Home Blog Page 7

পিতার দায়

৯ মে ২০২১

বারান্দার এক কোণায় পাটি পেতে বাহলুল সাহেব আর তার স্ত্রী তাদের ছোট ছেলেকে নিয়ে বসেছেন ইফতার সামনে নিয়ে। পবিত্র মাহে রমজান শেষ হতে চললো। গত বছর এই সময়ে ইফতারির সময় পরিবারে পাঁচজন সদস্য ছিলো। দু মাস হলো বড় মেয়েটাকে বিয়ে দিয়েছেন। দুই ছেলে আর এক মেয়েকে নিয়ে তার ছোট্ট সংসার। বড় ছেলেটা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে ওর নাম আহনাফ আর ছোট ছেলেটা প্রাইমারি স্কুলে। এবার ক্লাস ফোরে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছেলেটা দুপুরে বেরিয়ে গেছে বন্ধুদের সাথে ইফতার করবে বলে। ছোট ছেলেটা ইফতারির প্লেটটা সামনে নিয়ে উসখুস করছিলো।

বাহলুল সাহেব বুঝতে পারছিলেন ছেলের এই উসখুসের কারণ। ইফতারি তার পছন্দ হয়নি। প্লেটের এক কোণায় একমুঠো ছোলা মুড়ি আর দুটো খেজুর। গ্লাসে লেবুর শরবত। যেখানে চিনির বদলে গুড় দেওয়া হয়েছে। সারা দিন রোজা রেখে এই ইফতারি খাবে তা ছেলেটা কল্পনাই করতে পারে না।ছোট মানুষ তাই মনটা সহসাই খারাপ হয়। এর অবশ্য কারণও আছে। সে দেখেছে বাবা সকালেই এক গাদা বাজার করে এনেছে। সেখানে আম ছিলো, আনারস ছিলো,তরমুজ ছিলো, খেজুর ছিলো,আপেল এবং কমলাও ছিলো। আর এখন কিনা ইফতারির সময় সেসবের কিছুই তাকে দেওয়া হয়নি।মসজিদের মিনার থেকে মাগরিবের আজানের ধ্বনি চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো। বাহলুল হাসেব প্লেট থেকে একটি খেজুর তুলে নিয়ে মুখে দিয়ে ইফতার শুরু করলেন। খেজুর খাওয়া শেষ হলে গ্লাস থেকে লেবুর শরবত পান করলেন।তিনি দেখলেন তার ছোট ছেলে আরহাম তখনো প্লেটে রাখা খেজুর দুটোকে এপাশ ওপাশ করছে।

বাহলুল সাহেব পেশায় স্কুল শিক্ষক। তার কোন ছাত্র কখনো বলতে পারবে না তিনি তাদের কাউকে বকা দিয়েছেন বা মেরেছেন। খুব্ই শান্ত স্বভাবের মানুষ। নরম দিল। পরিবারেও তিনি একই রকম। ছেলের এই অবস্থা দেখে তিনি বললেন আরহাম তুমি হয়তো ভাবছো সকালে যে এতো পদের ইফতার কিনলাম সেগুলো তোমাকে না দিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে আমরা খাবো আসলে কিন্ত তা নয়। সেগুলো তোমার বোনের শ্বশুরবাড়িতে পাঠিয়েছে। তুমিতো ছোট মানুষ তাই বুঝতে পারছো না। মেয়ে বিয়ে দিয়েছি এবারই প্রথম রমজান তাই অন্তত একদিন যদি ওর শ্বশুর বাড়িতে ইফতার না পাঠাই তাহলে তোমার বোনের কি সম্মান থাকবে বলো? চিন্তা করো না কয়েকদিন পর যখন ঈদের আগে বেতন পাবো তখন তোমার জন্য আবার ভালো ভালো আইটেম কিনে আনবো। তখন আমরা তিনজন একসাথে মিলে খাবো। বাবার কথায় ছোট্ট আরহামের মনটা শান্ত হলো। সে কপট অভিমানে বাবাকে বললো মনে থাকে যেন বাবা। সামান্য দুই আইটেমের ইফতার শেষ হতে তাদের খুব একটা সময় লাগলো না। বাড়ির কাছেই মসজিদ। ইফতার শেষ হতেই বাহলুল সাহেব মসজিদে চলে গেলেন। গিয়ে দেখলেন তখনো কোন কোন মুসল্লি ইফতার করছে। তাদের প্লেটের দিকে তাকালেই বুঝা যায় প্লেটে এখনো যা আছে তা বাহলুল সাহেবের ইফতারের শুরুর অংশের চেয়েও বেশি।তিনি সেসবের ভ্রুক্ষেপ না করে সামনের কাতারে গিয়ে বসলেন।

দক্ষিণ দিকে বসে ইফতার করছিলেন গোলাম রাব্বানী। তিনি বাহলুল সাহেবকে বললেন বাহলুল ভাই এতো দ্রুত মসজিদে চলে এসেছেন যে! ইফতারি করেছেন নাকি  করার সময় পান নি। আসেন আমার সাথে ইফতার করেন। বাহলুল সাহেব মুখে যথাসম্ভব হাসি টেনে বললেন নাহ ভাই ইফতার করেই এসেছি। ইফতারিতে আমি আসলে খুব বেশি খেতে পারিনা তাহলে নামাজের পর এই রাতে আর খাওয়া হয় না। কথাটা তিনি অবশ্য মিথ্যাও বলেন নি। সত্যি সত্যিই ইফতারিতে বেশি আইটেম খেলে তখন এই রাতে আর তিনি ভাত খেতে পারেন না।

ইফতার শেষে গ্রামের বিভিন্ন বাড়ি থেকে মুসল্লিরা দলে দলে মসজিদে এসে জমায়েত হলে নির্দিষ্ট সময়ে জামাত শুরু হলো। নামাজের মাঝেই বাহলুল সাহেবের মোবাইল দুবার বেজে উঠলো। সাইলেন্ট মুডে ছিলো বলে অন্য মুসল্লিদের অসুবিধা হয়নি। নামাজ শেষ হলে মসজিদ থেকে বেরিয়ে মোবাইলটা হাতে নিলেন। দেখলেন বড় মেয়ে ফোন করেছে। যেহেতু তিনি ধরতে পারেন নি তাই মিসড কল হিসেবে উঠে আছে। বাহলুল সাহেব মোবাইলের ব্যালেন্স চেক করলেন। দেখলেন পচিশ টাকা আছে। তিনি মেয়েকে ফোন করলেন। ওপাশ থেকে মেয়ে রুবানা ফোন ধরে বললো বাবা কেমন আছো? ফোন দিয়েছিলাম ধরলে না যে! বাহলুল সাহেব বললেন নামাজে ছিলামরে মা এই জন্য ধরতে পারিনি। মাত্র নামাজ শেষ করে ফোন হাতে নিয়ে দেখলাম তুই ফোন করেছিলি তাই এখন ব্যাক করলাম। তোরা কেমন আছিস? বাবার কথায় রুবানার কন্ঠস্বর বদলে গেলো। বললো এই আছি মোটামুটি! মেয়ের কথা শুনে বাহলুল সাহেব জানতে চাইলেন এভাবে বলছিস কেনরে মা? জামাই,শ্বশুর শাশুড়ী সবাই ভালো আছে তো? আমরা যে ইফতার পাঠিয়েছিলাম  সেলিমের মাধ্যমে সেগুলো কি তোর শ্বশুর শাশুড়ির পছন্দ হয়নি? কিছু বলেছে তারা?

বাবার কথা শুনে রুবানা বললো বাবা শ্বশুর শাশুড়ি তেমন কিছু বলেনি তবে ফুফু শ্বাশুড়ি বলেছে ইফতারি একটু কম হয়ে গেছে! বাহলুল সাহেব মোবাইলে কথা বলতে বলতে পশ্চিম দিকে ফাকা মাঠের রাস্তার দিকে এগিয়ে গেলেন। তিনি মেয়েকে বললেন মারে সাধ্যমত চেষ্টা করেছি ইফতার পাঠাতে। ১৫ হাজার টাকার ইফতার পাঠিয়েছি। যাই হোক চিন্তা করিসনা বলবি বাবার শরীর খারাপ ছিলো তাই তেমন কিছু করতে পারেনি আগামী বার আরও বেশি করে পাঠাবে। বাবার কথা শুনে রুবানা বললো ঠিক আছে বাবা মনে থাকে যেন। আগামী বার কম পাঠালে আমার আর মান সম্মান কিছু থাকবে না। রুবানা দেখতে পায়নি মোবাইলের এ প্রান্তে বাহলুল সাহেবের চোখে পানি টলমল করছে। রুবানা একবারও জানতে চাইলো না বাবা তুমি যে বললে তোমার শরীর খারাপ কি হয়েছে তোমার? সে বরং তার শ্বশুরবাড়ির বিষয় নিয়েই বেশি উৎসাহী। বাহলুল সাহেব বললেন মারে অনেক ক্ষণ কথা হলো এবার রাখি? রুবানা বললো বাবা শোনো আরও কথা আছে!

বাহলুল সাহেব বললেন বল মা কি কথা বলবি। রুবানা বললো বাবা ঈদতো চলেই আসলো। তুমি তোমার জামাই এবং তার বাড়ির লোকদের জন্য ঈদের কাপড় দিবা না? নতুন নতুন এগুলো না দিলে কেমন লাগবে বলো? বাহলুল সাহেব কি আর বলবেন তিনি মেয়েকে বললেন হ্যারে মা কেন দেবো না অবশ্যই দেবো। রুবানা বললো কিন্তু বাবা বাড়ির লোকেরা বলছিলো তুমি যে কাপড় কিনবা তা অনেক সময় মাপ মত নাও হতে পারে আবার কালারও পছন্দ নাও হতে পারে। তার চেয়ে তুমি যদি টাকা দিয়ে দাও তাহলে ওরা সবাই কিনে নিতে পারবে। ওরা বলেছে ২৫ হাজার টাকা হলেই মোটামুটি হয়ে যাবে। তুমি বরং দু একদিনের মধ্যেই আহনাফকে দিয়ে টাকাটা পাঠিয়ে দিও। আর আহনাফ আসতে না পারলে বিকাশেও দিতে পারো। অবশ্য বিকাশে দিলে তুমি কিন্তু অবশ্যই খরচ সহ পাঠাবা। না হলে কিন্তু আবার বাজেটে কম পড়ে যাবে ক্যাশ আউট করতে গেলে। বাহলুল সাহেব নিজেকে শান্ত করে কোন মতে মেয়েকে বললেন ঠিক আছে চিন্তা করিস না। এই বলে তিনি ফোন রেখে দিলেন। অবশ্য ফোন রেখে না দিলেও এমনিতেই লাইন কেটে যেতো। ব্যালেন্স ছিলো পচিশ টাকা। তা দিয়ে তো আর ঘন্টা পার করা যায় না।

মেয়ের সাথে কথা বলা শেষ করে তিনি চোখ মুছে রাস্তার পাশেই বসে পড়লেন।সামান্য এক স্কুল মাস্টার তিনি। বেতন সর্বসাকুল্যে ১৮ হাজার টাকা। ছেলে মেয়েরা যখন ছোট ছিলো তখন সংসারের খরচ কিছুটা কম ছিলো। তাছাড়া তার স্ত্রী টুকটাক সেলাইয়ের  কাজ করেও কিছু টাকা আয় করতেন সেসব জমিয়ে তিন লাখ টাকা হয়েছিল। তার পুরোটাই মেয়ের বিয়েতে খরচ হয়ে গেছে। উপরন্তু আরও কিছু টাকা ধার দেনা করতে হয়েছে। বড় ছেলে আহনাফকে প্রতি মাসে থাকা খাওয়া বাবদ ৬ হাজার টাকা দিতে হয়। আহনাফ দুটো টিউশনি করে বাকিটা সামলে নেয় কিন্তু সমস্যা হয় যখন সেমিস্টার ফি দেওয়ার  সময় আসে। হাতে যে টাকা ছিলো তা দিয়ে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে ইফতার কিনে পাঠিয়েছে। বেতন পেতে এখনো কয়েকদিন বাকি। বোনাসও পাবে সামান্য। বেতন আর বোনাস মিলিয়ে হয়তো মোট টাকা পাবে ২৫ হাজার টাকা। অথচ রুবানা বলেছে তার শ্বশুরবাড়ির লোকদের কাপড় কিনতে লাগবে ২৫ হাজার টাকা। পুরোটা দিয়ে দিলে সংসার চলবে কি করে? বাড়িতে আরওতো চারজন মানুষ আছে।তিনি আর কিছু ভাবতে পারেন না! যে করেই হোক মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে টাকা পাঠাতেই হবে। না হলে রুবানার মানসম্মান থাকবে না। তিনি ভাবতে থাকেন কার কাছ থেকে টাকা ধার নেওয়া যেতে পারে! ধার নেওয়া কোন সমস্যা না কারণ তাকে সবাই খুব ভক্তি শ্রদ্ধা করে। যে কারো কাছে চাইলেই ধার পাবে কিন্তু সেটা শোধ করাটাই যত সমস্যা। তিনি ভাবতে ভাবতে বাড়ির  পথে হাটতে শুরু করলেন। অন্ধকার হয়ে গেছে। আকাশে তখন মস্ত বড় চাঁদ তার সাথে সাথে হাটছে। বাহলুল সাহেব ভাবছেন তার মেয়েটা বদলে গেছে! তার অসুস্থ্যতার কথা শুনেও একবার জানতে চায়নি কি হয়েছে বাবা তোমার? ডাক্তার দেখাওনি?

বাহলুল সাাহেব আর ভাবতে পারেন না। বেশি  ভাবলেই মনটা উথাল পাথাল করে ওঠে। এদিকে তারাবিহ নামাজের সময় হয়ে আসছে। তিনি দ্রুত পায়ে বাড়ির দিকে হাটতে শুরু করলেন। বাড়ি পৌছার পর স্ত্রী জানতে চাইলেন নামাজ পড়ে ফিরতে এতো দেরি হলো যে! বাহলুল সাহেব আসল কথা গোপন করে বললেন একটু হাটতে বেরিয়েছিলাম। তার  স্ত্রী তখন বললো তোমাকে আহনাফ বার বার খুজছিলো। কি যেন বলবে।তিনি ওজু করে ঘরে ঢুকলেন। বিছানার উপর বসলেন। কিছুক্ষণ পর ঘরে ঢুকলো আহনাফ। বললো বাবা এসেছ? বাহলুল সাহেব তাকে কাছে ডাকলেন। বললেন তুই কি আমাকে কিছু বলবি? আহনাফ বাবার পাশে গিয়ে বসলো তার পর বললো বাবা ঈদের পর পরইতো আামার সেমিস্টার ফাইনাল। সব কিছু মিলিয়ে ৩০ হাজার টাকা মত লাগবে। গত দুই মাসে টিউশনী থেকে যে টাকা পেয়েছিলাম তা থেকে খরচ করার পর দশ হাজার টাকা মত জমাতে পেরেছি। বাকি ২০ হাজার টাকা হলেই হবে। বাহলুল সাহেব বললেন চিন্তা করিসনা দেখছি কি করা যায়। তুমি খাবার খেয়ে শুয়ে পড়। আহনাফ বললো বাবা শুধু দেখি বললে কিন্তু হবে না। দেরি হলে কিন্তু এক্সাম দিতে পারবো না! তখন একটা সেমিস্টার পিছনে পড়ে যাবো। বাহলুল সাহেব ছেলেকে কি বলবেন তা বুঝে উঠতে পারলেন না। তিনি শুধু বললেন চিন্তা করিস না টাকার জোগাড় হয়ে যাবে।

বাবার সাথে কথা শেষ হলে আহনাফ বেরিয়ে গেলো। আরহামকে কোথাও দেখা যাচ্ছে না দেখে বাহলুল সাহেব স্ত্রীর কাছে জানতে চাইলেন আরহাম কোথায়? তিনি বললেন রান্না ঘরে আমার পাশে বসে আছে। বাহলুল সাহেব ছোট ছেলেকে ডাক দিলেন। বাবার ডাকে  আরহাম ঘরে গিয়ে বাবার পাশে বসলো। বাহলুল সাহেব জানতে চাইলেন তোমার কি এখনো মন খারাপ? ঈদতো চলেই আসছে তুমি ঈদে কী কী কিনতে চাও? আরহাম বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ তার পর বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললো বাবা ঈদে আমার কিচ্ছু চাই না। গত বার যা কিনেছিলাম সবতো নতুনই আছে। ওগুলোতেই চলবে। বাহলুল সাহেবের চোখে আবার পানি চলে আসলো। তিনি বুঝতে পারলেন ইফতারের পর আরহামকে ওর মা খুব সুন্দর করে সব বুঝিয়েছে তাই সে ছোট হলেও বুঝতে পারছে।

তারাবিহ নামাজ শেষ করে রাতের খাবার খেয়ে বাহলুল সাহেব যখন বিছানায় গেলেন তখন নানা চিন্তায় তার চোখে আর ঘুম আসলো না। তিনি ভাবতে লাগলেন কদিন বাদেই মৌসুমি ফলের সময়। মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে নানা পড়ের ফল পাঠাতে হবে। কম পাঠালে মেয়ের সম্মান থাকবে না। এদিকে আবার দুমাস পর কোরবানির ঈদ। তখন হয়তো কোরবানীর জন্য একটা গরুও পাঠাতে হতে পারে। গরুর যে দাম তাতে ৫০ হাজার টাকার কমতো কোন ভাবেই কেনা সম্ভব না। এরচেয়ে কমে কেনা গরু পাঠালে মেয়ের মান সম্মান থাকবে না। তিনি বেঁচে থাকতে মেয়ের অসম্মান হোক তা হতে দিতে পারেন না। সব কিছুর জন্য চাই টাকা। কিন্তু তারতো সীমিত আয়। এ দিয়ে তিনি কি করবেন। বিছানায় এপাশ ওপাশ করে সারাটা রাত পার করে দিলেন। সেহরি খেয়ে ফজরের নামাজ পড়ে তিনি যখন ঘুমাতে গেলেন তখন ক্লান্তিতে দুচোখে ঘুম নেমে আসলো। ঘুমের মধ্যে কত রকম স্বপ্ন দেখলেন।

ঘুম থেকে যখন উঠলেন তখন বেলা সাড়ে নয়টা। তিনি হাত মুখ ধুয়ে খাতা কলম নিয়ে বসলেন হিসেব করতে। দেখতে চেষ্টা করলেন কোরবানীর ঈদ পযর্ন্ত তার কতটাকা দরকার। হিসেব করে যে পরিমান পেলেন তা ধার করা সম্ভব নয়। শেষে সিদ্ধান্ত নিলেন পশ্চিম মাঠে যে ধানের জমি আছে সেটা বিক্রি করে দিবেন নয়তো বন্দকি রাখবেন। অবশ্য বিক্রি করার চেয়ে বন্দকি রাখলে পরে সেটা টাকা দিয়ে ছাড়িয়ে নেওয়া যাবে। এর পরই তিনি বেরিয়ে পড়লেন বিভিন্ন জনের সাথে জমি বন্দকির বিষয়ে আলোচনা করতে। নিজেদের গ্রামে আলোচনা না করে পাশের গ্রামের পরিচিত কয়েকজনের সাথে কথা বললেন। পরে আবু সালেহ মাতব্বর সাড়ে তিন লাখ টাকা দিয়ে জমিটি বন্দকি নিলেন। বাহলুল সাহেব টাকা গুলো নিয়ে ব্যাংকে জমা রাখলেন।যখন যার জন্য যতটুকু দরকার তা তুলে খরচ করবেন। টাকা হাতে পাওয়ার পর আহনাফকে দিয়ে একটি খামে করে মেয়ের বাড়িতে টাকা পাঠালেন। ঈদের পর আহনাফ যখন ঢাকায় ফিরলো তখন তার সেমিস্টার ফির টাকাটাও দিয়ে দিলেন। বড় মেয়ে রুবানা টাকা পেয়ে যেমন খুশি হয়েছিল তেমনি আহনাফও খুশি। তারা অবশ্য দুজনের কেউ জানতে চেষ্টা করেনি বাবা কি করে এতোগুলো টাকা জোগাড় করলেন। আর বাহলুল সাহেব ভাবলেন যা কিছু করেছি সবতো ছেলে মেয়ের জন্যই। এই জমিজমা সবতো ছেলে মেয়ের জন্যই। ওদের জন্য খরচ না করলে কার জন্য রেখে দেবো।

ফসল তোলার সময় সেবার অর্ধেক ফসল বাড়িতে আসলে বাহলুল সাহেবের স্ত্রী জানতে চাইলেন ফসল অর্ধেক এসেছে কেন? তিনি তখন ঘুরিয়ে বললেন এবার জমি নিজে চাষ করতে পারিনি,বর্গা দিয়েছিলাম  তাই অর্ধেক এসেছে।তিনি চিন্তা করতে লাগলেন এবারতো অর্ধেক এসেছে পরের বার যখন একটুও আসবে না তখন কী জবাব দিবেন? মনে মনে ঠিক করে রাখলেন তখন বলবেন ফসল বাড়িতে আনার ঝামেলা তাই বর্গা চাষীকে বলেছি বিক্রি করে টাকা দিতে সেই টাকা দিয়ে চাল ডাল কিনে খাবো। আবার ভাবলেন যা সত্যি তাই না হয় স্ত্রীকে বলে দেই। পরিবারের দুঃখ ব্যথা দুজনে শেয়ার করেই চলা উচিৎ। একরাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে তিনি স্ত্রীকে পিতা হিসেবে তার দায় নিয়ে সব খুলে বললেন। কিন্তু তিনি বুঝতে পারেন নি যে তার কোন কথাই তার স্ত্রী শুনতে পায়নি। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে বিছানায় শোয়ার সাথে সাথে তার দুচোখে রাজ্যের ঘুম নেমে এসেছিল। ( পরিমার্জন করতে হবে)

গ্রামের স্মৃতি

ছোটবেলার কথা মনে পড়লো। বাবাকে দেখতাম হাট থেকে ইলিশ মাছের ভাগ কিনে আনতেন। বাবার সাথে হাটে গিয়ে দেখেছি একটি বড় ইলিশ কেটে টুকরা গুলো কয়েক ভাগ করা হতো। তার পর প্রতি ভাগের দাম সমান রাখা হত। যার যে ভাগ পছন্দ সে নিয়ে নিতো। এখনকার মত যদিও তখন ইলিশের দাম এতো টাকা ছিলো না কিন্তু তখন মানুষের আয়ও সীমিত ছিলো। অধিকাংশ পরিবার একটি আস্ত ইলিশ কেনার ক্ষমতা রাখতো না তাই তারা ভাগে ইলিশ কিনতো। পরিবারের সবাই হয়তো ইলিশের পেটি খেতে চায় কিন্তু ভাগে কেনার দরুন এতোগুলো পেটি জুটতো না। ফলে একবারের ইলিশের পেটি যারা খেতো পারের বার ইলিশ আনলে তাদের আর পেটি খাওয়া হতো না। পেটির বিপরীত অংশকে বলা হতো গাদার মাছ। মানে ইলিশের বডিকে দুটো অংশে ভাগ করে পেটের অংশকে পেটি আর পিঠের অংশকে গাদা বলে খুলনা অঞ্চলের কিছু কিছু এলাকায়।

ইলিশের মাথা এবং লেজে প্রচুর কাটা থাকে। এবং ইলিশের কাটা খুব একটা সহজ কাটা নয়। ফলে দেখতাম অনেকেই লেজ এবং মাথা খেতে চাইতো না। তখন যেহেতু মাছ ভাগে কেনা হতো তাই মাথাটাও অন্তত দুই ভাগ হয়ে যেত। আমি ছোট বেলা থেকে লেজ এবং মাথা দুটোই সময়ে সময়ে ভাগে পেতাম। পেটি এবং গাদাও ভাগে পেতাম। তবে লেজ এবং মাথা খেতে খেতে এক সময় মাছের কাটা শুদ্ধ খাওয়া শুরু করলাম। অভ্যাস হয়ে যাওয়ার পর আজ অব্দি ছোট,বড়,মাঝারি কোন মাছের কোন কাটাই আর ফেলা হয় না। সবটাই খেয়ে ফেলি। অনেকেই বলে মাছের কাটা খাওয়া ভালো আবার অনেকে বলে খারাপ। আমি ওসব কখনো ভেবে দেখিনি।

এখনতো পানির অভাব। আমি যখন ছোট ছিলাম (ব্রিটিশ আমলের কাছাকাছি সময়ে!!!) তখন মাঠে ঘাটে পানি থৈ থৈ করতো। উঠোন পেরোলেই পানি আর পানি। আমাদের বাড়ির পুর্ব পার্শ্বে যে বড় মাঠ আছে সেখানে ধান চাষ হয়। পাশাপাশি মৌসুম অনুযায়ি পাটও চাষ হয়। আমি দেখেছি সেই সব ধানের জমিতে পুটি,বেলে,ট্যাংরা,কই সহ নানা পদের দেশী মাছ পাওয়া যেতো। অনেকেই মাছ ধরতো বিভিন্ন ধরনের জাল পেতে। আমার বাবাও মাছ ধরতেন আমি সাথে থাকতাম। বড়শি দিয়েও মাঝে মাঝে মাছ ধরেছি তবে আমার বড়শিতে খুব কমই মাছ উঠতো। আমাদের গ্রামে কোন নদী নেই। গ্রামের খুব কাছেও কোন নদী নেই। তবে গ্রামের পাশ দিয়ে একটি খাল আছে। সেই খালেও প্রচুর মাছ হতো। বাবাকে দেখতাম সেই খালে খ্যাপলা জাল দিয়ে মাছ মারতে। অনেকে হয়তো খ্যাপলা জাল জিনিসটা কি সেটাই জানে না। বাবা নিজ হাতে জাল বুনতেন। আামার বাবা এতো কিছু পারতেন যে আমি বাবাকে দেখে তখন মুগ্ধ না হলেও এখন মুগ্ধ হই আর ভাবি আমার বাবা কত্ত কিছু পারেন।

মাছ ধরার সময় বাবার পাশে পাশে থাকতাম এবং মাছগুলো খালোই নামে বাশের কঞ্চি সরু করে কেটে তৈরি একটি পাতিলে রাখতাম।বাবা জাল নিজে বুনতেন এবং আমাদের একটি পুরোনো ভিটে বাড়ি ছিলো যেখানে আমার দাদার বাবারা বাস করতেন সেখানে অনেক গাব গাছ ছিলো। বাবা সেই গাব গাছ থেকে গাব ছিড়ে এনে কুচি কুচি করে একটি চাড়িতে রাখতেন। চাড়ি হলো মাটি দিয়ে তৈরি বড় রকম একটি পাতিল যেটায় সাধারণত ধান সিদ্ধ করার জন্য ধান ভিজিয়ে রাখা হতো। এখনকার দিনে যারা গরুর খামারে গিয়েছে তারা দেখবে গরুকে খাবার খেতে দেওয়ার জন্য এক ধরনের পাতিল বানানো হয় ইট সিমেন্ট দিয়ে ঠিক সেরকম। আরও সহজে বলতে গেলে অনেকটা বেসিনের সিংকের মত তবে সেটা রাউন্ড হতো। সেটাতে গাব গুলো কুচি কুচি করে কেটে তাতে পানি দিয়ে তার মাঝে জাল ভিজিয়ে কিছুক্ষণ পর উঠিয়ে রোদে শুকাতে দেওয়া হতো। এতে করে জালের সুতা গুলো মজবুত হতো।

আমাদের বাড়িতে যে সব কাঠের দরজা,জানালা,পালংক,চেয়ার,টেবিল আছে তার সবই বাবার নিজ হাতে বানানো। তখনতো এতো আধুনিক প্রযুক্তি ছিলো না। হাতে বাটাল দিয়ে হাতুড়ি পিটা করে নকশা করা হতো। নিজেরাই একরকম রোলার তৈরি করে তার দুই ধারে কাঠ পেরেকে ঢুকিয়ে রশি বেধে সামনে পিছনে করলে সেটা ঘুরতো আর সেখানে বাটাল( এক ধরনের কাঠ মিস্ত্রীদের অস্ত্র) ধরে ডিজাইন করা হতো। আমি সেই রশি ধরে টানার কাজ করতাম। সেই সময়ে বাবা আমাকে একটা মোবাইল কিনে দিয়েছিলেন। তাতে ভিজিএ ক্যামেরা ছিলো। সেটা দিয়ে ভিডিও করতাম সেই সব দৃশ্য।

আমার বাবা খুব ভালো ঘুড়ি বানাতে পারেন। আমাদের গ্রামে ঘুড়িকে চিলে বলা হয়। কত রকম ঘুড়ি যে হতো আজ সেসবের নামও ভুলে গেছি। এখনো দুই চার গ্রামের বাচ্চারা,কিশোর কিশোরীরা বাবার কাছে আব্দার নিয়ে আসে ঘুড়ি বানিয়ে দেওয়ার। বাবা সেটা আনন্দের সাথে তৈরি করে দেন। হরেক রকম ঘুড়ি। তবে এখন এই আধুনিক কালে দেখি সেই সব ঘুড়ি আর চলে না। আমাদের গ্রামে কয়েকজনের বাড়িতে এক ধরনের গাছ ছিলো যার ফল পাকলেই ফলের মধ্যে আঠা হতো। সেই গাছের নাম বলা গাছ। আমাদের অঞ্চলে বলা গাছই বলা হতো। ফলগুলো ছোট ছোট বলের মত কিংবা অনেকটা আঙ্গুরের মত। সেটার মধ্যে প্রাকৃতিক আঠা হতো। আরেকটা গাছ আছে যার নাম কচা গাছ। এই গাছের ডালের জয়েন্টের অংশ থেকে আঠা বের হতো।আজকে আমার এই লেখা যারা পড়ছে তাদের অনেকে হয়তো এই সব কিছুর অনেক কিছু জীবনে কোন দিন দেখেনি এমনকি শোনেও নি। তাদের জন্য যতটা সম্ভব ছবি দিতে চেষ্টা করছি।

আমি যখন ছোট ছিলাম তখন কোন দিন বৈশাখী মেলা দেখিনি। অন্যান্য মেলা দেখেছি বিশেষ করে ঘোড় দৌড় মেলা, লাঠি খেলার মেলা, নৌকা বাইচ মেলা।সবচেয়ে ভালো লাগতো নৌকা বাইচ। এক একটা নৌকা অনেক লম্বা। সেগুলোর কোন কোনটিতে ৫০ জন মানুষ চড়তো এবং বৈঠা ধরতো। সে এক অপুর্ব দৃশ্য। তবে অবাক হতাম ঘোড় দৌড়ের মেলা দেখে। ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চারা ঘোড়ার পিঠে চড়ে এতো দ্রুত ঘোড়া ছুটাতো যে ভয়ে পিলে চমকে উঠতো। তখনতো ইতিহাসের বীর ঘোড় সওয়ারিদের নামও শুনিনি। এখন কেবলই মনে হয় গ্রামের মেলায় দশ বছরের ছোট্ট ছেলেটি যে গতিতে ঘোড়া ছুটাতো তা দেখলে মহাবীর আলেকজান্ডারও অবাক হতেন। সাধারণত মেলায় গিয়ে আমি মিষ্টি খেতাম,ভিউ কার্ড কিনতাম, নাগরদোলায় চড়তাম,আর এক পাতার ক্যালেন্ডার কিনতাম যেখানে তাজমহল সহ কত কিছুর ছবি থাকতো। তখনতো বুঝতাম না যে তাজমহল আসলে কী।

লেখাটা শুরু করেছিলাম মাছ নিয়ে কিন্তু লেখাটা হুট করে কোথা থেকে মোড় নিয়ে কোথায় চলে আসলো। যারা কোন দিন গ্রামে যায়নি কিংবা যাদের জন্ম শহরে তারা অনেক কিছুই হয়তো কোনদিন শোনেও নি। এখনতো দিন যাচ্ছে আর গ্রামও শহর হয়ে যাচ্ছে। গ্রাম শহর হওয়া মোটেও ভালো কথা নয়।

আমার বেশ মনে আছে আমি যখন নানা বাড়িতে যেতাম কোন উপলক্ষ্য নিয়ে তখন নানা বাড়ির বাইরের অংশ যেটাকে ওই এলাকায় খোলেন বলে যা একটা দ্বিতীয় উঠান হিসেবে পরিচিত সেখানে পাটি বিছিয়ে খোলা আকাশের নিচে গরম কালে একসাথে দশ পনের জন ঘুমাতাম। অনেক গল্প হতো, আকাশে জ্বলজ্বল করতে থাকা চাঁদ দেখতাম, তারা দেখতাম। ঈদ বা মেলা উপলক্ষ্যে বড়রা তখন আমাদের হরিণের ছবিওয়ালা এক টাকার নোট দিতেন অথবা দোয়েলের ছবিওয়ালা দুইটাকার নতুন নোট দিতেন। তাতেই আমরা অনেক খুশি হয়ে যেতাম।

এখন যখন গ্রামে যাই তখন গ্রামেও ওয়াইফাই কানেকশন পাই! ডিশ লাইন পাই, এবং অন্যান্য সব সুযোগ সুবিধা পাই কিন্তু আগেকার সেই আনন্দ আর পাইনা। তখন আমরা দাড়িয়া বান্ধা,গোল্লাছুট,সাত চাড়া আরও কত রকম খেলা খেলতাম সেগুলোর নামও ভুলে গেছি। এখনো যে গ্রামে ছোটরা নেই তা নয় কিন্তু সেই সব খেলা নেই। ওরাও শহরের মানুষের মত সেসবের নাম জানে না। এখন মাঠে ঘাটে পানি নেই,সেই সব সুস্বাদু মাছ নেই। ছোট ছোট বাচ্চারা এখন মোবাইলে পাবজি খেলে,ফ্রী ফায়ার খেলে। দেখে মনেই হয় না ওরা গ্রামের ছেলে। গ্রামকে গ্রামের মত থাকতে দেওয়া উচিত। বিদ্যুৎ,পাকা রাস্তা হোক কিন্তু গ্রামের বাকি সব ঠিক থাকুক। শহরের মানুষদেরও উচিৎ মাঝে মাঝে গ্রামে গিয়ে ছোটদেরকে গ্রাম দেখানো।

এখন আর বাবা হাটে গিয়ে মাছের ভাগ কিনতে পারেন না। কারণ হাটে এখন কেউ মাছের ভাগ বিক্রি করে না। যে কিনতে পারে না সে মোটেই কেনে না আর যারা কেনে তারা কেজি কেজি কেনে। কদিন আগে লিখেছিলাম ১৫ বছর পর বোধহয় তালের রস খেলাম। খেজুরের রসতো খাইনা আরও অনেক দিন। এবারও খেতে পারিনি। এক জীবনে আর কোন দিন খেতে পারবো কিনা তাওতো জানি না। এখনতো তাল খেজুর গাছ কমতে কমতে শুন্যের কোটায় নেমে এসেছে। এগুলোর চারা লাগানো দরকার।

আমাদের গ্রামের বাড়িতে প্রায় ১৫ রকম ফলের গাছ আছে। আাম,জাম,কাঠাল,লিচু,পেয়ারা,আমড়া,কামরাঙ্গা,জামরুল,আশফল,লেবু,সফেদা,আতা,তলা,জাম্বুরা (ছোলম) সহ আরও কি কি যেন আছে মনে পড়ছে না। ফলের গাছ এখন আর লাগায় না। মা দেখলাম দুটো বাগান করেছেন দুটোই মেহগনি গাছ দিয়ে ভরপুর। মার লাগানো মেহগনি গাছ গুলি বেশ বড় হয়েছে। হয়তো কয়েক বছর পর বিক্রি করলে কোন কোনটি ৫০ হাজার টাকায়ও বিক্রি হবে। হিসেব করলে দেখা যায় এভারেজে ২০ হাজার টাকা করে হলেও কয়েক কোটি টাকার গাছ হবে।

তবে গাছ লাগানো দরকার শহর এবং শহরতলীতে। পরিবেশ দুষণ সবথেকে বেশি হয় শহরে। অথচ সেই জায়গাতেই গাছ লাগানো হয় না বরং যা দুই চারটা আছে তাও কেটে ফেলা হয়। আধুনিকায়নের নাম করে সর্বনাশের পথে হাটছি আমরা। সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের গাছ কাটা হলো,আমরা প্রতিবাদ করলাম কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। এখন সবাই সেটা ভুলে গেছে। বর্ষার এই সময়ে আসুন বেশি করে গাছ লাগাই। শুধু তাই নয় যেখানে পানি আছে সেখানেই দেশি মাছের পোনা ছাড়ি। এই বাংলা আবার ভরে উঠুক ফল ও ফসলে,মাছে ভাগে বাঙ্গালী কথাটি আবার নতুন রুপে ফিরে আসুক।

–জাজাফী

১৫ জুন ২০২১

আমার সাধাণ বাবার গল্প

সবার কাছে তার বাবাই সেরা বাবা।তবে কেউ কেউ নানা কারণে বাবাকে পছন্দ করে না। অনেকে নিজেদের আব্দার বাবার কাছে করার পর বাবা সেগুলো পুরণ করতে পারেনা বলে বাবাকে অপছন্দ করে। অথচ তারা জানেই না যে সব বাবাই চেষ্টা করে সন্তানের সব সখ,আব্দার পূরণ করতে। কিন্তু সবার পক্ষে তা সম্ভব হয় না। আমার বাবা সেরা কি না তা নিয়ে আমি কখনো ভেবে দেখিনি। তবে আমার বাবা খুব ভালো বাবা। বাবা যখন বেশ ছোট তখন বাবা তার এক বন্ধুকে পড়ালেখার জন্য খরচ দিতেন। টাকা বাচিয়ে,মা বাবার কাছ থেকে নিয়ে বাবা তার সেই বন্ধুকে পড়াশোনার খরচ দিতেন। বাবার সেই বন্ধু ছিলেন বাবার চেয়ে ছোট। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমার জন্মের অনেক আগে পাশ করে বেরিয়েছেন। বাবা তখনো তাকে পড়াশোনার জন্য সহযোগিতা করতেন। আবার বাবা বোধহয় সেই থেকেই ছোটদেরকে অত্যন্ত স্নেহ করেন। এখনো ছোটরা বাবাকে ঘিরে থাকে। কারো ঘুড়ি বানানোর দরকার হলে যেমন বাবার কাছে এসে আবদার করে তেমনি পড়াশোনা বিষয়েও বাবা তাদের হেল্প করে। আমার বাবা শিক্ষক হিসেবে শুধু নিজের দিন পার করেন নি বরং তিনি ক্রমাগত ভাবে নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে চেষ্টা করেছেন। ছোটবেলায় সেসব বুঝতাম না কিন্তু এখন ভেবে অবাক হই আমার বাবা এতো কিছু জানেন। 

আমাদের বাড়িতে যে দরজা,জানালা,চেয়ার,টেবিল,আলনা,পালঙ্ক আছে তার সবই বাবার নিজ হাতে বানানো। আমার বাবা কাঠ মিস্ত্রি ছিলেন না কিন্তু তার ছিলো কাঠ মিস্ত্রির সব ইন্সট্রুমেন্ট। সেই ছোট বেলায় বাবা যখন বাড়ির আসবাব তৈরি করতেন তখন আমি ছিলাম বাবার যোগালে বা হেল্পার। হাতুড়ি,র‌্যাদা আরও কত কি দিয়ে কাজ করতে হতো। আমাদের শহরে কোন বাড়ি ছিলো না। গ্রামেই বাবা ছোট খাট একটি বাড়ি করেছেন। তখনকার সময়ে চারদিকে বর্ষায় অনেক পানি জমতো। বাড়ির উঠোন বাদে সবখানে থৈ থৈ করা পানি থাকতো। সেই পানিতে নানা প্রকার দেশী মাছ জন্মাতো এবং বেড়ে উঠতো। এখনতো পানিও নেই মাছও নেই। সেই সময়ে বাবা মাছ ধরতেন। বাবা বর্ষা শুরুর বেশ আগে থেকে নিজ হাতে খ্যাপলা জাল তৈরি করতেন। তার পর গাবের পানিতে সেই জাল ভিজিয়ে সুতো শক্ত করতেন। বাবার দেখাদেখি আমিও তখন জাল বুনা শিখেছিলাম। 

বাবা যখন জাল দিয়ে মাছ ধরতে যেতেন আমিও সাথে যেতাম। আমার হাতে থাকতো খালোই। বাঁশের কঞ্চি চিকন করে কেটে তৈরি করা এক প্রকার পাতিলের নাম খালোই। সেটাও বাবা নিজ হাতে তৈরি করতেন। এছাড়া বাবা বাশের কঞ্চি দিয়ে ঝুড়ি বানাতেন,পাটখড়ি দিয়ে বেড়া বানাতেন। এমনকি আমাদের বাড়িতে যে রান্না ঘরে ছনের চালা ছিলো সেটাও বাবা নিজে করতেন। আমার দায়িত্ব ছিলো দুটো। বাবার হাতের ছনের আটি শেষ হয়ে গেলে নিচ থেকে আটি ছুড়ে উপরে তুলে দেওয়া আর একটা বাশের চিকন লাঠির মত ছিলো যেটাকে বলা হয় নাড়াই। সেটির মাথা সুচালো ছিলো অনেকটা বল্লমের মত যার মাথায় ছিদ্র থাকতো সুচের মত। ঘরের ভিতরে দাড়িয়ে ফাকে ফাকে খোচা মেরে সেই নাড়াইটা উপরে তুলে দিলে বাবা সেই নাড়াইয়ের ছিদ্রতে চিকন রশি ঢুকিয়ে দিতেন আমি নিচে টান দিতাম এবং নিচ থেকে বের করে খাচার অন্য প্রান্ত দিয়ে ঢুকিয়ে উপরে তুলে দিলে বাবা সেটা গেরো দিয়ে দিতেন। আমার বাবা পলো বানাতে পারতেন। আমি যে সব কথা লিখছি সেগুলোর অনেক গুলো এখন গুগলে সার্চ দিলে ছবি হিসেবে দেখা যাবে। পলো দিয়ে মূলত মাছ ধরা হতো। এটি বাশের চিকন সরু পাত তৈরি করে বানানো হতো। অনেকটা মাটির কলসের মত। পার্থক্য শুধু কলসের নিচের অংশ বন্ধ থাকে কিন্তু পলোর নিচে ফাকা থাকে। উপরের অংশ্ও ফাকা থাকে। সেটা পানির মধ্যে ঝপকের নামিয়ে দিয়ে উপর দিয়ে ভিতরে হাতড়ে মাছ ধরা হয়। আমিও ধরতাম সুযোগ পেলে।

কিছু গরু আছে যা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং গলায় সাধারণ ভাবে রশি বাধলে তাকে আটকে রাখা যায় না। এমন গরুকে বশে রাখার জন্য মুহোলি নামে একরকম মুখের খাচা তৈরি করা হয় রশি দিয়ে। এই মুহোলি মূলত দুই রকম হয়। একটি বাশের কঞ্চি দিয়ে বানানো হয় অনেকটা ছোট বাটির মত যা মুখে বেধে দিলে গরু কোন খাবার খেতে পারে না আরেকটি রশি দিয়ে তৈরি হয় যা মুখের ফাকা যায়গা দিয়ে বাধা থাকে অনেকটা ঘোড়ার লাগামের মত। এর ফলে গরু যত শক্তিশালীই হোক না কেন তা কন্ট্রোল করা যায়। এই জিনিষটা বানাতে এমন কিছু গেরো দিতে হয়,প্যাচ দিতে হয় যা সত্যিই কঠিন। আমি দেখেছি আশে পাশে দুই চার গ্রাম থেকে লোকেরা বাবার কাছে আসতো এটা তৈরি করতে। বাবা হাসি মুখে তৈরি করে দিতেন। বাবা খুব ভালো ঘুড়ি বানাতে পারেন। দূর দূরান্ত থেকে লোক আসতো বাবার কাছে ঘুড়ি বানাতে। এখন অবশ্য গ্রামে ঘুড়ি ওড়ানো হয় খুব কম। বাবা এখনো ঘুড়ি বানান তবে ছোটদের জন্য। এখনতো ছোটরাও আর ঘুড়ি ওড়ায় না বরং তারা মোবাইলে গেমস খেলে।

আমার বাবা খুব সৌখিন মানুষ। সাধ্যের মধ্যে নতুন কিছু চোখে পড়লেই কিনতেন। এখনকার ছেলে মেয়েরা যা চোখেও দেখেনি আমরা সেই সময়েও সেসব ব্যবহার করেছি। আমার বাবার জীবনের অনেকটা সময় নারায়নগঞ্জে কেটেছে। সেখানে তিনি অনেক ছাত্র পড়াতেন। বাবা খুব ঘুরতে ভালোবাসেন। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগেই বাবা আমাকে দেশের 46 টি জেলা ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন। এখনো সুযোগ পেলেই বাবা ঘুরতে বেরিয়ে পড়েন। কখনো কখনো বাবা নিজেই ড্রাইভ করেন আবার কখনো কখনো ড্রাইভার সাথে নিয়ে ঘুরতে যান। এই যেমন আমি এখনো পদ্মা সেতু দেখিনি কিন্তু বাবা ঠিকই মাকে নিয়ে পদ্মা সেতু দেখে এসেছেন। যখন যমুনা সেতু উদ্বোধন হয়েছিল বাবা আমাকে সাথে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমি যা কিছু শিখেছি তার অধিকাংশই বাবার কাছ থেকে শিখেছি। এই যে ছোটদের সাথে আমার এতো ভালো সম্পর্ক এই গুনটা মূলত বাবার কাছ থেকে পাওয়া। বাবার সাথে এখনো ছোটদের দারুণ সম্পর্ক। আমার বেশ মনে পড়ে সাতার সেখার ঘটনাটি। আমি তখন বেশ ছোট। আমাদের বড় একটি পুকুর ছিলো বাবা সেখানে গোসল করতেন। আমি বায়না ধরতাম। এমন একটি দিনে বাবা আমাকে হাতে তুলে পাড় থেকে বেশ খানিকটা ভিতরে ছুড়ে মারলেন। আমি বেশ খানিকটা পানি খেয়ে ফেললাম এবং ডুবে যাওয়া থেকে বাচার জন্য হাত পা ছুড়তে লাগলাম। বাবা জানতেন কতটুকু সময়ের মধ্যে আমাকে ধরতে হবে। তিনি ধরলেন। আমার সাহস বেড়ে গেলো। বাবার হাত ধরে সাতারটাও খুব অল্প দিনে শিখে ফেললাম। সাইকেল চালানো,গাছে চড়া সবটাই বাবার কাছ থেকে শিখেছি। আমি বাবাকে ছোট বেলা থেকেই অনেক ভয় পাই,এখনো ভয় পাই। বাবার কথার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পাইনা। ফেসবুকে বাবা যে সব পোষ্ট শেয়ার করেন সব কাস্টমাইজড আকারে শেয়ার করেন। শুধু তার লিস্টের বন্ধুরাই দেখতে পায়। বাবার প্রতিটি পোষ্টের লাইক কমেন্ট সংখ্যা আমার পাবলিক আকারে শেয়ার করা পোষ্টের কয়েক গুন বেশি।

আমার বাবা খুবই অমায়িক। তিনি আমাদের অনেক যন্ত্রণা হাসি মুখে সহ্য করেন। আমাকে কখনো বলেন নি যে আমাকে ডাক্তার  ইঞ্জিনিয়ার,পাইলট বা নির্দিষ্ট কোন কিছু হতে হবে। আমার বেশ মনে পড়ে বাবা আমাকে কিছু টাকা দিয়ে বলেছিলেন যাও যেখানে খুশি পড়ো। তবে আমার যতটুকু সম্মান আছে তা যেন না কমে। তুমি আমার সম্মান বাড়াতে পারো বা না পারো সম্মান যেন না কমে। আমি বাবার সেই একটি কথার উপর এখনো চলতে চেষ্টা করি। বাবা আমার কোন সখ অপূরনীয় রাখেন নি। অবশ্য আমি অহেতুক কোন আব্দার করেছি বলেও মনে পড়ে না। বাবাকে আমি ভালোবাসি খুব। চেষ্টা করি বাবাকে যথাসাধ্য সহযোগিতা করতে। আমার বাবা অন্য বাবাদের চেয়ে অনেক আলাদা। আমি যখন খুব ছোট তখন বাবা প্রচুর সিগারেট খেতেন। প্রতিদিন এক দুই প্যাকেট লাগতো। বড়দের মুখে শুনেছি একবার বাবার এক বন্ধু আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। বাবার সাথে বসে তিনি সিগারেট খাচ্ছিলেন। এমন সময় আমি গিয়ে বলেছিলাম বাবা আমাকেও দাও আমিও খাবো। এটা শুনে বাবার মনের মধ্যে কী ভাব তৈরি হয়েছিল জানিনা তার পর আর কোন দিন বাবা সিগারেট খান নি।তবে বাবা পান খেতে পছন্দ করতেন। 

বেশ কিছুদিন হলো স্কীন সমস্যায় ভুগছেন বলে ডাক্তারের নিষেধে পান খাওয়াও ছেড়ে দিয়েছেন। তবে চা কফি এখনো পান করতে ভালোবাসেন। স্কীন সমস্যার কারণে বাবাকে এখন সব সময় চামচ দিয়ে খেতে হয়।আমার বাবা গাড়ি চালাতে খুব ভালোবাসেন। লোন নিয়ে গাড়ি কিনেছিলেন। এখন অবশ্য পুরো লোন শোধ করে ফেলেছেন। বাবার সাথে আমি যখন গাড়িতে চড়ি তখন মাঝে মাঝে একটু বিরক্ত লাগে কারণ বাবা খুব হর্ণ বাজান। সামনে থেকে কোন গাড়ি আসতে দেখলেও হর্ণ বাজান যদিও দুজনই দুজনকে দেখতে পাচ্ছে এবং পাশে পর্যাপ্ত জায়গা আছে। আমি জীবনে একদিনই গাড়ি চালিয়েছি তাও বাবার জোরাজুরিতে। বাবার লাইসেন্স থাকলেও আমার কোথাও শেখাও হয়নি লাইসেন্সও করা হয়নি।

বাবার কারো সাথে কোন বিবাদ নেই। দল মত নির্বিশেষে বাবা সবার সাথে মেশেন। সবাই বাবাকে সম্মান করেন। আমার বাবা যাদের কাছে পড়াশোনা করেছেন আমিও তাদের কাছে পড়াশোনা করেছি। আমার বাবার প্রিয় খাবারের মধ্যে গরুর মাংস অন্যতম তবে স্কীন সমস্যার কারণে গরুর মাংস খেতে পারেন না। তবে তার পরও কখনো কখনো খেতে চেষ্টা করেন । কোরবানীর সময় বাবা নিজ হাতে গরু কোরবানী করেন,জবেহ করেন এবং নিজ হাতে চামড়া ছাড়িয়ে মাংস কাটেন। বাবার দেখা দেখি আমিও শিখেছিলাম এটা। মনে পড়ে  একবার আমার খুব ইচ্ছে হলো দেশের সবচেয়ে বড় ঈদগাহ শোলাকিয়াতে ঈদের নামাজ পড়বো। বাবাকে বলতেই বাবা রাজি হয়ে গেলেন। সেটা ছিলো কোরবানীর ঈদ। কিশোরগঞ্জে আমার অনেক বন্ধু ছিলো তার মধ্যে আবুল বাশার নামে এক বন্ধুর বাড়িয়ে গিয়ে উঠলাম। ওরা গরু কোরবানী দিয়েছিল আমি নিজে ওদেরকে গরুর চামড়া ছড়াতে এবং গোস্ত কাটতে সাহায্য করেছিলাম।

বাবা দিবসকে সামনে রেখে যখন আমাকে বলা হলো একটি লেখা লিখে দিতে তখন ঝাপি থেকে যা মনে আসলো লিখে ফেললাম। আমার কাছে নির্দিষ্ট কোন দিন নয় বরং প্রতিটি দিনই বাবা দিবস। বাবাকে আমি ভালোবাসি,শ্রদ্ধা করি। বাবার সাথে ভালো সম্পর্ক থাকলেও আমরা বাবাকে আপনি আপনি করে সম্মোধন করি। ছোট বেলা বাবা আমাকে তুই বলে সম্মোধন করতেন এখন বড় হয়েছি বলে বাবা আমাকে তুমি বলে সম্মোধন করেন। তবে খুব ছোটবেলার কথা জানিনা কিন্তু মোটামুটি 10 বছর বা তার কিছু বেশি বয়স হওয়ার পর থেকে যতটা মনে করতে পারি তাতে বাবাকে বুকে জড়িয়ে ধরা হয়নি। এই বিষয়টি আমার মনের মধ্যে অনেক তোলপাড় করতো। দু বছর আগে ঈদের নামাজের সময় মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম বাবার সাথে কোলাকুলি করবো। সেটাই ছিলো জ্ঞান হবার পর বাবার সাথে প্রথম বুকে বুক মেলানো।দিন শেষে এই হলো আমার প্রিয় বাবা। বাবা দিবসে পৃথিবীর সব বাবাকে শ্রদ্ধা,ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।

–জাজাফী

16 জুন 2021

www,zazafee.com

কাচের চুড়ি

ছোট্ট মেয়েটি হাসি মুখে মায়ের শোকেসের সামনে গিয়ে দাড়ায়।ড্রয়ার খুলতেই চোখে পড়ে একগোছা কাচের চুড়ি। চুড়িগুলোর দিকে অপলোক দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে কন্ঠে সবটুকু দরদ মিশিয়ে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলে মা এই চুড়ি গুলো আমি হাতে পরি? মা তার ছোট্ট রাজকন্যার কথা শুনে হাসে।নিজ হাতে ড্রয়ার থেকে চুড়ি গুলো তুলে নিয়ে ছুয়ে দেখে। ভেসে ওঠে এগার বছর আগের স্মৃতি। কলেজে পড়াকালিন সময়ে বৈশাখী মেলা থেকে কেনা চুড়ি গুলো এখনো সে যত্ন করে রেখে দিয়েছে। সে কী আর জানতো একদিন তার মেয়ে এই চুড়ি হাতে নেওয়ার জন্য সখ করবে। কাচের চুড়ি সাধারণত কেউ এতোদিন যত্ন করে রাখে না কিন্তু তিনি রেখেছিলেন। তারমনের মধ্যে এক কিশোরী বালিকা যেন স্বপ্ন বুনে দিয়েছিল চুড়ি গুলো রেখে দিও যত্ন করে। একদিন তোমার কোল জুড়ে আসবে একরাজকন্যা। সেই রাজকন্যার বয়স যখন ছয় বছরে পড়বে তখন সে আনমনে তোমার ড্রয়ার খুলে চুড়িগুলোর দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকবে। তার পর বলবে মা চুড়ি গুলো আমি একটু পরি?

ছোট্ট এই রাজকন্যাটির নাম সুবাইতা। পুরো নাম জাফনা সুবাইতা হাসান। মা বাবার একমাত্র আদরের সন্তান। ওর হাতের চুড়ি গুলো মায়ের কলেজ জীবনের স্মৃতি। কিছু কিছু স্মৃতি এমনই মধুর হয়,ভালোবাসায় বেঁধে নেয় জীবনের পরতে পরতে।

20 জুন 2021

হাউজ টিউটর, বেতন, অভিভাবকদের চাহিদা এবং কিছু অন্য লেভেলের হাউজ টিউটরঃ

প্রত্যেক বাবা মা তার সন্তানের মঙ্গলের জন্য সেরা বিষয়গুলিই বেছে নিবেন এটাই স্বাভাবিক। প্রতিযোগিতামূলক এই সমাজে সবেমাত্র স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে এমন বাচ্চার জন্যও তাই হাউজ টিউটর রাখেন অনেক অভিভাবক। গত কয়েকদিন আমি বিভিন্ন অভিভাকের সাথে তাদের বাচ্চাদের জন্য হাউজ টিউটর রাখলে কেমন টিচার চান,কতদিন পড়ানো হবে এবং তার বিনিময়ে কত টাকা বেতন দিবেন এমন বেশ কিছু প্রশ্ন করেছিলাম। দু’একজন বাদে বাকি সব অভিভাবকের মতামত প্রায় একই ছিলো। অধিকাংশ অভিভাবক হাউজ টিউটর নির্বাচনে নিম্ন লিখিত বিষয়গুলি ফলো করেন

  • হাউজ টিউটর নামিদামি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লে ভালো হয়।
  • হাউজ টিউটর ভালো কোনো সাবজেক্ট নিয়ে পড়লে ভালো হয়।
  • হাউজ টিউটর শিক্ষক হলে কোন স্কুল/কলেজে পড়ান সেটা বিবেচনা করেন।
  • সপ্তাহে 4 থেকে 6 দিন পড়াবেন এমনটি আশা করেন।
  • সপ্তাহে 4 থেকে 6 দিন পড়ালে বেতন 1500 টাকা থেকে 3000 টাকার মধ্যে রাখতে চান।
  • এক ঘন্টার বদলে দেড় থেকে তিন ঘন্টা পড়ানো হোক এমনটি চান।
  • নার্সারিতে পড়ুয়া বাচ্চাকে পড়ানোর জন্যও তারা ভালো সাবজেক্টে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে এমন হাউজ টিউটর চান। সপ্তাহে 4 থেকে 6 দিন পড়ানোর বিনিময়ে 1500 থেকে 3000 টাকা দিতে চান।
  • হাউজ টিউটর যেন বাচ্চার সাথে বন্ধুর মত আচরণ করে সেটা চান।

এর বাইরে খুবই সীমিত সংখ্যক অভিভাবক বলেছেন যে ক্লাসের ছাত্র/ছাত্রীকেই হাউজ টিউটর পড়াক না কেন তাদের বেতন কোন ভাবেই 5 হাজারের কম হওয়া উচিৎ নয়। কারণ একজন মানুষ বাসায় গিয়ে বাচ্চাকে পড়াবে,সময় দিবে সেটা সপ্তাহে 3 দিনই হোক বা 5 দিন হোক তার জন্য কোন ভাবেই 1500 থেকে 2500 টাকা বেতন হতে পারে না।

দু একজন অভিভাবক বলেছেন ক্লাস ৫ অব্দি বাচ্চাদের হাউজ টিউটর দরকারই হয় না যদি অভিভাবকরা একটু সময় দেয়। এটা অবশ্যই গুরুত্বপুর্ণ। কিছু অভিভাবক বলেছেন হাউজ টিউটরের বেতন নির্ভর করে অনেক সময় এলাকাভিত্তিক। কিন্তু ব্যক্তিগত ভাবে আমার কখনোই মনে হয় না যে একজন হাউজ টিউটর যে কিনা বাসায় গিয়ে পড়াবে সে যে এলাকার জন্যই হোক না কেন তার বেতন কোন ভাবে 1500 থেকে 2500 টাকা হতে পারে।

# টিউশন বিষয়ে আমার বাস্তব অভিজ্ঞতাঃ

আজ থেকে ঠিক 14 বছর আগে আমি যখন টিউশন করতাম তখন একটি টিউশন থেকে আমি মাসে 15 হাজার টাকা সম্মানী পেতাম। আমি সপ্তাহে 3 দিন পড়াতাম এবং এক ঘন্টা 20/30 মিনিটের বেশি কখনোই পড়াতাম না। ছাত্র/ছাত্রী কোন ক্লাসে পড়ে এটা বিবেচ্য ছিলো না। এবং আমি তখন আলাদা আলাদা যায়গায় বাসায় গিয়ে 5 টা টিউশন করাতাম। আমি বাচ্চাদের সাথে বন্ধুত্বপুর্ন  ব্যবহার করতাম কিনা তা অভিভাবকরাই বলতে পারবেন তবে কোন অভিভাবক আমায় ভুলে যান নি। এখনো সুযোগ পেলেই খোঁজ নেন। এই যে তারা আমায় এতোগুলো টাকা দিতো তার মানে এই নয় যে তারা অনেক বড়লোক ছিলো। তখন আমার হাতে প্রচুর অফার আসতো টিউশনের কিন্তু আমি সময় দিতে পারতাম না। 14 বছর আগের তুলনায় এখনকার টিউশনের দাম এতোটা কমতে পারে আমি কল্পনাও করতে পারি না।

  • আমি যাদের কাছে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম এবং উদাহরণ স্বরুপ যে বাচ্চাগুলোর জন্য হাউজ টিউটর রাখলে কার কেমন চাহিদা জানতে চেয়েছিলাম সেই বাচ্চাদের প্রত্যেকের একদিনের আয় থেকেও হাউজ টিউটরের মাসিক বেতন অন্তত তিন ভাগের এক ভাগ (বাচ্চাদের নিজেদের আয়ের কথা বলছি)। যেখানে একটি বাচ্চা একদিনে যে সম্মানি পাচ্ছে সেখানে কম পক্ষে 16 দিন বাসায় গিয়ে পড়িয়ে তার তিন ভাগের এক ভাগ বেতন পাওয়ার যোগ্যতা রাখে হাউজ টিউটর। তাও অনেকগুলো শর্ত সাপেক্ষে! যে শর্তগুলোর কথা আমি উপরে উল্লেখ করেছি। ধরুন উদাহরণ স্বরুপ যে বাচ্চাদের কথা আমি বলেছি তাদের সম্মানি পাওয়াটা যে খুব সহজ তাও নয়। একটি বাচ্চাকে ভোর সাড়ে চারটায় ঘুম থেকে উঠে শুটিং স্পটে যেতে হয়, সারাদিন থাকতে হয় এবং কখনো কখনো রাত বারটা বা তারও বেশি সময় থেকে ওই পরিমান সম্মানি পেতে হয়। আমি অবশ্যই এই বিষয়টি স্বীকার করি। কিন্তু বাস্তবতা বিবেচনা করলে দেখি বাচ্চাটিকে নেওয়ার জন্য বাসার সামনে গাড়ি দাড়িয়ে থাকে, আবার কাজ শেষ হলে বাসায় পৌছে দেয়। বাচ্চাটি শুটিংয়ের ফাঁকে পিকনিকের মত আনন্দ করতে পারে,খেলতে পারে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া একজন হাউজ টিউটরকে প্রচন্ড জ্যাম ঠেলে,ঘাম ঝরিয়ে,টাকা খরচ করে,ঝড় বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বাসায় গিয়ে পড়াতে হয়। 2500/3000 টাকা সম্মানির অর্ধেক চলে যায় যাওয়া আসায়।

# অন্য লেভেলের হাউজ টিউটরঃ

আমার পরিচিত অসংখ্য হাউজ টিউটর আছে যাদের শিডিউল পাওয়া বিখ্যাত সব ডাক্তারদের সিরিয়াল পাওয়ার চেয়েও কঠিন। আর তাদের চাহিদা এতো বেশি যে শুনলে যে কেউ অবিশ্বাস করবে। আমি এমন অসংখ্য হাউজ টিউটরকে চিনি যারা মাসে 25000 থেকে শুরু করে 40 হাজার টাকা অব্দি নিয়ে থাকে এবং কোন ভাবেই সপ্তাহে 3 দিনের বেশি পড়ায় না। শুধু তাই নয় তাদেরকে বাসা থেকে গাড়ি দিয়ে নিয়ে আসতে হয় আবার দিয়ে আসতে হয়। ধরুন একজন অভিভাবক তার সন্তানকে পড়াবে বলে ওই শিক্ষকদের ওই পরিমান টাকা দিতে রাজি আছে এবং গাড়িও দিতে রাজি আছে তার পরও তাদের কাছে সন্তানকে পড়াতে পারে না দুটো কারণে। প্রথমত সেই শিক্ষকরা যে কোন স্কুল বা কলেজের ছেলে মেয়েকে পড়ায় না। দ্বিতীয়ত তাদের প্রতি অভিভাবকদের এতো বেশি আগ্রহ যে তারা পড়ানোর সময় পায় না। তাদের অলরেডি শিডিউল বুকড হয়ে থাকে। 

আবার এমন টিচারও আছে (জাষ্ট স্টুডেন্ট) যারা কারো বাসায় গিয়ে পড়ায় না বরং ছাত্র ছাত্রীকেই তার বাসায় গিয়ে পড়ে আসতে হয়। সে ক্ষেত্রেও প্রতি সাবজেক্ট 5000 টাকা করে নিয়ে থাকে।

আমার মতে প্রথম শ্রেণীর অভিভাবক এবং এই দ্বিতীয় শ্রেণীর হাউজ টিউটর একই ক্যাটাগরির। এক শ্রেণী শিক্ষকের পরিশ্রমের সঠিক মর্যাদা দিতে পারে না আরেক শ্রেণী অভিভাবকদের টাকা পয়সা তাদের বাজার মূল্য চড়া বিবেচনায় লুটে নেয়। এতো বেশি যেমন বেতন হওয়া কোন ভাবেই যুক্তিযুক্ত নয় ঠিক তেমনি ভাবে 1500/2500 টাকা হওয়াও কোন ভাবেই যুক্তিযুক্ত নয় বলে আমি মনে করি।

হাউজ টিউটরের বেতন (সর্ব নিম্ন ক্লাস অনুযায়ী) অন্তত 4000 টাকার কম কোন ভাবেই হওয়া উচিত নয় এবং সেটা 15000 টাকা বেশিও হওয়া উচিৎ নয়। অন্যদিকে যদি 3 দিনের বদলে আরও বেশিদিন পড়াতে হয় তাহলে বেতনের পরিমান আনুপাতিক হারে বাড়ানো উচিত। একই সাথে যদি ছাত্র ছাত্রী আরও উপরের ক্লাসের হয় এবং অনেক গুলো বিষয় পড়াতে হয় তাহলেও বেতন আনুপাতিক হারে বাড়ানো উচিত। এক সম্মানিত অভিভাবক বলেছেন সাবজেক্ট প্রতি 100 থেকে 150 টাকা হারে হওয়া উচিৎ। যেমন কেউ তিন সাবজেক্ট পড়বে মাসে 16 দিন। তাহলে 100*3=300*16= 4800 টাকা। এভাবে হিসেব করলে রাইট জাজমেন্ট হবে বলে তারা মনে করেন। 

এই লেখাটি যারা পড়ছেন অভিভাবক বা  হাউজ টিউটর যেই হোন সম্ভব হলে আপনার গুরুত্বপুর্ন মতামত দিবেন। এই লেখাটি দ্বারা কোন ভাবেই আমি কাউকে ছোট করতে চাইছি না বা কাউকে বড় করতে চাইছি না। আমার নিজের যেমন বাচ্চা নেই তেমনি আমি নিজেও টিউশন করি না। সেই অর্থে বাচ্চাদেরকে কম টাকায় পড়াতে পারলে আমার কোন লাভও নেই ক্ষতিও নেই। পাশাপাশি কোন টিচার যদি পড়িয়ে অনেক বেশি টাকা পায় তাতেও আমার কোন লাভ নেই,ক্ষতিও নেই। আমি লেখাটি দিয়ে একটি বাস্তব বিষয় তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি। ধন্যবাদ।

–জাজাফী

28 জুন 2021

কোন বিষয়েই অতিরিক্ত আসক্তি ভালো নয়

কোন বিষয়েই অতিরিক্ত আসক্তি ভালো কথা নয়। চাই সেটা নেশা দ্রব্য হোক বা অন্য যে কোন কিছু। আসক্তি যখন চরম পর্যায়ে চলে যায় তখন মানুষের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। মানুষ এমন এক জীব যাদের নেশা শুধু মাত্র মাদকদ্রব্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এক সময় মনে করা হতো মাদকদ্রব্যই একমাত্র নেশার জন্ম দেয় এবং সেই নেশা থেকে সমাজে নানাবিধ সমস্যা সৃষ্টি হয়।আধুনিক বিশ্বে এই ধারণা আমুল বদলে দিয়েছে প্রযুক্তি, এমনকি খেলাধুলা। আসক্তি বাড়ছে মোবাইলে,ইন্টারনেটে,গেমসে,টিকটকে,সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।এবং এই আসক্তি ছেলে- বুড়ো, কিশোর-কিশোরী সবাইকে নাকাল করে দিচ্ছে। আমরা যদি গত কয়েক বছরের চিত্র তুলে আনি তাহলে স্পষ্টই দেখা যাবে পাবজি,ফ্রী ফায়ার সহ নানাবিধ অনলাইন গেমে আসক্ত হয়ে পড়েছে নানা বয়সী ছেলে মেয়ে। এবং এই আসক্তির পরিমান এতোটাই বেড়ে গিয়েছে যে তারা হিতাহিত জ্ঞান শুন্য হয়ে যে কোন অন্যায় কাজ করতেও দ্বিধা করছে না। বাড়ছে ডার্ক ওয়েবে অবাধ বিচরণ। জড়িয়ে পড়ছে নানাবিধ অপরাধে। মাদকের ভয়াল থাবা তাদের গ্রাস করে নিচ্ছে। 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে অনেকে প্রতারণার পথ বেছে নিচ্ছে। লাইকি,টিকটক ভিডিও বানানোর নামে বেহায়াপনা যেমন বেড়েছে তেমনি নারী ও শিশু নির্যাতন,পাচার বেড়েছে ঢের। এর সবই সামাজিক অবক্ষয়। গেমস খেলার টাকা চেয়ে না পেয়ে অনেকে বাবা মায়ের মানিব্যাগ,পার্স থেকে টাকা সরাচ্ছে যা তাদের নৈতিক অবক্ষয়ের চূড়ান্তে পৌছে দিচ্ছে। কেউ কেউ বাবা মা বা অন্যদের ক্রেডিট কার্ড থেকেও তথ্য চুরি করে টাকা নষ্ট করছে। এর বাইরে আছে ফ্যান ফলোয়ার বিষয়ক আসক্তি। 
আমি যখন এই লেখাটি লিখছি তখন বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবলের দুটি জনপ্রিয় আসর চলছে। একটি ইউরো কাপ, অন্যটি কোপা আমেরিকা। ইউরো কাপ নিয়ে আগ্রহের পরিমান অনেক থাকলেও সেটি কোন কালেই বাড়াবাড়ি পর্যায়ে যায় নি। কিন্তু আমাদের দেশে কোপা আমেরিকা এবং বিশ্বকাপ ফুটবল হলে সেটা ভয়াবহ পর্যায়ে পৌছে যায়। এই দেশে বিভিন্ন দেশের সমর্থক থাকলেও মূলত ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনার সমর্থক বেশি। কোন দলের সমর্থক কম আর কোনটার বেশি সেই তর্কে যেতে চাই না। কিন্তু ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের এদেশীয় সিংহভাগ সমর্থকই পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে। এমনকি আপন দুই ভাইয়ের মধ্যেও মারামারি, খুনো খুনি বাধিয়ে দেয় এই দুই দলের খেলা। সারাদেশে কোপা আমেরিকা কাপে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে অসংখ্য অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। অনেকেই হতাহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। ফুটবল বা কোন কিছুর প্রতি কতটা আসক্তি জন্মালে ভিনদেশী দলের খেলা নিয়ে মানুষ এতোটা মাতামাতি করতে পারে যার দরুন নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি রক্তারক্তি ঘটাতে পারে।

আমার ধারণা আমাদের দেশের মানুষের রক্তেই দোষ মিশে আছে। আমি ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি এই দেশে রাজনৈতিক দলের সমর্থকরা দলের নানা বিষয়ে বিরোধীদের সাথে খুনোখুনিতেও জড়িয়ে পড়তে দ্বিধা করে না। অথচ বোকার দল কখনো ভেবেও দেখে না যে তারা যাদের জন্য বিবাদ করে তারা এসব কিছুর অনেক বাইরে অবস্থান করে। একই গ্রামের দুই রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের মধ্যে মারামারি হয়ে হতাহত হওয়ার ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। তার পর তারা হাসপাতালে যায়,ভুরি ভুরি টাকা খরচ করে। আবার এক সময় মিটমাট হয়ে যায়। ক্ষতি যা হওয়ার তা কিন্তু কেবল মাত্র তাদেরই হয়। তারা যাদের সমর্থন করে এই সব নেক্কারজনক ঘটনার জন্ম দেয় সেই মানুষদের এতে কিছুই যায় আসে না। এমনকি কেউ মারা গেলেও তাদের চোখে পানি আসবে না। একই ভাবে ফুটবলে ব্রাজিল আর্জেন্টিনার সমর্থন করে এই যে খুনোখুনি রক্তারক্তি এর কোন খবর অব্দি ব্রাজিল আর্জেন্টিনাতে পৌছাবে না। মেসি,নেইমারতো দূরের কথা ওই দেশের কারো কানেই পৌছাবে না। হতে পারে বাংলাদেশে অবস্থিত দুই দেশের দূতাবাসে ইংরেজী পত্রিকা এবং টিভিতে সংবাদ দেখানো হলে হয়তো দূতাবাসের কর্মকর্তাদের চোখে পড়তেও পারে আবার নাও পারে। তাহলে কী লাভ এই খুনোখুনি,রক্তারক্তি করে? ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা যেই জিতুক না কেন বা হারুক না কেন তাদে হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থিত বাংলাদেশের এই সব সমর্থকদের কোন লাভও হবে না ক্ষতিও হবে না। তার পরও ভালোলাগা ভালোবাসা থেকে একটি দল সমর্থন করা যেতেই পারে কিন্তু সেই সমর্থন করতে গিয়ে রক্তারক্তি খুনোখুনি কোন ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। খুব সহজে ফুটবল দিয়েই ফুটবলকে বিচার করা যেতে পারে। ক্লাব ফুটবল খুব জনপ্রিয়। অনেকেই বার্সেলোনা,রিয়ালমাদ্রিদ,বায়ার্নমিউনিখ,চেলসি সহ কোন না কোন দল সমর্থন করেন। প্রতিনিয়ত সেই সব দলের কেউ না কেউ পরাজিত হয় কেউ না কেউ জয়ী হয়। এই সব ক্লাস ফুটবল যারা সমর্থন করেন তাদের মধ্য থেকেইতো ব্রাজিল আর্জেন্টিনার সমর্থক উঠে আসে। তাহলে ক্লাব ফুটবলের জয় পরাজয় যদি তাদের কখনো উসকে না দেয় তবে ব্রাজিল আর্জেন্টিনা ম্যাচ বা তার ফলাফল কেন এতোটা মার মুখী করে তোলে? শুধু তাই নয় এই দেশে অন্যান্য দলের সমর্থকওতো আছে। তারাতো কখনো মারমুখী আচরণ করে না। ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা দুই দলের এক বিরাট অংশ সমর্থক আসলে অসভ্য। আর এ কারণেই তারা অসভ্যের মত আচরণ করে।

কথা থেকে কথা আসে। আপনি যখন কাউকে খোঁচা দিয়ে কথা বলবেন সে কতক্ষণ আর চুপ থাকবে। সেও একসময় উত্তর দিবে। কথায় কথা বাড়ে। এবং এই কথা বাড়তে বাড়তে কথার গরমে শরীর গরম হয়ে মেজাজ গরম হয়ে যায়। সেটা তখন আর স্বাভাবিক পর্যায়ে থাকে না। শুরু হয় অপ্রীতিকর ঘটনা। মারামারি হানাহানি। যে ফুটবল সমর্থন করে দুই পয়সারও উপকার নেই বরং নানা ভাবে ক্ষতি আছে তা এভাবে অন্ধের মত সমর্থন করা তাদেরই সাজে যারা বাস্তবজ্ঞান বিবর্জিত। আমি বলছি না সমর্থন করা ছেড়ে দিতে তবে আমি বলতে চাই এই অন্ধ সমর্থনের কোন মানে হয় না। যা কিছু ক্ষতির কারণ তা অবশ্যই পরিত্যাগ করা উচিত। কিন্তু কে শোনে কার কথা। আনন্দের জন্য পাবজি,ফ্রী ফায়ার সহ বিভিন্ন গেমস খেলা যেতেই পারে কিন্তু তার একটি লিমিট থাকতে হবে। গেম যখন আনন্দের পরিবর্তে নেশা হয়ে দাড়ায় এবং টাকা পয়সা নষ্ট হতে শুরু করে তখন তা কোন ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।একই ভাবে হাসি মশকরা বা মজা করার জন্য লাইকি টিকটক করা হয়। কিন্তু সেটি এখন দিন দিন এমন পর্যায়ে চলে যাচ্ছে যা সামাজিক অবক্ষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। 

8 জুলাই 2021

আমাদের স্বপ্ন ভাঙ্গার দায় কার?

জাজাফী

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমাদের জন্ম হয়নি তাই ইতিহাস থেকে জেনেছি আমাদের পুর্বসুরীদের আত্মদানের কথা। তাদের জীবনের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা এসেছিল তার সুফল আমরা ভোগ করছি।এই প্রজন্মের প্রতিটি কিশোর-কিশোরী,তরুণ-তরুণীর মনের মধ্যে গেঁথে ছিলো স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর কথা। সবাই ভেবেছিল এই দিনে গোটা বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে আনন্দের বান ডেকে যাবে। কথা ছিলো রাজধানী ঢাকা সহ দেশের প্রতিটি শহরে,মহল্লায় লাল-সবুজের ঢল নামবে। তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরী সবার গায়ে থাকবে লাল-সবুজের পোশাক,হাতে থাকবে ছোট্ট একটি লাল সবুজের পতাকা, আর মাথায় থাকবে ফেস্টুন।

কিন্তু আমাদের সেই স্বপ্ন ভেঙ্গে গেছে। কিংবা বলা যায় আমাদের স্বপ্ন ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে। আমাদের এই স্বপ্ন ভাঙ্গার দায় কার? স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ছেলে বুড়ো সবার যখন আনন্দ মিছিলে বেরিয়ে আসার কথা তখন সবাই আমরা অবরুদ্ধ। দীর্ঘদিন আমরা অবরুদ্ধ ছিলাম করোনা ভাইরাসের কারণে তবে এবার আমরা অবরুদ্ধ অন্যভাবে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী হয়ে উঠেছে দলীয় উঁৎসব। এমন একটি উদযাপনের সুযোগ পেলোনা আপামর জনসাধারণ। বিগত দিনগুলোতে আমরা দেখেছি যে দলই ক্ষমতায় বসেছে জাতীয় দিবসগুলো হয়ে উঠেছে কেবল মাত্র তাদের নিজস্ব উদযাপনের দিন। ক্ষমতার বাইরে থাকা দলগুলো যেমন মনে করেছে এই দেশে জাতীয় দিবস বলে আসলে কোন দিন নেই। আমরাতো এমন বাংলাদেশ চাইনি। মুখে যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কথা বলে তাদের কাছে আমাদের প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে আপনারা কি বলতে পারবেন বঙ্গবন্ধু আসলে কোন আদর্শ রেখে গেছেন যা আপনারা ধরে রেখেছেন?

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালিত হবার কথা ছিলো দল মত নির্বিশেষে একত্র হয়ে। প্যারেড গ্রাউন্ডের অনুষ্ঠানে কেবল মাত্র রাষ্ট্রীয় অতিথি এবং নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষ ছাড়া আর কেউ যেতে পারেনি। বিরোধী দল গুলো ছিলো একেবারেই নিস্ক্রিয়। চোখে পড়ার মত তাদের কোন কর্মসুচী ছিলো না এই ঐতিহাসিক দিনে।তাদের কি এই দিনের জন্য কোন বাজেট ছিলো না? দেশ প্রেমের জন্য বাজেট লাগে? অন্যদিকে সরকার এ ক্ষেত্রে কোন ভূমিকাই পালন করতে পারেনি। সরকারের উচিত ছিলো সব কিছু ভুলে গিয়ে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর এই আয়োজনকে সর্বদলীয় করে তোলা। যেখানে আওয়ামীলীগ,জাতীয় পার্টি,বিএনপি সহ অন্যান্য স্বাধীনতার স্বপক্ষের দলগুলোকে একত্র করে দায়িত্ব ভাগ করে দিয়ে একটি সুন্দর আয়োজন করা যা দেখে বিশ্ববাসী অবাক হয়ে যাবে।কিন্তু আমরা তা দেখিনি। এমনকি এই দিনে বেগম জিয়ার কোন বক্তব্যও চোখে পড়েনি। হয়তো আমার চোখে পড়েনি কিন্তু অন্যদের চোখে পড়েছে বলেও শুনিনি।

এই আওয়ামীলীগ অনেক বদলে গেছে। তারা মনে ও মননে আমুল পাল্টে গেছে। মনে পড়ে স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীর সময়েও ক্ষমতায় ছিলো এই আওয়ামীলীগ। তখন সেই আয়োজনে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা,ইয়াসির আরাফাতের মত বিশ্ব বরেণ্য নেতা। যাদের গ্রহণযোগ্যতা সর্বত্র। এবারও বিশ্ব বরেণ্য অনেকেই এসেছেন তাদের নিয়ে কোথাও কোন অসুবিধা নেই। মূল সমস্যা গিয়ে দাড়িয়েছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে।বাংলাদেশ সরকার ভালো করেই জানে বাংলাদেশের মুসলিমরা আবেগপ্রবন এবং ধর্মীয় বিষয়ে তারা কোন ভাবেই ছাড় দিতে রাজি নয়। ব্যক্তি নরেন্দ্র মোদির চেয়ে বরং নরেন্দ্র মোদির নানা সময়ে ধর্ম বিষয়ে আপত্তিকর অবস্থানই মূলত বাঙ্গালীদের মধ্যে মোদি বিরোধীতার জন্ম দিয়েছে। কাশ্মীর ইস্যু থেকে শুরু করে সম্প্রতি ভারতের আদালতে একজন আপিল করেছে মহাগ্রন্থ আল কুরআনের 26টি আয়াত বাতিলের সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত তা এখনো ঝুলিয়ে রেখেছে অথচ এটি খারিজ করে দেওয়ার কথা ছিলো। এমনকি নরেন্দ্র মোদি এ বিষয়ে নিরবতার ভূমিকা পালন করে একার্থে ওই লোকের আবেদনকেই সমর্থন করেছে যা বাঙ্গালী মুসলিমদের মনে মোদি বিদ্বেষ সৃষ্টি করেছে। যারা প্রতিবাদ করেছে নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর বিরোধীতা করে তারা কি ভুল করেছে প্রতিবাদ করে? তাদের কি এই অধিকার নেই? দেশটা কি তাদের কারো নয়?

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে দেশের অনেক যায়গায় বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। সবটাই হয়েছে মোদির বাংলাদেশ সফর ঘিরে। যখন সংবাদে জানানো হলো স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশে আসবেন তখন থেকেই সরব ছিলো অগণিত বাঙ্গালী। এসব খবর জানার পরও সরকার নরেন্দ্র মোদি বিষয়ে সিদ্ধন্তে স্থির থাকার মাধ্যমে এদেশের জনগণের মতামতকে আরও একবার পদদলিত করেছে।শুধু তাই নয় বরং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম ফেসবুক ও মেসেঞ্জারকেও তারা নিয়ন্ত্রণ করেছে। ফলে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ঘরে বসে বন্ধুদের সাথে আলোচনা করে কাটানোর ক্ষেত্রেও আমরা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। সাংবাদিকদের কাছে অনেকেই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুললে তারা সরকারের নেতৃস্থানীয়দের সাথে কথা বলেছে কিন্তু তারা তাদের শেখানো কথাই উত্তর হিসেবে সাংবাদিকদের বলে দিয়েছে যে, না তারা ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করেনি। এর ঠিক একদিন পর ফেসবুক কর্তৃপক্ষ নিজ থেকেই জানিয়েছে যে তাদের সহযোগিতা ছাড়াই বাংলাদেশ সরকার ফেসবুক নিয়ন্ত্রণ করছে এবং এই প্রযুক্তি বাংলাদেশ সরকারের হাতেই আছে।

এই যে একটি বক্তব্য সারা দেশের  মানুষের কাছে মিথ্যা বলে প্রমানিত হলো  এতে সরকারের ভাবমুর্তি নষ্ট হয় না? এর আগে টিকা ইস্যুতে একটি দেশের নাম উল্লেখ করে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলেছিলেন অমুক দেশ আমাদের থেকে টিকা নিতে চেয়েছে  এই বক্তব্যের বিপরীতে সেই দেশ জানালো তারা আমাদের কাছে কোন টিকা চায় নি! মিথ্যা কোন না কোন ভাবে এক সময় ঠিকই আলোতে চলে আসে।তখন মানুষ সেটা জানতে পারে।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর যে উৎসবের স্বপ্ন আমরা দেখতাম তার কিয়দাংশও পুরণ হয়নি উপরন্তু স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ব্যক্তি স্বাধীনতার পায়ে শেকল পরানো হয়েছে। সরকার একদিকে বলছে তারা কারো ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে না,বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে না, অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করছে। পাশাপাশি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করে প্রকারান্তে বুঝিয়ে দিচ্ছে কিছু বলে দেখো বুঝবে কত ধানে কত চাল।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ঢাকা সহ সারা দেশে যত জায়গায় সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে তার দায় ক্ষমতাসীনদের উপরও অনেকটা বর্তায় এবং এটি এড়িয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। যারা আন্দোলন করেছে তারা আগে থেকেই জানিয়েছে তারা ভারত বিরোধী নয় বরং তাদের একমাত্র সমস্যা নরেন্দ্র মোদি।এটা জানার পর সরকার চাইলেই সাম্ভাব্য পরিস্থিতি কী হতে পারে সেটা বিবেচনা করে এই অনুষ্ঠানকে আরও সফল করতে পারতো। এই যে একাধিক প্রাণ গেলো,জ্বালাও পোড়াও হলো,হরতালের ডাক আসলো এর কোনটিই তখন ঘটতো না।স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের অবদান আমরা কেউ কোন কালেও অস্বীকার করি না এবং কোন ভাবেই ছোট চোখে দেখি না। ভারতের সহযোগিতা ছিলো বলেই আমরা স্বাধীনতা অর্জনের পথটাকে আরও মসৃন করতে পেরেছিলাম। তা না হলে হয়তো আমাদের আরও ত্যাগ স্বীকার করতে হতো। ভারতের সাথে আমাদের বন্ধুত্বের সম্পর্ক এবং সেটা আজীবন অটুট থাকুক এটাও সবাই চায় কিন্তু এক নরেন্দ্র মোদিকে আমন্ত্রণ জানানো না জানানো নিয়েতো  সেই সম্পর্ক চিড় ধরতো না। অথচ তা করতে পারলে এই দিনে এমন করে রক্ত ঝরতো না,কলঙ্কিত হতো না স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী।

মনে রাখা দরকার ছিলো স্বাধীনতা যেমন কোন এক পক্ষের একক অবদানে অর্জিত হয়নি, তেমনি এই দেশটিও একক কোন দলের নয়। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে সেদিন দল মত নির্বিশেষে আপামর বাঙ্গালী স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল।সেই অনেক ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠান প্রশ্নবিদ্ধ হলো কিছু মানুষের রক্ত ঝরিয়ে,সম্পদের ক্ষতি করে। যারা মিছিল করেছিল তাদের দোষ ছিলো তারা লাঠি হাতে মিছিলে নেমেছিল, তাদের চোখে মুখে ছিলো প্রতিহিংসা। কিন্তু তারাতো মারমুখী হয়ে ওঠেনি যতক্ষণ না পুলিশ তাদের সামনে বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছে,দিকে দিকে ছাত্রলীগের ছেলে মেয়েরা বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছে। তখনই সংঘর্ষের ঘটনার জন্ম হয়েছে। সুতরাং দোষ থাকলে উভয় পক্ষেরই দোষ দিতে হবে।

স্বাধীন একটি দেশে যে কোন ঘটনার প্রতিবাদে যে কেউ মিছিল করতেই পারে। ন্যায্য দাবী হলে সেটি শোনাও একটি সুশীল সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু সরকার যখন বাক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে, তখন তাদের কাছে কোন দাবীয় আর ন্যায্য থাকে না। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী আর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠান একত্রে করাও যুক্তিযুক্ত হয়নি। কেননা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সব মানুষের মনে দাগ কাটার কথা যেটা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী নিয়ে কাটবে না। যারা বিএনপি করে বা অন্যান্য দল করে তাদের কাছে বঙ্গবন্ধুর জন্ম উৎসবের চেয়ে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর উৎসব অনেক বেশি আগ্রহের। কিন্তু একই সাথে দুটোর আয়াজন করার মাধ্যমে প্রকারান্তে সরকার জেনে শুনে বাকি দলগুলোকে এই আয়োজনে আগ্রহী হতে নিরুৎসাহীত করেছে বলে আমি মনে করি। চারদিকে এতো উন্নয়নের মধ্যে এমন মনোভাব সত্যিই পীড়াদায়ক। এভাবে চলতে থাকলে বাহ্যিক দিক থেকে হয়তো আমরা উন্নত একটি দেশ নির্মানে সক্ষম হবো তবে আমাদের মধ্যে ভ্রাতিত্বের কোন বন্ধন থাকবে না। পারস্পারিক সহযোগিতার মনোভাব থাকবে না। একটি দেশকে উন্নতির শীর্ষে নিয়ে যেতে হলে ছোট বড় সব শ্রেণী পেশা ও মতবাদের মানুষকে এক সাথে মিলে মিশে কাজ করতে হয়। কিন্তু স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর উৎসব দেখে সেই স্বপ্ন ভেঙ্গে গেছে।আমাদের স্বপ্ন ভঙ্গের দায় তাহলে কার?

28 মার্চ 2021

প্রাবন্ধিক ও সমাজকর্মী

[email protected]

www.zazafee.com

ভিখারী থেকে ফ্যাশন মডেল

মানুষের জীবনের মোড় ঘুরতে সময় লাগে না।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম একদিকে যেমন মানুষকে হতাশায় ডোবাচ্ছে, ঠিক তার বিপরীতে অনেক মানুষের জীবন কিংবা ভাগ্য রাতারাতি বদলে দিচ্ছে এই মাধ্যম। এমন ঘটনা বিশ্বের সর্বত্র। এবার ফিলিপাইনে এমনই এক ঘটনা সামনে এসেছে। তেমনই এক ভাগ্যবতীর গল্প এটা। এক সময় যে রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করতো আজ সে বিশ্ব ব্যাপী আলোচিত এবং নামী মডেল।মেয়েটির নাম রিতা গাভিওয়ালা। থাকে ফিলিপাইনে। বয়স মাত্র ১৩। রিতা বাবা-মায়ের সঙ্গে যখন ফিলিপাইনের জামবাঙ্গা থেকে লুচেনা শহরে আসেন, তখন একদম কিশোরী। তার বাবা একজন ময়লা সংগ্রহকারী। রাস্তা বা ডাস্টবিন থেকে ময়লা সংগ্রহ করতেন। সে সময় বাসায় রিতার মা বাচ্চাদের দেখাশোনা করতেন। রিতারা পাঁচ ভাই-বোন। রিতা ‘বাদজাও গার্ল’ নামেও পরিচিত। সমুদ্রে ভাসমান জীবনযাপন করা একটি সম্প্রদায়ের নাম বাদজাও সম্প্রদায়। এই সম্প্রদায় থেকেই রিতার আগমন, যার কারণে তাকে এই নামে ডাকা হয়।

৪ বছর আগে রাস্তায় ভিক্ষা করত রিতা। কিন্তু ৪ বছর পর সে পরিণত হলো ফ্যাশন মডেল এবং অনলাইন সেলিব্রিটিতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয় তার ছবি। ইনস্টাগ্রামেও রয়েছে লক্ষাধিক ফলোয়ার।২০১৬ সালে ফিলিপাইনের ফটোগ্রাফার তোফার লুসবান শহরে কুইন্টোতে বেড়াতে এসেছিল। সেখানেই রাস্তায় ভিক্ষা করা অবস্থায় রিতার সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে একটি ছবি তোলেন তিনি। এরপর ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন তোফার। সঙ্গে সঙ্গেই ভাইরাল হয়ে যায় ছবিটি, আর বদলে যায় রিতার জীবন।২০১৬ সালে রিতার ছবি যখন ভাইরাল হয়, তখন তাকে ভালোবেসে অনেকেই আর্থিক সহায়তা দিয়েছিলেন। বেশ কয়েকটি ফ্যাশন ব্র্যান্ড রিতাকে মডেলিংয়ের অফার দিয়ে বসে। বিভিন্ন টিভি শোতেও ডাক পড়তে শুরু হয় তার। সেই সময় ফিলিপাইনের অনেক নামি সুন্দরী এমনকি সুন্দরী প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়নদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন রিতা গাভিওলা। আর এ কারণে মাত্র ১৩ বছর বয়সেই টেলিভিশনের রিয়ালিটি শোতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান রিতা। এখন প্রচুর নেটিজেন রিতার প্রতি উৎসুক, উন্মুখ হয়ে থাকেন। কেননা, রিতা ইনস্টাগ্রামে যেসব ছবি প্রকাশ করেন, তা তরুণ হৃদয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় বলে নেটিজেনদের দাবি।  

২০১৮ সালে ইউটিউবে একটি ভিডিও আপলোড করেন রিতা। যাতে তিনি তার নতুন বাড়ি সম্পর্কে তথ্য দিয়েছিলেন। তার আমেরিকান ফ্যান গ্রেস এই বাড়িটি তৈরি করতে সহায়তা করেছিলেন। রিতা আজকাল সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের ছবি নিয়ে খবরে রয়েছেন। তবে এই মুহুর্তে তার অগ্রাধিকার হল পড়াশোনা শেষ করা। সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে অনেকেরই জীবন বদলে গেছে। তবে, তার মধ্যে যারা সর্বাধিক সাফল্য পেয়েছেন, তাদের মধ্যে একজন রিতা।


যখন  রিতার ছবি ইন্টারনেটের বিভিন্ন মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল, সেটা ৫ বছর আগের কথা- তখন তিনি অনেকের কাছ পছন্দ হয়েছিলেন। আর্থিকভাবে সহায়তাও করেছিলেন নেটিজেন ও সেলিব্রিটিরা।  ছবিটি ভাইরাল হয়ে গেলে বেশ কয়েকটি ফ্যাশন ব্র্যান্ড রিতাকে একটি মডেলিংয়ে ডাকে। কিছুদিন পর টিভি শোতেও হাজির রিতা। 

রিতা গাভিওলা ২০১৮ সালে ইউটিউবে একটি ভিডিও আপলোড করেন। যেখানে তিনি তার নতুন বাড়ি সম্পর্কে তথ্য দিয়েছিলেন। তার আমেরিকান ভক্ত গ্রেস এই বাড়িটি তৈরি করতে সহায়তা করেছিলেন। তবে এই মুহূর্তে তার অগ্রাধিকার হলো পড়াশোনা শেষ করা।

10 জানুয়ারি 2021

উপমহাদেশের সমকালীন গুরুত্বপূর্ণ নারী চলচ্চিত্র নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেন

জাজাফী

সৈয়দা রুবাইয়াত হোসেন আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত ও প্রতিষ্ঠিত বর্তমান সময়ের একজন মেধাবী বাংলাদেশি নারী চলচ্চিত্র নির্মাতা, লেখক, প্রযোজক এবং গবেষক।১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে নির্মিত “মেহেরজান” চলচ্চিত্র পরিচালনার মাধ্যমে ২০১১ সালে চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসাবে তিনি আত্মপ্রকাশ করেন। এই চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি করে এবং মুক্তির মাত্র এক সপ্তাহ পরেই চাপের মুখে পরিবেশক সিনেমা হল থেকে নামিয়ে নেয়। তবে এটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত ও বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয়েছে।

তার দ্বিতীয় ছবি “আন্ডার কন্সট্রাকশন” সমকালীন ঢাকা শহরের প্রেক্ষাপটে মধ্যবিত্ত এক নারীর আত্ম-অনুসন্ধানের চিত্র। ২০১৫ সালে সিয়াটল চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ারের পর জানুয়ারি ২১, ২০১৬ বাংলাদেশে ছবিটি মুক্তি পায়।

তার নির্মিত “মেড ইন বাংলাদেশ” টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসব ২০১৯ এ প্রিমিয়ারের পর একই বছরের ডিসেম্বরে ফ্রান্স, পর্তুগাল ও ডেনমার্কে ৭০টির অধিক সিনেমা হলে মুক্তি পায়। ২০২০ সালের শুরুতে কানাডা, আমেরিকা ও বিশ্বের অন্যান্য দেশেও ছবিটি মুক্তি পায়।

রুবাইয়াত হোসেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ সৈয়দ আবুল হোসেন ও খাজা নার্গিস হোসেনের মেয়ে। সম্প্রতি তিনি উপমহাদেশের সমকালীন গুরুত্বপূর্ণ ১০ নারী নির্মাতার তালিকায় প্রথম স্থানে আছেন । এ তালিকায় আরও রয়েছেন পাকিস্তানের মেহরীন জব্বার, ভারতীয় নির্মাতা সোনালি বোস, সুমন কিট্টুর, ওরভাজি ইরানি, মেঘনা গুলজার, মঞ্জু বোরাহ, শতরূপা সান্যাল, জয়া আখতার ও ববি শর্মা বড়ুয়া।

রুবাইয়াত হোসেন মূলত একজন গবেষক।সত্যজিৎ রায় এবং ঋত্বিক ঘটকের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে রুবাইয়াত হোসেন চলচ্চিত্রে আগ্রহী হন এবং ২০০২ সালে নিউইয়র্ক ফিল্ম একাডেমিতে চলচ্চিত্র পরিচালনায় ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন। তিনি প্রখ্যাত স্মিথ কলেজ থেকে উইমেন স্ট্যাডিজে স্নাতক এবং পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দক্ষিণ এশীয় গবেষণা ও নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের টিশ স্কুল অফ আর্টস থেকে চলচ্চিত্র বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন।
তার আগ্রহের বিষয়ের মধ্যে রয়েছে সুফিজম, বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ, বাঙ্গালী মর্ডানিটি এবং ফিমেল সেক্সুয়ালিটি ইত্যাদি। তিনি আইন ও শালিস কেন্দ্র, নারীপক্ষ-তে নারী অধিকার নিয়ে কাজ করেছেন। এছাড়া তিনি ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ইকনোমিক্স এবং সোশ্যাল সায়েন্স বিভাগে পার্টটাইম শিক্ষকতা করছেন। ব্যক্তিগত জীবনে রুবাইয়াত হোসেন বিবাহিত। জুন ২০০৮ সাল থেকে তিনি চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক আশিক মোস্তফার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ। ২০০২ সালে তিনি ফুলকুমার নামে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মান করেন। এরপর তিনি কিছু স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মান করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রগুলো হল – প্রিয় আমি (৮ মিনিট), বালিকার গোল্লাছুট (৫২ সেকেন্ড), সীমান্ত (১ মিনিট ১২ সেকেন্ড)। এ সকল ছবিই তিনি ২০০৫ সালে নির্মান করেন। মেহেরজান চলচ্চিত্র নির্মানের মাধ্যমে তিনি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মান শুরু করেন। এছাড়া তিনি সাহিত্যচর্চার সাথে যুক্ত আছেন। রুবাইয়াত হোসেন ব্যক্তি জীবনে একাধিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তার মধ্যে কয়েকটি
  • এমিলি গিমে পুরস্কার – প্যারিসের গিমে মিউজিয়াম কর্তৃক প্রদত্ত
  • জুরি এওয়ার্ড ও ক্রিটিক এওয়ার্ড, ভেসুল এশীয় চলচ্চিত্র উৎসব, ফ্রান্স
  • শ্রেষ্ঠ উদীয়মান পরিচালক পদক, নিউ ইয়র্ক এশিয়ান আমেরিকান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব
  • অরসন ওয়েলস পদক, টিবুরন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
  • সমালোচক পুরস্কার, জয়পুর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, ভারত
  • জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০১৬ – শ্রেষ্ঠ সংলাপ
  • জুরি পুরস্কার ও দর্শক পুরস্কার, এমিয়েন্স আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, ফ্রান্স
  • প্রিমিও ইন্টারফেডি, তুরিন (টোরিনো) চলচ্চিত্র উৎসব
  • দর্শক পুরস্কার, আফ্রিকান ডায়াস্পোরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব।

রুবাইয়াত হোসেন এবং তার জীবনসঙ্গী আশিক মোস্তফা ২০০৮ সালে বাংলাদেশ ভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণ সংস্থা খনা টকিজ (পূর্বে ইরা মোশন পিকচার্স নামে পরিচিত) প্রতিষ্ঠা করেন যা দেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত বেশ কিছু চলচ্চিত্র নির্মানের পাশাপাশি বাংলাদেশের তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের আন্তর্জাতিক অঙনে তুলে ধরার পেছনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

10 জানুয়ারি 2021

জমজ সন্তানের মায়েরা

সন্তান জন্মদানের মাধ্যমে একজন মা পরিপুর্নতা লাভ করেন। তার জীবনের সব থেকে বড় পাওয়া হলো নিজ গর্ভে জন্মনেওয়া সন্তান। সন্তান যেমনই হোক মায়ের কাছে সে সাতরাজার ধন।সন্তানকে লালনপালন করতে গিয়ে,মানুষ করতে গিয়ে মায়েরা তাদের সুখ,স্বপ্ন সবটাই বিসর্জন দিয়ে থাকেন। সন্তানের জন্য মায়ের যে অবদান সেটা কোন কিছুর বিনিময়ে শোধ করা সম্ভব নয়। এ কারনেই ইসলামে মায়ের মর্যাদা অনেক বেশি।কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় যে সন্তানকে মা কষ্ট করে লালনপালন করেছেন বড় হয়ে সেই সন্তান মাকে সরিয়ে দিচ্ছে। বলা হয়ে থাকে একজন মা একা দশটি সন্তান লালন পালন করতে পারলেও অনেক সময় দশটি সন্তান একজন মা কে দেখেশুনে রাখতে পারে না।

আমরা সবাই প্রতিটি মায়ের অবদানের কথা কোন ভাবেই অস্বীকার করতে পারি না।বিশেষ করে গর্ভকালিন সময়ে এবং সন্তান প্রসবের পর অন্তত সেই সন্তানের বয়স দশ বছর না হওয়া অব্দি মায়ের কষ্টের সীমা নেই। যদিও দেখতে গেলে মা তার সন্তানের জন্য জীবনের শেষ দিন অব্দি চিন্তা করেন,ঘুম নষ্ট করেন।একটি সন্তান লালনপালন করতে মায়ের অনেক কষ্ট হয় কিন্তু একটির বদলে দুটি হলেতো কথাই নেই বিশেষ করে জমজ সন্তানের মায়েদের একই সাথে অনেক আনন্দ আবার অনেক কষ্ট।অম্ল মধুর সেই স্মৃতি মাকে ক্ষণে ক্ষণে আনন্দ দেয়। স্বভাবতই একটির বদলে দুটি সন্তানকে এক সাথে গর্ভে ধারণ করার ফলে গর্ভকালিন সময়েও মাকে অতিরিক্ত ভার বহন করার পাশাপাশি অতিরিক্ত ঝুকি বহন করতে হয়।এর পর সন্তান জন্ম নেওয়ার পর দায়িত্ব দ্বিগুন হয়। এক সন্তানকে খাওয়াতে গেলে অন্য সন্তানকে অপেক্ষায় থাকতে হয়, কখনো কখনো কান্নাও শুরু করে দেয়। আবার দেখা যাচ্ছে এক সন্তানকে খাইয়ে মা দু মিনিটের জন্য কোন কাজে গেলেন এবং ফিরে এসে যে সন্তানকে খাইয়েছিলেন তাকেই আবার খাওয়ালেন এমন ভুল নিয়মিত হয়।তাসিন তাজিম নামে দুই জমজ সন্তানের মায়ের সাথে আলোচনা থেকে জানা গেলো জমজদের লালনপালন করতে গিয়ে অনেক কষ্টের এবং আনন্দের ঘটনা ঘটে।যেমন একবার তাজিমের অসুখ হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। একদিন তাজিম হাসপাতালের বিছানা ছেড়ে উঠে একটু দূরে খেলছিল আর তাসিন তখন বিছানায় বসে ছিলো। নার্স এসে কিছু না বলেই তাসিনকে ইনজেকশন দিতে শুরু করলো!! যখন সিরিঞ্জ তাসিনের হাতে দিতে যাবেন তখন তিনি বললেন নার্স কি করছেন! ওতো সুস্থ্য ওকে কেন ইনজেকশন দিবেন। নার্স আসলে জানতেন না যে ওরা জমজ। পরে তাজিম আসলে তাকে ইনজেকশন দেওয়া হলো।মজার ঘটনাই বেশি ঘটে। তাসিন তাজিম দুজনই অভিনয় করে,মডেলিং করে। একবার শুটিং সেটে খেলতে খেলতে তাসিনের শরীরে ময়লা লেগে গেলো। মেকাপ করতে সময় লাগবে দেখে তাসিনের বদলে তাজিমকে দিয়ে বাকি শুটিং করিয়ে নেওয়া হলো।

তবে অধিকাংশ সময় জমজদের মধ্যে ভীষণ ভাব থাকলেও মাঝে মাঝে খুব ঝগড়া,মারামারির ঘটনাও ঘটে। জমজ সন্তানের মায়েদের সে ক্ষেত্রে অনেক যন্ত্রনা ভোগ করতে হয়। একই সময়ে একই বয়সী দুটি সন্তানকে সমান ভাবে লালনপালন করা কঠিন হয়ে পড়ে।গোলস করানো,খাওয়ানো,পোষাক পরানো এবং স্কুলে আনা নেওয়াতে খুবই কষ্ট হয়।এই সময়ে বাবা বা পরিবারের অন্য কারো সহযোগিতা খুবই প্রয়োজন।সন্তান গর্ভে আসার পর প্রাথমিক ভাবে জানা যায় না যে এক সন্তান জন্ম নিবে নাকি একাধিক। কোন কোন ক্ষেত্রে জমজ নয় বরং ট্রিপলেক্স বা তিনজন সন্তানও জন্ম নিয়ে থাকে। তবে সেটা খুব কম সংখ্যক।বর্তমান সময়ে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার কারনে বেশ আগে থেকেই জানা যায় কয়জন সন্তান জন্ম নিবে বা ছেলে না মেয়ে হবে। সে ক্ষেত্রে যখন জমজ সন্তান হবে জানা যায় তখন মায়ের প্রতি আরও বেশি যত্নশীল হতে হবে।এক সন্তান হলে মাকে যতটুকু পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করতে হতো জমজ সন্তান হলে তার চেয়ে বেশি গ্রহণ করতে হবে যেন দুজনের চাহিদা ঠিকভাবে পুরণ হয়।তবে আশার কথা হচ্ছে শতকরা নব্বই ভাগ জমজ সন্তান খুব মেধাবী হয়ে থাকে।তারা পরস্পর পরস্পরকে অনুসরণ,অনুকরণ করে এবং তাদের পছন্দ-অপছন্দ সব কিছুতেই মিল থাকে।যেমন তাজিম ছবি  আকঁতে বসলে তাসিন ওকে আইডিয়া দেয়।একে অন্যকে পড়া করতে সাহায্য করে,পোষাক পরতে সাহায্য করে।জমজ সন্তান একটু বড় হলে তখন মায়ের কষ্ট অনেকটাই দূর হয়।তবে স্কুল ভর্তি থেকে শুরু করে অন্যান্য প্রতিযোগিতায় মনখারাপের ঘটনাও ঘটে যা মাকে সামলাতে হয় খুব কষ্ট করে।একজন চান্স পেলে অন্যজনের মন খারাপ হয় তাই জমজরা চেষ্টা করে দুজনই একই সাথে একই স্কুলে পড়তে,দুজনেই চ্যাম্পিয়ন হতে নয়তো একজনও নয়।তবে হাজার কষ্ট হলেও জমজ সন্তানের মায়েরা তাদের সন্তানদের নিয়ে খুবই সুখী।জমজরা যেন দুই নয়নের দুটি মণি।

31 মে 2020