Home Blog Page 20

পতাকা কেবল মাত্র এক টুকরো কাপড় নয়

 

একটুকরো লাল রঙের কাপড়ের যেমন বলার মত কোন মূল্য নেই তেমনি একটুকরো সবুজ রঙের কাপড়ের ক্ষেত্রেও তাই।আবার ও দুটোকে একসাথে জোড়া লাগানোর পরও খুব বেশি পরিবর্তন হয়না।কিন্তু যখন পরিমাপ করে সবুজ কাপড়ের মাঝে গোল করে লাল একটুকরো কাপড় জোড়া লাগিয়ে দেওয়া হয় তখন?সেটা হয়ে ওঠে অমূল্য।সেটা তখন আমরা বুকে ধরি। সেই কাপড়টি যখন একটা লাঠির মাথায় বেঁধে আকাশে ওড়াই তখন আমরা অপলোক তার দিকে তাকিয়ে থাকি।পতাকা হলো একটি দেশের পরিচয় বহনকারী এবং নিদর্শন স্বরুপ।অবস্থার পরিবর্তনের সাথে সাথে একটা কাপড় কতটা মযার্দাপুর্ন হয়ে ওঠে তার দৃষ্টান্ত এটা।যেমন একটুকরো সাদামাটা কাপড় যখন আল কুরআনের গিলাফ হিসেবে ব্যবহৃত হয় তখন সেই কাপড়ের টুকরোটি হাত থেকে পড়ে গেলে সাবধানে সেটা উঠিয়ে আমরা চুমু খাই।এটা কিন্তু ওই কাপড়ের প্রতি সম্মান দেখানো নয় বরং কাপড়টি যার ছোয়া পেয়ে ধন্য হয়েছে তাকে সম্মান দেখানো।শেখ সাদীর জীবনের একটি ঘটনা আমরা জানি।সাধারণ পোষাকে তিনি যখন একটা দাওয়াতে উপস্থিত হয়েছিলেন তখন তাকে কেউ সম্মান দেখায়নি,চিনতেও পারেনি এবং সেখানে ঢুকতে দেয়নি।পরে যখন তিনি ভাল পোষাক পরে উপস্থিত হলেন তখন তাকে যথাযথ সম্মান দেখানো হলো।বাকি ঘটনাটা আমরা এখানে না বললেও চলবে।আমরা বলতে চাইছি একই ভাবে যখন লাল সবুজের কাপড় সাদামাটা ভাবে জোড়া লাগানো হয় তখন তা ততোটা মযার্দা পায়না যতটা পায় পতাকা হিসেবে।লাল সবুজের ওই পতাকায় মিশে আছে আমাদের ভালবাসা ও শ্রদ্ধা।

কিন্তু আফসোস দিন যতই গড়াচ্ছে ওই পতাকার প্রতি আমাদের ভালবাসা ও শ্রদ্ধা ততোই কমে যাচ্ছে।আপাত দৃষ্টিতে দেখলে মনে হবে আগের তুলনায় পতাকার প্রতি ভালবাসা বেড়েছে কিন্তু ওটার অধিকাংশই মেকি ভালবাসা ও শ্রদ্ধা।

তবে কি আমরাও আমেরিকার মত পতাকাকে একটুকরো কাপড় ভাবতে শুরু করেছি?একটু খেয়াল করলে দেখবেন আমেরিকানরা পতাকাকে আমাদের মত ভালবাসে না শ্রদ্ধাও করে না।তারা পতাকাকে অন্য আর একটুকরো কাপড়ের মতই মনে করে।তাই তারা পতাকা দিয়ে অর্ন্তবাস তৈরি করে,পতাকা দিয়ে তারা বিকিনি তৈরি করে।তার পর সেটা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে।এই ঢাকা শহরের দোকানেও আমেরিকান পতাকার অর্ন্তবাস কিনতে পাওয়া যায়।

আমরা অনেক রক্তের বিনিময়ে লাল সবুজের এই পতাকাটি পেয়েছি তাই পতাকার প্রতি আমাদের যে ভালবাসা আছে তা পৃথিবীর আর কারো থাকার কথাও নয়।কিন্তু দিন দিন নানা ভাবে আধুনিকতার নামে আমরা পতাকাকে তুচ্ছজ্ঞান করছি।জেনে কিংবা না জেনে পতাকার মযার্দা ক্ষুন্ন করছি।জাতীয় দিবসে আমরা ভালবেসে পতাকা ওড়াই।কিন্তু একদিন পরই দেখি সেই পতাকা ধুলোয় গড়াগড়ি খাচ্ছে।অনেক সময় দেখি পতাকা একবার আকাশে ওড়ানোর পর তা আর নামানো হচ্ছেনা।পতাকা বাতাসে,ঝড় বৃষ্টিতে একদিন ছিড়ে নষ্ট হচ্ছে।

ভয়াবহ ব্যাপার হচ্ছে দশ টাকা দিয়ে যে হাতে ধরা পতাকা আমরা কিনছি তা অনুষ্ঠান শেষে কিংবা পরেরদিনই রাস্তায় লুটোপুটি খাচ্ছে।আমরা গত কাল যে পতাকাকে বুকে ধরেছিলাম পরদিন সেটিই আমাদের গাড়ির চাকার নিচেয়,নিজেদের পায়ের নিচেয় পিষ্ট হচ্ছে।শুধুকি এক টুকরো পতাকাকে পা দিয়ে দলিত করছি?পক্ষান্তরে এটাকি দেশটাকেও পদদলিত করা নয়? জাতীয় পতাকার প্রতি অবহেলা,অনাদরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নির্মিত একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘লাল সবুজের পতাকা’। যেখানে ফুটে উঠেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় দিবসে জাতীয় পতাকার প্রতি মানুষের অতিরিক্ত আগ্রহ এবং ভালোবাসার যে চিত্রটি দৃশ্যমান, তার বিপরীতে জাতীয় দিবসের বাইরে, অন্যান্য সাধারণ সাদামাটা দিনে সেই একই জাতীয় পতাকার প্রতি মানুষের আগ্রহের যেমন অভাব, তেমনি রয়েছে এক ধরনের অবহেলা ও অজ্ঞতা।

কাগজে লাল সবুজের পতাকা ছাপানো হচ্ছে এবং সেটা জাতীয় দিবসে সুতোয় বেধে রাস্তায় ঝোলানো হচ্ছে নিবার্চনী পোষ্টারের মত। সেটাও রোদ,বৃষ্টি,ঝড়ে নষ্ট হচ্ছে।আমেরিকানদের বিকিনিতে পতাকা ব্যবহার করার মত পযার্য়ে যেতে কি বেশি সময় লাগবে?

লাল সবুজের পতাকা আমাদের অহংকার।এটি পাওয়ার জন্য আমাদের পুবর্পুরুষেরা যে আত্মত্যাগ স্বীকার করেছে তা আমাদের মনে রাখতে হবে।পতাকাকে শুধু মাত্র একটুকরো কাপড় ভাবলে চলবেনা।

হরহামেশা দেখছি গাড়িতে ইচ্ছেমত পতাকা ঝোলানো হচ্ছে।নিজ দেশের পতাকা ব্যবহার করার অধিকার প্রত্যেকেই রাখে তবে সেটার একটা নীতিমালা থাকা উচিত। ব্যক্তিপযার্য়ে জাতীয় পতাকা ব্যবহারের কোন বিধান আছে কিনা আমার জানা নেই।যদি থাকে তবে সেটিকে কাযর্কর করতে হবে।সবাইকে জানাতে হবে।আর যদি না থাকে তবে এখনি সময় জাতীয় পতাকা ব্যবহারের ক্ষেত্রে নীতিমালা প্রণয়নের।তা না হলে একদিন আমাদের দুঃখের সীমা থাকবেনা যেদিন আমেরিকানদের মত হয়ে যাবে।

অন্য দেশ ও জাতি তাদের পতাকাকে সম্মান দেখাক বা না দেখাক তাতে আমাদের কিছু যায় আসেনা কিন্তু লাল সবুজের পতাকা তুচ্ছ কোন একটুকরো কাপড় নয়।সেটার প্রতি যথাযথ সম্মান দেখাতে হবে।নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পতাকা নামাতে হবে।

অনেক রক্ত,প্রাণ আর সম্ভ্রমের বিনীময়ে অর্জিত পতাকার সম্মান বজায় রাখা প্রতিটি বাঙ্গালীর কর্তব্য।পতাকার প্রতি অসম্মান দেখানো মানে দেশকেই অপমান করা।নিজের মাকে অপমান করা।অবশ্য অনেক অভাগাই আছেন যারা নিজ মাকে বৃদ্ধাশ্রমে ফেলে আসেন।তাদের কাছে পতাকাও একটা ফেলনা কাপড় ছাড়া কিছুনা। আর সে জন্যই নীতিমালা করে এটার অসম্মান যেন না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে।মনে রাখতে হবে পতাকা কেবল মাত্র এক টুকরো কাপড় নয়।

১৯ ডিসেম্বর ২০১৬

 

সৈয়দ শামসুল হকঃ পরাণের গহীন ভেতরে যার বসবাস।

বাংলা সাহিত্যের আকাশে অসংখ্য ক্ষণজন্মা সাহিত্যিকদের মাঝে একটি অনন্য নাম সৈয়দ শামসুল হক।১৯৬৬ সালে দেশ যখন আন্দোলনে টালমাটাল,বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে বছর ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবী উপস্থাপন করলেন ঠিক একই বছর বাংলাএকাডেমী সাহিত্য পুরস্কারে ভুষিত হলেন এক উদীয়মান তরুণ।মাত্র ২৯ বছর বয়সে বাংলা একাডেমীর ইতিহাসের সবর্কনিষ্ঠ পদক বিজয়ী সাহিত্যিক হলেন আমাদের সবর্জন শ্রদ্ধেয় সৈয়দ শামসুল হক,সব্যসাচী লেখক।বাংলা সাহিত্যে তিনি যে দৃপ্তপদে হেটেছিলেন তা অক্ষুন্ন ছিল জীবনের শেষ দিন পযর্ন্ত।তার চেয়ে কম বয়সে এখনো কেউ বাংলাএকাডেমী পদক লাভ করতে পারেনি।তিনি একাধারে কবি,ঔপন্যাসিক,নাট্যকার,কথাসাহিত্যিক হিসেবে সমান খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। বাঙ্গালী মধ্যবিত্ত সমাজের আবেগ অনুভূতি বিকার স বই খুব সহজ ভাষায় সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন তিনি। আট ভাই বোনের উৎসবমুখর পরিবারের বড় সন্তান ছিলেন সৈয়দ হক।১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা কুড়িগ্রামে এক সৈয়দ পরিবারে তার জন্ম হয়েছিল।সেদিন সৈয়দ সিদ্দিক হুসাইন ও হালিমা খাতুনের ঘর আলো করে যে শিশুটির জন্ম হয়েছিল দিনে দিনে তিনি আলোয় ভরে দিয়েছেন বাংলাসাহিত্যকে।তাই তিনি কুড়িগ্রামের সৈয়দ পরিবারের উর্ধে গিয়ে বাংলাসাহিত্য পরিবারের এক খ্যাতিমান সাহিত্যিক হিসেবে সাহিত্যাকাশে সমাসীন হয়েছেন।

সব্যসাচী এই লেখকের সাহিত্যিক জীবন শুরু হয়েছিল গল্প লিখে।যতদুর জানা যায় ১৯৫১ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে ফজলে লোহানী সম্পাদিত “অগত্যা” নামে একটি সাময়ীকীতে তার প্রথম লেখা গল্প “উদয়াস্ত” প্রকাশিত হয়েছিল। তবে তারও আগে কবির যখন বয়স মাত্র বার বছর তখন তিনি আনমনেই কবিতা লিখতেন।কবির সহধর্মীনী কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হকের ভাষ্য মতে কবি একবার টায়ফয়েডে সয্যাশায়ী ছিলেন তখন লিখেছিলেন

  “আমার ঘরে জানালার পাশে গাছ রহিয়াছে/

     তাহার উপরে দুটি লাল পাখি বসিয়া আছে” ।

সেই থেকে ক্রমে ক্রমে সাহিত্যের নানা শাখায় তার দৃপ্ত পদচারণা।তার স্কুল জীবন কেটেছে জন্মভূমি কুড়িগ্রামের মাইনর স্কুলে তার পর।যে বছর তার লেখা গল্প প্রথম প্রকাশিত হলো সেই একই বছর সেই বয়সেই তিনি মুম্বাই গিয়ে একটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা সংস্থায় কিছুদিন কাজও করেন।ফলে এক সময় আমরা দেখতে পাই চলচ্চিত্র তথা চিত্রনাট্য রচনাতেও তিনি হয়ে ওঠেন সমান পারদর্শী।ম্যাট্টিক পরীক্ষার পর তিনি তার খাতায় প্রায় ২০০টির অধিক কবিতা লিখেছিলেন।

হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক বাবা সৈয়দ সিদ্দিক হুসাইন চেয়েছিলেন তার বড় ছেলেটি বড় হয়ে ডাক্তার হবে।তার মত হোমিওপ্যাথি ডাক্তার নয় বরং দেশজোড়া খ্যাতি হবে এমন বড় ডাক্তার।কিন্তু বাবার সেই স্বপ্ন তাকে কখনো আপ্লুত করতে পারেনি।তিনি ডাক্তার হবনা হবনা পণ করে বাড়ি থেকেই পালিয়ে বম্বে চলে গেলেন।যদি বাবার স্বপ্ন পুরনে ব্রতী হতেন তবে বাংলা সাহিত্য হয়তো সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হককে পেতো না।ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন যথেষ্ট মেধাবী।১৯৫২ সালে মুম্বাই থেকে ফিরে নিজের ইচ্ছায় ঢাকার জগন্নাথ কলেজে মানবিক বিভাগে ভর্তি হলেন।সাহিত্য তাকে কিশোর বয়সেই খুব টেনেছিল বলেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।এর পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগে ভর্তি হলেও শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারেন নি। তার প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস “দেয়ালের দেশ” যখন প্রকাশিত হল তখন তিনি তৃতীয় বর্ষের ছাত্র।সেই অবস্থায় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মায়া কাটিয়ে বেরিয়ে এলেন।

সৈয়দ শামসুল হক তার রচনায় সমসাময়িক বাংলাদেশকে তুলে ধরতে চেয়েছেন। আগের বড় লেখকেরা সকলেই গ্রামকেন্দ্রিক উপন্যাস বা গল্প লিখেছেন। সৈয়দ শামসুল হক নতুন উদীয়মান মধ্যবিত্তের কথা ভালো করে বললেন এবং মধ্যবিত্ত জীবনের বিকারকেও তিনি ধরলেন।দীর্ঘজীবনে তিনি অনেক উপন্যাস লিখেছেন। তার অনুজ এবং তরুণ লেখকেরা প্রভাবিত হয়েছেন তার লেখায়। তাদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘হক ভাই’ নামে।

সৈয়দ শামসুল হকেরা যুগে যুগে একবারই জন্মে। বাংলা সাহিত্যে তিনি যা দিয়েছেন তা তাকে চিরস্মরনীয় করে রাখবে। বিশ্বের অন্যান্য সাহিত্যে সাহিত্যের কলাকৌশল নিয়ে অগণিত বই আছে।আমেরিকার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন লেখক কবি তৈরির কোর্সও করানো হয়।প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অগণিত তরুন কবি সাহিত্যিক সেই সব কোর্সে ভর্তি হয়ে সাহিত্যের নানাবিধ কলাকৌশল আয়ত্ব করে সাহ্যিত রচনা শুরু করে।আমাদের দেশের তরুন কবি সাহিত্যিকদের সেই ভাগ্য হয়নি আমেরিকার মত দেশে গিয়ে দীক্ষা নিয়ে আসবে।কিন্তু সৃষ্টিকর্তা এদেশের অগণিত নবীন কবি সাহিত্যিকদের জন্য মহীরুহ করে পাঠিয়েছিলেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক কে। তিনিই বাংলা সাহিত্যের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে নবীন কবি ও সাহিত্যিকদের জন্য ধারাবাহিক ভাবে সাহিত্যের নানাবিধ কলাকৌশল নিয়ে লিখতে শুরু করলেন। তার রচিত সেই কলাম “মার্জিনে মন্তব্য” শিরোনামে বই আকারে গ্রন্থগত হয়েছে।

বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় লেখক  আনিসুল হক নিজেও সৈয়দ হকে মুগ্ধ ছিলেন, সৈয়দ শামসুল হকের প্রবন্ধ, উপন্যাস তাকেও অনেক বেশি প্রভাবিত করেছে বলে তিনি স্বীকার করেন। তিনি কেবল একজন সাহিত্যিকই ছিলেন না বরং সব কিছু ছাপিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন কবি সাহিত্যিকদের কাছে “হক ভাই”। সৈয়দ শামসুল হক কবি হিসেবেও পরবর্তী প্রজন্মের কবিদের জন্য পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছেন।

সৈয়দ হক ছিলেন অমায়িক।তার জন্মদিনে যখন কেউ তাকে মুঠোফোনে ম্যাসেজ দিত তিনি শত ব্যস্ততার মাঝেও প্রতিউত্তর দিতে ভুল করতেন না।এমনকি তিনি দেশের বাইরে থাকলে তার মুঠোফোনে তারই রেকর্ডকৃত কন্ঠ শোনা যেত,যেখানে বলা হত তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।খুব জরুরী হলে তার আর্ন্তজাতিক নাম্বারে ফোন করতে। তার বিনয় প্রকাশ পেয়েছে তার কবিতাতে।

কবি তার “এপিটাফ” কবিতায় লিখেছেন

“মি কে তা নাইবা জানলে।

আমাকে মনে রাখবার দরকার কি আছে?

আমাকে মনে রাখবার?

বরং মনে রেখো নকল দাঁতের পাটি,

সন্ধ্যার চলচ্চিত্র আর জন্মহর জেলি।

আমি এসেছি, দেখেছি, কিন্তু জয় করতে পারিনি”।

কবি বলেছেন তিনি জয় করতে পারেন নি।কিন্তু তার অগণিত পাঠক মনে করেন সৈয়দ হক তার লেখা দিয়ে তার সাহিত্য কর্ম দিয়ে সবার হৃদয়ের মণিকোঠায় ঠাই করে নিয়েছেন।১৯৭০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থ, বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা। আধুনিক সময়ে কোন কবির এত দীর্ঘ কবিতা বেশ বিরল। তার এই কাব্যগ্রন্থের কারণে তিনি তখন আদমজী পুরস্কার লাভ করেন।

তার আরেক বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘পরানের গহীন ভিতর’ দিয়ে তিনি তাঁর কবিতায় আঞ্চলিক ভাষাকে উপস্থাপন করেছেন।আঞ্চলিক ভাষায় কবিতা লেখা যায় কিংবা সেটা জনপ্রিয়তা পায় তার প্রমান রেখে গেছেন সৈয়দ হক। আবৃত্তিশিল্পীদের কাছে আবৃত্তির জন্য কবিতার তালিকা চাইলে দেখা যায় অবধারিত ভাবেই তার পরাণের গহীন ভিতর অবশ্যই তালিকাতে আছে।

কবিতায় তার ধারাবাহিকভাবে যে অবদান তা বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। সৈয়দ হককে অনুসরণ করে পরবর্তী কবিরা বা তার পরবর্তী কালের কবিরা আঞ্চলিক ভাষায় কবিতা লেখার চেষ্টা করেছেন। তার ‘খেলারাম খেলে যা’ অনুকরণ করে আমাদের কথাসাহিত্যিকেরা লিখেছেন। বাংলা সাহিত্যে সৈয়দ হকের অবদানকে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই।সৈয়দ শামসুল হকের কর্ম জীবনও ছিল বৈচিত্রময়। তার কর্মজীবনের প্রায় সাত বছর তিনি কাটিয়েছেন লন্ডনে বিবিসি বাংলা বিভাগের সাথে। ১৯৭১ সালে দেশ যখন স্বাধীনতার মুলমন্ত্রে ঐক্যবদ্ধ হয়ে হানাদার বাহিনীকে রুখে দিচ্ছে তখন তিনি বিবিসি বাংলা থেকে সেই সংবাদ বিশ্বকে জানিয়েছেন অকুন্ঠচিত্তে।

নাট্যকার হিসেবেও সৈয়দ শামসুল হক ছিলেন দারুণ সফল। বিশেষ করে তাঁর রচিত দুটি কাব্যনাট্য ‘নুরলদিনের সারাজীবন’ এবং ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ বাংলা নাটকে একটি বিশেষ স্থান দখল করে রয়েছে। তার যে শব্দের ব্যবহার, রূপকল্প, কাব্যময়তা এবং তার সঙ্গে সঙ্গে নাটকের যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত এই সমস্ত কিছু তিনি যেভাবে ধারণ করেছেন বাংলা নাটকে এই ঘটনা আর কেউ ঘটাতে পেরেছে বলে মনে করেন না অগণিত বোদ্ধা সমালোচক ও পাঠক এমনকি তার রচিত নাটকের অনেক অভিনেতাও তাই মনে করেন। শিল্পক্ষেত্রে সৈয়দ শামসুল হকের অবদান শুধু নাটকেই সীমাবদ্ধ নয়, তিনি চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লিখেছেন, এমনকি চলচ্চিত্রের জন্য গানও রচনা করেছেন। পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। তাঁর রচিত ‘হায়রে মানুষ, রঙ্গিন ফানুস’ গানটি এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে।বাংলা সাহিত্যিকদের মধ্যে সাহিত্যের নানাবিধ খুটিনাটি নিয়ে প্রথম লেখা লিখেছেন সৈয়দ হক। সৈয়দ শামসুল হক ভাষার ব্যবহার নিয়ে লিখেছেন ‘হৃৎকলমের টানে’ বা ‘কথা সামান্যই’ এগুলো  বাংলা সাহিত্যানুরাগীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তিনি একইসঙ্গে একজন সৃষ্টিশীল লেখক এবং ভাষার ব্যবহারে ছিলেন অত্যন্ত সচেতন।

যুগে যুগে অনেক কবি সাহিত্যিক সীমানার ওপারে চলে গেছে।চলে যাওয়ার কিছুদিন বাদেই তারা মানুষের মন থেকেও মুছে গেছে।কিন্তু সৈয়দ হক সেই মানের লেখক ও কবি ছিলেন যাদের দেহান্তর হলেও মানুষের মনে তারা দীর্ঘস্থায়ী আসন তৈরি করে রেখে গেছেন। যে লেখক শিল্প সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতে সমান পারদর্শিতা দেখিয়েছেন তাকে বাংলা সাহিত্যপ্রেমীরা ভুলে যেতে পারবেনা। বলা যেতে পারে তিনি যদি সারা জীবনে মাত্র দুটো বই লিখতেন “পরাণের গহীন ভেতর” কিংবা “বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা” তাহলেও তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকতেন। তার রচিত কাব্যনাট্য “নুরুলদিনের সারাজীবন” কিংবা “পায়েল আওয়াজ পাওয়া যায়” তাকে বাংলা সাহিত্যের আকাশে স্থায়ী আসন করে দিয়েছে। তিনি ছিলেন সেই তারা যে ডুবে যেতে যেতেও আলো দিয়ে যায়। দীর্ঘদিন অসুস্থ অবস্থায় তিনি যখন দেশের বাইরে উন্নত চিকিৎসা নিচ্ছিলেন তখন জানতে পেরেছিলেন তার অবস্থার খুব বেশি উন্নতি হবেনা।তখন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন দেশের মাটিতে ফিরে যাবেন।পরাণের গহীণ ভেতর দেশের জন্য দেশের মাটিও মানুষের জন্য তার ছিল টান।তিনি হাসপাতালের বেডে বসে জীবনের শেষ দিন পযর্ন্ত  অবিরাম লিখে গেছেন।বাংলা সাহিত্যকে করে গেছেন সমৃদ্ধ।

তার কবিতায় ছিল প্রেম ছিল ছিল ভাষার প্রতি মমতা।তাইতো তিনি আঞ্চলিক ভাষা তুলে এনেছেন তার অগণিত কবিতায়। তিনি লিখেছেন

“কি আছে তোমার দ্যাশে? নদী আছে? আছে নাকি ঘর?

ঘরের ভিতরে আছে পরানের নিকটে যে থাকে?”

অগণিত ভক্তকুলের পরানের নিকটে তিনি আছেন এবং চিরকাল থাকবেন।শুধু আক্ষেপ এই যে আর কোন দিন বাংলাএকাডেমীর সবুজ চত্বরে তার পদধুলী পড়বেনা। আর কোন দিন সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে বসা একুশে বই মেলাতে তাকে পায়চারি করতে দেখা যাবেনা।নজরুল মঞ্চে আর কোন দিন নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচনে দেখা যাবেন আলোর সারথীকে।সৈয়দ শামসুল হকের কলম এখন থেমে গেছে, কিন্তু তিনি যে ভবিষ্যৎ লেখকদের-কবিদের-নাট্যকারদের অনুপ্রাণিত করবেন, পথ দেখাবেন তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। তার রচিত “নিষিদ্ধ লোবান” উপন্যাসটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছিল ১৯৯০ সালে। পরবর্তীতে সেটা নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে এবং দর্শকপ্রিয় হয়েছে। তিনি মৌলিক রচনার পাশাপাশি অনুবাদেও সিদ্ধহস্ত ছিলেন। ম্যাকবেথ,টেম্পেষ্ট,শ্রাবণ রাজা তার উল্লেখযোগ্য অনুবাদ কর্ম।

বাংলা সাহিত্যের এই ক্ষণজন্মা সৈব্যসাচী লেখক তার অগণিত সাহিত্য কর্মের স্বীকৃতি স্বরুপ দেশের প্রায় সব বড় পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ১৯৬৬ সালে সবর্কনিষ্ঠ সাহিত্যিক হিসেবে তিনি পেয়েছিলেন বাংলা একাডেমী পুরস্কার। সেই পথচলায় আরো যোগ হয়েছে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার(১৯৬৯),অলক্ত স্বর্ণপদক(১৯৮২),আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৩),নাসিরুদ্দীন স্বর্ণপদক (১৯৯০) এবং ১৯৮৪ সালে দেশের সবর্চ্চো সম্মান একুশে পদকে ভুষিত হয়েছেন এই খ্যাতিমান সাহিত্যিক।একই সাথে তিনি চিত্রনাট্য,সংলাপ ও গীতিকার হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভুষিত হয়েছেন।এছাড়াও তার প্রাপ্তির খাতায় আরো অগণিত পুরস্কার রয়েছে। প্রতি বছর ২৭ সেপ্টম্বর এলে আমাদের হৃদয় তার শুন্যতায় হাহাকার করে উঠবে।তিনি আমাদের মাঝে না থেকেও থাকবেন অনন্তকাল।যতদিন বাংলা সাহিত্য থাকবে ততোদিন তার পায়ের পাওয়াজ পাওয়া যাবে। তিনিইতো দেখিয়েছেন নুরুলদীনের সারাজীবন।তিনি আছেন পরাণের গহীন ভেতর।

২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬

 

হাসপাতালে সুবিধার তুলনায় বর্ধিত ফি কেন?

 

আমাদের দেশ ক্রমাগত ভাবে উন্নত হচ্ছে।জীবন যাত্রার মান বাড়ছে সেই সাথে বাড়ছে নিত্যদিনের খরচ।সেই তুলনায় বাড়ছেনা আমাদের মত নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের উপার্জন।মূল্যবৃদ্ধির দিক দিয়ে সব থেকে এগিয়ে আছে হাসপাতাল গুলো।সেবার মান বাড়ুক বা না বাড়ুক তারা ঠিকই রোগী থেকে উচ্চ মূল্যে চার্জ আদায় করছে।স্কয়ার,এপোলোর মত বড় হাসপাতালগুলোর কথা বাদই দিলাম আসুন আমরা সাধারন মানের হাসপাতালগুলোর দিকে তাকাই।যেখানে দেখতে পাই এক একটি কেবিন ভাড়া তারা চার হাজার থেকে আট হাজার টাকা আদায় করছে।

যদি গড়পরতায় চার হাজার টাকা হিসেবে ধরি তাহলে মাসে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা চার্জ হচ্ছে শুধু মাত্র একটি দেড়শো থেকে দুইশো স্কয়ারফিটের রুমের জন্য।মনে করি ওই রুমে সারা মাসের ত্রিশদিনই রোগী থাকছেনা।সে ক্ষেত্রে আমরা আনুমানিক দশদিন রোগী থাকবে বলে ধরে নিলে দেখা যাবে ভাড়া আদায় হচ্ছে ৪০ হাজার টাকা।কী আছে ওই রুমে,ওই কেবিনে? যেখানে প্রতিদিনের জন্য ৪ হাজার বা তার বেশি টাকা ভাড়া আদায় করা হবে?একটা ফ্রিজ আছে।সারা দিন ফ্রিজ চললে কতটুকু বিদ্যুত খরচ হয় তা আমাদের কম বেশি সবার জানা।একটা ফ্রিজের দাম কত তাও আমাদের অজানা নয়।রুমে একটা টিভি আছে সেই টিভির দাম এবং সারা দিন টিভি চালালে বিদ্যুৎ কি পরিমান খরচ হয় তাও আমাদের অজানা নয়।আর আছে একটা এসি।সেই এসি সম্পর্কেও আমাদের ধারনা কম নয়।সব মিলিয়ে কোন ভাবেই রুমের ভাড়া প্রতিদিন ৪ হাজার টাকা হতে পারেনা।৮ হাজার টাকার হিসাব বাদই রাখলাম।

এই ঢাকা শহরের সব থেকে অভিজাত এলাকায় বিলাশবহুল অ্যাপার্টমেন্ট ভাড়া পাওয়া যায় ৮০ হাজার টাকা থেকে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকায়।যে অ্যাপার্টমেন্টে থাকে কম পক্ষে চার থেকে ছয়টি বেড রুম, চারটি বাথ রুম দুইটি বারান্দা,ড্রয়িং,ডায়নিং আরো অনেক কিছু।সব কিছু বাদ দিয়ে যদি আমরা শুধু বেড রুম ধরে হিসাব করি তাহলে দেখতে পাই চার রুম হিসেবে প্রতি রুমের ভাড়া আসে মাসে ৩০ হাজার টাকা বা তার কিছু বেশি।তার মানে প্রতিদিনের হিসাবে মাত্র ১০০০ টাকা।পাশাপাশি বাকি সুবিধার কথা বাদই দিলাম।সেই অ্যপার্টমেন্টে সারা বছর এসি চলে,গিজার চলে, টিভি ফ্রিজতো চলেই।দেখা যাচ্ছে সব ফ্যাসিলিটি থাকার পরও রুম প্রতি খরচ ২০০০ টাকার অধিক হয়না।তা ছাড়া সেই রুম গুলোও হাসপাতালের নাম মাত্র কেবিনের মত কবুতরের বাসা নয়।

একটা সাধারণ মানের হাসপাতালে দেড়শো স্কয়ারফিট বা তার কিছু বেশি বড় একটা কেবিনের ভাড়া তাহলে কি করে ৪০০০ টাকা থেকে ৮০০০ টাকা হতে পারে তা আমাদের বোধগম্য নয়।এমনকি নন এসি হলেও সেই সব রুমের ভাড়া ১০০০ থেকে ১৮০০ টাকা বা তার কিছু বেশি।এখন আমরা যদি একটু ভাল করে দেখি তাহলে এসি এবং নন এসির ভাড়ার তারতম্য দেখতে পাই প্রায় দ্বিগুন।নন এসি রুমে শুধু মাত্র এসি এবং ফ্রিজ নেই।একটা এসি এবং একটা ফ্রিজের জন্য দিনে ২০০০ বা তার বেশি টাকা চার্জ করা হয় কি করে তাও আমাদের ক্ষুদ্র মস্তিস্কে ধরেনা।যদি বলা হয় সব কিছুর সাথে আয়া বুয়া,প্রতিদিনের ডাক্তারের ভিজিট সব কিছুর চার্জ সহ ওই পরিমান ভাড়া আসে তাহলেও সেটা অতিরিক্তই মনে হয়।ডাক্তার দিনে একবার ভিজিট করলে তার চার্জ যদি আমরা ৫০০ টাকা ধরি আর নার্সের জন্য ৩০০ টাকা ধরি তাহলে মোট ৮০০ টাকা হয়।পাশাপাশি আয়া বুয়ার চার্জ কত সেটা প্রত্যেকেই জানি।সেটা ধরলেও দেখা যাচ্ছে ১০০০ এর বেশি চার্জ হচ্ছেনা।কিন্তু সেটা কোন ভাবেই ৪০০০ টাকা হতে পারে না।

আমরা ওই সব কেবিনে মাসে দশদিন রোগি থাকবে বলে ধরেছি।কিন্তু দেখা যায় প্রায় পচিশ দিনই কেবিন গুলো পরিপুর্ন থাকে।তাহলে এক রুমের ভাড়া আদায় হচ্ছে আড়াই লাখের বেশি।যেখানে এই শহরের সব থেকে বিলাশবহুল ডুপ্লেক্সের ভাড়াই আড়াই লাখ টাকা নয় সেখানে একটা রুম থেকে সাধারণ মানের একটা হাসপাতাল ভাড়া আদায় করছে আড়াই লাখ বা তারও বেশি টাকা।স্বাস্থ্যমন্ত্রনালয় কিংবা সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এগুলোর দিকে কোন দিন নজর দিয়েছে কিনা আমাদের জানা নেই।

এই দিক গুলোতে নজর দেওয়া সংশ্লিষ্ট সবার দায়িত্ব।আমাদের কারো এতো বেশি টাকা নেই যে ওই পরিমান ভাড়া দিতে আমাদের গায়ে লাগবেনা।এ গুলো যে অনিয়ম এবং অতিরিক্ত আদায় হচ্ছে তা আমাদের মত ক্ষুদ্রজ্ঞান সম্পন্নরাও বুঝতে পারে কিন্তু যাদের বুঝার কথা তারাই বুঝতে চায়না। একটা ছোট্ট কেবিনে দু্ইটি সাধারণ সিট এবং সাধারণ সুবিধার বিনিময়ে এতো গুলো টাকা চার্জ করা কোন ভাবেই যুক্তিযুক্ত বলে মনে করিনা।

এবার আসি ডাক্তারদের বিষয়ে।সেবার ব্রত নিয়ে আমরা চিকিৎসা বিদ্যা পড়তে শুরু করি কিন্তু দিন যায় আর আমাদের চিন্তা চেতনার পরিবর্তন হতে থাকে।ডাক্তার মাত্রই রোগীর এক আস্থার স্থান।টাকার বিনিময়ে হলেও সে ঠিকই সেবা দিয়ে যাচ্ছে।কিন্তু টাকার পরিমানটার দিকে তাকালে সেটি আৎকে ওঠার মত অবস্থা হয়।অধিকাংশ হাসপাতালে একটা শিশুর জন্মের সময় সিজারের জন্য শুধু মাত্র ডাক্তারের ফি দিতে হচ্ছে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা।একজন ডাক্তার তার পড়াশোনার জন্য অনেক শ্রম দিয়েছেন, তার চেয়ে বেশি তিনি অর্থ খরচ করেছেন।কিন্তু সেই অর্থ ওঠানোর জন্য সিজারের সময় এতো টাকা চার্জ নেওয়াকে আমরা যুক্তিযুক্ত মনে করিনা।সে যদি পাঁচ হাজারের পরিবর্তে তিন হাজার টাকা চার্জ করতো তাহলে নিশ্চই তার খুব বড় কোন ক্ষতি হতনা। উপরন্ত রোগী এবং তার পরিবারের জন্য সেটা বড় ধরনের উপকার হতো বলেই মনে করি।সিজারের সময় ওষুধ থেকে শুরু করে যাবতীয় প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি রোগি কর্তৃক সর্বরাহ করা হয়ে থাকে।এমনকি রোগি ওটিতে নেওয়ার আগে বন্ডে সাইন করা হয় যে রোগির যে কোন ক্ষতি হলে ডাক্তার দায়ী থাকবে না।এখন দেখা যাচ্ছে ডাক্তার শুধু মাত্র রোগির শরীর কেটে শিশুটিকে সুন্দর ভাবে বের করে আনছে এবং আনুষাঙ্গিক কাজ করছে।সময় লাগছে সর্ব সাকুল্যে আধা ঘন্টা।এই আধাঘন্টার জন্য তাকে চার্জ হিসেবে দিতে হচ্ছে নুন্যতম ৫ হাজার টাকা।যেহেতু ওটিতে একাধিক ডাক্তার থাকেন তাই সব মিলিয়ে চার্জ ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার কাছা কাছি চলে আসছে।অথচ তারা একটু সদয় হলেই এই চার্জ কমিয়ে আনতে পারতো।আমাদের দেশে সেবা দান কারী বলে যারা আছেন তারা আসলে সেবা দান করছেনা বরং সেবা টাকার বিনিময়ে বিক্রি করছে।

৫ জানুয়ারি ২০১৭

 

চাকরি ক্ষেত্রে বিষয় বৈষম্য কেন?

 

বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে এখন অনেক বিষয়ে পড়ানো হচ্ছে যা আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশের জন্য মোটেই যুগোপযোগী নয়।যে দেশে চাকরির বিজ্ঞাপন মানেই বিবিএ এমবিএ চাওয়া সে দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের অপারপার বিষয়গুলোর মূল্য কি?শেখার জন্য আমরা বা আমাদের সমাজের কয়জন স্কুল,কলেজ,বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই?সবাই যাই সার্টিফিকেট অর্জন করে ভাল চাকরি করার স্বপ্ন নিয়ে।আর চাকরি মানেই যেখানে বিবিএ এমবিএ এবং নামে মাত্র হাতে গোনা কয়েকটি বিষয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয় সেখানে আরবী,ফার্সি,উর্দু,বাংলা কিংবা ওরকম আরো বিষয় গুলিতে পড়ে কতটা কাজে আসবে তা আমাদের জানা নেই। বরং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ওই সব বিষয়ে ভাল রেজাল্ট করার পরও আমাদের ভাই বোনেরা হতাশ হচ্ছে চাকরির বিজ্ঞাপন গুলো দেখে।

          আমরা কোন বিষয়কেই ছোট চোখে দেখিনা বা কাউকে কারো চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেইনা বলে যারা বড় বড় কথা বলে তারাই বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের উচু স্তরে বসে বিজ্ঞাপন সাজায় বিশেষ কিছু বিষয় ছাড়া যেখানে অন্যরা আবেদনই করতে পারেনা।তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ওই সব বিষয় পড়িয়ে লাভ কি?বন্ধ করে দেওয়াইকি যুক্তিযুক্ত নয়? চাকরি পাওয়ার প্রাথমিক শর্তই যদি হয় বিবিএ এমবিএ তাহলে গোড়া থেকেই কেন আমরা সেসব বিষয় নিয়ে পড়ছিনা,পড়াচ্ছিনা।যে সব বিষয়ের আপাত দৃষ্টিতে কর্মজীবনে না কোন চাহিদা আছে না কোন মূল্য আছে, সেসব বিষয়ে ভর্তি হয়ে ছাত্র ছাত্রীদের হাতাশাই শুধু বাড়বে।আমরা মনে করিনা যে শুধু মাত্র বিশেষ কিছু বিষয়ের ছাত্র ছাত্রীরাই ওই সব চাকরি পাওয়ার যোগ্য আর বাকিরা লবডঙ্কা।চাকরির বাজারে কে কার থেকে এগিয়ে সেটা বুঝতে হলে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাথমিক ভাবে সব বিষয়ধারীকে আবেদনের সুযোগ দিয়ে দেখুন।কে কার থেকে ভাল তা তখনই বুঝা যাবে।যোগ্যতার বিচার আপনারা যখন সার্টিফিকেট দিয়ে করেন তখন বাকি বিষয়ধারিদের আর কিইবা করার থাকে।

          যারা ২০০৪ সালে এইচএসসি পাশ করেছিল তারা এখন অন্যদের তুলনায় আরো ভীষণ রকম বিপদে আছে।সরকার নির্ধারণ করেছিল গ্রেড পয়েন্ট ৫ এর মধ্যে ৩ পেলেই প্রথম শ্রেনী ধরা হবে।সেই দিক বিবেচনা করেই সব চলছিল। ইদানিং দেখা যাচ্ছে বিজ্ঞাপনগুলোতে গ্রেড পয়েন্ট ৫ এর মধ্যে ৪ থেকে ৪.৫ চাওয়া হচ্ছে।২০০৪ সালে বা তার আগে পাশ করা ছাত্রছাত্রীদের কতজন ওরকম গ্রেড পয়েন্ট নিয়ে পাশ করেছিল?তাদের বয়স শেষের পথে এবং তাদের মধ্যে অনেকেই বেকার।যাওবা স্বপ্ন ছিল, এখন গ্রেড পয়েন্টের খড়গের নিচেয় তারা মরিমরি করছে।

          ঢলাও করে এ প্লাসের বন্যা বইয়ে দিয়ে এখন পু্বর্সুরীদের বিপদে ফেলে দিয়েছে এদেশেরই কতিপয় নীতিনির্ধারকেরা।কে তাদের বুঝাবে, যারা নিজেরাই বুঝতে পারেনা।একটা গ্রাম্য প্রবাদ আছে উঠলো বাই চললো বু দরগায় যাই। এদেশেও হয়েছে তাই। যখন যার যা খুশি তাই নিয়ম করে নিচ্ছে।

          চাকরির বিজ্ঞাপন গুলোতে হাতে গোনা কয়েকটা বিষয় ছাড়া বাকি বিষয়ের ছাত্র ছাত্রীরা আবেদন করার সুযোগটুকুও পাচ্ছেনা। এটা সম্ভবত বেকারত্বকে মাথায় পেতে নেওয়া অগণিত ছাত্রছাত্রীরা ছাড়া এ দেশের কারো চোখে পড়েনা, কারো মাথায় ঢোকেনা। হাতে গোনা বিষয় গুলি ছাড়া বাকিরা যদি আবেদন করার সুযোগই না পাবে তবে বন্ধ করে দিন ওই সব বিষয় যার কোন বাজার মুল্য নেই। মুহাম্মদ জাফর ইকবাল স্যার একবার বলেছিলেন এ দেশে প্রত্যেক ছাত্র ছাত্রীকে দুটো বিষয়ে পড়তে সুযোগ দেওয়া উচিত। একটা হলো বিবিএ এমবিএ যা দিয়ে সে চাকরি করে খাবে, আরেকটা হলো সে অন্তর থেকে যে বিষয়ে পড়তে ইচ্ছা করে সেটা।

          বিসিএস এবং সরকারী কিছু কিছু চাকরি ছাড়া কর্ম জীবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিভিন্ন মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানী গুলো পছন্দের তালিকায় শীর্ষে।সেগুলো বাদেও পন্য বাজারজাত করে এমন সব কোম্পানীতে মার্কেটিং এর চাকরির ক্ষেত্রেও বাকি সব বিষয়কে মুল্যায়নও করা হয়না।গুড়ো দুধ বিক্রি করুন আর সয়াবিন তেল বিক্রি করুন সব ক্ষেত্রেই হাতে গোনা কয়েকটি বিষয় ছাড়া বাকিরা যেন যোগ্যই নয়।তাহলে বিশ্ববিদ্যালয় গুলো কেন জেনে শুনে ওসব বিষয়ে ভর্তি করিয়ে পড়ানো হচ্ছে? এটাকি বিশ্ববিদ্যালয় বা শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা জানেনা?জানার পরও কেন ওসব বিষয় চালু রয়েছে?

          হয় চাকরি ক্ষেত্রে এই সব বিষয় বৈষম্য দূর করুন নয়তো চাকরির বাজারে হাতে গোনা যে বিষয়গুলো সবাই মূল্যায়ন করছে সেগুলোর বাইরের সব বিষয় বন্ধ করে দিন। কথায় বলে দুষ্টু গরুর চেয়ে শুন্য গোয়াল ভাল।যে বিষয়ে পড়ে কর্ম জীবনে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হতে হয় সেই সব বিষয়ে পড়ার চেয়ে না পড়াই কি ভাল নয়?

          ঢলাও ভাবে এ প্লাসের বন্যা শুরু হওয়ার আগে যারা এইসএসসি পাশ করেছিল তাদের কথা বিবেচনা করে সর্বক্ষেত্রে গ্রেড পয়েন্ট ৩ প্রাপ্তদের আবেদন করার সুযোগ দিতে হবে।যে কোন চাকরির ক্ষেত্রে (ইঞ্জিনিয়ারিং এবং ক্ষেত্র বিশেষ বাদে) প্রাথমিক আবেদনের ক্ষেত্রে কোন বিষয়ের বেড়াজাল রাখা চলবেনা।ডিজিটাল বাংলাদেশে ওগুলো এক একটা এনালগ সিস্টেম ছাড়া আর কিছু নয়।প্রাথমিক আবেদনের সুযোগ সবারই থাকা উচিত। তার পর ধাপে ধাপে কেউ মেধার বলে টিকে গেলে সে যোগ্য বলে বিবেচিত হবে। চাই সে আরবীতেই পড়ুক আর সংস্কৃতিতেই পড়ুক।আর না টিকলে সে বিবিএ এমবিএ হলেও বাতিল বলে বিবেচিত হোক এটাই সবার কাম্য।

          মূলত আমাদের দেশে কর্মমূখী শিক্ষার বড়ই অভাব।কারীগরি শিক্ষাই বলি আর অন্যান্য বিষয় বলি কোনটাই মূলত এদেশের অধিকাংশ কাজের সাথে খাপ খায়না।মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে বাংলাদেশ তার কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌছার পর এ দেশ যেদিন উন্নত দেশে পরিণত হবে সেদিন আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইচ্ছা মত যে কোন বিষয় নিয়ে পড়লেও কোন সমস্যা থাকবেনা।কারণ তখন কর্মসংস্থানের কোন অভাব থাকবেনা।তবে বর্তমান পরিস্থিতির কথা চিন্তা করলে নীতিনির্ধারকদের আরো কড়া হতে হবে।চাকরিদাতারা কেন অন্য সব বিষয়কে আবেদনের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত করছে তার জবাব চাইতে হবে। সেই সাথে সরকার নির্ধারিত গ্রেড পয়েন্ট তিনের বদলে কেন চার বা সাড়ে চার চাওয়া হচ্ছে তাও খতিয়ে দেখতে হবে।পাঁচটা বিষয়কে প্রধান্য দিয়ে বাকি ত্রিশটা বিষয়কে পায়ে মাড়িয়ে গেলে দেশে একদিন বেকারত্ব এতো বেড়ে যাবে যে জনসংখ্যার দুই তৃতীয়াংশ তখন বেকার হয়ে বসে থাকবে।এদেশের আকাশ সেদিন বেকারের দীর্ঘশ্বাসে ভারি হয়ে উঠবে।সে ভার সইবার মত শক্তি তো আমাদের নেই।

১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭,দৈনিক ইত্তেফাক।

 

পাঠকেরা সেই গল্পটি জানে

 

আজ আমরা অভাবে জর্জরিত এক জাতি।অভাব যেন আমাদের নিত্যদিনের সাথী।আমাদের টাকা পয়সার অভাব,বাড়ি গাড়ির অভাব,প্রেম ভালবাসার অভাব,ক্ষমতার অভাব,চক্ষুলজ্জার অভাব,নীতি ও আদর্শেরও অভাব।আমাদের বড়ই অভাব।শুধু মানুষের অভাব নেই। কবি বলেছিলেন “অভাব শুধু নাই মানুষের/চাই কত মন চাই কত সের”। কিন্তু আজ হঠাৎ মনে হচ্ছে সব কিছুর সাথে মানুষেরও অভাব প্রবল হয়েছে।সংস্কৃতি মন্ত্রনালয়ের পৃষ্টপোষকতায় রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের গা ঘেসে দাড়ানো আজমপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে দশ দিন ব্যাপী বই মেলার আয়োজন করা হয়েছে।বই মেলার উদ্বোধন করেছিলেন মাননীয় মন্ত্রী জনাব আসাদুজ্জামান নুর।সেদিন উপস্থিত ছিলেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন এবং আরো অনেকে।সেই উদ্বোধনের সময় যা মানুষ এসেছিল তার পর মেলা প্রাঙ্গণ খা খা করছে।

৮৬টি স্টলে সজ্জিত এই মেলার পুরো মাঠ কাপের্ট দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়েছে যেন পাঠকের পায়ে ধুলো না লাগে।কিন্তু হায় ধুলোর কপালে যেমন পাঠকের পায়ের ছোয়া লেখা নেই তেমনি কাপের্টের কপালেও পাঠকের পায়ের ছোয়া লাগার ভাগ্য লেখা ছিলনা বোধহয়।একুশে বই মেলার পর এতো বড় পরিসরে আর কোথাও বই মেলা হতে দেখিনি আমি।উত্তরা বিশাল একটি এরিয়া এবং সেখানে সাধারন মানুষের পাশাপাশি এলিট শ্রেনীর মানুষেরও বসবাস। দেশ সেরা রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের পাশাপাশি আরো অনেক নামি দামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে।তার পরও বই মেলা পুরো ফাঁকা।এমন অনেক প্রকাশনী আছে যাদের এই চার পাঁচ দিনেও দশটা বই বিক্রি হয়েছে কিনা সন্দেহ আছে।পাঠক না আসলে বই বিক্রি হবে কি করে।মানুষ জানেই না যে এতো বড় একটা মেলা হচ্ছে। জানবে কি করে? কোন পত্রিকায় কোন টিভিতে বই মেলার কোন খবর ছাপা হয়নি।শুনেছি অনেক পত্রিকা টিভি প্রেস ব্রিফিং না দিলে নিউজ কাভার করেনা।তাহলে আমাদের মত সাধারণদের প্রশ্ন ভারত থেকে যে হাতিটি ছুটে এসেছিল এবং আমরা যাকে বঙ্গবাহাদুর উপাধী দিয়েছিলাম তার খবর কিভাবে পত্রিকা কিংবা টেলিভিশনে প্রচার হলো।সেই হাতিটিকি তবে প্রেস ব্রিফিং করেছিল।

কদিন আগে একটা হনুমান ছুটে আসলো ভারত থেকে সেটা নিয়েও বেশ হইচই হলো নিউজ হলো,ফলোআপ নিউজও হলো।কিন্তু একটা বিশাল পরিসরের সুন্দর বই মেলার কোন নিউজই ছাপা হলো না কোথাও।পাশেই রাজউক উত্তরা মডেল কলেজে ২২ ডিসেম্বর থেকে ২৪ ডিসেম্বর পযর্ন্ত রাজউক ন্যাশনালস অনুষ্ঠিত হলো যেখানে টেলিভিশন চ্যানেল যেমন ছিল তেমনি রেডিও এবং পত্রিকাও ছিল।বই মেলা শুরু হয়েছে সেটারও আগে এবং সেটা এখনো চলছে।অথচ তারা সেটা আমলেই নেয়নি।

বইয়ের প্রতিকি তাহলে অরুচি ধরে গেছে?না হলে এরকম হবে কেন?মনে পড়ে গেল সেই গল্পটি।এক শিক্ষক শ্রেনী কক্ষে তার ছাত্রদের বললেন মনে করো তোমাদেরকে কেউ এক ব্যাগ বই আর এক ব্যাগ টাকার মধ্য থেকে যে কোনটি বেছে নিতে বললো ।তোমরা কোনটা নেবে?এক ছাত্র উঠে দাড়িয়ে বললো স্যার আমি হলে টাকাটাই নেব।স্যার তখন বললেন তুমি বোকা,আমি হলে বইগুলোই নিতাম।ছাত্রটি তখন বললো স্যার আপনিতো বই ই নিবেন।যার যেটার অভাব সেতো সেটাই নেবে।

আমাদের মনে হয় জ্ঞানের কোন অভাব আর নেই।তাই বই কেনা,বই পড়ার প্রতি আমাদের আর কোন আগ্রহ নেই।জানুয়ারির শুরুতেই আন্তর্জাতিক বানিজ্য মেলা শুরু হবে।দেখা যাবে টিকেট কেটে আমরাই মেলাতে ঢুকছি কত কিছু কিনছি কিংবা কিছু না হলেও ঘুরে বেড়াচ্ছি।অথচ বই মেলাতে ফ্রিতেও কেউ ঢুকছিনা।আর্মি স্টেডিয়ামে মাঝে মাঝেই নানা ধরনের ফেস্ট হয়।টিকেট কাটতে গেলে দেখা যায় টিকেট শেষ।চড়া দামেও তখন টিকেট পাওয়া যায়না।অথচ এতো সুন্দর জ্ঞানের আধার সাজিয়ে বসে থাকা মেলাটিতে আমাদের যাওয়ার সুযোগই হয়না।কেউ কেউ বলছেন উত্তরা ব্যাকওয়ার্ড জায়গাতে মেলা হচ্ছে।আমরা অবাক হই এটা শুনে।যেখানে রাজউক কলেজের মত প্রতিষ্ঠান রয়েছে,যেখানে দেশের সব সেরা সেরা ইংরেজী মাধ্যম স্কুল গুলোর প্রধান শাখা রয়েছে,বিমানবন্দর,রেলস্টেশান রয়েছে সেখানে যদি যাতায়াত ব্যবস্থা খারাপ ও ব্যাকওয়ার্ড মনে হয় তবে এই ঢাকা শহরে আর কোনটা ব্যাকওয়ার্ড নয় তা নতুন করে জানতে হবে।ট্রেনে করে ঢাকা থেকে বের হওয়া এবং আসার জন্য উত্তরার কোন বিকল্প নেই।বিমান বন্দর সেটাও উত্তরাতে।এবং ঢাকার সব থেকে নিরিবিলি এলাকা উত্তরা।তাহলে পাঠকের উপস্থিতি কম কেন?কারণ পাঠক সেই গল্পটা জানে।

এক ভদ্র মহিলা তার স্বামীর জন্মদিনে স্বামীকে কিছু উপহার দিতে চান।তিনি গেলেন সুপার মার্কেটে।যে মার্কেটে প্রায় সবই পাওয়া যায়।তিনি দোকানীকে বললেন আমি আমার স্বামীর জন্মদিনে উপহার দিতে চাই।কি দিলে ভাল হয় বলুনতো।দোকানী একটা পারফিউম ধরিয়ে দিয়ে বললেন এটা নিতে পারেন।মহিলা বললেন না না পারফিউম সেতো ওর একটা আছে।দোকানী তখন একটা শেভিং ক্রিম দিলেন।মহিলা আবার বললেন না না ওটাতো ওর একটা আছেই। এভাবে দোকানী ভদ্র মহিলাকে যাই দিচ্ছেন সেটাই তিনি ফিরিয়ে দিচ্ছেন কারণ তা নাকি একটা আছেই।

দোকানদার তখন একটা বই ধরিয়ে দিয়ে বললেন এটা নিতে পারেন,উপহার হিসেবে বই খুবই ভাল।ভদ্র মহিলা বললেন না না বই? বইও তো একটা আছে!

সম্ভবত আমাদের সবার একই দশা হয়েছে।কোন কালে নিজে একটা বই কিনেছি কিংবা উত্তরাধিকার সুত্রে পেয়েছি তাই আর আমাদের কোন বই লাগবে না।কিংবা স্কুলের সেই ছাত্রটির ভাষায় যার যা অভাব সেতো তাই নিবে। আমাদের জ্ঞানের অভাব নেই বলেই জ্ঞানের আধার বই আর আমাদের চাইনা।আর নিউজ মিডিয়া গুলো? হা এই সামান্য সংবাদ প্রচার করে তাদের কোন লাভ হবেনা।তার চেয়ে বরং কোন মডেল কিংবা আলোচিত ব্যক্তির কিছু একটা ছাপলে দর্শক খাবে বেশি।কথায় আছেনা তেলো মাথায় তেল দেয়,আমাদের হয়েছে তাই।

৬ জানুয়ারি ২০১৭,দৈনিক ইত্তেফাক।

 

বাঙ্গালীর অাতিথেয়তা

 

মাছে ভাতে যেমন বাঙ্গালী, তেমনি অতিথি পরায়ন হিসেবেও বাঙ্গালীর সুনাম আছে।ইতিহাস বেশ পুরোনো।ইবনে বতুতা কিংবা তারও আগে যারা এই বাংলায় এসেছেন তারা এদেশের মানুষের অতিথিপরায়নতা দেখে মুগ্ধ হয়েছেন।সেই ধারাবাহিকতা এই আধুনিক কালে হয়তো কিছুটা ফিঁকে হয়ে গেছে তবে একেবারে বিলীন হয়নি।তাইতো ভ্যালেরি টেইলরদের মত অগণিত খ্যাতিমান মানুষ এই দেশের মাটি ও মানুষের ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে এদেশেই স্থায়ী ভাবে থেকে গেছেন।

এমন স্মৃতি আমাদের প্রায় প্রত্যেকেরই আছে যে, কোথাও গিয়েছি কিংবা নিজের বাড়িতেই মেহমান এসেছে।খেতে বসার পর দেখা গেল পরিবারের অন্যদের সাথে অতিথিকে খাওয়ানোর পর খাবারের আর কিছু বাকি নেই।পরিবারের নারীরা তখন হাসিমুখেই অভূক্ত থেকেছে।নিজের পাতের মাছের টুকরাটি অনায়াসে অতিথির পাতে তুলে দিয়েছে।স্মৃতি গুলি সবার কাছেই মুগ্ধকর।

তবে শুধু মাত্র পারিবারিক বন্ধনে আবদ্ধরাই যে অতিথি তাই নয়।আধুনিক বিশ্বে অতিথি কথাটির ব্যপকতা বিশাল।এর পরিমন্ডল নিজ পরিবার ছেড়ে গোটা দেশের মধ্যে বিস্তার লাভ করেছে।আজকে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত বা কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে যে বিদেশীরা ঘুরতে এসেছে তারাও আমাদের অতিথি।যারা সিলেটের চা বাগান কিংবা জাফলং এর সৌন্দর্য দেখতে এসেছে তারাও আমাদের অতিথি।

চলন বিল কিংবা আড়িয়াল বিল থেকে শুরু করে হাকালুকি হাওড়ের অবাধ জলে ভেসে থাকা দুর কোন দেশ থেকে আসা পানকৌড়িটিও কিন্তু আমাদের অতিথি।

জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের জলাশয় গুলি অতিথি পাখির অভয়াশ্রম বলেই পরিচিত।সাইবেরিয়া থেকে উড়ে উড়ে যে পাখিটি আমাদের দেশে এসেছে সে আমাদের পরম অতিথি।তার সেবা করা আমাদের কর্তব্য।

কিন্তু যে বিদেশী অতিথিরা আমাদের পযর্টন কেন্দ্রগুলোতে ঘুরতে আসছে আমরা তাদের কতটা আতিথেয়তা দেখাতে পারছি?অনেক ক্ষেত্রে বিদেশী দেখলেই তুলনামূলক ভাবে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছি।সার্বিক ভাবে তারা হয়তো নিরাপদেই আছে কিন্তু মানসিক ভাবে তারা কতটা প্রশান্তি পাচ্ছে তা আমাদের দেখার বিষয়।ভিন দেশী একটা মানুষ এদেশের সৌন্দর্য দেখতে এসেছে আমাদের উচিত তাদেরকে যথা সাধ্য সহযোগিতা করা,ভালবাসা দেখানো।এতে করে সেই মানুষ গুলি নিজ দেশে ফিরে গিয়ে আমাদের দেশের মানুষের ভালবাসা ও আতিথেয়তার কথা বাকিদের বলবে এবং তারাও এই দেশ ঘুরতে আসার আগ্রহ পাবে।ফলে দেশের সম্মান বাড়ার পাশাপাশি পযর্টন শিল্প থেকে জাতীয় আয় বাড়বে।কিন্তু আমরা অনেক সময় লোভাতুর হয়ে পযর্টকদের থেকে খাদ্য সামগ্রি থেকে শুরু করে রিক্সা,হোটেল,যানবাহন সব কিছুতেই অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছি।এতে করে আমাদের সম্মান কমছে বই বাড়ছেনা।তারা হয়তো প্রাথমিক ভাবে বুঝতে পারছেনা যে আমরা তাদের থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করছি কিন্তু একসময় ঠিকই তারা বুঝতে পারছে যে তাদেরকে আমরা ঠকিয়েছি।এর ফলে এই দেশের ভাবমুর্তি নষ্ট হচ্ছে।

একই ভাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সহ যে সব জলাশয়ে অতিথি পাখির আগমন হচ্ছে আমরা সেখানে আমাদের সেই সব অতিথিদের নানা ভাবে ভোগাচ্ছি। উড়ন্ত পাখির ছবি তোলার আশায় শান্ত জলে অবাধ সাতারে মেতে থাকা পাখির দিকে অনেক সময় আমরা ঢিল ছুড়ে তাদের আকাশে উড়িয়ে দিচ্ছি যা মোটেই উচিত নয়।এতে করে কখনো কখনো পাখি হতাহত হচ্ছে পাশাপাশি তাদের মধ্যে ভয়ের জন্ম হচ্ছে।সুদুর সাইবেরিয়া থেকে উড়ে আসা একটা অতিথি পাখিকে ঢিল ছুড়লে তার ভয় লাগাটাই স্বাভাবিক।

অতিথি পাখিকে আপনার পরিবারের সাথে তুলনা করুন।মনে করুন দাম্মাম শহরে আপনি অবস্থান করছেন।কেউ যদি আপনার দিকে ঢিল ছুড়ে মারে তাহলে আপনার কেমন লাগবে একবার চিন্তা করে দেখুন।নিশ্চই ভাল লাগবেনা।তেমনি ভাবে সাইবেরিয়া বা অন্য কোথাও থেকে উড়ে আসা অতিথি পাখিরও খারাপ লাগে।

শীত কাল আসলে পাখি শিকারীদের লোভ আরো বেড়ে যায়।তারা নির্বিচারে অতিথি পাখি শিকার করে বিক্রি করে আমাদেরই মত কারো না কারো কাছে।এগুলো বন্ধ হওয়া উচিত।অতিথি পরমাত্মীয় তাই তাকে ভালবাসতে হবে, সম্মান দেখাতে হবে, আগলে রাখতে হবে।

আমরা যদি ক্রমাগত ভাবে আমাদের ঐতিহ্য ভুলে যেতে থাকি তবে একদিন এই দেশে আর কোন পযর্টক আসবেনা,আর কোন অতিথি পাখি আমাদের আকাশে ডানা মেলবে না,ভেসে বেড়াবেনা কোন পানকৌড়ি,বক,বেলে হাঁস।আমরা চাইবো যে যেখানে যে অবস্থানে আছি আমাদের অতিথিদের যথাযথ সম্মান দেখাবো।আর একটা অতিথি পাখিকেও যেন কোন শিকারীর শিকারে পরিণত না হতে হয় সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।যারা অতিথি পাখি দেখার জন্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় বা অন্য কোথাও যাবে তাদের সতর্ক থাকতে হবে যেন ভুলেও কেউ অতিথি পাখিকে ঢিল না ছুড়ি।

পযর্টন এলাকাগুলোর সব শ্রেনীর মানুষদের প্রতি অনুরোধ থাকবে যেন কোন পযর্টককে কোন ভাবেই ঠকানো না হয়।

তলোয়ারের জোরে যা জয় করা যায়না তা হৃদয় দিয়ে জয় করা যায়।তাই আমাদের পুবর্পুরুষেরা যেমন অতিথি পরায়ণ ছিলেন তেমনি আমাদেরও সেই ধারাবাহিকতা ধরে রাখা উচিত।যেন গোটা বিশ্ব অবাক হয়ে এদেশে ছুটে আসে।এ দেশ হয়ে ওঠে সবার জন্য আদর্শ ও অনুপ্রেরণার একমাত্র দৃষ্টান্ত।

২০ ডিসেম্বর ২০১৬,দৈনিক ইত্তেফাক।

 

জীববৈচিত্র রক্ষার দায়িত্ব সবার

 

রাজশাহীর বিন্দুর মোড়,সারিসারি ভাজিভুজির দোকান।সেই সব দোকানে সিঙ্গাড়া, সমুচা, পিয়াজু, চপকে আড়াল করে লোভাতুর জিহ্বায় লালা ঝরিয়ে দিতে প্রস্তুত যে খাবারটি তার নাম চড়ুই ভাজি।চড়ুইয়ের রোষ্ট।দাম মাত্র চল্লিশ টাকা।মাত্র চল্লিশটাকা উপার্জনের নিমিত্তে এভাবেই প্রতিনিয়ত আমাদের দেশের জীববৈচিত্রের অন্যতম আকর্ষন চড়ুই নিধন চলছে।এভাবেই লোভাতুরদের কবলে পড়ে হারিয়ে যাচ্ছে অগণিত প্রাণী।টিকে আছে কেবল সেই সব প্রাণী যা এখনো বাঙ্গালীরা খাদ্য তালিকায় যোগ করতে পারেনি।এমন দিন আসতে হয়তো বেশি দেরি নেই যেদিন বাঙ্গালীরা মাছরাঙ্গা থেকে শুরু করে জাতীয় পাখি দোয়েল হয়ে কাকও সাবাড় করে দেবে।একদা কবিতায় পড়ছি

“বাবুই পাখিরে ডাকি বলিছে চড়াই

কুড়ে ঘরে থাকি করো শিল্পের বড়াই।

আমি থাকি মহা সুখে অট্রালিকার পরে

তুমি কত কষ্ট পাও রোদ বৃষ্টি ঝড়ে”।

এখন আর চড়ুই কোন বাবুই পাখিকে ডেকে ওরকম করে কথা বলতে পারেনা।বাবুই পাখি এখন কেবল আমাদের ইতিহাসের পাতায় খুঁজে পাওয়া যায়।বাবুই পাখির ঘর ভেঙেছে সেই বহুকাল আগে। সে আর শিল্পের বড়াই করার মত অবকাশ পায়নি।আমাদের লোলুপ দৃষ্টির রোশানল থেকে বাঁচতে পারেনি তালগাছে অসাধারণ নৈপুন্যে বাসা বাঁধা পাখিটি।আমরা যে যেখানে পেয়েছি বাবুই পাখি ধরে খেয়েছি কিংবা বাজারে বিক্রি করে অন্যের খাবার তালিকায় যোগ করে দিয়েছি।এখনো এদেশে অগণিত তালগাছ আছে কিন্তু সেই গাছের পাতায় পাতায় আজ আর কোন বাবুই পাখির বাসা দেখা যায়না।একই সাথে মহা সুখে থাকা চড়ুই পাখির সুখও বেশিদিন থাকেনি।শুধু যে রাজশাহীর বিন্দুর মোড়ে চড়ুই পাখি রোষ্ট করে বিক্রি হচ্ছে তাই নয়, হয়তো আমাদের অজানা আরো কত জায়গায় জীবন্ত চড়ুই পাখি বিক্রি হচ্ছে এবং সেটা কারো না কারো বাড়িতে গিয়ে ভুরি ভোজের জন্য কোরবানি হচ্ছে।বালিহাস,বক,শালিক,পানকৌড়ি এখন আর দেখা যায়না।এভাবে প্রতিনিয়ত হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের ঐতিহ্যের এই সব অঙ্গগুলি।এভাবেই একদিন আমরা জীববৈচিত্রহীন এক মরুভূমিতে পরিণত হব।নানা সময় খবরে দেখতে পাই কোথাও কোথাও হরিণের মাংসও বিক্রি হয়।সুন্দরবনের মত অভয়ারন্যেও প্রাণীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগে ভুগে বিলীন হয়ে গেছে অনেক পাখি।আমাদের নদী নালায় শত শত প্রজাতির মাছ ছিল এখন হাতে গোনা কয়েকটা ছাড়া বাকি গুলো ইতিহাসের পাতায় ঠাই নিয়েছে।যে গুলো আছে তাও সীমিত।যে কোন সময় সেই অংশও বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

পরিবেশ বিজ্ঞানীরা নানা সময়ে নানা ভাবে বুঝাতে চেষ্টা করেছেন কিন্তু আমরা কেউ সেসব কথা আমলে নেইনি।প্রত্যেকটি প্রাণীর গুরুত্ব এ বিশ্বে সীমাহীন।ধরুন এই ঢাকা শহরে যদি একটাও কাক না থাকে তাহলে এই শহর আমরা যেভাবে নোংরা করি তা দুদিনেই আমাদের শহরকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলবে।একটা বনকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য প্রাণিকুলের ভূমিকা অনন্য।পশু-পাখি, জীব-জন্তু ছাড়া কোন বনের অস্তিত্বই কল্পনা করা যায়না।প্রাণিকুলের সাথে বন-বনানির আত্মিক সম্পর্ক।লোভাতুরদের লোলুপ দৃষ্টিতে পড়ে আমাদের ঐতিহ্য রয়েলবেঙ্গল টাইগারও এখন বিলীন হওয়ার পথে।সামান্য কয়টা বাঘই এখন বেঁচে আছে।আশ্চর্য হতে হয় এটা ভেবে যে সুন্দরবনের দুই তৃতীয়াংশ বাংলাদেশের অংশে থাকলেও আমাদের অংশে বাঘের সংখ্যা ভারতীয় অংশের কিয়দাংশ মাত্র।পাচারকারিরা নানা ভাবে বাঘ শিকার করে জীবিত অথবা মৃত পাচার করে।

সরকার এবং পরিবেশবিদদের চোখের সামনে দেশের আনাচে কানাচে হরদম পশুপাখি বিক্রি হচ্ছে।কেউ সেসবে নজর দিচ্ছেনা।রাজধানীর কাটাবনেও রয়েছে অগণিত দোকান। যেখানে নানা রকম পশুপাখি বিক্রি হচ্ছে।এমন নয় যে সব পশু পাখিই পোল্ট্রি মুরগির মত চাষ করা।ওখানেওতো প্রাকৃতিক ভাবে জন্মনেয়া বিভিন্ন বন থেকে ধরে আনা পাখি থাকতে পারে।সে গুলো খতিয়ে দেখা উচিত।

মানব জাতিকে টিকে থাকতে হলে জীববৈচিত্রের দিকে অবশ্যই আন্তরিকভাবে নজর দিতে হবে।জীববৈচিত্রের উপর অনেকটা নির্ভর করে মানব জাতির সুন্দর ভাবে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা।গাছের গোড়া কেটে আগায় পানি ঢাললে যেমন কোন কাজ হয়না তেমনি জীববৈচিত্র ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়ে সুন্দর সুনির্মল পরিবেশে বেঁচে থাকার কথা কল্পনাও করা যায়না।আমাদের দেশের আনাচে কানাচে যেভাবে বন্য প্রাণী ও পশুপাখি নিধন হচ্ছে তা সত্যিই আশংকাজনক।নীতিনির্ধারকদের উচিত এসব বিষয়কে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে এর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া।আর একটি চড়ুই পাখিও যেন ধরা না হয়,আর একটি বক,পানকৌড়িও যেন হারিয়ে না যায়, আর কোন হরিণ যেন মারা না পড়ে, সে বিষয়ে জোর পদক্ষেপ নিতে হবে।এসবের সাথে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

১৯৭১ সালে যুদ্ধের ভয়াবহ দিনে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা দিনের পর দিন না খেয়ে থেকেছে তবুও জীববৈচিত্র নষ্ট করেনি।একটা চড়ুই,শালিক,বক তারা ধরেনি।ভাতের অভাব হলে তাকে বলে হাভাত কিন্তু এখনতো ভাতের কোন অভাব নেই। এখন আছে সংস্কৃতি ও দেশের জীববৈচিত্রের প্রতি ভালবাসার অভাব।এই অভাবীদের কি নামে ডাকা হবে তা জানা নেই।আমরা আশা করবো রাজশাহীর বিন্দুর মোড়ে বিক্রি হওয়া চড়ুই পাখিটির মত আর যেন কোন পাখিকে এভাবে ধ্বংস করা না হয়।বেঁচে থাকুক জীববৈচিত্র,বেঁচে থাকুক প্রাণিকুল আর সবাই মিলে ওদের জন্য সুন্দর একটা পরিবেশ গড়ে তুলতে আসুন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করি।

২২ নভেম্বর ২০১৬,দৈনিক ইত্তেফাক।

 

সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে আমরা কতটা ভাবছি?

 

সন্তানের ভবিষ্যত নিয়ে সব বাবা মাই চিন্তামগ্ন থাকে।কিন্তু আমার মনে হয় সন্তানের ভবিষ্যতের চেয়ে আজকালকার বাবা মায়েরা নিজেদের কথাই বেশি ভাবে।যদিও আমি জানি এবং বিশ্বাস করি আমার এই কথার সাথে এদেশের নিরানব্বই ভাগ মানুষই একমত হতে পারবেনা।আজকালকার বাবা মায়েরা সন্তানকে দামী স্কুল,সেরা শিক্ষকের কাছে পড়াতে পিছপা হননা তার একমাত্র কারণ কিন্তু সন্তানের ভবিষ্যত নয়।এর পিছনে আরো অনেক কারণ আছে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সমাজে নিজেদের স্ট্যাটাস ঠিক রাখা।

যেন পাশের বাসার ভাবি বলতে না পারেন আমার বাচ্চা দেশ সেরা স্কুলে পড়ে আপনার বাচ্চা কোথায় পড়ে?এর বাইরে আরো যে কারণ আছে তা হলো সেরা স্কুল কলেজে পড়লে বাচ্চার ভবিষ্যত বেশি উজ্জল হবে ফলে সে ভাল ভার্সিটিতে পড়াশোনা করে বেশি বেতনের চাকরি করবে।বৃদ্ধ বয়সে তারা সন্তানের সাথে খুব আরামে কাটাতে পারবে।কোন কোন বাবা মা সন্তানের নিজস্ব স্বপ্নকে গলাটিপে হত্যা করে তার উপর চাপিয়ে দেয় নিজেদের অপুরনীয় স্বপ্ন।

হয়তো বাবা মা নিজেরা ডাক্তার হতে চেয়েছিলেন কিন্তু পারেননি এখন তারা স্বপ্ন দেখেন তাদের সন্তান ডাক্তার হবে। সে অনুযায়ি নানা ভাবে সন্তানকে চাপ দিতে থাকেন। ফলে সন্তানের ইঞ্জিনিয়ার বা ক্রিকেটার বা শিক্ষক যা হওয়ার স্বপ্ন ছিল তা নিমিশে মাটি চাপা পড়ে যায়। এভাবে না জানি এদেশের কত ছেলে মেয়ের নিজের স্বপ্ন নিজের অজান্তেই কোরবানী হয়ে গেছে।আমি যা বলছি এটা একান্তই আমার ভাবনা থেকে বলছি।আমি বিশ্বাস করি এই কথার সাথে অধিকাংশই একমত হবেনা।

বাংলাদেশের সেই সব অভিভাবকদের কাছে আমাদের প্রশ্ন যারা সন্তানদের দেশ সেরা স্কুল কলেজে ভর্তি করানোর জন্য সকাল সন্ধ্যা সন্তানের উপর বইয়ের বোঝা চাপিয়ে দিয়েছেন এবং কেউ কেউ মোটা অংকের ডোনেশান দিয়েছেন আপনারা কি বলতে পারেন যদি নামি দামি সেই সব স্কুলে বাচ্চাকে ভর্তি করানোর পরও সেই বাচ্চাকে সেই স্কুলের স্যারদের কাছে কিংবা অন্য কোন স্যার বা কোচিংএ প্রাইভেট পড়াতেই হবে তাহলে নামি দামি স্কুলে ভর্তি করে লাভ কি? হ্যা এটা আমি অবশ্যই বিশ্বাস করি যে ভাল স্কুলের পরিবেশ ভাল হয় এবং পড়াশোনার মান তুলনামুলক ভাবে অনেক ভাল হয়।তার মানে এই নয় যে অপেক্ষাকৃত সাধারণ মানের স্কুলের ছেলে মেয়েরা কিছুই শেখেনা এবং জীবনে কিছুই হতে পারেনা।

যে টাকা আপনার বাচ্চাকে নামিদামি স্কুলে ভর্তির জন্য খরচ করেছেন কিংবা ডোনেশান দিয়েছেন কিংবা কোচিং প্রাইভেট করে খরচ করেছেন সেই টাকা আপনার হাতে রাখুন। বাচ্চাকে বাসার পাশের সাধারণ কোন স্কুলে ভর্তি করান। তার পর সেই হাতে রাখা টাকা গুলো বাচ্চার পড়াশোনার এবং সার্বিক কল্যানের জন্য খরচ করুন। দেখবেন আপনার বাচ্চা অনেক নামি দামি স্কুলের সেরা ছাত্র ছাত্রীর চেয়ে কোন অংশেই খারাপ রেজাল্ট করবে না। বরং তার উপর প্রেশার কম থাকায় সে বরং পড়াশোনার পাশাপাশি কোকারিকুলার একটিভিটিস গুলোতেও ভাল করবে।তাদের শৈশব কৈশর হারিয়ে যাবেনা। উত্তরা থেকে মতিঝিল কিংবা মতিঝিল থেকে মিরপুর যাওয়া আসা করে যে সময় নষ্ট হয় সেই সময়টাও সে কাজে লাগাতে পারবে।

মূল কথা হচ্ছে ভাল স্কুলে ভর্তির জন্য যদি এতোই দৌড়ঝাপ করবো তাহলে কেন বাচ্চাকে ধর্ম কিংবা শারিরীক শিক্ষার মত সাধারণ বিষয়েও স্কুলেরই টিচারের বাসায় প্রাইভেট পড়তে যেতে হবে? ভাল স্কুল, নামি দামি স্কুল তাহলে আপনার বাচ্চাকে কি দিচ্ছে? সেই স্কুলে ভর্তি করানোর জন্য কেন তবে উঠে পড়ে লেগেছেন? আপনি জানেন যে আপনি নিজে আপনার সন্তানের মেধাকে, আপনার সন্তানের সুন্দর শৈশব কৈশরকে ধ্বংস করছেন! কোচিং প্রাইভেটে যদি যেতেই হয় তাহলে নামি দামি স্কুল আর ঘরের পাশের সাধারণ স্কুলের মধ্যে পার্থক্য কোথায়? বুয়েট, মেডিকেল, ঢাকা ভার্সিটি বা অন্য যে কোন ভার্সিটিতে যে কোন বিভাগে গিয়ে আমরা যদি একটিবার খোঁজ নিয়ে দেখতাম যে কে কোন স্কুল থেকে পড়ে এসেছে তাহলেই বিষয়টা পরিস্কার হয়ে যেত।

অবাক হয়ে দেখি আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের অধিকাংশই গ্রাম থেকে, মফস্বল শহর থেকে এসেছে। অখ্যাত কোন গ্রামের সাধারণ স্কুল কলেজ থেকে পাশ করে আসা ছাত্র ছাত্রীরা যে হারে বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট, মেডিকেলে চান্স পাচ্ছে এই শহরের নামি দামি স্কুল কলেজ থেকে পাশ করা ছাত্ররা আনুপাতিক ভাবে সেই হারে চান্স পাচ্ছেনা। সাধারণ স্কুলের ছাত্রটির জন্য যা ব্যয় হয়েছে তার দশগুন ব্যয় হচ্ছে শহরের ছাত্র ছাত্রীর জন্য বিশেষ করে ভাল মানের স্কুল কলেজের ছাত্র ছাত্রীদের জন্য।

এই যে ব্যয় হচ্ছে এটা তৈরি করেছি আমরা নিজেরা অভিভাবকেরা। আমার মনে করছি ভাল স্কুল কলেজে ভর্তি না করলে আমাদের সন্তানেরা ভাল মানুষ হতে পারবে না প্রতিষ্ঠিত হতে পারবেনা। এটা সম্পুর্ন ভুল ধারনা। বেরিয়ে আসুন আপনাদের দিবাস্বপ্ন থেকে। বাস্তবতা বুঝতে চেষ্টা করুন। এখন চলছে  শিক্ষাবাণিজ্য। যে যাই বলুকনা কেন নিজ থেকে একটু চিন্তা করে দেখুন তাহলেই সব পরিস্কার হয়ে যাবে। এই সব শিক্ষাবানিজ্যের বিরুদ্ধে এখনি সোচ্চার হোন। নতুবা আপনার আমার সন্তান ভাই বোন কাগজে কলমে ভাল রেজাল্টধারী হবে কিন্তু বাস্তব জীবনে কি হবে সেটা সময়ই বলে দেবে।

প্রাইভেট এবং কোচিং যেখানে করতেই হচ্ছে সেখানে নামি দামি স্কুলে পড়ানো আর না পড়ানো সমান কথা।আমি আবারও বলতে চাই নামি দামি স্কুলের পরিবেশ অনেক ভাল এবং পড়াশোনার মানও অনেক অনেক ভাল কিন্তু ওই সব প্রতিষ্ঠান একই সাথে আপনার সন্তানের উপর নানা প্রেশার তৈরি করছে এবং আপনার পকেট খালি হচ্ছে।প্রতিনিয়ত চলছে ক্লাস টেষ্ট এটা সেটা আরো কত নামে বেনামে টেষ্ট।সে গুলো ফুলফিল করতে গিয়ে আপনার আমার সন্তানেরা হাপিয়ে উঠছে।পাশ থেকে আমরা বাতাস করছি আর বলছি এইতো আর একটু চেষ্টা করো দেখবে তুমি সেরা হয়ে যাবে।আমিও মেনে নিচ্ছি ক্লাসটেষ্ট এটা সেটা টেষ্ট নিলে মেধা শানিত হয়।

কিন্তু ওর মনের মধ্যে কি লড়াই একা একা করে চলেছে তার খবর আমরা কেউ রাখিনা।কদিন আগে আমার যে বোনটি ভর্তি পরীক্ষায় চান্স পায়নি বলে আত্মহত্যা করেছে তার জন্য আমি আপনি সবাইকি দায়ী নই?ভর্তি পরীক্ষায় চান্স না পাওয়া মানেই জীবনের শেষ নয় এটা তাকে আমরা শেখাইনি বরং তাকে শিখিয়েছি ভর্তি পরীক্ষায় চান্স না পাওয়া মানেই তোমার জীবন ব্যর্থ।ফলে আমাদের বোন, আমাদের সন্তান বোঝা বয়ে বয়ে ক্লান্ত হয়ে জীবনকেই ছুটি দিয়ে দিচ্ছে।

প্রতিযোগিতার এই বিশ্বে কাউকে না কাউকে হারতেই হবে কিন্তু একবার হার মানেই জীবন শেষ নয় এই শিক্ষাটা আমরা কেউ আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে দিচ্ছিনা। ফলে স্বপ্নগুলো মরে যাচ্ছে সেই সাথে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদেরই উজ্জল সম্ভাবনাময় কোন কিশোর কিশোরী তরুন তরুনী। তাই মিছেই ভ্রমের পিছনে ছুটবেন না। বাচ্চার ভবিষ্যতের কথা যদি চিন্তা করতেই হয় তবে ভেবে দেখুন আপনি ভুল পথেই এগোচ্ছেন।

১০ নভেম্বর ২০১৬,দৈনিক ইত্তেফাক।

 

সন্ত্রাসবাদ

 

আধুনিক সভ্যাতার চরম উৎকর্ষতার এই যুগে বিশ্বের প্রায় তিনশোকোটি মানুষ দারিদ্রসীমার নিচে বাস করে। বর্তমান বিশ্ব ক্ষুধা,দারিদ্র,অপুষ্টি,নিরক্ষরতা,জনসংখ্যার বিস্ফোরণ ইত্যাদি সমস্যায় জর্জরিত। কিন্তু সব কিছুকে ছাপিয়ে আলোচনার শীর্ষে সন্ত্রাসবাদ। যা গোটা বিশ্বকে অস্থির করে তুলেছে।সম্প্রতি বাংলাদেশের অভিজাত এলাকা গুলশানের একটি হোটেলে যে হামলা হয়েছে তা সত্যিই ভয়ের কারণ।এর আগে বাংলাদেশে সম্ভবত এরকম কোন ঘটনা ঘটেনি।যেহেতু সন্ত্রাসবাদের সবর্জন স্বীকৃত কোন সংজ্ঞা নেই তাই কারা সন্ত্রাসী বা কারা সন্ত্রাসী নয় তা নিরুপন করা বেশ দুরুহ।বলা হয়ে থাকে “One Mans Terrorist is another mans Freedom Fighter” অর্থাৎ যে একজনের কাছে সন্ত্রাসী সে অন্যজনের কাছে মুক্তিযোদ্ধা। যেমন কশ্মীরীদের স্বাধীনতা আন্দোলন ভারতের কাছে বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সন্ত্রাসবাদ। কিন্তু মুসলিম বিশ্ব সহ অনেকের কাছে তারা স্বাধীনতাকামী। তাদের যৌক্তিক দাবী খোদ জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত।অনুরুপ ভাবে ইসরাইলি বাহিনী যখন নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালিয়ে নিরাপরাধ লোকদের হত্যা করে, তাদের বাড়ি ঘর ধ্বংস করে তখন তা বিবেচিত হয় আত্মরক্ষার অধিকার হিসেবে । পক্ষান্তরে ফিলিস্তিনিরা পাল্টা আক্রমন করলে তা সন্ত্রাসবাদ বলে উচ্চবাচ্য করা হয়। মার্কিন তাবেদারী না করলে কতিপয় রাষ্ট্র হয় সন্ত্রাসীদের মদদদাতা।পক্ষান্তরে কন্ট্রাবিদ্রোহীদের সহ বিভিন্ন গুপ্তহত্যা ও গণহত্যার জন্য মার্কিনীরা যখন সামরিক সহায়তা দেয় তখন তাদেরকে সন্ত্রাসী বলে অভিহিত করা হয়না। এই কথা বলে সভ্যতার মূখোশ পরা যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের মত একটি রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে। মূলত যতদিন পযন্ত বিশ্বে মৌলিক মানবাধিকার ও সবার জন্য ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠিত না হবে ততদিন পযন্ত সন্ত্রাসী ও সন্ত্রাসবাদের সীমারেখা নিরুপন সম্ভব হবেনা।সন্ত্রাসবাদ বা Terrorism শব্দটির উদ্ভব হয় ফ্রান্সে ১৭৮৯-১৭৯৯ সালে ফরাসী বিপ্লব চলাকালীন সময়ে। এ সময়ে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালু এবং জনপ্রিয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তনের লক্ষ্যে The Regime de La Terreur (Reign of Terror) নামে একটি বিশেষ পরিষদ গঠিত হয়। কিন্তু ফরাসী বিপ্লবের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে মাত্রাতিরিক্ত বাড়াবাড়ি এবং সহিংস কর্মকান্ডের জন্য এই Terror রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের হাতিয়ারে পরিণত হয়। মনে করা হয়ে থাকে ঠিক তখন থেকে Terror  শব্দটি নেতিবাচক ভাবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। সন্ত্রাসবাদের সংজ্ঞা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে যথেষ্ট মতপার্থক্য রয়েছে। ব্রায়ান জেংকিন্সের মতে “রাজনৈতিক পরিবর্তন সাধনের উদ্দেশ্যে শক্তির প্রয়োগ বা শক্তি প্রয়োগের হুমকিই সন্ত্রাসবাদ”। অনেকেই মনে করেন সন্ত্রাসবাদের কারণ নিয়ে আলোচনা অপ্রাসঙ্গিক। কারণ সন্ত্রাস একটি অশুভ শক্তি এবং একে নিমূর্ল করাই মূল কথা। কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মনে করেন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালালে তা আরো সন্ত্রাসের জন্ম দেবে।

কেননা রাজনৈতিক,সামাজিক,সাংস্কৃতিক এমনকি ধমীর্য় কারণেও সন্ত্রাসবাদের জন্ম হতে পারে। অনেক ধমীর্য় গোষ্ঠী আছে যাদের ধারনা তাদের বিরোধীদের হত্যা করে নির্মূল করতে পারা পুন্যের কাজ। তেমনি অনেক উগ্রপন্থী খ্রিষ্ঠান ও এটাকে Crusade বা পবিত্র ধর্মযুদ্ধ মনে করেন। ফলে এরাই জড়িয়ে পড়ে সন্ত্রাসবাদে। কখনো কখনো ধর্মীয় মূলনীতির অপব্যাখ্যার ফলে সৃষ্টি হয় ধর্মীয় উগ্রবাদ যা ক্রমান্বয়ে সন্ত্রাসবাদের দিকে ধাবিত করে। বাস্তবতা আরো কঠিন। আমরা কেবল সন্ত্রাসবাদ সন্ত্রাসবাদ করে করে গলা ফাটাই। সন্ত্রাসবাদকে চিরতরে মিটিয়ে দেওয়ার জন্য লাখ লাখ নিরীহ মানুষকেও হত্যা করতে দ্বিধা করিনা। কিন্তু কখনো ভেবে দেখিনা কেন সন্ত্রাসবাদের জন্ম হয়। এটা ভুলে গেলে চলবেনা যে বৃহৎ রাষ্ট্রগুলো যখন তাদের বন্ধু রাষ্ট্রগুলোকে অন্যায় কর্মকান্ডে অর্থনৈতিক ও সামরিক মদদ যোগায় তখন প্রায় নিরস্ত্র নিযাতিত জনগণ অনন্যোপায় হয়ে সন্ত্রাসের পথ বেছে নেয়। এর জ্বলন্ত উদাহরণ হচ্ছে মাকির্নীদের ইসরাইলকে অনৈতিক কাজেও আর্থিক সমর্থন যোগানো। এর ফলে ইসরাইলরাই আক্রান্ত হচ্ছেনা খোদ আমেরিকাকেও চরম মূল্য দিতে হচ্ছে।বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে শুধু ধর্ম ও বর্ণের কারণে অনেক মানুষ প্রতিনিয়ত বৈষম্য ও নির্যাতনের স্বীকার হচ্ছে। কোন অঞ্চলের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় যখন ধর্মীয় ও বর্ণবাদী কারণে তাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয় তখন মারাত্মক সামাজিক অসন্তোষ ও সন্ত্রাসবাদের জন্ম হয়। অপেক্ষাকৃত দুবর্ল রাষ্ট্রগুলোর ওপর ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রগুলোর আগ্রাসন ব্যপক সন্ত্রাসবাদের জন্ম দিয়ে গোটা বিশ্বকে বিপজ্জনক করে তুলেছে। ঠান্ডা লড়াইয়ের যুগে আমরা এর বিকাশ লক্ষ্য করেছি। এমনকি একবিংশ শতাব্দীতে সভ্যতার চরম উৎকর্ষতার এই যুগে যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক আফগানস্তান,ইরাক সহ বিভিন্ন দেশে চালানো আগ্রাসন  গোটা বিশ্বকে সন্ত্রাসবাদের লীলাভূমিতে পরিণত করেছে।ফলে জন্ম নিয়েছে তালেবান,আলকায়দা কিংবা আইএসের মত সংগঠনগুলো।

যুক্তরাজ্যের লিচেষ্টরশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এন্ড্রু সিল্কের মতে, পাল্টা সন্ত্রাস তথা সন্ত্রাসের মাধ্যমে সন্ত্রাস দমননীতির ফলে সন্ত্রাসবাদ বন্ধ হওয়াতো দূরের কথা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে। প্রতিটি সুস্থ বিবেক সম্পন্ন মানুষ সন্ত্রাসবাদকে ঘৃণা করে। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে তারা বাধ্য হয়ে সন্ত্রাসের আশ্রয় নেয়।তাই যেসব পরিস্থিতির কারণে সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের জন্ম হয় সেসব চিহ্নিত করে তা প্রতিকারের ব্যবস্থা করতে পারলেই কেবল সন্ত্রাসবাদ বন্ধ করা সম্ভব। বিশ্ব এখন এমন এক সময় পার করছে যখন সন্ত্রাস মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী।অধিকার হারা মানুষ অধিকারের জন্য সন্ত্রাসের পথ বেছে নিচ্ছে। বিশ্ব ব্যাপী অশান্তি সৃষ্টি হচ্ছে। আর সেই মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়ে তাদের সন্ত্রাসের পথে ঠেলে দিয়ে আবার সন্ত্রাস দমনের নামেও রাষ্ট্র নিজেই সন্ত্রাসী কর্মকান্ড পরিচালনা করে যাচ্ছে। মানুষ কখনো সন্ত্রাসী হয়ে জন্মায়না, পরিস্থিতিই তাকে সন্ত্রাসী করে তোলে। তাই বিশ্বব্যপী সন্ত্রাসবাদ বিস্তারের কারণ গুলো চিহ্নিত করে প্রতিকার মূলক ব্যবস্থা নিতে হবে।বিশ্বের প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত হলে সন্ত্রাসবাদ আপনাআপনি কমে যাবে।মাহাত্মাগান্ধীর ভাষায় “চোখের বদলে চোখ নেওয়ার রীতি গোটা জাতিকে অন্ধ করে দিচ্ছে”।আমরা একটি শান্তিময় বিশ্বের স্বপ্ন দেখি। আগামীর বিশ্ব হোক সন্ত্রাস মুক্ত। নূর হোসেন বেঁচে থাকলে হয়তো নতুন করে বুকে পিঠে লিখতেন “সন্ত্রাসবাদ নিপাত যাক,গোটা বিশ্ব শান্তি পাক”।

……………..

১৩ মার্চ ২০১৭ পোষ্ট। এটি মূলত গতবছর লেখা। তারিখ মনে নেই।

 

বাঙ্গালীর শর্টকোর্স প্রীতি

আজকাল রাস্তাঘাটে চলার উপায় নেই। যেদিকে তাকাই দেখি তিনদিনে ইংরেজী শিখুন, পাঁচ দিনে রকমারি রান্না শিখুন, এক ঘন্টায় ত্রিশটা যাদু শিখুন,ড্রাইভিং শিখুন (গাড়ির স্টিয়ারিং ধরা লাগবেনা!) আরো কত কিছু যে শর্টকোর্সের মাধ্যমে শেখানো হচ্ছে তার প্রমানতো পাচ্ছেন আমাদের কোমলমতি শিশু কিশোর তরুণ শিক্ষার্থীদের মেধা ও মননের পরীক্ষা দেখে। এভাবে আর কত?

আসুন একটা শোনা গল্প আবার শুনি নতুন করে

বিলগেটস লাইবেরিয়াতে নতুন অফিস নিয়েছে সেখানে দক্ষ একজন লোক নিয়োগ করা হবে। সারা দুনিয়ার অগণিত মানুষ আবেদন করেছে। কেউ কারো থেকে কম না। বিল গেটস চাইছিলেন সব প্রার্থী উপস্থিত থাকুক। সে জন্য তিনি টিএডিএর ব্যবস্থাও করেছিলেন। তো সে নিয়মে সবাই উপস্থিত হলো।

প্রথমে মাইকে ঘোষণা করা হলো যারা ওরাকল পারেন না তারা চলে যান। দেখা গেল অর্ধেকই ওরাকল পারে না।সেখানে একজন বাঙ্গালীও ছিল। সে মনে করলো এ আর এমন কি,শর্ট কোর্স করে শিখে নেব! তাই সে থেকে গেল। এর পর বলা হলো যারা সি++ এ কাজ করেন নি তারা চলে যান। তখন দেখা গেল আরো অর্ধেকের বেশি উঠে চলে গেল। বাঙ্গালী নিজেই নিজেকে বললো এ আর এমন কি শর্ট কোর্স করে শিখে নেব। একে একে বিলগেটস নানা অ্যাপলিকেশানের বিষয়ে জানতে চাইলে দেখা গেল আস্তে আস্তে প্রার্থী কমতে কমতে মাত্র অল্প কয়েকজন বাকি আছে।

বিলগেটস তখন বললেন যারা লাইবেরিয়ার ভাষায় কথা বলতে পারেন তারা বাদে বাকিরা চলে যান। দেখা গেল দুজন বাদে সবাই চলে গেছে। সেই দুজনের মধ্যে প্রিয় বাঙ্গালী ভাইটাও ছিল। সে মনে মনে আগের মতই ভেবেছিল এ আর এমন কি শর্ট কোর্স করে শিখে নেব।

বিলগেটস যখন দেখলেন দুজন প্রার্থী আছে এবং দুজনই সব যোগ্যতার অধিকারী অথচ তার মাত্র একজন লোক দরকার তখন তিনি ঘোষণা করলেন আপনারা দুজন লাইবেরিয়ার ভাষায় কথা বলুন।

বাঙ্গালী দমবার পাত্র নয়। পার্ট যখন নিয়েছি পার্ট আরো নেব তবুও চাকরির আগা মাথা দেখেই ছাড়বো ভেবে সে খাটি বাংলায় বলে উঠলো ভাই আমার নাম সবজান্তা শমশের,আপনি ভাল আছেনতো? আমাদের বাঙ্গালী সাহসী ভাইকে অবাক করে দিয়ে ওপাশ থেকে দ্বিতীয় ব্যক্তি বললো হ্যা ভাই ভাল আছি। আমার নাম শাফিক খান,আমি ভাল আছি। এর পর তারা দুই বাঙ্গালী অনর্গল কথা বলতেই থাকলো। বিলগেটস লাইবেরিয়ার ভাষা বুঝতো না,বাংলা ভাষাও বুঝতো না। তাই সে মনে করলো বাহ তারা দুজনেই কত সাবলিল ভাবে লাইবেরিয়ার ভাষায় কথা বলছে। শেষে সিদ্ধান্ত পাল্টে দুজনকেই নিয়োগ দিলেন।
এটা একটা কল্পিত গল্প। এখন গুগল ট্রান্সলেটরতো আছেই সাথে দোভাষীও আছে। বাঙ্গালীরা শুধু কল্পনায়ই সেরা নয় সত্যিকার অর্থেও তারা যে সেরা তার প্রমান তারা বিভিন্ন ভাবে রাখছে। তালিকা করলে সেটা বিশাল লম্বা হবে। তবে শিক্ষা ব্যবস্থার যে বেহাল দশা দেখছি তাতে আমাদের ভবিষ্যত যে কোন দিকে যাচ্ছে তা বুঝতে পারছি না। সবাই ছুটছে শর্টকোর্সের পিছনে। এভাবে শর্ট করতে করতে না জানি আমাদের শর্টসার্কিট হয়ে যায়।

১৭ জুলাই ২০১৬,দৈনিক ইত্তেফাক।