Sunday, July 25, 2021
Home Blog

আমাদের স্বপ্ন ভাঙ্গার দায় কার?

0

জাজাফী

স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আমাদের জন্ম হয়নি তাই ইতিহাস থেকে জেনেছি আমাদের পুর্বসুরীদের আত্মদানের কথা। তাদের জীবনের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা এসেছিল তার সুফল আমরা ভোগ করছি।এই প্রজন্মের প্রতিটি কিশোর-কিশোরী,তরুণ-তরুণীর মনের মধ্যে গেঁথে ছিলো স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর কথা। সবাই ভেবেছিল এই দিনে গোটা বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে আনন্দের বান ডেকে যাবে। কথা ছিলো রাজধানী ঢাকা সহ দেশের প্রতিটি শহরে,মহল্লায় লাল-সবুজের ঢল নামবে। তরুণ-তরুণী, কিশোর-কিশোরী সবার গায়ে থাকবে লাল-সবুজের পোশাক,হাতে থাকবে ছোট্ট একটি লাল সবুজের পতাকা, আর মাথায় থাকবে ফেস্টুন।

কিন্তু আমাদের সেই স্বপ্ন ভেঙ্গে গেছে। কিংবা বলা যায় আমাদের স্বপ্ন ভেঙ্গে দেওয়া হয়েছে। আমাদের এই স্বপ্ন ভাঙ্গার দায় কার? স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ছেলে বুড়ো সবার যখন আনন্দ মিছিলে বেরিয়ে আসার কথা তখন সবাই আমরা অবরুদ্ধ। দীর্ঘদিন আমরা অবরুদ্ধ ছিলাম করোনা ভাইরাসের কারণে তবে এবার আমরা অবরুদ্ধ অন্যভাবে। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী হয়ে উঠেছে দলীয় উঁৎসব। এমন একটি উদযাপনের সুযোগ পেলোনা আপামর জনসাধারণ। বিগত দিনগুলোতে আমরা দেখেছি যে দলই ক্ষমতায় বসেছে জাতীয় দিবসগুলো হয়ে উঠেছে কেবল মাত্র তাদের নিজস্ব উদযাপনের দিন। ক্ষমতার বাইরে থাকা দলগুলো যেমন মনে করেছে এই দেশে জাতীয় দিবস বলে আসলে কোন দিন নেই। আমরাতো এমন বাংলাদেশ চাইনি। মুখে যারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শের কথা বলে তাদের কাছে আমাদের প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে আপনারা কি বলতে পারবেন বঙ্গবন্ধু আসলে কোন আদর্শ রেখে গেছেন যা আপনারা ধরে রেখেছেন?

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালিত হবার কথা ছিলো দল মত নির্বিশেষে একত্র হয়ে। প্যারেড গ্রাউন্ডের অনুষ্ঠানে কেবল মাত্র রাষ্ট্রীয় অতিথি এবং নির্দিষ্ট সংখ্যক মানুষ ছাড়া আর কেউ যেতে পারেনি। বিরোধী দল গুলো ছিলো একেবারেই নিস্ক্রিয়। চোখে পড়ার মত তাদের কোন কর্মসুচী ছিলো না এই ঐতিহাসিক দিনে।তাদের কি এই দিনের জন্য কোন বাজেট ছিলো না? দেশ প্রেমের জন্য বাজেট লাগে? অন্যদিকে সরকার এ ক্ষেত্রে কোন ভূমিকাই পালন করতে পারেনি। সরকারের উচিত ছিলো সব কিছু ভুলে গিয়ে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর এই আয়োজনকে সর্বদলীয় করে তোলা। যেখানে আওয়ামীলীগ,জাতীয় পার্টি,বিএনপি সহ অন্যান্য স্বাধীনতার স্বপক্ষের দলগুলোকে একত্র করে দায়িত্ব ভাগ করে দিয়ে একটি সুন্দর আয়োজন করা যা দেখে বিশ্ববাসী অবাক হয়ে যাবে।কিন্তু আমরা তা দেখিনি। এমনকি এই দিনে বেগম জিয়ার কোন বক্তব্যও চোখে পড়েনি। হয়তো আমার চোখে পড়েনি কিন্তু অন্যদের চোখে পড়েছে বলেও শুনিনি।

এই আওয়ামীলীগ অনেক বদলে গেছে। তারা মনে ও মননে আমুল পাল্টে গেছে। মনে পড়ে স্বাধীনতার রজতজয়ন্তীর সময়েও ক্ষমতায় ছিলো এই আওয়ামীলীগ। তখন সেই আয়োজনে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা,ইয়াসির আরাফাতের মত বিশ্ব বরেণ্য নেতা। যাদের গ্রহণযোগ্যতা সর্বত্র। এবারও বিশ্ব বরেণ্য অনেকেই এসেছেন তাদের নিয়ে কোথাও কোন অসুবিধা নেই। মূল সমস্যা গিয়ে দাড়িয়েছে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে নিয়ে।বাংলাদেশ সরকার ভালো করেই জানে বাংলাদেশের মুসলিমরা আবেগপ্রবন এবং ধর্মীয় বিষয়ে তারা কোন ভাবেই ছাড় দিতে রাজি নয়। ব্যক্তি নরেন্দ্র মোদির চেয়ে বরং নরেন্দ্র মোদির নানা সময়ে ধর্ম বিষয়ে আপত্তিকর অবস্থানই মূলত বাঙ্গালীদের মধ্যে মোদি বিরোধীতার জন্ম দিয়েছে। কাশ্মীর ইস্যু থেকে শুরু করে সম্প্রতি ভারতের আদালতে একজন আপিল করেছে মহাগ্রন্থ আল কুরআনের 26টি আয়াত বাতিলের সেই আবেদনের প্রেক্ষিতে আদালত তা এখনো ঝুলিয়ে রেখেছে অথচ এটি খারিজ করে দেওয়ার কথা ছিলো। এমনকি নরেন্দ্র মোদি এ বিষয়ে নিরবতার ভূমিকা পালন করে একার্থে ওই লোকের আবেদনকেই সমর্থন করেছে যা বাঙ্গালী মুসলিমদের মনে মোদি বিদ্বেষ সৃষ্টি করেছে। যারা প্রতিবাদ করেছে নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর বিরোধীতা করে তারা কি ভুল করেছে প্রতিবাদ করে? তাদের কি এই অধিকার নেই? দেশটা কি তাদের কারো নয়?

স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে দেশের অনেক যায়গায় বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে। সবটাই হয়েছে মোদির বাংলাদেশ সফর ঘিরে। যখন সংবাদে জানানো হলো স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তীতে নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশে আসবেন তখন থেকেই সরব ছিলো অগণিত বাঙ্গালী। এসব খবর জানার পরও সরকার নরেন্দ্র মোদি বিষয়ে সিদ্ধন্তে স্থির থাকার মাধ্যমে এদেশের জনগণের মতামতকে আরও একবার পদদলিত করেছে।শুধু তাই নয় বরং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম ফেসবুক ও মেসেঞ্জারকেও তারা নিয়ন্ত্রণ করেছে। ফলে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ঘরে বসে বন্ধুদের সাথে আলোচনা করে কাটানোর ক্ষেত্রেও আমরা সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি। সাংবাদিকদের কাছে অনেকেই বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তুললে তারা সরকারের নেতৃস্থানীয়দের সাথে কথা বলেছে কিন্তু তারা তাদের শেখানো কথাই উত্তর হিসেবে সাংবাদিকদের বলে দিয়েছে যে, না তারা ফেসবুক বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করেনি। এর ঠিক একদিন পর ফেসবুক কর্তৃপক্ষ নিজ থেকেই জানিয়েছে যে তাদের সহযোগিতা ছাড়াই বাংলাদেশ সরকার ফেসবুক নিয়ন্ত্রণ করছে এবং এই প্রযুক্তি বাংলাদেশ সরকারের হাতেই আছে।

এই যে একটি বক্তব্য সারা দেশের  মানুষের কাছে মিথ্যা বলে প্রমানিত হলো  এতে সরকারের ভাবমুর্তি নষ্ট হয় না? এর আগে টিকা ইস্যুতে একটি দেশের নাম উল্লেখ করে ক্ষমতাসীন দলের নেতারা বলেছিলেন অমুক দেশ আমাদের থেকে টিকা নিতে চেয়েছে  এই বক্তব্যের বিপরীতে সেই দেশ জানালো তারা আমাদের কাছে কোন টিকা চায় নি! মিথ্যা কোন না কোন ভাবে এক সময় ঠিকই আলোতে চলে আসে।তখন মানুষ সেটা জানতে পারে।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর যে উৎসবের স্বপ্ন আমরা দেখতাম তার কিয়দাংশও পুরণ হয়নি উপরন্তু স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ব্যক্তি স্বাধীনতার পায়ে শেকল পরানো হয়েছে। সরকার একদিকে বলছে তারা কারো ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে না,বাকস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করছে না, অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করছে। পাশাপাশি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করে প্রকারান্তে বুঝিয়ে দিচ্ছে কিছু বলে দেখো বুঝবে কত ধানে কত চাল।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে ঢাকা সহ সারা দেশে যত জায়গায় সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে তার দায় ক্ষমতাসীনদের উপরও অনেকটা বর্তায় এবং এটি এড়িয়ে যাওয়ার কোন সুযোগ নেই। যারা আন্দোলন করেছে তারা আগে থেকেই জানিয়েছে তারা ভারত বিরোধী নয় বরং তাদের একমাত্র সমস্যা নরেন্দ্র মোদি।এটা জানার পর সরকার চাইলেই সাম্ভাব্য পরিস্থিতি কী হতে পারে সেটা বিবেচনা করে এই অনুষ্ঠানকে আরও সফল করতে পারতো। এই যে একাধিক প্রাণ গেলো,জ্বালাও পোড়াও হলো,হরতালের ডাক আসলো এর কোনটিই তখন ঘটতো না।স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের অবদান আমরা কেউ কোন কালেও অস্বীকার করি না এবং কোন ভাবেই ছোট চোখে দেখি না। ভারতের সহযোগিতা ছিলো বলেই আমরা স্বাধীনতা অর্জনের পথটাকে আরও মসৃন করতে পেরেছিলাম। তা না হলে হয়তো আমাদের আরও ত্যাগ স্বীকার করতে হতো। ভারতের সাথে আমাদের বন্ধুত্বের সম্পর্ক এবং সেটা আজীবন অটুট থাকুক এটাও সবাই চায় কিন্তু এক নরেন্দ্র মোদিকে আমন্ত্রণ জানানো না জানানো নিয়েতো  সেই সম্পর্ক চিড় ধরতো না। অথচ তা করতে পারলে এই দিনে এমন করে রক্ত ঝরতো না,কলঙ্কিত হতো না স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী।

মনে রাখা দরকার ছিলো স্বাধীনতা যেমন কোন এক পক্ষের একক অবদানে অর্জিত হয়নি, তেমনি এই দেশটিও একক কোন দলের নয়। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে সেদিন দল মত নির্বিশেষে আপামর বাঙ্গালী স্বাধীনতা যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়েছিল।সেই অনেক ত্যাগের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী অনুষ্ঠান প্রশ্নবিদ্ধ হলো কিছু মানুষের রক্ত ঝরিয়ে,সম্পদের ক্ষতি করে। যারা মিছিল করেছিল তাদের দোষ ছিলো তারা লাঠি হাতে মিছিলে নেমেছিল, তাদের চোখে মুখে ছিলো প্রতিহিংসা। কিন্তু তারাতো মারমুখী হয়ে ওঠেনি যতক্ষণ না পুলিশ তাদের সামনে বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছে,দিকে দিকে ছাত্রলীগের ছেলে মেয়েরা বাঁধা হয়ে দাড়িয়েছে। তখনই সংঘর্ষের ঘটনার জন্ম হয়েছে। সুতরাং দোষ থাকলে উভয় পক্ষেরই দোষ দিতে হবে।

স্বাধীন একটি দেশে যে কোন ঘটনার প্রতিবাদে যে কেউ মিছিল করতেই পারে। ন্যায্য দাবী হলে সেটি শোনাও একটি সুশীল সরকারের দায়িত্ব। কিন্তু সরকার যখন বাক স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে, তখন তাদের কাছে কোন দাবীয় আর ন্যায্য থাকে না। বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী আর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর অনুষ্ঠান একত্রে করাও যুক্তিযুক্ত হয়নি। কেননা স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সব মানুষের মনে দাগ কাটার কথা যেটা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী নিয়ে কাটবে না। যারা বিএনপি করে বা অন্যান্য দল করে তাদের কাছে বঙ্গবন্ধুর জন্ম উৎসবের চেয়ে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর উৎসব অনেক বেশি আগ্রহের। কিন্তু একই সাথে দুটোর আয়াজন করার মাধ্যমে প্রকারান্তে সরকার জেনে শুনে বাকি দলগুলোকে এই আয়োজনে আগ্রহী হতে নিরুৎসাহীত করেছে বলে আমি মনে করি। চারদিকে এতো উন্নয়নের মধ্যে এমন মনোভাব সত্যিই পীড়াদায়ক। এভাবে চলতে থাকলে বাহ্যিক দিক থেকে হয়তো আমরা উন্নত একটি দেশ নির্মানে সক্ষম হবো তবে আমাদের মধ্যে ভ্রাতিত্বের কোন বন্ধন থাকবে না। পারস্পারিক সহযোগিতার মনোভাব থাকবে না। একটি দেশকে উন্নতির শীর্ষে নিয়ে যেতে হলে ছোট বড় সব শ্রেণী পেশা ও মতবাদের মানুষকে এক সাথে মিলে মিশে কাজ করতে হয়। কিন্তু স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর উৎসব দেখে সেই স্বপ্ন ভেঙ্গে গেছে।আমাদের স্বপ্ন ভঙ্গের দায় তাহলে কার?

28 মার্চ 2021

প্রাবন্ধিক ও সমাজকর্মী

[email protected]

www.zazafee.com

ভিখারী থেকে ফ্যাশন মডেল

0

মানুষের জীবনের মোড় ঘুরতে সময় লাগে না।সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম একদিকে যেমন মানুষকে হতাশায় ডোবাচ্ছে, ঠিক তার বিপরীতে অনেক মানুষের জীবন কিংবা ভাগ্য রাতারাতি বদলে দিচ্ছে এই মাধ্যম। এমন ঘটনা বিশ্বের সর্বত্র। এবার ফিলিপাইনে এমনই এক ঘটনা সামনে এসেছে। তেমনই এক ভাগ্যবতীর গল্প এটা। এক সময় যে রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষা করতো আজ সে বিশ্ব ব্যাপী আলোচিত এবং নামী মডেল।মেয়েটির নাম রিতা গাভিওয়ালা। থাকে ফিলিপাইনে। বয়স মাত্র ১৩। রিতা বাবা-মায়ের সঙ্গে যখন ফিলিপাইনের জামবাঙ্গা থেকে লুচেনা শহরে আসেন, তখন একদম কিশোরী। তার বাবা একজন ময়লা সংগ্রহকারী। রাস্তা বা ডাস্টবিন থেকে ময়লা সংগ্রহ করতেন। সে সময় বাসায় রিতার মা বাচ্চাদের দেখাশোনা করতেন। রিতারা পাঁচ ভাই-বোন। রিতা ‘বাদজাও গার্ল’ নামেও পরিচিত। সমুদ্রে ভাসমান জীবনযাপন করা একটি সম্প্রদায়ের নাম বাদজাও সম্প্রদায়। এই সম্প্রদায় থেকেই রিতার আগমন, যার কারণে তাকে এই নামে ডাকা হয়।

৪ বছর আগে রাস্তায় ভিক্ষা করত রিতা। কিন্তু ৪ বছর পর সে পরিণত হলো ফ্যাশন মডেল এবং অনলাইন সেলিব্রিটিতে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয় তার ছবি। ইনস্টাগ্রামেও রয়েছে লক্ষাধিক ফলোয়ার।২০১৬ সালে ফিলিপাইনের ফটোগ্রাফার তোফার লুসবান শহরে কুইন্টোতে বেড়াতে এসেছিল। সেখানেই রাস্তায় ভিক্ষা করা অবস্থায় রিতার সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হয়ে একটি ছবি তোলেন তিনি। এরপর ছবিটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন তোফার। সঙ্গে সঙ্গেই ভাইরাল হয়ে যায় ছবিটি, আর বদলে যায় রিতার জীবন।২০১৬ সালে রিতার ছবি যখন ভাইরাল হয়, তখন তাকে ভালোবেসে অনেকেই আর্থিক সহায়তা দিয়েছিলেন। বেশ কয়েকটি ফ্যাশন ব্র্যান্ড রিতাকে মডেলিংয়ের অফার দিয়ে বসে। বিভিন্ন টিভি শোতেও ডাক পড়তে শুরু হয় তার। সেই সময় ফিলিপাইনের অনেক নামি সুন্দরী এমনকি সুন্দরী প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়নদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন রিতা গাভিওলা। আর এ কারণে মাত্র ১৩ বছর বয়সেই টেলিভিশনের রিয়ালিটি শোতে অংশ নেওয়ার সুযোগ পান রিতা। এখন প্রচুর নেটিজেন রিতার প্রতি উৎসুক, উন্মুখ হয়ে থাকেন। কেননা, রিতা ইনস্টাগ্রামে যেসব ছবি প্রকাশ করেন, তা তরুণ হৃদয়ে আগুন ধরিয়ে দেয় বলে নেটিজেনদের দাবি।  

২০১৮ সালে ইউটিউবে একটি ভিডিও আপলোড করেন রিতা। যাতে তিনি তার নতুন বাড়ি সম্পর্কে তথ্য দিয়েছিলেন। তার আমেরিকান ফ্যান গ্রেস এই বাড়িটি তৈরি করতে সহায়তা করেছিলেন। রিতা আজকাল সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের ছবি নিয়ে খবরে রয়েছেন। তবে এই মুহুর্তে তার অগ্রাধিকার হল পড়াশোনা শেষ করা। সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে অনেকেরই জীবন বদলে গেছে। তবে, তার মধ্যে যারা সর্বাধিক সাফল্য পেয়েছেন, তাদের মধ্যে একজন রিতা।


যখন  রিতার ছবি ইন্টারনেটের বিভিন্ন মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল, সেটা ৫ বছর আগের কথা- তখন তিনি অনেকের কাছ পছন্দ হয়েছিলেন। আর্থিকভাবে সহায়তাও করেছিলেন নেটিজেন ও সেলিব্রিটিরা।  ছবিটি ভাইরাল হয়ে গেলে বেশ কয়েকটি ফ্যাশন ব্র্যান্ড রিতাকে একটি মডেলিংয়ে ডাকে। কিছুদিন পর টিভি শোতেও হাজির রিতা। 

রিতা গাভিওলা ২০১৮ সালে ইউটিউবে একটি ভিডিও আপলোড করেন। যেখানে তিনি তার নতুন বাড়ি সম্পর্কে তথ্য দিয়েছিলেন। তার আমেরিকান ভক্ত গ্রেস এই বাড়িটি তৈরি করতে সহায়তা করেছিলেন। তবে এই মুহূর্তে তার অগ্রাধিকার হলো পড়াশোনা শেষ করা।

10 জানুয়ারি 2021

উপমহাদেশের সমকালীন গুরুত্বপূর্ণ নারী চলচ্চিত্র নির্মাতা রুবাইয়াত হোসেন

0
rubaiat-hossain
rubaiat-hossain

জাজাফী

সৈয়দা রুবাইয়াত হোসেন আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত ও প্রতিষ্ঠিত বর্তমান সময়ের একজন মেধাবী বাংলাদেশি নারী চলচ্চিত্র নির্মাতা, লেখক, প্রযোজক এবং গবেষক।১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে নির্মিত “মেহেরজান” চলচ্চিত্র পরিচালনার মাধ্যমে ২০১১ সালে চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসাবে তিনি আত্মপ্রকাশ করেন। এই চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি করে এবং মুক্তির মাত্র এক সপ্তাহ পরেই চাপের মুখে পরিবেশক সিনেমা হল থেকে নামিয়ে নেয়। তবে এটি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত ও বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয়েছে।

তার দ্বিতীয় ছবি “আন্ডার কন্সট্রাকশন” সমকালীন ঢাকা শহরের প্রেক্ষাপটে মধ্যবিত্ত এক নারীর আত্ম-অনুসন্ধানের চিত্র। ২০১৫ সালে সিয়াটল চলচ্চিত্র উৎসবে প্রিমিয়ারের পর জানুয়ারি ২১, ২০১৬ বাংলাদেশে ছবিটি মুক্তি পায়।

তার নির্মিত “মেড ইন বাংলাদেশ” টরন্টো চলচ্চিত্র উৎসব ২০১৯ এ প্রিমিয়ারের পর একই বছরের ডিসেম্বরে ফ্রান্স, পর্তুগাল ও ডেনমার্কে ৭০টির অধিক সিনেমা হলে মুক্তি পায়। ২০২০ সালের শুরুতে কানাডা, আমেরিকা ও বিশ্বের অন্যান্য দেশেও ছবিটি মুক্তি পায়।

রুবাইয়াত হোসেন বাংলাদেশের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ সৈয়দ আবুল হোসেন ও খাজা নার্গিস হোসেনের মেয়ে। সম্প্রতি তিনি উপমহাদেশের সমকালীন গুরুত্বপূর্ণ ১০ নারী নির্মাতার তালিকায় প্রথম স্থানে আছেন । এ তালিকায় আরও রয়েছেন পাকিস্তানের মেহরীন জব্বার, ভারতীয় নির্মাতা সোনালি বোস, সুমন কিট্টুর, ওরভাজি ইরানি, মেঘনা গুলজার, মঞ্জু বোরাহ, শতরূপা সান্যাল, জয়া আখতার ও ববি শর্মা বড়ুয়া।

রুবাইয়াত হোসেন মূলত একজন গবেষক।সত্যজিৎ রায় এবং ঋত্বিক ঘটকের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে রুবাইয়াত হোসেন চলচ্চিত্রে আগ্রহী হন এবং ২০০২ সালে নিউইয়র্ক ফিল্ম একাডেমিতে চলচ্চিত্র পরিচালনায় ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন। তিনি প্রখ্যাত স্মিথ কলেজ থেকে উইমেন স্ট্যাডিজে স্নাতক এবং পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দক্ষিণ এশীয় গবেষণা ও নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের টিশ স্কুল অফ আর্টস থেকে চলচ্চিত্র বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন।
তার আগ্রহের বিষয়ের মধ্যে রয়েছে সুফিজম, বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ, বাঙ্গালী মর্ডানিটি এবং ফিমেল সেক্সুয়ালিটি ইত্যাদি। তিনি আইন ও শালিস কেন্দ্র, নারীপক্ষ-তে নারী অধিকার নিয়ে কাজ করেছেন। এছাড়া তিনি ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ইকনোমিক্স এবং সোশ্যাল সায়েন্স বিভাগে পার্টটাইম শিক্ষকতা করছেন। ব্যক্তিগত জীবনে রুবাইয়াত হোসেন বিবাহিত। জুন ২০০৮ সাল থেকে তিনি চলচ্চিত্র পরিচালক ও প্রযোজক আশিক মোস্তফার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ। ২০০২ সালে তিনি ফুলকুমার নামে একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মান করেন। এরপর তিনি কিছু স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মান করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেন। তার নির্মিত স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রগুলো হল – প্রিয় আমি (৮ মিনিট), বালিকার গোল্লাছুট (৫২ সেকেন্ড), সীমান্ত (১ মিনিট ১২ সেকেন্ড)। এ সকল ছবিই তিনি ২০০৫ সালে নির্মান করেন। মেহেরজান চলচ্চিত্র নির্মানের মাধ্যমে তিনি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নির্মান শুরু করেন। এছাড়া তিনি সাহিত্যচর্চার সাথে যুক্ত আছেন। রুবাইয়াত হোসেন ব্যক্তি জীবনে একাধিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তার মধ্যে কয়েকটি
  • এমিলি গিমে পুরস্কার – প্যারিসের গিমে মিউজিয়াম কর্তৃক প্রদত্ত
  • জুরি এওয়ার্ড ও ক্রিটিক এওয়ার্ড, ভেসুল এশীয় চলচ্চিত্র উৎসব, ফ্রান্স
  • শ্রেষ্ঠ উদীয়মান পরিচালক পদক, নিউ ইয়র্ক এশিয়ান আমেরিকান আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব
  • অরসন ওয়েলস পদক, টিবুরন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র
  • সমালোচক পুরস্কার, জয়পুর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, ভারত
  • জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ২০১৬ – শ্রেষ্ঠ সংলাপ
  • জুরি পুরস্কার ও দর্শক পুরস্কার, এমিয়েন্স আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব, ফ্রান্স
  • প্রিমিও ইন্টারফেডি, তুরিন (টোরিনো) চলচ্চিত্র উৎসব
  • দর্শক পুরস্কার, আফ্রিকান ডায়াস্পোরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব।

রুবাইয়াত হোসেন এবং তার জীবনসঙ্গী আশিক মোস্তফা ২০০৮ সালে বাংলাদেশ ভিত্তিক চলচ্চিত্র নির্মাণ সংস্থা খনা টকিজ (পূর্বে ইরা মোশন পিকচার্স নামে পরিচিত) প্রতিষ্ঠা করেন যা দেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত বেশ কিছু চলচ্চিত্র নির্মানের পাশাপাশি বাংলাদেশের তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতাদের আন্তর্জাতিক অঙনে তুলে ধরার পেছনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

10 জানুয়ারি 2021

জমজ সন্তানের মায়েরা

0

সন্তান জন্মদানের মাধ্যমে একজন মা পরিপুর্নতা লাভ করেন। তার জীবনের সব থেকে বড় পাওয়া হলো নিজ গর্ভে জন্মনেওয়া সন্তান। সন্তান যেমনই হোক মায়ের কাছে সে সাতরাজার ধন।সন্তানকে লালনপালন করতে গিয়ে,মানুষ করতে গিয়ে মায়েরা তাদের সুখ,স্বপ্ন সবটাই বিসর্জন দিয়ে থাকেন। সন্তানের জন্য মায়ের যে অবদান সেটা কোন কিছুর বিনিময়ে শোধ করা সম্ভব নয়। এ কারনেই ইসলামে মায়ের মর্যাদা অনেক বেশি।কিন্তু অনেক সময় দেখা যায় যে সন্তানকে মা কষ্ট করে লালনপালন করেছেন বড় হয়ে সেই সন্তান মাকে সরিয়ে দিচ্ছে। বলা হয়ে থাকে একজন মা একা দশটি সন্তান লালন পালন করতে পারলেও অনেক সময় দশটি সন্তান একজন মা কে দেখেশুনে রাখতে পারে না।

আমরা সবাই প্রতিটি মায়ের অবদানের কথা কোন ভাবেই অস্বীকার করতে পারি না।বিশেষ করে গর্ভকালিন সময়ে এবং সন্তান প্রসবের পর অন্তত সেই সন্তানের বয়স দশ বছর না হওয়া অব্দি মায়ের কষ্টের সীমা নেই। যদিও দেখতে গেলে মা তার সন্তানের জন্য জীবনের শেষ দিন অব্দি চিন্তা করেন,ঘুম নষ্ট করেন।একটি সন্তান লালনপালন করতে মায়ের অনেক কষ্ট হয় কিন্তু একটির বদলে দুটি হলেতো কথাই নেই বিশেষ করে জমজ সন্তানের মায়েদের একই সাথে অনেক আনন্দ আবার অনেক কষ্ট।অম্ল মধুর সেই স্মৃতি মাকে ক্ষণে ক্ষণে আনন্দ দেয়। স্বভাবতই একটির বদলে দুটি সন্তানকে এক সাথে গর্ভে ধারণ করার ফলে গর্ভকালিন সময়েও মাকে অতিরিক্ত ভার বহন করার পাশাপাশি অতিরিক্ত ঝুকি বহন করতে হয়।এর পর সন্তান জন্ম নেওয়ার পর দায়িত্ব দ্বিগুন হয়। এক সন্তানকে খাওয়াতে গেলে অন্য সন্তানকে অপেক্ষায় থাকতে হয়, কখনো কখনো কান্নাও শুরু করে দেয়। আবার দেখা যাচ্ছে এক সন্তানকে খাইয়ে মা দু মিনিটের জন্য কোন কাজে গেলেন এবং ফিরে এসে যে সন্তানকে খাইয়েছিলেন তাকেই আবার খাওয়ালেন এমন ভুল নিয়মিত হয়।তাসিন তাজিম নামে দুই জমজ সন্তানের মায়ের সাথে আলোচনা থেকে জানা গেলো জমজদের লালনপালন করতে গিয়ে অনেক কষ্টের এবং আনন্দের ঘটনা ঘটে।যেমন একবার তাজিমের অসুখ হলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। একদিন তাজিম হাসপাতালের বিছানা ছেড়ে উঠে একটু দূরে খেলছিল আর তাসিন তখন বিছানায় বসে ছিলো। নার্স এসে কিছু না বলেই তাসিনকে ইনজেকশন দিতে শুরু করলো!! যখন সিরিঞ্জ তাসিনের হাতে দিতে যাবেন তখন তিনি বললেন নার্স কি করছেন! ওতো সুস্থ্য ওকে কেন ইনজেকশন দিবেন। নার্স আসলে জানতেন না যে ওরা জমজ। পরে তাজিম আসলে তাকে ইনজেকশন দেওয়া হলো।মজার ঘটনাই বেশি ঘটে। তাসিন তাজিম দুজনই অভিনয় করে,মডেলিং করে। একবার শুটিং সেটে খেলতে খেলতে তাসিনের শরীরে ময়লা লেগে গেলো। মেকাপ করতে সময় লাগবে দেখে তাসিনের বদলে তাজিমকে দিয়ে বাকি শুটিং করিয়ে নেওয়া হলো।

তবে অধিকাংশ সময় জমজদের মধ্যে ভীষণ ভাব থাকলেও মাঝে মাঝে খুব ঝগড়া,মারামারির ঘটনাও ঘটে। জমজ সন্তানের মায়েদের সে ক্ষেত্রে অনেক যন্ত্রনা ভোগ করতে হয়। একই সময়ে একই বয়সী দুটি সন্তানকে সমান ভাবে লালনপালন করা কঠিন হয়ে পড়ে।গোলস করানো,খাওয়ানো,পোষাক পরানো এবং স্কুলে আনা নেওয়াতে খুবই কষ্ট হয়।এই সময়ে বাবা বা পরিবারের অন্য কারো সহযোগিতা খুবই প্রয়োজন।সন্তান গর্ভে আসার পর প্রাথমিক ভাবে জানা যায় না যে এক সন্তান জন্ম নিবে নাকি একাধিক। কোন কোন ক্ষেত্রে জমজ নয় বরং ট্রিপলেক্স বা তিনজন সন্তানও জন্ম নিয়ে থাকে। তবে সেটা খুব কম সংখ্যক।বর্তমান সময়ে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার কারনে বেশ আগে থেকেই জানা যায় কয়জন সন্তান জন্ম নিবে বা ছেলে না মেয়ে হবে। সে ক্ষেত্রে যখন জমজ সন্তান হবে জানা যায় তখন মায়ের প্রতি আরও বেশি যত্নশীল হতে হবে।এক সন্তান হলে মাকে যতটুকু পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করতে হতো জমজ সন্তান হলে তার চেয়ে বেশি গ্রহণ করতে হবে যেন দুজনের চাহিদা ঠিকভাবে পুরণ হয়।তবে আশার কথা হচ্ছে শতকরা নব্বই ভাগ জমজ সন্তান খুব মেধাবী হয়ে থাকে।তারা পরস্পর পরস্পরকে অনুসরণ,অনুকরণ করে এবং তাদের পছন্দ-অপছন্দ সব কিছুতেই মিল থাকে।যেমন তাজিম ছবি  আকঁতে বসলে তাসিন ওকে আইডিয়া দেয়।একে অন্যকে পড়া করতে সাহায্য করে,পোষাক পরতে সাহায্য করে।জমজ সন্তান একটু বড় হলে তখন মায়ের কষ্ট অনেকটাই দূর হয়।তবে স্কুল ভর্তি থেকে শুরু করে অন্যান্য প্রতিযোগিতায় মনখারাপের ঘটনাও ঘটে যা মাকে সামলাতে হয় খুব কষ্ট করে।একজন চান্স পেলে অন্যজনের মন খারাপ হয় তাই জমজরা চেষ্টা করে দুজনই একই সাথে একই স্কুলে পড়তে,দুজনেই চ্যাম্পিয়ন হতে নয়তো একজনও নয়।তবে হাজার কষ্ট হলেও জমজ সন্তানের মায়েরা তাদের সন্তানদের নিয়ে খুবই সুখী।জমজরা যেন দুই নয়নের দুটি মণি।

31 মে 2020

শোল মাছের মাথা

0

আরিফের জীবনে হঠাৎ করে প্রেম আসলো। আরিফ নিজেও কখনো ভাবেনি এমন কারো প্রতি তার মুগ্ধতা তৈরি হবে। স্কুল জীবনে রেসিডেন্সিয়াল মডেল কলেজে পড়াশোনা শেষ করে ভর্তি হয়েছিল নটরডেম কলেজে। সুতরাং স্কুল এবং কলেজ জীবন ছিলো অন্যরকম যেখানে মেয়েদের সংস্পর্শ ছিলো না বললেই চলে। পড়াশোনার চাপ ছিলো বেশ পাশাপাশি পারিবারিক চাহিদার কথা মাথায় রেখে সে কারো প্রতি দুর্বল হওয়ার সুযোগটুকুও পায়নি। মাঝে মাঝে হয়তো কাউকে ভালো লেগেছে কিন্তু  সামনে এগোনোর সাহস বা সুযোগ কোনটাই হয়নি। এইচএসসি পরীক্ষার পর ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে যখন কোচিং সেন্টারে ভর্তি হলো তখন তার জীবনে প্রথমবারের মত বসন্তের আগমন ঘটলো। একজনের প্রতি তার মুগ্ধতা আকাশচুম্বী হলো।

ঘটনার শুরু হয়েছিল ক্লাস পরীক্ষায় আরিফের প্রথম হওয়া নিয়ে। মেয়েটা এসে ওকে অভিনন্দন জানালো।উত্তরে সে ধন্যবাদ দিতেও ভুলে গেলো বরং অপলোক তাকিয়ে থাকলো মেয়েটির দিকে।মেয়েদের দৃষ্টি থেকে বোধহয় কোন কিছুই এড়িয়ে যেতে পারে না। আরিফের মুগ্ধ দৃষ্টি মেয়েটিকে আকৃষ্ট করলো। সে বুঝলো আরিফ তার প্রতি মুগ্ধ হয়েছে। তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কতক্ষণ সময় পেরিয়েছে আরিফ বুঝতেই পারেনি।মেয়েটি বললো আমার নাম তিশা।বন্ধু হবে আমার? তিশার কথা শুনে আরিফ সম্বিত ফিরে পেয়ে ধন্যবাদ জানালো। বললো ঠিক আছে। তিশার সামনে আরিফ বেশ লজ্জা পাচ্ছিল।

ক্লাস শেষে দুজন একসাথে কোচিং থেকে বের হয়ে ওভারব্রিজ পার হয়ে হলিক্রসের দিকে হাটতে শুরু করলো।আরিফের বাসা ওদিকটাতে কিন্তু আরিফ জানে না তিশার বাসা কোথায়।মনে মনে ভাবলো সে যেহেতু ওদিকেই যাচ্ছে তাহলে বাসা ওদিকেই হবে হয়তো।কথায় কথায় আরিফ জানতে চাইলো ঢাকায় কোথায় বাসা নিয়েছ? তিশা হাসি হাসি মুখে খানিকটা লজ্জা পাওয়ার ভঙ্গিতে বললো কল্যাণপুরে।আমি রাঙামাটি সরকারী কলেজ থেকে পরীক্ষা দিয়েছি।এখানে একটা মেসে উঠেছি।কল্যাণপুরে থাকো তাহলে এদিকে কোথায় যাচ্ছ? কোন কাজ আছে এদিকে? এমন প্রশ্নে তিশা আরও বেশি লজ্জা পেলো। তবুও যা সত্যি সে তাই বললো। তিশা বললো এদিকে আমার কোন কাজ নেই। ভাবলাম তোমার সাথে একটু হাটি।

এর পর দুজন গল্প করতে করতে বিজ্ঞান কলেজ পার হয়ে গেলো। তিশাই আরিফকে বললো কফি খাবে? আরিফ রাজি হয়ে গেলো এবং দুজন কফি খেতে খেতে অনেক গল্প করলো। নিজেদের স্বপ্নের কথা শেয়ার করলো পাশাপাশি ব্যক্তি জীবনের অনেক গল্প উঠে আসলো। তিশার চেহারাটা খুব সুন্দর তবে কিছুটা অন্যরকম। দেখলে উপজাতীয় মনে হয়। আরিফ জিজ্ঞেস করবে কি না ভাবছিলো। এটা জিজ্ঞেস করলে যদি তিশা কিছু মনে করে তাই উসখুস করছিল। তিশা সেটা লক্ষ্য করে কিছুটা আন্দাজ করতে পারলো। তার পর নিজ থেকেই বললো আমি কিন্তু উপজাতীয় সম্প্রদায়ের মানুষ। আমার পুরো নাম তিশা চাকমা।উপজাতীয় শুনে প্রথমে একটু দমে গেলেও তিশার মুখের দিকে তাকিয়ে তা মুহুর্তেই ভুলে গেলো। এভাবে রোজ গল্প করতো,একে অন্যকে সহযোগিতা করতো এবং একসময় তারা দুজন দুজনকে ভালোবেসে ফেললো তখন তাদের স্বপ্নটাও এক হয়ে গেলো।

সিদ্ধান্ত নিলো যে কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে দুজন একই ডিপার্টমেন্টে পড়তে চেষ্টা করবে। সেটা একান্তই সম্ভব না হলে অন্তত বিশ্ববিদ্যালয় যেন এক থাকে। ভর্তি পরীক্ষার পর দুজনই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আর্ন্তজাতিক সম্পর্ক বিভাগে ভর্তি হলো। আরিফের পরিবার থেকে ওদের সম্পর্কের কথা জানার পর প্রথমে মেনে না নিলেও পরে মেনে নিলো।এর পর পড়াশোনা শেষ হলে পারিবারিক ভাবেই দুজনের বিয়ে হলো।বিশ্ববিদ্যালয় পড়াকালীন সময়েই আরিফ অনেকবার রাঙ্গামাটিতে গিয়েছে তিশার সাথে। উপজাতীয় সংস্কৃতির অনেক কিছু সে জেনে নিয়েছে। শুরু থেকেই তিশার বাবা মা পরিবারের অন্যরা আরিফকে পছন্দ করতো।

বিয়ের আগে বা পরে কখনোই আরিফের যত্নের কোন ত্রুটি রাখতো না। এক বৃষ্টিবিঘ্নিত রাতে ঘুমোতে যাবার আগে আরিফ তিশাকে বললো বহুদিন থেকে আমার মনে একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে কিন্তু উত্তর পাচ্ছিনা। তিশা জানতে চাইলো কি সেই প্রশ্ন? আরিফ বললো ছাত্র জীবন থেকেই আমি যখন তোমার সাথে তোমাদের বাড়িতে আসতাম তখন বিভিন্ন সময় নানা ভাবে রান্না করা শোল মাছ খেয়েছি। এমনকি আজ রাতেও খুব স্বাদ করে শোল মাছ খেলাম। তোমার মায়ের হাতের রান্নাও অতুলনীয়। কিন্তু একটা বিষয় লক্ষ্য করলাম সেটা হলো আমাকে কোন দিন মাছের মাথা খেতে দাওনি এমনকি আজকেও যখন সবাই একসাথে বসে খেলাম তখনও কাউকে মাছের মাথা খেতে দেখলাম না। তোমরা কি শোল মাছের মাথা না খেয়ে ফেলে দাও? তিশা আরিফের কথা শুনে কিছুটা অবাক হলো। তার পর বললো তুমি এতোদিন আমাদের সাথে খুব স্বাদ করে যা খেয়েছ সেটাতো শোল মাছ না! সেটাতো সাপ! আর সাপের মাথা কি খাওয়া যায় নাকি?

তিশার কথা শুনে আরিফ চমকে উঠলো। সে ভাবলো তিশা তার সাথে রসিকতা করছে।অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে জানতে চাইলো তিশা তুমিকি আমার সাথে রসিকতা করছো? সাপ হতে যাবে কেন? ওটাতো শোল মাছ। তিশা বললো আরিফ আমি তোমার স্ত্রী এবং এক সময় প্রেমিকা ছিলাম। আমি কেন তোমার সাথে রসিকতা করতে যাব। সত্যি সত্যিই আমরা আজকে রাতে যেটা খেয়েছি সেটা সাপ।আমরাতো সাপ খাই আর সাপের মাথা খাওয়া যায় না তাই তোমাকেও কখনো মাথা খেতে দেওয়া হয়নি।

তিশার কথা শুনে আরিফের মাথা ঘুরতে শুরু করলো এবং সে হড়হড় করে বমি করে দিলো। সে রাতে অনেক বার বমি হলো এবং কোন ভাবেই বমি থামানো গেলো না।কোন ভাবেই বমি কমছেনা দেখে তাকে সদর হাসপাতালে নেওয়া হলো। ডাক্তার স্যালাইন দিলেন,ইনজেকশন দিলেন তবে তেমন কিছু হলো না। ভোর রাতে আরিফ মারা গেলো। আরিফ বিষক্রিয়ায় মারা যায়নি বরং না জেনে এতোদিন সাপ খেয়েছে সেটা মনে করে বমি করতে করতে মারা গেছে। তিশার দুই চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে থাকলো। সে যদি বুঝতে পারতো তবে আরিফকে সাপের কথাটা বলতো না। অবশ্য তারতো কোন দোষ নেই। তিশাতো ভেবেছে অন্যদের মত আরিফও নিশ্চই জানে যে তারা সাপ খায়!

3 জুন 2020

করোনায় বিপযস্থ কর্মজীবী মায়েরা

0

করোনা ভাইরাস পৃথিবীতে এমন ভাবে বিস্তার করেছে যে নিজ ঘরেও কেউ আজ আর নিরাপদ নয়। নানা ভাবে দিন দিন সংক্রমন বেড়েই চলেছে।এর মধ্যে যে সব নারী একই সাথে কর্মজীবী এবং সন্তানের মা তারা ভীষন ঝুকির মধ্যে আছেন। শুধু মাত্র ঝুকিই নয় বরং আতংকিত থাকতে হচ্ছে সারাক্ষণ।সন্তান এবং পরিবারের সর্বাঙ্গীন কল্যান কামনা কারী মানুষটি পরিবারকে ভালো রাখতে ঝুকিপুর্ন দিনে ঝুকি নিয়ে কর্মস্থলে যাচ্ছেন। ফলে কর্মজীবী মায়েদের সারাক্ষণ তটস্থ থাকতে হচ্ছে। ভোরে অফিসের উদ্দেশ্যে বের হওয়ার পর থেকে ফেরা অব্দি কত শত মানুষের সংস্পর্শে তাকে আসতে হয়। তিনি জানতেও পারেন না কোন মানুষটি ভাইরাসের বাহক হিসেবে তার সামনে,পিছনে বা পাশ দিয়ে যাওয়া আসা করছে আর সেই ভাইরাসের একাংশ নিজের অজান্তে ঘরে নিয়ে গিয়ে ঘরে থাকা সন্তানদের এবং অন্যান্যদের বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছেন।

সাম্প্রতিক একটি অনুষ্ঠানে এক নারী শিল্পী গান করছিলেন, এর মাঝেই তার তিন-চার বছরের মেয়েটি তাকে জড়িয়ে ধরে আছে এমন একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। এ ছবিটি একজন কর্মজীবী মায়ের ছবি।কিছুদিন পুর্বে আরেকটি ছবিতে দেখা যায় ভারতের এক নারী ব্যাংক কর্মকর্তা অফিসের চেয়ার-টেবিলে বসে কাজ করছেন পেছনে মেঝেতে দুধের বোতলমুখে শুয়ে আছে তার ছোট্ট জ্বরে আক্রান্ত শিশু সন্তানটি। এটিও একজন কমর্জীবী মায়েরই ছবি।


সন্তান পালনে বাবাদের ভূমিকা অর্থ উপার্জন আর কখনও কখনও পড়া বুঝিয়ে দেওয়ার মধ্যেই সীমিত।সবকিছু সমান ভাবে সামলাতে হয় মা কে। কিন্তু সেই মা যদি হন কর্মজীবী তাহলে সমস্যার অন্ত থাকে না।এছাড়াও কর্মজীবী নারীদের এক বিরাট অংশ সিংগেল মাদার হিসেবে সন্তানকে লালন পালন করতে বাধ্য হয়েই কর্মক্ষেত্রে থাকতে হচ্ছে।সন্তানকে খাওয়ানো,গোসল করানো,স্কুলে পাঠানো,স্কুল থেকে নিয়ে আসা সব সামলাতে হয় পাশাপাশি অফিসও করতে হয়। করোনার এই দিনে সেটা হয়ে উঠেছে আরও ভয়াবহ। যদিও স্কুল বন্ধ তাই সন্তানকে স্কুলে পাঠানো এবং নিয়ে আসার বিষয়টি থাকছে না কিন্তু তিনি নিজে সন্তানকে ফেলে রেখে অফিসে যাচ্ছেন এক রকম অনিশ্চয়তার মধ্যে। আবার ফিরছেন ভয় আর শঙ্কা নিয়ে। অন্য দিকে স্কুলগুলোতে অনলাইন ক্লাস হওয়ায় সেগুলো তদারকিতে কর্মজীবী মা সন্তানকে সময় দিতে পারছেন না ফলে সন্তানের পড়াশোনা ব্যহত হচ্ছে।

জ্যামের শহরে ভীড় ঠেলে,গাদাগাদি করে বাসে সিট না পেয়ে দাড়িয়ে রোজ অফিস করা এবং অফিস শেষে সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাতে পোহাতে বাসায় ফেরা তার নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার।কী এক দিন এলো অফিস ফেরৎ মা তার সন্তানকে বুকে জড়িয়ে নিতে পারছেন না যতক্ষণ না তিনি নিজে গোসল করে পরিচ্ছন্ন না হচ্ছেন।নিজের চেয়েও মায়ের কাছে সন্তানের নিরাপত্তার বিষয়টি বেশি গুরুত্বপুর্ন।

আমাদের কর্মপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এখনও নারীর মেধা আর পরিশ্রমের মূল্যায়ন করা হয় কদাচিৎ। উপরন্তু সন্তানের অসুস্থতার কারণে কাজে ছুটি চাইলে কমর্জীবী মায়েদেরকে অহরহ কটূ কথা আর টিপ্পনি শুনতে হয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আর পুরুষ সহকর্মীদের কাছে।

করোনা ভাইরাসের এই ঝুকিপুর্ন অবস্থায় একজন পুরুষ সারাদিন অফিস করে বাসায় ফিরে চাইলে একাকী থাকতে পারেন কিন্তু কর্মজীবী নারী যিনি কারো মা,কারো স্ত্রী তার কোন ভাবেই একা থাকা সম্ভব নয়। স্বামী,সন্তান সবার দায়িত্ব এ সমাজ একক ভাবে তার কাঁধেই চাপিয়ে দিয়েছে।সন্তানের প্রতি মায়ের মমতা অতুলনীয়। তিনি চাইলেই এমন দুর্যোগের সময়েও সন্তানকে দূরে ঠেলে দিতে পারেন না ফলে কর্মজীবী মায়েদের জন্য করোনাকাল হয়ে উঠেছে বিষে ভরা কাটার সমতুল্য যা তাকে বার বার ক্ষতবিক্ষত করছে। মাতৃত্বকালীন ছুটি বলে যে বিষয়টি চালু আছে এই দুযোর্গকালীন সময়ে একই ভাবে কর্মজীবী মায়েদের সন্তানের কথা বিবেচনা করে বিপদকালীন ছুটির ব্যবস্থা রাখা উচিত ছিলো।

নিজের পায়ে দাড়ানোর স্বপ্ন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকিয়ে সমাজের নানা কথা শুনতে শুনতে যে নারী কর্মজীবনে প্রবেশ করে তাকেও নানা কারনে পঁচিশেই বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয়। তার পর নতুন সংসার আর চাকরি নিয়ে হিমশিম খেতে খেতেই সে হয়তো অনাগত সন্তানের আগমনী বার্তা শোনে বছর না ঘুরতেই। পান থেকে চুন খসলেই সব দোষ গিয়ে পড়ে নারীর ওপর। সন্তানের অসুখে, পরীক্ষার খারাপ ফলাফলে যেন পিতার কোন দোষ নেই, সব দোষ কর্মজীবী নারীর।

যে সব কর্মজীবী নারীর সন্তান দেখাশোনার জন্য পরিবারে কেউ নেই তাদের অনেকেই সন্তানের জন্য কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। আর যারা কষ্ট করে চাকরি করছেন ও সন্তান পালন করছেন তারা দুটি একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। করোনা ভাইরাসের এই দুর্যোগকালিন সময়ে সেটি হয়ে উঠেছে আরও ভয়াবহ।কর্মজীবী মায়েরা না পারছেন কাজ ছেড়ে দিতে আবার না পারছেন ঠিকমত ধরে রাখতে।উভয় সংকটে পড়ে তিনি এবং তার সন্তানকে ঝুকির মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে।

4 জুন 2020

ব্যাংক,জালনোট,এটিএম এবং সাধারনের ভুল ধারণা

0

আজকের এই লেখাটি সেই সব মানুষের জন্য যারা কোন না কোন সময় ব্যাংক অথবা এটিএম থেকে টাকা উত্তোলন করতে গিয়ে এক বা একাধিক জাল নোট পেয়েছেন কিংবা এক হাজার টাকার নোটের মধ্যে পাচঁশত টাকা কিংবা পাঁচশত টাকার নোটের মধ্যে একশত টাকার নোট পেয়েছেন।কিংবা টাকা জমা দিতে গিয়ে ভুল করে বেশি জমা দিয়েছেন কিন্তু ক্যাশিয়ার সেটা ফেরত দেয়নি কিংবা টাকা উত্তোলন করেছেন টাকা কম পেয়েছেন।তার পর স্বভাবতই গালি দিয়েছেন ব্যাংক কর্মকর্তাকে এবং ব্যাংককে। আমি ব্যাংক বিষয়ে কোন পন্ডিত কেউ নই তবে আমার ঝুলিতে গবেষণার কিছু অভিজ্ঞতা জমা আছে। অসংখ্য ব্যাংক কর্মকর্তার সাথে এবং এটিএম সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলেছি এসব বিষয় নিয়ে। সেসব থেকে যতটা পারি বলতে চেষ্টা করবো। বন্ধু তালিকায় যে সব ব্যাংকার বন্ধুরা আছেন তারা বুঝতে পারবেন আমি কতটা ভুল বলেছি আর কতটা সঠিক বলেছি। তবে হ্যা লেখাটি পুরোপুরি না পড়লে বুঝতে অসুবিধা হবে। পড়তে চাইলে পুরোটা পড়বেন না চাইলে মোটেই পড়ার দরকার  নেই তার চেয়ে বরং আপনার মধ্যে যে ধারণা জন্মেছে সেটি নিয়ে থাকাই ভালো।

প্রথমে আসি ব্যাংকের ক্যাশ এরিয়া সম্পর্কেঃ

প্রতিটি ব্যাংকের প্রতিটি শাখার অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ন একটি অংশ হলো ক্যাশ এরিয়া,যেখানে এমনকি ওই শাখার সব কর্মকর্তা কর্মচারিরও প্রবেশাধিকার নেই। দিনের শুরুতে ক্যাশে যারা কাজ করেন তারা সেখানে প্রবেশ করার আগেই তাদের মানিব্যাগ নির্ধারিত লকারে জমা রাখতে হয়। সুতরাং সেই মানুষটির কাছে কোন টাকা থাকে না। লেনদের শুরু হলে ভল্ট থেকে টাকা বের করে প্রতি কাউন্টারে কিছু কিছু টাকা দেওয়া হয় যা আগের দিন বিকেলে প্রস্তুতকৃত। একজন ক্যাশিয়ার/ক্যাশ টেলার টাকা জমা নিয়ে থাকে এবং বিতরণ করে থাকে। আধুনিক ব্যাংকিং সুবিধাযুক্ত ব্যাংকের একই কাউন্টারে জমা এবং উত্তোলনের সুযোগ থাকে। তো একজন গ্রাহক যখন টাকা জমা দিতে আসেন তখন কাউন্টারে যাওয়ার পর ক্যাশিয়ার সেটা বুঝে নেন,গুনে নেন এবং টাকা জাল আছে কি না, তিন বা তার চেয়ে বেশি টুকরা আছে কি না সেটা চেক করে নেন। কোন কারণে গ্রাহকের ওই টাকার মধ্যে গ্রাহকের অজান্তে হোক আর জানা অবস্থায় হোক যদি কোন জাল নোট থাকে বা তিনটুকরা নোট থাকে এবং এই চেকিংএর সময় ক্যাশিয়ারের চোখে সেটা ধরা না পড়ে তাহলে কি হতে পারে? সেটা জমা হয়ে যাচ্ছে এবং অন্য একজন গ্রাহক যখন টাকা উত্তোলনের জন্য আসবে এবং ক্যাশিয়ার সেই টাকা থেকেই পরিশোধ করবে তখন ক্যাশিয়ার এবং গ্রাহক দুজনের অজান্তেই জাল নোট বা তিনটুকরা নোট বা অচল নোট গ্রাহকের হাতে চলে যাবে। অর্থাৎ এক গ্রাহক না জেনে জাল নোট জমা দিয়েছে,ক্যাশিয়ারের চোখ সেটা এড়িয়ে গেছে বিধায় সেই জাল নোট বা অচল নোট অন্য গ্রাহকের হাতে চলে গেছে। এখন সেই গ্রাহক যদি সাথে সাথে জাল নোট ধরতে পারে তাহলে কি হয়? সে হয়তো কটুকথা বলে অথচ ক্যাশিয়ারের কিন্তু কোন দোষ নেই।

আচ্ছা দোষের ব্যাপারটা পরে আসি। গ্রাহক সাথে সাথে জাল নোট বুঝতে পারলে কাউন্টার থেকেই সেটা পরিবর্তন করে দেওয়া হয় এবং আপনারা হয়তো ভাবতে পারেন ওই জালনোট অন্য কারো কাছে গছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়? আসলে তা নয় সেটা সাধারণত সেই গ্রাহকের সামনেই পাঞ্চ করে দেওয়া হয়। ক্যাশিয়ার টাকা জমা নেওয়ার সময় জাল নোট ধরতে পারলে তা ছিদ্র করে উক্ত গ্রাহককে দিয়ে দেয়।কিন্তু যখন ঘটনাটা উল্টো ঘটে তখন কি হয়? অর্থাৎ কোন গ্রাহক যখন টাকা উত্তোলন করতে গিয়ে জাল নোট পায় তখনও টাকাটা ছিদ্র করা হয় কিন্তু ভর্তুকি দিতে হয় ওই অফিসারকে যিনি ক্যাশ লেনদেন করছেন! অথচ জাল টাকাটা কিন্তু তার নয়।ব্যাংক এ ক্ষেত্রে ওই অফিসারকে জালনোটের কোন বিনিময় মূল্য দিবে না বরং সেটা অফিসারকেই বহন করতে হবে। মোদ্দা কথা হলো ক্যাশ কাউন্টারে কোন কারণে ক্যাশ রিসিভের সময় জালনোট সনাক্ত করতে অফিসার ব্যার্থ হলে সেটা তাকেই বহন করতে হয়। আবার দেখুন যদি কোন গ্রাহক টাকা উত্তোলন করে নিয়ে যায় এবং সেই টাকার মধ্যে সেই জালনোট থেকে যায় তাহলে গ্রাহকের কপাল পোড়ে কারণ নিয়ম অনুযায়ি ব্যাংকের বাইরে গিয়ে ফিরে এসে কোন অনুযোগ করলে তা গ্রহনযোগ্য নয়। ঘটনা এখানেই শেষ নয়। ধৈর্য্য ধরে পড়তে হবে পুরোটা।

মনে করুন কোন গ্রাহক না জেনে টাকা জমা দিয়েছিল এবং সেই টাকার মধ্যে জাল নোট ছিলো যা অফিসারও বুঝতে পারেনি এবং সেভাবেই রয়ে গেছে। তো গ্রাহকের একাউন্টে টাকাটা জমা হয়ে যাচ্ছে কিন্তু বিপদ থেকে যাচ্ছে অফিসারের মাথায়। এই বিপদ কতদিন অব্দি থাকছে শুনলে অবাক হবে। ধরুন সারাদিন অন্যান্য লেনদেন করার পরও কোন কারণে সেই জালনোটটা তার কাছেই থেকে গেলো তাহলো কি হবে? দিন শেষে ক্যাশ অফিসার তার টাকা গুছিয়ে বান্ডিল করে (এই বান্ডিল বিষয়ে আলাদা করে আরও লিখবো)। তো সেই বান্ডিলের কোন একটিতে সেই জাল নোট বা তিনটুকরা নোট বা অচল নোট থেকে গেলো। বান্ডিল করার পর ব্যাংকের নির্দিষ্ট ফ্লাইলিফ লাগানো থাকে,সীল মারা থাকে আর থাকে ওই অফিসারের সিগনেচার! এখন যতদিন অব্দি ওই সিগনেচার যুক্ত কাগজটি ওই বান্ডিলের উপর থাকবে ততোদিন অব্দি টাকা যেখানেই যাক না কেন জালনোট সনাক্ত হলে ঘুরে ফিরে ওই অফিসারের ঘাড়েই সেটা পড়বে এবং তাকেই তার দায়ভার বহন করে টাকাটা টুকরো টুকরো করতে হবে এবং সমপরিমান টাকা নিজের পকেট থেকে পরিশোধ করতে হবে। তাহলেই বুঝুন যে জালটাকা কোন ভাবে সনাক্ত করতে অফিসার ব্যার্থ হলে সব সময়ের জন্যই তার উপরই সেটা রিস্ক হিসেবে থেকে যাচ্ছে এবং সে কোন ভাবেই আপনাকে নিজ থেকে জালটাকা দেয়নি। অন্তত এই লেখাটা পড়ার পর আশা করি ভবিষ্যতে কোন ক্যাশিয়ারকে দোষ দিতে পারবেন না যে সে আপনাকে জাল টাকা দিয়েছে। জালটাকা কিভাবে আপনার হাতে গিয়েছে তা আমি পরিস্কার করে দেখিয়ে দিলাম। একজন ক্যাশ অফিসারের যে কত বিপদ সেটা বুঝতে হলে পুরো লেখাটা মন দিয়ে পড়ুন।

টাকা কম দেওয়া বা বেশি দেওয়া বিষয়ঃ

অনেক সময় আপনি টাকা জমা দিতে গিয়েছেন 20 হাজার কিন্তু সেখানে নোট ছিলো 21 হাজার।আপনি প্রথমে খেয়াল করেন নি এবং অফিসার যখন মেশিনে গুনেছে এবং মেশিন রিড করেছে 20 হাজার তখন নিশ্চিত হয়ে টাকাটা জমা করা হয়েছে। যেহেতু মেশিন দেখিয়েছে বিশ হাজার আবার আপনি লিখেছেনও বিশ হাজার তখনতো দ্বিতীয়বার গণনা করার প্রয়োজন নেই। আপনি ফিরে গেলেন পরে সেদিন বা অন্য যে কোন দিন মনে হলো আপনার ওখানে 21 হাজার ছিলো। আপনি অবশ্যই ভুল বলেন নি। যেহেতু ছিলো তার মানে অবশ্যই ছিলো।কিন্তু আপনি কোন ভাবেই ওই অফিসারকে চোর ভাবতে পারেন না যে আপনার অতিরিক্ত এক হাজার টাকা সে মেরে দিয়েছে।আপনিতো টাকা জমা দিয়ে চলে গেছেন এর পরেরটুকু আমার গবেষণা থেকেই না হয় শুনুন। জমা দেওয়ার সময় আপনি যেমন জানতেন না ওখানে একটা নোট বেশি আছে তেমনি অফিসারও জানতেন না। ধরে নিন সারা দিনে ওই অফিসার আর কোন ভুল করেনি অর্থাৎ কাউকে একটা নোট ভুল করে বেশি দিয়ে দেয়নি তাহলে কি হবে? তার কাছে হিসাবের অতিরিক্ত একটা নোট বেশি থাকবে।

এখানেই অনেক কিছু ঘটবে। এ ক্ষেত্রে কয়েকটা বিষয় ঘটতে পারে যার একটা একটা করে বলছি।দিন শেষে সে যখন নোটগুলো বান্ডিল করবে তখন একই ভাবে ভুল করে কোন এক বান্ডিলে যদি একটা নোট বেশি চলে যায় অর্থাৎ 100টা নোটের বদলে 101 টা নোট থাকে এবং আপনার সময়কার ঘটনার মতই মেশিন গণনাতে সেটা 100 নোট দেখায় তাহলে অফিসারের দিন শেষে কোন টাকা বেশিও হবে না কমও হবে না।এবং পরবর্তী দিন সেই অতিরিক্ত টাকার বান্ডিলটা যদি কাউকে পেমেন্ট করা হয়ে যায় তাহলে কি হবে? আপনি ক্লেম করলেও আপনার টাকা ফেরৎ পাবেন না তার তিনটি কারণ। প্রথমত সিসিটিভিতে দেখা যাবে আপনি বিশটা নোটই দিয়েছেন আর দ্বিতীয় কারণ আপনার লেখা ভাউচারে বিশ হাজার টাকা লেখা এবং বিশটি নোট লেখা। যেহেতু অফিসার বিশ হাজার টাকা পেয়েছে এবং আপনার একাউন্টেও বিশ হাজারই জমা করেছে তাই আপনি কোন ভাবেই প্রমান করতে পারবেন না যে আপনার ওখানে এক হাজার বেশি ছিলো।

এখনো শেষ করিনি সুতরাং পড়তে থাকুন। আর তৃতীয় কারণ হলো সেদিন অফিসারের কাউন্টারে দিন শেষে হিসাবের বাইরে কোন টাকা পাওয়া যায় নি। যদি যেত তাহলে সিসিটিভিতে বিশটা দেখালেও টাকাটা আপনি পেতে পারতেন। এছাড়াও কিন্তু আপনি টাকাটা পেতে পারেন ঘটনা এবার দ্বিতীয় বা তৃতীয়দিনে যেতে হবে। কিভাবে? ধরুন পরবর্তী দিন আগেরদিনে করা সেই একটা নোট বেশি ওয়ালা বান্ডিল একই অফিসারের হাতে নাও পড়তে পারে। অন্য অফিসার সেই বান্ডিলটা পেমেন্ট করতে গিয়ে গুনলেন এবং একটা নোট বেশি পেলেন। কয়েকবার গুনে একই ফল আসলে তিনি দেখবেন কার সিগনেচার আছে? তখন তাকে দেওয়া হবে এবং একটা নোট বের করে ক্যাশ ইনচার্জের কাছে রাখবেন যেন যদি কেউ ক্লেইম করে তাকে ফেরত দেওয়া যায়।আর ওই দিন যদি ক্লেইম না আসে তাহলে ব্যাংকের সান্ড্রি একাউন্টে তা জমা রাখা হবে।ঘটনা আরও আছে যা কোনদিন আপনারা কেউ জানেন না বা শোনেন নি। ধরুন আগেরদিন করা সেই অতিরিক্ত টাকা সহ বান্ডিলটা অন্য এক অফিসারের হাতে পড়লো এবং তিনি সেটা একবারে পেমেন্ট না করে বান্ডিল ভেঙে বিভিন্নজনকে পেমেন্ট করলেন।

তাহলে কি হবে? সে যদি সারাদিনে আর কোন ভুল না করে তাহলে দিন শেষে তার হাতে একটা নোট মানে সেই এক হাজার টাকা বেশি থাকবে!!অথচ এটা কিন্তু তার ভুল নয় এবং তার টাকাও নয়।এটা নিয়ে তার অন্তত এক ঘন্টা নষ্ট হবে,চিন্তা হবে,রেপুটেশান খারাপ হবে। অন্তত একঘন্টা কিভাবে নষ্ট হবে সেটা বলছি। সেদিন যেহেতু একটা নোট বেশি হয়েছে মানে এক হাজার টাকা বেশি হয়েছে তাই সেদিনের সব ভাউচার সে বের করে একটা একটা করে চেক করবে। আপনি টাকা জমা দেওয়ার সময় অনেক সময় কয়টাকার নোট কয়টা লিখতে চান না বা লেখেন না এটা ঠিক নয়। এটা বিপদ থেকে বাচিয়ে দেয়। অফিসার তখন খুজে খুজে দেখবেন কে কতটাকার নোট কতপিস দিয়েছেন এবং তা মিলিয়ে কতটাকা হয়েছে। একই ভাবে তিনি যে সব চেক পেমেন্ট করেছেন তার পিছনে তিনি কাকে কতটাকার নোট কতটা দিয়েছেন তা সব লিখে রাখেন সেসবও মিলিয়ে দেখবেন। যদি দেখেন কোথাও কাউকে যে পরিমান নোট দিয়েছেন তাতে টাকার পরিমান কম হয় তাহলে তিনি ধরে নিবেন তিনি লোকটাকে টাকা কম দিয়েছেন।

তখন তাকে ফোন করে জানতে চাইবেন স্যার আজকে আপনি টাকা তুলতে এসেছিলেন কতটাকা তুলেছিলেন এবং আমরা আপনাকে কতটাকার নোট কতপিস দিয়েছি যদি বলতেন।দেখা গেলো আসলেতো ভুল হয়নি তাই ওপাশ থেকে জানানো হলো টাকা ঠিক আছে। তার মানে অফিসার লেখার সময় ভুল সংখ্যা লিখেছিলেন। কিন্তু যে এক হাজার টাকা বেশি সেটার তাহলে কি হবে?কারণ কোথাও আর কোন ক্লু নেই। শেষে টাকাটা সান্ড্রি একাউন্টে জমা করা হবে। ধরুন একসপ্তাহ পর আপনি এসে ক্লেম করলে তখন এই টাকাটা পাবেন না কারণ যার কাউন্টারে আপনি টাকা বেশি দিয়েছিলেন তার কাউন্টারে সেদিন কোন টাকা বেশি হয়নি!!এটাতো আপনিও স্বীকার করবেন পুরো প্রক্রিয়াটা দেখালাম। কথা শেষ হয়নি। পেমেন্টের ক্ষেত্রে যেমন তিনি কল করেছেন রিসিভের ক্ষেত্রেও চেক করবেন। যদি কোন সন্দেহজনক কিছু থাকে তবে সেই গ্রাহককে একই ভাবে ফোন করা হবে। যদি সেরকম কিছু না থাকে তাহলে টাকাটা সান্ড্রি একাউন্টে জমা হবে।

  • এবার আসি টাকা কম দেওয়া বা বেশি দেওয়া বিষয়ে। কিংবা কম নেওয়া বিষয়েঃ

আপনি টাকা জমা দিতে গিয়েছেন এবং ইচ্ছেকরে হোক বা অনিচ্ছায় হোক আপনি ভাউচারে যে পরিমান লিখেছেন টাকা তার চেয়ে কম দিয়েছেন। অফিসার সেটা নেওয়ার সময় ধরতে পারেনি এবং সেভাবেই জমা করে দিয়েছে। দিন শেষে অফিসারের টাকা শর্ট পড়বে। সেটা যদি এক লাখও হয় বা একশো হয় তা্ও একই কথা।দিন শেষে যখন ক্যাশ মিলবে না তখন সে সব ভাউচার চেক করবে। যদি কোথাও নোটের সংখ্যার সাথে টাকার মিল না থাকে তবে সেটাকে সাসপেক্ট করবে। আর যদি সবঠিক থাকে আসলে ফিজিক্যাল টাকা দেওয়ার সময় আপনি কম দিয়েছেন তবে মনে রাখবেন সেই শর্ট পড়া টাকার পুরোটাই ওই অফিসারকে নিজের পকেট থেকে দিয়ে  ক্যাশ মেলাতে হবে। সেটা এক লাখ টাকা হলেও তাকেই দিতে হবে। ব্যাংক কোন রকম সহযোগিতা করবে না। তাহলে উপরের বর্ননা থেকে কি দাড়ালো? আপনার থেকে কোন কারণে টাকা বেশি নিলেও সেটা ওই অফিসার নিজের কাছে রাখতে পারবে না বা খেতে পারবে না আবার আপনাকে অতিরিক্ত টাকা দিয়ে দিলে সেটাও অফিসারকে নিজের পকেট থেকেই দিয়ে দিতে হবে। সুতরাং সব কিছুতেই অফিসারের বিপদ।আর দিন শেষে ভাউচার চেক করতে গিয়ে যদি ভুলটা ধরা পড়ে তাহলে অবশ্য টাকাটা উদ্ধার হয়। বেশি হলে তা গ্রাহককে দিয়ে দেওয়া হয় এবং কম হলে সেটাও গ্রাহক থেকে আদায় করা সম্ভব হয় কারণ সব প্রমান আছে।

বান্ডিলে নোট মিশ্রন হওয়া না হওয়াঃ

অনেক সময় আপনারা অভিযোগ করেন অমুক ব্যাংক বা এটিএম থেকে এক হাজার টাকার বান্ডিলের মধ্যে 500 টাকার নোট ঢুকিয়ে দিয়েছে বা 500 টাকার নোটের মধ্যে 100 টাকা ঢুকিয়ে দিয়ে বাটপারি করেছে। এই কথাটা ভুল। আমি আগেই খানিকটা বলেছি যে ক্যাশ অফিসাররে ড্রয়ারে প্রচুর লুজ টাকা বা খুচরা নোট জমা হতে থাকে। একই ড্রয়ারে সবধরনের খুচরা নোট থাকে। দিন শেষে অফিসার সেই টাকা গুছিয়ে বান্ডিল করেন।কোন কারণে সেই গোছানোর সময় নোট মিক্সড হতে পারে এবং আমি আগেই দেখিয়েছি ভুল যাই হোক বিপদ কিন্তু ঠিকই অফিসারের মাথার উপর থেকেই যায়। এই নোট মিক্সিং হলেও ঘটনা একই ঘটে। দিন শেষে তার ক্যাশ মেলে না।ধরুন 500 টাকার নোটের মধ্যে একটা 100 টাকা ঢুকে গেছে তার পর সেই বান্ডিল যখন মেশিনে কাউন্ট করা হচ্ছে তখন কিন্তু ঠিকই 100 পিচই দেখাবে। এর মানে দিন শেষে ওই অফিসারের 400 টাকা বেশি হবে! আসলে কিন্তু বেশি না। সে অনেক চেষ্টা করেও যদি খুজে বের করতে না পারে যে কেন বেশি হলো তাহলে ওই চারশো টাকা ব্যাংকের সান্ড্রি একাউন্টে জমা হয়ে যাবে।

পরদিন বা যে কোন দিন সেই মিক্সড বান্ডিল পেমেন্ট করা হলে সবার অজান্তেই 500 টাকার নোটের মধ্যে 100 মিক্সড হয়ে গ্রাহকের হাতে চলে যাবে এবং গ্রাহক অফিসার এবং ব্যাংকে গালি দিবে। ঘটনা এখানেই শেষ না। গ্রাহক বান্ডিলের উপরের ফ্লাই লিফ না ছিড়ে ব্যাংকে গেলে সেটা বদলে দেওয়া হবে। গ্রাহকের সামান্য সময় নষ্ট হবে এর বেশি কিছু না। কিন্তু যে অফিসারের সিগনেচার আছে তার কি হবে জানেন? মেমো খাবে। পাশাপাশি ওই একশো টাকা বের করে সেখানে একটা পাচশো টাকার নোট নিজের পকেট থেকে দিয়ে দিতে হবে। অফিসারের চারশো টাকা লস। কারণ গতদিন যে টাকা সে বেশি ছিলো ভেবে সান্ড্রি একাউন্টে জমা করেছিল তা আর সে বের করতে পারবে না।অথচ পরেরদিন বা যেদিন ধরা পড়বে যে বান্ডিলের মধ্যে নোট মিক্সিং হয়েছে সেদিনতো তাকে ঠিকই সেটা দিতে হবে। একই ভাবে জাল টাকার ক্ষেত্রেও ঘটনাটা সেম।আপনি মনে রাখবেন একজন ক্যাশ অফিসার অবশ্যই সৎ।

তার পদে পদে বিপদ মাথায় নিয়ে,গ্রাহকের গালি শুনে,উর্ধতন কর্মকর্তার ঝাড়ি শুনে কাজ করতে হয়। অফিসে সব চেয়ে বেতন কম তাদের,সবচেয়ে সম্মান কম তাদের,সবচেয়ে গালি শুনতে হয় তাদের কিন্তু সবচেয়ে প্রেশার নিতে হয় তাদের। দু চারজন বাদে অধিকাংশ গ্রাহক টাকা উত্তোলন করতে গিয়ে কোন ভাবে বেশি টাকা পেলে তা আর ফেরৎ দেয় না। কোন ভাবে আইডেন্টিফাই করা না গেলে পুরো টাকা সেই অফিসারকেই বহন করতে হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে অফিসারের পুরো মাস এমনকি দুই মাসের বেতনের সমপরিমান টাকাও একদিনে গচ্ছা দিতে হয়। কিন্তু এটা নিশ্চিত থাকুন আপনি টাকা জমা দিতে গিয়ে যদি মাত্র একটাকাও বেশি দিয়ে আসেন কিংবা এক লাখও বেশি দিয়ে আসেন তা ওই অফিসার ভোগ করে না বরং সেটা ব্যাংকের সান্ড্রি একাউন্টে জমা থাকে। আপনি প্রমান করে সেটা ফিরিয়ে নিতে পারেন।

  • এটিএম মেশিন থেকে জাল টাকা,তিনটুকরা নোট বের হওয়া বিষয়েঃ

বাস্তব জ্ঞান সম্পন্ন কোন ব্যাংক কর্মকর্তাই অস্বীকার করবে না যে কখনোই কোন ব্যাংকের এটিএম থেকে জাল টাকা বা তিনটুকরো জোড়া দেওয়া নোট বের হয় না। কিংবা 500 টাকার মধ্যে 100 টাকার নোট বা 1000 টাকার মধ্যে 500 টাকার নোট মিক্সড হয়ে বের হয় না।যদি কেউ বলে যে বের হয় না তাহলে ধরে নিতে হবে সেই অফিসার মুর্খ এবং বাস্তবজ্ঞান সম্পন্ন নয় পাশাপাশি নিজের ব্যাংকের দোষগুলো ঢাকতে চা। প্রকৃত পক্ষে এটিএম থেকে কালেভদ্রে (খুবই রেয়ার) এই সব ঘটনা ঘটতে পারে। আপনি মাত্র 500 টাকা উঠিয়েছেন সেটাও কিন্তু জোড়া দেওয়া হতে পারে,জাল হতে পারে। আবার ধরুন মাত্র পনেরশ  টাকা উত্তোলন করতে গিয়েও একটা ভিন্ন নোট পেতে পারেন।আমি না বললেও অন্তত এরই মধ্যে অনেকেই হয়তো বুঝতে পারছেন আসলে কি ঘটে? দেশের অধিকাংশ ব্যাংক যাদের বৃহদ এটিএম নেটওয়ার্ক আছে যেমন ডাচ বাংলা ব্যাংক,ব্র্যাক ব্যাংক থার্ডপার্টি ভেন্ডরের মাধ্যমে ক্যাশ লোড করে থাকে।সে ক্ষেত্রে ভেন্ডর প্রথমে ব্যাংকের শাখা থেকে টাকা নিয়ে আসে।

আগেই ঘটনাগুলো পড়ে থাকলে বুঝতে সুবিধা হবে। ভেন্ডরকে শাখা যে টাকার বান্ডিলগুলো দিয়ে থাকে তা কিন্তু অফিসারেরাই করে এবং সেই টাকার মধ্যে যদি আগের ওই ভুল মিক্সিং বান্ডিল থেকে যায় তবে সেটা ভেন্ডরের হাতে চলে যায়। একই ভাবে জালটাকা বা তিনচারটুকরা জোড়া দেওয়া নোটও থাকতে পারে।তো ভেন্ডর সেই বান্ডিল গুলো নিয়ে ট্রাংকে ঢুকায় এবং ট্র্যাংক বন্ধ করে সেখানে একধরনের ট্যাগ লাগিয়ে দেয় যা একবার লাগালে খুলতে হলে ছিড়ে ফেলতে হয় এবং এই ট্যাগের নাম্বার তিন চার স্তরে বিতরণ করা হয়। অর্থাৎ খুলতে হলে তা কেবল থার্ডপার্টি ভেন্ডর অফিসে নিয়ে বুঝিয়ে দেওয়ার সময় খুলতে হবে অথবা এটিএম লোডিং এর সময় খুলতে হবে। একবার খুললে ট্র্যাংক অরক্ষিত অবস্থায় থাকবে এবং সেই অবস্থায় আপনি কোথাও মুভ করতে পারবেন না। এর পর এটিএম লোড দেওয়ার সময়  এটিএম মেশিনের মধ্যে চারটা ক্যাসেট থাকে। এই ক্যাসেট হলো একরকম ড্রয়ার। যার একটিকে 1000 টাকার নোট একটিতে 500 টাকার নোট এবং একটি ফাকা থাকে। আর চতুর্থ ক্যাসেট হলো বিন হিসেবে ব্যবহারের জন্য।

অর্থাৎ কেউ টাকা ওঠানোর সময় অনেক সময় ননডিসপেন্স হতে পারে। আপনি কমান্ড দিলেন কিন্তু টাকা বের হলো না সেই টাকাটা ওই ননডিসপেন্স ক্যাসেটে জমা থাকে। আগেকার দিনে মেশিনে 100 টাকার নোটও দেওয়া হতো তাই চারটা ক্যাসেট সিস্টেম রয়েই গেছে। যাই হোক বলছিলাম মাত্র 500 টাকা উঠাতে গেলেও সেটা জাল পড়তে পারে। কিভাবে সেটা বলছি। ধরুন কোন এক 500 টাকার বান্ডিলের মধ্যে ক্যাশ অফিসারের সেই ভুল ক্রমে থাকা নোটটি রয়ে গেছে এবং অন্যান্য বান্ডিলের সাথে সেই বান্ডিলের নোটগুলোও এটিএমএ লোড দেওয়া হয়েছে। অন্যান্য নোট তুলে নেওয়ার পর সবার সামনে ওই জাল নোট বা জোড়াদেওয়া নোট এসে গেছে সেই সময়ে আপনি 500 টাকা উঠাতে চাইলেন। তাহলে সেটাই আপনার হাতে পড়বে। আর তখনই আপনি গালি দিতে শুরু করবেন। এ ক্ষেত্রে সব ব্যাংক সব সময় বলে থাকে আপনি টাকা যেখান থেকেই উঠান না কেন দেখে নিবেন,গুনে নিবেন। এটিএম থেকে টাকা তুলে চেষ্টা করবেন গুনে বুঝে দেখে নিতে।

সেখানেই যদি ভুল চোখে পড়ে তবে রাগ করবেন না,বিচলিত হবেন না বরং তাদের কলসেন্টারে ফোন করে বিষয়টি জানাবেন। সব এটিএম এর একটা করে নাম্বার থাকে আর সেখানে ক্যামেরাও থাকে। আপনি ক্যামেরার দিকে নোটটি অথবা নোটগুলো দেখান এবং সেখান থেকেই ফোন করে বিষয়টি জানান। আপনি নিশ্চিত থাকুন সমাধান পাবেন। এক সপ্তাহ সময় লাগলেও আপনি সমাধান পাবেন। আপনার 500/1000 টাকার জন্য ব্যাংক কোন ভাবেই তাদের রেপুটেশন নষ্ট করবে না এবং আপনাকে 500/1000 জাল বা মিক্সড নোট দিয়ে ঠকাচ্ছে না এটা শ্রেফ একটা ভুল যা আগেই বিস্তারিত লিখেছি কিভাবে ভুল সংগঠিত হয়।আরও আছে, আপনাকে আগেই বলেছি ব্যাংকে সান্ড্রি একাউন্ট বলে একটা একাউন্ট আছে যেখানে ক্যাশে কোন টাকা অতিরিক্ত হলে তা জমা রাখা হয়। প্রতিটি ব্যাংকের প্রতিটি শাখায় এই সান্ড্রি একাউন্টে অনেক টাকা জমা পড়ে আছে যার কোন মালিক এসে প্রমান সহ দাবী করেনি। যারা প্রমান সহ দাবী করেছে তারা তাদের টাকা ফেরত পাচ্ছে। যদিও সেটা এক দু মাস পার হয়ে গিয়ে থাকে।

8 জুন 2020

একটি চুরির অভিযোগ

0

রমনা থানার ওসি আকরাম সাহেব চা খেতে খেতে ভাবছিলেন কী দুর্যোগ আসলো যে বেঁচে থাকাই কঠিন হয়ে পড়েছে। যারা কোটি কোটি টাকা আছে সেও বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছে আবার দিন আনে দিন খায় এমনও কেউ কেউ আছেন যারা রোগাক্রান্ত হওয়ার পর কদিন ভুগেই পুরোপুরি সুস্থ্য হয়ে উঠছেন।পত্রিকার পাতা খুলতেই মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে।চারদিকে মহামারি যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে তা দেখেও মানুষ সচেতন নয়।তিনি এবং তার মত অনেকেই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে এই মহামারির সময়েও ঘরের বাইরে বের হতে হচ্ছে।কাজ করতে গিয়ে তিনি দেখেছেন অনেকেই বেহুদাই বাইরে ঘোরাঘুরি করছে। এদেরকে জেল,জরিমানার ভয় দেখিয়ে আদতে কোন লাভ নেই কারণ এরা করোনার মত ভয়াবহ মহামারিকেই ভয় পায় না সেখানে সামান্য জেল জরিমানার ভয় থাকারতো কথাই নেই। চা খেতে খেতে পত্রিকার পাতা ওল্টাচ্ছিলেন এবং শিরোনাম দেখছিলেন। খেলার পাতায় দেখলেন এই করোনার মধ্যেও রোনালদো প্রায় বিশে কোটি টাকা আয় করেছে তাও আবার ইন্সটাগ্রামে মাত্র চারটা পোষ্ট করে! আর মেসি আয় করেছে চৌদ্দ কোটি টাকা।এতো টাকা? ভাবা যায়? আমাদের দেশের সিংহ ভাগ মানুষ সারা জীবনেও এক কোটি টাকায় আয় করতে পারে না আর এরা মাত্র চারটা পোষ্ট দিয়ে বিশ কোটি টাকা আয় করে। তিনি ভাবেন তারওতো একটা ফেসবুক আইডি আছে শুধু মাত্র সময় পার করার জন্য ব্যবহার করা। অবশ্য সত্যি বলতে ফেসবুকে ঢোকার সময়ইতো তার নেই। চোর পুলিশ খেলেইতো সময় কেটে যায়। আইডিটা করা হয়েছিল সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে চলার জন্য যেন কেউ বলতে না পারে আপনার এখনো ফেসবুক একাউন্ট নেই?!

ফেসবুক দিয়েও শুনেছেন অনেকে লাখ লাখ টাকা আয় করে।এসব নিয়ে ভাবতে গেলে তার মাথা গুলিয়ে যায়।পাতা ওল্টাতে ওল্টাতেই চোখে পড়ে কোথায় কয়টা খুন হয়েছে,কতজন ধর্ষিত হয়েছে,কত বস্তা চুরি যাওয়া চাল ধরা পড়েছে।তিনি অত্যন্ত সৎ পুলিশ অফিসার।সব সময় সত্যের পথে থাকতে চেষ্টা করেন,মানুষের উপকার করেন।ন্যায় বিচারের পক্ষে আজীবন লড়াই করতে চান। আলিশান বাড়ি,দামী গাড়ি এসবের প্রতি তার বা তার পরিবারের কোন মোহ নেই।পত্রিকায় হরহামেশাই লোভী মানুষের লোভ দেখে তার খুব অবাক লাগে।মানুষ না খেয়ে মরে যাচ্ছে,করোনাআক্রান্ত হয়ে মরে যাচ্ছে,ভয়ে মরে যাচ্ছে আর এর মাঝেও একশ্রেনীর মানুষ নির্বিঘ্নে সব কিছুকে তোয়াক্কা করে নানা রকম অপরাধ করেই চলেছে! ভাবতে ভাবতেই চাটুকু শেষ করে কাপটা টেবিলে রেখে দিলেন। পত্রিকা পড়তে ইচ্ছে করছে না।শুধু মনখারাপের খবর ছাড়া আর কিছু নেই। পত্রিকা রেখে তিনি উঠে দাড়ালেন এমন সময় এক ভদ্রমহিলা তার কামরায় ঢুকলেন।তিনি বললেন আমি একটা অভিযোগ দায়ের করতে এসেছি। আমার বাসার কাজের মেয়েটা আমার স্বর্ণের হার এবং টাকা পয়সা নিয়ে পালিয়েছে। ওসি সাহেব বললেন পাশের কামরায় গিয়ে অভিযোগ লিখিয়ে রেখে যান আমরা দেখবো। মহিলা নাছোড় বান্দা। তিনি বললেন স্যার আপনিই লিখুন এবং এর একটা ব্যবস্থা করুন।

কী আর করা! মানুষ হিসেবে তিনি অত্যন্ত ভালো মনের বিধায় আর কিছু বললেন না।তবে অভিযোগ লেখার সময় খুটিনাটি জেনে নিলেন। মেয়েটার বয়স কেমন,কতদিন হলো কাজ করছে,গ্রামের বাড়ি কোথায়,বেতন কত দেওয়া হতো সব।ভদ্রমহিলা নিজের বাসার ঠিকানা,মোবাইল নাম্বার এবং কাজের মেয়ের একটি ছবি সহ অভিযোগ লিখিয়ে চলে গেলেন। ওসি সাহেব ভাবলেন এতো ঝামেলার মধ্যে বিপদ মাথায় নিয়ে এখন আবার এই কাজের মেয়েকে খুজঁতে হবে।ওসি সাহেবকে অবশ্য বেশি বেগ পেতে হলো না।মেয়েটির গ্রামের বাড়ীর ঠিকানায় খোঁজ নিতেই মেয়েটিকে পাওয়া গেলো। খুবই অভাবের সংসার তাই বাধ্য হয়ে বাবা মা মেয়েকে সাত বছর আগে ঢাকায় ওই ভদ্রমহিলার বাসায় কাজে পাঠিয়েছিলেন। নিজেদেরই যেখানে পেট চলে না সেখানে মেয়েকে কিভাবে খাওয়া পরা দিবেন! মেয়েটার গ্রামের বাড়ী গাজীপুরের টঙ্গীতে। টঙ্গী থানার সাথে যোগাযোগ করে মেয়েটিকে রমনা থানায় আনা হলো। ওসি সাহেব তাকে নির্ভর দিয়ে বললেন তোমার কোন ভয় নেই। তোমার নামে চুরির অভিযোগ হয়েছে বলেই যে তোমার জেল জরিমানা হবে বা তুমি চোর হয়ে যাবে এমন নয়। তুমি নির্দ্বিধায় সব খুলে বলো।ওসি সাহেব মেয়েটির জড়তা এবং ভয় কাটানোর জন্য কনস্টেবল আদিলকে বলে দুটো বিস্কুট আর এক কাপ চা সাথে এ গ্লাস পানি দিতে বললেন। তবে মেয়েটি বিস্কুট বা চা কোনটাই খেলো না বরং গ্লাস থেকে ঢকঢক করে পানি খেয়ে নিলো। বুঝাই যাচ্ছে সে মারাত্মক ভয়ে আছে।

ওসি সাহেব সময় নিলেন। এর মাঝে সেই ভদ্র মহিলা সৈয়দা খাতুনকে ফোন করে জানালেন আপনার কাজের মেয়েকে আমরা থানায় নিয়ে এসেছি আপনি আসুন। খবর পেয়েই সৈয়দা খাতুন বেরিয়ে পড়লেন।তিনি যখন বাসা থেকে বের হচ্ছেন তখনও তিনি জানতেন না যে তার চুরি যাওয়া হার বা টাকা তিনি ফেরৎ পাবেন নাকি অন্য কিছু ঘটবে। এরই মধ্যে ওসি সাহেব মেয়েটির কাছ থেকে সব জেনে নিলেন। মানুষের চোখ দেখলেই তিনি বুঝতে পারেন সে সত্যি বলছে নাকি মিথ্যা বলছে। ওসি সাহেবের পুরোপুরি বিশ্বাস মেয়েটি যা বলেছে সব সত্যি বলেছে। বিগত সাত বছর ধরে সে সৈয়দা খাতুনের বাসায় থেকে কাজ করছে  কিন্তু তাকে কোন বেতন দেওয়া হয়নি এমনকি ছুটিতে বাড়িতেও যেতে দেওয়া হয়নি। অবশ্য বাবা মায়ের সাথে মাঝে মাঝে ফোনে কথা বলিয়ে দিতেন। সৈয়দা খাতুন যে চুরির অভিযোগ করেছে সে সম্পর্কে মেয়েটি বলেছে সে সম্পুর্ন নির্দোষ। সে স্বর্নের চেইন বা টাকা কোনটাই নেয়নি। সে বরং নিয়মিত শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে অতিষ্ঠ হয়ে বাসা থেকে পালিয়েছে। এরই মধ্যে সৈয়দা খাতুন তার স্বামীকে নিয়ে থানায় হাজির হলেন। তার চোখ রাগে জ্বলজ্বল করছে যেন পুড়িয়ে ছাই করে দিবেন। ওসি সাহেব তাদেরকে বসতে বললেন। তার পর মেয়েটি যা যা বলেছে সে ব্যাপারে তাদের মতামত জানতে চাইলো। সৈয়দা খাতুনের স্বামী জনাব মোজাম্মেল হক নিরেট সাদাসিধে মানুষ। তিনি জানালেন কাজের মেয়েটির বিষয়ে তিনি তেমন কিছু জানেন না। মেয়েটিকে তার নম্রভদ্র মনে হয়েছে। কখনো কোন কিছুতে অবাধ্য হয়নি। তবে আমার স্ত্রী যেহেতু সারাদিন বাসায় থাকে সেই ভালো বলতে পারবে। আমি অফিসের কাজে বাইরে বাইরে থাকি বলে বাসায় খুব একটা থাকাই হয় না।

ওসি সাহেব সৈয়দা খাতুনের কাছে প্রশ্ন করলে তিনি মেয়েটি যা বলেছে তা সব মিথ্যে বলে অভিযোগ করলেন। তখন ওসি সাহেব বললেন আপনার বাসায়তো সিসি ক্যামেরা আছে তাইনা? তারা জানালো সিড়িতে এবং গেটের সামনে সিসিক্যামেরা আছে। ওসি সাহেব টিম সহ মেয়েটিকে সাথে করে ভদ্রমহিলা আর তার স্বামীকে নিয়ে তার বাসায় গেলেন । সিসিক্যামেরার ফুটেজ এবং বাসার দারোয়ানের কাছ থেকে জানা গেলো মেয়েটি সেদিন দারোয়ানকে বলেই বেরিয়েছে এবং সে এক কাপড়ে বেরিয়েছে। এবার ওসি সাহেব একটু কঠোর হলেন। পুলিশ হলে কঠোর হতেই হবে তবেই সত্য বেরিয়ে আসবে। হলোও তাই। চাপাচাপির পর সৈয়দা খাতুন স্বীকার করলেন যে সত্যি সত্যিই বিগত সাত বছর মেয়েটিকে কোন বেতন দেওয়া হয়নি।ওসি সাহেব আবারও ভীষণ অবাক হলেন! টাকাওয়ালা মানুষ হয়েও কি করে মানুষ গরীবদের ন্যায্য পাওনা সময় মত বুঝিয়ে দেয় না! অল্পদিনের দুনিয়ায় মানুষের এতো বেশি লোভ! মরণের সময় কেউতো সাথে করে কিছু নিয়ে যাবে না!

ওসি সাহেব সৈয়দা খাতুন এবং তার স্বামীকে কঠোর ভাষায় বললেন আপনারা যেটা করেছেন তা ঘোরতর অন্যায়। প্রথমত বছরের পর বছর তাকে দিয়ে কাজ করিয়েছেন কিন্তু বেতন দেন না। দ্বিতীয়ত তার উপর শারীরিক নির্যাতন করেছেন আর তৃতীয়ত বিনা দোষে তাকে চোর সাব্যস্ত করে থানায় ডায়েরি করেছেন। এর জন্য আপনাদের বড় শাস্তি হবে। সৈয়দা খাতুনের চেহারা সাথে সাথে মলিন হয়ে গেল। তিনি একবার স্বামীর দিকে,একবার ওসি সাহেবের দিকে আরেকবার কাজের মেয়েটির দিকে তাকাতে থাকলেন। কাজের মেয়েটির নাম আলেয়া। আলেয়ার মুখের দিকে তাকিয়ে ওসি সাহেব বুঝতে পারলেন মেয়েটির মন থেকে ভয় চলে গেছে। সে বুঝতে পেরেছে সে যে চোর না তা প্রমান হয়েছে সেই সাথে তার উপর যে জুলুম করা হয়েছে তা পুলিশ বুঝতে পেরেছে। সৈয়দা খাতুনের স্বামী বললেন স্যার কেসকাচালির মধ্যে না গিয়ে কি কোন ভাবে মিটমাট করা যাবে? ওসি সাহেব খানিকক্ষণ ভাবলেন তার পর বললেন আলেয়া এখন থেকে আর আপনাদের বাসায় কাজ করবে না এবং বিগত সাত বছরের পাওনা সব মিটিয়ে দিতে হবে। সৈয়দা খাতুনের স্বামী মোজাম্মেল সাহেব শর্ত মেনে নিলেন। সেদিনই তিনি প্রায় দুই লক্ষ টাকার একটি চেক তুলে দিলেন ওসি সাহেবের হাতে। ওসি সাহেব সেটা আলেয়াকে বুঝিয়ে দিলেন। সৈয়দা খাতুন চা দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু ওসি সাহেব বললেন এখন চা খেতে চাই না। মনটা এমনিতেই খারাপ হয়ে আছে। তিনি বেরিয়ে পড়লেন। তার সাথে আলেয়াও বেরিয়ে আসলেন। তিনি নিজে গাড়ির টিকেট করে আলেয়াকে বাসে তুলে দিলেন। বাসে ওঠার আগে আলেয়া ওসি সাহেবের পায়ে হাত রেখে সালাম করলেন। তার চোখে পানি। ওসি সাহেবের চোখেও পানি।এক জীবনে এমন দৃশ্য তিনি খুব কমই দেখেছেন। ন্যায় বিচার দিতে গিয়েও নানা প্রমানের অভাবে তিনি ন্যায় বিচার দিতে পারেন নি, মানুষের পাশে দাড়াতে পারেন নি।

মেয়েটিকে বাসে উঠিয়ে দিয়ে থানায় ফিরে গেলেন ওসি আকরাম সাহেব।চলন্ত বাসের জানালায় মুখ ঠেকিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে মেয়েটি।সে এখন মুক্ত স্বাধীন। তার বাবার খুব ইচ্ছে ছিলো ছোট্ট একটি মুদি দোকান দিবেন তা থেকে যা আয় হবে তা দিয়ে সংসার চলে যাবে। কিন্তু টাকার অভাবে তা করতে পারেন নি। যা আয় হয় তা দিয়ে সংসারই চলে না টাকা জমাবেন কিভাবে।স্বপ্নটা তাই স্বপ্নই থেকে গেলো।আলেয়া ভাবে এই টাকা দিয়ে বাবার জন্য একটা দোকান করবে তার পর সুখে শান্তিতে বাস করবে।বাস থেকে নেমে সে সোজা বাড়িতে চলে গেলো। অনেক বছর পর মেয়েকে পেয়ে বাবা মায়ের সে কী আনন্দ।মেঝেতে পাটি পেতে বসে আলেয়া বাবার হাতে চেকটা ধরিয়ে দিয়ে বললো বাবা আমাদের আর বেশি কষ্ট করতে হবে না। যে বাড়িতে কাজ করতাম সেখান থেকে বিগত সাত বছরের বেতন একসাথে পেয়েছি প্রায় দুই লক্ষ টাকা। এটা দিয়ে তুমি দোকান করতে পারবে।বাবা মায়ের চোখে পানি এসে গেলো।মেয়েকে বুকে জড়িয়ে নিলেন।

কয়েকদিনের মধ্যেই মধুমিতা রোডে ছোট্ট একটি দোকান দিলো আলেয়ার বাবা এবং ভালো একটা সম্মন্ধ দেখে আলেয়ার বিয়ে ঠিক করলেন।আত্মীয় স্বজন খুব বেশি নেই বলে তেমন কাউকে দাওয়াত করার দরকার পড়লো না। পাড়াপ্রতিবেশী যারা আছে তারাই আসবে। আলেয়ার মনে পড়লো একজনকে তার বিয়েতে দাওয়াত দিতেই হবে তিনি হলেন ওসি আকরাম সাহেব। সেদিন বিদায় দেওয়ার সময় তিনি তার মোবাইল নাম্বার দিয়েছিলেন যেন কোন অসুবিধা হলে ফোন করতে পারে।নাম্বারটা খুঁজে বের করে আলেয়া ফোন করলো ওসি সাহেব তখন স্ত্রী কন্যাকে নিয়ে রাতের খাবার খেতে বসেছেন। ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে আসলো একটি মেয়ে কন্ঠ। ওসি সাহেব জানতে চাইলেন কে? আলেয়া বললো স্যার আমি আলেয়া।ওসি সাহেব বললেন কোন আলেয়া? আলেয়া বললো স্যার মনে নেই একবার আমি থানায় এসেছিলাম ওই যে চোর আলেয়া! বলেই হেসে উঠলো। ওপাশ থেকে ওসি সাহেবও হাসলেন। তিনি বললেন তুমি চোর বলছো কেন? তুমিতো চোর নও! আলেয়া বললো স্যার চোর না বললে তো বুঝবেন না আমি কোন আলেয়া।তার পর সে তার বিয়ের দাওয়াত দিলো এবং অনুরোধ করলে ওসি সাহেব যেন পরিবারের সবাইকে সাথে করে তার বিয়েতে অবশ্যই উপস্থিত হয়।

করোনা ভাইরাসের কবল থেকে পৃথিবী মুক্তি পেয়েছে।যথাসম্ভব ধুমধাম করেই আলেয়ার বিয়ের আয়োজন চলছে। ওসি সাহেব একদিনের ছুটি নিয়ে স্ত্রী কন্যাকে সাথে নিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দিলেন। আলেয়া মেয়েটিকে খুবই সুন্দর লাগছে। মায়া ভরা চেহারা।ওসি সাহেবকে দেখে সে উঠে এসে পায়ে হাত দিয়ে সালাম করলো এবং বাবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো। ওসি সাহেবের স্ত্রী আলেয়ার হাতে একটি স্বর্ণের হার ধরিয়ে দিয়ে বললেন সুখী হও মা। আমাদের পক্ষ থেকে তোমার জন্য সামান্য এ উপহার! আলেয়ার চোখে পানি চলে আসলো। তারা এতোটাই গরীব যে বিয়েতে নাকফুল ছাড়া আর কোনটাই স্বর্ণরে না। ওসি সাহেবের মেয়েটার নাম নীলা। সে এবার এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। আলেয়ার চোখে পানি দেখে সে বললো আলেয়া আপু চোখের পানি মুছে ফেলো। সাত বছর নির্মম নির্যাতন সহ্য করেও যখন তুমি কাঁদোনি এখনতো সুখের সময় এখন কেন কাঁদবে?

আলেয়া চোখের পানি মুছে নীলাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বললো সাত বছরে জমে থাকা চোখের পানি আজ না হয় আনন্দ হয়ে একটু ঝরে পড়ুক।

9 জুন 2020

নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতন কমছেইনা

0

পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ যখন মৃত্যুর মুখোমুখি দাড়িয়ে ঠিক তখন বাংলাদেশে এক শ্রেণীর মানুষ নামের অমানুষ কারো কারো জীবন অতিষ্ঠ করে তুলছে। আজও কিছু নরপিশাচ তাদের হিংস্র থাবায় খুবলে খাচ্ছে নারী ও কন্যা শিশুকে।এ যেন করোনার সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে তাদের নির্মমতা। শুধু মাত্র জুন মাসে সারা দেশে ৩০৮ জন নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে যা আমরা বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের লিগ্যাল এইড উপ পরিষদের প্রকাশিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানতে পারি। এই ৩০৮ জনের মধ্যে ১০১ জন নারী এবং বাকি সব কন্যাশিশু!পত্রিকার পাতা খুললেই প্রতিনিয়ত নারী ও কন্যাশিশু খুন,ধর্ষন নির্যাতনের খবর চোখে পড়ে যা সত্যিই বেদনা দায়ক। স্বাধীন বাংলাদেশে যে হারে নারী ও শিশু ধর্ষিতা হচ্ছে বোধকরি স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় বর্বর পাকিস্তানিদেরকেও ওরা হার মানিয়ে দিয়েছে। মহিলা পরিষদ যে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে তা দেশের প্রথম শ্রেণীর  ১৪টি দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত এক মাসের সংবাদ থেকে তথ্য নিয়ে করা হয়েছে।

করোনা ভাইরাস মহামারি আকারে হানা দিয়ে আমাদের অগনিত প্রিয়জনকে চিরতরে আমাদের থেকে ছিনিয়ে নিয়েছে ঠিকই কিন্তু একদিন না একদিন নিশ্চই করোনা নামের এই ঘাতক বিদায় নেবে এবং আমার আবার আগের জীবনে ফিরে যেতে পারবো। কিন্তু আফসোস বছরের পর বছর ধরে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ধর্ষক,নির্যাতক নামের এই সব নরাধমেরা সমাজের জন্য করোনা ভাইরাসের চেয়েও বেশি ক্ষতিকর।করোনা ভাইরাস থেকে বেঁচে থাকার জন্য আমরা কিছু নিয়ম অনুসরণ করলেই রক্ষা পেতে পারি কিন্তু এই সব ধর্ষক,খুনী,নির্যাতক নামের করোনা ভাইরাস থেকে কি করে সমাজের নারী ও কন্যা শিশুরা নিরাপদ থাকবে তা আজও আমরা কেউ জানি না। নারী ও কন্যা শিশুরা নিজ গৃহে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে,বাইরে নির্যাতিত হচ্ছে, সমাজের যে যেখানেই থাকুকনা কেন কোন না কোন ভাবে সে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। যেন নারীদের জন্মই হয়েছে নির্যাতিত হওয়ার জন্য। কত আইন হলো,কত সংগঠন হলো, নারী অধিকার নিয়ে কত সভা সেমিনার হলো, কত আন্দোলন হলো কিন্তু কিছুতেই এই সব খুনী,ধর্ষকদের দমিয়ে রাখা গেলো না। কাল হোক বা পরশু হোক বা দুবছর পর হোক করোনা ভাইরাসের টিকা আবিস্কার হবে এবং একদিন তা সমুলে নিপাত যাবে কিন্তু এই সব নির্যাতন কারী থেকেই যাবে। এমন একটি সামাজিক টিকা দরকার যার মাধ্যমে সমাজ থেকে নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতনকারী এবং ধর্ষকদের সমুলে উৎপাটন করা যাবে।

মহিলা পরিষদের প্রতিবেদন সত্যিই উদ্বেগজনক। মাত্র এক মাসে সারা দেশে ৬৯ জন ধর্ষণ ও ২৫ জন গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। এ সময় ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে সাত জনকে। এ ছাড়া ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ১৫ জনকে। শুধু এখানেই শেষ নয় বরং এর বাইরে শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছে তিনজন, যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে ছয় জন। মানুষ যেখানে করোনার ভয়ে শিথিয়ে আছে সেখানে কিকরে নির্ভয়ে এই সব নরপিশাচেরা জঘন্য কাজে লিপ্ত হয়! ওদের নির্যাতনের ধরনও আলাদা আলাদা। এই এক মাসে অ্যাসিড আক্রান্তের শিকার হয়েছে এক জন। অগ্নিদগ্ধের শিকার হয়েছে চার জন। এমনকি অপহরণ করা হয়েছে মোট ১৪ জনকে। আবার একজনকে পতিতালয়ে বিক্রি ও করা হয়েছে!

এসিড নিক্ষেপ,শ্লীলতাহানি,যৌন নির্যাতন করেই ওরা ক্ষান্ত হয়নি বরং এই সময়ে বিভিন্ন কারণে ৬২ জন নারী ও কন্যাশিশুকে হত্যা করা হয়েছে। এদের মধ্যে যৌতুকের কারণে হত্যা করা হয়েছে অন্তত পাঁচ জনকে। আমরা শিশু সুরক্ষা সেল করেছি, নারী নির্যাতন বন্ধে কত কাজ করছি কিন্তু কিছুতেই এসব থামছে না।দরিদ্র পরিবারের শিশু এবং কিশোরী রুটি রুজির জন্য অপেক্ষাকৃত ধনীদের বাসায় কাজ করতে আসে। সেখানেও তারা নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। গত এক মাসে দুই জন গৃহপরিচারিকাকে হত্যা করা হয়েছে এবং এক জন গৃহপরিচারিকাকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়।

করোনায় জীবনযাত্রার অনেক কিছু পরিবর্তন হলেও নারী ও কন্যা শিশু নির্যাতন কমেনি বরং বেড়েছে অনেক বেশি। এই এক মাসে যৌতুকের কারণেও নির্যাতন করা হয়েছে সাত নারীকে। আমরা আইন করে যৌতুক বন্ধের চেষ্টা করেছি ঠিকই কিন্তু তার পরও হরহামেশাই যৌতুকের বলি হতে হচ্ছে নারীকে। শারীরিক নির্যাতন, উত্ত্যাক্ত করা কোন কিছুই থামেনি। আর এসব কারণে আত্মহত্যার পরিমানও বেড়েছে।এবং প্রতিটি আত্মহত্যাকেই একটি হত্যাকান্ড হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে। জুন মাসের পরিসংখ্যন বলছে এই সময়ে বিভিন্ন নির্যাতনের কারণে ১৭ জন নারী আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে। ৩৪ জন নারী ও কন্যাশিশুর রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। বাল্যবিবাহ আগে থেকেই নিষিদ্ধ ছিল তার ওপর করোনাকালে যে কোন বিয়ের অনুষ্ঠানে সরকারি বিধি নিষেধ থাকলেও প্রতিবেদন অনুযায়ি গত মাসে অন্তত বাল্যবিবাহ হয়েছে এক কন্যাশিশুর।

পরিসংখ্যন অনুযায়ি করোনাকালে নারী নির্যাতনের ঘটনা বেড়েছে। কিন্তু সব তথ্য গণমাধ্যম পর্যন্ত পৌঁছায় না। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা গ্রহণসহ দ্রুত গ্রেফতার এবং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা জরুরী। অন্যথায় এই সব ঘাতক,নরপিশাচদের থাবায় আগামীতে আরও বহু প্রাণ ঝরে যাবে এবং নির্যাতন,ধর্ষনের শিকার হবে অগণিত নারী ও কন্যা শিশু।

উন্নত রাষ্ট্র গড়তে চাই ইতিবাচক পরিবর্তন

0

বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক দেশ। এই দেশে রাজনীতি গণতন্ত্রের অস্ত্র হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু রাজনীতি এখন অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি স্বার্থে ব্যবহৃত হচ্ছে। নানাক্ষেত্রে দলীয়করণ, একে অন্যের দোষারোপ করা এখন নিত্যদিনের রুটিনে পরিণত হয়েছে। দুই সমান্তরাল রেখার মতন চলে রাজনৈতিক প্রধান দুই দল, অথচ এদের একই সরলরেখায় চলার কথা ছিলো। ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি ও তার নেতাকর্মীরা মনে করে ক্ষমতা যাদের হাতে সেই আওয়ামীলীগের সাথে জনগণের কোনো সম্পর্ক নেই। অন্যদিকে ক্ষমতাশীনরা মনে করে বিএনপিকে জনগণ ত্যাগ করেছে। এই গ্যাপ পুরণের দুই দলের কোনো ইচ্ছা বা প্রচেষ্টা নেই।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয় হয়েছিল একটি স্বপ্ন নিয়ে। যে স্বপ্নের বাংলাদেশ হবে ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি তে সমুজ্জ্বল সম্ভাবনাময় একটি রাষ্ট্র । স্বাধীনতার ঊনপঞ্চাশ বছরে ক্ষমতার পালাবদলে এদেশের সফলতা ও ব্যর্থতা দুটোই বেশ আলোচিত। রাষ্ট্রের সাথে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত রাজনীতি।রাষ্ট্রের ছোট থেকে বড় সব বিষয়ের সাথে এটি জড়িত। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো সিংহভাগ তরুণ এখন রাজনীতি বিমুখ।তরুণ সমাজ দেশের মোট জনসংখ্যার একটা বড় অংশ । যারা দেশ, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি নিয়ে নতুন চিন্তা করে, সমাজকে, সুখী সমৃদ্ধ বৈষম্যহীন করে গড়ে তুলতে চায়। যেখানে দূর্নীতি, অপসংস্কৃতির বদলে সৎ এবং ঝঞ্ঝামুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে উঠবে।

তরুণ প্রজন্মই পারে আধুনিক চিন্তা, মনন শক্তি দিয়ে কাজের প্রসার ঘটানো, বেকারত্ব ও গোঁড়ামি মুক্ত স্বপ্নের বাংলাদেশ গঠন। আর তাই প্রয়োজন তরুণ প্রজন্মের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা। উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ এক দুরন্ত গতির সময় পার করছে, সেই সময়কে আরো এগিয়ে নিতে সবক্ষেত্রে সবধরণের মানুষের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ খুবই জরুরি, সেখানে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখতে পারে তরুণরাই। বর্তমান বাঙালি তরুণ প্রজন্মের সামনে দেশের কিছু লজ্জাজনক সামাজিক সমস্যা, সাম্প্রদায়িকতা, বৈষম্য, বেকারত্ব যা একবিংশ শতাব্দীর সভ্যতা, আধুনিকতার সম্পূর্ণ বিপরীতে।

স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় যে ভিতের ওপর হয়েছিলো, যেই সংস্কৃতির চর্চাকে প্রতিষ্ঠিত করতে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিলো সেই চর্চা থেকে যোজন যোজন দূরে গিয়ে ব্যাক্তি এবং গোষ্ঠী স্বার্থ বড় হয়ে ওঠায় রাষ্ট্রের উন্নয়নের গতি শ্লথ হয়েছে, সেই সাথে বারবার থমকে গিয়েছে গণতান্ত্রিক চর্চার পথ।  তরুণরা সৃষ্টিশীল, দেশপ্রেমিক। এই তরুণরাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে গড়ে তুলেছিলো গণজাগরণ মঞ্চ, এছাড়াও সামাজিক, অর্থনৈতিক, গবেষণা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে যেখানেই তরুণরা নেতৃত্ব দিয়েছে সেসব কাজে সফলতার হার বেড়েছে।

বর্তমানে জাতীয় রাজনীতিতে দ্বিদলীয় বৃত্ত দেখা যায়, যাদের রাজনৈতিক অদুর্দর্শিতার কারণে কখনো ভোটারবিহীন নির্বাচন, কখনো সামরিক শাসকদের ক্ষমতাদখল, কখনো পেছনের দরজা দিয়ে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের পায়তারা, এসব রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নও থমকে গিয়েছে বারবার, তবুও শেখ হাসিনার বলিষ্ঠ নেতৃত্বে দেশ যেটুকু এগিয়েছে সেটুকুতে তরুণদেরই একটা বড় অবদান আছে।

তরুণদের সরাসরি রাজনীতিবিমুখতাই সকলের অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের চর্চা ব্যহত হয়ে, অগণতান্ত্রিক গোষ্ঠী রাষ্ট্রক্ষমতা দখল নিতে পারার অন্যতম কারণ । এক পক্ষ বলছে দেশে কোন রাজনৈতিক সংকট নেই অন্যদল বলছে রাজনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এই দুইয়ের মাঝে যে সাধারণ জনগণ আছে তারা কি মনে করছে তা কেউ কখনো ভেবে দেখছে না। আমজনতা বলে কথা।এই মুহূর্তে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক যে সংকট বিরাজ করছে তা থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ হতে পারে রাজনীতিতে তরুণদের আরো অংশহগ্রহণ বাড়িয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় তরুণদের অংশ নেবার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, অসাম্প্রদায়িক বাঙালির মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন হয়েছিল মূর্খতা ও রাজনৈতিক অসচেতনতা থেকে। তরুণ সমাজ রাজনীতির মোড় ঘুরিয়েছে সবসময়। বিপ্লব এসেছে তাদের হাত ধরেই। কিন্তু বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সাম্প্রতিক সময়টিকে ফ্রেমে ধারণ করলে সেটা খানিকটা আলাদাই মনে হয়। কখনো কখনো দ্বিধায় পড়ে যেতে হয়। মনে হয় ক্ষমতাশীল ও দায়িত্বশীল পদে অবস্থানকারী লোকদের ব্যবহারে পুরনো সামন্তীয় দম্ভ ফুটে উঠছে।

বারবার রাজনীতির মাঠে বর্ষিয়ানদের পালাবদল উন্নয়নের ধারায় কতটা গতি আনতে পারে তা নিয়ে প্রশ্ন করার কিছু নেই।বিগত বছর গুলোতে তাদের কার্যক্রম সবাই দেখেছে। সুতরাং তরুণদের কাঁধে সেই একই দায়িত্ব দিতে পারলে তারা তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্রের কতটা উন্নয়ন এবং গণতান্ত্রিক ধারা আরো সমু্ন্নত করতে পারবে সেটা দেখার সুযোগ তৈরি করা উচিৎ।

রাজনীতি শব্দটা আজকাল অনেকের জন্য একটা লাভজনক ব্যবসার নাম হয়ে উঠেছে। অথচ বঙ্গবন্ধু যে স্বপ্ন নিয়ে স্বাধীনতার ডাক দিয়েছিলেন সেই  স্বপ্নে কোথা্ও এরকম হওয়ার কথা ছিল না। মানুষের অধিকার, ন্যূনতম চাহিদা মেটাবার ব্যবস্থা, সামাজিক ন্যায়, মানবিক মর্যাদা এসবের জন্য ব্রিটিশ শাসন থেকে পাকিস্তানের শৃঙ্খল ভেঙে বাংলাদেশের জন্ম। কিন্তু সেখানেও কেবল খাবার, বাসস্থান, স্বাস্থ্য আর শিক্ষার সংস্থান করতে মানুষের নাভিশ্বাস যেমন বাড়ছে, অন্যদিকে মানুষের টাকা অকল্পনীয় উন্নয়ন ব্যয় ও দুর্নীতি, ব্যঙ্ক, শেয়ার কেলেঙ্কারি নানাভাবে লোপাট অব্যাহত আছে।

তরুণ প্রজন্মের অংশীদার হিসেবে ঐতিহাসিক পরাম্পরায় এ দেশের তরুণরা যা করে এসেছে তা অব্যাহত রাখা; এই রোগ, স্বপ্নের বাংলাদেশ থেকে যে বিচ্যুতি তা চিন্তায়, কাজে, ঘরে, আড্ডা-অবসরে, রাজপথে প্রতিরোধ করা; নয়ত আমাদেরই হয়ত পচে যাওয়া একটা দেশ ও সমাজের ভার বইতে হবে।

টিএসসিতে কিংবা চারুকলায় গেলে দেখা যায় তরুণ প্রজন্মের ব্যাগে, ক্যাপে, নোটবুকে চে গুয়েভারা, ফিদেল ক্যাস্ট্রো সহ অন্যান্য বিপ্লবী নেতাদের ছবি বা ট্যাটু। অথচ সেই তরুণদের মধ্যে সরাসরি রাজনীতির প্রতি তেমন কোন আগ্রহ দেখতে পাওয়া যায় না।ফলশ্রুতিতে স্বার্থান্বেষী কিছু মানুষে ছেয়ে যাচ্ছে ছাত্র রাজনীতির বড় একটা অংশ।শুধু মাত্র একা শেখ হাসিনার পক্ষে সেসব সামলে ওঠা সম্ভব নয়। তরুণদের সুস্থ রাজনীতির চর্চার জন্যে সবচেয়ে বেশি জরুরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অবাধ রাজনৈতিক চর্চা, নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সাংস্কৃতিক, সামাজিক, রাজনৈতিক তথা গণতান্ত্রিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। ছাত্র সংসদ নির্বাচনের রীতি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলেও সেটা চালু হয়েছে কিছুদিন হলো তবে তা মানুষের মধ্যে আশা জাগাতে পারেনি। সেখানেও ক্ষমতার প্রভাব দেখানোর রীতি চোখে পড়ছে। 

ভোটের রাজনীতিতে যেখানে তরুণরা একটা বড় প্রভাব রাখতে পারে, সেখানে সরকার পরিচালনায় তরুণদের অংশগ্রহন একেবারেই হতাশাজনক। নির্বাচন পদ্ধতি,সরকার পদ্ধতিসহ রাষ্ট্রের বিভীন্ন বিভাগ নিয়ে তরুণদের মতামত ও অংশগ্রহণেরর  ভিত্তিতে সরকার পরিচালিত হলে সে সরকার আরো গতিশীল এবং কার্যকরি হয়ে উঠতো। উন্নত রাষ্ট্র গড়তে হলে এই সব ইতিবাচক পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরী।ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকেও সংশোধন করতে হবে এবং আমাদেরকে যুক্তিযুক্ত কথা বলতে দিতে হবে যেন তার আলোকে সরকার সময়োপযোগি সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারে।যেটা হয়ে উঠবে বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সত্যিকারের সোনার বাংলা।যেখানে কোন খাদ থাকবে না।

জাজাফী

নিবন্ধকার,ও উন্নয়নকর্মী

www.zazafee.com

5 আ   গ ষ্ট 2020