Home Blog Page 12

আলী রাজ ম্যাজিশিয়ান এবং তুখোড় বক্তা

যাদুকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য আমাদের দেশের যে কয়জন ম্যাজিশিয়ান কাজ করছেন তার মধ্যে আলীরাজ অন্যতম। আলী রাজ সম্পর্কে আমার তেমন কোন ধারণা ছিলো না।তিনি যে বড়মাপের যাদুশিল্পী এটাও আমার আগে জানা ছিলো না। এর প্রধান কারণ তিনি বাংলাদেশে খুব কম শো করেন। কিংবা যখন করতেন তখন ম্যাজিক বিষয়ে আমার তেমন আগ্রহ ছিলোনা বা খোজ খবরও নেওয়া হতো না। এটা একান্তই আমার ব্যর্থতা।কিন্তু যখন ম্যাজিক নিয়ে একটু আগ্রহী হয়ে উঠলাম তখন জানতে পারলাম আলী রাজ নামের এই ম্যাজিশিয়ানের কথা। অন্যদের মত ফেসবুকে নিজেকে প্রকাশ করেন না বলেই তাকে আমি দেরীতে চিনেছি।তার ম্যাজিক দেখেছি এবং মুগ্ধ হয়েছি। বিশ্বের বড় বড় ম্যাজিশিয়ানরা যেভাবে ম্যাজিক শো করে তার ধরন একই।ইচ্ছে ছিলো তাকে কাছ থেকে লক্ষ্য করবো।সেই ইচ্ছেটা অবশেষে পুরণ হলো।

সান্ধ্যকালিন এক সভায় ম্যাজিশিয়ান আলী রাজ বক্তব্য দিলেন।আমি তার বক্তব্য শুনে মুগ্ধ।তিনি অসম্ভব ভালো বক্তা এবং বেশ পরিশ্রমী ও কৌশলী।…..বিস্তারিত পরে লিখবো।

এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড

রাণী এলিজাবেথ একটি বই পড়ে ভীষণ মুগ্ধ হয়েছিলেন।তার পর সেই বইয়ের লেখককে তিনি আমন্ত্রন জানালেন রাজপ্রাসাদে।তার লেখা বইয়ের ভূয়সী প্রশংসা করলেন এবং আগ্রহ প্রকাশ করলেন তার লেখা বাকি সব বই তিনি পড়তে চান তিনি যেন সেগুলোর একটা করে কপি বাকিংহাম প্যালেসে পাঠিয়ে দেন। রাণীর কথা মত লেখক তার বাকি সব বই পাঠিয়ে দিলেন।বইগুলি হাতে নিয়ে রাণী তো থ!! কারণ বইগুলি ছিলো সব গণিতের। আর লেখক ছিলেন একজন বিখ্যাত গণিতবিদ। সেই তরুণ গণিতবিদের নাম চার্লস ডজসন।

নাম শুনে অনেকেই চিনতেই পারবে না। মনে করতে পারেন এটি কোন ছদ্মনাম। আসলে এটিই তার আসল নাম কিন্তু এই নামে তিনি কম পরিচিত। তার ছদ্মনামেই সবাই তাকে চেনে।তিনি বিশ্ব বিখ্যাত লেখক লুইস ক্যারল! লুইস ক্যারল নামটা বলতেই মনে পড়ে যে বইটির কথা সেটি হলো “এলিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড” এই বিখ্যাত শিশুতোষ বইটি নিয়ে হলিউডে নির্মিত হয়েছে সিনেমা। সিনেমায় একটি গুরুত্বপুর্ন ভূমিকায় অভিনয় করেছেন বিশ্ববিখ্যাত অভিনেতা জনিডেপ।


এলিস নামে এক প্রিটিন মেয়ের গল্প এটি।সে একবার এক রহস্যময় জগতে প্রবেশ করে নানা অদ্ভুত বিষয়ের মুখোমুখি হয়। এক পার্টিতে থাকা কালিন এলিস বাগানের দিকে একটি সুন্দর খরগোশ দেখতে পেয়ে সেদিকে এগিয়ে যায়।কিছুটা কাছে গিয়ে এলিস বিস্মিত হয় কেননা সেই খরগোশটি একটি কোট পরে আছে এবং তার হাতে ঘড়ি আছে! এলিস সেটি ধরতে গেলে খরগোশটি একটি গর্তে ঢুকে যায়। এলিস সেই গর্তের মুখের কাছে মুখ নিতেই হুড়মুড় করে গর্তে পড়ে যায়। এলিসের মনে হয় সে অতল গভীরে হারিয়ে যাচ্ছে। পড়তে পড়তে সে একটি ঘরের মধ্যে গিয়ে পড়ে।

শুরু হয় এলিসের সেই রহস্যময় জগতের গল্প। এলিস দেখতে পায় সেই ঘরের মধ্যে একটি টেবিল তার উপর বেশ কিছু জিনিষ রাখা। একটুকরো পনিরও আছে আর আছে বোতল ভর্তি পানীয়। সেখানে খাওয়ার কথাও বলা আছে।এলিস যখনই পনিরেরে টুকরা থেকে খানিকটা খায় অমনি সে অনেক বড় হয়ে যায়। ছাদে গিয়ে ঠেকে তার মাথা। খুব বিপদে পড়ে সে। আবার যখন আরেকটুকরা খায় অমনি সে অনেক ছোট হয়ে যায় ফলে সে টেবিলটার উপরে যা আছে তা দেখতে পায় না।


ওই ঘরে ছিলো ছোট্ট একটি দরজা। সেই দরজা দিয়ে বের হওয়ার মতই ছোট হয়ে গিয়েছিল এলিস।কিন্তু দরজা খোলার চাবি ছিলো টেবিলের উপর। এভাবেই টানটান উত্তেজনা আর বিস্ময় নিয়ে শুরু হয়েছে এলিস ইনওয়ান্ডারল্যান্ড সিনেমাটি। এটির সিকোয়েলও বের হয়েছে।
এবার আসি অন্য ঘটনায়। লুইস ক্যারল ১৮৬২ সালের জুলাইয়ে ছোট নৌকায় করে সঙ্গীদের নিয়ে ঘুরতে গিয়েছিলেন। অক্সফোর্ড থেকে গডস্টো পর্যন্ত ছিল সেই যাত্রা।


আর এই যাত্রা থেকে ১৮৬৫ সালে জন্ম নিয়েছিল অ্যালিসেস অ্যাডভেঞ্চার ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড উপন্যাসটি।সেই যাত্রায় ক্যারলের সাথে ছিল তাঁর বন্ধু পাদ্রী রবিনসন ডাকওয়ার্থ এবং ক্যারলের কাছের বন্ধু হ্যারি লিডেলের ছোট্ট তিন বোন এডিথ (৮), এলিস (১০) ও লরিনা (১৩)।
আর এই তিন বোনকে দেখেই অদ্ভুত এক খেয়ালি গল্প ফেঁদেছিলেন ক্যারল, যার মূল চরিত্র ছিল এলিস। কল্পনায় বিভিন্ন উদ্ভট চরিত্রের সাথে দেখা হয় এলিসের। আর এসব চরিত্র নিয়েই গড়ে ওঠে তার জগৎ।
আশা করি সিনেমাটি ছোটদের দারুণ পছন্দ হবে এবং ছোটদের পাশাপাশি বড়রাও খুব পছন্দ করবে।
–জাজাফী

২৮ জুন ২০১৯

নান্নি জায়সেলমির

শিশুতোষ চলচ্চিত্র নিয়ে আমার ভীষণ আগ্রহ। সেই আগ্রহ থেকেই আমি অসংখ্য শিশুতোষ চলচ্চিত্র দেখেছি এবং সংগ্রহ করেছি। গতকাল আমি চিলড্রেন্স মুভির একটি লিস্ট শেয়ার করেছিলাম। লিস্টে প্রথম যে নামটি ছিলো সেটি নান্নি জায়সেলমির। ১০ বছর বয়সী নান্নি নামের এক ছেলের গল্প বলা হয়েছে এই সিনেমায়। এই সিনেমা দেখা নিয়ে আমার একটা দারুন অভিজ্ঞতা আছে। আমি সকালে উঠে ক্লাসে যাবো বলে রেডি হয়েছি সেই সময় টিভি চালু করতেই দেখি এই সিনেমাটি হচ্ছে। বের হওয়ার আগে বিশ মিনিট মত দেখলাম। এতো মুগ্ধ হলাম যে সেদিন ক্লাস টেষ্ট ছিলো তাও না গিয়ে বাসায় থেকে গেলোম।

সিনেমাটি মূলত রাজস্থানে বসবাসরত দশ বছর বয়সী নান্নিকে নিয়ে।নান্নি আর ওর বড় বোন সহ ওর মা থাকে রাজস্থানের জায়সেলমিরে।নান্নির আয় দিয়েই মুলত সংসার চলে। ওদের একটা উট আছে।রাজস্থানে বিদেশী পযর্টকদের ও সাফারি করায়। পাশাপাশি ভ্রমন গাইড হিসেবেও সে চমৎকার। একই সাথে বেশ কয়েকটি ভাষায় ওর দক্ষতা আছে।মূলত বিভিন্ন দেশ থেকে আগত পযর্টকদের কাছ থেকেও ও নানা ভাষায় পারদর্শীতা অর্জন করে।স্কুলে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। ওর একটাই নেশা সেটা হলো ববি দেওলের সিনেমা দেখা ববিদেওলের যে কোন সংবাদ সে লুফে নেয়।ও যখন খুব ছোট ছিলো তখন একবার ববি দেওল শ্যুটিং করতে এসে ওকে কোলে নিয়েছিলো একটি সীনের প্রয়োজনে।একটু বড় হয়ে ও সেই ঘটনাটা শোনার পর থেকেই ববিদেওলকে নিজের বন্ধু বলে মনে করতো।

একবার ও জানতে পারলো ববিদেওল আসবে শ্যুটিং করতে রাজস্থানে! ও সে কী আনন্দ। এর মাঝে মরুভূমিতে ও উট নিয়ে একাকী বাসায় যাচ্ছিল। হঠাৎ দেখলো একটা জীপ বালুতে আটকে গেছে।ড্রাইভার বললো তোমার উটকে দিয়ে হেল্প করবা? ও রাজি হলো।এক টানে গাড়িটাকে তুলে দিলো। লোকটা বললো তোমার উটতো দারুন! নান্নি তখন ফিরে যেতে যেতে বললো “মনে হচ্ছে তুমি এই এলাকায় নতুন এসেছ তাই রাজা জায়সেলমিরের নাম শোনোনি। রাজা জায়সিলমির হলো নান্নির উটের নাম। লোকটা তখন বললো তোমার নাম কি? ও তখন বললো নান্নি! নান্নি জায়সেলমির। ও যখন উটের কাছে গেলো তখন গাড়ি থেকে নেমে আসলো ববিদেওল।

নান্নিকে ডাক দিলেন! নান্নি ফিরে তাকিয়ে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলো।কাছে গিয়ে হাত ছুয়ে দেখলো আর উটকে বললো একটা ঢিসা দিতে। ওকে উট গুতো মেরে ফেলে দিলে ববিদেওল জানতে চাইলেন এটা কি হলো? ছোট্ট নান্নি বললো টেষ্ট করে দেখলাম আমি স্বপ্ন দেখছি না তো!! ববিদেওল বললো না স্বপ্ন নয় তুমি সত্যিই দেখছো। নান্নি তখন অভিমান করে বললো দোস্ত তোমাকে কত্ত চিঠি দিলাম তুমি একটারও উত্তর দিলে না।তখন ববিদেওল নিজের পকেট থেকে শেষ চিঠিটা বের করে বললেন তোমার সব চিঠি পেয়েছি কিন্তু উত্তর দেবো কি করে তোমার ঠিকানাতো লিখে দাওনি!!

অসাধারণ এক গল্প এটি। নান্নির সাথে ববিদেওলের দেখা হলো আড্ডা হলো।নান্নির বড় বোনের বিয়ে ঠিক হলে ববিদেওলকে দাওয়াত দেওয়া হলে সে জানালো অবশ্যই আসবো। কিন্তু বিয়ের দিন আসলো না।সবাই নান্নিকে বললো তুমি যা ভেবেছ সব ছিলো তোমার কল্পনা। ববিদেওল সেই ছোটবেলায় তোমাকে কোলে নিয়েছিল তার পর কোনদিন তার সাথে তোমার দেখা হয়নি। নান্নির মনখারাপ হয়ে গেলো।কিন্তু কল্পনা বা যেভাবেই হোক নান্নি যে ববিদেওলের সাথে আড্ডা দিয়েছিল তখন ববিদেওল তাকে অসাধারণ সব জ্ঞানের কথা বলেছিল যা ওকে অনুপ্রাণিত করেছিল।সেই সব কথাই ও স্মরণ করতে লাগলো। তার পর?……

এক সন্ধ্যায় বিরাট এক হলরুমে একটি বইয়ের লেখককে বুকার পুরস্কারে ভূষিত করা হবে।সেই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে আসলেন সত্যিকারের ববি দেওল।পুরস্কার প্রদানের পর লেখককে ববিদেওল বললেন কি অসাধারণ কাহিনী একদম হৃদয় ছুয়ে যাওয়া। ববিদেওলকে ধন্যবাদ জানিয়ে লেখক যখন চলে যাবে তখন ববিদেওল পিছন থেকে ডাক দিলেন নান্নি!! এটা শুনে লেখক থমকে দাড়ালেন তার চোখ ছলছল করছে।তিনি ফিরে এলে ববিদেওল তাকে জড়িয়ে ধরলেন এবং বললেন নান্নি এটা স্বপ্ন নয় সত্যি। তোমার চিঠি আমি পেয়েছি।আমন্ত্রনের চিঠি এখনো আমার হাতেই আছে।

মরুভূমিতে উটের জকি সেই ছোট্ট ছেলেটিই বুকার পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে!

আমার যতটুকু মনে হয়েছে সিনেমাটি ছোটদের দেখা উচিত। বাবা মায়েরও দেখা উচিত। সিনেমাটিকে আমি ১০/১০ নম্বর দিতে একবারও ভাবছি না।

তবুও মনে থাকবে

পাহাড়ের ঢাল বরাবর শহর থেকে একটি রাস্তা উত্তর দিকে চলে গেছে।দুই পাশে সবুজ চা বাগান চোখ জুড়িয়ে দেয়।এই পথ দিয়েই বিমানবন্দরে যেতে হয়।মালনিছড়া চা বাগান পেরোতেই হাতের ডান পাশে এক দেয়াল ঘেরা সবুজ চত্ত্বর।সেই চত্বরে প্রবেশের প্রধান ফটকের বুকে শোভা পাচ্ছে একটি লোগো আর উপরে লেখা চত্বরের নাম।এখানে যারা থাকে তাদেরকে আলোকের অভিসারী বলা হয়।সারা দেশে এমন বারটা সবুজ চত্বর আছে।চত্বরের অধিবাসীরা ওটাকে খাকি চত্বর বলতেই বেশি ভালোবাসে।২০১৮ সালের শেষ দিকে চা বাগানের শোভায় রাঙা আলোকের অভিসারীদের সেই চত্বরে বসেছিল ICCLMM। ইন্টার ক্যাডেট কলেজ লিটেরারি এন্ড মিউজিক মিট।অন্যান্য কলেজের ক্যাডেটরা এসেছিল নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমান করতে।দেখতে দেখতে পুরো আয়োজন শেষ হয়ে গেলো।বিজয়ী হলো আলোকের অভিসারীরাই।

ক্যাডেটরা সবাই সবার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছে।এই আয়োজনে এসে বরিশাল ক্যাডেট কলেজের সৌরভের অনেক কিছুই ভালো লেগেছে তার মধ্যে সব থেকে বেশি ভালো লেগেছে এক জয়পুরিয়ানকে! জয়পুরহাট ক্যাডেট কলেজের সেজুতিকে তার মনে ধরেছে।মাঝে বেশ কবার কথাও হয়েছে দুজনের মধ্যে।সৌরভ ঠিক বুঝে উঠতে পারেনি সেজুতি তার প্রতি ঠিক তারই মত আকৃষ্ট কি না।বিদায়ের আগে সৌরভ সেজুতির সামনে গিয়ে দাড়ালো। সেজুতি বুঝলো সৌরভ কিছু একটা বলতে চায় তাকে।সে আমতা আমতা করছিল দ্বিধান্বিত ছিলো।সেজুতিই তাকে সাহস জুগিয়ে বললো কিছু বলবি?এবার সাহস পেয়ে সৌরভ বললো তোর অ্যাপুলেট আর নেমপ্লেটটা আমাকে দিবি?

এ কথা শুনে সেজুতি জানতে চাইলো আমার অ্যাপুলেট আর নেমপ্লেট নিয়ে তুই কি করবি? সৌরভ বললো না মানে ওগুলো আমার কাছে থাকলে তোর কথা মনে পড়বে।সেজুতি হাসলো।বুঝলো সৌরভ ওর প্রেমে পড়ে গেছে। কিন্তু ওরতো কিছু করার নেই ও যে আগেই অন্য কারো প্রেমে ডুবে আছে।সেজুতি ওকে বললো না দিলে আমার কথা তোর আরো বেশি বেশি মনে পড়বে। সৌরভ বুঝতে না পেরে জানতে চাইলো সেটা কিরকম? সেজুতি মিষ্টি করে একটা বাকা হাসি দিয়ে বললো তখন তোর বার বার মনে পড়বে সেজুতির কাছে ওর অ্যাপুলেট আর নেমপ্লেট চেয়েছিলাম দিলো না!!

সেজুতি যখন কলেজ গেট দিয়ে বের হলো সৌরভও পিছু পিছু বের হলো। তার পর ওর সামনে গিয়ে বললো সেজুতি I Love You!! তুমি সব থেকে সুন্দরী ক্যাডেট! এ কথা শুনে সেজুতি খুব খুশি হলো তবে সে সেটা বুঝতে না দিয়ে বললো কিন্তু আমার চেয়েও সুন্দরী ক্যাডেটতো তোর পিছনেই দাড়িয়ে আছে! সৌরভ ওকে তুই থেকে তুমি করে সম্মোধন করলেও ও সেটা করলো না। সেজুতি যখন বললো তার চেয়েও সুন্দরী ক্যাডেট পিছনে দাড়িয়ে আছে তখন সৌরভ পিছন ফিরে তাকালো। না সেখানে কেউ ছিলো না।সে সেজুতির দিকে তাকিয়ে বললো কই কেউতো নেই! সুযোগ পেয়ে সেজুতি বললো সৌরভ তুই যদি সত্যিই আমাকে ভালোবাসতি তাহলে আমার চেয়েও সুন্দরীর কথা শুনে পিছন ফিরে তাকাতি না। I Cant Love you এটুকু বলে হাটতে শুর করলো। এবার সৌরভ আর সামনে গিয়ে দাড়ালো না।সেজুতিকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললো তোকে দেবো বলে বন্ধুর মাধ্যমে একটা স্বর্ণের আংটি এনেছিলাম তোকে আর দেওয়া হলো না!

স্বর্ণের আংটির কথা শুনে সেজুতি ফিরে আসলো। বললো জানপাখি একটু কি দুষ্টুমীও করা যাবে না? আমিতো দুষ্টুমী করেছি তোমার সাথে।সেজুতি যেন মোমের মত গলে গেলো।সে সৌরভের সামনে গিয়ে দাড়ালো। ওর হাত থেকে আংটিটা নিয়ে মধ্যমাতে পরে নিলো। তার পর চারদিকে তাকিয়ে যখন দেখলো ওদেরকে কেউ খুব একটা দেখছেনা তখন সে সৌরভকে একটা উষ্ণ আলিঙন দিলো এবং মুখে আলতো করে একটা চুমু দিলো।তার পর খুশি মনে ফিরে গেলো বাসে।

কলেজ বাস ছাড়তে তখনো খানিকটা দেরি। সৌরভ দাড়িয়ে আছে একাকী।কিছুক্ষণ আগের সব কথা ভাবছে। ওদিকে সেজুতি হাতে আংটি নিয়ে বাসে গিয়ে উঠলো। ক্লাসমেটদের দেখালো।এর কিছুক্ষন পরই সেজুতিকে দেখা গেলো হনহন করে হাটতে হাটতে সৌরভের সামনে এসে দাড়ালো। তার পর বললো সৌরভ এটাতো স্বর্ণের আংটি না! তোমার বন্ধুতো তোমাকে ঠকিয়েছে!! সৌরভ বললো তুমি যদি সত্যিই আমাকে ভালোবাসতে তবে এটা স্বর্ণ কি না তা যাচাই করে দেখতে না। সুতরাং I cant Love You!!

কিছুক্ষণ নিরবতার পর কেউ কোন কথা না বলে নিজ নিজ বাসে গিয়ে বসলো।দুজনই জানালার বাইরে অনন্ত আকাশের দিকে তাকিয়ে দুজনকে মনে করতে থাকলো।বুঝলো ভালোবাসা হোক বা না হোক তবুও মনে থাকবে।
১০ জুন ২০১৯
তবুও মনে থাকবে
জাজাফী
#ICCLMM
#SCC

ভ্যাকেশানে গেমস প্রস্তুতি

আন্তঃহাউজ গেমস কম্পিটিশান ঘিরে তিন হাউজে সাজসাজ রব পড়ে গেছে।জুনিয়রদের দিকে সিনিয়রেরা একটু বেশিই মনোযোগী। ওদের পারফরমেন্সের উপর হাউজের চ্যাম্পিয়ন হওয়া না হওয়া অনেকটাই নির্ভর করছে।কিন্তু সমস্যা হলো গেমস কম্পিটিশানের ঠিক আগে আগেই রমজানের ভ্যাকেশান শুরু হয়ে যাওয়ায় প্রস্তুতির কিছুটা ঘাটতি পড়ে যাবে।হাউস গেমস প্রিফেক্ট ইশতিয়াক ভাই আমাদেরকে ডেকে পাঠালেন।ক্লাস সেভেন সারিবদ্ধ ভাবে দাড়ানো। সামনে ইশতিয়াক ভাই।এই দীর্ঘ ভ্যাকেশানে কিভাবে কি করতে হবে তা বুঝিয়ে বলছেন।বিশেষ করে আন্তঃহাউজ গেমস কম্পিটিশানে হাউজকে চ্যাম্পিয়ন করতে হলে বাড়িতে গিয়েও যে ভালো ভাবে নিয়মিত প্রস্তুতি নিতে হবে তা তিনি গুরুত্ব দিয়ে বললেন।

আমাদের ক্লাসের এ ফর্মের নাবিল একটু শেয়ানা টাইপের।সে বললো জ্বি ভাই বাড়িতে গিয়ে ভ্যাকেশানেও গেমস চর্চা করবো।সব ট্যাকটিসও ভালো করে শিখে নেবো।ইশতিয়াক ভাই খুব খুশি হলেন। তিনি আমাদেরকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললেন নাবিলের মত সবাই কিন্তু প্রস্তুতি নিবে।এবার তিনি এহতেশামকে ইশারা করে বললেন এহতেশাম তুমি কি কি প্র্যাকটিস করবা? এহতেশাম বললো ভাই রোজ ক্রিকেট ফুটবল টেনিস খেলবো।ইশতিয়াক ভাই জানতে চাইলেন রোজ কত ঘন্টা খেলবা? এহতেশাম সবাইকে অবাক করে দিয়ে বললো ভাই যতক্ষণ আম্মুর মোবাইলের চার্জ শেষ না হবে ততোক্ষণ খেলবো।কিছুক্ষণ পর দেখা গেলো হাউজ করিডোর ধরে একের পর এক ফ্রন্টরোল দিতে দিতে এক কোণা থেকে অন্য কোণায় যাচ্ছে এহতেশাম।ওর ভ্যাকেশানে গেমস প্রস্তুতি বুঝি তখন থেকেই শুরু হয়ে গেছে।

১০ জুন ২০১৯
ভ্যাকেশানে গেমস প্রস্তুতি
জাজাফী

স্মৃতিগুলো ভেসে ওঠে নিরব অশ্রুপাত

দেখতে দেখতে ছয়টা বছর পেরিয়ে গেলো।মাত্র কয়েক ঘন্টার ব্যবধানে নামের আগে এক্স শব্দটি জুড়ে দেওয়া হবে।কম বেশি সবার মনটাই বিষন্ন।ক্যাডেট থেকে এক্স ক্যাডেট হওয়ার ক্ষণিক বেদনা সবাইকে বিমর্ষ করে রেখেছে।কলেজ ক্যান্টিনের দিকে হাটছে আরেফিন।।মনের মধ্যে উথালপাতাল ভাবনা।বাংলা সিনেমার দৃশ্য চোখে ভাসছে!নায়ক দুঃখের সময় লাল পানি খেয়ে দুঃখ ভুলে থাকতে চেষ্টা করে।ক্যাডেট থেকে এক্স ক্যাডেট হওয়াটাওতো দুঃখ। কিন্তু এই দুঃখের দুটি ভিন্ন রং।নতুন কিছুর হাতছানি আছে সামনে সেটাও একরকম আনন্দের।তার পরও ক্ষণিকের দুঃখ ভুলে থাকার জন্য কিছু একটা করা দরকার। বাংলা সিনেমার নায়কের মত না হোক কোকাকোলাতো খাওয়া যাবে এই ভাবনা থেকেই ক্যান্টিনের দিকে যাওয়া।

Image result for rangpur cadet college
রংপুর ক্যাডেট কলেজ

হাউস থেকে বেরিয়ে গুটিগুটি পায়ে হাটতে থাকে আরেফিন।পা যেন আর চলতেই চায় না।আশেপাশে কাউকে দেখা যাচ্ছে না।নিশ্চই দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে সবাই কিছু না কিছুতে ব্যস্ত।চলে যাবার তাড়া আছে সবার মধ্যে।হতে পারে কেউ কেউ আগেই ক্যান্টিনে গিয়ে বসেছে।আরেফিন ক্যান্টিনে ঢুকে চারদিকে তাকিয়ে দেখলো কোথাও কেউ নেই।সবাই যেন ভোজবাজির মত উধাও হয়ে গেছে।কি আর করা একটা কোক খেয়ে কিছুটা শান্ত হতে হবে ভেবে সে যখন একটু এগিয়েছে তখন দেখতে পেলে টেবিলের উপর কাচের বোতলে একবোতল কোক।ক্যাপ খোলা।তার মানে কেউ খেতে বসেছিল কোন কারণে উঠে গেছে।আরেফিন ভাবলো তাহলে আর কুপন খরচ করে লাভ কি! ফ্রিতে যখন পাইলাম এই ভেবে সে বোতলটা হাতে তুলে নিলো।

বোতলের গায়ে একটা কাগজে সর্তক বার্তা লেখা।এই কোক কেউ খাবি না এটাতে আমি থুথু দিয়ে রেখেছি।নিচে সৈকতের নাম লেখা।মনে মনে সৈকতকে গালি দিয়ে বললো শালা বাটপার থুথু দিয়ে রেখে গেছে। আজ তোর একদিন কি আমার একদিন। সে পকেট থেকে কলম বের করে নিচে লিখে দিলো “ যেহেতু এই কোকে থুথু দেওয়া এবং আমি খেতে পারছি না তাই আমিও থুথু দিয়ে গেলাম” নিচে নিজের নাম লিখে দিলো আরেফিন।এর পর একটু দূরে একটা টেবিলে সে একটা কোক নিয়ে খেতে থাকলো।সৈকত ফিরে আসলো কিছুক্ষণের মধ্যেই।ও আসলে ওয়াশরুমে গিয়েছিল।রেখে যাওয়া কোক বহাল তবিয়তে আছে দেখে সে স্বস্তি পেলো।

সৈকত কোকের বোতলটা নিয়ে যখন খেতে যাবে তখন দেখতে পেলো নিজের লেখার নিচে আরো কিছু লেখা। সে ভালো করে পড়ে দেখে তার আক্কেল গুড়ুম! একটু দূরেই আরেফিন সব দেখে মিটমিট করে হাসছিলো।এক্স ক্যাডেট হওয়ার দুঃখের দিনেও খানিকটা আনন্দ হচ্ছে।আরেফিন যেহেতু নাম লিখে রেখেছিল তাই ক্যান্টিনে আরেফিনকে দেখে সৈকত এগিয়ে গেলো।কোকের বোতল সেখানেই পড়ে থাকলো।সৈকত ওর কাছে গিয়ে বললো শালা তুই এইডা কি করলি? আমিতো এমনি এমনি ওখানে লিখছিলাম ওটাতে থুথু আছে যেন কেউ না খায় আর তুই শালা সত্যি সত্যিই থুথু দিলি?

সৈকতের কথা শুনে আরেফিন থ! বলেকি এই ছেলে। থুথু না দিয়েই থুথু দিয়েছি লিখে রেখেছে! আর সেটা দেখেই কিনা সে নিজের কুপন খরচ করে কোক কিনেছে! আরেফিন বললো আরে কি বলিস তুই? আমি থুথু দেবো কেন? আমিতো এমনিতেই থুথু দিয়েছি লিখে রেখেছি তোর লেখা দেখে।সৈকত স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে কোক খাবে বলে ফিরে আসলো।এসে দেখতে পেলো কোকের বোতল ফাঁকা পড়ে আছে।বোতলের গায়ে লাগানো কাগজটাও নেই।পাশে জাফর দাড়িয়ে আছে! সৈকত জাফরকে বললো শালা আন্ধা নাকি তুই? কোন কিছু না দেখেই পুরো কোক টুকু শাবাড় করে দিলি?এই কাগজটাতে কি লেখা দেখিসনি?

জাফর কোকের স্বাদ নিয়ে আয়েশ করে বসলো। তার পর বললো দেখেছি বলেইতো আরো বেশি আগ্রহ নিয়ে খেয়েছি।তোদের সামান্য থুথু দেওয়া কোকই যদি না খেতে পারি তবে কিসের বন্ধুত্ব হলো?ওখানে থুথু না দিয়ে বিষ দিলেও খেয়ে ফেলতাম। বন্ধুদের দেওয়া বিষওতো অমূল্য। জাফরের এমন কথা শুনে সৈকতের চোখটা ছলছল করে উঠলো।সে জাফরকে জড়িয়ে ধরলো।অন্য টেবিলে বসে থাকা আরেফিনও ছুটে আসলো।তিন বন্ধু একে অন্যকে জড়িয়ে কাঁদতে লাগলো।ক্যান্টিন বয়রা আরো একবার দেখলো বন্ধুত্বের শক্তি।ক্যান্টিনের দেয়ালে দেয়ালে ধ্বনিত হলো ক্যাডেট লাইফের মর্মবাণী।

দূর থেকে কারো একজনের কন্ঠস্বর ভেসে আসলো।চোখ তুলে তাকাতেই দেখতে পেলো দরজা দিয়ে ঢুকছে সিফাত।

মূখে করুণ সুরে গাইছে জাজাফীর সদ্য লেখা গানের লাইন লাইন

“স্টিশানে থামলো গাড়ি এবার যেতে হবে
ছয় বছরের প্রেম তবুও হৃদয় মাঝে রবে।
ফিরবে না আর একজীবনে খাকি পরার দিন
যে খাকিতে জমে গেছে ভালোবাসার ঋণ।
ছয় দাগের ওই অ্যাপুলেটে রাখি যখন হাত
স্মৃতিগুলো ভেসে ওঠে নিরব অশ্রুপাত”।

১৮ মে ২০১৯
নিরব অশ্রুপাত
জাজাফী

আরও পড়ুনঃ তিন শহরের টানে

ভিক্টর ভিটকো ম্যাজিকে যিনি বুদ হয়ে আছেন

ম্যাজিক কথাটির মধ্যেই একরকম ম্যাজিক রয়েছে।রুপকথার গল্পের মত একজন ম্যাজিশিয়ান ভোজবাজির মত উধাও হয়ে যেতে পারে আবার অদৃশ্য থেকে কিছু আনতেও পারে।কিন্তু ম্যাজিক আসলে কি? ম্যাজিক এর বাংলা প্রতিশব্দ যাদু হলেও এটি কিন্তু তথাকথিত যাদুবিদ্যা নয় এবং ম্যাজিশিয়ান মানে যাদুকর হলেও এই যাদুকর রুপকথার যাদুকরের মত নয়।ম্যাজিক হলো কিছু কৌশল যা বিজ্ঞানের একটি ধারার মধ্যে অর্ন্তভুক্ত।কোন কিছু নতুন করে আবিস্কার করার নামই বিজ্ঞান।ম্যাজিকও তেমনই নতুন কিছু দেখানো।মানুষ মাত্রই স্মৃতিরোমন্থন করতে ভালোবাসে।

অতীতকে বর্তমানে টেনে এনে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তাই মানুষের সামনে ভেসে ওঠে এমন সব ঘটনা যা আজীবন আনন্দ হয়ে ঘিরে থাকে।আর সেটা যদি হয় আবিস্কারকের কাছে তাহলেতো কথাই নেই।আবিস্কারক কোন একটি আবিস্কার করে যতটানা আনন্দ পায় তার চেয়ে বেশি আনন্দ হয় যখন তিনি দেখেন তার আবিস্কৃত কোন বিষয় নিয়ে কেউ কাজ করছে,কেউ সেটা ব্যবহার করছে।আলেক্সান্ডার গ্রাহামবেল টেলিফোন আবিস্কার করে যতটা আনন্দ পেয়েছিলেন তার চেয়ে ঢের বেশি আনন্দিত হয়েছিলেন টেলিফোনে অন্যদেরকে কথা বলতে দেখে।ম্যাজিকের ক্ষেত্রেও রয়েছে আবিস্কারক এবং আবিস্কারকেরও রয়েছে অনেক গল্প।

আজ আমরা বলবো ভিক্টর ভিটকোর কথা।অনেকের কাছেই নামটি অচেনা মনে হবে কিন্তু যারা ম্যাজিক নিয়ে কাজ করেন কিংবা ম্যাজিকের খোঁজ খবর রাখেন তারা নামটি নিশ্চই জানেন।তিনি অসংখ্য ম্যাজিক আবিস্কার করেছেন কিন্তু তার আবিস্কৃত সব থেকে বিখ্যাত ম্যাজিক হলো ফ্লাইং লিংকিং রিং ম্যাজিক।১৯৯৪ সালে জাপানের ইয়োকোহামাতে FISM আয়োজিত জেনারেল ম্যাজিক ফেস্টিভ্যালে তিনি ফ্লাইং লিংকিং রিং প্রদর্শন করেন এবং দর্শকনন্দিত হয়ে দ্বিতীয় পুরস্কার লাভ করেন।তার পর ক্রমাগত ভাবে সেটি জনপ্রিয়তা পেতে থাকে কিন্তু অনেকেই এর রহস্য ভেদ করতে পারে না।ভিক্টর ভিটকো রাতারাতি বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়ত অর্জন করতে থাকেন।

স্বাধীন বাংলাদেশেও ম্যাজিক হয়,ম্যাজিশিয়ানও আছেন অনেকে।কেউ কেউ আর্ন্তজাতিক খ্যাতি সম্পন্ন।আমাদের এই দেশটাকে বিশ্বের অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ চিনতে শুরু করেছে।ভিক্টর ভিটকোর মত ম্যাজিশিয়ান আগে কখনো এই দেশের নাম শুনেছে কিনা জানিনা তবে এবার তারই আবিস্কৃত ম্যাজিকের কল্যাণে তিনি এই দেশ সম্পর্কে জানতে পারলেন।স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি ফিরে গেলেন ১৯৯৪ সালে ইয়োকোহামাতে তুমুল করতালি ঘেরা সেই সময়ে।

ইউটিউবে তিনি একটি ভিডিও দেখে মুগ্ধ হলেন।তিনি দেখতে পেলেন বাংলাদেশের এক ম্যাজিশিয়ান তার আবিস্কৃত  ফ্লাইং লিংকিং রিং ম্যাজিক দারুন ভাবে প্রদর্শন করছেন।ম্যাজিশিয়ানের নাম প্রিন্স হারুন।এর আগে প্রিন্স হারুন যে সব শো করেছেন তা এই প্রদর্শনীর তুলনায় সামান্যই বলতে হবে।তা না হলে ভিক্টর ভিটকোর মত ম্যাজিশিয়ান মুগ্ধতা প্রকাশ করে ফেসবুকে এটা নিয়ে লিখতেন না।ভিক্টর লিখলেন সত্যিই আমাকে তুমি ফিরিয়ে নিয়ে গেলে ১৯৯৪ সালের ইয়োকোহামাতে।বাংলাদেশে ফ্লাইং লিংকিং রিং ম্যাজিকটি প্রদর্শনের ক্ষেত্রে প্রিন্স হারুন অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।ভিক্টর ভিটকো এটির আবিস্কারক হিসেবে প্রিন্স হারুনের ভূয়সী প্রশংসাও করেছেন।

আবিস্কারকের কাছ থেকে যখন বাহবা পাওয়া হয় তখন সেই বিষয়ে কাজ করার সার্থকতা পাওয়া যায়।ম্যাজিশিয়ান প্রিন্সহারুনের ক্ষেত্রেও কথাটি প্রোযোজ্য।যারা ম্যাজিকটি দেখে নানা বিধ মন্তব্য করেছেন তাদের সেই মন্তব্যের চেয়ে তাই ভিক্টরের মন্তব্য ম্যাজিশিয়ানের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে ধরা দেয়।আবিস্কারকের অনুপ্রেরণামুলক মন্তব্য পেয়ে ম্যাজিশিয়ান তাই তার কাজকে আরো সুনিপুনভাবে ফুটিয়ে তুলতে আপ্রান চেষ্টা করছেন।যদিও তিনি জানেন নিখুত বলে কিছু হয়না,কোথাও না কোথাও খুৎ থেকেই যায়।তার পরও ম্যাজিশিয়ান প্রিন্স হারুনের চেষ্টা নিরন্তর।ফ্লাইং লিংকিং রিং ম্যাজিকটি তাকে স্বমহিমায় উদ্ভাসিত করেছে।

জাজাফী

জিনিয়াস

লেখকঃ নুসরাত জাহান মুনিরা

বিকেলটা খুব সুন্দর ছিলো।ফুরফুরে হিমেল হাওয়ায় খোলা চুল উড়ছিলো।আম্মু বলার পরও সেদিন আমি দুই বেণী করিনি।কেউ কেউ আছে যারা চুলে দুটো বেণী দেখলে পাগল হয়ে যায়।এমনই একজনকে আমি দেখেছি ভার্সুয়াল জগতে।যে ক্ষণে ক্ষণে হাসে,হাসায় কিন্কু কখনো কাউকে কাদায় না।বিকালে মেসেঞ্জারের লিস্ট দেখতে যেয়ে জাজাফী নামে একটি আইডি দেখে এড দিয়েছিলাম।ছবিতে যে বাচ্চাটিকে দেখেছি খুব মায়াবি চেহারা।মুখে সুন্দর করে যে আল্পনাটি আকা তা আমাদের হৃদয়ের কথা বলে।ওখানে লেখা অমর একুশে।এক জীবনে এর চেয়ে মিষ্টি আর কি কথা থাকতে পারে।কিন্তু ওর চুলগুলো,ওর চেহারা কোন কিছুর সাথেই অমর একুশে কথাটি মেলে না।ওকে দেখলেতো কোন ভাবেই মনে হয়না ও বাঙ্গালী।আমার বান্ধবী আনুশকা বললো এমনওতো হতে পারে ওই দেশে যখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয় তখন সে অন্যদের দেখাদেখি অমর একুশে লিখেছে।

আমারও তাই মনে হলো।কিন্তু কোন ভাবেই কথা হচ্ছিলো না।কয়েকদিন পর তার সাথে আমার কথা হলো।এই ছেলেটিকে আমার খুব জিনিয়াস মনে হলো।তার কথা বলা,তার চিন্তা চেতনা সবই জিনিয়াসদের মত।কিন্তু সে নিজে মানতেই চায় না যে সে অনেক জিনিয়াস।চৈমনি নামে একটি রাজ্য আছে।সে হলো সেই রাজ্যের রাজপুত্র।আমাকে সে নিজে বলেছে এটা।আমি অবাক হইনি।তবে আমি ওয়ার্ল্ড ম্যাপ খুজে কোথাও চৈমনি রাজ্যের অস্তিত্ব পাইনি।এটা যখন তাকে বললাম তখন সে হেসে দিয়ে বললো তুমি কি করে চৈমনি রাজ্যের কথা জানবে সেটাতো পাতালপুরীতে।পাতালপুরী কথাটা আমার জানা আছে।সাগরের নিচে থাকে রুপকথার গল্পে পড়েছি।আমি বললাম আচ্ছা জাজাফী তুমিকি তবে রুপকথার গল্পের রাজপুত্র?সে মাথা নেড়ে বললো হ্যা আমি রুপকথার রাজপুত্র তবে আমাকে ছুয়ে দেখা যায় কিন্তু রুপকথার রাজপুত্রদের ছুয়ে দেখা যায় না।

ম্যানহাটনের এক নিরিবিলি রাস্তায় হাটছিলো এক নারী।তার কালো চুল বাতাসে উড়ছিলো।সে পথ চিনছিলো না এমন সময় এক ছেলে তার পাশে পাশে হাটতে শুরু করলো আর জানতে চাইলো তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি দূর বিদেশ থেকে এখানে এসেছ এবং কিছু চিনতে পারছো না। তুমি চাইলে আমি তোমাকে হেল্প করতে পারি।মেয়েটি জানালো আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোতে ইকোনমিক্স এর উপর পোষ্ট ডক্টরাল করতে।ছেলেটি জানালো সেও একই বিশ্ববিদ্যালয়ে পলিমার সায়েন্স নিয়ে পিএইচডি করছে।তার পর শুরু হলো গল্প আড্ডা জানাশোনা এবং একদিন সেই ঘরে আলোর রোশনাই হয়ে আবির্ভাব হলো এক রাজপুত্রর যে নিজেকে চৈমনি রাজ্যের রাজপুত্র বলে।

আমি শুনে অবাক হলাম।তুমি আমেরিকান!অথচ কি সুন্দর বাংলায় কথা বলো।ধুর বিশ্বাসই হয় না। তুমি নিশ্চই ঢপ মারছো।সে হাসে আর হাসে।তার হাসিটাও সুন্দর।আমি বলি পিচ্চি এতো হাসো কেন? সত্যিটা বলো।তখন জানা গেলো সে যখন গ্রেড ফোরে পড়ে তখন বাংলাদেশ সম্পর্কে জানতে পারে,একুশে ফেব্রুয়ারি সম্পর্কে জানতে পারে তার পর মাকে বলে বাংলাদেশে ঘুরতে আসে।এই দেশের আলো বাতাস তাকে মায়াডোরে বেধে ফেলে তাই সে আর যেতে পারে না।যদি সত্যি সত্যিই জাজাফী আবার কোন দিন চৈমনি রাজ্যে ফিরে যায় তবে আমরা জানিনা আর কখনো রাজপুত্রটিকে দেখবো কিনা।চৈমনি রাজ্যের রাজপুত্রকে আমরা এখানেই রেখে দিতে চাই যদি সে থাকে তবে আকাশ থেকে তারার মত ফুলঝুরি নামবে তাকে স্বাগত জানাতে।

আমি যখন এসব কথা তাকে লিখছি সে তখন চুপটি করে পড়ছে।জিনিয়াসরা বুঝি না পড়ে থাকতে পারে? এটা বলতেই তার পড়াশোনা স্টপ। সে বললো সে জিনিয়াস না কিন্তু আমরাতো তা বিশ্বাস করি না।আমি অবশেষে ফেসবুকের মেসেঞ্জারে তার নিকনেম সেট করলাম জাজাফী জিনিয়াস।

তিন শহরের টান


ক্লাসে মন বসছিলো না।শেষে দুপুরের আগেই বাসায় ফিরে এলাম।গত বছর ৯ মার্চের কথা।আমাদের বাসা মহম্মদপুরের নুরজাহান রোডে।বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফিরে সাধারণত বিকেল থেকে সন্ধ্যা পযর্ন্ত বন্ধুরা মিলে টোকিও স্কয়ারের ওদিকটাতে আড্ডা দেই।সেদিন কিছুই ভালো লাগছিলো না।ক্লাস শেষ না করে বাসায় ফিরে এলাম।খানিকটা ঘুমিয়ে যখন উঠলাম তখন মোবাইলে অনেক গুলো মিসড কল দেখতে পেলাম।বন্ধুরা ফোন দিয়েছিল।কি মনে করে ওদেরকে আর ব্যাক করলাম না।চোখে মুখে পানির ছিটা দিয়ে কম্পিউটারের সামনে বসলাম।মেইল ওপেন করতেই চোখে পড়লো I will lift up my eyes। কথাটি দেখার সাথে সাথে বুঝলাম মেইল এসেছে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগেরি থেকে।কানাডার আলবার্টাতে অবস্থিত বেশ নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়।তিন মাস আগে ওরা একটা প্রোগ্রামে অংশ নেওয়ার জন্য সারা বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র ছাত্রীদের কাছ থেকে আবেদন আহ্বান করেছিল।কি মনে করে আমিও দিয়েছিলাম।কখনো ভাবিনি ওরা আমাকে সেই প্রোগ্রামে ডাকবে।

আমি স্বপ্নকে তাড়া করে ফিরি।পৃথিবীর বন্দরে বন্দরে আমার নৌকা ভিড়াই স্বপ্ন খুঁজবো বলে।কিন্তু স্বপ্নগুলো ছায়ার মত সরে যায়।আমি যখন এক পা এগিয়ে যাই তখন সেও এগিয়ে যায়।আকাশের চাঁদটাও ঠিক তাই।যেন আমার সাথে সেও প্রতিযোগিতায় নেমেছে।আমি ভাবি যে স্বপ্নকে ছুবো বলে দিনাতিপাত করছি সে কবে আসবে?কবে তাকে ছুয়ে দেখতে পাবো।কিন্তু পাইনা, সেই সুযোগও আসে না।আমিও হাল ছাড়ি না।মনের মধ্যে বুনে রেখেছি সেই স্বপ্ন যা দেখার মধ্যেও আনন্দ আছে।

স্কুল লাইফ থেকেই পরিবেশ নিয়ে তুমুল আগ্রহ আমার।আমি যখন ম্যানহাটন জুনিয়ার হাইস্কুলে পড়তাম তখনই বন্ধুদের সাথে পরিবেশ নিয়ে কাজ করেছি।স্কুল থেকে আমরা মাঝে মাঝেই চলে যেতাম রকফেলার পার্কে।বন্ধুরা মিলে সারা বিকেল কাটিয়ে আসতাম প্রাকৃতিক পরিবেশে।রকফেলার পার্কের গাছগুলো খুব সুন্দর।মনে হতো আমাদের আগমনে ওরা বেশ খুশি।মাঝে মাঝে আমার বন্ধু গ্রেগর গাছের সাথে কথাও বলতো।যদিও সেসব ছেলেমানুষী ছিলো তবে ভালোবাসাও ছিলো খুব।তারই ধারাবাহিকতায় আমরা ইউনেস্কোর বেশ কিছু প্রোগ্রামে অংশ নিয়েছিলাম।স্কুলে আমাদের ছিলো এনভায়রনমেন্ট ক্লাব।সেই ক্লাবে আমি ছিলাম।তার পর আমি যখন চলে এলাম তখন কিছুদিন সেসবে ভাটা পড়ে গেলো।এর প্রধান কারণ রকফেলার পার্কে সামান্য কটা গাছ দেখে যে আমি অভিভূত ছিলাম সেই আমি যখন বাংলাদেশের সবুজ বেলাভূমিতে এসে পৌছালাম তখন আমি বাকরুদ্ধ।এতো সবুজ এখানে! আমার বন্ধুরা আসলে নির্ঘাৎ পাগল হয়ে যাবে এই সৌন্দর্য দেখে।এনভায়রনমেন্ট ক্লাবের চিন্তা তখন আর মাথায় আসেনি।তবে মনে যে বিষয়টি গেথে ছিলো তার প্রতি এতো সহজেতো ভালোবাসা উবে যাওয়ার কথা নয়।আমার মনের মধ্যেও ছিলো।

স্কুল কলেজ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় আঙিনায় পা রাখার পরও প্রকৃতির প্রতি আমার অবিরাম ভালোবাসা ছিলো।সুন্দর পৃথিবীটা দিনদিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে দেখে মনখারাপ হতো।তাই পরিবেশ নিয়ে কাজ করার ইচ্ছে ছিলো সব সময় এবং সুযোগ পেলেই আমি তা করতাম।আমার জিওগ্রাফীতে পড়ুয়া বন্ধুরাও বেশ অবাক হতো।বলতো একাউন্টিং ম্যানেজমেন্ট পড়ুয়া ছাত্রের পরিবেশ নিয়ে এতো জানাশোনার আগ্রহ দেখে অবাক হই।

ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগেরি পঞ্চাশতম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে তারা এ আয়োজন করলো।সমস্ত ব্যয়ভার তাদের।এমন সুযোগ আমি তাই হাতছাড়া করতে চাইনি।আর বিষয়টি যেহেতু পরিবেশ নিয়ে এবং আমার পছন্দের তাই আমাকে আরো টেনেছে।সারাদিনের ক্লান্তি ভাব মুহুর্তেই উবে গেলো যখন মেইলের শুরুতেই ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগেরির মটো চোখে পড়লো।মিস্টার ডেবোরাহ ইয়েডলিনের সাইন করা স্ক্যান কপি এটাচ করে পাঠিয়েছে।সেখানে আমাকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেছেন তোমার অতীত অভিজ্ঞতা এবং পরিবেশের প্রতি ভালোবাসার গল্পগুলো আমাদের মুগ্ধ করেছে।আমরা চাই তুমি আমাদের এ আয়োজনে যুক্ত হয়ে তোমার ভালোবাসার গল্পগুলো শেয়ার করো এবং পরিবেশ সুন্দর করা বিষয়ে তোমার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরো।

আমি মন্ত্রমুগ্ধের মত পড়ছি মিস্টার ডেবোরাহ ইয়েডলিনের আমন্ত্রনপত্র।তিনি বিশ্ববিদ্যালয়টির চ্যান্সেলর।দিনতারিখ দেখতে গিয়ে বুঝলাম সময় খুব বেশি নেই।সাথে সাথে মেইলের প্রিন্ট কপি নিয়ে ছুটলাম মাম্মামের কাছে।বললাম আমাকে কানাডা যেতে হবে।মাম্মাম মেইলের কপি হাতে নিয়ে মনোযোগ দিয়ে দেখে অভিনন্দন জানালেন আর বললেন ওখান থেকে মাত্র চল্লিশ কিলোমিটার দূরেই আমেরিকা সীমান্ত।আর বড়জোর ২৪০ কিলোমিটার গেলেই ম্যানহাটন।তুমি চাইলে ঘুরে আসতে পারো!মাম্মামের কথাটা মনে ধরলো।ভাবলাম ভালোই হবে যদি শৈশবের স্কুলটাতে ঢু মেরে আসি।অ্যাম্বাসিতে গিয়ে সব পেপার রেডি করি এবং বেশ সহজেই সব কিছু হয়ে যায়।তার পর নির্ধারিত দিনে আকাশে উড়াল দেই।প্রথমবারের মত কানাডা যাচ্ছি।হাতে বেশ সময় নিয়েছি।ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগেরির আয়োজিত “দ্য আর্থ সামিট ২০১৮” এ অংশ নেওয়ার পর ঘুরবো বেশ কিছু যায়গা।বিশেষ করে ভ্যাঙ্কুভার,টরেন্টোর বেশ কিছু যায়গা।নায়াগ্রা জলপ্রপাতের ওদিকটাতেও যাবো।

কোন রকম ঝামেলা ছাড়াই ক্যালগেরি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে গিয়ে নামলাম।বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আরো অনেকেই এসে পৌছেছে।বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একটি টীম আমাদের রিসিভ করার জন্য অপেক্ষা করছে।আমার ডেলিগেট ছিলো ওকিনাওয়া নামে এক জাপানিজ মেয়ে।জাপানিজ হলেও সে বেশ ইংরেজী জানে।তার সাথে কথা চালিয়ে যাওয়ায় আমার কোন অসুবিধা হলো না।পথে যেতে যেতে অনেক কথা হলো।আমি তাকে জানালাম দুজন মানুষের সাথে দেখা করার খুব ইচ্ছে আমার।ওকিনাওয়া তাদের পরিচয় জানতে চাইলে আমি বললাম তারা হলেন ওয়েন অ্যাডামস আর ক্যাথিরিন কিং। আমার কথা শুনে সুন্দর একটা হাসি দিলো ওকিনাওয়া।তার হাসির কারণ আমার জানা ছিলো না। আমি জানতে চাইলাম হাসলে কেন? সে তখন বললো তোমার ইচ্ছে দেখছি এমনিতেই পুরণ হতে চলেছে।ওয়েন অ্যাডামস আর ক্যাথিরিন উপস্থিত থাকবেন এই প্রোগ্রামে।শুধু তাই নয় ঘুরতে নিয়ে যাবেন তাদের গড়ে তোলা “ফ্রিডম কৌভ” বা স্বাধীন দ্বীপে।শুনে আমার খুব ভালো লাগলো। ফ্রিডম কৌভ খুবই সুন্দর একটি জায়গা।ওখানে না গেলে কানাডা আসার আনন্দ ফিকেঁ হয়ে যাবে।এক সপ্তাহ ব্যাপী “দ্য আর্থ সামিট ২০১৮” এর কার্যক্রম বেশ সুন্দর ভাবে চলতে থাকলো।সেটি নিয়ে পরে বিস্তারিত লিখবো বলে ভাবছি।

আর্থ সামিট শেষ হওয়ার পর মাম্মামের কথা মনে পড়লো।ভাবলাম এবার পাড়ি জমাবো আমেরিকায়।কতদিন যাওয়া হয়নি।আলবার্টা থেকে আমি গিয়ে উঠেছিলাম ভ্যাঙ্কুভারে।ওখানে আমার ছোট চাচ্চুর বাসা।পরিবার সহ স্থায়ীভাবে বাস করছে।ভ্যাঙ্কুভার পৃথিবীর সব থেকে সুন্দর শহরগুলোর মধ্যে অন্যতম।কুইক শাটল নামক বিলাসবহুল বাসে রওনা হলাম ম্যানহাটনের উদ্দেশ্যে। সরাসরি ম্যানহাটন যেতে পারবো না। আমাকে প্রথমে যেতে হবে সিয়াটল তার পর সেখান থেকে ম্যানহাটন।ভ্যাঙ্কুভার থেকে ৯৯ নং সড়ক ধরে আমাদের কুইক শাটল চলতে শুরু করলো।এতো দ্রুতগামী যে মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যেই আমরা সীমান্তে পৌছে গেলাম।সীমান্তের এ অংশের দুটো নাম আছে। কানাডা অংশের নাম সারি আর আমেরিকা অংশের নাম ব্লেইন।খুব দ্রুততার সাথে ইমিগ্রেশান চেকিং চলতে থাকলো।

একসময় আমার পালা চলে আসলো।পাসপোর্ট হাতে নিয়ে অফিসার আমার মূখের দিকে তাকালেন।এমন ভাবে তাকালেন যেন আমার মধ্যে রহস্যজনক কিছু একটা পেয়েছেন।আমি বললাম কি দেখো অমন করে?অফিসারের নাম ফিলিপ কার্ট।সে মুচকি হাসি দিয়ে বললো তোমার গল্প আমরা জানি।তুমি যে চোখ ভিজিয়ে একদিন চলে গিয়েছিলে সেই খবরতো সবাই জানে।তোমাকে স্বাগতম!

ছোটবেলার কথা খুব মনে পড়ে গেলো।সেই ঘটনাটা যে পত্রিকায় ঢলাওকরে ছাপা হয়েছিল তা আমার জানাই ছিলো না।বিষয়টি ভাবতেই আমি মুগ্ধ হয়ে গেলাম।মনে মনে তখন অনেক কল্পনা।ম্যানহাটন জুনিয়র হাইস্কুলে পৌছে না জানি আমি কি কি দেখবো।তারা কি আমাকে মনে রেখেছে? আমার শৈশবের স্কুল! ভাবতেই ভালো লাগছে।মনে মনে ভাবলাম অবশ্যই আমাকে মনে রেখেছে।আমি যেহেতু মনে রেখেছি সে কেন মনে রাখবে না।জানালার কাচের ভিতর দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছি।দ্রুত গতিতে চলছে আমাদের বাস।মন পড়ে আছে তিন জায়গায়।ভ্যাঙ্কুভার,ম্যানহাটন আর ঢাকা।অন্য দুটি শহর যত সুন্দরই হোক না কেন আমি অবশ্যই ঢাকায় ফিরে যাবো।বাংলায় কথা বলার জন্য,বাংলায় লেখার জন্য।

গল্পঃ তিন শহরের টান

লেখাঃ জাজাফী

২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

তার আগমন

মেঘাচ্ছন্ন আকাশকে উপেক্ষা করে বইপ্রেমীরা কিংবা খুশিতে ঠেলায় ভাল্লাগে ঘোরতে টাইপের অগণিত বিভিন্ন বয়সী মানুষ আজ বইমেলায় এসেছিলেন।লিখিত নিয়মে শেষ দিন বলে কথা।অগণিত পাঠক দর্শক লেখক এবং বিক্রেতার ভিড়ে এক তরুণকেও দেখা যাচ্ছে।কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে সে ঘুরছে এক স্টল থেকে আরেক স্টলে।বই দেখছে এবং কোনটা পছন্দ হলে কিনে নিচ্ছে।নালন্দার সামনে সে কিছুক্ষণ দাড়ালো।অনেক বই বিক্রি হচ্ছে।কোন কোন নামিদামী লেখক,জনপ্রিয় লেখক দাড়িয়ে দাড়িয়ে পাঠকদের অটোগ্রাফ দিচ্ছেন।মুখে ধরে রেখেছেন মিষ্টি হাসি।সেই তরুণ সামনে এগিয়ে গেলেন।এক লেখকের বইয়ের কপি নিলেন।বইটি নিয়ে দারুণ আলোচনা হচ্ছে।বইটি কিনবেন বলে মনস্থির করলেন।লেখক তখন বইটি চাইলেন অটোগ্রাফ দিবেন বলে।সেই তরুণ আর কি বলবে বইটি এগিয়ে দিলেন।লেখক নাম জানতে চাইলেন কিন্তু সেই তরুণ নাম বলতে অসুবিধা আছে বলে জানালেন।তিনি বললেন আমাকে আপনিও চেনেন এবং নাম বললে চিনে ফেলবে অগণিত মানুষ। সুতরাং খুব সমস্যা হবে।জনপ্রিয় সেই লেখক ভীষণ আশ্চর্য হলেন।তার সামনে দাড়ানো তরুণ পাঠকের মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি কোন ভাবেই চিনতে পারলেন না।পাঠকের কাছে তিনি অনুরোধ করলেন কানের কাছে মুখ নিয়ে অন্তত তিনি যেন তার নামটি বলেন।

জনপ্রিয় লেখক যখন এমনটি আবদার করেছেন তখন সেই তরুণ আর না করতে পারলেন না।স্টলের দিকে মুখ এগিয়ে নিয়ে লেখকের কানের কাছে নিজের নাম বললেন।নাম শুনে লেখক ভীষণ চমকে উঠলেন।তার চোখ যেন বিশ্বাসই করতে পারছে না। এই নাম তিনি অগণিতবার শুনেছেন।এমনকি এক জীবনে নিজের নাম যতবার শুনেছেন তার চেয়েও বেশিবার শুনেছেন এই তরুণটির নাম।আশ্চর্য কখনো তাকে দেখেননি।লেখক আবদারের সুরে বললেন ভাই আপনার সাথে একটি ছবি তুলতে চাই।তরুন বিনয়ের সাথে তা প্রত্যাখ্যান করলেন। বললেন আপনিতো জানেন আমার অবস্থা।আমি সবিনয়ে এই প্রস্তাব থেকে সরে আসতে চাইছি।যেহেতু আমার কাছে আপনার নাম্বার আছে এবং এই যে আজকে দেখা হলো আগামীতে আমি ফোন করেই না হয় আপনার সান্নিধ্যে চলে আসবো। এ কথা শুনে জনপ্রিয় লেখক বললেন কি যে বলেন!আপনার তুলনায় আমিতো সামান্য মানুষ।বিদায় নিয়ে তরুনটি নালন্দা থেকে সামনে এগিয়ে গেলেন।

প্রথমার স্টল পেরিয়ে বাংলা একাডেমী ক্যান্টিনের দিকে তরুণ হাটতে শুরুকরলো।পথে দেখতে পেলেন কবি ও নাট্যকার আসাদুল ইসলাম তার একমাত্র কন্যা মেঘদূত এবং মেঘদূতের মাকে সাথে নিয়ে সেলফী তুলছেন।তরুন সেটি ভালোভাবে লক্ষ্য করলেন।তরুণ জানেন মেঘদূত এবং তার বাবা মা দুজনই তার নাম অনেকবার শুনেছেন কিন্তু কখনো দেখেননি।যদি জানতেন এই তরুণটিই সেই আলোচিত তরুণ তবে তিনি অবাক হতেন।তরুণটি এই অভিনেতা পরিবারকে পাশ কাটিয়ে বাংলাএকাডেমী ক্যান্টিনের পথে পা বাড়ালেন।উৎস প্রকাশনীতে তখন প্রখ্যাত নাট্যকার মামুনুর রশিদ বসে আছেন।তরুন দাড়িয়ে দাড়িয়ে তার কিছু কথা শুনলেন।পথে যেতে যেতেও অনেকের মূখে নিজের নাম শুনলেন কিন্তু তার মনে তেমন কোন ফিলিংস আসলো না।তিনিতো আসলে এমনই।উৎস প্রকাশনীর সামনে দাড়িয়ে তখন লেখক মাসউদুল হক গল্প করছেন।তাঁর হাতে বেশ কিছু বইয়ের ব্যাগ।তরুণ এই লেখকের বইও পড়েছেন।তার পড়তে ভালো লাগে।একবার হয়তো ইচ্ছে হলো তাকে বলবেন আপনার বৃক্ষচারী গল্পটি বইয়ের অন্যান্য গল্পের তুলনায় কম আকর্ষনীয় লেগেছে তার পরও এটিকেই কেন বইয়ের নাম হিসেবে গ্রহণ করলেন।বলতে চেয়েও বলা হয়নি।তরুণ জানেন মাসউদুল হকও তাকে চেনে এবং তার নাম জানে।তার নাম কত মানুষ জানে সে হয়তো নিজেও জানে না।

একটা কফি খাওয়া দরকার।কিন্তু ভীষণ লম্বা লাইন।কফি খেতে গেলে আধাঘন্টা হয়তো দাড়িয়ে থাকতে হবে। তরুন আর অপেক্ষাকরলেন না।লেখক বলছি মঞ্চে তখন স্বকৃত নোমান আরেকজন লেখককে নিয়ে আলোচনায় বসেছেন।ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা নামাজ পড়ে বের হচ্ছে আর কেউ কেউ অপেক্ষা করছে লাইন পাওয়ার।তরুন জানে মঞ্চে আলোচনারত দুই খ্যাতিমান সাহিত্যিকও তার নাম জানে।কী আশ্চর্য কখনো পরিচয় দিতে ইচ্ছে করে না তার।একাকী ঘুরে বেড়াতে তার ভালো লাগে।আদর্শর স্টলের সামনে গিয়ে দাড়ালেন।এখানে আয়মান সাদিক,ঝংকার মাহবুব সহ আরো অনেক মোটিভেশনাল স্পিকারের বই বেরিয়েছে এবং তরুণ শুনেছে সেগুলো লাখ লাখ কপি বিক্রি হচ্ছে।তরুনের খুব ভালো লাগে।সে জানে আয়মান সাদিক কিংবা ঝংকার মাহবুবও তার নাম জানে। এমনকি তাদের বই যেসব পাঠক কিনছেন তাদের সিংহভাগই কোন না কোন ভাবেই তার নাম শুনেছে।

এই লেখাটি কেউ পড়ে নিশ্চই ভাবছেন ধুরো মিয়া কি কও! সেই তরুণ কোন তালেবর যে সব্বাই তারে চিনে অথচ দেখে নাই।

আমার মনে হয় আমি ভুল কিছু বলছি না।কথাপ্রকাশের উল্টোদিকের একটি স্টলে দাড়িয়ে নানা বিষয়ে কথা বলছেন প্রখ্যাত শিল্পী ফকির আলমগীর।তরুন তার পাশে গিয়ে দাড়ান।মনদিয়ে তার কথা শোনেন।কিন্তু কিছু বলেন না।একবার ইচ্ছে করে তাকে প্রশ্ন করবে আপনার আত্মজৈবনিক যে বইটি লিখেছেন সেটি কোন প্রকাশনীতে আছে।কিন্তু বলা হয়না।তরুণ মনে মনে ভাবেন ফকির আলমগীরতো অনেক পড়াশোনা করেন,খোঁজ খবর রাখেন।তিনিও কি তার নাম জানেন?হয়তো জানেন আবার হয়তো জানেন না।তরুণ ভাবেন সে তো এমন কেউ নয় যে তাকে সবার চিনতেই হবে।তবে সে এটুকু জানে যে বইমেলার সাথে যুক্ত সবাই তার নাম জানে।প্রতিটি স্টলের প্রতিটি সেলসম্যান তার নাম শুনেছে অন্তত একবার হলেও।আবার সে বইমেলা ঘুরে দেখতে শুরু করে।মাঝে মাঝে পছন্দ হলে বই কেনে।

দিব্য প্রকাশের স্টলে তখন বসে আছেন মঈনুল আহসান সাবের।পাঠকদের অটোগ্রাফ দিতে ব্যস্ত।তরুণের ইচ্ছে করে তাকে বলবেন আপনার কাফকা আসবে বইটি আপনার লেখা অন্য বইয়ের মত ভালো লাগেনি। আব্দুল জলিল যে কারণে মারা গেলেন কিংবা করণজল সহ অন্যান্য লেখার তুলনায় এটি নিতান্তই সামান্য হয়ে গেছে।কিন্তু ছোট মুখে বড় কথা বলা ঠিক হবেনা জেনে সে কিছু বলে না।নিজের নাম পরিচয় দিলে এই বিখ্যাত লেখকও নিশ্চই তাকে চিনবেন।

সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে।ফিরে যেতে হবে।যদিও মেলায় আরো অনেকটুকু সময় থাকা যায় কিন্তু তার থাকতে ইচ্ছে করলো না।এই মেলাতো তার নয়!সে তার করতে চেয়েও পারেনি।বিদ্যাপ্রকাশের সামনে সে যেমন মোহিত কামালকে দেখলেন অটোগ্রাফ দিতে তেমনি কিশোর ক্ল্যাসিক তিনগোয়েন্দাখ্যাত লেখক রবিকব হাসানকেও দেখলেন একটি স্টলে।রকিব হাসানকে তার ভীষণ ভালো লাগে।কত সাদামাটা তিনি।মেলায় তারও অগণিত পাঠক আছেন কিন্তু তিনি যখন এক স্টল থেকে অন্য স্টল মেলার এ প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়ান তাকে কেউ চেনেনা। অথচ তার নাম জানে প্রায় সবাই।তরুন বোধহয় তার মত খ্যাতিকেই বেশি ভালোবাসে।তাকে চিনবে না কিন্তু তার নাম চিনবে এমন।

ফেরার পথে সে দেখতে পায় অগণিত পাঠক নিবার্সন কিনছেন এবং লেখক তাঁর পাঠকদের অটোগ্রাফ দিচ্ছেন এবং হাসিমূখে কারো কারো সাথে ছবিও তুলছেন।এরই মাঝে তরুণ দেখতে পায় পিরামিড,তাজমহলের গল্প সহ অনেক অসাধারণ বইয়ের অনুবাদক এবং সাহিত্যসমালোচক,লেখক,বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোঃ আদনান আরিফ সালিম তথা সালিম অর্নবও নিবার্সন নিলেন এবং লেখকের সাথে হাসিমূখে কথা বললেন।তরুণ শুধু সব চেয়ে চেয়ে দেখলেন।বিখ্যাত এই সব লেখক কবিরা যে তার নাম জানে এতেই তরুণ খুশি।একসময় দেখলেন সালিম অর্ণব বেরিয়ে যাচ্ছেন অন্য অনেক পাঠকের সাথে।তরুন আস্তে আস্তে মেলার গেট দিয়ে বেরিয়ে গেলেন।তিনি হাটছেন শাহবাগের দিকে।গন্তব্য নিজ বাসা।

দুটো চোখ তাকে খুব অনুসরণ করলেও তিনি বুঝতে পারেননি।টিএসসির কাছাকাছি আসতেই সেই দুটি চোখের মানুষ তার পাশে পাশে হাটতে লাগলেন।আস্তে করে তরুণের নাম ধরে ডেকে বললেন ভাই কেমন আছেন!তরুন চমকে উঠলেন।হাজার হাজার মানুষের ভীড়ে কেউ তাকে চেনেনি অথচ এই ছেলেটি তাকে চিনে ফেলেছে! তিনি আশ্চর্য হয়ে জানতে চাইলেন আপনি কি করে আমাকে চেনেন?সেই আগন্তুক বললেন আপনাকে কেউ না চিনলেও আমি চিনি।আমাকে যে চিনতেই হয়।আমিতো আপনার মত সব বিখ্যাত মানুষকেই চিনি,সব লেখক কবিকে চিনি।তরুণ আরো অবাক হলেন।জানতে চাইলেন আপনি কে? আপনার নাম কি?ছেলেটি বললো আমার নাম শুনলেও আপনি চিনতে পারবেন না।আমিতো আগন্তুক মাত্র।আপনার লেখা বই আমি পড়েছি।পুরো মেলা জুড়ে আমার দুটো চোখ আপনাকে অনুসরণ করেছে কিন্তু আপনি বুঝতেই পারেননি।নালন্দার সামনে বিখ্যাত লেখক যখন আপনার সাথে ছবি তুলতে চাইলেন তখনও আমি ছিলাম।আমি জানি আপনি তার সাথে ছবি তুলতে রাজি হননি তাই আমিও আপনার সাথে ছবি তুলতে চাইবো না।

সেই বিখ্যাত তরুণ আমাকে অবাক করে দিয়ে পকেট থেকে নিজের মোবাইল বের করলেন।বললেন আপনি আমার সাথে ছবি তুলতে চান না সেটা আপনার ব্যাপার কিন্তু যে মানুষটি আমাকে চিনে ফেলেছে তার সাথে ছবি তুলতে বরং আমারই আগ্রহ হচ্ছে।ছেলেটি সবিনয়ে সেই বিখ্যাত তরুণকে বললেন আমিও ঠিক আপনারই মত।সবিনয়ে ছবি তোলার বিষয়টি এড়িয়ে যেতে চাই। নামযশে খ্যাত সেই মানুষটি মিষ্টি করে হাসি দিলেন।তাঁর সাথে হেসে উঠলো ছেলেটি।বিখ্যাত মানুষটি জানতেও পারলো না তার মত মানুষকে চিনে ফেলা ছেলেটি আমি।

প্রিয় পাঠক আপনারা কি অনুমান করতে পারেন সেই বিখ্যাত তরুণটির নাম কি?