Home Blog Page 5

এতো বড় নোট আমরা ভাংতি দিতে পারছি না

প্লুটো গ্রহ থেকে বলছি। যদিও পৃথিবীর মানুষ মনে করে প্লুটো তার গ্রহত্ব হারিয়েছে তাতে আমগো কিছু যায় আসে না। তোমরা মিয়া কইলা আর আমগো গ্রহত্ব হারায় গেল? এইডা কি মাইনষের যৌবন যে হারায় যাইবো? আমরা বহুত বালা আছি। হুনেন আমগো সুখের কতা কইয়ে যাই। তয় এমন আঞ্চুলিক বাষায় কইলি আমনেরা নাও বুঝবার পারেন তাই আপনেগো লাহান শুদ্দু বাষায় কইতেছি-

ঈদ  আসতে বেশি দেরি নেই। ঈদের কেনাকাটা করতে হবে। কিন্তু  বাবার কাছে টাকা চাইতে ভয় পাচ্ছি। এই সময়ে বাবার হাতেও তেমন টাকা নেই। একমাত্র উপায় বড় আপু। আপুকে বললে নিশ্চই একটা উপায় হবে। আমি দুরুদুরু বুকে আপুর রুমে সামনে গিয়ে দুবার নক করলাম। আপু বললো আয় ভেতরে আয়। আমি কাচুমাচু করে তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। আমার ভাবসাব দেখেই আপু বুঝলো আমি কিছু একটা ধান্দা করতে এসেছি। আপু বললো ভণিতা না করে কী বলবি বল। আমি খানিকটা সাহস পেয়ে বললাম আপু ঈদতো চলেই আসলো কিছু কেনাকাটা করবো । বাবার কাছে বলে কিছু টাকা ম্যানেজ করে দে না। আপু একগাল হেসে বললো এই সামান্য বিষয়ে বাবাকে বলতে হবে কেন? তোর যাকিছু কেনাকাটা করা দরকার সব টাকা আমি দেবো।

আপুর মুখে এমন কথা শুনে আমিতো থ। যা খুশি কিনতে পারবো আর সব  টাকা আপু দেবে! আমি বললাম আমার প্লুটো সেরা বোন আছে বলেই আমি প্লুটোর সবচেয়ে সুখী মানুষ। কিন্তু আমার সুখটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। আপু যখন পার্স খুলে আমার দিকে টাকা এগিয়ে দিল তখন আমার মাথায় আসমান ভেঙ্গে পড়ার দশা। আমি আশা করেছিলাম হাজার বিশেক টাকা হয়তো আপু দিবে। কিন্তু কিসের কী? এ কেমন ঠাট্টা বুঝলাম না। নিজের ভাইয়ের সাথে কেউ এমন রসিকতা করে? তাও যদি ক্লাস টুতে পড়ুয়া ভাই হতো  তাও একটা কথা হতো। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া একটা ভাই তার সাথে এমন বাদরামো করা মোটেই ঠিক না। আমি আপুর হাত থেকে টাকাটা নিলাম। একটা দোয়েলের ছবি ওয়ালা নোট। মানে দুইটাকা। আমি বললাম আপু এই টাকাটা কি আমি অ্যালবামে ঢুকিয়ে রাখবো?

আমার কথা শুনে আপু বললো মারবো এক থাপ্পড়। এতো টাকা কেউ এলবামে ঢুকিয়ে রাখে? আমার আপুর মাথাটা গেছে। তা না হলে মাত্র দুই টাকার একটা নোটকে এতো টাকা বলে? আমি কিছু না বলে তার দিকে তাকালাম। সে বললো আরে গাধা এখন জিনিসপত্রের দাম যে হারে কমেছে তুই সেটা খোঁজ রাখিস? এই দুইটাকা নিয়ে তুই বাজারে গিয়েই দেখ। আমি বললাম আপু এমন ইয়ার্কি করলে কিন্তুভালো হবে না বলে দিচ্ছি। আপু বললো দেখ আমি মোটেও ইয়ার্কি করছি না। শুধু তুই কেন অনেক মানুষেরই এটা বিশ্বাস হবে না যে জিনিসপত্রের দাম কমতে কমতে একেবারে তলানিতে নেমে এসেছে। তোকে একটা মন্ত্র শিখিয়ে দিচ্ছি। যে কোনো দোকানে গিয়ে তুই সেই মন্ত্রটা বলবি আর এই টাকাটা দিবি। দেখবি যা কিনতে চাইবি তাই কিনতে পারবি।

আমি আপুর কাছ থেকে সেই মন্ত্রটা শিখে নিয়ে খুব দ্বিধাগ্রস্থের মত লজ্জার মাথা খেয়ে প্রথমে অ্যাপেক্সের শোরুমে গেলাম। পছন্দমত একজোড়া জুতা নিলাম। জুতার উপর কোনো দাম লেখা নেই। কাউন্টারে গিয়ে আপুর দেওয়া দুইটাকার নোটটা দিলাম। কাউন্টারের ভদ্রলোক চোখ কপালে তুললো। আমি মনে মনে প্রমাদ গুনলাম। এইরে মানসম্মান সব গেলো। নিশ্চই এবার পিন্ডিদিবে। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে কাউন্টার থেকে বললো স্যার এতো বড় নোটতো ভাংতি হবে না। আপনি মাত্র এক জোড়া জুতো নিয়ে দুইটাকার নোট দিলে কিভাবে হবে? আমি তার কথা বুঝতে পারলাম না। সেও কি তবে আমার সাথে ইয়ার্কি করতেছে? আমি আরো বেশি বিব্রত হয়ে বললাম আসলে হয়েছে কি আপু আমার সাথে ইয়ার্কি করে এই নোটটা দিয়েছে। এর জন্য আমি লজ্জিত।

দোকানদার বললো স্যার আপনার লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই বরং আমরাই লজ্জিত যে এতো বড় নোট আমরা ভাংতি দিতে পারছি না। এবার কিছুটা সাহস পেয়ে জানতে চাইলাম জুতার দাম কত হয়েছে? দোকানদার বললো তিন টয়সা হয়েছে। আমি এই শব্দটা আগে শুনেছি বলে মনে পড়ছে না। জিজ্ঞেস করলাম তা এই টয়সা জিনিসটা কী? তিনি বললেন স্যার দশ হাজার টয়সা মিলে হয় এক পয়সা। তার মানে হলো  আপনি যে দুই টাকা দিয়েছেন তার মূল্য ২০ লাখ টয়সা। এতো টাকা কি কেউ দোকানে রাখে? আমি সাথে সাথে জোরে জোরে সেই মন্ত্রটা পড়ে ফেললাম। আপুর কথা তাহলে সত্যি!

বাজার সম্পর্কে আমারতো দেখি কোনো ধারণাই ছিল না। তারপর একে একে আইফোন সিক্সটি নাইন কিনলাম। একটা স্বর্ণের তৈরি ঘড়ি কিনলাম। পারফিউম কিনলাম। অনেকগুলো টিশার্ট কিনলাম,জিন্স কিনলাম। শেষে বাড়ি ফেরার সময় দেখলাম আপু যে দুই টাকার নোটটা দিয়েছি তা এখনো পকেটেই আছে। আসলে এতো বড় নোট কেউ ভাংতি দিতে পারেনি। সবাই বলেছে স্যার নিয়ে যান পরে দিয়েন। আমরা অন্তত বলতে পারবো আমাদের দোকানে এমন এক মহান তালেবর এসেছিলেন যার পকেটে দুই টাকার একটা চকচকে নোট থাকে! এতো টাকার মালিক হয়েও তিনি কত সাধাসিধে। একথা শুনে আমার মনে পড়ে গেল মার্ক টোয়েনের লেখা মিলিয়ন পাউন্ড ব্যাংক নোট গল্পটির কথা।

আমি বাসায় ফিরে আপ্লুত কন্ঠে আপুকে বললাম আপু তোমার কথাতো সত্যি। জিনিসপত্রের দাম এতো কমলো কিভাবে? তখন আপু বললো সব ওই মন্ত্রের যাদুরে সব ওই মন্ত্রের যাদু। কদিন পর দেখবি সব ফ্রিতে পাওয়া যাচ্ছে। আমি আপুকে তার দেওয়া দুই টাকার নোটটা ফিরিয়ে দিলাম। এতো বড় নোট নিয়ে আমার ঘুম আসবে না।

২৭ মার্চ ২০২৩

বিদেশে উচ্চশিক্ষা নাকি মেধা পাচার

প্রতিবছর উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশ থেকে অসংখ্য শিক্ষার্থী বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছে। আপাত দৃষ্টিতে এটি দেখে আমরা আনন্দিত হচ্ছি যে আমাদের শিক্ষার্থীরা, আমাদের সন্তানেরা বিশ্ব বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের ‍সুযোগ পাচ্ছে। তবে আমি এ নিয়ে প্রকারান্তে ভীষণ ভাবে ভীত হয়ে পড়েছি। আমার মনে কেবলই প্রশ্ন উকি দিচ্ছে বিদেশে উচ্চ শিক্ষা নাকি মেধা পাচার হচ্ছে?  কারণ আমি দেখছি এই যে আমাদের যে শিক্ষার্থীরা বিদেশে উচ্চ শিক্ষার জন্য যাচ্ছে তাদের মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষা আমাদের জন্য কাজে আসছে বাকি ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষা আমাদের দেশের জন্য কোনো কাজেই আসছেনা শুধুমাত্র প্রতি বছর কত সংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাচ্ছে তার সংখ্যা বৃদ্ধি ছাড়া। আমি দেখেছি যারা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাচ্ছে তাদের সিংহভাগ শিক্ষার্থী সেই দেশে অথবা উন্নত কোনো দেশে স্থায়ী ভাবে বসবাস করা শুরু করেছে। 

এটি অবশ্যই সবার কাম্য যে প্রত্যেকেই চায় নিরাপদ ও উন্নত জীবনযাপন করতে। ফলে তারা চাইবে তারা তাদের সুবিধামত দেশে বসবাস করতে। কিন্তু ভেবে দেখেছেন কি এই যে যারা বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে গিয়ে দেশের টাকা বিদেশে নিয়ে গেছে তারপর উচ্চশিক্ষা শেষে সেই দেশে বা উন্নত কোনো দেশে বসতি গেড়েছে এবং সেখানেই সেটেলড হয়েছে তারা কিন্তু তাদের উপার্জনের টাকা রেমিটেন্স আকারে দেশে পাঠাচ্ছে না বরং তারা যে দেশে অবস্থান করছে সেখানেই থাকছে। ফলে তাদের এই উচ্চশিক্ষা, এই মোটা বেতনের চাকরি দিয়ে বাংলাদেশের কোনো লাভ হচ্ছে না।  ইউনেস্কোর “ গ্লোবাল ফ্লো অব টার্শিয়ারি লেভেল স্টুডেন্ট” শিরোনামের এক প্রতিবেদন অনুযায়ি শুধুমাত্র ২০২১ সালে বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে গিয়েছে ৪৯ হাজার ১৫১ জন শিক্ষার্থী।

বাংলাদেশের অগ্রগতির সবচেয়ে বড় অন্তরায় এদেশের বিপুল জনগোষ্ঠীকে মানবসম্পদে রূপান্তরিত করতে না পারা, মেধাবীদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে না পারা।শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, অপরাজনীতি, শিক্ষকদের রাজনীতিসহ নানাবিধ কারণে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছাত্রাবস্থায় মেধাবীদের এক বিশাল অংশ বিদেশে যাওয়ার চেষ্টায় থাকে। একসময় তারা চলেও যায়। এতে করে তারা শুধু বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে তা-ই নয়, সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে অপার সম্ভাবনাময় মেধাও। একজন মেধাবী শিক্ষার্থী দেশে যদি তার যোগ্যতা অনুসারে কর্মক্ষেত্র ও নিরাপত্তা না পান, তখন তাদের মধ্যে হতাশা কাজ করবেই। প্রসঙ্গ যখন সন্তানের নিরাপদ ভবিষ্যৎ, নিরাপদ জীবনযাপনের জন্য কেউ যদি বিদেশে গমন করেন, তাহলে তাকে দোষ দেওয়া যায় কি? আমরা মাঝে মধ্যেই তাদের কটাক্ষ করে বলে থাকি, তারা স্বার্থপরের মতো দেশের স্বার্থ বিবেচনা না করে বিদেশে পাড়ি জমায়। আদতে মেধাবীরা দেশ ছাড়তে চান না, পরিস্থিতি তাদের দেশ ছাড়তে উদ্বুদ্ধ করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০২১-২২ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠানো ডলারের পরিমাণ ছিল ৯৮.৮ মিলিয়ন ডলার। চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (২০২২-২৩), এটি ১৫৩.১ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। গত ২০২১-২২ অর্থবছরে, ৩২১ মিলিয়ন ডলার ( প্রায় ৩,৫৩,০২৫,০০০,০০০ টাকা ) উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে পাঠানো হয়েছিল৷ ২০২১-২০২২ শিক্ষাবর্ষে, আন্তর্জাতিক ছাত্র পাঠানোর দেশগুলির তালিকায় বাংলাদেশ ১৪ তম থেকে ১৩ তম স্থানে উঠে এসেছে৷মার্কিন দূতাবাস ১৪-১৮ নভেম্বর আন্তর্জাতিক শিক্ষা সপ্তাহ (IEW) উদযাপনে মঙ্গলবার ঘোষণা করেছিল। তাদের তথ্য মতে গত এক দশকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীর সংখ্যা তিনগুণেরও বেশি হয়েছে, যা ২০১১ সালে ৩,৩১৪ থেকে বেড়ে ২০২১-২০২২ শিক্ষাবর্ষে ১০৫৯৭ পর্যন্ত এসেছে। স্বাধীনতার পরপরই, বাংলাদেশ ১০৭৪-১৯৭৫ শিক্ষাবর্ষে ৪৮০ জন শিক্ষার্থীকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাঠায়। এদিকে সংখ্যার দিক থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পড়তে যাওয়া বিদেশী শিক্ষার্থীদের মধ্যে বাংলাদেশীদের অবস্থান শীর্ষ ২৫-এ। ২০১৭ সালে দেশটির বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন ৬ হাজার ৪৯২ শিক্ষার্থী। এছাড়া ওই সময়ে অস্ট্রেলিয়ায় ৮ হাজার ৯৮৬, যুক্তরাজ্যে ৩ হাজার ১১৬ ও কানাডায় ২ হাজার ২৮ শিক্ষার্থী বাংলাদেশ থেকে পড়তে যান।

বিদেশে পড়তে যাওয়া বাংলাদেশী শিক্ষার্থীর সংখ্যা গত ১২ বছরে বেড়ে হয়েছে প্রায় চার গুণ। ইউনেস্কোর ইনস্টিটিউট ফর স্ট্যাটিস্টিকসের (ইউআইএস) তথ্য বলছে, ২০০৫ সালে বিভিন্ন দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হয়েছিলেন ১৫ হাজার বাংলাদেশী শিক্ষার্থী। ২০১৭ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৬ হাজারে। ব্রিটিশ কাউন্সিলের মতো প্রতিষ্ঠান যেখানে অদূর ভবিষ্যতে বৈশ্বিকভাবে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমার সম্ভাবনা দেখছে, সেখানে বাংলাদেশসহ কিছু দেশ থেকে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর এ প্রবাহ আগামী বছরগুলোয় আরো বাড়বে বলে মনে করা হচ্ছে।নিম্ন জীবনমান, দুর্বল শিক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তাও বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের বিদেশমুখী করছে। বিদেশে পড়তে যাওয়া এসব তরুণের অধিকাংশই ধনী পরিবারের। আর তাদের পড়াশোনার মাধ্যম ইংরেজি, যাদের অনেকেই পাঠ শেষে আর দেশে ফেরেন না।

৭০-৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী দেশে  না ফেরায় দেশ উল্টো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।  যা বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশের অর্থনীতি ও আত্মাসমাজিক উন্নয়নে বিরাট ধাক্কা। পাবলিক  বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া একজন অনার্স ও মাস্টার্স ডিগ্রীপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীর পিছনে সরকারি কোষাগার থেকে ব্যয় হচ্ছে ৫ লাখ টাকার অধিক, একজন বুয়েটের শিক্ষার্থীর শিক্ষা  ব্যয় হচ্ছে ১০ লাখ টাকা আর একজন মেডিক্যাল শিক্ষার্থীর পিছনে ১৫ লাখ টাকার ব্যয় করছে সরকার। আবার তারা যখন উন্নত বিশ্বে ডিগ্রি অর্জন করতে যায়, তখনও দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা প্রচার হয়। যদিও এই ব্যয়ের পুরোটা ভার বাংলাদেশ বহন করে কিন্তু মেধাবী শিক্ষার্থীরা দেশে না ফেরায় সুফল ভোগ করছে উন্নত বিশ্ব। এ-কথা সত্য যে,  বিদেশ থেকে বাংলাদেশ প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স আহরণ করে । কিন্তু এর সিংহভাগ আসে প্রবাসী শ্রমিকদের  আয় থেকে। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া অধিকাংশ  চিকিৎসা, প্রকৌশলী, শিক্ষক ও  শিক্ষার্থীরা দেশের অর্থনীতিতে তেমন একটা  অবদান রাখছে না। তারা উন্নত জীবনযাপন আশায় সে-সব দেশের নাগরিকত্ব নিয়ে পরিবারসহ স্থায়ীভাবে বসবাস করছে।গত কয়েক দশকে উন্নয়নশীল দেশগুলো পাচার হয়ে যাওয়া মেধা ফিরিয়ে আনতে এবং মেধা পাচার ঠেকাতে নানার রকমের উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু  বাংলাদেশে এখনো তেমন কোন উদ্যোগ গৃহীত হয়নি। ফলে চরম মেধা শূণ্যতায় ভুগছে দেশ।

দেশে উচ্চবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এ শ্রেণীর অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের দেশে পড়াশোনা করাতে চাইছেন না। ফলে উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের একটি বড় অংশ পড়াশোনার জন্য বিদেশে চলে যাচ্ছে। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীর বিদেশযাত্রায় দেশের উন্নয়ন হচ্ছে, এমনটা বলা যাবে না। কারণ এ শিক্ষার্থীদের ক্ষুদ্র অংশই ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে আসছে। এটি একধরনের মেধা পাচার। দেশে ভালো কর্মসংস্থান নেই। আবার শিক্ষার্থীরা দেশে ফেরত আসার তাগিদও অনুভব করছেন না।প্রাকৃতিক  সম্পদের প্রাচুর্যতা  ছাড়াও একটি দেশে শুধু মানব সম্পদের সঠিক ব্যবহার মাধ্যমে এগিয়ে যেতে পারে। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান, সিঙ্গাপুর, সুইজারল্যান্ড মতো দেশগুলো  শুধুমাত্র মানব সম্পদকে কাজে লাগিয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জন করেছে।

উন্নত দেশের গবেষণা, প্রযুক্তি আর স্থিতিশীলতাকে কাজে লাগিয়ে আমাদের দেশের মেধাবী সন্তানরা সেসব দেশকে আরও শক্তিশালী ও পরাক্রমশালী করেন। আর দেশ হারায় তার সবচেয়ে মেধাবী, জ্ঞানী, দক্ষ ও যোগ্য নাগরিককে। সম্ভাবনাময় এ তুখোড় প্রজন্মকে হারিয়ে নিজ দেশ উন্নয়ন ও অগ্রগতি যাত্রায় বাধার সম্মুখীন হয়।শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, অপরাজনীতি, শিক্ষকদের রাজনীতিসহ নানাবিধ কারণে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য ছাত্রাবস্থায় মেধাবীদের এক বিশাল অংশ বিদেশে যাওয়ার চেষ্টায় থাকে। একসময় তারা চলেও যায়। এতে করে তারা শুধু বিদেশে পাড়ি দিচ্ছে তা-ই নয়, সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে অপার সম্ভাবনাময় মেধাও

২১ নভেম্বর ২০২২

মার্লো বার্কলের স্বাক্ষাৎকার

১৩ বছর বয়সী মার্লো বার্কলের জন্ম ১৮ নভেম্বর ২০০৮ ক্যালিফোর্নিয়াতে। ছোটবেলা থেকেই সে ক্যালিফোর্নিয়ার মনরোভিয়ার একটি থিয়েটারে অভিনয় শুরু করে যা তাকে জাতীয় টেলিভিশন বিজ্ঞাপনে কাজের ‍সুযোগ করে দেয় এবং ধীরে ধীরে সে হলিউড সিনেমায় জায়গা করে নেয়। সোশ্যাল মিডিয়া ইন্সটাগ্রামে সে বেশ জনপ্রিয়। এ বছর হলিউড নির্মিত তার অভিনীত দুটি মুভি রিলিজ হয়েছে যার মধ্যে একটি “স্পিরিটেড” এবং অন্যটি “স্ল্যাম্বারল্যান্ড”।গত ১৮ নভেম্বর তার ১৩ তম জন্মদিনেই নেটফ্লিক্সে মুক্তি পেয়েছে তার নতুন মুভি “ স্লাম্বারল্যান্ড”।  কচিকাঁচার আসরের পক্ষ থেকে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় এই কিশোরী অভিনেত্রীর স্বাক্ষাৎকার নিয়েছেন জাজাফী।

প্রশ্নঃ কচিকাচার আসরের পক্ষ থেকে তোমাকে শুভেচ্ছা। আমরা যখন তোমার সাথে যোগাযোগ করলাম তখনো ভাবিনি তুমি আমাদেরকে সময় দিবে। তুমি কি এর আগে বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতে?

মার্লো বার্কলে: ধন্যবাদ তোমাকে। আমার অভিনীত নতুন মুভি রিলিজ নিয়ে ব্যাস্ত ছিলাম এবং পড়াশোনারও একটু চাপ ছিল। ফলে সময় মত রিপ্লাই দিতে পারিনি। তাছাড়া নিয়ম অনুযায়ি কিশোরী হওয়ায় বাবা মা সব দেখাশোনা করে। তারা যখন দেখলো বাংলাদেশ থেকে একটি বাংলা ভাষার পত্রিকা  আমার ইন্টারভিউ করবে তখন বেশ অবাক হলো। এতো দূরের একটি দেশের একটি জনপ্রিয় পত্রিকা আমার ইন্টারভিউ করবে ‍শুনে তারা যেমন আনন্দিত হলো আমিও আনন্দিত হলাম। এটি আমার জন্য সম্মানের বিষয়। এর আগে ওয়ার্ল্ডহিস্ট্রিতে বাংলাদেশ সম্পর্কে জেনেছি তবে সেটা ততোটা নয়।

প্রশ্নঃ এই মুহুর্তে তোমার নতুন মুভি “স্লাম্বারল্যান্ড” নেটফ্লিক্সে ট্রেন্ডিং হিসেবে আছে। আর মজার বিষয় হলো মুভিটি রিলিজ হয়েছে তোমার জন্মদিনে! তোমার অনুভূতি জানতে চাই।

মার্লো বার্কলে: আমার ১৩ তম জন্মদিনের সেরা উপহার ছিল মুভিটি রিলিজ হওয়া। এটি একটি স্বপ্নের মত মুভি। এই মুভিটি বিশ্বব্যাপী দারুণ জনপ্রিয় হয়েছে। জন্মদিনে মুভি রিলিজ হওয়ার মত এক্সাইটিং আর কোনো বিষয় থাকে না। বাবা মা পরিবারের সবাইকে নিয়ে মুভিটি দেখার যে অভিজ্ঞতা সত্যিই মুগ্ধকর। বন্ধুরাও মুভিটি দেখে উচ্ছসিত প্রশংসা করেছে।

প্রশ্ন: তোমার কি মনে আছে কবে তুমি অভিনেতা হতে চেয়েছিলে? এবং অভিনেতা হতে চাওয়ার মূল কারণ কি ছিল? কারো অভিনয় দেখে অভিনেতা হতে চেয়েছিলে?

মার্লো বার্কলে:  এই প্রশ্নটি আমার খুব ভালো লাগে। আমার বেশ মনে আছে আমি আমার বোনের সাথে গান করতাম। তখনো কিন্তু অভিনেতা হবো ভাবিনি। এরকম সময়ে একজন এজেন্ট আমাদের সাথে যোগাযোগ করলেন একটি অডিশনের জন্য। সেটা ছিল হলিউড নির্মিত সিঙ্গেল প্যারেন্টস মুভির অডিশন। আমি ও আমার বোন গেলাম। আমি ভাবিনি যে আমাকে ওরা নির্বাচিত করবে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো ওরা আমাকে নির্বাচিত করলো। এটা ছিল আমার জীবনের প্রথম বড় প্রজেক্ট। যা শেষ করতে দুই বছর লেগেছিল।

প্রশ্ন: তোমার প্রিয় মিউজিক্যাল শো কোনটি? তুমি ব্রডওয়েতে কোন বাদ্যযন্ত্রে থাকতে চাও?

মার্লো বার্কলে: আমি বিটলজুইস করতে পছন্দ করবো। আমি মনে করি লিডিয়া চরিত্রে অভিনয় করা অনেক মজার হবে—বিটলজুইস-এ যে কোনো ভূমিকাই আশ্চর্যজনক হবে কারণ এটি একটি মজার মিউজিক্যাল শো।

প্রশ্ন: এবার জানতে চাই ক্রিস্টমাস স্টোরি বেসড মুভি “স্পিরিটেড” এ কাজ করার বিষয়ে। এটি একই সাথে একটি মিউজিক্যাল মুভি। এমন মুভিতে কাজ করার আগ্রহ হলো কিভাবে?

মার্লো বার্কলে: আমি আসলে ছোটবেলা থেকেই ক্রিস্টমাস মুভির ভক্ত। পাশাপাশি এটি একটি মিউজিক্যাল মুভি। আমি যখন দেখলাম এই মুভিতে  উইল ফেরেল আর রায়ান রেনল্ডসের মত বিশ্ববিখ্যাত সঙ্গীত শিল্পী কাজ করছে তখন স্বাভাবিক ভাবেই আগ্রহী হয়ে উঠি। কারণ আমি জানি ক্রিস্টমাস রিলেটেড মুভি পরিবারের সবাই মিলে দেখে এবং রায়ান আর উইল ফেরেলের বিশ্বব্যাপী অনেক ফ্যানস থাকায় সহজে তাদের কাছে পরিচিত হওয়া যাবে। তাদের সাথে কাজ করাটা নিঃসন্দেহে দারুণ ব্যাপার। তারপর আমি স্ক্রিপ্ট পড়ে নিজেই নিজেকে বললাম “ ওহ এটাতো দারুন একটি গল্প, আমাকে এ গল্পে অভিনয় করতেই হবে। বিশেষ করে যখন আমি দেখলাম আমাকে ভিন্ন ভিন্ন দুটি চরিত্রে অভিনয় করা লাগছে”। 

প্রশ্নঃ শুটিং সেটে বড়দের সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতা জানতে চাই। বড়দের সাথে কাজ করতে গিয়ে কি কোনো অসুবিধা হয়?

মার্লো বার্কলে: তোমাকে সত্যি বলছি আমার না ছোটদের থেকে বড়দের সাথে অভিনয় করতে বেশি ভালো লাগে। কারণ এর ফলে আমি খুব দ্রুত ম্যচিউরিটি লাভ করি। ছোটদের সাথে অভিনয় করার সময় সবাই আমাকে বাচ্চা বাচ্চা বলে ডাকে কিন্তু বড়দের সাথে কাজ করতে গিয়ে এমনটি হয় না কারণ পুরো সেটে বাচ্চা আমি একাই। আমি তাদের সাথে খুব ভালোভাবে মিশে যেতে পারি। আমার মনে হয় কিশোরী হিসেবে ছোটদের সাথে অভিনয় করার চেয়ে বড়দের সাথে অভিনয় করাটা বেশি সহজ।

প্রশ্ন: তোমার অভিনীত “স্পিরিটেড” এবং “স্লাম্বারল্যান্ড” মুভির গল্পে ক্ষতির সাথে মোকাবেলার যে প্লট তা প্রায় কাছাকাছি। যদিও তোমার  ক্যারেক্টার ভিন্ন ভিন্ন এবং মুভিতে সিংহভাগ সময় তোমাকে দেখা গেছে। কোন মুভিটি তোমার বেশি ভালো লেগেছে এবং এই ধরনের প্লটে একাধিক মুভিতে কাজ করার বিষয়ে তোমার মতামত কী?

মার্লো বার্কলে: রিলিজের পর দুটি ‍মুভিই আমি মনোযোগ গিয়ে দেখেছি। বিশেষ করে স্ল্যাম্বারল্যান্ড মুভিটি বেশি ভালো লেগেছে। এই সিনেমায় অভিনয় করতে গিয়ে দারুণ অভিজ্ঞতা হয়েছে। মুভিতে যে এক্সাইটিং দৃশ্যগুলো দেখে সবাই শিউরে উঠছে বাস্তবে তা শুটিং হয়েছে ঘরের মধ্যে মানে গ্রীনস্ক্রিনে! ভিএফএক্স এমন ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে যে মুভিতে নিজের দৃশ্যগুলো দেখে নিজেই শিউরে উঠেছি। অভিয়াসলি দুটি মুভিই মজার। তবে স্ল্যাম্বারল্যান্ড বেশি ভালো লেগেছে। এই মুভির ক্যারেক্টারটি ছিল চ্যালেঞ্জিং। এই ধরনের মুভিতে কাজ করতে আমার খুবই ভালো লাগে।

প্রশ্ন: মুভিতে ক্রিস ওডউড, জেসন মামোয়া এবং তোমাকে প্রথম সিলেক্ট করা হয়েছিল বলে জানি। সে ক্ষেত্রে তোমরা কি পারস্পারিক বুঝাপড়ার জন্য প্র্যাকটিস করেছিলে? যাকে বলে গ্রুমিং?

মার্লো বার্কলে:  আমি জেসনের সাথে বুঝাপড়ার জন্য কিছু কাজ করেছিলাম তবে ক্রিসের সাথে করিনি। আমি আর ক্রিস সরাসরি সেটে শ্যুট করেছি কোনোরকম প্র্যাকটিস ছাড়াই যদিও তা ছিল কিছুটা অবিশ্বাস্য ব্যাপার। তবে ভাবিনি কোনোরকম প্র্যাকটিস ছাড়াই সিন গুলো এতোটা ভালো হবে। আর জেসনের সাথে আমি জুমে মিটিং করেছিলাম। আর সত্যি বলতে জুম মিটিংয়ের শুরুতে আমি ভীষণ নার্ভাস ছিলাম কারণ সেটা ছিল তার সাথে আমার প্রথম মিটিং।  কিন্তু সেরা মানুষগুলো এমনই হয় যে তারা আমাকে খুব সহজে মানিয়ে নিতে সাহায্য করে। আমরা শুটিংয়ের সময় অনেক মজা পেয়েছি কারণ রোল প্লে করার মাঝে হাঠৎ করে তার কুকুর ডেকে উঠতো আর তিনি সব ছেড়ে তাকে থামাতে এগিয়ে যেতেন। তার সাথে অভিনয় করতে গিয়ে আমার সব স্ট্রেস নিমিষেই হাওয়া হয়ে যায়। আমি তার থেকে অনেক কিছু শিখেছি।

প্রশ্ন: স্ল্যাম্বারল্যান্ড মুভিতে তোমাকে চরিত্রের মধ্যে ঢুকে যেতে দেখেছি। মনেই হয়নি ওটা সিনেমা। মনে হয়েছে বাস্তবেই নিমোকে সাগরের মধ্যে থাকা একটি লাইটহাউজে দেখছি। এই ধরনের কম্প্লেক্স ক্যারেক্টার কেন বেছে নিলে ?

মার্লো বার্কলে: স্ল্যাম্বারল্যান্ডের জন্য আমি প্রথমে অডিশন দিই। আমাকে স্ক্রিপ্ট পড়তে দেওয়া হয়। আমি স্ক্রিপ্ট পড়ে এতোটা মুগ্ধ হই যে পরিচালক ফ্রান্সিস লরেন্সকে আমি অডিশন চলাকালিন সময়েই বলি যে আমি যদি এই চরিত্রটি নাও পাই বা আমাকে নির্বাচিত নাও করা হয় তবুও আমি মুভিটি দেখবো। কারণ আমি দেখলাম নিমো চরিত্রটির সাথে আমি ভীষণ ভাবে কানেক্টেড হয়ে গেছি বিশেষ করে তার জীবনে আগত ঘটনাগুলি আমাকে স্পর্শ করেছে। পরবর্তীতে আমি যখন এই চরিত্রে অভিনয় করি তখন মনে হয়েছিল যেন আমার নিজের জীবনের গল্প এটা। আমার মনে হচ্ছিল আমি যেন সত্যি সত্যিই নিমোর সাথে ভ্রমন করছি বিচিত্র জগতে। এই মুভি থেকে আমি বাস্তব জীবনের জন্য যে উপলব্ধিটি পেয়েছি তা হলে ধৈর্য ধরতে হবে। এবং চারপাশ সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।

প্রশ্ন: আমরা দেখেছি স্ল্যাম্বারল্যান্ড মুভিতে তুমি দীর্ঘ সময় পানির নিচেয় অবস্থান করেছ। অনুমান করছি এগুলোর সবই ছিল সিজিআই এবং স্পেশাল ইফেক্ট। ঠিক কি না? এরকম কাল্পনিক গল্পে অভিনয় করতে কেমন লাগে?

মার্লো বার্কলে: সত্যি বলতে এটা একধরনের পাগলামীর মত মনে হয়। কখনো ভীষণ রোমাঞ্চকর আবার কখনো আতঙ্কের। তবে সব সময় স্ট্যান্ট করা বা এই ধরনের কাজ করার স্বপ্ন ছিল আমার। তাছাড়া পানির সিনগুলোর জন্য আমি দীর্ঘ সময় সুইমিং পুলে অবস্থান করেছি। সেটাও ছিল মজার অনুভূতি। কাল্পনিক চরিত্রে অভিনয় করা রোমাঞ্চকর বিষয়। বিশেষ করে মুভি রিলিজ হওয়ার পর নিজের কাছেই অবিশ্বাস্য লাগে। বন্ধুরাও ভীষণ এক্সাইটেড থাকে।

প্রশ্ন: সত্যিই দারুণ বিষয়। আমরা কিন্তু ভাবিনি যে পানির দৃশ্যগুলোর জন্য তোমাকে পানিতে থাকতে হয়েছে। আমরা ভেবেছি ওটা স্পেশাল ইফেক্ট ছিল।

মার্লো বার্কলে: এটা সত্যি। তবে আমার সেটে কলাকুশলীরা ছিল দারুণ শান্ত। এমনকি তারা মাঝেমাঝেই আমাকে বলতো যদি তোমার ব্রেক নেওয়ার দরকার হয় তবে তুমি রেস্ট নিতে পারো। ফলে আমি বেশ ভালো অনুভব করেছি। এই সিনগুলোর মধ্যে মাত্র একটিতে অভিনয় করতে গিয়ে আমি কিছুটা নার্ভাস ছিলাম আর সেটা হলো যখন আমি নৌকা থেকে পড়ে গেলাম এবং ডুবে গেলাম পানির নিচে।। সেই ‍দৃশ্যের জন্য আমি অনেক বার প্র্যাকটিস করেছি। আমার বার বার মনে হচ্ছিল আমি পারবো না। আমি সেটা বলেছিলাম তাদেরকে। আমার স্ট্যান্ট সুপারভাইজার গুইলিয়ানো আমার কাছে আসলেন এবং বললেন তুমি চিন্তা করো না  তুমি অবশ্যই পারবে। আমি তোমাকে দেখিয়ে দিচ্ছি। তারপর তিনি প্র্যাকটিক্যালি আমাকে স্টেপ বাই স্টেপ করে দেখালেন। এবং তখন বিষয়টা আমার কাছে খুবই ইজি হয়ে গেল।

প্রশ্ন: আমরা তোমার অভিনয়ের মুগ্ধতায় ভাসছি। এটিই সিনেমার যাদু। তোমার এখন অনেক ধরনের অভিনয় এক্সপেরিয়েন্স আছে। তুমি একজন মাল্টি ট্যালেন্টেড অভিনেতা। তোমার কাছে জানতে চাই পরবর্তীতে তুমি কোন ধরনের মুভিতে অভিনয় করতে চাও? কেমন চরিত্র চাও তুমি?

মার্লো বার্কলে: সত্যি বলতে আমি হরর মুভিতে অভিনয় করতে চাই। যদিও আমি একটা ভিতু বিড়াল। আমি মোটেও হরর মুভি দেখতে পারি না। ভয়ের সিনেমা আমাকে সন্ত্রস্ত করে রাখে যদি না অনেক গুলো ভালো মানুষ আমার সাথে থাকে। তার পরও কিন্তু আমি হরর মুভিতে কাজ করতে চাই যেখানে সুপার গ্রাফিক্স থাকবে,মজার সব মেকাপ থাকবে। এমনকি আমি ফাইটিং সিনেও অভিনয় করতে চাই যেখানে মারামারি করতে গিয়ে আমার নাক দিয়ে রক্ত বের হবে, বড় রকম আঘাতপ্রাপ্ত হবো বা আমি খুন হয়ে যাবো। আমার মনে হয় এটি হলে দারুণ হবে। কারণ আমার খুব দেখার ইচ্ছে এই ধরনের সিনগুলোর ব্যাকস্টেজ কাজগুলো কেমন হয়?

প্রশ্ন: মেকাপ বিষয়ে যেহেতু বললে তাহলে এ নিয়ে তোমাকে প্রশ্ন করি। লসঅ্যাঞ্জেলসে স্লাম্বারল্যান্ড মুভির প্রিমিয়ারে আমরা দেখেছি তুমি খুবই সুন্দর আর মিষ্টি একটি মেয়ে। তুমিকি বলবে যে তুমি বিউটি এবং ফ্যাশন বিষয়ে খুবই সচেতন ভাবে পদক্ষেপ ফেলো?

মার্লো বার্কলে: সম্ভবত এক কি দুই বছর আগের কথা আমি বলেছিলাম আমি মেকাপ সচেতন মানুষ। দুই বছর আগে যে পোশাক আমি পরতাম এখন সেগুলো দেখলে ভাবি হায় আমি এগুলো পরতাম! আমাকে নিশ্চই পাগলের মত দেখাতো! বর্তমানে আমি খুবই ফ্যাশন সচেতন। তবে সব সময়ই আমি গ্ল্যামরাস লাইফ পছন্দ করি। আমি মেকাপ করার সময় খুবই উপভোগ করি। বিশেষ করে কিভাবে নিজেকে আরও সুন্দর আর মুগ্ধকর রুপে উপস্থাপন করা যায় সেই প্রক্রিয়াটা আমার ভালো লাগে। মেকাপের পর নিজেকে আরো গর্জিয়াস মনে হয়।

প্রশ্ন: আমরা স্ল্যাম্বারল্যান্ড সিনেমায় নিমো চরিত্রে তোমাকে সত্যিকার অর্থেই একজন ১২ বছর বয়সী বাচ্চা হিসেবে দেখেছি। কিন্তু সিনেমার প্রিমিয়ার শোতে তোমাকে বেশ বড় মনে হয়েছে। তুমিকি নিজ থেকেই প্রেসের সামনে অপেক্ষাকৃত বড় হিসেবে প্রকাশ করতে চেয়েছ? ওরকম একটি কালারফুল মোমেন্ট তোমার কেমন লেগেছে?

মার্লো বার্কলে: আমি এখনো একজন কিশোরী। আমার বয়স মাত্র তের বছর এবং আমি এখনো ইয়াং। তবে আমি কিন্তু খুব বেশি ছোট নই। আমি নিজেকে ম্যাচিউরড মনে করি এবং মানুষকে তা দেখাতে চাই। এটি এমন একটি অনুভূতি যা তুমি ভাষায় প্রকাশ করতে পারবে না।

প্রশ্ন: তাহলে তোমার পরবর্তী লক্ষ্য কী? কবে নতুন কাজে ফিরবে?

মার্লো বার্কলে: ওয়েল, আমি অলরেডি নতুন একটি শোতে যুক্ত হয়েছি যার নাম  “ টাইনি বিউটিফুল থিংস”। এই সিরিজে আমি বেশ কয়েকটি এপিসোডে আছি যেখানে আমি কার্থি হানের ছোটবেলার চরিত্রে অভিনয় করেছি। তবে আমার বন্ধুরা এটি দেখতে পারবে না কারণ এটি ছোটদের জন্য নির্মিত নয়। যদিও এটি ছোটদের জন্য নির্মিত নয় তবু্ও এটির অংশ হতে পারাটা দারুণ ব্যাপার। সুতরাং আমি এক্সাইটেড এই সিরিজটি কেমন হবে সেটা দেখার জন্য। এছাড়াও আমার নানা জায়গায় অডিশন চলছে এবং খুশির খবর হলো “ স্ল্যাম্বারল্যান্ড-২” আসবে শিঘ্রই। তবে তা নিয়ে এই মুহুর্তে কিছু বলতে পারবো না।

কচিকাচার আসর: ধন্যবাদ মার্লো। আগামীতে আরও অসাধারণ সব মুভিতে তোমাকে দেখার প্রত্যাশা ব্যক্ত করছি।

২৭ নভেম্বর ২০২২

আট বছর বয়সী চাওয়ালা বনাম সুঠামদেহী নিরাপত্তারক্ষির গল্প

কক্সবাজারে ৪০ বছর বয়সী একজনের সাথে পরিচয় হয়েছিল। শরীর স্বাস্থ্য যথেষ্ট ভালো। পাশাপাশি কুরআনের হাফেজ। কথা প্রসঙ্গে জানতে পারলাম তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তারক্ষি হিসেবে চাকরি করেন। বেতন সর্ব সাকুল্যে ৬৫০০ টাকা।তবুও মানুষটি বেশ হাসিখুশি। এই পরিমান বেতন পেয়েও যেন তার কোনো ভাবান্তর নেই। যেন বেশ সুখী জীবনযাপন করছেন। তার বেতনের পরিমান শুনে প্রথমেই আমার মনের মধ্যে যে প্রশ্নটি উকি দিয়েছিল সেটা হলো পরিবার নিয়ে এই বেতনে কিভাবে সংসার চালানো সম্ভব। পরে জানতে পারলাম এর পাশাপাশি তিনি দুই তিনটা টিউশনী করেন। আরবী পড়ান। তাতে আর কতইবা আয় হয়। হয়তো আরও হাজার তিনেক বা চারেক টাকা পান। সব মিলিয়ে তার আয় কোনো ভাবেই ৯ হাজার ছাড়াতে পারেনি। বাড়িতে দুধের বাচ্চা আছে। পরিবারে লোক সংখ্যা চারজন। বাসা ভাড়া,বাচ্চাদের খাবার কেনা,নিজেদের খাবার কেনা সব মিলিয়ে চারজনের সংসার ৭/৮ হাজার টাকায় চালানোর মানে হলো একটা অসম্ভবকে সম্ভব করা। তারপরও বেশ ভালোই চলছিল।
হঠাৎ একদিন দেখি লোকটা হাউমাউ করে কাঁদছে। কারণ জানতে চাইলে বুঝলাম কিছুদিন আগে মাসের বেতন হওয়ার পর রাগ করে চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছিলেন। এখন সংসার চলছে না,বাচ্চাটা অসুস্থ্য। তাই তিনি আগের প্রতিষ্ঠানে গিয়েছেন চাকরিটা যেন তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু অফিস তার কথা আমলে নেয়নি। কেন আমলে নেয়নি সেটাও বুঝলাম। সে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার সময় কিছুই বলেনি।অফিসের বস তাকে কিছু প্রশ্ন করেছিল ডিউটিতে অনুপস্থিত থাকা বা হাজিরা দিয়ে চলে যাওয়া বিষয়ে যা সিসিক্যামেরার ফুটেজে দেখা গেছে। সে সম্পর্কে সে আশানুরুপ জবাব দিতে পারেনি ফলে অফিস থেকে বেশ কথা শোনানো হয়েছে বলে সে হুট করে রাগ করে চাকরি ছেড়ে দিয়েছে। এখন পড়েছে মহা বিপদে। অথচ এমন ক্ষেত্রে তার উচিত ছিলো চাকরি ছেড়ে না দিয়ে নিজের ভুল স্বীকার করে আগামীতে এমন হবে না মর্মে কথা দেওয়া। অথবা চাকরি ছেড়ে দিয়ে ওই অফিস মুখো না হয়ে নতুন কিছু জুটিয়ে নেওয়া। তাহলে আজকে তার এমন হাউমাউ করে কাঁদা লাগতো না।
এবার মূল কথায় আসি। তার মত শক্তিশালী একজন মানুষ কেন কক্সবাজারের মত একটি জায়গায় জন্ম নিয়ে, বেড়ে উঠে ৬৫০০ টাকা বেতনের চাকরি করবে? এই পরিমান টাকাতো সে চাইলে অনায়াসেই ইনকাম করতে পারে। কক্সবাজারে ১০ হাজার টাকা হেসে খেলেই আয় করা যায় বলে আমি অন্তত মনে করি। এ জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি,লাখ টাকা পুজি এর কোনো কিছুরই দরকার নেই। সেই বিষয়ে বলার আগে ওই নিরাপত্তারক্ষির ডিউটি টাইম সম্পর্কে একটু বলি। একজন নিরাপত্তারক্ষি হিসেবে সে যেখানে চাকরি করতো সেখানে তাকে তিনটি আলাদা আলাদা শিফটে ডিউটি করতে হতো। কখনো সকাল ছয়টা থেকে দুপুর দুইটা পযর্ন্ত আবার কখনো দুপুর দুইটা থেকে রাত দশটা পযর্ন্ত এবং তৃতীয় আরেকটি শিফট শুরু হয় রাত দশটা থেকে সকাল ছয়টা পযর্ন্ত। সকালে এবং দুপুরের শিফট মোটামুটি সুবিধাজনক কারণ তখন অফিসের ভিতরে এসির মধ্যে থাকার সুযোগ আছে। কিন্তু রাত দশটার পর যে শিফট শুরু হয় সেই সময় থেকে সারা রাত তালাবদ্ধ অফিসের বাইরে শাটারের সামনে বসে থাকতে হয়। গরম,মশার কামড় আর ঘুমানোর তেমন কোনো সুযোগ থাকে না। এতো কষ্ট সহ্য করেই শেষ নয় বরং ঈদ বা অন্যান্য দিনেও তাদের কোনো রকম ছুটি নেই,কোনো রকম ওভারটাইম নেই,কোনো রকম ঈদ বোনাস নেই। তার পরও তাকে কেন এই চাকরিটাই করতে হবে আমার মাথায় আসে না। কক্সবাজার না হয়ে অন্য কোথাও হলে আলাদা কথা ছিলো। তাছাড়াও তার মত শক্তসমর্থ যুবক না হয়ে অন্য কেউ হলেও কথা ছিলো।
আমি যেহেতু রেগুলার বীচে হাটাহাটি করি তাই বিভিন্ন ছোট ছোট ব্যবসায় নিয়োজিতদের কাছ থেকে দেখি এবং তাদের সাথে গল্পও করি। মাত্র পাঁচ বছর বয়স থেকে শুরু করে ষাট বছরের বৃদ্ধ মানুষও আছে যারা বীচ কেন্দ্রিক ব্যবসার পসরা সাজিয়েছে। এই ব্যবসার জন্য লাখ লাখ টাকা পুজির দরকার নেই। খেয়াল খুশি মত ব্যবসা করলেও মাসে ১০/১৫ হাজার টাকা আয় হয়। বীচ কেন্দ্রিক বেশ কিছু দোকান আছে যেখান থেকে ওরা পানি,চিপ্স,জুস,সিগারেট এটা সেটা নিয়ে বিক্রি করে। একটি পানি ১৫ টাকা দিয়ে কিনে ২০ টাকায় বিক্রি করে। লাভ ৫ টাকা। ৪০টা পানি বিক্রি করলেও ২০০ টাকা লাভ। বলা চলে বিনা পুজিতেই এই দুইশো টাকা লাভ। কারণ বেশ কিছু দোকান আছে যারা কোনো রকম সিকিউরিটি মানি ছাড়াই ভ্রাম্যমান হকারদের এই সব পণ্য দিয়ে থাকে। বেচাবিক্রির পর তাদেরকে টাকাটা দিলেই হয়। এর বাইরে ঝাল মুড়ি, বাদাম,কাঁচা আম,আমড়া,পেয়ারা,চা,কফিও বিক্রি করা যায়। বিশেষ করে খাবার আইটেম সব সময়ই বিক্রি হয়। এগুলোর যে কোনোটার ব্যবসাই করা যায় এবং পুজি এক দুই হাজার টাকা হলেই হয়। যে মানুষটির কথা উল্লেখ করেছি তাকে আমি প্রথম যখন পরিচয় হয়েছিল এই সব কথা বলেছিলাম কিন্তু কেন জানি না এগুলো সে আমলে নেয়নি।
গতকাল সন্ধ্যার পর সায়মন বীচ রিসোর্ট থেকে বেরিয়ে বীচে নামতেই আবছা অন্ধকারে দেখলাম একটা আট বছর বয়সী ছেলে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কফি খাচ্ছে। দেখেই বুঝলাম সে কফি বিক্রি করে। আশেপাশে কেউ নেই। এগিয়ে গিয়ে বললাম কেমন আছো তুমি? ব্যবসা কেমন চলছে। এরকম আরও কিছু কথা হলো। তার থেকে জানতে পারলাম সে রোজ এক থেকে দেড় হাজার টাকার কফি বিক্রি করে। বিকেলে বেরিয়ে রাত দশটা বারটা পযর্ন্ত বিক্রি করে। এতে তার ৭০ শতাংশ লাভ থাকে। মানে এক হাজার বিক্রি করলে সাতশো টাকা লাভ। মাসে ২১ হাজার টাকা আয়! একটা ছোট্ট বাচ্চা সে কফি বিক্রি করে গড়ে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা আয় করছে অথচ শক্তসমর্থ এক যুবক যে কোনো ছুটি নেই,ঘুমানোর ব্যবস্থা নেই,কোনো আরাম নেই রোজ আট ঘন্টা ডিউটি করে বেতন পাচ্ছে মাত্র সাড়ে ছয় হাজার টাকা। এই মানুষদের কেন আক্কেল হয় না? পরে বুঝলাম তারা নাকি আত্মসম্মানের কারণে ওই সব বীচ কেন্দ্রিক ব্যবসা করতে পারে না। আমার বুঝে আসে না যে নিরাপত্তারক্ষির চাকরিতে আত্মসম্মান যায় না কিন্তু বীচকেন্দ্রিক ব্যবসা করলে আত্মসম্মান যায়! অথচ পান বিক্রি করলে,ঝাল মুড়ি বিক্রি করলে,বাদাম বিক্রি করলে বা চা কফি বিক্রি করলে সে ঘুরে বেড়াতে পারতো, পরিবারকে যথেষ্ট সময় দিতে পারতো, রাতে আরাম করে ঘুমাতে পারতো। মাঝে মাঝে চাইলেই এক দুদিন কাজ না করে ঘরে বসে থাকতে পারতো। এতো সব করেও তার আয় হতো অনেক অনেক বেশি।
এই যে এরা চাকরি ছেড়ে দিয়ে সংসার চালাতে না পেরে আবার সেই একই অফিসে গিয়ে হাউমাউ করে কেঁদে সাড়ে ছয় হাজার টাকার চাকরিটা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে এটাই আমার কাছে আশ্চর্যের বিষয় লাগে। যদি অনেক বেতন হতো,প্রেস্টিজিয়াস চাকরি হতো, উচ্চ শিক্ষিত হতো তাহলে আলাদা বিষয় ছিলো। কিন্তু সে যে চাকরির জন্য কান্নাকাটি করছে তাতে না আছে তেমন সম্মান, না আছে বেতন, না আছে সুখ। আপনারা যারা কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে গিয়েছেন তারা নিশ্চই দেখেছেন ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা কেমন ব্যবসা করছে। তারা বুঝলেও এই মানুষগুলো বুঝতে পারে না। টাকা আয়ের জন্য সৎ পথে পরিশ্রম করে আয় করার মানসিকতা থাকতে হবে। তবেই সুখ আসবে। এই মানুষটি সহ আরও যারা আছে তারা অনায়াসেই নিজেদের ভাগ্যের চাকা আগের তুলনায় ঘুরিয়ে নিতে পারে বিশেষ করে বীচ কেন্দ্রিক ব্যবসা করে।
আমার এই অংশের লেখা তাদের জন্য যারা মোটামুটি একটা চাকরির আশায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ঢাকায় ছুটে যাচ্ছে এবং গার্মেন্টস বা নিরাপত্তারক্ষি কিংবা ছোট খাটো চাকরির আশায় বসে আছে তাদের উচিত ঢাকার দিকে ছুটে না গিয়ে কক্সবাজার চলে যান। ওখানে একটা বাসা নিন তার পর চা,কফি,চিপ্স,আমড়া,পেয়ারা এসবের যে কোনোটা নিয়ে নেমে পড়ুন। ইনশা আল্লাহ একদম প্রথম দিনেই আপনি লাভবান হবেন। আপনি যে অল্প বেতনের চাকরির জন্য ঢাকায় যাচ্ছেন সেই চাকরিটা পেলেও বেতন এক মাস পরে হাতে পাবেন। কিন্তু এখানে প্রথম দিনই আপনি লাভের মুখ দেখবেন। আমার এই লেখাটি যারা পড়ছেন তাদের মধ্যে যারা অল্প শিক্ষিত কিংবা কর্মসংস্থান না থাকায় পরিবারের বোঝা হয়ে উঠেছেন,হতাশ হচ্ছেন তারা ৫/৬ হাজার টাকা যোগাড় করে কক্সবাজার চলে আসুন। বাস থেকে নেমেই আপনার ভাগ্য পরীক্ষায় নেমে পড়ুন। পেটে ভাত না থাকলে যাদের সামনে মানসম্মান নিয়ে চিন্তিত তারা কেউ এসে ভাত কাপড় দিবে না। এখানে অনেক কিছুই বিক্রি করা যায় এবং বেশ ভালো প্রফিট করা সম্ভব। হতাশ না হয়ে নিজের ভাগ্যটা একবার পরীক্ষা করে দেখুন।
যে সব জিনিস বিক্রি করা যেতে পারে এবং যা থেকে অতি অবশ্যই লাভ হবে।
কলা ( বদর মোকাম মসজিদের পাশের গালিতে কলার আড়ৎ আছে। যেখান থেকে মোটামুটি দামে কলা কিনতে পারবেন এবং বীচে বা শহরে ঘুরে ঘুরে বিক্রি করতে পারবেন)
পানি,চিপ্স,বিস্কুট,জুস,সিগারেট ( লাবণী পয়েন্টের ওখানে গিয়ে যে কাউকে বলবেন মাটির দোকান কোনটা। দেখিয়ে দেবে। মাটি ভাইয়ের দোকান থেকে এই সব পণ্য আপনি নিতে পারবেন এবং বিক্রি করতে পারবেন)
দই ( ছোট ছোট কাপ দই ঝাকায় করে বীচে বিক্রি হয়। প্লাস্টিকের কাপ ২০ টাকা আর মাটির কাপ ২৫/৩০ টাকায় বিক্রি হয়। কেনা দাম পড়বে ১৫ টাকা। প্রতিদিন মিনিমাম ১০০ কাপ বিক্রি করতে পারবেন এবং তাও কয়েক ঘন্টা সময় নিলেই)।
হেয়ার ব্যান্ড ( বীচে দেখবেন মেয়েদের জন্য লাইট জ্বলে এমন হেয়ার ব্যান্ড বিক্রি হচ্ছে প্রতিটি ১০০ টাকা দামে। বাজারঘাটা থেকে ওগুলো পাইকারি ৪০ টাকা দিয়ে কিনতে পারবেন। অন্যরা ১০০ করে বিক্রি করছে আপনি ৬০ টাকা লাভ না করে ২০ টাকা লাভের চিন্তা নিয়ে ক্রেতা কেমন দাম দিতে চায় সেটা বিবেচনা করে বিক্রি করতে পারবেন। যারা ১০০ করে বিক্রি করছে তারাতো আর আপনাকে পাহারা দিচ্ছে না যে আপনি কত বিক্রি করছেন। দাম চাবেন ১০০ টাকা। কেউ যদি ৭০ টাকা দাম বলে তাও দিয়ে দিন। তবুওতো আপনার লাভ হবে ৩০ টাকা! ভাবা যায়? যদি ২০ টা বিক্রি করতে পারেন তাও নীট প্রফিট ৬০০ টাকা। মাসে ১৮ হাজার টাকা। সাথে বীচে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দতো থাকলোই)।
কাঁচা আম,পেয়ারা,বাদাম ( এগুলো সবই বাজারঘাটা থেকে কিনতে পারবেন)
চা,কফি ( একটা ফ্ল্যাক্স কিনবেন, পানি চাইলে নিজে বাসা থেকে গরম করতে পারেন আবার চাইলে গরম পানি কিনেও নিতে পারবেন। এক প্যাকেট ১০ টাকা দামের নেসক্যাফে কফি দিয়ে আপনি অনায়াসে দুটো কফি বানাতে পারবেন। ওরা অবশ্য পাঁচটাকা দামের প্যাকেট দিয়ে একটা বানায়। সাথে দুধ চিনি। বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকা করে। আপনি ৩০০ টাকার দুধ,চিনি,কফি,গরম পানি নিয়ে বের হলে দিন থেকে নিশ্চিত আপনার পুজির ওই তিনশো টাকার বাইরে আরও ৬০০ থেকে ১০০০ টাকা আয় করে ঘরে ফিরতে পারবেন)।
পুথি,মালা,ঝিনুক ( এগুলোর ব্যবসায় না নামাই ভালো কারণ এগুলো মানুষ হাটতে হাটতে কেনে না বরং দোকান থেকেই কিনতে পছন্দ করে)।
হাত পা মেসেজ করা ( আমি দেখেছি একদল ছোট ছোট ছেলে মেয়ে পর্যটকদের হাত,পা,মাথা মেসেজ করে দিয়েও বেশ ভালো টাকা আয় করছে)
গান শুনিয়ে ( একদল ছোট ছোট ছেলে মেয়ে পর্যটকদের গান শুনিয়েও আয় করছে)
এই দেশে একাধিক বার বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে,পত্রিকায় প্রতিবেদন হয়েছে এমন কিছু হকারের যারা স্মার্ট পোশাক পরে হকার হিসেবে ব্যবসা করছে। এটা একটা পজিটিভ দিক। সাধারণত হকার শ্রেণীর মানুষেরা খুব সাধারণ পোশাক পরে। কেউ যদি এই ধারার বাইরে গিয়ে একই পেশায় নিয়োজিত হয় তবে অন্যদের তুলনায় সে অধিক লাভবান হয় বা অধিক কাস্টমার পায়। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত শুধু ঘুরে বেড়ানোর জন্যই সুন্দর নয় বরং ছোট ছোট ব্যবসার জন্যও দারুন একটি স্থান। ঘরে বসে হতাশ না হয়ে আমার কথা মত এখানে এসে একবার ভাগ্যপরীক্ষা করে দেখতে পারেন। আশা করি সুফল পাবেন।
লজ্জার কিছু নেই।
খোদ আমেরিকার তৎকালিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মেয়ে মালিয়া নিজেও তার অবসর সময়ে লাইব্রেরীতে,রেস্টুরেন্টে কাজ করে আয় করতো,অভিজ্ঞতা অর্জন করতো। সেই তুলনায় আমার আপনার বাবা প্রেসিডেন্টতো দূরের কথা ওয়ার্ড কাউন্সিলরও না। অবশ্য অন্য দেশের প্রেসিডেন্টের তুলনায় আমার দেশের ওয়ার্ড কাউন্সিলররা বেশি সাবলম্বি। এর আগে কোনো এক দেশের প্রধানমন্ত্রী তার পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন বেতনের টাকায় সংসার চলছে না এই অভিযোগে। সারা বিশ্বেই যা নিউজ হয়েছিল। আমাদের দেশে অবশ্য সেই সুযোগ নেই। ওয়ার্ড কাউন্সিলররাও এতো টাকার মালিক যে আলিশান বাড়ি,দামী গাড়ি তাদের কাছে নস্যি ব্যপার। যাই হোক অল দ্য বেস্ট। আমি কিন্তু এখনো উপার্জনের দ্বিতীয়,তৃতীয় এমনকি চতুর্থ কোনো ওয়ে থাকলে সেটাও গ্রহণ করতে চেষ্টা করি,যদি সেটা সৎ পথ হয়। এমনকি এই যে আমি ভালো বাংলা টাইপ করতে পারি উপযুক্ত সম্মানি পেলে আমি যে কারো বাংলা টাইপ করে দিতেও রাজি আছি। বসে বসে বেহুদা ফেসবুকে সময় নষ্ট করার বদলে যদি কারো বাংলা টাইপ করে এক দুশো টাকা পাওয়া যায় সেওবা মন্দ কী? আমার অবশ্য এই অভিজ্ঞতা বেশ পূরোনো।শুধু একটি প্রথম শ্রেণীর পত্রিকার জন্য খেটে খুটে কিছু কাজ করে দিই কোনো রকম সম্মানি ছাড়াই। তাদের উচিত ছিলো কিছু সম্মানি দেওয়া। সম্পাদককে ভালোবাসি এবং প্রিয় বিষয়ে কাজ বলেই বিনা পয়সায় ওটুকু করি। ৫ বছর ধরে করে দিচ্ছি। সবার সুন্দর আগামী প্রত্যাশা করছি। পৃথিবীতে শান্তি বিরাজ করুক।
-জাজাফী
৯ জুন ২০২২

জুলাই মাসে লেখা কবিতাগুচ্ছ

১.

 

ঐ যে দূরে ছোট্ট নদীটি যার নাম অমরাবতী

ওখানে কখনো সেতু হবে না

সব নদীতে সেতু হলে কোথায় বৈঠা বাইবে মাঝি?

 

২.

 

কী বিচিত্র জীবন তোমার

কখনো কাকের মত না জেনে নিজের মনে করে

আজীবন অন্য কারো ডিমে তা দিয়ে গেলে।

কখনো মালির মত

হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা দিয়ে গোলাপ ফুটিয়ে

অন্য কারো হাতে তুলে দিলে সৌরভ নিতে!

চোখের সামনে কত চায়ের কাপে ধোয়া ওঠা থেমে গেল

কারো ঠোটের স্পর্শ ছাড়াই।

 

৩.

 

হাতের কাছে থাকা মোমবাতি জ্বেলে অনায়াসেই অন্ধকার তাড়ানো যেতো

তবুও সে কত রাত অন্ধকারে জানালা খুলে কাটিয়ে দিল

চাঁদের জোছনার অপেক্ষায়।

 

৪.

 

আকাশচুম্বী অট্টালিকা বুকে রাজধানী উপাধি নিয়ে

আমার সামনে এক ব্যর্থ শহর দাঁড়িয়ে

মরিচিকা জেনেও আমরা ছুটছি এই শহরের টানে।

 

হে দাম্ভিক শহর!

কী নিয়ে গর্ব করো তুমি?

রাজধানী হয়েছ বলে তোমার গর্ব করার কিছু নেই

আমি দেখেছি তোমার বুকে আকাশচুম্বী অট্টালিকা থাকা সত্ত্বেও

বেওয়ারিশ কুকুরের মত অসংখ্য মানুষ রাস্তায় ঘুমায়।

 

তোমার ঘরে থরে থরে সাজানো রঙ্গীন কাপড় থাকা সত্ত্বেও

খালি গায়ে ঘোরে নাম না জানা কত মানব সন্তান

হে ব্যর্থ শহর! তবে কোন মুখে গর্ব করো তুমি?

 

৫.

 

যদি ভোর রাতে জেগে উঠে দেখো

কুয়াশার চাদর ছিড়ে মৃদু পায়ে কেউ এসে দাড়ায়

 

৬.

 

তুমি এখন আর নেই

কোথাও দূর পাহাড়ের দেশে হারিয়ে গেছ

তুমি না থাকলেও মনে করার মত অনেক স্মৃতি দিয়ে গেছ

সেই সব স্মৃতিগুলোর জন্য তোমাকে ধন্যবাদ।

 

৭.

এক সমুদ্র জল নিয়ে বসে আছি আগুন নেভাবো বলে

কোথাও কি আগুন লাগেনি কারো মনে?

কী করে লাগবে আগুন দিয়াশলাইয়ের কাঠিতো এখানে

দিয়াশলাই ছাড়া কি আর সহজে আগুন জ্বলে?

 

৮.

 

তোমাকে ওরা খুঁজতে এসে শুণ্য হাতে ফিরে গেছে

তন্নতন্ন করে খুঁজেও তোমাকে পায়নি

হায়! ওরা যদি একবার আমার হৃদয়ে খোঁজ নিতো

তোমাকে পেতো।

 

৯.

হে ভূমিহীন কৃষক!

তোমার চোখের সামনে এতো বৃষ্টি নামলো

অথচ একফোঁটা জল জমিন স্পর্শ করলো না কখনো

কোথায় তোমার সেই খাস জমি?

কোথায় তোমার সেই ফসলের মাঠ?

যেখানে দুফোঁটা বৃষ্টির জল ফসল ফলিয়ে দেবে।

 

আর কতকাল ভূমিহীন কৃষক হয়ে থাকবে তুমি?

তোমার আকাশে শরতের মেঘ জমতে আরতো বেশি দেরি নেই!

 

১০.

আকাশ জুড়ে তারার মেলা বসুক,জোছনায় মাখামাখি চাঁদ

ওদিকে তাকালে কি মিটবে কখনো তোমাকে দেখার সাঁধ।

 

১১.

ঘরের আলো নিভিয়ে লাভ কী

অন্ধকারে এ দুটি হাত কারে ছোঁবে?

 

১২.

 

হে প্রত্নত্ত্ববিদ!

তেত্রিশ বছর অনুসন্ধান করেও

খনন করার মত পুরার্কীতির সন্ধান পাওনি

তবুও কোন আশা বুকে নিয়ে আজও তুমি অনুসন্ধান করে চলেছ?

 

১৩.

 

ধরিনি কখনো তারে,ছুঁয়েও দেখিনি কভু

শুধু একবার তাকিয়েছি তারপর তাকাইনি আর

এতেই নাকি উপক্রম মা হবার।

 

১৪.

 

ডিম আমার খুবই প্রিয়

আমার ভালো লাগে ডাবল ডিমের চপ

ডিম ভর্তাও পছন্দ করি আমি

কখনো কখনো দুটো ডিম অমলেট করতে ইচ্ছে করে

মুরগীর ডিমে হবে না, এতো ছোট যে কুসুমটাও দেখা যায় না

আমি বরং রাজহাঁসের ডিম চাই

দুটো বড় উটপাখির ডিম হলেও চলবে

এতো বড় ডিম যে দুই হাতে ধরে রাখা যাবে না

অনেক যত্নে খোলসবন্দী কুসুম বের করে আনবো

ভেতরটা কেমন সাদা আর হলুদে ভরপুর।

 

১৫.

 

কত র্তীথের কাক চাতকের মত চেয়ে থাকে

দেখা মেলেনা তার

কারো বা অভাব নেই

বিপরীতে কারো না পাওয়ার হাহাকার।

 

১৬.

 

মাঠের পর মাঠ সূর্যমুখী ফুটে আছে

তবুও কিছু মৌমাছি সারা জীবন কাঁটিয়ে দেয় ফুলের সন্ধানে

তার বসার মত একটি সূর্যমুখীও খালি নেই,বেদখল হয়ে গেছে

সুতরাং অন্যদের মত রোজ সন্ধ্যায় চাকে ফেরার তাড়া থাকে না তার।

 

একটি ফুলের দেখা পাবার অপূরণীয় আশা বুকে নিয়ে

তেপান্তরের মাঠ পেরিয়ে সে দিগন্তের শেষ সীমানা ছোঁয়।

 

পৃথিবীতে একই ভাবে বহু ফুল ফোঁটে, আপন সৌরভ ছড়ায়

কিন্তু সেই সৌরভ পৌঁছেনা কোনো মৌমাছির কাছে

কিছু কিছু ফুলের মধুও শুকিয়ে যায় মৌমাছির অপেক্ষায়।

 

১৭.

 

ভালোবাসার বিনিময়ে এক টুকরো জমি কিনবো

যেখানে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নামতেই

ঝাউবন ঘেরা উপত্যকার দেখা মিলবে

পাহাড় আর উপত্যকার মাঝে থাকবে ছোট্ট একটি পুকুর

জলহীন পুকুরের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হবো।

 

১৮.

ঐ যে দূরে দুটো পর্বতশৃঙ্গ কেওকেরাডাং আর তাজিংডং

সুযোগ পেলে এক শীতে আমি দুটোই জয় করতে চাই

পাহাড় জয় করে হাকালুকি হাওড়ে নেমে সাঁতার কাটবো

চলন বিল যখন ডাকবে সেখানেও চলে যাবো।

 

১৯.

 

ডিমে তা দিতে দিতে ঘুমিয়ে থাকা পাখিটিও

মাঝে মাঝে জেগে ওঠে

কিছুক্ষণ জেগে থেকে আবার ঘুমায়।

 

২০.

 

ভালোবাসার উষ্ণতায় মোমের মত হৃদয় আমার গলে গেলে

সে দোষ একা আমার নয়।

 

২১.

 

একটি মাছ একুরিয়ামের বাইরে পানির অভাবে

ছটফট করতে করতে

মুখে ফেনা তুলে চোখের সামনে নিস্তেজ হয়ে গেল।

 

২২.

মোমের মত নরম হৃদয়ের কাছে এসে

কেন ভালোবাসার উষ্ণতা ছড়ালে

তোমার ভালোবাসার উষ্ণতায় গলিয়ে দিলে হৃদয় আমার

তোমার স্পর্শ পেলে সুপ্ত আগ্নেয়গিরিও লাভা ছড়াবে।

 

২৩.

 

দূর আকাশের আলোকিত চাঁদ

আমাকে অন্ধকারে রেখে

তুমি কার ঘর আলোকিত করবে বলে অপেক্ষায় আছো?

 

২৪.

 

দূর আকাশের আলোকিত চাঁদ

তোমাকে ছোঁয়ার সাধ্য আমার নেই

যখন খুশি তুমিতো এসে আমায় ছুঁয়ে দিতে পারো

আমিতো তোমার কাছে অধরা নই।

 

ইচ্ছে হলেই আমার এই অন্ধকার ঘর মুহুর্ত নিমিষেই

তোমার একরাশ জোছনায় আলোকিত করে দিতে পারো।

দূর আকাশের আলোকিত চাঁদ

আমাকে অন্ধকারে রেখে

তুমি কার ঘর আলোকিত করবে বলে অপেক্ষায় আছো?

 

২৫.

 

হৃদয়টা ভেঙ্গে দিতে পারো,ভেঙ্গে দিতে পারো আয়না

ভালোবাসা কী করে ভাংবে বলো?

ভালোবাসা ভাঙা যায় না।

 

২৬.

 

বৃষ্টিতে ভিজে যাবো ভেবে কারো কাছে ছাতা চাই না

তার চেয়ে বরং এমন কাউকে চাই

যে আমার সাথে বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হবে।

 

২৭.

 

সূর্যের পিছু নিয়েছি, আমাকেতো জ্বলতেই হবে

কয়লাকে পুড়ে যাওয়ার ভয় দেখিয়ে লাভ নেই

তার জন্মই হয়েছে অন্যের দেওয়া আগুনে পুড়ে ছাই হবে বলে।

২৮.

 

তোমাকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা গ্রহগুলোর মাঝে আমিও ছিলাম

তারপর একদিন প্লুটোর মত না জানি কোন অপরাধে গ্রহত্ব হারালাম

প্লুটো এখন আর সৌরজগতের কেউ নয়,আমিও নই

সূর্যকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকা প্লুটো জানে গ্রহত্ব হারানোর বেদনা।

 

২৯.

 

মাত্র পাঁচ মিনিটের স্বাধীনতা নিয়ে জন্মেছিলাম আমি

সেই সময়ে আমার কোনো নাম ছিলো না

তবুও আমি ভালোবাসা পেয়েছি

আমার পরনে কোনো কাপড় ছিলো না

তবুও আমি নিষ্পাপ ছিলাম।

 

কোথাও যাবার তাড়া ছিলো না আমার

ইচ্ছে হলেই হেসেছি আবার কেঁদেছি।

সেই সময়ে আমার কান্নার শব্দ অনেকের মুখে হাসি ফুটিয়েছে

মাত্র পাঁচ মিনিটের স্বাধীনতা নিয়ে জন্মেছিলাম আমি।

 

পাঁচমিনিট পেরিয়ে যাবার পর আমি পরাধীন হয়ে গেলাম

ওরা নিজেদের মত করে আমার নাম ঠিক করে দিল

আমার মতামত ছাড়াই ওরা আমাকে

শেখ,মোল্লা,পাল,সেন কিংবা চট্টোপাধ্যয় উপাধী ধিল।

 

পরাধীনতার সেই শিঁকল আর কোনোদিন ছিঁড়তে পারিনি আমি

আজও তাই প্রতিনিয়ত সেই সব বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছি

যা আমি নিজ থেকে পছন্দ করিনি

ওরাই আমার উপর চাপিয়ে দিয়েছে।

মাত্র পাঁচ মিনিটের স্বাধীনতা নিয়ে জন্মেছিলাম আমি।

 

একদিন আবার আমি স্বাধীন হবো

সেদিনও আমার কোনো নাম থাকবে না,পদবী থাকবে না

স্বাধীনতা দিয়ে ওরা আমায় অচেনা জগতে পাঠিয়ে দেবে

যেখানে আমার পূর্বসুরীরা অপেক্ষা করছে।

 

৩০.

 

এতো অভিমান কী করে ভাঙাই প্রিয়তম ফুল

ভুলতো করোনি তুমি

যা কিছু হয়েছে আমার তা ভুল।

৩১.

মায়াবী আলো জ্বেলে ডেকেছ আমায়

ছুটেছি তোমার পিছে

গিয়ে দেখি মরিচিকা তুমি,যা দেখেছি সবটুকু মিছে।

 

৩২.

 

ফুল হয়ে সৌরভ ছড়াও, চাঁদ হয়ে ছড়িয়ে দাও আলো

তাইতো তোমাকে আমি এতো বাসি ভালো।

 

৩৩.

 

আমার হৃদয় খুন করে আজও নির্বিঘ্নে ঘুরে বেড়ায় খুনী

তবুও তার জেল হয় না,ফাঁসী হয় না

তাকে আরও বহুবার খুনের সুযোগ করে দেওয়া হয়।

 

তার হৃদয় হরণ করা খুনী চোখের আগুনে

কত প্রেমিক হৃদয় অঙ্গার হয়েছে

তবুও সে অপরাধী নয়! সে প্রেমিকা

যার প্রেমের অনলে পুড়ে গেছে তেত্রিশ কোটি প্রেমিক হৃদয়

চুরি করে নিয়ে গেছে সবগুলো মন।

 

৩৪.

 

তুমি ফুল হলেও অন্তত ছুঁয়ে দেখা যেত

সুবাশ নেওয়া যেত

তুমি হয়েছ আকাশের চাঁদ, যাকে ছোঁয়া যায় না

দূর থেকে তাকিয়ে মুগ্ধ হতে হয়

জোছনায় মাখামাখি হতে হয়।

 

৩৫.

পৃথিবীর তিনভাগ জলে ডুবিনি আমি

ডুবেছি তোমার প্রেমে।

 

৩৬.

 

সুদক্ষ নাবিক সে

আটলান্টিক পাড়ি দিতে গিয়েও ডুবেনি কখনো

ডুবেছে তোমার প্রেমে।

 

৩৭.

তুমি ছাড়া যখন কথা বলার মত দ্বিতীয় কাউকে পেলাম না

তখন আমি নিরুপায় হয়ে নিজেই নিজের সাথে কথা বলি

আজও তোমাকে কেন্দ্র করে

এক কাল্পনিক ভারসাম্যে আমার সবকিছু ঘুরপাক খায়

কবিতার ছন্দগুলো আজ প্রকম্পিত বিস্ফোরণে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে

তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা।

 

৩৮.

যদিও আমার তুমি ঘৃণা করো তবু আমি খুশি

তোমার অজান্তেই তোমার মনে আমার আমিকে পুষি।

 

৩৯.

ঝরে পড়া ফুল

তোমার হাতের স্পর্শে মালা হয়ে শুকিয়ে যায় কারো অপেক্ষায়

তবুও তুমি রোজই মালা গাথো

সে আর আসে না।

 

৪০.

 

বয়ে চলা নদীর মত অজস্র জনপদ ঘুরে

আমিও ফিরে যেতে চাই তোমার পানে।

 

৪১.

 

কার জন্য তুমি আকাশের তারা হয়ে জ্বলো?

আমিতো এখানে,নেমে এসো মাটির পৃথিবীতে।

 

৪২.

 

আকাশের তারা হয়ে কতকাল জ্বলবে?

এরচেয়ে খসে পড়ো

নেমে এসো মাটির পৃথিবীতে।

 

৪৩.

 

ভালোবাসার কাঙ্গাল এক ভিখারী তোমার দুয়ারে দাঁড়িয়ে

তাড়িয়ে দিওনা তারে

যাবার সময় হলে চলে যাবে,ফেরানো যাবে না আর।

 

৪৪.

 

আজও পর্বতারোহীর অপেক্ষায় সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে

মাউন্ট মেনোলিস আর মাউন্ট এরদুভাস

একদিন পর্বতারোহী এসে অজেয় থাকা পাহাড় জয় করে

ধীরে ধীরে নেমে আসবে পাহাড়ের পাদদেশে

যেখানে ঝাউবনে ঘেরা ছোট্ট শান্ত দিঘিতে সাঁতার কেটে

সমস্ত অবসাদ দূর করবে।

 

এ এমন পাহাড় যার চূড়া স্পর্শ করেনি কোনো পবর্তারোহী

এ এমন দিঘি, যে দিঘির জল স্পর্শ করেনি পৃথিবীর আর কোনো সাতারু

কী করে পারবে বলো সূর্যের আলোই কখনো পৌঁছাতে পারেনি সেখানে।

 

৪৫.

 

কোথাও হারিয়ে যেতে চাই

দিগন্তের ওপারে জোছনায় মাখামাখি সড়ক ধরে

অজানায়।

 

৪৬.

 

এক কোটি বছর আগে যাত্রা করে কিছু আলো

মাত্র সেদিন তোমাকে ছুঁয়ে গেল

আমার সাধ্য কী এক জীবনে তোমাকে ছোঁয়ার।

 

৪৭.

 

আমি অপেক্ষায় থাকি সেই সূর্যের

যা আজও উদিত হয়নি আমার আকাশে

হ্যালির ধুমকেতুর মত কোনো একদিন হয়তো সে উদিত হবে।

 

৪৮.

 

একটি ফুল বিছানায় ফুটবে আমার জন্য

কেবল তারই অপেক্ষায় আমি।

 

৪৯.

 

নাম না জানা সুগন্ধী ফুল

তোমার সৌরভে মুগ্ধ হয়ে পাপড়ী গুলোয় হাত বুলাতে বুলাতে

পৃথিবীর সব কিছু ভুলে যেতে চাই।

 

৫০.

বছর ঘুরে তবু ঈদের চাঁদ এলো

প্রিয় কেউ তবু এলো না

ভালোবাসাটুকু জমা রয়ে গেল

এবারও তা কেউ পেলো না।

 

৫১.

 

কুরবানি হয়ে যাক হৃদয়ের পশু

মিটে যাক অহমিকা,অভিমান,ক্রোধ

হৃদয়টা ভরে থাক ভালোবাসা মমতায়

ধুলোয় মিশে যাক অহমিক বোধ।

 

৫২.

 

আমাকে সুগন্ধী বিলাবে বলে যদি ফুটেছিলে গোলাপ

ঝরে গেলে কেন?

তবে কি ধরে নেবো আমার জন্য নয়

তুমি ফুটেছিলে ঝরে যাবার জন্য।

চাঁদকে জায়গা করে দিতে যেমন সূর্যকে ডুবে যেতেই হয়।

 

৫৩.

তুমিতো গোলাপ নও

তবুও তোমায় ছুঁতে গিয়ে

কন্টকযুক্ত শাখা প্রশাখায় ক্ষতবিক্ষত হই

তোমাকে আর ছোঁয়া হয় না।

 

৫৪.

 

দোহাই তোমার একবার চোখ খোলো

দেখো আঁধার নামিবার আগে।

 

৫৫.

 

তোমার ভূবনজোড়া হাসি ভালোবাসি

দিঘল কালো চুলে রাখি হাত

তোমার চাঁদ মুখ দেখে কেটে যায় রাত।

 

৫৬.

 

একটা পুরো আকাশ আমার নক্ষত্রহীন

চাঁদ হয়ে সে আকাশে কেউ আলো  ছড়ায়নি কোনো দিন।

একবার ধুমকেতুর মত এসেছিল কেউ

চোখ তুলে তাকাবার আগেই চলে গেছে সেও।

তারপর কত বিনিদ্র রজনী কেটে গেছে একা

তবু কোনো অপ্সরা আফ্রোদিতির পাইনিকো দেখা।

 

৫৭.

 

পদ্মা সেতু পদ্মা সেতু তোমার কাছে শুধাই

মানুষ কেন তোমার উপর ছবি তুলছে হুদাই।

ছবিতেকি তোমায় ওরা ধরতে পারে কভু?

তাও কেন যে ওরা সবাই ছবি তুলছে তবু।

 

৫৮.

 

এতো সহজে কী করে তাকে ছেড়ে দেই বলো

কৈশোরে যার ঠোটে ঠোট রেখে চুমু খেয়েছি

ভালোবেসে নিঃশ্বাসের সাথে মিশে গেছে সে

তাকে কি এতো সহজে ছাড়া যায়?

 

৫৯.

প্লেগ আক্রান্ত মৃতদেহকে যেমন অবহেলায় ছুঁড়ে ফেলা হয়

কেউ কেউ তার চেয়েও অবহেলায় পাশকাটিয়ে চলে যায়।

 

যদি সুখ আর দুঃখ দুটোর স্বাদই নিতে চাও একসাথে

তবে কাউকে ভালোবেসে দেখো।

ভালোবাসা কাউকে খালিহাতে ফেরায় না

তার আছে অগনিত সুখ আর দুঃখের নদী

হাসি কান্নায় জীবন ভরিয়ে দেবে।

 

৬০.

 

ভুল করে বসন্ত ভেবে

বর্ষায় ডেকে ওঠা কোকিলের মত দুঃখী আর কেউ নেই।

 

৬১.

 

ভেবো না সুখ আর কোনোদিন আসবে না

সময় হলেই আবার বসন্ত আসবে

কষ্টগুলো ঝরা পাতার মত ঝরে যাবে

তখন আকাশ জুড়ে তারার মেলা বসবে

বাগানে ফুটে থাকবে সুগন্ধী গোলাপ।

৬২.

হে আকাশেল চাঁদ!

তোমার দিকে তাকাবার সময় কোথায়?

অপেক্ষা করো অথবা ডুবে যাও

পৃথিবীর জমিনে থাকা সাড়ে চারশো কোটি চাঁদের আলো

এখনো দেখা হয়নি

সেখানে তোমাকে দেখার সময় কোথায়?

 

৬৩.

 

পৃথিবীর সাড়ে চারশো কোটি চাঁদ ফেলে তোমরা যারা

আকাশের একমাত্র চাঁদের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হও

তোমাদের দেখে আমি অবাক হই।

 

উপরের সবগুলো জুলাই -২০২২ মাসে লেখা।

নিজেকে বড় সৌভাগ্যবান মনে হয়

ছোটবেলায় অনেক পাওয়া না পাওয়ার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছি। মনের মধ্যে একরকম আক্ষেপ কাজ করতো সেই সব না পাওয়া নিয়ে। তবে বহু আগেই সেই ধারণা থেকে আমি বেরিয়ে এসেছি। এখন আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি। সে কারণে প্রতিনিয়ত আলহামদুলিল্লাহ বলে আল্লাহর শুকরিয়া জ্ঞাপন করি। প্রত্যেক মানুষের জীবনেই পাওয়া না পাওয়া উভয়টি বিদ্যমান। আমার ক্ষেত্রেও তাই। কিন্তু আমার না পাওয়ার চেয়ে পাওয়া বিষয়গুলোর দিকে তাকালে আমি আনন্দিত হই। বার বার নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে হয়।
অনেক শিশু জন্মের পর পর কিংবা জন্মের আগেই মৃত্যুবরণ করেছে। আমি আল্লাহর রহমতে পৃথিবীর আলো দেখতে পেয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ। অনেকে নানা অসংগতি নিয়ে জন্ম নিয়েছে বা নিচ্ছে, আমি সুস্থ্য ভাবে জন্ম নিয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ। জন্মের পর আমি আমার বাবা মাকে পেয়েছি যা আমার সৌভাগ্য। আলহামদুলিল্লাহ। মহান আল্লাহ আমাকে পিতা মাতার স্নেহ ভালোবাসা দিয়েছেন। অনেকেই আছে যারা জন্মের পর বাবা অথবা মা অথবা উভয়ের কাউকে পায়নি। আমি পেয়েছি। সুতরাং নিজেকে আমি সৌভাগ্যবান মনে করি। যখন স্কুলে ভর্তি হয়েছি তখন বাবা মা সাথে করে নিয়ে গিয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ। অনেকেরই সেই ভাগ্য হয়না। আমি স্কুলে যেতে পেরেছি সেটাও আমার জন্য সৌভাগ্য। অনেকের জীবনে স্কুলে যাওয়ার সুযোগ ঘটেনা।
আমি দেখেছি যে বয়সে আমি স্কুলে যেতাম সেই বয়সী ছেলে মেয়েরা জীবিকার তাগিদে কাজ করছে। আমি প্রতিদিন তিন বার খাবার খেতে পেরেছি, মাঝে মাঝে মাছ মাংস খেতে পেরেছি। আলহামদুলিল্লাহ। অন্য অনেকে সেই বাল্যকাল থেকেই মাছ মাংসতো দূরের কথা তিনবেলা ডাল ভাতও জুটাতে পারেনি। আমার সাথে এই দেশে অগণিত শিক্ষার্থী এসএসসি এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। তাদের অনেকেই পাশ করতে পারেনি। আমি পাশ করতে পেরেছি। আলহামদুলিল্লাহ। অনেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির স্বপ্ন দেখেছে,চেষ্টা করেছে কিন্তু সুযোগ পায়নি। আমি সুযোগ পেয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ। শিক্ষাজীবন শেষ করে অনেকেই পছন্দের চাকরি খোজে কিন্তু পায় না। কেউ কেউতো কোনো চাকরিই সহজে জোটাতে পারে না। সেই তুলনায় আমি মনে মনে যখন যা চেয়েছি প্রায় সব পেয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ।
করোনা মহামারিতে কত জন পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে,কতজন আক্রান্ত হয়ে যন্ত্রণায় কাতরিয়েছে। আমি বেঁচে আছি,সুস্থ্য আছি এবং নিরাপদে আছি। এ জন্য আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি। আলহামদুলিল্লাহ। অনেকে সুস্থ্য থেকেও নামাজ রোজা করতে পারে না বা করে না। আল্লাহর নাম উচ্চারণও করে না। আমি এগুলো করতে পারছি। আলহামদুলিল্লাহ। অনেকের মস্তিস্ক বিকৃত হয়ে গেছে, অনেকে নিজের মাথা বিক্রি করে দিয়েছে,অনেকে ভুল পথে চলে গেছে। আমার মাথা বিকৃত হয়নি,মাথা বিক্রি হয়নি এবং ভুল পথেও যাইনি। আলহামদুলিল্লাহ। আমি অনেক ভালো বন্ধু পেয়েছি যাদের আমি ভালোবাসি। আমি আখেরাতে বিশ্বাসী,মৃত্যুর পর পুনরুত্থানে বিশ্বাসী, জান্নাত জাহান্নামে বিশ্বাসী,হাশর মিজানে বিশ্বাসী,নবী রাসুল,ফেরেস্তা ও আসমানী কিতাবে বিশ্বাসী। আলহামদুলিল্লাহ।
আমি যাদের দুনিয়ার জীবনে বন্ধু হিসেবে পেয়েছি,ভালোবেসেছি পরকালিন জীবনেও তাদের এভাবেই পেতে চাই। জান্নাতের মাঝে বয়ে চলা সুমিষ্ট পানির নদীর তীরে পা ছড়িয়ে বসে গল্প করতে চাই। আপনারা কি সেই যাত্রায় আমার সঙ্গী হবেন? আমাদের কি জান্নাতে দেখা হবে?আপনিও কি আমাকে জান্নাতে আপনার বন্ধু হিসেবে পেতে চান? এই যে এমন ভাবনা ভাবতে পারছি এ জন্যও আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করছি। আলহামদুলিল্লাহ। এইসব কিছুর জন্যই আলহামদুলিল্লাহ।
১২ জুন ২০২২

আমার কিছু ইচ্ছের কথা বলি

আমার কিছু ইচ্ছের কথা বলি। ইচ্ছেগুলো সত্যি হোক বা না হোক বলতে তো দোষ নেই। হতেও পারে আমার এই ইচ্ছের কথা অন্য কারো ইচ্ছের সাথে মিলে গেছে। আর তার পর হয়তো নতুন কিছু হতে পারে। আমার বাসা যেহেতু কক্সবাজারে তাই আমি কক্সবাজার কেন্দ্রীক দু একটি কথা বলতে চাই। কক্সবাজারে সমিতিপাড়া নামে একটি এলাকা আছে। এয়ারপোর্টের পশ্চিম সাইডে সমুদ্র সৈকতের পাশ ঘেষা এরিয়া। এখানে যারা বসবাস করে তাদের ৯৯ শতাংশই দারিদ্রসীমার নিচে বসবাস করে। দিন আনে দিন খায়। এর একটা ছোট্ট উদাহরণ দিয়ে বাকি কথাগুলো লিখতে চেষ্টা করছি।
বেশ কিছুদিন আগে কাজের প্রয়োজনে আমি ওই এলাকায় ঘুরতে গিয়েছিলাম। এমনকি ওখানে সমুদ্রে নেমে গোসল করেছিলাম। আমি সাধারণত সমুদ্র খুব ভালোবাসি এবং আমার ব্যাগে সব সময় অন্তত একটি টাওয়েল থাকে আর পরণে একাধিক শর্টপ্যান্ট থাকে যেন আমি ইচ্ছে হলেই সাগরে নামতে পারি। তো সেদিনের স্মৃতিটা আমার আজও মনে আছে। আমি সাগরে নেমে সাতার কেটে কাপড় বদলে যখন মূল রাস্তার দিকে হাটছি তখন দেখলাম দুটি ছেলে ছোট ছোট ঝাউগাছের উপর তাদের ভেজা হাফ প্যান্ট শুকাতে দিয়ে গায়ের জামা কোমরে পেচিয়ে অপেক্ষা করছে। কাছে গিয়ে বললাম তোমরা এভাবে দাড়িয়ে আছো কেন? কাপড় শুকানো হলে তার পর বাড়িতে যাবা? ওরা বললো হ্যা কাপড় শুকানোর পর বাড়ি যাবে।
তার পর যে কথাটা বললো সেটি বেদনাদায়ক। আমি বললাম ভেজা কাপড়ে বাড়িতে গেলে কি মা বকা দিবে? তখন ওরা বললো মা বকা দিবে না । তখন জানতে চাইলাম তাহলে এখানে কেন দাঁড়িয়ে আছো? বাড়িতে গিয়েইতো কাপড় শুকাতে দিতে পারো। ওরা তখন বললো ওদের দুজনেরই ওই একটা করে প্যান্ট তাই শুকিয়ে তার পর সেটা পরতে হবে। এখানে ভালো রোদ আছে দ্রুত শুকাবে। আমার খুব খারাপ লাগলো। আমি যে হাফপ্যান্ট পরে সাগরে নেমেছিলাম সেটি ওদের একজনকে দিয়ে দিলাম। যদিও তার একটু লুজ হবে তাও সে বললো ম্যানেজ করতে পারবে। ওটা পেয়ে সে ভীষণ খুশি হলো। অন্যজনকে বললাম আবার যেদিন আসবো তোমার জন্যও একটা নিয়ে আসবো। তার পর সত্যি সত্যি বেশ কিছুদিন পর আবার যখন গেলাম তার জন্যও একটা প্যান্ট নিয়ে গিয়েছিলাম। সে সেটা পেয়ে খুব খুশি হয়েছিল।
উপরের এই ঘটনাটা বলে আমি নিজের মহত্বের প্রচার করছি না। প্রসঙ্গক্রমে ঘটনাটি বলতে হলো। আমাদের একাধিক মাননীয় মন্ত্রী তাদের নানা বক্তব্যে বলেছেন দেশে গরীব মানুষ নাই। মানুষের অনেক টাকা হয়েছে,ক্রয় ক্ষমতা বেড়েছে। তারা চাইলে তিন বেলা মাংস খেতে পারে। এক শ্রেণীর মানুষের টাকা হয়েছে এ কথা আমিও স্বীকার করি। কিন্তু এক শ্রেণীর মানুষ গরীব হতে হতে পথে বসে গেছে। এই যে সমিতিপাড়ার কথা বললাম ওখানেই একদিন সন্ধ্যায় দেখলাম ভ্যানে করে কাপড় বিক্রি হচ্ছে প্রতিটা ২০ টাকা দাম। তাও দেখলাম কেউ কেউ কেনার ক্ষমতা রাখে না। এই পুরো এলাকায় প্রায় ৩০০ ছোট ছোট ছেলে মেয়ে আছে। তাদের প্রত্যেকের অবস্থাই এমন। তারা দারিদ্রসীমার নিচে বাস করে। আমার একার পক্ষে এদের সবাইকে কিছু দেওয়া সম্ভব হয় না দেখে আমি দু একবার ুওদের কিছু সংখ্যককে ৫ টাকা দশ টাকা দামের আইসক্রিম খাইয়েছি। ওদেরকে কাপড় দেওয়া না দেওয়া নিয়ে মূলত আমার এই লেখা নয় বরং এবার আসি মূল ঘটনায়।
কিছুদিন আগে কাজের প্রয়োজনে আবারও সমিতিপাড়ায় গিয়েছিলাম। সমিতিপাড়াতে ঢুকতে সাগরের দিকে দ্বিতীয় যে গলিটা ওটা দিয়ে আমি সাগরের দিকে হাটলাম। ভাবলাম ওদিকটায় একটু হাটাহাটি করে তবেই ফিরবো। সাগরের কাছাকাছি যাওয়ার পর পেটে টান পড়লো। ইমার্জেন্সি টয়লেটে যাওয়ার দরকার হলো। আসেপাশে যে বাড়িগুলো দেখলাম সেখানে টয়লেট চোখে পড়লো না। একটি পিছিয়ে আসতেই ওখানে একটা বাংলো দেখা যায়। শুনেছি কোনো এক পুলিশ কর্মকর্তার বাংলো। গেট লাগানো থাকে তাই ভিতরে কি আছে না আছে জানা নেই। তার পরেই যে বাড়িটা একটা খুপরি ঘরের মত। উঠোনে একটা টিউবওয়েল আছে। সেখানে একটা বাচ্চা খেলা করছে এবং তার পাশে এক ভদ্রমহিলা কিছু শাক সবজি কাটাকাটি করছে। আমি তাকে বললাম আপনাদের বাড়িতে টয়লেট আছে? আমার জরুরী যাওয়া দরকার। তিনি তাদের টয়লেট দেখিয়ে দিলেন। আমি টিউবওয়েল থেকে বদনায় করে পানি নিয়ে টয়লেটে গেলাম। ওখানে যাওয়ার পর আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো বিশ বছর আগে আমাদের বাড়ির দৃশ্য। ঠিক এমনই টয়লেট ছিলো আমাদের। তিনপাশে পলিথিন মোড়ানো, দরজা নেই। দরজার একটা বেশ বড় অংশ পুরোপুরি ফাঁকা। কেউ হঠাৎ করে আসলে যে টয়লেটে আছে সে লজ্জা পাবে আর যে আসবে সেও লজ্জা পাবে। এই টয়লেটই ছেলে মেয়ে সবাই ব্যবহার করে। টয়লেট থেকে বেরিয়ে টিউবওয়েলের পানিতে হাত ধুতে ধুতে সেই ভদ্রমহিলার কাছে জানতে চাইলাম এই টয়লেট যদি টিন দিয়ে ঘিরে দেওয়া হয় তাহলে কত খরচ হবে? তিনি জানালেন পাঁচ ছয় হাজার টাকা খরচ হবে। আর যদি নিচের অংশ ইটের গাথুনি দেওয়া হয় তবে সেটা কমপক্ষে ১৫ হাজার টাকা লাগবে। তাদের থাকার ঘর দেখেই বুঝেছি টয়লেটের জন্য ৫ হাজার কিংবা ১৫ হাজার খরচ করা তাদের পক্ষে কোনো কালেও সম্ভব নয়। এই দৃশ্য শুধু ওই একটি বাড়িতেই এমন নয়। আশেপাশে প্রায় সব বাড়িতে। নিচে কোনো মত একটা স্ল্যাব দিয়ে রাখা। উপরে খোলা,দরজাবিহীন চটের বস্তায় ঘেরা টয়লেট। অনেক বাড়িতে আবার টয়লেটও নেই। তারা পাশেই ঝাউবাগানের উপরই নির্ভর করে।
এই সব দৃশ্য গভীর ভাবে দেখলে খুবই সামান্য ব্যাপার মনে হবে। কারণ ঠিকমত তিন বেলা অনেকে খেতেই পায় না,পরার মত কাপড়ই পায় না সেখানে পাকা করা কিংবা টিন দিয়ে ঘেরা টয়লেটের স্বপ্ন দেখাতো অনেক দূরের ব্যাপার। এই এলকারা জনপ্রতিনিধিরা এদিকে কখনো আসেও না। উল্লেখ্য প্রায় প্রতিটি বাড়িতে অবশ্য একটা করে টিউবওয়েল দেওয়া আছে। যদিও সেই টিউবওয়েলে সব সময় পানি ওঠে না। জনপ্রতিনিধিরা থাকে ধরাছোয়ার বাইরে। তারা এখন উন্নয়ন প্রচারে ব্যস্ত। কিংবা তারা আরও বড় বড় সমস্যা সমাধানে ব্যস্ত। এই সব ছোটখাটো সমস্যা নিয়ে ভাবার সময় কোথায়?
আমার মনে হয় প্রতিটি বাড়িতে টয়লেট থাকাটা জরুরী। এবং সেই টয়লেটে দরজা থাকাও জরুরী। আমার আর্থিক সক্ষমতা থাকলে নিশ্চই এই এলাকার প্রতিটি বাড়িতে একটি করে অথবা কয়েক বাড়ির জন্য একই স্থানে কয়েকটি যৌথ টয়লেট বানিয়ে দিতাম। এমন যৌথ টয়লেট বানাতে হলেও অন্তত ৩০ টা টয়লেট বানানো লাগবে। অনেক খরচের ব্যাপার। আপনাদের এ বিষয়ে মতামত কী? এই মানুষগুলোকে কি আমরা সবাই মিলে স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট বানিয়ে দিতে পারি? পাকা করা না হোক অন্তত চারপাশে টিনের বেড়া আর সামনে টিনের দরজা বানিয়ে দেওয়া যেতে পারে? যার প্রতিটিতে খরচ হবে ৫/৬ হাজার টাকা। কিংবা আপনাদের কারো পরিচিত এমন কোনো সংস্থা আছে যারা এ বিষয়ে হেল্প করতে পারবে। আমার খুবই ইচ্ছে এই দারিদ্রসীমার নিচে বাস করা শিশু কিশোর কিশোরীদের জন্য কিছু করার এবং এই এলাকার মেয়েরা যেন অন্তত দরজা যুক্ত টয়লেট ব্যবহারের সুযোগ পায় সে বিষয়ে কিছু করা। এই বিষয়ে আপনাদের পরামর্শ চাই। কিভাবে এটি করা সম্ভব হতে পারে বলে আপনি মনে করেন? এই বিষয়ে আপনিকি কোনো ভাবে এগিয়ে আসতে পারবেন? কক্সবাজারে আমার পরিচিত কিছু মানুষ আছে তাদের মাধ্যমে এটি করা সম্ভব হবে যদি আর্থিক বা র ম্যাটেরিয়ালের যোগান পাওয়া যায়।
— জাজাফী
১৩ জুন ২০২২

পাগলের প্রলাপ কিংবা উর্বর মস্তিষ্কের চিন্তা ভাবনা

রাজনীতি থেকে শুরু করে ক্রিকেট,ফুটবল হয়ে সিনেমার নায়ক নায়িকা পযর্ন্ত সব বিষয়েই প্রতিটি মানুষের নিজস্ব পছন্দ,অপছন্দ,বক্তব্য থাকবে এটাই স্বাভাবিক।ঠিক এই মুহূর্তে আমি যখন এই লেখাটি লিখতে বসেছি আমার হাতে আসলে তেমন কোনো কাজ নেই। তো ভাবলাম এটা নিয়ে কিছু লিখি।
প্রথমেই রাজনৈতিক দলের সমর্থন বিষয়ে বলি। আপনি যখন কোনো একটি দলকে পছন্দ করেন এবং অন্য একটি দলকে অপছন্দ করেন তার কারণ কী? কখনো কি সেটা ভেবে দেখেছেন? আপনি যে দলের সমর্থন করেন সেই দলের কোন বিষয়গুলি আপনাকে মুগ্ধ করেছে আর যেই দল সমর্থন করেন না তাদের কোন বিষয়টি আপনাকে তাদের দল সমর্থন করা থেকে সরিয়ে রেখেছে। আমি আমার বন্ধুদের মধ্যে দেখেছি তারা প্রায় সবাই কোনো না কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই তাদের কেউ কেউ দেখেছি ছাত্র নেতা হয়ে ক্যাম্পাসে প্রভাব বিস্তার করেছে। আবার কেউ কেউ অন্য দলের সমর্থক হয়ে নানা হয়রানির শিকার হয়েছে। আমাদের দেশের রাজনৈতিক বা অন্যান্য নানা ক্ষেত্রে সমর্থকদের মধ্যে অনেক রকম বিষয় লক্ষ্য করা যায়। তারা সাধারণত যে দল সমর্থন করে তাদের ভুল গুলো এড়িয়ে যায় কিংবা ইচ্ছে অথবা অনিচ্ছেয় সেই সব ভুলগুলো স্বীকার করে না। প্রতিটি রাজনৈতিক দলেরই ভালো এবং মন্দ দিক আছে। প্রত্যেকেই কিছু না কিছু উন্নয়নমূলক কাজ করে এবং কিছু না কিছু সমালোচিত কাজ করে। প্রত্যেক দলেই কম বেশি ভালো এবং খারাপ মানুষ থাকে। তাদের আচরণেও তা লক্ষ্যনীয়। কিন্তু প্রায় শতভাগ ক্ষেত্রে এই মন্দ বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়। একজন নেতার ভালো কাজে আপনি প্রশংসার বন্যা বইয়ে দিবেন কিন্তু তার মন্দ কাজে তার সমালোচনা করবেন না এটা কি আসলে ঠিক? আপনার কী মনে হয়? আপনি ঠিক কাজটি করছেন?
রাজনৈতিক নেতা একজন ড্রাইভার বা চালক। আর সাধারণ জনগণ সেই চালকের পিছনে বসা যাত্রী। এখন চালকের কাজ হলো সুন্দর ভাবে দেশ নামক গাড়িটি চালিয়ে নিয়ে যাওয়া। যেন যাত্রীরা নিরাপদে থাকে। কিন্তু দেশ চালক যদি কখনো ভুল করে,ভুল পথে চলতে শুরু করে যাত্রীরা সেটা কেন ধরিয়ে দিবে না? একজন বাস চালক যখন ভুল পথে গাড়ি চালানো শুরু করে কিংবা চলতি পথে মোবাইলে কথা বলতে থাকে বা বার বার থামতে থাকে তখন যাত্রীরা যেমন তাকে তাগাদা দেয়,ভুল ধরিয়ে দেয় ঠিক একই ভাবে কেন রাজনৈতিক নেতাদের ভুল হলে তা ধরিয়ে দেওয়া হয় না। বিশেষ করে সেই দলের সমর্থকরা কেন তা করে না? আমি দেখেছি প্রতিটি রাজনৈতিক দলের সমর্থক নিজ দলের ভুলগুলো পাশকাটিয়ে যায়। ছাত্র সংগঠনগুলো নিজ দলীয় সরকারের সব বিষয়ে সমর্থন করা ছাড়া কখনো সাধারণ মানুষের পক্ষ নিয়ে সরকারের কাছ থেকে কোনো দাবী আদায়ের নজির খুব একটা দেখা যায় না। এখনতো এমন হয়েছে যে ক্ষমতায় যখন যারা থাকে তাদের সমালোচনা করলেই বিপদ। গত কয়েক বছরে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে কত শত মামলা হয়েছে,কতজনের জেল হয়েছে তার হিসাব আমার কাছে নেই। এই যে একরোখা ভাব,প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতে পারে কিন্তু সমালোচনা সহ্য করতে পারে না এটাই দেশের জন্য ক্ষতিকর। প্রশংসার পাশাপাশি যৌক্তিক সমালোচনা গ্রহণ করে নিজেদের ভুলগুলো শুধরে নিতে পারলে সেই নেতা বা সেই দল নামে মাত্র নয় বরং সত্যিকার অর্থেই মানুষের হৃদয়ে স্থান পায়।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো কেউ ক্ষমতাসীন দলের সমালোচনা করলেই তাকে বিরোধী দলের দালাল বলে সম্মোধন করা হয়। একই ভাবে বিরোধী দলের সমালোচনা করলে তাকে সরকারী দলের চামচা মনে করা হয়। এই বিষয়টি ঘটেছে আমাদের রাজনৈতিক দূরদর্শীতায় ফাকফোকর থাকার কারণে। ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগের বড় বড় নেতাদের মুখেই শুনেছি কেউ কেউ বলেছে “ এখন গাছের পাতায় পাতায় আওয়ামীলীগ” জনাব ওবায়দুল কাদের বলেছেন “ এখন সবাই নেতা হতে চায়, সামনের সারিতে থাকতে চায়”।
এই যে সামনে থাকতে চাওয়া বা নেতা হতে চাওয়া কিংবা পাতায় পাতায় আওয়ামীলীগ এর কোনোটাই কিন্তু সুখকর নয়। দেশের সবাইতো আওয়ামীলীগ হতে পারে না আবার সবাই বিএনপি বা জামাত বা জাতীয় পার্টিও হতে পারে না। তার মানে এই যে অধিকাংশ লোক এদের মধ্যে একটি বড় অংশ সুবিধাভোগী। আর এর ফলে রাজনৈতিক বিভেদ,কোন্দল আরও অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। অন্যদিকে এই যে সবাই নেতা হতে চাইছে এর কারণ কী? আমার ধারণা ওরা জানে নেতা হওয়া মানেই সুযোগ সুবিধা পাওয়া। আজ থেকে বিশ বছর আগে যারা বিভিন্ন দলের নেতা হয়েছিল আর আজকে যারা নেতা হচ্ছে তাদের মধ্যে আকাশ পাতাল ব্যবধান। এটা কিন্তু তারা হাওয়া থেকে শেখেনি বরং সিনিয়রদের দেখেই শিখেছে। যখন সংবাদপত্রে প্রকাশ হচ্ছে অমুক ছাত্রনেতার কোটি কোটি টাকা হয়েছে তখন স্বাভাবিক ভাবেই একরকম লোভ তৈরি হচ্ছে। আর পত্রিকায় প্রকাশ হতে হবে এমন নয় বরং নেতার চালচলন,গাড়ি বাড়ি দেখে কারো বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয় যে এই মানুষটি আগে কেমন দিনকাটাতেন আর এখন কেমন কাটান। ফলশ্রুতিতে সবাই নেতা হতে চাইবে এটাই স্বাভাবিক।
রাজনৈতিক এবং অন্যান্য বিষয়ে সমর্থকদের মধ্যে পারস্পারিক সম্মান দেখানো বা অন্যের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টা এখন নেই বললেই চলে।বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন “ সংখ্যায় যদি একজনও হয় আর সে ন্যায্য কথা বলে সেটা গুরুত্ব সহকারে নেওয়া হবে”। আজকাল একজনতো দূরের কথা হাজার বা লাখ মানুষ একটি দাবী উত্থাপন করলেও তা ধোপে টেকে না। এই যে দেশের দুটি বৃহত্তম দল আওয়ামীলীগ আর বিএনপি। দুই দলের সমর্থক ও নেতা কর্মীদের মধ্যে আজ পযর্ন্ত একটি বিষয়ও পাইনি যেখানে একমত হয়েছে। একদম সাধারণ সমর্থক থেকে শুরু করে সিনিয়র নেত্রীবৃন্দ পযর্ন্ত সবার একই অবস্থা। দুই দলের নেতারাই বিপরীত দলের প্রয়াত নেতাদের নিয়ে যখন যা খুশি বলছে। এতে করে ওই সব নেতাদের সম্মান বাড়ছে না বরং কমছে। তারেক রহমান যখন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটুক্তি করছে তখন আওয়ামীলীগের নেতারা জিয়াউর রহমানকে নিয়ে কথা তুলছে। এতে মূলত দুই দল পরস্পর একার্থে নিজেরাই নিজেদের নেতাদের অসম্মান করছে।
এর পর আমরা বলতে পারি নাম পরিবর্তনের সংস্কৃতি নিয়ে। এটি বাংলাদেশের জন্য খুবই উদ্বেগজনক এবং ক্ষতিকর বিষয়। কোনো একটি প্রতিষ্ঠান নির্মানের পর যে নামকরণ করা হয় পরবর্তীতে সেটা পরিবর্তন করলে কত কিছুতে যে পরিবর্তন করা লাগে তা কল্পনাতীত। আর যদি বিষয়টি আর্ন্তজাতিক সর্ম্পক যুক্ত হয় তাহলে বিশ্বব্যাপী তার পরিবর্তন করলা লাগে। যেমন উদাহরণ স্বরুপ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কথাই বলি। এটি নির্মানের সময় কী নাম ছিলো তা না হয় নাই বললাম। জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নামে দীর্ঘকাল এটি সারা বিশ্বে পরিচিতি লাভ করেছে। পরবর্তীতে সেটি যখন পরিবর্তন করে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করা হলো তখন দেশে বিদেশে সব জায়গায় এই নামটি সংযোজন করার জন্য কত কিছু পরিবর্তন করা লেগেছে! প্রচুর টাকা খরচ হয়েছে। এই যে নাম পরিবর্তন হলো ধরে নিলাম একজন আল্লাহর ওলীর নামে নামকরণ করা হয়েছে ঠিক আছে। কিন্তু যদি আবার বিএনপি ক্ষমতায় আসে কখনো আর তারা যদি যে কোনো কারণেই হোক এখনকার নামটি পরিবর্তন করে আবার জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নামকরণ করে তাহলে কী ঘটবে? দেশের প্রচুর অর্থ অপচয় হবে। আবার বিশ্বব্যাপী এই পরিবর্তন নিয়ে কাজ করতে হবে।
এভাবে পালাক্রমে আবার ক্ষমতার বদল হলে আবার নাম পরিবর্তন হবে যা কোনো ভাবেই কাম্য হতে পারে না। এর আগে আমার যতদূর মনে পড়ে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের নামও পরিবর্তন করে বেগম খালেদা জিয়া মেডিকেল কলেজ করা হয়েছিল এবং আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় এসে সেটি পরিবর্তন করে আগের নাম বহাল রেখেছে। আমার মতে যখন যে সরকারই আসুক না কেন এই নাম পরিবর্তনের সংস্কৃতি বদলানো উচিৎ। কারো নামে কিছু করতে হলে যখন নতুন একটি প্রতিষ্ঠান দাড় করানো হবে তখন সেটির নামকরণ সেই মানুষের নামে করা যেতে পারে এবং পরবর্তী সময়েও সেই নামটিই বহাল রাখা উচিৎ। নাম পরিবর্তনের সংস্কৃতি কোন দল চালু করেছিল এসব নিয়ে আর জলঘোলা করা ঠিক হবে না। যারাই করুক সেসব ভুলে গিয়ে এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা উচিত।
প্রথমে যে কথাটি বলছিলাম প্রশংসা ও সমালোচনা নিয়ে। আপনি আপনার পছন্দমত একটি দল সাপোর্ট করবেন এটি আপনার অধিকার। এই অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার অধিকার কারো নেই। কিন্তু আপনিকি কোনো একটি দল সাপোর্ট করতে গিয়ে নিজেকে সেই দলের অন্ধ সমর্থক বানিয়ে ফেলছেন কি না সেটা ভেবে দেখেছেন? আপনার পছন্দের দলের কোনো খারাপ বিষয়টি আপনার চোখে পড়ে না? পড়লেও আপনি এড়িয়ে যান? তাহলে আমার মতে আপনি সঠিক পথ অবলম্বন করছেন না। ভালো এবং মন্দ উভয় দিক বিবেচনা করতে হবে। যে ছাত্রটি সবগুলো প্রশ্নের সঠিক উত্তর দিলো আর যে ছাত্রটি কয়েকটি ভুল উত্তর দিলো উভয়ে সমান নাম্বার পেতে পারে না। ভালো করলে ভালোর প্রশংসা করতে হবে এবং খারাপ করলে তার সমালোচনা করতে হবে। আবার সমালোচনার নামে অযথা দোষারোপ করাও নিন্দনীয় কাজ। ব্রাজিল কবে সাত গোল খেয়েছিল সেটা তুলে যেমন খোঁচা মারা যুক্তিযুক্ত নয় একই ভাবে আর্জেন্টিনা কত বছর বিশ্বকাপ পায়নি বা ব্রাজিলের তুলনায় কত কম পেয়েছে সেটা দেখিয়ে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের দুয়ো দেওয়াও ঠিক নয়। পারস্পারিক শ্রদ্ধাবোধ থাকা চাই। আপনি তখনই উত্তম সমর্থক হয়ে উঠবেন যখন আপনার চোখে আপনার সমর্থিত দলের ভুলগুলো চোখে পড়বে,সমালোচনা করবেন এবং বিপরীত দলের ভালো গুলো চোখে পড়বে এবং প্রশংসা করবেন। আপনি ব্রাজিলের সাপোর্টার হয়ে যদি দেখেন মেসি ভালো করেছে তবে তার প্রশংসা করা উচিৎ এবং আপনি আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়ে যদি দেখেন ব্রাজিল খারাপ করেছে তাতে হাসাহাসি করা উচিৎ নয়।
ঠিক একই ভাবে আপনি যে রাজনৈতিক দলকেই সাপোর্ট করুন না কেন সেই দলের ভালো মন্দ উভয় দিক আপনি সমান চোখে দেখবেন এবং আপনার বিপরীত দলের ভালোগুলোকে স্বীকার করবেন।ব্যক্তিগত ভাবে আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক নই। এমনকি আমি মধ্যস্বত্ত্বভোগীও নই। আমি অবজার্ভার। আমি আমার নিতান্ত জ্ঞান থেকে বার্ডসআই ভিউতে দেখি। সরকারি বা বিরোধী যে দলই হোক না কেন তাদের ভালো কাজগুলোকে আমি সমর্থন জানাই এবং মন্দ কাজগুলোর বিরোধীতা করি বা সমালোচনা করি। একটি উন্নয়ন মূলক কাজ দেখে আমি সরকারের প্রশংসার পাশাপাশি সেই একই কাজে প্রাক্কলিত বাজেটের তুলনায় খরচের পরিমান কয়েকগুন বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়ে কঠোর সমালোচনা করি। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় একটি ঘটনা। মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা প্রদানকে আমি খুবই ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখি। পাশাপাশি অনেক ভূয়া মুক্তিযোদ্ধার কথা শুনি সেগুলোর বিরোধীতা করি।যুদ্ধাপরাধীদের বিচারকে পুরোপুরি সমর্থন করি এবং ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দলে অনেকেই একই অভিযোগে অভিযুক্ত হওয়ার পরও বহালতবিয়তে থাকাকে সমালোচনা করি। বিশ্ববাজারে দাম বাড়লে দেশে দাম বাড়বে এটা আমিও মানি কিন্তু বিশ্ববাজারে যখন দাম কমে তখন দেশের বাজারে সেই একই পণ্যের দাম কমে না। এটির কঠোর সমালোচক আমি। ব্যাংক থেকে হাজার কোটি টাকা লোন নিয়ে ভেগে যাবে তাদেরকে কিছুই বলা হবে না অথচ গরীব কেউ দশ বিশ হাজার টাকা নিয়ে সময় মত দিতে না পারলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয় এটির ঘোর বিরোধী আমি। আইন সবার জন্য সমান হওয়ার পক্ষে আমি।
আমি একই সাথে ছাত্ররাজনীতির পক্ষে কিন্তু সেটা যেন কোনো ভাবেই দলীয় লেজুড়ভিত্তিক না হয়। উষ্কানীমূলক বক্তব্য আমি ঘৃণা করি। বিএনপি এক সময় বলতো আওয়ামীলীগ আগামী পঞ্চাশ বছরেও ক্ষমতায় আসবে না এবং এখন আওয়ামীলীগও বলে বিএনপি আগামী ৫০ বছরেও ক্ষমতায় আসতে পারবে না। আমি এরকম কথা বলার বিপক্ষে। এটিকে আমার কাছে অহংকার মনে হয়। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের লাগামহীন বক্তব্য,খোঁচা মারা কথা আমার পছন্দ নয়।
১৫ জুন ২০২২

আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ে বিষয়ে এক আদার ব্যাপারির কথা

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর এক বক্তব্যে বলেছিলেন যারা উন্নয়ন চোখে দেখে না তাদের চোখের ডাক্তার দেখানো উচিৎ। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের সাথে পুরোপুরি একমত পোষণ করি। তবে তিনি যদি একই সাথে ঘোষণা করতেন উন্নয়ন দেখার পাশাপাশি আমাদের ভুলগুলোও ধরিয়ে দিলে সেগুলো শুধরে নিয়ে দেশটিকে সত্যিকারের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলতে চেষ্টা করবো তাহলে কতই না ভালো হতো। কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক সেই অংশটুকু বলা হয়নি। তিনি আরও বলেছেন আমাদের কথা বলার অধিকার আছে। উদাহরণ স্বরুপ টিভিতে টকশোতে কথা বলার প্রসঙ্গ টেনেছিলেন। তিনি বলেছিলেন টিভিতে যে কথা বলা হয় কাউকে কি ধরে নেওয়া হয়েছে? তা ঠিক যে কাউকে ধরে নেওয়া হয়নি। কিন্তু টিভিতে যারা কথা বলে তারা খুবই ভেবেচিন্তে যতটুকু বলা নিরাপদ ততটুকুই বলে। সেখানে সমালোচনা থাকলেও শেষ পযর্ন্ত গুনগানের মাধ্যমেই শেষ হয়। সেই যে বক্সিং প্রতিযোগিতা চলাকালিন খুব মারামারি হলেও পুরস্কার বিতরণীর সময় পরস্পরের সাথে হাত মেলানো হয় অনেকটা তেমন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যাদেরকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলেছিলেন মানে চোখের ডাক্তার দেখাতে বলেছিলেন আমি অবশ্য সেই দলে ছিলাম না কখনো, থাকবো না কখনো। আমি এমন একটি দলে আছি যারা ভালোকে ভালো আর মন্দকে মন্দই বলে জানে। আর তাই আমরা উন্নয়ন যেমন দেখি তেমনি ভুলগুলোও দেখি।

 

 

 

কথা বলার স্বাধীনতা থাকলেও অনেকে যা বলতে চায় তা বলে না। সত্যি  সত্যিই যদি মিথ্যা শনাক্তকরণ মেশিন সেট করে বক্তাদের বক্তব্য পরীক্ষা করা যেত তাহলে নিশ্চই বিস্মিত হতে হতো। সে যাই হোক আজ বলবো ভিন্ন একটি বিষয় নিয়ে। প্রসঙ্গ আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ে। ঢাকা থেকে রাজশাহী,দিনাজপুর,বগুড়া,খুলনা অঞ্চলের ৩০ টি জেলায় যারা যাতায়াত করেন তারা জানেন এটি তাদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। ২০১৭ সালে খুব ঘটা করে ঘোষণা করা হয়েছিল শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত একটি এক্সপ্রেসওয়ে নির্মান করা হবে। তখন বাজেটও ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু সেটা হওয়া তো দূরের কথা কাজও শুরু হয়নি। এখনই বিস্মিত হবেন না বরং আরেকটু কথা শুনে তার পর বিস্মিত হোন। এই প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারন করা হয়েছিল ২০১৭ থেকে জুন ২০২২ পযর্ন্ত। এবার বুঝলেন কী অসাধারণ কাজ হয়েছে যে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে চলেছে কিন্তু কাজই শুরু হয়নি। শুধু তাই নয় নকশাও করা হয়নি! এই পাঁচ বছরে তাহলে প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা কী করেছে?

 

আমি মাঝে মাঝেই এই সব রথিমহারথিদের ধন্যবাদ দিয়ে থাকি। কারণ তাদের কার্যকলাপ আসলেই সোনার অক্ষরে বাঁধিয়ে রাখার মতই। আজ আমি ধন্যবাদ দিতে চাই এই প্রকল্পের পরিচালক মো. শাহাবুদ্দিন খান সাহবকে। প্রকল্পের মূল কাজ শুরু করতে পারেন নি অথচ মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে এ জন্য ধন্যবাদ দিতে চাই না বরং তাকে ধন্যবাদ দিতে চাই এ জন্য যে মূল কাজ শুরুই করতে পারেননি অথচ পাঁচ বছর পার হয়ে গেছে আর এখনি তিনি আবেদন করেছেন আরও চার বছর বাড়ানো হোক। শুধু তাই নয় সেই সাথে আরও ৬৫২ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর আবেদন করেছেন। আসুন এই উপলক্ষ্যে তাকে ধন্যবাদ দিই। নিশ্চই একটি ধন্যবাদ পাওয়ার দাবী তিনি করতেই পারেন। কোনো কাজ ভালো ভাবে সম্পন্ন করতে হলে সময় নিয়ে করাই শ্রেয়। আর এ কারণেই তিনি এই পাঁচ বছরে টিম সহ ভেবেছেন।ভাবতে ভাবতে সময় পার হয়েছে বলেই নকশাও করা হয়নি। এখন ভাবনার অবসান হয়েছে। এখন যেহেতু সব কিছুর দাম বেড়েছে তাই ৬৫২ কোটি টাকা বাড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন। সেই সাথে আরও চার বছর সময় চেয়েছেন। আমার মনে হয় এই প্রকল্প শেষ করার জন্য চার বছর নয় তাকে আরও বেশি সময় দেওয়া উচিত। তিনি আরও ভাবুন এবং আরও সময় নিয়ে করুন। অথচ তিনি যদি সময়মত কাজ করতেন তাহলে এই বিশাল অংকের টাকা অতিরিক্ত খরচের প্রস্তাব করতে হতো না। অবশ্য বিশাল অংক বলছি কেন? আজকাল এই সব পরিমান টাকা নীতিনির্ধারকদের কাছে সামান্যই বলা চলে। কারণ এর আগে একাধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তি হাজার কোটি টাকাকেও সামান্যই বলেছেন।

 

 

 

২০১৭ সালে একনেকের এক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। অথচ প্রকল্পের পুরোটা সময় পেরিয়ে গেলেও মূল কাজ শুরু করতে পারেনি। এর কারণ হিসেবে তারা দেখিয়েছে যে তারা চীনের সাথে চুক্তি করতে পারেনি। এই প্রকল্পে চীন থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার কথা ছিলো। বাড়তি যে পরিমান টাকা দাবী করেছে তা সহ এখন মোট ব্যয় দাড়াচ্ছে ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। যারা পাঁচ বছর ধরেও একটি চুক্তি করতে পারেনি তারাতো শুরুতেই ব্যর্থ। তাদের হাতে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব বহাল রাখা কোনো ভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। কথা শুধু এখানেই শেষ নয়! পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য মো. মামুন-আল-রশীদের ভাষ্যমতে “ প্রকল্পটির মূল নকশাই এতোদিন ঠিক করতে পারেনি। তবে এখন নকশা প্রায় চূড়ান্ত। প্রকল্পটি সংশোধন করা হলে শিঘ্রই কাজ শুরু করতে পারবে”।

 

যে প্রকল্প ৫ বছরে শেষ হওয়ার কথা সেই প্রকল্পের নকশাই করতে পারেনি পাঁচ বছরে এর চেয়ে আশ্চর্যজনক আর কী থাকতে পারে।এটিকে দায়িত্বে অবহেলা বলা ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আব্দুল্লাহপুর-আশুলিয়া-বাইপাইল হয়ে নবীনগর মোড় এবং ইপিজেড হয়ে চন্দ্রা মোড় পযন্র্ত মোট ২৪ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়ে হওয়ার কথা ছিলো।পাশাপাশি ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ র‌্যাম্প হবে এবং উড়াল সড়কের উভয় পাশে চার লেনের ১৪.২৮ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক হবে।

 

প্রথমবার প্রকল্পের প্রস্তাবে ১৬ হাজার ৯০১ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছিল। এখন সেটা হুহু করে বাড়ছে! যাই হোক প্রকল্পের কাজের মধ্যে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল এবং তাদের ভাষ্যমতে ৯০ % জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। বাকি দশভাগ অধিগ্রহণেও নাকি তেমন সমস্যা হবে না। আর হ্যা মূল কাজ শুরু হয়নি,নকশা হয়নি কিন্তু এরই মধ্যে খরচ হয়েছে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। অবশ্য তার মধ্যে জমি অধিগ্রহণেই খরচ হয়েছে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা।

 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমরা জানি এবং দেখেছি বাংলাদেশে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। বড় বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে এবং সেগুলোর অনেকটাই শেষ হয়েছে এবং কিছু কিছু শেষের পথে। এই যেমন পদ্মা সেতু,মেট্রোরেল,পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র,বঙ্গবন্ধু টানেল,বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট সহ আরও অনেক কিছু। আমরা এটা অস্বীকার করি না এবং অস্বীকার করার মত আহাম্মকও নই। কিন্তু আমরা উল্টোপিঠটাও দেখি। প্রতিটি প্রকল্প শেষ করার জন্য যে মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং যে বাজেট ধার্য করা হয়েছিল তা সেই মেয়াদের এবং সেই পরিমান অর্থে হয়নি। আমরা এই জানি প্রতিনিয়ত বিশ্ববাজারে নানাবিধ পণ্যের দাম বাড়ছে তাই ৫ বছর আগে কোনো একটি বাজেট করলে সেই একই পরিমান অর্থে পাঁচ বছর পর কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। খরচ বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তা বলে প্রতিটি প্রজেক্টের জন্য ধার্যকৃত বাজেটের তিনগুনের বেশি কেন ব্যয় হবে এটাই বোধগম্য হয়নি কখনো। কোথায় যায় এতো টাকা? কিভাবে খরচ হয়? আমরা জানি সময়ের কাজ সময়ে না করলে কাজ জমে পাহাড় হয়ে যায়। এই সব প্রকল্প সময়মত করতে পারলে খরচ কমতো যা দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে পারতো। একটি প্রকল্প যত দ্রুততম সময়ে করা যায় খরচ ততো কমে। পাশাপাশি ওই প্রকল্প থেকে রাজস্ব আসতে শুরু করে। ফলে আমাদের নেওয়া ঋণও পরিশোধ করা অপেক্ষাকৃত সহজ হয়। কিন্ত কোনো এক অজ্ঞাত কারণে আশ্চর্যজনক ভাবে দেখি সব প্রকল্পই বাজেটের কয়েকগুন বেশি খরচ করে শেষ করা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের কয়েকগুন সময় নিয়ে শেষ করা হচ্ছে।  এ থেকে আমরা খুব সহজেই কি বলতে পারি যে যারা প্রকল্পের সময় ও বাজেট নির্ধারণ করে থাকেন তাদের হিসেবে ভুল আছে। তারা তাদের সামর্থের বাইরে আন্দাজে একটা সময় নির্ধারণ করেছে এবং আন্দাজে ব্যয় নির্ধারণ করেছে। তারা যদি সত্যি সত্যিই সামর্থবান হতো তবে নির্ধারিত সময়ে নির্ধারিত বাজেটেই কাজ শেষ করতে পারতো।

 

যা হয়ে গেছে তা বাদ। এখন নতুন কোনো প্রকল্প হাতে নিলে সেগুলো কাদের হাতে দেওয়া হচ্ছে তা একটু যাচাই করে দেখা উচিত বলে আমি মনে করি। শুধু তাই নয় তারা যে সময় এবং ব্যয় নির্ধারণ করছে তা কতটা বাস্তবসম্মত সেটাও খতিয়ে দেখা উচিত। এবং এমন একটি নির্দেশনা দেওয়া উচিত যেন নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারলে শাস্তি দেওয়া হবে এবং প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পেলে তাতেও শাস্তি দেওয়া হবে। এমন কিছু না করলে ভবিষ্যতে যত প্রকল্প হাতে নেওয়া হবে সবগুলোতেই নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগবে এবং ব্যয়ও একই ভাবে কয়েকগুন বেড়ে যাবে। আজ যারা আছে কাল তারা থাকবে না কিন্তু ভবিষ্যত প্রজন্মের ঘাড়ে থেকে যাবে ঋণের বোঝা। সেই বোঝা বইতে পারবে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম? আমরা কি তেমন একটি ভবিষ্যত প্রজন্ম গড়ে যেতে পারছি? নাকি যাদের রেখে যাচ্ছি তারাও আমাদেরই মত?

 

জানি না। এসব নিয়ে ভাবতে গেলে মাথা খারাপ হয়ে যায়। এ কারণেই বোধহয় বলা হয়ে থাকে “ আদার ব্যাপারি হয়ে জাহাজের খবর রাখার কী দরকার”

 

 

 

-জাজাফী

আদার ব্যাপারী

৩১ মে ২০২২

অগ্নিকান্ডের কারণ,প্রতিকার এবং কিছু দাবী

আমাদের জীবন আজ আনন্দ বেদনার মহাকাব্য হয়ে গেছে।আমরা প্রতিনিয়ত খুশির সওদা করতে গিয়ে এক সমুদ্র দুঃখ নিয়ে ফিরে আসছি। সেই দুঃখ আজীবন বয়ে বেড়াচ্ছে আমাদের স্বজন। এই যেমন গতকাল বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড এক নিমিষে অসংখ্য মানুষের স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে পরিনত করেছে। আজীবনের জন্য দুঃখের সাগরে ভাসিয়ে দিয়েছে। একটি দুটি নয় ৩৮ এর অধিক মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

রাজধানীসহ সারাদেশেই অগ্নিকান্ডের ঘটনা বাড়লেও বাড়েনি জনসচেতনতা। সরকারের বিভিন্ন সংস্থা যেমন-রাজউক, সিটি করপোরেশন আবাসিক-বাণিজ্যিক ভবনসহ কল-কারখানাগুলোতে যথাযথ অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা নিশ্চিতে সঠিক নজরদারি করতে পারছে না। আর এ কারণে ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ও প্রাণহানি বেড়েই চলছে। ২০২০ সালে সারাদেশে ১৮ হাজার ১০৪টি অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। অগ্নিকান্ডের ঘটনায় দগ্ধ হয়ে মারা গেছে ২ হাজার ১৩৮ জন। আহত হয়েছে ১৪ হাজার ৯৩২ জন।

২০২১ সালে সারা দেশে ২২ হাজার ২২২টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। যা ২০২০ সালের দুর্ঘটনার চেয়ে ১ হাজার ৪৯টি বেশি। এক বছরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা বেড়েছে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশ। গত এক বছরে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মোট ৩৩০ কোটি ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ১৯০ টাকার অধিক ক্ষতি হয়েছে। এসব অগ্নিকাণ্ডের ফলে ২ হাজার ৫৮০ জন নিহত হন। আহত হয় ১১ হাজার ৯৯৯ জন। এই তথ্য আমার মনগড়া নয় বরং ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের সদর দপ্তর থেকে বিভিন্ন সময়ে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে।গত বছরের এপ্রিলে সবচেয়ে বেশি ২ হাজার ৮৬১টি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ঐ সময় ১৫০ জন নিহত হয়। আহত হয় ১ হাজারের বেশি মানুষ। অগ্নিকান্ডের ঘটনা কমিয়ে আনতে ফায়ার সার্ভিসের পক্ষে বিভিন্ন সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে নির্দেশনা দিলেও তা মানছে না। ফলে অগ্নিকান্ডের ঘটনা কমছেই না।

 

দেশের অধিকাংশ অগ্নিকান্ডের ঘটনার সূত্রপাতের পেছনে মানুষের অসচেতনতা, ঘনবসতি, অপরিকল্পিত নগরায়নকে দায়ী করা যেতে পারে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে আমার তাই মনে হয়েছে।

ঢাকায় অগ্নিকান্ডের ঘটনা বেশি, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণও বেশি। ঢাকায় ঘনবসতি ও অলিগলিতে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি প্রবেশ করতে না পারায় ঢাকায় ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। ব্যবসায়িক এলাকা পুরনো ঢাকায় সড়কগুলো একেবারেই সরু। কোনো সড়কেই দুটি গাড়ি পাশ কাটানোর জায়গা নেই। পুরনো ঢাকাসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এখন অগ্নিকান্ডের সময়ে ফায়ার সার্ভিসের পানিবাহী গাড়ি প্রবেশে সমস্যায় পড়ছে। দেশের বহুতল ভবন ও কল-কারখানাসহ বাণিজ্যিক ভবনগুলোর প্রায় ৯০ ভাগেই অগ্নিনির্বাপণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। বেশির ভাগ ভবন পুরনো, তাই বর্তমানে সেগুলোতে প্রয়োজনীয় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা সংযোজন করাও কঠিন। তাছাড়া অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়নের ফলেও আগুনের ঘটনা বাড়ছে।

অগ্নিকান্ডের পেছনে মূল তিনটি কারণ রয়েছে। প্রথমত মানুষের অসচেতনতা, দ্বিতীয়ত ঘনবসতি এবং তৃতীয় অপরিকল্পিত নগরায়ণ। দেখা গেছে, মানুষ অসচেতনভাবে গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে রাখছেন কিংবা বৈদ্যুতিক সংযোগে দুর্বল তার ব্যবহার করায় অগ্নিকান্ডের ঘটছে। যেখানে সেখানে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার না করেই রাসায়নিক কেমিকেল রাখা হচ্ছে যার অধিকাংশই দাহ্য। সেগুলো এক একটি বোমার মত ভয়াবহ বিপর্যয় যেকে আনতে পারে। ছোটদের আগুন নিয়ে খেলা, যন্ত্রাংশের সংঘর্ষ, ত্রুটিপূর্ণ বৈদ্যুতিক সংযোগ ও বৈদ্যুতিক যন্ত্র, সিগারেটের জ্বলন্ত টুকরো, খোলা বাতির ব্যবহার, চুলার আগুন, মিস ফায়ার, চিমনি, রাসায়নিক বিক্রিয়া, বাজি পোড়ানো ইত্যাদি কারণে আগুন লাগে। প্রায় প্রতি মাসে একাধিক আগুন লাগে। বিশালসংখ্যক অগ্নিকাণ্ডের নেপথ্যে শহরে বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট, বৈদ্যুতিক যন্ত্রাংশ (এসি, ফ্রিজ),গ্যাসের চুলাসহ আবাসিক এলাকায় দাহ্যপদার্থ রাখা, কারখানা স্হাপন প্রভৃতি কারণে মূলত অগ্নিকান্ড ঘটে থাকে।

আমার জানা মতে সারা দেশে ৪৫৭টি ফায়ার স্টেশন আছে। নতুন ৪০টি উদ্বোধনের অপেক্ষায়। ঢাকা শহরে ১৪টি ফায়ার স্টেশনের পাশাপাশি মন্ত্রীপাড়াসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় পাঁচটি টহল ডিউটি আছে। প্রশিক্ষিত দক্ষবাহিনী কাজ করছে। আামি কখনোই মনে করি না যে আমাদের ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা দক্ষ নয় বা সাহসী নয়। তারা জীবন বাজী রেখে এগিয়ে আসে। এই যেমন গতদিনের চট্টগ্রামের ভয়াবহ অগ্নিকান্ডে সাত বা তারও অধিক সংখ্যক ফায়ার সার্ভিস কর্মী জীবন দিয়েছেন। কিন্তু সমস্যা হলো আমাদের এই বীরেরা সাহসের কমতি না থাকলেও তাদের কাজের জন্য যে সরঞ্জাম আছে তা যথেষ্ট নয়। এমনকি যেগুলো আছে সেগুলো যুগোপযোগী নয়। আরও আধুনিক যন্ত্রপাতি প্রয়োজন।

 

২০১৬ সালের ২১ আগষ্ট হঠাৎ করে আবারও বসুন্ধরা সিটিতে আগুন লাগে। এ নিয়ে মোট তিনবার আগুন লেগেছে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এই শপিংমলে।সেদিন আমি ওখানেই ছিলাম। কী ভয়াবহ সেই দৃশ্য।

আমরা শপিং করতে যাই খুশি নিয়ে আর ফিরে আসি স্বজন হারানো ব্যাথায় বুক চাপড়াতে চাপড়াতে।এর আগে দুইবার যখন আগুন লেগেছে তখন এই শপিংমলের সংশ্লিষ্টদের আরো সচেতন হওয়া উচিত ছিল।আমার জানতে পেরেছি বিগত দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও তার কোন রিপোর্ট কোথাও জমা পড়েনি।

এরকম একটা স্বনামধন্য শপিংমলে অনাহুত ভাবে অগ্নিকান্ডের ঘটনা তাই জন মনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি করে।ফায়ার সার্ভিসের ২৯টা ইউনিট একাধারে অগ্নিনির্বাপন কাজে নিয়োজিত থেকে ঘন্টার পর ঘন্টা চেষ্টা করে আগুন নিয়ন্ত্রনে আনলেও ততোক্ষণে বেশ কয়েকজন হতাহত হয়েছে।

শুধু বসুন্ধরা সিটির ঘটনাই নয় বরং দেশে প্রতিনিয়ত অসংখ্য অগ্নিকান্ডের ঘটনা আমরা দেখছি।তাজরিন ফ্যাশনের অগ্নিকান্ডের ভয়াবহতা আজও আমাদের রাতের ঘুম কেড়ে নেয়। কিন্তু তার পরও আমাদের মধ্যে সচেতনতার বড়ই অভাব।

কয়েক বছর আগে পুরান ঢাকার নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকান্ডের ঘটনার পর গঠিত তদন্ত কমিটি ১৭ দফা সুপারিশ করেছিল। ওই সুপারিশমালার মধ্যে ছিল জরুরি ভিত্তিতে আবাসিক এলাকা থেকে গুদাম বা কারখানা সরিয়ে নেয়া, অনুমোদনহীন কারখানার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া, রাসায়নিক দ্রব্যের মজুদ, বাজারজাতকরণ এবং বিক্রির জন্য লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে প্রক্রিয়া জোরদার করা, ‘অগ্নি প্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন ২০০৩’ ও ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড অনুযায়ী ভবন নির্মাণ নিশ্চিত করা, আবাসিক এলাকায় রাসায়নিক বা বিস্ফোরক দ্রব্যের মজুদ বা বিপণনের বিরুদ্ধে জনমত গঠন, আবাসিক এলাকায় রাসায়নিক দ্রব্য বা বিস্ফোরক জাতীয় পদার্থ মজুদকরণ বা বিপণন কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা, ঘরবাড়িতে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক তারের গুণগতমান নিশ্চিত করা, রাস্তায় স্থাপিত খোলা তারের ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন, সম্ভাব্য দুর্ঘটনা পরিহার করতে প্রতি মাসে অন্তত একবার বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার সরেজমিনে পরীক্ষা করা, দ্রুত অগ্নিনির্বাপণের জন্য স্থানীয়ভাবে পৃথক পানির লাইনসহ হাইড্রেন্ট পয়েন্ট স্থাপন করা, দুর্ঘটনা মোকাবেলায় জাতীয় পর্যায়ে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়ে জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন, রাসায়নিক ও রাসায়নিক জাতীয় দাহ্য বস্তুর আলাদা দফতরের পরিবর্তে সব দফতরের মধ্যে সমন্বয় সাধন, সময়ের চাহিদা অনুযায়ী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগের অবকাঠামো, জনবল, প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জামের আধুনিকায়ন, জনসচেতনতা বাড়ানো, অগ্নিকান্ডের সময় যেন উৎসুক জনতা উদ্ধার কাজে বিঘ্ন ঘটাতে না পারে সেজন্য আইনৎশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো, পাঠ্যসূচিতে অগ্নিকান্ড, উদ্ধার ও প্রাথমিক চিকিৎসার বিষয়গুলো বাধ্যতামূলক করা, ৬২ হাজার কমিউনিটি স্বেচ্ছাসেবক তৈরির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা, কমিউনিটি সেন্টারগুলো নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার আওতায় আনা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো ডেকোরেটরের উপকরণের সঙ্গে প্রয়োজনীয়সংখ্যক অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র রাখা ইত্যাদি। কিন্তু নিমতলীর ঘটনার ১০ বছর পরও সুপারিশমালাগুলোর অধিকাংশই বাস্তবায়ন করা হয়নি। যতদূর মনে পড়ে ২০১০ সালে নিমতলীতে আগুনে পুড়ে ১২৪ জন মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।

 

একের পর এক দেশের আনাচে কানাচে শপিংমল, শিল্পকারখানায় আগুন লেগে রক্তমাংসের শরীর পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে।এভাবে আর কত দিন? কেন আগুন লাগছে শপিংমল কিংবা শিল্প কারখানায়? কী এর রহস্য? এর থেকে কি কোনই প্রতিকার নেই? কোন ভাবেই কি আগুন লাগা থামানো যায় না? আগুন লাগার কিছু সাম্ভাব্য কারণ আমরা চিহ্নিত করতে পারি।

বৈদ্যুতিক সংযোগ দেয়ার ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময় তাড়াহুড়ো করেই হোক আর খরচ বাঁচাতে গিয়েই হোক নিম্ন মানের বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে সহজেই তা থেকে শর্টসার্কিট হয়ে আগুন লাগছে।

পোষাক শিল্পে আগুন লাগার ক্ষেত্রে বিশেষত যে কারণটি লক্ষ্য করা যেতে পারে তা হলো কর্মরত অধিকাংশ শ্রমিক কর্মচারি ধুমপান করে। যখন বিরতী দেয়া হয় তখন অনেকেই এখানে সেখানে দাঁড়িয়ে ধুমপান করে।

এরপর যখন ঘন্টা বা সাইরেন বাজে কাজে ফিরে যাওয়ার, তখন অনেকেই হাতের সিগারেট বা বিড়ির অবশিষ্টাংশটুকু যত্রতত্র ফেলে দেয়। সেই রেখে যাওয়া সিগারেটের অল্প একটু আগুন ভেতরের তাপে আরো বেশি উত্তপ্ত হয় এবং একসময় ভয়াবহ আগুন হিসেবে সব জ্বালিয়ে দেয়। মশার কয়েল থেকেও অগ্নিকান্ডের সুত্রপাত হতে পারে।

বিগত বছর গুলোতে দেখা গেছে দেশের আনাচে কানাচে শপিংমল সহ শিল্প প্রতিষ্ঠানে বেশ অনেক বার আগুন লেগেছে এবং প্রতিবারই বেশ কিছু মানুষ মারা যাচ্ছে। যার সবচেয়ে ভয়াবহতা দেখেছি তাজরিন ফ্যাশনের অগ্নিকান্ডে। শত শত মানুষ লাশ হয়ে আজীবনের মত হারিয়ে গেছে।

যাদের অনেককেই কেউ চিনতেই পারেনি। কোন কোন মা তার ছেলেকে শেষ বারের জন্যও দেখতে পায়নি। কোন কোন শিশু তার বাবা মাকে শেষ বারের জন্য বাবা-মা বলে ডাকতে পারেনি। গবেষণায় দেখা গেছে আগুন লাগার সাথে সাথে তা চারদিকে ছড়িয়ে পড়েনা।

চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে এবং ভয়াবহ রুপ নিতে যতটুকু সময় লাগে তার অনেক আগেই ভবন থেকে সব মানুষ নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে পারে। তাহলে কেন সেটা হচ্ছেনা? তার কারণ হতে পারে এরকম যে গার্মেন্টস গুলোতে ঘুরে দেখা গেছে প্রায় সবগুলোতেই একটাই মাত্র পবেশপথ এবং সেই প্রবেশ পথটাও খুব বেশি প্রশস্থ নয়। এ ছাড়া সেটা সব সময় বন্ধ রাখা হয়। ফলে আগুন লাগার পর ভয়ে আতংকে সবাই যখন ছোটাছুটি করে গেটের কাছে আসে এবং দেখে গেট বন্ধ তখন তারা দিশাহারা হয়ে পড়ে। সেই হুড়োহুড়িতেই অনেকে চাপা পড়ে আবার অনেকে জ্ঞান হারায়। এর ফলে হতাহতের সংখ্যা বেড়ে যায়।

শপিংমল কিংবা কারখানা গুলোতে অগ্নি নিবার্পক ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে সহজে আগুন নিয়ন্ত্রনে আনা সম্ভব হয়না।

কোনো এক ফ্লোরে আগুন লাগলে সাথে সাথে যদি অটো অ্যালার্মিং সিস্টেম চালু থাকে  তবে অন্য ফ্লোরে অবস্থানরতরা আগেই স্থান ত্যাগ করতে পারে। এ ব্যবস্থার অপ্রতুলতার কারণে অন্তিম মুহুর্তে সবাই বুঝতে পারে আগুন লেগেছে। ফলে তারা দিশা হারা হয়ে পড়ে। হতাহতের সংখ্যাও বাড়ে।  শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে শপিংমল গুলোতেও সব সময় ভবনের ছাদ বন্ধ থাকে। ফলে দুর্ঘটনার পর ছাদ দিয়ে সহজেই কেউ বেরিয়ে আসতে পারেনা । দেশে শপিং মল,আবাসিক হাউজিং কিংবা শিল্প কারখানা নির্মানের পর নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা জোরালো তা নিশ্চিত না হয়েই ব্যবহারের জন্য খুলে দেওয়া হয়। ফলে দুঘর্টনার সময় হতাহতের পরিমান বাড়ে।

কোথাও কোন অবস্থাতেই আগুন লাগুক এটা কারো কাম্য হতে পারেনা। সচেতনতাই পারে এর থেকে আমাদের রক্ষা করতে।

প্রথমত ভবন নির্মানের সময় সচেতন ভাবে মানসম্মত বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে যেন বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিটের আশংকা শুন্যের কোটায় নেমে আসে। একই সাথে বিপদ কালীন দ্রুত বাহির হওয়ার মত বিকল্প ব্যবস্থাও রাখতে হবে। ভবনের ছাদ সবর্দা খোলা রাখতে হবে এবং ভবনের ছাদের থেকে অস্থায়ী প্রস্থান ব্যবস্থা রাখতে হবে। ভবন ব্যবহারের জন্য চালু করার আগেই নিম্চিত হতে হবে যে সেখানে পযার্প্ত অগ্নিনিবার্পক ব্যবস্থা আছে। ফায়ার স্টিংগুইশার বা ফায়ার এলার্ম বা ওয়াটার হোস পযার্প্ত না থাকা পযর্ন্ত ভবন ব্যবহারের জন্য খুলে দেওয়া যাবেনা। ভবনে নিয়োজিত কর্মচারিদের নিয়োগের আগেই ভালভাবে বিপদ কালীন করনীয় বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। কেননা এতে করে সবাই ধীর স্থির ভাবে কিভাবে বিপদ থেকে বাঁচা যায় তা বুঝতে পারবে। এলার্মিং সিস্টেম নাজুক থাকায় এক ফ্লোরে আগুন লাগলে অন্য ফ্লোরের মানুষ তা জানতেই পারেনা। তাই এলার্মিং সিস্টেমের দুর্বলতা দুর করতে হবে যেন আগুন লাগার সাথে সাথে সবাই সেটা বুঝতে পারে। পযাপ্ত সিসিটিভির ব্যবস্থা রাখতে হবে যেন কোথায় কি হচ্ছে তা সহজেই মনিটর করা যায়। এতে করে বিপদের আশংকা কমে যাবে। শপিংমল এবং শিল্প কারখানার জন্য প্রতি ফ্লোরে অন্তত একজন করে মনিটরিং অফিসার নিয়োগ দিতে হবে। তাদের দায়িত্ব প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা ঘুরে ঘুরে শপিংমল বা কারখানার সব কিছু দেখাশোনা করা। কোথাও কোন সমস্যা থাকলে তার সমাধানের ব্যবস্থা নেওয়া। এমনকি প্রতি সপ্তাহে বা মাসে বৈদ্যুতিক ও যান্ত্রিক সব সংযোগ ও অন্যান্য ব্যবস্থা পরীক্ষা করে দেখতে হবে ঠিক আছে কিনা।

চট্টগ্রামের যে ভয়াবহ অগ্নিকান্ড ঘটেছে তার ভয়াবহতা ভাষায় ব্যক্ত করা সম্ভব নয়। ডেইলিস্টারের এক প্রতিবেদনে দেখলাম যে ছেলেটি প্রথম এই ঘটনা ফেসবুক লাইভ করেছিল বিস্ফোরণের সময় সেও হতাহত হয়ে পরে মারা গেছে। এই ভয়াবহতার পিছনে সবচেয়ে প্রধান কারণ ওখানে থাকা দাহ্যপদার্থ। রাসায়নিক পদার্থগুলোর কারণে অগ্নিকান্ডের ভয়াবহতা বেড়েছে। কত হাজার কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হয়েছে তার হিসেব করতে চাই না। কিন্তু কতগুলো জীবন আগুনে পুড়ে শেষ হলো,কতগুলো পরিবার আজীবনের জন্য দুঃখের বোঝা কাঁধে নিলো তার হিসেব রাখা দরকার। পাশাপাশি পত্রিকার সংবাদে দেখেছি মালিকপক্ষ নাকি গা ঢাকা দিয়েছে ফলে এই লেখাটি যখন লিখছি তখন পযর্ন্ত জানা যায়নি ভেতরে কী ধরনের কেমিকেল ছিলো।

চট্টগ্রামের এই ভয়াবহ ঘটনাই শেষ নয়। দেশে আজ আরও একাধিক জায়গায় অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে পত্রিকা থেকে জেনেছি। আজই যেন এই দেশে অগ্নিকান্ডের শেষতম ঘটনাটা ঘটেছে এমন হয়। ভবিষ্যতে আর কোনো অগ্নিকান্ড ঘটুক তা আমরা চাই না। দেশের প্রধান দুটি ভয়াবহতম বিষয়ের একটি হলো অগ্নিকান্ড আরেকটি হলো সড়ক দুর্ঘটনা। সারা দেশে আজও একাধিক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং প্রাণ হারিয়েছে অনেকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বুয়েটের সাবেক শিক্ষার্থী এবং বিজ্ঞানীর মৃত্যু। প্রতিটি মৃত্যুই বেদনার। এ দুঃখ আজীবন বয়ে বেড়ানো যে কতটা কষ্টের তা শুধু তারাই জানে যাদের প্রিয়জন হারিয়েছে।

চট্টগ্রাম সহ সারা দেশে বিভিন্ন সময়ে এই সব দুর্যোগের সময় মানুষ যেভাবে এগিয়ে এসেছে তা সত্যিই প্রশংসনীয়। সেই সব লড়াকু সহযোগিতাপরায়ণ মানুষদের জন্য আমি গোটা দেশের পক্ষ থেকে ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানাই। এভাবেই বেঁচে থাকুক মানবতা।

আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে অগ্নিকান্ডের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করতে, সড়ক দুর্ঘটনার হার কমাতে। আমরা কেউ চাইনা আর কোন ভাই বোন বন্ধু আগুনে পুড়ে বা অন্য কোন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাক। সবাই সচেতন হলেই কেবল আশা করা যাবে যে আর কোনো পুড়ে যাওয়া লাশের ছবি কোনো পত্রিকার পাতায় আমাদের দেখতে হবে না।

-জাজাফী

৫ জুন ২০২২

পরিমার্জিত

২৩ আগষ্ট ২০১৬,দৈনিক ইত্তেফাক।