আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ে বিষয়ে এক আদার ব্যাপারির কথা

0
25

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর এক বক্তব্যে বলেছিলেন যারা উন্নয়ন চোখে দেখে না তাদের চোখের ডাক্তার দেখানো উচিৎ। আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের সাথে পুরোপুরি একমত পোষণ করি। তবে তিনি যদি একই সাথে ঘোষণা করতেন উন্নয়ন দেখার পাশাপাশি আমাদের ভুলগুলোও ধরিয়ে দিলে সেগুলো শুধরে নিয়ে দেশটিকে সত্যিকারের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলতে চেষ্টা করবো তাহলে কতই না ভালো হতো। কিন্তু যে কোনো কারণেই হোক সেই অংশটুকু বলা হয়নি। তিনি আরও বলেছেন আমাদের কথা বলার অধিকার আছে। উদাহরণ স্বরুপ টিভিতে টকশোতে কথা বলার প্রসঙ্গ টেনেছিলেন। তিনি বলেছিলেন টিভিতে যে কথা বলা হয় কাউকে কি ধরে নেওয়া হয়েছে? তা ঠিক যে কাউকে ধরে নেওয়া হয়নি। কিন্তু টিভিতে যারা কথা বলে তারা খুবই ভেবেচিন্তে যতটুকু বলা নিরাপদ ততটুকুই বলে। সেখানে সমালোচনা থাকলেও শেষ পযর্ন্ত গুনগানের মাধ্যমেই শেষ হয়। সেই যে বক্সিং প্রতিযোগিতা চলাকালিন খুব মারামারি হলেও পুরস্কার বিতরণীর সময় পরস্পরের সাথে হাত মেলানো হয় অনেকটা তেমন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর যাদেরকে উদ্দেশ্য করে কথাগুলো বলেছিলেন মানে চোখের ডাক্তার দেখাতে বলেছিলেন আমি অবশ্য সেই দলে ছিলাম না কখনো, থাকবো না কখনো। আমি এমন একটি দলে আছি যারা ভালোকে ভালো আর মন্দকে মন্দই বলে জানে। আর তাই আমরা উন্নয়ন যেমন দেখি তেমনি ভুলগুলোও দেখি।

 

 

 

কথা বলার স্বাধীনতা থাকলেও অনেকে যা বলতে চায় তা বলে না। সত্যি  সত্যিই যদি মিথ্যা শনাক্তকরণ মেশিন সেট করে বক্তাদের বক্তব্য পরীক্ষা করা যেত তাহলে নিশ্চই বিস্মিত হতে হতো। সে যাই হোক আজ বলবো ভিন্ন একটি বিষয় নিয়ে। প্রসঙ্গ আশুলিয়া এক্সপ্রেসওয়ে। ঢাকা থেকে রাজশাহী,দিনাজপুর,বগুড়া,খুলনা অঞ্চলের ৩০ টি জেলায় যারা যাতায়াত করেন তারা জানেন এটি তাদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ পথ। ২০১৭ সালে খুব ঘটা করে ঘোষণা করা হয়েছিল শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত একটি এক্সপ্রেসওয়ে নির্মান করা হবে। তখন বাজেটও ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু সেটা হওয়া তো দূরের কথা কাজও শুরু হয়নি। এখনই বিস্মিত হবেন না বরং আরেকটু কথা শুনে তার পর বিস্মিত হোন। এই প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারন করা হয়েছিল ২০১৭ থেকে জুন ২০২২ পযর্ন্ত। এবার বুঝলেন কী অসাধারণ কাজ হয়েছে যে প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হতে চলেছে কিন্তু কাজই শুরু হয়নি। শুধু তাই নয় নকশাও করা হয়নি! এই পাঁচ বছরে তাহলে প্রকল্পের সাথে সংশ্লিষ্টরা কী করেছে?

 

আমি মাঝে মাঝেই এই সব রথিমহারথিদের ধন্যবাদ দিয়ে থাকি। কারণ তাদের কার্যকলাপ আসলেই সোনার অক্ষরে বাঁধিয়ে রাখার মতই। আজ আমি ধন্যবাদ দিতে চাই এই প্রকল্পের পরিচালক মো. শাহাবুদ্দিন খান সাহবকে। প্রকল্পের মূল কাজ শুরু করতে পারেন নি অথচ মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে এ জন্য ধন্যবাদ দিতে চাই না বরং তাকে ধন্যবাদ দিতে চাই এ জন্য যে মূল কাজ শুরুই করতে পারেননি অথচ পাঁচ বছর পার হয়ে গেছে আর এখনি তিনি আবেদন করেছেন আরও চার বছর বাড়ানো হোক। শুধু তাই নয় সেই সাথে আরও ৬৫২ কোটি টাকা ব্যয় বাড়ানোর আবেদন করেছেন। আসুন এই উপলক্ষ্যে তাকে ধন্যবাদ দিই। নিশ্চই একটি ধন্যবাদ পাওয়ার দাবী তিনি করতেই পারেন। কোনো কাজ ভালো ভাবে সম্পন্ন করতে হলে সময় নিয়ে করাই শ্রেয়। আর এ কারণেই তিনি এই পাঁচ বছরে টিম সহ ভেবেছেন।ভাবতে ভাবতে সময় পার হয়েছে বলেই নকশাও করা হয়নি। এখন ভাবনার অবসান হয়েছে। এখন যেহেতু সব কিছুর দাম বেড়েছে তাই ৬৫২ কোটি টাকা বাড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করেছেন। সেই সাথে আরও চার বছর সময় চেয়েছেন। আমার মনে হয় এই প্রকল্প শেষ করার জন্য চার বছর নয় তাকে আরও বেশি সময় দেওয়া উচিত। তিনি আরও ভাবুন এবং আরও সময় নিয়ে করুন। অথচ তিনি যদি সময়মত কাজ করতেন তাহলে এই বিশাল অংকের টাকা অতিরিক্ত খরচের প্রস্তাব করতে হতো না। অবশ্য বিশাল অংক বলছি কেন? আজকাল এই সব পরিমান টাকা নীতিনির্ধারকদের কাছে সামান্যই বলা চলে। কারণ এর আগে একাধিক দায়িত্বশীল ব্যক্তি হাজার কোটি টাকাকেও সামান্যই বলেছেন।

 

 

 

২০১৭ সালে একনেকের এক সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেওয়া হয়। অথচ প্রকল্পের পুরোটা সময় পেরিয়ে গেলেও মূল কাজ শুরু করতে পারেনি। এর কারণ হিসেবে তারা দেখিয়েছে যে তারা চীনের সাথে চুক্তি করতে পারেনি। এই প্রকল্পে চীন থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার কথা ছিলো। বাড়তি যে পরিমান টাকা দাবী করেছে তা সহ এখন মোট ব্যয় দাড়াচ্ছে ১৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। যারা পাঁচ বছর ধরেও একটি চুক্তি করতে পারেনি তারাতো শুরুতেই ব্যর্থ। তাদের হাতে এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব বহাল রাখা কোনো ভাবেই যুক্তিযুক্ত নয়। কথা শুধু এখানেই শেষ নয়! পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য মো. মামুন-আল-রশীদের ভাষ্যমতে “ প্রকল্পটির মূল নকশাই এতোদিন ঠিক করতে পারেনি। তবে এখন নকশা প্রায় চূড়ান্ত। প্রকল্পটি সংশোধন করা হলে শিঘ্রই কাজ শুরু করতে পারবে”।

 

যে প্রকল্প ৫ বছরে শেষ হওয়ার কথা সেই প্রকল্পের নকশাই করতে পারেনি পাঁচ বছরে এর চেয়ে আশ্চর্যজনক আর কী থাকতে পারে।এটিকে দায়িত্বে অবহেলা বলা ছাড়া আর কিছুই মনে হয় না। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আব্দুল্লাহপুর-আশুলিয়া-বাইপাইল হয়ে নবীনগর মোড় এবং ইপিজেড হয়ে চন্দ্রা মোড় পযন্র্ত মোট ২৪ কিলোমিটার এক্সপ্রেসওয়ে হওয়ার কথা ছিলো।পাশাপাশি ১১ কিলোমিটার দীর্ঘ র‌্যাম্প হবে এবং উড়াল সড়কের উভয় পাশে চার লেনের ১৪.২৮ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক হবে।

 

প্রথমবার প্রকল্পের প্রস্তাবে ১৬ হাজার ৯০১ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছিল। এখন সেটা হুহু করে বাড়ছে! যাই হোক প্রকল্পের কাজের মধ্যে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের সাথে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছিল এবং তাদের ভাষ্যমতে ৯০ % জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। বাকি দশভাগ অধিগ্রহণেও নাকি তেমন সমস্যা হবে না। আর হ্যা মূল কাজ শুরু হয়নি,নকশা হয়নি কিন্তু এরই মধ্যে খরচ হয়েছে ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। অবশ্য তার মধ্যে জমি অধিগ্রহণেই খরচ হয়েছে ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা।

 

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আমরা জানি এবং দেখেছি বাংলাদেশে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। বড় বড় প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে এবং সেগুলোর অনেকটাই শেষ হয়েছে এবং কিছু কিছু শেষের পথে। এই যেমন পদ্মা সেতু,মেট্রোরেল,পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র,বঙ্গবন্ধু টানেল,বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট সহ আরও অনেক কিছু। আমরা এটা অস্বীকার করি না এবং অস্বীকার করার মত আহাম্মকও নই। কিন্তু আমরা উল্টোপিঠটাও দেখি। প্রতিটি প্রকল্প শেষ করার জন্য যে মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছিল এবং যে বাজেট ধার্য করা হয়েছিল তা সেই মেয়াদের এবং সেই পরিমান অর্থে হয়নি। আমরা এই জানি প্রতিনিয়ত বিশ্ববাজারে নানাবিধ পণ্যের দাম বাড়ছে তাই ৫ বছর আগে কোনো একটি বাজেট করলে সেই একই পরিমান অর্থে পাঁচ বছর পর কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। খরচ বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তা বলে প্রতিটি প্রজেক্টের জন্য ধার্যকৃত বাজেটের তিনগুনের বেশি কেন ব্যয় হবে এটাই বোধগম্য হয়নি কখনো। কোথায় যায় এতো টাকা? কিভাবে খরচ হয়? আমরা জানি সময়ের কাজ সময়ে না করলে কাজ জমে পাহাড় হয়ে যায়। এই সব প্রকল্প সময়মত করতে পারলে খরচ কমতো যা দেশের অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে পারতো। একটি প্রকল্প যত দ্রুততম সময়ে করা যায় খরচ ততো কমে। পাশাপাশি ওই প্রকল্প থেকে রাজস্ব আসতে শুরু করে। ফলে আমাদের নেওয়া ঋণও পরিশোধ করা অপেক্ষাকৃত সহজ হয়। কিন্ত কোনো এক অজ্ঞাত কারণে আশ্চর্যজনক ভাবে দেখি সব প্রকল্পই বাজেটের কয়েকগুন বেশি খরচ করে শেষ করা হচ্ছে। নির্ধারিত সময়ের কয়েকগুন সময় নিয়ে শেষ করা হচ্ছে।  এ থেকে আমরা খুব সহজেই কি বলতে পারি যে যারা প্রকল্পের সময় ও বাজেট নির্ধারণ করে থাকেন তাদের হিসেবে ভুল আছে। তারা তাদের সামর্থের বাইরে আন্দাজে একটা সময় নির্ধারণ করেছে এবং আন্দাজে ব্যয় নির্ধারণ করেছে। তারা যদি সত্যি সত্যিই সামর্থবান হতো তবে নির্ধারিত সময়ে নির্ধারিত বাজেটেই কাজ শেষ করতে পারতো।

 

যা হয়ে গেছে তা বাদ। এখন নতুন কোনো প্রকল্প হাতে নিলে সেগুলো কাদের হাতে দেওয়া হচ্ছে তা একটু যাচাই করে দেখা উচিত বলে আমি মনে করি। শুধু তাই নয় তারা যে সময় এবং ব্যয় নির্ধারণ করছে তা কতটা বাস্তবসম্মত সেটাও খতিয়ে দেখা উচিত। এবং এমন একটি নির্দেশনা দেওয়া উচিত যেন নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারলে শাস্তি দেওয়া হবে এবং প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি পেলে তাতেও শাস্তি দেওয়া হবে। এমন কিছু না করলে ভবিষ্যতে যত প্রকল্প হাতে নেওয়া হবে সবগুলোতেই নির্ধারিত সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সময় লাগবে এবং ব্যয়ও একই ভাবে কয়েকগুন বেড়ে যাবে। আজ যারা আছে কাল তারা থাকবে না কিন্তু ভবিষ্যত প্রজন্মের ঘাড়ে থেকে যাবে ঋণের বোঝা। সেই বোঝা বইতে পারবে আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্ম? আমরা কি তেমন একটি ভবিষ্যত প্রজন্ম গড়ে যেতে পারছি? নাকি যাদের রেখে যাচ্ছি তারাও আমাদেরই মত?

 

জানি না। এসব নিয়ে ভাবতে গেলে মাথা খারাপ হয়ে যায়। এ কারণেই বোধহয় বলা হয়ে থাকে “ আদার ব্যাপারি হয়ে জাহাজের খবর রাখার কী দরকার”

 

 

 

-জাজাফী

আদার ব্যাপারী

৩১ মে ২০২২