Home Blog Page 8

করোনায় বিপযস্থ কর্মজীবী মায়েরা

করোনা ভাইরাস পৃথিবীতে এমন ভাবে বিস্তার করেছে যে নিজ ঘরেও কেউ আজ আর নিরাপদ নয়। নানা ভাবে দিন দিন সংক্রমন বেড়েই চলেছে।এর মধ্যে যে সব নারী একই সাথে কর্মজীবী এবং সন্তানের মা তারা ভীষন ঝুকির মধ্যে আছেন। শুধু মাত্র ঝুকিই নয় বরং আতংকিত থাকতে হচ্ছে সারাক্ষণ।সন্তান এবং পরিবারের সর্বাঙ্গীন কল্যান কামনা কারী মানুষটি পরিবারকে ভালো রাখতে ঝুকিপুর্ন দিনে ঝুকি নিয়ে কর্মস্থলে যাচ্ছেন। ফলে কর্মজীবী মায়েদের সারাক্ষণ তটস্থ থাকতে হচ্ছে। ভোরে অফিসের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার পর থেকে ফেরা অব্দি কত শত মানুষের সংস্পর্শে তাকে আসতে হয়। তিনি জানতেও পারেন না কোন মানুষটি ভাইরাসের বাহক হিসেবে তার সামনে,পিছনে বা পাশ দিয়ে যাওয়া আসা করছে আর সেই ভাইরাসের একাংশ নিজের অজান্তে ঘরে নিয়ে গিয়ে ঘরে থাকা সন্তানদের এবং অন্যান্যদের বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন।

সাম্প্রতিক একটি অনুষ্ঠানে এক নারী শিল্পী গান করছিলেন, এর মাঝেই তার তিন-চার বছরের মেয়েটি তাকে জড়িয়ে ধরে আছে এমন একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এ ছবিটি একজন কর্মজীবী মায়ের ছবি।কিছুদিন পুর্বে আরেকটি ছবিতে দেখা যায় ভারতের এক নারী ব্যাংক কর্মকর্তা অফিসের চেয়ার-টেবিলে বসে কাজ করছেন পেছনে মেঝেতে দুধের বোতলমুখে শুয়ে আছে তার ছোট্ট জ্বরে আক্রান্ত শিশু সন্তানটি। এটিও একজন কমর্জীবী মায়েরই ছবি।


সন্তান পালনে বাবাদের ভূমিকা অর্থ উপার্জন আর কখনও কখনও পড়া বুঝিয়ে দেওয়ার মধ্যেই সীমিত।সবকিছু সমান ভাবে সামলাতে হয় মা কে। কিন্তু সেই মা যদি হন কর্মজীবী তাহলে সমস্যার অন্ত থাকে না।এছাড়াও কর্মজীবী নারীদের এক বিরাট অংশ সিংগেল মাদার হিসেবে সন্তানকে লালন পালন করতে বাধ্য হয়েই কর্মক্ষেত্রে থাকতে হচ্ছে।সন্তানকে খাওয়ানো,গোসল করানো,স্কুলে পাঠানো,স্কুল থেকে নিয়ে আসা সব সামলাতে হয় পাশাপাশি অফিসও করতে হয়। করোনার এই দিনে সেটা হয়ে উঠেছে আরও ভয়াবহ। যদিও স্কুল বন্ধ তাই সন্তানকে স্কুলে পাঠানো এবং নিয়ে আসার বিষয়টি থাকছে না কিন্তু তিনি নিজে সন্তানকে ফেলে রেখে অফিসে যাচ্ছেন এক রকম অনিশ্চয়তার মধ্যে। আবার ফিরছেন ভয় আর শঙ্কা নিয়ে। অন্য দিকে স্কুলগুলোতে অনলাইন ক্লাস হওয়ায় সেগুলো তদারকিতে কর্মজীবী মা সন্তানকে সময় দিতে পারছেন না ফলে সন্তানের পড়াশোনা ব্যহত হচ্ছে।

জ্যামের শহরে ভীড় ঠেলে,গাদাগাদি করে বাসে সিট না পেয়ে দাড়িয়ে রোজ অফিস করা এবং অফিস শেষে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে পোহাতে বাসায় ফেরা তার নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।কী এক দিন এলো অফিস ফেরৎ মা তার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে নিতে পারছেন না যতক্ষণ না তিনি নিজে গোসল করে পরিচ্ছন্ন না হচ্ছেন।নিজের চেয়েও মায়ের কাছে সন্তানের নিরাপত্তার বিষয়টি বেশি গুরুত্বপুর্ন।

আমাদের কর্মপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এখনও নারীর মেধা আর পরিশ্রমের মূল্যায়ন করা হয় কদাচিৎ। উপরন্তু সন্তানের অসুস্থতার কারণে কাজে ছুটি চাইলে কমর্জীবী মায়েদেরকে অহরহ কটূ কথা আর টিপ্পনি শুনতে হয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আর পুরুষ সহকর্মীদের কাছে।

করোনা ভাইরাসের এই ঝুকিপুর্ন অবস্থায় একজন পুরুষ সারাদিন অফিস করে বাসায় ফিরে চাইলে একাকী থাকতে পারেন কিন্তু কর্মজীবী নারী যিনি কারো মা,কারো স্ত্রী তার কোন ভাবেই একা থাকা সম্ভব নয়। স্বামী,সন্তান সবার দায়িত্ব এ সমাজ একক ভাবে তার কাঁধেই চাপিয়ে দিয়েছে।সন্তানের প্রতি মায়ের মমতা অতুলনীয়। তিনি চাইলেই এমন দুর্যোগের সময়েও সন্তানকে দূরে ঠেলে দিতে পারেন না ফলে কর্মজীবী মায়েদের জন্য করোনাকাল হয়ে উঠেছে বিষে ভরা কাটার সমতুল্য যা তাকে বার বার ক্ষতবিক্ষত করছে। মাতৃত্বকালীন ছুটি বলে যে বিষয়টি চালু আছে এই দুযোর্গকালীন সময়ে একই ভাবে কর্মজীবী মায়েদের সন্তানের কথা বিবেচনা করে বিপদকালীন ছুটির ব্যবস্থা রাখা উচিত ছিলো।

নিজের পায়ে দাড়ানোর স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে সমাজের নানা কথা শুনতে শুনতে যে নারী কর্মজীবনে প্রবেশ করে তাকেও নানা কারনে পঁচিশেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। তার পর নতুন সংসার আর চাকরি নিয়ে হিমশিম খেতে খেতেই সে হয়তো অনাগত সন্তানের আগমনী বার্তা শোনে বছর না ঘুরতেই। পান থেকে চুন খসলেই সব দোষ গিয়ে পড়ে নারীর ওপর। সন্তানের অসুখে, পরীক্ষার খারাপ ফলাফলে যেন পিতার কোন দোষ নেই, সব দোষ কর্মজীবী নারীর।

যে সব কর্মজীবী নারীর সন্তান দেখাশোনার জন্য পরিবারে কেউ নেই তাদের অনেকেই সন্তানের জন্য কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। আর যারা কষ্ট করে চাকরি করছেন ও সন্তান পালন করছেন তারা দুটি একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। করোনা ভাইরাসের এই দুর্যোগকালিন সময়ে সেটি হয়ে উঠেছে আরও ভয়াবহ।কর্মজীবী মায়েরা না পারছেন কাজ ছেড়ে দিতে আবার না পারছেন ঠিকমত ধরে রাখতে।উভয় সংকটে পড়ে তিনি এবং তার সন্তানকে ঝুকির মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে।

4 জুন 2020

ব্যাংক,জালনোট,এটিএম এবং সাধারনের ভুল ধারণা

আজকের এই লেখাটি সেই সব মানুষের জন্য যারা কোন না কোন সময় ব্যাংক অথবা এটিএম থেকে টাকা উত্তোলন করতে গিয়ে এক বা একাধিক জাল নোট পেয়েছেন কিংবা এক হাজার টাকার নোটের মধ্যে পাচঁশত টাকা কিংবা পাঁচশত টাকার নোটের মধ্যে একশত টাকার নোট পেয়েছেন।কিংবা টাকা জমা দিতে গিয়ে ভুল করে বেশি জমা দিয়েছেন কিন্তু ক্যাশিয়ার সেটা ফেরত দেয়নি কিংবা টাকা উত্তোলন করেছেন টাকা কম পেয়েছেন।তার পর স্বভাবতই গালি দিয়েছেন ব্যাংক কর্মকর্তাকে এবং ব্যাংককে। আমি ব্যাংক বিষয়ে কোন পন্ডিত কেউ নই তবে আমার ঝুলিতে গবেষণার কিছু অভিজ্ঞতা জমা আছে। অসংখ্য ব্যাংক কর্মকর্তার সাথে এবং এটিএম সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলেছি এসব বিষয় নিয়ে। সেসব থেকে যতটা পারি বলতে চেষ্টা করবো। বন্ধু তালিকায় যে সব ব্যাংকার বন্ধুরা আছেন তারা বুঝতে পারবেন আমি কতটা ভুল বলেছি আর কতটা সঠিক বলেছি। তবে হ্যা লেখাটি পুরোপুরি না পড়লে বুঝতে অসুবিধা হবে। পড়তে চাইলে পুরোটা পড়বেন না চাইলে মোটেই পড়ার দরকার  নেই তার চেয়ে বরং আপনার মধ্যে যে ধারণা জন্মেছে সেটি নিয়ে থাকাই ভালো।

প্রথমে আসি ব্যাংকের ক্যাশ এরিয়া সম্পর্কেঃ

প্রতিটি ব্যাংকের প্রতিটি শাখার অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ন একটি অংশ হলো ক্যাশ এরিয়া,যেখানে এমনকি ওই শাখার সব কর্মকর্তা কর্মচারিরও প্রবেশাধিকার নেই। দিনের শুরুতে ক্যাশে যারা কাজ করেন তারা সেখানে প্রবেশ করার আগেই তাদের মানিব্যাগ নির্ধারিত লকারে জমা রাখতে হয়। সুতরাং সেই মানুষটির কাছে কোন টাকা থাকে না। লেনদের শুরু হলে ভল্ট থেকে টাকা বের করে প্রতি কাউন্টারে কিছু কিছু টাকা দেওয়া হয় যা আগের দিন বিকেলে প্রস্তুতকৃত। একজন ক্যাশিয়ার/ক্যাশ টেলার টাকা জমা নিয়ে থাকে এবং বিতরণ করে থাকে। আধুনিক ব্যাংকিং সুবিধাযুক্ত ব্যাংকের একই কাউন্টারে জমা এবং উত্তোলনের সুযোগ থাকে। তো একজন গ্রাহক যখন টাকা জমা দিতে আসেন তখন কাউন্টারে যাওয়ার পর ক্যাশিয়ার সেটা বুঝে নেন,গুনে নেন এবং টাকা জাল আছে কি না, তিন বা তার চেয়ে বেশি টুকরা আছে কি না সেটা চেক করে নেন। কোন কারণে গ্রাহকের ওই টাকার মধ্যে গ্রাহকের অজান্তে হোক আর জানা অবস্থায় হোক যদি কোন জাল নোট থাকে বা তিনটুকরা নোট থাকে এবং এই চেকিংএর সময় ক্যাশিয়ারের চোখে সেটা ধরা না পড়ে তাহলে কি হতে পারে? সেটা জমা হয়ে যাচ্ছে এবং অন্য একজন গ্রাহক যখন টাকা উত্তোলনের জন্য আসবে এবং ক্যাশিয়ার সেই টাকা থেকেই পরিশোধ করবে তখন ক্যাশিয়ার এবং গ্রাহক দুজনের অজান্তেই জাল নোট বা তিনটুকরা নোট বা অচল নোট গ্রাহকের হাতে চলে যাবে। অর্থাৎ এক গ্রাহক না জেনে জাল নোট জমা দিয়েছে,ক্যাশিয়ারের চোখ সেটা এড়িয়ে গেছে বিধায় সেই জাল নোট বা অচল নোট অন্য গ্রাহকের হাতে চলে গেছে। এখন সেই গ্রাহক যদি সাথে সাথে জাল নোট ধরতে পারে তাহলে কি হয়? সে হয়তো কটুকথা বলে অথচ ক্যাশিয়ারের কিন্তু কোন দোষ নেই।

আচ্ছা দোষের ব্যাপারটা পরে আসি। গ্রাহক সাথে সাথে জাল নোট বুঝতে পারলে কাউন্টার থেকেই সেটা পরিবর্তন করে দেওয়া হয় এবং আপনারা হয়তো ভাবতে পারেন ওই জালনোট অন্য কারো কাছে গছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়? আসলে তা নয় সেটা সাধারণত সেই গ্রাহকের সামনেই পাঞ্চ করে দেওয়া হয়। ক্যাশিয়ার টাকা জমা নেওয়ার সময় জাল নোট ধরতে পারলে তা ছিদ্র করে উক্ত গ্রাহককে দিয়ে দেয়।কিন্তু যখন ঘটনাটা উল্টো ঘটে তখন কি হয়? অর্থাৎ কোন গ্রাহক যখন টাকা উত্তোলন করতে গিয়ে জাল নোট পায় তখনও টাকাটা ছিদ্র করা হয় কিন্তু ভর্তুকি দিতে হয় ওই অফিসারকে যিনি ক্যাশ লেনদেন করছেন! অথচ জাল টাকাটা কিন্তু তার নয়।ব্যাংক এ ক্ষেত্রে ওই অফিসারকে জালনোটের কোন বিনিময় মূল্য দিবে না বরং সেটা অফিসারকেই বহন করতে হবে। মোদ্দা কথা হলো ক্যাশ কাউন্টারে কোন কারণে ক্যাশ রিসিভের সময় জালনোট সনাক্ত করতে অফিসার ব্যার্থ হলে সেটা তাকেই বহন করতে হয়। আবার দেখুন যদি কোন গ্রাহক টাকা উত্তোলন করে নিয়ে যায় এবং সেই টাকার মধ্যে সেই জালনোট থেকে যায় তাহলে গ্রাহকের কপাল পোড়ে কারণ নিয়ম অনুযায়ি ব্যাংকের বাইরে গিয়ে ফিরে এসে কোন অনুযোগ করলে তা গ্রহনযোগ্য নয়। ঘটনা এখানেই শেষ নয়। ধৈর্য্য ধরে পড়তে হবে পুরোটা।

মনে করুন কোন গ্রাহক না জেনে টাকা জমা দিয়েছিল এবং সেই টাকার মধ্যে জাল নোট ছিলো যা অফিসারও বুঝতে পারেনি এবং সেভাবেই রয়ে গেছে। তো গ্রাহকের একাউন্টে টাকাটা জমা হয়ে যাচ্ছে কিন্তু বিপদ থেকে যাচ্ছে অফিসারের মাথায়। এই বিপদ কতদিন অব্দি থাকছে শুনলে অবাক হবে। ধরুন সারাদিন অন্যান্য লেনদেন করার পরও কোন কারণে সেই জালনোটটা তার কাছেই থেকে গেলো তাহলো কি হবে? দিন শেষে ক্যাশ অফিসার তার টাকা গুছিয়ে বান্ডিল করে (এই বান্ডিল বিষয়ে আলাদা করে আরও লিখবো)। তো সেই বান্ডিলের কোন একটিতে সেই জাল নোট বা তিনটুকরা নোট বা অচল নোট থেকে গেলো। বান্ডিল করার পর ব্যাংকের নির্দিষ্ট ফ্লাইলিফ লাগানো থাকে,সীল মারা থাকে আর থাকে ওই অফিসারের সিগনেচার! এখন যতদিন অব্দি ওই সিগনেচার যুক্ত কাগজটি ওই বান্ডিলের উপর থাকবে ততোদিন অব্দি টাকা যেখানেই যাক না কেন জালনোট সনাক্ত হলে ঘুরে ফিরে ওই অফিসারের ঘাড়েই সেটা পড়বে এবং তাকেই তার দায়ভার বহন করে টাকাটা টুকরো টুকরো করতে হবে এবং সমপরিমান টাকা নিজের পকেট থেকে পরিশোধ করতে হবে। তাহলেই বুঝুন যে জালটাকা কোন ভাবে সনাক্ত করতে অফিসার ব্যার্থ হলে সব সময়ের জন্যই তার উপরই সেটা রিস্ক হিসেবে থেকে যাচ্ছে এবং সে কোন ভাবেই আপনাকে নিজ থেকে জালটাকা দেয়নি। অন্তত এই লেখাটা পড়ার পর আশা করি ভবিষ্যতে কোন ক্যাশিয়ারকে দোষ দিতে পারবেন না যে সে আপনাকে জাল টাকা দিয়েছে। জালটাকা কিভাবে আপনার হাতে গিয়েছে তা আমি পরিস্কার করে দেখিয়ে দিলাম। একজন ক্যাশ অফিসারের যে কত বিপদ সেটা বুঝতে হলে পুরো লেখাটা মন দিয়ে পড়ুন।

টাকা কম দেওয়া বা বেশি দেওয়া বিষয়ঃ

অনেক সময় আপনি টাকা জমা দিতে গিয়েছেন 20 হাজার কিন্তু সেখানে নোট ছিলো 21 হাজার।আপনি প্রথমে খেয়াল করেন নি এবং অফিসার যখন মেশিনে গুনেছে এবং মেশিন রিড করেছে 20 হাজার তখন নিশ্চিত হয়ে টাকাটা জমা করা হয়েছে। যেহেতু মেশিন দেখিয়েছে বিশ হাজার আবার আপনি লিখেছেনও বিশ হাজার তখনতো দ্বিতীয়বার গণনা করার প্রয়োজন নেই। আপনি ফিরে গেলেন পরে সেদিন বা অন্য যে কোন দিন মনে হলো আপনার ওখানে 21 হাজার ছিলো। আপনি অবশ্যই ভুল বলেন নি। যেহেতু ছিলো তার মানে অবশ্যই ছিলো।কিন্তু আপনি কোন ভাবেই ওই অফিসারকে চোর ভাবতে পারেন না যে আপনার অতিরিক্ত এক হাজার টাকা সে মেরে দিয়েছে।আপনিতো টাকা জমা দিয়ে চলে গেছেন এর পরেরটুকু আমার গবেষণা থেকেই না হয় শুনুন। জমা দেওয়ার সময় আপনি যেমন জানতেন না ওখানে একটা নোট বেশি আছে তেমনি অফিসারও জানতেন না। ধরে নিন সারা দিনে ওই অফিসার আর কোন ভুল করেনি অর্থাৎ কাউকে একটা নোট ভুল করে বেশি দিয়ে দেয়নি তাহলে কি হবে? তার কাছে হিসাবের অতিরিক্ত একটা নোট বেশি থাকবে।

এখানেই অনেক কিছু ঘটবে। এ ক্ষেত্রে কয়েকটা বিষয় ঘটতে পারে যার একটা একটা করে বলছি।দিন শেষে সে যখন নোটগুলো বান্ডিল করবে তখন একই ভাবে ভুল করে কোন এক বান্ডিলে যদি একটা নোট বেশি চলে যায় অর্থাৎ 100টা নোটের বদলে 101 টা নোট থাকে এবং আপনার সময়কার ঘটনার মতই মেশিন গণনাতে সেটা 100 নোট দেখায় তাহলে অফিসারের দিন শেষে কোন টাকা বেশিও হবে না কমও হবে না।এবং পরবর্তী দিন সেই অতিরিক্ত টাকার বান্ডিলটা যদি কাউকে পেমেন্ট করা হয়ে যায় তাহলে কি হবে? আপনি ক্লেম করলেও আপনার টাকা ফেরৎ পাবেন না তার তিনটি কারণ। প্রথমত সিসিটিভিতে দেখা যাবে আপনি বিশটা নোটই দিয়েছেন আর দ্বিতীয় কারণ আপনার লেখা ভাউচারে বিশ হাজার টাকা লেখা এবং বিশটি নোট লেখা। যেহেতু অফিসার বিশ হাজার টাকা পেয়েছে এবং আপনার একাউন্টেও বিশ হাজারই জমা করেছে তাই আপনি কোন ভাবেই প্রমান করতে পারবেন না যে আপনার ওখানে এক হাজার বেশি ছিলো।

এখনো শেষ করিনি সুতরাং পড়তে থাকুন। আর তৃতীয় কারণ হলো সেদিন অফিসারের কাউন্টারে দিন শেষে হিসাবের বাইরে কোন টাকা পাওয়া যায় নি। যদি যেত তাহলে সিসিটিভিতে বিশটা দেখালেও টাকাটা আপনি পেতে পারতেন। এছাড়াও কিন্তু আপনি টাকাটা পেতে পারেন ঘটনা এবার দ্বিতীয় বা তৃতীয়দিনে যেতে হবে। কিভাবে? ধরুন পরবর্তী দিন আগেরদিনে করা সেই একটা নোট বেশি ওয়ালা বান্ডিল একই অফিসারের হাতে নাও পড়তে পারে। অন্য অফিসার সেই বান্ডিলটা পেমেন্ট করতে গিয়ে গুনলেন এবং একটা নোট বেশি পেলেন। কয়েকবার গুনে একই ফল আসলে তিনি দেখবেন কার সিগনেচার আছে? তখন তাকে দেওয়া হবে এবং একটা নোট বের করে ক্যাশ ইনচার্জের কাছে রাখবেন যেন যদি কেউ ক্লেইম করে তাকে ফেরত দেওয়া যায়।আর ওই দিন যদি ক্লেইম না আসে তাহলে ব্যাংকের সান্ড্রি একাউন্টে তা জমা রাখা হবে।ঘটনা আরও আছে যা কোনদিন আপনারা কেউ জানেন না বা শোনেন নি। ধরুন আগেরদিন করা সেই অতিরিক্ত টাকা সহ বান্ডিলটা অন্য এক অফিসারের হাতে পড়লো এবং তিনি সেটা একবারে পেমেন্ট না করে বান্ডিল ভেঙে বিভিন্নজনকে পেমেন্ট করলেন।

তাহলে কি হবে? সে যদি সারাদিনে আর কোন ভুল না করে তাহলে দিন শেষে তার হাতে একটা নোট মানে সেই এক হাজার টাকা বেশি থাকবে!!অথচ এটা কিন্তু তার ভুল নয় এবং তার টাকাও নয়।এটা নিয়ে তার অন্তত এক ঘন্টা নষ্ট হবে,চিন্তা হবে,রেপুটেশান খারাপ হবে। অন্তত একঘন্টা কিভাবে নষ্ট হবে সেটা বলছি। সেদিন যেহেতু একটা নোট বেশি হয়েছে মানে এক হাজার টাকা বেশি হয়েছে তাই সেদিনের সব ভাউচার সে বের করে একটা একটা করে চেক করবে। আপনি টাকা জমা দেওয়ার সময় অনেক সময় কয়টাকার নোট কয়টা লিখতে চান না বা লেখেন না এটা ঠিক নয়। এটা বিপদ থেকে বাচিয়ে দেয়। অফিসার তখন খুজে খুজে দেখবেন কে কতটাকার নোট কতপিস দিয়েছেন এবং তা মিলিয়ে কতটাকা হয়েছে। একই ভাবে তিনি যে সব চেক পেমেন্ট করেছেন তার পিছনে তিনি কাকে কতটাকার নোট কতটা দিয়েছেন তা সব লিখে রাখেন সেসবও মিলিয়ে দেখবেন। যদি দেখেন কোথাও কাউকে যে পরিমান নোট দিয়েছেন তাতে টাকার পরিমান কম হয় তাহলে তিনি ধরে নিবেন তিনি লোকটাকে টাকা কম দিয়েছেন।

তখন তাকে ফোন করে জানতে চাইবেন স্যার আজকে আপনি টাকা তুলতে এসেছিলেন কতটাকা তুলেছিলেন এবং আমরা আপনাকে কতটাকার নোট কতপিস দিয়েছি যদি বলতেন।দেখা গেলো আসলেতো ভুল হয়নি তাই ওপাশ থেকে জানানো হলো টাকা ঠিক আছে। তার মানে অফিসার লেখার সময় ভুল সংখ্যা লিখেছিলেন। কিন্তু যে এক হাজার টাকা বেশি সেটার তাহলে কি হবে?কারণ কোথাও আর কোন ক্লু নেই। শেষে টাকাটা সান্ড্রি একাউন্টে জমা করা হবে। ধরুন একসপ্তাহ পর আপনি এসে ক্লেম করলে তখন এই টাকাটা পাবেন না কারণ যার কাউন্টারে আপনি টাকা বেশি দিয়েছিলেন তার কাউন্টারে সেদিন কোন টাকা বেশি হয়নি!!এটাতো আপনিও স্বীকার করবেন পুরো প্রক্রিয়াটা দেখালাম। কথা শেষ হয়নি। পেমেন্টের ক্ষেত্রে যেমন তিনি কল করেছেন রিসিভের ক্ষেত্রেও চেক করবেন। যদি কোন সন্দেহজনক কিছু থাকে তবে সেই গ্রাহককে একই ভাবে ফোন করা হবে। যদি সেরকম কিছু না থাকে তাহলে টাকাটা সান্ড্রি একাউন্টে জমা হবে।

  • এবার আসি টাকা কম দেওয়া বা বেশি দেওয়া বিষয়ে। কিংবা কম নেওয়া বিষয়েঃ

আপনি টাকা জমা দিতে গিয়েছেন এবং ইচ্ছেকরে হোক বা অনিচ্ছায় হোক আপনি ভাউচারে যে পরিমান লিখেছেন টাকা তার চেয়ে কম দিয়েছেন। অফিসার সেটা নেওয়ার সময় ধরতে পারেনি এবং সেভাবেই জমা করে দিয়েছে। দিন শেষে অফিসারের টাকা শর্ট পড়বে। সেটা যদি এক লাখও হয় বা একশো হয় তা্ও একই কথা।দিন শেষে যখন ক্যাশ মিলবে না তখন সে সব ভাউচার চেক করবে। যদি কোথাও নোটের সংখ্যার সাথে টাকার মিল না থাকে তবে সেটাকে সাসপেক্ট করবে। আর যদি সবঠিক থাকে আসলে ফিজিক্যাল টাকা দেওয়ার সময় আপনি কম দিয়েছেন তবে মনে রাখবেন সেই শর্ট পড়া টাকার পুরোটাই ওই অফিসারকে নিজের পকেট থেকে দিয়ে  ক্যাশ মেলাতে হবে। সেটা এক লাখ টাকা হলেও তাকেই দিতে হবে। ব্যাংক কোন রকম সহযোগিতা করবে না। তাহলে উপরের বর্ননা থেকে কি দাড়ালো? আপনার থেকে কোন কারণে টাকা বেশি নিলেও সেটা ওই অফিসার নিজের কাছে রাখতে পারবে না বা খেতে পারবে না আবার আপনাকে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে দিলে সেটাও অফিসারকে নিজের পকেট থেকেই দিয়ে দিতে হবে। সুতরাং সব কিছুতেই অফিসারের বিপদ।আর দিন শেষে ভাউচার চেক করতে গিয়ে যদি ভুলটা ধরা পড়ে তাহলে অবশ্য টাকাটা উদ্ধার হয়। বেশি হলে তা গ্রাহককে দিয়ে দেওয়া হয় এবং কম হলে সেটাও গ্রাহক থেকে আদায় করা সম্ভব হয় কারণ সব প্রমান আছে।

বান্ডিলে নোট মিশ্রন হওয়া না হওয়াঃ

অনেক সময় আপনারা অভিযোগ করেন অমুক ব্যাংক বা এটিএম থেকে এক হাজার টাকার বান্ডিলের মধ্যে 500 টাকার নোট ঢুকিয়ে দিয়েছে বা 500 টাকার নোটের মধ্যে 100 টাকা ঢুকিয়ে দিয়ে বাটপারি করেছে। এই কথাটা ভুল। আমি আগেই খানিকটা বলেছি যে ক্যাশ অফিসাররে ড্রয়ারে প্রচুর লুজ টাকা বা খুচরা নোট জমা হতে থাকে। একই ড্রয়ারে সবধরনের খুচরা নোট থাকে। দিন শেষে অফিসার সেই টাকা গুছিয়ে বান্ডিল করেন।কোন কারণে সেই গোছানোর সময় নোট মিক্সড হতে পারে এবং আমি আগেই দেখিয়েছি ভুল যাই হোক বিপদ কিন্তু ঠিকই অফিসারের মাথার উপর থেকেই যায়। এই নোট মিক্সিং হলেও ঘটনা একই ঘটে। দিন শেষে তার ক্যাশ মেলে না।ধরুন 500 টাকার নোটের মধ্যে একটা 100 টাকা ঢুকে গেছে তার পর সেই বান্ডিল যখন মেশিনে কাউন্ট করা হচ্ছে তখন কিন্তু ঠিকই 100 পিচই দেখাবে। এর মানে দিন শেষে ওই অফিসারের 400 টাকা বেশি হবে! আসলে কিন্তু বেশি না। সে অনেক চেষ্টা করেও যদি খুজে বের করতে না পারে যে কেন বেশি হলো তাহলে ওই চারশো টাকা ব্যাংকের সান্ড্রি একাউন্টে জমা হয়ে যাবে।

পরদিন বা যে কোন দিন সেই মিক্সড বান্ডিল পেমেন্ট করা হলে সবার অজান্তেই 500 টাকার নোটের মধ্যে 100 মিক্সড হয়ে গ্রাহকের হাতে চলে যাবে এবং গ্রাহক অফিসার এবং ব্যাংকে গালি দিবে। ঘটনা এখানেই শেষ না। গ্রাহক বান্ডিলের উপরের ফ্লাই লিফ না ছিড়ে ব্যাংকে গেলে সেটা বদলে দেওয়া হবে। গ্রাহকের সামান্য সময় নষ্ট হবে এর বেশি কিছু না। কিন্তু যে অফিসারের সিগনেচার আছে তার কি হবে জানেন? মেমো খাবে। পাশাপাশি ওই একশো টাকা বের করে সেখানে একটা পাচশো টাকার নোট নিজের পকেট থেকে দিয়ে দিতে হবে। অফিসারের চারশো টাকা লস। কারণ গতদিন যে টাকা সে বেশি ছিলো ভেবে সান্ড্রি একাউন্টে জমা করেছিল তা আর সে বের করতে পারবে না।অথচ পরেরদিন বা যেদিন ধরা পড়বে যে বান্ডিলের মধ্যে নোট মিক্সিং হয়েছে সেদিনতো তাকে ঠিকই সেটা দিতে হবে। একই ভাবে জাল টাকার ক্ষেত্রেও ঘটনাটা সেম।আপনি মনে রাখবেন একজন ক্যাশ অফিসার অবশ্যই সৎ।

তার পদে পদে বিপদ মাথায় নিয়ে,গ্রাহকের গালি শুনে,উর্ধতন কর্মকর্তার ঝাড়ি শুনে কাজ করতে হয়। অফিসে সব চেয়ে বেতন কম তাদের,সবচেয়ে সম্মান কম তাদের,সবচেয়ে গালি শুনতে হয় তাদের কিন্তু সবচেয়ে প্রেশার নিতে হয় তাদের। দু চারজন বাদে অধিকাংশ গ্রাহক টাকা উত্তোলন করতে গিয়ে কোন ভাবে বেশি টাকা পেলে তা আর ফেরৎ দেয় না। কোন ভাবে আইডেন্টিফাই করা না গেলে পুরো টাকা সেই অফিসারকেই বহন করতে হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে অফিসারের পুরো মাস এমনকি দুই মাসের বেতনের সমপরিমান টাকাও একদিনে গচ্ছা দিতে হয়। কিন্তু এটা নিশ্চিত থাকুন আপনি টাকা জমা দিতে গিয়ে যদি মাত্র একটাকাও বেশি দিয়ে আসেন কিংবা এক লাখও বেশি দিয়ে আসেন তা ওই অফিসার ভোগ করে না বরং সেটা ব্যাংকের সান্ড্রি একাউন্টে জমা থাকে। আপনি প্রমান করে সেটা ফিরিয়ে নিতে পারেন।

  • এটিএম মেশিন থেকে জাল টাকা,তিনটুকরা নোট বের হওয়া বিষয়েঃ

বাস্তব জ্ঞান সম্পন্ন কোন ব্যাংক কর্মকর্তাই অস্বীকার করবে না যে কখনোই কোন ব্যাংকের এটিএম থেকে জাল টাকা বা তিনটুকরো জোড়া দেওয়া নোট বের হয় না। কিংবা 500 টাকার মধ্যে 100 টাকার নোট বা 1000 টাকার মধ্যে 500 টাকার নোট মিক্সড হয়ে বের হয় না।যদি কেউ বলে যে বের হয় না তাহলে ধরে নিতে হবে সেই অফিসার মুর্খ এবং বাস্তবজ্ঞান সম্পন্ন নয় পাশাপাশি নিজের ব্যাংকের দোষগুলো ঢাকতে চা। প্রকৃত পক্ষে এটিএম থেকে কালেভদ্রে (খুবই রেয়ার) এই সব ঘটনা ঘটতে পারে। আপনি মাত্র 500 টাকা উঠিয়েছেন সেটাও কিন্তু জোড়া দেওয়া হতে পারে,জাল হতে পারে। আবার ধরুন মাত্র পনেরশ  টাকা উত্তোলন করতে গিয়েও একটা ভিন্ন নোট পেতে পারেন।আমি না বললেও অন্তত এরই মধ্যে অনেকেই হয়তো বুঝতে পারছেন আসলে কি ঘটে? দেশের অধিকাংশ ব্যাংক যাদের বৃহদ এটিএম নেটওয়ার্ক আছে যেমন ডাচ বাংলা ব্যাংক,ব্র্যাক ব্যাংক থার্ডপার্টি ভেন্ডরের মাধ্যমে ক্যাশ লোড করে থাকে।সে ক্ষেত্রে ভেন্ডর প্রথমে ব্যাংকের শাখা থেকে টাকা নিয়ে আসে।

আগেই ঘটনাগুলো পড়ে থাকলে বুঝতে সুবিধা হবে। ভেন্ডরকে শাখা যে টাকার বান্ডিলগুলো দিয়ে থাকে তা কিন্তু অফিসারেরাই করে এবং সেই টাকার মধ্যে যদি আগের ওই ভুল মিক্সিং বান্ডিল থেকে যায় তবে সেটা ভেন্ডরের হাতে চলে যায়। একই ভাবে জালটাকা বা তিনচারটুকরা জোড়া দেওয়া নোটও থাকতে পারে।তো ভেন্ডর সেই বান্ডিল গুলো নিয়ে ট্রাংকে ঢুকায় এবং ট্র্যাংক বন্ধ করে সেখানে একধরনের ট্যাগ লাগিয়ে দেয় যা একবার লাগালে খুলতে হলে ছিড়ে ফেলতে হয় এবং এই ট্যাগের নাম্বার তিন চার স্তরে বিতরণ করা হয়। অর্থাৎ খুলতে হলে তা কেবল থার্ডপার্টি ভেন্ডর অফিসে নিয়ে বুঝিয়ে দেওয়ার সময় খুলতে হবে অথবা এটিএম লোডিং এর সময় খুলতে হবে। একবার খুললে ট্র্যাংক অরক্ষিত অবস্থায় থাকবে এবং সেই অবস্থায় আপনি কোথাও মুভ করতে পারবেন না। এর পর এটিএম লোড দেওয়ার সময়  এটিএম মেশিনের মধ্যে চারটা ক্যাসেট থাকে। এই ক্যাসেট হলো একরকম ড্রয়ার। যার একটিকে 1000 টাকার নোট একটিতে 500 টাকার নোট এবং একটি ফাকা থাকে। আর চতুর্থ ক্যাসেট হলো বিন হিসেবে ব্যবহারের জন্য।

অর্থাৎ কেউ টাকা ওঠানোর সময় অনেক সময় ননডিসপেন্স হতে পারে। আপনি কমান্ড দিলেন কিন্তু টাকা বের হলো না সেই টাকাটা ওই ননডিসপেন্স ক্যাসেটে জমা থাকে। আগেকার দিনে মেশিনে 100 টাকার নোটও দেওয়া হতো তাই চারটা ক্যাসেট সিস্টেম রয়েই গেছে। যাই হোক বলছিলাম মাত্র 500 টাকা উঠাতে গেলেও সেটা জাল পড়তে পারে। কিভাবে সেটা বলছি। ধরুন কোন এক 500 টাকার বান্ডিলের মধ্যে ক্যাশ অফিসারের সেই ভুল ক্রমে থাকা নোটটি রয়ে গেছে এবং অন্যান্য বান্ডিলের সাথে সেই বান্ডিলের নোটগুলোও এটিএমএ লোড দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য নোট তুলে নেওয়ার পর সবার সামনে ওই জাল নোট বা জোড়াদেওয়া নোট এসে গেছে সেই সময়ে আপনি 500 টাকা উঠাতে চাইলেন। তাহলে সেটাই আপনার হাতে পড়বে। আর তখনই আপনি গালি দিতে শুরু করবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যাংক সব সময় বলে থাকে আপনি টাকা যেখান থেকেই উঠান না কেন দেখে নিবেন,গুনে নিবেন। এটিএম থেকে টাকা তুলে চেষ্টা করবেন গুনে বুঝে দেখে নিতে।

সেখানেই যদি ভুল চোখে পড়ে তবে রাগ করবেন না,বিচলিত হবেন না বরং তাদের কলসেন্টারে ফোন করে বিষয়টি জানাবেন। সব এটিএম এর একটা করে নাম্বার থাকে আর সেখানে ক্যামেরাও থাকে। আপনি ক্যামেরার দিকে নোটটি অথবা নোটগুলো দেখান এবং সেখান থেকেই ফোন করে বিষয়টি জানান। আপনি নিশ্চিত থাকুন সমাধান পাবেন। এক সপ্তাহ সময় লাগলেও আপনি সমাধান পাবেন। আপনার 500/1000 টাকার জন্য ব্যাংক কোন ভাবেই তাদের রেপুটেশন নষ্ট করবে না এবং আপনাকে 500/1000 জাল বা মিক্সড নোট দিয়ে ঠকাচ্ছে না এটা শ্রেফ একটা ভুল যা আগেই বিস্তারিত লিখেছি কিভাবে ভুল সংগঠিত হয়।আরও আছে, আপনাকে আগেই বলেছি ব্যাংকে সান্ড্রি একাউন্ট বলে একটা একাউন্ট আছে যেখানে ক্যাশে কোন টাকা অতিরিক্ত হলে তা জমা রাখা হয়। প্রতিটি ব্যাংকের প্রতিটি শাখায় এই সান্ড্রি একাউন্টে অনেক টাকা জমা পড়ে আছে যার কোন মালিক এসে প্রমান সহ দাবী করেনি। যারা প্রমান সহ দাবী করেছে তারা তাদের টাকা ফেরত পাচ্ছে। যদিও সেটা এক দু মাস পার হয়ে গিয়ে থাকে।

8 জুন 2020

নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতন কমছেইনা

পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ যখন মৃত্যুর মুখোমুখি দাড়িয়ে ঠিক তখন বাংলাদেশে এক শ্রেণীর মানুষ নামের অমানুষ কারো কারো জীবন অতিষ্ঠ করে তুলছে। আজও কিছু নরপিশাচ তাদের হিংস্র থাবায় খুবলে খাচ্ছে নারী ও কন্যা শিশুকে।এ যেন করোনার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তাদের নির্মমতা। শুধু মাত্র জুন মাসে সারা দেশে ৩০৮ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে যা আমরা বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড উপ পরিষদের প্রকাশিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানতে পারি। এই ৩০৮ জনের মধ্যে ১০১ জন নারী এবং বাকি সব কন্যাশিশু!পত্রিকার পাতা খুললেই প্রতিনিয়ত নারী ও কন্যাশিশু খুন,ধর্ষন নির্যাতনের খবর চোখে পড়ে যা সত্যিই বেদনা দায়ক। স্বাধীন বাংলাদেশে যে হারে নারী ও শিশু ধর্ষিতা হচ্ছে বোধকরি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বর্বর পাকিস্তানিদেরকেও ওরা হার মানিয়ে দিয়েছে। মহিলা পরিষদ যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তা দেশের প্রথম শ্রেণীর  ১৪টি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত এক মাসের সংবাদ থেকে তথ্য নিয়ে করা হয়েছে।

করোনা ভাইরাস মহামারি আকারে হানা দিয়ে আমাদের অগনিত প্রিয়জনকে চিরতরে আমাদের থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে ঠিকই কিন্তু একদিন না একদিন নিশ্চই করোনা নামের এই ঘাতক বিদায় নেবে এবং আমার আবার আগের জীবনে ফিরে যেতে পারবো। কিন্তু আফসোস বছরের পর বছর ধরে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ধর্ষক,নির্যাতক নামের এই সব নরাধমেরা সমাজের জন্য করোনা ভাইরাসের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর।করোনা ভাইরাস থেকে বেঁচে থাকার জন্য আমরা কিছু নিয়ম অনুসরণ করলেই রক্ষা পেতে পারি কিন্তু এই সব ধর্ষক,খুনী,নির্যাতক নামের করোনা ভাইরাস থেকে কি করে সমাজের নারী ও কন্যা শিশুরা নিরাপদ থাকবে তা আজও আমরা কেউ জানি না। নারী ও কন্যা শিশুরা নিজ গৃহে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে,বাইরে নির্যাতিত হচ্ছে, সমাজের যে যেখানেই থাকুকনা কেন কোন না কোন ভাবে সে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। যেন নারীদের জন্মই হয়েছে নির্যাতিত হওয়ার জন্য। কত আইন হলো,কত সংগঠন হলো, নারী অধিকার নিয়ে কত সভা সেমিনার হলো, কত আন্দোলন হলো কিন্তু কিছুতেই এই সব খুনী,ধর্ষকদের দমিয়ে রাখা গেলো না। কাল হোক বা পরশু হোক বা দুবছর পর হোক করোনা ভাইরাসের টিকা আবিস্কার হবে এবং একদিন তা সমুলে নিপাত যাবে কিন্তু এই সব নির্যাতন কারী থেকেই যাবে। এমন একটি সামাজিক টিকা দরকার যার মাধ্যমে সমাজ থেকে নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনকারী এবং ধর্ষকদের সমুলে উৎপাটন করা যাবে।

মহিলা পরিষদের প্রতিবেদন সত্যিই উদ্বেগজনক। মাত্র এক মাসে সারা দেশে ৬৯ জন ধর্ষণ ও ২৫ জন গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ সময় ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে সাত জনকে। এ ছাড়া ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ১৫ জনকে। শুধু এখানেই শেষ নয় বরং এর বাইরে শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছে তিনজন, যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে ছয় জন। মানুষ যেখানে করোনার ভয়ে শিথিয়ে আছে সেখানে কিকরে নির্ভয়ে এই সব নরপিশাচেরা জঘন্য কাজে লিপ্ত হয়! ওদের নির্যাতনের ধরনও আলাদা আলাদা। এই এক মাসে অ্যাসিড আক্রান্তের শিকার হয়েছে এক জন। অগ্নিদগ্ধের শিকার হয়েছে চার জন। এমনকি অপহরণ করা হয়েছে মোট ১৪ জনকে। আবার একজনকে পতিতালয়ে বিক্রি ও করা হয়েছে!

এসিড নিক্ষেপ,শ্লীলতাহানি,যৌন নির্যাতন করেই ওরা ক্ষান্ত হয়নি বরং এই সময়ে বিভিন্ন কারণে ৬২ জন নারী ও কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়েছে। এদের মধ্যে যৌতুকের কারণে হত্যা করা হয়েছে অন্তত পাঁচ জনকে। আমরা শিশু সুরক্ষা সেল করেছি, নারী নির্যাতন বন্ধে কত কাজ করছি কিন্তু কিছুতেই এসব থামছে না।দরিদ্র পরিবারের শিশু এবং কিশোরী রুটি রুজির জন্য অপেক্ষাকৃত ধনীদের বাসায় কাজ করতে আসে। সেখানেও তারা নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। গত এক মাসে দুই জন গৃহপরিচারিকাকে হত্যা করা হয়েছে এবং এক জন গৃহপরিচারিকাকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়।

করোনায় জীবনযাত্রার অনেক কিছু পরিবর্তন হলেও নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতন কমেনি বরং বেড়েছে অনেক বেশি। এই এক মাসে যৌতুকের কারণেও নির্যাতন করা হয়েছে সাত নারীকে। আমরা আইন করে যৌতুক বন্ধের চেষ্টা করেছি ঠিকই কিন্তু তার পরও হরহামেশাই যৌতুকের বলি হতে হচ্ছে নারীকে। শারীরিক নির্যাতন, উত্ত্যাক্ত করা কোন কিছুই থামেনি। আর এসব কারণে আত্মহত্যার পরিমানও বেড়েছে।এবং প্রতিটি আত্মহত্যাকেই একটি হত্যাকান্ড হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। জুন মাসের পরিসংখ্যন বলছে এই সময়ে বিভিন্ন নির্যাতনের কারণে ১৭ জন নারী আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে। ৩৪ জন নারী ও কন্যাশিশুর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। বাল্যবিবাহ আগে থেকেই নিষিদ্ধ ছিল তার ওপর করোনাকালে যে কোন বিয়ের অনুষ্ঠানে সরকারি বিধি নিষেধ থাকলেও প্রতিবেদন অনুযায়ি গত মাসে অন্তত বাল্যবিবাহ হয়েছে এক কন্যাশিশুর।

পরিসংখ্যন অনুযায়ি করোনাকালে নারী নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে। কিন্তু সব তথ্য গণমাধ্যম পর্যন্ত পৌঁছায় না। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণসহ দ্রুত গ্রেফতার এবং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা জরুরী। অন্যথায় এই সব ঘাতক,নরপিশাচদের থাবায় আগামীতে আরও বহু প্রাণ ঝরে যাবে এবং নির্যাতন,ধর্ষনের শিকার হবে অগণিত নারী ও কন্যা শিশু।

উন্নত রাষ্ট্র গড়তে চাই ইতিবাচক পরিবর্তন

বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। এই দেশে রাজনীতি গণতন্ত্রের অস্ত্র হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু রাজনীতি এখন অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। নানাক্ষেত্রে দলীয়করণ, একে অন্যের দোষারোপ করা এখন নিত্যদিনের রুটিনে পরিণত হয়েছে। দুই সমান্তরাল রেখার মতন চলে রাজনৈতিক প্রধান দুই দল, অথচ এদের একই সরলরেখায় চলার কথা ছিলো। ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি ও তার নেতাকর্মীরা মনে করে ক্ষমতা যাদের হাতে সেই আওয়ামীলীগের সাথে জনগণের কোনো সম্পর্ক নেই। অন্যদিকে ক্ষমতাশীনরা মনে করে বিএনপিকে জনগণ ত্যাগ করেছে। এই গ্যাপ পুরণের দুই দলের কোনো ইচ্ছা বা প্রচেষ্টা নেই।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয় হয়েছিল একটি স্বপ্ন নিয়ে। যে স্বপ্নের বাংলাদেশ হবে ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি তে সমুজ্জ্বল সম্ভাবনাময় একটি রাষ্ট্র । স্বাধীনতার ঊনপঞ্চাশ বছরে ক্ষমতার পালাবদলে এদেশের সফলতা ও ব্যর্থতা দুটোই বেশ আলোচিত। রাষ্ট্রের সাথে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত রাজনীতি।রাষ্ট্রের ছোট থেকে বড় সব বিষয়ের সাথে এটি জড়িত। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো সিংহভাগ তরুণ এখন রাজনীতি বিমুখ।তরুণ সমাজ দেশের মোট জনসংখ্যার একটা বড় অংশ । যারা দেশ, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি নিয়ে নতুন চিন্তা করে, সমাজকে, সুখী সমৃদ্ধ বৈষম্যহীন করে গড়ে তুলতে চায়। যেখানে দূর্নীতি, অপসংস্কৃতির বদলে সৎ এবং ঝঞ্ঝামুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

তরুণ প্রজন্মই পারে আধুনিক চিন্তা, মনন শক্তি দিয়ে কাজের প্রসার ঘটানো, বেকারত্ব ও গোঁড়ামি মুক্ত স্বপ্নের বাংলাদেশ গঠন। আর তাই প্রয়োজন তরুণ প্রজন্মের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা। উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এক দুরন্ত গতির সময় পার করছে, সেই সময়কে আরো এগিয়ে নিতে সবক্ষেত্রে সবধরণের মানুষের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ খুবই জরুরি, সেখানে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখতে পারে তরুণরাই। বর্তমান বাঙালি তরুণ প্রজন্মের সামনে দেশের কিছু লজ্জাজনক সামাজিক সমস্যা, সাম্প্রদায়িকতা, বৈষম্য, বেকারত্ব যা একবিংশ শতাব্দীর সভ্যতা, আধুনিকতার সম্পূর্ণ বিপরীতে।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় যে ভিতের ওপর হয়েছিলো, যেই সংস্কৃতির চর্চাকে প্রতিষ্ঠিত করতে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিলো সেই চর্চা থেকে যোজন যোজন দূরে গিয়ে ব্যাক্তি এবং গোষ্ঠী স্বার্থ বড় হয়ে ওঠায় রাষ্ট্রের উন্নয়নের গতি শ্লথ হয়েছে, সেই সাথে বারবার থমকে গিয়েছে গণতান্ত্রিক চর্চার পথ।  তরুণরা সৃষ্টিশীল, দেশপ্রেমিক। এই তরুণরাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে তুলেছিলো গণজাগরণ মঞ্চ, এছাড়াও সামাজিক, অর্থনৈতিক, গবেষণা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেখানেই তরুণরা নেতৃত্ব দিয়েছে সেসব কাজে সফলতার হার বেড়েছে।

বর্তমানে জাতীয় রাজনীতিতে দ্বিদলীয় বৃত্ত দেখা যায়, যাদের রাজনৈতিক অদুর্দর্শিতার কারণে কখনো ভোটারবিহীন নির্বাচন, কখনো সামরিক শাসকদের ক্ষমতাদখল, কখনো পেছনের দরজা দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের পায়তারা, এসব রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নও থমকে গিয়েছে বারবার, তবুও শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দেশ যেটুকু এগিয়েছে সেটুকুতে তরুণদেরই একটা বড় অবদান আছে।

তরুণদের সরাসরি রাজনীতিবিমুখতাই সকলের অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের চর্চা ব্যহত হয়ে, অগণতান্ত্রিক গোষ্ঠী রাষ্ট্রক্ষমতা দখল নিতে পারার অন্যতম কারণ । এক পক্ষ বলছে দেশে কোন রাজনৈতিক সংকট নেই অন্যদল বলছে রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এই দুইয়ের মাঝে যে সাধারণ জনগণ আছে তারা কি মনে করছে তা কেউ কখনো ভেবে দেখছে না। আমজনতা বলে কথা।এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক যে সংকট বিরাজ করছে তা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হতে পারে রাজনীতিতে তরুণদের আরো অংশহগ্রহণ বাড়িয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় তরুণদের অংশ নেবার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, অসাম্প্রদায়িক বাঙালির মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন হয়েছিল মূর্খতা ও রাজনৈতিক অসচেতনতা থেকে। তরুণ সমাজ রাজনীতির মোড় ঘুরিয়েছে সবসময়। বিপ্লব এসেছে তাদের হাত ধরেই। কিন্তু বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক সময়টিকে ফ্রেমে ধারণ করলে সেটা খানিকটা আলাদাই মনে হয়। কখনো কখনো দ্বিধায় পড়ে যেতে হয়। মনে হয় ক্ষমতাশীল ও দায়িত্বশীল পদে অবস্থানকারী লোকদের ব্যবহারে পুরনো সামন্তীয় দম্ভ ফুটে উঠছে।

বারবার রাজনীতির মাঠে বর্ষিয়ানদের পালাবদল উন্নয়নের ধারায় কতটা গতি আনতে পারে তা নিয়ে প্রশ্ন করার কিছু নেই।বিগত বছর গুলোতে তাদের কার্যক্রম সবাই দেখেছে। সুতরাং তরুণদের কাঁধে সেই একই দায়িত্ব দিতে পারলে তারা তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রের কতটা উন্নয়ন এবং গণতান্ত্রিক ধারা আরো সমু্ন্নত করতে পারবে সেটা দেখার সুযোগ তৈরি করা উচিৎ।

রাজনীতি শব্দটা আজকাল অনেকের জন্য একটা লাভজনক ব্যবসার নাম হয়ে উঠেছে। অথচ বঙ্গবন্ধু যে স্বপ্ন নিয়ে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন সেই  স্বপ্নে কোথা্ও এরকম হওয়ার কথা ছিল না। মানুষের অধিকার, ন্যূনতম চাহিদা মেটাবার ব্যবস্থা, সামাজিক ন্যায়, মানবিক মর্যাদা এসবের জন্য ব্রিটিশ শাসন থেকে পাকিস্তানের শৃঙ্খল ভেঙে বাংলাদেশের জন্ম। কিন্তু সেখানেও কেবল খাবার, বাসস্থান, স্বাস্থ্য আর শিক্ষার সংস্থান করতে মানুষের নাভিশ্বাস যেমন বাড়ছে, অন্যদিকে মানুষের টাকা অকল্পনীয় উন্নয়ন ব্যয় ও দুর্নীতি, ব্যঙ্ক, শেয়ার কেলেঙ্কারি নানাভাবে লোপাট অব্যাহত আছে।

তরুণ প্রজন্মের অংশীদার হিসেবে ঐতিহাসিক পরাম্পরায় এ দেশের তরুণরা যা করে এসেছে তা অব্যাহত রাখা; এই রোগ, স্বপ্নের বাংলাদেশ থেকে যে বিচ্যুতি তা চিন্তায়, কাজে, ঘরে, আড্ডা-অবসরে, রাজপথে প্রতিরোধ করা; নয়ত আমাদেরই হয়ত পচে যাওয়া একটা দেশ ও সমাজের ভার বইতে হবে।

টিএসসিতে কিংবা চারুকলায় গেলে দেখা যায় তরুণ প্রজন্মের ব্যাগে, ক্যাপে, নোটবুকে চে গুয়েভারা, ফিদেল ক্যাস্ট্রো সহ অন্যান্য বিপ্লবী নেতাদের ছবি বা ট্যাটু। অথচ সেই তরুণদের মধ্যে সরাসরি রাজনীতির প্রতি তেমন কোন আগ্রহ দেখতে পাওয়া যায় না।ফলশ্রুতিতে স্বার্থান্বেষী কিছু মানুষে ছেয়ে যাচ্ছে ছাত্র রাজনীতির বড় একটা অংশ।শুধু মাত্র একা শেখ হাসিনার পক্ষে সেসব সামলে ওঠা সম্ভব নয়। তরুণদের সুস্থ রাজনীতির চর্চার জন্যে সবচেয়ে বেশি জরুরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অবাধ রাজনৈতিক চর্চা, নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাংস্কৃতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক তথা গণতান্ত্রিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। ছাত্র সংসদ নির্বাচনের রীতি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলেও সেটা চালু হয়েছে কিছুদিন হলো তবে তা মানুষের মধ্যে আশা জাগাতে পারেনি। সেখানেও ক্ষমতার প্রভাব দেখানোর রীতি চোখে পড়ছে। 

ভোটের রাজনীতিতে যেখানে তরুণরা একটা বড় প্রভাব রাখতে পারে, সেখানে সরকার পরিচালনায় তরুণদের অংশগ্রহন একেবারেই হতাশাজনক। নির্বাচন পদ্ধতি,সরকার পদ্ধতিসহ রাষ্ট্রের বিভীন্ন বিভাগ নিয়ে তরুণদের মতামত ও অংশগ্রহণেরর  ভিত্তিতে সরকার পরিচালিত হলে সে সরকার আরো গতিশীল এবং কার্যকরি হয়ে উঠতো। উন্নত রাষ্ট্র গড়তে হলে এই সব ইতিবাচক পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরী।ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকেও সংশোধন করতে হবে এবং আমাদেরকে যুক্তিযুক্ত কথা বলতে দিতে হবে যেন তার আলোকে সরকার সময়োপযোগি সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারে।যেটা হয়ে উঠবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সত্যিকারের সোনার বাংলা।যেখানে কোন খাদ থাকবে না।

জাজাফী

নিবন্ধকার,ও উন্নয়নকর্মী

www.zazafee.com

5 আ   গ ষ্ট 2020

সখদের বাসায় যাওয়া

শিশু শিল্পীদের মধ্যে কেবল মাত্র একজনের বাসায় আমি গিয়েছি। সেই একজন হলো সাদিকা মালিহা সখ।আমি নিজেই কল্পনা করতে পারিনি যে ওভাবে সত্যি সত্যিই গিয়ে হাজির হবো। এর আগে একবার অবশ্য অতিথি ইশরাতের বাসার নিচে গিয়ে ফিরে এসেছি। ওকে একটা পার্সেল দিতে গিয়েছিলাম। ও অবশ্য জানতো না যে আমি যাবো কিংবা যাওয়ার কোন পরিকল্পনাও ছিলো না। তবে সখদের বাসায় যাওয়ার জন্য সখ এবং ওর পরিবার আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। দীর্ঘ 14 বছর পর ঢাকার বাসা ছেড়ে দিতে বাধ্য হলাম। সব কিছু সরিয়ে নেওয়ার মত কেউ না থাকায় আমাকেই কক্সবাজার থেকে তিনদিনের জন্য ঢাকায় যেতে হলো। তিনদিন আসলে খুবই কম সময়। 14 বছর ধরে যা কিছু জমেছে তা কি তিনদিনে সরানো সম্ভব ? বিশেষ করে যদি সেটা সাজিয়ে গুছিয়ে সরাতে হয়। আমি দ্বিতীয় দিন সকালেই অনেকটা খেই হারিয়ে ফেলেছিলাম। হঠাৎ মনে হলো এতো চিন্তা না করে যা কিছু আছে সব প্যাক করে ফেলি তার পর সময় পেলে যখন পারি দেখে শুনে আলাদা করে নেবো। যে ভাবনা সেই কাজ। দেখা গেলো দ্বিতীয় দিন বিকেলেই সব গুছিয়ে কুরিয়ার করে দিলাম। কিছু বই পাঠালাম তুর্যদের বাসায়।সম্ভবত 180 কপি বই পাঠিয়েছি ওদের ওখানে। এর বাইরে কিছু বাড়িতে পাঠিয়েছি আর বাকি কিছু কক্সবাজারে।

তুর্যর আম্মু,দিহানের আম্মু,তাসিন তাজিম এবং সখ সবাই বলেছিল যেন আমি দেখা করি। কিন্তু সবার সাথে আমার বন্ধুত্ব এতো ভালো যে এক দুই ঘন্টার জন্য দেখা করে কোন আনন্দই হবে না বরং দুঃখ হবে যে ইস কেন আরও বেশি সময় থাকা হলো না। তুর্যর আম্মুকে বললাম এবার আসতে পারবো না। অন্য কোন দিন আসবো। তাসিন তাজিমকে বললাম তোমাদের বাসায় আসার সম্ভাবনা প্রবল কারণ বনশ্রীতে আমি আমার আরেকটা পরিচিত ভাইয়ের বাসায় যেতে পারি তাহলে ওখান থেকে তাসিন তাজিমের বাসায় যাওয়া সহজ হবে। তবে কাউকেই কথা দেইনি। এর মাঝে সখও বললো আমি যদি যাই হতে খুশি হবে। আমি বললাম কথা দিচ্ছি না তবে ঠিকানা দিয়ে রাখলে সুযোগ পেলে গিয়ে বাসার নিচে দাড়িয়ে ফোন করবো। যেহেতু দ্বিতীয় দিনেই কাজ শেষ করে রেখেছি আর শেষ দিন শুধু ব্যাংকে একটু কাজ ছিলো সেটা সারতে সারতে দুপুর একটা বাজলো। ভাবলাম হাতে বেশ সময় আছে তাই কোন এক বাসা থেকে ঘুরে আসা যেতে পারে। একটা মোটরসাইকেল ভাড়া করে রওনা হলাম সখদের বাসায়।মোটরসাইকেল থেকে নামার পর দেখি লোকটা তার হেলমেট নিতে ভুলে গেছে যা আমার মাথায় তখনো লাগানো। হেলমেট খুব হাল্কা হওয়ায় বুঝতেই পারিনি যে মাথায় হেলমেট আছে।সেটা কিভাবে লোকটার কাছে পৌছানো যাবে তা নিয়ে অনেক সময় পার করলাম কিন্তু কাজের কাজ কিছু হলো না।শেষে উপায় না পেয়ে বাসা অব্দি নিয়ে গেলাম।যদি কখনো লোকটা বাসার নাম মনে করে খোজ নিতে আসে তবে পেয়ে যাবে। 

সখদের বাসাটা বিরাট এক বিল্ডিং এ। মনে হয় ছাদটা আকাশে গিয়ে ঠেকেছে। বাসার বাইরের আউটলুক দেখেই মনে হয় রাজপ্রাসাদ।তবে বাসার পার্কিংলট খুব একটা ভালো লাগেনি। নিচে দাড়িয়ে ফোন দিলাম সখকে। ওর আম্মু রিসিভ করলেন। নাম্বার যেহেতু সেভ করা নেই তাই জানতে চাইলেন কে আমি? আমি নিজের কথা না বলে জানতে চাইলাম এটা কি সখদের বাসা? তিনি বললেন হ্যা সখদের বাসা। আমি তখন নাম বললাম। ওপাশ থেকে সবার মধ্যে একরকর্ম উচ্ছ্বাস প্রকাশ পেতে দেখলাম। সখের আম্মু সখকে ডেকে বললেন জাজাফী এসেছে! যদিও তাদের বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে সত্যি সত্যিই আমি এসেছি। সখকে তিনি বললেন নিচে নেমে আমাকে রিসিভ করতে কিন্তু সখের নাকি নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিলো আমি এসেছি শুনে! ওরা কত সহজ সরল যে সামান্য এই আমি এসেছি শুনে এতোটা খুশি হয়েছে যে আম্মুকে বলেছে আম্মু একটা ইনহেলার কিনে আনো নিঃশ্বাস নিতে পারছি না এক্সাইটমেন্টের কারণে। অবশেষে সখের বাবা নেমে আসলেন। বললেন জাজাফী রাইট? আমি মাথা দোলালাম তিনি আন্তরিকতার সাথে হাত এগিয়ে দিলেন।

করোনার এই দিনে হাত মেলানো কি ঠিক? আমি বিষয়টা বললাম কারণ আমিইতো বাইরে থেকে এসেছি সুতরাং  জীবাণু বহন কারী হয়তো স্বয়ং আমিই। তার পরও তার আন্তরিকতার কাছে হার মেনে হাত মেলালাম। লিফটে করে উঠলাম সখদের বাসায়। রুমে ঢুকে দেখলাম সিমসাম নিরিবিলি একটা বাসা।মাত্র পৌনে তিনজন মানুষ থাকে বাসায়। সখের বাবা মা সখ আর ওর পুতুলের মত একটা ভাই। সে ভীষণ শান্ত আর ভদ্র তবে শুনেছি মাঝে মাঝে ভীষণ দুষ্টুমী করে।আমি হাতমুখ ধুয়ে ওজু করে নামাজ পড়লাম। এর মাঝে সখের ছোট্ট পুতুলের মত ভাইটা বার কয়েক আমাকে উকি মেরে দেখে গেলো। ভয় পাচ্ছিল কিংবা অপরিচিত দেখে সহজে আসতে চাইছিলো না। নামাজ শেষ হলে সখদের প্রধান রুমে গিয়ে বসলাম। গল্প হলো ওর বাবা মায়ের সাথে আর সখের ভাইকে কাঁধে নিলাম গল্প করলাম সখের সাথে।

সখের হাত থেকে ওর মোবাইল নিয়ে ওর আইডি থেকে মেসেঞ্জারে কল করলাম নির্ঝর বিশালকে। সেতো খুবই অবাক। বায়না ধরলো ভাইয়া আমাদের বাসায় আসো এক্ষুনি আসো।নির্ঝরের সাথে কথা শেষ করে সুবাইতাকে ফোন করলাম। সে যদিও তখন তার কাজিনদের সাথে গ্রামের বাড়িতে দারুন ব্যস্ত। তার পরও কিছুটা কথা হলো।ফোন করলাম জুয়েনাকে চমকে দেওয়ার জন্য তবে মনে হলো ও বেচারির মনটা কোন কারণে খুবই বিষন্ন। এর বাইরে ফোন করলাম আয়াজকে তবে কথা হয়নি।শুরুতে আমি কাউকেই বলিনি যে আমি সখদের বাসায় গিয়েছি।তবে একটু একটু করে অনেকেই জেনে গেলো যে আমি গিয়েছিলাম সখদের বাসায়। তখনই আমার ক্ষুদে বন্ধুরা মন খারাপ করা শুরু করলো। আয়াজ মনখারাপ করে কথাই বলবে না বলে সিদ্ধান্ত নিলো কিন্তু আমি পরে কক্সবাজারে ফিরে এসে সুন্দর করে বুঝিয়েছি সে বিষয়টি বুঝতে পেরেছে। দিহান রিহান তাসিন তাজিমকেও বুঝিয়ে বলেছি।ওরা বুঝতে পেরেছে। সবাই আমাকে এতো ভালোবাসে,পছন্দ করে যে আমি মুগ্ধ। একজীবনে আমিতো ওদের জন্য কিছুই করিনি। শুধু মাত্র ওদের একটা দুটো ছবি শেয়ার করেছি আর হয়তো দু চার কথা লিখেছি। ওদের কেউ কেউ আছে যাদের কাছে আমার সম্পর্কে নেগেটিভ কিছু বললেই ওরা রাগ করে! এমনকি মা বাবাও যদি বলে!! 

সখদের বাসাটা কেমন?

সখদের বাসাটা খুব সুন্দর,মনোরম,নিরিবিলি।ডায়নিং স্পেচ একটু ছোট তবে ওভার অল বাসাটা সুন্দর। একটা সুন্দর ড্রয়িং রুম আছে যেখানে দারুণ আড্ডা দেওয়া যায়। আবার চাইলেই স্টুডিও হিসেবে ব্যবহার করা যায়। বোধহয় এই রুমে সখ নাচ প্র্যাকটিস করে।সখদের বাসায় একটা রুম ফাঁকা পড়ে আছে সেখানে একটা টেবিল রেখেছে। সখ মাঝে মাঝে সেখানে বসে ছবি আঁকে আর ভাইয়ের সাথে আড্ডা দেয়।বাইরে তাকালেই খোলা আকাশ দেখা যায়।আমার বাসা নিয়ে যখন ঝামেলা হচ্ছিল তখন অনেকেই আমাকে নানা ভাবে সহযোগিতা করতে চেয়েছিল তাদের প্রত্যেকের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।সেই মানুষগুলোর মধ্যে সখের পরিবারও ছিলো। তারা আমাকে ওই খালি রুমটাই দিয়ে দিতে চেয়েছিল। উত্তরা হলে আমি অবশ্য প্রস্তাবটা লুফে নিতাম তবে নয়াপল্টন বলে আর লুফে নিতে পারিনি।যেমন আমার বইয়ের বিরাট একাংশ তুর্যদের বাসায় রেখে দিয়েছি। মজার ব্যাপার হচ্ছে বইগুলো কিন্তু বাক্সবন্দি হয়ে থাকবে না বরং খুবই আন্তরিকতা দেখিয়ে তুর্যর বাবা মা একটা নতুন বুকশেলফ পযর্ন্ত অর্ডার দিয়েছে যেন বইগুলি প্রদর্শন করা যায় এবং সুন্দর থাকে। সখদের বাসায় বড় একটা টিভি আছে যদিও এখন ইন্টারনেট ইমেইলের যুগে টিভি খুব একটা দেখাই হয় না। ওর পুতুলের মত ছোট্ট শান্ত ভাইটিও নিজে একা একাই ইউটিউব দেখে! ভাবা যায়!

কি কি খেলাম? আন্তরিকতা কেমন?

জীবনে প্রথমবার গিয়েছি,প্রথম বার দেখা কিন্তু মনে হয়েছে জনম জনমের পরিচিত আমি। আত্মার সাথে মিশে থাকা এক অসাধারণ সম্পর্ক যেন হৃদয়ের সাাথে হৃদয়ের। আমি যাওয়ার সাথে সাথে যেন রান্নার ধুম পড়ে গেলো।বিষয়টা অনেকটা এমন যে সখদের বাসায় জাজাফী আসেনি বরং এসেছে প্রিন্স অ্যাডওয়ার্ড! ফ্রিজ ভর্তি হরেক রকম মাছ মাংস ভর্তি। তা থেকে বের করতে গিয়ে সখের আম্মুর হরহামেশাই ভুল হচ্ছিল। এক রকম মাংস বের করতে গিয়ে বের হচ্ছিল অন্যরকম। খেতে বসে দেখি অন্তত 10 রকম আইটের রেডি! যে আমি বছরের পর বছর দুপুরে কিছুই খাই না তার সামনে দশ রকম পদ সাজিয়ে দিলে সে কি রেখে কি খাবে? সখের বাবা একটা একটা করে উঠিয়ে দিলেন। চিংড়ি রান্নাটার স্বাদ অন্যরকম ছিলো। আমি আগে কোথাও এতো স্বাদ করে চিংড়ি খাইনি। সখদের বাসায় গিয়েও আমার পুরোনো অভ্যাস আমি ত্যাগ করিনি। মানে দুই রকম মাছ খেয়েছি সবরকম কাটা সহ।ওরা সেটা অবশ্য নোটিশ করেনি তবে আমিই দেখিয়ে দিয়েছি।দুই তিন রকম সবজি ডাল একেবারেই ছুয়ে দেখিনি।খাবার শেষ করে সবে মাত্র গিয়ে বসেছি গল্প করবো বলে তখনই সখের আম্মু আবার প্লেটে করে রুটি আর হাসের মাংস নিয়ে হাজির। সত্যি বলছি হাসের মাংস অসাধারণ হয়েছিল কিন্তু আগেইতো হরেকম রকম খাবার খেয়ে পেট ভর্তি করে ফেলেছি তাই হাসের মাংস আর রুটি যতই সুস্বাদু হোক না কেন খেতে পারিনি। জোর করার পর জাষ্ট এক টুকরা মাংস আর এক টুকরা রুটি খেয়েছি। এটা খাওয়া শেষ হতে না হতেই দেখি কয়েক রকম ফল কেটে নিয়ে এসেছেন। পেটে যায়গা থাকলে তবেই না খাবো। তার পরও একটুকরা আম খেলাম। আর দুই রকম মিষ্টি খেলাম।

সখের বাবার সাথে অনেক বিষয়ে কথা হলো। মানুষ হিসেবে তিনি সত্যিই দারুণ।প্রথম বার দেখা হওয়ার পরও মনে হয়নি তিনি আমাকে প্রথম দেখছেন।সদালাপি এবং নিপাট ভদ্রলোক তিনি। তবে আমার খুবই বিব্রত লেগেছে আমার সাথে আপনি আপনি সম্মোধনে কথা বলার জন্য। আমি শুরুতেই বলেছিলাম আমাকে অনায়াসে তুমি বা তুই করেও বলা যাবে। আর নাম ধরে ডাকলে আরও ভালো। যেমন সখ,আয়াজ,রোহান,সিজদা আমাকে নাম ধরে ডাকে। যাই হোক গল্পে গল্পে অনেক সময় হয়ে গেলো আমার আবার ফেরার তাড়া ছিলো। আছরের নামাজ পড়লাম এবং এক কাপ ধোয়া ওঠা চা খেয়ে বিদায় নিলাম। আসার সময় আমার হাতে দুটো উপহার তুলে দেওয়া হলো। একটা উপহার প্রায় এক বছর আগে সখ বান্দরবন-রাঙ্গামাটির দিকে ভ্রমনে গিয়ে আমার জন্য কিনে এনেছিল (কি জিনিষ বলা যাবে না) সে যখন ভ্রমনে গিয়ে ওটা কিনেছিল তখনই আমাকে বলেছিল জাজাফী তোমার জন্য একটা গিফট কিনলাম যখন দেখা হবে দিবো তোমাকে। আরেকটা গিফট ওর বাবা মায়ের পক্ষ থেকে।প্রয়োজনীয় উপহার যা আমার নানা সময়ে বেশ কাজের।(এটাও বলবো না কি উপহার)।মজার ব্যাপার হচ্ছে উপহার দিয়েই তারা ক্ষান্ত হন নি বরং এক বক্স হাসের মাংশ আর রুটি দিয়ে দিয়েছেন! পেট এতো ভর্তি ছিলো যে আমি নিশ্চিত ছিলাম রাতে আর ক্ষুধা লাগবে না। হলোও তাই। রাত পেরিয়ে সকাল হলো এবং সকাল সাড়ে সাতটার দিকে আমি কক্সবাজারে পৌছালাম। গোসল সেরে ব্রাশ করে সখদের দেওয়া রুটি আর হাসের মাংশ খেলাম আয়েশ করে। রুটি এবং মাংসের স্বাদ অক্ষুন্ন ছিলো। হাসের মাংস না হয়ে অন্য কোন মাংস হলে এই গরমে নিশ্চই নষ্ট হয়ে যেতো।

বিদায়ের পালাঃ

স্বল্প সময়ে যে আপ্যায়ন সখ এবং ওর পরিবার করেছে তা অকল্পনীয়। অতিথিপরায়নতার দিক থেকে আমি সখের পরিবারকে 100 তে নম্বর দিতে গিয়ে 200 দিয়ে দেবো। আমাকে এগিয়ে দেওয়ার জন্য সখ নিচে নামতে চেয়েছিল তবে আমি নিষেধ করেছি। পরে ওর বাবা নিজে গাড়িতে করে আমাকে বেশ অনেকটা এগিয়ে দিলেন। আমি সেখান থেকে অন্য একটা গাড়িতে করে উত্তরা ফিরে এসে বাসের টিকেট করলাম। আমি ভেবেছিলাম বাস বোধহয় রাত আটটায় তাই সখদের ওখান থেকে দ্রুত ফিরে এসেছি তবে এসে শুনি বাস রাত সাড়ে দশটায়। টিকেট করে বাসায় গিয়ে  ফ্রেশ হয়ে নামাজ পড়লাম এবং অপেক্ষা করলাম কখন রাত 9.45 বাজবে আর আমি বাসা থেকে বের হবো। তার পর সময় হলো এবং বেরিয়ে পড়লাম। পিছনে পড়ে থাকলো আমার অনেক বছরের স্মৃতি বিজড়িত ঘর,টেবিল,চেয়ার,বিছানা। বাড়ি মালিককে বলে  এসেছি সেগুলো বিক্রি করে দিতে। এখন আমার ঢাকায় কোন বাসা নেই। তবে বাসা না থাকলেও আমার জন্য সাজানো গোছানো অনেকগুলো বাসা আছে যেখানে আমি গেলেই আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়ে আপ্যায়নের ডালি সাজিয়ে বসানো হবে। এতোটা ভালোবাসা আমার জন্য যারা জমিয়ে রেখেছে তাদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। সখদের বাসা থেকে ঘুরে এসে খুবই আনন্দ পেয়েছি। যদিও অন্য অনেকে মন খারাপ করেছে তবে সবাইকে বলেছি আরও বেশি সময় নিয়ে আসবো আড্ডা দিতে। এর পর করোনা পরিস্থিতি ভালো হলে তখন আবার যখন আসবো সে সময় সবার বাসায় যাওয়া সম্ভব হবে না বিধায় সবাইকে নির্দিষ্ট কোথাও আমন্ত্রণ জানাবো। সবাই মিলে আনন্দ হবে আড্ডা হবে। 

অনাত্মীয় আত্মীয় হলো আত্মার সাথে মিশে

ভালোবাসা পেয়ে না জানি কখন হারায়ে ফেলেছি দিশে।

ঢাকা শহরে আমার অনেক রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়র বসবাস,নিজস্ব বাড়ি,গাড়ি থাকার পরও তাদের সাথে কখনো কথা হয় না,যোগাযোগ হয় না, যাওয়াও হয় না কিন্তু যাদের সাথে আমার কোন দিন দেখা হয়নি তাদের সাথে নিয়মিত কথা হয়,যোগাযোগ হয় আর এভাবেই একে অন্যের আত্মর আত্মীয় হয়ে উঠি।এ বন্ধন অটুট রবে যতকাল বেঁচে রব। আর তাইতো অনাত্মীয় হয়েও আমাকে কেউ তার ব্যাংক একাউন্টের নমিনি করেছে আর আমিও গত দিন আমার কোম্পানীর নামে খোলা একাউন্টে কাউকে নমিনি করেছি। এর নাম ভালোবাসা। এর নির্দিষ্ট কোন সংজ্ঞা আমার দেওয়ার সাধ্য নেই।

28 জুলাই 2020

আবার আসিবো ফিরে

বই মেলা আমার খুবই প্রিয়।ছোটবেলা থেকে বই পড়ার যে নেশা তৈরি হয়েছিল তা আরও বহুগুণ বেড়ে গিয়েছিল বইমেলার কারণে।আমার সারাদিন কাটতো টিএসসিকে ঘিরে।তাই প্রতিবছর বইমেলা শুরু হলে প্রায় রোজই মেলায় ঘুরে বেড়াতাম।এই মেলা আমাকে অনেক কিছু শিখিয়েছে,অনেক আনন্দ দিয়েছে। 2006 সাল থেকে 2019 সাল পযর্ন্ত প্রতিটি বইমেলায় আবার ছিলো অবাধ বিচরণ। কিন্তু এবারই ব্যতিক্রম ঘটনা ঘটলো। বইমেলার শুরুর কিছুদিন আগেই কক্সবাজার চলে যেতে হলো।ভেবেছিলাম বইমেলার মাঝে একদিন ঘুরে যাবো কিন্তু সেটা আর হয়ে ওঠেনি। দিনের পর দিন পার হতে লাগলো।ঢাকার যানজট,বিরক্তিকর শব্দ সবই কেন যেন ভালোই লাগতো। সপ্তাহে দুদিন সবার সাথে আড্ডা দিতাম।কিন্তু সব থেমে গেলো। তার পর করোনা ভাইরাসের লকডাউনে কেটে গেলো অনেকগুলো দিন,সপ্তাহ,মাস। অবশেষে তিনদিনের ঝটিকা সফরে ঢাকায় ফিরলাম।

22 জুলাই রাতের গাড়িতে ঢাকায় রওনা দিলাম।উদ্দেশ্য আমার ঢাকার বাসা বদলাতে হবে।দীর্ঘদিন না থাকার পরও আমি নিয়মিত বাসা ভাড়া পরিশোধ করেছি। ওখানে আমার প্রিয় কম্পিউটার,তিনশো মত বই,প্রচুর ম্যাগাজিন সহ অন্যান্য অনেক গুরুত্বপুর্ন দ্রব্যাদি ছিলো।সব সরিয়ে নিতে হবে। আমি যে বাসায় ভাড়া থাকতাম সেই বাড়ির মালিক মারা যাওয়ার পর তার সন্তানেরা বাড়ির দখল নিতে শুরু করে এবং আমি যে ফ্ল্যাটে ছিলাম সেটা্ও একজন দখল নিয়েছে। তারা নোটিশ দিলো ঈদের আগেই বাসা ছেড়ে দিতে হবে।আমি যেহেতু ঢাকার বাইরে আছি তাই বাকবিতন্ডায় না গিয়ে বাসার সব কিছু শিফট করার চিন্তা করলাম। আমার হাতে সময় খুবই কম। মাত্র তিনদিনে আমাকে অনেক কিছু করতে হবে তাই বসে বসে কর্মপরিকল্পনা করে তার পর ঢাকায় ফিরলাম।

আমি যখন গাড়ি থেকে নামলাম তখন সকাল সাড়ে সাতটা বাজে।ছয় মাস আগে ঢাকাকে আমি যেমন দেখে গিয়েছিলাম ছয় মাস পরেও ঠিক তেমনই আছে বলে মনে হলো! আমাদের উন্নয়ন কতটা গতিসম্পন্ন তা বুঝতে অসুবিধা হলো না। বাসায় গিয়ে রুমে ঢুকেই ধাক্কা খেলাম। মনে হলো আমি কোন প্রাগৈতিহাসিক গুহায় এসে পৌছেছি।ক্যাপ্টেন নিমো মারা যাবার বহু বছর পর তার বিখ্যাত ডুবো জাহাজ নটিলাস খুজেঁ পাওয়ার পর যেমন দেখাচ্ছিল আমার রুমটা যেন ঠিক তেমন হয়ে গেছে। সবকিছু আগের জায়গাতে থাকলেও তার উপর কয়েক স্তর ধুলো ময়লা জমে একাকার অবস্থা। ব্যাগটা পাশে নামিয়ে রেখে প্রথমে বইগুলো সরিয়ে পরিস্কার করলাম। টেবিল পরিস্কার করলাম এবং এর মাঝে কম্পিউটার চালু করতে চেষ্টা করে আবার ধাক্কা খেলাম। পরিকল্পনার একটা অংশ এমন ছিলো যে কম্পিউটারের সব ডেটা কপি করে আমার পোর্টেবল হার্ডডিস্কে নিবো এবং কম্পিউটার থেকে সব মুছে ফেলে সেটা গ্রামে পাঠিয়ে দেবো। সেখানে আমার ভাইয়ের একটা মেয়ে আছে সে কম্পিউটার চালাতে পারবে।কিন্তু দীর্ঘদিন চালু না করার কারণে ধুলোর আস্তর জমে কম্পিউটার অকেজ হয়ে গেছে। খুব বেশি চেষ্টা করার সুযোগ আমার হাতে ছিলো না তাই আর চেষ্টা না করে অন্য কাজে মনোযোগ দিলাম।

পুর্ব পরিকল্পনা মাফিক বইগুলোর একটা তালিকা করলাম। বই কোথায় কতগুলো রাখবো তা আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলাম সে অনুযায়ি তালিকা করে ফেললাম। তালিকা বলতে বইয়ের নাম এবং লেখকের নাম লিপিবদ্ধ করলাম। কম্পিউটার চালু হলে তা সরাসরি টাইপ করা হতো কিন্তু যেহেতু সেটা করা যায়নি তাই কাগজে লিখলাম। বইয়ের লিস্ট করা হয়ে গেলে সেগুলো আলাদা করে বেশ কিছু কার্টুনে ভরলাম। কিছু বই কোথাও রাখার মত অবস্থা ছিলো না বলে কেজি দরে বিক্রি করে দিলাম। বাসা বদলাতে না হলে ওই বইগুলি বিক্রি করতে হতো না। 38 কেজি বই বিক্রি করে দিয়েছি।লিস্ট অনুযায়ি ইস্টার্ন ব্যাংক উত্তরা শাখাতে যাওয়ার কথা আমার একটি পেমেন্ট সেটেলমেন্ট করার জন্য। হাতের কাজ খানিকটা গুছিয়ে নিয়ে ব্যাংকে গেলাম। কক্সবাজার ব্রাঞ্চে আগেই বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ করেছিলাম কিন্তু বিশ দিনেও তা কার্যকর হয়নি বলে উত্তরা ব্রাঞ্চে যাওয়া। তারাও খানিকটা সময় বসিয়ে রেখে সেই একই কথা বললেন এবং আবার একটা ফর্ম ধরিয়ে দিলেন পুরণ করার জন্য। পুরণ করা শেষ হলে ব্যাংক থেকে বেরিয়ে গেলাম সিটি ব্যাংকে। আমার একটা আমেরিকান এক্সপ্রেস ক্রেডিট কার্ড রিনিউ করার জন্য।ওখানে কাজ শেষ করে দ্রুত বাসায় ফিরে গেলাম। সারাদিন কাজ করে রাতে মনে হলো কাজের মূলত সব বাকি। খুবই ঘাবড়ে গেলাম। শেষে পরদিন শুক্রবার সকালে উঠে কোন কিছু না ভেবেই যা আছে সব প্যাক করা শুরু করলাম। ভাবলাম সময় মত সব প্যাক করে যেটা যেখানে পাঠানোর সেটা সেখানে পাঠিয়ে দেই। তার পর কখনো না হয় সব ঠিক করে নেওয়া যাবে। যে ভাবনা সেই কাজ। আর এটা করতে গিয়ে কাজ মূলত অনেকটাই এগিয়ে গেলো। কিন্তু যে পরিমান কার্টুন হচ্ছে তাতে আমার পক্ষে কুরিয়ারে নেওয়া সম্ভব নয় তখন পরিচিত এক ভাইকে ডাকলাম। সে বলার সাথে সাথেই চলে আসলো। তার বাসা বাড্ডাতে। এদিকে বইগুলোর কিছু অংশ বাড্ডাতে তুর্যদের বাসায় রাখার কথা। যেহেতু ওই ভাইয়ের বাসা ওদিকে তাই সে আসলে একই সাথে অনেক কিছুই করা যাবে ভেবে তাকে ডাকলাম। সে আশার পর বাকি কাজ গুছিয়ে একটা ভ্যান ঠিক করে সব নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। সুন্দরবন কুরিয়ারে বুকিং শেষ করে প্রথমে গেলাম একটা সুপারশপে। সেখান থেকে 989 টাকার চকলেট কিনলাম তুর্য আর তুর্ণর জন্য। চকলেট কিনে একটা আমি নিজে খেলাম আরেকটা ওই ভাইকে দিলাম। এর পর চকলেটের প্যাকেট ওনার হাতে দিয়ে ওনাকে সিএনজিতে উঠিয়ে দিয়ে বিদায় জানালাম।দুঃখের ব্যাপার হলো ওই ভাই চকলেটগুলো ভুলে সিএনজিতে ফেলেই নেমে গেছে। শুনে মনটাই খারাপ হয়ে গেলো। বেছে বেছে এত্তো রকম চকলেট কিনেছিলাম।আমি তখন পরিচিত দুই ভাইয়ের সাথে রাজলক্ষ্মীতে গল্প করছিলাম এসব নিয়ে। পরে সেদিনই রাতে আবার চকলেট কিনলাম এবং বাসায় নিয়ে গেলাম। আর সেই ভাইকে বলে রাখলাম পরদিন শনিবার যেন চকলেটগুলো দিয়ে আসে।

সখ,তাসিন তাজিম, দিহান,তুর্য ওরা সবাই চেয়েছে আমি যেন ওদের সাথে দেখা করি কিন্তু সময় খুব কম। তাও ভালো যে তিনদিনের কাজ দুদিনে শেষ করতে পেরেছি বলে হাতে একদিন ফ্রি। সেই দিনও যদিও ব্যাংকে কিছু কাজ ছিলো। সেই কাজ শেষ করতে করতে দুপুর একটা বেজে গেলো। সখ বলেছিল যদি সম্ভব হয় আমি যেন অবশ্যই বাসায় যাই। আমি ঠিকানা নিয়ে রেখেছিলাম আর বলেছিলাম যদি সম্ভব হয় তবে বাসার নিচে এসে ফোন করবো। যখন দেখলাম কাজ শেষ তখন মনে হলো তাহলে সখদের বাসায় যাওয়া যেতে পারে। যদিও মূলত আমার ইচ্ছে ছিলো তাসিন তাজিমের সাথে দেখা করার বিশেষ করে ওদের বাসার ওখানে আমার পরিচিত এক বন্ধু আছেন তার সাথে দেখা করতে গেলে তাসিন তাজিমের সাথেও দেখা করা যাবে।তবে ওদিকে আর যাওয়া হলো না। উত্তরা থেকে চকলেট কিনে একটা মোটরসাইকেলে করে রওনা দিলাম। মোটর সাইকেল ওয়ালার হেলমেট আমার পছন্দ হলো না সেটা নিয়েও তার সাথে কথা বললাম। এর মাঝে মোটরসাইকেলে তেল নিলেন এবং তার কাছে খুচরা ছিলো না বলে আমি দিয়ে দিলাম। ভাড়া যেহেতু আগেই দেওয়া হয়ে গেছে তাই গাড়ি থেকে আমি নামার সাথে সাথে তিনি চলে গেলেন। আমারও খেয়াল ছিলো না যে আমার মাথায় হেলমেট আছে। পরে দেখি হেলমেটটা রয়ে গেছে। সেটা কি করে লোকটার কাছে পৌছানো যায় ভেবে ভেবে কয়েক জায়গায় আমার মোবাইল নাম্বার দিয়ে এলাম। সখদের বাসা খান টাওয়ারে। অনেক বার খান টাওয়ারের নাম উচ্চারণ করেছিলাম তাই ভাবলাম ড্রাইভার যদি বিষয়টা মনে করতে পারে তবে খান টাওয়ারের ওখানে গিয়ে খোঁজ নিতে পারবে। সে জন্যই খান টাওয়ারের নিচে হেলমেট রেখে দিলাম। এর আগে পথে বাসার জন্য মিষ্টি কিনলাম।সখের বাসার নিচে দাড়িয়ে সখের আম্মুর নাম্বারে ফোন করলাম। তিনি জানতে চাইলেন আমি কে? আমি বললাম এটা কি সখদের নাম্বার? তিনি বললেন হ্যা। তখন আমার নাম বলতেই তিনি চিনলেন। প্রথমে বিশ্বাসই করেন নি যে আমি এসেছি। তিনি সখকে নিচে নামতে বললেন তবে পরে অবশ্য সখ না মেনে ওর বাবা নেমেছে। গল্পে গল্পে জানা হলো  আমি এসেছি শুনে নাকি সখের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল এক্সাইটমেন্টের কারণে।

28 জুলাই 2020

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মাণের পথে আমাদের অর্জন

”একটি বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার, 

সারাবিশ্বের বিস্ময় তুমি আমার অহংকার।”

শিল্পীর কন্ঠে বিশ্বের বিস্ময় হিসেবে যে বাংলাদেশের কথা বলা হয়েছে, কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেটিকে বলেছেন ” আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি”। সেই সোনার বাংলাকে সত্যিকারের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আজীবন স্বপ্ন দেখেছেন,সংগ্রাম করেছেন যে মানুষটি তিনি বাঙ্গালী জাতির সর্বকালের সর্ব শ্রেষ্ঠ নেতা, স্বাধীন বাংলার স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বিবিসি বাংলার জরিপে তাই আপামর জনসাধারণ সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী হিসেবে তাঁকে নির্বাচিত করতে কালক্ষেপন করেন নি। বঙ্গবন্ধু তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা,বলিষ্ঠ নেতৃত্ব আর মানুষের প্রতি তার যে অগাধ ভালোবাসা ছিলো তার জন্যই তিনি পেরেছেন। এখনো পৃথিবীতে যেখানেই নির্যাতন নিপীড়ন চলে আর স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দেয় সেই সব ঘটনার কথা তুলে ধরতে গেলে অবধারিত ভাবেই বঙ্গবন্ধুর নাম চলে আসে। সবাই আক্ষেপ করে বলে ফিলিস্তিনে একজন ইয়াসির আরাফাত ছিলেন কিন্তু বঙ্গবন্ধু ছিলেন না। কাশ্মীরের মত আরও যারা স্বাধীনতার জন্য প্রতিনিয়ত জীবন দিচ্ছে তাদের সব আছে শুধু বঙ্গবন্ধু নেই। একজন বঙ্গবন্ধু থাকলে স্বাধীনতার স্বাদ পেতে তাদের এতো বছর লাগতো না।

একটি সুন্দর আগামী বিনির্মাণের স্বপ্ন বঙ্গবন্ধু দেখেছিলেন তা ক্ষণে ক্ষণে ব্যহত হয়েছে কিছু স্বার্থান্বেষিদের চক্রান্তে। ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথে কখনো কখনো এই দেশে ক্ষমতায় এসেছে পাকিস্থানীদের দোষর। যার ফলে তারা নানা কূটকৌশলে বঙ্গবন্ধুর নাম নিশানা মুছে দিতে চেয়েছে। কিন্তু তারা বোধ হয় কবি ইমতিয়াজ মাহমুদের লেখা কবিতার লাইন দুটো  জানতো না! কবি লিখেছেন 

”যত দূর যাও পাখি দেখা হবে ফের

স্বাধীন ঐ  আকাশটা শেখ মুজিবের”।

মুজিব এমন একটি নাম যা মুছে দেওয়া যায় না। সেই যে আওয়াজ উঠতো এক মুজিব লোকান্তরে লক্ষ মুজিব ঘরে ঘরে। বাস্তবে তার প্রয়োজন নেই বরং বঙ্গবন্ধু স্বয়ং উপস্থিত আছেন মানুষের হৃদয়ে,দেশের মাটি ও জলে। পাকিস্তানি দোষরেরা যারা পচাত্তরের পনেরই আগষ্ট বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে নির্মুলে নেমেছিল তারা জানতো না বীরের রক্ত ও ঘাম যে জমিনে পড়েছে সেই জমিন তাদের মুক্তি দিবে না। এরই ফলশ্রুতিতে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্য নিয়ে তার সুযোগ্য কন্যা বর্তমান বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা আলো জ্বেলে এগিয়ে যাচ্ছেন।

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মাণের পথে আমাদের অর্জন কি কি সেটা বলার আগে আমাদের জানতে হবে বঙ্গবন্ধু কি কি স্বপ্ন দেখেছিলেন? তিনি চেয়েছিলেন দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল অব্দি বিদ্যুতের আলো পৌছাক,কাচা পথগুলো পাকা হোক। কৃষকেরা তাদের ফসলের ন্যায্য দাম পাক আবার নানা সময়ে তারা সাহায্য সহযোগিতা পাক। তিনি চেয়েছিলেন রাজধানী ঢাকার সাথে সড়ক,আকাশ এবং রেলপথে অন্যান্য জায়গার সাথে সুন্দর যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি হোক।প্রান্তিক পর্যায়ে যারা আছে তারা তাদের অধিকার ফিরে পাক।তিনি চেয়েছিলেন সমাজ থেকে সব রকম অন্যায় দূর করে একটি আদর্শ সমাজ ব্যবস্থা তৈরি করতে। বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন এদেশের একদল ঘাতকদের নির্মমতার কারণে যথাসময়ে তিনি নিজ হাতে সত্যি করে যেতে না পারলেও তিনি রেখে গিয়েছেন তার সুযোগ্য কন্যাকে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতা গ্রহণের প্রথম বারে তিনি সব কিছু গুছিয়ে নিতে পারেননি কারণ তখন পুর্ববর্তী সরকার দেশের রাজনৈতিক,অর্থনৈতিক যে দূরাবস্থা তৈরি করে রেখেছিল তা কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই সময় পেরিয়ে গিয়েছিল। তবে তার মনের মধ্যে পিতার অপূরণীয় স্বপ্ন বাস্তবায়নের একটি লক্ষ্যমাত্রা ছিলো যা নতুন মেয়াদে ক্ষমতা গ্রহণের সাথে সাথে তিনি বাস্তবায়ন করতে শুরু করেন। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে উন্নয়নের যে অগ্রযাত্রা আমরা দেখতে পাচ্ছি তা বর্ণনা করে শেষ হবে না। তার পরও আমরা কিছু গুরুত্বপুর্ন অর্জন তুলে ধরতে চেষ্টা করছি।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচারঃ

স্বাধীনতার বিপক্ষে যারা কাজ করে এদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নকে মুছে দিতে চেয়েছিল বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলায় তাদের বিচার হয়েছে এবং দেশ কলঙ্কমুক্ত হয়েছে। সেদিন এই সব দেশদ্রোহীরা  আমাদের সুর্যসন্তানদের নির্মমভাবে হত্যা না করলে আজকের বাংলাদেশ আরও সমৃদ্ধ হতে পারতো। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে সোনার বাংলা নির্মানের পথে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার একটি অন্যতম অর্জন।

নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণঃ

একটি স্বাধীন দেশের নিজস্ব একটি বা একাধিক স্যাটেলাইট থাকা অত্যন্ত জরুরী। টেলি যোগাযোগ ব্যবস্থার অভুতপুর্ব উন্নয়ন সাধনের জন্য স্যাটেলাইটের কোন বিকল্প নেই। বঙ্গবন্ধু স্বপ্ন দেখতেন বাংলাদেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরে বেড়াবে। স্বাধীনতার পর একটি নাজুক,ভঙ্গুর অর্থনীতি সামলে উঠতে না উঠতেই ঘাতকেরা বঙ্গবন্ধুর প্রাণ কেড়ে নেওয়ায় তিনি সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারেন নি। তার পর কত সরকার এসেছে একটিবারও এসব ভেবে দেখেনি।অবশেষে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র,মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য পুত্র এবং তার উপদেষ্টা,ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মানের কান্ডারি সজিব ওয়াজেদ জয়ের হাত ধরে আমরা নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করতে সক্ষম হয়েছি। আজ তাই যে অল্প সংখ্যক দেশের নিজস্ব স্যাটেলাইট পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরে বেড়াচ্ছে বাংলাদেশ তার মধ্যে একটি। বঙ্গবন্ধু তনয়ার হাত ধরে একটি বড় স্বপ্ন আমরা পুরণ করতে পেরেছি এটি বাংলাদেশের বড় অর্জন গুলোর একটি। এর মাধ্যমে আকাশে লাল সবুজের পতাকা শোভা পাচ্ছে এবং বঙ্গবন্ধুর নামও মহাকাশে পৌছে গেছে।

সমুদ্রসীমা জয়ঃ

বছরের পর বছর ধরে সমুদ্র সীমা নিয়ে মায়ানমারের সাথে যে দ্বৈরথ চলছিলো তা সমাধানে বঙ্গবন্ধু পদক্ষেপ নেওয়ার আগেই তাকে চলে যেতে হয়েছিল।সেই সমস্যার সমাধান করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শুধু তাই নয় বরং আমরা তাঁর হাত ধরে সমুদ্র সীমা জয় করেছি।

১৪ মার্চ ২০১২ মিয়ানমারের সঙ্গে বিরোধ নিষ্পত্তির পর ৭ জুলাই ২০১৪ নিষ্পত্তি হয় ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা বিরোধ। বঙ্গোপসাগরে দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে চলা সমুদ্রসীমা নিয়ে এ বিরোধের অবসান ঘটায় বাংলাদেশ এখন লাভ করেছে একটি স্থায়ী সমুদ্রসীমা, যার আয়তন ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার। 

স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে এক মহড়ার সময় বঙ্গবন্ধু বায়নোকুলার দিয়ে বিস্তীর্ণ সমুদ্র ঘুরেফিরে দেখছিলেন। তারপর বলেছিলেন, সমুদ্র নিয়ে ভারতের সঙ্গে মিটমাট হচ্ছে না। আমি যা চেয়েছি আমাকে তা পেতে হবে। তিনি বলেছিলেন, এ সাগর থেকেই আরেকটি বাংলাদেশ পাব। পানি বিশেষজ্ঞ এবিএম আব্বাস বলেছিলেন, He (Mujib) had decided not to compromise on the water question.’ কথাটি ছিল সমুদ্রসীমা ও ফারাক্কা নিয়ে। এর আগেই ১৯৭৩ সালে হল্যান্ডের পানি বিশেষজ্ঞদের আমন্ত্রণ জানিয়ে বঙ্গবন্ধু তাদের বলেছিলেন, আপনাদের দেশ তো সমুদ্রের নিচে। আমি চাই সমুদ্রে ক্রসড্যাম করে আরেকটি বাংলাদেশ। সেভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিনি অগ্রসর হয়েছিলেন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই জে. এন দীক্ষিত তার বইতে লিখেছেন, ১৯৭২ সালের মার্চ মাসে ঢাকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা ওঠে। তিনি বলেছেন, তার ধারণায় বাংলাদেশ সমুদ্র থেকে তেল নেবে এবং তার বিনিময়ে ভারত নেবে প্রাকৃতিক গ্যাস। কিন্তু বঙ্গবন্ধু রাজি হননি।

বঙ্গবন্ধুর সমগ্র অস্তিত্বজুড়ে ছিল বাংলাদেশ। বাংলাদেশের সবুজ মাঠ, বহমান জলরাশি, নদীগুলোর উথাল-পাতাল, ভাঙাগড়া আর দক্ষিণে বিস্তীর্ণ সমুদ্রের উত্তাল গর্জন এবং সবুজ নিসর্গ এই নিয়ে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ। বঙ্গবন্ধু যেমন জানতেন, বাংলাদেশের স্থলভাগের কোথায় কী আছে, তেমনি বঙ্গোপসাগরের তলদেশে রয়েছে গ্যাস, তেল, খনিজ ও প্রাণিজ সম্পদের অফুরান সম্ভাবনা। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালে সংবিধান রচনা করার সময় এ লক্ষ্যে ১৪৩ অনুচ্ছেদের ২ উপধারায় লিখে দিয়েছেন। ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সীমানা এবং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় জলসীমা ও মহীসোপানের সীমানা নির্ধারণের বিধান করতে হবে।’

বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন তার সুযোগ্য কন্যার হাত ধরে বাস্তবায়িত হয়েছে। আমরা একই সাথে ভারত এবং মায়ানমারের সাথে বিরোধ থাকা সমুদ্রসীমা জয় করতে পেরেছি যার পরিমান আরও একটি বাংলাদেশের সমান।

যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নঃ

বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপুর্ব উন্নয়ন হবে। সেই লক্ষ্য নিয়ে আমরা একাধিক আর্ন্তজাতিক মানের বিমানবন্দর নির্মান করেছি পাশাপাশি দেশের নানা প্রান্তে যোগাযোগের জন্য বিমানবন্দর নির্মান করেছি। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন যমুনার ডাকা বুকে সেতু হবে যেন রাজশাহী এবং আসেপাশের জেলার মানুষ অনায়াসে ঢাকায় যাতায়াত করতে পারে। উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রেখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে সেটা বাস্তবায়িত হয়েছে। যমুনা সেতুর নির্মাণ কাজ শেষ হলে ১৯৯৮ সালের ২৩ ই জুন গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেতুটির উদ্বোধন করেন। এর মাধ্যমে এ অঞ্চলের মানুষের মনে সুখের সুবাতাস বইতে থাকে। রাজধানীর সাথে সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা আরও উন্নত হয় ফলে জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়। এটি বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বির্নিমাণের পথে আমাদের একটি অন্যতম অর্জন। এর পর আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম পদ্মা নদীর উপর সেতু করবো কেননা খুলন ও তার আসেপাশের এলাকার মানুষকে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করে সীমাহীন দুর্ভোগ সহ্য করে ফেরী পার হতে হয় ফলে ছুটি কাটাতে ঘরমুখী মানুষের গুরুত্বপুর্ন অনেকটা সময় পথেই শেষ হয়। বঙ্গবন্ধু একটি আদর্শ রূপরেখা দাড় করিয়েছিলেন যে তার স্বপ্নের সোনার বাংলা কেমন হবে। সেই স্বপ্নের পালে হাওয়া লাগিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে আজ পদ্মাসেতু দিয়ে রেল এবং গাড়ি চলাচল সময়ের ব্যাপার মাত্র। অনেকটুকু কাজ দৃশ্যমান হয়েছে। বিশাল বাজেটের এই প্রকল্প বাস্তবায়নে বিশ্ব ব্যাংক সহ অন্যান্য আর্ন্তজাতিক সংস্থাগুলো যখন এদেশীয় অনেকের চক্রান্তের কাছে নতি স্বীকার করে ভেটো দিয়েছিল তখন এদেশের কিছু মানুষ ভেবেছিল পদ্মা সেতু আমরা নির্মান করতে পারবো না। কিন্তু তারা জানতো না যার শরীরে বঙ্গবন্ধুর রক্ত বহমান তিনি দমে যাবার পাত্রী নন। পিতার যোগ্য কন্যা হিসেবে অত্যন্ত সাহসের সাথে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন দেশীয় অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মিত হবে। এটা শোনার পর যারা অট্টহাসি হেসেছিল এবং যারা একদিন বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি মনে করতো তারা অবাক বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছে। তাদের মুখে কুলুপ এটে দিয়েছে এবং তারা বাকহীন। তারা ভাবতেই পারেনি বলিষ্ঠ নেতৃত্বের গুনে আমরা অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারছি। যা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বিনির্মাণের পথে এক একটি বড় সাফল্য হিসেবে ধরা দিচ্ছে।

এখন দেশের অধিকাংশ জেলার সাথে আমরা রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করতে সক্ষম হয়েছি এবং যে সব জেলায় এখনো রেলপথ হয়নি তা আমাদের কর্মপরিকল্পনার মধ্যেই  রয়েছে। আমরা 2041 সালের মধ্যে একটি আধুনিক সুন্দর এবং বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছি তা বাস্তবায়নে আমাদের পথচলা ক্রমাগত ভাবে স্পষ্ট হচ্ছে। আমরা রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে মেট্রোরেল নির্মান কাজ শুরু করে অনেকটা এগিয়ে নিতে পেরেছি। এর ফলে রাজধানী ঢাকার মানুষের যাতায়াতের যে দুর্ভোগ তা অনেকাংশে কমে যাবে। আমরা যানজট নিরসনের লক্ষ্যে রাজধানী ঢাকা সহ চট্টগ্রাম এবং অন্যান্য জায়গায় ফ্লাইওভার নির্মান করেছি যা আমাদের অর্জনের খাতাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।

আমরা আধুনিক নৌ বন্দর স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছি পাশাপাশি আমাদের নৌ বহরে নতুন নতুন জাহাজ সংযোজন করতে পেরেছি।

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উন্নয়নঃ

কিছুদিন আগেও এই দেশের মানুষ কল্পনাও করতে পারতো না আমাদের দেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মান করা সম্ভব হবে কিন্তু আমরা শতভাগ বিদ্যুতায়নের লক্ষ্য নিয়ে “শেখ হাসিনার উদ্যোগ,ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ” শ্লোগানকে সামনে রেখে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ হাতে নিতে সক্ষম হয়েছি। ফলে এর মাধ্যমে আমরা দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশেও বিদ্যুৎ রপ্তানি করতে পারবো।শুধু তাই নয় যে সব এলাকায় আমার বিদ্যুৎ সুবিধা পৌছাতে পারিনি সেই সব এলাকায় আমরা সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে জনগণের পাশে থেকেছি।

পরিবেশগত উন্নয়নঃ

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা হবে আধুনিক এবং ডিজিটাল সেই লক্ষ্য নিয়ে ঢাকার রাজপথের দুই দিকে বৃক্ষরোপন ও সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ করা হয়েছে। স্থানে স্থানে আধুনিক পাবলিক টয়লেট নির্মান করা হয়েছে,আধুনিক যাত্রী ছাউনী নির্মান করা হয়েছে। আমরা ট্যানারি শিল্পকে ঢাকার বাইরে নিতে সক্ষম হয়েছি এবং রাজধানীর উন্নয়নের কথা বিবেচনা করে রাজধানীকে দুটি ভাগে বিভক্ত করে তার উন্নয়ন আরও গতিশীল করেছি। খাল খনন,অবৈধ নদী দখলমুক্ত করতে চেষ্টা করেছি এবং পরিকল্পনা করে সমুদ্রের মাছ আহরণের ব্যাপারে বিধিনিষেধ জারির মাধ্যমে মাছের প্রজনন বৃদ্ধি করেছি।

খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নঃ

খেলাধুলা এবং সাংস্কৃতিক উন্নয়নে আমাদের অর্জন উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ এখন ক্রিকেটের তিন সংস্করণেই সমীহ জাগানো দল।আমাদের দেশ থেকে সাকিব আল হাসান তিন ধরনের ক্রিকেটে একই সময়ে বিশ্ব সেরা অলরাউন্ডার নির্বাচিত হয়ে দেশের পতাকাকে তুলে ধরেছে। আমরা বিশ্বের বিভিন্ন বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে গর্বের সাথে পা রাখতে পেরেছি,গণিত অলিম্পিয়াডে গোল্ড মেডেল পেয়েছি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আর্ন্তজাতিক মানের স্টেডিয়াম নির্মিত হয়েছে এবং বাংলা একাডেমীতে প্রতি বছর আর্ন্তজাতিক মানের সাহিত্য সম্মেলন আয়োজিত হচ্ছে। এদেশীয় চলচ্চিত্রের উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকার প্রতি বছর চলচ্চিত্র নির্মানে যেমন অনুদান দিচ্ছে তেমনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদানের মাধ্যমে সবাইকে সম্মানিত করছে।

শিক্ষা ব্যবস্থা ও অন্যান্য বিষয়ে উন্নয়নঃ

সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্য নিয়ে শেখ হাসিনার সরকার ব্যাপক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। একটি জাতি শিক্ষিত হলে তবেই উন্নয়ন আরও গতিময়তা পায়। সে লক্ষ্য নিয়ে দেশে অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে,মেডিকেল এবং ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হয়েছে। গবেষণাগার নির্মান করা হয়েছে। মেয়েরা যেন সমান ভাবে অবদান রাখতে পারে তাই নারী শিক্ষার জন্য অবৈতনিক শিক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি উপবৃত্তি দেওয়া হচ্ছে। প্রাইমারি স্কুলগুলোতে ছেলে মেয়ে সবাইকে উপবৃত্তির আওতায় আনা হয়েছে। বিনামুল্যে বই বিরতণ করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণতহবিলের মাধ্যমে অসহায়দের সহায়তাকরা হচ্ছে। মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা প্রদান করা হচ্ছে।

আর্ন্তজাতিক প্রশংসাঃ

জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা কোথাও আশ্রয় না পেয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে এবং মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তা গ্রহণ করেছেন। মাতৃ স্নেহে তাদের লালন করার পাশাপাশি তাদের হারানো অধিকার ফিরিয়ে দিতে চেষ্টা করে আর্ন্তজাতিক প্রশংসা পাচ্ছেন। আর এ কারণেই বিশ্বের অনেক দেশ এখন বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রোল মডেল মনে করেন।তাকে বিশ্ব নেতারা উপাধী দিয়েছে মাদার অব হিউম্যানিটি।

শেষ কথাঃ

বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা বির্নিমাণের পথে আমাদের যত অর্জন তা 2000 শব্দের একটি প্রবন্ধে লিখে শেষ করা যাবে না। সাম্য,মৈত্রী,ভ্রাতিত্ব,যোগাযোগ ব্যবস্থা,অবকাঠামোগত উন্নয়ন,শিক্ষা,শান্তি,প্রগতি,ন্যায় বিচার এবং দুস্থদের কল্যাণে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার সরকারের অবদান বলে শেষ হবে না। আগষ্ট শোকের মাস। এ মাসেই আমরা হারিয়েছি সর্বকালের সর্ব শ্রেষ্ঠ নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। তিনি আকাশের ওপার থেকে নিশ্চই তার কন্যার এই সাফল্য দেখে আনন্দিত হচ্ছেন। তার রুহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং গোটা বাঙ্গালী জাতিকে মহাদেব সাহার সেই কবিতার লাইনটুকু স্মরণ করিয়ে দিতে চাই-

” নত হও, কাঁদো তুমি, 

আজ শোক, আজ বর্ষা মাস 

কী করে ভূলব বলো কলঙ্কের সেই ইতিহাস? 

বাংলার নদনদী ভরে ওঠো, 

রাখো ভরে দুচোখের জল 

ধোয়াও চোখের জলে রক্তমাখা তাঁর।”

প্রিয়াঙ্কা দুবের নো নেশন ফর উইমেন

–জাজাফী

প্রিয়াঙ্কা দুবে ভারতের একজন পুরষ্কারপ্রাপ্ত অনুসন্ধানী সাংবাদিক। ভারতে গণধর্ষণ ও নারীর প্রতি সহিংসতা নিয়ে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা ভিত্তিক গ্রন্থ ‘নো নেশন ফর উইমেন’ তাকে বিশ্বজুড়ে পরিচিত করেছে। দিল্লিসহ কয়েকটা রাজ্যে নারীর প্রতি সহিংসতা, ধর্ষণ নিয়ে যে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তারই রিপোর্টেজ বুক ‘নো নেশন ফর উইমেন’। এখানে প্রিয়াঙ্কা অনুসন্ধান করে শুধু ঘটনাটাই বলেন নি বরং পাশাপাশি সমাজের ভেতরে খুবই শক্তিশালী ধর্ষণের মনস্তত্ত্বকে লালন করার বিষয়টিও তথ্য দিয়ে, বিশ্নেষণ করে তুলে ধরেছেন। লেখকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন এবং ভাষ্য অনুযায়ি সমাজের ভেতরে, আর একটু জোর দিয়ে বললে সিংহভাগ পরিবারের ভেতরেই ধর্ষণের মনস্তত্ত্ব যুগ যুগ ধরে যত্ন করে পেলেপুষে রাখা হচ্ছে। এ কারণেই এ সমাজে ধর্ষণ বন্ধ হচ্ছে না। যেমন তিনি উদাহরণ স্বরুপ বলেছেন, পরিবারের সবাই মিলে নিজেদের পছন্দের ছেলের সঙ্গে একটা মেয়েকে তার অমতে জোর করে বিয়ে দিচ্ছে- এটা কিন্তু গণধর্ষণের একটা আয়োজনের মধ্যেই পড়ে। কিন্তু সমাজের প্রচলিত মনস্তত্ত্ব এটাকেই লালন করছে এবং প্রশ্রয় দিচ্ছে। বরং মেয়ে বা অন্য কেউ এর বিরুদ্ধে বললে সমালোচনার মুখে পড়বে। ‘নো নেশন ফর উইমেন’ বইটাতে লেখক প্রিয়াঙ্কা দুবে অনেক আলোচিত ঘটনার আরও গভীর অনুসন্ধান করে সমাজব্যবস্থার ভেতরে ধর্ষণ এবং নারীর প্রতি সহিংসতাকে উৎসাহিত করার যেসব উপাদান আছে, সেটাকেই তুলে আনার চেষ্টা করেছেন।

ভারত মহিলাদের জন্য বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক স্থান হিসাবে পরিচিত – এই অনুমানের সাথে প্রতি পনের মিনিটে দেশে একজন মহিলাকে ধর্ষণ করা হয়। এটা সত্য যে ২০১২ সালে নয়াদিল্লির একটি বাসে নৃশংসভাবে গণধর্ষণ করার পরে মারা যাওয়া ফিজিওথেরাপি শিক্ষার্থী জ্যোতি সিংয়ের গল্প বিশ্ব জানে। তবে ভারত সহ বিশ্বের কম লোকই ২০১৪ সালে ধর্ষণ, খুন, বিকলাঙ্গ হওয়া উত্তর প্রদেশের শিশু কবিতা ও রাগিনীদের কথা শুনেছেন।পশ্চিমবঙ্গের ১৭ বছরের কিশোরী, যার লাশ ২০১৩ সালে একটি খাল দিয়ে ভেসে যাচ্ছিল। কিশোরী মেয়েটির শরীর ছিলো অর্ধনগ্ন এবং গভীর ব্লেডের চিহ্ন। প্রিয়াঙ্কা দুবে বইটিতে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, কীভাবে মেয়েটির মা বলেছিলেন “ঘরে বসে আমরা পেঁয়াজের খোসা ছাড়ানোর মতো কেউ কিশোরী মেয়েটির ত্বক যেন খুলে ফেলেছিল”।

নো নেশন ফর উইমেনের তেরটি অধ্যায়ে পিতৃতান্ত্রিক পরিস্থিতি অন্বেষণ করে যা দেশে এই ধরনের চরম স্তরের যৌন সহিংসতা স্মরণ করিয়ে দেয়। তবে এটিই একমাত্র অনাকাঙ্ক্ষিত বা পাশবিক বিবরণ নয়। ভারতে ধর্ষণ বহু-স্তরযুক্ত এবং এটি বিভিন্ন সামাজিক, ভৌগলিক এবং সাংস্কৃতিক পরিস্থিতিতে নিজেকে আলাদাভাবে প্রকাশ করে।লেখক জোর দিয়ে বলেছেন: “যে কোনওভাবে ধর্ষণকে সাধারণীকরণ করা হ’ল আলোচনাকে পিছনে নিয়ে যাওয়া”।

ধর্ষণের হাত থেকে বেঁচে যাওয়া একজন মা দুবেকে বলেছিলেন যে তারা জাট মাঠের ভূমিহীন কৃষকদের একটি সম্প্রদায় থেকে এসেছিল এবং “অবশ্যই, জাট মালিক মনে করেন যে তার দলিত দাসদাসী শ্রমিকের কন্যা ও স্ত্রীদের প্রতি তার সমস্ত অধিকার রয়েছে”।এই মহিলা আরও বলেছিলেন, “যখন কোনও নির্দিষ্ট রাতে জাট দলিতদের বাড়িতে প্রবেশ করে এবং লোকটিকে ক্ষেত ছাড়ানোর মতো কাজ দেয়, তখন তাকে বেরিয়ে আসতে বলে। তারপরে তারা তাদের মহিলাদের সাথে ঘুমায় “।

যৌন সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্থ এবং বেঁচে যাওয়াদের ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি অন্য একটি বিষয় যেখানে ভারতের মূলধারার মিডিয়া সাধারণত আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।প্রিয়াঙ্কা দুবে দেখিয়েছেন যে বর্ণভিত্তিক সুযোগ-সুবিধাগুলি কীভাবে অপরাধীদের পুলিশী তদন্তকে অবতরণ করতে সক্ষম করেছে, একটি সাধারণ কৌশলকে “তাদের বিরুদ্ধে মামলাগুলি অনিবার্য করার চেষ্টা করে যাতে তারা খালাস পেতে পারে বা কয়েক দশক ধরে এই মামলাটিতে টানা যায়” বলে বর্ণনা করে।

তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে পুলিশ, চিকিৎসক এবং এমনকি ম্যাজিস্ট্রেটরা ধর্ষণের মামলাগুলি নথিভুক্ত করতে অস্বীকার করেছেন; বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের প্রতি সাক্ষাতকারীদের ‘প্রতিকূল’ করে তোলা; ফরেনসিক প্রমাণের সাথে হস্তক্ষেপ করা; এবং মহিলাদের মামলা প্রত্যাহারের জন্য হুমকি দিয়েছে। সহিংসতা এবং ন্যায়বিচার অস্বীকারের শীর্ষে, কলঙ্ক বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের উপর বিশাল আকার ধারণ করেছে। পূর্ব দিল্লিতে ধর্ষণের শিকার তিন বছরের কিশোরীর মা দুবেকে জানিয়েছিলেন যে প্রতিবেশীরা মেয়েটিকে ‘লোভী’ বলে চিহ্নিত করেছিল কারণ তার ধর্ষণকারীরা তাকে মিষ্টি দিয়ে প্রলুব্ধ করেছিল।



নো নেশন ফর উইমেন বলছে যে প্রতিবেদন করা ধর্ষণের প্রতিটি ঘটনার জন্য, কয়েক ডজন অন্যান্য ভয় এবং লজ্জার কারণে অ-রিপোর্টিত হন। “ভারতে ধর্ষণই একমাত্র অপরাধ, যার জন্য ভিকটিমকে দোষী করা হয়”, দুবে লিখেছেন। “প্রত্যেকে পরিবার – বন্ধুবান্ধব, পুলিশ থেকে শুরু করে – শিকারকে সন্দেহের সাথে দেখেন। তার সাক্ষ্য প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে … তার চরিত্র নিয়ে এলোমেলো প্রশ্ন সহ “। অভিজাত ভারতে নারীর ক্ষমতায়ন এবং লিঙ্গ সংবেদনশীলতার আশেপাশে শব্দটি কমিয়েছে দুবে। পরিবর্তে, তিনি ভয়াবহ অপরাধ এবং অবিচারের “সমান্তরাল মহাবিশ্বের” দিকে মনোযোগ এনেছেন যা দেশটি স্বীকৃতভাবে স্বীকৃত নয়।



26 আগষ্ট 2020

বাংলা ভাষায় অনুবাদ সাহিত্যঃ মাসরুর আরেফিনের অবদান

– জাজাফী

এক ভাষার সাহিত্য অন্য ভাষার পাঠকদের সামনে তুলে ধরার প্রধানতম মাধ্যম হলো অনুবাদ। অনুবাদের মাধ্যমেই আমরা রুশ ভাষার সাহিত্যিকেরা কি লিখছেন বা জাপানী লেখকদের লেখার গুনমান কেমন তা বুঝতে পারছি।একজন পাঠকের পক্ষে ভিন্ন ভিন্ন ভাষার সাহিত্যের স্বাদ নেওয়ার জন্য অনেক ভাষা রপ্ত করা সম্ভব নয়।ফলে এই কঠিন কাজটি পাঠকদের জন্য আরও সহজ করে তোলে অনুবাদ সাহিত্য। আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে ইংরেজী কম বেশি সবাই জানলেও যে কোন সাহিত্য যদি ইংরেজীতে অনুদিত হয় তার প্রকৃত স্বাদ পাওয়া সব সময় সবার পক্ষে সম্ভব নয়।মাতৃভাষার সাথে পৃথিবীর দ্বিতীয় কোন ভাষাকে তুলনা করা যায় না। একজন ভিন দেশী অন্য কোন দেশের ভাষা সম্পর্কে যতই পান্ডিত্য অর্জন করুন না কেন তিনি সেই ভাষায় কথা বলা একজনের সাথে পেরে উঠবেন না। সাহিত্যে অনেক সময় আঞ্চলিক শব্দ যেমন ব্যবহার করা হয় তেমনি অনেক প্রতিশব্দ এবং রুপক শব্দ ব্যবহার করা হয়ে থাকে যা ভিন্ন কোন ভাষায় কথা বলা পাঠকের কাছে সম্পুর্ন অপরিচিত হতেই পারে, যেহেতু তা ভিনদেশী অভিধানে যুক্ত নয়। আর এই সব দিকগুলো আরও সহজ হয়ে ওঠে অনুবাদকের কল্যাণে।

বাংলাদেশে যারা অনুবাদ সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তাদের মধ্যে সর্বাগ্রে যার নাম আসে তিনি হলেন অধ্যাপক কবীর চৌধুরী। তিনি তার দীর্ঘজীবনে অনেক নান্দনিক অনুবাদকর্ম আমাদের উপাহার দিয়ে আমাদের সমৃদ্ধ করেছেন। নোবেলজয়ী নাগিব মেহফুজ থেকে শুরু করে ব্রিটিশ ও আমেরিকান নামকরা সাহিত্যিকদের সাহিত্য কর্ম বাংলায় অনুবাদ করে আমাদের সাহিত্যচর্চার পথ উর্বর করে গেছেন তিনি। কবীর চৌধুরীর পর যারা বাংলাদেশের অনুবাদ সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কবি শামসুর রাহমান, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, সৈয়দ শামসুল হক, হায়াৎ মামুদ, দ্বিজেন শর্মা, রকিব হাসান, খন্দকার আশরাফ হোসেন, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, কায়সার হক, ফকরুল আলম, আনোয়ার হোসাইন মঞ্জু আবদুস সাত্তার, এ এ রেজাউল করিম, সাজ্জাদ শরীফ ও রফিকুম মুনীর চৌধুরী, রাজু আলাউদ্দিন,জুলফিকার নিউটন,মাসরুর আরেফিন এবং অনীশ দাস অপু প্রমুখ। যদিও জুলফিকার নিউটনের অনুবাদ নিয়ে অনেক জলঘোলা হয়েছে, কুম্ভীলকবৃত্তির প্রমান হাজির করেছে অসংখ্য পাঠক এবং লেখক সেসব কথা বাদ দিলাম। আজ সেই সব অনুবাদকদের মধ্য থেকে আমরা কথা বলবো এমন একজন সম্পর্কে যিনি একাধারে অনুবাদক,কথাসাহিত্যিক এবং কবি।একাধিক গুনের অধিকারী মানুষটির নাম মাসরুর আরেফিন।সাহিত্যের অন্যান্য শাখায় তাঁর সমান বিচরণ থাকলেও আমরা আজ শুধু তাঁর অনুবাদ কর্ম নিয়ে কথা বলবো। মাসরুর আরেফিনের অনুবাদ সাহিত্য নিয়ে আলোচনার আগে আনুসঙ্গিক অন্যান্য বিষয় নিয়ে অল্পবিস্তর আলোকপাত জরুরী।

বাজারে অনুবাদের অনেক চাহিদা থাকায় আজকাল অনেক ভূঁইফোড় অনুবাদক তৈরি হয়েছে। যারা ভিন্ন ভাষায় পর্যাপ্ত দক্ষ না হয়েও প্রতি বছর বইমেলার বৈচিত্র্য অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশ করে। তাদের ভাষা ও কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। আবার কখনো নকল অনুবাদও চোখে পড়ে। অনেক সময় অনেক আকর্ষনীয় সাহিত্যও অনুবাদকের অদক্ষতার কারণে পাঠকের মনে বিরুপ প্রতিকৃয়া তৈরি করতে পারে। একই সাহিত্য ভিন্ন ভিন্ন অনুবাদকের অনুবাদে অনেক পার্থক্য তৈরি হতে দেখা যায়। সে ক্ষেত্রে পাঠকের মনের মত অনুবাদ যিনি করতে পারেন তিনিই অনুবাদক হিসেবে সার্থক বলে বিবেচিত হয়ে থাকেন। আলোচ্য অনুবাদক সেই দিক বিবেচনায় কতটা সফল সেটা আমরা বুঝতে চেষ্টা করবো।

আমাদের বাংলা সাহিত্যের যে ইতিহাস সেখানে অনুবাদের উপস্থিতি মোটাদাগে বলার মত নয়।শুরুতে যদি আমরা কাফকার কথা টেনে আনি তাহলে দেখতে পাই গোটা পৃথিবী যখন কাফকা বন্দনায় মাতোয়ারা, আমরা তখন কাফকার নামগন্ধও জানতে পারিনি। এর মূলে রয়েছে অনুবাদের অনুপস্থিতি এবং অন্যান্য লেখক,সাহিত্যিকদের জানার কৌতুহলের অভাব। পৃথিবীর কোথায় কে কি লিখলো তার খোঁজ না রাখলে মূলত অনেক কালজয়ী সাহিত্যের স্বাদ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হতে হয়। অনুবাদ সাহিত্যের ব্যাপক পরিচিত ও প্রচলনের অভাবেই মূলত কাফকা এদেশে প্রবেশ করেছে অনেক পরে আশির দশকে। সেই সময়ে বাংলা সাহিত্যে যারা যুক্ত ছিলেন তারা সচেষ্ট হলে কাফকার সাহিত্য আমাদের দেশে প্রবেশ করতো আরও অনেক আগে। অনেকের মতে এর আগেও কাফকা অনুদিত হয়েছে কিন্তু ভাষাগত ভাবে সেগুলো এতোটাই দুর্বল ছিলো যে পাঠকের মনে যায়গা করে নিতে পারেনি। শুধু কাফকাই নয় বরং বিশ্বের অপরাপর বিখ্যাত লেখক কবিদের লেখা বাংলা ভাষায় অনুবাদে আমাদের যে উদাসীনতা এবং এই যে দীর্ঘ বিলম্ব এর পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। আলোচ্য অনুবাদক মাসরুর আরেফিন সেই ধারা থেকে বেরিয়ে এসে বাংলাভাষার পাঠকদের জন্য কাফকাকে সহজ ভাবে অনুবাদ করতে চেষ্টা করেছেন।

মাসরুর আরেফিন কিশোর কালে ক্যাডেট কলেজে পড়ালেখা করেছেন। কলেজে পা রাখার পর এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো তার সামনে।একদিন কলেজ লাইব্রেরীতে বই খুঁজতে গিয়ে চোখে পড়লো “ দ্য আউট সাইডার” গল্পটি। লেখক আলবেয়ার কামু। বিশ্ববিখ্যাত লেখক তিনি। এর আগে যদিও কিশোর মাসরুর আরেফিনের আলবেয়ার কামু নামে যে কোন লেখক আছেন তা জানা ছিলো না।ঘটনাটা ১৯৮৬ সালের। কিছুদিন আগেই ভর্তি হয়েছেন বরিশাল ক্যাডেট কলেজে।রুটিনমাফিক সব কিছু করতে হয়। প্রতিটি সেকেন্ডের যেখানে পাই পাই করে উশুল করতে না পারলে অবসরে করবো বলে সেই ফুসরত আর মেলে না।আলবেয়ার কামুর লেখা “ দ্য আউট সাইডার” গল্পটি একনাগাড়ে পড়তে পড়তেই শেষ হয়ে গেলো। বইটি ছিলো বাংলায় অনুদিত।সেই অনুবাদটি কলকাতা থেকে প্রকাশিত হয়েছিল।আউটসাইডার পড়তে গিয়ে ঘোর লাগা সময়ের মধ্যেই আরও একটি নাম চোখে পড়ে। ফ্রান্সৎস কাফকা! অদ্ভুত সুন্দর নাম। এর আগে এই নামটাও মাসরুর আরেফিনের জানা ছিলো না।আলবেয়ার কামু যে লেখক দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন সেই ফ্রানৎস কাফকাকে তো পড়তেই হবে। সংকল্পবদ্ধ হয়েছিলেন তিনি। কিন্তু আশ্চর্য হতে হলো যে কাফকার কোন বই বাংলাদেশে অনুবাদ পাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। এভাবে অনুবাদ সাহিত্যের প্রতি একপ্রকার ভালোলাগা তৈরি হলো। পড়া হয়ে গেল আরও অনেক বিশ্বসাহিত্য। ১৯৯০ সাল। বরিশাল ক্যাডেট কলেজ থেকে পাশ করে সেই সাহিত্য প্রেমী মানুষটি তখন মুম্বাইতে, বোম্বে সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। ওই সময় কোনো একটা লাইব্রেরিতে ফ্রানৎস কাফকার ”মেটামরফসিস অ্যান্ড আদার স্টোরিজ” বইটা তার চোখে পড়লো। দীর্ঘদিন যে লেখকের নাম বুকের মধ্যে লালন করেছেন সেই লেখকের বই সামনে পড়তেই আর দেরি না করে তা পড়ে ফেলেন।ততোদিনে কৈশর পেরিয়ে যৌবনের দ্বারপ্রান্তে তিনি এবং ঠিক ওই ‘রূপান্তর’ গল্পের প্রথম লাইনটা যেটা গার্সিয়া মার্কেজ এবং অনেক সাহিত্যিকের যেটা দিয়ে লেখালেখি শুরু: এক সকালে গ্রেগর সামসা ঘুম থেকে উঠে দেখে সে একটা পোকা হয়ে গেছে। ওই লাইনটি মাসরুর আরেফিনের মধ্যে একই অভিঘাত আনে। লেখকের ভাষায় ওটাই তার প্রথম পড়া কাফকা। তবে সেবার আর বাংলায় অনুদিত পড়া হয়নি বরং ওটা ছিলো ইংরেজীতে। পরবর্তী কালে তিনি বলেছেন তাঁর ধারণা  ‘রূপান্তর’ গল্পটাই কাফকার প্রথম গল্প যেটা তিনি পড়েছিলেন। এতো সুন্দর সব বিশ্ব সাহিত্য বাংলাভাষার পাঠকদের সামনে তুলে ধরার জন্য হৃদয়ের গভীর থেকে তিনি ডাক শুনতে পেলেন। কৈশর থেকে যৌবন পেরিয়ে এখন সুর্য মধ্যগগনে। সেই সাহিত্য প্রেমী মানুষটিও একে একে পার করেছেন অনেক বসন্ত। সেই সাথে হাত পাকিয়ে নিয়েছেন সাহিত্যের বেশ কিছু দিকে। যার মধ্যে অনুবাদ অন্যতম।

বিশ্বসাহিত্যে অনুবাদ ও রূপান্তরের বিরাট ভূমিকা অনস্বীকার্য। সাহিত্য ও কাব্যের ক্ষেত্রে অনুবাদ ও রূপান্তর অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়ে। আমাদের এই গ্রহে ভাষা ও উপভাষার পরিসংখ্যান দেওয়া দুরূহ, যেহেতু সংখ্যার দিক থেকে তা অগণিত। মহাকবি হোমার রচিত আদি মহাকাব্য ‘ইলিয়ড’ ও ‘ওডিসি’ প্রাচীন গ্রিক ভাষায় রচিত। আমরা আজকের পাঠকেরা তার এক বর্ণও বুঝতাম না, যদি গ্রন্থগুলো ইংরেজিতে অনূদিত না হতো। এ দুটো মহাকাব্য বাংলা ভাষায়ও অনূদিত হয়েছে। ‘মহাভারত’, ‘রামায়ণ’-এর মতো দুই মহাকাব্য যদি সংস্কৃত ভাষা থেকে বাংলায় অনূদিত না হতো, আধুনিক যুগের পাঠকরা এ দুই মহাগ্রন্থের কাছে ঘেঁষতেও পারত না। রাজশেখর বসু যে সহজ ও সংক্ষিপ্তভাবে আমাদের কাছে ‘মহাভারত’ গ্রন্থ হৃদয়গ্রাহী করে তুলেছেন, তার তুলনা বিরল। বুদ্ধদেব বসুর মতো বাংলা সাহিত্যের বহুপ্রভা লেখকের কল্যাণেই আমরা আজ বোদলেয়ার ও হোল্ডারলিনের কবিতা বাংলা ভাষায় পড়তে পারছি।

আমরা বাঙালিরা যেহেতু ইংরেজি পড়া, লেখা ও বোঝার মতো জানি, সমগ্র বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে আমাদের পরিচয় মূলত ইংরেজি ভাষার মাধ্যমে হয়ে থাকে। মওলানা রুমি, কাহ্‌লিল জিবরান ও ওমর খৈয়ামের অনন্য কাব্যপ্রতিভার সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটেছে ইংরেজি ভাষার মাধ্যমেই। নিশ্চিতভাবে অনুবাদে মৌলিক ভাষার স্বাদ ও ধার অনেকটাই কমে যায়। কিন্তু দুধের স্বাদ ঘোলে মিটানো ছাড়া বিশ্বের সাহিত্যপ্রেমীদের আর কোনো উপায় থাকে না। এভাবে চায়নিজ, জাপানি, রাশিয়ান, জার্মান, স্প্যানিশ, ফরাসি, আরবি, ফারসি, উর্দুসহ বিশ্বের অগণিত ভাষা ও উপভাষার সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটে ইংরেজি ভাষায় অনুবাদের মাধ্যমে।তবে এখন বেশ কিছু গুণী লেখক অনুবাদকের ভূমিকায় অবতীর্ন হয়ে মাতৃভাষায় বিদেশী সাহিত্যের স্বাদ পাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। আমরা তেমনই একজন লেখক, কবি ও অনুবাদক মাসরুর আরেফিনের গল্প বলতে চাই।

২০১৯-এ আগস্ট আবছায়া এবং ২০২০-এ আলথুসার, বাংলাভাষায় সম্পূর্ণ নতুন স্বাদের এ-দুটি উপন্যাস লিখে সমকালীন বাংলা সাহিত্যে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসা মাসরুর আরেফিন মূলত কবি। পড়াশোনা করেছেন ইংরেজি সাহিত্য এবং মার্কেটিং ও ফিন্যান্স-এ। ২০০১ সালে প্রথম কাব্যগ্রন্থ ”ঈশ্বরদী, মেয়র ও মিউলের গল্প” প্রকাশের পর তা বাংলা কবিতার পাঠককে দিয়েছিল নতুন কাব্যভাষার স্বাদ। বইটি সে বছর প্রথম আলোর নির্বাচিত বইয়ের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়। এরপর মৌলিক সাহিত্য রচনা থেকে দীর্ঘ একটা বিরতি নিয়ে তিনি ডুব দেন বিশ্বসাহিত্য অনুবাদের কাজে। অনেকেই মনে করেন অনুবাদ সাহিত্যে মাসরুর আরেফিনের অবদান বাংলাভাষাকে সমৃদ্ধ করেছে অনেক বেশি।এটি পাঠক মাত্রই তার অনুদিত গ্রন্থ পাঠের মাধ্যমে উপলব্ধি করতে পারবেন। তাঁর অনুবাদে ফ্রানৎস কাফকা গল্পসমগ্র (২০১৩) ব্র্যাক-সমকাল সাহিত্য পুরস্কার ও বাংলা একাডেমি-চিত্তরঞ্জন সাহা সেরা প্রকাশনা পুরস্কার লাভ করে। ২০১৫ সালে বেরোয় তাঁর হোমারের ”ইলিয়াড” এবং সমাদৃত হয় পাঠক মহলে। বিশ্ব সাহিত্যের বাঘা বাঘা লেখকের বই যেগুলো বাংলায় অনুদিত হয়েছে তার মধ্যে যা কিছু হাতে এসেছে তা তিনি মন্ত্রমুগ্ধের মত পড়েছেন এবং নতুন করে ভাবার অবকাশ মিলেছে।

১৯৯০ এর দিকে বিশ্বসাহিত্যের ভান্ডারে প্রবেশ করে তিনি এতোটাই মন্ত্রমুগ্ধ হন যে একই সময়ে সমান্তরাল ভাবে একাধিক লেখকের বই পড়তে শুরু করেন। সেই সময়ে তিনি একই সাথে কাজুও ইশিগুরোর লেখা “রিমেইনস অব দ্য ডে” এবং ফ্রানৎস কাফকার “ দ্য ট্রায়াল” ‍উপন্যাস দুটি প্যারালালি পড়তে শুরু করেন।

একজন সফল অনুবাদকের জন্য পড়া এবং মূল লেখকের মনের ভাব বুঝতে পারাটা ভীষন জরুরী। মাসরুর আরেফিন অনুবাদের ক্ষেত্রে প্রতিটি লেখাকে নিবিড় ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং বুঝতে চেষ্টা করেছেন লেখক মুলত কোন দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে লিখেছেন।নিজে একজন কথা সাহিত্যিক হওয়ায় আরেকজন কথাসাহিত্যিকের সাহিত্য ভাষা বুঝতে সুবিধা হয়েছে। যা কিছু সরল আসলে তা কি ততোটাই সরল কিছু বুঝানো হয়েছে নাকি আরও কিছু। অনেকটা হারুকি মুরাকামির নরওয়েজিয়ান উড লেখার অভিজ্ঞতার মত যিনি কাহিনীর বাস্তব রূপ নিজে আগে উপলব্ধি করেছেন এবং তার পর লিখেছেন যেন মূল অনুভুতিটা লেখার মধ্যে চিত্রায়িত হয়। অনুবাদক হিসেবে মাসরুর আরেফিন চেয়েছে পাঠক যেন অনুদিত বইটি পড়তে গিয়ে বার বার মনে করে এটি কোন অনুবাদ বই নয় বরং এটিই মূল লেখা।

বিখ্যাত লেখক হোর্হে লুই বোর্হেস মনে করেন কাফকার সেরা গল্প “গ্রেট ওয়আল অব চায়না”। আলোচ্য অনুবাদক মাসরুর আরেফিন এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন তিনি “গ্রেট ওয়াল অব চায়না” পড়েছেন নব্বইয়ের দশকে মুম্বাইতে বসে।এভাবে একটা শেষ করে আরেকটা,আরেকটা শেষ করে আরেকটা।কাফকা যেন মাসরুর আরেফিনকে নেশা ধরিয়ে দিয়েছিল যা পরবর্তী কালে তাকে কাফকার সাহিত্যকর্ম অনুবাদে সহায়তা করেছিল। ১৯৯২ সালে যখন তিনি পড়াশোনা করছেন সেই সময়েই এই গল্পটি পড়া এবং সেই সময়ে তিনি এতোটাই মুগ্ধ ছিলেন যে আগে অনুবাদের অভিজ্ঞতা না থাকলেও তিনি এটিকে অনুবাদ করতে শুরু করেন। সেই সময়ে তিনি ভারতে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। অনুবাদগুলি ভালো হয়নি, উন্নত মানের অনুবাদ হয়নি তবুও আশা কথা হলো বেসিক অনুবাদ তো একই, বেসিক কাঠামো ঠিকই ছিলো।লেখক ও অনুবাদক মাসরুর আরেফিন মূলত যে বয়সে কাফকা,কামু পড়তে শুরু করেছিলেন ঠিক সেই সমসাময়িক সময়েই তিনি সেগুলো অনুবাদ করতে শুরু করেন।ফলে সেই সময়ে করা অনুবাদে কিছু দুর্বলতা চোখে পড়ে যা তিনি পরবর্তী সময়ে কাটিয়ে উঠেছেন।

পড়তে পড়তেই মাসরুর আরেফিন ‍বুঝতে পারলেন কাফকা আমাদেরকে এমন একটা সিরিয়াস টোনে গল্পগুলা বলে গেছেন যে, আমরাও এই ওয়াল্টার বেনজামিন,থিওডোর অ্যাডর্নো, জ্যাঁ পল সার্ত্রে থেকে শুরু করে সিরিয়াস লেখকদের ব্যাখ্যাতে কাফকা এমন এক সিরিয়াস রূপ নিয়ে নিয়েছে। বিশ্বব্যাপী চারদিকে কাফকার ডিকন্সট্রাকশন হচ্ছে। দেশে দেশে সাহিত্যিক,অনুবাদক,লেখক এবং শিল্পবোদ্ধারা ফ্রানৎস কাফকাকে অনেক দিক থেকে দেখার চেষ্টা করা হচ্ছে।যেটাকে বলা যেতে পারে ”ম্যাচিউরড ভিউ অব ফ্রানৎস কাফকা”। কাফকা কি আসলেই এত ডার্ক, কাফকা কি আসলেই এত প্রোফেটিক? এগুলো বুঝতে চেষ্টা করেছেন মাসরুর আরেফিন। এবং তার অনুবাদের ভূমিকা সহ অন্যান্য বিষয়ে লক্ষ্য করলে পাঠক সহজেই বুঝতে পারবেন একজন অনুবাদক হিসেবে মাসরুর আরেফিন কতটা পরিশ্রমী এবং নিষ্ঠাবান।

কাফকা অনুবাদ করতে গিয়ে মাসরুর আরেফিন অনেক ভাবে কাফকাকে পর্যবেক্ষণ করেছেন। তারুণ্যের উচ্ছ্বাস থেকে কাফকাকে দেখেছেন,পাশাপাশি একটা নিশ্চিত ব্যাখ্যার মধ্যে কাফকাকে দেখতে চেয়েছেন — মাসরুর আরেফিন বুঝতে পেরেছেন ফ্রানৎস কাফকা মানেই ”কাফকায়েস্ক”। অনুবাদক হিসেবে তিনি কাফকার হিউমারটা ধরতে পেরেছেন। আমরা দেখি অনেক অনুবাদক গৎবাধা অনুবাদ করে দায় সারেন এবং ফ্রানৎস কাফকার হিউমার বলতে যে কিছু আছে  তা অনেকেই বুঝতে পারেন না। কারণ সেটা বুঝতে হলে যতটা গভীর ভাবে তলিয়ে দেখতে হয় তা খুব কম অনুবাদকের আছে। কাফকাকে অনেকে মনে করে ভীতি, নৈরাজ্য, ভয়, আতঙ্ক, দুঃস্বপ্ন–ফ্রানৎস কাফকা মানেই তাই। আসলে কিন্তু সেটা নয়। মাসরুর আরেফিন এমন ভাবে অনুবাদে হাত দিয়েছেন যে লেখাটি মূলত বাংলাতেই লেখা হয়েছিল। পাঠককে টেনে ধরে তাঁর প্রতিটি অনুবাদ।

ফ্রানৎস কাফকার প্রথম অনুবাদক ছিলেন ইংরেজ দম্পতি উইলা অ্যান্ড এডুইন মুয়ির। ওই মুয়ির পড়া কাফকা এই পৃথিবীতে একটা জেনারেশনের কাফকা। তারপরে আরো অনেকগুলা কাফকা আসে ইংরেজি ভাষায়। যেমন ম্যালকম প্যাস্লির অনুবাদগুলা পাওয়া শুরু হয়, যেগুলাকে বলা হয় ডেফিনেটিভ এডিশন। যেমন এডুইন মুয়ির অ্যান্ড উইলা মুয়িরের অনুবাদে, তারা বিশ্বাস করত যে কাফকা ধর্মপ্রচারক, তারা বিশ্বাস করতেন যে কাফকার লেখা আধ্যাত্মিকতায় ভরা, স্পিরিচুয়াল রাইটিং। তাদের লেখাগুলার মধ্যে সবকিছু স্পিরিচুয়াল — যদি কাফকা লিখতেন একটা স্বচ্ছ আলো, ওনারা লিখতেন একটা অনির্বাণ দীপ্তি। পরে ম্যালকম প্যাস্লি,জে এ আন্ডারউড,আরন্স্ট্ কাইজার, এইথ্নে উইলকিনস, মাইকেল হফমান, মার্ক হারম্যান এদের অনুবাদগুলো আসতে থাকে পঁচানব্বই সালের পরের থেকে। মূলত এই সব অনুবাদ গ্রন্থে মূল কাফকার বেশ খানিকটা অনুপস্থিত থেকে গেছে। মাসরুর আরেফিন সেই অনুপস্থিত কাফকাকে সঠিক ভাবে উপস্থিত করতে চেষ্টা করেছেন।

মাসরুর আরেফিনের অন্যতম আরেকটি অনুবাদ কর্ম মহাকবি হোমারের মহাকাব্য “ইলিয়াড”। উদ্দেশ্যই ছিল এটার একটা আক্ষরিক একাডেমিক অনুবাদ করা, যাতে ইংরেজিতে যাদের যাতায়াত নেই, গ্রিক ভাষায় যাতায়াত নেই, তারা যেন এই অনুবাদটা হাতে নিয়ে বলতে পারেন_ এটাই হোমার। এর মধ্যে একটা শব্দও বাদ যায়নি, যেটা হোমারে আছে। শুধু ভাষার পরিবর্তনটা বাদ দিলে মনে হবে পাঠক খোদ নিজেই যেন উপস্থিত ছিলেন। ভাষার আভিজাত্যের সঙ্কীর্ণ বেড়াই যদি হয় ভাষান্তরের পক্ষে অন্যতম প্রতিবন্ধক, তা স্বীকার করে নিতে কোন অসুবিধা থাকে না। অনুবাদের সাথে মূলের প্রভেদ চিরকালই দেহরুপ বাইরের খোলসের সাথে অর্ন্তনিহিত আত্মার মতই। মাসরুর আরেফিনের অনুবাদের ক্ষেত্রে বিষয়টি কিছুটা ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়েছে বলে মনে হয়। তিনি অনুবাদে নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রেখেছেন ফলে তা হয়ে উঠেছে সুপাঠ্য। অনুবাদ কীভাবে হবে বা কতটুকু হওয়া সম্ভব এসব বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আরোপিত নিজস্ব পরিভাষাটিও মাসরুর আরেফিনের অনুবাদে খুঁজে পাওয়া যায়। অনুবাদের মাধ্যমে এক ভাষার সাহিত্যের আস্বাদ বা আঘ্রাণ অন্য ভাষায় কখনোই সেভাবে পাওয়া যায় না। স্বভাবতই রসকষহীন অনুবাদ হয়ে দাঁড়ায় অনেকটা মরা বাছুরের মত। কিন্তু কখনো কখনো কোন কোন অনুবাদক তাদের জ্ঞানের গভীরতা ও পর্যবেক্ষনের গুণে তা কাটিয়ে উঠতে পারেন। সঠিক তাৎপর্য ধারণ করতে পারেন হৃদয়গত ভাবে। একজন পাঠক হিসেবে আমার মনে হয়েছে এই কাজটি খুব ভালোভাবে করতে পেরেছেন মাসরুর আরেফিন। তিনি সম্পুর্ন তাৎপর্য হৃদয়ে জাগ্রতে রেখেই অনুবাদের কাজে হাত দিয়েছেন। আর নিজের উপলব্ধির সবটুকু তিনি নিঃশেষ করে দিয়ে অনুবাদ করেছেন। 

ভাষা স্রোতের মতো, তা নিরন্তর পরিবর্তনশীল। মূল ভাষাকে সমৃদ্ধ করার জন্য আঞ্চলিক ভাষারও একটা ভূমিকা আছে। আঞ্চলিক ভাষার শব্দ, বাক্যবিন্যাস ও ঝঙ্কার মূল ভাষাকে সমৃদ্ধ করে। বর্তমানে, আমাদের দেশে বাংলা ভাষা কথন আধুনিকতার নামে নানা ভাবে নষ্ট হচ্ছে। আধুনিকতা ভাষায় বিকৃতি গ্রহণ করে না, ভাষার সুষমা ও উন্নতিই কেবল প্রত্যাশা করে। নিত্যদিনের আধুনিক বাক্‌চারিতায় প্রমিত ভাষার সঙ্গে আঞ্চলিক ভাষার মিশ্রণ শ্রুতিকটু হয়ে থাকে। অবশ্য বাচনিক ভাষায় শব্দ-নির্বাচন, উচ্চারণ, বাচনভঙ্গি, ধ্বনি ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই অনুবাদের ক্ষেত্রে নিয়মের তোয়াক্কা না করে নিজের মত অনুবাদ করে থাকেন ফলে সাহিত্য তার নিজস্ব স্বকীয়তা যেমন হারায়, তেমনি পাঠকের কাছে তা হয়ে ওঠে দুর্বোধ্য। মাসরুর আরেফিনের অনুবাদে এই সব স্বকীয়তা ধরে রাখার চেষ্টা স্পষ্ট ভাবে ফুটে উঠেছে।

আমার সাথে হয়তো অনেকেই এক মত নাও হতে পারেন তবে অনুবাদকেরাও মূল লেখকের মতই উল্লেখযোগ্য। রজার বেকনের মতে অনুবাদের ক্ষেত্রে মূল ভাষা এবং অনুদিত ভাষা উভয়কেই গুরুত্ব দিতে হবে। প্রাচীন গ্রীক থেকে ল্যাটিন অনুবাদ এবং সমসাময়িক সাহিত্যের মাতৃভাষায় অনুবাদের মধ্যে পার্থক্য বিষয়ে বেকন যথেষ্ট সচেতন থাকতে বলেছেন। এমনকি এই একই বিষয়ে দান্তেও সহমত পোষণ করেছেন। ফলে ভালো অনুবাদের সাথে নৈতিক ও নান্দনিকতার দিকটি গুরুত্বপুর্ন। আর এ কারণেই মাসরুর আরেফিন তাঁর অনুবাদে সঠিক ভাবকে প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নৈপুণ্য অর্জন করেছেন। অনুবাদকে নির্ভুল করতে হলে অনুবাদকের প্রয়োজন মূল লেখাটি ভালোভাবে পড়া ও তার নিহিতার্থ যথাযথ ভাবে উপলব্ধি করা। অর্থ অনুধাবন করতে পারলে তবেই কেবল তা সঠিক ভাবে অনুদিত হওয়া সম্ভব। কাফকার রচনা অনুবাদ কালে এবং হোমার অনুবাদ কালে মোটাদাগে বলতে গেলে সব সময় মাসরুর আরেফিন এই খুটিনাটি বিষয়গুলো মাথায় রেখেছেন।

অনেক পাঠক মনে করতেন বুদ্ধদেব বসু বোদলেয়ার অনুবাদের মাধ্যমে পরবর্তী বাংলা কবিতার জন্য যে অমিয় সম্ভাবনা তৈরি করেছিলেন, ঠিক তেমনি যদি তিনি বা তাঁর মত যোগ্য কেউ কাফকার অনুবাদ করতেন তাহলে বাংলা সাহিত্যের বহু বিচিত্র সম্ভাবনাকে নিশ্চিত করে তোলা যেত। যেমনটা হোর্হে লুই বোর্হেস স্প্যানিশ ভাষায় ফকনার এবং কাফকা অনুবাদের মাধ্যমে চল্লিশের দশকেই নিজের এবং পরবর্তী লেখক যেমন গ্যাবরিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ,মারিয়ো বার্গাস ইয়োশা বা কোর্তাসা প্রমুখদের জন্য সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করেছিলেন। আশার কথা হলো আমাদের বাংলা সাহিত্যের অনেক লেখকের ধারনাকে উপেক্ষা করেই শেষ অব্দি কাফকা বাংলায় অনুদিত হয়েছে এবং মোটাদাগে এটিকে কোন ভাবেই কারো পক্ষে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। মাসরুর আরেফিন যে অনুবাদটি করেছেন তার গুরুত্ব বাংলাভাষার পাঠকদের কাছে যারপরনাই অবর্ননীয়।

গুরুত্বপুর্ন ব্যাপার হলো মাসরুর আরেফিন একাই কাফকাকে বাংলায় অনুবাদ করেন নি বরং কলকাতা থেকেও এটির একাধিক অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে। ফলে কেউ চাইলেই মিলিয়ে দেখতে পারেন মাসরুর আরেফিনের অনুবাদ এবং কলকাতার অনুবাদের পার্থক্য,সাবলিলতা,মাধুর্য এবং গ্রহণযোগ্যতা কতটা। আর সেখানেই পাঠক খুব সহজেই উপলব্ধি করতে পারবেন অনুবাদক হিসেবে মাসরুর আরেফিন কতটা সফলতার পরিচয় দিয়েছেন। উদাহরণ স্বরুপ আমরা মনোজ চাকলাদারের কথা বলতে পারি। মনোজ চাকলাদার নামে এক অনুবাদক তার কাফকার অনুবাদ বইয়ে যে সূচনা বক্তব্য লিখেছেন সেখানেও বাক্য গঠনে অনেক অসংগতি আছে। দুঃখের ব্যাপার হলো যে কোন সাধারণ পাঠকও সেটি পড়তে গেলে  মনে হবে এই অনুবাদক অর্থাৎ মনোজ চাকলাদারের কাফকা সম্পর্কে তেমন ধারণাও অস্বচ্ছ। অন্যদিকে মাসরুর আরেফিন কাফকা নিজে পড়েছেন,উপলব্ধি করেছেন এবং গভীরতা অবলোকন করে তবেই অনুবাদ করেছেন। মাসরুর আরেফিনের বইয়ে তথ্যের প্রাচুর্য,অনুবাদের সততা এবং টীকা ভাষ্যের যে অপুর্ব সমাবেশ আমরা দেখতে পাই তা আরেফিনের অনুবাদ না পড়া অব্দি কাফকা প্রেমিক পাঠকেরা বুঝতে পারবে না। এইরকম দৃষ্টান্ত তারা আগে কখনো দেখেনি।

বিশ্বসাহিত্যের পরম্পরায় কাফকার সঠিক অবস্থানটিকে স্পষ্ট করে তোলার জন্য যে বিপুল পরিমান জ্ঞান আহরোণ করা প্রয়োজন তা তিনি করেছেন এবং নিষ্ঠার সাথে নিপুন ভাবে তা বিন্যস্ত করেছেন।অনুবাদকের জন্য দরকার অনেক বেশি সতর্কতা, যেন বিশ্বস্ততার মানদন্ডে মোটামুটিভাবে নির্ভরযোগ্য ইংরেজী অনুবাদের উপর ভরসা না করলে বাংলায় ভালো অনুবাদে কাফকাকে সঠিক ভাবে পাওয়া কঠিন। অনুবাদক হিসেবে মাসরুর আরেফিন এই দিকটিতে বেশ সতর্ক ভাবে পা ফেলেছেন। 

কলকাতার মনোজ চাকলাদার যেমন “মেটামরফোসিস” এর অনুবাদ এভাবে শুরু করেছেন- “ এক সকালে অস্বস্তিকর স্বপ্ন থেকে গ্রেগর সাসমা জেগে ওঠে,দেখে একটা বিরাট বড়ো পোকায় রুপান্তরিত হয়ে গেছে” ঠিক একই লেখা মাসরুর আরেফিন অনুবাদ করেছেন এভাবে “এক সকালে গ্রেগর সাসমা অস্বস্তিকর সব স্বপ্ন থেকে জেগে উঠে দেখে সে তার বিছানায় পড়ে আছে এক দৈত্যাকার পোকায় রুপান্তরিত হয়ে।” দুটি অনুবাদ দেখলেই পাঠক বুঝতে পারবে কোন অনুবাদটির পাঠযোগ্যতা বেশি।অনুবাদের ক্ষেত্রে সবগুলো অর্থকে শক্ত বাধঁনে বেঁধে একটি পুর্ণাঙ্গা বাক্য গঠনের মাধ্যমে এক অপুর্ব সৌন্দর্য সৃষ্টি করতে হয়, যা মাসরুর আরেফিন করতে পেরেছেন।

কাফকা অনুবাদের পর মাসরুর আরেফিন চেয়েছিলেন হোমার অনুবাদ করতে। তবে নানা কারণে তা দেরি হয়েছে। ১৯৯২-৯৩ সালে স্যাঁ-ঝন পের্সের আনাবাজ অনুবাদ করছিলেন যা পরবর্তীতে ‘মাটি’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। আনাবাজ অনুবাদ করতে গিয়ে তিনি দেখেছেন সেখানে ট্রয় শহরের প্রসঙ্গ আছে।লেখক ও অনুবাদক মাসরুর আরেফিন এক আলাপচারিতায় এ নিয়ে কথা বলেছিলেন। তাঁর মতে ওই প্রসঙ্গটা এমন ভয়ংকর ছিল যে,নদীতে মৃত গাধার শরীর ভেসে যাচ্ছে। ‘আনাবাজ’ কবিতার সেই নদীর নামটা বের করতে গিয়ে তিনি খুঁজে পেলেন স্যাঁ-ঝন্ পের্স কবিতায় যে ইলিয়ন শহরের কথা বলছে, সেই ইলিয়ন হচ্ছে ট্রয় শহরের আরেক নাম। তখন ট্রয় জানতে গিয়ে জানলেন হেলেনের কথা, ট্রয়ের যুদ্ধের কথা। এসব পড়তে পড়তে আটকে গেলেন। অন্য সবার মতোই ট্রয়ের যুদ্ধ সম্পর্কে পড়া তো ছিলই, কিন্তু সেই তখন থেকে একেবারে পূর্ণ মনোযোগে পড়া শুরু করলেন। 

পাঠক সাধারণত অল্প বয়সে তথা সপ্তম-অষ্টম শ্রেণীর দিকে ট্রয়ের যুদ্ধ, হেলেন কিংবা হেক্টর, একিলিসের কথা পড়ে থাকে। কিন্তু সেটা অনেকটা রোমাঞ্চ কাহিনী পড়ার মতো করে পড়া। মাসরুর আরেফিন গভীরভাবে হোমারের জগতে ঢুকলেন ‘৯২-৯৩ সালের দিকে। তখন থেকেই আগ্রহ তৈরি হয় এবং সিদ্ধান্ত নেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ দুই মহাকাব্য ”ইলিয়াড” এবং ”ওডিসি” একদিন বাংলা অনুবাদ করবেন। আগ্রহটা ভেতরে ভেতরে ছিল। আর কাফকা অনুবাদ করে ফেলার পর মনে হলো, একই জিনিস আবার না করতে। অনুবাদকের ভাষায় ”অনেকটা একঘেয়ে লাগছিল কাফকায় হাত দিতে”। ঠিক তখনই ইলিয়াড-এর অনুবাদে হাত দিলেন এবং দু’বছরের মধ্যে অনুবাদ কাজটা শেষ করে ফেললেন। বাংলায় তখন পর্যন্ত এসব বিখ্যাত কাজের প্রামাণ্য কোনো অনুবাদ হয়নি। আগে যে অনুবাদগুলো হয়েছে তা অনেকটা সংক্ষেপিত কিংবা ভাবানুবাদ। অবশ্য সেগুলো থেকেও পাঠকদের আগ্রহ বাড়ে। পড়তে সহজবোধ্য হয়। বাংলার সামাজিক-সাংস্কৃতিক ভাবধারায় সেটাকে ফুটিয়ে তুললে মানুষের কাছে সহজে বোধগম্য হয়। হোমারের প্রতি কিংবা ট্রয় ও হেলেনের প্রতি সাধারণ পাঠকদের আগ্রহী করে তোলে।

এসব অনুবাদের ভূমিকা বিরাট। কিন্তু এখানে একটা ত্রুটি থেকে যায় যে সেই সময় অব্দি, একটা প্রামাণ্য হোমার কিংবা আদর্শ একটা হোমার বাংলায় হয়নি। যেটা কিনা লাইন বাই লাইন ধরে ধরে করা। সেটা হয়তো একটু কম পাঠকপ্রিয় হতে পারে, কিংবা রোমাঞ্চ কাহিনীর মতো পড়তে আনন্দ নাও লাগতে পারে। কিন্তু মাসরুর আরেফিন সেটা করেছেন। এটি একটি আক্ষরিক একাডেমিক অনুবাদ, যেখানে ইংরেজিতে যাদের যাতায়াত নেই, গ্রিক ভাষায় যাতায়াত নেই, তারা এই অনুবাদটা হাতে নিয়ে বলতে পারবেন এটাই হোমার। এর মধ্যে একটা শব্দও বাদ যায়নি, যেটা হোমারে আছে। শুধু ভাষার পরিবর্তনটা বাদ দিলে পাঠকের মেনে হবে যেন মূল হোমারই বাংলায় পড়ছেন। অনুবাদক হিসেবে মাসরুর আরেফিনের এটা একটা বড় সাফল্য এবং গর্বের স্থান হয়ে আছে যে তিনি আক্ষরিক ভাবে হোমারকে বাংলাভাষার পাঠকের দোড়গোড়ায় পৌছে দিয়েছেন।

পাঠক যখন মাসরুর আরেফিনের অনুদিত কাফকা এবং ইলিয়াড পড়বে তখন মনে হতে পারে কাফকার চেয়ে ইলিয়াডের প্রতি বোধহয় লেখকের ব্যক্তিগত টানটা বেশিই ছিল। আর সে কারণেই কাফকার অনুবাদের চেয়ে ইলিয়াডের অনুবাদ নিঁখুত হয়েছে, এবং পাঠক মাত্রই বুঝতে পারবে এটি অনুবাদের ক্ষেত্রে অনুবাদক সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করেছেন। আরেফিনের অনুবাদের সাবলিলতার কারণে বাঙালি পাঠকমাত্রই ”ইলিয়াড” উপভোগ করবে। 

মাসরুর আরেফিন যেন কেবলমাত্র ইলিয়াডটাই অনুবাদ করেন নি বরং বইয়ের শুরু, ভূমিকায় নানাভাবে বিষয়টাকে খোলাসা করার চেষ্টা করেছেন, যেন পাঠক খুব সহজেই কাহিনীতে ঢুকতে পারে। একটি নির্দিষ্ট বিষয়ের রাজনৈতিক ব্যাখ্যা, পৌরাণিক ব্যাখ্যা রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। হঠাৎ ইলিয়াডে ঢুকতে গেলে যে কোনো পাঠকের জন্যই বিষয়টি কঠিন হয়ে যেতো যদি না এই ব্যাখ্যা না রাখা হতো। প্রধান চরিত্রগুলোর নামে একটা অংশ রাখা হয়েছে,যেন হাজারেরও বেশি নামের মধ্যে গুলিয়ে গেলে  সেখান থেকে উদ্ধার করা যায়। মাসরুর আরেফিনের ইলিয়াডের অনুবাদটা মূল হোমারের ইলিয়াডের লাইনের হুবহু রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। যে পর্বে যেখানে যে লাইন আছে, অনুদিত গ্রন্থে সেভাবেই রাখা হয়েছে। যা পাঠকের জন্য সুবিধাজনক হয়েছে। এসবই বাঙালি পাঠকদের মধ্যে ইলিয়াডকে সহজগম্য করে তুলে ধরবে। সবকিছু মিলিয়ে মাসরুর আরেফিন অনুদিত ইলিয়াড একটা সম্পূর্ণ সফল অনুবাদ বই হিসেবে অনায়াসে গ্রহণযোগ্যতা পাবে।

আমাদের দেশে গভীর অনুধ্যান নিয়ে এ রকম পরিশ্রমী কাজ খুব একটা হয় না। একটা দেশের শিল্প-সাহিত্যের অগ্রগতির জন্য কেবল অনুবাদ নয়, যে কোনো ক্ষেত্রেই প্রতিশ্রুতিশীল কাজের প্রয়োজন রয়েছে। এ ধরনের কাজ যে কোনো দেশের সাহিত্যকেই আরও ঋদ্ধ করে। ফলে মাসরুর আরেফিনকে বাংলাভাষার পাঠকেরা ধন্যবাদ জানাতেই পারে তাঁর এই দারুণ কাজের স্বীকৃতি স্বরুপ।

মাসরুর আরেফিন একাধারে কবি,কথাসাহিত্যিক এবং অনুবাদক। তিনি এই তিন ভূমিকাতেই যথেষ্ট সক্রিয়তা বজায় রেখেছেন। তিনি অনুবাদ করতে যেমন ভালোবাসেন, তেমনি ভালোবাসেন কবিতা লিখতে, এবং মৌলিক রচনা লিখতেও তিনি সিদ্ধহস্ত।

মাসরুর আরেফিনের লেখার সাথে পরিচয় হয় কাফকার গল্পের অনুবাদ দিয়েই । মাঝে মাঝে খটমটে আবহাওয়ার অনুবাদ মনে হলেও পাঠ পর্যালোচনা আর টীকা-ভাষ্যগুলো ছিল অসাধারণ । পড়ে একজন ঋগ্ধ এবং একনিষ্ঠ পাঠকের পরিচয় পেয়েছিলাম । কাফকার প্রতি লেখকের যে আবেগ তা আমকেও ছুঁয়ে গিয়েছিল । মূলত প্রথমদিকের অনুবাদ বলেই হয়তো এটি হয়েছে যা তিনি তার পরবর্তী কাজগুলোতে পুষিয়ে নিয়েছেন।

বাক্যের সৌন্দর্য,সাবলিলতা,নির্ভুলতা এবং বিশ্বস্ততার প্রশ্নে তিনি পাঠককে চমৎকৃত করতে পেরেছেন। নিখুত ভাবে কিছুই বর্জন করছেন না আবার মনগড়া কিছুও জুড়ে দেন নি। তিনি অনুবাদের সুবিধার্থে গ্রীক ভাষা অব্দি শিখেছেন বলে এক আলোচনায় জানিয়েছিলেন। পাশাপাশি ইংরেজী অনুবাদের সব থেকে সেরাটা বেছে নিয়েছেন। অনুবাদের ক্ষেত্রে বর্ণনা কৌশল,ভাষার পরিমিতি,বাচনভঙ্গি সব মিলিয়ে মাসরুর আরেফিন তা বেশ ভালোভাবেই বাংলা ভাষায় উপহার দিয়েছেন। প্রকৃত অর্থে মাসরুর আরেফিনের এই অনুবাদগুলির আগে যে সব অনুবাদ আমরা দেখি তার সাথে তুলনামূলক পর্যালোচনা করতে গেলে মাসরুর আরেফিনের অনুবাদ সাবলিল এবং প্রাঞ্জল যা পাঠকের হৃদয়গ্রাহী হবে এতে কোন সন্দেহ নেই।পরিশেষে একজন সাধারণ পাঠক হিসেবে অনুবাদক মাসরুর আরেফিনকে মূল্যায়ণ করতে গেলে নির্দ্বিধায় বলা যায় অনুবাদক হিসেবে তিনি তার সেরাটাই ঢেলে দিয়েছেন এবং তিনি এ ক্ষেত্রে পুর্ববর্তী অনেক অনুবাদকের চেয়ে অপেক্ষাকৃত বেশি সফল হয়েছেন।আমরা পাঠক মাত্রই আশা করি তাঁর হাত ধরে বিশ্ব সাহিত্যের আরও গুরুত্বপুর্ন অনেক লেখা বাংলায় অনুদিত হবে।

— জাজাফী

17 আগষ্ট 2020

কি আমার পরিচয়

কে আমি এ কথা জানতে চেওনা,কি আমার পরিচয়

বেঁচে আছি নাকি মরে গেছি তাও নিদারুন সংশয়।

আমি গুলিতে নিহত মেজর সিনহা, নিরব নিথর দেহ,

আমি ছোপ ছোপ দাগে রক্তে ভেজা পরিচয়হীন কেহ ।

আমি লাশ হয়ে যাওয়া বুয়েটের ছেলে আবরারের চিৎকার,

আমি ব্যথিতের মনে জমে থাকা কিছু থু থু আর ধিক্কার।

আমি নুসরাত,তনু, সায়মা,নাদিয়া ব্যথিতের নিঃশ্বাস,

আমি সন্তান হারা কতশত মার‌ হাহাকার হাহুতাশ।

আমি পিলখানাতে অসহায় কারো মৃত্যুর একাকী সঙ্গী,

আমি ধর্ষিতা নারীর বেঁচে থাকার এক নিদারুন কোন ভঙ্গি।

আমি বাবার সামনে গাড়ি চাপা পড়া হতভাগা সন্তান,

আমি লাখো শিশুদের বলিদান আর হারানো সে সম্মান ।

আমি কুমারি গর্ভে বেড়ে ওঠা শিশু লজ্জায় মাথা নত

আমি তাজরীনে সেদিন অগ্নিকাণ্ডে শ্রমিক হৃদয়ে ক্ষত ।

আমি‌ চকবাজারে মৃত মার কোলে নিষ্পাপ শিশু প্রান,

আমি অপরিকল্পিত‌ ভবনের নিচে মৃত শরীরের ঘ্রান।

আমি সাগর, রুনির কলমে জমা দীর্ঘ কালের শ্বাস,

আমি বনানীতে জ্বলে পুড়ে যাওয়া কোন পরিচয়হীন লাশ।

আমি বিশ্বজিৎ আর রাজন রিফাতের শরীরের তাজা রক্ত,

রেল লাইনের পাশে পড়ে থেকে হয়ে গেছে যেটা শক্ত।

আমি কাঁটাতারে ঝুলা গুলিবিদ্ধ ফেলানীর মৃত লাশ

প্রিয়তমা নামে ছলনা কারির ফাঁদে পড়া হাহুতাশ।

আমি এমনি হাজারো নামহীন কিছু খবরের শিরোনাম,

আমি গুম হয়ে যাওয়া শত মানুষের শেষ হওয়া ইহধাম।

আমি বাবার হাতে খুন হয়ে গাছে ঝুলন্ত তুহিনের আর্তনাদ,

আমি অপ্রকাশিত শত মানুষের লুকানো প্রতিবাদ।

একটা মানুষ কতবার মরে জানা আছে নাকি কারো?

কোন মরনের বিচারই বা তোমরা কতটা করতে পারো?