হাউজ টিউটর, বেতন, অভিভাবকদের চাহিদা এবং কিছু অন্য লেভেলের হাউজ টিউটরঃ

প্রত্যেক বাবা মা তার সন্তানের মঙ্গলের জন্য সেরা বিষয়গুলিই বেছে নিবেন এটাই স্বাভাবিক। প্রতিযোগিতামূলক এই সমাজে সবেমাত্র স্কুলে যাওয়া শুরু করেছে এমন বাচ্চার জন্যও তাই হাউজ টিউটর রাখেন অনেক অভিভাবক। গত কয়েকদিন আমি বিভিন্ন অভিভাকের সাথে তাদের বাচ্চাদের জন্য হাউজ টিউটর রাখলে কেমন টিচার চান,কতদিন পড়ানো হবে এবং তার বিনিময়ে কত টাকা বেতন দিবেন এমন বেশ কিছু প্রশ্ন করেছিলাম। দু’একজন বাদে বাকি সব অভিভাবকের মতামত প্রায় একই ছিলো। অধিকাংশ অভিভাবক হাউজ টিউটর নির্বাচনে নিম্ন লিখিত বিষয়গুলি ফলো করেন

  • হাউজ টিউটর নামিদামি কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়লে ভালো হয়।
  • হাউজ টিউটর ভালো কোনো সাবজেক্ট নিয়ে পড়লে ভালো হয়।
  • হাউজ টিউটর শিক্ষক হলে কোন স্কুল/কলেজে পড়ান সেটা বিবেচনা করেন।
  • সপ্তাহে 4 থেকে 6 দিন পড়াবেন এমনটি আশা করেন।
  • সপ্তাহে 4 থেকে 6 দিন পড়ালে বেতন 1500 টাকা থেকে 3000 টাকার মধ্যে রাখতে চান।
  • এক ঘন্টার বদলে দেড় থেকে তিন ঘন্টা পড়ানো হোক এমনটি চান।
  • নার্সারিতে পড়ুয়া বাচ্চাকে পড়ানোর জন্যও তারা ভালো সাবজেক্টে ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে এমন হাউজ টিউটর চান। সপ্তাহে 4 থেকে 6 দিন পড়ানোর বিনিময়ে 1500 থেকে 3000 টাকা দিতে চান।
  • হাউজ টিউটর যেন বাচ্চার সাথে বন্ধুর মত আচরণ করে সেটা চান।

এর বাইরে খুবই সীমিত সংখ্যক অভিভাবক বলেছেন যে ক্লাসের ছাত্র/ছাত্রীকেই হাউজ টিউটর পড়াক না কেন তাদের বেতন কোন ভাবেই 5 হাজারের কম হওয়া উচিৎ নয়। কারণ একজন মানুষ বাসায় গিয়ে বাচ্চাকে পড়াবে,সময় দিবে সেটা সপ্তাহে 3 দিনই হোক বা 5 দিন হোক তার জন্য কোন ভাবেই 1500 থেকে 2500 টাকা বেতন হতে পারে না।

দু একজন অভিভাবক বলেছেন ক্লাস ৫ অব্দি বাচ্চাদের হাউজ টিউটর দরকারই হয় না যদি অভিভাবকরা একটু সময় দেয়। এটা অবশ্যই গুরুত্বপুর্ণ। কিছু অভিভাবক বলেছেন হাউজ টিউটরের বেতন নির্ভর করে অনেক সময় এলাকাভিত্তিক। কিন্তু ব্যক্তিগত ভাবে আমার কখনোই মনে হয় না যে একজন হাউজ টিউটর যে কিনা বাসায় গিয়ে পড়াবে সে যে এলাকার জন্যই হোক না কেন তার বেতন কোন ভাবে 1500 থেকে 2500 টাকা হতে পারে।

# টিউশন বিষয়ে আমার বাস্তব অভিজ্ঞতাঃ

আজ থেকে ঠিক 14 বছর আগে আমি যখন টিউশন করতাম তখন একটি টিউশন থেকে আমি মাসে 15 হাজার টাকা সম্মানী পেতাম। আমি সপ্তাহে 3 দিন পড়াতাম এবং এক ঘন্টা 20/30 মিনিটের বেশি কখনোই পড়াতাম না। ছাত্র/ছাত্রী কোন ক্লাসে পড়ে এটা বিবেচ্য ছিলো না। এবং আমি তখন আলাদা আলাদা যায়গায় বাসায় গিয়ে 5 টা টিউশন করাতাম। আমি বাচ্চাদের সাথে বন্ধুত্বপুর্ন  ব্যবহার করতাম কিনা তা অভিভাবকরাই বলতে পারবেন তবে কোন অভিভাবক আমায় ভুলে যান নি। এখনো সুযোগ পেলেই খোঁজ নেন। এই যে তারা আমায় এতোগুলো টাকা দিতো তার মানে এই নয় যে তারা অনেক বড়লোক ছিলো। তখন আমার হাতে প্রচুর অফার আসতো টিউশনের কিন্তু আমি সময় দিতে পারতাম না। 14 বছর আগের তুলনায় এখনকার টিউশনের দাম এতোটা কমতে পারে আমি কল্পনাও করতে পারি না।

  • আমি যাদের কাছে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করেছিলাম এবং উদাহরণ স্বরুপ যে বাচ্চাগুলোর জন্য হাউজ টিউটর রাখলে কার কেমন চাহিদা জানতে চেয়েছিলাম সেই বাচ্চাদের প্রত্যেকের একদিনের আয় থেকেও হাউজ টিউটরের মাসিক বেতন অন্তত তিন ভাগের এক ভাগ (বাচ্চাদের নিজেদের আয়ের কথা বলছি)। যেখানে একটি বাচ্চা একদিনে যে সম্মানি পাচ্ছে সেখানে কম পক্ষে 16 দিন বাসায় গিয়ে পড়িয়ে তার তিন ভাগের এক ভাগ বেতন পাওয়ার যোগ্যতা রাখে হাউজ টিউটর। তাও অনেকগুলো শর্ত সাপেক্ষে! যে শর্তগুলোর কথা আমি উপরে উল্লেখ করেছি। ধরুন উদাহরণ স্বরুপ যে বাচ্চাদের কথা আমি বলেছি তাদের সম্মানি পাওয়াটা যে খুব সহজ তাও নয়। একটি বাচ্চাকে ভোর সাড়ে চারটায় ঘুম থেকে উঠে শুটিং স্পটে যেতে হয়, সারাদিন থাকতে হয় এবং কখনো কখনো রাত বারটা বা তারও বেশি সময় থেকে ওই পরিমান সম্মানি পেতে হয়। আমি অবশ্যই এই বিষয়টি স্বীকার করি। কিন্তু বাস্তবতা বিবেচনা করলে দেখি বাচ্চাটিকে নেওয়ার জন্য বাসার সামনে গাড়ি দাড়িয়ে থাকে, আবার কাজ শেষ হলে বাসায় পৌছে দেয়। বাচ্চাটি শুটিংয়ের ফাঁকে পিকনিকের মত আনন্দ করতে পারে,খেলতে পারে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া একজন হাউজ টিউটরকে প্রচন্ড জ্যাম ঠেলে,ঘাম ঝরিয়ে,টাকা খরচ করে,ঝড় বৃষ্টি মাথায় নিয়ে বাসায় গিয়ে পড়াতে হয়। 2500/3000 টাকা সম্মানির অর্ধেক চলে যায় যাওয়া আসায়।

# অন্য লেভেলের হাউজ টিউটরঃ

আমার পরিচিত অসংখ্য হাউজ টিউটর আছে যাদের শিডিউল পাওয়া বিখ্যাত সব ডাক্তারদের সিরিয়াল পাওয়ার চেয়েও কঠিন। আর তাদের চাহিদা এতো বেশি যে শুনলে যে কেউ অবিশ্বাস করবে। আমি এমন অসংখ্য হাউজ টিউটরকে চিনি যারা মাসে 25000 থেকে শুরু করে 40 হাজার টাকা অব্দি নিয়ে থাকে এবং কোন ভাবেই সপ্তাহে 3 দিনের বেশি পড়ায় না। শুধু তাই নয় তাদেরকে বাসা থেকে গাড়ি দিয়ে নিয়ে আসতে হয় আবার দিয়ে আসতে হয়। ধরুন একজন অভিভাবক তার সন্তানকে পড়াবে বলে ওই শিক্ষকদের ওই পরিমান টাকা দিতে রাজি আছে এবং গাড়িও দিতে রাজি আছে তার পরও তাদের কাছে সন্তানকে পড়াতে পারে না দুটো কারণে। প্রথমত সেই শিক্ষকরা যে কোন স্কুল বা কলেজের ছেলে মেয়েকে পড়ায় না। দ্বিতীয়ত তাদের প্রতি অভিভাবকদের এতো বেশি আগ্রহ যে তারা পড়ানোর সময় পায় না। তাদের অলরেডি শিডিউল বুকড হয়ে থাকে। 

আবার এমন টিচারও আছে (জাষ্ট স্টুডেন্ট) যারা কারো বাসায় গিয়ে পড়ায় না বরং ছাত্র ছাত্রীকেই তার বাসায় গিয়ে পড়ে আসতে হয়। সে ক্ষেত্রেও প্রতি সাবজেক্ট 5000 টাকা করে নিয়ে থাকে।

আমার মতে প্রথম শ্রেণীর অভিভাবক এবং এই দ্বিতীয় শ্রেণীর হাউজ টিউটর একই ক্যাটাগরির। এক শ্রেণী শিক্ষকের পরিশ্রমের সঠিক মর্যাদা দিতে পারে না আরেক শ্রেণী অভিভাবকদের টাকা পয়সা তাদের বাজার মূল্য চড়া বিবেচনায় লুটে নেয়। এতো বেশি যেমন বেতন হওয়া কোন ভাবেই যুক্তিযুক্ত নয় ঠিক তেমনি ভাবে 1500/2500 টাকা হওয়াও কোন ভাবেই যুক্তিযুক্ত নয় বলে আমি মনে করি।

হাউজ টিউটরের বেতন (সর্ব নিম্ন ক্লাস অনুযায়ী) অন্তত 4000 টাকার কম কোন ভাবেই হওয়া উচিত নয় এবং সেটা 15000 টাকা বেশিও হওয়া উচিৎ নয়। অন্যদিকে যদি 3 দিনের বদলে আরও বেশিদিন পড়াতে হয় তাহলে বেতনের পরিমান আনুপাতিক হারে বাড়ানো উচিত। একই সাথে যদি ছাত্র ছাত্রী আরও উপরের ক্লাসের হয় এবং অনেক গুলো বিষয় পড়াতে হয় তাহলেও বেতন আনুপাতিক হারে বাড়ানো উচিত। এক সম্মানিত অভিভাবক বলেছেন সাবজেক্ট প্রতি 100 থেকে 150 টাকা হারে হওয়া উচিৎ। যেমন কেউ তিন সাবজেক্ট পড়বে মাসে 16 দিন। তাহলে 100*3=300*16= 4800 টাকা। এভাবে হিসেব করলে রাইট জাজমেন্ট হবে বলে তারা মনে করেন। 

এই লেখাটি যারা পড়ছেন অভিভাবক বা  হাউজ টিউটর যেই হোন সম্ভব হলে আপনার গুরুত্বপুর্ন মতামত দিবেন। এই লেখাটি দ্বারা কোন ভাবেই আমি কাউকে ছোট করতে চাইছি না বা কাউকে বড় করতে চাইছি না। আমার নিজের যেমন বাচ্চা নেই তেমনি আমি নিজেও টিউশন করি না। সেই অর্থে বাচ্চাদেরকে কম টাকায় পড়াতে পারলে আমার কোন লাভও নেই ক্ষতিও নেই। পাশাপাশি কোন টিচার যদি পড়িয়ে অনেক বেশি টাকা পায় তাতেও আমার কোন লাভ নেই,ক্ষতিও নেই। আমি লেখাটি দিয়ে একটি বাস্তব বিষয় তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি। ধন্যবাদ।

–জাজাফী

28 জুন 2021