Home Blog Page 14

কথা দিতে পারি

তুমি আমায় কোন অনুরোধ করো না
তুমি অনুরোধ করো এটা আমি মানতে পারি না
আমার কাছে কেন তুমি অনুরোধ করবে?
আমি চাই তুমি দাবী নিয়ে বলো
অনুরোধের চেয়ে দাবী নিয়ে বললে বেশি আপন মনে হয়
আমি তোমার অনুরোধ নয়,দাবী মেটাতে ভালোবাসি।

তোমার যদি মনে হয় সকালের রোদ গায়ে মাখবে
অথচ বিছানা ছেড়ে উঠে জানালার পর্দা সরাবে না
তবে অনুরোধ নয় দাবী নিয়ে বলো আমি সরিয়ে দেবো
টেবিলের উপর রাখা রিমোর্টটা এনে তোমার হাতে দেবো
যেন তুমি বালিশে হেলান দিয়ে গায়ে রোদ মেখে টিভিতে প্রিয় কোন অনুষ্ঠান দেখতে পারো।

আমি জানি তোমার খুব চা পছন্দ
এককাপ চা দিবে? এমন করে না বলে তুমি বরং বলতে পারো
এখন খুব চায়ের তৃষ্ণা পেয়েছে
আর কিছু নয়,এই দাবীটুকুই আমার চাই
আমি ছুটে গিয়ে তোমার জন্য চা করে আনবো
পেয়ালা থেকে ধোয়া ওঠা চা ঢালতে ঢালতে তোমার মূখের দিকে তাকাবো
যে মূখের দিকে তাকিয়ে থাকার চেয়ে আনন্দের আর কিছু নেই।

তুমি আমায় কোন অনুরোধ করো না
তুমি অনুরোধ করো এটা আমি মানতে পারি না
আমার কাছে কেন তুমি অনুরোধ করবে?
আমি চাই তুমি দাবী নিয়ে বলো
অনুরোধের চেয়ে দাবী নিয়ে বললে বেশি আপন মনে হয়
আমি তোমার অনুরোধ নয়,দাবী মেটাতে ভালোবাসি।

মানুষ এখন আর কথা দেয় না
সুনীলের কেউ কথা রাখেনি শোনার পর সবাই ধরেই নিয়েছে
কেউ কথা রাখেনা,
কিন্তু আমি তোমায় কথা দিতে চাই
মিথ্যে স্বপ্ন নয়,আমি তোমায় বাস্তবতা দেখাতে চাই।

কথা দিতে পারি
ডিটারজেন্ট পাউডার কখনো তোমার কোমল হাত শুষ্ক করবে না
সারা সপ্তাহ জমে থাকা কাপড়গুলো ধোয়ার জন্য আমার দুটো হাতই যথেষ্ট
ধুলোধুসরিত পথে জ্যামের বিরক্তি নিয়ে তোমাকে কখনো বাজারে যেতে হবে না
টাটকা সবজি ফলমুল কিনে আনার ভারটুকু আমার
এমনকি কখনো বলবো না ফলটুকু ছুরি দিয়ে কেটে দাও।

কথা দিতে পারি
তোমাকে কখনো রান্না ঘরে গিয়ে গ্যাসের চুলোয় আগুন দিতে হবে না
এটো থালা ধোয়ার মত কাজতো নয়ই এমনকি রান্নাও নয়
বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙ্গিনায় পা রাখার আগেই ওসব আমার আয়ত্বে চলে এসেছিল
নিজের এটো থালার পাশাপাশি তোমার এটো থালাটাও আমি ধুয়ে দেবো
বেসিনের সামনে তুমি শুধু হাতটা মেলে ধরো
সাবান দিয়ে যত্ন করে ধুয়ে দেবো।
তোমার পছন্দের সব খাবার রান্না শিখে নিয়েছি আরও আগে।

কথা দিতে পারি
তোমাকে কখনো কাঁদাবো না,তুমি হাসতে না চাইলে হাসাবো না
তুমি যা কিছু অপছন্দ করো তা তোমার চারপাশ থেকে সরিয়ে দেবো
এমনকি যদি কখনো অপছন্দ করো আমাকেও
কখনো কৈফিয়ত চাবো না,অভিযোগ করবো না তোমার কাছে
আমি বরং সব কিছুর কৈফিয়ত দিতে প্রস্তুত।

কথা দিতে পারি
বসন্তের আগমনের সাথে সাথে যে ফুল সবার আগে ফুটবে সেটা তোমাকে দেবো
প্রিয় শিল্পীর গাওয়া নতুন গানের প্রথম অ্যালবাম তোমাকে দেবো
ডেবিট কার্ড ক্রেডিট কার্ডের পাসওয়ার্ডতো তোমাকে অনেক আগেই দিয়ে রেখেছি
কখনো প্রশ্ন করবো না কত খরচ করেছ ।

তুমি আমায় কোন অনুরোধ করো না
তুমি অনুরোধ করো এটা আমি মানতে পারি না
আমার কাছে কেন তুমি অনুরোধ করবে?
আমি চাই তুমি দাবী নিয়ে বলো
অনুরোধের চেয়ে দাবী নিয়ে বললে বেশি আপন মনে হয়
আমি তোমার অনুরোধ নয়,দাবী মেটাতে ভালোবাসি।

#কথা_দিতে_পারি
— জাজাফী
৩০ জানুয়ারি ২০১৯

একটি অনাকাঙ্খিত এসএমএস

সকালের নাস্তা সেরে সবে মাত্র পত্রিকাটা হাতে নিয়েছি। টুংটাং শব্দ করে মোবাইলে একটা মেসেজ এলো। ফোন কোম্পানীর বিরক্তিকর মেসেজ ইদানিং এতো বেড়ে গেছে যে বলে বুঝানো যাবে না। তবুও মোবাইলটা হাতে নিয়ে কী মেসেজ এসেছে চেক করতে গিয়ে ভিমরি খাওয়ার দশা! আমি স্বপ্ন দেখছি নাকি ভিমরতিতে ধরছে বুঝে উঠতে কয়েক মিনিট সময় লেগে গেলো। গায়ে চিমটি কেটে দেখতে চেষ্টা করলাম এটা কি সত্যি নাকি স্বপ্ন। বুঝলাম স্বপ্ন নয় বরং সত্যি! মোবাইলের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখি..সরকারের তরফ থেকে আমার এ্যাকাউন্টে ৫০ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। আমার মন খুশিতে ভরে গেল। ঘর থেকে বের হলাম আর চিৎকার করে বাড়ির সবাইকে বললাম,সবাই শোনো, দিন বদলে গেছে, আমার এ্যাকাউন্টে ৫০ লাখ টাকা এসে গেছে।রুম থেকে বউ বেরিয়ে বললো, অত খুশির কি আছে, আমার এ্যাকাউন্টেও ৫০ লাখ টাকা দিয়েছে। এই যে মেসেজ দেখ।একটু অবাক হলাম, ভাবলাম আশেপাশে সবাইকে গিয়ে মহা খুশির এই ঘটনাটা বলি। আমার বাড়ির পাশের বাড়িতে  থাকে দলিল উদ্দিন।সামনে পেতেই তাকে ঘটনাটা বললাম। তিনি আমায় বললেন, বেশি উত্তেজিত হয়ো না, আমাদের এ্যাকাউন্টেও ৫০ লাখ জমা হয়েছে।

আমার খুশি সব উড়ে গেল। ভাবলাম যাই, বাজারে গিয়ে মহিতোষের দোকান থেকে কিছু মিষ্টি নিয়ে আসি।বাজারে গিয়ে দেখলাম, দোকান বন্ধ। পাশের একজনকে জিজ্ঞেস করলাম,ও ভাই এই মিষ্টির দোকান বন্ধ কেন?সে বললো,মিষ্টি দোকানদারের আর দোকানদারি করার কি দরকার। তার এ্যাকাউন্টে ৫০ লাখ এসে গেছে। মিষ্টি যেহেতু কিনতেই পারলাম না তাই ভাবলাম একটু নিউ মার্কেটে যাই, সেখান থেকে কিছু নিয়ে আসি। সেকি! কোনো দোকান পাট খোলা নেই।ওনাদের এ্যাকাউন্টেও নাকি ৫০ লাখ এসে গেছে…..।প্রচন্ড খিদে পেয়েছে ভাবলাম এখানে তো দোকান পাট বন্ধ। সামনের দিকে যাই, ভালো কোন হোটেলে তৃপ্তি করে খাওয়া যাবে।সামনে যতই যাই সবই দেখি ফাঁকা। হোটেলের বাইরে দাড়িয়ে থাকা স্বাগত জানানোর সেই লোকও নেই, যে কাস্টমার দেখলেই সালাম ঠুকে ওয়েলকাম করেন, শপিং মলের সিকিউরিটিও নেই। সবার এ্যাকাউন্টেই ৫০ লাখ এসে গেছে। মার্কেটে কেউ নেই।সবজি ওয়ালা, চা ওয়ালা, শরবত ওয়ালা,ফাস্টফুড ওয়ালা কেউ নেই। সব কিছুই বন্ধ।সকলের ঠিকানা এখন ব্যাঙ্কে ৫০ লাখ টাকা তোলার জন্যে। কেননা এখন আর কারো কাজ করার দরকার নেই, সবার কাছেই ৫০ লাখ আছে।

আমার এক বন্ধু ফোন করে বললো,আমি জব ছেড়ে দিয়েছি, আমার এ্যাকাউন্টে ৫০ লাখ টাকা আছে। আমার এক বড় ভাই ফোন করে বললো,আমার আর্ট স্কুল অফ করে দিয়েছি! আমার আশেপাশের ছোট বোন আর স্কুলে যাচ্ছে না। আমার বন্ধু মুবাশ্বের টিউশন পড়ানো বন্ধ করে দিয়েছে। নিপা নামের মেয়েটিও আর কলেজে যায় না,ইভান আর জব খু্ঁজে না,শ্রমিকরা আর কারখানায় যায় না, কলকারখানা সব বন্ধ।সবার এ্যাকাউন্টে ৫০ লাখ টাকা জমা আছে। সবাই এখন বড়লোক। সবাই সুর তুলছে, গান করছে, নৃত্য করছে…..বিকেলে হাটতে হাটতে মাঠের দিকে গেলাম, কৃষকরা সবাই কাজ ছেড়ে বাড়িতে। কেউ নেই জমিতে। এখন তাদের রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে কাজ করার আর দরকার নেই। তারা সবাই বড়লোক হয়ে গেছে। সবার এ্যাকাউন্টেই ৫০ লাখ টাকা।৭ দিন পর দেখা গেল খিদের জ্বালায় লোক কাঁদছে। কেননা, জমি থেকে কেউ ফসল তুলছে না, সমস্ত দোকানপাট বন্ধ, হোটেল, মেডিক্যাল সব বন্ধ। অসুস্থ হয়ে মানুষ মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কেননা, খাবার নেই, ডাক্তার নেই। পশুরাও না খেতে পেয়ে মরছে। জমিতে সবুজ ঘাস নেই, সোনালী ফসল নেই। শিশুরা খিদের জ্বালায় কাঁদছে, গোয়ালা দুধ দিচ্ছে না বলে।মানুষ এখন ছুটছে মুঠো মুঠো টাকা নিয়ে। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরছে পকেটে টাকা নিয়ে।কাঁদছে মানুষ লক্ষ টাকা হাতে নিয়ে আর বলছে,এই ভাই নাও ১০ হাজার টাকা, আমাকে ২০০ গ্রাম দুধ দাও। দুদিন বাচ্চাটা না খেয়ে আছে।১০ দিন বাদে মানুষ না খেতে পেয়ে মরছে। কিছু কিছু লোক টাকার ব্যাগ নিয়ে ঘুরছে রাস্তায়। এই নাও ভাই ৫ লাখ টাকা, আমাকে ৫ কেজি চাল দাও। ১০ দিন থেকে না খেয়ে আছি।

সব বাজার হাট বন্ধ হয়ে গেছে। শাক সবজি খাবার দাবার কারো কাছেই নেই। সবদিকে শুধু মৃত্যুর ছবি দেখা যাচ্ছে।আমিও আমার ৫০ লাখ টাকা নিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছি, নাও ভাই নাও ৫০ লাখ নিয়ে নাও,তবুও কিছু খাবার দাও।কে কার টাকা নেবে, খাবার কারো কাছেই নেই। মানুষ মানুষের দিকে তেড়ে আসছে হিংস্র সিংহের মত। মনে হচ্ছে, মানুষ মানুষকে খাবে।অচেনা একলোক তাড়া করেছে আমাকে, চিবিয়ে খাবে বলে। ছুটছি আমি। আমি ক্ষুধার্ত মানুষ, কতটা আর ছুটব?পড়ে গেলাম হোঁচট খেয়ে. ..মা গো করে চিৎকার করে উঠলাম…..বউ তখন ঘুম থেকে লাফ দিয়ে উঠে কি হলো তোমার ? সকাল হয়ে গেছে, ঘুম থেকে উঠো, চোখে মুখে পানি দিয়ে আসো। এই তুমি বাচাঁও বাঁচাও বলে চেঁচাচ্ছিলে কেন? কোন খারাপ স্বপ্ন দেখছিলে নাকি ?আমি বললাম, না, খারাপ নয়, ভালো দিনের স্বপ্ন। গরিব আমরা, কিন্তু ঘরে দুমুঠো খাবার তো আছে,তৃষ্ণার পানি তো আছে,শিশুরা খেলছে,পশুরা মাঠে ঘাস খাচ্ছে,দোকানে ভিড় আছে,যানবাহন চলছে তো চলছে,মানুষের সমাগম চলছে,বাগানে ফুল ফুটছে,প্রকৃতি হাসছে…..। অনেকে ভাবে সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ কেন ধনী গরীব সুষ্টি করছে ?সবাইকেতো চাইলে ধন সম্পদ দিতে পারতো।সবাইকে সুখ শান্তি দিতে পারতো।বাস্তবতা হল ধনী গরীব বৈষম্য আছে বিধায় এখনও পৃথিবী টিকে আছে এবং কেয়ামত পর্যন্ত টিকে থাকবে।সবাই ধনী হলে কি হতো দেখেছেনত।

৯ জানুয়ারি ২০১৯

উত্তরা,ঢাকা, বাংলাদেশ।

আমার মৃত্যু হোক একবারই

জীবন মাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে বাধ্য এটা একটি অমোঘ সত্য এবং এর কোন পরিবর্তন নেই।জন্ম হলে তাকে একদিন মৃত্যুবরণ করতেই হবে।মৃত্যু বিষয়ে ভাবতে গিয়ে আজ আমার মনে হলো মৃত্যু অনেক রকম হতে পারে।এই অনেক রকমের মধ্যে আমি অবশ্যই রোগে ভুগে মরা,স্বাভাবিক মৃত্যু,বৃদ্ধ হয়ে মারা যাওয়া,দুর্ঘটনা আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া এসব বলছিনা কারণ এর প্রতিটিই মানুষের অন্ত্যিম মৃত্যু।আমি ভেবে দেখলাম অন্ত্যিম মৃত্যু ছাড়াও মানুষ মরতে পারে বহুভাবে।মানুষের আত্মিক মৃত্যু ঘটতে পারে,মানুষের মানসিক মৃত্যু ঘটতে পারে। একই ভাবে রাজনৈতিক,সামাজিক,অর্থনৈতিক,মানসিক মৃত্যুও হতে পারে।

আমার সামনে যে মানুষটি ঘুরে বেড়াচ্ছে তিনি জীবিত হয়েও যে মৃত নন তা আমি জানিনা।অন্ত্যিম মৃত্যু হলে সেটা সাধারণ ভাবে বুঝা যায় কেননা তখন তার সব কিছু বন্ধ হয়ে যায় ফলে আমরা তাকে শেষ বিদায়ের জন্য সাজিয়ে দেই এবং চিরবিদায় জানিয়ে দেই।কিন্তু জীবিত থাকতেই যখন একজন মানুষ নানা রকম মৃত্যুবরণ করে তখন বুঝে ওঠা কঠিন যে তিনি কোন না কোন মৃত্যুবরণ করেছেন।রাজনৈতিক মৃত্যু কিভাবে হতে পারে সেটা নিয়ে ভাবতে বসে সবার আগে এক সময়ের স্বৈরশাসক প্রবল প্রতাপশালী জেনারেল এরশাদের কথা মনে পড়লো।তিনি যখন নিজে একটি দল করেছিলেন এবং সেই দল নিয়ে প্রবল প্রতাপে দাপিয়ে বেড়িয়েছেন তখন তিনি রাজনৈতিক ভাবে জীবিত ছিলেন।স্বৈরশাসক হিসেবে তার পতন হওয়ার পর থেকে তিনি যখন পরগাছা হয়ে গেলেন তখন থেকেই তিনি মূলত বাহ্যিক জীবনে জীবিত থাকলেও রাজনৈতিক ভাবে মৃত বলে মনে হয়। মৃতরা চাইলেই যেমন কিছু করতে পারে না আসলে কিছু করারও থাকে না।মানুষ মারা গেলে তার সব কিছু বন্ধ হয়ে যায় তখন তার নিজের মঙ্গলের জন্য চিন্তা করতে হলে অন্যের মূখের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়।ঠিক একই ভাবে এরশাদ সাহেবও এখন তেমনই অন্যের মূখের দিকে তাকিয়ে থাকেন।

তিনি নির্বাচনের আগে সিএমএইচে গিয়ে ভর্তি হন কারণ তিনি জানেন না তিনি যাদের মদদপুষ্ট তারা ক্ষমতাসীন হবে নাকি হেরে যাবে। যদি তারা কোন ভাবে পা পিছলে যায় তাহলে অবধারিত ভাবেই এরশাদ সাহেবের কপালে দুঃখ রয়েছে।আর এ কারণেই তিনি সাবেক সেনানায়ক ও রাষ্ট্রপতি হওয়ার দরুণ সিএমএইচে আশ্রয় নেন।অনেকটা ব্যাঙের শীত নিদ্রার মত। শীত শেষ হলেই ব্যাঙ যেমন গর্ত থেকে বেরিয়ে আসে তেমনি তিনিও সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলেন।এটাকে আমার মনে হয়েছে রাজনৈতিক মৃত্যু।

সাম্প্রতিক সময়ে আরো অনেকেই রাজনৈতিক মৃত্যুবরণ করেছেন।ড.কামাল হোসেন কিংবা মাহমুদুর রহমান মান্না বা মীর্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে আমি এই তালিকায় রাখতে চাইনা কেননা তারা নিজ নিজ অবস্থানে থেকে একটি জোট করেছেন।এ তালিকায় রাখা যেতে পারে ব্যারিষ্টার নাজমুল হুদাকে যিনি ক্ষমতার লোভে দল বদল করেছেন।এই দলবদলও এক প্রকার রাজনৈতিক মৃত্যু বলে আমি মনে করি।একই ভাবে এ কিউ এম বদরুদ্দৌজা চৌধুরী বা অন্যান্যদের মধ্যে যারা শুরু থেকে যে দলের সাথে ছিলেন পরবর্তীতে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে অন্য কোন দল গড়েছেন কিংবা অন্য দলে ভীড়েছেন তারা মূলত রাজনৈতিক মৃত্যুবরণ করেছেন।

মানুষের নৈতিক মৃত্যু ঘটেছে বহু আগে।এখনকার দিনে আমাদের সমাজের অধিকাংশই নৈতিক ভাবে মৃত।নীতি ও আদর্শহীন মানুষ পৃথিবীর আলো-বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে জীবিত অবস্থায় কিন্তু তার নৈতিকতা নেই বলে তিনি বা তারা নৈতিক ভাবে মৃত।একটা মানুষের সুখী হওয়ার জন্য খুব বেশি কিছুর দরকার আছে বলে আমি মনে করি না।খুব ভালো ভাবে বলতে গেলে বলতে পারি থাকার জন্য একটি বাড়ি,চলাফেরার জন্য একটি গাড়ী আর শিক্ষা চিকিৎসা সহ অন্যান্য কারণে কিছু টাকা থাকলেই সুখী হওয়ার কথা।এ জন্য হাজার হাজার কোটি টাকার দরকার আছে বলে মনে করি না।কিন্তু কয়েক বারের প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়ার পুত্র তারেক রহমান কিংবা আরাফাত রহমানের সম্পদের পরিমাণ সম্পর্কে পত্রপত্রিকা যেভাবে উল্লেখ করেছে তাতে অবাক হয়েছি।একটি উন্নয়নশীল দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর পরিবার কতটুকু সুযোগ সুবিধা পায় যে যার দরুণ খরচ বাচিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক হওয়া সম্ভব?এমনটি যখন ঘটে তখন স্বাভাবিক ভাবেই তাকে নৈতিক মৃত্যু বলে ভাবা যেতে পারে।তারেক রহমান বা তার পরিবার আর্থিক কেলেঙ্কারীর সাথে আদৌ জড়িত কি জড়িত না সেটা খুজে বের করা বা সেটার ফয়সালা দেওয়ার আমি কেউ নই।যে কেউ যখন অস্বাভাবিক ভাবে টাকার পাহাড় গড়তে থাকে তখন নৈতিক ভাবে তার যদি অধঃপতন ঘটে থাকে তাহলে তিনি বা তারা নিশ্চই নৈতিক মৃত্যুর শিকার।

হরহামেশাই আমরা এমন মৃত ব্যক্তিদের দেখি।পরীক্ষায় ভালো নম্বর দেওয়ার নাম করে যে শিক্ষক তার নৈতিকতা বিসর্জন দিয়েছেন তিনি নৈতিক ভাবে মৃত।যে অফিসার ফাইল আটকে রেখে অনৈতিক সুবিধা ভোগ করছে তিনিও নৈতিক ভাবে মৃত।একই ভাবে সমাজের প্রতিটি ক্ষেত্রে অগণিত নৈতিক মৃত মানুষ ঘুরছে।

অর্থনৈতিক ভাবেও মানুষ মৃত হয়ে থাকে।রাস্তায়,ফুটপাথে যারা ঘুমায়,সারাদিন খায় কিংবা খায়না তারা অর্থনৈতিক ভাবে মৃত।মৃত মানুষ যেমন অন্যের দোয়া ও আশীর্বাদের আশায় থাকে এই মানুষগুলোও সেভাবেই অন্যের দয়া প্রার্থী।মিয়ানমার থেকে আগত রোহিঙ্গারাও অর্থনৈতিক ভাবে মৃতদের কাতারেই পড়ে।মানুষ যখন অর্থনৈতিক ভাবে মৃত্যুবরণ করে তখন তাদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বাড়ে।তারা জৈবিক ভাবে বেচে থাকার জন্য সব কিছু করতে পারে।সমাজে তখন অপরাধের পরিমান বেড়ে যায়।যারা নৈতিক ভাবে মৃত তাদের মত ভয়াভহ হয়ে না উঠলেও এরাও সমাজের জন্য ক্ষতিকর।এদের মাধ্যমে সন্ত্রাস,চোরাচালানী,ছিনতাই,মাদক ব্যবসার প্রসার ঘটে থাকে।

উন্নত ও সুখী জীবনের আশায় আমরা ভীষণ পরিশ্রম করি।বাড়ী গাড়ী টাকাপয়সা করি।ছেলে মেয়েকে ভালো স্কুল কলেজে পড়াই,ভালো পোষাক কিনে দেই।এসব করতে গিয়ে আমরা জীবিত থেকেও মৃত্যুবরণ করি।এই মৃত্যুকে আমরা বলতে পারি কর্পোরেট মৃত্যু।খুব ভোরে পরিবার যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন আমরা উঠেপড়ি অফিসের উদ্দেশ্যে।কিংবা হতে পারে আমরা যখন ঘুম থেকে উঠি তখন বাচ্চারা স্কুলে চলে যায় ফলে তাদের মুখ দেখা হয়না।তারপর আমরাও অফিসে ছুটি।সারাদিন কাজে ডুবে থাকি,উন্নতি করার লক্ষ্য নিয়ে আমরা প্রচুর কাজ করি।দায়িত্ব পালন করি।দিন শেষে রাত নামে আমরা ঘরে ফিরি ক্লান্ত হয়ে।কিন্তু যখন ঘরে ফিরিতখন দেখা যায় আমাদের বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়েছে।কিংবা তারা না ঘুমালেও আমরা এতোটাই ক্লান্ত থাকি যে তারা মনে করে ক্লান্ত মানুষটিকে একটু বিশ্রাম করতে দেই।এই ভেবে তারাকাছে আসে না কিংবা আমরাই ক্লান্ত থাকার দরুন তাদেরকে কাছে ঘেসতে দেইনা।

এতে করে আমাদের জীবন থেকে অনেক কিছু হারিয়ে যায়।উৎকর্ষতার নাম করে আমরা যা অর্জন করি তার চেয়ে হারাই অনেক বেশি।বাড়ি গাড়ি হলেও আমরা বাস্তবে সুখ খুজে পাই না।পরিবারের সাথে আমাদের সময় কাটানো হয়না।পছন্দ মত সিনেমা দেখতে পারিনা,ঘুরতে যেতে পারিনা,গল্প করতে পারিনা,পড়তে পারিনা।সন্তান ও পরিবার সামলাতে গিয়ে মেয়েরাও হয়তো একটু মনের মত সাজগোজও করতে পারে না।আর এভাবেই একদিন বাড়ি গাড়ী সম্পদের মালিক হতে হতে আমরা দৈহিক ভাবেও মৃত্যুবরণ করি।তার মানে হলো আমরা কর্মক্ষেত্রে নিজেদের উন্নতির কথা চিন্তা করে অবিরাম নিরলস ভাবে কাজ করতে গিয়ে কর্পোরেট মৃত্যুর শিকার হই। এসবের বাইরেও যে একটা জীবন থাকতে পারে তা আমরা কখনো বুঝতে চেষ্টা করিনা।আমরা কখনো কখনো নিজেদের উন্নয়নের কথা ভাবতে গিয়ে অন্যকে ঠকাই।অথচ দুদিনের জীবনে সাথে করে নিয়ে যাওয়া হবেনা তেমন কিছুই।দৈহিক মৃত্যুর আগেই আমরা এভাবেই প্রতিনিয়ত নানা ভাবে মৃতদের কাতারে নাম লেখাচ্ছি।

মানুষ যখন অন্ত্যিম মৃত্যু তথা দৈহিক ভাবে মৃত্যুবরণ করে তখন তার দ্বারা কারো ক্ষতি হয়না কিন্তু বাকি সব মৃত্যুই ব্যক্তি,সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়ায়।তাই আমি চাই জীবিত থেকেও নানারকম মৃতদের কাতারে শামিল না হয়ে বরং জীবনে একবারই মৃত্যুবরণ করি। যে মৃত্যুর নাম অন্ত্যিম যাত্রা।যখন আমাকে বিদায় জানাতে ব্যস্ত সারা পৃথিবী।

–জাজাফী
১৯ নভেম্বর ২০১৮

কচুরিপানার খাল

বিকেলে ফুটবল খেলতে গিয়ে রোজ একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতো কলেজে।এ ফর্মের কারো পা থেকে বল গিয়ে যদি কোন ভাবে ইকরামের পায়ে ঠেকতো তাহলে সেই চিরচেনা ঘটনা।বলকে কিছুক্ষন এ পা ও পা করে গোলপোষ্টের দিকে সজোরে লাথি মারতো।বল কোন কালেও গোলপোস্টে যেতো না বরং সেটা গোলবারের উপর দিয়ে উড়ে গিয়ে পড়তো পাশের খালের মাঝখানে।বিরক্ত লাগতো সবার।কচুরিপানায় ভর্তি খালে অসংখ্য জোঁক কিলবিল করতো।বল একবার সখানে পড়লে কে তুলে আনবে?দুমিনিটের জন্য খালে নামলে অন্তত দশটা জোঁক আটকে যেতো পায়ে।কেউ যখন যেতে রাজি নয় তখন দেখা যেতো ইকরাম স্বেচ্ছায় গিয়ে সেই কোমর সমান পানি থেকে গিয়ে বল কুড়িয়ে নিয়ে আসতো।অতটুকু সময়েই তার পায়ে চার পাঁচটা জোঁক লেগে যেতো।সে তখন খেলা থামিয়ে খালপাড়ে বসে বসে জোঁক ছড়াতো।ওপারে দেখা যেতো দুটো ছোট্ট মেয়ে আর একজন মা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে।তারা যেন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে একটা ছেলে পা থেকে জোঁক ছড়াচ্ছে।

প্রথম প্রথম কয়েকদিন মনে হয়েছে ইকরাম বোধহয় গোল করার জন্যই সজোরে গোলপোষ্টে বল মারতো কিন্তু কোন কারণে গোল হতো না।কিন্তু ঘটনাটা ছিল ভিন্ন কিছু সেটা টের পাওয়া গেলো এক বুধবার বিকেলে। এ ফর্ম বিফর্ম করে খেলা হতো।সেদিন এ ফর্ম পড়লো খালের সাইডে আর বি ফর্ম অন্য সাইডে।ইকরাম ছিলো এ ফর্মে কিন্তু সে খেলতে রাজি হলো না।সে চায় খালের বিপরীত সাইডে খেলতে।এর পর নিয়মে পরিণত হয়ে গেলো যেন।তখনো সেভাবে কিছু বুঝা যায়নি কিন্তু রোজই যখন খেলতে গিয়ে ইকরাম গোলপোষ্টের কাছে গিয়ে সজোরে বলে লাথি মারতো আর সেটা গিয়ে বরাবরের মতই পড়তো কচুরিপানার খালে তখন সবাই খুব বিরক্ত হতো।অথচ রোজকার মতই সে স্বেচ্ছায় জোকের কামড় সহ্য করে খাল থেকে বল কুড়িয়ে নিয়ে আসতো।ক্লাসের অন্যরা সবাই আশ্চর্য হয়ে দেখলো প্রতিদিনই ইকরাম একই কাজ করছে এবং সেই সময়ে খালপাড়ে সেই দুটো ছোট্ট মেয়ে আর তাদের মা দাড়িয়ে ওর দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ছে।সেই হাত নাড়ানো দেখে ইকরামের মুখে হাসি ফুটে উঠতো।জোকের কামড়ের যায়গা থেকে তখন রক্ত বের হলেও সে সেসবে গুরুত্ব দিতো না।

ছেলেটা বোধহয় কুমিরের রচনার গল্পটি জানতো।আর তাই রচনার সেই গল্পের মতই ঘটতো ওর ক্ষেত্রে।সেই যে একটা ছেলেকে টিচার যে রচনাই লিখতে দিতো সে সেটাতে কুমির টেনে আনতো অনেকটা সেরকম।তাকে যখন পলাশীর যুদ্ধের রচনা লিখতে দেওয়া হয়েছিল এই ভেবে যে অন্তত এই রচনাতে সে কুমির আনতে পারবে না তখন দেখা গেলো ছেলেটা ঠিকই লিখলো নবার সিরাজউদ্দৌলা মিরজাফরকে আশ্রয় দিয়ে খাল কেটে কুমির এনেছে।ইকরামও ঠিক সেরকমই করলো।যেখানে যে পজিশনেই তাকে খেলতে দেওয়া হোকনা কেন সে ঠিকই বলটাকে কচুরিপানার খালে পাঠাবেই।একসময় জানা গেলো মুলরহস্য।ওপারে দাড়িয়ে থাকা বাচ্চা মেয়েদুটি ছিলো ইকরামের বোন।আর তাদের সাথে দাড়িয়ে হাত নাড়া মহিলা ছিলেন ইকরামের মা।অন্যরা এটা জানার পর খুব আফসোস করতো।ইস ইকরাম কত সৌভাগ্যবান।রোজ বিকেলে মাকে বোনদেরকে দেখতে পায়।এ খাল ভরা বর্ষায় উপচে পড়তো; আর হিম শীতে তার পানি হতো কোমর পর্যন্ত। প্রিন্সিপাল স্যারের বাড়ির পিছের অংশের পানি বেশ গভীর ছিল। এই খালের শীতল পানিতে নেমে ইকরামদের সাতার চলতো অবিরাম।দুইধারের দুই বাসিন্দাদের মধ্যে চোখাচোখি হতো কথা হতো ইশারায়।এতো কাছে থেকেও এতো দূরে।কচুরিপানারা তখন ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে দেখতো।পুবোন বাতাসে কচুরিপাতা নড়তো সেই সাথে নড়ে উঠতো মায়ের মন।ব্যাকুল হয়ে তাকিয়ে থাকতো ছেলের দিকে।ছেলে তখন আচল ছোয়া দূরত্বে থেকেও অধরা।পিটির আগে দৌড়ে চলে যেতো খালপাড়ে যদি মায়ের সাথে দেখা হয়।

এর পর কেটে গেছে অনেক বছর।পুরোনো সেই খাল এখনো আছে আগের চেয়ে বদলে গেছে ঢের।পুরোনো সেই মানুষগুলো নেই।খালের একপাশে এখন মা তার সন্তানকে দেখবে বলে দাড়িয়ে থাকে না।তিনি থাকেন আরো দূরে নক্ষত্র ভরা আকাশে।তাকিয়ে থাকেন সন্তানের দিকে। ইকরামও এখন আর সেই খালপাড়ে বসে পায়ে লেগে থাকা জোক ছড়াতে ছড়াতে মা বোনকে দেখতে পায়না।সে বরং ভরা পুর্নিমার রাতে আকাশের পানে তাকিয়ে দেখে ওইতো দূর নক্ষত্র মাঝে জ্বলজ্বল করে জ্বলে থাকা তারাটিই বুঝি মা।ইকরামের তখন মনে হয় দূর আকাশে তারা হয়ে জ্বলে থাকা মা আর মাটির পৃথিবীতে বসে থাকা ছেলের মাঝে যে দুরত্ব তা বুঝি সেই কচুরিপানার খালের মতই।দূরত্ব যতটুকুই হোক সেটা অধরাই রয়ে গেছে।যেমন অধরা ছিলো খাকিচত্বরের সেই কচুরিপানার খাল পাড়ে দাড়ানো প্রিয়জন।ইকরামের মনেও পড়েনা কেউ কোন দিন ওই খালটির কোন নাম দিয়েছিলো।ইকরামের খুব ইচ্ছে করে মায়ের স্মৃতিকে স্মরণ করে ওই খালের একটা নাম দিবে।কি নাম দিবে সে ভাবতে থাকে।তার মন বলে খালটির নাম হতে পারে মাতৃস্নেহ।কেননা নিয়মের বেড়াজালে আটকা পড়লেও সে ওই খালপাড়ে গেলে মাতৃস্নেহ খুঁজে পেতো।আকাশের দিকে তাকিয়ে ইকরাম একথা যখন ভাবছিল তখন একটা তারা তার সমস্ত আলো নিয়ে একবার জ্বলে উঠলো।ইকরামের মনে হলো মা বুঝি এ কথায় সম্মতি দিচ্ছে।

১৮ নভেম্বর ২০১৮

টেরোরিষ্ট

ওয়াশিংটন ডিসির ব্যস্ত রাস্তার ফুটপাত ধরে অনেক মানুষ নিজ নিজ গন্তব্যের পথে অবিরাম হেটে চলেছে।সবাই ভীষণ ব্যস্ত।বলতে গেলে তখনো শহরের ঘুম ভাঙ্গেনি অথচ মানুষ ছুটছে তার কর্মস্থলে।সে জন্যই বলা হয়ে থাকে নিউইয়র্ক আর ওয়াশিংটন শহর কখনো ঘুমায় না।পথে যেতে যেতেই হয়তো কেউ কেউ সেরে নিচ্ছে জরুরী যোগাযোগ।অনেকে কানে মোবাইল ধরে কথা বলছে আর হাটছে।কেউ কেউ প্রাতরাশ সেরে বাসায় ফিরছে কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনতে শুনতে।সেই সব পথচারিদের মধ্যে শেহজাদও আছে।শেহজাদ হাওয়ার্ড ইউনিভার্সিটিতে পোষ্টগ্রাজুয়েট করছে।ওয়াশিংটন ডিসিতে মেরিডিয়ান হিল পার্ক নামে যে পার্কটি আছে রোজ সকালে অন্য অনেকের মত শেহজাদও ওখানে হাটতে যায়।এটা ওর নিত্যদিনের রুটিনে পরিণত হয়েছে।বাসায় ফিরে গোসল করে বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে।সাধারণত ব্রেকফাষ্ট সে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যান্টিনেই করে থাকে।

একাকী এই শহরে ক্যান্টিনের মত অনায়াসে খাবার পাওয়া তার জন্য কষ্টকর।বাইরের ক্যাফেগুলোতে যে খাবার পাওয়া যায় তার দাম অনেক।স্কলারশীপের টাকায় পড়তে এসে সব যদি খাবারের পিছনে ব্যয় করতে হয় তাহলে কি করে চলবে ভেবে সে বরাবরই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যান্টিনকে প্রধান্য দেয়।পথে যেতে যেতে শেহজাদের মনে পড়ে বাবার কথা,মায়ের কথা আর একমাত্র আদরের বোন মিফরার কথা।যে শহরে সে জন্মেছিল তা আজ আর শহর নেই।হয়তো শহর ছিলোনা কোন কালেও।সে এক আজব শহর।যে শহরের রাস্তায় রাস্তায় পাগলা কুকুর ঘুরে বেড়ায় এবং মানুষ দেখলেই কামড়ে দিতে চায়। সেই সব কুকুরদের সাথে ওরা জন্ম থেকেই লড়াই করছে।সে লড়াই যেন কোন দিন থামবে না।সব থেকে ভয় হয় মিফরাকে নিয়ে।একমাত্র বোনটাকে সে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসে।বাবা মা আর বোনকে ফেলে এই দূর দেশে পড়তে আসতেও তার ভালো লাগেনি কিন্তু না পড়লেওতো চলবে না ভেবেই সে এসেছে।

একদিন দুদিন পর পর মিফরার সাথে ওর কথা বলতে ইচ্ছে করে কিন্তু কথা বলা হয়ে ওঠেনা।যে খরচ তা সে কুলিয়ে উঠতে পারে না।পরিকল্পনা করে তাই মাসে একবার করে কথা বলে।বোনটা যেন ফোন রাখতেই চায় না।সারা মাসে জমে থাকা সব কথা সে তার ভাইকে বলবেই।শেহজাদেরও ভালো লাগে।বোনের সাথে কথা বলার মত আনন্দ সে আর কিছুতে পায় না।শেহজাদ স্বপ্ন দেখ এমন একটি ভুবনের যেখানে তার বোন আনন্দে হেসে খেলে বেড়াবে। রাস্তায় চলতে গিয়ে কারো কোন অসুবিধা হবে না।আকাশে অনবরত বোমারু বিমান ঘুরে বেড়াবে না।ডোরাকাটা পোশাকের সেনাবাহিনীর সদস্যরা ভারি অস্ত্র নিয়ে তাড়া করবে না।এই স্বপ্ন তার পুবর্পুরুষেরাও দেখেছে।সেই স্বপ্নের বীজ একটু একটু করে বংশপরম্পরায় শেহজাদের মধ্যেই অঙ্কুরিত হয়েছে।কিন্তু শুধু বীজ অঙ্কুরিত হলেইতো হবে না সেটিকে পরিচর্যা করার সুযোগ থাকতে হবে। শেহজাদ কিংবা তার মত অগণিত মানুষ সেই সুযোগ বঞ্চিত।পাগলা কুকুরেরা তাদের পিছনে রাত দিন ধাওয়া করে।তাদের সাথে লড়াই করে কোন মত ওরা বেচে আছে।বিশ্বের আর কেউ সেই সব পাগলা কুকুরের বিরুদ্ধে হাতিয়ার তুলে নেয় না।শেহজাদেরা তাই নিরুপায়।

মেরিডিয়ান হিলপার্ক থেকে বেরিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে হাটছে শেহজাদ।চারদিকে নজর রাখছে।এ শহরটা তার বেশ ভালোই লাগে।কোথাও কোন অরাজকতা নেই,সবাই নিয়মের মধ্যে চলছে।

হঠাৎ শোরগোল উঠলো।মানুষ ছোটাছুটি শুরু করলো।শেহজাদ প্রথমে কিছু বুঝে উঠতে পারলো না।কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতেই সে দেখতে পেলো সত্যিকারের একটা পাগলা কুকুর মানুষকে তাড়া করছে।এই কুকুর আর শেহজাদের শহরের কুকুর আলাদা।এই কুকুর তার দাত ও নখ দিয়ে কামড়ে দিতে চায় কিন্তু শেহজাদের শহরের কুকুরেরা আগ্নেয়াস্ত্র হাতে ধেয়ে আসে। শেহজাদ দেখতে পায় রাস্তা ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে।শান্ত শহরটা মুহুর্তে সেই পাগলা কুকুরের ভয়ে ভীত হয়ে পড়েছে।কুকুরটা যাকে পাচ্ছে তাকেই কামড়ে দিতে চেষ্টা করছে।কেউ কেউ ৯১১ এ ফোন করে সাহায্য চাইছে। শেহজাদ জানেনা ঠিক কতক্ষণের মধ্যে পুলিশ আসবে আর কুকুরটাকে আটক করবে।সব থেকে নিষ্ঠুর দৃশ্য দেখলো শেহজাদ।এক মা তার তিন বছরের মেয়েকে ফেলে রেখেই ছুটে পালাচ্ছে কুকুরের ভয়ে।মেয়েটা ভয়ে কেদে উঠলো।সম্ভবত বিপদের আশংকা তার মনেও ছিলো।সেও হয়তো কুকুরটাকে দেখে ভয়ে শিউরে উঠেছিল।ওই বয়সেও সে বুঝতে পেরেছিল পাগলা কুকুরটা তাকেও কামড়ে দিবে।

শেহজাদের মনে পড়ে যায় মুঘল সম্রাট জহিরুদ্দিন মুহাম্মদ বাবরের কথা।একবার তিনি ভ্রমনে বেরিয়েছিলেন।হঠাৎ শহরের রাস্তায় এক পাগলা হাতি ছুটে আসলো।ভয়ে যে যেদিকে পারে ছুটে পালালো।রাস্তায় পড়ে রইলো এক মেথরের ছেলে।ছদ্মবেশী সম্রাট বাবর দেখলো পাগলা হাতিটি বাচ্চাটিকে পিষে মেরে ফেলবে।তিনি জীবনের ঝুকি নিয়ে হাতির আঘাত সহ্য করে বাচ্চাটিকে বাঁচালেন।তখন আশেপাশের অনেকেই বললো তুমিকি পাগল নাকি?একটা মেথরের ছেলেকে বাঁচানোর জন্য নিজের জীবন দিতে চলেছিলে।তুমিকি বেওকুব নাকি!ছদ্মবেশী সম্রাট বাবুর তাদের ওই সব কথায় কান দেননি।তিনি বিপদের দিনে একটি শিশুকে উদ্ধার করেছেন এটাই অনেক বড় ব্যাপার।শেহজাদ সম্বিত ফিরে পেলো।সে দেখতে পেলো বাচ্চা মেয়েটি ভয়ে চিৎকার করে কাদছে।আসে পাশে অনেক মানুষ ছোটাছুটি করছে কিন্তু কেউ ওকে নিতে এগিয়ে আসছে না।পাগলা কুকুরটা ক্রমেই ওর কাছে চলে আসছে।শেহজাদ নামের পচিশ বছরের যুবকটি এক দৌড়ে বাচ্চাটির কাছে পৌছে গেলো।চিল যেমন ছো মেরে শিকার ধরে আকাশে উড়ে যায় শেহজাদ অনেকটা সেভাবেই বাচ্চাটিকে কোলে তুলে নিলো।এক দৌড়ে রাস্তার ধারে দেয়ালের কাছে চলে গেলো।পাগলা কুকুরটিও তখন ওর পিছনে ধাওয়া করলো।শেহজাদ বাচ্চাটিকে দেয়ালের উপর বসিয়ে দিয়ে ফিরে তাকালো কুকুরটির দিকে।তার পর সুযোগ বুঝে কুকুরটিকে লাথি মেরে ফেলে দিলো।এর পর কুকুরটিকে আর কোন সুযোগ দিলো না।সে কয়েক দফা লাথি মেরে কুকুরটিকে ঘায়েল করে ফেললো।কয়েক মিনিটের মধ্যেই কুকুরটি নিস্তেজ হয়ে পড়লো এবং মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো।

বিচিত্র এই পৃথিবী আরো একবার কাছ থেকে দেখার সুযোগ হলো শেহজাদের।কিছুক্ষণ আগে যে পাগলা কুকুরটির ভয়ে সবাই পড়িমরি করে পালিয়ে যাচ্ছিলো তারাই সবাই একে একে এসে জড় হতে লাগলো।শহরে পাগলা কুকুর নেমেছে এই সংবাদ আগেই ছড়িয়ে পড়েছিলো সুতরাং আসেপাশে সাংবাদিকেরাও চলে এসেছিল।তারা যখন দেখলো এক যুবক পাগলা কুকুরটিকে মেরে পরিবেশ শান্ত করেছে তখন তারা নির্ভয়ে ফিরে এলো।শেহজাদকে ঘিরে তখন হাজারো জনতা।সবাই তাকে বাহবা দিতে লাগলো।সিএনএন এর সাংবাদিক রডরিক মায়ার ভিড় ঠেলে শেহজাদের সামনে এসে দাড়ালো।সে তখনো হাপাচ্ছে। দেখেই বুঝা যায় সে নিশ্চই বেশ দৌড়েছে।কিছুটা ধাতস্থ হয়ে সে বললো আপনার সাহস আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা।আপনি যেভাবে পাগলা কুকুরটির সাথে লড়াই করে বাচ্চাটিকে রক্ষা করেছেন পাশাপাশি সবাইকে ভয় থেকে বাচিয়েছেন তাতে আপনাকে নিয়ে আমাদের গর্ব হয়।আমি সিএনএন থেকে এসেছি।আমরা চাই আপনাকে নিয়ে একটি প্রতিবেদন করবো সিএনএন এ।আপনার নাম কি বলুন? আমরা আপনার নাম সহ প্রতিবেদন করবো “দুঃসাহসী এক আমেরিকান যুবক কর্তৃক পাগলা কুকুরের হাত থেকে এক শিশুর প্রাণ রক্ষা পেলো”।চারদিকে ধন্য ধন্য পড়ে যাবে।আপনার মত আমেরিকানদের জন্যই আমেরিকা আজ বিশ্বে সব থেকে শক্তিশালী হতে পেরেছে।আপনারাই স্বপ্নের বীজ বুনে দিয়েছেন “উই উইল মেক আমেরিকা গ্রেট”

শেহজাদ চুপ করে সিএনএন এর সাংবাদিক রডরিক মায়ারের কথা শুনছিলো।সে থামলে শেহজাদ বললো:  আমি আমেরিকান নই! আমি ফিলিস্তিনি।আর আমরাতো জন্ম থেকেই কুকুরদের সাথেই লড়াই করে আসছি। সুতরাং এমন পাগলা কুকুরের সাথে লড়াই করাটা আমাদের জন্য কঠিন কিছু না”। রডরিক মায়ার খসখস করে নোটবুকে কিছু লিখে নিলেন।শেহজাদের ওসবে মন নেই।সে দেখলো রডরিকের সাথে আসা ক্যামেরাম্যান ওর কিছু ছবিও তুলে নিলো।মুহুর্তেই ভীড় কমে গেলো।যে যার বাসায় ফিরে গেলো।শেহজাদও ফিরলো।গোসল করে বেরিয়ে পড়লো বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্দেশ্যে।ডক্টর রুথাব আজ একটা গুরুত্বপুর্ন ক্লাস নিবেন বলে ও একটু আগে আগেই বেরিয়েছে।ক্যাফেটেরিয়াতে বসে নাস্তা খেতে খেতে টিভিতে সকালের সংবাদটাও দেখে নেওয়া যাবে। বিশেষ করে ফিলিস্তিনের সংবাদ জানতে খুব ইচ্ছে করে।বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাফেটেরিয়াতে বসে সকালের নাস্তা খেতে খেতে টেলিভিশনের দিকে তাকালো।তখন সংবাদ শুরু হবে। ব্রেকিং নিউজে চোখ আটকে গেলো শেহাদের।সিএনএন নিউজ করেছে “মুসলিম টেরোরিষ্টদের হাত থেকে রক্ষা পাচ্ছে না অবুঝ পশুরাও! এবার ওয়াশিংটন ডিসির ব্যস্ত সড়কে খুন হলো এক নিরীহ কুকুর!!” ব্রেকং নিউজের শিরোনামের সাথে সাথে শেহজাদের একটি ছবিও দেখানো হচ্ছে।

নাস্তা শেষ করা হলো না।মনটাই খারাপ হয়ে গেলো।কিছুক্ষণের মধ্যেই নিশ্চই আমেরিকান পুলিশ তাকে গ্রেফতার করবে।তার পর যে অধ্যায়ের মধ্য দিয়ে তাকে যেতে হবে মনে মনে সেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করলো শেহজাদ।ইচ্ছে করছে ইয়োলোস্টোন ন্যাশনাল পার্কে উদ্ভ্রান্তের মত হাটবে।মনে পড়ছে বাবা মাকে।মনে পড়ছে একমাত্র বোন মিফরাকে।কুকুরদের আঘাতে যদি বাড়ির টিভিটা ভেঙ্গে না গিয়ে থাকে তবে মিফরাও কি এই সংবাদটা দেখবে না?আর কি কোন দিন দুই ভাই বোনের দেখা হবে না?শেহজাদ এসব ভাবছে আর হাটছে।অবাক বিস্ময়ে সে হতবাক হয়ে গেছে।কয়েক মুহুর্ত আগে যে মানুষটি তার ভালো কাজের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলো সেই মানুষটিই তাকে টেরোরিষ্ট বানিয়ে দিয়েছে।মুসলিমদের জন্য টেরোরিষ্ট শব্দটা যেন পদ পদবীর মত হয়ে গেছে।শেহজাদের খুব আফসোস হয়।নিজ বাসভূমি ফিলিস্তিনে তারা নিরাপদ নয়,বিশ্বের কোথাও তারা নিরাপদ নয়।তারা মুসলিম,তাদের নামের আগে আমেরিকানরা টেরোরিষ্ট শব্দটি ব্যবহার করতে ভালোবাসে।মোবাইলটা বের করে একমাত্র বোন মিফরার সাথে কথা বলবে বলে মনস্থির করে।মোবাইল স্ক্রীনে নিজের চেহারাটাই ভেসে ওঠে।সে মনে মনে ভাবে যাকে দেখছি সে নাকি টেরোরিষ্ট!

৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৮

জাজাফী

ছোটবোনের মেহমানদারী

জেএসসি পরীক্ষার পর বেশ লম্বা ছুটি আমার হাতে।সারাদিন টিভি দেখা,ঘুরতে যাওয়া,গেমস খেলার পরও আমি চেষ্টা করি কিছুটা পড়াশোনা করতে।গল্পের বই বেশি পড়ছি তবে ক্লাস নাইনের বইও সংগ্রহ করে পড়তে চেষ্টা করছি।আবার কখনো কখনো কোন কিছুই পড়তে ইচ্ছে করেনা। এই যেমন আজকে।পড়ার টেবিলে বসে আছি কিন্তু পড়ায় মন বসছে না। অনেকক্ষণ ধরে তাই কলম নিয়ে আঁকিবুকি করছি।ওদিকে বাসায় মেহমান এসেছে।মেহমান বলতে আমার আম্মুর কলিগেরা এসেছে সাথে তাদের বাচ্চাকাচ্চা।আম্মু এর মাঝেই আমাকে দুবার ডাক দিয়ে বলেছেন শঙ্খনীল ড্রয়িংরুমে যাও মেহমানদের সাথে গল্প করো।আমি যাইনি।আম্মু নিশ্চই এ জন্য আমাকে বকবে তারপরও কেন যেন যেতে ইচ্ছে করেনি।আমার একটা পিচ্চি বোন আছে।আমার নাম নীল তাই আম্মু আমার নামের সাথে মিলিয়ে ওর নাম রেখেছিল নীলাঞ্জনা।আমি অবশ্য নীলাঞ্জনাকে ছোট্ট করে নীলা বলে ডাকি।সবাই যেমন আমার নাম শঙ্খনীল হলেও ছোট করে নীল ডাকে ঠিক তেমনি।

আম্মু ডাকার পরও যখন আমি মেহমানদের সামনে যাইনি তখন আমার আদরের বোনটাকে আম্মু বলেছে দেখোতো তোমার ভাইয়া কি করছে? আমি যখন খাতায় এলোমেলো আকিবুকি করছি এমন সময় আমার পিচ্চি বোনটা এসে বললো ভাইয়া ভাইয়া তোমার কাছে ক্রিম আছে? আমি বললাম হ্যা আছে কিন্তু ক্রিম কি করবা? সে বললো মেহমান আসছে তাই ক্রিম লাগবে! আমি বললাম মেহমান আসলে ক্রিম কেন লাগবে? মেহমান ক্রিম দিয়ে কি করবে? সে তখন বললো আরে বোকা ভাইয়া তুমি কি জানো না মেহমানকে নাস্তা দিতে হয়।আমি বললাম আরে জ্ঞানী আপু তুমি বলো মেহমানকে নাস্তা দিতে হলে ক্রিম কেন লাগবে?আমাদের নীলা তখন বললো ভাইয়া মেহমানকে নাস্তা দেব কিন্তু দেখলাম যে বিস্কুট দেব সেটাতে ক্রিম নেই। ওদিকে আম্মু বলেছে বয়াম থেকে ক্রিমওয়ালা বিস্কুট দিতে! তাই তোমার কাছে আসলাম ক্রিম নিতে যেন বিস্কুটে ক্রিম লাগিয়ে দিতে পারি। বুঝতেই পারছো প্রেসটিজের ব্যাপার বিশেষ করে আম্মুর কলিগেরা এসেছে সাথে তাদের বাচ্চাকাচ্চা। ক্রিমছাড়া বিস্কুট কি মেহমানকে দেওয়া যায়?এতে আম্মুর প্রেসটিজ থাকবে। সবাই বলবে লিপির বাসায় গিয়েছিলাম আর আমাদেরকে নাস্তার সময় ক্রিমছাড়া বিস্কুট দিয়েছে! আমি মুখটাতে গাম্ভীর্য এনে বললাম তুমিতো ঠিকই বলেছ,আম্মুর কলিগদেরকে কি আর ক্রিম ছাড়া বিস্কুট দেওয়া যায়।

আজ আমার মাথায় দুষ্টুমী ভর করলো।নীল যদি নীলাকাশে পাখি হয়ে ইচ্ছেমত ডানাই না মেলতে পারে তাহলে আর শঙ্খনীল হয়ে লাভ কী! ভাবলাম আজ না হয় একটু দুষ্টুমী করাই যাক!আমি টেবিল থেকে ক্রিমের কৌটোটা ওর হাতে দিয়ে দিলাম।তবে ওকে বললাম এই ক্রিমতো মিষ্টি লাগবে না তাহলে?নীলা বললো তুমি চিন্তা করোনা ভাইয়া আমি ক্রিমে ফ্লেভার আনার জন্য চিনি মিশিয়ে দেব।এর পর আমি অপেক্ষায় থাকলাম ওদিকে কি রিঅ্যাকশান হয় সেটা দেখার জন্য।জানি ধরা পড়লে নীলাঞ্জনা আম্মুকে সব বলে দেবে আর আম্মু আমাকে ধরবে।

আম্মু রান্না ঘরে ব্যস্ত আর নীলা একাএকাই মেহমানদের নাস্তা দিচ্ছে।এইটুকু পিচ্চি হলে কি হবে খুবই অতিথিপরায়ণ।তার আতিথেয়তায় সবাই খুব মুগ্ধ।এতোটাই মুগ্ধ যে মুখে নেওয়া ক্রিমলাগানো বিস্কুট খুব তৃপ্তিসহকারে খেয়েছে কিন্তু কিচ্ছু টের পায়নি!আমি আমার বোনকে মনে মনে বাহবা দিয়েছি।ও নিশ্চই এমন ভাবে চিনির ফ্লেভার তৈরি করেছে যে মেহমানরা বুঝতেই পারেনি তারা যে ক্রিম খাচ্ছে তা মুখে নেওয়া ক্রিম।পরদিন আম্মু অফিসে গেলে সব কলিগেরাই বিস্কুটের প্রশংসা করে বলেছে বিস্কুটের ক্রিমটা খুব সেন্টওয়ালা ছিল এবং টেষ্টও আনকমন ছিল।তবে রাতে একটু পেটে সমস্যা হচ্ছিল সবারই।বিস্কুটের ক্রিম এবং সেন্ট এই দুটি কথা আম্মুর কানে বেজেছে।খটকাও লেগেছে কিন্তু সাংবাদিক হওয়ায় আম্মু বিষয়টা চেপে গেছে।বাসায় ফিরে সবার আগে আম্মু ড্রয়িংরুমে বসে নীলাঞ্জনাকে পাশে বসিয়ে বিস্কুটের ক্রিমের বিষয়ে জানতে চাইছে।আম্মু যে মেহমানদের ক্রিমওয়ালা বিস্কুট দিতে বলেছিল! তখন নীলা বলেছে আসলে আম্মু হয়েছে কি তুমিতো আমাকে ক্রিমওয়ালা বিস্কুট দিতে বলেছিলে কিন্তু সেই সব বিস্কুটতো আমি আর ভাইয়া আগেই খেয়ে ফেলেছিলাম।পরে তুমি যখন ক্রিমওয়ালা বিস্কুট দিতে বললে তখন ভাবলাম এখন ক্রিমওয়ালা বিস্কুট কোথায় পাই?শেষে বুদ্ধি করে ভাইয়ার কাছ থেকে মুখে লাগানো ক্রিম নিয়ে তাতে চিনি মিশিয়ে নতুন ফ্লেভার বানিয়ে মেহমানদের দিয়েছি।তারাতো খুবই পছন্দ করেছে কিন্তু বুঝতে পারেনি!

নীলাঞ্জনার কথা শুনে আম্মু প্রথমে হো হো করে হেসেছে তার পর আমাকে ডেকেছে নীল এইদিকে আসো।আমিতো আম্মুর কথা শুনেই বুঝতে পারছি কি ঘটতে চলেছে।আমার কানের দিকে তাকিয়ে দেখলে যে কেউ বুঝতে পারবে আম্মু কি করেছিল।ছোটবোনের মেহমানদারীর স্মৃতি চিহ্ন এখনো আমার কানে লেগে আছে।কানদুটো বেশ লাল হয়ে গেছে।

২২ জানুয়ারি ২০১৮

ইরেজার

জাজাফীর মন ভালো নেই।শাহ মখদুম হল থেকে বেরিয়ে হাটতে হাটতে বঙ্গবন্ধু হলের সামনে দিয়ে শামছুজ্জোহার সমাধি পেরিয়ে সে তখন একাকী হাটছে প্যারীস রোডে।কোন কিছুই তার ভালো লাগছে না।সোডিয়াম বাতির মোহনীয় আলো তার মনকে আরো ভারাক্রান্ত করে তুলেছে।অন্য দিনের মত আজ আর সে তাপসী রাবেয়া হলের দিকে হাটছে না।ওদিকে যাবার সব গুলো রাস্তা বোধহয় গতকালই বন্ধ হয়ে গেছে। এখন তার গন্তব্য শাহেব বাজার।এই পথটুকু হেটে কাজলা গেটে গিয়ে রাস্তা পার হবে তার পর রিকশা নিয়ে চলে যাবে সাহেব বাজার।

কাজলা গেট পার হতেই একটা রিকশা পেয়ে গেলো।রিকশায় একজন যাত্রী ছিলো সে ওখানেই নামলো।রিকশাওয়ালা জানতে চাইলো কোথায় যাবেন? জাজাফী বললো সাহেব বাজার চলুন।রিকশায় চড়তেই রিকশা চলতে শুরু করলো।কাজলা গেট পেরিয়ে রুয়েট পেরিয়ে রিকশা চলছে সাহেব বাজারে।কিছু একটা কিনতে হবে সে জন্যই ওদিকে যাওয়া।কি কিনতে হবে মনে করতে চেষ্টা করলো জাজাফী। খানিকটা ভাবার পর মনে পড়লো একটা ইরেজার কিনতে হবে।এদিকে অনেক দোকান থাকলেও সেরকম ভালো মানের ইরেজার সে পায়নি।অগত্যা যেতে হলো সাহেব বাজার।রিকশা ভাড়া মিটিয়ে বড় লাইব্রেরীতে গিয়ে দাড়ালো সে।দোকানী জানতে চাইলো কি লাগবে? জাজাফী বললো ভালো ইরেজার হবে?দোকানদার ছেলেটা বেশ কিছু ইরেজার দেখালো।দেখতে বেশ চমৎকার কিন্তু কোনটাই পছন্দ হলো না জাজাফীর।

তার এমন ভাব দেখে দোকানদার জানতে চাইলো এগুলোতো সেরা ইরেজার।যে কোনটাই নিয়ে যেতে পারেন।জাজাফী মাথা দোলালো।তার মানে এগুলো দিয়ে তার কাজ হবে না।দোকানী জানতে চাইলো কি মুছবেন ইরেজার দিয়ে?এগুলো দিয়েতো পেন্সিলের দাগ এমনকি কলমের দাগও মুছতে পারবেন।জাজাফীর কোন ভাবান্তর হলো না।অমোচনীয় কালি মুছা যাবে এমন কোন কিছু কি লাগবে?দোকানী জানতে চাইলে জাজাফী মাথা নেড়ে সায় দিলো।এবার দোকানী একটা লিকুইডের বোতল দিলেন।সেটার গায়ে লেখা রিডিউসার।দোকানী জানালো এটি দিয়ে যে কোন লেখা যে কোন কিছু মুছে ফেলতে পারবেন।বোতলটা হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখলো জাজাফী। তার পর জানতে চাইলো এটি দিয়ে কি সেই মেয়েটির নাম মুছে ফেলা যাবে যার নাম আমার হৃদয়ে লিখেছি!গতকাল সে আমাকে বলেছে আমি যেন তার নাম মুছে ফেলি হৃদয় থেকে।

দোকানদার ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলো। তার চোখটা কেন যেন ঝাপসা হয়ে গেলো।সে দেখতে পেলো জাজাফী নামের ছেলেটি তার দোকান থেকে খালিহাতে ফিরছে।হৃদয়ে লেখা প্রিয়তমার নাম মুছে ফেলার মত ইরেজার খুঁজতে খুঁজতে নিশ্চই জাজাফীর বাকি জীবন কেটে যাবে।তার পর একদিন নিজেই ইরেজ হয়ে যাবে পৃথিবী থেকে।

গল্পঃ ইরেজার
লেখাঃ জাজাফী
৩০ অক্টোবর ২০১৮

চারিত্রিক সনদপত্র ও অন্যান্য

বিকেল গুলো এখন বিষন্ন হয়ে উঠেছে।রাত জেগে ফেসবুক ইউটিউবে ঘুরাঘুরি করে সকালে ঘুমোতে গেলে ঘুম ভাঙে দুপুরে।যতক্ষণ ঘুমিয়ে থাকি কোন চিন্তা নেই কিন্তু বিকেল যেন আর কাটতেই চায় না।কি করে কাটবে?একাকী এই শহরে ঘুরে বেড়াতে কার বা ভালো লাগে।যখন আমার অখন্ড অবসর তখন বন্ধুরা ব্যাচমেটরা সব অফিসে নিজের ক্যারিয়ার আর কাজ নিয়ে ব্যস্ত।শুধু আমরাই কোন কাজ নেই।পাশ করে বের হয়ে একটা কাজের জন্য কত চেষ্টা করেছি কিন্তু কাজ আর মেলেনি।এখন তাই অবসরযাপন করছি।বন্ধুরা অফিস থেকে ফিরে রাতে ফেসবুকে বসলে আড্ডা চলে।সকালে ওরা সব যে যার অফিসে চলে গেলে আমার যেহেতু কিছু করার থাকেনা তাই আমি ঘুমাই।বড়ভাইদের কাছে সিভি দিয়ে রেখেছি।সিভি দিতে দিতে আমি ক্লান্ত হলেও সিভি দেওয়া থামাইনি।এমনকি একটা পযার্য়ে গিয়ে ছোটভাইদেরকেও সিভি দিতে শুরু করলাম।

ফোনে টাকা থাকেনা বলে সব সময় সবাইকে ফোন করতে পারিনা।রাতে অবশ্য অনেকের সাথে মেসেঞ্জার বা ভাইবারে কথা হয়।ফোনে টাকা থাকুক চাই না থাকুক ইন্টারনেট চালাতে পারি বিশেষ করে বাসায় থাকাকালীন।দোতলায় থাকে রিমুরা।ওদের ওয়াইফাই নেটওয়ার্ক আমার রুমেও খানিকটা আসে।একদিন ও যখন স্কুল থেকে বাসায় ফিরছিলো তখন ওকে বললাম এই রিমু আমাকে একটু হেল্প করবি? ও বললো ভাইয়া তুমিতো বড় মানুষ তোমার আবার হেল্প লাগবে কেন?তাছাড়া আমার মত পুচকে তোমাকে কি এমন হেল্প করতে পারবে?আমি আসলে মনে মনে ফন্দি এটেছিলাম কারণ এ ছাড়া আমারতো আর কোন উপায় ছিলো না।আমি রিমুকে বল্লাম জানিস আমি না ভীষণ একটা গাধা।আমার কথা শুনে রিমু আমার মুখেরদিকে তাকিয়ে বললো এইটা তুমি অবশ্য ঠিকই বলেছো।তোমার চেহারার মধ্যে একটু গাধাগাধা ভাব আছে।

বিষয়টা আমাকে বেশ ভাবালো।আমি প্রশ্ন করলাম তুই কি করে বুঝলি আমার চেহারার মধ্যে গাধাগাধা ভাব আছে।রিমু বললো এটা আমার কথা নয় এটা প্রতীতি আপু বলেছে।প্রতীতি হলো রিমুর বড় বোন।বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে।আমার সাথে কথা হয়না।অতো সুন্দরী মেয়েদের সাথে কথা বলতে আমার ভয় হয়।কিংবা বলা চলে লজ্জাও হয়।আমি এমনকি আড়চোখে তাকাইও না।এক দুবার তাকে দেখেছি এবং সমস্যা হলো তার দিকে তাকালে চোখ ফেরানো যায় না।ওসব চিন্তা বাদ দিয়ে যে ফন্দি করেছি সেটা হাছিলে মন দিলাম। আমি বললাম রিমু সত্যি বলছি আমাকে একটু হেল্প করতে হবে।রিমু এবার সিরিয়াস ভাবে জানতে চাইলে ভাইটু অতো ভনিতা না করে সোজা বলো কি করতে হবে?তবে হ্যা তুমি যদি কোন চিঠিফিটি লিখে আমার হাতে দিয়ে বলো এটা প্রতীতি আপুকে দিতে হবে তাহলে কিন্তু পারবো না।

আমি বললাম খুব পাকা পেকেছিস দেখি।আরে ওসব কিছু না।রিমু বললো ওসব কিছু না তাহলে কি?তুমি যে বললে হেল্প লাগবে।আমার মত গিনিপিগের হেল্প লাগবে তোমার মত জলহস্তির এটা ভাবা যায়?রিমুর সাথে আমার দারুন বন্ধুত্ব।ক্লাস সেভেনে উঠেছে সে।রাজউকে পড়ে।আমি রিমুদের বাসায় ভাড়া থাকি।ভাড়া বাকি পড়েছে বেশ ক মাসের।জানিনা যে কোন সময় ঘর থেকে বের করে দেবে কিনা।অবশ্য রিমুকে রিকোয়েস্ট করে তখন কিছু একটা করা যাবে।আমি রিমুকে বললাম জানিস আমি না ঠিক জানিনা কিভাবে মোবাইলে ওয়াইফাই কানেক্ট করতে হয়! তোরাতো ওয়াইফাই ব্যবহার করিস আমাকে শিখিয়ে দিবি কিভাবে ওয়াইফাই কানেক্ট করে?রিমু আমার হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে সার্চ দিলো।সবার আগে রিমুদের নেটওয়ার্ক আসলো।রিমু তখন ওটাতেই পাসওয়ার্ড দিয়ে কানেক্ট করে দেখিয়ে বললো এইতো এভাবে করতে হয়।মোবাইলে ও পাসওয়ার্ড দেওয়ার সাথে সাথে ওর হাত থেকে মোবাইল নিয়ে অটো সেভ দিয়ে দিলাম যেন পাসওয়ার্ডটা থেকে যায়।তারপর রিমুর হাতে আবার মোবাইলটা ফিরিয়ে দিতে দিতে বললাম ও তাই এতো দেখি বেশ সোজা আর আমি দেখ কত বড় গাধা যে এটাও বুঝতে পারিনি।রিমু মাথা দোলাতে দোলাতে বাসায় চলে গেলো।সেই থেকে আমি ফ্রিতে ওয়াইফাই চালাই।রাতে বাসায় থাকলে সেই ওয়াইফাই দিয়ে নেট চালাই এবং কথাও বলি।

যতজনকে সিভি দিয়ে রেখেছিলাম তার তালিকা করলে একটা বড় টালি খাতা লাগবে।আমি মোবাইল কোম্পানী থেকে বিশ টাকা ধার নিয়ে দুএকজনকে ফোন করলাম।কারো কাছেই কোন আশার বাণী শুনতে পেলাম না।শুধু শুধু আমার বিশটাকা খরচ হয়ে গেলো।আমি যখন বিশটাকার চিন্তায় মগ্ন তখন অচেনা নাম্বার থেকে ফোন আসলো।ফোন রিসিভ করে জানতে চাইলাম কে?ওপাশ থেকে বললো ভাই আমি সিয়াম চিনতে পারতেছেন না?কলেজে আপনার ফলোয়ার ছিলাম।আমি চিনতে পারলাম।বললাম কি খবর সিয়াম বলো।ও বললো ভাই আপনি আমাকে সিভি দিয়েছিলেন মনে আছে?আমি মনে মনে বললাম সিভিতো কতজনকেই দিয়েছি তা কি আর মনে থাকে।মুখে বললাম হ্যা হ্যা মনে আছে।তা কি খবর বলো।সিয়াম বললো ভাই একটা চাকরির ব্যবস্থা হয়েছে আপনার জন্য।আপনি কাগজপত্র সব সত্যায়িত করে পাঠান সাথে অবশ্যই চারিত্রিক সনদপত্র দিবেন।সিয়ামকে অনেক অনেক ধন্যবাদ জানালাম এবং বিস্তারিত জেনে নিলাম কবে কোথায় কিভাবে কি করতে হবে।ফোন রেখে দেওয়ার পর মনে আর আনন্দ ধরে না।

মনে হচ্ছিল যাই এখনি প্রতীতিকে বলে আসি চাকরিটা আমি পেয়েগেছি তুমি শুনছো!কিন্তু আমি তা বলতে পারিনি।প্রতীতি তো আর বেলাবোস নয় যে তাকে গানে গানে এ খবর দেবো।আমি তখনই কাগজপত্র যা ছিলো সব চেক করলাম।এখন চারিত্রিক সনদপত্র জোগাড় করতে হবে।রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে চিন্তা করলাম এই চারিত্রিক সনদপত্র জিনিষটা একটা ফালতু বিষয়।আমার চারিত্রিক সনদ দিবে অন্য একজন যে কিনা আমাকে তেমন জানেই না!আমার চরিত্র সম্পর্কে সব থেকে ভালো জানি আমি নিজে।তাহলে আমার নিজের স্টেটমেন্ট না নিয়ে অন্যের বলা কথায় কান দিয়ে লাভ কি?যারাই আমাকে চারিত্রিক সনদ দিবে তারাতো আমার সম্পর্কে ভালোই বলবে!ওসব ভেবে অবশ্য লাভ নেই।ওদের চাহিদা সনদপত্র সুতরাং আমাকে তা দিতেই হবে।

পরদিন বিকেলে বাসা  থেকে বেরিয়ে সোজা রওনা হলাম কমিশনারের অফিসে।কিন্তু গিয়ে দেখলাম কমিশনার নেই।পিওনের কাছে জিজ্ঞেস করলাম সে বললো কমিশনার কাজে বাইরে আছে আজ আর দেখা হবে না।তাকে আমি আমার বিষয়টা বললাম কিন্তু সে বললো কমিশনার না থাকলেতো দেওয়ার সুযোগ নেই।অগত্য আমাকে ফিরে আসতে হলো।পরদিন আবার গেলাম কিন্তু একই কথা।এভাবে পরপর পাচদিন যাওয়ার পর আর সহ্য হলো না।কেননা আর হাতে মাত্র একদিন আছে।কাগজপত্র সব জমা দিতে হবে।এতো কাঠখড় পুড়িয়ে একটা চাকরির ব্যবস্থা হলো তা যদি এভাবে হাতছাড়া হয়ে যায় সামান্য একটা চারিত্রিক সনদের জন্য তাহলে তো আক্ষেপের সীমা থাকবে না।আমি পঞ্চম দিন পিওনকে বললাম কি তামাশা শুরু করেছেন আপনারা।যখনই আসি কমিশনার থাকে না তাহলে যায় কোথায়?তাকে জনগণ ভোট দিয়ে নিবার্চিত করেছে জনসেবা করার জন্য।কিন্তু আমরা কি সেই জনসেবাটুকু পাচ্ছি।একটা চারিত্রিক সনদ নেওয়ার জন্য পরপর পাচদিন আসলাম কিন্তু কমিশনারের খোজ নেই।বিষয়টা কি বলুনতো।

আমার কথায় সেই পিওনের বোধহয় বেশ রাগ হলো।সে ক্ষেপে উঠে বললো আরে রাখেন মিয়া আপনার চারিত্রিক সনদপত্র! কে দেবে আপনাকে চারিত্রিক সনদপত্র?পিওনের কথা শুনে আমি অবাক হলাম।বললাম কে দেবে মানে? কমিশনার দিবে।চারিত্রিক সনদপত্রতো কমিশনারই দেয়।সে মুখে তাচ্ছিল্যের ভাব করলো।আমি বললাম আজকে চারিত্রিক সনদ না নিয়ে আসি এখান থেকে যাবো না।এই বলে চেয়ার টেনে বসে পড়লাম।তখন পিওন বললো ভাই বসে থেকে কোন লাভ নেই।কমিশনার আসবে না।তারা আসার মত অবস্থা নেই।সুযোগও নেই।পিওনের কথায় মনে খটকা জাগলো।বললাম আসবে না আসার সুযোগ নেই এসবের মানে কি?

পিওন হাই তুলতে তুলতে বললো ভাই আপনি বরং এক মাস পরে আসেন, আসলে কমিশনার সাহেব একটি ধর্ষন মামলায় এখন জেলে আছেন। তবে চিন্তার কোন কারণ নেই। তদবীর চলছে, আশা করি দু একমাসের মধ্যে জামিন হয়ে যাবে।আমি আর কোন কথা না বাড়িয়ে উঠে পড়লাম।যে কমিশনারের নিজের চরিত্রের ঠিক নেই সে আবার আমাকে কি করে চারিত্রিক সনদপত্র দিবে?ভেবেছিলাম আর কখনো দুইনাম্বারী চিন্তা মাথায় আনবো না কিন্তু পরিস্থিতি আমাকে এটা করতে বাধ্য করলো।নীলক্ষেত থেকে যেমন সত্যায়িত সিল বানিয়ে নিজেই সব সত্যায়িত করি তেমনি এবার নিজের চারিত্রিক সনদপত্রও বানিয়ে নিতে হবে।সেদিনই সন্ধ্যার দিকে গিয়ে একটা চারিত্রিক সনদ বানালাম।পরদিন সরাসরি উপস্থিত হতে হবে সেই সব সনদ কাগজপত্র নিয়ে।উত্তেজনায় ঘুম হলো না ঠিকমত।

বিছানায় গড়াগড়ি খেতে লাগলাম।খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে রুমমেটের সাবান ধার করে গোসল করলাম।থাকলে হয়তো একটু সেন্টও নিতাম।সেই ছোট ভাইয়ের অফিস পান্থপথে।আমাকে বলে রেখেছে আমি যেন সকাল দশটার মধ্যে উপস্থিত হই।সেই মোতাবেক আমিরেডি হয়ে সব পেপার্স নিয়ে রওনা হলাম।যাওয়ার সময় রুমমেট শুভর কাছ থেকে পাচশো টাকাও ধার নিলাম।বললাম চাকরিতো পেয়ে গেছি আজই জয়েন করছি।সুতরাং টাকাটা বেতন পেয়েই ফেরত দেবো কোন সমস্যা নেই।ও টাকাটা দিলো।ভাবলাম পথে যেন দেরি না হয় তাই উবারে করে যাই।যেহেতু আমার মেগাবাইট নেই তাই ঘরে বসেই ফ্রি ওয়াইফাই দিয়ে উবার ডাকলাম।কল রিসিভ করে লোকেশান ঠিক করে বেরিয়ে পড়লাম।

রাস্তার দুইধারের দৃশ্য অবিরাম সরে যেতে লাগলো।মোটরসাইকেলের পিছনে হেলমেট পরে আমি তখন স্বপ্ন দেখছি।কত বেতন হবে?কত খরচ করবো আর কত জমাবো।কতদিন জমানোর পর এমন একটা মোটর সাইকেল আমি কিনতে পারবো।থেকে থেকে জ্যামও ছিলো।পান্থপথে নামলাম।সিয়ামকে ফোন করবো বলে ফোন হাতে নিতেই মনে পড়লো ফোনে কল করার মত টাকা নেই।আগেরবার যে বিশটাকা ধার নিয়েছিলাম সেটাই এখনো শোধ করা হয়নি।তবে ভাবলাম চাকরিটা যেহেতু হয়ে গেছে তাই টাকা রিচার্জ করাই যায়।এই ভেবে একটা দোকান খুজে একশো টাকা রিচার্জ করলাম।পাশে একজন আইসক্রিম বিক্রি করছিলাম একটা কোণ আইচক্রিম খেলাম।হাতে তখনো দুশো টাকা মত আছে।এবার ফোন করবো বলে নাম্বার বের করতে যাবো এমন সময় সিয়ামের ফোন।মনেমনে খুশি হলাম।ভাবলাম ফোন রিসিভ করেই বলবো সিয়াম আমি অলরেডি চলে এসেছি আর পাচমিনিটের মধ্যে অফিসে পৌছাবো।ফোন রিসিভ করে আমি কিছু বলার আগেই সিয়াম বললো ভাই খুবই দুঃখিত আপনার আজকে আর আসার দরকার নেই।আসলে হয়েছে কি বস বলেছে এখন আপাতত কোন নতুন লোক নিয়োগ দেওয়া হবে না।আমি খুবই দুঃখিত যে এমন একটা কথা বলতে হচ্ছে।

সিয়ামের কথা শুনে বুকটা ফেটে গেলো।সব থেকে বেশি খারাপ লাগলো এই যে ধার করে টাকা এনে সেটা দিয়ে উবারে এসেছি খাচ্ছি মোবাইলে রিচার্জ করছি।অগত্য কলেজের জুনিয়রকে তো আর কিছু বলা যায় না তাই মুখে বললাম না না সিয়াম এতে দুঃখ পাওয়ার কি আছে।এখন হয়নি আশা করিপরে হবে।তাছাড়া তুমি ফোনকরে ভালো করেছ আমি বরং বাসাতেই থাকি।যেহেতু বাসা থেকে বের হইনি তাই কোন সমস্যা নেই আরামছে ঘুম দেওয়া যাবে।সিয়ামের কাছে মিথ্যে কথাটা বলেও খারাপ লাগলো।কোন কিছু আর করার নেই।হাটতে হাটতে বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেলাম।সারা দুপুর ঘুরে শেষে বিকেলে বাংলামোটর গিয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ঢুকলাম।বাতিঘরে গিয়ে কিছু বই নাড়াচাড়া করলাম।কোন কিছুই ভালো লাগছে না।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ছাদে গিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসলাম।এখানে যারা আসে তাদের অনেককেই আমি চিনি।এক কোণায় রেজাঘটক আর তার দলবল ছবি তোলার মহড়া দিচ্ছে।আমি উদাস মনে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।মন চাইছিলো একটা কিছু খাই কিন্তু সায় দিচ্ছিল না।শুধু শুধু কটা টাকা নষ্ট করে লাভ কি।বাসায় ফিরবো বলে উঠে দাড়ালাম।হাটিহাটি পা পা করে লিফটের সামনে গিয়ে দাড়ালাম।লিফট উপরে আসছে।বোতাম চেপে অপেক্ষা করলাম।লিফট খুলতেই ভিতর থেকে লোকজন বের হতে শুরু করলো।সব শেষে বের হলো সিয়াম।আমার কলেজের ছোট ভাই।আমার দিকে তাকিয়ে সে ভীষণ লজ্জা পেলো।কিছু হয়তো বলতে চেয়েছিল আমি সুযোগ না দিয়ে লিফটে উঠে নিচে নেমে পড়লাম।

বাংলামোটর মোড়ে দাড়িয়ে আছি বিআরটিসি ডাবলডেকারের জন্য।হাতে তখন একটা ফাইল।সেই ফাইলে অনেক অনেক সত্যায়িত কাগজপত্র।সবার উপরে দেখা যাচ্ছে চারিত্রিক সনদপত্র।নীলক্ষেত থেকে পঞ্চাশ টাকা দিয়ে বানানো।

লেখাঃ জাজাফী

২৪ অক্টোবর ২০১৮

টুনির মায়ের জন্মদিন

মুমু! মানে টুনির মা। দুই অক্ষরের একটি নাম।ভারি সুন্দর।ভারি সুন্দর তার কথা বলা,তার কিশোরী বয়সের উচ্ছলতা তার হাসি তার দুষ্টুমী।সে খুব ছবি তুলতে ভালোবাসে।দুই ভাই বোনের মধ্যে সে ছোট।বড় ভাই ডাক্তার এবং সে তাকে খুবই আদর করে।এমন আদর করে যে আদরে আদরে মুমু কিছুটা বাদর না না বাদরানী হয়ে উঠেছে।তবে ওই রকম দুষ্টুমী বেশ আনন্দের।মুমুর সাথে আমার কখনো দেখা হয়নি।কোন দিন দেখা হবে এমনও ভাবা যায় না।মুমুর সাথে আমার কথা হয়নি,কখনো কথাও হবে কিনা জানা নেই।মুমুর সাথে আমিও ভীষণ দুষ্টুমী করি।একবার মুমু আমার কাছে আমার ছবি চাইলো আমি ওকে ছবি পাঠালাম।কিন্তু ছবি পাঠালাম অন্য কারো!আসলে ছবি যদি দিতেই হয় তাহলে ইনবক্সে কেন দিতে হবে?সবার সাথেইতো শেয়ার করা যায়।

তাই দুষ্টুমী করে ফেসবুক থেকে একজনের ছবি নিয়ে ইনবক্সে দিয়ে দিলাম।ও ভেবেছে ওটাই বুঝি জাজাফী।কিন্তু অন্য একজনের কথা ধার করে বলতে হচ্ছে “জাজাফী হলো একটা রহস্যে ভরা বই,যে বইটি এখনো প্রকাশিত হয়নি তাই সেই বইয়ের কনটেন্ট সম্পর্কে কারো ধারনা নেই”।

মুমু

মুমুর আজ জন্মদিন।কত তম জন্মদিন? ১৫ তম। তার মানে আমার চেয়ে মুমু প্রায় ২২ বছরের ছোট।মুমুর অনেক অনেক ছবি দেখেছি।সে বিভিন্ন স্টাইলে ছবি তোলে।ওকে আমি জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছি কিন্তু ওর মন ভরেনি।ও চায় আমি যেন ওকে আরো সুন্দর করে শুভেচ্ছা জানাই।এখন কথা হলো আমি কী করে আরো সুন্দর করে শুভেচ্ছা জানাবো।ও খুব রাগ করে যদি ওকে পিচ্চি বলে ডাকি।এখন ১৫ বছর বয়সতো আর পিচ্চি না কিন্তু আমার তুলনায় সে নিশ্চই পিচ্চি।তাকে তা ডাকা যাবে না।তাহলে কি ডাকবো? আমি বলি তুমি একটা বুড়ি।সে অবশ্য এটা মেনে নিতে রাজি আছে।

আমি যদি বলি এই মুমু তোমাকে আমি আপু বলে ডাকি? সে রেগে মেগে আগুন।বলে আর কিছু পাইলা না ডাকার জন্য? আমি বললাম আপু ডাকলে সমস্যা কি? সে বলে পৃথিবীতে সৈকত ছাড়া তার আর কোন ভাই নেই আর কোন ভাই লাগবে না।বাচ্চা মানুষ তার কোনটা দুষ্টুমী আর কোনটা সাধারণ আচরণ তা বুঝে ওঠা কঠিন।মুমুকে একবার একটা গিফট পাঠিয়েছিলাম।পিচ্চিদের গিফট দিতে আমার ভালো লাগে।ওরা গিফট পেলে খুশি হয়।মুমুর জন্মদিনে ওকে বলতে চাই আমি কিন্তু সব্বার আগে তোমার জন্মদিনের উপহার পাঠিয়েছিলাম।

আমার একটা বান্ধবী আছে।মুমু তাকে চেনে।অবশ্য সেই বিখ্যাত ডায়লগের মত “ নাম বললে চাকরি থাকবে না” টাইপের ব্যাপার আছে।তাই আমরা কেউ সেই নামটা উচ্চারণ করি না।মুমু তাকে যখন আপু বলে ডাকে তখন ভালো লাগে।মুমুর এই জন্মদিনে আমাদের পক্ষ থেকে অনেক অনেক শুভেচ্ছা।আর হ্যা আমরা বড়রা চাই মুমু ভালো করে পড়াশোনা করুক এবং ভালো রেজাল্ট করুক। সামনে কত্ত পড়াশোনা।তার পর একদিন একটা রাজপুত্র এসে মুমুকে পঙ্খিরাজে চড়িয়ে নিয়ে যাবে রাজমহলে।সেদিন আমরা ওকে হাসিমুখে বিদায় দেবো।আমাদের স্বপ্নগুলো একটু একটু করে বড় হোক। শুভজন্মদিন টুনির মা।

চারিত্রিক সনদপত্র ও অন্যান্য

বিকেল গুলো এখন বিষন্ন হয়ে উঠেছে।রাত জেগে ফেসবুক ইউটিউবে ঘুরাঘুরি করে সকালে ঘুমোতে গেলে ঘুম ভাঙে দুপুরে।যতক্ষণ ঘুমিয়ে থাকি কোন চিন্তা নেই কিন্তু বিকেল যেন আর কাটতেই চায় না।কি করে কাটবে?একাকী এই শহরে ঘুরে বেড়াতে কার বা ভালো লাগে।যখন আমার অখন্ড অবসর তখন বন্ধুরা ব্যাচমেটরা সব অফিসে নিজের ক্যারিয়ার আর কাজ নিয়ে ব্যস্ত।শুধু আমরাই কোন কাজ নেই।পাশ করে বের হয়ে একটা কাজের জন্য কত চেষ্টা করেছি কিন্তু কাজ আর মেলেনি।এখন তাই অবসরযাপন করছি।বন্ধুরা অফিস থেকে ফিরে রাতে ফেসবুকে বসলে আড্ডা চলে।সকালে ওরা সব যে যার অফিসে চলে গেলে আমার যেহেতু কিছু করার থাকেনা তাই আমি ঘুমাই।বড়ভাইদের কাছে সিভি দিয়ে রেখেছি।সিভি দিতে দিতে আমি ক্লান্ত হলেও সিভি দেওয়া থামাইনি।এমনকি একটা পযার্য়ে গিয়ে ছোটভাইদেরকেও সিভি দিতে শুরু করলাম।

 

ফোনে টাকা থাকেনা বলে সব সময় সবাইকে ফোন করতে পারিনা।রাতে অবশ্য অনেকের সাথে মেসেঞ্জার বা ভাইবারে কথা হয়।ফোনে টাকা থাকুক চাই না থাকুক ইন্টারনেট চালাতে পারি বিশেষ করে বাসায় থাকাকালীন।দোতলায় থাকে রিমুরা।ওদের ওয়াইফাই নেটওয়ার্ক আমার রুমেও খানিকটা আসে।একদিন ও যখন স্কুল থেকে বাসায় ফিরছিলো তখন ওকে বললাম এই রিমু আমাকে একটু হেল্প করবি? ও বললো ভাইয়া তুমিতো বড় মানুষ তোমার আবার হেল্প লাগবে কেন?তাছাড়া আমার মত পুচকে তোমাকে কি এমন হেল্প করতে পারবে?আমি আসলে মনে মনে ফন্দি এটেছিলাম কারণ এ ছাড়া আমারতো আর কোন উপায় ছিলো না।আমি রিমুকে বল্লাম জানিস আমি না ভীষণ একটা গাধা।আমার কথা শুনে রিমু আমার মুখেরদিকে তাকিয়ে বললো এইটা তুমি অবশ্য ঠিকই বলেছো।তোমার চেহারার মধ্যে একটু গাধাগাধা ভাব আছে।

 

বিষয়টা আমাকে বেশ ভাবালো।আমি প্রশ্ন করলাম তুই কি করে বুঝলি আমার চেহারার মধ্যে গাধাগাধা ভাব আছে।রিমু বললো এটা আমার কথা নয় এটা প্রতীতি আপু বলেছে।প্রতীতি হলো রিমুর বড় বোন।বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে।আমার সাথে কথা হয়না।অতো সুন্দরী মেয়েদের সাথে কথা বলতে আমার ভয় হয়।কিংবা বলা চলে লজ্জাও হয়।আমি এমনকি আড়চোখে তাকাইও না।এক দুবার তাকে দেখেছি এবং সমস্যা হলো তার দিকে তাকালে চোখ ফেরানো যায় না।ওসব চিন্তা বাদ দিয়ে যে ফন্দি করেছি সেটা হাছিলে মন দিলাম। আমি বললাম রিমু সত্যি বলছি আমাকে একটু হেল্প করতে হবে।রিমু এবার সিরিয়াস ভাবে জানতে চাইলে ভাইটু অতো ভনিতা না করে সোজা বলো কি করতে হবে?তবে হ্যা তুমি যদি কোন চিঠিফিটি লিখে আমার হাতে দিয়ে বলো এটা প্রতীতি আপুকে দিতে হবে তাহলে কিন্তু পারবো না।

 

আমি বললাম খুব পাকা পেকেছিস দেখি।আরে ওসব কিছু না।রিমু বললো ওসব কিছু না তাহলে কি?তুমি যে বললে হেল্প লাগবে।আমার মত গিনিপিগের হেল্প লাগবে তোমার মত জলহস্তির এটা ভাবা যায়?রিমুর সাথে আমার দারুন বন্ধুত্ব।ক্লাস সেভেনে উঠেছে সে।রাজউকে পড়ে।আমি রিমুদের বাসায় ভাড়া থাকি।ভাড়া বাকি পড়েছে বেশ ক মাসের।জানিনা যে কোন সময় ঘর থেকে বের করে দেবে কিনা।অবশ্য রিমুকে রিকোয়েস্ট করে তখন কিছু একটা করা যাবে।আমি রিমুকে বললাম জানিস আমি না ঠিক জানিনা কিভাবে মোবাইলে ওয়াইফাই কানেক্ট করতে হয়! তোরাতো ওয়াইফাই ব্যবহার করিস আমাকে শিখিয়ে দিবি কিভাবে ওয়াইফাই কানেক্ট করে?রিমু আমার হাত থেকে মোবাইলটা নিয়ে সার্চ দিলো।সবার আগে রিমুদের নেটওয়ার্ক আসলো।রিমু তখন ওটাতেই পাসওয়ার্ড দিয়ে কানেক্ট করে দেখিয়ে বললো এইতো এভাবে করতে হয়।মোবাইলে ও পাসওয়ার্ড দেওয়ার সাথে সাথে ওর হাত থেকে মোবাইল নিয়ে অটো সেভ দিয়ে দিলাম যেন পাসওয়ার্ডটা থেকে যায়।তারপর রিমুর হাতে আবার মোবাইলটা ফিরিয়ে দিতে দিতে বললাম ও তাই এতো দেখি বেশ সোজা আর আমি দেখ কত বড় গাধা যে এটাও বুঝতে পারিনি।রিমু মাথা দোলাতে দোলাতে বাসায় চলে গেলো।সেই থেকে আমি ফ্রিতে ওয়াইফাই চালাই।রাতে বাসায় থাকলে সেই ওয়াইফাই দিয়ে নেট চালাই এবং কথাও বলি।

 

যতজনকে সিভি দিয়ে রেখেছিলাম তার তালিকা করলে একটা বড় টালি খাতা লাগবে।আমি মোবাইল কোম্পানী থেকে বিশ টাকা ধার নিয়ে দুএকজনকে ফোন করলাম।কারো কাছেই কোন আশার বাণী শুনতে পেলাম না।শুধু শুধু আমার বিশটাকা খরচ হয়ে গেলো।আমি যখন বিশটাকার চিন্তায় মগ্ন তখন অচেনা নাম্বার থেকে ফোন আসলো।ফোন রিসিভ করে জানতে চাইলাম কে?ওপাশ থেকে বললো ভাই আমি সিয়াম চিনতে পারতেছেন না?কলেজে আপনার ফলোয়ার ছিলাম।আমি চিনতে পারলাম।বললাম কি খবর সিয়াম বলো।ও বললো ভাই আপনি আমাকে সিভি দিয়েছিলেন মনে আছে?আমি মনে মনে বললাম সিভিতো কতজনকেই দিয়েছি তা কি আর মনে থাকে।মুখে বললাম হ্যা হ্যা মনে আছে।তা কি খবর বলো।সিয়াম বললো ভাই একটা চাকরির ব্যবস্থা হয়েছে আপনার জন্য।আপনি কাগজপত্র সব সত্যায়িত করে পাঠান সাথে অবশ্যই চারিত্রিক সনদপত্র দিবেন।সিয়ামকে অনেক অনেক ধন্যবাদ জানালাম এবং বিস্তারিত জেনে নিলাম কবে কোথায় কিভাবে কি করতে হবে।ফোন রেখে দেওয়ার পর মনে আর আনন্দ ধরে না।

 

মনে হচ্ছিল যাই এখনি প্রতীতিকে বলে আসি চাকরিটা আমি পেয়েগেছি তুমি শুনছো!কিন্তু আমি তা বলতে পারিনি।প্রতীতি তো আর বেলাবোস নয় যে তাকে গানে গানে এ খবর দেবো।আমি তখনই কাগজপত্র যা ছিলো সব চেক করলাম।এখন চারিত্রিক সনদপত্র জোগাড় করতে হবে।রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে চিন্তা করলাম এই চারিত্রিক সনদপত্র জিনিষটা একটা ফালতু বিষয়।আমার চারিত্রিক সনদ দিবে অন্য একজন যে কিনা আমাকে তেমন জানেই না!আমার চরিত্র সম্পর্কে সব থেকে ভালো জানি আমি নিজে।তাহলে আমার নিজের স্টেটমেন্ট না নিয়ে অন্যের বলা কথায় কান দিয়ে লাভ কি?যারাই আমাকে চারিত্রিক সনদ দিবে তারাতো আমার সম্পর্কে ভালোই বলবে!ওসব ভেবে অবশ্য লাভ নেই।ওদের চাহিদা সনদপত্র সুতরাং আমাকে তা দিতেই হবে।

 

পরদিন বিকেলে বাসা  থেকে বেরিয়ে সোজা রওনা হলাম কমিশনারের অফিসে।কিন্তু গিয়ে দেখলাম কমিশনার নেই।পিওনের কাছে জিজ্ঞেস করলাম সে বললো কমিশনার কাজে বাইরে আছে আজ আর দেখা হবে না।তাকে আমি আমার বিষয়টা বললাম কিন্তু সে বললো কমিশনার না থাকলেতো দেওয়ার সুযোগ নেই।অগত্য আমাকে ফিরে আসতে হলো।পরদিন আবার গেলাম কিন্তু একই কথা।এভাবে পরপর পাচদিন যাওয়ার পর আর সহ্য হলো না।কেননা আর হাতে মাত্র একদিন আছে।কাগজপত্র সব জমা দিতে হবে।এতো কাঠখড় পুড়িয়ে একটা চাকরির ব্যবস্থা হলো তা যদি এভাবে হাতছাড়া হয়ে যায় সামান্য একটা চারিত্রিক সনদের জন্য তাহলে তো আক্ষেপের সীমা থাকবে না।আমি পঞ্চম দিন পিওনকে বললাম কি তামাশা শুরু করেছেন আপনারা।যখনই আসি কমিশনার থাকে না তাহলে যায় কোথায়?তাকে জনগণ ভোট দিয়ে নিবার্চিত করেছে জনসেবা করার জন্য।কিন্তু আমরা কি সেই জনসেবাটুকু পাচ্ছি।একটা চারিত্রিক সনদ নেওয়ার জন্য পরপর পাচদিন আসলাম কিন্তু কমিশনারের খোজ নেই।বিষয়টা কি বলুনতো।

 

আমার কথায় সেই পিওনের বোধহয় বেশ রাগ হলো।সে ক্ষেপে উঠে বললো আরে রাখেন মিয়া আপনার চারিত্রিক সনদপত্র! কে দেবে আপনাকে চারিত্রিক সনদপত্র?পিওনের কথা শুনে আমি অবাক হলাম।বললাম কে দেবে মানে? কমিশনার দিবে।চারিত্রিক সনদপত্রতো কমিশনারই দেয়।সে মুখে তাচ্ছিল্যের ভাব করলো।আমি বললাম আজকে চারিত্রিক সনদ না নিয়ে আসি এখান থেকে যাবো না।এই বলে চেয়ার টেনে বসে পড়লাম।তখন পিওন বললো ভাই বসে থেকে কোন লাভ নেই।কমিশনার আসবে না।তারা আসার মত অবস্থা নেই।সুযোগও নেই।পিওনের কথায় মনে খটকা জাগলো।বললাম আসবে না আসার সুযোগ নেই এসবের মানে কি?

 

পিওন হাই তুলতে তুলতে বললো ভাই আপনি বরং এক মাস পরে আসেন, আসলে কমিশনার সাহেব একটি ধর্ষন মামলায় এখন জেলে আছেন। তবে চিন্তার কোন কারণ নেই। তদবীর চলছে, আশা করি দু একমাসের মধ্যে জামিন হয়ে যাবে।আমি আর কোন কথা না বাড়িয়ে উঠে পড়লাম।যে কমিশনারের নিজের চরিত্রের ঠিক নেই সে আবার আমাকে কি করে চারিত্রিক সনদপত্র দিবে?ভেবেছিলাম আর কখনো দুইনাম্বারী চিন্তা মাথায় আনবো না কিন্তু পরিস্থিতি আমাকে এটা করতে বাধ্য করলো।নীলক্ষেত থেকে যেমন সত্যায়িত সিল বানিয়ে নিজেই সব সত্যায়িত করি তেমনি এবার নিজের চারিত্রিক সনদপত্রও বানিয়ে নিতে হবে।সেদিনই সন্ধ্যার দিকে গিয়ে একটা চারিত্রিক সনদ বানালাম।পরদিন সরাসরি উপস্থিত হতে হবে সেই সব সনদ কাগজপত্র নিয়ে।উত্তেজনায় ঘুম হলো না ঠিকমত।

 

 

বিছানায় গড়াগড়ি খেতে লাগলাম।খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠে রুমমেটের সাবান ধার করে গোসল করলাম।থাকলে হয়তো একটু সেন্টও নিতাম।সেই ছোট ভাইয়ের অফিস পান্থপথে।আমাকে বলে রেখেছে আমি যেন সকাল দশটার মধ্যে উপস্থিত হই।সেই মোতাবেক আমিরেডি হয়ে সব পেপার্স নিয়ে রওনা হলাম।যাওয়ার সময় রুমমেট শুভর কাছ থেকে পাচশো টাকাও ধার নিলাম।বললাম চাকরিতো পেয়ে গেছি আজই জয়েন করছি।সুতরাং টাকাটা বেতন পেয়েই ফেরত দেবো কোন সমস্যা নেই।ও টাকাটা দিলো।ভাবলাম পথে যেন দেরি না হয় তাই উবারে করে যাই।যেহেতু আমার মেগাবাইট নেই তাই ঘরে বসেই ফ্রি ওয়াইফাই দিয়ে উবার ডাকলাম।কল রিসিভ করে লোকেশান ঠিক করে বেরিয়ে পড়লাম।

 

রাস্তার দুইধারের দৃশ্য অবিরাম সরে যেতে লাগলো।মোটরসাইকেলের পিছনে হেলমেট পরে আমি তখন স্বপ্ন দেখছি।কত বেতন হবে?কত খরচ করবো আর কত জমাবো।কতদিন জমানোর পর এমন একটা মোটর সাইকেল আমি কিনতে পারবো।থেকে থেকে জ্যামও ছিলো।পান্থপথে নামলাম।সিয়ামকে ফোন করবো বলে ফোন হাতে নিতেই মনে পড়লো ফোনে কল করার মত টাকা নেই।আগেরবার যে বিশটাকা ধার নিয়েছিলাম সেটাই এখনো শোধ করা হয়নি।তবে ভাবলাম চাকরিটা যেহেতু হয়ে গেছে তাই টাকা রিচার্জ করাই যায়।এই ভেবে একটা দোকান খুজে একশো টাকা রিচার্জ করলাম।পাশে একজন আইসক্রিম বিক্রি করছিলাম একটা কোণ আইচক্রিম খেলাম।হাতে তখনো দুশো টাকা মত আছে।এবার ফোন করবো বলে নাম্বার বের করতে যাবো এমন সময় সিয়ামের ফোন।মনেমনে খুশি হলাম।ভাবলাম ফোন রিসিভ করেই বলবো সিয়াম আমি অলরেডি চলে এসেছি আর পাচমিনিটের মধ্যে অফিসে পৌছাবো।ফোন রিসিভ করে আমি কিছু বলার আগেই সিয়াম বললো ভাই খুবই দুঃখিত আপনার আজকে আর আসার দরকার নেই।আসলে হয়েছে কি বস বলেছে এখন আপাতত কোন নতুন লোক নিয়োগ দেওয়া হবে না।আমি খুবই দুঃখিত যে এমন একটা কথা বলতে হচ্ছে।

 

সিয়ামের কথা শুনে বুকটা ফেটে গেলো।সব থেকে বেশি খারাপ লাগলো এই যে ধার করে টাকা এনে সেটা দিয়ে উবারে এসেছি খাচ্ছি মোবাইলে রিচার্জ করছি।অগত্য কলেজের জুনিয়রকে তো আর কিছু বলা যায় না তাই মুখে বললাম না না সিয়াম এতে দুঃখ পাওয়ার কি আছে।এখন হয়নি আশা করিপরে হবে।তাছাড়া তুমি ফোনকরে ভালো করেছ আমি বরং বাসাতেই থাকি।যেহেতু বাসা থেকে বের হইনি তাই কোন সমস্যা নেই আরামছে ঘুম দেওয়া যাবে।সিয়ামের কাছে মিথ্যে কথাটা বলেও খারাপ লাগলো।কোন কিছু আর করার নেই।হাটতে হাটতে বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেলাম।সারা দুপুর ঘুরে শেষে বিকেলে বাংলামোটর গিয়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে ঢুকলাম।বাতিঘরে গিয়ে কিছু বই নাড়াচাড়া করলাম।কোন কিছুই ভালো লাগছে না।

 

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ছাদে গিয়ে একটা চেয়ার টেনে বসলাম।এখানে যারা আসে তাদের অনেককেই আমি চিনি।এক কোণায় রেজাঘটক আর তার দলবল ছবি তোলার মহড়া দিচ্ছে।আমি উদাস মনে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।মন চাইছিলো একটা কিছু খাই কিন্তু সায় দিচ্ছিল না।শুধু শুধু কটা টাকা নষ্ট করে লাভ কি।বাসায় ফিরবো বলে উঠে দাড়ালাম।হাটিহাটি পা পা করে লিফটের সামনে গিয়ে দাড়ালাম।লিফট উপরে আসছে।বোতাম চেপে অপেক্ষা করলাম।লিফট খুলতেই ভিতর থেকে লোকজন বের হতে শুরু করলো।সব শেষে বের হলো সিয়াম।আমার কলেজের ছোট ভাই।আমার দিকে তাকিয়ে সে ভীষণ লজ্জা পেলো।কিছু হয়তো বলতে চেয়েছিল আমি সুযোগ না দিয়ে লিফটে উঠে নিচে নেমে পড়লাম।

 

বাংলামোটর মোড়ে দাড়িয়ে আছি বিআরটিসি ডাবলডেকারের জন্য।হাতে তখন একটা ফাইল।সেই ফাইলে অনেক অনেক সত্যায়িত কাগজপত্র।সবার উপরে দেখা যাচ্ছে চারিত্রিক সনদপত্র।নীলক্ষেত থেকে পঞ্চাশ টাকা দিয়ে বানানো।

 

লেখাঃ জাজাফী

২৪ অক্টোবর ২০১৮