Home Blog Page 16

ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার বনাম বঙ্গবন্ধু

জাজাফী

ব্রাজিলের রিওডিজেনিরো শহরটির কথা মনে আসলেই সব থেকে আগে চোখে ভেসে ওঠে যে স্থানটি সেটি ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার।পাহাড়ের উপর দুই হাত প্রশস্থ করে দাড়িয়ে আছে বিশাল এক পাথরের ভাস্কর্য যেটির নাম ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার।ব্রাজিলে গেলে কোন পযর্টকই এই স্থাপত্যশিল্প না দেখে ফিরে আসেনা।পযর্টকদের প্রধান আকর্ষণ হয়ে উঠেছে ক্রাইস্ট দ্যা রিডিমার।ব্রাজিলীয়রা মনে করে পাহাড়ের উপর স্থাপিত যিশুখ্রিষ্টের দুই হাত প্রশস্থ করে রাখা ভাস্কযর্টি যেন তার প্রশস্থ হাত দিয়ে পুরো শহরটাকেই আগলে রেখেছে।

ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের বিশ্ব স্বীকৃতি মিলেছে।পৃথিবীর অগণিত পযর্টক যখন আমাদের দেশে আসবে তখন সেই স্মৃতি বিজড়িত স্থান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে হয়তো কেউ যাবে কেউ যাবে না।কারণ তাদের দৃষ্টি আকর্ষণের মত তেমন কিছু সেখানে খুঁজে পাবেনা ভেবেই তারা আগ্রহ হারাবে।যদিও সেখানে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি যাদুঘর এবং শিখা অনিবার্ণ রয়েছে তার পরও সবার আগ্রহ আসবে না।

রিওডিজেনিরো শহরের সাথে ঢাকা শহরের বিস্তর পার্থক্য।ওই শহরটা পাহাড় অরণ্যে ঘেরা পক্ষান্তরে আমাদের ঢাকা শহরের একশো কিলোমিটার আসেপাশেই কোন পাহাড় এমনকি উচু টিলাও নেই।ফলে দূর থেকে চোখে পড়ার মত তেমন কিছু নেই এখানে।আমি অনেকদিন থেকে ভেবেছি সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের যে স্থানে দাড়িয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন সেখানে একটি সুউচ্চ টাওয়ার স্থাপন করা উচিত এবং সেই টাওয়ারের উপরে থাকবে তর্জনী উচু করা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একটি ভাস্কর্য।টাওয়ারটির উচ্চতা যদি কোন ভাবে ২০ তলা ভবনের সমান করা যায় এবং বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যটি যদি ৩০ ফুট উচু করা যায় তবে ঢাকা শহরের যে কোন প্রান্ত থেকেই সেটা চোখে পড়বে।এই দেশে আগত পযর্টকদের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠবে ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের জায়গাটি।তারা একই সাথে চিনবে সবর্কালের সবর্শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।এমনকি যে সব দেশী-বিদেশী তাদের প্রয়োজনে ঢাকাতে আসবে তারাও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঘুরে যেতে চেষ্টা করবে। দেশী বিদেশী যারাই প্লেনে করে বিমান থেকে অবতরণ করবে তাদের চোখে পড়বে বঙ্গবন্ধুর তর্জনী উচু করে দাড়িয়ে থাকা ভাস্কর্যটি।স্বাভাবিক ভাবেই তাদের আগ্রহ হবে স্থানটিতে ঘুরে যাওয়ার।এতে করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান হয়ে উঠবে অন্যতম পযর্টন কেন্দ্র।

আমরা কোটি কোটি টাকা খরচ করে গিনেস বুকে নাম লেখানোর জন্য অতীতে জাতীয় সঙ্গীত গেয়ে রেকর্ড করেছিলাম যদিও সেই রেকর্ড বেশিদিন টেকেনি।আমরা সাতই মার্চের এই স্বীকৃতি উদযাপন করছি অনেক আনন্দের সাথে।সেখানেও কিছু কিছু অর্থ খরচ হচ্ছে।আমরা কত ভাবে অর্থ অপচয় করছি সেখানে বাঙ্গালীর স্বাধীনতার মহানায়কের স্মৃতি বিজড়িত স্থানে তাঁর একটি সুউচ্চ ভাস্কর্য স্থাপন করা আশা করি আমাদের জন্য কঠিন কিছু হবে না।প্রথম দিকে আমি ভেবেছিলাম ভাস্কর্যটি সংসদভবনের পাশে খামারবাড়ীতে বঙ্গবন্ধু চত্ত্বর নামে যে স্থানটি আছে ওখানে করলে ভাল হবে কিন্তু পরে মনে হলো জায়গাটি এর জন্য যথোপোযুক্ত নয়।সম্প্রতি মহান ভাষণটিকে যখন বিশ্ব স্বীকৃতি দেওয়া হলো তখন মনে হলো এই কাজটির জন্য সবার্পেক্ষা উত্তম স্থান হবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান।

রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম হওয়ায় এদেশে নানা সময় ভাস্কর্য স্থাপন নিয়ে বাকবিতণ্ডার জন্ম হয়েছে।সম্ভবত শুরুটা হয়েছিল বিমানবন্দর চত্ত্বরে লালনের ভাস্কর্য স্থাপনের সময় থেকে।তার পর সুপ্রিমকোর্টের সামনে স্থাপিত ভাস্কর্যটি নিয়ে যেটা হলো তা রীতিমত সংবাদের প্রধান শিরোণাম হওয়ার যোগ্য।হয়তো অনেকেই মনে করতে পারেন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে একটি সুউচ্চ টাওয়ার নির্মান করে সেটির উপর ক্রাইস্ট দ্যা রিডিমারের মত করে বঙ্গবন্ধুর তর্জনী উচু করা একটি ভাস্কর্য নির্মান করলে আবার এদেশে অরাজকতা তৈরি হবে এবং অগণিত মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়বে।আমি অবশ্য এই কথাটির সাথে একমত নই।এর পিছনে যথেষ্ট যুক্তি রয়েছে।প্রথমত মুসলিম প্রধান দেশ হওয়ায় প্রতিবছর হজ্জ্বের সময় হাজীগন বিমানবন্দর চত্ত্বর দিয়ে হজ্জ্বে যাওয়া আসা করার সময় লালনের ভাস্কর্যটি তাদের চোখে পড়তো এবং সেটিতে তাদের পাপবোধ হত বিধায় তারা সেটিকে অপসারণের দাবী জানিয়েছে।অন্যদিকে সুপ্রিমকোর্টের সামনের ভাস্কর্যটিও সেই একই ধরনের বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে বিশেষত একটি গ্রীক দেবী মুর্তিকে বাঙ্গালী মুসলমানরা গ্রহণ করতে পারেনি।

এই দিক থেকে বঙ্গবন্ধু অবশ্যই ভিন্ন একটি বিষয়।দেশে যে যে দলই করুকনা কেন উপরে যাই বলুকনা কেন ভিতরে ভিতরে বঙ্গবন্ধু ও তাঁর অবদান সম্পর্কে সবাই অবগত এবং শ্রদ্ধাবনত।সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে পৃথিবী কেন একজন বাঙ্গালীও মনে রাখতো না যদি না সেখানে বঙ্গবন্ধু তর্জনী উচু করে ভাষণ না দিতেন এবং সেই ভাষণই বাঙ্গালীর স্বাধীনতার ভীত গড়ে দিয়েছিল।সেদিন বঙ্গবন্ধুর উচ্চারিত প্রতিটি শব্দ বাঙ্গালীকে স্বাধীনতার চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছিল।ওই স্থানটি তাই বঙ্গবন্ধুর জন্য স্মরণীয় হয়ে গেছে।সুতরাং ওখানে ক্রাইস্ট দ্য রিডিমারের মত বঙ্গবন্ধুর একটি ভাস্কর্য স্থাপন করলে কারো দ্বিমত থাকবে বলে মনে করি না। যদি তাই না হতো তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবনের সামনে স্থাপিত অপরাজেয় বাংলা,টিএসসির রাজু ভাস্কর্য থেকে শুরু করে গাজীপুর চৌরাস্তায় স্থাপিত জাগ্রত চৌরঙ্গী কোনটিই টিকে থাকতো না।আমার জানা মতে শুধু মাত্র একবার দাবী উঠেছিল অপরাজেয় বাংলা ভাস্কর্য অপসারণ করতে হবে কিন্তু সেই দাবী ধোপে টেকেনি।এর পর আর কখনো কোন ভাস্কর্য নিয়ে প্রতিবাদ হয়নি।বিশেষত বঙ্গবন্ধুর কোন ভাস্কর্য নিয়ে প্রতিবাদ করারতো কোন প্রশ্নই ওঠেনা।

এর আগে অনেক স্থানেই বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপিত হয়েছে কিন্তু সেগুলোর আকার এবং অবস্থান ঐতিহাসিক নির্দশন বহনের জন্য যথেষ্ট নয়।বন্যেরা বনে সুন্দর শিশুরা মাতৃক্রোড়ে নামে যে প্রবাদটি আছে অনেকটা সেরকমই বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের জন্য সব থেকে উত্তম যায়গা সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এবং সেই ভাস্কর্যটি হওয়া চাই ক্রাইস্ট দ্য রিডিমারের মত সুউচ্চ যেন দূর থেকেও সবাই দেখতে পায় ঐ তো বাঙ্গালীর স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধু দাড়িয়ে আছেন।

এখন কথা উঠতে পারে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এই ধরনের স্থাপনার জন্য যদি জায়গা বরাদ্দ করা হয় তাহলে উদ্যানের জায়গা কমে যাবে।আমি মনে করি ওই জায়গাটা ওই ভাষণ সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য ব্যবহার করাই যুক্তিযুক্ত।আজ আমরা সব দল যে ওখানে সভা সমাবেশ করার সুযোগ পাচ্ছি তার একমাত্র কারণ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ।যদি সেদিন ওখানে ভাষণ না হতো তাহলে হতে পারতো ঢাকা শহরের অন্যান্য স্থানের মত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানও আজ জনবসতি গড়ে উঠতো এবং তখনো আমরা সভা সমাবেশ করার সুযোগ পেতাম না। আর তাছাড়া স্থানটিতে একটি টাওয়ার নির্মান করলে নিশ্চই পুরো অঞ্চলটি ছেয়ে যাবে না।প্রতিবছর লাখ লাখ মানুষ একুশে বইমেলাতে আসে।সেই সব অগণিত বইপ্রেমীদের মনেও ধরা দিবে এই ভাস্কর্যটি।ওয়ারেন বাফেটের একটি কথা খুব মনে পড়ছে।তিনি বলেছিলেন ‘আগে জমাও,তার পর যদি কিছু থাকে সেটা খরচ করো’। আমিও মনে করি সবার আগে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান হোক বঙ্গবন্ধু ও তাঁর স্মৃতি চিহ্নের ধারক ও বাহক।তার পর যদি বাকি কিছু স্থান থাকে তো বাকি কাজে ব্যবহার করা যাবে।

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জায়গা বেশ অনেক।একুশে বইমেলার স্থান বাদেও চারপাশে অগনিত স্থান পড়ে আছে।আমার মতে যে স্থানটিতে স্মৃতিস্তম্ভ তৈরি করা হয়েছে ওখানেই একটি নির্দিষ্ট এরিয়া নিবার্চিত করে সেখানে একটি সুউচ্চ টাওয়ার নির্মানের এখনি সময় এবং সেই টাওয়ারটা অন্তত চার থেকে পাঁচ হাজার স্কয়ারফিট দৈর্ঘ্য প্রস্থের হওয়া চাই এবং টাওয়ারে ওঠার ব্যবস্থাও থাকা চাই।ক্রাইস্ট দ্য রিডিমারে যেমন ভাস্কর্যের বেদীতে গিয়ে মানুষ সৌন্দর্য অবলোকন করতে পারে এটিতেও সেই ব্যবস্থা থাকা উচিত।তবে একটি বিষয়ে শুধু পার্থক্য রাখতে হবে তা হলো ক্রাইস্ট দ্য রিডিমারের ভাস্কর্যের ভিতরেও প্রবেশের সুবিধা আছে অর্থাৎ সিড়ি দিয়ে সরাসরি ভাস্কর্যের হাতের উপর বা মাথার উপরও ওঠা যায়।এ ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যে এই সুবিধাটি রাখা উচিত হবেনা।যেন শুধু মাত্র বেদী পযর্ন্ত ওঠা যায় সেই ব্যবস্থা রাখতে হবে।

এখন কথা হলো চার পাঁচ হাজার স্কয়ারফিট জায়গা নেওয়ার পর কিন্তু সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের তামাম জায়গা পড়েই থাকবে সুতরাং চিন্তিত হওয়ার তেমন কোন কারণ নেই।এই টাওয়ারটি নির্মান করার আগে ভাস্কর্যশিল্পী এবং এর সাথে যুক্ত ইঞ্জিনিয়ারদের উচিত রিওডিজেনিরোতে গিয়ে ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার ভাস্কর্যটি ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করে আসা।ঠিক কিভাবে কোন কোন উপাদান দিয়ে এই টাওয়ারটি নির্মান করলে দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং অন্তত একই সাথে এক হাজার বা তার বেশি মানুষকে অনায়াসে ধারণ করতে পারবে সেদিকেও নজর দিতে হবে।কেননা ঘুরতে আসা প্রত্যেকেই টাওয়ারে উঠতে আগ্রহ দেখাবে।টাওয়ারের একদম উপরে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য বেদীর চারপাশের রেলিংএ শক্ত কাচের দেওয়াল দিয়ে ঘিরে দিতে হবে যেন পযর্টকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় কেননা অনেকেই রেলিং ধরে দাড়িয়ে ঢাকা শহরটি দেখতে চাইবে।মূল কথা হলো ক্রাইস্ট দ্য রিডিমার পর্যবেক্ষণ করলেই বাকিটা পরিষ্কার হয়ে যাবে।

এখন আসি নির্মান ব্যয় প্রসঙ্গে।অনেকেই বলবেন সরকারী অর্থে এটা নির্মান করা কতটা যৌক্তিক?আমি বলতে চাই বঙ্গবন্ধু যদি না থাকতেন তাহলে আজকের এই বাংলাদেশকি থাকতো?আওয়ামীলীগ,বিএনপি,জাতীয় পার্টি কোন দল কি থাকতো?কোন সরকার কি থাকতো?তাহলে বঙ্গবন্ধুইতো সব সরকারের মধ্যমনি হওয়ার কথা।তাঁর জন্য একটি ভাস্কর্য নির্মানের ব্যয় কেন তবে সরকার বহন করতে পারবে না?যারা বলবেন দেশে অগণিত সমস্যার পিছনে টাকা খরচ না করে একটি ভাস্কর্য নির্মানে এতো গুলো টাকা ব্যয় করা যুক্তিযুক্ত নয় তাদের বলতে চাই সমস্যা সব সময়ই ছিল এবং থাকবে। তা বলে এটিকে কোন ভাবেই এড়িয়ে যাওয়া যুক্তিযুক্ত নয়।আমিতো মনে করি দেশে দল মত নিবির্শেষে অগণিত বঙ্গবন্ধু প্রেমী আছেন যাদের কাছে প্রস্তাব রাখলে এই ভাস্কর্য ও টাওয়ার নির্মানের পুরো ব্যয় তারা বহন করবে।চাঁদা তুলে হলেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু ওয়াচ টাওয়ার এবং সেটির উপরে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য স্থাপন করা হবে।তবে এই পন্থা অবলম্বন করলে সেটি হবে জাতির জন্য কলঙ্কের নাম।যাঁর জন্য দেশ স্বাধীন হলো তাঁর একটি ভাস্কর্য স্থাপনের জন্য যদি চাঁদা উঠাতে হয় সেটি অবশ্যই লজ্জাকর ব্যপার বলে আমি মনে করি।তবে হ্যাঁ ঘোষণা দেওয়ার পর কেউ যদি স্বেচ্ছায় এই আয়োজনে আর্থিক সহযোগিতা করতে আগ্রহী হয় তবে সেটি অবশ্যই গ্রহণ করা উচিত।পাশাপাশি আগত পযর্টকদের মধ্যে যারা টাওয়ারে উঠবে তাদের থেকেও একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ পযর্ন্ত টিকেটের ব্যবস্থা করা যেতে পারে এতে করে এই স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষন কাজ আরো সহজ হবে।এবং হরহামেশা যে কেউ উঠে স্থাপনাটিকে দুবর্ল করতে পারবে না।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের প্রতিটি মানুষ আশা করি এ বিষয়টি বিবেচনায় নিবেন।আমি স্বপ্ন দেখি সেই দিনটার যেদিন ঘুম থেকে জেগে বেলকনিতে দাড়াতেই সকালে সুযর্টা যেমন চোখে পড়বে তেমনি চোখে পড়বে বঙ্গবন্ধুর তর্জনী উচু করা ভাস্কর্যটি।

২৫ নভেম্বর ২০১৭

ইমেইলঃ [email protected]

 

রেজাল্ট কিন্তু দিচ্ছেনা

দেব দেব করে MBBS এর
রেজাল্ট কিন্তু দিচ্ছেনা
এই ফাঁকে কিছু ঘটে যেতে পারে
কেউ তার খোঁজ নিচ্ছেনা।

বাড়িতে কোন রান্না না করে
হোটেলে যেমন খাওয়া যায়
প্রশ্ন পত্র ফাঁস না করেও
কখনোবা চান্স পাওয়া যায়।

চোখ কান সব খোলা রাখো ভাই
কি যে হয় সব আড়ালে
গ্যাঞ্জাম লাগে এই কথা নিয়ে
প্রতিবাদ করে দাড়ালে।

মন্ত্রী মশাই এতো লেট কেন?
রেজাল্ট কখন পাবো?
দোকানীরা সব পথ চেয়ে আছে
মিঠাই কখন খাবো।

জানিনা এবারও কত ভাই বোন
ফেলবে চোখের জল
ভাল এক্সাম দিয়েও হয়তো
পাবেনাকো ভাল ফল।

আড়ালে যা হবে তা কি আর জানি
কত কিছুইতো ঘটে
কত অভাগার কপাল পুড়বে
পড়ে যাবে সংকটে।

এমন দিনকি আসবে কখনো
মরবেনা কারো আশা
সবার স্বপ্ন সত্যি হবে
বেঁচে রবে ভালবাসা।

ডাক্তার হব পণ করে কেউ
হতাশ হবেনা আর
মন্ত্রী মশাই বলুন না কে
গ্যারান্টি দেবে তার।

আর কেন দেরি এবার আপনি
রেজাল্ট খানাতো দিন
MBBS রেজাল্ট নিয়ে
আর কত হবে সীন?

এই ফাঁকে যদি কোন কিছু ঘটে
কে নেবে তার দায়
ভাল এক্সাম দিয়েও আমরা
করবো কি হায় হায়?

#জাজাফী
১০ অক্টোবর ২০১৬
#MBBS_Result2016

তোফায়েলের প্যারেন্টস ডে

রাতে কারো ঘুম আসছিলনা। লাইটস আউটের ঘন্টা বাজলেই বা কার কি। চিন্তা একটাই কালতো প্যারেন্টস ডে।ক্যাডেট লাইফে প্যারেন্টস ডে মানেই ক্যাডেটদের ঈদের দিন।হয়তো আমারও। কিন্তু কালকের প্যারেন্টস ডেটাকে কেন যেন ঈদের দিন ভাবতে পারছিনা। রাত পেরিয়ে সকাল হলে যে প্যারেন্টস ডেটা আসবে সেটি যে আর কোন দিন ফিরে আসবেনা। এক জীবনে আর কোন দিন প্যারেন্টস ডে আসবেনা আমাদের জীবনে। যদিও সারা জীবন বাবা মায়ের সাথে থাকলে প্রতিদিনই প্যারেন্টস ডে হিসেবে ধরে নেওয়া যাবে কিন্তু কলেজ লাইফের শেষ প্যারেন্টস ডে হওয়ায় এই অনুভূতিটা অন্যরকম। ভাবতেই পারছিনা এই প্রিয় আঙিনা ছেড়ে চলে যেতে হবে।আর কোন দিন আমাদের জীবনে এই আঙিনায় প্যারেন্টস ডে নামের আড়ালে ঈদের আনন্দ ফিরে আসবে।

সবাই কম বেশি নির্ঘম কাটাচ্ছে।মনের মধ্যে প্যারেন্টস ডের আনন্দের চেয়ে ফুরিয়ে যাওয়া বেদনাটাই বেশি।মনের অজান্তেই যেন চোখে পানি চলে আসছে।একদিন এই চত্ত্বরে বাবা মা যখন রেখে গিয়েছিল সেদিনো আমরা কেঁদেছিলাম। সেদিনও কেদেছিলাম কষ্টে। কিন্তু এখন যে কাদছি সেটাও কষ্টের কিন্তু এই কষ্টটা এই আঙিনা ছেড়ে যাওয়ার কষ্ট।

আমার পাশের বেডে তোফায়েল।তোফায়েল ঘুমায়নি। সে ডায়রি নিয়ে বসেছে।কি কি সব লিখছে।তার মনে কোন বেদনার ছায়াও দেখতে পাচ্ছিনা।প্রতিবার প্যারেন্টস ডেতে ওকে আর সবার মতই আনন্দিত দেখায়। তার মানে এবারও সবার মত তাকে বিষন্ন দেখানোর কথা ছিল কিন্তু হয়েছে তার উল্টোে। সেই একমাত্র খুশিতে আটখানা হয়ে আছে। ব্যাপারটা বুঝতেই পারিনি। বার কয়েক জিজ্ঞেস করলেও সে কিছু বলেনি। শুধু মুচকি মুচকি হেসেছে।

এর আগে যত বার প্যারেন্টস ডে এসেছে ততোবারই দেখেছি তোফায়েলের বাবাই শুধু এসেছেন।কোন দিন ওর আম্মুকে আসতে দেখিনি। ভাই বোনও কখনো আসেনি। আমি আর কোন কিছু না ভেবে ঘুমাতে চেষ্টা করলাম।

লাস্ট প্যারেন্টস ডেতে আমাদের প্রায় সবারই বাবা মা ভাই বোনেরা এসেছে। কারণ এবার না আসলে পরেতো আর কোন প্যারেন্টস ডে পাবেনা।আমরা একই সাথে আনন্দিত এবং আর কোন প্যারেন্টস ডে পাবোনা ভেবে বিষন্নও কিছুটা। সবাই সবার সাথে গল্প করছি।একজন আারেকজনকে তার মা বাবা ও পরিবারের সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে।

হঠাৎ চোখ গেল তোফায়েলের দিকে।সে দেখি এক ভদ্রমহিলা আর একটা সমবয়সী কিংবা অপেক্ষাকৃত কম বয়সী মেয়ের সাথে হেসে হেসে কথা বলছে। আমি আর মুকাব্বির এগিয়ে গিয়ে ওর পিঠ চাপড়ে দিলাম।সে আমাদেরকে ভদ্রমহিলার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো এই আমার আম্মু আর আমার ছোট বোন লামিয়া। আমি আর মুকাব্বির ওর আম্মুকে সালাম দিলাম। এর আগে কোন প্যারেন্টস ডেতেই তারা আসেনি। আমি আন্টিকে বললাম আগে কেন আসেননি প্যারেন্টস ডেতে। শুধু আংকেলই আসতেন। তিনি জানালেন তার কাজ থাকে তাছাড়া সময়ও খুব একটা হয়ে ওঠেনা। এটা যেহেতু শেষ প্যারেন্টস ডে আর ওর বাবা যেহেতু আসতে পারতেছেনা তাই আমি আর লামিয়া আসলাম।

আর কথা না বাড়িয়ে ওদেরকে রেখে আমি আর মুকাব্বির নিজেদের বাবামাকে নিয়ে মেতে উঠলাম। ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সব দেখাচ্ছি এমন সময় এক ভদ্রলোক আমাকে নাম ধরে ডাকদিলেন। আমি ফিরে তাকিয়েই চিনতে পারলাম। তোফায়েলের বাবা! আমি সালাম দিয়ে আংকেলকে বললাম আংকেল তাহলে আপনিও এসেছেন। আন্টিতো বললো যে আপনি কাজের চাপে আসতে পারছেন না তাই তিনি একাই এসেছেন। তিনি আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। হঠাৎ খেয়াল করলাম তার পাশে আরেকজন ভদ্রমহিলা আর ছোট্ট আট নয় বছরের একটা মেয়ে। তিনি কিছুটা সময় নিয়ে জানতে চাইলেন আন্টি মানে?তোফায়েলের আম্মুতো আমার সাথেই আছে।

আমি তখন খেয়াল করে দেখলাম সত্যি সত্যিই আংকেলের পাশে আন্টি আর তোফায়েলে বোন। আমি পিচ্চিটার মাথার চুলে বিলি কেটে বললাম কেমন আছ লামিয়া?সে হেসে দিয়ে বললো ভাল আছি ভাইয়া। আমি বুঝলাম এলাহী কান্ড ঘটতে চলেছে।কিন্তু যেন ঝামেলা না হয় তাই আংকেলকে আগেই বললাম যে কোন সিনক্রিয়েট না করতে। কারণ সিনক্রিয়েট করলে কলেজ কর্তৃপক্ষ না জানি কি করে বসে।

আমি মুকাব্বিরকে ডাক দিলাম।সে দৌড়ে আসলো।আমি পরিচয় করিয়ে দেওয়ার আগেই মুকাব্বির তোফায়েলের বাবাকে চিনতে পারলো এবং সালাম দিল।আমি ইশারা করতেই ও বুঝে গেল কি ঘটেছে। আমি আর মুকাব্বির যেন বীর দর্পে আংকেল আর আন্টিকে নিয়ে তোফায়েলের দিকে রওনা হলাম। দুর থেকেই দেখলাম তোফায়েল তার বোন মানে লামিয়াকে মুখে তুলে খাইয়ে দিচ্ছে। লামিয়াও মাঝে মাঝে তোফায়েলকে খাইয়ে দিচ্ছে। আহ কি প্রশান্তি। কি ভালবাসা ভাই বোনের মধ্যে।ওদিকে লামিয়া কিন্তু আমার পাশে পাশে হাটছে!

আমি তোফায়েলের সামনে গিয়ে দাড়ালাম। তার পর সেই আন্টিকে বললাম আন্টি আংকেলতো এসেছেন।তিনি মনে করেছেন আপনি একা একা প্যারেন্টস ডেতে কিভাবে না জানি সময় কাটাবেন তাই তিনিও ছুটে এসেছেন। সাথে সাথে তার মুখটা কালো হয়ে গেল।আমি আর মুকাব্বির ছাড়া কেউ কিছু জানতে পারলোনা।মুকাব্বির অবশ্য তোফায়েলকে বাগে পেয়ে ছেড়ে দেয়নি খালিহাতে। সে সাজানো লামিয়া মানে তোফায়েলের গার্লফ্রেন্ডকে বললো বাবা এসেছেন পা ছুয়ে সালাম করো।আর সাজানো লামিয়ার মাকে বললেন আন্টি আপনি চুপ করে বসে আছেন কেন। আংকেল এসেছেন আংকেলের সাথে ঘুরে ঘুরে দেখুন সব।

দিন শেষে বাবা মা ফিরে গেছেন।গত রাতে যে তোফায়েলের মুখটা হাজার ওয়াট বাল্বের মত উজ্জ্বল ছিল সেই তোফায়েল গোমরা মুখে বসে আছে।আমাদের উপর তার রাগ হয়নি মোটেও। এমন পরিস্থিতি ঘটবে তা সে স্বপ্নেও ভাবেনি। বন্ধুদের বলে রাখা ছিল প্যারেন্টস ডের সময় খোজ নিয়ে জানতে যে বাবা মা আসবে কিনা। যদি কোন প্যারেন্টস ডেতে বাবা মা না আসেন তবে যেন গার্লফ্রেন্ডকে বোন সাজিয়ে লিপি আপাকে মা সাজিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। লাষ্ট প্যারেন্টস ডের আগে তোফায়েলের গ্রামের বন্ধু নাজির গিয়ে ওর বাবার কাছে জানতে চাইলো কাকা প্যারেন্টস ডেতো এসে গেল তা কে কে যাবেন এবার। তোফায়েলের বাবা বললেন এবার কেউ যেতে পারছিনা বাবা। নানা ঝামেলার মধ্যে আছি।বন্ধু উপস্থিত থাকতেই বাবা তোফায়েলকে ফোন করে সেটা জানিয়েও দিল।তোফায়েলের সুযোগ হয়েছিল নাজিরের সাথে এক মিনিট কথা বলার।

যেহেতু অনেক আগে থেকেই ওসব শিখিয়ে দেওয়া আছে তাই তোফায়েল নাজিরকে বলেছিল দান দান তিন দান শেষ দান আমাদের। এতেই সে যা বুঝার বুঝে গিয়েছিল। ওদিকে প্যারেন্টস ডে নিয়ে তাই তোফায়েলের ছিল সেইরকম আনন্দস্বপ্ন। গার্লফ্রেন্ড আসতেছে।কেউ তাকে চেনেনা। বোন বলে পরিচয় করিয়ে দিবে।মুখে তুলে খাইয়ে দেবে আর কাধের উপর হাত রেখে পাশাপাশি হাটবে এর থেকে রাজ কপাল আর কি হতে পারে।

অপর দিকে তোফায়েলের বাবা আগের রাতে চিন্তা করলেন ছেলেতো কদিন বাদেই চলে আসবে কলেজ থেকে। এটাই জীবনের শেষ প্যারেন্টস ডে।তাছাড়া ওর মা আর লামিয়াকেও কোন দিন কলেজে নেওয়া হয়ে ওঠেনি কেবল মাত্র ভর্তির দিন ছাড়া। তাই তিনি মত পাল্টে লাস্ট প্যারেন্টস ডেতে উপস্থিত হবেন বলে সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি ভেবেছিলেন ছেলেকে চমকে দেবেন।তিনি যতটা ভেবেছিলেন তার থেকে শত গুন বেশি চমকেছে তোফায়েল।সেই সাথে তোফায়েলের বাবা মাও চমকেছে। শেষ প্যারেন্টস ডের কথা তাই তোফায়েলের মনে থাকবে সারাজীবন। এমনকি আমাদের চেয়েও বেশি।


তোফায়েলের প্যারেন্টস ডে
জাজাফী—- ফেসবুকে জাজাফী

১৫ মে ২০১৬

 

শিক্ষকের ভুল ধরা কি ভুল

ছাত্র হয়ে শিক্ষকের ভুল ধরা যাবে না,সেটা করলে পাপ হবে এবং শিক্ষাজীবন ববার্দ হয়ে যাবে।শিক্ষাজীবন ববার্দ যেন না হয় তাই দিনের পর দিন আমরা শিক্ষকের ভুল দেখেও মুখ খুলিনি পাপ হবে বুঝলেন পাপ।পাপের ভয়ে আমরা আজীবন ভুল শিখেছি, ভুল জেনেছি, ভুল ভাবে বড় হয়েছি।আমাদের জন্মটাই যেন ভুল সময়ে হয়েছে।রসিকতা নয় বরং আক্ষেপ করে বলতেই পারি জন্মটা একাত্তুরের আগে হলে হয়তো এ জীবন টেনে নিতে হত না।স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়ে শহীদ হয়ে যেতাম। তাহলে আর শিক্ষকদের ভুল দেখে মেজাজ খারাপ হতনা,শিক্ষকদের ভুল ধরার দরকার পড়তো না এবং পাপও হতনা।

দেশ এখন রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে চিন্তিত তার মাঝে আমি ভুল নিয়ে তবেকি ভুলভাল বকছি?ইদানিং ফেসবুকের কল্যাণে কিছু কিছু কথা কিছু কিছু ছবি কিছু কিছু ভিডিও ভাইরাল হয়।ভাইরাল শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ কি তা এখনো আবিস্কার হয়েছে কিনা কারো জানা থাকুক বা না থাকুক এই শব্দটির সাথে প্রায় সবাই পরিচিত হয়ে গেছে।এমনও হতে পারে সেলফীর মত এই ভাইরাল শব্দটিও আসলে যে কোন ভাষার ক্ষেত্রে নতুন সংযোজোন হয়েছে।তো কাজের কথায় আসা যাক।কিছুদিন আগে কোন একটি টিভি চ্যানেলের করা একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল যেখানে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের কিছু সাধারণ প্রশ্ন করা হয়েছিল কিন্তু কেউ সঠিক উত্তর দিতে পারেনি।আর এতেই সারা দেশ ফুসে উঠলো,শিক্ষা ব্যবস্থাকে গালিগালাজ করলো শিক্ষামন্ত্রীকে ধুয়ে দিল যেন সব দোষ শিক্ষামন্ত্রীর আর সরকারের।

আমরা সেই টেলিভিশন চ্যানেলের পেজে,সাইটে গিয়ে একটু খোঁজ নিতেই দেখতে পেলাম দুই লাইন লেখায় তিনটা বানান ভুল।যেহেতু তারাই নেমেছে ভুল ধরতে সেহেতু তাদের ভুলগুলো কে ধরবে তার দায়িত্ব সম্ভবত তারা বন্টন করেনি তখনো।অগত্য সেটা নিয়েও খুব হুলুস্থুল কান্ড ঘটে গেল এবং তারা তখন শুধরে নিল।এর পর জানা গেল সেই নিউজটাও নাকি ভুয়া ছিল।এটার সত্যতা যাচাই করার চিন্তা আপাতত মাথা থেকে সরিয়ে ফেলছি।কেউ যদি প্রমান চায় তবে সেই প্রমান দেবার মত সময় এবং ইচ্ছে কোনটাই আমার নেই।আমাদের প্রশ্নপত্রে ভুল,স্কুল কলেজের বইয়ে ভুল,রাস্তায় রাস্তায় অলিতে গলিতে পোষ্টার ব্যানারে ভুল।বুকের উপর সেপটি পিন দিয়ে আটকে রাখা নেমপ্লেটে ভুল।চলনে বলনে ভুল আচার আচরণে ভুল।আমাদের জীবনটাই যেন ভুলের রাজ্য হয়ে উঠেছে।আচ্ছা আমাদের কি দোষ বলুন।যে বই পড়ে আমরা জ্ঞানী হব বলে ভেবেছি সেই বইয়ে ভুল থাকলে আমরাতো ভুলই শিখবো।যে প্রশ্নে ভুল থাকে সেই প্রশ্নের উত্তর দিলে আমরাতো ভুল উত্তরই দেব।আর যে শিক্ষক আমাদের পড়ান তিনি ভুল করলে কি হবে? অবশ্যই আমরা ভুল শিখবো কিন্তু তার ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়া যাবেনা।কারণ শিক্ষকের ভুল ধরাও ভুল।এটা মস্তবড় পাপ।

এই ভুলের রাজ্যে কারো কারো হয়তো সেই ছাত্রটির মত মতিগতি বিগড়ে যেতে পারে।আচ্ছা জানা গল্পটা না হয় আরো একবার জেনে নেওয়া যেতেই পারে এতে দোষেরতো কিছু নেই।ন্যাড়া না হয় বেলতলায় একবারই যায় কিন্তু আমরাতো ন্যাড়া নই তাই একবারের যায়গায় দশবার গেলেওবা ক্ষতি কি।যদিও আমরা বেল তলা যাচ্ছিনা বরং জানা গল্প আরেকবার জানতে চেষ্টা করছি।

স্কুল থেকে ফিরে সেই ছাত্রটি তার বাবাকে বললো বাবা কাল থেকে আর স্কুলে যাবনা।যাচ্ছেতাই ব্যাপার খুবই বিরক্তিকর।কারো মধ্যে কোন কান্ডজ্ঞান নেই কেউ দায়িত্ববান নয় সব একটা মিথ্যাবাদি।ছেলের কথা শুনে বাবাতো ভীষণ অবাক।জানতে চাইলেন কি হয়েছে সেটা আগে খুলে বলো তার পর ভেবে দেখা যাবে তুমি স্কুলে যাবে কি যাবেনা।ছেলেটি বললো স্কুলে যাব কি করে। যে স্কুলের শিক্ষকেরা সামান্য একটি বিষয়ে একমত হতে পারেনা সেই স্কুলে গিয়ে আমি কি শিখবো তাইতো বুঝতে পারছিনা।ক্লাসে আইসিটি স্যার বললেন সেল মানে হলো মোবাইল ফোন।পরের পিরিয়ডে বিজ্ঞান স্যার বললেন সেল মানে হলো কোষ।গণিত স্যার বললেন সেল মানে হলো বিক্রয়।সমাজ বিজ্ঞাস স্যার বললেন সেল মানে হলো জেলখানা।যেখানে এক সেল কথাটাকেই স্যারেরা সবাই মিলে এক অর্থে মেনে নিতে পারছেনা সেখানে গিয়ে আমি কি শিখবো?

গল্পটি পড়ে কারো হয়তো হাসি পাবার কথা নয় কিংবা এই গল্পটি কেন বললাম সেটার কারণ খুঁজতে শুরু করে দিতে পারেন।আসলে অনেকটা ধান ভানতে শিবের গীতের মত ব্যাপার।বলছিলাম শিক্ষকদের ভুলের কথা।ছোটবেলায় ছোট খাট ভুলের কারণে কতবার যে দুই হাতে বেতের বাড়ি পড়ে লাল হয়ে গেছে তার হিসেব নেই।সেই সব বেতের বাড়ির দাগ কবেই মুছে গেছে কিন্তু স্মৃতিগুলো রয়ে গেছে।তখন না হয় ছোট ছিলাম এবং সেই সব শিক্ষকেরাও সবাই অল্প শিক্ষিত ছিল তাই ভুলগুলো মেনে নেওয়াই যেতে পারে কিন্তু এখনকার আধুনিক শিক্ষকেরাতো উচ্চ শিক্ষিত।তারা প্রথম শ্রেনীতে প্রথম তারা সেরাদের সেরা।তারা কি করে ভুল করে?ভুল করলে অবশ্য দোষ নেই কিন্তু তারা সেটা দিনের পর দিন কি করে চালিয়ে যায়?শুধরে নিতে পারেনা?তার মানে হলো তিনি বা তারা যে ভুল করছেন সেটাই তারা বুঝতে পারছেন না।এই যে বুঝতে না পারাটা কি অন্যায়  হবে?নাহ তা হবে কেন?কিন্তু আমি যে তাদের ভুলের কথা বলছি এটা খুবই অন্যায় হচ্ছে,আমার শিক্ষাজীবন ববার্দ হয়ে যাবে।

ছোটবেলায় শিক্ষকের ভুল ধরতাম না কারণ বাবা মা বড়রা বলতেন শিক্ষকের ভুল ধরাও ভুল এতে পাপ হয়,পড়ালেখা ববার্দ হয়ে যায়।এখনতো বড় হয়েছি তাই ভুল ধরলে পড়ালেখা ববার্দ হওয়ার ভয় পাওয়ারতো কোন কারণ নেই তাইনা? আছে আছে অবশ্যই বরবাদ হওয়ার কারণ আছে।শিক্ষকের ভুল ধরিয়ে দিলে তিনি তখনকার মত কিছু নাও বলতে পারেন কিন্তু মনে মনে তার একটা গান ঠিকই মুখস্ত আছে তিনি সেটা বেশ সুর করে গাইতে থাকবেন।“তুমি আমার ঘুড়ি আমি তোমার লাটাই,যেদিকেই উড়ে বেড়াও,আমার আকাশ পুরোটাই”। তার মানে হলো তুমি যত খুশি আমার ভুল ধরো পরীক্ষার খাতাতো আমার হাতেই আসবে।কী করে কত নাম্বার পাও সেটা দেখিয়ে দেব।সুতরাং বড় হয়েও শিক্ষকের ভুল ধরতে যাওয়ার সুযোগ নেই তাতে পাপ হবে পাপ।তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে ভবিষ্যতে ধরা খাবে পাবেনাকো মাপ তখন যতই করো বাপ বাপ।

এইতো গত বছর যারা এইচএসসি পাশ করলো তাদের পরীক্ষার খাতা দেখেছে তাদেরই মত ছাত্র ছাত্রীরা।এ খবর পত্রপত্রিকার মাধ্যমে আমাদের সবারই জানা।শিক্ষক নিজে না দেখে অন্যকে দিয়ে দেখাচ্ছেন এটাতো ভারি অন্যায় কিন্তু এই অন্যায় ধরা যাবেনা তাহলে পাপ হবে,পড়াশোনাও ববার্দ হয়ে যাবে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে যাদের কাছে পিএইচডি থিসিস জমা দিলাম তারা সবাই বিজ্ঞজন এটা মানতেই হবে।থিসিস পেপার উপস্থাপনের সময় দাড়ি কমা সেমিকোলন কোথাও ছুটে গেলেই থামিয়ে দিচ্ছেন কথা শোনাতে পিছপা হচ্ছেন না।ঠিক সেই গুণীজনদের তত্ত্বাবধানে যখন একটা সংকলন বের হচ্ছে সেখানে কোন দাড়ি কমা সেমিকোলনের ভুল নয়,কোন শব্দ গঠনের ভুল নয় সরাসরি একটি মিথ্যাকে সত্য বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে কেউ কিছু মনেই করছেনা।যারা থিসিস পেপারের দাড়ি কমা সেমিকোলনের ভুল ধরে নাজেহাল করে ছাড়ছে তারাই একটি সংকলনের দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে বার কয়েক প্রুফ দেখে ছাপিয়ে দিচ্ছেন সম্পুর্ন মিথ্যে কথা তাতে তাদের কোন দোষ দেওয়া যাবেনা কারণ তারা শিক্ষক এবং শিক্ষকের ভুল ধরা পাপ।দাড়ি কমা সেমিকোলন ভুল হতে পারে কিন্তু পুরো একটা তথ্যই কি করে উল্টে যেতে পারে তা জানা নেই।

একটা চার চাকার গাড়ি চলতে চলতে একটা চাকা খুলে পড়ে যেতে পারে তখন গাড়িতে তিনটা চাকা থাকবে।কিন্তু একটা গাড়ি চলতে চলতে হাওয়া থেকে আরো একটা চাকা এসে সেই গাড়িতে লেগে যেতে পারেনা নিশ্চই।ঠিক একই ভাবে একটা শব্দ ভুল হতে পারে তা বলে একটা পুরো তথ্য কি করে ভুল হয় সেটা ধরা যাবেনা কারণ তাদের ভুল ধরাওতো পাপ।যদি মনে করি তাদের অজ্ঞাতে ওটা হয়েছিল তাহলে সেই সব শিক্ষার্থীদের দোষ দিয়ে লাভ কি যারা জাতীয় স্মৃতি সৌধ কোথায় অবস্থিত তা বলতে পারেনি।এটা বেশ পুরোনো ঘটনা বলছিলাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়া স্বরণিকার কথা।পুরোনো কাসুন্দি ঘেটে লাভ নেই বরং নতুন কিছু বলা যেতে পারে।সুকান্ত যেমন লিখে গেছেন “এসেছে নতুন শিশু তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান”। ঠিক তেমনি ভাবে নতুন ঘটনার জন্ম হয়েছে তাই পুরোনো গুলোর লেজ ধরে পড়ে থেকে কোন লাভ নেই।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবন মানেই অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ন একটি স্থান।ওখানে যারা বসেন,কথা বলেন তাদের শিক্ষা দীক্ষা জ্ঞান গরিমা কোন কিছুই কম নয় এবং এ নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই।কিন্তু যখন দেখা যায় সেই সিনেট ভবনের দেয়ালে ঝুলে থাকা জাতীয় প্রতীক আসলে ভুল তখনোকি তাদের ভুল ধরা যাবেনা? না যাবেনা কারণ তাদের ভুল ধরাওতো একপ্রকার ভুল।এতে পাপ হবে পাপ।আর পাপের কারণে লেখাপড়া ববার্দ হয়ে যাবে।রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে যে জাতীয় প্রতীক স্থাপন করা হয়েছিল তাতে শুধুমাত্র শাপলা আছে দুই পাশে নেই ধানের শীষ উপরে নেই তিনটি পাটপাতা আর চারটি তারকাও নেই।দেখে মনে হয় তারকারা আলো দিতে দিতে নিভে গেছে।পাটপাতা গুলোকে ভর্তা করে খেয়ে ফেলা হয়েছে আর যেহেতু পাটপাতার ভর্তা খেতে হবে তাহলেতো ভাত দরকার আর ভাত হয় চাল থেকে এবং চাল হয় ধান থেকে।সুতরাং ধানের শীষ নিয়ে নেওয়া হয়েছে।তাই সেখানে শুধুমাত্র শাপলাটাই আছে।কোন গ্রাম্য বালিকার নজরে পড়েনি নইলে খোপায় পরবে বলে শাপলাটাকেও হয়তো তুলে নিত।কর্তৃপক্ষ বলছেন তারা নাকি জানেন না বিষয়টি।তারা খোজ নিয়ে দেখবেন বিষয়টি সত্যি কিনা যদি সত্যি হয় তাহলে ব্যবস্থা নিবেন।এই যে তারা বললেন জানেন না বিষয়টি কিংবা এই যে বড় একটা ভুল এই ভুল ধরিয়ে দেওয়া যাবেনা কারণ ধরিয়ে দিলে পাপ হবে পাপ। আর এতে করে শিক্ষা জীবন ববার্দ হয়ে যাবে।তাদের এই না জানাটা কোন দোষের নয়।তার জন্য আমি একটা খুবই শক্ত যুক্তি দাড় করিয়েছি।মায়ানমারের আরাকান অঞ্চলে বেশ কিছুদিন ধরে সেনাবাহিনী রোহিঙ্গা মুসলিমদের হত্যা করছে বাড়ি ঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে ফলে প্রান নিয়ে কোন মত পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে লাখ লাখ মানুষ।এই কথাটি শান্তিতে নোবেল বিজয়ী শান্তির দূত অং সান সুচিকে বলা হলে তিনি বললেন তিনি নাকি বিষয়টি জানেনই না!এতো বড় একজন মানুষ এতো বড় একটি বিষয়ের কথাই যেখানে জানেন না সেখানে সিনেট ভবনে জাতীয় প্রতীক ভুল হয়েছে এটা না জানা কোন বিষয়ই না।আর আমাদেরকেও চুপ থাকতে হবে ওসব ভুল ধরিয়ে দেওয়া যাবেনা কারণ গুরুজনদের ভুল ধরাও ভুল তাতে পাপ হয় পাপ।আর পাপ হলে লেখাপড়া ববার্দ হয়ে যায়।

ভুল ধরো না পাপ হবে

—জাজাফী

২১ সেপ্টেম্বর ২০১৭

দৈনিক ইত্তেফাকে ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭ তে প্রকাশিত। প্রকাশের সময় বেশ কিছু অংশ সংযোজন বিয়োজন করা হয়েছে এবং শিরোনামও চেঞ্জ করা হয়েছে।

বোকা ক্যাডেটের গল্প

কলেজ ছুটি হয়ে গেছে।বরাবরের মতই ভ্যাকেশানের দিনগুলো কাজে লাগাতে চায় ক্যাডেট সজল ।সজল আমার খুব ভাল বন্ধু।হাওড় অঞ্চলে বাড়ি হওয়ায় জেলে না হয়েও ওরা জন্ম থেকেই জেলেদের মত জীবনযাপন করে অভ্যস্ত।পরিবারে বাবা মা এক বোন রিফা ছাড়া আর কেউ নেই।বোনটাও কলেজে পড়ে তবে সে খুবই বুদ্ধিমতী আর আমার বন্ধুটা খুবই সাদাসিধে এবং বোকা। ওর বোকামীর গল্প বলে শেষ করা যাবেনা।এ নিয়ে ওর বোন রিফার অভিযোগের শেষ নেই।ভাইয়ার জন্য নাকি ওর প্রেসটিজ পাংচার হওয়ার দশা।সে নিজে প্রতিবার ভ্যাকেশানে এসে ভাইয়াকে একটু স্মার্ট একটু চালাক বানাতে চেষ্টা করছে কিন্তু সজল কিছুতেই স্মার্ট হচ্ছেনা চালাক হচ্ছেনা।রিফা মনে করে ওর ভাইয়া ইচ্ছে করেই বোকা সেজে থাকে যেন লোকে ওকে নিয়ে হাস্যকর কান্ড করতে পারে।

পারিবারিক অবস্থা বেশি ভাল না হওয়ায় ভ্যাকেশানে এসে সজল অনেক কাজ করে।বাবার সাথে মাঝে মাঝে হাওড়ে গিয়ে মাছও ধরে।ভ্যাকেশানে একদিন বাবা মাছ ধরে বাড়ি আসার পর কিছুটা জ্বর জ্বর বোধ করায় সজলকে বললো তুই গিয়ে মাছগুলো বাজারে বিক্রি করে আয়তো। সজল এক কথায় রাজি হয়ে গেল। তার পর ঘর থেকে একটা আর্টপেপার নিয়ে তা দিয়ে একটা সাইনবোর্ডমত বানালো।

হাটের একটা নিরিবিলি স্থানে বসে সামনে সেই সাইনবোর্ড লাগিয়ে দিল তাতে লেখা ছিল এখানে মাছ বিক্রি করা হয়।সে অপেক্ষায় থাকলো লোকজন আসবে আর মাছ কিনবে।এক দুষ্টু লোক আসলো।সে এসে মাছ টিপেটুপে দেখে বললো আরে মিয়া তুমি সাইনবোর্ডে “এখানে” মাছ বিক্রি করা হয় লিখেছ কেন? এখানে যে মাছ বিক্রি করা হয় সেটাতো লোকে এমনিতেই বুঝবে তাই এখানে কথাটা মুছে ফেলো।সজল তার কথা মত এখানে শব্দটা মুছে ফেললো। লোকটা কিন্তু মাছ না কিনেই আলগা জ্ঞান দিয়ে চলে গেল।

সজল অপেক্ষা করতে লাগলো অন্য ক্রেতাদের।এর মাঝে আরো একজন আসলো এবং মাছ টিপেটুপে দাম জিজ্ঞেস করে সাইনবোর্ডের দিকে তাকাল। তার পর কি যেন ভেবে বললো আরে ভাই আপনি মাছ নিয়ে বসেছেন এটাতো সবাই দেখতেই পাচ্ছে। তাহলে মাছ কথাটা লেখার দরকার কি? আপনিতো আর মাংস বিক্রি করতেছেন না।মাছ কথাটা তাই মুছে দেওয়া উচিত। সজল বললো আচ্ছা মুছে দিচ্ছি।তার পর সে মাছ কথাটাও মুছে দিলে সাইনবোর্ডে থাকলো শুধু বিক্রি করা হয়।ওই লোকটাও আগের লোকটার মত মাছ না কিনে ফিরে গেল।সজলের কিন্তু মোটেই মনখারাপ হলনা।

কিছুক্ষণ পর আরো এক খরিদ্দার আসলো এবং একই ভাবে মাছ টিপেটুপে দেখে দাম জিজ্ঞেস করলো কিন্তু সজল যে দাম চাইলো তা তার পছন্দ হয়নি অন্যদিকে সে যে দাম বলেছে সজলও সে দামে বিক্রি করবেনা।লোকটা উঠে যেতে যেতে সাইনবোর্ড দেখলো এবং বললো ভাই তুমি এখানে লিখছো বিক্রি করা হয়।এটাতো বাহুল্য।তুমি যে মাছ বিক্রি করার জন্য বসেছ এটাতো সবাই বুঝতেই পারছে। তুমি নিশ্চই মাছ ফ্রিতে বা মাংনা দিবানা। তাই এই বিক্রি করা হয় কথাটা লেখারতো কোন মানে হয়না।লোকটার কথা শুনে সজল বললো আপনি ঠিকই বলেছেন। ওটা মুছে দিচ্ছি।সাথে সাথে সে সাইনবোর্ড থেকে সেটা মুছে দিল এবং সাইনবোর্ডটাই সরিয়ে ফেললো।

এর পর অনেক ক্ষণ সে অপেক্ষা করলো কিন্তু কেউ তার মাছ কিনতে আসলোনা দামও জিজ্ঞেস করতে আসলোনা।হাট যখন প্রায় শেষ হয়ে এসেছে তখন সে মাছগুলো ব্যাগে ঢুকিয়ে বাড়ির পথে রওনা হলো।বাড়িতে গিয়ে মাছের ব্যাগটা মায়ের হাতে দিয়ে বললো মা মাছতো বিক্রি করতে পারিনি। লোকজন মাছ কিনতেই চায়না।কথাটা বাবাও শুনলেন।তবে কিছু বললেন না।তিনি শুধু আক্ষেপ করে বললেন আজ কাল মানুষ মাছ শাক খাওয়াও কি বন্ধ করে দিচ্ছেনাকি।সবারই কি আমাদের মত আকাল পড়েছে।

সেই মাছ গুলো রাতে রান্না হলো বাবা খুব তৃপ্তি করে খেলেন আর খেতে খেতে বললেন এক বছর ধরে বলা চলে এমন স্বাদ করে খাওয়া হয়নি।গরীব মানুষ যা মাছ ধরি সবতো বিক্রি করে দেই।নিজেরা খেলে ছেলে মেয়ের পড়ার খরচ জোগাবো কি করে তাই কখনো খাওয়া হয়না।

রাতে খাবার শেষ করে সজল আমাদের বাড়িতে এসেছিল।সে সব ঘটনা খুলে বলেছিল।বুঝলাম সজল ইচ্ছে করেই মাছের দাম দ্বিগুন চেয়েছে যেন কেউ কিনতে না পারে।কতদিন সে বাবা মাকে ভাল কিছু খেতে দেখেনি ভেবেই এটা করা।ও চাইলে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে মাছগুলো নিয়ে ফিরে যেতে পারতো কিন্তু তাতে মিথ্যে বলা হত।আর ও যেটা বলেছে এবং করেছে তাতে মিথ্যে কিছু নেই। সত্যিইতো লোকে দাম বলেছে কিন্তু কিনতে চায়নি।রিফা যে ওকে খুব বোকা মনে করে আসলেতো এই ক্যাডেট বোকা না। সজল ভেবেছে একদিনের জন্য এই মাছগুলো বিক্রি না করলে কতইবা ক্ষতি হবে তার চেয়ে বাবা মা যদি একদিনও একটু ভাল খাবার খেতে পায় তাইতো অনেক কিছু।বাবা মা নিজে কখনোই এটা করতেন না।তারা চাইতেন তাদের সন্তানেরা ভাল থাকুক বড় হোক। এটা করতে গিয়ে নিজেদের সব সুখ আহ্লাদ বিসর্জন দিয়ে চলেছেন ভেবে সজলের খুব মন খারাপ হয়।

কিন্তু মনে মনে সে ছিল দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।বাবা মাকে সে খুশি করার জন্য যা কিছু করা দরকার করতে চেষ্টা করবে।একদিন আকাশের সব মেঘ কেটে গিয়ে আলোর রেখা দেখা দিল।আইএসএসবিতে দাপুটে পারফরমেন্স দেখিয়ে ৭৯ তম বিএমএতে গ্রীনকার্ড নিয়ে ফিরে এলো বাড়িতে। বাবার হাতে কার্ডটা ধরিয়ে দিয়ে বাবাকে জড়িয়ে ধরে বললো বাবা অনেকতো কষ্ট করেছ এবার আর তোমাদের কষ্ট করতে হবেনা।আমি তোমাদের জন্য সুখের সংবাদ নিয়ে এসেছি।বাবা খুব ভাল করে দেখলেন কার্ডটা।তিনি একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লেন।নিজের পরিবারের দুঃখ ঘুচেযাওয়ার দিন এসেছে বলে নয় বরং সন্তানের ভবিষ্যৎ উজ্জল হয়ে ধরা দিয়েছে এটা ভেবে।তিনি নিজে হয়তো সন্তানের জন্য সুখের ঠিকানা দিয়ে যেতে পারতেন না তাই এই সাফল্য তাকে খুবই খুশি করেছে।

বাবার হাত থেকে ভাইয়ার গ্রীন কার্ডটা নিয়ে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে ভাইয়াকে অভিনন্দন জানাল।রাতে খাওয়াদাওয়ার পর সজল যখন বিছানায় গেল তখন রিফা গুটিগুটি পায়ে ওর রুমে ঢুকে থমকে দাড়াল।সজল জানতে চাইলো কিরে কিছু বলবি? রিফা কাদো কাদো হয়ে বললো ভাইয়া আমি খুবই স্যরি।আমি তোমাকে সারা জীবন বোকা বলে খোটা দিয়েছি আনস্মার্ট বলেছি সে জন্য তুমি আমাকে ক্ষমা করো।সজল বিছানা থেকে নেমে আদরের বোনটার চুলে বিলি কেটে বললো আমি তোর উপর মোটেই রাগ করিনি।যে ভাইয়ের তোর মত একটা বোন আছে সে কি কখনো বোকা আর আনস্মার্ট হতে পারে?

বিএমএর দীর্ঘ প্রশিক্ষণ শেষে সোর্ড অব অনার নিয়ে ফিরে আসছে আমাদের সজল।সেই দিনটার স্বপ্ন দেখি।

Zazafee

৯ সেপ্টেম্বর ২০১৭

আত্মবিশ্বাসই সফলতার প্রথম শর্ত

আমাদের আত্মবিশ্বাসের বড়ই অভাব।আমরা নিজেরা কতটা কি করতে পারি সে বিষয়ে আমাদের নিজেদের যেন কোন ধারণা নেই বরং অন্যরা আমাদের কর্মক্ষমতা সম্পর্কে যখন কোন মতামত দেয় তখনই আমরা সেটাকে কেবল গ্রহণ করি, চাই সেটা ইতিবাচক হোক বা নেতিবাচক হোক।এর ফলে দেখা যাচ্ছে আমরা কোন একটা কাজ পারার পরও আত্মবিশ্বাসের অভাবে সেটা করতে পারিনা কিংবা করতে চেষ্টাও করিনা।এই সমাজ এবং এই সমাজের কিছু মানুষ আমাদেরকে গল্পের সেই তথাকথিত হাতি বানাতে চাইছে এবং আমরাও বিনা দ্বিধায় সেই হাতি হয়ে যাচ্ছি।এখন আমাদেরই ভেবে দেখতে হবে যে আমরা কি আত্মবিশ্বাসে বলিয়ান মানুষ হবো, নাকি গল্পের সেই হাতি হবো।সবার বুঝার সার্থে হাতির গল্পটি বলে নিতে চাই।তার পর নিজেদের সাথে মিলিয়ে দেখি সত্যিই আমরা সেই হাতি হচ্ছি নাকি মানুষ হচ্ছি।

পাবর্ত্য এলাকার রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে এক লোক দেখলেন রাস্তায় বিশাল একটা হাতি একটা ছাগল বাধা রশি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে।লোকটি অবাক হয়ে হাতির মালিককে বললেন এতো বিশাল একটা হাতিকে এই ছাগল বাধার রশি দিয়ে বেঁধেছেন কেন?আপনিতো খুবই বোকা, হাতিটাতো সামান্য এই রশি ছিড়ে চলে যাবে। হাতির মালিক একটু হাসি দিয়ে বললেন ওই বিশাল হাতিটা এই সামান্য রশিটাও ছিড়তে পারবেনা। লোকটা অবাক হয়ে জানতে চাইলো কেন ছিঁড়তে পারবেনা। হাতির গায়েতো বিশাল শক্তি। সে এর চেয়ে দশগুন মোটা রশিও অনায়াসে ছিড়ে ফেলতে পারে।তার কথা শুনে হাতির মালিক বললেন আপনার কথা ঠিক আছে তবে এই বিশাল হাতিটি এই সামান্য রশিটিও ছেড়ার ক্ষমতা রাখেনা। ও যখন খুব ছোট ছিল তখনও এই রশিটা দিয়েই ওকে বেঁধে রাখতাম আর ও তখন অনেক চেষ্টা করতো এটা ছিড়ে বেরিয়ে যাওয়ার জন্য। কিন্তু সেই সময়ে ও এতোটাই ছোট ছিল যে এই রশিটাও ছেড়া ওর পক্ষে অসম্ভব ছিল। ফলে দিনের পর দিন চেষ্টা করেও সে ছিড়তে পারেনি। এটা ওর আত্মবিশ্বাসকে শুন্যের কোটায় নামিয়ে দিয়েছে। ওর মনের মধ্যে গেথে গেছে যে রশিটা ছোটবেলায় অনেক চেষ্টা করেও ছিড়তে পারিনি সেটা আর কোন দিনই ছিড়তে পারবো না। ও যদি জানতো যে ওকে যে রশি দিয়ে বাঁধা হয়েছিল সেটা ছোট বেলার জন্য যথেষ্ট শক্ত ছিল কিন্তু বড় বেলার জন্য তা তুচ্ছ তাহলে ও ছিড়ে বেরিয়ে যেতে পারতো।কিন্তু ওর সেই আত্মবিশ্বাসই নেই। আত্মবিশ্বাসহীন জীবনে সফলতা আসেনা।

এখন মিলিয়ে দেখুন এই গল্পটার সাথে আমাদের জীবনের মিল আছে কিনা। প্রতিনিয়ত আমরা কিছু করতে চাইলেই আশেপাশের অনেকেই বলে তুমি পারবেনা,এটা তোমার জন্য অসম্ভব কাজ,তুমি শুধু শুধু সময় নষ্ট করছো। যা পারবেনা তার পিছনে সময় দিয়ে লাভ কি। নানা জন এভাবে প্রতিনিয়ত আমাদের উদ্যোগকে কটাখ্য করেছে,মনোবল ভেঙ্গে দিচ্ছে,বুঝাচ্ছে যে আমরা অক্ষম।আর আমরা তাদের কথাকেই প্রাধান্য দিয়ে নিজে একটিবারও চেষ্টা করে দেখছি না।আমাদের নিজের উপর কোন বিশ্বাস নেই, আস্থা নেই কিন্তু ওই সব তথাকথিত মানুষের বলা কথার উপর বিশ্বাস আছে।আমি কি পারি বা না পারি সেটা আমি ছাড়া পৃথিবীর আর কারোতো জানার কথা নয়। কি করে জানবে বলুন? নিজেকে একবার প্রশ্ন করে দেখুন।

যদি কোন কিছু আমরা পেরে থাকি সেটাও সবার আগে আমাদেরই জানার কথা আর যদি কোন কিছু না পেরে থাকি সেটাও সবার আগে আমাদেরই জানার কথা। কিন্তু আমরা নিজে সেসব জানিনা না বরং জানে অন্য কেউ।এই অন্য কেউরাই আমাদেরকে সেই হাতি বানিয়ে রেখেছে যে হাতি ছোটবেলার সেই বিশ্বাসটাতেই অটুট থেকেছে। আমি আপনি কি হাতি? আমি আপনি কি মানুষ নই? তাহলে হাতিটার মত সেই বিশ্বাসে অটুট থাকবো কেন? অন্য লোকে বলবে আপনাকে দিয়ে এটা হবেনা, আপনি শুধু শুধু সময় নষ্ট করছেন, এই সব কথা কেন আপনি বিশ্বাস করে বসে থাকবেন?আপনার ক্ষমতা আছে কিছু করে দেখানোর কেবল মাত্র সাহস নিয়ে শুরু করুন। তার পর দেখিয়ে দিন আপনার শক্তি।

আপনি হয়তো চল্লিশ কেজি ওজনের একটা পাথর ওঠাতে পারবেন না, তার মানেতো এই নয় যে আপনি পাথরই ওঠাতে পারেন না। আপনি দুই কেজি ওজনের একটা পাথরতো ওঠাতে পারেন।

সমাজের কিছু লোক আপনাকে আমাকে সেই হাতি বানাতে চায় আর আমরা আত্মবিশ্বাসহীন সেই হাতির মত সমাজের কথা শুনে বোকা হয়ে বসে থাকি।কান নিয়েছে চিলে শুনে চিলের পিছনে ছুটি, কানে হাত দিয়ে দেখিনা।

আপনার আমার ঘাড়ের উপরে কি একটা মাথা নেই? সেই মাথায় কি চিন্তা করার কোনই ক্ষমতা নেই? যদি থেকে থাকে তাহলে অন্যের কথা শুনে বসে থাকবো কেন? নিজে চিন্তা করে দেখুন। তার পর শুরু করুন।অন্ধকার সরে গিয়ে ঠিকই আলো আসে। লোডশেডিং বেশিক্ষণ থাকেনা। আলো আসবেই। শুধু সময়ের ব্যবধান মাত্র। বঙ্গবন্ধু তার সাত মার্চের ভাষণে বলেছিলেন “তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো”। আমরা যে স্বাধীন একটা দেশ পেয়েছি তা কিন্তু ওই যা কিছু নিয়ে প্রস্তুত থাকার কারণে। সুতরাং অন্যে আপনাকে হাতি বানিয়ে রাখতে চাইলে আপনি থাকবেন কেন? আপনিও আপনার যা কিছু আছে তাই নিয়েই ঝাপিয়ে পড়ুন। সাফল্য একদিনে আসেনা। একটা গর্ত খুড়ে একটা আমের আটি সেখানে রেখে দিলে একদিন না একদিন সেটা থেকে চারা গাছ বের হবেই। হয়তো সেই আটিটা নষ্ট হলে চারাগাছ বের হবেনা, তাহলে আপনি আরো কয়েকটা গর্ত খুড়ে সেখানেও কয়েকটা আটি রাখুন।মনে রাখবেন সব গুলো আটি কিন্তু নষ্ট নয়। আপনি একবার কোন কিছুতে ফেইলিওর হয়েছেন মানে এই নয় সারা জীবনে আর কোন দিন বিজয়ী হবেন না।সুতরাং সমাজ আমাকে আপনাকে সেই হাতি হতে বললে আপনি আমি তা হব কেন? নিজের আত্মবিশ্বাস ধরে রাখুন।নিজেই নিজেকে বলুন যে আপনিও পারবেন। সুতরাং আজই এখনি শুরু করুন। খাতা কলম নিয়ে বসে যান এবং পরিকল্পনা করুন আপনি ঠিক কোন কাজটি নিয়ে এগোতে চান।সফলতা আসবেই। ঠিক যেমন মেঘ কেটে গেলে সুর্য উকি দেয়।আমাদের সফলতার সুর্যও নিশ্চই উকি দিবে।

জাজাফী

নিবন্ধকার

ওয়েবসাইটঃ www.zazafee.com

৯ এপ্রিল ২০১৭

(দৈনিক আমাদের সময় পত্রিকায় প্রকাশিত ১৩ ডিসেম্বর ২০১৭)

স্বরলিপির টানে

তালপুকুরে বাগিচাগাঁও নামে একটি গ্রাম আছে কুমিল্লাতে।তালপুকুর নামটা যেমন সুন্দর তেমনি সুন্দর বাগিচাগাঁও নামটি।নাম শুনেই মনে হয় সারা গ্রাম জুড়ে বিছিয়ে রাখা হয়েছে তালসুপারি নারকেল বাগান।তালপুকুরের বাগিচাগাও গ্রামে নিশিকান্ত দাশের বাড়ি।সংসারে মানুষের অভাব নেই।তিন মেয়ে আর ছয় ছেলে মিলে তার বিশাল পরিবার।লোকে হাসতে হাসতে বলে মেয়ে তিনটে না হয়ে ওগুলো যদি ছেলে হতো তাহলে একটা পুরো ফুটবল টিম হয়েও একজন অতিরিক্ত হিসেবে সাইড লাইনে বসে থাকতে পারতো।নিশিকান্ত দাশ ওসব কথা কানেও তুলতেন না।তিনি তার মত করে চলতেন।কেউ কেউ রসিকতা করে বলতো নিশি আরেকটা ছেলে নিলেতো ভালই হতো। শুনেছি সাত হলো লাকী নাম্বার।তবে সব থেকে বেশি যে কথাটি শুনতে হত তা হলো এতো সন্তান কেন নিলে নিশিদা?

এর উত্তরে নিশিকান্ত দাশ একটা হাই তুলে বলতেন সব তার ইচ্ছা।আর তাছাড়া খাবার পরবারেরতো আর অভাব নেই আমার সুতরাং দু দশটা ছেলেপুলে মানুষ করা আমার জন্যতো কঠিন কিছু না।তা বাপু তোমাদের এতো বাধছে কেন?নিশিকান্ত দাশের কথা শুনে সবাই অবশ্য চুপ করে যেত।সেতো ঠিকই বলেছে।তার একটা ছেলে থাকুক না দশটা থাকুক তাতে অন্যদের কী? কেউকি ওদের খাবার পরবার দিচ্ছে যে এতো কথা উঠছে।খেয়ে থাকুক না খেয়ে থাকুক সবতো নিশিকান্ত নিজেই সামলাচ্ছে।নিশিকান্ত দাশ ভাবতেন তার সন্তানেরাই তার ভবিষ্যত।এক রাতে বিছানায় পাশ ফিরতে ফিরতে তার স্ত্রী হেমপ্রভা দাশ বললেন শুনছেন আপনি আবার চাঁদমুখ দেখতে চলেছেন।প্রথম বার বাবা হওয়ার সংবাদ শুনে নিশিকান্ত দাশ স্ত্রীকে একটি সোনার হার উপহার দিয়েছিলেন কিন্তু তার পর ওই সংবাদটি নিয়মিত সংবাদ বুলেটিনের মত প্রতি এক দু বছর পর পর প্রচার হতে থাকায় সেই আগের খুশি ফিরে আসেনি।

সংবাদটি দেওয়ার পর কোন প্রতিকৃয়ার আশাও করেনি হেমপ্রভা দাশ।কিন্তু তিনি অবাক হয়ে দেখলেন বহু বছর পর তার স্বামী এই সংবাদ শুনে বেশ খুশি হয়েছেন। নিশিকান্ত দাশ স্ত্রীকে অবাক করে দিয়ে বললেন এই সংবাদ শোনার পর আমি খুবই খুশি।এবারও আশাকরি একটি ছেলেই হবে।সাতভাই মিলে গোটা এলাকা মাতিয়ে রাখবে।হেমপ্রভা দাশ স্বামীর কথা শুনে খুশি হলেন।ঠিক আট মাস সাতাশ দিন পর জন্মনিল যে শিশুটি তাকে কোলে তুলে নিতে নিতে নিশিকান্ত দাশ বড় ছেলে সুরেনকে ডেকে বললেন বাবা সুরেন তোর এই ভাইয়ের নাম কি রাখবো বলতো।সুরেন ছোট মানুষ সে কি করে নাম ঠিক করবে তাই বাবার মূখের দিকে তাকিয়ে থাকলো।

বাবা তখন ছোট্ট শিশুটিকে চুমু খেতে খেতে বললেন সুরেনের ভাই তাই ওর নাম হবে সুধীন।নিশিকান্ত দাশের ছেলে সুধীন দাশ।বদ হয়ে বংশের নাম উজ্জল করবে সে।সুরেন বললো বাবা আমি যখন ওর মত ছিলাম তখন আপনি কি আমাকে কোলে নিয়ে এভাবেই নাম দিয়েছিলেন?বাবা বললেন সে কথাতো এখন আর মনে নেই।

মায়ের কোলপোছা ধন ছিল সুধীন।আর কোন সন্তান নিবেন না বলে সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সুধীন তাদের শেষ সন্তান হয়ে থাকলো।সুধীনকে সবাই বেশ ভালবাসতো।গ্রামের ছেলেদের সাথে মিশে খুব বাউন্ডুলেপনা করে বেড়ালেও তার ছিল প্রখর মেধাশক্তি। সে পড়াশোনায় খুবই ভাল ছিল।বামচন্দ্র পাঠশালায় তার হাতে খড়ি হওয়ার পর বিদ্যালয় পরিবর্তন করে ঈশ্বর পাঠশালায় ভর্তি হয়।পড়াশোনায় সে কখনো ফাঁকি দিতনা। কিন্তু এর মাঝেই শুরু হয়ে গেল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।সেই যুদ্ধের ডামাডোলে যখন স্কুল বন্ধ হয়ে গেল তখন তার বাউন্ডুলেপনা মাথা চাড়া দিয়ে উঠলো।কিভাবে কিভাবে যেন দাবা খেলাও শিখে গেল।প্রখর বুদ্ধি থাকায় দাবাতে বরাবরই সে বড়দেরও হারিয়ে দিত।

সুরেন তখন বড় হয়ে সঙ্গীত বিষয়ে শিক্ষকতায় যোগ দিয়েছে।দাদার কাছে সঙ্গীত নিয়ে অনেক কিছু শুনে শুনে সুধীনের মনেও সঙ্গীতের প্রতি ভালবাসা জন্মে গেল।কিন্তু মা চাইতেন সে সঙ্গীত বাদ দিয়ে পড়াশোনা করুক,বড় হোক।সুরেন একটা গানের স্কুল চালাত সেখানে অনেক ছাত্র ছাত্রী ছিল কিন্তু মায়ের নিষেধাজ্ঞার কারণে সুধীন সেখানে বসতে পারতো না যদিও গানের প্রতি তার ছিল প্রবল টান।পাটকাঠির বেড়া দেওয়া ঘরে দাদা যখন তার ছাত্র ছাত্রীদের গানের তালিম দিতেন সুধীন তখন বেড়ার বাইরে পিছনে ঘাপটি মেরে বসে বসে সেই সব গান শুনতো তালিম নিত।তার পর দুরে কোন মাঠে,কোন নদীর কিনারে কিংবা কোন বটগাছের নিচেয় বসে আপন মনে গলা সাধতো।একটু একটু করে কথাটা চাউর হয়ে গেল যে সুধীন বেশ ভাল গান শিখেছে।সবাই খুব অবাক হত বিশেষ করে মা বাবা অন্য ভাই বোনেরা।সুধীনতো কখনো গানের তালিম নেয়নি তাহলে কি করে শিখলো?তাদের বিশ্বাস হতনা।তবে সুরেন ঠিকই বুঝতো।সে জানতো তার ছোট ভাই তার ছাত্র ছাত্রীদের তালিম দেওয়ার সময়টিতে ঘরের পিছনে ঘাপটি মেরে বসে বসে সব শোনে।

একদিন দাদার মুখের একটি কথাই সুধীনের জীবনটাকে বদলে দিল।দাদা তার ছাত্র ছাত্রীদের গানের পরীক্ষা নিলেন কিন্তু দেখা গেল কেউ কিচ্ছুটি শিখতে পারেনি।সুরেন তখন বললো তোরা সব এক একটা গাধা গাধি।এতো করে শেখালাম তার পরও কিছু শিখলিনা কিচ্ছু শেখাতে পারলাম না।অথচ ঘরের কোনা দিয়ে যারা ঘুরঘুর করে তারাতো ঠিকই শিখে নিয়েছে।দাদার বলা এই কথাটি সুধীনের জীবনটাকেই বদলে দিল।সে বুঝতে পারলো সে গান রপ্ত করতে পেরেছে এবং বেশ ভালভাবেই পেরেছে।

কুমিল্লা জিলাস্কুল তখনও শহরের সেরা স্কুল।সুধীন জিলা স্কুল থেকে মেট্রিক পাশ করে যখন ভিক্টোরিয়া কলেজে ভর্তি হল তখন দেশে রাজনৈতিক ডামাডোল শুরু হয়ে গেছে।সব দিকে সজাগ দৃষ্টি রেখেও গানের প্রতি সুধীনের ভালবাসা ক্রমান্বয়ে বাড়তেই থাকলো।১৯৪৮ সালে বেতারে গান গাওয়ার সুযোগ এলে সে সেটা লুফে নিল।সেই যে তার পদচারণা শুরু তাকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি।দূর থেকে নিশিকান্ত দাশ আর হেমপ্রভা দাশ দেখলেন তাদের ছেলেটা গানের পাখির মত ডানা মেলে দিয়েছে।সেই সুরের ডানায় মাতাল সারা দেশ।এর অনেক আগেই সুধীনের জীবনে প্রেম এলো।দাদা সুরেন যে সঙ্গীতের স্কুলটি চালাতেন সেখানে এক সুন্দরী ছাত্রী ছিল নীলিমা।যেমন তার নামের সৌন্দর্য তেমনি তার রুপ।সুধীন পাগল হয়ে যেতেন।পরস্পরের সাথে ভাবের বিনিময় হয়ে যেতে বেশি দেরি হয়নি।গানের গলা এতোই সুন্দর ছিল যে নীলিমার নীল রঙ সেই কন্ঠের যাদুতে মুগ্ধ হয়ে মিশে গেল একাকার হয়ে।

বাংলা একাডেমী প্রতিষ্ঠিত হল ১৯৫৫ সালে।সেই বছরই বিয়ের সানাই বাজলো সুধীন দাশ আর নীলিমার বাড়িতে।ধুমধাম করে বিয়ে হলো তাদের।কুমিল্লা ছেড়ে তারা তখন ঢাকার মিরপুরে এসে উঠলেন।তাদের ঘর আলো করে জন্ম নিল নিলয় আর সুপর্না নামে আরো দুই গানের পাখি।সুধীন দাশের পুরো ঘর তখন সঙ্গীতময়।ততোদিনে গানের পাখিটির পরিবারের অনেক পুরোনো নতুন সদস্য না ফেরার দেশে চলে গেছে।সেই তালিকায় যোগ হল তার একমাত্র ছেলে নিলয়।ছেলে হারিয়ে সুধীন দাশের মনটা ব্যাথায় ভার হয়ে গেল।

কত সুর্য উঠলো আর ডুবলো।কত প্রান অকালে ঝরে গেল।ভাষা আন্দোলন হলো,রাষ্ট্রভাষা বাংলা হল,যুদ্ধ হল,দেশ স্বাধীন হল সব কিছু দেখলেন কাছ থেকে।নিজেই একটু একটু করে হয়ে উঠলেন ইতিহাসের জীবন্ত স্বাক্ষী।বাগিচাগাওয়ের সেই ছোট্ট সুধীন দাশ আর সেদিনের সুধীন নেই।সে তখন এমন বড় হয়ে গেল যে তাকে তাঁর বলে সম্বোধন করতে গিয়ে চন্দ্রবিন্দু ব্যবহার করতে হয়।নজরুল সঙ্গীতে তাঁর ভালবাসা ছিল চোখে পড়ার মত।নজরুল সঙ্গীতের জন্য তিনি একটু একটু করে চিরস্মরণীয় হয়ে ওঠার পথে এগিয়ে গেলেন।এতো কিছু দেখতে দেখতে তিনি বোধহয় অনেক ক্লান্ত হয়ে পড়লেন।কৈশরে দুরন্তপনা বাউন্ডুলেপনায় যার খ্যাতি ছিল তিনি বড় হয়ে সঙ্গীতে খ্যাতি অর্জন করলেন।

বয়সের ভারে তিনি নুইয়ে পড়েছিলেন।ডায়াবেটিস শরীরে বাসা বেঁধেছিল।যে হৃদয়ে সঙ্গীতের জন্য একটি রাজপ্রাসাদ তিনি তৈরি করেছিলেন সেই হৃদয়ে কোন এক ফাঁকে বাসা বেঁধেছিল হৃদরোগ।এক রাতে সারা আকাশ যখন তারায় তারায় ভরে আছে,মানুষ যখন ঘুমোতে যাবে তখন শরীর কাঁপিয়ে জ্বর এলো।স্থানীয় ডাক্তারের পরামর্শে নাপা প্যারাসিটামল খাওয়ানো হলো কিন্তু জ্বর কমল না।দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া হলো।যে বৃদ্ধটিকে হাসপাতালে নেওয়া হলো তিনি ততোদিনে সাধারণ কোন বৃদ্ধ নন,তাঁর ছিল দেশ বিদেশ জোড়া খ্যাতি।সরকারী হাসপাতালে রোগিদের ঠিক কতটা সেবা দেওয়া হয় তাতো সবাই জানে।সুধীন দাশকে জাতীয় হৃদরোগ হাসপাতালে নেওয়া হলে তারা জানালো সেখানে আইসিইউ ফাঁকা নেই।এবার তাহলে বসুন্ধরাতে এপোলো হাসপাতালে নেওয়া যাক।সেখানকার ডাক্তারদের কোন ত্রুটি না থাকলেও রাত আটটার দিকে সবাইকে কাঁদিয়ে গানের পাখি আজীবনের মত উড়ে গেল খাঁচা ভেঙ্গে।তাঁর কাছে ডাক এসেছিল, তিনি সে ডাকে সাড়া দিতে কাপর্ন্য করেন নি।তিনি ছুটে গেলেন স্বরলিপির টানে।

১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭

ফজ মেশিনের আবেদন

আশরাফ ভাই চায়ের দাওয়াত দিয়েছিলেন ওনার অফিসে।দেশের একটি প্রথম শ্রেনীর ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট তিনি।অনেক দিন দেখা হয়না তাই ভাবলাম গিয়ে চায়ের আড্ডায় শামিল হই।একই সাথে চা পান করা হবে আবার সুখ দুঃখের গল্পও করা হবে।তবে সমস্যা কী জানেন ইদানিং ব্যাংক গুলোতে গ্রাহক সংখ্যার এতো চাপ যে বসে দু’দন্ড শান্তিমত কথাও বলার উপায় নেই।অবশ্য গ্রাহক সেবা দিতে বসে দু’দন্ড শান্তি মত গল্প করার খায়েশ মনে স্থান দেওয়াটাও এক প্রকার অন্যায়।সেবা দেওয়ার সময় এক মাত্র কাজ হলো সেবা দেওয়া। আরাম করা আড্ডা দেওয়ার জন্য অফিস টাইমের বাইরেতো অনেক সময় আছেই।এই দিক থেকে আশরাফ ভাই বেশ রিলাক্সেই আছেন বলা চলে। কাঁচ দিয়ে ঘেরা এসি রুমে নির্ঝঞ্ঝাট তার অফিস।

এগারটার দিকে ফোন দিয়ে রওনা দিলাম।ফুলার রোড থেকে মতিঝিল খুব বেশি দূরে না হলেও রাস্তায় যে যানজট তাতে ঘন্টা দেড়েক সময়ের কমে যাওয়া যাবে বলে মনে হয়নি।ড্রাইভারকে বললাম একটু ফাঁকা রাস্তা খুঁজে সেদিক দিয়ে যেতে।শুধু মাত্র চা খাওয়ার জন্য ফুলার রোড থেকে মতিঝিলে যাওয়া লোক আমি নই। আসলে ওই ব্যাংক থেকে আমার নতুন ফ্যাক্টরীর জন্য লোন পাওয়ার কথা চলছে।কাজ কতদূর এগিয়েছে সেটারও একটু খোঁজ নেওয়া দরকার তাই রথ দেখা আর কলা বেঁচা দুইই এক সাথে করার ধান্ধায় চলে গেলাম ভাইয়ের অফিসে।অফিসে উঠে ভাইয়ের রুমে গিয়ে সামনে চেয়ার টেনে বসলাম। বেশ গল্প আড্ডায় সময় কাটছিল। মাঝে মাঝে এক দু’জন কাষ্টমার আসছিল বিশেষ বিশেষ কাজে, ভাই মিনিটের ব্যবধানেই সেসব সমাধান করে বিদায় দিয়ে আবার আড্ডায় মেতে উঠছিলেন।

পুরো আড্ডায় আমি ছিলাম দর্শক আর ভাইয়ের কথার মুগ্ধ শ্রোতা। তার কথা শুনতে আমার বেশ লাগে বলেই মাঝে মাঝেই দেখা করতে যাই।তিনি আমাকে নানা ভাবে পরামর্শ দিয়ে থাকেন বড় ভাইয়ের মত।তিনি জানতে চাইলেন নতুন ফ্যাক্টরীর কাজ কতদূর এগিয়েছে।আমি জানালাম জিরাবোতে দশ কাঠা জমির উপর আপাতত তিন তলা শেষ করে ফ্যাক্টরী চালু করবো তার পর লোনটা ওকে হলে বাকিটা দেখবো।এরকম সময়ে একজন বুড়ো মত লোক কাঁচের দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকতে ঢুকতে বললো ছার আসতি পারি? আশরাফ ভাই বললেন আসুন আসুন,চেয়ার দেখিয়ে বললেন এখানে বসুন এবং বলুন কি দরকার।

আশরাফ ভাইয়ের কথা মত লোকটি চেয়ারে বসতে গিয়েও না বসেই বললো থাহুক না ছার বসতি অবিনে।আমি এট্টা দরকারে আইছি। কোন অঞ্চলের ভাষা তা আমি বলতে পারবো না কারণ ভাষা বিষয়ে আমি খুব বেশি দক্ষ নই।লোকটি একটি দরখাস্ত এগিয়ে দিল আশরাফ ভাইয়ের সামনে।ভাই সেটা ভালমত পড়ে জানতে চাইলেন আপনি যে পজ মেশিনের আবেদন করছেন আপনার কিসের ব্যাবসা?পজ মেশিন কেন নিবেন?দৈনিক কত টাকা লেনদেন হবে?

আমি লোকটার দিকে তাকিয়ে বুঝতে চেষ্টা করলাম তিনি কী এমন ব্যবসা করতে পারেন যেখানে পজ মেশিন লাগবে। আমারতো মনে হয় তার দ্বারা এমন কোন ব্যবসা করা সম্ভব নয় যেখানে কার্ডে পেমেন্ট করা মত কোন কাস্টমার যাবে।আশরাফ ভাইয়ের কথা শুনে লোকটা বললো ছার আমিতো কুনো ব্যাপসা করিনে।ভাইয়ের সাথে সাথে আমিও খুব অবাক হলাম। ব্যাবসা করেনা অথচ পজ মেশিন চায়! ভাই জানতে চাইলেন তাহলে আপনি কেন পজ মেশিন চান? লোকটা তখন বললো ছার যা দিনকাল পড়িছে আর মানুষজনে যা কেরডিট কাড অইছে তাতে ফজ মেশিন না নিয়ে উপায় কি কন?লোকটির কথাতে আঞ্চলিক টান আছে তিনি পজকে তাই ফজ বলেছেন।শুনতে বেশ মজাই লাগছিল।

আশরাফ ভাই বললেন তাতো ঠিকই বলেছেন। এখনতো সবাই ক্রেডিট কার্ড ডেবিট কার্ডই বেশি ব্যবহার করে। কিন্তু সেসবতো দোকানের জন্য।পজ মেশিনতো কেনাকাটার বিল পরিশোধের জন্য লাগে।আপনিতো কোন ব্যবসা করেন না তাহলে আপনার কেন লাগবে?

লোকটি আমতা আমতা করে বললো ছার আমিতো দৈনিক বাংলার মোড়ে ভিক্ষা করি।যার কাছেই ভিক্ষা চাই হেই কয় টাহা নাই কেরডিট কাড আছে।আমিতো জানিনা হেইডা কি জিনিস।একজনরে কলাম তালি কেরডিট কাডই দ্যান।লোকটা একটা গালি দিয়ে চলে গেল।পরে পাড়ার এক শিক্ষিত লোকের কাছে জানতি পারলাম বিষয়ডা কি। তাই ভাবলাম এট্টা ফজ মেশিন নিলে কেউ কেরডিট কাড কইয়ে ভিক্ষা না দিয়ে যাইতে পারবো না।আমি লোকটির কথা শুনে তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলাম।আমার মূখে আর কোন কথা আসলো না।

এর ফাঁকে আশরাফ ভাই তাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে বিদায় করলেন যে কোন ব্যবসা করা ছাড়া ফজ মেশিন কাউকে দেওয়া হয়না। আশরাফ ভাইও কি করে যেন পজ মেশিনকে ফজ মেশিন বলে ফেললেন। তবে তিনি যে ইচ্ছে করে বলেননি সেটা পরে বুঝলাম।এর অনেক দিন পর একবার আশরাফ ভাই আর আমি ম্যাপললিফে খেতে গিয়ে পেমেন্ট করার সময় মনে পড়লো সেই ঘটনাটা।চুপিচুপি ভাইকে বললাম ভাই এখানে কিন্তু ব্র্যাক ব্যাংকের ফজ মেশিন আছে।ভাই হো হো করে হেসে উঠলেন,কাউন্টারের লোকটা কি বুঝলো কে জানে।
————————————
শিরোনামঃ ফজ মেশিনের আবেদন
#জাজাফী

১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭
#ব্যাংকার_সমাচার

ছোটলোক

বাড়ি যাচ্ছি। কাঁধে ছোট্ট একটি ব্যাগ,ভিতরে বলার মত তেমন কিছু আছে বলে মনে পড়ছে না। আইডি কার্ডটা যদি বলার মত কিছুর তালিকায় ধরা হয় তাহলে অবশ্য বলার মত ঐ আইডি কার্ডটাই আছে। তবে ঐ আইডি কার্ডের তেমন কোন মূল্য নেই। ওটা দেখালে রেশনও পাওয়া যাবে না আবার মাংনাও কোথাও যাওয়া যাবে না।আমার ব্যাগের মধ্যে এখন ওটা একটা জঞ্জাল ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে দুটো সময়ে ওটার কিছুটা মূল্য বুঝা যায়। যখন আমি কাজে ঢুকি তখন গলার সাথে ওটা ঝোলানো না থাকলে কোন ভাবেই ঢুকতে পারিনা। আর দ্বিতীয় কারণটা অবশ্য আরো কঠিন।আমি বেওয়ারিশ হয়ে যাওয়ার অপবাদ থেকে কেবলমাত্র ওটাই আমাকে সাহায্য করতে পারে।

রাস্তার যে অবস্থা আর যা দিনকাল পড়েছে তাতে যে কোন সময় ভবলীলা সাঙ্গ হওয়া অসম্ভব কিছু নয়। আর পথে ঘাটে ওরকম কিছু ঘটে গেলে আইডি কার্ডটাই ভরসা। অন্তত কারো মনে দয়া হলে চাঁদাটাদা তুলে আমার অচেতন দেহটাকে পরিবারের কাছে পৌছে দিলে তারা দু’চারদিন কাঁদার মত একটা উপলক্ষ্য পাবে।আর যদি বেওয়ারিশ হিসেবে লাশ দাফন করে দেওয়া হয় তাহলে পরিবারের লোকেরা ভাববে আমি বোধহয় আরেকটা বিয়ে করে সেই সংসারে এতোটাই মজে আছি যে, পরিবারের কথা ভুলেই গেছি। তাদের ভাবনাটা অবশ্য একদম মিধ্যে হবে না। আমি মারা গেলে আমারতো আরেকটা সংসারই হবে। মাটির ছোট্ট ঘরটি তখন আমার বাড়ি বলে ধরে নেওয়া যাবে।

মোবাইল ইন্টারনেটের যুগে আইডি কার্ড না থাকলেও পরিচয় বের করা কঠিন কিছু নয় এমন যুক্তি অবশ্য অনেকেই দিতে পারেন। সাভারের রানাপ্লাজায় যারা মারা গিয়েছিল তাদের সবার কাছেই মোবাইল ছিল কিন্তু লাশ উদ্ধারের পর সেই মোবাইলগুলো কিভাবে যেন হাওয়া হয়ে গেল। ফলে অনেকের আইডি কার্ড এবং মোবাইল কোনটাই না পাওয়ায় বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করে দেওয়া হলো।সুতরাং আমি মারা গেলে আমার পকেট থেকেও মোবাইলটা যে হাওয়া হয়ে যাবে না তার নিশ্চয়তাইবা আমি কি করে দেব?কিংবা এই নিশ্চয়তাইবা কে আমাকে দেবে।আর সে জন্যই আপাত দৃষ্টিতে বিশ্ব ব্যাংকের সিইও না হয়ে ও জঞ্জাল আইডি কার্ডটা ব্যাগেই রেখেছি। নিজের বেওয়ারিশ সমাধস্থ হওয়ার ভয়ে নয় বরং পরিবারকে দু’চারদিন কান্নার উপলক্ষ্য দেওয়ার জন্য ওটা সাথে রাখা।আর তাছাড়া ফিরে এসে কাজে যোগ দিতে হলেওতো ওটা লাগবে। ব্যাগের সবচেয়ে ছোট পকেটে একটা ব্রাশ আর পেষ্টও আছে।

ষ্টিশানরোড ওভার ব্রিজের ওপর থেকে দশটাকা দিয়ে ব্রাশটা কিনেছিলাম সে বছর দু’য়েক আগে। ব্রাশের মাথাটা বয়সের ভারে বেকে গেছে কিন্তু এতো দিন যে আমার সংসারে ছিল সে বৃদ্ধ হয়ে গেছে বলেতো আর তাকে ফেলে দিতে পারি না। বড়লোকদের কথা বাপু আলাদা। ডাক্তার বলেন ব্রাশ নাকি তিন মাসের বেশি ব্যবহার করা যাবেনা।ফলে তিন মাস পর তারা ব্রাশটাকে ফেলে দেয়। ঠিক যেমন একটা বয়সে বাবা মাকে ফেলে দেয় পুরোনো ভেবে। পুরোনো হয়ে যাওয়া ব্রাশটা ডাষ্টবিনে ফেলে দেওয়া আর বৃদ্ধ বাবা মাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসা সমান কথা।স্টিশানরোড ওভারব্রিজের উপর থেকে যে ব্রাশটা আমার পরিবারে ঠাই নিয়েছিল বছর দুয়েক আগে আমি তাকে বৃদ্ধ পুরোনো ভেবেও তাই ফেলে দেইনি।ভয় হয় আজ যদি ব্রাশটা পুরোনো ভেবে ফেলে দেই কাল হয়তো বাবা মাকেও পুরোনো ভেবে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসবো।

ব্রাশের সাথে একটা পেষ্টও আছে ব্যাগের ছোট পকেটে।পেষ্ট বলতে ঠিক যা বুঝায় এটা সেরকম নয়। ওটার কথা তাই না বলাই ভাল। একটি লুঙ্গি আর একটি গামছাও আছে। ছুটির দিন গুলিতে গোসলের সময় আমি কখনো লুঙ্গি ভিজতে দেইনা। লুঙ্গিটা ভেজালে পরার মত তেমন কিছু থাকবেনা। মেস ঘরের দরজাটা একদিন আমার সাথে শত্রুতা করলো। যখন দোকানে যাব বলে বের হচ্ছি তখন দরজাটা আমাকে থামিয়ে দিল। আমি যদিও শুনতে পাইনি তবে দরজাটা নিশ্চই গান ধরেছিল ‘যেওনা সাথী আমার চলেছ একেলা কোথায়’। সে গানটা নিশ্চই আমার জন্য নয় বরং আমার লুঙ্গিটার জন্য।

আমি শুনতে না পেয়ে যখন জোর করে বের হয়েছি তখন লুঙ্গি আর দরজার হাত ছুটে গেল এবং একটা শব্দ শুনতে পেয়ে পিছনে তাকিয়ে দেখি লুঙ্গির একটা অংশ ছিড়ে গেছে।মেজাজ খারাপ করে লাভ নেই ভেবে দোকান থেকে সুঁই সুতা কিনে ঘরে বসে নিজেই সেলাই করে নিলাম।ক’টা টাকা গচ্ছা গেল ভেবে বেশ মনখারাপ হল। ব্যাগের ভিতরে একটা পুরোনো পাঞ্জাবী আছে। ঈদে বাড়ি যাচ্ছি, পাঞ্জাবী ছাড়া ঈদগাহে যাওয়াটা বেশ অস্বস্তিকর হবে ভেবে বউবাজার থেকে পাঞ্জাবীটা কিনে এনে টানা দুই ঘন্টা হুইল পাউডারে ভিজিয়ে রেখেছিলাম। ধুয়ে শুকানোর পর সেটা লন্ড্রিতে দেওয়া হয়নি।পাঁচ টাকা খরচ করে পাঞ্জাবী লন্ড্রি করা আমার কাছে শ্রেফ বিলাসীতা ছাড়া কিছুই নয়। তার চেয়ে বরং ভাজ করে তিনদিন বালিশের নিচেয় চাপা দিয়ে রাখলাম এবং আসার সময় বের করে আনতে গিয়ে বেশ পরিতৃপ্ত হলাম। চমৎকার ভাজ হয়েছে। বিদ্যুৎ ছাড়া বিনা খরচে লন্ড্রি করাটা বেশ আনন্দের।

বাড়ি যাচ্ছি ঈদের ছুটিতে। আর কিছু পাই না পাই বেশ লম্বা ছুটি পেয়েছি। ছুটি শেষে যখন ফিরে আসবো তখনকার অবস্থা কল্পনা করতেও ভয় পাই। বৃহস্পতিবার অফিস শেষ করে বেরিয়েছি। রাতেই ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছিলাম। একটি তালি দেওয়া লুঙ্গি,কোনা ছিড়ে যাওয়া একটি গামছা,দু’বছর বয়সী মাথা বেকে যাওয়া ব্রাশ আর একটুখানি পেষ্ট ছাড়া বলার মত তেমন কিছু ছিলনা ব্যাগের মধ্যে। একটি চিরুনী অবশ্য থাকতে পারতো তবে দু’টো হাতে যেখানে দশটা আঙ্গুল আছে সেখানে চুল আচড়ানোর জন্য চিরুনী কিনলে নিজেকে সম্রাট শাহজাহান মনে হবে।নিজেই যদি সম্রাট শাহজাহান হয়ে বসে থাকি তবে বাড়িতে যাকে রেখে এসেছি তিনিতো মমতাজ হতে চাইবেন।

চিরুনীর সাথে আয়নাটাও প্রাসঙ্গিক। তবে আয়নাও কেনা হয়নি। আয়নায় দেখার মত মূখই যদি না থাকে তাহলে আয়না কিনে লাভ কি?বাড়িতে গেলে অবশ্য আয়নার অভাব হয় না। একটা ছোট আয়নার পাশাপাশি একটা বড় আয়নাও আছে। বড় আয়নার সাথে ছোট আয়নাটা ফ্রিতে পাওয়া। আয়নাটা এতোই ছোট যে পুরো মূখটা একবারে দেখা যায় না। আর বড় আয়নাতে শুধু মূখ নয় পুরো আমাকেই দেখা যায়। বাজার থেকে কেনা আয়নায় মূখ দেখা না গেলেও আমার আয়না আমাকে দেখেই আমার সম্পর্কে সব বলে দিতে পারে। কথা বলা আয়নায় মূখ দেখা হয়েছে জীবনে একবার তার পর কেবলই কথাই শুনতে হচ্ছে।

ব্যাগটা কাঁধে নিয়ে আনারকলি থেকে বেরিয়ছি, যেতে হবে আব্দুল্লাহপুর। এটুকু পথ রিকশাতে গেলে বেশ দ্রুতই যাওয়া যায়। আমি দেখেছি মানুষ যখন রাস্তায় বের হয় তখন রিকশাওয়ালারাই ডেকে ডেকে জিজ্ঞেস করে মামা কই যাবেন। আমাকে কখনো কোন রিকশাওয়ালা ডেকে জানতে চায়নি আমি কোথায় যাব। আজকে একটু তাড়া ছিল। ভাবলাম রিকশা করে আব্দুল্লাহপুর যাই।যদিও মাত্র পাঁচ টাকা খরচ করবোনা ভেবে পাঞ্জাবী লন্ড্রিতে দেইনি কিন্তু তাড়া বলে কথা, তাই রিকশা চড়ার বিষয়ে কোন ছাড় না দিলেও চলবে। পরপর তিনজন রিকশা ওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম যাবে কিনা।তারা আমার কথার জবাবই দিল না। ভাবলাম মামা বলে ডেকেছি বলে হয়তো কথার উত্তর দেয়নি। চতুর্থজনকে বললাম ভাই যাবেন। কিন্তু সেও জবাব দিল না। মন খারাপ হোক বা না হোক মেজাজ খারাপ হওয়ার কথা কিন্তু আমার মেজাজ খারাপ হল না। হতে পারে মেজাজ বলতে আমার মধ্যে এখন আর কিছু অবশিষ্ট নেই। পঞ্চম রিকশাওয়ালা কথা বললো। তবে তার কথাও আশা ব্যাঞ্জক নয়। সে ত্রিশ টাকা ভাড়া চেয়েছিল আমি তাকে দশটাকা দিতে চাইলাম।তাতেই সে তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো।যেতে যেতে তার মূখ থেকে শুধু একটি কথাই শুনতে পেলাম ‘ছোটলোক’।কথাটা আমাকেই বলা হল কিন্তু আমার গায়ে লাগলো না। গরুকে মানুষ যখন গরু বলে ডাকে কিংবা কুকুরকে যদি কুকুর বলে ডাকে তাহলে তাদের গায়ে লাগার কথা নয়। মানুষকে কখনো গরু বা কুকুর বললে সেটা গালি দেওয়া হয় তাই গায়ে লাগে। কিন্তু ছোটলোককে ছোটলোক বললে তাই গায়ে লাগার কথাও নয়। আমাকে ছোটলোক বলে সে হয়তো তৃপ্তি পেয়েছে তবে আমার লাখটাকার ক্ষতিতো হয়নি।

রিকশাওয়ালা দশটাকায় যেতে রাজি না হওয়ায় আমার বরং লাভ হল।যে টাকাটা রিকশা ভাড়া দিতে হত সেটা বেচে গেল। বুক পকেটে হাত দিয়ে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে মধুমিতা থেকে আনারকলি রোড ধরে হাটতে হাটতে আব্দুল্লাহপুরের দিকে এগোতে থাকি। সারা রাস্তায় মানুষের ঢল। বাড়ি যাচ্ছি, কাঁধে ছোট্ট একটি ব্যাগ কিন্তু মনে হচ্ছে গোটা শহরটাকে, শহরের মানুষগুলোকেই সাথে করে নিয়ে যাচ্ছি। ক্লাস এইটের বিজ্ঞান বইয়ে গ্রহ নক্ষত্রের কথা পড়েছিলাম। সুযর্কে কেন্দ্র করে ঘুরছে পৃথিবীর মত আরো অনেক গুলো গ্রহ। বাড়ি ফেরার সময় চারদিকে এতো মানুষ দেখছি নিজেকে একটি নক্ষত্র মনে হচ্ছে। যাকে ঘিরে গ্রহের মত আবর্তন করছে হাজার হাজার মানুষ।যদিও তারা তাদের বাড়িতে যাচ্ছে কিন্তু ক্ষণিক সময়ের জন্য আমার মন ভাবতে ভালবাসছে যে তারা আসলে আমাকে ঘিরে আবর্তন করছে।

যে বাসের জানালা খোলা যায় না সে বাসের কথা থাক বরং যে সব বাসের সিট কিছুটা বাঁকানো যায় সে সব বাসের কথাও কখনো কল্পনা করতে পারি না। বাসস্ট্যান্ডে গিয়ে দেখি মানুষের সমুদ্র।চারদিকে মানুষ আর মানুষ কিন্তু কোন বাস নেই। কেউ কেউ বেশ নিবির্কার। হয়তো তাদের আগে থেকেই টিকেট করা আছে তাই অনেকটা নিশ্চিন্ত থাকতে পারছে। একটা দুধের শিশু মায়ের আঁচলের তলে মূখ লুকিয়ে পৃথিবীর সব উত্তেজনা বিরক্তিকে পাশ কাটিয়ে আরাম করে চুকচুক করে ক্ষুধা নিবারণ করছে। পাঁচ বছরের বাচ্চা একটি ছেলে বাবার হাত ধরে কোথাও যাওয়ার জন্য টানাটানি করছে। বাবা যেতে চাইছেনা দেখে তার চোখে মূখে বিরক্তির ছাপ। ঝালমুড়িওয়ালা,শরবতওয়ালা আর বাদামওয়ালাদের কপাল দিয়ে ঘাম ঝরলেও মনে দারুণ খুশি। বেচা কেনা চলছে হরদম।

বাসস্ট্যান্ডের উত্তরে তুরাগ নদীর তীরে যে ফিলিং স্টেশান তার দোতলার বিশাল এরিয়া নিয়ে একটা হোটেল করা হয়েছে। চারদিকে উপচেপড়া ভীড় থাকলেও হোটেলটা পুরো ফাঁকা।পেটে ক্ষুধা থাকলেও সম্ভবত কেউ ভারি খাবার খাওয়ার পক্ষে নয়।হোটেল বেয়ারাকে দেখা যাচ্ছে রেলিং ধরে দাড়িয়ে ভীড়ের দিকে চাতকের মত চেয়ে আছে।নির্ধারিত বেতনের চাকরি করলেও বেয়ারাও চায় হোটেলে লোকজন আসুক। তাতে দু’দশটাকা বকশিস পেলে সেটা অনেক।

লোকজনের কাঁধে,পিঠে,হাতে ব্যাগ, গাট্টিবোচকা।কোন কোনটা ঢাউস সাইজের। দেখে কল্পনাও করা যায় না তার মাঝে কি এমন জিনিষ আছে। বাক্সপেটরার বহর দেখে মনে হয় লোকগুলো আজীবনের জন্য যান্ত্রিক এই শহরের মায়া কাটিয়ে গ্রামে চলে যাচ্ছে। যা টেনে নিয়ে যাচ্ছে তা যদি আবার ফিরিয়ে নিয়ে আসতে হয় তাহলে এই অযথা ধকলের দরকার কি!আমার সাথে কাঁধে ঝোলানো দুইকেজি ওজনের ব্যাগটা ছাড়া কিছু নেই।টুকটাক কিছু কিনতে হলে নিজের শহরে নেমেই কেনা যাবে, তাতে করে বোঝা বহনের কষ্টটা বেঁচে যাবে।

একজনের হাতে একটা সিলিং ফ্যান।বাড়িতে গিয়ে আরামে বাতাস খাবে চিন্তা করেই হয়তো ফ্যানটা সাথে করে নিয়ে যাচ্ছে।আমি ভাবছি যারা বাড়িতে আছে তারাকি তাহলে কারেন্ট থাকার পরও ফ্যান ছাড়াই থাকে?নাকি এমন হতে পারে তাদের ঘরে ফ্যান আছে কিন্তু যিনি বাড়িতে যাবেন তার থাকার ঘরে কোন ফ্যান নেই ভেবেই নিয়ে যাচ্ছেন। আরেকজন সাথে করে একটা টিভি নিয়ে যাচ্ছে। হতে পারে বাড়ির জন্যই কিনেছেন। একটা টেলিভিশনের শখ আমারও ছিল। মেয়েটা পাশের বাড়ি গিয়ে মাঝে মাঝে টিভি দেখে। কখনো কখনো অসময়ে তারা টিভি বন্ধ করে দিলে মেয়েটা মনখারাপ করে ফিরে আসে।আমাকে একদিন সে বললো  বাবা একটা টিভি কিনতে কত টাকা লাগে। এ ব্যাপারে আমার কোন ধারণা ছিলনা তবে তাকে বললাম সে তো বেশ কিছু টাকা লাগবেই। সেদিন থেকে সে মাটির ব্যাংকে টাকা জমাতে শুরু করেছে। তার একটা টিভির খুব শখ। লোকটার হাতে টিভিটা দেখে কথাটা মনে পড়ে গেল।

মাঝে মাঝে পুলিশের হুইসেল শোনা যাচ্ছে। তখন একটা কি দুটো বাস মানুষের ভীড় ঠেলে বেরিয়ে যাচ্ছে। দরজা জানালা সব বন্ধ। পেট্রোল পাম্পের পাশে দাড়িয়ে অপেক্ষা করতে করতে একটা মিনিবাস আসলো। ভাড়া জিজ্ঞেস করার মত সুযোগ পেলাম না তার আগেই দেখি পুরো বাস কানায় কানায় ঠাসা। ভাড়া জেনে বাসে ওঠার আশায় গুড়ে বালি। এক যাত্রীর কাছে জানতে পারলাম নবিনগর পযর্ন্ত ভাড়া একশো টাকা। গত সপ্তাহে যখন গেলাম তখন ভাড়া ছিল ত্রিশ টাকা আর এখন সেটা একশোতে ঠেকেছে।চাকরি করি,মাস গেলে বেতন পাই,ঈদের সময় দু’চার টাকা বেশি ভাড়া না দিলে কি চলে? এসবই বাসওয়ালাদের চিন্তা ভাবনা।আমি বোনাস পেয়েছি মাত্র একবার, একজনের কাছ থেকে। তার পর ঢাকা থেকে বাড়ি যাওয়া অব্দি আমাকে বোনাস দিতে হবে দশবার।চাকরিজীবীকে বাড়ি ফিরতে দেখলে লোকে মনে করে সে বুঝি টাকার বস্তা নিয়ে বাড়ি ফিরছে।

তিরতির করে ঘামছি।বাস কখন পাব জানি না। হাটাহাটি করে ক্ষুধাও লেগেছে বেশ।ঝালমুড়ি ঝালমুড়ি বলে যে লোকটা সমানে চেচাচ্ছিল আমি তাকে কাছে ডেকে বললাম পাঁচ টাকার ঝালমুড়ি দিন। সে আমার দিকে এমন ভাবে তাকালো যেন দিনের বেলায় সে ভূত দেখছে। তার পর বললো পাঁচ টাকার ঝালমুড়ি হয় না।কমপক্ষে দশটাকার নিতে হবে। আমি বললাম যান লাগবেনা। আমি শুনতে পেলাম সে বিড়বিড় করে বলছে ছোটলোক। আমি তাকে ধরতে পারতাম কিন্তু কোন ইচ্ছেই হয়নি। ছোটলোক বলায় আমারতো আর জাত চলে যাচ্ছেনা।

মুড়ি খাওয়ার ইচ্ছেটা মাঠে মারা গেল। আমার মত আরেকজন ছোটলোকের দেখা পেলে দু’জনে মিলে দশটাকার মুড়ি কিনে খাওয়া যেত। পকেটে হাত দিয়ে একটা পাঁচটাকার নোট বের করে অন্য পকেটে রেখে দিলাম। মেয়েটার জন্য যদি একটা টিভি কেনা যায়। এমনিতেতো টাকা জমাতে পারিনা তাই যখন রিকশা ভাড়া বনিবনা না হলে হেটে যাই তখন ঐ টাকাটা আলাদা করে রাখি। যখন ঝালমুড়ি বা অন্য কিছু খেতে গিয়ে কোন কারণে খাওয়া হয়না তখন সেটাও আলাদা করে রাখি। মেয়ের মা টিটকারি মেরে বলে তোমার যতসব ছোটলোকি কারবার। ছোটলোক কথাটা একটা বোর্ডে লিখে গলায় ঝুলিয়ে রাখার মত নামডাক আমার হয়ে গেছে।

দিনে কতবার যে ছোটলোক কথাটা শুনি তা হিসেবের বাইরে। ছোটলোক বলার কারণে যদি প্রত্যেকের কাছ থেকে পাঁচ টাকা করে জরিমানা আদায় করা যেত তাহলে বোধহয় এতোদনে মেয়ের জন্য একটা টিভি কিনে ফেলতে পারতাম।

বাসের ভাড়া শুনে মাথার মধ্যে চক্কর দিতে শুরু করলো। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে আর কারো মাথা চক্কর দিচ্ছে না। ভাড়া যাই হোক সবাই বাস আসলেই হুড়মুড় করে উঠে বসছে। হয়তো সিটে বসে দেখছে পা ঢুকছেনা, নয়তো জানালায় কাঁচ নেই।বৃষ্টি আসলে কাক ভেজা ভিজে যেতে হবে জেনেও তাদের মূখে প্রশান্তির ছায়া। বাসে যে উঠতে পেরেছে এটাই যেন বড় ভাগ্যের ব্যাপার। হেটে যাওয়ার মত দূরত্ব হলে আমি হয়তো হেটেই চলে যেতাম।কিছু একটা খাওয়া দরকার কিন্তু বাজেটের সাথে মিলিয়ে তেমন কিছু পাচ্ছিনা। হঠাৎ দেখলাম আমড়া আমড়া বলে একটা বাচ্চা ছেলে চেচাচ্ছে। ভাবলাম পাঁচ টাকায় কিছু পাই বা না পাই অন্তত একটা আমড়া পাওয়া যাবে। ছেলেটা কাছে আসতেই জানতে চাইলাম তোমার আমড়া কত করে। শুনলাম আজ আর আমড়াও পাঁচ টাকায় পাওয়া যায় না।ডিম যেমন শহরের হাওয়া লেগে, তেলের ছ্যাকা পেয়ে মামলেট হয়ে গেছে তেমনি পাঁচ টাকার আমড়া ঈদের বাতাস লেগে দশটাকা হয়ে গেছে। এই ছেলেটি অবশ্য আমাকে ছোট লোক বলেনি। সম্ভবত ঐ কথাটা বলার মত বয়স এখনো হয়নি ওর।

দেড় ঘন্টা দাড়িয়ে থেকে অবশেষে গাড়িতে উঠলাম। গাড়ি বলতে একটা ট্রাক। মেঝেতে ত্রিপল বিছিয়ে বসার মত সুন্দর ব্যবস্থা করা হয়েছে। বৃষ্টি হলে কাক ভেজা ভিজতে হবে এরকম সম্ভাবনার কথা ভেবে উপরে সামিয়ানা টাঙ্গিয়ে দেওয়া হয়েছে। সুরতাং আকাশ দেখতে দেখতে যাওয়ার সুযোগ নেই। পাটুরিয়া ফেরী ঘাট পযর্ন্ত যেতে হবে। বাসে ভাড়া চাচ্ছিল তিনশো টাকা শেষে এই ট্রাকে দেড়শো টাকায় দফারফা করা হলো। হয়তো গতকাল কিংবা তার আগের দিন এই ট্রাকে করে কোরবানীর গরু এসেছিল ঢাকাতে। আর আজ সেই ট্রাকে আমরা ফিরছি,আমরা মানুষ কেউ কেউ আমাদের নাম দিয়েছে ছোটলোক।

রংধনুর যেমন অনেকগুলো রং থাকে তেমনি সমাজে অনেক গুলো স্তর থাকে।আমরা যখন দেড়শো টাকা ভাড়ায় ট্রাকে করে ফিরছি তখন কেউ কেউ আমাদের সারা মাসের মাইনের সমানটাকা খরচ করে ঘরে ফিরছে। কেউ নিজের গাড়ীতে যাচ্ছে,কেউবা প্লেনে যাচ্ছে আবার কেউবা এসি গাড়িতে যাচ্ছে। আর আমরা যাচ্ছি ট্রাকে। ট্রাকের চারপাশে দেয়ালের মত উচু। উপরে ভারি ত্রিপলের ছাউনি থাকায় ভিতরটা গুমোট গরম আর নিস্তব্ধ অন্ধকার। অনেক গুলো মানুষ একসাথে না থাকলে কবরের অন্ধকারের সাথে তুলনা করা যেত। এক পাশে বসে ঝিমুচ্ছে আমারই বয়সী একজন। পরিচিত দুএকজনকে পেয়ে কেউ কেউ খোশ গল্পে মেতে আছে।তাদের এ যাত্রাটা বেশ আনন্দপুর্ন হবে বলেই ধরে নিয়েছি। এখানে যারা আছে তারা সবই  এক কাতারের। আমার মত সবাই হয়তো জাবের এন্ড জুবায়েরে কাজ করে না তবে অন্য কোন না কোন গামের্ন্টসে নিশ্চই কাজ করে।কেউ কেউ হয়তো হোটেলে বেয়ারার কাজ করে, কেউবা বাসের হেল্পার-কন্ডাক্টর। এ শহরে কত মানুষ, তাদের হাজারটা পেশা।

আমি নিটিং হেলপার।প্রতিনিয়ত নিটিং সুপারভাইজার থেকে আরো খানিকটা কাজ শিখতে চেষ্টা করছি।যদি নিজে একটু একটু করে এগোতে এগোতে সুপারভাইজার হতে পারি সে আশা আমার মনেও আছে।ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাচ্ছি বাবা মা স্ত্রী সন্তানের সাথে ঈদ কাটাবো বলে। বদ্ধ ট্রাকে প্রচন্ড গরমে ঘামছি। হঠাৎ দেখলাম একজন গাট্টিবোচকা থেকে একটা চার্জার ফ্যান বের করে সেই বাতাসে আরাম পাচ্ছে।আমার অবশ্য দেখা ছাড়া উপায় নেই। ট্রাকের প্রচন্ড শব্দের মধ্যেও ক্লান্তিতে দুচোখে ঘুম নেমে আসছে।ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখে দেখতে পাই এক একটি দ্রুতগামী বাস আমাদের পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে।

ট্রাকের পাটাতনে বসে দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে কতক্ষণ ঘুমিয়েছি জানা নেই।ঘুমের মধ্যে অনেক রকম স্বপ্ন দেখেছি।হঠাৎ মানুষের চিৎকার চেচামেচিতে ঘুম ভাংলো।প্রথমে বুঝে উঠতে পারিনি কি হয়েছে পরে বুঝলাম আমরা পাটুরিয়া ঘাটে চলে এসেছি। এই ঘাট পার হয়ে আমাকে যেতে হবে অনেক দূর। যশোরের ঝিকরগাছায়, ওখানেই আমাদের বাড়ি। বাড়ি বলতে ঠিক যা বুঝায় সেরকম নয়।একটা ছনের ঘরে তিনটা রুম।একটাতে বাবা মা থাকে একটাতে আমি স্ত্রী কন্যাকে নিয়ে থাকি আরেকটাতে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র রাখা। একটা ছোট রান্নাঘরও আছে খাওয়াদাওয়া সব সেখানেই সারি। ফেরী ঘাটে নেমে মানুষের আরেকদফা ঢল দেখলাম।

ফেরীর টিকেট কাটতে হবে।টিকেট বিক্রেতারা জায়গায় জায়গায় দাড়িয়ে আছে আর তাদের ঘিরে ঘরে ফেরা মানুষের জটলা। অপেক্ষাকৃত কম ভীড় দেখে একজনের কাছ থেকে টিকেট কিনলাম। পঁচিশ টাকার টিকেট বিক্রি হচ্ছে পয়ত্রিশ টাকায়। বুঝাই যাচ্ছে মানুষের এখন বেশ টাকা হয়েছে তাই টিকেটের গায়ে পঁচিশ টাকা লেখা দেখার পরও কারো মনে প্রশ্ন নেই কেন দশটাকা অতিরিক্ত দিতে হবে।আমার অত টাকা হয়নি,আমি পকেট থেকে পঁচিশটাকা বের করে লোকটার হাতে ধরিয়ে দিলাম। আশ্চর্য হয়ে দেখলাম লোকটা প্রতিবাদ করলো না। আমি শুধু বলেছিলাম টিকেটের গায়েতো পঁচিশ টাকা লেখা । সে সম্ভবত একজন কাষ্টমারের পিছনে অনেক সময় না দিয়ে বরং বাকিদের কথা ভেবে আর কথা বাড়ায়নি।

টিকেট হাতে নিয়ে ফেরী ঘাটের কিনারে গিয়ে দাড়াই। গাড়ি ওঠা নামার জন্য দুটো আলাদা রাস্তা তৈরি করা হয়েছে। দুই রাস্তার মাঝখানে ফাঁকা এবং সেটা দিয়ে নিচের পানি দেখা যায়। তখন বেশ রাত সুতরাং অালো আধারিতে বিষয়টি খুব একটা চোখে পড়েনা।সুবিধামত যায়গায় দাড়িয়ে ভাবছি এই ফেরীতে উঠতে পারবোতো!যে পরিমান মানুষ ভীড় করেছে তাতে তিল ধারনের ঠাই হবে কিনা সন্দেহ আছে। যেহেতু আমার সাথে বড় কোন গাট্টিবোচকা নেই তাই সুবিধামত যায়গায় দাড়ালাম যেন ঠেলেঠুলে উঠতে পারি। এর মাঝে হঠাৎ সোরগোল শুনে এগিয়ে গেলাম।একটা দুধের বাচ্চা পাটাতনের উপর পড়ে আছে আর তার হতভাগা মা দুই পাটাতনের মাঝের ফাঁকা যায়গাতে পড়ে ব্যথায় কাতরাচ্ছে। মহিলাকে টেনে তোলা হল আর একজন বাচ্চাটাকে উঠিয়ে কোলে নিল। বাচ্চাটা তখন সমানে কাঁদছে।

ব্যথায় কাতরাতে কাতরাতে মা তার সন্তানের খোঁজ করছে।মা তাহলে এমনই হয়! নিজের কষ্টকে চাপা দিয়ে সন্তানের কথা ভাবে। আকাশে তখন আধখানা চাঁদ।চাদেঁর মৃদু আলো নদীর পানিতে অন্যরকম মোহনীয় দৃশ্য সৃষ্টি করেছে।লঞ্চ ঘাট থেকে লঞ্চ ছেড়ে যাচ্ছে তার সাইরেনের শব্দ শুনতে পাচ্ছি। আমার বুদ্ধি নিম্নস্তরের ।অফিসে রাস্তায় এ কথাটা বার কয়েক শুনতে হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে প্রতিবাদ করার চেয়ে নিরবে শুনে যাওয়াই ভাল।তবে আজ আমি কিছুটা বুদ্ধিমানের পরিচয় দিয়েছি।সবাই যখন ঐ ফেরী ঘাটে ভীড় করেছে এবং সেখানে তিল ধারনের ঠাই নেই আমি তখন ভীড় ঠেলে বাইরে বেরিয়ে উল্টোদিকে হাটতে শুরু করি। দেখে মনে হতে পারে সদ্য ঘাটে নোঙ্গর করা ফেরীতে আমি ওপার থেকে এপারে এসেছি।

আমি লক্ষ্য করে দেখলাম এক নাম্বার ঘাটে ভিড়েছে খান জাহান আলী ফেরীটি। ওদিকটা অনেকটাই নির্জন। সবাই যখন দুই নাম্বার ফেরী ঘাটে মৌমাছির ঝাকের মত গিজগিজ করে ভীড় করে আছে আমি তখন এক নাম্বার ঘাটে দাড়িয়ে থাকা খান জাহান আলীতে উঠে হাত মুখ ধুয়ে ছাদে গিয়ে বসি।ফুরফুরে বাতাস আমাকে মুগ্ধ করে,শীতলতা এনে দেয় আমার সারা শরীরে।পুরো ফেরীতে হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ আর যারা গাড়িতে ছিল তারা। অথচ দুইনাম্বার ঘাটে যে সব ফেরী এসে ভীড়ছে তাতে মানুষের এতো ভীড় যে ঠিকমত দাড়ানোর জায়গা থাকছেনা।

মধ্যরাত। আকাশে আধখানা চাঁদ আলো দিয়ে পরিবেশটাকে মোহনীয় করে রেখেছে। যতদূর চোখ যায় কেবল জোছনার স্রোত। পদ্মার ঢেউগুলো জোছনার ঢেউ হয়ে উঠেছে।ফেরীর ছাদে নামাজের যায়গা আছে।কয়েকজন ধর্মপ্রান মানুষ সৃষ্টিকর্তার প্রার্থনায় নিজেদের মত্ত রেখেছে। একটু একটু করে ফেরীটা ক্রমাগতভাবে তীর ছেড়ে মাঝ নদীর দিকে ধাবিত হচ্ছে। এক ডিমওয়ালা ডিমডিম বলে চেচিয়ে গেল। বেচারার ব্যবসা ভাল যাচ্ছেনা। এক নাম্বার ফেরীঘাট প্রায় জনশুন্য অথচ সে যদি দুই নাম্বার ঘাটে থাকতো তাহলে তার ঝাকার সবগুলো ডিম এতোক্ষণে নিশ্চই শেষ হয়ে যেত। ওর কথা চিন্তা করে মনে হলো একটা ডিম খাওয়া যেতেই পারে। পনের টাকার একটা ডিম ক্ষুধা মেটানোর জন্য যথেষ্ট নয়। ক্ষুধা এতোটাই প্রবল হয়েছে যে ডিম থেকে আমি কতটুকু প্রোটিন পাব তার হিসেব না করে ডিমটা আমার ক্ষুধার কতটা নিবারণ করতে পারবে সেটাই মূখ্য বিষয় হয়ে দাড়াল। খরিদ্দার না পেয়ে ডিমওয়ালা নিচে নেমে গেল।

ভাবলাম পনের টাকার ডিম না খেয়ে বরং দশটাকার ঝালমুড়ি খেলে ক্ষুধা কিছুটা নিবারণ হবে। অপেক্ষায় থাকলাম কিন্তু কোন ঝালমুড়িওয়ালা এলোনা।সম্ভবত ঝালমুড়িওয়ালারা দুই নাম্বার ফেরী ঘাটে ওদিকটাকেই বেছে নিয়েছে।আমার মনে হলো যারা ফেরীতে ঝালমুড়ি বা ডিম বিক্রি করে তাদেরতো ফেরী বদলানোর দরকার পড়েনা। সব হয়তো ভাগ্য।এই ডিমওয়ালা কি ভাবতে পেরেছে যে এই ফেরীটা দুই নাম্বার ঘাটে না ভীড়ে এক নাম্বার ঘাটে ভীড়বে।ডিম কিংবা ঝালমুড়ি কোনটাই খাওয়া হয়নি বলে টাকাটা বেঁচে গেলেও সেটা আলাদা করে রাকিনি। এবার যেহেতু দামাদামি পযর্ন্ত যাইনি তাই ওটা আলাদা করা হয়নি। এভাবে সব কাজেই আলাদা করতে গেলে দেখা যাবে পুরো টাকাটাই আলাদা হয়ে গেছে।পুরো টাকা মানে কিন্তু বাদশাহ হুমায়ূনের রত্নভান্ডার নয়। বেতনের সাত হাজার টাকার সাথে বোনাস তিন হাজার টাকা মিলে মোট দশ হাজার টাকা। ফ্যাক্টরীতে আমার চেয়েও কেউ কেউ কম বেতন পায় এবং তারা কিভাবে সন্তান পরিবার নিয়ে বেঁচে থাকে সেটা জানতে খুবই ইচ্ছে হয়।

ঈদ বলে টাকার পরিমান দশহাজারে ঠেকলেও খরচ এ সময়ে এতো বেশি হয় যে বলার নয়।মেসে থাকি।যে বুয়া রান্না করেন সেই বুয়াকে পঞ্চাশ টাকা বোনাস দিতে হয়েছে। যেখানেই যাচ্ছি সবার বোনাস চাই। যেন আমি একটা টাকার বস্তা নিয়ে বসেছি বোনাস দেব বলে।বাড়ি যাচ্ছি, খরচ হচ্ছে, আর তোমরাতো আমরা যাচ্ছি বলেই ইনকাম করতে পারছো তাহলে আবার বোনাসের দরকার কি। ঈদের মাস ছাড়া বাকি সময়টাতে বেতনের সাত হাজার টাকা দিয়েই চলতে হয়। হোটেল থেকে সকালে বিশ টাকা দিয়ে দুটো মোটা রুটি কিনে আনি। একটা রেখে দেই দুপুরের জন্য আরেকটা সকালে খাই। খাওয়ার আগে রুটিটাকে এক প্লেট পানির মধ্যে একটু লবন দিয়ে ভিজিয়ে রাখি।রুটিটা ভিজে মোটা হয়ে যায় এবং রুটি থেকে যেটা পানির সাথে মিশে যায় সেটাও খেয়ে ফেলি। বেশ ভাল ভাবেই পেট ভরে যায়। দুপুরেও ঠিক তাই করি। আর রাতে। নাহ বলতে গেলে কিছুই খাইনা। রাতেতো ঘুমিয়ে থাকি সুতরাং কোন কাজ কর্মহীন সময়ে খাবার খেয়ে লাভ কী। আর তাছাড়া ঘুমিয়ে থাকলে ক্ষুধাও লাগেনা। কিংবা ক্ষুধা লাগলেও টের পাওয়া যায়না। একান্তই খাওয়া লাগলে এক কাপ চায়ে একটা পাউরুটি ভিজিয়ে খাই। আমার কাছে মনে হয় পৃথিবীর সব থেকে মজার খাবার হল চায়ে পাউরুটি ভিজিয়ে খাওয়া।একবার আমার স্ত্রীকে কথাটা বলেছিলাম তার পর বেড়াতে গিয়ে সে পাউরুটি চা দিয়ে ভিজিয়ে খেয়ে বমি করার অবস্থা। সে বিছানায় শুয়ে রাতে আমায় প্রশ্ন করেছিল তুমি ওটা খাও কি করে? আমি নিবির্কার ছিলাম। আমারতো বেশ ভালই লাগে। ফেরী ঘাটে ভিড়তে বেশ দেরি। চা পাউরুটির কথা মনে পড়তেই ছাদ থেকে নেমে ক্যান্টিনে গিয়ে চা আর পাউরুটি খেয়ে নিলাম। দুপুর অব্দি তাহলে আর কিছু খাওয়া লাগবেনা।

হোটেলে বড় বড় গামলায় সাজিয়ে রাখা ইলিশের পেটিগুলো আমার দিকে তাকিয়ে সম্ভবত টিটকারি মারছিল।তবে পকেটে দশ হাজার টাকা থাকার পরও আমি সামান্য একটা পেটি দিয়ে ভাত খাচ্ছিনা কেন এটা যারা ভাবছেন তারা হয়তো জানেন না ওই পেটি দিয়ে ভাত না খাওয়ায় যে টাকাটা বাচবে সেটা দিয়ে আমার পুরো পরিবার এক বেলা খেয়ে থাকতে পারবে।

এইমাঝ রাতেও অনেকের মোবাইল মাঝে মাঝেই টুংটাং শব্দে বেজে উঠছে।বাড়ি ফিরছে দেখে হয়তো স্বজনেরা খুব উদ্বিঘ্ন হয়ে আছে। আমার ফোনে কেউ ফোন করার নেই। বউবাজার থেকে দুটো পুরোনো মোবাইল কিনেছিলাম আটশো টাকা দিয়ে। একটা বাড়িতে রেখে এসেছি আরেকটা আমার কাছে। খুব জরুরী না হলে ফোন করা হয় না। আগে থেকেই ঠিক করা আছে আমরা মোট তিন মিনিট কথা বলবো। এক মিনিট বউ পরিবারের খবর বলবে, এক মিনিট আমি নিজের কথা বলবো, আরেক মিনিট বাবা মা অথবা মেয়েটা কথা বলবে। এই মধ্য রাতে তারা কেউ জেগে নেই। ঘুম নষ্ট করে আমার জন্য বেহুদা চিন্তা করার কোন কারণও নেই। লোকে ঘন্টার পর ঘন্টা ফোনে কী এমন কথা বলে জানিনা।

ফেরী যখন ঘাটে ভিড়লো তখন রাত পৌনে দুইটা। ফেরী ঘাট থেকে বাস স্ট্যান্ড আধা কিলোমিটার দূরে। ওখান থেকে অটোতে গেলে দশটাকা ভাড়া নেবে সময় লাগবে পাঁচ মিনিট। আমি হেটেই রওনা হলাম। গোটা রাত পড়ে আছে আমার সামনে। আধা কিলোমিটার হাটতে বড়জোর বিশ মিনিট সময় লাগবে কিন্তু বেঁচে যাবে পুরো দশটা টাকা। এই মাঝ রাতে দশটাকা বাঁচানোটাও আমার কাছে অনেক বড় ব্যাপার।

অন্ধকার রাস্তায় আমি শুধু একাই হাটছিনা বরং আরো অনেকেই আছে। মনে মনে ভাবছি লোকে যে বলে আমি ছোটলোক তাহলে কি এরাও সবাই আমারই দলে। এদের সংখ্যাতো নেহাত কম নয়। বাসস্ট্যান্ডে এসে ঘুরে ঘুরে বাস খুঁজতে লাগলাম। এপারে কোন ট্রাকের বন্দ্যোবস্থ নেই সুতরাং দু’পাঁচ টাকা বেশি হলেও বাসেই যেতে হবে। হঠাৎ সাকায়েত ভাইয়ের সাথে দেখা। সে ড্রাইভার, আমাদের গ্রামেই বাড়ি। তাকে খুব ব্যতিব্যস্ত দেখাচ্ছে।ভাবলাম তার গাড়িতে যদি যেতে পারি হয়তো ভাড়া কিছু কম লাগবে কিন্তু সে এমন ভাব করলো যেন আমি তার গাড়িতে মাংনা যেতে চাইছি। মনটাই খারাপ হয়ে গেল।আল আমিনের সাথেও দেখা হলো, সেও গাড়ি চালায়। জিজ্ঞেস করলাম তোমার গাড়িতে সিট আছে কিনা। সে আমতা আমতা করে বললো কাকা ইঞ্জিন কভারে যেতে পারবেন দুইশো টাকা ভাড়া লাগবে। মনে মনে হিসেব করে দেখলাম দুইশো টাকা মানেতো অনেক।প্রায় পাঁচ কেজি চাল কেনা যাবে। আমি এদিকে ওদিকে খুঁজে খুঁজে একটা বাস পেলাম। ভাড়া সমান সমান তবে একটা সিট পেলাম।

পৌছাতে দুই আড়াই ঘন্টা লাগবে।সে সময়টাতে দু’চোখ বুজে ঘুমিয়ে নিলাম। বাসস্ট্যান্ডে নামার পর আমার করার মত কিছু থাকলো না। রাত তখন পৌনে চারটা বাজে। কেউ কেউ সেই রাতেই বাড়িতে চলে গেল। বিশেষ করে যাদের বাসা শহরেই। অন্য দিকে যাদের শহরে বাড়ি নেই তাদের অনেকেই শহরের কোন না কোন আত্মীয়র বাসায় থাকার জন্য চলে গেল। কারো কারো বাড়ি শহর থেকে দূরে হলেও চলে যেতে পারলো কারণ বাস থেকে নামলেই বাড়িটা হাটা দূরত্বে। আর আমার এই শহরে, এই রাতে যাওয়ার মত কোন বাসা নেই। বাস চলাচল করলেও গ্রামে যাওয়ার উপায় নেই। বাস আমাকে যেখানে নামিয়ে দেবে সেখান থেকে ভ্যানে করে দুই কিলোমিটার যাওয়ার পর আরো দুই কিলোমিটার হেটে যেতে হয়। বাস থেকে নেমে ঐ দুই কিলোমিটার যাওয়ার জন্য কোন ভ্যান পাওয়া যাবে না। সুতরাং রাত পোহানোর অপেক্ষায় বাসস্ট্যান্ডে একটা বেঞ্চিতে বসে থাকলাম। ভোর হলে তখন বাস ধরে রাড়ি ফেরা যাবে।

পাশে একটা চায়ের দোকানের বেঞ্চিতে আমার মত দু’জন গার্মেন্টস কর্মী এসে বসলেন। মাত্র দু’মিনিটের মধ্যেই দোকানদার তাদের খুব আপনজন হওয়ার চেষ্টায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।বিস্কুট,চানাচুর খেতে দিলেন, চা আনালেন। একটা টেবিল ফ্যান ছিল সেটাও তাদের দিকে ঘুরিয়ে দিলেন।মহিলা দু’জন তার পুবর্পরিচিত ছিল না।পাশে যে আমিও জলজ্যান্ত একজন মানুষ বসে আছি তা সম্ভবত তার চোখেই পড়েনি।

আমি যে বেঞ্চিতে বসেছি সেখানে এক পাশে এসে বসলো এক সিগারেটখোর। মনের সুখে সিগারেটে টান দিয়ে ধোয়া ছাড়তে লাগলো। মন বলছিল লোকটাকে বলি ভাই অন্য কোথাও গিয়ে সিগারেট টানুন। পরে আর কথা বাড়ালাম না।অবশ্য একটু পরে তার সাথে অনেক কিছু নিয়ে কথা হলো।কিছুক্ষণ বাদে লোকটা উঠে চলে গেলে গার্মেন্টসকর্মী মহিলা দু’জন আমার সাথে গল্পে যোগ দিল।গল্পের বিষয়বস্তু একটু আগে উঠে যাওয়া সিগারেট খাওয়া লোকটি।সে বলেছে তার বাবার বয়স চল্লিশ পয়তাল্লিশ বছর হবে অথচ তার নিজের বয়সই পয়ত্রিশের উপরে।মহিলা দুজন অনেকটা রাগত স্বরে বললো বলদটা বলে কি! তার বাপ কি তাহলে পাঁচ বছর বয়সে বিয়ে করেছিল।পাঁচ বছর বয়সে কি বাবা হওয়ার ক্ষমতা থাকে?

বেতন ভাতা নিয়েও অনেক আক্ষেপ করলো। সামান্য ক’টা টাকা বেতন,ঢাকা থেকে আসতে যেতেই অনেক গুলো টাকা শেষ হয়ে যায়। পরিবারের লোকজন পরিস্থিতি বুঝতে চায় না, বিশেষ করে ছোটরা। তারা বায়না ধরলে আর রেহাই নেই। এদিক থেকে আমার মেয়েটা খুব ভাল। একটা টিভির শখ তার বহুদিনের। তবে কখনো নাছোড়বান্দার মত কেনার বায়না ধরেনি। কিছুক্ষনের মধ্যে বেঞ্চগুলো অপেক্ষমান মানুষে ভরে গেল।আমার মতই এদের সবার এ শহরে থাকার মত কোন যায়গা নেই। হোটেলে গিয়ে উঠবে সে সামর্থও নেই কারো। আবার এই রাতে গ্রামে যাবে সে অবস্থাও নেই। পথে চুরি ডাকাতির ভয় আছে। সামান্য পাঁচ সাত হাজার টাকা ছাড়া কারো কাছেই তেমন কিছু নেই। ঐ টাকাগুলো খোয়া গেলে ঈদের আনন্দ বিষাদে রুপ নিবে। তাই ঝুঁকি না নিয়ে ভোর হবার অপেক্ষায়।

সকাল হলে শহর থেকে মেয়ের জন্য একটা জামা আর স্ত্রীর জন্য একটা অল্প দামী শাড়ি কিনলাম। ঘরে বাবা মা আছেন। সারা বছর তাদেরকেও কিছু দেওয়া হয়না। এ জন্য অবশ্য স্ত্রী কন্যার মত তাদের মনেও তেমন কোন আক্ষেপ নেই। বাবা বলেন ‘ছোটলোকের ঘরে জন্মেছিস পোড়া কপাল নিয়ে, তাই সারা জীবন কষ্ট করতে হচ্ছে’। আমি কিছু বলতে পারি না। আমার স্ত্রী বাবার পাশে দাড়িয়ে শান্তনা দিয়ে বলে বাবা অমন কথা বলবেন না। দেখবেন নিশ্চই একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। বাবা মূখে হাসি টেনে বলেন তোমার মত একজনকে পরিবারের সদস্য হিসেবে পেয়েছি বলেই কিছুটা শান্তি। স্ত্রী কন্যার কাপড় কেনার পাশাপাশি বাবার জন্য পাঞ্জাবী আর মায়ের জন্য শাড়ী কিনলাম। ঢাকা থেকে কিনতে পারতাম কিন্তু সেরকম সময় ছিল না। আর তাছাড়া ঢাকায় জিনিসপত্রের দাম বেশি। সবার কাছেই গরম টাকা থাকে। সেই চিন্তা করে নিজের শহর থেকে কেনা।

ঈদের দিন সকালে মেয়েটার হাতে দুটো বিশ টাকার নোট ধরিয়ে দিলাম। সারা বছর কিছুইতো দেওয়া হয় না। টাকাটা হাতে নিয়ে সে নেড়েচেড়ে দেখলো।তার পর জামার পকেটে রেখে দিল।তার মূখে তখন দারুন খুশির আভা। আমি মেয়েটার হাসিমূখ দেখে নামাজে গেলাম। মনে মনে ভাবতে লাগলাম সামান্য টাকা দিয়ে ও কি কি কিনবে। নামাজ শেষে খেতে বসেছি, মেয়েটাও পাশে বসেছে। তার হাতে তখন গত বছর বৈশাখী মেলা থেকে কেনা মাটির ব্যাংকটা। পকেট থেকে একটা বিশটাকার নোট, একটা দশটাকার নোট আর কয়েকটা দুইটাকার নোট বের করে একটা একটা করে সে তার মাটির ব্যাংকে ভরতে লাগলো। আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম তুমি কিছু খাওনি? সে বললো বাবা খেয়েছিতো। চার টাকার পিয়াজু কিনেছিলাম। আমি খেয়েছি, দাদা দাদিকে দিয়েছি, মাকেও দিয়েছি। তোমার জন্য রাখতে চেয়েছিলাম কিন্তু মা বললো পিয়াজু খেলে তোমার নাকি পেটে সমস্যা হয় তাই বাকিটাও খেয়ে ফেলেছি। আর এই বেঁচে যাওয়া টাকাগুলো জমাচ্ছি যদি একটা টিভি কেনা যায়। মেয়ে আমার অসময়ে জন্মেছে। ওর জন্মানো উচিত ছিল শায়েস্তা খার আমলে যখন টাকায় আট মন চাল পাওয়া যেত বলে শুনেছি।

বাবার বলা সেই পুরোনো কথাটা খুব মনে পড়ে গেল। ছোটলোকের ঘরে জন্মেছিস পোড়া কপাল নিয়ে। আমার মেয়টাওতো জন্মেছে আমার ঘরে। তাকে আমি কোন ভাবেই ছোটলোক ভাবতে চাই না। যার মন এতো বড় সে কখনো ছোটলোক হতে পারে না। ঈদের পরদিন মেয়েটা জ্বরে পড়লো। জ্বরে ওর সারা শরীর পুড়ে যাচ্ছিল। একটা ভ্যানে করে বিনোদপুর বাজারে ফুলমিয়া ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলাম। ডাক্তার সব দেখেশুনে সদরে পাঠিয়ে দিলেন।

অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে জানা গেল মেয়ের ম্যালেরিয়া হয়েছে। চিকিৎসায় এ রোগ ভাল হয়। ঈদের বাজার সদাই করার পর যৎসামান্য টাকা ছিল হাতে। তা দিয়ে মেয়ের চিকিৎসা করা সম্ভব নয়। গ্রামের মধ্যে অর্থ বিত্ত সম্পন্ন লোকের অভাব নেই। কায়েকজনের কাছে ধার চাইতেই তারা নানা অজুহাত দেখালো। শেষে গেলাম সুজাউদ্দিন চাচার বাড়িতে। গ্রামের সব থেকে টাকাওয়ালা সে। মেয়ের অবস্থার কথা বলে কিছু টাকা ধার চাইলাম। তিনি জানালেন দেবার মত টাকা তার হাতে নেই। থাকলে নিশ্চই দিতেন। আমি তার কাছে শ্রেফ ধার চাইতে গিয়েছি তাই সেখানে জোর করার কিছু নেই।

যখন খালি হাতে ফিরছি তখন দেখলাম তার বড় ছেলে এসে তার কাছে টাকা চাইতেই পকেট থেকে বেশ কিছু টাকা বের করে দিলেন। কত টাকা জানি না, তবে পাঁচ দশ হাজারের কম নয়। টাকার জোগাড় অবশ্য পরে করেছিলাম স্ত্রীর কানের দুল বিক্রি করে। শেষপযর্ন্ত কিছু হয়নি। মেয়েটা তিনদিনের জ্বরে ভুগে সব মায়া কাটিয়ে চলে গেল। বাবা,মা, স্ত্রী শোকে পাথর হয়ে গেল, আমিও। মেয়েটা ক্লাস ফাইভে পড়তো। হাতের লেখা ছিল খুব সুন্দর। সে নেই, তার স্মৃতি রয়ে গেছে। ওর একটা খাতা হাতে নিয়ে ওল্টাতে থাকি। মাঝখানে চিঠির মত করে লেখা। ‘বাবা আমি যে মাটির ব্যাংকটাতে টাকা জমাই সেটা দিয়ে আমি কিন্তু কোন টিভি কিনবো না।যদিও আমি তোমাকে বলেছি টিভি কেনার জন্য টাকা জমাচ্ছি। টিভি না দেখলেতো আমরা মরে যাব না। আমি টাকা জমাই অন্য কারণে। তুমি ঢাকাতে থাক। বাড়িতে মা আমি আর দাদা দাদি থাকি। মায়ের হাতে তুমি যে টাকা গুলো দাও তা দিয়ে পুরো মাস চলে না। তুমি যখন থাকো না তখন যদি কারো অসুখ হয় আমরা টাকা পাব কোথায়? সে কথা ভেবেই আমি টাকা জমাই। বিপদের দিনে যদি কাজে লাগে’।

চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। খাতাটা বন্ধ করে বুকের সাথে জড়িয়ে ধরি।যেন খাতাটা নয় মেয়েকেই জড়িয়ে রাখছি। ওর মাটির ব্যাংকটা বইখাতার পাশেই ছিল। এক হাতে ব্যাংকটা সামনে মেলে ধরি।এর সবগুলোতে আমার মেয়ের স্মৃতি জড়িয়ে আছে। ওইটুকু ছোট্ট মাটির ব্যাংকে কতটাকা জমা হয়েছে তা দেখার দরকার নেই। ব্যাংকটা আজীবন ওভাবেই রেখে দিতে চাই।

ছুটি শেষ হয়ে গেছে কিন্তু শোক শেষ হয়নি। এক জীবনে এই শোক শেষ হবার নয়। বাবা মাকে স্ত্রীর হেফাজতে রেখে আবার ঢাকার পথে রওনা হই। ঈদে বাড়ি ফোরর মতই অবস্থা। তবে যাওয়ার সময় কিছু সুখ সাথে করে নিয়ে এসেছিলাম সেই সাথে কিছু সুখের মুহুর্ত কাটানোর স্বপ্ন ছিল।আর ফেরার সময় একবুক বেদনা নিয়ে যাচ্ছি। ভাবছি অফিসের বড় স্যারদের বলে স্ত্রীর জন্য যদি একটা কাজ জোগাড় করতে পারি তাহলে বাবা মাকে ঢাকায় নিয়ে আসা যাবে। আমাদের দু’জনের উপার্জনে নিশ্চই দু’বেলা খেয়ে পরে বেঁচে থাকা যাবে।

মেয়েটা মারা যাবার তিন মাস পর বাবা মা স্ত্রীকে ঢাকায় নিয়ে এসেছি। ওর জন্য আমাদের ফ্যাক্টরীতেই একটা কাজের ব্যবস্থা করেছি। দুই রুমের একটা বাসা ভাড়া নিয়েছি মাজার রোডের কাছে। ভাড়া সাড়ে চার হাজার টাকা।দু’জনের মোট বেতন থেকে ভাড়া মিটিয়ে যা থাকে তা দিয়ে চারজনের কোন মতে বেঁচে থাকা হবে।  এর মাঝে আমাদের বড় স্যার খুব অসুস্থ হয়ে পড়লেন।ঢাকার নামকরা এক হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। একদিন তাকে দেখতে গেলাম। হঠাৎ দেখা হলো আমাদের গ্রামের সব থেকে বড়লোক সুজাউদ্দিন চাচার সাথে। তিনি এ হাসপাতালে কেন তা বুঝতে পারিনি। তাকে দেখে এগিয়ে গেলাম। জানতে চাইলাম কার কি হয়েছে। শুনলাম তার একমাত্র ছেলের হার্টের অপারেশান আজই কিন্তু কোন ভাবেই তার গ্রুপের রক্ত পাওয়া যাচ্ছেনা।আমি বললাম চাচা রক্ত তো কিনতে পাওয়া যায়।আপনারতো টাকার অভাব নেই। আমরা না হয় ছোটলোক, আমাদের সমস্যা হতে পারে কিন্তু আপনাদেরতো সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

তিনি ছলছল চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন।তাকে খুব অসহায় দেখাচ্ছিল।আমি তাকে শান্তনা দেবার ভাষা খুঁজে পাইনি। বড় স্যারকে দেখার জন্য সুজাউদ্দিন চাচার কাছ থেকে বিদায় নিলাম। তার আগে জানলাম তার ছেলের ও নেগেটিভ রক্ত লাগবে কিন্তু এই গ্রুপের রক্ত পাওয়া যাচ্ছে না। আর এক ঘন্টার মধ্যে অপারেশান করতে না পারলে খুব অসুবিধা হয়ে যাবে। আমি বিদায় নিয়ে সামনের দিকে হাটতে হাটতে ভাবতে লাগলাম যে গ্রুপের রক্ত সহজে পাওয়া যায় না সেই গ্রুপের রক্ত আল্লাহ কেন সৃষ্টি করলেন।

বড় স্যারকে যেখানে রাখা হয়েছে সেখানে যেতে হলে নিজের পরিচয় দিতে হচ্ছে। কোম্পানী থেকে দেওয়া আইডি কার্ডটা দেখালাম। আমাকে ঢুকতে দিল। আইডি কার্ডটা ফিরিয়ে নিয়ে যখন পকেটে রাখতে যাব তখন আশ্চর্য হয়ে দেখলাম আমার আইডি কার্ডে রক্তের গ্রুপ লেখা ও নেগেটিভ। চাকরিতে ঢুকার সময় রক্ত পরীক্ষা করেছিল সে কথা মনেই ছিল না। আমি দ্রুত নেমে গেলাম। সুজাউদ্দিন চাচার ছেলের জন্য রক্ত দিতে এসেছি বলার পর তারা আমার রক্ত নিল।সুজাউদ্দিন চাচা এমন কেউ নন যে তার নাম বললেই হাসপাতালের সবাই চিনবে।আমি কাউন্টারে গিয়ে রোগীর নাম, বাবার নাম এবং রক্তের গ্রুপ বলায় তারা আমার থেকে রক্ত নিতে সম্মত হয়েছে।

আমি রক্ত দিয়ে যখন বের হচ্ছি তখন সুজাউদ্দিন চাচা কাউন্টারে দাড়ানো।তার মুখে কিছুটা স্বস্তির চিহ্ন।কাউন্টারের লোকটা আমাকে দেখিয়ে দিয়ে বললেন ইনিই আপনার ছেলের জন্য রক্ত দিয়েছেন। সুজাউদ্দিন চাচার চোখ ছলছল করে উঠলো।

আমি কোন কিছু পাত্তা না দিয়ে হন হন করে বেরিয়ে আসলাম। তিনিও আমার পিছনে পিছনে আসতে লাগলেন। হয়তো কিছু বলতে চেয়েছিলেন আমি সে সুযোগ দেইনি। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে বাস ধরে ফিরে এসেছি। মনে মনে হাসতে হাসতে বলেছি ছোটলোকের রক্ত শরীরে বয়ে বেড়াক সুজাউদ্দিনের ছেলে। যদিও ওই রক্ত মিশে গিয়ে বাকি রক্তটুকু বদলে দিতে পারবেনা। সুজাউদ্দিন চাচা কিংবা তার ছেলের সাথে আর কখনো দেখা হয়নি বলে জানা হয়নি ছোটলোকের রক্ত নিয়ে সে সুখে আছে কিনা।

২ আগষ্ট ২০১৭

১ সেপ্টেম্বর ২০১৭

প্রকৃতি প্রেমীর চলে যাওয়া

আমরা যখন বাসার ছাদে টবে লাগানো
বনসাইটাও টিকমত চিনে উঠতে পারিনি
তুমি তখন যান্ত্রিক এই নগরীর অলিতে গলিতে দেয়ালের ফাঁকে ফাঁকে
জন্ম নেওয়া প্রতিটি বৃক্ষ তরুলতাকে চিনেছ,
সেগুলোকে মানব সন্তানের মত একএকটি নামে তুমি ডাকতে।

শিমুলিয়া গ্রামের আকাশ আজ মেঘে ঢাকা
সেই শোকাচ্ছন্ন মেঘ সারা বাংলার আকাশটাকেই ঢেকে ফেলেছে
লজ্জাবতী লতারা যেমন হাতের ছোয়ায় নতজানু হয়
ঠিক তেমনি তোমার চলে যাওয়ার বেদনা সইতে না পেরে
তোমার ভালবাসার সন্তানেরা কান্নারত।

একদিন থাকবোনা এই অমোঘ সত্যটা উপলব্ধি করে
এ শহরের অলিতে গলিতে,এ দেশের আনাচে কানাচে
তুমি নিজ হাতে লাগিয়েছ অগণিত বৃক্ষ
যেন তারা তোমার অবর্তমানেও আমাদের জন্য বিশুদ্ধ বাতাস দেয়
অক্সিজেন দিয়ে আমাদের বাঁচিয়ে রাখে।

প্রকৃতি প্রেমী,যে ভালবাসা ওরা তোমার থেকে পেয়েছে
তুমি চলে যাওয়ার পর সেই শুন্যতা যদি ওদের গ্রাস করে নেয়
বন খেকোরা যদি আবার ধারাল দাত বসিয়ে দিতে উদ্ধত হয়
তুমি আবার ফিরে এসো,জন্ম নিও আমারই মাঝে নব নব রুপে
তুমি ছাড়া এই বাংলার অগণিত বৃক্ষ লতা গুল্ম
আজীবনের মত নির্বাক হয়ে যাবে,কথা বলার ভাষাটুকুও যে তোমার কাছেই ছিল।

———-
#জাজাফী
১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭
উৎসর্গঃ প্রয়াত শ্রদ্ধাভাজন দ্বিজেন শর্মাকে। আজ ভোরে তিনি না ফেরার দেশে চলে গেলেন।