অনশ্চিত নতুন ভোর

নভেম্বর মাস। জেরুজালেম জুড়ে শীত নেমে এসেছে। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের ঠিক বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দূরের অন্ধকার দিগন্তের দিকে তাকিয়ে আছেন গাদি আইজেনকোট। দিন কয়েক আগেই প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে নতুন সরকার গঠনের আমন্ত্রণ পেয়েছেন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অচলাবস্থা আর নেতানিয়াহু যুগের অবসানের পর, ইসরায়েলের ভাগ্য এখন তাঁর কাঁধে।

টেবিলের ওপর রাখা ফাইলগুলোর দিকে চোখ পড়তেই তাঁর মনে পড়ে গেল প্রায় দুই দশক আগের সেই দিনগুলোর কথা। ২০০৬ সাল, লেবানন যুদ্ধের পর উত্তর কমান্ডের প্রধান হিসেবে তিনি এক নতুন সামরিক তত্ত্বের জন্ম দিয়েছিলেন। সেই তত্ত্বের নাম ছিল ‘দাহিয়া ডকট্রিন’। বৈরুতের দাহিয়া শহরতলির নামানুসারে রাখা সেই তত্ত্বের মূল দর্শন ছিল নির্মম ও স্পষ্ট। শত্রু যদি জনবসতি থেকে আক্রমণ চালায়, তবে তাদের দমনে কেবল সামরিক ঘাঁটি নয়, বরং পুরো অবকাঠামোর ওপর এমন অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও বিধ্বংসী শক্তি প্রয়োগ করতে হবে, যেন পরবর্তী কয়েক দশক তারা আর মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে।

একজন পেশাদার সৈনিক হিসেবে গাদি সবসময় বিশ্বাস করতেন, মধ্যপ্রাচ্যের রূঢ় বাস্তবতায় টিকে থাকতে হলে ‘ভীতি প্রদর্শন’ বা ডিটারেন্সই একমাত্র ভাষা। তিনি কখনো শান্তির কপোত ছিলেন না। স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ধারণাকেও তিনি বরাবরই অবাস্তব বলে মনে করেছেন।

কিন্তু মানুষের জীবন কি কেবল সামরিক মানচিত্র আর রণকৌশলের ছকে চলে?

গাদির হাত নিজের অজান্তেই পকেটে থাকা একটি পুরনো ছবির কোণা স্পর্শ করল। তাঁর ছেলে গাল আইজেনকোট। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে গাজার উত্তরাঞ্চলে এক সুড়ঙ্গ অভিযানে প্রাণ হারিয়েছিল গাল। তখন গাদি নিজেই যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভার সদস্য। যে রণকৌশল আর কঠোর সামরিক শক্তির চর্চা তিনি সারা জীবন করে এসেছেন, সেই যুদ্ধেরই নির্মম বাস্তবতা কেড়ে নিয়েছিল তাঁর নিজের সন্তানকে। গাজার ধ্বংসস্তূপের ভেতর দাঁড়িয়ে সেদিন তিনি অনুভব করেছিলেন, সামরিক শক্তি দিয়ে ইট-পাথরের ইমারত গুঁড়িয়ে দেওয়া যায়, শত্রুকে কোণঠাসা করা যায়, কিন্তু রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ছাড়া এই রক্তক্ষয়ী চক্রের কোনো শেষ নেই।

নেতানিয়াহুর সাথে তাঁর বিরোধের শুরুটাও ছিল সেখানেই। গাদি দেখেছিলেন, কীভাবে দীর্ঘমেয়াদী কোনো রাজনৈতিক সমাধান ছাড়াই যুদ্ধকে প্রলম্বিত করা হচ্ছিল। উগ্র ডানপন্থি জোটসঙ্গীদের খুশি রাখতে গিয়ে কূটনীতির সব দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

ঘড়ির কাঁটা রাত বারোটা ছুঁইছুঁই। ভেতরের কক্ষে জোটের শরিক দলগুলোর নেতারা অপেক্ষা করছেন। আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নেসেটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে হবে তাঁকে।

গাদি দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভেতরের কক্ষের দিকে পা বাড়ালেন। তিনি জানেন, তাঁর সামনে এখন দুই সত্তার লড়াই। একদিকে তাঁর ভেতরের সেই কঠোর জেনারেল, যিনি প্রয়োজনে ‘দাহিয়া ডকট্রিন’-এর মতো নির্মম শক্তি প্রয়োগ করতে দ্বিধা করেন না; আর অন্যদিকে একজন শোকাতুর পিতা ও রাষ্ট্রনায়ক, যিনি জানেন শুধু বারুদের গন্ধে কোনো জাতির ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হয় না। নতুন ভোরের ইসরায়েলকে তিনি কোন পথে নিয়ে যাবেন? লৌহকঠিন রণকৌশলের পুরনো বৃত্তে, নাকি কঠোর নিরাপত্তার সাথে বাস্তবসম্মত কূটনীতির এক নতুন সমীকরণে? সেই উত্তরই এখন খুঁজছে পুরো মধ্যপ্রাচ্য।

ভেতরের কক্ষে পা রাখতেই কোলাহল থেমে গেল। দীর্ঘ টেবিলের চারপাশে বসে আছেন ভবিষ্যৎ জোটের শরিক দলের নেতারা। মধ্যপন্থি, সাবেক জেনারেল, আর কিছু কট্টর জাতীয়তাবাদী নেতারাও আছেন। সবার চোখেই কৌতূহল আর প্রত্যাশার ছাপ।

গাদি আইজেনকোট নিজের আসনে বসলেন। তার সামনে রাখা একটি ফোল্ডারে লেখা ‘অপারেশন নিউ ডন’। এটি কোনো সামরিক হামলার পরিকল্পনা নয়, বরং গাজা ও উত্তর সীমান্ত নিয়ে তার নতুন সরকারের রূপরেখা।

কট্টরপন্থি জোটসঙ্গী ইয়োভ কড়া গলায় কথা শুরু করলেন, “গাদি,আমরা আপনাকে সমর্থন দিয়েছি কারণ আপনি সেনাপ্রধান ছিলেন। আপনি ‘দাহিয়া ডকট্রিন’-এর রূপকার। গাজা ও লেবাননের সীমান্তে আমাদের আবারও সেই পুরনো রূপে ফিরতে হবে। ওরা যেন মাথা তোলার সাহস না পায়, সেজন্য আরও কঠোর সামরিক অভিযান দরকার।”

কক্ষের ভেতর পিনপতন নীরবতা। সবাই গাদির উত্তরের অপেক্ষায়।

গাদি শান্ত চোখে ইয়োভের দিকে তাকালেন। এরপর ধীরে ধীরে ফোল্ডারটি খুললেন এবং বললেন, ইয়োভ, ২০০৬ সালে যখন আমি দাহিয়া ডকট্রিনের কথা বলেছিলাম, তখন আমাদের লক্ষ্য ছিল শত্রুকে এমন এক বার্তা দেওয়া, যাতে তারা যুদ্ধের কথা ভুলে যায়। কিন্তু আজ বিশ বছর পর আমাদের নিজেদেরই প্রশ্ন করতে হবে,আমরা কি আসলেই যুদ্ধ থামাতে পেরেছি?

একজন সাবেক গোয়েন্দা প্রধান মাথা নেড়ে সায় দিলেন। ইয়োভ ভ্রু কুঁচকে বললেন, আপনি কি তবে দুর্বলতা দেখানোর কথা বলছেন? স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র মেনে নেবেন?

-কখনোই না,

গাদির কণ্ঠস্বর মুহূর্তেই ইস্পাতের মতো কঠিন হয়ে উঠল।

আমাদের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস হবে না। হামাস বা হিজবুল্লাহর সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের বিন্দুমাত্র চেষ্টা দেখলে আমি দাহিয়া ডকট্রিনের চেয়েও কঠোর শক্তি প্রয়োগ করতে দ্বিধা করব না। কিন্তু…

গাদি একটু থামলেন, তার কণ্ঠ কিছুটা নরম হয়ে এলো।

…কিন্তু শুধু বোমা ফেলে আর ট্যাংক চালিয়ে একটি ভূখণ্ডকে চিরকাল করায়ত রাখা যায় না। নেতানিয়াহু সেই ভুলটাই করেছেন। তিনি যুদ্ধকে রাজনৈতিক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেছেন, কোনো সমাধান খোঁজেননি।

গাদি টেবিলের মাঝখানে একটি মানচিত্র মেলে ধরলেন।

আমাদের কৌশল হবে দ্বিমুখী। একদিকে সীমান্তে থাকবে অভেদ্য সামরিক প্রাচীর। যাকে বলে ‘আয়রন ফিস্ট’। কোনো উসকানি এলে তাৎক্ষণিক ও বিধ্বংসী জবাব দেওয়া হবে। অন্যদিকে, গাজায় দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধবিরতি ও পুনর্গঠনের দায়িত্ব আমরা আন্তর্জাতিক মিত্র ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেব। আমরা সেখানে স্থায়ী দখলদার হয়ে থাকব না, আবার ওদের হাতে অস্ত্রও থাকতে দেব না।

বৈঠক শেষে যখন সবাই বেরিয়ে যাচ্ছেন, তখন ভোর প্রায় সাড়ে চারটা। জানালার কাঁচের ওপারে জেরুজালেমের আকাশে ভোরের আবছা আলো ফুটতে শুরু করেছে।

গাদি একা দাঁড়িয়ে রইলেন মানচিত্রটির সামনে। তিনি জানেন, তার এই নতুন পথের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে বিশ্বাস অর্জন। ইসরায়েলের জনগণ চায় নিরাপত্তা, আর গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া লাখো মানুষ চায় একটু নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা। পকেটে থাকা ছেলে গালের ছবিটা আবারও ছুঁয়ে দেখলেন তিনি। মনে মনে বললেন,

ইতিহাস হয়তো আমাকে একজন কঠোর জেনারেল হিসেবেই মনে রাখবে, কিন্তু আমি চাই না আর কোনো বাবাকে তার সন্তানের কফিন কাঁধে নিতে হোক।

নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার আগেই গাদি আইজেনকোট তার সবচেয়ে কঠিন যুদ্ধটা শুরু করে দিলেন। নিজের ভেতরের পুরনো আদর্শের সাথে নতুন বাস্তবতার যুদ্ধ।

জেরুজালেম থেকে মাত্র সত্তর কিলোমিটার দূরে, ভূমধ্যসাগরের তীর ঘেঁষে জেগে থাকা গাজা শহর তখনো রাতের অন্ধকার আর ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে।

খান ইউনিসের এক ভাঙাচোরা দালানের ছাদে দাঁড়িয়ে আছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব তারিক আল-মাসরি। পেশায় তিনি ছিলেন একজন স্কুলশিক্ষক। গত তিন বছরের যুদ্ধে তার স্কুল, বাড়ি সবই ধুলোয় মিশে গেছে। ছাদের এক কোণে ত্রিপল টাঙানো অস্থায়ী তাঁবুতে ঘুমিয়ে আছে তার একমাত্র নাতনি, আট বছরের লায়লা। লায়লার বাবা-মা দুজনেই ২০২৪ সালের এক বিমান হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন।

ভোরের আজানের ঠিক আগে তারিকের হাতে থাকা পুরনো ট্রানজিস্টর রেডিওটিতে আরবি সংবাদে ভেসে এলো নতুন খবর। ইসরায়েলে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যুগের অবসান হতে চলেছে। প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটকে নতুন সরকার গঠনের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন…

খবরটা শুনে তারিকের মুখে কোনো হাসি ফুটল না, আবার নতুন করে কোনো আতঙ্কও তৈরি হলো না। তার ক্লান্ত চোখে শুধু একরাশ শূন্যতা।

পাশের ধ্বংসস্তূপ থেকে উঠে এলেন প্রতিবেশী যুবক সামির। হাতে দুটি প্লাস্টিকের জার, পানির সন্ধানে বেরিয়েছেন। রেডিওর খবরটা তার কানেও গেছে। সামির তিক্ত হাসি হেসে বললেন,

তারিক চাচা, শুনলেন তো? নেতানিয়াহু যাচ্ছে, আইজেনকোট আসছে। তাতে আমাদের কী? সাপ বদলাবে, বিষ তো একই থাকবে।

তারিক দূরের ধূসর দিগন্তের দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তুই ঠিকই বলেছিস সামির। এই আইজেনকোটকে আমরা চিনি। ২০১৮ সালে সীমান্তে যখন আমাদের তরুণরা মিছিল করেছিল, তখন এই লোকই ছিল ওদের সেনাপ্রধান। আর লেবাননের সেই ‘দাহিয়া ডকট্রিন’ পুরো জনপদ গুঁড়িয়ে দেওয়ার যে নীতি, সেটাও তো ওরই মস্তিষ্কপ্রসূত।

তাহলে আর আশা কী?

সামির দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

আশা নেই, তবে একটা পরিবর্তন হয়তো আসতে পারে।

তারিক ধীরগতিতে বললেন। নেতানিয়াহু চেয়েছিল যুদ্ধটা অনন্তকাল চলুক, কারণ যুদ্ধ থামলেই তার গদি টলে যেত। কিন্তু এই নতুন লোকটা, আইজেনকোট, ওর নিজের ছেলেও এই যুদ্ধে মারা গেছে। যে বাবা সন্তানের লাশ কাঁধে নিয়েছে, সে অন্তত জানে যুদ্ধের দাম কতটা চড়া। হয়তো আমাদের বন্ধু হবে না, আমাদের স্বাধীন রাষ্ট্রও দেবে না; কিন্তু ও হয়তো এই অন্তহীন বোমাবর্ষণটা থামাবে।

ঠিক তখনই তাঁবুর ভেতর থেকে লায়লা বেরিয়ে এলো। চোখ কচলে দাদুর হাত ধরে বলল,

দাদু, আজও কি আকাশ থেকে আগুন পড়বে? আমি কি আজ একটু নিচে নেমে খেলতে পারব?

তারিক নাতনির মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। জেরুজালেমের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে বসে গাদি আইজেনকোট যে ‘আয়রন ফিস্ট’ আর ‘নতুন ভোরের’ মানচিত্র আঁকছেন, তারিক তা জানেন না। তিনি শুধু জানেন, লায়লার মতো লাখো শিশুর বেঁচে থাকার জন্য এখন একটি যুদ্ধবিরতি বড্ড প্রয়োজন। তা সে যে জেনারেলের হাত ধরেই আসুক না কেন।

পূর্ব আকাশে সূর্যের প্রথম আলো ফুটে উঠল। ধ্বংসস্তূপের ফাঁক গলে সেই আলো এসে পড়ল লায়লার মুখে। গাজার মানুষ জানে না এই নতুন ভোর তাদের জন্য সত্যিই শান্তি বয়ে আনবে, নাকি এটি আরেকটি দীর্ঘ রাতের আগের সাময়িক বিরতি মাত্র।

জেরুজালেমের পার্লামেন্ট ভবন, নেসেট। চারদিকে টানটান উত্তেজনা। জোটের শরিকদের সাথে দীর্ঘ দরকষাকষির পর আজ আস্থা ভোটের দিন। স্পিকারের আসনের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী হতে যাওয়া গাদি আইজেনকোট। তার ঠিক উল্টো দিকে বিরোধীদলীয় নেতার আসনে বসে আছেন সদ্য বিদায়ী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু, যার চোখে পরাজয়ের তিক্ততা আর ভবিষ্যতের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের ইঙ্গিত স্পষ্ট।

ডায়াসে দাঁড়িয়ে গাদি তার লিখিত ভাষণের কাগজগুলো একপাশে সরিয়ে রাখলেন। কক্ষজুড়ে পিনপতন নীরবতা।

মাননীয় স্পিকার,

গাদির কণ্ঠস্বর গম্ভীর ও দৃঢ়।

গত কয়েক দশক ধরে আমরা ভেবেছি, কেবল শত্রুর শহর গুঁড়িয়ে দিলেই আমাদের সীমান্ত নিরাপদ থাকবে। আমি নিজেও সেই সামরিক দর্শনের অংশ ছিলাম। কিন্তু আজ আমাদের স্বীকার করতে হবে দাহিয়া ডকট্রিন শত্রুকে ভীত করতে পারে, কিন্তু স্থায়ী শান্তি আনতে পারে না। প্রকৃত নিরাপত্তা আসে তখনই, যখন আমরা শক্তির পাশাপাশি কূটনীতিকেও ব্যবহার করতে শিখি।

কট্টর ডানপন্থি বেঞ্চ থেকে প্রতিবাদের গুঞ্জন উঠল। নেতানিয়াহু মৃদু হাসলেন, যেন তিনি জানেন এই পথ কতটা পিচ্ছিল। গাদি কোনো দিকে না তাকিয়ে বলে চললেন,

আজ থেকে গাজায় আমাদের সামরিক অভিযানের ধরন বদলাবে। কোনো উসকানি এলে আমরা চরম আঘাত হানব, কিন্তু একই সাথে আমরা দীর্ঘমেয়াদী যুদ্ধবিরতি এবং পুনর্গঠনের পথ খুলে দেব। কারণ, ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণ করা যায় না।

ভোটগ্রহণ শেষে ফলাফল ঘোষিত হলো। ৬৫-৫৫ ভোটে জয়ী হয়ে ইসরায়েলের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন গাদি আইজেনকোট।

সেদিন বিকেলে, জেরুজালেম থেকে সত্তর কিলোমিটার দূরে গাজার খান ইউনিসে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। গত তিন বছরে প্রথমবারের মতো আকাশে কোনো যুদ্ধবিমানের গর্জন শোনা গেল না।

স্কুলশিক্ষক তারিক আল-মাসরি ভাঙা ছাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে আছেন। তার হাতে ধরা ছোট্ট রেডিওতে ভেসে আসছে ইসরায়েলের নতুন প্রধানমন্ত্রীর যুদ্ধবিরতির ঘোষণার খবর। ঠিক তখনই নিচের ধুলোমাখা গলি থেকে আট বছরের লায়লার হাসির শব্দ ভেসে এলো। দীর্ঘদিন পর সে অন্য শিশুদের সাথে ধ্বংসস্তূপের ফাঁকে এক টুকরো খোলা জায়গায় বল নিয়ে খেলছে।

তারিক আকাশের দিকে তাকালেন। তিনি জানেন, গাদি আইজেনকোটের এই শান্তি কোনো ভালোবাসার দান নয়; বরং এটি একজন কঠোর জেনারেলের ঠান্ডা মাথার হিসাব-নিকাশ। তবুও, আজ অন্তত লায়লার মাথার ওপর থেকে আগুন ঝরছে না।

একই সময়ে, জেরুজালেমে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের জানালায় দাঁড়িয়ে দূরের পশ্চিম দিগন্তের দিকে তাকিয়ে আছেন গাদি আইজেনকোট। তার পকেটে থাকা ছেলে গালের ছবিটা হাতে নিলেন। চোখ থেকে দুফোটা অশ্রু ঝরে পড়লো। যদিও কেউ জানে না নিজের সন্তান হারানোর দুঃখ অনুভব করে সে কখনো গাজার অগনিত সন্তান হারা পিতা মাতা এবং পিতা মাতা হারা সন্তানের দুঃখ অনুভব করতে পারলেন কি না। আইজেনকোটের মনটা আজ একটু হালকা মনে হচ্ছে।

মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হলো। জেরুজালেমের একজন জেনারেল আর গাজার একজন সাধারণ শিক্ষক, দুজনই জানেন, এই শান্তি কাঁচের মতো ভঙ্গুর। সামান্য এক স্ফুলিঙ্গ আবারও সব জ্বালিয়ে দিতে পারে। তবুও, বারুদের ধোঁয়া সরিয়ে তারা দুজনেই এখন তাকিয়ে আছেন এক অনিশ্চিত, কিন্তু নতুন এক ভোরের দিকে।

-জাজাফী

৮ নভেম্বর ২০২৬

You may also like...