Home Blog Page 13

চলচ্চিত্র বিষয়ক বইয়ের তালিকা

–জাজাফী

  • চলচ্চিত্র শিক্ষা-হাসান রাউফুন-১৫০ টাকা।
  • বিশ্বসরা ৫০ চলচ্চিত্র-মুম রহমান।
  • ইরানী চলচ্চিত্রঃ ১০ নারী নির্মাতা-২২৫ টাকা।
  • চলচ্চিত্র ভাবনা—১৫০ টাকা।
  • আন্তোরিওনির সিনে জগত-২৬০ টাকা।
  • মুখোমুখি ঋত্বিক-সত্যজিৎ- ২৭০ টাকা।
  • বিশ্ব সেরা আরো ৫০ চলচ্চিত্র-২৬০ টাকা।
  • ফ্রাসোয়া ত্রুফোঃ প্রেম ও দেহগ্রস্ত ফিল্মমেকার-২৬০ টাকা।
  • প্রসঙ্গঃ সিনেমা—বাবলু ভট্টাচার্য-৯০ টাকা।
  • নতুন সিনেমা সময়ে—নুরুল আলম আতিক।
  • সিনেমার ঋত্বিক ঋত্বিকের সিনেমা—ইরাবান বসুরায়-৩০০ টাকা।
  • সিনেমা থেকে চিত্রালী—খন্দকার মাহমুদুল হাসান-৩৩৮ টাকা।
  • রূপের কল্পনির্ঝর-সোমেশ্বর ভৌমিক-৪৫০ টাকা।
  • সিনেমা এলো কেমন করে—ফারহানা মিলি-৫৩ টাকা।
  • সিনেমা সংক্রান্ত-পুর্নেন্দু পত্রী-১৮০ টাকা।
  • আমার সিনেমা জীবন-শাহজাহান চৌধুরী-৪৫০ টাকা।
  • চলচ্চিত্রের দেশ বিদেশ-রেজা ঘটক।
  • বিষয় চলচ্চিত্র—সত্যজিৎ রায়।
  • একেই বলে শ্যুটিং—সত্যজিৎ রায়।
  • ছবি বানানোর গল্প—হুমায়ূন আহমেদ।
  • চিত্রনাট্য রচনার কলাকৌশল—হাসান রাউফুন।
  • চলচ্চিত্র শিক্ষা—হাসান রাউফুন।
  • আমার আমি—উত্তম কুমার।
  • সিনেম্যান—সৈয়দ নাজমুস সাকিব।
  • নাটকের ক্লাস—ডক্টর রাজিব হুমায়ুন।
  • শর্টফিল্ম নির্মানের কলাকৌশল—হাসান রাউফুন।
  • চলচ্চিত্র পাঠ সহায়িকা—বিধান রিবেরু।
  • বায়োস্কোপ চলচ্চিত্র প্রভৃতি—শাহাদুজ্জামান।
  • ফিল্ম সেন্স—সার্গেই আইজেনস্টাইন।
  • চলচ্চিত্র নাট্য তত্ত্ব ও রচনা নির্দেশনা- অনুপম হায়াৎ।
  • চলচ্চিত্রের চালচিত্র—জাকির হোসেন রাজু।
  • সিনেমামা—সৈয়দ নাজমুস সাকিব।
  • বাংলাদেশের চলচ্চিত্র—আব্দুল হাই শিকদার।
  • প্রসঙ্গ সিনেমা- বাবলু ভট্টাচার্য।
  • টিভি নাটক নির্মান কৌশল—মুহম্মদ হুমায়ূন কবীর।
  • চলচ্চিত্রবিদ্যা—অনুপম হায়াৎ।
  • চলচ্চিত্রপাঠ—ফাহমিদুল হক।
  • বাংলাদেশের চলচ্চিত্র—আহমেদ আমিনুল হক।
  • চলচ্চিত্র নির্মানের কলাকৌশল—মাহবুব আজাদ।
  • ইরানী চলচ্চিত্র—পবিত্র কুমার কুন্ডু।
  • বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সমালোচনা—অনুপম হায়াৎ।
  • চলচ্চিত্র নির্মানে একডজন টিপস—ইহতিশাম আহমদ।
  • নতুন সিনেমা সময়ের প্রয়োজন—নুরুল আলম আতিক।
  • মুখোমুখি ঋত্বিক-সত্যজিৎ–উদিসা ইসলাম।
  • তারেক মাসুদঃজাতীয়তা বাদ ও চলচ্চিত্র—ফাহমিদুল হক।
  • চার্লিচ্যাপলিন—মৃনাল সেন।
  • আমার ভূবনঃমৃনাল সেন—বিশ্বরায়।
  • ফিল্ম মেকারের ভাষা—বিজয় আহমেদ।
  • চলচ্চিত্রের কারিগরীমান—মাসুদ উর রহমান।
  • তথ্যচিত্র পরিচালনা ও নির্মান কৌশল—অজয় সরকার।
  • বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস—অনুপম হায়াৎ।
  • তারেক মাসুদঃচলচ্চিত্রের আদমসুরত—মনিস রফিক।
  • চলচ্চিত্র কলার রূপরুপান্তর—সাজেদুর আওয়াল।
  • চরিত্র সৃষ্টি ও অভিনয়—রাহমান চৌধুরী।
  • চলচ্চিত্র বিচার-বিধান রিবেরু।
  • থিয়েটার কথা-জিয়া হায়দার।
  • চলচ্চিত্র তারকাদের বেদনার কথা-লিয়াকত হোসেন খোকন।
  • ইরানী চলচ্চিত্রঃ ১০ নারী নির্মাতা—উদিসা ইসলাম।
  • বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে সেন্সর ব্যবস্থা—বিবেকানন্দ রায়।
  • প্রথাবিরোধী চলচ্চিত্র-আইয়ুব হোসেন।
  • মেঘে ঢাকা তারা—ঋত্বিক কুমার ঘটক।
  • ফ্রাসোয়া ক্রফোঃপ্রেম ও দেহগ্রস্থ ফিল্মমেকার—রুদ্র আরিফ।
  • নাট নাট্য চলচ্চিত্র কথা—পশুপতি চট্টপাধ্যয়।
  • অভিনয়কলা—ডক্টর মোঃ মুস্তাফিজুর রহমান।
  • হুমায়ূন আহমেদের শেষ ও প্রথম চলচ্চিত্র—মতিন রহমান।
  • অস্কার বিজয়ী চলচ্চিত্র-মুম রহমান।
  • সিনেমার ঋত্বিক ঋত্বিকের সিনেমা-ইরাবান বসুরায়।
  • চলচ্চিত্র সমালোচনা—ফাহমিদুল হক।
  • ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্র—ডা.সাজেদুল আউয়াল।
  • বাংলাদেশের নাট্যচর্চা—রামেন্দু মজুমদার।
  • বিশ্বসেরা আরো ৫০ চলচ্চিত্র—মুম রহমান।
  • প্রতিবাদের নান্দনিকতা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র—নাদির জুনায়েদ।
  • চার্লিচ্যাপলিন—কাজল ঘোষ।
  • সিনেমার ইতিবৃত্ত—পার্থ রাহা।
  • গৌতম ঘোষের চলচ্চিত্র—মনিস রফিক।
  • ইউরোপের চলচ্চিত্র—অপুর্ব কুমার কুন্ডু।
  • আলমগীর কবীরের চলচ্চিত্র-অনুপম হায়াৎ।
  • বুম্বা,শর্টরেডি—প্রসেঞ্জিৎ।
  • ক্যামেরার পেছনের সারথি—মনিস রফিক।
  • ছোটদের অভিনয়—ডক্টর মোস্তাফিজুর রহমান।
  • বিশ্বসেরা চার নাটক—কবীর চৌধুরী।
  • বাংলাদেশের চলচ্চিত্র—আব্দুল্লাহ জেয়াদ।
  • সিনেমার আলাপ—ফাহিম ইবনে সারোয়ার।
  • চিত্রনাট্যকলা তৃতীয়খন্ড—অনুপম হায়াৎ।
  • চলচ্চিত্র বিশ্বের সারথি—মনিস রফিক।
  • প্রসঙ্গ সত্যজিৎ-আমানুল হক।
  • অস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র—অপুবর্কুমার কুন্ডু।
  • সিনেমা থেকে চিত্রালি—খন্দকার মাহমুদুল হাসান।
  • সোনিয়া মুরগ্রনীত স্তানিস্লাভস্কির অভিনয়পদ্ধতি—ডক্টর মুহম্মদ মুস্তাফিজুর রহমান।
  • মঞ্চে আলো ও ধ্বনি—ড. নীরোদবরণ হাজরা।
  • সিনেমার ভাষা—ধীমান দাশ গুপ্ত।
  • আন্তনিওনির সিনেজগৎ–রুদ্র আরিফ।
  • ভিনদেশী চলচ্চিত্র—অপুর্ব কুমার কুন্ডু।
  • সিনেমার অ আ ক খ—ধীমান দাশগুপ্ত।
  • মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র ও অন্যান্য—অনুপম হায়াৎ।
  • বাংলাদেশের চলচ্চিত্রঃসাম্প্রতিক প্রসঙ্গ—ড.মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর হোসেন।
  • দেখাঃচলচ্চিত্র চিত্রকলা—মাহমুদুল হোসেন।
  • মিডিয়া বিচিত্র-মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর।
  • বাংলাদেশের থিয়েটার—নৃপেন্দ্র সাহা।
  • চলচ্চিত্র সম্পাদনা—ধীমানদাশগুপ্ত।
  • চলচ্চিত্রের সাথে বোঝাপড়া—বেলায়েত হোসেন মামুন।
  • সিনেওয়ালা—রুদ্র আরিফ।
  • ব্রাত্যজনের বায়োস্কোপ—জয়ন্তকুমার ঘোষ।
  • চলচ্চিত্রঃনানা প্রসঙ্গ—কবীর আনোয়ার।
  • শতবর্ষে চলচ্চিত্র—দিব্যেন্দু পালিত।
  • বাংলাদেশের সাম্প্রতিক চলচ্চিত্র—আহমুদ শরীফ।
  • বিশ্ব চলচ্চিত্রের রূপরেখা—অনুপম হায়াৎ।
  • চলচ্চিত্রের চালচিত্র-নুর উল আলম লেনিন।
  • সিনেওয়ালা-২—রুদ্র আরিফ।
  • সিনেওয়ালা-৩- রুদ্রআরিফ।
  • আওয়ার ফিল্ম দেয়ার ফিল্ম—সত্যজিৎ রায়।
  • নাট্যচিন্তা—বিজন ভট্টাচার্য।
  • চলৎ চিত্র চলে কেন—জা নেসার ওসমান।
  • স্টার্ট সাউন্ড ক্যামেরা অ্যাকশন—শচীন ভৌমিক।
  • সিনেমা সংক্রান্ত=পুর্নেন্দু পত্রী।
  • বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আলোচিত শিশু শিল্পী—আহমেদ তেপান্তর।
  • উসমান সেমবেনের চলচ্চিত্র হালা-বিধান রিবেরু।
  • বাংলাদেশের অন্য সিনেমা—সুশীল সাহা।
  • থিয়েটারের পথে—মামুনুর রশীদ।
  • চলচ্চিত্র চরিতাভিধান—বাবুল ভট্টাচার্য।
  • সিনেমার লেখা- নাজিমুদ্দীন শ্যামল।
  • কান কথা—জনি হক।
  • বাস্তবোত্তর চলচ্চিত্র—শশাঙ্ক শেখর মৃধা।
  • নাটকের আনন্দযজ্ঞে—অপুর্বকুমার কুন্ডু।
  • বিলাতী যাত্রা থেকে স্বদেশী থিয়েটার—সুবীর রায় চৌধুরী।
  • কিকরে ক্যামেরায় চোখ রাখলাম—রাজা সেন।
  • সিনেমায় নামতে হলে—মিঠুন চক্রবর্তী।
  • সত্যজিৎ রায় সিনেমা ও লেখায়—রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যয়।
  • সিনেমা অ সিনেমা—লাডলী মুখোপাধ্যয়।
  • ফিল্ম ইন ফাইভ সেকেন্ড—গিয়াম্মার্কো মিলেসী।
  • চলচ্চিত্রের ইতিহাসে নিউ থিয়েটার—পিনাকী চক্রবর্তী।
  • সিনেমা হওয়ার গল্প—দিব্যেন্দু পালিত।
  • বিশ্ব চলচ্চিত্রে চীনা প্রেক্ষাপট—এনামুল হক টুটুল।
  • টেলিভিশন প্রযোজনা—শাকিল বিন মুশতাক।
  • বাঙ্গালীর সিনেমা—আহমদ মাযহার।
  • বাংলাদেশের ডিজিটাল চলচ্চিত্র—ফাহমিদুল হক।
  • চলচ্চিত্রের খোলা জানালা—অনুপম হায়াৎ।
  • ১০ রকমের ১০০০ চলচ্চিত্র—মুম রহমান।
  • কথা চলচ্চিত্র—শাহাদুজ্জামান।
  • অভিনয়ে প্রথম পাঠ—রহমত আলী।
  • সিনেমা – মাহমুদুল হোসেন।
  • চলচ্চিত্র ভাবনা—মাহবুব আলম।
  • চলচ্চিত্র নির্মান ও পরিকল্পনা—ধীরেশ ঘোষ।
  • চলচ্চিত্র সমালোচনা—অনুপম হায়াৎ।
  • চলচ্চিত্র লেখাঃচিত্রনাট্য ও গান—তারেক মাসুদ।
  • দশটি রাজনৈতিক চলচ্চিত্র –নাদির জুনাইদ।
  • বাংলাদেশের চলচ্চিত্র চলচ্চিত্রে বাংলাদেশ—আহমেদ আমিনুল ইসলাম।
  • ডিজিটাল সিনেমা নির্মান থেকে প্রক্ষেপন—মোহাম্মদ হোসেন জেমী।
  • চলচ্চিত্রের নান্দনিকতা—হাসনাত আব্দুল হাই।
  • নিজের পায়ে নিজের পথে—ঋত্বিক কুমার ঘটক।
  • সিনেমার শিল্পরুপ—তানভীর মোকাম্মেল।
  • নাটক করতে হলে—আতাউর রহমান।
  • হরেক রকম চলচ্চিত্র—মুম রহমান।
  • মনের মানুষঃচিত্রনাট্য ও অন্যান্য প্রসঙ্গ—গৌতম ঘোষ।
  • অভিনয় শিল্পী হতে হলে—হাবীব আহসান।
  • টিভি অনুষ্ঠান নির্মান কৌশল—হাবীব আহসান।
  • চলচ্চিত্র অধ্যয়নং তপঃ –ইকবাল হোসাইন চৌধুরী।
  • প্রসংগ বাংলা চলচ্চিত্র—বেবী মওদুদ।
  • বাংলাদেশের চলচ্চিত্র- গিতিআরা নাসরিন।
  • মঞ্চ ব্যবস্থাপনা—গোলাম সরোয়ার জুয়েল।
  • চলচ্চিত্র নির্মানে নেপথ্যে কথকতা—আব্দুল্লাহ জেয়াদ।
  • দংশন চিত্রনাট্য—এস এম নুর উল আলম।
  • চলচ্চিত্র স্মৃতি ও আমি—মাসুদ উর রহমান।
  • একটি ছবির জন্ম—ফেদেরিকো ফেলেনি।
  • একেই বলে শ্যুটিং—সত্যজিৎ রায়।
  • পুরোনো ঢাকায় চলচ্চিত্র—অনুপম হায়াৎ।
  • চলচ্চিত্রযাত্রা- তারেক মাসুদ।
  • চলচ্চিত্রের সময় সময়ের চলচ্চিত্র—ফাহমিদুল হক।
  • চলচ্চিত্রের আদি থেকে বর্তমান—নুরুল ইসলাম বরিন্দী।
  • রাফকাট-মোস্তফা সরোয়ার ফারুকী।
  • জহির রায়হানের চলচ্চিত্র—অনুপম হায়াৎ।
  • চলচ্চিত্রের খুটিনাটি—হাসান আজিজুল হক।
  • বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের রূপরেখা—অনুপম হায়াৎ।
  • অভিনয় প্রসঙ্গ ও অনুসঙ্গ—মুস্তাফিজুর রহমান সৈয়দ।
  • চিত্রনাট্যকলা—অনুপম হায়াৎ।
  • ডিজিটাল মুভি মেকিং—মাহবুব আলী।
  • ডিজিটাল চলচ্চিত্র—আশরাফ শিশির।
  • চলচ্চিত্র নাটক ও সাহিত্যের অলিতে গলিতে—দিলদার হোসেন।
  • হুমায়ূন আহমেদের চলচ্চিত্র—মোমিন রহমান।
  • সিনে লয়েড—আরিফ মাহমুদ।
  • ঋত্বিক ঘটকের তিতাস একটি নদীর নাম (চিত্রনাট্য) মনিস রফিক।
  • চলচ্চিত্র তারকাদের জীবনের গল্প—আব্দুল্লাহ জেয়াদ।
  • চলচ্চিত্রচর্যা—সাজেদুল আউয়াল।
  • মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্রে নারী নির্মান—কাবেরী গায়েন।
  • টেলিভিশন নাটকের স্ক্রিপ্ট ও নির্মান—তারেক মাসুদ।
  • বাংলাদেশের চলচ্চিত্র—মুহম্মদ খসরু।

সংকলনেঃ জাজাফী

আনোয়ার পাশা ও তার সাহিত্যকর্মঃ “রাইফেল,রোটি,আওরাত”

“রাইফেল,রোটি,আওরাত” এই একটি নাম উচ্চারণের সাথে সাথে যে মানুষটির কথা মনে পড়ে তিনি আনোয়ার পাশা। সার্থক এই ঔপন্যাসিক তার উপন্যাসের ভাষায় এমন মাধুর্য আনয়ন করেন যে সেটা হয়ে ওঠে কল্পনার বাইরে বাস্তবতারই একটি দৃশ্য কল্প। বাংলা সাহিত্যের খ্যাতিমান লেখক আনোয়ার পাশার “রাইফেল,রোটি,আওরাত ঠিক সেরকমই একটি উপন্যাস। শেষ হয়েও হইলনা শেষ টাইপের উপন্যাসটায় সমাপ্তি টানা হয়েছে কিছু অভাবনীয় কথামলার সমন্বয়ে, “পুরোনো জীবন টা সেই পঁচিশের রাতেই লয় পেয়েছে। আহা তাই সত্য হোক। নতুন মানুষ, নতুন পরিচয় এবং নতুন একটি প্রভাত। সে আর কতো দূরে। বেশী দূরে হতে পারে না। মাত্র এই রাতটুকু তো! মা ভৈঃ। কেটে যাবে

গল্পকার কেবল গল্প লিখেই ক্ষান্ত হন না। তিনি বরং নিজে স্বপ্ন দেখেন এবং স্বপ্ন দেখান। লেখকের মনে আশার বাণী সেই সাথে কিছুটা সংশয়ও বটে। আশার বাণী দেখেই বুঝা যাচ্ছে যুদ্ধের ভয়াবহতা তখনো শেষ হয় নি। যে কোন ধরণের ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর সাধারনত উক্ত বিষয় নিয়ে সাহিত্যকর্ম কিংবা লেখালেখি শুরু হয়। ঘটনা চলাকালীন অবস্থায় সে ঘটনা নিয়ে সার্থক সাহিত্য তৈরী করা বেশ কঠিন। রবীঠাকুরের ভাষায়, “প্রত্যক্ষের একটা জবরদস্তি আছে – কিছু পরিমাণে তাহার শাসন কাটাইতে না পারিলে কল্পনা আপনার জায়গাটি পায় না।” এখানেই অনন্য আনোয়ার পাশা। ‘প্রত্যক্ষের জবরস্তি’র শিকার হননি তিনি, বরং সে শাসনকে পাশ কাটিয়ে তার শৈল্পিক মনটাকে ঠিক জায়গায়ই রেখেছেন। আর তার সে ‘শৈল্পিকতা’র পাশে ঠিকই জায়গা দিয়েছেন সে সময়ের ইতিহাসকে, ঘটনাপ্রবাহকে।

১৪ই ডিসেম্বর বদর বাহিনীর হাতে প্রাণ হারানো শহীদ আনোয়ার পাশার “রাইফেল, রোটি, আওরাত” – সেই কালের ঘটনাপ্রবাহের মধ্যে বসে লেখা আমাদের সমগ্র ইতিহাসে খুব সম্ভব এটাই একমাত্র উপন্যাস। এর রচনাকাল ৭১ এর এপ্রিল থেকে জুন মাস। । একটা বিষয় আমাদের মনে রাখতে হবে, যুদ্ধ পরবর্তী অবস্থায় আমাদের ইতিহাস চর্চার অবস্থা খুবই করুণ; প্রত্যেকের আমলে নিজ নিজ চাহিদা মত ইতিহাসের বিকৃতি, নিজেদেরকে সে সময়ে উল্লেখযোগ্য আসনে বসানোর বিকৃত মানসিকতা আমাদেরকে, মানে এই প্রজন্মকে শুধু ভুল ইতিহাসই শিক্ষা দেয় নি, বরং দিয়েছে ইতিহাসের প্রতি চরম অনীহা। যেহেতু বইয়ের রচনাকাল যুদ্ধচলাকালীন সময় তাই এই দিক থেকে এই বইয়কে একটা উল্লেখযোগ্য দলিল হিসেবেই ধরা যায়। সে সময়টাকে এত বাস্তবতার সাথে আর কোন উপন্যাসে কেউ তুলে ধরতে পারেন নাই, যেটা আনোয়ার পাশা করতে পেরেছেন।

লেখক নিজে যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ছিলেন, তিনি উপন্যাসের কাহিনী তাই তুলে এনেছেন বাংলাদেশের শত আন্দোলনের প্রানকেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অঞ্চল থেকেই। বইয়ের নায়ক সুদীপ্ত শাহীন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক । লেখক সুদীপ্ত শাহীন চরিত্রে প্রবেশ করে ক্রমান্বয়ে ঘটনার পর ঘটনা বর্ননা করে গেছেন। তার চোখেই আমরা দেখতে পাই আমাদের যুদ্ধটাকে। জগন্নাথ হল এবং ইকবাল হলের ভয়াবহ অবস্থাটাও আমরা দেখতে পাই তার চোখে। লাশের সারির মাঝে দাড়িয়ে বাস্তবতাকে পাশকাটানো যায়না। এই কঠিন বাস্তবতাকে অত্যন্ত নিখুত ভাবে উপস্থাপনের পান্ডিত দেখিয়েছেন আনোয়ার পাশা। এখানে যেমন অধ্যাপক গোবিন্দ চন্দ্র দেব, মুনিরুজ্জামান, ডঃ জ্যোতির্ময় গুহঠাকুরতা সহ আরো অনেক বিখ্যাত শিক্ষকদের কথা আছে তেমনি আছে ‘অধ্যাপক খালেক, মালেক ‘ এর মত চরিত্র। এই দুই চরিত্রের মাধ্যমে লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন সে সময়ের শিক্ষিত পাকিস্থানি দালালদের কথা। অবশ্য এটাও দেখিয়েছেন, এই দালালরাও পাকি বর্বরতার হাত থেকে রেহাই পায় নি।

“বাংলাদেশীরা সব হিন্দু হয়ে গিয়েছে” – এই অজুহাতে পাকিরা আমাদের উপর হামলে পড়েছিল। এর প্রমান বর্তমানে অনেক পাকিস্তানি জেনারেলদের লেখা বইপত্রে ও পাওয়া যায়। আফসোস হয় সেই সব লেখক জেনারেল পদবীধারীদের জন্য।ইতিহাসের কলংকজনক অধ্যায়ে তাদের নামটাও লেখা থাকবে। এই উপন্যাসে লেখক এই দিকটিও তুলে ধরেছেন চরম দক্ষতার সাথে। সুদীপ্তকে যখন খাকি পোশাকের জওয়ান “কুত্তা” বলে সম্বোধন করে তখন সে বলে উঠে,

‘হাম কুত্তা নেহি হ্যায়, হাম মুসলমান হ্যায়।’

‘তোম যো মুসলমান হ্যায় উ তো ভোল গিয়া।’

ক্ষণজন্মা সুলেখক আনোয়ার পাশার জন্ম ১৯২৮ সালের ১৫ এপ্রিল পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরের ডাবকাই গ্রামে। পিতা হাজী মকরম আলী। ১৯৬৬ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন এবং আমৃত্যু এখানেই কর্মরত ছিলেন। আর সব মানুষের মতই স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতেন সবসময়। এখানেই বলেছেন, “বাঙ্গালীর অস্ত্রের শক্তি আজ সীমিত হতে পারে, কিন্তু ভালোবাসার সম্পদ তো অফুরন্ত। সেই প্রীতি ভালোবাসার সঙ্গে এবার অস্ত্রের সম্মেলন হয়েছে – এবার বাঙ্গালী দুর্জয়…।” কিন্তু দুনিয়াকে যিনি পরিচালনা করেন তিনিইতো চিত্রনাট্য সাজিয়ে রেখেছেন।তার সাজানো চিত্রনাট্যকে এড়িয়ে অভিনয় করার মত কুশীলব কে আর আছে,সাধ্য কার। আর সে জন্যই আনোয়ার পাশাও তাঁর স্বপ্নের বাস্তব রূপায়ণ দেখে যেতে পারেননি । “রাইফেল, রোটি, আওরাত” – তার জীবনের শেষ বই – প্রত্যক্ষ আর সাক্ষাৎ ঘটনাবলীকে উপন্যাসে রূপ দেয়ার এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত।

একবার আমার ছোট বোন আমাকে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক কোন উপন্যাসের নাম বলতে বলেছিল, আমি নির্দ্বিধায় বলেছিলাম আনোয়ার পাশার লেখাটির কথা। নতুন কেউ যে মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে পড়া শুরু করতে চায় তাদেরকে আমি সবসময় দুটো উপন্যাসের কথাই বলব, এক, “রাইফেল – রোটি- আওরাত” আর দুই, হুমায়ূন আহমদের “জোছনা জননীর গল্প”।

………………………………………………………………………………..

১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

উত্তরা,ঢাকা-১২৩০

সৈয়দ শামসুল হকঃ পরাণের গহীন ভেতরে যার বসবাস।

বাংলা সাহিত্যের আকাশে অসংখ্য ক্ষণজন্মা সাহিত্যিকদের মাঝে একটি অনন্য নাম সৈয়দ শামসুল হক।১৯৬৬ সালে দেশ যখন আন্দোলনে টালমাটাল,বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে বছর ঐতিহাসিক ৬ দফা দাবী উপস্থাপন করলেন ঠিক একই বছর বাংলাএকাডেমী সাহিত্য পুরস্কারে ভুষিত হলেন এক উদীয়মান তরুণ।মাত্র ২৯ বছর বয়সে বাংলা একাডেমীর ইতিহাসের সবর্কনিষ্ঠ পদক বিজয়ী সাহিত্যিক হলেন আমাদের সবর্জন শ্রদ্ধেয় সৈয়দ শামসুল হক,সব্যসাচী লেখক।বাংলা সাহিত্যে তিনি যে দৃপ্তপদে হেটেছিলেন তা অক্ষুন্ন ছিল জীবনের শেষ দিন পযর্ন্ত।তার চেয়ে কম বয়সে এখনো কেউ বাংলাএকাডেমী পদক লাভ করতে পারেনি।

তিনি একাধারে কবি,ঔপন্যাসিক,নাট্যকার,কথাসাহিত্যিক হিসেবে সমান খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। বাঙ্গালী মধ্যবিত্ত সমাজের আবেগ অনুভূতি বিকার স বই খুব সহজ ভাষায় সুন্দর ভাবে তুলে ধরেছেন তিনি। আট ভাই বোনের উৎসবমুখর পরিবারের বড় সন্তান ছিলেন সৈয়দ হক।১৯৩৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় জেলা কুড়িগ্রামে এক সৈয়দ পরিবারে তার জন্ম হয়েছিল।সেদিন সৈয়দ সিদ্দিক হুসাইন ও হালিমা খাতুনের ঘর আলো করে যে শিশুটির জন্ম হয়েছিল দিনে দিনে তিনি আলোয় ভরে দিয়েছেন বাংলাসাহিত্যকে।তাই তিনি কুড়িগ্রামের সৈয়দ পরিবারের উর্ধে গিয়ে বাংলাসাহিত্য পরিবারের এক খ্যাতিমান সাহিত্যিক হিসেবে সাহিত্যাকাশে সমাসীন হয়েছেন।

সব্যসাচী এই লেখকের সাহিত্যিক জীবন শুরু হয়েছিল গল্প লিখে।যতদুর জানা যায় ১৯৫১ সালে মাত্র ১৬ বছর বয়সে ফজলে লোহানী সম্পাদিত “অগত্যা” নামে একটি সাময়ীকীতে তার প্রথম লেখা গল্প “উদয়াস্ত” প্রকাশিত হয়েছিল। তবে তারও আগে কবির যখন বয়স মাত্র বার বছর তখন তিনি আনমনেই কবিতা লিখতেন।কবির সহধর্মীনী কথাসাহিত্যিক আনোয়ারা সৈয়দ হকের ভাষ্য মতে কবি একবার টায়ফয়েডে সয্যাশায়ী ছিলেন তখন লিখেছিলেন

  “আমার ঘরে জানালার পাশে গাছ রহিয়াছে/

     তাহার উপরে দুটি লাল পাখি বসিয়া আছে” ।

সেই থেকে ক্রমে ক্রমে সাহিত্যের নানা শাখায় তার দৃপ্ত পদচারণা।তার স্কুল জীবন কেটেছে জন্মভূমি কুড়িগ্রামের মাইনর স্কুলে তার পর।যে বছর তার লেখা গল্প প্রথম প্রকাশিত হলো সেই একই বছর সেই বয়সেই তিনি মুম্বাই গিয়ে একটি চলচ্চিত্র প্রযোজনা সংস্থায় কিছুদিন কাজও করেন।ফলে এক সময় আমরা দেখতে পাই চলচ্চিত্র তথা চিত্রনাট্য রচনাতেও তিনি হয়ে ওঠেন সমান পারদর্শী।ম্যাট্টিক পরীক্ষার পর তিনি তার খাতায় প্রায় ২০০টির অধিক কবিতা লিখেছিলেন।

হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক বাবা সৈয়দ সিদ্দিক হুসাইন চেয়েছিলেন তার বড় ছেলেটি বড় হয়ে ডাক্তার হবে।তার মত হোমিওপ্যাথি ডাক্তার নয় বরং দেশজোড়া খ্যাতি হবে এমন বড় ডাক্তার।কিন্তু বাবার সেই স্বপ্ন তাকে কখনো আপ্লুত করতে পারেনি।তিনি ডাক্তার হবনা হবনা পণ করে বাড়ি থেকেই পালিয়ে বম্বে চলে গেলেন।যদি বাবার স্বপ্ন পুরনে ব্রতী হতেন তবে বাংলা সাহিত্য হয়তো সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হককে পেতো না।ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন যথেষ্ট মেধাবী।১৯৫২ সালে মুম্বাই থেকে ফিরে নিজের ইচ্ছায় ঢাকার জগন্নাথ কলেজে মানবিক বিভাগে ভর্তি হলেন।সাহিত্য তাকে কিশোর বয়সেই খুব টেনেছিল বলেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।এর পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজী বিভাগে ভর্তি হলেও শিক্ষাজীবন শেষ করতে পারেন নি। তার প্রথম প্রকাশিত উপন্যাস “দেয়ালের দেশ” যখন প্রকাশিত হল তখন তিনি তৃতীয় বর্ষের ছাত্র।সেই অবস্থায় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মায়া কাটিয়ে বেরিয়ে এলেন।

সৈয়দ শামসুল হক তার রচনায় সমসাময়িক বাংলাদেশকে তুলে ধরতে চেয়েছেন। আগের বড় লেখকেরা সকলেই গ্রামকেন্দ্রিক উপন্যাস বা গল্প লিখেছেন। সৈয়দ শামসুল হক নতুন উদীয়মান মধ্যবিত্তের কথা ভালো করে বললেন এবং মধ্যবিত্ত জীবনের বিকারকেও তিনি ধরলেন।দীর্ঘজীবনে তিনি অনেক উপন্যাস লিখেছেন। তার অনুজ এবং তরুণ লেখকেরা প্রভাবিত হয়েছেন তার লেখায়। তাদের কাছে তিনি পরিচিত ছিলেন ‘হক ভাই’ নামে।

সৈয়দ শামসুল হকেরা যুগে যুগে একবারই জন্মে। বাংলা সাহিত্যে তিনি যা দিয়েছেন তা তাকে চিরস্মরনীয় করে রাখবে। বিশ্বের অন্যান্য সাহিত্যে সাহিত্যের কলাকৌশল নিয়ে অগণিত বই আছে।আমেরিকার অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন লেখক কবি তৈরির কোর্সও করানো হয়।প্রতি বছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অগণিত তরুন কবি সাহিত্যিক সেই সব কোর্সে ভর্তি হয়ে সাহিত্যের নানাবিধ কলাকৌশল আয়ত্ব করে সাহ্যিত রচনা শুরু করে।আমাদের দেশের তরুন কবি সাহিত্যিকদের সেই ভাগ্য হয়নি আমেরিকার মত দেশে গিয়ে দীক্ষা নিয়ে আসবে।কিন্তু সৃষ্টিকর্তা এদেশের অগণিত নবীন কবি সাহিত্যিকদের জন্য মহীরুহ করে পাঠিয়েছিলেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক কে। তিনিই বাংলা সাহিত্যের প্রথম ব্যক্তি হিসেবে নবীন কবি ও সাহিত্যিকদের জন্য ধারাবাহিক ভাবে সাহিত্যের নানাবিধ কলাকৌশল নিয়ে লিখতে শুরু করলেন। তার রচিত সেই কলাম “মার্জিনে মন্তব্য” শিরোনামে বই আকারে গ্রন্থগত হয়েছে।

বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় লেখক  আনিসুল হক নিজেও সৈয়দ হকে মুগ্ধ ছিলেন, সৈয়দ শামসুল হকের প্রবন্ধ, উপন্যাস তাকেও অনেক বেশি প্রভাবিত করেছে বলে তিনি স্বীকার করেন। তিনি কেবল একজন সাহিত্যিকই ছিলেন না বরং সব কিছু ছাপিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন কবি সাহিত্যিকদের কাছে “হক ভাই”। সৈয়দ শামসুল হক কবি হিসেবেও পরবর্তী প্রজন্মের কবিদের জন্য পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছেন।

সৈয়দ হক ছিলেন অমায়িক।তার জন্মদিনে যখন কেউ তাকে মুঠোফোনে ম্যাসেজ দিত তিনি শত ব্যস্ততার মাঝেও প্রতিউত্তর দিতে ভুল করতেন না।এমনকি তিনি দেশের বাইরে থাকলে তার মুঠোফোনে তারই রেকর্ডকৃত কন্ঠ শোনা যেত,যেখানে বলা হত তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করছেন।খুব জরুরী হলে তার আর্ন্তজাতিক নাম্বারে ফোন করতে। তার বিনয় প্রকাশ পেয়েছে তার কবিতাতে।

কবি তার “এপিটাফ” কবিতায় লিখেছেন

“আমি কে তা নাইবা জানলে।

আমাকে মনে রাখবার দরকার কি আছে?

আমাকে মনে রাখবার?

বরং মনে রেখো নকল দাঁতের পাটি,

সন্ধ্যার চলচ্চিত্র আর জন্মহর জেলি।

আমি এসেছি, দেখেছি, কিন্তু জয় করতে পারিনি”।

কবি বলেছেন তিনি জয় করতে পারেন নি।কিন্তু তার অগণিত পাঠক মনে করেন সৈয়দ হক তার লেখা দিয়ে তার সাহিত্য কর্ম দিয়ে সবার হৃদয়ের মণিকোঠায় ঠাই করে নিয়েছেন।১৯৭০ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর রচিত কাব্যগ্রন্থ, বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা। আধুনিক সময়ে কোন কবির এত দীর্ঘ কবিতা বেশ বিরল। তার এই কাব্যগ্রন্থের কারণে তিনি তখন আদমজী পুরস্কার লাভ করেন।

তার আরেক বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘পরানের গহীন ভিতর’ দিয়ে তিনি তাঁর কবিতায় আঞ্চলিক ভাষাকে উপস্থাপন করেছেন।আঞ্চলিক ভাষায় কবিতা লেখা যায় কিংবা সেটা জনপ্রিয়তা পায় তার প্রমান রেখে গেছেন সৈয়দ হক। আবৃত্তিশিল্পীদের কাছে আবৃত্তির জন্য কবিতার তালিকা চাইলে দেখা যায় অবধারিত ভাবেই তার পরাণের গহীন ভিতর অবশ্যই তালিকাতে আছে।

কবিতায় তার ধারাবাহিকভাবে যে অবদান তা বাংলা সাহিত্যের অমূল্য সম্পদ। সৈয়দ হককে অনুসরণ করে পরবর্তী কবিরা বা তার পরবর্তী কালের কবিরা আঞ্চলিক ভাষায় কবিতা লেখার চেষ্টা করেছেন। তার ‘খেলারাম খেলে যা’ অনুকরণ করে আমাদের কথাসাহিত্যিকেরা লিখেছেন। বাংলা সাহিত্যে সৈয়দ হকের অবদানকে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই।সৈয়দ শামসুল হকের কর্ম জীবনও ছিল বৈচিত্রময়। তার কর্মজীবনের প্রায় সাত বছর তিনি কাটিয়েছেন লন্ডনে বিবিসি বাংলা বিভাগের সাথে। ১৯৭১ সালে দেশ যখন স্বাধীনতার মুলমন্ত্রে ঐক্যবদ্ধ হয়ে হানাদার বাহিনীকে রুখে দিচ্ছে তখন তিনি বিবিসি বাংলা থেকে সেই সংবাদ বিশ্বকে জানিয়েছেন অকুন্ঠচিত্তে।

নাট্যকার হিসেবেও সৈয়দ শামসুল হক ছিলেন দারুণ সফল। বিশেষ করে তাঁর রচিত দুটি কাব্যনাট্য ‘নুরলদিনের সারাজীবন’ এবং ‘পায়ের আওয়াজ পাওয়া যায়’ বাংলা নাটকে একটি বিশেষ স্থান দখল করে রয়েছে। তার যে শব্দের ব্যবহার, রূপকল্প, কাব্যময়তা এবং তার সঙ্গে সঙ্গে নাটকের যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত এই সমস্ত কিছু তিনি যেভাবে ধারণ করেছেন বাংলা নাটকে এই ঘটনা আর কেউ ঘটাতে পেরেছে বলে মনে করেন না অগণিত বোদ্ধা সমালোচক ও পাঠক এমনকি তার রচিত নাটকের অনেক অভিনেতাও তাই মনে করেন।

শিল্পক্ষেত্রে সৈয়দ শামসুল হকের অবদান শুধু নাটকেই সীমাবদ্ধ নয়, তিনি চলচ্চিত্রের চিত্রনাট্য লিখেছেন, এমনকি চলচ্চিত্রের জন্য গানও রচনা করেছেন। পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। তাঁর রচিত ‘হায়রে মানুষ, রঙ্গিন ফানুস’ গানটি এখনো মানুষের মুখে মুখে ফেরে।বাংলা সাহিত্যিকদের মধ্যে সাহিত্যের নানাবিধ খুটিনাটি নিয়ে প্রথম লেখা লিখেছেন সৈয়দ হক। সৈয়দ শামসুল হক ভাষার ব্যবহার নিয়ে লিখেছেন ‘হৃৎকলমের টানে’ বা ‘কথা সামান্যই’ এগুলো  বাংলা সাহিত্যানুরাগীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তিনি একইসঙ্গে একজন সৃষ্টিশীল লেখক এবং ভাষার ব্যবহারে ছিলেন অত্যন্ত সচেতন।

যুগে যুগে অনেক কবি সাহিত্যিক সীমানার ওপারে চলে গেছে।চলে যাওয়ার কিছুদিন বাদেই তারা মানুষের মন থেকেও মুছে গেছে।কিন্তু সৈয়দ হক সেই মানের লেখক ও কবি ছিলেন যাদের দেহান্তর হলেও মানুষের মনে তারা দীর্ঘস্থায়ী আসন তৈরি করে রেখে গেছেন। যে লেখক শিল্প সাহিত্যের প্রায় সব শাখাতে সমান পারদর্শিতা দেখিয়েছেন তাকে বাংলা সাহিত্যপ্রেমীরা ভুলে যেতে পারবেনা। বলা যেতে পারে তিনি যদি সারা জীবনে মাত্র দুটো বই লিখতেন “পরাণের গহীন ভেতর” কিংবা “বৈশাখে রচিত পঙক্তিমালা” তাহলেও তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকতেন। তার রচিত কাব্যনাট্য “নুরুলদিনের সারাজীবন” কিংবা “পায়েল আওয়াজ পাওয়া যায়” তাকে বাংলা সাহিত্যের আকাশে স্থায়ী আসন করে দিয়েছে। তিনি ছিলেন সেই তারা যে ডুবে যেতে যেতেও আলো দিয়ে যায়। দীর্ঘদিন অসুস্থ অবস্থায় তিনি যখন দেশের বাইরে উন্নত চিকিৎসা নিচ্ছিলেন তখন জানতে পেরেছিলেন তার অবস্থার খুব বেশি উন্নতি হবেনা।তখন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন দেশের মাটিতে ফিরে যাবেন।পরাণের গহীণ ভেতর দেশের জন্য দেশের মাটিও মানুষের জন্য তার ছিল টান।তিনি হাসপাতালের বেডে বসে জীবনের শেষ দিন পযর্ন্ত  অবিরাম লিখে গেছেন।বাংলা সাহিত্যকে করে গেছেন সমৃদ্ধ।

তার কবিতায় ছিল প্রেম ছিল ছিল ভাষার প্রতি মমতা।তাইতো তিনি আঞ্চলিক ভাষা তুলে এনেছেন তার অগণিত কবিতায়। তিনি লিখেছেন

“কি আছে তোমার দ্যাশে? নদী আছে? আছে নাকি ঘর?

ঘরের ভিতরে আছে পরানের নিকটে যে থাকে?”

অগণিত ভক্তকুলের পরানের নিকটে তিনি আছেন এবং চিরকাল থাকবেন।শুধু আক্ষেপ এই যে আর কোন দিন বাংলাএকাডেমীর সবুজ চত্বরে তার পদধুলী পড়বেনা। আর কোন দিন সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে বসা একুশে বই মেলাতে তাকে পায়চারি করতে দেখা যাবেনা।নজরুল মঞ্চে আর কোন দিন নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচনে দেখা যাবেন আলোর সারথীকে।সৈয়দ শামসুল হকের কলম এখন থেমে গেছে, কিন্তু তিনি যে ভবিষ্যৎ লেখকদের-কবিদের-নাট্যকারদের অনুপ্রাণিত করবেন, পথ দেখাবেন তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। তার রচিত “নিষিদ্ধ লোবান” উপন্যাসটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছিল ১৯৯০ সালে। পরবর্তীতে সেটা নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে এবং দর্শকপ্রিয় হয়েছে। তিনি মৌলিক রচনার পাশাপাশি অনুবাদেও সিদ্ধহস্ত ছিলেন। ম্যাকবেথ,টেম্পেষ্ট,শ্রাবণ রাজা তার উল্লেখযোগ্য অনুবাদ কর্ম।

বাংলা সাহিত্যের এই ক্ষণজন্মা সব্যসাচী লেখক তার অগণিত সাহিত্য কর্মের স্বীকৃতি স্বরুপ দেশের প্রায় সব বড় পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। ১৯৬৬ সালে সবর্কনিষ্ঠ সাহিত্যিক হিসেবে তিনি পেয়েছিলেন বাংলা একাডেমী পুরস্কার। সেই পথচলায় আরো যোগ হয়েছে আদমজী সাহিত্য পুরস্কার(১৯৬৯),অলক্ত স্বর্ণপদক(১৯৮২),আলাওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৩),নাসিরুদ্দীন স্বর্ণপদক (১৯৯০) এবং ১৯৮৪ সালে দেশের সবর্চ্চো সম্মান একুশে পদকে ভুষিত হয়েছেন এই খ্যাতিমান সাহিত্যিক।একই সাথে তিনি চিত্রনাট্য,সংলাপ ও গীতিকার হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভুষিত হয়েছেন।এছাড়াও তার প্রাপ্তির খাতায় আরো অগণিত পুরস্কার রয়েছে। প্রতি বছর ২৭ সেপ্টম্বর এলে আমাদের হৃদয় তার শুন্যতায় হাহাকার করে উঠবে।তিনি আমাদের মাঝে না থেকেও থাকবেন অনন্তকাল।যতদিন বাংলা সাহিত্য থাকবে ততোদিন তার পায়ের পাওয়াজ পাওয়া যাবে। তিনিইতো দেখিয়েছেন নুরুলদীনের সারাজীবন।তিনি আছেন পরাণের গহীন ভেতর।

জাজাফী

২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬

ইমেইলঃ [email protected]

দিনবদলের সাক্ষী

জীবিত থেকেও মানুষ একা হয়ে যেতে পারে বাহার সাহেব হঠাৎই সেটা অনুভব করলেন।মৃত্যুর পর যেমন তার কোন সঙ্গী থাকেনা অনেকটা সেরকম।বাহার সাহেব বেশ বড় রকম হোচট খেলেন।তার পাশে এখন কেউ নেই।একবার মনে হলো চিমটি কেটে দেখবেন তিনি আসলে বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন।মৃত্যুর কয়েক ঘন্টা পরই সবাই বিদায় জানায়।বাহার সাহেবকেও সবাই বিদায় জানিয়েছে।তিনি এখন একা অথচ তিনি বেঁচে আছেন এটাই আশ্চর্যের বিষয়।

মনে পড়ে মাত্র কদিন আগেও চারপাশে এতো মানুষ ভীড় করতো যে দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার দশা। তিনি হিসাব মেলাতে চেষ্টা করেন।সেই সব দিনগুলিতে তার যাকিছু ছিলো এখনো তার সবটাই আছে শুধু মানুষ গুলো নেই।সেই দামী গাড়িটা এখনো আছে,মুখের হাসি,কথা বলার ভঙ্গি,মাঝে মাঝে বাংলার সাথে অদ্ভুত রকম ইংরেজী মিশিয়ে কথা বলার কোনটাই তিনি ছেড়ে দেন নাই।অথচ তাকে নিয়ে কোন মাতামাতি নেই।

কদিন আগে পান থেকে চুন খসলেই বাহার সাহেবকে নিয়ে আলোচনার ঝড় উঠতো আর এখন টু শব্দটিও শোনা যায় না।একই মানুষ একই পরিবেশ কিন্তু চিত্রনাট্য আলাদা।শুধু মাত্র নির্ধারিত চেয়ারটিতে তিনি এখন আর বসেন না বলেই তার এখন আর কোন মূল্য নেই।

বাদাম খেয়ে যেমন সবাই খোসা ফেলে দেয়,কলা খেয়ে ছোবড়াটা যেমন ফেলে দেয় তিনিও তেমনই।একার্থে তাকেও ফেলে দেওয়া হয়েছে।বিমানবন্দরে সী অফ করতে যেমন কেউ আসেনি তেমনি বিমান থেকে অবতরণের পরও তাকে রিসিভ করতে তেমন কেউ আসেনি।অথচ কদিন আগেও তার আগমনে চারদিকে রব পড়ে যেতো।শহরের দেয়ালে দেয়ালে রঙ্গীন পোষ্টার ছেয়ে যেতো।মোড়ে মোড়ে নির্মিত হতো তোরণ। …….

অগল্পঃ দিনবদলের সাক্ষী
–জাজাফী

আরও পড়ুনঃ

আমি কিছু লিখিনি

0

নভেম্বরের ২৭ তারিখ বিকেলে হঠাৎ বদরুলের ফোন।ও সাধারণত আমাকে খুব একটা ফোন করেনা।সারাক্ষণই নিজেকে নিয়ে তামাশা করে,ছোট বলে খোটা দেয়।অথচ বন্ধুদের মধ্যে সেই সব থেকে সফল।

বিশাল একটা ব্যবসা তার।হাজার খানেক কর্মী অনবরত কাজ করে চলেছে।প্রতিদিন অনেক লাভ করছে।আর আমরাতো সবাই লবডঙ্কা। তার পরও তার একই কথা তোদের মত আইবিএ থেকে পড়িনি বলে জীবনে কিছুই হইতে পারলাম না।সেই বদরুল যখন ফোন করে বললো দোস্ত দারুণ একটা ব্যপারে তোর সাথে কথা বলতে চাই। আমি বললাম কি কথা বলে ফেল। সে বললো আরে ফোনে বলা যাবে না।এটা একটা এক্সাইটিং ব্যাপার।তোর সাথে দেখা করেই বলতে চাই।যেহেতু দেখা করতে চায় তাই বদরুলকে বললাম এক কাজ কর আমার বাসায় চলে আয়।বাসায় আসতে বললাম এ জন্য যে আগেরবারের মত রাস্তায় দাড়িয়ে সিঙ্গাড়া সমুচা যেন খেতে না হয়।

বদরুল কিছুক্ষণ ভাবলো।তার পর বললো নারে দোস্ত বাসায় আসা যাবে না।তারচেয়ে বরং তুই ধানমন্ডি লেকে চলে আয় আমরা ওখানে হাটতে হাটতে কথা বলি।আমি সুযোগ বুঝে খোচা মেরে বললাম তোর মত কোটিপতি ধানমন্ডি লেকের রাস্তায় হাটবে দেখতে কেমন লাগবে না? সে হো হো করে হেসে উঠে বললো ইয়ার্কি করিস না।ওকে বললাম ঠিক আছে আসতেছি।তারপর যথারীতি গিয়ে হাজির হলাম।হাটতে হাটতে ওর সাথে নানা বিষয়ে কথা বললাম কিন্তু ও আসল কথা বলেই না।আমি বললাম দোস্ত এবারতো আসল কাহিনী বল।যে কারণে তুই আমাকে ডেকেছিস।সে বললো দোস্ত ভালো খবর বলার আগে আয় তোরে কিছু খাওয়াই।ও যখন বললো আয় তোরে কিছু খাওয়াই তখনই সব গুবলেট হয়ে গেলো।এখানেতো খাওয়ার তেমন কিছু নেই।

একটু দূরেই একটা ছেলে সিঙ্গাড়া সমুচা বিক্রি করছে তাকে ডাকলো!আমি বললাম শালা তুইতো মহা ধান্দাবাজ।এখানেও ব্যবসা করতেছিস?বন্ধুকে খাওয়াবি সেখানেও ব্যবসা। এই সিঙ্গাড়া সমুচাও নিশ্চই তোর কোম্পানী ডেলিভারি দিছে?সে মুচকি হেসে বললো কী জানি।ছেলেটা কাছে আসতেই ও সিঙ্গাড়া সমুচা দিতে বললো।আমি জানতে চাইলাম এই সিঙ্গাড়া সমুচা কি তুমি বাসায় বানিয়েছ না কিনেছ? ছেলেটা এক গাল হেসে দিয়ে বললো সার কি যে কন। বানামু ক্যান। এইডা অইলো গিয়া টিসির বিখ্যাত সিঙ্গাড়া সমুচা। নামতো সুনাই হোগা?

ছেলেটার বাংলা হিন্দি মিলিয়ে কথা বলা বেশ মজাই লাগলো।টিএসসি বলতে না পেরে সে টিসি বলেছে।হাসি পাচ্ছিল খুব।আমি সিঙ্গাড়া খেতে খেতে বদরুলকে বললাম তোর ব্যবসাতো ভালো চলছে।তাহলে তুই অন্য কিছু না খাইয়ে এটাই কেন খাওয়াচ্ছিস?সে বললো আরে দোস্ত যারা আমার জন্য লাভের বন্দোবস্ত করেছে তাদেরকে হেল্প করা আমার দায়িত্ব। নিজের পণ্য যদি নিজেই না কিনি তবে কে কিনবে?আর কথা বাড়ালাম না। বললাম এবার আসল কথা বল যেটা বলার জন্য ডেকেছিস। বদরুল একটু থামলো তার পর বললো দোস্ত বই লিখেছি! এবারের বই মেলায় বই বের হচ্ছে।

বদরুলের বই বের হচ্ছে শুনে আমি আরো অবাক হলাম।সে কবে বই লিখতে শুরু করলো বুঝলাম না।বললাম কি বই?সিঙ্গাড়া বিক্রি করে কোটিপতি কিভাবে হলাম টাইপের বই না অন্য কিছু?বদরুল বললো শোন টিটকারী মারিস না।আইবিএতে পড়িনি বলে কি আমরা বই লিখতে পারি না?আমি রাগ দেখিয়ে বললাম বদরুল ভালো হবেনা বললাম।বার বার আইবিএ আইবিএ করে খোটা দিবি না। আইবিএতে পড়লে মানুষ মহাজ্ঞানী হয়ে যায় না।কি বই লিখেছিস সেটা বল।তাছাড়া হঠাৎ বই লিখতে গেলি কেন?বদরুল বললো এটা এমন একটা বই যাকে তুই কোন বিশেষণে বিশেষিত করতে পারবি না।মানুষ কবিতা লেখে বই হয় কবিতার,গল্প লেখে বই হয় গল্পের,উপন্যাস লেখে বই হয় উপন্যাসের,ভ্রমনকাহিনী লেখে বই হয় ভ্রমনকাহিনীর,উপদেশমূলক বই লেখে বই হয় উপদেশবাণী কিন্তু আমার এই বইয়েতো এসবের সবই আছে এবং আরো নানা বিষয় আছে।তাই বিশেষণে বিশেষায়িত করার উপায় নেই।এই দায়িত্ব বাংলা ভাষার পন্ডিতদের কিংবা তোদের মত আইবিএর ছাত্র ছাত্রীদের।

আমি বললাম বদরুল তোর যে মারাত্মক একটা রোগ হয়েছে তুই জানিস?বদরুল রেগে গিয়ে বললো কি বলিস এসব? আমার রোগ হলে আমি জানবো না?মারাত্মক রোগ মানে তো এইডস।আমিতো এমন কিছু করিনি যার জন্য এটা হবে!আমি বললাম গাধা সে বললো হতেও পারে!আমি বললাম তুই খাজ কাটার গল্পটা জানিস? বদরুল কিছুটা ভাবলো তার পর বললো হ্যা ওই যে এক ছাত্রকে যে রচনাই লিখতে দিক না কেন সে সেটাতে কুমির টেনে আনতো এবং কুমিরের লেজে খাজ কাটা খাজকাটা এটা লিখে পৃষ্ঠা ভরাতো।তার পর তাকে পলাশীর যুদ্ধের রচনা লিখতে বলা হলো সে সেখানেও কুমির নিয়ে আসলো আর খাজকাটা খাজকাটা ব্যবহার করলো।আমি বললাম হ্যা ঠিক এরকমই হয়েছে তোর দশা।তুইও কথায় কথায় আইবিএ আইবিএ টেনে আনছিস।বদরুল আমার কথায় মর্মাহত হলো বলে মনে হলো।বললো দোস্ত স্যরি।তোদের মত আইবিএতে পড়িনি বলে কোন কিছুই মনে থাকে না।আমি বললাম এই যে আবার তুই আইবিএ নিয়ে টানাটানি করতেছিস।

যাই হোক বদরুলের সাথে কথা হলো ওর বই নিয়ে।বইয়ের কন্টেন্ট নিয়ে।আমি বললাম বদরুলরে তোর ভবিষ্যত উজ্জল।তোকে মানুষ চিনবে।যদিও অলরেডি তোর কোটিপতি হওয়ার গল্প সবাই জানে এবং তোকে চেনে কিন্তু এবার তোকে আরো চিনবে।আমি বললাম বলতো বাংলাদেশের বড় কিছু সেলিব্রেটির নাম। ও বললো সাকিব আল হাসান,আনিসুল হক,মাশরাফী, শাকিব খান।আমি মাথা নেড়ে বললাম আরে ওনারাও সেলিব্রেটি তবে তুই ওনাদের চেয়েও বড় সেলিব্রেটি হবি যাদের কথা মানুষ রোজ বলবে আলোচনা হবে।ও আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলো এমন দু চারজন সেলিব্রেটির নাম বল শুনি যাদের নিয়ে রোজ আলোচনা হয়। আমি বললাম এই ধর গিয়া সেফু দা,হিরো আলম,এটিএন বাংলার মাহফুজুর রহমান কিংবা প্রখ্যাত ভার্স্কযশিল্পী মৃনাল হক।তুই হবি এই তালিকার নতুন সদস্য।

আমার কথা শুনে বদরুল ভীষণ রেগে গেলো।বললো তোদের মত আইবিএতে পড়িনি বলে এভাবে আমাকে ছোট করবি? আমি বললাম শোন তোকে ছোট করিনি।যাদের কথা বললাম তারা প্রত্যেকেই নিজেদের গুনে বিখ্যাত।আরেকটা কথা তালিকায় একটা নাম বলতে ভুলে গেছি তিনি কেকা ফেরদৌস।আচ্ছা শোন তোর ওই সিঙ্গাড়া সমুচায় কিন্তু কেকা ফেরদৌসীর ভার্সন আনতে পারিস। মানে নুডুলসের পুর ভরে দিতে পারিস।সেটাও চমৎকার হবে।আর যদি তুই কখনো কোন রেস্টুরেন্ট টাইপের কিছু দিস তবে সেটাতে মিউজিক সিস্টেম রাখবি। আগত ভোজনরসিকেরা নুডুলসের পুর ভর্তি সিঙ্গাড়া সমুচা খেতে খেতে মাহফুজুর রহমানের গান শুনবে।আর হ্যা রেস্টুরেন্টের ডিজাইনের ক্ষেত্রে তুই যাকেই পছন্দ করিস না কেন গেটের বাইরে অবশ্যই তোর একটা ভাস্কর্য স্থাপন করবি।দায়িত্ব কাকে দিতে হবে আশা করি তোকে বলে দিতে হবে না।

আমার কথা শুনে বদরুল যেন থ হয়ে গেলো এবং কিছুসময় কথা বলতেই ভুলে গেলো।ভুলে গেলো বলেই ওর কাছ থেকে বার কয়েক একটি কথা শোনা হলো না।আবার যখন কথা শুরু করবে সেই কথাটা নিশ্চই বলবে।বুঝতে পারছেন কোন কথা?বদরুলকে বললাম দোস্ত আরেকটা কথা।তোর এই সব সাফল্যে সাংবাদিকেরা তোকে প্রশ্ন করবে কেন এটা করছেন তখন তুই অবশ্যই বলবি এই মনে করেন খুশিতে ভাল্লাগে ঠেলায় ঘোরতে!আর কেউ কেউতো তোকে দেখে হিংসে করবে তখন তুই ফেসবুক লাইভে এসে বলবি কি আমার মত হতে চাও? তবে সিঙ্গাড়া সমুচা বিক্রি করো,কি হিংসে হয়? এবার বদরুল আমাকে থামিয়ে দিলো।বললো দোস্ত তুই তখন থেকে যা খুশি বলে যাচ্ছিস আর নয়।আমি আইবিএতে পড়িনি বলে এমন করে খোচা দিবি না।ওর কথা শুনে আমিও একবার স্যরি বললাম।আমি জানি বদরুলের এই অভ্যাস যাবে না।ও বললো দোস্ত কাজের কথায় আসি বইতো প্রকাশ পাচ্ছে এখন বিক্রি বাড়াবো কি করে বুদ্ধি দে!আমি বললাম বদরুল তুই এটা কি বলিস?তুই নিজের বুদ্ধিতেই আজ এতো বড় হয়েছিস,মার্কেটিং বিষয়ে আমার চেয়ে অবশ্যই তোর জ্ঞান অনেক বেশি এটা তুই মানিস বা না মানিস।

সেদিনের মত আর কোন কথা হলো না।বদরুলের সাথে পরে কথাও হলো কয়েকদিন। কি চিন্তা করেছে জানতে চাইলে সে বললো না। শুধু বললো নিজের টাকা খরচ করে বই বের করেছি ১০ হাজার কপি।আমার চিন্তা হলো একদিনেই বিক্রি করে ফেলবো।তুই শুধু ২১ ফেব্রুয়ারিতে মেলায় আসিস দেখবি।আমি বললাম একুশে ফেব্রুয়ারিতেই কেন? ও বললো সেদিনই সব থেকে বেশি ভীড় থাকবে।বই বিক্রিও বাড়বে।আমি অপেক্ষায় থাকলাম বদরুলের টেকনিক কি হবে জানার জন্য। অবশেষে আসলো সেই একুশে ফেব্রুয়ারি।

কোথাও বদরুলের টিকিটির দেখা নেই।স্টলে গিয়ে ওর লেখা বইটি দেখেছি তেমন কেউ আগ্রহ দেখাচ্ছে না।প্রকাশকও বেশ বিরক্ত।এমন সময় মাইকে একটি কন্ঠস্বর ভেসে আসলো।কন্ঠ শুনেই চিনলাম এটা বদরুল।ও বলছে আমি বদরুল বলছি।কোটিপতি বদরুল।নামতো সুনাই হোগা।সারা ঢাকা শহরের অলিতে গলিতে আপনারা যে সিঙ্গাড়া সমুচা খাচ্ছেন সব আমার কোম্পানীর। এবার মেলার প্যাভিলিয়ন ২৭ এ আমার লেখা বই “আমি কিছু লিখিনি” পাওয়া যাচ্ছে।আধাঘন্টার মধ্যে আপনারা যদি আমার বই না কেনেন তবে বাংলা একাডেমীর ছাদ থেকে লাফিয়ে আমি আত্মহত্যা করবো।

বদরুলের এই ঘোষণা শুনে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম।কী টেকনিকরে বাবা। কিন্তু কতটা কাজ করবে তাতো জানি না।দেখলাম সমবেদনা জানিয়ে হোক আর অন্য যে কোন কারণে হোক প্যাভিলিয়ন ২৭ এ ভীড় বাড়তে লাগলো এবং বিক্রি হতে শুরু করলো।যে বইটা কেউ ছুয়ে দেখছিলো না সেই “আমি কিছু লিখিনি” দেদারছে বিক্রি হতে লাগলো।ওদিকে পুলিশ আইনশৃঙ্খলাবাহিনীও বসে নেই।ফায়ারসার্ভিসের তিনটা ইউনিট চলে এসেছে।টিভি চ্যানেলের লোকেরা লাইভ দেখাতে শুরু করেছে কিন্তু বদরুলকে ফুটেজে আনা যাচ্ছে না।বাংলা একাডেমী ভবনের ছাদের দরজা বন্ধ।বদরুল নিশ্চই ভিতর থেকে বন্ধ করে দিয়েছে।ফায়ার সার্ভিসের লোকেরা বিল্ডিং এর চারদিকে জাল পেতে দিয়েছে যেন লাফ দিয়ে নিচে পড়লেও বদরুল বেঁচে যায়।এবার দরজা ভেঙ্গে ছাদে গিয়ে দেখা গেলো সেখানে বদরুলতো দূরের কথা কোন মানুষই নেই।একটা টেপ রেকর্ডার বাজছে যার সাথে একটি শক্তিশালী মাইকের কানেকশান লাগানো।

সবাই হতাশ হয়ে নিচে নেমে আসলো এবং বদরুলকে গালি দিতে লাগলো।আমি ভাবলাম বন্ধুর লেখা বই এক কপি না কিনলে কেমন দেখায়।প্যাভিলিয়ন ২৭ এ গিয়ে হাজির হলাম। তখনো অনেক ভীড়।ভীড় ঠেলে সামনে গিয়ে সেলস ম্যানকে বললাম ভাই “আমি কিছু লিখিনি” বইটির একটি কপি দিন। তিনি জানালেন বইটা আগেই শেষ হয়ে গেছে। আমরা মাত্র ১০ হাজার কপি প্রিন্ট করেছিলাম সব শেষ।কাল আসেন পাবেন।

বদরুলের নামে ওয়ারেন্ট জারি হলো কেননা একুশে বইমেলার মত যায়গায় সে এমন একটা বাজে নাটক করেছে সবাইকে ভয় পাইয়ে দিয়েছে,শান্তি বিনষ্ঠ করেছে।কিন্তু বদরুলের কিছুই হলো না।আদালতে প্রমান হলো বদরুল সেদিন বাংলাদেশেই ছিলো না।সে একটি বিজনেস সামিটে যোগ দিতে কুয়ালালামপুরে ছিলো।বদরুলের সাথে দেখা হলে জানা যাবে কিভাবে কি ঘটেছিল।

গল্পঃ কোটিপতির লেখা বই “আমি কিছু লিখিনি”
লেখাঃ জাজাফী
৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

মমতার বন্ধন

0

শীতের বিকেল।আকাশের সুর্য যে রোদ ছড়াচ্ছে তা উষ্ণতার জন্য যথেষ্ট নয়।বিশেষ করে কক্সবাজারের আবহাওয়াটাও অন্যরকম।আমার বন্ধু উইলহেমের আমন্ত্রনে ঢাকা থেকে আরও তিনজন বন্ধুকে সাথে নিয়ে পৌছেছি কক্সবাজারে।অন্য তিন বন্ধুর একজন কানাডিয়ান,একজন ইন্ডিয়ান এবং একজন রাশিয়ান।স্কুল লেভেলে আমরা ফিফথ গ্রেড পযর্ন্ত একসাথে পড়েছি ম্যানহাটন জুনিয়র হাইস্কুলে।তার পর আমি ফিরে এলাম মাতৃভূমিতে আর ওরা থেকে গেলো।তবে পরবর্তীতে ওদের অনেকেই নিজ নিজ দেশে ফিরে গেলো।কিন্তু বিধিলিপিতে যা লেখা আছে তা খন্ডাবার সাধ্য মানুষের নেই।গ্রহ নক্ষত্রের মত আবর্তিত হতে হতে আমরা আবার মিলিত হয়েছি।উইলহেম ম্যানহাটনে থেকে গেলেও আমি,গ্রেগর,রুদ্রনীল আর মায়োকভস্কি পরিবারের সাথে পাড়ি জমিয়েছি মাতৃভূমিতে।আমাদের মধ্যে তবুও যোগাযোগ ছিলো সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যানে।আমরা কথা দিয়েছিলাম আজীবন বন্ধু থাকবো যেখানেই থাকি না কেন।সেই কথা আজও অব্দি রাখতে চেষ্টা করেছি।

ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে আমি মেইল করেছিলাম গ্রেগর,রুদ্রনীল আর মায়োকভস্কিকে।সেই সাথে মেইল করেছিলাম উইলহেমকেও।সেই মেইলে ওদের আমন্ত্রন জানিয়েছিলাম ফেব্রুয়ারি জুড়ে বাংলা একাডেমীতে হওয়া বইমেলার সৌন্দর্য দেখার জন্য।বলেছিলাম প্রতি বছর একুশ ফেব্রুয়ারিতে যে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালিত হয় সেটির সুতিকাগার এই সোনার বাংলাদেশের জাতীয় শহিদ মিনারে খালি পায়ে শ্রদ্ধা জানানো লাখো জনতার ভীড় দেখতে,প্রভাত ফেরী দেখতে। আমি ভেবেছিলাম ওরা তেমন আগ্রহ দেখাবে না।কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে এক এক করে সবাই মেইলের উত্তর দিয়েছিল এবং জানিয়েছিল ওরা আসবে।শুধু উইলহেম লিখেছিল পরে জানাবে।উইলহেমের বিষয়টা আলাদা।সে আসবে কি আসবে না সেটা আমি ধরে রাখিনি।ষোল বছর বয়স থেকেই সে জাতিসংঘের নানা কার্যক্রমে যুক্ত থাকায় সারা বছরই কোন না কোন কাজে ব্যস্ত থাকে।

বয়স বাড়ার সাথে সাথে তার কাজও নিশ্চই অনেক বেড়েছে। সে সেই সব ব্যস্ততা কাটিয়ে একুশে বইমেলা দেখতে আসবে আর একুশে ফেব্রুয়ারির প্রভাতফেরীতে যোগ দিবে আমি সেটা আশাও করিনি।তবে অন্যরা যখন মেইল পেয়ে উচ্ছাস প্রকাশ করে বলেছে আসবে তখন আমি নিশ্চিত তারা আসবেই।রুদ্রনীলতো আমাদের পাশের দেশেই থাকে।ইন্ডিয়া থেকে আসতে তার খুব একটা বেগ পেতে হবে না।ভাবছিলাম গ্রেগর আর মায়োকোভস্কির কথা।বিশেষ করে মায়োকোভস্কি আসবে রাশিয়ার উইলিয়ানোভস্ক শহর থেকে।উইলিয়ানোভস্ক শহরটি রাশিয়ার রাজধানী মস্কো থেকেও ৮৯৩ কিলোমিটার পুর্বে ভলগা নদীর তীরে।এই শহরেই জন্ম নিয়েছিলেন ভ্লাদিমির লেনিন।এতোটা দূর থেকে জার্নি করে আসতে ওর নিশ্চই কষ্ট হবে।আমি এসব কথা ওদের জানাতেই ওরা আমাকে নিশ্চিত করে জানালো এই উইন্টারে বাংলাদেশ ভ্রমনের এই সুযোগের মত আনন্দের আর কিছু থাকতে পারেনা।একই সাথে অনেক কিছু হবে।বন্ধুরা মিলে দীর্ঘ চৌদ্দ বছর পর আড্ডা হবে সেই সাথে বইমেলা এবং প্রভাতফেরী দেখা হবে।

আমি আমার বাল্যবন্ধুদের উৎসাহে ভীষণ পুলকিত হলাম।আমার কাঁধে তখন অনেক গুলো দায়িত্ব।ভাবছি ওদেরকে কি আমার বাসায় রাখবো নাকি হোটেলে?এটি নিয়ে আমরা গ্রুপে আলোচনা করলাম।ওরা জানালো ওরা আমার বাসাতে থাকতেই বেশি আগ্রহী।মাম্মামকে কথাটা বলতেই সেও বললো বেশতো বন্ধুরা আসুক।ওদের সাথে আমারওতো চৌদ্দ বছর দেখা হয়নি।দারুন হবে।সেদিন থেকেই দিনক্ষণ গুনতে লাগলাম।বার বার শুধু উইলহেমের কথা মনে পড়ছিল।সত্যিই ও যদি আসতো আরো ভালো হতো।ম্যানহাটন জুনিয়র হাইস্কুলে পড়াকালীন সময়ে আমরা সব থেকে বেশি আড্ডা দিতাম উইলহেমের বাসায়।ওর বাবা মা আমাদের দারুণ পছন্দ করতো।আর আমরা পছন্দ করতাম ওর বোন রসি উইলহেমকে।তখন সে নাইনথ গ্রেডে পড়তো আর আমরা ফিফথ গ্রেডে।কিন্তু বাবা মা না থাকলে সে আমাদের বেবীসিটার হতো।তবে খুব আদর করতো।

দিনক্ষণ ঠিক হলো।উইলহেম কিছুই জানায়নি তবে অন্যরা জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে ঢাকায় পৌছাবে।থাকবে পুরো ফেব্রুয়ারি জুড়ে।আমাকে বলে দিলো এই এক মাস কি কি করা হবে তার একটি তালিকা তৈরি করতে।আমি পরিকল্পনা করতে শুরু করলাম।বইমেলায় ঘুরতে যাওয়া,শহিদ মিনার,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ অন্যান্য যায়গায় ঘুরতে যাওয়া।মাম্মাম বললো ওদেরকে বিশ্বের সব থেকে বড় সমুদ্রসৈকতটাও দেখিয়ে নিয়ে আয়।সুতরাং আমি তালিকাতে যুক্ত করলাম কক্সবাজারের নাম।২৯ জানুয়ারি ঢাকায় এসে পৌছালো গ্রেগর আর রুদ্রনীল।ওদেরকে এয়ারপোর্টে গিয়ে রিসিভ করে সোজা বাসায় নিয়ে এলাম।উত্তরার তিন নাম্বার সেক্টরের বার নাম্বার রোডে আমাদের বাসা।

নিরিবিলি সিমসাম বাসা।৩৪০০ স্কয়ারফিট বাসায় আমরা চারজন মাত্র মানুষ থাকি।একমাত্র বোন থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে।ছোট ভাই তার বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে।থাকার ভিতরে আমি মাম্মাম,বাপী আর আমাদের আব্দুল চাচা।আব্দুল চাচাই বাসার সব বাজার সদাই করে।অনেকটা কেয়ারটেকারের মত।রুদ্রনীল আর গ্রেগর দুজনই আমাদের বাসাটা খুব পছন্দ করলো।আমি জানতাম ওদের পছন্দ হবে। বাংলাদেশে ওরা এবারই প্রথম এসেছে।বিমানবন্দরে নেমে ওরা যতটানা আমার দিকে তাকিয়েছে তার চেয়ে বেশি বাইরের চারপাশটা দেখায় ব্যস্ত।দুজন প্রায় কাছাকাছি সময়ে আসায় একসাথে বাসায় নিয়ে আসতে পেরেছি।মায়োকভস্কির সাথে ফেসবুকে যোগাযোগ হয়েছে ওর আসতে আরো সাড়ে সাত ঘন্টা মত লাগবে।

বিকেলে আমি,রুদ্রনীল আর গ্রেগর বের হলাম।উদ্দেশ্য ওদেরকে উত্তরা ঘুরিয়ে দেখাবো।বিশেষ করে দিয়াবাড়ি এলাকাটা।যদিও গ্রেগরের দেশ অনেক উন্নত তার পরও এমন গ্রামীন পরিবেশ ওর ভালো লাগবে বলেই মনে করেছি।তিন বন্ধু রিকশায় চড়ে ঘুরতে গেলাম দিয়াবাড়ী।ভোর রাতে এসে পৌছালো মায়োকভস্কি।বেশ ভালোই চলছিল আমাদের আড্ডা।মন খারাপ হচ্ছিল উইলহেমের জন্য।ইস সেও যদি আসতো।প্রধানমন্ত্রী বই মেলা উদ্বোধন করে যাওয়ার পর আমার প্রথমদিনেই মেলা ঘুরে দেখলাম।যদিও মেলা ততোটা গোছানো হয়নি, আরো সপ্তাহ খানেক লাগবে তার পরও গ্রেগর,রুদ্রনীল আর মায়োকভস্কি তিনজনই ভীষণ মুগ্ধ। এতো বড় বই মেলা তারা জীবনে কল্পনাও করেনি।ফেব্রুয়ারির দুই তারিখ সকালে উইলহেমের ফোন!বললো বাংলাদেশে এসেছি!!এখন আছি কক্সবাজারে!আমরাও যেন চলে যাই।আমরা ওর কথা শুনে অবিশ্বাস করলাম,বললাম বিশ্বাস হচ্ছেনা,ছবি দে।তখন সে বেশ কিছু ছবি পাঠালে বুঝলাম সত্যিই ও এসেছে।আমাদের সব থেকে প্রিয় বন্ধু উইলহেম এসেছে আমরাকি আর ঢাকায় বসে থাকতে পারি? ছুটে গেলাম কক্সবাজারে।গিয়ে বুঝতে পারলাম ও এসেছে জাতিসংঘের ইউএনএইচসিআর এর হয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির পরিদর্শনে।

আমারও খুব ইচ্ছে ছিলো রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মানবেতর জীবন কাছ থেকে উপলব্ধি করার কিন্তু যাওয়ার সুযোগ হচ্ছিল না।৩ ফেব্রয়ারি বিকেলে পৌছে গেলাম রোহিঙ্গা ক্যাম্পে যেখানে আগে থেকেই আমাদের বন্ধু উইলহেম উপস্থিত ছিলো।ইউএনএইচসিআর এর প্রতিনিধিদের একটি দল এসেছে পরিদর্শন করতে সেই দলে উইলহেমও আছে।বন্ধুকে কাছে পেয়ে কত গল্প হলো।আমরা ঘুরে ঘুরে ক্যাম্প দেখতে লাগলাম।ও আমাদেরকে বললো তোদের জন্য দারুন একটি সারপ্রাইজ আছে।আমরা ভাবতে লাগলাম কী হতে পারে সেই সারপ্রাইজ কিন্তু কুলকিনারা করতে পারলাম না।ও খোলাসা করে কিছু বললো না।সুতরাং অপেক্ষায় রইলাম।ক্যাম্পের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত দেখতে লাগলাম।ওদের করুণ অবস্থা আমাকে ব্যথিত করলো।

একটা খোলামেলা যায়গাতে অনেক মানুষের ভীড় দেখে এগিয়ে গেলাম।উইলহেম জানালো ওখানেই তোদের জন্য সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে।ওর কথা শুনে আমাদের আগ্রহ আরো বহুগুন বেড়ে গেলো।দ্রুত পায়ে এগিয়ে গেলাম।ভীড় ঠেলে যতটা সম্ভব সামনে গিয়ে দেখতে পেলাম ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধি দলের অনেক সদস্য সেখানে উপস্থিত।মাঝখানে একটি চেয়ারে কালো গাউন পরা মধ্যমনি।তিনি সবার উদ্দেশ্য কথা বলছেন।তার কথা গুলো শুনতে ভালো লাগলো।তার চেহারায় বিষণ্নতা লক্ষ্যনীয়।তিনি যেন রোহিঙ্গাদের দুঃখে ভীষণরকম দুঃখী।যদিও স্বাভাবিক ভাবে দুঃখীই বলা যায় তা না হলে কি আর এতো দূরে ছুটে আসতেন।এই মানুষটি অসম্ভব প্রিয় হয়ে উঠেছে সবার কাছে।আমরা চার বন্ধুই তাকে অনেক আগে থেকেই চিনি।বিশেষকরে টিভিতে দেখেছি।

অসহায় এতিমদের জন্য তার মনে অনেক ভালোবাসা।জানতে চাইলে তিনি বললেন সম্ভব হলে পৃথিবীর সব এতিম শিশুকিশোর কিশোরীকে নিজের সন্তান হিসেবে লালনপালন করতাম।মায়ের নামের জায়গায় নিজের নাম লিখে দিতাম।তার কথা শুনে মনে পড়লো বঙ্গবন্ধুর সেই অমর বাণী।তিনি বলেছিলেন একাত্তুরে জন্ম নেওয়া পিতাহীন প্রতিটি শিশুর পিতার নামের জায়গায় আমার নামটি লিখে দাও।এই মানুষটি কি বঙ্গবন্ধুকে চেনে? কিংবা বঙ্গবন্ধুর সেই অমর বাণী শুনেছে।গল্পে গল্পে তিনি জানালেন এক করুন গল্প। ২০১৫ সালে সিরিয়ার তত্কালীন সহিংসতায় উদ্বিগ্ন হয়ে তিনি তুরস্কের একটি শরণার্থী শিবিরে গিয়েছিলেন। সেখানকার অমানবিক পরিস্থিতি দেখে দীর্ঘসময় ধরে সিরিয়ায় চলা এই নির্মম সহিংসতার সমাধানে নিরাপত্তা পরিষদের ব্যর্থতার কড়া সমালোচনাও করেছিলেন। শরণার্থী শিবিরে পিতৃহীন তিন সিরীয় শিশুকে দেখে এবং তাদের বাবা-মায়ের করুণ মৃত্যুর বিষয়টি জেনে তিনি তৎক্ষণাৎ তিন শিশুকেই দত্তক নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেন। এই শিশুদের বাবাকে সৈন্যরা ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করেছিল, আর তাদের মা বোমার আঘাতে মারা যান। ছয় সন্তান থাকার পরও তার এই দত্তক নেওয়ার সিদ্ধান্ত বিশ্বজুড়ে প্রশংসা অর্জন করেছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিভিন্ন জটিলতার কারণে আর সেই শিশুদের দত্তক নেওয়া সম্ভব হয়নি। এই তিনজনকে দত্তক না নেওয়ার দুঃখটি এখনো তিনি ভুলতে পারেননি।

একনাগাড়ে সেই সব গল্প বলে যাচ্ছিলেন আর আমরা মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনছিলাম।সুদুর আমেরিকা থেকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অগণিত দুঃখী মানুষদের খোঁজ নেওয়া মানুষটিকে রোহিঙ্গা শরণার্থীরা অ্যাঞ্জেল মনে করলো আর আমরা দেখলাম সত্যিকারের মানুষটি হলিউডের বিখ্যাত অভিনেত্রী অ্যাঞ্জেলিনা জোলি।

গল্পঃ মমতার বন্ধন
লেখাঃ জাজাফী
১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

বসন্ত এসেও আসেনি

0

বসন্তের গল্প শুনবেন? ভালোবাসা দিবসের গল্প? প্রেম আসা না আসার গল্প? এই গল্পটা আমার বন্ধু মাহমুদের। নির্ঝর আবাসিক এলাকায় আমাদের বাসা।মাহমুদও ওখানেই থাকে। ওর বাবা লেফটেনান্ট কর্নেল আমার মাম্মামের ব্যাচমেট।কিভাবে কিভাবে যেন আমরা একই কোয়ার্টারে বাসা পেয়ে গেলাম।তখন আমরা ক্লাস ফাইভে পড়ি।ছুটে বড়াই কলোনীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে।আমি কিছুটা ভাবুক আর ও খুব চঞ্চল।১১ই ফেব্রুয়ারি ছিলো মাহমুদের জন্মদিন।সেই পার্টিতে আসেপাশের সব আন্টিরা এসেছিলেন তাদের ছেলে মেয়েকে নিয়ে।জন্মদিনের কেক কাটার পর সবাই একে একে মাহমুদকে খাইয়ে দিচ্ছিল।এমন সময় রুমানা আন্টি আসলেন।পরনে হলুদের আবরণযুক্ত সিল্কের শাড়ী।খোপায় জবা ফুল নয়তো অন্য কোন ফুল ঠিক মনে নেই।বাম হাতে একটা দামী ঘড়ি আর ডান হাতে স্বর্ণের বালা।বয়স মাম্মামের মতই।ব্রিগেডিয়ার আতিক আংকেলের স্ত্রী।আমি আগেও অনেকবার দেখেছি কিন্তু মাহমুদ সম্ভবত সেবারই প্রথম দেখলো।

তিনি যখন মাহমুদকে কেক খাওয়াতে গেলেন তখন আমরা থ হয়ে গেলাম।মাহমুদ কেক না খেয়ে রুমানা আন্টির মুখের দিকে অপলোক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।আন্টি কেক হাতে নিয়ে বললেন হা করো কিন্তু তার কোন ভ্রুক্ষেপ নেই।যেন কোথাও হারিয়ে গেছে।শেষে রুমানা আন্টি ওর মাথায় টোকা দিয়ে বললেন এই যে রাজপুত্র কি ভাবছো?কোথায় হারিয়ে গেছো?মাহমুদ বললো দেখছি,অবাক চোখে দেখছি পৃথিবীর সৌন্দর্য! আমরা সবাই হো হো করে হেসে উঠলাম।বলে কি ছেলে? রুমানা আন্টি বললো বাব্বাহ কবি কবি ভাব ছেলের। তা পৃথিবীর সৌন্দর্য কোথায় দেখলে?মাহমুদ তখন অবাক করে দিয়ে বললো এই যে তোমার মধ্যে।আচ্ছা তুমি এতো সু্ন্দর কেন? জানো আমি তোমার প্রেমে পড়ে গেছি!

আমরাতো সবাই ভীষণ রকম চমকে উঠলাম আর রুমানা আন্টি হো হো করে হেসে উঠলেন তার পর মাহমুদের আম্মুকে ডেকে বললেন আপা আপনার ছেলে কি বলে শোনেন! সে নাকি আমার প্রেমে পড়েছে। মাহমুদের আম্মু হেসে উঠে বললেন এ আর নতুন কি? এখন পযর্ন্ত মনে হয় ও বিশজনের প্রেমে পড়েছে।রুমানা আন্টি বললেন ছেলেতো দেখছি বিশ্বপ্রেমিক হবে।সেদিন অনেক আনন্দ হলো।রুমানা আন্টি চলে যাবার সময় ওকে বললেন আমাদের বাসায় এসো কিন্তু প্রিয় রাজপুত্র।কে জানতো কথাটা মাহমুদ মনের মধ্যে পুষে রাখবে।পরদিন ১২ই ফেব্রুয়ারি স্কুল ছুটির পর ও বললো চল আজ রুমানা আন্টির বাসায় যাবো। আমরা তখন সেমস এ পড়ি। বিএএফ শাহীন কলেজের ইংলিশ মিডিয়ামে।একই ভবনের সেভেন্থ ফ্লোরে রুমানা আন্টিদের বাসা আর আমাদের নাইন্থ ফ্লোরে।ওর খুব ইচ্ছে গোলাপ ফুল কিনে নিবে কিন্তু কোথায় পাবে গোলাপ? শেষে নিজের খাতার পাতা ছিড়ে সেখানে রংপেন্সিল দিয়ে সুন্দর অসুন্দর মিলিয়ে গোলাপের ছবি আকলো। উদ্দেশ্য রুমানা আন্টিকে দিবে।

যথারীতি লিফটে উঠে নিজেদের বাসার নাম্বার না চেপে রুমানা আন্টির ফ্লোর নির্বাচন করলাম।গেটের সামনে দাড়িয়ে কলিংবেল চাপতেই কিছুক্ষণের মধ্যে একটি মেয়ে দরজা খুলে দিলো। ওটা রোদেলা আপু।স্কলাস্টিকাতে স্ট্যান্ডার্ড এইটে পড়ে।আমাকে খুব ভালো করেই চেনে।কিন্তু মাহমুদকে চেনে না কিংবা মাহমুদও তাকে চেনে না। সে পড়াশোনা নিয়ে খুব বিজি থাকে তাই বাইরে বের হয় কম।আমি মাঝে মাঝে আসি বলে দেখা হয় কথাও হয়।আমাদেরকে দেখে রোদেলা আপু বললেন আরে পুচকু কেমন আছো? এখন যে আসোই না। আজ কি মনে করে? আমি বললাম আপু ভাবলাম তোমাদেরকে দেখে যাই।দেখলাম মাহমুদ অপলোক তাকিয়ে আছে রোদেলা আপুর দিকে।বুঝলাম ও ব্যাটা আবার নতুন করে প্রেমে পড়েছে। রুমানা আন্টি বাসাতেই ছিলো।তিনি জানতে চাইলেন রোদেলা কে এসেছে রে? রোদেলা আপু আমাদের কথা বললো।আন্টি তখন আমাদের সামনে আসলেন।জানতে চাইলেন কি খবর।

মাহমুদকে দেখে বললেন এই যে রাজপুত্র তুমি তবে আজ আমাকে দেখতে চলেই আসলে! মাহমুদের সেদিকে খুব একটা ভ্রুক্ষেপ নেই।সে বললো পাষ্ট ইজ পাষ্ট।ফরগেট দ্যাট মেমোরি,আই অ্যাম ইন আ নিউ রিলেশানশীপ! যা ভেবেছিলাম তাই।রুমানা আন্টি হো হো করে হেসে উঠে জানতে চাইলেন তুমি এ কেমন প্রেমিক যে গতকালই আমাকে পছন্দ করে আজই ভুলে গেলে? তা তোমার নতুন প্রেমিকা কে শুনি? মাহমুদ জানালো একটু আগে যে রাজকন্যাটা আমাদেরকে দরজা খুলে দিলো সে!আন্টি এবার রোদেলা আপুকে ডাকলেন।রোদেলা আপু সামনে আসতেই তিনি বললেন নাও তোমার প্রেমিককে বরণ করে নাও।রোদেলা আপু প্রথমে কিছু বুঝতে পারলো না পরে আন্টি বললেন মাহমুদ গতকাল আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছে আর আজ দেখা করতে এসে যখন তোমাকে দেখেছে তখন আমাকে ভুলে গিয়ে তোমার প্রেমে পড়েছে।

সব শুনে রোদেলা আপুও হাসতে শুরু করলো।মাহমুদ এসবে পাত্তা দিলো না।ফিফথ গ্রেডে পড়লে কি হবে ভাব দেখে মনে হয় সে ও লেভেল দিয়েছে আরো বছর খানেক আগে।সেদিন এক ঘন্টা ধরে জমিয়ে আড্ডা দিলাম।এরমাঝে বাসায় ফোন করে জানিয়ে দিলাম আমরা রোদেলা আপুদের বাসায় আছি।ফিরে আসার আগে রোদেলা আপু মাহমুদের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো তুইতো এখনো পুচকে! এখনি প্রেম করবি? তাও আবার আমার মত বড় আপুর সাথে! তাই হয় নাকি।মাহমুদ বললো আমাকে পুচকে বলবে না।আমি যথেষ্ট বড় হয়েছি।আর হ্যা দেখবে আমি যখন বড় হয়ে যাবো তখনো তোমার বিয়ে হবে না।মাহমুদের কথা শুনে রোদেলা আপু বললো তুইকি আমায় অভিশাপ দিচ্ছিস?সামনে ১৩ই ফেব্রুয়ারি পহেলা ফাল্গুন কি করবি সেদিন? ও কিছু বললো না।

আমরা বেরিয়ে এলাম।মনে মনে ভাবলাম ১৪ই ফেব্রুয়ারি ভ্যালেন্টাইন্স ডে তে সে না জানি আবার কাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে বসে।তবে পরদিন সে আর কি করেছিল আমি জানতে পারিনি।পরবর্তী জীবনে তার প্রেমে পড়া চলতেই থাকে। ক্লাস সেভেনে আমরা আলাদা হয়ে গেলাম।ও ভর্তি হলো সিলেট ক্যাডেট কলেজে।তবে আমাদের যোগাযোগ অবিচ্ছিন্ন থাকলো।পরে জানতে পারলাম ক্লাস টুয়েলভের সময় ভ্যাকেশানে এসে এক জুনিয়রকে ও প্রেম নিবেদন করেছিল কিন্তু সে বলেছিল ভাইয়া আপনিতো আমার চেয়ে বেশ বড় তাই আমি রিলেশানে যেতে চাইছি না।আমি চাই সম বয়সী কারো সাথে রিলেশান করতে।

এ নিয়ে আমাদের অনেক গল্প হতো।বিশেষ করে ভ্যাকেশানে একসাথে আড্ডা দিতে দিতে এসব কথাই হতো বেশি।ওকে বললাম তাহলে এবার তুই সমবয়সী কারো সাথে প্রেম কর।যে কথা সেই কাজ।ভেবেচিন্তে একজনকে পছন্দ করলো।ওর নাম প্রিয়তী।বুঝে শুনে তাকে প্রেম নিবেদন করলো কিন্তু সেই কপালের দশা। প্রিয়তী বললো দ্যাখ মাহমুদ সমবয়সীতে প্রেম হয়না যাষ্ট বন্ধুত্ব হয়।আমার বাবা মা যখন আমাকে বিয়ে দিতে চাইবে তুই তখনো স্ট্যাবলিশড হতে পারবি না ফলে আমাদের প্রেম বৃথা হয়ে যাবে।শুধু শুধু কষ্ট পেয়ে লাভ কি?এটা শোনার পর মাহমুদ আর প্রেমের ব্যাপারে কথা তোলেনি।আমরাও আর ওকে ঘাটাইনি।

বয়স বাড়তে বাড়তে ৪৮এ ঠেকলো,চাকরিতে বেশ সুনাম অর্জন করলো পরিবার থেকে বিয়ের কথা বললো কিন্তু সে অনঢ়। কিছুতেই সে বিয়ে করবে না।অনেকে অনেক কথা বললো কিন্তু কাজের কাজ কিছু হলো না।তার জীবনে বসন্ত আসে বসন্ত যায় পহেলা ফাল্গুন নিয়ে তার কোন মাতামাতি নেই,১৪ই ফেব্রুয়ারি নিয়ে তার কোন মাতামাতি নেই।আমরাও সবাই চুপ থাকলাম।ও ওর মত করে থাকুক।কিন্তু হঠাৎ গতবছর ভ্যালেন্টাইন্স ডের আগে ওকে খুব চঞ্চল দেখাচ্ছিল।আমি বললাম কিরে মাহমুদ কাহিনী কি?এতো উচ্ছল কেন এবার?মনে হচ্ছে নতুন করে বসন্ত এসেছে জীবনে।সে হাসলো তার পর বললো দোস্ত এবার ভ্যালেন্টাইন্স ডে তে একজনকে প্রোপোজ করবো বলে ভাবছি।আমি বললাম কে সে? ও বললো না।শুধু বললো কালকে সাথে থাকিস।

আমি অপেক্ষায় থাকলাম।পরদিন বিকেলে মাহমুদ আমাকে ফোন করলো।আমি রেডি হয়ে ওর সাথে দেখা করলাম।আমরা তখন উত্তরাতেই থাকি।সাত নাম্বার সেক্টরের ওখানে উত্তরা হাইস্কুলের সাথে লাগোয়া পার্ক।আমি আর মাহমুদ অপেক্ষা করতে লাগলাম ওর প্রেমিকা আসবে বলে।একটু পর একটা অষ্টাদশী কন্যা এসে হাজির হলো।সুন্দর দেখতে।মেয়েটিকে আমি চিনি।সে আমাকে দেখে কিছুটা লজ্জা পেলো।সালাম দিয়ে বললো আংকেল কেমন আছেন?আমি বললাম ভালো আছি। তোমার আম্মু কেমন আছে?সে বললো আম্মু ভালো আছে।একদিন আসেন বাসায়।আম্মু আপনার কথা বলে।আমি বললাম ঠিক আছে আসবো।

ভাবলাম আমি দাড়িয়ে থাকলে ওদের কথা বলতে অসুবিধাহবে তাই একটু চা খেয়ে আসি বলে ওদের একাকী রেখে বেরিয়ে গেলাম। মিনিট পাচেক পরেই মাহমুদের ফোন।আবার পার্কে ঢুকলাম।পার্কের বেঞ্চিতে মাহমুদ মনমরা করে বসে আছে।বললাম রুমকি কোথায়?আমার মুখে রুমকি নামটা শুনে মাহমুদ চমকে গেলো।জানতে চাইলো ওর নাম যে রুমকি তুই আগেই জানতি? ও যে তোকে আংকেল বলে ডাকলো তুই আগেই চিনতি? আমি বললাম হ্যা চিনতামইতো। এমনকি ওর মা কেও চিনি।ওর মাকে তুই প্রোপজ করেছিলি মনে আছে? মাহমুদ জানতে চাইলো ওর মায়ের নাম কি? আমি বললাম প্রিয়তী! যে তোকে বলেছিল সমবয়সীদের মধ্যে প্রেম হয় না।ওকে আরো বিমর্ষ দেখালো।জানতে চাইলাম তুইকি রুমকিকেই প্রেমের প্রস্তাব দিতে চেয়েছিলি কিংবা দিয়েছিস? সে বললো দিয়েছি এবং রিজেক্ট হয়েছি।সে শেষপযর্ন্ত বলেছে আপনিতো আমার আংকেল হন,আম্মুকে আপনার কথা বলেছি আম্মু বলেছে আপনি নাকি তাকেও প্রোপজ করেছিলেন।এখন আপনি আমাকেও প্রোপোজ করতে চাইছেন!

আমি বললাম তুই এসব চিন্তা বাদ দে।মনে কর তোর জীবনে বসন্ত হয়তো এসেও আসেনি,তোর জীবনে ভ্যালেন্টাইন্স ডে হয়তো এসেও আসেনি।তার পর দু্ই বন্ধু বাসার দিকে হাটতে শুরু করলাম।

গল্পঃ বসন্ত এসেও আসেনি,
লেখাঃ জাজাফী (Zazafee)
১৩ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

আরও পড়ুনঃ

উজবেক কবি ও আমি

0

কথা বলতে গিয়ে আমি একটি প্রশ্নের মূখোমুখি হলাম।তিনি জানতে চাইলেন আপনিকি কবিতা লেখেন? আমি বললাম কবিতা লিখি না।তিনি তখন আমাকে দ্বিতীয় প্রশ্নটি করলেন। অবাক হয়ে বললেন আপনি কবিতা লেখেন না অথচ আপনার নাম মতিন উদ্দিন? তার কথা শুনে আমিও ভীষণ অবাক হলাম।কবিতা লেখা না লেখার সাথে মতিন উদ্দিনের কি আসে যায়?মতিন উদ্দিন নাম হলেই কি কবিতা লিখতে হবে? নাকি জগতের সব মতিন উদ্দিনই কবিতা লেখে।আর তা ছাড়া এই নামে যে কোন বিখ্যাত কবি আছেন তাওতো শুনিনি কখনো।আমি বিস্ময় গোপন না রেখেই তাকে প্রশ্ন করলাম কবিতা না লিখলে কি আমার নাম মতিন উদ্দিন হতে পারে না? কিংবা মতিন উদ্দিন নাম হলেইকি তাকে কবিতা লিখতে হবে? তিনি খানিকটা চুপ থাকলেন।

ঘটনার শুরুটা বেশ অন্যরকম।বইমেলায় ঘুরছি হঠাৎ একটি মূখের দিকে তাকিয়ে খুব চেনা চেনা মনে হলো।একটু ভাবতেই মনে পড়লো সেই মুখটি।আরে এই মুখটিতো আমার পরিচিত।কখনো কথা বলার সুযোগ হয়নি।আমি পায়ে পায়ে এগিয়ে গেলাম।শুদ্ধস্বরের স্টল পেরিয়ে শিশু চত্বরের কাছাকাছি পৌছে তাকে খুব কাছ থেকে দেখলাম। তার পর নিশ্চিত হয়ে পাশ কাটিয়ে সামনে গিয়ে দাড়ালাম।অনেকটা পথ আগলে দাড়াবার মত।আমি বললাম তোমাকে খুব চেনা চেনা মনে হচ্ছে।আচ্ছা তুমিকি মেঘদূত যাকে দেখেছিলাম কলাবাগান খেলার মাঠে কর্ডলেস হাতে সুন্দর করে উপস্থাপনা করতে? সে মিষ্টি করে হাসলো।তার মনে তখন আনন্দ নিশ্চই খেলা করছিল।তার উপস্থাপনা এতোটাই মুগ্ধকর ছিলো যে এই বইমেলার ভীড়েও অনায়াসে তাকে কেউ চিনে ফেলছে। তার ভক্ত তৈরি হয়েছে দেখেও সে নিশ্চই খুশি হয়েছে।সে বললো হ্যা আমিই মেঘদূত।

Image may contain: 3 people, including Asadul Islam, people smiling, beard and glasses
মেঘদূত ও তার পরিবার

হঠাৎ খেয়াল হলো তার সাথে আরো দুজন মানুষ আছেন।আমি তাদের সালাম দিলাম।তারা জানালো তারা মেঘদূতের বাবা এবং মা।আমি তখন জানতে চাইলাম আচ্ছা মেঘদূত তোমাকে আমি তুমি করে বলবো নাকি আপনি করে? সে বললো আমিতো ছোট মানুষ আমাকে তুমি করে বললেইতো বেশি ভালো হয়।আমি বললাম বেশ তাই হবে।আচ্ছা তোমার কি কোন বই বেরিয়েছে? বই বের হলে সেটি কিনবো এবং তোমার অটোগ্রাফ নেবো। সে মিষ্টি করে হেসে উঠলো। বললো নাহ আমার কোন বই বের হয়নি।আমিতো ছোট মানুষ বই কি করে লিখবো এখনতো আমার অন্যের লেখা বই পড়ার সময়।

আমি বললাম কিন্তু জানো এই মেলাতেও ছোটদের অনেকের বই বেরিয়েছে।তারা কেউ কেউ তোমার চেয়েও অনেক ছোট আর কেউ কেউ একটু বড়। এই যেমন (Meem Noshin Nawal Khan) মীম নোশিন নাওয়াল খানের “টুপিটুন” নামে একটি বই বেরিয়েছে বিদ্যাপ্রকাশ থেকে। সে তোমার চেয়ে বড় আর যেমন ধরো অলীন বাশারের বই বেরিয়েছে সে তো অনেক ছোট। মেঘদূত হাসলো। বললো আমিও তাহলে পরে লিখতে চেষ্টা করবো। আমি বললাম তুমি যে সুন্দর উপস্থাপনা করো তাতে তুমি লিখলে নিশ্চই সেটা দারুন হবে।আমি এখন তোমার অটোগ্রাফ নিবো কি করে বলোতো? তোমার তো কোন বই নেই! সে অবাক বিস্ময়ের সাথে বললো আমার অটোগ্রাফ নিবে তুমি?কিন্তু কেন? আমিতো বিখ্যাত কেউ নই যে আমার অটোগ্রাফ নিবে।

আমি মেঘদূতের মুখের দিকে তাকিয়ে বললাম বিখ্যাতরা কি নিজেরা বুঝতে পারে সে বিখ্যাত না অখ্যাত।মানুষের ভক্ত যে কোন সময় তৈরি হতে পারে। আমি না হয় একটু আগেই হয়েছি।মেঘদূত তখন হাসলো।বললো আচ্ছা ঠিক আছে তুমি একটা কাজ করতে পারো আমার বাবাওতো লেখে। তার বই বেরিয়েছে তুমি সেটা নিতে পারো তাহলে সেই বইয়ে আমি তোমাকে অটোগ্রাফ দিবো।

আমি বললাম তোমার বাবার বইয়ের নাম কি? সে তখন বললো বাবার বইয়ের নাম “নীরবতার বাঁশিতে তৃষ্ণার ফেরিওয়ালা” আমি একটি বই কিনলাম।তার পর মেঘদূতের সামনে মেলে ধরলাম অটোগ্রাফ নেওয়ার জন্য। মেঘদূত তখন জানতে চাইলো আচ্ছা তোমার নাম কি? অটোগ্রাফ দিতে হলেতো তোমার নাম লাগবে। আমি তখন বললাম আমার নাম মতিন উদ্দিন।

আমার নাম বলার সাথে সাথে পাশে দাড়িয়ে থাকা ওর বাবা এবং মা হো হো করে হেসে উঠলো।মেঘদূত নিজেও হাসলো।ওদের হাসির কারণ বুঝতে পারলাম না। একজনের নাম কি কোন ভাবে মতিন উদ্দিন হতে পারে না? আর এই নামটাকি সত্যিই হাস্যকর? প্রশ্নটা করেই ফেললাম যে তারা কেন আমার নাম শুনে হাসছে? এ প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে তারা বরং উল্টো প্রশ্ন করলো আমি কবিতা লিখি কি না।তার পর কত কথা হলো। শেষে মেঘদূত বললো তোমার হাতে মোবাইল নাও এবং ইন্টারনেটে মতিন উদ্দিন নাম দিয়ে সার্চ দাও।

আমি সাথে সাথে সার্চ দিয়ে দেখি সত্যিই এ নামে একজন উজবেক কবি আছেন যিনি নিজের নাম উল্টো করে নদ্দিউ নতিম লিখে বিখ্যাত হয়েছেন।গুগলে ফটো নামে যে অপশন আছে সেটিতে ক্লিক করে সেই মতিন উদ্দিনের ছবি দেখার আগ্রহ হলো। যখনই ছবিতে ক্লিক করলাম তখন অসংখ্য ছবি দেখতে পেলাম। ছবির মানুষটা চেনা চেনা লাগছিলো। কোথায় যেন দেখেছি কোথায় যেন দেখেছি।এটা ভাবতে ভাবতে পাশের দুজনের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে দেখলাম আরে এই মতিন উদ্দিনতো আমার পাশেই দাড়ানো! তখন জানতে পারলাম নদ্দিউ নতিম নামে অসাধারণ একটি নাটক করেছেন এই লোকটা।এই লোকটা মানে মেঘদূতের বাবা।মেঘদূত আমাকে আরো অবাক করে দিয়ে জানালো জানো ওই নাটকের একটি গুরুত্বপুর্ন চরিত্রে আমি নিজেও অভিনয় করেছি।

মেঘদূতের অটোগ্রাফ নিয়ে মেলা থেকে ফিরলাম।ও বলেছে আগামী শো তে যেন আমি উপস্থিত থাকি।কিন্তু আমি থাকবো না এটা নিশ্চিত।আমি মতিন উদ্দিন হলেও কবিতা লিখি না।একজন উজবেক কবির আয়োজনে অকবি হয়ে আমি কি করে থাকি।

–জাজাফী
১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

আরো পড়তে পারেনঃ

ভাবনায় ছিলোনা এমন

ফুটপাত ধরে একাকী হাটছি।হঠাৎ একটি কালো পাজেরো গতি কমিয়ে আমার পাশে পাশে চলতে শুরু করলো।আমি ভাবলাম গাড়ীটা থামবে তাই গতি কমিয়েছে।পরে দেখলাম গাড়ীর কাচ নামিয়ে কেউ একজন আমাকে ডাকছে।মানুষটাকে চিনতে পারছি না।সে গাড়ি থামিয়ে নিচে নেমে আসলো।ড্রাইভার গাড়ি চালাচ্ছিল সে পিছনে বসা। কাছে আসতেই চিনতে পারলাম আমার বন্ধু বদরুল।বদরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপেক্ষাকৃত পেছনের দিকের একটি সাবজেক্টে পড়াশোনা করেছে।

ভাবলাম আজকাল উবারেতো সহজেই যাওয়া আসা করা যায় ও বোধহয় উবারে কোথাও যাচ্ছে।আমি বললাম দোস্ত উবারে করে কই যাস? সে বললো উবারে করে যাবো কেন?দেখছিস না এটা পাজেরো। উবারে কখনো পাজেরো দেখেছিস? ভাবলাম তাও ঠিক।বললাম তাহলে গাড়ীটা কার? সে বললো গাড়িটা সে কিনেছে।৮৬ লাখ টাকা দাম পড়েছে।আমার মাথায় হাত। বললাম কোন বড় লোকের একমাত্র মেয়েকে পটিয়ে বিয়ে করে রাতারাতি বড়লোক হয়েছিস নাকি আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপ পেয়েছিস?

আমার বন্ধু আমার কাধে হাত রেখে বললো দোস্ত তোদের মত আইবিএতে পড়তে পারিনি বলে কি গাড়ি কিনতে পারি না।ওর কথা শুনে মনে মনে বললাম শালা টিটকারি মারো!খোচা মারো। মুখে বললাম তা দোস্ত অমন করে বলছিস কেন?আমি কি কখনো তোকে ছোট চোখে দেখেছি?এখন বল কিভাবে কিভাবে এতো দামী গাড়ি কিনলি? সে বললো দোস্ত বিজনেস বুঝলি বিজনেস করছি।তোদের মত বিজনেস ফ্যাকাল্টিতে না পড়লেও বিজনেস কিছু কিছু বুঝি।

বিজনেস করে এতো টাকাওয়ালা হয়েছে শুনে আরো অবাক হলাম। জানতে চাইলাম কিসের বিজনেস যে এতো পয়সাওয়ালা হয়েছিস?অবৈধ কোন ব্যবসা নয়তো? বিদেশে আদম পাচার করিস নাকি? সে হো হো করে হেসে উঠে বললো দোস্ত ইয়ার্কি করিস না। ওরকম কিছু না। এই বিজনেসের আইডিয়া কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই পেয়েছি আর সেটা ইউনিক হিসেবে বিবেচনা করে কাজে লাগিয়েছি। এবং অল্প দিনেই বিরাট লাভ পেয়েছি।

জানতে চাইলাম কিসের বিজনেস খুলে বল। আমার বন্ধু বললো ভিসি স্যারের কথা শুনে মাথায় বুদ্ধি খেলে গেলো।সারা ঢাকার অলিতে গলিতে কত সিঙ্গাড়া সমুচার দোকান। সবখানে ৫ টাকা কিংবা আরো দামে বিক্রি হচ্ছে।ওরা কত কষ্ট করে সিঙ্গাড়া সমুচা বানিয়ে তার পর সেটা পাচ টাকা দামে বিক্রি করছে।আমি ভাবলাম আমি যদি তিনটাকা দিয়ে টিএসসি থেকে সিঙ্গাড়া সমুচা কিনে সারা ঢাকার অলিতে গলিতে যতো দোকান আছে সবার কাছে চারটাকা দরে বিক্রি করি তাহলে প্রতিদিন আমি সাড়ে সাত লাখ পিচ সিঙ্গাড়া সমুচা বিক্রি করতে পারবো। সব খরচ বাদ দিয়েও আমার প্রতিদিন ৫ লাখ টাকা লাভ থাকবে।ওদিকে সেই সব দোকানদাররাও কোন পরিশ্রম না করে আমার কাছ থেকে চারটাকা দিয়ে কিনে পাচটাকায় বিক্রি করে প্রতিটাতে একটাকা লাভ করতে পারবে। এই চিন্তা থেকে আমি টিএসসি থেকে প্রতিদিন সিঙ্গাড়া সমুচা কিনতে লাগলাম এবং সারা ঢাকার অলিতে গলিতে সাপ্লাই দিতে শুরু করলাম। একমাসেই আমার ১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা লাভ হলো।

বন্ধুর কথা শুনে আমার মাথায় আসমান ভেঙে পড়ার মত অবস্থা।আমাকে হতভম্ব হতে দেখে সে একটা ঝাকুনি দিয়ে বললো দোস্ত আয় তোকে সিঙ্গাড়া খাওয়াই। এই বলেই পাশে ফুটপাতে দাড়িয়ে সিঙ্গাড়া বিক্রি করছে এমন একজনের কাছে সিঙ্গাড়া চাইলো।আমরা পাচটাকা দরে সিঙ্গাড়া কিনে খেতে লাগলাম। আমার বন্ধু গুল মারছে কিনা সেটা যাচাই করার জন্য সিঙ্গাড়াওয়ালাকে প্রশ্ন করলাম এই সিঙ্গাড়া কি তুমি বানিয়ে আনছো না কিভাবে কি? সে জানালো এটা টিএসসির বিখ্যাত সিঙ্গাড়া।আমাদের সাপ্লাইয়ার এসে দিয়ে যায়।আমরা চার টাকা দরে কিনি এবং একটাকা লাভে পাচটাকায় বিক্রি করি।

হাতে নাতে প্রমান পেয়ে আমার আক্কেল গুড়ুম। বন্ধুকে বললাম দোস্ত তুইতো জিনিয়াসরে। ইচ্ছে করছে তোর কদমবুচি করি। ও হেসে উঠলো। এর মাঝে শুনতে পেলাম কে যেন বলছে কাট। আমি পিছনে তাকিয়ে দেখি বেশ কয়েকজন মানুষ হাতে লাইট ক্যামেরা আরো কতকি। বন্ধুর সাথে কথা বলতে বলতে খেয়ালই করিনি পিছনে আরেকটা গাড়ী ছিলো। বন্ধুকে বললাম কাহিনী কি? সে জানালো তোর অজ্ঞাতেই একটা শ্যুটিং করে ফেললাম। এটি একটি শর্ট ফিল্ম নাম “তিনটাকার সমুচায় কোটি পতি”

লেখাঃ জাজাফী
৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

আমাদের দেখা হয়েছিল

একবারই আমাদের দেখা হয়েছিল
না না একবার নয়,দুইবার
শীতের শেষ বিকেলে সুর্য ডুবে গিয়ে যখন সারা আকাশ জুড়ে
কুয়াশা নেমে আসছে তখন
কোন এক যান্ত্রিক শহরের ব্যস্ত রাস্তায় আমি দৌড়াচ্ছি
তোমাকে দেখবো বলে।

সময়কে বেঁধে রাখতে না পেরে সময়ের সাথে পাল্লা দিতে
মোটর যানে চড়েছি,দৌড়েছি রিকশার মন্থর গতি এড়াতে
যদি দুটো মিনিট আগে পৌছাতে পারি তবে তোমাকে দুমিনিট বেশি দেখতে পাবো
এই ভাবনা থেকে আমার অবিরাম ছুটে চলা।

অনেক গুলো বসন্ত পেরিয়েছে,অনেক শীতের সকালে
একাকী সুর্যর আলোর দিকে মুখ করে দাড়িয়েছি
দু বছর তো কম সময় নয়,তুমি মুখ তুলে তাকালে
দেখা হয়ে গেলো তোমার আমার।

তুমি আর আমি দুই শহরে থাকি, দূরত্ব সীমাহীন
তবুও রোজ তোমাকে দেখি,খুব কাছে কাছে রাখি
হৃদয় ছোয়া সেই দূরত্ব ঘুচিয়ে দিতে ইচ্ছে করে
তার পর তুমি এলে আমার শহরে
তোমাকে দেখে আমি যেন আকাশের চাঁদ মাটিতে নেমে আসতে দেখেছি।

যতটা সময় পাশে ছিলে,দুচোখ ভরে দেখেছি
যেন চোখ সরালেই তুমি হারিয়ে যাবে সেই ভয়ে
আমি সারাক্ষণ তোমার পানে তাকিয়ে থেকেছি
আমার চাহুনিতে তুমি কিছু দেখেছ কিনা জানা হয়নি
আমার অযাচিত বাহানা তোমাকে কষ্ট দিয়েছে বলে ক্ষমা চাই।

খুব ভোরে সুর্য জাগার আগে আমি জেগে উঠি
তোমার সান্নিধ্য পাবো বলে ছুটি নিরন্তর
অপেক্ষাও তখন মধুর লাগে এই ভেবে যে তুমি আসবে
তোমার আগমনের চেয়ে আনন্দের আর কিছু নেই
তোমার হাসির চেয়ে সুন্দর আর কিছু নেই
তোমার চুলের খোপার চেয়ে সুদৃশ্য আর কিছু নেই
দু একটা চুল বাতাসে তোমার মুখ ঢেকে দিচ্ছিল
আমি তা সরিয়ে দিয়ে চাঁদমুখটা দেখেছি বার বার।

তার পর এলো শেষ ট্রেন
তোমাকে সেই ট্রেনে উঠিয়ে দিতেই বুকটা হুহু করে কেঁদে উঠলো
তোমার গন্তব্য ধীরে ধীরে তোমার সন্নিকট হলো
আমার সাথে দূরত্ব বাড়তে বাড়তে বহু দূরে চলে গেলে
আবার কবে দেখা হবে তার অপেক্ষা কেবলই।

২৬ জানুয়ারি ২০১৯
আমাদের দেখা হয়েছিল।
জাজাফী