Monday, February 26, 2024
Home Blog

১২ বছর বয়সী সফল উদ্যোক্তা মিয়া মনজিডেলিস

0

কিশোরী একটি মেয়ে। নাম মিয়া মনজিডেলিস। এখন যার বয়স মাত্র ১২ বছর। স্কুলের বন্ধুদের সাথে খেলা করে,টিভি দেখে আর রেস্টুরেন্টে গিয়ে মজার মজার খাবার খেয়ে দিন পার করা আর দশজন কিশোর কিশোরীর মত নয় সে। ফেসবুক,ইউটিউব,টিকটক বা ইন্সটাগ্রামে ছবি আর ভিডিও পোস্ট করা মিলিয়ন ভিউ পাওয়া তথাকথিত সেলিব্রেটিও সে নয়। তবুও সে সেলিব্রেটি। তবুও সে বিশ্বব্যাপী আলোচিত এবং প্রশংসিত! সে সবার থেকে বেশ আলাদা। কারণ এই বয়সেই সে প্রতিষ্ঠিত উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী। মনজিডেলিস মাত্র পাঁচ বছর বয়সেই পাওয়ারপনি আবিস্কার করেছিল। এখন আমাদের জানা দরকার এই পাওয়ার পনি জিনিসটা আসলে কী? পনি শব্দের অর্থ টাট্টু আর টাট্টু কথাটা বলার সাথে সাথে যে বিষয়টা মাথায় আসে সেটা হলো ঘোড়া। যে ঘোড়া খুবই ছোট তাকে আমরা টাট্টুঘোড়া বলি। তাহলে প্রশ্ন উঠতে পারে মনজিডেলিস কিভাবে টাট্টুঘোড়া আবিস্কার করলো? এখানে একটি ছোট্ট তথ্য দিতে হচ্ছে। পনি শব্দের আগে সে পাওয়ার শব্দটি ব্যবহার করেছে। তার মানে দাঁড়াচ্ছে পাওয়ারপনি হলো ব্যাটারি চালিত টাট্টুঘোড়া! হ্যাঁ ঠিকই পড়েছেন। মিয়া মনজিডেলিস যেটা আবিস্কার করেছে সেটি হলো ব্যাটারি চালিত ঘোড়া। আর এই ঘোড়ায় চড়লে সত্যিকার ঘোড়ায় চড়ার মতই অনুভূত হয়। মিয়া মনজিডেলিস একই সাথে নিউইয়র্কে অবস্থিত “দ্য ফ্যামিলি এন্ড চিলড্রেন এসোসিয়েশন” এর মেম্বার। এটি একটি দাতব্য সংস্থা, যারা অসহায় শিশু কিশোর ও বয়স্কদের সহযোগিতা করে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো মিয়া গত বছর এই সংস্থাকে ৫ হাজার ডলার সাহায্য দিয়েছে এবং বাংলাদেশী টাকায় যার পরিমান সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা! দ্য হেরাল্ড ট্রিবিউনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে সে বলেছিলো ” আমি সব সময় অসহায় শিশু ও তাদের পরিবারকে সাহায্য করতে ভালোবাসি”। আর আশ্চর্য বিষয় হলো তার এই সাহায্য দেওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়েছিল যখন তার বয়স ছিলো মাত্র ৩ বছর!

মনজিডেলিস ছোটবেলা থেকেই ঘোড়ায় চড়তে পছন্দ করতো। তার ছিলো ঘোড়ার প্রতি দূরন্ত ভালোবাসা। কিন্তু মন চাইলেইতো আর ঘোড়ায় চড়া যায় না। বিশেষ করে ছোটরা ঘোড়ায় চড়তে গেলে কতরকম বিপদ হতে পারে। আর সে জন্য ছোটরা যখন ঘোড়ায় চড়ে তখন বড় কেউ না কেউ সাথে থাকতে হয়। কিন্তু দেখা গেলো বাবা অফিসে, মা রান্নার কাজে কিংবা বাজারে গিয়েছে এমন সময় ঘোড়ায় চড়তে ইচ্ছে করছে। তখন উপায় কি? একা একাতো ঘোড়ায় চড়তে পারবে না। ঘোড়ার পিঠেইতো উঠতে পারবে না। সুতরাং এমন একটা ঘোড়া দরকার যেটা হবে তার মত ছোটদের জন্য। যার পিঠে সে একা একাই উঠতে পারবে এবং যখন খুশি সে সেই ঘোড়ায় চড়তে পারবে। এমনকি মাঝ রাতে ঘুম ভেঙ্গে গেলে তার যদি ইচ্ছে করে একটু ঘোড়ায় চড়বো তো কারো সাহায্য ছাড়াই সে একা একা সেই ঘোড়ায় চড়তে পারবে। কিন্তু এমন আজব ঘোড়া কি দুনিয়ার কোথাও একটাও আছে? ধরে নিলাম একটা আছে আর সেই ঘোড়াটা কোনো ভাবে মনজিডেলিসের জন্য সংগ্রহ করা হলো। সেটা দেখে যদি তার বন্ধুরা বলে তাদেরও অমন একটি ঘোড়া চাই। তখন কোথায় পাবে সেই ঘোড়া? বাবা মা তখন কষ্ট পাবে। মনজিডেলিসের উপর রাগ করবে। সুতরাং সে সিদ্ধান্ত নিলো এমন একটি ঘোড়া সে নিজেই তৈরি করবে! মাত্র পাচ বছর বয়সে সে এমন কিছু ভাবতে পারে কেউ কি কল্পনা করতে পারে? রুপকথার গল্পে হলে না হয় মানা যেত। বাস্তবে এমন ঘোড়া! কিন্তু সে যেহেতু সিদ্ধান্ত নিয়েছে তাই সে এমন একটি ঘোড়া তৈরি করেই ছাড়বে এবং শুধু একটি নয় পরবর্তীতে দুনিয়ার সব শিশু কিশোর কিশোরীদের জন্য এমন টাট্টুঘোড়া তৈরি করবে বলে সে সিদ্ধান্ত নিলো। নাম দিলো পাওয়ারপনি।

মনজিডেলিস আবিস্কৃত সেই পাওয়ারপনিতে আইওএস সাপোর্ট করে! আছে একটি জুমি ইঞ্জিন! আর এটা আবিস্কারের পর তার নাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়লো। শিশু কিশোর কিশোরীদের মধ্যে তার আবিস্কৃত পাওয়ারপনি দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠলো। সে নিশ্চয়তা দিয়েছে এই টাট্টুঘোড়ায় যারা চড়বে তারা প্রত্যেকেই অনেক আনন্দ পাবে।

নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ডে থাকে মনজিডেলিস। সে পাওয়ারপনির আবিস্কারক এবং প্রতিষ্ঠাতা। বর্তমানে শোর রোড এলিমেন্ট্রি স্কুলে সিক্সথ গ্রেডে পড়াশোনা করছে। ছোটবেলা থেকেই ঘোড়া পছন্দ করতো এবং স্বপ্ন দেখতো একদিন সে একটি ঘোড়ার মালিক হবে। কিন্তু সে যেখানে থাকতো সেখানে ঘোড়া রাখার মত জায়গা ছিলো না। সুতরাং বাবা মা তাকে ঘোড়া কিনে দিতে পারেনি। কিন্তু সে কখনো হাল ছাড়েনি। সে তার স্বপ্ন পূরণে সব সময় ছিল দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এক ক্রিসমাসে সে একটি খেলনা ঘোড়া এবং একটি হভারবোর্ড উপহার পেয়েছিল। সে ভাবলো আচ্ছা যদি ঘোড়াটাকে হভারবোর্ডের উপর বসিয়ে দেই তাহলে কেমন হয়? তাহলেইতো একই সাথে দুটোতেই চড়া হবে আর তার ইচ্ছেও পূরণ হবে। আর সেই সময়েই তার মাথায় আইডিয়া আসলো ব্যাটারি চালিত ঘোড়া তৈরি করবে যেন যখন খুশি, যেখানে খুশি সে চড়তে পারবে। আর এ কাজে তাকে তার বাবা খুবই সহযোগিতা করেছে। যখন সে তার আইডিয়া বাবার সাথে শেয়ার করলো বাবা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গেলো।তারপর তিনি তাকে সবরকম সহযোগিতা করলেন। একসময় বাবা কঠোর পরিশ্রম করতেন। কিন্তু মনজিডেলিসের আইডিয়াটা শেয়ার করার পর দুজনে মিলে যখন সত্যি সত্যিই পাওয়ারপনি তৈরি  করে ট্রায়াল দিয়ে সফল হলেন এবং বাজারে বিক্রি করে দারুণ সাড়া পেলেন তখন থেকে তাদের ভাগ্যই বদলে গেলো। মনজিডেলিস তাই নিজেকে খুবই সৌভাগ্যবতী মেয়ে মনে করে।

মনজিডেলিস নিজে যেহেতু ছোট তাই সে ছোটদের বিষয়টা মাথায় রেখেই তার ব্রান্ডের একটি সুন্দর নাম খুঁজতে শুরু করলো। অনেক নামের ভীড়ে শেষে পাওয়ারপনি নামটা তার বেশি পছন্দ হলো।তার বন্ধুরা তার এই আবিস্কারে ভীষণ এক্সাইটেড ছিলো। যখনই সে নতুন একটি পাওয়ারপনি তৈরি করে তার ট্রায়াল দিয়েছে তখনই বন্ধুরা উৎসাহ নিয়ে সেটা দেখেছে। উপভোগ করেছে। একবার এক সাক্ষাৎকারে মনজিডেলিসকে প্রশ্ন করা হয়েছিল তুমি এই পাওয়ারপনি প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন জিনিসটি শিখেছ? সে তখন বলেছিল ”ছোট বলে কাউকে অবজ্ঞা করা যাবে না। এবং ছোটদের কল্পনায় যা আসে সেটিকেও উড়িয়ে দেওয়া যাবে না। সেই আইডিয়াও বাস্তব জীবনে নিয়ে আসা সম্ভব যা আমি করে দেখিয়েছি। বিশ্বাস,আস্থা,সহযোগিতা আর গ্রুপওয়ার্ক করতে পারলে অনেক কিছুই করা সম্ভব যা প্রাথমিক ভাবে অসম্ভব মনে হতে পারে।” 

তার প্রতিষ্ঠানে রয়েছে স্পেশাল ডিজাইনার,ইঞ্জিনিয়ার,ইলেক্ট্রিশিয়ান। আর প্রতিটি কাজই সে নিজে তদারকি করে থাকে। ডিজাইনার যখন ডিজাইন করে তখন সে নিজে সেটা দেখে এবং জাস্টিফাই করে যে সেই ডিজাইনটি তার গ্রাহকশ্রেণীর পছন্দ হবে কি না। যদি কিছু মডিফাই করার দরকার হয় তাহলে সে সেভাবেই ইন্সট্রাকশন দেয়। মনজিডেলিসের মতে নিজের মত করে একটি ব্যবসা দাড় করানো খুবই কঠিন বিষয়। তবে যদি নিজের আইডিয়ার উপর নিজের প্রবল বিশ্বাস থাকে,যথাযথ পরিকল্পনা থাকে আর লেগে থাকার মত মানসিকতা থাকে তাহলে যে কেউ সেই প্রজেক্ট সফল করার পথ নিজেই খুঁজে নিতে পারবে। আর এই পথপরিক্রমায় যতই বাঁধা আসুকনা কেন, সেগুলো অনায়াসেই পার করা সম্ভব হবে।

ক্রিসমাসে পাওয়া দুটো উপহার আর নিজের একটি স্বপ্ন থেকে কিশোরী মনজিডেলিস সফল উদ্যোক্তা হিসেবে খ্যাতি পেয়েছে। সুতরাং বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করে উদ্যোক্তা হবো বা কিছু করবো এমন ধারণা নিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই। মিয়া মনজিডেলিসের উদ্যোক্তা হওয়ার গল্প থেকে আমরা এই শিক্ষাই পেতে পারি যে শুরু করার কোনো বয়স সীমা থাকে না আর শুরু করার পর লেগে থাকলে একদিন না একদিন সফলতা আসবেই। হাল ছাড়া যাবে না।

২৭ ডিসেম্বর ২০২৩

যে শিশু কিশোর কিশোরীরা ১ হাজার বই পড়েছে!

0

বইয়ের মত অকৃত্রিম বন্ধু আর হয় না। বই পড়ায় যে আনন্দ তার একটি ধারণা পাওয়া যায় বিশ্ববিখ্যাত শিশুতোষ লেখক রোয়াল্ড ডালের লেখা “মাতিলদা” বই থেকে। যেখানে মাতিলদা নামের ছোট্ট মেয়েটি বই পড়ায় এতো বেশি আগ্রহী যে পড়তে শেখার পর পরই সে লাইব্রেরীতে গিয়ে অসংখ্য বই পড়ে ফেলে। হলিউডে এটা নিয়ে দুটো সিনেমাও হয়েছে। বই পড়ে আমরা হাসি,কাদি,আনন্দপাই আবার অনেক জ্ঞানার্জনও করি। তবে অনেকেই বই পড়তে খুব একটা পছন্দ করে না। কিন্তু পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছে যারা বইপড়তে খুবই ভালোবাসে। আর আমরা তাদের বলি বইয়ের পোকা। ছোটবেলা থেকে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারলে জীবনে নানা সুবিধা পাওয়া যায়। কখনো নিজেকে একা লাগে না। মনে হয় সবচেয়ে সেরা বন্ধুতো আমার সাথেই আছে। আর সেই সেরা বন্ধু হলো বই। বই আমাদের নতুন এক জগতের সন্ধান দেয়। আমরা যত বেশি বই পড়ি আমাদের মনের চোখ খুলে যায়। আমরা কল্পনা করতে পারি নতুন নতুন ভূবনের। আমাদের চিন্তার প্রসার ঘটে। জ্ঞানের বিকাশ ঘটে।

কর্মব্যস্ত জীবনে অনেকেই বই পড়ার সুযোগ মেলে না বলে অভিযোগ করে। আবার উল্টোটাও দেখা মেলে। বিশ্ববিখ্যাত মানুষ বিলগেটস বা মার্ক জুকারবার্গও প্রচুর ব্যস্ত থাকেন। কিন্তু তাদের বই পড়ার যে নিয়মিত অভ্যাস তাতে কোনো অসুবিধা হয় না। তারা সময় বের করে প্রতিদিনই বই পড়েন। একজন মানুষ তার সারা জীবনে ঠিক কতগুলো বই পড়তে পারে? কেউ কেউ বলেন ৫ হাজার আবার কেউ কেউ বলেন ১০ হাজার। বইয়ের সাইজ,ধরণ এসবের উপর সব কিছু নির্ভর করে। কেউ যদি রাত দিন পড়তেই থাকে তবে সে হয়তো অনেকগুলো বই পড়তে পারবে। আর যারা সবে মাত্র কিন্ডারগার্টেন শুরু করেছে এবং যাদের বয়স ১২ বছর বা তার কম তাদের পক্ষে ওই বয়সে ঠিক কতগুলো বই পড়া সম্ভব? স্কুলের পড়া,খেলাধুলা,টিভি দেখা সব কিছু বাদ দিয়ে যে সময় মেলে তাতে হয়তো ১০ থেকে ২০ টা বই পড়তে পারে। কিন্তু অবাক করা বিষয় হলো পৃথিবীতে এমন অনেক শিশু কিশোর কিশোরী আছে যারা কিন্ডারগার্টেন পার হওয়ার আগেই ৩০০ থেকে ১০০০ বই পড়ে ফেলেছে! অনেকের কাছেই এই তথ্যটি অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে। তারা চাইলে ইন্টারনেটে সার্চ দিলেই এর সত্যতা খুঁজে পাবে। তেমনই কিছু শিশু কিশোর কিশোরীর গল্প শোনাতে চাই।

লানা রেনল্ড ও জুদাহ রেনল্ড

আমেরিকার  পেনসিলভেনিয়ার অন্তর্গত ব্রুকভিল নামক স্থানে একটি লাইব্রেরি আছে যার নাম রেবেকা এম আর্থার্স লাইব্রেরী। স্থানীয় মানুষ এই লাইব্রেরীর সদস্য। সদস্যদের মধ্যে রয়েছে শত শত শিশু কিশোর কিশোরী। সেই সব শিশু কিশোর কিশোরীদের অনেকেই এক হাজার বই পড়ে ফেলেছে আবার কারো কারো সংখ্যা এক হাজারের কাছাকাছি চলে গেছে। তারা এই লাইব্রেরীতে এসেই পড়ছে এবং তারা পড়াটাকে খুব উপভোগ করছে। তাদেরই একজন লানা রেইনল্ড। সে কিছুদিন আগেই এক হাজার বই পড়ে শেষ করেছে। লানা যখন খুব ছোট ছিলো তখন সে দেখতো মা তার পাশে বসে বই পড়ছে। কখনো কখনো মা তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বই পড়তেন। সেই থেকে বইয়ের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয় লানার মনের মধ্যে। সে হয়তো তখনই মনে মনে ভেবে রেখেছিল মায়ের মতই সেও অনেক বই পড়বে। রোজ রাতে ঘুমানোর আগেও মা তাকে বই থেকে গল্প শোনাতো। সেই সব গল্পে রাজপুত্র,রাজকন্যা যেমন থাকতো তেমনি অনেক সুন্দর সুন্দর শিক্ষনীয় ঘটনাও থাকতো। তারপর সে যখন স্কুলে গিয়ে দেখে দেখে পড়া শিখলো তখন সে মায়ের পাশে বসে তার উপযোগী বই পড়তো। 

লানা যতগুলো বই পড়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় বই “দ্য নেস্টিং বার্ড”। কারণ সে পাখির ছানা খুব ভালোবাসতো। লানার ছোট্ট একটা ভাই আছে। মা যেমন ছোট বেলায় তাকে গল্প পড়ে শোনাতো লানা নিজেও পড়তে শেখার পর তার ছোট ভাই জুদাহ রেনল্ডকে পাশে বসিয়ে বই পড়ে শোনাতো। এভাবে তার ভাইও বইয়ের প্রতি ভালোবাসায় আটকা পড়লো। ছোটবেলা থেকে লানা যে সব বই পড়েছিল সেগুলোই এখন জুদাহ নিজে পড়ছে। আর সে এরই মধ্যে ২০০ বই পড়ে ফেলেছে। বয়স যদিও মাত্র ৭ বছর! আর তার প্রিয় বই “পিটি দ্য ক্যাট”।

লানার বই পড়ার শুরুটা তার মায়ের হাতে হলেও সেটা গতি পেয়েছিল রেবেকা এম আর্থার্স লাইব্রেরীর বই পড়া কর্মসূচীর মাধ্যমে। বাংলাদেশে যেমন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বই পড়ার কর্মসূচী আছে অনেকটা সেরকম। লানার মায়ের নাম মাইলিয়া রেনল্ড তার এক বান্ধবীর মাধ্যমে বইপড়া কর্মসূচীর বিষয়ে জানতে পেরেছিলেন। সেই বান্ধবী তার বেবীদেরকে খুব ছোট বেলা থেকেই ওই লাইব্রেরীতে নিয়ে যেতেন এবং নিজেও বই পড়তেন। এটা শুনে মাইলিয়ার মনে হলো তিনি লানাকেও ওই লাইব্রেরীর সদস্য করবেন। বাড়িতে বসে অনেক বই পড়া হয়েছে। আরও কত শত বই আছে যার সব কিনে পড়া যেমন সম্ভব নয় তেমনি অনেক বইয়ের সন্ধানও অনেক সময় পাওয়া হয়না। কিন্তু লাইব্রেরীতে গেলে যেমন অসংখ্য বই পাওয়া যাবে তেমনি পড়ার পরিবেশও ভালো থাকায় পড়ায় গতি আসবে। তাছাড়া মাইলিয়া মনে করতেন এই পড়ার অভ্যাস তার ছোট্ট ছেলে মেয়েকে ভবিষ্যতে সফল হতে সহযোগিতা করবে। সেই থেকে লানা আর তার ভাই জুদাহ বাড়িতে পড়ার পাশাপাশি লাইব্রেরীতে গিয়েও পড়তে শুরু করলো। উল্লেখ্য লানা ও তার ভাই মূলত হোমস্কুল করতো বলে তাদের হাতে ছিলো পড়ার মত অনেক বেশি সময় ও সুযোগ।

বেথেনি ফ্রিটজ

লানা রেনল্ডের মতই বেথেনি ফ্রিটজ নামের মেয়েটিও বইয়ের পোকা। সেও এরই মধ্যে ১ হাজার বই পড়ে শেষ করেছে। বেথেনির দাদি আন ফ্রিটজ বলেছেন বেথেনির বয়স যখন মাত্র তিন বছর তখন থেকে সে লাইব্রেরীর গ্রীষ্মকালীন বইপড়া কর্মসূচীতে নাম দিয়েছিলো। বেথেনিদের বাসায় যে রেফ্রিজারেটর আছে সেটার দরজায় সে একটা চার্ট লাগিয়ে রেখেছিল কবে কখন কোন বই পড়বে। রোজ সে সকালে এবং রাতে ঘুমানোর আগে নিয়ম করে বই পড়তে শুরু করেছিল। বেথেনিও লাইব্রেরী খুব ভালোবাসতো। বইয়ের রাজ্যে সে আনন্দের সাথে বিচরণ করতো। লাইব্রেরী থেকে যখনই যে অফার দিতো সে ও তার পরিবার তা লুফে নিতো। জুদাহের মত বেথেনির প্রিয় বইয়ের নামও “পিটি দ্য ক্যাট”। বেথেনি বলেছে এই বইটি তার বেশি ভালো লেগেছে কারণ যে বিড়ালটিকে নিয়ে এই বইটি লেখা হয়েছে সে খুব মজার মজার ঘটনা ঘটায়। সেগুলো পড়লে খুব আনন্দ হয়, হাসি পায়। 

লাইব্রেরীতে বসে পড়ার পাশাপাশি লাইব্রেরী থেকে পছন্দের বই বাড়িতে নিয়ে যাওয়ারও সুযোগ আছে। একবার তাকে যখন প্রশ্ন করা হলো কোন বইটি তুমি বাড়িতে নিয়ে পড়তে চাও? সে বলেছিল পারলে সবগুলোই সে বাড়ি নিয়ে পড়তে চায়! বইগুলো কিন্তু খুব বেশি বড় না। ছবিযুক্ত দারুণ সব ফিচার বুক। যেখানে ছবির সাথে সাথে কয়েক লাইন করে গল্পবলা হয়। ফলে খুব দ্রুতই পড়া হয়। বেথেনি ঘুম থেকে উঠে বই পড়ে, নাস্তার টেবিলে নাস্তা করতে করতে বই পড়ে। নাস্তা শেষ হলে বই পড়ে। দুপুরে ঘুমোতে যাবার আগে বই পড়ে আবার ঘুম থেকে উঠেও বই পড়ে। রাতে খাবারের আগে বই পড়ে আবার খাবার শেষেও বই পড়ে। আর ঘুমোতে যাবার আগেও বই পড়ে! বই বই আর বই। মুনির হাসানের একটা বইয়ের কথা মনে পড়লো। যে বইটির নামই “ পড়ো পড়ো পড়ো”। বেথেনি বা লানারা যদিও মুনির হাসানের বইটির কথা জানে না কিন্তু তারা যেন পণ করেছে শুধু পড়বে আর পড়বে।

অ্যাবি হলিস:

আরেক পড়ুয়ার নাম অ্যাবি হলিস। বয়স এখন মাত্র ৬ বছর। এ বছর সে কিন্ডারগার্টেন পার করবে। এরই মধ্যে সে রেবেকা এম আর্থার্স লাইব্রেরীর গ্রীষ্মকালীন বই পড়া কর্মসূচীতে অংশ নিয়ে ৯০০ বই পড়ে ফেলেছে। অ্যাবি খরগশের গল্প পড়তে বেশি ভালোবাসে। তার ইচ্ছে ১০০০ বই পড়া শেষ করে সে লাইব্রেরী থেকে পুরস্কার নিবে। এই প্রোগ্রামে যারাই ১০০০ বই পড়া শেষ করেছে তাদেরকে লাইব্রেরী থেকে পুরস্কৃত করা হচ্ছে। এই এক হাজার বই পড়ার জন্য সময় পাওয়া যায় পুরো এক বছর। অনেকে ভাবতে পারে এই বয়সে এক বছরে ১ হাজার বই পড়া কিভাবে সম্ভব? তাদের জন্য একটি তথ্য যুক্ত করেছেন রেবেকা এম আর্থার্স লাইব্রেরীর লাইব্রেরিয়ান। বাচ্চাদের বই পড়ায় উৎসাহ যোগাতে তারা একটি ব্যতিক্রম সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। বাচ্চাদের বইগুলো সাধারণত খুব ছোট হয়। ২০ থেকে ৩০ পৃষ্ঠায় সীমাবদ্ধ হয়। ছবি আর লেখায় বইটি পরিপূর্ণ থাকে। ফলে দেখা যায় একটি বইয়ের শব্দ সংখ্যা ৫০০ থেকে ১০০০ এর কম হয়। ফলে এক বসাতেই পুরো বই পড়া হয়ে যায়। অন্যদিকে কোনো বাচ্চার যদি কোনো বই খুব ভালো লাগে এবং সে যদি সেই বইটি বারবার পড়ে তবে প্রতিবার পড়া হিসেবে একটি সংখ্যা কাউন্ট করা হয়। মানে অ্যাবি হলিস তার পছন্দের বইটি যদি ১০০ বার পড়ে থাকে তবে সে একশোটি বই পড়েছে বলে ধরে নেওয়া হবে। লাইব্রেরিয়াম স্ট্রম মনে করেন রিপিটেশনের মাধ্যমে বাচ্চারা যেন বইয়ের বিষয়বস্তু আরও ভালোভাবে জানতে ও শিখতে পারে তাই এই ব্যবস্থা রাখা।

বই আমাদের মনের চোখ বাড়ায়। আমাদের জ্ঞানভান্ডার সমৃদ্ধ করে। বই পড়ে আমরা যেমন আনন্দ পাই তেমনি শিখতে পারি অনেক কিছু। আমাদের জাতীয় গ্রন্থাগারের গেটের বাইরে এক সময় বড় একটি পাথরের বই তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে বড় করে লেখা ছিলো “ পড়িলে বই আলোকিত হই, না পড়িলে বই অন্ধকারে রই”। আর এ কারণেই বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তাদের কর্মসূচীর নাম দিয়েছিল ”আলোকিত মানুষ চাই”।

৮ জানুয়ারি ২০২৪

তের বছর বয়সে যে ১৩ লাখ গাছ লাগিয়েছে

0

পৃথিবী বদলে দিতে চায় তাদের জন্য বয়স কখনো বাঁধা হতে পারে না।তারা হয় অদম্য সাহসী, অকুতোভয় যোদ্ধা। হার না মানা প্রত্যয় থাকে তাদের হৃদয়ের গভীরে। ফলে কোনো কিছুই তাদেরকে দমিয়ে রাখতে পারে না।তারা তাদের চারপাশ ভালোভাবে দেখে।তারপর সিদ্ধান্ত নেয় যেমন পৃথিবী সে আশা করে, যেমন পরিবেশ সে আশা করে এই পৃথিবী তেমন নেই।তার জন্য নতুন একটি পৃথিবী চাই। আর সেই নতুন পৃথিবী কেউ তাকে গড়ে দিবেনা। সেই পৃথিবী সে নিজেই গড়ে নিবে।আর পরবর্তী প্রজন্মের জন্য রেখে যাবে সুন্দর স্বপ্নময় একটি পৃথিবী।যুগে যুগে এমন মানুষ জন্ম নিয়েছে। তাদের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়।যারা শৈশব থেকে কৈশোরে পা রাখতে রাখতেই এমন কিছু করেছে যার জন্য গোটা পৃথিবী তাদেরকে চিনেছে, তাদেরকে মনে রেখেছে। তেমনই এক কিশোরীর গল্প এটা।তার নাম এলিয়ান ওয়ানজিকু ক্লিস্টন।

কেনিয়ার নাইরোবির হিলভিউ স্টেটের চারপাশে যে সাইকেল  চালাতে ভালোবাসে। যে পৃথিবীকে সবুজে ভরে দিতে চায়।হতে চায় ওয়েনগেরি মাথাইয়ের যোগ্য উত্তরসূরী।যদিও সে এরই মধ্যে ওয়েনগেরি মাথাইয়ের উত্তরসূরী হিসেবে নিজেকে বিশ্ব দরবারে পরিচিত করে তুলতে সক্ষম হয়েছে। ওয়ানজিকুর বয়স ১৩ বছর।জন্ম ও বেড়ে ওঠা কেনিয়ায়। ৮ বছর বয়সেই সে কেনিয়া সরকার কর্তৃক “ইকো ওয়ারিয়র” পুরস্কার পেয়ে কেনিয়ার সর্বকনিষ্ঠ মাশুজা বা জাতীয় হিরো হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।মাত্র ৪ বছর বয়স থেকে গাছ লাগানো শুরু করে ১৩ বছর বয়সে তার লাগানো গাছের সংখ্যা ১৩ লাখ!২০২১ সালে মাত্র দশ বছর বয়সে সে পল হ্যারিস ফেলোশীপ পুরস্কারে ভূষিত হয়।এলিয়ান ওয়ানজিকু বৃক্ষরোপন এবং প্লাস্টিক দুষণ বন্ধের জন্য নিরলস ভাবে কাজ করছে।সে মনে করে ২০৫০ সালের মধ্যে পৃথিবীর ৭০% মানুষ শহরে বাস করবে।সুতরাং যদি আমরা সুস্থ্য সুন্দর জীবনযাপন করতে চাই তবে আমাদেরকে অবশ্যই আমাদের শহরগুলিকে সবুজ ও স্বাস্থ্যকর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।

এলিয়ান ওয়ানজিকুর বয়স যখন মাত্র চার বছর এবং সে কিন্ডারগার্টেনে পড়তো তখন তাদেরকে একটি প্রজেক্ট করতে দেওয়া হয়েছিল হিরোদের উপর।সেই প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করতে গিয়ে সে প্রথম জানতে পারে আফ্রিকার প্রথম নারী নোবেল বিজয়ী এবং কেনিয়ার পরিবেশবাদী বিশ্ববিখ্যাত নারী ওয়েনগেরি মাথাই সম্পর্কে।ছোট্ট এলিয়ান ওয়েনগেরির কাজ সম্পর্কে যতই জানছিলো ততোই মুগ্ধ হচ্ছিল।তার ছোট্ট মনে মাথাইয়ের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা তৈরি হয়েছিল।তার বার বার মনে হচ্ছিল ইস আমিও যদি তার মত হতে পারতাম। এবং তাকে সে আইডল মেনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল আমিও তারমতই হবো। কিন্তু সে আরো বেশি পড়াশোনা করতে গিয়ে জানতে পারে তার এই আইডল মানুষটি আজ আর পৃথিবীতে নেই।তখন ছোট্ট এলিয়ানের মনে একটি ভাবনার উদয় হয়। সে সিদ্ধান্ত নেয় তাহলে আমিই হবো এই কাজের অগ্রগামী নেতা।মাথাইয়ের কাজ সম্পর্কে জানতে গিয়েই গাছের প্রতি ভালোবাসা তৈরি হয়েছিল এবং বৃক্ষরোপনে আগ্রহী হয়ে উঠেছিল ছোট্ট এলিয়ান।বহু গল্পে সে শুনেছিল ওয়েনগেরি মাথাই বহু আম গাছ লাগিয়েছেন। আর এলিয়ান নিজেও আম খুব পছন্দ করে।তার মনে হতো সে জন্মেছে আম খাওয়ার জন্য!সে যখন ওয়েনগেরি মাথাইকে নিয়ে বিস্তারিত পড়াশোনা শুরু করলো তখন তার বার বার মনে হতো আমিও এটা করতে পারবো।আর সেদিনই সে ওই প্রজেক্ট শেষ করে কিন্ডারগার্টেন থেকে বাড়ি ফিরে প্রথমেই একটি কমলালেবু গাছ লাগালো।আর রাতে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বললো মা তুমিকি আমাকে প্লিজ কারুরা বনে নিয়ে যেতে পারবে। এই বনটি নাইরোবির অসাধারণ একটি বনাঞ্চল। এভাবে বার বার আব্দার করার কারণে একসময় বিরক্ত হয়ে হলেও তার মা রাজি হলেন এবং বললেন ঠিক আছে নিয়ে যাবো। তারপর মায়ের সাথে সেখানে গিয়ে আমি মুগ্ধ ও বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাই।যতদূর চোখ যায় ছোট বড় নানা ধরনের বৃক্ষ। চোখ জুড়িয়ে যায়। এমন সুন্দর সবুজ পৃথিবীইতো গড়তে হবে।সেখানে কাছেই একটি দোকান ছিলো। যেখানে গাছের খুব ছোট ছোট চারা বিক্রি করা হয়। এলিয়ান তার মাকে অনুরোধ করলো মা এখান থেকে কয়েকটা চারা কিনে নিয়ে যাই।মা তার কথায়রাজি হলেন এবং কয়েকটি চারা কিনে বাড়ি নিয়ে গেলেন।সেদিনই সেগুলো লাগানো হলো।আর সেখান থেকেই তার মধ্যে বৃক্ষরোপনের প্রতি আগ্রহ বেড়ে গেলো, ভালোবাসা বেড়ে গেলো। কাছাকাছি থাকা স্কুলগুলোতে সে গাছ লাগাতে শুরু করলো।এটা তার কাছে খুবই আনন্দের বিষয় হয়ে উঠলো। তার মনে হতো গাছেরা যেন তার সাথে কথা বলছে চুপিচুপি।

এর কয়েক বছর পর এলিয়ান তরুণদের সাথে নিয়ে মায়ের সহযোগিতায় একটি সংগঠন দাড়করালো। নাম রাখলো “চিলড্রেন্স উইথ নেচার”।এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান কাজ ছিলো তার মতই যে সব শিশু কিশোর কিশোরী সবজু পৃথিবী গড়তে চায়,গাছ ভালোবাসে তাদেরকে সংযুক্ত করতে।যেন দশে মিলে করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ এমনটি হয়ে ওঠে।তারা সিদ্ধান্ত নিলো জলবায়ু নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে। বৈশ্বিক উষ্ণতা কমাবে।একই সাথে তাদের এই কার্যক্রম সাস্টেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গল বা এসডিজির সাথে যুক্ত হলো।পাশাপাশি তাদের এই কার্যক্রম কেনিয়ার ভিশন ২০৩০ এর সাথেও যুক্ত হলো।তাদের এই সংগঠনটি মূলথ সেই সব শিশুদের অর্ন্তভূক্ত করে যারা তাদের মতই গাছ লাগাতে ভালোবাসে এবং যারা নিজেদের জীবনকে সুন্দর ও নিরাপদ করার পাশাপাশি তাদের সন্তানদের জন্য একটি সুন্দর পৃথিবী রেখে যেতে চায়।

এলিয়ান তার দলবল নিয়ে স্কুলে স্কুলে গিয়ে শিশু কিশোর কিশোরীদের সাথে এসব নিয়ে কথা বলতে শুরু করে। সে বুঝাতে চায় কেন গাছ লাগানো প্রয়োজন এবং কিভাবে প্লাস্টিক আমাদের পরিবেশকে নষ্ট করছে । কিভাবে এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব।আর এভাবেই সে ও তার দল ৭৯টি স্কুলে গিয়েছে এবং রোপন করার জন্য তাদেরকে গাছের বীজ দিয়েছে।এছাড়াও বিভিন্ন হোটেল ও পার্কেও তারা বীজ উপহার দিয়েছে শুধুমাত্র পরিবেশগত পরিবর্তন আনার জন্য।এতো এতো বীজ এবং চারা কেনার জন্য প্রয়োজন হয়েছে অনেক অনেক  টাকা। ছোট্ট এই কিশোরী মেয়েটির অর্থের যোগান হয়েছে বিভিন্ন ভাবে। শুরু করলে সফলতা আসেই। আমাদের দেশে যেমন একটি কথা প্রচলিত আছে টাকা ভূতে যোগাবে। এলিয়ানের টাকা যদিও কোনো ভূতে যোগায়নি তবে মাধ্যম তৈরি হয়েছে। সে শুরু করেছিলো নিজের টিফিনের টাকা দিয়ে, নিজের জমানো টাকা দিয়ে এবং মায়ের কিছু জমানো টাকার মাধ্যমে।পরবর্তীতে তার এই কাজ দেখে অনেকেই টাকা দিয়ে, বীজ দিয়ে, চারা দিয়ে তাকে সহযোগিতা শুরু করায় তার বৃক্ষরোপন কর্মসূচি আরও বেগবান হয়।

কেনিয়ার নাইরোবিতে জন্ম নেওয়া এলিয়ান নিজেও কি কখনো ভেবেছিল তার এই কার্যক্রম এভাবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে। শুধু কেনিয়া নয় পুরো আফ্রিকা মহাদেশের সব দেশ ছাড়িয়ে এখন এই বৃক্ষরোপন কর্মসূচি তারা আমেরিকাতেও চালু করেছে। সব দেশেইতো  মানুষ কম বেশি গাছ লাগায়। কিন্তু কিশোরী এলিয়ান তার সংগঠনের মাধ্যমে পুরো আফ্রিকাকে সবুজায়নের পাশাপাশি আমেরিকাতেও কার্যক্রম বেগবান করেছে।৪ বছর বয়সে যে শিশুটি গাছ লাগানো শুরু করেছিল তার বয়স এখন ১৩। সে এখন কিশোরী। এই নয় বছরে সে তার সংগঠনের মাধ্যমে তের লাখ গাছ লাগিয়েছে।এলিয়ান পৃথিবীর সব কিশোর কিশোরীর উদ্দেশ্যে বলেছে “তোমরা যে যেখানেই থাকো না কেন, তোমরাও চাইলে আমাদের সাথে যুক্ত হতে পারো একটি সুন্দর নির্মল সবুজ পৃথিবী গড়ার এই আন্দোলনে”আর এটা করতে হলে তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে ভিজিট করে নিজের সম্পর্কে বলতে হবে,তুমি কি করতে চাও এবং কিভাবে করতে চাও সেটা জানাতে হবে এবং কিভাবে তুমি সহযোগিতা করতে চাও সেটাও বলতে হবে।

শুধু কেনিয়ার নাইরোবিতে গাছ লাগিয়েই থেমে যায়নি এলিয়ান। ওয়েনগেরি মাথাইকে আদর্শ মেনে সে সবুজায়নের এই চেষ্টাকে সারা বিশ্বেই ছড়িয়ে দিতে চেষ্টা করছে। এখন তার লক্ষ্য সাহেল মরুভূমির বুকে ৮ হাজার কিলোমিটার জুড়ে বনায়ন করার।যা কিনা পুরো আফ্রিকা মহাদেশব্যাপী প্রশস্থ। তার লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ মিলিয়ন অবক্ষয়িত জমি পুনরোদ্ধার করা এবং ২৫০ মিলিয়ন টন কার্বন রিসাইক্লিং করা।সে একই সাথে প্রচুর বাঁশ লাগাতে চায় যা দিয়ে নদী পরিস্কার করা যাবে এবং সেগুলো বিক্রির মাধ্যমে তার কার্যক্রম চালিয়ে নিতে পারবে এবং প্রচুর বাবলা গাছ লাগাতে চায় যেটা পর্যাপ্ত ছায়া দিবে।আর এই বছরে সে সাহিল মরুভূমিতে ১ মিলিয়ন গাছ লাগানোর টার্গেট নিয়েছে।সম্প্রতি কেনিয়ার পরিবেশ ও বন মন্ত্রনালয়ের কেবিনেট সেক্রেটারি কেরিয়াকো টোবিকো তাকে “মিচুকি পার্ক আরবান গ্রীন স্পেচ” প্রকল্পের কো চেয়ার নির্বাচন করেছে।যেদিন এই পার্ক উদ্ভোধন করা হয়েছিল সেদিন এলিয়ান কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট উহুরু মুইগাই কেনিয়াত্তাকে পার্কের সব দিকে ঘুরিয়ে দেখিয়েছিল।আর এই প্রজেক্টে এলিয়ানের দায়িত্ব হলো সবুজায়ন ঠিক রেখে শিশুদের খেলার সুযোগ তৈরি করা এবং খেলতে খেলতে শেখার ব্যবস্থা করা।

মানুষ বাসস্থান তৈরির জন্য এখন প্রতিনিয়ত গাছ কাটছে। এতে করে পরিবেশের উপর বিরুপ প্রভাব পড়ছে।এলিয়ান চায় অতি প্রয়োজন ছাড়া যেন গাছ কাটা না হয় এবং কাটলেও অধিক পরিমান গাছের চারা লাগাতে হবে।সে যখন আরও ছোট ছিল তখন একবার তার স্কুলের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় খুব মন খারাপ হয়ে গিয়েছিল। স্কুলের পাশে সবচেয়ে বড় যে  গাছটি ছিলো সেদিন সেটা কেটে ফেলা হয়েছিল। এই গাছের সাথে তাদের ছিল কত স্মৃতি। এখানে বসে বন্ধুরা মিলে বই পড়তো, গল্প করতো। গাছটি কেটে ফেলায় তার হৃদয়ে আঘাত লেগেছিল।সেই বয়সেই সে জানতো যে গাছটি কেন তারা কাটছে। গাছটি না কাটলে স্কুলের জন্য ভবন নির্মানের মত যথেষ্ট জায়গা পাওয়া যেতো না।তবে সে সবচেয়ে বেশি চিন্তিত মানুষ কেন এখনো পরিবেশ যে ভয়াবহ ঝুকিতে আছে সেটা বুঝতে পারছে না। কেন মানুষ অধিক হারে গাছ লাগাচ্ছে না।কিশোরী এলিয়ান মনে করে বড়রা পরিবেশ নিয়ে মোটেও চিন্তিত না।সে মনে করে বড়দেরই সবচেয়ে বেশি অবদান রাখা উচিত। তারাই সবচেয়ে ভালো জানে যে পৃথিবী থেকে গাছের সংখ্যা কমে গেলে পরিবেশের উপর কেমন প্রভাব পড়বে। কতটা ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে। ছোটদের মত এই পৃথিবীটাতো বড়দেরও। এই দিক থেকে তার মা খুবই ভালো। যদিও তিনি একটু লাজুক। নিজেকে প্রকাশ করতে চান না। তবে এলিয়ানের এই বৃক্ষরোপন কর্মসূচির অর্থের যোগান তার মাধ্যমেই হয়ে থাকে।

গাছ লাগানোর প্রতি এমন ভালোবাসার জন্য অনেক সময় তাকে বিরুপ পরিবেশের সাথে মোকাবেলা করতে হয়েছে। নতুন স্কুলে গিয়ে অনেক কটুকথাও শুনতে হয়েছে। কিন্তু সে দমে যায়নি।সে তার লক্ষ্যে অবিচল ছিলো।এলিয়ানের মতে শুধু সুন্দর সু্ন্দর রাস্তা,উচু উচু ভবন, দামি দামি কার থাকাটাই উন্নয়ন নয়। পাশাপাশি বায়ূ দূষণ কমাতে হবে, পানি দূষণ কমাতে হবে,অপুষ্টিতে ভুগে শিশু মৃত্যুর হার কমাতে হবে। এই যে বৃক্ষনিধনের ফলে যে বিরুপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিবে তা হয়তো আজ দেখা যাচ্ছে না কিন্তু এর ভয়াবহ রূপ আরও অনেক বছর পর উপলব্ধি করা যাবে যখন প্রতিহত করার সুযোগ থাকবে না। তাই এখন থেকেই সাবধানতা অবলম্বন করা জরুরী।এলিয়ানের আফসোস দেশে দেশে এতো তরুন, যুবক আছে যারা নিজেদের ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবলেও সুন্দর নির্মল পৃথিবী কিভাবে গড়ে তোলা যায় তা নিয়ে ভাবে না। কিভাবে শিশুদের জন্য সুন্দর একটি পৃথিবী নির্মাণ করা যায় সেই চিন্তা কারো মাথায় নেই।  

যারা গাছ লাগায় এলিয়ান তাদেরকে ভালোবাসে। তবে সে মনে করে আমাদের বুঝতে হবে কোন গাছ কোন জায়গায় লাগানো উচিত যেন ইকোসিস্টেমে কোনো বাধা তৈরি না হয়।এলিয়ান তার বয়সী কিশোর কিশোরীদের উদ্দেশ্যে বলেছে তোমাদের জন্য আমার উপদেশ হলো শুরু করো।মনে করো তুমি কিছু খাওয়া শুরু করেছ যার মধ্যে বীজ আছে। তুমি খাওয়ার পর সাথে সাথেই সেই বীজটি মাটিতে পুতে দাও। যেন একদিন তা থেকে চারা জন্মাতে পারে। শুরুটাতো এভাবেই হতে হয়।ঠিক শিশুদের হাটতে শেখার মত ছোট ছোট পদক্ষেপ দিয়েই শুরু করো। পরিবর্তন আনতে হলে তুমি যতটুকু পারো সেটাই শুরু করো।শুরুতেই বিরাট কিছু করতে না পেরে হতাশ হওয়া যাবে না। এছাড়াও তুমি যা করতে চাও সেটায় তোমার বাবা মাকেও রাজি করাতে চেষ্টা করতে হবে। যতক্ষণ তারা রাজি হবে না ততক্ষণ তাদের রাজি করাতে চেষ্টা অব্যাহত রাখো। কারণ তারা রাজি হয়ে গেলে তুমি তোমার কাজে নানা ভাবে সহযোগিতা পাবে।তারপর এক সময় নিজ দেশের সরকারকেও প্রভাবিত করতে হবে। কারণ তাদের হাতে অনেক জমি আছে, অনেক ক্ষমতা আছে। তারা একটু চেষ্টা করলেই খুব সহজেই বনায়নে সফল হতে পারে।কখনোই হতাশ হওয়া যাবে না, হাল ছেড়ে দেওয়া যাবে না।সম্প্রতি এলিয়ান বিখ্যাত ফুটবলার ডেভিড ব্যাকহামের সাথে সম্মিলিত ভাবে কলেরা নিমূল বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধির কাজে যুক্ত হয়েছে।এলিয়ান কেনিয়ার সর্বকনিষ্ট পরিবেশবিদ হিসেবে শিশু কিশোর কিশোরীদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রতিনিয়ত কাজ করে চলেছে। সম্প্রতি বিশ্ব বিখ্যাত ব্লগার “নাস ডেইলি” তাকে নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।এলিয়ান এখন পযর্ন্ত তিনটি বই লিখেছে।

-জাজাফী

২১ নভেম্বর ২০২৩

মহেশখালী দ্বীপ এক অপার সম্ভাবনাময় পযর্টন এলাকা

0

কর্মব্যস্ত জীবনে নিজেকে একটু স্বস্তি দিতে অনেকেই ছুটি পেলেই ঘুরতে বেরিয়ে পড়েন।ভ্রমণপিয়াসী মানুষের কাছে একটি কমন প্রশ্ন হলো পাহাড় না সাগর? মানে পাহাড়ে ঘুরতে ভালোবাসেন নাকি সাগরে। কারো কাছে পাহাড় ভালো লাগে, আবার কারো কাছে সমুদ্র। কিন্তু এমনওতো মানুষ আছে যাদের একই সাথে পাহাড় এবং সাগর দুটোই ভালো লাগে।সেই সব মানুষের জন্য দুটি আলাদা এলাকায় গিয়ে আলাদা ভাবে পাহাড় আর সাগর দেখার সময় করে ওঠা যেমন কঠিন, তেমনি খরচও যোগান দেওয়া অনেক সময় কঠিন হয়। কিন্তু কেমন হতো যদি একই জায়গায় পাহাড়ের সাথে সাথে সাগরের দেখা মিলতো। হ্যা কক্সবাজার এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। মেরিন ড্রাইভ ধরে সামনে প্রায় নব্বই কিলোমিটার জুড়ে একদিকে পাহাড় আরেকদিকে সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ আছে। তবে এই পাহাড়গুলোতে চড়ার খুব একটা সুযোগ নেই। শুধুমাত্র হিমছড়িতে থাকা পাহাড়ে পযর্টকরা উঠতে পারেন। যদি কারো এর চেয়েই উঁচু পাহাড়ে উঠতে ইচ্ছে করে এবং পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে সাগর দেখতে ইচ্ছে করে, তাহলে তাদের জন্য আকর্ষণীয় পযর্টন কেন্দ্র হতে পারে মহেশখালী ও কুতুবদিয়া। বিশাল সাগরের জলরাশির মাঝে দুটি দ্বীপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি কক্সবাজার শহরের উত্তর- পশ্চিম কোণায় স্ব-মহিমায় দণ্ডায়মান এ দ্বীপাঞ্চল। বাঁকখালী নদীর কিছু অংশ এবং বঙ্গোপসাগরের মহেশখালী চ্যানেল পাড়ি দিয়ে যেতে হয় মহেশখালী। আবার চকরিয়া উপজেলার বদরখালী-মহেশখালী সংযোগ ব্রিজ হয়ে সড়ক পথেও যাওয়া যায় মহেশখালী।

মহেশখালী কক্সবাজার জেলার একটি দ্বীপ উপজেলা। কক্সবাজার থেকে এটি মাত্র ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। প্রায় ৩৬২ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের মহেশখালী উপজেলায় সোনাদিয়া, মাতারবাড়ি, ধলঘাটা নামে তিনটি দ্বীপ রয়েছে। ১৮৫৪ সালে গড়ে ওঠে এই দ্বীপটি। তবে জনশ্রুতি আছে ১৫৫৯ সালের প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ফলে মূল ভূ-খন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই দ্বীপের সৃষ্টি হয়। বৌদ্ধ সেন মহেশ্বর থেকেই প্রায় ২০০ বছর আগে এই জায়গায়র নামকরণ হয়। যা মহেশখালী দ্বীপ নামেও পরিচিত। পান, মাছ, শুঁটকী, চিংড়ি, লবণ এবং মুক্তার উৎপাদনে সমগ্র বাংলাদেশে এই উপজেলার সুনাম রয়েছে। কক্সবাজার থেকে ৪-৫ ঘন্টা সময় ব্যায় করলেই মহেশখালী দ্বীপ থেকে ঘুরে আসা যায়।

মহেশখালীর দক্ষিণ প্রান্তের নয়ন জুড়ানো জেটিদ্বয় পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। গ্রাম বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য সারিসারি পানের বরজ আর সুপারি বাগান, পাহাড়ি কাঠ, ফল-ফলাদির বাগান, লবণের মাঠ, মাছের ঘেরের নয়নাভিরাম দৃশ্য, ফসলের সবুজ-শ্যামল মাঠ ও প্রাকৃতিক অপরূপ সৌন্দর্য সবাইকে আনমনা করে। সোনাদিয়ার শুঁটকি উৎপাদন ক্ষেত্র ও গভীর সমুদ্রে মাছ ধরা জেলেদের হৈ-হুল্লোড়, সৈকতে ঝুড়ি হাতে শামুক কুড়ানো বালক-বালিকাদের চপলতা, ধান ও লবণ চাষিদের হাড়ভাঙ্গা খাটুনির ফাঁকে-ফাঁকে ক্লান্তি নাশী ভাটিয়ালী এবং আঞ্চলিক গান আর ভরা জোয়ারে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ মনকে আন্দোলিত করে। মহেশখালী জাতীয় অর্থনীতিতে রাখছে অনেক বড় মাপের অবদান। দেশের অন্যতম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী সম্পদ চিংড়ি উৎপাদিত হয় মহেশখালীতে। পোশাক শিল্পের পরেই চিংড়ি দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনৈতিক খাত। মহেশখালীতে উৎপাদিত বাগদা, লইল্যা চিংড়ি ও কাঁকড়া এবং অন্যান্য সামুদ্রিক সু-স্বাদু মাছ রফতানি করে সরকার বার্ষিক কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আয় করছে।

মহেশখালি বাংলাদেশের একমাত্র পাহাড়িয়া দ্বীপ। এ দ্বীপের মৈনাক পর্বতের উপরে রয়েছে আদিনাথ মন্দির। এ দ্বীপের কারুকার্য এখানে আসা দর্শনার্থীদের আকৃষ্ট করে। এছাড়াও বছরের ফাল্গুন মাসে এখানে আদিনাথ মেলা অনুষ্টিত হয়। এখানে রয়েছে বেশ কিছু বৌদ্ধ বিহার, জলাবন ও নানা প্রজাতির পশুপাখি। এছাড়াও আছে রাখাইন পাড়া ও স্বর্ণ মন্দির। চাইলে ঝাউবাগান ও চরপাড়া বীচ থেকে ঘুরে আসতে পারবে যে কোনো পযর্টক। চলতি পথেই দেখতে পাবে পান গাছের বাগান আর লবণের মাঠ। মহেশখালীর পানের সুনাম সারা বাংলাদেশ ব্যাপী। তাই যারা কখনো পান খায়নি তারাও এখানে এসে মিষ্টি পান খেতে ভোলে না। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপূর্ব লীলাভূমি যেন সোনাদিয়া-মহেশখালী দ্বীপ। মূল ভুখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হলেও এ দ্বীপ সাধারণ মানুষ ও পর্যটকদের কাছে সব সময় আকর্ষণীয় বিষয়। সারি সারি নয়নাভিরাম প্যারাবন আর এর পাশ ঘিরে অসংখ্য ছোট বড় খাল জালের মতো বিছিয়ে রয়েছে। সোনাদিয়া দ্বীপে সমুদ্রের পাশ ঘেঁষে গড়ে ওঠা সুউচ্চ বালিয়ারীর তুলনা দেশে দ্বিতীয়টি নেই। দ্বীপের সমুদ্র সৈকতের বেলাভূমিতে পানির কিনার ঘেঁষে লাল কাঁকড়া, সবুজ বনানী ও জীববৈচিত্র্যে ভরা এ দ্বীপটি যেন দেশী-বিদেশী পর্যটকদের কাছে টানে। এছাড়াও সুবিশাল প্যারাবন ও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ পাহাড়ী বনাঞ্চল পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণে পরিণত করেছে। তবে সোনাদিয়া দ্বীপকে পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষার জন্য ইতোমধ্যে ১৯৯৯ সালে ইকোলজিক্যাল ক্রিটিক্র্যাল এরিয়া হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এ দ্বীপের পরিবেশের মান উন্নয়নে ইতোমধ্যে পরিবেশ অধিদফতরের পক্ষ থেকে নেয়া হয়েছে বনায়ন কার্যক্রম।

সনাতন ধর্মীয় পুরোহিতদের মতে মহাদেব মহেশের নামানুসারে মহেশখালীর নামকরণ। ভূ-তাত্ত্বিকদের মতে মহেশখালী মূলত: কোন দ্বীপ ছিল না, কোন মহা প্রাকৃতিক পরিবর্তন বা দুর্যোগের কারণে মূল ভূখ- হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে এ দ্বীপের সৃষ্টি। টেকনাফ হতে সিলেট পর্যন্ত দেশের পূর্বাঞ্চলে টারশিয়ারি যুগের পাহাড়সমূহের অবিচ্ছেদ্য অংশই দ্বীপ মহেশখালীর দক্ষিণ থেকে উত্তর জুড়ে অবস্থিত। যেখানে রয়েছে মুসলিম, হিন্দু ও রাখাইন সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের সংমিশ্রণে বাঙ্গালী জাতিসত্তার এক অপূর্ব সম্মিলন।দেশের মূল ভূখ- থেকে বিছিন্ন জনপদ মহেশখালী শিক্ষা-দীক্ষায় এগিয়ে যাচ্ছে ধীর পায়ে। স্কুল-কলেজ, কাওমী ও আধা-সরকারি মাদ্রাসাসমূহের পাশাপাশি অবরোধবাসিনী নারী সমাজকে যুগোপযোগী শিক্ষায় শিক্ষিতকরণের লক্ষ্যে গড়ে উঠেছে বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, বালিকা মাদ্রাসা ও মহিলা কলেজ।

রয়েছে প্রাচীন ও আধুনিক স্থাপত্য শৈলীর অসংখ্য মসজিদ, মন্দির ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের দৃষ্টি নন্দন ক্যাং। মহেশখালী প্রাকৃতিকভাবে চমৎকার ভৌগোলিক সৌন্দর্য নিয়ে গঠিত ও অবস্থিত। বলতে গেলে এমন দ্বীপমালা পৃথিবীতে বিরল। আয়তনের দিক থেকে মালদ্বীপ, সিঙ্গাপুর এবং হংকং এর প্রায় কাছাকাছি। মহেশখালীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো চারপাশে সমুদ্র ও জলরাশি, যেন ভাসমান বিশাল এক জাহাজ বহর আর উত্তর-দক্ষিণ লম্বা ও উঁচু পর্বতমালা, মনে হয় যেন জাহাজ বহরের সু-উচ্চ পাল। কাছ থেকে আর দূর থেকে যেখান থেকে দেখুন না কেন সমুদ্র ঘেঁষে উঁচু পাহাড় যে কোনো প্রকৃতিপ্রেমী ও নান্দনিক দৃষ্টি সম্পন্ন মানুষকে অনায়াসেই আকৃষ্ট করবে।

মহেশখালীর সোনাদিয়া বিখ্যাত শুঁটকি উৎপাদন কেন্দ্রের জন্য। তদুপরি সোনাদিয়া আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট হিসেবেও ভ্রমণ বিলাসী মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয়। অর্থনীতির আর একটা বড় খাত হলো লবণ। এ দ্বীপে উৎপাদিত লবণ দেশের সিংহভাগ জনগোষ্ঠীর প্রয়োজন মেটাতে সক্ষম। বলা যায়, প্রায় এককভাবে বাংলাদেশের সমস্ত লবণ কক্সবাজার জেলায় উৎপাদিত হয়।যাঁরা সাগরপথে ট্রলার বা স্পিডবোটে চড়ে কোথাও যাননি, তাঁদের জন্য মহেশখালী ভ্রমন হবে সবচেয়ে বেশি উপভোগ্য। স্পিডবোটে বা ট্রলারে চড়ে বাঁকখালী চ্যানেল পার হওয়ার সময়টা দারুণ। সকালবেলা দূরে রোদ আর নদীর অপরূপ সৌন্দর্য দেখতে দেখতেই পৌঁছে যাবেন গন্তব্যে। সুবিশাল পাহাড় আর অপরূপ দৃশ্যের এই দ্বীপ।

পযর্টন ও অর্থনৈতিক ভাবে অপার সম্ভাবনাময় মহেশখালী দ্বীপের রয়েছে অনেক সীমাবদ্ধতা। শিক্ষা ক্ষেত্রে অনগ্রসরতা, যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহালদশা, স্বাস্থ্য খাতে অরাজকতা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এ অঞ্চলের মানুষকে ব্যথিত করে।ফলে পযর্টন শিল্পের প্রসারও সেভাবে ঘটছে না। শহরের সাথে এই দ্বীপের মানুষের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম নৌকা বা স্পিড বোট। প্রসব বেদনায় কাতর মহিলারা ছটফট করতে থাকে নৌকা কিংবা স্পিড বোটে। অনেক সময় বাচ্চা প্রসব হয়ে যায় নৌকা কিংবা স্পিড বোটে।অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলা ভূমি মহেশখালীর যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি করতে না পারলে পযর্টন শিল্পের এই অপার সম্ভাবনাময় দ্বীপটি থেকে আমরা সেভাবে সুফল ভোগ করতে পারবো না।আজকে যারা কক্সবাজারকে সত্যিকারের আকর্ষণীয় পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার গালভরা বুলি আওড়ান, তাদের ভেবে দেখা উচিত শুধুমাত্র একটি সৈকত, হিমছড়ির একটি মরা ঝর্ণা ও ডুলাহাজারার একটি নাম মাত্র সাফারী পার্ক দিয়ে তারা দেশ-বিদেশের পর্যটকদের মন জয় করা সম্ভব নয়।

এই শহরে নেই কোন আনন্দ-বিনোদনের সু-ব্যবস্থা। এমতাবস্থায় কক্সবাজারকে সত্যিকারের পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে হলে কক্সবাজার শহরের পার্শ্ববর্তী অঞ্চলসমূহে নতুন নতুন পর্যটন স্পট সৃষ্টি করতে হবে। বিশেষত: প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সাগর তনয়া মহেশখালীকে অপরূপ সাজে সজ্জিত করতে হবে এবং মহেশখালীর পর্যটন সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হবে। দ্বীপ অঞ্চলটিকে একটি আকর্ষণীয় পর্যটন ও বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত করা যেতে পারে। মহেশখালীর রাখাইন পল্লী ও ক্যাং সমূহের প্রয়োজনীয় সংস্কার, রাখাইনদের হস্তশিল্প ও সংস্কৃতি ইত্যাদিকে কেন্দ্র করে একটি স্বতন্ত্র রাখাইন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে তাকে একটি পর্যটন স্পটে পরিণত করা যেতে পারে।

মহেশখালীর পর্যটন সম্ভাবনার অন্যতম প্রতিবন্ধক হলো দুর্গম যোগাযোগ ও অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা। উল্লেখ্য যে, আদিনাথ স্পটে প্রতিবছর লাখ লাখ পর্যটক আগমন করে থাকে। আসা-যাওয়ার পথে তাদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের সম্মুখীন হতে হয়। মহেশখালীর প্রতি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার লক্ষ্যে কক্সবাজার-মহেশখালী চ্যানেলে পর্যাপ্ত স্পিডবোট, নৌকা, লঞ্চ ও সী-ট্রাক চালু পূর্বক অস্বাভাবিক ভাড়া বৃদ্ধি রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য মহেশখালী থানা প্রশাসনকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে আদিনাথ অঞ্চলে একটি পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করা যেতে পারে। অবিলম্বে বাঁকখালী ও মহেশখালী চ্যানেলের ভরাট হওয়া নদী ড্রেজিং এর জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

মহেশখালীতে স্থলপথে যাতায়াতের প্রধান সড়ক গোরকঘাটা-জনতাবাজার সড়কের ২৭ কি. মি. রাস্তা পূর্ণাঙ্গরূপে পাকা করার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।মহেশখালীতে বাস্তবায়নাধীন কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প ও প্রস্তাবিত গভীর সমুদ্র বন্দর পর্যটন সম্ভাবনার এক নবদ্বার উন্মুক্ত করবে। অভাগা দ্বীপাঞ্চলবাসীর সুবিধার্থে না হলেও মহাভাগ্যবতী জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কোম্পানীগুলোর ব্যবসায়িক সুবিধার্থে মহেশখালীর সাথে কক্সবাজার শহরের সরাসরি স্থল যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে যমুনা কিংবা পদ্মাসেতুর ন্যায় একটি সেতু নির্মাণ করা যেতে পারে।কক্সবাজার জেলার মহেশখালী উপজেলার আরেকটি পযর্টন স্পট হলো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ সোনাদিয়া দ্বীপ। দ্বীপের মোট আয়তন ৭ বর্গকিলোমিটার। জেলা সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে কুতুবজোম ইউনিয়নে এর অবস্থান। এ দ্বীপের দুটি গ্রামে বর্তমানে প্রায় ১৭শ’ লোকের বসবাস। বাঁকখালী নদীর মোহনায় মহেশখালী পয়েন্ট থেকে স্পিডবোটে মাত্র ১৫ মিনিটের দূরত্বে অবস্থিত সোনাদিয়া দ্বীপ। বর্তমানে ক্লাইমেট রিজিলিয়েন্ট পার্টিসিপেটরি এফরেস্টেশন এ্যান্ড রিফরেস্টশন প্রকল্পের মাধ্যমে সোনাদিয়া দ্বীপের বনায়ন কার্যক্রম চালু আছে। এছাড়াও জলপাই রঙের সামুদ্রিক কাছিম ও পরিযায়ী পাখি সংরক্ষণের জন্য প্রকল্প নেয়া হয়েছে। অসংখ্য খাল ও প্যারাবনের সারি গিয়ে মিলেছে দ্বীপের মূল ভূখন্ডে। যাওয়ার পথে নদী ঢেউ আর প্যারাবনের বাতাসের দোল খাওয়ার দৃশ্য যে কারও মন কেড়ে নেবে। একবার গেলে বারবার যেতে ইচ্ছে হবে এ দ্বীপে। দেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় প্যারাবনের একটি বিরাট অংশ সোনাদিয়া দ্বীপে দেখা যায়। সোনাদিয়ার প্যারাবন বাইন বৃক্ষসমৃদ্ধ। দেশে বিদ্যমান ৩ প্রজাতির বাইন গাছই এখানে পাওয়া যায়। এছাড়া প্যারাবনে গেওয়া হরিগোজা, নুনিয়া, ঝাউ ইত্যাদি ম্যানগ্রোভ উদ্ভিদও রয়েছে। প্যারাবনের ভেতরে সুন্দরবনের মতো ছোট ছোট নদীর দু’পাশে নয়নাভিরাম দৃশ্যও চোখে পড়ে।

সোনাদিয়ার প্যারাবন চর, খাল ও মোহনা নানা প্রজাতির মাছ ও অমেরুদন্ডী প্রাণীর গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। দ্বীপটির প্যারাবনসংলগ্ন খালে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ যেমন- বাটা, কোরাল, তাইল্যা, দাতিনা, কাউন ও পোয়া পাওয়া যায়। সোনাদিয়া দ্বীপ ভ্রমণে প্রায় ১৪ কিলোমিটার প্রশস্ত সৈকত, সৈকত ঘেঁষে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকা সুবিশাল ঝাউবন, সুউচ্চ বালিয়ারী, জালের মতো ছোট-বড় অসংখ্য খালবেষ্টিত ম্যানগ্রোভ বন, বিস্তীর্ণ ল্যাগুন্যাল ম্যাডফ্লাট, কেয়া নিসিন্দার ঝোপ, বিচিত্র প্রজাতির জলচর পাখি চোখে পড়বে। সমুদ্রের পাশ ঘেঁষে অবস্থিত সুউচ্চ বালিয়ারীর তুলনা যেন দেশে দ্বিতীয়টি নেই। সমুদ্র ও সৈকত থেকে ঝাউবনের দৃশ্য অপূর্ব শোভাবর্ধন করে। সৈকত এবং বালিয়ারীর বিপন্ন জলপাই বর্ণের সামুদ্রিক কাছিমের ডিম পাড়ারও উপযোগী স্থান এটি। স্থানীয়রা জানান, এখানে সামুদ্রিক সবুজ কাছিমও ডিম পাড়তে আসে। সমুদ্র সৈকতের বেলাভূমিতে পানির কিনার ঘেঁষে বিচরণ করতে দেখা যায় লাল কাঁকড়া।

শীতকালে সোনাদিয়া দ্বীপে নানা ধরনের স্থানীয় ও জলচর পাখির আগমন ঘটে। চর এবং খালের ধারে জলচর পাখির বেশি সমাগম ঘটে। এখানে ৭০ প্রজাতির জলচর পাখির দেখা মেলে। ডিসেম্বর থেকে ফেরুয়ারি পর্যন্ত সময়ে সোনাদিয়ায় জলচর পাখি বিশেষত দেশী-বিদেশী কাদাখোচা পাখির মেলা বসে এখানে। এই দ্বীপটিকে আকর্ষনীয় পযর্টনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হলে যাতায়াত ব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি রাত্রী যাপনের সুন্দর ব্যবস্থা করতে হবে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। কক্সবাজার সদর থেকে মহেশখালী পযর্ন্ত কেবল কারের ব্যবস্থা করলে পযর্টকদের আগ্রহ বাড়বে। ফলে এখান থেকে সরকারের বড় অংকের আয় হবে যা পযর্টন শিল্পকে আরো এগিয়ে যেতে সহযোগিতা করবে। তবে দ্বীপের অনন্য বৈশিষ্ট্য বজায় রাখতে অবশ্যই এখানে বড় বড় হোটেল মোটেল করা যাবে না। তার বদলে কটেজ তৈরি করা যেতে পারে এবং সেটা অবশ্যই সরকারি ভাবে। যেহেতু কক্সবাজার শহর থেকে খুব বেশি দূরে নয় তাই পযর্টকরা অনায়াসেই মহেশখালী ঘুরে শহরে ফিরে আসতে পারবে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করলে এবং যাতায়াত ব্যবস্থা ঠিক করতে পারলে সারা বছরই এই অঞ্চলটি হতে পারে পযর্টকদের জন্য শীর্ষ পছন্দের যায়গা।

-জাজাফী

২১ নভেম্বর ২০২৩

নিরাপদ পৃথিবীর জন্য যে কিশোরীরা লড়াই করছে

0

আজকের শিশুরা আগামী দিনের ভবিষ্যত। আর সেই ভবিষ্যত প্রজন্ম যেন নিরাপদে বেড়ে  ওঠে তার জন্য চাই একটি নিরাপদ পৃথিবী। যে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল থাকবে শিসামুক্ত,ওজনস্তর থাকবে ফাটলমুক্ত। যে পৃথিবী থাকবে সবুজ শ্যামলিমায় ঘেরা। তারুণ্যের কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন 

এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান

জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপপিঠে

চলে যেতে হবে আমাদের

চলে যাবতবু আজ যতক্ষণ দেহে আছে প্রাণ

প্রাণপণে পৃথিবীর সরাব জঞ্জাল,

বিশ্বকে শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি

নবজাতকের কাছে আমার দৃঢ় অঙ্গীকার

কবি আগামী দিনের শিশুদের জন্য যেমন পৃথিবী রেখে যেতে চেয়েছিলেন আমরা তেমন পৃথিবী পাইনি। দিন যাচ্ছে আর পৃথিবী তার রূপ হারাচ্ছে। ক্রমাগত ভাবে পৃথিবী ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌছে যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে একদিন এ পৃথিবীতে মানুষ বসবাস করতে পারবে না। একদিন এ পৃথিবী হয়ে উঠবে মৃত্যুপুরী। পৃথিবীর জলবায়ু বদলে যাচ্ছে। পানি ও বাতাস দুষিত হচ্ছে। শহর থেকে গ্রাম বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। নগরায়নের এই যুগে পৃথিবী তার স্বরুপ হারাচ্ছে। এ নিয়ে আমাদের মত বড়রা চিন্তা না করলেও পৃথিবীতে কিছু শিশু কিশোর কিশোরী পৃথিবী বাঁচানোর জন্য সংগ্রাম করছে তাদের মধ্যে গ্রেটা থুনবার্গ,ফাতিহা আয়াত, সুবহা সাফায়েত সিজদা এবং রেবেকা শবনম অন্যতম। তাদের সম্পর্কে আজ আমরা আলোচনা করবো। 

গ্রেটা থুনবার্গ:

পরিবেশ আন্দোলনের সাথে যুক্ত কিশোর কিশোরীদের মধ্যে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে আলোচিত নাম গ্রেটা থুনবার্গ। ফিনিক্স পাখির মত তার গল্প আজ বিশ্বব্যাপী আলোচিত। ছোট্ট মানুষটি যখন কন্ঠ উচিয়ে বলে “ হাউ ডেয়ার ইউ” তখন বিশ্ব নেতারা নড়ে চড়ে বসে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে সফল হয়েছেন গ্রেটা। বিষয়টিকে বৈশ্বিক আন্দোলনে রূপান্তরিত করেছেন। বলা যায়, এই আন্দোলনের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন কৈশোরেই। গ্রেটার জন্ম ২০০৩ সালের ৩ জানুয়ারি সুইডেনের স্টকহোমে।তার মা ম্যালেনা আর্নম্যান একজন অপেরা গায়িকা এবং বাবা স্ভান্তে থুনবার্গ একজন অভিনেতা এবং রসায়নে নোবেল পুরস্কার জয়ী বিজ্ঞানী স্ভান্তে আরহেনিয়াসের উত্তরসূরি।

৮ বছর বয়সে তাঁর ‘অ্যাসপারজার সিনড্রোম’ ধরা পড়ে, যা একধরনের বিকাশগত ব্যাধি। এই ব্যাধিতে আক্রান্ত মানুষেরা একটা ধারণা বা আগ্রহের ওপর গভীরভাবে মনোনিবেশ করে। গ্রেটার ক্ষেত্রে এই বিষয় ছিল জলবায়ু পরিবর্তন। গ্রেটা বলেন, ‘আমার অনেকটা এমন মনে হচ্ছিল যে আমি যদি জলবায়ুর পরিবর্তন সম্পর্কে প্রতিবাদ না করি, তাহলে ভেতরে ভেতরে আমি যেন মারা যাচ্ছিলাম।’

এর কয়েক বছরের মধ্যে গ্রেটা নিজেকে পরিবর্তন করে। হয়ে যায় নিরামিষাশী এবং বিমান ভ্রমণ থেকে বিরত থাকে। মা–বাবাকেও নিরামিষাশী হতে এবং বিমানে ওঠা এড়াতে রাজি করায়। গ্রেটা ২০১৮ সালে স্থানীয় এক পত্রিকায় জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ে রচনা প্রতিযোগিতায় পুরস্কার পায়। একই বছরের সেপ্টেম্বর মাসে সুইডেনের জাতীয় নির্বাচনের তিন সপ্তাহ আগে পার্লামেন্টের সামনে বসে পড়ে গ্রেটা। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আইনপ্রণেতাদের উদ্বুদ্ধ করতে ‘স্কুল স্ট্রাইক ফর ক্লাইমেট’ লেখা একটা ব্যানার নিয়ে শুরু করে অবস্থান কর্মসূচি। এই আন্দোলন গ্রেটা একাই শুরু করেছিল। পরদিন থেকে অনেকেই তাঁর পাশে দাঁড়াতে শুরু করে। তাঁর এই আন্দোলন প্রচারমাধ্যমে ব্যাপক সাড়া ফেলে। এরপর ‘ফ্রাইডেজ ফর ফিউচার’ নামে একটা আন্দোলন শুরু করে। প্রতিবাদ স্বরুপ প্রতি শুক্রবার স্কুলে অনুপস্থিত থাকে গ্রেটা। তাঁর এই অভিনব প্রতিবাদও অল্প দিনের মধ্যে সুইডেন এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশে ছড়িয়ে পড়ে। গ্রেটা ইউরোপজুড়ে ট্রেন ভ্রমণ শুরু করে এবং বিভিন্ন স্থানে বক্তৃতা দিতে থাকে।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় ব্যর্থতার জন্য বিশ্ব নেতাদের ‘বিশ্বাসঘাতক’ বলে নিন্দা করে আবেগপূর্ণ বক্তৃতা করেছেন সুইডেনের কিশোরী জলবায়ু আন্দোলনকারী গ্রেটা থানবার্গ। নিউইয়র্কে অবস্থিত জাতিসংঘের সদর দফতরে সংস্থাটির সেই জলবায়ু সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন অর্ধশতাধিক বিশ্বনেতা। গ্রেটা তার কন্ঠকে যথাসম্ভব উচু করে দৃঢ় কন্ঠে ঘোষণা করেছে ‘বাস্তুসংস্থান ধ্বসে পড়ছে, গোটা বিশ্ব আজ গণবিলুপ্তির (মানুষসহ সকল প্রাণী) হুমকির মুখে অথচ আপনারা সবাই টাকার কথা বলছেন, আপনারা যার যার দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়ে ভাবছেন। এই সাহস আপনাদের হয় কীভাবে?’বক্তৃতার শুরুতেই প্রচন্ড আক্রমণাত্মকভাবে কথা বলা শুরু করেন গ্রেটা থুনবার্গ। বিশ্বনেতাদের উদ্দেশে গোটা বিশ্বের তরুণ ও যুব সমাজের হয়ে সে কী বার্তা দিতে চায় এমন প্রশ্ন করা হলে গ্রেটা থুনবার্গ বলে, ‘আমাদের বার্তা হলো, আমরা আপনাদের ওপর নজর রাখছি।’ 

গ্রেটা থুনবার্গ তার বক্তব্যে গোটা বিশ্বের তরুণ সমাজের সঙ্গে বিশ্বনেতারা প্রতারণা ও বিশ্বাসঘাতকতা করেছে বলে অভিযোগ করে। সরকারপ্রধানদের উদ্দেশে সে বলে, ‘আপনারা আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করছেন, আমাদের ব্যর্থ করে দিচ্ছেন। আপনাদের বিশ্বাসঘাতকতা বুঝতে পারছে যুবসমাজ।’ গ্রেটা থুনবার্গের আশঙ্কা, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে গোটা পৃথিবী কী মারাত্মক ঝুঁকির মুখে আছে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই তা বলে আসলেও এবারের সম্মেলনেও বৈশ্বিক এই ঝুঁকি মোকাবিলায় নতুন কোনো পরিকল্পনা বিশ্ববাসীর সামনে হাজির করতে পারবেন না বিশ্বনেতারা। বিশ্ব নেতাদের চোখে চোখ রেখে এই কিশোরী বলেছে ‘আপনারা আপনাদের ফাঁকা বুলি দিয়ে আমার স্বপ্ন এবং আমার শৈশব চুরি করেছেন। ভবিষ্যত প্রজন্মের চোখ আপনাদের এখন আপনাদের ওপর। যদি আপনারা আমাদের ব্যর্থ করতে চান তাহলে আমি বলছি, আপনাদের আমরা কখনোই ক্ষমা করবো না।’ গ্রেটা আরও বলেছে “এই সবকিছুই ভুল। আমার এখানে থাকা উচিত নয়। মহাসাগরের ওপারের স্কুলে আমার থাকার কথা। আমরা এভাবে চলতে দেব না।’ রাষ্ট্র প্রধানদের উদ্দেশে সে বলে, ‘তারা শিশুদের অধিকার রক্ষায় কাজ করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিলেও আদৌ তারা কিছুই করছে না।

জার্মানিতে একটি কয়লা খনি সম্প্রসারণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়ে আটক হয়েছিল প্রখ্যাত সুইডিশ পরিবেশকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ। অবশ্য আটকের কয়েক ঘন্টা পরই তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। মুক্তির পর সে বলেছিল ‘জলবায়ু রক্ষার আন্দোলন কোনো অপরাধ নয়।’

ওয়াঙ্গারি মাথাইয়ের মৃত্যুদিবস ছিল ২৫ সেপ্টেম্বর। খুব নীরবে দিনটি চলে গেল। ‘ক্লাইমেট অ্যাকশন’ সপ্তায় বিশ্ব সংবাদমাধ্যম গ্রেটা থুনবার্গকে নিয়ে এতই ব্যস্ত থাকল যে মাথাইয়ের নামও শোনা গেল না কোথাও! পরিবেশসচেতনতা আন্দোলনে নতুন ঢেউ আনতে পারায় গ্রেটা ধন্যবাদার্হ নিঃসন্দেহে! গ্রেটা কিশোরী হওয়ায় তার প্রতি দুনিয়াও সহানুভূতিশীল। এ বছর বিবিসির জরিপেও গ্রেটা বিশ্বের ১০০ জন অনুপ্রেরণাদায়ী নারীর মধ্যে অন্যতম একজনের স্বীকৃতি পেয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় ভূমিকা রাখার জন্য গ্রেটা অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছে। ২০১৯ সালে মনোনীত হয়েছিল শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের জন্য। ২০১৯ সালের ১৩ ডিসেম্বর মাত্র ১৭ বছর বয়সী গ্রেটা টাইম ম্যাগাজিনের বর্ষসেরা ব্যক্তিত্ব নির্বাচিত হয়। ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ ব্যক্তি হিসেবে এই গৌরব অর্জন করে গ্রেটা থুনবার্গ। টাইম ম্যাগাজিন তাঁকে ‘দ্য পাওয়ার অব ইয়ুথ’ উপাধিতে ভূষিত করে। স্যার ডেভিড অ্যাটেনবরো গ্রেটার প্রশংসা করেছেন এই বলে যে সে যা অর্জন করেছে তা আর কেউ করতে পারেনি। গ্রেটাকে তিনি বলেছেন, “তুমি পৃথিবীকে জাগিয়ে তুলেছ। আমি তোমার কাজে গর্বিত।”

ফাতিহা আয়াত:

ফাতিহা আয়াত যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে বসবাসকারী বাংলাদেশী বংশোদ্ভুত লেখক, শিশু অধিকার কর্মী ও একজন জলবায়ু পরিবর্তন সংস্কারক। সে CHIL&D নামের একটি সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা যেখানে জলবায়ু, স্বাস্থ্য, তথ্য, শিক্ষা ও উন্নয়ন নিয়ে কাজ করে। ফাতিহা আয়াত ২০১১ সালের ১৩ অক্টোবর বাংলােদেশে জন্মগ্রহণ করে।আমেরিকার বুকে নিজেকে একটুকরো বাংলাদেশ করে রেখেছে।তার বর্তমান বয়স ১৩ বছর। ফাতিহার বয়স যখন সাত বছর সেই বয়স থেকে ফাতিহা নিজে শেখে আর অন্যদের শেখায়। যে বয়সে আমরা বাসায় মেহমান আসলে লজ্জা আর ভয়ে লুকিয়ে থাকি সেই বয়সে সে জাতিসংঘের সদরদপ্তরে বিখ্যাত সব মানুষের সামনে বক্তব্য দিয়েছে।ওর বক্তব্য শুনে অন্যরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছে। 

শুধুমাত্র ২০২৩ সালেই ফাতিহা আয়াত এখন পর্যন্ত তিন বার জাতিসঙ্ঘ সদর দপ্তরে বক্তব্য রেখেছে। এগুলো ছিল বিশ্ব পানি সম্মেলন, ইকোসক ইয়ুথ ফোরাম, ১৭তম আন্তর্জাতিক মানবাধিকার যুব সম্মেলন।বিশ্বের নানা প্রান্তে ফাতিহা আমন্ত্রিত হয়ে শিশু অধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন রোধ সহ নানা বিষয়ে বক্তব্য দিয়ে থাকে। অধিকার প্রতিষ্ঠায় কথা বলে।কিছুদিন আগেই সে “চেঞ্জ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ” শীর্ষক তার প্রথম টেডএক্স বক্তব্য রেখেছে নিউইয়র্কের ইরভিংটনে। এছাড়াো এস্টনিয়ার রাজধানী ট্যালিনে আয়োজিত “লেটস ডু ইট” কনফারেন্সে সে বক্তব্য । তার অন্যান্য বক্তব্যের মধ্যে রয়েছে ইউএন গ্লোবাল কম্প্যাক্ট ও প্যাসিফিক ইন্সটিটিউট আয়োজিত “ওয়াটার ম্যান্ডেট” সেমিনার,কার্বন ডিস্ক্লোজার প্রজেক্ট আয়োজিত “ওয়াটার সিকিউরিটি” কনফসারেন্সে বক্তব্য এবং সাস্টেইনেবল ডেভেলপ্নেন্ট সলিউশন্স নেটওয়ার্ক আয়োজিত “হিউম্যান প্ল্যানেট ফোরাম” অনুষ্ঠানে রাখা বক্তব্য অন্যতম।

গত বছর ২৬ সেপ্টেম্বর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুযোগ্য পুত্র সজিব ওয়াজেদ জয়ের উপস্থিতিতে ফাতিহা জাতিসংঘে বক্তব্য দিয়েছে। আর এ বছর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে একই দিন একই বিষয়ে জাতিসংঘে বক্তব্য রেখেছে। নানা বিষয় নিয়ে ফাতিহা সচেতনতা গড়ে তুলতে কাজ করছে। আমরা যখন গাছ কাটি,আইসক্রিম খেয়ে যেখানে সেখানে খোসা ফেলে পরিবেশ নষ্ট করি, ছোট্ট ফাতিহা তখন পৃথিবীকে বাঁচানোর জন্য প্রতিবাদ করে। এরই প্রেক্ষিতে গত ১২ আগস্ট বিশ্ব যুব দিবসের অনুষ্ঠানে সে জাতিসংঘে ভাষণ দিয়েছে। সেখানে সে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা যুবকদের দ্বারা বনাঞ্চল ধ্বংস ও বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে এর ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরেছে। এছাড়াও ১৬তম আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সম্মেলন, ইউএন ডে এবং উইমেন পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাজেন্ডাতে অংশ নিয়ে শিশু নির্যাতন, লিঙ্গ বৈষম্য, পারিবারিক সহিংসতায় শিশুদের সমস্যা, শরণার্থী শিশুদের অমানবিক জীবন নিয়ে বক্তব্য তুলে ধরেছে।ওর বয়সীরা যখন কথা বলতেই ভয় পায় ফাতিহা তখন শিশুদের আনন্দময় শিক্ষার অধিকার নিয়ে কথা বলে।

বিশ্বব্যাপী শিশুদের দুঃখ-দুর্দশার কথা শুনে সিদ্ধান্ত নিয়েছে বড় হয়ে সে এমন কিছু করবে যেন আর কোনো শিশু ক্ষুধা বা তৃষ্ণায় একটি দিনও না কাটায়। ফাতিহার মতে ‘সন্তানকে মুখস্থ করাবেন নাকি আবিষ্কারের নেশা ধরিয়ে দেবেন সেই সিদ্ধান্ত আপনার’ । ছোট্ট ফাতিহা ক্ষুধা,দারিদ্র ও শিশু কিশোর কিশোরীদের জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়ার জন্য সবাইকে আহ্বান জানিয়েছে। এই পৃথিবীকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে হলে ফাতিহার সাথে কন্ঠ মেলাতে হবে।

রেবেকা শবনম:

গ্রেটা থুনবার্গ আর ফাতিহা আয়াতের সাথে কন্ঠ মিলিয়ে রেবেকা শবনম বিশ্বকে বাঁচানোর জন্য আওয়াজ তুলে বিশ্বব্যাপী আলোচিত হচ্ছে। ফাতিহার মতই সেও বিশ্বের প্রবল প্রতাপশালী দেশ আমেরিকার মাটিতে দাঁড়িয়ে যখন বলছে আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি, তখন লাল সবুজের পতাকাটি আরো খানিকটা সম্মানিত হচ্ছে।

মাত্র ছয় বছর বয়সে মা-বাবার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমায় রেবেকা শবনম। গত ১০ বছরে দেশের স্মৃতি তার অন্তর থেকে ম্লান তো হয়ইনি বরং দেশের কল্যাণের ভাবনায় তার পরিকল্পনা দৃঢ়তর হয়েছে। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অত্যন্ত সপ্রতিভ ষোড়শী রেবেকা। আর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সে জলবায়ু পরিবর্তনে বাংলাদেশের ঝুঁকি ও তা মোকাবেলার প্রয়োজনীয়তা বিশ্বের দরবারে তুলে ধরার জন্য নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছে।

এইতো সেদিনের কথা। স্পেনের মাদ্রিদে চলছিল বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের অধিকার আদায়ে ওই সম্মেলনে অংশ নিয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। একদিকে বাংলাদেশ সরকারের হয়ে প্রধানমন্ত্রী যেমন চেষ্টা করে যাচ্ছেন, অন্যদিকে তেমনি আন্দোলনকারীদের কাতারে থেকে প্রচেষ্টা চালাচ্ছে রেবেকা। সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সে ম্যানহাটানে প্রায় দুই লাখ মানুষের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল। জলবায়ু পরিবর্তনরোধে সোচ্চার সুইডিশ কিশোরী গ্রেটা তুনবার্গের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ম্যানহাটানে জড়ো হওয়া আন্দোলনকারীদের সামনের সারিতে ছিল রেবেকা শবনম। তাকে নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরা।তারপরই সে রাতারাতি পরিচত হয়ে ওঠে বিশ্বের কাছে।

বর্তমানে নিউ ইয়র্কে বসবাসরত শবনমের চেষ্টা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে বাংলাদেশ কতটা ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে, সে বিষয়ে সবাইকে জানানো। নিউ ইয়র্কে হাজারো মানুষের সামনে সে বলেছে, ‘আমি বাংলাদেশ থেকে এসেছি, যা জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম।’ বক্তৃতায় জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরে সে।

আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রেবেকা বলে, ‘ভেবেছিলাম, যখন বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হবে তখন সবাই চুপ থাকবে। তবে সবার সাড়া দেখে আমি নিজেই অবাক। এটা শুধু পরিবেশগত সংকট না, এটা মানবাধিকার সংকটও। বাংলাদেশের নারীরা পাচারের শিকার হয়। আর এটা জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আরো বেড়েছে। আমরা বাংলাদেশে থাকা নারী ও রোহিঙ্গাদের জানাতে চাই, তাদের জীবনের জন্য বিশ্বজুড়ে আন্দোলন করছি আমরা। এখনও স্কুলজীবন শেষ হয়নি রেবেকা শবনমের। সে মনে করে, সামনে হাঁটতে হবে আরও অনেক পথ। ভয়াবহ ঝুঁকিতে থাকা বাংলাদেশের নারী, শিশু ও রোহিঙ্গাদের জন্য বিশ্বের দরবারে কীভাবে সুবিচার প্রত্যাশা করা যায়, সেটাই তার চিন্তার মূল বিষয়। রেবেকা বলেছে, জলবায়ু আন্দোলনে বাংলাদেশ প্রসঙ্গ কেউ যেন ভুলে না যান, তা নিশ্চিত করতে লড়াই চালিয়ে যাবে সে।আমাদের দেশে এমন রেবেকার সংখ্যা নেহায়েত কম নয়,যারা পৃথিবীকে বাঁচাতে চায়।শুধু জ্বলে ওঠার অপেক্ষায়।

এভাবেই দুনিয়া জুড়ে তিন কিশোরী নিজ নিজ অবস্থান থেকে সুন্দর ও নিরাপদ পৃথিবীর দাবিতে কাজ করে যাচ্ছে। তারা হয়তো সুকান্তর সেই কবিতা কখনো পড়েনি কিন্তু এই বয়সেই হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছে যে এ পৃথিবীকে বাস যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে। এবং আশা করা হলো তারা অনেকটা সফলও হয়েছে। নাসার তথ্য মতে গত কয়েক বছরে বিশ্বব্যাপী যে পরিবেশ আন্দোলন গড়ে উঠেছে গ্রেটা থুনবার্গের উদ্যোগে তার কারণে আগের চেয়েও পৃথিবী অনেক বেশি সবুজ হয়েছে। সুতরাং আমরা সুন্দর একটি পৃথিবী গড়ে উঠবে সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করতেই পারি এবং সেই সাথে আমরা চাই পৃথিবীর ঘরে ঘরে এমন আলোকিত শিশু কিশোর কিশোরীর জন্ম হোক। যারা নিজেরাই নিজেদের জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তুলবে এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্যও একটি নিরাপদ, সবুজ পৃথিবী রেখে যাবে।

১৫ অক্টোবর ২০২৩

লেখাটির অংশবিশেষ প্রকাশিত হয়েছে দৈনিক খবরের কাগজ পত্রিকায় ২৪ অক্টোবর ২০২৩ এ। প্রকাশিত লেখার লিংক

ফিলিস্তিনের অকুতোভয় কিশোর কিশোরী

0

পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে জন্ম নেওয়া শিশুরা একদিন কিশোর হয়,তরুণ হয়, যুবক হয়। তারপর ডাক্তার,ইঞ্জিনিয়ার,পাইলট হয়। কিন্তু ফিলিস্তিন এমন একটি দেশ, যেখানে সেই সুযোগ মেলে না। ওখানে যুগে যুগে যে শিশু জন্ম নিয়েছে তাদের অনেকেই শৈশব পার করতে পারে না,অনেকেই কৈশোরে পা রাখতে পারে না। অনেকেই যৌবনের আগেই ঝরে পড়ে। তারা বীর কিশোর হয়,বীর তরুণ হয়, বীর যুবক হয়। বেঁচে থাকলে তাদের কেউ কেউ বীরপুরুষ হয়। এই পথপরিক্রমায় তাদের অনেকে শহীদ হয়। ফিলিস্তিনের শিশু কিশোর কিশোরীদের কথা ভাবলেই মনে পড়ে উর্দু ভাষার কবি ফয়েজ আহমদ ফয়েজের লেখা সেই কবিতা।ফিলিস্তিন নামক মৃত্যু উপত্যকায় বেঁচে থাকা শিশুদের সান্ত্বনা দিতে তিনি লিখেছিলেন- 

‘না বাছা, কেঁদো না!

তোমার বাসভূমে মৃতদের গোসল দিয়েছে সূর্য,

চাঁদ দিয়েছে কবর।’

দিন নয়, মাস নয় গত সত্তর বছর ধরে দখলদার ইসরায়েলিদের বন্দুক-বোমার প্রধান লক্ষ্যবস্তু হয়ে আছে ফিলিস্তিনে শিশুরা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এমন হাজারো শিশু ঝরে গেছে। কিন্তু ওরা জানে তারা নিজে মরলেও জাতিকে টিকিয়ে রাখতে হবে। তাই ধ্বংসপ্রায় ফিলিস্তিনি জাতিকে টেকাতে, অজস্র মৃত্যুর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে শহীদদের শূন্যস্থান ভরাটের জন্য আরও আরও ফিলিস্তিনি শিশু জন্ম নিয়েছে। তারা যেন হৃদয়ে ধারণ করেছে মাহমুদ দারবিশের লেখা “পরিচয় পত্র” কবিতার সেই লাইন-

‘লিখে রাখো! আমি একজন আরব 

এবং আমার পরিচয়পত্রের নম্বর পঞ্চাশ হাজার!

আমার আটটি সন্তান আর নবমটি 

পৃথিবীতে আসবে গ্রীষ্মকালের পর

তোমরা কি ক্ষুব্ধ হবে তাতে?’

ফিলিস্তিনের এমন ভয়াবহ পরিস্থিতির মাঝেও বোমা-বারুদে মাটিতে মিশে যেতে থাকা এই উপত্যকায় প্রতিবছর অন্তত ৫০ হাজার নারী সন্তান জন্ম দেয়।এখন গাজায় প্রতিদিন অন্তত ১৬০ জন নারী সন্তান প্রসব করছেন।কী নির্মমতার শিকার ফিলিস্তিনের শিশু কিশোর কিশোরী যে, তাদের বয়স পরিমাপ করা হয় তারা কতগুলো ইসরায়েলি হামলার শিকার হয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে। গাজার ২৩ লাখ জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকই শিশু কিশোর কিশোরী। 

এই লেখাটি যখন লিখছি তখন টিভিতে বিশ্বকাপ ক্রিকেট ম্যাচ চলছে। গ্যালারিতে উপচে পড়া ভীড়। সেই ভীড়ের মধ্যে অগনিত কিশোর কিশোরী নানা রকম প্ল্যাকার্ড হাতে বসে আছে। নিজ দলের সাফল্য দেখলেই প্লাকার্ড উঁচিয়ে উল্লাসে মেতে উঠছে।আবার নিজ দলের ব্যর্থতায় গালে,কপালে হাত রেখে হতাশা প্রকাশ করছে।পাশেই ভাই, বোন কিংবা প্রিয়জন আছে।খেলা শেষ হলে হয়তো পাশের কোনো রেস্টুরেন্টে বসে রাতের খাবার খাবে।কেউ বাসায় বসে নেটফ্লিক্সে পছন্দের কোনো মুভি বা সিরিজ দেখছে। আবার কেউ বন্ধুদের সাথে চ্যাট করছে,গেমস খেলছে। ঠিক সেই সময়ে চোখের সামনে ভেসে আসলো ফিলিস্তিনি শিশুদের মুখ। পৃথিবীর সবুজ জমিন নিজেদের রক্তে রঞ্জিত করে যারা স্বাধীনতা চেয়েছে। মনে পড়ছে ফিলিস্তিনের মানুষের দুঃখ নিয়ে মাহমুদ দারবিশের লেখা কবিতার লাইন-

‘আজকের দিনটি আগামী দিনের থেকে হয়তো ভালো,

কেবল মৃত্যুগুলোই আজ নতুন

প্রতিদিনই জন্ম নেয় যে নতুন শিশুরা

তারা ঘুমোতে যাওয়ার আগেই ঘুমিয়ে পড়ে, মৃত্যুতে

তাদের গণনা করা মূল্যহীন।’

একই পৃথিবীতে জন্ম নেওয়া কোটি কোটি শিশু কিশোর কিশোরীদের সাথে ফিলিস্তিনে জন্ম নেওয়া শিশু কিশোর কিশোরীদের জীবন ধারা আকাশ পাতাল ব্যবধান। ফিলিস্তিন হয়ে উঠেছে খোলা আকাশের নিচে পৃথিবীর বৃহত্তম জেলখানা। একদিকে পৃথিবীর অন্য দেশের কিশোর কিশোরীরা যখন প্রিয়জনের সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করে নিচ্ছে, তখন ফিলিস্তিনের কিশোর কিশোরীদের চোখে ঘুম নেই,পেটে খাবার নেই,ঘুমানোর জায়গা নেই,পড়াশোনা করার মত  স্কুল নেই,মাথাগোজার মত ঠাই নেই। মনে পড়ছে ১৪ বছর বয়সী স্কুল পড়ুয়া কিশোরী মালাক আল খতিবের কথা। গত বছর ৩১ ডিসেম্বর বেতিনে বিদ্যালয় থেকে বাড়ি ফেরার পথে তাকে ইসরায়েলি বাহিনী ধরে নিয়ে গেছে। দিনের পর দিন অত্যাচার দেখে সে ফুসে উঠেছিল। ইসরায়েলের সশস্ত্র সেনাদের ওপর বাধ্য হয়ে সে পাথর ছুঁড়ে হামলা করেছিল। তারপর তাকে গ্রেফতার করে ২ বছরের কারাদন্ড দেওয়া হয়।সেই সাথে জরিমানা করা হয় দেড় হাজার ডলার।কারাবন্দী থাকা এই কিশোরী ফিলিস্তিনের বর্তমান পরিস্থিতির প্রতীক হয়ে উঠেছে।

রামাল্লার কাছে বেইতিন শহরে কিশোরী মালাকের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। মালাকের মা খাওলা আল-খতিবদুঃখ জড়ানো কন্ঠে বলেছেন, ‘ প্রচন্ড শীতের মাঝেও গরম কাপড় ছাড়াই  কিশোরী মেয়েটিকে ডাণ্ডাবেরি পরিয়ে আদালতে হাজির করা হয়। এ অবস্থা দেখে মা হিসেবে আমার হৃদয় ভেঙে গেছে। আমি তার জন্য বাড়ি থেকে শীতের কাপড় নিয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু বিচারকের বাঁধার কারণে আমি পোশাকটি আমার মেয়েকে দিতে পারিনি।’ 

শুধু মালাক একা নয়! তার মত কিশোর কিশোরীর সংখ্যা অগণিত। মানবাধিকার সংগঠন ডিফেন্স ফর চিলড্রেন ইন্টারন্যাশনাল প্যালেস্টাইনের (ডিসিআই প্যালেস্টাইন) হিসাব মতে, পাথর নিক্ষেপের অভিযোগে দখলকৃত পশ্চিম তীর থেকে ইসরায়েলি বাহিনী প্রতিবছর গড়ে হাজার খানেক শিশুকে আটক করে।ইসরায়েলের কারাগারে এখনো ২০০ এর অধিক ফিলিস্তিনি শিশু-কিশোর কিশোরী বন্দী আছে। ইসরায়েলে ১২ বছরের কম বয়সীদের শিশু বলা হয়। ফলে বিচার করার সময় মালাক শিশু হিসেবে বিবেচিত হয়নি। যদিও ইউনিসেফের হিসাবে, ১৮ বছর পর্যন্ত ছেলে বা মেয়ে শিশুর মর্যাদা পায়। ইসরায়েল এর তোয়াক্কা না করেই ফিলিস্তিনের শিশুদের আটক, গ্রেপ্তার ও শাস্তি দিয়ে থাকে। 

জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে ফিলিস্তিনের শিশুদের প্রতি অমানবিক আচরণের জন্য ইসরায়েলের সমালোচনা করা হয়েছে। সেভ দ্য চিলড্রেনের ২০২২ সালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, গাজায় প্রতি পাঁচ শিশুর মধ্যে চারজনই বিষণ্নতা ও ভয়ের মধ্যে বাস করছে। এখানকার অর্ধেকেরও বেশি শিশু আত্মহত্যার কথা ভাবে এবং অন্য শিশুদের মৃত্যুর সাক্ষী হওয়ার ট্রমা নিয়ে বেঁচে থাকে।আর এই বেঁচে থাকার সংগ্রাম দেখে দেখে তারাও হয়ে ওঠে বোমার মত শক্তিশালী। মাহমুদ দারবিশ তাই লিখেছিলেন –

‘মৃত্যু অবধারিত, কিন্তু তাই বলে

জীবনকে তো থামিয়ে রাখা যায় না।’

আর সে কারণেই বোধহয় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ছাদখোলা কারাগারে জীবন-মৃত্যুর অঙ্ক কষতে থাকা ফিলিস্তিনি কিশোর কিশোরী মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় মরণ অবধারিত জেনেও গুলতি কিংবা পাথর হাতে ছিনা টানকরে দাঁড়িয়ে যায় ট্যাঙ্কের সামনে।

মালাকের কথা লিখতে লিখতেই চোখের সামনে ভেসে উঠছে আহেদ তামিমির মুখ। ১৬ বছরের এক অকুতোভয় কিশোরী। যে বয়সে হেসে খেলে পার করার কথা সেই বয়সে সে বন্দী জীবনের স্বাদ নিয়েছে। কোকড়া চুলের এই কিশোরী  মালাকের মতই হয়ে উঠেছে  ফিলিস্তিনি জনগণের মুক্তি আন্দোলন ও তৃতীয় ইন্তিফাদার প্রতীকী চরিত্র।তার একটি ভিডিও পৃথিবীর মানুষ দেখেছে। ভয়ংকর ক্রোধ নিয়ে সে তাকিয়ে আছে দখলদার ইসরায়েলি সেনাদের দিকে। হুংকার দিয়ে চলে যেতে বলার পরও সেনারা যখন যায়নি তখন সে দুই সেনাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে। এতো কিছু করেও যখন সেনাদের সরাতে পারেনি তখন তাদের দুই গালে সজোরে থাপ্পড় মারতে শুরু করে।কী দুঃসাহসী অকুতোভয় এই কিশোরী যে অস্ত্রধারী ইসরায়েলি সেনার গালে থাপ্পড় মারে।কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি।তাকে ও তার মাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, রিমান্ডে নিয়ে অত্যাচার করা হয়েছে। তবুও সে মাথায় নোয়ায়নি। সে বোধহয় হৃদয়ে সেই কথাটি ধারণ করেছিল “ মৃত্যু একবারই হয়, ভীতুরা মৃত্যর আগে বহুবার মনে”। কিন্তু সে তো ভীতু নয়। তাই সে প্রতিবাদ করেছে। তার মুক্তির জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে আওয়াজ উঠেছে। কিশোরী মালাকার মতই তামিমির বাড়িও রামাল্লাতে। ছোট বেলা থেকেই প্রতিবাদে অংশ নেওয়া তামিমি সাহসিকতার জন্য এর আগেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রশংসা কুড়িয়েছে। অনেক বছর ধরে তার গ্রামে প্রতি শুক্রবারেই প্রতিবাদ মিছিল বের হয়। মাত্র ৯ বছর বয়সে তামিমি প্রথম মিছিলে অংশ নিয়েছিল। বিভিন্ন তথ্যউপাত্ত থেকে জানা যায় ২০১৫ সালে ১১ বছর বয়সে ইসরায়েলি সেনার হাত থেকে তার চাচাত ভাই মোহাম্মদকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিল তামিমি।এমনকি সে তার ভাইকে বাঁচাতে এক ইসরায়েলি সেনার হাতে কামড় দিয়েছিল। ওই ছবি প্রকাশের দুই বছর পর তামিমিকে তুরস্কে “হানদালা সাহসিকতা পুরস্কার” দেওয়া হয়। একই সাথে তুরস্কের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রিসেপ তায়েফ এরদোয়ান তাকে সাক্ষাতের জন্য আমন্ত্রণ জানান। গত বছর শিশু অধিকারের উপর একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার জন্য খোদ যুক্তরাষ্ট্রের একটি সংগঠন তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। তবে দুঃখজনকভাবে মার্কিন প্রশাসন তাকে ভিসা দেয়নি।

মালাক আল খতিব কিংবা আহেদ তামিমির মত আরও এক কিশোরীর মথা মনে পড়লো। তার নাম উইসেল শেখ খালিল। গাজার রাস্তায় এক্কাদোক্কা খেলে বেড়ানো ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরী সে । বয়সকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে সে এখন ফিলিস্তিনের মানুষের মনে বীর হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে।যতদিন পৃথিবী থাকবে নিশ্চই তার নাম উচ্চারিত হবে শ্রদ্ধার সাথে। অঙ্ক আর নাচে যার বেশ দখল ছিল।রঙ তুলি হাতে ধরিয়ে দিলে মনোমুগ্ধকর ছবি আঁকতো। খুবই সাধারণ, শান্ত কিশোরীটি হঠাৎ করে ক্ষোভে ফেটে পড়ল। পরিবারের সদস্যরা অনেক বোঝাল। বলল সীমান্তে গেলে ইসরাইলি সেনারা গুলি করে মেরে ফেলবে।যার রক্তে বারুদের গন্ধ, সে কি আর কারো বারণ শোনে? জানি  এই কিশোরী কখনো বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুলের বিদ্রোহী কবিতা পড়েনি “ বল বীর! বল উন্নত মম শির! শির নেহারি আমারই নত শির ওই শিখর হিমাদ্রির” । কবিতা না পড়লেও কিশোরী মেয়েটিও তার শির নত করেনি। সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে ১১ বছরের ছোট ভাইকে নিয়ে বিক্ষোভ করতে ইসরাইলি সেনাদের গুলি ও কাঁদানে গ্যাস উপেক্ষা করেই একেবারে সীমান্তে পৌঁছে গিয়েছিল সে।  প্রথম দিকে সে বিক্ষোভকারীদের পানির বোতল এগিয়ে দিচ্ছিল। কিন্তু ইসরাইলি সেনারা দমন-পীড়ন বাড়ালে তার মনের মধ্যে আগুন জ্বলে ওঠে।মাতৃভূমি ফিলিস্তিনকে দখল করে গড়ে তোলা ইসরাইলের কাঁটাতারের বেড়া কেটে ফেলতে চেষ্টা করে।একপর্যায়ে ইসরাইলি সেনাদের স্নাইপারের গুলিতে শহীদ হয় অকুতোভয় কিশোরী উইসেল।তার মত অগনিত কিশোর কিশোরী চায় নিজের রক্তের বিনিময়ে হলেও যদি ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা আসে।

ঝঞ্ঝা বিক্ষুব্ধ পৃথিবী সম্পর্কে ন্যূনতম জ্ঞান ছিল না যাদের, সেই সব অসম সাহসী কিশোর কিশোরীই জীবনের পরোয়া না করে প্রতিনিয়ত ইসরাইলের নিপীড়নবিরোধী মিছিলে শামিল হয়েছে। উইসেল তার বাবা মাকে বলেছিল, “এভাবে মুখ বুঝে আর ইসরাইলি বর্বরতা মেনে নেবো না। অবশ্যই অন্যদের সঙ্গে সীমান্তে গিয়ে বিক্ষোভ করবো”।সেই সাথে আরও বলেছিল “মা, আমি যদি মারা যাই, তবে আমাদের ছোট্ট কক্ষটিতে আমার ভাইবোনরা একটু আরামে থাকতে পারবে। তারা থাকতে একটু বেশি জায়গা পাবে”। এইটুকু কিশোরী মেয়ে কত কিছু ভেবেছে। পরিস্থিতিই তাকে এভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে।

পরিসংখ্যন বলছে এ বছরের শুধু মে মাসে ১৮ বছরের কম বয়সী ৩৩১ জন ফিলিস্তিনিকে আটক করা হয়েছে। ২০১৬ সালে প্রতি মাসে গড়ে ৩৭৫ জন অপ্রাপ্তবয়স্ক ফিলিস্তিনিকে আটক করেছিল ইসরায়েল। এরপরও হামাসের ডাকে তৃতীয় ইন্তিফাদা শুরুর পর অসংকোচে রাস্তায় নেমে এসেছে ফিলিস্তিনি কিশোর-কিশোরীরা। আর আহেদ তামিমি, মালাক আল খতিব কিংবা উইসেল শেখ খলিল তাদের অনুকরণীয় নেতা হয়ে ওঠেছে।ফিলিস্তিন ও দেশটির মুক্তি আন্দোলনের সমর্থক হাজার হাজার কিশোর কিশোরী আশায় বুক বেঁধেছে, একদিন তামিমি,মালাক আর উইসেলের আত্মত্যাগের প্রতিদান তারা পাবে। স্বাধীন ফিলিস্তিন প্রতিষ্ঠিত হবে। হয়তো এই পথ পাড়ি দিতে তাদেরও হয়ে উঠতে হবে একজন মালাক, একজন তামিমি একজন উইসেল। সেদিন পৃথিবীর অন্যসব শিশু কিশোর কিশোরীর মত তারাও হাসি আনন্দে নিরাপদে বেড়ে উঠবে। ফিলিস্তিন হয়ে উঠবে নিরাপদ শহর। সেই দিনের অপেক্ষায়।

– জাজাফী

২১ অক্টোবর ২০২৩

লেখাটি দৈনিক খবরের কাগজ পত্রিকায় ২৭ অক্টোবর ২০২৩ তারিখে প্রকাশিত। লিংক

জেরুজালেম!

0

তপ্ত বালুর উপর রক্তের ছোপ ছোপ দাগ লাগা

পূণ্যভুমি জেরুজালেম!

সে যেন স্বামী পরিত্যাক্তা নারীর মতন, কিংবা

ভগ্নহৃদয়ের রাজকুমারীর মতন

যার স্বামী নেই অথবা প্রেমিক তাকে ফেলে গেছে

যার উপর কারো অধিকার নেই কিন্তু সবাই তাকে চায়।

এই নগরীর ধুলোর উপর দিয়ে হেঁটে গেছেন অজস্র মহামানব

পাথরের উপর খুঁজলে আজও তাঁদের পদচিহ্ন পাওয়া যাবে

গ্রীস্মের দাবাদাহে এ ভূমিতে যেমন প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়

শীত এলেই কাঁপুনি ধরায় হিমেল হাওয়া

জেরুজালেম ছাড়া যেন পৃথিবীর ইতিহাস অসম্পূর্ণ।

শহরের অলিতে গলিতে খাঁজকাটা পাথর গুলোর বুকে

রক্তের ছোপ ছোপ দাগ লেগে আছে

প্রতিটি বালুকণা চিৎকার করে যুগের পর যুগ প্রতিবাদ করছে

জেরুজালেম!

যে শহরে জন্মের আগেই শিশুর মৃত্যুর কথা ভাবে মা

বিয়ের আগেই বিধবা হওয়ার চিন্তা থাকে তরুণীর

কৈশোর পেরোনো হয়না এক তৃতীয়াংশ শিশুর।

জেরুজালেম!

এমন এক পূণ্যভূমি, স্রষ্ঠা ও সৃষ্টির মিলনস্থল

যার পাথরের ‍বুকে রয়েছে বহু অমিমাংসিত প্রশ্নের উত্তর

মহাপ্রলয়ের আগে মক্কা থেকে কাবাঘর চলে আসবে এখানে

ইস্রাফিলের সিঙার ফুৎকারে মৃতরা জেগে উঠবে

পুনরুত্থিত হয়ে এখানেই জড় হবে বিচারের আশায়।

জেরুজালেম!

অসংখ্য মৃত্যুর সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক নগর

বার বার বিধ্বস্ত হতে হতেও যে আবার মাথা তুলে দাঁড়ায়

যে শহরে বাতাসের মাঝে কানপাতলে শোনা যায়

মৃত আর নিপীড়িতের আর্তনাদ।

#জাজাফী

৬ নভেম্বর ২০২৩

অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি রোহিঙ্গা কিশোর কিশোরী।

0

মানুষের জীবনে কৈশোরকাল অনেকটা বসন্তের মত। এই সময়েই অনেক কিছু পরিবর্তন হয়। বসন্তে যেমন গাছে গাছে নতুন জীবন ফিরে আসে, তেমনি মানুষ কৈশোর থেকে যৌবনে পদার্পন করে। এই সময়ে জীবনের একটি ভীত তৈরি হয়। কিন্তু সবার ভাগ্যে এই সময়টা ভালোভাবে পার করা সম্ভব হয় না। যেমন রোহিঙ্গা কিশোর কিশোরী। এদের শৈশব সংকীর্ণ গলিতে এবং স্যাঁতস্যাঁতে ও অন্ধকারাচ্ছন্ন তাঁবুতেই কেটে যাচ্ছে। তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমারে চলা সহিংসতা ও নির্যাতন থেকে পালিয়ে এসে রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে থাকতে বাধ্য হয়েছে। যার অর্ধেকেরও বেশি শিশু এবং কিশোর-কিশোরী। এসব শরণার্থীদের কেউ কেউ আশ্রয়শিবিরে বাস করছে। আবার অনেকে স্বাগতিক বাংলাদেশী কমিউনিটির আশ্রয়ে রয়েছে। সেই সব কিশোর কিশোরীদের কয়েকজনের জীবনের গল্প সবার সাথে তুলে ধরতে চাই।

কিশোর কিশোরীদের নিয়ে লিখতে গেলে সঙ্গত কারণেই তাদের আসল নাম পরিচয় প্রকাশ করা ঠিক নয় বলেই ছদ্মনাম ব্যবহার করতে হয়। আজ থেকে চার বছর আগে মিয়ানমার থেকে অসংখ্য মানুষ জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল বাংলাদেশে। যাদের সিংহভাগ ছিলো কিশোর কিশোরী। তাদেরই একজন জোবায়ের (ছদ্মনাম)। সে যখন বাংলাদেশে আসে, তখন সে শরণার্থী শিবিরের বাইরে যেতে ভয় পেতো। তার মন থেকে সহিংসতার স্মৃতি মুছে যায়নি। বাংলাদেশে নিরাপদ আশ্রয়ে থেকেও সবসময় তার মধ্যে আতংক কাজ করতো। ১৪ বছর বয়সী জোবায়েরের বেশিরভাগ দিন কাটতো খুপরি ঘরের ভেতরে নির্জনে। পরিবারে তার কাছাকাছি বয়সী আরও ছয়টি ভাই বোন আছে। সবাই মিলে একটি খুপরি ঘরে গাদাগাদি করে থাকতে হয়। অথচ কদিন আগেও যার জীবন ছিলো হাসি আনন্দে পরিপূর্ণ। স্কুলে যেতো,বন্ধুদের সাথে খেলতো। নদীর পানিতে নেমে সাঁতার কাটতো। এখানে আসার পর তার আর কিছুই করার সুযোগ নেই। শিক্ষার সুযোগও ছিলো না।

তার বয়সী ৮০ শতাংশ রোহিঙ্গা কিশোর-কিশোরী আশ্রয়শিবিরে আসার পর শিক্ষার সুযোগ পায়নি। পরবর্তী সময়ে আশ্রয়কেন্দ্রে নানাবিধ শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর তাদের অনেকেই কিছু কিছু শিখতে শুরু করেছে। গত কয়েক বছরে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ থিয়েটার আর্টস দ্বারা পরিচালিত ইউনিসেফ সমর্থিত সামাজিক কেন্দ্রে যুব নেতৃত্ব এবং পিয়ার-টু-পিয়ার বিভিন্ন কর্যক্রমে তার মত কিশোর কিশোরীরা অংশ নিয়েছে। জীবনে নানা ক্ষেত্রে কাজে লাগবে এমন দক্ষতা অর্জন এবং সমমনা বন্ধুদের সাথে দেখা করার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে ক্যাম্পে থাকা সামাজিক কেন্দ্রগুলো। ক্যাম্পে থাকা কিশোরদের মধ্যে যারা সামাজিক কেন্দ্রের সুবিধা নিচ্ছে তাদের দিন একরকম কাটছে কিন্তু যারা এর বাইরে তাদের দিন সম্পূর্ন আলাদা। খোলা আকাশের নিচে থাকলেও রোহিঙ্গা কিশোর কিশোরীদের ক্যাম্পের বাইরে যাওয়া নিষেধ। যদিও অনেকেই নানা ভাবে বাইরে গিয়ে কাজ করছে। কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন হোটেল রেস্তোরায় তারা পরিচয় লুকিয়ে কাজ করছে। মেয়েদের সেই সুযোগ কম থাকায় তারা খুব একটা বাইরে যাচ্ছে না। কিন্তু কিশোরদের এই সুযোগ রয়েছে। আর যারা ক্যাম্পেই অবস্থান করছে তারা সাধারণত বন্ধুদের নিয়ে ক্যারাম খেলে,তাস খেলে বা আড্ডা দিয়ে সময় পার করে। দেশী বিদেশী নানা সংস্থার মাধ্যমে পরিবার প্রতি সহযোগিতা করা হয় ফলে অনেকের মধ্যেই একরকম গা ছাড়া ভাব দেখা যায়। কিন্তু অনেক কিশোর কিশোরী আছে যারা বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখে। তারা তাদের আয়ের পরিমান বৃদ্ধির জন্য লুকিয়ে বাইরে গিয়ে পরিচয় গোপন করে বিভিন্ন কাজের সাথে যুক্ত হয় বলেও দেখা যায়।

শরণার্থী কিশোর-কিশোরিদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ নিরসনের লক্ষে ইউনিসেফ রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় কমিউনিটির কিশোর-কিশোরী৬দের বয়ঃসন্ধিকালীন বিকাশ এবং দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বেশ কয়েকটি সামাজিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেছে। রোহিঙ্গা এবং স্থানীয় কমিউনিটির মধ্যে সামাজিক সংহতি উৎসাহিত করাও সামাজিক কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্য। এই সব সামাজিক কেন্দ্রে অনেক বাংলাদেশী কিশোর কিশোরীও সদস্য হিসেবে যুক্ত হয়েছে। যেন দেশ থেকে বিতাড়িত শরণার্থী হিসেবে থাকা রোহিঙ্গা কিশোর কিশোরীরা মানসিক ভাবে শক্তিশালী হতে পারে। তেমনই এক বাংলাদেশী কিশোরী সদস্য মানসুরা (ছদ্মনাম)। বয়স ১৫ বছর। গত দুই বছরে রোহিঙ্গা কমিউনিটির মেয়েদের সাথে তার মত বাংলাদেশী কিশোরী সদস্যরা দ্রুত বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছে। তারা প্রায়শই তাদের জীবন নিয়ে একে অন্যের সাথে গল্প করে। মানসুরার মতো সহজে বিশ্বাস করা যায় এমন অনেক কিশোরীকে পেয়ে রোহিঙ্গা কিশোরীরা তাদের লড়াই এবং প্রতিদিন কীভাবে তারা তাদের দেশকে মিস করছে সেই কষ্টের গল্প বলে।মানসুরা বলে, “একদিনের জন্যও বাংলাদেশ ছেড়ে যেতে বাধ্য হতে পারি আমি এটা কল্পনাও করতে পারিনা। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে তারা তাদের ঘরবাড়ি থেকে দূরে রয়েছে। এটা ভাবতেও খুব কষ্ট হয়”।

মানুষ যখন অসহায় হয়ে পড়ে, বিপর্যয়ের মুখে পড়ে, তখনই সবচেয়ে নিগ্রহীত হয়, নির্যাতনের শিকার হয়। ইউনিসেফ বাংলাদেশের ইমার্জেন্সি ম্যানেজার মাইকেল জুমা বলেন, “কিশোর কিশোরীরা যখন তাদের পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তখন তারা যৌন নির্যাতন, পাচার ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা সহ বিশেষ করে শোষণ ও নির্যাতনের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। তাদের স্কুল থেকে ঝরে পড়ার আশঙ্কাও বেড়ে যায়।এটি মানসিকভাবে অত্যন্ত বিপর্যয়কর একটি অভিজ্ঞতা, যা তাদের সুরক্ষা ও বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলে”। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা ১৫ বছরের কম বয়সী অসংখ্য রোহিঙ্গা মেয়ে শিশুরা ধর্ষণের শিকার হয়েছে বলে নানা সময়ে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছে। 

বাল্যবিবাহ একটি সামাজিক ব্যাধি। বাল্যবিবাহের ফলে নানা রকম সমস্যা তৈরি হয়। বাল্যবিবাহ রোধে বিশ্বব্যাপী জোর প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। আইন তৈরি করা হয়েছে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। কিন্তু এতো কিছুর পরও বাল্যবিবাহ বন্ধ হচ্ছে না। এর পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। বাল্যবিবাহ রোধে সামাজিক আন্দোলন চলমান থাকলেও ফাঁকফোকর দিয়ে প্রতিদিনই দেশের নানা প্রান্তে বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটছে। আশঙ্কাজনক বিষয় হলো বাল্যবিবাহের এই হার রোহিঙ্গাদের মধ্যে অনেক বেশি। কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরগুলোতে তার পরিধি ব্যাপকহারে বেড়েছে ৷ অন্তত ৯০ শতাংশ বিয়ে শুধু অভাবের তাড়নায় হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট গবেষক ও সমাজকর্মীরা। একবার ভেবে দেখুন একটি কিশোরীকে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে শুধুমাত্র তার প্রতিদিনের খাবারের জোগাড় হবে এই আশায়। বাবা মা কতটা অসহায় হলে কেবল মাত্র খাবারের জোগাড় হবে,পেটে ভাতে বেঁচে থাকবে এই চিন্তা থেকে মেয়েকে বিয়ে দিতে পারে।

কক্সবাজারে অবস্থিত রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ঘুরলে যে দৃশ্যটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়বে তা হলো বাচ্চা কোলে অসংখ্য কিশোরী। এ বিষয়ে যাদের পূর্ব ধারণা নেই তারা মনে করবে হয়তো বোনের কোলো তার ছোট ভাই বা বোন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। কিশোরীদের কোলে থাকা শিশুটি তার নিজের সন্তান! যে নিজেই কৈশোর পেরোয়নি সে এখন আরেক শিশুর মা! মোহাম্মদ সেলিম নামে একজনের কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি মিয়ানমারের কারারুপাং এলাকা থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে এসে কুতুপালং ক্যাম্পে ঠাঁই নিয়েছেন। তারা যখন মিয়ানমার বসবাস করতেন তখন থেকেই রোহিঙ্গাদের মধ্যে মেয়েদের অল্প বয়সে বিয়ে দেয়ার প্রচলন ছিল। যার মুল কারণই হল নিরাপত্তা। বাংলাদেশে আসার পরও সেটিই বড় কারণ হিসেবে রয়ে গেছে। তার মতে, “যদি আমার বোনটাকে আমি বিয়ে না দেই, তাহলে সে এদিক ওদিক চলাফেরা করবে আর ওরা ওর গায়ে হাত বাড়াবে। তাই আমরা তাড়াতাড়ি বিয়ে দিয়ে দেই। তাতে করে সে তার শ্বশুর বাড়িতে থাকবে। বাজারে যাবে না, এদিক ওদিক যাবে না। অধিকাংশ সময় সম্মান বাঁচাতে এটা করতে বাধ্য হতে হয়”।

তেমনই এক কিশোরীর ছদ্মনাম আকলিমা। বয়স ১৩ বছর। চোখের সামনে বাবা মাকে নৃশংস ভাবে খুন হতে দেখেছে সে। তারপর কিছুদিন জীবন নিয়ে পালিয়ে থেকে একসময় দাদির সাথে তিন দিন অবিরাম হেটে বাংলাদেশ সীমান্ত পার হয়ে এই দেশে আশ্রয় নিয়েছে। বাবা মা ছাড়া আকলিমাকে দেখার মত কেউ ছিলো না। সেই বাবা মা নৃশংসভাবে খুন হওয়ার পর দাদিই ছিলো একমাত্র আপনজন। কিন্তু শরাণার্থী শিবিরে থাকা দাদির পক্ষেও তার খরচ বহন করা সম্ভব ছিলো না। ফলে কয়েক মাস আগে তাকে বিয়ে দেওয়া হয়েছে! ১৩ বছর বয়সে যে কিশোরীর প্রজাপতির মত ডানা মেলে পৃথিবী দেখার কথা,স্কুলে যাওয়ার কথা,ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে বিভোর থাকার কথা, সেই কিশোরী এখন কারো স্ত্রী হিসেবে সংসার শুরু করেছে। হয়তো কদিন বাদেই সন্তানের মা হবে। ডয়েচেভেলের সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে মেয়েটি আক্ষেপ নিয়ে বলেছিল শুধুমাত্র পেটে ভাতে বেঁচে থাকার জন্য দাদি বাধ্য হয়ে তাকে বিয়ে দিয়েছেন! বিয়ে হয়েছে ফলে তার কাপড়,খাবার সব কিছুর দায়িত্ব স্বামী ও শ্বশুরবাড়ীর লোকদের। যদি এসবের চিন্তা না থাকতো তবে সে এই বয়সে বিয়ে করতো না। সুযোগ পেলে সে লেখাপড়া করতো।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এমন আকলিমার সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। হয়তো তাদের কারো নাম জরিনা, কারো নাম মর্জিনা বা নাফিসা হতে পারে। কিন্তু তাদের সবার ভাগ্য একই রকম। আকলিমার মতই আরেক কিশোরীর নাম জোবেদা। তারও বিয়ে হয়েছে কিছুদিন আগে। বয়স এখন ১৬ বছর। যখন বিয়ে হয়েছিল তখন আরো কম ছিল। তাছাড়াও আইনগত ঝামেলা এড়াতে অধিকাংশ বাল্যবিবাহের ক্ষেত্রে মেয়ের বয়স দুই থেকে তিন বছর বাড়িয়ে দেখানো হয়। হয়তো সে ক্ষেত্রে বিয়ের সময় আকলিমা বা জোবেদাদের প্রকৃত বয়স ১০ থেকে ১২ বছরও হয়ে থাকতে পারে।

ওরা জানে না ওদের অনাগত সন্তানের ভবিষ্যত কেমন হবে। শুধু জানে বিয়ে করার কারণে খাবারের সংকট কাটাতে পেরেছে। শরণার্থী শিবিরে পরিবার হিসেব করে ত্রাণ দেয়া হয় ৷ তাই নিজের সংসার হওয়ায় ত্রাণ এখন বেশি পাওয়া যাচ্ছে ৷ মেয়েদের জন্য খাদ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার তাদের বিয়ে দেওয়াই একমাত্র সমাধানের পথ হিসেবে মনে করে। এতে কিশোরীর শারীরিক ও মানসিক অনেক ক্ষতি হতে পারে জেনেও তারা তা আমলে নেয় না। এমনও পরিবার আছে, যাদের সদস্য সংখ্যা দশ এগারো জন। ছোট বাসায় দেখা যায় দুইজন যুবক ছেলে আর দুইজন যুবক মেয়ে। তখন তাদের দুইটা আলাদা রুম দিতে হয় যা তাদের পক্ষে সম্ভব না। ফলে তারা মনে করে ওদের যদি বিয়ে দিতে পারি তাহলে কিছুটা সুবিধা হবে।

রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছে বিভিন্ন দেশী এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা ৷ এসব প্রতিষ্ঠানের গড়া স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে প্রসুতি মায়েদের এবং শিশুদের জন্য চিকিৎসা সেবার বিশেষ ব্যবস্থা রয়েছে৷ কুতুপালং ক্যাম্পে দু’বছর ধরে কাজ করছেন ড. রোমানা ইসলাম৷ অল্পবয়সি মেয়েদের গর্ভধারণ নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন তিনি ৷ কখনো কখনো দিনে ২৫ থেকে ৩০ জন কিশোরী অন্তঃসত্ত্বার চিকিৎসা করেন তিনি ৷ তার মতে, ‘‘বাল্যবিবাহের শিকার মেয়েরা প্রথমত অপুষ্টিতে ভোগে৷ যেহেতু তারা নিজেরাই ছোট এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক, তাদের বাচ্চাগুলোও ছোট এবং অপরিনত হয়৷ অনেকসময় তাদের ডেলিভালির সময় অনেক বেশি রক্তক্ষরণ হয়৷ তারা নিজেরা নিজেদের যত্নতো নিতেই পারে না, সন্তানের যে পরিমাণ যত্ন নেয়া দরকার, সেটাও নিতে পারে না”। অন্যদিকে এদের মাধ্যমে বাংলাদেশের জন্মহারও বাড়ছে, জনসংখ্যাও বৃদ্ধি পাচ্ছে যা ভবিষ্যতের জন্য আরও বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে বলে মনে করেন অনেকেই। 

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে থাকা কিশোর কিশোরীদের শিক্ষা সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে দেখা যায়। নিজ দেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে অন্য একটি দেশে সহায় সম্বলহীন জীবনে অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত বাবা মায়ের সাথে কিংবা বাবা মা ছাড়া এতিম হিসেবে ঝুপড়িতে থেকে একটি কিশোর বা কিশোরীর পক্ষে পড়াশোনা করা কি সম্ভব? ক্যাম্পে থাকা কিশোর কিশোরীদের অবর্ননীয় সেই বেদনার কথা লিখে শেষ হবে না। জাতিসংঘের শিশু অধিকার বিষয়ক প্রতিষ্ঠান  ইউনিসেফ এবং তাদের অংশীদার বেসরকারি সংস্থাগুলো ২ হাজার ৮০০ শিক্ষা কেন্দ্রের মাধ্যমে কক্সবাজার ক্যাম্পে সাড়ে ৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী কিশোর কিশোরীদের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিল। করোনার ভয়াবহতার কারণে ২০২০ সালের মার্চে দেশব্যাপী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। একই সাথে বন্ধ হয়ে যায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পরিচালিত স্কুলগুলোও। ফলশ্রুতিতে রোহিঙ্গা কিশোর কিশোরীরা দীর্ঘ সময় শিক্ষার কোনোও সুযোগই পায়নি। আর ওই সময়ে বাল্য বিবাহের হার বেড়েছে, অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও বেশি ঘটেছে। যদিও পরবর্তীতে শিক্ষা কার্যক্রম আবার চালু হয়েছে।

ইউনিসেফ ১৫ থেকে ১৮ বছর বয়সী ৭৪,০০০-এর অধিক রোহিঙ্গা কিশোর-কিশোরীদের সাক্ষরতা, সংখ্যাগণনা, জীবন দক্ষতা এবং বৃত্তিমূলক দক্ষতা প্রশিক্ষণসহ শিক্ষার সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে। নূর নামে ষোল বছর বয়সী এক রোহিঙ্গা কিশোর ইউনিসেফ সমর্থিত বহুমূখী শিশু ও কিশোর-কিশোরী কেন্দ্রে দক্ষতা বিকাশের কার্যক্রমে অংশ নিয়েছিল। শরণার্থী শিবিরগুলোর সর্বত্র যেসব সৌর প্যানেল রয়েছে সেগুলো স্থাপন ও মেরামত করতে শিখছে নূর। ফলে সে এখন তার বাড়ির সৌর প্যানেল নিজে নিজেই মেরামত করতে পারে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে থাকা ১২ বছরের মেয়ে রাজিয়া। তার এবং তার ছোট বোন ফেরদৌস ও সাদেকার ইউনিসেফের ওয়ার্ল্ড ভিশন সেন্টারে অবস্থিত রোহিঙ্গা শিবিরে সবচেয়ে সেরা সময় কাটে। সেখানে তারা সেলাই, হস্তশিল্পের কাজের পাশাপাশি ইংরেজি ও বার্মিজ ভাষা এবং গণিতসহ জীবন ধারণের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও শেখে। শরণার্থী হিসেবে থাকা রোহিঙ্গা কিশোর কিশোরীরা নানা কারণে মাদক পাচার থেকে শুরু করে অন্যান্য সন্ত্রাসী কার্যক্রমের সাথেও জড়িয়ে পড়ছে।অনেক সময় তাদেরকে জোর করে এসব কাজে বাধ্য করা হচ্ছে। পাশাপাশি পাচারের শিকারও হতে হচ্ছে। 

জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মতে, শরণার্থীদের অন্তত ৬০ ভাগই ১৬ বছরের কম বয়সী কিশোর কিশোরী। উখিয়া,কুতুপালং সহ অন্যান্য শরণার্থী শিবিরে প্রায় সাড়ে তিন লাখ কিশোর কিশোরী রয়েছে। এদের মধ্যে প্রায় ১৫ হাজার কিশোর কিশোরী সহিংসতায় তাদের বাবা, মা অথবা দু’জনকেই হারিয়েছে। অন্তত ২০ হাজার রোহিঙ্গা কিশোর কিশোরী বিভিন্নভাবে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। ভয় ও আতঙ্ক কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করার জন্য গত কয়েক বছরে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে কয়েক শত শিশু কিশোর কিশোরী সহায়তা কেন্দ্র চালু করা হয়েছে, যেখানে নাচ, গান এবং অংশগ্রহণমূলক বিভিন্ন খেলার মাধ্যমে তাদের মন থেকে ভয়াবহ স্মৃতিগুলো মুছে দিতে চেষ্টা করা হয়। কিন্তু চাইলেই কি আর এমন বেদনার স্মৃতি মন থেকে মুছে ফেলা যায়? তেমনই এক কিশোরীর ছদ্মনাম জামিলা। তার বয়স এখন ১৫ বছর। যখন শরণার্থী হয়ে এসেছিল তখন বয়স ছিলো ১২ বছর। আপনজন বলতে কেউ নেই তার। অভিভাবক হিসেবে সে রাশিদা বেগম নামে একজনকে পেয়েছে। যিনি মায়ানমারে জামিলাদের প্রতিবেশী ছিল।

কিশোর কিশোরীর বিকাশে পরিবার এবং শিক্ষা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।কিন্তু একজন শরাণার্থী কিশোর বা কিশোরীর ক্ষেত্রে এ দুইটিরই কমতি দেখা যায়। রোহিঙ্গা কিশোর কিশোরীরা একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। এটি তাদেরকে হতাশার দিকে নিয়ে যেতে পারে। শিক্ষণের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা না থাকলে, পাচার, বাল্য বিবাহ, শোষণ ও নির্যাতনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ কম থাকা এবং বড় হওয়ার সাথে সাথে নিজেদের পরিচয় প্রকাশের যথাযথ জায়গা এবং সুযোগ না থাকায় এসব শরণার্থী কিশোর কিশোরীদের অনেকেই একটি হারানো প্রজন্মের অংশ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। নিজেদের পড়াশুনা, লেখালেখি, খেলাধুলা এবং সৃজনশীল দিকগুলো বিকশিত করার স্বাধীনতা রয়েছে তাদের জন্য এমন নিরাপদ জায়গা করে দেওয়া এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আর সেটা হতে পারে যদি তাদেরকে নিরাপদে তাদের মাতৃভূমিতে ফিরিয়ে নেওয়া যায়। এ জন্য শুধু বাংলাদেশ সরকারের ইচ্ছে বা প্রচেষ্টাই যথেষ্ট নয় পাশাপাশি মায়ানমারকেও সদিচ্ছা প্রকাশ করতে হবে এবং পৃথিবীর ক্ষমতাধর রাষ্ট্রকে জাতিগত এই সমস্যা সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। আমরা শুধু তাদের দিকে তাকিয়ে বলতে পারি “ পৃথিবীতে শান্তি বিরাজ করুক”।

৩০ অক্টোবর ২০২৩

ইমেইল: [email protected]

লেখাটি দৈনিক খবরের কাগজ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে ১০ নভেম্বর ২০২৩ । প্রকাশিত লেখার লিংক ইপেপারের লিংক

কক্সবাজারগামী ট্রেন: পর্যটন খাতে সম্ভাবনা ও আশঙ্কা

0

দেশের প্রধানতম পর্যটন নগরী কক্সবাজার। ছুটির অবসরে ঘুরতে যাওয়ার জন্য দেশের ভ্রমণপিয়াসী মানুষ স্বভাবতই কক্সবাজারকে প্রথম পছন্দ হিসেবে বেছে নেয়। তবে দীর্ঘদিন এখানে কাজের সুবাদে থাকার কারণে আমি দেখেছি এখানকার খরচ তুলনামূলক ভাবে অনেক বেশি। এমনকি ভালোভাবে হিসেব করলে দেখা যায় কক্সবাজারে আসলে একটি পরিবারের যে পরিমান খরচ হয় সেই একই পরিমান অর্থ ব্যয় করে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে ঘুরে আসা যায়। অন্যদিকে দূরত্বের কারণে অনেকেই ছুটি পেলেও খরচ ও অন্যান্য বিষয় বিবেচনা করে কক্সবাজারে যেতে পারে না। অনেকেই মনে করতো যদি কক্সবাজারে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকতো তাহলে কক্সবাজার যাওয়ার ইচ্ছেটা পূরণ হতো। কারণ তুলনামূলক ভাবে ট্রেনের ভাড়া কম থাকে। পাশাপাশি ট্রেনে ভ্রমন নানা কারণে আমারদায়ক বিধায় অনেকেই ট্রেনকেই যাতায়াতের জন্য সেরা মাধ্যম মনে করে।কিন্তু এতোদিন কক্সবাজারের সাথে রেল যোগাযোগ ছিল না। সম্প্রতি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো। কক্সবাজার রেল যোগাযোগ চালু হলো। এতে করে কক্সবাজারের সাথে সারা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন অধ্যায় সূচিত হবে বলে মনে করি। পর্যটনখাতে আয়ও বাড়বে। সেই সাথে এদিকে আরও বেশি কর্মসংস্থান হবে।

অর্থনীতির পরিভাষায় যোগান বৃদ্ধি পেলে দাম কমার কথা। যেহেতু ট্রেন যোগাযোগের একটি বড় মাধ্যম, তাই এটা স্বাভাবিক ভাবে ধরে নেওয়া যায় পযর্টকদের একটি বিরাট অংশ কক্সবাজার যাওয়া আসার ক্ষেত্রে রেলপথ বেছে নিবে। আর এটা হলে বাস এবং বিমানের যাত্রী সংখ্যা অনেকটাই কমে যাবে। ফলশ্রুতিতে বাস এবং বিমান উভয়েই যাত্রী ধরে রাখতে হলে ভাড়ার পরিমান কমানো ছাড়া কোনো পথ থাকবে না। সেই কমানোর পরিমান ঠিক কত হবে সেটা এখনি বলা যাচ্ছে না। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বিভিন্ন অফার দেওয়া,দাম কমানো সহ নানা সুযোগ সুবিধা বৃদ্ধি করা ছাড়া গ্রাহক ধরে রাখা সম্ভব নয়। যেহেতু যোগাযোগের তিনটি ভিন্ন মাধ্যমই এখন কার্যক্রম শুরু করেছে, তাই স্বভাবতই অপেক্ষাকৃত কম খরচে যে মাধ্যমে মানুষ যাতায়াত করতে পারবে সেটাই বেছে নিবে।

অনেক বয়স্ক মানুষ আছেন, এমনকি অনেক অল্প বয়সী মানুষও আছে যারা দীর্ঘ পথ বাসে ভ্রমন করতে পারে না। অসুস্থবোধ করা,বমি হওয়া থেকে শুরু করে নানা সমস্যায় ভুগতে হয়। তাছাড়াও দীর্ঘ ক্লান্তিকর ভ্রমনেও অনেকের মধ্যে অনীহা দেখা দেয়। ট্রেন সেটাকে অনেকটাই কমিয়ে দিতে পারে। ট্রেনের মধ্যে হেটে বেড়ানো যায়। চা কফি খাওয়া যায়। টয়লেটের ব্যবস্থা থাকে, বাইরের দৃশ্য দেখতে দেখতে পিকনিকের আমেজে যাওয়া যায়। অন্যদিকে অল্প সময়ে ভ্রমনের জন্য বিমান প্রধান মাধ্যম হলেও ঢাকা সহ অন্যান্য এয়ারপোর্ট থেকে কক্সবাজারের বিমান ভাড়া অনেক বেশি। ফলে সাধারণ মানুষের জন্য সেটা বহন করা সম্ভব হয় না। এ ক্ষেত্রে ট্রেন হয়ে উঠবে তাদের প্রথম পছন্দ কারণ কর্তৃপক্ষের দেওয়া হিসেব মতে ট্রেনের ভাড়া হবে বাসের প্রায় অর্ধেক বা তারও কিছু কম। ফলে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ দেশের অন্যান্য রুটের তুলনায় এই রুটে সারা বছরই যাত্রী পাবে এবং সঠিক ভাবে সেবা দিতে পারলে রেলওয়ের ভালো আয় হবে। কিন্তু সেবার মান অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে।

এটাতো গেলো সম্ভাবনার কথা। কিন্তু এই ট্রেন যোগাযোগ চালুর পর আমি কিছু আশঙ্কাও করছি। পযর্টকের পরিমান বেড়ে যাওয়ায় হোটেল মোটেলে যায়গার সংকুলান হবে না। এক শ্রেণীর মানুষ এটাকে পুজি করে হোটেল মোটেলের ভাড়া বাড়িয়ে দিতে পারে। একই সাথে অন্যান্য সেবা খাত যেমন, খাবারের হোটেল,প্রয়োজনীয় পণ্য,লোকাল গাড়ি ভাড়া সব বাড়িয়ে দিতে পারে। প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে। পরিবেশ দূষণের হার বাড়তে পারে। সেই সাথে সমুদ্র সৈকত এলাকায় অপরাধ প্রবণতাও বাড়তে পারে এবং সৈকতের পরিবেশও নষ্ট হতে পারে। যে পরিমান ধারণ ক্ষমতা আছে তার অধিক পযর্টকের আগমনে সৈকতের সৌন্দর্য নষ্ট হতে পারে। আর দেশের অন্যতম আকর্ষনীয় স্থান সেন্টমার্টিন যেহেতু কক্সবাজারেই তাই সেখানেও যেতে চাইবে অনেকে। ফলে সেন্টমার্টিনের জন্যও তা হবে ভয়াবহ।

অন্যদিকে ট্রেন চালুর পর গণপরিবহনের ভাড়া কমানো বা যাত্রী কমে যাওয়ার বিষয়টি আমলে নিয়ে একটি চক্র ভয়বহ সিদ্ধান্ত নিতে পারে। আর সেটা হতে পারে মানুষকে ট্রেন থেকে বিমুখ করা। এটা করার জন্য তারা চক্রান্ত করে ট্রেনে পাথর ছুঁড়ে মারতে পারে। সারা দেশের বিভিন্ন রুটে নানা সময়ে পাথর মারার ঘটনা আমরা দেখে থাকি। এটা কেউ পাগলামী করার জন্য মারে না বরং এর পেছনে নিশ্চই গোপন অভিসন্ধি থাকে। এখানেও তেমনটি ঘটার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। সব জায়গায় ভালো এবং খারাপ মানুষ থাকে। নিজেদের ব্যবসা ধরে রাখার জন্য, যাত্রী যেন কমে না যায় সেটা মাথায় রেখে কোনো দুষ্কৃতিকারী যদি ট্রেনের জানালায় পাথর ছুঁড়ে মারে,কাউকে হতাহত করে, ভয় দেখায়, তবে তারা অনেকটাই সফল হবে। ট্রেন থেকে হতাহতের ভয়ে যাত্রীরা মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। এতে করে এক শ্রেণীর মানুষ নিশ্চই লাভবান হবে যারা যাত্রী সেবা দিয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে আগে থেকেই ঘোষণা দেওয়া উচিত এই ধরনের কোনো ঘটনা ঘটলে প্রথমেই একই ধরনের সেবাদানকারীদের উপর পরোক্ষ ভাবে হলেও দোষ যাবে। এটা করতে পারলে শুরুতেই তারা সচেতন হবে এবং ভুলেও যদি কারো মনে এই ধরণের অভিসন্ধি থেকে থাকে তো তারা সেই পথ থেকে ফিরে আসবে। অন্যদিকে দালাল চক্র সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে যারা টিকেট নিয়ে দালালি করবে।

পৃথিবীর অনেক দেশ আছে যাদের অর্থনীতি একটি বড় অংশ পযর্টন নির্ভর। মরিশাচ,থাইল্যান্ড,ইন্দোনেশিয়া,ভূটান,মালদ্বীপ তার মধ্যে অন্যতম।তারা পযর্টনকে সত্যিকার অর্থে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পেরেছে বলেই আজ ওই সব দেশে পযর্টকদের আনাগোনা অনেক বেশি। বাংলাদেশ থেকেও প্রতিবছর ওই সব দেশে হাজার হাজার পযর্টক ভ্রমন করতে যাচ্ছে। তাদের মতামত আমরা নানা সময়ে দেখতে পাই। ওই সব দেশে গিয়ে তারা যেমন হসপিটালিটি পেয়ে থাকে,যেমন পরিবেশ পেয়ে থাকে তার ছিটেফোটাও আমরা আমাদের পযর্টনকেন্দ্রগুলোতে দিতে পারি না। ফলে বিদেশী পযর্টকরা যেমন আমাদের এখানে আসতে আগ্রহ হারায় তেমনি দেশীয় পযর্টকদের এক বিরাট অংশই বিদেশমুখী হয় বিশেষ করে যাদের আর্থিক সংগতি আছে।

সুতরাং পযর্টন শিল্প বলে আমরা যেটাকে আখ্যায়িত করি সেখানে পযর্টন শব্দটি থাকলেও শিল্প খুব একটা নেই বলাই চলে। শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারলেই কেবল এ খাত হয়ে উঠতে পারে অত্যন্ত লাভজনক এবং দেশ এই খাত থেকে অনেক বেশি লাভবান হতে পারে। বৈদেশিক মুদ্রায় আয় হতে পারে ঈর্ষনীয়। সে ক্ষেত্রে যাতায়াত ভাড়া,হোটেল ভাড়া নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পযর্টক বৃদ্ধিপেলেই একশ্রেণীর মানুষ সেটাকে পুজি করে হোটেল,মোটেল ভাড়া বাড়িয়ে দেয়, গাড়ি ভাড়া বাড়ায়, খাবারের দামও বাড়ায়। এসব নিয়ে নানা সময়ে আমরা নিউজ হতে দেখি কিন্তু আশানুরুপ পদক্ষেপ নিতে দেখি না। যদি এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা যায়,নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা যায় তবে এ খাত হয়ে উঠতে পারে অপার সম্ভাবনাময়। একই সাথে কক্সবাজারে সমুদ্র সৈকত ছাড়া আর কোনো বিনোদন মাধ্যম নেই। নেই কোনো সিনেপ্লেক্স,নেই কোনো মাল্টিপ্লেক্স,নেই কোনো বলার মত শিশুপার্ক বা অন্যান্য বিনোদন কেন্দ্র। ফলে দেশী বিদেশী পযর্টকরা এখানে এসে খুব সহজেই হতাশ হয়ে পড়ে, আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এই বিষয়গুলো কঠোর নজরদারীতে আনা জরুরী।

কক্সবাজারে বর্তমান যে পরিস্থিতি আছে তাতেও বলা যেতে পারে সরকার এখান থেকে মাসে শত কোটি টাকা রাজস্ব পাচ্ছে। কিন্তু সেই তুলনায় সরকারী ভাবে তেমন কোনো সুযোগ সুবিধাই এখানে দেওয়া হচ্ছে না বলে পযর্টকরা মনে করে। বীচ এরিয়াতে নেটওয়ার্কের অবস্থাও খুবই দুর্বল। তারা চাইলেও ঘরে রেখে আসা প্রিয়জনদেরকে ভিডিও কলে বা লাইভের মাধ্যমে সমুদ্র দেখাতে পারে না। অথচ চাইলেই পুরো জোনটাকে ফ্রি ওয়াইফাই জোন করে দেওয়া যায়। আর সরকারি ভাবে এটা করতে পারলে দারুণ প্রসংশাও পাবে বলে আমি মনে করি। লাবণী পয়েন্ট থেকে কলাতলী পয়েন্ট পযর্ন্ত এই তিন চার কিলোমিটার এরিয়ায় ১০০০ টি রাউটার লাগালে এবং প্রতিটির জন্য মাসে ১ হাজার টাকাও যদি খরচ হয় তবে মাসে ইন্টারনেট বাবদ খরচ হতো ১০ লাখ টাকা। যেখানে সরকার শত কোটি টাকা মাসে রাজস্ব পাচ্ছে সেখানে পযর্টকদের জন্য এক দুই কোটি টাকা তারা খরচ করতে পারবে না এটা অন্তত কল্পনাও করা যায় না। এর বাইরে বীচ এরিয়াতে যে লাইটগুলো আছে তা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম আলো দেয়। যে আলোতে বীচের সৌন্দর্য দেখা যায় না। এখানে স্টেডিয়ামের মত তিন পয়েন্টে তিনটি ফ্ল্যাড লাইট স্থাপন করতে পারলে পুরো এরিয়া আলোকোজ্জল হয়ে উঠতো এবং বীচ হয়ে উঠতো নিরাপদ এবং আকর্শনীয়। এমনকি এই সব ক্ষেত্রে যা খরচ হতো সেটাও সরকার চাইলে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মাধ্যমেই পূরণ করতে পারতো।

এই শহরে যাতায়াতের জন্য ব্যাটারিচালিত রিকশা বা টমটমই একমাত্র বাহন কিন্তু সেটার ভাড়ার কোনো বিধিনিষেধ নেই। যার কাছ থেকে যত হাকিয়ে নিতে পারে। পুরো জিম্যি করে রাখা হয় পযর্টকদের। ৩০ থেকে ৪০ কিলোমিটার পথ ব্যাটারি চালিত টমটমে যাওয়া আসার জন্য ভাড়া নেওয়া হয় ৮০০ থেকে ১২০০ টাকা! পাঁচ কিলোমিটার পথ যেতেও তারা ভাড়া দেড়শো থেকে দুইশো টাকা দাবী করে। যেখানে যেতে তাদের মাত্র দশ থেকে বার মিনিট সময় লাগে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে পযর্টন এই দেশে কখনোই শিল্পের পর্যায়ে পৌছাতে পারবে না। সরকার ও সংশ্লিষ্ট সকলের উচিত বিষয়টি গুরুত্বের সাথে নেওয়া।

#জাজাফী

৮ নভেম্বর ২০২৩

লেখাটি দৈনিক খবরের কাগজে প্রকাশিত হয়েছে ১৭ নভেম্বর ২০২৩ তারিখে। প্রকাশিত লেখাটির লিংক (ইপেপার) ওয়েবসাইটের লিংক

আমি যেভাবে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করি

0

সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারে আমি মোটামুটি সচেতনতা অবলম্বন করতে চেষ্টা করি। কখনো কখনো পোস্ট দেওয়ার পর ভুল হয়েছে বুঝতে পারলে সেটা সরিয়ে নিই। নানা কারণে অন্যদের তুলনায় আমি সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকটা সময় ব্যয় করি।তবে এডিক্টেড বলা যাবে না। কারণ সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করতে গিয়ে আমি অন্যান্য কাজ ফেলে রাখ না। সোশ্যাল মিডিয়ায় যে কাজগুলো আমি সাধারণত করি না তার একটি তালিকা নিম্নরুপ। 

১। ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করি না।

বিভিন্ন দিক বিবেচনা করেই মূলত আমি সোশ্যাল মিডিয়ায় আমার ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করি না।প্রতিনিয়ত নিজের জীবনকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরলে মানুষ আমার ব্যক্তিগত জীবনে মতামত দেওয়ার সুযোগ পাবে এবং যেহেতু আমি নিজেই আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার জনসম্মুখে তুলে ধরছি, তাই সবাই আমার জীবনে নাক গলানোকে নিজেদের অধিকার হিসেবে মেনে নেবে। গোপনে আমাকে নিয়ে চায়ের কাপে চর্চাও হবে প্রতিনিয়ত। তাই নিজের ব্যক্তিগত জীবনকে যতটা সম্ভব ব্যক্তিগত রাখাটাই আমি শ্রেয় মনে করি।  এ কারণে আপনারা আমার বন্ধু তালিকায় থাকার পরও,ভালো সম্পর্ক হওয়ার পরও আমার পড়াশোনা,কর্মজীবন,জীবনধারা সম্পর্কে আমি আপনাদের সাথে খুব কমই শেয়ার করি। বছরের পর বছর সুসম্পর্ক থাকার পরও আমার ছবি,বয়স,গ্রামের বাড়ি কোনো কিছুই আপনাদের সাথে আমি শেয়ার করিনি। দুএকজন যাদের সাথে আমার সরাসরি পরিচয় আছে তারাই শুধু খুব সীমিত পরিমান তথ্য জানেন। এতে আমি অনেক নিরাপদ বোধ করি। নির্ভার বোধ করি।

২। নেতিবাচক কথা বলি না

আমাদের দৈনন্দিন জীবনে আমরা কত কথাইতো বলি। কত ঘটনার মুখোমুখি হই। প্রতিটি বিষয়েই দুটি দিক থাকতে পারে যার একটি ইতিবাচক আরেকটি নেতিবাচক। আমি চেষ্টা করি নেতিবাচক বিষয়টি এড়িয়ে যেতে। এমন কোনো কথা বলি না যা নেতিবাচক। যার মাধ্যমে কারো উৎসাহে ভাটা পড়বে, কারো ক্ষতি হবে, কারো আত্মবিশ্বাস কমে যাবে। একজন কম নাম্বার পেয়েছে বলে তাকে বলি না তুমি এতো কম পেয়েছ! তারচেয়ে বরং ইতিবাচক ভাবে তাকে বলি তোমার নাম্বারতো বেশ। তবে তোমার মধ্যে যে সক্ষমতা আছে তুমি চেষ্টা করলে পরবর্তীবার আরও বেশি ভালো করবে। প্রতিনিয়ত তুমি নিজেই নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে পারবে। আমি কারো সাথে কারো তুলনা করে তার মনোবল ভেঙ্গে দিতে ইচ্ছুক নই। সব সময় তাই ইতিবাচক কথা বলাকে আমি প্রাধান্য দিই।

৩। বিতর্কিত পোস্ট করি না

নানা সময়ে আমাদের সমাজে অনেক ঘটনাই ঘটে যা নিয়ে তর্ক বিতর্ক হয়ে থাকে। আমি সাধারণত এমন কোনো পোস্ট করি না যা বিতর্কের জন্ম দেয়। কিছু পোস্ট করি যা হয়তো  আলোচনার বিষয় হতে পারে কিন্তু সেটা সেই অর্থে বিতর্ক তৈরি করে না। বিতর্ক বলতে সেই যে ডিম আগে না মুরগি আগে টাইপ বিষয়কে আমি এড়িয়ে চলি। তবে বিতর্কিত বিষয়ে আমি আমার মতামত তুলে ধরি যেন অপেক্ষাকৃত ভুল ধারণা নিয়ে থাকা মানুষ তা বুঝতে পারে। যেমন ক্রিকেটার তানজিম সাকিবের পুরোনো স্ট্যাটাস নিয়ে যে তর্ক বিতর্ক শুরু হয়েছে তা নিয়ে আমি কোনো পোস্ট করিনি। এর মানে আবার এই নয় যে আমি বিতর্ক এড়িয়ে যাচ্ছি।  আমার কিছু শুভাকাঙ্খী আছেন যারা নানা সময়ে এই ধরনের কোনো বিষয় নিয়ে আমার মতামত জানতে চান। তখন আমি সেসব নিয়ে লিখি বা মতামত দিই। নিজ থেকে বিতর্ক জন্মদিতে আমি পছন্দ করি না।

৪। সার্বক্ষণিক সেলফী/নিজের ছবি পোস্ট করি না

ফেসবুকে সিংহভাগ মানুষই ছবি শেয়ার করেন। এতে দোষের কিছু নেই। তবে কেউ কেউ প্রচুর সেলফী এবং নিজের অন্যান্য ছবি শেয়ার করেন। আমি খুবই কম শেয়ার করি। করলেও অনলি মি করে রাখি কিংবা কিছু নির্দিষ্ট মানুষ দেখতে পাবে সেভাবে অডিয়েন্স সেট করে তারপর পোস্ট করি। আমার এটা ভালো লাগে। 

৫। ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে অভিযোগ করি না

একটা সময় ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে আমিও অভিযোগ করতাম। পরে যখন একটু পরিণত হয়েছি তখন বুঝেছি এটা ঠিক না। অভিযোগ করতে হলে যার বিষয়ে অভিযোগ তাকেই সরাসরি অভিযোগ করার পক্ষে আমি। আমি চেষ্টাও করি ইনবক্সে তাদেরকে তাদের বিষয়ে জানাতে। সোশ্যাল মিডিয়াতে কারো বিষয়ে সরাসরি অভিযোগ করা থেকে যথাসম্ভব বিরত থাকি।

৬। অতিরিক্ত দেখনিপনা টাইপ পোস্ট করি না

নানা সময়ে রেস্টুরেন্টে খেতে দিয়ে বা কোথাও ঘুরতে গিয়ে বা কিছু কেনাকাটা করে তার ছবি তুলে শেয়ার করার একটা রীতি বা প্রবণতা আমাদের সমাজে দেখা যায়। আমিও ঘুরতে যাই,খেতে যাই, ছবি তুলি। তবে সেগুলো অন্যদের মত সোশ্যাল মিডিয়াতে শেয়ার করি না। স্মৃতি হিসেবে শুধু রেখে দিই। তবে কেউ আমাকে যখন উপহার দেয় তখন মাঝে মাঝে খুশি ধরে রাখতে না পেরে সেটা নিয়ে স্ট্যাটাস দিই।

৭। বিভ্রান্তিকর তথ্য পোস্ট করি না

অনেক সময় আমরা দেখতে পাই ভুল ও চটকদার তথ্য দিয়ে অনেক পোস্ট শেয়ার হয়। ওই সব পোস্ট প্রচুর ভিউ হয়,লাইক কমেন্ট পায় এবং ভালো লাগার কারণে অনেক মানুষ শেয়ারও করে। ক্ষেত্র বিশেষে আমারও ভালো লাগে। তবে যদি দেখি তথ্য বিভ্রান্তিমূলক এবং সত্যতা যাচাই করার সুযোগ নেই। কিংবা সত্যটা আমি জানতে পেরেছি যে পোস্টের তথ্য ভুল তখন আমি তা শেয়ার করা বা পোস্ট করা থেকে বিরত থাকি। বরং আমি অন্যরা যে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়াচ্ছে তা সবাইকে জানাতে চেষ্টা করি। আপনারা জানেন রিউমার স্ক্যানার পেজের মাধ্যমে এই ধরনের বিভ্রান্তিকর তথ্য যাচাই করে সবাইকে সচেতন করা হয়ে থাকে।

৮। হ্যাশট্যাগের অতিরিক্ত ব্যবহার করি না

আজকাল অনেকেই কথায় কথায় হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে থাকে। কিছু একটা হলেই হ্যাশট্যাগ দেয়। আমি খুব কম দেই। আমি হ্যাশট্যাগ দিলে শুধু নিজের নামে হ্যাশট্যাগ দিই যেন সহজে কখনো প্রয়োজন পড়লে আমার ওই লেখাটি খুঁজে পাই। তবে সব পোস্টে না বরং যদি কোনো কবিতা,গল্প বা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কিছু লিখি শুধু তখন এটা করি। অর্থাৎ আমার ওই হ্যাশট্যাগ অন্য কারো কাজে আসে না বা অন্য কাউকে প্রভাবিত করে না।

৯। কারো মন্তব্য ও মেসেজ উপেক্ষা করি না

নানা সময়ে আমরা অনেকের পোস্টে মন্তব্য করি বা মেসেজও দিয়ে থাকি। তবে সবাই সব সময় রিপ্লাই দেয় না। আমাকে যারা মেসেজ দেয় আমি প্রায় শতভাগ মানুষকে রিপ্লাই দিই। কাউকে উপেক্ষা করি না। পাশাপাশি যারা মন্তব্য করে তাদের মন্তব্যের রিপ্লাই দিতে চেষ্টা করি। আর যে সব মন্তব্যে রিপ্লাই দেওয়ার সুযোগ নেই সেগুলোতে লাইক দিই।

সোশ্যাল মিডিয়াকে ভালো কাজের জন্য ব্যবহার করতে পারলে অবশ্যই এটি থেকে অনেক উপকৃত হওয়া সম্ভব। আমি এর বহু প্রমাণ পেয়েছি। আবার অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে নিজেদের বিকৃত মানসিকতা জেনে না জেনে প্রকাশ করে থাকে। এটা আমি ঘুরতে ঘুরতে বিভিন্ন মানুষের পোস্টে করা কমেন্ট দেখে যেমন জেনেছি তেমনি বেশ কিছু জনপ্রিয় কিশোর কিশোরীর পেজের এডমিন হিসেবে শত শত বিকৃতমনা মানুষের পাঠানো মেসেজ দেখেও জেনেছি। সবার সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার হোক ইতিবাচক এবং নিরাপদ। শুভেচ্ছা সবাইকে।

১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৩