Wednesday, May 18, 2022
Home Blog

একবার যারা পড়েছে এমন প্রেমে

একবার মিরপুর ১০ নাম্বার থেকে বাসে করে কচুক্ষেত যাচ্ছিলাম। হঠাৎ কেউ একজন পিছন থেকে বললো এক্সমিউজমি ভাইয়া। আমি তাকিয়ে দেখি একটি মেয়ে। আমি তার কথায় মোটেও অবাক হইনি। সে নিজ  থেকে বললো ভাইয়া আমি  এফজিসিসির এক্স ক্যাডেট। বর্তমানে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএতে পড়ছি। এর পর পথ চলতে চলতে বেশ কথা হলো। কচুক্ষেত নেমে তাকে বললাম কী খাবে বলো। দুজনের কেউ কিন্তু কাউকে চিনি না। আগে কোন দিন দেখাও হয়নি। সে বললো ভাইয়া কিছু লাগবে না। আমি বললাম তা কি হয়। এর পর কচুক্ষেতেই একটি রেস্টুরেন্টে তাকে খাওয়ালাম। এক ঘন্টা গল্প করলাম নানা বিষয় নিয়ে।

আমার জানা মতে ক্যাডেট কলেজ ছাড়া আর কোন কমিউনিটি নেই যেখানে এরকম ঘটনা ঘটা সম্ভব। অচেনা একটা ছেলের সাথে  নিজ থেকে পরিচিত হওয়া,গল্প করা,রেস্টুরেন্টে বসে খাওয়া অসম্ভব ব্যাপার। আমি কখনো দেখিনি অন্য কোন প্রতিষ্ঠানের লোগো বা নাম ওয়ালা পোষাক পরিহিত কাউকে দেখে সেই প্রতিষ্ঠানেরই অন্য কেউ যে তাকে চেনে না এভাবে এগিয়ে গিয়ে কথা বলে,গল্প করে,এতোটা আন্তরিকতা দেখায়। ক্যাডেট টিশার্ট, হুডি পরা দেখলেই এগিয়ে গিয়ে প্রশ্ন করে ভাই কোন কলেজ? কত তম ইনটেক? কখনো কখনো রাস্তায় চলতে গিয়ে দেখা যায় কোন গাড়ির পিছনে গ্লাসে এক্স ক্যাডেট অন বোর্ড লেখা। সেটা দেখেও আপ্লুত হয়।ক্যাডেটরাই কেবল যত সিনিয়র হোক, বড় পদে হোক ভাই বলে সম্মোধন করে।একজন সদ্য এক্স ক্যাডেটের সাথে যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের বর্তমান গভর্ণর ফজলে কবিরের সাথে দেখা হয় তখনো তাকে ভাই ডাকে,যে পজিশনেই থাকুক অনায়াসে তাকে ভাই ডাকা যায়। চলতে পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া কতজনকেইতো দেখি কোন দিন জানতেও চাই না তুমি কোন ডিপার্টমেন্ট কিংবা আমাকেও কেউ বলেনি ভাই আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি।

 

বয়স ৮০ পেরিয়ে যাওয়ার পরও এক্স ক্যাডেটদের ক্লাস সেভেনের প্রথম দিনের কথাও মনে পড়ে,নভিসেসের কথাও মনে পড়ে,ফেয়ারওয়েল ডিনারের কি খেয়েছিল,লাইটসআউটের পর কবে কি করেছল,প্রতিটি প্যারেন্টস ডে,ইভিনিংপ্রেপ,ভ্যাকেশান,এক্সকারশান এমনকি প্রতিটি মুহুর্ত তাদের মনে থাকে। অ্যাপুলেটের এক একটি দাগ যেন তাদের কাছে স্বর্ণ দিয়ে মোড়া এক একটি অধ্যায়। একজন বিখ্যাত এক্স ক্যাডেট তাঁর একটি বই উৎসর্গ করেছিলেন কলেজের সিনিয়র এক ভাইকে যিনি কিনা কলেজে থাকতে সেই ক্যাডেটকে দিয়ে সু পলিশ করিয়েছিলেন। বহু বছর পরও সেসব তারা ভুলে যায়নি। সেই বড় ভাই অনেক দূরের দেশে থাকেন। যখন জানতে পারলেন তাকেই বই উৎসর্গ করা হয়েছে তিনি অবাক হলেন এবং জানতে চাইলেন তোকে দিয়ে সু পলিশ করিয়েছি সেই তুই কী মনে করে আমাকেই বই উৎসর্গ করলি? বিখ্যাত সেই এক্সক্যাডেট মিষ্টি হাসি হেসে বললেন ভাই শুধু কি সু পলিশ করিয়েছেন? কিছুকি শেখান নি?

 

ক্যাডেট, এক্স ক্যাডেটদের পরিচয় দেওয়ার জন্য নাম লাগে না,কী করছে সেটা জানা লাগে না মাত্র বললেই হয় ভাই/আপা আমি অমুক কলেজের এক্স ক্যাডেট। কখনো কখনো ক্যাডেট নাম্বার আর ইনটেক নাম্বারেই তার পরিচয়ের জন্য যথেষ্ট হয়।

 

আরও একটা ঘটনার কথা বলি, ক্যাডেট কলেজের ভর্তি পরীক্ষা হচ্ছে। আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজেও কেন্দ্র পড়েছে। এক এক্স ক্যাডেট তার ছাত্রকে ভর্তি পরীক্ষা দিতে নিয়ে গেছে। কলেজের বাইরে অপেক্ষা করছিল। হঠাৎ ঝুম বৃষ্টি ওখানে দাড়ানোর ব্যবস্থা নেই। পাশেই আর্মি অফিসারদের বাসভবন। তারই একটিতে সে ঢুকে গেলো। তার মনে হলো এখানে নিশ্চই কোন না কোন এক্স ক্যাডেট ভাই অফিসার  হিসেবে আছেন যদিও ওখানে আগে কখনো যায়নি এবং কাউকে চেনে না। তিন তলায় উঠে একটা দরজায় নক দিতেই একজন বেরিয়ে আসলেন এবং জানতে চাইলেন কী বিষয়? ছেলেটি বললো ভাই আপনি কি এক্স ক্যাডেট? এর পর আর কিছু বলতে হলো না তাকে ওই অফিসার ভিতরে নিয়ে গেলেন এবং নিজ হাতে কফি বানিয়ে খাওয়ালেন অনেক গল্প করলেন। এটা হলো এক্স ক্যাডেটীয় গল্প।

 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে অ্যালামনাই এসোসিয়েশানের গেটটুগেদার হচ্ছে নির্ধারিত  চাঁদার বিনিময়ে। এক শিক্ষার্থী কোন কারণে চাঁদা দিতে পারেনি কিন্তু ঘটনাক্রমে সেদিন টিএসসিতে উপস্থিত ছিলো। সেই গেটটুগেদারে তার ব্যাচমেটরাও ছিলো। হাই হ্যালো করেই তাকে বিদায় নিতে হলো। কেউ বললোও না তুমি থাকো! না সিনিয়র ভাইয়েরা না তার ব্যাচমেটরা। কিন্তু ক্যাডেট কমিউনিটিতে কখনোই এরকম ঘটে না। অরকা,মেকা,ওকাস,জেক্সকা,একক সহ সব এসোসিয়েশান এখনো প্রতিটি সদস্যকে এবং একে অন্যকে খুব আন্তরিক ভাবে গ্রহণ করে,ভালোবাসে।

 

“এ এমন প্রেম একবার যারা পড়েছে এমন প্রেমে

ভুলতে পারেনি যতক্ষণ তার শ্বাস না গিয়েছে থেমে।”

 

–জাজাফী

১৯/১১/২০

ক্ষমা চাওয়া ও ক্ষমা করা বিষয়ক কিছু কথা

আপনাদের চোখে পড়েছে কি না জানিনা, কয়েকদিন আগে ক্ষমা চাওয়া বিষয়ক একটি পোস্ট ফেসবুকে ভাইরাল হয়েছিল। যেখানে বলা হয়েছিল বলা হয়েছে, গীবতকারীকে লাইলাতুল কদরেও ক্ষমা করা হবে না যতক্ষণ না সে তার (যার নামে গীবত করা হয়েছে) কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। এর পর পরিচিত অপরিচিতদের কাছে ক্ষমা চেয়ে কিছু কথা লেখা হয়েছিল। সেই লেখাটি আমি অনেকের ফেসবুক টাইমলাইনে দেখেছি এবং অনেকে আমাকে ইনবক্সে পাঠিয়েছেন। আমি সবাইকে ক্ষমা করে দিয়েছি। এই ক্ষমা চাওয়া এবং ক্ষমা করা নিয়ে কিছু কথা লিখবো বলেই এই লেখাটি শুরু করেছি। যদি কারো ধৈর্য থাকে তবে পুরো লেখাটি পড়বেন হয়তো এমন কিছু জানতে পারবেন যা আপনি আগে জানতেন না অথবা আগে জানতেন কিন্তু আরও একবার জানলেও ক্ষতি নেই। সেই কথাগুলো বলার আগে আমি আমার সেই বন্ধুটির কথা বলতে যাই যে আমাকে ফোন করে এই বিষয়ে লেখার জন্য অনুপ্রাণিত করেছে। লেখার শুরুতেই নবীজী সা. এর সময়ের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করতে চাই।

একদিন নবীজী (সা.) সাহাবীদের নিয়ে মসজিদে নববীতে বসে আছেন। সবার মনে তাঁর কথা শোনার আগ্রহ। নবীজী বললেন,                   

يَطْلُعُ عَلَيْكُمُ الْآنَ رَجُلٌ مِنْ أَهْلِ الْجَنّةِ.

‘তোমাদের মাঝে এখন আসবে একজন জান্নাতী মানুষ।’ নবীজীর মুখে একথা শুনে  সবাই খুব উৎসুক হয়ে উঠেছিলেন, সেই সৌভাগ্যবান মানুষটি কে- তা দেখার জন্য। ইতিমধ্যে একজন আগমন করলেন, যিনি সবেমাত্র ওযু করেছেন। দাড়ি বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা পানি ঝরছে। জুতা জোড়া বাম হাতে ভাঁজ করা। ধীরে ধীরে মসজিদের দিকে আসছেন। এ দরোজা দিয়েই প্রবেশ করলেন তিনি নবীজীর মজলিসে শরীক হওয়ার জন্য।

দ্বিতীয় দিন। সবাই নবীজীকে ঘিরে বসে আছেন। নবীজী গতকালের মতই বললেন- ‘এখন তোমাদের মাঝে একজন জান্নাতী মানুষের আগমন ঘটবে।’ দেখা গেল এই দিনও সেই মানুষটিকেই আগমন করতে।

তৃতীয় দিন। গত দু’দিনের মত আজও নবীজী (সা.) বললেন সে একই কথা। দেখা গেল নবীজীর কথার পর সেই মানুষটিই মজলিসে আগমন করলেন।

কে এই সৌভাগ্যবান, যিনি তিন তিনদিন তিন তিনবার নবীজী (সা.)-এর মুখে জান্নাতী হওয়ার সনদ পেলেন? তিনি হচ্ছেন হযরত সা‘দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রা.।

                       

হযরত সা‘দ ইবনে আবী ওয়াক্কাস রা.। কেমন ছিলেন তিনি? কী ছিল তাঁর গুণ ও বৈশিষ্ট্য? নবী (সা.) যাঁর সম্পর্কে এই সুসংবাদ দিলেন তার পরের জীবনটুকু কীভাবে কেটেছে? সংক্ষেপে বললে তিনি ছিলেন নবীজীর অত্যন্ত প্রিয় ও বিশ্বস্ত সাহাবী। নবীজী তাকে খুব ভালোবাসতেন। তিনিও নবীজীকে ভালবাসতেন প্রাণ দিয়ে। মাত্র সতের বছর বয়সে তিনি ইসলাম কবুল করেন। তাঁর ইসলাম কবুলের বিবরণও খুবই চমৎকার। দ্বীন-ঈমানের জন্য অতুলনীয় ত্যাগ স্বীকার করেছেন তিনি। জিহাদের ময়দানে ছিল তাঁর অসাধারণ নৈপুণ্য। নবীজী তাঁর সমরকুশলতার প্রশংসা করেছেন। ইসলামের ইতিহাসে তিনিই সর্বপ্রথম শত্রুর বিরুদ্ধে তীর নিক্ষেপ করেছেন।

যে ঘটনাটি বলছিলাম- নবী (সা.)-এর মুখে হযরত সা‘দ রা. সম্পর্কে এই মহা সুসংবাদ ঘোষিত হওয়ার পর যা ঘটল; মজলিস শেষে হযরত সা‘দ রা. যখন বাড়ির পথে রওয়ানা হলেন তখন সাহাবী হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. তাঁর পিছু পিছু হাঁটতে লাগলেন। তাঁর মনে একটিই চিন্তা হযরত সা‘দ রা. কী আমল করেন? কোন আমলের গুণে তিনি এই মহা সৌভাগ্য অর্জন করলেন- তা তাকে জানতেই হবে।  তিনি হযরত সা’দ রা.কে বললেন তিনি তার বাড়িতে তিনদিন থাকতে চান। সা’দ রা. বললেন ঠিক আছে, থাকো। কোনো অসুবিধা নেই। সম্পর্কে সা’দ রা. তার চাচা হন।

হযরত আবদুল্লাহ একে একে তিন রাত হযরত সা‘দের বাড়িতে রইলেন। কৌতুহলের এ তিনরাতে তিনি যা কিছু আবিষ্কার করতে পারলেন তা তিনি এভাবে বর্ণনা করেছেন-

“আমি তিন রাত কাটালাম। তাঁকে রাত জেগে জেগে তাহাজ্জুদও তেমন পড়তে দেখলাম না। তবে রাতে ঘুম ভাঙ্গলেই পাশ ফেরার সময় আল্লাহু আকবার বলতেন; আল্লাহর যিকির করতেন; এরপর ফজরের সময় হলে নামাযের জন্য উঠে পড়তেন।

তবে এ তিন দিন তাঁকে কোনো অর্থহীন শব্দ বা বাক্য বলতে শুনিনি। শুধু ভালো কথাই বলতে দেখেছি।

তিন রাত কাটানোর পর তাঁকে বললাম- চাচা, আব্বার সাথে আমার রাগারাগির কিছু ঘটেনি। শুধু আপনার সাথে কিছু সময় থাকা এবং আপনার আমল পর্যবেক্ষণ করাই ছিল আমার উদ্দেশ্য। কারণ পর পর তিন দিন আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেছেন,

يَطْلُعُ عَلَيْكُمُ الْآنَ رَجُلٌ مِنْ أَهْلِ الْجَنّةِ.

‘এখন তোমাদের মাঝে একজন জান্নাতী মানুষের আগমন ঘটবে।’ তিন বারই দেখা গেল আপনার আগমন হয়েছে। তখন থেকেই আমি সংকল্প করেছি, আপনার সাথে থেকে আপনার ‘আমল’ পর্যবেক্ষণ করব এবং সে মোতাবেক আমল করে আমিও জান্নাতী হব।

কিন্তু চাচা, আপনাকে তো বেশি কিছু আমল করতে দেখলাম না! তাহলে কী এমন বিষয়, যা আপনাকে নবীজীর পাক যবানে উচ্চারিত এই সৌভাগ্য এনে দিল?

সা‘দ রা. বললেন, (ভাতিজা!) আমার আমল তো ঐটুকুই যা তুমি দেখেছ!

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রা. বোধ হয় কিছুটা আশাহত হলেন। ফিরে যাওয়ার সময় পেছন থেকে ডাক আসল- আবদুল্লাহ!

আবদুল্লাহ ফিরে তাকালেন।

হযরত সা‘দ বললেন, ভাতিজা, তুমি আমাকে যেমন দেখেছ আমার আমল তো ঐটুকুই। তবে একটি বিষয় আছে।

হযরত আবদুল্লাহ আগ্রহী হয়ে শুনতে লাগলেন। হযরত সা‘দ রা. বললেন, কোনো মুসলিম ভাইয়ের প্রতি আমি অন্তরে কোনো কটু চিন্তা পোষণ করি না, আর আল্লাহ কাউকে যে নিআমত দান করেছেন তার কারণে হিংসা করি না।

এ কথা শুনে হযরত আবদুল্লাহ বলে উঠলেন, হাঁ, এই গুণটিই আপনাকে ঐ সৌভাগ্যের অধিকারী করেছে। আর এটিই আমরা পারি না।–মুসনাদে আহমাদ ৩/১৬৬, হাদীস ১২৬৯৭; কিতাবুয যুহদ, হাদীস : ৬৪৬

 

ক্ষমা বিষয়ে আল কুরআনে অনেক বর্ণনা এসেছে যেমন ‘আর যারা মানুষকে ক্ষমা করে আল্লাহ তাদের ভালোবাসেন। ’

(সুরা : আল ইমরান, আয়াত : ১৩৪)

মানুষকে ক্ষমা করে দেওয়াটা তাকওয়ার পথকে মসৃণ করে। ক্ষমা তাকওয়ার নিকটবর্তী গুণ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর ক্ষমা করে দেয়াই তাকওয়ার নিকটতম।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ২৩৭)

মহান আল্লাহ অত্যন্ত দয়ালু ও ক্ষমাশীল। তিনি ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। যে অন্যকে ক্ষমা করে তাকেও ভালোবাসেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যারা সুসময়ে ও দুঃসময়ে ব্যয় করে এবং ক্রোধ সম্বরণ করে ও মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। ’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৩৪)

ক্ষমাকারীকে আল্লাহ তাআলা বিশেষভাবে পুরস্কার দেবেন। পরস্পরের মধ্যে বিরোধ নিষ্পন্নকারীও আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার পাবেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর মন্দের প্রতিফল মন্দ। অতঃপর যে ক্ষমা করে দেয় এবং আপস নিষ্পত্তি করে, তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে রয়েছে। নিশ্চয় আল্লাহ জালিমদের পছন্দ করেন না। ’ (সুরা শুরা, আয়াত: ৪০)

আল্লাহ শুধু মানুষের বাইরের আমল দেখেন না, মনের অবস্থাটাও দেখেন। কার মনে অন্যের প্রতি হিংসা, কার মনে অন্যের ক্ষতি সাধনের চিন্তা তা আল্লাহ ভালো করেই জানেন। কাজেই আল্লাহর সন্তুষ্টি পেতে হলে বাইরের আমলের সাথে ভেতরটাকেও পবিত্র ও নির্মল করতে হবে। অন্যের সুখে ও সৌভাগ্যে আনন্দিত হতে হবে। অন্যের দুঃখে দুঃখী হতে হবে। তাহলেই আল্লাহ আমাদের উপর খুশি হবেন, আমরাও হতে পারব জান্নাতী মানুষ।

ফেসবুকে যে মেসেজটি ছড়িয়ে পড়েছিল তা শুধু মেসেজ হিসেবে গণ্য না করে উপরে বর্ণিত বিষয়গুলি মাথায় রেখে সত্যি সত্যিই ক্ষমা চাওয়া এবং ক্ষমা করার মাধ্যমে আমরা নিজেদেরকে আরও পরিশুদ্ধ করে নিতে পারি। নিজে ভালো থাকার পাশাপাশি অন্যরাও যেন ভালো থাকতে পারে তার জন্যও যতটা সম্ভব চেষ্টা করি। পবিত্র মাহে রমজান বিদায় নিতে চলেছে। আমরা জানিনা আমাদের কোন আমল আল্লাহ কবুল করেছেন কার কোন আমল কবুল করেননি। আল্লাহ আমাদের সব কাজে ভুলত্রুটি ক্ষমা করে দিয়ে কবুল করে নিন সেই প্রার্থনা করি এবং আসুন আমরা ক্ষমা চাই এবং ক্ষমা করে দিই।

পরিশেষে ক্ষমা বিষয়ে কিছু বিখ্যাত উক্তি সংযোজন করছি

১। একজন বিশ্বাসীর সবচেয়ে বড় গুণ হলো ক্ষমা করতে পারা।

— হাসান আল বসরী (রঃ)

২। সুন্দর বিদায় হলো ক্ষতি না করে বিদায় নেয়া, সুন্দর ক্ষমা হলো বকা না দিয়ে ক্ষমা করা, সুন্দর ধৈর্য হলো অভিযোগ না রেখে ধৈর্য্ধারণ করা।

— ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ)

৩। যদি তুমি সত্যি শিখতে চাও কিভাবে ভালোবাসতে হয় তবে অবশ্যই কিভাবে ক্ষমা করতে হয় তাও শিখে নিতে হবে।

— মাদার তেরেসা

৪। দুর্বলরা কখনোই ক্ষমা করতে পারে না। ক্ষমা শুধু শক্তিশালীরাই করতে পারে।

— মহাত্মা গান্ধী

৫। ক্ষমা ছাড়া কোনো ভালোবাসার অস্তিত্ব নেই এবং ভালোবাসা ছাড়াও ক্ষমার অস্তিত্ব নেই।

— ব্রায়ান্ট এইচ. এমসিগিল

৬। ক্ষমাই যদি করতে না পারো, তবে ভালবাসো কেন ?

— রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

৭। ক্ষমা করে দাও কেননা আমাদের মাঝে কেউই ভুলের বাইরে নয়।

— সংগৃহীত

৮। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যত। হৃদয়ের জন্য কোন সময়ের সীমা নেই, সে তার আপন সময়টুকুই নেয়… ভালোবাসতে, ক্ষমা করতে, ভুলে যেতে।

— তারিক রামাদান

১০। অন্যরা ক্ষমার যোগ্য এজন্য ক্ষমা নয় বরং নিজের মনের প্রশান্তির জন্য ক্ষমা।

— জোনাথন হুইয়ি

১১। ক্ষমা কখনো অতীতকে পরিবর্তন করতে পারে না তবে ভবিষ্যতকে আরো বড় করতে পারে।

— পল বোসে

১২। ক্ষমা হলো ভালোবাসার সবচেয়ে বড় রূপ যার প্রতিদান হিসাবে আপনি পাবেন হাজারো ভালোবাসা।

— রবার্ট মুলার

১৩। দুর্বল লোকেরা প্রতিশোধ নেয়,শক্তিশালীরা ক্ষমা করে দেয় এবং বুদ্ধিমানরা এড়িয়ে চলে।

— আলবার্ট আইনস্টাইন

১৬। ক্ষমা করো এবং ভুলে যাও দেখবে প্রতিশোধ এর আগুন কিংবা দুঃখ কোনোটাই থাকবে না।

— সংগৃহীত

১৭। সম্পর্ক তখনই মজবুত হয় যখন স্বামী এবং স্ত্রী উভয়ই নিজেদের ভুলগুলোকে ক্ষমা করতে শেখে।

— সংগৃহীত

১৮। ক্ষমা মানে হলো অতীতে কি হয়েছে তা ভুলে যাওয়া এবং নতুন করে জীবন শুরু করা।

— জেরাল্ড জ্যাম্পোলস্কি

১৯। কেবলমাত্র ক্ষমাই পারে পাহাড় সম পরিমাণ একটি বন্ধুত্বের বন্ধন তৈরি করতে।

— উইলিয়াম আর্থার ওয়ার্ড

২০। ক্ষমা ছাড়া জীবন হলো একটা জেলের মতো।

— উইলিয়াম আর্থার ওয়ার্ড

২১। তোমার প্রতি আমার কোনো বিদ্বেষ নেই,ক্ষোভ নেই, কেবল আছে ভালোবাসা। তোমায় ক্ষমা করে দিলাম। আমার প্রতি তোমার ভালোবাসা না থাকুক কোনো ক্ষোভ রেখো না, ক্ষমা করে দিও।

— জাজাফী

মিথ্যা অপেক্ষা

নিউমার্কেট  থেকে ফিরছি। গন্তব্য রাইফেলস স্কয়ার। ওখানে আজ আমাদের ৯৩ ব্যাচমেটদের ইফতার পার্টি।প্রচন্ড গরম সেই সাথে প্রচন্ড জ্যামে পুরো শহর যেন থমকে গিয়েছে। পূর্বাভিজ্ঞতা বলে এই পথটুকু রিকশায় যাওয়ার চেয়ে হেটে গেলে অনেক দ্রুত যাওয়া যাবে। যেই ভাবা সেই কাজ। আমি রিকশায় না উঠে বরং হাটতে থাকি। ঢাকা কলেজের সামনের ফুটপাতগুলো বহুকাল আগেই হকারদের দখলে চলে গেছে। অবশ্য শুধু ঢাকা কলেজ কেন পুরো ঢাকা শহরের সিংহভাগ ফুটপাত এখন হকারদের দখলে। একবার এক হকারের সাথে এ নিয়ে কথা বলতে গেলে তিনি জানিয়েছিলেন স্যার ফুটপাতে না বসলে কোথায় বসবো। সামান্য যে পুজি তা দিয়েতো দোকান ভাড়া নেওয়ার ক্ষমতা নেই। আর তাছাড়া এই ফুটপাত দখল করে যে ব্যবসা করি আমরা সামান্য মানুষ আমাদের কি আর সেই ক্ষমতা আছে ফুটপাত দখল করার। জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন এখানে ক্ষমতাবানদের প্রশ্রয় আছে বলেই আমরা বসতে পারি। আর এই ফুটপাতে আমরা ব্যবসা করি বলেই পরিবার নিয়ে খেয়ে পরে বাচতে পারি। তাছাড়া অনেক মানুষ আছে যাদের বড় মার্কেটে গিয়ে কেনার সামর্থ নেই তারাও উপকৃত হয়। আমি আর কথা বাড়াই না।

 

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামি নামি করছে। আমাকে দ্রুত পৌছাতে হবে। ঢাকা কলেজ পেরিয়ে টিচার্স ট্রেনিং কলেজ। কলেজের দেয়াল ঘেসে তৈজসপত্র সাজিয়ে এক দোকানী বসে আছেন। তার দোকানে সৌখিন মানুষ ছাড়া তেমন কেউ আসে না। হাটতে হাটতে এক সময় সায়েন্সল্যাব মোড়ে চলে আসি। এই জায়গাটির সাথে অনেক স্মৃতি জড়িত। এক সময় এখানকার দোকান থেকেই গীটার এবং গীটারের যন্ত্রাংশ কেনা হতো। সেসব অবশ্য বহু পুরোনো স্মৃতি। কত কাল যে গীটারে হাত পড়েনি তার ঠিক নেই। মনে পড়ে একবার বাপ্পাদার সাথে টানা এক ঘন্টা একই সুরে গীটার বাজিয়ে তাকে মুগ্ধ করেছিলাম।তিনি বলেছিলেন তুমিতো বেশ বাজাও,কোথা থেকে শিখলে? আমি লাজুক মুখে বলেছিলাম কই আর বাজাই। গীটারতো আপনি বাজান। অমন করে যদি বাজাতে পারতাম! তিনিও আমার মতই আমার কথার বিপরীতে বললেন ধুর আমি আর কোথায় ভালো গীটার বাজাই। এই দেশে গীটার বাজায় আইয়ুব বাচ্চু। তার কথায় অবশ্য যুক্তি আছে। যাই হোক সেই সব স্মৃতিকে পাশ কাটিয়ে ফুটপাতে গিজগিজ করতে থাকা মানুষের ভীড় ঠেলে হাটতে থাকি। সিটি কলেজ পার হতে আমার দশ মিনিট লেগে যায়। কিন্তু আমার মনে হয় না এই দশ মিনিটে কোনো রিকশা বা গাড়ি দশ হাতও সামনে এগোতে পেরেছে।

 

সময় বেশি নেই। আমার ব্যাচমেটরা নিশ্চই আমার উপর ক্ষেপে আছে। ওরা বলেছিল ইফতারির অন্তত এক ঘন্টা আগে যেন আমি উপস্থিত থাকি। কিন্তু ঈদের বাজারে ওরা চাইলেইকি আর ওদের মত করে আমি হাজির হতে পারি। ওরাতো বড় বড় চাকরি করে,দামী গাড়িতে চড়ে। আমার কথাতো ভিন্ন। একঘন্টার ছুটিতে আমার যে অসুবিধা হবে ওরা এক সপ্তাহের ছুটি নিলেও তার বিন্দু মাত্র অসুবিধা হবে না।সিটি কলেজ পার হয়ে সীমান্ত স্কয়ারের দিকে হাটছি। বার কয়েক ঘড়ি দেখলাম। তখনো অবশ্য মিনিট বিশেক সময় আছে। হাটতে হাটতে একসময় ডমিনোজ বিল্ডিংয়ের সামনে চলে এলাম। আমি হাটছিলাম ডমিনোজ বিল্ডিংয়ের উল্টো দিকের রাস্তা ধরে। যেই পাশ দিয়ে ধানমন্ডির দিকে গাড়ি চলে সেদিক দিয়ে। হঠাৎ দেখলাম এক রিকশাওয়ালা দাড়িয়ে আছে তার চোখ অশ্রুসজল। সারা শরীর ঘামে ভেজা,মুখ কপাল ঘামে জবজব করছে। কী মনে করে কাছে গিয়ে জানতে চাইলাম আপনাকে এমন দেখাচ্ছে কেন? তিনি আমাকে যে কথাটি বললেন তা শুনবো বলে আমি প্রস্তুত ছিলাম না। তিনি বললেন “ ভাড়াটা না দিয়ে লোকটা চলে যেতে পারলো? ভাংতি করে আনছি বলে মিথ্যা অপেক্ষায় রেখে চলে গেলো। ইফতারের সময়ও হয়ে আসলো” বুঝলাম কোনো এক যাত্রী ভাড়া না দিয়ে ভাংতি আনার নাম করে সটকে পড়েছে। এবং এও বুঝলাম এই রিকশাওয়ালা রোজাদার।

 

তার জন্য মায়া হলো। আমি জানতে চাইলাম কত ভাড়া হয়েছিল? তিনি বললেন ৪০ টাকা। আমি পকেট থেকে মানিব্যাগটা বের করে দেখলাম সেখানে খুব বেশি টাকা নেই। তার পরও লোকটির ঘর্মাক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে খুব মায়া হলো। দুটো বিশ টাকার নোট বের করে তার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললাম এই নিন। যে চলে গেছে সে তো ফিরবে না। কিছু মানুষই আছে এমন যারা নামে মানুষ কিন্তু আদতে অমানুষ। লোকটি আমার মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলেন। তার পর আমাকে বিস্মিত করে বললেন আমি নিতে পারবো না। আপনিতো আমার রিকশায় চড়েন নি তাহলে কেন আপনার থেকে টাকা নেবো? রোজা রেখে এই টাকা নেওয়া কি আমার ঠিক হবে? তবে আপনার কথা শুনে ভালো লাগছে। মনটা শান্ত হয়েছে। আমি তাকে বললাম এই টাকাটা আমি আপনাকে খুশি হয়েই দিচ্ছি। মনে করুন আমিই আপনার রিকশায় চড়েছিলাম। আর এটাতো কোনো দান নয়। তার পরও তিনি নিলেন না। তখন তাকে বললাম এক কাজ করুন আমাকে রিকশায় করে সীমান্ত স্কয়ারের সামনে নামিয়ে দিন তার পর টাকাটা নিন। তিনি বললেন তা কী করে হয়? এইটুকু পথ রিকশা ভাড়াতো ৪০ টাকা নয়। বড়জোর বিশ টাকা। আমি তখন উপায় না দেখে বললাম ঠিক আছে আপনি বিশ টাকাই নিবেন আর বাকি বিশ টাকা বকসিস হিসেবে রাখবেন। আমরা যখন হোটেলে খেতে যাই তখনোতো বকসিস দেই।

 

হোটেলে খেলে যে বকসিস দেওয়া হয় এটা হয়তো তার জানা নেই। তিনি এবার মেনে নিলেন এবং আমাকে বললেন রিকশায় উঠতে। আমি তার রিকশায় উঠে বসলাম। তিনি গামছা দিয়ে মুখের ঘাম মুছে রিকশা চালাতে লাগলেন এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা রাইফেল্স স্কয়ারে পৌছে গেলাম। তার হাতে সেই চল্লিশ টাকা ধরিয়ে দিয়ে রিকশা থেকে নেমে সীমান্তস্কয়ার বিল্ডিংয়ের দিকে হাটতে শুরু করলাম। হঠাৎ মনে পড়লো লোকটিতো রোজাদার। তাকেওতো আমি চাইলে আমাদের ইফতার পার্টিতে নিতে পারি। এতে অবশ্য আমার ব্যাচমেটরা রাগ করতে পারে বা ছোট চোখে দেখতে পারে। ওরা হয়তো ভাববে ব্যাটা সারাজীবন ছোটলোক থেকে গেলি আর ছোটলোকদের নিয়েই চলাফেরা করতে থাকলি। আবার এমন ভাবনা নাও ভাবতে পারে। আমি চট করে ফিরে এলাম রিকশাওয়ালাকে আমাদের সাথে ইফতার করতে বলবো বলে কিন্তু হায় ফিরেই দেখি তিনি আরেক যাত্রীকে রিকশায় তুলে সবেমাত্র প্যাডেল চালাতে শুরু করছেন। তার রিকশার হাতলে ঝুলছে একটি পলিথিন। সেই পলিথিনের ভিতর থেকে উকি দিচ্ছে কিছু মুড়ি আর ছোলাবুট। হয়তো রিকশা চালাতে চালাতেই মাগরিবের আজান হবে আর তিনি ইফতার করবেন। জীবনের তাগিদে তাকে রিকশা চালাতে হয়। আমার সাথে একদিন ইফতার করে তার কোনো লাভ নেই বরং এই যে ইফতারি পলিথিনে ঝুলিয়ে যাত্রী নিয়ে যাচ্ছেন তাতে কিছু টাকা পাবেন যা দিয়ে তার সংসার চলবে।

 

কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থাকার পর সম্বিত ফিরে পেয়ে দেখলাম রিকশাটা কখন চোখের আড়ালে চলে গেছে। আমি দ্রুত পায়ে আমার গন্তব্যের দিকে হাটতে শুরু করলাম। রিকশাওয়ালা আমাকে একপ্রকার মুক্তি দিয়ে গেছে। তাকে নিয়ে গেলে যে পরিস্থিতি তৈরি হতো তা হয়তো তাকেও আহত করতে পারতো।ইফতারের পাঁচ মিনিট আগে পৌছালাম। বন্ধুদের সাথে কুশল বিনিময় করলাম। টেবিলে টেবিলে নানা পদের ইফতারি সাজানো। হালিম,চপ,পিয়াজু,বেগুনী,বুন্দিয়া,খেজুর,পেয়ারা,পেপে,তরমুজ,আপেল আর মালটার মাঝে উকি দিচ্ছে ছোলা আর মুড়ি। মাগরিবের আজান হয়ে গেলো। সবাই ইফতার করতে শুরু করলাম। কয়েক মিনিট বাদে আমার বন্ধু বদরুলের ছেলে জারিফ বললো আংকেল তুমিতো শুধু ছোলা আর মুড়ি ছাড়া কিছুই মুখে দাওনি? তুমিকি ওগুলো খাও না? আমার মনের মধ্যে তখন সেই দৃশ্যটি ভেসে বেড়াচ্ছে। একটি রিকশা,ঘর্মাক্ত একটি মুখ আর রিকশার হাতলের সাথে ঝুলন্ত পলিথিনের মধ্যে কিছু মুড়ি আর ছোলা।সেই সব ভাবতে ভাবতেই হয়তো ইফতারে অন্য আইটেমের দিকে আর হাত যায়নি। জীবন বড়ই আশ্চর্য জনক।

গল্পঃ মিথ্যা অপেক্ষা

২৪ এপ্রিল ২০২২
ছবিঃ বিদ্যানন্দ – Bidyanondo

আলোকের অভিসারী আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

সব সমাজেই এমন কিছু মানুষ থাকেন সংখ্যায় যাঁরা অল্প; কিন্তু যাঁদের মধ্যে জ্ঞানের ব্যাপ্তি, মূল্যবোধের বিকাশ, জীবনের উৎকর্ষ, আত্মমর্যাদার মহিমা- এসবের বড়রকম বিকাশ ঘটে। এঁরা সেই ধরনের মানুষ যাঁদের কেনা যায় না, বেচা যায় না।যাঁরা একটা জাতিকে রক্ষা করেন, এগিয়ে নেন, জাতিকে সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখান। স্বপ্ন দেখানোর অসাধারণ ক্ষমতা নিয়ে এই বাংলার জন্য আর্শিবাদ হয়ে জন্মেছিলেন এমনই একজন মানুষ, যিনি আলোকের অভিসারী হয়ে বহুমুখিতায় ও স্বপ্নচারিতায় পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে এ দেশে নানান সাংগঠনিক, সামাজিক, যূথবদ্ধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে আছেন,নিজে স্বপ্ন দেখেছেন এবং সবার মাঝে স্বপ্নের জাল বুনে চলেছেন অবিরাম। আলোকিত মানুষ গড়ার জন্য, মানুষকে স্বপ্ন দেখানোর জন্য শিক্ষকতা করেছেন। মানুষের হাতে তুলে দিয়েছেন বই।

তিনি একজন প্রতিশ্রুতিময় কবি,সমালোচক,সুবক্তা,টিভি উপস্থাপক এবং সাহিত্য সম্পাদক। তিনি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। ষাটের নতুন ধারার সাহিত্য আন্দোলনের কান্ডারি, দেশজুড়ে বই পড়া কর্মসূচির প্রণেতা এবং আনন্দপ্রাণ সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞের রুচিস্নিগ্ধ অঙ্গন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রাণপুরুষ এক আশা-জাগানিয়া মানুষ। শিক্ষকতার মর্মমূল স্পর্শ করে যে সব মহৎ হৃদয় শিক্ষকতাকে তাদের জীবনের সুমহান ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন তন্মধ্যে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্ভবত সবচেয়ে সেরাদের একজন।অধ্যাপক হিসেবে তাঁর খ্যাতি কিংবদন্তিতুল্য।

 

জন্ম ও শৈশব

২৫ জুলাই ১৯৩৯ সাল। কলকাতার পার্ক সার্কাসে জন্মগ্রহণ করেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ । তাঁর পৈতৃক নিবাস বাগেরহাট জেলার কচুয়া থানার অন্তর্গত কামারগাতির কচুয়া গ্রামে। তাঁর পিতা আযীমউদ্দিন আহমদ ছিলেন একজন স্বনামধন্য শিক্ষক।মায়ের নাম করিমুন্নেসা। পিতার শিক্ষক হিসেবে অসামান্য সাফল্য ও জনপ্রিয়তা শৈশবেই তাকে শিক্ষকতা পেশার প্রতি আকৃষ্ট করে। আবদুল্লাহ্ আবু সায়ীদ খুব অল্প বয়সে মাকে হারান। তিনি ছিলেন ভাইবোনদের মধ্যে তৃতীয়। তাঁর জীবনে তাঁর পিতার শিক্ষা ও আদর্শের প্রভাব সুস্পষ্ট। পিতার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘শিক্ষক হিসাবে আব্বা ছিলেন খ্যাতিমান। ১৯৫০ সালে আমি যখন পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র, আব্বা তখন পাবনা এডোয়ার্ড কলেজের অধ্যক্ষ। কলেজের ছাত্রছাত্রীরা তাঁর কথা উঠলে এমন সশ্রদ্ধ উদ্বেলতায় উপচে পড়ত যে মনে হত কোনো মানুষ নয়, কোনো ফেরেস্তা নিয়ে তারা কথা বলছে। একজন ভালো শিক্ষক ছাত্রদের হৃদয়ে শ্রদ্ধা ভালোবাসার যে কী দুর্লভ বেদিতে অধিষ্ঠিত থাকেন আব্বাকে দেখে তা টের পেতাম। একজন মানুষের এর চেয়ে বড় আর কী চাওয়ার থাকতে পারে। তখন থেকেই আমি ঠিক করেছিলাম এই পৃথিবীতে যদি কিছু হতেই হয় তবে তা হবে শিক্ষক হওয়া, আব্বার মতোন শিক্ষক’।

প্রথম শৈশবেই অল্পবিস্তর বইয়ের সাথে শিশু আবু সায়ীদের যোগাযোগ হয়। তার বড় বোন বই পড়তো।বোনের ওই বইগুলো তাকে পড়তে দেওয়া হতো না। সেসব ছিল মূলত উপন্যাস। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ যখন পঞ্চম শ্রেণীতে পড়েন তখন তিনি দেখতেন তার বাবা খুবই পড়াশোনা করতেন। দোতলার কোনায় ছিল তাঁর একান্ত পড়ার ঘর। ছোট্ট আবু সায়ীদ সহ ভাই বোনদের প্রায় কেউ-ই সে ঘরে যেতেন না। একদিন বাবাই তাকে সেখানে ডেকে পাঠালেন।যা তাকে সেদিন অনেক বেশি টেনেছিল তা হলো, তাঁর ঘরভর্তি বইয়ের বিশাল ভান্ডার।

ওই ঘরটা ছিল পাঁচ দেয়ালের। সবগুলো দেয়ালে শেল্ফভর্তি রংবেরঙের অজস্র বই। ঘরভর্তি ওই বিপুল বই তাকে অভিভূত করে ফেলল।এই ঘটনাটা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের শিশুমনকে খুবই প্রভাবিত করেছিল। শৈশবে গভীরভাবে যে স্বপ্ন মানুষ একবার দেখে, সারা জীবন তাকেই সে বড়ভাবে পুনর্গঠন করতে চায়। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ যে সারা জীবন শুধু দুনিয়া হাতড়ে রাশি রাশি বই সংগ্রহ করতে চেষ্টা করেছেন, সে হয়তো সেদিনের ওই বিশেষ মুহূর্তের স্বপ্নটাকে বড় ভাবে ফিরে পাওয়ার জন্য।

শিক্ষা জীবনঃ

আবদুল্লাহ্ আবু সায়ীদের শিক্ষা জীবনের সূচনা হয় টাঙ্গাইলের করটিয়ায়।তখন তার বয়স সবেমাত্র পাঁচ বছর। তাঁর প্রথম শিক্ষক ছিলেন শরদিন্দু বাবু। শৈশবের এই শিক্ষক সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য এমন, ‘আব্বা ছাড়া যে সব মানুষের নিবিড় ও শ্রদ্ধেয় মুখ আমাকে শিক্ষকতার পথে ডাক দিয়েছিল ছেলেবেলার শিক্ষক শরদিন্দু বাবু তাঁদের একজন। রোজ রোজ নতুন উপহার দিয়ে স্যার আমাকে পড়ার জগতের ভেতর আটকে রাখতেন। কবে কী উপহার আসবে এই নিয়ে সারাটা দিন কল্পনায় উত্তেজনায় রঙিন হয়ে থাকতাম। এমনি করে কখন যে একসময় পড়ার আনন্দ আর উপহার পাওয়ার আনন্দ এক হয়ে গিয়েছিল টের পাইনি। এক সময় অনুভব করেছিলাম স্যারের আদরের ভেতর থাকতে থাকতে আমি কখন যেন পড়াশুনাকে ভালোবেসে ফেলেছি।’ পরবর্তীতে তিনি রাধানগর মজুমদার একাডেমি স্কুলে ভর্তি হন।আবদুল্লহ্ আবু সায়ীদের জীবনে তাঁর শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষকদের প্রভাব বিস্তর। শিক্ষকদের কাছ থেকেই তিনি জীবনকে চিনেছেন, জগতকে চিনেছেন।

ক্লাস নাইনে পাবনা জিলা স্কুলে ভর্তি হওয়ার কিছুকাল আগেই  স্কুলে একজন প্রধান শিক্ষক এসেছিলেন। তিনি ছিলেন অদ্ভুত মানুষ। থ্রি পিস স্যুট আর জিন্নাহ ক্যাপ পরে এই বিশালদেহী হেডমাস্টার স্কুলের বারান্দা দিয়ে নিঃশব্দে হেঁটে বেড়াতেন। সেই যুগে তিনি বিলেতের এডিনবরায় এক বছরের জন্য পড়তে গিয়েছিলেন। ক্লাসে এসে তিনি নাকি বলতেন, ‘আমি যদি তোমাদের একবার বিলেতের গল্প বলি, সে যে কত কথা! তা তোমরা ভাবতেও পারবে না; বুঝতেও পারবে না।’ কথাটা হেসে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সেই প্রধান শিক্ষকই হঠাৎ অ্যাসেম্বলিতে বলেছিলেন, ‘তোমরা আগামী মাস থেকে আর স্কুলের বড় লাইব্রেরিটাতে আসবে না। প্রতিটি ক্লাসে আমি একটা করে ছোট্ট লাইব্রেরি করে দিচ্ছি। সেখান থেকেই তোমরা প্রতি সপ্তাহে বাড়িতে বই নেবে। তবে বই সবাইকেই নিতে হবে। এ বাধ্যতামূলক।’

এটা হয়তো ছিল তাঁর বিলেতি পড়াশোনারই ফসল। তিনি প্রতিটি ক্লাসের জন্য একটা করে বাক্স বানিয়ে দিয়েছিলেন। তাতে থাকত বই। বাক্সগুলো ক্লাসের দেয়ালের সঙ্গে আটকানো। প্রতি শনিবারে ওখান থেকে সবাইকে বই নিতে হতো। ক্লাসটিচার বেতন নিতেন আর ক্লাস ক্যাপ্টেন বই দিত।

বই নেওয়া তিনি সবার জন্য কেন বাধ্যতামূলক করেছিলেন, তা নিয়ে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ পরে অনেক ভেবেছেন। তাঁর ধারণা,মানব-বিকাশের ওপর বইয়ের প্রভাব কী, তা তিনি জানতেন। এর ফলে স্কুলের পরিবেশ কয়েক বছরের মধ্যে আশ্চর্যভাবে পাল্টে গেল।পুরো স্কুলটাই একটা ইন্টেলেকচুয়াল স্কুল হয়ে গেল। তার ফলও ফলতে লাগল।

গোটা স্কুলের ছাত্রদের মধ্যে নিজেদের ছাড়িয়ে যাওয়ার পিপাসা জেগে উঠল। স্কুল থেকে প্রতিবছর ম্যাট্রিকে স্ট্যান্ড করতে বা স্টার পেতে লাগল। সাধারণ ফলাফল হয়ে উঠল অসম্ভব ভালো। স্যার ফজলে হাসান আবেদ, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, জিয়া হায়দার—সবাই এই স্কুলের প্রায় সে সময়কার ছাত্র! বই যে মানুষকে কীভাবে উজ্জীবিত সুতোয় গেঁথে দিতে পারে, এ দৃশ্য এই তার জীবনে প্রথম দেখা।

নবম শ্রেণীতে ওঠার পর তিনি রাধানগর মজুমদার একাডেমি ছেড়ে পাবনা জেলা স্কুলে গিয়ে ভর্তি হন।১৯৫৫ সালে পাবনা জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করেন।পরের দুই বছর তিনি বাগেরহাট প্রফু্ল্লচন্দ্র কলেজে পড়েন।কলেজের শিক্ষকদের কথা প্রসঙ্গে অধ্যাপক আবদুল্লাহ্ আবু সায়ীদ বলেন, ‘আমার জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল শিক্ষকদের দেখা পেয়েছিলাম আমার কলেজ জীবনে। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের হাতে গড়া এই কলেজের শিক্ষকদের ভেতর শিক্ষকতার যে জ্যোতির্ময় রূপ আমি দেখেছি তার সমমানের কোনো কিছু আমি আর কখনো কোথাও দেখেছি বলে মনে পড়ে না’।

কলেজে তাঁর নীরব পথপ্রদর্শক ছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র। মূল ভবনটার সামনের দেয়াল ঘেষে সুদৃশ্য পামগাছের সারি ছিল। এর আঙিনার দরজা দিয়ে ঢুকলেই সিমেন্টের বেদির ওপর আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের ছড়ি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ভাস্কর্যটা চোখের সামনে দেখা যায়। নিঃশব্দে তিনি প্রফুল্লচন্দ্রের সেই ভাস্কর্যের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেন। তারপর একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে তাঁর ভেতর থেকে জীবনের দুর্লভ শিক্ষা ও শ্রেয়োবোধকে নিজের ভেতর টেনে নিতেন। তিনি লক্ষ্য করতেন বিকেলের সেই স্তব্ধ প্রাকৃতিক পরিবেশের ভেতর তার হৃদয় একটা দৃঢ় গভীর আত্মবিশ্বাসে সুস্থির হয়ে উঠেছে। প্রফুল্লচন্দ্র কলেজের অনেক শিক্ষকের কাছ থেকেই অনেক দুর্লভ প্রাপ্তি ঘটেছিল যা তাঁর জীবনকে, নানাভাবে প্রভাবিত করেছে।

উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। সেখান থেকে ১৯৬০ সালে স্নাতক এবং ১৯৬১ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আবদুল্লাহ্ আবু সায়ীদ বহু প্রথিতযশা শিক্ষকদের সান্নিধ্য লাভ করেন। সমাজের গুণীজন হিসাবে পরিচিত এসব শিক্ষকরা তাঁর জীবনে নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করেছেন। এঁদের মধ্যে রয়েছেন মুনীর চৌধুরী, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমুখ।মুনীর চৌধুরী সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘মুনীর স্যারের পড়ানো ছিল অনবদ্য। তিনি আমাদের রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প পড়িয়েছিলেন। পড়ানোর প্রাণবন্ত সরস উচ্ছলতার ভেতর দিয়ে ছোটগল্পের যে নিগূঢ় রস তিনি আমার ভেতর ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তা আজও আমার মনের ভেতরকার শিল্পভাবনাকে অনেকখানি প্রভাবিত করে রেখেছে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষ থেকে শুরু করে অন্তত দুই বছর পর্যন্ত তাঁর বাচনভঙ্গী আমার নিজের কথা বলার ধরন ধারণকেও প্রচ্ছন্নভাবে প্রভাবিত করে রেখেছিল।’

এছাড়াও বাংলা বিভাগের একজন অধ্যাপক বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তাঁর তরুণ চেতনাকে প্রায় পুরোপুরি অধিকার করে নিয়েছিলেন, তিনি অধ্যাপক আহমদ শরীফ। অধ্যাপক আহমদ শরীফ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জীবন, পৃথিবী, প্রেম, সমাজ সবকিছু সম্বন্ধে ক্লাশে তিনি এমন নির্মোহ কঠিন ও নেতিবাচক কথা বলতেন যা আমাকে আকৃষ্ট ও আতঙ্কিত করে তুলত। আমি তাঁর বাসায় নিয়মিত যেতাম এবং ভেতরকার উত্‍কন্ঠার হাত থেকে বাঁচার জন্য তাঁর সঙ্গে ঘন্টার পর ঘন্টা তর্ক করতাম। তাঁর মধ্যে একটা প্রচন্ড নেতিবাচক মনোভাব কাজ করত। তাঁর নেতিবাচকতার কাছে আমি ঋণী। কোনো বিষয়ের দিকে ক্ষমাহীন নির্মোহ দৃষ্টিতে তাকাবার এবং তার অন্তর্সত্যকে দুঃসাহসের সঙ্গে উচ্চারণ করার শক্তি আমি তাঁর কাছ থেকেই পেয়েছিলাম।’

স্ব স্ব ক্ষেত্রে মহিমায় ভাস্কর এসব গুণীজনদের সাহচর্য অধ্যাপক আবদুল্লাহ্ আবু সায়ীদের জীবনকে নানা ভাবে প্রভাবিত করেছে। এই সব মহান শিক্ষকদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েই তিনি এই মহিমান্বিত পেশায় প্রবেশ করেছেন।১৯৬৫ সালে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

 

কর্মজীবন

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ১৯৬১ সালে প্রথম শিক্ষকতায় যোগদান করেন মুন্সীগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজে। তখন তাঁর বয়স ছিল বাইশ। এম.এ. পরীক্ষা দেবার পরপরই তিনি ঐ কলেজে যোগ দিয়েছিলেন কিন্তু মজার ব্যাপার হলো একই সময়ে মুন্সীগঞ্জ কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন তাঁর বাবা আযীমউদ্দীন আহমদ। শিক্ষাবিদ ও নাট্যকার হিসাবে তিনি সেকালে দেশের সুধীমহলে সুপরিচিত ছিলেন। ছেলে একই কলেজে যোগ দিলে তাঁর জন্য প্রশাসনিক অস্বস্তির কারণ হবে মনে করে তিনি কলেজের গভর্নিং বোর্ডের সভায় আবদুল্লাহ্ আবু সায়ীদকে অন্তর্ভূক্তি করার ব্যাপারে আপত্তি প্রকাশ করেন। কিন্তু পরীক্ষার ফলাফল ভাল থাকায় কলেজের গভর্নিং বডির সদস্যরা সর্বসম্মতভাবে কলেজের খন্ডকালীন প্রভাষক হিসাবে তাঁকে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। গভর্নিং বডির সচিব হিসাবে তাঁর বাবাকেই তাঁর নিয়োগপত্র পাঠাতে হয়েছিল!

এরপর তিনি সিলেট মহিলা কলেজে অধ্যাপনায় যোগ দেন। সেই সময় মহিলা কলেজে ঢোকা তরুণ অধ্যাপকের জন্য সহজ ছিল না। কারণ তখন সিলেটের সমাজ খুবই রক্ষণশীল ছিল। কিন্তু ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকায় তাঁর চাকরিটা তখন হয়ে যায়। তবে এখানে তিনি বেশিদিন ছিলেন না। চাকরি পাওয়ার মাস দুয়েক পরই বাম ছাত্র আন্দোলনের মুখে তা বন্ধ হয়ে যায়।

 

১৯৬২ সালের পহেলা এপ্রিল তিনি রাজশাহী কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে সরকারি চাকুরিজীবন শুরু করেন। রাজশাহী কলেজে পাঁচ মাস শিক্ষকতা করার পর তিনি যোগ দেন ঢাকার ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজে। বর্তমানে এই কলেজটি বিজ্ঞান কলেজ নামে পরিচিত। একই সময় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগেও তিনি খন্ডকালীন শিক্ষক হিসাবে বাংলা পড়িয়েছেন। ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজে অধ্যাপনা করার সময় বছর দুয়েক তিনি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র চব্বিশ বছর। সহকর্মী হিসেবে ঢাকা কলেজে পেয়েছিলেন দুইজন নান্দনিক সাহিত্যিক ও প্রথিতযশা শিক্ষক শওকত ওসমান ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে। শওকত ওসমান যখন ঢাকা কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান তখন তিনি সেখানে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। ঢাকা কলেজের তদানীন্তন অধ্যক্ষ জালালউদ্দিন আহমেদের আমন্ত্রনে তিনি সেখানে যোগদান করেন। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ঢাকা কলেজেই তাঁর শিক্ষকতা জীবনের স্বর্ণযুগ অতিবাহিত করেন। কারণ সে সময় ঢাকা কলেজ ছিল দেশসেরা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা। শত প্রাণের উচ্ছ্বাসে তখন মুগ্ধ থাকতো ঢাকা কলেজ।

শিক্ষক হিসেবে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ জনপ্রিয়তার সর্বোচ্চ শিখর স্পর্শ করেছেন। অধ্যাপক হিসেবে তাঁর খ্যাতি কিংবদন্তিতুল্য।শিক্ষাঙ্গণের অবক্ষয়, শিক্ষকদের ভেঙ্গে পড়া মূল্যবোধ তাঁকে বিদ্ধ করেছে সবসময়। অপরিসীম ভালোবাসা, তীব্র পর্যবেক্ষণশক্তি ও প্রজ্ঞা মিশিয়ে তিনি অনুসন্ধান করেছেন এই অবক্ষয়ের কারণ। ছাত্রদের প্রকৃত আভিভাবক হিসাবে জাতীয় এই দুর্যোগটির দিকে জাতির মনোযোগ ফেরাতে চেয়েছেন।

তিনি ষাটের দশকে দু’বার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের ডাক পেয়েছিলেন। প্রথমবারে ডেকেছিলেন সে সময়কার বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ মুহম্মদ আবদুল হাই। দ্বিতীয়বার ১৯৬৮-৬৯-এর দিকে ডেকেছিলেন মুনীর চৌধুরী। তিনি তখন বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ। কিন্তু ঢাকা কলেজে প্রাণবন্ত, স্বপ্রতিভ, উজ্জ্বল ছাত্রদের পড়ানোর তৃপ্তি, শিক্ষক-জীবনের অনির্বচনীয়তম আস্বাদ ছেড়ে তিনি যেতে চাননি। তাঁর মতে, ‘বাংলা বিভাগে যোগদান করাটা আমার কাছে সবচেয়ে ভালো ছাত্রদের ছেড়ে সবচেয়ে খারাপ ছাত্রদের পড়াতে যাওয়ার মত মনে হয়েছে।’

বাংলাদেশে টেলিভিশনের সূচনালগ্ন থেকে রুচিমান ও বিনোদন-সক্ষম ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভুত হন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। টেলিভিশনের বিনোদন ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের উপস্থাপনায় তিনি পথিকৃৎ ও অন্যতম সফল ব্যক্তিত্ব।১৯৬৫ সালের জানুয়ারি মাস। হঠাৎ একদিন মুস্তফা মনোয়ার আর জামান আলী খান (পাকিস্তান টেলিভিশনের কর্মকর্তা) তাঁর ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজের (বিজ্ঞান কলেজ) হোস্টেলের কক্ষে এসে হাজির। তাদের অনুরোধ : কবি জসীমউদ্দীনের সাক্ষাৎকার নিতে হবে। তিনি রাজি হয়ে গেলেন। টিভিতে সেই তার প্রথম আসা। পরবর্তীকালে কুইজ প্রোগ্রাম, শিশুদের প্রোগ্রাম, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের উপস্থাপনার ভেতর দিয়ে টিভির সঙ্গে ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েছেন। ১৯৭৩ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত টিভির সাথে পুরোপুরি জড়িত ছিলেন।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রঃ

চীনা ভাষায় একটা প্রবাদ আছে “যদি এক বছরের জন্য পরিকল্পনা করতে চাও তবে শস্য রোপণ কর।যদি ত্রিশ বছরের জন্য পরিকল্পনা করতে চাও, তবে বৃক্ষ রোপণ কর।যদি এক শ বছরের জন্য পরিকল্পনা করতে চাও, তবে মানুষ রোপণ কর”। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ মানুষ রোপণ করতে চেয়েছেন। সে লক্ষ্য নিয়েই তিনি গড়ে তুলেছেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র গড়ে উঠেছে একটু একটু করে, অনেক দিনে। এই দীর্ঘ সময়ে বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের মুখে নানা উথ্থান পতনের মধ্যদিয়ে তাঁকে এগোতে হয়েছে।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের জন্ম ১৯৭৮ সালে। মূলতঃ দেশের আদর্শগত অবক্ষয় দেখে তা থেকে উত্তরণের জন্যে অধ্যাপক  আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ১৯৬৮ সালে তিনি একটা পাঠচক্র শুরু করেন। তখন তার মনে হয়েছিল, আমাদের জাতির জ্ঞানের এলাকা একেবারেই নিঃস্ব। জাতির ভেতর জ্ঞান দরকার। ঢাকা কলেজের কিছু মেধাবী ছেলেকে নিয়ে শুরু হয়েছিল পাঠচক্রটা। কিছুদিন চলেছিলও ওটা, কিন্তু উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের ডামাডোলে সবকিছু ওলট-পালট হয়ে গেল। সারা দেশে যে বিদ্রোহের ক্ষোভ প্রজ্বলিত হয়ে উঠল, তার মুখে সেই পাঠচক্র যে কোথায় ভেসে গেল, খুঁজেও পেলেন না।

স্বাধীনতার পর তাঁর মনে হলো সোনার বাংলা তো হয়েই গেছে, এখন লেপ মুড়ি দিয়ে একটা ভালোমতো ঘুম দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। ১৯৭৮ সাল আসতে আসতে টের পেলেন, সোনার বাংলা বলে আসলে কিছু নেই। ওটা একটা স্বপ্নের নাম। বাংলা আসলে মাটি আর কাদার। সবার শ্রম, চেষ্টা, সাধনা আর সংগ্রাম দিয়ে একে সোনায় পরিণত করতে হয়।

তখন আবার নতুন করে শুরু হলো নতুন পাঠচক্র। এই পাঠচক্র পাঁচ বছর চললে তিনি বুঝতে পারলেন তাদের চেষ্টা ব্যর্থ হয়নি। বহুমুখী জ্ঞান ও জীবনচর্চার ভেতর দিয়ে ছেলে মেয়েদের মনের অচিন্তিত বিকাশ ঘটেছে। বুদ্ধিদীপ্ত, ক্ষুরধার সম্পন্ন হয়ে উঠেছে তারা। সেই পাঠচক্রে ২০ জন ছেলেমেয়ে ছিল। তাদের প্রায় সবাই আজ নিজ নিজ ক্ষেত্রের নেতৃত্বে।

তাঁর মনে হলো, এই পথে আমরা স্বচ্ছন্দে এগোতে পারি। প্রথমেই মনে হলো, ছোট্ট পরিসরে যা সফল হলো, সারা দেশের সবখানে কেন তা সফল হবে না ? এভাবেই যাত্রা শুরু বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রথম কার্যালয় ছিল ঢাকা কলেজের পেছনে, নায়েমে—তখনকার শিক্ষা সম্প্রসারণ কেন্দ্রের একটা ছোট্ট মিলনায়তনে। সেখান থেকে  চলে যায় ৩৭ ইন্দিরা রোডে। সেটা ছিল একটা ভাড়া করা বাড়ি। বাড়িটা খুব সুন্দর। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ওই সময় ছিলেন বহিঃসম্পদ বিভাগের সচিব। তিনি কোনো একটা তহবিল থেকে বিশ্বসাহিত্যকেন্দ্রকে পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। ওই সহযোগিতা বিশ্বসাহিত্যকেন্দ্রের সামনে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছিল। সেই বছরেই কেন্দ্রের ভবনের জমিটা বিশ্বসাহিত্যকেন্দ্র পেয়ে যায়। দিয়েছিলেন আবুল হাসনাত, ঢাকার প্রথম মেয়র। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সহপাঠী! বাড়ির জন্য তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলে হেসে বললেন, ‘ক্যান, আমাগো কাছে ক্যান?’ কথাটা বলেছিলেন তিনি ছাত্র বয়সের রাজনীতিতে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদদের বিরুদ্ধ অবস্থানকে কটাক্ষ করে। তিনি তাঁকে বিশ্বসাহিত্যকেন্দ্রের স্বপ্নের আদ্যোপান্ত বুঝিয়ে বলেন। তিনি বললেন, ‘বুঝছি বুঝছি, ওই যে প্যারিসে আছে না-শিল্পী-লেখক-বুদ্ধিজীবীগো ছোট ছোট আখড়া। ওই সব বানাইবার প্ল্যান করছেন।’  সেদিন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ দেখলেন,আবুল হাসনাত আশ্চর্যভাবে ব্যাপারটা ধরে ফেলেছেন।

মাত্র ৩৫ টাকায় ১০টি বই কিনে ১৯৭৮ সালে শুরু হয়েছিল বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। ১৫ জন সভ্য নিয়ে শুরু হওয়া বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আজ সভ্য ১৫ লাখ।

বাংলাদেশে পাঠাগারের অপ্রতুলতা অনুধাবন করে ১৯৯৮ সাল থেকে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি কার্যক্রম আরম্ভ করে। সারাদেশ ব্যাপী ভ্রাম্যমান লাইব্রেরি কার্যক্রমের জন্য ৫৬ টি ভ্রাম্যমাণ গাড়ি আছে। এ স্বপ্ন পূরণের জন্য তাকে কত পরিশ্রম ও সাধনা করতে হয়েছে। তিনি আগে স্বপ্ন দেখেছেন, অতঃপর তাঁর মেধা, শ্রম, সাধনা ও অধ্যবসায় দিয়ে জয় করেছেন সকল প্রতিবন্ধকতা।

এক্ষেত্রে বিজ্ঞানী ও ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালামের উক্তিটি প্রণিধানযোগ্য, ‘তুমি তোমার স্বপ্ন পূরণের শেষ সীমা অবধি স্বপ্ন দেখো, জেগে জেগে তুমি যা দেখো সেটা স্বপ্ন নয়। স্বপ্ন সেটাই যা তোমাকে ঘুমাতে দেয় না।’

পুরস্কার ও সম্মাননা

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৭৭ সালে পেয়েছেন ‘জাতীয় টেলিভিশন পুরস্কার’ , ১৯৯৮ সালে পেয়েছেন মাহবুব উল্লাহ ট্রাস্ট পুরস্কার; ১৯৯৯ সালে পান রোটারি সিড পুরস্কার; ২০০০ সালে পান বাংলাদেশ বুক ক্লাব পুরস্কার। ২০০৪ সালে পেয়েছেন র‌্যামন ম্যাগস্যাসে পুরস্কার, ২০০৫ সালে পেয়েছেন একুশে পদক-২০০৫ এবং ২০০৮ সালে অর্জন করেন পরিবেশ পদক-২০০৮। ২০১২ সালে প্রবন্ধে অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশন থেকে পালমোকন-১৭ সম্মাননা।

সাহিত্যিক ও সংগঠকঃ

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এক সাব্যসাচী অভিনিবিষ্ট সাহিত্য-সাধক | আরাধনার মতো করে তিনি করে যাচ্ছেন সাহিত্যের সেবা। ষাটের দশকে বাংলাদেশে যে নতুন ধারার সাহিত্য আন্দোলন হয়, তিনি ছিলেন তাঁর নেতৃত্বে। সাহিত্য পত্রিকা ‘কণ্ঠস্বর’ সম্পাদনার মাধ্যমে সেকালের নবীন সাহিত্যযাত্রাকে তিনি নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা দিয়ে সংহত ও বেগবান করে রেখেছিলেন এক দশক ধরে।

প্রবন্ধকার আব্দুশ শাকুরের ভাষায়, ‘বহু গুণের মধ্যে যে গুণটি তাঁকে সর্ব অঙ্গনেই অনন্যতা দান করে সেটা সায়ীদের হিরণবরন সৃজনশীলতা যা সর্বদাই সক্রিয় এবং সর্বথা। সমানে সৃজনশীল তিনি কথাশিল্পে কথনশিল্পে কাব্যশিল্পে রচনাশিল্পে এমনকি সংগঠনশিল্পেও – বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র যার মূর্ত দৃষ্টান্ত। বৈঠকী বিনোদন থেকে গুরু বিচরণ – প্রতিভা তাঁর সর্বত্রই দ্যুতিময়।’

‘সংগঠন ও বাঙালি’ গ্রন্থটি তাঁর দুর্লভ সৃষ্টি। বাঙালি জাতির সাংগঠনিক প্রতিভা, সাংগঠনিক জ্ঞান, জাতি হিসেবে তার দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতার রূপরেখা এই গ্রন্থটি। ‘ভালোবাসার সাম্পান’ গ্রন্থটি ষাটের দশকে নৈরাজ্যবিক্ষুব্ধ উত্তাল বাংলাদেশে গড়ে ওঠা ব্যতিক্রমধর্মী সাহিত্য আন্দোলনের এক রূপরেখা। যে আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ছিলেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। “কন্ঠস্বর” ছিল তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত পত্রিকা।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, রফিক আজাদদের মতো বাঘাবাঘা সাহিত্যিক যেখানে লিখতেন। “নিষ্ফলা মাঠের কৃষক” তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ। অত্যন্ত নান্দনিক ভাষাশৈলীর এক উত্তম বহিঃপ্রকাশ এই বইটি। এখানে তিনি তাঁর শিক্ষা জীবন, শিক্ষার পরিবেশ, অবস্থা ও সর্বোপরি তাঁর শিক্ষকদের নিয়ে লিখেছেন অত্যন্ত দারুণ ঢংয়ে। তাঁর শৈশবের অনেক মজার ঘটনা রয়েছে গ্রন্থটিতে। এ গ্রন্থটি শিক্ষকদের জন্য অবশ্যপাঠ্য।

তাঁর ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আমি’ গ্রন্থটি অসাধারণ সব তথ্য ও অভিজ্ঞতায় পুষ্ট। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকের প্রতিবন্ধকতা, সমস্যা কিংবা কষ্টের অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে বইটিতে। এ যেন এক সংশপ্তকের টিকে থাকার আলেখ্য। ‘ভাঙো দুর্দশার চক্র’, ‘আমার বোকা শৈশব’, ‘ওড়াউড়ির দিনগুলি’, ‘আমার উপস্থাপক জীবন’, ‘রসস্ট্রাম থেকে’, ‘স্বপ্নের সমান বড়’, ‘বিস্রস্ত জার্নাল, ‘নদী ও চাষীর গল্প’ প্রভৃতি তাঁর অপূর্ব সৃষ্টি।

 

তাঁর প্রথম জীবনে লেখা কবিতাকে বিশ্লেষণ করলে তাকে গণ্য করা যেতে পারে রোমান্টিক, কালসচেতন, দেশপ্রেমিক এবং আধুনিক একজন কবি হিসেবে,পঞ্চাশ-উত্তর কালের আধুনিক ও প্রথাবিরোধী ছোটগল্পকারদের একজন হিসেবে,একজন ভাবুক, প্রাজ্ঞ, বিশ্লেষণপূর্ণ ও নতুন পথ-সন্ধানী প্রাবন্ধিক হিসেবে। এমনকি তার লেখা মৌলিক বা অনুদিত নাটকের জন্যেও তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন দীর্ঘদিন । তিনি কোনো একটি মাধ্যমে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি।সামাজিক নানা ক্ষেত্রে শ্ৰমদান ও সাফল্য অর্জন তার সাহিত্যিক পরিচয়কে আড়াল করে রাখল।এখনো তিনি সমান সক্রিয়, প্রতিবছর লিখে চলেছেন অনবদ্য একেকটি বই, আত্মজীবনীমূলক কিংবা প্রবন্ধের জর্নাল, সাক্ষাৎকার বা বক্তৃতার বই | কবিতা, প্রবন্ধ, ছোটগল্প, নাটক, অনুবাদ, জার্নাল, জীবনীমূলক বই ইত্যাদি মিলিয়ে তাঁর প্রস্থভাণ্ডারও যথেষ্ট সমৃদ্ধ। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ ৪০এর অধিক।

এ প্রসঙ্গে আবদুল্লাহ আবু সাঈদ নিজেই বলেছেন, ‘লিখতে চেয়েছিলাম। লিখতে পারিনি। মনে হয় লেখক হয়েই জন্মেছিলাম। সেটা পূর্ণ করতে পারলাম না। এখনো আমার সারা অস্তিত্ব জুড়ে কোটি-কোটি জীবন্ত শব্দের গনগনানি। ইদানীং কিছু কিছু লিখছি। যদি আর-কিছুদিন বেঁচে যাই, তাহলে হয়তো কিছু লিখতে চেষ্টা করব।’

তিনি মূলত শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক। সমালোচক এবং সাহিত্য সম্পাদক হিসাবেও তিনি অনবদ্য অবদান রেখেছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তাঁর সাহিত্য প্রতিভার স্ফূরণ স্তিমিত হয়ে আসে। তবে আত্মজীবনীসহ নানাবিধ লেখালেখির মধ্য দিয়ে আজও তিনি স্বীয় লেখক পরিচিতি বহাল রেখেছেন। তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র যা ত্রিশ বছর ধরে বাংলাদেশে আলোকিত মানুষ তৈরির কাজে নিয়োজিত রয়েছে।

 

বাঙালি নারীদের পোশাক শাড়ি নিয়ে একটি লেখার জন্য ব্যাপক সমালোচনায় পড়েছিলেন তিনি।৩০ অগাস্ট ২০১৯ প্রথম আলোতে ওই লেখা প্রকাশের পর সমালোচনার ঝড় ওঠে ইন্টারনেটে, সোশাল মিডিয়ায়; তার ‘পুরুষতান্ত্রিক’ দৃষ্টিভঙ্গীর সমালোচনা করেছেন নারী অঙ্গনের নেতৃস্থানীয়রাও।

অশীতিপর এই অধ্যাপক ‘শাড়ি’ শিরোনামে তার ওই লেখা শুরু করেন এভাবে- “শাড়ি পৃথিবীর সবচেয়ে যৌনাবেদনপূর্ণ অথচ শালীন পোশাক।” তিনি লিখেছেন, “আধুনিক শাড়ি পরায় নারীর উঁচু-নিচু ঢেউগুলো এমন অনবদ্যভাবে ফুটে ওঠে, যা নারীকে করে তোলে একই সঙ্গে রমণীয় ও অপরূপ।”তবে দেশের অনেক প্রোথিতযশা ব্যক্তিত্ব আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ওই লেখাকে ইতিবাচক ভাবে নিয়েছিলেন যেমন রুবানা হক।

৮০ পেরিয়েও আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তারুণ্যে ভরপুর। জীবনে বহুমাত্রিক সব কাজ করেছেন। কখনো শিক্ষকতা, কখনো উপস্থাপনা। তারুণ্যের মুখপাত্র হিসেবে সাহিত্য সম্পাদনা থেকে শুরু করে পরিবেশ রক্ষার জন্য আন্দোলনসংগ্রাম—সবই করেছেন তিনি। পাশাপাশি রচনা করেছেন মননশীল ও সৃজনশীল সাহিত্য। যত দিন বাঁচবেন তত দিন কাজ করে যেতে চান তিনি।

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সমাজকে জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত করতে হাতে আলোকবর্তিকা নিয়ে এগিয়ে চলেছেন। কলম হাতে তিনি যেমন সার্থক হয়েছেন, সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা সাহিত্যকে, তেমনিভাবে মোটা দাগে বলা যায়, মনোমুগ্ধকর বক্তা হিসেবে আমাদের বাংলায় তার জুড়ি মেলা ভার। এ দেশে লাখো লাখো পাঠক তৈরি করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এবং তাঁর স্বপ্নের বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র। সকল শ্রেণির মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন তিনি।সার্থক মানুষেরা ফলবান বৃক্ষের মতো অবনত। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সাহিত্যের অনেক শাখায় পদচারণা করেছেন বীরদর্পে, লিখেছেন প্রচুর। তবুও অতৃপ্তির বেদনা তাকে যেন কুরে কুরে খায়। তাঁর ভাষায়, ‘লিখতে চেয়েছিলাম। লিখতে পারিনি। মনে হয় লেখক হয়েই জন্মেছিলাম। সেটা পূর্ণ করতে পারলাম না। এখনো আমার সারা অস্তিত্ব জুড়ে কোটি কোটি জীবন্ত শব্দের গনগনানি। ইদানীং কিছু কিছু লিখছি। যদি আরও কিছুদিন বেঁচে যাই, তাহলে হয়তো কিছু লিখতে চেষ্টা করব।’

 

লেখকঃ জাজাফী

ইমেইল- [email protected]

ফেসবুকঃ www.facebook.com/zazafee.du

 

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২

————————————————————————–

সহায়ক রচনাবলীঃ

  • আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, নিবন্ধ;উইকিপিডিয়া
  • নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
  • বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আমি, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
  • আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: বহুমুখিতায় ও স্বপ্নচারিতায়,সম্পাদক: আতাউর রহমান, প্রকাশক: মাওলা ব্রাদার্স
  • ঝিনুক নীরবে সহো- মোশতাক আহমদ
  • বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র[
  • An interview of Abdullah Abu Sayeed(এবেলা)
  • আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ. ২০০১ (দ্বিতীয় সংস্করণ). বিস্রস্ত জর্নাল. সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা.
  • “‘পালমোকন-১৭’ পেলেন আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ”। দৈনিক কালের কণ্ঠ ১৮ নভেম্বর ২০১৭।
  • আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এর জীবনী : উল্লেখযোগ্য স্মৃতি
  • একুশে পদকপ্রাপ্ত সুধীবৃন্দ ও প্রতিষ্ঠান। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়। পৃ: ৬।

 

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী: পাওয়ার হাউস অব নলেজ

দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা যে লেখকের লেখায় জীবন্ত হয়ে ফুটে ওঠে তিনিই প্রকৃত লেখক। আর সে কারণেই ওই লেখকের মানুষ ও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতাও অনেক। সাগরে চলাচলরত জাহাজ যেন দিক হারিয়ে না ফেলে তাই বিভিন্ন দ্বীপে বাতিঘর নির্মান করা হয়। তেমনই একটি বাতিঘর আছে কক্সবাজারের কুতুবদিয়াতে। এটাতো গেল পানির সমুদ্র। পানি ছাড়াওতো সমুদ্র হয় যেটাকে আমরা বলি জ্ঞানের সমুদ্র। জ্ঞানের সমুদ্রেও কেউ কেউ বাতিঘর হয়ে ওঠেন। যেমন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। যাকে অনেকেই আমাদের চিন্তার বাতিঘর বলে আখ্যায়িত করেন। কথা প্রসঙ্গে সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেছিলেন “যে ক’জন মানুষের সাহচর্যে এসে আমি ঋদ্ধ হয়েছি, জীবনের গভীরতাকে উপলব্ধি করতে শিখেছি, সমাজ নিয়ে প্রচলিত চিন্তার বাইরে এসে ভাবতে শিখেছি, তাদের মধ্যে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম অগ্রগণ্য”।

সমাজে এমন কিছু মানুষ জন্মগ্রহণ করেন, যাদের কাজ ও চিন্তার বহুমুখিতা অনুকরণীয়। আজীবন শিক্ষাব্রতী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তেমনি একজন মানুষ। বিত্তবৈভব, ক্ষমতার মোহ তাকে কখনো স্পর্শ করেনি। গবেষণা, লেখালেখি, পত্রিকা সম্পাদনা, নাগরিক অধিকার আন্দোলনের অদ্বিতীয় কাণ্ডারি তিনি। মৃদুভাষী, নিরহঙ্কারী সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী রুচি ও ব্যক্তিত্বের এক অনন্য উদাহরণ।  অস্বীকার করার সুযোগ নেই, বাংলা প্রবন্ধ-সাহিত্যের পাঠকপ্রিয়তা অর্জন ও সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি যার অবদান তিনি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। স্বাধীনতার প্রায় একযুগ আগে থেকেই তিনি লেখালেখি করে আসছেন। অধ্যাপক, লেখক, সাহিত্যিক, সম্পাদক, শিক্ষাবিদ, মার্ক্সবাদী দার্শনিক এই মানুষটি ক্রমে পরিণত হয়েছেন আমাদের পাওয়ার হাউজ অব নলেজ হিসেবে।

জন্ম ও শৈশব কৈশোরঃ

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী একসময়ে বিক্রমপুর নামে খ্যাত বর্তমান মুন্সীগঞ্জ জেলার অন্তর্গত শ্রীনগর উপজেলার বাড়ৈখালী গ্রামে১৯৩৬ সালের২৩ জুন জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হাফিজ উদ্দিন চৌধুরী এবং মাতার নাম আসিয়া খাতুন। তিনি ছিলেন পিতা মাতার প্রথম সন্তান। বাবার বদলী চাকরির সুবাদে তিনি শৈশব থেকেই নানা স্থানে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পেয়েছেন এবং বাস করেছেন রাজশাহী,ময়মনসিংহ,ঢাকা ও কলকাতায়। ফলে নানা সময়ে তাকে স্কুলও পরিবর্তন করতে হয়েছে। তার শৈশবের প্রথম দিকটা কেটেছে গ্রামের বাড়িতে। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিল। বাবা বদলি হয়ে রাজশাহী, কলকাতা, ময়মনসিংহ এবং এক সময় ঢাকায় আসেন। ছেলেবেলায় তিনি যেখানেই থেকেছেন সেখানে নদী পেয়েছেন। নদীর সঙ্গে তাঁর শৈশবের সম্পর্কটা মধুর।

শিক্ষাজীবনঃ

তার শিক্ষাজীবনের সূচনা হয়েছিল গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জে। এর পর বাবার সাথে যখন রাজশাহীতে চলে গেলেন তখন রাজশাহীতে পড়াশোনা করেছেন। পরবর্তীতে তিনি কিছুদিন কলকাতায় বসবাস করেন। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পরিবারের সাথে তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং ঢাকার স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সেন্ট গ্রেগরিতে ভর্তি হন। সেন্ট গ্রেগরি স্কুল থেকে ১৯৫০সালে প্রথম বিভাগে স্কলারশিপ সহ ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করে তাঁর মেধার স্বাক্ষর রাখতে শুরু করেন। ওই সময় সেন্ট গ্রেগরি স্কুলটা কলেজ হয়ে গেল, তিনি সেখানেই ভর্তি হলেন। কলেজটা পরে নটর ডেম কলেজ নামে পরিচিত হয়েছে।

১৯৫২ সালে নটরডেম কলেজ থেকে মানবিক বিভাগ থেকে মেধা তালিকায় নবম স্থান সহ প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তি হন। সেই সময়ে তাদের বাসা ছিল বেগমবাজারে। সিরাজুল ইসলাম তখন রমনা দিয়েই যাতায়াত করতেন। একুশের আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল ১৯৪৮ সালে। এরপর ধারাবাহিকভাবে নানা কর্মসূচি, বিক্ষোভ হয়েছে। ’৫২-তে এসে এটা প্রবল আকার ধারণ করে। একুশে ফেব্রুয়ারির আগে যে মিছিল হয়েছিল তাতে তিনি অংশ নিয়েছিলেন। তখন তিনি কলেজে পড়তেন। ভাষা আন্দোলন চূড়ান্ত পর্বে ঢাকা মেডিকেলের আউটডোরের সামনে আমতলায় যে জমায়েত হয়েছিল সেখানেও তিনি গিয়েছিলেন। পুলিশ ছাত্রদের ওপর কাঁদুনে গ্যাস ছুড়ল, যে অভিজ্ঞতা আগে কখনো তাদের ছিল না। পুকুরের পানিতে রুমাল ভিজিয়ে চোখ মুছে আমতলার পেছনের রেললাইন দিয়ে তিনি সেদিন বাসায় চলে যান। ওইদিন গুলিতে কয়েকজন ভাষাসংগ্রামী শহীদ হন। তিনি সহ অন্যান্যরা মিছিল নিয়ে সদরঘাটে গিয়ে দেখেন সাধারণ মানুষ মর্নিং নিউজ অফিস জ্বালিয়ে দিয়েছে। একটা অভূতপূর্ব ঘটনা। ঢাকা শহরে এ রকম কখনো ঘটেনি। একুশে ফেব্রুয়ারির আগে পুরান ঢাকার মানুষ এ আন্দোলনে যোগ দেয়নি। এ আন্দোলন ছিল রমনা ও বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক। কিন্তু পুলিশের গুলি চালানোর পর আবহাওয়াটা বদলে গেল। তারা দেখলেন পুরান ঢাকার মানুষ এ আন্দোলনে আসছে। তারা নানাভাবে ছাত্রদের সাহায্য করছে। একুশের ঘটনায় নবাববাড়ী মুসলিম লীগের যে ঘাঁটি সেই ব্যবধানটা ভেঙে গেল। বুঝলেন এটা মধ্যবিত্তেরই আন্দোলন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যেন নতুন জীবন পেলেন। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাটা ছিল একেবারে খোলামেলা। তিনি হেঁটে হেঁটে ক্লাস করতে যেতেন। এত সুন্দর গাছপালা। গাড়িঘোড়ার ভিড় নেই। তাঁর জীবনটা খুব আনন্দের ছিল। ইতিমধ্যে রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলে গেছে। তিনি সহ অন্যান্যরা আজিমপুর কলোনিতে ছাত্রসংঘ এবং একটি পাঠাগার গড়ে তুললেন। মধ্যবিত্তের আকাঙ্ক্ষাটা ছিল একেবারে লেখাপড়াকেন্দ্রিক। তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসে নিয়মিত নির্বাচন হতো। সেবার সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ওই ইলেকশনে দাঁড়িয়ে গেলেন। নিয়ম ছিল, ছাত্র সংসদের সদস্য হবে ফার্স্ট ইয়ার থেকে। হল সংসদ নির্বাচনে রাজনীতি চলে এলো। এর আগে হল নির্বাচন হতো পারস্পরিক চেনাজানা, জেলার আনুগত্যের ভিত্তিতে। একদিকে মুসলিম লীগের পক্ষের ছাত্র এবং তার বিরুদ্ধের ছাত্র। ওই সময় সলিমুল্লাহ হলে গণতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট গড়ে ওঠে। ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়ন তখন গঠিত হয়েছে মাত্র। অনেকে বলে থাকেন, যুক্তফ্রন্টের ধারণাটা এখান থেকে তৈরি হয়। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীও এই ধারার সাথে ছিলেন। অন্যদিকে নির্বাচনে তিনি ও তার দল বিপুল ভোটে জিতলেন।

ওই সময় নির্বাচনে অংশগ্রহণ মানে মাইক্রোফোনে চেঁচামেচি, লিফলেট ছাপানো, বিভিন্ন ক্লাসে গিয়ে ছাত্রদের সঙ্গে পরিচিত হওয়া ইত্যাদি। মেয়েদের সংখ্যা কম ছিল, তাদের কোনো হল ছিল না। মেয়েরা বর্তমান প্রেসক্লাবের পাশে অবস্থিত চামেলি হাউসে থাকত। তারা বিভিন্ন হলের সঙ্গে অনাবাসিক শিক্ষার্থী ছিল। তখন একটা রাজনৈতিক মেরুকরণ হলো। আন্দোলন এগিয়ে যাচ্ছে। আবার ’৫৪ নির্বাচন হবে এ রকম সম্ভাবনা। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার ছাত্রজীবনে চমৎকার একটি সাংস্কৃতিক জীবন পেয়েছিলেন।

১৯৫৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে দ্বিতীয় শ্রেণীতে প্রথম স্থান সহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তার সাবসিডিয়ারির বিষয় ছিলো রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও অর্থনীতি। ১৯৫৬ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে ইংরেজী সাহিত্যে স্নাতোকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ারও সুযোগ পেয়েছেন। ইংরেজী সাহিত্যে গবেষণার জন্য তিনি পাড়ি জমিয়েছেন যুক্তরাজ্যের লীডস ইউনিভার্সিটিতে এবং পরবর্তীতে লেস্টার ইউনিভার্সিটিতে।

জোসেফ কনরাড, ই এম ফরস্টার ও ডি এইচ লরেন্সের উপন্যাসের অশুভের উপস্থিতিকে পিএইচডির বিষয় হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন তিনি; সাহিত্যের সীমানা থেকে ক্রমশ তিনি এই অশুভের সন্ধান করেছেন সমাজ ও রাষ্ট্রের বিস্তৃত পরিসরে।

সংসার জীবনঃ

১৯৬২ নাজমা জেসমিন চৌধুরীর সঙ্গে  সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর স্ত্রী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ছিলেন এবং ১৯৮৯ সালে ক্যানসারের কাছে হার মেনে মৃত্যুবরণ করেন।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর দুটি মেয়ে রওনাক আরা চৌধুরী ও শারমীন চৌধুরী। রওনাক সমাজবিজ্ঞান থেকে পাস করেছেন। অন্য মেয়ে শারমীন ইংরেজি সাহিত্যে পিএইচডি করেছেন, তিনি বুয়েটের মানববিদ্যা বিভাগের ইংরেজি শাখার সহকারী অধ্যাপক হিসেবে নিয়োজিত আছেন।

পেশাগত জীবন

ছাত্রজীবন শেষ হবার আগেই সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী  কর্মজীবন শুরু করেন। ১৯৫৬ সালে  এমএ পরীক্ষা দিয়েই মুন্সীগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজে চাকরি পেয়ে গেলেন। সপ্তাহে ছয় দিন সেখানে থাকতেন। সপ্তাহশেষে বাসায় চলে যেতেন । মুন্সীগঞ্জে খুব ভালোই কাটত। তারপর কিছুদিন জগন্নাথ কলেজে শিক্ষকতা করেন। সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পাওয়া খুব কঠিন ছিল। চাকরির পদের সংখ্যা খুব সীমিত ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক যদি পদত্যাগ, অবসর বা পরলোগ গমন করতেন তখন অন্যরা সুযোগ পেতো। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করলেন ১৯৫৭ সালে। তখন কোনো কোনো শিক্ষক কিছুদিন শিক্ষকতা করে সিভিল সার্ভিসে চলে যেতেন। এর ফলে বিভাগে পদশূন্য হতো। তা ছাড়া সিভিল সার্ভিস অনেক আকর্ষণীয় ছিল। ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক মুজিবুল হক সিভিল সার্ভিসে যাওয়ায় তার স্থলে যোগ দিলেন কবি আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ। তিনি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর দুই বছরের সিনিয়র।  কয়েক মাস পর তিনিও সিভিল সার্ভিসে চলে যান। তখন তার জায়গায় সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ঢুকলেন। দুটো কারণে এই চাকরিটা তিনি পছন্দ করেছিলেন। তার বাবা সব বাবার মতো চাইতেন, তার ছেলে সিভিল সার্ভিসে যাবে। সেই সময়ে ওটাই নিয়ম ছিল। সিরাজু ইসলাম চৌধুরীর শিক্ষকতার মূল কারণ ছিল এ চাকরির কোনো বদলি নেই। দ্বিতীয় আকর্ষণ ছিল গ্রন্থাগারটা। তখন ঢাকার সব পাড়ায় পাড়ায় গ্রন্থাগার ছিল। আর ছেলেবেলা থেকে পড়াশোনা তার খুব ভালো লাগতো। ফলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করেই শিক্ষকতা জীবন খুব উপভোগ করছিলেন।

১৯৫৯ সালে ১০ মাসের জন্য ব্রিটিশ কাউন্সিল বৃত্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষার্থে বিদেশ যাত্রা করেন। গন্তব্য  ইংল্যান্ডের লিডস ইউনিভার্সিটি। সেখানেই তিনি পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা ইন ইংলিশ স্টাডিজ শেষ করে দেশে ফিরে আসেন। ১৯৬৩ সালে সহকারী অধ্যাপক পদে উন্নীত হন। জ্ঞানের অন্বেষণে থাকা সিরাজুল ইসলামের পড়া ও শেখার পরিধি ক্রমাগত ভাবে বৃদ্ধিপেতে থাকে। ফলশ্রুতিতে তিনি ১৯৬৫ সালে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের নিমিত্তে কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে ইংল্যান্ডের লেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে যান। তিন বছর অক্লান্ত পরিশ্রম শেষে১৯৬৮ সালে তিনি তার কাঙ্খিত পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

সাহিত্যের প্রতি ভালোবাসা থেকেই তিনি তার পিএইচডির অভিসন্দর্ভের বিষয় হিসেবে বেছে নেন দ্য এনিমি টেরিটরি, ট্রিটমেন্ট অব এভিল, ইন দ্য নভেলস অব জোসেফ কনরাড, ইএম ফর্স্টার এন্ড ডিএইচ লরেন্স। যুক্তরাজ্যের মত একটি উন্নত দেশে সব রকম সুযোগ সুবিধার মধ্যে থেকে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে তিনি ইচ্ছে করলে সেই দেশেই ভালো পজিশনে চাকরি করতে পারতেন কিংবা ইউরোপ আমেরিকার অন্যান্য দেশেও ভালো সম্মানিতে কাজ করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। বরং দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে তিনি স্বদেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে ফিরে এসেছেন মাতৃভূমিতে এবং যোগ দিয়েছেন নিজের প্রাক্তন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বলে খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

মেধা ও পরিশ্রমের ফলে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্রমাগত ভাবে পদন্নোতি লাভ করতে থাকেন। দেশ যখন স্বাধীনতার স্বপ্নে বিভোর। রাজনৈতিক উত্তেজনা চারদিকে। নির্বাচন আর পূর্ব বাংলার মানুষের অধিকার নিয়ে সবাই সোচ্চার,সেই সময়ে ১৯৭০ সালে তিনি আবার পদন্নতী লাভ করে ইংরেজি বিভাগে রিডার পদ লাভ করেন। সেই সাথে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাউন্সিলের সদস্য মনোনীত হন।  স্বাধীনতার পর আবার বিশ্ববিদ্যালয় খুলল। সদ্য স্বাধীন দেশ। সবার মধ্যে অনেক আকাঙ্ক্ষা। সেই সময়ে ইংরেজী বিভাগের ড. খান সারওয়ার মুর্শিদ স্যার ভিসি হয়ে চলে গেলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ভাগ্য আবার বদলে গেলো। তিনি রিডার থেকে বিভাগের চেয়ারম্যান হয়ে গেলেন। যেটা তার ধারণার মধ্যেই ছিল না।

১৯৭৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একটি অধ্যাদেশ হাতে পেয়েছিলেন। তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা স্বায়ত্তশাসন চলে এলো। নির্বাচন চলে এলো। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর অবস্থানটা বরাবরই ছিল প্রতিষ্ঠানবিরোধী। ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে তাঁর আনুগত্য ছিল না। তিনি কখনো চিন্তাই করেননি উপাচার্য হবেন। তিনি সিনেট, সিন্ডিকেট ইলেকশনে দাঁড়িয়েছেন। সিনেট তিনজনের ভিসি প্যানেল দেয়, তার নামও আসছে। তিনি নির্বাচিতও হয়েছিলেন। তিনজনের প্যানেলের মধ্যে তিনিই সর্বোচ্চ ভোট পান। তখন প্রশ্ন এলো তিনি কি সত্যি সত্যিই উপাচার্য হতে চান? এরশাদের শাসনামলে তিনি কি পারবেন? সেটা কি শোভন হবে? সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর স্ত্রী তখন জীবিত। তার ধারণা ছিল, এই পদটা তার না। পরে আরও একটি সুযোগ আসে। কিন্তু সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লেখাপড়া করতে চেয়েছিলেন, প্রশাসনিক কাজ করতে চাননি। ফলে উপাচার্য হওয়া থেকে দূরে থেকেছেন।

পেশাগত জীবনে তিনি আরও নানা পদে নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করেন। উল্লেখযোগ্য হিসেবে আমরা বলতে পারি তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর কোষাধ্যক্ষ পদে নিযুক্ত ছিলেন। ১৯৮৫ পর্যন্ত এ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৮ সালে ঢাকা ইউনিভার্সিটি বুক সেন্টার প্রতিষ্ঠায় তিনি অগ্রগণ্য ভূমিকা পালন করেন।১৯৮৪ সালে  তিন বছরের জন্য তিনি কলা অনুষদের ডিন নিযুক্ত হন।১৯৮৬ সালে তিনি উদ্যোগ নিয়ে সেন্টার ফর এডভান্সড রিসার্চ ইন হিউম্যানিটিজ প্রতিষ্ঠা করেন।

২০০১ সালে তিনি অধ্যাপক হিসেবে অবসর গ্রহণ। এর দুই বছর পর  ২০০৩ সালে সরকার তাকে ইউজিসি অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেয় এবং ২০০৮ সালে তাকে প্রফেসর ইমেরিটাস অভিধায় ভূষিত করা হয়। তিনি একই সাথে বাংলা একাডেমির ফেলো।

মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলিতে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীঃ

মুক্তিযুদ্ধের সময়টা ছিল বাঙ্গালীদের জন্য বড় বিপদের সময়। ২৩ মার্চ বাংলা একাডেমিতে ভবিষ্যতের বাংলা সম্পর্কে একটি সভায় উপস্থিত ছিলেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। এছাড়াও তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে সভা করেছেন, মিছিলে গিয়েছেন।তাদের একটা সংগঠন ছিল সংগ্রামী লেখক শিবির। এর পক্ষ থেকে তিনি সভা-সমিতি করতেন। ২৫ মার্চ রাত ৮টার দিকে ইকবাল হলের ছেলেরা  বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবে এসে বলল, পাকিস্তান আর্মি চলে এসেছে, মনে হয় ভয়ঙ্কর কোনো ঘটনা ঘটবে। একথা শুনে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মনটা খারাপ হয়ে গেল। তিনি তখন জগন্নাথ হলের উল্টো দিকে কোয়ার্টারে থাকতেন। রাতের জগন্নাথ হলের ছাত্রদের কীভাবে হত্যা করা হয়েছে, সলিমুল্লাহ হলের ছাত্রদের কীভাবে হত্যা করা হয়েছে এসব কাহিনী আসতে থাকল। ছেলেরা কেউ কেউ তার বাসায় এসে আশ্রয় নিল। ২৬ মার্চ সকালে কারফিউ দিল। পরে ২৭ তারিখ কারফিউ ভাঙলে বাসা থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন।সেই সময়ে তিনি নানা জায়গায় থেকেছেন। তিনি মনে করেন এ জন্য বেঁচে গেছেন।

আর্মিরা তাঁর ঠিকানা জানত না। আর্মিদের হত্যার তালিকায় তারও নাম ছিল। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর এক আত্মীয় ছিলেন পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চে। তিনি তাকে সতর্ক করেছিলেন। টিক্কা খান যাওয়ার আগে সিরাজুল ইসলাম সহ ছয়জন শিক্ষকের নামে চিঠি দিয়ে গেলেন। সেখানেও তাকে সতর্ক করে দেওয়া হয়। তখন তিনি বুঝতে পারেন, দেশ স্বাধীন না হলে বিশ্ববিদ্যালয়ে আর আসা হবে না। ৭ ডিসেম্বর ওয়ারীতে গিয়ে তাদের এক আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। ১৪ ডিসেম্বর ওখানে কি কাণ্ড ঘটেছে সেটা তিনি জানতেনই না। কিন্তু পরবর্তীতে তিনি জেনেছেন ওই দিন এ জাতির বিশাল ক্ষতি হয়ে গেল। ওই কয়েক দিন বেশ উৎকণ্ঠায় দিন কাটছিলেন। তারপর ১৬ ডিসেম্বর স্যারেন্ডার হলো। ১৭ তারিখ এক সহকর্মী তাকে বললেন, আপনি বেঁচে আছেন এখনো! স্বাধীনতা যখন এলো তখন একটা মিশ্র অভিজ্ঞতা হলো। তিনি দেখলেন তার অনেক পরিচিত চেনা-জানা মানুষ মারা গেছেন। বিজয়ের পর মনে হলো অনেকটা যেন রোগমুক্তি। যেন বিরাট অসুখ থেকে  সেরে উঠলেন।

স্বাধীনতার উত্তাল সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম ব্যহত হলেও পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে তিনি আবার পদন্নতী লাভ করে হয়ে যান হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট।১৯৭৩ সালে তিনি ৩ বছরের জন্য চেয়ারম্যান মনোনীত হন। মেধা ও মননে অগ্রবর্তী মানুষটি ক্রমাগত ভাবে জ্ঞানের ভূবনে হয়ে ওঠেন মহীরুহ। ১৯৭৫ সালে তিনি অধ্যাপক পদে পদোন্নতি লাভ করেন।

তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় তার অবস্থান ছিল বিতর্কিত। যখন সারা দেশ একজোট হয়ে স্বাধীনতার মূলমন্ত্রে বিশ্বাসী হয়ে লড়াই করতে নেমেছে তখন তিনি সেগুলোকে পাশকাটিয়ে নিয়মিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেওয়া চালিয়ে গিয়েছেন এবং টিচার্স লাউঞ্জে আড্ডা দিয়েছেন। অথচ একই সময়ে অন্যান্য শিক্ষকেরা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জোরালো সমর্থন জানিয়ে ক্লাস বর্জন করেছে। কথিত আছে তিনি মুক্তিযুদ্ধকে দুই কুকুরের লড়াই বলে আখ্যা দিয়েছেন। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে তিনিই নানা সময়ে বলেছেন সুবিধাবাদী হলে তিনি আর বুদ্ধিজীবী থাকেন না।

সম্পাদক জীবনঃ

শিক্ষকতার পাশাপাশি তার নেশা পত্রিকা সম্পাদনা। কেননা তিনি ভেবেছেন পত্রিকা সম্পাদনার ভার হাতে থাকলে অন্যের লেখার সঙ্গে নিজের লেখালেখিটাও সচল থাকবে। পিএইচডি করতে ইংল্যান্ডে গিয়ে তিনি দেখেছেন সেখানকার শিক্ষকরা ক্লাসে পড়াতে আসেন ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়ে। লাইব্রেরিতে গিয়ে শিক্ষকরা প্রচুর পরিশ্রম করে প্রতিটি ক্লাসে লেকচারকে অনন্য করে তোলেন। আর সেই ক্লাস লেকচারগুলোই পরবর্তীতে বই হিসেবে বের হয়। এই জ্ঞানপ্রক্রিয়া তাকে উদ্বুদ্ধ করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনিই ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত ‘দ্য ঢাকা ইউনিভার্সিটি স্টাডিজ’ এবং ১৯৭৩ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পত্রিকা’ সম্পাদনা করেন।  তিনি আনোয়ার পাশা রচনাবলী (তিন খণ্ড) ও Dhaka University Convocation Speeches (দুই খণ্ড) সম্পাদনা করেছেন।

লেখার টেবিল থেকে মিছিলের রাজপথ—সর্বত্রই তিনি ছিলেন ও আছেন। বাংলা বানানে অন্যায় হস্তক্ষেপ কিংবা নির্বিচার বৃক্ষনিধনের বিরুদ্ধে তিনি সদা সোচ্চার এক নাম। তার সম্পাদিত পত্রিকা পরিক্রম, সাহিত্যপত্র, সাপ্তাহিক সময় উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও তিনি সম্পাদনা করেছেন সচিত্র সময় (১৯৯১),সাপ্তাহিক সময় (১৯৯৩-৯৫)

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাম্প্রতিক দুটো বই অবিরাম পথ খোঁজা (প্রথমা প্রকাশন, তৃতীয় মুদ্রণ, ফেব্রুয়ারি ২০১৯) এবং পিতার হুকুম (প্রথমা প্রকাশন, দ্বিতীয় মুদ্রণ, ফেব্রুয়ারি ২০১৮)।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সমষ্টি-মানুষের উত্থান চান। তিনি জানেন, মানুষের মাঝে আছে ‘স্বাধীনতার স্পৃহা, সাম্যের ভয়’। দায়বদ্ধ বুদ্ধিজীবী হিসেবে তিনি মানুষের মনোজাগতিক উন্নতির মাধ্যমে মানবিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার পথে তাঁর দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। এ জন্য বিভিন্ন সময় সাহিত্যপত্র, সময়-এর মতো রুচিশীল কাগজ সম্পাদনা করেছেন। গত দুই দশক বিরতিহীনভাবে তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয়ে চলেছে সাহিত্য-সংস্কৃতির ত্রৈমাসিক নতুন দিগন্ত। পত্রিকার মধ্য দিয়ে নতুন লেখকদের প্রকাশ-বিকাশের ক্ষেত্র প্রস্তুতের পাশাপাশি তাঁর প্রতিষ্ঠিত ‘সমাজ রূপান্তর অধ্যয়ন কেন্দ্র’-এর উদ্যোগে সমসাময়িক বিষয়ে আয়োজিত হয়ে চলেছে ‘আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ স্মারক বক্তৃতা’।

পুরস্কার ও সম্মাননাঃ

আলোকের দিশারী এই মানুষটি সারা জীবন বাংলা সাহিত্যকে যেভাবে সমৃদ্ধ করেছেন তার স্বীকৃতিও পেয়েছেন। নানা সময়ে তিনি সম্মানজনক একাধিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। শুরুটা হয়েছিল ১৯৭৫ সালে লেখক সংঘ পুরস্কার প্রাপ্তির মধ্য দিয়ে। এর পরের বছর ১৯৭৬ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পদক পান। এক বছর বিরতী দিয়ে ১৯৭৮ সালে তার হাতে ওঠে আব্দুর রহমান চৌধুরী পদক যা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রদত্ত। এর পর তিনি ১৯৮০ সালে লেখিকা সংঘ পদক পান। ১৯৮৩ সালে মাহবুবউল্লাহ ফাউন্ডেশন পদক পান। ১৯৮৮ সালে স্বীয় গবেষণার স্বীকৃতিস্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে স্বর্ণপদকে ভূষিত করে। একই বছর তিনি অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার পান। বাংলাদেশ সরকার তাকে ১৯৯৬ সালে শিক্ষায় একুশে পদকে সম্মানিত করেন। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বিভিন্নভাবে তার শ্রম ও সাহিত্যের জন্য মূল্যায়িত হয়েছেন। তিনি যে বিপুল মানুষের সম্মান ও পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছেন তা সন্দেহাতীত।  এছাড়াও অন্যান্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে আবদুর রহমান চৌধুরী পদক(ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), আব্দুর রউফ চৌধুরী পুরস্কার (২০০১), ঋষিজ পদক (২০০২), শেলটেক পদক (২০১৭) এবং প্রথম আলো বর্ষসেরা বই-১৪২১  সহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

সাহিচর্চার এবং উল্লেখযোগ্য গ্রন্থঃ

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর সাহিত্য জীবনের শুরুটা কথাসাহিত্য দিয়ে আর পরিণতি প্রবন্ধ-গবেষণাতে। এখনো অনেকে ভোলেননি তাঁর গল্পগ্রন্থ ভালমানুষের জগৎ বা শিশু–কিশোরদের জন্য লেখা দরজাটা খোলো বইয়ের কথা।  তিনি লেখালেখি শুরু করেছিলেন গল্প দিয়ে। ছোট গল্পের বইও আছে তার। শিশু-কিশোরদের জন্য গল্পের বইও লিখেছেন। পরে তিনি সরে এসেছেন প্রবন্ধে। সরে এসেছেন কথাটা পুরোপুরি বলা যাবে না। কারণ তার প্রবন্ধে রয়েছে গল্পের ধরন,কৌতুহল ও আনুষ্ঠানিকতা।যেন সংলাপে মত্ত হয়েছেন আপনজনের সাথে। পাশাপাশি তিনি উপন্যাসও লিখেছেন। তার প্রবন্ধে সাহিত্যের খ্যাতিমান নায়ক নায়িকারা নতুন রুপে মূল্যায়িত হয়েছে। বিশ্বসাহিত্যকে সফল ভাবেতুলে ধরেছেন এ দেশের পাঠকের সামনে। ব্যতিক্রম চিন্তা চেতনা এবং নতুনত্ব তার সব লেখারই বৈশিষ্ট্য। উপস্থাপন ও দৃষ্টিভঙ্গিজনিত কারণে এই চিন্তা চেতনা ও নতুনত্ব চিন্তাশীল পাঠকের কাছে খুবই সহজে ধরা পড়ে।

অন্যান্য লেখকরা সবাই যখন সাহিত্য জীবনের শুরুতে কবিতায় হাতেখড়ি নিয়েছেন তিনি তা করেননি। তিনি কখনো কবিতা  লেখেননি। গল্প লিখেছেন, উপন্যাস যে লেখেননি, তা-ও নয়; কিন্তু ও পথে এগোনো হয়নি। কবিতাতে প্রথম বাধাটি ছিল ছন্দ মেলাতে পারবেন না—এই ভয়; দ্বিতীয় বাঁধা কল্পনাক্ষমতা শক্তিশালী নয়—এই বোধ। অন্যদিকে তিনি এক সাক্ষাৎকারে গল্প লেখা তথা  কথাসাহিত্যের চর্চা নিয়ে বিস্তারিত্ আলাপ করেছেন। যেখানে তিনি দেখিয়েছেন কেন তিনি ওইদিকে অগ্রসর হননি বরং সাহিত্য সমালোচনার দিকে এগিয়েছেন বা প্রবন্ধের দিকে ঝুকেছেন।তিনি বলেন “আমি দেখেছি, আমার লেখাতে বৃত্তের উপমা বেশ ভালোভাবেই আছে; আমি বড় হয়েছি এবং রয়ে গেছি একটি বৃত্তের মধ্যেই। সে বৃত্তটা মধ্যবিত্তের। সেখানে আমার জন্য গল্প-উপন্যাসের পর্যাপ্ত উপাদান খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়নি। দ্বিতীয় কারণটা সাহিত্যের মান সম্পর্কে ধারণা। সাহিত্য পঠন-পাঠনের দরুন কথাসাহিত্যের উৎকর্ষের যে মানের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটেছে, ভয় হয়েছে, সেখানে পৌঁছাতে পারার চেষ্টাটা হবে পণ্ডশ্রম। আবার তৃতীয় একটা কারণও থাকতে পারে। সেটা হলো, সাহিত্যের শিক্ষকতার কারণে বিশ্লেষণপ্রবণতার বৃদ্ধি। সৃষ্টিশীল সাহিত্যের জন্য সংশ্লেষণ শক্তির দরকার; সেটার ঘাটতি ঘটেছিল বলেও হয়তো ধারণা। সে তুলনায় প্রবন্ধে দেখেছি স্বাধীনতা বেশি। নিজের চিন্তা ও উপলব্ধির কথা বলা যায়, অভিজ্ঞতারও ব্যবহার চলে; মানটাও থাকে নিজস্ব। তবে মননশীল ও সৃষ্টিশীল রচনার মধ্যে যে দুর্লঙ্ঘ্য কোনো প্রাচীর আছে, তা-ও সত্য নয়। মননশীল রচনাতেও সৃষ্টিশীলতা আনা সম্ভব। ওই দুইকে মেলানোর চেষ্টাটাও আমার ছিল”।

প্রায় ছয় দশক আগে ১৯৬৪-তে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ অন্বেষণ। এরপর সম্প্রতি প্রকাশিত বিদ্যাসাগর ও কয়েকটি প্রসঙ্গ পর্যন্ত তাঁর যে প্রাবন্ধিক অভিযাত্রা, তাতে বাংলা ও বিশ্বসাহিত্য বিষয়ে নতুন আবিষ্কার-উন্মোচনের পাশাপাশি আছে সমাজ-সংস্কৃতি-রাজনীতি-অর্থনীতি বিষয়ে নিজস্ব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ।

 

কুমুর বন্ধন, শরৎচন্দ্র ও সামন্তবাদ, বঙ্কিমচন্দ্রের জমিদার ও কৃষক, নজরুল ইসলামের সাহিত্যজীবন, উনিশ শতকের বাংলা গদ্যের সামাজিক ব্যাকরণ-এর সমান্তরালে তাঁর হাতেই লেখা হয়েছে শেকস্‌পীয়রের মেয়েরা, ধ্রুপদী নায়িকাদের কয়েকজন, ইংরেজি সাহিত্যে ন্যায়-অন্যায়, প্রতিক্রিয়াশীলতা: আধুনিক ইংরেজি সাহিত্যে–এর মতো জিজ্ঞাসাবাহী বই। মার্ক্সীয় আদর্শে অবিচল আস্থা তাঁর। গবেষণাগদ্য থেকে সাময়িক প্রসঙ্গে লেখা কলাম; সবকিছুতেই তাঁর এই কাঠামোর উপস্থিতি টের পাওয়া যায়। তবে জ্ঞানবিশ্বের সমসাময়িক অন্যান্য চর্চা নিয়ে তাঁর আগ্রহের অন্ত নেই। তাই উপমহাদেশের নিম্নবর্গীয় ইতিহাসবিদদের চিন্তাকাঠামো নিয়ে ‘ঔপনিবেশিক ভারতে ইতিহাসের গতিবিধি’ আর প্রাচ্যবাদী ভাবনাবলয় নিয়ে ‘এডওয়ার্ড সাঈদ কেন গুরুত্বপূর্ণ’ শীর্ষক সুদীর্ঘ প্রবন্ধ রচনা করেন। নীরদ সি চৌধুরীর ঔপনিবেশিক মনোবৃত্তি নিয়ে লিখতে ভোলেননি ‘কৃষ্ণসাহেবের ক্ষোভ’ ও ‘লড়াই’ নামের প্রবন্ধ। রবীন্দ্রনাথের মতোই উদার আন্তর্জাতিকতাবাদে বিশ্বাস তাঁর আর জাতীয়তাবাদ বিষয়ে অসাধারণ দুটো বই বাঙালীর জাতীয়তাবাদ এবং জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তিও তাঁরই লেখা।

ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন হোমারের অডিসি, এ্যারিস্টটলের কাব্যতত্ত্ব, ইবসেনের বুনোহাঁস, হাউসম্যানের কাব্যের স্বভাব। সম্পাদনা করেছেন একাত্তরের শহীদ বুদ্ধিজীবী আনোয়ার পাশার রচনাবলি।

প্রকাশিত বই

১. ছোটদের শেকস্পীয়র (১৯৬২) [আহমদ পাবলিশিং]

২. অন্বেষণ (১৯৬৪) [রোদেলা]

৩. ইবসেনের ‘বুনো হাঁস’ (১৯৬৫) [জাগৃতি প্রকাশনী]

৪. হাউসম্যানের ‘কাব্যের স্বভাব’ (১৯৬৫) [মুক্তধারা]

৫. Introducing Nazrul Islam (1965) Nazrul Islam: Poet and More (1994) [Nazrul Institute]

৬. দ্বিতীয় ভুবন (১৯৭৩) [বর্ষাদুপুর]

৭. নিরাশ্রয় গৃহী (১৯৭৩) [রাত্রি]

৮. আরণ্যক দৃশ্যাবলী (১৯৭৪) [বাংলা একাডেমি]

৯. অনতিক্রান্ত বৃত্ত (১৯৭৪) [সূচীপত্র]

১০. The Moral Imagination of Joseph Conrad (1974) [ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা সংস্থা]

১১. এ্যারিস্টটলের কাব্যতত্ত্ব (১৯৭৫) [গ্লোব লাইব্রেরী]

১২. প্রতিক্রিয়াশীলতা, আধুনিক ইংরেজী সাহিত্যে (১৯৭৫) [মুক্তধারা]

১৩. শরৎচন্দ্র ও সামন্তবাদ (১৯৭৫, ২০০৬) [সাহিত্য বিলাস]

১৪. The Enemy Territory, Evil in D. H. Lawrence (1976 [ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা সংস্থা]

১৫. আমার পিতার মুখ (১৯৭৬, ১৯৯১) [অন্যপ্রকাশ]

১৬. বঙ্কিমচন্দ্রের জমিদার ও কৃষক (১৯৭৬, ২০০৬) [সাহিত্য বিলাস]

১৭. কুমুর বন্ধন (১৯৭৭, ২০০০) [মুক্তধারা]

১৮. উপরকাঠামোর ভেতরেই (১৯৭৭) [মুক্তধারা]

১৯. তাকিয়ে দেখি (১৯৭৮) [মুক্তধারা]

২০. বেকনের মৌমাছিরা (১৯৭৮) [টচখ]

২১. স্বাধীনতা ও সংস্কৃতি (১৯৭৯) [ডানা প্রকাশনী]

২২. একই সমতলে (১৯৮০) [ব্র্যাক প্রকাশনী]

২৩. ঊনিশ শতকের বাংলাগদ্যের সামাজিক ব্যাকরণ (১৯৮০) [ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা]

২৪. আশির দশকে বাংলাদেশের সমাজ (১৯৮১) [ডানা প্রকাশনী]

২৫. স্বাধীনতার স্পৃহা ও সাম্যের ভয় (১৯৮১) [টচখ]

২৬. বাঙালী কাকে বলি (১৯৮২) [আহমদ পাবলিশিং হাউজ]

২৭. বাঙালীকে কে বাঁচাবে (১৯৮৩) [আহমদ পাবলিশিং হাউজ]

২৮. বৃত্তের ভাঙা-গড়া (১৯৮৪) [আহমদ পাবলিশিং হাউজ]

২৯. মুখোশ ও মুখশ্রী (১৯৮৫) [বাংলাএকাডেমি]

৩০. টলস্টয়, অনেক প্রসঙ্গের কয়েকটি (১৯৮৫) [রোদেলা]

৩১. নেতা, জনতা ও রাজনীতি (১৯৮৬) [স্বরবৃত্ত]

৩২. গণতন্ত্রের পক্ষ-বিপক্ষ (১৯৮৭) [বিজয় প্রকাশ]

৩৩. শেষ মীমাংসার আগে (১৯৮৮) [অঙ্কুর]

৩৪. দরজাটা খোলো (১৯৮৯) [নবরাগ]

৩৫. উদ্যানে এবং উদ্যানের বাইরে (১৯৮৯) [বিদ্যাপ্রকাশ]

৩৬. শ্রেণী, সময় ও সাহিত্য (১৯৯০) [গ্লোব লাইব্রেরী]

৩৭. ভালোমানুষের জগৎ (১৯৯০) [দিব্যপ্রকাশ]

৩৮. কেউ বলে বৃক্ষ কেউ বলে নদী (১৯৯০) [পল্লব পাবলিশার্স]

৩৯. হোমারের ওডেসি (১৯৯০) অনুবাদ [অন্বেষা]

৪০. বাবুলের বেড়া-ওঠা (১৯৯০) [নালন্দা]

৪১. স্বপ্নের আলোছায়া (১৯৯১) [সময়]

৪২. রাষ্ট্র ও কল্পলোক (১৯৯১) [বিদ্যাপ্রকাশ]

৪৩. দ্বিজাতি তত্ত্বের সত্যমিথ্যা (১৯৯২) [বিদ্যাপ্রকাশ][

৪৪. লেনিন কেন জরুরী (১৯৯২) [নালন্দা]

৪৫. আপনজন (১৯৯৩) [বিদ্যাপ্রকাশ]

৪৬. অপরিচিত নায়ক পরিচিত দুর্বৃত্ত (১৯৯৪) [আহমদ পাবলিশিং]

৪৭. বাঙালীর জয়-পরাজয় (১৯৯৪) [বিদ্যাপ্রকাশ]

৪৮. লিঙ্কনের বিষণœমুখ (১৯৯৪) [অন্বেষা]

৪৯. এর পথ ওর প্রাচীর (১৯৯৫) [বিদ্যাপ্রকাশ]

৫০. ভয় পেয়ো না বেঁচে আছি (১৯৯৫) [অনন্যা]

৫১. মাঝখানের মানুষেরা (১৯৯৫) [আফসার ব্রাদার্স]

৫২. দুই বাঙালীর লাহোরযাত্রা (১৯৯৬) [জাগৃতি প্রকাশনী]

৫৩. পতঙ্গ ভৃত্য ও দৈত্য (১৯৯৬) [বিদ্যাপ্রকাশ]

৫৪. রাষ্ট্রের মালিকানা (১৯৯৭) [বিদ্যাপ্রকাশ]

৫৫. ঊপনিবেশের সংস্কৃতি (১৯৯৮, ২০১১) [শুদ্ধস্বর]

৫৬. শেক্সপীয়রের মেয়েরা (১৯৯৮) [চিত্রা প্রকাশনী]

৫৭. ধ্রুপদী নায়িকাদের কয়েকজন (১৯৯৯) [চিত্রা]

৫৮. বাঙালীর জাতীয়তাবাদ (২০০০) [UPL]

৫৯. বাঙালীর সময়-অসময় (২০০০) [বিদ্যাপ্রকাশ]

৬০. পুঁজিবাদের দুঃশাসন (২০০১) [নবরাগ]

৬১. আত্মপ্রতিকৃতি নয় (২০০২) [ঐতিহ্য]

৬২. Middle Class and the Social Revolution in Bengal: An Incomplete Agenda (2002) [UPL]

৬৩. ইংরেজি সাহিত্যে ন্যায়-অন্যায় (২০০২) [গ্লোব লাইব্রেরী]

৬৪. ভূতের নয়, ভবিষ্যতের (২০০২) [ঐতিহ্য]

৬৫. বন্ধ করো না পাখা (২০০৩) [ঐতিহ্য]

৬৬. আমার আপন তিনজন (২০০৪) [মওলা ব্রাদার্স]

৬৭. শেষ নেই (উপন্যাস) (২০০৪) [ঐতিহ্য]

৬৮. ভরসার জায়গাজমি (২০০৪) [বিদ্যাপ্রকাশ]

৬৯. প্রভুর যত ইচ্ছা (২০০৫) [অন্যপ্রকাশ]

৭০. কণার অনিশ্চিত যাত্রা (উপন্যাস) (২০০৬) [অন্যপ্রকাশ]

৭১. বিচ্ছিন্নতার সত্য-মিথ্যা (২০০৬) [অন্যপ্রকাশ]

৭২. গণতন্ত্রের অমসৃণ পথ (২০০৬) [সূচীপত্র]

৭৩. গণতন্ত্রের সন্ধানে (২০০৬) [বিজয় প্রকাশ]

৭৪. দ্বন্দ্বের মেরুকরণ (২০০৬) [বিজয় প্রকাশ]

৭৫. পিতৃতান্ত্রিকতার বিপক্ষে (২০০৭) [বিদ্যাপ্রকাশ]

৭৬. হস্তান্তর নয়, রূপান্তর চাই (২০০৭) [নবরাগ]

৭৭. আলোতে অন্ধকার, অন্ধকারে আলো (২০০৭) [বিজয় প্রকাশ]

৭৮. ১৮৫৭ এবং তারপরে (২০০৮) [অন্যপ্রকাশ]

৭৯. দুই যাত্রায় এক যাত্রী (২০০৮) [পার্ল পাবলিকেসন্স]

৮০. অখণ্ড সেই বৃত্তে (২০০৯) [বিদ্যাপ্রকাশ]

৮১. বিরূপ বিশ্বে সাহসী মানুষ (২০১০) [জাগৃতি প্রকাশনী]

৮২. দীক্ষার খবরাখবর (২০১১) [অন্বেষা]

৮৩. কত মূল্য লইবে ইহার (২০১১) [অন্বেষা]

৮৪. দুই যাত্রায় এক যাত্রী (দ্বিতীয় খণ্ড) (২০১১) [পার্ল পাবলিকেসন্স]

৮৫. বাংলাসাহিত্য ও বাঙালী মধ্যবিত্ত (২০১২) [গ্লোব লাইব্রেরী]

৮৬. ছত্রভঙ্গের পূর্বাপর (২০১২) [বিদ্যাপ্রকাশ]

৮৭. পার হতে সংশয় (২০১৩) [শুদ্ধস্বর]

৮৮. রাষ্ট্রতন্ত্রের সমাজদ্রোহিতা (২০১৩) [অন্বেষা] ৮৯. রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথের মতোই (২০১৩) [জাগৃতি প্রকাশনী]

৯০. বিচ্ছিন্নতায় অসম্মতি (২০১৪) [বিদ্যাপ্রকাশ]

৯১. নজরুলকে কোন পরিচয়ে চিনবো (২০১৪) [সংহতি প্রকাশন]

৯২. রাষ্ট্র ও সমাজের মাঝখানে (২০১৪) [পার্ল পাবলিকেসন্স]

 

 

বিশেষত্বঃ

বিনয়, সাদামাটা জীবন, নিয়মানুবর্তিতা, সমাজতন্ত্রের প্রতি অবিচল আস্থা, রাজনৈতিক সচেতনতা, দেশ ও দশের প্রয়োজনে কলম হাতে অবিচল থাকা জ্ঞানতাপস এই শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার ক্লাসরুম শিক্ষার্থীদের কাছে ছিলেন এক ‘আদর্শ’। ঝড়-বৃষ্টি-বাদল-রাজনৈতিক উত্তাপ কোনো কিছুই ক্লাসরুমের ৫৫ মিনিটের নির্দিষ্ট সময়ের ওপর প্রভাব ফেলেনি।

এক লক্ষ্যস্থির শিক্ষকজীবনকে বহুগুণে, বহু মানে, বহু বৈচিত্র্য-বৈভবে আলাদা করে, তিলে তিলে সৃজনশীল মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে আমাদের জ্ঞানরাজ্যে, চিন্তার জগতে এক মহীরুহ হয়ে উঠলেন ক্রমশ। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী জ্ঞানজগতের নিশ্চিত, উত্তাপহীন, ক্ষমতাবৈভবহীন, সাদামাটা জগতেই বছরের পর বছর এক অন্তহীন আনন্দের সমুদ্রে অবগাহন করলেও প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার রাজনৈতিক স্বার্থেই কখনো কখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক রাজনীতিতে জড়িয়েছেন স্বেচ্ছায়।

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তাঁর এই শিক্ষক সম্পর্কে লিখেছেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের অঙ্গনের যে-সব অধ্যাপক আমাদের কালে চিন্তাজগতে আজীবন আমুণ্ডুপদনখ ক্রিয়াশীল থেকেছেন, তরুণ সম্প্রদায় ও সাধারণ মানুষের সামনে সম্ভাবনার স্বপ্নকে সাধ্যমতো উঁচু করে রেখেছেন, দেশবাসীর অর্থনৈতিক অসঙ্গতির অশ্রুময় ব্যবধানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে ক্ষান্তিহীন থেকেছেন- সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ছিলেন এঁদের সামনের সারিতে। সূর্যের কাছ থেকে যেমন ধার নিয়ে চলে বিভিন্ন গ্রহ, তেমনি তাঁর কাছ থেকে আলো নিয়ে চলে বিভিন্নস্থরের শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, রাজনীতিবিদ, রাষ্ট্র চিন্তক ও দৈনিকের সম্পাদক’।

তাঁর লেখা পড়ে দেখা যায়, তাঁর দায় দেশ ও দেশের প্রতি, ‘রাষ্ট্রের পক্ষে তিনি চিন্তায় ও কাজে, লেখায় ও কথায় লড়ে যাচ্ছেন একজীবন। দীর্ঘ সংগ্রামের মাঝখানে কোনো বিভাজন রেখা রাখেননি।’ নৈতিকতার স্বার্থে অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে বিলিয়ে দিচ্ছেন মেধা ও মনন! সমাজের প্রয়োজনে যেখানেই প্রতিবাদ করতে হয়েছে সেখানেই তিনি দাঁড়িয়েছেন অনড় অবিচলতায়। তাই তাকে আমরা দেখতে পাই ওসমানী উদ্যান বাঁচাও নাগরিক আন্দোলনে, লালন শাহ সমাধি সুরক্ষা আন্দোলনের নেতৃত্বে। দেখতে পাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে সংগঠিত সামাজিক আন্দোলনে, সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী নাগরিক আন্দোলনে, পরিবেশ আন্দোলনে, তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষার মতো জনঘনিষ্ঠ আন্দোলনের প্রথম কাতারে। তার এই সমাজঘনিষ্ঠ দলদাসহীন সক্রিয়তাও আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক মহলে শুধু ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়, অনন্যও বটে।

প্রথমত তার লেখার প্রসাদগুণ যে কোনো পাঠককে দারুণভাবে আকৃষ্ট করে। যে কোনো বিষয় একটি সাধারণ বিন্দুসম জায়গা থেকে লিখতে শুরু করেন তিনি। লেখায় তার ভাবনার বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে জড়িয়ে যায় আমাদের জীবন, সংস্কৃতি, রাজনীতি, ইতিহাস, দর্শন, সংগ্রাম, রাষ্ট্র ইত্যাদি। ছোট ছোট বাক্য, সহজ উদাহরণ, ঘনিষ্ট আলাপনে পাঠককে ধীরে ধীরে চিন্তার গভীরতম স্তরে নিয়ে যান অবলীলায়।

ব্যক্তিগত ভাবে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী। কিন্তু সমাজতন্ত্র সম্বন্ধে নানা কথা চালু আছে দেশে। তিনি সমাজতন্ত্রের সেই কূটতর্কের মধ্যে কখনোই প্রবেশ করেননি। তিনি সাধারণ মানুষের মঙ্গলার্থে জীবন মানের উন্নয়নকেই সমাজতন্ত্র হিসেবে বিবেচনা করেছেন। সব সময় তিনি বৈষম্য ও অসমতার বিরুদ্ধে তার চিন্তাকে সুতীক্ষ্ন ভাবে ধরে রেখেছেন।

 

সহায়ক রচনাবলীঃ

  • ‘নিষ্ফলা মাঠের কৃষক’, পৃ-২৩৭
  • সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী- ‘আমার আপন তিনজন’, পৃ-১১৭-১৮, বন্ধুর মুখচ্ছবি
  • “অনন্য সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী”। প্রথম আলো। ২৩ জুন ২০২১।
  • একুশে পদকপ্রাপ্ত সুধীবৃন্দ ও প্রতিষ্ঠান । সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়। পৃষ্ঠা১০। ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৪
  • বাংলা একাডেমী লেখক অভিধান, প্রধান সম্পাদক : সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদ, প্রকাশকাল : সেপ্টেম্বর, ২০০৮
  • “শেলটেক পদকে ভূষিত তিন গুণী”। দৈনিক কালের কণ্ঠ। ৫ নভেম্বর ২০১৭।
  • প্রথম আলো, ১৯ জানুয়ারি ২০১৬
  • একান্ত সাক্ষাৎকার, দৈনিক প্রথম আলো, ১৮ জুন ২০২১

 

জাজাফী

১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২২

কাঠগড়ায় দাঁড়ানো একজন মাহির সারোয়ার

0

কাঠগড়ায় দাঁড়ানো এসআর গ্রুপের চেয়ারম্যান মাহির সারোয়ার। ৭১ বছর বয়সী মাহির সারোয়ার এখনো বেশ শক্তসামর্থ। যে বয়সে অন্যের সাহায্য ছাড়া চলাফেরা করাই মুশকিল সেই বয়সে তিনি দিব্যি নাতি নাতনির সাথে ব্যাডমিন্টন খেলেন। আজ তিনি যে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন এটাই প্রথম নয় বরং জীবনে কত তম বার তিনি আজ কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন তার হিসেব নেই। সাড়ে তিনশো বারতো হবেই কমপক্ষে। এতো বড় একটি গ্রুপের চেয়ারম্যান হয়ে এতোবার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে শুনে হয়তো অনেকেই মনে করতে পারেন মাহির সারোয়ার সাহেব বোধহয় বড় রকম অপরাধী কিংবা নিয়মিত অপরাধ করেন বলেই প্রতি মাসে একবার কিংবা দুবার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়। আসলে তা নয়। মাহির সারোয়ার সাহেব কোনো রকম অপরাধের সাথে জড়িত নন। তিনি মূলত বিচার প্রার্থী। যতবার কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন প্রতিবারই তিনি বিচার প্রার্থী হিসেবেই দাড়িয়েছেন। এমন নয় যে প্রতিবার নিত্যনতুন মামলার জন্য তাকে আদালতের দারস্থ হতে হয়। তিনি বরং বছরের পর বছর একটি মামলায় বিচার চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছেন। আদালত বার বার তাকে শুন্য হাতে ফিরিয়ে দিয়েছে। আজ যখন বাসা থেকে বের হলেন তখন তিনি জানতেন এই মামলায় আজই তার শেষ আদালতে যাওয়া। আর কোনো দিন এই মামলার জন্য তাকে আদালতে যেতে হবে না। কারণ আজকেই মামলার নিষ্পত্তি হয়ে যাবে।

আদালত প্রাঙ্গনে অসংখ্য মানুষের ভীড়। বাইরে টিভি সাংবাদিকেরা অপেক্ষা করছে। সকালে যখন মাহির সারোয়ার সাহেবের গাড়ি আদালত চত্বরে এসে থামলো তখনই সাংবাদিকেরা তাকে প্রশ্ন করেছিল আজ কি বিচারের রায় পাবেন? মাহির সারোয়ার বলেছিলেন আজই এই মামলার শেষ দিন। আজই এই মামলার নিষ্পত্তি হয়ে যাবে। যে মামলায় গত ৬৫ বছর বিচারের আশায় তিনি আদালতে হাজির হয়েছেন আজ সেই মামলার শেষ দিন। তিনি যখন সাংবাদিকদের বললেন আজই শেষ দিন তখন সাংবাদিকেরা খুব আশ্চর্য হলো। মাহির সারোয়ার সাহেব কী করে নিশ্চিত হলেন যে আজই মামলার নিষ্পত্তি হয়ে যাবে। যে মামলা নিষ্পত্তি হবে হবে করে ৬৫ বছর পার করে দিয়েছে কী করে আজ নিষ্পত্তি হবে সেটা জানার কৌতুলহ সাংবাদিকদের মন উতলা করে তুললো। এ কারণেই আদালতের বাইরে তারা অপেক্ষা করছে। কাঠগড়ায় দাড়ানো মাহির সারোয়ার সাহেবের উকিল শফিউর রহমান বিচারকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বক্তব্য দিয়ে বসে পড়লেন। আসামী পক্ষের উকিল সেদিন উপস্থিত হননি।

বিচারক সাহেব খস খস করে কিছু একটা লিখলেন তার পর মাহির সারোয়ার সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন মাহির সারোয়ার সাহেব আসামী পক্ষের উকিল এবং আসামী পক্ষ উপস্থিত না থাকায় আজ মামলার নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে না। আগামী ২৯ জানুয়ারি এই মামলার পরবর্তী দিন ধার্য করছি। মাহির সারোয়ার সাহেব বিচারককে বললেন মাননীয় বিচারক এই মামলার আর কোনো শুনানী হবে না, আর কোনো দিন ধার্য করার দরকার নেই। আসামী আর কোনো দিন আদালতে হাজির হবে না। মাহির সারোয়ার সাহেবের কথা শুনে বিচারক অবাক হলেন। তার অবাক হওয়া বুঝতে পেরে মাহির সারোয়ার সাহেব নিজেই বলতে শুরু করলেন এই মামলা যখন শুরু হয় তখন আমার বয়স মাত্র ৬ বছর। আমার বর্তমান বয়স ৭১ বছর। গত ৬৫ বছর ধরে এই মামলা চলছে। ২৭ জন বিচারক বদল হয়েছে। উকিল বদল হয়েছে ১৩ জন কিন্তু মামলার রায় হয়নি। কিন্তু আজ হবে। কারণ যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাদের কেউ আজ আর আমাদের মাঝে নেই। যারা নেই তাদের বিরুদ্ধে শুনানী করে লাভ কী? এই মামলার চারজন আসামীর তিনজন কয়েক বছর আগেই মারা গিয়েছেন । যে একজন জীবিত ছিলেন তারও বয়স হয়েছিল ৯৮ বছর। তিনিও গতকাল মারা গিয়েছেন। মামলার সব আসামী মৃত। মৃত মানুষের আপনি কী বিচার করবেন? সে কারণেই আজকের পর এই মামলা আর চলবে না। আপনি আজই ফয়সালা ঘোষণা করে দিন।

বিচারক খসখস করে কিছু লিখলেন তার পর ঘোষণা করলেন দীর্ঘদিন শুনানির পর নানা সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত এই মর্মে সিদ্ধান্ত দিচ্ছে যে আসামীদের কেউ আজ আর জীবিত না থাকায় এই মামলা খারিজ করে দেওয়া হলো। বিচারকের ঘোষণা শুনে মাহির সারোয়ার সাহেব একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। এই দীর্ঘশ্বাস একই সাথে হতাশার এবং মুক্তির। আজকের পর থেকে আর তাকে আদালতে আসতে হবে না এটা আনন্দের। আর বেদনার বিষয় হলো ৬৫ বছর অপেক্ষা করেও তিনি বিচার পেলেন না। বিচারের রায় পেলেন না।

মামলা খারিজ হওয়ার পর মাহির সারোয়ার ও তার ছেলে মাহিম সারোয়ার এবং মেয়ে মারিয়া সারোয়ার আদালত থেকে বেরিয়ে এলেন। অপেক্ষারত সাংবাদিকেরা তাদের ঘিরে ধরলো। মাহির সারোয়ার খুব শান্ত ভাবে বললেন আজ থেকে এই মামলার আর কোনো শুনানী হবে না। মামলা খারিজ করে দেওয়া হয়েছে। এমন একটি মামলা হঠাৎ করে খারিজ করে দেওয়া হয়েছে শুনে সাংবাদিকরা সবাই আশ্চর্য হলেন। যে মমলা ৬৫ বছর ধরে চলছে তা হুট করে কিভাবে খারিজ করে দেওয়া হয়? মাহির সারোয়ার তখন নিজেই বললেন যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তারা কেউ আজ আর বেচে নেই। একজন বেচে ছিলো সেও গতকাল মারা যাওয়ায় এই মামলা খারিজ না হয়ে আর কোনো উপায় ছিলো না। সাংবাদিকরা জানতে চাইলেন এতোদিন অপেক্ষা করা এতো কষ্ট করার পর যখন এই রেজাল্ট পেলেন তখন আপনার অনুভূতি কী? মাহির সারোয়ার বললেন একই সাথে আনন্দিত এবং বেদনার্ত। আনন্দিত এ জন্য যে অবশেষে এই মামলার হাজিরা দেওয়ার দিন শেষ। আর বেদনার্ত হওয়ার কারণ হলো দীর্ঘ ৬৫ বছর মামলার শুনানি চললো কিন্তু বিচার পেলাম না। এর পর মাহির সারোয়ার ছেলে মেয়েকে নিয়ে বাসায় ফিরলেন। ড্রয়িং রুমের দেয়ালে টাঙ্গানো ছবিটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে চোখের পানি মুছলেন। ছবিটা তার বাবা মায়ের। সেই ছবিতে সেও আছে। যখন তার বয়স ছিল ৬ বছর। বাবা মায়ের সাথে কক্সবাজার গিয়েছিল সেখানকার একটি ছবি।

বাবা মায়ের মূখে এমন এক হাসি লেগে আছে যা কোনো দিন বিলীন হবার নয়। একটু পর খেলতে খেলতে ড্রয়িং রুমে ঢুকলো তার নাতি আমান। দাদুর হাত ধরে আমান জানতে চাইলো দাদু তোমার চোখে পানি কেন? তুমি কাঁদছো! তোমার কি আবার তোমার বাবা মায়ের কথা মনে পড়েছে? আচ্ছা দাদু তোমার বাবা মাকে আমি কী বলে ডাকবো? মাহির সারোয়ার নাতির হাত ধরে সোফাতে গিয়ে বসলেন। মাথার চুলে বিলি কেটে বললেন বাবা মায়ের কথা মনে না পড়ে পারে। তুমি যখন স্কুলে থাকো তোমারও নিশ্চই বাবা মায়ের কথা মনে পড়ে। আমার বাবা মাকে তুমি গ্রেট গ্রান্ডফাদার এবং গ্রেট গ্রান্ডমাদার বলবা। দাদুর কথা শুনে আমান মাথা নাড়ে এবং বলে আচ্ছা দাদু তোমার বাবা মা কি খুব গ্রেট ছিল যে তাদেরকে আমি গ্রেট গ্রান্ডফাদার এবং গ্রেট গ্রান্ড মাদার বলবো। মাহির সারোয়ার নাতিকে বললেন হ্যা তারা সত্যিই গ্রেট ছিলো। তবে দাদুর বাবা মাকে নাতি কী বলে ডাকবে তার বাংলা জানা নেই বলেই ইংরেজীতে এটা ডাকার কথা বলেছি। ও বুঝেছি বলে আমান তার পর দাদুকে বলে দাদু তোমার ব্যাগটা দাও কাল আবার যখন যাবে আমি ব্যাগটা তোমাকে গুছিয়ে দেব। মাহির সারোয়ার আমানকে বললেন নারে দাদু ভাই এই ফাইল নিয়ে আর কখনো বাইরে যাওয়া লাগবে না। ছোট্ট আমান বুঝতে পারে না কেন তার দাদুকে ওই সব ফাইল নিয়ে আর বাইরে যেতে হবে না।

পরদিন সকালে পত্রিকার ভিতরের পেজে ছোট্ট করে মাহির সারোয়ারের সেই মামলা বিষয়ে নিউজ হয়।আজ থেকে ৬৫ বছর আগে বাবা মা এক সাথে খুন হতে দেখা ছোট্ট মাহির সারোয়ারের বয়স এখন ৭১ বছর। ৪৮ ঘন্টা সময় বেঁধে দিয়েছিল তখনকার দায়িত্বশীলরা। তার পর আটচল্লিশ ঘন্টা,আটচল্লিশ মাস, আটচল্লিশ বছর পার করে ৬৫ বছর পার হলেও মামলার রায় হয়নি। অবশেষে আসামীদের মৃত্যুতে এই মামলা খারিজ হয়েছে।সব মেঘে বৃষ্টি হয় না। কিন্তু মাহির সারোয়ার মেঘ নামের সেই ৭ বছরের কিশোর পরবর্তী ৬৫ বছর ধরে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়েছে। আজও বাবা মায়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে চোখে জল ফেলে। তখন আকাশেও মেঘ থাকে আর জমিনেও মেঘ থাকে। চোখের সামনে জল ভরা চোখে ঝাপসা হয়ে ওঠে কবরের নাম ফলক। যেখানে মাহির সারোয়ারের বাবা মায়ের নাম লেখা সাগর-রুনি দম্পতি।

১১ ডিসেম্বর ২০২১
জাজাফী

আপনার সাফল্য ও ব্যার্থতা সব আপনারই হাতে

নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভালো রেজাল্ট নিয়ে পাশ করে বেরিয়েছি। এখন কি আর যে সে চাকরি করতে পারি? যে সে কাজ করতে পারি? এমন ভাবনা আমাদের দেশের অধিকাংশ শিক্ষার্থীর। আমার এই লেখাটি যদি আপনি পড়ে থাকেন তবে নিজের সাথে একবার মিলিয়ে নিতে পারেন যে আপনিও ওই দলের কি না।ধরুন একজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা এমন নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোনো একটি সাবজেক্টে প্রথম শ্রেণী বা হাই সিজিপিএ নিয়ে পাশ করলো। তার পর আমরা দেখতে পাই সে বা তারা বেছে বেছে চাকরির আবেদন করে। অনেক সময় পছন্দমত চাকরি হয় না ফলে হতাশ হয়। আবার একটু চেষ্টা করলেই যে চাকরি সে অনায়াসেই পেতে পারতো সে কিন্তু সেগুলো হেলায় ঠেলে ফেলে। এমনকি তাকে যদি বলা হয় তুমি ওই চাকরিতে আবেদন করো বা করোনি কেন? সে তখন চোখ কপালে তুলে বলে আরে তুমি পাগল হয়েছ? ওই চাকরি করবো আমি? এতো দামি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভালো সিজিপিএ নিয়ে পাশ করে বেরিয়ে এরকম একটি চাকরি করলে মানসম্মান থাকবে? এর চেয়ে বেকার থাকবো তাও ভালো।

 

আমি নিশ্চিত এমন ঘটনা আমাদের সমাজে অহরহ দেখা যায়। নিজেকে এতোটাই যোগ্য মনে করে যে যে কোনো কাজ সে করবে এমনটি ভাবতেই পারে না। ফলে পছন্দমত কাজ বা চাকরি না পেলে হতাশার পরিমান বাড়তে থাকে এবং এর ফলে অনেক সময় তুখোড় মেধাবী আর আত্মবিশ্বাসী হয়েও আত্মহননের পথ বেছে নেয়। বিগত কয়েক বছরে এর হার বেড়েছে অনেক বেশি। আপনি যদি এমন ধারণা নিয়ে বসে থাকেন যে আপনার মত এমন ভালো সাবজেক্ট,ভালো বিশ্ববিদ্যালয় এবং ভালো রেজাল্ট নিয়ে যে কোনো কাজ করা আপনার জন্য লজ্জাজনক বা অপমান জনক তবে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি আপনি ঢের পিছিয়ে আছেন।অন্তত চিন্তার জায়গা থেকে আপনি অনেকটাই পিছিয়ে আছেন। উন্নত বিশ্বের দিকে তাকালে আপনি দেখতে পাবেন তারা কোনো কাজকেই ছোটো চোখে দেখে না।

আজ আপনাদের আমি তেমনই একজন মানুষের কথা বলতে চাই। জীবনের নানা সময়ে ঘাতপ্রতিঘাত আর অবহেলা সহ্য করেও তিনি কখনো হার মানেননি। আর তার শিক্ষাগত যোগ্যতার কথা শুনলে আমি নিশ্চিত আপনি চোখ কপালে তুলবেন। তখন নিজের সাথে মিলিয়ে নিতে পারবেন আপনি তার চেয়েও উচ্চডিগ্রিধারী কি না কিংবা তার তুলনায় আপনি অধিক যোগ্য কি না। একই সাথে আপনি নিজেকে তার সাথে মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন আপনার এখন কোন কাজ করা উচিত কিংবা বসে থাকা উচিত। আপনি একবার কল্পনা করুনতো ধানমন্ডিতে কোনো একটি ফাস্টফুডের দোকানে বন্ধুদের সাথে খেতে বসেছেন যিনি খাবার সার্ভ করলেন তিনি  একজন পিএইচডি ডিগ্রীধারী! হয়তো বিশ্বাসই হচ্ছে না যে পিএইচডি ডিগ্রীধারী কেন ফাস্টফুডের দোকানে কাজ করবে! আপনি নিজে হলেও হয়তো এ কাজ করতেন না। এই মানুষটির নাম ইট্যাং ঝ্যাং। ১৯৫৫ সালে জন্ম নেওয়া ঝ্যাং এর জন্ম ও বেড়ে ওঠা সাংহাই শহরে। ছোটবেলা থেকেই প্রচন্ড মেধাবী ছিলেন। তিনি মাত্র নয় বছর বয়সে পিথাগোরাসের সূত্র প্রমান করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন। যে বয়েসে আমরা সাধারণত  পাটিগণিতের সাধারণ অংকগুলো শিখি সেখানে তিনি জিওমেট্টির কঠিন বিষয়গুলো অনায়াসে সলভ করেন। এ যেন আরেক রামানুজন।

কিন্তু হঠাৎ তার জীবন এলোমেলো হয়ে গেলো। চীনে শুরু হলো সাংস্কৃতিক বিপ্লব। তার রেশ অনেকটাই এসে আঘাত করলো ঝ্যাং এর জীবনে। ফলে সাংহাইতে টিকতে না পেরে তাকে তার মায়ের সাথে চলে যেতে হলো অজপাড়াগায়ে। যেখানে আধুনিক সুযোগ সুবিধার কিছুই ছিলো না। এমনকি ছিলো না পড়ালেখা করার মত তেমন স্কুল। অগত্যা বেচেথাকার তাগিতে তিনি মায়ের সাথে কাজে লেগে পড়লেন। পড়াশোনায় যে ছেলেটি এতো মেধাবী ছিল যে উচ্চতর ক্লাসের জিওমেট্টি অনায়াসে সলভ করতে পারতেন সেই মেধাবী ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে পুরোপুরি পড়াশোনার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলেন।সারাদিন মায়ের সাথে হাড়খাটুনি পরিশ্রম করে কোনো মত বেচে থাকার চেষ্টা করলেন। এবং টানা দশ বছর তিনি দিনমজুর হিসেবে কাজ করেছেন। দশ বছর শিক্ষার আলো বঞ্চিত! ইতপূর্বে বর্ণিত পিএইচডি শব্দটি নিশ্চই এখন আপনার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে আর ভাবছেন যে মানুষ বাল্য কালে শিক্ষা শুরুর পর হঠাৎ করে দশ বছর পুরোপুরি পড়াশোনার সুযোগ বঞ্চিত হয়েছিলেন তিনি কিভাবে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করলেন! হ্যা বিস্ময়কর বটে। পড়াশোনার সুযোগ বঞ্চিত হলেও তার মনের মধ্যে বড় হওয়ার যে স্বপ্ন ছিলো তিনি তা কোনো দিন ত্যাগ করেননি। নিজের মত করে ভাবতেন,নানা ভাবে সমস্যার সমাধান করতেন এবং এভাবেই তিনি নিজের পড়াশোনার পরিধি এগিয়ে নিতে থাকেন।

এই কঠিন সময় পার করে তিনি পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন  অতঃপর সাফল্যের সাথে ১৯৮২ সালে বিএসসি এবং ১৯৮৪ সালে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। তার বয়স তখন ২৭ বছর! আপনি ভেবে দেখেছেন ১০ বছর সব রকমের একাডেমিক শিক্ষার সুযোগ থেকে  বঞ্চিত মানুষটি আমাদের দেশের ছেলে মেয়েদের কাছাকাছি বয়সে (সেশন জটে অনেকের ২৭ বছরও লেগেছে বিশ্ববিদ্যালয় শেষ করতে এমন নজির আছে বাংলাদেশে) বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শেষ করেছেন। তার পর ১৯৮৫ সালে পার্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি প্রোগ্রামে ভর্তি হয়ে ১৯৯১ সালে সাফল্যের সাথে পিএইচডি অর্জন করেন। বাল্যকাল থেকে অসম্ভব কঠিন বাস্তবতা পার করে আসা ঝ্যাং মনে মনে ভাবলেন এবার তার দুঃখের দিন শেষ। এখন যেহেতু পিএইচডি ডিগ্রি হাতে পেয়েছেন ফলে নিশ্চই ভালো একটা মোটা বেতনের চাকরি জুটে যাবে। এই লেখাটি যদি আপনি এ পযর্ন্ত পড়ে থাকেন তবে আপনার মনেও একই ধারণা জন্মাতে পারে। কিন্তু ঝ্যাং নিজেও কল্পনা করতে পারেননি যে তার দুঃখের দিন এতো সহজে তাকে ছেড়ে যাবে না। দুঃখ যেন তার সাথে ভালোবাসার সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিল তাই তাকে ছেড়ে কোনো ভাবেই যেতে চাইছিলো না।

ভালো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভালো রেজাল্ট সহ বিএসসি,এমএসসির পাশাপাশি পিএইচডি ডিগ্রি থাকার পরও দিনের পর দিন চেষ্টা করেও একটি চাকরি জোগাড় করতে পারেননি ঝ্যাং।প্রথম দিকে তিনি অপেক্ষাকৃত ভালো মানের চাকরির চেষ্টা করেছেন যেখানে ভালো বেতন পাওয়া যাবে। সেখান থেকে তেমন সাড়া না পেয়ে শেষে চিন্তা করেছেন যে কোনো চাকরি হলেই তিনি তা করবেন। এই ভাবনা নিয়ে কত শত প্রতিষ্ঠানে সিভি দিয়েছেন,ভাইভা দিয়েছেন কিন্তু কেউ তার মেধার মূল্যায়ন করেনি, কেউ তাকে হায়ার করেনি। ঝ্যাং বিশ্বের অগণিত তরুণের জন্য আদর্শ স্থাপন করেছেন। তিনি  এতো অবহেলা সহ্য করেও হতাশ হননি, হাল ছেড়ে দেননি। এমনকি তিনি খোদ তার সুপারভাইজারের কাছ থেকেও চাকরি বিষয়ে কোনো রকম সহযোগিতা পাননি। আপনি হয়তো অবাক হয়ে ভাবতে পারেন কেন তার পিএইচডি সুপারভাইজার তাকে রেকোমেন্ড করেননি? এখানে রয়েছে মজার এক গল্প। ঝ্যাং তার পিএইচডি ডিগ্রি পেয়েছেন ঠিকই তবে তার পিএইচডি গবেষণাপত্রে তার সুপারভাইজারের গবেষণা কাজের বেশ কিছু ভুল ধরা পড়েছিল। ফলে তার গবেষক লজ্জায় পড়েছিলেন এবং রাগে ক্ষোভে ঝ্যাংকে কোনো রকম রেকমেন্ড করেন নি।

মাসের পর মাস শত শত প্রতিষ্ঠানে সিভি দিয়ে, ইন্টারভিউ দিয়েও যখন ঝ্যাং একটা চাকরি পেলেন না তখন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন তাকে কিছু একটা করতে হবে। যেই ভাবনা সেই কাজ। তিনি সে সময়ে নিউইয়র্কে ছিলেন। সেখানকার একটি রুস্টেুরেন্টের মালামাল খালাসের শ্রমিক হিসেবে তিনি কাজ শুরু করলেন! পিএইচডি ডিগ্রিধারী একজন মানুষ সে কি না মালামাল খালাসের শ্রমিক! রূপকথার গল্পেরমত শোনাচ্ছে বিষয়টি তাই না? কিন্তু এটাই বাস্তবতা। যারা বাস্তবতা বুঝতে পারে তারা এসবে পরোয়া করে না। ডিগ্রি মানুষের গায়ে লেখা থাকে না ফলে তিনি যে পিএইচডি ডিগ্রিধারী সেটা তিনি না বললে কারো বুঝার কথা নয়। আর ছোটবেলা থেকেই যেহেতু শ্রমিক হিসেবে দীর্ঘদিন কাজের অভিজ্ঞতা ছিল তাই এ কাজ করতে গিয়ে তাকে মোটেও কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়নি। আরদশজন শ্রমিকের মতই তিনি অনায়াসে মালামাল খালাসের কাজ করতে পেরেছেন। এর কিছুদিন পর তিনি কেন্টাকির মোটেলে এবং সাবওয়ে স্যান্ডউইচের দোকানেও কাজকরেছেন। আপনি শুনলে আরও একবার বিস্মিত হবেন যে তাকে এই ধরনের কাজ করতে হয়েছে পরবর্তী আট বছর। আট বছর পর তার ভাগ্যের চাকা ঘুরেছে। ভাগ্যক্রমে তার সাথে এক বিকেলে স্যান্ডউইচের দোকানে দেখা হয়েছিল স্বনামধন্য অধ্যাপক মিস্টার আপেলের সাথে। ঝ্যাং এর কথাবার্তা এবং ব্যবহার তাকে মুগ্ধ করেছিল এবং তাকে অন্য সবার থেকে আলাদা মনে হওয়ায় তিনি জানতে চেয়েছিলেন ঝ্যাং আসলে কতটুকু পড়াশোনা জানে। যদি সম্ভব হয় তবে তিনি তাকে এর চেয়েও ভালো কোনো কাজ জুটিয়ে দিতে চেষ্টা করবেন। এটা নির্ভর করছে ঝ্যাং কতটুকু পড়াশোনা জানে তার উপর। মিস্টার আপেল কিন্তু কল্পনাও করতে পারেননি যে তাকে যে মানুষটি স্যান্ডউইচ সার্ভ করছে তার পড়াশোনার দৌড় কত বেশি। ঝ্যাং যখন তাকে জানালেন আমার পিএইচডি ডিগ্রি আছে! তখন অধ্যাপক আপেল কিছুক্ষণ বাকরুদ্ধ হয়ে বসে থাকলেন। তার পর চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়িয়ে তাকে অভিবাদন করলেন এবং নিজের একটি কার্ড ধরিয়ে দিয়ে অফিসে দেখা করতে বললেন। ফলে অচিরেই ঝ্যাং এর কষ্টের জীবনের ইতি ঘটলো। অধ্যাপক আপেলের সহযোগিতায় তিনি নিউ হ্যাম্পশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে চাকরি পেলেন। তখন ঝ্যাং এর বয়স ৪৪ বছর! মানে ভেবে দেখেছেন সাফল্য আসতে কখনো কখনো ৪৪ বছর বা তারও বেশি সময় আপনাকে অপেক্ষা করতে হতে পারে।

 

ঝ্যাং এর জীবনের এই সব দিক আপনি ভালোভাবে অবলোকন করলে খুব সহজেই বুঝতে পারবেন জীবনের কোনো অবস্থাতেই হতাশ হতে নেই, হাল ছেড়ে দিতে নেই।নিজেই নিজেকে বলুন হাল ছেড়োনা বন্ধু। এ প্রসঙ্গে আমরা আমাদের বাংলা গানের কিংবদন্তী শিল্প কবির সুমনের উদাহরণ টানতে পারি। আপনি কি জানেন যে এই বিখ্যাত শিল্পী তার সঙ্গীত জীবন শুরুই করেছিলেন বয়স চল্লিশ পার হওয়ার পর! অনেকেই মনে করেন ছোটবেলা থেকে গানের তালিম না নিলে,চেষ্টা অব্যাহত না রাখলে শিল্পী হওয়া যায় না। সব যুক্তি ভুল প্রমান করে দিয়ে কবির সুমন শুধু শিল্পী হয়েই দেখাননি বরং হয়েছেন গানের মায়েস্ত্রো।ঠিক যেমন ঝ্যাং তার জীবনে চুয়াল্লিশটি বছর পার করে একটি ভালো চাকরির সুযোগ পেয়েছিলেন । আমাদের দেশের ছেলে মেয়েরা বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স না পেলে হতাশ হয়ে আত্মহননের পথ বেছে নেয়,একাডেমিক পরীক্ষায় ভালো না করতে পারলে আত্মহনন করে, বিসিএস  না পেলে বা অন্যান্য চাকরি না পেলেও আত্মহত্যা করে। তারা তাদের ভাবনাকে একই সমান্তরাল ধারায় বয়ে চলে ফলে ভিন্ন ভাবে ভাবলে যে তার ভাগ্য পরিবর্তন হতে পারতো তা সে কখনো চিন্তা করে না। শুধু মাত্র নির্দিষ্ট কিছু চাকরির অপেক্ষায় বছরের পর বছর পার করে দেয় এবং শেষ পযর্ন্ত সেটা না পেলে নিজের জীবন বৃথা মনে করে।

পৃথিবীতে কোনো কিছুর জন্যই আত্মহনন কাম্য নয়। আপনি যা পাননি তার কথা ভুলে যান বরং আপনার জন্য আরও যা অপেক্ষা করছে সেগুলো গ্রহণ করুন। জীবন সুন্দর হয়ে উঠবে। খোদ পিএইচডি ডিগ্রি থাকার পর যদি ঝ্যাং স্যান্ডউইচের দোকানে কাজ করতে পারেন,মাল খালাসের শ্রমিক হিসেবে কাজ করতে পারেন তবে আপনার করতে অসুবিধা কোথায়? যখন পেটে ভাত থাকবে না, পরনে কাপড় থাকবে না তখন কি কেউ আপনাকে ওগুলোর যোগান দিবে? যদি না দিয়ে থাকে তবে আপনি কিছু একটা কাজ করলে সেই সব লোক কী বললো না বললো তা নিয়ে মাথা ঘামিয়ে লাভ কী? পৃথিবীতে কে কি ভাবলো সেটা চিন্তা করে আপনি বসে থাকা মানে নিজেই নিজের ক্ষতি করা,নিজেকে পিছিয়ে রাখা। পৃথিবীর সর্বকালের সেরা বিজ্ঞানীদের একজন আলবার্ট আইনস্টাইন। আপনি শুনলে আরও একবার অবাক হবেন যে খোদ আইনস্টাইন নিজেই তার পিএইচডি ডিগ্রি অর্জনের পর যোগ্য চাকরি পাননি! আপনি তাহলে কেন হতাশ হচ্ছেন?

আমাদের আজকের আলোচনার নায়ক ঝ্যাং এর গল্প কিন্তু এখনো শেষ হয়নি।নিউ হ্যাম্পশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি পেলেন তার পর মন দিলেন অধ্যাপনায়। ছোটবেলায় লেগে থাকার যে গুণটি তিনি অর্জন করেছিলেন তাতে একটুও মরিচা ধরেনি। কিন্তু এতো কিছুর পরও সাফল্য যেন তার হাতে ধরা দিতেই চাইছিল না। তবে যার জন্ম হয়েছে হার না মানার এক দৃঢ়চেতা মন নিয়ে তিনি কি আর এতো সহজে হাল ছেড়ে দিতে পারেন। ঝ্যাং ও তাই হাল ছাড়েন নি। এর পর দেখতে দেখতে কতগুলো বছর কেটে গেছে। অবশেষে 2013 সালে তিনি পেলেন অসাধারণ এক সাফল্য। বছরের পর বছর ধরে লেগে থাকার ফল হিসেবে তিনি এমন একটি নাম্বারথিওরি তত্ত্ব প্রমাণ করেন যা অনেকদিন থেকে অমিমাংসিত ছিল। (থিওরিটি হলো, p,p+d উভয়ই মৌলিক সংখ্যা এরকম অসীম সংখ্যক জোড়া রয়েছে, যেখানে d< 70,000,000। d এর মান দুই হলে তা হয়ে যায় নামকরা টুইন প্রাইম কনজেকচার। আপনি ভাবতেও পারবেন না এ জন্য ঝ্যাং কত বছর চেষ্টা করেছেন! গুনে গুনে 15 বছর। এই পনের বছরে তার একবারও প্রমোশন হয়নি! আমরা হলে কী করতাম? ভাবতাম ধুর এতো খাটাখাটনি করেও প্রমোশন হচ্ছে না, যাহ চাকরিই করবো না! কিন্তু ঝ্যাং তা করেন নি। তিনি লেগে থেকেছেন এবং সত্যি সত্যিই এক সময় সাফল্য তার হাতে এসে ধরা দিয়েছে। ফলশ্রুতিতে এক লাফে প্রভাষক থেকে তিনি হয়ে গেলেন পূর্ণ অধ্যাপক! আর এই সময়ে ঝ্যাং এর সামনে একের পর এক সুযোগ আসতে থাকলো। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাকে অফার দেওয়া হলো।এবার তিনি বুঝেশুনে সেরাটাকেই বেছে নিলেন।

নিউ হ্যাম্পশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যায় শেষ করে তিনি যোগ দিলেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া স্যান্টা বারবারাতে! নাম্বার থিওরি তত্ত্ব প্রমানের পর শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণ অধ্যাপক হওয়াই নয় বরং একে একে অনেকগুলো পুরস্কারও পেয়েগেলেন। যার মধ্যে  কোল প্রাইজ, ক্যাম আর্থার অ্যাওয়ার্ড,রলফ শক প্রাইজ,ফ্রাঙ্ক নেলসন কোল প্রাইজ অন্যতম। এছাড়াও তাকে একাডেমী সিনিকা ফেলোশিপ দেওয়া হলো যা অত্যন্ত সম্মানজনক। পরবর্তী বছরে তিনি ইন্টারন্যাশনাল কংগ্রেস অব ম্যাথেমেটিশিয়ান এ আমন্ত্রিত বক্তা হওয়ার দুর্লভ সম্মাননা লাভ করেন।

একবার ভেবে দেখুন সেই যে দশ বছর বয়সে স্কুল ছেড়ে তাকে বাধ্য হয়ে দিনমজুরের কাজ করতে হয়েছিল, তিনি যদি সেটাই করতেন তবে বিখ্যাত এই ম্যাথেমেটিশিয়ানকে বিশ্ব পেতো না। তিনিও পেতেন না এতো এতো সাফল্য,খ্যাতি,গৌরব। ঝ্যাং এর জীবন থেকে শেখার আছে অনেক কিছু। আমরা যারা খুব অল্পতেই হতাশ হয়ে পড়ি তারা একটি বার ঝ্যাং এর জীবনের দিকে তাকাই। নিশ্চই আমাদের সামনে এমন এক দরজা দেখতে পাবো যে দরজা দিয়ে আলো বেরিয়ে আসছে। সেই আলোর পথে শুধু হাটতে হবে। এই রাস্তা চলে গেছে সাফল্যের ফুলে দুইদিক সজ্জিত করে। একদিন যে ছেলেটি অর্থকষ্টে পড়ে মায়ের সাথে দিনমজুরের কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন,সুপারভাইজার কর্তৃক অবহেলিত হয়েছেন,পিএইচডি ডিগ্রি থাকার পরও চাকরি পাননি, রেস্টুরেন্টে কাজ করেছেন,দিনের পর দিন অর্থাভাবে রাস্তায় রাস্তায় রাত পার করেছেন সেই মানুষটির ছিল নিজের উপর অগাধ বিশ্বাস। তিনি তার জ্ঞানকে অহংকার হিসেবে দেখেননি বরং থেকেছেন বিনয়ী এবং নিজের উপর আস্থাশীল। ফলে তিনি টুইন প্রাইম কনজেকচার সমস্যার সমাধান করেছেন। আপনি কি ভেবে দেখেছেন যদি অর্থবিত্ত থাকলেই সব হতো তাহলে এই সমস্যার সামাধান বহু আগেই অনেকে করে ফেলতেন।

খুব অল্প কিছু না পাওয়া,অল্প কিছু ব্যর্থতা সহ্য করতে না পেরে বা মেনে নিতে না পেরে আমাদের সমাজে অনেকেই আত্মহননের পথ বেছে নেয়। একবার আত্মহনন করলে তারতো করে দেখানোর মত আর কিছু থাকে না। সুতরাং তাদের উচিত এই গল্প থেকে শিক্ষা নিয়ে আরও একবার জেগে ওঠা। আরও একবার নিজের মনে গেয়ে ওঠা  ” গিভ মি সাম সানশাইন, গিভ মি সাম রেইন, গিভ মি আনাদার চান্স টু গ্রো আপ অন্সএগেন” । হ্যা আপনি চাইলেই আরেকটা চান্স পেতেই পারেন। সুযোগ আপনার হাতে অগনিত। আপনি শুধু লেগে থাকুন। দেখবেন ঝ্যাং এর মত আপনার হাতেও সাফল্য ধরা দিবে। কবির সুমনের মত আপনিও চাইলে শিল্পী হতে পারেন। বয়স কোনো বিষয় না, শিক্ষা গ্যাপ কোনো বিষয় না, গ্রেড কোনো বিষয় না, সাবজেক্ট কোনো বিষয় না। শুধু কাজকে ভালোবাসুন। পাছে লোকে কিছু বলে এই কথাটিকে তুড়ি দিয়ে উড়িয়ে দিন। লোকে কী বললো না বললো তাতে আপনার কিচ্ছু যায় আসে না। আপনার সাফল্য, ব্যার্থতা সব আপনারই হাতে। একবার না পারিলে দেখো শতবার বলে যে কথাটি কবি বলেছেন আপনি তার কতটা অনুসরণ করেছেন? একবার দুবার বা দশবার ব্যর্থ হওয়া মানে এই নয় যে আপনি সফল হবেন না। আপনিতো শত বার চেষ্টা করেননি। আপনি ভিন্ন ভাবে চেষ্টা করুন এবং নিজের উপর বিশ্বাস রাখুন। নিজেকে বলুন আপনি পারবেন। আপনি সেই সব যোদ্ধাদের একজন যারা কখনো হার স্বীকার করতে রাজি নয় বরং জীবনের শেষ দিন পযর্ন্ত লেগে থাকতে চায়। ঠিক যেমন আমাদের এই গল্পের মহানায়ক উইট্যাং ঝ্যাং।

৬ ফেব্রুয়ারি ২০২২

লেখাঃ জাজাফী

গ্রো আপ অন্সএগেন-৩

উইট্যাং ঝ্যাং (Yitang Zhang)

 

 

তাদের সম্মান ও খ্যাতি আইফেল টাওয়ারের মতই উঁচু

চলুন পৃথিবীর দিকে তাকাই।অগণিত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি আমরা দেখতে পাই অসংখ্য স্থাপনা,আশ্চর্য হই সেসব দেখে। যদি পৃথিবীর সেরা দশটি আকর্ষণীয় স্থানের কথা বলতে বলি তবে আপনি নিশ্চই মিশরের পিরামিড,আগ্রার তাজমহল,চীনের মহাপ্রাচির বা নায়াগ্রার জলপ্রপাতের কথা বলবেন।আমার বিশ্বাস সেই তালিকায় আরও একটি স্থানের নাম থাকবে।প্যারিস! হ্যাঁ নাম বলার সাথে সাথে আমাদের অনেকেরই নিশ্চই অব্যক্ত একটি ইচ্ছে মনের মধ্যে জেগে ওঠে, ইস! যদি প্যারিসে যেতে পারতাম। যেহেতু প্যারিস প্রসঙ্গ আসলো তাহলে মনে করে দেখুন প্যারিস গিয়ে আপনি কী কী দেখতে চাইবেন। আমি যা ভাবছি আপনিও নিশ্চই তাই ভাবছেন। পৃথিবীর বুকে মাথা উচু করে দাড়িয়ে থাকা আইফেল টাওয়ার।

প্যারিস মানেই সবার আগে আইফেল টাওয়ারের ছবি ভেসে উঠবে সবার চোখে। এর পর ল্যুভর মিউজিয়াম সহ অন্যান্য বিষয় নজরে আসবে। আপনি হয়তো মনে মনে এরই মধ্যে এই লেখাটি পড়তে পড়তে কল্পনা করেছেন আপনি আইফেল টাওয়ারের পাশে বিস্তৃত সবুজ ঘাসের উপর দাড়িয়ে আইফেল টাওয়ারকে আপনার ব্যাকগ্রাউন্ড করে বিভিন্ন ভঙ্গিতে ছবি তুলে স্মৃতির পাতা সমৃদ্ধ করেছেন পাশাপাশি আপনার ফেসবুক,ইন্সটাগ্রামে সেগুলো আপলোড দিয়ে বন্ধুদের জানাচ্ছেন ওহে প্রিয় বন্ধুবর দেখো আমার পরম সৌভাগ্য হয়েছে পৃথিবী সেরা একটি স্থানে দাড়িয়ে ছবি তোলার,মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকার। আপনি কি জানেন আজকে আইফেল টাওয়ার যেখানে দাড়িয়ে পৃথিবীবাসির চোখ ছানাবড়া করে রেখেছে সেটি ওখানে থাকার কথাই ছিল না! হয়তো তথ্যটি জানেন অথবা জানেন না। আইফেল টাওয়ারের স্থপতি গুস্তাভ আইফেল তার ডিজাইন এবং পরিকল্পনার কথা প্রথমে ফুটবলের স্বর্গরাজ্য স্পেনের বার্সেলোনা কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিলেন। আশা করেছিলেন সেটা তারা গ্রহণ করবেন এবং এই স্থাপনাটি বার্সেলোনাতে স্থাপিত হবে। কিন্তু তাকে হতাশ করে দিয়ে তার প্রস্তাব তারা নাকোচ করেছিল। তারা বলেছিল লোহালক্কড়ের এই জঞ্জাল দিয়ে শহরের প্রাণকেন্দ্রকে বিকৃত করতে চাই না!

আমার মনে হয় এই তথ্যটি জেনে আপনি হাসছেন এবং বিস্মিত হচ্ছেন এই ভেবে যে তারা কতইনা বোকামি করেছে, কতইনা ভুল করেছে। আপনার ধারণা সঠিক। এখন স্পেন নিশ্চই আফসোস করে সেদিন গুস্তাভ আইফেলের প্রস্তাবটি গ্রহণ করলে কতইনা ভালো হতো। শুধু মাত্র আইফেল টাওয়ারের প্রতি মুগ্ধতা দেখিয়ে প্রতিবছর যে পরিমান পর্যটক প্যারিস ভ্রমন করে তা থেকে ফ্রান্সের যে রেভিনিউ আসে সেটা বিস্ময়কর। এমন একটি সুযোগ তারা কতটা অবহেলায় হেলায় ঠেলে ফেলেছে। গুস্তাভ আইফেল যখন স্পেনের কাছ থেকে তার প্রস্তাবে সাড়া পেলেন না তিনি কিন্তু হাতশ হননি। তিনি এর পর ফ্রান্স সরকারের সাথে যোগাযোগ করেছে।ফ্রান্স সরকার খুব ভালোভাবে চিন্তাভাবনা করে প্রস্তাবটি গ্রহণ করেছে। তারপর বাকিটা ইতিহাস। এখন কাউকেই এ নিয়ে বলার অবকাশ রাখে না।

আইফেল টাওয়ার যেমন গর্বের সাথে মাথা উচু করে দাড়িয়ে আছে তেমনি সেই টাওয়ারের গায়ে পৃথিবী বিখ্যাত এমন কিছু মানুষের নাম খোদাই করা আছে যাদের নিয়ে পৃথিবীবাসি গর্ব করে। তাদের সম্মান,খ্যাতিও আইফেল টাওয়ারের মতই উচু। তেমনই একজন মানুষ ছিলেন অগাস্টিন লুইস কসি। পৃথিবীর সবাই সব মানুষের নাম জানে না। হতে পারে কসির নামও আপনি প্রথম বারের মত শুনছেন অথবা আগে থেকেই তার সম্পর্কে জানেন। অগাস্টিন লুইস কসি ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত গণিতবিদ। গণিত কথাটি শুনলেই আমাদের মধ্যে একপ্রকার ভয় কাজ করে কিন্তু মজার বিষয় হলো গণিত ছাড়া আমরা একটি দিন,একটি ঘন্টাও পার করতে পারিনা। প্রতিটি কাজে কর্মে আমাদের নানা ভাবে গণিতের উপর নির্ভরশীল হতে হয়। হিসেব নিকেষ করতে হয়। যাকে আমাদের এতোটা প্রয়োজন দেখুন আমরা তাকে কতইনা ভয় পাই। অথচ উল্টোটা হওয়ার দরকার ছিল। যেমন মোবাইল আমাদের নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় জিনিষ হয়েছে বলে সব সময় সাথে রাখি তেমনি গণিত বিষয়টিও ভালোবাসার স্থান দখল করার দরকার ছিল।

যাই হোক এই লেখাটি গণিতের প্রতি আপনার বা আমার ভালোবাসা তৈরির লক্ষ্যে রচিত নয় বরং আমরা অল্পবিস্তর কসি সম্পর্কে জানবো। আপনি হয়তো ভাবতে পারেন অগাস্টিন লুইস কসি নামে এক বিশ্ববিখ্যাত  গণিতবিদ সম্পর্কে জেনে আমাদের লাভ কী? আমার মনে হয় লেখাটি পড়লে নিজেই বুঝতে পারবেন লাভ আছে কি নেই। তবে এটাতো সত্যি আমরা জীবনে সব কিছু লাভের জন্য করি না। আমরা যখন সিনেমা দেখি,গান শুনি, কবিতা আবৃত্তি শুনি কিংবা আকাশে ঘুড়ি উড়ানো দেখি এগুলোর জন্য আমরা কিন্তু কখনো ভাবি না যে এগুলো করে লাভ কী? যাই হোক তবে কসির এই গল্প থেকে আপনি নিশ্চই এমন কিছু জানতে পারবেন যা আপনার জীবন পরিবর্তনে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারবে যদি আপনি তা কাজে লাগান।

আমাদের দেশে অগণিত শিশু কিশোর,তরুণ শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত সেটা আপনিও নিশ্চই জানেন। অভাবে জর্জরিত পরিবারগুলির সাথে কথা বললে তারা আক্ষেপ করে বলেন লেখাপড়া করানোর মত সামর্থ তাদের নেই। তাই তারা তাদের সন্তানদের লেখাপড়া শেখাতে পারেন না। আবার অনেকে মাধ্যমিকের গন্ডি পার হওয়ার পর ঝরে পড়েন তাদেরও একই সমস্যা। আমার ধারণা অগাস্টিন লুইস কসির সমস্যা ছিল তার চেয়েও অধিক। আপনি আপনার জীবনের দিকে তাকিয়ে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর মিলিয়ে নিন। আপনিকি আপনার জীবনে দিনের পর দিন না খেয়ে কাটিয়েছেন? কিংবা কোনো মতে এক বেলা খাবার খেয়ে কাটিয়েছেন? আপনিকি রাস্তায়,ফুটপাতে ঘুমিয়েছেন,ছেড়া কাপড়ে দিনের পর দিন পার করেছেন? যদি এই প্রশ্নের সবগুলোর উত্তর হ্যা হয় তবে ভিন্ন কথা। কিন্তু আমার বিশ্বাস আপনি এই লেখাটি পড়ছেন মানে হলো আপনাকে অন্তত এতোটা কঠিন সময় পার করতে হয়নি। আর যদি পার করতে হয়েও থাকে তবে এই লেখাটি যখন পড়ছেন তখন আপনি আপনার কর্মনিষ্ঠার গুনে সফল ব্যক্তিত্বে পরিনত হয়েছেন। আপনি নিজেই হয়ে উঠেছেন একজন দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী মানুষ। অগাস্টিন লুইস কসির জীবন ছিল এমনই ভাগ্যবিড়ম্বিত যে সারাদিনের কাজের জন্য তিনি মাত্র আধাপাউন্ড পাউরুটি পেতেন। কখনো কখনো তার চেয়েও কম পেতেন।আর যদি ভাগ্য সুপ্রসন্ন হতো তবে মাঝে মাঝে তিনি কয়েক টুকরো বিস্কুটও পেতেন। কিন্তু সেই বিস্কুট এতোটাই শক্ত যে দাত দিয়ে কামড় দিয়ে ভাঙা যেত না বরং পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হতো। তার পর যখন তা কিছুটা নরম হতো তখন খেতে হতো।

আমাদের ছেলে মেয়েরা সকালে রান্না করা তরকারি দুপুরে দিলে খেতে চায় না, মুখ ঝামটা মেরে যেদিকে মন চায় চলে যায়। তাদের জন্য অগাস্টিন লুইস কসির জীবন দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরা যেতে পারে। সারাদিন না খেয়ে কাজ করার পরও তিনি কখনো হতাশ হননি,হাল ছেড়ে দেননি। তিনি একটি স্বপ্নকে বুকে লালন করতেন,গণিত নিয়ে খেলা করতেন,গণিত ভালোবাসতেন। অক্লান্ত পরিশ্রম করে আমরা যখন বিছানায় গা এলিয়ে দিই এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমের দেশে তলিয়ে যাই সেখানে কসি তার স্বপ্নকে সত্যি করার জন্য সারাদিনের ক্লান্তিকর কাজের শেষে বসতেন গণিত নিয়ে। তার এই সাধনাই তাকে বিশ্ববিখ্যাত গণিতবিদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।তিনি কোনো পরিস্থিতিতেই তার গবেষণাকর্ম থামাননি। আপনি শুনলে চোখ কপালে তুলবেন যে কসি প্রায় আটশোটির মত মৌলিক গবেষণা পেপার প্রকাশ করেছিলেন।তার জীবনের দিকে তাকালে বার বার এটাই মনে হয় যে চেষ্টা করলে যে কোনো পরিবেশ থেকেই সফল হওয়া যায়। ধনসম্পদে পরিপূর্ণ থাকলেই যদি কেউ বিখ্যাত পন্ডিত,সাধক,বিজ্ঞানী হতে পারতেন তবে কসিদের মত কারো নাম আমরা জানতেও পারতাম না। নজরুলে মত কেউ কবি হতেন না।

অগাস্টিন লুইস কসির নামে আছে ষোলটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা ও তত্ত্ব। এতো ধারণা ও তত্ত্ব পৃথিবীর আর কোনো গণিতবিদের নামে নেই। তার সাধনা তাকে এতোটা মর্যাদা ও সাফল্য দান করেছিল যে আইফেল টাওয়ারের গায়ে খোদাই করা পৃথিবী বিখ্যাত বাহাত্তরজন মানুষের নামের যে ক্ষুদ্র তালিকাটি আছে সেখানে অগাস্টিন লুইস কসির নামটি উজ্জ্বল হয়ে আছে। সুতরাং ছোটো কিছু না পাওয়া,ছোটো কিছু ব্যর্থতার দায় নিয়ে হতাশ হওয়ার দরকার নেই,জীবন বিলিয়ে দেওয়ার দরকার নেই। আপনার আমার সমস্যা হয়তো আমাদের কাছে বড় মনে হচ্ছে কিন্তু চারদিকে তাকালে দেখতে পাবেন অগণিত মানুষ আছে যাদের জীবনে এতো বিশাল সমস্যা আছে যার তুলনায় আমাদের সমস্যাগুলো একটি বালুকণার সমান। তাদের সমস্যার সামনে আমাদের সমস্যা,না পাওয়ার ব্যর্থতা রেখে দিলে তা হবে সাহারা মরুভূমিতে একটি আংটি রাখলে যতটুকু হয় ততোটুকু।

 

পাত্রে ছিদ্র রেখে পানি ঢাললে তা বেরিয়ে যাবেই। আপনি পানি ঢালার পরিমান যতই বৃদ্ধিকরুন না কেন এক সময় সব পানিই বেরিয়ে যাবে। পানি ঢালা বৃদ্ধি না করে যদি ছিদ্র বন্ধ করতে পারেন তবে এক আজলা পানি রাখলেও তা দিনের পর দিন থেকে যাবে। জীবনে সবারই কোনো না কোনো সমস্যা থাকে। সেগুলোকে বড় করে না দেখে,হতাশ না হয়ে বরং সেগুলো সমাধানের পথ খুজে নিতে চেষ্টা করুন।ঠিক যেমনটি অগাস্টিন লুইস কসি করতেন। আপনি হয়তো আপনার সমস্যাটিকে এক দিক থেকে দেখেছেন বলে কূলকিনারা করতে পারছেন না, সমাধান খুজে পাচ্ছেন না ফলে হতাশার মাত্রা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আপনার সমস্যাটিকে একটি রুটি হিসেবে কল্পনা করুন যে রুটির এক দিক উপরে যা আপনি দেখতে পাচ্ছেন আরেক দিক উনুনে রাখা তাওয়ার উপর পড়ে আছে। ওটাকে উল্টো করে দেখুন। নতুন দিগন্ত দেখতে পাবেন। আপনার সমস্যার সমাধান হয়তো যে পাশটি আপনি দেখছেন না সে পাশেই বিদ্যমান। শুধু তাওয়ায় রাখা সমস্যা নামক রুটিটি উল্টে দেখুন।

বিকেলে যখন সূর্য আস্তে আস্তে ঢুবে যায় তখন ক্রমাগত অন্ধকারে তলিয়ে যায় গোটা বিশ্ব। আপনি সেটা দেখে হতাশ হবেন না যে হায় সব অন্ধকার হয়ে গেল। ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করে দেখুন। একসময় রাত পার হবে এবং আবার সূর্য উঠবে তার পূর্ণ আলো নিয়ে।যদি অন্ধকার দেখে হাল ছেড়ে দিয়ে জীবনকে ছুটি দিয়ে দেন তবে পরবর্তী সকালে নতুন সূর্য দেখার যে সুযোগ আপনার সামনে ছিল তা থেকে আপনি বঞ্চিত হবেন। এ জন্য কাউকে দায়ী করতে পারবেন না কারণ আপনার প্রতিটি সুযোগ ও সম্ভাবনা আপনি নিজেই নষ্ট করেছেন। আজকে আমার আপনার ঘরে যে বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলছে তার আবিস্কারক টমাস আলভা এডিসন। বলা হয়ে থাকে তিনি নয়শত নিরানব্বই বার ব্যর্থ হয়ে হাজারতম বারে সফল হয়েছিলেন। তিনি যদি এক দুবার চেষ্টা করেই হতাশ হতেন,চেষ্টা ছেড়ে দিতেন তবে বৈদ্যুতিক বাতি আবিস্কৃত হতো না। তিনি বলতেন আমিতো ব্যর্থ হইনি বরং আমি নয়শত নিরানব্বই ভাবে চেষ্টা করে দেখেছি বৈদ্যুতিক বাল্ব আবিস্কার করা যায় কি না। আপনি নয়শত নিরানব্বই ভাবে না হোক অন্তত নয়বার চেষ্টা করে দেখেছেন? সফলতা,সমস্যার সমাধান আপনার নাগালেই। শুধু আপনাকে রুবিকস কিউবটাকে ঘুরিয়ে দেখতে হবে ম্যাচিং কালারটা ঠিক কোন সাইডে আছে। তার পর দেখবেন নিমিষেই তা মিলে গেছে।

৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২

অগাস্টিন লুইস কসি

লেখাঃ জাজাফী

 

না মানুষি জীবন

পার্ট-১ (দৈনিক ইত্তেফাকের ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত)

দমকা হাওয়ায় হারিকেনের আলোটা কিছুক্ষন আগেই নিভে গেছে। ওটা আর জ্বালাতে ইচ্ছে করছেনা। রাত যদিও খুব একটা হয়নি তার পরও জেগে থাকতেও ইচ্ছে হচ্ছেনা। টিনের চালে অবিরাম বৃষ্টির ফোটা আছড়ে পড়ছে। নুপুরের শব্দের চেয়েও সেটা বেশি মিষ্টি মনে হচ্ছে। একা একা রাত জেগে থেকে আর কি হবে। বাবা মা কেউ বাড়িতে নেই। পরীর দিঘির মেলা দেখতে বড়দিকে সাথে নিয়ে বাবা মা ছোট পিসিদের বাড়িতে গেছে। যাওয়ার আগে বলে গেছে তারা আজ ফিরবেনা। ওরা বাড়িতে থাকলে আরো কিছুক্ষণ জেগে থাকতে হতো। পড়ি বা না পড়ি হারিকেন জ্বালিয়ে গুনগুন করলেই মা মনে করতো আমি বিদ্যাসাগর হচ্ছি। আদতে আমিতো লবডঙ্কা। পাটখড়ির বেড়ার নিচ দিয়ে বৃষ্টির পানি ঘরের ভিতরে ঢুকছে। চারদিকে ঘন অন্ধকার। অজ পাড়াগায়ে বিদ্যুতের আলো এসে পৌছেনি। ভোটের সময় নেতারা কত আশার বাণী শুনিয়ে গেছে তার কোন ঠিক নেই কিন্তু ভোট পার হলেই তারা হারিয়ে গেছে। আমরা জানি তারা আবার কোন একদিন ভোট চাইতে আমাদের দুয়ারে ভিখারীর বেশে দাড়াবে। তারা আগের সব কিছু ভুলে যাবে। আমরাও তাদেরকে ক্ষমা করে তাদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে বিশ্বাস করে আবার তাদের ভোট দিয়ে বিজয়ী করবো। সাত পুরুষের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে এটা। রমা কাকি সে দিক থেকে আলাদা। সে কাউকে ভোট দেয় না। নিতাই বাবু তাকে আশা দিয়েছিল ভোটে জিতলে আমাদের গ্রামের জন্য একটা টিউব অয়েল দিবেন, যেন সবাই সেই টিউব অয়েল থেকে বিশুদ্ধ পানি পান করতে পারি।

নিতাই বাবুকে আমরা ভোট দিয়ে পাশ করিয়েছিলাম কিন্তু তিনি কথা রাখেন নি। তার পর যারাই এসে ভোট চেয়েছে আর আশার বাণী শুনিয়েছে রমা কাকি কারো কোন কথা বিশ্বাস করেনি। সে আর মিথ্যা কথায় প্রতারিত হতে চায়না। আমাদের গ্রামের অন্যরা সবাই ঠিকই প্রতারিত হয়। পরিমল কাকার বড় ছেলেটা ঢাকায় থাকে। আসার সময় সে একটা টেলিভিশন কিনে নিয়ে এসেছিল। বিদ্যুত না থাকার কারণে তা আর দেখা হতো না কারো। কিন্তু টেলিভিশনটা ওভাবে ফেলে রেখে লাভ কি। তাই শেষে পরিমল কাকা একটা ব্যাটারি কিনে আনলেন। সেই টেলিভিশনে বিরেন শিকদারকেও দেখা যায় হাসি মুখে মুরগির রান খাচ্ছে, কোক খাচ্ছে। সেটা দেখে আমাদের হাহুতাশ হয়তো বাড়েনা কিন্তু রমা কাকির শরীর জ্বলে যায়। সে খেকিয়ে উঠে বলে, দেখ কইছিলাম না এরা নেমক হারাম। ভোটের সময় এসে হাতে পায়ে ধরে ভোট চায় আর ভোট ফুরালে লাপাত্তা। পাশ করার পরের পাঁচ বছর তাদেরকে শুধু টিভিতেই দেখা যায়। সে জন্যই আমি দুমুখো সাপকে বিশ্বাস করিনা। রমা কাকির কথায় যুক্তি আছে। এসএসসিতে লেটার মার্ক সহ পাশ করেছিল সে। কিন্তু গরীব ঘরে জন্ম নিয়ে  ওটুকু যে শিখতে পেরেছে এটাই ভাগ্য। পড়ালেখা আর হয়ে ওঠেনি তার।

 

বিকেল থেকেই আকাশে প্রচন্ড মেঘ জমেছিল। সন্ধ্যা নামতে না নামতেই আকাশ কাপিয়ে বৃষ্টি শুরু হলো। কতক্ষণ চলবে তার কোন ঠিক নেই। বৃষ্টির সাথে সমানে পাল্লা দিয়ে বইছে দমকা হাওয়া। বড়দি বাড়িতে থাকলে বৃষ্টির দিনে ওর মুখ থেকে ভেসে আসতো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা।

”নীল নব ঘনে আষাঢ় গগণে তিল ঠাই আর নাহিরে

ওগো আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে”

 

থেকে থেকে বিদ্যুত চমকাচ্ছে। সেই আলোতে চারদিক আলোকিত হয়ে আবার অন্ধকারে তলিয়ে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ চমকের সাথে সাথে চমকে উঠছে গোয়ালের গরুটা। তার সাথে হয়তো চমকে উঠছে তার বাছুরটাও। সে হাম্বা হাম্বা করে ডাকছে। ছোট বেলায় যখন বিদুৎ চমকাতো আমিও মায়ের আঁচলের তলে মুখ লুকাতাম।  আজ মাকে বেশি করে মনে পড়ছে। সারাদিন মা এতো বকে তার পরও আশ্চর্য ভাবে এখন মাকেই বেশি মনে পড়ছে। মাত্র একটি দিনের জন্যইতো মা পিসিদের বাড়িতে গেছে। আমাকে মা বকাবকি করে, আমারও খারাপ লাগে। অজ পাড়াগায়ে জন্ম নিয়ে যে বয়সে আমার কিছু একটা করার কথা, সংসারের হাল ধরার কথা সেই বয়সে আমি বাবার ঘাড়ে ভুতের মত চেপে বসে আছি। বড়দির বিয়ের সম্বন্ধ আসছে। আমাদের যে অবস্থা তাতে ভাল ঘরে বিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দুঃস্বপ্ন হয়ে যাচ্ছে। দু’টো মাত্র ঘর আমাদের বাড়িতে। একটা ছনের চালার রান্ন ঘর আর একটা টিনের। টিনের ঘরটা যে কিরকম টিনের সেটা টের পাওয়া যায় বৃষ্টি শুরু হলে। মা আর বড়দির ছোটাছুটি শুরু হয়। এখানে সেখানে থালা বাসন পেতে রাখতে হয়। বাবা কষ্ট করে একটা পড়ার টেবিল কিনে দিয়েছিল। সেই ছোট্ট টেবিলটার ওপর আমার আর বড়দির বই খাতা সাজানো আছে। বৃষ্টি এলে সেই বই খাতার উপরে তিন চারটা থালা বাটি ভর করে। সাধারণ ভাবে কেউ কিছু বুঝতে পারবেনা কিন্তু চোখটা টিনের চালে নিয়ে গেলে টের পাওয়া যাবে সেই চালে অসংখ্য ছিদ্র। বৃষ্টি আসলেই সেই ছিদ্র দিয়ে অবিরাম ভাবে জল ঢুকে পড়ে। সেই জল যেন আমাদের বই, খাতা, বিছানা ভিজিয়ে না দেয় তার চেষ্টাতে ব্যস্ত থাকে আমার মা আর বড়দি।

হঠাৎ মনে পড়ে আজ তো কারো ছোটাছুটি নেই। আজ তো তাহলে বৃষ্টি মনের আনন্দে সব ভিজিয়ে দিতে পারবে। একবার মনে হলো ভিজুক না একটু। পরে ভাবলাম মা আমাকে কত ভালবাসে,দিদিও ভালবাসে খুব। একদিনের জন্য এই বাড়িটা আমার হাতে সপে দিয়ে গেছে তারা। সেই দায়িত্বটুকু যদি পালন করতে না পারি তবে আমার ওপর থেকে তাদের সব বিশ্বাস উঠে যাবে। আমি দ্রুত উঠে পড়ি বিছানা ছেড়ে। খুঁজে খুঁজে দুই তিনটা বাটি, থালা, বাসন জোগাড় করি। বাবার বালিশের নিচেয় একটা দুই ব্যাটারির টর্চ লাইট ছিল সেটাও খুঁজে পাই। সেটা জ্বালিয়ে প্রথমে টেবিলের কাছে যাই। সকালে বাবা মা  আর দিদি বেরিয়ে যাওয়ার পর আর আমার ঘরে যাওয়া হয়নি। ঘুমানোর সময় আমি আজ বাবা মায়ের বিছানাতেই ঠাই নিয়েছিলাম। আমার ঘরে থাকার মত তেমন কিছু নেই যা চোরে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু মায়ের কিছু শাড়ী আর দিদির জন্য কেনা রুপোর গয়না আছে দুই জোড়া যেটা মায়ের ঘরে। সে জন্যই মায়ের ঘরে থাকা। আমার ঘরের দরজাতে একটা ছোট্ট তালা দেওয়া আছে। সেটা খুলে ভিতরে ঢুকে টর্চের আলো ফেলে থালাবাটি গুলো দিতে গিয়ে চমকে উঠি। মা কিংবা দিদি যাওয়ার আগেই যায়গায় যায়গায় থালা বাটি পেতে রেখে গেছে। তাদের দায়িত¦ বোধ আমাকে বিস্মিত করেছে। আমি নিশ্চিত জানি বাকি সব জায়গাতেও তারা একই ভাবে পাতিল বসিয়ে গেছে যেন বৃষ্টির জল ভিজিয়ে একাকার করে দিতে না পারে। আমি যে অকর্মা এবং অলস সেটা আমার মা কিংবা দিদি বেশ ভালই অনুভব করে। আমি নিশ্চিন্ত মনে ফিরে এলাম বাবা মার ঘরে। বাইরে গোয়ালের দিকে টর্চের আলো ফেলে দেখলাম গরুটা আর তার বাছুরটা দাড়িয়ে আছে। বিদ্যুৎ চমকানোর সাথে সাথে তারা ডেকে উঠছে। বেশ কিছুদিন হলো গরুটা তিন সের দুধ দিচ্ছে। সপ্তাহে হয়তো একদিন আমরা একচুমুক করে দুধ পান করি। বাকিটা বিক্রি করে দেই বাজারে। দিদির বিয়ের কথা চিন্তা করে আমারও খেতে ইচ্ছে করেনা।

দিদির বিয়েতে কত খরচ হবে কিন্তু আমি জানিনা বাবা একলা কিভাবে সেই খরচ সামলাবেন। বাবারতো আয় বলতে তেমন কিছুই নেই। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে আবার বিছানায় গা এলিয়ে দেই। বাইরে বৃষ্টির অবিরাম ঝরে পড়া আর টিনের চালে রিমঝিম শব্দ কানে এসে বাজছে। দক্ষিণের জানালাটা খুলতেই চোখে পড়ে পুকুরটা। পুকুরটা আমাদের না। পরিমল কাকার এই পুকুরটাতে সারা বছর পানি থাকে। গ্রীস্মকালে গায়ের সবাই এখানেই গোসল করে। কিন্তু বছরের বাকি সময়টাতে এখানে খুব একটা কেউ আসেনা। জানালাটা বন্ধ করে ঘুমাতে চেষ্টা করি। আসে পাশে কোন বাড়ি নেই। সব থেকে কাছের বাড়িটাও বেশ দুরে। বাবা কেন যে একলা এই নির্জন জায়গাতে বাড়ি করেছিল তা জানিনা। প্রতিদিন সবার আগে আমাদের বাড়িতে সন্ধ্যা নামে, আর সবার পরে আমাদের বাড়িতে সুর্যের আলো আসে। এ যেন আলো অন্ধকারে যাই। ভুতুড়ে মনে হয় যায়গাটাকে। তবে থাকতে থাকতে নির্জনতাকে কিভাবে কিভাবে যেন সবাই ভালবেসে ফেলেছি। দিদিও দেখি কখনো আর হাহুতাশ করে না। আমি কোন দিন এই বাড়িতে একাকী একটা রাত কাটিয়েছি বলে মনে পড়ে না।

 

পার্ট-২

 

হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল। বৃষ্টির শব্দের প্রথমে বুঝতে পারিনি তবে কিছুক্ষন কান খাড়া করে রাখার পর বুঝতে পারলাম দরজায় শব্দ হচ্ছে। রাত কয়টা বাজে অনুমান করতে পারছিনা। ঘড়ি না থাকার এই এক সমস্যা। যেখানে দু বেলা খাবার জন্য চুলায় আগুন জ্বলে না সেখানে ঘড়ি থাকাটাতো রীতিমত বিলাসীতা। আমি হাতড়ে হাতড়ে বাবার টর্চ লাইটটা খুঁজে বের করি। কত কাল আগে লাইটে ব্যাটারি লাগানো হয়েছিল তা বোধ হয় বাবা নিজেও জানেনা। লাইটের আলো কমে গেছে। এখন সেটা টিমটিম করে জ¦লছে। মনে হয় একটা জোনাক পোকা ধরে লাইটের মাথায় বন্দি করে রাখা হয়েছে সেই আলো দিচ্ছে। টর্চ লাইটা বাবা কেনেনি। একটা টর্চ লাইট কেনার সামর্থ আমার বাবার নেই বললেই চলে। কোন এক সন্ধ্যা রাতে গঞ্জ থেকে বাড়ি ফেরার পথে কালুকান্দির মাঠে হাটার সময় কিছু একটার সাথে বাবা হোঁচট খেয়েছিল। অন্ধকার ছিল বেশ। একটু খোঁজ নিয়ে দেখতে গিয়ে দেখে একটা টর্চ লাইট। বাবা সেদিন টর্চ লাইটটা হাতে নিয়ে সেটা জ¦ালিয়ে আসে পাশে কেউ আছে কিনা দেখতে চেষ্টা করেছিল। কিন্তু কাউকেই পাওয়া যায়নি। বাবা মিথ্যা বলেছিল কিনা জানিনা। কেউ যদি নাই থাকবে তবে ওখানে একটা টর্চ লাইট কেন থাকবে। কে ফেলে রেখে যাবে একটা টর্চ লাইট। বড় দিদি বলেছিল বাবা কোন কালে হয়তো এমন কোন পুন্য করেছিল যার জন্য পুরস্কার হিসেবে এই টর্চ লাইটটা পেয়েছে। আমি দিদির কথার কোন প্রতিবাদ করিনি। সম্ভবত সেই যে টর্চ লাইট পেয়েছিল ব্যাটারি সহ তার পর বাবা হয়তো কোন দিন লাইটে ব্যাটারি লাগায়নি।

লাইটটা জ্বালানোও হতো খুব কম। টিমটিমে আলো জ্বেলে দরজার কাছে যেতে না যেতেই আবার দরজায় করাঘাত পড়লো। বুঝলাম আমি ভুল শুনিনি। নিশ্চই বাইরে কেউ এসেছে। কে হতে পারে তা বুঝতে পারছিনা। বাবা নিশ্চই নয়। কারণ সে তো মা এবং দিদির সাথে পিসিদের বাড়িতে গেছে। আজ ফেরারও কথা নয়। আবার মনে হলো বাবাই হয়তো ফিরে এসেছে। পিসিদের বাড়িতে থাকার মত ঘরওতো সেই আমাদেরই মত। তাছাড়া আমাকে একা রেখে যাওয়ায় দুশ্চিন্তা হওয়ায় মা’ই হয়তো বাবাকে বাড়িতে পাঠিয়ে দিয়েছে। আমি জিজ্ঞেস করতে যাব তখন আবার দরজায় করাঘাত হলো। এবার কথাও শুনতে পেলাম। কে যেন আমার নাম ধরে ডাকছে। আমি গলা খাকারি দিয়ে বললাম কে? আমার কথা শুনে ওপাশ থেকে আওয়াজ এলো, নিখিলেশ দরজা খোলো, আমি সুষমা। কন্ঠ শুনে চিনতে পারলাম। কিন্তু সুষমা দি এতো রাতে, এই বৃষ্টির মাধ্যে কেন এসেছে? তাছাড়া আমিতো সব সময় সুষমাদি বলেই তাকে ডাকি। সে  পরিচয় দেবার সময় সুষমাদি না বলে শুধু সুষমা বললো কেন?

 

খুট করে দরজা খুলে বেরিয়ে এলাম। বাইরে তখনো অবিরাম ধারায় বৃষ্টি ঝরছে। এ বৃষ্টি যেন পণ করেছে সে আর থামবেই না। বৃষ্টি দেখে মনে হচ্ছে সে সারা গ্রাম ভাসিয়ে দেবে। আকাশের কি খুবই মন খারাপ? তার এই কান্না কি তবে থামবে না। টিনের ঘর হলেও আমাদের ঘরের বারান্দার ছাউনি ছনের। ছনের ছাউনি পুরোনো হয়ে যাওয়ায় সেটা গড়িয়ে মেঝেতে পানি পড়ছে। সেই ভেজা বারান্দায় পড়ে আছে একটা অর্ধ ছেড়া কলাপাতা। যে কলাপাতা মাথায় দিয়ে সুষমাদি এসেছে আমাদের বাড়িতে। একটা ছাতা কেনার মত সমর্থ এ গায়ের দু একজন ছাড়া কারোরই নেই। সবার ভরসা ওই কলাপাতা, নয়তো বড় কচু পাতা। বৃষ্টির মওসুমটা আমরা এক প্রকার ভিজে ভিজেই কাটিয়ে দেই। আগে জ্বর বাঁধতো খুব, এখন সব সয়ে গেছে। সুষমাদির ফেলে রাখা অর্ধ ছেড়া কলাপাতা থেকে চোখ সরিয়ে সুষমাদির দিকে চোখ ফেরাই। তার হাতে একটা হারিকেন মিটমিট করে জ¦লছে। হারিকেনে সম্ভবত তেল ফুরিয়ে এসেছে। তবে কি সুষমাদি হারিকেনের জন্য তেল নিতে এসেছে? ঘরে তেল আছে কি না তাওতো জানা নেই। এ সংসারের কোন জিনিষটা কোথায় রাখা থাকে তাও আমার জানা নেই। দিদি আর মাই সব সামলে রাখে। খাবার সময় হলেই কেবল আমাকে পাওয়া যায়। এখন যদি সুষমাদি হারিকেনের জন্য তেল চায় তবে সেটা খুঁজে পেতেই আমার রাত পেরিয়ে যাবে।

 

সুষমাদির হাতে ধরে রাখা হারিকেনের মৃদু আলোয় তার মুখটা খুব মায়াবি মনে হচ্ছে। পরনের শাড়িটা ভিজে একাকার হয়ে গেছে। শরীরের সাথে লেপটে আছে অর্ধ ছেড়া মলিন শাড়িটা। বাইরের তুমুল বৃষ্টি। সামান্য কলাপাতা তাকে সেই বৃষ্টি থেকে বাঁচাতে পারেনি। সুষমাদির খালি পা,ভেজা শরীর থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে মেঝেতে। মাটির মেঝে ভিজে কাদা হয়ে যাচ্ছে। আমাদের বাড়ি থেকে সুষমাদিদের বাড়ি বেশ খানিকটা দুর। মাঝের পথটুকুতে আর কোন বাড়ি নেই। জন শুন্য এ পাশটাতে কেবল  আমরাই থাকি। হারিকেনের তেল নিতেই যদি সুষমাদি আসবে তাহলে এই রাতে কেন আসতে হবে। রাতটাতো এমনিতেই কাটিয়ে দেওয়া যেত। সকালেই তেল নিয়ে যেতে পারতো। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আসায় সে কাপছে। আলো অন্ধকারের মিশেলেও সেই কাপুনিটা টের পাওয়া যাচ্ছে। আমি বললাম সুষমাদি এতো রাতে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে আসলে যে! মা,দিদি কেউতো বাড়িতে নেই। বাবাও গেছে তাদের সাথে পরীর দিঘির মেলা দেখতে। সুষমাদির কাপুনি বেড়েই চলছে। কাপাকাপা গলায় বললো, কাকিমা যাওয়ার সময় আমার সাথে দেখা হয়েছিল। বলেছে আজ নাকি ফিরবেনা।

 

হঠাৎ করে ঝড়ো বাতাস এসে সুষমাদির হাতে ধরে থাকা হারিকেনটি নিভিয়ে দিল। সেই সাথে বিদ্যুৎ চমকে উঠলে সুষমাদিকে কেমন যেন ঘোর লাগা মনে হলো। সুষমাদির বয়স যখন পনের বছর তখন তার বিয়ে হয়েছিল। সেই ঘরে একটা ফুটফুটে মেয়েও জন্ম নিল। মেয়েটির নাম সুকন্যা। সুকন্যার কপালে বোধ হয় সুখ লেখা ছিলনা। সুকন্যার বাবার ভাই বোন কেউ ছিলনা। পরিবারে কেউ না থাকলেও সুষমাদি সুখের কোন অভাব বোধ করেনি। সুকন্যাকে নিয়ে সুষমাদি আর তার স্বামীর ছিল সুখের সংসার। এক সকালে গঞ্জ থেকে ফেরার পর কি এক অসুখে পড়লো সে। বেশ কিছুদিন ভুগে মারা গেল। সুষমাদির কপালের সিদুর মুছে গেল সতের বছর বয়স হতে না হতেই। সুকন্যার বয়স তখন দেড় বছর। সুষমাদি মেয়েকে নিয়ে ফিরে আসলো বাবার ঘরে। বাবা ছাড়া সুষমাদির আর কেউ ছিলনা। জ্ঞাতি গোষ্ঠিও কেউ ছিলনা। বাবার কাছে শুনেছি তারা নাকি দুর কোন গা থেকে এসে এখানে বাড়ি করেছিল। তাই তাদের জ্ঞাতি গোষ্ঠি না থাকাই স্বাভাবিক। আস্তে আস্তে মিশতে মিশতে আমরাই তাদের আত্মীয়র মত হয়ে উঠেছিলাম।

 

সুষমাদির স্বামী মারা যাবার পর সে যখন বাপের বাড়ি চলে আসলো, তার বাবা তখন এক প্রকার বিছানায়। দীর্ঘ দিন তিনি হাপানি রোগে কাতরাচ্ছেন। মাঝ রাত হবে হয়তো। ঘড়ি নেই তাই বুঝতে পারছিনা ঠিক কত রাত হয়েছে। বাইরে প্রচন্ড বৃষ্টি আর আকাশে মেঘের কান ফাটানো শব্দ ছাড়া কোথাও কিছু চোখে পড়ছেনা। এই বৃষ্টি ভেজা ঘোর অন্ধকার রাতে বাড়িতে আমি একা। আমার সামনে খোলা চুল,খালি পা,ভেজা শরীরে দাড়িয়ে ঠকঠক করে কাঁপছে সুষমাদি। আমি কি বলবো বুঝতে পারছিনা। সুষমাদি হঠাৎ সেই অন্ধকারে হাতড়ে আমার হাতটা চেপে ধরলো। আমার সারা শরীর কেঁপে উঠলো। সে হাউ মাউ করে কেঁদে উঠে বললো নিখিলেস আমাকে বাঁচা। আমি বুঝতেই পারিনি কি হচ্ছে এবং কি হতে চলেছে। আমি নিজেকে সামলে নিয়ে সুষমাদির হাত থেকে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিতে চেষ্টা করলাম কিন্তু সে আরো জোরে চেপে ধরলো। আমি মনকে প্রবোধ দিয়ে সুষমাদিকে শান্ত হয়ে সব খুলে বলতে বললাম। সুষমাদি আমার হাতটা ছেড়ে দিয়ে বললো আমার একমাত্র মেয়ে সুকন্যা বোধ হয় আর বাঁচবেনা। আমার মাথায় যেন আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। আমি জানতে চাইলাম কি হয়েছে ওর। সুষমাদি জানালো সন্ধ্যা থেকে খুব জ¦র, সাথে প্রচন্ড বমি করতে করতে মেয়েটা একেবারে বিছানা ধরেছে। প্রচন্ড এই বৃষ্টির রাতে মেয়েটাকে  নিয়ে কি করবে সে ভেবে পায়নি তাই আমার কাছে এসেছে। আমি জানি আমিও নিরুপায়। এই মধ্য রাতে প্রচন্ড বৃষ্টিতে সব ভেসে যাচ্ছে। এর মাঝে আমার আর করার কিইবা থাকে। আমি সুষমাদিকে শান্তনা দিলাম। বললাম আমাকে কি করতে হবে বলো। সে আমাকে তার সাথে বাড়িতে যেতে বললো। বাবা মা আমাকে আমাদের বাড়িটা দেখে রাখতে বলে গেছে এখন এই বাড়ি ফেলে ঘোর অন্ধকার বৃষ্টি বিঘিœত এই রাতে কিভাবে আমি যাই ভেবে পাইনা।

 

সুষমাদিকে বারান্দায় রেখে আমি ঘরের ভিতরে যাই। বৃষ্টির শব্দে এতো কাছ থেকেও যেন একজন আরেকজনের কথা ঠিকমত শুনতে পাচ্ছিনা। আশে পাশে কোথাও কোন বাড়ি নেই, কোন মানুষ নেই। আমাদের বাড়িটা যেন কোন এক নিঝুম দ্বীপে। সুষমাদিকে বললাম, তুমি দাড়াও আমি ঘরে তালা মেরে আসি। অন্ধকারে মিটমিট করে জ¦লা টর্চ লাইটের আলোয় চাবি খুঁজলাম। চাবি হাতে নিয়ে ফিরতেই কার যেন গরম নিঃশ্বাস আমার কাধে এসে পড়লো। আমি চমকে চর্ট ফেলতেই ভেসে উঠলো সুষমাদির মুখ। সে মুখে বড় মায়া, যেন সেই মায়া কাটিয়ে কেউ চোখ ফেরাতে পারবেনা। আমি বললাম, সুষমাদি তুমি এখানে কখন এলে? সে বললো বাইরে অন্ধকারে ভীষণ ভয় করছিল, তাই তুমি ঘরে ঢোকার সাথে সাথে আমিও ঢুকেছি। আমি সুষমাদিকে নিয়ে ঘর থেকে বারান্দায় নেমে এলাম। ঘরের দরজায় তালাটা ভাল করে আটকে দিলাম। বারান্দার এক কোনায় একটা মাথল ছিল কিন্তু সেটা আর খুঁজে পেলাম না। বাবা এই মাথলটা নিজে বানিয়েছিলেন। রোদ  বৃষ্টিতে ওই মাথলটাই ছিল আমাদের একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু দরকারের সময় তা পাওয়া গেলনা। এই বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেই যেতে হবে। বেরোনোর আগে সুষমাদির হারিকেনটা আবার জ্বালিয়ে নিলাম। জানিনা কতক্ষণ সেটা জ্বলবে। বাইরে যে দমকা বাতাস তাতে মুহুর্তেই হারিকেন নিভে যাবে এটা নিশ্চিত।

 

মাথায় একটা গামছা পেচিয়ে সুষমাদির সাথে তার বাড়ির দিকে রওনা হলাম। পিছনে পড়ে থাকলো আমাদের বাড়িটি। যে বাড়িতে আজই প্রথম  আমি একাকি রাত কাটাতে চলেছিলাম। গ্রামের শেষ মাথায় আমাদের বাড়ি। আমাদের বাড়ির আগের বাড়িটাই সুষমাদিদের। সেই বাড়ি থেকে আমাদের বাড়ির দুরত্ব অনেক। মাঝখানে জন মানুষের বসবাসের চিহ্ন নেই। সে জন্যই রাস্তাও সেভাবে তৈরি হয়নি। রিলিফের টাকায় রাস্তা হওয়ার কথা ছিল, তার পরিবর্তে সেই রিলিফের টাকায় মেম্বারের বাড়িতে উঠেছে পাকা দালান। আমাদের কথা আর কে ভাবে! সুষমাদি আমার পাশে পাশে হাটছে। এতো কাছাকাছি অবস্থানে আমি কোন দিন কারো সাথে হাটি নি। না বাবা মার সাথে, না অন্য কারো সাথে। সুষমাদির ভেজা শরীর আমার শরীরের সাথে লেপ্টে যাওয়ার মত অবস্থা। আমি সে সবে গা করছিনা। মনের মধ্যে একটাই চিন্তা সুষমাদির একমাত্র কন্যা সুকন্যা এখন কেমন আছে। যে পরিমান বৃষ্টি হচ্ছে তাতে মাথার উপর ছাতা থাকলেও ভেজা থেকে শরীর বাঁচানো যেত না। সেখানে সুষমাদি এক হাতে হারিকেন অন্য হাতে কলাপাতা ধরে রেখেছে মাথার উপর। সেই কলাপাতা বাতাসে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেছে। আমরা দুজনই সমানে ভিজছি। বৃষ্টিতে ভিজে আমার গেঞ্জি শরীরের সাথে লেপ্টে আছে। পরনের লুঙ্গিটা পায়ের সাথে ভিজে জড়িয়ে গেছে, তাই হাটতে অসুবিধা হচ্ছে।  অন্ধকারে না তাকালেও বোঝা যায় সুষমাদিরও হাটতে অসুবিধা হচ্ছে। আমার পায়ে প্লাস্টিকের জুতো। সুষমাদি খালি পায়ে হাটছে। দুজনের পায়ের নিচ থেকে ছলাৎ শব্দে কাদা পানি ছিটকে সরে যাচ্ছে। বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হয়ে গেছি। শরীরটা হালকা কাপতে শুরু করেছে। সুষমাদিও কাপছে, তবে সেটা ভয়ে না বৃষ্টিতে ভিজে ঠান্ডায় তা বুঝতে পারছিনা। আগের বারের মত দমকা হাওয়ায় হারিকেন নিভে যায়নি বলে সেই আলোতে পথ কেটে কেটে এগিয়ে যাচ্ছি। মনের মধ্যে নানা চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে।

 

 

পার্ট–৩

অবিরাম বর্ষন আর মেঘের বিকট গর্জনের সাথে সমানে চলছে বিদুৎ চমক। ওরা যেন একে অন্যের সাথে শক্তির পরীক্ষায় নেমেছে। এই দুর্যোগ ঘন রাতে কোথাও কেউ জেগে নেই। আকাশে মেঘ দেখলেই সবাই যে যার ঘরে ফিরে যায়। তা না হলে হয়তো এই রাতেও এক দুজনকে দেখা যেত গঞ্জ থেকে ফিরছে। মানুষের বয়স বাড়ার সাথে সাথে ঘুম কমে যায়। সুখেন বাবুরও ঘুম কমে গেছে। মালোপাড়ার শেষ মাথায় সুখেন বাবুর বাড়ি। তিনি আমাদের গায়ের একমাত্র ডাক্তার। কোন বিশেষজ্ঞ কেউ নন, তবে অবহেলিত এই তল্লাটে তিনিই সবার কাছে বিশেষজ্ঞর চেয়েও বেশি কিছু। মানুষের বিপদে আপদে তাকে সব সময় পাশে পাওয়া যায়। চিকিৎসার জন্য তিনি কোন ফি নেন না কখনো। ওষুধের টাকাও সবাই সময় মত দিতে পারে এমন রেকর্ড নেই। এসব বোঝা যায় তার বাড়ির দিকে তাকালেই। আর দশজন মানুষের ঘরের সাথে তার ঘরের কোন পার্থক্য চোখে পড়েনা। ডাক্তার বলে যে তার আলিশান বাড়ি থাকবে, কিংবা ভাল খাবে, পরবে তা কিন্তু নয়। তিনি সারা জীবন মানুষের কল্যানে নিজেকে বিলিয়ে যাচ্ছেন। তার মতে ক্ষুদ্র এ জীবনে মানুষকে ভালবাসা ছাড়া আর কিইবা চাওয়ার থাকতে পারে। সবাইকে তিনি সমান চোখে দেখেন। তার এই সারল্য সবাইকে মুগ্ধ করে। যে যখন পারছে বাকিতে ওষুধ নিয়ে যাচ্ছে, আবার করো হাতে কিছু অতিরিক্ত টাকা থাকলে ডাক্তারকে দিয়ে যাচ্ছে যেন ওষুধ কিনে রাখতে পারে। উঠোনে দাড়িয়ে গলা খাকারি দিই। সুখী দাদু বলে আর ডাকা লাগেনা, তিনিই বলে ওঠেন কে? আমি বলি আমি নিখিলেশ।

 

ছোট্ট একটা গ্রাম আমাদের। সবাই সবাইকে চেনে। নাম বলতেই তাই তার চিনতে অসুবিধা হয়না। তার বয়স হয়েছে ঢের, আশি নব্বইয়ের বেশি। চোখে তাই বলে কম দেখেন এমন না। কানাই লাল স্যার যেখানে মোটা পাওয়ারের চশমা পরেন সুখেন বাবু সেখানে চশমা ছাড়াই দিব্বি দেখতে পান। বড়রা তাকে সুখেন বাবু বলেই ডাকে। সবাই মনে করে তার মত সুখী আর কেউ নেই। তিনি নিজেও সেটা স্বীকার করেন। আর আমরা ছোটরা তাকে সুখী দাদু বলে ডাকি। ছেলেপুলে কেউ নেই তার। তিনি একাই থাকেন বাড়িতে। ধীরেনের মা রোজ রান্না করে দিয়ে যায়, তাই তিনি খান। অনেক বছর হলো সুখেন বাবুর স্ত্রীও মারা গেছে। কেউ নেই বললেও আসলে ডাক্তার দাদুর সবাই আছে। আমার মত রক্তের সম্পর্কহীন তার অগণিত নাতি নাতনি আছে, গ্রামের বড়রা সবাই তাকে বাবার সম্মানে রাখে। কেউ বাড়িতে ভাল কিছু রান্না করলেই ডাক্তার দাদুর জন্য দিয়ে যায়। হারিকেনের সলতেটা একটু বাড়িয়ে দিয়ে তিনি আমাকে ভিতরে ডাকলেন। এতো রাতে কেন এসেছি জানতে চাইলেন। দাদুর হাতে ঘড়ি আছে। সেটা থেকেই জানতে পারলাম রাত তখন পৌনে দুইটা। আমি দাদুকে স্ব-বিস্তারে খুলে বললাম। সুকন্যার জ¦র এবং বমির কথাও বললাম। দাদু দিনের বেলা হলে হয়তো আমার সাথে ভ্যানে করে হলেও যেতে পারতো কিন্তু এই দুযোর্গ পুর্ন রাতে যেখানে আমার মত মানুষেরই চলাফেরা কঠিন সেখানে দাদুর ঘর থেকে বেরোনোই অসম্ভব। দাদু কয়েকটা ওষুধ ধরিয়ে দিয়ে কিভাবে খাওয়াতে হবে তার নিয়ম বলে দিলেন। কালকে যেন আমি এসে বলে যাই সুকন্যার কি অবস্থা সেটাও মনে করিয়ে দিলেন। আমি ওষুধ নিয়ে সুষমাদির বাড়ির দিকে রওনা দিলাম।

 

রাতে সুষমাদি যখন আমাকে ডাকতে গিয়েছিল আমাদের বাড়িতে, তখন তার সাথে তার বাড়িতে গিয়ে দেখি সুকন্যার অবস্থা খুবই খারাপ। অনেক বার বমি করে সে ক্লান্ত হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছে। শরীরে যেন কোন শক্তির লেশ মাত্র নেই। সারা শরীর জ¦রে পুড়ে যাচ্ছে। ওর বিছানার পাশে বসে কপালে হাত রাখতেই আমি নিজেই ভয় পেয়ে যাই। এই দুর্যোগ ঘন রাতে ছোট্ট অসুস্থ মেয়েটির জন্য কিইবা করার আছে আমার। সুষমাদি আমার পাশে বসে কাপা কাপা হাতে আমার বাহু চেপে ধরে বললো, নিখিলেশ এই মধ্য রাতে তুমিই আমার একমাত্র অবলম্বন। আমি তাকে অভয় দিলাম, সুকন্যার কিচ্ছু হবেনা। সে খুঁজে পেতে একটা গামছা দিল আমাকে। আমি গামছা দিয়ে মাথাটা না মুছেই বেরিয়ে গেলাম সুখেন বাবুর বাড়ির উদ্দেশ্যে। আমার ফেরার অপেক্ষায় হয়তো ঠায় দাড়িয়ে রইলো কন্যার সুস্থ্যতার আশা বুকে নিয়ে সুষমাদি।

 

ডাক্তার দাদু একটা পলিথিনে মুড়ে দিয়েছেন ওষুধ গুলো যেন ভিজে না যায়। আমি ফিরতে ফিরতে ঘন্টা খানেক পার হয়ে গেছে। মনের মধ্যে শঙ্কা, সুকন্যা ঠিক আছেতো! দরজায় কড়া নাড়তেই সুষমাদি দরজা খুলে দিল। আমি তার হাতে ওষুধ গুলো দিয়ে সুকন্যাকে খাইয়ে দিতে বললাম। ওষুধ খাওয়ানোর পর সে গামছা এনে আমার মাথা মুছে দিল। আমার শরীর ভিজে জবজবে হয়ে আছে। সে গেঞ্জিটা খুলে শরীর মুছে দিতে চাইলে আমি না করলাম। শেষে আমি নিজেই মুছে নিলাম। রান্না ঘর, শোবার ঘর করতে করতে সেও ততক্ষণে ভিজে জবজবে হয়ে গেছে। শরীরের সাথে লেপ্টে গেছে পরনের শাড়ি। আমি সেদিকে না তাকিয়ে সুকন্যার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলাম। এক ফাঁকে সুষমাদিকে বললাম, তুমিতো ভিজে একাকার হয়ে আছ। এভাবে বেশিক্ষণ থাকলে নিজেই অসুখে পড়বে, তখন তোমাকে দেখবে কে? সে এতো কষ্টের মধ্যেও ঠোটে হাসির রেখা টেনে বললো, কেন তুমিতো আছোই! আমি বললাম ঠাট্টা রেখে মাথা মুছে শাড়ী পাল্টে নাও। এর পর কতক্ষণ কেটেছে জানিনা। এক সময় অনেকটা স্বাভাবিকের মত সুকন্যা ঘুমিয়ে গেল। কপালে হাত দিয়ে দেখলাম জ¦র কমে এসেছে। রাত হয়তো পোহাতে চলেছে, আর থাকা ঠিক হবেনা ভেবে সুষমাদিকে বললাম এখন আমি যাই, সকাল হয়ে এলো। সে বললো, এইটুকুতো সময়, থেকেই যাও। আমি নানা বিষয় চিন্তা করে বাড়ির পথে হাটতে শুরু করলাম। পিছন ফিরে তাকালে বিদ্যুৎ চমকানো আলোতে হয়তো দেখতে পেতাম আমার চলে যাবার পথে তাকিয়ে আছে সুষমাদি। হয়তো সেটার পরিবর্তে দেখতাম দরজাটা বন্ধ করে ফেলেছে কারো অপেক্ষায় দাড়িয়ে না থেকে।

 

 

পার্ট-৪

 

ভোর হতে বেশি বাকি নেই। বৃষ্টির তোড় কিছুটা কমে এসেছে। বাইরে ফর্সা হতে শুরু করেছে। চোখে ঘুম নেই, ক্লান্তিও নেই। এই সামান্য সময়ের জন্য আর ঘুমাতেও ইচ্ছে করছেনা। সুষমাদির মেয়েটার জ¦র কিছুটা কমেছে। বাড়িতে কেউ নেই ভেবে সুষমাদিকে বলে চলে এসেছি। মেয়েটার জন্য খুব মায়া হচ্ছিল। সুকন্যা ছাড়া সুষমাদি বেঁচে থাকার মত কোন আশা দেখতে পায়না। বাবা হাপানিতে ভুগছে। যে কোন দিন তার ডাক এসে যাবে, তখন সুষমাদি একা হয়ে যাবে। মেয়েটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে সে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখে। আমি যখন সুকন্যাকে রেখে বাড়িতে ফিরে আসছি তখন সুষমাদি বলেছিল, তোমাকে এগিয়ে দেই। আমি নিষেধ করেছি। সে অসুস্থ বাবা এবং কন্যাকে রেখে এই বৃষ্টির দিনে আমাকে এগিয়ে দিতে আসুক সেটা আমিও চাইনি। তাছাড়া সে এগিয়ে দেওয়া না দেওয়া একই কথা। এমন তো নয় সে ছাতা নিয়ে আসবে আমি যেন না ভিজি। আমাকে ভিজতে ভিজতেই বাড়িতে আসতে হয়েছে। সে যদি এগিয়ে দিতে আসতো তবে তাকেও ভিজতে ভিজতেই আসতে হতো। আবার এই গহিন রাতে এতোটা পথ তাকে একাএকা ফিরে যেতে হতো। তার চেয়ে আমি একা চলে এসেছি এই ভাল। বারান্দায় গামছা ঝোলানো ছিল। সেটা দিয়ে ভাল করে মাথা মুছে সারা শরীর মুছেছি। ভিজে একাকার হয়ে যাওয়ায় লুঙ্গি পাল্টে আরেকটা পরতে হয়েছে। পাশ ফিরে শুতেই বার বার একটু আগের স্মৃতি মনে পড়ছে। সুষমাদির বাড়িতে যাওয়ার পর ঘরে ঢুকে সুষমাদিই প্রথম গামছা দিয়ে আমার মাথা মুছে দিয়েছে। আমি নিজেই মুছতে পারতাম কিন্তু সে জোর করে মাথা মুছে দিয়েছে। গা থেকে গেঞ্জি খুলে শরীরটাও মুছে দিতে চেয়েছিল আমি নিজে শরীর মুছেছি। কিন্তু সেই যে মাথা মুছে দিয়েছিল সেই স্মৃতিটুকুই আমার চোখে ভেসে উঠছে। বৃষ্টি শুধু যে আমাকে ভিজিয়েছিল তাতো নয়। সুষমাদিকেও সমানে ভিজিয়েছে। এই বৃষ্টির কোন মায়াদয়া নেই। বৃষ্টিতে ভেজার পর বেশিক্ষণ ওভাবে থাকলে নিশ্চিত কোন রোগ বাধিয়ে বসবে। আমি তাকে বললাম তুমিও মাথা মুছে নাও। আমি ততোক্ষণে সুকন্যার পাশে বসে দেখি কি অবস্থা।

 

আমাদের বাড়িতে দুটো ঘর থাকলেও সুষমাদির বাড়িতে একটাই ঘর। উঠোনের একপাশে একটা ছাপড়া উঠিয়ে রান্নার কাজ চালিয়ে নেয়। একমাত্র ঘরে দুটো রুম। একরুমে তার হাপানিতে কাতর বাবা থাকে অন্যটিতে সুকন্যাকে নিয়ে সে থাকে। আমি যখন সুকন্যার শিয়রের পাশে বসেছি সুষমাদি তখন গামছা দিয়ে ভেজা চুল মুছে নিচ্ছে। তার ঘরের কোন বারান্দা নেই যে আমি গিয়ে সেখানে দাড়াব আর সেই ফাঁকে সুষমাদি ভেজা শাড়ি পাল্টে নেবে। আমারতো মনে হয় পাল্টে নেবার মত শাড়িও তার আছে কিনা সন্দেহ। আমার ঘুম আসছেনা। বৃষ্টির দিনে সকালে পাখিরাও ডেকে ওঠেনা। সুর্যই যেখানে লুকিয়ে থাকে সেখানে পাখিরা কেন ডেকে উঠবে। ভোরের অপেক্ষায় আমার চোখ দুটো জেগে আছে। দুই চোখের পাতা এক করলেই সুষমাদির ঘরের ছবি ভেসে উঠছে। কি মনে করে যেন সুষমাদি আমাকে ডাক দিয়ে বললো নিখিলেশ গামছাটা দিয়ে আমার পিঠটা একটু মুছে দাওতো। আমিও কোন কিছু না ভেবে বাড়িয়ে দেওয়া গামছাটি নিয়ে তার ভেজা পিঠ আলতো করে মুছে দিলাম। সে হাত দিয়ে তার শাড়ীর আঁচল সরিয়ে রেখেছিল। খোলা পিঠ আলো আধারিতে কেমন যেন লাগছিল। কেন যেন সেই দৃশ্যটি চোখের সামনে বার বার ভেসে উঠছে। অথচ তখন কোন কিছুই মনে হয়নি। তার খোলা চুল,বস্ত্রহীন পিঠ কোন কিছুর প্রতি তখন নজর পড়েনি। এক মনে শুধু সুকন্যা নামের ছোট্ট মেয়েটির অসুখের কথা মাথায় ছিল। আর এখন বিছানায় শুয়ে শুয়ে কতনা কথা মনে পড়ছে। মনে পড়ছে যখন গামছা দিয়ে পিঠ মুছে দিচ্ছিলাম তখন তার মধ্যে কেমন যেন কাপুনি ছিল। মুখে এক ধরনের শব্দও ছিল তার। আমি আর ওসব ভাবতে পারিনা। শরীরে শীতল স্রোত বয়ে যায়। বলাইয়ের কথা মনে পড়ে। বলাই হলে কি হতো সেটা কল্পনা করতেই রক্ত হিম হয়ে আসে। মনে মনে ভাবতে থাকি সকালে উঠে কি কি কাজ করার আছে। সব কিছুর মাঝে একটা কথা ঠিকই ভেবে রাখি আর তা হলো সুকন্যাকে একবার গিয়ে দেখে আসা। ছোট্ট রোগাগ্রস্থ মেয়েটিকে রাতে যে অবস্থায় রেখে এসেছি তাতে দিনে একবার না গেলেই নয়। সুস্থ্য থাকতে ছোট্ট মেয়েটি আমাদের বাড়িতেই পড়ে থাকতো। আমার সাথে তার যেন জনম জনমের সম্পর্ক। সে যেন আমার আত্মার আত্মীয়। আমার সাথেই তার সব খুনসুটি। সে আমাকে দেখলে যেন দুনিয়া ভুলে যায়। বাপ মরা মেয়েটার প্রতি তাই আমারও স্নেহ উথলে ওঠে। কলেজ শেষ করে যখন বাড়ি ফিরি তখন একবার হলেও সুকন্যাকে দেখে আসি। ছোট্ট মেয়েটি হয়তো তার অসুস্থ নানার পাশে বসে থাকে নিশ্চুপ হয়ে।

 

বিছানায় এপাশ ওপাশ করতে করতে কতক্ষন পেরিয়েছে জানি না। গোয়ালে বাছুরটা সমানে হাম্বা হাম্বা করে ডেকে চলেছে। নিশ্চই তার বেশ ক্ষুধা লেগেছে। বিছানা ছেড়ে উঠে বসলাম। আড়মোড় ভেঙ্গে দরজা খুলে দেখি বেশ বেলা হয়ে গেছে। আকাশ মেঘলা থাকলেও বৃষ্টি নেই। সারাদিন হয়তো রোদের দেখা পাওয়া যাবেনা তবে বৃষ্টি আসার সম্ভাবনা খুব কম। ভাবছি বাবা মা এবং দিদি কি আজকে ফিরে আসবে? ফিরে না আসলে আমাকে না খেয়েই কাটাতে হবে। অবশ্য ঘরে নাড়ু চিড়ে আছে তা দিয়ে দিন পার করে দেওয়া যাবে। গোয়াল ঘরের দরজা খুলে গাভীটাকে বাইরে এনে খুটার সাথে বাঁধলাম। চাড়িতে জাওন দেওয়া দরকার কিন্তু কোন দিন ওসব দেওয়ার অভিজ্ঞতা আমার নেই। জীবনের রুঢ় বাস্তবতা টের পেতে শুরু করলাম। খুঁজে পেতে গোয়াল ঘরের এক কোণে কিছু খুদ এবং কুড়ো পেলাম। সেটা চাড়িতে পানির সাথে গুলিয়ে দিলাম। কিন্তু ওইটুকু খাবারে আর কিইবা হবে। পালা থেকে কিছু খড় নিয়ে এসে ছোট ছোট করে কাটলাম। সেগুলোও কুড়োর সাথে মিশিয়ে দিলাম। গাভীটা বেশ আরাম করে খেতে শুরু করলো। বাছুরটাও হাম্মা হাম্বা ডাক বন্ধ করে মায়ের বুকে মুখ লাগিয়ে আয়েশ করে দুধ খেতে শুরু করলো। আমি জানি জীবনে প্রথম বারের মত হলেও আমাকে নিষ্ঠুর হতে হবে। একটু খাওয়ার পরই জোর করে বাছুরটাকে সরিয়ে নিতে হবে। তার পর অপটু হাতে দুধ দোয়াতে হবে। ওর মায়ের দুধ ও খাবে এটাই স্বাভাবিক কিন্তু ওর মায়ের দুধের ওপর আমাদেরও জীবন জীবিকা নির্ভর করে অনেকাংশে। ওকে ছেড়ে দিয়ে রাখলে সবটুকু দুধ সে নিমিষে শেষ করে ফেলবে। তাই কিছুক্ষণ পাশে দাড়িয়ে থেকে ওর খাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকলাম। এর পর জোর করে সরিয়ে নিলাম। যে কাজটা কোন দিন করি নি আজ আমাকে সেটাই করতে হবে। দুধ দোয়াতে হবে।

 

মা যখন দুধ দোয়াতো বেশ কয়েক বার কাছে দাড়িয়ে সেটা দেখেছি। আশা করি চেষ্টা করলে পারবো। বাছুরটাকে একটা খুটির সাথে বেধে রেখে দুধ দোয়ানোর পাতিলটা নিয়ে আসলাম। মনে মনে ভাবতে লাগলাম মা সেই সময় কি কি করতো। তার পর ভাল করে ওলানে পালানোর পর যখন দুধ দোয়াতে শুর করবো বলে হাত দিয়েছি তখন অনুভব করলাম কার যেন একটা হাত আমার কাধের উপর এসে পড়েছে। চমকে উঠলাম সাথে সাথে। এ সময় এই সকালে কারো তো আসার কথা নয়। বাবা মা ফিরে আসলেও তাদের সময় লাগবে। পরীর দিঘিতো অনেক দুর। পিছন ফিরে ভুত দেখার মত চমকে উঠলাম। সুষমাদি দাড়িয়ে আছে। আমি আমতা আমতা করে বললাম, সুষমাদি তুমি এখানে, এই সময়ে? তার মুখে তেমন কোন চিন্তার বলি রেখা দেখিনি তখন। তার একমাত্র কন্যা যে গত রাতেও ভীষণ অসুস্থ ছিল সেরকম কোন চিন্তাও তার চেহারায় খুঁজে পাইনি। সুষমাদি একটু হেসে দিয়ে বললো, কাল তুমি আমার মেয়ের জন্য যা করেছ তার ঋণ কোন দিন শোধ হবেনা। মেয়েটা এখন বেশ ভাল আছে। ভাবলাম রাতে একা একা ভিজতে ভিজতে চলে এলে তোমার আবার জ¦রটর বাঁধলো কিনা দেখেই যাই। সেই সাথে মেয়েটার সুস্থ্যতার খবরটাও দিয়ে যাই। আমার মুখ থেকে শুধু ও শব্দটি বেরিয়ে আসলো। আমাকে সরিয়ে দিয়ে সুষমাদি নিজেই দুধ দোয়াতে শুরু করলো। মুখে যেন তার কথার ফুলঝুরি। তোমাকে দিয়ে কিছুই হবেনা। তবে রাতে তুমি আমাকে যেভাবে বিপদের সময় পাশে থেকে সাহস দিয়েছ তাইবা কয় জন পারে।

 

সুষমাদির যেন কোন তাড়া নেই। সে তার মত করে দুধ দোয়াচ্ছে। আমি বললাম দুধতো আমিই দেয়াতে পারতাম। তুমি আমার কাছে দিয়ে বাড়ি চলে যাও। আমি একাই পারবো। ওদিকে সুকন্যাকে একা রেখে এসেছ। সে আমার কথা শুনলো না। বললো ওকে নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। রাতে বেশি ঘুম হয়নি বলে ও এখন ঘুমাচ্ছে। সকালে উঠে আমি রান্নাও করে রেখে এসেছি। ভাবলাম তোমাকে রান্না করে দেবে কে তাই তোমাকে বলতে আসলাম আমাদের সাথে খেয়ো। আমি কোন কথা বললাম না। সুষমাদি দুধের পাতিলটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে উঠে দাড়াল। তাকে বেশ নির্ভার লাগছে। রাতে ও বাড়ি থেকে ফিরে আসার পর আমার মাথায় আকাশ সমান এলোমেলো চিন্তা ছিল এখন তা আর নেই। আমি চাইছি কেউ আসার আগেই সুষমাদি বাড়িতে ফিরে যাক। হয়তো বিধাতা আমার মনের কথা বুঝতে পারলেন। সুষমাদি নিজ থেকে আমাদের উঠোনটা ঝাড়ু দিয়ে নিজের বাড়ির দিকে রওনা দিলেন। যাওয়ার সময় বললেন, তুমি গোসল করে সোজা আমাদের বাড়ি চলে আসো। এক সাথে খাব। আমি সুষমাদির চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে না থেকে ঘরে ফিরে গেলাম। রাস্তায় কেউ যদি দেখে সুষমাদি আমাদের বাড়ির দিক থেকে সাত সকালে যাচ্ছে তাহলে কথা শুনতে হবে। আমার হাতে অনেক কাজ। দুধ নষ্ট হয়ে যাবে তাই ঘরে তালা লাগিয়ে রাড়িখালি বাজারের দিকে রওনা দিলাম। সমস্যা একটাই,আমি বাজারে থাকা কালিন সময়ে যদি বাবা মা ফিরে আসে তবে ঘরে ঢুকতে পারবে না। চাবিতো থাকবে আমার কাছে।কিন্তু দুধ নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়ে আমি সাথে সাথেই রওনা হয়ে গেলাম। ভুলে গেলাম সুষমাদির বাড়িতে সকালে খেতে যাওয়ার কথা।

 

 

পার্ট–৫

 

বাজারে যাওয়ার পথে হঠাৎ মনে পড়লো আমি তো দুধের দাম দর কিছুই জানিনা। তাহলে কিভাবে বিক্রি করবো। ষোল বছর বয়স হয়ে যাওয়ার পরও আমি কোন দিন কিছু বিক্রি করতে বাজারে গিয়েছি বলে মনে পড়েনা। সাত পাঁচ ভাবছি আর হাটছি। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল যাওয়ার পথে বলাইকে সাথে করে নিয়ে যাই। কিন্তু বলাইয়ের সাথে আমার কথা বলা বন্ধ। সে আমার ভাল বন্ধু ছিল কিন্তু তার সাথে আমি ইচ্ছে করেই কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছি। তাহলে একমাত্র উপায় হলো মহিতোষ জেঠু। বাজারে গিয়ে তার থেকে জেনে নিতে হবে দুধের বর্তমান দাম কত। দুধ দোয়ানোর পর মেপে দেখেছি তিন সের দুধ হয়েছে। যা বিক্রি হবে তার থেকে কিছু টাকা দিয়ে বাজার করতে হবে যেন বাবা মা দিদি ফিরে আসার পর রান্না বসাতে পারে। এমনিতেই আমার নাম হয়ে গেছে অলস অকম্মা। একটি মাত্র দিন বাবা মা আমার হাতে ছোট্ট সংসারটা রেখে গেছে সেটাই যদি গুছিয়ে সামলে রাখতে না পারি তবে সম্মানের ছিটেফোটাও থাকবেনা। অবশ্য বাবা মা কিংবা দিদির সামনে আমার সম্মান অসম্মানের কিছু নেই। আমি অলস হলেও তারা আমাকে ভালবাসবে আমি কর্মঠ হলেও তারা আমাকে ভালবাসবে। রাজপরিবারে জন্ম নিলে আমি না জানি কোন হালে চলাফেরা করতাম।

 

বাজারের পথে দুধের ঢালুন নিয়ে হাটছি আর লজ্জায় যেন লাল হয়ে যাচ্ছি। মনে হচ্ছে কেউ দেখে ফেললেই আমার সম্মানের বারটা বাজবে। কিন্তু আমি এও জানি যে যত জনই দেখুক কেউ একটু অবাকও হবে না। এখানে, এই গায়ে, এই মাঝি পাড়া থেকে শুরু করে ওদিকের মালোপাড়া পার হয়ে চৌধুরী পাড়া থেকে শুরু করে পুরো গ্রাম চক্কর দিলেও কেউ কিছু মনে করবেনা। খেটে খাওয়া মানুষ সবাই। তার পরও কেন যেন সংকোচ বোধ করছিলাম। কানাই লাল স্যারের বাড়ি বাজারে যাওয়ার পথেই পড়ে। স্যার যদি দেখে আমি দুধ বিক্রি করতে যাচ্ছি তবে আর যাই হোক মহা খুশি হবেন। তিনি ধরেই রেখেছেন যে আমাকে দিয়ে কেউ কোন দিন কিছু করাতে পারবে না। ভুল করে নাকি ইংল্যান্ডের রাজপরিবারের পরিবর্তে আমার জন্ম হয়েছিল এই দরিদ্র পরিবারে। সত্যি সত্যি আমি যখন কানাই লাল স্যারের বাড়ির কাছাকাছি এসেছি তখন দেখি বাড়ি থেকে কানাই লাল স্যার বের হয়েছেন বাজারে যাবেন বলে। তার চোখে মোটা কাচের চশমা। চশমার ওপাশে দুটো কোটরাগত চোখ। কিন্তু সেই চোখ আশ্চর্য নির্লিপ্ত মায়া ভরা। কোনো দিন স্যার আমাকে বকেন নি। সব সময় আদর করেছেন ভালবেসেছেন। দরিদ্র পরিবারে আমাদের সবার জন্ম হলেও স্যার আমাদের বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখাতেন। কোন কিছুকে নেগেটিভলি নিতেন না। আমাকে দেখে তিনি থামতে বললেন। প্রথমে চোখ থেকে চশমাটা খুলে পরনের ধুতিতে কয়েকবার মুছে নিলেন। তার পর চশমাটাকে যায়গা মত বসিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আশ্চর্য হয়ে বললেন আরে নিখিলেশ নাকি। কি আশ্চর্য! কি আশ্চর্য! তোমার হাতে দুধের ঢালুন দেখছি। এর চেয়ে ভাল খবর আর কি হতে পারে যে, নিখিলেশ শেষমেশ কিছু একটা বিক্রি করতে বাজারে যাচ্ছে।

আমি লজ্জায় লাল হয়ে উঠলাম। তিনি কইগো বলে তার স্ত্রীকে ডাকলেন। আমার হাত ধরে বাড়ির ভিতর নিয়ে গেলেন। আমার কি করা উচিত বুঝে উঠতে পারছিলাম না। স্যার আমাকে উঠোনে একটা টুলের উপর বসতে বললেন। পাশেই আরেকটা টুল নিয়ে নিজেও বসলেন। আমি আতি উতি করছি ছুটে বের হওয়ার জন্য। কানাই লাল স্যার অত্যন্ত জ্ঞানী মানুষ। তিনি বুঝলেন কেন আমি আতিউতি করছি। তিনি কাকিমাকে ডাকলেন। কাকিমা কাছে আসতেই আমি প্রনাম করলাম। কাকিমার সাথে আমার মাঝে মাঝে কলেজে যাওয়া আসার পথে কথা হয়। স্যার আগ বাড়িয়ে বললেন দেখ সুর্য আজ কোন দিকে উঠেছে। আমাদের নিখিলেশ দুধ বিক্রি করতে বাজারে যাচ্ছে। যাও ওকে ঘর থেকে দুটো নাড়ু চিড়ে এনে দাও। আমি জানি এখন খাওয়ার সময় নয় তার পরও স্যার যেভাবে ধরেছেন না খেয়ে বের হতে পারবো না। কাকিমা নাড়ু চিড়ে নিয়ে আসার পর আমাকে খেতেই হলো। এক ফাঁকে স্যার বললেন আমিও বাজারে যাচ্ছিলাম দুধ কিনবো বলে।তোমার ঢালুনে কতটুকু আছে? আমি জানালাম তিন সের। কানাই লাল স্যার কিছু একটা ভেবে নিয়ে বললেন আমার যদিও অত লাগবেনা তার পরও আমাদের নিখিলেশ প্রথম কিছু একটা বিক্রি করতে যাচ্ছে সেই উপলক্ষে তিন সের দুধই আমি কিনে নিলাম। স্যারের কথা শুনে আমি যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। অন্তত দুধ নিয়ে বাজারেতো যেতে হচ্ছেনা। স্যার আমাকে অভয় দিয়ে বললেন তুমি চিন্তা করো না, আমি তোমাকে বাড়িতে পেয়ে ঠকাবো না। তুমিতো বাজারে যাবাই তো আমার সাথেই চলো। সেখানে কি দরে বিক্রি হয় সেটা দেখেই তোমাকে দাম মিটিয়ে দেব।

 

মনে মনে স্যারকে প্রনাম করলাম। মনে হচ্ছিল স্যারের পা ধরে প্রনাম করি। নাড়ু চিড়ে মুখে দিয়ে জল পান করে স্যারের সাথে বেরিয়ে পড়লাম। ভাগ্যিস স্যারের সাথে দেখা হয়েছিল। বাজারে কিছু কিনতে গেলে আগে দোকানীই দাম চায়। সেখানে কম বেশি করে কেনা যায়। কিন্তু নিজেই যদি কিছু বিক্রি করতে যাই তবেতো আমাকেই আগে দাম চাইতে হবে। আমি ভেবে উঠতে পারছিলাম না দুধের সের কত করে চাবো। কারো কাছে জিজ্ঞেস করার কথাও ভাবতে পারছিলাম না কারণ সবাই ভাবতো কলেজে পড়ুয়া ছেলে দুধের সের কত তাও জানেনা। স্যারের কল্যানে সব লজ্জা থেকেই বেঁচে গেলাম। এমন কি বলাইকেও আর সাথে নেওয়ার চিন্তা করতে হল না। বাজারে গিয়ে স্যারই নিজে দুধের সেদিনের দর জেনে নিয়ে আমাকে টাকা দিয়ে দিলেন। টাকা নিয়ে স্যারকে প্রনাম জানিয়ে চাল,তেল,লবন,মরিচ আর শবজি কিনে বাড়ির পথে রওনা হলাম। বাজার থেকে বের হওয়ার পর মনে হলো যাওয়ার পথেই তো সুষমাদির বাড়ি। অসুস্থ্য সুকন্যাকে রাতে ওই অবস্থায় রেখে আসার পর এখন কি অবস্থায় আছে তা জানিনা। বাচ্চাটার জন্য এক টাকার সন্দেশ কিনে নিয়ে গেলে সে খুশি হবে। আবার ফিরে গিয়ে মহিতোষ জেঠুর দোকান থেকে এক টাকার সন্দেশ কিনে নিলাম। এতোক্ষণে বাবা মা দিদি নিশ্চই ফিরে এসেছে। তারা যেভাবে আমার কাছে বাড়ি রেখে গিয়েছিল এসে দেখবে কোন কিছুই সেভাবে নেই। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে কানাই লাল স্যারের বাড়ির কাছে আসার পর মনে পড়লো দুধের ঢালুনটা নিয়ে যেতে হবে।

আমি আবার স্যারের বাড়ির ভিতরে গিয়ে কাকিমা বলে ডাক দিলাম। কাকিমা সম্ভবত রান্না ঘরে ব্যস্ত ছিল। আমার ডাক শুনতে পেলো কিনা জানিনা, তবে ঘর থেকে উকি দিল চৌদ্দ পনের বছরের এক বালিকা। তার চোখে চোখ পড়তেই সে চোখ সরিয়ে নিল। মেয়েটিকে তো আমি আগে কখনো দেখি নি। মুহুর্তের মধ্যেই ভাবনার সাগরে ডুবে গেলাম আমি। আমি আবার কাকিমা বলে ডাক দিলাম কিন্তু আমার চোখ ছিল বারান্দায় লাজুক চোখে ঠায় দাড়িয়ে থাকা বালিকাটির দিকে। এবার কাকিমা আমার ডাক শুনে বেরিয়ে এলেন। ও নিখিলেশ! বলে তিনি রান্না ঘর থেকে ঢালুনটা নিয়ে এসে আমার হাতে দিলেন। আমার চোখের দৃষ্টি অনুসরণ করে তার চোখও তখন বারান্দাতে নিবদ্ধ হল। আমাকে বললেন আমার মেয়ের ননদ। একটু আগেই এসেছে। এবার ম্যাট্টিক পরীক্ষা দিয়েছে। অঞ্জলী নাম ওর। তার পর কাকিমা আমার দিকে দেখিয়ে বলল এ হলো আমাদের নিখিলেশ, খুব ভাল ছেলে,কলেজে পড়ে। আমি মনে মনে ভাবলাম মেঘ না চাইতেই জল। আমিতো কিছুই জানতে চাইনি, কিন্তু কাকিমা আমার মনে কথা পড়ে ফেলে সব বলে দিয়েছে। সেই সাথে আমার প্রশংসাও করেছে।

 

মনে হচ্ছিল বাড়ি ফিরে গিয়ে আর লাভ কি! এখানেই থেকে যাই। এ আকাশের অসীম ছায়াতলে রোদ বৃষ্টিতে ভিজে একাকার হয়ে দাড়িয়ে থাকি কারো জন্য অনন্ত অপেক্ষায়। কাকিমা আমাকে খোঁচা দিয়ে বললেন তাড়াতাড়ি বাড়ি যা,তোর মা আর দিদিকে দেখলাম বাড়ির দিকে যেতে। আমি সম্বিত ফিরে তাকিয়ে দেখি বারান্দাটা খাঁ খাঁ শুন্য। একটু আগেও ওখানে যে কেউ একজন ঠায় দাড়িয়ে ছিল তা আর মনেই হচ্ছেনা। চপল পায়ে সে হেটে চলে গেছে। যাওয়ার আগে রেখে গেছে স্নিগ্ধ পদচিহ্ন। আমি যতই পা চালাই পা যেন আর চলতেই চায়না। বার বার পিছনে ফিরে তাকাই কারো মুখ দেখার আশায়, কিন্তু আমাকে হতাশই হতে হয়। শেষ বার যখন তাকিয়েছি তখন কানাই লাল স্যারের ঘরের জানালায় অবিরাম হাসি মুখ। হাসি মুখে আনন্দ। সব মায়া কাটিয়ে বাড়ির দিকে রওনা হই। উঠোনে পা রাখতেই মনে পড়ে সুকন্যার কথা। বাচ্চাটাকে সারা দিনে একবারও দেখতে যাওয়া হয়নি। বাজার থেকে আসার সময় মহিতোষ জেঠুর দোকান থেকে আনা এক টাকার সন্দেশও পড়ে আছে পকেটে। আমাকে বাজার নিয়ে ফিরতে দেখে মায়ের মুখে ভুবোন ভোলানো হাসি। দিদিকেও খুব খুশি দেখাচ্ছে। বাবা সম্ভবত ফেরেনি। তকে আশেপাশে কোথাও দেখছিনা।

আমার এক হাতে বাজারের ব্যাগ। কাছে যেতেই মা আমার মুখে, শরীরে হাত বুলিয়ে দিয়ে আদর করলেন। বললেন আহ আমার মানিক চান এক দিনেই দেখ কেমন শুকিয়ে গেছে। ঠিক মত ঘুম হয়নি একা একা তাই নারে। আমি বলি মা সুকন্যার খুব অসুখ। রাতে একবার গিয়েছিলাম ওকে দেখতে। তার পর সুখেন বাবুর কাছ থেকে ওর জন্য ওষুধ এনে দিয়েছি। এখন সম্ভবত একটু ভাল আছে। আমার কথা শুনে মায়ের মুখটা যেন আরো উজ্জল হয়ে উঠলো। সে আমাকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে বললো আমার ছেলেটা কত ভাল কাজ করেছে। কে বলেছে আমার ছেলেকে দিয়ে কিছু হবে না? সে হলো সোনার টুকরো ছেলে। আমি মায়ের আলিঙ্গন থেকে নিজেকে মুক্ত করে দিদির হাতে বাজারের ব্যাগটা দিয়ে দুধ বিক্রির বাকি টাকা মায়ের হাতে দিলাম। সেখান থেকে মা আমাকে পাঁচ টাকার একটা নোট দিল। আমি সেটা না নিয়ে ফিরিয়ে দিতে দিতে বললাম মা রেখে দাও পরে অনেক কাজে লাগবে। আনন্দে সম্ভবত মায়ের চোখে জল চলে আসলো। আমি সেই জল গড়িয়ে পড়ার অপেক্ষা না করে মাকে বললাম সুকন্যার জন্য একটু সন্দেশ এনেছিলাম সেটা দিয়ে আসি আর ওকে দেখে আসি।

 

সুষমাদির বাড়ির উঠনে পা রাখতেই টের পেলাম সুকন্যা বেশ সুস্থ হয়ে উঠেছে। সে মায়ের সাথে আধো আধো বুলিতে কথা বলছে। আমি গলা খাকারি দিয়ে সুকন্যার নাম ধরে ডাক দিলাম। শুনতে পেলাম সে বলছে মামা এসেছে। শব্দটা সে হয়তো পুরোটা উচ্চারণ করতে পারেনি কিন্তু আমার কানে সেটা পুরাটাই শোনা গেছে। ঘরে ঢুকে সুকন্যার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে হাতে সন্দেশ দুটো ধরিয়ে দিতেই তার মুখটা খুশিতে ভরে উঠলো। শরীরটা এখনো বেশ ক্লান্ত। ওইটুকু শরীরের উপর দিয়ে অনেক ধকল গেছে। বমি আর জ¦রে সে কাহিল ছিল। সুষমাদির কন্ঠে তখন অভিমানের সুর। তোমাকে বললাম গোসল সেরে আমাদের বাড়ি আসো এক সাথে খাবো কিন্তু তোমার টিকিটিরও দেখা পেলাম না। আমি সুষমাদিকে সবিস্তার জানালাম। শুধু বাদ রাখলাম কানাই লাল স্যারের ঘরের জানালায় দেখা অবিরাম হাসিমুখের কথা। কথা বলতে বলতে সুষমাদি ভাত বেড়ে আমার সামনে রাখলো। আমি না করার পরও সে জোর করলো আমাকে খেতেই হবে। শেষমেশ খেয়ে আবার বেরিয়ে গেলাম। রাতে যখন বাড়িতে ফিরলাম বাবা তখনো ফিরে আসেনি। রাতে বাবা যখন ফিরবে তখন মা নিশ্চই বাবাকে তার ছেলের প্রশংসায় ভাসিয়ে দিবে।

 

 

পার্ট-৬

বলাইয়ের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছি। ওকে নিষেধ করেছি ও যেন ভুলেও কোন দিন আমাদের বাড়িতে আর না আসে। ও আসলে আমাদের বাড়িতে আসতো অন্য উদ্দেশ্য নিয়ে। প্রথম প্রথম গা করতাম না কিন্তু একসময় বিরক্তি চরমে উঠলে সরাসরি নিষেধ করে দিলাম। একদিন মা জিজ্ঞেস করলো হ্যারে বলাই দেখি খুব ঘন ঘন তোর কাছে আসে ব্যাপার কি? কি নিয়ে এতো কথা বলিস তোরা? আমি মাকে কি করে বলি। শেষে বলাইকে সরাসরি বললাম তুই আর আজ থেকে আমার বন্ধু না। আমার সাথে কথা বলবিনা, আমাদের বাড়িতেও আর আসবিনা। আমার কথা শুনে বলাইয়ের মন খারাপ হয়েছিল কিনা জানিনা কিংবা রাগ করেছিল কিনা তাও জানিনা। তবে তার পর থেকে সে আমাদের বাড়িতে আর আসেনি। আমি আর বলাই বিনোদপুর কলেজে একসাথেই পড়ি। কলেজে আমি নিয়মিত যাই বা না যাই বলাই ঠিকই নিয়মিত কলেজে যায়। পড়াশোনায় সে আমার থেকে খুব একটা ভাল ছিলনা কোন কালেও তবে সে কলেজে নিয়মিত যায় অন্য কারণে। বলাইয়ের সাথে কথা বলতে আমার কেমন যেন ঘেন্না হয়। ভাল কিছু তার মুখে কোন দিন আসে না। একদিন সে ব্যাগ থেকে দেখি একটা বই বের করেছে। বইয়ের কভারে অরুচিকর ছবি দেওয়া। সে সেই বইটা ক্লাসের অন্যদের দেখিয়ে কত রকম হাসি ঠাট্টা করেছে। রনজু রসিয়ে রসিয়ে বলেছে কিরে এতোদিন শুনেছি মানুষ বীজ গণিতের সুত্র মুখস্থ করে আর তুই শেষ পযর্ন্ত কামসুত্র মুখস্থ করছিস। এটা শুনে অন্যরা তখন সেকি হাসাহাসি।

 

আমার গা গুলিয়ে আসে। আমি সেই থেকেই ওকে এড়িয়ে চলতে শুরু করেছি। কিন্তু সে আমার বাড়ি অব্দি এসেছে। কানের কাছে বার বার ফুস মন্তর দিয়েছে। সে ওই বইটার চ্যাপ্টার গুলো প্রায় মুখস্ত করে ফেলেছে। কতই বা বয়স হবে ওর বা আমার। ষোলতে পড়েছি আমরা। একদিন বিকেলে আমি বসে আছি আমার ঘরে। জানালা বন্ধ করে বিছানায় শুয়ে আকাশ পাতাল ভাবছি। সেই সময় কোথা থেকে যেন বলাই এসে হাজির। আমার টেবিলের বসে হুট করে জানালাটা খুলে দিতেই বাইরের স্নিগ্ধ বাতাস ঢুকে গেল। একটু আগে যে ঘরটা অন্ধকার ছিল সেটা আলোকিত হলো। বলাই আমার দিকে না তাকিয়ে সোজা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বললো আহ কী অপরুপ দৃশ্য!। এমন দৃশ্য জনম জনম ধরে দেখে গেলেও সাধ মেটেনা। আমি অবাক হয়ে ভাবি এই জানালা দিয়ে আমিতো রোজ তাকিতে থাকি, কই আমার কাছেতো সেরকম কিছু মনে হয়না। জানালাটা খুললেই পুকুর সেই পুকুরে হয়তো স্বচ্ছ নীল জল আছে, হয়তো ভাল করে তাকালে সেই জলের নিচেয় ভেসে বেড়ানো শোল, গজারের ঝাক দেখা যাবে। হয়তো ফুস করে ভেসে উঠতে দেখা যাবে একটা টাকি মাছ তাকে ধিরে থাকবে তার হাজার খানেক ছানাপোনা। কিংবা দেখা যাবে দুটো হাস সমানে সাতার কাটছে। বিকেলের আলো টুকু আছড়ে পড়বে পুকুরের জলে আর সেটা চিকচিক করবে। এই দৃশ্য দেখে দেখে আমিতো ক্লান্ত। একবার দেখার পর আর দেখতে ইচ্ছে হয়না।

আমি বলি প্রথম দেখছিস তো তাই ওরকম মনে হচ্ছে। দু’দিন দেখলেই দেখবি সব ঘোলাটে হয়ে গেছে। ফোড়ন কেটে বলাই বললো তাহলে তুই নিশ্চই রোজ দেখিস! একদিনও বলিসনি এটা। আমি অবাক হয়ে ভাবি এটা বলার কি আছে। জানালা খুললেইতো রোজ ওই একই দৃশ্য চোখে পড়ে। আমি পাশ ফিরে শুই। ওর সাথে কথা বলতেই আর ইচ্ছে হয়না। কিছুক্ষণ পর বলাই নিজেই উঠে আসে। জানালাটা বন্ধ করে দিয়ে আমার বিছানার পাশে এসে বসে। মাথার চুলে বিলি কেটে দিয়ে বলে দোস্ত তোর এই জানালা খুললে যে সৌন্দর্য দেখা যায় তা স্বর্গের সৌন্দর্য থেকে কোন অংশে কম নয়! আমি হাসি আর বলি, আমি কি করে জানবো স্বর্গের সৌন্দর্য কেমন হয়। আমিতো আগে কখনো সেখানে যাইনি। বলাই আহ্লাদে আটখানা হয়ে বলে, দোস্ত আমি যদি এই সৌন্দর্য রোজ দেখতে পেতাম! তার পরদিন থেকে বলাই রোজ আসতে শুরুকরলো। একই সময়ে আসে, কিছুক্ষণ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকে, তার পর চলে যায়। কোন কোন দিন বলে, আজকে বাইরেটা ধুসর বর্ণহীন! আমি বাইরে তাকিয়ে দেখি আর দশটা দিনের সাথে কোন পার্থক্য নেই। তার পরও বলাইয়ের চোখে তা ধুসর বর্ণহীন লাগে কেন জানি না। সেই একই রকম অন্য একটা দিন জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকার সময় তার যেন চোখের পলকই পড়েনা। কিছু জিজ্ঞেস করলেই বলে, আহ! বিরক্ত করিস না। এই সৌন্দর্য দেখার সময় বিরক্ত করা ঠিক না। এটাতো আর সুর্য নয় যে, রোজ উঠবে আর দেখবো। তাছাড়া সুর্যের মধ্যে সৌন্দর্য বলেও কিছু নেই।

 

আমার বেশ অবাক লাগে। কিছুটা সন্দেহ হয়। কি এমন দৃশ্য দেখে বলাই! যা আমি দেখি না,যা আমাকে আকৃষ্ঠ করে না। আমি বিছানা ছেড়ে উঠে দাড়াই। বলাই যে দিকে অপলোক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সেদিকে দৃষ্টি ফেলি। যত দুর চোখ যায় সবুজের সমারোহ। পুকুরের জলে তখন দু’টো হাস অবিরাম সাতার কাটছে। এর বাইরেতো আর কিছুই চোখে পড়ে না। আমি ফোড়ন কেটে বলি দেখলামতো তোর অবিরাম সৌন্দর্য। আমাকেতো মুগ্ধ করতে পারলোনা। এই বলে আমি জানালাটা বন্ধ করে দিলাম। কি একটা কাজে মা ডাক দিতেই বলাইকে রেখে বাইরে বেরিয়ে এলাম। দেখলাম সুষমাদি ভেজা কাপড়ে আমাদের উঠোন পেরিয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছে। আমার চোখটা সাথে সাথে আমার রুমের দরজায় গিয়ে স্থির হলো। সেখানে ঠায় দাড়িয়ে আছে বলাই। বলাইয়ের চোখ তখন সুষমাদির চলে যাওয়া পথের  দিকে নিবদ্ধ। আমার আর বুঝতে বাকি রইলো না। রোজ সুষমাদি যখন গোসল করে জানালা খুলে বলাই সুষমাদির দিকেই তাকিয়ে থাকে। সেই দৃষ্টিতে কাম ছাড়া আর কিছু থাকেনা। মা আবার ডাক দিতেই আমি ছুটে যাই। মা আমাকে ডেকে বলাইয়ের কথাই বলে। জানতে চায় রোজ বলাই এই সময়টাতে কেন আসে। কি বলতে চায় সে। আমি কিছু বলতে পারি না। একটু আগে দেখা ঘটনাটা আমাকে পরিস্কার বুঝিয়ে দিয়েছে বলাই কেন আসে। কিন্তু সেটাতো মাকে বলা সম্ভব নয়। আমি ঘুরিয়ে বলি, মা ওর কিছু পড়া আমাকে দেখিয়ে দিতে বলে। মা খুশি হয়। মনে মনে নিশ্চই ভাবে আর যাই হোক ছেলেটা আমার বিদ্যাসাগর হচ্ছে!

 

একবার মনে হলো সুষমাদিকে বলি এই পুকুরে গোসল করতে না আসতে। আবার মনে হলো পুকুরটাতো আমাদের না। কেন তবে সুষমাদিকে নিষেধ করবো। তাছাড়া এখানে গোসল না করলে সুষমাদি কোথায় গোসল করবে। আসে পাশেতো আর কোন পুকুর নেই। তাকে যেতে হবে মালো পাড়াতে মুখুজ্জদের পুকুরে। সেখানে এক সাথে কত  ছেলে বুড়ো গোসল করে তার ঠিক নেই। তাদের কারো কারো বাকা চাহনি সুষমাদিকে কুরে কুরে খাবে। তার থেকে বরং ভাল হয় বলাইকেই আসতে নিষেধ করলে। পরদিন কলেজে গিয়ে বলাইকে নিষেধ করি তুই আর আমাদের বাড়িতে আসবি না। মা নিষেধ করেছে তুই যেন আমাদের বাড়িতে না যাস। আমি মুখের উপর একটা মিথ্যে কথা বলে দিই। এছাড়া আর করার কিছু ছিল না আমার। আমার মা যে বলাইকে যেতে নিষেধ করতে পারে এটা বলাইও বিশ্বাস করতো না। তার পরও সে আর কোন কথা বাড়ায়নি। তাই বলে সে আসা থামিয়ে দেয়নি। সে বরং সুষমাদিদের বাড়ির কাছাকাছি এসে কাউকে না কাউকে পাঠিয়ে দিত আমাকে ডাকার জন্য। আমার ইচ্ছে করতো না ওর সাথে দেখা করতে। তার পরও যেতাম। বলাইয়ের চোখ সারাক্ষণ সুষমাদির উঠোনে নিবদ্ধ থাকতো।

একদিন সুষমাদি উঠোনে বসে কি যেন করছিল। তার পরনে ছিল একটা ছেড়া শাড়ী। সেই শাড়ীর আঁচল দিয়ে শরীরটা কোন মত ঢাকতে পারলেও পিঠ খালিই থেকে যায়। যেখানে পেট পুরে দু’বেলা খাবারের জন্য চুলোই জ¦লেনা সেখানে এর বেশি আর কিইবা করতে পারতো সুষমাদি। বলাইয়ের কামুক চোখে সেই দৃশ্য মধুর লাগে। সে দৃষ্টি যেন ফেরাতেই পারে না। বিষয়টা আমার চোখ এড়ায়নি। আমি জোর করে ওকে সরিয়ে নিয়ে যাই। এখন আমার হাতে একটাই মাত্র পথ খোলা আর তা হলো লজ্জার মাথা খেয়ে বলাইয়ের বাবাকে সব খুলে বলা। বলাই কথায় কথায় অনেক বার সুষমাদির শরীর টেনে এনেছে আমি কিছু বলিনি। আমি কিছু বলতে গেলে সেটা আরো বেশি ঘোলা করে ফেলবে ভেবেই বলি নি। কিন্তু ওর দৃষ্টি আমার মোটেও সহ্য হতো না। সুষমাদির বয়স আর কত হবে আঠারতে পড়েছে সবে মাত্র। বিয়ের তিন বছরের মাথায় তার স্বামী মারা যায়। বাবাও না থাকার মত অবস্থা। চোখে কম দেখে, কানেও শোনে না বলা চলে। সারাদিন বিছানায় শুয়ে শুয়ে শেষ বিদায়ের প্রহর গোনে। বাড়ীর পাশের জমিটুকুতে শাকসবজি আবাদ করে নিজেদের খাওয়ার কাজ চালিয়ে বাকিটা বাজারে বিক্রি করে কিছু টাকা পাওয়া যায়, যা দিয়ে সংসার চলে না। তাই সুষমাদি মাঝে মাঝে এখানে সেখানে এর ওর বাড়িতে সাংসারিক কাজ করে কিছু কিছু আয় করতে চেষ্টা করে। কিন্তু সেই সামান্য আয় দিয়ে তিনজনের সংসার আর কতইবা চলে। তার ওপর ঘরে একজন অসুস্থ্য রোগী।

যে বয়সে স্বামী সোহাগে থাকার কথা, সেই বয়সে সংসারের ঘানি টানতেই তার দিন পার হয়। মেয়ের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তাকে কাজ করতে হয়। মানুষের লোলুপ দৃষ্টি এড়িয়ে বেঁচে থাকাও দুরুহ ব্যাপার। রমা কাকি কয়েক বার বলেছে আরেকটা বিয়ের কথা, কিন্তু সুষমাদি কানে তোলেনি। শেষমেশ রমা কাকিও বলা ছেড়ে দিয়েছে। সে এক কথার মানুষ। ভাল কথা বলার পর যদি কেউ না শোনে তবে রমাকাকি আর সেধে তাকে বলতে যায় না। তার ভাষায় নিজের খেয়ে পরে বনের মোষ তাড়িয়ে লাভ কি। কিন্তু দিন সব সময় একরকম যায়না। আকাশের রঙ যেমন ক্ষণে ক্ষণে বদলায় তেমনি মানুষের জীবনের রঙও বদলায়। মানুষের জীবনে সুখ দুঃখ পাশাপাশি অবস্থান করে। তবে কারো কারো জীবনে সম্ভবত দুটোর যে কোন একটার উপস্থিতিই চোখে পড়ে। এ গায়ের মানুষের মনে সুখ কতটা আছে তা কেউ বলতে পারবে না। সবাই সুখে থাকার অভিনয় করে চলেছে নিরন্তর। সুখে থাকার অভিনয়ের মধ্যেই যেন সব সুখ লুকিয়ে আছে। এক সকালে সবাইকে মুক্তি দিয়ে সুষমাদির বাবা বিদায় নিলে তার দুই কুলে আর কেউ রইলো না। ঘরে সামর্থহীন বাবা ছিল তাতেই তার ভরসার একটা জায়গা ছিল। নেকড়ে গুলো ভিড়তে সাহস পেতো না। চিতায় ওঠার সাথে সাথে তাই তার চিন্তা আরো বেড়ে গেল। সেই চিন্তাটা নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার চিন্তা। শশ্মান থেকে আমরা যখন ফিরে এসেছি সে তখন পা ছড়িয়ে বসে ছিল। তার একমাত্র মেয়ে সুকন্যা মায়ের পাশে নির্বাক চোখে মাকে দেখছিল। আকাশে এক ঝাক বুনো পায়রা ডানা ঝাপটে উড়ে গেল। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে চারদিক খা খা শুন্যতা যেন গ্রাস করে নিতে শুরু করলো। দুর থেকে ভেসে আসতে লাগলো ডাহুকের সকরুন সুরে ডাক।

 

পার্ট-৭

আমাদের দুধের গাভীটাকে অবশেষে বিক্রি করে দিতে হলো। এ ছাড়া বাবার হাতে আর কোন উপায় ছিলনা। দিদির বিয়ে ঠিক হয়েছে। যৌতুকের কোন বিষয় নেই তার পরও বর পক্ষকে আপ্যায়নের জন্য খরচতো কম নয়। তারা বলেছে ত্রিশজন আসবে। যেখানে তিনজনের পেট পুরে খাবার জোগাড় করার সামর্থই আমাদের নেই সেখানে ত্রিশজন নতুন মেহমানকে খাওয়ানোর ক্ষমতা বাবা কোথায় পাবে। শেষে কোন উপায়ান্ত না দেখে আমাদের আয়ের অন্যতম উৎস দুধেল গাভীটাকেই বিক্রি করে দিতে হলো। মা নিজ হাতে গরুটিকে যন্ত করে গোসল করিয়ে দিলো। দিদি তখন পাশেই দাড়িয়ে ছিল। টাকা পয়সার অভাবে দিদির বিয়েটা অনেক দেরি হয়ে গেছে। অনেকবার বিয়ের কথা উঠলেও দিদি সংসারের নানা চিন্তা করে অমত করেছে। সেই করতে করতে বয়স আঠার হয়ে গেছে। গরীব ঘরে চৌদ্দ পনের বছর বয়সী মেয়েই বোঝা সেখানে আঠারোতো ঢের বেশি। বাবা মা তাই আর দেরি করতে রাজি হয়নি। ভাল সম্মন্ধ দেখে দিদির বিয়ের আয়োজন করা হয়েছে। গরুটাকে গোসল করানোর সময় মায়ের চোখে জল ছিল,দিদির চোখেও জল চিকচিক করছিল। এতো আদরের ছিল গাভীটা যে, তার জন্য সবার মনেই মায়া জন্মে গেছে। সে যে শুধু দুধ দিতো তাই নয়, সে দুধ দিয়ে এ পরিবারের চারজন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখতো।

 

আমি যখন গরুটার রশি ধরে হাটের দিকে হাটতে শুরু করেছি দিদি আর মা বেশ কিছুদুর হাটতে হাটতে আমাদের পিছু পিছু আসলো। শত্রুজিৎপুর হাটে যাওয়ার পর আমাদের খুব বেশি দেরি করতে হয়নি। নারানপুরের আব্দুল করিম শেখ আমাদের গরুটিকে কিনে নিয়ে গেল। সম্ভবত গরুটিরও আমাদের প্রতি মায় পড়ে গিয়েছিল। সে বার কয়েক হাম্বা হাম্বা করে ডাক দিল। যেন বলতে চাইলো এভাবে আমাকে পর করে দিলে। কিংবা হতে পারে সে তার একমাত্র বাছুরটিকে ছেড়ে যাচ্ছে বলে তার কষ্ট হচ্ছে। মানুষ বড়ই নিষ্ঠুর হয়ে তার চোখে ধরা পড়ছে। মা এবং সন্তানকে আলাদা করে দেওয়ায় নিশ্চই তার মনে অনেক ক্ষোভ। আমার চেয়েও সম্ভবত বাবার মনে দুঃখটা বেশি। গরু বিক্রি করতে আসার সময় শেষ বারের মত ঢালুনে করে দুধটুকুও নিয়ে এসেছিলাম। দুধ বিক্রির পর বাবা ঢালুনটা আর বাড়িতে নিলেন না। বুঝলাম বাবার অনেক কষ্ট হচ্ছে। দিদির জন্য লাল বেনারসি শাড়ী কেনা হলো। পায়ে দেওয়ার জন্য আলতা কেনা হলো। এক গোছা রেশমী চুড়িও কেনা হলো। বর পক্ষ বলেছে তারা হাতের চুড়ি আর গলার হার দেবে। আমাদের গরীবের সংসারে সবটাই বিলাস দ্রব্য। বাবা দিদির জন্য একটা নাকফুল বানাতে দিয়েছিলেন সেটা নিলেন। বরের জন্য একটা আঙটিও কেনা হলো। সব মিলিয়ে সাধের গাভীটি বিক্রি করে যে টাকা পাওয়া গিয়েছিল তার অর্ধেকটাই শেষ হয়ে গেল। বিয়ে বাড়িতে খরচের কোন সীমা পরিসীমা নেই। লিস্ট ধরে ধরে বাকি সব কেনা হলো। বিয়ের আগের দিন রাত পযর্ন্ত সুষমাদি নিজে সাথে থেকে সব কিছু করলেন। দিদিকে সাজিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে মাকে নানা কাজে সহযোগিতা করলেন। তার মত ভাল মনের মানুষ এক জীবনে আমি খুব কম দেখেছি। তার চোখে বড়ই মায়া।মুখের হাসিতে কোন কৃপণতা নেই।

 

বিয়ের দিন সকালে দেখি বলাই এসে হাজির। তাকে এ বাড়িতে আসতে নিষেধ করার পরও সে এসেছে। যেহেতু একমাত্র দিদির বিয়ে তাই আমি আর তাকে কিছু বলতে পারিনি। তার সাথে সাথে শাশ্বত,অনিমেশ নিমাই ওরাও এসেছে। যদিও আমি ওদের কাউকেই দাওয়াত দেইনি। সামান্য আয়োজনে ওদেরকে দাওয়াত দেওয়ার মত অবস্থা ছিলনা আমার। যা আয়োজন করেছি তা আগত মেহমানদেরকেই আপ্যায়ন করতে পারবো কিনা সেটা নিয়েই দ্বিধা দ্বন্দে ছিলাম। অনিমেষ আমাকে বাড়ির এক কোণায় ডেকে নিয়ে গিয়ে কাঁধে হাত রেখে বলেছিল, তুই আমাদের দাওয়াত করিসনি তার পরও চলে এসেছি বলে মন খারাপ করিস না। আমরা জানি দাওয়াত করার মত অবস্থায় তোদের নেই। আমরাও এখানে এসে খাওয়ার জন্য মনস্থির করে রাখি নি। আমরা ভাবলাম তোর এই কঠিন মুহুর্তে বন্ধু হয়ে যদি তোর পাশেই না থাকতে পারি তবে কিসের বন্ধুত্ব। তোকে পুরো অনুষ্ঠানে সাহায্য করাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য। আমি অনিমেষকে বুকে টেনে নেই। চোখে জল এসে যায়। বলাইয়ের উপর থেকে মুহুর্তেই রাগ নেমে যায়। সবাই মিলে দিদির বিয়ের পুরো অনুষ্ঠানকে পরিপাটি করে তুলি। গেট সাজানো থেকে শুরু করে বরের বসার যায়গা সাজানো এবং বাকি সব কাজ আমরা আনন্দের সাথেই করতে থাকি। আমাদের ছুটোছুটি চলছে সমানে। কয়েকটা বাচ্চার সাথে দেখি সুকন্যা বসে কি যেন খাচ্ছে। ওর মাও নিশ্চই হয়তো কোন না কোন কাজ নিয়ে ব্যস্ত আছে। বর আসতেই হইচই পড়ে গেল। আমরা গেট ধরে দাড়িয়ে গেলাম। তবে বড়দের কথা মত আমরা বেশি উচ্চবাচ্য করলাম না। বরপক্ষ যথেষ্ট আন্তরিকতার সাথে আমাদেরকে খুশি করেই উঠোনে প্রবেশ করলো। খাওয়াদাওয়া শেষে বিয়ের যাবতীয় কাজ হয়ে গেলে এক সময় চোখের জলে ভাসিয়ে আমার একমাত্র দিদি শশুর বাড়ি চলে গেল। তার সাথে আমার যাওয়ার কথা ছিল কিন্তু যাওয়া হলো না। আমার বদলে আমার ছোট পিসির ছেলে অনন্ত আর আমাদের এক ঠাকুর মা গেল। দিদি হাউমাউ করে কেঁদেছিল। সেটা দেখে আমার চোখেও  জল এসে গেল। উঠোনটা ফাঁকা পড়ে থাকবে। যে উঠোনে সারাদিন মান দিদি হেটে বেড়াতো। ছোট বেলায় এই উঠোনে দিদির সাথে দাড়িয়া বান্ধা খেলতাম,লুকোচুরি খেলতাম। কত শত খুনসুটি হতো। সে সব দেখতে দেখতে চোখের পলকে স্মৃতির খাতায় আটকে গেল। কোন দিন আর সেই সব মুহুর্ত ফিরে আসবেনা।

 

আকাশে মেঘ করলে কোন দিন দিদি দৌড়ে এসে আমার পড়ার টেবিলে উপরে থালা বাসন পেতে দেবেনা। কোন দিন মাথার চুলে বিলি কেটে দেবে না। বাছুরটা সকাল থেকে হাম্বা হাম্বা করে ডেকে চলেছে। মায়ের অনুপস্থিতি তার বুকে যন্ত্রনার আগুন জ¦ালিয়ে দিয়েছে সেটা আমি অনুভব করতে পারছি দিদি চলে যাওয়ার পর থেকে। আপনজন কাছে না থাকার যন্ত্রনা যে কত কঠিন তা উপলব্ধি করছি। দিদিকে বিদায় দিয়ে খাওয়া নাওয়ার কথা ভুলে গেছি। বলাইরাও ফিরে গেছে। আমি আহাম্মকের মত তাদেরকে একটি বারের জন্যও খেয়ে যেতে বলি নি। মেহমানরা ত্রিশজন আসার কথা বলে ছিল কিন্তু তারা মাত্র বিশজন এসেছিল। খাবারের কোন কমতি ছিল না। অথচ আমার যে বন্ধুরা বিনা নিমন্ত্রনে এসে দিদির বিয়ের আয়োজনকে সুন্দর করে দিয়ে গেছে তাদেরকে খালি মুখে ফিরে যেতে দেখেও আমার মধ্যে কোন বোধ শক্তি কাজ করেনি। এখন আর কোন কিছুই ভাল লাগছে না। আশ্চর্য! আমার একমাত্র দিদির বিয়েতে সারাদিন সুষমাদির ছায়াটুকুও দেখলাম না। কিছুক্ষণ ঠায় দাড়িয়ে থেকে ঘরে চলে গেলাম। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই মনে হচ্ছিল রাজ্যের ক্লান্তি চোখে মুখে ভর করছে। সেই ক্লান্তি আসলে প্রিয়জন চলে যাওয়ার ক্লান্তি।

দিদিই ছিল আমার সব থেকে ভাল বন্ধু। সে কত দিন মুখে তুলে খাইয়ে দিয়েছে তার কোন হিসেব নেই। সেই ঋণ আমি কোন কালেও শোধ করতে পারবো না। সাত পাঁচ ভাবছি,আমার চোখ বন্ধ। সেই বন্ধ চোখে স্বপ্নের মত ভেসে ভেসে আসছে অতীতের সব সুখ স্মৃতি। হাঠাৎ কারো পায়ের শব্দে চোখ খুলে তাকাতেই দেখি বাবা দাড়িয়ে আছেন। মুখটা বিষন্ন তবে নির্ভার। বিবাহযোগ্য কন্যাকে বিয়ে দিতে পেরে তিনি আজ অনেকটাই ভারমুক্ত হয়েছেন বলেই তাকে নির্ভার লাগছে। অন্যদিকে প্রাণপ্রিয় কন্যাকে বিদায় দিয়ে মনটাও বেশ ভারাক্রান্ত। আমার পাশে বসে কিছুক্ষণ কথা বললেন। তার পর বললেন, তোর বন্ধুরা সবাই এতো খাটাখাটনি করলো শেষে না খেয়েই চলে গেল। যা গিয়ে ওদেরকে ডেকে নিয়ে আয়। অনেক খাবারতো বেচেই আছে। একসাথে দু’টো খাবি। তোরওতো খাওয়া হয়নি কিছু। সারাদিন ধকলতো কম যায়নি। আমারও বেশ খারাপ লাগলো। যারা আমার একমাত্র দিদির বিয়ের জন্য এতো কষ্ট করলো তাদেরকে অভুক্ত অবস্থায় চলে যেতে দেওয়া আমার উচিত হয়নি। বাবার কথা মত ওদেরকে ডেকে আনতে গেলাম। মনে মনে ভেবেছিলাম ওরা কেউ আসবে না। প্রথমত দাওয়াত দেইনি, তার উপর চলে আসার সময়ও একবার মুখ ফুটে বলিনি তোরা খেয়ে যায়। কোন মুখে ওদের সামনে গিয়ে দাড়াবো বুঝতে পারছিলাম না। যাওয়ার পথে সুষমাদিকে দেখলাম রাস্তায় দাড়িয়ে আছে। আমি তার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলাম। তার উপর আমার ভীষণ রাগ হচ্ছে। আমার একমাত্র দিদির বিয়ের দিন তাকে একটি বারের জন্যও আমাদের বাড়িতে দেখি নি। অথচ তার থাকার কথা ছিল। সে আর আমার দিদিতো ভাল বান্ধবী ছিল। একসাথে হেসে খেলেই তারা বড় হয়েছিল।

 

সে আমার পথ আগলে দাড়াল। মুখে একরাশ হাসি টেনে বললো, নিখিলেশ তোমার দিদির রাজকপাল। তার স্বামীও দেখতে রাজপুত্রর মত। আর শুনেছি বংশও ভাল। আমি কোন কথা বললাম না। আমি কয়েকবার তাকে পাশ কাটিয়ে যেতে চেষ্টা করলাম কিন্তু সে আমাকে যেতে দিল না। যেন আমার অভিমান ভাঙ্গাতে চায় সে। আমার মনের মধ্যে সীমাহিন ভাবনা। আমি তাকে হাত দিয়ে ঠেলে পাশ কাটিয়ে চলে গেলাম। একবারও পিছন ফিরে তাকালাম না। তাকালেই দেখতে পেতাম সে অপলোক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চোখে মুখে রাগ নেই, কিন্তু অভিমান ঠিকরে বেরিয়ে আসছে। পথে যেতে যেতে বার বার মনে হলো কেন সুষমাদি আমার পথ আগলে দাড়াল? কেন সে দিদির বিয়ের দিন আমাদের বাড়িতে গেল না। তার একমাত্র মেয়ে সুকন্যাকে দেখেছিলাম কিন্তু তাকে দেখি নি। প্রথমে ভেবেছিলাম সে কোন না কোন কাজে আছে তাই চোখে পড়ছেনা কিন্তু এখন মনে হলো আমাদেরতো রাজপ্রাসাদের মত আলিশান বাড়ি নয় যে সহজে চোখে পড়বে না। পরে মনে হলো বিয়ে বাড়িতে পরে যাবার মত তার কোন কাপড়ই ছিল না। মনটা ভেঙ্গে যেতে লাগলো। হাটতে হাটতে আমি ততোক্ষণে অনেক দূরে চলে এসেছি। মনে হচ্ছিল এক দৌড়ে ছুটে গিয়ে সুষমাদিকে বালি তুমি আমাকে ক্ষমা করো। তুমি আসোনি বলে আমি তোমার উপর না জেনে না বুঝে অভিমান করেছিলাম বলে আমাকে ক্ষমা করো। কিন্তু আমার আর ফিরে যাওয়া হয়নি। ভাবলাম পরে এক সময় এটা নিয়ে তার সাথে কথা বলবো।

 

এখন আমার চারদিকে শুন্যতা। কানাই লাল স্যারের বাড়ির কাছে আসতেই চোখ দুটো আপনা থেকেই খোলা জানালায় নিবদ্ধ হয়। চোখ দুটো বার বার আমার সাথে প্রতারণা করছে। সে জানে ওই খোলা জানালায় কেউ তার জন্য পথ চেয়ে বসে নেই তার পরও সে সেদিকে দৃষ্টি ফেরাবেই। একদিন এক মুহুর্তের জন্য ওই জানালায় অবিরাম হাসিমুখ দেখা গিয়েছিল কিন্তু সে যেন হ্যালীর ধুমকেতুর মত মিলিয়ে গেছে। তার পর আর কোন দিন তাকে দেখা যায়নি। অথচ এই পথ দিয়ে যতবার যাওয়া আসা করি আমার নিজের অজান্তেই চোখ দুটো কাকে যেন খুঁজে ফেরে সেই খোলা জানালায়। জানালাটার প্রতি আমার ক্ষোভ জমে গেছে। হয়তো কোন একদিন দা কুড়াল এনে জানালাটাকে খুন করে রেখে যাব। সে কোন সাহসে বার বার আমার সাথে প্রতারণা করবে,মরিচিকার মত সে আমার চোখ দুটোকে কেন টানবে। পোড়া চোখ যুক্তি শোনে না। কোন একদিন ওই জানালায় একচিলতে হাসি নিয়ে পুর্ন চন্দ্রের মত দেখা গিয়েছিল এক চন্দ্রমুখী। তার ছিল দীঘল কালো চুল,অপুর্ব সুন্দর মায়াকাড়া হরিণীর চোখ, আর হৃদয় খুন করা হাসি। যে হাসিটা এক নিমিষে খুন করতে পারে হাজারো নিখিলেশ, অনিমেশদের। তার পর সব স্মৃতির পাতায় আটকা পড়ে আছে। মনে অজান্তে যতবারই খোলা জানালায় দৃষ্টি পড়েছে কেবলই সেখানে শুন্যতা ছাড়া আর কিছুই খুঁজে পাইনি। কোন এক বিকেলে অস্তমান সুর্যের সাথে সাথে সেও অস্ত নিয়েছে। সুর্যটা প্রতিদিন একই নিয়মে উদয় হলেও সেই হাসি মুখ আর কোন দিন খোলা জানালায় দেখা যায় নি। হয়তো আর কোন দিন দেখাও যাবে না।

 

 

পার্ট-৮

কোন অলক্ষনেই যে একটা কবিতা লিখতে গিয়েছিলাম জানিনা। কি একটা লিস্ট করবে বলে কলেজে একদিন অনিমেশ আমার কাছে একটা কাগজ চাইলো। আমি ঝন্টু স্যারের সাথে কথা বলছিলাম বলে ওকে বলেছিলাম আমার খাতা থেকে ছিড়ে নে। স্যারের সাথে কথা বলা শেষ করে যখন ক্লাস রুমে ফিরেছি দেখি সবাই আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। একসময় মুচকি হাসিটা হো হো শব্দে ফেটে পড়লো। আমি বুঝেই উঠতে পারিনি তারা কি নিয়ে হাসছে। তার পর অনিমেশ তার পিছনে লুকিয়ে রাখা খাতাটি বের করে শব্দ করে পড়তে শুরু করলো।

 

”তোমার খোলা চুল,স্নিগ্ধ হাসি/বড় মায়াকাড়া,বড় ভালবাসি/

খোলা জানালায় অবিরাম হাসি মুখ/সে মুখে তাকিয়ে খুঁজি জীবনের সব সুখ।।

 

আমার আর বুঝতে বাকি থাকেনা যে ওরা আমার খাতাটা ঘেটে ঘেটে কবিতাটি পেয়েছে। তার পর ক্ষ্যাপানো শুরু করলো। বলাইয়ের আগের সব অপরাধ আমি ক্ষমা করে দিয়েছিলাম দিদির বিয়ের দিন। কিন্তু সেদিন বলাই জন্মের মত আমার শত্রু হয়ে গেল। আমি ওকে ইতোর বলে গালি দিলাম। তাতে তার কিছুই গেল আসলো না। সে তার মত করে বলতে লাগলো। সে বার বার বলতে লাগলো

 

”সুষমাদি তোমার খোলা চুল,স্নিগ্ধ হাসি/বড় মায়া কাড়া,বড় ভালবাসি

খোলা জানালায় অবিরাম সুষমাদির হাসিমুখ/সে মুখে তাকিয়ে খুঁজি জীবনের সব সুখ”

 

রাগে আমার শরীর থেকে থেকে কেঁপে উঠছিল। মনে হচ্ছিল বলাইকে খুন করে ফেলি। ক্লাসের সবাই আমাদের গায়ের ছিল না বলে তারা জানতো না সুষমাদি কে। আমি হাত থেকে কবিতাটি নিয়ে কুচি কুচি করে ছিঁড়ে ফেলি। কাগজে লেখা কবিতা কুচি কুচি করে ছিড়ে ফেলা যায়, কিন্তু বুকের মধ্যে যে কবিতা লেখা ছিল তা কি আর ছিঁড়ে ফেলা যায় কখনো! আমার জানা ছিল না যে কবিতাটা আরো কোথাও লিখে রেখেছি। সেদিন রাগে গজগজ করতে করতে বাড়ি ফিরে আসি। পথে সুষমাদির সাথে দেখা হয়। রাগ দেখিয়ে বলি যত্তসব ভাল্লাগেনা কিছু আর। সে কি বুঝলো জানিনা, বাড়ি ফেরার পর আমারও মন খারাপ হয়ে গেল। সে বেচারিরতো কোন দোষ নেই। নিজের বন্ধুদের আহাম্মকির কারণে শুধু শুধুতাকে রাগ দেখিয়ে এসেছি। দুপুরে না খেয়েই ঘুমিয়ে গেলাম। যখন ঘুম ভেঙ্গেছে তখন সন্ধ্যা হয় হয়। আড়মোড় ভেঙ্গে বিছানায় উঠে বসতেই দেখি  হাসি হাসি মুখ করে সুষমাদি টেবিলের উপর ঝুকে আছে। আমি আবারও চমকে উঠি। দরজা খোলাই ছিল। ঘর থেকেই দেখা যাচ্ছে মা রান্না করছে। রান্না ঘর থেকে আমার রুমটা বেশ ভাল ভাবেই দেখা যায়। আমি উঠে দেখি সুষমাদির হাতে আমার ডায়েরি। যে পাতাটা খোলা সেখানে সেই কবিতাটি! আশ্চর্য এ কবিতা ডায়েরিতে এলো কি করে! সুষমাদি মেট্রিক পাশ করেছিল সেকেন্ড ডিভিশানে। বিয়ের পর আর পড়ালেখা করা হয়নি। গরীব ঘরের ছেলে মেয়েদের বিয়ের পর আর পড়ালেখা হয়ে ওঠেনা। সে কবিতাটা আমার সামনেই শব্দ করে পড়ে শোনালো। আমি তাজ্জব হয়ে গেলাম যখন সে আবৃত্তি করলো

 

”সুষমাদি তোমার খোলা চুল,স্নিগ্ধ হাসি/বড় মায়াকাড়া বড় ভালবাসি

খোলা জানালায় অবিরাম সুষমাদির হাসিমুখ/সে মুখে তাকিয়ে খুঁজি জীবনের সব সুখ”।

 

আমি তো এ কবিতা লিখি নি। কবিতার কোথাও সুষমাদির কথা লেখা ছিল না, তার নামও ছিল না। কিন্তু সে যে কবিতাটা আবৃত্তি করলো তাতে স্পষ্ট তার নাম আছে,তার খোলা চুলের কথা আছে। আমি ছোবল দিয়ে তার হাত থেকে ডায়েরিটা নিয়ে কবিতাতে চোখ বুলালাম। নাহ সেখানে সুষমাদির নামতো নেই! তার মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম বাকা হাসি ঠোটে লেগে আছে। আমি তাকে কনুই দিয়ে ধাক্কা দিয়ে বললাম সুষমাদি এটা মোটেও ঠিক হলো না। আমাকে এভাবে ভড়কে দেওয়া উচিত হয়নি। সে কিছু বললো না।তার মুখের হাসি আরো বিস্তৃত হল। কবিতার প্রশংসাও করলো আর বললো কবিতা লেখা ছেড়ে না দিতে। আমি অবাক বিস্ময়ে আবিস্কার করলাম যে আমিতো কবিতা লিখতেই শুরু করিনি তাহলে ছাড়ার প্রশ্ন আসছে কোথা থেকে।

 

দুপুরে খাইনি বলে পেটে প্রচন্ড ক্ষুধা ছিল। ঘর থেকে বেরিয়ে পুকুর ঘাটে গিয়ে গোসল সেরে আসলাম। বার কয়েক এপাড় ওপাড় সাতার কাটার পর মনটা বেশ ফুরফুরে লাগলো। গোসল সেরে কাপড় পাল্টে খেতে বসলাম। সুষমাদি তখনো আমাদের বাড়িতেই ছিল। তার বাবা মারা যাবার পর অধিকাংশ সময় কাজ না থাকলে সে আমাদের বাড়িতেই থাকে। মায়ের সাথে গল্প করে সময় কাটায়। আমি আমার মত করে এখানে ওখানে ঘুরি ফিরি। যেদিন সুষমাদির মুখে নিজের লেখা কবিতা শুনেছিলাম সেদিনই সন্ধ্যার একটু পর মায়ের কথা মত সুকন্যাকে ও বাড়িতে দিয়ে আসতে গেলাম। সুষমাদি যে কথাটি বললো তা শুনে আমি আরো একবার চমকে উঠলাম। নিখিলেশ তোমার ঘরের জানালা খুলতেই দেখি অবিরাম সৌন্দর্য। যেন পৃথিবীর তাবৎ সৌন্দর্য সেদিন সেই বিকেলে তোমার জানালা ঠিকরে ভিতরে প্রবেশ করছিল। আমি কোন কথা না বাড়িয়ে ফিরে যাই বাড়িতে। আরো একবার সেই অন্ধকারে জানালা খুলে বাইরে তাকাই। আমার চোখে ঘন অন্ধকার ছাড়া কোথাও কোন সৌন্দর্য ধরা পড়েনা। মনে পড়ে যায় বলাইয়ের কথা। যার চোখ আটকে ছিল পুকুর ঘাটে অজানা কোন সৌন্দর্যের মোহে।

 

 

পার্ট-৯

বেশ কিছুদিন ধরে দিদিকে একটা কথা বলবো বলবো করে বলা হয়নি। কিভাবে বলবো সেটাই ভেবে পাচ্ছিলাম না। আবার না বলতে পারলেও খারাপ লাগছিল। কিছুদিন হলো দিদির বিয়ে হয়েছে। জামাইবাবু বেশ ভাল। দিদিকে আদরে আহ্লাদেই রাখে। আমার দিদিও অনেক ভাল। শিমুলিয়া গ্রামে যে কয়টা ঘর অবস্থা সম্পন্ন দিদিরা সেই ঘর গুলির মধ্যে অন্যতম। শুধু অবস্থা সম্পন্নই নয়, নামে যসেও তাদের খ্যাতি আছে। তৃতীয় বারের মত দিদি যখন শশুর বাড়ি থেকে আমাদের বাড়িতে আসলো তখন দিদিকে নিয়ে পুকুর ঘাটে হাটতে গেলাম। হাটতে হাটতে ছোট বেলার অনেক কথাই বললাম। তার পর আমতা আমতা করে দিদিকে বললাম, দিদি তোকে একটা কথা বলার ছিল। দিদি বললো, একটা কেন হাজারটা বল! তাতেতো দোষ নেই। কতদিন পর আসলাম বাড়িতে। তোর জমিয়ে রাখা সব কথা শুনবো বলেইতো আমি অস্থির হয়ে আছি। আমি দ্বিধান্বিত কন্ঠে বললাম, দিদি আমার আর কোন কিছুই ভাল লাগে না। এই গা, এই গায়ের মানুষ এবং তাদের চালচলন ভাল লাগে না। তাদের চোখের দৃষ্টি আমার ভাল লাগে না, তাদের মুখের কথাও আমার ভাল লাগে না। দিদি আমার কথার আগা মাথা কিছুই বুঝতে পারলো না। সে আমার একটু কাছে এসে বললো কি হয়েছে খুলে বল। আমি বললাম দিদি তোরতো অনেক গুলো কাপড় তার থেকে একটা যদি সুষমাদিকে দিয়ে আসতি। ওটুকু বলেই আমি আর অপেক্ষা না করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেলাম। হাটতে হাটতে নকখোলার বিলে চলে গেলাম।

 

নকখোলার বিলে অগণিত মাছরাঙ্গা পাখি আছে, আর আছে সাদা রঙের বক। নিজেল পানিতে তাকালেই দেখা যায় কই, ডাইনকানা আর টাকি মাছের সারি। একটা কলার ভেলায় চেপে মন যেদিকে যায় হাল বেয়ে চলে যেতে থাকি। মনে হয় জীবনানন্দ দাশের হাল ভেঙে যে নাবি হারায়েছে দিশা এর মত আমিও হারিয়ে যাই কোন সুদুরে। আমি জানি আমার কথা শুনে আকাশ পাতাল কিছু ভাববে না আমার দিদি। দারিদ্রতার যাতা কলে পিষ্ট হয়েইতো বড় হয়েছে দিদি। তার সাথেই বেড়ে ওঠা সুষমাদির অবস্থা দিদির চেয়ে ভাল আর কারো জানার কথাও নয়। আমি কথাটুকু বলেই তার সামনে থেকে সরে এসেছি লজ্জায়। যে কথাটা আমার বলার ছিল না সেটাই আমি তাকে বলে এসেছি। এ সমাজে এর দায় ছিল সকলের। টিভি খুললেই নিতাই রায়দের মুখ যেমন ভেসে আসে, তেমনি তার থেকে বেশি ভেসে আসে বীরেন শিকদারদের মুখ। যারা ভাগ্য বদলে দেবে বলে দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট চেয়েছিল। কিন্তু বাঙ্গালীর ভাগ্য ফেরেনি। একটা মাছরাঙ্গাকে দেখলাম ফুস করে জলের মধ্যে মাথা ঢুকিয়ে আবার বেরিয়ে আসলো। তার মুখে তখন একটা বড় পুটি মাছ। একটা দোড়া সাপ একেবেকে পানির উপর দিয়ে সাতার কেটে চলে গেল। কয়েকটা বালিহাস সাতার কাটছে মনের আনন্দে। যতদুর চোখ যায় পানি আর পানি। এই বিলটা কত মানুষের রুজি রুটির ব্যবস্থা করে তার কোন হিসেব নেই। আবার এই বিল কত যে প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।

বিলে সারা বছর পানি থাকে। কোথাও কোমর পানি তো কোথাও ঠাই নেই। কলিম মাঝির ছোট ছেলে এই বিলের পানিতে ডুবে মারা গিয়েছিল বলে শোনা যায়। এর পরও কত মানুষের জীবন এই পানি কাদায় হারিয়ে গেছে তা জানা নেই। রাজা লক্ষনেশ্বর শায়েস্তাখার আমলে এই বিল খনন করেছিল বলে শুনেছি কিন্তু সত্যি না মিথ্যা জানা হয়নি। সুর্য ডুবে গেছে অনেক আগে। আকাশে সাদা মেঘের ভেলার সাথে পাল্লা দিয়ে উড়ে চলেছে একঝাক বক। আস্তে আস্তে অন্ধকার চারদিক থেকে ঘিরে ধরছে। আমি ইচ্ছে করেই দেরি করছি। যেন দিদিকে বলে আসা বিষয়টা দিদির মাথা থেকে চলে যায়। আর দেরি করা ঠিক হবে না ভেবে ভেলাটা তীরের দিকে বাইতে শুরু করি। দুর থেকে কে যেন নিখিলেশ নাম ধরে ডাক দেয়। আমি ফিরে তাকাই না। আমি জানি ওটা ভ্রম ছিল। একটু এগোতেই কারো কান্নার শব্দ পাই। কেউ যেন ইনিয়ে বানিয়ে কাঁদছে আর নিখিলেশ আমাকে নিয়ে যা বলে ডাকছে। আমি জানি আমার ফিরে তাকানো মানেই সর্বনাশ ডেকে আনা। ওই ফাঁদে পা দিয়ে নকখোলার বিলে কত তাজা প্রাণ নিমিশে স্মৃতি হয়ে গেছে তা কারো অজানা নয়। নক খোলার বিলের মাঝে মাঝে খুটিতে শতর্কবানী লেখা আছে। কেউ ডাকলে পিছন ফিরে তাকানো যাবেনা। বিগত দুই বছরে কেউ এই ভুলটা করে নি। তাই নকখোলার বিল কারো পরিবারে কান্নার কারণ হয়ে উঠেনি। পিছন থেকে যতই ডাক আসুক আমি ভুলেও সেই ডাকে সাড়া দেব না।

 

পিছনের সেই মায়াবি ডাক উপেক্ষা করে ভেলাটা তীরে নিয়ে আসি। যেখান থেকে ভেলাটা নিয়েছিলাম সেখানে রাখা হয়নি। ভেলার মালিক ভেলাটা যায়গা মত না পেয়ে মরিয়া হয়ে খুঁজবে আর গালিগালাজ করবে। তা করুক! আমিতো আর সেই গালি শুনছি না। ভেলাটাকে খুটায় বেঁধে রেখে হাটতে থাকি বাড়ির দিকে। আমার সাহসের কোন অভাব নেই, তার পরও পিছন ফিরে তাকাইনি একটি বারও। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছি জীবনের উপর যেদিন বিতৃষ্ণা এসে যাবে সেদিন সন্ধ্যায় নকখোলার বিলে যাবো একাকী। তার পর যতদুর চোখ যায় ভেলা নিয়ে ভেসে বেড়াব। কেউ পিছন থেকে ডাকলে ফিরে তাকাবো। সেদিন কোন পিছুটান থাকবেনা আমার,সব মায়ার বাঁধন ছিন্ন করে চলে গেলেও আমার জন্য কারো চোখে জল ঝরবেনা। বাবা মা দিদি ছাড়া কাঁদার মত এ ভুবনে আমার আর কেইবা আছে। মাঝে মাঝে মনে হয় জীবনটা বেশ আনন্দের। বর্ষার দিন গায়ের রাস্তায় হাটুজল থাকে, আর গ্রীস্মের সময় সেখানে ধুলোর আস্তরণ চোখে পড়ে। কাদামাটি আর ধুলোর রাজ্যে আমাদের বসবাস। কখনো খেয়ে থাকি, কখনো না খেয়ে থাকি তাতে কিছু আসে যায়না, কিন্তু আমাদের নিত্যদিন ধুলোর সাথে মাখামাখি থাকেই। কত রাত হয়েছে বোঝা যাচ্ছেনা। ইচ্ছে করেই দেরি করে ফিরছি। এতোক্ষণে সবাই হয়তো ঘুমিয়ে গেছে। সুষমাদির বাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দেখলাম তার ঘরে বাতি জ¦লছে। মনে হলো একবার দেখা করে যাই। যেহেতু বাতি জ¦লছে তার মানে সে জেগেই আছে। আমি দরজায় কড়া নাড়তেই কে কে বলে কথা বলে উঠলো সে। আমি নাম বলতেই খুট করে দরজাটা খুলে গেল। তার মুখটা হাসিহাসি। আমার হাত ধরে ঘরের ভিতরে নিয়ে গেল। বিছানায় বেঘোরে ঘুমোচ্ছে সুকন্যা। সে কেন ঘুমায়নি বুঝতে পারি নি। সে কি ভেবে রেখেছিল আমি আসবো। তার অমলিন হাসিমুখ,দীঘল কালো চুলের সৌন্দর্য পেরিয়ে আমার চোখ দুটো আটকে আছে পরনের নতুন শাড়ীটার দিকে। দিদি সত্যি সত্যিই তাকে একটা শাড়ী আর ব্লাউজ দিয়ে গেছে যা সুষমাদি পরে আছে। আমার যেন কি হয়ে গেছে আমি জানি না। সে ভাত বেড়ে দিলে আমি অপলোক তার দিকে তাকিয়ে খেতে শুরু করি। একবারও মনে হয়নি আমি কেন এই রাতে একাকী তার ঘরে বসে তার বেড়ে দেওয়া ভাত খাব। তার যেন খাওয়াতেই আনন্দ। খাওয়া শেষে মুখ হাত মুছবো বলে আমি যখন গামছা খুঁজছি সে তখন এগিয়ে দিল। মুখ মুছে ফেরত দিতে গিয়ে খেয়াল হলো সেটা গামছা ছিলনা,সেটা ছিল সুষমাদির পরনের শাড়ীর আঁচল। সেও হয়তো তা খেয়াল করেনি আগে। যখন টের পেল সে যেন লজ্জায় লাল হয়ে গেল।

 

আমি বেরিয়ে গেলাম বাড়ির পথে। মনে মনে দিদিকে কৃতজ্ঞতা জানালাম। উঠনে পা রাখতেই টের পেলাম মা ঘুমায়নি। সে নিশ্চই এখনো না খেয়েই আছে। গলা খাকারি দিতেই মা দরজা খুলে বেরিয়ে আসলো। আমি আগে কখনো এরকম রাত করে বাড়ি ফিরিনি। সে আমাকে রান্না ঘরে নিয়ে পাটি পেতে দিল,নিজ হাতে ভাত মেখে মুখে তুলে দিল। একটু আগেই আমি যে খেয়ে এসেছি তার পরও খাওয়ার অভিনয় করতে হলো। মাকে কষ্ট দিতে মন চাইছে না। আমি বললাম মা তুমিও খেয়ে নাও। মায়ের খাওয়া হয় খুব কমই। দিদি ঘুমিয়েছে কিনা জানতে চাই। ঘুমোতে যাবার আগে খোলা জানালা দিয়ে দেখি দিদির মুখটি। অবসম্ভব সারল্য ভরা সেই মুখটির প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা ঝরে পড়ে। আকাশ থেকে অবিরাম ঝরে পড়া জোছনা পুকুরের পানিতে রহস্যময়তা সৃষ্টি করে রেখেছে। সেদিকে তাকিয়ে কত কিছু মনে পড়ছে। জীবনটা বড়ই বৈচিত্রময়।

 

 

পার্ট-১০

 

অনেক চেষ্টা করে শেষে চার লাইনের একটা কবিতা লিখতে পেরেছিলাম। কানাইলাল স্যারের বাড়িতে রেখে আসা ঢালুন আনতে গিয়ে যে চাঁদ মুখ দেখেছিলাম সেটা চোখে লেগে আছে। ফিরে আসার সময় খোলা জানালায় চন্দ্রমুখীর মত বাকা হাসি নিয়ে সে যে ইঙ্গিত দিয়েছিল তাতে প্রেম ছিল, সুখ ছিল, আর ছিল স্বপ্নের সিড়ি। সুকন্যার অসুখের খোঁজ নেওয়া,বাজার থেকে ওর জন্য আনা দুই টুকরা সন্দেশ, বাড়িতে বাবা মা দিদি ফিরে এছেসে সেই চিন্তা আর হাতে বাজারের ব্যাগের চিন্তাকে পাশ কাটিয়ে কখন যেন তাই ক্ষনিকের জন্য উদয় হওয়া চাঁদ হাসি প্রাধান্য পায় আমার কাছে। দিদির হাতে বাজারের ব্যাগটা ধরিয়ে দিয়ে মাকে বলে সুকন্যার জন্য আনা দুই টুকরো সন্দেশ দিতে সুষমাদির বাড়িতে পার রাখি। মনটা চঞ্চল হয়ে ওঠে,সেখানে আর এক মুহুর্তও দাড়াতে ইচ্ছে করে না। সুকন্যার হাতে সন্দেশ দুটো ধরিয়ে দিয়ে বেরিয়ে পড়ি। প্রথমে রাস্তায় কিছুক্ষণ হাটাহাটি করি মাথা শান্ত করার জন্য কিন্তু কোন কিছুই ভাবতে পারি না।

 

সন্ধ্যার অন্ধকার তখন চারদিক থেকে ধেয়ে এসেছে। হাটতে হাটতে কানাই লাল স্যারের বাড়ি অব্দি চলে যাই। ঠায় দাড়িয়ে থাকি রাস্তায়। আমার চোখ দুটো কি যেন খুঁজছে, কাকে যেন খুঁজে মরছে। দৃষ্টি আপনা আপনি চলে যায় কানাই লাল স্যারের ঘরের জানালায়। একটু আগে যে জানালায় অবিরাম হাসি মুখ ছিল, আর ছিল রহস্যময় চাহুনীর পাশাপাশি বাকা হাসি। এখন সেই জানালা বন্ধ। পাটকাঠির বেড়ার ফাঁক গলে ক্ষীণ আলো ঠিকরে বেরিয়ে আসলেও সেই অমলিন হাসি মুখ আর দেখা হয়ে ওঠে না। কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থেকে ভাবতে থাকি কোন অছিলা নিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢোকা যায়। মনে পড়তেই ছুটে যাই বাড়িতে। টেবিল থেকে একটা বই আর খাতা নিয়ে আবার ছুটি হাসি মুখের খোঁজে। উপরে দেখাই পড়া বুঝতে যাচ্ছি। কানাই লাল স্যারের উঠোনে দাড়িয়ে গলা খাকারি দিয়ে বলি স্যার বাড়িতে আছেন? স্যারের কোন উত্তর পাইনা। উত্তর আসে কাকিমার কাছ থেকে। স্যারের হাপানিটা হঠাৎ বেড়েছে। সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে তাই বিছানায় শরীর এলিয়ে দিয়েছে। কাকিমা ঘরের ভিতরে যেতে বলায় স্যারের পাশে গিয়ে বসি। মাথায় হাত বুলিয়ে দেই সে পরম আনন্দ পায়। আমার হাতে বই দেখে তার চোখটা উজ্জল হয়ে ওঠে। দীর্ঘ একটা নিঃশ^াস নিয়ে স্যার বলেন, তুই পড়তে এসেছিস আর দেখ আজই আমি অসুখে পড়েছি। অসুখটা তেমন কঠিন কিছু না। যে কোন সময় ঠিক হয়ে যাবে। তুই বরং কাল আসিস। মনে মনে বলি, ওহে নিখিলেশ তোমার অপেক্ষা বাড়লো আরো। চলে যাওয়ার কথা মুখ দিয়ে না বলা পযর্ন্ত নড়বো না বলে পণ করে বসে থাকি। এটা ওটা বলে স্যারের সাথে কথা চালিয়ে যেতে থাকি। উদ্দেশ্য একটাই যদি তব দেখা পাই হে প্রিয়ে। কিন্তু সে আর আসেনা। তার হাসির শব্দ শুনি,পাটকাঠির বেড়ার ফাঁক গলে অন্য রুম থেকে আলো এসে ঠিকরে পড়ছে সাথে বয়ে আনছে সেই হাসি,যে হাসিতে খুন হতে হয় অবিরাম। কিন্তু কতক্ষণ আর বসে থাকা যায়,কাকিমা বললেন রাত অনেক হয়েছে এবার বাড়ি যা, কাল আসিস। নিরাসক্ত মুখে আমি উঠে দাড়াই। পা চলতে চায় না। মনে হয় জানালার পাশে গিয়ে দাড়াই। যদি একবার জানালা খুলে যায়, ভেসে ওঠে সেই মুখ।

 

অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে পথ কেটে এগিয়ে যেতে থাকি। পিছনে পড়ে থাকে কানাই লাল স্যারের বাড়ি,দো চালা টিনের ঘর, আর দক্ষিনের জানালা। বার কয়েক ফিরে তাকাই। কিন্তু সেখানে আমার হাহুতাশ ছাড়া কিছু দেখতে পাই না। রাতে খাবারের পর চোখে আর ঘুম আসে না। কেবলই মনে পড়ে ক্ষণিক দেখা একটি মুখের ছবি। ঘুমোতে যাবার আগে ডায়েরির পাতায় জমে ওঠে চার লাইনের একটি কবিতা,আত্মপ্রকাশ ঘটে এক কবির। সকালে মায়ের ডাকে ঘুম ভেঙ্গে জেগে উঠি। আমার টেবিলের সামনে যে টুলটা পাতা আছে সেখানে বসে আছেন কানাইলাল স্যার। আমি প্রনাম জানিয়ে কখন এসেছেন সেটা জানতে চাই। তার শরীর এখন কেমন সেটাও প্রশ্ন করতে ভুলি না। স্যার হাসি মুখে বলেন, তিনি ভাল আছেন এবং হাপানী আর নেই এখন। গত দিন বেশ হাটাহাটি করে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন বলে হাপানীটা বেড়েছিল। তাছাড়া কাল তুই বই নিয়ে আশা করে কিছু একটা পড়া বুঝতে গিয়েছিলি আমি তোকে দেকাতে পারিনি বলে খারাপ লাগছিল। তাই ভাবলাম যাই তোর পড়াটা দেখিয়ে দিয়ে আসি। আমি আমতা আমতা করতে থাকি। পড়ার নামে আমারতো চাঁদ মুখ দেখার শখ ছিল কিন্তু সব ভেস্তে গেল। হাতমুখ ধুয়ে এসে অনিচ্ছাসত্ত্বেও স্যারের কাছে একটা দুটো অধ্যায় বুঝে নেই। মন পড়ে থাকে কানাই লাল স্যারের দোচালা টিনের ঘরের দক্ষিণ জানালায়। ভাবতে থাকি এখণ তবে কি উপায় করা যায়। পড়া শেষে স্যার যখন বাড়ির পথে হাটতে শুরু করেছেন আমিও পাশে গিয়ে হাটি। বলি স্যার আপনি কষ্ট করে আসলেন আমি আপনাকে এগিয়ে দিয়ে আসি। স্যার আমার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন যেন এক জীবনে তিনি কোন দিন আমার মত কোন শিক্ষাগুরু ভক্ত ছাত্র দেখেন নি। স্যার ধীরে ধীরে পা চালান। আমার মনে হয় আমি যেন খরগোশ-কচ্ছপের দৌড় প্রতিযোগিতায় আছি। চলতে পথে কত শত কথা হয়, যার সবটাই হয় পড়াশোনা নিয়ে। ইচ্ছায় অনিচ্ছায় জেনে না জেনে সেগুলোর উত্তর দিতে থাকি আর ভাবি আর কত দুর। যখন চোখের সামনে আবছা ভাবে ভেসে ওঠে স্যারের দোচালা ঘর, তখন মনের মধ্যে ফাগুনের হাওয়া বইতে শুরু হয়। মুখে যেন হাসির ফোয়ারা বয়ে যায়। আর তো কিছুটা সময়, তার পর দিনের আলোতেই দেখা হবে চাঁদ মুখ। যে মুখের হাসির সামনে বিমলিন হয়ে যায় তিনশো তেত্রিশটা পুর্ন চন্দ্র আর নিরানব্বইটা সুর্য। স্যার কি বুঝতে পেরেছিলেন আমার মনের কথাটা? অবশ্য না বুঝারও কোন কারণ ছিল না। আমার আতিউতি চাহুনী, আমার ছটফটানির মধ্যেইতো অনেক কিছু ছিল।

 

কোন একদিন হয়তো আমারই মত কানাই লাল স্যারও কারো না কারো জন্য এমনই ভাবে ছটফট করেছিলেন তা কে জানে। স্যারর উঠোনে পা রাখতেই কাকিমা জানালেন আরেকটু আগে আসতে পারতেন! মেয়েটা চলে গেল বাবার সাথে কথাও বলে যেতে পারলো না। ঠিক সেই সময় আমার মুখের দিকে তাকালে যে কেউ বলে দিতে পারতো আমি বুঝি সদ্য রাজ্যহীন কোন রাজা। বুকের মধ্যে কোথায় যেন চিনচিন ব্যথা অনুভব করলাম। যে চাঁদ দিগন্তের কাছে পুর্ন আভা নিয়ে সমুজ্জল ছিল সে আর নেই। যেন হ্যালির ধুমকেতুর মত দেখা দিয়ে আজীবনের মত হারিয়ে গেছে। এক জীবনে মানুষের ভাগ্যে দুবার হ্যালির ধুমকেতু দেখার সৌভাগ্য হয় না, আমারওকি তাই। উঠোনটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে, সেই সাথে বাড়িটাও। কেমন যেন শশ্মানের মত নির্জন মনে হচ্ছে অথচ আমার সামনে কাকিমা আছে কানাই লাল স্যারও আছেন। আমাকে একটা টুল দিয়ে কাকিমা বসতে বললেন। কিন্তু আমার আর বসে লাভ কি! যে জীবন ঘাস ফড়িংয়ের, শালিকের, দোয়েলের সে জীবন হয়নাকো দেখা। টুলটা সামনে শুন্যই পড়ে থাকে। টুলের ওপর রাখা সদ্য কাকিমার এনে দেয়া নাড়– চিড়ে আমাকে টানে না। যেন লাটাই থেকে সুতো ছিড়ে ঘুড়িটা দুর নীলিমায় হারিয়ে গেছে আর আমি শুন্য লাটাই হাতে বসে আছি। জীবনটা আনন্দের চেয়ে বেদনার রঙ দিয়েই বেশিটা সাজানো। যে সাজিয়েছে তার মনেওকি বেদনা ছিল? নাহ সে তো আনন্দ বেদনার বহু উর্ধে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও একটা নাড়– মুখে দিয়ে বেরিয়ে পড়ি। দুই চোখে শুন্যতা নিয়ে যে দিকে তাকাই আমাকে নিরাশা গ্রাস করে নিতে থাকে। আকাশ, বাতাস, এই শান্ত নদীর স্বচ্ছ জল, হিজল, তলাম, লতাগুল্ম কোন কিছুই আর আমাকে টানে না। হঠাৎ মনে হয় নকখোলার বিল আমাকে ডাকছে,আমাকে সেখানেই ছুটে যেতে হবে। যেতে যেতে বুক পকেটে হাত রাখি। সেখানে চার ভাজ করা যে কাগজটি আছে তার মাঝে বহু যতœ করে চার লাইনের একটা কবিতা লেখা হয়েছিল। কবিতা কারো শোনা হয়ে ওঠার আগেই মরে গেল,সেই সাথে বুঝিবা কবিরও মৃত্যু হলো। বুক পকেট থেকে ভাজকরা কবিতাটি বের করে চোখের সামনে মেলে ধরি,ঘোলাটে হয়ে আসে চোখের সামনে মেলে ধরা কাগজটি। চোখে সম্ভবত কিছু একটা পড়েছিল তাই জল টলমল করে ওঠে। আমি হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে জলটুকু মুছে ফেলি।

 

হাটতে হাটতে অজানার পথে বিরামহীন হেটে চলেছি। এ চলার যেন শেষ নেই। নকখোলার বিলের কথা বেশ মনে পড়ে যায়। সে যেন দুর থেকে আমাকে ডাকছে তার নীল ঘোলা জলে ভেলায় ভেসে যেতে। আমি হাটতে হাটতে বিলের ধারে চলে যাই। আগের দিন যেখান থেকে ভেলা নিয়েছিলাম আজ আর সেখানে কোন ভেলা বাঁধা নেই। ভেলার মালিক হয়তো সেদিন খুঁজে না পেয়ে অনেক গালিগালাজ করেছিল। একটু খুঁজে পেতেই একটা ভেলা চোখে পড়লো। খুটায় বাধা রশিটা খুলে ভাসিয়ে দিলাম ভেলা। আজ আর কোন পিছুটান নেই। যতদুর চোখ যায় ভেসে যাবো। কোন দিন যে হিজল তলায় কেউ যেতে সাহস করেনি আজ সেখানেও যেতে আমার কোন বাঁধা নেই। যে হাসির রেখা অজান্তেই মিলিয়ে গেছে, সে হাসি আর কোন দিন ফিরে আসবে কিনা জানি না। কোথাও কোন জন মানুষের চিহ্ন নেই। সবাই যে যার বাড়িতে ফিরে গেছে। ভেলায় ভাসতে ভাসতে এক সময় হিজল তলা চলে যাই। যে হিজল গাছটি নিয়ে কত না গল্প আছে। কেউ কোন দিন হিজল তলায় ভুলেও যায়না। সেখান থেকে কারো ফিরে আসার কোন নজির নেই। আমি দিব্বি সেখানে এসে আমার ভেলাটা থামিয়েছি। আশ্চর্য রকম স্বচ্ছ সেই পানি। মনে হয় নিচে কোন মাটি নেই। কোন একটা কাচের পাতিলের মধ্যে স্বচ্ছ পানি রাখা আর আমি সেই পানিতে ভেলা ভাসিয়ে রেখেছি। পকেট থেকে ভাজ করা কবিতার কাগজটি বের করে ছেলে বেলার মত করে নৌকা বানাই। ভাসিয়ে দেই হিজল তলার সেই স্বচ্ছ জলে।

 

কাগজের নৌকাটি স্থির হয়ে দাড়িয়ে থাকে। আমি যতই পানিতে ঢেউ তুলে সেটা সরিয়ে দিতে চাই সে সরে না। যাকে দেওয়ার ছিল তাকেই দিতে পারিনি বলেই কিনা জানিনা কবিতাটি হিজল তলার জলও গ্রাহণ করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে। যাকে ভাসিয়ে দিয়েছি তাকে আর ফিরিয়ে লাভ নেই। অনাদি অনন্তকাল সে ভেসে থাক তার মত করে। কিংবা ভেসে যাক মন যেদিকে যায়। রাত হয়ে গেছে বেশ আগে। কোথাও কোন আলো নেই। কিছু জোনাকী মিটমিট করে জলছে সেই সাথে আকাশে জ¦লে আছে পুর্নচাদ তাকে ঘিরে আছে অগণিত তারা। আশ্চর্য হয়ে দেখলাম কেউ আমাকে ডাকছে না। আমি ভেলাটা ভাসিয়ে নিয়ে তীরের দিকে বাইতে থাকি কিন্তু তার পরও কেউ পিছু ডাকে না। যে মায়াবীনির ডাকে সাড়া দিয়ে চিরকালের মত স্মৃতি হয়ে গেছে অনেক মানুষ এই নকখোলার বিলে, সেই মায়াবীনিওকি তবে নিখিলেশকে ত্যাগ করেছে। নিখিলেশ কি তবে এতোটাই অচ্ছুৎ।

 

ভেলা তীরের দিকে বাইতে বাইতে কতবার যে পিছনে ফিরে তাকিয়েছি তার ঠিক নেই। যতদুর চোখ গেছে শুধু ঘোলা জল আর জ¦লে থাকা জোনাকী ছাড়া কিছু চোখে পড়েনি। কবিতার সেই কাগজের নৌকাটি হয়তো এখনো অবিরাম আমারই মত ভেসে আছে হিজল তলার স্বচ্ছ জলে। তীর খুঁজে পেতে ভেলা থেকে নেমে বাড়ির পথে হাটছি। আমার সাথে সাথে হেটে চলেছে আকাশের মস্ত চাঁদ। সে কি তবে আমাকে পাহারা দিচ্ছে? কার ভয়ে পাহারা দিতে হবে আমাকে?

 

 

পার্ট-১১

 

 

সকাল থেকে মাকে দেখিনি। কোথায় গেছে তা আমাকে বলে যায়নি। তার ঘরে তালা লাগানো। মাকে খুঁজতেই হোক আর এমনিই হোক আমি বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়ি। যখন সুষমাদির বাড়ির কাছাকাছি এসেছি তখন সানাইয়ের সুর আমার কানে এসে শুল হয়ে বিঁধলো। ও বাড়িতে সানাইয়ের সুর বাজা মানে একমাত্র সুষমাদিরই বিয়ের সানাই হবে এটা বুঝতে বাকি থাকে না। বাড়িতে দুটো মাত্র প্রাণ। তিন বছরের সুকন্যা আর সুষমাদি। তবেকি সুষমাদির বিয়ে হচ্ছে? কার সাথে হচ্ছে,কেন হচ্ছে? এতো দিন যে মানুষটি বিয়ে করেনি এখন কেন করতে হচ্ছে। বাবা মারা যাওয়ার পর দুনিয়াতে একমাত্র মেয়ে ছাড়া সুষমাদির আর কেউ ছিলনা। মেয়ে এবং নিজের বেঁচে থাকার জন্য তাকে কাজ করতে হতো। মানুষের দৃষ্টিতে সে রোজ খুন হতো। তার বাবা বেঁচে থাকতেও তার বিয়ে নিয়ে আলোচনা হয়েছে কিন্তু বৃদ্ধ বাবার কথা চিন্তা করে সে রাজি হয়নি। কাঁপাকাঁপা পায়ে সুষমাদির বাড়ির উঠোনে পা রাখি। কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থেকে বুঝতে চেষ্টা করি। এর মাঝে সাজুগুজু করে সুষমাদি বেরিয়ে আসে। তার পাশে আমার মাও ছিল। আমি হতবাক হয়ে যাই। বুঝতে বাকি থাকেনা কিছু। একবার সুষমাদি সম্ভবত আমার দিকে তাকিয়েছিল আড়চোখে। সে চোখের দৃষ্টি যেন আমাকে খুন করতে চায়। আমি বেরিয়ে যাই। আমি হাটছি দিগন্তের পথে। কোথায় যাচ্ছি তার ঠিক নেই। হয়তো এই যাওয়ার কোন শেষ নেই। হয়তো এই পথ চিরকালের মত অচেনা হতে চলেছে।

 

কানাই লাল স্যারের ঘরের যে জানালায় আমার চোখ কারো হাসিমুখ খুঁজে ফিরতো, সেই জানালাটাও হয়তো খোলাই ছিল। কিন্তু আমার পোড়া চোখ সেদিকে ভুলেও একবার তাকালো না। পথে যেতে যেতে কত জনের সাথে দেখা হলো। তারা হয়তো আমার চোখে বিষন্নতা দেখেছিল, দেখেছিল কোন এক গভীর শুণ্যতা। আমার হাত ধরে দু একজন থামিয়ে কুশলাদি জানতে চেয়েছিল, আমি বলেছি ভাল আছি। কিংবা ভাল থাকার অবিরাম অভিনয় করে চলেছি। হাটতে হাটতে নবগঙ্গা নদীর ধার ধরে কত দুর গিয়েছি জানি না। আমি এতোটা দূরে যেতে চাইছি যেখানে সানাইয়ের সুর নেই,মেহেদীর রঙ নেই, কাজল কালো হরিণী চোখে তাকিয়ে কেউ আমাকে খুন করবে না। অনেক আগেই আমি সেই দুরত্ব অতিক্রম করে এসেছি। কিন্তু পোড়া চোখের পাতায় ভেসে আসছে কপালে লাল টিপ, আলতা রাঙা পা, সাখা সিদুরের ছবি। কানে অবিরাম বেজে চলেছে সানাইয়ের সুর। একটা ছোট্ট মাটির ঢিলাকেও অসহ্য লাগছে। পথ থেকে সেই ঢিলাটা কুড়িয়ে ছুড়ে মারছি নবগঙ্গার জলে। জল ছিটকে পড়ছে চার দিকে। আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি সে আকাশে কোন মেঘ নেই, সে আকাশে উজ্জল সুর্য যেন সব টুকু তেজ ঢেলে দিয়ে আমাকে পোড়াতে চায়। যদি ঢিল ছুড়ে আকাশাকে ছোয়া যেত, তবে একটা ঢিল ছুড়ে আকাশের বুকটা ছিন্ন ভিন্ন করে দিতাম। কেন আজ তার চোখে জল নেই,কেন সে কান্নার বৃষ্টি হয়ে নেমে আসেনা আজ। এক নিখিলেশ কেন অবিরাম অভিমানে জ¦লতে থাকবে।

 

আজ বোধ হয় আমার সেই দিন। আজওকি তবে নকখোলার বিল আমাকে আশ্রয় দেবে না? সেও কি সবার মত আমার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। সুষমাদির বাড়িতে যে সানাইয়ের সুর বাজছে সে বড়ই করুণ মনে হয় আমার কাছে। এর চেয়ে ভাল ছিল বধিরতা, তাহলে সেই সুর শুনতে হতো না কোন দিন। এর চেয়ে ভাল ছিল অন্ধ হওয়া, তাহলে দেখতে হতোনা সেই আলতা রাঙা পা,কপালের লাল টিপ, বেনারসীতে জড়ানো চির চেনা মুখখানি।

 

মায়ের কথা মনে পড়ছে খুব, সেই সাথে দিদির কথাও। এই যে আমি হাটছি নকখোলার বিলের দিকে, এ আমার অনন্তের পথে হেটে যাওয়া। এই পথ কিছুক্ষনের মধ্যেই ফুরিয়ে যাবে। হয়তো কোন দিন শোনা হবেনা দিদির আদুরে ডাক, মায়ের স্নেহ মাখা বুলি। বাবা গঞ্জ থেকে ফিরে এসে যখন নিখিলেশ বলে ডাক দিবে, তখন কেবল শুন্যতা ছাড়া আর কিছু ফিরে আসবে না। ঘরখানা আজীবনের মত শুন্য হয়ে পড়ে থাকবে। কিন্তু যে মায়াবীনির ডাক শুনতে আজ ছুটে চলেছি নকখোলার বিলের দিকে সে কি তবে সেদিনের মতই নিরব থাকবে, যেদিন আকাশে পুর্ন চাঁদ ছিল আর ছিল শত কোটি তারার মেলা। সেই জোছনার আলোয় চারদিক ছিল আলোকিত।

 

ভেলা নিয়ে হিজল তলা পেরিয়ে সপ্তসিন্ধু নামে যে যায়গাটি ছিল সেটিও পেরিয়ে এসেছি। আজও সেদিনের মত ভরা জোছনা চারদিক আলোকিত করে রেখেছে। বিলের জলে ভেলা ভাসানোর আগেই সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। সানাইয়ের সুর থেমে গেছে সেই কবে, কিন্তু আমার কানে সেটা বেজে চলেছে অবিরাম। সে যেন আমাকে শোনাতেই ব্যস্ত। যে মুখ প্রতিদিন সকাল সন্ধ্যা আমার সামনে ভেসে উঠতো গোচরে অগচরে সে এখন অতি দূর নক্ষত্রের পথে আজীবনের মত হারিয়ে গেছে। যাবার বেলায় তার সাথে কথা হয়নি,হয়তো আর কোন দিন সেই চিরচেনা কন্ঠটি শোনা হবেনা।

 

দ্বিতীয়বারের মত নকখোলার বিলের মায়াবীনি আমার সাথে ছলনা করলো। সারা রাত বিলের পানিতে ভেলা ভাসিয়ে বেড়ানোর পরও সে একটিবারের জন্যও আমাকে ডাকলো না। কেন ডাকলো না কে জানে! কেবলই মনে হতে লাগলো মানুষ যা বলেছিল সব ভুল ছিল, সব ছিল রটনা। এই ঘোলা জলের নকখোলার বিল, দুরে হিজল তলার স্বচ্ছ পানি, কারো সাথে প্রতারণা করেনি কখনো। মানুষ বিনা দোষে কলঙ্ক তিলক পরিয়ে রেখেছে যুগের পর যুগ।

 

কারো একজনের ধাক্কায় ঘুম ভাঙতেই ধড়ফড়িয়ে উঠি। ভেলার উপরই কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ভেলাটা ভাসতে ভাসতে তীরে এসে থেমে গেছে। কিন্তু বিলেতো কোন ¯্রােত নেই। আর যতদূর মনে পড়ে আমিতো বিলের মাঝামাঝিতেই ছিলাম যতক্ষন জেগে ছিলাম। কখন ঘুমিয়েছি, কিভাবে তীরে এসেছি তা জানা হয়নি। যে আমাকে ধাক্কা দিয়েছে তাকে আমি চিনি না। সম্ভবত অন্য কোন গায়ের লোক সে। তবে সে ছিল ভেলাটির মালিক। তার কথাতে বুঝলাম সে যেখানে ভেলাটি রেখেছিল সেখানে না পেয়ে খুঁজতে খুঁজতে এদিকে এসে পেয়ে গেছে। সারা রাত আমি ভেলাতে ভেসে কাটিয়ে দিয়েছি শুনে তার যেন বিস্ময়ের সীমা নেই। আমি জানি সে চারদিক রটিয়ে দেবে। এও জানি সে যেহেতু আমাকে চেনেনা তাই যাই বলে বেড়াক তাতে কারো কিছু আসে যায় না। হয়তো যুগের পর যুগ নকখোলার বিল নিয়ে মানুষের যে ভ্রান্ত ধারণাা ছিল সেটার মতই আরো নতুন কোন ভ্রান্ত ধারনার জন্ম নেবে।

 

বেলা হয়ে এসেছে। সারা রাত বাড়িতে ফিরিনি দেখে বাবা মা হয়তো চারদিকে খোঁজ নিয়েছে। যে বিল আমাকে ধরে রাখতে পারেনি, ফিরিয়ে দিয়েছে বারবার, সে জীবন বিলিয়ে দেওয়ার কোন মানে হয়না। আমি ফিরে যাই মায়ের কোলে, নিজ বাড়িতে। সুষমাদির বাড়ির কাছে যেতেই দেখতে পাই একদল লোক গরুর গাড়ি থামিয়ে বাড়িটি ভেঙ্গে নিয়ে যাচ্ছে। জানতে পারি বিয়ের সাথে সাথে বাড়িটি বিক্রি করে দিয়ে গেছে সুষমাদি। কত সহজেই মায়ার ব্াধন মানুষ ছিন্ন করতে পারে তা ভেবে বিষন্ন হয়ে পড়ি। এ ভব সংসারে কেবল একজন নিখিলেশ মায়া কাটিয়ে উঠতে পারেনি। বাড়িতে ফেরার পর মা বাবা বুকে জড়িয়ে ধরে যে আদর করেছিল তাতে মনে হয়েছিল হারিয়ে যাওয়া সন্তানকে তারা ফিরে পেয়েছে। বারান্দায় পাটি পেতে মায়ের পাশে বসে থাকি নিরবে। শুন্য চোখে তাকিয়ে থাকি পথটার দিকে। যে পথে কোন দিন ফিরে আসবেনা ব্ধান ছিন্ন করে যে চলে গেছে ।

 

পার্ট-১২

বলাই নেই তিন বছর হতে চললো। এই তিনবছরে জীবনের রঙ পাল্টেছে বহুবার। সে চোখের আড়াল হওয়ার সাথে সাথে মনেরও আড়াল হতে চলেছে। বলাইয়ের সাথে আমার কত হাসি কান্নার স্মৃতি মিশে আছে। একসাথে স্কুল কলেজ যাওয়া, নকখোলার বিলে ভেলায় চড়ে ঘুরে বেড়ানো, আরো কত কি। সেই বলাই এখন আর নেই। ভাগ্যের সন্ধানে সে তার বাপের শেষ সম্বল চাষের জমিটুকু বিক্রি করে মালদ্বীপ গেছে। তিন বছর হয়ে গেছে কিন্তু বলাইয়ের কোন খোঁজ পাইনি। প্রথম দিকে সে কিছু কিছু টাকা পাঠাতো তার পর তাও বন্ধ হয়ে গেছে। বলাইয়ের বাবা মা এক মাত্র ছেলের জন্য পাগল প্রায়। তাদের একটাই চাওয়া ছেলেটা ভালভাবে দেশে ফিরে আসুক। বলাইয়ের কি হয়েছে তা আমার জানা নেই। মাঝে মাঝে মনে হতো সে বুঝি ইচ্ছে করেই আড়াল হয়ে গেছে,ইচ্ছে করেই হারিয়ে গেছে। যতই ঘৃনা করিনা কেন বিদেশ যাওয়ার সময় তার সাথে শেষ দেখাটা করতে ভুলিনি। আমি কিছু বলার আগে স্বভাব মত সে বলেছিল, এই দেশে, এই গায়ে থেকে আর কি হবে?যেখানে দু মুঠো ভাত জোটেনা,ঘুমানোর জন্য ঘর জোটেনা, সেখানে আর থাকতে চাই না। ওর অভিমানি কথায় মনটা ভারি হয়ে ওঠে। কিন্তু যে খোঁচা দিতে শিখেছে সে খোঁচা না দিয়ে কথা বলার মানুষ না। যেতে যেতেও সে জ¦ালিয়ে যায় তার অনলে। আক্ষেপ করে বলেছিল ”তোমার খোলা চুল,স্নিগ্ধ হাসি/বড় মায়া কাড়া,বড় ভালবাসি। আমি জানি সে মনে মনে সুষমাদিকে ভালবাসতো। সুষমাদির একাকীত্ব তাকে ভাবাতো এবং তার দৃষ্টি সারাক্ষণ সুষমাদিকে খুঁজতো। যেতে যেতে তাই তার কন্ঠে আক্ষেপ ঝরে পড়ে। যে বাতাসে আর কোন দিন সুষমার খোলা চুল উড়বে না,যে পুকুরে সে আর কোন দিন অবাধ সাতারে মেতে উঠবেনা,যে পথে কোন দিন সে হাটবেনা, সে বাতাসে নিঃশ্বাস নিতে আমার কষ্ট হয়,সে পুকুরে সাতার কাটতে আমার বিষাদ লাগে,সেই পথে হেটে যেতে আমার ক্লান্তি লাগে।

 

বলাইয়ের মনে যে ভালবাসা জন্মেছিল তার কারণে সে কোন দিন সুষমাদিকে দিদি বলে ডাকেনি। তিন বছরের ছোট ছিল বলাই। সুষমাদির বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর বলাইকে ছন্নছাড়ার মত ঘুরে বেড়াতে দেখতাম। কলেজে যেত না ঠিকমত। তার পর একদিন কোন ভুত ঘাড়ে চেপে বসলো, সে দেশান্তরি হবে। সেই যে সে দেশান্তরি হলো এখন আর তাকে খুঁজে পাইনা। নকখোলার বিলের পানিতে পানকৌড়ি ভেসে বেড়ায়,ভেলায় চড়ে কত বিকেল পার করে দেই, শুধু ভেলার অন্য প্রান্তে বলাই নেই। হয়তো কোন দিনও তাকে আর ভেলার অন্য প্রান্তে খুঁজে পাব না।

 

পড়াশোনার পাট চুকিয়ে কানাই লাল স্যারের চেষ্টায় অম্বিকাপুর হাইস্কুলে চাকরি পেয়ে গেলাম। দিদির বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর বাড়িতে মানুষ কমে গেল, সেই সাথে খরচও কমলো কিছুটা। কিন্তু সারাদিন মায়ের কথা বলার মত মানুষের খুব অভাব ছিল। দিদি থাকতে মা সারাদিন দিদির সাথে গল্প করতো। দিদির বিয়ের পর কিছুদিন সুষমাদির সাথে গল্প হতো। এর পর আমি চাকরি পাওয়ায় সংসারে সুখ আসতে শুরু করেছে। বাবাকে পরিশ্রম কমিয়ে দিতে বলেছি। গোপিনাথপুর থেকে একটা ভাল সম্মন্ধ এসেছিল আমার জন্য। বাবা, মা, দিদি, জামাই বাবু সবাই মিলে কনে দেখে এসে জানাল তাদের বেশ পছন্দ মেয়েটিকে। আমি আর অমত করিনি বড়দের কথায়।

 

বিয়েতে বলাই ছাড়া আর সবাই ছিল। অনিমেষ ছিল,পঙ্কজ ছিল,নিমাই ছিল, শুধু বলাই ছিল না। তার থাকার কথাও না। সে তো দুর বিদেশে দেশান্তরি হয়েছে। বাসর রাতে বিছানায় ঘোমটা মাথায় যে আমার জন্য অপেক্ষায় ছিল তাকে প্রথম বার দেখেই চমকে উঠেছি।তার গলার স্বর আমার চেনা,তার হাসিটাও আমার চেনা। শরীর থেকে যে মিষ্টি সুবাশ ছড়িয়ে পড়ছিল সেটাও যেন আমার চেনা। ঘোমটার আড়ালে যেন অতি পরিচিত কারো মুখ লুকিয়ে রাখা। সেই মুখটা কার? জানালায় অবিরাম হাসি মুখের সেই আলো ছায়ার রানী নাকি অন্য কেউ যার অবাধ সাতারের মধ্যে কেউ কেউ খুঁজে পেতো পৃথিবীর তিন ভাগ সৌন্দর্য। ঘোমটা সরাতেই যেন তেত্রিশটা সুর্য একসাথে আমার চোখের সামনে আলো দিয়ে উঠলো। যেন নিরানব্বইটা পুর্ন চাঁদ একসাথে মিলে মিশে একাকার হয়ে গেল। কিন্তু সেই আলোর ধারায় কার যেন ছায়া পড়েছে। তুমি সুতোয় বেঁধেছ শাপলার ফুল নাকি তোমার মন, বলে তার মুখটা উচু করে ধরলাম। সেই প্রথম কথা বলে উঠলো।

 

তার হাসিতে প্রেম ছিল,তার কথায় যাদু ছিল। সে আমাকে প্রথম যে কথাটা বলেছিল এখনও বেশ মনে পড়ে। বিয়ের দেড় বছর পর সেটা মনে পড়তে বাধ্য করেছে আমাকে। সেদিনের মতই আরো একবার আমি চমকে উঠেছি। জীবনে না জানি আরো কতবার চমকাতে হবে আমাকে। আমি তাকে কোন নামে ডাকবো সেটা সে জানতে চেয়েছিল। তার নাম ছিল তমালিকা। আমি তাকে বলেছিলাম তোমাকে আমি তমালিকা বলেই ডাকবো। সে যখন বললো তার আরো একটা নাম আছে আমি সেটা ধরেও চাইলে ডাকতে পারি। আমি তখন সেই নামটা শোনার জন্য অপেক্ষায় ছিলাম। সে বলেছিল তার নাম সুষমা! ভীষণ রকম চমকে উঠেছিলাম সেদিন। বিষম খেলাম বেশ। একজনের সাথে আরেকজনের নাম মিলতেই পারে, তবে তার সেই চোখ, সেই নাক, সেই বাকা হাসিও যে মিলতে পারে তা ভাবিনি। কিংবা হয়তো আমার চোখ নিজের মত করে দৃশ্য সাজিয়ে নিয়েছে। বিছানা ছেড়ে নেমে সে জগ থেকে পানি ঢালতে ঢালতে বললো অমন চমকে উঠলে যে! আমার তখন কি আর বলার থাকতে পারে। যেন নকখোলার বিলে একাকী ভেলায় চড়ে ভেসে আছি আর পিছন থেকে মায়াবীনি সেই রাক্ষুসী আমাকে ডাকছে আর আমি নিরুত্তর ভেসে চলেছি কুলের দিকে।

 

দুজন দুজনাতে একাকার হয়ে কত কথা হয়েছিল সেদিন। ওর খুব কবিতার প্রেম ছিল। বিয়ের প্রথম রাতেই ও আমাকে কবিতা শুনিয়েছিল। সে তার প্রিয় কবিতার দুটো লাইন যখন শুনিয়েছিল তার পর থেকে কবিতা শুনতে আর ইচ্ছে হয়নি। সে আচমকা আমাকে চমকে দিয়ে আবৃত্তি করে উঠলো

“সুষমাদি তোমার খোলা চুল,স্নিগ্ধ হাসি/বড় মায়াকাড়া বড় ভালবাসি,

খোলা জানালায় অবিরাম সুষমাদির হাসিমুখ/সে মুখে তাকিয়ে খুঁজি জীবনের সব সুখ”।

 

জীবন বড়ই বৈচিত্রময়। কবিতা শুনে আমি চমকে উঠে কথা হারিয়ে ফেলি। তার মুখে তখন অবিরাম বাকা হাসি। বলতে পারিনা তোমার বাঁকা হাসিতেও প্রেম আছে। ঘোর লাগা কন্ঠে বলি, এ কবিতা কোথায় পেলে? সে হাসে, উত্তর দেয় না। পরদিন সকালে বেশ বেলা করে আমার ঘুম ভাঙে। আড়মোড় ভেঙে বিছানা ছাড়তে গিয়ে বালিশের নিচেয় কিছুর অস্তিত্ব খুঁজে পাই। বের করে দেখি একটা ডায়েরি,আমার লেখা। খুলে দেখি তেমন কিছুই লেখা নেই সেটাতে। শুধু মাঝখানে একটা পৃষ্ঠাতে ওই কবিতার চরণদুটি। সেখানে সুষমাদির নাম লেখা নেই, কিন্তু তমালিকা কি করে নাম জুড়ে দিয়ে আবৃত্তি করেছিল তা জানা হয়না।

 

দেড় বছর পর আমাদের ঘর আলো করে এক কন্যা সন্তানের জন্ম হলো। বাবা, মা, দিদি সবাই অনেক খুশি। আমারও অনেক ভাললাগা ভালবাসার ফসল ছিল সে। আতুর ঘর থেকে বের হওয়ার পর যখন নাম রাখার সময় এলো সবাই তাদের পছন্দ মত নাম বলতে লাগলো। আমি তমালিকাকে বললাম কি নাম রাখবা মেয়ের? সে বাসর রাতের মত সেই বাকা হাসি হেসে জানাল মেয়টির মান রাখলাম সুকন্যা! আমি তখন ঠায় দাড়িয়ে নির্বাক চোখে একবার তমালিকার দিকে আর একবার তার কোলের শিশুকন্যার দিকে তাকিয়ে জীবনের রহস্য খুঁজতে লাগলাম। ক্রমাগত আমি রহস্যের অতল গভীরে হারিয়ে যেতে যেতেও কোন কুল কিনারা খুঁজে পেলাম না। তবে কি তমালিকার মধ্যে সুষমা ফিরে এসেছে? তবে কি সদ্য জন্ম নেওয়া শিশুটির মধ্যে সুকন্যা ফিরে এসেছে। সবার মতামতের ভিত্তিতে মেয়েটার নাম সুকন্যাই রাখা হলো। অনেক বছর পর হয়তো পরিচিত নামটা ফিরে এলো এই ঘরে, এই আঙিনায়।

 

 

 

সুষমা কোথায় আছে আমি জানিনা। শুনেছি সে তার স¦ামীর সাথে একমাত্র কন্যাকে নিয়ে কোলকাতা চলে গেছে। কিন্তু আমি জানি সে আছে এই আঙ্গীনাতে, আমার আশেপাশেই। বারান্দায় খেজুর পাতার পাটি পেতে এক মাত্র মেয়ে সুকন্যাকে যে দুধ খাওয়াচ্ছে হয়তো সেই সুষমা,হয়তো সে তমালিকা নয়। তার মুখের দিকে তাকিয়ে কত অজানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজি কিন্তু সদুত্তর পাই না। যে হাসি মুখ আমার অন্তরকে প্রশমিত করে সে তমালিকা কিংবা সুষমা হতে পারে কিন্তু সে সুষমাদি নয়।

 

=================সমাপ্ত====================================

 

সুচনা- ২৫ মে ২০১৬

দুপুর ২.৩০

শেষ

২৭ মে ২০১৬

বিকাল ৫.৫৫

 

 

জাজাফী

ইমেইলঃ [email protected]

স্বজনহীন এই সব অনাত্মীয় মানুষের ভিড়ে

কবিতার ক্লাশে বসে তোমাকে খুঁজেছি শুধু ।কবির ভাষায় তিনি যাকে খুঁজেছেন সে হয়তো কোনো অপ্সরা,আফ্রোদিতি,স্বপ্নের রাজকুমারী।কিন্তু পাঠকমাত্রই কবিতার ক্লাসে কবির কবিতায় বুদ হয়ে ক্ষণিকের জন্য হলেও একটি বার কবির মুখ কল্পনা করে।বিস্মত চোখে কবির লেখা কবিতার প্রেমে পড়ে বারংবার। বাংলা কবিতার রয়েছে সুপ্রাচীন ইতিহাস যা অন্যান্য অনেক ভাষার ক্ষেত্রে তুলনামূলক ভাবে কম।ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় বাংলা কবিতার প্রধান যে কয়জন কবির নাম সবার আগে চলে আসবে তাদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ একজন। বাংলা কাব্যজগৎ প্রধানত রবীন্দ্রনাথকে ভিত্তি করে উঠে দাঁড়িয়েছে এমন কথাও সাহিত্যবোদ্ধাদের মুখে হরহামেশাই শোনা যায়। কেননা তিনিই বিশ্ব দরবারে বাংলাসাহিত্য তথা বাংলা কবিতাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। ইতিহাস স্বাক্ষ্য দেয় রবীন্দ্রপূর্ব বাংলা কাব্য বিশ্বদরবারে খুব বেশি পৌঁছাতে পারেনি।হয়তো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল সাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত না হলে বাংলা সাহিত্য বিশ্ব দরবারে যতটা পরিচিত হয়েছে তার সামান্য অংশও পরিচিতি পেতো না। এ কারণে রবীন্দ্রনাথের কাছে বাংলা সাহিত্যের অনেক ঋণ আছে। রবীন্দ্রকাব্যের এই সাফল্য এবং অবদানের কথা স্বীকার করে নিলেও আমাদেরকে বলতে হবে বাংলা কবিতাকে হাঁটতে শিখিয়েছেন রবীন্দ্র-পরবর্তী ষাটের দশকের কবিরা। তাঁরা প্রত্যেকেই স্বতন্ত্র কাব্যভাষার মাধ্যমে বাংলা কবিতাকে করেছেন সমৃদ্ধ,পাঠকপ্রিয়। শহীদ কাদরী,শঙ্খঘোষ,বিনয় মজুমদারেরা তাই বহুল পঠিত।

আধুনিক বাংলা কবিতার মাধ্যমে আমাদের রাজনৈতিক আন্দোলন সাংস্কৃতিক নব-জাগরণের ধারার সাথে যুক্ত হয়েছিল। ষাটের দশকের ‘রেনেসাঁ’ ছাড়া আমরা বিশ্বতালে তাল রেখে চলা শিখতে পারতাম না, আমাদের সেই বিরল আত্মবিশ্বাসটুকু আত্মস্থ হতো না যেটি না আসলে একটি সংগ্রামরত জাতি জগৎ-সম্মুখে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না, যেমন পারে না একটি অর্বাচীন বালক ভাব প্রকাশের ভাষাহীন হয়ে সৃষ্টিশীল হতে, শত মেধা থাকা সত্ত্বেও। ষাটের দশকের কবিতার ভুবন, তার শিল্পলোক, সেই বালকটিকে এক মেধাসম্পন্ন জাগতিক সম্ভাবনার একটি আত্মনির্ভর পাটাতন দিয়েছিল, যার ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে অনায়াসে একটি জাতি-নির্মাণের স্বপ্ন দেখা যায়। ষাটের দশকের সেই কবিদের মধ্যে যারা অগ্রগণ্য তাদের একজন  কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা। যিনি তাঁর আপন আঙ্গিকে বাংলা কবিতাকে দিয়েছেন অন্য এক উচ্চতা।তাঁর কবিতা  রবীন্দনাথ থেকে সম্পূর্ণ প্রভাবমুক্ত একথা তিনি নিজেও কখনো দাবী করেন নি, আবার এ কথাও কোনভাবেই স্বীকার করা যাবে না যে কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা ‘রবীন্দ্রানুসারী’ কবি।দরিয়া পাড়ের এই কবি আপন স্বকীয়তায় উজ্জ্বল,তাঁর কবিতায় এদেশের ইতিহাস ঐতিহ্যের সুমধুর গাঁথা জয় গান তাকে ’জাতিসত্ত্বার কবি’ সাম্মানে ভূষিত করে। ‘জাতিসত্তার কবি’ উপাধী বিষয়ে আমরা উল্লেখ করতে পারি  কবির কবিতার একটি লাইন—

‘যতদূর বাংলা ভাষা, ততদূর এই বাংলাদেশ’।

একটি মাত্র লাইনের মধ্যেই কত কিছু বলা হয়ে গেছে। অসাধারণ ভাবে অনেক অব্যক্ত কথা ফুটে উঠেছে । নুরুল হুদাকে আমরা অনায়াসেই বহুমাত্রিক কবি হিসেবে সম্মোধন করতে পারি কেননা তিনি কেবল মাত্র কবিতা রচনাই নয় বরং অন্যান্য বিষয়েও অবদান রেখে চলেছেন। তিনি বাংলা কাব্যে স-চেতন কাব্য আন্দোলনের প্রধান সংগঠক । জীবন থেকে পেরিয়ে গেছে সত্তরের অধিক বসন্ত।তবু্ও যেন এখনো তরুণ। যে কোনো তরুণের চেয়ে এখনো তিনি লেখালেখিতে বেশ প্রাণ খুঁজে পান। প্রয়াত কবি শামসুর রাহমানকে কবি নুরুল হুদা সম্পর্কে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি নির্দ্বিধায় বলেছিলেন  নুরুল হুদা বাংলা সাহিত্যের একজন‘গুরুত্বপূর্ণ কবি’ তাঁর কবিতায় চিত্রকল্প এক অবধারিত চিরসত্য রূপে ধরা দিয়েছে। কবি নূরুল হুদা তাঁর কবিতায় অত্যন্ত শিল্পিতভাবে স্বতন্ত্র্য এক ভাষা প্রয়োগের মাধ্যমে পাঠকের কাছে তার কবিতার প্রতি নিরবচ্ছিন্ন মনোযোগ দাবী করেছেন। সেটা তিনি পেয়েও গেছেন এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। যেমন জাতীসত্ত্বার  কবিতায় তিনি লিখেছেন-

 

বুনতে বুনতে বেড়ে উঠি, বুনতে বুনতে বুড়ো হয়ে যাই;

আমার অস্তিত্ব জুড়ে অসংখ্য সুতোর দাগ

বুকের গভীরে ঘোরে জন্মস্মর সুতো-কাটা কল

শিরায় শোণিত-স্রোতে

সুতোর মতোন কত শ্বেত শুভ্র নদী

পলিহীন প্লাবনবিহীন

সে নদীতে ভেসে ওঠে নাওয়ের বহর,বুকে তার

হাসন-লালন আর এক তারে বাঁধা লক্ষ সাঁই;

পুনর্বার

এই ডাঙা ছেড়ে যাই শ’খণ্ড স্বদেশ ছেড়ে অখণ্ড স্বদেশে

যাই মূল স্বপ্নে যাই ।

কবির এই কাব্য ভাষায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত বিশাল এক ইতিহাস। তাঁর এই কাব্য-নান্দনিকতা কাব্য-পিপাসু মানুষকে প্রাশান্তি দেয় এবং তিনি অনায়াসে জাতিসত্তার কবি বলে সকলের আন্তরিক স্বীকৃতি পেয়ে যান । তিনি আরেক স্থানে যেমন লিখেছেন,

 

‘ভালোবেসে জীবনকে আনগ্ন চেয়েছি

আমরা তামাটে জাতি, আমরা এসেছি

রাজধর্ম পিছে ফেলে পিছে ফেলে গোত্রের আরতি

লোকধর্মে লোকসংঘে সুদীক্ষা নিয়েছি

আমরা তামাটে জাতি, আমরা এসেছি ।’

 

১৯৭২ সালে মুহম্মদ নূরুল হুদার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘শোণিতে সমুদ্রপাত’ প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থে কবির উৎকর্ষ এবং পরিণতিবোধের স্বাক্ষর রয়েছে যেমন একটি কবিতায় তিনি লিখেছেন:

 

দূরে যাচ্ছো, বৃষ্টিপাত থেকে দূরে যাচ্ছে রিমঝিম পায়

বাজিয়ে শঙ্খের চুড়ি, হাওয়ায় এলিয়ে দিয়ে কালো কেশদাম

ঘুর্ণি নৃত্যে মেতে দূরে যাচ্ছো, দূরে যাচ্ছো তুমিও উর্বশী।

 

পাঠক মাত্রই এ গ্রন্থে কবির মধ্যে কিছু প্রস্তাবনা দেখতে পারবেন। এই গ্রন্থের কবিতা থেকে এটা স্পষ্ট হয় যে কবির হৃদয়ে প্রেম-বিরহ নস্টালজিয়া থাকলেও কবি তাতে কাতর নন, কবি তাঁর অতীতকে ফিরে আসতে আহবান জানান; তারপর অতীত আর বর্তমানের তফাৎ মহাকালীয় চেতনায় একীভুত করে ফেলেন। যেমন একস্থানে এসেছে:

 

‘যেখানেই হাত রাখি তোমার শরীর’

সুতরাং ‘সুতনুকা, আজ থেকে তোমাকে বিশাল বিদায়।’

আমাদের মনে হয় কবি কোনো সংকীর্ণ প্রত্যাশা দ্বারা আক্রান্ত নন যদিও কবির দুঃখ বিশাল, চেতনা বিশাল; যেমন এক কবিতায় তিনি লিখেছেন

‘যেন বৃদ্ধ সফোক্লিস

গ্রীসীয় খাড়ির মতো ক্লান্ত,

ভারি পাপড়ি জড়িয়ে অ্যাজিয়ান তীরে এসে দাঁড়ালো হঠাৎ।’

কবি সংকীর্ণ শব্দবন্ধ পরিত্যাগ করে ঐতিহ্যের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়েছেন।কবি মুহাম্মদ নুরুল হুদা তাঁর অসংখ্য কবিতায় চিত্রকল্পের ও আর্দশমান নানা উপমান সাদৃশ্য বর্ণনায় দ্যোতিময় করেছেন। ‍উদাহরণ স্বরূপ আমরা উল্লেখ করতে পারি ‘কোনো বৃক্ষ বিহঙ্গকে’ কবিতার নিম্নলিখিত লাইনগুলি-

“পালক রয়েছে পড়ে, উড়ে গেছে ডানা।

মন আছে, শরীরে উধাও। মধ্যদিন মধ্যরাত কোথায় কখন

হঠাৎ যাত্রার শুরু, কখন যে ট্রেন

নিজেই পালাতে গিয়ে জীবনের সূক্ষ্ম মেমব্রেন

ছিঁড়ে ফেলে চোখা শিঙে জেদী ম্যাটাডোর।

দরোজা খুলতে গিয়ে, দেখা যায়, খোলা আছে দোর।

আবদ্ধ থাকে না;

বৃক্ষের ও রয়েছে পাখা। কোনো বৃক্ষ বিহঙ্গেকে

পেছন ডাকে না’।

কবি মুহাম্মদ নুরুল হুদার কবিতায় প্রতিধ্বনি হয়ে ওঠে স্বদেশ স্বজাতির বিরল পদচারণর সম্মোহনদীপ্ত কালের মহাজাগরনী শক্তি। ‘দরিয়া চূড়ায়-বাড়ি’ কবিতাটি পড়লে কবির উদ্দাম- উচ্ছাস ভরা জীবনের কিভাবে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সংগ্রামরত এবং সে সংগ্রামে তিনি বিজিত হওয়ায় স্বপ্ন দেখেন তাঁর চিত্রলেখা ।

“একটি ঢেউ দুই ঢেউ লক্ষ- কোটি হাজার

ঢেউরের পরে ঢেউ ভাসছে। হাসছে বেশুমার

চলখলবল টলে ওরা, উছলে পড়ে ঘাড়ে

ঘোর বর্ষায় মত্ত ফনায় ছোবল মারে পাড়ে।

জোয়ার যখন ফুঁসে উঠে রোষে ওদের শ্বাস

ক্ষুধার থাবায় হোটেল মোটেল করছে বেকার গ্রাস

ভাটার সময় নিচ্ছে টেনে বেমান দরিয়া

নারী পুরুষ মাটি কাঁকড় সামনে যাকেই পায়।

কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা এ কবিতার মধ্য দিয়ে তার নাড়ীপোঁতা জীবনের উচ্ছ্বাস উদ্ভাসিত হয়। বাংলা কবিতায় তার আগমন প্রাক স্বাধীনতা পর্বে হলেও, উন্মোচন পর্ব স্বাধীনতা উত্তরকালে। সময়ের পথ পরিক্রমায় তার কবিতার প্রকাশভঙ্গির বহুতর ভাঙাচুরা চলেছে, চলেছে বির্নিমাণের ও বিবর্তনের বীক্ষা। স্বাধীন দেশের জাতীসত্ত্বার ভাবনা কবি নূরুল হুদার ভাবনাকে গতিশীল করেছে। দেশ, জগৎ, মানুষ, প্রেম, প্রকৃতি, নারী নানা রূপ-রস বৈচিত্র্যে প্রকাশ পেয়েছে ভিন্ন আঙ্গিকে। এই আঙ্গিক নির্মাণের মধ্য দিয়ে কবি নূরুল হুদা নিজেকে প্রকাশ করেছেন। নিজে হয়ে উঠেছেন কবিতার পাঠশালা। তার কাব্য ভাষা, স্বাতন্ত্র নির্মাণশৈলী তাকে নিয়ে গেছে এমন এক জায়গায় যেখানে নুরুল হুদা তার প্রাতস্বিক অবস্থানকে কাব্যকলার উঠোনে জায়গা দিতে পেরেছেন। ঐতিহ্যকে অবলম্বন করে কবিতাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার তাড়িত কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা শুরু থেকেই তার কাব্য সুষমায় যোগ করেছিলেন ভিন্নমাত্রা। মাটি ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে ঐতিহ্যকে তুলে নিয়েছিলেন কাঁধে। তার শিল্পচিন্তা কিংম্বা কাব্যকলার শব্দ নির্মাণ কাঠামোর বিন্যাসি আয়োজন সবখানেই তিনি এগিয়েছেন বাঙালি জাতিসত্তার ইতিহাসকে ধরে। যে কারণে দেখি, কবির জন্মস্থানের প্রতি তার যে টান কিংম্বা মৃত্তিকা সংলগ্নতা তাকে তাড়িত করেছে কাব্যকলার মধ্যেও তার জন্মদাগকে তুলে ধরার নিরন্তন প্রয়াস। যে কারণে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘শোণিতে সমুদ্রপাত’, দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘আমরা সশস্ত্র শব্দবাহিনী’ এবং তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘শোভাযাত্রা দ্রাবিড়ার প্রতি’-এই তিনটি কাব্যগ্রন্থের কবিতারগুলোর দিকে তাকালেই আমরা দেখি জাতিসত্তার বিষয়টি সর্বাগ্রে উঠে এসেছে। তার কবিতার অনন্য বিষয় বাঙালির জাতিসত্তা বিনির্মাণে তার ত্যাগ, তার সংগ্রাম, তার নিরন্তর যুদ্ধ। যে যুদ্ধের মধ্যে বসে তিনি সৈনিক কবি-কবিতার বরপুত্র লিখে চলেন দেশপ্রেমের ইশতেহার। তাঁর এই কাব্যসত্তা বাঙালির আবহমানকালের শক্তিমত্তার প্রতিনিধিত্ব করে। তাই তার “শোভাযাত্রা দ্রাবিড়ার প্রতি” কবিতায় দেখতে পাই-

সংঘাতে বিক্ষুব্ধ হই, নৈরাশ্যে তাড়িত হই, নেমে আসি পথে

শব্দশোভা জ্বলে ওঠে মিছিলে মিছিলে-শব্দ হয় সুতীব্র শ্লোগান

গণদাবী, গণতন্ত্র, সাম্যবাদ অনন্তর প্রতিশ্রুত হয়

শব্দ নয় শুধু মোম, শব্দ নয় সামরিক দেয়াল

বিশাল তিমির মতো একটি নতুন দ্বীপ

আজ রাতে জাগবে সাগরে, ক্রমে ক্রমে বাড়বে ভূবাগ

শ্যাম বৃক্ষের সারি, পাখিডাকা বন আর দৃপ্ত জনপদ

যাবে সেই দ্বীপে-স্বদেশ স্বজনহীন এই সব অনাত্মীয় মানুষের ভিড়ে

অবশেষে মিশে যেতে হয়, এসো সাথী হই;

জলমগ্ন হে দ্রাবিড়া, আমাদের যুগলাঙ্গ যাত্রা শুরু হোক।’

কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা কবিতা নির্মাণের নানা পর্যায় অতিক্রম করে বর্তমানে বাস্তবতার কবিতায় তার মেধা-মনন শক্তিকে নিয়োজিত করেছেন কাব্য নির্মাণের এমন এক জিজ্ঞাসায়, যেখানে বহুর আকাঙ্খা আছে। তিনি বহুর আকাঙ্খা ও স্বপ্নকে সচেতন কাব্য-নির্মাণের মধ্য দিয়ে শিল্প-সত্তা মানবমুখি করে তোলার চেষ্টা করছেন যা ইতিহাসের দাবীর সংগে সম্পৃক্ত। এ’দিক দিক থেকে তিনি প্রান্তিকতার কবিতায় বিশ্বাসী নন, কবিতার বহু মাত্রিকতা-প্রিয়তার অনুগামী। কোন হৈ চৈ নেই, আছে স্বপ্নগুলো সচেতন ভাবে পাঠকের মনে জাগরিত করে চিন্তা-কর্ম-ভাবনায় নতুন জিজ্ঞাসার উদ্রেক ঘটানো। নতুন হৃদ-স্পন্দনে মানুষকে সম্পৃক্ত করা। কবি যেমন তাঁর জাতিসত্তার কবিতায় সচেতন ভাবেই একটি জাতির নৃতাত্ত্বিক বিশ্লেষনের মধ্যদিয়ে তাঁর আদি পর্বের ইতিহাস, ইতিহাসে তার বিস্তার, তার সংগ্রাম, জয়-পরাজয়, নির্মাণ এবং বিবর্তন ইত্যাদিকে কাল পঞ্জির মতো বিশ্লেষিত করে কাব্য-রসায়ন নির্মাণ ও পূনর-নির্মাণ করছেন এবং শিল্প-মানকে অটুট রেখে কবিতা কে নতুন স্বপ্ন-ঘর পর্যন্ত পৌঁছে দিতে কর্ম-মুখর রয়েছেন ।

১৯৭৫ সালে প্রকাশিত হয় নূরুল হুদার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ, ‘আমার সশস্ত্র শব্দবাহিনী’ । প্রচলিত কাব্যপাঠের অভ্যাসকে ব্যাহত করেছে, কবিতার অবয়বের দিকে দিয়েও পূর্ববর্তী গ্রন্থের কবিতা থেকে পৃথক হয়ে গেছে। কোনো পড়ুয়া যদি প্রথমেই তাঁর এই গ্রন্থটি পাঠ করেন, তাহলে ঠিক কবিকে আবিস্কার করতে পারবেন না। কেননা, এই কাব্যের অনেক কবিতাই প্রাথমিক পাঠে মনে হয় নিতান্তই সহজ সরল যেমন:

পেলুম টাকা একটি টাকা টাটকা পেলুম

বুকে রাখলুম মুখে ঢাকলুম হাতে রইল ফাঁকা

পেলুম টাকা একটি টাকা হাটকা পেলুম

কেমন টাকা? আরশি টাকা, হাজার মুখ আঁকা

কাহার আরশি? রাজার আরশি, বাজার দরে হাঁকা।

 

নিরন্তর সংগ্রামের মধ্যদিয়ে কবি নূরুল হুদা নির্মাণ করে চলেন তার কবিতার ঘর গেরস্থালি। একুশ থেকে একাত্তর, দ্রাবিড় থেকে বাঙালি, সবকিছুই তার কবিতার উপজীব্য। যে কারণে আমরা দেখি, একুশের সঙ্গে তিনি পদ্মাপাড়ের ঢেউ সোয়ারের তুলনা করে লিখে চলেন কবিতা।

‘একুশ তো বাইশ নয়,বিশও নয়

একুশ কেবল একুশও নয়,

কত একুশ এলো গেলো

একুশ কি তবু একশই থেকে গেলো?

জীবনের তুমুল আলোড়ন, কোলাহল, ইতিহাস আর ভূগোলের অবস্থান নিয়ে কবি তাঁর তৃতীয় কার্বগ্রন্থ ‘শোভাযাত্রা দ্রাবিড়ার প্রতি’ নিয়ে হাজির হন ১৯৭৫ এ। এ গ্রন্থের নামের মধ্যেই বিবেচ্য বিষয় সংকলিত হয়ে আছে। ইতিহাসের কালচেতনার মধ্যে নুরুল হুদার অভিযাত্রা, রোমান্টিক মানসিকতার চেয়ে ক্লাসিক কাঠামোর দিকে তাঁর পক্ষপাতিত্ব; যে বিষয় এবং দার্শনিক বিষয়াদি তিনি রূপ দিতে তৎপর এ গ্রন্থে তার বিকাশ ঘটেছে। এ গ্রন্থে মুহম্মদ নূরুল হুদা যে দ্রাবিড়ার প্রতি নিবেদিত সে ‘মিথুনের শেষ নামে শাড়িহীনা, বিব্রস্ত্রা, আদিমা।’ তাঁর নায়িকারা রক্ত মাংসের নারী, মাতৃতান্ত্রিক কৃষিপ্রধান সমাজের নারী যারা শস্যবীজ রোপন করেছে, ধারণ করেছে মানব জীবাণু। যেমন তিনি “গৃহমুখী” কবিতায় লিখেছেন-

কে কোথায় কোন পাড়ে সুখে দুঃখে বেঁধেছিল নীড়

সবুজ চরের মতো প্রণয়িনী আঁচালের কাছে

সমর্পিত কে সেই যুবক।

তাঁর কবিতায় আছে দীপ্তির মনন, সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম যুক্তির কল্পনাময় প্রতীক ও রহস্যময় ভাষণ। সেই সাথে দেখতে পাই একটি সমান্তরাল প্রতিধ্বনি এবং বহুমাত্রিকতা। প্রতিটি চরণে তিনি তুলে আনতে চেষ্টা করেছেন প্রকৃতির অতিক্ষুদ্র বিষয়াবলি। দরিয়াপাড়ের কবি তাই কবিতা লিখতে হারিয়ে যান নিজের শৈশব-কৈশোর বেলায় দরিয়া নগরে।

বিশ্ববিখ্যাত কবিদের কবিতার দিকে তাকালে আমরা উদাহরণ স্বরুপ শেলীর প্রসঙ্গ টানতে পারি। শেলীর কাব্যের বিশেষ গুণ হিসেবে আমরা দেখতে পাই গতিশীলতা, প্রচন্ড হৃদয়াবেগ, মূর্তবাণী যেন বিশাল মানব সমুদ্রে মিলিত হয়।শেলীর সাথে তুলনা করছি না কিন্তু সমান্তরাল ভাবে দেখতে গেলে আমরা দেখতে পাই কবি নুরুল হুদার কাব্যেও সেই একই রকম আবেগ এবং বিশেষ করে মানব প্রেমেরই অনুষঙ্গ হয়ে থাকে তার পর সেটা ছড়িয়ে পড়ে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো তটভূমির দিকে। আমরা একপলকের জন্য ঘুরে আসতে পারি তাঁর ‘জাতিসত্তার কবিতায়’। যেমন–

‘তোমার স্মৃতিতে আজ লেখা হয় জীবনের লাল ইতিহাস

তোমার হাড়ের বহ্নি তাপ দেয় গৃহে গৃহে শীতার্ত নিশীথ’।

কবি হিসেবে পরিচিত হলেও তাঁর মধ্যে রয়েছে আরও নানাবিধ প্রতিভা। তিনি সমান ভাবে একজন ঔপন্যাসিক ও সাহিত্য সমালোচক। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা পঞ্চাশের অধিক। নূরুল হুদার জীবনে কবিতাই সব। কবিতাকে তিনি তাঁর জীবনের প্রধান বিষয় হিসেবে নিয়েছেন। তিনি চিন্তা করছেন এবং অতীতের ইতিহাস নিয়ে তাঁর কবিতা রচনায় ব্রতী হয়েছেন। ‘আমরা তামাটে জাতি’ শীর্ষক কাব্য গ্রন্থের কবিতায় কবি তাঁর স্বকীয়তাকে তুলে ধরেছেন এভাবে-

‘রোদ্দুর নেয়েছি আর বৃষ্টিতে বেড়েছি

সহস্র শতাব্দী দিয়ে নিজেকে গড়েছি

আমরা তামাটে জাতি, আমরা এসেছি।

কবির অধিকাংশ কবিতায় নানা বিষয় মডেল হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছে। তিনি প্রাণী ও জড়, প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান, মিথ ও প্রাসঙ্গিকতা, উপাখ্যান ও দর্শন, ঐতিহ্য ও পুরাতত্ত্ব, মহাজাগতিক বস্তু থেকে গাণিতিক প্রস্তর প্রভৃতির ব্যঞ্জনায় গড়ে তুলেছেন তাঁর ফিকশনাল ডাইমেনশনে। আমাদের এ পারিপার্শ্বিক বিশ্বের মধ্যে নবায়ন করতে চেয়েছেন এক ভিন্ন মাত্র। তাই তাঁর কবিতায় রূপক, সাঙ্কেতিকতা, আঙ্গিক, ভাষা, চিত্র ও দৃশ্যকল্প এক ভিন্নধর্মী মেটাফর তৈরি করেছে। এ ভিন্ন মেটাফর কবি হিসেবে তাঁর সময়ের থেকে তাঁকে আলাদাভাবে পৃথক করেছে। ধ্যানী ও জ্ঞানী মানুষ তিনি। কবিতার জন্য উজাড় করে দিয়েছেন সারাটা জীবন। বিপুল বৈষয়িক স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে কবিতার সাথে থেকেছেন। শুধু কবিতার সাথে পেতেছেন অভাবের সংসার । যাঁরা কাছ থেকে তাঁকে দেখেছেন তাঁরা জানেন নির্লোভ, নিরহংকার, সদালাপী, কবিতার স্বপ্নে বিভোর এই অসামান্য মানুষ কত সহজ ও সরল জীবন যাপন করেন। আমি নিজে কবি নূরুল হুদাকে যখন চিনতাম না সেই সময়ে দেখেছি বইমেলাতে কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে স্টলে স্টলে ঘুরে ঘুরে বই দেখছেন, কারো কারো সাথে গল্প করছেন। এর বহু বছর পর জানতে পেরেছি সাদামাটা যে মানুষটিকে আমি বইমেলায় ঘুরতে দেখেছি তিনিই নূরুল হুদা।

বিশিষ্ট নজরুল গবেষক কবি আব্দুল মান্নান সৈয়দ বলেছেন, ‘মুহম্মদ নূরুল হুদার কবিতার উতল তরঙ্গের পাশে গহন-উন্মুক্ত কিন্তু যুক্তিশীল, শিকড়িত কিন্তু মুক্তচিত্ত প্রবন্ধ-সমালোচনার একটি নির্জন নহর বয়ে চলেছে।’কবি নূরুল হুদা আধুনিকতম চিন্তার বিচিত্র-মুখী প্রকাশের মধ্য দিয়ে নতুনত্বর দিকে পাঠককে আহ্বান করেন- পাঠককে উপেক্ষা করার সুযোগ না দিয়েই।

কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা সৃষ্টিশীলতায় দ্বৈতসত্তা বিরাজমান। প্রথম সত্তায় আমরা তাঁর কবিতায় হই আকৃষ্ট, হৃদয়াবেগ দিয়ে তা গ্রহণ করি; আর তাঁর কবিতার দ্বিতীয় সত্তায় আমরা লাভ করি বহুমাত্রিক চিন্তা-উদ্রেককর বিচিত্র অনুষঙ্গ, যা পাঠ করতে আমরা হই আচ্ছন্ন ও সম্মোহিত। সৎ এবং গুরুত্বপূর্ণ কবির কবিতা শুধু আকৃষ্ট করে না, আকৃষ্ট স্তর পার হয়ে তা বিশেষ আচ্ছন্নতা বিস্তার করে, যেখানে তার রচনায় বহুমাত্রিক জ্যোতিবলয়ের স্বাক্ষর পাওয়া যায়। মুহম্মদ নূরুল হুদার অধিকাংশ রচনায় আমরা এই বৈশিষ্ট্য লক্ষ করি।

১৯৮৩ সালে কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা-র কাব্যগ্রন্থ “শুক্লা শকুন্তলা” প্রকাশ পায়। কবি তাঁর শুক্লা শকুন্তলা কাব্যগ্রন্থে সরল ও অনাড়ম্বর ভঙ্গিমায় অনায়াসলব্ধ এক নতুন কাব্যভাষা নির্মাণ করেছেন যা পাঠকের কাছে খুব সহজেই গ্রহণযোগ্য। আধুনিক বাংলা কবিতায় শুক্লা শকুন্তলা এক অনন্য সংযোজন। এই কাব্যগ্রন্থের কবিতাগুলো শিরোনামহীন চতুর্দশপদী সনেট। শুক্লা শকুন্তলার সনেটগুলো পাঠককে এক অদ্ভুত ঘোরের ভেতর প্রবেশ করাতে সক্ষম হয়। যেমন একটিতে তিনি লিখেছেন-

‘অনসূয়া, প্রিয়ংবদা বাঁচাও, বাঁচাও

অহেতু উত্যক্ত করে দুর্বৃত্ত মধুপ;

এই হুলে বড় জ্বালা, হুল নয় ধুপ;

যুগলে বাঁচাও, সখি, নয় মাথা খাও।’

কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা আত্মগরিমায় উচ্ছ্বসিত হয়ে চিৎকার করে ঘোষণা করেন তাঁর ভাষা এবং দেশের শ্রেষ্ঠত্বের এবং কবিতার মাধ্যমে বলে ওঠেন, ‘যত দূর বাংলা ভাষা তত দূর এই বাংলাদেশ’। বাংলা কবিতা চর্চার ইতিহাসে এতো বলিষ্ঠ ইশতেহার এর আগে এমনভাবে কেউ কখনও উচ্চারণ করেন নি। এই ইশতেহারের মাধ্যমে কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা বুঝিয়ে দিতে চেয়েছেন বাংলা ভাষা আজ আর নির্দিষ্ট কোন জাতি বা নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর ভেতর সীমাবদ্ধ নেই।

তিনি প্রকৃতপক্ষে একজন পরিশ্রমী কবি। শব্দ নির্বাচন, প্যারাডাইমিক শব্দের ব্যবহার ইত্যাদি নিয়ে তিনি সবসময় চিন্তাভাবনা করেন, এর প্রতিফলন তাঁর কবিতা। তাঁর কবিতায় কবিতা খুঁজে পাওয়া যায় ঠিকই, তবে মাঝে মধ্যে মনে হয় নির্মাণকেই তিনি প্রাধান্য দিয়েছেন বেশি। সৃষ্টি ও নির্মাণ কবিতার লক্ষণ বা গুণ হিসেবে যেভাবে চিহ্নিত, সেগুলোর ধারণাই তাঁকে নির্মাণের পথে নিয়ে গেছে। তবে নির্মাণের পথ বেয়ে কোনো কোনো সময় সৃষ্টির স্তরেও উঠে যান। কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা কবিতা নির্মাণের নানা পর্যায় অতিক্রম করে বর্তমানে বাস্তবতার কবিতায় তার মেধা-মনন শক্তিকে নিয়োজিত করেছেন কাব্য নির্মাণের এমন এক জিজ্ঞাসায়, যেখানে বহুর আকাক্সক্ষা আছে। তিনি বহুর আকাক্সক্ষা ও স্বপ্নকে সচেতন কাব্য-নির্মাণের মধ্য দিয়ে শিল্পসত্তা মানবমুখী করে তোলার চেষ্টা করছেন, যা ইতিহাসের দাবির সাথে সম্পৃক্ত।

বাংলা কবিতা মানেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ছোট বড় অনেক কবিই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ ভাবে অনুসরণ করেছেন,ভক্ত হিসেবে নাম লিখিয়েছেন। কবি নূরুল হুদাও কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের তেমনই  একজন সৃজনশীল ভক্ত। তিনি তাঁর কবিতায়, লেখা বিশ্লেষণে কবিগুরুর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার নানা অণুসঙ্গ তুলে ধরেছেন।

কবির বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ ‘দিগন্তের খোসা ভেঙে’ দ্বিতীয় কবিতা ‘কবিতাই সত্যাসত্য’ শিরোনামে বলেন:

 

ওইপাশে বসেছে ভুসুকু

এই পাশে দুখু

বারান্দায় চন্ডীদাস আর মাইকেল

শতাব্দীর শেষ চৈত্র

ঠাকুরের আঙিনায়

কবির মাইফেল।

শতবর্ষ পরে নয়

নয় আরো আগে

অনন্ত অনঙ্গ বঙ্গে

আজ শুধু

কবিরাই জাগে।

মৌলিক কবিতা রচনার পাশাপাশি তিনি অনুবাদ সাহিত্যে বেশ সময় ব্যয় করেছেন। বহু বিখ্যাত বিদেশি কবির কবিতা তিনি বাংলায় অনুবাদ করেছেন। তাঁর অনুদিত কবি ইয়েট্স দুইটি ছোট কবিতা সহজেই পাঠকের হৃদয়ে দাগ কাটে।

‘পান সঙ্গীত’ শিরোনামে কবি ইয়েটস কবিতা অনুবাদ করেন এভাবে:

 

মুখে সুরার পান পেয়ালা

চোখে প্রেমের বসবাস;

বুড়িয়ে গিয়ে মরার আগে

এই সত্য মানছি খাস;

মুখে তুলি পানপেয়ালা,

তোমাকে দেখি, ফেলি দীর্ঘশ্বাস।

 

অপেক্ষাকৃত তরুণ কবিরা মাইকেল মধুসূদন দত্ত বা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে খুব দূরে সরে না গেলেও ভাষার বাহ্যিক বিষয় পরিবর্তনের মাধ্যমে নতুন কাব্যভাষা নির্মাণে সচেষ্ট হয়েছেন। বাংলা কবিতার এই ক্রমবিবর্তনের ধারাবাহিকতায় আধুনিককালের দক্ষ কাব্যশিল্পী কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা তাই তাঁর “শোভাযাত্রা দ্রাবিড়ার প্রতি” কবিতায় লেখেন-

 

‘ভয়শূন্য জয়শূন্য জীবনের গূঢ়তম অর্থশূন্য তুমি তো বিষাদ

গুরুভার উরু মেলে নিরাসক্ত শুয়ে থাকো তুমি স্বর্ণনিভ

আমিতো অস্থির অস্থি, ঘানিক্লান্ত, জীবনের বিবর্ণ বলদ

মহাকাল স্তব্ধ হলে তুমি কি সন্তুষ্ট হও, হে অতীত বিমূঢ় অতীত?’

 

এই পঙক্তিগুলি পাঠককে এক ব্যতিক্রমী কাব্য-মূর্ছনায় আবিষ্ট করে তোলে। এখানেই তাঁর কৃতিত্ব। পাঠকের পুরো মনোযোগ তিনি নিজের আয়ত্তে নিয়ে নিতে পারেন অনায়াসে, পাঠককে এক মোহাচ্ছন্ন আবেগের দিকে হাঁটতে বাধ্য করেন।

কবি তাঁর দীর্ঘ কাব্য-সাধন জীবনে লিখেছেন প্রচুর যা নিয়ে বিস্তর গবেষণার দাবী রাখে। কবি নূরুল হুদা পশ্চিমের নানা কাব্য আন্দোলন, তত্ত্বের অন্ধ ধারক হন নি, তিনি বরং নিজের সংস্কৃতির ঐতিহ্যে আত্মিকরণের মধ্যমে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন।

তিনি বাংলা কাব্যের ধারাবাহিকতায় অবগাহন করে আধুনিকতাকে গ্রহণ করেছেন । মিশেয়ে দিয়েছেন আধুনিক সকল দৃষ্টিভঙ্গি তাঁর কবিতার প্রতিটি লাইনে। সংগত কারণেই তাঁর কাব্য-প্রতিভা ও গ্রহণযোগ্যতা ঈর্ষণীয়। কবির ভাষায় তাই আমরা বলতেই পারি-

 

“শ্যামাঙ্গিনী,

এতোকাল আমিও বুঝিনি,

কবিতার ক্লাশে বসে তোমাকে খুঁজেছি শুধু,

কবিতার দুধশাদা চরণ খুঁজিনি।”

 

–জাজাফী

(কবিতার ক্লাশে বসে তোমাকে খুঁজেছি শুধু / স্বজনহীন এই সব অনাত্মীয় মানুষের ভিড়ে)

10 থেকে 23 নভেম্বর 2021

সহায়ক রচনা:

 

১. জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, ৬৫তম জন্মবার্ষিকী স্মারক সংখ্যা, সম্পাদক : কামরুল

ইসলাম

২. জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, ৬৬তম জন্মবার্ষিকী স্মারক সংখ্যা, সম্পাদক : ফরিদ

আহমেদ দুলাল, বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব।

৩. কবি মুহম্মদ নুরুল হুদার জন্মদিন,সাহিত্য বার্তা, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৯

৪. মুহম্মদ নূরুল হুদা’র কবিতা: একটি তুলনামূলক পাঠ-প্রয়াস- আশরাফ জুয়েল

৫. মুহম্মদ নূরুল হুদার কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ চেতনা

৬. মুহম্মদ নূরুল হুদা- উইকিপিডিয়া নিবন্ধ

৭. কবি মুহাম্মদ নুরুল হুদার সাক্ষাৎকার- শ্যামল চন্দ্র নাথ, বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম। ১৭  আগস্ট, ২০১২

৮. ষাটের দশকের কবিতা ও আমাদের আধুনিকতা-বিনয়ক সেন

৯. বাংলাদেশের ষাটের দশকের কবিতা বিষয় ও প্রকরণ – বায়তুল্লাহ্‌ কাদেরী

23 নভেম্বর 2021