আমার সাধাণ বাবার গল্প

সবার কাছে তার বাবাই সেরা বাবা।তবে কেউ কেউ নানা কারণে বাবাকে পছন্দ করে না। অনেকে নিজেদের আব্দার বাবার কাছে করার পর বাবা সেগুলো পুরণ করতে পারেনা বলে বাবাকে অপছন্দ করে। অথচ তারা জানেই না যে সব বাবাই চেষ্টা করে সন্তানের সব সখ,আব্দার পূরণ করতে। কিন্তু সবার পক্ষে তা সম্ভব হয় না। আমার বাবা সেরা কি না তা নিয়ে আমি কখনো ভেবে দেখিনি। তবে আমার বাবা খুব ভালো বাবা। বাবা যখন বেশ ছোট তখন বাবা তার এক বন্ধুকে পড়ালেখার জন্য খরচ দিতেন। টাকা বাচিয়ে,মা বাবার কাছ থেকে নিয়ে বাবা তার সেই বন্ধুকে পড়াশোনার খরচ দিতেন। বাবার সেই বন্ধু ছিলেন বাবার চেয়ে ছোট। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমার জন্মের অনেক আগে পাশ করে বেরিয়েছেন। বাবা তখনো তাকে পড়াশোনার জন্য সহযোগিতা করতেন। আবার বাবা বোধহয় সেই থেকেই ছোটদেরকে অত্যন্ত স্নেহ করেন। এখনো ছোটরা বাবাকে ঘিরে থাকে। কারো ঘুড়ি বানানোর দরকার হলে যেমন বাবার কাছে এসে আবদার করে তেমনি পড়াশোনা বিষয়েও বাবা তাদের হেল্প করে। আমার বাবা শিক্ষক হিসেবে শুধু নিজের দিন পার করেন নি বরং তিনি ক্রমাগত ভাবে নিজেকে ছাড়িয়ে যেতে চেষ্টা করেছেন। ছোটবেলায় সেসব বুঝতাম না কিন্তু এখন ভেবে অবাক হই আমার বাবা এতো কিছু জানেন। 

আমাদের বাড়িতে যে দরজা,জানালা,চেয়ার,টেবিল,আলনা,পালঙ্ক আছে তার সবই বাবার নিজ হাতে বানানো। আমার বাবা কাঠ মিস্ত্রি ছিলেন না কিন্তু তার ছিলো কাঠ মিস্ত্রির সব ইন্সট্রুমেন্ট। সেই ছোট বেলায় বাবা যখন বাড়ির আসবাব তৈরি করতেন তখন আমি ছিলাম বাবার যোগালে বা হেল্পার। হাতুড়ি,র‌্যাদা আরও কত কি দিয়ে কাজ করতে হতো। আমাদের শহরে কোন বাড়ি ছিলো না। গ্রামেই বাবা ছোট খাট একটি বাড়ি করেছেন। তখনকার সময়ে চারদিকে বর্ষায় অনেক পানি জমতো। বাড়ির উঠোন বাদে সবখানে থৈ থৈ করা পানি থাকতো। সেই পানিতে নানা প্রকার দেশী মাছ জন্মাতো এবং বেড়ে উঠতো। এখনতো পানিও নেই মাছও নেই। সেই সময়ে বাবা মাছ ধরতেন। বাবা বর্ষা শুরুর বেশ আগে থেকে নিজ হাতে খ্যাপলা জাল তৈরি করতেন। তার পর গাবের পানিতে সেই জাল ভিজিয়ে সুতো শক্ত করতেন। বাবার দেখাদেখি আমিও তখন জাল বুনা শিখেছিলাম। 

বাবা যখন জাল দিয়ে মাছ ধরতে যেতেন আমিও সাথে যেতাম। আমার হাতে থাকতো খালোই। বাঁশের কঞ্চি চিকন করে কেটে তৈরি করা এক প্রকার পাতিলের নাম খালোই। সেটাও বাবা নিজ হাতে তৈরি করতেন। এছাড়া বাবা বাশের কঞ্চি দিয়ে ঝুড়ি বানাতেন,পাটখড়ি দিয়ে বেড়া বানাতেন। এমনকি আমাদের বাড়িতে যে রান্না ঘরে ছনের চালা ছিলো সেটাও বাবা নিজে করতেন। আমার দায়িত্ব ছিলো দুটো। বাবার হাতের ছনের আটি শেষ হয়ে গেলে নিচ থেকে আটি ছুড়ে উপরে তুলে দেওয়া আর একটা বাশের চিকন লাঠির মত ছিলো যেটাকে বলা হয় নাড়াই। সেটির মাথা সুচালো ছিলো অনেকটা বল্লমের মত যার মাথায় ছিদ্র থাকতো সুচের মত। ঘরের ভিতরে দাড়িয়ে ফাকে ফাকে খোচা মেরে সেই নাড়াইটা উপরে তুলে দিলে বাবা সেই নাড়াইয়ের ছিদ্রতে চিকন রশি ঢুকিয়ে দিতেন আমি নিচে টান দিতাম এবং নিচ থেকে বের করে খাচার অন্য প্রান্ত দিয়ে ঢুকিয়ে উপরে তুলে দিলে বাবা সেটা গেরো দিয়ে দিতেন। আমার বাবা পলো বানাতে পারতেন। আমি যে সব কথা লিখছি সেগুলোর অনেক গুলো এখন গুগলে সার্চ দিলে ছবি হিসেবে দেখা যাবে। পলো দিয়ে মূলত মাছ ধরা হতো। এটি বাশের চিকন সরু পাত তৈরি করে বানানো হতো। অনেকটা মাটির কলসের মত। পার্থক্য শুধু কলসের নিচের অংশ বন্ধ থাকে কিন্তু পলোর নিচে ফাকা থাকে। উপরের অংশ্ও ফাকা থাকে। সেটা পানির মধ্যে ঝপকের নামিয়ে দিয়ে উপর দিয়ে ভিতরে হাতড়ে মাছ ধরা হয়। আমিও ধরতাম সুযোগ পেলে।

কিছু গরু আছে যা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং গলায় সাধারণ ভাবে রশি বাধলে তাকে আটকে রাখা যায় না। এমন গরুকে বশে রাখার জন্য মুহোলি নামে একরকম মুখের খাচা তৈরি করা হয় রশি দিয়ে। এই মুহোলি মূলত দুই রকম হয়। একটি বাশের কঞ্চি দিয়ে বানানো হয় অনেকটা ছোট বাটির মত যা মুখে বেধে দিলে গরু কোন খাবার খেতে পারে না আরেকটি রশি দিয়ে তৈরি হয় যা মুখের ফাকা যায়গা দিয়ে বাধা থাকে অনেকটা ঘোড়ার লাগামের মত। এর ফলে গরু যত শক্তিশালীই হোক না কেন তা কন্ট্রোল করা যায়। এই জিনিষটা বানাতে এমন কিছু গেরো দিতে হয়,প্যাচ দিতে হয় যা সত্যিই কঠিন। আমি দেখেছি আশে পাশে দুই চার গ্রাম থেকে লোকেরা বাবার কাছে আসতো এটা তৈরি করতে। বাবা হাসি মুখে তৈরি করে দিতেন। বাবা খুব ভালো ঘুড়ি বানাতে পারেন। দূর দূরান্ত থেকে লোক আসতো বাবার কাছে ঘুড়ি বানাতে। এখন অবশ্য গ্রামে ঘুড়ি ওড়ানো হয় খুব কম। বাবা এখনো ঘুড়ি বানান তবে ছোটদের জন্য। এখনতো ছোটরাও আর ঘুড়ি ওড়ায় না বরং তারা মোবাইলে গেমস খেলে।

আমার বাবা খুব সৌখিন মানুষ। সাধ্যের মধ্যে নতুন কিছু চোখে পড়লেই কিনতেন। এখনকার ছেলে মেয়েরা যা চোখেও দেখেনি আমরা সেই সময়েও সেসব ব্যবহার করেছি। আমার বাবার জীবনের অনেকটা সময় নারায়নগঞ্জে কেটেছে। সেখানে তিনি অনেক ছাত্র পড়াতেন। বাবা খুব ঘুরতে ভালোবাসেন। আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগেই বাবা আমাকে দেশের 46 টি জেলা ঘুরিয়ে দেখিয়েছেন। এখনো সুযোগ পেলেই বাবা ঘুরতে বেরিয়ে পড়েন। কখনো কখনো বাবা নিজেই ড্রাইভ করেন আবার কখনো কখনো ড্রাইভার সাথে নিয়ে ঘুরতে যান। এই যেমন আমি এখনো পদ্মা সেতু দেখিনি কিন্তু বাবা ঠিকই মাকে নিয়ে পদ্মা সেতু দেখে এসেছেন। যখন যমুনা সেতু উদ্বোধন হয়েছিল বাবা আমাকে সাথে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমি যা কিছু শিখেছি তার অধিকাংশই বাবার কাছ থেকে শিখেছি। এই যে ছোটদের সাথে আমার এতো ভালো সম্পর্ক এই গুনটা মূলত বাবার কাছ থেকে পাওয়া। বাবার সাথে এখনো ছোটদের দারুণ সম্পর্ক। আমার বেশ মনে পড়ে সাতার সেখার ঘটনাটি। আমি তখন বেশ ছোট। আমাদের বড় একটি পুকুর ছিলো বাবা সেখানে গোসল করতেন। আমি বায়না ধরতাম। এমন একটি দিনে বাবা আমাকে হাতে তুলে পাড় থেকে বেশ খানিকটা ভিতরে ছুড়ে মারলেন। আমি বেশ খানিকটা পানি খেয়ে ফেললাম এবং ডুবে যাওয়া থেকে বাচার জন্য হাত পা ছুড়তে লাগলাম। বাবা জানতেন কতটুকু সময়ের মধ্যে আমাকে ধরতে হবে। তিনি ধরলেন। আমার সাহস বেড়ে গেলো। বাবার হাত ধরে সাতারটাও খুব অল্প দিনে শিখে ফেললাম। সাইকেল চালানো,গাছে চড়া সবটাই বাবার কাছ থেকে শিখেছি। আমি বাবাকে ছোট বেলা থেকেই অনেক ভয় পাই,এখনো ভয় পাই। বাবার কথার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পাইনা। ফেসবুকে বাবা যে সব পোষ্ট শেয়ার করেন সব কাস্টমাইজড আকারে শেয়ার করেন। শুধু তার লিস্টের বন্ধুরাই দেখতে পায়। বাবার প্রতিটি পোষ্টের লাইক কমেন্ট সংখ্যা আমার পাবলিক আকারে শেয়ার করা পোষ্টের কয়েক গুন বেশি।

আমার বাবা খুবই অমায়িক। তিনি আমাদের অনেক যন্ত্রণা হাসি মুখে সহ্য করেন। আমাকে কখনো বলেন নি যে আমাকে ডাক্তার  ইঞ্জিনিয়ার,পাইলট বা নির্দিষ্ট কোন কিছু হতে হবে। আমার বেশ মনে পড়ে বাবা আমাকে কিছু টাকা দিয়ে বলেছিলেন যাও যেখানে খুশি পড়ো। তবে আমার যতটুকু সম্মান আছে তা যেন না কমে। তুমি আমার সম্মান বাড়াতে পারো বা না পারো সম্মান যেন না কমে। আমি বাবার সেই একটি কথার উপর এখনো চলতে চেষ্টা করি। বাবা আমার কোন সখ অপূরনীয় রাখেন নি। অবশ্য আমি অহেতুক কোন আব্দার করেছি বলেও মনে পড়ে না। বাবাকে আমি ভালোবাসি খুব। চেষ্টা করি বাবাকে যথাসাধ্য সহযোগিতা করতে। আমার বাবা অন্য বাবাদের চেয়ে অনেক আলাদা। আমি যখন খুব ছোট তখন বাবা প্রচুর সিগারেট খেতেন। প্রতিদিন এক দুই প্যাকেট লাগতো। বড়দের মুখে শুনেছি একবার বাবার এক বন্ধু আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। বাবার সাথে বসে তিনি সিগারেট খাচ্ছিলেন। এমন সময় আমি গিয়ে বলেছিলাম বাবা আমাকেও দাও আমিও খাবো। এটা শুনে বাবার মনের মধ্যে কী ভাব তৈরি হয়েছিল জানিনা তার পর আর কোন দিন বাবা সিগারেট খান নি।তবে বাবা পান খেতে পছন্দ করতেন। 

বেশ কিছুদিন হলো স্কীন সমস্যায় ভুগছেন বলে ডাক্তারের নিষেধে পান খাওয়াও ছেড়ে দিয়েছেন। তবে চা কফি এখনো পান করতে ভালোবাসেন। স্কীন সমস্যার কারণে বাবাকে এখন সব সময় চামচ দিয়ে খেতে হয়।আমার বাবা গাড়ি চালাতে খুব ভালোবাসেন। লোন নিয়ে গাড়ি কিনেছিলেন। এখন অবশ্য পুরো লোন শোধ করে ফেলেছেন। বাবার সাথে আমি যখন গাড়িতে চড়ি তখন মাঝে মাঝে একটু বিরক্ত লাগে কারণ বাবা খুব হর্ণ বাজান। সামনে থেকে কোন গাড়ি আসতে দেখলেও হর্ণ বাজান যদিও দুজনই দুজনকে দেখতে পাচ্ছে এবং পাশে পর্যাপ্ত জায়গা আছে। আমি জীবনে একদিনই গাড়ি চালিয়েছি তাও বাবার জোরাজুরিতে। বাবার লাইসেন্স থাকলেও আমার কোথাও শেখাও হয়নি লাইসেন্সও করা হয়নি।

বাবার কারো সাথে কোন বিবাদ নেই। দল মত নির্বিশেষে বাবা সবার সাথে মেশেন। সবাই বাবাকে সম্মান করেন। আমার বাবা যাদের কাছে পড়াশোনা করেছেন আমিও তাদের কাছে পড়াশোনা করেছি। আমার বাবার প্রিয় খাবারের মধ্যে গরুর মাংস অন্যতম তবে স্কীন সমস্যার কারণে গরুর মাংস খেতে পারেন না। তবে তার পরও কখনো কখনো খেতে চেষ্টা করেন । কোরবানীর সময় বাবা নিজ হাতে গরু কোরবানী করেন,জবেহ করেন এবং নিজ হাতে চামড়া ছাড়িয়ে মাংস কাটেন। বাবার দেখা দেখি আমিও শিখেছিলাম এটা। মনে পড়ে  একবার আমার খুব ইচ্ছে হলো দেশের সবচেয়ে বড় ঈদগাহ শোলাকিয়াতে ঈদের নামাজ পড়বো। বাবাকে বলতেই বাবা রাজি হয়ে গেলেন। সেটা ছিলো কোরবানীর ঈদ। কিশোরগঞ্জে আমার অনেক বন্ধু ছিলো তার মধ্যে আবুল বাশার নামে এক বন্ধুর বাড়িয়ে গিয়ে উঠলাম। ওরা গরু কোরবানী দিয়েছিল আমি নিজে ওদেরকে গরুর চামড়া ছড়াতে এবং গোস্ত কাটতে সাহায্য করেছিলাম।

বাবা দিবসকে সামনে রেখে যখন আমাকে বলা হলো একটি লেখা লিখে দিতে তখন ঝাপি থেকে যা মনে আসলো লিখে ফেললাম। আমার কাছে নির্দিষ্ট কোন দিন নয় বরং প্রতিটি দিনই বাবা দিবস। বাবাকে আমি ভালোবাসি,শ্রদ্ধা করি। বাবার সাথে ভালো সম্পর্ক থাকলেও আমরা বাবাকে আপনি আপনি করে সম্মোধন করি। ছোট বেলা বাবা আমাকে তুই বলে সম্মোধন করতেন এখন বড় হয়েছি বলে বাবা আমাকে তুমি বলে সম্মোধন করেন। তবে খুব ছোটবেলার কথা জানিনা কিন্তু মোটামুটি 10 বছর বা তার কিছু বেশি বয়স হওয়ার পর থেকে যতটা মনে করতে পারি তাতে বাবাকে বুকে জড়িয়ে ধরা হয়নি। এই বিষয়টি আমার মনের মধ্যে অনেক তোলপাড় করতো। দু বছর আগে ঈদের নামাজের সময় মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম বাবার সাথে কোলাকুলি করবো। সেটাই ছিলো জ্ঞান হবার পর বাবার সাথে প্রথম বুকে বুক মেলানো।দিন শেষে এই হলো আমার প্রিয় বাবা। বাবা দিবসে পৃথিবীর সব বাবাকে শ্রদ্ধা,ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা জানাচ্ছি।

–জাজাফী

16 জুন 2021

www,zazafee.com