কোন বিষয়েই অতিরিক্ত আসক্তি ভালো নয়

কোন বিষয়েই অতিরিক্ত আসক্তি ভালো কথা নয়। চাই সেটা নেশা দ্রব্য হোক বা অন্য যে কোন কিছু। আসক্তি যখন চরম পর্যায়ে চলে যায় তখন মানুষের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। মানুষ এমন এক জীব যাদের নেশা শুধু মাত্র মাদকদ্রব্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এক সময় মনে করা হতো মাদকদ্রব্যই একমাত্র নেশার জন্ম দেয় এবং সেই নেশা থেকে সমাজে নানাবিধ সমস্যা সৃষ্টি হয়।আধুনিক বিশ্বে এই ধারণা আমুল বদলে দিয়েছে প্রযুক্তি, এমনকি খেলাধুলা। আসক্তি বাড়ছে মোবাইলে,ইন্টারনেটে,গেমসে,টিকটকে,সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।এবং এই আসক্তি ছেলে- বুড়ো, কিশোর-কিশোরী সবাইকে নাকাল করে দিচ্ছে। আমরা যদি গত কয়েক বছরের চিত্র তুলে আনি তাহলে স্পষ্টই দেখা যাবে পাবজি,ফ্রী ফায়ার সহ নানাবিধ অনলাইন গেমে আসক্ত হয়ে পড়েছে নানা বয়সী ছেলে মেয়ে। এবং এই আসক্তির পরিমান এতোটাই বেড়ে গিয়েছে যে তারা হিতাহিত জ্ঞান শুন্য হয়ে যে কোন অন্যায় কাজ করতেও দ্বিধা করছে না। বাড়ছে ডার্ক ওয়েবে অবাধ বিচরণ। জড়িয়ে পড়ছে নানাবিধ অপরাধে। মাদকের ভয়াল থাবা তাদের গ্রাস করে নিচ্ছে। 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকের মাধ্যমে অনেকে প্রতারণার পথ বেছে নিচ্ছে। লাইকি,টিকটক ভিডিও বানানোর নামে বেহায়াপনা যেমন বেড়েছে তেমনি নারী ও শিশু নির্যাতন,পাচার বেড়েছে ঢের। এর সবই সামাজিক অবক্ষয়। গেমস খেলার টাকা চেয়ে না পেয়ে অনেকে বাবা মায়ের মানিব্যাগ,পার্স থেকে টাকা সরাচ্ছে যা তাদের নৈতিক অবক্ষয়ের চূড়ান্তে পৌছে দিচ্ছে। কেউ কেউ বাবা মা বা অন্যদের ক্রেডিট কার্ড থেকেও তথ্য চুরি করে টাকা নষ্ট করছে। এর বাইরে আছে ফ্যান ফলোয়ার বিষয়ক আসক্তি। 
আমি যখন এই লেখাটি লিখছি তখন বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ফুটবলের দুটি জনপ্রিয় আসর চলছে। একটি ইউরো কাপ, অন্যটি কোপা আমেরিকা। ইউরো কাপ নিয়ে আগ্রহের পরিমান অনেক থাকলেও সেটি কোন কালেই বাড়াবাড়ি পর্যায়ে যায় নি। কিন্তু আমাদের দেশে কোপা আমেরিকা এবং বিশ্বকাপ ফুটবল হলে সেটা ভয়াবহ পর্যায়ে পৌছে যায়। এই দেশে বিভিন্ন দেশের সমর্থক থাকলেও মূলত ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনার সমর্থক বেশি। কোন দলের সমর্থক কম আর কোনটার বেশি সেই তর্কে যেতে চাই না। কিন্তু ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের এদেশীয় সিংহভাগ সমর্থকই পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে। এমনকি আপন দুই ভাইয়ের মধ্যেও মারামারি, খুনো খুনি বাধিয়ে দেয় এই দুই দলের খেলা। সারাদেশে কোপা আমেরিকা কাপে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মধ্যে অসংখ্য অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। অনেকেই হতাহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। ফুটবল বা কোন কিছুর প্রতি কতটা আসক্তি জন্মালে ভিনদেশী দলের খেলা নিয়ে মানুষ এতোটা মাতামাতি করতে পারে যার দরুন নিজেদের মধ্যে খুনোখুনি রক্তারক্তি ঘটাতে পারে।

আমার ধারণা আমাদের দেশের মানুষের রক্তেই দোষ মিশে আছে। আমি ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি এই দেশে রাজনৈতিক দলের সমর্থকরা দলের নানা বিষয়ে বিরোধীদের সাথে খুনোখুনিতেও জড়িয়ে পড়তে দ্বিধা করে না। অথচ বোকার দল কখনো ভেবেও দেখে না যে তারা যাদের জন্য বিবাদ করে তারা এসব কিছুর অনেক বাইরে অবস্থান করে। একই গ্রামের দুই রাজনৈতিক দলের সমর্থকদের মধ্যে মারামারি হয়ে হতাহত হওয়ার ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। তার পর তারা হাসপাতালে যায়,ভুরি ভুরি টাকা খরচ করে। আবার এক সময় মিটমাট হয়ে যায়। ক্ষতি যা হওয়ার তা কিন্তু কেবল মাত্র তাদেরই হয়। তারা যাদের সমর্থন করে এই সব নেক্কারজনক ঘটনার জন্ম দেয় সেই মানুষদের এতে কিছুই যায় আসে না। এমনকি কেউ মারা গেলেও তাদের চোখে পানি আসবে না। একই ভাবে ফুটবলে ব্রাজিল আর্জেন্টিনার সমর্থন করে এই যে খুনোখুনি রক্তারক্তি এর কোন খবর অব্দি ব্রাজিল আর্জেন্টিনাতে পৌছাবে না। মেসি,নেইমারতো দূরের কথা ওই দেশের কারো কানেই পৌছাবে না। হতে পারে বাংলাদেশে অবস্থিত দুই দেশের দূতাবাসে ইংরেজী পত্রিকা এবং টিভিতে সংবাদ দেখানো হলে হয়তো দূতাবাসের কর্মকর্তাদের চোখে পড়তেও পারে আবার নাও পারে। তাহলে কী লাভ এই খুনোখুনি,রক্তারক্তি করে? ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনা যেই জিতুক না কেন বা হারুক না কেন তাদে হাজার হাজার মাইল দূরে অবস্থিত বাংলাদেশের এই সব সমর্থকদের কোন লাভও হবে না ক্ষতিও হবে না। তার পরও ভালোলাগা ভালোবাসা থেকে একটি দল সমর্থন করা যেতেই পারে কিন্তু সেই সমর্থন করতে গিয়ে রক্তারক্তি খুনোখুনি কোন ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। খুব সহজে ফুটবল দিয়েই ফুটবলকে বিচার করা যেতে পারে। ক্লাব ফুটবল খুব জনপ্রিয়। অনেকেই বার্সেলোনা,রিয়ালমাদ্রিদ,বায়ার্নমিউনিখ,চেলসি সহ কোন না কোন দল সমর্থন করেন। প্রতিনিয়ত সেই সব দলের কেউ না কেউ পরাজিত হয় কেউ না কেউ জয়ী হয়। এই সব ক্লাস ফুটবল যারা সমর্থন করেন তাদের মধ্য থেকেইতো ব্রাজিল আর্জেন্টিনার সমর্থক উঠে আসে। তাহলে ক্লাব ফুটবলের জয় পরাজয় যদি তাদের কখনো উসকে না দেয় তবে ব্রাজিল আর্জেন্টিনা ম্যাচ বা তার ফলাফল কেন এতোটা মার মুখী করে তোলে? শুধু তাই নয় এই দেশে অন্যান্য দলের সমর্থকওতো আছে। তারাতো কখনো মারমুখী আচরণ করে না। ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা দুই দলের এক বিরাট অংশ সমর্থক আসলে অসভ্য। আর এ কারণেই তারা অসভ্যের মত আচরণ করে।

কথা থেকে কথা আসে। আপনি যখন কাউকে খোঁচা দিয়ে কথা বলবেন সে কতক্ষণ আর চুপ থাকবে। সেও একসময় উত্তর দিবে। কথায় কথা বাড়ে। এবং এই কথা বাড়তে বাড়তে কথার গরমে শরীর গরম হয়ে মেজাজ গরম হয়ে যায়। সেটা তখন আর স্বাভাবিক পর্যায়ে থাকে না। শুরু হয় অপ্রীতিকর ঘটনা। মারামারি হানাহানি। যে ফুটবল সমর্থন করে দুই পয়সারও উপকার নেই বরং নানা ভাবে ক্ষতি আছে তা এভাবে অন্ধের মত সমর্থন করা তাদেরই সাজে যারা বাস্তবজ্ঞান বিবর্জিত। আমি বলছি না সমর্থন করা ছেড়ে দিতে তবে আমি বলতে চাই এই অন্ধ সমর্থনের কোন মানে হয় না। যা কিছু ক্ষতির কারণ তা অবশ্যই পরিত্যাগ করা উচিত। কিন্তু কে শোনে কার কথা। আনন্দের জন্য পাবজি,ফ্রী ফায়ার সহ বিভিন্ন গেমস খেলা যেতেই পারে কিন্তু তার একটি লিমিট থাকতে হবে। গেম যখন আনন্দের পরিবর্তে নেশা হয়ে দাড়ায় এবং টাকা পয়সা নষ্ট হতে শুরু করে তখন তা কোন ভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।একই ভাবে হাসি মশকরা বা মজা করার জন্য লাইকি টিকটক করা হয়। কিন্তু সেটি এখন দিন দিন এমন পর্যায়ে চলে যাচ্ছে যা সামাজিক অবক্ষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। 

8 জুলাই 2021