Home Blog

বৃষ্টি, স্মৃতি ও বিশ্বকাপের দিনগুলো

বাইরে তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে। জানালার কাঁচের ভেতর দিয়ে সেই দৃশ্য চোখে এসে লাগছে। জানালার কাঁচটা সরিয়ে রাখতে পারলে বেশি ভালো হতো। আরও স্পষ্ট করে দেখতে পেতাম বৃষ্টির সৌন্দর্য। বৃষ্টি আমি পছন্দ করি আবার অপছন্দও করি। একই মানুষ একই বৃষ্টিকে পছন্দ করা আর অপছন্দ করা দুটো কথা একসাথে বলতে গেলে অনেকেই হাসবে। ভাববে পাগল হয়ে গেলাম কি না। আসলেও বিষয়টা সত্যি। এই যেমন এখন রুমের মধ্যে বসে লিখছি আর বাইরে জানালার ফাঁক দিয়ে অবিরাম ঝরতে থাকা বৃষ্টি দেখছি। এই দৃশ্য দেখতে আমার ভালো লাগে। বৃষ্টিকে এভাবে আমার ভালো লাগে।

কিন্তু বৃষ্টিকে তখনই আমার চরম বিরক্তিকর মনে হয় যখন আমি বাইরে থাকি। কোথাও ঘুরতে যাই আর হঠাৎ করে সে আমার সাথে শত্রুতা করে আমাকে ভিজিয়ে দেওয়ার প্রতিযোগিতায় নামে। বৃষ্টিতে ভিজতে আমার একই সাথে ভালো লাগে আবার বিরক্তও লাগে। যখন বাইরে ঘুরতে বের হই কিংবা সাথে ছাতা কিংবা রেইনকোট থাকে না তখন হুট করে আসা অনাহুত বৃষ্টিতে ভিজতে আমার খারাপ লাগে। কিন্তু কখনো কখনো এই আমিই নিজ থেকে উৎসবের মত করে বৃষ্টিতে ভিজি আর মেতে উঠি আনন্দে। যেমন ছোটবেলায় ফুটবল খেলতে গিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ভালো লাগতো। আবার একই সময়ে রোদ আর বৃষ্টির মিলনমেলায় ভিজতে ভালো লাগতো। ছোটবেলায় অনেক কিছু বুঝতাম না ফলে প্রথম বৃষ্টি এলেই নেমে পড়তাম। কিন্তু এখন জানি বছরের প্রথম বৃষ্টিতে ভিজতে নেই। সেই বৃষ্টির পানিতে অনেক কিছু থাকে যা ক্ষতির কারণ হতে পারে। তবে হ্যা প্রথম বৃষ্টি হলেও যদি তুমুল বৃষ্টি হয়ে দশ বা বিশ মিনিট পার হয় তখন ভিজলে অসুবিধা নেই।

আমার খারাপ লাগে শিলা বৃষ্টি আর খারাপ লাগে বৃষ্টির সময় যদি বিজলী চমকায়। বিজলী চমকানো ছাড়া বৃষ্টি হলে ভালো লাগে। আর সবচেয়ে ভালো লাগে যখন আমি গ্রামের বাড়িতে টিনের ঘরে থাকি এবং বৃষ্টি নামে। বৃষ্টির দিনে ঝাল মুড়ি খেতে মজা লাগে। পিঠা পুলিও খেতে মজা লাগে। জমিয়ে আড্ডা দেওয়া কিংবা মুভি দেখাও ভালো লাগে। অবশ্য বই পড়তেও খুব ভালো লাগে। কিন্তু সবচেয়ে বেশি ভালো লাগে বোধহয় কাথা মুড়িয়ে দিয়ে ঘুমিয়ে থাকা। এই মুহুর্তে আমি আমার ডেস্কে বসে কম্পিউটারে আজকের দিনের কথা লিখছি আর বাইরে বৃষ্টি দেখছি। সামনে একটা টিনের ঘরের চাল। সেটাতেই বৃষ্টি ঝরে পড়ছে। ওই ঘরটা না থাকলে রাস্তার দৃশ্যটাও দেখতে পেতাম। হয়তো দেখতাম কেউ কাক ভেজা ভিজে কোথাও চলে যাচ্ছে। বৃষ্টির মধ্যেই সাই করে কোনো বাস বা ট্রাক বা অন্য কোনো গাড়ি ছুটে যাচ্ছে। টায়ারের আঘাতে রাস্তার উপর পড়া বৃষ্টির পানি দুই দিকে ছুটে যাচ্ছে।

আমি যখন ছোট ছিলাম তখন দেখেছি আমাদের ঘরের টিনের চালে অনেক ছিদ্র ছিল। আম্মা সেই সব ছিদ্র বরাবর মেঝেতে ছোট ছোট হাড়ি পাতিল বা গামলা বসিয়ে দিতেন যেন বৃষ্টির পানি নিচে পড়ে মাটিতে কাদা তৈরি না হয়। আমিও মাঝে মাঝে মায়ের ব্যস্ততা থাকলে ওই কাজ করতাম। সময় গড়িয়ে গেছে। এখনো বৃষ্টি হয় তবে আগের মত ছুটে যেতে হয় না টিনের ছিদ্রর নিচে বাটি বা পাতিল পেতে রাখার জন্য। এখন আর টিনে ছিদ্র নেই। আল্লাহর রহমতে ও বরকতে এখন আমাদের অবস্থাও বদলেছে। বাড়িতে টিনের ঘর আছে,ছাদ করা বিল্ডিংও আছে। পাশেই পুকুর আছে। সেই পুকুরে অনেক রকম ছোট বড় মাছও আছে। আমি যখন ছোট ছিলাম তখন আমাদের কোনো পুকুর ছিল না,টিউবওয়েল ছিল না,টেলিভিশন ছিল না। আম্মা মসজিদের টিউবওয়েল থেকে পানি নিয়ে আসতেন। কত যে কষ্ট করতে হতো। গোসল করার জন্য বড় চাচাদের বাড়ির পিছনে থাকা গ্রামের সবচেয়ে বড় পুকুরই ছিল পুরো গ্রামের মানুষের একমাত্র ভরসা। কিন্তু সেই পুকুর আজও আছে। তার চেয়ে বড় কোনো পুকুর আজও গ্রামে কাটতে পারেনি কেউ। অথচ সেই পুকুরে কেউ আর গোসল করে না। কতকাল সেটা পরিত্যাক্ত হয়ে পড়ে আছে তা কেউ ঠিক বলতে পারবে না।

বড় চাচাও না ফেরার দেশে চলে গেছেন বহু বছর আগে। আমার বেশ মনে আছে আমি যখন গোসল করতে যেতাম তখন দেখতাম বড় চাচা বারান্দার খাটের উপর বসে আছেন। পান খাচ্ছেন। আমাকে দেখলেই ডাক দিতেন। গল্প করতেন। মাঝে মাঝে তাকে ফাঁকি দিয়ে অন্য পথ ধরে যাওয়া আসা করতাম। আজকে তাকে খুব মিস করি। কেন যে আরও অনেক বছর তিনি আমাদের মাঝে থাকলেন না। আল্লাহর ডাকে তাকে সাড়া দিয়ে চলে যেতে হলো। আমার বড় চাচা ছিলেন স্কুল শিক্ষক। হেড মাস্টার। আমি তার স্কুলে পড়বো বলে একবার ভর্তি হয়েছিলাম। সম্ভবত ওয়ান বা টুতে ভর্তি হয়েছিলাম। গ্রাম থেকে বেশ দূরেই ছিল সেই স্কুল। চাচা এলাকার বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকতা করেছেন তবে সেই স্কুলটাই সবচেয়ে কাছে ছিল বলে সেখানে ভর্তি হয়েছিলাম। ভর্তির পর নতুন বইও পেয়েছিলাম। কিন্তু আজ আর মনে নেই কেন সেই স্কুলে এক মাসও পড়া হয়নি। বড় চাচা অনেক গল্প জানতেন। তিনি যখন অবসর নিলেন এবং পেনশনের টাকা পেলেন তখন আমাদের মধ্যে একটা উৎসব উৎসব ভাব বিরাজ করছিল। যদিও চাচা আর আমরা আলাদা সংসারে ছিলাম।

বড় চাচার অনেক গুলো ছেলে মেয়ে। সেই সময়ে মনে হয় ওভাবে গুনতেও পারতাম না। বড় চাচার ছেলে মেয়েদের মধ্যে শুধু একজন আমার চেয়ে ছোট। বাকি সবাই আমার চেয়ে বড়। সেবার পেনশনের টাকা পাওয়ার পর মোট তিনটা ঘর দিলেন যার মধ্যে পাশাপাশি দুটো ঘর। ঘরগুলো ছিল টিনের। উপরে এবং চারপাশে বেড়ার সবটাই ছিল টিনের। নতুন টিনের সেই ঘর দেখতেও কেমন যেন ভালো লাগতো। সেই সময়ে এলাকায় ওরকম নতুন ঘরতো আর কারো ছিল না। অবশ্য আমাদের বাড়িতে তখনো পাকা ঘর ছিল। উপরে শুধু টিন ছিল। বড় চাচা তার মেজ ছেলের জন্য একটা পাওয়ার টিলারও কিনেছিলেন। সেটাই ছিল গ্রামের প্রথম ও একমাত্র পাওয়ার টিলার। সেই টিলার দেখতেও আমরা ভীষণ আগ্রহী ছিলাম। সব কিছু আমাদের চোখে বিস্ময়কর ছিল। এখন বুঝি বড় চাচা পেনশনে খুব বেশি টাকা পাননি। হয়তো তিন বা চার লাখ টাকা পেয়েছিলেন। কিন্তু সেই সময়ে ওই পরিমান টাকাও ছিল অনেক। তখনতো স্বর্ণের ভরি ছিল ছয় সাত হাজার টাকা।

আমার বেশ মনে আছে বাড়িতে নতুন ঘর দেওয়ার পর আমি অনেকের ছবি তুলেছিলাম। আমার দাদিকে দুই ঘরের মাঝে থাকা গোট বরাবর চেয়ারে বসিয়ে একটা ছবি তুলেছিলাম। আমার দাদির ওই একটা ছবিই আমার কাছে আছে। হয়তো আমিই না আমাদের পুরো গোষ্ঠীর কাছে দাদির ওই একটা ছবিই অবশিষ্ট আছে। কম্পিউটারের হার্ড ডিস্কে খুজলে পাওয়া যাবে। সেই সময়ে অবশ্য কম্পিউটার ছিল না। কম্পিউটার বলে যে কিছু পৃথিবীতে আছে তাও আমার জানা ছিল না। আমাদের পাশের গ্রামে রুহুল নামে এক ভাই আছেন। ওনার বাবা সৌদি আরব থাকতেন। একবার দেশে আসার সময় তার জন্য একটা ক্যামেরা এনেছিলেন। সেই ক্যামেরাটাই ছিল আমার ছবি তোলার মাধ্যম। রুহল ভাইকে কিছু টাকা দিয়ে ক্যামেরাটা আমি ইচ্ছে মত ব্যবহার করতাম। তারপর নেগেটিভ ওয়াশ করিয়ে ছবি প্রিন্ট করে এলবামে রেখে দিতাম। সেই এলবামে থাকতে থাকতে অনেক ছবি নষ্ট হয়ে গেছে। পরে যখন আমি ঢাকাতে শিফট হলাম তখন ছবিগুলো স্ক্যান করে ডিস্কে ভরে রেখেছিলাম। এখনতো হার্ড ডিস্কেই রাখতে পারি। তবে সব ছবি রাখা হয়নি। নেগেটিভ ছিল অবশ্য অনেক দিন। কিন্তু কোথাও আর সেই আগের মেশিনারিজ অবশিষ্ট পাইনি যা দিয়ে ছবি প্রিন্ট করবো।

আজকে রাতে ১১টায় ফুটবল বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার খেলা আছে। এক সময় আমিও আর্জেন্টিনার তুমুল ফ্যান ছিলাম। ছোট বেলায় বিশ্বকাপ খেলা দেখেছি। কাজিনদের প্রথম পছন্দ ছিল আর্জেন্টিনা। তখন আমি আর কিইবা বুঝি। ফলে তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে আমিও আর্জেন্টিনা সমর্থন শুরু করি। তারপর কেটে গেছে অনেক বছর। ২০২২ সালে বিশ্বকাপ জেতা পযর্ন্ত আমি আর্জেন্টিনার ফ্যান ছিলাম। তারপর বৈশ্বিক নানা কারণে সেই সমর্থন তুলে নিয়েছি। মুসলিম নিধনকারী ইসরায়েল এবং আমেরিকার ঘনিষ্ট বন্ধু আর্জেন্টিনা সরকার। তারা মুসলিম নিধনকে সমর্থন করে। তারচেয়ে বড় কথা হলো খোদ লিওনেল মেসি এটাকে সমর্থন করে। কিছুদিন আগে যখন আমেরিকা-ইসারেয়ল ইরান আক্রমন করলো সেটা শুনে মেসি হাত তালিও দিয়েছে। সেই দলকে আমি কিভাবে সমর্থন করতে পারি? যদিও জানি আমার মত একজনের সমর্থন করা না করায় কিছুই যায় আসে না। তবুও আমি আমার জায়গায় ঠিক থাকতে চাই।

ফুটবল বিশ্বকাপ দেখার স্মৃতি আগের গুলো তেমন মনে নেই। শুধু মনে আছে মিরোস্লেভ কোলেসা নামে জার্মানির যে খেলায়াড় এই বিশ্বকাপের আগ পযর্ন্ত সর্বাাধিক গোলদাতা ছিলেন তার সেই গোল দেওয়ার দৃশ্যগুলো আমার মনে আছে। তার আগে রোনালদোর গোল সংখ্যা বেশি ছিল। আমি তার খেলা দেখেই তখন বুঝেছিলাম এই খেলোয়াড় সর্বাধিক গোলদাতা হবেন। পরে তাই হয়েছিলেন। যদিও এই লেখা যখন লিখছি তখন তার সেই রেকর্ডে ভাগ বসিয়েছেন লিওনেল মেসি। আমি সেই কিশোর বয়সে খেলা দেখার সময় নোটখাতা রাখতাম। রেকর্ডগুলো লিখে রাখতাম। কে কত মিনিট সময়ে গোল দিলো সেটাও লিখে রাখতাম। তখন কি আর জানতাম এগুলো সব এমনিতেই রেকর্ড বই সংরক্ষণ করা হয়। আমার সবচেয়ে ভালো লাগতো গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার খেলা আর তেভেজের খেলা। এর বাইরে রোনালদিনহো,ডেভিড ব্যাকহাম,ওয়েন রুনি,ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এমনকি মেসির খেলাও ভালো লাগতো। জ্লানাতান ইব্রাহিমোভিসের খেলাও ভালো লাগতো। আজও মনে আছে বহু আগে শোনা ফুটবলের এক বিখ্যাত বাণী যেটা বলেছিলেন গ্যারি লিনেকার। তিনি বলেছিলেন “ফুটবল হলো এমন একটি খেলা, যেখানে ২২ জন মানুষ ৯০ মিনিট বলের পেছনে দৌড়ায় এবং শেষ পর্যন্ত জার্মানিই জেতে”।

এবার বিশ্বকাপ কে জিতবে জানি না। তবে এই বিশ্বকাপটা পর্তুগাল জিতলে পৃথিবীর শত কোটি লোক খুশি হতো। ক্রিষ্টিয়ানো রোনালদো নামে এক ফুটবল যাদুকর কতশত ট্রফি জিতেছে শুধু বিশ্বকাপ জেতা হয়নি। পর্তুগালের ইতিহাসেই শুধু নয় ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় বিশ্বকাপ ছাড়াই খেলা থেকে অবসরে যাক এটা কল্পনাও করতে খারাপ লাগে। যদিও তাদের প্রথম ম্যাচ তারা ড্র করেছে এবং রোনালদো পুরো খেলা জুড়েই ম্লান ছিলেন।

২২ জুন ২০২৬

এক নদী রক্ত পেরিয়ে

আকাশের রঙ বদলায়,রঙ বদলায় গিরগিটি আর সাগরের তলদেশে থাকা কাটল ফিশ। মানুষের জীবনের রঙও বদলে যায় ক্ষণে ক্ষণে। এ জীবনের রঙটাও হঠাৎই বদলে গেল। অমাবশ্যার ঘুটঘুটে অন্ধকারে নয়,পুর্নিমা চাঁদের আলোয় ভেসে যাওয়া রাতে নয়,সূর্য ডুবতে থাকা শেষ গোধুলীতে নয়,জীবনের রঙ বদলাতে শুরু করলো অনেকটা বলে কয়ে। কখনো ভাবিনি এমনটি হবে। বসন্ত আসে বসন্ত যায়। গাছে গাছে পুরোনো পল্লব ঝরে গিয়ে ফিরে আসে নতুন পাতা। সবুজে সবুজে ভরে যায় সারা পৃথিবী। তেমনি জীবন থেকে নিজের অজান্তেই পেরিয়ে যায় কত বছর। হঠাৎ একদিন অনুভব করি জীবনের অনেক পরিবর্তন এসেছে। আমিও তা অনুভব করতে পেরেছি।

যে আমি মায়ের আচঁলের তলে থেকে জীবনের আঠারটি বছর পার করেছি সেই আমিই আজ অন্যরকম এক পরিস্থিতির সম্মুখীন। আমি তাই এখন আর  মায়ের আঁচলের নিচে লুকিয়ে থাকা ভীতু বালকটি নই। আমার মনের মধ্যেও এখন অন্যরকম অনুভূতি জাগে। সেই অনুভূতির কথা আমি নিজেই নিজেকে বুঝাতে পারিনা। কখনো মনে হয় আমি বুঝি ডানা মেলা পাখি, ইচ্ছেমত উড়ে চলেছি তেপান্তরে। আবার কখনো মনে হয় আমি সাধক, যে জন্মেছে কেবল সন্যাসব্রত গ্রহণের জন্য। পরক্ষণেই হয়তো মনে হয়, না এসব কিছুই না, আমি মানুষ। সমাজ সংসারে আমার কত কাজ, কত দায়িত্ব। ক্ষণে ক্ষণে আমার মনের ভেতরে সব কিছু ওলট পালট হয়ে যায়। রঙ্গিন স্বপ্ন আমার বুকের মধ্যে বাসা বাঁধে। আবার হঠাৎই কোন কিছু জানান না দিয়েই উধাও হয়ে যায়। বয়সের অবিরাম ছুটে চলার মধ্য দিয়ে আমি পৌছে গেছি ভয়াবহ এক মুহুর্তে। চারদিকে কেবল মানুষের মনের মধ্যে নানা রকম আশঙ্কা দানা বেঁধে আছে। কখন কি হয় বলা যায়না। কিন্তু তাই বলে থেমে নেই প্রতিদিনকার জীবন প্রনালী। যে যার কাজে ব্যস্ত আছে ঠিকই। রিক্সা চালক রোজ রিক্সা নিয়ে বেরিয়ে পড়ছে পেড়ের টানে। নৌকার মাঝি দুটো মাছ ধরার আশায় পাল তুলে জাল ফেলছে পদ্মার ঘোলা জলে। বৃদ্ধ ছোমেদ মিয়ার মত মানুষেরা জীবিকার তাগিদে মাথায় তুলে নিচ্ছে ইটের ঝাকা। আর একদল মানুষ দিন রাত আর সব মানুষের দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে দিনাতিপাত করছে রাস্তায়-রাস্তায়, অলিতে-গলিতে মিছিল, মিটিং আর সমাবেশে উচ্চস্বরে গলা ফাটিয়ে বক্তৃতা দিয়ে। সেই বক্তৃতা শোনার জন্য সবাই কান উচু করে থাকে। রেডিওতে কখন এই সব বক্তৃতা প্রচার করা হবে তা নিয়ে থাকে সবার মধ্যে অপেক্ষায় থাকার প্রতিযোগিতা।

আমি এসব কিছুই ভাবতামনা । গ্রামে অনেকেইতো আমাকে খোকা বলে ডাকতো। যাকে মানুষ খোকা বলে ডাকে সে কি এতসব বুঝার মত বড় হয়েছে। আমিও তাই নিজেকে ছোট ভেবেই বসে ছিলাম। অথচ আমি যে আগেই বড় হয়ে গেছি সেটা একটি বারের জন্যও কেউ আমাকে বলে দেয়নি। আমার চাচার ছেলে রাসেল ভাই ঢাকায় থাকতেন। তিনিই প্রথম আমাকে কথায় কথায় অনেক কিছু বললেন। আমি দেখলাম সেসবের কিছুই আমি জানিনা। নিজেকে খুব হীন মনে হচ্ছিল। কিন্তু রাসেল ভাই আমার কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন ধুর বোকা এ আর এমন কি। তোর বয়সকি পেরিয়ে গেছে। সব জানতে পারবি। তার পর থেকে যে কয়দিন তিনি গ্রামে ছিলেন সে কয়দিন ওনার সাথেই ঘুরতাম। রেডিওতে খবর শুনতাম। ভাষণ ব্যাপারটা তখনই রাসেল ভাই আমাকে বুঝতে শিখিয়েছেন। এখন যে ভাষণ প্রচারিত হলে মানুষ কান খাড়া করে খুব অধীর আগ্রহ নিয়ে শুনতে থাকে আমিও নিজেকে তাদের দলে ভিড়িয়ে নিই। আমিও সেই সব কথা শোনার জন্য প্রতিক্ষীত মানুষের দলে মিশে থাকি। একদল মানুষ তাদের সমস্ত সুখ বিসর্জন দিয়ে রাজ পথে নেমে পড়েছে অধিকার আদায়ের মিছিল নিয়ে। আমারও খুব ইচ্ছে করে ঐ সব লোকদের পাশে গিয়ে দাড়াতে। আমারও ইচ্ছে এক সুরে সুর মিলিয়ে এক কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গাই আমার প্রিয় মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা। কিন্তু আমি পারিনা। আমি পারিনা আমার বিভিন্ন অপারগতার কারণে। কোনটা মায়াজাল আবার কোনটা পিছন থেকে আমাকে টেনে ধরে রাখার কারণে।

গ্রামের পাশ দিয়ে নদী। নদীর দুই ধারে সারি সারি আম কাঠাল আর সুপারি গাছ ঠায় দাড়ানো। বৈশাখ মাসে নদীর তীর ঘেসে বসে বৈশাখী মেলা। ঈদের মাঠে সবাই আনন্দ সহকারে কোলাকুলি করি। হিন্দুদের পূজোর সময় তার্ওা ঢোল বাজিয়ে আনন্দে মেতে ওঠে। অতি সাদামাটা একটা গ্রাম। সেই সাদামাটা গ্রামের একটা সাধারণ পরিবারে আমার জন্ম। সেই সাধারণ পরিবারের সুখ দুঃখ ভাগাভাগি করে আমার বসবাস। গ্রামের আর দশটা সাধারণ ছেলে মেয়েদের মতই জন্মের পর থেকে সেখানেই বেড়ে উঠেছি। আমার জীবনটাই তাই এক প্রকার সাদাসিঁেধ। ঈদ এলে নতুন জামা কেনার জন্য বায়না ধরার সাহস হতোনা কখনো। সংসারে বাবা, মা আর ছোট্ট একটা ভাইকে নিয়ে আমার দিন চলে নড়বড়ো আকারে। তবে যেভাবেই দিন চলুকনা কেন সুখ বলতে যা বুঝায় তার সবটাই আমি ভীষণ রকম উপলব্ধি করি। বাবা মায়ের স্নেহের আঁচল তলে আমি আর আমার ভাই দুজন আনন্দের সাথেই বেড়ে উঠেছি। আমার ভাই আমার পিঠেপিঠি নয় তবে ও আমার খুব ভাল বন্ধু। একসময়তো এমন ছিল দুজনে একসাথে একই প্লেটে ভাত না খেতে পারলে আমাদের দিনটাই খারাপ যেত। বাবা যদি আমাকে দুটো টাকা দিত আমি তা নিজের জন্য খরচ করতাম না। আমার ছোট ভাইয়ের জন্যও কিছু না কিছু কিনতাম। আমার ছোট ভাইও সেই শিক্ষাটা আপনা আপনি পেয়ে গেছে। আমাকে না দিয়ে সে বোধ হয় কোন দিন একটা পেয়ারাও খায়নি।

সময়টা বদলে গেছে ভীষণ রকম। চারদিকে বিপদের আবহ তৈরি। সম্মুখ সমরের প্রস্তুতি এখন আবালবৃদ্ধাবণিতা সকলের মাঝে। এই বিপদের দিনে আমার মনের ভিতরে জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরির লাভার উদ্গিরণ চলতেই থাকে। সেই লাভায় ইচ্ছে হয় সবাইকে জ্বালিয়ে দিই। ইচ্ছে হয় আরও অনেক কিছু কিন্তু সেগুলোর কোনটিই হয়ে ওঠেনা। রাত হলে আগে হুতোম পেচারা ডেকে উঠতো। সেই ডাক শুনে কতবার যে ভয়ে আমার ছোট ভাই আমাকে জড়িয়ে ধরেছে। এখন আর সেই সব হুতোম পেচা ডাকেনা। কোথায় যেন হারিয়ে গেছে সেই সব রাত জাগা হুতোম পেচা। যেন হঠাৎই ওজের যাদুকর এসে সবগুলোকে বন্দী করে নিয়ে গেছে। কিংবা হ্যামিলনের বাশিওয়ালার বাশি শুনে তার পিছু পিছু চলে গেছে হুতোম পেচারা। রুমাদের দীঘিতে যে সব পানকৌড়ি ভেসে বেড়াতো তারাও কোথায় যেন হারিয়ে গেল। যেন সমাজ সংসার ছেড়ে আমাদের ছেড়ে ওরা সবাই বৈরাগী হয়ে এ গ্রাম এ শহর ছেড়ে দূরে হিমালয়ের কোন এক অজানা অঞ্চলে হারিয়ে যাচ্ছে।

শহরের রাজপথ এখন অনেক মানুষের ভারি পদক্ষেপে প্রকম্পিত হচ্ছে। কেবল মাত্র একটা ডাকের অপেক্ষা। হয়তো তার পরই সবাই ঝাঁপিয়ে পড়বে সেই মহারণে। মিষ্টির টুকরাকে ঘিরে যেমন পিপড়ার সারি ঘুরতে থাকে শহর নগরে আজ সেইরকম সারি সারি মানুষ। তারাও যেন কি এক অমৃতের সন্ধান পেয়েছে। আমি তরতাজা তরুণ। আমার বয়স যখন মাঠে মাঠে ফুটবল কিংবা অন্যসব খেলাধুলার সামগ্রি নিয়ে দাপিয়ে বেড়ানোর। আমার এই বয়সটা যখন কোন কিছুকে পরোয়া না করার। ইচ্ছে হতো আমিও রুষে উঠি, আমিও ঐ সোনার ছেলেদের সাথে মিশে আমাকে ধন্য করে ফেলি। আবার আমার বাবা মা আর ছোট্ট ভাইটার কথা মনে পড়ে। আমার বুকের ভিতরে মোচড় মেরে ওঠে। আমি আর তেমন কিছুই ভাবতে পারিনা। আমি যতই ভাবতে যাই ততোই কেউ একজন আমাকে পিছনে টেনে নিয়ে যায়। কেউ একজন আমার কানের কাছে ফিস ফিস করে বলে, কী দরকার ওসবের মধ্যে জড়ানোর। আছোতো ভালোই, তাহলে বাপু ইচ্ছে করে কপাল এগিয়ে সিদুঁর নেওয়ার দরকার কি? কিন্তু আমার মনের মধ্যে যে একজন বসবাস করে সে বলে, দরকার আছে বৈকি। তোমাকেইতো যেতে হবে। দেখছনা তোমাদের মত আরও কত জন এগিয়ে যাচ্ছে নির্ভীক ভাবে। বলিষ্ঠ কন্ঠ তাদের আকাশ বাতাসকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। সেই সারিতে তুমি না থাকলে তুমিতো পিছিয়ে পড়বে।

আমি আমার অন্তরের ডাক শুনতে পাই। যে কাঠ পুড়ে পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে তাকে আর কতটুকুই বা পোড়ানো যায়। আমিও পুড়েছি আমার মাঝে বেঁচে থাকা সুপ্ত আগ্নেয়গিরীর ঘুমন্ত আগুনে। তাইতো অন্তরের ডাকে সাথে সাথে আমিও বুঝতে পারি সত্যিই আমাকে যেতে হবে। সত্যিই আমার যাওয়া দরকার। কিন্তু তবুও যেতে পারিনা। প্রতিটা মানুষের মস্তিস্কে দুটি বিষয় সব সময় থাকে তার একটি হল লজিক বা যুক্তি অপরটি হল আবেগ বা মায়া। লজিক যেটাকে বলে যাও এটা কর এবং এটা করাই যুক্তি যুক্ত, ঠিক সেই বিষয়টাই আবেগ বা মায়া নামের অংশটা বলে এটা করার কোন দরকার নেই। আমার এখন নিজেকেই ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে, আমি আবেগে গা ভাসিয়ে দেব, নাকি লজিকের পথটা বেছে নেব। একজন সচেতন মানুষ হিসেবে আমার লজিকের অংশটাই বেশি পছন্দ।

সেই সময়টাতে গ্রামাঞ্চলে শহরের মত অতটা প্রভাব না পড়লেও রেডিও টিভিতে শুনে শুনে মানুষের মনে ভয় জমে গিয়েছিলো। এই বুঝি আসছে, এই বুঝি হঠাৎ ঝড়ো হাওয়ার মত সব কিছু ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। আর চারদিকে উঠছে কান্নার রোল। গরীব চাষার দুয়ারে রাজার সৈন্যরা কর নিতে আসলে যেমন তার বুকের খাঁচা ভয়ে থর থর করে কেঁপে ওঠে ঠিক তেমনি সবাই ভয়ে তটস্থ। কিংবা তাদের কাছে মনে হতো এই বুঝি আর কেউ থাকলোনা প্রিয়জন হারানোর শোকে কাঁদার মত। টগবগে এক যুবক আমি। উনিশ কি বিশ বছর বয়স আমার। শরীরের শক্তি আমার মনের অজান্তেই বলে দেয় যা এখনো বসে  আছিস কেন? কিন্তু তবুও আমি যেতে পারি না। এর মাঝেই এসে গেল উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের সময়। বাবা মায়ের ইচ্ছে আমি যেন বড় কোন প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ পাই। আমাদের দেশে বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বলতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেই বুঝায়। আমারও আজন্ম কালের লালিত স্বপ্ন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বো। সেই আশা বুকে নিয়েই অতিবাহিত করেছি বারো বছরের দীর্ঘ স্কুল এবং কলেজ জীবন। আমি যতই এসব কথা ভাবি ততই মনের মধ্যে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়। আবার সাথে সাথেই সেটা বেদনার ছায়াতে কালো হয়ে ওঠে। কিছু প্রিয় মানুষকে ছেড়ে দূরে কোন একটা জায়গাতে একা একা থাকতে হবে ভেবে আমার ভেতরে কেমন যেন করে ওঠে। তার পর আসে সেই কাংক্ষিত দিনটি। আমার যাবার কথা ভেবে বাবা মা আগেই সব কিছু রেডি করে রেখেছেন। তাদের মনের মধ্যে আমাকে নিয়ে অনেক আশা, অনেক স্বপ্ন প্রতিনিয়ত দোলা দিয়ে যায়।

মা আমার জন্য নাড়– তৈরী করে রেখেছে। বাবা বাজার থেকে এক কেজি চিড়া কিনে এনে রেখেছে। আমার মা জানতো আমি খুব বেশি চিড়া আর নাড়– পছন্দ করি। এক প্রকার মন চাইছিলো, আবার মনটাকে শান্তনা দিতে পারছিলাম না যে, এই সব প্রিয় মানুষেরা পড়ে থাকবে এই গ্রামে, যেখানে আমি মাঠে, ঘাটে, প্রান্তরে হেসে খেলে বড় হয়েছি । আর আমি থাকবো দূরে অচেনা একটা শহরে। যেখানে আমার থাকার কোন পরিচিত জায়গা নেই। স্নিগ্ধ বাতাস নেই, যে বাতাসে শ্বাস নিয়ে বেড়ে উঠেছি মুক্ত বিহঙ্গের মত। শান বাঁধানো পুকুর নেই, যে পুকুরে ডুব সাতার খেলেছি চাচাতো ভাইবোনদের সাথে। নেই মহিতোষ জেঠুর মিষ্টির দোকান, যেখান থেকে প্রতি হাটে বাবা আমাদের দুই ভাইয়ের জন্য গজা কিনে আনতেন। আমি এমন এক শহরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি যেখানে আমি এর আগে কোন দিন যাইনি। এমনকি রাসেল ভাই ছাড়া আমার পরিচিত এমন কেউ নেই যে সেই শহরে থাকে। যার কাছে গিয়ে আমি উঠতে পারবো, নিজেকে মানিয়ে নেওয়া পর্যন্ত তার কাছে থাকবো। অথচ এই আমার ছোট্ট গ্রামটিতে বাতাস বয়ে আনে আমার বন্ধুদের শরীরের ঘ্রান। মনে হয় বন্ধুরা আমার সাথেই আছে। রাতের অন্ধকারে নদীর ধারে হাটলে মনে হয় এই নদী আমার ব›ধু এই গাছ এই পাখি সব আমার আপনজন। অথচ এসব আর আমার সঙ্গী হবেনা।

ছোট্ট একটা চিরকূটের মত কাগজে বাবা তার এক বন্ধুর ছেলের ঠিকানা লিখে দিয়েছেন। আমাকে আজ সেখানে গিয়ে থাকতে হবে। আমি তাকে কোন দিন দেখিনি পযর্ন্ত। সেখানে সবাই আমার অচেনা, সবাই আমার অজানা। যেন দূর বিদেশ থেকে আগত কোন অবাঙ্গালী যে কারো সাথে কথা বলে বুঝাতে পারছেনা যে সে কি চায়। আমি সেই অজানা আঙ্গিনাতে একাকী কেমন করে থাকবো সে কথা আমি কোন ভাবেই ভাবতে পারিনা। আমি আমার ছোট্ট ব্যাগটিতে আমার প্রয়োজনীয় কাপড় এবং টুকিটাকি জিনিস ভরে নিয়ে বাবা মায়ের দোয়া নিয়ে বেরিয়ে যাই। মায়ের চোখে তখন জল ছিল আমি তা দেখার সাহস পাইনি। বাবার বুকে তখন ভালবাসা ছিল সে বুকে নিজেকে জড়িয়ে নিতে পারিনি। ছোট্ট ভাইটি স্কুলে থাকায় শেষ বারের মত তার সাথে দেখাও হয়নি। স্কুল থেকে ফিরে আমাকে না পেয়ে সে দিশে হারা হয়ে এ ঘর ও ঘর করবে আর তার বুকে শুন্যতা এসে ভর করবে। বাবা মাকে ফেলে রেখে আমি যখন বাড়ী ছেড়ে অনেকটাই দুরে এসে পৌছেছি, ঠিক তখন পিছন থেকে আমার কানে ভেসে আসে একটা নারী কন্ঠ। সেই নারী কন্ঠের ডাকে আমি আমার মনের অজোন্তেই থমকে দাড়াই। এই কন্ঠটা আমার অনেক দিনের চেনা। অনেক আগের থেকে আমার অন্তর আত্মার সাথে সেই কন্ঠটি মিশে আছে। আমার স্বপ্ন এবং জাগরণে তার ছবি আমি দেখেছি। একাকী এবং আধো আলো ছায়ার রাতে আমি যখন নির্ঘুম কাটিয়েছি তখন সে ছিলো আমার স্বপন সঙ্গী।

এক গ্রাম্য বালিকার ডাকে আমি যখন থমকে দাড়াই, তখনই টের পাই আমি এক প্রকার মায়ার বন্ধনে বাঁধা পড়ে গেছি। আমার বাবা বলতেন ‘‘জানিস মায়া বড় কঠিন জিনিস ,একবার মায়াতে পড়ে গেলে সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে সময় লাগে। অনেকেই বেরিয়ে আসতে পারেনা, সেই অনেকের মধ্যে মহাপুরুষরাও থাকে। সুতরাং সব সময় চেষ্টা করবি যেন কোন মায়া তোর পথের সাথী না হয়।’’ বাবার কথা এখন বার বার মনে পড়ছে। হয়তো আগেও পড়তো, যদি না বাবা মায়ের কাছ থেকে এভাবে কোথাও পাড়ি জমাতাম। এর আগে কোন দিন এমনটি হয়নি। আমি আগে কখনোই এমন ভাবে কোথাও অনেক দিনের জন্য পাড়ি জমাইনি বলেই হয়তো ব্যাথাটা অনুভব করতে পারিনি। আমাদের গ্রামের সেই মেঘ বালিকাটি, যার সাথে আমার কেটেছে অনেকটা বছর। যে ছিলো সেই ছোট বেলা থেকেই আমার খেলার সাথী। তাকে না দেখলে  আমার কোন কিছুই ভালো লাগতোনা। সেই প্রিয় মানুষটিকে ফেলে রেখে আমি যখন একাকী শহরে পাড়ি জমাচ্ছি তখন সেই মানুষটি আমার পথ রোধ করে দাড়ালো। বললো, আমাকে না বলেই চলে যাচ্ছ? আমি তখনও বুঝতে পারিনি এতে বলে যাওয়ার কী আছে? তার সাথে আমার সর্ম্পকটা ছিলো বন্ধুত্ব বন্ধুৃত্ব। এক সাথে স্কুলে পড়েছি, এক সাথে কলেজও পার করে এসেছি। আমি তাকে পাশ কাটিয়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করলাম কিন্তু পারলামনা। বার বার আমার মনের মধ্যে কেউ একজন আমাকে পিছনে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলো। আমার মন বলছিল অনেক কথা। আমি তাকে কোন রুপ সুযোগ না দিয়েই বললাম, আমি তাহলে আসি। সে তখন আমার দিকে ছলছল চোখে তাকিয়ে থাকলো। যেন তার মুখের ভাষা মুর্হুতেই উবে গেছে। আমি দেখলাম তার চোখে পানি । আমি বুঝতে পারিনি সে কেন কাদঁছে। আমি সেই ছোট বেলার মতই তার চোখের পানিটুকু হাতের তালু দিয়ে মুছে দিয়ে বললাম, দুর পাগলী কাঁদতে হয় নাকি। কিন্তু এই কথা বলার সাথে সাথে সে আরও জোরে কেঁদে উঠলো। সেই সাথে সে আমাকে জড়িয়ে ধরলো। এই প্রথম কোন মেয়ে আমাকে এভাবে জড়িয়ে ধরলো। গ্রাম্য সমাজের চোখে এটা খুবই খারাপ কাজ। আমি ওকে হাত দিয়ে সরিয়ে নিয়ে আশে পাশে লক্ষ্য করলাম কেউ বিষয়টা দেখলো কিনা। আমি যখন নিশ্চিত হলাম যে কেউ দেখেনি, তখন তাকে প্রশ্ন করলাম, আজ তোমার কী হয়েছে যে তুমি ওভাবে কাঁদছো ? সে তখন অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে বললো, ‘না কিছুই হয়নি কাঁদছি আমি আমার মনের সুখে।’ আমি অবাক হলাম এই ভেবে যে, মনের সুখেও মানুষ কাঁদেনাকি। আমি কোন কিছু বলছিনা দেখে সে বললো, আমি কেন কাঁদছি তা তুমি এখনো বুঝতে পারলেনা? আমি সেই ছেলেবেলার বন্ধুত্বের মত তাকে বললাম, ঠিক আছে আমাকে না হয় বলে দাও। কিন্তু সে কোন কথা বললো না। বরং আরও জোরে জোরে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে লাগলো। এর পর আমাকে কোন কথা না বলে ওড়নার আঁচলে চোখ মুছে পালিয়ে গেল।

সে চলে যাওয়ার পর আমিও আবার চলতে শুরু করলাম। সেদিন তার পায়ে নুপুর ছিল যা সে বাউলাখালির মেলা থেকে কিনেছিল। সেই নুপুর তার পায়ে মানিয়েছিল বেশ। চলে যাবার সময় তার নুপুরের ধ্বনি আমার কানে ভেসে আসছিল। যে ধ্বনি শরীর ছোয়া দূরত্ব থেকে বেজে উঠেছিল তা ক্রমে ক্রমে দূরে মিলিয়ে গেল। শুধু নুপুরের অস্পষ্ট ধ্বনি আমার হৃদয়ের কোন এক আঙ্গিনায় বাজতে থাকলো একই তালে। এর কিছুক্ষণ পরই আমি অনুভব করলাম তাকে ছেড়ে আসতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। যে কষ্টটি এর আগে কোন দিন আমার হয়নি। ভালবাসার কোন দেশ নেই,ভাল লাগার কোন সংজ্ঞা নেই। আমি মনে মনে ভাবলাম, আমি কি তাহলে তাকে ভালোবেসে ফেলেছি ? আবার ভাবলাম, তাওবা কি করে হয়? আমিতো তাকে শুধু বন্ধুই ভেবেছি। আর সেওতো আমাকে বন্ধুই ভাবতো। এখন যদি তাকে ভালোবাসার কথা বলি তাহলে সে যদি মুখ ফিরিয়ে নেয়। তাই এ কথা মন থেকে মুছে ফেলে হাটতে শুরু করি। সারি সারি তাল সুপারি গাছ। গ্রামের রাস্তার এই অপার সৌন্দর্যকি আমি শহরে দেখতে পাব?

মাইল তিনেক পথ আমাকে হাটতে হবে, তবেই একটা ইটের রাস্তা পাওয়া যাবে। সেখান থেকে একটা ভ্যান গাড়ি করে আরও মাইল পাঁচেক যাওয়ার পর বড় রাস্তার মোড়। সেখানেই ঢাকা যাওয়ার গাড়ি থামে। এতটা পথ চলার পর ঢাকা যাবার গাড়ি হয়তো আমাদের ধরতে হতোনা। কিন্তু সব আমাদের ভাগ্যের লেখনী। ব্রিটিশরা এদেশ ছেড়ে চলে গেছে বহুবছর আগে। কিন্তু আমাদের ভাগ্যের সিঁকে ছেড়েনি। বাবা মায়ের মুখে শুনেছি, একসময় এদেশে জোর আন্দোলন শুরু হলো। ভারত পাকিস্তান আলাদা হয়ে গেল। সেই আন্দোলনের সময়ও বঙ্গবন্ধু নামের এই মানুষটি ছিলেন। তিনি নিজেই নাকি মানুষকে স্বপ্ন দেখাতেন, পাকিস্তান হলে আমাদের ঘরে শান্তি আসবে, দেশের সব কিছুতেই উন্নতি হবে। কিন্তু আমাদের ভাগ্য ফেরেনি। সেই আগে যেমন রাস্তা ছিল এখনো তেমনই আছে। কাদায় ডুবে থাকে প্রায় সমস্ত রাস্তা। ঘোড়া আর গরুর গাড়ি চলা ছাড়া এসব রাস্তায় অন্য কিছু চলতে পারেনা। এখন বৃষ্টি নেই, তাই দু’একটা ভ্যান চলে। আমাদের যে স্বপ্ন দেখানো হয়েছিলো সেই স্বপ্ন ছিল এরকম যে, রাস্তাঘাট পাঁকা হবে,ট্রেন চলবে,বাস চলবে,কলকারখানার চাঁকা ঘুরবে। সেই সাথে বাঙ্গালীদের ভাগ্যের চাঁকাও ঘুরবে। পাকিস্তান হলো, কিন্তু বাঙ্গালীদের ভাগ্যের চাঁকা আর ঘুরলোনা। শেখ মুজিব নামে যাকে আজ সবাই বঙ্গবন্ধু বলে চিনি, সেই তিনিই একদিন স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন স্বাধীন পাকিস্তানের। সেই স্বাধীন পাকিস্তান হয়েও যখন বাঙ্গালীদের সুখ আসলোনা, তখন তিনি সত্যটা অনুধাবন করতে পারলেন। আজ সারা দেশে মানুষ সেই সত্য উপলব্ধি করেই স্বাীন বাংলাদেশ গড়ার মিছিলে শামিল হচ্ছে।

পাকিস্তানের স্বপ্ন দেখানো সেই মানুষটিই এখন স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে তিনি নির্বাচনে জয়ী হয়ে বাঙ্গালীদের স্বপ্ন সত্য করার পথে দুই তৃতীয়াংশ এগিয়ে গেলেও পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী তাকে ক্ষমতায় বসতে দেয়নি। ঠিক এরকম একটা পরিস্থিতিতে গোটা দেশ উত্তপ্ত। সেই সময়ে বাবা মায়ের কথা মত আমি উচ্চ শিক্ষা নিতে ঢাকার পথে রওনা হয়েছি। যেখানে দেশের ভাগ্য নিয়েই দোটানার মধ্যে বসবাস, সেখানে ক্ষুদ্র এই আমি আমার ভাগ্যের কথা চিন্তা করছিনা। নানা চিন্তা আমার মাথায় এসে ভর করছে। যতদিন গ্রামে ছিলাম, এসব চিন্তার কোনটিই আমার মাথায় আসেনি। আজ হাটছি আর মাথার মধ্যে নানা চিন্তা গিজ গিজ করে উঠছে।। ঘন্টা খানেক হাঁটার পর আমি সেই ইটের রাস্তায় পৌছে আলীমুদ্দি নামে এক ভ্যান চালকের ভ্যানে চেপে বসলাম। তাকে আমি চিনি না, কিন্তু অন্যদের ডাকাডাকির কারণে নামটা জানতে পেরেছি। আমার মত কিংবা আমার চেয়ে কিছুটা বয়সে ছোটই হবে সে। কিন্তু তার কর্ম জীবন শুরু হয়েছে আরও দশ বছর আগে। এর মাঝে সে বিয়ে করেছে, আবার দুটো বাচ্চার বাপও হতে পেরেছে। এতো অল্প বয়সে বাপ হওয়া কোন কৃতীত্বের বিষয় নয় বরং সেটা একটা ভীতির কারণ। সন্তাানকে লালন পালন করানো ছাড়াও আরও অনেক ঝামেলা পোহাতে হয়। আমি কারো বাবা নই তারপরও আমি আমার বাবার কথা চিন্তা করেই এটা বুঝতে শিখেছি যে, বাবা হওয়া অনেক কষ্টের ব্যাপার। আমি বাবাকে যখন যা কিনে দিতে বলি বাবা তাই এনে দেয়, অথচ সন্তান হয়ে বুঝতে চেষ্টা করিনা বাবা জিনিসটা কিভাবে এনে দিলেন। তার কাছে কি যথেষ্ট পরিমান টাকা ছিল? তিনি কি খেয়েছেন, নাকি না খেয়ে আছেন। বাবার সুখ দুঃখ আমাদের মত ছেলে মেয়েদের চিন্তাতেও আসেনা। আমি অবশ্য বিভিন্ন বই পড়ে পড়ে বাবা মায়ের কষ্ট অনুভব করতে শিখেছি অনেক আগেই। আমাদের সমাজের অনেকেই সেটা শেখেনা। তারা বরং বাবাকে, মাকে নানা বিষয়ে চাপ দিতে থাকে। সমাজের এই অবক্ষয় শুধু শহরের নামি দামি স্কুলে পড়–য়া ছেলে মেয়েদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, এখন তা ছড়িয়ে পড়েছে চারদিকে মহামারি আকারে।

কত বাবা সন্তানের  চাহিদা পুরণ করতে না পেরে আত্মগ্লানীতে ভুগে মারা গেছে তা এখন রীতিমত ইতিহাস। আলীমুদ্দি নামের যে ছেলেটির ভ্যানে আমি চেপে বসেছি সে নিশ্চই ইতিমধ্যে বাবা হওয়ার যন্ত্রনা বুঝতে শুরু করেছে। কিন্তু বাবা মা এমনই যে শত কষ্ট হলেও তারা সেটা সন্তানকে বুঝতে দিতে চাননা। আলীমুদ্দিও হয়তো তার গোপন কষ্ট আর ব্যাথা লুকিয়ে রেখেছে। আমাদের হৃদয়টাও এক অচেনা ভুবন। একটাই ঘর অথচ হৃদয় নামের সেই অদ্ভুত ঘরেই বাস করে সুখ দুঃখ হাসি কান্না হতাশা সব। কারো সাথে যেন কারো বিরোধ নেই। যখন যার ইচ্ছে বেরিয়ে আসে। এই হাসায় তো এই কাদিয়ে একাকার করে দিয়ে যায়। আলীমুদ্দির ভ্যানে চেপে বসার সাথে সাথেই আমার গ্রামটাকে আমার কাছে অচেনা মনে হতে লাগলো। আমার  চারদিকের সব দৃশ্য আস্তে আস্তে অচেনা হতে শুরু করলো। আর বুকের মধ্যে অজানা ব্যাথা হুহু করে কেঁদে উঠলো। সেই ব্যাথা কি আমার বাবা মায়ের জন্য? আমার গ্রামের জন্য? নাকি আমার খেলার সাথীদের জন্য তা আমি বুঝতে পারলাম না। কিন্তু আমার মনের মধ্যে কেউ একজন বাস করে, যে আমাকে বার বার বলে দিচ্ছিলো যে, এই ব্যাথাটা আমার বাবা মার জন্য এবং সেই সাথে আমার সেই ছোট বেলার সাথী মেঘবালিকাটির জন্য। যার সাথে আসার সময়ও দেখা হয়েছিলো এবং সে অনেক কিছু হয়তো বলতে ইচ্ছে করেছিলো। যে কথা বলা হয়নি সে কথার কোন দাম নেই, যে কথা শোনা হয়নি সে কথাই অমুল্য। আমার ফেলে আসা মেঘবালিকা যে কথা বলতে চেয়েছিল অথচ আমি শুনতে চাইনি তা এখন আমাকে পুড়াচ্ছে। তার অভাব আমি অনুভব করছি। সে চলে যাবার পর থেকে একটু একটু করে আমি অনুভব করতে পারছিলাম যে, আমি ঐ মেয়েটিকে ভালোবেসে ফেলেছি। কিন্তু সেই ভালোবাসার কথা এখন আর তাকে জানাতে পারছিনা। এ আকাশ আমার কথা শুনবে না যে আমি তাকে খবর পাঠাবো। এ বাতাস আমার অচেনা যাকে দিয়ে আমার মনের কথা পাঠিয়ে দেব গ্রামে ফেলে আসা বালিকা বন্ধুর কাছে। এই এতটুকু সময়ের ব্যবধানে আমার স্বপ্ন ডানায় ভর করে উড়ে চলা মন পাখির ডানার রঙ ফিকে হয়ে গেছে। আমি ভাবলাম শহরে পৌছে বাবা মাকে যখন চিঠি লিখবো তখন না হয় তাকেও একখানা লিখবো। সেই চিঠিতে থাকবে অনেক আবেগ, অনেক না বলা কথা। যা আজ একা একাই মনের গহীনে জন্ম নিয়েছে। সেই কথা গুলোও কেবল তাকে নিয়েই গড়ে উঠেছে। ঝাউ বনে দোলা দিয়ে যাওয়া বাতাসের মত আমার মনের আঙ্গিনায় কোন এক রঙ্গিলা বাতাস আমাকে উদাস করে দিচ্ছে। দূর পাহাড়ের সুউচ্চ চূড়া থেকে নিয়ে আসছে স্মৃতির রাশিমালা। একথা ভাবতে ভাবতেই আলীমুদ্দির ভ্যানটি বাস ছাড়ার স্থানে চলে আসে। আর সাথে সাথেই কিছু সময়ের জন্য ক্ষান্ত দিতে হয় আমার প্রিয় ভাবনা গুলিকে।

ভাড়া মিটিয়ে আমি একটা টিকেট কিনে নিজের সিটে গিয়ে বসি। এমন একটা ভাল গাড়িতে এর আগে আমি কখনোই চড়িনি। আমি নীলগঞ্জের মোড়ে দাড়িয়ে ছোট ছোট বাস, টেম্পু এসবই দেখেছি, সাথে কলেজে যাবার সময় এরকম দু’চারটে গাড়িও দেখেছি, কিন্তু এই প্রথম আমি এমন একটা গাড়িতে চড়ে বসলাম। গাড়ির সিটটা সুন্দর। আমার অজানা এই পৃথিবীর নিরানব্বই ভাগ। আস্তে আস্তে আমার সামনে নব দিগন্তের সুচনা হচ্ছে, আর আমি সেটা আমার দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছি। এসব ভাবতে ভাবতেই এক সময় আমার যাবার গাড়িটি ছেড়ে দেয়, আর পিছনে পড়ে থাকে আমার সব পরিচিত মুখ, সব চেনা জানা দৃশ্য। কিন্তু মনটাকেতো আর বেঁেধ রাখা যায়না। আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল, তাহলে মনের গতি কত? মনতো আলোর চেয়ে দ্রুত চলতে পারে। আচ্ছা এই বিষয়টা নিউটন বা আইনস্টাইনের মাথায় আসেনি কেন। অবশ্য এসেছিল কিনা সেটাইবা কে জানে। কোন বিজ্ঞানী কখন কি ভেবে গেছেন তা হয়তো আমাদের কাছে সঠিক ভাবে পৌছেনি, তাই আমরাও জানতে পারিনি সত্যিই তারা মনের এই গতিবেগ নিয়ে আদৌ চিন্তা করেছিল কিনা। মন এমন একটা আশ্চর্য জিনিস ইচ্ছে করলেই যে কোন সময়ে চলে যেতে পারে। মন যেমন অতীতে ফিরে যেতে পারে, আলো সেটা পারেনা। মন হচ্ছে কবিদের ভাষায় অচিন পাখি, যা ধরতে গেলে যায়না ধরা। তাই সে তার নিজের মত করে অনেক কিছু ভাবতে থাকে। ভাবতে থাকে শহরে গিয়ে কিভাবে কি করবে, কোথায় কিভাবে চলবে । সেই সাথে ভাবতে থাকে চলে আসার সময়ে তার সেই প্রিয় বালিকা বন্ধুর মুখটি।

আমার সেই বালিকা বন্ধুটি সামান্য সময়ের ব্যাবধানে আমার মনের মধ্যে ভালোবাসার মানুষে পরিণত হয়েছে। আমি তাকে মনে মনে নাম দিলাম তমালিকা। কারণ সে ছিলো ফুলের মত নরম এবং কোমল। তার হাতের ছোয়া ছিলো প্রজাপতির পাখার মত কোমল। একবার যদি সে চোখ তুলে তাকাতো; তবে তার সেই চাহনীর অপূর্ব সৌন্দর্য পৃথিবীর সব সৌন্দর্য্য বিমলিন করে দিত। যদি একবার সে হাসতো তবে পৃথিবীর সব আলো তার হাসির নিচে চাঁপা পড়ে যেত। তমালিকা আর তরুলতা যাই বলিনা কেন, তাতে তার সৌন্দর্যের তুলনা হয়না। তমালিকা! যদিও এটি তার আসল নাম নয়।  বাবা মা তাকে নাম দিয়েছিলো আলেয়া। আলেয়া মানে ভ্রম কিন্তু আমি বলি আলেয়া মানে আলোর প্রদীপ।সে একটি আলোর প্রদীপের মতই। সে  তার বাবা মায়ের মনকে আলোকিত করেছে। আবার কেউ কেউ তাই সারা জীবন আলেয়ার বা ভ্রমের পিছনে ছুটে ছুটে ক্লান্ত হয়ে যায়। আমার কাছে অবশ্য এই আলেয়াকে কখনোই ভ্রম মনে হয়নি।  গ্রামের সবুজের সাথে মিশে তার রুপ দিন দিন আরো আলোকোজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। আমরা যখন একসাথে স্কুলে যেতাম তখনই দেখেছি অন্য সব ছেলেরা মেয়েরা ওর দিকে তাকিয়ে থাকতো। যেন মানুষ নয়, কোন হুরপরী দেখছে। তার এই সুন্দর রুপ এতোদিন আমার চোখে ধরা পড়েনি। আমি কেবল তার কন্ঠ শুনেছি। আমি কেবল তার চলার সময় নুপুরের শব্দ শুনেছি। তার কন্ঠ, তার নুপুরের ধ্বনি শুনেই আমি যেখানে মন্ত্রমুগ্ধ, সেখানে তার রুপ দেখার কথা আমার মনে থাকার কথাই নয়।আমি একটা কবিতা পড়েছিলাম ”পা দুখানি দেখতে দেখতে মূখ দেখতে ভুলে গেছি।” কবির নাম মনে নেই। সেই কবির মত স্বভাবতই তাই তার রুপ দেখার কথা আমার মনেই ছিলনা। আর আজ, এই প্রথম আমি তার সত্যিকার সৌন্দর্য্য দেখতে পেলাম। যাও ছিলো ক্ষণিকের জন্য। আমি সেই ক্ষনিকের স্মৃতিকে বুকের মধ্যে ছবির মত এঁেক নিয়েছি। সেই ছবিটি আমি রোজ সকাল সন্ধ্যায় দেখবো। ছবি জিনিসটা খুব অবাক করে দেয়ার মত। কেউ ইচ্ছে করলেই তার জীবনটাকে বেঁধে রাখতে পারে ছবির মাধ্যমে। ছোট বেলা একটা মানুষ দেখতে কেমন ছিল তা সে বড় হলেও দেখতে পারে ছবির মাধ্যমে। ছবি তার বয়সকে বেঁধে রাখে ফ্রেমের মাধ্যমে। আমার মনে এখন নানা ধরনের চিন্তা দেখা দিতে শুরু করেছে। দূর পাল্লার বাসে এর আগে কখনো চড়িনি। আমার পরিধি ছিল দিনাজপুরের ভেতরে সীমাবদ্ধ। মনেও পড়েনা যে, নানা বাড়ি ছাড়া আমি কখনো কোথাও গিয়েছি কিনা। অনেকটা নিজেকে কুপমন্ডুক বলে মনে হয়। যার সীমানা কেবল ছোট্ট কুয়োর জল টুকুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। আর সেই জলাশয়কেই তার মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জলাশয়। বাবা, মা, ভাই, পরিচিত জনকে ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট আমার বুকের এক কোনায় গেঁথে গেছে। বুকের মাঝখানটা আমার প্রিয় গ্রাম আর মেঘবালিকাকে ছেড়ে যাওয়ার কষ্টে নীল হয়ে আছে। আর বাকি পাশটাতে আস্তে আস্তে ভীড় করছে নতুন কিছু জানা ও দেখা অদেখা সুখ। সেই অদেখা সুখ যদি আমার প্রান প্রিয় মা বাবা, গ্রাম কিংবা মেঘবালিকাকে ছেড়ে আসা দুঃখকে ভুলিয়ে দেয়, আমি তখন আর কোন সাধারন মানুষ থাকবোনা।

আমার মমত্ববোধ,ভালবাসা সব একীভূত হয়ে আমি মানুষ থেকে ভিন্ন কিছু হয়ে যাবো। হতে পারে রক্তমাংশের আদলে গড়া কোন মুর্তি কিংবা ভালবাসা, ঘৃণা, ভয়ের উর্ধে থাকা কোন মহাপুরুষ। অথচ আমি এ দ’ুটোর কোনটিই হতে চাইনা। আমি না হতে চাই মহাপুরুষ, না ভীরু কাপুরুষ। স্বাভাবিক যে জীবনে ছন্দ আছে,সুখ আছে,বেদনা আছে, আমি সে জীবনই প্রত্যাশা করি।  রবীন্দ্রনাথের নির্ঝরের স্বপ্ন ভঙ্গ যেমন ভালো লাগে তেমনি ভালবাসি নজরুলের বিদ্রোহী।

বাসের জানালা দিয়ে হুহু করে বাতাস আসছে। সেই বাতাসে সামনের সিটে বসা তরুনী বা কুমারী যাই বলিনা কেন তার ঘন কালো চুল উড়ছে। দু’একটা চুল সিটের বাঁধা পেরিয়ে আমার মুখে এসে লাগছেনা তা নয়। মিষ্টি সুবাশ মনকে স্বাভাবিক ভাবেই উতলা করে তোলে। দু একবার সে চুল সরিয়ে দিয়েছি কিন্তু সেই চুলের গোছা বাতাসের সঙ্গী হয়ে বার বার ফিরে আসছে। আমি কোন মহাপুরুষ নই, তাই চুল গুলোকে আর ঠেলে সরিয়ে দিচ্ছিনা। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাই, বাস ছুটে চলেছে দূরন্ত গতিতে। সেই সাথে সদ্য দেখা দৃশ্য পিছনে চলে যাচ্ছে। অদ্ভুত এক দৃশ্য। মনে হচ্ছে আমাদের বাস নয় পাশ থেকে দৃশ্য গুলোই সরে যাচ্ছে। আকাশে যেমন মেঘ ভেসে চলে, মনে হচ্ছে আজ আমিই ভেসে যাচ্ছি। কিছুক্ষণ পর পর আমার মন সত্যি সত্যি খারাপ হয়ে যাচ্ছে ফেলে আসা কিছু মুখ মনে করে। আমি জানি মুখগুলো সব সময়ই আমার চোখের পর্দায় ভেসে থাকবে। আমি কল্পনাতে ফিরে যাই ফেলে আসা সবুজে ছাওয়া গ্রামে। যেখানে আমার মা, বাবা, ভাই,পাড়া প্রতিজন আছে,চির চেনা স্কুল আছে,নদী আছে,আম বাগান,লিচু বাগান আছে, আর আছে আমার শিশুকাল থেকে শুরু করে শৈশবের প্রতিটি দিন একসাথে কাটানো খেলার সাথী, পড়ার সাথী, মেঘবালিকা।

কতক্ষণ এভাবে চলেছে তা আমার জানা নেই। হয়তো ভাবতে ভাবতেই আমি এক সময় ঘুমিয়ে পড়েছি। বাসের হেলপারের হাক ডাকে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। আমি শুনতে পেলাম যে ইতিমধ্যেই আমি ঢাকায় পৌছে গেছি। তাড়াতাড়ি তল্পিতল্পা গুটিয়ে নিয়ে বাস থেকে খোলা আকাশের নিচেয় রাজ পথে নেমে আসি। ভাবতে ভালো লাগে আমি সেই আকাংখিত ঢাকা শহরে চলে এসেছি। শুনেছি যেখানে রাতের আকাশে তারা ঝকমক করুক বা না করুক পুরো শহর থাকে আলো ঝলমলে নানা রঙ্গের আলোক বাতি। আজ আমি এই মুর্হুতে সেই স্বপ্নের শহরে এসে পৌছেছি। স্বপ্নের শহর আমাকে যতই কাছে টানুক তার মোহজালে, তার পরও মনটাতে ভীড় করে আছে সেই সব পুরোনো স্মৃতি। শহরে পৌছানোর পর চারদিক আমার অন্ধকার মনে হতে শুরু করলো। আমার পৌছার খবরটাও ইচ্ছে করলে এখন আমি আমার বাবা মাকে কিংবা প্রিয় সেই মানুষটিকে জানাতে পারছিনা। নতুন এসেছি বলে ঢাকা শহরের কোন কিছুই আমার চেনা জানা নেই। এখানে সেখানে নানা আকারের দোকান-পাট, বাড়ী-ঘর, মস্ত বড় দালান কোটা। একটু পর পরই ছোট বড় নানা আকারের অলি গলি। কোন গলিতে ঢুকলে কোথায় যাওয়া যাবে তার কোন হিসাব নেই। বাবার লেখা চিঠিটার কথা মনে পড়তেই আমি পকেটে হাত দিই। কিন্তু আমার কপালে যে এমন কিছু লেখা আছে আমি তা কোন দিন ভাবতেও পারিনি। আমার কপালে নেমে আসছে চরম দুর্ভোগ, সেটা আমি বুঝতে পারলাম আমার জামার পকেটে হাতটা ঢুকিয়েই। সেখানে বাবার লেখা চিরকুটটির টিকিটিও নেই। আমি মনের ভুলে সেটা পড়ার টেবিলে ফেলে রেখে চলে এসেছি। মা যখন ঘর গুছাতে যাবে তখন ওটা চোখে পড়বে এবং আমার পরিণতির কথা ভেবে আকাশ ফাটানো বিলাপ করতে থাকবে। বাবা হয়তো মাকে শান্তনা দেবার  জন্য বলবে কাঁদছো কেন সালেহা! তোমার ছেলেকি আর সেই আগের মত ছোট আছে যে সে হারিয়ে যাবে? কিন্তু আমিতো জানি আমার মা বিনা কারণে কাঁদছে না। তার মনের মধ্যে যে ভয় ঢুকেছে তার কোনটিই মিথ্যা নয়। আমি যে, যে কোন সময় হারিয়ে যেতে পারি তা বলাই বাহুল্য। শুধু এতটুকু ভরসা যে আমি লেখাপড়া জানা তরতাজা তরুন। ফলে যে কারো কাছে জেনে নিতে পারবো কোথাও যাওয়ার আসল রাস্তা কোনটি। কিন্তু আসল সমস্যা হলো এই ঢাকা শহরে আমি এক অচেনা যুবক, যাব কোথায়? থাকবইবা কোথায়?

বাস ঢাকাতে পৌছে যে জায়গাতে থেমেছে, একজনকে জিজ্ঞেস করে জেনেছি জায়গাটার নাম গাবতলী। গন্তব্যহীন ভাবে আমি হাটতে শুরু করলাম। হাটতে হাটতে এক সময় আমি অনেকটা দূরে চলে আসলাম এবং একটি খোলা মাঠের পাশে গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিতে ইচ্ছে পোষন করলাম। শহরে এই জায়গাতে এতো বড় মাঠ কিভাবে থাকে তা আমি ভাবতে পালছিলামনা। পরে জানলাম ওটা একটা কলেজ মাঠ আর কলেজটির নাম বাংলা কলেজ। যে ভাষার জন্য বায়ান্নতে রাজপথ কাপিয়ে মিছিল উঠেছিল। আমাদের পূর্বসুরীরা বিলিয়েছিল বুকের তাজা রক্ত। সেই বাঙলাকে মিশিয়ে একটি কলেজ থাকতে পারে তা ছিল আমার কল্পনাতীত। কলেজের নাম শুনে আমার মনে হলো এই কলেজে শুধু মাত্র বাংলাই পড়ানো হয়। মনে মনে খুশিই হলাম যে, আমাদের দেশে একটা বাংলা শেখার মত কলেজও আছে। কিন্তু ভাবনাটা আবার সরিয়ে নিলাম। বাংলাতো আমাদের মাতৃভাষা, তাহলে সেটা শিখার জন্য কলেজ লাগবে কেন? প্রথমবার ঢাকায় আসা বলেই আমার মধ্যে এতো কৌতুহল আর এতো ভ্রান্ত ধারনা বিরাজ করছিলো। একসময় প্রায় সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলো। কিন্তু আমি আমার কোন গন্তব্য নির্ধারণ করতে পারলাম না। শেষে সিদ্ধান্ত নিলাম কোন একটা মসজিদে গিয়ে রাত কাটাবো। ধর্মীয় উপাসনালয়গুলো মানুষের নিরাপদতম স্থান। সৃষ্টি কর্তাকে ডাকার জন্য কোন স্থান কাল প্রয়োজন হয়না কিন্তু একনিষ্ঠ ভাবে ডাকতে হলে ধর্মীয় উপাসনালয় দরকার। আমি যদি সেই শান্তিময় স্থানে আশ্রয় নিই তাহলে আমার মনের ভয়গুলো দূর হয়ে যাবে। এই ভাবনাকে মনে প্রশ্রয় দিয়ে আমি আশেপাশে একটা মসজিদ খুঁজতে লাগলাম এবং কিছুক্ষণ খোঁজা খুঁিজর পর একটা মানান সই মসজিদ পেয়েও গেলাম। অন্তত আজকের রাতটাতো কাটানো যাবে ভেবে মনের মধ্যে একটু শান্তি অনুভব করলাম।

মাগরিবের নামাজ পড়ে অপেক্ষায় থাকলাম কখন এশার নামাজের সময় হয়। কেননা এশার নামাজ শেষ হলেই কেবল মসজিদ ফাঁকা হবে। আর তখন মসজিদে আমি ঘুমতে পারবো। আমার অপেক্ষার পালা যেন আর ফুরোতেই চায়না। ওদিকে আজ কেন যেন আকাশে মেঘ জমেছে। থেকে থেকে ডেকে উঠছে অজানা অক্রোশে। আকাশে চাঁদ নেই ,তারা নেই। প্রগাড় অন্ধকারে তলিয়ে গেছে সমস্ত পৃথিবী। আমি অপেক্ষা করতে থাকি মুছল্লিদের ফিরে যাওয়া পর্যন্ত। শেষে সেই কাংক্ষিত সময়টি আসলো এবং আস্তে আস্তে মসজিদ ফাঁকা হতে লাগলো। নানা চিন্তায় আমার ক্ষুধা মরে গেছে। মনেই হয়নি আমি সারাদিন প্রায় অভুক্ত ছিলাম। এরপর একটু একটু করে ক্ষুধা অনুভব করতে শুরু করলাম। বাড়ি থেকে আসার সময় মা যতœ করে ব্যাগের মধ্যে চিড়ে নাড়– ভরে দিয়েছেন। আমি মনে মনে ভাবলাম আজকের রাতটা চিড়ে আর নাড়– খেয়েই কাটিয়ে দেব। সবাই যখন মসজিদ ছেড়ে চলে গেলো, আমি তখন ব্যাগ থেকে একটা কাথা বের করে সেটাকে পেচিয়ে বালিশ বানিয়ে মাথার নিচেয় দিয়ে শুয়ে পড়লাম। আমি এখন অনেক নিরাপদ। রাত পার হলেই ঝকঝকা সকাল। তখন কিছু একটা করতে পারবো ভেবেই আনন্দ হচ্ছিল। যদিও বাবা মায়ের কথা খুব মনে পড়ছিল। কিন্তু বিপদ যার পিছু নেয় তার সামনে পিছনে কোথাও কোন আলো থাকেনা। কিছুক্ষণ পরই আমি আবিষ্কার করলাম একটা লোক আমার মাথার কাছে এসে দাড়িয়ে রাগী রাগী কন্ঠে বলছে এই তুমি কে? এখানে ঘুমচ্ছো কেন? আমি বললাম, আমি গ্রাম থেকে এসেছি, আমার কোন থাকার যায়গা নেই বলে আজ রাতটা আমি এখানেই কাটাতে চাই। আমার কথা শুনে লোকটি আরও রেগে উঠলো

‘বলি এটাকি তোমার বাপের তালুক নাকি যে তুমি এখানে রাত কাটাতে চাও’ বলেই লোকটি হেকে উঠলো। আমি ব্যাপারটা বুঝতে পারলামনা। এতে সমস্যা কোথায়? একটা বিপদাপন্ন মানুষ মসজিদে একটা রাত কাটাতে চায় তাতে তো কোন সমস্যা হওয়ার কথা নয়। কিন্তু এ লোকটা কী অসভ্যের মত কথা বলছে! আমি বললাম আপনি আমার সাথে এতো খারাপ ব্যাবহার করছেন কেন? মসজিদতো আল্লাহর ঘর, এখানে তার বান্দারা রাত কাটাতেই পারে। লোকটা তখন অগ্নি মুর্তি ধারণ করলো এবং আমাকে প্রায় জোর করেই বসা থেকে উঠতে বাধ্য করলো। শেষে নিজ হাতে আমার ব্যাগটা নিয়ে মসজিদ থেকে ছুড়ে ফেললো। বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম সম্ভবত এসব কারণেই বিদ্রোহী হতে বাধ্য হয়েছিলেন। তার কলমে এমনি এমনি লেখা হয়নি

“তব মসজিদ মন্দিরে খোদা

নাই মানুষের দাবি

মোল্লা পুরুত লাগিয়েছে তার

সকল দুয়ারে চাবি।”

আমার জায়গায় নজরুল থাকলে জানিনা এই লোকটার নাকটা জায়গামত থাকতো কিনা। লোকটা কেবল আমার সাথে রাগত স্বরে কথা বলেই ক্ষান্ত হয়নি সে বরং আমার ব্যাগটাও ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। আমি গ্রাম থেকে এসেছি বলেই নয়, আমি বাবা মায়ের বাধ্য সন্তান, তাই লোকটাকে তেমন কিছু বলিনি। কিন্তু এতেই ঘটনা থেমে থাকলোনা। সে আমার বুকেও কয়েকবার ধাক্কা দিলো। আমার ইচ্ছে হচ্ছিলো লোকটাকে আচ্ছা রাম ধোলাই দিই কিন্তু ইচ্ছেটাকে দমিয়ে রেখেই আমি আবার আমার যুক্তি দাড় করানোর বৃথা চেষ্টা করতে লাগলাম। লোকটার চিৎকার চেচামেচিতে আশ পাশের আরও অনেক লোক এসে হাজির হলো। তারা আমার কাছে অনেক কিছু জানতে চাইলে আমি তাদেরকে আমার সব কথা খুলে বললাম। কিন্তু কেউ আমার প্রতি সমবেদনা জানানোর কোন ইচ্ছেই প্রকাশ করলোনা। তারা কেবল আহ বেচারা! বলেই ক্ষান্ত দিলো। ঢাকায় নেমে ঠিকানা হারিয়ে আমি যতটানা আহত হয়েছিলাম তার চেয়ে অনেক বেশি ব্যথিত মর্মাহত হলাম যখন দেখলাম আমার কথা শোনার পরও কেউ আমার প্রতি সমবেদনা দেখাতে এগিয়ে আসলোনা। গ্রাম আর শহরের মধ্যে যে আকাশ পাতাল পার্থক্য তা আমি বুঝতে শুরু করলাম। গ্রামে কেউ কাউকে চিনুক বা না চিনুক একের বিপদে অন্যে ঠিকই এগিয়ে আসে। আর শহরে কেউ বিপদে পড়লে অন্যরা তা দেখতে আনন্দ পায়। আমি হতাশায় নুইয়ে পড়িনি। ভেবেছি দেখি কি করা যায়। কেউ যখন আমার পক্ষে কথা বললো না তখন কেবল একটি অর্ধ বয়স্ক ছেলে আমার কথা শুনে আমার  কাছে এগিয়ে এসে বললো তুমি দিনাজপুর থেকে এসেছো? তোমার বাবার নাম অমুক এবং তুমি অমুক গ্রামের বাসিন্দা? আমি তার কথার ঠিক ঠিক জবাব দিলাম এবং অবাক হলাম যে, এই লোকটাকে আমি চিনিনা কিন্তু সে আমার অনেক কিছুই জানে। লোকটি আমার কাঁেধ হাত রেখে বললো, আমি তোমার বাবার বন্ধুর ছেলে। তোমার বাবা আমাকে অনেক দিন আগেই চিঠিতে  জানিয়েছিলো যে, তুমি সেপ্টেম্বর মাসের সতের তারিখে ঢাকায় আসবে। আমার বাবা তোমার বাবার খুব ভালো বন্ধু। আমার বাবাও আমাকে চিঠিতে তোমার কথা জানিয়েছিলো। আজ আমি সকাল থেকেই গাবতলী বাস স্ট্যান্ডে তোমার অপেক্ষায় বসে ছিলাম কিন্তু তোমার কোন খোঁজ না পেয়ে ফিরে এসেছি। আসলে পথওতো কম নয়। দিনাজপুর থেকে সোজা আসার কোন পথও নেই। রাজশাহী নাটোর হয়ে সিরাজগঞ্জ এসে থেমে যেতে হয়েছে। তার পর নদী পার হয়ে আসতে আসতে হয়তো তোমার দেরি হয়েগেছে। আর আমিও তোমাকে না পেয়ে ফিরে চলে এসেছি। আমি তার কথা শুনে লজ্জা পেলাম। স্থানীয় সবাইকে বলে আমার হয়ে ক্ষমা চেয়ে সে আমাকে তার বাসায় নিয়ে গেলো। সে যে আমার হয়ে এতো গুলো লোকের সামনে ক্ষমা চাইলো বিষয়টি আমাকে আরও লজ্জায় ফেলে দিলো। অথচ আমি মোটেই তার এই ক্ষমা চাওয়াটাকে পছন্দ করলামনা। আমিতো কোন অন্যায় করিনি। আমি সত্য কথাটাই কেবল বলেছি। আমার বাবার বন্ধুর ছেলে আমাকে বুঝিয়েছেন যে, এখানে সত্য কথাটা বলে কোন লাভ নেই। যা আমি কয়েকটা দিন যেতে না যেতেই টের পেয়েছি।

বাবার বন্ধুর এই ছেলেটির নাম রাসেল। আমার একটা কাজিনের নামও রাসেল। রাসেল ভাই বাঙলা কলেজে অনার্স পড়ছেন। তার পঠিত বিষয় অর্থনীতি। আর এক বছর হলেই তার পড়ালেখা শেষ হবে। তখন হয়তো কোন একটা চাকরীতে ঢুকবেন। কিন্তু আমি শুনেছি তিনি রাজনীতিতে জড়িত। দেশের পরিস্থিতি এখন ভালোনা বলে বাবা মা আমাকে বার বার বলেছে “সাবধান বাবা! তুমি ওসবের ভিতরে জড়াবেনা কিন্তু।” ওসব বলতে বাবা মা আমাকে কি বলতে চেয়েছেন তা আমি বুঝতে পারিনি। সময়টা এখন ১৯৭০ সালের শেষের দিকে। মাত্র এক বছরও হয়নি আসাদ নামে এক বাঙ্গালী অধিকারের কথা বলতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে মারা গেছেন। যে জীবন দিয়ে গেছে তার পরিবার কতইনা কষ্টে আছে। আর যারা জীবন কেড়ে নেয় তারা মানুষ না অমানুষ তা বুঝে উঠতে পারিনি। আসাদের মৃত্যুতে এদেশের মানুষ অনেক কিছু বুঝতে শিখে গেছে। আসাদের মৃত্যুর সেই ঘটনা সবাই কম বেশি জানে। দেশটাতে তাই এখনও চলছে বিভিন্ন রকম মিছিল মিটিং সমাবেশ। সবার মুখে মুখে একটাই কথা আর তা হলো স্বাধীনতা। আমাদের এই সুন্দর দেশটাকে পাকিস্তানীরা দীর্ঘ দিন ধরে শাসন করে আসছে। আর আজ তা হয়ে উঠেছে চরম শোষন নির্যাতনের ভিন্ন এক রুপ। বাঙ্গালীরা তাই অকপটে ঘোষণা করেছে আমরা স্বাধীনতা চাই। সেই দলে মিশে যেতে আমারও ইচ্ছে করছে।

ঢাকায় পৌছার পর প্রথম দিনেই ঠিকানা বিহীন হয়ে পড়তে হলো এক চরম বিপদে। কোন রুপ চিন্তা ভাবনা না করেই মসজিদে থাকার চিন্তা করে আরেক বিপদ এসে মাথায় চাপতে বসেছিলো। রাতের খাবার খেতে খেতে রাসেল ভাইকে আমার ঢাকা আসার ঘটনাটা বললাম এবং ঠিকানা ফেলে রেখে আসার কারণে তিনি আমাকে ভর্ৎসনা করলেন। অবশ্য আমি এই ভর্ৎসনাটা পাবার যোগ্য কাজই করে এসেছি। উচ্চ শিক্ষার জন্য যে ছেলে শহরের এসেছে তার আরও বেশি সচেতন হওয়া উচিত ছিল। যেন তেন ভাবে ঠিকানা লেখা চিঠিটা ফেলে আসা তার জন্য মুর্খতার পরিচয় দেয়ার নামান্তর। আমিও তাই করেছি এবং নিজেকে অযোগ্য মুর্খ বলে পরিচয় দিয়েছি। আল্লাহর অশেষ রহমত তাই তিনি আমার সাথে রাসেল ভাইয়ের সাক্ষাত ঘটিয়েছেন। প্রথম দেখাতেই আমি বুঝতে পেরেছি এই রাসেল ভাই নামের মানুষটা সত্যিকার অর্থে অসাধারণ। তিনি আমার সব কথা শুনে আমাকে শান্তনা দিয়ে বললেন ক’টা দিন গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। আমিও মনে মনে তাই চাইলাম। এই অচেনা অজানা শহর মায়া ভরা আর এখানে চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানা রকম বিপদ। এই সব অনাহুত বিপদ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে চাই আরো বেশি সচেতনতা, আরও বেশি বুদ্ধি।

রাতে খাবার খেয়ে ঘুমোতে যাবার আগেই বাবা মাকে একটা চিঠি লিখলাম। সাথে আমার খেলার সাথী সেই বালিকা বন্ধুটি যে আজ আমার ভালোবাসায় পরিণত হয়েছে তাকেও একটা চিঠি লিখলাম। বাড়ী থেকে সাথে করে নিয়ে আসা ডায়রীতে প্রতিদিনের কথামালা লিখে রাখতে শুরু করলাম। পরদিন সকালে রাশেদ ভাই বাসার সবার সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দিলেন।

অন্ধকারের পিছনেই আলো থাকে। এই কথাটা আমি বইয়ে পড়েছি। বাবা, মা, শিক্ষক, গুরুজন সবার মুখেই শুনে এসেছি। আমার নিজের জীবনটাও এখন এক আলো আধারির খেলা। উচ্চশিক্ষার আশায় বাবা, মা, ভাই সবাইকে ফেলে রেখে চলে এসেছি ঢাকাতে। এই ঢাকা আজ উত্তাল মিছিলের নগরী। এখানে থেকে থেকে মিছিলের আওয়াজে পুরো এলাকা প্রকম্পিত হচ্ছে। রাস্তা ঘাট, চায়ের দোকানের আড্ডায়,রাস্তার মোড়ে মোড়ে সবার মুখেই একটি কথা,বেঁেচ থাকার আনন্দ ফিরে পাওয়া। আর সেই আনন্দ ফিরে পাওয়ার জন্য যে কোন ত্যাগের নিমিত্তে প্রস্তুত হওয়া। একটা কিছু পেতে হলে একটা কিছুর মায়া ত্যাগ করতেই হয়। এটা এতদিন আমি বুঝতে পারতাম না। আজ আমি হাড়ে হাড়ে সেটা টের পাচ্ছি। আমার এবং বাবা মায়ের স্বপ্নটাকে পূরণ করতে এসে আমাকেও ত্যাগ স্বীকার করতে হচ্ছে। দূরে থাকার কষ্টটা বুকে চেপে রাখতে হচ্ছে। সেই সাথে একটা চির চেনা হাসি মুখ। যার সাথে রোজ আমার দেখা হতো, কথা হতো, সেই ছোট বেলা থেকে মাত্র কিছুদিন আগ পর্যন্তও। এখন সে সম্পূর্ণ একাকী। নাকি তাকে ছেড়ে আসার পর সেও আমাকে ভুলে গিয়ে অন্য কাউকে খেলার সাথী,খুনসুটির সাথী করে নিয়েছে তা আমি কল্পনা করতে পারিনা। আমার চারদিকে কেবল হতাশা এসে ভর করছে। একবার ইচ্ছে হচ্ছে সব ছেড়ে ছুড়ে গ্রামের সেই মেঠো পথে বেনী দুলিয়ে হেসে খেলে বেড়ানো বালিকার সান্নিধ্যে চলে যাই। যেখানে আমার প্রানাধিক প্রিয় মা আছে, আরো আছে আমার বাবা সহ অতি আপন পরিচিত জন। এই চিন্তাটা করার সাথে সাথেই আমার মনটা ভাল হয়ে যায়। আবার জানালা দিয়ে যখন দেখি একটা মিছিল যাচ্ছে, মুখে অধিকারের ঝাঝালো শ্লোগান। তখন ইচ্ছে করে, না আর বাড়ী গিয়ে কি হবে তার চেয়ে বরং এই দলে মিশে যাই। কোনটা যে আমার করা উচিত তা আমি বুঝে উঠতে পারিনা।

প্রতিদিন এমন করেই কাটতে থাকে আমার। সেই সাথে ফুরাতে থাকে আমার ডায়রীর পাতা। আমি লিখছিতো লিখছিই। এই লেখা কবে শেষ হবে তা আমি জানিনা। লিখতে আমার মোটেও ভাল লাগতো না। কিন্তু এখানে এসে নেই কোন খেলার সাথী,পাড়ার সাথী, কিংবা না কোন ভালো বই, যা পড়ে সময় কাটিয়ে দেয়া যাবে। তাই ডায়েরী লেখাটাকেই আপন ভাবতে বাধ্য হয়েছি এক প্রকার নিজের ইচ্ছের বাইরেই। আর সেই যে লিখতে শুরু করেছি, এখন আর ভাবতে হয়না কি নিয়ে লিখবো। এই হয়তো লিখছি আমার গ্রামের কথা, পরক্ষণেই মিছিলের আওয়াজ কানে ভেসে আসায় লেখা বাঁক নিয়ে ঘুরে যাচ্ছে অন্য দিকে। যখন রাত অনেক হয় তখনও আমার লিখতে অসুবিধা হয়না। গ্রামে থাকতে এশার নামাজ শেষে খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে পড়া ছাড়া আর কোন কাজ থাকতোনা। সন্ধ্যা হতে না হতেই আমরা নিশ্চুপ হয়ে ঘুমের দেশে হারিয়ে যেতাম। প্রথম প্রথম এখানে এসে বিদ্যুতের আলোতে খুব সমস্যা হচ্ছিল। সব কিছু কেমন অন্যরকম লাগছিল। এখন সব কিছু চোখে সয়ে গেছে। মাও এই কথাটা বলতেন যে, দেখিস শহরে গেলে তোর গ্রামের কথা একদমই মনে থাকবেনা। আমি বলতাম কি যে বলোনা মা। আমি কোন দিনও গ্রামের কথা ভুলবোনা। সত্যিই আমি ভুলিনি। আর ভুলে যাওয়ার কোন সম্ভাবনাও নেই।

২.

মিছিলে মিছিলে প্রকম্পিত গোটা নগরী। ১৬১০ সালে যে ঢাকা রাজধানী হিসেবে গোড়াপত্তন হয়েছিল সেই ঢাকা আজ থেকে থেকে কেঁপে উঠছে। ঢাকা শহরের প্রাণ কেন্দ্রে অবস্থিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। আমার স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান। হয়তো পরিস্থিতিগত কারণেই অনেকে এখানে ভর্তির সুযোগ থাকার পরও ভর্তি না হয়ে গ্রামের কোন কলেজে ভর্তি হয়েছে। আবার যাদের টাকার কোন অভাব নেই তারা বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। আমার এ দুটোর কোনটিই ভাগ্যে লেখা নেই। সাধারন একটা ঘরের ছেলে হওয়ায় আমার পরিবারের পক্ষে উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশ পাঠানোর কোন সামর্থই আমার বাবার নেই। আর এলাকার কলেজে পড়াও বাবা  বা আমার কারোই পছন্দ নয়। দেশে থেকে পড়তে হলে সেরা বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়া উচিত। আর তাই সেই সুযোগটা আমি নিমিষেই পেয়ে গিয়েছিলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে নিজেকে এই উত্তাল শহরের সাথে দিন দিন মানিয়ে নিতে শুরু করলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিস্থিতি খুব একটা ভাল নয়। ছাত্ররা প্রতিদিনই মাথায় ফেস্টুন বেঁধে বিভিন্ন দাবিতে মিছিল করছে। বাড়ী থেকে আসার সময় বাবা মা আমাকে অনেক করে বুঝিয়ে বলেছেন “সাবধান বাবা তুই কিন্তু কোন মিছিল মিটিংএর মধ্যে যাবিনা। ওসব করার আরো অনেক মানুষ আছে । তোর কাজ শুধু লেখা পড়া করা।” আমিও আমার বাবা মায়ের কথা মেনে চলার চেষ্টা করতে থাকি। কিন্তু একটা চিন্তা আমার মাথায় সারাক্ষণই ঘুরপাক খেতে থাকে, আর তা হলো, আমার বাবা মা আমাকে যেমন বলেছেন যে, মিছিল মিটিংএ যাবিনা ও সব করার জন্য আরো লোক আছে । সেই লোক গুলো কারা? তারা যখন আমার মতো বাড়ী থেকে এসেছে, তাদের বাবা মা কি আমার বাবা মায়ের মতো করে মিছিল মিটিং থেকে দূরে থাকতে বলেন নি? নাকি বলেছেন লেখা পড়া তোর জন্য নয় শুধু মিছিল মিটিং করে বেড়াবি। লেখা পড়া করার জন্য আরো মানুষ আছে। প্রশ্ন গুলো আমি আমার মতো করে আমাকেই করি। আবার আমিই এর কোন না কোন উত্তর বের করে ফেলি। হয়তো কোনটা নিজের কাছে মনঃপুত হয় আবার কোনটা মনঃপুত হয়না। আমি খুব চেষ্টা করছি হলে একটা সিট পেতে। যদি কোন ভাবে একটা সিটের ব্যবস্থা হয় তাহলে আর রাসেল ভাইয়ের ঘাড়ের ওপর বসে তাকে এমন করে জ্বালাতন করতে হবেনা। দরখাস্তু করেছি হলে সিটের জন্য কিন্তু সেখান থেকে বলা হয়েছে সিট পেতে একটু দেরি হবে। আমি সেই দেরিটা কত দিনের তা অনুমান করতে থাকি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্তরের স্বাদ এখনো নিতে পারিনি। ক্লাস মোটামুটি অনিয়মিত বললেই বলা চলে। তার পরও আমি চেষ্টা করি ক্যাম্পাসে নিয়মিত হাজির হতে। বলতে দ্বিধা নেই যে, বাবা, মা বলার পরও মিছিল মিটিং আমার মোটামুটি ভালই লাগে। আমি অবশ্য এখনও কোন মিছিলে যাইনি। এরই মাঝে আমি অনেকগুলো বন্ধুও বানিয়ে ফেলেছি। তাদের অনেকেই আবার এই মিছিল মিটিং এর সাথে সরাসরি জড়িত। তাদের দিকে তাকালে আমার বুকটা আনন্দে ভরে ওঠে। এই ছেলেগুলো শুধু নিজেদের কথা ভাবেনা। এরা ভাবে আমাদের কথা, আমাদের এই দেশের কথা। এরা আমার বন্ধু ভাবতেই নিজের মনে খুব ভাল লাগে। এরাই বোধহয় সোনার ছেলে। এখনও আমরা একটা স্বাধীন দেশ আলাদা করে কাছে পাইনি। এখনও আমাদের ভালবাসার ভূবনে পতপত করে ওড়ে চাঁদ তারা খচিত পতাকা। পতাকার আর কি দোষ! দোষতো সেই পতাকার ধারক ও বাহকদের। তাদের কারণেই পতাকা হয়ে ওঠে আমাদের চোখের বিষ।  ১৯৪৫ সালে যে পতাকাটা আমাদেরই পূর্বপুরুষেরা ছিনিয়ে এনেছিল, সেই পতাকাই আজ আমাদের চোখের বিষ হয়ে উঠেছে। আসলে পতাকা কারো চোখের বিষ হয়না বরং চোখের বিষ হয় সেই পতাকার ধারক ও বাহকেরা। তারা অন্যায় অত্যাচারে চারদিক বিভিষিকাময় করে তুলেছে। নিরিহ বাঙ্গালীদেরকে ইতিপূর্বে জোর করে মাতৃভাষা বাংলা বলা থেকে দুরে রাখতে চেয়েছিল কিন্তু তা তারা পারেনি। বাঙ্গালীরা জানতো মাতৃভাষায় কথা না বলা মানে আপন মাকেই ভুলে যাওয়া। তারা তা মেনে নেয়নি। বুকের রক্ত দিয়ে তাই প্রতিষ্ঠিত করেছে মাতৃভাষার দাবী। বাধ্য হয়ে দুরাচারীরা বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করে নিয়েছে। সেই শুরু, এখনো থামেনি শয়তানদের অত্যাচার। তারা এখন পুরো বাঙ্গালীদের দাবিয়ে রাখতে চায়। গোলাম বানিয়ে কাজ হাসিল করতে চায়। আমি খুব কাছ থেকে দেখছি বাঙ্গালীরা অত বোকা নয়। তারা আবারও মাথা উচু করে বাঁচার স্বপ্ন নিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আমি জানি তাদের বিজয় আসবেই। হয়তো সে জন্য দিতে হতে পারে অনেক রক্ত অনেক আত্মহুতি।

মনে মনে আমিও নিজেকে প্রস্তুত করে নিচ্ছি। প্রয়োজনে আমাকেও যে যেতে হবে। কোন একটা কাজে আমি বাইরে গিয়েছিলাম। এখানে সেখানে শুধু মানুষ আর মানুষ। যে যেমন করে পারছে ইয়াহিয়ার মুন্ডুপাত করছে। করবেনা! সেইতো সব ঘটনার হোতা। আমারও ইচ্ছে হয় সামনে পেলে বেটাকে জুতাপেটা করি। সেই সৌভাগ্য আমার কোন দিন হবেওনা । সারাদিন এখানে ওখানে ঘুরে সন্ধ্যায় যখন বাসায় ফিরেছি তখন দেখি রাসেল ভাই আমার ডায়রিটা খুব মন দিয়ে পড়ছেন। আমি এতে একটুও অবাক হইনি। এটা সেরকম কোন ডায়রি নয় যে, যে কেউ এটা পড়তে পারবেনা। এটা আমার একান্ত গোপনীয় ডায়রি হলেও এতে আমার দেশ প্রেম এবং মমত্ববোধের সবকিছুই জাগরুক আছে। আমার ডায়রিটা পড়ে রাশেদ ভাইয়ের চোখ আরও জ্বলজ্বল করে উঠলো। তিনি আনন্দে আত্মহারা হবার মতই বলে উঠলেন আমরা স্বাধীনতা পাবই। আমি জিজ্ঞেস করলাম আমরা স্বাধীনতা পাব এ কথা ঠিক, কিন্তু আপনি সেটা আগেভাগেই বলছেন কিভাবে? তিনি তেমন কিছুই বললেন না। শুধু ডায়রিটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, এতে সব লেখা আছে। সে কথা যে বিফলে যাবার নয়। আমি তখন আমার ডায়রিটা নিয়েই মনে মনে নিজের কাছে গর্ব বোধ করলাম। রাসেল ভাই আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন, তুমি অবশ্যই আমাদের সারির সামনে থাকবে। এমন একটা মহৎ কাজের সামনের সারিতে জায়গা পাওয়াও ভাগ্যের ব্যাপার। আমি মনে মনে একপ্রকার রাজি হয়েই থাকলাম। এর ঠিক পনের দিনের মাথায় হলে আমার সিট পাকা হয়ে গেল।

মানুষের এক জীবনে কত দৃঃখ কত আনন্দ পাশাপাশি বসবাস করে। এই সুখ তো এই দুঃখ। আমার জীবনটাও তেমন। গত দিনও যেখানে আমার থাকার যায়গা ছিলনা আর এখন আমি দিব্যি হলে সিট পেয়ে গেলাম। আমি সেই অবস্থাতেই হলে উঠে পড়লাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলে আমার সিট হল। নীল ক্ষেতের মোড়েই ইকবাল হল। হল জীবন আমার ভালই কাটছিল।হলে উঠেই বাবাকে চিটি লিখলাম যে, আমি হলে সিট পেয়েছি। কয়দিন যেতে না যেতেই বাবার চিঠি আসলো এবং তিনি লিখেছেন যে, রাসেল ভাই তাকে আগেই চিঠিতে জানিয়েছে যে, আমি হলে উঠে গেছি। হলে উঠে বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের অনেকের সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেল। হল জীবন নানা বৈচিত্রে পরিপূর্ন থাকে। সেই বৈচিত্রের মাঝে আরো বেশি রং ঢেলে দিয়েছে দেশের এই পরিস্থিতি। আমি আমার ডায়রিতে যা লিখে রাখছি তা আমার নিজের মত করে লিখছি। বাবা মায়ের স্বপ্ন আর নিজের স্বপ্ন এক করে এখানে এসেছি উচ্চ শিক্ষা নিতে। উচ্চ শিক্ষা নেওয়ার তাগিদের চেয়ে এখন বরং ঐ সব মানুষের কাতারে মিশে যেতে বেশি ইচ্ছে করছে, যারা বুক চিতিয়ে ঝাঝালো শ্লোগানে শ্লোগানে বাংলার রাজপথ উত্তাল করে তুলেছে। সেই মানুষের সারিতে আমি আছি কি নেই সেটাই এখন আমার মাথায় বার বার ঘুরপাক খাচ্ছে। আমার পাশে এখন কেউ নেই। হলের ১১ নাম্বার রুমে একটা বড় ভাইকে ধরে জায়গা করে নিয়েছি। তবে ঘুমোনোর সময় অবশ্যই আমাকে তার মশাড়ী টাঙ্গিয়ে দিতে হবে। গোসলের সময় তার কাপড় ধুয়ে দিতে হবে। মনকে শান্তনা দিয়েছি, একটু মাথা গোজার ঠাই পাওয়ার বিনীময়ে এই সামান্য কাজ করে দেয়া কোন কষ্টেরই না। নিজের কাপড় ধুতে পারলে তার সাথে অতিরিক্ত একটা কাপড় ধোয়া কষ্টের কিছু নয়। রাতে নিজে ঘুমোতে গেলে মশাড়ি টাঙ্গাতে পারলে অন্যের সাথে সেটা টাঙ্গানো কোন কষ্টের কাজ নয়। আমার রাতটা কাটে কোন মত কিন্তু দিন আসলেই শুরু হয় যন্ত্রনা। আমি আমার মনকে প্রবোধ দিতে পারিনা।

সময়টা বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন সময়। বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন স্বাধীনতা। সেই স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে পাকিস্তানীরা। বাঙ্গালীরা মাথা উচু করে কাঁধে কাঁধ রেখে দাড়িয়েছে। স্বাধীনতা আসবেই। আমি বরাবরই ইতিহাসের পোঁকা ছিলাম। ইতিহাস আমার ভাল লাগতো। সেটা যদি হয় নিজের দেশের ইতিহাস, নিজের সমসাময়িক ইতিহাস, তবে আমারও ইচ্ছে হয় সেই ইতিহাসে ঢুকে পড়ি। দেশের এই পরিস্থিতিতে আমাদের ক্লাস শুরু হচ্ছেনা। যেখানে গোটা বাঙ্গালী জাতির অস্বিত্ত্বের প্রশ্ন সেখানে সামান্য ক্লাস নিয়ে আমার মাথা ঘামানো উচিত হয়নি। কেবল মাত্র পরিচিতি ক্লাসটা হয়েছিল। সেদিন সেই ক্লাসে যে স্যার বক্তব্য দিয়েছিলেন তার নামটাও জানা হয়নি। তবে তার বক্তব্যের পুরোটাই অন্তরে গেথে গিয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, সামান্য ক্লাস নিয়ে চিন্তা করে কি লাভ! যদি পুরো দেশটাই না থাকে। এখন আমাদের চিন্তা চেতনা হওয়া উচিত কেবল মাত্র প্রিয় দেশকে নিয়ে। এই দেশটা স্বাধীন হলে আমাদের ক্লাস হবে আনন্দপুর্ন।” আমিও তাই স্বাধীনতার কথাই মনে প্রানে আওড়াতে থাকি। প্রতিদিন সকাল বিকাল মিছিল মিটিং চলছেই। এর মাঝে ইকবাল হলের কয়েকজনের সাথে আমার বন্ধুত্ব হয়ে গেল। আজমল, কবির,জুবায়ের ,আরিফ এবং বিশেষ করে আশরাফের কথা লিখতেই হচ্ছে। ওরা আমাকে আপন করে নিয়েছে। ওরা আমাকে দেশের কথা বলেছে, দেশের মানুষের সুখ দুঃখের কথা বলেছে। বলেছে ওরা কী করতে চায় তার সবটাই। বিনিময়ে চেয়েছে আমার সহযোগিতা এবং পাশে থাকার অঙ্গীকার। কথা গুলো আমার মনের মতই ছিল। আমি ওদের সাথে একমত হলাম। পড়ালেখার কথা একদম ভুলে গেলাম।

বাবা মা ভাই বা আমার নিজের স্বপ্ন কি তা নিয়ে আর ভাবার সময় নেই। এখন সবাইকে নিয়েই ভাবতে হবে। সবাই বলা বলি করছিল দেশে ভয়াবহ আকারে যুদ্ধ বাধঁতে পারে। অনেকেই ভীতু লোকদের মত বাড়িতে ফিরে গেল। আমাদেরকেও বাড়ী থেকে বলা হল ফিরে যেতে। কিন্তু আমি এবং আমার বন্ধুরা তা মেনে নিলাম না। মার্চের ৭ তারিখে রেসকোর্সের ময়দানে বিরাট সমাবেশ হবে। সেখানে দেশের কথা বলা হবে এবং অধিকারের কথা বলা হবে। আমাদের দেশে আমাদের মানুষকে আমরা ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেও আমাদের নেতাদের ক্ষমতায় বসাতে পারিনি। ওরা আমাদের হাতে শাসন ভার দিতে চায় না। পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী নানা ভাবে ষড়যন্ত্র করছে। বাঙ্গালীদের পায়ে ওরা শিকল পরিয়ে রাখতে চায়। বাঙ্গালী এখন আর সেই আগের মত নেই। এখন তারা স্বাধীনতা চায়। এ জন্য যে কোন ত্যাগ স্বীকার করতে সবাই প্রস্তুত। অপেক্ষায় থাকলাম ৭ মার্চ আসার। অবশেষে আসলো সেই আকাংখিত ৭ মার্চ। সলিমুল্লাহ হল থেকে আমি রাকিব,বিল্লাল ,রেজা সহ প্রায় বিশ জন বন্ধুকে নিয়ে ইকবাল হলের বন্ধুরা  একত্রে বেরিয়ে শহীদ মিনারের সামনে গিয়ে দাড়ালাম। অপেক্ষা করতে থাকলাম ইকবাল হল থেকে অন্য সব বন্ধুদের আসার। এই সেই শহীদ মিনার! যা গড়ে উঠেছিল আমাদের পূর্বসুরীদের রক্তের বেদীতে। চারপাশে যে সব কৃষ্ণচূড়া শাখা প্রশাখায় ফুল ফুটিয়েছে তা আমাদের পূর্বসুরীদের আত্মদানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এখনো প্রতি ফেব্রুয়ারীতে আমরা শহীদ স্মরণে ফুল দেই। প্রভাত ফেরী আমাদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় বায়ান্নর রাজপথে। শহীদ মিনারের পাশে দাড়িয়ে আমরা অন্যদের জন্য অপেক্ষা করছি আর মনে মনে ভীষণ সাহস খুঁজে পাচ্ছি। এই মিনার আমাদের শক্তি যোগাচ্ছে। আমাদের সামনে আরো বড় ইতিহাস হয়তো অপেক্ষা করছে। অন্যদের কথা জানিনা আমি আমার কথা বলতে পারি যে আমি আজ ভীষণ ভাবে উত্তেজিত। আসলে আমি ভীষণ আগ্রহ নিয়ে প্রতিক্ষায় আছি বঙ্গবন্ধুকে এক নজর দেখবো বলে। বাবা মায়ের কাছে তার কথা শুনেছি। যা শুনেছি তাতে মনে হয়েছে লোকটা সম্পর্কে অতিরঞ্জিত করে বলা হচ্ছে। আমার মতের সাথে একমত হতে পারেনি আমাদের হলের রাশেদ। সে মনে করে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে আমি যা শুনেছি তা আসলে মোটেও অতিরঞ্জিত কিছু নয় বরং বলতে গেলে কমই শুনেছি। রাশেদের বদলে অন্য কেউ হলে হয়তো কথাটা মেনে নিতাম না। কিন্তু রাশেদ হলে ভিন্ন কথা। বিখ্যাত ব্যক্তিদের সম্পর্কে রাশেদের বিস্তর জ্ঞান আছে। সারাদিন কত রকম বই যে ও পড়ে তা হিসাবের বাইরে। আমি তাই রাশেদের কথাই মেনে নিয়ে অপেক্ষায় আছি বঙ্গবন্ধুকে একনজর দেখার জন্য, তার মুখ থেকে দুটো কথা শোনার জন্য। চারদিক থেকে ভেসে আসছে মিছিলের ধ্বনি। সেই মিছিলে ছিল নানা মত নানা পেশার মানুষ। কিন্তু সবাই এক সারিতে মিলেছে একই দাবী আদায়ের মিছিলে। তাদের মুখ থেকে ভেসে আসছে কত রকম শ্লোগান। তোমার আমার ঠিকানা পদ্মা মেঘনা যমুনা। আরো কত কত শ্লোগান এই আকাশ এই বাতাসকে করে তুলছে প্রকম্পিত।

শহীদ মিনারে আমাদের বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলোনা। অবশেষে সবাই আসলো এবং একসাথে আমরা সারি বেঁধে মিছিল করতে করতে রেসকোর্সের ময়দানে হাজির হলাম। আমাদের মিছিলের ভাষা ছিল জোরালো। কোনদিন যে আমি মিছিল করিনি, সেই আমার মুখেই মিছিলের ঝাঁঝালো ধ্বনি। আমাদের চেয়েও অনেকেই দেশকে এবং দেশের মানুষকে বেশি ভালবাসে তার প্রমান পেলাম রেসকোর্সের ময়দানে গিয়ে। আমাদের আগেই লাখ লাখ মানুষ ওখানে হাজির হয়েছে। সবাই দেশকে ভালবাসে, দেশের মানুষের জন্য সব কিছু করতে পারে। একজন তার পাঁচ বছরের ছেলেকে সাথে করে নিয়ে এসেছে আর তাকে বিড় বিড় করে বলছে, ‘বাজান ঐ দেহ উনি হইলেন গিয়া বঙ্গবন্ধু,উনার কথা হুনার লাইগা আমরা এহানে আইছি,উনি যুদ্ধ করবার কইলে আমি যুদ্ধে যাইমু তহন তুমি কি করবা?’ সেই অল্প বয়সি ছেলে যার এ অবস্থায় কথা বলারই কথা না সে বলে উঠলো, ‘আমিও যুদ্ধে যামু বাজান’। বাশের খুটিতে বঙ্গবন্ধুর ছবি দেখে সে আর তার ছোট্ট ছেলেটি কথা বলছিল। বিশাল জনতার মাঝখানে একটা সাদাসিধে মঞ্চ। সেই মঞ্চে উঠবেন আপামর বাঙ্গালীর প্রিয় মানুষটি যাকে নির্বাচিত করেও ক্ষমতার গদিতে বসাতে পারিনি। আমরা জনতার ভীড় ঠেলে এগিয়ে গেলাম। অনেকেই আমাদেরকে আগে যেতে দিতে চাচ্ছিলনা কিন্তু আমরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জেনে জায়গা করে দিল। আমরা তখন এগোতে এগোতে প্রায় মঞ্চের কাছাকাছি। এমন সময় সোল্লাসে চিৎকার করে উঠলো লাখ লাখ বাঙ্গালী কণ্ঠ। জনতার মঞ্চে এসে দাড়ালেন শেখ মুজিবুর রহমান। আপামর বাঙ্গালী এই লোকটাকে বঙ্গবন্ধু বলে ডাকে। মানুষটিকে অনেক দিন থেকেই দেখার ইচ্ছে ছিল। আর সেই মানুষটিকে আজ কাছ থেকে দেখছি। বুকের সাহস আরো বেড়ে গেল। মনে হচ্ছিল এখনই যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ি। যখন তেমন কিছু জানতাম না, যখন শেখ মুজিবকে দেখিনি, তখন ভাবতাম এই লোকটাকে নিয়ে এত মাতামাতির কি আছে! অবশেষে বুঝলাম আসলে এই লোকটাকে নিয়েই মাতামাতি করা দরকার। বুকে যার অসম সাহস তিনিইতো বীর। আর ভাবতে লাগলাম আসলেই এই লোকটাকে নিয়ে খুব একটা মাতামাতি হয়না। দেশের প্রতি তার অসাধারন ভালবাসা দেখলে মনে হয় তার জন্য আমাদের অনেক কিছু করা দরকার। তার নামে আমরা যে চিৎকার দিচ্ছি সেটা আরও জোরে দেয়া উচিৎ যেন পাকিস্তান শাসক গোষ্ঠী আটলান্টিক মহাসাগরের তলদেশে নটিলাস ডুবো জাহাজে চড়ে থাকলেও আওয়াজ শুনে ভয়ে থর থর কেঁেপ ওঠে। এসব ভাবছি আর উত্তেজনায় ফুলছি। রাশেদ আমার পাশে ছিল। সে আমাকে আলতো খোঁচা দিয়ে বললো তোকে বলেছিনা বঙ্গবন্ধু মানেই বাংলাদেশ। দেখ মানুষের ভালবাসা কাকে বলে। আমি ওর কথায় একমত হলাম। হঠাৎ সব চিৎকার থেমে গেল। তিনি মাইকে বক্তৃতা শুরু করলেন। আমি যদি পাশে না থাকতাম, আমি যদি উপস্থিত না থাকতাম, তবে বাঙ্গালী হয়ে জন্ম নেওয়াই আমার জন্য বৃথা হয়ে যেত। তিনি কথা বলতে শুরু করলেন, আর আমার শরীরের শিরায় শিরায় রক্তের শীতল স্রোত বয়ে যেতে লাগলো। একটা মানুষ এমন করে বলতে পারে কিভাবে। তিনি বললেন এবং থেকে থেকে মানুষের চিৎকার ধ্বনি মুখরিত হল। সম্বলহীন প্রায় যে মানুষগুলি তারাও হাতে লাঠি, বাঁশ যা পেল তাই তুলে নিল। আমার হাতের কাছে কিছু ছিল না। তাই আমি খালি হাতটাই তুলে ধরলাম। চিৎকার করতে করতে গলার স্বর ভঙ্গ হল। এবং একসময় দেখা গেল যে আমি যা কথা বলছি তা আমি নিজেই শুনতে পারছিনা। রাতে হলে এক মিটিং বসলো। সেখানেও এ বিষয়ে কথা হল। দিন যাচ্ছে আর পরিস্থিতি ঘোলাটে হচ্ছে। তবে বঙ্গবন্ধু যেভাবে সবাইকে প্রস্তুত থাকতে বলেছেন সবাই সেভাবেই প্রস্তুত। যে স্বপ্নটা কোটি কোটি বাঙ্গালী দেখছে এখন মনে হচ্ছে সেই স্বপ্নটা আমাদের দূয়ারে চলে এসেছে। একটা পতাকা এই আকাশে পতপত করে উড়বে কোন বাধাহীন ভয়হীন ক্লান্তিহীন ভাবে সেই আশায় বুক বেধে আছি। তার জন্য যা কিছু করা দরকার সব করতে আমরা প্রস্তুত।

৩.

লালবাগ কেল্লার পশ্চিম পার্শ্বের গলিতে রিমুদের বাসা। রিমু এবার ক্লাস থ্রিতে পড়ে। আমি রিমুর গৃহ শিক্ষক। আমার হলের এক বড় ভাই আমাকে টিউশনীটা জোগাড় করে দিয়েছিলেন যা দিয়ে আমি মোটামুটি নিজের খরচ চালিয়ে নিতে পারি। মাসে পচাত্তর টাকা এই সময়ে অনেক বলেই বিবেচিত। আর তাছাড়া টিউশনী হলেও রিমুর বাবা মা আমাকে অনেক আপন করে নিয়েছেন। তাদের নিজেদের কোন ছেলে নেই বলেই আমাকে এতটা স্নেহ করেন। কিছুক্ষণ আগে আমি টিউশনী থেকে ফিরেছি। ফেরার পথে আমার স্টুডেন্ট আমার হাতে একটা খাম ধরিয়ে দিয়েছিল, যদিও সেটা খুলে দেখা হয়নি। রিমুদের বাসায় আমি প্রথম যেদিন যাই সেদিনই বুঝতে পারি তার বাবা দেশকে অনেক ভালবাসেন। রিমু আমাকে স্যার বলে ডেকেছিল মাত্র একদিন। যেদিন আমি প্রথম ওদের বাসায় ওকে পড়াতে যাই সেদিন। তারপর আমারও ওকে খুব ভাল লাগলো। এর আগে গ্রামে দু একটা ছেলে মেয়েকে বিনা পারিশ্রমিকে পড়াতাম। তখন থেকেই ছোটদের ভাল লাগতো। রিমুকে পড়াতে যাওয়ার দ্বিতীয় দিনেই রিমু একটা বায়না ধরলো। আমি কিন্তু আজ থেকে আর স্যার ট্যার বলতে পারবোনা। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম স্যার বলবেনা তো কি বলবে? তুমি কি তাহলে আমার নাম ধরে ডাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছ নাকি? রিমুর সরল জবাব আরে তাই হয় নাকি। নাম ধরে ডাকা যায়না কি! আমি আরেকটু বেশি অবাক হয়ে জানতে চাইলাম তো তাহলে তুমি আমাকে কি বলে ডাকবে? রিমু একগাল হেসে দিয়ে বললো ভাইয়া বলে ডাকবো। ওর কথা শুনে আমার খুব আনন্দ হল। বাড়িতে থাকতে ছোট ভাইটা আমাকে কত আদর করে ভাইয়া ডাকতো সেই ডাকটা আবার শুনতে পাব ভেবেই ভাল লাগছিল। রিমু আরও বললো আমি কিন্তু তুমি তুমি করে কথা বলবো। আমি আর না করলাম না। কিন্তু ওকে বলে দিলাম তোমার বাবা মা রাগ করলে তখন কে ম্যানেজ করবে? ও দিকটা দেখবে বলে সে আমাকে আশ্বাস দিল। সত্যি সত্যিই রিমু ওর বাবা মাকে পটিয়ে ফেললো আমাকে ভাইয়া ডাকবে এ ব্যাপারে। তার্ওা কোন কিছু বললেন না। ছোট্ট একটা মেয়ে একজনকে ভাইয়া ডেকে আনন্দ পাবে এতে রাগ করার কি আছে। এরপর থেকে রোজ ওদের বাসায় পৌছার সাথে সাথে রিমু দৌড়ে আসতো ভাইয়া কেমন আছ বলে এমন আদুরে গলায় আমাকে ডাকতো যেন মনে হত সত্যিই আমি আরেক জন্মে ওর মায়ের পেটের ভাই ছিলাম।

মার্চের ২৫ তারিখ সন্ধ্যায় রিমুদের বাসায় গেলাম ওকে পড়াতে। পরিস্থিতি এখন ঘোলাটে। যুদ্ধ হবে এটা অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে গেছে। পাকিস্তান আরমির গাড়ি রাস্তায় রাস্তাায় টহল দিচ্ছে। ওদের টহলে কিছু কিছু মানুষ ভীত সন্ত্রস্থ হয়ে পথ থেকে সরে যাচ্ছে। আর কেউ কেউ কোন ভ্রুক্ষেপই করছে না। আমাদের মনের মধ্যে জ্বলতে শুরু করেছে। ২৫ মার্চ রিমুকে পড়াতে গেলেও আর পড়ানো হয়ে ওঠেনি। যাবার পথে ইকবাল হলের গেটে পাকিস্তান আরমির কয়েকজন সৈন্যকে টহল দিতে দেখে এসেছি। ঠিক জানিনা ওদের মনের মধ্যে কি শয়তানি জমা হয়ে আছে। কোন একটা বড় অঘটন ঘটতে যাচ্ছে এটা মন বলছিল। সব কিছু বিবেচনা করে মনটা বিষন্ন হয়ে উঠেছিল। মন বলছিল আজ আর রিমুকে পড়াতে যাবনা। কিন্তু মাসের শেষ পর্যায়ে পড়ানো গ্যাপ দেয়া ঠিক হবেনা ভেবেই ওদের বাসায় গেলাম। আমি চিন্তিত এটা ওদের বুঝতে দিতে না চাইলেও চেহারাতে কোন একটা কিছু ছিল যা দেখে রিমুও বুঝতে পারলো আমার মন খারাপ। ও কাছে এসে বললো ভাইয়া আজ আমি পড়বোনা। কেন পড়বেনা তা জিজ্ঞেস করার আগেই রিমুর আম্মু বললো কাল ২৬ মার্চ রিমুর জন্মদিন। ও তাই তোমাকে নিয়ে পরিকল্পনা করতে চায় জন্মদিনে কি কি করবে। আমি সব চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিয়ে মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু চাইলেইতো আর যোদ্ধার মন থেকে যুদ্ধের চিত্র মুছে ফেলা যায়না। বার বার যেটাকে দূরে রাখতে চায় সেটাই মনের মধ্যে বেশি করে দানা বাঁধে। ৭ মার্চের জনসভায় বঙ্গবন্ধুর কথা গুলো ধ্বমনিতে রক্তের সাথে মিশে গেছে। প্রতিক্ষনে তা কানে বাঁজে। রিমু আমার হাত ধরে ওর রুমে নিয়ে গেল। অবশেষে ছাত্রী এবং শিক্ষক কিংবা ভাই এবং বোন মিলে ২৬ মার্চ রিমুর জন্মদিনের পরিকল্পনা করতে লাগলাম। সেদিন রাতে রিমুর বাবার সাথে দেশের পরিস্থিতি নিয়ে বেশ কথা হলো। তিনি আশংকা প্রকাশ করে বললেন এ মাসে বা এর পরের মাসেই হয়তো পাকিস্তান আরমি কোন অঘটন ঘটাবে। এ কথা শোনার সাথে সাথে আমার মনের মধ্যে যে আশঙ্কা আর ভয় ছিল তা জেগে উঠলো। আমার বুকটা অজান্তেই কেঁপে উঠলো। পাকিস্তান আরমি যদি সর্বনাশ করতে চায় তবে হয়তো প্রথম আঘাত হানবে বঙ্গবন্ধুর ওপর। কেননা ওরা জানে এবং বিশ্বাস করে গোটা বাঙ্গালী জাতির চেয়ে এক বঙ্গবন্ধু ওদের পথের বড় কাঁটা। ওরা বঙ্গবন্ধুকে প্রচন্ড ভয় করতো। ভয় করতো বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে, ভয় করতো বঙ্গবন্ধুর দৃঢ়তাকে।

আমি রিমুর বাবাকে সরাসরি প্রশ্ন করলাম তহলেকি ওরা বঙ্গবন্ধুর কোন ক্ষতি করবে? তিনি বললেন, পাকিস্তান বাহিনী এতটা দুঃসাহস দেখাতে পারবেনা। কেননা বঙ্গবন্ধুর কিছু হলে বাঙ্গালীকে কোন ভাবেই দমিয়ে রাখা যাবেনা। জেনে শুনে পাকিস্তানীরা এই ভুলটা অন্তত করবেনা। বঙ্গবন্ধু যেখানে বলেই দিয়েছেন, “আমি যদি হুকুম দিবার নাও পারি তোমরা প্রস্তুত থেকো।” এরপর বাঙ্গালী যদি দেখে তাদের প্রিয় মানুষটি নেই, তখন যে আগুন জ্বলে উঠবে তা দমিয়ে রাখার মত ক্ষমতা পাকিস্তানের নেই।  কথাগুলো শুনে আমার রক্তে উষ্ণ স্রোত বয়ে গেল। আমার পেশি শক্ত হয়ে উঠলো। আমার মনে হলো আমার শরীরের রক্ত প্রবাহ দ্বিগুন হয়েছে। তিনি আশংকা করছেন পাকিস্তানীরা অন্য কোন ভাবে আমাদের ক্ষতি করবে। হয়তো আমাদের পুর্ব পাকিস্তানের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করবে। অর্থনৈতিক ভাবে আমাদের দুর্বল করার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে পর্যাপ্ত অর্থ যোগান বন্ধ করা হবে। হতে পারে অন্য যে কোন কিছু। সমস্যার দোলাচালে থাকলে মানুষের মনে নানা আশংকাই জাগে। আমাদের অবস্থা এখন সেই সংকটাপন্ন অবস্থা। এখন আমাদের সামনে কি ঘটতে যাচ্ছে তা আমাদের অনুমান করাও কল্পনাতীত। দেশের পরিস্থিতি নিয়ে এবং আমার পড়ালেখা নিয়ে রিমুর বাবার সাথে অনেক কথাই বলা হলো এবং দেখা গেল রাত গভীর হয়েছে। সুতরাং আমার আর হলে ফেরা হলোনা। রাতে রিমুদের বাসাতেই থেকে গেলাম। সবে মাত্র চোখে রাজ্যের ঘুম নেমে আসছে এমন সময় বিকট শব্দে চোখ থেকে সেই ঝড়ের মত ধেয়ে আসা ঘুম পালিয়ে গেল। ঘড়িতে সময় তখন রাত পৌনে দুইটা। ২৬ মার্চ চলে এসেছে আজ রিমুর জন্মদিন। ঘুমোতে যাবার আগেও কি আমি ভাবতে পেরেছি যে সকালে রিমুর জন্মদিন আর পালন করা হবেনা। না এমন নয় যে রিমু অসুস্থ হয়ে পড়েছে কিংবা হারিয়ে গেছে। রিমু ঠিক রিমুর মতই সুস্থ স্বাভাবিক আছে অথচ তার পরও ওর জন্মদিনটা পালন করা হচ্ছেনা। এমনকি রিমু নিজেওকি জানতো তার এবারের জন্মদিনে একটা বেলুনও ফুটানো হবেনা। হয়তোবা ২৫ মার্চের এই রাত্রি দ্বিপ্রহরের বিকট শব্দ রিমুর জন্মদিনের কোন এক আতশ বাজি ফোটানোর শব্দের মত। কাছে কিংবা দূরে শব্দ ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। মানুষের চিৎকার, কান্নার আওয়াজ, আকাশ বাতাস ভারি করে তুলেছে। কিসের আওয়াজ তা বুঝতে আমাদের বাকি থাকলোনা। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী রাতের অন্ধকারে নির্বিচারে গুলি চালাচ্ছে নিরিহ বাঙ্গালীর ওপর।

রিমুর বাবা ঘুমোতে যাবার আগেও যে আশঙ্কার কথা বলেছিলেন তা এতো অল্প সময়েই পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী করে বসতে পারে আমাদের কল্পনাতেও ছিলনা। গুলির বিকট শব্দে সবারই ঘুম ভেঙ্গে গেছে। সবাই ভীত সন্ত্রস্ত্র। বিদ্যুৎ আছে, লাইট গুলোও ঠিক আছে কিন্তু কারো আলো জ্বালাবার সাহস হলোনা। আমি সেই ঘুটঘুটে অন্ধকারেই রুম থেকে বেরিয়ে ড্রয়িং রুমে আসি। আগে থেকেই সেখানে জড় হয়েছিল রিমুর বাবা মা কাজের লোক আর ছোট্ট রিমু। ওদের বাসার কাজের লোকগুলোও ভয়ে জড়সড় হয়ে আছে। ড্রয়িং রুমে টিমটিম করে মোমবাতির আলো জ্বলছে। সেই আলোতে এক একটা মানুষকে আরো বেশি ভীত হতাশাগ্রস্থ মনে হচ্ছে। মৃত্যু ভয়ে মানুষ কতটা ভীত হতে পারে আর কতটা জড়সড় হতে পারে তা সেই দৃশ্যটা দেখলে এমনিতেই বোঝা যায়। আমি আসতেই রিমু আমার গা ঘেসে বসলো। মোমবাতির মৃদু আলোয় স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছিল রিমুর চোখে মুখে ভয়ানক ভয়ের ছাপ। সেই সাথে ভয়ে ওর শরীর কাঁপছিল। এমন পরিস্থিতিতে কারো মুখ দিয়েই কথা বের হবার কথা নয়। আমাদের কারো মুখ থেকেই কোন কথা বের হচ্ছিলনা। আমরা অনেকটা বাকরুদ্ধ মানুষের মত বসে থাকলাম কিছুক্ষন আর শুনতে থাকলাম থেকে থেকে ভেসে আসা গুলির আওয়াজ আর চিৎকার রত মানুষের হাহাকার আর গগণ বিদারী কান্নার আওয়াজ। কিছুক্ষণ পর আমাদের মধ্যে ফিসফিসানি শুরু হলো। রিমু আমার গা ঘেসে বসতেই আমি ওর মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিতে দিতে গলার স্বর নিচু ও কিছুটা স্বাভাবিক করে ওকে শান্তনা দিলাম যে সকাল হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। তোমার জন্মদিনে আমরা কেক আনবো বেলুন ফোটাবো। কিন্তু আমি জানি আমি রিমুর সাথে মিথ্যা কথা বলছি। সকাল হলে কোন কিছুই ঠিক হবেনা এবং দেখা যাবে সব বেঠিক। আমার কোলে মাথা রেখে ভীত সন্ত্রস্ত রিমু আবার ঘুমিয়ে পড়লো। চারিদিকে কোথাও তখন গুলির আওয়াজ নেই। আছে কেবল মানুষের কান্না আর আর্তনাদের বিষাদময় সুর। আমার তখনই ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে ইচ্ছে হচ্ছিল। কোথায় কি হচ্ছে দেখতে ইচ্ছে হচ্ছিল। কিন্তু সেই সময় তা সম্ভব নয় বলে ভোর হবার অপেক্ষায় থাকলাম। কখনো কখনো সময় শেষ হতে চায়না। অপেক্ষার সময় খুবই যন্ত্রনাদায়ক। কোন ভাবেই সে শেষ হতে চায়না। মনে হচ্ছিল এই রাত কোন দিন শেষ হবেনা। এই সময়ে আমার মাথা তেমন কাজ করছিলনা। একটি বারের জন্যও চিন্তা হয়নি হলের কথা,চিন্তা হয়নি বঙ্গবন্ধুর কথা। কেবল মাত্র আর্ত চিৎকার রত মানুষের ছবি কল্পনার চোখে ভেসে উঠছিল।

সে রাতে আর ঘুম এলোনা। অপেক্ষার সময় অবশেষে শেষ হলো। অবশেষে এলো ভোর। ২৬ মার্চের এই ভোর যে কোন দিনের ভোর থেকে ভিন্ন। অন্য যে কোন দিন ভোরে যেভাবে পুব আকাশে সুর্য ওঠে আজও হয়তো একই ভাবে সুর্য উঠেছে, তার পরও আজকের এই ভোর অন্য রকম। চারদিকে থমথমে ভাব। বাতাস ভারি হয়ে গেছে। রিমুদের বাসা থেকে বেরিয়ে আজিমপুর হয়ে হলে ফিরছি। রাস্তায় কেবল মানুষ আর মানুষ। গত রাতে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর তান্ডবের কথাই তাদের মুখে মুখে। নীলক্ষেত মোড়ে আসতেই মানুষের জটলা দেখতে পেলাম। ভিড় ঠেলে এগিয়ে দেখি পাশাপাশি তিনটে লাশ। দু’জনের মুখ চোখ বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে বিকৃত করা। বাকি জনকে চিনতে পারলাম। সলিমুল্লাহ হলের রাসেল ভাই। রাসেল ভাইকে আমি একটু একটু চিনতাম। ওনার লাশ আমার হৃদয় ভেঙ্গে দিল। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনতে আমরা ইকবাল হল ও সলিমুল্লাহ হল থেকে যে ছোট্ট দল মিছিল করতে করতে এগিয়ে যাচ্ছিলাম তার অগ্রভাগে ছিলেন রাসেল ভাই। তার গলায় ছিল অসম্ভব জোর। বুকে ছিল অসম সাহস আর ক্ষিপ্রতা ও আত্মপ্রত্যয়। তার এক একটা স্লোাগান এখনও আমার কানে বাজছে। আমার সাথে প্রথম যেদিন কথা হলো সেদিন তিনি শুরুতে আপনি করে কথা বলতে শুরু করলেন। আমি বললাম রাসেল ভাই আমি আপনার কত জুনিয়র। আমার সাথে আপনি আপনি করে কথা বললে আমার খারাপ লাগে। আপনি আমাকে লজ্জায় ফেলে দেবেন না। আমার সাথে তুমি করে বলবেন। রাসেল ভাই একগাল হেসে দিয়ে বলেছিলেন কি করে বলি? বলাতো যায়না আজ আমি যার সাথে তুমি বা তুই করে কথা বলবো কাল সেতো বিখ্যাত কেউ হয়ে যেতে পারে। তাই সম্মান দিয়ে আপনি করে বলার চেষ্টা করছি। আমি বললাম ভাই কোন দিন বিখ্যাত হবোনা আর যদি হয়েই যাই তো সেদিনও আমি আজকের আমিই থাকবো। তখনও আপনি আমাকে তুমি করেই বলবেন। আমার সরল জবাবে সেদিন রাসেল ভাই আমাকে বলেছিলেন সত্যিই তুই খুব ভাল। দেখবি তুই অনেক বড় হতে পারবি। তোকে দিয়ে অনেক কিছু হবে। আমার আশা গুলো আমাকে সে যে দোয়া করেছিল তা প্রতিফলিত হওয়ার আগেই সেই মানুষটি আমার চোখের সামনে নিরব নিথর হয়ে পড়ে আছে। অথচ সামনে আরও কত মিছিল হবে, তিনি সেখানে থাকতে পারবেন না। তার থাকাটা জরুরী ছিল। তিনি সেটা বুঝেও আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তিনি যেহেতু আমার পরিচিত তার লাশটা এখান থেকে নিয়ে যাওয়াটা আমার কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। কিন্তু একাতো তা সম্ভব নয়। তাই প্রথমে হলে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলাম।

হলের গেটে আসতেই বর্বরতা কাকে বলে তার চাক্ষুস সাক্ষ্যি হলাম। রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে পরিচিত অপরিচিত কত মুখ। নিমিষেই আমি নীলক্ষেত মোড়ে পড়ে থাকা রাসেল ভাইয়ের কথা ভুলে গেলাম। একটু আগেও যে মানুষটার জন্য আমার খুব দুঃখ হচ্ছিল এখন তা ছাপিয়ে গেছে। আমার সাথে ভীষন অন্তরঙ্গ ছিল এমন অনেকেই লাশ হয়ে পড়ে আছে, আমার করার কিছু নেই। সেখানে সামান্য পরিচিত রাসেল ভাইকে নিয়ে চিন্তা আমার মাথাতে আসার কথাই নয়। রাস্তায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা অসংখ্য মুখের কোনটিতেই হাসি নেই। কারো দেহেই প্রান নেই। গত রাতে হানাদার বাহিনী গোটা ইউনিভার্সিটি এলাকায় যে তান্ডব চালিয়েছে তা পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম অধ্যায়। সৃষ্টিকর্তা করুণা করে আমাকে এই রাতের জন্য হল থেকে দূরে রেখেছিলেন। তা না হলে আমি যে বিভিষিকাময় দৃশ্যের কথা লিখছি তা আর লেখা হতোনা। আমি নিজেই তখন লাশ হয়ে গন্ধ ছড়াতাম। এ জন্য সৃষ্টিকর্তাকে প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা জানালাম। হলে ঢুকতেই ঢুকতেই বর্বরতার তীব্রতা চোখে জ্বালাপোড়া শুরু হলো। গোটা হল ধ্বংসস্তুপে পরিনত হয়েছে। সেখানে কেবল জানালার ভাঙ্গা কাচ আর মেধাবীদের রক্তমাখা নিথর দেহ। যারা বেঁচে গিয়েছিল তাদের মুখে ভাষা নেই। বিভিষিকাময় এই দৃশ্য দেখে আমরা কাদঁতে ভুলে গেলাম। হলের বড় একটা রুমে জরুরী সভা বসলো। সেখানে বলা হলো পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী আবার হানা দেয়ার আগে, আবার সর্বনাশ করার আগেই এখান থেকে আমাদের বেরিয়ে যেতে হবে। যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। এ যুদ্ধে আমাদের জয়ী হতেই হবে। ছাত্র নেতারা আমাদের বিভিন্ন দলে বিভক্ত করে দিলেন। আমরা কলম ধরা ছাড়া কোন দিন অস্ত্র ধরার কথা চিন্তাও করিনি, সেই আমরাই কলমের কথা ভুলে গিয়ে অস্ত্র ধরতে প্রস্তুত হলাম। আমরা দেশের নামে শপথ নিলাম। এ দেশটা আমাদের এবং এর স্বাধীনতা আমরা ছিনিয়ে আনবোই। এ জন্য দরকার অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষন এবং রণাঙ্গনের রণকৌশল আয়ত্ব করা। একাত্তর এখন কোন সাধারন দশটা পাঁচটা বছরের মত নয়। একাত্তর আমাদের আগামী প্রজন্মের জন্য রক্তাক্ত ইতিহাস হয়ে থাকবে। আমার এই লেখাটা কারো হাতে পড়লে যেন জানতে পারে আমরা কত কষ্ট আর যন্ত্রনার মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছি। আমরা জানিনা স্বাধীনতার স্বাদ কিরূপ, কিন্তু আমরা জানি পরাধীনতার তিক্ত স্বাদের অসহ্য যন্ত্রনা। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তথা কথিত শ্রেষ্ঠ সৈনিক বলে যারা পরিচিত ছিল তারাই কাপুরুষের মত এদেশের নিরীহ মানুষদের হত্যা করেছে। পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠি ৭ মার্চের ভাষন শুনে ভয়ে শিউরে উঠেছিল। তারা বুঝতে পেরেছিল বাংলার স্বাধীনতার এই আন্দোলন কোন ক্রমেই দমিয়ে রাখা যাবেনা। একমাত্র পথ কোন ভাবে বাঙ্গালীদের মনের মধ্যে ভয় ঢুকিয়ে দেয়া। ভয় ঢুকিয়ে দিতে পারলেই বাঙ্গালী থেমে যাবে। সেই ভয় ঢুকিয়ে দিতেই তারা গত রাতে বিভিষিকাময় ঘটনার জন্ম দিয়েছে। পাকিস্তানী কাপুরুষেরা ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যায় লিপ্ত হলো। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক,ছাত্র,কুলি দিন মজুর তাদের হিংস্র থাবা থেকে বাঁচতে পারেনি। রিমুকে পড়াতে যাওয়ার সময় নীলক্ষেত মোড়ে নিঃস্ব ঘরহীন জরিনা আর তার ছয় বছরের ছেলেটাকে দেখেছিলাম। তারাও রক্ষা পায়নি। আমি নিজ চোখে বর্বরতার শেষ চিহ্নটুকু দেখে এসেছি নীলক্ষেত মোড়ে। জরিনার পরনের শাড়ী ছিল শত ছিন্ন। তার এক মাত্র সন্তানেরও তাই। গত রাতে এক মুঠো ভাত খেয়েছিল কিনা তা আমি জানিনা। হয়তো খেয়েছিল, হয়তো জীবনের শেষ খাওয়াটাও খাওয়া হয়নি অভাবে। ফুটপাতে যাদের বসবাস তাদের আবার সুখ আর সুখের নিদ্রা কি! জরিনাও তার সন্তানকে আকড়ে ধরে ফুটপাতেই বেঁচে থাকতে চেয়েছিল। স্বামী একটা সন্তান জন্মদিয়ে জরিনাকে ফেলে গেছে। খেয়ে না খেয়ে সে তার ছেলেকে বড় করে তুলছিল। ছেলেটা তার নীলক্ষেত স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেনীতে পড়তো। তারও স্বপ্ন ছিল সন্তান বড় হবে মানুষের মত মানুষ হবে। অথচ তার স্বপ্নটাও অংকুরেই শেষ হয়ে গেল।

ইকবাল হল সহ অন্যান্য হলের চারদিকে লাশের সারি। তার ভিতর আমি এক অভাগা মনের আনন্দে ডায়রি লিখছি। লিখছি ফুটপাতে পড়ে থাকা জরিনা নামের এক নিঃস্ব মা ও তার ছেলের লাশ হওয়ার কথা। আমি কথাগুলো এমনি এমনি লিখছিনা। আর মনের আনন্দে লেখার তো কোন অবকাশই নেই। আজ যে সবুজ জমিন জানা অজানা হাজারো মানুষের বুকের রক্তে লাল হয়েছে, সেই জমিনের ওপর বসে আমি কিভাবে মনের আনন্দে ডায়রি লিখি। কারো মনেই যে শান্তি নেই, আনন্দ নেই, এটা কারো অজানা নয়। বিগত দিনে বাঙ্গালীদের কম কষ্ট ভোগ করতে হয়নি। কম আন্দোলন হয়নি এদেশে। কত নারী তার সন্তানকে স্বামীকে হারিয়েছে তার হিসাব নেই। তাদের কথা কেউ লিখে রাখেনাই বলে তারা ইতিহাস থেকেই হারিয়ে গেছে। অথচ তাদের অবদান কোন অংশে কম ছিলনা। শুধু এসব কারণেই আমি জরিনা বা তার মত হতদরিদ্র ফুটপাতের মানুষের কথা লিখছিনা। ওর ছেলেটাকে আমি চিনতাম। আমাদের বন্ধু হাসনাত আরো কয়েক জনকে সাথে নিয়ে বিকেলে ফুটপাতে যে সব ছেলে মেয়ে বেড়ে উঠেছে তাদের বিনিপয়সায় পড়ায়। জরিনার ছেলেটাও স্কুল শেষে ওখানে আসতো। কয়েকদিন আমিও ক্লাস নিয়েছি। তখন থেকেই জরিনা ও তার ছেলেকে চিনি। গরিব হোক,সে তো আমাদেরই প্রতিবেশী। চেনা জানা মানুষ। এক মা, যে তার সন্তানকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতো। সেই মা তো দেশের জন্যই প্রাণ দিল। তার কথা আমি যদি নাই লিখি তবে কি লাভ এই অথর্ব ডায়রি লিখে। ডায়রি লেখার চেয়ে এখন বরং যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া বেশি প্রয়োজন। গত রাতে আগুনের ফুলকির মত সহস্র গোলাবর্ষন,মেশিনগানের গুলিবর্ষনের একটানা শব্দে সমস্ত ঢাকা নগরী ভুতুড়ে,মৃতের লাশের শহরে পরিণত হয়েছে। উত্তরে দক্ষিণে পুবে পশ্চিমে সব দিকেই আগুনের লেলিহান শিখা গগন চুম্বি হয়ে পড়েছিল।  বেলুচিস্থানের কসাই কুখ্যাত টিক্কাখান,আব্দুল্লাহ খান নিয়াজি,ফরমান আলী,ইয়াহিয়া খান বাঙ্গালীর রক্ত দেখতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। আমরা বন্ধুরা মিলে আশেপাশের খোঁজ জানার চেষ্টা করলাম। পিলখানা থেকে শুরু করে রাজারবাগ পুলিশ লাইন এমনকি ধানমন্ডি পর্যন্ত।

জানালা দিয়ে বাইরে তাকালেই একটা আকাশ চোখে পড়ে। সেই আকাশটা সীমাহীন । কখনো সেই আকাশ নীলের ছড়াছড়ি আবার কখনো কালবোশেখী মেঘে ঢেকে থাকে। রাতে সেই আকাশটাই তারায় তারায় ঝিলমিল করে আর তার মাঝে জোছনার রানী চাঁদ মিটমিট করে হাসে। সেই আকাশে এখন কোন তারা নেই,এখন কোন চাঁদ নেই। গুমোট মেঘেমেঘে গোটা আকাশ ছেয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে আকাশের সেই তুলনাহীন নীল। চোখ তুটো কি যেন খুঁজছে। বাইরে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি আর আনমনাই কত কিছু ভাবছি। একটা পাখি হয়তো গাঙচিল নয়তো ভূবন চিল নয়তো অন্য কোন নাম নাজানা পাখি ডানা ঝাপটে উড়ে গেল। তার উড়ে যাওয়ার শব্দ পেলাম কিন্তু তাকে দেখতে ইচ্ছে হলোন। মনটা খারাপ হয়ে আছে। ঘরের দরজাটা খোলা আছে। ইচ্ছে হলেই বাইরে যেতে পারি। তারপরও মনে হচ্ছে আমি বন্দী। আমার পায়ে শিকল পরিয়ে রেখেছে। আমার কোন স্বাধীনতা নেই। যে স্বাধীনতা পেলে একটা পাখি আকাশে ইচ্ছা মত ডানা মেলতে পারে। যে স্বাধীনতা পেলে বনের হরিণ ইচ্ছে মত ঘুরতে পারে। সেই স্বাধীনতা আমার নেই। সেই স্বাধীনতা নেই কোটি কোটি বাঙ্গালীর। বর্বর পাকিস্তানীরা দিয়ে গেছে সীমাহীন যন্ত্রনা। যে ক্ষত বাঙ্গালীর হৃদয়ে দাগ কেটেছে তা মুছে ফেলার নয়। এর মাঝেই আরো ভয়াবহ সংবাদ আসতে থাকলো। সেই সব ভয়ংকর সংবাদের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর সংবাদ হলো বঙ্গবন্ধু নেই। আমি খুব সাবলিল ভাষায় কথাটি লিখলেও আমার হাত কাঁপছে,আমি বিচলিত এবং অনেকটা হিস্ট্রিয়া গ্রস্থ রোগীর মত। বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ কন্ঠ আমাকে এবং গোটা বাঙ্গালী জাতিকে জাগ্রত করেছে। বঙ্গবন্ধু নেই এ কথা শোনা মানে হৃদয়ে রক্তক্ষরণ শুরু হওয়া। গত রাতে বর্বর হামলা চালিয়ে গোটা এলাকা লাশের স্তুপ বানিয়ে ওরা সবচেয়ে ভয়ংকর কাজটি করেছে। আর তা হলো বঙ্গবন্ধুকে গায়েব করে দেয়া। কেউ জানেনা বঙ্গবন্ধু কোথায় আছেন। তিনি বেঁচে আছেন না তাকেও শেষ করে দিয়েছে তার কিছুই জানিনা। পথে পথে মানুষের মাঝে মিশ্র প্রতিকৃয়া। সবাই একই কথা বলছে ওরা নাকি বঙ্গবন্ধুকে মেরে ফেলেছে। আমার সাথে রাশেদ,নজিব সহ আরো কয়েকজন ছিল। রাশেদ সবসময় জ্ঞানী মানুষের মত কথা বলে। ও জোর দিয়ে বলেছে পাকিস্তানীরা বঙ্গবন্ধুকে ধরে নিয়ে গেলেও হত্যা করার সাহস রাখেনা। ওর কথায় বুকে সাহস আসে। আমরাওতো চাই বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকুন, ভালো থাকুন। ওর কথায় যুক্তি আছে। যে মানুষের কথায় কোটি কোটি বাঙ্গালী রুখে দাড়ায় কামানের সামনে, তাকে হত্যা করলে কি ভয়ানক কান্ড ঘটবে তা বোকা হলেও পাকিস্তানী শাসক গোষ্ঠী অনুধাবন করতে পারে বলে আমাদের বিশ্বাস।

হলে ফিরে আশেপাশের সংবাদ সবাইকে দিতেই সবাই আবার এক রুমে জড় হলো। এর মাঝে অনেকে মিলে মৃত ছাত্রদের লাশ সরিয়ে ফেলেছে। যা করেছে তা অতি দ্রুততার সাথেই করেছে। হলে এখন থমথমে পরিবেশ। সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে রাত হবার আগেই সবাই হল ছেড়ে বেরিয়ে যাবে। এর কিছুক্ষণের মাঝে খবর আসলো বঙ্গবন্ধু ভাল আছেন এবং তাকে পাকিস্তানীরা বন্দী করে রেখেছে। অনেক কষ্টে একটা রেডিও জোগাড় করা গেল। সেই রেডিওতে অস্পষ্ট ভাবে বিভিন্ন কথা ভেসে আসছে। আমরা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কথা শুনে রেডিওর নব ঘুরাতে লাগলাম। অনেক চেষ্টার পর অস্পষ্ট শব্দ ভেসে আসতে লাগলো। কখনো সংগ্রামী গান আবার কখনো কথা ভেসে আসছিল। কিন্তু তা এতটাই অস্পষ্ট যে, কিছুই বোঝা গেলনা। এটা যে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র তা বুঝতে বাকি থাকলোনা। এরপর বেতারে ভেসে আসলো স্বাধীনতার ঘোষনা। সে ঘোষণা শুনে আমরা স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হলাম। আমরা যুদ্ধে অংশ নেব এবং তার জন্য প্রয়োজন অস্ত্র এবং প্রশিক্ষণ। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে রওনা হলাম রিমুদের বাসায়। মাথার ওপর যে আকাশটা নীল ছিল, সে আজ আশা নিরাশার দোলাচালে কালো মেঘে ঢাকা পড়ে গেছে। রিমুদের বাসায় কলিংবেল নেই। হয়তো আগে ছিল কোন কারণে এখন নেই। আবার এমনও হতে পারে এ বাসায় কলিংবেল কোন কালেই ছিলনা। দরজায় টোকা দিলাম, কোন সাড়া শব্দ পেলামনা। আবার টোকা দিলাম, কিন্তু এবারও কোন সাড়া শব্দ নেই। ওরাকি তাহলে বাসায় নেই নাকি! ব্যাপারটা নিয়ে ভাবতেই পারছিলাম না। আরো জোরে ধাক্কা দিতেই ওপাশ থেকে ভীত কন্ঠে কাজের ছেলেটা জানতে চাইলো কে? আমি নাম বলতেই দরজা খুলে দিল এবং ভেতরে ঢুকতেই দরজা আবার বন্ধ করে দিল। ঘরে বৈদ্যুতিক বাতি থাকলেও কেউ তা জ্বালাচ্ছেনা । ভয়ে সবাই স্থবির। সোফায় বসতে বসতে বললাম একগ্লাস পানি হবে। আমার বলা শেষ হতে না হতেই নিজাম ভাই গ্লাসে পানি নিয়ে আসলো। গ্লাসটা চকচক করছে। মনে হয় বেলজিয়াম গ্লাস। তা না হলে এতো চকচকে হতোনা। রিমুর বাবা মা এমনিতেই খুব সৌখিন। তাদের পানি পানের গ্লাস বেলজিয়াম হবে এটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। নিজাম ভাইয়ের কাছ থেকে পানির গ্লাসটা নিয়ে ঢকঢক করে সবটুকু পানি শেষ করলাম। নিজাম ভাই আমার পানি পান এক নজরে দেখলেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে হয়তো বলতেন এত দ্রুত পানি খাওয়ার কি দরকার ধীরে ধীরে খেলেই হয়। কিন্তু এখন যেহেতু সময় বদলে গেছে তাই তা বলার অবকাশ নেই। পিপাসা পেয়েছে পানিটাই মুখ্য। সেটা বেলজিয়াম গ্লাসেই হোক কিংবা মাটির বদনায় হোক। তবে রুচি বলে একটা কথা আছে। কোন কোন সময় ওসব রুচি নিয়ে বসে থাকলে চলেনা। আমিতো এখন সেরকম একটা সময়েই আছি। নিজ হাতে পরিচিত জনদের লাশ সরিয়েছি। পথে বেওয়ারিশ ভাবে পড়ে থাকতে দেখেছি ইউনিভার্সিটির খুব কাছ থেকে দেখা বড় ভাইদের। সারাদেশে এখন যুদ্ধের থমথমে পরিবেশ। এই পরিবেশে মুখে একটু পানি দিতে পারাটাই যথেষ্ট। পানিটুকু পান করে নিজাম ভাইয়ের হাতে খালি গ্লাসটা ফিরিয়ে দিলাম।

নিজাম ভাই রিমুদের বাসায় টুকটাক কাজ করে দেন এবং তিনিই সব বাজার সদাই করেন। তার গ্রামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ। বহুদিন হলো তিনি রিমুদের বাসায় আছেন। সেটি রিমুর জন্মেরও কয়েক বছর আগে থেকেই। রিমুর নানা বাড়িও কিশোরগঞ্জ। পাগলার মসজিদ থেকে সামান্য দক্ষিণে এগোলেই ওর নানাবাড়ি। নিজাম ভাই রিমুর নানাদের আত্মীয় এবং বিশ্বস্ত হওয়ায় রিমুর আম্মু ওনাকে সাথে করে নিয়ে এসেছিলেন। নিজাম ভাই আমার থেকে দু এক বছরের বড় হবে। লেখাপড়া না শিখলেও বেশ গুছিয়ে কথা বলতে পারেন। তার সাথে কথা বললে সহজে কেউ বুঝতে পারবেনা যে আসলে তিনি নিরক্ষর। পানিটুকু শেষ করে ওনার হাতে গ্লাসটা দিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। নিজাম ভাই একটু কাছে এসে গলা খাদে নামিয়ে বললেন শুনলাম ভার্সিটির অবস্থা ভাল না এর মাঝে ওখানে থাকা আপনার জন্য নিরাপদ নয়। এখন কি করবেন? কোথায় থাকবেন? ঢাকায় থাকা যায় এমন কোন আত্মীয় স্বজন আছে? নিজাম ভাই একসাথে অনেকগুলো প্রশ্ন করলেন। আবারও একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বললাম হলে ফিরছিনা। ওখানে থাকা মানে নিশ্চিত মৃত্যুর ফাঁদে পা রাখা। আবার চিন্তাও হয়, হলে থাকবোনা তো থাকবো কোথায়? ঢাকায় থাকার মত এমন কোন আত্মীয় নেই। যদি থেকেও থাকে তাদের সাথে আমার পরিচয় নেই। এখন বড় মুশকিলই হলো। নিজাম ভাইয়ের গলায় দরদ নেমে এলো। তিনি আমাকে গ্রামে চলে যেতে বললেন। আমি নিজাম ভাইয়ের হাত ধরলাম,বললাম নিজাম ভাই গ্রামে যাওয়া যাবেনা। গ্রামে যাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব নয়। চারদিকে যে পরিস্থিতি তাতে গ্রামও যে শান্ত আছে তা বলা যাবেনা। আমার কথায় নিজাম ভাই কোন উত্তর দিলেন না। শুধু মাথা নাড়ালেন। এর কিছুক্ষণ পর রিমুর বাবা মায়ের সাথে দেখা হলো।  তারা বাসাতেই ছিলেন কিন্তু কেউ কোন কথা বলেননি। নিজাম ভাই তাদেরকে আমার কথা বললে তবেই তারা আমার সামনে আসলেন। রিমু জেগে নেই। জেগে থাকলে দৌড়ে আমার কাছে আসতো। গত কালকের রাতের গোলাগুলি আর দিনে মানুষের আহাজারি ওর ছোট্ট মনকে বিষিয়ে তুলেছে। হয়তোবা সে কারনেই স›ধ্যা নামতে না নামতেই ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেছে। ঘুমই ভাল। অন্তত একটু শান্তি পাওয়া যায়। জেগে থাকা মানেই কোন দুর্ঘটনা, কোন কুৎসিৎ বিভৎস দৃশ্য। ভাঙ্গা আয়নায় মুখ দেখার চেয়ে মুখ না দেখাই ভাল। তেমনি হানাদারদের নৃশংসতা দেখার চেয়ে ঘুমিয়ে থাকাই ভাল। রিমুর বাবা সরাসরি কথা বলা শুরু করলেন। রিমুর আম্মু তার পাশে বসা। রিমুর বাবার গলার স্বরও খাদে নেমে এলো। হলের সব খবর জানতে চাইলেন এবং আমি এখন কি করবো সেটাও জানতে চাইলেন। আমি তাকে জানালাম এ অবস্থায় হলে থাকতে চাইনা, আবার গ্রামেও ফিরে যেতে চাইনা। আবার যখন জানালাম ঢাকায় আমার কোন আত্মীয় স্বজন নেই যার বাসায় ক’দিন থাকতে পারি, তিনি খুব চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তিনি কোন রুপ আড়ষ্ঠতা না দেখিয়ে আমাকে সরাসরি বললেন তুমি বরং পরিস্থিতি শান্ত না হওয়া পর্যন্ত আমার বাসাতেই থাক। আমিও ভাবান্তরহীন তাকে প্রশ্নটা করলাম সত্যিইকি পরিস্থিতি আদৌ শান্ত হবে? এবার তার মুখে চিন্তার রেখা দেখা দিল। আমি তাকে বিগত দিনের কথা বললাম। তাকে জানালাম যখন গ্রামে ছিলাম তখন বঙ্গবন্ধুর নাম শুনেছি অল্পবিস্তর কিন্তু দেখা হয়নি কখনো। এরপর যখন ঢাকায় আসলাম এবং পরিস্থিতি আস্তে আস্তে বদলাতে শুরু করলো, আমিও তখন বদলে গেলাম। রাস্তায় মিছিল; আমি ঘরে বসে একা একা বই পড়ছি। মিছিলের এক একটি ধ্বনি কানে ঢুকছে আর আমি ক্রমান্বয়ে বইয়ের পাতা থেকে হারিয়ে যাচ্ছি মিছিলের সাথে। একদিন দু’দিন করে করে যখন বন্ধুদের সাথে রেসকোর্সের ময়দানে গেলাম সেদিন ছিল ৭ মার্চ। মাত্র কদিন আগের কথা আপনার ভুলার কথাও নয়। পুরো ময়দান লাখ লাখ মানুষে ভরপুর। ময়দান কেঁপে কেঁপে উঠছিল মিছিলে মিছিলে। বক্তা মাত্র একজন। যার অপেক্ষায় আর সবাই নিশ্চুপ শ্রোতা হতে অপেক্ষার প্রহর গুনছিল। একটা সাদামাটা মঞ্চ,ছড়ানো ছিটানো বাঁশের মাথায় গুটিকয়েক মাইক আর অজস্র মানুষের হাতে ছোট বড় লাঠি। ভীড় ঠেলে এগিয়ে গেলাম মঞ্চের খুব কাছে। সেখানে সেই মঞ্চে দাড়ালেন বীর,দাড়ালেন আপামর বাঙ্গালীর প্রানের মানুষ বঙ্গবন্ধু। তার কথা শুনে তখনই আমি আমাকে দেশের নামে উৎসর্গ করে এসেছি। আমিতো এখন পালিয়ে থাকতে পারিনা! আমিতো এখন গ্রামে ফিরে যেতে পারিনা। যে শপথ আমি সেদিন নিয়েছিলাম সে শপথ পুরণের সময় এসে গেছে। তাই আমার পথ আমি স্থির করে নিয়েছি। 

আমার কথা বলা শেষ হলে আমি অনুভব করলাম কেউ একজন আমাকে জড়িয়ে ধরেছে। পরক্ষণেই বুঝলাম তিনি রিমুর বাবা। তার চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছে। তিনি বললেন আমি যেদিন প্রথম তোমার সাথে দেশ নিয়ে কথা বলেছিলাম সেদিনই বুঝতে পেরেছিলাম দেশের প্রতি তোমার কতটা টান। তুমি যুদ্ধে যাচ্ছ এটা গৌরবের কথা। এ দেশ স্বাধীন হবেই। যে দেশের তরুণেরা কলম ফেলে অস্ত্র হাতে নেয় মাতৃভূমিকে রক্ষার তাগিদে, সে দেশ স্বাধীন হবে না তো কোন দেশ স্বাধীন হবে। হানাদারেরা রাতের অন্ধকারে যে নৃশংস ঘটনার জন্ম দিয়েছে একদিন তার ফল তারা ভোগ করবেই। কিন্তু বাবা যুদ্ধ কোন সাধারণ বিষয় নয়। আবেগ দিয়ে যেমন জীবন চলেনা তেমনি মুখে বললেই যুদ্ধে যাওয়া যায়না। সে জন্য দরকার প্রস্তুতি এবং প্রশিক্ষণ। তার কথাগুলো ছিল আমার জন্য অত্যন্ত উপকারী। তিনি অনেক রাত পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান দিলেন। জানিনা তিনিও আমার মত যুদ্ধে যাবেন কিনা। কিংবা আমার মত তার মনেও যুদ্ধে যাবার দৃঢ় সংকল্প আছে কিনা। তিনি একসময় সামরিক বাহিনীর উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন। তিনি তাৎক্ষণাৎ বিভিন্ন অস্ত্র সম্পর্কে আমাকে প্রাথমিক ধারণা দিলেন। কোন অস্ত্র কিভাবে চালাতে হয়,কোনটির রেঞ্জ কত সব জানালেন। বলতে গেলে ঘরের মধ্যে একরাতেই তিনি আমাকে সামরিক মহড়া করিয়ে নিলেন। পরদিন সকালেই আমি রিমুদের বাসা থেকে বেরিয়ে পড়লাম। আসার সময় রিমুর বাবা আমার হাতে পাচশত টাকা ধরিয়ে দিলেন। আমিও নিতে সংকোচ বোধ করলাম না। যুদ্ধের এই সময়ে টাকা এবং খাবার খুবই জরুরী। অন্য সময় হলে কোন ভাবেই আমি টাকাটা নিতাম না। সেটা রিমুর বাবাও জানেন। কিন্তু এখন সময় ভিন্ন স্রোতে বয়ে চলেছে। তিনি বললেন এই টাকাগুলো তোমার বিভিন্ন সময় কাজে লাগবে। দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে আমি কতটা অবদান রাখতে পারবো জানিনা, তবে রিমুর বাবা ইতমধ্যে দেশের স্বাধীনতার জন্য তার গুরুত্বপুর্ণ অবদান রাখতে শুরু করেছেন। তিনি সদ্য মুক্তি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে যাওয়া একজন তরুণকে বুকে নিয়েছেন, বিভিন্ন পরামর্শ দেয়ার পাশাপাশি অনেকগুলো টাকা দিয়েছেন। তার চেয়ে বড় কথা আমাকে প্রথম কোথায় যেতে হবে তাও তিনি ঠিক করে দিয়েছেন। বগুড়ার শেরপুরে আতাহার সাহেবের বাড়িতে গিয়ে আমাকে উঠতে হবে। তিনি টেলিগ্রাম করে তাকে জানিয়ে দিয়েছেন। এখন যোগাযোগ ব্যবস্থা যেরকম আছে দুদিন বাদে তা হয়তো থাকবেনা। তখন হয়তো কেউ কারো সাথে খবর আদান প্রদান করতে পারবেনা। আতাহার সাহেব ওখানকার স্থানীয় লোক। ১৯৪৮ সালে তিনি সেনাবাহিনী থেকে অবসর নিয়েছেন। তিনি সেনাবাহিনীতে একজন সাধারণ সৈনিক ছিলেন। রিমুর বাবা ছিলেন আতাহার সাহেবের অফিসার। সেই সুত্রেই তিনি আতাহার সাহেবকে আমার কথা জানিয়েছেন। আমি যখন কথাগুলো লিখছি তখন আমি আতাহার সাহেবের বাড়িতে। বাড়িতে তিনি , তার স্ত্রী ছাড়াও রয়েছে তার দুই ছেলে ও এক মেয়ে। বড় ছেলে আমার বয়সী,স্থানীয় এক কলেজে বিএ পড়ছে আর ছোট ছেলে পড়ে মাদ্রাসায়। একমাত্র মেয়ের নাম ফিরোজা। ফিরোজাও মাদ্রাসায় ক্লাস টেনে পড়ে। রিমুদের বাসা থেকে বেরিয়ে প্রথমে গাবতলী এসেছি। উদ্দেশ্য একটাই যদি রাসেল ভাইয়ের সাথে দেখা হয় তাকে অন্তত এতটুকু বলে যাব যে আমি যুদ্ধে যাচ্ছি। কখনো আমার বাবা মায়ের সাথে দেখা হলে যেন সংবাদটা দিতে পারেন। মনে মনে ভেবেছিলাম রাসেল ভাই হয়তো আমাকে আবার অপমান করে তাড়িয়ে দেবেন। কিন্তু গিয়ে দেখলাম রাসেল ভাই নেই। নজরুল ভাই ছিলেন তিনি আমাকে কাছে ডেকে বললেন রাসেল ভাই যুদ্ধে গেছে। একথা শোনার পর আমার বুকটা আনন্দে ভরে উঠলো। কিছুক্ষণ পর নজরুল ভাই জানালেন তিনিও যুদ্ধে যাবেন। তবে সপ্তাহ খানেক পর কিছু জরুরী কাজ সেরে তবেই যুদ্ধে যাবেন। আমি তাকে আমার কথাও জানালাম। তিনি আমার কাঁধে হাত রেখে বললেন দেশটা যখন আমাদের এ দেশটাকেতো আমরাই রক্ষা করার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়বো। সেদিনের ঘটনার জন্য যে রাগ নজরুল ভাইয়ের ওপর জমেছিল তা হারিয়ে গেল। রাসেল ভাইয়ের সেই অপমানের কথা আমি বেমালুম ভুলে গেলাম। আর ফিরে আসার আগে নজরুল ভাইও আমার হাত ধরে বললেন আমি এখন বুঝতে পেরেছি যে সেদিন তোমার ওপর অন্যায় করা হয়েছে। আমি এর জন্য ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আমি নজরুল ভাইয়ের হাত ধরে বললাম ভাই ছোটদের কাছে বড়দের ক্ষমা চাইতে হয়না এমনিতেই ক্ষমা হয়ে যায়।

যারা দেশের জন্য যুদ্ধে যেতে প্রস্তুত হচ্ছে তাদের একে অন্যের কাছে কোন অপরাধ থাকতে পারেনা। আমি নজরুল ভাইয়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ফিরে এলাম। ইতিউতি করেও আর কাউকে দেখলাম না। এমনকি সেই কাজের মহিলাকেও না। যার কারণে রাসেল ভাই আমাকে যাচ্ছেতাই বলে দুর দুর করে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। মহিলার ওপর এখন আমার আর কোন ক্ষোভ নেই। এখন আমার সব ক্ষোভ পাকিস্তান বাহিনীর ওপর। যারা আমাদের শান্তি কেড়ে নিয়ে রক্তের বন্যা বইয়ে দিয়েছে তাদের জন্য সব ক্ষোভ ঢেলে দিতে চাই। যে আগুন জ্বলে উঠেছে বুকের গভীরে সে আগুনে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিতে চাই পাকিস্তানী হানাদারদের। গাবতলী রাসেল ভাইয়ের মেসে গিয়ে তাকে না পেয়ে সোজা টঙ্গীতে চলে আসলাম। আসার সময় চোখে পড়লো অসংখ্য ছুটন্ত মানুষ। গাট্টি বোচকা বেঁধে সবাই নিরুদ্দেশ হচ্ছে। আমার ইচ্ছে হচ্ছিল ওদের বলি তোমরা কোথায় নিরুদ্দেশ হচ্ছো? নিজের দেশ ছেড়ে তোমরা এভাবে চলে যেতে পারনা। কিন্তু আমি তা বলতে পারিনি। আসার পথেই খুব মায়া হলো একটা ছেলের জন্য। সে তার খেলার সাথীদের রেখে কিছুতেই গ্রামে যেতে রাজি নয়। সে বায়না ধরেছে আমি এখানে থেকে যাবো। রাকিন,ত্বকি ওদের ফেলে আমি অন্য কোথাও যাবোনা। আমি বুঝলাম রাকিন,ত্বকি ওর বন্ধুদের নাম। মা তাকে তাড়া দিলো বক বক করিসনা,এখানে থাকবো থাকবো করলেইতো হবেনা মিলিটারী এসেছে সবাইকে মেরে ফেলবে। পাশ থেকে ছোট্ট মেয়েটা মাকে প্রশ্ন করলো মা মিলিটারী শুধু শুধু আমাদের মারবে কেন? মা যেন রাগে ফেটে পড়তে চাইলেন। রাগত স্বরে মেয়েকে ধমক দিয়ে বললেন ওদের ইচ্ছা হয়েছে তাই মারবে। মেয়ে মায়ের ধমকানিতে ভয় পেলোনা। সে তার মাকে দার্শনিকের মত বললো ওদের ইচ্ছে হবে আর মারবে ? এটাকি মগের মুল্লুক? ওরা মারতে আসলে আমরাও মারবো। খালেক স্যারকে বলবো আমরা পড়া না পারলে স্যার যে বেত দিয়ে আমাদের মারেন সেটা দিয়ে মিলিটারিদের এমন মার মারবে যে ওরা বাবার নাম ভুলে যাবে। মেয়েটার কথা শুনে আমার খুব ভাল লাগলো। কোন না কোন ভাবে সেওতো মুক্তিযোদ্ধা! মা তাকে এবার ভীষণ জোরে ধমক দিয়ে থামিয়ে দিলেন। ধমকের চোটে মেয়ে যেন কেদেই ফেলে। ওর বাবা শান্তনা দিলেন আর স্ত্রীকে বললেন আহ ছাড়োতো এত ধমকাচ্ছ কেন? এতে কাজ হলো। মহিলা আর কোন কথা বললোনা। বোনকে শান্তনা দিতে এগিয়ে এলো ভাইটি। বয়স দশ এগার হবে। আর বোনটার বয়স ছয় সাত। বোনের কাধে হাত রেখে বললো মন খারাপ করিসনা। পাকিস্তানিরা মারতে আসলে আমরাও ছেড়ে দেবনা। এবার দুই ভাই বোনের মধ্যে গল্প জমে উঠলো।

আচ্ছা ভাইয়া পাকিস্তানীরা মারতে আসলে তুইওকি  ওদের মারবি?

হ্যা অবশ্যই মারবো। মারবোনা কেন? ওরা যদি তোকে মারতে আসে ভাই হয়ে আমি কি বসে থাকবো? আচ্ছা ভাইয়া পাকিস্তানীদের সাথে কি দিয়ে যুদ্ধ করবি? বোনের প্রশ্ন শুনে ভাই পকেটে হাত দেয়। বের করে আনে একটা গুলতি। অন্য পকেট থেকে বের করে কিছু মারবেল। বোনকে দেখিয়ে দেখিয়ে বলে এই গুলতি আর মারবেল দিয়ে ওদের সব কটার কপাল ফাটিয়ে দেব। বোন তার ভাইয়ের কথা শুনে সাহস পায় আর আনন্দে হাত তালি দিয়ে ওঠে। হাত তালি দিতে আমারও ইচ্ছে হয় কিন্তু দিইনা। আবার ্িদইনা বললেও ভুল হবে। ওদের কথা শুনে হাত তালি দিই মনে মনে। আচমকা হাত তালি দেয়া দেখে ওদের মা অবাক হয় কিন্তু কিছু বলেনা। মনের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ক্রমাগত ভাবে জেগে ওঠে। দুই ভাই বোনের কথাগুলো মনে দাগ কেটে যায়। যে দেশের ছোট্ট বাচ্চারা তাদের স্কুল মাস্টারকে দিয়ে বেত পিটা করে পাকিস্তানীদের তাড়াতে চায় সে দেশের স্বাধীনতা রুখে এমন সাধ্য কার।

রাস্তায় কোন গাড়ি নেই। দু একটা রিক্সা চলছে তার আপন গতিতে। রাস্তায় মানুষ আর মানুষ। সবাই ছুটছে নিরাপদ গন্তব্যের দিকে। আমি ছুটছি টঙ্গী হয়ে আমার গন্তব্যে পৌছার পথে। টঙ্গীতে এসে একটা দোকান থেকে রুটি আর কলা কিনে খেলাম। অধিকাংশ দোকানপাটই বন্ধ। দু’একটা দোকান খোলা আছে কিন্তু লোকজন নেই বললেই চলে। দোকানের ঝাপটা অর্ধেক নামানো। ভিতরে একটা বাচ্চা ছেলেকে নিয়ে বসে আছে মধ্য বয়ষ্ক দোকানদার। দোকানদারের মুখে দাড়ি মাথায় টুপি। কলা আর পাউরুটি খেতে খেতেই দেখলাম আরো দু একজন লোক দোকানে এটা সেটা কিনতে আসছে। তাদের মাঝে ছোটখাট কথাও হচ্ছে। একজন বললো কি জীবন মিয়া পাকিস্তানীগো দলে ঢুকবা নাকি সারাক্ষণ টুপি পরে আছ। পাশ থেকে আরেকজন বলে উঠলো কি ভাই এলো মেলো কথা বলেন। টুপি পরলেই কি পাকিস্তানী হয়নাকি। টুপি দাড়ি ইসলামী লেবাস,নবীর সুন্নত এটা নিয়ে মশকরা করবেন না। কোন মুসলমান কি পাকিস্তানী হতে পারে! ওনার এই কথা শুনে আমি তাজ্জব বনে গেলাম। বলে কি এই লোকটা। গোটা পাকিস্তানতো মুসলমান সংখ্যা গরিষ্ঠ তাহলে এ কথা বলার মানে কি। পরক্ষণেই সব পরিস্কার হলো। পাকিস্তানী হানাদারেরা যা করেছে তাতে তারা মুসলমান কিনা তা কি জানি। ইসলাম মানে শান্তি আর ইসলাম এভাবে অন্যায় ভাবে কাউকে মারতে বলেনি। এর পর তিনি ছোটখাট একটা বক্তৃতা দিলেন। কথা গুলো ছিল খুব জোরালো এবং যুক্তিপূর্ণ তাই যাকে উদ্দেশ্য করে বললেন তিনি আর কোন উত্তর দিলেননা। তাদের কথাবার্তা থেকে জানলাম দোকানদারের নাম জীবন। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন সেই অনেক আগে থেকে। লোক দুটো চলে যাবার পর আমি তার সাথে একটু কথা বলার চেষ্টা করতেই জানতে পারলাম মনের মধ্যে দেশের জন্য তার কত টান। তিনি দোকান খোলা রেখেছেন যদি কোন মুক্তিকামী মানুষ তার দোকান থেকে কিছু কেনে তাতে তার ভাল লাগবে এটা ভেবে। মনে মনে বললাম আপনিতো ইতমধ্যে কত মুক্তিকামী মানুষকেই আপনার দোকানের খাবার খ্ওায়ালেন। জীবন ভাইয়ের দোকান থেকে পাউরুটি কলা খেয়ে  কোন মত পেটটাকে শান্ত করেই ট্রেনে উঠে বসলাম।

লক্কড়ঝক্কড় সেই ট্রেনে করে আমি পৌছালাম বগুড়ার সান্তাহারে। এর বেশি ট্রেন লাইন নেই। ট্রেন থেকে নেমে তিন মাইল পায়ে হাটা পথ। এরপর একটা বড় রাস্তয় উঠলাম। সেই বড় রাস্তায় গরু আর ঘোড়ার গাড়ী চলে। একটাকা ভাড়া দিয়ে উঠে বসলাম একটা ঘোড়ার গাড়িতে। গাড়ী চলছে আকাবাঁকা পথ বেয়ে। একসময় সে পথটুকুও ফুরালো। এর আগে আমি কখনো বগুড়াতে আসিনি। তার পরও সব কেমন চেনা চেনা মনে হচ্ছিল। ঘোড়ার গাড়ী থেকে নেমে আবার সেই পায়ে হাটা পথ। এদিকটাতে তেমন কোন রাস্তা নেই যা দিয়ে গাড়ী চলবে। অনেক মানুষকেই দেখা যাচ্ছে ঐ পথ দিয়ে হেটে যেতে। কিছুদুর হাটার পর একটা বাড়ীর সামনে আসলাম। সেখানে একজনকে জিজ্ঞেস করতেই তিনি আতাহার সাহেবের বাড়ী দেখিয়ে দিলেন। তারপর আমি এখানে পৌছালাম। এ বাড়ীতে এসে প্রথমে একে একে সবার সাথে পরিচিত হলাম। তিন দিন হলো আমি এ বাড়ীতে আছি। সবাই মনে করছে যুদ্ধের সময়টা আমি এ বাড়ীতে নিরাপদে থাকার জন্য এসেছি। এটা বুঝলাম এ কারণে যে গত রাতে খাবার সময় আতাহার সাহেবের স্ত্রী তার মেয়েকে বললেন , তোর জন্য সুবিধা হলো, অতদূর যেয়ে আর  পড়তে হবেনা। এখন থেকে ওর কাছেই পড়তে পারবি। আমি মাথা তুলে মেয়েটির দিকে তাকালাম। অসম্ভব সুন্দরী মেয়েটা। মায়ের কথা শুনে তার মুখে হাসির খৈ ফুটলো। সে হয়তো মনে মনে এটাই চাচ্ছিল। হয়তো সে অত দূরে গিয়ে পড়তে হবেনা ভেবে আনন্দ পাচ্ছিল নতুবা আমাকে দেখে তার ভেতরে একটু একটু অন্যরকম অনুভূতি জেগেছিল। রাতেই সে একবার আমার কাছে অংক করে গেছে।

সকাল হতে না হতেই সে আবার হাজির। সে অংকে ভালো বলেই মনে হলো। কেননা আমি তাকে কোন অংক একবার বুঝিয়ে দিলেই সে ওরকম বাকি অংক গুলো করতে পারে। তবে এ বয়সে যা হয় আরকি! সে কেমন অন্যরকম ভাবে আমার দিকে তাকায়। আমি বুঝতে পারি তার মনের ভাষা। কারণ এখন আমার মনের ভাষা বোঝার মত ছোট খাট জ্ঞান হয়েছে। হয়তো আলেয়া যখন চলে আসার সময় কিছু কথা ইঙ্গিতে বলেছিল তখন তা বুঝে উঠতে পারিনি তবে এখন বুঝি সে আসলে কি বুঝাতে চেয়েছিল। দুপুরে খাবার সময় ওর আম্মা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন বাড়ীতে আমার কে কে আছেন। এখানে থাকতে কোন অসুবিধা হচ্ছে কিনা। আমি আগেই ভেবে রেখেছিলাম আমার কী বলা উচিৎ। আমি ভেবেছিলাম আতাহার চাচা মনে হয় সবাইকে আগে থেকে সব বলে রেখেছেন । আমি কেন এসেছি কতদিনের জন্য এসেছি এসব আরকি। কিন্তু দেখলাম কোন এক অজানা কারণে তিনি তার বাড়ীর কাউকে আমার আসার উদ্দেশ্য বলেননি। বাধ্য হয়ে আমাকেই সব বলতে হলো। আমি এখানে নিরাপদে থাকতে আসিনি এবং যুদ্ধে যাবার জন্য এসেছি শুনে আতাহার চাচার স্ত্রী নির্বাক হয়ে গেলেন, আর মেয়েটাকে দেখলাম গাল ফুলিয়ে চোখ দিয়ে পানি ঝরাচ্ছে। মেয়েরা বোধ হয় একটুতেই হাসতে কাদঁতে পারে। মেয়েরা অল্পতেই ভাল কাঁদতে পারে এটা তার প্রমান। কেবল আতাহার চাচার বড় ছেলের মধ্যে খুশির আভা ফুটে উঠলো। খাবার শেষ করে আমি যখন বিছানায় শুয়ে আছি তখন সে আসলো। ওর নাম জামান। ও জানালো যে ওরা সব বন্ধুরাও যুদ্ধে যাচ্ছে। কথাটা শোনার সাথে সাথে একটা প্রশান্তি আমার মনের মধ্যে ভরে গেল। এরপর ওর সাথে আমার অনেক কথা হলো। ওর জীবনের অনেক হাসি কান্নার গল্প ও আমাকে শোনালো। যুদ্ধ শেষে ফিরে আসবে কিনা কেউ জানেনা। যেমন আমি জানিনা যুদ্ধ শেষে আবার সেই চিরচেনা গ্রামের মেঠো পথে হাটতে হাটতে বাবা মায়ের কাছে পৌছাবো কিনা। সে এক অদূর ভবিষ্যৎ হলেও সে সত্যিকার এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ। হয়তো এ জন্যই সে আমাকে তার অন্তরে জমে থাকা সব কথা থেকে কিছু কিছু জানালো। বলার মত আমার থলিতে কিছু ছিলনা বলে আমি সংক্ষেপে ইতি টেনেছি। হ্যা! বলতে পারতাম আলেয়াকে নিয়ে কত শত কথা। তাকে নিয়ে বলতে গেলে আজীবন বলেও আমি শেষ করতে পারবো কিনা জানিনা। অথচ আমি নিদ্বির্ধায় জামানের কাছে সব লুকিয়ে কথা সংক্ষেপ করেছি। এরপর আমি সোজা ইন্ডিয়াতে আসলাম। বগুড়াতে আমি শুধু কয়েকদিন থাকার জন্য এবং সেখান থেকে প্রশিক্ষণ নেয়ার তাগিদে এখানে আসা। দিনাজপুর সীমান্ত দিয়ে আমি ইন্ডিয়াতে ঢুকেছি। বগুড়া আতাহার চাচার বাড়ী থেকে গাইবান্ধার সাঘাটা হয়ে আস্তে আস্তে আমি দিনাজপুরে পৌছাই। এখানেই আমার বাড়ী অথচ আমি একটি বারের জন্যও বাড়ী যাওয়ার কথা মনে করিনি। যে বাবা মা বার বার আমাকে বলেছেন ওসবের ভিতর যাসনা, ওসব করার জন্য আরো লোক আছে, সেই বাবা মা আমাকে যুদ্ধে যেতে দিতেন কিনা জানিনা। হয়তো পরিস্থিতি বুঝে আমাকে যাওয়ার অনুমতি দিতেন। কাহারোলে আমার সাথে যোগ দিল আরো কয়েকজন যুবক। ওরা সবাই মুক্তি যুদ্ধে অংশ নেবে বলে ট্রেনিং নিতে ইন্ডিয়া এসেছে। আমরা খুব সাবধানে বর্ডার পার হলাম।

এখানে যে ক্যাম্পে এসে উঠেছি সেখানে আমার অনেক পরিচিত মুখ আছে যেমন

নাজমুল,মান্নান,জসীম,বাকি,রাকিবুল সহ অনেকে। ওরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন বিভাগের ছাত্র। ওদের কাছে পেয়ে আমার ভাল লাগছে। যুদ্ধের প্রস্তুতি নিতে এসে বন্ধুত্বের বেড়াজালে বাঁধা পড়ছিনা। তবে চেনা মুখ বীরের বীরত্বকে বাড়তে সাহায্য করে। ”মুক্তিযুদ্ধ কোন ছেলে খেলা নয়, কিংবা তুচ্ছ কোন বিষয় নয়। মুক্তিযুদ্ধ মানে অবধারিত মৃত্যু হাতে বয়ে বেড়ানো। মুক্তিযুদ্ধ মানে মৃত্যুর বিনিময়ে জীবন ফেরী করা। যেখানে ভয়কে তুচ্ছজ্ঞান করে শত্রুর বুকে মরণ কামড় দেয়াই যোদ্ধার একমাত্র দায়িত্ব। শত্রুকে ছিন্ন ভিন্ন করা যেমন যোদ্ধার দায়িত্ব তেমনি সহযোদ্ধাদের রক্ষা করাও এরই মত একটা দায়িত্ব। সাধনা,ধৈর্য্য আর অত্যন্ত কঠোর অনুশীলন একজন মুক্তিযোদ্ধার আগামী দিনের পথ চলা সহজ করতে পারে। সেই সাথে দেশের স্বাধীনতা অর্জনে সহায়ক হতে পারে।” এগুলো ছিল ট্রেনিং এর আগে মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশ্যে দেয়া উপদেশ। যে যুদ্ধের জন্য নাম লিখিয়েছি মুক্তিযুদ্ধে জানি সে যুদ্ধে প্রাণ দেয়ার মানসিকতা থাকা দরকার। নিজেকে শক্ত করি এবং প্রস্তুতি নিয়ে ফেলি মৃত্যুকে যে কোন মুহুর্তে আলিঙ্গন করার। এভাবেই শুরু মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি। এক সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন কসরত শেখার পর হাতে এলো অস্ত্র। প্রথম দিন থ্রি নট থ্রি রাইফেল,দুদিন পর স্টেনগান এবং এভাবে একে একে হালকা মেশিনগান থেকে শুরু করে মর্টার ও একে ফর্টিসেভেন চালানো। এক ফাঁকে শিখে নিয়েছি হ্যান্ড গ্রেনেড কিভাবে ছুড়তে হয় তার কলাকৌশল।

যুদ্ধ শুরু হবার আগেই পেয়েছি সহযোদ্ধাকে হারানোর কষ্ট। যেদিন প্রথম গ্রেনেড ছোড়ার কলা কৌশল শেখানো হলো সেদিনই হারালাম দুজন সহযোদ্ধাকে। গ্রেনেডের পিন দাত দিয়ে খুলে দূরে লক্ষ্যবস্তুর দিকে ছুড়ে মারতে হয়। আমাদের মারজান নারে সহপ্রশিক্ষণরত যোদ্ধা পিন খুলে ছুড়ে দিতে দেরি করে ফেলে এবং ওর হাতেই গ্রেনেড ফেটে যায়। এতে ও মারাত্মক ভাবে আহত হয়। কিন্তু চিকিৎসা দিতে দিতে সে নিথর হয়ে পড়ে। ঠিক একই ভাবে জরিপ তার গ্রেনেডের পিন খুলে একটা ঝোপের দিকে ছুড়ে মারে। আমাদের কারো জানা ছিলনা যে তারেক নামে আমার এক প্রশিক্ষণরত যোদ্ধা সেই ঝোপের আড়ালে প্রসাব করতে বসেছিল। গ্রেনেড সেখানে পড়তেই তার গগণ বিদাবী চিৎকারে আমরা ছুটে যাই। এবং তার ছিন্ন ভিন্ন দেহ প্রাণহীন ভাবে পড়ে থাকতে দেখি। যুদ্ধ শুরু করার আগেই আমরা কষ্টের সাগরে ভাসতে থাকি। সব কিছু মেনে নিয়ে প্রশিক্ষণ চালিয়ে যাই। যুদ্ধের ভয়াবহ পরিস্থিতিতে মাথা ঠান্ডা রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ এ কথাটা বার বার করে বলে দেয়া হয়েছে। ছোট খাট যে কোন জ্ঞানই কাজে লাগতে পারে বলে যারা শিক্ষিত ছিল তাদেরকে অস্ত্র চালনার পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয়ে অল্প বিস্তর শেখানো হলো। প্রাথমিক চিকিৎসা থেকে শুরু করে প্রতিকুল আবহাওয়ায় টিকে থাকার কৌশল। মানুষ যে মৃত্যুকে এতটা ভালবাসতে পারে তা এখন অনুভব করতে পারি। যুদ্ধ মানেই মৃত্যু একথা জেনেও লাখ লাখ তরুণ,যুবা,বৃদ্ধ অস্ত্র হাতে নিচ্ছে মানে মৃত্যুকেই আলিঙ্গন করছে। এ জন্যই বোধহয় বায়ান্নতে আমরা ভাষা পেয়েছিলাম। এমন দৃশ্য অন্তরকে আনন্দ দেয়। যে যুদ্ধ একটা স্বাধীন পতাকার জন্য,একটা স্বাধীন ভূখন্ডের জন্য ,সে যুদ্ধে প্রাণ দিতে প্রস্তুত আমরা। ট্রেনিং শেষে দিনাজপুর সীমান্ত দিয়ে রাতের অন্ধকারে ফিরে এলাম। ততদিনে দেশের নানা প্রান্তে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। অস্ত্র গোলাবারুদ,চিকিৎসা সব কিছুর প্রশিক্ষণ নিয়েছি। যুদ্ধের ময়দানে যে কোন ভাবে সাহায্য করতে পারাটাই হবে গুরুত্বপুর্ন। ততদিনে আওয়ামীলীগ ও ছাত্রলীগের বাছাই করা তরুণ ও শিক্ষিত কর্মীদের নিয়ে গড়ে উঠেছে মুজিব বাহিনী। তারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে শুরু করেছে। এ ছাড়াও বিভিন্ন প্রান্তে আলাদা আলাদা ভাবে গড়ে উঠেছে মুক্তিযোদ্ধাদের দল। আমি সোজা ভৈরব চলে গেলাম।

দেখতে দেখতে বৈশাখ চলে আসলো। নামে হলেও বৈশাখ আসলেই আমাদের মনটা আনন্দে ভরে ওঠে। বাঙলা নববর্ষ বলে কথা। পৃথিবীতে কত কত ভাষা আছে কিন্তু তাদের কোন নববর্ষ নেই। আছে খ্রিষ্ঠীয় নব বর্ষ যা অনেকে ইংরেজী নববর্ষ বলে থাকে। আর আছে হিজরী সন বা আরবী নববর্ষ। এর বাইরে কেবল বাঙলা নববর্ষ আছে। প্রতিবছর কম বেশি আনন্দ হতো। গ্রামে দু এক স্থানে মেলাও বসতো। আর এবার দেখতে দেখতে বৈশাক এলো চলে গেল টেরই পেলাম না। বৈশাখ যেন নিরুত্তাপ হয়ে এসেছিল গোপনে আবার গোপনেই চলে যেতে চাচ্ছে। বৈশাখ মানেই এপ্রিলের ভ্যাপসা গরম। আকাশে মাঝে মাঝে মেঘের আনাগোনা। মাঝে মাঝেই বৃষ্টির শীতল পরশ বুলিয়ে যাওয়া। যুদ্ধর ডামাডোলে সব বিমলিন হয়ে গেছে। সব রঙ ফিকে হয়ে গেছে। বৈশাখের সেই উত্তপ্ত গরমের দিনে আকাশ যখন মেঘে মেঘে ঢেকে গেল গোটা ভূমিকে বৃষ্টির শীতল পরশ দিতে এরকম সময়ে ১৪ ও ১৫ এপ্রিল ভৈরবে ভয়াবহ রকম যুদ্ধ হলো। পাকিস্তান হানাদার বাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতিরোধের মুখে মুখ থুবড়ে পড়লো। সেই যুদ্ধে সরাসরি থাকার সৌভাগ্য আমার হলোনা। যুদ্ধ শেষে আমি মুক্তিবাহিনীর সাথে যোগাযোগ করলাম এবং তাদের সাথে যোগ দিলাম। শুরু হলো গ্রাম থেকে শহরে এসে শিক্ষা জীবন শুরু করা এক তরুণের যোদ্ধা জীবন। আমার প্রশিক্ষণ সম্পর্কে সব জেনে নিয়ে আমাকে দায়িত্ব দেয়া হলো মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে শত্রু সৈন্যের অবস্থান ও খবর পৌছে দেয়া। আমি জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও দায়িত্ব পালন করবো বলে সিদ্ধান্ত নিলাম।

৪.

জুনের শেষ দিকে প্রচুর বৃষ্টি শুরু হলো। এমন বৃষ্টি বিগত সময়ে খুব একটা দেখা যায়নি। সকালে মানুষ ঘুম থেকে উঠে বৃষ্টি দেখছি এবং সারাদিন চলছে তুমুল বর্ষণ। গত এক মাসেরও বেশি সময়ে ডায়রীতে কলম ছোয়াতে পারিনি। এখন আমাদের প্রচুর ব্যস্ততা। এই বৃষ্টি আমাদের জন্য রহমত স্বরূপ। কখনো কখনো বৃষ্টি যেমন কষ্ট দেয় তেমনি কখনো কখনো বৃষ্টি আমাদের অনেক আনন্দের কারণ হয়ে দাড়ায়। বিগত সপ্তাহ খানেকের বৃষ্টি আমাদের জন্য অনেক উপকারে এসেছে। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাড়িয়ে আমরা কেবল দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়ছি। এ লড়াইয়ের শেষ অবধী আমরা সাহস হারাবোনা বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। মৃত্যুই যেখানে আমাদের সামনে তুচ্ছ সেখানে বৃষ্টি কোন ব্যাপারই না। একজন মুক্তিযোদ্ধা কোন কিছুতেই ভীত নয়। সৃষ্টিকর্তার ওপর পূর্ন আস্থা রেখে সে কেবল সামনে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ঝড় ঝঞ্জা সেখানে তুচ্ছ নগণ্য। সারাদিনের বৃষ্টিপাতে আমাদের যুদ্ধের উত্তেজনায় এতটুকু ভাটা পড়েনি বরং আমাদের কাজের গতি বেড়েছে। আমরা চাই স্বাধীনতা, তাই ঐ একটি শব্দকে পাওয়ার জন্য আমাদের অন্তহীন প্রচেষ্টা। অপরদিকে হানাদার পাকিস্তাানীরা জোর করে সেটা রুখতে চায়। তাদের কাছে বিষয়টা এমন যে বাঙ্গালীকে রুখতে পারলে অখন্ড পাকিস্তান থাকবে না রুখতে পারলেও সমস্যা নেই। আর তাই বৃষ্টির প্রকপতায় পাকিস্তানীরা মুশড়ে পড়েছে। এ কথা জোর দিয়ে আমি লিখতে পারছি কারন বিগত সময়ের চেয়ে বৃষ্টির এ সময়ে আমাদের পথচলা আরো গতিময় হয়েছে। আমরা অনেকগুলো পাকিস্তানী ক্যাম্প অ্যাম্বুশ করে উড়িয়ে দিয়েছি। ওরা এখন ভীত সন্ত্রস্ত। এভাবে চলতে থাকলে আমাদের খুব বেশিদিন স্বাধীনতার সুখের জন্য অপেক্ষা করতে হবেনা। মুক্তিযুদ্ধে আমার দায়িত্ব সংবাদ আদান প্রদান করা। এ জন্য আমাকে বিভিন্ন সময়ে ছদ্মবেশ নিতে হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও নিতে হবে। প্রথম প্রথম আমার খুব ভয় হতো। এখন আর ভয় করেনা। এখন কোথাও কোন সংবাদ পৌছে দিতে গেলে খুব আনন্দ হয়। আর সবচেয়ে বেশি আনন্দ হয় যখন দেখি আমার দেয়া সংবাদকে ভিত্তি করে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানীদের ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। তখন মনে হয় আমার যদি ডানা থাকতো কিংবা আমি যদি আরও দ্রুতগতি সম্পন্ন হতে পারতাম তাহলে যেখানে মুক্তিযোদ্ধারা আছে তাদের কানে শত্রুর অবস্থান নিশ্চিত করতে পারতাম। গত দুইদিন ঘর থেকে বের হইনি। এক সপ্তাহ হলো জ্বরে ভুগছি। এই সময় জ্বরের কথা মাথায় রাখার সময়ও আমাদের নেই। জ্বরের মধ্যেই এখানে সেখানে ছোটাছুটি করেছি। কিন্তু শরীরতো যোদ্ধার হাতের একে ফর্টিসেভেন নয় যে তাকে যেভাবে চালাবো সেভাবেই চলবে। সে চলে তার নিজস্ব নিয়মে। গতকাল শরীর কাপুনি দিয়ে জ্বর আসলো। আমি চোখে অন্ধকার দেখতে শুরু করলাম। আমার পকেটে গুরুত্বপুর্ন সংবাদ সম্বলিত একটা চিঠি। চিঠিটা যে কোন মুল্যেই হোক কাহারোলে মুক্তি বাহিনীর হাতে পৌছাতে হবে। আমার শরীরের যে অবস্থা তাতে আমি উঠেই বসতে পারছিলাম না সেখানে সংবাদ নিয়ে অতদূরে যাব কি করে তা ভেবে কুল কিনারা পাচ্ছিলাম না। আমাকে অসুস্থ শরীরে ভীষণ চিন্তিত দেখে আমি যে বাড়িতে আছি সে বাড়ির কাকি আমার কাছে সব শুনে বললেন চিন্তা নেই বাবা আমি আমার ছেলেকে পাঠাচ্ছি। শুনে আমি বড়ই আস্বস্থ হলাম। কিন্তু যখন ওনার ছেলেকে দেখলাম তখন আমার আশার আলো ক্ষীণ হয়ে গেল। আমি ভেবেছিলাম ওনার ছেলে বোধ হয় বেশ বড়সড় হবে। হয়তো মুক্তিযোদ্ধাও হতে পারে। কিন্তু যখন দেখলাম বার বছরের একটা ছোট্ট ছেলে তখন আমি আবার চিন্তায় পড়ে গেলাম। এতটুকু একটা ছেলেকে যুদ্ধের ময়দানে ঠেলে দেয়া ঠিক হবেনা। কিন্তু আমি যাই ভাবিনা কেন শেষে আমার সব চিন্তা দূর হয়ে গেল ছেলেটার কিছু কথা শুনে। ছেলেটা নিজের অসম্ভব সাহসের পরিচয় দিতেই আমার কাছে এসে বললো “ ভাইজান আমি ছোট বইলা আমারে পাঠাইতে ভয় পাইতাছেন যে যদি আমি ধরা পড়ি,যদি আমি মইরা যাই। আপনেওতো ধরা পড়বার পারেন,আপনেওতো মারা পড়বার পারেন। এই দ্যাশটা যেমন আপনের এই দ্যাশটা আমার,আমগো সবার। আমারেও এটটু সুযোগ দ্যান।” ওর কথাগুলো শুনে আমার চোখ ভিজে উঠলো। আমি যদি ঠিক ওর বয়সী থাকতাম তাহলে আমিওকি এরকম করে কথা বলতাম? নাকি ভয়ে মুখ ফিরিয়ে নিতাম। তা আমি জানিনা। শেষে ওকে আর না করতে পারলাম না। সব বুঝিয়ে বিদায় জানালাম।

সকালে আমাকে ভীষণ অবাক করে দিয়ে ও ফিরে আসলো নতুন সংবাদ নিয়ে। অসুস্থ শরীরেও আমি ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে কপালে মুখে চুমু দিলাম। ওর নাম জহির। আমি ওদের বাড়িতে গত চারদিন ধরে আছি। মৃত্যুর ভয়ে বা ধরা পড়ার ভয়ে ভীতুদের মত আমি পালিয়ে নেই। আমি অসুস্থ শরীরেই রাতের অন্ধকারে আমার কর্তব্য পালনের জন্য এ বাড়ির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। কোন এক সময়ে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গিয়েছিলাম জানিনা। জ্ঞান ফিরলে জানতে পারলাম এরা আমাকে তুলে এনে সেবা করে সুস্থ করার চেষ্টা করছে। ওরা যখন জানতে পারলো আমি মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করছি তখন ওরা আমার প্রতি আরো বেশি মমতা দেখালো। এখন আমি অনেকটাই সুস্থ। হয়তো দু একদিনের মধ্যেই আমি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠবো। তারপর হয়তো এদের সাথে আমার আর দেখা হবেনা। এই ক’দিনে এরা আমার অতি আপন হয়ে উঠছে। কোন কাজ নেই এবং শরীর একটু সুস্থ বোধ করায় আজ অনেক কিছু লিখতে পারছি। কোন কাজ নেই বললে ভুল হবে। আসলে কাজ আছে অফুরন্ত। এখনো আমাদের কাঙ্খিত স্বাধীনতা আমরা অর্জন করতে পারিনি। আমরা কেবল আমাদের সফলতার পথে কয়েক ধাপ এগিয়েছি মাত্র। এখনও আমাদের পাড়ি দিতে হবে অনেক পথ। যে পথে আছে মৃত্যুর ভয়, আছে রক্ত নদীর উষ্ণ স্রোত। তা বলে আমরা থেমে যাবনা। এই সময়ে আমি চেষ্টা করছি জমানো কথাগুলো লিখে ফেলতে। হতেও পারে এটাই আমার শেষ লেখা। আর তাই যতটুকু সম্ভব লিখে ফেলাই ভাল মনে করছি। স্বাধীনতার এই পথ বড় জরাজীর্ণ,কন্টকময় আর রক্তে রক্তে অতি পিচ্ছিল। সুতরাং যে কোন সময় মৃত্যু আমাকে গ্রাস করবেনা তা বলা যাবেনা। আমি তাই লিখছি যতটুকু লেখা সম্ভব। এ সময় আমি কয়েকদিন পর বা সপ্তাহ খানেক পর ডায়েরি লিখতে বসি। কদিন পরে হয়তো একেবারেই বসার সময় হবেনা। এ বাড়িতে দুটো শোলার বেড়া দেয়া ছনের ঘর ছাড়া তেমন কিছু নেই। অত্যন্ত গরীব হওয়ায় ছেলে মেয়েরা স্কুলে পর্যন্ত যেতে পারেনা। দিন আনে দিন খায় এই যাদের অবস্থা। এমনকি যুদ্ধের এই সময়ে হয়তো তাও ঠিকমত রোজগার হয়না। তার মাঝে আমি বিগত কয়েকদিন কাঁধে চেপে বসে আছি। আমি জানি এবং বিশ্বাস করি তারা শত কষ্টের মাঝেও কিছু মনে করছেনা। কারণ তারাও দেশকে ভালবাসে। যে পরিবারের ছোট্ট একটা ছেলে মুক্তি যুদ্ধে অবদান রাখতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করে সেই পরিবার একজন মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যকারীকে অপছন্দ করতে পারেনা। তারপরও নিজের কাছে খুব খারাপ লাগছে। এ বাড়ির চাচার নাম আজহার ফকির। সেই সুত্রে ছেলের নাম রেখেছে জহির ফকির। ফকির কথাটার মধ্যে একরকম গরীবি ভাব ফুটে ওঠে যা এ পরিবারকে দেখলেই সহজে বুঝা যায়।

আজহার চাচার এক ছেলে দুই মেয়ে। বড় মেয়ে জরিনাকে বিয়ে দিয়েছে দু’বছর হলো। আর ছোট মেয়ের বয়স ষোলতে পড়েছে। ওনার মাথায় এখন ভীষণ চিন্তা। দেশে যুদ্ধ মেয়ে বাড়ন্ত চিন্তা হওয়াই স্বাভাবিক। মানুষ বলে গোবরে পদ্মফুল ফোটে। আসলেই কোন দিন গোবরে পদ্মফুল ফুটেছে কিনা জানিনা, তবে এই গরিবের ঘরে আকাশের চাঁদ যে কোন এক ফাঁকে নেমে এসেছে তা আমি টের পেলাম গতকাল সকালে। আজহার চাচার এক মাত্র ছেলে জহির বাড়ি ছিলনা,আজহার চাচাও কোথায় যেন গিয়েছিল সেই ফজরের আজান হলে। চাচি পঙ্গু , কারো সাহায্য ছাড়া চলাফেরা করতে পারেন না। সুতরাং যখন আমার খাবারের সময় হলো তখন ষোল বছরের মেয়েটাই আমার জন্য খাবার নিয়ে আসলো। হয়তো এর আগেও আমার কাছে এসেছিল কিন্তু আমি জ্বরে এতটাই বেহুশ ছিলাম যে বুঝতে পারিনি। আমি যেন কোন মানবী নয় হুর পরী দেখলাম। কিছুক্ষণ আমি কোন কথা বলতে পারলাম না। আমি অপলোক তাকিয়ে ছিলাম আর মেয়েটা লজ্জায় লাল হয়ে উঠছিল। হয়তো আমার মত করে কোন দিন কেউ তার দিকে তাকিয়ে থাকেনি। নির্জন এই এলাকায় আসে পাশে তেমন বাড়ি ঘর নেই। যেহেতু স্কুলে বা কলেজে যায়নি তাই খুব একটা বাড়ির বাইরে তাকে যেতে হয়নি। এ ফুল নির্জনে ফুটেছে নির্জনে নিজেই নিজের সুবাশ ছড়িয়েছে। সে সুবাশ আর কেউ পায়নি আর কেউ দেখেনি নির্জন এই প্রান্তে ফুটে থাকা গোলাপের অপার সৌন্দর্য। হঠাৎ আমার আলেয়ার কথা মনে হলো। চোখের পলকে মেয়েটার চেহারা আমার কাছে আলেয়ার মত মনে হতে লাগলো। আমি ভুলে গেলাম আমি মুক্তিযোদ্ধা। আমি অসুস্থ হয়ে আজহার নামে এক চাচার বাসায় আছি। আমি ভুলে গেলাম আমার সামনে দাড়িয়ে থাকা অপরূপ সৌন্দর্যে ভরা ষোল বছরের কুমারী কন্যা আজহার চাচার মেয়ে। আমার কেবল মনে হলো না এ আর কেউ নয় এ আমার আলেয়া। আগে কখনো এরকম করে ভাবিনি। এখন আমি ভাবতে শুরু করেছি আলেয়া নামে যাকে ফেলে এসেছি সে আমার। আর তাই ডায়েরিতে নির্লজ্জের মত লিখছি আমার আলেয়া। আলেয়া এই ডায়রিটা পড়লে কি ভাববে? তার অজান্তে তাকে নিয়ে কেউ একজন ডায়েরি লিখছে এটা সে কিভাবে গ্রহন করবে? এর একটাই উত্তর আমি জানিনা।

আমার মনে হচ্ছিল আলেয়াই বুঝি আমার সামনে এসে দাড়িয়ে তার আলোয় আমার চারদিক আলোকিত করে রেখেছে। “ আপনের শরীল এহন কেমুন লাগতাছে? মায় জিগায়।” মেয়েটার এই কথায় আমি সম্বিত ফিরে পাই। একটু সুস্থ লাগছে বলতেই মেয়েটা আবার ফিরে গেল। আমার সাথে একবার তার চোখাচোখি হলো। কি ছিল সেই চোখের ভাষায়? মুহুর্তেই সব কেমন এলোমেলো হয়ে গেল। কি ছিল সেই চোখের চাহুনীতে? কোন মায়া,কোন কুহক। কিন্তু আমি কোন মায়া বা কুহকে জড়াতে চাইনা। গত কাল সকালে মেয়েটার সাথে চোখাচোখি হবার পর আজ এই সন্ধ্যা পর্যন্ত কতবার যে সে আমার সামনে এসেছে তা আমার হিসাবের বাইরে। কারণে অকারণে সে আমার সামনে এসেছে। কিছুক্ষণ আগেও দেখেছি সে লুকিয়ে আমার ডায়েরি লেখা দেখছে। আমি বুঝতে পারছি আমার প্রতি তার টান আর মায়া পড়ে গেছে।

যে চোখ কখনো কুমড়ো ফুলই দেখেনি সে যদি রাতারাতি গোলাপ ফুল দেখে তাহলে সে তার পলক ফেলতে পারেনা এটাই স্বাভাবিক। এই মেয়েটাও তাই। কোন দিন হয়তো কোন যুবককে দেখেনি, যে তার এত কাছে এসেছে তার সাথে কথা বলেছে। জহির আমাকে বলেছে ওর ছোট বু গত কয়েকদিন আমার মাথায় পানি ঢেলেছে,মাথা মুছিয়ে দিয়েছে। সেই সেবাই হয়তো একটু একটু করে মায়ার জন্ম দিয়েছে। মায়া বড় অদ্ভুত জিনিস। এর কুহক থেকে বেরিয়ে আসা অত্যন্ত কঠিন। কত মনীষী, কত সাধক এই মায়ার টানে সব ছেড়েছে তা অজানা। কিন্তু একজন যোদ্ধা এরকম কুহক এরকম মায়ায় বাঁধা পড়তে পারেনা। আমিও তাই তার চোখের ভাষা বুঝেও কিছু বুঝিনি বলে মনকে সায় দিচ্ছি। কেবল মাত্র আলেয়ার আলোকে ঢেকে রাখা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। বীর সে রণাঙ্গনে শত্রুকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে পারলেও আলেয়ার আলোর কাছে সে মোমের মত। আলেয়ার আলোর ছোয়ায় তাকে যে গলতেই হবে। আমিও তাই গলে গেছি। মিশে গেছি সেই আলোর বর্ণিল শোভার অমিয় সুধা ভরা কোন এক রঙ্গিন ভুবনে। মনটা একটা দিনের জন্য উতলা হয়ে উঠেছে। আজ কেবলই ফেলে আসা দিনের কথা মনে পড়ছে। ইচ্ছে হচ্ছে বিগত দিনের কথা লিখে লিখে ডায়েরির পাতা ফুরিয়ে ফেলি। ভালবাসার মায়া বুঝতে পারার আগেই আমি যে ভালবাসার বন্ধনে আবদ্ধ ছিলাম তা এখন অনুভব করি। তার সাথে আমার যে চলাফেরা আর মধুর সময় কাটিয়েছি তা এখন ক্ষণে ক্ষণে আমার অন্তরে দোলা দেয়। তখন আমি সপ্তম শ্রেণীতে পড়ি। ক্লাসে দু’একটা পড়া বাদে বাকিগুলো করতে পারি। ভালো ছাত্র নই, আবার খারাপও বলা চলেনা। পাশাপাশি মাঠে ফুটবল নিয়ে দাপিয়ে বেড়াই। একদিন অষ্টম শ্রেণীর সাথে আমাদের খেলা হচ্ছিল। আমি ছিলাম সেন্টার ফরোয়ার্ডের খেলোয়াড়। বল নিয়ে ছুটে যাচ্ছিলাম আর আমাকে প্রতিরোধ করতে অষ্টম শ্রেণীর তিনজন খেলোয়াড় বাঁধা হয়ে দাড়ালো। তাদের সেই প্রতিরোধের মুখে আমি সশব্দে মাটিতে পড়ে গেলাম। আমার মনে হচ্ছিল আমার একটা পা ভেঙ্গে গেছে। দু’জন খেলোয়াড়ের কাঁধে ভর করে আমি মাঠের বাইরে ফিরে আসলাম। ব্যাথায় আমার পা টনটন করছিল। হাটুর কাছে ছিলে রক্ত বেরিয়ে তা জমাট বেঁধে গিয়েছিল। ভীড় ঠেলে সেদিন কোথা থেকে যে আলেয়া ছুটে আসলো। ইস! কেটে রক্ত বেরিয়ে গেছে! এখনই ব্যান্ডেজ করা দরকার। তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে ইত্যাদি বলে আলেয়া আকাশ মাথায় তুললো। আমি এতে এতটুকু অবাক হইনি কেননা সে এরকমই। খুব ছোটবেলা থেকে একসাথে বেড়ে উঠেছি। একসাথে নদীতে সাঁতার কেঁেটছি,বিলের পানি থেকে শাপলা তুলেছি কিংবা কখনো কখনো সুর্য ওঠার আগেই বকুল কুড়িয়েছি। সে আমার ব্যাথায় ব্যথিত হতেই পারে। কিন্তু সেই ছুটোছুটি দেখে ক্লাসের অন্যরা সে কী টিটকারী মারতে শুরু করলো। এক একজন খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ওকে জ্বালিয়ে মারতে লাগলো। কিন্তু সে দমবার পাত্রী নয়। অন্যরা যখন বললো ও ব্যাথা পেয়েছে তাতে তোর এত মাথা ঘামানো কেন? ব্যাথা যেন ওর না তোর নিজের। ও তখন ছাফ ছাফ জানিয়েছে ও আমাদের ক্লাসমেট ও ব্যাথা পেলে মাথা ঘামাবো নাতো কার জন্য মাথা ঘামাবো। আবার যখন অন্যরা ওকে বলেছে আমরাতো এতো চিন্তা করছিনা তুই চিন্তা করছিস কেন? ও সেদিন কাউকে তোয়াক্কা করেনি,বলেছে তোরা সব হৃদয়হীন পাষন্ড তাই অন্যের দুঃখে দুঃখ অনুভব করিসনা। সেই তখনও আমি ওর কথা শুনে মুগ্ধ হয়ে যেতাম। আমিও যে ওর প্রতি দরদ দেখাইনি তা নয়।

একবার যখন শাপলা তুলতে গিয়ে কিছু একটা লেগে ওর পা কেটে রক্ত বেরোলো সেদিনতো আমিই ছুটে গিয়ে জারমনি লতা এটা সেটা এনে ওর ক্ষতস্থানে লাগিয়ে রক্ত পড়া বন্ধ করলাম। আজ বুঝি সেসব নিছক কোন ব্যাপার ছিলনা। সেসব ছিল একটু একটু করে জন্ম নেয়া মনের গভীরের ভালবাসা। আমি নিশ্চিত জানি ঐ সময় ভালবাসা কি জিনিস তা বোঝার মত বয়স আমার ছিলনা। আলেয়া সেটা বুঝতো কিনা জানিনা। আমি তখন না বুঝলেও এখন বুঝি সেটা ছিল ওর প্রতি আমার অন্তরের টান। অসংখ্য স্মৃতি আজ আমাকে আনন্দ বেদনায় ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ওদের বাড়ীতে কোন পিঠা বানালে সদরে ও অগচোরে আমার জন্য পিঠা নিয়ে আসতো। আমিও আমাদের গাছের পেয়ারা,লিচু কিংবা আতা ওকে চুপিসারে দিইনি তা নয়। কোনদিন কেউ সে সব একা খাইনি। হয়তো ও কিছু একটা আমার জন্য নিয়ে এসেছে কিন্তু খেয়েছি দুজনে ভাগ করে। আবার আমিও যখন কিছু ওকে খেতে দিয়েছি ও তা আমাকেও খেতে দিয়েছে। এখন সে সব কেবল স্মৃতি। যে মানুষটা বাস্তবে আমার পাশে নেই সেই মানুষের স্মৃতিই আমার আনন্দের বাহন। আমি নিজেকে সেই আনন্দ থেকে বঞ্চিত করতে চাইনি। গত কয়েকদিন আজহার চাচার বাড়ীতে থেকে ওনার পরিবারের সাথে মিশে গেছি। জানিনা আমার ভাগ্যটাই এমন কিনা অথবা বার বার কেবল আমার সাথেই এমন হচ্ছে কেন আমি বুঝে উঠতে পারিনা। যখন যেখানে যে পরিবারের সাথে মিশেছি দেখেছি সেই সব পরিবার দুঃখের সাগরে ডুবে আছে। বাইরে থেকে হয়তোবা সেই দুঃখ বুঝার উপায় নেই। কিন্তু ছাই চাপা আগুনের মত সেই দুঃখ গুলো মানুষ গুলোকে পুড়িয়ে ছারখার করে দিচ্ছে। একটু সুস্থ হওয়ার পরই আমি আজহার চাচার বাড়ী থেকে বেরিয়ে পড়লাম। চাচা চাচিকে বিদায় জানিয়ে তাদের ছোট্ট ছেলেটার মাথায় হাত রেখে যখন ফিরে যাচ্ছি তখন কি এক শুন্যতা আমার বুকের মধ্যে হুহু করে উঠলো। বার বার আমি মায়ার টানে বাঁধা পড়তে পড়তে কোন একদিন হয়তো সেই মায়ার আঁধারে হারিয়ে যাব।

আমি ঘর থেকে উঠোনে নামলাম এবং দেখলাম রান্নাঘরের খুটি ধরে ঠায় দাড়ানো আজহার চাচার ছোট মেয়ে। তার চোখ ছলছল করছে,হাতটা কাঁপা কাঁপা। যে মানুষটি আমাকে সেবা করে সুস্থ করে তুলেছিল আমি তাকে না বলেই চলে যেতে চেয়েছিলাম। আমার মন আমাকে বাঁধা দিল, তাই তার দিকে একটু এগিয়ে গিয়ে তাকে বিদায় জানালাম। আমি আর অপেক্ষা করিনি। সন্ধ্যার অন্ধকারে যেমন এসেছিলাম ঠিক তেমনি আজহার চাচার বাড়ী থেকে বেরিয়ে গেলাম। পিছনে পড়ে থাকলো আজহার চাচা,তার স্ত্রী আর কন্যা। শুনতে পেলাম কুমারী কন্ঠের অস্ফুট স্বরের কান্না। আজহার চাচা হয়তো কিছু বুঝে উঠতে পারেননি তার মেয়ে কেন কাঁদছে কিন্তু আজহার চাচার স্ত্রী বুঝতে পেরেছিলেন। এমনকি তার ছোট্ট ছেলেটিও বুঝতে পেরেছিল বোনের এই গুমরে কেঁদে ওঠার কারণ। আর আমারতো না বুঝার কথাই নয়। সে মনে মনে আমাকে ভালবেসেছিল  অথচ আমি বাঁধা পড়েছি আরও আগে অন্য কোন একজনের পৃথিবীতে। আজহার চাচার ছেলেটি আমাকে কিছুদূর পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেল। ফিরে যাওয়ার সময় সে শুধু বললো “বুবুরে আমি বুঝাইছি মুক্তিযোদ্ধাদের মনে দেশের জন্য সব ভালোবাসা জমা করা আছে। সেই ভালোবাসা থাইকা তোরে দেওনের মত এতটুকুও খালি নাই। বুবু শোনেনাই তাই আইজ এমন বাধভাঙ্গা কান্দন। আমি বুবুরে আবার বুঝামু। কিন্তু ভাইজান যুদ্ধ শ্যাষ অইলে আপনি যদি বাইচা থাহেন তাইলে কি বুবুর কাছে ফিরে আসন যায়না?” আমি ওর কথার কোন উত্তর দিতে পারিনি। নিঃশব্দে আমার গন্তব্যের পথে হেটে চলেছি। আমার মুখ কথা না বললেও হৃদয়তো ঠিকই কথা বলেছে। আমি ওকে কিভাবে বলি চাইলেও আমি ফিরে আসতে পারছিনা। আমিতো আলেয়ার আলোর নিচ থেকে বেরিয়ে আসতে পারবোনা। আলেয়ার আলোটুকুই আমার সম্বল। ওখান থেকে বেরিয়ে আসলে যে অন্ধকার আমাকে গ্রাস করবে তা দূর হবার নয়। 

৫.

জীবনটা অদ্ভুত রহস্যে ঘেরা। আকাশ যেমন কখনো রৌদ্রজ্জল কখনো মেঘাচ্ছন্ন থাকে, মানুষের গোটা জীবনে অসংখ্য বার রোদ মেঘের লুকোচুরি খেলা থাকে। একটা দিন চলে যায় আর তা স্মৃতি হয়ে জমা থাকে। জীবন মানেই সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, উচ্ছাস-হতাশা, রাগ ক্ষোভের মিলন মেলা। এমন  কি একজন মানুষকেও খুঁজে পাওয়া যাবে যার কোন কালে কোন দুঃখ ছিলনা কিংবা এমন কাউকে কি আদৌ খুঁজে পাওয়া যাবে যার কোন কালেও সুখ ছিলনা। সুখ এবং দুঃখ পাশাপাশি অবস্থান করে যেমন রাত আর দিন। একটা মুহুর্তের সুখ ও কখনো কখনো আজীবন আনন্দের খোরাক জন্মাতে পারে। তেমনি একটা মুহুর্তের কোন বেদনা দায়ক স্মৃতি আজীবন যন্ত্রণা দিতে পারে।  কী ছিলাম আর এখন আমার জীবনটা কোন দিকে মোড় নিল এটা আমি কোন দিন ভাবিনি। সামনের দিনগুলোতে আমার জন্য কি অপেক্ষা করছে তাও আমার অজানা। এই মেঘ রৌদ্র ছায়ার খেলায় নিজেকে প্রথম আবিস্কার করেছিলাম গ্রাম থেকে বাবা মা ভাই পরিবার পরিজন সর্বপরি আলেয়ার আলো ছেড়ে শহরের কোলাহলে পাড়ি জমানোর দিন থেকে। আমার গাড়ি চলছিল আর ক্রমান্বয়ে পিছে পড়ে ছিল আমার শৈশব কৈশর আর শিশুকালের স্মৃতি জড়ানো সোনালী সবুজ আমার চিরচেনা গ্রাম। যা কিছু নতুন ক’দিন বাদে তাই পুরাতন হয়ে যায়। এই যেমন শহরের জীবন যা অচেনা ছিল এখন তা নিছকই পুরাতন মনে হয়। অবশ্য এটাও ঠিক শহরের জীবনের স্বাদ পুরোপুরি বুঝে ওঠার আগেই দেশের পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে গেল। যে নদীতে পানি ছিলনা সে নদী হয়ে উঠলো খরস্রোতা। যে বাঙ্গালী বায়ান্নতে ফুসে উঠেছিল সেই বাঙ্গালী উনসত্তুরের পর একাত্তুরে আবার দাউদাউ করে জ্বলে উঠলো।

পাকিস্তানীরা উনুনের আগুন দেখেছে কিন্তু ছাইচাপা আগুনের তেজ দেখেনি। সাপের লেজে পা দিলে সাপ যেমন ছোবল দেবেই তেমনি বাঙ্গালী জ্বলে উঠলো। সেই জ্বলে ওঠার মিছিলে আমি যখন আমাকেই সাদরে স্বগতম জানালাম আমার মনে হলো আমার জীবন ধন্য হলো। ভাষা আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃত আব্দুল মতিনের সাথে একবার দেখা হয়েছিল। সেই সময়ে তার কথা থেকেই অনুভব করেছিলাম শুধু ভাষার মুক্তিই বাঙ্গালীর জন্য যথেষ্ট নয় এ জন্য দরকার পূর্ন স্বাধীনতা। অবশেষে আজ সত্যিই আমরা স্বাধীনতার পথে। স্বাধীনতা কথাটা যতটা সহজে বলা যায় স্বাধীনতা অতটা সহজ নয়। আমি এক ক্ষুদ্র প্রান স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নেয়া লাখ লাখ বাঙ্গালীর মত আমিও দেশের স্বাধীনতার জন্য লড়ছি । এরই মাঝে দেখেছি বিভিষিকাময় মৃত্যু যার কোন কোনটা আমার একান্ত কাছের। কোন কোন মৃত্যু ছিল আমার হৃদয় ছোয়া। আমার হাতের ওপর মাথা রেখে চির নিদ্রায় ঘুমিয়ে গেছে কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। এভাবে দেশের আনাচে কানাচে কতজন মুক্তিযোদ্ধা দেশের জন্য বুকের রক্ত দিয়ে চিরতরে ঘুমিয়ে গেছে তা হয়তো কোন দিন জানা হবেনা। সুতরাং স্বাধীনতা মানেই যেমন সুখ তেমনি স্বাধীনতা মানেই এক বুক কষ্ট। যুদ্ধের ময়দানে শত্রুকে ছিন্ন ভিন্ন করতে ভয় পাইনা। ভয় পাইনা শত্রুর ছুড়ে মারা বুলেট বিদ্ধ হয়ে চিরতরে নিস্তব্ধ হয়ে যাবার। কেবল ভয় পাই সহযোদ্ধা কেউ যখন ঢলে পড়ে মৃত্যুর কোলে। মৃত্যু এমনই যে তাকে ঠেকানোর ক্ষমতা কারো নেই। প্লাটুনের পর প্লাটুন পাকিস্তানী সৈন্যকে নিস্তব্ধ করে দিতে যে যোদ্ধার বেগ পেতে হয়নি সেই বীর যোদ্ধা মৃত্যুর কাছে স্রোতের তোড়ে ভেসে যাওয়া নিছক কোন খড় কুটোর মত।

স্মৃতি মানুষকে আনন্দ দেয় কিন্তু কিছু কিছু স্মৃতি মানুষকে যন্ত্রণা দিতে দিতে নিঃশেষ করে ফেলে। সেই সব স্মৃতি ইচ্ছে হলেও ভুলে থাকা যায়না। মনে হয় শরীরের কোন একটা ব্যাথার মত সে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে আছে। ঢাকায় এসে প্রথম যে দুঃসহ স্মৃতির ছোবলে আমি ক্লান্ত সেই স্মৃতি এখনো আমাকে কাঁদায়। আলো আধারির এই জীবন সত্যিই বিচিত্র। একরাতে মুক্তিযোদ্ধারা খুব খাবারের কষ্টে পড়লো। সাথে যে খাবার ছিল তা ফুরিয়ে গেল। গ্রামের পর গ্রাম জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে। কোন কোন এলাকা প্রায় জনশুন্য। সেই রাতে পাশের গ্রাম থেকে এক মহিলা তার ছোট ভাইকে সাথে করে প্রাণের মায়া ত্যাগ করে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাবার নিয়ে এলো। সেই খাবার খেয়ে আমরা পরিতৃপ্ত হলাম। কে সেই মহিলা তা আমি জানতামনা। একজন মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য প্রাণের মায়া ত্যাগ করে পাশের গ্রাম থেকে খাবার নিয়ে এসেছে সে সাধারণ কোন মহিলা হতে পারেনা। দেশ প্রেমের জ্বলন্ত উদাহরণ সে। তাকে না দেখেও মনের মধ্যে শ্রদ্ধা জাগে। যুদ্ধের ময়দানে মুক্তিয্দ্ধোারা যুদ্ধ করে শত্রুকে ছিন্ন ভিন্ন করে দেয় আর সেই সব মুক্তিযোদ্ধাদের নানা ভাবে সাহায্য করে আরো অনেক কিশোর যুবা বৃদ্ধ এবং নারী। তাদের অবদান কোন অংশেই কম নয়। একদিন দু’দিন করে করে পাঁচদিনের মাথায় খাবার দিয়ে যাওয়া নারীকে দেখলাম। তার চেহারা আমার চেনা। এমনকি আমি আমার নিজের চেহারা ভুলে গেলেও তার চেহারা ভুলবোনা বলে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলাম। একরাতে আমি যখন অন্য যোদ্ধাদের পাশে বসে খাচ্ছিলাম সেই মহিলা তখন পাতে খাবার তুলে দিচ্ছিল। হঠাৎ তার মুখের দিকে আমার চোখ পড়লো। এ কয়দিনে সে খাবার তুলে দিয়েছে কিনা তা জানিনা। আমার মুখের ভেতরে যে কয়টা ভাত ছিল তা আর পেটের ভিতরে ঢুকলোনা। আমি অর্ধভুক্ত অবস্থায় উঠে গেলাম। কেন জানিনা হড়হড় করে বমি হয়ে পেটে যতটুকু খাবার ঢুকেছিল তাও বেরিয়ে গেল। ঐ মহিলা আর কেউ নয়, যার কারণে চোর সাবস্ত হয়ে রাসেল ভাইয়ের মেস ছেড়েছিলাম এ সেই মহিলা। রাগে ঘৃণায় আমার মাথা খারাপ হয়ে উঠছিলো। আমার এহেন অবস্থা দেখে কমান্ডার আমার কাছে এসে জানতে চাইলেন হঠাৎ আমার কী হলো। নিজের জীবনে ঘটে যাওয়া করুণ ইতিহাস,লজ্জার ইতিহাস আমি অন্যকে বলি কি করে। আমি কমান্ডারের কাছে সব চেপে গেলাম।

কী আশ্চর্য আমি অবলিলাক্রমে একটা কঠিন সত্যকে চেপে গেলাম। অথচ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার সময় শপথ নিয়েছিলাম যে কমান্ডারের অধীনে যুদ্ধ করবো তার কাছে কোন কিছু লুকাবোনা। অথচ আমি কথা রাখিনি। নিজের আক্রোশ মেটানোর জন্য চেপে গেছি সব কিছু। মহিলা আমাকে চিনতে ভুল করেনি। আমার এহেন অবস্থা যে তাকে দেখার কারনেই হয়েছে তা সে নিশ্চিত ছিল। পরদিন সে আর খাবার নিয়ে আসলো না। তার বদলে তার ছোট ভাই আর অন্য একজন মধ্যবয়সী মহিলা খাবার নিয়ে আসলেন। আমার সেই খাবার খেতে ঘৃণা হচ্ছিল। যুদ্ধের এই ভয়াবহ সময়ে খাবারের যখন প্রকট সমস্যা তখন সেই আমাদের খাবার নিয়ে এসেছে। না জেনে কয়েক দিন তার হাতের রান্না খেয়েছি বলে নিজের ওপর নিজেরই ঘৃনা হচ্ছিল। সিদ্ধান্ত নিলাম ঐ মহিলার রান্না আর খাবনা। সেটাও আর সম্ভব হলোনা। তার ছোট ভাই আমার ছোট ভাইয়ের বয়সী। আগের কয়দিন সে তার বোনের সাথে এসেছিল আর সেদিন আসলো মাকে সাথে নিয়ে। আমি তাকে কিছু বলিনি। বলার প্রয়োজনও মনে করিনি। সে নিজে আমার তাবুতে এসে ঢুকেছে। আমার পাশে বসে কয়েকটা কথা বলেছে। এই অল্প বয়সেও সে কথা বলেছে পরিনত বয়সের মানুষের মত করেই। আমি বিশ্বাস করেছি সে কারো শিখিয়ে দেয়া কথা বলেনি। পরিস্থিতিই হয়তো তাকে পরিণত করেছে। সে বলেছে মানুষকে ঘৃনা করতে নেই। ঘৃনা করতে হয় মানুষের ভেতরের পশুত্বকে। একজনের কোন এক সময়ের দেয়া কষ্ট মনে রেখে খাবারের সাথে রাগ দেখানো ঠিক নয়। যে যোদ্ধা নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে পরিবার পরিজন,বন্ধু স্বজন,আত্মীয় সব ফেলে দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবনদানের মহোৎসবে রক্ত দেয়া নেয়ার প্রতিযোগিতায় নামতে পারে তার কোন ব্যাক্তিগত আক্রোশ থাকা সাজেনা। যে দেশ প্রেমের মহান ব্রত নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধ করছে তার জীবনে ঐ সব দুঃখ ভুলে যাওয়া উচিৎ।

ওর কথা শুনে আমি আশ্চর্য হয়েছি। হয়তো ওর বোন কোন না কোন ভাবে বলেছে অতীতে কোন একদিন সে আমার সাথে খারাপ ব্যাবহার করেছিল তাই আমি অমন করছি। বোনের হয়ে তাই ছেলেটি আমাকে ওসব শুনিয়েছে। ওর কথায় যুক্তি আছে কিন্তু ওর কথা আমাকে সেই দুঃসহ স্মৃতি থেকে বের করে আনতে পারলোনা। তবে আমি তার রান্না করা খাবার ঠিকই খেলাম। তার ওপর আমার যে ক্ষোভ ছিল তা এতটুকু পরিমান কমেছিল কিনা জানিনা তবে ভেতরে এমন কিছু পরিবর্তন এসেছিল যা বুঝতে পারিনি। দেশ প্রেম আর একজন মানুষের ভেতরে ঘুমিয়ে থাকা সুন্দর মন বাহ্যিক দৃষ্টিতে কেউ দেখতে পায়না। কিছুদিন পর আমরা পাকিস্তানীদের একটা ক্যাম্প উড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করলাম। আমাদের মধ্য থেকে কঠিন পরিকল্পনা মাফিক আমরা এগিয়ে চললাম। রংপুর দিনাজপুরের মাঝামাঝি ছিল শত্রু ঘাটি। আমরা তিন দিক থেকে শত্রু ব্যারাক ঘিরে আক্রমন শুরু করলাম। আমাদের হাতে পর্যাপ্ত অস্ত্র ছিল তা সত্তেও আমরা প্রায় পিছু হটতে বাধ্য হচ্ছিলাম পাকিস্তানী সৈন্যদের ভারি গোলাবর্ষনের কারণে। ওরা সৈন্য সংখ্যায় আমাদের দ্বিগুণ ছিল এবং ওদের অস্ত্র ছিল আধুনিক ও শক্তিশালী। আমরা যখন একটু একটু করে পিছু হটতে শুরু করেছি ঠিক তখন দেখলাম পাকিস্তান শিবিরে আগুন জ্বলে উঠলো। প্রথমটা বুঝতে পারিনি,দু’মিনিটের মাথায় বুঝতে পারলাম ক্যাম্পের অপর প্রান্ত থেকে হ্যান্ড গ্রেনেড ছুড়ে মারা হচ্ছে। আমরা পূর্ণ শক্তিতে আবার কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তুললাম। এর আধ ঘন্টা খানেকের মধ্যে শত্রুদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে সক্ষম হলাম। আমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলাম ঐ যোদ্ধাদের যারা পিছন থেকে গ্রেনেড মেরে আমাদের জয় নিশ্চিত করেছে। যুদ্ধ থেমে গেলে আমরা দ্রুত ওদিকটাতে এগিয়ে গেলাম। চারদিকে শত্রু সৈন্যের মৃতদেহ ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে তার মাঝে মৃত্যুর নিরবতা থাকলেও ভেসে আসছিল কান্নার আওয়াজ। আওয়াজ শুনে মনে হচ্ছিল অল্প বয়স্ক কোন ছেলে কাঁদছে। কাছে গিয়ে বাকহারা হয়ে গেলাম। মানুষ তার শত্রুর ব্যাথায় কাঁদতে পারে এই প্রথম অনুভব করলাম। আমার চোখ জলে ভিজে গেল। যে ছেলেটা কাঁদছে সে আমার পরিচিত। এগার বছরের এই ছেলেটার পাশে এক বাক্স হ্যান্ড গ্রেনেড যার দুই তৃতীয়াংশ কিছুক্ষণ আগে মিনিটে মিনিটে বিস্ফোরিত হয়েছে। তার পাশে একটা রক্তাক্ত মৃতদেহ। মৃত দেহটাকে ঘিরে যে ছেলেটি কাঁদছিল বিগত ক’দিন সেই তার মাকে সাথে করে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাবার সরবরাহ করেছে। আর যে এখন চির নিদ্রায় তলিয়ে গেছে সে তার একমাত্র বোন। সেই মানুষটি যাকে আমি রাসেল ভাইয়ের মেসে থাকতেই ঘৃণা করতে শিখেছি। সেই মহিলা যার রান্না খেয়ে একদিন বমি করেছি। যার জন্য একদিন আমি চোর সাবস্ত হয়ে রাসেল ভাইয়ের মেস থেকে গলা ধাক্কা খেয়ে বিতাড়িত হয়েছিলাম।

কী আশ্চর্য ! সে এখন আর নেই! যাকে আমি ঘৃণা করেছি সেই আমাদের যুদ্ধকে সহজ করেছে। নিজ হাতে গ্রেনেডের পিন খুলে ছুড়ে মেরেছে শত্রু শিবিরে। তার সেই ছুড়ে দেয়া গ্রেনেডের আঘাতে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেছে শত্রু সৈন্য। একজন সামান্য কাজের বুয়া থেকে সে এখন এই মুহুর্তে একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা। যাকে এতদিন আমি ঘৃণা করেছি এবং ভেবেছি আজীবন ঘৃণা করে যাব মুহুর্তের ব্যবধানে সব পাল্টে গেছে। শ্রদ্ধায় আমি কাতর হয়ে পড়ি। ওর ছোট্ট ভাইটার কথাই ঠিক। মানুষের একদিনের ব্যবহার দিয়ে তাকে চেনা যায়না। কে জানতো এই মানুষটি এমন অসাধারণ দেশ প্রেম দেখিয়ে যাবে। তাকে দাফন করে ফিরে আসার পর থেকে তার একমাত্র ভাই আমাদের সাথে থেকে গেল। কিশোর মুক্তিযোদ্ধা নুরু আমাদের কমান্ডারের সহযোগী হিসেবে কাজে লেগে গেল। যে কথা সেদিন মকান্ডারের কাছে গোপন করেছিলাম অবলিলা ক্রমে সবাইকে তা বলে দিলাম। সব শুনে শত্রুর বুক ঝাঝরা করতে একট্ওু শঙ্কিত না হওয়া মুক্তিযোদ্ধারা চোখের জলে ভেসে গেল। আমার সব ঘৃনা আক্রোশ শেষ হয়ে গেল। এই দেশ যখন স্বাধীন হবে তখন এই মানুষটির কথা হয়তো কোন ইতিহাসের পাতায় থাকবেনা। কিন্তু অন্তত যে কয়জন মুক্তিযোদ্ধা তার বীরত্ব দেখেছে তার সম্পর্কে জেনেছে তারা তাকে শ্রদ্ধাভারে স্মরণ করবে। এর নাম দেশ প্রেম, এর নাম ভালবাসা। শহীদ এই রমনীর ছোট ভাই তার জীবনের কত কথাইনা আমাদের শোনালো। আমরা অপারেশানে যাচ্ছি একথা শুনে মেয়েটি কমান্ডারকে অনুরোধ করেছিল তাকে সাথে নিতে। প্রশিক্ষণহীন একটা মেয়েকে যুদ্ধে নেয়া বোকামী হবে ভেবেই কমান্ডার না করেছিলেন। মেয়েটি ঠিকই মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যুদ্ধে সে যাবেই তাই যেখানে আমরা গোলাবারুদ রেখেছিলাম সেখান থেকে কোন এক ফাকে এক বাক্স হ্যান্ড গ্রেনেড সরিয়ে রেখেছিল। খাবার দিয়ে যাওয়ার সময় ওর ছোট ভাই কমান্ডার থেকে কথার ছলে জেনে গিয়েছিল কিভাবে হ্যান্ড গ্রেনেড ছুড়তে হয়। সামান্য একটা ছেলের মুখে শোনা থেকেই অসাধারন দক্ষতায় সে ছুড়ে মেরেছে একের পর এক গ্রেনেড। সেই গ্রেনেডের আঘাতে তছনছ করে ভেঙ্গে গেছে শত্রু শিবির। তারই এক ফাঁকে শত্রুর ছোড়া বুলেট এসে তাকে আজীবনের মত নিরব করে দিয়ে গেছে। একমাত্র বোনের মৃত্যু নিজ চোখে দেখেছে এগার বার বছরের ছেলেটি। যে বোন রান্না করে তাকে নিজ হাতে খাইয়ে দিত, নতুন জামাকাপড় কিনে দিত, সেই বোনকে হারিয়ে দুদিন নির্বাক ছিল তার ছোট মন ছোট চোখ।

ডায়রি লেখার কোন এক ফাঁকে ভেবেছিলাম রাসেল ভাইয়ের মেসে থাকতে যে ঘটনা ঘটেছিল সেই বর্ণনাটুকু কেটে দেব কিন্তু তার আর হয়ে ওঠেনি। তবে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছি দেশ স্বাধীন হওয়ার পর যদি বেঁচে থাকি তবে কোন একদিন আলেয়াকে নিয়ে এখানে আসবো ঠিক এই মাটির খুব কাঝে যেখানে এক বীর মুক্তিযোদ্ধা রমনী দেশের শত্রকে বিনাশ করতে করতে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়ে গেছে।

বহুদিন পর রাসেল ভাইয়ের সাথে যখন দেখা হলো তিনি তখন পুরোদস্তুর মুক্তিযোদ্ধা। আখাউড়া অঞ্চলে তিনি দেশের জন্য যুদ্ধ করছেন। কোন এক দৈব বলে তার সাথে আমার দেখা হয়ে গেলে আমি ভেবেছিলাম তিনি হয়তো আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবেন। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা সত্যিই মানুষকে ঘৃণা করতে জানেনা। তিনি কবেই সে কথা সেসব ঘটনা ভুলে গেছেন। আমি মুক্তি যুদ্ধে অংশ নিয়েছি দেখে তিনি ভীষন খুশি। আমাকে বুকে জড়িয়ে নিলেন। আমি সেই অবস্থাতেই তাকে জানালাম সেই সব দিনের কথা। তিনি নিজেও বিশ্বাস করতেন আমি নির্দোশ ছিলাম কিন্ত তার আত্মসম্মানের কাছে সেই বিশ্বাস প্রশ্রয় পায়নি। কিন্তু তিনি যখন শুনলেন সেই ফরিদা নামের কাজের বুয়া মুক্তিযুদ্ধে বিরাট অবদান রেখে দেশ মাতৃকার জন্য জীবন দিয়েছে তখন রাসেল ভাইয়ের চোখও ক্ষনিকের জন্য ছলছল করে উঠেছিল। শুধু যোদ্ধা বলেই নয় একজন দেশ প্রেমী মানুষ দেশের জন্য আত্মত্যাগ করেছে তা জেনেই তার মনে এত ভালবাসা এত শ্রদ্ধা। রাসেল ভাই একদিন আমার ডায়রি পড়ে যে কথাটি বলেছিলেন আবার তিনি সেই কথাটিই জানালেন। দেশ স্বাধীনতার খুব কাছে চলে এসেছে। প্রথম দিকে মুক্তিযোদ্ধারা ছোট ছোট ছাড়া ছাড়া ভাবে আক্রমন করে যুদ্ধটাকে এগিয়ে নিয়েছে। এখন মুক্তিযুদ্ধ পুরোপুরি বাঙ্গালীদের দিকে বললে ভুল হবেনা। ইতমধ্যে অনেক এলাকা থেকে খবর এসেছে পাকিস্তানীরা পলায়ন করতে বাধ্য হচ্ছে। স্বাধীন সুর্য উঠবে তার জন্য একটা একটা করে দিন পার করছি, একটা একটা করে রাত পার করছি। এরই মধ্যে হয়তো কত মা কত বোন স্বাধীন পতাকা বানাতে শুরু করেছে তার হিসাব নেই। স্বাধীনতা যুদ্ধ শেষ হলে আবার কবে চির চেনা সেই গ্রামে ফিরে যাব তার দিন গুনি,দিন গুনি সেই স্মৃতি হাতড়ে হাতড়ে যখন নদীর জলে অবাধ সাতারে মেতেছি কিংবা নৌকায় বিলের জলে ভেসে ছোট ভাইকে সাথে নিয়ে বড়শী ফেলেছি। অথবা কখনো কখনো শাপলা তুলেছি কেবল মাত্র আলেয়ার হাতে তুলে দেব বলে। যদিও তখন সেটা ভালবাসা ছিলনা অথচ এখন ঠিকই অনুভব করি আজ যে ভালবাসার চারাগাছ আমার ভেতরে বেড়ে উঠছে তা রোপিত হয়েছিল সেই শাপলা তোলা কিংবা বকুল কুড়ানোর বয়স থেকেই।

৬.

ব্রহ্মপুত্র নদ কুড়িগ্রামকে অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ন করে তুলেছে। ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিম তীরে কুড়িগ্রাম চিলমারি বন্দর। নৌপথে সারা দেশের সাথে এর যোগাযোগ। এর বিপরীত দিকে ব্রহ্মপুত্র নদের পুর্বতীরে অবস্থিত রৌমারি। এই রৌমারিতে শত্রুসেনাদের একটা শক্তঘাটি। সেখানে অত্যন্ত দামী এবং কার্যকরী অস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুদ আছে বলে খবর পায় মুক্তিযোদ্ধারা। রৌমারিকে মুক্ত করতে হবে এই পণ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল ব্রহ্মপুত্র নদী সাতরে পার হলো। সে যে সে ধরনের সাতার নয়! মাথায় কচুরিপানা তার ওপর একহাতে স্টেনগান, একে ফোর্টিসেভেন এবং হ্যান্ড গ্রেনেড নিয়ে শুধু মাথাটুকু পানির উপর ভাসিয়ে সীমাহীন কষ্ট করে ব্রহ্মপুত্রের খরস্রোতা হিংস্রতাকে উপেক্ষা করে মুক্তিযোদ্ধারা পৌছালো রৌমারিতে। সেই দলে আমিও ছিলাম একজন সাধারন সহযোগী হিসেবে। রৌমারিকে নিরাপদ ও মুক্ত করার পাশাপাশি উদ্দেশ্য ছিল শত্রু শক্তি খর্ব করা ও তাদের মনোবল নষ্ট করে অস্ত্র ও গোলাবারুদ দখল করা। যে পোশাকটা হল থেকে বেরুনোর সময় গায়ে জড়িয়েছিলাম সেই পোষাকটাই শত ছিন্ন হয়েও শরীরের সাথে লেগে আছে। আকাশে কখনো মেঘ, কখনো রোদ, কখনোবা হাড় কাপানো শীত কিংবা রৌদ্র দগ্ধ দুপুর গড়িয়ে গেছে কিন্তু আমাদের পোষাক ঐ একটাই। বৃষ্টি কাদায় যে পোষাক ভিজেছে রোদে তাই শুকিয়েছে শরীরের সাথে লেগে থেকে। এই সময়টা আমাদের গ্রামে ফসল তোলার ধুম পড়ে যেত। আমিও কত বার বাবার সাথে ফসলের মাঠে ঘুরেছি, সে কথা মনে হতেই একটু অন্যরকম লাগে। খেজুর গাছে রস হলেও যেমন এখন আমাদের কিছু করার নেই, তেমনি কদম গাছে ফুল হলেও আমাদের দেখার সময় নেই। বৈশাখ গেল,চৈত্র গেল ,অগ্রহায়ণ কিংবা পৌষ ও যাবে, কিন্তু আমাদের এই পথ চলা, এই জীবনের বিনিময়ে দেশকে স্বাধীন করার অভিযান থামবে কবে তা আমরা কেউ জানিনা। চিলমারীতে যুদ্ধ হবে এটা অবধারিত ছিল। আমরা কয়েক সপ্তাহ ধরে পরামর্শ করেছি, পরিকল্পনা করেছি চিলমারী আক্রমন করবো বলে। ইংরেজদের নিয়মে রাত বারটা পার হলেই নতুন দিন ও তারিখ শুরু হয়। সেই হিসেবে ১৭ অক্টোবর ভোর হতে তখনো ঘন্টা তিনেক বাকি, আমরা বেরিয়ে পড়লাম। বিশ্বাস ছিল এই রাতের তৃতীয় প্রহরে শত্রু সেনারা নিশ্চই গভীর ঘুমে ডুবে থাকবে। আমরা অতর্কিত হামলা চালিয়ে ওদের বিনাশ করে ফেলবো। আমরা প্রতিবার যা করি এবারও সেই শপথ নিয়ে একসাথে বেরিয়ে পড়লাম অভিযানে। গোটা কুড়িগ্রাম নিস্তব্ধ। মিলিটারীরা কয়েক দিনে এখানে নৃশংসতা দেখিয়েছে। নিরীহ মানুষের বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দিয়েছে,বিবাহিত অবিবাহিত নারীকে তুলে নিয়ে গেছে ক্যাম্পে। চিলমারী মিলিটারী ক্যাম্পের একটা সাম্ভাব্য নকশা আমরা করেছিলাম। সে মোতাবেক রাতের শেষ ভাগে গোটা ক্যাম্পকে ঘিরে ফেললাম। অতর্কিতে গর্জে উঠলো ৩৭ টি স্টেনগান ২১ টি একে ফর্টিসেভেন আর দমাদম ছুড়ে মারা হলো কয়েক ডজন হ্যান্ড গ্রেনেড। গোটা এলাকা আগুনের লেলিহান শিখায় আলোকিত হয়ে উঠলো। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে শত্রু বাহিনী আমাদের প্রতিরোধ করতে মরিয়া হয়ে উঠলো। ওদের কাছে ছিল অত্যাধুনিক সব অস্ত্র। কিন্তু আমাদের ছিল সাধারন অস্ত্র আর অসাধারন কিছু মৃত্যু নিয়ে খেলা করা মুক্তিযোদ্ধা। মাত্র দেড় ঘন্টা গোলা বর্ষণ শেষে শত্রু সৈন্যরা কুপোকাত হলো। যারা পিছু হটতে গেল তারা ছুটে আসা গুলিতে ভূপাত হলো। তারপরও কয়েকজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হলো। আমরা হঠাৎ নিজেদের সবার কথা ভাবতে শুরু করলাম।

যুদ্ধের ময়দানে যে বীর শত্রুকে ছিন্ন ভিন্ন করে পরবর্তী ও বর্তমান প্রজন্মকে একটা স্বাধীন পতাকা, একটি স্বাধীন দেশ এনে দিতে মরনপণ লড়ছে তাদের মধ্য থেকে কত জন শহীদ হচ্ছে, কতজন আগামী দিনে শহীদ হবে, তা আমাদের জানা নেই। আমরা যুদ্ধ থেমে গেলে অস্ত্রাগারের পাশে মিলিত হলাম। দেখা গেল আমাদের ৬৮ জন মুক্তিযোদ্ধার মধ্যে ৮ জন উপস্থিত নেই। আমরা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে আশ পাশে খুঁজতে শুরু করলাম। সেনা ব্যারাকের পশ্চিম গেটের পাশে সারি সারি শত্রুর লাশের মধ্যে আমাদের দুজন সহযোদ্ধাকে পেলাম। তারা সম্মুখ সমরেই শহীদ হয়েছে। তাদের মৃত দেহ কাঁেধ করে অস্ত্রাগারের কাছে এনে রাখলাম। কাঁধ ভেসে যাচ্ছে রক্তে আর সারা মুখ এবং বুক ভেসে যাচ্ছে চোখের পানিতে। একটু একটু করে স্বাধীনতা পাচ্ছি আর একটু একটু করে স্বজন,সহযোদ্ধা হারানো ব্যাথা আমাদের অন্তরকে পুড়িয়ে তামা বানিয়ে ফেলছে। এভাবে পূর্বপাশের জংলামত জায়গা গিয়ে দেখতে পেলাম আরেকজন সহযোদ্ধাকে।  তিনি পায়ে গুলি খেয়ে আহত হয়ে পড়ে আছেন। তাকে এবং তার অস্ত্রটাকে কাঁেধ করে ফিরে এলাম অস্ত্রাগারের সামনে। একে একে সবাই সেখানে উপস্থিত হলাম। চিলমারি মুক্ত করতে আসার সময় সাথে নিয়ে এসেছিলাম ৬৮ টি তরতাজা প্রাণ। ফিরে যাচ্ছি সেই ৬৮ জনই কেবল তাদের মধ্যে ৫ জন আর কোন দিনই কোন যুদ্ধ জয়ের পর বুকে বুক মিলাবেনা। আর কোন দিন তারা মুখে চিৎকার দিয়ে জয় বাংলা বলবেনা। কোন দিন আর একসাথে বসে খাবেনা। তারা যুদ্ধের ময়দানেই শহীদ হয়েছেন। যে কাঁধে শত্রুর বুক ঝাঝরা করা মেশিনগান নিয়ে ঘুরেছি, সেই কাঁধে তুলে নিতে হয়েছে বন্ধু ও সহযোদ্ধা শহীদ মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ। তিনজন ভীষণ ভাবে আহত, তাদেরকেও কাঁেধ করে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছি।

ছোট খাট চিকিৎসা বিদ্যা শিখেছিলাম ক্যাম্প চলাকালীন সময়ে। এখন সেটা কাজে লাগলো। হতাহত তিন যোদ্ধা বন্ধুকে সেবা করার জন্য পরবর্তী পাঁচদিন আমি আর কোন অভিযানে যেতে পারলামনা। শত্রুর সাথে যখন যুদ্ধ হয় তখন আমার ভয় করেনা। কিন্তু আমি ভয়ে কুকড়ে থাকি আহত মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুর পাশে। চিলমারি যুদ্ধে আহত তিন সহযোদ্ধাকে সেবা করার সময় আমি কেঁদেছি এতটাই যে একজন মানুষ এর বেশি কাঁদতে পারেনা। আগে যখন যুদ্ধে আমার দায়িত্ব ছিল খবর পৌছে দেয়া, তখন আমার কোন চিন্তা ছিলনা। শত্রু ছিনিয়ে নিলে কেবল আমার জীবনটাই নেবে। আর এখন এই যুদ্ধের ময়দানে আমি একই সাথে যেমন বীর তেমনি শঙ্কায় জর্জরিত এক তরুণ। এখানে এই যুদ্ধের ময়দানে বাবাকে,মাকে কিংবা ভাইকে হারানোর কোন ভয় আমার নেই। তাদেরকে হারাবো বা হারাতে পারি সে কথা জেনেইতো এখানে নাম লিখিয়ে ছিলাম। তারা যদি হারিয়ে যায় তবেতো তারা হারিয়ে যাবে আমার অগচরে। এখানে এই যুদ্ধের ময়দানে আমি ভয় পাচ্ছিনা আমার শৈশবে একসাথে বেড়ে ওঠা বালিকা বন্ধুকে হারিয়ে ফেলার। আমার ভয়টা তার চেয়ে বড়। একসাথে যে সহযোদ্ধা মেশিনগানের গর্জন তুলেছে, তাকে যখন গড়িয়ে পড়তে দেখি তা এবুককে শত মর্টারের আঘাতে জর্জরিত হওয়ার চেয়ে কষ্ট দেয়। তিনজন আহত যোদ্ধাকে সেবা করার সময় তাদের জীবন কাহিনী শুনেছি। একজন চট্টগ্রাম থেকে এসেছে যার বাবা বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে শহীদ হয়েছিলেন। সে আমাকে তার বাবার নাম বলেনি। সে বলে, শহীদ বাবা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছে এটাই গর্ব। কিন্তু মানুষ তার নাম করে নানা রঙতামাশা করবে তা তারা চায়না। আমি এতে কোন প্রতিবাদ করিনি। যে বাবা ভাষার জন্য শহীদ হয়েছেন সে বাবাকে সবাই শ্রদ্ধা করি। ওর একমাত্র বোনের বিয়ে ঠিক হয়েছিল। বনেদি ঘরের ছেলে,এপ্রিলের তিন তারিখে বিয়ের দিন ধার্য হয়েছিল। একমাত্র বোনের বিয়ের যাবতীয় কেনাকাটা ও নিজ হাতে করেছিল। যার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছিল সে ছিল ওর বন্ধু। এর ফলে বোনের বিয়েটা সে নিজে বেশ জাকজমক ভাবেই দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তা আর হয়ে উঠলোনা। বিয়ের শানাই বেঁজে ওঠার আগেই হানাদার বাহিনীর মর্টার আর কামানের ঝাঝালো শব্দে সব শেষ হয়ে গেল। রিমুর জন্মদিন যেমন পালন করা হয়নি, তেমনি বোনের বিয়ের সানাইও বেঁজে ওঠেনি। যার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছিল সে একসময় ওদের বাড়িতে এসে সবার কাছে ক্ষমা চেয়েছে। সে বলেছে এখন এই পরিস্থিতিতে বিয়ে করা কোন ভাবেই সম্ভব নয়। তাকে যেন সবাই ক্ষমা করে কারণ সে যুদ্ধে যাবে। তার কথা শুনে কেউ হাহুতাশ করেনি। সবাই জানে যদি দেশটাই না থাকে তবে সামান্য বিয়ের আয়োজন করে লাভ কী। অবশেষে সে যুদ্ধে গেল। যাবার আগে কথা দিয়ে গিয়েছিল সে যদি যুদ্ধ জয় করে ফিরে আসে তবে বিয়েটা হবে। বলতে বলতে আমার সহযোদ্ধা আহত মুক্তিযোদ্ধা বন্ধুর চোখ ভিজে ওঠে। তার মুখের ভাষা অস্পষ্ট হয়ে ওঠে। কিছুক্ষণ ফুপিয়ে কেঁদে কেঁদে নিশ্চুপ হয়ে যায় মাত্র কয়েকটি কথা বলে। তার ঐ বন্ধু যার সাথে তার বোনের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল এবং সে কথা দিয়েছিল যুদ্ধ শেষে ফিরে আসলে বিয়ে হবে। সেই বন্ধুটি সত্যিই আর কোন দিন ফিরে আসবেনা। মাত্র ক’দিন আগে ৩ অক্টোবর সে দেশের জন্য যুদ্ধ করে শহীদ হয়েছে। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের একটি গ্রাম তেলিখালী। পাকবাহিনী এটাকে একটা দুর্ভেদ্য ঘাটি হিসেবে গড়ে তুলেছিল। মুক্তিযোদ্ধা ও মিত্রবাহিনী মিলে সেই দুর্ভেদ্য ঘাটিকে গুড়িয়ে দিয়ে বাংলার স্বাধীনতাকে আরো কাছে নিয়ে এসেছে। সেই যুদ্ধে পাক হানাদারদের ২৩৭ জন নিহত হয় এবং একজন বন্দি হয়। তেলিখালীর যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের ১৯ জন শহীদ হয়েছে ওর সেই বন্ধুও তাদের মধ্যে একজন। যে বন্ধুর সাথে এক মাত্র বোনের বিয়ের সব আয়োজন শেষ করেছিল, সেই বন্ধু আর নেই। আর কোন দিন তার সাথে দেখা হবেনা,কথা হবেনা। যে স্বাধীনতার জন্য সে প্রাণ দিয়েছে, সেই দেশ স্বাধীনতার দ্বার প্রান্তে দাড়িয়ে আছে। সেই দেশের মুক্ত বাতাসে মাত্র একটি বারের জন্যও তার আর নিঃশ্বাস নেয়া হলোনা। যে বোনকে বুকে আগলে স্নেহ দিয়ে বড় করেছে, সেই বোনের মেহেদী রাঙা হাত যার হাতে তুলে দেবে বলে স্বপ্ন লালন করেছিল, সে স্বপ্নটা বিলীন হয়ে গেল। এসব বলতে বলতে আমার আহত সহযোদ্ধা বন্ধু  বেলায়েত ক্রমান্বয়ে ঢলে পড়লো। ওর শরীরের কয়েক যায়গা গুলি লেগেছিল। কাঁধের কাছের গুলিটা বের করা সম্ভব হয়নি। কে জানতো মাত্র ১৪ দিনের ব্যবধানে বন্ধুর পথ ধরে সেও হারিয়ে যাবে।

আহত যোদ্ধার সেবা করে আমি কখনো ক্লান্তি অনুভব করিনি। অথচ তার প্রতিটি কথা আমাকে ক্লান্তিতে অবশ করে দিয়েছে। আমি তার পাশে হাত ধরে বসা, মাত্র সকালেও যাকে নিজ হাতে ভাত তুলে খাইয়ে দিয়েছি সে আর নেই। সেই বেলায়েত চলে গেছে না ফেরার দেশে। এর চেয়ে নির্মম আর কী হতে পারে। আরও একজন মুক্তিযোদ্ধা বন্ধু শহীদ হলো। মৃত্যুর সময় তার মুখ নড়ছিল। কি বলতে চাচ্ছিল সে? কী বলতে চাচ্ছিল আমার সহযোদ্ধা বন্ধু বেলায়েত? বলতে বলতে সেতো অনেক কিছু বলেছিল। তার স্বপ্নের  কথা,বোনের কথা,বন্ধুর কথা সব তো সে বলেছে। তার পরও হয়তো তার অনেক কিছু বলা হয়ে ওঠেনি। আসলেই কি তার বলা শেষ হয়েছিল? বলতে বলতে শেষ সময়ে সে তো শ্বাস নিতে পারছিলানা। তার গলার স্বর তখন খাদে নেমে গিয়েছিল। তার মুখ নড়া দেখে মনে হচ্ছিল সে অনেক কিছু বলতে চায়। চোখ ঘুরিয়ে হয়তো শেষ বারের মত স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে দাড়ানো মাতৃভূমিটাকে দেখে নিয়েছে। সে হয়তো তার একমাত্র বোন আর মায়ের কথা বলতে চেয়েছিল। বলতে চেয়েছিল তার অবর্তমানে ভাই হয়ে যেন বোনকে বিয়ে দিই, আর মাকে দেখে রাখি। যে মা তার স্বামীকে বায়ান্নতে রক্ত দিতে দেখেছে , যে মা কদিন আগে এক মাত্র মেয়ের জন্য দেখে রাখা জামাইকে হারিয়েছে, সেই মা একমাত্র ছেলেকে হারানোর শোক সইবে কি করে? তাকেতো আমাদের দেখে রাখতেই হবে। আমি পাগলের মত হাহাকার করে উঠি। কিন্তু আমি কি সত্যিই তার বোনের জন্য ভাই হয়ে পাশে দাড়াতে পারবো? আমি কি সত্যিই স্বামী হারা, সন্তান হারা মায়ের ছেলে হয়ে তার শুন্য বুকটা কিছুটা হলেও ভরিয়ে দিতে পারবো। অনিশ্চিত ভবিষ্যতের এক পথিক আমি। দেশের জন্য যে বেলায়েত জীবন দিল, সেই বেলায়েতের মরদেহ পাশে রেখে আমি নির্বিকার। তাকে বা তার মৃত দেহকে কথা দেয়ার মত সাহস আমার নেই। এ বড় ভার মনে হয় আমার কাছে। আমার কেবলই মনে হয় বেলায়েত বেঁচে থেকে যদি আমার কিছু হত তবে ভাল হতো। আমরা ওর শহীদ মরদেহ ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়ে সমাহিত করলাম। জানি স্বাধীন দেশ ও দেখে যেতে পারেনি কিন্তু ক’দিন বাদেই ও যে মাটিতে ঘুমিয়ে থাকবে সে মাটি মুক্ত স্বাধীন হবেই হবে।

যে জীবন সুখ ও দুঃখের ,যে জীবন হাসি এবং কান্নার, সে জীবন আমরা ভুলে গেছি। সুখ এবং দুঃখ ভুলে কেবল শান্তি কেনার জন্য আমরা যুদ্ধের ময়দানে মৃত্যু ও জীবন বেঁচাকেনা করছি। আমার কষ্টটা এত বেশি হতনা, যদি আমি আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা করার সাথে জড়িয়ে না থাকতাম। সেবা করে করে দু’জনকে সারিয়ে তুললাম। কিন্তু কেবল বাঁধন কেটে চলে গেল বেলায়েত। নাসির ওর সাথে অনেকগুলো অপারেশানে গায়ে গা ঘেসে অংশ নিয়েছে। বেলায়েতের চলে যাওয়া ও কোন ভাবেই মেনে নিতে পারছেনা। আমাদের কমান্ডার যখন ওকে শান্তনা দিয়ে বললেন, নাসির আমরাতো মৃত্যু ফেরী করতে এসেছি, সেখানে ভয় বা ভেঙ্গে পড়ার কিছু নেই। নাসির সে কথা শুনবে কেন। কোন কোন সময় আবেগের কাছে যুক্তি সত্যিকার অর্থে যুক্তিহীন হয়ে পড়ে। ওর ভাষায় বেলায়েত এখনই কেন চলে যাবে। স্বাধীনতা আসবে,সেই স্বাধীনতার সুখ কেমন তা অনুভব করবে,স্বাধীন পতাকা কপালে বেঁধে নিজ গ্রামে ফিরে যাবে। যে বোনকে মেহেদী রাঙ্গা হাতে বিয়ের পালকীতে শশুরবাড়ীতে পাঠাবে, সেই সব মুহুর্তকে পিছনে ফেলে বেলায়েতের এই চলে যাওয়া অবর্ননীয় দুঃখ আমাদের হৃদয় ছেপে হাহাকার তুলেছে। পদ্মা,মেঘনা,যমুনা,ব্রহ্মপুত্র উত্তাল ঢেউয়ে ভেঙ্গে যায়। সেই উত্তাল ব্রহ্মপুত্রের তীরে শহীদ বেলায়েতের কবর। সেই কবরে শুনশান নিরবতা। সব ভেঙ্গে গেলেও ব্রহ্মপুত্র নিশ্চই ওর কবরকে ভেঙ্গে দেবেনা। যে তার জীবনটা দিয়ে গেছে একটা স্বাধীন দেশের জন্য, একটা স্বাধীন পতাকার জন্য, তাকে ব্রহ্মপুত্র কেন কষ্ট দেবে। ব্রহ্মপুত্রকি জানেনা যে এ দেশটা পরাধীন থাকা মানে ব্রহ্মপুত্রের নিজেও পরাধীন থাকা। দেশ স্বাধীন হলে সে নিজেওতো স্বাধীনতার সুখ পাবে। দেশের সুর্যসন্তানকে সে নিশ্চই তার গর্ভে বিলীন করে দেবেনা। বেলায়েতের দাফন শেষ করতে করতে বেলা ডুবে আসে। ব্রহ্মপুত্রের অথৈ জলের নিজে হারিয়ে যায় সেদিনের সুর্য। আমরা ফিরে আসি মুক্তি ক্যাম্পে। যারা যুদ্ধের ময়দানেই শহীদ হয়েছিল তাদের জন্য যতটানা কষ্ট অনুভব করেছি, তার চেয়ে শতগুন বেশি কষ্ট পেয়েছি বেলায়েতের বেলায়। একটা অভিযান সফলভাবে শেষ করে চলে আসার পর আস্তে আস্তে সে যখন চলে গেল, তখন তা আমাদের বুকে কামানের ছুড়ে দেয়া গোলার মত আঘাত হানলো। শহীদ বেলায়েতের পরনের কাপড় একটা পলিথিনে ভরে কমান্ডার নিজের কাছে রেখে দিলেন। যুদ্ধ শেষে স্বাধীন দেশে যদি আমরা বেঁচে থাকি তবে বেলায়েতের শেষ চিহ্ন তার পরিবারকে তুলে দেয়া যাবে।

পাক বাহিনীর নিষ্ঠুরতম আক্রমনে বাংলার গ্রাম-গঞ্জ, নগর-বন্দর ছারখার হয়ে গেছে। শিক্ষক, ছাত্র, চাকরিজীবী, ব্যাবসায়ী, কৃষক সবাই নিজ নিজ পেশা ফেলে অস্ত্র হাতে তুলে নিতে বাধ্য হয়েছে। দেশের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনলে সব ফিরে আসবে। অনেক রক্ত, অশ্রু, মা বোনদের লাঞ্ছনা, পিতার লাশ, দগ্ধ শস্যক্ষেত্র, ভগ্ন ভিটা, বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি, এত সব কিছুর বিনিময়ে আমরা মরণপণ যুদ্ধ করে ছিনিয়ে এনেছি স্বাধীনতার লাল সূর্য। মুক্তি যুদ্ধে শত্রুর বর্বর হামলা থেকে প্রাণ বাঁচানোর জন্য যে বালক তার পিতার হাত ধরে বেরিয়ে পড়েছিল অনিশ্চিত যাত্রা পথে, সে হয়তো বেঁেচ নেই, কিংবা হয়তো একসময় আমারই মত সেও যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। হতে পারে সে বেঁেচ আছে, হতে পারে সে দেশের জন্য জীবন দিয়েছে। যে বালিকা তার পিতাকে রাতের অন্ধকারে অস্ত্র হাতে বিদায় নিতে দেখেছিল, হয়তো তার পিতা আর কখনো ফিরে এসে স্বস্নেহে কপালে হাত রাখতে পারবেনা। হয়তো বা সেই পিতা ফিরে আসবে কিন্তু ফেলে যাওয়া স্নেহের দুলালী মেয়েটাকে দেখতে পাবেনা। যে মা তার পুত্রকে নিজ হাতে সাজিয়ে যুদ্ধে পাঠিয়েছে, যুদ্ধ শেষে সেই মার কোল খালি হয়েছে অথবা এমনও হতে পারে সে দেখে যেতে পারেনি তার সেই বীর সন্তান তার জন্য লাল সবুজের একটা পতাকা ছিনিয়ে এনেছে, ছিনিয়ে এনেছে সবুজ ভূমি আর রক্তিম সূর্য। দেশ প্রেমের বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ারেই শুধু আমরা ভেসে পড়িনি, অত্যাচারে আমরা বিদগ্ধ হতে হতে জ্বলে উঠেছি। আমরা জ্বলে উঠেছি সীমাহীন অত্যাচারের আগুনে পুড়ে। সেই জ্বলে ওঠা থেকেই আমাদের এই স্বাধীনতা। এই যেমন আমি বিশ্ববিদ্যালয় জীবন এখনো শুরুই করতে পারলাম না তার আগেই আমাকে কলম ফেলে অস্ত্র ধরতে হলো। এখনও জানিনা আমার বাবা, মা, ছোট ভাই এবং আমার সেই মেঘ বালিকা বেঁচে আছে না হানাদারদের হিংস্র থাবায় স্বাধীনতার সূর্য ওঠার আগেই বিদায় নিয়েছে। মাত্র গত কাল রেসকোর্সের ময়দানে হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পন করতে বাধ্য হলো। আমাদের মা বোনের সম্ভ্রম হারানো বৃথা যায়নি। আমাদের পিতা, পিতামহ, ভাই বা সন্তানদের রক্ত দেয়া বৃথা যায়নি। নয় মাস একটা দু’টো দিন নয়। এই নয় মাসে আমরা দেখেছি নয়টা যুগের কষ্ট আর সাধনা। দেখেছি শত্রুর বুকে নিশানা করে ছুড়ে মারা কামানের গুলি। দেখেছি মিছিলে মিছিলে যারা রাজপথ উত্তাল করে স্বাধীনতার ঝড় তুলেছিল তাদের হাতের গর্জে ওঠা এক একটা স্টেনগান। এই সব স্মৃতি আমি কোন দিন ভুলবোনা। আমার এই ডায়রি লেখা শুধু মাত্র এই কারনে। আমি যদি যুুদ্ধের ময়দানে শত্রুর গুলির নিচেয় পড়ে যেতাম তবে আমি হারিয়ে যেতাম। এই যে এখন আমি নিঃশ্বাস নিচ্ছি, এটা স্বাধীন দেশের স্বচ্ছ বাতাস। স্বাধীনতার মানেই হলো এই সুখটুকু একান্তে নিজের মত করে কাছে পাওয়া। গত কাল রেসকোর্সের ময়দানে পাক হানাদার বাহিনী দলবল নিয়ে আত্মসমর্পন করেছে। সাধারন অর্থে এটা বললেও আমি বলবো আমরা আমাদের শত্রু পাক হানাদার বাহিনীকে আত্মসমর্পন করতে বাধ্য করেছি। আমরা তখনও ময়মনসিংহে ছিলাম যখন পাকবাহিনী আত্মসমর্পন করছে। আমাদের কাছে খবর আসলো আর সাথে সাথে আমরা আমাদের অস্ত্র উচিয়ে চিৎকার করে আকাশ বাতাস কাপিয়ে প্রতিধ্বনি তুললাম। মুক্তিযোদ্ধারা একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে আনন্দ প্রকাশ করতে লাগলো। ভেবেছিলাম প্রথমে ঢাকা যাব তার পর বাড়ি ফিরে যাব। কিন্তু মন সায় দেয়নি। স্বাধীনতার এই নয় মাস প্রিয়জনকে ছেড়ে থেকেছি, তাই এখন প্রথম তাদের খোঁজ নেয়া দরকার ভেবেই সোজা বাড়ির দিকে রওনা হলাম। সহযোদ্ধা বন্ধুদের বিদায় জানালাম। পিছনে ফেলে গেলাম কষ্টের কত স্মৃতি। কত সহযোদ্ধা মুক্তিযেদ্ধাকে চিরদিনের জন্য এখানে সেখানে এ মাটির নিচেয় ঘুম পাড়িয়ে রেখে এসেছি।

৭.

যুদ্ধ জয় করে বাড়িতে ফিরে গিয়ে দেখি সব আমার অচেনা। সেই সুন্দর সাজানো গোছানো গ্রামখানা পাকিস্তানী হানাদারেরা ধুলোয় ধুসরিত করেছে। এখানে মুক্তি যোদ্ধাদের দু’টি দল দুই দিক থেকে আক্রমন করে পাকিস্তানী হানাদারদের পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেয়নি। আত্রাই নদীর তীর ঘেসে আমাদের সবুজে শ্যামলে ছাওয়া ছোট্ট গ্রামখানি অনেকটাই ফাঁকা। ফাঁকা হওয়ার কারণ নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছেনা। হতে পারে মিলিটারিরা মানুষদের ধরে ধরে নির্বিচারে হত্যা করেছে, আবার অনেকেই পালিয়ে গেছে প্রানের ভয়ে। আমি মুক্তি যুদ্ধে অংশ গ্রহণের পর একবার একটা মিশনে বোচাগঞ্জ এসেছিলাম। বোচা গঞ্জ আমার নানা বাড়ি। আমার নানা তখন বেঁেচ ছিলেন। অনুমতি ছিলনা তারপরও আমার পরিবার, আমার গ্রামের খবর নেয়ার জন্য অপারেশানের এক ফাঁকে বোচাগঞ্জে নানার বাড়িতে গিয়েছিলাম। আমার পরনে একটা কাদা মাখা প্যান্ট, গায়ে ফুলহাতা শার্ট। পিছনে বাজারের ব্যাগের ভেতর একটা এলএমজি। নানা আমাকে দেখে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। আমাদের অগ্রগতির কথা জানতে চাইলেন। আমি তার কাছে খবর পেলাম মা বাবা ওরা সবাই ভাল আছেন। আমাদের গ্রাম থেকে অনেকেই মুক্তি যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। আমাদের গ্রামে কয়েক ঘর হিন্দুও ছিল। কানাই লাল স্যার এবং তার পরিবার ইন্ডিয়া পালাতে গিয়ে রাজাকারদের হাতে ধরা পড়ে এবং তাদেরকে যমুনেশ্বরী নদীর তীরে দাড় করিয়ে হত্যা করা হয়। তাদের লাশ ভাসতে ভাসতে কোথায় গিয়ে পতিত হয় তা কারোর জানা নেই। আমার একজন বন্ধু ছিল রাম কৃষ্ণ। রাম কৃষ্ণ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হয়েছিল। ওর বাবা রাজ শেখর বসু ছিলেন একজন হোমিও প্যাথিক ডাক্তার। রাম কৃষ্ণ শুধু মাত্র টাকার অভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারেনি। রাম কৃষ্ণও মুক্তি যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। রাম কৃষ্ণের বাবা ওকে বলেছিলেন এ দেশটা আমাদের। এ দেশ ছেড়ে চলে যাব কেন? মরতে হলে লড়াই করে এদেশেই মরবো। কাপুরুষের মত পালিয়ে যাবনা। রাম কৃষ্ণ বাবার আশির্বাদ নিয়ে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়লো। এরকম আরো অনেকেই যুদ্ধে সক্রিয় এবং পরক্ষ ভাবে অংশ নিয়েছিল। এসব তথ্য আমি আমার নানার কাছ থেকে নিয়েছি। আমাদের পারিবারিক অবস্থা খুব একটা ভাল ছিলনা তবে আমার নানার ছিল অগাধ সম্পত্তি। আমার নানা ছিলেন পেশায় ডাক্তার। সবাই আমার নানাকে ডাক্তার ছমির উদ্দিন আহমেদ বলেই চিনতো।

পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বর্বরতার দিনেও নানা মুষড়ে পড়েননি। তিনি আমার মাথায় হাত রেখে দোয়া করেছিলেন। বলেছিলেন তোদের মত ছেলে মেয়েরা থাকতে এদেশের কোন ভয় নেই। দেখিস দেশ স্বাধীন হবেই। আমি নানার কাছ থেকে বিদায় নিতে গিয়ে রান্না ঘরের দরজার দিকে চোখ পড়তেই থমকে গেলাম। নানা আমাকে তথ্যটা আগে দেননি। কেন দেননি তা আমি অনুমান করতে পারছি। রান্না ঘরের দরজায় আমার মা দাড়িয়ে আছেন। কতদিন পর মাকে দেখছি, আমার প্রাণটা জুড়িয়ে গেল। দশ বছরের বাচ্চা ছেলের মত দৌড়ে গিয়ে মায়ের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। মা আমার কপালে চুমু একে দিয়ে বললেন তোকে আমি দূর থেকেই দেখছিলাম। আমাকে দেখে তোর যদি ফিরে যেতে ইচ্ছে না করে তাই শত ব্যাথা বুকে চাঁপা দিয়ে দূরে দাড়িয়ে ছিলাম। আমি মাকে অভয় দিলাম। মা আমরা জিতবই। মা নিজেও সেটা মনে করতেন। সে রাতেই আমাকে পঞ্চগড় চলে যেতে হল। যাবার সময় অতি সাবধানে দিনাজপুর জেলার কাহারোলে একটা বাড়িতে যেতে হলো। কাহারোলে যে বাড়িতে গেলাম সে বাড়িটা আমার বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া বন্ধু রাশেদের। ও একটা চিঠি দিয়ে বলেছিল বাড়িতে পৌছে দিস। আমি চিঠি পৌছে দিতে গিয়ে দেখি বাড়ির প্রায় চিহ্নই নেই। একজনের কাছে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলাম মিলিটারিরা এ বাড়ির সবাইকে মেরে ফেলেছে এবং বাড়িটা জ্বালিয়ে দিয়েছে। আমি আর কিছু ভাবতে পারিনা। রাশেদের পরিবারের অনেক খবর আমি সংগ্রহ করেছিলাম এবং রাশেদের সাথে ফিরে গিয়ে আমার সেসব কথা বলার কথা ছিল। মুক্তি যুদ্ধ শেষে বাড়ি ফিরছি। কত কিছু ভাবতে ভাবতে অনেক দূর পথ চলে গেলাম। সব মায়া ,সব স্মৃতি। কোনটা আনন্দের কোনটা বিস্বাদের।

আত্রাই নদীতে একটা ব্রিজ ছিল সেটাও গুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। একটা নৌকাতে করে পার হয়েছি। এখন আমার মনের মধ্যে কোন ভয় নেই, কোন হতাশা নেই। একদিন বাড়ি থেকে ঢাকা যাওয়ার পথে আমার মনে যেরকম অবস্থা হয়েছিল, আজ তার ছিটে ফোটাও আমার মধ্যে দেখা যাচ্ছেনা। আমি এখন একটা মুক্ত স্বাধীন দেশ পেয়েছি। এখানে ভয় থাকার কোন কারন নেই। যুদ্ধের ভয়াবহ দিনগুলিতেও আমি এভাবেই ডায়েরি লিখে রেখেছি। কিন্তু আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করেছি আমার সহজ সরল মেঘবালিকা সেই বন্ধুটির কথা খুব একটা লেখা হয়নি। এখন আবার মনে পড়ছে। সব স্মৃতি হাতড়ে হাতড়ে বেরিয়ে আসছে। সেই সব স্মৃতি ফিরে গিয়ে আলেয়াকে বলবো, আর ও শুনে হাসতে হাসতে পেটে খিল লাগিয়ে দেবে এবং তারই এক ফাঁকে আমি তাকে বলবো, তোমার হাসিটা আগের চেয়ে সুন্দর হয়েছে, সেই সাথে তুমিও। আমি কি তোমাকে একটু ভালবাসতে পারি। ও এ কথা শুনে হয়তো দৌড়ে পালিয়ে যাবে, নয়তো ওর হাসিটা আরো বেশি উজ্জ্বল হবে। গ্রামের পথে হাটতে হাটতে আমার মনে হচ্ছে এদেশে কোন যুদ্ধ হয়নি। যদিও চারদিকে ধ্বংসস্তুপ। আমার মনে হচ্ছিল আমি বুঝি প্রিয় মানুষ গুলিকে ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাচ্ছি। যুদ্ধে যাওয়ার আগে কয়েকটা চিঠি আমি আমার মাকে লিখেছিলাম। সেই সাথে আমি আমার বালিকা বন্ধুকেও চিঠি লিখতে ভুল করিনি। দু একটার উত্তরও পেয়েছিলাম। একটা চিঠি এখনো আমার বুক পকেটে আছে। আমার ঠিক মনে নেই তবে এটাই ছিল ওর লেখা শেষ চিঠি যা আমার হাতে এসেছিল মুক্তি যুদ্ধ চলাকালিন সময়ে। হয়তো পরেও অনেক চিঠি পাঠিয়েছে কিন্তু ওগুলো আর আমার হাতে এসে পৌছেনি। দেশের পরিস্থিতি পুরোপুরি ঘোলাটে হয়ে যাওয়ায় যোগাযোগ ব্যাবস্থাও অচল হয়ে পড়ে। আর তাছাড়া আমি কখন কোথায় থেকেছি হয়তো চিঠি আসলেও আমার হাতে পৌছেনি। ওর যে লেখাটা আমার হাতে সব শেষে এসেছিল সেটা আমার চোখের সামনে। চিঠিটা লিখতে গিয়ে ওর নিশ্চই হাত কাঁপছিল। হাতের লেখাটাও খুব একটা সুন্দর হয়নি। অবশ্য এমন পরিস্থিতিতে হাতের লেখা কোন মুখ্য বিষয় হতে পারেনা। বার বছর ওর সাথে পড়ালেখা করেছি । ওর হাতের লেখাও আমার খুব পরিস্কার মনে আছে। ও আমাকে এই চিঠিটা লিখেছিল আমি যুদ্ধে যাবার পরে, তবে তাতে কোন তারিখ ছিলনা,কোন শিরোনামও ছিলনা।

“ এখন আর পড়ালেখা করতে ইচ্ছে করেনা। ইচ্ছে করে মুক্তি যুদ্ধে যাই। কিন্তু কোথায় গেলে মেয়ে হয়েও মুক্তি যুদ্ধে অংশ নেয়া যাবে তা জানিনা বলে যেতে পারছিনা। আমি এখন ঘরের মধ্যে বন্দী প্রায়। বাবা মা সবাই ভয়ে ভয়ে দিনাতিপাত করছে ,কখন না জানি মিলিটারি চলে আসে। তুমি যদি মাত্র একটি বার আসতে আমি তোমার সাথে চলে যেতাম। বাবা মায়ের পর আমি কেবল তোমাকেই বেশি বিশ্বাস করি। আমি তোমার সাথে যুদ্ধে যেতেও ভয় পাবনা। যদি এই চিঠি তোমার হাতে পৌছে তুৃমিকি আমাকে নিতে আসবে? তুমি নিজেও কি যুদ্ধে যাবে? আমার মনে হয় তুমি যুদ্ধে যেতে পারবেনা। তোমার মত একটা ভীতু যুদ্ধে যেতে পারেনা। চলে যাবার সময় আমার কোন কথাই তুমি বুঝতে পারনি, সেখানে গ্রেনেড কিভাবে ছুড়তে হয় সেটা বুঝবে কিভাবে? আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করবো। শুধু মাত্র তোমাকে একটা কথা বলার জন্য। তার আগেই তুমি যদি বুঝতে পার আমি কি বলতে চাই তাহলে দেরি করোনা শুধু তোমার উত্তরটা জানাইও।

“ আলেয়া ”

এই চিঠিটা পেয়েছিলাম তানিমের কাছে। ওর সাথে আমার দেখা হয়েছিল পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে। ও ঢাকা থেকে আসার সময় চিঠিটা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল। কারণ ও জানতো আমি এ অঞ্চলে কোন না কোন খবর নিয়ে আসবোই।

আমি যুদ্ধ জয়ী বীর। ফিরে এসেছি নিজ গ্রামে। বিধ্বস্থ  একটা দেশে কেনার মত কিছুই নেই। যাও কেনার মত আছে তা কেনার ক্ষমতা আমার নেই। যৎসামান্য উপহার কিনে ব্যাগে ভরে হাটছি বাড়ির পথে। ভেসে উঠছে বহুদিন আগে হেসে খেলে বেড়ানো সেই সব স্মৃতি। বুক পকেট থেকে চিঠিটা বের করে এরই মাঝে কয়েকবার পড়েছি। তাতে কি ! যত বার পড়ছি ততবারই মনে হচ্ছিল নতুন কিছু পড়ছি। দেখতে দেখতে আমার চির চেনা উঠোনে চলে এসেছি। এই বাড়িতে আঠার বছর জীবন যাপন করেছি। আমি মা বলে ডাক দিতেই ঘর থেকে মা ছুটে বেরিয়ে আসলেন। তার ছোখ ছলছল করছে। পানিতে ভিজে উঠেছে। আমি মায়ের বুকে ঝাপিয়ে পড়ি। মনে হতে থাকে আমি বুঝি এগার বছরের ছেলেটা। মা আমার কপালে মুখে চুমু দিতে থাকে। আমি আবেগ ধরে রাখতে পারিনা। কাঁদতে থাকি, সে কান্না আনন্দের। মা ছেলের মিলনের দৃশ্য দেখতে ততক্ষনে অনেকেই ভীড় করেছে। বাবা বাড়িতে ছিলেননা। কিছুক্ষনের মধ্যে বাবাও ফিরে এলেন। অনেকক্ষণ চলে যাবার পরও আমি আমার পনের বছরের ভাই জাহিনকে খুঁজে পেলাম না। মাকে ওর কথা জিজ্ঞেস করতেই মায়ের চোখ আবার ভিজে উঠলো। মায়ের কন্ঠ আবার জড়িয়ে আসলো। যুদ্ধ শুরু হবার পর ও খুব জোরাজুরি করছিল যুদ্ধে যাবার জন্য। আমি নিষেধ করেছিলাম বলে ও একদিন এক রাত আমার সাথে কথা বলেনি। হয়তো আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল। এক সকালে উঠে দেখি ও ঘরে নেই। টেবিলের ওপর একটা চিঠি।

“ মা তোমাকে কষ্ট দিতে চাইনি কিন্তু তার পরও থাকতে পারলামনা,আমরা মুক্তি যুদ্ধে না গেলে আর কারা যাবে বলো? তুমিকি চাওনা দেশটা স্বাধীন হোক? আমরা যাচ্ছি মা ,আমরা তোমার সোনার ছেলে। পতাকা নিয়ে ফিরে আসবো আর পতাকা আনতে না পারলে কোন দিন ফিরবোনা

“ জাহিন”

আমি আমার এমন ভাইয়ের জন্য গর্ব বোধ করি। ও এখনো ফিরে আসেনি। ও বেঁচে আছে না মারা গেছে তা আমার জানা নেই। আমি মাকে শান্তনা দিলাম। দেখো মা একদিন নিশ্চই ও ফিরে আসবে। মায়ের মন সহজে শান্ত হয়না। অনেক দিন পর বাড়িতে এসেছি। মাঝে কেটে গেছে প্রায় একটা বছর। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর আর বাড়িতে ফিরে আসা হয়নি। এর মাঝেই যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। আমিও যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। অনেক দিন বাদে গ্রামে এসে তাই সারা গ্রাম ঘুরে ঘুরে দেখলাম। যেখানে যেখানে শৈশবে আমার পদচারণা ছিল সেখানে আমার হারানো স্মৃতি খুঁজে বেড়ালাম। অনেক বাড়ি ঘরই জ্বালিয়ে দেয়া হয়েছিল। আমাদের স্কুলে যাওয়ার পথে রাস্তার মোড়ে একটা বড় বট গাছ ছিল। সেখানে গিয়ে দেখি একটা কংকাল ঝুলছে। একজন বললো “হারামজাদাটা রাজাকার ছিল,সবাই মিলে গাছে ঝুলাইয়া দিছে। ভাইজান ওর কংকালে থুথু মারেন,আমরা রোজ থুথু মারি।” লোকটার কথা শুনে আমি সত্যি সত্যিই থুথু মারলাম। যদিও আমি জানি ওকে থুথু না মারলেও কিছু যায় আসেনা। ওর শাস্তি ও ঠিকমতই পেয়েছে। দেশের শত্রু যারা বেঁেচ আছে তাদের মুখে এমন করে থুথু মারতে পারলে মনে শান্তি পেতাম।

আমি হাটছি আমার বালিকা বন্ধুর খোঁজে, যার লেখা একটা চিঠি এখনো আমার বুক পকেটে আছে। মাঝখানে আমি মাকে একটা চিঠি লিখে ওর কথা বলেছিলাম, যদিও মাকে ওর নাম বলিনি। মাকে জানিয়েছিলাম যুদ্ধ শেষে যখন ফিরে আসবো তখন ওকে তোমার কাছে নিয়ে আসবো। আমি হাটছি আর পিছনের স্মৃতি আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে। স্কুলে পড়ার সময় আমি ছিলাম সত্যিকারের হাবাগোবা, তবে মোটামুটি ধনের মেধাবী । কম বেশি সবাই আমাকে আরো বেশি বোকা বানানোর চেষ্টা করতো । সেই সব দিনগুলিতে কী এক মায়ার টানে আলেয়া আমাকে ঢাল হয়ে ঘিরে রাখতো। আমি তখন বুঝতে পারতাম না আমার জন্য তার মনে কিসের এতো দরদ। জ্বর হয়ে বিছানায় পড়ে থাকলে কেউ আমার খোঁজ নিতনা, কিন্তু ও ঠিকই আসতো। আমার কপালে হাত রেখে বলতো “ইস গরমে গা পুড়ে যাচ্ছে“। আমি অনেক দিন বাদে ফিরে এসেছি। ওদের বাড়ির উঠোনে পা রাখতেই কেমন যেন বুকের মধ্যে ধড়ফড় করতে লাগলো। আমি ওর নাম ধরে ডাকার শক্তি পেলাম না। কিছুটা লজ্জা কিছুটা ভয়। যে নামটা বছরের পর বছর ক্ষণে ক্ষণে উচ্চারণ করেছি, সেই নামটা আজ মুখে আনতে পারছিনা। মুক্তিযুদ্ধে হেরে গিয়ে হানাদার বাহিনী যখন আত্ম সমর্পন করতে বাধ্য হলো তখন যতটা উত্তেজনা অনুভব করেছি এখন তার চেয়ে বেশি অনুভব করছি। কি পেয়েছি কি পাইনি মনের ভেতর তার হিসার নিকাশ চলছে। বাবা মা চেয়েছিল আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই, সে স্বপ্ন পুরন হয়েছে। কোটি কোটি বাঙ্গালীর সাথে নিজে যখন স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম একটি স্বাধীন দেশ এবং আকাশে ওড়ানোর মত স্বাধীন একটা পতাকার। সেই স্বপ্নটাও নিজে স্বাক্ষী হয়ে পূরন করতে পেরেছি। না পাওয়ার খাতা প্রায় শুন্য। যুদ্ধ জয় করে ফিরে আসা বীরের সামনে অপূর্নতা বলে কিছু থাকার কথা নয়। কিন্তু আমার জন্য খানিকটা অপূর্ণতা রয়ে গেছে। চারদিকে এত আলো তার মাঝেও আমি আলোর খোঁজে আলেয়ার কাছে ছুটে এসেছি। জানি অন্য সব আলো আমার চারপাশে আলোকিত করবে ঠিকই কিন্তু আমার মনের ঘর আলোকিত করতে পারে শুধু আলেয়ার আলো। স্বাধীন একটা দেশ এবং স্বাধীন একটা পতাকা নিয়ে আসতে পেরেছি এর চেয়ে বড় উপহার আলেয়াকে আর দিতে পারবোনা জেনেও সাধ্য মত লাল শাড়ী এনেছি। শাড়ীটা হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলবো বর্ষার প্রথম কদমফুল নয়,বাগানের হাসনা হেনা নয়, তোমার জন্য যুদ্ধ করে এনেছি স্বাধীন সূর্য,স্বাধীন দেশ এবং আকাশে ওড়ানোর মত স্বাধীন একটা পতাকা। সেই সাথে এনেছি শহীদের রক্তের সাথে মিল রেখে লাল কাপড়। আমার কথা শুনে আলেয়ার কী অনুভূতি হবে তা ভাবতে থাকি।

খানিকক্ষন দাড়িয়ে থেকে ওর মাকে ডাকলাম, কাকি বাড়িতে আছেন? একবার দু বার তৃতীয়বার ডাকার পর ওর মা বেরিয়ে আসলেন। আমাকে দেখে চিৎকার করে কেঁদে আমার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। হতে পারে যুদ্ধ শেষে জীবিত ফিরে এসেছি সেই আনন্দে কাঁদছেন, কারণ অনেকের ছেলে মেয়েই জীবিত ফিরে আসতে পারেনি। আবার এমনও হতে পারে আলেয়া আমাকে নিয়ে তার স্বপ্নের কথা তার মাকে বলেছে এবং আমি ফিরে এসেছি দেখে তার এমন বাঁধ ভাঙ্গা কান্না। আমি কাকিকে শান্তনা দিয়ে বললাম এখন কাঁদার সময় শেষ। দেখবেন দেখতে দেখতে সব ঠিক হয়ে যাবে। তিনি কোন কথা বললেন না। হয়তো কিছু কিছু ব্যাথা কোন দিন শেষ হবার নয়। তিনি আমাকে হাত ধরে বাড়ির পাশে বকুল তলায় নিয়ে গেলেন। এই বকুল তলা আমি অনেক বার এসেছি। প্রতিবারই আমার ভাল লেগেছে। কেবল এবারই বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠলো। আলেয়া আমার পাশে নেই সে জন্যই কি এমনটি হচ্ছে, নাকি অন্য কিছু তা আমি বুঝে উঠতে পারছিনা। আগের সেই বকুল গাছ আর আজকের এই বকুল গাছের মধ্যে যুগ যুগান্তের পার্থক্য। যে  বকুল গাছের নিচে কেবল ঝরা বকুলের সমাহার থাকতো আজ সেই বকুল গাছের তলে নতুন একটা কবর। কার কবর সেটা জিজ্ঞেস করার সাহস আমার হলনা। হতে পারে আলেয়ার ছোট ভাই মারা গেছে কিংবা আলেয়ার বাবা মারা গেছে। আলেয়াও যে মারা যেতে পারে সে কথাটা আমার মাথায় একবারও আসেনি। আমি কবরের মানুষটার জন্য দু হাত তুলে প্রার্থনা করলাম। কাকি আমার হাত ধরে ঘরে নিয়ে আসলেন। কোথা থেকে খুঁজে খুঁজে একটা রক্ত মাখা চিঠি আমার হাতে ধরিয়ে দিয়েই জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেলেন। কার চিঠি, কাকে লিখেছে, এসব তখন মামুলি ব্যাপার। জ্ঞান হারা মানুষটির সেবা করাই তখন একমাত্র কাজ ছিল। আমি সাহায্যের হাত বাড়ানোর জন্য কেউ একজনকে খুঁজছিলাম। আমার সামনে এসে দাড়াল আলেয়ার বাবা এবং ছোট ভাই আলাদীন। আমার বুকটা কেঁপে উঠলো। কোন পূর্বাভাস ছাড়াই চোখ বেয়ে অশ্রু নামতে লাগলো। বকুল গাছের নিচেয় যে কবরটা দেখেছি, বার বার সেটাও চোখের সামনে ভেসে উঠলো। আলেয়ার বাবা বা ভাই কেউ মারা যায়নি, তাহলে কবরটা কার? কোন অজ্ঞাত নামা মুক্তিযোদ্ধার? আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। আমি সব কিছু ভুলে হাতের রক্ত মাখা চিঠিটি চোখের সামনে মেলে ধরলাম। বাড়ি আসার সময় আলেয়ার জন্য একটা লাল টুকটুকে অল্প দামি শাড়ি কিনেছিলাম, সেটা তখন আমার পাশে। চিঠিটি চোখের সামনে মেলে ধরতেই আরেকটি যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। হানাদারদের ধুলোয় মিশিয়ে দেয়া বীর যোদ্ধা এই যুদ্ধে নিজেকে জয়ী করতে পারলোনা। জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেলাম। জ্ঞান হারানোর আগে হাতে ধরে রাখা চিঠির প্রতিটি অক্ষর আমার বুকের মধ্যে এক একবার বেয়নেট দিয়ে খুচিয়ে খুচিয়ে আমাকে ক্ষত বিক্ষত করে যাচ্ছিল। চিঠিটি ছিল আমাকে লেখা আলেয়ার শেষ চিঠি। চিঠিতে যা লেখা ছিল সেটা ছবি হয়ে আমার চোখে ভাসছিল।

৮.

আলেয়ার কবরে এখন প্রতিদিন বকুল ফুল ঝরে পড়ে। সকালের সুর্য আলেয়াকে আলো দেয়। ওর কবরেই বকুল ফুল ঝরে পড়া উচিৎ। মৃত্যুর আগে ও আমাকে ওর ভাল লাগা ভালবাসার কথা লিখে গেছে। শুধু জেনে যেতে পারেনি আমিও ওকে ভালবাসি এবং এখনো ওকে ভালবাসি। আলেয়ার লেখা শেষ চিঠি পড়ে আমি যখন জ্ঞান হারাচ্ছিলাম, তখন সেকেন্ডের ভিতরে বিগত সময়ের সব স্মৃতি আমার চোখের সামনে ভেসে উঠেই একবারে সব অন্ধকার হয়ে গেল। তার পর আমার আর কিছুই মনে নেই। আমি জ্ঞান হারানোর পর সবাই ধরাধরি করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে তিনি চিকিৎসা করেন এবং আমার জ্ঞান ফিরে আসে। মা এবং অন্যদের মুখে  শুনেছি জ্ঞান ফেরার পর আমি কোন কিছুই মনে করতে পারিনি। শুধু মা বাবার চেহারাটা মনে ছিল। প্রায় দেড় বছর চিকিৎসার পর আমি সুস্থ হয়ে উঠি। একরাতে আলেয়া তার মায়ের সাথে ঘুমাচ্ছিল হঠাৎ দুড়–ম দাড়াম শব্দ। ভয়ে ওরা কেঁপে উঠলো এবং সাথে সাথে ওদের দরজায় লাথির আঘাত লাগলো। ওরা তখনই বুঝতে পারলো মিলিটারি এসেছে। আলেয়ার মা অনেক চেষ্টা করেও ওকে বাচাঁতে পারেনি। চোখের সামনে রাজাকার এবং পাকিস্তানী মিলিটারিদের বর্বরতা দেখেছে আলেয়ার ছয় বছরের ভাই আলাদীন। রক্তাক্ত ক্ষত বিক্ষত আলেয়া সেই অবস্থাতেই তার প্রিয় মানুষটিকে চিঠি লিখে তার মায়ের হাতে দিয়ে বলেছে “ ও যদি ফিরে আসে এই চিঠি যেন ওকে দেওয়া হয়”। এই টুকু ছিল আলেয়ার শেষ কথা।

রাস্তার মোড়ে বড় বটগাছে যে কংকালটা ঝুলছে সেটা আর কারো নয়, রাজাকার শরাফত আলীর। যে বদমাইশটার কারনে আমার জীবন থেকে আলেয়ার আলো নিভে গেছে চির তরে। এর মাঝে আমার ছোট ভাইও ফিরে এসেছে। মা ভীষণ আনন্দিত। বলতে গেলে দেশের এই বিরাট অর্জনে যত ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে এবং যত ক্ষতি হয়েছে, আমার মায়ের তেমন একটা ক্ষতি হয়নি। প্রতি রাতে আলেয়ার লেখা চিঠিগুলি একবার করে পড়ি, শুধু রক্তমাখা চিঠিটা পড়ি প্রতি চাদনী রাতে, যখন চাঁদ তার সমস্ত জোছনা ঢেলে দেয়। তখন আমি আলেয়াকে ভাবি এবং তার জন্য চোখের জল বিসর্জন দেই। সুস্থ হবার পর আমি আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে যাই। রাশেদের মা বাবাকে লেখা চিঠিটাও আমার পকেটে। ওর দেখা পেলে ওর চিঠিটা ওকে ফেরৎ দেব। রাশেদের বাড়িতে গিয়ে কাউকে না পেয়ে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি মিলিটারিরা ওদের বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়ছিল এবং ওর বাবা মা এবং ছোট ভাইকে গুলি করে হত্যা করেছিল। ওর অতি আদরের বোনকে ক্যাম্পে ধরে নিয়ে গিয়ে পাশবিক অত্যাচার করে বেয়নেট চার্জ করে খুচিয়ে খুচিয়ে মেরে ফেলেছিল। আমি কিভাবে রাশেদকে এসব কথা বলবো ভেবে পাইনি। আমি অনেকটা পালিয়ে থাকতাম, যেন রাশেদের সাথে আমার দেখা না হয়। আমার আর পালিয়ে থাকতে হলনা। সত্যি এক জীবনে আর কোন দিন রাশেদ আমার সামনে এসে দাড়াবেনা। আমাকে জিজ্ঞেস করবেনা আমার বাবা মাকে চিঠিটা দিয়েছিলি কিনা। একদিন এস এম হলের বারান্দায় বসে আছি। হঠাৎ দেখি মাহমুদ আমার পাশে দাড়ানো। প্রথমটাতে আমি চমকে উঠেছিলাম। আমার অবচেতন মন আমাকে বলছিল হয়তোবা রাশেদ এসে দাড়িয়েছে। পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখি মাহমুদ। রাশেদ আর মাহমুদ দুজনেই আট নম্বর সেক্টরে যুদ্ধ করেছিল। মাহমুদকে দেখে আমি কিছুটা শান্ত হলাম। আমার পাশে বসে মাহমুদ আমার কাধে হাত রাখলো। আমার অসুস্থতার দিনগুলোতেও ও সারাক্ষণ আমার পাশে ছিল। আমার এবং আলেয়ার সব বিষয় ও জানতো বলেই হয়তো আমাকে নানা ভাবে ভুলিয়ে ভালিয়ে রাখার চেষ্টা করতো। কিন্তু বিষয়টা হয়ে গিয়েছিল শরীরের একটা ব্যাথা স্বরুপ। ভুলতে চাইলেও ভুলতে পারিনি। আসলে আমি স্মৃতিগুলো কোনদিন ভুলতে চাইনা। পাশে বসে মাহমুদ পকেট থেকে একটা চিঠি বের করলো। এই চিঠিটাও রক্ত মাখা। বুকের মধ্যে আবার প্রচন্ড ব্যাথা অনুভব করলাম। চিঠিটা খুলে পড়লাম এবং সাথে সাথে আমার চোখ অশ্রুতে ভিজে ঝাপসা হয়ে উঠলো। রাশেদের লেখা চিঠি। রাশেদ যখন চিঠিটি লিখছিল মাহমুদ তখন ওর পাশে বসা। মাহমুদ নিজ চোখে দেখেছে রাশেদের মৃত্যু দৃশ্য। রাশেদ ছিল আমার ভীষণ ভালো বন্ধু। সারাক্ষন আমরা একসাথে থাকতাম। কথা ছিল একই সেক্টরে যুদ্ধ করবো, তা আর হয়ে ওঠেনি। রাশেদ আমাকে অনুরোধ করেছে আমি যেন ওর বাবা মাকে দেখে রাখি। এবং ও যে মারা গেছে এটা যেন তাদের বুঝতে না দেই। রাশেদ আরো অনুরোধ করেছে ওর বোন নিতুকে আমি যেন ভালো ঘরে বিয়ে দেই। আমি যে রাশেদকে তার বাবা মায়ের এবং অতি আদরের বোনের সংবাদ দিতে পারবোনা বলে পালিয়ে বেড়াচ্ছি সেই রাশেদ আমাকে মুক্তি দিয়ে গেছে। মুক্তির নামে দিয়ে গেছে আজীবনের মত শিকল পরা ব্যাথা। রাশেদের লেখা চিঠি পড়ে ভাজ করে পকেটে রেখেছি। যেখানে আগে থেকেই আরেকটা রক্ত মাখা চিঠি ছিল,চিঠিটা আলেয়ার।

সন্ধ্যা হয়ে আসছে। স্বাধীন দেশে সুর্য ডুবছে । এস এম হলের বারান্দায় মাহমুদের পাশে বসে আমি শুন্য দৃষ্টিতে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি। সে আকাশে কোন মেঘ নেই ,এক ঝাঁক পাখি ডানা ঝাপটে নীড়ে ফিরছে। তারাও আজ স্বাধীন। হল মসজিদ থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে ,হাতের তালু দিয়ে চোখ মুছে আমরা দু’জন উঠে দাড়িয়েছি। মাহমুদ নির্বিকার,যতই মুছছি চোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছেই। এখন আর অশ্রু মুছতে ইচ্ছে করছেনা। ও ওর মত করে ঝরতে থাক। এখন আমার পকেটে রক্ত মাখা দুটো চিঠি, একটি মুক্তি যোদ্ধার, অন্যটি মুক্তিযোদ্ধাকে ভালবাসা এক বীরাঙ্গনার। চিঠি দুটোয় হাত বুলিয়ে বাকি জীবন কাটিয়ে দেব। মসজিদের দিকে হাটছি আর মুখ দিয়ে বিড় বিড় করে বেরিয়ে আসছে একটি কথা ,এখন আমার কাছে দুটো চিঠি, রক্ত মাখা দুটো চিঠি।

———————–সমাপ্ত——————————

অনুভার গল্প

২৮ এপ্রিল

বিশেষ কারণে বিকেল চারটার মধ্যেই অফিস ছুটি হয়ে গেছে মাহিবের। আগে আগে ছুটি হলে সবারই ভালো লাগে। আর সবার মতই মাহিবেরও খুব ভালো লাগছে। বিশেষ করে এপ্রিলের ২৭ তারিখে চারটার মধ্যে অফিস ছুটি হওয়া ওর জন্য খুবই জরুরী ছিল। ছুটি না হলেও বসকে বলে ছুটি নিয়ে সে বেরিয়ে যেতো। তাকে ক্যাম্পাসে যেতে হবে। সাথে করে নিয়ে যেতে হবে একটা তিনতলা কেক। কেকের উপর সুন্দর করে লেখা থাকবে শুভ জন্মদিন অনুভা। মাহিবের অফিস উত্তরাতে। ছাত্রজীবন থেকেই সে উত্তরায় থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি উত্তরা হয়ে সেই কোনাবাড়ি পযর্ন্ত যায়। সেই গাড়িতেই ছাত্রজীবনে চলাফেরা করতো মাহিব। গাড়িটার নামটাও সুন্দর। ক্ষণিকা। ঢাকা ও আশেপাশের ছাত্র ছাত্রীদের জন্য বিভিন্ন রুটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি চলাচল করে। গাড়িগুলোর কোনোটার নাম চৈতালি,কোনোটার নাম ক্ষণিকা,কোনোটার নাম শ্রাবণ। আগে যখন মাহিব কল্যাণপুরে থাকতো তখন সে চৈতালি বাসে নিয়মিত যাওয়া আসা করতো। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে উঠেছিল। অবশ্য তারপর অনেক গুলো টিউশন উত্তরাতে হওয়ায় সে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ছেড়ে দিয়ে উত্তরাতে থিতু হয়েছিল। সেই থেকে ছাত্রজীবন শেষ করে কর্মজীবন শুরু করেছে উত্তরাতেই। উত্তরা তার নিজের বাড়ির মত হয়ে উঠেছে। যেন প্রতিটি ইঞ্চি ইঞ্চি মাহিবের চেনা। অফিস শেষে বন্ধু ও কলিগদের সাথে রোজ ঘুরে বেড়ানো ছিল ওর নিয়মিত অভ্যাস। যখন আগে আগেই ছুটি হয়ে গেল তখন মাহিব হাফছেড়ে বাচলো। অন্তত ছুটির জন্য বসের সামনে গিয়ে দাড়াতে হবে না। এক দুই ঘন্টা আগে বের হতে চাইলেও বস যেভাবে তাকায় তাতে ছুটি নেওয়ার চেয়ে না নেওয়াই বেশি ভালো মনে হয়।

অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা বাসায় গিয়ে পোষাক বদলে নেয় মাহিব। অফিসে স্যুট টাই পরে থাকলেও সাধারণত এমনিতে সে জিন্স আর টিশার্ট বেশি পছন্দ করে। মাহিব দেরি না করে বেরিয়ে পড়ে। রাজলক্ষ্মী আর আজমপুরের মাঝামাঝি পেস্ট্রি শপ থেকে একটি তিন পাউন্ডের কেক কেনে। কেকের উপর সুন্দর করে লিখে নেয় শুভ জন্মদিন অনুভা। যার জন্য কেক কেনা হয়েছে সে কিন্তু জানে না। আগামী কাল ২৮ এপ্রিল অনুভার জন্মদিন। অনুভা থাকে নেত্রকোনাতে। ওখানেই বাসা। পড়াশোনাও করেছে ওখানে। স্কুল ছুটির অবসরে সে এসেছে খালার কাছে। এখানে কয়েকদিন থাকবে। মাহিব অনুভার খালামনির কাছ থেকে জেনে নিয়েছিল যে অনুভা ওর জন্মদিনে ঢাকাতেই থাকবে। তখন থেকেই মাহিব ভেবে রেখেছিল ওর জন্য কেক নিয়ে যাবে। অবশ্য  অনুভা যখন নেত্রকোনাতে থাকতো তখনও কোনো না কোনো ভাবে মাহিব ওর জন্য কেক পাঠাতো। জন্মদিনে অন্যান্য উপহারও পাঠাতো। এবার যেহেতু সে ঢাকাতেই আছে তাই মাহিবের মনে হলো ওকে সারপ্রাইজ দেওয়া যাবে। যেই ভাবা সেই কাজ। একটি কেক নিয়ে সে সিএনজিতে ক্যাম্পাসের দিকে রওনা দিলো। অনুভার খালামনি ক্যাম্পাসের পাশেই থাকে।  

যখনই অনুভা ঢাকায় আসতো সে মাহিবের সাথে ঘুরে বেড়াতো। ভাইয়া বলতে পাগল। তার যত আব্দার সব মাহিবের কাছে। মাহিবও তাকে খুব স্নেহ করে। উত্তরা থেকে ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে মাহিব দেখলো সেদিন মারাত্মক জ্যাম। তিন ঘন্টা লেগে গেলো ওইটুকু পথ যেতে। তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। চারদিকে অন্ধকার নেমে এসেছে। অবশ্য শহরে রাতও দিনের মতই আলোকিত থাকে। অনুভার খালামনির বাসার সামনে গিয়ে খালামনিকে ফোন করলো। তার সাথে আগেও কথা হয়েছিল। অবশ্য মাহিব বলেনি যে সে কেক নিয়ে আসবে। মাহিবের ফোন রিসিভ করার পর সে বললো অনুভাকে গেটে পাঠাতে। অবশ্য তাকে বলতে নিষেধ করলো কে এসেছে। শুধু বলা হলো একটা পার্সেল এসেছে যাও নিয়ে আসো। অনুভা তার খালামনির কথামত গেটে আসলো। মাহিবকে দেখে সে বিস্মিত হয়ে গেল। সে কল্পনাও করেনি মাহিব ভাইয়া আসবে। তারপর দাড়িয়ে দাড়িয়ে কিছুক্ষণ কথা বলে জন্মদিনের জন্য আনা কেকটা দিয়ে মাহিব বিদায় নিলো। যদিও জন্মদিন আগামী কাল ২৮ এপ্রিল। কিন্তু কালকে মাহিবের অফিস থাকবে সকাল থেকে বিকেল পযর্ন্ত। সেই সময়ে আসতে পারবে না। তাই আগে থেকেই কেক দিয়ে গেলো। তাছাড়া জন্মদিন রাত বারটার পর থেকে নাকি শুরু হয়। সেই রীতিও সে ফলো করলো। ভাইয়ের কাছ থেকে এমন সুন্দর একটা কেক পেয়ে অনুভা ভীষণ খুশি। মাহিব এবার বাস ধরে উত্তরাতে ফিরে গেলো। যেতে যেতে বেশ রাত হলো। বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে এশার নামাজ পড়ে রাতের খাবার খেলো। অনুভাকে জন্মদিনের কেক দিতে পেরে তার খুব ভালো লাগছে। শান্তি শান্তি লাগছে।

রাত বারটা বাজার পর অনুভাকে ফোন করে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালো। অনুভা কেক পেয়ে এমনিতেই খুশি। জন্মদিনের উইশ পেয়ে আরও খুশি হলো। পরদিন সকালে যথারীতি অফিসে ঢুকলো মাহিব। সারাদিন অফিস করলো। ওর অফিস টাইম বিকেল চারটা পযর্ন্ত। ছুটি হওয়ার পর অফিস থেকে বেরিয়ে হাটাহাটি করলো। অন্য এক বন্ধুর সাথে ঘুরে বেড়ালো এবং রাতে বাসায় ফিরলো। সারাদিন আর ফেসবুকে ঢোকা হয়নি। মাহিব ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার খেয়ে যখন ফেসবুকে ঢুকলো তখন দেখতে পেলো অনুভার খালামনির আইডি থেকে একটা নোটিফিকেশন এসেছে। বন্ধু তালিকায় থাকা কেউ পোস্ট দিলে সাধারণত নোটিফিকেশন আসে। সেই নোটিফিকেশন অনুসরণ করে টাইমলাইনে যেতেই মাহিব দেখতে পেলো রীবন্দ্রচত্ত্বরে অনুভা তার জন্মদিনের কেক কেটে জন্মদিন উদযাপন করেছে। মাহিবের দেওয়া সেই কেকটাই কাটা হয়েছে। অবশ্য আরও একটা ছোট কেকও ছিল। আর ওর পাশে ছিল অনুভার দুই খালামনি এবং অন্য আরও অনেকে। তাদের কাউকে অবশ্য মাহিব চেনে না। জন্মদিনে তাহলে বেশ ভালোই এনজয় করেছে অনুভা। মাহিব অনুভাকে মেসেজ দিল তোর জন্মদিনে কী দারুণ সেলিব্রেট করলি। আমাকে বললে আমিওতো চলে আসতাম।

মাহিব ভাবতেও পারেনি অনুভা তাকে এমন কিছু বলবে। অনুভারা চার বোন। কোনো ভাই নেই। অনুভা যখন ক্লাস থ্রিতে পড়তো তখন থেকে মাহিবের সাথে পরিচয়। মাহিব তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে পড়তো। সেই থেকে মাহিব হয়ে উঠেছিল অনুভার একমাত্র ভাই। সব কিছুতে সে ভাই হিসেবে তার সর্বচ্চটা দিয়ে বোনকে ভালোবাসতো। তার জন্য সব কিছু সাধ্যমত চেষ্টা করতো। তার সব ইচ্ছে পূরণ করতে চেষ্টা করতো।

যে সব মানুষের কথা আমি কখনো ভুলে যেতে পারিনি তাদের মধ্যে অনুভা একজন।

বার্লে গ্রিফিন লেকের পানির দিকে তাকালে আকাশের প্রতিচ্ছবি দেখা যায়। যেন পানির নিচে আরেকটা আকাশ। লেকের ইন্টারলকিং পেভার ব্লক দিয়ে বাঁধানো পথ ধরে জগিং করতে করতে ক্লান্ত হয়ে কোনো একটি বেঞ্চিতে বসে সেদিকে তাকিয়ে হয়তো অনুভার অনেক কিছুই মনে পড়ে। অনেক মানুষের ছবি ভেসে ওঠে। দেশের মাটিতে বাবা মা বোন আত্মীয় পরিজন,সহপাঠীরা রয়ে গেছে। সেই সব প্রিয়জনকে নিশ্চই সে মিস করে। কিন্তু আমি জানি না আমার কথা কখনো তার মনে পড়ে কি না। আমার ছবি তার মন থেকে পুরোপুরি মুছে গিয়েছে কি না। মানুষ সুখে দুঃখে দুই ধরনের মানুষকে মনে করে। যারা তাদের প্রিয়জন আর যারা তাদের শত্রু। আমি অবশ্য এই দুই ক্যাটাগরিতে পড়ি বলে মনে হয় না। কিন্তু আমার জীবনে প্রিয়জন হিসেবে অনুভা ছিল,আছে এবং হয়তো ভবিষ্যতেও থাকবে। আমিও একদিন অনুভার জীবনে প্রিয়জন হিসেবেই ছিলাম। অন্তত সেই সময়ে আমার তাই মনে হতো। সময়ের সাথে সাথে সূর্য যেমন তার তেজ হারায়। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামলে সূর্য চোখের আড়ালে চলে যায় তেমনি আমাদের জীবন থেকেও অনেক মানুষ ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। এই হারানো আবার দুই রকম হতে পারে। যারা দুনিয়া থেকেই চিরতরে হারিয়ে যায় আর যারা দুনিয়াতে থেকেও হারিয়ে যায়।

অনুভার কথা মনে পড়লে আমার বার বার মনে পড়ে আটাশ এপ্রিলের কথা। এই দিন অনুভার জন্মদিন। একটা দীর্ঘ সময় এই দিনটি ছিল আমার জীবনের অন্যতম সুন্দর দিন। এক মাস আগে থেকে অনুভার জন্য নানা রকম উপহার কেনায় ব্যস্ত হয়ে উঠতাম। উপহারগুলো হয়তো সামান্যই ছিল কিন্তু তাতে ভালোবাসার কোনো কমতি ছিল না। অনুভাও সেটা খুব উপভোগ করতো। এখনও প্রতি বছর অনুভার জন্মদিন আসে আবার চলেও যায়। কিন্তু জানা হয় না আগের মত ওর জন্মদিন উদযাপন হয় কি না। অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরাতে থাকে অনুভা। পিএইচডি করতে গিয়েছে ওখানে। আমি অবশ্য ভাবতাম সে ইঞ্জিনিয়ারিং করবে অথবা চিকিৎসা বিদ্যায় উচ্চশিক্ষা নিবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় দেখলাম সে পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন নিয়ে পড়তে বেশি আগ্রহী।

  • মুকুল নিকেতন/পরিচয়
  • ভিকারুননিসা নুন স্কুল দ্বিতীয় দেখা
  • ঢাকায় ঘুরতে আসা ও অপেক্ষা
  • বিশ্বকাপ ক্রিকেটের টিকেট
  • জন্মদিনের কেক দেওয়া ও জন্মদিন পালন
  •  

নিশিকান্ত

নিশিকান্তর বাবা মারা গেছেন তিন বছর আগে। মারা যাবার সময় নিশিকান্ত কিংবা তার মায়ের জন্য বাবা কিছুই রেখে যাননি। ওর একজন দিদি আছেন। দুই ভাই বোনের মধ্যে দিদি বড়। দিদি থাকে গৌরীপুরে। বনেদী ঘরের ভাল একটা ছেলের সাথে তার বিয়ে দেয়া হয়েছে। ছেলেটির নাম রামকৃষ্ণ। রেলওয়েতে চাকরির সুবাদে নিশিকান্তর বড় দিদি বিভিন্ন যায়গা ঘুরতে পেরেছে। নিশিকান্ত নিজেও দিদির সাথে অনেক জায়গা গিয়েছে। একবারতো দিদির সাথে কক্সবাজার গিয়েছিল। কী বিশাল সমুদ্র সৈকত। ও শুনেছে এটাই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সমুদ্র সৈকত। ছোট্ট নিশিকান্ত সেবার সমুদ্র সৈকতে দাড়িয়ে দিদির কাছে প্রশ্ন করেছিল আচ্ছা দিদিভাই যতদূর চোখ যায় শুধু জল আর জল। জলের ওপারে আসলে কী আছে? কিছু কি আছে? দিদি ভাই তখন হেসে উত্তর দেয় নিশ্চই কিছু আছে। তুই বড় হয়ে কলম্বাসের মত গিয়ে আবিস্কার করিস ওপাশে কী আছে। দিদির কথা শুনে নিশিকান্তও হেসে ওঠে। সে স্কুলে দীপেন স্যারে মুখে শুনেছে কলম্বাস আমেরিকা আবিস্কার করেছিল। কলম্বাসের আগে কেউ জানতোই না সমুদ্রের ওপাশে আমেরিকা নামে একটা দেশ আছে। সেই সব কথা নিশিকান্তর বেশ মনে পড়ে।

বাবা দেহ ত্যাগের সময় নিশিকান্তের বয়স ছিল নয় বছর। বাবার সাথেও নিশিকান্তর ছিল দারুণ সব স্মৃতি। সে কখনো ভাবেনি এতো দ্রুত এতো অল্প বয়সে এভাবে বাবাকে হারাতে হবে। বাবার ভালোবাসা পুরোপুরি উপভোগ করার আগেই তিনি পরলোকগত হলেন। তারপর চোখের নিমিশে দিনগুলো যে কিভাবে কাটতে লাগলো তা ওর ধারণারও বাইরে। বাবা গত হয়েছেন তিন বছর সেই দিক থেকে নিশিকান্তর বর্তমান বয়স বার বছর। ময়মনসিংহের মুকুল নিকেতন স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেনীর ছাত্র সে। বাবা গত হওয়ার পর সম্বলহীন নিশিকান্ত আর তার মা মুশড়ে পড়ে। দিদি মাঝে মাঝে সামান্য কিছু টাকা পাঠায় তা দিয়ে সংসার চলে না। অবশ্য দিদিকেও দোষ দেওয়ার উপায় নেই। পরের সংসারে থাকে সে। সেখান থেকে মা আর ছোট ভাইয়ের জন্য যে কিছু টাকা পাঠাতে পারছে এটাইতো বিরাট ব্যাপার। ওইটুকুও যদি সে না দিতো তাহলে নিশিকান্তদের কিছু বলার থাকতো না।

ছোট্ট নিশিকান্ত সিদ্ধান্ত নেয় আর পড়ালেখা করবে না। পড়ালেখা ছেড়ে দিয়ে ছোট খাট কিছু একটা করবে যা দিয়ে তাদের সংসারটা বেচে যায়। বাবা বেচে থাকলে ওর জীবনটা নিশ্চই অন্যরকম হতে পারতো। যে স্বপ্ন সে দেখতো সেই স্বপ্ন সত্যি করতে পারতো। পড়াশোনা করে কত কিছু হতে পারতো। কিন্তু এখন আর সেটা ভেবে লাভ কী? যে নেই তাকে ঘিরে তো আর স্বপ্ন দেখা যাবে না। এখন যে কোনো ভাবেই হোক সংসারটা টিকিয়ে রাখতে হবে। সে যদি স্কুলে যায়,পড়াশোনা করে তাহলে একদিন নিশ্চই বড় কিছু হয়ে সংসারের হাল ধরতে পারবে। মাকে সুখী করতে পারবে। কিন্তু সেটাতো দীর্ঘ এক যাত্রা। সেই যাত্রাপথ পাড়ি দেওয়ার জন্য যে রসদ দরকার তা কোথা থেকে আসবে? ফলে তাকে কিছু না কিছু করতেই হবে। একেতো সে ছোট মানুষ তাই পড়াশোনা করার ফাঁকে ফাঁকে কিছু আয় রোজগার করার মত কোনো উপায় তার জানা নেই। আয় করতে হলে তাকে পড়াশোনা ছাড়তেই হবে। কিন্ত তার মা ভারতী দেবী কোনো ভাবেই ছেলের লেখাপড়া বন্ধ হোক এটা চান না।

সংসারে অভাব আর মায়ের হাড় খাটুনি দেখে বার বছরের ছেলেটার খুব খারাপ লাগে। মনমরা করে নদীর ধারে বসে থাকে। কে জানতো একদিন তার মাকেও অন্যের বাড়িতে কাজ করে সংসার চালাতে হবে। অথচ বাবা বেঁচে থাকতে কত সম্মান ছিল তাদের। নিজেদের জন্য ভাত তরকারি রান্না করা আর উঠোন ঝাড়ু দেওয়ার বাইরে নিজেদের কাপড় ধোয়া ছাড়া তেমন কোনো কাজই করা লাগতো না। যদিও বাবা ছোট্ট একটা চাকরি করতেন কিন্তু তিনজনের সংসার সেই টাকায় চলে যেতো। বাবার সাথে কাটানো সেই সব দিনের কথা মনে হলেই নিশিকান্তর মন খারাপ হয়ে যায়। তখন সে নদীর ধারে গিয়ে বসে থাকে। আকাশপাতাল ভাবে। পৌষের এক বিকেলে নিশিকান্ত হাটতে হাটতে ব্রহ্মপুত্র নদের ধারে শান বাঁধানো ঘাটে গিয়ে বসলো। তার দৃষ্টি অনেক দূরের নীল আকাশের দিকে। আকাশে তখন একঝাক বুনো পাখি উড়ে যাচ্ছে। কয়েকটা কবুতরও দেখা যাচ্ছে। হয়তো আশেপাশে কারো পোষা কবুতর হবে। কিছু খন্ড খন্ড মেঘ ভেসে ভেবে কোথাও চলে যাচ্ছে। দিনের বেলায় আকাশে কোনো তারা দেখা যায় না। যদি দেখা যেতো তবে সে হয়তো সেই তারার মাঝে তার বাবাকে খুজতো। মায়ের মুখ থেকে শুনেছে যারা পরলোকগত হয় তারা আকাশের তারা হয়ে যায়। ছোট বেলায় সে যখন মায়ের মুখে এরকম কথা শুনতো তখন প্রশ্ন করতো আচ্ছা মা সুকুমার জেঠুও কি তারা হয়ে গেছে? আমিও কি একদিন তারা হয়ে যাবো? মা তখন ওর মাথার চুলে বিলি কাটতে কাটতে বলতেন একদিন সবাই আকাশের তারা হয়ে যাবে।

নদীর পাড়ে বসে বসে বাবা থাকতে তার সুন্দর সময়ের কথা ভাবতে থাকে। সকাল থেকে কেবল একটা শুকনো রুটি খেয়ে সে সারাটা দিন কাটিয়ে দিয়েছে। মনটা তার ভাল নেই। মায়ের শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না। থেকে থেকে জ্বর আসছে কাপুনি দিয়ে। যে ঘরে ওরা থাকে সেটাতে টিনের ছাউনি দেওয়া। বহুবছরের পুরোনো সে ঘর। জায়গায় জায়গায় টিন ছিদ্র হয়ে গেছে। সেই ছিদ্র দিয়ে সুর্যের আলো ঢুকে পড়ে। রাতে চন্দ্রের আলোয় দেখা যায়। আর বৃষ্টির দিনে সেটা দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। সেই ঘরেই নিশিকান্ত আর তার মা থাকে। মায়ের অসুখ। মাকে ডাক্তার দেখানোর মত কোনো টাকা তার নেই। সেই সব চিন্তায় মনটা বিষিয়ে উঠেছে নিশিকান্ত নামের বার বছরের ছেলেটার।

রোজ বিকেলে নিশিকান্ত এই জায়গাটাতে বসে থাকে। এলোমেলো চিন্তা তার মাথায় সারাক্ষণ ঘুরপাক খেতে থাকে। এটা সেটা ভাবতে ভাবতে এক সময় সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। প্রতিদিনের মতো নিশিকান্ত সেদিনও বাড়ির পথে রওনা হয়। বাড়ি বলতে যা বুঝায় এটা তা নয়। জিলাস্কুলের পশ্চিম পার্শ্বের যে একতলা ছিমছাম বাড়িটা আছে ওদিকে তাকালেই ওর ভীষণ কষ্ট হয়। ঐ বাড়িটা ওর ভীষণ চেনা। বড় মায়া লাগে বাড়িটার দিকে তাকালেই। ঐ পথ দিয়ে যাওয়ার সময় নিশিকান্তের চোখ ছলছল করে ওঠে।  বিশেষ করে ওর বন্ধু নাফিস তিহামী যখন দরজায় দাঁড়িয়ে ওকে ভেতরে আসতে বলে তখন। একদিন ওই বাড়িতে নিশিকান্ত ওর বাবা মাকে নিয়ে কতইনা আনন্দে থাকতো। বাড়িটা নিশিকান্তর বাবার তৈরি। হঠাৎ একটা ঝড়ে সব কেমন এলোমেলো হয়ে গেল। নিশিকান্তর বাবার ভীষণ অসুখ করলো। প্রথমে ময়মনসিংহ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। কিন্তু চিকিৎসার পরও কোনো উন্নতি না হলে ডাক্তাররা বলেন ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যেতে। ঢাকায় তখন নিশিকান্তদের পরিচিত কেউ নেই। কিছুদিন হলো দিদির বিয়ে হয়েছে। সেখানেও অনেক খরচ হয়ে গিয়েছে। জমানো টাকা বলতে এখন আর কিছুই নেই। ঢাকা মেডিকেলে ভর্তির পর প্রায় এক সপ্তাহ কেটে গেলো। ডাক্তাররা তেমন কোনো আশা দেখালেন না। তারা বললেন আপনারা একবার চাইলে ইন্ডিয়াতে নিয়ে যেতে পারেন। দেশেই চিকিৎসা করানোর মত সামর্থ্য ছিল না তাদের সেখানে বিদেশে নেওয়া,ভিসা পাসপোর্ট করা কত ঝক্কি ঝামেলার কাজ। কিন্তু যে করোই হোক লোকটাকে বাঁচানো দরকার। কোলকাতাতে তার এক জেঠু থাকতো। তার সাথে টেলিফোনে কথা বললো। তিনি জানালেন মাদ্রাজে ভালো চিকিৎসা হয়। গেলে তিনি সময় দিতে পারবেন। এরপর সিদ্ধান্ত হলো মাদ্রাজে নিয়ে যাবেন।  চিকিৎসার টাকা জোগাড় করতে একে একে সব বিক্রি করতে হলো। শেষ সম্বল মাথা গোজার ঠাই বাড়িটাও বিক্রি করে দিতে হলো। তবে নিশিকান্তদের ভাগ্য সহায় হলো না। মাদ্রাজে প্রায় এক মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর বাবা পরলোক গমন করলেন। আর্থিক অবস্থা এতোটাই করুণ ছিল যে বাবার মরদেহ দেশে এনে দাহ করার সুযোগ হলো না। জেঠুদের ওখানেই একটা শ্মশানে নিয়ে দাহ করা হলো। নিশিকান্তর দিদি শেষ বারের মত বাবার মুখদর্শন থেকে বঞ্চিত হলো। কেননা সেবার মা আর নিশিকান্তই গিয়েছিল বাবার সাথে। এছাড়াও বিদেশে একজন বড় মানুষ দরকার ছিল বলে জামাইবাবুও সাথে গিয়েছিলেন। বাবার চিকিৎসা করতে গিয়ে নিজেদের বাড়িটাও বিক্রি করতে হয়েছিল।

সেই বাড়িটা এখন নাফিস তিহামীদের। পররাষ্ট্রমন্ত্রনালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা তিহামীর বাবা। সাড়ে আট লাখ টাকার বিনিময়ে তিনি বাড়িটা কিনে নিয়েছিলেন। এখন তিহামীরা ঐ বাড়িতে থাকে। ছোট্ট তিহামী ওর এই বন্ধু নিশিকান্তর দুঃখ বোঝে। অগচোরে চোখের দু ফোটা জলও ফেলে। কিন্তু ওর জন্য সে কিছুই করতে পারে না । একদিন কত আনন্দ ছিল নিশিকান্ত নামের বার বছরের এই দুঃখি ছেলেটার মনে। তিহামীর সাথে এখানে সেখানে ঘুরে বেড়াতো। আনন্দ করতো। আর আজ সে একা ঘরহীন, চাল চুলাহীন পথের মানুষ। তিহামী যদিও তাকে সেই আগের মতই বন্ধু মনে করে কিন্তু নিশিকান্ত নিজে ওর কাছ থেকে সব সময় দূরে দূরে থাকার চেষ্টা করে। নিজেকে আর অন্যের দয়ার পাত্র হিসেবে দেখতে তার ভালো লাগে না। যদিও তিহামী কখনো তাকে দয়ার পাত্র মনে করে না। কিন্তু নিশিকান্ত নিজ থেকেই আত্মমর্যাদা ঠিক রাখতে এটা করে।

সন্ধ্যার অন্ধকার ক্রমেই ঘনিয়ে আসছে দেখে নিশিকান্ত দ্রুত পা চালায় বাড়ির দিকে। রোগাগ্রস্থ মা একা বাড়িতে পড়ে আছে। ওর ইচ্ছে হয় মায়ের জন্য কিছু একটা করতে কিন্তু কিছুই করতে পারে না। অন্ধকারে হাটতে হাটতে নিশিকান্ত অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কিন্তু পুরোনো বাড়িটার কাছে আসলেই তার পা আর চলতে চায় না। তার পরও আজ সে সব চিন্তা ভুলে গিয়ে দ্রুত পা চালাতে থাকে। পাকা রাস্তার মোড়েই ওদের পুরোনো সেই বাড়িটা। অবশ্য এখন আর ওদরে বাড়ি বলার সুযোগ নেই। বাড়িটাতো আর এখন ওদের নেই। রাস্তাটা ব্রহ্মপুত্র নদের তীর ঘেষে জামালপুর চলে গেছে। নিশিকান্ত সেই অন্ধকারে ঐ পথে একা একা হাটছিল। দূরপাল্লার গাড়িগুলি তখন মাঝে মাঝেই ভেপু বাজিয়ে চোখের সামনে হাজির হয়ে আবার মুহুর্তেই মিলিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ নিশিকান্ত লক্ষ্য করলো একজন বৃদ্ধা মহিলা রাস্তা পার হচ্ছেন। কিন্তু তিনি রাস্তা পার হচ্ছেন খুব ধীর গতিতে। দেখে মনে হচ্ছিল বৃদ্ধা লোকটি দৃষ্টিহীন।

নিশিকান্ত দাড়িয়ে দাড়িয়ে কিছুক্ষণ লক্ষ্য করলো। ঠিক তাই। বৃদ্ধার হাতে একটা সাদা রঙের লাঠি এবং সে সেই লাঠি মাটিতে ছুইয়ে ছুইয়ে রাস্তা পার হচ্ছেন। নিশিকান্ত জানতো সাদা ছড়ি অন্ধদের প্রতীক। তাই বৃদ্ধার হাতের লাঠি দেখে সে নিশ্চিত হলো বৃ্দ্ধা লোকটি চোখে দেখে না। ঠিক এমন সময় একটা ট্রাক পিছন দিক থেকে ছুটে আসলো । কিছু বুঝে ওঠার আগেই ট্রাকটি বৃদ্ধা মহিলাকে চাপা দিয়ে চোখের সামনে দূরে মিলিয়ে গেল।নিশিকান্তর চোখের সামনে দুর্ঘটনাটা ঘটলো এবং সে প্রায় বাকরুদ্ধ হয়ে দেখলো মর্মান্তিক ঘটনাটা। ঐ মুহুর্তে তার কি করা উচিৎ তা সে বুঝতে পারছিননা। বার বছর বয়স্ক একটা বাচ্চা ছেলে সন্ধ্যার অন্ধকারে প্রায় জনহীন এই রাস্তায় চোখের সামনে একটা বিভৎস দৃশ্য দেখার পর স্বভাবতই জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাবার কথা কিন্তু নিশিকান্তের বেলায় তা ঘটলো না। জীবনের রুঢ় বাস্তবতার সাথে সংগ্রাম করতে করতে সে ভীষণ সাহসী হয়ে উঠেছে। এই সব দুর্ঘটনা তাই তার কাছে এখ তুচ্ছ বলেই মনে হয়। বার বছরের নিশিকান্ত পুর্নবয়স্ক মানুষের মত এই মাত্র দুর্ঘটনায় পতিত বৃদ্ধা মহিলার ক্ষতবিক্ষত দেহের পাশে গিয়ে দাড়ায়। সারা রাস্তা বৃদ্ধার রক্তে ভেসে গেছে।

বৃদ্ধা তখনো মারা যায়নি| বিড়বিড় করে মুখে কি যেন বলছিল| নিশিকান্ত কান পেতে কথা গুলো শোনার চেষ্টা করলো এবং বুঝতে চেষ্টা করলো বৃদ্ধা মহিলা মুখে কি বলছে কিন্তু লাভ হলনা একটুও| বৃদ্ধার কথাগুলো ছিল জড়ানো জড়ানো| শুধু মাত্র তিনটি শব্দ নিশিকান্ত বুঝতে পেরেছিল যেগুলি ছিল জামি জিমি জুনা| কথাগুলোর আগা মাথা কিছুই নিশিকান্তের মাথায় ঢুকছিলনা| নিশিকান্ত যা ভেবেছিল ঠিক তাই|  সে দেখলো মহিলাটি ঠিকই অন্ধ কিন্তু হঠাৎ সে লক্ষ্য করলো যে বৃদ্ধা মহিলার কপালের ঠিক মাঝখানে গোল একটা ছিদ্র| সাধারণত গুলি লেগে যেভাবে ছিদ্র তৈরী হয় অনেকটা সেরকম| কিন্তু নিশিকান্ত বুঝতে পারে না মহিলার কপালে এরকম ছিদ্র কোথা থেকে আসলো| একটা ট্রাকে মহিলাটিকে চাপা দিয়েছে সেখানে ছিদ্র হওয়ারতো কোন কথাই নয়| নিশিকান্ত ততক্ষণে ভুলে গেল বাড়ী যাওয়ার কথা| ভুলে গেল যে তার মা অসুস্থ হয়ে বিছানাতে কাতরাচ্ছে| তার মনের মধ্যে কেবল ঘুরপাক খাচ্ছে ঐ একটি ব্যাপার ,কেন মহিলার কপালের মাঝখানে অমন একটা ছিদ্র| ইচ্ছে হচ্ছে এখনই তিহামীকে ডেকে এনে ব্যাপারটা দেখাতে কিন্তু এখনতো সেটাও সম্ভব নয়| নিশিকান্ত ক্ষতবিক্ষত মহিলাটির উপর অনেকটা ঝুঁকে পড়লো| মাথাটা নিচু করে বৃদ্ধা মহিলার কপালের ছিদ্রটির দিকে তাকালো এবং সাথে সাথে তার মাথার ভিতর ঘুরপাক খেতে শুরু করলো|  বৃদ্ধার কপালের ছিদ্র থেকে হালকা সোনালী আলো বেরিয়ে আসছে| কেন আসছে কোথা থেকে আসছে তার কিছুই জানে না নিশিকান্ত| তার মাথা কেবল ঘুরছে আর ঘুরছে| সারা পৃথিবীটাই তার কাছে কেমন ঘুরপাক খাচ্ছে| চারিদিকে ভীষণ নিস্তব্ধ| হঠাৎ নিশিকান্ত সম্বিত ফিরে পেল এবং খেয়াল করলো চারিদিকে কোথাও কোনো আলো নেই| রাস্তায় যে ট্রাকগুলো হেডলাইট জ্বালিয়ে ছুটে যাচ্ছিল এখন সেগুলোরও দেখা নেই| তাহলে কি অনেক রাত পর্যন্ত সে এখানে বসে আছে? নাকি অন্য কোনো কারণ? অন্ধকারে কোথাও কিছু দেখা যাচ্ছে না| কেমন যেন একটা ভূতুড়ে পরিবেশ বিরাজ করছে| গভীর অন্ধকারে বার বছরের একটা বালক ক্ষত বিক্ষত একটা লাশ সামনে করে বসে আছে এটা ভয়ংকর একটা দৃশ্য|হিসাব কষে দেখা যায় আজ পূর্ণিমা তিথী| কিন্তু আকাশের কোথাও চাঁদের ছিটে ফোটাও নেই| একটা তারা নেই,কোথাও কোনো পাখিদের ডাক নেই। এমনকি ঝিঝিরা পর্যন্ত আজ কেন যেন ডাকতে ভুলে গিয়ে নিশ্চুপ হয়ে আছে| এটা মনে হচ্ছে পাতালপুরী| নিশিকান্ত কিছুই বুঝে উঠতে পারে না কি এর রহস্য| কোন দিক থেকে কোন দিকে সময় গড়িয়ে যাচ্ছে তা তার ধারনার বাইরে| চারিদিকে কোনো আলো না থাকলেও ক্ষত বিক্ষত বৃদ্ধার কপালের ছিদ্র দিয়ে সোনালী আলোটা ঠিকই বেরিয়ে এসে আশপাশ আলোকিত করে রেখেছে| সেই আলো অদ্ভুত রকমের ,মায়াবী জগতের মত থমথমে ভাব বিরাজ করছে| অন্য সময় হলে নিশিকান্ত ভয়ে চিৎকার করে উঠতো কিন্তু আজ তার মধ্যে কোনো ভয়ই কাজ করছে না| ভয় বলতে যে কোনো শব্দ আছে তা আজ তার কাছে অপরিচিত মনে হচ্ছে|

বিজ্ঞান বলে অধিক ভয়ের কোনো কারণ ঘটলে মানুষ ভীষণ সাহসী হয়ে ওঠে| কারণ প্রচুর পরিমান ভয়ের কোনো কারণ ঘটলে মানুষের রক্তে এড্রেনালিন নামক এক প্রকার এনজাইম প্রচুর পরিমানে বৃদ্ধি পায় এবং যার ফলে সমস্ত ভয় কেটে যায়| নিশিকান্তের বেলায়ও আজ তাই ঘটেছে| বৃদ্ধার কপালের ছিদ্র দিয়ে আরেকবার তাকালো নিশিকান্ত এবং আবারও তার মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠলো| কিন্তু এবার সে একটু হলেও কিছু একটা দৃশ্য দেখতে পেল| ছিদ্রটা যেন সীমাহীন অতল গভীর| সেই গভীরে গোটা পৃথিবীটাই হারিয়ে যেতে পারে এবং কৃষ্ণগহ্বর বলতে যে জিনিসটির কথা শোনা যায় এটা অনেকটা তারই মতো| সেই ছিদ্রটার ভিতরে যা কিছু দেখলো তা অবাস্তব| ভিতরে সুন্দর একটা বাগান,যেখানে অনেক ছেলে মেয়ে খেলা করছে,গাছে গাছে ফুল পাখিদের কলরব| একটা অর্ধ্ব মৃত মানুষের মাথায় একটা ছিদ্র সেই ছিদ্র দিয়ে এসব দেখা যাচ্ছে সেটা কাউকে বললে নিশ্চই সবাই তাকে পাগল বলে অভিহিত করবে| সেটা নিশিকান্তের নিজেরই বিশ্বাস হচ্ছিল না| নাহ সে নিশ্চই ভুল দেখেছে এবং হাত দিয়ে চোখটা মুছে নিয়ে  আবার সে বৃদ্ধার কপালের সেই অদ্ভুত ছিদ্র দিয়ে ভিতের তাকালো| এবার দৃশ্যটা পাল্টে গেছে| এবার সে দেখলো অন্য চিত্র একটা বড় রুমের মধ্যে অনেক গুলো মানুষকে হাত পা বেঁধে ফেলে রাখা হয়েছে| হাতপা বাঁধা লোকগুলো হাত পা ছুঁড়ে পালাবার অহেতূক চেষ্টা করছে কিন্ত কোনো কাজ হচ্ছে না| দু’জন লোক হাতে জ্বলন্ত আগুনের মশাল নিয়ে মাঝে মাঝেই হাত পা বাঁধা লোকগুলোর গায়ে স্পর্শ করছে আর সাথে সাথে লোকগুলি বেদনায় গগন বিদারী চিৎকার করে উঠছে|

দৃশ্যটা দেখে নিশিকান্ত দুই হাতে চোখ বন্ধ করে ফেললো| সে অমন ভয়ানক দৃশ্য দেখতে রাজি নয়| কিছুক্ষণ পর সে চোখের উপর থেকে হাতটা সরিয়ে নিলো এবং অবাক হয়ে দেখলো কিছুক্ষণ আগের সেই ভয়াল দৃশ্য পরিবর্তন হয়ে ভিন্ন একটা দৃশ্য এসে হাজির হয়েছে| একটা মানুষ তার সমস্ত শক্তি দিয়ে রাস্তার উপর পড়ে থাকা একটা গাছের গুড়িকে সরাতে চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না| লোকটা ঘেমে সারা শরীর ভিজে গেছে|  একেক সময় একেক দৃশ্য নিশিকান্তের চোখের সামনে ভসে উঠছে|  হঠাৎ সে হালকা আলোর ভিতরে দেখতে পেল বৃদ্ধা মহিলার সমস্ত শরীর কেঁপে উঠছে| হয়তো মুহূর্তের মধ্যেই বৃদ্ধা মহিলা মারা যাবে| তার খুব মায়া হলো যদি মহিলাকে সে হাসপাতালে নিয়ে যেতে পারতো কিন্তু তার মতো ছোট্ট ছেলের পক্ষে এমন একজন মহিলাকে বয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়| এসব চিন্তা করতে করতে নিশিকান্ত মহিলার মুখের দিকে তাকালো আর সবেচেয়ে ভয়ানক দৃশ্য দেখলো তখন| বৃদ্ধা মহিলার মুখটা ক্রমে ক্রমে খুলে যাচ্ছে ,হা হয়ে যাচ্ছে আর ভিতর থেকে হালকা নীল আলো বেরিয়ে আসছে বাইরে| নিশিকান্ত কোনো দিন এমন দৃশ্য দেখেনি| রক্তমাংসে গড়া একটা মানুষের মুখের ভিতর থেকে কখনো আলোকরশ্মি বেরিয়ে আসার কথা নয়| সে যতদূর জানে তাতে এটা অসম্ভব| এই মুহূর্তে তার স্নিগ্ধ-মুগ্ধর কথা মনে পড়ছে| স্নিগ্ধ-মুগ্ধ জমজ দুই ভাই জিলাস্কুলের ভীষণ ভাল ছাত্র| ওদের কাছে মানুষের দেহতত্ত্ব নিয়ে অনেক আলোচনা শুনেছে নিশিকান্ত| রফিকুল ইসলাম স্যার নিজেও ওদের ক্লাসে এ নিয়ে অনেক কথা বলেছেন কিন্তু কখনো এমন অদ্ভুত কথা শোনেনি যা আজ সে নিজ চোখে দেখছে| মুখে শুনলে হয়তো বিশ্বাস হতো না কিন্তু নিজ চোখে দেখার পর সেটাকে অবিশ্বাসের উপায় নেই| মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল সব বুঝি মনের কল্পনা কিন্তু গায়ে চিমটি কেটে দেখেছে যে সে স্বপ্ন দেখছে না|

নিশিকান্ত যখন এসব কথা ভাবছিল ঠিক তখনই শরীরে গরম বাতাসের একটা চাপ অনুভব করলো| হঠাৎ করে গরম বাতাস বইছে কেন সেটাও এক প্রকারের রহস্য| শীত কাল তার পরও এমন গরম বাতাস আসার কোনো কথাই নয়| প্রচন্ড শীতের মাঝেও সে ঘেমে নেয়ে যাচ্ছে| ইচ্ছে হচ্ছে গায়ের জামাটা খুলে বাতাস করতে| ওদিকে বৃদ্ধা মহিলা তখনো অস্ফুট স্বরে বিভিন্ন কথা বলছিল| যার মধ্যে মাত্র ঐ তিনটা শব্দই নিশিকান্ত বুঝতে পারছিল| কিন্তু কথাগুলোর অর্থ কি তা সে মিলাতে পারছিল না| নিশিকান্ত আবার মহিলার মুখের দিকে তাকালো| এতক্ষণ মুখ থেকে হালকা নীল আলো বের হচ্ছিল এখন সেটা হলুদ হয়ে গেছে এবং সেই হা করা মুখ থেকে বেরিয়ে আসা হলুদ আলোর ভিতর থেকে নিশিকান্ত দেখলো একটা লিকলিকে সাপ একে বেঁকে বেরিয়ে আসছে| নিশিকান্ত এবার ভড়কে গিয়ে লাফিয়ে দু হাত পিছিয়ে গেল|  সাপটার গায়ের রং সোনালী তার ওপর বাদামী রঙের ডোরাকাটা| হাতের কাছে এই মুহূর্তে নিশিকান্ত কিছু একটা খুঁজছিল যা দিয়ে সাপটাকে সে আক্রমন করতে পারবে কিন্তু হাতড়িয়ে হাতড়িয়ে তেমন কিছুই পেল না| তার হাতটা অন্ধকারের মাঝেই পিছনদিকে ঘুরিয়ে একটা লাঠি খুঁজলো এবং শক্তমতো কিছু একটা তার হাতে বাঁধলো| সে সেটাকে আকড়ে ধরে সামনে আনলো| মুখ থেকে বেরিয়ে আসা সাপটা তখন বালক নিশিকান্তের সামনে দু হাত দূরে গিয়ে ফনা তুলে দাঁড়ালো| নিশিকান্ত অবাক হয়ে দেখলো সাপটার বুকে ঠিক যেখানে ফনা তুলেছে সেখানটাতে ঐ তিনটি শব্দ লেখা | এসবের কিছুই নিশিকান্তের মাথায় ঢুকছিলনা| সে শক্ত  মত যে জিনিষটা কুড়িয়ে নিয়েছিল সেটা উঁচু করে তুলে ধরলো যেন সাপটা আক্রমন করতে আসলে সেও আক্রমন করতে পারে| ফনাতুলে দাঁড়িয়ে থাকা সাপটার ভিতরে আক্রমন করার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না|

নিশিকান্ত একটু ভাল করে লক্ষ্য করে দেখলো ফণা তুলে তার সামনে যে সাপটা দাঁড়িয়ে আছে তার মুখটা অবিকল মানুষের মত| নিশিকান্ত অবাক হয়ে একপলকে তাকিয়ে থাকলো| ঠিক সেই সময়ে সাপের চোখের সাথে নিশিকান্তের চোখাচোখি হল| একটা মায়াবি আলোকরশ্মি নিশিকান্তের চোখে এসে লাগলো| নিশিকান্তের চোখটা ঘুমে বন্ধ হয়ে আসতে চাইলো| কিন্তু জোর করে সে চোখটা খুলে রাখলো| কিছুক্ষণের মধ্যেই তার সারা শরীরে প্রশান্তি নেমে আসলো এবং সামনে থেকে সাপটা একে বেকে অন্ধকারে হারিয়ে গেল| সাপটা যেহেতু চলে গেছে তাই হাতে ধরে রাখা শক্ত জিনিষটার আর কোনো দরকার নেই ভেবে ওটা ফেলে দিতে যাবে এমন সময় সে লক্ষ্য করলো যে তার হাতে ধরে রাখা জিনিষটা আসলে শক্ত নয় বরং ঠান্ডা এবং ভীষণ নরম| নিশিকান্ত ভাবলো শীতের কারণে হয়তো ঠান্ডা হয়ে গেছে| কিন্তু নরম হওয়ারতো কোনো কারণ নেই| ধরে রাখা জিনিষটি এবার সে চোখের সামনে এনে মেলে ধরলো| ভয়ে এই প্রথম নিশিকান্ত কুকড়ে গেল|  সে শক্ত লাঠি মনে করে এতক্ষণ যা ধরে রেখেছিল সেটা আসলে আরেকটা সাপ| সে দ্রুত হাত থেকে সাপটিকে দূরে ছুড়ে ফেলে দিল| এতক্ষণ কোনো ভয় না লাগলেও এখন তার একটু একটু ভয় লাগছে| সব চিন্তা বাদ দিয়ে সে আবার মহিলাটির দিকে ফিরে তাকালো| আহত মহিলাটি নড়াচড়া করছে| নিশিকান্ত মহিলাটির আরো নিকটে গিয়ে বসলো| তার মনে হল মহিলাটিকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া উচিত| কিন্তু কিভাবে নেবে সে সেটা ভাবতে পারছিল না| ঠিক এমন সময় ঘোড়ার পায়ের আওয়াজ তার কানে ভেসে আসলো| হ্যা একটি নয় পর পর চারটি ঘোড়ার পায়ের আওয়াজ| এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই তার সামনে চারটি ঘোড়ার একটি টমটম গাড়ি এসে থামলো| সব কিছু ভুলে গিয়ে নিশিকান্ত টমটম ওয়ালার কাছে গিয়ে সাহায্য প্রার্থনা করলো যেন সে মহিলাটিকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে সাহায্য করে|

টমটম ওয়ালা তাকে সাহায্য করতে রাজি হল কিন্তু সে ছিল দুই পাহীন এক টমটম চালক| কোনো একদিন রেললাইন ধরে হাটার সময় রেলে তার দুই পা কাঁটা পড়েছিল| তাই সে গাড়ি থেকে নেমে হতাহত মহিলাটিকে টেনে তুলতে পারবে না| এখন নিশিকান্তকেই টেনে টেনে তুলতে হবে| ছোট্ট নিশিকান্ত উপায়হীন হয়ে ভাবনাহীন ভাবে বৃদ্ধা মহিলার হাত ধরে আস্তে করে টান দিল| সাথে সাথে সে অবাক হয়ে দেখলো বৃদ্ধা মহিলাটিকে তার ভীষণ হালকা মনে হচ্ছে| সে অনায়াসেই বলতে গেলে এক হাতে বৃদ্ধা মহিলাকে উঁচু করে টমটম গাড়িতে নিয়ে বসলো| টমটম ওয়ালা হইহই করে ঘোড়া চালিয়ে দিলেন | আর ঠকঠক ঠক ঠক শব্দ করে চার ঘোড়ার টমটম এগিয়ে চললো| কিছুক্ষণের ভিতরেই তারা সদর হাসপাতালের গেটে হাজির হলো| নিশিকান্ত আগের মতোই বৃদ্ধা মহিলাকে প্রায় এক হাতে উচু করে গাড়ি থেকে নামিয়ে নিল এবং তার কাছে যে কোনো ভাড়া নেই সেটাও সে টমটম ওয়ালাকে জানালো| টমটম ওয়ালা কিছুই বললো না। শুধু মঙ্গল কামনা করে চলে গেল| নিশিকান্ত ক্ষতবিক্ষত মহিলাকে নিয়ে সদর হাসপাতালের দরজার সামনে দাঁড়ালো| আস্তে করে সিঁড়ির ওপরে বৃদ্ধা মহিলাকে শুইয়ে দিয়ে দরজায় নক করলো| ভিতরে কোনো সাড়াশব্দ নেই| কিন্তু এমনতো হবার কথা নয়| রাত যতই হোক না কেন হাসপাতালে নার্স,ডাক্তারেরা জেগে থাকার কথা| এর আগেও বাবা মার সাথে দিদিকে নিয়ে সে অনেক রাতেও হাসপাতালে এসেছে। তখনতো দরজায় নক করতেও হয়নি|  আবার নক করলো নিশিকান্ত কিন্তু এভাবে অনেক বার নক করেও কোনো ফল হল না| বেদনায় মুশড়ে পড়লো নিশিকান্ত নামের বার বছরের ছেলেটা| তার ধারনা ছিল এখনো যদি ডাক্তার দেখানো যেত  তাহলে এই মহিলা বেঁচে যেতে পারতো| কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও কোনো লাভ হল না| রাজ্যের ঘুম নিশিকান্তের চোখে নেমে আসলো| বৃদ্ধা মহিলার পাশেই ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে গেল নিশিকান্ত|

 অনেক বেলা অব্দি নিশিকান্ত ঘুমে বিভোর থাকলো| ঘুমের মাঝে বার বার তার মায়ের মুখটা ভেসে উঠছিল| সকালে কিছু মানুষের কোলাহলে নিশিকান্তের ঘুম ভাংলো| নিশিকান্ত দেখলো অনেক মানুষের ভীড়| কিন্তু সে কিছুতেই বুঝতে পারলো না যে ঠিক এই স্থানে সে কেমন করে কখন আসলো| সে রাতে একজন বৃদ্ধা হতাহত  ক্ষত বিক্ষত মহিলাকে টমটম গাড়িতে করে সদর হাসপাতালে এসছিল| হাসপাতালের সিঁড়িতে বৃদ্ধা মহিলাকে রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল আর এখন ঘুম থেকে জেগে উঠে দেখছে সে অচেনা একটা জায়গাতে শুয়ে আছে| সেই বৃদ্ধা মহিলাটির নাম গন্ধটিও নেই| অনেক  মানুষের ভীড়ে সে  কোনো পরিচিত মুখ খুঁজে পাচ্ছিল না যাকে সে জিজ্ঞেস করবে সে আসলে এখানে আসলো কিভাবে? হঠাৎ অনেক মানুষের ভীড়ে সে একজন চেনা মানুষ দেখতে পেল| তার সমবয়সী একটা ছেলে পরনে থ্রিকোয়ার্টার প্যান্ট গায়ে নীল রঙের শার্ট| যে ছেলেটি তার খুব কাছের খুব প্রিয় বন্ধু নাফিস তিহামী তিহাম| তিহামকে দেখে সে দৌঁড়ে মানুষের ভীড়ে ঢুকে গেল| পিছন থেকে তিহামের কাঁধে হাত রাখতেই তিহাম চমকে ফিরে তাকালো| নিশিকান্তকে দেখে সে হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো| ওর কান্না দেখে জনসমুদ্র নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে গেল| নিশিকান্ত বুঝতে পারল না এতে কাঁদার কি আছে|  সে ওকে শান্তনা দিয়ে কি হয়েছে জানতে চাইলো| ততক্ষণে নিমিকান্ত আর তিহামীর পাশে অনেকেই এসে দাঁড়িয়েছে যারা নিশিকান্তের ভীষণ পরিচিত|

বড় জেঠু,দিদি,দিদা,কাকিমা,ঠাকুরমা সবাই এসেছে| তাদের দেখে নিশিকান্ত চমকে গেল| তিহামীর কান্না ততক্ষণে থেমে গেছে| নিশিকান্ত ঠাকুর মাকে জিজ্ঞেস করলো ঠাকুর মা কি হয়েছে? তোমরা সবাই এখানে কেন? ঠাকুরমা ওকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলে বললো ওরে হতভাগা তুই আজ তিনদিন কোথায় ছিলি? ঠাকুর মার মুখে তিনদিন শব্দটি শুনে চমকে উঠলো নিশিকান্ত| তার কাছে সব কিছু ঘোরের মতো লাগছিল| সে তো গতকাল বিকেলে নদীর ধারে এসে বসেছিল | আসার সময়ও ঠাকুর মার সাথে দেখা হয়েছিল আর সেই ঠাকুরমাই কিনা এখন বলছে তিনদিন কোথায় ছিলি| নিশিকান্ত গলার স্বর নামিয়ে বললো নাতো  ঠাকুরমা আমিতো গতকাল…………………বলতে গিয়ে থেমে গেল| তার চোখটা তখন দূরে একটা খাটিয়ার ওপর নিবদ্ধ হল| সাদা কাপড়ে জাড়ানো কোনো একজন শুয়ে আছে| সেখান থেকে ভেসে আসছে কর্পুরের গন্ধ| বুকের ওপর কয়েক গোছা গাদা ফুলের সদ্য গাথা মালা| উপস্থিত সবার চোখে বাধ ভাঙ্গা জল| দিদিটা একটু দূরে বুক চাপড়ে কাঁদছে| এমন কান্না শুধু একবারই দিদিকে কাঁদতে দেখেছিল নিশিকান্ত তার বাবা মারা যাবার পর বাড়ি ফিরে আসার পর |  আবার আজকে সেই একই রকম বুক ফাটানো কান্নায় দিদি হাহুতাশ করছে| নিশিকান্ত বুকের মাঝে শুন্যতা অনুভব করলো| তারও চোখ বেয়ে অশ্রু গাড়তে শুরু করলো| কোথায় যেন কিছু একটা অতি আপন কিছু হারিয়ে ফেলার তীব্র বেদনা মনের অজান্তেই ভর করলো ছোট্ট নিশিকান্তের বুকে|

চার পাশে দাঁড়ানো ছোট বড় সবার চোখে জল মুখে মৃত্যুপুরীর নিরবতা বিরাজ করছিল| কারো মুখে কোন কথা নেই দেখে নিশিকান্ত উঠে দাড়ায়| দিকবিদিক জ্ঞানশুন্য হয়ে ছুটে যায় খাটিয়াতে শোয়ানো সাদা কাপড়ে ঢাকা মানুষটার কাছে| সেই মায়া ভরা হাসি এখনো মুখে লেগে আছে| যে মুখে সে হাজার বার চুমু খেয়েছে| যে দুটি হাত দেহের দুই পাশে নিস্তব্ধ হয়ে  পড়ে আছে এই হাত দুটি কত বার নিশিকান্তের মাথায় বুলিয়ে দিয়েছে,আদর করে এই দুটি হাত দিয়ে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরেছে আজ চোখের সামনে সেই হাত দেহের পাশে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে আছে| কিছুক্ষণ পর যে মানুষটাকে চিতার আগুনে পোড়ানো হবে সেই মানুষটি নিশিকান্তের মা| নিশিকান্তের বুক ফেটে কান্না আসছে কিন্তু সেই কান্নার শব্দ মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসছেনা| জ্বর অবস্থায় সে তার মাকে একলা ফেলে রেখে চলে এসেছিল আর সেই মা অসহায় ভাবে যন্ত্রনায় কাতরাতে কাতরাতে চলে গেল| যাবার আগে হয়তো তার খুব ইচ্ছে ছিল নিশিকান্তের হাতেএকটু জল খাবে ,ওর সাথে দুচারটে কথা বলবে কিন্তু নিশিকান্তকে সে কাছে পায়নি| নিশিকান্তের বুকটা ক্রমশ ফেটে যেতে চাচ্ছে| তার মা আর নেই একথা সে আর ভাবতে পারছেনা| নিশিকান্ত তার কোমল দুটি হাত তার মায়ের মুখে ছোয়াল| কী কোমল সেই অনুভূতি| ওর মনে হচ্ছিল মা চলে যায়নি শুধু কিছুটা ক্লান্ত হয়ে ঘুমচ্ছে| আর ও ডাকারসাথেই ওর মা উঠে বসবে| পুরোহিত ওকে বার বার তাগাদা দিচ্ছে মায়ের সৎকার এবং মুখাগ্নি করার জন্য কিন্তু নিশিকান্ত উঠছেনা| সে বাধভাঙ্গা আবেগে মায়ের চোখের পাতাদুটো সরিয়ে দিলো|এইতো তার মা তার দিকে ঠিকই তাকিয়ে আছে| মায়ের লাশের সামনে বারবছরের নিশিকান্তের বাধ ভাঙ্গা আকুলি বিকুলি দেখে পুরো এলাকা নিস্তব্ধ হয়ে গেল| সবাই চোখের জলে ভাসতে লাগলো| সেই চোখে সবকিছু ঝাপসা মনের হল| ঠিক এরই মাঝে দৃশ্যপট পরিবর্তন হতে শুরু করলো তা অন্য কেউ খেয়াল করেনি কেবল তিহামী ছাড়া| কিন্তু কেন এমন হচ্ছে তা তিহামীও বুঝতে পারলোনা| মায়ের বন্ধ চোখের পাতা সরাতেই চোখে চোখে কথা হল নিশিকান্তের | নিজের অজান্তেই নিশিকান্তের চোখ থেকে হালকা একটা সোনালী আলোকরশ্মি মায়ের চোখে গিয়ে মিশলো| ব্যাপারটা না দেখলো নিশিকান্ত না দেখলো তিহামী বা অন্য কেউ| নিশিকান্ত কেদে কেদে চোখ ফুলিয়ে উঠে দাড়ালো| পুরোহিতকে বললো চলুন ঠাকুর|  ওর কথাটা ঠাকুরের কান পর্যন্ত পৌছালনা  এমনকি অন্য কারো কানেও নয়| সবাই তখন নিস্পলক চেয়ে আছে এক অতি আশ্চর্য ঘটনার দিকে| নিশিকান্ত  শুধু অন্যদের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে| পিছনে আস্তে করে নড়ে চড়ে উঠে বসেছে তার প্রানাধিক প্রিয় মা| সবাই তখন বিস্ময়ে হতবাক| ডাক্তার বলেছে নিশিকান্তের মায়ের দেহত্যাগ হয়েছে| সেখানে নাড়ির কোন স্পন্দন নেই| ডাক্তারদের কথা সাধারণ দৃষ্টিতে সবাই মেনে নিয়ে নিশিকন্তের মায়ের সৎকারের ব্যবস্থা করেছে| যদিও চিতার আগুনে তখনও উঠানো হয়নি| সবার আশ্চর্যšি^ত চোখ দেখে নিশিকান্ত অবাক হল| ঠিক তখনই কে যেন তাকে ডাকলো নিশি| বড় চেনা সেই ডাক | বড় মধুর সেই কন্ঠ, যে কন্ঠ সে বারটা বছর ধরে শুনেছে আর বুকের মধ্যে অন্যরকম সুখ অনুভব করেছে| এমন করে কে তাকে ডাকছে? তার মা ছাড়াতো কেউ তাকে কখনো অমন করে নিশি বলে ডাকেনা| কিন্তু মাতো আজ অন্য ভূবনের পথযাত্রী হাতলে কে তাকে ডাকবে? এমন চিন্তার মাঝে ডুবতে গিয়ে নিশিকান্ত আবার শুনতে পেল কেউ একজন খুব কোমল ¯^রে তাকে ডাকছে বাবা নিশি আমার কাছে আয় তিন দিন তোকে দেখিনি| একথা শোনার সাথে সাথে নিশিকান্ত পিছন ফিরে তাকালো| সে অবাক বিস্ময়ে দেখলো দুই হাত বাড়িয়ে তার মা তাকে ডাকছে|  যে মাকে সে কিছুক্ষণের মধ্যে মুখাগ্নি করতে যাচ্ছিল সেই মা আসলে মরেনি| সুখ নিদ্রায় এতই নিমগ্ন ছিল যে ডাক্তারেরা পর্যন্ত তার নাড়িরস্পন্দন ধরতে পারেনি| দৌড়ে গিয়ে নিশিকান্ত তার মায়ের কোলে ঝাপিয়ে পড়লো| চারিদিকে তখন অন্যরকম অনুভূতি অন্যরকম আনন্দ  এবং শীতল বাতাস বয়ে গেল| কেউ জানলোনা বুঝলোনা কিভাবে একটা শীতল ঘুমন্ত মানুষ জেগে আবার উঠলো| পুরোহিত নিজে হতবাক হয়ে ঠায় দাড়িয়ে থাকলো| যারা এসেছিল শবদেহ নিয়ে তারাই ফিরে গেল আনন্দ মিছিল নিয়ে| সমস্ত এলাকাতে ঘটনাটা ছড়িয়ে পড়লো আর পাড়া প্রতিবেশি সবাই জড় হতে লাগলো নিশিকান্তদের বাসায়| এরপর মাত্র তিনদিন পর নিশিকান্তদের স্কুল থেকে চিঠি আসলো পরীক্ষার ফি আদায়ের জন্য| সংসারের দূরাবস্থা পেটে খাবার জোটেনা সেখানে পরীক্ষার ফি বাবদ পাঁচশো টাকা কিভাবে দেবে ওরা তাই জানেনা নিশিকান্ত| আগামী পরশু দিনের মধ্যে ফি দিতে না পারলে  নিশিকান্তের পরীক্ষা দেয়া হবেনা| নিশিকান্ত তার মাকে জানালো যে তার পরীক্ষা দেয়ার দরকার নেই| কিন্তু তার মা বলেছে যে করেই হোক তিনি টাকার জোগাড় করবেন| মুখে ছেলেকে আশ্বাস দিলেও ভিতরে ভিতরে সে ভীষন হতাশা বোধ করছিল|  মাত্র একদিনের ভিতরে এত গুলো টাকা সে কোথায় পাবে| চিন্তায় চিন্তায় ঐ দিন সারা রাত ভারতী দেবীর ঘুম আসলোনা| নিশিকান্ত অবশ্য তিহামীকে বললে ওর পরীক্ষার ফিটা  তিহামী দিয়ে দিত| কিন্তু নিশিকান্ত এটা চায়না| কারো সাহায্য তার দরকার নেই| পরদিন সকাল গড়িয়ে দুপুর এলো এবং একসময় দুপুর পেরিয়ে বিকেল  পেরিয়ে সন্ধ্যা নেমে আসলো কিন্তু ভারতী দেবী ছেলের পরীক্ষার ফি জোগাড় করতে পারলেন না| রাত পোহালেই পরীক্ষার ফি দিতে হবে অন্যথায় তার ছেলের পরীক্ষা দেয়া হবেনা| নিশিকান্ত ওসব চিন্তা বাদ দিলেও ওর মা চিন্তায় চিন্তায় কাহিল হয়ে পড়লো| বিরস মুৃখে সে ভেঙ্গে পড়া অবস্থায় অসহায়ের মতো করুণ দৃষ্টিতে নিশিকান্তের দিকে তাকালো| মায়ের কষ্টটা নিশিকান্ত খুব বুঝতো তাই সে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বললো তুমি অত ভেঙ্গে পড়ছো কেন মা? এবার না হোক আগামী বার পরীক্ষাতো দেবই তাহলেইতো হবে| ছেলের মুখের কথা শুনে ভারতী দেবী কিছুটা খুশি হলেন| সকাল নয়টা পেরিয়ে গেছে | মুকুল নিকেতন স্কুল মাঠে লাইন দিয়ে দাড়িয়ে আছে ছাত্র ছাত্রীরা| সবাই পরীক্ষার ফি দেবে বলে লাইন দিয়ে দাড়িয়েছে| বাড়ির উঠোনে বসেই সেই কঠিন দৃশ্যটা দেখছিলেন ভারতী দেবী আর তার কষ্টের ধন বুকের মানিক নিশিকান্ত কিন্তু করার ছিলনা কিছুই| মায়ের চোখে জল ছল ছল করে উঠছিল| অথচ দৃশ্যটা অন্যরকম হওয়ার কথা ছিল| ঐ ছেলে মেয়েদের সারিতে তারপ্রুত্র নিশিকান্তরও থাকার কথা ছিল কিন্তু আজ সে সেই সারিতে নেই| নিশিকান্ত মায়ের চোখের জল মুছে দিল| বাইরে তখন শো শো করে বাতাস বইছে| সেই বাতাসের শব্দকে ছাপিয়ে নিশিকান্ত আর তার মায়ের কানে মটর সাইকেলের তীব্র  ভেপু বাজানোর শব্দ  এসে আঘাত করলো| সচকিত চোখে ফিরে তাকালো নিশিকান্ত এবং তার মা ভারতী দেবী| তাদের জীর্ণ কুটিরের ছোট্ট উঠোনে এসে থেমেছে লাল রঙের একটা মোটর সাইকেল| পাশে দাড়িয়ে আছেন মধ্য বয়স্ক একজন ভদ্রলোক| ভদ্রলোকের চোখে তখন রোদ চশমা হাতে দামী ঘড়ি| দেখে মনে হয় বড় কোন চাকরী করে কিংবা লোকটা অনেক টাকাওয়ালা| নিশিকান্তের মাকে প্রনাম করে কাছে এসে দাড়ালো লোকটি| অচেনা এই লোকটিকে বসতে দেবার মতোও কিছু নিশিকান্তদের ঘরে নেই| নিজেই ¯^বিস্তারে নিজের পরিচয় দিলেন ভদ্রলোক| তার কথা থেকে বোঝা গেল ভদ্রলোকের নাম বলাই কুমার| থাকেন আসামের লুসাই পাহাড়ের সন্নিকটে| তিনি ওখানে একটা টি এস্টেটের মালিক এবং যেখানে প্রতিদিন দেড়শো শ্রমিক কাজ করে| জন্ম সুত্রে তিনি বাংলাদেশী এবং সব পরিচয় দেবার পর ভারতী দেবী জানতে পারলেন বলাই কুমার নামের এই ভদ্রলোক তার ¯^ামীর ছাত্র| টাকার অভাবে বিলেতে লেখাপড়া করতে যেতে পারছিলনা এই ছেলেটি| সেই বিপদের সময়ে নিশিকান্তের বাবা  তাকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দিয়েছিলেন| সেই টাকায় বিলেত গিয়ে পড়ালেখা করে এখন সে মস্ত বড়লোক| বাড়ী গাড়ি সব কিছুই আছে তার| নিশিকান্তের বাবা মারা যাবার ঘটনাটা সে শুনেছে কিন্তু কোন ভাবেই সে ছুটে আসতে পারেনি| আজ এসেছে সেই টাকাগুলো ফেরৎ দিতে| এই কথাগুলো বলেই পকেট থেকে এক বান্ডিল নোট বের করে ভারতী দেবীর হাতে ধরিয়ে দিলেন| ভারতী দেবী তখন বাক রুদ্ধ হয়ে দাড়ানো| এই টাকাটা পেয়ে সে পুরো দুনিয়াটা হাতে পেয়েছে| সে বার কয়েক বলাই কুমার নামক ভদ্রলোককে ধন্যবাদ জানিয়ে ভিতরে গিয়ে দুটো নাড়ু আর এক গ্লাস জল এনে লোকটিকে সামান্য আতিথেয়তা গ্রহণ করতে বললেন| বলাই কুমার মেধাবী মানুষ ভারতী দেবীর বর্তমান করুণ অবস্থা বুঝতে পেরেই এই সামান্য আতিথেয়তাকে অনেক বড় মনে করে গ্রহণ করলেন| শেসে অনেক ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নেবার আগে বলে গেলেন কখনো কোন সমস্যা হলে তারা যেন তারসাথে কোন রুপ সংকোচ না করে যোগাযোগ করেন| বলাই কুমার ভদ্রলোক যেভাবে ভেপু বাজিয়ে এসেছিলেন আবার সেভাবেই চলে গেলেন| ভারতী দেবীর মুখে তখন অন্যরকম আনন্দ খেলা করছিল| মুকুল নিকেতনের মাঠে তার নিশিকান্তের পদচারণা দেখতে পাচ্ছিল| সে নিশিকান্তকে শিঘ্রই কাপড় পরে স্কুলে রওনা হতে বললেন| নিশিকান্তও খুশি মনে টাকা নিয়ে স্কুলে গেল| তার মা তাকে বহুদিন পর ঝালমুড়ি আর ফুচকা খাওয়ার জন্য অতিরিক্ত টাকা দিয়েছে|  কত দিন সে ওসবের মুখ চোখে দেখেনি| যদিও তার ভীষণ প্রিয় বন্ধু তিহামী বার বার ওকে খেতে বলতো কিন্তু নিশিকান্ত কখনো খেতনা| সেই থেকে তিহামী নিজেও আর কোন দিন ঝালমুড়ি কিংবা ফুচকা খায়নি| যখনই খেতে ইচ্ছে হয় ঠিক তখনই নিশিকা&েতর কথা মনে পড়ে আর ভীষণ ভাবে মন খারাপ হয়ে যায়| এ নিয়ে ওর বাবা ওকে অনেক বার প্রশ্ন করেও কোন উত্তর পায়নি| নিশিকান্ত মায়ের কাছে পাওয়া টাকা দিয়ে আজ নিজেই তিহামীকে খাওয়াবে বলে ঠিক করলো| শেষে লাইনে দাড়িয়ে একসময় পরীক্ষার ফিস জমা দিয়ে প্রবেশ পত্র নিল| মাত্র তিনদিন পর পরীক্ষা শুরু হবে অথচ ওর তেমন কিছুই পড়া হয়নি| ছাত্র হিসেবে মধ্যম শ্রেণীর নিশিাকান্ত পড়ালেখায় ভাল মন দিতো কিন্তু দারিদ্রতারকাছে সব কিছু তুচ্ছ হয়ে গেল| স্কুল থেকে দেয়া বইগুলো ছাড়া কোন নোট খাতা কিছুই ছিলনা ওর| তিহামীর কাছ থেকে মাঝে মাঝে পড়া বুঝে নিত এই যা| সামনে পরীক্ষা কী করবে ও ভেবে পাচ্ছিল না| মন মরা করে বাড়ী ফিরতেই মা জিজ্ঞেস করলেন পরীক্ষার ফিস জমা দিয়েছে কিনা| ও জানালো যে পরীক্ষার ফিস জমা দেয়া হয়েছে| কিন্তু তারপরও ওর মন খারাপ কেন জানতে চাইলে সে তার মাকে তার প্রস্তুতির কথা খুলে বললো| মা ওকে শান্তনা দিয়ে বললেন এবারের মত কোন একভাবে পরীক্ষাটা শেষ কর কয়েক দিনের মধ্যেই নোট গাইড কিনে দেব| নিশিকান্ত মায়ের কথা শোনার পর পূর্ণদ্যোমে লেখাপড়া শুরু করলো| এর মাঝেই সে ভুলে গেল সে রাতের ঘটে যাওয়া নানা কাহিনী| তিহামীর কাছে গিয়ে সে পড়াগুলো একবার করে দেখে নিল| যদিও তিহামীদের বাসায় যেতে ওর একদমই ভাললাগেনা তারপরও লেখাপড়ার তাগিদে যেতেই হয়| তিহামী ওকে কথা দিয়েছে ও বড় হলে বাড়িটা নিশিকান্তকে ফেরৎ দেবে কিন্তু নিশিকান্ত ওসব কথায় কান দেয়না| তিন দিন পর নিশিকান্তর পরীক্ষা শুরু হল| মায়ের আশির্বাদ নিয়ে নিশিকান্ত পরীক্ষা দিতে গেল| যুগে যুগে দেশে দেশে প্রতি ক্লাসেই কিছু দুষ্টু ছেলে মেয়ে থাকে যারা অন্যদের শুধু জ্বালাতন করে| নিশিকান্তদের ক্লাসেও তেমন ক’জন দুষ্টু ছেলে ছিল যাদের মধ্যে শ্রীকান্ত,অমল,বাদল আর রাতুল অন্যতম| সব সময় অন্যকে কিভাবে ডোবানো যায় শাস্তি দেয়া যায় এই চিন্তা ওদের মাথায় ঘুরপাক খেত| ক্লাসে কম বেশি সবাই কোন না কোন ভাবে ওদের ফাদে পা দিয়ে শাস্তি পেয়েছে| ওদের দ্বারা অপমানিত হয়েছে| এটা ওদের চিরদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়েগেছে| এর মধ্যে নিশিকান্তও কয়েকবার ওদের দ্বারা অপমানিত হয়েছে কিন্তু কখনো কিছু বলেনি| ওরা সবাই ক্ষমতাবান ঘরের ছেলে তাই ওদের সাথে লাগা ঠিক হবেনা বলেই নিশিকান্তকে বুঝিয়েছে তিহামী| তাই নিশিকান্তও ওদের আর ঘাটতে যায়নি|  আজ পরীক্ষার হলে ঢুকার সাথে সাথে পাজি ছেলে গুলো একসাথে বলে উঠলো “বিদ্যাসাগর আসিয়াছেন তিন না¤^ার বেঞ্চে বসিয়াছেন,কি লিখিবেন? লিখিবেন ঘোড়ার ডিম পাইবেন বড় বড় রসগোল্লা,হা হা হা|” ওদের মুখ ভেংচানো দেখে নিশিকান্তর মাথায় রাগ উঠে যাচ্ছিল| কিন্তু পরীক্ষার কথা চিন্তা করে ও চুপকরে থাকলো| এর পনের মিনিট পর খাতা দেয়া হল| নিশিকান্ত শান্ত মনে খাতার ওপর নাম রোল না¤^ার শ্রেণী ,বিষয় যা লেখার সব লিখে নিল| আজ নিজের কাছেই নিজেকে অচেনা মনে হচ্ছে| হাতের লেখাটা নিজেই চিনতে পারছেনা|  সুন্দর সে লেখা ভীষণ পরিচ্ছন্ন এবং সাজানো গোছানো| যে কেউ দেখলেই চক্ষু ছানাবড়া হয়ে যাবে| এরপর যখন প্রশ্ন দেয়া হল তখন সবগুলো প্রশ্ন পড়ে নিশিকান্ত ভীষন অবাক হলো| সে যে সব প্রশ্ন পড়েছে ঠিক সেগুলোই এসেছে| তার চোখের সামনে উত্তর গুলো বইয়ের পাতার মতো ভেসে উঠছে| সে কোন দিকে না তাকিয়ে আপন মনে লিখতে লাগলো| মূল খাতা শেষ হলে অতিরিক্তি পাতা নিল এবং তিন ঘন্টা হতে যখন আরও পৌনে এক ঘন্টা বাকি তখনই সে খাতা বন্ধ করে জমা দিয়ে দিল| পরীক্ষার হলে ছোট খাট ফিসফিসানির শব্দ কানে ভেসে আসছিল| পাশের জনের কাছ থেকে একটু সাহায্য পাবার আশায় অনেকেই এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল| ক্লাসের ভাল ছাত্রগুলি তখনও লেখা শেষ করতে পারেনি অথচ নিশিকান্ত লেখা শেষ করে খাতা জমা দিয়ে বেরিয়ে গেছে| ওর খাতা জমা নেবার সময় অধিক্রম দত্ত্ব স্যারও ভ্রু কুঞ্চন করলেন| তার মুখে তখন অনেকটাই তাচ্ছিল্যের ভাব বিরাজ করছিল| সাধারণত এমনটাই হবার কথা | কারণ সেরা ছাত্ররা যেখানে উত্তর দিতে হিমশিম খাচ্ছে সেখানে অতি নগণ্য একজন ছাত্র সবগুলো উত্তর নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই লিখে শেষ করেছে বললে তাচ্ছিল্য আসাই ¯^াভাবিক| কিন্তু অধিক্রম দত্ত স্যার যদি খাতাটার দিকে অন্তত একবার তাকাতেন তবে ‘থ’ হয়ে যেতেন এমনকি তারমুখে কোন কথা বের হতোনা|

  নিশিকান্তের মনটা বেশ ফুরফুরে| প্রথম দিনের পরীক্ষাটা সে বেশ ভালই দিয়েছে|  বিগত বছর গুলোতে কখনোই এতো ভাল পরীক্ষা সে দিতে পারেনি| বরাবরই সে দুই তিন বিষয়ে ফেল করি করি করে  কোন মতে পাশ করে গিয়েছে আর এবার প্রথম পরীক্ষাটাই এতো ভাল হয়েছে যে খুশিতে ধেই ধেই করে নাচতে ইচ্ছে করছে| ভারতীদেবী ছেলের পরীক্ষা ভাল হয়েছে শুনে ভীষণ খুশি| মনে মনে এই ছেলেকে নিে য়তার অনেক ¯^প্ন অনেক আশা| বিকেলে হাটতে হাটতে নিশিকান্ত তিহামীদের বাসায় গেল|  তিহামী তখন পরদিনের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে ব্যস্ত| নিশিকান্ত জানে তিহামীর পরীক্ষা অনেক ভাল হয়েছে কারণ তিহামী ওদের ক্লাসের ফাষ্ট বয় তাই ইচ্ছে করেই জিজ্ঞেস করেনি পরীক্ষা কেমন হয়েছে| কিন্তু ওর পরীক্ষাযে ভাল হয়েছে এটা তিহামী জানতোনা| নিশিকান্ত নিজেই বললো আজ আমার পরীক্ষা ভীষণ ভাল হয়েছে|  সবগুলোর সঠিক উত্তর দিয়েছি এবং খুব সুন্দর করে সাজিয়ে লিখেছি|  ওর কথা শুনে তিহামী তেমন কিছু মন্তব্য করলোনা| তিহামী জানে ওর কথা পুরোপুরি ঠিক নয় কারণ ইংরেজিতে কোন দিন নিশিকান্ত চল্লিশের ঘরে পৌছায়নি আর সেই যদি বলে খুব ভাল পরীক্ষা দিয়েছে তা কি করে বিশ্বাস করে?  সে ক্লাসের ফাষ্ট বয় হয়েও এবার সবগুলোর  উত্তর দিতে পারেনি সেখানে একশো তেইশ রোল না¤^ারের একটা ছাত্র সবগুলোর উত্তর দেবে এটা অকল্পনীয়|  তিহামী কথা না বাড়িয়ে শুধু এতটুকু বললো যে আমার পরীক্ষা খুব বেশি ভাল হয়নি| সবগুলোর উত্তর দিতে পারিনি| ওর কথা শুনে নিশিকান্ত অবাক হলো| এত সহজ প্রশ্ন আর তিহামী উত্তর দিতে পারেনি এটা  কী করে হয়ে? মুখের ওপর কথাটা বলেই ফেলল কিন্তু তিহামী প্রিয় বন্ধটাকে এ ব্যাপারে কিছু বললনা| রাত পেরুলেই ইংরেজি দ্বিতীয় পত্র পরীক্ষা তাই নিয়ে সে ব্যস্ত হয়ে পড়লো| নিশিকান্তকে বুঝিয়ে দিল কোনগুলো পড়তে হবে| কিন্তু নিশিকান্তের মনে হচ্ছিল তিহামীর দেখানো প্রশ্নগুলো আসবেনা| তাই সে নিজের মতো করে পড়লো এবং ওর মনের সাম্ভাব্যতার কথা তিহামীকেও জানালো| এরপরও তিহামী ওকে কিছু বললোনা| পরদিন পরীক্ষার হলে প্রশ্নপত্র হাতে পেয়ে তিহামীর চক্ষু চড়কগাছ| তার পড়া প্রশ্ন গুলো থেকে খুব সামান্যই কমন পড়েছে অথচ গতকাল নিশিকান্ত যা বলেছিল হুবহু ঠিক সেরকমই প্রশ্ন এসেছে| ঘাড় ফিরিয়ে দেখলো তার মতো প্রায় সকলেই কলম কামড়াচ্ছে| কিন্তু একজন ছাত্র খুব মনোযোগ দিয়ে কারো দিকে না তাকিয়ে এক মনে লিখছে| সেই একজন ছাত্রই বলতে গেলে সবার গনার বাইরে আর সে হলো নিশিকান্ত| তিহামীর কাছে সব কেমন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে| গত দিনের মতো ঐ দিনও নিশিকান্ত ঘন্টা পড়ার আগেই খাতা জমা দিয়ে চলে গেল| গতদিন অধিক্রম দত্ত স্যার ওর খাতা নিয়েছিলেন আর আজ নিলেন মনিরা ম্যাডাম|  অধিক্রম স্যারের মতো মনিরা ম্যাডামও অনেকটা তাচ্ছিল্যের সাথে ওর খাতা জমা রাখলেন|  তিহামী উঠে এসে মনিরা ম্যাডামকে বললেন গত কাল এবং আজ যে প্রশ্ন এসেছে তা আমাদের আয়ত্তের বাইরে| এমনকি এই প্রশ্নগুলো আমাদেরকে পড়ানোও হয়নি খুব একটা| তাহলে টিচারেরা কেন এমন প্রশ্ন করলেন? মনিরা ম্যাডাম বললেন নাতে াএমন কোন প্রশ্নই করা হয়নি যা তোমাদের পড়ানো হয়নি| তিহামী প্রশ্নটা মনিরা ম্যাডামের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললো একবার চোখ বুলিয়ে নিন| মনিরা ম্যাডাম নিজেও শক খেলেন| এই বিষয়টা তিনি পড়ান এবং প্রশ্নগুলোও তিনিই করেছেন| তাহলে এই প্রশ্নগুলো আসলো কোথাথেকে| এই প্রশ্নগুলোতো তিনি দেননি| তাহলেকি প্রেসের লোকেরা ভুল প্রশ্ন ছাপিয়েছে? ঐ দিনের মতো পরীক্ষা শেষ হলো| শিক্ষকেরা অবাক হয়ে দেখলেন সব গুলো প্রশ্নই তাদের করা প্রশ্নথেকে ভিন্ন| প্রেসে গিয়ে খবর নেয়া হলো তারা তাদেরকে ভুল প্রশ্ন দিয়েছে কিনা দেখা গেল মুকুল নিকেতন থেকে যে প্রশ্ন হাতে লিখে জমা দেয়া হয়েছে ঠিক সে প্রশ্নই ছাপানো হয়েছে|  স্যারেরা এটা দেখেও অবাক হলেন| তাদেরই হাতে লেখা প্রশ্নগুলো এরা ছাপিয়েছে| অথচ স্পষ্ট মনে আছে এই ধরণের কোন প্রশ্ন তারা লেখেনি| ঐ দিন পরীক্ষা শেষে ফুরফুরে মনে বাড়ীর পথে হেটে চলেছে নিশিকান্ত| ঠিক সেই সময়ে তার অন্য সহপাঠীরা পরীক্ষা দিচ্ছে| সেদিনও তিহামীর পরীক্ষা ভাল হলনা| ভাল ছাত্র বলে যা নিজ থেকে লিখতে পেরেছে  কিন্তু এটা আহামরি কোন ভাল পরীক্ষা নয়| যথারীতি আবার বিকেলে নিশিকান্তের সাথে দেখা| পড়ালেখার কথা বাদ দিয়ে আজ তিহামী শুধু আবিষ্ট মনে ওর দিকে তাকিয়ে থাকলো| হঠাৎ করে কিভাবে একটা মানুষ এমন হয়ে উঠতে পারে তা সে কিছুতেই ধরতে পারছিলনা| এভাবেই একে একে সবগুলো পরীক্ষা শেষ হয়ে গেল|  আবার আগেরমতো ক্লাস আরম্ভ হলো| নিশিকান্তের মা তাকে নতুন স্কুল ড্রেস,জুতা,মোজা এবং ব্যাগ কিনে দিয়েছে| নতুন সব কিছুই নিশিকান্তকে নতুন রুপে বলিয়ান করে তুলেছে| সে ফুরফুরে মন নিয়ে স্কুলে পৌছাল| তিহামী ওকে নতুন পোষাকে দেখে ভীষণ খুশি হল| আজ ওকে ভীষণ সুন্দর লাগছে| কিন্তু তিহামীর কাছে ওকে সুন্দর লাগলে কি হবে কুৎসিত মনের মানুষগুলির কাছে ওর এই সুন্দর পোষাক পছন্দ হলনা| আচ¤ি^তে শ্রীকান্ত,অমল,বাদল আর রাতুল এসে মুঠি ভরে ধুলো কাদা এনে ওরগায়ের সুন্দর জামায় লাগিয়ে দিল| তিহামী তখন ওদের বললো তোমরা ওর নতুন জামায় কাদা লাগিয়ে দিলে কেন?  শ্রীকান্ত অমল বাদল আর রাতুল ছেলে গুলো ছিল অসম্ভব বেয়াদব| তারা তিহামীকে বললো ওরটাতে ধুলো দিয়েছি তাতে তোর কী ? তোরটাতে দিইনি এইতো তোর ভাগ্য| যা ভাগ এখান থেকে নইলে তোরটাতেও লাগিয়ে দেব| তিহামী তখন বললো তোমরা এটা ভাল করছোনা| আমি কিন্তু হেড স্যারের কাছে বিচার দেব| একথা বলার সাথে সাথে পাজি ছেলেগুলো নিশিকান্তর মতো ওর জামায়ও কাদা লাগিয়ে  হা হা করে হাসতে লাগলো| তিহামী তখন ওদের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো| নিশিকান্ত এতো দিন ছেলেগুলোকে কিছুই বলেনি আজ ওর নতুন জামায় কাদা লাগিয়ে দিয়েছে তাতেও কিছু বলেনি কিন্তু যখন দেখলো তিহামীর জামায় কাদা লাগিয়ে দিয়েছে তখন সে হাত গুটিয়ে বসে থাকলোনা| রাগে ফুলতে ফুলতে শ্রীকান্তের কলার ধরে ধাক্কা মারলো| সাথে সাথে শ্রীকান্ত মাটিতে পড়ে ধুলোয় গড়াগড়ি খেল| অমল বাদল আর রাতুল তখন এক যোগে নিশিকান্তকে জাপটে ধরলো| নিশিকান্ত আজ ভেতর থেকে শক্তি অনুভব করছে| পাশাপাশি বিগত দিনের অপমানের যন্ত্রনা আজ চাগিয়ে উঠেছে| সে ঝাকুনি দিয়ে ওদের তিনজনের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে যাকে সামনে পেল কিলিয়ে আলুভর্তা বানিয়ে ফেললো| দূরে দাড়িয়ে তিহামী ওর শক্তি আর সাহস দেখছিল| আর আশ্চর্য হচ্ছিল এই ভেবে যে এই ছেলেটিই এতোদিন ওদের সব অপমান মুখ বুজে সহ্য করে এসেছে| নিশিকান্তের হাতে বেদম ধোলাই খেয়ে শ্রীকান্ত,অমল,বাদল আর রাতুল খোড়াতে খোড়াতে পালিয়ে গেল| তিহামী বা নিশিকান্ত কারো আর ঐ দিন ক্লাস করা হলোনা| বাড়ি ফিরতে ফিরতে তিহামী নিশিকান্তকে অনেক কথা বললো ওরা চারজন ক্ষমতাবান লোকের ছেলে | স্কুল কমিটির প্রধান মীর্জা আজিমুদ্দিনের ছেলে রাতুল| অন্য তিনজনের একজন চেয়ারম্যান বিমল মিত্রের ছেলে অমল,একজন স্কুলের দাতা সদস্য রহমতউল্যার ছেলে বাদল এবং অন্যজন স্কুলের শিক্ষক অধিক্রম দত্তের ছেলে শ্রীকান্ত| ওদের চারজনকে মারার জন্য কালকেই হয়তো শাস্তি পেতে হবে নিশিকান্তকে আর সেই শাস্তি হবে ভয়ংকর| তিহামীর কথায় কোন ভাবান্তরই হলোনা নিশিকান্তের মনে| সে এক মনে হাটছেতো হাটছেই| আর কেবল একটা কথাই ভাবছে সে ওদের চারজনকে একা ধরাশায়ী করলো কিভাবে? এত সাহসইবা ও পেল কোথায়? বাড়িতে ফিরলে মা ওকে ধুলো কাদা মাখা কেন জানতে চাইলে সহজ ভাবেই নিশিকান্ত মাকে সব খুলে বললো| তিহামীর মতোই মা ভারতী দেবীও চিন্তিত হয়ে পড়লেন| তিনি তার এক মাত্র ছেলেকে অনেক করে বুঝালেন | পরদিন সত্যি সত্যি নিশিকান্তের মা ভারতী দেবীকে স্কুলে ডেকে পাঠানো হল| বিচারের আসন বসানো হলো যেখানে শ্রীকান্ত,অমল,বাদল আর রাতুলের বাবাও উপস্থিত ছিলেন| প্রধান শিক্ষক ভারতী দেবীকে সব খুলে বললেন এবং ছেলে গুলোকে যে ভীষণ আকারে মেরেছে তাও বললেন| ভারতী দেবী ছেলের নির্দোষীতার কথা হেড স্যারকে বলার পরও তিনি সেটা মানতে রাজি হলেন না| নিজের ছেলের কথা যদি তার মা বলে তাহলে তা গ্রহণ যোগ্য নয় বলে জানালেন| তিহামী তখন সাক্ষী হয়ে হেডস্যারকে সব খুলে বললো| সব শুনে নিশিকান্তকে ক্ষমা করে দেয়া হলো| আসলে সবাই যেরকম ভাবতো শ্রীকান্ত,অমল ,বাদল আর রাতুলের বাবা সেরকম খারাপ মানুষ নয়| তারা সত্যি সত্যিই অন্যায়ের আপোষ করেন না এটা প্রমানিত হলো| যদি তাই না হতো তবে হেড স্যারকে চাপ দিয়ে ঠিকই তারা নিশিকান্তকে শাস্তি দিত| তিহামী এবং নিশিকান্ত সহ সকলের এত দিনের ভুল ধারণা ভেঙ্গে গেল| এরপর থেকে আবার তারা নিয়মিত স্কুলে আসতে শুরু করলো| এর মাঝেই পরীক্ষার রেজাল্ট ঘোষণার দিন আসলো| স্যারদের মাঝে কানাঘুসা হতে লাগলো| তারা ক্লাস সিক্সের একটা খাতা দেখে ভীষণ অবাক হয়েছে| খাতাটা নিশিকান্তের| প্রতিটি পরীক্ষাতে ঝকঝকে পরিস্কার হাতের লেখায় সুন্দর উপস্থাপনায় সব গুলোর সঠিক উত্তর সে ক্রমাš^য়ে লিখে দিয়েছে| এমনকি নাফিস তিহামী তিহাম যেখানে সবগুলোর উত্তর দিতে পারেনি সেখানেও সে সঠিক ভাবে উত্তর দিয়েছে| কোথাও কোন কাটা ছেড়া নেই| ফলাফল ঘোষনার পর দেখা গেল সবার চেয়ে একশো বত্রিশ না¤^ার বেশি পেয়েছে নিশিকান্ত| ফলাফল দেখে অন্যরা যেমন বাকহীন হয়ে পড়েছে তেমনি নিশিকান্ত আরও বেশি| সে নিজে জানো কখনো কোন বিষয়ে ষাট না¤^ার সে তুলতে পারেনি আর এবার সে সব পরীক্ষাতেই আশি না¤^ারের ওপরে পেয়েছে| রেজাল্টের পর থেকে সবাই ওকে আপন ভাবতে লাগলো| ভারতী দেবী তার ছেলের ফলাফলে ভীষন খুশি| তার ¯^প্ন পূরন করতে তার ছেলে ভাল ফলাফল করা শুরু করেছে|  সবাই খুশি হলেও কেবল খুশি নয় নিশিকান্ত নিজে| সে কখনোই তিহামীকে টপকে যেতে চায়না| দুই বা তিন হোক তাতে কোন আপত্তি নেই কিন্তু সে মনে প্রাণে চায় যেন তিহামীই ক্লাসে প্রথম হয়| কিন্তু তা কোন ভাবেই হচ্ছেনা| আগে ক্লাসের পড়াও নিশিকান্ত ভালমতো পারতোনা এখন স্যারেরা যা পড়া দেয় সব পারে| শত চেষ্টা করেও সে পরীক্ষা বা ক্লাস কোথাও খারাপ করতে পারেনা| পড়াগুলো যেন আপনা আপনিই ওর মাথার ভিতরে ঢুকে যাচ্ছে| তিহামীকে সে বলেছে আরো বেশি করে গুরুত্ব দিয়ে পড়তে যেন সে ওকে টপকে যেতে পারে আর নিজে পড়া কমিয়ে দিয়েছে কিন্তু তারপরও কিছুই হচ্ছেনা| বইয়ের পাতা তার চোখের সামনে আপনাআপনিই ভেসে উঠছে| মনের অজা&েত কখনো কখনো ও দেখেছে ওর মাথার ভিতরে কে যেন ফিস ফিসিয়ে কথা বলে|

  স্কুল থেকে একসাথে বাসায় ফিরছিল নিশিকান্ত আর তিহামী দুই বন্ধু| বিদ্যাময়ী স্কুলের সামনে অনেক মানুষের উপচেপড়া ভীড় দেখে তিহামী এবং নিশিকান্তর মনে কৌতূহল জাগলো| ভীড় ঠেলে ভিতরে গিয়ে দেখলো একজন সাপুড়ে সাপখেলা দেখাচ্ছে| কয়েক প্রকারের সাপের ভিতরে একটা বড় গোখরা সাপও ছিল| সেটা নিয়েই খেলা দেখাচ্ছিল সাপুড়ে| বাঁশির তালে তালে অনেক উচুতে ফনা তুলে দাড়াচ্ছিল সাপটি| তিহামী মুগ্ধ বিস্ময়ে ফনাতোলা সাপটির দিকে তাকিয়ে ছিল| একফাকে নিশিকান্ত তিহামীকে বললো একটা মজা দেখবি? রহস্যের গন্ধ পেয়ে তিহামী মাথা নাড়িয়ে সায় দিলো| নিশিকান্ত তখন চুপি চুপি ওকে বললো আয় এখনি সাপটা ফণা তোলা বন্ধ করবে| কিন্তু কিভাবে করবে,কেন করবে,কী রহস্য এর ভিতরে কিছুই জানতোনা তিহামী| সে শুধু নিশিকান্তকে অনুসরণ করলো| নিশিকান্ত ওকে নিয়ে সাপটি যেদিকে মুখ করে ফণা তুলেছিল ঠিক সেই পাশে গিয়ে দাড়ালো| ফণা তোলা সাপটির চোখে চোখ পড়লো নিশিকান্তর এবং যাদুর কাঠির ছোয়ার মত সাথে সাথে সাপটি ফণা নামিয়ে একদম মাটির সাথে শুয়ে পড়লো| সাপুড়ে অনেক চেষ্টা করেও সাপটিকে আর ফণা তুলাতে পারলোনা|  এটা কিভাবে করা হলো তিহামী জানতে চাইলেও নিশিকান্ত কিছু বললোনা| ওদিকে সাপুড়ে জানালো অনেক বার খেলা দেখিয়ে সাপটি ক্লান্ত হয়ে পড়েছে তাই সে আর ফণা তুলবেনা| তিহামী চুপি চুপি নিশিকান্তকে জিজ্ঞেস করলো  সাপুড়ে যা বলেছে তাকি সত্যি? নিশিকান্ত মাথা দুলিয়ে জানালো সত্যি নয়|  এবার তিহামী ওকে অনুরোধ করলো তুই তাহলে সাপটাকে আবার ফণা তোলা| নিশিকান্ত ওকে একটু অপেক্ষা করতে বললো| সাপুড়ে সাপটাকে যখন ঝুড়িতে রাখলো  ঠিক তখনই আবার  নিশিকান্তের চোখে চোখ পড়লো সাপটির   এবং সাথে সাথে ফুপিয়ে ফণা তুলে দাড়ালো সাপটি| এবার আগের চেয়ে দ্বিগুন| দর্শকরা হাতে তালি বাজাতে লাগলো আর সবচেয়ে বেশি আনন্দিত হলো তিহামী| সাপুড়ে নিজেই হতবাক হয়ে গেল এসব কান্ড কারখানা দেখে| ঠিক এমন সময় সাপটি তাকে ছোবল মারলো| আগেই বিষদাত ভাঙ্গা ছিল বলে  সাপুড়ের কিছু হলনা| এভাবে ঐ দিনকার মতো সাপুড়ের খেলার সর্বনাশ হল কিন্তু সাপুড়ে এর কোন কারণ বা কুল কিনারা খুঁেজ পেল না| পথে যেতে যেতে তিহামী এর ভেতরের রহস্য জানতে চাইলো| কৌতুহলের সাথে জানতে চাইলো তুইকি কোন মন্ত্র জানিস যে সাপ তোর কথায় ওঠে বসে|  নিশিকান্ত মাথা দুলিয়ে অ¯^ীকার করে বলে আরে না তেমন কিছু না তবে কেন যেন এটা হয় আমিও ঠিক বুঝতে পারিনা| নিশিকান্ত কথাটি মিথ্যে বলেনি| সে সেই রাতে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা পুরোপুরি ভুলে গেছে ফলে এসব কেন হচ্ছে তা সে ধরতে পারছেনা| এরপর নিশিকান্ত তিহামীকে আরো একটি ঘটনার কথা জানালো| হেড স্যারকে দিয়ে শাস্তি দিতে পারেনি বলে শ্রীকান্ত ,অমল,বাদল আর রাতুল নিজেরা পরিকল্পনা করে আমাকে অন্য ভাবে শাস্তি দিতে চেয়েছিল| আজ থেকে মাত্র পনের দিন আগের ঘটনা যা তোকে বলতে ভুলেই গিয়েছিলাম| আমি আমার ঠাকুমার সাথে শুয়ে ছিলাম| হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল এবং ঘরের পাশে ফিসফিস করে কথা বলার আওয়াজ শুনতে পেলাম|  আমি টু শব্দটি না করে চুপটি করে বসে থাকলাম| এর কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্ধকারেই দেখতে পেলাম শ্রীকান্ত.অমল,বাদল আর রাতুল একজন মধ্য বয়স্ক মানুষকে সাথে নিয়ে আমার রুমের জানালার পাশে এসে দাড়িয়েছে|  আমি সেই ঘুটঘুটে অন্ধকারেও স্পষ্ট দেখতে পেলাম  মধ্য বয়স্ক লোকটার হাতে একটা ল¤^া গোকরা সাপ| এবং সে সেটা আমার রুমের জানালা দিয়ে ভিতরে ছেড়ে দিল| চট করে আমি ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম| কিন্তু সাপটা সোজা আমার পা বরাবর  দুই হাত দূরে থেমে গেল| সাপকে আমার খুব একটা ভয় কখনোই লাগতোনা|  তাই আমি সরাসরি সাপটির চোখের দিকে তাকালাম এবং হঠাৎ করে আমার সারা শরীর শীতল হয়ে গেল | তারপর চোখের সামনে দেখলাম সাপটা আমার সামনে মাথা নিচু করে প্রণাম করার ভঙ্গি করলো| আমি ব্যাপারটা কিভাবে কি ঘটলো কিছুই বুঝতে পারলামনা| মনে মনে শুধু বললাম যারা আমাদের ক্ষতি করার জন্য তোকে এখানে ছেড়ে দিয়েছে তুই তাদেরকে পাকড়াও করতে পারিসনা? মনে মনে যখন এ কথা ভেবেছি  সাপটিও সাথে সাথে ফণা তুলে ফিরে গেল শ্রীকান্তদের দিকে| নিজেদের পাঠানো সাপ  তাদের দিকেই তেড়ে আসছে দেখে সাপুড়ে সহ চারজনই পড়ি মরি করে পালালো| তখন থেকেই বুঝেছি কোন একটা অজ্ঞাত কারণে সাপ আমাকে কিছু বলেনা এবং আমার কথা শোনে| তিহামী ওর কথা শুনে ভীষণ ভাবে আশ্চর্য হলো| কিন্তু এমনটি কেন হচ্ছে তা তারা দুজনের কেউই বুঝে উঠতে পারলোনা| পরদিন সকালেই স্কুলে গিয়ে জানতে পারলো ঐ চারজন ছাত্র ভীষণ অসুস্থ| তাদের শরীরের বিভিন্ন জায়গায় হঠাৎ করে ঘা হতে শুরু করেছে| ওদেরকে সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং চিকিৎসা চলছে| তবে ডাক্তারেরা এই রোগের কারণ খুজে পাচ্ছেনা|  প্রতিটি ক্ষত স্থানেই পরীক্ষা করে সাপ বা ঐ জাতীয় কোন প্রাণীর বিষের উপস্থিতি দেখা গেছে | অথচ ওদের কাউকেই কখনো সাপে কাটেনি| তিহামী আর নিশিকান্তও ওদেরকে দেখতে হাসপাতালে গেল| ওদের দেখে তিহামী বিচলিত না হলেও নিশিকান্ত ঘাবড়ে গেল| ওদের শরীরের যেখানে যেখানে ও আঘাত করেছিল  ঠিক সেখানে সেখানেই ঘা হয়েছে| তাহলেকি ওর হাতই বিষাক্ত ? ভাবনায় পড়ে গেল নিশিকান্ত|  ওর এই হঠাৎ চিন্তিত মুখের দিকে তাকিয়ে তিহামী কিছুটা বেদনা অনুভব করলো| এই ছেলেগুলোই দীর্ঘদিন ওকে জ্বালাতন করেছে অথচ সহজ সরল অসম্ভব মেধাবী এবং সাহসী নিশিকান্ত তাদেরই বিপদের দিনে পাশে বসে চোখের জল ফেলছে|  ও আমার বন্ধু এ কথা ভাবতেই তিহামীর ভীষণ গর্ব অনুভূত হচ্ছে| নিশিকান্তের আরো একটু গা ঘেষে বসলো তিহামী| ওরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে যে নিশিকান্ত সব ভুলে গিয়ে ওদেরমতো খারাপ ছেলে গুলোকে দেখতে এসেছে পাশে বসেছে| বাড়ি ফিরে নিশিকান্ত তার মা ভারতী দেবীকে ওদের করুণ অবস্থার কথা জানিয়েছে| শুনে ভারতী দেবীরও খুব খারাপ লেগেছে| কোন বাবা মার কোল যে খালি হতে চলেছে তা তার জানা নেই| ভয়ে নিশিকান্তকে সে বুকে জড়িয়ে নেয়| নিশিকান্ত সারা দিনই মন খারাপ করে থাকে| বিকেলে রেল লাইনের ওপর একা একা নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকে| তিহামী বুঝতে পারেনা নিশিকান্তর হঠাৎ কী হলো যে সে তাকে এড়িয়ে চলছে| কোন ভাবেই নিশিকান্ত বুঝে উঠতে পারছেনা যে ছেলেগুলোর শরীরে তার হাতের আঘাতের চিহ্ণ আসলো কী করে|  এর মাত্র তিনদিন পর ডাক্তারেরা জানালো যে শ্রীকান্ত ,অমল,বাদল এবং রাতুলের অবস্থা ভাল নয়| তাদেরকেবিদেশেনিয়ে গেলে ভালহতেপারে| ওরা প্রত্যেকেই ছিল নিজ নিজ পিতার একমাত্র সন্তান| আদরের মানিককে বাঁচাতে তারা শেষ স¤^ল বিক্রি করে  হলেও বিদেশেযাওয়ার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলো| শুধু শ্রীকান্তের জন্য কোন ব্যবস্থা করতে পারলেন না  তার দরিদ্র স্কুল মাষ্টার পিতা অধিক্রমদত্ত| ছেলেকে মৃত্যু সজ্জ্যায় দেখে তিনি দিনদিন ভেঙ্গে পড়তে লাগলেন| শ্রীকান্তের মা ভবানী দত্ত প্রায় উন্মাদিণীরন্যায় বিলাপ করতে লাগলেন| অমল বাদল আর রাতুলের বাবা  ওদেরকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে গেলেন| উন্নত  চিকিৎসা দিয়ে কলিজার টুকরা ছেলেকে সুস্থ করে তুলতেই হবে| পরিবার পরিজন আত্মিয় ¯^জন স্কুলের শিক্ষক এবং সহপাঠীরা সবাই অপেক্ষায় থাকলো  কী হয় তা দেখার জন্য| প্রার্থনা করতে লাগলো ছেলেগুলো যেন সুস্থ হয়ে ফিরে আসে| মাত্র পনের দিন পর বাদল রাতুল আর অমলকে চিকিৎসা শেষে সিঙ্গাপুর থেকে দেশে ফিরিয়েআনা  হলো| কিন্তও এতে কেউ আনন্দিত হতে পারলোনা| ততক্ষণে পরিবার পরিজনের ভেতরে চাপা গুঞ্জন শুরু হলো| রাতুল আর বাদলের পরিবার ব্যস্ত হয়ে পড়লো সাদা কাপড়.আগরবোতি, সুরমা,কর্পুর কেনার জন্য| আলাদা আলাদা ছোট্ট দুটি মাটির ঘর বানানোর জন্য|  আর অমলের দাদা কাকা জেঠুরা ব্যস্ত হয়ে পড়লো চন্দন কাঠ জোগাড় করে চিতার আগুন জ্বালাবার ব্যবস্থা করতে লাগলো| পিতা মাতা শেষ স¤^লটুকু বিকিয়ে দিয়েও আদরের সন্তানকে বাঁচাতে পারেনি| শ্রীকান্তের বাবা অধিক্রম দত্ত এবং মা ভবানী দত্ত রাতুল অমল আর বাদলের মৃত্যু খবর শুনে গগণ বিদারী আর্তনাদ করতে লাগলো| চোখের সামনে প্রিয় বন্ধুদের মৃত্যু দেখে নির্বাক হয়ে গেল সজ্জ্যাশায়ী শ্রীকান্ত| বাঁচার সব আশা সে পুরো পুরি ছেড়ে দিয়েছে| বিদেশেচিকিৎসা করাতে নিয়ে গিয়েও একই রোগে তার বন্ধুরা বেঁেচ ফিরে আসেনি সেখানে তার বাঁচার আশা করা বোকামী| কিন্তু প্রতিটা মানুষ বাঁচতে চায়,বাঁচার জন শ্রীকান্তেও মনটাও আকুলী বিকুলী কওে ওঠে| বিগত দিনের স্মৃতিগুলি বার বার তার চোখে ভেসে ওঠে| মনের অজান্তেই শ্রীকান্তেও চোখ ছলছল করে ওঠে| চিরকালের মতো হারিয়ে যাওয়া তিন বন্ধুর মরদেহ সমাধস্থ এবং দাহ করার পর সবাই শোক সইতে না পেরে সদর হাসপাতালে ভীড় জমালো| সবাই এসেছে শ্রীকান্তকে দেখতে | সেই আগত জচনসমুদ্েরর ভীড়ে বাদ পড়েনি অমল বাদল আর রাতুলের বাবা মাও| বিশ্বের বড় বড় ডাক্তারেরা কোন রোগই ধরতে পারেনি| সন্তান হারিয়ে ওদের বাবা মা একদম নিঃ¯^ হয়ে পড়েছে| সকলের উপস্থিতিতে গোটা হাসপাতালে থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে| শ্রীকান্তের মনে হল একসাথে শেষ বারের মতো সবাই তাকে বিদায় জানাতে এসেছে| সবার উপস্থিতিতে হাসপাতালের পরিবেশ ভারি হয়ে উঠেছে| একসাথে এতোগুলো মানুষ দেখে কড়া মেজাজী অধিক্রম দত্ত স্যারও থেকে থেকে কেঁদে উঠলেন| তিনি স্পষ্ট দেখতে পারছেন তার ছেলের বিদায়ী  যাত্রায় এরা সবাই জড় হয়েছে| বিকেলের দিকে হাসপাতালে ভীড় কমে গেল এবং বিকেল পাঁচটা নাগাদ একেবারেই ফাকা হয়ে গেল| বিছানায় ফ্যাকাশে মুখেশুয়ে আছে শ্রীকান্ত ,চোখ দুটো ফোলাফোলা,সারা শরীরের বিভিন্ন স্থানে খাবলা খাবলা মাংসে দগদগে ঘা ,সেই দগদগে থেতলে যাওয়া মাংসের ওপর মাছিরা আয়েশ করে বসছে কিন্তু শ্রীকান্তের সেদিকে কোন মন নেই| ওর দৃষ্টিটা কেবলই শূণ্যতায় ঘুরপাক খেতে থাকে|  মাত্র বার বছর বয়স ওর ,চরে যাবার সময় এটা নয় কিন্তু ঐ ডাকটা এমন কঠিন যে একবার ডাকলে না শুনে উপায় নেই|  এতদিনের প্রিয় বন্ধুরা সে ডাকে সাড়া দিয়ে সুদুর নীলিমায় হারিয়ে গেছে|  এবার সামান্য ব্যবধানে তাকেও যেতেহবে|  থাকবেনা বাবা মার আদর মাখা শাসন,মুকুল নিকেতনের ছোট্ট খেলার মাঠে দাপিয়ে বেড়ানো কিংবা মনিরা ম্যাডামের ছেলে উৎসর হাত ধরে বন্ধুত্ব বন্ধুত্ব খেলা| ধীরে ধীরে চোখের পর্দা নেমে আসছে|  ঐ যে দূরে তিন বন্ধু অমল বাদল আর রাতুল ওকে ডাকছে| সন্ধ্যায় ডাক্তার এসে ওর বাবা মাকে বলেছে ওকে বাড়ি নিয়ে যেতে| এখানে রেখে টাকা খরচ করে কোন লাভ নেই| সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা না করে অধিক্রম দত্ত স্যার তার আদরের সন্তান শ্রীকান্তকে রাত দশটার আগেই বাড়ি নিয়ে গেলেন| ব্রক্ষ্মপুত্র নদের তীর ঘেসে ইস্কান্দার মিজার সুবিশাল বাংলো বাড়ী| সেই বাড়ীর পাশেই অধিক্রম দত্তের ছোট্ট একটা বাড়ী| মুকুল নিকেতনে শিক্ষকতা করে পাশাপাশি টিউশনী করে এক সন্তান আর স্ত্রীকে নিয়ে সুখে দুঃখে সংসার ভালই চলে যায়| আর পাশে ইস্কান্দার মির্জা শান শওকাতের সাথে জীবণ কাটাতে থাকে| সন্তান টাকা কড়িতে তিনি যেমন সমৃদ্ধশালী তেমনি জ্ঞানে গুণেও তার চেয়ে কোন অংশে কমতি নেই| কলেজের গণিত বিভাগের অধ্যাপক,তিন সন্তানের জনক তিনি| যে সন্তানগুলো এক একটা কোহীনুর সম| বড় ছেলে অভি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে আর ছোট& দুই ছেলে স্নিগ্ধ  এবং মুগ্ধ জিলা স্কুল থেকে এবার এস এস সি পরীক্ষা দিচ্ছে| অধিক্রম দত্ত কখনোই নিজেকে ওদের সাথে তুলনা করেনা কিন্তু ইস্কান্দার মির্জা ছিলেন অসম্ভব ভালো মানুষ|  তাই তিনি সব সময় অধিক্রম দত্তকে সমাদর করতেন| তার এই বিপদের দিনে ইস্কান্দার মির্জা  চিকিৎসার জন্য অনেক টাকা দিতে চেয়েছিলেন যা দিয়ে অধিক্রম দত্ত ছেলেকে চিকিৎসা করাতে বিদেশে নিয়ে যেতে পারতেন| কিন্তু যখন দেখলেন অমল বাদল আর রাতুলকে বিদেশে নিয়েও কোন লাভ হয়নি তখন ইস্কান্দার মির্জার টাকা তিনি গ্রহণ করলেন না| তার দুঃখ ইস্কান্দার মির্জা বুঝতে পারেন| স্নিগ্ধ মুগ্ধ ওরাও শ্রীকান্তের জন্য ব্যথিত হয়ে ওঠে|  সময়ে অসময়ে গণিতের সমস্যাগুলি সমাধানের জন্য শ্রীকান্ত ওদের কাছে ছুটে আসতো| আর সেই ছোট্ট ছেলেটা যে কোন সময় তাদের চোখের সামনে থেকে হারিয়ে যাবে এটা ভাবতেই স্নিগ্ধ মুগ্ধর চোখ ছলছল করে ওঠে|  বিকেলের দিকে শ্রীকান্তের শরীর একটু ভাল লাগতে থাকলো| কিন্তু এটা ভাল লক্ষণ নয় বলেই সে মনে করে| হয়তো একটা ভাল হয়েই আবার সে ঢলে পড়বে মৃত্যুর কোলে| এরই মাঝে আত্মীয় ¯^জন পাড়া প্রতিবেশী কম বেশি সবাই এসে ওকে দেখে গেছে কথা বলে গেছে| শুধু নিশিকান্ত ঐ দিনের পর আর আসেনি|  সবার থেকে সে এখন আলাদা| কারো সাথে সে এখন মেশেনা| কারো কাধে সে এখন আর হাত রাখেনা| শ্রীকান্তের খুব ইচ্ছে করে নিশিকান্তকে দেখতে কিন্তু নিশিকান্ত আসেনা| শ্রীকান্ত তিহামীকে অনুরোধ করে  যেন নিশিকান্তকে অন্তত একবার আসতে বলে| তিহামী ওকে কথা দেয় যে সে যে করেই হোক নিশিকান্তকে নিয়ে আসবে| শ্রীকান্তকে কথা দিলেও মনে মনে  সে ভীষণ দুর্বলতা অনুভব করে| সত্যিইকি সে নিশিকান্তকে ওর কাছে নিয়ে আসতে পারবে?

   রেল লাইনটা একদম ফাকা| অনেকক্ষণ পর যখন একটা রেল গাড়ি আসে কেবল তখনই রেল লাইনের পাতগুলো সুখ পায়| স্টেশান থেকে অনেকটা দূরে নিশিকান্তদের বাড়ী| বাড়ীর পাশ দিয়ে চলে গেছে রেল লাইন | ও যেখানে বসে আছে এখানে চারপাশে সারি সারি দেবদারু গাছ| আগে ও ব্রক্ষ্মপুত্র নদের ধারে বসে থাকতো এখন আর সেখানে বসতে নিশিকান্তর ভাল লাগেনা| একাকী তাই রেল লাইনের এই স্থানটাতে বসে থাকে| খুব ভাল লাগে রেল লাইনের এই নিরবতা| চারদিকে কোথাও কেউ নেই, মাথার ওপর আদিগন্ত নীল আকাশ| সেই আকাশে  একখন্ড মেঘ নেই ,চারদিকে সোনালী রোদের ঝিলমিল জ্যোৎস্না| বার বছরের একটা ছোট্ট ছেলে একাকী নিরবে রেললাইনে বসে থাকাটা শোভনীয় নয়| এই বয়সে তার থাকার কথা খেলার মাঠে| বন্ধুদের সাথে  নদীর পানিতে ঝাপিয়ে বেড়ানোই ছিল ¯^াভাবিক| নিশিকান্ত তার ঠিক বিপরীত| একাকী নিঃসঙ্গতায় সারাক্ষণ কাটাতে ভালবাসে| মনে তার পড়ার সাথীদের হঠাৎ হারিয়ে যাওয়ার দুঃখ|  অনেকক্ষণ হল তিহামী ওর পিছনে এসে দাড়িয়েছে  কিন্তু ও টের পায়নি| তিহামী প্রথম ওদের বাড়ীতে গিয়ে ওকে পায়নি| নিশিকান্তের মাকে ডেকে জিজ্ঞেস করেছে মাষিমা নিশি কোথায়? ভারতী দেবীই বলে দিয়েছে নিশিকান্ত এখানে| ওদের বাড়ী থেকে তাই সোজা সে এখানে চলে এসেছে| তিহামী ওকে ডাক দিল নিশি! হঠাৎ ওর নাম ধরে  কে ডাকছে শুনেই সে ফিরে তাকাল| আচ¤ি^তে সে চমকে উঠলো| ওখানে যে তিহামী দাড়িয়ে আছে তা তার মনে হলনা| মনে হল যেন রাতুল দাড়িয়ে আছে| সে অস্ফুট ¯^রে বলেই উঠলৈা রাতুল তুমি? তিহামী বুঝতে পারলো যে ও ভুল দেখছে তাই বলল রাতুলকে কোথায় দেখলি আমিতো তিহামী| রাতুলরা যে আর কোন দিন ফিরে আসবেনা আর কোন দিন তোকে বা আমাকে জ্বালাতন করবেনা| কথাগুলো নিশিকান্তের বুকের মধ্যে শেল হয়ে বিধলো| শ্রীকান্ত ওকে দেখতে চেয়েছে এই কথাটা সে নিশিকান্তকে জানালো| অনেক অনুরোধ করেও নিশিকান্তকে রাজি করাতে পারলোনা| সন্ধ্যা তখনো হয়নি তার আগেই তিহামী ফিরে গিয়ে শ্রীকান্তকে দুঃখের এই সংবাদটি জানালো| যার জীবনটাই আর সামান্য সময় মাত্র  তার কাছে এটা কোন দুঃখই নয়| ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে এসেছে| তিহামী শ্রীকান্তকে বিদায় জানিয়ে বাড়ীতে ফিরে গেল|  সে নিজেও জানেনা যে এটাই শ্রীকান্তের সাথে তার শেষ দেখা কি না| মসজিদের মিনারে মিনারে মাগরিবের আজানের ধ্বণি আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হতে লাগলো| আর শ্রীকান্ত ক্রমে ক্রমে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে লাগলো| আজান শেষ হলে চারদিকে নিরবতা নেমে আসলো| সেই নিরবতা শশ্মানের নিরবতাকে হার মানায়| শ্রীকান্তের শরীর ক্রমশ খারাপ হতে লাগলো| একটু একটু করে কেপে উঠলো সারা শরীর| ওদিকে নিশিকান্তের মনটাও আনচান করতে লাগলো| মৃত্যু পথযাত্রী তার এক বন্ধু তাকে দেখতে চাচ্ছে অথচ সে যাচ্ছেনা এই ব্যাথায় অনুশোচনায় সে ছটফট করতে করতে অবশেষে রেললাইন ধরে দক্ষিণ দিকে হাটতে শুরু করলো| দক্ষিণ দিকে আধাঘন্টা হাটলে শ্রীকান্তদের বাড়ী| হাটি হাটি পা পা করে একসময় নিশিকান্ত ওদের বাড়ীতে পৌছে গেল| অধিক্রম  দত্তের একমাত্র ছেলে তখন মৃত্যু যন্ত্রনায় ছটফট করছে| কাঠের দুই কপাট ওয়ালা দরজা তখন খোলাই ছিল| আস্তে কওে দরজা সরিয়ে ভিতওে ঢুকলো নিশিকান্ত| ঘরের উত্তর কোণায় একটা বিছানাতে শ্রীকান্ত মৃত্যু যন্ত্রনায় ছটফট করছে| নির্বিকার চোখে ধীর পায়ে সে বিছানার কাছে এসে দাড়ালো| ওকে দেখে শ্রীকান্তেও শরীরটা কাপা বন্ধ হয়ে গেল| শত কষ্টের মাঝেও ঠোটের কোণায় এক চিলতে হাসির রেখা দেখা দিল|  শ্রীকান্ত ওকে অস্ফুট ¯^রে পাশে বসতে বললো| শ্রীকান্তের পাশে বসতে বসতে  তার চোখে জল ছলছল করে উঠলো| শ্রীকান্ত ওর হাতটা ধরতে চাইলো কিন্তু সে তাকে ওর হাতটা ধরতে দিল না| এই হাতের আঘাতের চিন&হ শ্রীকান্তের শরীরে ক্ষত সৃষ্টি করেছে| সুতরাং এই হাত সে আর কাউকে ছুতে দেবেনা| নিশিকান্ত হাতটা সরিয়ে নিল| শ্রীকান্ত ওকে অনুনয় করে বললো শেষ বারের মতো তোর হাতটা আমার হাতে রাখ একটু ছুয়ে দেখি| আর কোন দিনতো তোকে অমন করে কষ্ট দিতে পারবোনা| ওর কথা শুনে নিশিকান্তের বুকের মধ্যে ঝড় উঠলো কাপা কাপা ভাবে হাতটা এগিয়ে দিল শ্রীকান্তের দিকে| সেই হাতটা পরম মমতায় ভালবাসায় বুকের সাথে জড়িয়ে নিল মৃত্যু পথযাত্রী শ্রীকান্ত| ঐ হাতটা বুকের সাথে জাপটে ধরতেই সব কিছু পরিবর্তন শুরু হলো| একপ্রকার শীতল অনুভুতি জাগলো শ্রীকান্ত এবং নিশিকান্তের সমস্ত শরীরে| মনে হলো দুজন যেন একই মানুষ| মনে হলো একের রক্ত যেন অন্যের শরীরে শির শির করে মিশে যাচ্ছে| ওর হাতটা ধরে শ্রীকান্ত খুব আরাম বোধ করলো| মাথার ভিতরে একবার ঝিমঝিম করে উঠে সব থেমে গেল|  সমস্ত শরীরে কোন যন্ত্রণা নেই চোখের সামনে যে শূণ্যতা বিরাজ করছিল সেটিও এখন আর নেই| কেন কিভাবে এমন অনুভূতির জন্ম হলো শ্রীকান্ত তা জানেনা| হয়তো মৃত্যুর ঠিক আগ মুর্হূতে এমনটিই অনুভূত হয়| এভাবে প্রায় দশ মিনিট সে নিশিকান্তর হাতটা বুকের সাথে চেপে ধরে রাখলো| নিশিকান্ত বা শ্রীকান্ত কেউ তখনো লক্ষ্য করেনি যে এরই মাঝে অনেক কিছু ঘটে গেছে|হাতটা ছাড়িয়ে নিয়ে বাড়ি ফিরে গেল নিশিকান্ত| অধিক্রম দত্ত এবং তার স্ত্রী ভবানী দত্ত সারা দিন কান্নাকাটির ধকল সইতে না পেরে  ঘুমিয়ে পড়লো| চারদিকে কেবল বিদঘুটে অন্ধকার,কোথাও কোন সাড়া নেই|সেই অন্ধকারে শ্রীকান্ত নিজের শরীর পর্যন্ত দেখতে পেলনা| একটু দূরে মা তার জন্য একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে রেখেছিল| দমকা বাতাসে সেই মোমবাতিটিও নিভে গেছে|  দূর থেকে ভেসে আসছে ডাহুকের করুণ সুরে ডাক| সেই করুণ সুরের ডা&কও শ্রীকান্তর এখন আর খারাপ লাগছেনা| তার মনের মধ্যে একপ্রকার আনন্দই খেলা করছে| জানালার ফাক গলে আরো বেশি অন্ধকার ঘরের মধ্যে প্রবেশ করছে| এভাবে একসময় শ্রীকান্ত গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়লো| সকালে অধিক্রম দত্ত এবং তার স্ত্রী ভবানী দত্ত ধড়ফড় করে বিছিানায় উঠে বসলেন| পাশের কক্ষে তাদের রুগ্ন মৃতপ্রায় ছেলে শ্রীকান্তের কোন সাড়াশব্দ নেই|ভয়ে কুকড়ে গেলেন শ্রীকান্তের বাবা মা| দৌড়ে ঢুকেগেলেন শ্রীকান্তের কক্ষে| তাদের ছেলে তখন ঘুমিয়ে আছে আপন মনে| ছেলের কাছে গিয়ে গায়ের ওপর হাত রাখলেন অধিক্রম দত্ত| ছেলের শরীরটা ভীষন ঠান্ডা| মৃত মানুষের শরীরই এমন ঠান্ডা হয়| তাহলেকি তাদের ছেলে আর নেই| তারা গগণ বিদারী আর্তনাদ করে ওঠে| তাদের কান্নার শব্দে শ্রীকান্ত জেগে উঠে বলে বাবা মা তোমরা কাঁদছো কেন? ছেলের কথায় স¤ি^ত ফিরে পায় তারা| ছেলে বেঁেচ আছে দেখে তারা খুশি হয়| হঠাৎ ভবানী দত্ত লক্ষ্য করলেন তার ছেলের শরীরের কোথাও সেই দগদগে ঘা নেই| এমনকি গতকালও যে থেতলে যাওয়া মাংস দেখেছেন যেখানে মাছি বসতো তার কোন চিহ্নই নেই| সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে গেছে শ্রীকান্ত| এটা ঘটেছে অন্ধকারে একদম ভোজ বাজীর মতো| কোন কথা না বলে সেই সকালেই তারা মন্দিরে পূজো দিতে গেল| তাদের একমাত্র সস্তান মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছে এতেই তারা খুশি| তাদের আর কোন কিছুই চাওয়ার নেই| গোটা শহর নগর গোটা ময়মনসিংহের আর কেউ জানতে পারেনি ওখানে কী ঘটেছে | সবাই মেনে নিয়েছে শ্রীকান্ত নামের ছেলেটাও মারা যাবে| কোন একটা অজ্ঞাত কারণে সে সুস্থ হয়ে উঠেছে| ঘটনাটা তিহামী বা নিশিকান্তও জানেনা| ঘুম থেকে তখনও নিশিকান্ত জেগে ওঠেনি| দরজায় কেউ একজন আঘাত করছে আর নিশিকান্ত নিশিকান্ত বলে ডাকছে| সাতসকালে হাকডাক শুনে নিশিকান্তর মা বেরিয়ে এলেন| চোখের সামনে অক্ষত শ্রীকান্তকে দেখে তিনি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন| খানিকটা সময় নিরবতার মাঝে কেটে গেল| শ্রীকান্ত বা নিশিকান্তর মা কেউ কোন কথা বলতে পারলোনা| মাকে চুপ করে থাকতে দেখে নিশিকান্তও বিছানা ছেড়ে বেরিয়ে আসলো| তার সামনে দাড়ানো শ্রীকান্ত যার সারা শরীরে মাংস খাবলে খাবলে পড়ছিল| সে এখন তার সামনে দাড়ানো পুরোপুরি সুস্থ একজন মানুষ| নিশিকান্ত কিছুই বুঝে উঠতে পারলোনা| তার এসব মতি ভ্রম মনে হলো| গায়ে চিমটি কেটে গেখলো সে ঘুমিয়ে আছে না কি জেগে আছে| কিন্তু না তার কোন ভুল হচ্ছেনা| মাকে সাথে করে সে যা দেখছে তা বাস্তব| এর মাঝেই শ্রীকান্ত এসে ওকে বুকে জড়িয়ে ধরেছে| শ্রীকান্ত বিশ্বাস করে য নিশিকান্তর হাতটা বুকে চেপে ধরার পরই  সে ভাল হয়ে গেছে|  সে সারা শহর ঘুরলো এবং তাকে দেখে সবাই বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেল| সদর হাসপাতালের ডাক্তারেরা পর্যন্ত বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকলেন| যে মানুষটির মারা যাবার কথা ,বেঁেচ থাকার কোন সম্ভাবনাই তারা দেখেনি  সেই মানুষটিই এখন দিব্যি সুস্থ হয়ে হেসে খেলে বেড়াচ্ছে|  শ্রীকান্ত তার ছোট্ট গলার ¯^র আরো উচু করে চিৎকার করে বলতে লাগলো যে তাকে সুস্থ করেছে নিশিকান্ত| সে এও বললো যে নিশিকান্তর হাতে যাদুর ছোয়া আছে| ওর হাতটা বুকে রাখতেই সে সুস্থ হয়ে উঠেছে| খবর পেয়ে রাতুল বাদল আর অমলের বাবা মাও ছুটে এসেছে| তারা সবাই পুরোনো ব্যাথাটা আবার বুকের মধ্যে নতুন করে অনুভব করতে লাগলেন|  অমলের বাবা মা কিছু ভাবলেন না কিন্তু রাতুল আর বাদলের মা বার বার বলতে লাগলেন ওদের কবর খুড়ে বের করে নিশিকান্তর হাত ছোয়াতে হবে| বড় মসজিদের ইমাম সাহেব সব শুনে বলেছেন এটা গোনাহের কাজ আর তাছাড়া মৃত মানুষকে কোন মানুষ জীবিত করতে পারেনা| যদি জীবিত হয় তবে কেয়ামত হয়ে যাবে| কিন্তু সন্তান হারা মায়ের বাধ ভাঙ্গা আকুতি এবং সেই সাথে সবাই ইমাম সাহেবকে অনুরোধ করলেন অনুমতি দেয়ার জন্য| উপায়ান্ত না দেখে তিনি এ কাজের অনুমতি দিলেন তবে এও বলে রাখলেন যে কোন উপকার হবেনা| শেষে অনেক মানুষের উপস্থিতিতে ওদের লাশ ওপরে তোলা হল| অনিচ্ছা সত্তেও নিশিকান্ত সেই মৃত লাশের বুকের ওপর হাত রাখলো| সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলো কী ঘটতে যাচ্ছে তা দেখার জন্য| কিন্তু তেমন কিছুই ঘটলোনা| ইমাম সাহেবের কথাই যে ঠিক সেটা নিশিকান্তও জানতো তারপরও তাকে সেটা করতে হলো| সবার চক্ষু ছানাবড়া করে দিয়ে তাই রাতুল বা বাদলের মৃত দেহ জীবিত হয়ে উঠে বসলোনা| শেষে হতাশায় ডুবে যাওয়া মানুষ গুলি আবার মৃত দেহ দুটি মাটিচাপা দিল| ওপর ওপর রাতুল আর বাদলের মা পূণরায় ছেলের লাশ দেখে আরো বেশি শোকাহত হয়ে পড়লেন| একদিন দুদিন করে করে সবার মধ্যেই শোক কাটিয়ে ওঠার শক্তি সঞ্চারিত হল| ওরাও আবার স্কুলে যাওয়া শুরু করলো| শ্রীকান্ত এখন নিশিকান্তকে ভীষণ পছন্দ করে| যদিও নিশিকান্ত ওকে দূরে দূরে রাখে| এমনকি নিশিকান্ত তিহামীর সাথেও মেশেনা| এর মাঝেই ওর মা ওকে গাইড বই গুলি কিনে দিয়েছেন| তাই সে তিহামীর কাছে আগের মত বইও আনতে যায়না| দেখতে দেখতে দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষার সময় এসে গেল| পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে সবাই তখন ব্যস্ত হয়ে পড়লো| ব্যস্ত নিশিকান্ত নিজেও| তার কেন যেন মনে হচ্ছে পরীক্ষাটা খুব ভাল হবে| যখন বই খুলে পড়তে বসে তখন মনে হয় পড়াগুলি আপনাআপনিই তার মাথার ভিতরে ঢুকে পড়ছে| নিশিকান্ত তাই পড়ালেখা বা পরীক্ষা নিয়ে কুব একটা ভাবছেনা| তার মন বার বার ফিরে যাচেছ সে রাতে একজন বৃদ্ধা মহিলাকে সে সে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল| যদিও বাস্তবে তা ঘটেনি| সেই রাতে সেই সাপের চোখ থেকে যে আলোক রশ্মি বেরিয়ে নিশিকান্তর চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছিল তার পর থেকেই নিশিকান্তর মাঝে এমন পরিবর্তন| সব কিছুই ঠিক আছে কেবল ঠিক নেই একটি বিষয় আর তা হলো নিশিকান্ত কাউকে আঘাত করলেই সেখানে ঘা হয়ে যাচ্ছে| এজন্য নিজেকে বড় নিষ্ঠুর ও খারাপ মনে হচ্ছে| এসব ভেবে ভেবে নিশিকান্তর মনটা বিষিয়ে উঠছে|

   গত পরীক্ষায় ভাল করতে পারেনি বলে তিহামী এবার আরো বেশি গুরুত্ব দিয়ে পড়াশোনা করছে| তিহামীর বাবা ছেলের এই অতিরিক্ত পড়াশোনা দেখে খুব বেশি অবাক হলেন| তিনি জানেন তার চেলে ক্লাসের ফাস্ট বয়| এমনকি সে প্রতিদিন দুই ঘন্টা করে পড়লেও তার চেয়ে বেশি ন¤^র কেউ পাবেনা | তিহামীর বাবা এটা নিয়ে শুধু নিজেই গর্ব করেন না বরং স্কুলের শিক্ষকেরাও তিহামীকে নিয়ে গর্ব করে| সেই তিহামী কিনা খেলার মাঠে যাওয়া বন্ধ করে লেখাপড়ায় অত্যাধিক মনোযোগ দিয়েছে এটা অবাক হবার মতই বিষয়| এমনকি সে কম্পিউটারের সামনেও আর আগের মত বসেনা| বাসার ছাদে উঠে আর আগের মতো ঘুড়ি উড়ায় না| তিহামীর ছোট ভাই ওকে আদুরে গলায় বলে চলনা ভাইয়া ঘুড়ি উড়াই কিন্তু তিহামী ওঠেনা| তিহামীর একটাই ভাবনা সাধারণ একটা ছেলে যে কিনা কোন পরীক্ষায় চল্লিশের বেশি ন¤^র পায়না সেই ছেলেটা সব বিষয়ে সবাইকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে কিভাবে? তাই তাকে ঠিক থাকতে হলে আরো বেশি মনোযোগি হতে হবে| তিহামীর বাবা অবশ্য এসব জানে না| জানলে হয়তো তিনিও অবাক হতেন যে তার ছেলেকেও কেউ একজন টপকে যাচ্ছে| তিহামী নিজেই ব্যাপারটা বাবার কাছে চেপে গেছে| মনে করেছে কোন একটা কারণে নিশিকা&ত ওর েেয় ভাল করলেও এবার নিশ্চই ও নিশিকান্তকে পিছনে ফেলবে| সেই আশা বুকে নিয়ে তিহামী কঠোর পরিশ্রম করতে লাগলো| শিক্ষকদের সবার নজর তিহামীর ওপর| পাশাপাশি হঠাৎ ঝলসে ওঠা নিশিকান্তর ওপরও শিক্ষকদের খানিকটা নজর পড়েছে| জুলাইয়ের ২২ তারিখে পরীক্ষা শুরু হলো| তিহামী অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো  পরীক্ষার আগে নিশি ওরকাছে নোট নিতে কিংবা কোন প্রশ্নগুলো কমন আসতে পারে তা জানতে আসেনি| মনেমনে তিহামী ওকে দেমাগী সাব্যস্ত করেছে| পরীক্ষায় ভাল করে ও ওকে দেখিয়ে দেবে| প্রথম পরীক্ষার দিন দেখাগেল তিহামীর পড়ে আসা প্রশ্নই এসেছে তবে একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে| মোটামুটি সুন্দর করে সাজিয়ে গুছিয়েই সবগুলোর সে উত্তর দিয়েছে| পরীক্ষা শেষে তিহামী নিশিকান্তর কাছে ওর পরীক্ষা কেমন হয়েছে জানতে চাইলে সে জানালো পরীক্ষা ভাল হয়নি| এমনটি হবে তা আগেই ভেবেছিল তিহামী| আগ বাড়িয়ে তাই বলেই ফেললো কালকে আমার বাসায় আসলেই পারতি আমি তোকে বলে দিতাম কোন প্রশ্নগুলো আসতে পারে| তাহলেই পরীক্ষা ভাল দিতে পারতি|  ঠিক আছে আজ আসিস আমি তোকেবুঝিয়ে দেব আগামী কালের পরীক্ষায় কোনগুলো আসার সম্ভাবনা বেশি| নিশিকান্ত ওর কথায় হ্যা বা না কোন কিছুই বললোনা| তিহামী ওর কাধে হাত রেখে বললো অত ভেঙ্গে পড়ছিস কেন? আমিতো আছি| নিশি  কে জানালো বিশেষ কারণে ও যেতে পারবেনা| প্রতিযোগিতা করার ইচ্ছে থাকলেও নিশিকান্তকে মনে মনে তিহামী অনেক ভালবাসে| বিকেলে তাই নিজেই সে নিশিদের বাড়িতে আসলো| ওকে দেখে নিশিকান্তর মা ভীষণ খুশি| এমন একটা মেধাবী ভদ্র ছেলে তার ছেলের সাথে মেশে ,বাসায় আসে সেটা খুশির কথা| যে কোন বাবা মাই চায় তার ছেলের মেয়ের বন্ধুরা হোক মেধাবী ভদ্র এবং মানবীয় গুনাবলীর অধিকারী| কিছু বাবা মা আছে ভিন্ন| তারা তাদের স্ট্যাটাস নিয়ে ভীষণ চিন্তিত থাকে| ছেলেকে তাই গরীব বন্ধুদের সাথে মিশতে দিতে চায়না| যার ফলশ্রুতিতে বড়লোক বখাটে ছেলেদের সাথে মিশে সুন্দর ছেলেটাই হয়ে ওঠে অমানুষ| বন্ধু নির্বাচনে আভিজাত্যকে প্রাধান্য দিতে হয়না| প্রাধান্য দিতে হয় মানুষের মেধা,চরিত্র এবং মানষিকতাকে| বন্ধু কখনো অন্য বন্ধুর বাসায় এসে চিরকাল পড়ে থাকেনা| কিংবা সাহায্যের জন্যও হাত পেতে থাকেনা| পরস্পরের মধ্যে সুখদুঃখ ভাগাভাগি করে নেয়ার নামই প্রকৃত বন্ধুত্ব| বয়সের ফ্রেমে বন্ধুত্বকে বেধে রাখা ঠিক নয়| একজন এগার বছরের ছোট্ট ছেলের সাথে পচিশ বছর বয়সের এক যুবকের বন্ধুত্ব হতেই পারে এতে দোষের কিছু নেই| এতে করে পরস্পর পরস্পরের কাছ থেকে অনেক কিছু শিখতে পারে| নিশিকান্তর মা তাই তিহামী দেখে বেশি খুশি| নিশি তখন পড়ার টেবিলে বই খুলে নিয়ে বসে আছে| চোখ ড়ুটো বইয়ের পাতায় না রেখে খোলা জানালা দিয়ে সুদুর আকাশের  সীমাহীন নীলিমায় তাকিয়ে আছে| নিশি ইদানিং দার্শনিকের মতো তাকিয়ে থাকে এটা শ্রীকান্তের অভিব্যক্তি| তাকে দেখলে সব সময় ভাবুক মনে হয়| তিহামী ওর পাশেগিয়ে বসেছে অথচ ও টেরও পায়নি| ওর কাধে একটা হাত রাখতেই নিশি ফিরে তাকালো| ওর চোখের নিচে কালো দাগ পড়েছে| অনেক দিন না ঘুমোলে যেমনটি হয় ঠিক সেরকম| তিহামী ভেবেছে  ও পড়ালেখা নিয়ে এত চিন্তিত| তিহামী ওকে আবার শান্তনার সুরে বললো আমি যেগুলো বলছি এগুলো পড় তাহলেই সব কমন পড়বে| নিশিকান্ত মাথা নাড়লো| এটা সম্মতি জ্ঞাপন নয় সে বরং মুখ দিয়ে বললো তার মনে হয় ঐ প্রশ্নগুলোর সবগুলো আসবেনা| সে নিজেই তিহামীকে কিছু প্রশ্ন  দেখিয়ে বললো আমার মনে হয় এগুলো আসবে| নিশির দেকানো প্রশ্নগুলো মনে রাখলো তিহামী| বাসায় ফিরে এসে নিজের পছন্দ মতো প্রশ্নগুলো পড়ার পর চিন্তায় ডুব দিল| নিশির কথা ফেলে দেয়ার মত নয়| গত পরীক্ষাতেও সে যা বলেছিল সেগুলোই এসেছিল| তিহামী তাই অতিরিক্ত হিসেবে ঐ প্রশ্নগুলোও পড়ে রাখলো| পরদিন পরীক্ষা দিতে গিয়ে তিহামী  নিশিকান্তর অনুমানযে একশ ভাগ সত্য তার প্রমান পেল|  এরপরদিন থেকে প্রতি পরীক্ষায় নিশিদের বাড়ীতে গিয়ে ওর কাছ থেকে সাজেশান্স নিয়ে তিহামী সে অনুযায়ী পরীক্ষা দিতে লাগলো| ফলাফল সেই আগের মতই| তিহামীকে ছাড়িয়ে নিশি অনেক বেশি ন¤^র পেল| ক্লাসে ওর মর্যাদা বৃদ্ধি পেল| যারা ওকে দূরে দূরে রাখতো তারাও ক্রমে ক্রমে ওর বন্ধু হতে শুরু করলো| তিহামীতো ওকে আরো বেশি পছন্দ করতে শুরু করলো| নিশিকান্তদের ঘরের সাথে লাগোয়া কোন বাথরুম নেই| ভদ্র সমাজে যেটাকে এটাচ বাথরুম বলে| বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে বাঁশ ঝাড়ের পাশে টিনের বেড়া দেয়া টয়লেট| নিশিকান্তদের বাসা শহরে হলেও ওদের বাড়ীটা যে জায়গাতে সেটা অনেকটাই গ্রাম্য পরিবেশ| এক অন্ধকার রাতে নিশি বের হলো বাথরুমে যাওয়ার জন্য|  চারদিকে তখন কোথাও কোন আলো নেই| কোথাও কোন পাখিদের ডাক নেই| সারা শহরে একটা জনমানুষ জেগে নেই| কেবল কিছু রাতপ্রহরা ঝিঁঝিপোকা অবিরাম ডেকে চলেছে| নিশিকান্ত ঘর থেকে বেরিয়ে একাকী হাটছে আর এই বিচিত্র প্রাণী ঁিঝি পোকার কথা ভাবছে| নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করলো আচ্ছা ঝিঁঝি পোকার ইংরেজি কী? নিজেই আবার উত্তর দিল জানিনাতো| ঠিক তখনই ও শুনতে পেল কেউ একজন ওর কানের কাছে  ফিসফিসিয়ে বলছে ঘরে ডিকশনারী আছে দেখেনাও| নিশিকান্ত চারদিকে খুজেও কাউকে না পেয়ে বাবলো নিজের মনই হয়তো কথাটা বলেছে| সে তখনই ঘরে গিয়ে অভিধানটা খুলে দেখলো ঝিঁঝিপোকার ইংরেজি হচ্ছে ক্রিকেট| এটা দেখে ওর খুব আন্দ হলো|  যে খেলাটা সবার প্রিয় সেটার অর্থই ঝিঁঝিপোকা! স্কুলে বন্ধুদেরকে জিজ্ঞেস করে তাক লাগিয়ে দেয়া যাবে| ভাবতে ভাবতে সেআবার ঘর থেকে বের হয়ে বাথরুমের দিকে যেতে লাগলো| হঠাৎ একটা আলোর ঝলকানি চারদিকে মুহূর্তের জন্য আলোকময় করে সা করে চলে গেল|  ও জানতো এটা একটা উল্কাপিন্ড তাই ওকে এটা বেশি ভাবান্তর করলোনা| নিশিকান্ত বাথরুমের কাজ শেষ করে পানির বদনাটা খুজতে গিয়েই পড়লো বিপত্তিতে| মনে পড়লো পানির বদনাটা উঠোনেই ফেলে রেখে চলে এসেছে| এখন কী করা যায় ভাবতেই ওর হাসি পাচ্ছিল| ঠিক এমন সময় ও দেকলো টয়লেটের দরজাটা আপনা আপনি খুলে যাচ্ছে এবং শূণ্যে বাসতে ভাসতে পানির বদনাটা ওর সামনে এসে নিচে মাটিতে নেমে গেল| টয়লেটের দরজাটা তখন ভেতর থেকে বন্ধ ছিল | কিন্তু কিভাবে খুলে গেল ,কে খুললো তা ভেবে ও ভয় পেয়ে গেল| শেষে তাড়াহুড়ো কওে পানি খরচ কওে হাত ধুয়ে দ্রুত ভয়ে ভয়ে বেরিয়ে আসলো| কিছুক্ষণ পরেই ও লক্ষ্য করলো ওর জড়তা ভয় সব কেটে গেছে| সব কেমন ভূতুতে কান্ড বলে ওর মনে হলো| দ্রুত বিছানায় গিয়ে কাথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকে| সকালে ঘুম থেকে উঠেও মাকে কিছু বলেনা| ঐ দিনের পর থেকে নিশিকান্ত অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো সে যখন যেখানেই যায় মনে হয় কেউ একজন তার পিছনে পিছনে হাটছে| পিছন ফিওে তাকাতেই সে কাউকে দেখতে পায়না| এভাবেই সুখে দুখে কাটতে থাকে মা ছেলের ছোট্ট সংসার| এর কিছুদিন পর মুকুল নিকেতন স্কুলের উত্তর পার্শ্বে যে চারতলা বিল্ডিংটি দেখা যায় ঐ বিল্ডিং এর ছাদে উঠেছিল তিহামী নিশিকান্ত এবং ওদেও বন্ধুরা| হঠাৎ ধাক্কা ধাক্কি করতে গিয়ে অনিক নামের ছেলেটা পা পিছলে ছাদ থেকে পড়ে যাচ্ছিল| নিশিকান্ত সেটা দেখেই দ্রুত ওর হাত টেনে ধরলো|  শেষে বিপদ যা ঘটার ঘটে গেল| অনিকের মোটা শরীরের ভার সইতে না পেরে টান  লেগে অনিকেরসাথে সাথে চারতলা থেকে নিশিকান্তও পড়ে গেল| ওদের দুজনের পড়ে যাওয়ার শব্দে চারদিক থেকে ছাত্র ছাত্রী ও শিক্ষকেরা ছুটে আসলেন| নিশিকান্ত ততক্ষণে শোয়া থেকে উঠে বসেছে| পাশে নিশ্চুপ অবস্থায় অষাড় হয়ে পড়ে আছে অনিক| অনিকের কোন সাড়া শব্দ নেই| নিশিকান্ত অবাক বিস্ময়ে নিজের শরীর দেখতে লাগলো| চারতলা থেকে পড়ে গিয়েও ওর হাড়গোড় একটুও ভাঙ্গেনি,মচকায়নি এমনকি একটু আচড়ও লাগেনি| ওদিকে একই সাথে অনিকও ছাদ থেকে পড়ে গিয়েছে কিন্তু তার কোন সাড়াশব্দ নেই| নিরবতা ভেঙ্গে বিজ্ঞানের স্যার দীনেষ কান্তি নাথ অনিকের লুটিয়ে পড়া দেহের কাছে এসে বসলেন| গায়ে হাত দিয়ে ধাক্কা দিলেন| অনিক অনিক বলে বার কয়েক ডাকও দিলেন | কিন্তু অনিকের কোন সাড়া নেই| নিজে যতটুকু বোঝেন তাতেই হাত ধরে নাড়ির স্পন্দন দেখলেন| মনে হল সেখানে সব গুলো ধমনী নিস্তেজ হয়ে গেছে| শেষে তাড়াহুড়ো করে অনীককে সদর হাসপাতালে নেয়া হলো| ডাক্তারেরা অনিক নামের ফুটফুটে ছেলেটাকে মৃত ঘোষনা করলেন| আবার একটা লাশ কাধে করে সবাই ছুটলো কালী তলা শশ্মানে| চোখ বেয়ে বেরিয়ে আসলো ব্যাথার অশ্রু| সবাই আরো বেশি অবাক হলো নিশিকান্তকে দেখে| একই সাথে সেও ছাদ থেকে নিচে পড়ে গিয়েছিল  অথচ তার কিছুই হলোনা! চারদিকে গুঞ্জন উঠলো এই ছেলে নিশ্চই যাদু জানে| আবার কেউ কেউ বলতে লাগলো এ আসলে মানুষ না মানুষের ছদ্মবেশে প্রেতাত্মা| কেউ কেউ বললো ওর সাথে জ্বীন ভূত আছে| নইলে এত্তো সব কান্ড ঘটে| কোন কোন গার্ডিয়ান জোর আওয়াজ তুললো এই অভিশপ্ত অপায়া ছেলেটাকে স্কুল থেকে বের করে দিতে হবে নইলে আমাদের বাচ্চাদের এই স্কুলে আর রাখবোনা| ঐ ছেলের সাথে মারামারি করে তিন তিনটে ছেলে অকালে প্রাণ দিয়েছে| ঐ ছেলের সাথে থেকে আজ আবার আরেকটা ছেলে প্রান দিল| সব ওর দোষ ওকে স্কুল থেকে বের করে দিন| গার্ডিয়ানদের কেউ কেউ নিরব থাকলো আবার কিছু সংখ্যক গার্ডিয়ান নিশিকান্তর পক্ষ নিয়ে বললো শুধু শুধু আপনারা ছেলেটার ওপর দোষ চাপাচ্ছেন কেন? তিনটা ছেলে মারা গেলেও শ্রীকান্ততো বেঁেচ গেছে| তাহলে ছেলেটার দোষ কোথায়? এমনকি ছাদ থেকে পড়ে যাওয়ার সময় নিশিকান্ত নিজেওতো ওকে বাঁচাবার জন্য চেষ্টা করেছে| কিন্তু অধিকাংশ গার্ডিয়ান এসব কথা গায়ে মাখলোনা| শেষে সবাইকে বুঝিয়ে সুজিয়ে প্রধান শিক্ষক সিদ্ধান্ত নিলেন  ফাইাল পরীক্ষা শেষ হলে তার পর না হয় নিশিকে টিসি দিয়ে দেয়া যাবে| সকলের সব কথা শুনে নিশিকান্তর মনটা বিষিয়ে উঠলো| ইচ্ছে হলো বই খাতা সবার মুখে ছুড়ে মেরে মুখে থুথু ছিটিয়ে স্কুল থেকে বেরিয়ে যায়| আর স্কুল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় মুখে বলতে বলতে যাবে এই স্কুলের নিকুচি করি| মনে মনে জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে গেলেও নিশিকান্ত মুখে কিছু বললোনা| সে তার মাকে অনেক ভালবাসে| মা যা বলে ও শুধু তাই করে| এখন ওকে নিয়ে যত কথাই হোকনা কেন মায়ের কথা ছাড়া আর কারো কোন কথাই ও কানে তুলবেনা| নিশিকান্তর মা চিন্তায় পড়ে গেলেন| চিন্তায় পড়ে গেল তিহামী এবং শ্রীকান্ত| নিশিকে ছাড়া ওদের একদিনও চলবেনা| শিক্ষকদের চিন্তা আরো বেশি| ছাত্র হিসেবে নিশিকান্ত এখন সবার চেয়ে ভাল| তাকে স্কুল থেকে বের করে দেয়া ঠিক হবেনা| আর তাছাড়া শিক্ষকদের কারো কাছেই মনে হয়না যে সব ঘটনা ঘটেছে তার জন্য আসলেই নিশিকান্ত দায়ি| আবার ওকে স্কুলে রাখলেও বিপদ| অন্য অভিভাবকেরা হুমকি দিয়েছে তাদের বাচ্চাকে নিয়ে যাবে| এক নিশিকান্তর কথা চিন্তা করেতো আর স্কুলের অনেক বাচ্চা হারাতে চাবেনা| শিক্ষকেরা কেবল ভাবতে লাগলেন আসলে কি করা উচিৎ| নিশিকান্ত ওসব নিয়ে মাথা ঘামালোনা| সে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী বালক| চিন্তা শুধু কেবল মাকে নিয়ে| মা ওর চিন্তায় চিন্তায় পাগল হয়ে যাবে| মা ওকে ঘিরে কত শত ছবি আকে ¯^প্ন দেখে | সেই ¯^প্নকে যেকরেই হোক বাস্তবায়িত করবে বলেই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ বালক নিশিকান্ত| খেয়ে না খেয়েও স্কুলে যেতে তাই নিশিকান্তর কোন আপত্তি ছিলনা| ও নিজে একা হলে কোন কথাই ছিলনা| কোন না কোন স্কুলেতো ওকে অবশ্যই ভর্তি করে নেবে| ঐদিন বিকেলে আগের মতই একাকী বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে রেল লাইনের ওপর বসে থাকলো নিশিকান্ত| খুজতে খুজতে তিহামী আর শ্রীকান্তও ওর কাছে চলে আসলো| সত্যিকারের বন্ধুর মতো ওর পাশে বসে ওর কাধে হাত রাখলো| অনেক কিছু নিয়ে কথা হল| ওরা দুজনে ওকে শান্তনা দিয়ে ওকে বললো দেখিস কিছুই হবেনা| তোর কোন দোষ নেই| এসব কথায় নিশিকান্তর মনের কোন পরিবর্তন হলনা| তারমন না দুঃখ বারাক্রান্ত আর না আনন্দে উদ্বেলিত| সে সরল মনেই বললো ওসব নিয়ে আমি কিছু ভাবছিনা| আমি ভাবছি আমাদের স্কুলে এমন একটা সংগঠন খুলবো যারা ব্যাথিত মানুষের পাশে গিয়ে দাড়াবে| যেসব ছাত্র ছাত্রী গরীব তাদেরকে সাহায্য করবে| ওর কথা শুনে তিহামী এবং শ্রীকান্ত বেশ পুলকিত হলো| কী কী পরিকল্পনা করেছে তা জানতে চাইলো| শেষে নিশি ওদেরকে সব খুলে বললো| প্রথমে আমাদের ক্লাস থেকে কাজ মুরু করবো| আমরা যারা মোটামুটি সচ্চল পরিবার থেকে এসেছি অর্থাৎ যাদের বাবা মা প্রতিদিন আমাদের টিফিনের জন্য কিছু কিছু টাকা দেয় সেই সব ছাত্র ছাত্রীরা প্রতি মাসে টিফিন থেকে অন্তত পাঁচ টাকা বাচিয়ে একজনের কাছে জমা রাখবো| আমাদের ক্লাসে যেহেতু আড়াইশো ছাত্র ছাত্রী তাহলে তাদের ভিতর থেকে প্রায় দুইশো জন আছে যারা টিফিন থেকে এভাবে টাকা জমাতে পারি| দুইশো জন পাঁচ টাকা করে দিলে প্রতি মাসে এক হাজার টাকা জমা হবে| সেই টাকা আমরা আমাদের গরীব বন্ধুদের দেব যাতে করে তা দিয়ে তারা খাতা কলম কিনতে পারে| আমরা এর পর অন্য ক্লাস গুলোতে যাব এবং তাদেরকে বুঝাবো| এভাবে সবাই যদি এগিয়ে আসে তবে সবার মধ্যে বন্ধুত্ব সৃষ্টি হবে| আমাদের ছোট ছোট দুঃখ গুলো দূর হয়ে যাবে| ওর কথা শুনে আনন্দে একেবারে হাত তালি দিয়ে উঠলো তিহামী এবং শ্রীকান্ত| পরিকল্পনা করতে করতে ওদের অজান্তেই অনেক রাত হয়ে গেল ওরা তা টেরই পেল না| একসময় খেয়াল হল চারদিক অন্ধকার হয়ে গেছে বাড়ি ফিরতে হবে| তিন জনই উঠে পড়লো এবং রেললাইন ধরে হাটতে লাগলো| পথে যেতে যেতে তিহামী মনের অজান্তেই বলে ফেললো ঐ গার্ডিয়ানগুলো কিরকম দেখলি! নিশি ফাষ্ট হচ্ছে দেখে সব দোষ ওর ঘাড়ে চাপিয়ে ওকে তাড়ানোর ফন্দি আটছে| ওদের মুখ যদি বন্ধ হয়ে যেত তাহলে কেমন হতো? নিশিকান্ত কোন উত্তর দিলনা| শ্রীকান্ত বললো খুব ভাল হত| ওনারা মজা টের পেতেন| এবার দুজন মিলে নিশিকান্তর মতামত জানতে চাইলো| দুজনের ভীষন রকম চাপাচাপিতে শেষে বাধ্য হয়েই নিশিকান্ত বলে ফেললো ঠিক আছে বন্ধ হয়ে যাক| বন্ধ হলেই যদি ভাল মনে হয়| শ্রীকান্ত বা তিহামী কিছুই টের পেলনা কিন্তু নিশি ঠিকই শুনতে পেল তার কানের কাছে কেউ একজন ফিসফিস করে বলছে তুমি যখন বলছো তখনতো বন্ধ হতেই হবে| নিশিকান্ত চমকে উঠলো| সর্বনাশ ! একথাটা কেন সে মুখে উচ্চারণ করলো| সত্যি সত্যি যদি ওনাদের কথা বন্ধ হয়ে যায় তাহলে আর উপায় থাকবেনা| কিন্তু কানের কাছে কে ফিসফিস করে কথা বললো? প্রথমে ভাবলো তিহামী বা শ্রীকান্ত ফিসফিসিয়ে কথা বলেছে পরক্ষনেই ওর মনে হলো ওরা কেউ বলেনি| ওরা বললে ফিসফিসিয়ে বলতো না| এদিক ওদিক ফিরে দেখলো কাউকে দেখা যায় কিনা কিন্তু কাউকে পেলনা| নিশিকান্তর এহেন আচরণ দেখে ওরা দুজনও অবাক হলো| জিজ্ঞেসকরলো ওভাবে কী দেখছিস?  নিশিকান্ত বললো কে যেন কানের কাছে ফিসফিসকরে কথা বলছে| তোরা কি কেউ শুনতে পাচ্ছিস? ওরাও তাকিয়ে দেখলো কেউ নেই তখন ওরা বললো না আমরাতো কিছু শুনতে পাচ্ছিনা| শেষে নিশি ভাবলো ও নিজেই মনের ভুলে এসব চিন্তা করছে| সব মনের ভুল ভেবে তিনজনই নিজ নিজ বাসায় ফিরে গেল|

  আগষ্টের দ্বিতীয় রবিবার মুকুল নিকেতন স্কুলটা এগারটারমধ্যেই ছুটি হয়ে গেল এবং নোটিশ আসলো স্কুল আগামী তিনদিন বন্ধ থাকবে| কেন বন্ধ থাকবে কিসের বন্ধ তা ছাত্র ছাত্রীরা কেউ বুঝে উঠতে পারলোনা| রাস্তায় যেতে যেতে ছাত্র ছাত্রীরা খুব আলোচনা করতে লাগলো| দু চারজন ছাত্র ছাত্রীকে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে দেখা গেল| শ্রীকান্ত ভাবলো আহা বেচারীরা স্কুলটাকে কতইনা ভালবাসে যে স্কুল বন্ধ হয়েছে বলে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে| তিহামী ওর কথা মানলোনা বললো এরাতো দুষ্টুর শিরোমনি,একদিন স্কুল বন্ধ হলে এদের ভীষণ আনন্দ হয়| নিশ্চই ওরা অন্য কোন কারণে কাঁদছে| ওরা তখন একজনের কাছে গিয়ে তার কাধে শান্তনার হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো কাদিস না মাত্র তিনদিন পরইতো স্কুল আবার খুলবে তখন আবার মজা করবি| ছেলেটা ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছিল এবং সেই অবস্থাতেই জানালো যে সে স্কুলের জন্য কাঁদছেনা | রহস্যের গন্ধ পেয়ে তিহামী ছেলেটার গা ঘেসে দাড়িয়ে সুর নরম করে ওর কান্নার কারন জানতে চাইলো| ছেলেটা ওদের যা জানালো তাতে ওদের ভীমরতি খাবার উপক্রম| ছেলেটার বাবা তাদেরই একজন যারা স্কুলে এসে উচ্চবাচ্য করেছিল এবং নিশিকান্তকে স্কুল থেকে তাড়িয়ে দেবার দাবী তুলেছিল| সেই লোকটি ঐ দিনের পর থেকে এই এক সপ্তাহ কোন কথা বলতে পারছেনা শুধু আ আ শব্দ করছে| এটা শুনে নিশিকান্তদের চোখ কপালে| কোন মতে শান্তনা দিয়ে কান্না রত আরেকটি ছেলের কাছে গিয়ে একই ভাবে তার কান্নার কারণ জানতে চাইলে সেও জানালো তার বাবা কথা  বলতে পারছেনা| নিশিকান্তর কাছে ব্যাপারটা পুরোপুরি পরিস্কার হয়ে গেল| তার মুখের কথাই ফলে গেছে| এটা নিশ্চই যে ফিসফিস করে কথা বলেছিল তার কারসাজি| এটাও পরিস্কার হয়ে গেল যে স্কুল কেন তিনদিন ছুটি ঘোষনা করা হয়েছে| শুধু পুরোপুরি পরিষ্কার নয় তিহামী বা শ্রীকান্তর কাছে| অবশেষে ওরা একে একে সবার কাছেই জানতে পারলো যে সবার বাবার ক্ষেত্রেই একই ঘটনা ঘটেছে| সারা পথ হাটতে হাটতে তিহামী এবং শ্রীকান্তকে অনেকটা উৎফুল্লই মনে হল| বার কয়েক বলেই ফেললো যে আমাদের প্রার্থনা কাজে লেগেছে,ব্যাটারা শাস্তি পেয়েছে| ওদের কথায় নিশিকান্তর মনে তেমন কোন ভাবান্তর হলোনা| সে নিরবে নিজের মত করে চিন্তা করতে করতে হাটতে থাকলো| ওর এখন অনেক ভাবনা| সেই ভয়াল রাতের পর থেকে সে মুখে যা উচ্চারন করছে তাই ফলে যাচ্ছে| এখন থেকে সব কিছু ভেবে চিন্তে বলতে হবে| বাসায় ফিরতে ফিরতে ওদের দুপুর গড়িয়ে গেল| কথা ছিল স্কুল থেকে ফিরে নদীতে যাবে গোসল করতে| কিন্তু বাড়ি ফিরে নিশিকান্তর একটুও ইচ্ছে হলনা নদীতে যেতে| সে দুপুরে কোন মত খেয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল এবং গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল| ঘুমের মাঝে সে নানা রকম ¯^প্ন দেখতে লাগলো| ওদিকে বন্ধুরা সবাই নদীর ঘাটে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করে করে শেষে নিজেরা গোসল করে ফিরে গেল| খোঁজ নিয়ে দেখা গেল সত্যি সত্যি ঐ দিন যে সব গার্ডিয়ান নিশিকান্তকে স্কুল থেকে বের করে দেয়ার দাবী জানিয়েছিল তারা কেউই কথা বলতে পারছেনা| স্কুল বন্ধ তাই তিহামীর ইচ্ছে হল ঐ লোকগুলিকে একটু দেখতে যাবে| সে শ্রীকান্তকে রাজি করিয়ে নিশিকান্তদের বাড়ীতে গেল| নিশিকান্ত কিছুতেই যেতে রাজি নয়| তার পরও ওরা নাছোড়বান্দা| শেষে তিনজন মিলে লোকদের দেখতে বের হলো| প্রথমে ওরা সানীর বাবাকে দেখতে গেল| দেখা গেল তিনি নির্বাক বসে আছেন| ওদের দেখে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলেন কিন্তু কিছুই বলতে পারলেন না| সানী বারান্দার একপার্শ্বে মুখ গোমরা করে বসে আছে| সানীর মা ¯^ামীর পাশে মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে| ওদের দেখেও তার মধ্যে তেমন কোন পরিবর্তন দেখা গেল না| এরপর ওরা গেল নিতাইদের বাসায়| নিতাইয়ের বাবা শ্যামল দত্ত এমনিতে ভীষণ রাগী মানুষ কিন্তু গিয়ে দেখা গেল একদম শক্তিহীন রোগা মানুষের মত তিনিও নিশ্চুপ হয়ে গেছেন| ওদের দেখে তার চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়লো| নিতাই ওর মাকে ওদের তিনজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল| নিশিকান্তর নাম শুনতেই নিতাইয়ের মা রেগেমেগে আগুন| পারলে তখনই নিশিকান্তকে প্রায় মেরেই বসে| নিশিকান্তর বিরুদ্ধে তার হাজারটা অভিযোগ| তার ধারনা নিশিকান্তর জন্যই তার ¯^ামী আজ কথা বলতে পারছেনা| সে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করলো| অন্তরের বিষ ঢেলে দিল নিশিকান্তর ওপর| একজন মানুষ কতক্ষণ মুখ বুজে গালিগালাজ সহ্য করতে পারে? নিশিকান্তর মাথায় রাগ উঠে গেল| সেও বড় মানুষের মত রাগে ফুলতে লাগলো| ওর চেহারা অগ্নিমুর্তি ধারন করলো| শরীর থেকে গরম হাওয়া বেরতে লাগলো| চিৎকার করে বললো চুপ করুন আপনি| আমার জন্য আপনার ¯^ামীর কথা বলা বন্ধ হয়েছে তাইনা? আপনার ¯^ামীতো ভান ধরেছে কথা না বলার| আমি তার ভান এক্ষুনি ছুটিয়ে দি&িচ্ছ বলেই কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই বারান্দার কোনায় পড়ে থাকা ফুল ঝাড়ুটি তুলে নিয়ে নিতাইয়ের বাবার পিঠে সপাং সপাং দুবার মেরে বসলো এবং বললো কথা বল শালা হারামি| মুখ বন্ধ করে ভান ধরেছিস? ওর আচরণে নিতাই সহ উপস্থিত সবাই হতভ¤^ হয়ে গেল| এরপরই হঠাৎ থেমে গেল নিশিকান্ত| রাগের মাথায় কী অন্যায়টাই না করে ফেলেছে সে| এমন সময় সত্যি সত্যিই কথা বলে উঠলো নিতাইয়ের বাবা| সবাই ভীষণ খুশি হল| নিশিকান্ত কী করেছে তাও সবাই ভুলে গেল| কোন কিছু ঘটার আগেই নিশিকান্ত নিতাইদের বাসা থেকে হন হন করে বেরিয়ে গেল| ওর দেখাদেখি তিহামী এবং শ্রীকান্তও বেরিয়ে পড়লো| এরপর ওরা আর অন্যদের বাসায় যাওয়ার সাহস করলোনা| আবারও চারদিকে সাড়া পড়লো নিশিকান্তকে নিয়ে| অন্য যারা কথা বলতে পারছিলনা তারাও নিশিকান্তদের বাড়ীতে হাজির হল| সকলের অনুরোধে নিশিকান্ত সবকটাকে ঝাড়ুপেটা করলো কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলোনা| লোকগুলো নিতাইয়ের বাবার মত কথা বলা শুরু করলোনা| হতাশ হয়ে সবাই ফিরে গেল| কেবল কিছু দুষ্টু ছেলে মেয়ে হেসে গড়াগড়ি যেতে লাগলো এই ভেবে যে বড় বড় মানুষগুলি নিশির হাতে কিভাবেইনা ঝাড়ুপেটা খেল| ডাক্তারেরা কোন রকম অসংগতি খুজে পাননি যার কারণে লোকগুলোর কথা বলার শক্তি হারিয়ে যাবে| ওদিকে তিনদিন পর স্কুল আবার খুলে দেয়া হলো| আবার নিশিকান্তরা স্কুলে যাওয়া শুরু করলো| মাত্র পনের দিনের ব্যাবধানে ওদের ক্লাসে দেড়শো ছাত্র ছাত্রী ওদের সংগঠনে যোগ দিল|  প্রথমে সিদ্ধান্ত নিল মাসে প্রতি ছাত্র পাঁচ টাকা জমা দেবে| পরে দেখা গেল সবাই দশ টাকা দিতে রাজি হয়েছে| সংগঠনের কমিটি গঠন করা হলো| অধিক্রম দত্ত স্যারকে প্রধান উপদেষ্টা এবং মনিরা মিসকে নারী উপদেষ্টা করে ষোল সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষিত হল| ঐ দিনই কম বেশি সবাই টাকা জমা দিয়ে দিল| এক মাস যেতে না যেতেই দেখা গেল ওদের সহায়তায় অন্য ক্লাসগুলোও উদ্যোগ নিয়ে কমিটি গঠন করে টাকা জমা করতে শুরু করেছে| স্থানীয় এবং জাতীয় পত্রিকায় ওদের এই সুন্দর উদ্যোগের সংবাদ ছাপা হল এবং এর একটি সুন্দর নাম আহ্বান করা হল| বিভিন্ন মহল থেকে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেল| শেষে অনেক গুলি নামের মধ্য থেকে “আলোর মেলা” নামটা সবার পছন্দ হলো| এই সংগঠনে যারা কাজ করছে তারাতো সবাই সত্যি সত্যি এক একজন আলোকিত মানুষ যারা অন্যদেরকেও আলোকিত করার চেষ্টা করছে| সেদিন থেকেই আলোর মেলার যাত্রা শুরু হলো| কিশোরগঞ্জ থেকে এ্যাডভোকেট হাসান ইমাম এই নামটি পাঠিয়েছেন| সাথে পাঠিয়েছেন দুই হাজার টাকা এবং কিছু দিক নির্দেশনা| ভদ্রলোকের প্রতি অনেকটা চির কৃতজ্ঞই থেকে গেল নিশিকান্তর দল|  দুই মাস পর দেখা গেল শুধু মুকুল নিকেতন স্কুলেই জমা পড়েছে একত্রিশ হাজার টাকা| শিক্ষকেরাও কিছু কিছু টাকা দিতে লাগলেন| সেই টাকায় দরিদ্র ছেলে মেয়েরা ভাল ভাবে পড়া লেখা করার সুযোগ পেতে থাকলো| ওদের এই উদ্যোগের কথা পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর জিলা স্কুল ,বিদ্যাময়ী স্কুল সহ অন্যরাও অণুপ্রানিত হয়ে এই মহান কাজটা শুরু করলো| আলোর মেলা দিন দিন আরো সম্প্রসারিত হতে লাগলো এবং আলোর মেলাতে আরো বেশি আলোকিত মানুষের ভীড় বাড়তে লাগলো|  সংগঠন বাদ দিলে পড়ালেখা সবারই আগের চেয়ে ভাল চলছে| একে অন্যকে পড়া বুঝিয়ে দিচ্ছে| এতে করে স্কুলে সত্যিকারের পড়ালেখার পরিবেশ ফিরে এসেছে| নভে¤^রের প্রথম সপ্তাহে ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হল| রাতের আকাশে পূর্ণ চন্দ্র আর তারার মেলা| দিনে পরীক্ষার চিন্তা| প্রথম দিন পরীক্ষা দিয়ে এসে নিশিকান্ত দ্বিতীয় দিনের পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে লাগলো| কিন্তু পড়া কিছুতেই তার মাথায় ঢুকলোনা| কোন পড়াই সে আর মুখস্ত করতে পারছেনা| পরীক্ষার ফলাফল বেরনোর পর তাই সবার চক্ষু ছানাবড়া| নিশিকান্ত গণিত ইংরেজি,বিজ্ঞান সহ ধর্ম বিষয়েও ফেল করেছে| যে নিশিকান্ত গত দুই পরীক্ষায় সবাইকে ছাড়িয়ে সর্বোচ্চ ন¤^র পেয়েছিল সে কিনা শেষ পরীক্ষায় কোন বিষয়েই পাশ করতে পারেনি| সবার ধারণা সংগঠনে সময়  দিতে গিয়ে তার পড়ালেখার এই করুণ পরিনতি| কিন্তু ভালভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যায় নিশিকান্ত সংগঠনের জন্য তেমন সময় দেয়নি বরং পড়ালেখায় তার মন ছিল বেশি| এছাড়া পরীক্ষার আগে সেইতো ক্লাসের অন্যদের বুঝিয়েছে | সেই সব প্রশ্ন লিখেই অন্যরা ভাল রেজাল্ট করেছে অথচ নিশিকান্ত পাশ করতে পারেনি|  নিয়ম অনুযায়ী কোন ছাত্র ছাত্রী পাঁচ বিষয়ের ওপরে ফেল করলে তাকে স্কুল থেকে বের করে দেয়া হয়| তাই আরেকবার সুযোগ চেয়েও নিশিকান্ত পার পেলনা| তাকে টিসি দিয়ে বের করে দেয়া হলো| ছেলের এই দুসংবাদে মা ভারতী দেবী পাগলের মতো হয়ে গেলেন| সামনে যাকে পান খামচি মারেন,কামড়াতে আসেন| এ অবস্থায় অন্য  কোন স্কুলই নিশিকান্তকে ভর্তি করতে রাজি হলনা| এমনকি নিজের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত “আলোর মেলা” নামক সংগঠনও তার পাশে এসে দাড়াতে পারলোনা স্কুল কমিটির চোখ রাঙ্গানীর ভয়ে| গোটা ময়মনসিংহে নিশিকান্তদের আত্মীয় বলতে আর কেউ নেই| এখানে থাকলে নিশ্চিত ওর মা এবং ও না খেয়ে মারা যাবে| ভেবে চিন্তে কোন উপায় বের করতে পারলোনা| যাওবা দিদি ছিল সেও গত বছর সিলেটে চলে গেছে| অনেক ভেবে চিন্তে শেষে সিদ্ধান্ত নিল জামালপুর যাবে| ওখানে মায়ের এক পিসতুতো ভাই আছে,এক সময় মা তাকে অনেক সাহায্য করেছে| এই বিপদের সময় সে নিশ্চই সাহায্য করবে ভেবে নিশিকান্ত মাকে নিয়ে জামালপুরের ট্রেনে চেপে বসলো| যাওয়ার সময় তিহামী বা শ্রীকান্ত কাউকে কিছু বললোনা| যে ট্রেনে ওরা জামালপুর যাচ্ছিল ঐ ট্রেনের টিটি ছিল একটু বেয়াদব ও গন্ডার টাইপের| টিকেট চাইতে আসলে নিশিকান্ত টিকেট দেখাতে না পারায় সে অনেক গালিগালাজ করলো| আসে পাশের কিছু যাত্রী বসে বসে তামাশা দেখলো আর কিছু যাত্রী প্রতিবাদ করলো| টিটি উল্টো তাদেরকেও একহাত দেখে নিল| “বলি ভাড়াটাকি আপনারা দিবেন যে এই নবাব জাদাকে জামালপুর নিয়ে যাব| দিন ওর আর ওর মার টিকেটের দাম দিন|” এ কথা শুনে যারা প্রতিবাদ করছিল তারাও চুপ হয়ে গেল| নিশিকান্ত রাগে দুখে কেঁদেই ফেললো| ওর চোখের পানি দেখেও টিটির মন গললোনা| ট্রেন যখন পিয়ারপুর ষ্টেশানে এসে থামলো ঠিক তখনই টিটি নিশিকান্ত এবং ওর অসুস্থ মাকে ট্রেন থেকে নামিয়ে দিল| নিশিকান্তর ভীষণ রাগ হচ্ছিল| ভরা ট্রেনে ওদের দুঃখে দুঃখী হওয়ার মতো একজনওকি লোক ছিলনা? পিয়ারপুর ষ্টেশানে ট্রেনটা দশ মিনিট থামে| এই সময়ে যাত্রীদের অনেকেই নিচে নেমে এটা সেটা কিনে খায়|  সেই সব মানুষের খাওয়া দেখে নিশিকান্তর পেটের ক্ষুধা আরো বেড়ে যায়| দুঃখে অনেকটা ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদতে শুরু করে নিশিকান্ত| ওর কান্না দেখে হয়তো অনেকেই থমকে দাড়ায় কিন্তু পাশে এসে কাধের ওপর স্নেহের হাত কেউ বুলিয়ে দেয়না| ট্রেন ছাড়তে আজকে একটু বেশিই দেরী হচ্ছে| অন্য একটা ট্রেন ক্রস করবে বলে এই ট্রেনটা অপেক্ষা করছে| নিশিকান্ত দেখলো ট্রেনের সেই টিটি নিচে নেমে এক কোণায় দাড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে| নিশিকান্ত হঠাৎ মনের মধ্যে শক্তি খুজে পেল| হঠাৎ তার মনে হল তারতো অজানা এক ধরনের ক্ষমতা ছিল সেটা এখনো আছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখা যায়| নিশিকান্ত এক মনে টিটির দিকে তাকালো| মনে মনে বললো সিগারেটে হঠাৎ আগুন ধরে যাক এবং টিটির মুখ পুড়ে যাক| বলতে না বলতেই টিটির আত্মচিৎকার নিশিকান্তর কানে ভেসে আসলো| তাকে ঘিরে লোকজন জড় হল| সত্যি সত্যি সিগারেটের আগুনে তার মুখ অনেক খানিই পুড়ে গেছে| কেউ বুঝে উঠতে পারলোনা কেন এমনটি ঘটলো| কেউ কেউ সিগারেটের ফেলে দেওয়া অংশের দিকে মুখ নিচু করে বুঝতে চেষ্টা করলো আসলে ব্যপারটা কী| অনেকের ধারনা ˆতরীর সময় ভুল করে খানিকটা বারুদ ওর ভিতরে ঢুকে গিয়েছিল আর তাই সেই অংশে আগুন লাগতেই ফস করে জ্বলে ওঠে| আসল ঘটনাটা জানে কেবল নিশিকান্ত| ট্রেনটা কিছুক্ষনের মাঝেই ছেড়ে যাবে| ওদিকে ক্ষুধায় নিশিকান্তর পেট জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে| নিজের অজানা সেই শক্তির প্রয়োগ করে সে এবার খাবার খাওয়ার চিন্তা করলো| কিন্তু ওর সব চেষ্টাই বৃথা হয়ে গেল| ও মনে মনে ইচ্ছে করেছিল বলেই ট্রেনের টিটির মুখ পুড়ে গিয়েছিল কিন্তু হাজার বার ইচ্ছে প্রকাশ করার পরও কোন খাবার তার সামনে এসে ধরা দিল না| এভাবে আর বেশিক্ষণ থাকতে পারবেনা| হঠাৎ একটা কোমল হাত পিছন থেকে ওর কাধে এসে ঠেকলো| ফিরে তাকাতেই দেখলো ওর বয়সী একটি ছেলে দাড়িয়ে আছে| তার পাশে মাঝ বয়সি একজন লোক| লোকটি হয়তো ছেলেটির বাবা বা মামা এই ধরনের কেউ হবে| নিশিকান্ত কাধ থেকে ছেলেটির হাত নামিয়ে দিল| ছেলেটা সুন্দর পোশাক পরে আছে| আর ওর সারা শরীর ময়লায় ভরপুর| পেটে ক্ষুধার যন্ত্রনা| ছেলেটা ওর দুঃখ বুঝতে পেরেছে তাই ওকে বললো আমি তোমার একজন বন্ধুর মত| আমাদের বাসা জামালপুরে| তোমার সমস্যা আমি বুঝি তাইতো বন্ধুর মত তোমার পাশে দাড়াতে চাই| নিশিকান্ত ওর কথা শুনে একটু আশ্বস্ত হলো| ছেলেটি ওকে এবং ওর মাকে নিয়ে আবার ট্রেনে উঠে বসলো| ব্যাগে টিফিন বক্সে খাবার ছিল তা থেকে ওদেরকে খেতে দিল| কোথায় যাবে কোথায় থাক ইত্যাদি জানতে চাইলে নিশিকান্ত সব একটু ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বললো| ছেলেটার নাম সায়ন| এক ভাই এক বোনের মধ্যে ও বড়| জামালপুর জিলা স্কুলে নিশিকান্তর মত একই ক্লাসে পড়ে| ছাত্র হিসেবে আর দশজন ছাত্রের চেয়ে অনেক ভাল| তুলনা করলে অনেকটা তিহামীর সাথে তুলনা করা যায়| সায়নের বাবা অগ্রনী ব্যাংকে চাকরী করেন| কাজের ব্যস্ততার ভিড়েও বাবা ঠিকই সায়নকে সময় দেন| এরকম বাবা খুব একটা দেখা যায়না| নিশিকান্তর সাথে ওর বাবাও অনেক কথা বলে| শেষে ট্রেন থেকে নামার সময় একটা ঠিকানা লিখে দেয়| যদি কখনো সময় হয় ও যেন সায়নদের বাসায় আসে| ওদের বাসা চামড়াগুদাম মোড়ের ওখানে| কোন রকম মাথা নেড়ে সায় দেয় নিশিকান্ত| ও আর ওর মায়ের ট্রেনের ভাড়াটা সায়নের বাবাই দিয়ে দেয়| নিশিকান্তর এতে করে ওদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে| ট্রেন থেকে নেমে সায়ন নামের ছেলেটা ওর বাবার সাথে বাসায় চলে যায়| স্টেশনে পড়ে থাকে নিশিকান্ত আর তার রোগাক্রান্ত মা| নিশিকান্ত কিভাবে ওর মায়ের সেই পিসতুতো ভাইয়ের বাসায় যাবে তা বুঝে উঠতে পারেনা| ওর কাছে কানা কড়িও নেই যা দিয়ে রিক্সা করে বাসায় পৌছাবে| আর তাছাড়া ও জানেনা তার বাসাটা ঠিক কোথায়| কোন কিছু বুঝে উঠতে না পেরে ও অনেকক্ষন মাকে নিয়ে রেল ষ্টেশনের এক পাশে বসে থাকলো| সন্ধ্যা তখন প্রায় হয় হয় এমন সময় একটা ট্রেন আসলো| ট্রেন থেকে যাত্রীরা যে যার মতো নেমে বাড়ির দিকে যেতে লাগলো| সেই ট্রেনে ঢাকা থেকে আসলো এক বিদেশী ভদ্রলোক| রেল ষ্টেশনে নেমে সে আশপাশের লোকদের কাছে সরকারী বাংলোতে যাওয়ার রাস্তা জানতে চাইলো| বিদেশী লোকটার কথা কেউ বুঝতে পারলোনা| লোকটা যদি ইংরেজিতেও কথা বলতো তাহলেও কেউ না কেউ তাকে রাস্তাটা বলে দিত| কিন্তু এই ভদ্রলোক খাটি স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলছে| আমাদের দেশের খুব কম মানুষই স্প্যানিশ ভাষা জানে| মফ¯^ল শহরের একটা রেলওয়ে ষ্টেশনে স্প্যানিশ ভাষা জানে এমন কাউকে খুজে পাওয়াও সম্ভব নয়| আবার এই ভদ্রলোক ইংরেজি একটুও বোঝেন না| কিছুক্ষনের মধেই লোকটিকে ঘিরে একটি জটলা ˆতরি হল| এতক্ষণ এসবের কিছুই খেয়াল হয়নি নিশিকান্তর| হঠাৎ কি মনে করে প্লাটফর্মের দিকে তাকাতেই দৃশ্যটা ওর চোখে পড়লো| সে কৌতুহলী হয়ে ভীড়ের কাছে এগিয়ে আসলো| এসে দেখলো একজন বিদেশিকে নিয়ে মানুষ কৌতুহলী হয়ে উঠেছে| বিদেশী ভদ্রলোকও এত মানুষ দেখে একেবারে ঘাবড়ে গেছেন| তার কন্ঠ¯^র একেবারে খাদে নেমে গেছে| নিশিকান্ত পাশের লোকটিকে জিজ্ঞেস করলো বিদেশী লোকটাকে নিয়ে কি সমস্য? নিশিকান্ত ছোট বলে লোকটা ওর কথার কোন উত্তর দিলনা| নিশিকান্ত তাই আরেকজনের কাছে জানতে চাইলো| সে জানালো লোকটি কি যেন বলছে কিন্তু কেউ বুঝতে পারছেনা| এবার নিশিকান্ত নিজেই লোকটির সামনে এসে দাড়ালো| সে লোকটিকে প্রথমে ইংরেজীতে জিজ্ঞেস করলো আপনিকি কোন সমস্যায় পড়েছেন? লোকটি কিছুই বুঝলোনা| এবার নিশিকান্ত লোকটিকে স্প্যানিশ ভাষায় বললো বিয়েনবেনিভো,যার অর্থ ¯^াগতম| কারণ নিশিকান্ত বাংলার পাশাপাশি এ দুটিভাষা ছাড়া আর কোনটিই জানেনা| স্প্যানিশ ভাষার শব্দ শোনার সাথে সাথেই বিদেশী ভদ্রলোক নড়ে উঠলো| তার মুখে মৃদু হাসির রেখা দেখা দিল| সে নিশিকান্তর কাছে এসে ওর কাধে হাত রেখে বললো এস্তয় বুসকান্দো,মানে তোমাকেই খুজছি| জানতে চাইলো রেষ্ট হাউসে যাওয়ার পথ কি| নিশিকান্ত যেহেতু জামালপুরে আজই নতুন তাই পথটা তারও জানা নেই| কিন্তু তাতে কোন সমস্যা হলনা| কারণ সে লোকটির কথা বুঝতে পরছে যা সে অন্যদের কাছ থেকে বাংলায় প্রশ্ন করে জেনে নিতে পারবে| নিশিকান্ত স্থানীয়দের কাছ থেকে রেষ্ট হাউসের ঠিকানা নিয়ে লোকটিকে স্প্যানিশ ভাষায় বুঝিয়ে দিল| লোকটি খুশি হয়ে ওকে একশো টাকার একটা নোট ধরিয়ে দিল| অন্য সময় হলে নিশিকান্ত এ টাকা নিতনা| কিন্তু অসুস্থ মাকে নিয়ে খালি হাতে রেল ষ্টেশানে বসে থাকা সম্ভব নয় বলে সে টাকাটা নিল| এরপর সে একটা রিক্সা ডেকে লোকটিকে উঠিয়ে রিক্সাওয়ালাকে বুঝিয়ে দিল যে ওনাকে ঠিক রেষ্ট হাউসের গেটে নামিয়ে দেবেন| আর তার কাছ থেকে ভাড়া এক টাকাও বেশি নেবেন না| রিক্সা ওয়ালা মাথা নেড়ে সায় দিল| উপস্থিত সবাই এবার নিশিকান্তকে ঘিরে ধরলো| অবাক বিস্ময়ে তারা নিশিকান্তকে দেখতে লাগলো| এতটুকুন একটা ছেলে কিভাবে লোকটির সাথে কথা বললো| আর সে লোকটি কি বলছে তা এ বুঝলো কিভাবে? উপস্থিত কয়েকজন ওর কাছে জানতে চাইলো লোকটি আসলো কোন ভাষায় কথা বলছিল| ও জানালো লোকটি স্পেন থেকে এসেছে এবং তার ভাষাও স্প্যানিশ| স্কুলে পড়া কালিন সময়ে ওরা ল্যাঙ্গুয়েজ ক্লাব থেকে স্প্যানিশ ভাষাটা মোটামুটি রপ্ত করে নিয়েছিল বলেই আজ একজন বিদেশীকে উপকারের পাশাপাশি নিজেও উপকৃত হল| আস্তে আস্তে লোক কমে গেল এবং নিশিকান্ত ওর মায়ের কাছে ফিরে আসলো| ভিড় দেখে সে যদি এগিয়ে না যেত তাহলে আজ তাকে এবং তার মাকে উপস হয়েই থাকতে হত| এমনকি ঐ বিদেশী লোকটিকেও হয়তো ওখানেই পড়ে থাকতে হত| ভাগ্যে যা লেখা থাকে তা হবেই| এবার কোথাও গিয়ে মাথা গুজতে হবে| সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়ে গেছে| ময়মনসিংহ হলেও না হয় কোথাও জায়গা করে নিতে পারতো কিন্তু এখানেতো ও কোন জায়গাই চেনেনা| তাহলে মাকে নিয়ে সে কোথায় যাবে| উপায়ান্ত না দেখে রাতটা পার হোক এই ভেবে রেল ষ্টেশানের যাত্রী ছাউনির নিচেয়ই বসে থাকলো| পাশের দোকান থেকে পাউ রুটি আর কলা কিনে এনে মাকে নিয়ে খেল| রাতে প্রচন্ড আকারে বৃষ্টি হল| সেই বৃষ্টির ঝাপটা এসে লাগলো যাত্রী ছাউনির নিচেয় বসে থাকা নিশিকান্ত এবং তার মায়ের শরীরে| নিশিকান্তর কিছু না হলেও সেই বৃষ্টির পানি গায়ে লেগে অসুস্থ মায়ের শরীর আরো অসুস্থ হয়ে পড়লো| কোন মত রাত গড়িয়ে সকাল হলেই নিশিকান্ত দেখলো তার মায়ের অবস্থা খুব একটা ভালনা| রেল ষ্টেশনে কুলির কাজ করে ওর বয়সী একটা ছেলে রমিজ| রমিজ ওর এই কষ্ট দেখে সেদিনকার মত কাজ বাদ দিয়ে নিশিকান্তর পাশে এসে দাড়ায়| সে নিশিকান্তর সাথে ওর মাকে সদর হাসপাতালে নিয়ে গেল| এর তিনদিন পর নিশিকান্তর মা মারা গেল| নিশিকান্ত এখন এক দম একা| আপন বলতে আর তেমন কেউ রইলোনা| একমাত্র দিদি সেও অনেক দূরে থাকে| নিশিকান্তর মাকে কালীঘাটে নিয়ে দাহ করা হয়| হিন্দুদের নিয়ম অনুযায়ী নিশিকান্তর মাথা মুন্ডন করার কথা থাকলেও নিশিকান্ত সেটা করলনা| বাবা মারা যাবার পর নিশিকান্ত আস্তে আস্তে ধর্মের থেকে অনেক দূরে সরে যেতে থাকে| তার চূড়ান্ত পর্যায় আসে মায়ের দেহ ত্যাগের পর| জামালপুর এসে নিশিকান্তর থাকার কথা ছিল ওর মায়ের এক পিসতুতো ভাইয়ের বাসায় কিন্তু সে বাসায় আর যাওয়া হলোনা তার| সে এখন রমিজের সাথে বস্তিতে থাকে| ওর মা মারা গেছে তিনদিন হলো| আর ও জামালপুর এসেছে ছয়দিন| এক সময় ঘুরতে ঘুরতে সে রেষ্ট হাউসের কাছে চলে আসলো| হঠাৎ তার সেই স্প্যানিশের কথা মনে পড়লো| ভাবলো যাই একবার দেখেই যাইনা লোকটা কেমন আছে| পোষাকে নোংরা হলেও চাল চলনে নিশিকান্তর ভিতরে ছিল শিক্ষিত মানুষের ছাপ| রেষ্ট হাউসের গেটের কাছে আসতেই নিশিকান্তর চোখ পড়লো পুকুর পাড়ে বেঞ্চির ওপর| সেই স্প্যানিশ ভদ্রলোক বসে আছে| সে গেট দিয়ে ভিতরে প্রবেশ করতেই দারোয়ান ওকে আটকালো| চোর বলে সাব্যস্ত করে ওকে রেষ্ট হাউসের পরিচালকের সামনে হাজির করলো| নিশিকান্ত তাকে বললো যে সে আসলে চোর নয়| সে এদিক দিয়ে যাচ্ছিল তাই ভাবলো স্প্যানিশ ভদ্রলোকের সাথে একটু দেখা করে যাই| ওর মুখে স্প্যানিশ লোকটার কথা শুনে তিনি বিস্মিত হয়ে জানতে চাইলেন “তুমি কিভাবে জান যে এখানে একজন স্প্যানিশ থাকেন? নিশিকান্ত তখন তাকে সেদিনকার সব ঘটনা খুলে বললো| ওর কথা শুনে পরিচালক একটুও দেরি না করে সত্যতা যাচাই করার জন্য ওকে লোকটির সামনে নিয়ে গেলেন| লোকটি ওদের উপস্থিতি টের পেয়ে মাথা ঘুরিয়ে তাকালেন এবং সাথে সাথে নিশিকান্তকে দেখে আনন্দে চিৎকার করে উঠলেন| তিনি নিশিকান্তর হাতে  হাত মেলালেন| এ দেখে পরিচালক ভদ্রলোক আশ্চর্য হয়ে গেলেন| পাশাপাশি নিশিকান্তর প্রতি কৃতজ্ঞতাও অনুভব করলেন| এই বিদেশী ভদ্রলোক আসার পর তাকে নিয়ে নানা ঝামেলায় পড়তে হয়েছে| বিশেষ করে তিনি ইংরেজি জানেন না বলে তার সাথে কোন কথাই বলা সম্ভব হচ্ছিলনা| এটা দেখে ঢাকায় টেলিফোন করা হয়েছিল যেন একজন দোভাষী পাঠানো হয় কিন্তু ঢাকা থেকে জানানো হয়েছে যে দোভাষী আসতে আরও সপ্তাহ খানেক লাগবে| কেননা সব দোভাষীরাই অন্য কোন পর্যটকের সাথে আছে| নিশিকান্তকে পেয়ে তাই রেষ্ট হাউসের পরিচালকের ভাল লাগলো| সে সাথে সাথে ঢাকায় টেলিফোন করে জানিয়ে দিল যে আর কোন দোভাষী পাঠাতে হবেনা| এখানেই একজন দোভাষী পাওয়া গেছে| তিনি নিশিকান্তর কাছ থেকে তার সব কিছু জেনে তাকে আপাতত এখানেই থাকতে অনুরোধ করলেন| এক দিক থেকে নিশিকান্তর ভালই হল| বস্তিতে থাকতে তার মোটেও ভাল লাগছিলনা তাছাড়া সেখানে খাওয়া দাওয়াও খুব একটা ভাল নয়| সে বিনা বাক্য ব্যয়ে রাজি হয়ে গেল| রেষ্ট হাউজের পরিচালক ওর জন্য নতুন জামা জুতো কিনে এনে দিলেন এবং নিশিকান্ত আবার আগের মত পুরোদস্তুর ভদ্র বনে গেল| রোজ সকাল বিকেল স্প্যানিশ ভদ্রলোককে নিয়ে নানা যায়গা ঘুরতে বের হয় এবং সন্ধ্যায় ফিরে আসে| এভাবেই কেটে যায় প্রায় পনের দিন| স্প্যানিশ ভদ্রলোক জামালপুরে এসেছেন এক মাসের জন্য| সেই দিক থেকে আগামী কয়েকদিন নিশিকান্তর আর কোন চিন্তা করতে হবেনা| সে এই ভদ্রলোকের সাথে আরামেই কাটাতে পারবে| আর এই কয়দিনে যা ইনকাম হবে তা দিয়ে সে বাকি কিছুদিন চালিয়ে নিতে পারবে| মার্চের সতের তারিখ নিশিকান্ত স্প্যানিশ ভদ্রলোককে নিয়ে ঘুরতে বের হল| স্প্যানিশ ভদ্রলোকের নাম আন্দ্রে নেল| নেল ওকে বলেছে সে যে কয়দিন এখানে থাকবে নিশি যেন তার সাথেই থাকে| নিশিকান্ত বিদেশী সংস্কৃতির অনেক কিছুই জানে তাই সে আন্দ্রে নেল কে শুধু নেল বলে ডাকে| বাংলাদেশের কেউ হলে কী রাগটাইনা করতো যে বড় দের নাম ধরে ডাকছো কেন? বিদেশীদের কাছে বড় আর ছোট নেই সবাই সবার নাম ধরে ডাকে| ঘুরতে বেরিয়ে একসময় নিশি এবং নেল জিলাস্কুলের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল| নেল ওর কাছে জানতে চাইলো এটা কি? নিশিকান্ত জানাল এটা জামালপুর জিলাস্কুল| এটা একটা স্কুল জানতে পেরে নেল আগ্রহ প্রকাশ করলো স্কুলটা ঘুরে দেখবে| স্কুল খোলা এবং পুরোদমে ক্লাস চলছে এই মুহুর্তে কিভাবে নেলকে ভিতরে নেওয়া যায় তা ভেবে পাচ্ছেনা নিশিকান্ত| এর মাঝেই ওর মনে পড়লো ট্রেনে পরিচিত হওয়া ছেলেটার কথা | সায়ন নামের সেই একই বয়সের ছেলেটাও এই স্কুলে পড়ে| ওকে বলে হেড স্যারের সাথে কথা বলে নেলকে ভেতরে নিয়ে যাওয়া যাবে| দারোয়ান চাচাকে দিয়ে সায়নকে ডেকে আনা হল| সায়ন ওকে দেখে অবাক হলো এবং খুশি হল| চলে আসার পর সায়ন ওর কথা ভেবেছে কিন্তু ও কোথায় থাকে সেটা জানেনা বলে যোগাযোগ করা হয়নি| শেষে সায়ন হেড স্যারের সাথে কথা বলে ওদেরকে ভেতরে নিয়ে গেল| একজন বিদেশীকে স্কুলে আসতে দেখে অনেকেই ক্লাস ছেড়ে বেরিয়ে আসলো | যেন একটা আনন্দ মেলা কিংবা অনুষ্ঠান| বাচ্চারা নেলকে ছুয়ে দেখতে লাগলো| নেলেরও ভাল লাগলো| সে নিশিকান্তকে জানাল এখানে এসে তার অনেক ভাল লাগছে| নিশিকান্ত সেটা স্কুলের সবাইকে জানালে তারা আনন্দে জয়োল্লাস ধ্বনি করলো| শিক্ষকেরাও নেলএর কাছে এসে দাড়িয়েছে| নিশিকান্ত নেলকে এবং স্যারদেরকে পরস্পরের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল| এতটুকু একটা বাচ্চা এই বিদেশীর সাথে স্প্যানিশ ভাষায় কথা বলছে দেখে সবাই ভীষণ অবাক হল| কেউ কেউ সুযোগ পেলে জিজ্ঞেসই করতো যে তুমি এই বিদেশী ভাষা শিখলে কিভাবে কিন্তু তা আর হয়ে উঠলোনা| তার আগেই ওরা বেরিয়ে আসলো| সায়ন সবাইকে জানালো নিশির সাথে ওর কিভাবে পরিচয় হয়েছিল| সবাই ছেলেটার দুঃখ ব্যথা শুনে মর্মাহত হয়ে সমবেদনা জানাল| তবে সায়নের কাছে ভাল লাগলো এই দেখে যে আগের দিনে দেখা নিশি আর আজকের দেখা নিশির মধ্যে অনেক ব্যবধান| সেদিন ওর পরনে ছিল ময়লা কাপড় আর আজ পরিপাটি কাপড়ে এক বিদেশী ভদ্রলোকের পাশে ওকেও একজন ভদ্রলোক মনে হচ্ছে| নিশিকান্ত নেল নামের ভদ্রলোকের সাথে থেকে থেকে অনেক কিছুই শিখে ফেলেছে| সে স্প্যানিশ ভাষাটাও বেশ ভালই রপ্ত করে ফেলেছে| পেশায় বিদেশী লোকটা প্রানী বিজ্ঞানী| লোকটা এদেশের বিভিন্ন স্থান ঘুরে ঘুরে নানা প্রজাতির প্রাণিদের নিয়ে গবেষণা করছেন| এরই মধ্যে তিনি নিশিকান্তকে তার সাথে অন্যান্য জায়গাতে যেতে প্রস্তাব করেছে| নিশিকান্তর যেহেতু কোন স্কুল নেই থাকার জায়গা নেই সেহেতু সে এক কথায় রাজি হয়ে গেল| নিশিকান্তর কাছে জীবন মানেই কোন মত বেঁেচ থাকা| সংগ্রামের এই জীবনে তাই একটু সুখ আসলে সেটাকে পায়ে ঠেলে দেওয়া ঠিক হবেনা ভেবে নিশিকান্ত রাজি হয়ে গেছে| নেল ঠিক করেছে আগামী এপ্রিলের তিন তারিখেই কিশোরগঞ্জের উদ্দেশ্যে রওনা হবে| সাথে যাবে তার অনেক অনেক কাজের সহযোগী গাইড বালক নিশিকান্ত| নিশিকান্তও মনে মনে কিশোরগঞ্জে যাওয়ার জন্য ভীষণ ভাবে মুখিয়ে আছে| কেননা নিশিকান্তরা যখন একটা ভালকাজের সংগঠন খুলেছিল সেটার নাম দিয়েছিলেন কিশোরগঞ্জের এক ভদ্রলোক যার নাম হাসান ইমাম| লোকটার রুচিবোধ অনেক ভাল এবং ভালকাজে সহযোগিতা করার মনোভাব রয়েছে দারুন ভাবে| তাই তাকেও দেখার ইচ্ছে আছে| এক সাথে নতুন একটা জেলা ভ্রমন পাশাপাশি একটা কাঙ্খিত লোকের সাথে দেখা হওয়া | কিন্তু বাধ সাধলো এক মহা ঝামেলা| নেল নামের বিদেশীর সাথে থেকে থেকে নিশিকান্ত ওর অতীত দিনের কথা ,দুঃখ ব্যথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল| ঠিক এমন  একটা সময়ে মার্চের ২৭ তারিখে দুপুরে সারা শহর রটে গেল স্প্যানিশ ভদ্রলোক খুন হয়েছেন| সত্যি সত্যি খোজ নিয়ে দেখা গেল নেল নামের লোকটি খুন হয়েছে| রেষ্ট হাউজের বাথরুমে তার লাশ পাওয়া গেছে| রেষ্ট হাউজের দারোয়ান এবং ঝাড়ুদারকে পুলিশ গ্রেফতার করেনিয়ে গেছে| ধারনা করা হচ্ছে লোকটাকে ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়েছে| রেষ্ট হাউজের সামনে পুলিশ পাহারা বসানো হয়েছে| নিশিকান্ত এসবের কিছুই জানেনা| সে একটা কাজে সকালেই বেরিয়েছিল তাই তার অনুপস্থিতিতে এত বড় ঘটনা ঘটেছে সে তার কিছুই জানতে পারেনি| পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের পর রেষ্ট হাউসের দায়িত্বরত ম্যানেজার নিশিকান্তর কথাও বলেছে| ফলে পুলিশ আদেশ দিয়েছে নিশিকান্তকে কোথাও দেখলেই গ্রেফতার করতে| নিশিকান্ত এটাও জানেনা| সারা শহরের মানুষ ঘটনাটা জেনে গেলেও নিশিকান্তর কানে খবরটা পৌছেনি কেননা সে তার সেই বস্তির বন্ধুর সাথে ঘুরতে ঘুরতে শহরের বাইরে চলে গিয়েছিল| বিকেলে নিত্যদিনের মতই নিশিকান্ত রেষ্ট হাউজে ফিরছিল| প্রধান ফটকে তালা লাগান এবং পাশে পুলিশ দাড়িয়ে আছে দেখে ও একটু আশ্চর্য হল| প্রথমে ভাবলো হয়তো ভিআইপি কেউ এসেছে তাই অতিরিক্ত পুলিশ পাহারা| আবার ভাবলো যদি ভি আইপি কেউ এসেই থাকে তবে আগের সিকিউরিটি গার্ড কোথায়? তাছাড়া গেটে তালা ঝুলছে কেন?  সে কাছে যেতেই একজন কনস্টেবল ওকে বাধা দিয়ে বললো এই ছোকরা কি চাই এখানে? নিশিকান্ত জানাল সে রেস্ট হাউসের ভেতরে যেতে চায়| ওখানে যে স্প্যানিশ ভদ্রলোক আছেন তিনি ওর পরিচিত| স্প্যানিশ ভদ্রলোকের কথা শুনে কনস্টেবল জানতে চাইলেন তোমারনাম কি? নিশিকান্ত ওর নাম বলতেই পাশের গার্ড রুমে বসেথাকা হাবিলদার বেরিয়ে আসলেন এবং ওয়াকি টকিতে থানায় কথা বললেন| “স্যার নিশিকান্ত নামে যাকে আপনি গ্রেফতার করতে বলেছিলেন সেএসেছে তাকেকি নিয়ে আসবো? ওপাশ থেকে কি বলা হল তা নিশিকান্ত জানতে পারলোনা | শুধু দেখলো দুজন কনস্টেবল ওর দুই পাশে এসে দুই হাত শক্তকরে ধরে জিপে তুলল| নিশিকান্ত কিছুই বুঝতে পারলোনা কেন পুলিশ ওকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে| ওর অপরাধটা কী তা ও জানতে চাইলে হাবিলদার ওর কথার কোন জবাব দিলেন না| থানায় গিয়ে দেখা গেল অনেক মানুষের ভিড়| নিশিকান্তকে জেলার প্রধান পুলিশ কর্মকর্তা এসপি সাহেবের সামনে হাজির করা হলো| এসপি সাদিকুর রহমান সাহেব নিশিকান্তর দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলেন তুমিনিশিকান্ত? নিশিকান্ত মাথা নাড়িয়ে উত্তর দিল ইয়েস স্যার| এসপি সাদিকুর রহমান বললেন আমি ভেবেছিলাম নিশিকান্ত নামের লোকটা হয়তো বয়স্ক হবে কিন্তু এখন দেখছি তুমি একদম ছোট ঠিক আমার ছেলের বয়সী| নিশিকান্ত যখন এসপি সাহেবের মুখে শুনলেন যে ওর বয়সী এসপি সাহেবের একটা ছেলে আছে তখন ওর মাঝে একটু সাহস সঞ্চার হল| যদিও নিশিকান্তকে পুলিশে ধরেছে বলে ওর খুব একটা ভয় হচ্ছেনা| ও সাহস করে জিজ্ঞেস করলো কিন্তু স্যার আমাকে ধরে আনা হয়েছে কেন? এসপি সাহেব নিজেই অবাক হয়ে জানতে চাইলেন কেন সারা  শহরের মানুষ জানে আর তুমি জাননা? নিশিকান্ত যে কিছুই জানেনা সেটা সে জানাল| এসপি সাহেব বললেন নেল নামের স্প্যানিশ ভদ্রলোক খুন হয়েছেন| খুনের কথা শুনেই কেপে উঠলো নিশিকান্ত| যে সে লোকনয় একেবারে সে যার পাশে পাশে ঘুরে বেড়িয়েছে সেই নেল| নিশিকান্তর চোখ ছলছল করে উঠলো| এ কয়দিনেই বিদেশী লোকটরি ওপর ওর মায়া জন্মে গেছে| রাতে একসাথে থাকা খাওয়া সারাদিন ঘুরে বেড়ানো সব সময় নিশিকান্ত লোকটির পাশে থাকতো আর সেই লোকটি খুন হয়েছে তা শুনে নিশিকান্ত কাঁদবেনা তো কে কাদবে? পাশে দাড়িয়ে থাকা ওসি ইকরামুল ওকে মৃদু ধমক দিয়ে বললেন এখন কেদে কেদে ভান করার দরকার নেই| তুমি জাননা বললেতো হবেনা ! কিভাবে কেন খুন করেছ সেটা বল| ওসি সাহেবের কথা শুনে নিশিকান্তর রাগ আরো বেড়ে গেল| সে বলল আমি খুন করিনি| আমি শুধু তার সাথে থাকতাম এবং আমি স্প্যানিশ ভাষা জানি বলেই লোকটি সব সময় আমাকে সাথে রাখতো| এই এতটুকু একটা বাচ্চা স্প্যানিশ ভাষা জানে দেখে এসপি সাহেব খুব অবাক হলেন| ওর কোন কথাই কেউ আমলে আনলোনা| পরদিন খবরের কাগজে ছাপা হল নিশিকান্ত নামের বালক ছেলেটাকে খুনের দায়ে জেল হাজতে পাঠান হয়েছে| এসপি সাহেব বাসায় ফিরে রাতে খাবার টেবিলে নিশিকান্তর কথা বলছিলেন যে অতটুকু একটা ছেলে সে কিনা এমন একটা খুন করতে পারলো| এসপি সাহেবের স্ত্রী বললেন টাকার লোভে মানুষ কত কিছুইনাকরে| কিন্তু তাদের কথার প্রতিবাদ করলো তাদের এক মাত্র ছেলে শিশির| শিশির জানাল ও ওদের স্কুলে একবার নিশিকান্তকে দেখেছে বিদেশী ভদ্রলোককে নিয়ে আসতে| নিশিকান্ত কিছুতেই খুন করতে পারেনা আর তাছাড়া পুলিশ নিশিকান্ত খুন করেছে এমন কোন যুক্তি দেখাতে পারবেনা| কেননা খুন করা হয়েছে যে চুরি দিয়ে তার হাতলের ছাপ এখনো পরীক্ষা করে দেখা হয়নি| যদি সেই হাতলের হাতের ছাপের সাথে ওর ছাপ বা ফিঙ্গারপ্রিন্ট মিলে যায় তবেই তাকে দোষি বলা যাবে| শিশিরের কথা শুনে ওর বাবা মা কথাটা আমলে নিলেন| পরদিন ফিঙ্গার প্রিন্ট করা হলে দেখা গেল নিশিকান্তর সাথে তার কোন মিল নেই তখন ¯^ভাবতই নিশিকান্ত নির্দোষ প্রমানিত হওয়ার কথা থাকলেও সরকার পক্ষের উকিল দাবি করলেন নিশিকান্ত অন্য কারো মাধ্যমে এই খুনটা করিয়েছে তাই প্রকৃত দোষি সেই| মামলাটা এভাবেই ঝুলতে থাকলো| পরপর অন্য আসামী যাদের গ্রেফতার করা হয়েছিল তাদের ফিঙ্গার প্রিন্ট করা হলো কিন্তু তাদের সাথেও মিললনা| কোন ভাবেই নিশিকান্ত বা অন্য আটক আসামীরা মুক্তি পেলনা| এভাবে এক সপ্তাহ যাবার পর জিলাস্কুল মাঠে মিলিত হল শিশির,সায়ন,রাকিন,সাগর ওরা সবাই | ওরা সিদ্ধান্ত নিল যে কোন ভাবেই হোক একদিনের পরিচিত বন্ধুটাকে ওরা বাঁচাবে| শেষে শিশিরের বাবার কাছে অনুনয় বিনয় করে ওরা নিশিকান্তর সাথে দেখা করতে গলে| ওদের দেখেই নিশিকান্ত চিনতে পারলো এবং মনে মনে খুশি হল| নিশিকান্ত ওদেরকে সব খুলে বল| ঘটনার দিন ও রেষ্ট হাউজ থেকে সকালেই বেরিয়ে গেছে এবং ফিরেছে সন্ধ্যায়| নেল খুন হয়েছে এটা ও জানতোই না| শিশির ওর কাছে জানতে চাইলো আর কোন কথা মনে আছে কিনা,কে কে নেল এর সাথে দেখা করতে আসতো,নেল কি কি করতো বা অন্য কোন গোপন তথ্য| অনেকক্ষণ চিন্তা করার পর নিশিকান্ত জানাল আমি পুলিশকে অনেক কথাবলার চেষ্টা করেছি কিন্তু তারা আমার কোন কথাই শোনেনি| আমাকে যদি রেষ্ট হাউসে নিয়ে যাওয়া হয় তাহলে আমি হয়তো কোন তথ্য বের করতে পারবো| ওরা নিশিকান্তর সাথে কথা শেষ করে জেলার সাহেবের সাথে দেখা করে এ কথা বললো | জেলার সাহেব শিশিরকে চেনে কেননা শিশিরের বাবা জেলার এসপি| কিন্তু নিয়মের বাইরে কিছুই তিনি করতে পারবেন না| এসপি সাহেব এবং কোর্টের আদেশ ছাড়া নিশিকান্তকে রেষ্ট হাউজে নেয়া যাবেনা বলে তিনি জানালেন| ওরা ফিরে এসে শিশিরের বাবাকে সব জানালো এবং তিনি আশ্বাস দিলেন এ ব্যাপারে ভেবে দেখার| পরদিন ওদের সাথে করে নিশিকান্তকে রেষ্ট হাউজে নিয়ে যাওয়া হলো| অনেক ঘুরে ঘুরেও তেমন কোন তথ্য নিশিকান্ত সংগ্রহ করতে পারলোনা| শেষে হতাশায় নুইয়ে পড়ার মত ওরা বেরিয়ে আসলো| নিশিকান্ত যেমন আশায় বুক বেধেছিল তেমনি শিশির,সাগর,সায়ন বা রাকিনরাও ওর মুক্তি হবে এই কামনা করছিল কিন্তু তা আর হলনা| ওরা রেষ্ট হাউজের গেট পার হয়ে কেবল পুলিশের ভ্যানে উঠেছে এমন সময় নিশিকান্ত জানাল ওর মনে পড়েছে এবং ও নিশ্চিত খুনীদের ধরা যাবে| ওর কথা মত আবার রেষ্ট হাউজে ঢোকা হল এবং নিশিকান্ত সবাইকে নিয়ে সোজা রেস্ট হাউজের লাইব্রেরিতে গেল| সেখানে একটা বইয়ের আলমারির পিছনে উকি দিতেই ওর মুখ উজ্জল হয়ে উঠলো| হাত বাড়িয়ে একটা ল্যাপটপ বের করে আনলো| সেই ল্যাপটপের সাথে ল¤^ার তার| সেটা দেখে এসপি সাহেব জিজ্ঞেস করলেন ল্যাপটপ এখানে কেন এবং তার কিসের? নিশিকান্ত জানাল ল্যাপটপ নেল নামের বিদেশীর| উনি এটিকে এখানে সেট করে বিভিন্ন জয়গায় ছোট ছোট সিসি ক্যামেরা লাগিয়েছিলেন| নেল ছিলেন প্রানী বিজ্ঞানী এবং তার ধারনা ছিল এই রেষ্ট হাউজে কিছু অপরিচিত পাখি এবং ভিন্ন প্রজাতির এক ধরনের সরীসৃপ তথা টিকটিকি জাতীয় প্রাণী আছে| সেটার অবস্থান এবং তথ্য ও ছবি নেয়ার জন্যই এই সিসি ক্যামেরা স্থাপন করেছিলেন| খুন যেখানেই করা হোক হয়তো সিসি ক্যামেরায় সেই দৃশ্য ধরা পড়েছে| ওর কথা মত চিকন তার ধরে ধরে এগিয়ে যাওয়ার পর দেখা গেল বিভিন্ন রুমে সত্যি সত্যি সিসি ক্যামেরা লাগান যেটা সাধারন ভাবে চোখে পড়েনা| ল্যাপটপটা রাকিন হাতে নিয়ে অন করলো এবং আরকাইভ থেকে বিভিন্ন রেকড ফাইল প্লে করতে করতে একটা ফাইলের এসে ওদের চোখ স্থির হয়ে গেল| বিডিওতে দেখা গেল নেল বাথ রুমে যাচ্ছে এমন সময় তিনজন লোক বাথ রুমে ঢুকেই ওর গলায় ছুরি ধরে ওর কাছ থেকে চাবি নিয়ে নিল এবং যাওয়ার সময় ল¤^া মত লোকটা বলল এ শালাকে বাচিয়ে রেখে কি হবে যদি পুলিশকে বলে দেয় তাই ওকে শেষ করে ফেলি| মোটা মত লোকটা বললো ঠিক আছে | এই বলেই নির্দয়ের মত নেলের বুকে ছুরিকাঘাত করলো| মুখ দিয়ে যাতে শব্দ করতে না পারে তাই মুখ চেপে ধরলো| সব দৃশ্য সিসি ক্যামেরায় রেকর্ড হচ্ছে এটা জানলে নিশ্চই ঘাতকেরা তাকে খুন করার সাহস পেতনা| এরপর খুনিরা নেলের ব্যাগ লাগেজ এবং আলমারি থেকে গুরুত্বপূর্ন সব কিছু নিয়ে নিল| সবচেয়ে আশ্চর্য বিষয় হচ্ছে যাওয়ার সময় গেটের দারোয়ানের সাথে হেসে হেসে কথা বলছিল এবং তার হাতে কিছু একটা ধরিয়ে দিয়েছিল যা স্পষ্ট নয়| এসব দেখে স্পষ্টই প্রমান হল নিশিকান্ত এর সাথে জড়িত নয়| নিশিকান্তর মুখে হাসি ফুটলো সেই সাথে হাসি ফুটলো রাকিন,সায়ন বা শিশিরদের মুখে| কোর্টে আবেদন করা হলো| আবেদন করলেন সাগরের বাবা| সাগরের বাবা একজন নাম করা উকিল| জ সাহেব সব শুনে এবং দেখে নিশিকান্তকে মুক্তি দিলেন| এবার পালা দারোয়ানের| সে প্রথম থেকেই অ¯^ীকার করেছে যে সে এর কিছুই জানেনা অথচ সে যে জানে তা এখন প্রমানিত| এখন আর কিছুতেই অ¯^ীকার করার উপায় নেই| তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করার পর সে মারের চোটে সব গড় গড় করে ¯^ীকার করলো| নেল নামের ভদ্রলোক অনেক দিনের জন্য বাংলাদেশে এসেছে তাই তার কাছে নিশ্চই অনেক টাকা আছে| সেই টাকার লোভেই রেষ্ট হাউসের ম্যানেজার বুদ্ধি করে নিশিকান্তকে সকালেই সরিয়ে দিয়ে নিজের লোকদের দিয়ে খুন করিয়েছে নেলকে| সব শোনার পর ম্যানেজারকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞেস করতেই খুনিদের আসল পরিচয় পাওয়া গেল| খুনি তিনজনের পরিচয় পাওয়ার পর পুলিশ তাদের ধরতে অভিযান চালাল এবং তিন দিনের মাথায় তারা ধরা পড়লো| এরা স্থানীয় এমপির দলের লোক | এমপি চৌধুরি জয়েন উদ্দিন অবশ্য অ¯^ীকার করলেন যে তিনি  এদের কাউকেই চেনেন না| অবশেষে বিচার বিভাগীয় তদন্ত শেষে দেশের সর্বচ্চো আইনে কোন বিদেশীকে হত্যা করার অপরাধে ম্যানেজার এবং তিন খুনিকে ফাসি দেয়া হল| আর গেটের দারোয়ানকে পাঁচ বছরের জেল দেয়া হল| কেননা সেও পরিস্থিতির ¯^ীকার ছিল| তাকে হুমকি দেয়া হয়েছিল যে সে এ কাজে রাজি না থাকলে তাকে চাকরী চ্যুত করা হবে আর এর চেয়ে বেশি বাড়াবাড়ি করলে তাকেও খুন করা হবে| সেই ভয়েই সে এ কাজ করতে রাজি হয়েছিল|

নিশিকান্তর জিলাস্কুলে ভর্তি

  নেল খুন হওয়ার পর নিশিকান্তর জীবনে আবার অন্ধকার নেমে আসলো| তারতো কোন থাকার জায়গা নেই,খাবার কেনার মত কোন টাকা নেই এসব ভেবে সে আবার সেই পুরোনো  বন্ধুর বস্তিতে গিয়ে উঠলো| নিশিকান্তকে এখন অনেকেই চেনে| পত্রিকায় ওর ছবি উঠেছিল,খবর হয়েছিল কিংবা সায়ন রাকিন ওরা সবাইও ওকে চেনে| সেই সাথে জিলা স্কুলের অনেকেই চেনে| একদিন বিকেলে নিশিকান্ত বসে ছিল জিলাস্কুলের পাশে নদীর কিনারে| ওর মনটা খুব খারাপ| স্কুলে অনেক অনেক ছাত্র হেসে খেলে আনন্দ করছে অথচ ও সেখানে যেতে পারছেনা| ওরও ইচ্ছে হয় আবার স্কুলে ভর্তি হতে কিন্তু তার আর উপায় নেই| বাবা নেই মা নেই এমনকি বোনও নেই বললেই চলে| মা মারা যাওয়ার খবরটা পর্যন্ত বোন জানলোনা| বোন কোথায় আছে তাও ওর জানা নেই| কেবল শুনেছে সিলেটে থাকে| কিন্তু সিলেট কোন ছোট খাট জায়গা নয় যে গেলেই পাওয়া যাবে| আবার সেখানে যেতে হলেও কিছু টাকার প্রয়োজন সেই টাকাটাও ওর হাতে নেই|

অবশেষে নিশিকান্ত সায়ন রাকিন আর সাগরের প্রচেষ্টায় জামালপুর জিলাস্কুলে ভর্তি হলো| জিলাস্কুল কর্তৃপক্ষ যেহেতু নিশিকান্তর আসল ব্যপার জানেনা তাই তাকে ভর্তি করে নিতে তাদের তেমন কোন অনিহা বা সমস্যা দেখা গেল না| প্রথমে তারা টিসি চেয়েছিল কিন্তু রাকিনদের কথার জোরে স্যারেরা সেটা বেমালুম ভুলে গেল| রাকিনদেরকে নিশিকান্ত কোন কিছুই গোপন না করে খোলাখুলি বলে দিয়েছে| সাগর আর জাহিদ ওর কথাকে স্রেফ গাজাখুরি হিসেবে ভেবে নিলেও রাকিন বা সায়ন ওকে গুরুত্বর সাথেই দেখেছে| যে কোন মানুষের ভিতরেই কোন না কোন সুপার ন্যাচারাল পাওয়ার থাকে| কারো কারো সেই শক্তিটা তুলনামুলক ভাবে অনেক বেশি বলে সেটাকে আজগুবী বা অমুলক মনে হয়| কেউ আছে বড় বড় গুন অংক মুহূর্তের মধ্যেই করে ফেলতে পারে| আবার কারো কারো এমন আছে যে সে কারো মুখ দেখলেই তার মনের অবস্থা বলে দিতে পারে| শুধু তাই নয় এমনও দেখা গেছে কারো কারো মুখস্থ করার এমন প্রতিভা থাকে তা না দেখলে বিশ্বাস হয়না|তেমনি নিশিকান্তরও হয়তো তেমন এক ধরনের সুপার ন্যাচারাল পাওয়ার থেকে থাকতে পারে| আর সেটা বুঝতে তো বেশি দিন দেরি করতে হবেনা| দু চারদিন গেলেইতো জানা যাবে আসলেই ওর মধ্যে কোন শক্তি আছে নাকি ও সব বানিয়ে বলেছে| এরপর আসলো চমক দেখানোর পালা| অংকে নিশিকান্ত প্রথম ক্লাসেই ফাটাফাটি সাফল্য দেখাল| দেখা গেল স্যার সেদিন অংকের ক্লাসে একটি ধারা লিখে তার যোগফল নির্ণয় করতে দিলেন ধারাটি ছিল এরকম ১+২+৩+……………..+১০০| অন্যরা যখন কিভাবে সমাধান করবে তা ভাবছে এবং এটা যোগ করতে হলে আগে সংখ্যা গুলি লিখতে হবে ভাবছে নিশিকান্ত ততক্ষনে সমাধান করে স্যারের সামনে খাতা মেলে ধরেছে| স্যার নিজেও এটা দেশে বিস্মিত| কেননা এটা করতে খানিকটা সময় লাগার কথা| কিন্তু দেখা গেল নিশিকান্তর উত্তর দেখে স্যার আরো তাজ্জব হয়ে গেলেন| তিনি অনেকক্ষন নিশিকান্তর দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলেন| নিশিকান্ত আসলে কার্ল ফ্রেডারিক গাউসের জীবনী পড়েছিল| তিনিই প্রথম এই ধারার সহজ এই সমাধান বের করেছিলেন| বলা হয়ে থাকে গাউস কথা বলা শিখার আগেই গণিত শিখেছিলেন| রাকিন জিজ্ঞেস করলো স্যার ওর উত্তরটাকি ঠিক হয়েছে ? স্যার যখন বললেন ঠিক হয়েছে তখন স্যারের মত ক্লাসের সবাই ওর দিকে হা হয়ে তাকিয়ে থাকলো| ওরা তখনই বুঝতে পারলো নিশিকান্ত যা বলেছিল তা ঠিক| ওর ভেতরে সত্যি সত্যিই অন্যরকম একটা শক্তি আছে যা আর কারো নেই| তার পরও ওরা কিছুদিন দেখতে চাইলো যে আর কোন কিছু দেখাতে পারে কি না| 

নিশিকান্তর ধর্মান্তর

নিশিকান্তের আর কোন ভাবেই চলছেনা। তার এই মুহুর্তে টাকা পয়সার প্রয়োজন। ওদিকে ওর খ্রিষ্টান বন্ধু যোসেফ ওকে বার বার লোভ দেখাচ্ছে যে তুই যদি আমাদের ধর্মে চলে আসিস তবে আমরা তোকে অনেক টাকা সম্পদ লিখে দেব। ফলে তোর আর কোন সমস্যা থাকবেনা। টাকার লোভ কম বেশি সবারই আছে। তার ওপর অভাব থাকলেতো কোন কথাই নেই। নিশিকান্ত বার বার নিজেকে প্রশ্ন করে কোন পথটা তোর জন্য ভাল আর কোন পথটা তোরজন্য খারাপ তা ভেবে চিন্তে বের রে নে।নিশিকান্তর ভিতরের সত্তাটা ওকে বার বার বুঝাতে চেষ্টা করে যে নিজের ধর্ম ত্যাগ করলে তুই বড় পাপী হয়ে যাবি তাউ এ কাজ করিসনা। আবার ভিতরেরআরেকটা সত্তা ওকে আরো বেশি প্রবোধ দেয় এই বলে যে না খেয়ে মরে যাওয়ার চেয়ে তুই তোর ধর্ম পরিবর্তন কর।

এসব যখন হচ্ছিল তখন নিশিকান্তর পাশে দাড়ানোর মত নিকটজন কেউ ছিলনা। কেবল ওর বয়সী ছোট ছোট বন্ধুরা ছাড়া আর কেউ ওর পাশে এসে ওর কাধে হাত রেখে বললোনা যে নিশিকান্ত ঘাবড়ে যাচ্ছ কেন আমরাতো আছি। এই এতটুকু একটা বাচ্চা ছেলে কতটুকুই বা সে খায়। যেখানে ঘুমোতে দেয়া যায় শান্ত ছেলের মত সেখানেই সে ঘুমো।এতদিন সে তার এক বন্ধুর সাথে বস্তিতে থাকতো। এখন বিপদের ওপর বিপদ। সেই বন্ধু ঢাকায় চলে গেছে হকারী করতে। সে এখন থেকে ঢাকাতেই থাকবে। কোন আয় নেই তার ওপর স্কুলে ভর্তি হয়েছে তাই নিশিকান্তর থাকার যায়গাটাও চলে গেল।অল্প বয়সে বাবা হারালো কিছুদিন যেতে না যেতেই মাকেও হারালো আর এক মাত্র দিদি তারও তেমন কোন খবর নেই। মা মারা গেছে এই খবরটা পযর্ন্ত দিদিকে সে জানাতে পারেনি। কেমন করে জানাবে। কোন যোগাযোগের নাম্বারওতো তার কাছে নেই।নিশিকান্ত নিজেই সিদ্ধান্ত নিল সে ধর্মান্তরীত হবে। সে যোসেফকে বললো ধর্মান্তরীত হওয়ারআয়োজন করতে।ওর কথা শুনে যোসেফ মহা খুশি। সে তার বাবাকে নিয়ে ফাদারের সাথে কথা বলে পরবর্তী রবিবার গীর্জায় নিশিকান্তের ধর্মান্তরীত হওয়ার সব আয়োজন করে রাখলো। নিশিকান্ত দেখলো রবিবার আসতে ঢের বাকি। এর মাঝে ওকে অনেক কিছু করতে হবে।এই কদিনে জামালপুরে অনেকেই নিশিকান্তকে মোটামুটি চিনে ফেলেছে। বিশেষ করে বিদেশী ভদ্রলোকেরসাথে তার চলাফেরা এবং সেই বিদেশী খুন হওয়াকে কেন্দ্র করে তার ছবিও পত্রিকাতে ছাপা হয়েছিল। চায়ের দোকানে রাস্তা ঘাটে মানুষ ওর কথা আলোচনা করতো।ওদিকে পত্রিকায় নেলের খুন হওয়ার ঘটনার সাথে যখন নিশিকান্তর ছবিও ছাপা হলো এবং বলা হলো এই খুনেরসাথে নিশিকান্ত নামের বার বছরের ছেলের সম্পর্ক আছে তখন ওর জন্মভূমি ময়মনসিংহের মানুষ হায় হায় করে উঠলো। ওর পুরোনো সব বন্ধুদের অনেকেই আফসোস করে বললো কী সর্বনাশ! নিশিকান্ত খুন করেছে? আর সেই সব পরিবারের সদস্যরা হাফ ছেড়ে বাচলো এই বলে যে ভাগ্যিস এই খুনিটাকে এখান থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল তা না হলে কিযে হতো! অথচ পত্রিকায় যখন প্রকাশ হলো নিশিকান্ত বিদেশী ভদ্রলোক নেল খুনের সাথে কোন যোগসাজ ছিলনা তখন কিন্তু কেউ বলেনি বাহ নিশিকান্ততো খুব ভালো ছেলে। ও এরকম একটা কাজ করতে পারে তা আমাদের কল্পনাতেও ছিলনা। শুধু শুধু নিরাপরাধ ছেলেটার নামে কলংক লাগানো।নিশিকান্ত ওসব নিয়ে কিছুই ভাবেনি। এই অল্প বয়সেই সে বুঝে গেছে এই পৃথিবীটা কতটা নিষ্ঠুর। তাই কে কাকে কি বললো আর কি ভাবলো তা সে পাত্তা দেয়না। যেখানে পেটই চলেনা সেখানে অতসব ভেবে কি হবে। অথচ একটা সময় ছিল নিশিকান্ত মনে মনে যা বলতো তাই ফলে যেত।এখনআর সেই আশ্চর্য বিষয়টা ঘটনা।কেন ঘটেনা এটা নিয়েও নিশিকান্ত কখনো চিন্তা করেনি।যেহেতু কদিন বাদেই সে ধর্মান্তরিত হবে এবং তাখন তার কোন অভাব থাকবেনা সেহেতো এই কদিন সে পড়াশোনার কোন বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে চায়না। জামালপুর আসার পর প্রথম দিকে তার খুব একা একা লাগতো। কেননা আগে ময়মনসিংহ থাকতে তার একাকী নিরবে বসে থাকার যায়গা ছিল এখানে তেমন কোন নিজর্ন জায়গা নেই যেখানে নিশিকান্ত কিছুক্ষণ বসে থাকবে। কথায় কথায় ও সায়নকে এটা বলতেই সায়নওকে জানালো দারুন একটা নিরিবিলি জায়গা এখানে আছে। তবে ভয়ের ব্যাপার হলো সেখানে দিনের বেলাও কেউ যেতে সাহস করেনা।যেখানে দিনের বেলাও কেউ যেতে সাহস করেনা সেরকম জায়গা যে সত্যিই নিরিবিলি হবে এতে নিশিকান্তর কোন সন্দেহ থাকলোনা। সে সায়নের কাছ থেকে জায়গাটার লোকেশান জেনে নিয়ে ওইদিন বিকেলেই সেখানে রওনা হলো। শহর থেকে খুব একটা দূরে নয়। তবে লোকালয় নেই সেখানে। সেটা একটা চর এলাকা।নদীর ধারে দাড়ালেই দেখা যায় ঘন জঙ্গলে পরিপূর্ন এক বিশাল দ্বীপ এলাকা। হয়তো কেউ কখনো ওখানে যায়না। আর গেলেও নদীর ধার থেকেই আবারফিরে আসে। এক মাঝিকে বলতেই সে তেড়ে আসলো। এইটুকুন পুলা তুমি এইডা কি কও। জানোনা ওহানে কেউ দিনের বেলা বড় মানুষও যায়না তুমি যাইবা কিবা?নিশিকান্ত তাকে কিছু একটা বলতে চাইলো কিন্ত সে বলার সুযোগ দিলোনা। তার আগেই ঘাটে নৌকা বেধে কোথায় যেন চলে গেল। নিশিকান্ত এদিক সেদিক দেখে যখন নিশ্চিত হলো আশে পাশে আর কেউ নেই তখন সে নিজেই নৌকার রশি খুলে তাতে উঠে বসলো। এর আগে ময়মনসিংহ থাকতে এক মাঝির সাথে ওর বেশ খাতির ছিল। সেই শিখিয়ে দিয়েছিল কিভাবে নৌকার বৈঠা বাইতে হয়। নিশিকান্তর তাই তেমন কোন বেগ পেতে হলোনা।ওপারে গিয়ে ঝোপের আড়ালে নৌকাটাকে লুকিয়ে রেখে সে ঘন জঙ্গলের ভিতর ঢুকে গেল।লোকজনের চলাফেরা নেই বলেই হয়তো নাম নাজানা কত কত রকম গাছ ও ঘাস এখানেজন্মেছে। কিছুদূর এগোতেই নিশিকান্তের ভুল ভেঙ্গে গেল। সবাই বলেছে বা বলে যে এখানে দিনের বেলাও কেউ আসেনা ও এখানে না আসলে হয়তো তাইই বিশ্বাস করতো। আর এখানে এসে সে যা দেখলো তাতে তার চোখ কপালেউঠে গেল। এখানে কেউ আসেনা নয় বলতে গেলে নিয়মিতই আসে। আর তা না হলে জঙ্গলের একটু গভীরে যেতেই সে স্পষ্ট রাস্তা দেখতে পেতনা। ঘন জঙ্গলে মানুষ না আসলে সেখানে ঘাস জন্মে থাকতো যেটা সে নদীর কিনার থেকে জঙ্গলের কিছুদূর পর্যন্ত দেখেছে।অথচ এখানে তার ব্যতিক্রম তার সামনে ঘাসহীন চলার পথ। সেই অন্ধকার আর আধো আলো ছায়ারমাঝে নিশিকান্ত সেই পথ ধরে এগিয়ে যেতে লাগলো। বেশ অনেকক্ষণ হাটার পর তার সামনের পথ থেমে গেল। থেমে গেল বলতে তিনটা পথ এক স্থানে এসে মিলেছে বলে ওকে থামতে হলো।কোন পথ দিয়ে গেলে কোথায় গিয়ে পৌছাবে তা তার জানানেই।তারপর নিশিকান্ত চোখ বন্ধ করলো। সে চোখ বন্ধ করার সাথে সাথে একটা আলোর ঝিলিক চোখের মাঝে খেলে গেল। সেই আলোর ঝলকানিতে সে দেখতে পেলো তিনটা রাস্তার একদম শেষ রাস্তাটার মাথায় একটা বাড়ি আছে। সে কল্পনাতে হোক আর যেভাবেই হোক সে যা দেখতে পেলো সেই রাস্তায়ই যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিল। সেই অনুযায়ি সে হাটতে শুরু করলো। হাটতে হাটতে কখন যে সন্ধ্যা হয়ে গেছে তা সে টেরও পায়নি। টের পাবে কি করে জঙ্গলের ভিতর দিয়ে সে যখন হাটছিলো তখন তার চারপাশ আলোকিত ছিল। সে ভাবলো এখনো সন্ধ্যা হতে ঢের বাকি।অথচ সন্ধ্যা হয়েছে অনেক আগেই। এই আলোর উৎস কি তা নিশিকান্তর জানা ছিলনা। আদৌ সেখানে সে অন্য কোন আলোতে পথ চলছিল কিনা তাও সে কল্পনা করেনি। একসময় সে একটা বাড়ি দেখতে পেলো। সেই বাড়ির দরজা জানালা সব বন্ধ। কোথাও কেউ আছে কিনা তা জানার জন্য  বাড়িটার চারদিকে সে একটা চক্কর দিলো। এরপর দরজায় ধাক্কা দিলো।এইরকম সময়ে সে শুনতে পেলো কারা যেন কথা বলতে বলতে এদিকে আসছে। সে একটা ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়লো। নিশিকান্ত দেখলো দুটো অদ্ভত রকম প্রাণীতে চড়ে দুজন মানুষ ঘরটার সামনে এসে দাড়ালো আর সাথে সাথে দরজা খুলে গেল। নিশিকান্ত বুঝতে পারলোনা দরজা এমনি এমনি খুলে গেল নাকি ওরা কোন মন্ত্র পড়ে দরজা খুললো। ও সব চেয়ে বেশি অবাক হলো যে লোক দুটো আসলো তাদের প্রত্যেকেরই তিনটা করে চোখ। দুটো ঠিক মানুষেরমত আর একটা ঠিক কপালের মাঝখানে। নিশিকান্তর হঠাৎ সেই বুড়ির কথা মনে হলো। সেই বুড়ির ছিল দুটো চোখ আর কপালের মাঝখানেএকটা বিশাল ফুটো। সেই ফুটো দিয়ে আলো বের হচ্ছিল আর সে যখন সেটা দিয়ে ভিতরে তাকালো আজব আজব অনেক কিছু সে দেখতে পেল। এই লোকদুটোর কি আসলেই তিনটে চোখ নাকি কপালেরমাঝখানের ওটা সেই বুড়ির মতই একটা ফুটো।সে আর কিছুই ভাবতে পারলোনা। আর যে প্রানী দুটোতে চড়ে লোকটা আসলো সেই প্রানীও অদ্ভুত। না ইউনিকর্ণ না ঘোড়া না মানুষ। এই সব কিছুরসাথে মিলিয়ে তার পেছনে দুটো ডানাও আছে। নিশিকান্ত অনেক বই পড়েছে। সে থেকে ও জানে এই অঞ্চলে ইউনিকর্ণ বা এ জাতীয় কোন প্রাণী থাকার কথা নয়। গোটা বাংলাদেশ এমনকি এশিয়াতে কোন আজব প্রাণী নেই। থাকলে বিজ্ঞানীরা অনেক আগেই খুজে পেত।তাহলে কিএরা ভীন গ্রহের বাসিন্দা? এখানে নিরিবিলি থাকার চেষ্টা করছে।তাও হতে পারেনা। পৃথিবীর বায়ুমন্ডলে প্রবেশের আগেই বিজ্ঞানীরা নিশ্চই তাদের অস্তিত্ব টের পেতো। তাহলে কারা এরা? নাকি মনের ভুল। সে সাহস করেউঠে দাড়ালো। দরজার সামনে গিয়ে করাঘাত করলো কিন্তু সেই আগের মতই ভিতর বা বাইরে থেকে কোন সাড়া পাওয়া গেলনা।শেষে নিশিকান্ত ফিরে আসলো।নিশিকান্তর সামনে সময় যেনো থেমে গিয়েছিল। তাই সে যখন সেই ঘন জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসলো তখন সে দেখলো সূর্য উঠছে। সে অবাক হয়ে গেল। সে তাহলে একটা রাত এখানে কাটিয়েছে? ঝোপের ভিতর থেকে নৌকাটা খুজে পেতেই সে সেটাতে চেপে এ পাশে ফিরে আসলো। এসে দেখলো একটা লোক মাথা নিচু করে বসে আছে। সে নৌকা থেকে নেমে কাছে আসতেই চিনতে পারলো লোকটাকে। নৌকার সেই মাঝি। নিশিকান্ত ভাবলো এবার হয়েছে লোকটা নিশ্চই তেড়ে আসবে। তাই সে আগেই স্বীকার করে বললো চাচা আমার ভুল হয়ে গেছে আপনাকে না জানিয়ে আপনার নৌকাটা নিয়ে গিয়েছিলাম। নৌকার মাঝি ওকেতো কিছু বললেনই না বরং হা করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন তার পর ভুত ভূত বলে চেচিয়ে নৌকা ফেলে রেখে পালিয়ে গেলেন। নিশিকান্ত ভাবলো লোকটা বোধহয় পাগল হয়ে গেছে। তাই ওকে দেখে ভূত ভূত বলে পালিয়ে গেল এমনকি নিজের নৌকাটাও ফেলে গেল। শেষে নিশিকান্ত নৌকাটা ঘাটে বেধে রেখে বস্তির সেই ছোট্ট ঘরে ফিরতে লাগলো। পথেই যোসেফের বাসা। ভাবলো একবার কথা বলেই যাই ওরা কতদূর কি আয়োজন করেছে তা জেনে যাই। সেই ভাবনা থেকে নিশিকান্ত যখন ওদেরবাসায় গেল তখন যোসেফ সেকি রাগ। নিশিকান্ত ওর রাগের কারণ জানতে চাইলে যোসেফ বললো এভাবে আমাকে অপমান না করলেও পারতি। আমি না হয় তোকে ধর্ম ত্যাগ করে আমার ধর্মে আসতে বলেছি তাই বলে এভাবে অপমান করবি? আমি কি তোকে জোর করেছি? নিশিকান্ত ভেবে পেলোনা এর মাঝে সে যোসেফকে কখন অপমান করলো। সে বললো কি হয়েছে খুলে বল। আমি কখন তোকে অপমান করলাম? যোসেফ একটু শান্ত হয়ে বললো তোর ধর্মান্তরীত হওয়ার কথা ছিল আর আমি সব আয়োজন করে রেখেছিলাম অথচ সময় মত তুই আসলিনা! ।ওর কথা শুনে নিশিকান্ত থ হয়ে গেল। বলেকি এই ছেলে। ধর্মান্তরীত হওয়ার কথা সেই রবিবারে তা আসতে এখনো চারদিন বাকি অথচ ও এসব কি বলছে। নিশিকান্ত বললো ধর্মান্তরীত হওয়ার কথাতো সেই রবিবারে এখনোতো ঢের বাকি! যোসেফ এবার রেগে মেগে আগুন। রবিবার চলে গেছে গতকাল আর আজ সোমবার। ওর কথার আগা মাথা নিশিকান্ত কিছুই বুঝতে পারছিলনা। সেদিনের পত্রিকাটা হাতে নিতেই সত্যিটা অনুভব করতে পারলো। সত্যিই আজ সোমবার আর গতকালই রবিবার চলে গেছে। অথচ গতকাল বিকেলেইনা ও বেরিয়েছিল রাত পেরোতেই সে চলে এসেছে এর মাঝেই পাচ দিন পার হয়ে গেল কিভাবে? কোন কথা না বাড়িয়ে নিশিকান্ত বস্তিতে ও যেখানে থাকতো সেখানে চলে আসলো। হাতমুখ ধুয়ে সোজা চলে গেল স্কুলের বিজ্ঞান স্যারের কাছে। নিশিকান্তকে দেখে স্যার অবাক হলেন। তুমি কোথায় পালিয়ে গিয়েছিলে নিশিকান্ত। তোমারতো ধর্মান্তরীত হওয়ার কথা ছিল। তার পরতো তোমাকে কোথাও খুজেই পাওয়া যাচ্ছিলনা। কোথায় ছিলে এই কয়দিন । নিশিকান্ত পরিস্কার বুঝতে পারলো ওর মা অসুস্থ হওয়ারসময় যা ঘটেছিল এবারও তাই ঘটেছে তবে একটু বেশি সময় নিয়ে। সে বললো স্যার একটু সমস্যায় পড়েছিলাম তাই কোথাও কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারিনি। নিশিকান্ত পাশ কাটিয়ে গেল আসল ঘটনা। তারপর একটু সময় নিয়ে সে জানালো যে সে এসেছে বিজ্ঞানের কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে। বয়স তের আর এই বয়সে স্যারের সাথে বিজ্ঞানের কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনায় এসেছে শুনে স্যারেরও ভালো লাগলো। যিনি বিজ্ঞান পড়ান তার কাছেতো বিজ্ঞান বিষয়ক সবই ভালো লাগবেই। নিশিকান্তকে তিনি বললেন বলো কি জানতে চাও। এই স্যারকে নিশিকান্ত বেশ পছন্দ করে। সে শিক্ষক হিসেবে সত্যিই দারুন। যেমন অনেক বিষয়ে জানাশোনা আছে তেমনি ছাত্রদেরসাথে বন্ধুর মত সম্পর্ক। নিশিকান্ত জানতে চাইলো স্যার সময়কে কি কোন ভাবে বেধে রাখা যায় বা থামিয়ে রাখা যায়? বা এমনকি হতে পারে পাশাপাশি দুটো স্থান এক স্থানে সময় চলমান আর এক স্থানে সময় স্থীর। ওর প্রশ্ন শুনে স্যার আশ্চর্য হয়ে গেলেন। এরকম প্রশ্ন সাধারণত এই বয়সী ছেলে মেয়েরা করতে পারেনা বা এরকম প্রশ্ন এদের মাথাতে আসারই কথা নয়। স্যার মন্ত্রমুগ্ধের মত ওর কথা শুনলেন এবং তার পর তিনি যতটুকু জানতেন তা জানালেন। বিজ্ঞানীরা দীর্ঘ দিন ধরে সময়কে কিভাবে স্থীর করা যায় তা নিয়ে গবেষণা করছেন। এমনকি নিশিকান্ত যে প্রশ্ন করেছে বিজ্ঞানীদেরমনেও একই প্রশ্ন। মহাবিশ্বে ওয়ার্ম হোল তৈরি থেকে শুরু করে আরো কত কিছুর কল্পনা করা হচ্ছে। তাতে দেখা গেছে যে পাশাপাশি দুটো স্থানের সময় দুই রকম হতেই পারে। কোন এক স্থানে সময় দ্রুত চলে আবার কোন কোন স্থানে ধীরে চলে। নিশিকান্ত আর কোন প্রশ্ন করলোনা। সে স্যারকে বিদায় জানিয়ে চলে আসলো। তার এখন স্পষ্ট মনে পড়ছে সেই বৃদ্ধা বুড়ির কথা। যারসাথে তার এক অন্ধকার রাতে রাস্তার মাঝে দেখা হয়েছি। বৃদ্ধা তখন এক্সিডেন্ট করে রাস্তায় গড়াগড়ি খাচ্ছিল। সে রাতে নিশিকান্তের আর ঘুম এলোনা। ওদিকে সেই নৌকার মাঝি চারদিকে ছড়িয়ে দিল এক পুচকে ছেলে তার নৌকা নিয়ে নদীর ওপাশে গিয়ে পাচ দিন থেকে এসেছে। সে মানুষ না ভূত। নিশিকান্ত দেখলো এতো মহা বিপদ। অথচ যে কোন ভাবেই হোক তাকে ওখানে যেতেই হবে। যেতে গেলে কেউ না কেউ দেখে ফেলবে। হাটতে হাটতে সেই নদীর ঘাটে গেল। গিয়ে অবাক হয়ে দেখলো সেখানে অনেক মানুষের ভীড়। ভীড় ঠেলে ভেতরে গিয়ে দেখলো ভীড়ের মধ্যমনি সেই নৌকার মাঝি। কথা বলছে মূলত নিশিকান্তকে নিয়েই। সেই সব গল্প শুনে নিশিকান্তরই অবাক হওয়ার পালা। সবাইতো জানতো এই নির্জন দ্বীপের মত ঘন জঙ্গলে দিনের বেলাও কেউ একা প্রবেশ করেনা সেখানে একা একটা তের বছরের ছেলে সেই ভয়ংকর জঙ্গলে পাচ দিন কাটিয়ে এসেছে শুনে যে কারো ভয়ে শিউরে ওঠারকথা। নিশিকান্ত ভাবলো অন্য কেউকি জানে যে ওই জঙ্গলে সময় থেমে যায়। নাকি অন্য কোন কারনে সবাই মনে করে যে জঙ্গলটা ভয়ংকর।কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থেকে নৌকার মাঝি কি কি গল্প বলে তা শুনতে ইচ্ছে হলো। এক সময় মাঝিকে একটা লোক প্রশ্ন করলো আচ্ছা যে বাচ্চা ছেলেটা তোমার নৌকা নিয়ে ওপারে গিয়ে পাচদিন থেকে এসেছে তাকে দেখলেকি চিনতে পারবে? মাঝি বললো অবশ্যই চিনতে পারমু।আরেকজন বললো আচ্ছা ছেলেটা যখন তোমার সামনেআসলো তখন কি ওর বড় বড় দাত ছিল? পাশ থেকে একজন বলে উঠলো কোন শিং ছিল? সেই সাথে আরো একজন বললো আচ্ছা ওর চোখ দিয়েকি তখন ধোয়া বের হচ্ছিল? লোকগুলোর প্রশ্ন শুনে নিশিকান্তর নিজের কাছেই নিজেকে ভয়ংকর মনে হচ্ছিল। আয়না থাকলে তখনই একবার সে নিজের চেহারাটা দেখেনিত। এবার সবার প্রশ্নের জবাবে নৌকার মাঝি বলতে শুরু করলো ুছেলেটা যখন আমার সামনে এসে দাড়ালো আমি তখন অনুভব করলাম চারদিক গরম হয়ে উঠেছে। একটা কড়া গন্ধ এসে নাকে লাগলো। আমি মাথা উচু করে তাকাতেই দেখতে পেলাম সেই ছোট্ট ছেলেটার লম্বা লম্বা দাত আর লম্বা লম্বা হাত পায়ের নখ। এ কথা শোনার সাথে সাথেই নিশিকান্ত নিজেরহাতে পায়ের নখের দিকে তাকালো। নাহ সব ঠিক আছে। লোকটা মিথ্যা বলছে। আবার মনে হলো সে যা বলছে তা সত্যিওতো হতে পারে। হয়তো সেই সময়ে সেরকমই ছিল এখন আর নেই। নিশিকান্ত আবারও শোনারচেষ্টা করলো লোকটা কি বলে।এবার লোকটা এমন কথা বললো যে নিশিকান্তর বমি আসতে লাগলো আর রাগে পেশি শক্ত হয়ে গেল। নৌকার মাঝি জানালো এর পর নাকি সেই ছেলেটা হঠাৎ তাকে কামড় দিতে ইয়া বড় বড় দাত বের করে তেড়ে আসছিল। সে কোন মতে দৌড়ে পালিয়ে বেচে গেছে। নির্ঘাত ছেলেটা ভূত বা এধরনের কিছু। নিশিকান্ত এবার নিজেকে ধরে রাখতে পারলোনা। ভীড় ঠেলে এগিয়ে গিয়ে বললো আপনারা এই পাগলের কথা শুনছেন কেন। ইনি যা বলছে তার কিছুই সত্যি নয়। দেখেন ইনি আরো কত মিথ্যা বলে। একজনে বলতে যাচ্ছিল খোকা তুমি কিভাবে শিওর হলে যে উনি মিথ্যা বলছেন তা আর প্রশ্ন করার দরকার হলোনা। মাঝি যে মিথ্যা বলছে তা মাঝি নিজেই প্রমাণ দিলো। নিশিকান্তকে দেখে বলে উঠলো আরে এইতো সেই ছেলে যে আমার নৌকা নিয়ে পাচদিন ওই জঙ্গলে থেকে এসেছে। এইতো আমাকে খাওয়ার জন্য তাড়া করেছিল। সবাই তখন নিশিকান্তর দিকে তাকালো। নাহ কোন অসঙ্গতি তারা খুজে পেলোনো। কেউ কেউ নিশিকান্তর হাত ছুয়ে দেখলো আর যারাঅতি ভীতু প্রকৃতির তারা নিশিকান্ত থেকে একটু দূরে সরে গেল।যখন দেখা গেল আসলে সেরকম কিছুই না তখন সবাই যে যার মত চলে গেল। সেখানে থেকে গেল শুধু নিশিকান্ত আর নৌকার মাঝি।মাঝি ওকে দেখে ভীত থাকলো। সেই ফাকে নিশিকান্ত আবার নৌকায় উঠে নৌকার বৈঠা বাইতে শুরু করলো। নদীর কুলে দাড়িয়ে মাঝি চিৎকার করে বলতে শুরু করলো যে ভয়ংকর ছেলেটা আবার জঙ্গলে ঢুকছে। কিন্ত তার কথায় কেউ কান দিলনা। সেরাতে নিশিকান্ত সাহস হারালোনা। সে মনে মনে ভাবলো আজ যে কোন ভাবেই হোক যা হয় হোক তবুও ওই অদ্ভুত লোকদের দেখা পেলে তাদের সামনে দাড়াবে। অপেক্ষায় থাকতে লাগলো কখন তাদের দেখা মেলে। ওর অপেক্ষার পালা যেন শেষই হতে চায়না।

    (এই চ্যাপ্টার শেষ করে আগের চ্যাপ্টারের শেষে কি ঘটেছিল তা লিখতে হবে)

 বিশ্বের নানা প্রান্তে একটা ভয়ংকর সংবাদ প্রচারিত হলো। ভীন গ্রহবাসী পৃথিবীতে এসেছে। তারা পৃথিবীরএখন চরম বিপদ। বিজ্ঞানীরা জানেনা কোথায় সেই ভয়ংকর প্রাণীগুলি অবতরণ করেছে। তারা শুধু এতটুকু জানতে পেরেছে যে এই বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে হলে এমন একটা ছেলে দরকার যার বয়স তের বছর। যার অন্যরকম শক্তি আছে। যার শরীরের ভিতর দিয়ে গামা রশ্মি প্রবাহিত হতে পারে। যার হৃৎপিন্ডের সিস্টোলিক চাপ ডায়াস্টোলিক চাপের তিন গুন। সেই ছেলেটি এমন যে একহাজার পাওয়ারের লাইটের দিকে টানা দশ মিনিট তাকিয়ে থাকতে পারবে তার কিছুই হবেনা। বিজ্ঞানীরা একটা আল্ট্রা সাউন্ড ব্যবহার করে সেই ভয়ংকর প্রাণীদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করছে কিন্ত কোন ভাবেই সেই তরঙ্গ তারা ধরতে পারছেনা। পৃথিবী ব্যাপী এই সব কথা প্রচার করা হচ্ছে ঘন্টায় ঘন্টায়। যে যতটুকু পারছে চেষ্টা করছে এরকম একটা ছেলে খুজে বের করতে। নিজ বাসায় যে সমস্ত ছেলে সন্তানআছে এবং যাদের বয়স তের বছর তাদের ক্লিনিক্যাল টেষ্ট করা হচ্ছে। কিন্ত তিন চার দিন কেটে যাওয়ার পরও এমন কোন ছেলে সন্তানের খোজ মেলেনি।

অ্যানা

মধ্য বয়ষ্ক মানুষটির নাম রাফা,রাফায়েল রডরিগেজ। পুরোনো গাড়ির ব্যবসা আছে। তা দিয়েই সংসার চলে। সংসার বলতে সে একা একজন মানুষ। বউ ছেলে মেয়ে কেউ তার সাথে থাকে না। এক সকালে সে নিজে নিজেই তার গাড়ির বিজ্ঞাপন তৈরি করছিল। ক্যামেরা অন করে গাড়িগুলোকে পেছনে রেখে সে নিজের মত করে বলছিল আমি রাফা, রাফায়েল রডরিগেজ— । এমন সময় পাশ থেকে কেউ একজন তাকে অনুকরণ করে কথা বলে ওঠে। রাফা পেছনে ফিরে দেখে এগার বছরের একটি মেয়ে বসে আছে। যেন তাকে ভেংচি কাটছে। সে মেয়েটিকে তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য তার দিকে ধাওয়া করলে মেয়েটি দৌড়ে সরে যায়। রাফা আবার ফিরে এসে নতুন করে ভিডিও বানানোর চেষ্টা করে। তখন দেখা যায় সেই ছোট্ট মেয়েটি আবার ফিরে এসেছে এবং ঘরের বারান্দায় টুল পেতে বসেছে। মেয়েটি দেখতে খু্বই মিষ্টি চেহারার অধিকারী,শান্ত আর ভীষণ বুদ্ধিমতি। গায়ে লাল টিশার্টের কলার থেকে হাফ হাতা পযর্ন্ত সাদা স্ট্রাইপ দেওয়া। পরনের জিন্স। দারুন মানিয়েছে তাকে। চুল ফ্রেঞ্চকাট। রাফা তার কাছে এগিয়ে আসে। জানতে পারে তার মা জেলে আছে এবং বাবা তাদেরকে অনেক আগেই তাড়িয়ে দিয়েছে। মেয়েটির নাম অ্যানা। অ্যানা সেদিন সারাদিন তার সাথে ঘুরে রাতে তার বাসায় থাকে। মাঝ রাতে রাফায়েল ঘুম থেকে উঠে ড্রয়িং রুমে এসে দেখে অ্যানা সোফার উপর শুয়ে আছে। রাফা সেখানে আসার পর অ্যানা চোখ পিটপিট করে তাকায়। রাফা তখন নিজের পরিচয় দেয় যে তার নাম রাফা, রাফায়েল রডরিগেজ। অ্যানা বলে আমার নাম অ্যানা এবং আমি জানি তোমার নাম রাফা। তারপর দুজন দুজনকে গুডনাইট বলে ঘুমিয়ে পড়ে।

পরদিন থেকে অ্যানা সব সময় রাফার সাথেই থাকে। রাফা আর অ্যানা কোথাও ঘুরতে গিয়েছিল। ফিরে এসে দেখে রাফার গ্যারেজের সব গাড়ি কর্তৃপক্ষ তুলে নিয়ে যাচ্ছে। সে কোনো ভাবেই তাদের আটকাতে পারে না। অ্যানার উপর রাগ ঝাড়ে যেন সব দোষ অ্যানার। রাফা ভেঙ্গে পড়ে আর অ্যানা তাকে সাহস দিতে চেষ্টা করে। তারপর দুজন বহু দূরে সাগর পাড়ে চলে যায়। যেখানে এমন একটি কুপ আছে যার গভিরতা কেউ জানে না। কুপের পাশে দাড়ালে হঠাৎ বিশাল একটা জলচ্ছ্বাসের মত তৈরি হয়। রাফা জানায় বহুদিন আগে কেউ একজন এই কুয়োয় ঝাপ দিয়েছিল। সাথে সাথে কুয়ো শুকিয়ে দিয়েছিল আর লোকটিকে সাগরের মাঝে ‍নিয়ে ফেলেছিল। অ্যানা অবাক হয়। অ্যানা দেখে রাফা হতাশ হয়ে পড়েছে। রাফা তাকে বলেছে এই ব্যবসার টাকা দিয়েই তার সংসার চলে। রাফার হাতে তখন সামান্য কিছু টাকা ছিল। অ্যানা দেখলো রাফা জুয়ার আসরে যায় বিশেষ করে মোরগের লড়াই হয় যেখানে। একদিন অ্যানা তার পিছুপিছু যায় এবং দেখতে পায় রাফা তার শেষ সম্বল পাঁচ হাজার ডলার হেরে যায়। এগার বছর বয়সী অ্যানার খুব ক্ষুধা লাগে কিন্তু টাকা নেই। তখন ওই ক্লাবের হোটেলে ঢুকে দেখতে পায় একটি টেবিলে পপকর্ণ বাকেট। সেখানে কিছু পপকর্ণ অবশিষ্ট আছে। সে সেগুলো খেতে থাকে। হঠাৎ চোখে পড়ে একপাশে একটা বেবি ট্রলি যা অনেকটা হুইল চেয়ারের মত। বাচ্চা মেয়ের স্বভাব অনুযায়ি অ্যানা সেটা নিয়ে আসে এবং সেখানে বসে খেলতে থাকে। এক ফাঁকে ওর হাতে থাকা পপকর্ণ বাকেটের সব পপর্কণ শেষ হয়ে যায়। এমন সময় পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এক লোক সেই ফাঁকা বাকেটে ২০ বাকসের একটি নোট দেয়। 

Defne Keen

বুদ্ধিমতী এনা সাথে সাথে বিষয়টা বুঝে ফেলে। এবার সে ইচ্ছে করেই হুইল চেয়ারের মত করে পুরো হোটেলের বিভিন্ন টেবিলে ঘুরতে থাকে আর তার বাকেটে ডলার এবং বাকস জমা হতে থাকে। রাতে সব ডলার হেরে রাফায়েল যখন বাসায় ফিরবে বলে গাড়িতে ওঠে তখন পেছনের সিট থেকে অ্যানা বেরিয়ে আসে। অনেক গল্প হয়। সে তাকে ডলার দেখায়। পুরো বিষয়টা বলে। সে বলে তুমি চাইলে তোমার ব্যবসার টাকা জোগাড় করতে আমি সাহায্য করবো। রাফায়েল তাতে সায় দেয় না। অ্যানার কাছ থেকে তার মায়ের বিষয়ে জেনে একদিন জেলে গিয়ে অ্যানার মায়ের সাথে দেখা করে এবং অ্যানাকে অ্যানার বাবার কাছে রেখে আসার সিদ্ধান্ত নেয়। এটা শুনেই অ্যানা বলে গিয়ে দেখবে তার বাবা তাকে চেনেই না। অনেক ঘটনার পর একদিন যখন সত্যি সত্যিই অ্যানার বাবার সাথে দেখা করে অ্যানার কথা বলে তখন লোকটা অস্বীকার করে। সে তখন তার নতুন স্ত্রীকে নিয়ে মেতে আছে। অ্যানা এবং রাফা ফিরে আসে। এক চার্চে যায়। সেই সময়ে অ্যানা সেই ক্লাবের মতই হুইল চেয়ারে বসে চার্চে আগতদের কাছ থেকে প্রচুর ডলার সাহায্য পায়। চার্চের দায়িত্বরত মহিলা বিষয়টি টের পায় এবং চার্চের বাইরে এসে অ্যানা ও রাফাকে ধরে ফেলে। অফিসে নিয়ে অনেক কথা হয়। 

বুদ্ধিমতি ছোট্ট অ্যানা চার্চের কর্মকর্তাদেরও কনভিন্স করে ফেলে। বলে এটিকে  একটি ফান্ড রেইজিং ওয়ে হিসেবে নিতে। কিছু অর্থ চার্চ পাবে বাকিটা অ্যানা পাবে। তারা রাজি হয়। এটা কোনো ভাবেই রাফা মানতে চায় না। এটা অন্যায়। পরে রাফা অ্যানাকে রেখে চলে যায়। অ্যানা চার্চের হয়ে সবার সামনে হুইল চেয়ারে বসে গল্প বলে। মিরাকল হিসেবে প্রচার করে যে সে এখন উঠে দাড়াতে পারে,হাটতে পারে। সবাই ইমপ্রেসড হয় এবং প্রচুর সহযোগিতা করে। কিন্তু এক পর্যায়ে দেখা যায় ৫০ হাজার ডলার আয় হয়েছে কিন্তু অ্যানা তার ভাগের অংশ চাইলে তারা বলে সে সব টাকাতো ডোনেট করে দিয়েছে চার্চের নামে। এমনই নাকি চুক্তি ছিল। কিন্তু ওরা জানতো না অ্যানা কতটা বুদ্ধিমতী। ওদের এই কথাগুলো সে রেকর্ড করে নিয়েছিল। পরে একদিন ব্যবসায়ীদের সম্মেলনে চার্চের জন্য ফান্ড রেইজিং হচ্ছে এমন অনুষ্ঠানে হাজির হয়ে অ্যানা কর্তৃপক্ষকে সেই রেকর্ড দেখায় ফলে বাধ্য হয়ে তারা অ্যানাকে ৩০ হাজার ডলার ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয়। নানা চড়াই উতরাই পার হয়ে অ্যানা আর রাফায়েল অবশেষে আবার তাদের গ্যারেজ দাড় করাতে পারে। আগে রাফা নিজে মডেল হিসেবে গাড়ি বিক্রির চেষ্টা করে ভিডিও বানাতো এখন অ্যানা সেই কাজটি করে। গাড়ি ধুয়ে দেয় আর ভিডিও করে গাড়ির গুনাগুন বর্ননা করে।

অ্যানা নামের এই মুভিটি চমৎকার লেগেছে। গত কাল ২৩ অক্টোবর ২০২২ তারিখ রাতে মুভিটি দেখলাম। আগেই নামানো ছিল তবে দেখা হয়নি। মুভিতে মাঝে মাঝেই স্প্যানিশ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে তবে বুঝতে অসুবিধা হয়নি। অ্যানা চরিত্রে ডেফিনি কিন নামের মেয়েটি অসাধারণ অভিনয় করেছে। ডেফনি কিন এর আগে লোগান সিনেমায় উলভারিনের মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করেছে। তার অভিনয় দক্ষতা,তার মিষ্টি চেহারা,বুদ্ধিমত্তা আর দূরন্তপনা আমার ভালো লেগেছে। ডেফনি কিন তথা অ্যানাকে খুব আপন মনে হয়েছে।মনে হয়েছে এমন কেউ পরিবারে থাকলে দারুণ সময় কাটে।

তুলসি দাস জুনিয়র

বাবা তুলসি দাস একজন স্নুকার খেলোয়াড়। প্রায় প্রতি বছরই স্নুকার  ক্লাব চ্যাম্পিয়ণশীপে খেলেন এবং ফাইনালেও ওঠেন। তবে ভাগ্য সহায় না হওয়ায় কোনোদিন চ্যাম্পিয়ন হতে পারেননি। সব ম্যাচ ভালো খেললেও কেন যেন ফাইনালে সব তালগোল পাকিয়ে ফেলেন। তুলসি দাসের বদঅভ্যাস হলো প্রচুর মদ খান। মাতাল হয়ে কি আর ফাইনাল জেতা যায়? পাশে বসে বসে নিরব দর্শক হিসেবে তুলসি দাসের  দুই ছেলে এবং স্ত্রী তার হার দেখে। ছোট ছেলেটির মন খারাপ হয় সবচেয়ে বেশি। বাবার সাথে সেইতো নিয়মিত খেলা দেখতে আসে। বাবার খুব ভালো বন্ধু সে। তার বড় ভাই অবশ্য হতাশাবাদীদের দলে। সে সব সময় বলে তার বাবা কোনোদিনও উইনার বোর্ডে নাম লেখাতে পারবে না। কিন্তু ছোট ছেলেটি তা মানতে নারাজ। সে সিদ্ধান্ত নেয় তার বাবা না পারলেও সে নিজে একদিন চ্যাম্পিয়ন করবে। বার বছর বয়সী ছেলেটির নাম মিডি। মিডি চরিত্রে অসাধারণ অভিনয় করেছে বরুন বুদ্ধদেব। সত্য ঘটনা অবলম্বেনে নির্মিত চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় ২০২২ সালে এবং একই বছর তা নেটফ্লিক্সেও রিলিজ হয়। পাশাপাশি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে। মৃদুল তুলসীদাস ছবিটি বানিয়েছেন নিজের জীবনের উপর ভিত্তি করেই। তবে সিনেমা মুক্তি পাওয়ার আগেই মারা যান তাঁর বাবা ও তাঁর বাবার চরিত্রে অভিনয় করা রাজীব কাপুর।৬৮তম জাতীয় পুরস্কারের তালিকায় মৃদুল তুলসীদাসের সিনেমা ‘তুলসীদাস জুনিয়ার’ পেয়েছে সেরা ছবির সম্মান। আশুতোষ গোয়ারিকর প্রযোজিত এই ছবি পরিচালকের নিজের গল্প অবলম্বনে তৈরি। ছোটবেলায় বাবার সঙ্গে কাটানো মুহূর্তই এই ছবির বিষয়বস্তু। সঙ্গে এটাই অভিনেতা রাজীব কাপুরের শেষ কাজ। মারা যাওয়ার আগে এই ছবিতেই শেষবার অভিনয় করেছিলেন তিনি। আর সেই কারণে মৃদুল এই সম্মান উৎসর্গ করলেন নিজের প্রয়াত বাবা আর অভিনেতা রাজীব কাপুরকে।

বাবাকে বার বার হেরে যেতে দেখে মিডি নামের বার বছরের ছেলেটি সিদ্ধান্ত নেয় সেও প্রতিযোগিতায় খেলবে কিন্তু সে তো কখনো স্নুকার খেলা শেখেনি। নিয়মও জানে না। তারপরও সাহস নিয়ে সে ক্লাবে গিয়ে অনেকের কাছে হেল্প চায় কিন্তু কেউ তাকে খেলায় নিতে চায় না। বিশেষ করে ষোল বছর হয়নি বলে আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। কিন্তু মিডি হার মানবেনা বলে সিদ্ধান্ত নেয়। তার বড় ভাই তাকে নানা ভাবে সহযোগিতা করে। সে আসলে একরকম জুয়ার নেশায় ছিল। ছোট ভাই মিডিকে দিয়ে সে আসলে টাকা আয় করতে চাইতো। ফলে কখনো ক্রিকেটার কখনো ব্যাডমিন্টন কখনো টেনিস খেলায় নিয়ে যেত। কিন্তু মিডি চাইতো বাবার মত স্নুকার খেলবে। একদিন সে একই ক্লাবের এক মেম্বারের নজরে পড়ে। তিনি সাদাসিধে মানুষ। ছোট্ট মিডিকে নিজের সাথে খেলতে বলে এবং নিয়ম কানুন শেখায়। তবে মজার বিষয় হলো তিনি নিজেই তেমন খেলা পারেন না। টাকাওয়ালা মানুষ তাই ক্লাবের মেম্বার হয়েছেন। ক্লাবের কেউ তার সাথে খেলতে চায় না।

খোজ নিতে নিতে মিডি জানতে পারে তার বাসা থেকে অনেক অনেক দূরে একটা জায়গা আছে সেখানে টাকার বিনিময়ে স্নুকার খেলা যায়। আর সেখানেই একজন পাক্কা স্নুকার খেলোয়াড় আছে যার নাম মোহাম্মদ সালাম। সবাই তাকে সালাম ভাই বলে ডাকে। মিডি সেখানে যায় এবং সেই বস্তির মত জায়গায় একটা ক্লাব খুজে পায়। সালাম ভাই আসে। বিশাল দেহি সালাম ভাই খেলা শুরুর আগে এক ঘন্টা ঘুমিয়ে নেয়। তার খেলা দেখে মিডি বিস্মিত হয়। সে সিদ্ধান্ত নেয় সালাম ভাইয়ের কাছ থেকে শিখবে। কিন্তু লোকটা যা বদরাগি। সবাই নিষেধ করে। তবুও সে দমে যায় না। দূর থেকে একটু একটু করে তাকে ফলো করে। একদিন সালাম ভাইয়ের নজর পড়ে তার প্রতি। তারপর সে সালাম ভাইকে অনুরোধ করে তাকে যেন শেখানো হয়। সে তার জীবনের গল্প বলে। সালাম ভাই রাজি হয়। এর পর থেকে রোজ সে বাড়ি থেকে অনেক দূরে গিয়ে সালাম ভাইয়ের কাছে তালিম নেয়। সালাম ভাই চরিত্রে অভিনয় করেন প্রখ্যাত অভিনেতা সঞ্জয় দত্ত।

মুভিতে দেখা যায় সালাম ভাই একজন ভবঘুরে টাইপ মানুষ। কোথায় কী করেন তার কোনো খোজ নেই কিন্তু রোজ ক্লাবে এসে স্নুকার খেলেন। তার সাথে কিন্তু কেউ খেলে না। নিজেই স্টার্ট করে এক চান্সে সব ফেলে দেন। এরপর আসে ক্লাব চ্যাম্পিয়নশীপের সময়। মিডি তার ভাইকে নিয়ে আবেদন পত্র আনতে গেলে কেউ দিতে চায় না। তখন সেই যে ক্লাবের এক সাদাসিধে মেম্বার সে অনুরোধ করে চেয়ারম্যানকে। চেয়ারম্যান তাকেও ভালোভাবে বুঝায় যে ক্লাবের নিয়ম কি। ঠিক এরকম সময় মিডির বাবা তুলসী দাস এক খেলোয়াড়ের সাথে বাজিতে খেলে মাঝপথে খেলা ছেড়ে চলে যায়। অনেক গুলো টাকা হারে। এটা মিডি মেনে নিতে পারে না। সে তার ভাইকে সাথে নিয়ে ক্লাবে এসে লোকটিকে বলে খেলা এখনো শেষ হয়নি। তখন লোকটা বলে তোর বাবাতো চলে গেছে কে খেলবে আমার সাথে? তখন মিডি বলে আমিই খেলবো। সবাই খুব হাসে। কেউ তখনো জানতো না যে ভেতরে ভেতরে মিডি এই খেলায় পারদর্শী হয়ে উঠেছে। লোকটির সাথে মিডি খেলতে শুরু করে এবং অনায়াসে তাকে হারিয়ে দেয়। যখন সবাই উল্লাস করছে তখন সেখানে চেয়ারম্যান আসে এবং মিডির খেলা দেখে অভিভূত হয় আর সাথে সাথে তাকে প্রতিযোগিতায় খেলার অনুমতি দেয়।

প্রস্তুতি ভালোই চলছিল। প্রতিযোগিতা শুরু হলো। ফর্ম জমা দেওয়ার সময় ক্লাব থেকে নাম জানতে চাইলে সে বললো নাম লিখুন তুলসি দাস জুনিয়র! মিডি নাম না লিখে সে তার বাবার নাম লিখলো কারণ উইনার বোর্ডে সে তার বাবার নাম দেখতে চায়। একই প্রতিযোগিতায় তার বাবা তুলসি দাসও অংশ নিল। দেখা গেল প্রথম দিন মিডি তথা তুলসি দাস জুনিয়রের খেলা পড়েছে সেই শুভাকাঙ্খি ক্লাব মেম্বারের সাথে। মিডি তাকে অনায়াসে হারিয়ে দিয়ে পরের রাউন্ডে চলে গেল। অন্যদিকে তার বাবা তুলসি দাসও  একের পর এক গেম জিতে সামনে এগিয়ে গেল। একসময় বাবা ছেলের দেখা হলো বা লড়াইয়ে নামার সময় হলো। সেই গেমে মিডি জিতলো তবে তার মন খারাপ। সে মনে করে বাবা তাকে ইচ্ছে করে জিতিয়েছে।

এভাবেই একে একে সে ফাইনালে উঠে গেল এবং প্রতি বার যার কাছে বাবা ফাইনালে হারে সেই জিমি টেন্ডনের সাথে খেলা পড়লো। খেলতে গিয়ে দেখা গেল প্রথমে বেশ ভালোই খেলছিল মিডি। খেলার এক পর্যায়ে সেখানে প্রবেশ করলেন মোহাম্মদ সালাম তথা সালাম ভাই। গার্ড তাকে ঢুকতে দিচ্ছিল না তখন এমন সময় মিডি বললো সে আার কোচ! যখন এই কথা বললো তখন সবাই তার দিকে ফিরে তাকালো। ক্লাবের প্রেসিডেন্টও তার দিকে তাকিয়ে দেখলো আরে তিনিতো পরিচিত মানুষ। তখন গার্ডকে নির্দেষ দিলেন আসতে দিতে এবং ঘোষণা করে জানিয়ে দিলেন সালাম ভাই জাতীয় চ্যাম্পিয়ন! চলছে ক্লাব চ্যাম্পিয়নশীপ সেখানে সালাম ভাই জাতীয় চ্যাম্পিয়ন ভাবা যায়। সালাম ভাইকে পেয়ে সবাই খুশি। তুলসি দাস জুনিয়রও ভালো খেলছে। ব্রেকের সময় বারে গিয়ে সে যখন লেমনেড খেলো তখন জিমি টেন্ডন বিয়ার খাচ্ছিল। এক পর্যায়ে জিমি টেন্ডন মিডি তথা তুলসি দাস জুনিয়রের আঙ্গুল ধরে এমন ব্যাথা দিল যে পরে তার খেলতে ভীষণ অসুবিধা হচ্ছিল। এসব দেখে সালাম ভাই উঠে বেরিয়ে গেলেন। যাওয়ার সময় ইশারা করলেন মিডিকে। মিডি বুঝলো তাকে কী করতে হবে। সালাম ভাই যেমন এক ঘন্টার ঘুম দিতেন সবাইকে অবাক করে দিয়ে মিডিও সেভাবে একটা ঘুম দিল। জিমি টেন্ডন সহ বাকি সবাই বিস্মিত হলো এটা দেখে। জিমি টেন্ডনতো বললো বাচ্চাটাকে বাসায় নিয়ে ঘুম পাড়ান। ঠিক এক ঘন্টা পর মিডি তথা জুনিয়র তুলসি দাস উঠলো। হাতমুখ ধুয়ে নিল এবং একটু পর বাবা যে স্টিক দিয়ে খেলতেন সেটি নিয়ে আসলো। তার পর আর তাকে ফিরে তাকাতে হয়নি। জিমি টেন্ডনকে আর কোনো সুযোগই দেয়নি সে। একাই তরতর করে খেলে চ্যাম্পিয়ন হয়ে পুরো ক্লাবের ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী খেলোয়াড় হিসেবে উইনার বোর্ডে নাম লেখালো।

বিজয়ী ঘোষণার পর পরই সে ছুটে চলে গেল সালমান ভাইয়ের কাছে। সেখানে গিয়ে দেখলো সবাই চিন্তিত। মিডি গিয়ে দুই হাত উচু করতেই সবাই বুঝে গেল মিডি চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। অন্যদিকে পুরস্কার তুলে দেওয়া হলো তুলসি দাসের হাতে। বোর্ডে নাম উঠলো জুনিয়র তুলসি দাস।

সিনেমাটি বাস্তব জীবনের গল্প অবলম্বনে নির্মিত এবং ক্রিকেটের বাইরেও যে অন্য কোনো গেমস নিয়ে বানানো সিনেমা এতোটা আকর্ষণীয় হতে পারে তার প্রমান এই সিনেমাটি। আপনি দেখতে বসলে ভালো না লেগে যাবে না। বরুন বুদ্ধদেব তথা জুনিয়র তুলসি দাস অসাধারণ অভিনয় করেছে। সেই সাথে বাকিরাও নিজেদের ছাড়িয়ে গেছে। নেটফ্লিক্সে মুভিটি দেখলাম।

২৪ অক্টোবর ২০২২

আ বয় কলড ক্রিসমাস

ছেলেটির নাম নিকোলাস। বয়স বার। বরফের দেশে বাবার সাথে বাস করে। সারাক্ষণই থাকে মৃত্যু ভয় বিশেষ করে কখন না কখন মেরু ভল্লুক এসে আক্রমন করে। ছোট্ট একটি কুড়ে ঘর তাদের। বাবা আর নিকোলাস দুজনের বাস। ঘুমোনোর আগে নিকোলাস বাবার কাছে গল্প শুনতে চায়। একদিন বাবার সাথে ঘুরতে গিয়ে সে ভল্লুকের আক্রমনের শিকার হলেও দুজনই বেঁচে যায়। এর মাঝে এক রাতে নিকোলাসদের বাসায় একটু ইদুর ঢুকে খাবার চুরি করে। ওর বাবা কুড়াল দিয়ে তাকে কেটে  টুকরো টুকরো করতে চেষ্টা করলেও পারে না। তিড়িংবিড়িং করে লাফিয়ে সরে যায়। পাশাপাশি নিকোলাস নিজেও ইদুরটাকে মারতে নিষেধ করে। এবং একসময় ইদুরটা নিকোলাসের বন্ধু হয়ে যায়। কিছুদিন পর বাবাকে একটি অভিযানে যেতে হয়। এলফাম নামে এক যাদুর শহর খুঁজে বের করার দলে ভেড়ে। এলফাম এমন একটি শহর যা সাধারণ মানুষের কাছে গল্প হিসেবে আছে। কিন্তু কেউ সেভাবে বিশ্বাস করে না। আর সেটা নিকোলাসদের বাড়ি থেকে অনেক অনেক দূরে। দিনের পর দিন সেখানে ভ্রমন করতে হয়। বরফ ঢাকা পুরো এলাকা। নিকোলাস বাবার সাথে যাওয়ার আব্দার করলেও তিনি না করেন। নিকোলাসকে দেখে রাখার জন্য তিনি তার আপন বোনকে চিঠি লেখেন এবং সেই বোন এসে হাজির হয়। নিকোলাস যদিও তাকে পছন্দ করে না। বাবা অভিযানে বের হওয়ার পর পরই যখন বাড়িতে নিকোলাস আর তার ফুপু ছাড়া কেউ নেই তখন ফুপু নিকোলাসকে বাড়ি থেকে বের করে দেয়। কোথাও থাকার যায়গা নেই। শুধু বরফ আর বরফ। নিকোলাস তার সেই ইদুর বন্ধু আর কিছু জামাকাপড় কম্বল নিয়ে দূরেই কাঠখড়ি দিয়ে তাবুর মত বানিয়ে সেখানে বাস করতে থাকে। এক সকালে ওকে ফুপু ডেকে স্যুপ খেতে দেয়। বেশ মজাদার ‍স্যুপ খেতে থেকে একসময় দেখতে পায় তার প্রিয় একটি খেলনা যা একটি বড় সাইজের মুলা দিয়ে তার মা বানিয়েছিল সেটা দিয়ে স্যুপ রান্না করেছে। এতে নিকোলাসের মন খারাপ হয়। একই সময়ে নিকোলাসের বাবা যাওয়ার সময় তাকে একটা হ্যাট দিয়ে গিয়েছিল সেটাও আগুনে পুড়িয়ে দিতে চায়। তখন নিকোলাস আগুন লাগা অবস্থায় হ্যাটটি নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে বরফে চাপা দিয়ে আগুন নেভায়। 

দেখা যায় আগুনে অনেকটুকু পুড়ে গেছে। ভেতরে কিছুটা নকশা দেখা যাচ্ছে। নিকোলাস সেটা ছিড়ে হ্যাটটা উল্টে দিতেই দেখতে পায় সেখানে একটা নকশা কাটা যা সেই যাদুর শহর এলফামে যাওয়ার পথ নির্দেশ করছে! নিকোলাস সিদ্ধান্ত নেয় বাবাকে খুঁজতে যাবে। যেহেতু অনেক দিন হলেও বাবা ফিরে আসেনি। শেষে ফুপুকে না বলেই সে বেরিয়ে পড়ে। সাথে তার সেই ইদুর বন্ধু। মজার বিষয় হলো একপর্যায়ে নিকোলাস কারো একজনের কথা শুনতে পায় কিন্তু আসেপাশে কেউ নেই। তারপর সে দেখে তার ইদুর বন্ধুটিই কথা বলছে! নিকোলাস অবাক হয় এবং জানতে পারে ইদুরটি আগে থেকেই কথা বলতে পারতো কিন্তু সে বলেনি। এরপর গল্প করতে করতে সেই বরফের মধ্যে ওরা হাটতে থাকে। পথে একটা মেরু হরিণ বা ওই টাইপের প্রাণী যার হরিণের মত সিং আছে ওদেরকে আক্রমন করে। ওরা প্রাণ ভয়ে একটা গাছে ওঠে। পরে দেখতে পায় হরিণটা তীর বিদ্ধ হয়ে আছে। নিকোলাস নিচে নেমে আসে যদিও ইদুর ওকে নিষেধ করে। তীরবিদ্ধ হরিণকে সে তীরমুক্ত করে। তারপর বিদায় জানিয়ে হাটতে শুরু করে। এমন সময় দেখা যায় হরিণটাও ওদের ফলো করছে। একপর্যায়ে ওদের সঙ্গী হয়। নিকোলাসকে ইশারায় বলে হরিণের পিঠে চড়ে বসতে। নিকোলাস চড়ে বসে এবং অবাক হয়ে দেখে সেই হরিণটা খুবই দ্রুত বেগে তাদের নিয়ে বরফের উপর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ঘোড়ার মত দ্রুত গতি তার। একসময় তারা সত্যি সত্যিই এমন যায়গায় উপস্থিত হয় যে নিকোলাস জ্ঞান হারায়।

ওই সময়ে ওই পথ দিয়ে এলফামের ছোট্ট সাত বছর বয়সী একটি মেয়ে আর তার দাদু যাচ্ছিল। মানব শিশু দেখে তাদের মায়া হয় এবং তাকে সহযোগিতা করে। যদিও এলফামের সবাই মানুষকে ভয় পায় এড়িয়ে চলে। নিকোলাস কিন্তু এলফাম দেখতে পায় না যদিও সে তখন এলফামের মাঝেই দাড়িয়ে আছে। তখন ছোট্ট মেয়েটি বলে বিশ্বাস নিয়ে তাকাও দেখতে পাবে। তখন আস্তে আস্তে পুরো এলফাম ওর সামনে দৃশ্যমান হয়। ওরা একসাথে এলফামে গেলে রাণীর লোকদের টহল দিতে দেখে। ওরা একযায়গায় গিয়ে দেখে সবােই আনন্দ করছে। মেরি ক্রিসমাস বলছে। নিকোলাস জানেই না ক্রিসমাস আসলে কী। তখন ছোট্ট মেয়েটি ওকে কিছু তথ্য দেয়। নিকোলাস বলে ওর মা ওকে ক্রিসমাস বলে ডাকতো! একসময় রাণী এসে হাজির হয় এবং উৎসব বন্ধ করে দেয়। নিকোলাসকে মানব শিশু হিসেবে বন্দি করা হয় কারণ কিছুদিন আগে মানুষেরা এলফামের এক শিশুকে কিডনাপ করেছে। নিকোলাস কথা দেয় তাকে উদ্ধার করে আনবে কিন্তু কেউ কথা শোনে না। পরে ওকে যেখানে বন্দী করা হয় সেখানে পাখাওয়ালা একটি মেয়ের সাথে পরিচয় হয়। সেই ্ওকে সাহায্য করে। তারপর ওরা বেরিয়ে পড়ে। সেই হরিনের কাধের একটা জায়গায় হাত পড়তেই নিকোলাস অবাক হয়ে দেখতে পায় হরিণটা তাদেরকে নিয়ে আকাশে উড়ছে!

অনেক ঘটনার পর নিকোলাস সেই এলফাম শিশুটিকে উদ্ধার করে ফিরিয়ে দেয়। নেটফ্লিক্সে গতকাল ২২ অক্টোবর ২০২২ রাতে মুভিটি দেখলাম।

দুবাই ট্রানজিট

কিছুক্ষণ আগে দুবাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে চেক আউট করেছেন আফতাব আহমেদ। বাংলাদেশ থেকে তিনদিনের সফরে তিনি এখানে এসেছেন। চেকআউট করার পর তার প্রথম কাজ হলো একটা গাড়ি ভাড়া করা। নিজের ইন্টারন্যাশনাল ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে। নিজের গাড়ি সব সময় নিজেই ড্রাইভ করতে ভালোবাসেন। পেশায় তিনি একজন আইনবিদ। তবে দুবাইতে তিনি কোনো আইন বিষয়ক কাজে আসেননি। ব্যবসায়িক কাজেও আসেননি। তিনি  এসেছেন একটা বিশেষ কারণে। স্ত্রী পুত্র আর কন্যাকে সাথে আনার সুযোগ নেই। তিনি একাই এসেছেন। অবশ্য স্ত্রী পুত্র কন্যা কেউ দেশে নেই। একটা গাড়ি ভাড়া নিতে পারলে তখন আসেপাশে ঘুরে দেখা সহজ হবে। হাতে তিনদিন সময় আছে। ফিরতি টিকেট আগেই করা আছে। এমনকি সেই টিকেট তিনি করেছেন দুবাই আসারও অনেক আগে। অর্থাৎ আগে ফেরার টিকেট করেছেন তারপর আসার টিকেট করেছেন। গাড়ি ভাড়া নিতে পারলে সেই গাড়ি ড্রাইভ করে পছন্দসই হোটেল খুঁজে নেওয়া যাবে। তার এই দুবাই সফরের কথা স্ত্রী পুত্র কন্যা কেউ জানে না। শুধু আমি জানি। আমি তার একজন বন্ধু। অবশ্য শুধু তার একার বন্ধু না বরং পাশাপাশি তার পুত্র আর কন্যারও বন্ধু। তাকে আমি চিনেছি তার কন্যার মাধ্যমে। সে বিরাট কাহিনী সেটা না হয় অন্য একদিন বলা যাবে।

আফতাব আহমেদ অত্যন্ত মেধাবী আর জ্ঞানী একজন মানুষ। যে কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে তিনি নিজেই যথেষ্ট হওয়ার পরও প্রায় সর্বক্ষেত্রে তিনি তার কয়েকজন বন্ধু ও শুভাকাঙ্খীর সাথে আলোচনা করে তাদের মতামত জানতে চেষ্টা করেন। সৌভাগ্যক্রমে সেই কয়েকজন শুভাকাঙ্খীর একজন আমি। নানা বিষয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আমার সাথে আলোচনা করেন। একদিন আমি তাকে বললাম আমি খুবই সাধারণ মানুষ। জ্ঞানগরিমাও তেমন নেই। তারপরও আমার মতামত নেন কেন? তিনি হাসলেন। বললেন কাছের মানুষদের সাথে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিলে সিদ্ধান্তে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকে। আমাদের বন্ধুত্ব দশ বছরের । তবে দেখা হয়েছে মাত্র চার বার। তিনি দীর্ঘদিন দেশের বাইরে ছিলেন। মালয়েশিয়া,ইংল্যান্ড সহ বিভিন্ন জায়গায় থেকেছেন পড়াশোনা ও কাজের সুবাদে। হঠাৎ তার বাবা অসুস্থ হলে সংবাদ পেয়ে চলে এসেছেন। বিষয়টা এতো দ্রুত ঘটেছিল যে সাথে করে স্ত্রী পুত্র কন্যাকে নিয়ে আসতে পারেননি। এক সন্ধ্যায় তিনি আমাকে ফোন করলেন। সব সময়ইতো করেন। আমাকে ফোন করে বললেন তানজিম সাহেব আপনার সাথে একটা বিষয়ে আলোচনা করবো বলে ফোন দিলাম। আমি তাকে বললাম সেটা আপনি না বললেও আমি বুঝতে পেরেছি। আপনি কাজের মানুষ। কাজের কথা ছাড়া আপনার থেকেতো আর বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র ছাত্রীদের মত টাইমপাস করার মত গল্প শোনার আশা করতে পারি না। তিনি আমার কথা শুনে একটু হাসলেন তারপর তিনি জানালেন তিনি দুবাই যাচ্ছেন। কেন যাচ্ছেন সেটাও জানালেন আর আমার মতামত জানতে চাইলেন।

তার কাছ থেকে পুরোটা শুনে আমি বিস্মিত হলাম। পাশাপাশি মুগ্ধও হলাম। তিনি দুবাই যাচ্ছেন মূলত তার স্ত্রী পুত্র আর কন্যাকে সারপ্রাইজ দিবেন বলে। তারা বাংলাদেশে আসবে। আফতাব সাহেব নিজেই টিকেট করে দিয়েছেন। তারা অবশ্য জানে না যে সেই ফ্লাইটে দুবাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে যখন ট্রানজিট নিবে আর নতুন একজন যাত্রী তাদের পাশের সিটে উঠবে সেই যাত্রী কে। সেটা মূলত আফতাব সাহেব নিজে। স্ত্রী পুত্র কন্যার জন্য টিকেট কাটার সময়ই তিনি দুবাই থেকে বাংলাদেশ পযর্ন্ত নিজের নামেও একটা টিকেট করেছেন। আমেরিকা থেকে তারা যখন দুবাইয়ে ট্রানজিট নিবে তখন নিশ্চই কল্পনাও করবে না ওখানে আফতাব সাহেবের সাথে দেখা হবে। আফতাব সাহেবের এই পরিকল্পনা সত্যিই দারুণ। আমিও বললাম এটা হবে জীবনের অন্যতম চমকপ্রদ ঘটনা। এরপর নির্ধারিত দিনে তিনি ঢাকা থেকে দুবাইয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। যেহেতু এতোটা পথ এতোগুলো টাকা খরচ করে যাবেন তাই তিনি স্ত্রী পুত্র কন্যারা যেদিন দুবাইয়ে ট্রানজিট নিবে তার তিনদিন আগে দুবাই পৌছালেন। যেন আশেপাশে ঘুরে দেখা যায়। সেই ভাবনা থেকেই তিনি দুবাই এসেছেন। এবং নিজের জন্য একটা গাড়ি ভাড়া নিবেন বলে পাশেই আল ইসলাহ রেন্ট এ কারে উপস্থিত হলেন।

লন্ডন থেকে ব্যারিস্টার হয়ে দেশে বিদেশে নানা যায়গায় চাকরি করেছেন। তারপর দীর্ঘদিন আমেরিকাতে সেটেল্ড। ফলে ইংরেজীতে তিনি খুবই নেটিভ স্পিকার বলা যেতে পারে। তিনি আল ইসলাহ রেন্ট এ কারে গিয়ে তার চাহিদার কথা ইংরেজীতেই জানালেন। রেন্ট এ কারের মালিক সব মনোযোগ দিয়ে শুনলেন এবং তাকে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখলেন। এরপর তার পাসপোর্ট,ভিসা,ড্রাইভিং লাইসেন্স সব চেক করলেন । রেন্ট এ কার থেকে গাড়ি ভাড়া নেওয়ার জন্য কিছু শর্তও দিলেন। প্রথম শর্ত হলো ১ হাজার দিরহাম সিকিউরিটি হিসেবে জমা রাখতে হবে। আর গাড়ির ভাড়া দৈনিক ৫০০ দিরহাম। তবে ফুয়েল বা তেল যা লাগে নিজ খরচে ব্যবহার করতে হবে। আফতাব সাহেব রাজি হলেন। নির্ধারিত ফর্ম পূরণ করে তার কাছে জমা দিলেন।

আফতাব সাহেব এক সময় সেভ দ্য চিলড্রেন্স এ কাজ করেছেন। ফলে মানুষ নিয়ে কাজ করার চমৎকার অভিজ্ঞতা তার আছে। তাছাড়া ব্যরিস্টার হিসেবেও তিনি কিছুদিন প্র্যাকটিস করেছেন। সেই জীবনেও আছে দারুণ সব গল্প। সেই সব গল্প তিনি প্রায় সবই আমাকে বলেছেন। তিনি সব সময় বলেন তানজিম সাহেব আপনি হলেন আমার কথা জমিয়ে রাখা সিন্দুক। আপনি হলেন আমার কথা জমা রাখা ডায়েরি। তার জীবনের কত গল্প যে আমাকে তিনি বলেছেন। আমাকে বলতেন লিখে রাখুন। গল্প হয়ে উঠবে। আমি লিখি লিখি করে আর লেখা হয় না। আমি যদি লেখক হতাম তাহলে হয়তো সুন্দর করে তার জীবনের গল্প লিখতে পারতাম। তারপরও কিছু কিছু লিখতে চেষ্টা করেছি। হয়তো লিখতে লিখতেই লেখক হলেও হতে পারি। মূল গল্পে আবার ফিরে আসি। তিনি আল ইসলাহ রেন্ট এ কারের অফিসে যে লোকটির কাছে ফর্ম জমা দিলেন তার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন আপনিই কি এই প্রতিষ্ঠানের মালিক? লোকটি জানালো তিনিই মালিক। টেবিলের একদিকে একটা পেন স্ট্যান্ডে অবশ্য নাম খোদাই করা দেখলেন। এতোক্ষণ খেয়াল করেননি। মালিকের নাম জয়নুল আবেদীন। নাম এবং চেহারা দেখে লোকটিকে বাঙ্গালী বলে মনে হলো আফতাব আহমেদের। তিনি কৌতুহল চেপে না রেখে জানতে চাইলেন আপনি কি বাংলাদেশী? লোকটি জানালো তিনি বাংলাদেশী। এবার আফতাব সাহেব তার সাথে বাংলাতেই কথা বলতে শুরু করলেন।

বিদেশ বিভূইয়ে ব্যবসা করা জয়নুল আবেদীন কত দেশের মানুষের সাথে কথা বলেন। সবার সাথেই ইংরেজীতে কথা বলতে হয়। হয়তো মাতৃভাষায় কথা বলার সুযোগই মেলে না। অবশ্য বাড়িতে স্ত্রী পুত্র কন্যা থাকলে আলাদা কথা। আফতাব সাহেব মানুষের সাথে পরিচিত হলে আন্তরিকতার কোনো কমতি রাখেন না। তিনি তার সাথে সময় থাকলে নানা বিষয়ে গল্প করেন। জয়নুল আবেদীনের সাথেও তিনি গল্প জুড়ে দিলেন। জানতে চাইলেন এখানে কতদিন হলো এসেছেন। পরিবারে কে কে আছে এবং তারা কি এখানেই থাকে নাকি বাংলাদেশে থাকে? জয়নুল আবেদীন জানালেন পরিবার তার সাথেই থাকে। বাবা মা ভাই বোন গ্রামে থাকে। পরিবারে তার একটি কন্যা আছে যার বয়স দশ বছর।ছোট্ট সুখী পরিবার। আফতার সাহেবের নিজেরও একটি কন্যা আছে। তিনি মেয়েকে ভীষণ ভালোবাসেন। জয়নুল আবেদিন সাহেবেরও একটি কন্যা আছে এবং সেও প্রায় তার মেয়ের বয়সী শুনে তার সম্পর্কেও জানতে আগ্রহী হলেন। তিনি জানতে চাইলেন মেয়েটির নাম কী এবং কিসে পড়ছে। জয়নুল আবেদীন জানালেন তার মেয়ের নাম মায়মুনা ইসলাম। সে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়াশোনা করছে। পাশাপাশি বাসায় বসে বসে পবিত্র কুরআন হিফজ করছে।

আফতাব আহমেদ তার কথা শুনে ভীষণ মুগ্ধ হলেন। বিশেষ করে তার বলা শেষ কথাটা তাকে চুম্বকের মত আটকে রাখলো। তিনি জানতে চাইলেন

বাসায় বসে হিফজ করার এই আইডিয়াটা কোথায় পেলেন?

জয়নুল আবেদীনের মুখটা উজ্জল হয়ে উঠলো। তিনি জানালেন ফাতিহা আয়াত নামে তের বছর বয়সী একটি মেয়েকে চেনেন যে পরিবারের সাথে আমেরিকাতে থাকে। সেই ছোট্ট মেয়েটি বাসায় বসে বসে পবিত্র কুরআন হিফজ করছে। তার ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় তিনি এবং পরিবারের সবাই নিয়মিত দেখেন। তার মেয়ে মায়মুনাও ফাতিহা আয়াতের ভক্ত। তার থেকে অনুপ্রাণিত হয়েই মায়মুনা জেনারেল লাইনে পড়াশোনার পাশাপাশি পবিত্র কুরআন হিফজ করা শুরু করেছে। বেশ কয়েক পারা হিফজ সম্পন্ন করেছে। আফতাব আহমেদকে তিনি বললেন আপনি কি ফাতিহা আয়াতের নাম শোনেন নি? মেয়েটা অনেক পপুলার। সে অনেক বার জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছে। এছাড়াও বিশ্ববিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়েও বক্তব্য দিয়েছে। শিশু অধিকার সহ নানা বিষয়ে সে সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে। মেয়েটির বাড়ি বাংলাদেশে। গোটা বাংলাদেশীদের জন্য সে গর্বের বিষয়। তাকে নিয়ে আমরা গর্ব করি। কতইনা সৌভাগ্যবান ফাতিহা আয়াতের বাবা মা। তার কথা শুনে আফতাব সাহেব বললেন ফাতিহা আয়াত নামটা বেশ পরিচিতই লাগছে। তার কথা শুনে জয়নুল আবেদীন বললেন দাড়ান আপনাকে ফাতিহার ভিডিও দেখাই তাহলে চিনতে সুবিধা হবে।

আফতাব সাহেব দেখলেন জয়নুল আবেদীন মোবাইলটা হাতে নিয়ে ইউটিউবে ফাতিহা আয়াতের চ্যানেল খুঁজে বের করলেন। ফাতিহা যেখানে নিয়মিত ভিডিও আপলোড করে থাকে। তিনি আগেই চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করে রেখেছেন। ফলে সার্চ লিস্টে শুরুতেই ফাতিহার চ্যানেল চলে আসলো। এবার তিনি চ্যানেলে থাকা প্রথম ভিডিওটা চালু করলেন। যেখানে ফাতিহা আর তার বাবা কথা বলছে। ভিডিওটা চালু হতেই জয়নুল আবেদীনের চেহারা পরিবর্তন হয়ে গেলো। তিনি একবার ভিডিও দেখছেন আরেকবার আফতাব আহমেদের দিকে তাকাচ্ছেন। কারণ ভিডিওতে ফাতিহার সাথে তার বাবাকে দেখা যাচ্ছে আর সেই মানুষটির সাথে জয়নুল আবেদিনের সামনে বসে থাকা মানুষটি দেখতে হুবহু একই রকম। এটা কী করে সম্ভব? বিষয়টা ভেবেই জয়নুল আবেদীন কনফিউজড। তিনি তার কনফিউশন প্রকাশ করে বললেন এটা হলো ফাতিহা আয়াত আর তার বাবা। কিন্তু ফাতিহার বাবার সাথে আপনার চেহারার এতোটা মিল কেন? কিভাবে সম্ভব? তার কথা শুনে গাড়ি ভাড়া নিতে আসা আফতাব আহমেদ হেসে উঠলেন।তারপর বললেন আমিই ফাতিহা আয়াতের বাবা!

আল ইসলাহ রেন্ট এ কারের মালিক জনাব জয়নুল আবেদীনের জীবনে এরচেয়ে বিস্ময়কর ঘটনা কখনো ঘটেছে বলে তিনি মনে করতে পারবেন না। তিনি বিস্ময়ে কিছুক্ষণ কথাই বলতে পারলেন না। আফতাব আহমেদ তার হাতে টোকা দিয়ে বললেন এটা স্বপ্ন নয় সত্যি। তিনি তার দুবাই আসার কারণ জানালেন। তিনদিন পর ফাতিহা, ফালাক্ব আর তার মা আমেরিকা থেকে এমিরেটস এর একটা ফ্লাইটে বাংলাদেশে যাবে। দুবাইতে ট্রানজিট নিবে। তাদেরকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্যই মূলত তিনি এখানে এসেছেন। ফাতিহারা সারপ্রাইজড হওয়ার আগে অবশ্য জয়নুল আবেদীন নিজেও সারপ্রাইজড হলেন। তিনি বললেন আপনার সাথে পরিচিত হয়ে খুবই ভালো লাগলো। একটু আগে যে ফর্মটি পূরণ করে আফতাব আহমেদ তার হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন সেটি ছিড়ে ফেললেন। এটা দেখে আফতাব আহমেদ একটা কনফিউজড হলেন। তিনি এসেছেন গাড়ি ভাড়া নিতে। সব শর্ত মেনে ফর্ম পূরণ করে দিয়েছেন আর এখন সেই ফর্ম ছিড়ে ফেলার মানে কী? তাকে কি তবে গাড়ি ভাড়া দেওয়া হবে না? তিনি জানতে চাইলেন ফর্ম ছিড়লেন কেন? আমিতো গাড়ি ভাড়া নিতে চাই।জয়নুল আবেদীন জানালেন অবশ্যই আপনি গাড়ি ভাড়া পাবেন। তবে আগে আপনার সাথে যে আলোচনা হয়েছিল এখন পরিচিত হওয়ার পর সেই আলোচনা বদলাতে চাই। আপনাকে বলেছিলাম ১ হাজার দিরহাম সিকিউরিটি মানি জমা দিতে হবে। এখন সেটা লাগবে না। ফাতিহা আয়াতের নামই সিকিউরিটির জন্য যথেষ্ট। আর আপনার কাছে ভাড়া হিসেবে দৈনিক ৫০০ দিরহাম চেয়েছিলাম সেটাও বাদ। আপনি শুধু খরচের টাকাটা দিবেন। মানে ৩৫০ দিরহাম দিবেন। সব শুনে আফতাব আহমেদ বিস্মিত হলেন। জয়নুল আবেদীন তাকে অনুরোধ করলেন তার বাড়িতে যাওয়ার জন্য। এক বেলা মেহমান হিসেবে তাকে আপ্যায়ন করার সুযোগ চাইলেন। সেই আবদার রক্ষা করতে পারলে হয়তো ভালো হতো কিন্তু আফতাব সাহেবের পক্ষে তা রাখা সম্ভব হলো না।

জয়নুল আবেদীন জানালেন বাড়ি ফিরে গিয়ে যখন মায়মুনা এবং ওর মাকে বলবো ফাতিহা আয়াতের বাবার সাথে দেখা হয়েছিল তখন মায়মুনা নিশ্চই মন খারাপ করবে। বলবে বাবা আমার সাথেও দেখা করিয়ে দিতে। বাবা আংকেলকে বাসায় নিয়ে আসতে। তখন মেয়ের কাছে ছোট হতে হবে। আফতাব সাহেব বললেন এটা অবশ্য ঠিকই বলেছেন। তবে নানা কারণে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু আপনাকে যেন মায়মুনার কাছে বিব্রত হতে না হয় তার একটা ব্যবস্থা করতে পারি। আর তা হলো আপনি বাসায় ভিডিও কল দিন। তাহলে আমি মায়মুনার সাথে কথা বলবো। সাথে সাথে জয়নুল আবেদীন বাড়িতে ফোন করলেন। সেদিন স্কুল ছুটি থাকায় মায়মুনা ঘরেই ছিল। বাবার ফোনটা সেই রিসিভ করেছিল। ফোন রিসিভ করতেই বাবার মুখটা দেখে সে বিস্মিত হয়ে জানতে চাইলো বাবা তোমার মুখতো আজকে এক হাজার ওয়াট বাল্বের মত উজ্জল দেখাচ্ছে। কী ব্যাপার বলোতো শুনি? মেয়েটা তার বুদ্ধিমতী। মাশাআল্লাহ। বাবার মুখের হাসি দেখেই বুঝতে পেরেছে কিছু একটা আনন্দের বিষয় আছে বলেই বাবা তাকে এই সময়ে ফোন করেছে এবং বাবার মুখে এতো হাসি। বাবা তখন বললেন তোমার এক আংকেলের সাথে দেখা হলো। তিনি এখনো আমার সামনে আছেন। তোমার সাথে কথা বলতে চান।

ছোট্ট মায়মুনা অবাক হলো। তার কোন আংকেল এখন বাবার অফিসে আছেন? দেশ থেকে তেমন কেউতো দুবাই আসার কথা না। ছোট মামা? নাকি বড় চাচ্চু? না বড় চাচ্চুরতো পাসপোর্টই নেই। কতবার তাকে বলা হয়েছে একটা পাসপোর্ট করো। একবার ঘুরে যাও দুবাই। কিন্তু কখনোই তিনি পাসপোর্ট করেননি। দেশ ছেড়ে যদি কোথাও যেতে হয় তবে সেটা যাবেন মক্কা আর মদিনায়। আর কোথাও যাওয়ার ইচ্ছে তার নেই। অবশ্য এর মাঝে তিনি পাসপোর্ট করলেও করতে পারেন। মায়মুনা ভাবলো এটা বড় চাচ্চুও হতে পারে আবার ছোট মামাও হতে পারে। মামা অনেকদিন থেকেই বলছিলেন দুবাই ঘুরতে আসবেন। কিন্তু ব্যবসার চাপে কখনো আসতে পারেননি। কে হতে পারে সে ধারণা করতে পারছে না। আবার এমনও হতে পারে এলাকার কেউ হয়তো দুবাই এসেছেন চাকরি নিয়ে। ছোট্ট মায়মুনার মনের মধ্যে যে অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে তা জয়নুল আবেদীন সাহেব বুঝতে পারছেন। তিনি মেয়েটির কাছে জানতে চাইলেন তুমি অনুমান করোতো কে হতে পারে? তুমি কিন্তু সেই আংকেলকে খুব পছন্দ করো। যদিও তার সাথে তোমার কখনো কথা হয়নি এমনকি দেখাও হয়নি। বাবার মুখ থেকে এটুকু শুনে ছোট্ট মায়মুনা একেবারেই বিমূড় হয়ে গেলো। এমন এক আংকেল তার সাথে কথা বলতে চান যাকে সে নাকি খুব পছন্দ করে অথচ কখনো দেখা হয়নি, কথাও হয়নি। এমন কেউতো তার দুই কুলের আত্মীয়র মধ্যে নেই। সে এবার বাবাকে বললো বাবা আংকেলের কাছে ফোনটা দাওতো দেখি।  জয়নুল আবেদীনের সাথে যা কথা হচ্ছিল সবই শুনছিলেন আফতাব আহমেদ। তিনিও আনন্দ পাচ্ছিলেন। তার হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে যখন আফতাব আহমেদ সালাম দিলেন আর জানতে চাইলেন মায়মুনা কেমন আছো? তখন তাকে দেখে কিছুক্ষণের জন্য মায়মুনা কোনো কথাই বলতে পারলো না। এটা কি স্বপ্ন নাকি সত্যি? তার অবস্থা বুঝতে পেরে আফতাব আহমেদ আবার তাকে সালাম দিলেন। তখন মায়মুনা সালামের উত্তর দিয়ে কথা বলা শুরু করলো। সে কল্পনাও করতে পারেনি ফাতিহা আয়াত আপুর বাবার সাথে সে কথা বলবে। তিন চার মিনিট কথা হলো। তার ইচ্ছে ছিল সব গল্প সামনা সামনি বসে শুনবে তাই সে দাওয়াত করলো আংকেল আপনি বাবার সাথে আমাদের বাসায় চলে আসুন। হোটেল নেওয়ারও দরকার নেই। খুব খুশি হবো। আফতাব সাহেব ছোট্ট মায়মুনাকে কিভাবে না করবেন ভেবে পাচ্ছিলেন না। তাকে উদ্ধার করতে এগিয়ে আসলেন মায়মুনার বাবা জয়নুল আবেদীন। তিনি মেয়েকে বুঝিয়ে বললেন আংকেল এবার আসতে পারবেন না। পরবর্তীতে কখনো আসলে তোমার সাথে দেখা হবে। আর আমরা যখন দেশে যাবো তখনও দেখা হবে। এই শান্তনা দিয়ে মায়মুনার থেকে বিদায় নিতে হলো।

সেই দিনটার কথা হয়তো আজীবন মনে থাকবে মায়মুনার। মনে থাকবে আল ইসলাহ রেন্ট এ কারের মালিক জয়নুল আবেদীনের। আর ফাতিহা আয়াতের বাবা আফতাব আহমেদও নিশ্চই কখনো ভুলতে পারবে না। এতো কিছু যে ঘটছে ফাতিহা,ফালাক্ব বা তার মা এর কিছুই জানতে পারেনি। জানতে পারলেতো আর সারপ্রাইজ থাকবে না। তারাতো তাহলে জেনেই যাবে যে আফতাব সাহেব দুবাইতে এসেছে তাদের রিসিভ করতে। একই ফ্লাইটে এখান থেকে তিনি বাংলাদেশে যাবেন।

জন এফ কেনেডি বিমানবন্দর থেকে ফাতিহাদের ফ্লাইট ছাড়বে। বাসার সব কিছু গোছগাছ করে ফাতিহা,ফালাক্ব আর তার মা বের হলেন জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে …………. চলমান

১১ মে ২০২৬

অনুভা

বিশেষ কারণে বিকেল চারটার মধ্যেই অফিস ছুটি হয়ে গেছে মাহিবের। আগে আগে ছুটি হলে সবারই ভালো লাগে। আর সবার মতই মাহিবেরও খুব ভালো লাগছে। বিশেষ করে এপ্রিলের ২৭ তারিখে চারটার মধ্যে অফিস ছুটি হওয়া ওর জন্য খুবই জরুরী ছিল। ছুটি না হলেও বসকে বলে ছুটি নিয়ে সে বেরিয়ে যেতো। তাকে ক্যাম্পাসে যেতে হবে। সাথে করে নিয়ে যেতে হবে একটা তিনতলা কেক। কেকের উপর সুন্দর করে লেখা থাকবে শুভ জন্মদিন অনুভা। মাহিবের অফিস উত্তরাতে। ছাত্রজীবন থেকেই সে উত্তরায় থাকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি উত্তরা হয়ে সেই কোনাবাড়ি পযর্ন্ত যায়। সেই গাড়িতেই ছাত্রজীবনে চলাফেরা করতো মাহিব। গাড়িটার নামটাও সুন্দর। ক্ষণিকা। ঢাকা ও আশেপাশের ছাত্র ছাত্রীদের জন্য বিভিন্ন রুটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গাড়ি চলাচল করে। গাড়িগুলোর কোনোটার নাম চৈতালি,কোনোটার নাম ক্ষণিকা,কোনোটার নাম শ্রাবণ। আগে যখন মাহিব কল্যাণপুরে থাকতো তখন সে চৈতালি বাসে নিয়মিত যাওয়া আসা করতো। পরে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে উঠেছিল। অবশ্য তারপর অনেক গুলো টিউশন উত্তরাতে হওয়ায় সে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ছেড়ে দিয়ে উত্তরাতে থিতু হয়েছিল। সেই থেকে ছাত্রজীবন শেষ করে কর্মজীবন শুরু করেছে উত্তরাতেই। উত্তরা তার নিজের বাড়ির মত হয়ে উঠেছে। যেন প্রতিটি ইঞ্চি ইঞ্চি মাহিবের চেনা। অফিস শেষে বন্ধু ও কলিগদের সাথে রোজ ঘুরে বেড়ানো ছিল ওর নিয়মিত অভ্যাস। যখন আগে আগেই ছুটি হয়ে গেল তখন মাহিব হাফছেড়ে বাচলো। অন্তত ছুটির জন্য বসের সামনে গিয়ে দাড়াতে হবে না। এক দুই ঘন্টা আগে বের হতে চাইলেও বস যেভাবে তাকায় তাতে ছুটি নেওয়ার চেয়ে না নেওয়াই বেশি ভালো মনে হয়।

অফিস থেকে বেরিয়ে সোজা বাসায় গিয়ে পোষাক বদলে নেয় মাহিব। অফিসে স্যুট টাই পরে থাকলেও সাধারণত এমনিতে সে জিন্স আর টিশার্ট বেশি পছন্দ করে। মাহিব দেরি না করে বেরিয়ে পড়ে। রাজলক্ষ্মী আর আজমপুরের মাঝামাঝি পেস্ট্রি শপ থেকে একটি তিন পাউন্ডের কেক কেনে। কেকের উপর সুন্দর করে লিখে নেয় শুভ জন্মদিন অনুভা। যার জন্য কেক কেনা হয়েছে সে কিন্তু জানে না। আগামী কাল ২৮ এপ্রিল অনুভার জন্মদিন। অনুভা থাকে নেত্রকোনাতে। ওখানেই বাসা। পড়াশোনাও করেছে ওখানে। স্কুল ছুটির অবসরে সে এসেছে খালার কাছে। এখানে কয়েকদিন থাকবে। মাহিব অনুভার খালামনির কাছ থেকে জেনে নিয়েছিল যে অনুভা ওর জন্মদিনে ঢাকাতেই থাকবে। তখন থেকেই মাহিব ভেবে রেখেছিল ওর জন্য কেক নিয়ে যাবে। অবশ্য  অনুভা যখন নেত্রকোনাতে থাকতো তখনও কোনো না কোনো ভাবে মাহিব ওর জন্য কেক পাঠাতো। জন্মদিনে অন্যান্য উপহারও পাঠাতো। এবার যেহেতু সে ঢাকাতেই আছে তাই মাহিবের মনে হলো ওকে সারপ্রাইজ দেওয়া যাবে। যেই ভাবা সেই কাজ। একটি কেক নিয়ে সে সিএনজিতে ক্যাম্পাসের দিকে রওনা দিলো। অনুভার খালামনি ক্যাম্পাসের পাশেই থাকে।  

যখনই অনুভা ঢাকায় আসতো সে মাহিবের সাথে ঘুরে বেড়াতো। ভাইয়া বলতে পাগল। তার যত আব্দার সব মাহিবের কাছে। মাহিবও তাকে খুব স্নেহ করে। উত্তরা থেকে ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে মাহিব দেখলো সেদিন মারাত্মক জ্যাম। তিন ঘন্টা লেগে গেলো ওইটুকু পথ যেতে। তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে। চারদিকে অন্ধকার নেমে এসেছে। অবশ্য শহরে রাতও দিনের মতই আলোকিত থাকে। অনুভার খালামনির বাসার সামনে গিয়ে খালামনিকে ফোন করলো। তার সাথে আগেও কথা হয়েছিল। অবশ্য মাহিব বলেনি যে সে কেক নিয়ে আসবে। মাহিবের ফোন রিসিভ করার পর সে বললো অনুভাকে গেটে পাঠাতে। অবশ্য তাকে বলতে নিষেধ করলো কে এসেছে। শুধু বলা হলো একটা পার্সেল এসেছে যাও নিয়ে আসো। অনুভা তার খালামনির কথামত গেটে আসলো। মাহিবকে দেখে সে বিস্মিত হয়ে গেল। সে কল্পনাও করেনি মাহিব ভাইয়া আসবে। তারপর দাড়িয়ে দাড়িয়ে কিছুক্ষণ কথা বলে জন্মদিনের জন্য আনা কেকটা দিয়ে মাহিব বিদায় নিলো। যদিও জন্মদিন আগামী কাল ২৮ এপ্রিল। কিন্তু কালকে মাহিবের অফিস থাকবে সকাল থেকে বিকেল পযর্ন্ত। সেই সময়ে আসতে পারবে না। তাই আগে থেকেই কেক দিয়ে গেলো। তাছাড়া জন্মদিন রাত বারটার পর থেকে নাকি শুরু হয়। সেই রীতিও সে ফলো করলো। ভাইয়ের কাছ থেকে এমন সুন্দর একটা কেক পেয়ে অনুভা ভীষণ খুশি। মাহিব এবার বাস ধরে উত্তরাতে ফিরে গেলো। যেতে যেতে বেশ রাত হলো। বাসায় ফিরে ফ্রেশ হয়ে এশার নামাজ পড়ে রাতের খাবার খেলো। অনুভাকে জন্মদিনের কেক দিতে পেরে তার খুব ভালো লাগছে। শান্তি শান্তি লাগছে।

রাত বারটা বাজার পর অনুভাকে ফোন করে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানালো। অনুভা কেক পেয়ে এমনিতেই খুশি। জন্মদিনের উইশ পেয়ে আরও খুশি হলো। পরদিন সকালে যথারীতি অফিসে ঢুকলো মাহিব। সারাদিন অফিস করলো। ওর অফিস টাইম বিকেল চারটা পযর্ন্ত। ছুটি হওয়ার পর অফিস থেকে বেরিয়ে হাটাহাটি করলো। অন্য এক বন্ধুর সাথে ঘুরে বেড়ালো এবং রাতে বাসায় ফিরলো। সারাদিন আর ফেসবুকে ঢোকা হয়নি। মাহিব ফ্রেশ হয়ে রাতের খাবার খেয়ে যখন ফেসবুকে ঢুকলো তখন দেখতে পেলো অনুভার খালামনির আইডি থেকে একটা নোটিফিকেশন এসেছে। বন্ধু তালিকায় থাকা কেউ পোস্ট দিলে সাধারণত নোটিফিকেশন আসে। সেই নোটিফিকেশন অনুসরণ করে টাইমলাইনে যেতেই মাহিব দেখতে পেলো রীবন্দ্রচত্ত্বরে অনুভা তার জন্মদিনের কেক কেটে জন্মদিন উদযাপন করেছে। মাহিবের দেওয়া সেই কেকটাই কাটা হয়েছে। অবশ্য আরও একটা ছোট কেকও ছিল। আর ওর পাশে ছিল অনুভার দুই খালামনি এবং অন্য আরও অনেকে। তাদের কাউকে অবশ্য মাহিব চেনে না। জন্মদিনে তাহলে বেশ ভালোই এনজয় করেছে অনুভা। মাহিব অনুভাকে মেসেজ দিল তোর জন্মদিনে কী দারুণ সেলিব্রেট করলি। আমাকে বললে আমিওতো চলে আসতাম।

মাহিব ভাবতেও পারেনি অনুভা তাকে এমন কিছু বলবে। অনুভারা চার বোন। কোনো ভাই নেই। অনুভা যখন ক্লাস থ্রিতে পড়তো তখন থেকে মাহিবের সাথে পরিচয়। মাহিব তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষে পড়তো। সেই থেকে মাহিব হয়ে উঠেছিল অনুভার একমাত্র ভাই। সব কিছুতে সে ভাই হিসেবে তার সর্বচ্চটা দিয়ে বোনকে ভালোবাসতো। তার জন্য সব কিছু সাধ্যমত চেষ্টা করতো। তার সব ইচ্ছে পূরণ করতে চেষ্টা করতো।—– (চলমান)

২৮ এপ্রিল ২০২৬

মহামতি কুরেইশী

তড়িঘড়ি করে অফিস থেকে নিচে নামলো সুজন। নামার আগে বলে গেল বস একটু নিচে যাচ্ছি। তার মধ্যে একরকম উত্তেজনা কাজ করছে। সে না বললেও আমি বুঝতে পারলাম কেন তার মধ্যে এতো উত্তেজনা কাজ করছে। তার প্রিয় একজন মানুষ আসছে। সেটার উত্তাপ তার মনের মধ্যে ছড়িয়ে গেছে।তাকে বললাম সুজন একটু পরে যাও। সে বললো স্যার লেট করলে দেরি হয়ে যাবে। শেষে নুন আনতে পানতা ফুরানোর মত দশা হবে। যে উদ্দেশ্যে আমি নিচে যেতে চাচ্ছি তা আর হবে না। সূর্যাস্ত দেখার জন্য কিংবা নতুন চাঁদ দেখার জন্য আপনি বসে থাকলে চলবে না। যথাসময়ে উপস্থিত হতে হবে। আমিও তেমনই চাঁদ দেখবো বলেই নিচে যাচ্ছি। সুজনের কথা শুনলে যে কেউ ভাববে ও বোধহয় পাগল টাগল হয়ে গেছে। এখন সকাল সাড়ে এগারটা বাজে। এই সময়ে দিনের বেলায় সে নতুন চাঁদ কিভাবে দেখবে? নতুন চাঁদ উঠতে এখনো ঢের বাকি আর সেটাও উঠবে সন্ধ্যাবেলায়। সেই চাঁদ দেখে চাঁদে দেখা কমিটি ঘোষণা করবে কুরবানীর ঈদ কবে হবে। অথচ সুজন এখন এই দিনের বেলায় নতুন চাঁদ দেখতে নিচে যাচ্ছে। বিষয়টা আসলে অন্যদের কাছে বিস্ময়কর মনে হলেও আমি জানি ও যা বললে ঠিকই বলছে। রুপক অর্থে ও যে মানুষটিকে দেখার জন্য ব্যস্ত হয়ে নিচে যাচ্ছে তিনি ওর কাছে নতুন চাঁদের মতই। ঘোষণা অনুযায়ী আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বিরাট এক গাড়িবহর নিয়ে এই পথ দিয়ে যাবেন সেই আকাঙ্ক্ষীত মানুষটি। সুজন যাকে মনে ও প্রাণে ধারণ করে। দিব্য চোখে একনজর তাকে দেখার সাধ মনে মনে পুষে চলেছে বছরের পর বছর। সুযোগ হয়নি কখনো। সুতরাং এতো কাছে চলে আসা সুযোগ সে হাতছাড়া করতে রাজি নয়। আমাকে বললো স্যার ফিরে এসে শুনবো আপনার কথা। আমাকে আর আটকাবেন না। আমিও হাসি দিয়ে বললাম ঠিক আছে যাও।

বেশ কিছুদিন হলো প্রচন্ড লোডশেডিংএ হাসফাঁস করছি। আইপিএস এর ব্যবস্থা নেই। অবশ্য একটা জেনারেটর আছে। প্রচন্ড শব্দ হয়। জেনারেটরে যে এতো শব্দ হতে পারে তা আমার জানা ছিল না। যখন ছোট ছিলাম তখন মাঠে ধানের জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য শ্যালো মেশিন ব্যবহার করা হতো। ভটভট করে শব্দ হতো। অনেক দূর থেকেও সেই শব্দ শোনা যেতো। সেই সাথে বের হতো ডিজেল পোড়া কালো ধোঁয়া। এখনো বেশ মনে আছে সেই শব্দ ছিল বিকট। কিন্তু এই জেনারেটরের সাথে যদি তুলনা করি তবে সেটার শব্দ মশার কানের কাছে গান শোনানোর চেয়ে তীব্র নয়। কিন্তু গরম থেকে বাঁচতে হলে জেনারেটরের শব্দ সহ্য করতেই হবে। তা সহ্য করতে আপত্তি নেই কারো। তবে জেনারেটর চালানোর জন্য যে তেল দরকার সেটার গভীর সংকট চলছে। ফলে খুব সচেতন ভাবে অতি প্রয়োজন ছাড়া জেনারেটর চালানোর সুযোগ নেই। আর আমাদের এই জেনারেটরটাও না একে বারে হাভাতে হাতির মত। এতো পরিমান তেল খায় যে বলে বুঝানো যাবে না। চৈত্র মাসে ফেটে চৌচির হওয়া জমিতে এক বোতল পানি দিলে যেমন সাথে সাথে সেটা উধাও হয়ে যায় আমাদের জেনারেটরটা অনেকটা সেরকম। এক হাজার টাকার অকটেন দিলে টেনেটুনে দুই ঘন্টা চলে। ছোটবেলায় মা বলতেন হিসাব না করে চললে রাজার গোলাও শেষ হয়ে যায়। তখন কথাটা না বুঝলেও এখন বুঝি। এখনতো একটু বড় হয়েছি। আর আমাদের এই জেনারেটরটা দেখলে সেটা আরও বেশি করে মনে পড়ে। যে হারে সে তেল খায় সেই হারে মনে হয় টিউবওয়েলের মুখ দিয়ে পানিও বের হয় না। অথচ আমাদের পাশেই  অনিমেষদার অফিস। সেই অফিসেও একটা জেনারেটর আছে। কিন্তু শব্দ নেই। একদম কাছে না গেলে তার শব্দ শোনা যায় না। বিয়ের পর নতুন স্বামী স্ত্রী বাসর ঘরে যেভাবে ফিসফিস করে প্রায় শোনা যায় না এমন ভাবে কথা বলে। প্রেমিক প্রেমিকা যেমন পার্কে বসে কিংবা মোবাইলে খুব নিচু গলায় কথা বলে। পাশে দাঁড়ালেও শোনা যায় না। অনিমেষ দার অফিসের জেনারেটর অনেকটা সেরকম। খুব কাছে না গেলে শব্দ শোনা যায় না। অথচ অনিমেষদার অফিস চলছে নিগিঢিগির উপর। অর্থনৈতিক দিক থেকে একেবারে যাচ্ছেতাই অবস্থা। কিন্তু তারপরও তাদের সব কিছু কত ফিটফাট। কথায় বলে উপরে ফিটফাট আর ভেতরে সদরঘাট। অনিমেষদার অফিসের সব ফিটফাট হলেও অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিক থেকে একেবারে নাজেহাল অবস্থা। বছরের পর বছর ব্যবসায় লস যাচ্ছে। মালিকপক্ষ নিজেও লুটেপুটে খাচ্ছে। সেই দিক থেকে আমাদের অফিস অনেক ভালো অবস্থানে আছে। কিন্তু ভালো অবস্থানে থাকলেও উল্টো চিত্র ফুটে উঠেছে বাহ্যিক সৌন্দর্য দেখার দিক থেকে। বিদ্যুৎ সাশ্রয় করার জন্য অধিকাংশ লাইট বন্ধ থাকে। হঠাৎ করে কেউ গেট ঠেলে ভিতরে ঢুকলে ভড়কে যাবে। ভাববে এটা কি অফিস নাকি কোনো অন্ধকার গুহায় এসে পৌঁছালাম?

পাশাপাশি দুটি অফিসের জেনারেটরের এই পার্থক্য দেখে আবুল হায়াত আর চঞ্চল চৌধুরী অভিনীত সেই বিজ্ঞাপনের কথা মনে পড়ে যায়। দুটো জেনারেটরই বিদ্যুৎ উৎপাদন করে তবে দামের পার্থক্য থাকায় সার্ভিস কোয়ালিটি আকাশ পাতাল ব্যবধান। অবশ্য এ ক্ষেত্রেও বিজ্ঞাপনে দেখানো আবুল হায়াতের মেয়ে জামাই চঞ্চল চৌধুরী যেমন দামে সস্তা দেখে বাজে কাপড়,বাজে টিন কিনে ভেবেছিল জিতে গেছে। পরে দ্রুত টিন ফুটো হয়ে গেছে আর এক ধোয়াতেই কাপড় থেকে রং উঠেছে। আমাদের জেনারেটর কেনার ক্ষেত্রেও অফিসের সুপ্রিম বস একই নীতি ফলো করে ধরা খেয়েছে। অবশ্য তিনিতো বসেন হেড অফিসে। তাকে তো আর এই বিকট শব্দ শোনা লাগে না। অন্যদিকে তেল কেনার আবার সারা মাসের জন্য বরাদ্দ মাত্র ৫ হাজার টাকা। যেখানে ১ হাজার টাকার তেলে মাত্র দু ঘন্টা যায় সেখানে সারা মাস কিভাবে ৫ হাজার টাকার তেল দিয়ে চলা যায় তা আমার বোধগম্য নয়। অল্প দামে না কিনে ভালো জিনিস কিনলে তাতে তেল খরচ হতো কম আবার শব্দও হতো কম।টেকসই হতো। দীর্ঘ মেয়াদে লাভবান হওয়া যেতো। বোধহয় দূরদর্শী চিন্তা থেকেই বাংলা প্রবাদ প্রচলন হয়েছিল সস্তার বার অবস্থা।

শীত শেষ হতে না হতেই বিদ্যুৎ সংকট শুরু হলো। আর তা ক্রমাগত ভাবে প্রকট হতে শুরু করলো। এক ঘন্টা বিদ্যুৎ থাকে আর এক ঘন্টা থাকে না। গ্রামের দিকের কথাতো বলাই যাবে না। সেখানে এক ঘন্টা বিদ্যুৎ থাকলে দুই ঘন্টা থাকে না। গ্রামের লোকেরা বলে মাঝে মাঝে নাকি তাদের গ্রামে বিদ্যুৎ আসে! একটা গল্প শুনেছিলাম এক লোকের খুব মামলা দেওয়ার অভ্যাস ছিল। সুযোগ পেলেই মামলা দায়ের করতো। লোকটা একবার শহরে গেলো। তার সাথে যে গিয়েছিল সে জানতে চাইলো ভাই কাজতো শেষ এখন কী করবেন? সোজা বাড়ি যাবেন নাকি অন্য কিছু করবেন? সে বললো শহরে যখন এসেছি চাচার নামে একটা মামলা দিয়েই যাই। বিদ্যুতের অবস্থা হয়েছে সেরকম। বিদ্যুৎ সংকট মানেই বিদ্যুৎ বিভাগ মনে করে শহরের মানুষকে বিদ্যুৎ দিয়ে গ্রামের লাইন অফ করে রাখি। এর পিছনে অবশ্য কিছু যুক্তি তারা নিজেরা ভেবে রেখেছে। বিদ্যুৎ অফিস মূলত শহরে। আর সেই শহরে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকলে অফিস ঘেরাও হওয়ার সম্ভাবনা আছে। গত সপ্তাহে আমাদের শহরে বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও হয়েছিল বলে শুনেছি। আমি অবশ্য তখন ট্যুরে ছিলাম। তাছাড়াও শহরে নামীদামী ক্ষমতাবান লোকও থাকে। অন্যদিকে গ্রামে থাকে গেয়ো ভুত, কৃষক,দিনমজুর। গ্রাম থেকে শহরের দূরত্বও অনেক। তাদের ক্ষমতাও কম। ফলে গ্রামে বিদ্যুৎ না থাকলে তারা হয়তো দুই চারটা গালি দিবে,হাসফাস করবে কিন্তু বিদ্যুৎ অফিসতো ঘেরাও করতে আসবে না। আর তাছাড়া তারা তাদের গ্রামের বাড়িতে বসে দুই চারটা গালি দিলে সেই গালিতো আর শুনতে হচ্ছে না। তাই বিদ্যুৎ অফিসের কর্তারা গ্রামের লোকদেরকেই বলির পাঠা মনে করেন। তারা আরও ভাবেন গ্রামের মানুষ হাতপাখার বাতাস খেতে পারবে। অনেক গাছ আছে,পুকুর আছে। সেই পুকুরপাড়ে গিয়ে বসবে। গরম কম লাগবে। এগুলো কিন্তু আমার কথা না। এগুলো মানুষ বলাবলি করে। এসব বলা কি আমার পক্ষে সাজে?

বিদ্যুতের এই চরম সংকটের মধ্যেও কখনো কখনো হাওয়া থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন হয়। কিংবা বলা চলে হাওয়া থেকে বিদ্যুৎ যোগান দেওয়া হয়। তখন কোনো লোডশেডিং হয় না। দারিদ্রকে যাদুঘরে পাঠানোর কথা বলেছিলেন কোনো এক গুণীজন। তেমনি সেই সময়ে লোডশেডিং শব্দটা কেবল ডিকশনারির পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে। কোথায় যেন হারিয়ে গেছে এক গানের শিল্পী যে কোটায় সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। তিনি সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন বিদ্যুৎ একদিন ঝাকায় করে ফেরি করা হবে। এই বিদ্যুৎ লাগবে বিদ্যুৎ। কিন্তু সেই দিন আমাদের দেখা হয়নি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যয়ের কেউ কথা রাখেনি কবিতার মত আক্ষেপ করা যেতেই পারে। সেই ফেরিওয়ালী এখন জেলে নাকি পলাতক ঠিক মনে পড়ছে না। বিদ্যুৎ সংকটে লোডশেডিং এর প্রকট এতো বেশি হয়েছিল যে জনজীবনে অশান্তি নেমে এসেছিল। কিন্তু হঠাৎ গতকাল দুপুরের পর থেকে এক সেকেন্ডের জন্যও বিদ্যুৎ যেতে দেখিনি। এটা অবশ্য অনুমেয়ই ছিল। এটুকু বুঝার জন্য রকেট সায়েন্স জানা লাগে না। মহামতি কুরেইশী আসবেন। সে কারণেই তার সম্মানার্থে বিদ্যুৎ বিভাগ এই অভাবনীয় কাজটি করেছেন বলে অনেকের ধারণা। মহামতি কুরেইশী অচিন্ত্যনগরের নতুন জমিদার। আগের জমিদারের অবসরের পর তাকে জমিদারি দেওয়া হয়েছে। একসময় তিনি প্রচন্ড ক্ষমতাবান ছিলেন। আগের জমিদারের সাথে বিরোধ থাকায় তাকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল। তার পর কেটে গেছে পচিশ বছর। কুরেইশীর বয়স এখন সত্তর। অবশেষে তার নির্বাসন জীবনের অবসান ঘটেছে এবং তিনি অচিন্ত্যপুরে ফিরে এসেছেন। ফিরে এসেই মহামতি হিসেবে জমিদারি গ্রহণ করেছেন। চারদিকে এখন তার জয়জয়কার। অবশ্য রাজ্যে এমনও অনেক লোক আছে যারা তাকে সমালোচনায় ব্যস্ত। কিন্তু তিনি তা গায়ে মাখেন না। সহজ সরল দিনযাপন করছেন। এগুলো দেখে আমিও অনেক মুগ্ধ হই। অবশ্য আমার মুগ্ধতা সুজনের মত না।

যেহেতু মহামতি কুরেইশী আসবেন তাই তিনি যেন এসে সব কিছু ঠিকঠাক দেখতে পান,প্রজাদের কাছ থেকে কোনো অভিযোগ না পান সে কারণেই মুলত বিদ্যুৎ বিভাগ এমন অসাধারণ কাজ করেছে। গতকাল দুপুরের পর থেকে এক মিনিটের জন্যও বিদ্যুৎ বিভ্রাট হয়নি। কিন্তু অনুমান করছি এই সুখ বেশিক্ষণ স্থায়ী হবে না। কথায় আছে ”সুদে আসলে উশুল করে নিবে”। মহামতি কুরেইশী চলে যাওয়ার পর বিদ্যুৎ কতক্ষণ বন্ধ থাকবে,কী পরিমান লোডশেডিং হবে তা কল্পনাও করতে পারছি না। তবে সুজনের উত্তেজনা দেখে ভালো লাগছে। সে তড়িঘড়ি করে নিচে নেমে গেলো। মোটামুটি ধারণা করতে পারি কী ঘটতে যাচ্ছে। তারপরও সুজন ফিরে আসলে তার কাছ থেকে জানার আগ্রহ থেকে যাচ্ছে। কয়েক মিনিটের মধ্যে সুজন ফিরে আসলো। তার চোখে মুখে আনন্দের আভা। নতুন চাকরি পেলে কিংবা লটারি জিতলে যেমন মানুষ উল্লাসিত থাকে সে যেন তারচেয়েও বেশি আনন্দিত। অদৃশ্য ডানায় ভেসে বেড়াচ্ছে। মুখ জুড়ে হাসি। অন্যের মুখে হাসি দেখতে পেলে আমার ভালো লাগে। নিজে কারো মুখে হাসি ফুটাতে পারি বা না পারি এমনিতে কারো মুখে হাসি দেখলে আমিও খুশি হই। সুজনের হাসি আমাকেও খুশি করলো। জানতে চাইলাম এতো আনন্দিত কেন সুজন? সুজন হাফাতে হাফাতে বললো দেখা হয়েছে স্যার! দেখা হয়েছে। আমার দিকে তাকিয়ে হাতও নেড়েছেন। সুজনের কথা থেকে বুঝলাম মহামতি কুরেইশী এই পথ দিয়ে কিছুক্ষণ আগে গিয়েছেন। যাওয়ার পথে গাড়ির কাঁচ নামিয়ে দুইপাশে অপেক্ষারত জনসাধারণের উদ্দেশ্যে হাত নেড়েছেন। সুজনও তাদের মধ্যে অন্যতম। কিন্তু সুজন ভেবেছে তার উদ্দেশ্যেই বোধহয় মহামতি হাত নেড়েছেন। এই কারণেই বোধহয় বাংলায় প্রবাদ রচিত হয়েছে “পাগলের সুখ মনে মনে”। যাই হোক নিজেকে সুখী ভাবতে পারাও বিরাট ব্যাপার। অনেকে কোটি টাকার সম্পদ থাকার পরও সুখী না। সেখানে সুজন অসংখ্য মানুষের ভীড়ে থেকে মহামতির হাতনাড়াকে নিজের বিরাট সৌভাগ্য মনে করে সুখী হওয়াটাতো অন্যরকম ব্যাপার। এই সুখ কজনইবা অনুভব করতে পারে?

সেদিন সারাদিন সুজনের মুখে হাসি ফুটে থাকলো। হয়তো অফিস শেষে বাড়িতে যাওয়ার পথে পরিচিত যতজনের সাথে ওর দেখা হবে সবাইকে বলবে জানিস আজকে মহামতি কুরেইশী আমার দিকে চেয়ে হাত নাড়িয়েছেন। ওর ফেসবুক আছে কি না জানি না। থাকলে নিশ্চই স্ট্যাটাসও দিবে। সেই স্ট্যাটাসে অনেকে লাইক দিবে। অনেকে আবার প্রমাণ চেয়ে বসবে। মহামতি কুরেইশী যে তোকে উদ্দেশ্য করে হাত নেড়েছে তার প্রমাণ দেখা। ছবি থাকলে ছবি দেয়। অবশ্য যদি সত্যি সত্যি ছবিও থাকতো তাও অনেকে সন্দেহ করতো। সন্দেহপ্রবণরা বলবে আরে এটাতো এআই দিয়ে বানানো ছবি।

২৭ এপ্রিল ২০২৬