেখা দিতেই চায়না। এর প্রধান কারণ আমরা একসময় ওঁদের লেখাকে পাত্তাই দিতাম না।

কথার ফাঁকে পরিমল এসে চা দিয়ে গেল। আমরা এক বাসাতেই থাকি। গ্রাম থেকে এসে আমার সাথেই থেকে গেল।নানা কাজে আমাকে সে সহযোগিতা করে।কাজের লোক বলে যে কথাটি আছে আমি আসলে তাকে সেই ঘরানার মধ্যে ফেলতে চাইনা।সে পরিবারের সব কাজ করে পরিবারেরই অংশ হিসেবে।আমরা একই সময়ে একই টেবিলে বসে খাই এতে আমাদের জাত যায়না। বিশ বছর ধরে কাজ করার অভিজ্ঞতা তাকে শিখিয়েছে কখন কোন সময়ে এ বাসায় চা কফির দরকার।চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে সম্পাদক সাহেবকে বললাম বাংলাদেশী সাহিত্যিকদের লেখাও আমাদের লেখার সাথে রাখতে পারলে পাঠক দুই বাংলার সাহিত্যের স্বাদ পেত। সিনেমা তৈরি হচ্ছে দুই বাংলার যৌথ প্রযোজনায় যদিও তা নিয়ে খুব অসন্তোষের জন্ম হয়েছে তবে সাহিত্যে দুই বাংলাকে এক মলাটে আনতে পারলে কোন অসন্তোষ তৈরি হত কিনা বলতে পারছিনা। দুই বাংলা যদিও দুটি ভিন্ন দেশ তবে ভাষা যেহেতু এক তাই সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে উভয়ের মাঝে সেতুবন্ধন তৈরি হলে মন্দ হতনা।এ ব্যাপারে আপনাদের মত পত্রিকাওয়ালারা বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

চায়ের কাপটা টেবিলের উপর নামিয়ে রাখতে রাখতে সম্পাদক সাহেব বললেন দুই বাংলার লেখা এক মলাটে আনার চেষ্টা করবেন। আমি বললাম বসুন আমি আপনার জন্য রেডি করা লেখাটি নিয়ে আসি। লেখা শেষ করে টেবিলের উপর বই চাপা দিয়ে রেখেছিলাম গল্পটা মোট দশ পৃষ্ঠার লেখা।পৃষ্ঠা গুলো বইয়ের নিচ থেকে নিয়ে একটা খামে ভরে সম্পাদকের হাতে তুলে দিলাম।তিনি খাম থেকে লেখা বের করে আমার সামনেই পড়তে শুরু করলেন। তার আগে জানতে চাইলেন আমার সময় হবে কিনা। আমি সম্মতি দিলে তিনি পড়তে শুরু করলেন। উদ্দেশ্য একটাই কোথাও খটকা লাগলে তিনি জেনে নিবেন। কম্পোজের সময় এতে সুবিধা হবে। অনেক সময় হাতের লেখা বুঝতে অসুবিধা হয়।গল্প পড়া শেস করে সম্পাদক কিছুটা উসখুশ করতে লাগলেন। আমি বললাম কি হলো গল্পকি ভাল হয়নি? তিনি বললেন আপনার লেখা গল্প ভাল হবেনা এটা কেউ বিশ্বাস করবে? তবে এই গল্পটা দারুণ ভাবে শুরু হয়েছে এবং শেষও হয়েছে তারুন ভাবে কিন্তু সমস্যা হল মাঝখানে এসে গল্পটায় চ্ছেদ পড়েছে। মনে হচ্ছে কি যেন ছুটে গেছে। একটা পযার্য়ে গল্পটা ঠিক মিলছেনা।

আনন্দবাজারের সম্পাদকের হাত থেকে গল্পটি নিয়ে জানতে চাইলাম কোন জায়গায় ওরকম মনে হয়েছে। তিনি দেখিয়ে দেওয়ার পর নিজে একবার পড়লাম। সম্পাদক ঠিকই ধরেছেন। গল্পটা ঐ জায়গায় এসে ঠিক মিলছেনা। আমার স্পষ্ট মনে আছে গল্পটায় কোথাও এরকম চ্ছেদ ছিলনা।পৃষ্ঠা নাম্বার মিলিয়ে দেখতে গিয়ে খেয়াল হল ছয় নাম্বার পৃষ্ঠার পর সাত নাম্বার এবং আট নাম্বার পৃষ্ঠা মিসিং। সম্পাদকও তখন সেটা খেয়াল করলেন। আমি আবার লেখার টেবিলে গিয়ে তন্নতন্ন করে খুঁজলাম কিন্তু ঐ পাতাটা পেলাম না। পরিমলকে ডেকে জানতে চাইলাম আমার লেখার টেবিলের আশেপাশে কেউ গিয়েছিল কিনা,কোন কিছুতে হাত দিয়েছিল কিনা।সে জানালো ছোট বাবু গিয়েছিল। ছোট বাবু মানে আমার ছেলে বিজয়। এবার পাঁচ বছরে পড়েছে।

বিজয়কে ডাকলাম সে এসে সম্পাদক সাহেবকে নমস্কার জানিয়ে পাশের সোফায় বসলো। সে তার মায়ের কাছ থেকে বেশ আদব কায়দা শিখেছে। ওর মা বনেদী ঘরের মেয়ে তাই ছেলেকে খুব ছোটবেলা থেকেই আদব কায়দা রপ্ত করিয়েছে। কারো শিখিয়ে দেওয়া ছাড়াই নমস্কার দেওয়া দেখে সম্পাদক সাহেব খুব বিস্মিত হয়েছেন। আমি বললাম বাবা বিজয় তুমিকি আমার লেখার টেবিলে গিয়েছিলে? সে বললো গিয়েছিল। আমি জানতে চাইলাম কেন গিয়েছিলে? ওর কথা থেকে জানা গেল প্লেন বানাবে বলে আমার লেখার টেবিলে গিয়েছিল কাগজ নিতে। যে খাতায় লেখা হয় মাঝে মাঝে কাগজওয়ালার কাছে তা কেজি দরে বিক্রি করে দেওয়া হয় এটা সে দেখেছে এবং তা থেকে ভেবে নিয়েছে যে কোন লেখা কাগজের দরকার নেই। তাই সাদা কাগজ না নিয়ে প্লেন বানানোর জন্য ওখান থেকেই একটা কাগজ নিয়েছে যেখানে আমি আনন্দ বাজারের পুজো সংখ্যার জন্য গল্প লিখেছিলাম।

ছেলের কথা শুনে সম্পাদক সাহেব অবাক হলেন। আমি বললাম চিন্তা করবেন না দশ মিনিট বসুন আমি একপাতা নতুন করে লিখে দিচ্ছি। ছেলেটা যেটা দিয়ে প্লেন বানিয়েচে তা হয়তো পাওয়া যাবেনা। আমি বিজয়কে যেতে বলে সম্পাদকের সামনে বসেই মিলিয়ে লিখতে চেষ্টা করছি। ঠিক আগেরটুকুর মত হবে এমনটা আশা করা বোকামী। হয় তার চেয়ে ভাল হবে নয়তো তার চেয়ে খারাপ হবে। এক প্যারামত লিখেছি তখন সাইকরে একটা কাগজের প্লেন এসে পড়লো টেবিলের উপর। তাকিয়ে দেখি বিজয় দরজায় দাড়িয়ে আছে। প্লেটা হাতে নিতেই বুঝলাম এটাই লেখার হারানো অংশ। ছেলের সাধ করে বানানো কাগজের প্লেনটা ভেঙ্গে ওর মনে কষ্ট দিতে ইচ্ছে হলনা।সম্পাদকের মূখের দিকে তাকিয়ে বুঝলাম তিনি চাইছেন প্লেনটা ভেঙ্গে আগের লেখাটাই নিতে। আমার মন অবশ্য তা বলছিলনা। দ্বিধান্বিত ছিলাম।

ধীর পায়ে বিজয় এসে টেবিলের সামনে দাড়ালো তারপর প্লেনটা হাতে নিয়ে ভাঁজ খুলে কাগজটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো বাবা আমি না হয় আরেকটা কাগজ নিয়ে নতুন প্লেন বানিয়ে নেব। আমি বুঝিনি লেখা কাগজও দরকারী হয়। ছেলের উপস্থিত বুদ্ধি আমাদের দুজনকেই মুগ্ধ করলো। পুজা সংখ্যা বের হবার পর সম্পাদক নিজে এলেন সৌজন্য সংখ্যা দিতে। কোলকাতার উপকন্ঠেই আমার বাড়ি। সম্পাদক সাহেব সাথে করে একটা ব্যাটারি চালিত রিমোটকন্ট্রোল প্লেনও নিয়ে এসেছিলেন বিজয়ের জন্য। সেটা পেয়ে বিজয় ভীষণ খুশি। কাগজের উড়োজাহাজের আনন্দ সে খুঁজে নেবে যান্ত্রিক উড়োজাহাজে।

৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭

চিকিদের দুঃসময়ের গল্প

জন্মের পর চিকি ওর মা বাবাকে দেখেনি। ওর জন্মের এক সপ্তাহ আগে ওর বাবাকে মেরে ফেলা হয়েছিল। যেদিন চিকির জন্ম হল সেদিনই ওর মাকেও খুন করা হল। চিকি এসব জানতো না। ও যখন একটু বড় হল তখনই এসব জানতে পারলো। দুটো কোমল হাত সব সময় চিকিকে আগলে রাখতো। হাত দুটো ফারহানার।ফারহানা এমআইটিতে পড়ে। ভার্সিটি বাদে বাকি সময়ে ওর সাবর্ক্ষনিক সাথী চিকি। চিকিও ফারহানার আদর পেয়ে দুঃখ ভুলে যেতে চেষ্টা করে কিন্তু বাবা মা পুবর্পুরুষদের মুত্যুর কথা চিন্তা করে তার খুব জিদ চেপে যায়। মা বাবার খুনের প্রতিশোধ নিতে চায়। কিন্তু চিকি অনেক ছোট। সে এই বয়সে হত্যার প্রতিশোধ নিতে পারবে না। ফারহানার কাছ থেকে সে খুনী সম্পর্কে সব শুনেছে।

আমেরিকার নিউজার্সিতেই থাকে খুনিটা। শুধু যে চিকির বাবা মা দাদা দাদিকে সে খুন করেছে এমন নয়। সেই খুনীটা আরও বহু খুন করেছে। খুন করে সে ডলার কামিয়েছে এবং ধনী থেকে আরে ধনী হচ্ছে।চিকি এর প্রতিশোধ নিতে চায়।শুধুমাত্র একটু বড় হওয়ার অপেক্ষা।বাবা মায়ের হত্যার প্রতিশোধ সে নেবেই নেবে।তবে সে লোকটাকে খুন করবেনা। সে তার চোখ দুটো তুলে নেবে। অন্ধ হয়ে বাকি জীবন সে বেঁচে থাকুক এবং কষ্ট পাক এটাই চিকির ইচ্ছা।চিকি সেটা ফারহানাকে বলেছে।বুদ্ধিটা ফারহানারও বেশ পছন্দ হয়েছে।

ফারহানা থাকে ম্যানহাটনে। ওখান থেকে নিউজার্সি বেশ দূরে। কিন্তু চিকির বাবা মার খুনের বদলা নিতে দরকার হলে পৃথিবীর একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যেতে রাজি আছে চিকি।গুগল ম্যাপ থেকে ফারহানা ওকে রাস্তা দেখিয়েছে।এভাবেই পরিকল্পনা করতে করতে চিকি বেশ বড় হলো। তার বিয়ে হলো এবং কয়েকটা বাচ্চাও হলো।যেহেতু চিকির একটা পরিবার হয়েছে এবার সে প্রতিশোধ নিতে বের হতে পারবে। ফারহানা ততোদিনে এমআইটি থেকে পড়াশোনা শেষ করে বাংলাদেশে ফিরে গেছে।চিকি তাই ফারহানাকে বলতে পারেনি এবার সে প্রতিশোধ নিতে বের হচ্ছে।

এক সকালে পরিবারের সবাইকে ডেকে বাবা মা দাদা দাদির হত্যাকারির কথা বলেছে। তখন সে জানতে পারলো চিকির শ্বশুরকেও হত্যা করা হয়েছে।রাগ তার আরো দ্বিগুন হলো। পরদিন সে হত্যার প্রতিশোধ নিতে বেরিয়ে গেল। বাসার সামনেই একটা লরি দাড়িয়ে ছিল। সে লুকিয়ে সেটাতে উঠে পড়লো। লরিতে লেখা ছিল ম্যানহাটন টু নিউজার্সি। সুতরাং বিনা দ্বিধায় চিকি লরিতে উঠে লুকিয়ে থাকলো। কতক্ষণ গাড়ি চললো সে জানেনা। এক সময় গাড়িটা থেমে গেল।শুনতে পেলো ড্রাইভার তার হেল্পারকে বলছে নিউজার্সি চলে এসেছি সব আনলোড করো। চিকি যখন বের হবে তখন দেখলো লরিতে সাজানো কার্টনগুলোর একটার ডালা খুলে গেছে। ভিতরে কি আছে তা দেখার জন্য চিকি যখন উকি দিল তখন তার গা শিউরে উঠলো। সেটার ভিতরে ওরই জাত ভাইয়ের মৃত দেহ।

তার মানে চিকি যে খুনীটাকে খুঁজছে এই গাড়িটাও তারই। না জানে কত মায়ের কোল প্রতিদিন খালি হচ্ছে। বুড়ো খুনীটাকে শায়েস্তা করতে না পারলে এই হত্যাকান্ড থামবেনা। মনটাকে শক্ত করে চিকি বের হলো। ওকে দেখে ফেললো লরির ড্রাইভার এবং হেল্পার। তবে তেড়ে না এসে উল্টো বাবাগো মাগো ভুত ভুত বলে চেচাতে চেচাতে পালিয়ে গেল। তারা ভেবেছে কি করে এতোগুলো মৃতদেহের মধ্য থেকে একটা জীবিত বেরিয়ে এসেছে।এটা ভুত ছাড়া কিছু নয়।

এতে অবশ্য চিকির সুবিধা হলো।প্রথম দফায় বিপদে পড়তে গিয়েও বেঁচে গেল।গাড়ি থেকে নেমে সে সামনে তাকিয়ে দেখলো বিল্ডিংয়ের সামনে বুড়ো খুনীটার বিশাল একটা মুর্তি সেখানে নিচেয় বুড়োর নাম লেখা।ফারহানা আগেই গুগল থেকে বুড়োটার ছবি দেখিয়েছিল তাই নাম লেখা না থাকলেও তাকে চিনতে চিকির অসুবিধা হত না।চিকির ইচ্ছে হচ্ছিল ওটাকেই সবার আগে ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেবে কিন্তু ভারি পাথরে তৈরি মুর্তি ভাঙ্গা চিকির পক্ষে সম্ভব নয়। সে খুব সাবধানে বুদ্ধি করে খুনীটার বাড়িতে ঢুকলো। খুঁজে খুঁজে তার ঘরটাও পেয়ে গেল। চিকির মনটা খারাপ হয়ে গেল। দরজার পাশে খুনী বুড়োটার একটা বড় ছবি বাঁধাই করা আছে।সেখানে যা লেখা ছিল তা থেকে চিকি জানতে পারলো বুড়োটা এক বছর আগেই মারা গেছে।

এক বছর হলো ফারহানা বাংলাদেশে চলে গেছে। এই এক বছরে চিকি তাই নতুন কোন সংবাদ জানতে পারেনি।এতো কষ্ট করে প্রতিশোধ নিতে এসেও তার প্রতিশোধ নেওয়া হলোনা। সে আবার অন্য একটা গাড়িতে করে ফিরে গেল ম্যানহাটনে।তাকে বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। বাচ্চাকাচ্চা তাকে ঘিরে ধরে জানতে চাইলো প্রতিশোধের কথা। চিকি বললো খুনী বুড়োটা এক বছর আগেই মারা গেছে। একথা শুনে চিকি বাদে বাকি সবাই খুব খুশি হয়ে চিৎকার করে উঠলো। কিন্তু চিকি তখনো বিমর্ষ।তার স্ত্রী জানতে চাইলো খুনী বুড়োটা মারা গেছে এটাতো ভাল কথা। আর কাউকে সে খুন করতে পারবেনা। আমরা নিরাপদে থাকবো। চিকি বললো বুড়ো স্যান্ডার্স মারা যাওয়ার আগেই সারা পৃথিবীতে লাখ লাখ খুনীর জন্ম দিয়ে গেছে। সেই সব খুনীরা এখনো প্রতিদিন লাখ লাখ মুরগী মেরে ফেলছে তার পর সেগুলো ফ্রাই করে ক্যান্টাকি ফ্রাইডচিকেন নাম দিয়ে বিক্রি করে কোটি কোটি ডলার আয় করছে। আমাদের মত চিকিদের দুঃখ বুঝি কোন দিন শেষ হবেনা।

ম্যানহাটনে ফারহানা যে বাড়িতে থাকতো সেই বাড়ির মালিকের ছিল বিশাল একটি মুরগীর ফার্ম।চিকির জন্ম সেখানেই।ফারহানা থাকাকালিন নিজ হাতে সে মুরগীগুলোকে খাবার দিত আর তখনই চিকি নামের ছোট্ট একটি মোরগের বাচ্চার সাথে ভাল সম্পর্ক হয়েছিল। সে চলে যাবার পর সেভাবে কেউ আর চিকিদের আদর করতো না।বুড়ো স্যান্ডার্স মারা যাবার পরও তাই তাদের মুত্যু ভয় কাটছেনা।সে পরিবারের সবাইকে কাছে ডেকে বলেছে যে কোন সময় ঘাতক হানা দিতে পারে। খুনীদের হাত থেকে তারা কেউ রেহাই পাবেনা। কিন্তু কিছুটা সাবধানে থাকতে পারলে হয়তো আরো কটাদিন বেঁচে থাকা যাবে।

পরদিন সকালে দুটো লম্বা হাত এসে খপ করে চিকির গলা চেপে ধরলো। চিকির নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল।পরিবারের কথা যেমন মনে পড়ছিল তেমনি মনে পড়ছিল ফারহানার কথাও। কিছুক্ষণ পর একটা ধারালো চুরি দেহ থেকে চিকির মাথাটা আলাদা করে দিল। তার পর সব অন্ধকার। চিকি আজীবনের মত ঘুমিয়ে গেল।

৩ সেপ্টেম্বর ২০১৭

 

উচ্চতর ডিগ্রি নাকি দ্রুত কর্মসংস্থান

রূপকথার গল্পের মত বলতে হয় সে বহুকাল আগের কথা এদেশের মানুষ লেখাপড়া শিখতো জ্ঞানার্জনের জন্য কিন্তু এখন আমরা লেখাপড়া শিখি একটা ভাল চাকরির আশায়।আমাদের দেশে লেখাপড়া,উচ্চতর ডিগ্রি সবই মূলত একটি ভাল কর্মসংস্থানের লক্ষ্যে।এখন প্রশ্ন হচ্ছে কোনটা শ্রেয়? উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন নাকি দ্রুততম সময়ে স্বাবলম্বি হওয়া?আমাদের এই উন্নয়নশীল দেশে পারিবারিক টানাপোড়েনের মধ্যে প্রতিটি পরিবার চায় তাদের সন্তান শিক্ষিত হোক কিন্তু সেই শিক্ষিত হোক কথাটিকে সত্যে পরিণত করতে গিয়ে তাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়।সীমিত আয়ে সন্তানের পড়াশোনার খরচ যোগান দেওয়া পরিবারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে।এমতাবস্থায় পরিবার কিন্তু মন থেকে এটাও চায় তাদের সন্তান যদি সংসারে হাল ধরতো তাহলে কিছু না হোক একটুখানি সুখের দেখা পাওয়া যেত।

আপনি যদি উচ্চবিত্ত এমনকি মধ্যবিত্তও না হয়ে থাকেন তাহলে যে কথাগুলো বলা হচ্ছে তা আপনি অনুভব করতে পারবেন। আজ থেকে কয়েক দিন আগে ৫ জুলাই আমার পরিচিত অনেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৭৮ তম দীর্ঘমেয়াদি কোর্সে জয়েন করেছে এবং আপনি শুনলে অবাক হবেন তাদের সিংহভাগই এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে যাদের ফলাফল বের হয়নি।এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল বের হওয়ার আগেই তারা দেশের প্রথমশ্রেনীর একটি চাকরি পেয়েছে যা তাদের জীবনকে আমুল বদলে দেবে।পাশাপাশি আপনার আমার ছেলে মেয়ে ভাই বোন কিংবা অন্য কারো ছেলে মেয়ে ভাইবোন যারা এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে তারা দিনরাত অবিরাম পরিশ্রম করছে কোন একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন একটা বিষয়ে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার জন্য।আমি আগেই বলেছি যে আমরা যে যেখানে যে বিশ্ববিদ্যালয়ে যে বিষয় নিয়েই পড়িনা কেন আমাদের মূল লক্ষ্য কিন্তু একটাই আর তা হলো ভাল একটা চাকরি। দু চারজন হয়তো ভাল ফলাফল করে শিক্ষকতা পেশায় আসবে এবং জ্ঞান বিলাবে সেটাও একপ্রকার ভালমানের একটি চাকরি পাবার নামান্তর।

আমি যদি আমার বন্ধুদের কথা বলি তাহলে বলতে হয় তাদের মধ্যে যারা সেনাবাহিনীতে কিংবা অন্য কোন বাহিনীতে কিংবা মনে করি কোন একটা বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে সাধারণ কোন পদে চাকরি নিয়েছে যাদের বেতন ধরে নেওয়া যেতে পারে মাত্র দশ থেকে পনের হাজার টাকা।পক্ষান্তরে আমি কিংবা আমাদের কারো সন্তান দেশের সব থেকে ভাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সব থেকে সেরা বিষয়ে ভর্তির সুযোগ পেলো এবং পড়াশোনায় খুব মনোযেগি হলো। এই দুজনের মধ্যে অনেক কিছুর পার্থক্য গড়ে উঠবে। একজন হয়তো লেখাপড়া করে অনেক ভাল রেজাল্ট করবে এবং তাকে সে জন্য চার থেকে ছয় বছর অপেক্ষা করতে হবে তার পর সে একটা চাকরি পাবে এবং ধরে নেওয়া যেতে পারে তার বেতন হবে ত্রিশ থেকে চল্লিশ হাজার টাকা। পক্ষান্তরে আমাদের যে বন্ধু সাধারন একটা প্রতিষ্ঠানে হয়তো সেলস ম্যানের চাকরি নিয়েছিল এইচএসসি পরীক্ষার পরই সে এই ছয় বছরে কয়েক লাখ টাকার মালিক হয়ে যাবে যা তাকে এবং তার পরিবারকে আমার তুলনায় অনেক বেশি সুখ এনে দিতে সক্ষম।

উচ্চশিক্ষা নিয়ে আমি যখন একটা প্রতিষ্ঠানে প্রবেশনারী লেভেলে ত্রিশ হাজার টাকা বেতনে চাকরি নেব ঠিক সেই সময়ে আমারই বন্ধুর ছয় বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা জমা হবে,একটা দুটো প্রোমশান পাবে এবং পাশাপাশি সে যদি প্রতি মাসে দু হাজার টাকা করেও জমা করে রাখে তাহলে ওই ছয় বছরে তার জমাকৃত টাকার পরিমান দাড়াবে ১ লক্ষ ৪৪ হাজার টাকা।অনেকটা খরগোশ আর কচ্ছপের দৌড়ের মত বেশি বেতন পেয়েও তখন আমি তাকে আদতে ছাড়িয়ে যেতে পারবো না।এটাতো গেল সাধারণ লেভেলে যারা চাকরি নিয়েছে তাদের উদাহরণ।পাশাপাশি যারা এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলের পর ভাল কোন চাকরি নিয়েছে তাদের অবস্থা আরো উন্নতির দিকে যা কল্পনাতীত।

যেমন আমার এক বন্ধু যে সেনাবাহিনীতে সাধারণ সৈনিক পদে জয়েন করেছিল এবং চাকরি জীবনে সে জাতিসংঘ মিশন করে এসেছে।ওই মিশন থেকে সে যে আর্থিক সুবিধা লাভ করেছে তা আমি আইবিএ থেকে পাশ করে ঠিক কতদিনে অর্জন করতে পারবো সেটাকি আপনি অনুধাবন করতে পারবেন? ধরুন আমি আইবিএ থেকে ভাল সিজিপিএ নিয়ে পাশ করে দেশের বড় কোন একটা প্রতিষ্ঠানে বেশ ভাল পদে চাকরি পেলাম এবং শুরুতেই আমাকে পঞ্চাশ হাজার বা তারও বেশি বেতন দেওয়া হলো। তার পরও দেখা যাবে আমার যে বন্ধু জাতিসংঘ মিশন করে এসেছে তার অর্জিত সম্পদের সমান আয় করতে আমাকে কয়েক বছর পার করতে হবে।আদতে যদিও কথাটা সেরকম নয়।কেননা আপনি যত উচু পদের চাকরি করবেন আপনার ব্যয়ও ততোধিক হবে।ফলে খরচের পর খুব বেশি জমাতে পারবেন বলে মনে করিনা।

বুয়েট,আইবিএ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেরা বিষয়গুলো বাদ দিলে বাকি সব ছাত্রছাত্রীদের কথা চিন্তা করলে বেশ হতাশ হতে হয়।তারা প্রতিবছর ভাল ফলাফল করে পাঁচ ছয় বছরে মাষ্টার্স ডিগ্রি অজর্ন করে একের পর এক চাকরির পরীক্ষা দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে যায় কিন্তু চাকরি হয়না। ফলে দেখা যায় এইচএসসির পর মুলত সে একটা কর্মসংস্থান করতে প্রায় নয় থেকে দশবছর পার করে ফেলে যে সময়টাতে অন্য বন্ধু যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগই পায়নি কিংবা চেষ্টাও করেনি বরং কাজে নেমে পড়েছে তার অর্জিত সম্পদ তখন দেখার মত।

এতো সব কথা বলার মানে এই নয় যে আমি উচ্চশিক্ষার পক্ষে নই।আমিও চাই দেশের প্রতিটি নাগরিক উচ্চশিক্ষিত হোক।কিন্তু আমাদের দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা বিবেচনা করে,পারিবারিক দুঃখ দুর্দশার কথা চিন্তা করে আমার মনে হয়েছে উচ্চশিক্ষার চেয়ে দ্রুত কর্মসংস্থান অধিক জরুরী।কিন্তু প্রশ্ন উঠতে পারে দ্রুত কর্মসংস্থান কিভাবে সৃষ্টি হবে?চিন্তা করে দেখুন বিগত বছর গুলিতে আমাদের দেশে বিলিয়নিয়ারের সংখ্যা কি পরিমান বৃদ্ধি পেয়েছে।এমনকি তাদের টাকা সুইস ব্যাংকে রাখা হচ্ছে।দেশের ভিতরেই যারা হাজার কোটি টাকা ব্যাংকে জমিয়ে বিলিয়নিয়ার তকমা গায়ে লাগিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে দেশের উন্নতির জন্য,দেশ থেকে বেকারত্ব কমানোর জন্য এবং অধিকতর কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য মূলত ঐ সব টাকাওয়ালাদের স্বদিচ্ছার খুবই প্রয়োজন।ব্যাংকে হাজার কোটি টাকা জমিয়ে না রেখে সেগুলো সঠিক ভাবে বিনিয়োগ করলে,নতুন শিল্প কারখানা তৈরি করলে এদেশের অধিক সংখ্যক লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা সম্ভব হত।তখন দেখা যেত কোন পরিবারের একাধিক সন্তান থাকলে একজন হয়তো কর্মসংস্থান সৃষ্টি হওয়ায় সংসারের হাল ধরে বাকিদের উচ্চশিক্ষিত হতে সহযোগিতা করতে পারতো।তখন আমরা বলতে পারতাম যে আমরা শিক্ষার জন্যই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হচ্ছি।

সরকার চাকরির বয়স বাড়াবেনা বলে তাদের সিদ্ধান্তকে খুটির সাথে শক্তভাবে বেধে রেখেছে।অন্যদিকে পযার্প্ত শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা নিয়ে বের হলেও সে পরিমান কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় ক্রমাগত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে।এভাবে চলতে থাকলে এ দেশ একদিন বেকারদের ভারি নিঃশ্বাসে কেপে উঠবে।দেশকে উন্নত করতে হলে সবার আগে চাই কর্মসংস্থান সৃষ্টি।কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে না পারলে লাখ লাখ উচ্চশিক্ষিত তৈরি করে লাভ কি?সেটা হয়তো পরিসংখ্যনের দিক থেকে এগিয়ে রাখবে যে আমাদের দেশের সিংহভাগ লোক উচ্চশিক্ষিত কিন্তু অন্যদিকে যে পিছিয়ে যাবে সেটা কেন আমরা ভাবছিনা।

এখনই আমাদের আফসোস করতে হচ্ছে যে পরিমান শিক্ষার্থী এ প্লাস নিয়ে পাশ করছে তাদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়েই ভর্তিরসুযোগ দিতে পারছিনা আর সেই সব শিক্ষার্থীরা যখন কোন না কোন প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে বের হবে তখন তাদেরকে আমরা কোথায় রাখবো?শিক্ষার্থীরা হলো ফসলের মত।আপনি অনেক ফসল উৎপাদন করলেই হবেনা বরং সেগুলো যত্নকরে রাখার মত ব্যবস্থাও করতে হবে।শুধু উচ্চতর ডিগ্রির সুযোগ দিলেই হবেনা বরং সেই ডিগ্রিধারীদের কাজেরও সুযোগ দিতে হবে।

আমি উচ্চশিক্ষার পক্ষে থেকেও মনে প্রাণে বিশ্বাস করি আমাদের দেশের জন্য উচ্চতর ডিগ্রির চেয়ে দ্রুত কর্মসংস্থানকেই প্রাধান্য দিতে হবে।এটা মনে রাখা আবশ্যক কর্মহীন মানুষ কখনো দেশকে এগিয়ে নিতে পারেনা তারা বরং দেশের বোঝা হয়ে থাকে।তাই সবার আগে কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারলে তবেই আমাদের উন্নত দেশের কাতারে পৌছার স্বপ্ন সত্যি হবে।

–জাজাফী

৬ জুলাই ২০১৭

ওয়েবসাইট www.zazafee.com

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার মান বনাম ভাবমূর্তি

জুলাই-২০১৭ তে ৯৬ বছরে পা দিয়েছে দেশের সব থেকে প্রবীণ এবং প্রধানতম বিশ্ববিদ্যালয়।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে আমাদের রয়েছে অনেক ইতিহাস। যে বিশ্ববিদ্যালয় শুধু মাত্র একটি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবেই থাকেনি পাশাপাশি হয়ে উঠেছে ইতিহাসের অংশ।আমাদের ইতিহাসের সব থেকে গুরুত্বপুর্ন দুটি অধ্যায় বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন এবং একাত্তুরের মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অতুলনীয়।বিশ্ববিদ্যালয় এক কালে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে খ্যাতি পেয়েছিল।কিন্তু এখন অনেকেই মনে করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার অতীতের ঔজ্বল্য হারিয়ে ফেলেছে।আমরা বিশ্বের অপারপার বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় চোখ মেললে দেখতে পাই সেরা একশোতো দূরের কথা পাঁচশো বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকা করলেও আমাদের ঐতিহ্যের এই বিশ্ববিদ্যালয়কে খুঁজে পাইনা।এক কালে পাওয়া গেলেও এখন নানা কারণে সেই তালিকায় আর ঠাই হয়না আমাদের প্রিয় বিশ্ববিদ্যালয়ের।তার মানে স্বাভাবিক ভাবেই বলা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান কমে গেছে বলেই বর্হিবিশ্বে এর ভাবমুর্তিও কমে গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সভাপতি সাইফুর রহমান সোহাগ আশা প্রকাশ করেছেন আগামী ২০৪১ সালের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উঠে আসবে বিশ্বের সেরা ২০ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায়।কিন্তু বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করলে কোন ভাবেই আমরা এরকম আশা প্রকাশ করার সাহস পাইনা।বিগত বছর গুলোতে আমরা দেখেছি একের পর এক নতুন বিভাগ চালু হয়েছে এবং প্রতিবছরই সেই সব বিভাগে ছাত্র ছাত্রী ভর্তি হচ্ছে।আগের তুলনায় প্রতিটি বিভাগে ছাত্র ছাত্রীদের রেজাল্ট ভাল হচ্ছে,সিজিপিএর দিকে তাকালে দেখতে পাই অধিকাংশ বিভাগের এক বৃহদাংশ শিক্ষার্থীর সিজিপিএ ৩ এর উপরে এবং সেটা ৩.৯ এর ঘরে গিয়ে পৌছেছে।অন্যদিকে শ্রমবাজারের দিকে তাকালে আমরা দেখছি সেই সব মেধাবী ভাল ফলাফলধারীদের অনেকেই বেকারত্বের বোঝা মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

প্রধানত যে সব নতুন বিভাগ চালু হয়েছে দেশে তার অধিকাংশরই নির্দিষ্ট কোন কর্মক্ষেত্র তৈরি হয়নি।ফলে ভাল ফলাফল নিয়ে পাশ করার পরও চাকরিদাতাদের কাছে তারা অবহেলিত হচ্ছে।যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের মান যাচাই করা হয় তখন কেবল মাত্র ভাল ফলাফল আর শিক্ষার দিকেই নজর দেওয়া হয়না বরং পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা পাশ করে কে কতটা কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পেরেছে কিংবা স্বাবলম্বি হয়েছে সেসবও দেখা হয়। এ কারণেই বিগত বছর গুলিতে দেখা গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় তালিকায় এগিয়ে আছে।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান আগের তুলনায় কমেছে এটা আমরা মুখে না বললেও আমাদের সামনে তা স্পষ্ট হয়ে উঠছে।আমরা দেখতে পাই বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বিভাগ নিয়মিত সময়ের বাইরে সান্ধ্যকালীন কোর্স চালু করে শিক্ষার্থী ভর্তি করছে।সান্ধ্যকালীন ওই সব কোর্সে যাদের ভর্তি করা হচ্ছে তাদের ভর্তি যোগ্যতা নিয়ে খোদ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষেরই সন্দেহ আছে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে ওই সব শিক্ষার্থীদের ফলাফলও জরিপের আওতাভুক্ত হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবির্ক মানসুচক নিম্নগামী হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ কামাল উদ্দিন সিনেট অধিবেশনের বাজেট বক্তৃতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশের বেশ কিছু পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সান্ধ্যকালীন কোর্স নিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেছেন বলে প্রথম আলো সহ বেশ কিছু নামিদামী পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে। উল্লেখ্য, গত কয়েক বছরে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েকটি বিভাগে সান্ধ্যকালীন কোর্স খোলা হয়েছে। কামাল উদ্দিনের মতে, এসব কোর্সে কখনো কখনো ভর্তি পরীক্ষা ছাড়াই নিম্নমানের শিক্ষার্থী ভর্তি করার অভিযোগ রয়েছে। সিনেট সভায় তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেছেন, এই কোর্সের মাধ্যমে শুধু ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল ও অর্থ লাভের আশায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় অসংখ্য নিম্নমানের গ্র্যাজুয়েট তৈরি করছে। এর মাধ্যমে একশ্রেণির শিক্ষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনাম ক্ষুণ্ন করছেন। তিনি এই শ্রেণির শিক্ষকদের ‘শিক্ষক দোকানদার’ বলেও মন্তব্য করেন।

শিক্ষা যখন পন্যের মত বেচাকেনা শুরু হয় আর বিশ্ববিদ্যালয় যখন সেই বেচাকেনার বাজার হয়ে ওঠে তখন সেখানে শিক্ষার মান নিম্নগামী হবে এটাই স্বাভাবিক।আমরা কদিন আগেই পত্রিকার মাধ্যমে জেনেছি দেশের ৩৩টি বিশ্ববিদ্যালয় দীর্ঘদিন উপাচাযর্হীন অবস্থায় চলছে।দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সবোর্চ্চ স্তর হলো বিশ্ববিদ্যালয়।এখন যদি বিশ্ববিদ্যালয়ই নানা অনিয়মের জালে জড়িয়ে পড়ে আর শিক্ষার বাণিজ্যিকিকরণে যুক্ত হয় তাহলে শিক্ষার মান থাকে কি করে।

শিক্ষাই জাতির মেরুদন্ড কিন্তু আমরা নানা ভাবে সেই মেরুদন্ডই ভেঙ্গেদিচ্ছি।এখন আমাদের দেশ থেকে অনেক শিক্ষার্থী প্রতিবছর এমআইটি,কেমব্রিজ,অক্সফোর্ড থেকে শুরু করে ক্যালটেক এবং স্ট্যানফোর্ডে পড়তে যাচ্ছে।এদিক থেকে বিবেচনা করলে নির্দ্বিধায় বলা চলে আমাদের ছেলে মেয়েরা আগের তুলনায় মেধাবী হয়েছে।বিশ বছর আগে এমআইটি,অক্সফোর্ড বা হাবার্ডে আমাদের দেশের শিক্ষার্থী খুঁজে পাওয়া ছিল ভাগ্যের ব্যাপার আর আজকের দিনে সেখানে প্রায় প্রতিটি কোর্সেই আমাদের দেশের শিক্ষার্থী পাওয়া যায়। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে বিশ্বের নামিদামী বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয়ে ভাল করলেও আমাদের এদেশীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার গুণগত মান নিম্নগামী হওয়ায় আগের তুলনায় বর্হিবিশ্বের শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে কিছুটা অনিহা প্রকাশ করছে।

বর্হিবিশ্বের ছাত্র ছাত্রীরা শিক্ষার গুণগত মান বিচারে এখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং অপরাপর পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে কোন কোন বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়কে পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রাখছে।সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে সুযোগ সুবিধা এবং তুলনামুলক খরচ কম হওয়ার পরও সেখানে ভর্তির বদলে অনেকে গাজীপুরের আইইউটিতে ভর্তি হচ্ছে যদিও সেটা পনের থেকে বিশ লাখ টাকার ব্যাপার।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাননীয় উপাচার্য বলেছেন ‘বিশ্ববিদ্যালয় কোনো অবস্থাতেই বাণিজ্যকেন্দ্র নয়। এটি আমাদের উপলব্ধি করতে হবে।’ কিন্তু তারই অধীনে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক বিভাগই সান্ধ্যকালীন কোর্স চালু করে অনেকটা বাণিজ্যিকিকরণে লিপ্ত হয়েছে যা কোষাধক্ষ্যের বক্তব্যেই স্পষ্ট হয়েছে এবং সেই একই বক্তব্যকে অন্য অনেকে সমর্থন জানিয়েছেন।

সান্ধ্যকালীন কোর্স বিশ্বের আরো অনেক বিশ্ববিদ্যালয়েই আছে তবে সময়ের পার্থক্য ছাড়া সেখানে শিক্ষার মানের তেমন কোন পার্থক্য না থাকায় সেটা নিয়ে কেউ প্রশ্ন তোলেনি। এ ক্ষেত্রে পার্শ্ববতীয় দেশ ভারতের দুটি খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সান্ধ্য কোর্সের বিষয়টি আলোচিত হতে পারে। আইআইটি মুম্বাইয়ে কর্মরত পেশাজীবীদের জন্য এম. টেক. স্নাতকোত্তর ডিগ্রি দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। সেখানে নিয়মিত এম. টেক. কোর্সটিও সান্ধ্যকালীন। অন্যদিকে দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে সান্ধ্যকালীন কিছু ডিপ্লোমা কোর্স রয়েছে। সেখানে সান্ধ্যকালীন কোনো স্নাতক বা স্নাতকোত্তর ডিগ্রি দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায় না। ঠিক তেমনিভাবে আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কোনো কোনো কোর্স চালু করলে দোষের কিছু হবে না। তবে তা করতে হবে নিয়মিত কোর্সের কোনো প্রকার বিঘ্ন না ঘটিয়ে। ভর্তিসহ মূল্যায়ন একই মানের রাখাও সংগত। আর বিবেচনায় রাখা সংগত, একই শিক্ষক বিভিন্ন কাজে জড়িয়ে পড়লে তাঁর শিক্ষাদানের মান ক্রমান্বয়ে উঁচু হওয়ার সুযোগ কম।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিত্যনতুন বিভাগ খোলার পরিবর্তে পুবর্বতী বিভাগগুলিকে যুগোপোযোগি শিক্ষার আওতায় আনা অধিক জরুরী।বিশ্ববিদ্যালয়ে আরো অধিকতর গবেষণাক্ষেত্র তৈরি করতে হবে পাশাপাশি শিক্ষার্থীদেরও কেবল মাত্র সিলেবাস শেষ করে পরীক্ষায় ভাল সিজিপিএ পাওয়ার বদলে নিজেকে সত্যিকারের শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে।শিক্ষকদের উচিত বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে অতিরিক্ত সময় না দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে আরো খানিকটা সময় দিয়ে এর মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখা।সাদা দল-নীল দল নানা মত অভিমতে না জাড়িয়ে বিশ্বের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মত শিক্ষাই একমাত্র ব্রতী হিসেবে মেনে নিয়ে কাজ করতে পারলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও পরিবেশগত মানোন্নয়ন সময়ের ব্যাপার মাত্র।তখন হয়তো আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় সেরাদের তালিকায় আসায় আর কোন বাধা থাকবে না।

–জাজাফী

৩ জুলাই ২০১৭

উত্তরা,ঢাকা-১২৩০

দৈনিক ইত্তেফাকে ৪ জুলাই ২০১৭ তে প্রকাশিত

মরা নদীর হাহাকার:আমাদের করণীয়

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এদেশের আনাচে কানাচে জালের মত বিছিয়ে আছে অসংখ্য নদী। কিন্তু আফসোস নদীগুলো মৃতপ্রায়। মা ছাড়া সন্তানের যেমন পরিচয় দেবার মত কিছু থাকেনা তেমনি নদীমাতৃক দেশ তকমা গায়ে লাগিয়ে নদীকে উপেক্ষা করে থাকা যায় না। কিন্তু আমরা থাকছি। নদী মরে যাক তাতে আমাদের কি? আমরা আছি আমাদের তালে। এটাই যেন হয়ে উটেছে আমাদের ধ্যানজ্ঞান। নদী যেভাবে মরে যাচ্ছে,শুকিয়ে যাচ্ছে, তাতে করে বলা যেতে পারে আর কয়েক দশক ধৈর্য ধরে থাকলে হয়তো পদ্মাসেতুর দরকার হতোনা। পদ্মাও যে অন্য নদীর মত মরে যাবেনা তার গ্যারান্টি আমাদের কাছে নেই। আমাদের পুবর্পুরুষেরা যেমন হারিয়ে গেছে একদিন নিশ্চই আমরাও হারিয়ে যাব। ঠিক একই ভাবে অগনিত নদী যেমন নাব্যতা হারিয়ে মৃতপ্রায় তেমনি অনাদর অবহেলায় একদিন হয়তো ঢেউতোলা পদ্মাও তার ভরা যৌবন হারিয়ে মরে যাবে, আর তখন সেই পদ্মার মাঝ দিয়ে আমরা গাড়ি চালিয়ে পার হতে পারবো, যদিনা আমরা সচেতন হই।

বাংলাদেশ যেহেতু নদীমাতৃক দেশ  সুতরাং নদী এদেশের মায়ের মত। এদেশে নদীর যে অবদান এবং আবশ্যকতা তা সহজেই অনুমেয়। সেচ কাজ চালানো থেকে শুরু করে ব্যবসা বানিজ্যে নদীপথ অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ন ভূমিকা পালন করে। কিন্তু আমাদের দেশে হাতে গোনা কয়েকটি নদী বাদে প্রায় সিংহভাগ নদীই তার নাব্যতা হারিয়েছে। বর্ষার মৌসুমে কিছুটা পানি থাকলেও সেটির অগভিরতার কারণে ভারি নৌযান চলাচলের অনুপযুক্ত হয়ে থাকে। ফলে ব্যবসা বানিজ্যের পরিবহন পথ হিসেবে সব থেকে স্বল্প ব্যায়ী নদীপথ আমরা ব্যবহার করতে পারিনা।

আমাদের নদীগুলো ক্রমাগত ভাবে ভরাট হয়ে যাচ্ছে। বর্ষায় ভারি বর্ষনে আবাদী জমি থেকে স্রোতে মাটি কেটে সেটা নদীতে গিয়ে পড়ছে ফলে নদী ভরাট হচ্ছে। অপরদিকে শিল্প কারখানা সহ নানা বর্জ্য নদীতে ফেলায় নদীর নাব্যতা হারাচ্ছে। নদীর নাব্যতা না থাকায় বর্ষায় দেখা দিচ্ছে ভয়াবহ বন্যা অন্যদিকে চৈত্রের খরতাপে দেখা দিচ্ছে পানিশুন্যতা। চারদিক ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে ভারত নির্মিত ফারাক্কা বাধ ও আমাদের নদীর নাব্যতা হারানোর জন্য দায়ী। নদী যদি সব সময় প্রবাহমান থাকতো তাহলে যে পরিমান নাব্যতা হারিয়েছে তার তুলনায় অনেক কম নাব্যতা হারাতো। যখন আমাদের পানির দরকার তখন আমরা তা পাচ্ছিনা আবার যখন পানির চাহিদা কম তখন হুট করে পানি আসছে যা আমাদের কৃষিপ্রধান দেশে নানা সংকট সৃষ্টি করছে।

আমরা যদি নদীর ঐতিহাসিক গুরুত্বের কথা চিন্তা করি তাহলে ফিরে যেতে হবে একাত্তুরে। অপেক্ষাকৃত অনেক দুবর্ল অস্ত্র নিয়েও বাঙ্গালীরা দেশ স্বাধীন করতে পেরেছিল যে কয়টি কারণে তার মধ্যে বুকে অসীম সাহস যেমন একটি তেমনি নদীমাতৃকতাও অন্যতম। আমরা দেখতে পাই বর্ষার মৌসুমে মুক্তিবাহিনী সব থেকে সফল এর প্রধান কারণ ্ ামাদের সাথে নদীর গভীর সম্পর্ক। মুক্তিযোদ্ধারা অনায়াসে ঝড়বৃষ্টিতেও নদী সাতরে অভিযান চালাতে পেরেছে পক্ষান্তরে হানাদার বাহিনী নদীর কাছে অচেনা ছিল বলে তারা তেমন সাতারও জানতো না ফলে বৃষ্টির দিনে যেমন তারা তেমন তৎপর ছিলনা তেমনি নদী পথেও তারা ছিল অপটু।ফলে মুক্তিযোদ্ধারা সহজেই শত্রুকে ছিন্ন ভিন্ন করতে পেরেছে। সেই সব নদীই আজ মৃতপ্রায়। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলিতে যে নদী আমাদের জন্য সহায় ছিল,যে নদীর জন্য এ দেশ নদীমাতৃক দেশ বলে পরিচিতি পেয়েছে সেই সব নদী অনাদর অবহেলায় মরে যাচ্ছে।

আমরা সবাই জানি ইট বানানোর জন্য মাটি লাগে।আমরা নিবির্চারে ফসলের জমি নষ্ট করে ইট বানানোর মাটি সংগ্রহ করে একই সাথে দুটি ক্ষতি করছি। ফসলের জমি নষ্ট করছি ফলে কৃষি জমি কমে যাচ্ছে যা আমাদের জন্য হুমকি স্বরুপ। আমি বলতে চাই নদীর মাটি দিয়েও ইট হয়। ফসলের জমি নষ্ট না করে ইট তৈরির জন্য নদীর মাটি ব্যবহার করা হোক। এতে করে একই সাথে অনেক গুলো উপকার সাধীত হবে। ইট তৈরির মাটি পাওয়া যাবে পাশাপাশি নদী খনন ও হবে। আপনি লক্ষ্য করলে দেখবেন দেশের অনেক নদী থেকেই বালু তোলা হচ্ছে কিংবা মাটিও তোলা হচ্ছে কিন্তু নদীর নাব্যতা ফিরে আসছেনা। এর প্রধান কারণ অপরিকল্পিত ভাবে মাটি ও বালু উত্তোলন। আমি বেশ কিছু নদী থেকে বালু ও মাটি তোলা দেখেছি তারা নদীর কিনার ঘেষে বালু ও মাটি তুলছে ফলে নদীর গভীরতা বৃদ্ধি পাওয়ার বদলে প্রশস্ততা বাড়ছে।

একটি নদীর প্রশস্ততা বৃদ্ধি পাওয়া মানেই নদী তীরের জমি কমে যাওয়া। এইভাবে বালু বা মাটি তুললে নদীর নাব্যতা ফিরে আসবেনা। নদী খনন মানে নদীকে প্রশস্ত করা নয় বরং নদীর গভীরতা বৃদ্ধি করা। আমরা কেউ সেটা করছিনা। মাঝ নদী থেকে মাটি উত্তোলোনের খরচ বেশি দেখে আমরা নদীর তীর কেটে সমতল ভূমি নষ্ট করে নদীকে প্রশস্ত করার নামে দেশের ক্ষতি করছি। সরকারের উচিত এ ব্যপারে কঠোর নির্দেশ দেওয়া যে ইট তৈরি করতে হলে অবশ্যই নদী খনন করে মাটি নিতে হবে। আর কোন ফসলের জমি নষ্ট করে ইট বানানো যাবেনা। সে ক্ষেত্রে শুধু মাত্র ইট ব্যবসায়ীদের উপরদায় চাপিয়ে দিলে সেটা ঠিক হবেনা।সরকারকে সবার্ত্মক ভাবে তাদের পাশে দাড়াতে হবে। তাদের ঐ কাজে অতিরিক্ত যে ব্যয় হবে তা সরকার বহন করলে দু’পক্ষই লাভবান হবে। সরকার নিজে ড্রেজার দিয়ে নদী খনন করলে পুরো ব্যয়ভার সরকারকে বহন করতে হতো যা সময় সাপেক্ষ্য এবং বেশ ব্যয়বহুল। অন্যদিকে ইট তৈরির জন্য যারা মাটি তুলবে তাদের আর্থিক সহায়তা দিলে ইটতৈরির জন্য তারা মাটি তুলবে পাশাপাশি নদীর গভীরতা বৃদ্ধি পাবে এবং নাব্যতা ফিরে আসবে।

কেউ নিজের পরিমিত ব্যয় থেকে অতিরিক্ত ব্যয় করতে চাইবেনা। মনে রাখতে হবে এই নদী আমাদের ঐতিহ্যের অংশ। কৃষি কাজে যেমন নদীর সীমাহিন গুরুত্ব তেমনি ভৌগলিক নানা দিক থেকেও নদী তাৎপযর্পুর্ন।একসময় আমরা মাছে ভাতে বাঙ্গালী বলে পরিচয় দিতাম সেটা নদীর কল্যাণে। যেখানে নদীর নাব্যতা ছিল ফলে প্রচুর মাছও জন্মাতো। এখন নদী তার নাব্যতা  হারিয়েছে আর আমরাও হারিয়েছি মাছে ভাতে বাঙ্গালী পরিচয়। দেশ ডিজিটাল হচ্ছে,প্রচুর কল কারখানা হচ্ছে বলে নদীকে আপনি অবহেলা করতে পারবেন না। আমাদের চেয়ে পঞ্চাশ বছর আগে যে সব দেশ ডিজিটাল হয়েছে তারাও তাদের নদীকে বাচিয়ে রেখেছে। টেমস নদীর কথা ভেবে দেখুন। চলুন ঘুরে আসি ইতালির ভেনিস নগরীতে,যে নগরী পুরোটাই নদীর উপর ভাসমান। যারা কোন কালেও নদীমাতৃক দেশ ছিলনা তারা যদি নদীকে আকড়ে ধরে বেঁচে থাকে তাহলে নদীমাতৃক দেশ হয়ে আমাদেরকি উচিত নয় তাকে বাঁচিয়ে রাখার। নদী পরিবেশের একটি গুরুত্বপুর্ন অংশ।

বিশেষ করে আমাদের দেশের জন্য নদী অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ন।আমাদের মনে রাখতে হবে নদী বাচলে এই দেশ আরো দ্রুত শিল্প সমৃদ্ধ হবে। আমরা খাদ্য এবং অর্থকারী ফসলে স্বয়ংসম্পুর্ন হয়ে বিদেশে রপ্তানী করতে পারবো। আসুন নাব্যতা হারানো নদীগুলোরদিকে সুদৃষ্টি দেই এবং তার হারানো যৌবন ফিরিয়ে দেই। এদেশের প্রতিটি নদী তার নাব্যতা ফিরে পাক। সকাল সন্ধ্যা পালতোলা নৌকা ভেসে বেড়াক তার বুকে। জেলেরা জাল ফেলুক আর ফিরে আসুক মাছে ভাতে বাঙ্গালী পরিচয়ের সেই উজ্জল দিনগুলি।

জাজাফী

২৮ জুন ২০১৭

নদীর নাব্য ফিরে আসুক শিরোনামে দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত ১৪ জুলাই ২০১৭

 

দুই মেরু

আমি একদিন যাবো তোমার বাড়িতে,তোমার আঙিনায়
উত্তর ঘরের বারান্দা থেকে টুল এনে কেউ একজন বসতে দেবে আমায়
টুলটাতে বসতে বসতে আমার চোখ তোমাকে খুঁজবে
আমার ঘ্রাণেন্দ্রিয় তোমার খোলা চুল থেকে ভেসে আসা সৌরভ খুঁজবে
শুধু তুমি এসে দাড়াবেনা আমার সামনের ফাঁকা উঠোনে
তুমিতো তখন পায়ে আলতা মেখে নববধুর সাজে কারো আগমনের অপেক্ষায়
আমি সেদিন তোমার বাড়িতে সামান্য অতিথি মাত্র।

তুমিও একদিন আসবে আমার বাড়িতে,আমার আঙিনায়
উত্তর ঘরের বারান্দা থেকে টুল এনে কেউ তোমাকে বসতে দেবেনা
সুতরাং বসতে বসতে তোমার চোখ আমাকে খুঁজবেনা
তোমার ঘ্রাণেন্দ্রিয় আপনা থেকেই খুঁজে পাবে ভেসে আসা গন্ধ
শুধু আমি এসে দাড়াবোনা তোমার সামনে ফাঁকা উঠোনে
আমিতো তখন নতুন কাপড়ে,নতুন সাজে প্রস্থানের অপেক্ষায়
আমি সেদিন আমার বাড়িতেই বিদায় নেওয়া অতিথি মাত্র
অতিথি চলে গিয়ে আবার ফিরে আসে,আমার আসা হবেনা কখনো।

তুমি আর আমি কি তবে এমনই,পৃথিবীর দুই মেরুর মত
একে অন্যকে সারা জীবনেও দেখা হয়না
যখন আমি অপেক্ষায় থাকি তখন তুমি অন্য কোন খানে
যখন তুমি চোখ তুলে তাকাও তখন আমি নেই।

#দুই_মেরু
#জাজাফী
২৫ মে ২০১৭

সীমান্তের কুলবৃক্ষ ও প্যাঁচা

তোমাকে সীমান্তের কুলবৃক্ষ ভেবে কাটাতারের প্রাচীর পেরিয়ে
চলে এসেছিল কতিপয় ক্ষুধার্ত প্যাঁচা
ওরা তোমার কুলছিড়ে খেয়েছে,তোমার ডাল ভেঙ্গেছে
তার পর যেতে যেতে তোমার শিকড়ে ঠোকর দিয়ে গেছে।
 
তুমি তখন চিৎকার করেছ,কোন পাখি সেই চিৎকারে তোমার পাশে দাড়ায়নি
প্যাঁচাদের ঠোকর যখন তোমাকে ক্ষতবিক্ষত করছিল
যখন একটু একটু করে তোমার ডাল ভেঙ্গেছিল
তোমার কেবলই মনে হচ্ছিল পৃথিবীতে আর কোন পাখি নেই,সব বুঝি প্যাঁচা
যারা কেবল কুলবৃক্ষভেবে তোমাকে দলিত করেছে।
 
তারপর একটু একটু করে তুমি নিস্তেজ হয়ে গেলে, তোমাকে দাহ করা হলো
প্যাঁচারা তখন অন্যকোন কুলবৃক্ষ খোঁজায় ব্যস্ত
তুমি বুঝে গেলে এভাবেই তোমাদের জন্মহয় প্যাঁচাদের ঠোকর খাওয়ার জন্য
আবার যদি জন্মাতে পারতে হয়তো তুমি রুখে দাড়াতে
কেটে ফেলতে প্যাঁচাদের ঠোট,নখ এবং তার থেকেও ধারালো যা কিছু।
 
কিন্তু তুমিতো সীমান্তের কুলবৃক্ষ নও,
তুমিতো বাগানের সব থেকে সুরভী ছড়ানো হাসনা হেনা,বেলী কিংবা গন্ধরাজ
তোমার কোমলতায় হেসে ওঠে আকাশের চাঁদ,নদীতে জোয়ার আসে
তুমি নিজে সেটা জানতে
তবুও তোমাকে ওরা সীমান্তের কুলবৃক্ষ ভেবে দলিত করে
ওরাতো অন্য কিছু নয়,ওরাতো প্যাঁচা।
 
——
 
#জাজাফী
২১ মে ২০১৭

যে জীবন ফড়িং এর

কখনো ভাবিনি এমন দিন আসবে। এরচেয়ে ঢের ভালো ছিল আমাদের শিশুকাল। অভাব বলে তেমন কিছু চোখে দেখিনি।দিন দিন এ সমাজে টিকে থাকা দায় হয়ে পড়েছে। আমি হয়তো বড় মানুষ বিধায় খেয়ে না খেয়ে কোনো মতে দিন কাটিয়ে দিতে পারবো কিন্তু আমার দুধের শিশুর কী হবে? তারতো আমার মত সহ্য ক্ষমতা নেই। তার যখন দুধ প্রয়োজন তখন তা তাকে না দিলে এই শিশুটি অকালে ঝরে যাবে। বউয়ের মুখের দিকে তাকানো যায় না। তবুও সে উপলব্ধি করে যে আমার সাধ্যের মধ্যে সবটুকু দিয়ে সংসারের হাল ধরতে চেষ্টা করি। মতিঝিলের একটি অফিসে অফিস সহকারি হিসেবে কাজ করি। বেতন মোটে আট হাজার টাকা। তাও বেশ চলছিল কিন্তু হঠাৎ করে দ্রব্যমূল্য বাড়তে থাকায় এই টাকায় কিছুই হয় না। বউ বার বার করে বলে তুমি অফিসে বসকে বলো বেতন বাড়াতে। আমার আর সাহসে কুলায় না। কিন্তু এভাবেওতো চলা যায় না। ফলে একদিন সিদ্ধান্ত নিই বসকে যে করেই হোক বেতন বাড়ানোর কথা বলবো।

সামনেই কোরবানীর ঈদের ছুটি হবে। ছুটির আগে বসদের মন মেজাজ ভালো থাকে।এমন একটি উপলক্ষ্যকে কেন্দ্র করে এক বিকেলে বসের মতিগতি বুঝে তার রুমে ঢুকলাম। বস জানতে চাইলেন কী জয়নাল আবেদীন কী খবর আপনার। আমি বললাম স্যার আছি কোনো মতে বেচেবর্তে। জিনিসপত্রের যে হারে দাম বাড়ছে তাতে বেঁচে আছি এইতো অনেক বড়। বস বললেন সেটা অবশ্য ঠিকই বলেছেন। আমি মুখ কাচুমাচু করে দাড়িয়ে থাকলাম। ইতস্থ করছি বলবো কি বলবো না। বস মনে হয় বিষয়টা বুঝলেন। তিনি জানতে চাইলেন জয়নাল আবেদীন কিছু বলবেন? আমি বললাম স্যার বলতে তো চাই আবার সাহস হয়না। বস আমাকে অভয় দিয়ে বললেন এতোদিন কাজ করেন এই অফিসে আমাকে বলতে ভয় কিসে। বলুন। আমি বসের কথায় কিছুটা সাহস পেয়ে বললাম

স্যার, আমার বেতন বাড়ান। যে বেতন পাই তা দিয়ে কোনো ভাবেই আর সংসার চলছে না। না খেয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা যাবো মনে হচ্ছে। বস আমার কথা শুনলেন এবং কিছুক্ষণ ভাবলেন। তার পর বললেন জয়নাল আবেদীন আপনার বিষয়টা আমি বুঝি তবে বেতন বাড়ানো কোনো ভাবেই সম্ভব হচ্ছে না। আপনি নিশ্চই জানেন অফিসের অবস্থা। আমি বললাম স্যার তাহলে আগামীকাল থেকে আমাকে বিকাল ৫ টার পর ছুটি দিয়ে দিন। আমার বড় উপকার হবে। বস জানতে চাইলেন বিকেল পাঁচটায় ছুটি নিয়ে কী করবেন? আমি লজ্জায় মাথা নিচু করে বললাম বউ বাচ্চার মুখের দিকে তাকানো যায় না। কতদিন ভালো কাপড় ভালো খাবার কিনে দিতে পারিনা। ঘর ভাড়া দিতেই পুরো মাসের বেতনের তিন ভাগের দুই ভাগ চলে যায়। বাকি টাকায় আর কিইবা করা যায়। যেহেতু বেতন বাড়াতে পারবেন না সেহেতু পাচটার মধ্যে ছুটি দিলে আমি সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পযন্র্ত অটো রিকশা চালাবো। তাতে যা আয় হবে তা দিয়ে সংসারের বাকি খরচ চালাতে পারবো। স্যার দয়া করে এই আর্জিটা অন্তত রাখুন।

বস দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। বললেন ঠিক আছে দেখি তোমাকে ছুটি দিতে পারি কি না। বসকে ধন্যবাদ দিয়ে বসের রুম থেকে বেরিয়ে আসলাম। শেষ বিকেলে অন্তত কিছুটা হলেও প্রশান্তি লাগছিল। অফিস শেষে বস যখন বের হচ্ছিলেন আমি তখন রাস্তায় বাসের অপেক্ষায়। বস আমার পাশে এসে দাড়িয়ে বললেন জয়নাল আবেদীন  আপনি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ভালো করেছেন। তবে মধ্যরাতে যদি অটো চালাতে চালাতে ক্ষুধা লেগে যায় তাহলে সোজা কমলাপুর রেলস্টেশনের দক্ষিণ পাশে চলে আসবেন। আমি বসের এই কথার কিছুই বুঝলাম না। আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলাম স্যার খাওয়ার জন্য ওখানে যাবো কেন? বস তখন বললেন মধ্যরাতে আমি ওখানে পরাটা আর ডাল ভাজি বিক্রি করি। আমারওতো সংসার আছে।

এটুকু বলেই বস বেরিয়ে গেলেন। আমাদের অফিসের কোনো গাড়ি নেই। সুতরাং বস হলেও তাকে পাবলিক সার্ভিস বাসেই উঠতে হয়। আমি বসের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। একটু আগে বস যেটা বললেন সেটা সত্যি না মিথ্যা বুঝে উঠতে পারলাম না। অবশ্য সত্যি না হওয়ার কোনো কারণও দেখতে পেলাম না। তিনি যে বেতন পান তার লেভেল অনুযায়ী  জীবনযাপন করতে তিনিও ঠিক আমার মতই হিমশিম খাচ্ছেন। কাছেই কোনো একটি মসজিদ থেকে এশার আজান ভেসে আসছে। অফিস ফেরত ক্লান্ত মানুষগুলি এই শহরের জ্যাম ঠেলে বাসায় প্রিয়জনের কাছে যাওয়ার জন্য আমারই মত গাড়ির অপেক্ষায় আছে। ঘন্টার পর ঘন্টা জ্যামের যন্ত্রণা সহ্য করেও যখন প্রিয়জনের সান্নিধ্য পাই সব ভুলে যাই। কিন্তু ঘুম আর আসে না। এই শহর ক্রমে ক্রমে বসবাসের অযোগ্য হয়ে উঠছে আর দ্রব্যমূল্য যেভাবে বাড়ছে তাতে মনে হয় একদিন পুরো দেশে হাহাকার উঠবে। সেই শব্দ সহ্য করার মত মানসিক শক্তি কি আমাদের আছে?

– জাজাফী

8 মে 2017