গ্রামের স্মৃতি

ছোটবেলার কথা মনে পড়লো। বাবাকে দেখতাম হাট থেকে ইলিশ মাছের ভাগ কিনে আনতেন। বাবার সাথে হাটে গিয়ে দেখেছি একটি বড় ইলিশ কেটে টুকরা গুলো কয়েক ভাগ করা হতো। তার পর প্রতি ভাগের দাম সমান রাখা হত। যার যে ভাগ পছন্দ সে নিয়ে নিতো। এখনকার মত যদিও তখন ইলিশের দাম এতো টাকা ছিলো না কিন্তু তখন মানুষের আয়ও সীমিত ছিলো। অধিকাংশ পরিবার একটি আস্ত ইলিশ কেনার ক্ষমতা রাখতো না তাই তারা ভাগে ইলিশ কিনতো। পরিবারের সবাই হয়তো ইলিশের পেটি খেতে চায় কিন্তু ভাগে কেনার দরুন এতোগুলো পেটি জুটতো না। ফলে একবারের ইলিশের পেটি যারা খেতো পারের বার ইলিশ আনলে তাদের আর পেটি খাওয়া হতো না। পেটির বিপরীত অংশকে বলা হতো গাদার মাছ। মানে ইলিশের বডিকে দুটো অংশে ভাগ করে পেটের অংশকে পেটি আর পিঠের অংশকে গাদা বলে খুলনা অঞ্চলের কিছু কিছু এলাকায়।

ইলিশের মাথা এবং লেজে প্রচুর কাটা থাকে। এবং ইলিশের কাটা খুব একটা সহজ কাটা নয়। ফলে দেখতাম অনেকেই লেজ এবং মাথা খেতে চাইতো না। তখন যেহেতু মাছ ভাগে কেনা হতো তাই মাথাটাও অন্তত দুই ভাগ হয়ে যেত। আমি ছোট বেলা থেকে লেজ এবং মাথা দুটোই সময়ে সময়ে ভাগে পেতাম। পেটি এবং গাদাও ভাগে পেতাম। তবে লেজ এবং মাথা খেতে খেতে এক সময় মাছের কাটা শুদ্ধ খাওয়া শুরু করলাম। অভ্যাস হয়ে যাওয়ার পর আজ অব্দি ছোট,বড়,মাঝারি কোন মাছের কোন কাটাই আর ফেলা হয় না। সবটাই খেয়ে ফেলি। অনেকেই বলে মাছের কাটা খাওয়া ভালো আবার অনেকে বলে খারাপ। আমি ওসব কখনো ভেবে দেখিনি।

এখনতো পানির অভাব। আমি যখন ছোট ছিলাম (ব্রিটিশ আমলের কাছাকাছি সময়ে!!!) তখন মাঠে ঘাটে পানি থৈ থৈ করতো। উঠোন পেরোলেই পানি আর পানি। আমাদের বাড়ির পুর্ব পার্শ্বে যে বড় মাঠ আছে সেখানে ধান চাষ হয়। পাশাপাশি মৌসুম অনুযায়ি পাটও চাষ হয়। আমি দেখেছি সেই সব ধানের জমিতে পুটি,বেলে,ট্যাংরা,কই সহ নানা পদের দেশী মাছ পাওয়া যেতো। অনেকেই মাছ ধরতো বিভিন্ন ধরনের জাল পেতে। আমার বাবাও মাছ ধরতেন আমি সাথে থাকতাম। বড়শি দিয়েও মাঝে মাঝে মাছ ধরেছি তবে আমার বড়শিতে খুব কমই মাছ উঠতো। আমাদের গ্রামে কোন নদী নেই। গ্রামের খুব কাছেও কোন নদী নেই। তবে গ্রামের পাশ দিয়ে একটি খাল আছে। সেই খালেও প্রচুর মাছ হতো। বাবাকে দেখতাম সেই খালে খ্যাপলা জাল দিয়ে মাছ মারতে। অনেকে হয়তো খ্যাপলা জাল জিনিসটা কি সেটাই জানে না। বাবা নিজ হাতে জাল বুনতেন। আামার বাবা এতো কিছু পারতেন যে আমি বাবাকে দেখে তখন মুগ্ধ না হলেও এখন মুগ্ধ হই আর ভাবি আমার বাবা কত্ত কিছু পারেন।

মাছ ধরার সময় বাবার পাশে পাশে থাকতাম এবং মাছগুলো খালোই নামে বাশের কঞ্চি সরু করে কেটে তৈরি একটি পাতিলে রাখতাম।বাবা জাল নিজে বুনতেন এবং আমাদের একটি পুরোনো ভিটে বাড়ি ছিলো যেখানে আমার দাদার বাবারা বাস করতেন সেখানে অনেক গাব গাছ ছিলো। বাবা সেই গাব গাছ থেকে গাব ছিড়ে এনে কুচি কুচি করে একটি চাড়িতে রাখতেন। চাড়ি হলো মাটি দিয়ে তৈরি বড় রকম একটি পাতিল যেটায় সাধারণত ধান সিদ্ধ করার জন্য ধান ভিজিয়ে রাখা হতো। এখনকার দিনে যারা গরুর খামারে গিয়েছে তারা দেখবে গরুকে খাবার খেতে দেওয়ার জন্য এক ধরনের পাতিল বানানো হয় ইট সিমেন্ট দিয়ে ঠিক সেরকম। আরও সহজে বলতে গেলে অনেকটা বেসিনের সিংকের মত তবে সেটা রাউন্ড হতো। সেটাতে গাব গুলো কুচি কুচি করে কেটে তাতে পানি দিয়ে তার মাঝে জাল ভিজিয়ে কিছুক্ষণ পর উঠিয়ে রোদে শুকাতে দেওয়া হতো। এতে করে জালের সুতা গুলো মজবুত হতো।

আমাদের বাড়িতে যে সব কাঠের দরজা,জানালা,পালংক,চেয়ার,টেবিল আছে তার সবই বাবার নিজ হাতে বানানো। তখনতো এতো আধুনিক প্রযুক্তি ছিলো না। হাতে বাটাল দিয়ে হাতুড়ি পিটা করে নকশা করা হতো। নিজেরাই একরকম রোলার তৈরি করে তার দুই ধারে কাঠ পেরেকে ঢুকিয়ে রশি বেধে সামনে পিছনে করলে সেটা ঘুরতো আর সেখানে বাটাল( এক ধরনের কাঠ মিস্ত্রীদের অস্ত্র) ধরে ডিজাইন করা হতো। আমি সেই রশি ধরে টানার কাজ করতাম। সেই সময়ে বাবা আমাকে একটা মোবাইল কিনে দিয়েছিলেন। তাতে ভিজিএ ক্যামেরা ছিলো। সেটা দিয়ে ভিডিও করতাম সেই সব দৃশ্য।

আমার বাবা খুব ভালো ঘুড়ি বানাতে পারেন। আমাদের গ্রামে ঘুড়িকে চিলে বলা হয়। কত রকম ঘুড়ি যে হতো আজ সেসবের নামও ভুলে গেছি। এখনো দুই চার গ্রামের বাচ্চারা,কিশোর কিশোরীরা বাবার কাছে আব্দার নিয়ে আসে ঘুড়ি বানিয়ে দেওয়ার। বাবা সেটা আনন্দের সাথে তৈরি করে দেন। হরেক রকম ঘুড়ি। তবে এখন এই আধুনিক কালে দেখি সেই সব ঘুড়ি আর চলে না। আমাদের গ্রামে কয়েকজনের বাড়িতে এক ধরনের গাছ ছিলো যার ফল পাকলেই ফলের মধ্যে আঠা হতো। সেই গাছের নাম বলা গাছ। আমাদের অঞ্চলে বলা গাছই বলা হতো। ফলগুলো ছোট ছোট বলের মত কিংবা অনেকটা আঙ্গুরের মত। সেটার মধ্যে প্রাকৃতিক আঠা হতো। আরেকটা গাছ আছে যার নাম কচা গাছ। এই গাছের ডালের জয়েন্টের অংশ থেকে আঠা বের হতো।আজকে আমার এই লেখা যারা পড়ছে তাদের অনেকে হয়তো এই সব কিছুর অনেক কিছু জীবনে কোন দিন দেখেনি এমনকি শোনেও নি। তাদের জন্য যতটা সম্ভব ছবি দিতে চেষ্টা করছি।

আমি যখন ছোট ছিলাম তখন কোন দিন বৈশাখী মেলা দেখিনি। অন্যান্য মেলা দেখেছি বিশেষ করে ঘোড় দৌড় মেলা, লাঠি খেলার মেলা, নৌকা বাইচ মেলা।সবচেয়ে ভালো লাগতো নৌকা বাইচ। এক একটা নৌকা অনেক লম্বা। সেগুলোর কোন কোনটিতে ৫০ জন মানুষ চড়তো এবং বৈঠা ধরতো। সে এক অপুর্ব দৃশ্য। তবে অবাক হতাম ঘোড় দৌড়ের মেলা দেখে। ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চারা ঘোড়ার পিঠে চড়ে এতো দ্রুত ঘোড়া ছুটাতো যে ভয়ে পিলে চমকে উঠতো। তখনতো ইতিহাসের বীর ঘোড় সওয়ারিদের নামও শুনিনি। এখন কেবলই মনে হয় গ্রামের মেলায় দশ বছরের ছোট্ট ছেলেটি যে গতিতে ঘোড়া ছুটাতো তা দেখলে মহাবীর আলেকজান্ডারও অবাক হতেন। সাধারণত মেলায় গিয়ে আমি মিষ্টি খেতাম,ভিউ কার্ড কিনতাম, নাগরদোলায় চড়তাম,আর এক পাতার ক্যালেন্ডার কিনতাম যেখানে তাজমহল সহ কত কিছুর ছবি থাকতো। তখনতো বুঝতাম না যে তাজমহল আসলে কী।

লেখাটা শুরু করেছিলাম মাছ নিয়ে কিন্তু লেখাটা হুট করে কোথা থেকে মোড় নিয়ে কোথায় চলে আসলো। যারা কোন দিন গ্রামে যায়নি কিংবা যাদের জন্ম শহরে তারা অনেক কিছুই হয়তো কোনদিন শোনেও নি। এখনতো দিন যাচ্ছে আর গ্রামও শহর হয়ে যাচ্ছে। গ্রাম শহর হওয়া মোটেও ভালো কথা নয়।

আমার বেশ মনে আছে আমি যখন নানা বাড়িতে যেতাম কোন উপলক্ষ্য নিয়ে তখন নানা বাড়ির বাইরের অংশ যেটাকে ওই এলাকায় খোলেন বলে যা একটা দ্বিতীয় উঠান হিসেবে পরিচিত সেখানে পাটি বিছিয়ে খোলা আকাশের নিচে গরম কালে একসাথে দশ পনের জন ঘুমাতাম। অনেক গল্প হতো, আকাশে জ্বলজ্বল করতে থাকা চাঁদ দেখতাম, তারা দেখতাম। ঈদ বা মেলা উপলক্ষ্যে বড়রা তখন আমাদের হরিণের ছবিওয়ালা এক টাকার নোট দিতেন অথবা দোয়েলের ছবিওয়ালা দুইটাকার নতুন নোট দিতেন। তাতেই আমরা অনেক খুশি হয়ে যেতাম।

এখন যখন গ্রামে যাই তখন গ্রামেও ওয়াইফাই কানেকশন পাই! ডিশ লাইন পাই, এবং অন্যান্য সব সুযোগ সুবিধা পাই কিন্তু আগেকার সেই আনন্দ আর পাইনা। তখন আমরা দাড়িয়া বান্ধা,গোল্লাছুট,সাত চাড়া আরও কত রকম খেলা খেলতাম সেগুলোর নামও ভুলে গেছি। এখনো যে গ্রামে ছোটরা নেই তা নয় কিন্তু সেই সব খেলা নেই। ওরাও শহরের মানুষের মত সেসবের নাম জানে না। এখন মাঠে ঘাটে পানি নেই,সেই সব সুস্বাদু মাছ নেই। ছোট ছোট বাচ্চারা এখন মোবাইলে পাবজি খেলে,ফ্রী ফায়ার খেলে। দেখে মনেই হয় না ওরা গ্রামের ছেলে। গ্রামকে গ্রামের মত থাকতে দেওয়া উচিত। বিদ্যুৎ,পাকা রাস্তা হোক কিন্তু গ্রামের বাকি সব ঠিক থাকুক। শহরের মানুষদেরও উচিৎ মাঝে মাঝে গ্রামে গিয়ে ছোটদেরকে গ্রাম দেখানো।

এখন আর বাবা হাটে গিয়ে মাছের ভাগ কিনতে পারেন না। কারণ হাটে এখন কেউ মাছের ভাগ বিক্রি করে না। যে কিনতে পারে না সে মোটেই কেনে না আর যারা কেনে তারা কেজি কেজি কেনে। কদিন আগে লিখেছিলাম ১৫ বছর পর বোধহয় তালের রস খেলাম। খেজুরের রসতো খাইনা আরও অনেক দিন। এবারও খেতে পারিনি। এক জীবনে আর কোন দিন খেতে পারবো কিনা তাওতো জানি না। এখনতো তাল খেজুর গাছ কমতে কমতে শুন্যের কোটায় নেমে এসেছে। এগুলোর চারা লাগানো দরকার।

আমাদের গ্রামের বাড়িতে প্রায় ১৫ রকম ফলের গাছ আছে। আাম,জাম,কাঠাল,লিচু,পেয়ারা,আমড়া,কামরাঙ্গা,জামরুল,আশফল,লেবু,সফেদা,আতা,তলা,জাম্বুরা (ছোলম) সহ আরও কি কি যেন আছে মনে পড়ছে না। ফলের গাছ এখন আর লাগায় না। মা দেখলাম দুটো বাগান করেছেন দুটোই মেহগনি গাছ দিয়ে ভরপুর। মার লাগানো মেহগনি গাছ গুলি বেশ বড় হয়েছে। হয়তো কয়েক বছর পর বিক্রি করলে কোন কোনটি ৫০ হাজার টাকায়ও বিক্রি হবে। হিসেব করলে দেখা যায় এভারেজে ২০ হাজার টাকা করে হলেও কয়েক কোটি টাকার গাছ হবে।

তবে গাছ লাগানো দরকার শহর এবং শহরতলীতে। পরিবেশ দুষণ সবথেকে বেশি হয় শহরে। অথচ সেই জায়গাতেই গাছ লাগানো হয় না বরং যা দুই চারটা আছে তাও কেটে ফেলা হয়। আধুনিকায়নের নাম করে সর্বনাশের পথে হাটছি আমরা। সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের গাছ কাটা হলো,আমরা প্রতিবাদ করলাম কিন্তু কিছুতেই কিছু হলো না। এখন সবাই সেটা ভুলে গেছে। বর্ষার এই সময়ে আসুন বেশি করে গাছ লাগাই। শুধু তাই নয় যেখানে পানি আছে সেখানেই দেশি মাছের পোনা ছাড়ি। এই বাংলা আবার ভরে উঠুক ফল ও ফসলে,মাছে ভাগে বাঙ্গালী কথাটি আবার নতুন রুপে ফিরে আসুক।

–জাজাফী

১৫ জুন ২০২১