আলোকের অভিসারী আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

0
23

সব সমাজেই এমন কিছু মানুষ থাকেন সংখ্যায় যাঁরা অল্প; কিন্তু যাঁদের মধ্যে জ্ঞানের ব্যাপ্তি, মূল্যবোধের বিকাশ, জীবনের উৎকর্ষ, আত্মমর্যাদার মহিমা- এসবের বড়রকম বিকাশ ঘটে। এঁরা সেই ধরনের মানুষ যাঁদের কেনা যায় না, বেচা যায় না।যাঁরা একটা জাতিকে রক্ষা করেন, এগিয়ে নেন, জাতিকে সম্ভাবনার স্বপ্ন দেখান। স্বপ্ন দেখানোর অসাধারণ ক্ষমতা নিয়ে এই বাংলার জন্য আর্শিবাদ হয়ে জন্মেছিলেন এমনই একজন মানুষ, যিনি আলোকের অভিসারী হয়ে বহুমুখিতায় ও স্বপ্নচারিতায় পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে এ দেশে নানান সাংগঠনিক, সামাজিক, যূথবদ্ধ কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে আছেন,নিজে স্বপ্ন দেখেছেন এবং সবার মাঝে স্বপ্নের জাল বুনে চলেছেন অবিরাম। আলোকিত মানুষ গড়ার জন্য, মানুষকে স্বপ্ন দেখানোর জন্য শিক্ষকতা করেছেন। মানুষের হাতে তুলে দিয়েছেন বই।

তিনি একজন প্রতিশ্রুতিময় কবি,সমালোচক,সুবক্তা,টিভি উপস্থাপক এবং সাহিত্য সম্পাদক। তিনি আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। ষাটের নতুন ধারার সাহিত্য আন্দোলনের কান্ডারি, দেশজুড়ে বই পড়া কর্মসূচির প্রণেতা এবং আনন্দপ্রাণ সাংস্কৃতিক কর্মযজ্ঞের রুচিস্নিগ্ধ অঙ্গন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রাণপুরুষ এক আশা-জাগানিয়া মানুষ। শিক্ষকতার মর্মমূল স্পর্শ করে যে সব মহৎ হৃদয় শিক্ষকতাকে তাদের জীবনের সুমহান ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন তন্মধ্যে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্ভবত সবচেয়ে সেরাদের একজন।অধ্যাপক হিসেবে তাঁর খ্যাতি কিংবদন্তিতুল্য।

 

জন্ম ও শৈশব

২৫ জুলাই ১৯৩৯ সাল। কলকাতার পার্ক সার্কাসে জন্মগ্রহণ করেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ । তাঁর পৈতৃক নিবাস বাগেরহাট জেলার কচুয়া থানার অন্তর্গত কামারগাতির কচুয়া গ্রামে। তাঁর পিতা আযীমউদ্দিন আহমদ ছিলেন একজন স্বনামধন্য শিক্ষক।মায়ের নাম করিমুন্নেসা। পিতার শিক্ষক হিসেবে অসামান্য সাফল্য ও জনপ্রিয়তা শৈশবেই তাকে শিক্ষকতা পেশার প্রতি আকৃষ্ট করে। আবদুল্লাহ্ আবু সায়ীদ খুব অল্প বয়সে মাকে হারান। তিনি ছিলেন ভাইবোনদের মধ্যে তৃতীয়। তাঁর জীবনে তাঁর পিতার শিক্ষা ও আদর্শের প্রভাব সুস্পষ্ট। পিতার কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘শিক্ষক হিসাবে আব্বা ছিলেন খ্যাতিমান। ১৯৫০ সালে আমি যখন পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র, আব্বা তখন পাবনা এডোয়ার্ড কলেজের অধ্যক্ষ। কলেজের ছাত্রছাত্রীরা তাঁর কথা উঠলে এমন সশ্রদ্ধ উদ্বেলতায় উপচে পড়ত যে মনে হত কোনো মানুষ নয়, কোনো ফেরেস্তা নিয়ে তারা কথা বলছে। একজন ভালো শিক্ষক ছাত্রদের হৃদয়ে শ্রদ্ধা ভালোবাসার যে কী দুর্লভ বেদিতে অধিষ্ঠিত থাকেন আব্বাকে দেখে তা টের পেতাম। একজন মানুষের এর চেয়ে বড় আর কী চাওয়ার থাকতে পারে। তখন থেকেই আমি ঠিক করেছিলাম এই পৃথিবীতে যদি কিছু হতেই হয় তবে তা হবে শিক্ষক হওয়া, আব্বার মতোন শিক্ষক’।

প্রথম শৈশবেই অল্পবিস্তর বইয়ের সাথে শিশু আবু সায়ীদের যোগাযোগ হয়। তার বড় বোন বই পড়তো।বোনের ওই বইগুলো তাকে পড়তে দেওয়া হতো না। সেসব ছিল মূলত উপন্যাস। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ যখন পঞ্চম শ্রেণীতে পড়েন তখন তিনি দেখতেন তার বাবা খুবই পড়াশোনা করতেন। দোতলার কোনায় ছিল তাঁর একান্ত পড়ার ঘর। ছোট্ট আবু সায়ীদ সহ ভাই বোনদের প্রায় কেউ-ই সে ঘরে যেতেন না। একদিন বাবাই তাকে সেখানে ডেকে পাঠালেন।যা তাকে সেদিন অনেক বেশি টেনেছিল তা হলো, তাঁর ঘরভর্তি বইয়ের বিশাল ভান্ডার।

ওই ঘরটা ছিল পাঁচ দেয়ালের। সবগুলো দেয়ালে শেল্ফভর্তি রংবেরঙের অজস্র বই। ঘরভর্তি ওই বিপুল বই তাকে অভিভূত করে ফেলল।এই ঘটনাটা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের শিশুমনকে খুবই প্রভাবিত করেছিল। শৈশবে গভীরভাবে যে স্বপ্ন মানুষ একবার দেখে, সারা জীবন তাকেই সে বড়ভাবে পুনর্গঠন করতে চায়। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ যে সারা জীবন শুধু দুনিয়া হাতড়ে রাশি রাশি বই সংগ্রহ করতে চেষ্টা করেছেন, সে হয়তো সেদিনের ওই বিশেষ মুহূর্তের স্বপ্নটাকে বড় ভাবে ফিরে পাওয়ার জন্য।

শিক্ষা জীবনঃ

আবদুল্লাহ্ আবু সায়ীদের শিক্ষা জীবনের সূচনা হয় টাঙ্গাইলের করটিয়ায়।তখন তার বয়স সবেমাত্র পাঁচ বছর। তাঁর প্রথম শিক্ষক ছিলেন শরদিন্দু বাবু। শৈশবের এই শিক্ষক সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য এমন, ‘আব্বা ছাড়া যে সব মানুষের নিবিড় ও শ্রদ্ধেয় মুখ আমাকে শিক্ষকতার পথে ডাক দিয়েছিল ছেলেবেলার শিক্ষক শরদিন্দু বাবু তাঁদের একজন। রোজ রোজ নতুন উপহার দিয়ে স্যার আমাকে পড়ার জগতের ভেতর আটকে রাখতেন। কবে কী উপহার আসবে এই নিয়ে সারাটা দিন কল্পনায় উত্তেজনায় রঙিন হয়ে থাকতাম। এমনি করে কখন যে একসময় পড়ার আনন্দ আর উপহার পাওয়ার আনন্দ এক হয়ে গিয়েছিল টের পাইনি। এক সময় অনুভব করেছিলাম স্যারের আদরের ভেতর থাকতে থাকতে আমি কখন যেন পড়াশুনাকে ভালোবেসে ফেলেছি।’ পরবর্তীতে তিনি রাধানগর মজুমদার একাডেমি স্কুলে ভর্তি হন।আবদুল্লহ্ আবু সায়ীদের জীবনে তাঁর শিক্ষা জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষকদের প্রভাব বিস্তর। শিক্ষকদের কাছ থেকেই তিনি জীবনকে চিনেছেন, জগতকে চিনেছেন।

ক্লাস নাইনে পাবনা জিলা স্কুলে ভর্তি হওয়ার কিছুকাল আগেই  স্কুলে একজন প্রধান শিক্ষক এসেছিলেন। তিনি ছিলেন অদ্ভুত মানুষ। থ্রি পিস স্যুট আর জিন্নাহ ক্যাপ পরে এই বিশালদেহী হেডমাস্টার স্কুলের বারান্দা দিয়ে নিঃশব্দে হেঁটে বেড়াতেন। সেই যুগে তিনি বিলেতের এডিনবরায় এক বছরের জন্য পড়তে গিয়েছিলেন। ক্লাসে এসে তিনি নাকি বলতেন, ‘আমি যদি তোমাদের একবার বিলেতের গল্প বলি, সে যে কত কথা! তা তোমরা ভাবতেও পারবে না; বুঝতেও পারবে না।’ কথাটা হেসে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

সেই প্রধান শিক্ষকই হঠাৎ অ্যাসেম্বলিতে বলেছিলেন, ‘তোমরা আগামী মাস থেকে আর স্কুলের বড় লাইব্রেরিটাতে আসবে না। প্রতিটি ক্লাসে আমি একটা করে ছোট্ট লাইব্রেরি করে দিচ্ছি। সেখান থেকেই তোমরা প্রতি সপ্তাহে বাড়িতে বই নেবে। তবে বই সবাইকেই নিতে হবে। এ বাধ্যতামূলক।’

এটা হয়তো ছিল তাঁর বিলেতি পড়াশোনারই ফসল। তিনি প্রতিটি ক্লাসের জন্য একটা করে বাক্স বানিয়ে দিয়েছিলেন। তাতে থাকত বই। বাক্সগুলো ক্লাসের দেয়ালের সঙ্গে আটকানো। প্রতি শনিবারে ওখান থেকে সবাইকে বই নিতে হতো। ক্লাসটিচার বেতন নিতেন আর ক্লাস ক্যাপ্টেন বই দিত।

বই নেওয়া তিনি সবার জন্য কেন বাধ্যতামূলক করেছিলেন, তা নিয়ে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ পরে অনেক ভেবেছেন। তাঁর ধারণা,মানব-বিকাশের ওপর বইয়ের প্রভাব কী, তা তিনি জানতেন। এর ফলে স্কুলের পরিবেশ কয়েক বছরের মধ্যে আশ্চর্যভাবে পাল্টে গেল।পুরো স্কুলটাই একটা ইন্টেলেকচুয়াল স্কুল হয়ে গেল। তার ফলও ফলতে লাগল।

গোটা স্কুলের ছাত্রদের মধ্যে নিজেদের ছাড়িয়ে যাওয়ার পিপাসা জেগে উঠল। স্কুল থেকে প্রতিবছর ম্যাট্রিকে স্ট্যান্ড করতে বা স্টার পেতে লাগল। সাধারণ ফলাফল হয়ে উঠল অসম্ভব ভালো। স্যার ফজলে হাসান আবেদ, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, জিয়া হায়দার—সবাই এই স্কুলের প্রায় সে সময়কার ছাত্র! বই যে মানুষকে কীভাবে উজ্জীবিত সুতোয় গেঁথে দিতে পারে, এ দৃশ্য এই তার জীবনে প্রথম দেখা।

নবম শ্রেণীতে ওঠার পর তিনি রাধানগর মজুমদার একাডেমি ছেড়ে পাবনা জেলা স্কুলে গিয়ে ভর্তি হন।১৯৫৫ সালে পাবনা জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করেন।পরের দুই বছর তিনি বাগেরহাট প্রফু্ল্লচন্দ্র কলেজে পড়েন।কলেজের শিক্ষকদের কথা প্রসঙ্গে অধ্যাপক আবদুল্লাহ্ আবু সায়ীদ বলেন, ‘আমার জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল শিক্ষকদের দেখা পেয়েছিলাম আমার কলেজ জীবনে। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের হাতে গড়া এই কলেজের শিক্ষকদের ভেতর শিক্ষকতার যে জ্যোতির্ময় রূপ আমি দেখেছি তার সমমানের কোনো কিছু আমি আর কখনো কোথাও দেখেছি বলে মনে পড়ে না’।

কলেজে তাঁর নীরব পথপ্রদর্শক ছিলেন আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র। মূল ভবনটার সামনের দেয়াল ঘেষে সুদৃশ্য পামগাছের সারি ছিল। এর আঙিনার দরজা দিয়ে ঢুকলেই সিমেন্টের বেদির ওপর আচার্য প্রফুল্লচন্দ্রের ছড়ি হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ভাস্কর্যটা চোখের সামনে দেখা যায়। নিঃশব্দে তিনি প্রফুল্লচন্দ্রের সেই ভাস্কর্যের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেন। তারপর একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে তাঁর ভেতর থেকে জীবনের দুর্লভ শিক্ষা ও শ্রেয়োবোধকে নিজের ভেতর টেনে নিতেন। তিনি লক্ষ্য করতেন বিকেলের সেই স্তব্ধ প্রাকৃতিক পরিবেশের ভেতর তার হৃদয় একটা দৃঢ় গভীর আত্মবিশ্বাসে সুস্থির হয়ে উঠেছে। প্রফুল্লচন্দ্র কলেজের অনেক শিক্ষকের কাছ থেকেই অনেক দুর্লভ প্রাপ্তি ঘটেছিল যা তাঁর জীবনকে, নানাভাবে প্রভাবিত করেছে।

উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। সেখান থেকে ১৯৬০ সালে স্নাতক এবং ১৯৬১ সালে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আবদুল্লাহ্ আবু সায়ীদ বহু প্রথিতযশা শিক্ষকদের সান্নিধ্য লাভ করেন। সমাজের গুণীজন হিসাবে পরিচিত এসব শিক্ষকরা তাঁর জীবনে নানাভাবে প্রভাব বিস্তার করেছেন। এঁদের মধ্যে রয়েছেন মুনীর চৌধুরী, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ প্রমুখ।মুনীর চৌধুরী সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘মুনীর স্যারের পড়ানো ছিল অনবদ্য। তিনি আমাদের রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প পড়িয়েছিলেন। পড়ানোর প্রাণবন্ত সরস উচ্ছলতার ভেতর দিয়ে ছোটগল্পের যে নিগূঢ় রস তিনি আমার ভেতর ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তা আজও আমার মনের ভেতরকার শিল্পভাবনাকে অনেকখানি প্রভাবিত করে রেখেছে। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষ থেকে শুরু করে অন্তত দুই বছর পর্যন্ত তাঁর বাচনভঙ্গী আমার নিজের কথা বলার ধরন ধারণকেও প্রচ্ছন্নভাবে প্রভাবিত করে রেখেছিল।’

এছাড়াও বাংলা বিভাগের একজন অধ্যাপক বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে তাঁর তরুণ চেতনাকে প্রায় পুরোপুরি অধিকার করে নিয়েছিলেন, তিনি অধ্যাপক আহমদ শরীফ। অধ্যাপক আহমদ শরীফ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জীবন, পৃথিবী, প্রেম, সমাজ সবকিছু সম্বন্ধে ক্লাশে তিনি এমন নির্মোহ কঠিন ও নেতিবাচক কথা বলতেন যা আমাকে আকৃষ্ট ও আতঙ্কিত করে তুলত। আমি তাঁর বাসায় নিয়মিত যেতাম এবং ভেতরকার উত্‍কন্ঠার হাত থেকে বাঁচার জন্য তাঁর সঙ্গে ঘন্টার পর ঘন্টা তর্ক করতাম। তাঁর মধ্যে একটা প্রচন্ড নেতিবাচক মনোভাব কাজ করত। তাঁর নেতিবাচকতার কাছে আমি ঋণী। কোনো বিষয়ের দিকে ক্ষমাহীন নির্মোহ দৃষ্টিতে তাকাবার এবং তার অন্তর্সত্যকে দুঃসাহসের সঙ্গে উচ্চারণ করার শক্তি আমি তাঁর কাছ থেকেই পেয়েছিলাম।’

স্ব স্ব ক্ষেত্রে মহিমায় ভাস্কর এসব গুণীজনদের সাহচর্য অধ্যাপক আবদুল্লাহ্ আবু সায়ীদের জীবনকে নানা ভাবে প্রভাবিত করেছে। এই সব মহান শিক্ষকদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েই তিনি এই মহিমান্বিত পেশায় প্রবেশ করেছেন।১৯৬৫ সালে তিনি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

 

কর্মজীবন

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ১৯৬১ সালে প্রথম শিক্ষকতায় যোগদান করেন মুন্সীগঞ্জ হরগঙ্গা কলেজে। তখন তাঁর বয়স ছিল বাইশ। এম.এ. পরীক্ষা দেবার পরপরই তিনি ঐ কলেজে যোগ দিয়েছিলেন কিন্তু মজার ব্যাপার হলো একই সময়ে মুন্সীগঞ্জ কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন তাঁর বাবা আযীমউদ্দীন আহমদ। শিক্ষাবিদ ও নাট্যকার হিসাবে তিনি সেকালে দেশের সুধীমহলে সুপরিচিত ছিলেন। ছেলে একই কলেজে যোগ দিলে তাঁর জন্য প্রশাসনিক অস্বস্তির কারণ হবে মনে করে তিনি কলেজের গভর্নিং বোর্ডের সভায় আবদুল্লাহ্ আবু সায়ীদকে অন্তর্ভূক্তি করার ব্যাপারে আপত্তি প্রকাশ করেন। কিন্তু পরীক্ষার ফলাফল ভাল থাকায় কলেজের গভর্নিং বডির সদস্যরা সর্বসম্মতভাবে কলেজের খন্ডকালীন প্রভাষক হিসাবে তাঁকে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেন। গভর্নিং বডির সচিব হিসাবে তাঁর বাবাকেই তাঁর নিয়োগপত্র পাঠাতে হয়েছিল!

এরপর তিনি সিলেট মহিলা কলেজে অধ্যাপনায় যোগ দেন। সেই সময় মহিলা কলেজে ঢোকা তরুণ অধ্যাপকের জন্য সহজ ছিল না। কারণ তখন সিলেটের সমাজ খুবই রক্ষণশীল ছিল। কিন্তু ভাগ্য সুপ্রসন্ন থাকায় তাঁর চাকরিটা তখন হয়ে যায়। তবে এখানে তিনি বেশিদিন ছিলেন না। চাকরি পাওয়ার মাস দুয়েক পরই বাম ছাত্র আন্দোলনের মুখে তা বন্ধ হয়ে যায়।

 

১৯৬২ সালের পহেলা এপ্রিল তিনি রাজশাহী কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে সরকারি চাকুরিজীবন শুরু করেন। রাজশাহী কলেজে পাঁচ মাস শিক্ষকতা করার পর তিনি যোগ দেন ঢাকার ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজে। বর্তমানে এই কলেজটি বিজ্ঞান কলেজ নামে পরিচিত। একই সময় প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য বিভাগেও তিনি খন্ডকালীন শিক্ষক হিসাবে বাংলা পড়িয়েছেন। ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজে অধ্যাপনা করার সময় বছর দুয়েক তিনি কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র চব্বিশ বছর। সহকর্মী হিসেবে ঢাকা কলেজে পেয়েছিলেন দুইজন নান্দনিক সাহিত্যিক ও প্রথিতযশা শিক্ষক শওকত ওসমান ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে। শওকত ওসমান যখন ঢাকা কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান তখন তিনি সেখানে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। ঢাকা কলেজের তদানীন্তন অধ্যক্ষ জালালউদ্দিন আহমেদের আমন্ত্রনে তিনি সেখানে যোগদান করেন। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ঢাকা কলেজেই তাঁর শিক্ষকতা জীবনের স্বর্ণযুগ অতিবাহিত করেন। কারণ সে সময় ঢাকা কলেজ ছিল দেশসেরা শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মিলনমেলা। শত প্রাণের উচ্ছ্বাসে তখন মুগ্ধ থাকতো ঢাকা কলেজ।

শিক্ষক হিসেবে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ জনপ্রিয়তার সর্বোচ্চ শিখর স্পর্শ করেছেন। অধ্যাপক হিসেবে তাঁর খ্যাতি কিংবদন্তিতুল্য।শিক্ষাঙ্গণের অবক্ষয়, শিক্ষকদের ভেঙ্গে পড়া মূল্যবোধ তাঁকে বিদ্ধ করেছে সবসময়। অপরিসীম ভালোবাসা, তীব্র পর্যবেক্ষণশক্তি ও প্রজ্ঞা মিশিয়ে তিনি অনুসন্ধান করেছেন এই অবক্ষয়ের কারণ। ছাত্রদের প্রকৃত আভিভাবক হিসাবে জাতীয় এই দুর্যোগটির দিকে জাতির মনোযোগ ফেরাতে চেয়েছেন।

তিনি ষাটের দশকে দু’বার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদানের ডাক পেয়েছিলেন। প্রথমবারে ডেকেছিলেন সে সময়কার বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ মুহম্মদ আবদুল হাই। দ্বিতীয়বার ১৯৬৮-৬৯-এর দিকে ডেকেছিলেন মুনীর চৌধুরী। তিনি তখন বাংলা বিভাগের অধ্যক্ষ। কিন্তু ঢাকা কলেজে প্রাণবন্ত, স্বপ্রতিভ, উজ্জ্বল ছাত্রদের পড়ানোর তৃপ্তি, শিক্ষক-জীবনের অনির্বচনীয়তম আস্বাদ ছেড়ে তিনি যেতে চাননি। তাঁর মতে, ‘বাংলা বিভাগে যোগদান করাটা আমার কাছে সবচেয়ে ভালো ছাত্রদের ছেড়ে সবচেয়ে খারাপ ছাত্রদের পড়াতে যাওয়ার মত মনে হয়েছে।’

বাংলাদেশে টেলিভিশনের সূচনালগ্ন থেকে রুচিমান ও বিনোদন-সক্ষম ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভুত হন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। টেলিভিশনের বিনোদন ও শিক্ষামূলক অনুষ্ঠানের উপস্থাপনায় তিনি পথিকৃৎ ও অন্যতম সফল ব্যক্তিত্ব।১৯৬৫ সালের জানুয়ারি মাস। হঠাৎ একদিন মুস্তফা মনোয়ার আর জামান আলী খান (পাকিস্তান টেলিভিশনের কর্মকর্তা) তাঁর ইন্টারমিডিয়েট টেকনিক্যাল কলেজের (বিজ্ঞান কলেজ) হোস্টেলের কক্ষে এসে হাজির। তাদের অনুরোধ : কবি জসীমউদ্দীনের সাক্ষাৎকার নিতে হবে। তিনি রাজি হয়ে গেলেন। টিভিতে সেই তার প্রথম আসা। পরবর্তীকালে কুইজ প্রোগ্রাম, শিশুদের প্রোগ্রাম, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের উপস্থাপনার ভেতর দিয়ে টিভির সঙ্গে ধীরে ধীরে জড়িয়ে পড়েছেন। ১৯৭৩ থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত টিভির সাথে পুরোপুরি জড়িত ছিলেন।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রঃ

চীনা ভাষায় একটা প্রবাদ আছে “যদি এক বছরের জন্য পরিকল্পনা করতে চাও তবে শস্য রোপণ কর।যদি ত্রিশ বছরের জন্য পরিকল্পনা করতে চাও, তবে বৃক্ষ রোপণ কর।যদি এক শ বছরের জন্য পরিকল্পনা করতে চাও, তবে মানুষ রোপণ কর”। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ মানুষ রোপণ করতে চেয়েছেন। সে লক্ষ্য নিয়েই তিনি গড়ে তুলেছেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র গড়ে উঠেছে একটু একটু করে, অনেক দিনে। এই দীর্ঘ সময়ে বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের মুখে নানা উথ্থান পতনের মধ্যদিয়ে তাঁকে এগোতে হয়েছে।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের জন্ম ১৯৭৮ সালে। মূলতঃ দেশের আদর্শগত অবক্ষয় দেখে তা থেকে উত্তরণের জন্যে অধ্যাপক  আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ১৯৬৮ সালে তিনি একটা পাঠচক্র শুরু করেন। তখন তার মনে হয়েছিল, আমাদের জাতির জ্ঞানের এলাকা একেবারেই নিঃস্ব। জাতির ভেতর জ্ঞান দরকার। ঢাকা কলেজের কিছু মেধাবী ছেলেকে নিয়ে শুরু হয়েছিল পাঠচক্রটা। কিছুদিন চলেছিলও ওটা, কিন্তু উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের ডামাডোলে সবকিছু ওলট-পালট হয়ে গেল। সারা দেশে যে বিদ্রোহের ক্ষোভ প্রজ্বলিত হয়ে উঠল, তার মুখে সেই পাঠচক্র যে কোথায় ভেসে গেল, খুঁজেও পেলেন না।

স্বাধীনতার পর তাঁর মনে হলো সোনার বাংলা তো হয়েই গেছে, এখন লেপ মুড়ি দিয়ে একটা ভালোমতো ঘুম দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। ১৯৭৮ সাল আসতে আসতে টের পেলেন, সোনার বাংলা বলে আসলে কিছু নেই। ওটা একটা স্বপ্নের নাম। বাংলা আসলে মাটি আর কাদার। সবার শ্রম, চেষ্টা, সাধনা আর সংগ্রাম দিয়ে একে সোনায় পরিণত করতে হয়।

তখন আবার নতুন করে শুরু হলো নতুন পাঠচক্র। এই পাঠচক্র পাঁচ বছর চললে তিনি বুঝতে পারলেন তাদের চেষ্টা ব্যর্থ হয়নি। বহুমুখী জ্ঞান ও জীবনচর্চার ভেতর দিয়ে ছেলে মেয়েদের মনের অচিন্তিত বিকাশ ঘটেছে। বুদ্ধিদীপ্ত, ক্ষুরধার সম্পন্ন হয়ে উঠেছে তারা। সেই পাঠচক্রে ২০ জন ছেলেমেয়ে ছিল। তাদের প্রায় সবাই আজ নিজ নিজ ক্ষেত্রের নেতৃত্বে।

তাঁর মনে হলো, এই পথে আমরা স্বচ্ছন্দে এগোতে পারি। প্রথমেই মনে হলো, ছোট্ট পরিসরে যা সফল হলো, সারা দেশের সবখানে কেন তা সফল হবে না ? এভাবেই যাত্রা শুরু বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের।

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রথম কার্যালয় ছিল ঢাকা কলেজের পেছনে, নায়েমে—তখনকার শিক্ষা সম্প্রসারণ কেন্দ্রের একটা ছোট্ট মিলনায়তনে। সেখান থেকে  চলে যায় ৩৭ ইন্দিরা রোডে। সেটা ছিল একটা ভাড়া করা বাড়ি। বাড়িটা খুব সুন্দর। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ওই সময় ছিলেন বহিঃসম্পদ বিভাগের সচিব। তিনি কোনো একটা তহবিল থেকে বিশ্বসাহিত্যকেন্দ্রকে পাঁচ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। ওই সহযোগিতা বিশ্বসাহিত্যকেন্দ্রের সামনে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছিল। সেই বছরেই কেন্দ্রের ভবনের জমিটা বিশ্বসাহিত্যকেন্দ্র পেয়ে যায়। দিয়েছিলেন আবুল হাসনাত, ঢাকার প্রথম মেয়র। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের সহপাঠী! বাড়ির জন্য তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলে হেসে বললেন, ‘ক্যান, আমাগো কাছে ক্যান?’ কথাটা বলেছিলেন তিনি ছাত্র বয়সের রাজনীতিতে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদদের বিরুদ্ধ অবস্থানকে কটাক্ষ করে। তিনি তাঁকে বিশ্বসাহিত্যকেন্দ্রের স্বপ্নের আদ্যোপান্ত বুঝিয়ে বলেন। তিনি বললেন, ‘বুঝছি বুঝছি, ওই যে প্যারিসে আছে না-শিল্পী-লেখক-বুদ্ধিজীবীগো ছোট ছোট আখড়া। ওই সব বানাইবার প্ল্যান করছেন।’  সেদিন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ দেখলেন,আবুল হাসনাত আশ্চর্যভাবে ব্যাপারটা ধরে ফেলেছেন।

মাত্র ৩৫ টাকায় ১০টি বই কিনে ১৯৭৮ সালে শুরু হয়েছিল বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। ১৫ জন সভ্য নিয়ে শুরু হওয়া বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে আজ সভ্য ১৫ লাখ।

বাংলাদেশে পাঠাগারের অপ্রতুলতা অনুধাবন করে ১৯৯৮ সাল থেকে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি কার্যক্রম আরম্ভ করে। সারাদেশ ব্যাপী ভ্রাম্যমান লাইব্রেরি কার্যক্রমের জন্য ৫৬ টি ভ্রাম্যমাণ গাড়ি আছে। এ স্বপ্ন পূরণের জন্য তাকে কত পরিশ্রম ও সাধনা করতে হয়েছে। তিনি আগে স্বপ্ন দেখেছেন, অতঃপর তাঁর মেধা, শ্রম, সাধনা ও অধ্যবসায় দিয়ে জয় করেছেন সকল প্রতিবন্ধকতা।

এক্ষেত্রে বিজ্ঞানী ও ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এপিজে আব্দুল কালামের উক্তিটি প্রণিধানযোগ্য, ‘তুমি তোমার স্বপ্ন পূরণের শেষ সীমা অবধি স্বপ্ন দেখো, জেগে জেগে তুমি যা দেখো সেটা স্বপ্ন নয়। স্বপ্ন সেটাই যা তোমাকে ঘুমাতে দেয় না।’

পুরস্কার ও সম্মাননা

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। ১৯৭৭ সালে পেয়েছেন ‘জাতীয় টেলিভিশন পুরস্কার’ , ১৯৯৮ সালে পেয়েছেন মাহবুব উল্লাহ ট্রাস্ট পুরস্কার; ১৯৯৯ সালে পান রোটারি সিড পুরস্কার; ২০০০ সালে পান বাংলাদেশ বুক ক্লাব পুরস্কার। ২০০৪ সালে পেয়েছেন র‌্যামন ম্যাগস্যাসে পুরস্কার, ২০০৫ সালে পেয়েছেন একুশে পদক-২০০৫ এবং ২০০৮ সালে অর্জন করেন পরিবেশ পদক-২০০৮। ২০১২ সালে প্রবন্ধে অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ লাং ফাউন্ডেশন থেকে পালমোকন-১৭ সম্মাননা।

সাহিত্যিক ও সংগঠকঃ

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী এক সাব্যসাচী অভিনিবিষ্ট সাহিত্য-সাধক | আরাধনার মতো করে তিনি করে যাচ্ছেন সাহিত্যের সেবা। ষাটের দশকে বাংলাদেশে যে নতুন ধারার সাহিত্য আন্দোলন হয়, তিনি ছিলেন তাঁর নেতৃত্বে। সাহিত্য পত্রিকা ‘কণ্ঠস্বর’ সম্পাদনার মাধ্যমে সেকালের নবীন সাহিত্যযাত্রাকে তিনি নেতৃত্ব ও দিকনির্দেশনা দিয়ে সংহত ও বেগবান করে রেখেছিলেন এক দশক ধরে।

প্রবন্ধকার আব্দুশ শাকুরের ভাষায়, ‘বহু গুণের মধ্যে যে গুণটি তাঁকে সর্ব অঙ্গনেই অনন্যতা দান করে সেটা সায়ীদের হিরণবরন সৃজনশীলতা যা সর্বদাই সক্রিয় এবং সর্বথা। সমানে সৃজনশীল তিনি কথাশিল্পে কথনশিল্পে কাব্যশিল্পে রচনাশিল্পে এমনকি সংগঠনশিল্পেও – বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র যার মূর্ত দৃষ্টান্ত। বৈঠকী বিনোদন থেকে গুরু বিচরণ – প্রতিভা তাঁর সর্বত্রই দ্যুতিময়।’

‘সংগঠন ও বাঙালি’ গ্রন্থটি তাঁর দুর্লভ সৃষ্টি। বাঙালি জাতির সাংগঠনিক প্রতিভা, সাংগঠনিক জ্ঞান, জাতি হিসেবে তার দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতার রূপরেখা এই গ্রন্থটি। ‘ভালোবাসার সাম্পান’ গ্রন্থটি ষাটের দশকে নৈরাজ্যবিক্ষুব্ধ উত্তাল বাংলাদেশে গড়ে ওঠা ব্যতিক্রমধর্মী সাহিত্য আন্দোলনের এক রূপরেখা। যে আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা ছিলেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। “কন্ঠস্বর” ছিল তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত পত্রিকা।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, রফিক আজাদদের মতো বাঘাবাঘা সাহিত্যিক যেখানে লিখতেন। “নিষ্ফলা মাঠের কৃষক” তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ। অত্যন্ত নান্দনিক ভাষাশৈলীর এক উত্তম বহিঃপ্রকাশ এই বইটি। এখানে তিনি তাঁর শিক্ষা জীবন, শিক্ষার পরিবেশ, অবস্থা ও সর্বোপরি তাঁর শিক্ষকদের নিয়ে লিখেছেন অত্যন্ত দারুণ ঢংয়ে। তাঁর শৈশবের অনেক মজার ঘটনা রয়েছে গ্রন্থটিতে। এ গ্রন্থটি শিক্ষকদের জন্য অবশ্যপাঠ্য।

তাঁর ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আমি’ গ্রন্থটি অসাধারণ সব তথ্য ও অভিজ্ঞতায় পুষ্ট। বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকের প্রতিবন্ধকতা, সমস্যা কিংবা কষ্টের অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে বইটিতে। এ যেন এক সংশপ্তকের টিকে থাকার আলেখ্য। ‘ভাঙো দুর্দশার চক্র’, ‘আমার বোকা শৈশব’, ‘ওড়াউড়ির দিনগুলি’, ‘আমার উপস্থাপক জীবন’, ‘রসস্ট্রাম থেকে’, ‘স্বপ্নের সমান বড়’, ‘বিস্রস্ত জার্নাল, ‘নদী ও চাষীর গল্প’ প্রভৃতি তাঁর অপূর্ব সৃষ্টি।

 

তাঁর প্রথম জীবনে লেখা কবিতাকে বিশ্লেষণ করলে তাকে গণ্য করা যেতে পারে রোমান্টিক, কালসচেতন, দেশপ্রেমিক এবং আধুনিক একজন কবি হিসেবে,পঞ্চাশ-উত্তর কালের আধুনিক ও প্রথাবিরোধী ছোটগল্পকারদের একজন হিসেবে,একজন ভাবুক, প্রাজ্ঞ, বিশ্লেষণপূর্ণ ও নতুন পথ-সন্ধানী প্রাবন্ধিক হিসেবে। এমনকি তার লেখা মৌলিক বা অনুদিত নাটকের জন্যেও তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন দীর্ঘদিন । তিনি কোনো একটি মাধ্যমে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি।সামাজিক নানা ক্ষেত্রে শ্ৰমদান ও সাফল্য অর্জন তার সাহিত্যিক পরিচয়কে আড়াল করে রাখল।এখনো তিনি সমান সক্রিয়, প্রতিবছর লিখে চলেছেন অনবদ্য একেকটি বই, আত্মজীবনীমূলক কিংবা প্রবন্ধের জর্নাল, সাক্ষাৎকার বা বক্তৃতার বই | কবিতা, প্রবন্ধ, ছোটগল্প, নাটক, অনুবাদ, জার্নাল, জীবনীমূলক বই ইত্যাদি মিলিয়ে তাঁর প্রস্থভাণ্ডারও যথেষ্ট সমৃদ্ধ। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ ৪০এর অধিক।

এ প্রসঙ্গে আবদুল্লাহ আবু সাঈদ নিজেই বলেছেন, ‘লিখতে চেয়েছিলাম। লিখতে পারিনি। মনে হয় লেখক হয়েই জন্মেছিলাম। সেটা পূর্ণ করতে পারলাম না। এখনো আমার সারা অস্তিত্ব জুড়ে কোটি-কোটি জীবন্ত শব্দের গনগনানি। ইদানীং কিছু কিছু লিখছি। যদি আর-কিছুদিন বেঁচে যাই, তাহলে হয়তো কিছু লিখতে চেষ্টা করব।’

তিনি মূলত শিক্ষাবিদ ও সাহিত্যিক। সমালোচক এবং সাহিত্য সম্পাদক হিসাবেও তিনি অনবদ্য অবদান রেখেছিলেন। কিন্তু ধীরে ধীরে তাঁর সাহিত্য প্রতিভার স্ফূরণ স্তিমিত হয়ে আসে। তবে আত্মজীবনীসহ নানাবিধ লেখালেখির মধ্য দিয়ে আজও তিনি স্বীয় লেখক পরিচিতি বহাল রেখেছেন। তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ কীর্তি বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র যা ত্রিশ বছর ধরে বাংলাদেশে আলোকিত মানুষ তৈরির কাজে নিয়োজিত রয়েছে।

 

বাঙালি নারীদের পোশাক শাড়ি নিয়ে একটি লেখার জন্য ব্যাপক সমালোচনায় পড়েছিলেন তিনি।৩০ অগাস্ট ২০১৯ প্রথম আলোতে ওই লেখা প্রকাশের পর সমালোচনার ঝড় ওঠে ইন্টারনেটে, সোশাল মিডিয়ায়; তার ‘পুরুষতান্ত্রিক’ দৃষ্টিভঙ্গীর সমালোচনা করেছেন নারী অঙ্গনের নেতৃস্থানীয়রাও।

অশীতিপর এই অধ্যাপক ‘শাড়ি’ শিরোনামে তার ওই লেখা শুরু করেন এভাবে- “শাড়ি পৃথিবীর সবচেয়ে যৌনাবেদনপূর্ণ অথচ শালীন পোশাক।” তিনি লিখেছেন, “আধুনিক শাড়ি পরায় নারীর উঁচু-নিচু ঢেউগুলো এমন অনবদ্যভাবে ফুটে ওঠে, যা নারীকে করে তোলে একই সঙ্গে রমণীয় ও অপরূপ।”তবে দেশের অনেক প্রোথিতযশা ব্যক্তিত্ব আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ওই লেখাকে ইতিবাচক ভাবে নিয়েছিলেন যেমন রুবানা হক।

৮০ পেরিয়েও আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তারুণ্যে ভরপুর। জীবনে বহুমাত্রিক সব কাজ করেছেন। কখনো শিক্ষকতা, কখনো উপস্থাপনা। তারুণ্যের মুখপাত্র হিসেবে সাহিত্য সম্পাদনা থেকে শুরু করে পরিবেশ রক্ষার জন্য আন্দোলনসংগ্রাম—সবই করেছেন তিনি। পাশাপাশি রচনা করেছেন মননশীল ও সৃজনশীল সাহিত্য। যত দিন বাঁচবেন তত দিন কাজ করে যেতে চান তিনি।

অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সমাজকে জ্ঞানের আলোয় উদ্ভাসিত করতে হাতে আলোকবর্তিকা নিয়ে এগিয়ে চলেছেন। কলম হাতে তিনি যেমন সার্থক হয়েছেন, সমৃদ্ধ করেছেন বাংলা সাহিত্যকে, তেমনিভাবে মোটা দাগে বলা যায়, মনোমুগ্ধকর বক্তা হিসেবে আমাদের বাংলায় তার জুড়ি মেলা ভার। এ দেশে লাখো লাখো পাঠক তৈরি করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এবং তাঁর স্বপ্নের বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র। সকল শ্রেণির মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়েছেন তিনি।সার্থক মানুষেরা ফলবান বৃক্ষের মতো অবনত। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সাহিত্যের অনেক শাখায় পদচারণা করেছেন বীরদর্পে, লিখেছেন প্রচুর। তবুও অতৃপ্তির বেদনা তাকে যেন কুরে কুরে খায়। তাঁর ভাষায়, ‘লিখতে চেয়েছিলাম। লিখতে পারিনি। মনে হয় লেখক হয়েই জন্মেছিলাম। সেটা পূর্ণ করতে পারলাম না। এখনো আমার সারা অস্তিত্ব জুড়ে কোটি কোটি জীবন্ত শব্দের গনগনানি। ইদানীং কিছু কিছু লিখছি। যদি আরও কিছুদিন বেঁচে যাই, তাহলে হয়তো কিছু লিখতে চেষ্টা করব।’

 

লেখকঃ জাজাফী

ইমেইল- [email protected]

ফেসবুকঃ www.facebook.com/zazafee.du

 

২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২

————————————————————————–

সহায়ক রচনাবলীঃ

  • আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, নিবন্ধ;উইকিপিডিয়া
  • নিষ্ফলা মাঠের কৃষক, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
  • বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র ও আমি, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
  • আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: বহুমুখিতায় ও স্বপ্নচারিতায়,সম্পাদক: আতাউর রহমান, প্রকাশক: মাওলা ব্রাদার্স
  • ঝিনুক নীরবে সহো- মোশতাক আহমদ
  • বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র[
  • An interview of Abdullah Abu Sayeed(এবেলা)
  • আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ. ২০০১ (দ্বিতীয় সংস্করণ). বিস্রস্ত জর্নাল. সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা.
  • “‘পালমোকন-১৭’ পেলেন আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ”। দৈনিক কালের কণ্ঠ ১৮ নভেম্বর ২০১৭।
  • আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ এর জীবনী : উল্লেখযোগ্য স্মৃতি
  • একুশে পদকপ্রাপ্ত সুধীবৃন্দ ও প্রতিষ্ঠান। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়। পৃ: ৬।