Home Blog Page 15

লিন্ডা একটি শাড়ী কিনেছিল

লেখকঃ জাজাফী

বুধবার বিকেলে লিন্ডার ফোন পেলাম।আমি তখন বাইরে বের হবো বলে প্রস্তুতি নিচ্ছি এমন সময় ফোন এলো।অপরিচিত নাম্বার।কান্ট্রিকোড দেখে বুঝলাম ফোন কোথা থেকে এসেছে।তবে বুঝতে পারিনি কে ফোন করতে পারে।রিসিভার তুলে কানে লাগাতেই ওপাশ থেকে লিন্ডার কন্ঠ ভেসে এলো।কন্ঠ শুনে বুঝিনি যে ওটা লিন্ডা কারণ ওর সাথে আমার দেখা হয়নি বিশ বছর।আর কথা হয়েছে কালেভদ্রে মাসে দু মাসে।ম্যানহাটন জুনিয়র হাইস্কুলে আমি আর লিন্ডা একসাথে পড়তাম।গ্রেড ফোরে পড়াকালীন যখন আমি আর মম এদেশে চলে এলাম তখন থেকে একটু একটু করে লিন্ডার সাথে আমার যোগাযোগ কমতে থাকলো।ইমেইলে কথা হতো মাঝে মাঝে  তবে ফেসবুক যুগে প্রবেশের পর বেশ যোগাযোগ হয়।আমি যখন মমের সাথে ম্যানহাটনে থাকতাম তখন লিন্ডা ওর সিঙ্গেল মাদারের সাথে ম্যানহাটনেই থাকতো।ও বলেছিল ওর সিঙ্গেল মাদার তবে আমার তখনই মনে হতো আসলে কথাটি ঠিক নয়।কোন এক অজ্ঞাত কারণে ওরা বাবার কথা চেপে যেতে চায়।আমিও তাই কখনো তোড়জোড় করিনি।

লিন্ডার পুরো নাম লিন্ডা ওয়াটসন।ওর গ্রান্ডফাদার জেমস ওয়াটসন আমেরিকার প্রখ্যাত ব্যবসায়ী ছিলেন।বাংলাদেশে চলে আসার পর লিন্ডার সাথে যোগাযোগ কমে গেলেও কখনো বিচ্ছিন্ন হইনি আমরা।স্কুল কলেজ পেরিয়ে দুজন দুই দেশের দুই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে নিজেদের মত করে দিন কাটাচ্ছি ঠিকই তবে ফেসবুকে দুজন দুজনের অম্লমধুর স্মৃতিগুলি ফ্রেমে ধরে রেখে শেয়ার করছি একে অন্যের সাথে।এর ফলে কখনো মনেই হয়নি আমরা আর আগের মত একসাথে নেই।কোন এক বিচিত্র কারণে লিন্ডার কোন বয়ফ্রেন্ড জোটেনি অথচ ও এতো সুন্দর যে একবার তাকালে সহজে চোখ ফেরানো যায় না।আমি একবার জানতে চেয়েছিলাম তোমার কোন বয়ফ্রেন্ড নেই?ও বলেছিল না নেই তবে আছে একজন কিন্তু সে আসলেই আমার বয়ফ্রেন্ড কিনা তা আমি নিজেও জানিনা কারণ তাকে কখনো কথাটি বলা হয়নি।আমি ওকে নিজ থেকে উৎসাহ দিয়ে বলেছিলাম তুমি তাহলে অপেক্ষা করছো কেন?বলে দাও তার পর দেখো সে তোমাকে নিশ্চই এড়িয়ে যেতে পারবে না।তুমি হলে সেই লাল শিখা যার আকর্ষণ এড়ানোর ক্ষমতা নেই কোন পোকার।পোকারা যেমন জ্বলন্ত শিখার দিকে মোহগ্রস্থের মত ছুটে যায় তেমনি সেও তোমার দিকে ছুটে আসবে।লিন্ডা অন্যমনস্ক হয়ে যায়।তবে কথা না ঘুরিয়েই বলে সে তো আর পোকা নয় আর আমিও জ্বলন্ত শিখা নই।তাছাড়া সে হলো আকাশের চাঁদের মত যাকে চাইলেই ধরা যায় না ছোয়া যায়না। তাকে দেখতে হয় দূর থেকে ছুতে হয় কল্পনায় আর আকতে হয় নিজের মনের সাতরঙে।

লিন্ডার কথাগুলো আমার খুব ভালো লাগে।কি মিষ্টি করে কথা বলে।তার চেয়েও অদ্ভুত লাগে সেই মানুষটির কথা চিন্তা করে যাকে লিন্ডা পছন্দ করে কিন্তু বলতে পারেনা ছুতে পারে না।লিন্ডাকে উপেক্ষা করার মত মানুষও যে থাকতে পারে তা আমার জানা ছিল না।বিকেলে লিন্ডার ফোন পেয়ে আমি বেশ পুলকিত হলাম।বেশ অনেক দিন পর ফোন করেছে এটা আনন্দের একটি কারণ তার চেয়ে বড় কারণ হলো লিন্ডা এই সামার ভ্যাকেশানে বাংলাদেশে ঘুরতে আসতে চায়।আমার বেশ আনন্দ হলো।আমি লিন্ডাকে ফোনে রেখেই মমকে বললাম যে জানো মম লিন্ডা বাংলাদেশে আসছে! আমার মুখ থেকে কথাটি শোনার সাথে সাথে মমের মুখটা যেন একশোওয়াট বাল্বের মত আলোকিত হয়ে উঠলো।মমের দিকে তাকিয়ে আমি খুবই অবাক হলাম।যেন মনে হলো লিন্ডা মমের খুব আপন কেউ অথচ মমের সাথে তার তেমন কোন সম্পর্কই ছিলনা।সেই ছোট্ট লিন্ডাকে মম খুব কমই দেখেছে।তাছাড়া আমাদের ম্যানহাটনের বাসাতেও সে একবারের বেশি দুবার আসেনি।মম আমার হাত থেকে রিসিভারটা নিয়ে কানে লাগিয়ে এমন উচ্ছাস প্রকাশ করলো যে লিন্ডা নিজে পারলে তখনি উড়ে চলে আসে।ও কেন বাংলাদেশে আসতে চায় তা জানিনা তবে তখন মনে হচ্ছিল মমের ভালোবাসাটুকু পাওয়ার জন্য হলেও সে বাংলাদেশে আসবেই।মম খুটিয়ে খুটিয়ে অনেক কথা জানতে চাইলেন তার পর আমার হাতে দিলেন ফোনটা।আমি আরো কিছুক্ষণ কথা বলে ফোন রেখে দিলাম।ও অলরেডি ভিসা পেয়ে গেছে আগামী সাটারডেতে ওর ফ্লাইট।হাতের কর গুনে দেখলাম সময় বেশি দেরি নেই।

আগে কখনো বাংলাদেশে আসেনি ও।হঠাৎই বাংলাদেশ নিয়ে এতো আগ্রহ কেন সেটা প্রশ্ন উঠতে পারে তবে গ্রেড ফোরে থাকতে আমি যখন ওকে বাংলাদেশের কথা বলেছিলাম এবং বলেছিলাম আমার মম বাংলাদেশে জন্ম নিয়েছে তখন ও খুবই উৎসাহী ছিল জানার জন্য।বিশেষ করে ভাষা আন্দোলন আর স্বাধীনতা যুদ্ধের সেই উত্তাল দিনের কথা ও কখনো ভুলতে পারেনি।বাচ্চারা যেমন দাদু দিদার কাছে রোজ রুপকথার গল্প শোনার জন্য বায়না করে ও ঠিক তেমন করতো।রোজই স্কুলে আমাকে চেপে ধরতো গল্প বলার জন্য যেন আমি নিজে ভাষা আন্দোলন করেছি আর মুক্তিযুদ্ধের একজন সৈনিক!বলতে বলতে এমন হয়ে গেল যে ওর সব মুখস্থ।কিন্তু তারপরও ও শুনতে চাইতো।তখন বুঝিনি তবে এখন মনে হয় ও আসলে মুক্তিযুদ্ধ,ভাষা আন্দোলনের গল্প শোনার নাম করে আমার কন্ঠ শুনতে ভালোবাসতো।যেহেতু আমি মুক্তিযুদ্ধ,ভাষাআন্দোলনের স্মৃতি খুব ভালোবাসি তাই ও চাইতো আমার প্রিয় বিষয় নিয়েই যেন আমি বলতে পারি।

সন্ধ্যায় মম আমাকে রেডি হতে বললেন মার্কেটে যেতে হবে।আমি ভীষণ অবাক হয়ে জানতে চাইলাম মম একটু আগেই না তুমি মার্কেট থেকে আসলে এখন আবার কেন মার্কেটে যেতে হবে?মুখে একরাশ হাসি টেনে বললেন লিন্ডা আসছে ওর জন্য ঘর গোছাতে হবে না?তাই কিছু কেনা কাটা করতে হবে।আমি দুষ্টুমীর সুরে বললাম মম তুমি এমন করছো যেন লিন্ডা নামে যে আসছে সে আসলে তোমার এখানে চিরদিন থেকে যাবার জন্য আসছে।মনে হচ্ছে সে তোমার খুব কাছের কেউ।আমার কথাটি খপ করে টেনে নিয়ে মম আমার কাধে হাত রেখে বললো তুইতো বেশ দারুণ একটি কথা বলেছিস।এটা আমার মাথায় আসেনি কেন?লিন্ডাকেতো আজীবনের জন্যই রেখে দেওয়া যায়! আমি আরো খানিকটা অবাক হয়ে জানতে চাইলাম কিভাবে রেখে দিবে?আর সেইবা কেন থাকবে?মম আমাকে বললেন কেন তুইকি আজীবন একাই থাকবি নাকি?তোর সাথে লিন্ডাকে বেশ মানাবে।মমের কথা শুনে আমি হাসিতে ফেটে পড়লাম।যদিও কথাটি খুব একটা খারাপ বলেনি।মমের সাথে মার্কেট থেকে অনেক কিছু কেনা কাটা করলাম।রাতে লিন্ডাকে ফেসবুকে মেসেজ দিলাম সে বাংলাদেশে কি এমনিতেই ঘুরতে আসবে নাকি অন্য কোন কারণ?সাথে সাথে ওর উত্তর পাইনি।ঘুমোতে যাবার আগে আরেকবার চক করতেই দেখলাম ওর রিপ্লাই এসেছে।সেখানে সে লিখেছে আমি বাংলাদেশে আসবো একটি বিশেষ কারণে।শুনেছি বাংলাদেশ আগের থেকে অনেক উন্নত হয়েছে,ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌছে গেছে,নেতা নেত্রীরা এখন নিয়মিত শপিং করতে আমেরিকা কানাডাতে আসছে।কারো কারো পুরো পরিবার দেশের বাইরে রাজার মত বাস করছে কিন্তু টাকা পয়সার কোন অভাব হচ্ছেনা।এর বাইরে আরো কয়েকটা কারণ আছে এই যেমন বাংলাদেশে ঘুরতে গিয়ে অনেক পযর্টক সুন্দর সুন্দর মন্তব্য করেছে সেগুলি আমাকে আগ্রহী করে তুলেছে।তাছাড়া তুই চলে যাবার পরতো তোর সাথে কখনো দেখা করার সুযোগ হয়নি এটাও একটা কারণ বলতে পারিস। তবে প্রধান কারণ যেটি তা আমি এখনি বলতে চাইনা।এসে তার পর বলবো।

প্রধান কারণ আর জানা হলো না এবং সেটা জানার জন্য মনটা বেশ উদগ্রীব হয়ে থাকলো।সেদিন চোখে আর ঘুম এলো না।দুটো কথা বেশ বার বার ঘুরে ফিরে আসছিল মাথার মধ্যে।প্রথমটি লিন্ডা নিজে বলেছে আর দ্বিতীয়টি মম বলেছে। লিন্ডা বলেছিল ও যাকে পছন্দ করে সে হলো চাঁদের মত যাকে দূর থেকে দেখতে হয়,কল্পনায় ছুতে হয়।চাঁদকে যেমন ছোয়া যায় না ঠিক তেমন।তার মানে সে এমন কারো কথা বলেছে যে তার থেকে অনেক দূরে থাকে তাই ইচ্ছে হলেও তাকে কাছে পাওয়া যায়না,ছোয়া যায়না বরং দূর থেকে দেখতে হয়।আমিওতো অনেক দূরে থাকে যাকে দুর থেকেই দেখতে হয় এবং কল্পনাতেই ছুতে হয়।তবে কি লিন্ডা আমার কথাই বলেছে!নিজেই নিজের মাথায় একটা টোকা দিয়ে বললাম যাহ এসব কেন ভাবছি।আবার মমের কথাটাও মাথায় ঘুরছে।লিন্ডাকেতো সারা জীবনের জন্যও রেখে দেওয়া যায়!তুইকি সারা জীবন একা থাকবি নাকি?তার মানে মম বলতে চাইছে লিন্ডা আর আমার মধ্যে একটি বন্ধন তৈরি হলে সে আমার হয়ে থাকবে।

নিজেকে বেশ পাগল বলে মনে হচ্ছে।আমি যে লিন্ডাকে নিয়ে এসব কথা ভাবছি ও জানতে পারলে কি মনে করবে!তবে চাইলেইতো আর মনের মধ্যে গড়ে ওঠা কল্পনার জাল ছিড়ে ফেলা যায় না।আমিও সেটা ছেড়ার চেষ্টা করিনি।

যথারীতি সাটারডে ইভিনিংএ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এমিরেটস এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটের বিজনেস ক্লাসের যাত্রী হয়ে বাংলাদেশের আলোবাতাসে বেরিয়ে এলো লিন্ডা ওয়াটসন।আমি আর মম আগে থেকেও প্লাকার্ড হাতে রিসিভিং জোনে হাজির ছিলাম।বোর্ডিং পাস হয়ে গেলে লিন্ডা বেরিয়ে এলো।আমাদের কেউ কাউকে চিনতে কোন বেগ পেতে হয়নি কারণ প্রতিনিয়তই আমরা একে অন্যকে ছবিতে দেখি।লিন্ডা আমাকে হাগ করে মমকে জড়িয়ে ধরলো।মমও ওকে এমন ভাবে আগলে নিলো যেন জনম জনমের পরিচয় দুজনের মধ্যে।যেন ওরা দুজন একসাথে বেড়ে উঠেছে,খেলেছে,স্কুলে গিয়েছে।ওর লাগেজ গুলো ভাগাভাগি করে টেনে নিয়ে গাড়িতে চেপে বসলাম।আমি সামনে বসলাম আর মম ওকে নিয়ে পিছনে বসলো।বাসায় যেতে যেতে কত যে কথা হলো।লিন্ডা বাংলাদেশে এসেছে মাত্র কয়েক সপ্তাহ থাকবে বলে।তবে ভালো না লাগলে একসপ্তাহ থেকেও চলে যেতে পারে।কথাটা বলতেই মম বললো আর যদি ভালো লেগে যায় তবেকি তুমি সারা জীবনের জন্য থেকে যাবে?মমের কথাটা ওর মনে ভাবাবেগ তৈরি করলো।লিন্ডা বললো তেমন কিছু হলেতো বেশ মজাই হবে।সামনের লুকিং গ্লাসে তাকিয়ে একবার ওকে দেখে নিলাম।আগের সব দেখার সাথে এই দেখার কেন যেন কোন মিল নেই!! আশ্চর্য আমি বোধহয় ওকে বেশি করে ফিল করতে শুরু করেছি।

বাসায় ঢুকে ফ্রেশ হয়ে লিন্ডা ওর লাগেজ নিয়ে বসলো।আমেরিকা থেকে আসার সময় কত কিছু যে নিয়ে এসেছে তার কোন হিসেব নেই।আমাদের জন্য এবং আমাদের পরিচিতদের মধ্যে লিন্ডা যাদেরকে চেনে সবার জন্য কিছু না কিছুতো এনেছেই।বাদ পড়েনি জাহিন জামিল ফীহা নোভা মুনা মিফরা কেউ।কারো জন্য চকলেট এনেছে কারো জন্য পুতুল আবার কারো জন্য স্মার্টওয়াচ। যার যেমনটি পছন্দ তাকে তেমন উপহার।মমের জন্য এনেছে দামী কসমেটিক্স আর আমার জন্য কিছু টিশার্ট আর পারফিউম।সবার জন্য আনা উপহার বের করার পরও ওর লাগেজে একটা প্যাকেট ছিল।কাগজ দিয়ে মোড়ানো।আমি বললাম ওটা কি? ও বললো ওটা একটা শাড়ী!!আমেরিকানরাতো শাড়ী পরেই না বলা চলে!!তাহলে শাড়ী কার জন্য?মম বললেন তবেকি তুমি বাংলাদেশের কালচারের সাথে মিশতে চাও বলেই শাড়ী কিনেছ ওটা নিজে পরবে বলে? মমের কথা শুনে লিন্ডা মাথা নেড়ে জানালো নিজে পরার জন্য সে শাড়ীটা কেনেনি!! মমের চেয়েও বেশি অবাক হলাম আমি।তার পর জানতে চাইলাম তাহলে তুমি শাড়ী কেন কিনেছ? কাকে দিবে বলে কিনেছ? এবার ওর মূখটা বেশ মলিন হয়ে গেল।চোখ দুটো ছলছল করে উঠলো যেনবা তখনি সে কেঁদে ফেলবে।একটা মেয়ে একাকী আমেরিকা থেকে বাংলাদেশ দেখবে বলে ছুটে এসেছে আর দীর্ঘ ক্লান্তিকর জার্নির পর তাকে বিশ্রান নেওয়ার সুযোগ না দিয়ে আমরা তার সাথে আড্ডা শুরু করে দিয়েছি এটা বেশ অমানবিক।তবে লিন্ডা নিজে বললো সে ক্লান্ত নয় এবং এখনি তার বিশ্রামের দরকার হচ্ছেনা।তার পর একটু শান্ত হয়ে সে বললো শাড়ীটা সে একজনকে দিবে বলে কিনেছে এবং এই শাড়ীটা দেওয়াটাই বাংলাদেশে আসার প্রধান উদ্দেশ্য!

কেউ একজনকে একটা শাড়ী দেওয়ার জন্য আমেরিকা থেকে বাংলাদেশে আসতে পারে তা আমার কল্পনারও বাইরে ছিল।তাও যদি এমন হতো যে লিন্ডা নিজে একটি ছেলে এবং সে শাড়ীটা এমন একজন মেয়েকে দিতে চায় যাকে সে ভালোবাসে তাহলেও একটা কথা ছিল কিন্তু লিন্ডা নিজে মেয়ে হয়ে আরেকটা মেয়েকে একটা শাড়ী দেওয়ার জন্য হাজার হাজার ডলার হাতে নিয়ে বাংলাদেশে এসেছে এটা সত্যিই বিস্ময়কর।মম জানতে চাইলো কাকে দেবে শাড়ীটা? লিন্ডা জানালো সে যাকে শাড়ীটা দেবে তাকে সে চেনে না বরং তাকে খুজে নিতে হবে আর এ জন্যই সে বেশ কিছুদিন সময় নিয়ে বাংলাদেশে এসেছে।ওর কথা শুনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম।যাকে সে একটা শাড়ী দিবে বলে সুদুর আমেরিকা থেকে এসেছে তাকে সে চেনেই না এমনকি তার কোন ঠিকানাও সে জানে না!তাহলে কি করে দেবে সে?কোথায় পাবে তাকে?লিন্ডার সরল জবাব সে তাকে দেশের অলিতে গলিতে খুঁজবে তার পরও সে তাকে খুঁজে বের করবেই।

তখনকার মত আড্ডা শেষ করে লিন্ডাকে ওর রুম দেখিয়ে দেওয়া হলো।মম ওকে সব বুঝিয়ে দিলো।রুমের সাজ সজ্জা দেখে লিন্ডা খুবই অবাক হলো।মম ওটাকে এতো সুন্দর করে সাজিয়েছে যেন মনে হয় স্বপ্নলোক!ডিনার শেষে লিন্ডা সবাইকে ওর রুমে ডাকলো।তার পর ব্যাগ থেকে একটি অ্যালবাম বের করলো এবং সেটা থেকে একটি ছবি বের করলো।সেটি দেখিয়ে বললো এই মানুষটিকে আমি শাড়ী দেব বলে এসেছি।ছবিটার অনেক গুলো কপি করেছে লিন্ডা।একটি ছবি আমার হাতে দিয়ে একটি মমকেও দিলো।মিফরা,ফীহা,ফারহানা ওরাও একটা করে ছবি নিলো।সেই ছবিটার দিকে তাকিয়ে মনের অজান্তেই চোখে পানি চলে আসলো।আমি যখন নিজের চোখের পানি আড়াল করতে চেষ্টা করছি তখন লক্ষ্য করলাম অন্য সবার চোখেও পানি এবং সেটা কিছুক্ষণের মধ্যে প্রায় কান্নায় রূপ নিলো।ছবিটি একজন বয়স্ক মহিলার।একটি খোলা মাঠে বাশের বেড়ায় যিনি ভেজা শাড়ী শুকাতে দিয়ে ঠায় দাড়িয়ে আছেন।শাড়ীটা শুকাতে দিয়ে তার যে চলে যাবার কোন উপায় নেই কারণ শাড়ীর অন্য প্রান্ত তখন তার পরণে!তার যে একটি মাত্র শাড়ী যেটি গোসলের পর ভেজা থাকায় রোদে দাড়িয়ে শুকাতে হচ্ছে।একপাশ শুকিয়ে গেলে সে পাশ শরীরে জড়িয়ে নিয়ে অন্য পাশটাও শুকাতে হবে।

এই ছবির মানুষটির কথা ভেবে লিন্ডা সুদুর আমেরিকা থেকে ছুটে এসেছে শাড়ী নিয়ে।আফসোস আমি কেন গেলাম না?আমি কেন অতটা মায়া দেখালাম না?রাতে ঘুমানোর সময় চিন্তা করলাম যে দেশের রাস্তায় কয়েক কোটি টাকা দামের ব্যক্তিগত গাড়ী চলে সে দেশে এমনও মানুষ আছে যাদের ভেজা শাড়ী শুকাতে রোদে ঘন্টার পর ঘন্টা দাড়িয়ে থাকতে হয়।একটা শাড়ীর কতইবা দাম?পাঁচশো? এক হাজার?দুই হাজার?বিশেষ করে সাধারণ মানুষ যে শাড়ী পরে তার দামতো পাঁচশোটাকাও না।পরদিন সকালে আমি লিন্ডাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম সেই মহিলাকে খুঁজতে।ঢাকার অলিতে গলিতে,বস্তিতে বস্তিতে খুজলাম,মানুষকে ছবি দেখালাম কিন্তু কেউ বলতে পারলো না।এক সপ্তাহ ঘুরে পুরো ঢাকা দেখা শেষ হলে গেলাম ঢাকার বাইরে।সাভারে গিয়ে ছবিটা দেখাতেই অনেকেই চিনলো।তারা আমাদেরকে এলাকার নাম বলতেই আমরা ছুটে চললাম সেদিকে।পথে একটি দোকান থেকে আরো বেশ কয়েকটি শাড়ী কিনলো লিন্ডা।একসাথে অনেক গুলো শাড়ী হলে সেই মানুষটি আগামী কয়েক বছর নিশ্চিন্তে পরতে পারবে এটাই ছিল লিন্ডার চিন্তা।ওর মুখে হাসি ফুটে উঠলো।অবশেষে পাওয়া যাচ্ছে সেই মহিলাকে যাকে সে শাড়ী দিতে ছুটে এসেছে সুদুর আমেরিকা থেকে।

পথে একটি মাঠ পেরোতে হয়।যে মাঠের ছবি ছিল সেই ছবিটাতে যেখানে মহিলা শাড়ী শুকাচ্ছিল।দূর থেকে সেই বাশের বেড়াটিও দেখা গেল।তবে অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম সেই বেড়ার উপর কি যেন লাগানো।আমাদের গাড়ীটা যতই কাছে আসছিল ততো স্পষ্ট হচ্ছিল।এবং একসময় দেখলাম ওটা একটি শাড়ী!লিন্ডার চোখটা ছলছল করে উঠলো।ব্যাগ থেকে ছবিটা বের করে মেলে ধরতেই চোখটা প্রায় ঝাপসা হয়ে এলো পানিতে।এই শাড়ীটাতো সেই শাড়ী যেটা মহিলাম পরে ছিলেন এবং একটা পাশ রোদে শুকাতে দিয়েছিলেন।হঠাৎই লিন্ডার মনটা খারা হয়ে গেল।সে যাকে শাড়ী দিতে এসেছে তার বোধহয় এখন আর শাড়ীর প্রয়োজন নেই।নিশ্চই তাকে কেউ নতুন কাপড় কিনে দিয়েছে তা না হলে এই শাড়ীটা এখানে থাকতো না।আমি বললাম সেটা হলেতো ভালো হয়।তুমি যার দুঃখ দূর করতে ছুটে এসেছো তাকে সুখী দেখলে তোমারতো আনন্দিত হওয়া উচিত।আমার কথাটা লিন্ডার কাছে বেশ যুক্তিযু্ক্ত মনে হওয়ায় চোখের পানি মুছে ফেললো।তবে ড্রাইভারকে বলে গাড়ী থামিয়ে সে নেমে পড়লো।তার পর বাশের বেড়ার উপর রাখা শাড়ীটাতে সে হাত বুলাতে লাগলো। এভাবে কিছুক্ষণ পার হওয়ার পর আমরা আবার রওনা হলাম।লিন্ডার চেহারায় আগের মত দুশ্চিন্তার ছাপ নেই।সে বোধহয় মহিলার সুখী হওয়াতে খুবই আনন্দিত হয়েছে।সেই আবাসিক এলাকাতে প্রবেশ করতেই একজনের সাথে দেখা।গাড়ী থামিয়ে তাকে ছবিটা দেখাতেই তিনি যা বললেন তাতে লিন্ডার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো।লাস্ট সাটারডেতে যখন লিন্ডা আমেরিকা থেকে রওনা দিয়েছে তারও এক সপ্তাহ আগে মহিলা মারা গেছেন!লিন্ডার হাতে ধরে রাখা শাড়ীটা ছুটে পড়ে গেল।আমি সেটা উঠিয়ে ওর হাতে দিয়ে ওকে শক্ত করে ধরলাম।বুঝলাম কেন আসার সময় মহিলার সেই শাড়ীটাকে বেড়াতে লাগানো দেখেছিলাম।সত্যিইতো তার আর ওই শাড়ীর কোন দরকার নেই।তাকে সবাই মিলে নতুন কাপড় কিনে দিয়েছে। সে এখন অনেক সুখে আছে।তারতো আর ওই পুরোনো শাড়ীর কোন দরকার নেই।লিন্ডা একটি শাড়ী কিনেছিল সেই শাড়ীটা যার জন্য কিনেছিল তাকে দেওয়া হলো না।ফেরার পথে সে শাড়ীটাকে আগে নেড়ে দেওয়া শাড়ীটার উপর ঝুলিয়ে দিলো।ফিরতে ফিরতে অনেক রাত হলো।আকাশে তখন ভরা পুর্ণিমার চাঁদ।চাঁদের দিকে তাকিয়ে মনে পড়লো লিন্ডার সেই কথাটি।চাঁদের মতও কোন কোন মানুষ হয় যাদেরকে ধরা যায়না,ছোয়া যায়না বরং সরে যেতে থাকে।দুদিন পর ফিরতি ফ্লাইটে লিন্ডা ফিরে গেল আমেরিকাতে।জীবনে আর কোন দিন লিন্ডা শাড়ী কেনেনি।এমনকি আমাদের বিয়ের দিনেও সে শাড়ী পরেনি।

১৭ মার্চ ২০১৮

চিঠিওয়ালার খোঁজে

জাজাফী

কোটালিপাড়া বাস স্ট্যান্ড থেকে একটু অদুরেই সুন্দর পরিপাটি পোষ্টঅফিস।মোবাইল ইন্টারনেটের যুগে এখন আর কেউ তেমন একটা চিঠি লেখেনা বলেই পোষ্টঅফিসটাকে পরিত্যাক্ত মনে হয়।মানুষ মনে করে চিঠি লেখা মানে সময় নষ্ট করা।যে কথা চিঠি লিখে জানাতে এক সপ্তাহ লেগে যাবে সে কথা কয়েক সেকেন্ডেই বলে দেওয়া গেলে কে আর চিঠি লেখে?পোষ্ট অফিসের ডাক বাকাসোটা তাই এখন মনে মনে হাহুতাশ করে।ওর প্রাণ নেই বলেই হয়তো কেউ সেটা বুঝতে পারেনা তবে পোষ্ট অফিসের পিওন ওবায়দুর মিয়া ঠিকই অনুভব করে।আগেকার দিনের কথা তার খুব মনে পড়ে।প্রতিদিন দুবার করে ডাক বাকসো খুললে কত যে চিঠি আসতো।কত মানুষ তাদের প্রিয়জনকে চিঠি লিখতো।সেই সব দিনের কথা মনে পড়লে ওবায়দুর মিয়ার খুব মন খারাপ হয়।

 

চিঠি আসে না বলে তেমন কোন কাজও নেই, সারাদিন বসে থেকে মোটেই ভালো লাগেনা।ক’বছর আগেও রোজ কত শত ছেলে মেয়ে সকাল বিকাল পোষ্ট অফিসে আসাযাওয়া করতো।কেউ লিখতো প্রেমের চিঠি কেউ খোজ নিতো প্রিয়জন কোন চিঠি পাঠিয়েছে কিনা আবার কেউ আসতো চাকরির আবেদন পত্র পাঠাবে বলে।দুদিন পর পর হলুদ খাম আনতে হতো,পোষ্টকার্ড লাগতো শয়ে শয়ে।রেডিওর অনুষ্ঠানগুলোতেও চিঠি লিখতো অনেকে।একটা রেডিও ছিল ওবায়দুর মিয়ার।সেই রেডিওতে কতবার পরিচিত সেই সব ছেলে মেয়ের নাম শুনেছে।এখন আর কেউ আসে না।রোজ সকালে এসে পরিস্কার পরিচ্ছন করে এবং রোজ দুবার করে ডাক বাকসো খোলে।যদিও সে জানে কেউ চিঠি দেয়নি।ঠিক একই ভাবে পালা করে ওবায়দুর মিয়া জেলা সদরে গিয়ে হলুদ খামের চিঠিবিহীন বস্তাটি কাধে নিয়ে ফিরে আসে।এ কাজে তার কোন অনীহা নেই।

বিগত কয়েক বছরে কোন চিঠি আসেনি দেখে একপ্রকার ধরেই নিয়েছিলেন আর কোনদিন চিঠি আসবে না।কিন্তু ওবায়দুর মিয়াকে অবাক করে দিয়ে সদর পোষ্টমাস্টার একদিন বললেন ওবায়দুর তোমার অপেক্ষার দিন ফুরিয়েছে।কোটালিপাড়ার ঠিকানায় ঢাকা থেকে চিঠি এসেছে।ওবায়দুর মিয়া খুশি মনে বস্তা নিয়ে ফিরে গেলেন।পোষ্টঅফিসে গিয়ে বস্তাখুলে দেখলেন সেখানে একটি মাত্র চিঠি।হলুদ খামের চিঠিটি পরম যত্নে হাতে নিয়ে প্রাপকের ঠিকানা দেখে চমকে উঠলেন।প্রাপকের ঠিকানার স্থলে নাম লেখা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।প্রেরকের নামের স্থানে লেখা রেদওয়ান,বয়স দশ,ঢাকা।

চিঠি হাতে নিয়ে হতবিহ্বল পিওন ওবায়দুর।কি করবেন এই চিঠি?কি করে পৌছে দেবেন প্রাপকের কাছে।তিনি চিঠিটি খুললেন।ছোটছোট দুটি কাচা হাতে লেখা চিঠি।

প্রিয় বন্ধু আমার,

যে বয়সে আমি তোমায় চিঠি লিখছি সে বয়সীরা সাধারণত তোমাকে দাদুভাই বলে ডাকার কথা কিন্তু আমি তোমায় বন্ধু বলে লিখছি,তুমিতো বঙ্গবন্ধু,বাঙ্গালী, তাই তুমি আমারও বন্ধু।আকাশের চাঁদকে যেমন সবাই ভালোবেসে মামা বলে ডাকে তেমনি তোমাকে আমরা ভালোবেসে বঙ্গবন্ধু ডাকি।জানি এই চিঠি তুমি হাতে পাবেনা কোনদিন। তারপরও তোমাকে লিখছি।আমি বইয়ে পড়েছি তোমার কথা।বাবা মায়ের মুখে শুনেছি তোমার কথা আর টেলিভিশনে দেখেছি তুমি হাত উচু করে বক্তৃতা দিচ্ছ।তোমার সেই বক্তৃতা এখন আমার মুখস্থ।তুমি অনেক স্বপ্ন নিয়ে যে দেশটি আমাদের জন্য রেখে গিয়েছ সেই দেশটিকে আমাদের বড়রা তোমার মত করে ভালোবাসতে পারেনি,গড়ে তুলতে পারেনি।আমিতো অনেক ছোট তাই আমিও কিছু করতে পারছিনা।তোমার শুন্যতা আমাদেরকে প্রতিদিন কাঁদায়।তুমিকি আরো একবার ফিরে আসতে পারো না আমাদের মাঝে?

ইতি তোমার বন্ধু

রেদোয়ান।

পিওন ওবায়দুরের চোখে পানি এসে গেল।বেশ কবার চিঠিটা পড়লেন।তারপর আবার যত্নকরে ঢুকিয়ে রাখলেন হলুদ খামে।মনে মনে ভাবলেন কোনদিন সময় পেলে বঙ্গবন্ধুর কবরের পাশে দাড়িয়ে রেদোয়ানের লেখা চিঠিটা পড়ে শোনাবেন।এই ঘটনার একসপ্তাহ পর তিনি অবাক হয়ে দেখলেন আরো একটি চিঠি এসেছে এবং সেই চিঠিটার প্রাপকও বঙ্গবন্ধু।প্রেরক রেদওয়ান।এই চিঠিটা আরো মায়াভরা আকুতিতে ভরপুর।চিঠি পড়ে হাপুস নয়নে কাঁদলেন ওবায়দুর।এভাবে দু’মাস গেল এবং নিয়মিত রেদোয়ানের লেখা চিঠি আসতে লাগলো।কি করবে ওবায়দুর এই চিঠিগুলো দিয়ে?তিনি ছুটির আবেদন করলেন।যে করেই হোক ঢাকায় যাবেন।খুঁজে বের করবেন রেদোয়ান নামের দশবছরের ছেলেটিকে।চাকরি জীবনে ওবায়দুর কোনদিন এক সাথে তিনদিনের ছুটি চায়নি অথচ এখন কোন কাজ নেই এমনিতেই ছুটির মত তবুও সে ছুটির আবেদন করলো।তার ইচ্ছা ঢাকাতে গিয়ে রেদোয়ানকে খুঁজবেন।রেদোয়ানের লেখা চিঠিগুলো এতো ভারী মনে হতে লাগলো যে কেবলমাত্র বঙ্গবন্ধু ছাড়া সেই ভার বহন করার ক্ষমতা আর কারো নেই।এভাবে চলতে থাকলে ওবায়দুরের চোখের সবটুকু জল শুকিয়ে যাবে।ছুটি নিয়ে জমানো টাকাগুলো সাথে করে রওনা হলো ঢাকার উদ্দেশ্যে।পরিবার বলতে ওবায়দুরের কিছু ছিলনা।একাকী জীবনে স্ত্রী সন্তানের কোন পিছুটান ছিলনা।একটা ব্যাগে কিছু কাপড় আর রেদোয়ানের লেখা চিঠিগুলি নিয়ে বাসে চেপে বসলেন।

রেদোয়ান স্কুল থেকে ফিরছিল।ফেরার পথেই পোষ্ট অফিস।টিফিনের সময় সে আরো একটি চিঠি লিখেছে।সেটি হলুদ খামে ভরে পোষ্ট অফিসের ডাকবাকসে ফেলবে বলে যখন সেখানে গিয়ে দাড়ালো দেখলো সেই ডাকবাকসোর পাশে শুয়ে আছে এক বয়স্ক লোক।পাশে তার চটের ব্যাগ।ওর মনে হলো লোকটা বুঝি ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে গেছে।মায়া হলো খুব।রেদোয়ান যখন স্কুল ব্যাগ থেকে চিঠি বের করে ডাকবাকসে ফেলতে যাবে তখন বৃদ্ধ লোকটি খুব ক্লান্ত ভঙ্গিতে উঠে বসতে চেষ্টা করলো কিন্তু পারলো না।রেদোয়ান ডাকবাকসে চিঠিটা না ফেলে লোকটিকে বসতে সাহায্য করলো।লোকটি ওরমুখের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলো তুমিকি রেদোয়ান?রেদোয়ান খুব অবাক হয়ে বললো হ্যা আমি রেদোয়ান কিন্তু আপনি আমাকে কি করে চেনেন?লোকটির কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিল।হাত ধরে উঠিয়ে বসাতেই রেদোয়ান দেখলো ওর হাত লাল হয়ে গেছে।রক্ত কোথা থেকে আসলো?লোকটি অনেক কষ্টে জানালো কয়েকজন লোক ছুরি মেরে টাকাগুলো ছিনিয়ে নিয়ে গেছে।

 

আসেপাশে কেউ নেই।রেদোয়ান কি করবে বুঝতে পারছে না।লোকটিতো মারা যাবে!রেদোয়ানকে চিন্তা করতে নিষেধ করে বললো তুমি আমার পাশে বসো।তুমি কি আজও চিঠি পোষ্ট করতে এসেছিলে?রেদোয়ান আরো চমকে উঠলো।সে যে চিঠি লেখে সেটাতো লোকটির জানার কথা নয়। লোকটি ওর মনের ভাব বুঝতে পেরে খুব কষ্ট করে চটের ব্যাগ থেকে বেশ কিছু হলুদ খাম বের করলো।খামের উপরের লেখাগুলো রেদোয়ানের চেনা।ও নিজে লিখেছিল,প্রাপক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।চিঠিগুলো ওর হাতে ধরিয়ে দিয়ে আজ যে চিঠিটা ও পোষ্ট করতে চেয়েছিল সেটি হাতে নিয়ে খুলে পড়লো।চোখটা জলে ভরে উঠলো।পড়া শেষ হলে চিঠিটা ফেরত দিয়ে বললো আজ থেকে তুমি আর কখনো এই চিঠি লিখো না।এমন চিঠির ভার বইতে পারার শক্তি যে আর কারো নেই।তুমি যখন অনেক বড় হবে তখন তুমি যাকে চিঠি লিখছো তার কবরের পাশে গিয়ে দাড়িয়ে তোমার মনের কথা বলে এসো।এটুকু বলেই তিনি ঢলে পড়লেন ছোট্ট রেদোয়ানের কোলে।রেদোয়ানের একহাতে ধরা অনেকগুলো হলুদখামের চিঠি,চিঠিগুলো যাকে লিখেছিল তার কাছ থেকে একজন দূত এসে ফিরিয়ে দিয়ে গেছে।সেই চিঠির হলুদ রঙ এখন লাল হয়ে গেছে রক্তে।রেদোয়ান হাতে ধরে রাখা চিঠির  দিকে তাকিয়ে কান্না জড়িত কন্ঠে বললো প্রিয় বন্ধু আমার, তুমিকি দেখেছ যে দেশের মানুষকে তুমি স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখিয়ে স্বাধীনতা এনে দিয়েছিলে সেই দেশ কোন অবস্থায় আছে।তোমাকে যে এখন আমাদের খুবই প্রয়োজন।তুমিকি আরেকবার জন্মনিতে পারো না আমাদের মাঝে।

ছিনতাই কারীর ছুরির আঘাতে কিছুক্ষণ আগে মারা যেতে যেতে পিওন ওবায়দুর চিঠিওয়ালার কোমল হাতদুটো ধরে শেষকথা গুলো বলে যেতে পেরে খুব শান্তি পেয়েছে।আর চিঠিওয়ালা? সেই চিঠিগুলো বুকের সাথে চেপে ধরে ওবায়দুরের লাশের পাশে নিবার্ক হয়ে বসে আছে।তার কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না।সে কোথায় যাবে?তার মনে হলো যাবার মত কোন জায়গা নেই।

৪ মার্চ ২০১৮

মানিক জেনারেল স্টোর

–জাজাফী

মধুমিতা রোড দিয়ে ঢুকে একটু সামনে এগোতেই হাতের ডানে মোড় নিয়েছে একটি সরু গলি।গলির এই রাস্তাটি আরিচপুরের মধ্য দিয়ে সোজা গিয়ে মিশেছে টঙ্গী বাজারে।আইসক্রিম ফ্যাক্টরী পেরিয়ে মোড় নিয়ে এগোতেই তিনতলা মসজিদ।মসজিদটি সুন্দর এবং পাঁচওয়াক্তই মুসল্লীতে ভরপুর থাকে।যদিও এটির আকার তিনতলা ছাড়িয়ে গেছে অনেক আগেই কিন্তু কি কারণে যেন এখনো এটিকে তিনতলা মসজিদ বলেই সবাই ডাকে।ঠিক যেমনটি কল্যাণপুরে দোতলা মসজিদ নামে একটি মসজিদ রয়েছে যেটি দোতলাতো নয়ই বরং পাঁচ তলারও বেশি।মধ্যআরিচপুর তিনতলা মসজিদের বিপরীতে লাগোয়া বেশ কটি দোকানের একটির নাম মানিক জেনারেল স্টোর।মাঝে মাঝে সময় পেলেই স্টোরের সামনে গিয়ে দাড়ায় হাসান।কিছু কিনুক বা না কিনুক দাড়িয়ে থাকে।পোশাকে দুবর্লতা থাকলে মনে হতো যেনবা সাহায্যের আশায় দাড়িয়ে আছে।এই স্টোরে তার খুব যাতায়াত।ওখানে আরো ক’জন পরিচিত মুখের দেখা পাওয়া যায়।মানিক জেনারেল স্টোরের মালিকের নাম মানিক।

ছাত্র জীবন থেকেই হাসান টঙ্গীতে থাকলেও মানিক স্টোরে সে কখনো যেতো না কিংবা তার পরিচয়ও ছিলনা।সে থাকতো মধুমিতা রোডের নুরজাহান কটেজের চিলেকোঠায়।এলাকায় কতশত ছেলে মেয়ে থাকতো কিন্তু সে তেমন কাউকে চিনতো না আবার তেমন কারো সাথে মিশতোও না।মেসে থাকতে হতো তাই সাধ্যমত চেষ্টা করতো সঙ্গ এড়িয়ে চলতে।অবাক হয়ে দেখতো সেই মেসের অন্যান্য সদস্যদের কাছে নিয়মিত নানা ধরনের লোক আসাযাওয়া করে।কেউ আত্মীয় কেউ বন্ধু কেউবা নিছক পরিচিত।হাসানের বয়সীরাও আসতো।তবে সে কারো সাথে যচে কথা বলতো না। একদিন বেশ কজন যুবক আসলো দলবেধে।তাদের মধ্যে পরিচয় হলো ফৌজদারহাট ক্যাডেট কলেজ থেকে পাশ করে সদ্য ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হওয়া এক তুখোড় মেধাবীর সাথে।ছেলেটির সাথে কথা বলে ওর খুবই ভালো লাগলো।ও অবাক হয়ে দেখলো ছেলেটিকে না চিনলেও ছেলেটির ছোটবোনটাকে সে আগে থেকেই চিনতো কারণ ওদের ক্লাসের অনেককেই হাসান প্রাইভেট পড়াতো।যেহেতু দলের একজনের সাথে পরিচয় ঘটেছে তাই বাকিদের সাথেও সৌজন্য সাক্ষাতটা জরুরী।সেদিন পরিচয় হলো মশিউর নামে আরো একজনের সাথে।দিন যেত আর ওদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হতো।এভাবে একটু একটু করে বেশ ভালোবন্ধুত্ব হয়ে গেল বিশেষ করে মশিউরের সাথে।

হাসান অবাক হয়ে দেখলো মশিউর নামের ছেলেটি অনেক বিষয়ে সূক্ষ্ম জ্ঞান রাখে যা তাকে দেখলে বোঝা যায়না।এমনকি হাসান এতো বই পড়ার পরও যেসব বিষয়ে কোন ধারণাই ছিলনা সেসব বিষয়েও মশিউর নামের ছেলেটির বেশ ভালো জানাশোনা ছিল।ফলশ্রুতিতে অন্যদের সাথে পরিচিতিতেই থেমে থাকলেও মশিউরের সাথে হাসানের বন্ধুত্ব হলো নিগুঢ়।আড্ডা হতো,গল্প হতো এবং নানা বিষয়ে জ্ঞানবিতরণ চলতো।এর মাঝেই হাসান পড়াশোনা শেষ করে চাকরিতে ঢুকে গেল।তবে বন্ধুত্ব ছুটলো না।মশিউরের মাধ্যমেই প্রথম মানিক জেনারেল স্টোরের মালিক মানিক ভাইয়ের সাথে হাসানের পরিচয় হলো।মানুষটিকে দেখলে কেউ বলতেই পারবেনা তিনি পড়াশোনা জানা লোক এবং এখনো পড়ছেন।দেখলে তাকে ঢের বয়স্ক মনে হলেও তিনি মনে মনে চিরতরুণ।প্রথম প্রথম মানিক ভাইকে হাসানের মনে হতো শুধুই দোকানদার কিন্তু এক সময় মনে হতে লাগলো তিনি শুধুই দোকানদার নন বরং পড়াশোনা জানা ভ্রমনপিয়াসী একজন মানুষ।

 

ফেসবুকে দেখা যায় তারা সবাই দলবেধে রাঙামাটি,বান্দরবন,কক্সবাজার আরো কত জায়গা ঘুরে বেড়াচ্ছে।যেন পঞ্চপযর্টকদল।এক বিকেলে মশিউর ফোন করে হাসানকে জানালো মানিক ভাইয়ের স্ত্রীর সিজারিয়ান বেবী হবে রক্ত দরকার।আগে থেকেই হাসানের রক্তের গ্রুপ জানা থাকায় মশিউরের বলতে সুবিধা হয়েছিল।হাসানও রেডি ছিল রক্ত দেওয়ার জন্য।যেহেতু অপারেশান হবে হাসানের অফিসের কাছাকাছি একটি হাসপাতালে তাই সে নির্ভয় দিয়ে বললো দশমিনিট আগে ফোন দিলেই সে চলে আসতে পারবে।ওর কেন যেন মনে হচ্ছিল এবারও বোধহয় রক্ত দিতে হবে না।এর আগে যতবার ও রক্তদিতে গিয়েছে কোন বারই রক্ত লাগেনি।কিন্তু সেবার সত্যি সত্যিই রক্ত লাগলো।মানিক ভাইয়ের ফুটফুটে একটি মেয়ে হলো।প্রথমে সবাই খুব ভয়ে ছিল তবে আল্লাহর অশেষ কৃপায় মেয়েটি একটু একটু করে সুস্থ্য হয়ে উঠলো।সেই থেকে মানিক ভাইয়ের সাথে হাসানেরও বেশ মধুর সম্পর্ক।

মানিক জেনারেল স্টোরে এর পর থেকেই ওর আসাযাওয়া।ওখানে সবাই মিলে দাড়িয়ে বসে আড্ডা দিতে দিতে শিল্প সাহিত্য রাজনীতি অর্থনীতি,চলচ্চিত্র সহ নানা বিষয়ে আলোচনা চলতো।হাসান মুগ্ধ হয়ে দেখতো ছোট্ট একটি দোকান অথচ ক্রেতারা যা চাইছে মানিক ভাই প্রায় সবই দিতে পারছেন।হাসান একবার জানতে চাইলো মানিক ভাই আপনার দোকানে কি কোন ম্যাজিক আছে যে ক্রেতারা যা চাইছে সেটাই বের করেদিচ্ছেন। আপনার দোকানে পাওয়া যায় না এমন কি কিছু আছে?মানিক ভাই হাসলেন।তিনি বললেন ক্রেতাদের চাহিদার কথাতো মাথায় রাখতে হবে।তবে কেউ এসে মদ চাইবে সেটাও দিতে হবে এমনতো কোন কথা নেই।তার পর তিনি সাথে যোগ করলেন হয়তো কোন একদিন দেখবেন কোন এক ক্রেতা এমন কিছু চাইছে যা আশেপাশের দোকানে পাওয়া যাচ্ছে অথচ আমার দোকানে নেই।হতে পারে সেটা নিষিদ্ধ কোন বস্তু নয় তারপরও আমার দোকানে নেই।হাসান আর কথা বাড়ায় না।ওর বরং অপেক্ষায় থাকতে ভালো লাগে।কবে সেই দিন আসবে যেদিন দেখবে মানিক জেনারেল স্টোরে এসে কোন একজন কাষ্টমার ফিরে যাচ্ছে তার কাঙ্খিত দ্রব্যটি না পেয়ে।এর পর তিন বছর কেটে গেছে।মানিক জেনারেল স্টোরের সামনে দাড়িয়ে কতদিন যে আড্ডা হয়েছে তার হিসেব নেই।কিন্তু হাসান কোন দিন কোন কাষ্টমারকে দোকানে কোন একটি দ্রব্য নেই এমন কথা শুনে ফিরে যেতে দেখেনি।সে মনে মনে ভেবেই নিয়েছে এই ছোট্ট দোকানটি হলো সার্চ ইঞ্জিন গুগলের মত যেখানে সার্চ দিলে সবই পাওয়া যায়।সে আশা ছেড়েই দিয়েছে যে কোন কাষ্টমার তার কাঙ্ক্ষিত দ্রব্যটি না পেয়ে ফিরে যাচ্ছে এমনটি দেখা যাবে না।

এর মাঝে হাসানের বড় আপা বাসা নিলো মধ্য আরিচপুরে।ফলে তখন মাঝে মাঝেই সে ওই এলাকায় যেত।এক শুক্রবারে সে আপার বাসায় গিয়ে আপাদের সাথে গল্প করে খেয়ে ফিরে যাওয়ার জন্য বের হলো।ভাবলো এতো কাছে এসে মানিক ভাইদের সাথে দেখা না করে যাওয়া ঠিক হবেনা তাছাড়া আবার কবে আসা হবে তারতো কোন ঠিক নেই।ধীর পায়ে সে দাড়ালো মানিক জেনারেল স্টোরের সামনে।সেখানে তখন মানিক ভাই ছিলেন আর তপু ভাই ছিলেন।অনেক দিন পর হাসানকে দেখে দুজনই হাত বাড়িয়ে দিলেন,কুশল জানতে চাইলেন।বেশ কিছুক্ষণ গল্প হলো।মশিউর তখন অন্য কোথাও কাজে ব্যস্ত থাকায় তার সাথে দেখা হলোনা।গল্প করে হাসান যখন মানিক জেনারেল স্টোর থেকে বেরিয়ে যাবে ঠিক তখন একজন ক্রেতা এসে তার কাঙ্ক্ষিত দ্রব্য চাইলেন।মানিক ভাই দুঃখ প্রকাশ করে বললেন দুঃখিত আমার দোকানে আপনার কাঙ্ক্ষিত দ্রব্যটি বিক্রি হয়না।

 

হাসান ভীষণ ভাবে চমকে উঠলো।দেশের অলিতে গলিতে বিক্রি হয়,রাস্তায় ফুটপাতে বিক্রি হয় এবং ভাতের চেয়েও যেটিকে সবাই বেশি প্রয়োজনীয় মনে করে সেই দ্রব্যটি মানিক জেনারেল স্টোরে বিক্রি করা হয়না!হাসান থমকে দাড়িয়ে অবাক হয়ে মানিক ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে মানিক ভাই এটাতো নিষিদ্ধ কোন বস্তু নয় তাহলে আপনি কেন বিক্রি করেন না?মানিক ভাই মুখে তার চিরাচরিত হাসি টেনে বললেন একদিন বলেছিলাম নিশ্চই দেখবেন কোন না কোন ক্রেতা মানিক জেনারেল স্টোরে এসে তার কাঙ্ক্ষিত দ্রব্যটি না পেয়ে ফিরে যাবে আজ সেটা চাক্ষুস করলেন।আমি নিজে যেহেতু সিগারেট খাই না এবং মনে করি সিগারেট শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর তাই আমি দোকানে সিগারেট বিক্রি করিনা।একটি সিগারেট বিক্রি করলে আমার হয়তো সামান্য লাভ হবে কিন্তু যার কাছে বিক্রি করছি তারতো চরম ক্ষতি হবে।আমি একজন সুনাগরিক হয়ে নিশ্চই কারো সামান্যতম ক্ষতি হোক এটা চাইতে পারি না।

মানিক ভাইয়ের কথা শুনে হাসান অবাক হয়ে তার মূখের দিকে তাকিয়ে থাকলো।তিনতলা মসজিদের মাইক থেকে তখন মুয়াজ্জিনের কন্ঠে ভেসে আসলো এশার আজানের ধ্বনি।মানিক জেনারেল স্টোরের মালিক মানিক ভাই দোকান থেকে বেরিয়ে মসজিদের দিকে রওনা দিলেন।হাসান দেখলো মানিক ভাইয়ের দোকানের ঝাপিটা খোলাই আছে এবং দোকানে পাহারা দেওয়ার মত কেউ নেই,এমনকি সিসিক্যামেরাও লাগানো নেই।রাত হয়ে গেছে আর অপেক্ষা করা যাবেনা ভেবে হাসান বেরিয়ে পড়লো।রিকশায় উঠে পিছন ফিরে একবার বিক্রেতা বিহীন ঝাপখোলা দোকানটির দিকে তাকালো।চোখে পড়লো ছোট্ট একটি বিলবোর্ড যেখানে গোটাগোটা করে লেখা মানিক জেনারেল স্টোর।যে স্টোরে সিগারেট বিক্রি করা হয়না।

৩ মার্চ ২০১৮

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম শিশুতোষ চলচ্চিত্র

–জাজাফী

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম শিশুতোষ চলচ্চিত্র ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’ মুক্তি পায় ১৯৮০ সালে। তবে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল, এই ছবির নির্মাতা বাদল রহমান ভারতের পুনে থেকে চলচ্চিত্রে প্রশিক্ষণ নিয়ে এসে ছবিটি নির্মাণে হাত দেন। পেয়েছিলেন সরকারি অনুদানও। ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’ চলচ্চিত্রটির মূল কাহিনি এরিখ কাস্টনারের হলেও এর চিত্রনাট্য রচনা করেছিলেন বাদল রহমান নিজে। বিদেশি গল্প পরেও নিজ দেশের সমাজ-বাস্তবতাকে অসাধারণভাবে তুলে ধরা হয়েছিল এতে। চলচ্চিত্রের কাহিনিতেও আনা হয় ব্যাপক পরিবর্তন। এতে মূল চরিত্র হলো এমিল। খুদে গোয়েন্দা হিসেবে দুর্দান্ত অভিনয় করা সেই এমিল নিজেই এখন যেন রহস্যঘেরা। অভিষেক ছবির পর আর দেখা মেলেনি তার। দেশের প্রথম শিশুতোষ চলচ্চিত্রে অভিনয় করা সেই শিশু এমিল এখন কোথায়? কীভাবে তার কাটে দিন? এখনও কি পর্দার মতোই গোয়েন্দাগিরিতে আগ্রহ আছে? নাকি খোলনচলে বদলে গেছে সব! এমন প্রশ্ন অনেক দর্শকের মনে। এমিল নামের সেই দূরন্ত গোয়েন্দা কিশোরের আসল নাম রেয়াজ শহীদ।


বর্তমানে মালয়েশিয়ার জহর বাহরু শহরে তার বসবাস।এর আগে ঢাকাতে আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে হেড অব আইটি হিসেবে কাজ করতেন। মালয়েশিয়া ২০১৮ সালে এসেছেন। সেখানেও একটা আমেরিকান স্কুল-শ্যাটাক সেন্ট ম্যারিস ফরেস্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল স্কুলে আইটি ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করছেন।



বাংলাদেশের সরকারি অনুদানে প্রথম শিশুতোষ চলচ্চিত্র ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’। এই চলচ্চিত্রে যুক্ত হওয়ার পুরো গল্পটা দারুণ ছিলো।   ছবির পরিচালক বাদল রহমান ৭৩/৭৪-এর সময় পুনে ফিল্ম ইন্সটিটিউটে স্কলারশিপ নিয়ে পড়াশোনা করতে যান। ওনার সঙ্গে আরও অনেকেই গিয়েছিলেন। সেখানে বাদল রহমান ফিল্ম এডিটিংয়ের ওপর ডিপ্লোমা করে দেশে ফেরেন ৭৬/৭৭ সালের দিকে। তাঁর সাথে সালাহউদ্দীন জাকী ও ছিলেন। দু’জনই সরকারি অনুদান পান চলচ্চিত্র বানানোর জন্য। বাদল রহমান পেলেন ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’র জন্য আর সালাহউদ্দীন জাকী পেলেন ‘ঘুড্ডি’ চলচ্চিত্রের জন্য। দুটিই খুব চমৎকার গল্প। তখন তো রেয়াজ শহীদ অর্থাৎ আজকের খুদে এমিল খুবই ছোট। তবে তিনি তখনই জানতেন, এই দুটো ছবি অনুদান পেয়েছে।



১৯৭৭ সাল। রেয়াজ শহীদ পড়াশোনা করছেন উদয়ন স্কুলে, ক্লাস সিক্সে। বাদল রহমানের সাথে তাদের পরিবারের একটা যোগাযোগ ছিল। রেয়াজ শহীদ অর্থাৎ এমিলের ফুফুর বাসায় প্রায়ই আসতেন আড্ডা দিতে। হঠাৎ একদিন ডেকে বললেন, ‘তোমার ফাইনাল পরীক্ষা কবে শেষ হবে?’
রেয়াজ শহীদ ওনাকে বললেন, নভেম্বরের শেষেই পরীক্ষা শেষ হবে।তখনও তিনি ছবির বিষয়ে কিছু জানতেন না। এরপর একদিন বলেই বসলেন, ‘‘আমি তো ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’ নিয়ে একটা চলচ্চিত্র বানাচ্ছি। আমি তোমাকে মূল চরিত্রে অভিনয়ের জন্য চাই।’’



এর আগে রেয়াজ শহীদ তথা এমিলের ক্যামেরার সামনে দাঁড়ানোর তেমন কোনও অভিজ্ঞতাই ছিল না। যদিও তার পরিবার সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলের মধ্যেই ছিল। প্রয়াত আলমগীর কবির তার মামা হন। মানে এই পরিমণ্ডলে তাদের পরিবারের অনেকেরই বেশ যোগাযোগ ছিল এবং এখনো আছে।  কিন্তু নিজে সিনেমা করবে, ক্যামেরার সামনে দাঁড়াবে- এসব মাথায় আসেনি।
তবে বলার পর সে খুব বিস্মিত হয়। যেটাতে বেশি কৌতূহল জেগেছিল সেটা হলো, যখন বাদল রহমান বললেন, ‘আমরা খুলনা শুটিং করবো।’



চলচ্চিত্রটি দেখলে জানবেন, এমিল খুলনার ছেলে। ঢাকায় আসার আগ পর্যন্ত সে খুলনাতেই ছিল। সেখানে যাওয়ার বিষয়টা অ্যাডভেঞ্চারের মতো লেগেছিল তখন। আবার বাদল রহমানের নিজেরও ছেলেবেলায় খুলনায় একটা বড় সময় কেটেছে। শহরটিতে উনি সেন্ট জোসেফ স্কুলে পড়তেন। সিনেমায়ও দেখানো হয়েছে, এমিল খুলনা সেন্ট জোসেফ স্কুলের ছাত্র।


সিনেমায় সুযোগ পাওয়ার পর এমিলের মা অর্থাৎ রেয়াজ শহীদের মা অখুশি হননি। একটু চিন্তিত ছিলেন। তবে খুব বেশি সমস্যা হয়নি। সবাই উৎসাহ দিয়েছেন। কারণ, স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম শিশুতোষ চলচ্চিত্র হতে যাচ্ছে। তাদের কাছে এটাই ছিল বড় বিষয়। রেয়াজ শহীদের তখন যে বয়স ছিল তাতে এসব কিছুই বুঝতে পারেন নি। তবে শুধু জানতেন, খুলনা যাবেন। খুলনায় তখন ১৫ দিন শুটিং হয়েছিল। ছবিটা মুক্তি পেয়েছিল ১৯৮০ সালে।  শুটিং শুরু হয়েছিল ৭৭ সালে। তারপর মাঝে বন্ধ ছিল। এরপর আবার শুরু হয় ৭৮ সালে। তবে অধিকাংশ শুটিং হয়েছিল ৭৯ সালে। ওই বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত অধিকাংশ শুটিং হয়। যেমন, ইন্টারকন্টিনেন্টালের ভেতরে, চোরকে ধাওয়া করে যাওয়া, সাকুরার ওখানে। তারপর ডাবিং, এডিটিংসহ সবকিছু মিলিয়ে শেষ করতে সময় লেগেছে ১৯৮০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত। সিনেমাটা মুক্তি পেয়েছিল ১৯৮০ সালের সেপ্টেম্বরে।


অর্থ খুব বড় একটা বিষয়। সিনেমার শুটিং প্রায় ৬-৭ মাসের ওপরে অর্থের অভাবে বন্ধ ছিল। বাদল রহমান এই সিনেমা নির্মানের জন্য অনুদান পেয়েছিলেন তিন লাখ টাকা বা এর অল্প কিছু বেশি। এরপর পুরোটাই বাদল রহমানের ইনিশিয়েটিভ থেকে তৈরি করতে হয়েছিল। অনুদান পেয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু একটা ছবি বানাতে গেলে স্পেশালই মন মতো কারিগরি ব্যবস্থা নিয়ে, ভালো কলাকুশলীদের নিয়ে যদি করতে হয় তবে সেটা ওই টাকায় হয়ে ওঠে না। এজন্য বিভিন্ন জায়গা থেকে ডোনেশন সংগ্রহ করা হয়েছিল। এমনকি তিনি নিজের পকেট থেকেও একটা বড় অংশ খরচ করেছেন। আরেকটা বিষয় ছিল, এই চলচ্চিত্রে কোনও কলাকুশলী পারিশ্রমিক নেননি। শ্রদ্ধেয় গোলাম মোস্তফা সাহেব ছাড়া আর অভিনেতাদের কেউই পারিশ্রমিক নেননি। রেয়াজ শহীদ তথা এমিল সহ অন্যান্য বাচ্চারা তো বুঝতেই পারেনি কী হচ্ছে। বাকিদের মধ্যে যেমন, বাদল রহমানের বন্ধু সিনেমেটোগ্রাফার প্রয়াত আনোয়ার হোসেন সাহেবও পারিশ্রমিক নেননি। অথচ উনি কিন্তু তখনি আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত একজন খ্যাতিসম্পন্ন সিনেমেটোগ্রাফার। এছাড়াও উনি তখন ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ নিয়ে কাজ করছিলেন। 



শিশু এমিল শুটিং করতে করতে কৈশোর ছুঁই ছুঁই করছিল।সিনেমায় লক্ষ করলে দেখা যায়, খুলনার এমিল আর ঢাকার এমিলের মধ্যে পার্থক্য আছে। এমিলের গলার স্বর বদলে গিয়েছিল। ক্লাস সিক্সের শেষে শুরু হলো। এরপর শুটিং বন্ধ হয়ে যখন আবার শুরু হলো তখন ক্লাস সেভেনের মাঝামাঝি। ওই সময়টায় এমিলের গলার স্বর বদলে যাচ্ছিল। উচ্চতাও একটু বেড়েছিল। সমালোচকরা অবশ্য খুব একটা খেয়াল করতে পারেননি। 




ছোট্ট এমিল যে চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছে, এমন কোনও অনুভূতিই ছিল না তার মধ্যে। মূল বিষয় ছিল অ্যাডভেঞ্চার।তগুলো বাচ্চা, সবাই সমবয়সী। পুরোপুরি বাচ্চাদের জন্য একটা প্লট এটাই তো বাংলাদেশে প্রথম। এখনও একমাত্র ওই সিনেমার প্লটই বাচ্চাদের জন্য ছিল।

চলচ্চিত্র যখন মুক্তি পেলো,  এমিল  তার পরিবার সহ তখন ক্যান্টনমেন্টে থাকতো। ওই সময় ১৯৮০ সালে বন্যার পানি ঢাকা শহরে অনেক জায়গায় ঢুকে পড়ে। রেয়াজ শহীদ তথা এমিলদের বাসায়ও পানি চলে আসে। তাই ঐ সময় কিছুদিন মগবাজারে তারা তার ফুফুর বাসায় ছিল। যেখানে বাদল রহমান আসতেন। যখন ক্যান্টনমেন্ট সিনেমা হলে ছবিটা আসে এলাকার অনেকেই জানতো না এমিল চরিত্রে যে ছেলেটি অভিনয় করেছে সে খোদ ক্যান্টনমেন্টেই আছে।সিনেমা দেখার পর পাড়ার সবাই দেখে তো অবাক। এটা শুনে অনেক মজা রেয়াজ শহীদ খুব মজা পেয়েছিল।


এমিল চরিত্রে অভিনয়টা তার কাছে থ্রিলিং ছিল যে সে একটা চলচ্চিত্রে কাজ করেছে, সেটা সিনেমা হলে দেখাচ্ছে। যেদিন রিলিজ পায় মনে তখন রেয়াজ শহীদ ক্লাস নাইনে পড়তো। বাংলা টিচার জামিলা হঠাৎ ক্লাসে এসে বললেন, ‘আজকে শুক্রবার বাংলাদেশের প্রথম শিশুতোষ চলচ্চিত্র মুক্তি পাচ্ছে। এখানে আমাদের ছাত্র রেয়াজ অভিনয় করেছে প্রধান চরিত্রে। এটা আমরা সেলিব্রেট করবো। ওকে সবাই কনগ্রেচুলেট করো।’ সবাই তখন তালিও দিল। আরেকটা বিষয় হলো, ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’তে এমিলের সাথে যারা ছিলেন বিভিন্ন চরিত্রে, তারা অনেকেই উদয়নের ছাত্র। যেমন- শিপলু, তারপর ইমরান। ইমরান তো তার ক্লাসমেট। ওই সময় এটাই ছিল স্কুলের বড় খবর। রাস্তায় চলতে গেলে সবাই দেখিয়ে বলতো, ওই যে এমিল যাচ্ছে। প্রথম প্রথম সবার অ্যাটেনশন পেয়ে খুব লজ্জা লাগতো। বাইরে বেরুলেও অনেকেই জিজ্ঞেস করতো, এই তুমি এমিল না? সেও লজ্জা পেয়ে বলত, হ্যাঁ আমিই এমিল। 



ছোট সেই দূরন্ত এমিল এখন বড় হয়ে গেছে। তার সন্তানরা জানে বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেছেন। কয়েক বছর আগে তিনি তার মেয়েকে নিয়ে কানাডা গিয়েছিলেন ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি করানোর জন্য। সেখানে  বড় এমিলের অনেক বন্ধুরাও আছে। কানাডা যাওয়ার পর সবাইকে এক বন্ধুর বাসায় দাওয়াত করা  হলো। সেখানেই এক বন্ধু দাওয়াতের মাঝখানে সবার সামনে বিষয়টা বলে উঠলো।



চলচ্চিত্রটি করতে গিয়ে খুদে অভিনেতারা খুব আনন্দ পেয়েছিল কারণ বাদল রহমান সবকিছু শিশু শিল্পীদের ওপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। এ কারণে খুদে শিল্পীরা যে অভিনয় করছে তা তারা বুঝতেই পারেনি। সব ছিলো একদম ন্যাচারাল। অন্যান্য যারা ছিলেন যেমন, গোলাম মোস্তফা, সারা যাকের, বেনু জামান তাদেরকেও তিনি কখনও বলেননি কী কী করতে হবে। মানে কিছু চাপিয়ে দেননি। তিনি সিচুয়েশন বুঝিয়ে দিয়েছেন আর চরিত্রটার একটা ছোট্ট আইডিয়া দিয়েছেন।এর ফলে চলচ্চিত্রটি দারুণ ভাবে চিত্রায়িত হয়েছে।



চলচ্চিত্রে অনেক ডায়লগ আছে যেগুলো স্ক্রিপ্টে ছিল না। এসব কিন্তু অন দ্য স্পট ইম্প্রুভাইজ হয়েছে। বাদল রহমান ন্যাচারালি একটা শিশু কীভাবে কথা বলে, কেমন আচরণ করে সেগুলো যেন বের হয়ে আসে এজন্যই কখনও চাপিয়ে দেননি।  

আরেকটা বিষয় হলো, প্রায় ১০-১৫ জন বাচ্চা কাজ করেছে। এদের সামলানো কিন্তু ছোটখাটো বিষয় নয়। উনি কখনও বিরক্ত হননি।শিশুশিল্পীরা সবাই ছিলো সমবয়সী। শুটিংয়ের সময় দেখা যেত সবাই স্পটে গিয়েই খেলা শুরু করে দিয়েছে। কোনও সিনের শুটের আগে বাদল রহমান ডাক দিলেন, এই সবাই আসো। এমিলরা তখন দৌড়ে এসে শুট করতো। শুট শেষ আবার দৌড়ে খেলতে চলে যেত। পুরো হৈ হুল্লোড়ের মধ্যে ছিলো সবগুলো বাচ্চা। চমৎকার সময় কেটেছিল।



দর্শক মনে এখনো প্রশ্ন জাগে এমিলের গোয়েন্দা বাহিনীর দ্বিতীয় পর্ব হতো তাহলে কেমন হতো? মানে এমিলরা সবাই এখন বড় হয়ে গেছে। এখন তাদের গোয়েন্দা বাহিনী কাজ নিয়ে যদি চলচ্চিত্র হয় তাহলে মন্দ হবে না। একজন এমিল তার অভিনয় দিয়ে দর্শক হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন। তাইতো চলচ্চিত্র থেকে দূরে থেকেও তিনি মানুষের হৃদয়ে আছেন। অনেক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেও কেউ কেউ মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারেন না অথচ মাত্র একটি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে তিনি যুগযুগ মানুষের হৃদয় জুড়ে আছেন। এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী আজও অম্লান।

ফারাক্কা বাঁধঃদ্বিমূখী সংকটে বাংলাদেশ

জাজাফী

উভয় সংকট বলে একটা কথা প্রচলিত আছে।দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ যার ভুক্তভোগী।ফারাক্কা বাধ বাংলাদেশের জন্য উভয় সংকট তৈরি করেছে।অনেকটা গলায় কই মাছের কাটা ফোটার মত যা গিলেও ফেলা যাচ্ছেনা আবার বেরও করা যাচ্ছেনা।ফারাক্কা বাধ চালু থাকলে বাংলাদেশের নদনদী শুকিয়ে যায় এবং কৃষিকাজে ব্যাপক ক্ষতি হয়। অন্য দিকে ফারাক্কা বাধ খুলে দিলেও বাংলাদেশের চরম ক্ষতি হয়।ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত পানি এসে নদনদীকে ছাপিয়ে সেই পানি লোকালয়ে আঘাত হানে। বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যা একই সাথে ফসলের ক্ষতির পাশাপাশি মানুষের আবাসন ব্যবস্থাকে নাজুক করে তোলে।তাই বাংলাদেশের জন্য ফারাক্কা নামটাই মরণ ফাদ বলে আখ্যায়িত করা যায়।

 বছরের পর বছর যে বাঁধ আমাদের গলার কাটা হয়ে দাড়িয়ে ছিল। পত্রিকাগুলো এটা নিয়ে ঢলাও করে লিখছে। আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম ফারাক্কা খুলে দিলে আমাদের সুবিধা হবে। নদীতে পানি আসবে চাষাবাদে সুবিধা হবে কিন্তু আমাদের এটাও ভেবে দেখতে হবে ভারতের মত দেশ না জেনে না বুঝে নিজেদের লাভের দিকটা না দেখে নিশ্চই কোন কিছু করবে না। লাভের কথা বিবেচনা করেই তারা ফারাক্কা বাঁধ নির্মান করেছিল এবং নিশ্চই কোন সার্থের জন্যই আবার তা খুলে দিতে যাচ্ছে। বছরের পর বছর ধরে ফারাক্কা বাঁধ নিয়ে আমাদের গলা ফাটানো চিৎকার তারা কানে তোলেনি আর আজ হঠাৎ করে তারা ফারাক্কা বাঁধ খুলে দিতে সম্মত হচ্ছে এটা ভাবনার বিষয়। এবং তারই প্রেক্ষিতে আমরা দেখতে পাচ্ছি আমাদের নদী গুলো নাব্য সীমার বাইরে ছাপিয়ে গেছে এবং পরিস্থিতি ক্রমে অবনতির দিকে।নদীতে পানি না থাকলে যতটা ক্ষতি হয় তার থেকে বেশি ক্ষতি হচ্ছে অতিরিক্ত পানির কারণে।

ফারাক্কা বাঁধ বাংলাদেশে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ব্যাপক ও ভয়াবহ ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করেছে। ভারত কর্তৃক গঙ্গার পানির একতরফা প্রত্যাহার বাংলাদেশের কেবল প্রতিবেশ ও পরিবেশ ব্যবস্থাই ধ্বংস করেনি বরং এ দেশের কৃষি, শিল্প, বনসম্পদ ও নৌযোগাযোগের মতো অর্থনৈতিক খাতগুলির ওপরও হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে। আমরা দেখতে পাই যে, ভারত তাদের বন্দরকে পলির হাত থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে ফারাক্কা বাঁধ তৈরি করেছিল। সেই ভারত যে আবার কোন সুবিধার কথা বিবেচনা না করেই ফারাক্কা বাঁধ খুলে দিতে চাইছে এরকম ভাবা উচিত হবেনা।এবং অলরেডি তার ফল আমরা চাক্ষুস দেখতে পাচ্ছি।

ইতিহাসের অলিগলি ঘুরে দেখতে পাই ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ সরকার ভারত সরকারের সাথে গঙ্গা প্রশ্নে জরুরি আন্তরিক আলোচনা শুরু করে। ১৯৭২ সালে গঠিত হয় ভারত-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশন (JRC)। ১৯৭৪ সালের ১৬ মে ভারত ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীদ্বয় এক যৌথ ঘোষণায় দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন যে, ফারাক্কা প্রকল্প চালু করার আগে গঙ্গায় বছরে সর্বনিম্ন প্রবাহের সময়কালে নদীর জলবণ্টন প্রশ্নে তারা পারস্পরিক গ্রহণযোগ্য একটি মতৈক্যে উপনীত হবেন। ঐ শীর্ষ বৈঠকে আরও স্থির হয় যে, শুষ্ক মৌসুমের পানি ভাগাভাগির পর্যায়ে দুই দেশের মধ্যে কোন চুক্তিতে উপনীত হওয়ার আগে ফারাক্কা বাঁধ চালু করা হবে না। কিন্তু তাদের মনে মনে ছিল ভিন্নরকম পরিকল্পনা। আর সে জন্যই  ১৯৭৫ সালে ভারত বাংলাদেশকে জানায় যে, ফারাক্কা বাঁধের ফিডার ক্যানাল পরীক্ষা করা তাদের প্রয়োজন। সে সময় ভারত ১৯৭৫ সালের ২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সময়ের মধ্যে ১০ দিন ফারাক্কা থেকে ৩১০-৪৫০ কিউবিক মিটার/সেকেন্ড গঙ্গার প্রবাহ প্রত্যাহার করার ব্যাপারে বাংলাদেশের অনুমতি প্রার্থনা করে। বাংলাদেশ সরল বিশ্বাসে এতে সম্মতি জ্ঞাপন করে। ভারত বাঁধ চালু করে দেয় এবং নির্ধারিত সময়ের পরেও একতরফাভাবে গঙ্গার গতি পরিবর্তন করতে থাকে যা ১৯৭৬ সালের পুরা শুষ্ক মৌসুম পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। ৫৮টি আন্তর্জাতিক নদীসহ কমপক্ষে ২৩০টি নদ-নদী বিধৌত বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক নদীগুলির মধ্যে ৫৫টির উৎপত্তি ভারত থেকে এবং তিনটি মায়ানমার থেকে। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনার উপনদী ও শাখানদী বিধৌত মোট এলাকার পরিমাণ ১৭,২০,০০০ বর্গকিলোমিটার। এ এলাকার শতকরা সাত ভাগ বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্ত।

১৯৭২ সালের নভেম্বরে যৌথ নদী কমিশন গঠিত হয়। নদী কমিশনের লক্ষ্য ছিল উভয় দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলি থেকে সর্বাধিক সুবিধা লাভের লক্ষ্যে যৌথ প্রয়াস চালানো, বন্যা নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও যৌথভাবে তা বাস্তবায়ন করা, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের পূর্বাভাস নির্ণয়ের বিশদ পদক্ষেপ সুপারিশ করা এবং পানিসম্পদের সুষম বণ্টনের ভিত্তিতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও সেচ প্রকল্পগুলোর জন্য সমীক্ষা ও জরিপ চালানো। আমরা দেখেছি নদী কমিশন আদতে বাংলাদেশের জন্য কোন সুফল বয়ে আনতে পারেনি।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর গঙ্গার পানি বন্টন সম্পর্কে নতুন করে আলোচনা শুরু হয় এবং ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর নয়াদিল্লিতে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি বন্টন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিতে নির্ধারিত হয় যে, উভয় পক্ষের সম্মতিক্রমে গৃহীত ফর্মুলা মোতাবেক ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত সময়ে দু’দেশের মধ্যে গঙ্গার পানি ভাগাভাগি হবে, এবং ভারত নদীটির জলপ্রবাহের মাত্রা গত ৪০ বছরের গড় মাত্রায় বজায় রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করবে। যেকোন সঙ্কটময় পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ ৩৫ হাজার কিউসেক পানির নিশ্চয়তা পাবে। দীর্ঘ মেয়াদে গঙ্গার পানি প্রবাহ বৃদ্ধির লক্ষ্যে উভয় দেশ পারস্পরিক সহযোগিতার প্রয়োজনে এবং দুদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত অন্যান্য নদীর পানি বণ্টনের ক্ষেত্রেও অনুরূপ চুক্তিতে পৌঁছানোর ব্যাপারে একমত হয়। কিন্তু তার পরও ফারাক্কা বাঁধ আমাদের জন্য বাধার দেয়াল হয়ে দাড়িয়ে ছিল বছরের পর বছর। আর এখন সেই বাধ খুলে দেওয়ায় আমাদের আবার নতুন সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে।

ফারাক্কা-উত্তর আমলে গঙ্গার প্রবাহ সংকট নৌপরিবহণ খাতকেও আঘাত হেনেছে। এখন শুষ্ক মৌসুমে ৩২০ কিলোমিটারের বেশি প্রধান ও মধ্যম নৌপথ বন্ধ রাখতে হয়। ভারত কর্তৃক শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানির ব্যাপক প্রত্যাহার বাংলাদেশের গঙ্গা-নির্ভর এলাকার জনগণের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মারাত্মক প্রভাব ফেলেছে। ভারত কর্তৃক বছরের পর বছর শুষ্ক মৌসুমের মূল্যবান পানি সম্পদ প্রত্যাহারের ফলে বাংলাদেশকে আজও কৃষি, মৎস্য, বনজ, শিল্প, নৌপরিবহণ, জলসরবরাহ ইত্যাদি ক্ষেত্রে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। বাংলাদেশের এসব ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ ক্ষতির আনুমানিক পরিমাণ প্রায় ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। পরোক্ষ ক্ষতি হিসাবে আনলে এই পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে অপরিকল্পিত ভাবে ফারাক্কা খুলে দেওয়ার কারণে অতিরিক্ত পানি আমাদের দেশে বন্যপরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে।

আমাদের নদনদী গুলো মৃতপ্রায় ছিল ভারতের একচেটিয়া নীতির উপর ভিত্তি করে দাড়িয়ে থাকা ফারাক্কা বাধ।আগের সেই নাব্যতা আর নেই। কিন্তু একই ভাবে ভারত তার খেয়াল খুশি মত ফারাক্কা বাধ খুলে দেওয়ায় বাংলাদেশ বড় আকারের ধাক্কা খেলো। এখন নদী গুলো ছাপিয়ে যাচ্ছে ভারত থেকে বয়ে আসা পানি। কথা ছিল নির্দিষ্ট পরিমান পানি ছাড়া হবে যেন দেশের সার্বিক চাহিদা মেটানো যায় এবং বন্যাপরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়। একই সাথে যেন ভারতেও কোন সমস্যা না হয়। কিন্তু চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী টাইপের নীতিতে বিশ্বাসী ভারত তার খেয়াল খুশি মত বাধ তৈরি করে পানি আটকে দিয়ে আমাদের যেমন ক্ষতি করছে তেমনি ভাবে খেয়াল খুশি মতই বাধ ছেড়ে দিয়েও আমাদের ক্ষতি করছে।আদতে তাই যৌথ নদী কমিশন কোন কাজেই আসেনি।এখন সময় এসেছে ফারাক্কা নিয়ে কাযর্কর পদক্ষেপ গ্রহণ করার।ফারাক্কা যদি থাকে তবে সেটা যেভাবে থাকলে দুই দেশের  কারো কোন ক্ষতি হবেনা সেটা নিশ্চিত করতে হবে।নতুবা স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ভারত আমাদেরকে যেভাবে সাহায্য করেছিল সেই অসাধারণ অবদানের গায়ে কলঙ্কতিলক পড়বে।

জাজাফী

ইমেইলঃ [email protected]

নারী দেহ নিয়ে লালসা তোমার

হায়রে অভাগা জাতি, বদলেছ রাতারাতি।
ভীড় দেখলেই নারী দেহ নিয়ে করতেছ হাতাহাতি।

নারী দেহ নিয়ে লালসা তোমার,সারাক্ষণ করো হাসফাঁস
মনে কি পড়েনা এই তুমিইতো নারী দেহে ছিলে দশমাস।

হেটে যায় মেয়ে তুমি সেটা দেখে বলে ওঠো খাসা মাল
তোমারও যে এক বোন আছে, সেটা ভুলে হলে বেসামাল।

অন্যের বোন মেয়েরা সবাই মাল হয়ে যায় চোখে
তোমার বোনটা হেটে গেলে তবে কি আর বলবে লোকে।

#জাজাফী
#বোনের_জন্য_ভালবাসা
৬ ডিসেম্বর ২০১৬

স্বপ্নযাত্রা ১৯৭১

মুক্তিযুদ্ধ কোন গল্প বা কবিতা নয় যে একবার দুবার পড়ার পর তার আবেদন ফুরিয়ে যাবে। যতদিন বাঙ্গালী ও বাংলা থাকবে ততোদিন মুক্তিযুদ্ধ সমান ভাবে সমাদৃত হবে কিংবা বলা যায় দিন পেরোবে আর মু্ক্তিযুদ্ধের আবেদন বৃদ্ধি পেতে থাকবে।

মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী প্রজন্মের অধিকাংশই তাদের প্রিয় দেশের জন্ম এবং জন্মের প্রকৃত ইতিহাসতো দূরে থাকুক স্বাধীনতা দিবস বিজয় দিবসটাও ঠিকমত মনে রাখতে পারেনা। জাতীয় সঙ্গীতটাও ঠিকমত গাইতে পারেনা। তাই বাঙ্গালীর জাতির সব থেকে আলোচিত অধ্যায় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যত বেশি সম্ভব কাজ করা উচিত।

যুদ্ধ পরবর্তী সময় এমনকি যুদ্ধ চলাকালীন সময় থেকেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বেশ কাজ হচ্ছে। রচিত হয়েছে গল্প,কবিতা এবং উপন্যাস। সেই পথে আছেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক থেকে শুরু করে হাসান হাফিজুর রহমান,আনিসুল হক এবং নির্মলেন্দু গুণের পাশ কাটিয়ে স্বয়ং হুমায়ুন আহমেদ এবং মুহাম্মদ জাফর ইকবাল পযর্ন্ত।

এর বাইরেও অনেকেই মুক্তিযুদ্ধকে নানা ভাবে তুলে ধরতে চেষ্টা করেছেন। সেলুলয়েডের ফিতাতেও তা উঠে এসেছে সমান ভাবে। হুমায়ুন আহমেদ তার দেয়াল উপন্যাসকে আমাদের সামনে মুক্তিযুদ্ধকে জীবন্ত করে তুলে ধরেছেন বললে অত্তুক্তি হবেনা। আর বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত আত্মজীবনীতেও মুক্তিযুদ্ধ সমান ভাবে উঠে এসেছে।

বিগত দশকে যারা মুক্তিযুদ্ধ,স্বদেশ প্রেম এবং জাতীয় চেতনার পাশাপাশি ছোটদের জন্য কিছু করতে চেয়েছেন বা চেষ্টা করেছেন তাদের মধ্যে দীপু মাহমুদ অন্যতম। সুলেখক হিসেবে ইতমধ্যে তিনি সবার দৃষ্টি আকর্ষন যেমন করেছেন তেমনি ছোটদের জন্য বই লিখে যে দায়িত্বের পরিচয় দিয়েছেন তা সত্যিই অতুলনীয়।

ব্যক্তি দীপু মাহমুদ যেমন এককাঠি সরেস এবং বন্ধুভাবাপন্ন ঠিক তার থেকেও এগিয়ে তার লেখা এবং লেখনী।
সুনিপুন শব্দকারীগর হিসেবে তিনি একের পর এক তথ্য জুড়ে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে আমাদের চেতনার মধ্যে এমন ভাবে ঢুকিয়ে দিতে চেয়েছেন যেন এক একটা উপন্যাসের চরিত্রকে আমার নিজেদের চরিত্র হিসেবে খুজে পাই।

মুক্তি যুদ্ধ একটা শক্তিশালী বিষয় এবং বাঙ্গালীর জাতীয় জীবনের সব থেকে আলোচিত ঘটনা। ত্রিশ লক্ষ শহীদের আত্মদানে অর্জিত দেশে সেই সব শহীদের কথা সকলের কাছে পৌছে দেওয়া সকলের নৈতিক দায়িত্ব। হুমায়ুন আহমেদদের সাথে একই পথে হেটে অনেকটা এগিয়ে গেলেন সুলেখক দীপু মাহমুদ।

দীপু মাহমুদ যথেষ্ট দায়িত্বশীল মানুষ এবং শব্দসৈনিক সেটা তার রচিত স্বপ্ন যাত্রা ১৯৭১ বইটি পড়লেই বুঝা যায়।

বইটির সুচনা বাক্য থেকে শেষ অবধী পাঠক নিজেই ক্রমাগত ভাবে হারিয়ে যাবে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে।

মুক্তিযুদ্ধর মত একটা প্রেক্ষাপটকে উপজীব্য করে উপন্যাস রচনা করা যথেষ্ট কঠিন কাজ। কিন্তু অভিজ্ঞ স্বর্ণকারের কাছে যেমন যে কোন ডিজfইনেই গহনা তৈরি করা যায় তেমনি এক অভিজ্ঞ কলম সৈনিক হিসেবে অত্যন্ত সুনিপুণ ভাবে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অসাধারণ বইটি লিখতে পেরেছেন দীপু মাহমুদ।

মুক্তি যুদ্ধ নিয়ে এ যাবৎকাল যা কিছু ঘটেছে যা করা হয়েছে তার তুলনায় এটি কোন অংশেই কম নয়।
বোদ্ধা পাঠকের কাছে দীপু মাহমুদের “স্বপ্ন যাত্রা ১৯৭১” বইটি সত্যি সবাইকে স্বপ্ন যাত্রার মাধ্যমে যুদ্ধ দিনে ফিরিয়ে নিয়ে যাবে এবং এক একজনকে বীরের বেশে দাড় করাবে এটাতে কোন সন্দেহ নেই।

সাহিত্য রস থেকে শুরু করে শব্দচয়নে লেখক নিপুণ কারীগরের ভূমিকায় উপস্থিত হয়েছেন। দু একটা বানানে ভুল থাকা অস্বাভাবিক নয় কম্পিউটার কম্পোজের কারণে ওটা হতে পারে বাকি সব ঠিক ছিল। প্রচ্ছদটিও ছিল চমৎকার।

একুশে বইমেলাতে প্রতি বছর পাঁচ থেকে ছয় হাজার বই প্রকাশ পায়। এবার নিশ্চই সেই সংখ্যাটা যথেষ্টই বেশি। কিন্তু অগণিত সংখ্যক বইয়ের ভীড়েও নির্ভাবনায় বেছে নেওয়ার মতই একটি বই “স্বপ্ন যাত্রা ১৯৭১”। তবে আসুন দীপু মাহমুদের চিত্রায়িত চরিত্র গুলোর সাথে আরো একবার ফিরে যাই একাত্তরে। সে যাত্রা হোক স্বপ্ন যাত্রা।

…………………..

জাজাফী

ইমেইলঃ [email protected]

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

 

ইস্টিশানঃ মুহাম্মদ জাফর ইকবাল

রেল ইস্টিশানে বসে আছেন বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয় লেখক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল।ইদানিং তাকে প্রতি বৃহস্পতিবার রেল ইস্টিশানে বসে থাকতে দেখা যায়।তার কারণ তিনি প্রতি বৃহস্পতিবার সিলেট থেকে ঢাকায় যান।ঘটনাটা বেশ কিছুদিন আগের।শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন হলের নাম “জাহানারা ইমাম” হল করার প্রতিবাদে তখন আন্দোলন চলছে। একদল নামের পক্ষে আরেক দল বিপক্ষে। বিষয়টা এমন দাড়ালো যে এক পর্যায়ে মুহাম্মদ জাফর ইকবালের বাসায় পযর্ন্ত বোমা মারা হলো।নিজের চেয়ে নিজের সন্তানদের সব বাবা মাই বেশি ভালবাসেন (ইদানিংকার বাবা মাদের কথা আলাদা,যারা পরোকীয়া প্রেমের জন্য নিজের সন্তানকে গলা টিপে হত্যা করতেও দ্বিধা করেনা)। স্বভাবতই মুহাম্মদ জাফর ইকবালও তার দুই সন্তান ইয়েশিম এবং নাবিলকে অনেক ভালবাসেন এবং নিরাপত্তার কথা ভেবে তাদেরকে ঢাকায় রেখে আসলেন। সেই সন্তানের টানে প্রতি বৃহস্পতিবার তিনি এবং ইয়াসমিন হক ম্যাডাম ছুটে যান ঢাকাতে।

এমনই একটা দিন মুহাম্মদ জাফর ইকবাল ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছেন। পত্রিকা হাতে ছোট্ট একটি ছেলে তার সামনে আসলে তিনি একটি পত্রিকা কিনলেন এবং ছেলেটিকে দুটো টাকা বেশি দিলেন।জনপ্রিয় এই লেখক ও অধ্যাপককে অবাক করে দিয়ে সেই ছোট্ট ছেলেটি প্রায় হুকুমের স্বরে বলে উঠলো “দুই টাকা বেশি দিলেন কেন?আমিকি ভিক্ষা করি?” ছেলেটির সাথে তিনি কথা বলেছিলেন। ছেলেটার নাম জালাল।তিনি অবাক হয়ে জালালকে দেখলেন তার সাথে কথা বললেন। জালাল চলে যাওয়ার পরও জালালের গল্পটা মুহাম্মদ জাফর ইকবালের লেখক সত্ত্বার মধ্যে জেগে থাকলো।এভাবে বেশ অনেক দিন ধরে প্রতি বৃহস্পতিবার মুহাম্মদ জাফর ইকবালকে ঢাকা সিলেট যাওয়া আসা করতে হলো। সেই আসা যাওয়ার মাঝে নিয়মিত ইস্টিশানের সেই অনাদর অবহেলায় বেড়ে ওঠা জালালদের সাথে তার কথা হতো।বেশ ভাল বন্ধুত্বও হয়ে গিয়েছিল তাদের মধ্যে।

এক জীবনে মানুষকে কত ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়। মুহাম্মদ জাফর ইকবাল ট্রেনের অপেক্ষায় বসে আসেন।লেখক মনে কত ভাবনার উকিঝুকি থাকে।তিনিও সেভাবে কত কিছু নিয়ে ভাবছিলেন। হঠাৎ একদিকে চোখ পড়তেই তিনি দেখলেন একদল ছোট ছোট ছেলে মেয়ে অনেকটা মিছিলের মত করে তার দিকে এগিয়ে আসছে। খুব কাছে আসলে তিনি দেখলেন মিছিলের মত করে আসা ছেলে মেয়ে গুলো ওই স্টিশানেই বেড়ে ওঠা সেই সব বাচ্চা যাদের সাথে বিগত কয়েক মাসে প্রতি বৃহস্পতিবার দেখা হতো কথা হতো এবং ভাল সখ্যতা গড়ে উঠেছে। সেই বাচ্চাদের মিছিলের সবার সামনে জালাল নামের সেই ছেলেটি।তার হাতটা পিছনে রাখা। যেন প্যারেডে সে আরামে দাড়িয়েছে। উৎসুক দৃষ্টিতে মুহাম্মদ জাফর ইকবাল ওদের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। সবার চোখে মুখে আনন্দ খেলা করছে। জালাল কথা বলে উঠলো।“আপনার জন্য একটা উপহার এনেছি”। উপহার কথাটা শুনে জাফর ইকবাল মুগ্ধ হয়ে গেলেন।জালাল তখন তার পিছনে লুকিয়ে রাখা হাতটা সামনে মেলে ধরলো। তার হাতে তখন একটা চিপ্সের প্যাকেট।সে সেই চিপ্সের প্যাকেট মুহাম্মদ জাফর ইকবালের হাতে দিল।ছোটদেরবন্ধু এই মানুষটি মুগ্ধ বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলেন।

এক জীবনে মুহাম্মদ জাফর ইকবাল দেশে বিদেশে অনেক পুরস্কার পেয়েছেন, অনেক উপহারও পেয়েছেন। কিন্তু সেদিন জালাল আর তার সাথে আসা অবহেলিত বাচ্চাগুলোর দেওয়া সামান্য এক প্যাকেট চিপ্সই তার জীবনে পাওয়া সব থেকে দামী উপহার এবং এই সুলেখক, ছোটদেরবন্ধু মানুষটি সেটা নিজ মুখে স্বীকার করেছেন।

পরিস্থিতি যখন শান্ত হয়ে গেল, তখন মুহাম্মদ জাফর ইকবাল স্যার ফিরে গেলেন সিলেটে।স্থায়ী ভাবে সেখানে বাস করতে শুরু করলেন। খুব প্রয়োজন ছাড়া আর ঢাকায় আসা যাওয়া হতোনা।কিন্তু লেখকের মন থেকে জালালের ঘটনা গুলো মুছে যায়নি।তারই ফলশ্রুতিতে লেখা হলো “স্টিশান” নামে অসাধারণ একটি কিশোর উপন্যাস। লেখক যে লেখাটি নিজ চোখে দেখা এবং উপলব্ধিজ্ঞান থেকে লিখেছেন।উপন্যাসের শেষ অংশে সেটার অকপট স্বীকারোক্তিও চোখে পড়বে। তিনি বলেছেন উপন্যাসটির শেষ অ্যাডভেঞ্চারটুকু কল্পনার রঙে লেখা, বাকি সবটাই তার চোখে দেখা।

“ইস্টিশান” বইটি আমি অন্তত পাঁচ থেকে ছয়বার পড়া শুরু করেও পড়তে পারিনি।চার পাঁচ পাতা পড়ার পর কেন যেন আমাকে টানেনি লেখাটা। আজ যখন আর কোন বই হাতের কাছে নেই তখন “ইস্টিশান” জোর করে পড়তে শুরু করলাম এবং দশ পনের পৃষ্ঠা পড়ার পর তলিয়ে গেলাম স্টিশানের একেবারে গভিরে।অবাক হয়ে ভাবলাম এই অসাধারণ বইটিই বেশ কয়েকবার পড়া শুরু করেও ভাল লাগেনি বলে পড়তে পারিনি!!!!ইস্টিশানেতো হরহামেশাই যেতাম।কমলাপুর রেল স্টিশান থেকে সিয়াম আমাকে কতবার ট্রেনে উঠিয়ে দিয়েছে তার কোন সীমা নেই। আমিওতো ওই সব অবহেলীত শিশু কিশোরদের খুব কাছ থেকে দেখেছি।ওদের যে কষ্ট আছে তা জানতাম কিন্তু কোনদিন ওভাবে ভেবে দেখিনি ওদের অতটা কষ্ট।

মুহাম্মদ জাফর ইকবাল খুব কাছ থেকে তার বড় হৃদয় দিয়ে যে জালালদের দেখেছেন,যে জালালদের সাথে বন্ধুর মত মিশেছেন এবং তাদের কষ্ট গুলো বুকে ধরে রেখে শেষে ভার বইতে না পেরে “ইস্টিশান” বইটি লিখে কিছুটা ভার কমিয়েছেন সেই “ইস্টিশান” না পড়লে দুঃখের রংটা সব সময় হয়তো আমার চোখে তামাটেই থেকে যেত।

আমাদের চার পাশে কতনা জালালের বসবাস। আমরা কয়জনেরইবা খোঁজ পাই,কয়জনেরইবা খোঁজ রাখি।একজন সু লেখক এবং ছোটদেরবন্ধু হিসেবে সেই কাজটা বেশ ভালই করেছেন তিনি। বইয়ের শেষে তাই কৃতজ্ঞতা জানাতে ভুল করেননি এই সুলেখক। তিনি লিখেছেন জালালের এই গল্পটা কোন বানোয়াটি গল্প নয়। এটা তার নিজের দেখা গল্প।শুধু মাত্র শেষ অধ্যায়ে বর্ণিত অ্যাডভেঞ্চারটি তার কল্পনা প্রসুত। তিনি আরো লিখেছেন জালালদের নিয়ে যে বইটা লিখলেন তা কোন দিন জালালেরা পড়ে দেখবেনা এমনকি হয়তো জানবেইনা যে তাদের নিয়ে কেউ একজন বই লিখেছে।

পাঠক মাত্রই জালালের এই গল্পটা পড়ে মুগ্ধ হবেন এবং কোন কোন পর্যায়ে চোখের কোণায় জল জমে যাবে এতে কোন সন্দেহ নেই।

জালাল একটা ছোট্ট ছেলে।যার বাবা নেই,চাচার লাথি গুতো সহ্য করতে না পেরে যে শহরে চলে এসেছে। যার বোনটা না খেয়ে মারা গেছে এবং যার মাকে জোর করে অন্য একজনের সাথে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়েছে।যে ছোট্ট ছেলেটি দেখেছে সবুজ নামে তার থেকে এক বছর বড় ছেলেটিকে নৃশংসভাবে খুন করা হয়েছে এবং একটুর জন্য সে নিজেও হয়তো খুন হয়ে যেতে পারতো। ইস্টিশানে জালাল যাদের সাথে থাকে তারা সবাই প্রায় সমবয়সী কিন্তু কিভাবে কিভাবে যেন জালাল তাদের অভিভাবক হয়ে গেল। এক মিষ্টি আপার সাথে তাদের দেখা হয়েছিল যিনি না চাইতেই প্রত্যেককে দুইটাকার একটা নতুন নোট দিতেন। সেই আপার কারণেই বদলে গেল জালালের জীবন। জীবনের ঝুকি নিয়ে সে একটা বাচ্চা মেয়েকে ট্রেনে কাটা পড়ার হাত থেকে বাঁচালো এবং একদল পাচার কারীর থেকে একদল শিশুকে বাঁচালো।

“ইস্টিশান” নামের আড়ালে জালাল ঢাকা পড়েনি। তাই পাঠক মাত্রেরই মনে হবে এই বইটার নাম “ইস্টিশান” না হয়ে “একজন জালালের গল্প” টাইপের কিছু হলে ভাল হতো।

বইটির শুরুটা যেভাবে হয়েছে তা হয়তো পাঠককে সেভাবে টানবেনা। মনে হবে ঠিক মুহাম্মদ জাফর ইকবালীয় ঢংএর লেখা নয় সেটা।যে ভুলটা আমার ক্ষেত্রেও ঘটেছিল। কিন্তু দশ পনের পৃষ্ঠা পড়ার পর ধারণা পাল্টে যাবে।গল্প থেকে তখন আর পাঠক বেরিয়ে আসতে পারবেনা। মনে হবে এটা বুঝি কোন জালালের গল্প নয়, এটা যেন তার নিজেরই গল্প। এখানেই লেখকের সার্থকতা।

“স্টিশান” বইটির শেষ অংশে লেখকের সরল স্বীকারোক্তিকেও অনেকে বিজ্ঞাপন,বইয়ের কাটতি বাড়ানোর কৌশল বলে চালিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু তারা কখনোই ভেবে দেখেন না যে পাঠক বই কেনে প্রথম দিকটা দেখে। শেষ অংশ পড়ে দেখে বই কেনে এমন পাঠক মেলা ভার। তাই লেখক যদি বিজ্ঞাপন বা বইয়ের কাটতির কথা চিন্তা করতেন তবে শেষ কথা গুলো আগেই বলে নিতে পারতেন।

যে গল্পটি ভালবেসে লেখা হয়েছে সেটির নাম”ইস্টিশান” যেখানে একটা অসাধারণ আপার দেখা মিলবে আর দেখা মিলবে জালাল নামের তের বছরের এক কিশোরকে।যে কোন কিছুকেই পরোয়া করেনা,যে কারো বিপদে সে মাথা ঠান্ডা রেখে কাজ করে।জালালকে খুব মনে পড়ছে,খুব মনে পড়ছে,খুউব………..।

………………….

জাজাফী

৬ মার্চ ২০১৬

জেনারেল ও নারীরা

আজাদের মাকে আমরা হয়তো ঠিক সেভাবে চিনতাম না যদি না একজন আনিসুল হকের জন্ম হতো।আমি সেই আজাদের মায়ের কথা বলছি যিনি অনন্তকালের জন্য ঘুমিয়ে গেছেন জুরাইন কবরস্তানে। তিনি সেই মা যিনি সন্তান ভাত খেতে চেয়েছিল কিন্তু তিনি নিজ হাতে তুলে শেষ বারের মত ভাত খাইয়ে দিতে পারেন নি বলে জীবনের শেষ দিন পযর্ন্ত ভাত খাননি। তিনি সেই মা যিনি সন্তান বিছানায় ঘুমাতে পারেনি বলে জীবনের শেষ দিন পযর্ন্ত বিছানায় ঘুমান নি। এই কথা গুলো বলছিলাম আনিসুল হক ও তার উপন্যাস “জেনারেল ও নারীরা” সম্পর্কে আলোকপাত করার প্রাথমিক পাঠ হিসেবে। আনিসুল হক তার মা উপন্যাসে শহীদ আজাদের মাকে যেভাবে চিত্রায়ন করেছেন তা যে কোন শ্রেনীর পাঠকের চোখে শ্রাবণধারা আনবে এটা নিশ্চিত।

আনিসুল হক একজন শক্তিমান লেখক হিসেবে অনেক আগেই বাংলাসাহিত্যের আকাশে উজ্জল হয়ে জ্বলতে শুরু করেছেন।লিখেছেন অনেক টিভিনাটক এবং তার লেখা কলাম অত্যন্ত জনপ্রিয়।মা উপন্যাসটি লিখে তিনি আমাদেরকে যেভাবে মোহিত করেছেন এর আগে কোন লেখক ঠিক সেভাবে করেছেন কিনা সন্দেহ আছে। সুলেখক আনিসুল হক রম্য রচনাতেও যথেষ্ট পরিপক্কতা দেখিয়েছেন। তার লেখা “আবার তোরা কিপ্টে হ” রম্য রচনাটি তাই পাঠকের মনে দাগ কেটেছে। শিশু সাহিত্যেও তার অবদান উল্লেখযোগ্য। তিনি বিগত বছরে এবং এ বছরে গুড্ডু বুড়োর কান্ডকারখানা এমন ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন যে শিশু কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সীর কাছে হয়ে উঠেছে সুপাঠ্য।

কিন্তু আনিসুল হক তার “মা” উপন্যাসটি যেভাবে উপস্থাপন করেছিলেন বাকি গুলোতে ঠিক সেই ধারা সেই আবেগ ছিলনা।

কিন্তু তার ক্ষুরধার কলমের ধার যে কোন অংশে কমেনি তা তিনি আবার প্রমান করলেন।’জেনারেল ও নারীরা’- নামে এক অসাধারণ উপন্যাস নিয়ে আবার হাজির হলেন আমাদের সামনে।বাংলাদেশের জন্মের শুরু থেকে এখন পযর্ন্ত প্রতিটি মুহুর্তই যেন এক একটা ইতিহাস।১৭৫৭ সালে মীর জাফরের বিশ্বাস ঘাতকতা থেকে শুরু করে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন ৬৯ এর গণ অভ্যুত্থান এবং ৭১ এর স্বাধীনতা যুদ্ধের পর ৭৫ এর বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ড সব এক একটা করুণ ইতিহাস। ইতিহাসের পাতায় পাতায় যারা খুজে ফেরেন বাংলাদেশের জন্ম কাহিনী তারা নিশ্চই কম বেশি দেশকে ভালবাসেন। সেই সব দেশ প্রেমীদের জন্য দেশ এবং দেশের মুক্তিযুদ্ধ নামে সব থেকে গুরুত্বপুর্ন অধ্যায়কে সুনিপুণ হাতে শব্দের পর শব্দ জোড়া লাগিয়ে অসাধারণ এক সাহিত্য কর্ম নিয়ে হাজির হয়েছেন আনিসুল হক।’জেনারেল ও নারীরা’- যেন বাংলাদেশেরই জন্ম কাহিনী।হুমায়ুন আজাদের “লাল নীল দীপাবলী” যেমন বাংলা সাহিত্যের জন্মইতিহাস বহন করছে ঠিক তেমনি বাংলাদেশের জন্ম থেকে বেড়ে ওঠাও যেন চিত্রের মত চিত্রায়িত হয়েছে আনিসুল হকের ‘জেনারেল ও নারীরা’ গ্রন্থে। বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ নেতৃত্ব থেকে শুরু করে পাকিস্তানী হানাদারদের কুৎসিত নৃশংসতার কোনটাই বাদ পড়েনি।ইয়াহিয়া খানতের নোংরামীর ইতিহাস কম বেশি সবাই জানলেও অনেক অজানা তথ্যও নতুন করে চোখে ভেসে উঠবে। উপন্যাসের নামের আড়ালে এটি তাই হয়ে উঠছে সমৃদ্ধ ইতিহাস গ্রন্থ এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিময় অধ্যায়ের একটি দলিল।কেননা সুলেখক আনিসুল হক শুধু মাত্র উপন্যাস হিসেবেই নয় এটিকে করেছেন তথ্য সমৃদ্ধ একটি বই যার প্রমাণ স্বরুপ তিনি জুড়ে দিয়েছেন তথ্যসুত্র। ইতিহাসের প্রমত্ত ধারায় কেবল মাত্র গা ভাসিয়ে না দিয়ে লেখক তার সুনিপুন হাতে তুলে ধরেছেন বাস্তব চিত্র।তাই ‘জেনারেল ও নারীরা’ কেবল মাত্র একটি উপন্যাসের তকমা লাগিয়েই পার পেতে পারেনা বরং এটিকে আরো অনেক অভিধায় অবিহিত করা যায়।

মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে না পেরে যারা আক্ষেপ করেন তারা এই বইটি পড়ে এক নিমিষে হারিয়ে যেতে পারেন সেই সব উত্তাল ভয়াল দিনে।একথা নিশ্চিত করেই বলা চলে “মা” উপন্যাসের পর সুলেখক আনিসুল হক আবার একটি অসাধারণ গ্রন্থ নিয়ে হাজির হলেন বাংলার আকাশে।যে গ্রন্থটি তার স্বীয় স্বকীয়তাবলে স্থায়ী আসন নিয়ে নিয়েছে বলেই  অনেক বোদ্ধা পাঠক মনে করেন।

আনিসুল হকের হাত ধরে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আরো অনেক লেখা বেরিয়ে আসুক এবং আমরা মুক্তিযুদ্ধকে আরো কাছ থেকে দেখি সেই প্রত্যাশাই করে অধিকাংশ পাঠক। তাই সবর্পরি আনিসুল হককে আমাদের ধন্যবাদ দিতে কাপন্য করা উচিৎ নয়। তিনি তার ‘জেনারেল ও নারীরা’ বইটির জন্য আরো একবার ধন্যবাদ পাওয়ার অধিকার রাখেন।ধন্যবাদ আনিসুল হক কে।

………………….

#জাজাফী

২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

 

কংক্রিটের শহরে বিনোদন বলে কিছু নেই

কংক্রিটের শহরে উচু উচু দালান।সকালের সুর্যটা এখন আর চোখে পড়েনা।ভোর হতে না হতেই আগে যখন আমাদের চোখে সুর্যের সোনালী আলো এসে পড়তো এখন সেই আলো দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হয় বেলা দশটা বা তারও বেশি সময় পযর্ন্ত।সুর্যের আলো দেখার আগেই অবশ্য আমাদের বেরিয়ে যেতে হয় অফিসে কিংবা কাজে।সাত সকালে না বের হলে সময় মত অফিসে পৌছা কোন ভাবেই সম্ভব নয়।রাস্তায় যে পরিমান যানজট থাকে তা কাটিয়ে কর্মস্থলে পৌছা রীতিমত এক একটি যুদ্ধ জয়ের সমান।কর্মস্থলে যাওয়ার সময় বাড়িতে যাদের রেখে আসি তারা কি তবে খুব আনন্দে দিন পার করে?ঠিক সেরকমটি ভাবার কোন কারণ নেই।ছেলে মেয়েরা ঘুম ঘুম চোখে কাধে ভারি ব্যাগ ঝুলিয়ে স্কুলে ছোটে।নিজের শরীরের চেয়েও কখনো কখনো ভারি হয়ে ওঠে সেই ব্যাগ।ওদের আর দোষ কি?অপ্রয়োজনীয় বইয়ের বোঝাতো আমরাই চাপিয়ে দিয়েছি ওদের কাঁধে।ছেলে মেয়েদের সাথে সাথে বের হতে হয় ঘরের গৃহিণীদের।সন্তানকে স্কুলে দিয়ে বসে থাকতে হয় ঘন্টার পর ঘন্টা।এই সময়টাতে তারা কি করে?একে অন্যের সাথে গল্প করে সময় কাটায়।গল্পে আমাদের দেশের সমাজ ব্যবস্থা,রাজনীতি,অর্থনীতি,শিক্ষা ব্যবস্থা,খেলাধুলা কিংবা ইতিহাস ঐতিহ্যের কিছুই উঠে আসেনা।তাদের আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে পারিবারিক টানাপোড়েন নয়তো সিরিয়ালের কথা।এবং যখন সিরিয়ালের কথা ওঠে তখন অবধারিত ভাবেই সেটা কলকাতার বাংলা চ্যানেল গুলোয় প্রচারিত সিরিয়াল প্রাধান্য পায়।কংক্রিটের এই শহরে বিনোদন বলতে গৃহিণীদের কাছে সিরিয়ালটুকুই সম্বল।

বিকেলে সন্তানের হাত ধরে ফুরফুরে হাওয়ায় হাটতে বের হওয়ার ফুসরত কোথায়।এ শহরে খোলা হাওয়ার হাটার মত রাস্তা নেই,পার্ক নেই,বিনোদনের মত পযার্প্ত যায়গা নেই।পার্ক যা দু একটা আছে তাও কোন না কোন ভাবে দখল হয়ে আছে।খেলার মাঠ যা দু একটা আছে তাও কোন না কোন ক্লাব দখল করে রেখেছে তাদের ক্লাবে ভর্তি ছেলে মেয়েরাই শুধু সেখানে খেলার সুযোগ পায়।অন্যদিকে সন্তানের স্কুল ছুটি শেষেও ছুটি মেলেনা মা সন্তানের।স্কুল শেষে কোচিং তার পর বাসায় ফিরে হাত মুখ ধুয়ে ফ্রেশ হতে না হতেই বাসার কলিংবেল বেজে ওঠে।ঠায় দাড়িয়ে আছে গৃহশিক্ষক।গৃহশিক্ষক বিদায় নিতে না নিতেই হোমওয়ার্ক নিয়ে ব্যস্ত হতে হয় সেই সাথে মাকেও ব্যস্ত হতে হয় পাশে বসে ছেলে মেয়েকে সাহায্য করা এবং ঘরের রান্না বান্না সব করা।রাতে ঘুমানোর আগে বাচ্চারা হয়তো টিভি ছেড়ে একটু কার্টুন দেখে নয়তো মোবাইলে বা কম্পিউটারে একটু গেম খেলে।তাদের অবসর বলতে সাপ্তাহিক ছুটির দিন কিন্তু সেটাও হয়তো তারা জমে থাকা হোমওয়ার্কের পিছনে ব্যয়করে। অন্যদিকে গৃহিনীরা ছুটির দিনে বসে বসে পছন্দের সিরিয়াল দেখে। কেননা বিনোদন বলতে টিভি ছাড়া তো এ শহরে আর তেমন সহজলভ্য কিছুই নেই।

উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে বর্তমান বাংলাদেশে বেসরকারী ২৯টি টিভি চ্যানেল চালু আছে।এর মধ্যে ১৯টি চ্যানেল নিজেদের বিনোদোন চ্যানেল বলে পরিচয় দিয়ে থাকে বাকি ৮টি চ্যানেল খবরের চ্যানেল হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকে।অন্যদিকে গানবাংলা নামে একটি গান ভিত্তিক চ্যানেলও সম্প্রচার হচ্ছে।

কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে এ শহরের ঘরে ঘরে টিভি চললেও ঘুরলে দেখা যায় এই ২৯টি চ্যানেলের খুব কম সংখ্যক চ্যানেলই আমার দেখি।আমাদের পছন্দের তালিকায় বরাবরই বিদেশী চ্যানেল বিশেষ করে ইন্ডিয়ান বাংলা চ্যানেলগুলো প্রাধান্য পাচ্ছে।এর প্রধান কারণ কী হতে পারে? আমাদের চ্যানেলে প্রচারিত অনুষ্ঠান কি তুলনামূলক ভাবে ইন্ডিয়ান চ্যানেলের চেয়ে কম মানসম্মত? নাকি ইন্ডিয়ান চ্যানেলে এমন ইউনিক কিছু দেখাচ্ছে যা দর্শক লুফে নিচ্ছে কিন্তু আমরা সেরকম আকর্ষণীয় কোন অনুষ্ঠান তৈরি করতে পারছিনা ফলে দর্শক আমাদের দেশীয় চ্যানেল কম দেখছে।ইন্ডিয়ান বাংলা চ্যানেলগুলো ঘুরে দেখতে পাই সেখানে সিরিয়াল প্রচার হচ্ছে এবং সেই সিরিয়ালগুলোর বিষয়বস্তু সমাজে বিশৃংখলা তৈরিতে গুরুত্বপুর্ন ভূমিকা রাখতে পারে কিংবা বলা চলে রাখছে।অধিকাংশ চ্যানেল যে সব সিরিয়াল প্রচার হচ্ছে তাতে পারিবারিক কলহ এবং সেই কলহকে কিভাবে আরো জোরালো করা যায়,কিভাবে কুটনামি,ষড়যন্ত্র করা যায় সেসবই দেখাচ্ছে।আর সেটা টেনে এতো লম্বা করছে যে কোন কোন সিরিয়াল একাধারে ৫ বছর চললেও শেষ হচ্ছেনা এবং কবে শেষ হবে তা আমাদের কারো জানা নেই। সেই সব সিরিয়াল থেকে আমাদের মেয়েরা কি শিখছে তা অবশ্য বলাই বাহুল্য।

অন্যদিকে আমাদের দেশের চ্যানেল গুলোর অনুষ্ঠান গুলোর দিকে তাকালে দেখতে পাই অনুষ্ঠান বিশেষ করে নাটক গুলো খুব একটা মান সম্মত না হলেও একেবারে ফেলে দেবার মত নয়।তার পরও কেন তাহলে দর্শক সেসব থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে?এর প্রধান কারণ ত্রিশ মিনিটের নাটকের মাঝে চার বার বিজ্ঞাপন দিচ্ছে ফলে দর্শক এমনিতেই বিরক্ত হচ্ছে।তারা ভেবেই পাচ্ছে না যে তারা কি আসলে নাটক দেখছে নাকি বিজ্ঞাপন দেখছে?ইন্ডিয়ান চ্যানেল গুলোতে এই কাজটি খুবই গুরুত্বের সাথে নিয়েছে।তারা বিজ্ঞাপন বিরতি খুব কম দেয় এবং দিলেও সময় দেখানো হয় ফিরে আসছি আর এতো মিনিট পর যা দর্শককে বুঝতে শেখায় তুমি এর মাঝে কিছু কাজ করলেও তোমার পরবর্তী অংশ বঞ্চিত হওয়ার কোন কারণ নেই।ঠিক এতো সময় পর তুমি ফিরে আসলেই দেখতে পাবে।আমাদের দেশে সেরকম কোন বালাই নেই।বিজ্ঞাপন শুরু হলে তা থামার কোন নাম নেই।এর পর আসি অন্য দিকে।আমাদের যে সব চ্যানেল বিনোদন চ্যানেল বলে পরিচিত সেগুলোতে প্রতি ঘন্টায় সংবাদ পরিবেশিত হচ্ছে পাশাপাশি নিচেয় স্ক্রলিং করে সংবাদ শিরোণাম দেখানো হচ্ছে।ইন্ডিয়ান বিনোদন চ্যানেলে কোন দিন সংবাদ পরিবেশিত হয়েছে কিংবা নিচে স্ক্রলিংএ সংবাদ শিরোণাম দেখানো হয়েছে এমন কোন নজির অন্তত আমার চোখে পড়েনি।

সুতরাং বিনোদন চ্যানেলে কেন সংবাদ পরিবেশিত হবে এটাই আমাদের বোধগম্য নয় এর ফলেও দর্শক এই সব বিনোদন চ্যানেলগুলোকে এড়িয়ে চলছে।দেশে ৮টি সংবাদভিত্তিক চ্যানেল থাকার পরও বিনোদনকেন্দ্রীক চ্যানেল গুলোতে কেন সংবাদ পরিবেশন করতে হবে তার কোন যুক্তি আমরা খুঁজে পাইনা।অবশ্য একটা যুক্তি দেওয়া যেতে পারে যে সংবাদের সময়ও বিজ্ঞাপন পাওয়া যাচ্ছে তা দিয়ে ভাল আয় হচ্ছে।

সিএনএন,বিসিসি বা অন্যান্য দেশের সংবাদ চ্যানেলগুলোর দিকে তাকালে দেখতে পাই সেখানে বিজ্ঞাপন নামে দর্শক হয়রানি করা হয় না। কিন্তু আমাদের দেশের কী সংবাদ ভিত্তিক চ্যানেল আর কী বিনোদোন কেন্দ্রীক চ্যানেল সবাই সংবাদ পরিবেশন করছে আর সব থেকে হাস্যকর ব্যাপার হলো সংবাদ শিরোনাম প্রচার করছে কোন এক স্পন্সর কোম্পানীর নামে,বিরতিতে যাচ্ছে কোন এক স্পন্সর কোম্পানীর নামে বিরতি থেকে ফিরে এসে যে সংবাদ পরিবেশিত হবে তাও অন্য কোন না কোন স্পন্সর কোম্পানীর নামে।টিভি চ্যানেল মালিকেরা সম্ভবত কখনো এটা নিয়ে মাথা ঘামায় না।তাদের চিন্তা হলো টাকা আয় করতে হবে তাই যেখানে খুশি সেখানে বিজ্ঞাপন জুড়ে দেব।এর ফলে আজকাল দর্শক সংবাদ শুনতেও ত্যাক্ত বিরক্ত হচ্ছে।এর বাইরে সারাক্ষন টিভি চ্যানেলের নিচেয় স্ক্রলিংয়ে নানা সংবাদ শিরোণাম যাওয়ার পাশাপাশি স্ক্রিনের বিভিন্ন স্থানে নানা আকারের বিজ্ঞাপন দেখা যাচ্ছে যা খুবই দৃষ্টিকটু এবং বিরক্তির কারণ। এর ফলে স্বভাবতই দর্শক বিশেষ করে মেয়েরা নিরবিচ্ছিন্ন বিনোদনের জন্য ইন্ডিয়ান চ্যানেলের দিকে ঝুকে পড়ছে।

এখন আসি অন্য প্রসংগে।মেয়েদেরকে দোষ দিয়ে কোন লাভ নেই।তারা ইন্ডিয়ান চ্যানেলই যে শুধু দেখে তা কিন্তু নয়।বিজ্ঞাপনের যাতাকলে না পিষলে তারা এদেশীয় চ্যানেলও দেখতে আগ্রহ দেখায়।সুলতান সুলেমান বা ইউসুফ জুলেখা সিরিজ যে টিভি চ্যানেলগুলো প্রচার করেছে তাদের টিআরপি কতটা উপরে ছিল তা একটু খতিয়ে দেখলেই বুঝা যাবে।আমি নিজে আমার আপার বাসায় গিয়েছি এমন সময় সুলতান সুলেমান শুরু হলে তাদেরকে দেখেছি ইন্ডিয়ান চ্যানেল থেকে চোখ সরিয়ে ফিরে আসছে সেই চ্যানেলে কারন সেটি তাদের কাছে আরো আকর্ষনীয় হয়েছে।সেখানে তুলনামূলক ভাবে বিজ্ঞাপনও কম ছিল।যদিও আমাদের দেশের অনেকেই বিদেশী সিরিয়াল প্রচারে দ্বিমত পোষণ করেছিলেন তার পরও মনে হয় ওই সিরিয়ালগুলোই কিছু সময়ের জন্য হলেও এদেশের অগণিত দর্শককে ইন্ডিয়ান চ্যানেল থেকে ফিরিয়ে আনতে পেরেছিল।

চ্যানেল সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে কি কোন নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে কিনা এটা ভাবার অবকাশ নেই।কেননা চ্যানেল সংখ্যা অনেক বাড়লেও তার মধ্য থেকে একটা দুটো কি আমাদের দর্শকদের টেনে রাখতে পারতো না? এতো চ্যানেল থাকার পরও তাহলে কি করে ইন্ডিয়ান চ্যানেলের দিকে আমাদের ঝোক বেশি?কারণ আমাদের চ্যানেল আমাদের দর্শকদের চাহিদা এবং পছন্দ অনুযায়ি না কোন অনুষ্ঠান প্রচার করতে পারছে না তারা বিজ্ঞাপন কমাতে পারছে।যে অনুষ্ঠানই প্রচার হোকনা কেন সেটা বিজ্ঞাপনের ফাদে আটকা পড়ে দর্শক হারাচ্ছে।

বিনোদন চ্যানেলের নাম করে সংবাদ প্রচার কোন ভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়।আমাদের গলা বড় হয়ে গেছে তাই টেবিলে সাজিয়ে রাখা সব খাবারই আমরা খেতে চাইছি।আমাদের টিভি চ্যানেলগুলোও সেরকমই সংবাদ বিনোদোন কোন কিছুই তারা বাদ দিতে চায় না।সংবাদ ভিত্তিক চ্যানেল সংবাদ নিয়ে থাকুক বিনোদোন ভিত্তিক চ্যানেল বিনোদোন প্রচার করুক তাহলে দর্শক পাওয়া যাবে এবং সেই সাথে বিজ্ঞাপন প্রচারের দিকেও নজর দিতে হবে।

গান বাংলা চ্যানেল নামে যে চ্যানেলটি আছে তাদের নীতিতে সম্ভবত তারা এখনো অটল আছে।তারা গানের চ্যানেল নাম দিয়ে সংবাদ বা অন্য কিছু প্রচার করছে না।অন্যদিকে সম্প্রতি দূরন্ত টিভি নামে আরেকটি চ্যানেল সম্প্রচার হচ্ছে তারা শিশু কিশোরদের উপযোগি বেশ কিছু অনুষ্ঠান প্রচার করছে।অন্যদিকে তাদের বিজ্ঞাপনের পরিমানও তুলনামুলক ভাবে কম।কিন্তু কথা হচ্ছে নতুন নতুন সব চ্যানেলই এরকম করে থাকে।নতুন পন্য বাজারে আসলে যেমন ছাড় চলে,নতুন বউ যেমন স্বামীর ঘরে এসে কম কথা বলে ঠিক তেমনি নতুন চ্যানেলও শুরুর দিকে কম বিজ্ঞাপন,অপেক্ষাকৃত ভাল অনুষ্ঠান এবং দর্শকদের কথাই বেশি ভাবে।কিন্তু কদিন যেতে না যেতেই তারা অন্যান্য চ্যানেলের মতই একই কাতারে নাম লেখায়।এখন দূরন্ত টিভিও যে সেই কাতারে যাবে না তার কোন নিশ্চয়তা নেই।

এটিএন বাংলার দুটো আলাদা চ্যানেল আছে।একটি বিনোদোন কেন্দ্রীক আরেকটি সংবাদ ভিত্তিক।কিন্তু অবাক হয়ে দেখি বিনোদন ভিত্তিক এটিএন বাংলাতেও সংবাদ শিরোনাম সংবাদ প্রচারিত হচ্ছে।তাহলে আলাদা করে এটিএন নিউজ নামে চ্যানেল খোলার কি দরকার ছিল?

আমাদের টিভি চ্যানেল গুলোর আরেকটি সমস্যা হলো নিজেদের তৈরি সংবাদ প্রচারের পাশাপাশি বাংলাদেশ টেলিভিশনের সংবাদ প্রচার করছে এবং বিবিসি সিএনএন বা অন্যান্য সংবাদ চ্যানেলের সংবাদও প্রচার করছে।অন্য দিকে বাংলা সংবাদ প্রচারের পাশাপাশি কোন কোন চ্যানেল ইংরেজী সংবাদও প্রচার করছে।ফলে বিনোদনের জন্য যে সময়টুকু দরকার তার দুই তৃতীয়াংশ চলে যাচ্ছে সংবাদ প্রচার এবং বিজ্ঞাপনের জন্য।ফলে দর্শকদের জন্য বিনোদন বলতে আর বাকি থাকে কি?ফলশ্রুতিতে এদেশীয় দর্শক বিশেষ করে নারী দর্শক বিদেশী চ্যানেলের প্রতি ঝুকে পড়েছে।

চ্যানেল বৃদ্ধির সাথে সাথে অনুষ্ঠান তৈরির হিড়িক পড়ে গেছে।অনেক নবীন নির্মাতা সিনেমা নাটক তৈরিতে নেমে পড়ছে।অনেক সময় দেখা যাচ্ছে কারীগরি দক্ষতা না থাকার পরও অনায়াসে নাটক নির্মান করছেন এবং সেটা সম্প্রচার হচ্ছে। ফলে সেই নাটক বা সেই অনুষ্ঠানের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হচ্ছে না।মিরাক্কেলের অনুকরণে এদেশেও তৈরি হয়েছে অনুষ্ঠান কিন্তু তা মোটেই দর্শকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি।এমনকি দর্শক হাসানোর জন্য মিরাক্কেলের এক সময়ের বিজয়ী আবু হেনা রনির মত মানুষও অনুষ্ঠানকে জনপ্রিয় করতে পারেনি কৌশলগত অদক্ষতার কারণে।

চ্যানেল সংখ্যা বেশি হওয়ার কারণে দর্শক দ্বিধাদন্দে থাকে কোন চ্যানেল থেকে কোন চ্যানেল দেখবে কিন্তু তার পরও চ্যানেল গুলো যদি নিয়মতান্ত্রিক ভাবে সুন্দর সুন্দর পরিকল্পিত অনুষ্ঠান সম্প্রচার করতো তাহলে দর্শক তাদের পছন্দ মত অনুষ্ঠানগুলি দেখতো বলে আমি মনে করি।আমাদের দেশের নাট্য নির্মাতা,অনুষ্ঠান নির্মাতারা অনেক সময় বিদেশী চ্যানেল এবং অনুষ্ঠানের অনুকরণ করে থাকেন। অথচ আমাদের দেশে নবীন প্রবীন অগণিত লেখক কবি আছেন কখনো তারা তাদের কাছে নিত্য নতুন গল্প,আইডিয়া চায়নি কিংবা লেখক কবিদের লেখা নিয়ে যথাযথ মূল্যায়ন না করার ফলে লেখক কবি আইডিয়াবাজরাও হয়তো তাদের আইডিয়া তাদের লেখা শেয়ার করা থেকে বিরত থেকেছে।এর ফলে অনুষ্ঠানের মানও বাড়ছে না।এখন সময় এসেছে টিভি চ্যানেলগুলোকে দেশ এবং দেশীয় দর্শকের কথা বিবেচনা করে ভাল মানের অনুষ্ঠান নির্মানে ব্রতি হবে এবং বিজ্ঞাপনের পরিমাণও কমিয়ে আনতে হবে।একটি চ্যানেলে শুধু সিনেমা,শুধু নাটক,টকশো বা সংবাদ প্রচারই সব নয়।একটু চিন্তা করলে আরো নিত্য নতুন আইডিয়া নিয়ে ভিন্ন ধারার অনুষ্ঠান করেও দর্শকদের মন জয় করা সম্ভব বলে মনে করি।

টিভি চ্যানেল গুলো আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি তুলে ধরার মাধ্যমেও অনেক অভিনব কিছু প্রচার করতে পারে।আশা করবো অচিরেই চ্যানেল মালিক এবং নির্মাতারা এ বিষয়ে চিন্তা ভাবনা করে দর্শকদের আকর্ষণীয় কিছু উপহার দিবেন।

জাজাফী

২৭ নভেম্বর ২০১৭

ইমেইলঃ [email protected]

ওয়েবসাইটঃ www.zazafee.com