Friday, February 3, 2023
Homeপ্রবন্ধবিছানা ছেড়ে একদিন আর উঠলেন না

বিছানা ছেড়ে একদিন আর উঠলেন না

বিছানা ছেড়ে একদিন আর উঠলেন না। কে জানতো কথাটি একদিন তাঁর জীবনেও মিলে যাবে। বার্ধক্যজনিত কারণে সেই যে বিছানাকে সঙ্গী করলেন তার পর সবাইকে কাঁদিয়ে অনন্তলোকের যাত্রী হলেন হাসান আজিজুল হক। বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান কথাসাহিত্যক হিসেবে যিনি নিজের অবস্থান তৈরি করে নিয়েছিলেন । ষাটের দশকে ধুমকেতুর মত উদয় হলেন এই কথাসাহিত্যিক। তিনি তাঁর সুনিপুন গদ্য এবং মর্মস্পর্শী বর্ণনাভঙ্গির জন্য প্রসিদ্ধ । ভাষার বিভায় তাঁর গল্প হয়ে উঠে অনন্য। দীর্ঘ সাহিত্যজীবন পেয়ে খুব বেশি না লিখেও তাঁর শ্রম-অধ্যয়নলব্ধ গল্পচর্চার উজ্জ্বল ব্যতিক্রম উদাহরণ রেখে যান বাংলা কথাসাহিত্যে। আর এ কারণেই তিনি বর্তমান বাংলাদেশের ইতিহাসে ছোটগল্পে বা উপন্যাসে  অপরিহার্য একটি নাম হয়ে ওঠেন। শুধু বাংলাদেশ নয়, বাংলাভাষা-অঞ্চলে অর্থাৎ পশ্চিমবঙ্গেও মানুষের কাছেও তাঁর নাম সর্বাগ্রে উচ্চারিত হয়।

নিজের জীবনকে দিয়ে, দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও জানাশোনাকে নিয়ে তিনি মুগ্ধ রাখেন পাঠককে, আদায় করে নেন সমীহ। ক্রমশ পরিবর্তনশীলতার মধ্যে দিয়ে হাসান আজিজুল হক কথাসাহিত্যে আঁকেন মানুষের জীবন, জীবনের গভীরতম সংবেদ। ১৯৬০ সালে প্রকাশিত প্রথম গল্প ‘শকুন’-এ প্রমাণ দেন তার দৃষ্টিশক্তির, অনেক দূরে যাওয়ার অভিপ্রায়কে তিনি বাস্তবে রূপ দেন—বাংলা কথাসাহিত্যে পোক্ত করে নেন নিজের আসন।ষাটের দশকের শুরু থেকে কেবল গল্প বুনেছেন । কিংবা বলা যায় জীবন চলার পথের সমুদয় অভিজ্ঞতাকে গল্পের বা উপন্যাসের কাহিনী ও চরিত্রে জীবন্ত করে গেছেন তিনি।গল্প, প্রবন্ধ, সাক্ষাৎকার ও উপন্যাসে ব্রাত্যজন, প্রান্তিকজনের জীবন, কৃষ্টি ও সংগ্রাম তুলে এনেছেন বলিষ্ঠভাবে।

মুক্তিযুদ্ধ ও দেশভাগ তার সাহিত্যের অন্যতম বিষয়বস্তু।বিশদ ও বিশ্বস্থভাবে প্রকৃতি বর্ণনা, জন্ম-মৃত্যুর প্রসঙ্গ, সমাজকে তীব্রভাবে ব্যঙ্গ করা তো আছেই, দেশভাগ-মুক্তিযুদ্ধ এমন হৃদয় দিয়ে আর তেমন কেউ দেখাতে পারেননি। হাসান আজিজুল হক জীবনের জয়গান গেয়ে যান তার সৃজনে। গল্পের নিজস্ব ভাষা, উপস্থাপন ভঙ্গিমা, জীবন দেখা ও দেখানোর জন্য তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। ছোটগল্পই তার কাজের প্রধান অঞ্চল। এ জন্য কখনো কখনো তাকে ‘ছোটগল্পের রাজপুত্তুর’ বলা হয়। অনেক পরে হলেও দীর্ঘদিনের ছোটগল্পের চরাচর তিনি মিশিয়েছেন পূর্ণাঙ্গ উপন্যাসের বিশাল প্রান্তরে। ‘আগুনপাখি’ উপন্যাসে তিনি ঔপন্যাসিকের শক্তিমত্তার পরিচয় দিয়েছেন।

দীর্ঘ জীবনে, বিট্রিশ-পাকিস্তান পর্ব শেষ করে সার্বভৌম বাংলাদেশে বসবাস করার অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ আজিজুল হকের কথাসাহিত্যের ভূবন। শৈশব-কৈশোর কাটানো সে রুক্ষ রাঢ়বঙ্গকে ভুলতে পারেন না বলেই, নিজের ভেতর উদ্বাস্তু অনুভূতিরেখাটা প্রবলভাবেই খনন করে যান। দেশ ভাগ ও দাঙ্গা বিষয়ক গল্প-উপন্যাসের ধারায় হাসান আজিজুল হকের গল্প-উপন্যাস স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমিণ্ডত। তেতাল্লিশের দুর্ভিক্ষ, ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ও উদ্বাস্তু সংকটের কালে হাসান আজিজুল হকের বালক বয়স, কিন্তু প্রত্যেকটি ঘটনা তাঁকে স্পর্শ করে গেছে। এই বেদনাময় স্মৃতি তাঁর শিল্পীসত্তায় চিরজাগরূক। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘দেশভাগ আমার জীবনের জন্য একটি ক্ষতস্বরূপ। ক্ষত সারলেও দাগ থেকে যায়। আমি এই দাগের কারণ অনুধাবন করার চেষ্টা করেছি।’  আর এ কারণে খুব সহজেই তাঁর কথাসাহিত্যের বিষয় হয়ে ওঠে স্বাধীনতা সংগ্রাম, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, পঞ্চাশের মন্বন্তর, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সংঘাত, বস্ত্রসংকট, দেশভাগ, উত্তরকালে সৃষ্ট উদ্বাস্তু ও শরণার্থী সমস্যা, পাকিস্তানের স্বৈরশাসন, বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনের সকল পর্যায়, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাস্তবতা, গণতন্ত্রের অপমৃত্যু, সামরিকতন্ত্রের উত্থান ও বিকাশ ইত্যাদি অভ্যন্তরীণ ঘটনাপ্রবাহ ।

 

অনায়াসে বলা যায় বাংলা কথাসাহিত্যের নির্মাণকৌশলের প্রতিটি অনুষঙ্গে, আখ্যান-নির্মাণে, ভাষারীতিতে, শব্দসৃজনে, শব্দচয়নে, বাক্যগঠনে, বাক্যবিন্যাসে, সংলাপ-নির্মাণে, রূপক-উপমায়, চিত্রকল্পে হাসান আজিজুল হক নতুন  মাত্রা যোগ করেছেন।

প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয় “আত্মজা ও একটি করবী গাছ” শুধু তাঁর গল্পে নয়, বাংলা সাহিত্যের সমস্ত দেশভাগের গল্পের মধ্যে বিশিষ্টতার দাবিদার। দেশত্যাগী মানুষের মর্মঘাতী যন্ত্রণার তীব্রতার সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটেছে এ গল্পে। যেমন বলা হয়েছে, ‘দেশ ছেড়েছে যে তার ভেতর বাইরে নেই। সব এক হয়ে গেছে।’

বিষয়, ভাষা এবং আঙ্গিকের স্বাতন্ত্রের কারণে আমরা সহজেই চিনে নিতে পারি হাসান আজিজুল হকের গল্প। তাঁর গল্পে চমক দেয়ার কোনো ব্যাপার নেই।ফলে তাঁর গল্প পড়ে আমরা চমকে উঠি না, বরং এক ভিন্নতর বোধে তাড়িত হই। এ কারণেই তাঁর আত্মজা ও একটি করবী গাছ, শকুন, তৃষ্ণা, জীবন ঘষে আগুন, নামহীন গোত্রহীন, ইত্যাদি গল্পের শিল্পচেতনা বাংলা সাহিত্যের পাঠকদের মধ্যে সবসময় ভাস্বর হয়ে থাকে।

৬৭ বছর বয়সে এসে তিনি লিখলেন পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস আগুনপাখী।  একটি উপন্যাস লিখেই তিনি হইচই ফেলে দিলেন বাংলাদেশ তথা ভারতবর্ষে। ‘আগুনপাখি’ উপন্যাসের বিষয় বিশ্বযুদ্ধ, দেশভাগ, দাঙ্গা, দুর্ভিক্ষ ও দেশান্তরিত মানুষের ইতিহাস। একজন ব্যক্তি, একটি পরিবার, একটি সমাজ, একটি সম্প্রদায়, একটি দেশ, একটি জাতির ভাঙন-উত্থান-পতনের ইতিহাসকে আখ্যানে বেঁধে ফেলতে চেয়েছেন বলেই কোনো চরিত্রের নাম ব্যবহার করেননি। দেশভাগের পটভূমিতে রচিত ‘আগুনপাখি’ অনেক কারণেই বিশিষ্ট হয়ে উঠেছে। দেশ-কাল-সমাজের কথা উপন্যাসে থাকে। রাঢ়বঙ্গের মুসলিম সমাজের চিত্র এঁকেছেন লেখক। হাসান আজিজুল হকের শৈশব-কৈশোরের বাস্তব অভিজ্ঞতা এই উপন্যাসের ভিত্তি তৈরি করেছে। একটি পরিবারের উত্থান-পতনের ভেতর দিয়ে তিনি গোটা মুসলিম সমাজের উত্থান-পতনের চিত্র এঁকেছেন। দেশব্যাপী হানাহনির খবরও বাদ যায়নি তাঁর কলম থেকে। সবাই দেশ ছেড়ে যায়। একজন নারী যায় না। সে দেশভাগের ভ্রান্ত রাজনীতির বিরুদ্ধে নিজের অজান্তেই প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। কেবলই নিজের জন্যে এই প্রতিবাদ। কেবলই বাস্তুভিটের টানে এই প্রতিবাদ। কেবলই অস্তিত্বের প্রয়োজনের এই প্রতিবাদী লড়াকু জীবনের পথে পা বাড়ায় গ্রামীণ এক নারী। স্বামী-সন্তান-সংসার ছেড়ে একাকী ভিটেমাটি আগলে রাখার মধ্যে যে প্রতিবাদী চেতনা, তা-ই এই উপন্যাসের মূল সুর।

 

সংকট বেশি ঘনীভূত হয় দেশভাগের সময়ে। এই সময়ে যাঁরা অপশন নিয়ে দেশত্যাগ করেছেন, তাঁদের তীব্র মনোদ্বন্দ্বের কথা হাসান আজিজুল হক ভালো করেই জানেন। আর জানেন বলেই তাঁর মতো লোকের হাতে এত সুষ্ঠুভাবে প্রকাশিত হল। ভিটেমাটি বদল হলেও শান্তি আসে না। এই সত্যও উচ্চারিত হয়েছে উপন্যাসের ভেতরে।

রাজশাহী কলেজে পড়ার সময় কলেজের উদ্যমী তরুণ মিসবাহুল আজীমের সম্পাদনায় প্রকাশিত ভাঁজপত্র চারপাতায় হাসান আজিজুল হকের প্রথম লেখা ছাপা হয়, লেখাটির বিষয় ছিল রাজশাহীর আমের মাহাত্ম্য। তবে সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল পত্রিকায় ১৯৬০ সালে ‘শকুন’ শীর্ষক গল্প প্রকাশের মধ্য দিয়ে হাসান আজিজুল হক সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তবে কৈশর জীবনেই তাঁর সাহিত্যচর্চার হাতেখড়ি। তিনি যখন কাশীশ্বরী উচ্চ বিদ্যালয়ের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র তখন ঐ স্কুলে রাজা সৌমেন্দ্র চন্দ্র নন্দীর আগমন উপলক্ষ্যে একটি সম্বর্ধনাপত্র রচনার মধ্য দিয়ে তার লেখালেখি জীবনের শুরু। বাংলা সাহিত্যে অবদানের জন্য নানা সময়ে তিনি পেয়েছেন সম্মাননা এবং পুরস্কার। ১৯৭০ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার,ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার(১৯৮৮), আলাওল সাহিত্য পুরস্কার(১৯৮৩),১৯৯৯ সালে একুশে পদক,সাহিত্য রত্ন পুরস্কার(২০১৮),  এবং ২০১৯ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার।সার্বজৈবনিক সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতি স্বরূপ ২০১৮ সালে তাকে একটি বেসরকারি ব্যাংকের পক্ষ থেকে ‘সাহিত্যরত্ন’ উপাধি দেওয়া হয়। এছাড়া ‘আগুনপাখি’ উপন্যাসের জন্য তিনি ২০০৮ সালে কলকাতা থেকে ‘আনন্দ সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করেন। ২০১২ সালে আসাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এবং ২০১৮ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডি-লিট ডিগ্রি পান ।  ।

হাসান আজিজুল হকের গল্পেও প্রেম আছে। তবে তাঁর গল্পের চরিত্ররা অতটা প্রেম-কাতর নয়। রবীন্দ্রনাথ কিংবা শরৎচন্দ্রের কল্পলোকচারী প্রেম ও রোমান্সের বিপুল ঐশ্বর্য নেই তাঁর গল্পে। গল্পে প্রেমকে তিনি অনুষঙ্গ হিসেবে এনেছেন অতি সুক্ষ্ম, পরিমিত ও শৈল্পিকভাবে।

হাসান আজিজুল হকের গল্পে উপজীব্য হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গ।এই ঘরানার গল্পসমূহকে দুইটি শ্রেণীতে ভাগ করা যায়। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ের গল্প আর মুক্তিযুদ্ধোত্তর সময়ের গল্প। ‘ভূষণের একদিন’, ‘নামহীন গোত্রহীন’, কৃষ্ণপক্ষের দিন’- গল্পগুলোতে মুক্তিযুদ্ধকালীন পরিস্থিতি খুঁজে পাওয়া যায়। আর যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ের অবস্থাক্রমে বর্ণিত হয়েছে ‘আটক’, ‘কেউ আসেনি’, ‘ফেরা’ ও ‘ঘরগেরস্থি’ তে।এখন গল্পগুলোকে বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে দেখানোর প্রয়াস থাকবে লেখক মুক্তিযুদ্ধের যেসকল উপাদান গল্পে ব্যবহার করেছেন সেগুলো। আর সেখান থেকে বাদ যাবে না যুদ্ধ-পরবর্তীকালে মানুষের ভেতরে জমানো হতাশা ও নৈরাশ্য।

হাসান আজিজুল হকের ‘আটক’ গল্পে বর্ণিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত স্তরে, পাকিস্তানী বাহিনীর কোণঠাসা হয়ে পড়া ও বাংলার স্বাধীনচেতা মানুষের উৎফুল্লের বিবরণ। ‘ভূষণের একদিন’ গল্পে দেখা যায়- পাকিস্তানী সেনার তা-বের শিকার হয়ে, দুচোখে বিস্মিত জিজ্ঞাসা নিয়ে কিভাবে প্রাণ হারিয়েছে প্রত্যন্ত গ্রামগঞ্জের এমন সব শ্রমজীবী মানুষ, যারা ‘মুক্তিযুদ্ধ’ কি তা জানতই না।প্রত্যাগত মুক্তিযোদ্ধার মানস-রূপান্তেরের ধারাক্রম বর্ণিত হয়েছে- ‘ফেরা’ গল্পে। এর কেন্দ্রীয় চরিত্র আলেফ।

‘কেউ আসে নি’গল্পের মতোই ‘ফেরা’ গল্পে উঠে এসেছে স্বাধীন দেশের মুক্তিযোদ্ধাদের হতাশা-নৈরাশ্যের কথা। যুদ্ধকালীন আলেফের স্বপ্ন ছিল, সে হয়তো দেশ স্বাধীন হলে দুমুঠো ভাত খেতে পারবে। আবার  ললিতনগরের  বিলে  চিংড়ি  ধরবে,  কিন্তু তা স্বপ্নই থেকে যায়। এই স্বাধীন দেশে তার মতো হাজারো মুক্তিযোদ্ধাকে সে দেখতে পায় রাইফেল কাঁধে করে হাঁটছে বেকার কর্মহীন অবস্থায়।

নানা-মাত্রিক হতাশা যন্ত্রণায় জর্জরিত নেতিবাচক পরিণতিতে তাঁর পৌঁছে যাওয়া এ গল্পের মূল উপজীব্য। যুদ্ধক্ষেত্রে পায়ে গুলিবিদ্ধ হয় আলেফের। গুলি বের করার পর ছেঁড়াখোঁড়া মাংসগুলো জড়ো করে সেলাই করে দেয়া হয়েছে। আর একটু উপরে গুলি লাগলে গোটা পা-ই কেটে ফেলতে হতো। ছেলেকে জীবিত ফিরে পেয়ে আবেগে আপ্লুত হয়েছে আলেফের জননী। ছেলের পয়ের শুকিয়ে যাওয়া ক্ষত দেখে শিউড়ে ওঠেন জননী- ছেলের প্রাণটাও যে চলে যেতে পারত! যেমন লেখক এ প্রসঙ্গে লিখেছেন ‘কঠিন কথা ভেবে দেখার সময় লোকের যেমন ভ্রু কুঁচকে উঠে, চোয়াল শক্ত হয়ে যায় আলেফের ভ্রুতে তেমনিই গিট পড়ে , আর তেমনিই শক্ত হয়ে যায় তার চোয়াল,আলেফ বলে ওঠে ‘দেশের জন্যি যুদ্ধে গিইলাম’।

নামহীন গোত্রহীন গল্প গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯৭৫ সালে সাতটি গল্প আছে এই গ্রন্থে যা মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছে। গল্পগুলিতে দেখানো হয়েছে পশ্চিম পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর বর্বরোচিত আচরণ সেই সাথে স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশ করলেও সাধারণ মানুষের হৃদয় যন্ত্রণার যে বিন্দুমাত্র প্রশমন ঘটেনি এবং আরও নানা সমস্যায় আবদ্ধ হয়ে জীবনধারণ করাই কঠিন হয়ে উঠেছে সেই দিকটিও ফুটে উঠেছে এই গ্রন্থে। ‘নামহীন গোত্রহীন’ গল্পের মূল চরিত্রে দেখা যায় ঘরে ফেরায় ব্যাগ্র-ব্যাকুল এক পথচারী। চেনা শহরে পৌঁছে সে অচেনা অনুভবে আক্রান্ত হয়। রাস্তার দুই পাশের দোকানপাট বন্ধ, বাড়িঘরগুলোর তো যেন দাঁতকপাটি লেগেছে।

নিঃশব্দ অন্ধকারের বুক চিড়ে বুটের শব্দ ওঠে।রাজাকারের হাতের রাইফেল কেড়ে নিয়ে বিভীষিকাময় অবস্থার মধ্য দিয়ে পাঁচজন গেরিলা যোদ্ধার পলায়নপরতার বিবরণ রয়েছে ‘কৃষ্ণপক্ষের একদিন’ গল্পটিতে। পাকিস্তানী সেনার চোখ এড়িয়ে ছুটতে ছুটতে তারা খালের জলে এসে নামে। প্রায় বালক বয়সী একরাম চলতে অপারগ হলে নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থেই তাকে এখানে জীবিত রেখে যাওয়া হবে না বলে জানিয়ে দেয় জামিল নামের একজন। ফেলে আসা গ্রামের ভেতর থেকে ভেসে আসছে মেশিনগানের বিরতিহীন আওয়াজ। সেই সঙ্গে চলছে বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ, আতঙ্কিত মানুষের আর্তচিৎকার।শরণার্থী-জীবন শেষে নিজের ভিটেয় ফিরে আসা এক পরিবারের ফের অসহায়ত্বের তথ্যনির্ভর বিবরণ মেলে ‘ঘরগেরস্থি’ গল্পে। দেশ স্বাধীন হতেই এক বুক স্বপ্ন নিয়ে গাঁয়ে ফিরে এসেছিল রামশরণ পরিবার। স্বাধীনতার আগে অভাব ছিল, ভারতে যাওয়ার পরও তা পিছু ছাড়েনি, চিরসঙ্গী সেই অভাব এখনও যে লেগে থাকবে তারা তা জানে। তবু নিজের ভিটে বলে কথা।

‘কেউ আসে নি’ গল্পে যে বিষয়টি শক্ত মাটি পায় তা হলো- যুদ্ধফেরত মুক্তিযোদ্ধাদের স্বাধীন দেশের প্রতি বিরক্ত প্রতিক্রিয়া। ‘যে স্বপ্ন-কল্পনা,আশা-আকাক্সক্ষা ছিল ‘স্বাধীনতা’ শব্দটিকে ঘিরে তার বাস্তবায়নের অভাব মুক্তিযোদ্ধাদের হতাশাগ্রস্ত করে।লেখক মুক্তিযুদ্ধের  সময় সংঘটিত ঘটনাগুলোকে বাস্তব ও বেশ জোরালোভাবে তুলে আনতে সক্ষম হন গল্পে। আসলে  মুক্তিযুদ্ধ  সম্পর্কে লেখকের যে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা তারই প্রতিফলন যেন ঘটেছে ‘মুক্তিযুদ্ধ’ বিষয়ক গল্পগুলোতে।  যুদ্ধের সময় ঘটে যাওয়া নানা লোমহর্ষক ঘটনার বিবরণ, যুদ্ধ-পরবর্তীকালে মানুষের প্রত্যাশা ছিল দুবেলা দুমুঠো ভাত খেয়ে শান্তিতে ঘুমাবে, কিন্তু তা পূরণ  না হওয়ায় তাদের মাঝে যে হতাশা দানা বেঁধে ওঠে, তা দক্ষ কারিগরের মতো হাসান আজিজুল হক তুলে এনেছেন গল্পে।  এ গল্পগুলো যেন মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধ-পরবর্তী হতোদ্যোমের এক অনন্য দলিল হয়ে রয়েছে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে  বাংলা ছোটগল্প জন্ম  নিয়ে বর্তমানে তা কী বর্ণিল-বিচিত্র-নানা  ভঙ্গিময়  হয়ে  উঠেছে হাসান আজিজুল হকের গল্প  না  পড়লে তা বোঝার কোন উপায় নেই। তিনি গল্পকে  নির্মাণ করেছেন নিজের  মতো করে, আর  তাতে রয়েছে  বাস্তবতার প্রলেপ।মাত্র ৮২ বছরের জীবন নিয়ে পৃথিবীতে এসেছিলেন এই অনন্য কথা সাহিত্যিক।দিয়ে গেছেন দুই হাত উজাড় করে। লিখে গেছন কালজয়ী সব লেখা। তার পর একদিন রোগসজ্জায় বিছানায় সজ্জ্যাশায়ী হলেন। বিছানা ছেড়ে একদিন আর উঠলেন না।গল্প এবং উপন্যাস ছাড়াও প্রবন্ধ, নাটক, শিশুসাহিত্য, স্মৃতিকথা, আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থসহ সম্পাদিত গ্রন্থ রচনায়ও তিনি অসামান্য অবদান রেখেছেন। সমালোচক হিসেবেও তিনি ছিলেন প্রাজ্ঞ ব্যক্তিত্ব। বলা যায়, বাংলাসাহিত্যের অধিকাশং জায়গাকেই করেছেন সমৃদ্ধ। বাংলা সাহিত্য তাঁর কাছে অনেকটাই ঋণী।

 

লেখাঃ জাজাফী

গল্পকথক,সমাজকর্মী

www.zazafee.com

 

 

 

তথ্যসূত্রঃ

  • হাসান আজিজুল হকের কথাসাহিত্য : বিষয়বিন্যাস ও নির্মাণ কৌশল-চন্দন আনোয়ার
  • হাসান আজিজুল হক ও আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের গল্পের বিষয় ও প্রকরণ-সরিফা সালোয়া ডিনা,   বাংলা একাডেমি,  ঢাকা, ২০১০, পৃ. ১৫৫
  • হাসান আজিজুল হক, ‘ভূষণের একদিন’,  গল্পসমগ্র ১, মাওলা ব্রাদার্স, ঢাকা,  ২০১১, পৃ. ২৪৮
  • ‘গল্পে একাত্তর ও তারপর’-ড. স্বপ্না রায়,শিলালিপি (কালের কণ্ঠ), ঢাকা, জানুয়ারি ২০১১, পৃ. ১৩
  • হাসান আজিজুল হক, একাত্তর করতলে ছিন্নমাথা, সাহিত্য প্রকাশ, ঢাকা, ২০০৮, পৃ. ৬৬।
  • আমি আমার শেষ নিয়ে ভাবছি না- দৈনিক প্রথম আলো, ১৫ নভেম্বর ২০২১।
  • হাসান আজিজুল হক- উইকিপিডিয়া নিবন্ধ।

 

 

Most Popular

Recent Comments

RichardDeecy on ছোটলোক
RichardDeecy on গন্তব্য
RichardDeecy on দুই মেরু
FreddieCesty on তুমি বললে
FreddieCesty on দুই মেরু