কাঠগড়ায় দাঁড়ানো একজন মাহির সারোয়ার

0
67

কাঠগড়ায় দাঁড়ানো এসআর গ্রুপের চেয়ারম্যান মাহির সারোয়ার। ৭১ বছর বয়সী মাহির সারোয়ার এখনো বেশ শক্তসামর্থ। যে বয়সে অন্যের সাহায্য ছাড়া চলাফেরা করাই মুশকিল সেই বয়সে তিনি দিব্যি নাতি নাতনির সাথে ব্যাডমিন্টন খেলেন। আজ তিনি যে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন এটাই প্রথম নয় বরং জীবনে কত তম বার তিনি আজ কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন তার হিসেব নেই। সাড়ে তিনশো বারতো হবেই কমপক্ষে। এতো বড় একটি গ্রুপের চেয়ারম্যান হয়ে এতোবার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে শুনে হয়তো অনেকেই মনে করতে পারেন মাহির সারোয়ার সাহেব বোধহয় বড় রকম অপরাধী কিংবা নিয়মিত অপরাধ করেন বলেই প্রতি মাসে একবার কিংবা দুবার কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়। আসলে তা নয়। মাহির সারোয়ার সাহেব কোনো রকম অপরাধের সাথে জড়িত নন। তিনি মূলত বিচার প্রার্থী। যতবার কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছেন প্রতিবারই তিনি বিচার প্রার্থী হিসেবেই দাড়িয়েছেন। এমন নয় যে প্রতিবার নিত্যনতুন মামলার জন্য তাকে আদালতের দারস্থ হতে হয়। তিনি বরং বছরের পর বছর একটি মামলায় বিচার চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হচ্ছেন। আদালত বার বার তাকে শুন্য হাতে ফিরিয়ে দিয়েছে। আজ যখন বাসা থেকে বের হলেন তখন তিনি জানতেন এই মামলায় আজই তার শেষ আদালতে যাওয়া। আর কোনো দিন এই মামলার জন্য তাকে আদালতে যেতে হবে না। কারণ আজকেই মামলার নিষ্পত্তি হয়ে যাবে।

আদালত প্রাঙ্গনে অসংখ্য মানুষের ভীড়। বাইরে টিভি সাংবাদিকেরা অপেক্ষা করছে। সকালে যখন মাহির সারোয়ার সাহেবের গাড়ি আদালত চত্বরে এসে থামলো তখনই সাংবাদিকেরা তাকে প্রশ্ন করেছিল আজ কি বিচারের রায় পাবেন? মাহির সারোয়ার বলেছিলেন আজই এই মামলার শেষ দিন। আজই এই মামলার নিষ্পত্তি হয়ে যাবে। যে মামলায় গত ৬৫ বছর বিচারের আশায় তিনি আদালতে হাজির হয়েছেন আজ সেই মামলার শেষ দিন। তিনি যখন সাংবাদিকদের বললেন আজই শেষ দিন তখন সাংবাদিকেরা খুব আশ্চর্য হলো। মাহির সারোয়ার সাহেব কী করে নিশ্চিত হলেন যে আজই মামলার নিষ্পত্তি হয়ে যাবে। যে মামলা নিষ্পত্তি হবে হবে করে ৬৫ বছর পার করে দিয়েছে কী করে আজ নিষ্পত্তি হবে সেটা জানার কৌতুলহ সাংবাদিকদের মন উতলা করে তুললো। এ কারণেই আদালতের বাইরে তারা অপেক্ষা করছে। কাঠগড়ায় দাড়ানো মাহির সারোয়ার সাহেবের উকিল শফিউর রহমান বিচারকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বক্তব্য দিয়ে বসে পড়লেন। আসামী পক্ষের উকিল সেদিন উপস্থিত হননি।

বিচারক সাহেব খস খস করে কিছু একটা লিখলেন তার পর মাহির সারোয়ার সাহেবের দিকে তাকিয়ে বললেন মাহির সারোয়ার সাহেব আসামী পক্ষের উকিল এবং আসামী পক্ষ উপস্থিত না থাকায় আজ মামলার নিষ্পত্তি করা সম্ভব হচ্ছে না। আগামী ২৯ জানুয়ারি এই মামলার পরবর্তী দিন ধার্য করছি। মাহির সারোয়ার সাহেব বিচারককে বললেন মাননীয় বিচারক এই মামলার আর কোনো শুনানী হবে না, আর কোনো দিন ধার্য করার দরকার নেই। আসামী আর কোনো দিন আদালতে হাজির হবে না। মাহির সারোয়ার সাহেবের কথা শুনে বিচারক অবাক হলেন। তার অবাক হওয়া বুঝতে পেরে মাহির সারোয়ার সাহেব নিজেই বলতে শুরু করলেন এই মামলা যখন শুরু হয় তখন আমার বয়স মাত্র ৬ বছর। আমার বর্তমান বয়স ৭১ বছর। গত ৬৫ বছর ধরে এই মামলা চলছে। ২৭ জন বিচারক বদল হয়েছে। উকিল বদল হয়েছে ১৩ জন কিন্তু মামলার রায় হয়নি। কিন্তু আজ হবে। কারণ যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাদের কেউ আজ আর আমাদের মাঝে নেই। যারা নেই তাদের বিরুদ্ধে শুনানী করে লাভ কী? এই মামলার চারজন আসামীর তিনজন কয়েক বছর আগেই মারা গিয়েছেন । যে একজন জীবিত ছিলেন তারও বয়স হয়েছিল ৯৮ বছর। তিনিও গতকাল মারা গিয়েছেন। মামলার সব আসামী মৃত। মৃত মানুষের আপনি কী বিচার করবেন? সে কারণেই আজকের পর এই মামলা আর চলবে না। আপনি আজই ফয়সালা ঘোষণা করে দিন।

বিচারক খসখস করে কিছু লিখলেন তার পর ঘোষণা করলেন দীর্ঘদিন শুনানির পর নানা সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে আদালত এই মর্মে সিদ্ধান্ত দিচ্ছে যে আসামীদের কেউ আজ আর জীবিত না থাকায় এই মামলা খারিজ করে দেওয়া হলো। বিচারকের ঘোষণা শুনে মাহির সারোয়ার সাহেব একটি দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। এই দীর্ঘশ্বাস একই সাথে হতাশার এবং মুক্তির। আজকের পর থেকে আর তাকে আদালতে আসতে হবে না এটা আনন্দের। আর বেদনার বিষয় হলো ৬৫ বছর অপেক্ষা করেও তিনি বিচার পেলেন না। বিচারের রায় পেলেন না।

মামলা খারিজ হওয়ার পর মাহির সারোয়ার ও তার ছেলে মাহিম সারোয়ার এবং মেয়ে মারিয়া সারোয়ার আদালত থেকে বেরিয়ে এলেন। অপেক্ষারত সাংবাদিকেরা তাদের ঘিরে ধরলো। মাহির সারোয়ার খুব শান্ত ভাবে বললেন আজ থেকে এই মামলার আর কোনো শুনানী হবে না। মামলা খারিজ করে দেওয়া হয়েছে। এমন একটি মামলা হঠাৎ করে খারিজ করে দেওয়া হয়েছে শুনে সাংবাদিকরা সবাই আশ্চর্য হলেন। যে মমলা ৬৫ বছর ধরে চলছে তা হুট করে কিভাবে খারিজ করে দেওয়া হয়? মাহির সারোয়ার তখন নিজেই বললেন যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তারা কেউ আজ আর বেচে নেই। একজন বেচে ছিলো সেও গতকাল মারা যাওয়ায় এই মামলা খারিজ না হয়ে আর কোনো উপায় ছিলো না। সাংবাদিকরা জানতে চাইলেন এতোদিন অপেক্ষা করা এতো কষ্ট করার পর যখন এই রেজাল্ট পেলেন তখন আপনার অনুভূতি কী? মাহির সারোয়ার বললেন একই সাথে আনন্দিত এবং বেদনার্ত। আনন্দিত এ জন্য যে অবশেষে এই মামলার হাজিরা দেওয়ার দিন শেষ। আর বেদনার্ত হওয়ার কারণ হলো দীর্ঘ ৬৫ বছর মামলার শুনানি চললো কিন্তু বিচার পেলাম না। এর পর মাহির সারোয়ার ছেলে মেয়েকে নিয়ে বাসায় ফিরলেন। ড্রয়িং রুমের দেয়ালে টাঙ্গানো ছবিটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে চোখের পানি মুছলেন। ছবিটা তার বাবা মায়ের। সেই ছবিতে সেও আছে। যখন তার বয়স ছিল ৬ বছর। বাবা মায়ের সাথে কক্সবাজার গিয়েছিল সেখানকার একটি ছবি।

বাবা মায়ের মূখে এমন এক হাসি লেগে আছে যা কোনো দিন বিলীন হবার নয়। একটু পর খেলতে খেলতে ড্রয়িং রুমে ঢুকলো তার নাতি আমান। দাদুর হাত ধরে আমান জানতে চাইলো দাদু তোমার চোখে পানি কেন? তুমি কাঁদছো! তোমার কি আবার তোমার বাবা মায়ের কথা মনে পড়েছে? আচ্ছা দাদু তোমার বাবা মাকে আমি কী বলে ডাকবো? মাহির সারোয়ার নাতির হাত ধরে সোফাতে গিয়ে বসলেন। মাথার চুলে বিলি কেটে বললেন বাবা মায়ের কথা মনে না পড়ে পারে। তুমি যখন স্কুলে থাকো তোমারও নিশ্চই বাবা মায়ের কথা মনে পড়ে। আমার বাবা মাকে তুমি গ্রেট গ্রান্ডফাদার এবং গ্রেট গ্রান্ডমাদার বলবা। দাদুর কথা শুনে আমান মাথা নাড়ে এবং বলে আচ্ছা দাদু তোমার বাবা মা কি খুব গ্রেট ছিল যে তাদেরকে আমি গ্রেট গ্রান্ডফাদার এবং গ্রেট গ্রান্ড মাদার বলবো। মাহির সারোয়ার নাতিকে বললেন হ্যা তারা সত্যিই গ্রেট ছিলো। তবে দাদুর বাবা মাকে নাতি কী বলে ডাকবে তার বাংলা জানা নেই বলেই ইংরেজীতে এটা ডাকার কথা বলেছি। ও বুঝেছি বলে আমান তার পর দাদুকে বলে দাদু তোমার ব্যাগটা দাও কাল আবার যখন যাবে আমি ব্যাগটা তোমাকে গুছিয়ে দেব। মাহির সারোয়ার আমানকে বললেন নারে দাদু ভাই এই ফাইল নিয়ে আর কখনো বাইরে যাওয়া লাগবে না। ছোট্ট আমান বুঝতে পারে না কেন তার দাদুকে ওই সব ফাইল নিয়ে আর বাইরে যেতে হবে না।

পরদিন সকালে পত্রিকার ভিতরের পেজে ছোট্ট করে মাহির সারোয়ারের সেই মামলা বিষয়ে নিউজ হয়।আজ থেকে ৬৫ বছর আগে বাবা মা এক সাথে খুন হতে দেখা ছোট্ট মাহির সারোয়ারের বয়স এখন ৭১ বছর। ৪৮ ঘন্টা সময় বেঁধে দিয়েছিল তখনকার দায়িত্বশীলরা। তার পর আটচল্লিশ ঘন্টা,আটচল্লিশ মাস, আটচল্লিশ বছর পার করে ৬৫ বছর পার হলেও মামলার রায় হয়নি। অবশেষে আসামীদের মৃত্যুতে এই মামলা খারিজ হয়েছে।সব মেঘে বৃষ্টি হয় না। কিন্তু মাহির সারোয়ার মেঘ নামের সেই ৭ বছরের কিশোর পরবর্তী ৬৫ বছর ধরে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়েছে। আজও বাবা মায়ের কবরের পাশে দাঁড়িয়ে চোখে জল ফেলে। তখন আকাশেও মেঘ থাকে আর জমিনেও মেঘ থাকে। চোখের সামনে জল ভরা চোখে ঝাপসা হয়ে ওঠে কবরের নাম ফলক। যেখানে মাহির সারোয়ারের বাবা মায়ের নাম লেখা সাগর-রুনি দম্পতি।

১১ ডিসেম্বর ২০২১
জাজাফী